আত্ম-বিশ্লেষণ - মূলসূত্র : সাংখ্য দর্শন।
এক :
আমরা একটু ভালো থাকার জন্য কত কিছুই না করি। তথাপি সারাক্ষন একটা ভয়ে ভয়ে থাকি। এই বুঝি শরীর খারাপ করলো। এই বুঝি জীবনের অন্তিম দিন ঘনিয়ে এলো। আর বেঁচে থাকবার জন্য সোনার তরী এই স্থূল শরীরটাকে সুস্থ-সবল রাখবার জন্য কতই না কসরত করি। সকাল-বিকেল প্রাণায়াম ইত্যাদি করি। পরিমিত আহার করি, পুষ্টিকর খাবার খাই। তথাপি ভয় যায় না। শারীরিক অসুস্থতায় ডাক্তারের কাছে, কবিরাজের কাছে ছুটে যাই। মনের শান্তির জন্য গুরুদেবের কাছে যাই, তান্ত্রিকের কাছে যাই। জড়িবুটি খাই, তান্ত্রিক ক্রিয়া করি, যাগযজ্ঞ করি। তথাপি দুঃখ দূর হয় না।
মরণের পরে কি হবে, তা নিয়ে সারাক্ষন আতঙ্কিত হয়ে থাকি। তাই সারা গায়ে (গলায়, হাতে, মাথায়) রুদ্রাক্ষের মালা ধারণ করি। শুনেছি রুদ্রাক্ষ ধারণকারীকে স্বয়ং শিব ঠাকুর রক্ষা করে থাকেন। মৃত্যুর পরে রুদ্রাক্ষ ধারণকারীকে স্বয়ং শিব তাঁর শিবলোকে নিয়ে যান। তুলসীর মালা পড়ি। শুনেছি তুলসী মালাধারীকে স্বয়ং বিষ্ণু তার বিষ্ণুলোকে নিয়ে যান। পুজো পাঠ করি। জপ-ধ্যান করি। ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করি। কিন্তু ভয় যেন কিছুতেই আমাকে ছেড়ে যেতে চায় না। মৃত্যুর পরে কোথায় যাবো, তা জানি না। মৃত্যুর পরের জগৎ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে এক মহাত্মা বলেছিলেন, সেটা নাকি একটা স্বপের জগৎ। মৃত্যুর পরে আমরা সবাই নাকি সেই স্বপ্নের জগতে বাস করি। আর এই স্বপ্নের জগৎ নাকি, পার্থিব জগতের অনুরূপই একটা জগৎ। সেখানে নাকি এই জগতের সব কিছুই আছে। সেখানে আমাদের স্থূল শরীর থাকে না, কিন্তু সূক্ষ্ম শরীর বা একটা মানসিক শরীর থাকে। এমনকি যারা অতীতে মারা গিয়েছেন, তারাও নাকি সেখানে সূক্ষ্ম শরীরে আছে। কিন্তু আমি তো স্বপ্নের মধ্যে নানান ভয়ংকর দৃশ্যের সম্মুখীন হই। স্বপ্নের মধ্যেও আমি ভয়ে ভয়ে থাকি। স্বপ্নে আমি এক অজানা ভীতিপ্রদ জগতের মধ্যে প্রবেশ করি। আর সেখান থেকে ফিরে আসবার রাস্তা হারিয়ে ফেলি। নিজেকে অসহায় লাগে। স্বপ্নের মধ্যে আমি পরীক্ষার আতঙ্কে থাকি। কিঁছুতেই পড়া শেষ করতে পারি না। স্বপ্নের জগতেও আমার অফিসে দেরি হয়ে যায়। স্বপ্নের জগৎ একটা আতঙ্কের জগৎ। স্বপ্ন ভেঙে গেলে আমি স্বস্তি ফিরে পাই। তাহলে কি আমি মৃত্যুর পরে এই দুঃস্বপ্নের জীবনে প্রবেশ করবো ? সারাক্ষন ছাইপাশ এই সব দুশ্চিন্তা ঘিরে থাকে। আর আমি ভয়ে ভয়ে থাকি।
যদিও এই বোধ আমার দৃঢ় হয়েছে, যে এই শরীরটা আমি নোই, এই শরীরটা আমার। আমি এই শরীরকে আশ্রয় করে কালাতিপাত করছি মাত্র । কিন্তু কথা হচ্ছে, এই স্থূল শরীর ছেড়ে যাবার পরে আমার কি গতি হবে, তা আমি জানিনা। আমার এও ধারণা হয়েছে, যে এই স্থূল শরীর ছেড়ে যাবার পরে আমাকে একটা সূক্ষ্ম শরীরের আশ্রয়ে থাকতে হবে। সেই শরীরটার নাম হচ্ছে মনোময় শরীর। আর এই মনোময় শরীরে আমাকে সমস্ত সুখ-দুঃখ ভোগ করতে হবে। কিন্তু তার পরে কি হবে ? আর কতদিনই বা আমাকে সেই মনোময় সূক্ষ্ম শরীরে থাকতে হবে, আর একটা আতঙ্কের জীবন অতিবাহিত করতে হবে, তা আমি জানি না। বরং বলা যেতে পারে, এটা ভেবে আমি ভয় পাই, এই যে স্থূল শরীরে আমি আছি, তা কিছু কালের মধ্যেই কালের গতির সঙ্গে সঙ্গে পচনশীল পদার্থে পরিণত হবে। হয়তো অগ্নিতে দাহ হবার কারনে কয়েক ঘন্টার মধ্যে শরীরের গতি হবে পঞ্চভূতে। অর্থাৎ এই শরীর পঞ্চভূতে মিশে যাবে। এখনই, এই বৃদ্ধাবস্থায়, শরীরের কিছু কিছু অঙ্গ অকেজো বা কমজোরি হয়ে পড়েছে। এর পরে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই একটা সময় আসবে যখন শরীর স্থবির হয়ে যাবে। শরীর তখন কর্ম্ম করবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে, চলাফেরার অযোগ্য হয়ে যাবে, চোখের দৃষ্টি আবছা হয়ে আসবে, শ্রবণশক্তি হারিয়ে যাবে, চোখের সামনে থেকে এই সুন্দর পৃথিবীটা হারিয়ে যাবে। শ্রবণশক্তি হারিয়ে যাবে,আমি হয়তো আর এই পৃথিবীর গান শুনতে পাবো না। হয়তো একটা মনোময় শরীরের সঙ্গে মনোময় জগতে প্রবেশ করবো, যে শরীর সূক্ষ্ম কিন্তু ব্যক্ত। যার সমস্ত অস্তিত্ত্ব থেকেও নেই। যেমনটা আমাদের স্বপ্নের জগতে হয়ে থাকে। স্বপ্নকালীন অবস্থায়, যেমন স্বপ্নের জগতকে সত্য বলে মনে হয় মাত্র, কিন্তু সত্য হচ্ছে এই স্বপ্নের জগতের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই, কোনো অস্তিত্ত্ব নেই। আর তা কেবলমাত্র স্বপ্ন থেকে বা ঘুম থেকে জেগে উঠে টের পাই।
যাই হোক, আমি সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকি। ভয় আমাদের মাকড়সার জালের মতো ঘিরে থাকে। এই ভয়ের জাল, আতঙ্কের জাল কেটে আমি বেরুতে পারি না। এক দমবন্ধ করা অবস্থা। আমি কেবল অসহায় হয়ে, ধীরে ধীরে অবশ হয়ে যাই। জ্ঞান হারাই। এখান থেকে বেরুবো কি করে ? এই অবস্থা থেকে বেরুবার তাগিদ আমাকে সব অশরীরী মহাত্মাদের আশ্রয় গ্রহণ করে। তাদের কথা শুনবার জন্য মনের মধ্যে একটা ব্যাকুলতা বোধ করতে থাকি। আর এই ব্যাকুলতাই আমাকে সাংখ্য দর্শনের সম্মুখীন করে দেয়। আমি অদ্ভুত এই দর্শনের মধ্যে প্রবেশ করি।
সাংখ্য দর্শনের একটা ছোট্ট কারিকা পুস্তিকা আছে। যার লেখক হচ্ছেন ঈশ্বর কৃষ্ণ। এই ছোট্টো পুস্তিকায় মাত্র ৭২টি শ্লোক। কারিকা কথাটার অভিধান গত অর্থ সাংকেতিক ভাষা। অর্থাৎ স্বল্পাক্ষর বৃত্তি দ্বারা অনেকার্থ জ্ঞাপিকা কবিতা। এই শ্লোকগুলো আমাকে আত্মবিশ্লেষনের সুযোগ করে দিলো। সেই কথাগুলোই আজ আমি লিপিবদ্ধ করবার জন্য সচেষ্ট হয়েছি।
সাংখ্য (সাঙ্খ্য) - বলা হয়, এটি আসলে প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিক কপিলমুনি দ্বারা রচিত পচিঁশ সংখ্যক তত্ত্বমূলক দর্শনশাস্ত্র। একে কাপিল বা কপিল দর্শনও বলা হয়ে থাকে। এই পঁচিশটি তত্ত্ব হচ্ছে পুরুষ, প্রকৃতি, মহৎ (বুদ্ধি), অহঙ্কার, সূক্ষ্মপঞ্চভূত (শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ), স্থূল পঞ্চভূত (ক্ষিতি, অপ, তেজঃ, মরুৎ, ব্যোম) পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ন, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক) পঞ্চ কর্ম্মেন্দ্রিয় (হস্ত, পদ, বাক, পায়ু, উপস্থ) ও একটি অন্তর-ইন্দ্রিয় অর্থাৎ মন এই পঁচিশটি তত্ত্বের দর্শনশাস্ত্র। কেউ কেউ বলে থাকেন, সাংখ্য কথাটার অর্থ হচ্ছে "সাং" অর্থাৎ যথাযথ, "খ্য" অর্থাৎ জানা বা জ্ঞাত হওয়া। অর্থাৎ যথাযথ ভাবে জ্ঞাত হওয়ার গ্রন্থ বা দর্শনশাস্ত্র। এখন কথা হচ্ছে যথাযথ ভাবে কাকে জানা ? যথাযথভাবে এই সৃষ্টিকে জানা, আর এইভাবে নিজেকে, নিজের প্রকৃতিকে যথাযথ ভাবে জানা যায় যে গ্রন্থ থেকে তাকেই বলা হচ্ছে সাংখ্য দর্শন। আত্মদর্শন হয়ে থাকে এই দর্শন শাস্ত্র থেকে। আসলে এটি একটি বিচারমূলক গ্রন্থ। বিচারের সাহায্যে এই সৃষ্টিকে, স্রষ্টাকে, এমনকি নিজের স্বরূপকে চিনবার, জানবার এক জ্ঞানগর্ভ আলোচনার ইঙ্গিত আছে এই গ্রন্থে। "ইঙ্গিত" বলার অর্থ হচ্ছে, আমাদের প্রাচীন ঋষিগণ তাঁদের উপলব্ধি-জাত জ্ঞান সূত্রের আকারে অর্থাৎ অতি সংক্ষেপে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। সূত্র অর্থাৎ ইঙ্গিত মাত্র। সেখান থেকে মূল সূত্রের ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ ব্যাখ্যাকারীর জ্ঞান বা উপলব্ধি অনুযায়ী করে থাকেন। আর এই সব উচ্চ জ্ঞানাধিকারীর শব্দচয়ন এতটাই দুর্বোধ্য বা বহুমাত্রিক হয়, যে এর যথাযথ অর্থ নিরুপন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমনই একজন কারিকার হচ্ছেন, ঈশ্বর কৃষ্ণ। আমরা এই ঈশ্বর কৃষ্ণের কারিকা থেকে বুঝবার চেষ্টা করবো সাংখ্য দর্শন।
যখন কেউ ত্রিবিধ দুঃখের সম্মুখীন হয়, তখন তার মধ্যে দুঃখের হেতু ও দুঃখত্রানের উপায় সম্পর্কে প্রশ্ন জাগে। এই হচ্ছে কারিকার সূচনা। দুঃখ থেকে রেহাই পাবো কি করে ? এই প্রশ্ন ও তার উত্তরের সন্ধান আদিম যুগ থেকে প্রতিটি জীবের মধ্যে উৎসারিত হচ্ছে। আজও সেই প্রবাহ চলছে।
দুঃখত্রানের (উপশমের) উপায় সম্পর্কে সাধারনতঃ যে উপায়গুলোর কথা বলা হয়, তা আসলে শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া মাত্র। উৎকৃষ্ট উপায় হচ্ছে ব্যক্ত প্রকৃতি, অব্যক্ত প্রকৃতি ও জ্ঞাতা এই তিন সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান। আসলে যত ধর্ম্মগ্রন্থ, পুরান, দর্শনাদি আমরা দেখতে পাই তার সবই জগতে শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ের কথা বলেছেন। ঠিক তেমনি সাংখ্য দর্শনিকগণও জগতের দুঃখের কারনে অনুসন্ধান করেছেন এবং তাত্ত্বিক জ্ঞান দান করেছেন। সাংখ্য মতে সমস্ত দুঃখের কারন হচ্ছে আমাদের অজ্ঞানতা। আমাদের ভ্রমাত্মক জ্ঞান। এই অজ্ঞানতা ও ভ্রমাত্মক জ্ঞান দূর করতে পারলেই, শান্তি যা আমাদের সহজাত, তা লাভ করতে পারবো।
আমরা যখন শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ পড়ছিলাম, তখন দেখেছিলাম, এই উপনিষদ শুরু হয়েছে কয়েকটা প্রশ্ন দিয়ে আর তা হচ্ছে এই জগতের কারন কি বা কে ? আমরা কোথা থেকে এসেছি ? সৃষ্টির পরে কে আমাদের পালন করে থাকেন ? মৃত্যুর পর আমরা কোথায় যাবো ? তখন আমাদের কি অবস্থা হবে ? কার কারনে আমরা সুখ দুঃখ ভোগ করি ?
