আত্ম-বিশ্লেষণ - মূলসূত্র : সাংখ্য দর্শন।


আত্ম-বিশ্লেষণ -  মূলসূত্র : সাংখ্য দর্শন। 

এক  :

আমরা একটু ভালো থাকার জন্য কত কিছুই না করি। তথাপি সারাক্ষন একটা ভয়ে ভয়ে থাকি।  এই বুঝি শরীর  খারাপ করলো। এই বুঝি জীবনের অন্তিম দিন ঘনিয়ে এলো। আর বেঁচে থাকবার জন্য  সোনার তরী এই স্থূল শরীরটাকে সুস্থ-সবল রাখবার জন্য কতই না কসরত করি। সকাল-বিকেল প্রাণায়াম ইত্যাদি করি। পরিমিত আহার করি, পুষ্টিকর খাবার খাই। তথাপি ভয় যায় না। শারীরিক অসুস্থতায় ডাক্তারের কাছে, কবিরাজের কাছে ছুটে যাই। মনের শান্তির জন্য গুরুদেবের কাছে যাই, তান্ত্রিকের কাছে যাই।  জড়িবুটি খাই, তান্ত্রিক ক্রিয়া করি, যাগযজ্ঞ করি।  তথাপি দুঃখ দূর হয় না। 

 মরণের  পরে কি হবে, তা নিয়ে সারাক্ষন আতঙ্কিত হয়ে থাকি। তাই সারা গায়ে (গলায়, হাতে, মাথায়) রুদ্রাক্ষের মালা ধারণ করি। শুনেছি রুদ্রাক্ষ ধারণকারীকে স্বয়ং শিব ঠাকুর রক্ষা করে থাকেন। মৃত্যুর পরে রুদ্রাক্ষ ধারণকারীকে স্বয়ং শিব তাঁর শিবলোকে নিয়ে যান। তুলসীর মালা পড়ি।  শুনেছি তুলসী মালাধারীকে স্বয়ং বিষ্ণু তার বিষ্ণুলোকে নিয়ে যান। পুজো পাঠ  করি। জপ-ধ্যান করি। ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করি।  কিন্তু ভয় যেন কিছুতেই আমাকে ছেড়ে যেতে চায় না। মৃত্যুর পরে কোথায় যাবো, তা জানি না। মৃত্যুর পরের জগৎ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে এক মহাত্মা  বলেছিলেন,  সেটা নাকি একটা স্বপের জগৎ। মৃত্যুর পরে আমরা সবাই নাকি সেই স্বপ্নের জগতে বাস করি। আর এই স্বপ্নের জগৎ নাকি, পার্থিব জগতের অনুরূপই  একটা জগৎ।  সেখানে নাকি এই জগতের সব কিছুই আছে। সেখানে আমাদের স্থূল শরীর  থাকে না, কিন্তু সূক্ষ্ম শরীর  বা একটা মানসিক শরীর  থাকে।  এমনকি যারা অতীতে মারা গিয়েছেন, তারাও নাকি সেখানে সূক্ষ্ম শরীরে  আছে।  কিন্তু আমি তো স্বপ্নের মধ্যে নানান ভয়ংকর  দৃশ্যের সম্মুখীন হই। স্বপ্নের মধ্যেও আমি ভয়ে ভয়ে থাকি। স্বপ্নে আমি এক অজানা ভীতিপ্রদ জগতের মধ্যে প্রবেশ করি।  আর সেখান থেকে ফিরে আসবার রাস্তা হারিয়ে ফেলি। নিজেকে অসহায় লাগে। স্বপ্নের মধ্যে আমি পরীক্ষার আতঙ্কে থাকি। কিঁছুতেই পড়া শেষ করতে পারি না। স্বপ্নের জগতেও আমার অফিসে দেরি হয়ে যায়। স্বপ্নের জগৎ একটা আতঙ্কের জগৎ। স্বপ্ন ভেঙে গেলে আমি স্বস্তি ফিরে পাই।  তাহলে কি আমি মৃত্যুর পরে এই দুঃস্বপ্নের জীবনে প্রবেশ করবো ? সারাক্ষন ছাইপাশ এই সব দুশ্চিন্তা ঘিরে থাকে।  আর আমি ভয়ে ভয়ে থাকি। 

যদিও এই বোধ আমার দৃঢ় হয়েছে, যে এই শরীরটা আমি নোই, এই শরীরটা আমার। আমি এই শরীরকে আশ্রয় করে কালাতিপাত করছি মাত্র ।  কিন্তু কথা হচ্ছে, এই স্থূল  শরীর  ছেড়ে যাবার পরে আমার কি গতি হবে, তা আমি জানিনা। আমার এও ধারণা  হয়েছে, যে এই স্থূল শরীর  ছেড়ে যাবার পরে আমাকে একটা সূক্ষ্ম শরীরের আশ্রয়ে থাকতে  হবে। সেই শরীরটার নাম হচ্ছে মনোময় শরীর। আর এই মনোময় শরীরে আমাকে সমস্ত সুখ-দুঃখ ভোগ করতে হবে। কিন্তু তার পরে কি হবে ? আর কতদিনই বা আমাকে সেই মনোময় সূক্ষ্ম শরীরে থাকতে হবে, আর একটা আতঙ্কের জীবন অতিবাহিত করতে হবে, তা আমি জানি না।  বরং বলা যেতে পারে, এটা  ভেবে আমি ভয় পাই, এই যে স্থূল শরীরে আমি আছি, তা কিছু কালের মধ্যেই কালের গতির সঙ্গে সঙ্গে পচনশীল পদার্থে পরিণত হবে। হয়তো অগ্নিতে দাহ  হবার কারনে কয়েক ঘন্টার মধ্যে শরীরের গতি হবে পঞ্চভূতে। অর্থাৎ এই শরীর  পঞ্চভূতে মিশে যাবে। এখনই, এই বৃদ্ধাবস্থায়,  শরীরের কিছু কিছু অঙ্গ অকেজো বা কমজোরি হয়ে পড়েছে। এর পরে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই একটা সময় আসবে যখন শরীর স্থবির হয়ে যাবে। শরীর তখন কর্ম্ম করবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে,  চলাফেরার অযোগ্য হয়ে যাবে, চোখের দৃষ্টি আবছা হয়ে আসবে, শ্রবণশক্তি হারিয়ে যাবে, চোখের সামনে থেকে এই সুন্দর পৃথিবীটা হারিয়ে যাবে। শ্রবণশক্তি হারিয়ে যাবে,আমি হয়তো আর এই পৃথিবীর গান শুনতে পাবো না। হয়তো একটা  মনোময় শরীরের সঙ্গে মনোময় জগতে প্রবেশ করবো, যে শরীর  সূক্ষ্ম কিন্তু ব্যক্ত। যার সমস্ত অস্তিত্ত্ব থেকেও নেই। যেমনটা আমাদের স্বপ্নের জগতে হয়ে থাকে। স্বপ্নকালীন অবস্থায়, যেমন স্বপ্নের জগতকে  সত্য বলে মনে হয় মাত্র, কিন্তু সত্য হচ্ছে এই স্বপ্নের জগতের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই,  কোনো অস্তিত্ত্ব নেই। আর তা কেবলমাত্র স্বপ্ন থেকে বা ঘুম থেকে জেগে উঠে টের পাই। 

যাই হোক, আমি সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকি।  ভয় আমাদের মাকড়সার জালের মতো ঘিরে থাকে। এই  ভয়ের জাল, আতঙ্কের জাল কেটে আমি বেরুতে পারি না। এক দমবন্ধ করা অবস্থা।  আমি কেবল অসহায় হয়ে, ধীরে ধীরে অবশ হয়ে যাই। জ্ঞান হারাই। এখান  থেকে বেরুবো কি করে ? এই অবস্থা থেকে বেরুবার তাগিদ আমাকে সব অশরীরী মহাত্মাদের আশ্রয় গ্রহণ করে।  তাদের কথা শুনবার জন্য মনের মধ্যে একটা ব্যাকুলতা বোধ করতে থাকি। আর এই ব্যাকুলতাই আমাকে সাংখ্য দর্শনের সম্মুখীন করে দেয়।  আমি অদ্ভুত এই দর্শনের  মধ্যে প্রবেশ করি। 

সাংখ্য দর্শনের একটা ছোট্ট কারিকা পুস্তিকা আছে।  যার লেখক হচ্ছেন ঈশ্বর কৃষ্ণ। এই ছোট্টো পুস্তিকায়  মাত্র ৭২টি শ্লোক। কারিকা কথাটার অভিধান গত অর্থ সাংকেতিক ভাষা। অর্থাৎ স্বল্পাক্ষর বৃত্তি দ্বারা অনেকার্থ জ্ঞাপিকা কবিতা। এই শ্লোকগুলো আমাকে আত্মবিশ্লেষনের সুযোগ করে দিলো।  সেই কথাগুলোই আজ আমি লিপিবদ্ধ করবার জন্য সচেষ্ট হয়েছি।   

সাংখ্য (সাঙ্খ্য) - বলা হয়, এটি আসলে প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিক কপিলমুনি দ্বারা রচিত পচিঁশ সংখ্যক তত্ত্বমূলক দর্শনশাস্ত্র। একে কাপিল বা কপিল দর্শনও বলা হয়ে থাকে। এই পঁচিশটি তত্ত্ব হচ্ছে পুরুষ, প্রকৃতি, মহৎ (বুদ্ধি), অহঙ্কার, সূক্ষ্মপঞ্চভূত  (শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ), স্থূল পঞ্চভূত  (ক্ষিতি, অপ, তেজঃ, মরুৎ, ব্যোম) পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ন, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক) পঞ্চ কর্ম্মেন্দ্রিয় (হস্ত, পদ, বাক, পায়ু, উপস্থ) ও একটি অন্তর-ইন্দ্রিয় অর্থাৎ মন এই পঁচিশটি তত্ত্বের দর্শনশাস্ত্র। কেউ কেউ বলে থাকেন, সাংখ্য কথাটার অর্থ হচ্ছে "সাং" অর্থাৎ যথাযথ, "খ্য" অর্থাৎ জানা বা জ্ঞাত হওয়া। অর্থাৎ যথাযথ ভাবে জ্ঞাত হওয়ার গ্রন্থ বা দর্শনশাস্ত্র। এখন কথা হচ্ছে যথাযথ ভাবে কাকে জানা ? যথাযথভাবে এই সৃষ্টিকে জানা, আর এইভাবে নিজেকে, নিজের প্রকৃতিকে যথাযথ ভাবে জানা যায় যে গ্রন্থ থেকে তাকেই বলা হচ্ছে সাংখ্য দর্শন। আত্মদর্শন হয়ে থাকে এই দর্শন শাস্ত্র থেকে।  আসলে এটি একটি বিচারমূলক গ্রন্থ।  বিচারের সাহায্যে এই সৃষ্টিকে, স্রষ্টাকে, এমনকি নিজের স্বরূপকে চিনবার, জানবার এক জ্ঞানগর্ভ আলোচনার ইঙ্গিত আছে এই গ্রন্থে। "ইঙ্গিত" বলার অর্থ হচ্ছে, আমাদের প্রাচীন ঋষিগণ তাঁদের উপলব্ধি-জাত  জ্ঞান সূত্রের আকারে অর্থাৎ অতি সংক্ষেপে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। সূত্র অর্থাৎ ইঙ্গিত মাত্র।  সেখান থেকে মূল সূত্রের ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ ব্যাখ্যাকারীর জ্ঞান বা উপলব্ধি অনুযায়ী করে থাকেন। আর এই সব উচ্চ জ্ঞানাধিকারীর শব্দচয়ন এতটাই দুর্বোধ্য বা বহুমাত্রিক হয়, যে এর যথাযথ অর্থ নিরুপন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমনই  একজন কারিকার হচ্ছেন, ঈশ্বর কৃষ্ণ। আমরা এই ঈশ্বর কৃষ্ণের কারিকা থেকে বুঝবার চেষ্টা করবো সাংখ্য দর্শন। 

যখন কেউ ত্রিবিধ দুঃখের সম্মুখীন হয়, তখন তার মধ্যে দুঃখের হেতু ও দুঃখত্রানের উপায় সম্পর্কে প্রশ্ন জাগে। এই হচ্ছে কারিকার সূচনা। দুঃখ থেকে রেহাই পাবো কি করে ? এই প্রশ্ন ও তার উত্তরের সন্ধান আদিম যুগ থেকে প্রতিটি জীবের মধ্যে উৎসারিত হচ্ছে। আজও সেই প্রবাহ চলছে।  

দুঃখত্রানের (উপশমের) উপায় সম্পর্কে সাধারনতঃ যে উপায়গুলোর কথা বলা হয়, তা আসলে শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া মাত্র। উৎকৃষ্ট উপায় হচ্ছে ব্যক্ত প্রকৃতি,  অব্যক্ত প্রকৃতি ও জ্ঞাতা এই তিন সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান। আসলে যত ধর্ম্মগ্রন্থ, পুরান, দর্শনাদি  আমরা দেখতে পাই তার সবই জগতে শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ের কথা বলেছেন। ঠিক তেমনি সাংখ্য দর্শনিকগণও জগতের দুঃখের কারনে অনুসন্ধান করেছেন এবং তাত্ত্বিক জ্ঞান দান  করেছেন। সাংখ্য মতে সমস্ত দুঃখের কারন হচ্ছে আমাদের অজ্ঞানতা।  আমাদের ভ্রমাত্মক জ্ঞান।  এই অজ্ঞানতা ও ভ্রমাত্মক জ্ঞান দূর করতে পারলেই, শান্তি যা আমাদের সহজাত, তা লাভ করতে পারবো। 

আমরা যখন শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ পড়ছিলাম, তখন দেখেছিলাম, এই উপনিষদ শুরু হয়েছে কয়েকটা প্রশ্ন দিয়ে আর তা হচ্ছে এই জগতের কারন কি বা কে ? আমরা কোথা থেকে এসেছি ? সৃষ্টির পরে কে আমাদের পালন করে থাকেন ? মৃত্যুর পর আমরা কোথায় যাবো ? তখন আমাদের কি অবস্থা হবে ? কার কারনে আমরা সুখ দুঃখ ভোগ করি ? 