সাংখ্য দার্শনিক বলছেন, বলছে, সৃষ্টি স্থিতি ও লয়ের মূল কারন জানতে গেলে প্রকৃতির মুলে যেতে হবে। অব্যক্ত অবিকৃত মূল প্রকৃতির মধ্যে প্রবেশ করতে হবে।
সাংখ্য দর্শন দ্বৈতবাদে বিশ্বাসী। অর্থাৎ সৃষ্টি স্থিতি লয় বা জন্ম জীবন মৃত্যু এই তিন কার্য্য সম্পাদিত হচ্ছে যখন দুটো শক্তি একত্রিত হচ্ছে। কথায় বলে এক হাতে তালি বাজে না। নারী ও পুরুষের মৈথুনে জন্ম নেয় মাতা-পিতার অনুরূপ আরো একটি দেহ। অর্থাৎ সৃষ্টি মাত্রই দুয়ের সম্মেলনে প্রকাশিত সত্ত্বা। যখন দুটো শক্তি পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়, তখন শব্দব্রহ্ম-এর সৃষ্টি হয়। সাংখ্য দর্শন এই দুটো শক্তিকে নাম দিয়েছেন পুরুষ ও প্রকৃতি।
অদ্বৈত বাদীগণ অবশ্য বলছেন, এই যে প্রকাশময় বিশ্ব তা আসলে একই সত্য থেকে উদ্ভূত। সত্য এক, সত্য কখনও দুই হতে পারে না। আর এই একই সত্য থেকে ব্রহ্মান্ডের সমস্ত কিছু উদ্ভূত, আবার প্রলয়কালে সেই একই সত্যের মধ্যে লয় প্রাপ্ত হয়ে থাকে। সেই একই সত্য বহুরূপে প্রতিভাত হচ্ছে, এবং শেষে সেই সত্যের মধ্যে প্রবেশ করছে।
সাংখ্য দর্শন বলছে, প্রকৃতি ও পুরুষের মিলনেই এই ব্রহ্মান্ড প্রকাশমান হয়েছে। এই যে পুরুষের কথা বলছেন, তা হচ্ছে শুদ্ধ চৈতন্য। এই শুদ্ধ চৈতন্যই সমস্ত কিছুর দ্রষ্টা ও জ্ঞাতা কিন্তু অক্রিয়। অর্থাৎ শুদ্ধ চৈতন্যের মধ্যে কোনো ক্রিয়া সংগঠিত হয় না। "পু" কথাটার অর্থ পূরণ করা। তো যিনি পূরণ করেন, তিনি পুরুষ। আবার "পুর" কথাটার অর্থ হচ্ছে শরীর। "বস" অর্থাৎ বাস করা। যিনি শরীরে বাস করেন। অর্থাৎ দেহী বা আত্মা। এই পুরুষ হচ্ছেন সৃষ্টির মূল চৈতন্যময় ঈশ্বর। তো পুরুষ সত্ত্বা হচ্ছে অক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় সত্ত্বা যা সৃষ্টির সমস্ত কিছুর মধ্যে দ্রষ্টা স্বরূপ হয়ে অবস্থান করছেন। ইনিই একমাত্র জ্ঞাতা।
সাংখ্য দর্শন আরো একটা কথা বলছেন, আর তা হচ্ছে প্রকৃতি যা ক্রিয়াশীল, বা ক্রিয়াশক্তি। "প্রকৃ" অর্থাৎ করা। যারদ্বারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যাবতীয় পদার্থ সৃষ্টি হয়েছে। এটি চৈতন্যময় পুরুষের ঠিক বিপরীত একটা অজ্ঞানময় জড় সত্ত্বা। তো একটা জড় সত্ত্বা আরেকটি হচ্ছে শুদ্ধ চৈতন্য। এই দুয়ের মিলনে প্রকাশমান হয়েছে এই বিশ্বব্রহ্মান্ড। একটু অন্যভাবে বললে বলতে হয়, একটা জ্ঞানময় সত্ত্বা আর একটা অজ্ঞানময়। একটা ক্রিয়াশীল আর একটা নিষ্ক্রিয়। একটা স্থির আর একটা গতিশীল। দৃশ্যমান ত্রিগুণাত্বক এই যে জগৎ এর আদি কারন হচ্ছে প্রকৃতি। আমরা জানি, নিরাকার গুণাতীত ব্রহ্ম ত্রিগুণাত্বক রূপে সাকার - সত্ত্ব রজঃ তমঃ।
সাংখ্য দর্শন দ্বৈতবাদের প্রতিষ্ঠাতা। অর্থাৎ সাংখ্য দর্শন পুরুষ ও প্রকৃতি দুটি সত্তাকে সমান গুরুত্ত্ব দিয়ে থাকে। এখন কথা হচ্ছে দুই হাত না হলে তালি বাজে না, নারী-পুরুষ এই দুইয়ের মিলন না হলে সন্তানের জন্ম হয় না, এটা যেমন সত্য, তেমনি এই যে দুটো হাত এটা কোনো বৃহৎ সত্ত্বা বা সমগ্র শরীরের অংশ মাত্র। আবার এই যে বৃহৎ সত্তা বা শরীর এটি দুই ভাগে বিভক্ত অর্থাৎ এর মধ্যে যেমন আছে হাড্ডি-রক্ত মাংস তেমনি আছে এরই মধ্যে একটা সূক্ষ্ম শরীর অর্থাৎ মন যা এই হাত দুটোকে একত্রিত হতে প্রেরণা যোগাচ্ছে। এই প্রেরণার ফলেই হাত দুটো মিলিত হচ্ছে ও একটা শব্দ তরঙ্গের সৃষ্টি করছে। আমরা যদি আরও একটু গভীরে যাই, তবে বুঝতে পারবো শুধু মন বা হাত এই শব্দ সৃষ্টি করছে না, এর মধ্যে আরো একটা জিনিস হচ্ছে ইচ্ছে বা ইচ্ছেশক্তি। যতক্ষন মনের মধ্যে ইচ্ছেশক্তির প্রবেশ না ঘটছে, ততক্ষন না মন ক্রিয়াশীল হচ্ছে, না হাত ক্রিয়াশীল হচ্ছে। তো সূক্ষ্ম মন-শরীর ও স্থূল অন্ন-শরীর এবং ইচ্ছেশক্তি এই তিনে মিলে এই শব্দ তরঙ্গের সৃষ্টি করছে। তো হাতের পিছনে আছে মন ও ইচ্ছেশক্তি যা বাহ্য ভাবে দৃষ্টিগোচর নয়। কিন্তু হাতের ক্রিয়া আমাদের কাছে দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে। মনের ক্রিয়া বা ইচ্ছে শক্তির ক্রিয়া দৃষ্টি গোচর হয় না। তথাপি, এই সত্য আমরা উপলব্ধি করতে পারি।
সাংখ্য দর্শন ঈশ্বর বা সর্বশক্তিমান বলে কারুর অস্তিত্ত্ব সম্পর্কে নির্বিকার। ঈশ্বর থাকুন বা না থাকুন, ব্রহ্মান্ডের সমস্ত কিছুর মধ্যে গুরুত্ত্বপূর্ন হচ্ছে এই পুরুষ বা চৈতন্য সত্ত্বা ও প্রকৃতি বা অচেতন সত্ত্বা । এদের দুজনের অবর্তমানে না ব্রহ্মান্ড প্রকাশিত হতে পারে, না ব্রহ্মান্ড ক্রিয়াশীল হতে পারে। হাত ছাড়া হাততালি হতে পারে না, আবার মন না চাইলেও হাত হাত-হাততালি দেবে না। ঈশ্বরবাদীগণ বলে থাকেন, মনের মধ্যে এই যে ইচ্ছেশক্তি যা মনকে উদ্ভুদ্ধ করছে হাততালি দিতে, একেই ঈশ্বর বলা যেতে পারে। তো তৃতীয় শক্তি সমস্ত কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এই তৃতীয় শক্তিকেই একেশ্বরবাদীগণ বলছেন ঈশ্বর।
আসলে মহাত্মা কপিল দুটো বাদেরই সমার্থক - এর মধ্যে একটা হচ্ছে সাংখ্য-প্রবচন সূত্র আর একটি হচ্ছে তত্ত্ব- সমাস প্রবচন সূত্র। মহামুনি কপিলের সেই প্রবচন কোনোটিই আর হয়তো পাওয়া যায় না। কেবল তার অনুসরণকারীরা এই সম্পর্কে যা কিছু লিখে গেছেন, তার কিছু কিছু এখনও পাওয়া যায়। অর্থাৎ সাংখ্য প্রবচন থেকে প্রাপ্ত তত্ত্বকথা ব্যাখ্যাকারী তার নিজের মতো করে লিখে গেছেন। দেখুন একটা হচ্ছে তত্ত্বকথা। আর একটা হচ্ছে তার ব্যবহারিক প্রয়োগ। ঋষি পতঞ্জলি সাংখ্য তত্ত্বকথাকে কিভাবে ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগ করতে হবে তার উপায় সুনির্দিষ্টভাবে লিখে গেছেন, তার "যোগদর্শন" বইতে। আবার এই সাংখ্য দর্শনের অর্থাৎ নিরীশ্বর বাদের প্রভাব দেখতে পাই আমরা বৌদ্ধ সাহিত্য। অন্যদিকে ঈশ্বরবাদ বা একেশ্বর বাদের প্রভাব আছে আমাদের বেদান্তে।
যাইহোক, সাংখ্য দর্শন যেমন জগৎ উৎপত্তির ক্রোম হিসেবে পচিঁশটি তত্ত্বের কথা বলেছে, তেমনি ব্রহ্মজ্ঞান দান করেছেন। অর্থাৎ এই তত্ত্বকথা থেকে আমরা ধীরে ধীরে জগৎ উৎপত্তির মূল সেই প্রকৃতি থেকে শুরু করে পুরুষ অর্থাৎ শুদ্ধ চৈতন্য স্বরূপে উপস্থিত হতে পারি।
আমরা জানি সমস্ত কার্য্যের পিছনে একটা বা একাধিক কারন হয়ে থাকে। প্রকৃতির দুটো দিক , একটা ব্যক্ত আর-একটা অব্যক্ত। একটা আলো একটা অন্ধকার। একটা দিন আর একটা রাত্রি। যা কিছু আমরা দিনের বেলা চাক্ষুষ করি, তার সবই রাত্রি বেলাতে অন্ধকারে আমাদের চাক্ষুষ না হলেও বর্তমান থাকে। এই সত্য আমাদের সবার উপল্বদ্ধিতে আসে। তো ব্যক্ত জগৎ যদি কার্যফল হয় তবে কার্যের কারন স্বরূপ হচ্ছে অব্যক্ত জগৎ । সাংখ্য দর্শন বলছে, আমাদের চোখের সামনে যা কিছু দেখছি, তার সবই একসময় অব্যক্ত অবস্থায় বর্তমান ছিল। ঘটের কারন যেমন মাটি, তেমনি মাটির মধ্যে লুকিয়ে আছে অসংখ্য সম্ভাবনা। মাটি থেকে যেমন ঘট্ হতে পারে, তেমনি হাড়ি, কলসি গেলাস ইত্যাদি হতে পারে। অর্থাৎ কারনে মধ্যে লুকিয়ে আছে অসংখ্য সম্ভাবনা। আবার যা কিছু আমরা দেখছি, সেটি শুধু কার্য্য নয়, এই সবের মধ্যেই লুকিয়ে আছে অসংখ্য সম্ভাবনা বা কারন । পাথরের টুকরোর মধ্যে আছে শিব, আছে কৃষ্ণ আছে বানর। শিল্পীর মনের মধ্যে যে চিত্র আঁকা হয়, ধীরে ধীরে তা এই পাথরের টুকরোর মধ্যে ফুটে ওঠে। একটা সন্তান যখন জন্ম নেয়, সেই সন্তানের মধ্যেও অসংখ্য সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে, যা ভবিষ্যতে প্রকাশিত হতে পারে। শুধু পরিবেশ ও পরিস্থিতি (নিমিত্ত কারন) সহায় হলেই, এই সম্ভাবনা নানানরূপে প্রকাশিত হতে পারে। আর পরিবর্তনশীল এই জগতে সব কিছুর মধ্যে সেই সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। আমরা যা কল্পনাও করতে পারি না। যা কিছু আমি আপনি দেখছি, তা কেবল একটি সময়ের জন্য, একটা মুহূর্তের জন্য, কেননা প্রকৃতির সমস্ত কিছুর মধ্যে পরিবর্তনের স্বভাব বর্তমান। আর এই পরিবর্তনের স্বভাবের কারণেই সে তার পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে। মূল বস্তু ধীরে ধীরে কালের গতিতে মিশ্র বস্তুতে পরিণত হয়। আর প্রত্যেক মিশ্র বস্তু ত্রিগুণের তারতম্যের কারনে ভিন্ন ভিন্ন স্বভাবের ভিন্ন ভিন্ন বস্তুর জন্ম দিয়ে থাকে।
মোদ্দা কথা হচ্ছে সাংখ্য দর্শন কোনো বস্তুর প্রকাশের পিছনে যে কারন আছে তার বিশ্লেষণ করেছেন। আবার কারনের যে কানুন (law of causes ) ও তার পরিণতি-জ্ঞান সমস্ত বিশ্বকে চকিত করছে। বিশ্বে কোনো কিছুই কারন বিহীন হতে পারে না। সবই নিয়মের অধীন। সূর্য তার নিজের অক্ষপথে কাল থেকে কালান্তর ধরে ঘুরেই চলেছে। এমনকি ঈশ্বরের যদি কোনো অস্তিত্ত্ব থাকে তবে জানবেন, তারও একটা কারন আছে। আবার আমরা যে সুখ-দুঃখ ভোগ করছি অর্থাৎ সুখ দুঃখের যদি কোনো অস্তিত্ত্ব থাকে তবে জানবেন তারও একটা কারন আছে। আমাদের কাজ হবে সেই সুখ-দুঃখের কারনের সন্ধান করা। আর যেহেতু জগতের সমস্ত বস্তুই মিশ্র অবস্থায় আছে, তাই যে কারনের কারনে এই সুখ-দুঃখের উপলব্ধি সেই কারন থেকে ভোক্তাকে সরিয়ে নিতে পারলেই, আমরা সুখ-দুঃখের পারে চলে যেতে পারবো। সাংখ্য দর্শন বলছে, তথাকথিত সুখ-দুঃখ যা আমাদের ভ্রমাত্মক জ্ঞান বা অজ্ঞান থেকে উপলব্ধি হয়ে থাকে, তার অপসারণ করতে পারলেই আমরা সুখ-দুঃখের পারে চলে যেতে পারি। শুধু সত্যজ্ঞান। সত্য কি তার জ্ঞান হলেই আমাদের সমস্ত দুঃখাদি দূর হতে পারে। আর এই অপসারণ-এর জ্ঞান দান করে সাংখ্য দর্শন।
আরো একটা কথা হচ্ছে এই যে প্রকৃতি তা ত্রিগুণাত্মক। প্রকৃতির সমস্ত বস্তুর মধ্যে নিহিত আছে তার গুন্ বা তিনটে গুন্ । গুণহীন কোনো বস্তু জগতে নেই। তা আমরা জানি আর না জানি। আর এই যে গুন্ তার সেই বস্তুর সঙ্গে অভেদ সম্পর্কযুক্ত হয়ে রয়েছে । ধীরে ধীরে আমরা কারণের সূত্র (সঙ্কেত) সম্পর্কে ঋষি কপিলদেবের কাছ থেকে শুনবো। চলবে। ...