সাংখ্য দার্শনিক বলছেন, বলছে, সৃষ্টি স্থিতি ও লয়ের মূল  কারন জানতে গেলে প্রকৃতির মুলে যেতে হবে। অব্যক্ত অবিকৃত মূল প্রকৃতির মধ্যে প্রবেশ করতে হবে। 

সাংখ্য  দর্শন দ্বৈতবাদে বিশ্বাসী।  অর্থাৎ সৃষ্টি স্থিতি লয় বা জন্ম জীবন মৃত্যু এই তিন কার্য্য সম্পাদিত হচ্ছে যখন দুটো শক্তি একত্রিত হচ্ছে। কথায় বলে এক হাতে তালি  বাজে না। নারী ও পুরুষের মৈথুনে জন্ম নেয় মাতা-পিতার অনুরূপ আরো একটি দেহ।  অর্থাৎ সৃষ্টি মাত্রই  দুয়ের  সম্মেলনে প্রকাশিত সত্ত্বা। যখন দুটো শক্তি পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়, তখন শব্দব্রহ্ম-এর সৃষ্টি হয়। সাংখ্য  দর্শন এই দুটো শক্তিকে নাম দিয়েছেন পুরুষ ও প্রকৃতি। 

অদ্বৈত বাদীগণ অবশ্য বলছেন, এই যে প্রকাশময় বিশ্ব তা আসলে একই সত্য থেকে উদ্ভূত। সত্য এক, সত্য কখনও  দুই হতে পারে না। আর এই একই সত্য থেকে ব্রহ্মান্ডের সমস্ত কিছু উদ্ভূত, আবার প্রলয়কালে সেই একই সত্যের মধ্যে লয় প্রাপ্ত হয়ে থাকে। সেই একই সত্য বহুরূপে প্রতিভাত হচ্ছে, এবং শেষে সেই সত্যের মধ্যে প্রবেশ করছে। 

সাংখ্য  দর্শন বলছে, প্রকৃতি ও পুরুষের মিলনেই এই ব্রহ্মান্ড প্রকাশমান হয়েছে। এই যে পুরুষের কথা বলছেন, তা হচ্ছে শুদ্ধ চৈতন্য। এই শুদ্ধ চৈতন্যই সমস্ত কিছুর দ্রষ্টা ও জ্ঞাতা কিন্তু অক্রিয়। অর্থাৎ শুদ্ধ চৈতন্যের মধ্যে কোনো ক্রিয়া সংগঠিত হয় না। "পু" কথাটার অর্থ পূরণ করা। তো যিনি পূরণ করেন, তিনি পুরুষ। আবার "পুর" কথাটার অর্থ হচ্ছে শরীর। "বস" অর্থাৎ বাস করা। যিনি শরীরে বাস করেন। অর্থাৎ দেহী বা আত্মা। এই পুরুষ হচ্ছেন সৃষ্টির মূল চৈতন্যময় ঈশ্বর। তো পুরুষ সত্ত্বা হচ্ছে অক্রিয় বা নিষ্ক্রিয়  সত্ত্বা যা সৃষ্টির সমস্ত কিছুর মধ্যে দ্রষ্টা স্বরূপ হয়ে অবস্থান করছেন। ইনিই একমাত্র জ্ঞাতা। 

সাংখ্য দর্শন আরো একটা কথা বলছেন, আর তা হচ্ছে প্রকৃতি যা ক্রিয়াশীল, বা ক্রিয়াশক্তি। "প্রকৃ" অর্থাৎ করা।  যারদ্বারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যাবতীয় পদার্থ সৃষ্টি হয়েছে। এটি  চৈতন্যময় পুরুষের ঠিক বিপরীত একটা অজ্ঞানময় জড় সত্ত্বা। তো একটা জড় সত্ত্বা  আরেকটি হচ্ছে শুদ্ধ চৈতন্য।  এই দুয়ের মিলনে প্রকাশমান হয়েছে এই বিশ্বব্রহ্মান্ড। একটু অন্যভাবে বললে বলতে হয়, একটা জ্ঞানময় সত্ত্বা  আর একটা অজ্ঞানময়।  একটা ক্রিয়াশীল আর একটা নিষ্ক্রিয়। একটা স্থির আর একটা গতিশীল। দৃশ্যমান ত্রিগুণাত্বক এই যে জগৎ এর আদি কারন হচ্ছে প্রকৃতি। আমরা জানি, নিরাকার গুণাতীত ব্রহ্ম ত্রিগুণাত্বক রূপে সাকার - সত্ত্ব রজঃ তমঃ।   

সাংখ্য দর্শন দ্বৈতবাদের প্রতিষ্ঠাতা। অর্থাৎ সাংখ্য দর্শন পুরুষ ও প্রকৃতি  দুটি সত্তাকে   সমান গুরুত্ত্ব দিয়ে থাকে। এখন কথা হচ্ছে দুই হাত না হলে তালি বাজে না, নারী-পুরুষ এই দুইয়ের  মিলন না হলে  সন্তানের জন্ম হয় না, এটা  যেমন সত্য, তেমনি এই যে দুটো হাত এটা কোনো বৃহৎ সত্ত্বা  বা সমগ্র শরীরের অংশ মাত্র। আবার এই যে বৃহৎ সত্তা বা শরীর  এটি দুই ভাগে বিভক্ত অর্থাৎ এর মধ্যে যেমন আছে হাড্ডি-রক্ত মাংস তেমনি আছে এরই মধ্যে একটা সূক্ষ্ম শরীর  অর্থাৎ মন যা এই হাত দুটোকে একত্রিত হতে প্রেরণা যোগাচ্ছে। এই প্রেরণার ফলেই হাত দুটো মিলিত হচ্ছে ও একটা শব্দ তরঙ্গের সৃষ্টি করছে। আমরা যদি আরও একটু গভীরে যাই, তবে বুঝতে পারবো শুধু মন বা হাত এই শব্দ সৃষ্টি করছে না, এর মধ্যে আরো একটা জিনিস হচ্ছে ইচ্ছে বা ইচ্ছেশক্তি।  যতক্ষন মনের মধ্যে ইচ্ছেশক্তির প্রবেশ না ঘটছে, ততক্ষন না মন ক্রিয়াশীল হচ্ছে, না হাত ক্রিয়াশীল হচ্ছে। তো সূক্ষ্ম মন-শরীর ও স্থূল অন্ন-শরীর এবং ইচ্ছেশক্তি এই তিনে মিলে এই শব্দ তরঙ্গের সৃষ্টি করছে। তো হাতের  পিছনে আছে মন ও ইচ্ছেশক্তি যা বাহ্য ভাবে দৃষ্টিগোচর নয়। কিন্তু হাতের ক্রিয়া আমাদের কাছে দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে।  মনের ক্রিয়া বা ইচ্ছে শক্তির ক্রিয়া দৃষ্টি গোচর  হয় না। তথাপি, এই সত্য আমরা উপলব্ধি করতে পারি।  

সাংখ্য দর্শন ঈশ্বর বা সর্বশক্তিমান বলে কারুর অস্তিত্ত্ব সম্পর্কে নির্বিকার। ঈশ্বর থাকুন বা না থাকুন, ব্রহ্মান্ডের সমস্ত কিছুর মধ্যে গুরুত্ত্বপূর্ন হচ্ছে এই পুরুষ বা চৈতন্য সত্ত্বা  ও প্রকৃতি বা অচেতন সত্ত্বা । এদের দুজনের অবর্তমানে না ব্রহ্মান্ড প্রকাশিত হতে পারে, না ব্রহ্মান্ড ক্রিয়াশীল হতে পারে। হাত ছাড়া হাততালি হতে পারে না, আবার মন না চাইলেও হাত হাত-হাততালি দেবে না। ঈশ্বরবাদীগণ বলে থাকেন, মনের মধ্যে এই যে ইচ্ছেশক্তি যা মনকে উদ্ভুদ্ধ করছে হাততালি দিতে, একেই ঈশ্বর বলা যেতে পারে। তো তৃতীয় শক্তি সমস্ত কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এই তৃতীয় শক্তিকেই একেশ্বরবাদীগণ বলছেন ঈশ্বর। 

আসলে মহাত্মা কপিল দুটো বাদেরই সমার্থক  - এর মধ্যে একটা হচ্ছে সাংখ্য-প্রবচন সূত্র আর একটি হচ্ছে তত্ত্ব- সমাস  প্রবচন সূত্র।  মহামুনি কপিলের সেই প্রবচন কোনোটিই আর হয়তো পাওয়া যায় না। কেবল তার অনুসরণকারীরা এই সম্পর্কে যা কিছু লিখে গেছেন, তার কিছু কিছু এখনও পাওয়া যায়।  অর্থাৎ সাংখ্য প্রবচন থেকে প্রাপ্ত তত্ত্বকথা ব্যাখ্যাকারী তার নিজের মতো করে লিখে গেছেন। দেখুন একটা হচ্ছে তত্ত্বকথা। আর একটা হচ্ছে তার ব্যবহারিক প্রয়োগ। ঋষি পতঞ্জলি সাংখ্য তত্ত্বকথাকে কিভাবে ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগ করতে হবে তার উপায় সুনির্দিষ্টভাবে লিখে গেছেন, তার "যোগদর্শন" বইতে। আবার এই সাংখ্য দর্শনের অর্থাৎ নিরীশ্বর বাদের প্রভাব দেখতে পাই আমরা বৌদ্ধ সাহিত্য। অন্যদিকে ঈশ্বরবাদ  বা একেশ্বর বাদের প্রভাব আছে আমাদের বেদান্তে। 

যাইহোক, সাংখ্য দর্শন যেমন জগৎ উৎপত্তির ক্রোম হিসেবে পচিঁশটি তত্ত্বের কথা বলেছে, তেমনি ব্রহ্মজ্ঞান দান  করেছেন।  অর্থাৎ এই তত্ত্বকথা থেকে আমরা ধীরে ধীরে জগৎ উৎপত্তির মূল সেই প্রকৃতি থেকে শুরু করে পুরুষ অর্থাৎ শুদ্ধ চৈতন্য  স্বরূপে উপস্থিত হতে পারি। 

আমরা জানি সমস্ত কার্য্যের পিছনে একটা বা একাধিক কারন হয়ে থাকে। প্রকৃতির দুটো দিক , একটা ব্যক্ত আর-একটা অব্যক্ত। একটা আলো  একটা অন্ধকার। একটা দিন আর একটা রাত্রি। যা কিছু আমরা দিনের বেলা চাক্ষুষ করি, তার সবই রাত্রি বেলাতে অন্ধকারে আমাদের চাক্ষুষ না হলেও  বর্তমান থাকে। এই সত্য আমাদের সবার উপল্বদ্ধিতে আসে।  তো ব্যক্ত জগৎ যদি কার্যফল হয় তবে  কার্যের কারন স্বরূপ হচ্ছে অব্যক্ত জগৎ । সাংখ্য  দর্শন বলছে, আমাদের চোখের সামনে যা কিছু দেখছি, তার সবই একসময় অব্যক্ত অবস্থায় বর্তমান ছিল। ঘটের কারন যেমন মাটি, তেমনি মাটির মধ্যে লুকিয়ে আছে অসংখ্য সম্ভাবনা। মাটি থেকে যেমন ঘট্  হতে পারে, তেমনি হাড়ি, কলসি গেলাস ইত্যাদি হতে পারে।  অর্থাৎ কারনে মধ্যে লুকিয়ে আছে অসংখ্য সম্ভাবনা।  আবার  যা কিছু আমরা দেখছি, সেটি শুধু কার্য্য নয়, এই সবের  মধ্যেই লুকিয়ে আছে অসংখ্য সম্ভাবনা বা কারন । পাথরের টুকরোর মধ্যে আছে শিব, আছে কৃষ্ণ আছে বানর।  শিল্পীর মনের মধ্যে যে চিত্র আঁকা  হয়, ধীরে ধীরে তা এই পাথরের টুকরোর মধ্যে ফুটে ওঠে। একটা সন্তান যখন জন্ম নেয়, সেই সন্তানের মধ্যেও অসংখ্য সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে, যা ভবিষ্যতে প্রকাশিত হতে পারে। শুধু পরিবেশ ও পরিস্থিতি (নিমিত্ত কারন) সহায় হলেই, এই সম্ভাবনা নানানরূপে প্রকাশিত হতে পারে। আর পরিবর্তনশীল এই জগতে সব কিছুর মধ্যে সেই সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে।  আমরা যা কল্পনাও করতে পারি না। যা কিছু আমি আপনি দেখছি, তা কেবল একটি সময়ের জন্য, একটা মুহূর্তের জন্য, কেননা প্রকৃতির সমস্ত কিছুর মধ্যে পরিবর্তনের স্বভাব বর্তমান। আর এই পরিবর্তনের স্বভাবের কারণেই সে তার পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে। মূল বস্তু ধীরে ধীরে কালের গতিতে মিশ্র বস্তুতে পরিণত হয়। আর প্রত্যেক মিশ্র বস্তু ত্রিগুণের তারতম্যের কারনে ভিন্ন ভিন্ন স্বভাবের ভিন্ন ভিন্ন বস্তুর জন্ম দিয়ে থাকে। 

মোদ্দা কথা হচ্ছে সাংখ্য দর্শন কোনো বস্তুর প্রকাশের পিছনে যে কারন আছে তার বিশ্লেষণ করেছেন। আবার কারনের যে কানুন (law of  causes ) ও তার পরিণতি-জ্ঞান  সমস্ত বিশ্বকে চকিত করছে। বিশ্বে কোনো কিছুই কারন বিহীন হতে পারে না। সবই  নিয়মের অধীন। সূর্য তার নিজের অক্ষপথে কাল থেকে কালান্তর ধরে ঘুরেই চলেছে। এমনকি ঈশ্বরের যদি কোনো অস্তিত্ত্ব থাকে তবে জানবেন, তারও একটা কারন আছে। আবার  আমরা যে সুখ-দুঃখ ভোগ করছি অর্থাৎ সুখ দুঃখের যদি কোনো অস্তিত্ত্ব থাকে তবে জানবেন তারও  একটা কারন আছে। আমাদের কাজ হবে সেই সুখ-দুঃখের কারনের সন্ধান করা। আর যেহেতু জগতের সমস্ত বস্তুই মিশ্র অবস্থায় আছে, তাই যে কারনের কারনে এই সুখ-দুঃখের উপলব্ধি সেই  কারন থেকে ভোক্তাকে সরিয়ে নিতে পারলেই, আমরা সুখ-দুঃখের পারে চলে যেতে পারবো। সাংখ্য দর্শন বলছে,  তথাকথিত সুখ-দুঃখ যা আমাদের ভ্রমাত্মক জ্ঞান বা অজ্ঞান থেকে উপলব্ধি হয়ে থাকে, তার অপসারণ করতে পারলেই আমরা সুখ-দুঃখের পারে চলে যেতে পারি। শুধু সত্যজ্ঞান।  সত্য কি তার জ্ঞান হলেই আমাদের সমস্ত দুঃখাদি দূর হতে পারে। আর এই অপসারণ-এর জ্ঞান দান  করে সাংখ্য দর্শন। 

আরো একটা কথা হচ্ছে এই যে প্রকৃতি তা ত্রিগুণাত্মক।  প্রকৃতির সমস্ত বস্তুর মধ্যে নিহিত আছে তার গুন্ বা তিনটে গুন্ । গুণহীন কোনো বস্তু জগতে নেই।  তা আমরা জানি আর না জানি।  আর এই যে গুন্ তার সেই বস্তুর সঙ্গে অভেদ সম্পর্কযুক্ত হয়ে রয়েছে । ধীরে ধীরে  আমরা কারণের সূত্র (সঙ্কেত) সম্পর্কে ঋষি কপিলদেবের  কাছ থেকে শুনবো। চলবে। ...

হরি ওম তৎ  সৎ। 

--------------------


আত্ম-বিশ্লেষণ - মূলসূত্র : সাংখ্য দর্শন। ২ 

দুই 

জগতের সমস্ত কার্য্যের পিছনে আছে এক বা একাধিক কারন। কারন ছাড়া কোনো কাজ এই জগত- ব্রহ্মাণ্ডে সংগঠিত হতে পারে না, হয় না। ব্যক্ত জগতের ক্ষেত্রে যেমন একথা সত্য, তেমনি অব্যক্ত জগৎ সম্পর্কেও এটি ধ্রুব সত্য। প্রতিটি কার্য্যের পিছনে একটা কারন আছে। আবার কার্য্যের ভিতরেও  লুকিয়ে আছে কারন। তো কার্য্য ও কারন পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এরা এঁকে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। প্রতিটি বস্তুর মধ্যে তার ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে। কথায় বলে সমস্ত শিশুর মধ্যেই ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা।  অতীতের পরিনাম বর্তমান হয়ে রয়েছে। আবার একই ঘটনা বা বস্তুর সঙ্গে অনেক কারন লুকিয়ে থাকে।  আমি যে জন্ম গ্রহণ করেছি, তার একটা ক্রোম আছে। এই যে বৃদ্ধ দেহ এ একসময় যুবক ছিল, তার আগে কিশোর ছিল, তার আগে শিশু ছিল, তার আগে মাতৃগর্ভে ভ্রূণ আকারে ছিলো।  তার আগে পিতার মধ্যে বীর্যকারে ছিলো।  এই বীর্য একসময় রক্তের আকারে ছিলো. রক্ত একসময় অন্নের রসের  মধ্যে ছিলো. অন্ন একসময় উদ্ভিদের মধ্যে ছিলো. উদ্ভিদ একসময় পৃথিবীর মধ্যে ছিলো. পৃথিবী একসময় জলের মধ্যে ছিলো, জল একসময় তেজের মধ্যে বা অগ্নির মধ্যে ছিলো, তেজ একসময় বায়ুর মধ্যে ছিলো, বায়ু একসময় আকাশের মধ্যে ছিলো.আকাশ একসময় হিরণ্যগর্ভের মধ্যে ছিলো। ওই যে আগে যা ছিলো  তাকে আপনি কারন বলতে পারেন। আর আজ যা হয়েছেন, তা আসলে কার্য্য। এই কার্য্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে অসংখ্য সম্ভাবনা।  অর্থাৎ ভবিষ্যতের ব্রহ্মান্ড লুকিয়ে আছে এই আজকের কার্য হিসেবে  বা ভবিষ্যৎ কার্য্যের কারন হিসেবে বর্তমান প্রকট হয়ে রয়েছে। 

আবার প্রত্যেক প্রকাশিত বস্তুর মধ্যেই প্রকাশ ও অপ্রকাশ লুকিয়ে আছে।  আমার যেমন দশটি বহিরেন্দ্রিয়  আছে তেমনি  আছে অন্তরেন্দ্রিয়। আমার মধ্যে আছে বুদ্ধি, আমার মধ্যে আছে তেজঃশক্তি,  ইচ্ছেশক্তি। এগুলো আমাদের উপল্বদ্ধিতে আসে, কিন্তু অন্যের কাছে গোচরীভূত হয় না। ঠিক তেমনি সমস্ত বস্তুর মধ্যে যেমন একটা বাহ্যিক দিক আছে যা আমাদের সকলের কাছে দৃশ্যমান তেমনি আছে কিঁছু অদৃশ্য শক্তি যা বাইরের থেকে বোঝা যায় না,  কিন্তু আছে। আমাদের সবার মধ্যে আছে বোধশক্তি যার জন্য আমার সুখ-দুঃখ, আনন্দ নিরানন্দ উপলব্ধি করি । এই যে উপলব্ধি এইযে বোধশক্তি এ কাউকে দেখানো য়ায় না, কিন্তু আছে - এসব দ্রুব সত্য।  আমরা একে  অস্বীকার করি না, করতে পারি না। এই যে বোধশক্তি বা চেতনশক্তি এর একটা আশ্রয় আছে। এই চেতনশক্তি যার আশ্রয়ে আছে তিনি চৈতন্য। এই চৈতন্যের দুটো ভাগ একজন দ্রষ্টা আরেকজন ভোক্তা। একটা পরমাত্মা, আরেকটা জীবাত্মা। 

আমি যে সুখ-দুঃখ ভোগ করি, তা এই বোধশক্তির কারনে হয়ে থাকে। শরীরের কোনো অঙ্গ  থেকে যখন এই বোধশক্তি স্তিমিত হয়ে যায়, তখন আমার আর কোনো শারীরিক সুখ-দুঃখ-বেদনা অনুভব হয় না। তেমনি মন থেকে যখন এই বোধশক্তি লোপ পায়, তখন আমার আর কোনো মানসিক সুখ-দুঃখ বোধ থাকে না। আসলে এই যে রক্তমাংসের শরীর , দশ ইন্দ্রিয়, মন বা বুদ্ধি এগুলো সবই হচ্ছে জড়। অন্ন বা খাদ্য থেকে সূক্ষ্ম অংশ নিয়ে যেমন শরীর  পুষ্টিলাভ করে তেমনি এই অন্ন থেকেই গঠিত হয়  মন বা বুদ্ধি । এসবই  জড়পদার্থ।  কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ বুদ্ধির মানুষের কাছে এগুলো সহজে ধরা পড়ে  না। যাইহোক, সাংখ্য মতে সমস্ত দ্রব্যের মূলগত একটা ঐক্য আছে।  মূলত সবই এক। সমস্ত দ্রব্যই পরিনাম ক্রমে সবরকম (ভিন্ন ভিন্ন) দ্রব্য হতে পারে। 

সাংখ্য দর্শন পৃথিবীর সবচেয়ে আদি-দর্শন। এই আদি দর্শন শাস্ত্র  কারণকে  দুভাগে ভাগ করেছে প্রথমত নিমিত্ত-কারন  দ্বিতীয়ত উপাদান-কারন । বলা হয় নিমিত্ত বশত উপাদানের পরিনাম প্রাপ্ত অবস্থা হলো কার্য। বলা হচ্ছে, মূল কারন হলো প্রকৃতি। নিমিত্ত কারন হলো পুরুষ। এই পুরুষের সান্নিধ্য বশতঃ মূল উপাদান অর্থাৎ প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন পরিনাম প্রাপ্ত হয়ে এই বিষয় ব্রহ্মান্ড রূপে অভিব্যক্ত হয়েছে। তাই সাংখ্য দার্শনিকগণ বলে থাকেন, সব বস্তু থেকে সবকিছুই হতে পারে। জল, মাটি ইত্যাদি আদি পঞ্চভূত থেকে সমস্ত উদ্ভিদাদির সৃষ্টি হয়েছে আবার তা থেকে উদ্ভিদভোজী জঙ্গম  প্রাণীদের সৃষ্টি হয়েছে। এই যে জঙ্গম প্রাণীদেহ আবার পরিণত হচ্ছে পঞ্চভূতে।  সুতরাং আমরা সহজেই এটা  বুঝতে পারি যে চক্রাকারে সব বস্তু থেকে সব বস্তু হতে পার। ঋষি বলছেন "সর্বং সর্বাত্মকম" 

এই প্রসঙ্গে একটা গল্প বলি, শিরডির সাঁইবাবার নাম শুনে থাকবেন আপনারা।  তাঁর কাছে একদিন এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত এসেছিলেন দেখা করতে। সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন, কিঁছু লাড্ডু। সাঁইবাবা সম্পর্কে তিনি অনেক প্রশংসাবাক্যঃ শুনেছেন।  তিনি নাকি মস্ত সাধু।  কেউ কেউ তাঁকে ভগবানের সাক্ষাৎ অবতার বলে থাকেন। তো ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, সাঁইবাবাকে  বললেন, আপনার জন্য লাড্ডু নিয়ে এসেছি, আসুন একসাথে বসে আমরা লাড্ডু গ্রহণ করি।  সাঁইবাবা  বললেন, ঠিক আছে বসুন আমার কাছে চাপাটি (রুটি) আছে পেঁয়াজ আছে। আগে দুজনে বসে সেটা খেয়ে নিই, শেষে মিষ্টিমুখ করা যাবে।  বলে দুটো পেঁয়াজের টুকরো, আর চারটে  চাপাটি বের করে দুটো পন্ডিতের হাতে দিতেই, পণ্ডিত ব্রাহ্মণ ছিঃ ছিঃ  করে উঠে দাঁড়ালেন। আর বলে উঠলেন, আমি শুনেছিলাম, আপনি একজন সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ।  আপনি পেঁয়াজ খান ? এটা তো তামসিক খাবার। এসব খেলে শরীরে তামসিক গুনের বৃদ্ধি হয়ে থাকে।  বলে পিছন ফিরে হাটা  দিলেন।  পিছন থেকে সাঁইবাবা ডাকলেন, বললেন, দয়া  করে কিছু মুখে না দিয়ে যাবেন না,  আপনার যা-তে অভিরুচি, আপনি বলুন তাই আপনাকে এনে দিচ্ছি।  দয়া  করে খালিমুখে আশ্রম থেকে যাবেন না। আপনি তো দুধ পান করবেন।  একটু সবুর করুন, আমি আপনার দুধের ব্যবস্থা করছি। বলে কয়েকটা পেঁয়াজ নিয়ে চটকাতে লাগলেন।  আর সবাই দেখলেন, পেঁয়াজের বাটি  দুধে পরিপূর্ন  হয়ে গেলো।  বললেন, দয়া করে গ্রহণ করুন। পন্ডিত এবার হতবম্ব হয়ে গেলেন। এগিয়ে এসে সাঁইবাবার পায়ে আছড়ে পড়লেন। সাঁইবাবা  বললেন, "সবকা মালিক এক হ্যায়।" এসব সত্যিই  করা যায় কি না জানিনা।  কিন্তু একথা সত্যি জগতের সবকিছুই সেই পঞ্চভূতের মিশ্রণ মাত্র। ত্রিগুণের মিশ্র অবস্থা মাত্র।  পার্থক্য শুধু আকার, নাম ও গুনে। ত্রিগুণের মিশ্রনের তারতম্যের কারনে এমনটা হয়ে থাকে, একথা অস্বীকার করি কি করে ? উপাদান অর্থাৎ প্রকৃতির  সান্নিধ্যে  ভিন্নতা, আসলে তো সবই এক পুরুষ ব্রহ্ম । 

এখন কথা হচ্ছে কারণের  মধ্যেই যদি সমস্ত কার্য্য লুকিয়ে থাকে, তবে কোন শক্তি তাকে কারন থেকে কার্য্যে পরিণত করছে ? এই শক্তিকে সাংখ্য দার্শনিকগণ বলছেন "নিমিত্ত" কারন।  আপনি  একে  অনুঘটক বলতে পারেন। অর্থাৎ যে বস্তু নিজে অপরিবর্তিত থেকে অপর  দ্রব্যের রাসায়নিক পরিবর্তন করতে পারে। একে  আপনি যন্ত্রবিশেষ বলতে পারেন। আখ থেকে রস বার  করবার যন্ত্র, বা সর্ষে  থেকে তেল বের করবার যন্ত্র।  আসলে যার মধ্যে যে সম্ভাবনা আছে, তাকে প্রকাশ্যে আনবার জন্য সাহায্যকারী। তো প্রথম হচ্ছে কারন, দ্বিতীয় হচ্ছে কার্য্য, তৃতীয় হচ্ছে কারন থেকে কার্য্যকে বের করে নিয়ে আসবার যন্ত্রবিশেষ, শক্তি বিশেষ বা অবস্থা বিশেষ। 

একেই সাংখ্য  দার্শনিকগণ বলছেন নিমিত্ত কারন। যদি আপনি দুধ  থেকে মাখন বানাতে চান, তবে আপনাকে  তবে আপনাকে বিশেষ প্রক্রিয়ার  মধ্যে দিয়ে এগুতে হবে। দুধ থেকে দই বা সর।  দই বা সর থেকে মাখন। এখন যদি  আপনার কাছে উপাদান-কারন যদি না থাকে অর্থাৎ দুধ বা সর বা দই যদি না থাকে তবে আপনি মাখন বানাতে পারবেন না।  নিছক জল থেকে আপনি মাখনের প্রত্যাশা করতে পারেন না। আপনি যদি কাপড় বানাতে চান, তবে আপনাকে সুতোর সাহায্য নিতে হবে, আবার আপনি রেশমি কাপড় বানাতে চাইলে আপনাকে রেশম সংগ্রহ করতে হবে। অর্থাৎ আপনি যা চান তা পেতে গেলে, আপনাকে সঠিক উপাদানের সন্ধান করতে হবে।  অর্থাৎ কাপড়ের মধ্যে মিশে আছে যে সুতো বা রেশম  তা আপনাকে সংগ্রহ করতে হবে। এই যে সঠিক চয়ন অর্থাৎ সঠিক কাঁচামাল যা আপনার বাঞ্ছিত বস্তুর উপাদান তা আপনাকে সংগ্রহ করতে হবে। এবার আপনাকে কাপড় বোনার  মেশিন জোগাড় করতে হবে। আপনি বাড়ি তৈরী করতে চাইলে, আপনাকে ইট, কাঠ পাথর, সংগ্রহ করতে হবে। রাজমিস্ত্রি সংগ্রহ করতে হবে   অর্থাৎ যে শক্তি কার্য্যের প্রকাশের কারন, তাকে আপনার খুঁজে বের করতে হবে।  এই শক্তিকে সাংখ্য  দর্শন বলছে "শক্তি কারন।" 

তো কারন-তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমরা কি পেলাম ? ১. কার্য্য, কারনে মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় আছে, তাকে আমাদের বুঝতে হবে, খুঁজে বের করতে হবে ২. এমন কোনো একটা শক্তি বা যন্ত্র প্রয়োজন যা এই প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ কারন থেকে কার্য্য প্রকাশ করবার জন্য সাহায্য করবে। ৩. কার্য্য ও কারনে মধ্যে যে সূত্র বাধা হয়ে রয়েছে তাকে দূর করতে হবে।  

সাংখ্য দার্শনিকগণ আমাদেরকে আশ্বাস দিচ্ছেন, যে যদি আমরা কার্য্য-কারনের সম্পর্কটা ধরতে পারি - অর্থাৎ কি  নিয়মে কারন থেকে কার্য্যের উৎপত্তি বা পরিণতি প্রাপ্ত হচ্ছে, তাকে যদি আমরা সম্যক রূপে উপলব্ধি করতে পারি, তবে আমাদের জীবনের সমস্ত সমস্যার বিশেষ করে মানসিক উত্তেজনা, অবসাদ, উদ্যমহীনতা,  হতাশা, ইত্যাদি থেকে রেহাই পেতে  পারি। যখন আমরা আশঙ্কায় ভুগি, যখন আমাদের মনের মধ্যে বিশৃঙ্খলতা আসে, যখন আমরা অনিশ্চয়তায় ভুগি, তখন যদি আমাদের মধ্যে কার্য্য-কারনে নিয়মের জ্ঞান থাকে, তবে পরিস্থিতির বিচার বিশ্লেষণ করে, আমরা মনকে শান্ত করতে পারি। প্রথম দিকে আমরা কার্য্যের মধ্যে কারন অনুসন্ধান করতে ব্যর্থ হই। তার কারন হচ্ছে, কার্য্যের মধ্যেই অব্যক্ত অবস্থায়, বা সুপ্ত অবস্থায় বিরাজ করছে কারন । অর্থাৎ কার্য্যের মধ্যেই  কারন লুকিয়ে আছে। কিন্তু  কার্য্য-কারন জ্ঞান না থাকার জন্য, তা আমরা ধরতে পারি  না। তখন আমাদের সম্মুখে  শুধু কার্য্যটাই প্রকাশিত হয়েছে। আর এই কার্য্যই আমাদের নজরে আসে। কার্য্যের মধ্যেই যে কারন অপ্রকাশিত অবস্থায় আছে, তা আমাদের বোধগম্য হয় না। তো আমাদের কাজ হচ্ছে কার্য্যের মধ্যে কারনে অনুসন্ধান বা কারনের  মধ্যে কার্য্যের অনুসন্ধান। 

একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হতে পারে।  ধরুন, আপনার সাথে কারুর কথা কাটাকাটি হয়েছে, আপনাকে কেউ বাজে কথা বলেছে। এতে করে আপনার মনের মধ্যে ব্যাথার সৃষ্টি হয়েছে, আপনার মনে আঘাত লেগেছে, নিজেকে অপমানিত বোধ করেছেন ।  এখন রাতে শুতে যাবার আগে, এই নিয়ে আপনি ভাবছেন, যুক্তি দিয়ে, বিচার বুদ্ধির সাহায্যে ব্যাপারটাকে বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কোনো কারন খুঁজে পাচ্ছেন না।   ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়েছেন। সকাল বেলা যখন আপনি জেগে উঠবেন, তখন আপনার মন কিন্তু নিস্তেজ হয়ে থাকবে, কোনো কাজে আপনার মন বসবে না। আসলে আমরা জানি না, ওই ঘটনা আমার মনের কোনো অংশে আঘাত করেছে।  মনের ব্যাকুলতা, অস্থিরতা আমাদের অস্থির করেছে। কিন্তু তার নিস্পত্তির উপায় আমাদের কাছে নেই। আমরা মন এই ঘটনায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, কিন্তু মনের ঠিক কোথায় আঘাত লেগেছে, এবং সেটা নিরসনের উপায় আমার জানা নেই।  

দেখুন, আমাদের শরীরে যখন আঘাত লাগে, তখন আঘাতপ্রাপ্ত অংশের কোষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়।  এখন যেখানে আঘাত লেগেছে, সেই অংশের পরিচর্য্যা প্রয়োজন। হাতে আঘাত লাগলে, আপনি পায়ে মলম লাগিয়ে ভালো থাকতে পারবেন না। ঠিক তেমনি মানসিক শরীরের বা মনোময় কোষের কোন অংশ দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সেটা আপনাকে বুঝতে হবে। 

অর্থাৎ বাইরের ঘটনা বা বাইরের কারন সম্পর্কে আপনি জ্ঞাত হয়েছেন, কিন্তু এতে করে আপনার মনের কোন অংশে আঘাত প্রাপ্ত হয়েছে, সেই দিকটা আপনি ধরতে পারেন নি। বোঝার চেষ্টা করুন, কালকের এই ঘটনা কি আপনার  ভাবাবেগকে আঘাত করেছে ? নাকি আপনার বহুদিনের লালিত বিশ্বাসে আঘাত করেছে ? কালকের ঘটনা কি আপনাকে অসহায় করেছে, ভয় পাইয়ে দিয়েছে,  নাকি একা  করে দিয়েছে ? মনের যে বিস্তীর্ন ক্ষেত্র, তার কোথায় আঘাত এসেছে, বা কোথায় প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেটা বুঝতে গেলে বা এই ক্ষতস্থান মেরামত করতে গেলে আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। অর্থাৎ মূল কারন লুকিয়ে আছে অতীতের গর্ভে। অর্থাৎ আমাদের স্মৃতির মধ্যে কেউ বলেন সংস্কারের মধ্যে সুপ্ত  অবস্থায় আছে । আর অতীতের গর্ভে যে মূল কারন যা স্মৃতির কোঠরে অবচেতন অবস্থায় ছিল তা এখন  বর্তমান রূপে প্রকাশ পেয়েছে। এই অতীত ও বর্তমান এই দুটোকে ধরতে পারলে, জানবেন জাগরণ শুরু হয়েছে।  আপনার ঘুম ভেঙে গেছে, আপনি এখন মনের গভীরে অর্থাৎ অন্তর্জ্ঞানের জগতের মধ্যে প্রবেশ করেছেন।  আত্মজ্ঞানের বীজ অংকুরিত হতে শুরু করেছে, শুদ্ধজ্ঞানের আলোর টানে।  ঠিক যেমন মাটির মধ্যে গ্রথিত বীজ সূর্য্যের আলোর টানে  আবরণ ছাড়িয়ে, মাটি ভেদ করে বেরিয়ে আসে, নিজেকে প্রকাশিত করে । আপনার মধ্যেও ঠিক তেমনি আত্মজ্ঞানের বীজ অংকুরিত হতে শুরু করেছে। মনের জগতে আপনার বিচরণ শুরু হয়েছে।  মনের কোন কোঠরে, কি লুকিয়ে আছে, তা আপনার জ্ঞানের বিষয় হয়েছে। 

আমরা আগেই শুনেছি, যে কেবল মাত্র  সুনির্দিষ্ট কারনের  মধ্যে সম্ভাব্য  ভবিষ্যৎ বা  কার্য্যফল লুকিয়ে আছে। যে কারন এই ভবিষ্যৎকে প্রকট করে তাকে  সাংখ্য  দার্শনিক বলছেন, শক্তি-কারন। এই শক্তি-কারন থেকেই আকাঙ্খিত ফল মিলতে পারে। ধরুন,  আপনি দুধ থেকে দই পেতে পারেন, ঘোল পেতে পারেন, মাখন পেতে পারেন, ঘি পেতে পারেন। এখন দুধ থেকে এই ফলগুলো পেতে গেলে, আপনাকে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির সাহায্য গ্রহণ করতে হবে। অর্থাৎ একটা মাত্র কারন ভিন্ন ভিন্ন বা বহু ভবিষ্যৎ পরিণতি এনে দিতে পারে। কিন্তু এর জন্য দরকার প্রয়োগের কুশলতা অর্থাৎ শক্তি-কারন । আপনি কাঠ থেকে দরজা, জানালা,  চেয়ার, টেবিল, খাট ইত্যাদি যে কোনো আসবাব, এমনকি এই কাঠ থেকে আপনি অগ্নির উত্তাপ গ্রহণ করতে পারেন। এখন কথা হচ্ছে দুধের মধ্যে ঘি-মাখন ইত্যাদি বা কাঠের মধ্যে আসবাব বা অগ্নি এর জন্য দরকার উপযুক্ত প্রক্রিয়ার গ্রহণ বা শক্তি কারন । এখন এই  নিমিত্ত কারনের (কাঠ বা দুধ) এর মধ্যে যেমন এক বা একাধিক সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, তেমনি এমন অনেক কারন আছে, যার কারনে একটি মাত্র  সম্ভাবনার প্রকাশ হতে পারে। অগ্নি  থেকে আপনি উত্তাপ পাবেন, জল থেকে আপনি আদ্রতা পাবেন,  উল্টোটা পাবেন না।  চাঁদ থেকে স্নিগ্ধতা পাবেন, যা সূর্য্যের কাছে আশা করতে পারেন না। এই যে  নিমিত্ত কারনে মধ্যে কার্য্য সম্ভাবনা বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, বা কারনে মধ্যে যে পরিণতির স্বভাব লুকিয়ে আছে, এই সংখ্যা দর্শন বলছে "শক্তি-কারনের" ফলে তা প্রকাশিত হতে পারে। 

এই নিমিত্ত কারনে মধ্যে এক বা একাধিক সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকতে পারে।   এটা  নির্ভর করে নিমিত্ত কারনের  মধ্যে কোন গুন্ কতটা অনুপাতে অবস্থান করছে তার উপরে। আর এই গুনের উপরে নির্ভর করেই  তার স্বভাব রচিত হয়। তো  এই  শক্তি-কারন,  নিমিত্ত কারণকে  এক বা একাধিক রূপে প্রকাশ করতে পারে বা  করবার ক্ষমতা বা পরিণতি লাভের  দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু নিমিত্ত কারনে মধ্যে যে স্বভাব আছে,  এই স্বভাবকে আমাদের বুঝতে হবে, ধরতে হবে। তা যদি না ধরতে পারি, তবে আমাদের আকাঙ্খিত বস্তু বা কার্য্যের সাক্ষাৎ করতে পারবো  না। ধরুন আপনি ঘি আশা করছেন, তবে আপনাকে দুধ বা দুধের গুন্ যার মধ্যে আছে, তাকে সংগ্রহ করতে হবে। আপনি আখের রসের মধ্যে এই গুন্ পাবেন না।  আর আখের রস দিয়ে কখনও ঘি পাবেন না।  আখের রস জ্বাল দিলে গুড় পাবেন আর দুধ জ্বাল  দিলে সর বা ঘি   পেতে পারেন। তার কারন হচ্ছে দুধের মধ্যে যেমন সর বা ঘি-এর   কারন আছে, তেমনি গুড়ের কারন আছে আখের রসের মধ্যে। তাই প্রতিটি বস্তুর মধ্যে যে স্বভাব বর্তমান আছে, বা যে সব গুনের সমাহার আছে, তাকে আমাদের বুঝবার চেষ্টা করতে হবে। যখন কোনো বস্তুর মধ্যে অব্যক্ত বা অস্ফুট  স্বভাব সম্পর্কে আপনি জ্ঞাত হবেন, তবে আপনার ইচ্ছে পূরণ হতে পারে। 

শক্তি  কারন এক বা একাধিক হতে পারে। দেখুন কালি (কলমের) আপনার খাবার বস্তু নয়, কিন্তু দুধ আপনার খাদ্য বা পানীয় হতে পারে। কালি দিয়ে আপনি লিখতে পারেন। আর দুধ আপনার শরীরের পুষ্টি সাধন করতে পারে। তো কালির মধ্যে যে অব্যক্ত অস্ফুট স্বভাব আছে, তা এই তরল সাদা রঙের দুধের মধ্যে নেই। তো যেকোনও বস্তু থেকে বা ঘটনা থেকে যদি আপনি আপনার মনের  মতো জিনিস পেতে চান তবে তার নিমিত্ত কারনে স্বভাবের দিকটা, যা তার মধ্যে অব্যক্ত অবস্থায় আছে সেই জ্ঞান আপনাকে সংগ্রহ করতে হবে। তো অবস্থা বা  কারণের মধ্যে এই অব্যক্ত স্বভাব লুকিয়ে আছে, আর এটাকে ধরতে পারলে, আর আর শক্তি কারণকে সঠিক প্রয়োগ করতে পারলে এবং নিমিত্ত কারনের সহায়তা পেলে, আপনি আপনার ইচ্ছেমতো বস্তুর সন্ধান পেতে পারেন। তো  আমাদের আকাঙ্খ্যা (ইচ্ছে) পূরণ করতে হলে  বস্তুর মধ্যে সুপ্ত স্বভাবকে ধরতে হবে।  

দেখুন, একটা বীজের মধ্যে গাছ  লুকিয়ে আছে। আপনার অভিজ্ঞতা আপনাকে বলে দিতে পারে, এটা থেকে কি ধরনের গাছ জন্মাতে পারে।  এখন কথা হচ্ছে এই বীজ যদি সিন্দুকের মধ্যে পুরে  রাখেন, বা হাতের মধ্যে ধরে রাখেন,একে  যদি আপনি আলো-জল-বাতাস-মাটির সংস্পর্শে না আসতে  দেন, তবে এই গাছের দেখা কোনোদিন মিলবে না। শক্তি কারন  যতক্ষন এই বীজের বা নিমিত্ত কারনে সঙ্গে সম্পৃক্ত না হচ্ছে, ততক্ষন বীজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা যে অব্যক্ত শক্তি বা প্রচ্ছন্ন শক্তি আছে, তা অচিরেই নিঃশেষ হয়ে যাবে। শুকনো বীজে গাছ নাও হতে পারে। তো আপনাকে বীজকে সময় মতো মাটিতে পুততে হবে, জল দিতে হবে, সূর্যালোকের  সুযোগ করে দিতে হবে, তবেই বীজের (নিমিত্ত করেন) মধ্যে গাছ হবার যে সম্ভাবনা শক্তি ছিলো  তার প্রকাশ ঘটবে। অন্যথায় সব মাটি হয়ে যাবে। অর্থাৎ বীজ গাছ না হয়ে মাটিতে পরিণত হবে। কিন্তু পরিণতি কালের গতিতে হবেই। তো আকাঙ্খিত বস্তু পেতে গেলে, আমাদের যেমন নিমিত্ত কারনে সন্ধান করতে হবে, নিমিত্ত কারনে স্বভাব সম্পর্কে অবহিত হতে হবে, আর সবশেষে শক্তি-কারণের  সহায়তা গ্রহণ করতে হবে। 

আমরা সৃষ্টি বলতে কি বুঝি ? পদার্থের আবির্ভাবই  সৃষ্টি। বিশ্ব  ব্রহ্মান্ড হচ্ছে পদার্থের সমষ্টি। এখন এই যে পদার্থ তা অনন্ত। আর এই অনন্ত পদার্থ চিদাত্মার অন্তঃস্থিত। যখন চিদাত্মার মধ্যে ইচ্ছের উদয় হয়, অর্থাৎ ইচ্ছেশক্তি যখন ক্ষুদ্ধ হয়, তখন তার অন্তঃস্থিত পদার্থের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তো এই যে পদার্থ এর মধ্যে আছে অন্তঃপ্রকাশ আবার বহিঃপ্রকাশ। অন্তঃপ্রকাশেরও  উর্দ্ধে তার যে স্থিতি, তাকেই পদার্থের চিদস্বরূপে অবস্থান ধরে নিতে হবে। 

তো পদার্থের যে অন্তঃপ্রকাশ তা এই  সৃষ্টিপর্ব্বের অন্তর্গত। যোগীপুরুষের দৃষ্টিতে এই অন্তঃপ্রকাশ হচ্ছে জ্ঞানের লীলাক্ষেত্র।  এখানেই যত  জ্ঞানের খেলা চলছে। বাহ্য  যে সৃষ্টি তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্রিয়া। আর এই উভয়ের মুলে আছে ক্ষুব্ধ ইচ্ছে। এই ইচ্ছে হচ্ছে ভাবসত্তার বীজ। আবার ইচ্ছের একটা অতীত অবস্থা আছে, যাকে  বলা হয় আনন্দস্বরূপ। এই আনন্দ যখন ক্ষুব্ধ হয়, অর্থাৎ আনন্দ সাগরে যখন ভাবের বুদবুদ উদয় হয় তাকে আপনি ইচ্ছে বলতে পারেন। এই আনন্দ সাগরে কিন্তু কোনো বীজ নেই। তথাপি এই আনন্দ সাগরেই বীজরূপী ইচ্ছের উদয় হয়। আবার এই ইচ্ছের নিবৃত্তিতে আনন্দর অভিব্যক্তি ঘটে । অর্থাৎ আনন্দ সাগরে ইচ্ছে-বীজরূপী বুদবুদ যখন ফেটে যায় তখন আবার নির্ম্মল আনন্দের অভিব্যক্তি ঘটে। তো সৃষ্টির মুলে  আনন্দ। এই যে আনন্দ সাগরে ইচ্ছেভূমিতে যে বীজের কথা বললাম, এটিই প্রথম আকার ।  যদিও এই আকার নিরবয়ব অর্থাৎ এর  কোনো অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নেই। আনন্দ সাগরে এই বীজরূপী ইচ্ছে (বুদবুদ) অঙ্গহীন। ঋষিগণ বলছেন, জ্ঞানভূমিতে যখন পদার্থের অন্তঃপ্রকাশ ঘটে, তখন সেই জ্ঞান হয় সাকার। কিন্তু এই সাকার-জ্ঞানের কোনো জ্ঞেয় থাকে না। তখন জ্ঞান ও জ্ঞেয়  মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে। অর্থাৎ এই যে সাকার জ্ঞান সে নিজেই নিজেকে জ্ঞাত করছে। নিজেই নিজের জ্ঞেয়। একটা  উদাহরনের সাহায্যে আমরা ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করি।  ধরুন একটা রসোগোল্লা - ইচ্ছেরুপী বীজ ভূমিতে এই রসোগোল্লা একটা ভাব মাত্র। এই রসোগোল্লা  তখন অব্যক্ত। একসময় এই অব্যক্ত রসোগোল্লা জ্ঞানভূমিতে এসে আকার প্রাপ্ত হয়। কিন্তু এই যে রসোগোল্লা  বা তার তার আকার এর কোনো বাহ্য  অস্তিত্ত্ব নেই। আমরা ধ্যানের মধ্যে বা স্বপ্নের মধ্যে এইরূপ নানান দৃশ্য বা বস্তুর আকার দেখতে পাই, যার কোনো বাস্তব অস্তিত্ত্ব নেই। কিন্তু স্বপ্নের জগতে বা ধ্যানের গভীরে যখন সাধক অবস্থান করেন, তখন তার কাছে সেটি সত্য বলে প্রতিভাত হয়।  এই দর্শন-শ্রবণ বা অবয়ব বা প্রকাশ  কেবলমাত্র অন্তঃপ্রকাশ, যা ধ্যানীর কাছে বা স্বপ্নদ্রষ্টার কাছেই সত্য। অন্যদের কাছে নয়। যোগীপুরুষ বলছেন, এই যে অন্তঃপ্রকাশ বা জ্ঞানের ভূমিতে যে প্রকাশ তা হচ্ছে ইচ্ছে-শক্তির পরিনতি বিশেষ। এই অন্তঃপ্রকাশ বা জ্ঞান আকারে যে প্রকাশ তা-ই  একসময় ভৌতজগতে আত্মপ্রকাশ করে। তো আমাদের বুঝতে হবে, এই যে বাহ্য  প্রকাশ তা আসলে সেই ইচ্ছের, যা একসময় আনন্দ সাগরে ভেসে উঠেছিল, তার  অন্তিম প্রকাশ মাত্র । 