হরি ওম তৎ সৎ।
--------------------
আত্ম-বিশ্লেষণ - মূলসূত্র : সাংখ্য দর্শন। ২
দুই
জগতের সমস্ত কার্য্যের পিছনে আছে এক বা একাধিক কারন। কারন ছাড়া কোনো কাজ এই জগত- ব্রহ্মাণ্ডে সংগঠিত হতে পারে না, হয় না। ব্যক্ত জগতের ক্ষেত্রে যেমন একথা সত্য, তেমনি অব্যক্ত জগৎ সম্পর্কেও এটি ধ্রুব সত্য। প্রতিটি কার্য্যের পিছনে একটা কারন আছে। আবার কার্য্যের ভিতরেও লুকিয়ে আছে কারন। তো কার্য্য ও কারন পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এরা এঁকে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। প্রতিটি বস্তুর মধ্যে তার ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে। কথায় বলে সমস্ত শিশুর মধ্যেই ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা। অতীতের পরিনাম বর্তমান হয়ে রয়েছে। আবার একই ঘটনা বা বস্তুর সঙ্গে অনেক কারন লুকিয়ে থাকে। আমি যে জন্ম গ্রহণ করেছি, তার একটা ক্রোম আছে। এই যে বৃদ্ধ দেহ এ একসময় যুবক ছিল, তার আগে কিশোর ছিল, তার আগে শিশু ছিল, তার আগে মাতৃগর্ভে ভ্রূণ আকারে ছিলো। তার আগে পিতার মধ্যে বীর্যকারে ছিলো। এই বীর্য একসময় রক্তের আকারে ছিলো. রক্ত একসময় অন্নের রসের মধ্যে ছিলো. অন্ন একসময় উদ্ভিদের মধ্যে ছিলো. উদ্ভিদ একসময় পৃথিবীর মধ্যে ছিলো. পৃথিবী একসময় জলের মধ্যে ছিলো, জল একসময় তেজের মধ্যে বা অগ্নির মধ্যে ছিলো, তেজ একসময় বায়ুর মধ্যে ছিলো, বায়ু একসময় আকাশের মধ্যে ছিলো.আকাশ একসময় হিরণ্যগর্ভের মধ্যে ছিলো। ওই যে আগে যা ছিলো তাকে আপনি কারন বলতে পারেন। আর আজ যা হয়েছেন, তা আসলে কার্য্য। এই কার্য্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে অসংখ্য সম্ভাবনা। অর্থাৎ ভবিষ্যতের ব্রহ্মান্ড লুকিয়ে আছে এই আজকের কার্য হিসেবে বা ভবিষ্যৎ কার্য্যের কারন হিসেবে বর্তমান প্রকট হয়ে রয়েছে।
আবার প্রত্যেক প্রকাশিত বস্তুর মধ্যেই প্রকাশ ও অপ্রকাশ লুকিয়ে আছে। আমার যেমন দশটি বহিরেন্দ্রিয় আছে তেমনি আছে অন্তরেন্দ্রিয়। আমার মধ্যে আছে বুদ্ধি, আমার মধ্যে আছে তেজঃশক্তি, ইচ্ছেশক্তি। এগুলো আমাদের উপল্বদ্ধিতে আসে, কিন্তু অন্যের কাছে গোচরীভূত হয় না। ঠিক তেমনি সমস্ত বস্তুর মধ্যে যেমন একটা বাহ্যিক দিক আছে যা আমাদের সকলের কাছে দৃশ্যমান তেমনি আছে কিঁছু অদৃশ্য শক্তি যা বাইরের থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু আছে। আমাদের সবার মধ্যে আছে বোধশক্তি যার জন্য আমার সুখ-দুঃখ, আনন্দ নিরানন্দ উপলব্ধি করি । এই যে উপলব্ধি এইযে বোধশক্তি এ কাউকে দেখানো য়ায় না, কিন্তু আছে - এসব দ্রুব সত্য। আমরা একে অস্বীকার করি না, করতে পারি না। এই যে বোধশক্তি বা চেতনশক্তি এর একটা আশ্রয় আছে। এই চেতনশক্তি যার আশ্রয়ে আছে তিনি চৈতন্য। এই চৈতন্যের দুটো ভাগ একজন দ্রষ্টা আরেকজন ভোক্তা। একটা পরমাত্মা, আরেকটা জীবাত্মা।
আমি যে সুখ-দুঃখ ভোগ করি, তা এই বোধশক্তির কারনে হয়ে থাকে। শরীরের কোনো অঙ্গ থেকে যখন এই বোধশক্তি স্তিমিত হয়ে যায়, তখন আমার আর কোনো শারীরিক সুখ-দুঃখ-বেদনা অনুভব হয় না। তেমনি মন থেকে যখন এই বোধশক্তি লোপ পায়, তখন আমার আর কোনো মানসিক সুখ-দুঃখ বোধ থাকে না। আসলে এই যে রক্তমাংসের শরীর , দশ ইন্দ্রিয়, মন বা বুদ্ধি এগুলো সবই হচ্ছে জড়। অন্ন বা খাদ্য থেকে সূক্ষ্ম অংশ নিয়ে যেমন শরীর পুষ্টিলাভ করে তেমনি এই অন্ন থেকেই গঠিত হয় মন বা বুদ্ধি । এসবই জড়পদার্থ। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ বুদ্ধির মানুষের কাছে এগুলো সহজে ধরা পড়ে না। যাইহোক, সাংখ্য মতে সমস্ত দ্রব্যের মূলগত একটা ঐক্য আছে। মূলত সবই এক। সমস্ত দ্রব্যই পরিনাম ক্রমে সবরকম (ভিন্ন ভিন্ন) দ্রব্য হতে পারে।
সাংখ্য দর্শন পৃথিবীর সবচেয়ে আদি-দর্শন। এই আদি দর্শন শাস্ত্র কারণকে দুভাগে ভাগ করেছে প্রথমত নিমিত্ত-কারন দ্বিতীয়ত উপাদান-কারন । বলা হয় নিমিত্ত বশত উপাদানের পরিনাম প্রাপ্ত অবস্থা হলো কার্য। বলা হচ্ছে, মূল কারন হলো প্রকৃতি। নিমিত্ত কারন হলো পুরুষ। এই পুরুষের সান্নিধ্য বশতঃ মূল উপাদান অর্থাৎ প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন পরিনাম প্রাপ্ত হয়ে এই বিষয় ব্রহ্মান্ড রূপে অভিব্যক্ত হয়েছে। তাই সাংখ্য দার্শনিকগণ বলে থাকেন, সব বস্তু থেকে সবকিছুই হতে পারে। জল, মাটি ইত্যাদি আদি পঞ্চভূত থেকে সমস্ত উদ্ভিদাদির সৃষ্টি হয়েছে আবার তা থেকে উদ্ভিদভোজী জঙ্গম প্রাণীদের সৃষ্টি হয়েছে। এই যে জঙ্গম প্রাণীদেহ আবার পরিণত হচ্ছে পঞ্চভূতে। সুতরাং আমরা সহজেই এটা বুঝতে পারি যে চক্রাকারে সব বস্তু থেকে সব বস্তু হতে পার। ঋষি বলছেন "সর্বং সর্বাত্মকম"
এই প্রসঙ্গে একটা গল্প বলি, শিরডির সাঁইবাবার নাম শুনে থাকবেন আপনারা। তাঁর কাছে একদিন এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত এসেছিলেন দেখা করতে। সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন, কিঁছু লাড্ডু। সাঁইবাবা সম্পর্কে তিনি অনেক প্রশংসাবাক্যঃ শুনেছেন। তিনি নাকি মস্ত সাধু। কেউ কেউ তাঁকে ভগবানের সাক্ষাৎ অবতার বলে থাকেন। তো ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, সাঁইবাবাকে বললেন, আপনার জন্য লাড্ডু নিয়ে এসেছি, আসুন একসাথে বসে আমরা লাড্ডু গ্রহণ করি। সাঁইবাবা বললেন, ঠিক আছে বসুন আমার কাছে চাপাটি (রুটি) আছে পেঁয়াজ আছে। আগে দুজনে বসে সেটা খেয়ে নিই, শেষে মিষ্টিমুখ করা যাবে। বলে দুটো পেঁয়াজের টুকরো, আর চারটে চাপাটি বের করে দুটো পন্ডিতের হাতে দিতেই, পণ্ডিত ব্রাহ্মণ ছিঃ ছিঃ করে উঠে দাঁড়ালেন। আর বলে উঠলেন, আমি শুনেছিলাম, আপনি একজন সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ। আপনি পেঁয়াজ খান ? এটা তো তামসিক খাবার। এসব খেলে শরীরে তামসিক গুনের বৃদ্ধি হয়ে থাকে। বলে পিছন ফিরে হাটা দিলেন। পিছন থেকে সাঁইবাবা ডাকলেন, বললেন, দয়া করে কিছু মুখে না দিয়ে যাবেন না, আপনার যা-তে অভিরুচি, আপনি বলুন তাই আপনাকে এনে দিচ্ছি। দয়া করে খালিমুখে আশ্রম থেকে যাবেন না। আপনি তো দুধ পান করবেন। একটু সবুর করুন, আমি আপনার দুধের ব্যবস্থা করছি। বলে কয়েকটা পেঁয়াজ নিয়ে চটকাতে লাগলেন। আর সবাই দেখলেন, পেঁয়াজের বাটি দুধে পরিপূর্ন হয়ে গেলো। বললেন, দয়া করে গ্রহণ করুন। পন্ডিত এবার হতবম্ব হয়ে গেলেন। এগিয়ে এসে সাঁইবাবার পায়ে আছড়ে পড়লেন। সাঁইবাবা বললেন, "সবকা মালিক এক হ্যায়।" এসব সত্যিই করা যায় কি না জানিনা। কিন্তু একথা সত্যি জগতের সবকিছুই সেই পঞ্চভূতের মিশ্রণ মাত্র। ত্রিগুণের মিশ্র অবস্থা মাত্র। পার্থক্য শুধু আকার, নাম ও গুনে। ত্রিগুণের মিশ্রনের তারতম্যের কারনে এমনটা হয়ে থাকে, একথা অস্বীকার করি কি করে ? উপাদান অর্থাৎ প্রকৃতির সান্নিধ্যে ভিন্নতা, আসলে তো সবই এক পুরুষ ব্রহ্ম ।
এখন কথা হচ্ছে কারণের মধ্যেই যদি সমস্ত কার্য্য লুকিয়ে থাকে, তবে কোন শক্তি তাকে কারন থেকে কার্য্যে পরিণত করছে ? এই শক্তিকে সাংখ্য দার্শনিকগণ বলছেন "নিমিত্ত" কারন। আপনি একে অনুঘটক বলতে পারেন। অর্থাৎ যে বস্তু নিজে অপরিবর্তিত থেকে অপর দ্রব্যের রাসায়নিক পরিবর্তন করতে পারে। একে আপনি যন্ত্রবিশেষ বলতে পারেন। আখ থেকে রস বার করবার যন্ত্র, বা সর্ষে থেকে তেল বের করবার যন্ত্র। আসলে যার মধ্যে যে সম্ভাবনা আছে, তাকে প্রকাশ্যে আনবার জন্য সাহায্যকারী। তো প্রথম হচ্ছে কারন, দ্বিতীয় হচ্ছে কার্য্য, তৃতীয় হচ্ছে কারন থেকে কার্য্যকে বের করে নিয়ে আসবার যন্ত্রবিশেষ, শক্তি বিশেষ বা অবস্থা বিশেষ।
একেই সাংখ্য দার্শনিকগণ বলছেন নিমিত্ত কারন। যদি আপনি দুধ থেকে মাখন বানাতে চান, তবে আপনাকে তবে আপনাকে বিশেষ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে এগুতে হবে। দুধ থেকে দই বা সর। দই বা সর থেকে মাখন। এখন যদি আপনার কাছে উপাদান-কারন যদি না থাকে অর্থাৎ দুধ বা সর বা দই যদি না থাকে তবে আপনি মাখন বানাতে পারবেন না। নিছক জল থেকে আপনি মাখনের প্রত্যাশা করতে পারেন না। আপনি যদি কাপড় বানাতে চান, তবে আপনাকে সুতোর সাহায্য নিতে হবে, আবার আপনি রেশমি কাপড় বানাতে চাইলে আপনাকে রেশম সংগ্রহ করতে হবে। অর্থাৎ আপনি যা চান তা পেতে গেলে, আপনাকে সঠিক উপাদানের সন্ধান করতে হবে। অর্থাৎ কাপড়ের মধ্যে মিশে আছে যে সুতো বা রেশম তা আপনাকে সংগ্রহ করতে হবে। এই যে সঠিক চয়ন অর্থাৎ সঠিক কাঁচামাল যা আপনার বাঞ্ছিত বস্তুর উপাদান তা আপনাকে সংগ্রহ করতে হবে। এবার আপনাকে কাপড় বোনার মেশিন জোগাড় করতে হবে। আপনি বাড়ি তৈরী করতে চাইলে, আপনাকে ইট, কাঠ পাথর, সংগ্রহ করতে হবে। রাজমিস্ত্রি সংগ্রহ করতে হবে অর্থাৎ যে শক্তি কার্য্যের প্রকাশের কারন, তাকে আপনার খুঁজে বের করতে হবে। এই শক্তিকে সাংখ্য দর্শন বলছে "শক্তি কারন।"
তো কারন-তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমরা কি পেলাম ? ১. কার্য্য, কারনে মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় আছে, তাকে আমাদের বুঝতে হবে, খুঁজে বের করতে হবে ২. এমন কোনো একটা শক্তি বা যন্ত্র প্রয়োজন যা এই প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ কারন থেকে কার্য্য প্রকাশ করবার জন্য সাহায্য করবে। ৩. কার্য্য ও কারনে মধ্যে যে সূত্র বাধা হয়ে রয়েছে তাকে দূর করতে হবে।
সাংখ্য দার্শনিকগণ আমাদেরকে আশ্বাস দিচ্ছেন, যে যদি আমরা কার্য্য-কারনের সম্পর্কটা ধরতে পারি - অর্থাৎ কি নিয়মে কারন থেকে কার্য্যের উৎপত্তি বা পরিণতি প্রাপ্ত হচ্ছে, তাকে যদি আমরা সম্যক রূপে উপলব্ধি করতে পারি, তবে আমাদের জীবনের সমস্ত সমস্যার বিশেষ করে মানসিক উত্তেজনা, অবসাদ, উদ্যমহীনতা, হতাশা, ইত্যাদি থেকে রেহাই পেতে পারি। যখন আমরা আশঙ্কায় ভুগি, যখন আমাদের মনের মধ্যে বিশৃঙ্খলতা আসে, যখন আমরা অনিশ্চয়তায় ভুগি, তখন যদি আমাদের মধ্যে কার্য্য-কারনে নিয়মের জ্ঞান থাকে, তবে পরিস্থিতির বিচার বিশ্লেষণ করে, আমরা মনকে শান্ত করতে পারি। প্রথম দিকে আমরা কার্য্যের মধ্যে কারন অনুসন্ধান করতে ব্যর্থ হই। তার কারন হচ্ছে, কার্য্যের মধ্যেই অব্যক্ত অবস্থায়, বা সুপ্ত অবস্থায় বিরাজ করছে কারন । অর্থাৎ কার্য্যের মধ্যেই কারন লুকিয়ে আছে। কিন্তু কার্য্য-কারন জ্ঞান না থাকার জন্য, তা আমরা ধরতে পারি না। তখন আমাদের সম্মুখে শুধু কার্য্যটাই প্রকাশিত হয়েছে। আর এই কার্য্যই আমাদের নজরে আসে। কার্য্যের মধ্যেই যে কারন অপ্রকাশিত অবস্থায় আছে, তা আমাদের বোধগম্য হয় না। তো আমাদের কাজ হচ্ছে কার্য্যের মধ্যে কারনে অনুসন্ধান বা কারনের মধ্যে কার্য্যের অনুসন্ধান।
একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হতে পারে। ধরুন, আপনার সাথে কারুর কথা কাটাকাটি হয়েছে, আপনাকে কেউ বাজে কথা বলেছে। এতে করে আপনার মনের মধ্যে ব্যাথার সৃষ্টি হয়েছে, আপনার মনে আঘাত লেগেছে, নিজেকে অপমানিত বোধ করেছেন । এখন রাতে শুতে যাবার আগে, এই নিয়ে আপনি ভাবছেন, যুক্তি দিয়ে, বিচার বুদ্ধির সাহায্যে ব্যাপারটাকে বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কোনো কারন খুঁজে পাচ্ছেন না। ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়েছেন। সকাল বেলা যখন আপনি জেগে উঠবেন, তখন আপনার মন কিন্তু নিস্তেজ হয়ে থাকবে, কোনো কাজে আপনার মন বসবে না। আসলে আমরা জানি না, ওই ঘটনা আমার মনের কোনো অংশে আঘাত করেছে। মনের ব্যাকুলতা, অস্থিরতা আমাদের অস্থির করেছে। কিন্তু তার নিস্পত্তির উপায় আমাদের কাছে নেই। আমরা মন এই ঘটনায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, কিন্তু মনের ঠিক কোথায় আঘাত লেগেছে, এবং সেটা নিরসনের উপায় আমার জানা নেই।
দেখুন, আমাদের শরীরে যখন আঘাত লাগে, তখন আঘাতপ্রাপ্ত অংশের কোষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এখন যেখানে আঘাত লেগেছে, সেই অংশের পরিচর্য্যা প্রয়োজন। হাতে আঘাত লাগলে, আপনি পায়ে মলম লাগিয়ে ভালো থাকতে পারবেন না। ঠিক তেমনি মানসিক শরীরের বা মনোময় কোষের কোন অংশ দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সেটা আপনাকে বুঝতে হবে।
অর্থাৎ বাইরের ঘটনা বা বাইরের কারন সম্পর্কে আপনি জ্ঞাত হয়েছেন, কিন্তু এতে করে আপনার মনের কোন অংশে আঘাত প্রাপ্ত হয়েছে, সেই দিকটা আপনি ধরতে পারেন নি। বোঝার চেষ্টা করুন, কালকের এই ঘটনা কি আপনার ভাবাবেগকে আঘাত করেছে ? নাকি আপনার বহুদিনের লালিত বিশ্বাসে আঘাত করেছে ? কালকের ঘটনা কি আপনাকে অসহায় করেছে, ভয় পাইয়ে দিয়েছে, নাকি একা করে দিয়েছে ? মনের যে বিস্তীর্ন ক্ষেত্র, তার কোথায় আঘাত এসেছে, বা কোথায় প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেটা বুঝতে গেলে বা এই ক্ষতস্থান মেরামত করতে গেলে আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। অর্থাৎ মূল কারন লুকিয়ে আছে অতীতের গর্ভে। অর্থাৎ আমাদের স্মৃতির মধ্যে কেউ বলেন সংস্কারের মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় আছে । আর অতীতের গর্ভে যে মূল কারন যা স্মৃতির কোঠরে অবচেতন অবস্থায় ছিল তা এখন বর্তমান রূপে প্রকাশ পেয়েছে। এই অতীত ও বর্তমান এই দুটোকে ধরতে পারলে, জানবেন জাগরণ শুরু হয়েছে। আপনার ঘুম ভেঙে গেছে, আপনি এখন মনের গভীরে অর্থাৎ অন্তর্জ্ঞানের জগতের মধ্যে প্রবেশ করেছেন। আত্মজ্ঞানের বীজ অংকুরিত হতে শুরু করেছে, শুদ্ধজ্ঞানের আলোর টানে। ঠিক যেমন মাটির মধ্যে গ্রথিত বীজ সূর্য্যের আলোর টানে আবরণ ছাড়িয়ে, মাটি ভেদ করে বেরিয়ে আসে, নিজেকে প্রকাশিত করে । আপনার মধ্যেও ঠিক তেমনি আত্মজ্ঞানের বীজ অংকুরিত হতে শুরু করেছে। মনের জগতে আপনার বিচরণ শুরু হয়েছে। মনের কোন কোঠরে, কি লুকিয়ে আছে, তা আপনার জ্ঞানের বিষয় হয়েছে।
আমরা আগেই শুনেছি, যে কেবল মাত্র সুনির্দিষ্ট কারনের মধ্যে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ বা কার্য্যফল লুকিয়ে আছে। যে কারন এই ভবিষ্যৎকে প্রকট করে তাকে সাংখ্য দার্শনিক বলছেন, শক্তি-কারন। এই শক্তি-কারন থেকেই আকাঙ্খিত ফল মিলতে পারে। ধরুন, আপনি দুধ থেকে দই পেতে পারেন, ঘোল পেতে পারেন, মাখন পেতে পারেন, ঘি পেতে পারেন। এখন দুধ থেকে এই ফলগুলো পেতে গেলে, আপনাকে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির সাহায্য গ্রহণ করতে হবে। অর্থাৎ একটা মাত্র কারন ভিন্ন ভিন্ন বা বহু ভবিষ্যৎ পরিণতি এনে দিতে পারে। কিন্তু এর জন্য দরকার প্রয়োগের কুশলতা অর্থাৎ শক্তি-কারন । আপনি কাঠ থেকে দরজা, জানালা, চেয়ার, টেবিল, খাট ইত্যাদি যে কোনো আসবাব, এমনকি এই কাঠ থেকে আপনি অগ্নির উত্তাপ গ্রহণ করতে পারেন। এখন কথা হচ্ছে দুধের মধ্যে ঘি-মাখন ইত্যাদি বা কাঠের মধ্যে আসবাব বা অগ্নি এর জন্য দরকার উপযুক্ত প্রক্রিয়ার গ্রহণ বা শক্তি কারন । এখন এই নিমিত্ত কারনের (কাঠ বা দুধ) এর মধ্যে যেমন এক বা একাধিক সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, তেমনি এমন অনেক কারন আছে, যার কারনে একটি মাত্র সম্ভাবনার প্রকাশ হতে পারে। অগ্নি থেকে আপনি উত্তাপ পাবেন, জল থেকে আপনি আদ্রতা পাবেন, উল্টোটা পাবেন না। চাঁদ থেকে স্নিগ্ধতা পাবেন, যা সূর্য্যের কাছে আশা করতে পারেন না। এই যে নিমিত্ত কারনে মধ্যে কার্য্য সম্ভাবনা বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, বা কারনে মধ্যে যে পরিণতির স্বভাব লুকিয়ে আছে, এই সংখ্যা দর্শন বলছে "শক্তি-কারনের" ফলে তা প্রকাশিত হতে পারে।
এই নিমিত্ত কারনে মধ্যে এক বা একাধিক সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকতে পারে। এটা নির্ভর করে নিমিত্ত কারনের মধ্যে কোন গুন্ কতটা অনুপাতে অবস্থান করছে তার উপরে। আর এই গুনের উপরে নির্ভর করেই তার স্বভাব রচিত হয়। তো এই শক্তি-কারন, নিমিত্ত কারণকে এক বা একাধিক রূপে প্রকাশ করতে পারে বা করবার ক্ষমতা বা পরিণতি লাভের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু নিমিত্ত কারনে মধ্যে যে স্বভাব আছে, এই স্বভাবকে আমাদের বুঝতে হবে, ধরতে হবে। তা যদি না ধরতে পারি, তবে আমাদের আকাঙ্খিত বস্তু বা কার্য্যের সাক্ষাৎ করতে পারবো না। ধরুন আপনি ঘি আশা করছেন, তবে আপনাকে দুধ বা দুধের গুন্ যার মধ্যে আছে, তাকে সংগ্রহ করতে হবে। আপনি আখের রসের মধ্যে এই গুন্ পাবেন না। আর আখের রস দিয়ে কখনও ঘি পাবেন না। আখের রস জ্বাল দিলে গুড় পাবেন আর দুধ জ্বাল দিলে সর বা ঘি পেতে পারেন। তার কারন হচ্ছে দুধের মধ্যে যেমন সর বা ঘি-এর কারন আছে, তেমনি গুড়ের কারন আছে আখের রসের মধ্যে। তাই প্রতিটি বস্তুর মধ্যে যে স্বভাব বর্তমান আছে, বা যে সব গুনের সমাহার আছে, তাকে আমাদের বুঝবার চেষ্টা করতে হবে। যখন কোনো বস্তুর মধ্যে অব্যক্ত বা অস্ফুট স্বভাব সম্পর্কে আপনি জ্ঞাত হবেন, তবে আপনার ইচ্ছে পূরণ হতে পারে।
শক্তি কারন এক বা একাধিক হতে পারে। দেখুন কালি (কলমের) আপনার খাবার বস্তু নয়, কিন্তু দুধ আপনার খাদ্য বা পানীয় হতে পারে। কালি দিয়ে আপনি লিখতে পারেন। আর দুধ আপনার শরীরের পুষ্টি সাধন করতে পারে। তো কালির মধ্যে যে অব্যক্ত অস্ফুট স্বভাব আছে, তা এই তরল সাদা রঙের দুধের মধ্যে নেই। তো যেকোনও বস্তু থেকে বা ঘটনা থেকে যদি আপনি আপনার মনের মতো জিনিস পেতে চান তবে তার নিমিত্ত কারনে স্বভাবের দিকটা, যা তার মধ্যে অব্যক্ত অবস্থায় আছে সেই জ্ঞান আপনাকে সংগ্রহ করতে হবে। তো অবস্থা বা কারণের মধ্যে এই অব্যক্ত স্বভাব লুকিয়ে আছে, আর এটাকে ধরতে পারলে, আর আর শক্তি কারণকে সঠিক প্রয়োগ করতে পারলে এবং নিমিত্ত কারনের সহায়তা পেলে, আপনি আপনার ইচ্ছেমতো বস্তুর সন্ধান পেতে পারেন। তো আমাদের আকাঙ্খ্যা (ইচ্ছে) পূরণ করতে হলে বস্তুর মধ্যে সুপ্ত স্বভাবকে ধরতে হবে।
দেখুন, একটা বীজের মধ্যে গাছ লুকিয়ে আছে। আপনার অভিজ্ঞতা আপনাকে বলে দিতে পারে, এটা থেকে কি ধরনের গাছ জন্মাতে পারে। এখন কথা হচ্ছে এই বীজ যদি সিন্দুকের মধ্যে পুরে রাখেন, বা হাতের মধ্যে ধরে রাখেন,একে যদি আপনি আলো-জল-বাতাস-মাটির সংস্পর্শে না আসতে দেন, তবে এই গাছের দেখা কোনোদিন মিলবে না। শক্তি কারন যতক্ষন এই বীজের বা নিমিত্ত কারনে সঙ্গে সম্পৃক্ত না হচ্ছে, ততক্ষন বীজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা যে অব্যক্ত শক্তি বা প্রচ্ছন্ন শক্তি আছে, তা অচিরেই নিঃশেষ হয়ে যাবে। শুকনো বীজে গাছ নাও হতে পারে। তো আপনাকে বীজকে সময় মতো মাটিতে পুততে হবে, জল দিতে হবে, সূর্যালোকের সুযোগ করে দিতে হবে, তবেই বীজের (নিমিত্ত করেন) মধ্যে গাছ হবার যে সম্ভাবনা শক্তি ছিলো তার প্রকাশ ঘটবে। অন্যথায় সব মাটি হয়ে যাবে। অর্থাৎ বীজ গাছ না হয়ে মাটিতে পরিণত হবে। কিন্তু পরিণতি কালের গতিতে হবেই। তো আকাঙ্খিত বস্তু পেতে গেলে, আমাদের যেমন নিমিত্ত কারনে সন্ধান করতে হবে, নিমিত্ত কারনে স্বভাব সম্পর্কে অবহিত হতে হবে, আর সবশেষে শক্তি-কারণের সহায়তা গ্রহণ করতে হবে।
আমরা সৃষ্টি বলতে কি বুঝি ? পদার্থের আবির্ভাবই সৃষ্টি। বিশ্ব ব্রহ্মান্ড হচ্ছে পদার্থের সমষ্টি। এখন এই যে পদার্থ তা অনন্ত। আর এই অনন্ত পদার্থ চিদাত্মার অন্তঃস্থিত। যখন চিদাত্মার মধ্যে ইচ্ছের উদয় হয়, অর্থাৎ ইচ্ছেশক্তি যখন ক্ষুদ্ধ হয়, তখন তার অন্তঃস্থিত পদার্থের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তো এই যে পদার্থ এর মধ্যে আছে অন্তঃপ্রকাশ আবার বহিঃপ্রকাশ। অন্তঃপ্রকাশেরও উর্দ্ধে তার যে স্থিতি, তাকেই পদার্থের চিদস্বরূপে অবস্থান ধরে নিতে হবে।