এই যে জ্ঞানরূপী পদার্থের প্রকাশ এটি কিন্তু সাধকের সৃষ্টি হয়, এটি জ্ঞানভূমির সৃষ্টি। এর পরে যখন জ্ঞানভূমির সৃষ্টি  ক্রিয়াভুমিতে এসে উপস্থিত হয় তখন এটি ব্যবহারিক দৃষ্টিতে সৃষ্টি রূপে প্রকাশিত হয়। আমরা এর আগে শুনেছি নিমিত্ত কারন, উপাদান কারন, ও শক্তি কারন, এগুলো হচ্ছে জাগতিক সমস্ত পদার্থ সৃষ্টির মুলে। কিন্তু কথা হচ্ছে নিমিত্ত,  উপাদান ও শক্তি কারণের আবশ্যিক কার্যকারিতা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় কিন্তু ইচ্ছেশক্তি সৃষ্টিতে উপাদান ও শক্তি কারন আবশ্যক হয় না।  ইচ্ছেশক্তির সৃষ্টিতে এগুলোর আবশ্যক নাও হতে পারে। কিন্তু সত্য হচ্ছে কারন ছাড়া কোনো সৃষ্টি সম্ভব নয়। আসলে ইচ্ছে-সৃষ্টিতে পূর্ণাবস্থাই কারন। আপনারা লক্ষ্য  করে থাকবেন, যোগ-ঐশ্বর্যের অধিকারী পুরুষ অনেক চমৎকার প্রদর্শন করে থাকেন। অর্থাৎ কোনো উপাদান ছাড়াই কাম্য বস্তুর সৃষ্টি করে থাকেন। আসলে এই যে কাম্য বস্তু তিনি সৃষ্টি করেন, তার কারন-উপাদান তিনি নিজসত্তা থেকেই গ্রহণ করে থাকেন, বাহ্য প্রকৃতি থেকে নয়। আবার অনেক সময় বাহ্য  প্রকৃতি থেকেও তাঁরা  উপাদান গ্রহণ করে থাকেন। হাতে একটা গোলাপ ফুল নিয়ে, তাকে তিনি পদ্মফুলে রূপান্তরিত করে দিতে পাবেন।  আবার শূন্য থেকে সন্দেশ এনে দিতে পারেন। এই যে সৃষ্টি এটি যোগীর ইচ্ছে প্রভাবে ঘটে থাকে। অর্থাৎ যোগীপুরুষ নিজের ইচ্ছেপ্রভাবে বা ঐশীশক্তি প্রভাবে প্রকৃতিকে আপন বশে নিয়ে আসেন। দেখুন  সৃষ্টির সমগ্র উপাদান প্রকৃতি প্রদত্ত, আর এই প্রকৃতি  হচ্ছে ত্রিগুণাত্মিকা।  প্রকৃতি আত্মা থেকে ভিন্ন নয়। আত্মা ভিন্ন প্রকৃতির নিজস্ব কোনো সত্তা নেই। অর্থাৎ নিমিত্ত কারন আর উপাদান কারন অভিন্ন।  এই ব্যাপারটা আমরা আরো একটু ভালোভাবে বুঝবার চেষ্টা করবো।  

জ্ঞানময় জগতে বা অন্তর্জগতে  প্রকাশিত ফুল আর প্রকৃতির জগতে প্রকাশিত ফুল এক নয়। জ্ঞানময় জগতে প্রকাশিত ফুলের কোনো ভৌতিক সত্তা নেই। কিন্তু এই জ্ঞানময় জগতে প্রকাশিত ফুল যখন  অজ্ঞান জগতে অর্থাৎ জড় প্রকৃতির জগতে প্রক্ষিপ্ত হয়, তখন মায়া প্রপঞ্চময় জগতে প্রবেশ করে ভৌতিক আকার ধারণ করে। যা তখন আমাদের দৃষ্টিতে দৃশ্যমান। অর্থাৎ অজ্ঞানের জগতে ভৌতিক পদার্থ রূপে দৃশ্যমান হয়ে থাকে। আসলে পঞ্চিকরণের ক্রিয়ার স্বভাব হেতু এটি ঘটে থাকে। অর্থাৎ জ্ঞানময় সত্তায় যে অপার্থিব প্রকাশ ঘটেছিলো, তা অজ্ঞানের জগতে এসে পার্থিব পদার্থ রূপে প্রকাশিত হয়েছে। অন্ন যেমন ধীরে ধীরে পিতৃ-বিন্দুতে পরিণত হয়, আবার এই পিতৃবিন্দু মাতৃগর্ভে এসে ভৌতিক আকার গ্রহণ করে তেমনি জ্ঞানের জগতে যা কিছু দৃশ্যমান হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে অজ্ঞানের জগতে এসে পার্থিব রূপ নিয়েছে। অর্থাৎ জ্ঞানের জগতের অপার্থিব বস্তু যোনি প্রদেশে প্রবেশের ফলে জ্ঞানের আকারটি ভৌতিক আকারে পরিণত হয়। বলা হয়ে থাকে আত্মা এক যোনি  থেকে অন্য যোনিতে পরিভ্রমন করছে, যুগ যুগ  ধরে।  

আমরা আমরা আগেরদিন শুনেছিলাম, জ্ঞানের জগতে প্রকাশিত বস্তু যখন মায়া-যোনিতে প্রবেশ করে তখন অভৌতিক বস্তু ভৌতিক আকার ধারণ করে। এই ব্যাপারটা আমাদের অনেকে ধরতে অক্ষম হই। দেখুন এই জ্ঞানের ভূমিতে যেমন অব্যক্ত বস্তুর আবির্ভাব হয়, তেমনি আমাদের মনঃ-জগতে অর্থাৎ আমাদের অন্তরে অনেক মনোগ্ৰাহ্য বস্তুর আভাস  মেলে। এই যে মনঃ-গ্রাহ্যবস্তু তা আমাদের কাছে একটা আভাস  বা মনের কল্পনা মাত্র। কিন্তু এই মনের মধ্যে প্রকটিত বস্তু যখন ক্রিয়াভুমিতে প্রবেশ করে, তখন তা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু হয়ে ওঠে। শিল্পীর কল্পনায় শিবের ছবি  ভেসে ওঠে।  শল্পী যখন কাগজ-কলম নিয়ে বসেন, বা রং-তুলি নিয়ে বসেন, বা যখন হাতুড়ি বাটাল নিয়ে ক্রিয়া শুরু করেন, তখন তার মনের মধ্যে ভেসে ওঠা কল্পনা বাস্তবিক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু হয়ে ওঠে। আর এই বাহ্য  সৃষ্টি তখন সকলে নিজ নিজ ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করতে সক্ষম হয়। পাথরের টুকরো হয়ে ওঠে শিবঠাকুর বা শিল্পীর ইপ্সিত বস্তু যা সকলের  ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য। যা একসময় অব্যক্ত অবস্থায় শিল্পীর মনের আয়নায় ভেসে উঠেছিল, তাই এখন সকলের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু হয়ে উঠলো।  ঠিক তেমনি পরমেশ্বরের ইচ্ছাশক্তির সৃষ্টিতে জ্ঞানভূমিতে যে যে অভৌতিক সত্তার আভাস  ভেসে ওঠে, তার একটা নিজস্ব আকার থাকলেও  শুধুই জ্ঞানময়। অর্থাৎ ভৌতিক বা বাহ্যত প্রকাশিত নয়।  শ্রেষ্ঠ যোগীপুরুষের মনের মধ্যেও এমনিতর সাকার জ্ঞানবিশেষ ভেসে ওঠে। এটি তখন আলোক বিশেষ। প্রতিবিম্বিত আলোর বর্তিকা মাত্র। এসব শুধুই আলোক হলেও, আকৃতি বিশিষ্ট। অর্থাৎ অহং-এর মধ্যে ইদং।  এর পরে যখন যোগীপুরুষ জ্ঞানভূমি থেকে ক্রিয়াভুমিতে প্রবেশ করেন, তখন এই আভাস রূপী দৃশ্য ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়ে ওঠে। এই হচ্ছে সৃষ্টি।  ইচ্ছে শক্তির মধ্যে অহং-এর স্ফূরণ, কিন্ত এই অহং তখনও  ইদং এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। কারন এখানে ক্রিয়া নেই।  যখনই  ইদং থেকে পৃথক হয়ে সে দেহ বা প্রকৃতির সঙ্গে অহং বোধে লিপ্ত হয়, তখন সে মায়িক সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। এই পরিণতি প্রাপ্তির অর্থাৎ অব্যক্ত থেকে ব্যক্ত হবার একটা ক্রোম আছে।  ক্রিয়া শক্তির সঙ্গে বা মাতৃ শক্তির সঙ্গে মিলিত হবার আগে থাকে জ্ঞানশক্তি।  আসলে এই জ্ঞানশক্তিই সমস্ত সৃষ্টির কারন। ক্রিয়া শক্তিতে মিলিত হবার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে প্রথমে অস্ফুট, ধীরে ধীরে বিভিন্ন স্তরের মধ্যে দিয়ে স্ফুট হয়ে ওঠে। এই অস্ফুট থেকে স্ফুট হবার প্রক্রিয়াকে বলে গর্ভ ধারণ ও প্রসব। প্রসব হচ্ছে শেষ অবস্থা যা আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য।  আগের আগের অবস্থাগুলো বাহ্যত ক্রিয়ার জগতে খেলা করলেও, আমাদের কাছে দৃশ্যমান নয়। এ এক অদ্ভুত লীলা, যা জগৎব্যাপী আমাদের অজ্ঞাতে ঘটে চলেছে। এ এক রহস্যে ঘেরা বিজ্ঞান। এই বিজ্ঞানের চর্চ্চা করেছেন, আমাদের প্রাচীন মুনিঋষিগন। শুধু প্রাচীন বলি কেন, আজও আমাদের অজ্ঞাতসারে ঋষি-পুরুষগন এই লীলা খেলায় লিপ্ত আছেন। আমরাও ধীরে ধীরে ইপ্সিত বস্তুর আবির্ভাবের বিষয়টি বুঝে নেবার চেষ্টা করবো। 

যা বলছিলাম, বীজ থেকে গাছ হবে না মাটি হবে তা নির্ভর করছে শক্তি কারণের উপরে। বীজ নিমিত্ত কারন  মাত্র, কিন্তু শক্তি কারন সংযোগ না ঘটলে, জীবনটাই মাটি। মানব জীবন একটা বীজের মতো। একটা মানুষের মধ্যে অসংখ্য সম্ভাবনার বীজ লুকিয়ে আছে। এই বীজকে  অঙ্কুরিত হতে গেলে তাকে উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হবে, তাকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করতে হবে।  গাছে ফুল ফল ফোটাতে গেলে, যেমন আলো-জল-বাতাস-মাটির সংস্পর্শে আনতে  হবে, তেমনি বাইরের পোকামাকড়, গরু-ছাগলে না খেতে পারে, তার জন্য বেড়া দিতে হবে। যদিও গাছে কি ফল হবে, অর্থাৎ আপেল হবে না আম  হবে, তা আপনি নির্ধারণ করতে পারেন না।  . বীজের (নিমিত্ত কারণের) মধ্যে যে  সম্ভাবনা অব্যক্ত অবস্থায় লুকিয়ে আছে, অর্থাৎ বীজের নিজস্ব অব্যক্ত স্বভাবকে আপনি পরিবর্তন করতে পারবেন না। সেইজন্য আপনার ইচ্ছেমতো ফল পেতে গেলে, প্রথমেই আপনাকে যেটা করতে হবে তা হচ্ছে,  নিমিত্ত কারনে মধ্যে  আপনার আকাংখ্যার বস্তুর স্বভাব  লুকিয়ে আছে কি না তা বুঝতে হবে, এবং তাকেই খুঁজে বের করতে হবে  যার মধ্যে আকাঙ্খিত বস্তুর গুন লুকিয়ে আছে।  আর তার জন্য দরকার সেই জ্ঞান যা বস্তুর অন্তর্নিহিত ক্ষমতা, স্বভাব  বা সত্ত্বা  সম্পর্কে আপনাকে অবহিত করবে।  আপনি বীজ দেখে বা চারাগাছ দেখে নির্ধারণ করে নিতে পারবেন,  এখান  থেকে কি হতে পারে, যদি আপনার সে অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান থাকে । অর্থাৎ বীজের সম্ভাব্য পরিণতি জ্ঞান থাকা চাই  আমাদের। এই যে বীজ এটি নিমিত্ত মাত্র যার মধ্যে আপনার আকাঙ্খিত বস্তু লুকিয়ে আছে। নিমিত্ত কারন একটা মাধ্যম মাত্র যার সাহায্যে আপনি ইপ্সিত বস্তু লাভ করতে পারেন।  কিন্তু আপনার সেই জ্ঞান চাই, যার মাধ্যমে আপনি নিমিত্ত কারনে এর  স্বভাব  ধরতে পারবেন যা সুপ্ত আছে ওই বস্তুর মধ্যে । আবার  এই স্বভাবকে প্রকাশিত রূপ দিতে পারে শক্তি কারন। শক্তি কারনের  যথাযথ প্রয়োগে নিমিত্ত*কারন অভিব্যক্তি লাভ করতে পারবে, পরিণতির পথে এগিয়ে যেতে পারে ।  তো আমাদের নিমিত্তের স্বভাবকে ধরতে হবে, আবার শক্তি কারণের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে।  এই যে সম্ভাব্য পরিণতি জ্ঞান ও  শক্তি কারণের  প্রয়োগ তা আমাদের আকাঙ্খিত বস্তুর উৎপাদনে সাহায্য করবে। আমরা আমাদের ইপ্সিত বস্তু লাভ করবো। তো চারটে  জিনিস পেলাম ১, মনের ইচ্ছেশক্তির প্রয়োগ, অর্থাৎ  আকাঙ্খিত বস্তু লাভের  ইচ্ছেকে তীব্রতর করতে হবে।   ২. বস্তুর মধ্যে বা নিমিত্ত কারণের মধ্যে যে সম্ভাবনাগুলো লুকিয়ে  আছে তার  জ্ঞান সংগ্রহ করতে হবে ।  ৩, ক্রিয়াশক্তির যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে । ৪. সবশেষে ধৈর্য্যধরে  অপেক্ষা করতে হবে।  একটা জিনিস জানবেন সব কিছুর একটা সময় আছে , সময় না হলে কোনো কিছুই হয় না। 


যদি আপনার ইপ্সিত বস্তু না পান তবে বুঝতে হবে : 

১. নিমিত্ত কারনের  (বীজ) মধ্যে সেই সম্ভাবনা ছিল না। 
২. যে শক্তি কারণের  প্রয়োগ হয়েছে, তা যথাযথ নয়। 
৩. নির্দিষ্ট পরিণতির জন্য যে সময় দরকার  তা পর্যাপ্ত  ছিলো  না।  

-----------


আত্ম-বিশ্লেষণ - মূলসূত্র : সাংখ্য দর্শন। (৩)

তিন 

আমরা আমাদের সামনে দুই ধরনের প্রকাশ দেখতে পাই। আর এ সবই ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য। প্রথমতঃ  যাকিছু আমরা বহিরন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ন, নাসিকা, জিহবা, ত্বক) দ্বারা উপলব্ধি করতে পারি, যেমন গাছপালা, মনুষ্য পশু, পাখি, কীট  পতঙ্গ খাল-বিল নদী পাহাড় ইত্যাদি। এসবই আমরা প্রতক্ষ্য করে থাকি।  দ্বিতীয়তঃ  যাকিছু আমরা অন্তরেন্দ্রিয় বা মন দ্বারা উপলব্ধি করতে পারি - যেমন আমাদের আমিবোধ, বুদ্ধি, স্মৃতি, আমাদের চিন্তা, ইচ্ছে-আকাংখ্যা, রাগ, দ্বেষ, ঘৃণা, মোহ, ভয়, আসক্তি ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রকৃতির জগতে এই দুই ধরনের উপলব্ধিই আমাদের হয়ে থাকে। অর্থাৎ একটা স্থূল বস্তুর অনুভূতি, আর একটা সূক্ষ্ম বস্তুর অনুভূতি। এই দুই ধরনের জিনিসের মধ্যেই কার্য্য-কারন সম্পর্ক আছে। তো দুটো জগৎ - অন্তর্জগৎ ও বহির্জগৎ। অনুভূতির সাহায্যে আমরা এই দু জগতের জ্ঞান লাভ করে থাকি। তো প্রকৃতি দুই ভাগে বিভক্ত ব্যক্ত ও অব্যক্ত। এই অব্যক্ত অবস্থা থেকেই সমস্ত ব্যক্ত বস্তুর জন্ম হচ্ছে। 

আবার আমরা এও জানি, মন সূক্ষ্ম কিন্তু জড় পদার্থ। স্থূল দেহ যেমন অন্ন থেকে পরিপুষ্ট হয়ে থাকে, তেমনি মনও  এই অন্ন থেকে পুষ্টি লাভ করে থাকে। আমাদের যে পাঁচটি দেহ, তার মধ্যে তিনটি অর্থাৎ অন্নময়, প্রাণ-ময়, ও মন-ময়, এসবই পার্থিব, অর্থাৎ পদার্থের সূক্ষ্ম অংশ দিয়ে তৈরী । সবগুলো দেহই  একে  অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে।  বিজ্ঞানময় ও আনন্দময় দেহ অপার্থিব। ঋষিগণ বলে থাকেন   বিজ্ঞানময় দেহ অপার্থিব হলেও, এটি পার্থিব ও অপার্থিব দেহের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করতে পারে।   

সাংখ্য দার্শনিকগণ বলছেন, প্রকৃতিতে যখন তিনগুনের  (সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ)  সাম্যাবস্থা বজায় থাকে তখন প্রকৃতি  অব্যক্ত। বলা হয়, তমঃগুণে আছে আকর্ষণশক্তি, রজঃগুনে আছে বিকর্ষণ শক্তি  আর  সত্ত্ব গুনের হচ্ছে সাম্যাবস্থা। অর্থাৎ জগৎ যখন আকর্ষণ ও বিকর্ষণ শক্তির উর্দ্ধে অবস্থান করে, তখন তা সাম্যাবস্থা বা সত্ত্বগুণের আধিক্য বলে বুঝতে হবে। অন্যদিকে যখন তমঃ গুনের ফলে আকর্ষণ শক্তি  পায় বা রজঃ গুনের ফলে বিকর্ষণশক্তির আধিক্য ঘটে তখন শুরু হয় চঞ্চলতা বা গতি। এই গতির আর এক নাম হচ্ছে সৃষ্টি। আর এই গতি যখন কেন্দ্র থেকে বহির্মুখী হয়, তখন সৃষ্টি বা প্রকাশ  আর গতি যখন অন্তর্মুখী হয় তখন  লয় বা অপ্রকাশ। সাংখ্য দার্শনিকগণ বলছেন, জগৎ কখনো ব্যক্ত, কখনো অব্যক্ত। জগৎ ছিলো,  আছে, থাকবে। শুধু অবস্থান্তর মাত্র। তো শূন্য থেকে কিছু হয় নি, হয় না। যা ছিলো  তাই আছে, কেবল নাম-রূপের পরিবর্তন মাত্র। কখনও  সূক্ষ্ম, কখনও  স্থূল, কখনও  কার্য্য রূপে কখনো কারন রূপে। কোনও ভগবান বা ঈশ্বর এর স্রষ্টা  নয়, কেবল গুনের খেলা।  কখনো জগৎ সংকুচিত হচ্ছে, আবার কখনো সম্প্রসারিত হচ্ছে। 

বর্তমানে আমরা যাকে পদার্থ  বলি, দার্শনিকগণ তাকে  বলেন ভূত। এই ভূত শ্বাশ্বত, অনাদি, অনন্ত। আদি ভূত বলে যাকে চিহ্নিত করা হয়েছে, তা হচ্ছে আকাশ। এই যে আকাশ এটি আসলে প্রাণশক্তিতে ভরপুর। এই আকাশ শূন্য নয়। এই আকাশ ও তার প্রাণশক্তি মিলে  নানান ভূতের জন্ম দিয়েছে। এই মতবাদের মধ্যে আমরা ঋগ্বেদের ধ্বনি শুনতে পাই।      

এখন কথা হচ্ছে এই দুই ধরনের জিনিসের উৎস কোথায় ? সাংখ্য  দার্শনিকদের মধ্যে একদল  বলছেন, পুরুষ হচ্ছে সব কিছুর মুলে।  আর এক দল বলছেন, পুরুষ কখনও কোনো কার্য্যের কারন হতে পারে না। কেননা পুরুষ হচ্ছে ক্রিয়াহীন, নিষ্ক্রিয়, দ্রষ্টা বিশেষ, চৈতন্যস্বরূপ বা জ্ঞান মাত্র। তো যিনি কোনো কার্য্যের জন্য নিজেকে নিয়োজিত করেন না, তিনি কার্য্য বা কার্যফলের কারন হতে পারেন না। পুরুষ হচ্ছে নিত্য শুদ্ধ,  চৈতন্য স্বরূপ ।  অতএব এই সৃষ্টির পিছনে অন্য কেউ আছেন ।  আর প্রাথমিক কারন হিসেবে আমরা যাকে ধরতে পারি তিনি হচ্ছে প্রকৃতি।  

পুরুষ হচ্ছে শুদ্ধ জ্ঞান।  বলা হয়, এখানে নাকি কার্য্য-কারন মিশে আছে। আমার  মাঝে মধ্যে মনে হয়, আলোর আগে নিশ্চয় অন্ধকার ছিলো। আলোর প্রবেশে অন্ধকার দূরীভূত হলো।  এখন আলো নিত্য না অন্ধকার নিত্য ? আলো সত্য না অন্ধকার সত্য ? তেমনি জ্ঞানের আগে নিশ্চয় অজ্ঞান ছিল। তাহলে জ্ঞান চিরসত্য না অজ্ঞান চিরসত্য ।  বেদান্তে বলা হয়েছে, একটা সময় ছিল, যখন সৎ ছিলো না, অসৎ-ও ছিল না। যখন অন্ধকার ছিল না, আলোও  ছিলো  না।  তখন আলো-অন্ধকার, সৎ-অসৎ, জ্ঞান-অজ্ঞান সব একাকার হয়ে ছিলো। তখন আলো-অন্ধকার, আলো-অন্ধকারকেই  আবৃত করে ছিলো।  সৎ অসৎ একে  অন্যকে আবৃত করে ছিল।  তখন জ্ঞান-অজ্ঞান একে  অন্যের সঙ্গে মিশে ছিল।  এক  বৈ  দুই বলে কিছু ছিল না। 

এখন এই পুরুষ সম্পর্কে বলা হচ্ছে :  তিনি শুদ্ধ জ্ঞান। তিনিই সৎ। তিনি অক্ষর অর্থাৎ তার কোনো ক্ষয় নেই। তাহলে এই যে পুরুষ সম্পর্কে বলা হচ্ছে তা কি সৃষ্টির দ্বিতীয় পৰ্য্যায় ? অর্থাৎ গতিহীন এক শুদ্ধ অবস্থা ? 

পুরুষ অপরিবর্তনীয়। পুরুষ অক্ষর। পুরুষ হচ্ছে আশ্রয়স্থল। পুরুষ অসীম অবকাশ  যার মধ্যে প্রকৃতি তার লীলা খেলা করছেন ।  প্রকৃতিই  ভাঙছেন, গড়ছেন।  তো পরিবর্তনশীল জগতের কারন পুরুষ নন, অন্য কোথাও লুকিয়ে আছে সেই কারন,  আর তিনি হচ্ছেন  মুলা প্রকৃতি।  পুরুষ না  সূক্ষ্ম না স্থূল। এই পুরুষ বা শুদ্ধ জ্ঞান সীমাহীন, অনন্ত, বন্ধনহীন একটা অবস্থা। এঁকে  আপনি কিছুতেই  সীমার মধ্যে আনতে  পারবেন না । একে  আপনি মহাশূন্য বলতে পারেন, মহাকাল বলতে পারেন, যার কোনো শুরু নেই, শেষ নেই । তো যা সীমাহীন তাকে আপনি সীমার মধ্যে আবদ্ধ  করবেন কি করে ? আর মহাশূন্য থেকে সৃষ্টিই বা হবে কি করে।  আমাদের অভিজ্ঞতাও সেই কথাই বলে যে শূন্য থেকে কিছুই সৃষ্টি হতে পারে না।  

শুদ্ধ জ্ঞান বা চৈতন্য একটা অবস্থা মাত্র।  এই শুদ্ধ জ্ঞান কখনো কোনো বস্তুর  বা অনু-পরমাণুর কারন হতে পারে না। চৈতন্য থেকে আমরা অব্যক্ত যে অবস্থা অর্থাৎ মন, বুদ্ধি অনুভূতির সংযোগ দেখতে পাই। হয়তো এগুলোর সৃষ্টির মধ্যে শুদ্ধ চৈতন্যের ভূমিকা থাকতে পারে।   কিন্তু শুধুই জ্ঞান থেকে কোনো পদার্থ সৃষ্টি হতে পরে না। নিউট্রন বলুন, প্রোটন বলুন বা ইলেক্ট্রন বলুন তা শুধু জ্ঞানের কারনে সৃষ্টি হতে পারে না। সাংখ্য  দর্শন তাই সৃষ্টি তত্ত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রকৃতির প্রসঙ্গ তুলেছেন। প্রকৃতি অর্থাৎ যেখানে কার্য্য, গতি, পরিণতি বা তরঙ্গের সমারোহ আছে, সেই প্রকৃতির কথা বলেছেন। আমরা শুনেছি, প্রকৃতিই  একদিকে যেমন জড় অর্থাৎ চৈতন্য বিহীন, তেমনি প্রকৃতি হচ্ছে সূক্ষ্ম পদার্থের ব্যক্ত ও  অব্যক্ত অবস্থাও বটে । 

আমরা যখন নিজেদের  দিকে তাকাই, তখন আমাদের মধ্যেও এই দুটি অবস্থার অবস্থান দেখতে পাই। আমাদের অভিব্যক্তির মধ্যে যেমন একটা স্থূল দেহ দেখতে পাই, তেমনি আমাদের আছে অব্যক্ত মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহংকার  ইত্যাদি। আরো একটু গভীরে গেলেই বুঝতে পারি, আমাদের মধ্যে আছে বোধশক্তি, জ্ঞান বা অজ্ঞান। অর্থাৎ আমাদের মধ্যে সেই শুদ্ধ জ্ঞান বা অশুদ্ধ জ্ঞানের ভান্ডার আছে, যার সাহায্যে এই দুইয়ের অর্থাৎ অব্যক্ত জগৎ ও ব্যক্ত জগতের মধ্যে আমরা বিচরণ করতে পারি। সাংখ্য দর্শনের এই জায়গাটা যদি আমরা ধরতে পারি, তবে আমরা আত্মজ্ঞানের পথে অগ্রসর হতে পারবো। অর্থাৎ আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, জগতের সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক তা আমরা সম্যকরূপে উপলব্ধি করতে পারবো।  

তো আমাদের মধ্যে যে জড় সত্ত্বা  ও অ-জড় সত্ত্বা বা জ্ঞানসত্ত্বা উভয়ই বিরাজ করছে। এখন,  আমরা যদি নিজেকে বিশ্লেষণ করতে পারি, তবে সৃষ্টির উভয় সত্ত্বা অর্থাৎ পুরুষ ও প্রকৃতি সম্পর্কে একটা ধারণা  পেতে পারি। 

তার আগে আমরা আরো একটু ভালোভাবে বুঝে নেবো, সাংখ্য দর্শন এই সৃষ্টির ক্রোম সম্পর্কে কি বলছেন।  

সাংখ্য দর্শন সৃষ্টির ক্রমকে ২৫ ভাগে ভাগ করেছে। ১,পুরুষ, ২.প্রকৃতি, ৩.মহৎ অর্থাৎ প্রধান বা শ্রেষ্ঠ (বুদ্ধি)  ৪, অহঙ্কার  ৫. মানস ৬-১০, পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ন নাসিকা, জিহ্বা , ত্বক ) ১১-১৫. পাঁচটি কর্ম্মেন্দ্রিয় (বাক, পানি, পাদ, পায়ু, উপস্থ) ১৬-২০. পাঁচটি তন্মাত্র (শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ) ২১-২৫. পাঁচটি মহাভূত, (ক্ষিতি, অপ , তেজ,  মরুৎ, ব্যোম) .