তো পদার্থের যে অন্তঃপ্রকাশ তা এই সৃষ্টিপর্ব্বের অন্তর্গত। যোগীপুরুষের দৃষ্টিতে এই অন্তঃপ্রকাশ হচ্ছে জ্ঞানের লীলাক্ষেত্র। এখানেই যত জ্ঞানের খেলা চলছে। বাহ্য যে সৃষ্টি তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্রিয়া। আর এই উভয়ের মুলে আছে ক্ষুব্ধ ইচ্ছে। এই ইচ্ছে হচ্ছে ভাবসত্তার বীজ। আবার ইচ্ছের একটা অতীত অবস্থা আছে, যাকে বলা হয় আনন্দস্বরূপ। এই আনন্দ যখন ক্ষুব্ধ হয়, অর্থাৎ আনন্দ সাগরে যখন ভাবের বুদবুদ উদয় হয় তাকে আপনি ইচ্ছে বলতে পারেন। এই আনন্দ সাগরে কিন্তু কোনো বীজ নেই। তথাপি এই আনন্দ সাগরেই বীজরূপী ইচ্ছের উদয় হয়। আবার এই ইচ্ছের নিবৃত্তিতে আনন্দর অভিব্যক্তি ঘটে । অর্থাৎ আনন্দ সাগরে ইচ্ছে-বীজরূপী বুদবুদ যখন ফেটে যায় তখন আবার নির্ম্মল আনন্দের অভিব্যক্তি ঘটে। তো সৃষ্টির মুলে আনন্দ। এই যে আনন্দ সাগরে ইচ্ছেভূমিতে যে বীজের কথা বললাম, এটিই প্রথম আকার । যদিও এই আকার নিরবয়ব অর্থাৎ এর কোনো অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নেই। আনন্দ সাগরে এই বীজরূপী ইচ্ছে (বুদবুদ) অঙ্গহীন। ঋষিগণ বলছেন, জ্ঞানভূমিতে যখন পদার্থের অন্তঃপ্রকাশ ঘটে, তখন সেই জ্ঞান হয় সাকার। কিন্তু এই সাকার-জ্ঞানের কোনো জ্ঞেয় থাকে না। তখন জ্ঞান ও জ্ঞেয় মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে। অর্থাৎ এই যে সাকার জ্ঞান সে নিজেই নিজেকে জ্ঞাত করছে। নিজেই নিজের জ্ঞেয়। একটা উদাহরনের সাহায্যে আমরা ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করি। ধরুন একটা রসোগোল্লা - ইচ্ছেরুপী বীজ ভূমিতে এই রসোগোল্লা একটা ভাব মাত্র। এই রসোগোল্লা তখন অব্যক্ত। একসময় এই অব্যক্ত রসোগোল্লা জ্ঞানভূমিতে এসে আকার প্রাপ্ত হয়। কিন্তু এই যে রসোগোল্লা বা তার তার আকার এর কোনো বাহ্য অস্তিত্ত্ব নেই। আমরা ধ্যানের মধ্যে বা স্বপ্নের মধ্যে এইরূপ নানান দৃশ্য বা বস্তুর আকার দেখতে পাই, যার কোনো বাস্তব অস্তিত্ত্ব নেই। কিন্তু স্বপ্নের জগতে বা ধ্যানের গভীরে যখন সাধক অবস্থান করেন, তখন তার কাছে সেটি সত্য বলে প্রতিভাত হয়। এই দর্শন-শ্রবণ বা অবয়ব বা প্রকাশ কেবলমাত্র অন্তঃপ্রকাশ, যা ধ্যানীর কাছে বা স্বপ্নদ্রষ্টার কাছেই সত্য। অন্যদের কাছে নয়। যোগীপুরুষ বলছেন, এই যে অন্তঃপ্রকাশ বা জ্ঞানের ভূমিতে যে প্রকাশ তা হচ্ছে ইচ্ছে-শক্তির পরিনতি বিশেষ। এই অন্তঃপ্রকাশ বা জ্ঞান আকারে যে প্রকাশ তা-ই একসময় ভৌতজগতে আত্মপ্রকাশ করে। তো আমাদের বুঝতে হবে, এই যে বাহ্য প্রকাশ তা আসলে সেই ইচ্ছের, যা একসময় আনন্দ সাগরে ভেসে উঠেছিল, তার অন্তিম প্রকাশ মাত্র ।
এই যে জ্ঞানরূপী পদার্থের প্রকাশ এটি কিন্তু সাধকের সৃষ্টি হয়, এটি জ্ঞানভূমির সৃষ্টি। এর পরে যখন জ্ঞানভূমির সৃষ্টি ক্রিয়াভুমিতে এসে উপস্থিত হয় তখন এটি ব্যবহারিক দৃষ্টিতে সৃষ্টি রূপে প্রকাশিত হয়। আমরা এর আগে শুনেছি নিমিত্ত কারন, উপাদান কারন, ও শক্তি কারন, এগুলো হচ্ছে জাগতিক সমস্ত পদার্থ সৃষ্টির মুলে। কিন্তু কথা হচ্ছে নিমিত্ত, উপাদান ও শক্তি কারণের আবশ্যিক কার্যকারিতা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় কিন্তু ইচ্ছেশক্তি সৃষ্টিতে উপাদান ও শক্তি কারন আবশ্যক হয় না। ইচ্ছেশক্তির সৃষ্টিতে এগুলোর আবশ্যক নাও হতে পারে। কিন্তু সত্য হচ্ছে কারন ছাড়া কোনো সৃষ্টি সম্ভব নয়। আসলে ইচ্ছে-সৃষ্টিতে পূর্ণাবস্থাই কারন। আপনারা লক্ষ্য করে থাকবেন, যোগ-ঐশ্বর্যের অধিকারী পুরুষ অনেক চমৎকার প্রদর্শন করে থাকেন। অর্থাৎ কোনো উপাদান ছাড়াই কাম্য বস্তুর সৃষ্টি করে থাকেন। আসলে এই যে কাম্য বস্তু তিনি সৃষ্টি করেন, তার কারন-উপাদান তিনি নিজসত্তা থেকেই গ্রহণ করে থাকেন, বাহ্য প্রকৃতি থেকে নয়। আবার অনেক সময় বাহ্য প্রকৃতি থেকেও তাঁরা উপাদান গ্রহণ করে থাকেন। হাতে একটা গোলাপ ফুল নিয়ে, তাকে তিনি পদ্মফুলে রূপান্তরিত করে দিতে পাবেন। আবার শূন্য থেকে সন্দেশ এনে দিতে পারেন। এই যে সৃষ্টি এটি যোগীর ইচ্ছে প্রভাবে ঘটে থাকে। অর্থাৎ যোগীপুরুষ নিজের ইচ্ছেপ্রভাবে বা ঐশীশক্তি প্রভাবে প্রকৃতিকে আপন বশে নিয়ে আসেন। দেখুন সৃষ্টির সমগ্র উপাদান প্রকৃতি প্রদত্ত, আর এই প্রকৃতি হচ্ছে ত্রিগুণাত্মিকা। প্রকৃতি আত্মা থেকে ভিন্ন নয়। আত্মা ভিন্ন প্রকৃতির নিজস্ব কোনো সত্তা নেই। অর্থাৎ নিমিত্ত কারন আর উপাদান কারন অভিন্ন। এই ব্যাপারটা আমরা আরো একটু ভালোভাবে বুঝবার চেষ্টা করবো।
জ্ঞানময় জগতে বা অন্তর্জগতে প্রকাশিত ফুল আর প্রকৃতির জগতে প্রকাশিত ফুল এক নয়। জ্ঞানময় জগতে প্রকাশিত ফুলের কোনো ভৌতিক সত্তা নেই। কিন্তু এই জ্ঞানময় জগতে প্রকাশিত ফুল যখন অজ্ঞান জগতে অর্থাৎ জড় প্রকৃতির জগতে প্রক্ষিপ্ত হয়, তখন মায়া প্রপঞ্চময় জগতে প্রবেশ করে ভৌতিক আকার ধারণ করে। যা তখন আমাদের দৃষ্টিতে দৃশ্যমান। অর্থাৎ অজ্ঞানের জগতে ভৌতিক পদার্থ রূপে দৃশ্যমান হয়ে থাকে। আসলে পঞ্চিকরণের ক্রিয়ার স্বভাব হেতু এটি ঘটে থাকে। অর্থাৎ জ্ঞানময় সত্তায় যে অপার্থিব প্রকাশ ঘটেছিলো, তা অজ্ঞানের জগতে এসে পার্থিব পদার্থ রূপে প্রকাশিত হয়েছে। অন্ন যেমন ধীরে ধীরে পিতৃ-বিন্দুতে পরিণত হয়, আবার এই পিতৃবিন্দু মাতৃগর্ভে এসে ভৌতিক আকার গ্রহণ করে তেমনি জ্ঞানের জগতে যা কিছু দৃশ্যমান হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে অজ্ঞানের জগতে এসে পার্থিব রূপ নিয়েছে। অর্থাৎ জ্ঞানের জগতের অপার্থিব বস্তু যোনি প্রদেশে প্রবেশের ফলে জ্ঞানের আকারটি ভৌতিক আকারে পরিণত হয়। বলা হয়ে থাকে আত্মা এক যোনি থেকে অন্য যোনিতে পরিভ্রমন করছে, যুগ যুগ ধরে।
আমরা আমরা আগেরদিন শুনেছিলাম, জ্ঞানের জগতে প্রকাশিত বস্তু যখন মায়া-যোনিতে প্রবেশ করে তখন অভৌতিক বস্তু ভৌতিক আকার ধারণ করে। এই ব্যাপারটা আমাদের অনেকে ধরতে অক্ষম হই। দেখুন এই জ্ঞানের ভূমিতে যেমন অব্যক্ত বস্তুর আবির্ভাব হয়, তেমনি আমাদের মনঃ-জগতে অর্থাৎ আমাদের অন্তরে অনেক মনোগ্ৰাহ্য বস্তুর আভাস মেলে। এই যে মনঃ-গ্রাহ্যবস্তু তা আমাদের কাছে একটা আভাস বা মনের কল্পনা মাত্র। কিন্তু এই মনের মধ্যে প্রকটিত বস্তু যখন ক্রিয়াভুমিতে প্রবেশ করে, তখন তা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু হয়ে ওঠে। শিল্পীর কল্পনায় শিবের ছবি ভেসে ওঠে। শল্পী যখন কাগজ-কলম নিয়ে বসেন, বা রং-তুলি নিয়ে বসেন, বা যখন হাতুড়ি বাটাল নিয়ে ক্রিয়া শুরু করেন, তখন তার মনের মধ্যে ভেসে ওঠা কল্পনা বাস্তবিক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু হয়ে ওঠে। আর এই বাহ্য সৃষ্টি তখন সকলে নিজ নিজ ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করতে সক্ষম হয়। পাথরের টুকরো হয়ে ওঠে শিবঠাকুর বা শিল্পীর ইপ্সিত বস্তু যা সকলের ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য। যা একসময় অব্যক্ত অবস্থায় শিল্পীর মনের আয়নায় ভেসে উঠেছিল, তাই এখন সকলের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু হয়ে উঠলো। ঠিক তেমনি পরমেশ্বরের ইচ্ছাশক্তির সৃষ্টিতে জ্ঞানভূমিতে যে যে অভৌতিক সত্তার আভাস ভেসে ওঠে, তার একটা নিজস্ব আকার থাকলেও শুধুই জ্ঞানময়। অর্থাৎ ভৌতিক বা বাহ্যত প্রকাশিত নয়। শ্রেষ্ঠ যোগীপুরুষের মনের মধ্যেও এমনিতর সাকার জ্ঞানবিশেষ ভেসে ওঠে। এটি তখন আলোক বিশেষ। প্রতিবিম্বিত আলোর বর্তিকা মাত্র। এসব শুধুই আলোক হলেও, আকৃতি বিশিষ্ট। অর্থাৎ অহং-এর মধ্যে ইদং। এর পরে যখন যোগীপুরুষ জ্ঞানভূমি থেকে ক্রিয়াভুমিতে প্রবেশ করেন, তখন এই আভাস রূপী দৃশ্য ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়ে ওঠে। এই হচ্ছে সৃষ্টি। ইচ্ছে শক্তির মধ্যে অহং-এর স্ফূরণ, কিন্ত এই অহং তখনও ইদং এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। কারন এখানে ক্রিয়া নেই। যখনই ইদং থেকে পৃথক হয়ে সে দেহ বা প্রকৃতির সঙ্গে অহং বোধে লিপ্ত হয়, তখন সে মায়িক সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। এই পরিণতি প্রাপ্তির অর্থাৎ অব্যক্ত থেকে ব্যক্ত হবার একটা ক্রোম আছে। ক্রিয়া শক্তির সঙ্গে বা মাতৃ শক্তির সঙ্গে মিলিত হবার আগে থাকে জ্ঞানশক্তি। আসলে এই জ্ঞানশক্তিই সমস্ত সৃষ্টির কারন। ক্রিয়া শক্তিতে মিলিত হবার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে প্রথমে অস্ফুট, ধীরে ধীরে বিভিন্ন স্তরের মধ্যে দিয়ে স্ফুট হয়ে ওঠে। এই অস্ফুট থেকে স্ফুট হবার প্রক্রিয়াকে বলে গর্ভ ধারণ ও প্রসব। প্রসব হচ্ছে শেষ অবস্থা যা আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। আগের আগের অবস্থাগুলো বাহ্যত ক্রিয়ার জগতে খেলা করলেও, আমাদের কাছে দৃশ্যমান নয়। এ এক অদ্ভুত লীলা, যা জগৎব্যাপী আমাদের অজ্ঞাতে ঘটে চলেছে। এ এক রহস্যে ঘেরা বিজ্ঞান। এই বিজ্ঞানের চর্চ্চা করেছেন, আমাদের প্রাচীন মুনিঋষিগন। শুধু প্রাচীন বলি কেন, আজও আমাদের অজ্ঞাতসারে ঋষি-পুরুষগন এই লীলা খেলায় লিপ্ত আছেন। আমরাও ধীরে ধীরে ইপ্সিত বস্তুর আবির্ভাবের বিষয়টি বুঝে নেবার চেষ্টা করবো।
যা বলছিলাম, বীজ থেকে গাছ হবে না মাটি হবে তা নির্ভর করছে শক্তি কারণের উপরে। বীজ নিমিত্ত কারন মাত্র, কিন্তু শক্তি কারন সংযোগ না ঘটলে, জীবনটাই মাটি। মানব জীবন একটা বীজের মতো। একটা মানুষের মধ্যে অসংখ্য সম্ভাবনার বীজ লুকিয়ে আছে। এই বীজকে অঙ্কুরিত হতে গেলে তাকে উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হবে, তাকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করতে হবে। গাছে ফুল ফল ফোটাতে গেলে, যেমন আলো-জল-বাতাস-মাটির সংস্পর্শে আনতে হবে, তেমনি বাইরের পোকামাকড়, গরু-ছাগলে না খেতে পারে, তার জন্য বেড়া দিতে হবে। যদিও গাছে কি ফল হবে, অর্থাৎ আপেল হবে না আম হবে, তা আপনি নির্ধারণ করতে পারেন না। . বীজের (নিমিত্ত কারণের) মধ্যে যে সম্ভাবনা অব্যক্ত অবস্থায় লুকিয়ে আছে, অর্থাৎ বীজের নিজস্ব অব্যক্ত স্বভাবকে আপনি পরিবর্তন করতে পারবেন না। সেইজন্য আপনার ইচ্ছেমতো ফল পেতে গেলে, প্রথমেই আপনাকে যেটা করতে হবে তা হচ্ছে, নিমিত্ত কারনে মধ্যে আপনার আকাংখ্যার বস্তুর স্বভাব লুকিয়ে আছে কি না তা বুঝতে হবে, এবং তাকেই খুঁজে বের করতে হবে যার মধ্যে আকাঙ্খিত বস্তুর গুন লুকিয়ে আছে। আর তার জন্য দরকার সেই জ্ঞান যা বস্তুর অন্তর্নিহিত ক্ষমতা, স্বভাব বা সত্ত্বা সম্পর্কে আপনাকে অবহিত করবে। আপনি বীজ দেখে বা চারাগাছ দেখে নির্ধারণ করে নিতে পারবেন, এখান থেকে কি হতে পারে, যদি আপনার সে অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান থাকে । অর্থাৎ বীজের সম্ভাব্য পরিণতি জ্ঞান থাকা চাই আমাদের। এই যে বীজ এটি নিমিত্ত মাত্র যার মধ্যে আপনার আকাঙ্খিত বস্তু লুকিয়ে আছে। নিমিত্ত কারন একটা মাধ্যম মাত্র যার সাহায্যে আপনি ইপ্সিত বস্তু লাভ করতে পারেন। কিন্তু আপনার সেই জ্ঞান চাই, যার মাধ্যমে আপনি নিমিত্ত কারনে এর স্বভাব ধরতে পারবেন যা সুপ্ত আছে ওই বস্তুর মধ্যে । আবার এই স্বভাবকে প্রকাশিত রূপ দিতে পারে শক্তি কারন। শক্তি কারনের যথাযথ প্রয়োগে নিমিত্ত*কারন অভিব্যক্তি লাভ করতে পারবে, পরিণতির পথে এগিয়ে যেতে পারে । তো আমাদের নিমিত্তের স্বভাবকে ধরতে হবে, আবার শক্তি কারণের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। এই যে সম্ভাব্য পরিণতি জ্ঞান ও শক্তি কারণের প্রয়োগ তা আমাদের আকাঙ্খিত বস্তুর উৎপাদনে সাহায্য করবে। আমরা আমাদের ইপ্সিত বস্তু লাভ করবো। তো চারটে জিনিস পেলাম ১, মনের ইচ্ছেশক্তির প্রয়োগ, অর্থাৎ আকাঙ্খিত বস্তু লাভের ইচ্ছেকে তীব্রতর করতে হবে। ২. বস্তুর মধ্যে বা নিমিত্ত কারণের মধ্যে যে সম্ভাবনাগুলো লুকিয়ে আছে তার জ্ঞান সংগ্রহ করতে হবে । ৩, ক্রিয়াশক্তির যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে । ৪. সবশেষে ধৈর্য্যধরে অপেক্ষা করতে হবে। একটা জিনিস জানবেন সব কিছুর একটা সময় আছে , সময় না হলে কোনো কিছুই হয় না।
আত্ম-বিশ্লেষণ - মূলসূত্র : সাংখ্য দর্শন। (৩)
তিন
আমরা আমাদের সামনে দুই ধরনের প্রকাশ দেখতে পাই। আর এ সবই ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য। প্রথমতঃ যাকিছু আমরা বহিরন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ন, নাসিকা, জিহবা, ত্বক) দ্বারা উপলব্ধি করতে পারি, যেমন গাছপালা, মনুষ্য পশু, পাখি, কীট পতঙ্গ খাল-বিল নদী পাহাড় ইত্যাদি। এসবই আমরা প্রতক্ষ্য করে থাকি। দ্বিতীয়তঃ যাকিছু আমরা অন্তরেন্দ্রিয় বা মন দ্বারা উপলব্ধি করতে পারি - যেমন আমাদের আমিবোধ, বুদ্ধি, স্মৃতি, আমাদের চিন্তা, ইচ্ছে-আকাংখ্যা, রাগ, দ্বেষ, ঘৃণা, মোহ, ভয়, আসক্তি ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রকৃতির জগতে এই দুই ধরনের উপলব্ধিই আমাদের হয়ে থাকে। অর্থাৎ একটা স্থূল বস্তুর অনুভূতি, আর একটা সূক্ষ্ম বস্তুর অনুভূতি। এই দুই ধরনের জিনিসের মধ্যেই কার্য্য-কারন সম্পর্ক আছে। তো দুটো জগৎ - অন্তর্জগৎ ও বহির্জগৎ। অনুভূতির সাহায্যে আমরা এই দু জগতের জ্ঞান লাভ করে থাকি। তো প্রকৃতি দুই ভাগে বিভক্ত ব্যক্ত ও অব্যক্ত। এই অব্যক্ত অবস্থা থেকেই সমস্ত ব্যক্ত বস্তুর জন্ম হচ্ছে।
আবার আমরা এও জানি, মন সূক্ষ্ম কিন্তু জড় পদার্থ। স্থূল দেহ যেমন অন্ন থেকে পরিপুষ্ট হয়ে থাকে, তেমনি মনও এই অন্ন থেকে পুষ্টি লাভ করে থাকে। আমাদের যে পাঁচটি দেহ, তার মধ্যে তিনটি অর্থাৎ অন্নময়, প্রাণ-ময়, ও মন-ময়, এসবই পার্থিব, অর্থাৎ পদার্থের সূক্ষ্ম অংশ দিয়ে তৈরী । সবগুলো দেহই একে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে। বিজ্ঞানময় ও আনন্দময় দেহ অপার্থিব। ঋষিগণ বলে থাকেন বিজ্ঞানময় দেহ অপার্থিব হলেও, এটি পার্থিব ও অপার্থিব দেহের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করতে পারে।
সাংখ্য দার্শনিকগণ বলছেন, প্রকৃতিতে যখন তিনগুনের (সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ) সাম্যাবস্থা বজায় থাকে তখন প্রকৃতি অব্যক্ত। বলা হয়, তমঃগুণে আছে আকর্ষণশক্তি, রজঃগুনে আছে বিকর্ষণ শক্তি আর সত্ত্ব গুনের হচ্ছে সাম্যাবস্থা। অর্থাৎ জগৎ যখন আকর্ষণ ও বিকর্ষণ শক্তির উর্দ্ধে অবস্থান করে, তখন তা সাম্যাবস্থা বা সত্ত্বগুণের আধিক্য বলে বুঝতে হবে। অন্যদিকে যখন তমঃ গুনের ফলে আকর্ষণ শক্তি পায় বা রজঃ গুনের ফলে বিকর্ষণশক্তির আধিক্য ঘটে তখন শুরু হয় চঞ্চলতা বা গতি। এই গতির আর এক নাম হচ্ছে সৃষ্টি। আর এই গতি যখন কেন্দ্র থেকে বহির্মুখী হয়, তখন সৃষ্টি বা প্রকাশ আর গতি যখন অন্তর্মুখী হয় তখন লয় বা অপ্রকাশ। সাংখ্য দার্শনিকগণ বলছেন, জগৎ কখনো ব্যক্ত, কখনো অব্যক্ত। জগৎ ছিলো, আছে, থাকবে। শুধু অবস্থান্তর মাত্র। তো শূন্য থেকে কিছু হয় নি, হয় না। যা ছিলো তাই আছে, কেবল নাম-রূপের পরিবর্তন মাত্র। কখনও সূক্ষ্ম, কখনও স্থূল, কখনও কার্য্য রূপে কখনো কারন রূপে। কোনও ভগবান বা ঈশ্বর এর স্রষ্টা নয়, কেবল গুনের খেলা। কখনো জগৎ সংকুচিত হচ্ছে, আবার কখনো সম্প্রসারিত হচ্ছে।
বর্তমানে আমরা যাকে পদার্থ বলি, দার্শনিকগণ তাকে বলেন ভূত। এই ভূত শ্বাশ্বত, অনাদি, অনন্ত। আদি ভূত বলে যাকে চিহ্নিত করা হয়েছে, তা হচ্ছে আকাশ। এই যে আকাশ এটি আসলে প্রাণশক্তিতে ভরপুর। এই আকাশ শূন্য নয়। এই আকাশ ও তার প্রাণশক্তি মিলে নানান ভূতের জন্ম দিয়েছে। এই মতবাদের মধ্যে আমরা ঋগ্বেদের ধ্বনি শুনতে পাই।
এখন কথা হচ্ছে এই দুই ধরনের জিনিসের উৎস কোথায় ? সাংখ্য দার্শনিকদের মধ্যে একদল বলছেন, পুরুষ হচ্ছে সব কিছুর মুলে। আর এক দল বলছেন, পুরুষ কখনও কোনো কার্য্যের কারন হতে পারে না। কেননা পুরুষ হচ্ছে ক্রিয়াহীন, নিষ্ক্রিয়, দ্রষ্টা বিশেষ, চৈতন্যস্বরূপ বা জ্ঞান মাত্র। তো যিনি কোনো কার্য্যের জন্য নিজেকে নিয়োজিত করেন না, তিনি কার্য্য বা কার্যফলের কারন হতে পারেন না। পুরুষ হচ্ছে নিত্য শুদ্ধ, চৈতন্য স্বরূপ । অতএব এই সৃষ্টির পিছনে অন্য কেউ আছেন । আর প্রাথমিক কারন হিসেবে আমরা যাকে ধরতে পারি তিনি হচ্ছে প্রকৃতি।
পুরুষ হচ্ছে শুদ্ধ জ্ঞান। বলা হয়, এখানে নাকি কার্য্য-কারন মিশে আছে। আমার মাঝে মধ্যে মনে হয়, আলোর আগে নিশ্চয় অন্ধকার ছিলো। আলোর প্রবেশে অন্ধকার দূরীভূত হলো। এখন আলো নিত্য না অন্ধকার নিত্য ? আলো সত্য না অন্ধকার সত্য ? তেমনি জ্ঞানের আগে নিশ্চয় অজ্ঞান ছিল। তাহলে জ্ঞান চিরসত্য না অজ্ঞান চিরসত্য । বেদান্তে বলা হয়েছে, একটা সময় ছিল, যখন সৎ ছিলো না, অসৎ-ও ছিল না। যখন অন্ধকার ছিল না, আলোও ছিলো না। তখন আলো-অন্ধকার, সৎ-অসৎ, জ্ঞান-অজ্ঞান সব একাকার হয়ে ছিলো। তখন আলো-অন্ধকার, আলো-অন্ধকারকেই আবৃত করে ছিলো। সৎ অসৎ একে অন্যকে আবৃত করে ছিল। তখন জ্ঞান-অজ্ঞান একে অন্যের সঙ্গে মিশে ছিল। এক বৈ দুই বলে কিছু ছিল না।
এখন এই পুরুষ সম্পর্কে বলা হচ্ছে : তিনি শুদ্ধ জ্ঞান। তিনিই সৎ। তিনি অক্ষর অর্থাৎ তার কোনো ক্ষয় নেই। তাহলে এই যে পুরুষ সম্পর্কে বলা হচ্ছে তা কি সৃষ্টির দ্বিতীয় পৰ্য্যায় ? অর্থাৎ গতিহীন এক শুদ্ধ অবস্থা ?
পুরুষ অপরিবর্তনীয়। পুরুষ অক্ষর। পুরুষ হচ্ছে আশ্রয়স্থল। পুরুষ অসীম অবকাশ যার মধ্যে প্রকৃতি তার লীলা খেলা করছেন । প্রকৃতিই ভাঙছেন, গড়ছেন। তো পরিবর্তনশীল জগতের কারন পুরুষ নন, অন্য কোথাও লুকিয়ে আছে সেই কারন, আর তিনি হচ্ছেন মুলা প্রকৃতি। পুরুষ না সূক্ষ্ম না স্থূল। এই পুরুষ বা শুদ্ধ জ্ঞান সীমাহীন, অনন্ত, বন্ধনহীন একটা অবস্থা। এঁকে আপনি কিছুতেই সীমার মধ্যে আনতে পারবেন না । একে আপনি মহাশূন্য বলতে পারেন, মহাকাল বলতে পারেন, যার কোনো শুরু নেই, শেষ নেই । তো যা সীমাহীন তাকে আপনি সীমার মধ্যে আবদ্ধ করবেন কি করে ? আর মহাশূন্য থেকে সৃষ্টিই বা হবে কি করে। আমাদের অভিজ্ঞতাও সেই কথাই বলে যে শূন্য থেকে কিছুই সৃষ্টি হতে পারে না।
শুদ্ধ জ্ঞান বা চৈতন্য একটা অবস্থা মাত্র। এই শুদ্ধ জ্ঞান কখনো কোনো বস্তুর বা অনু-পরমাণুর কারন হতে পারে না। চৈতন্য থেকে আমরা অব্যক্ত যে অবস্থা অর্থাৎ মন, বুদ্ধি অনুভূতির সংযোগ দেখতে পাই। হয়তো এগুলোর সৃষ্টির মধ্যে শুদ্ধ চৈতন্যের ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু শুধুই জ্ঞান থেকে কোনো পদার্থ সৃষ্টি হতে পরে না। নিউট্রন বলুন, প্রোটন বলুন বা ইলেক্ট্রন বলুন তা শুধু জ্ঞানের কারনে সৃষ্টি হতে পারে না। সাংখ্য দর্শন তাই সৃষ্টি তত্ত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রকৃতির প্রসঙ্গ তুলেছেন। প্রকৃতি অর্থাৎ যেখানে কার্য্য, গতি, পরিণতি বা তরঙ্গের সমারোহ আছে, সেই প্রকৃতির কথা বলেছেন। আমরা শুনেছি, প্রকৃতিই একদিকে যেমন জড় অর্থাৎ চৈতন্য বিহীন, তেমনি প্রকৃতি হচ্ছে সূক্ষ্ম পদার্থের ব্যক্ত ও অব্যক্ত অবস্থাও বটে ।
আমরা যখন নিজেদের দিকে তাকাই, তখন আমাদের মধ্যেও এই দুটি অবস্থার অবস্থান দেখতে পাই। আমাদের অভিব্যক্তির মধ্যে যেমন একটা স্থূল দেহ দেখতে পাই, তেমনি আমাদের আছে অব্যক্ত মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহংকার ইত্যাদি। আরো একটু গভীরে গেলেই বুঝতে পারি, আমাদের মধ্যে আছে বোধশক্তি, জ্ঞান বা অজ্ঞান। অর্থাৎ আমাদের মধ্যে সেই শুদ্ধ জ্ঞান বা অশুদ্ধ জ্ঞানের ভান্ডার আছে, যার সাহায্যে এই দুইয়ের অর্থাৎ অব্যক্ত জগৎ ও ব্যক্ত জগতের মধ্যে আমরা বিচরণ করতে পারি। সাংখ্য দর্শনের এই জায়গাটা যদি আমরা ধরতে পারি, তবে আমরা আত্মজ্ঞানের পথে অগ্রসর হতে পারবো। অর্থাৎ আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, জগতের সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক তা আমরা সম্যকরূপে উপলব্ধি করতে পারবো।
তো আমাদের মধ্যে যে জড় সত্ত্বা ও অ-জড় সত্ত্বা বা জ্ঞানসত্ত্বা উভয়ই বিরাজ করছে। এখন, আমরা যদি নিজেকে বিশ্লেষণ করতে পারি, তবে সৃষ্টির উভয় সত্ত্বা অর্থাৎ পুরুষ ও প্রকৃতি সম্পর্কে একটা ধারণা পেতে পারি।
তার আগে আমরা আরো একটু ভালোভাবে বুঝে নেবো, সাংখ্য দর্শন এই সৃষ্টির ক্রোম সম্পর্কে কি বলছেন।
সাংখ্য দর্শন সৃষ্টির ক্রমকে ২৫ ভাগে ভাগ করেছে। ১,পুরুষ, ২.প্রকৃতি, ৩.মহৎ অর্থাৎ প্রধান বা শ্রেষ্ঠ (বুদ্ধি) ৪, অহঙ্কার ৫. মানস ৬-১০, পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ন নাসিকা, জিহ্বা , ত্বক ) ১১-১৫. পাঁচটি কর্ম্মেন্দ্রিয় (বাক, পানি, পাদ, পায়ু, উপস্থ) ১৬-২০. পাঁচটি তন্মাত্র (শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ) ২১-২৫. পাঁচটি মহাভূত, (ক্ষিতি, অপ , তেজ, মরুৎ, ব্যোম) .