এই পচিশ তত্ত্বগুলোকে আলোচনার সুবিধের জন্য মোটামুটি তিন ভাগ করা যায়। 

 ১. অপ্রকাশিত চৈতন্য, ২. প্রকাশিত অব্যক্ত অবস্থা ৩. প্রকাশিত ব্যক্ত অবস্থা। প্রকাশ তা সে ব্যক্ত হোক, বা অব্যক্ত এরও  উর্দ্ধে অবস্থান করে চৈতন্য বা পুরুষ। প্রকৃতি স্বাধীন ভাবে তার নিজের মধ্যে বর্তমান ত্রিগুণের প্রভাবে এই সৃষ্টি লীলায় মেতে আছে। অব্যক্ত অবস্থায় প্রকৃতি ত্রিগুণের সাম্যাবস্থা বিরাজ করে। আর এই ত্রিগুণের মধ্যে যখন অসাম্যের অবস্থা আসে, তখন ব্যক্ত অবস্থার সৃষ্টি হয়। তো দুটো অবস্থা পেলাম, ত্রিগুণের অসাম্যের অবস্থা  অর্থাৎ ব্যক্ত অবস্থা, দ্বিতীয় ত্রিগুণের সাম্যাবস্থা অর্থাৎ অব্যক্ত অবস্থা।  আর এই দুইই প্রকৃতি। আমরা যে পাঁচিশটি  ক্রোমের কথা বলেছি, তার মধ্যে তেইশটি ক্রোম এই প্রকৃতির মধ্যেই সংগঠিত হয়ে থাকে। 

পুরুষ ও প্রকৃতি সম্পর্কে আমরা একটা ধারণা আমরা আগেই পেয়েছি, পুরুষ অর্থাৎ শুদ্ধ চৈতন্য বিশেষ যিনি গুণাতীত। আর প্রকৃতি হচ্ছে ত্রিগুণাত্মক। এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তীতে করা যাবে। আসলে প্রকৃতির মধ্যে প্রথম যে প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়,  তা হচ্ছে মহৎ, যা অব্যক্ত বা সূক্ষ্ম । প্রকৃতির মধ্যে যা কিছু ঘটছে, তার প্রধান কারন হচ্ছে এই মহৎ। এই মহৎ-কে সাংখ্য দর্শনীগন বলছেন বুদ্ধি  অর্থাৎ আমাদের  নিশ্চয়াত্মিকা মনোবৃত্তি। যার দ্বারা আমাদের বোধ হয়। আমাদের বিচারশক্তি। আমাদের  পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের  সঙ্গে  যখন বিষয়ের  সংযোগ হয়, তখন আমাদের মন এই বুদ্ধির সাহায্যে বিষয়কে সুনিশ্চিত করে। তো মহৎ বা বুদ্ধি হচ্ছে প্রকৃতির মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও প্রথম সূক্ষ্ম প্রকাশ। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যা কিছুর উপস্থিতি তা বুদ্ধিই আমাদেরকে সুনিশ্চিত ভাবে জ্ঞাত করায়। এই মহৎ-কে বলা হয় হিরণ্যগর্ভ। অর্থাৎ প্রকৃতির গর্ভ-প্রদেশ হচ্ছে এই মহৎ।  মহৎ-এর মধ্যেই ভ্রূণ আকারে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের  জন্ম হয়ে থাকে। জগতে যাকিছু প্রকাশমান তার কারখানা হচ্ছে এই মহৎ বা হিরণ্যগর্ভ। মহৎকে বুদ্ধি বলা হচ্ছে তার কারন হচ্ছে এটি আসলে একটি সর্বোচ্চ ও সমগ্র  জ্ঞানভাণ্ডার।  এই সর্বোচ্চ জ্ঞানভান্ডারের দুটো কাজ।  একটা হচ্ছে বিষয়ের নিশ্চয় করা, অন্যটি হচ্ছে বিষয়ের বিচার। সাংখ্যকারের ভাষায়  নির্ণয় ও অবধারণ।  বুদ্ধি হচ্ছে সেই শক্তি  যা দ্রষ্টা ও দৃশ্যকে আলাদা করতে পারে, জ্ঞান ও জ্ঞাতাকে আলাদা করতে পারে।  এই বুদ্ধির  সাহায্যেই আমরা নিজেদেরকে অন্যের থেকে আলাদা করতে পারি। এই বুদ্ধিই আমাদের ভালো অনুভূতি ও খারাপ অনুভূতি, সুখ ও অসুখের মধ্যে পার্থক্য করে থাকে। এই বুদ্ধির সাহায্য আমরা জ্ঞান লাভ করে থাকি, এমনকি দুটো বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য নির্নয় করতে পারি।  বুদ্ধি বা অনুভূতির বিচারশক্তি যদি না থাকতো তবে আমাদের জগৎকে উপলব্ধি করতে পারতাম না।  

এই বুদ্ধি (মহৎ-তত্ত্ব) আবার, গুনের প্রভাবে দুই প্রকার হয়ে থাকে।  একটা হচ্ছে সাত্ত্বিক বুদ্ধি আরেকটা হচ্ছে তামসিক বুদ্ধি। তার মানে বুদ্ধির মধ্যে তমঃগুন্ ও সত্ত্বগুণ রয়েছে।  এর মধ্যে যেটির প্রাবল্য যখন বেশি থাকে  বুদ্ধির মধ্যে তখন তার প্রভাব বেশি দেখতে পাওয়া যায়। সত্ত্বগুনের  স্বভাব হচ্ছে আলোকিত করা, উন্মুক্ত করা, উন্মোচন বা প্রকাশিত করা। সত্যকে সামনে তুলে ধরা। জ্ঞান-দৃষ্টির মধ্যে স্বচ্ছতা আনয়ন  করা।    প্রকৃতির এই সত্ত্বগুণ যখন বুদ্ধির সঙ্গে বিরাজ করে, তখন ধর্ম্ম, জ্ঞান, বৈরাগ্য, ও ঐশ্বর্য্য বৃদ্ধি পায়।  অন্যদিকে যখন বুদ্ধির সঙ্গে তমঃগুণের প্রাবল্য থাকে তখন এর ঠিক বিপরীত অবস্থা হয়, অর্থাৎ তখন আসক্তি, অধর্ম্ম, অজ্ঞান ইত্যাদি দেখা যায়। তামসিক বুদ্ধি বন্ধনের  কারন, আর সাত্ত্বিক বুদ্ধি মুক্তির কারন হয়ে থাকে।  এই যে ধর্ম্মের কথা বললাম, এটি হচ্ছে ন্যায় পরায়ণতা, পবিত্রতা, শুদ্ধতা।  আর জ্ঞান হচ্ছে সৎ-অসৎ, নিত্য-অনিত্য সম্পর্কে বিচার করবার ক্ষমতা। বৈরাগ্য হচ্ছে অনিত্য বস্তুর প্রতি বিরাগ, অনাসক্তি।  ঐশ্বর্য্য হচ্ছে ঐশ্বরিক অনুভূতির  লক্ষে পৌঁছাবার জন্য দক্ষতা। তামসিক বুদ্ধির কারণেই আমরা এই জাগতিক বস্তুর মধ্যে আনন্দের সন্ধান পেতে চাই, আর এখানে নিজেদেরকে বেঁধে রাখি।  আর সাত্ত্বিক বুদ্ধি  মানুষকে  এই অনিত্য জগৎ থেকে মুক্তির পথ দেখায়।  তো তামসিক বুদ্ধি জাগতিক বন্ধনের  কারন হয়ে থাকে, অন্য দিকে সাত্ত্বিক বুদ্ধি বন্ধন থেকে  মুক্তির পথে টেনে নিয়ে যায়।  

সর্বোচ্চ জ্ঞানের ভান্ডার হচ্ছে এই মহৎ-তত্ত্ব। এই জ্ঞানই  পুরুষকে যেমন কার্য্য ও কারনের পার্থক্য নির্ণয়ে সাহায্য করে থাকে, তেমনি এই জ্ঞানের পথ প্রদর্শক হিসেবে কাজ করে প্রকৃতি। এই জ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রকৃতি। প্রকৃতিই জ্ঞান আহরণে পুরুষকে সাহায্য করে থাকে। আর এই জ্ঞানের ফলেই পুরুষ, প্রকৃতি থেকে নিজেকে আলাদা করে নিহ্নিত করতে পারে, নিজেকে আলাদা রাখতে পারে। পুরুষের এই শুদ্ধ জ্ঞানালোক মহৎ-এর মধ্যে প্রতিফলিত হয়। প্রকৃতি এমনিতে জড়, অচেতন কিন্তু মহৎ-এর মধ্যে যখন জ্ঞানালোক প্রতিফলিত হয়, তখন  প্রতিবিম্বিত  চেতন সত্ত্বা সৃষ্টিতে প্রতিফলিত হয়। অতএব যদিও মহৎ হচ্ছে সর্বোচ্চ জ্ঞানের আধার কিন্তু শুদ্ধ জ্ঞানের কথা যদি বলি তা আছে এই পুরুষের কারনে। অর্থাৎ পুরুষের চেতন সত্ত্বার কারনে মহৎ বা বুদ্ধি প্রকৃতির মাধ্যমে জ্ঞান সংগ্রহ করছে। 

আপনার একটা প্রতিচ্ছবি আপনি আয়নায় দেখছেন, যদিও আয়নার মধ্যে প্রতিফলিত ছবি  কিন্তু সত্যিকারের আপনি নয়। এটি কেবলই  ছবি কিন্তু হুবহু আপনার মতোই। ঠিক তেমনি পুরুষের চৈতন্যসত্ত্বা  মহৎ-এর উপরে বা বুদ্ধিসত্ত্বার উপরে প্রতিফলিত হচ্ছে মাত্র। এটি প্রতিফলন মাত্র। তো মহৎ স্ব-প্রকাশ নয়।  মহৎ প্রকৃতির (জড়) মধ্যেই  অভিব্যক্ত।  এটি প্রকৃতির অংশবিশেষ। কেবলমাত্র পুরুষের সন্মন্ধ-সান্নিধ্য হেতু  মহৎ পুরুষের চৈতন্যের প্রকাশের  নিমিত্ত হয়ে উঠেছে। আর এখান  থেকেই শুরু হচ্ছে সৃষ্টির ক্রিয়া। অর্থাৎ প্রকৃতির মধ্যে যে চেতনার প্রভাব তা এই মহৎ-এর করনে ঘটে থাকে। আর মহৎ আসলে পুরুষের একটা প্রতিফলিত সত্ত্বা। প্রকৃতির মধ্যে সৃষ্টির যে ক্রোম, বা প্রকৃতির মধ্যে যে পরিণতির যে  স্বভাব তার সন্মন্ধে প্রকৃতির নিজের কোনো জ্ঞান নেই, ভূমিকা নেই। কিন্তু এই প্রকৃতির মধ্যেই  লুকিয়ে আছে অসংখ্য সম্ভাবনার বীজ। প্রকৃতির মধ্যে অব্যক্ত এই প্রচ্ছন্ন সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রকৃতি নিজে জ্ঞাত নয়।    

অতএব,  পুরুষের মধ্যে যে চৈতন্য তা প্রথম এই প্রকৃতির অংশবিশেষ মহৎ-এর মধ্যে প্রতিচ্ছবি হিসেবে প্রকাশিত হয়। এর পরে প্রকৃতির ত্রিগুণের ভিন্ন ভিন্ন মিশ্রনের কারনে সৃষ্টির মধ্যে ভিন্নতা প্রদর্শিত হয়। তো মহৎ, যা প্রকৃতির প্রথম অবস্থা, বা প্রথম প্রকাশ তা ত্রিগুণাত্মিকা। মহৎ প্রকৃতির অংশ হলেও, সে পুরুষের চৈতন্য সত্ত্বার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। প্রকৃতি ত্রিগুনাত্বিক। আর এই ত্রিগুণের সাম্যাবস্থায় প্রকৃতি অব্যক্ত।  যখনই  গুনের তারতম্য শুরু হলো, তখন  প্রকৃতির মধ্যে গতি এলো, অর্থাৎ সৃষ্টি শুরু হলো। প্রকতি ব্যক্ত হতে শুরু করলো। 

তো মহৎ আসলে পুরুষের প্রতিফলিত সত্ত্বা, কিন্তু প্রকৃতির ত্রিগুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে,  প্রকৃতির ত্রিগুণের অসাম্যের কারনে অস্থির হয়ে উঠলো। ত্রিগুন অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ  তমঃ।  এই  সত্ত্ব গুনের প্রভাবে  প্রকাশিত হচ্ছে জ্ঞান, বিজ্ঞতা, ধর্ম্ম বা পবিত্রতা বা নৈতিক উৎকর্ষ, অনাসক্তি এবং দক্ষতা। অন্যদিকে তমঃ গুনের প্রভাবে দেখা দেয়  অজ্ঞান, অধর্ম্ম, আসক্তি, অজ্ঞতা, ভ্রমজ্ঞান অর্থাৎ সাত্ত্বিক অবস্থার বিপরীতে এই তামসিকের অবস্থান। আর  রজঃগুন কেবলমাত্র প্রকাশের  সাহায্য ক্রিয়া বিশেষ। 

তো নির্গুণ পুরুষ  অপরিবর্তিনীয়, কিন্তু মহৎ প্রকৃতির গুনের প্রভাবে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। পুরুষ চৈতন্য, মহৎ পুরুষের প্রতিচ্ছবি মাত্র।  পুরুষ স্বয়ংপ্রকাশ, মহৎ পুরুষের আলোতে প্রকাশিত ।  তো পুরুষের যে চৈতন্যশক্তি  তা যখন মহৎ-এ প্রতিফলিত হয়, কিন্তু মহৎ প্রকৃতির ত্রিগুণের কারনে একটা মিশ্র অবস্থা ধারণ করে। নির্গুণ পুরুষ অব্যক্ত ও স্থির, কিন্তু মহৎ ত্রিগুণের সাম্যাবস্থায় অব্যক্ত স্থির হলেও ত্রিগুণের অসাম্যে অস্থির ও ব্যক্ত। 

আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও আমরা দেখেছি, আমাদের বুদ্ধি, আমাদের যে অহঙ্কার , আমাদের যে মানস বৃত্তি তা প্রকৃতির গুনের দ্বারা প্রভাবিত হয়। আমরা আগেই শুনেছি পাঁচিশটি তত্ত্বের কথা। এই তত্ত্ব গুলোর মধ্যে প্রকৃতি-পুরুষের পরেই মহৎ-এর অবস্থান।  আর মহৎ-এর পরে আসে অহঙ্কার  (cosmic ego) . ত্রিগুণাত্মক মহৎ একসময় অহঙ্কারে  বিবর্তিত হয়। আর অহঙ্কারের মধ্যে যত  ত্রিগুণের প্রভাব বাড়তে থাকে, তত সে পৃথিবীর কাছাকাছি আসতে থাকে। এই হচ্ছে সাংখ্য দার্শনিকদের মতে সৃষ্টি বা জগৎ প্রকাশের প্রক্রিয়া। পরের দিন আমরা অহঙ্কার  সম্পর্কে শুনবো। 

আমরা আগেই শুনেছি, মহৎ বা বুদ্ধি হচ্ছে প্রকৃতির মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও প্রথম সূক্ষ্ম প্রকাশ। তো প্রথম  সূক্ষ্ম প্রকাশ হচ্ছে বুদ্ধি বা  মহৎ।  বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যা কিছুর উপস্থিতি তা বুদ্ধিই আমাদেরকে সুনিশ্চিত ভাবে জ্ঞাত করায়। এই মহৎ-কে বলা হয় হিরণ্যগর্ভ। অর্থাৎ প্রকৃতির গর্ভ-প্রদেশ হচ্ছে এই মহৎ।  মহৎ-এর মধ্যেই ভ্রূণ আকারে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের  জন্ম হয়ে থাকে। জগতে যাকিছু প্রকাশমান, তা সে ব্যক্ত হোক বা অব্যক্ত  তার কারখানা হচ্ছে এই মহৎ বা হিরণ্যগর্ভ। 