এই পচিশ তত্ত্বগুলোকে আলোচনার সুবিধের জন্য মোটামুটি তিন ভাগ করা যায়।
১. অপ্রকাশিত চৈতন্য, ২. প্রকাশিত অব্যক্ত অবস্থা ৩. প্রকাশিত ব্যক্ত অবস্থা। প্রকাশ তা সে ব্যক্ত হোক, বা অব্যক্ত এরও উর্দ্ধে অবস্থান করে চৈতন্য বা পুরুষ। প্রকৃতি স্বাধীন ভাবে তার নিজের মধ্যে বর্তমান ত্রিগুণের প্রভাবে এই সৃষ্টি লীলায় মেতে আছে। অব্যক্ত অবস্থায় প্রকৃতি ত্রিগুণের সাম্যাবস্থা বিরাজ করে। আর এই ত্রিগুণের মধ্যে যখন অসাম্যের অবস্থা আসে, তখন ব্যক্ত অবস্থার সৃষ্টি হয়। তো দুটো অবস্থা পেলাম, ত্রিগুণের অসাম্যের অবস্থা অর্থাৎ ব্যক্ত অবস্থা, দ্বিতীয় ত্রিগুণের সাম্যাবস্থা অর্থাৎ অব্যক্ত অবস্থা। আর এই দুইই প্রকৃতি। আমরা যে পাঁচিশটি ক্রোমের কথা বলেছি, তার মধ্যে তেইশটি ক্রোম এই প্রকৃতির মধ্যেই সংগঠিত হয়ে থাকে।
পুরুষ ও প্রকৃতি সম্পর্কে আমরা একটা ধারণা আমরা আগেই পেয়েছি, পুরুষ অর্থাৎ শুদ্ধ চৈতন্য বিশেষ যিনি গুণাতীত। আর প্রকৃতি হচ্ছে ত্রিগুণাত্মক। এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তীতে করা যাবে। আসলে প্রকৃতির মধ্যে প্রথম যে প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়, তা হচ্ছে মহৎ, যা অব্যক্ত বা সূক্ষ্ম । প্রকৃতির মধ্যে যা কিছু ঘটছে, তার প্রধান কারন হচ্ছে এই মহৎ। এই মহৎ-কে সাংখ্য দর্শনীগন বলছেন বুদ্ধি অর্থাৎ আমাদের নিশ্চয়াত্মিকা মনোবৃত্তি। যার দ্বারা আমাদের বোধ হয়। আমাদের বিচারশক্তি। আমাদের পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে যখন বিষয়ের সংযোগ হয়, তখন আমাদের মন এই বুদ্ধির সাহায্যে বিষয়কে সুনিশ্চিত করে। তো মহৎ বা বুদ্ধি হচ্ছে প্রকৃতির মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও প্রথম সূক্ষ্ম প্রকাশ। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যা কিছুর উপস্থিতি তা বুদ্ধিই আমাদেরকে সুনিশ্চিত ভাবে জ্ঞাত করায়। এই মহৎ-কে বলা হয় হিরণ্যগর্ভ। অর্থাৎ প্রকৃতির গর্ভ-প্রদেশ হচ্ছে এই মহৎ। মহৎ-এর মধ্যেই ভ্রূণ আকারে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের জন্ম হয়ে থাকে। জগতে যাকিছু প্রকাশমান তার কারখানা হচ্ছে এই মহৎ বা হিরণ্যগর্ভ। মহৎকে বুদ্ধি বলা হচ্ছে তার কারন হচ্ছে এটি আসলে একটি সর্বোচ্চ ও সমগ্র জ্ঞানভাণ্ডার। এই সর্বোচ্চ জ্ঞানভান্ডারের দুটো কাজ। একটা হচ্ছে বিষয়ের নিশ্চয় করা, অন্যটি হচ্ছে বিষয়ের বিচার। সাংখ্যকারের ভাষায় নির্ণয় ও অবধারণ। বুদ্ধি হচ্ছে সেই শক্তি যা দ্রষ্টা ও দৃশ্যকে আলাদা করতে পারে, জ্ঞান ও জ্ঞাতাকে আলাদা করতে পারে। এই বুদ্ধির সাহায্যেই আমরা নিজেদেরকে অন্যের থেকে আলাদা করতে পারি। এই বুদ্ধিই আমাদের ভালো অনুভূতি ও খারাপ অনুভূতি, সুখ ও অসুখের মধ্যে পার্থক্য করে থাকে। এই বুদ্ধির সাহায্য আমরা জ্ঞান লাভ করে থাকি, এমনকি দুটো বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য নির্নয় করতে পারি। বুদ্ধি বা অনুভূতির বিচারশক্তি যদি না থাকতো তবে আমাদের জগৎকে উপলব্ধি করতে পারতাম না।
এই বুদ্ধি (মহৎ-তত্ত্ব) আবার, গুনের প্রভাবে দুই প্রকার হয়ে থাকে। একটা হচ্ছে সাত্ত্বিক বুদ্ধি আরেকটা হচ্ছে তামসিক বুদ্ধি। তার মানে বুদ্ধির মধ্যে তমঃগুন্ ও সত্ত্বগুণ রয়েছে। এর মধ্যে যেটির প্রাবল্য যখন বেশি থাকে বুদ্ধির মধ্যে তখন তার প্রভাব বেশি দেখতে পাওয়া যায়। সত্ত্বগুনের স্বভাব হচ্ছে আলোকিত করা, উন্মুক্ত করা, উন্মোচন বা প্রকাশিত করা। সত্যকে সামনে তুলে ধরা। জ্ঞান-দৃষ্টির মধ্যে স্বচ্ছতা আনয়ন করা। প্রকৃতির এই সত্ত্বগুণ যখন বুদ্ধির সঙ্গে বিরাজ করে, তখন ধর্ম্ম, জ্ঞান, বৈরাগ্য, ও ঐশ্বর্য্য বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে যখন বুদ্ধির সঙ্গে তমঃগুণের প্রাবল্য থাকে তখন এর ঠিক বিপরীত অবস্থা হয়, অর্থাৎ তখন আসক্তি, অধর্ম্ম, অজ্ঞান ইত্যাদি দেখা যায়। তামসিক বুদ্ধি বন্ধনের কারন, আর সাত্ত্বিক বুদ্ধি মুক্তির কারন হয়ে থাকে। এই যে ধর্ম্মের কথা বললাম, এটি হচ্ছে ন্যায় পরায়ণতা, পবিত্রতা, শুদ্ধতা। আর জ্ঞান হচ্ছে সৎ-অসৎ, নিত্য-অনিত্য সম্পর্কে বিচার করবার ক্ষমতা। বৈরাগ্য হচ্ছে অনিত্য বস্তুর প্রতি বিরাগ, অনাসক্তি। ঐশ্বর্য্য হচ্ছে ঐশ্বরিক অনুভূতির লক্ষে পৌঁছাবার জন্য দক্ষতা। তামসিক বুদ্ধির কারণেই আমরা এই জাগতিক বস্তুর মধ্যে আনন্দের সন্ধান পেতে চাই, আর এখানে নিজেদেরকে বেঁধে রাখি। আর সাত্ত্বিক বুদ্ধি মানুষকে এই অনিত্য জগৎ থেকে মুক্তির পথ দেখায়। তো তামসিক বুদ্ধি জাগতিক বন্ধনের কারন হয়ে থাকে, অন্য দিকে সাত্ত্বিক বুদ্ধি বন্ধন থেকে মুক্তির পথে টেনে নিয়ে যায়।
সর্বোচ্চ জ্ঞানের ভান্ডার হচ্ছে এই মহৎ-তত্ত্ব। এই জ্ঞানই পুরুষকে যেমন কার্য্য ও কারনের পার্থক্য নির্ণয়ে সাহায্য করে থাকে, তেমনি এই জ্ঞানের পথ প্রদর্শক হিসেবে কাজ করে প্রকৃতি। এই জ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রকৃতি। প্রকৃতিই জ্ঞান আহরণে পুরুষকে সাহায্য করে থাকে। আর এই জ্ঞানের ফলেই পুরুষ, প্রকৃতি থেকে নিজেকে আলাদা করে নিহ্নিত করতে পারে, নিজেকে আলাদা রাখতে পারে। পুরুষের এই শুদ্ধ জ্ঞানালোক মহৎ-এর মধ্যে প্রতিফলিত হয়। প্রকৃতি এমনিতে জড়, অচেতন কিন্তু মহৎ-এর মধ্যে যখন জ্ঞানালোক প্রতিফলিত হয়, তখন প্রতিবিম্বিত চেতন সত্ত্বা সৃষ্টিতে প্রতিফলিত হয়। অতএব যদিও মহৎ হচ্ছে সর্বোচ্চ জ্ঞানের আধার কিন্তু শুদ্ধ জ্ঞানের কথা যদি বলি তা আছে এই পুরুষের কারনে। অর্থাৎ পুরুষের চেতন সত্ত্বার কারনে মহৎ বা বুদ্ধি প্রকৃতির মাধ্যমে জ্ঞান সংগ্রহ করছে।
আপনার একটা প্রতিচ্ছবি আপনি আয়নায় দেখছেন, যদিও আয়নার মধ্যে প্রতিফলিত ছবি কিন্তু সত্যিকারের আপনি নয়। এটি কেবলই ছবি কিন্তু হুবহু আপনার মতোই। ঠিক তেমনি পুরুষের চৈতন্যসত্ত্বা মহৎ-এর উপরে বা বুদ্ধিসত্ত্বার উপরে প্রতিফলিত হচ্ছে মাত্র। এটি প্রতিফলন মাত্র। তো মহৎ স্ব-প্রকাশ নয়। মহৎ প্রকৃতির (জড়) মধ্যেই অভিব্যক্ত। এটি প্রকৃতির অংশবিশেষ। কেবলমাত্র পুরুষের সন্মন্ধ-সান্নিধ্য হেতু মহৎ পুরুষের চৈতন্যের প্রকাশের নিমিত্ত হয়ে উঠেছে। আর এখান থেকেই শুরু হচ্ছে সৃষ্টির ক্রিয়া। অর্থাৎ প্রকৃতির মধ্যে যে চেতনার প্রভাব তা এই মহৎ-এর করনে ঘটে থাকে। আর মহৎ আসলে পুরুষের একটা প্রতিফলিত সত্ত্বা। প্রকৃতির মধ্যে সৃষ্টির যে ক্রোম, বা প্রকৃতির মধ্যে যে পরিণতির যে স্বভাব তার সন্মন্ধে প্রকৃতির নিজের কোনো জ্ঞান নেই, ভূমিকা নেই। কিন্তু এই প্রকৃতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে অসংখ্য সম্ভাবনার বীজ। প্রকৃতির মধ্যে অব্যক্ত এই প্রচ্ছন্ন সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রকৃতি নিজে জ্ঞাত নয়।
অতএব, পুরুষের মধ্যে যে চৈতন্য তা প্রথম এই প্রকৃতির অংশবিশেষ মহৎ-এর মধ্যে প্রতিচ্ছবি হিসেবে প্রকাশিত হয়। এর পরে প্রকৃতির ত্রিগুণের ভিন্ন ভিন্ন মিশ্রনের কারনে সৃষ্টির মধ্যে ভিন্নতা প্রদর্শিত হয়। তো মহৎ, যা প্রকৃতির প্রথম অবস্থা, বা প্রথম প্রকাশ তা ত্রিগুণাত্মিকা। মহৎ প্রকৃতির অংশ হলেও, সে পুরুষের চৈতন্য সত্ত্বার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। প্রকৃতি ত্রিগুনাত্বিক। আর এই ত্রিগুণের সাম্যাবস্থায় প্রকৃতি অব্যক্ত। যখনই গুনের তারতম্য শুরু হলো, তখন প্রকৃতির মধ্যে গতি এলো, অর্থাৎ সৃষ্টি শুরু হলো। প্রকতি ব্যক্ত হতে শুরু করলো।
তো মহৎ আসলে পুরুষের প্রতিফলিত সত্ত্বা, কিন্তু প্রকৃতির ত্রিগুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, প্রকৃতির ত্রিগুণের অসাম্যের কারনে অস্থির হয়ে উঠলো। ত্রিগুন অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ তমঃ। এই সত্ত্ব গুনের প্রভাবে প্রকাশিত হচ্ছে জ্ঞান, বিজ্ঞতা, ধর্ম্ম বা পবিত্রতা বা নৈতিক উৎকর্ষ, অনাসক্তি এবং দক্ষতা। অন্যদিকে তমঃ গুনের প্রভাবে দেখা দেয় অজ্ঞান, অধর্ম্ম, আসক্তি, অজ্ঞতা, ভ্রমজ্ঞান অর্থাৎ সাত্ত্বিক অবস্থার বিপরীতে এই তামসিকের অবস্থান। আর রজঃগুন কেবলমাত্র প্রকাশের সাহায্য ক্রিয়া বিশেষ।
তো নির্গুণ পুরুষ অপরিবর্তিনীয়, কিন্তু মহৎ প্রকৃতির গুনের প্রভাবে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। পুরুষ চৈতন্য, মহৎ পুরুষের প্রতিচ্ছবি মাত্র। পুরুষ স্বয়ংপ্রকাশ, মহৎ পুরুষের আলোতে প্রকাশিত । তো পুরুষের যে চৈতন্যশক্তি তা যখন মহৎ-এ প্রতিফলিত হয়, কিন্তু মহৎ প্রকৃতির ত্রিগুণের কারনে একটা মিশ্র অবস্থা ধারণ করে। নির্গুণ পুরুষ অব্যক্ত ও স্থির, কিন্তু মহৎ ত্রিগুণের সাম্যাবস্থায় অব্যক্ত স্থির হলেও ত্রিগুণের অসাম্যে অস্থির ও ব্যক্ত।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও আমরা দেখেছি, আমাদের বুদ্ধি, আমাদের যে অহঙ্কার , আমাদের যে মানস বৃত্তি তা প্রকৃতির গুনের দ্বারা প্রভাবিত হয়। আমরা আগেই শুনেছি পাঁচিশটি তত্ত্বের কথা। এই তত্ত্ব গুলোর মধ্যে প্রকৃতি-পুরুষের পরেই মহৎ-এর অবস্থান। আর মহৎ-এর পরে আসে অহঙ্কার (cosmic ego) . ত্রিগুণাত্মক মহৎ একসময় অহঙ্কারে বিবর্তিত হয়। আর অহঙ্কারের মধ্যে যত ত্রিগুণের প্রভাব বাড়তে থাকে, তত সে পৃথিবীর কাছাকাছি আসতে থাকে। এই হচ্ছে সাংখ্য দার্শনিকদের মতে সৃষ্টি বা জগৎ প্রকাশের প্রক্রিয়া। পরের দিন আমরা অহঙ্কার সম্পর্কে শুনবো।
আমরা আগেই শুনেছি, মহৎ বা বুদ্ধি হচ্ছে প্রকৃতির মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও প্রথম সূক্ষ্ম প্রকাশ। তো প্রথম সূক্ষ্ম প্রকাশ হচ্ছে বুদ্ধি বা মহৎ। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যা কিছুর উপস্থিতি তা বুদ্ধিই আমাদেরকে সুনিশ্চিত ভাবে জ্ঞাত করায়। এই মহৎ-কে বলা হয় হিরণ্যগর্ভ। অর্থাৎ প্রকৃতির গর্ভ-প্রদেশ হচ্ছে এই মহৎ। মহৎ-এর মধ্যেই ভ্রূণ আকারে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের জন্ম হয়ে থাকে। জগতে যাকিছু প্রকাশমান, তা সে ব্যক্ত হোক বা অব্যক্ত তার কারখানা হচ্ছে এই মহৎ বা হিরণ্যগর্ভ।
এই মহৎ বা বুদ্ধির গর্ভে জন্ম হচ্ছে অহঙ্কারের। তাই বুদ্ধিতে যেমন ত্রিগুণের প্রভাব আছে, তেমনি এই অহঙ্কারের মধ্যেও আছে ত্রিগুণের প্রভাব। এই অহঙ্কারই বস্তুর মধ্যে ভেদ নির্ণয় করে থাকে। এই অহঙ্কার আমি-তুমি বোধের সৃষ্টি করে। দ্রষ্টা ও দৃশ্যের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম হয়।
অহঙ্কার দুই প্রকারের হয়ে থাকে। সাত্ত্বিক অহঙ্কার ও তামসিক অহঙ্কার। তামসিক যে অহঙ্কার তার মধ্যে রয়েছে পাঁচটি তন্মাত্র। অন্যদিকে মানস হচ্ছে সাত্ত্বিক অহঙ্কারের ফল। অতি সূক্ষ্ম অবস্থায় কি ঘটছে ও তার কার্য্য-কারন তত্ত্ব (causal) তা এই মানসের মধ্যে প্রতিভাত হচ্ছে। এই মানসকে আমরা যেন মন বলে ভুল না করি। মানস হচ্ছে বিশ্লেষাত্মক প্রক্রিয়া বিশেষ। একে আপনি মনন বলতে পারেন। আমরা যখন কোনো বিষয়কে বিশ্লেষণ করি তাকে বলা হয় মনন বা বিষয়ের গভীরে আলোকপাত করা। এই মানস প্রক্রিয়ার ফলেই অতি সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মে আবার সূক্ষ্ম থেকে স্থূলে পরিণতি লাভ করছে। তো সাত্ত্বিক অহংকার থেকে মানস। এই সাত্ত্বিক অহংকার থেকে ধীরে ধীরে পাঁচটি জ্ঞান ইন্দ্রিয় ও পাঁচটি কর্ম্মেন্দ্রিয় এসেছে। এই যে জ্ঞান-ইন্দ্রিয় বা কর্ম্মেন্দ্রীয়ের কথা বলা হলো, তা কিন্তু আমাদের স্থূল চক্ষু-কর্ন, বা হস্ত-পদ নয়। এই ইন্দ্রিয় সকল হচ্ছে সূক্ষ্ম যা স্থূল ইন্দ্রিয়ের অলক্ষ্যে থেকে ক্রিয়া করে থাকে। অর্থাৎ দর্শনশক্তি, শ্রবণশক্তি, ঘ্রানশক্তি, রস-আস্বাদন করবার শক্তি, স্পর্শ শক্তি, বাকশক্তি, কোনোকিছু আকড়ে ধরবার শক্তি, চলাফেরা করবার শক্তি, নিঃসরণ শক্তি, প্রজনন শক্তি, এগুলো এই মানস ক্রিয়ার ফল। এই শক্তিরই স্থূল রূপ হচ্ছে চক্ষু, কর্ন , নাসিকা, জিহ্বা , ত্বক, বাক, পানি, পদ, পায়ু, উপস্থ । বলা যেতে এই শক্তিগুলো আমাদের শরীরের বিভিন্ন স্থূল অঙ্গের সাহায্যে ক্রিয়াশীল হয়ে থাকে। দেখুন, চোখ, বা মুখ দেখতে বা বলতে পারে না। দেখা বা বলা বা ক্রিয়া করবার শক্তি নিহিত আছে এই জ্ঞানেন্দ্রিয় বা কর্ম্মেন্দ্রীয়ের মধ্যে যা অতিশয় সূক্ষ্ম শক্তি বিশেষ। আমাদের শরীর থেকে যখন কিছু নিঃসরণ হয়, অর্থাৎ মল, বা রস, এমনকি সন্ত্রানকে মায়ের শরীর থেকে বহির্মুখী করে এই ইন্দ্রিয়শক্তি। তো এই ইন্দ্রিয়শক্তি কেবলমাত্র শরীরের স্থূল ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়া নয়। স্থূল ইন্দ্রিয়সকল একটা মাধ্যম মাত্র। আসলে এই শক্তি ক্রিয়া করে আমাদের মনন শক্তির সাহায্যে। আমরা দেখছি, আমাদের হাত মশাটাকে মারছে, আমরা দেখছি, লোকটা মুখ দিয়ে কথা বলছে, আমরা দেখছি লোকটি পা দিয়ে বল মারছে, এগুলো আসলে আমাদের মানস শক্তির বহির্প্রকাশ মাত্র। এই বাহ্য ক্রিয়ার অন্তরালে কাজ করছে আমাদের মানস শক্তি। মানস শক্তিতেই এই ক্রিয়াসকল সংগঠিত হয়, প্রকাশ হয় বিভিন্ন স্থূল ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে, যা আমাদের নজরে আসে। মানস শক্তি যখন ক্রিয়াশীল হয়, তখন আমাদের জৈব শরীরের মধ্যে হরমন বা বিশেষ ধরনের রস নিঃসরণ শুরু হয়। এই হরমন আমাদের স্থূল ইন্দ্রিয়গুলোকে উত্তেজিত করে বাহ্য ক্রিয়া সংগঠনে সাহায্য করে থাকে। মানস শক্তির অভাৱে কোনো জীব, কোনো কাজ তা সে ভালো বা মন্দ কোনো ক্রিয়াই করতে সক্ষম নয়। ঋষিপুরুষগন বলছেন, শরীরের মধ্যে যখন আমাদের বিষ উৎপন্ন হয়, তখন তা শরীর বের করে দিতে চায়। ঠিক তেমনি আমাদের মননের বিচারধারার মধ্যে যখন কোনো বৈকল্য বা বিকার উৎপাদন হয়, তখন তা আমাদের শরীরের বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসে। আর এই প্রক্রিয়াই আমাদের শারীরিক সুখ বা দুঃখের কারন হয়ে থাকে। এমনকি মানসিক সুখ দুঃখের কারনও হয়ে থাকে। একথা ভালো ভাবে বুঝে নেবার চেষ্টা করতে হবে আমাদের। আমাদের মনের মধ্যে উদ্ভূত কাম-বাসনা যখন স্থূল ইন্দ্রিয়ে উপস্থিত হয়, তখন সে আমাদের উর্জ্বাশক্তিকে ঠেলে বের করে দিতে চায়, আর আমরা ইন্দ্রিয়সুখ অনুভব করি। আমরা দর্শনসুখ, রমনসুখ, শ্রবণসুখ, ইত্যাদি অনুভব করি। এই যে ইন্দ্রিয়সুখ বা দুঃখ এটি প্রথমে আমাদের মানস শক্তিকে আশ্রয় করে জড়ো হয়েছিলো বা সঞ্চয় হয়েছিলো।
তো আমাদের সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয় সকলের যে ক্রিয়াশক্তি তা আমাদের শুধু শারীরিক সুখ দুঃখের কারন নয়, আমাদের জীবনের সমস্ত ধরনের সুখ-দুঃখের কারন হয়ে থাকে। সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়শক্তির ক্রিয়া পঞ্চমহাভূত, ও পঞ্চ তন্মাত্রের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। সত্যি কথা বলতে কি, ইন্দ্রিয় আমাদের দশটি নয়, ইন্দ্রিয় আমাদের এগারোটি। অর্থাৎ পাঁচটি কর্ম্মেন্দ্রিয়, পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়, আর একটি মানস। সাংখ্য দর্শনে বলা হচ্ছে, মানস আমাদের এই এগারোটি ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করছে। কারন মানস, সমস্ত ইন্দ্রিয় দ্বারা লব্ধ জ্ঞান শুধ সংগ্রহ করছে তাই নয়, এই মানস হচ্ছে ভোক্তা। এই মানসের দ্বারাই আমাদের জ্ঞানেন্দ্রিয়, কর্ম্মেন্দ্রিয়, ক্রিয়া করবার শক্তি পাচ্ছে। এবং নিজ নিজ কর্ম্মক্ষেত্রে ক্রিয়া করছে।
তো মানস একদিকে যেমন বাহ্যতঃ ক্রিয়া করছে, তেমনি আমাদের সমস্ত অন্তঃ-ক্রিয়া সংগঠনের মালিক। একটা মটোর যেমন ক্রিয়া করে তার যন্ত্রপাতির সাহায্যে, তেমনি এই মোটরকে শক্তি যোগায় ইলেকট্রিসিটি বা তেল, অর্থাৎ ইন্ধন। আমাদের শরীরে এই মানস এই ইন্ধন, তেল, বা ইলেকট্রিক শক্তির কাজটি করে থাকে। তেল বা ইলেকট্রিক শক্তি নিজে কোনো কাজ করতে পারে না, কিন্তু মোটরের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাহায্য পেলে, সে তার শক্তির উপযোগিতা প্রদর্শন করতে পারে।
এই মানসের মধ্যে প্রতিনিয়ত নানান রকম সংকল্প ও বাসনার বুদ্বুদ উৎপন্ন হচ্ছে। আর এই সংকল্প ইত্যাদি হচ্ছে ত্রিগুণের পরিনাম বিশেষ। আমাদের মধ্যে যে চেতনা, তা এই মানসের মাধ্যেমেই প্রবাহিত হচ্ছে। এই জন্য যোগীপুরুষগন বলছেন, আপনি যদি ইন্দ্রিয় সংযম করতে পারেন, আপনার ভিতরে কামনা-বাসনা-সঙ্কল্পগুলোকে যদি আপনি ধরতে পারে, তবে আপনি মানস সরোবরে অবগাহন করতে পারবেন। আর সেখানে যদি সংযমরূপ নৌকায় সওয়ারী হতে পারেন, তবে আপনি এই মানস সরোবরে উদ্ভূত সমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করে পরমশান্তিতে থাকতে পারেন।
তো আমরা শুনছিলাম অহঙ্কারের কথা। আমরা শুনেছি, অহঙ্কার দুই প্রকার, সাত্ত্বিক ও তামসিক। সাত্ত্বিক অহঙ্কার থেকে জাত হচ্ছে মানস অর্থাৎ অতি সূক্ষ্ম অবস্থায় কি ঘটছে ও তার কার্য্য-কারন তত্ত্ব (causal) তা এই মানসের মধ্যে প্রতিভাত হচ্ছে। মানস হচ্ছে বিশ্লেষাত্মক প্রক্রিয়া বিশেষ। মানস হচ্ছে পরিণতির কার্য্য-কারন। অন্যদিকে তামসিক অহঙ্কার-এর ফল হচ্ছে পাঁচটি তন্মাত্র, অর্থাৎ অতিসূক্ষ্ম উপাদান যার সংজ্ঞা নিরুপন করা শক্ত। প্রাথমিক মৌলিক পদার্থ এই তন্মাত্র ( শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ) । এই প্রাথমিক মৌলিক পদার্থকে কখনো বিশ্লেষণ করা যায় না। একে আপনি প্রাকৃতিক শক্তি নিচয়ও বলতে পারেন। জীবের স্বাভাবিক বাসস্থান হচ্ছে এই তন্মাত্র। এই তন্মাত্র থেকে আসে পঞ্চমহাভূত। প্রাণহীন, বোধশক্তিহীন, অনুভূতিহীন, অচেতন, পদার্থ বিশেষ। সৃষ্টির প্রাথমিক পর্যায়ে এই বায়বীয়, গ্যাসীয় বা তরল পদার্থের উৎপত্তির কারন হচ্ছে এই তন্মাত্র। এই তন্মাত্র থেকেই উদ্ভূত হচ্ছে পঞ্চ মহাভূত। আসলে ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ এই চারটিকে বলা হয় মৌলিক পদার্থ, যার ভিন্ন ভিন্ন মিশ্রনের ফলে এই সমস্ত প্রকাশিত-জগৎ সাকার ও গুনবিশিষ্ট হচ্ছে। জগতের পরিবর্তন প্রকট হচ্ছে। এখানে মানস বা ইন্দ্রিয়সকল অনুপস্থিত। বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের বেশিরভাগটাই এই তামসিক অহঙ্কারের ফল। এখানে অর্থাৎ গ্রহ, উপগ্রহ, তারা, নক্ষত্র যা কিছু আমাদের দৃষ্টির মধ্যে বা দৃষ্টির বাইরে তা এই তামসিক অহঙ্কার থেকে জাত।
তামসের বিশেষত্ব হচ্ছে এর দৃঢ়তা, স্থায়িত্ব বা স্থিরতা। পৃথিবী অপরিবর্তনীয় ও স্থায়ী, এর একটা নিজস্ব অবয়ব আছে। জল, অগ্নি, আকাশ, বাতাস, এদের সবার আলাদা আলাদা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। এই যে পঞ্চভূতের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, তা কখনও পরিবর্তন করা যায় না। সমগ্র প্রকাশিত জগৎ উৎপত্তির কারন এই পাঁচ মহাভূত। এই ভূৎসকল যখন ভিন্ন ভিন্ন পরিমানে, ও ভিন্ন ভিন্ন ধাপে, ভিন্ন ভিন্ন মিশ্রের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলতে লাগলো, তখন জগৎ রূপান্তরিত হতে হতে পরিণতির দিকে এগিয়ে চললো।
আমরা আগেই শুনেছি, এই স্থূল পঞ্চভূতের সূক্ষ্ম রূপ হচ্ছে পাঁচ তন্মাত্র। যখন আমরা কোনো কিছুকে হাত দিয়ে ধরি, তখন এই বস্তুর একটা বৈশিষ্ট্য আমাদের অনুভূতিতে আসে। কখনো ঠান্ডা, কখনো গরম, কখনও খসখসে, কখনো মসৃন। ঠিক তেমনি আমরা যখন চোখ দিয়ে দেখি, তখন আমাদের চোখের আয়নায় বা মনের আয়নার সামনে একটা অবয়ব ভেসে ওঠে। আমরা একটা বিশেষ অনুভূতি সম্পন্ন হই। ভিন্ন ভিন্ন পদার্থের মধ্যে এই যে বিশেষ বিশেষ অনুভূতি, যা আমাদের ইন্দ্রিয়সকল অনুভব করে, এটাই হচ্ছে ওই পদার্থের সূক্ষ্ম অবস্থা অর্থাৎ তন্মাত্র। পঞ্চভূতের ভিন্ন ভিন্ন মিশ্রনের কারনে উদ্ভূত পদার্থের মধ্যে তন্মাত্র সুপ্ত অবস্থায় বিরাজ করছে। একজন অন্ধ, কালাও এই অনুভূতির যোগ্য হয়ে থাকে। অর্থাৎ পদার্থের মধ্যে শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ - এর সুপ্ত অবস্থান হয়ে থাকে। তো আমরা যাকিছু ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধি করি, তা স্বরূপত আমাদের ইন্দ্রিয়সকলের মধ্যে নয়, এসব আসলে সেই উপাদানেরই বৈশিষ্ট্য। এসব ত্রিগুণাত্মক প্রকৃতির গুন, যা সমস্ত পদার্থের মধ্যেই ভিন্ন ভিন্ন প্রকারে নিহিত আছে। শব্দ আমাদের কানের মধ্যে নেই, গন্ধ আমাদের নাকের মধ্যে নেই, কান বা নাক হচ্ছে মাধ্যম মাত্র যার সাহায্যে মানস এই শব্দ-গন্ধ অনুভবের মধ্যে তরঙ্গের ঢেউ তুলছে। আর বুদ্ধি বা মহৎ-এ প্রতিফলিত চৈতন্য শক্তির মাধ্যমে পুরুষ এই ভোগ করছেন।
এই তন্মাত্র মহাভূতদেরকে সঙ্গে নিয়ে এই পার্থিব জগতের প্রকাশ ঘটাচ্ছে। সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে যে চেতনশক্তি তা মনের মাধ্যমে এই প্রকাশিত পার্থিব জগতের জ্ঞান সংগ্রহ করছে। জগতের সমস্ত বস্তু সম্পর্কে জ্ঞাত করাচ্ছে মানস ।
এবার আসি রাজসিক অহঙ্কারের কথায়। রাজসিক অহঙ্কার হচ্ছে একটা মাধ্যম যার সাহায্যে এই জ্ঞানের প্রবাহ চলছে। এই রাজসিক অহঙ্কার আমাদের অজ্ঞান অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। অথবা জ্ঞানালোক থেকে অজ্ঞান অন্ধকারের জগতে প্রবেশ করাচ্ছে। এই রাজসিক অহঙ্কার যেন একটা চলমান গাড়ি, যা আমাদের অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসে, বা উল্টোটা করে থাকে। রাজসিক অহঙ্কার একটা শক্তি বিশেষ যা আমাদের সুপ্ত গুন্ অর্থাৎ সাত্ত্বিক বা তামসিক গুন্ প্রকাশে সাহায্য করে থাকে। এই রজঃ শক্তি না থাকলে, আমাদের ভিতরের সুপ্তগুন্ অর্থাৎ তামসিক গুন্ বা সাত্ত্বিক গুন্, তার প্রকাশ সম্ভব হতো না। তো রজঃগুন হচ্ছে সেই শক্তি যা আমাদেরকে অজ্ঞান অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোকে নিয়ে যেতে পারে, আবার এই রাজসিক শক্তিই পারে আমাদের জ্ঞানের জগৎ থেকে অজ্ঞানের জগতে নিয়ে যেতে। আর এই কারণেই যোগীপুরুষগন সাধন পথে রজোগুণের মাহাত্ম স্বীকার করেছেন।
তো সাংখ্য দার্শনিকদের মতে প্রকৃতি ও পুরুষের মিলনে উদ্ভূত হচ্ছে মহৎ বা বুদ্ধি। এই বুদ্ধি সূক্ষ্ম। এই বুদ্ধিই দ্বৈত বোধের সৃষ্টিকারী। অর্থাৎ এই বুদ্ধির কারণেই ভালো-মন্দ, নিত্য-অনিত্য, সত্য-মিথ্যা, ঠিক-বেঠিক নির্ধারিত হচ্ছে। এই সূক্ষ্ম বুদ্ধিই পুরুষের নিত্যতা বা শাশ্বত অবস্থা এবং প্রকৃতির অনিত্যতা নির্নয় করে থাকে। যা কিছু দৃশ্যমান, তার সবই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তনশীল। তো প্রকৃতির পরিনাম ধর্ম্মী স্ব-ভাব অর্থাৎ অনিত্যতা, ও পুরুষের অপরিণামী স্ব-ভাব বা নিত্যতা বুদ্ধির উপস্থিতেই প্রকট হয়ে থাকে। এবার বুদ্ধি থেকে অহঙ্কার অর্থাৎ আমি-বোধ। সাত্ত্বিক অহঙ্কার থেকে আমরা পাই মানস, অর্থাৎ চিন্তা করবার শক্তি, কর্ম্মেন্দ্রিয় অর্থাৎ ক্রিয়া করবার শক্তি, এবং জ্ঞানেন্দ্রিয় অর্থাৎ বিষয় বা দৃশ্যের মধ্যে ভিন্নতাকে সুনির্দিষ্ট করবার শক্তি।

Comments
Post a Comment