এই মহৎ বা বুদ্ধির গর্ভে জন্ম হচ্ছে অহঙ্কারের। তাই বুদ্ধিতে যেমন ত্রিগুণের প্রভাব আছে, তেমনি এই অহঙ্কারের মধ্যেও আছে ত্রিগুণের প্রভাব। এই অহঙ্কারই বস্তুর মধ্যে ভেদ নির্ণয় করে থাকে। এই অহঙ্কার আমি-তুমি বোধের সৃষ্টি করে। দ্রষ্টা ও দৃশ্যের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম হয়। 

অহঙ্কার  দুই প্রকারের হয়ে থাকে।  সাত্ত্বিক অহঙ্কার  ও তামসিক অহঙ্কার।  তামসিক যে অহঙ্কার  তার মধ্যে রয়েছে পাঁচটি তন্মাত্র। অন্যদিকে মানস হচ্ছে সাত্ত্বিক অহঙ্কারের ফল। অতি সূক্ষ্ম অবস্থায় কি ঘটছে ও তার কার্য্য-কারন তত্ত্ব (causal) তা এই মানসের মধ্যে প্রতিভাত হচ্ছে। এই মানসকে আমরা যেন মন বলে ভুল না করি। মানস  হচ্ছে বিশ্লেষাত্মক প্রক্রিয়া বিশেষ। একে  আপনি মনন বলতে পারেন। আমরা যখন কোনো বিষয়কে বিশ্লেষণ করি তাকে বলা হয় মনন বা বিষয়ের গভীরে আলোকপাত করা। এই মানস প্রক্রিয়ার ফলেই অতি সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মে আবার সূক্ষ্ম থেকে স্থূলে পরিণতি লাভ করছে।   তো সাত্ত্বিক অহংকার থেকে মানস।  এই সাত্ত্বিক অহংকার থেকে ধীরে ধীরে পাঁচটি জ্ঞান ইন্দ্রিয় ও পাঁচটি কর্ম্মেন্দ্রিয় এসেছে। এই যে জ্ঞান-ইন্দ্রিয় বা কর্ম্মেন্দ্রীয়ের কথা বলা হলো, তা কিন্তু আমাদের স্থূল চক্ষু-কর্ন, বা হস্ত-পদ নয়।  এই ইন্দ্রিয় সকল হচ্ছে সূক্ষ্ম যা স্থূল ইন্দ্রিয়ের অলক্ষ্যে থেকে ক্রিয়া করে থাকে। অর্থাৎ দর্শনশক্তি, শ্রবণশক্তি, ঘ্রানশক্তি, রস-আস্বাদন করবার শক্তি, স্পর্শ শক্তি, বাকশক্তি, কোনোকিছু আকড়ে ধরবার শক্তি, চলাফেরা করবার শক্তি, নিঃসরণ শক্তি, প্রজনন শক্তি,  এগুলো  এই মানস ক্রিয়ার ফল। এই শক্তিরই  স্থূল রূপ হচ্ছে চক্ষু, কর্ন , নাসিকা, জিহ্বা , ত্বক, বাক, পানি, পদ, পায়ু, উপস্থ ।  বলা যেতে এই শক্তিগুলো আমাদের শরীরের বিভিন্ন স্থূল অঙ্গের সাহায্যে ক্রিয়াশীল হয়ে থাকে। দেখুন, চোখ, বা মুখ দেখতে বা বলতে পারে না।  দেখা বা বলা বা ক্রিয়া করবার  শক্তি নিহিত আছে এই জ্ঞানেন্দ্রিয় বা কর্ম্মেন্দ্রীয়ের মধ্যে যা অতিশয় সূক্ষ্ম শক্তি বিশেষ। আমাদের শরীর  থেকে যখন কিছু নিঃসরণ হয়, অর্থাৎ মল, বা রস, এমনকি সন্ত্রানকে মায়ের শরীর থেকে বহির্মুখী করে এই ইন্দ্রিয়শক্তি। তো এই ইন্দ্রিয়শক্তি কেবলমাত্র শরীরের স্থূল ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়া নয়।  স্থূল ইন্দ্রিয়সকল একটা মাধ্যম মাত্র।  আসলে এই শক্তি ক্রিয়া করে আমাদের মনন শক্তির সাহায্যে। আমরা দেখছি, আমাদের হাত মশাটাকে মারছে, আমরা দেখছি, লোকটা মুখ দিয়ে কথা বলছে, আমরা দেখছি লোকটি পা দিয়ে বল মারছে, এগুলো আসলে আমাদের মানস  শক্তির বহির্প্রকাশ মাত্র।  এই বাহ্য  ক্রিয়ার অন্তরালে কাজ করছে আমাদের মানস  শক্তি। মানস   শক্তিতেই এই ক্রিয়াসকল  সংগঠিত হয়, প্রকাশ হয় বিভিন্ন স্থূল ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে, যা আমাদের নজরে আসে। মানস  শক্তি যখন ক্রিয়াশীল হয়, তখন আমাদের জৈব শরীরের মধ্যে হরমন বা বিশেষ ধরনের রস নিঃসরণ শুরু হয়। এই হরমন আমাদের স্থূল ইন্দ্রিয়গুলোকে উত্তেজিত করে বাহ্য  ক্রিয়া সংগঠনে সাহায্য করে থাকে। মানস  শক্তির অভাৱে কোনো জীব, কোনো কাজ তা সে  ভালো বা মন্দ কোনো ক্রিয়াই করতে সক্ষম নয়। ঋষিপুরুষগন বলছেন, শরীরের মধ্যে যখন আমাদের বিষ উৎপন্ন হয়, তখন তা শরীর বের করে দিতে চায়। ঠিক তেমনি আমাদের মননের বিচারধারার মধ্যে যখন  কোনো বৈকল্য বা বিকার উৎপাদন হয়, তখন তা আমাদের শরীরের বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসে। আর এই প্রক্রিয়াই  আমাদের শারীরিক সুখ বা দুঃখের কারন হয়ে থাকে।  এমনকি মানসিক সুখ দুঃখের কারনও  হয়ে থাকে। একথা ভালো ভাবে বুঝে নেবার চেষ্টা করতে হবে আমাদের। আমাদের মনের মধ্যে উদ্ভূত কাম-বাসনা যখন স্থূল ইন্দ্রিয়ে উপস্থিত হয়, তখন সে আমাদের উর্জ্বাশক্তিকে ঠেলে বের করে দিতে চায়, আর আমরা ইন্দ্রিয়সুখ অনুভব করি। আমরা দর্শনসুখ, রমনসুখ, শ্রবণসুখ, ইত্যাদি অনুভব করি। এই যে ইন্দ্রিয়সুখ বা দুঃখ এটি প্রথমে আমাদের মানস শক্তিকে আশ্রয় করে জড়ো হয়েছিলো বা সঞ্চয়  হয়েছিলো। 

তো আমাদের সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয় সকলের যে ক্রিয়াশক্তি  তা আমাদের শুধু শারীরিক সুখ দুঃখের কারন নয়, আমাদের জীবনের সমস্ত ধরনের সুখ-দুঃখের কারন হয়ে থাকে। সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়শক্তির ক্রিয়া পঞ্চমহাভূত, ও পঞ্চ  তন্মাত্রের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। সত্যি কথা বলতে কি, ইন্দ্রিয় আমাদের দশটি নয়, ইন্দ্রিয় আমাদের এগারোটি। অর্থাৎ পাঁচটি কর্ম্মেন্দ্রিয়, পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়, আর একটি মানস। সাংখ্য দর্শনে বলা হচ্ছে,  মানস আমাদের এই এগারোটি ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করছে। কারন মানস, সমস্ত ইন্দ্রিয় দ্বারা লব্ধ জ্ঞান শুধ সংগ্রহ করছে তাই নয়, এই মানস হচ্ছে ভোক্তা। এই মানসের  দ্বারাই আমাদের জ্ঞানেন্দ্রিয়, কর্ম্মেন্দ্রিয়, ক্রিয়া করবার শক্তি পাচ্ছে। এবং নিজ নিজ কর্ম্মক্ষেত্রে ক্রিয়া করছে। 

তো মানস একদিকে যেমন বাহ্যতঃ ক্রিয়া করছে, তেমনি আমাদের সমস্ত অন্তঃ-ক্রিয়া সংগঠনের মালিক। একটা মটোর  যেমন ক্রিয়া করে তার যন্ত্রপাতির সাহায্যে, তেমনি এই মোটরকে শক্তি যোগায় ইলেকট্রিসিটি বা তেল, অর্থাৎ ইন্ধন।  আমাদের শরীরে এই মানস এই ইন্ধন, তেল, বা ইলেকট্রিক শক্তির কাজটি করে থাকে। তেল বা ইলেকট্রিক শক্তি নিজে কোনো কাজ করতে পারে না, কিন্তু মোটরের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাহায্য পেলে, সে তার শক্তির উপযোগিতা প্রদর্শন  করতে পারে। 

এই মানসের  মধ্যে প্রতিনিয়ত নানান রকম সংকল্প ও বাসনার বুদ্বুদ উৎপন্ন হচ্ছে। আর এই সংকল্প ইত্যাদি হচ্ছে ত্রিগুণের পরিনাম বিশেষ। আমাদের মধ্যে যে চেতনা, তা এই মানসের মাধ্যেমেই প্রবাহিত হচ্ছে। এই জন্য যোগীপুরুষগন বলছেন, আপনি যদি ইন্দ্রিয় সংযম করতে পারেন, আপনার ভিতরে কামনা-বাসনা-সঙ্কল্পগুলোকে যদি আপনি ধরতে পারে, তবে আপনি মানস সরোবরে  অবগাহন করতে পারবেন।  আর সেখানে যদি সংযমরূপ নৌকায় সওয়ারী হতে পারেন, তবে আপনি এই মানস সরোবরে উদ্ভূত সমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করে পরমশান্তিতে থাকতে পারেন। 

তো আমরা শুনছিলাম অহঙ্কারের কথা। আমরা শুনেছি, অহঙ্কার দুই প্রকার, সাত্ত্বিক ও তামসিক। সাত্ত্বিক অহঙ্কার  থেকে জাত  হচ্ছে মানস অর্থাৎ  অতি সূক্ষ্ম অবস্থায় কি ঘটছে ও তার কার্য্য-কারন তত্ত্ব (causal) তা এই মানসের মধ্যে প্রতিভাত হচ্ছে।  মানস  হচ্ছে বিশ্লেষাত্মক প্রক্রিয়া বিশেষ। মানস  হচ্ছে পরিণতির কার্য্য-কারন। অন্যদিকে তামসিক অহঙ্কার-এর ফল হচ্ছে পাঁচটি তন্মাত্র, অর্থাৎ অতিসূক্ষ্ম উপাদান যার সংজ্ঞা নিরুপন করা শক্ত। প্রাথমিক মৌলিক পদার্থ এই তন্মাত্র ( শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ) । এই প্রাথমিক মৌলিক পদার্থকে কখনো বিশ্লেষণ করা যায় না। একে  আপনি প্রাকৃতিক শক্তি নিচয়ও  বলতে পারেন। জীবের স্বাভাবিক বাসস্থান হচ্ছে এই তন্মাত্র। এই তন্মাত্র থেকে আসে পঞ্চমহাভূত। প্রাণহীন, বোধশক্তিহীন, অনুভূতিহীন, অচেতন, পদার্থ বিশেষ। সৃষ্টির প্রাথমিক পর্যায়ে এই বায়বীয়, গ্যাসীয় বা তরল  পদার্থের উৎপত্তির কারন হচ্ছে এই তন্মাত্র। এই তন্মাত্র থেকেই উদ্ভূত হচ্ছে পঞ্চ  মহাভূত।  আসলে ক্ষিতি, অপ,  তেজ, মরুৎ এই চারটিকে বলা হয় মৌলিক পদার্থ, যার ভিন্ন ভিন্ন মিশ্রনের ফলে এই সমস্ত প্রকাশিত-জগৎ সাকার ও গুনবিশিষ্ট হচ্ছে। জগতের  পরিবর্তন প্রকট হচ্ছে। এখানে মানস বা ইন্দ্রিয়সকল  অনুপস্থিত। বিশ্ব  ব্রহ্মান্ডের বেশিরভাগটাই  এই তামসিক অহঙ্কারের  ফল।  এখানে অর্থাৎ গ্রহ, উপগ্রহ, তারা, নক্ষত্র যা কিছু আমাদের দৃষ্টির মধ্যে বা দৃষ্টির বাইরে তা এই তামসিক অহঙ্কার  থেকে জাত। 

তামসের বিশেষত্ব হচ্ছে এর দৃঢ়তা, স্থায়িত্ব বা স্থিরতা। পৃথিবী অপরিবর্তনীয় ও স্থায়ী, এর একটা নিজস্ব অবয়ব  আছে।  জল, অগ্নি,  আকাশ, বাতাস, এদের সবার আলাদা আলাদা  নিজস্ব বৈশিষ্ট্য  আছে।  এই যে পঞ্চভূতের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, তা  কখনও  পরিবর্তন করা যায় না। সমগ্র প্রকাশিত জগৎ উৎপত্তির কারন এই পাঁচ মহাভূত।  এই ভূৎসকল যখন ভিন্ন ভিন্ন পরিমানে, ও ভিন্ন ভিন্ন ধাপে, ভিন্ন ভিন্ন মিশ্রের মধ্য  দিয়ে এগিয়ে চলতে লাগলো, তখন জগৎ রূপান্তরিত হতে হতে পরিণতির দিকে এগিয়ে চললো। 

আমরা আগেই শুনেছি, এই স্থূল পঞ্চভূতের সূক্ষ্ম রূপ হচ্ছে পাঁচ তন্মাত্র। যখন আমরা কোনো কিছুকে হাত দিয়ে ধরি,  তখন এই  বস্তুর একটা বৈশিষ্ট্য আমাদের অনুভূতিতে আসে। কখনো ঠান্ডা, কখনো গরম, কখনও  খসখসে, কখনো মসৃন। ঠিক তেমনি আমরা যখন চোখ দিয়ে দেখি,  তখন আমাদের চোখের আয়নায় বা মনের আয়নার সামনে একটা অবয়ব ভেসে ওঠে।  আমরা একটা বিশেষ অনুভূতি সম্পন্ন হই। ভিন্ন ভিন্ন পদার্থের মধ্যে এই যে বিশেষ বিশেষ  অনুভূতি, যা আমাদের ইন্দ্রিয়সকল অনুভব করে, এটাই হচ্ছে ওই পদার্থের সূক্ষ্ম অবস্থা অর্থাৎ তন্মাত্র। পঞ্চভূতের ভিন্ন ভিন্ন মিশ্রনের কারনে উদ্ভূত পদার্থের মধ্যে তন্মাত্র সুপ্ত অবস্থায় বিরাজ করছে।  একজন অন্ধ, কালাও এই  অনুভূতির যোগ্য হয়ে থাকে। অর্থাৎ পদার্থের মধ্যে শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ - এর সুপ্ত অবস্থান হয়ে থাকে। তো আমরা যাকিছু ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধি করি, তা স্বরূপত আমাদের  ইন্দ্রিয়সকলের মধ্যে নয়, এসব আসলে সেই উপাদানেরই  বৈশিষ্ট্য। এসব ত্রিগুণাত্মক প্রকৃতির গুন,  যা সমস্ত পদার্থের মধ্যেই  ভিন্ন ভিন্ন প্রকারে  নিহিত আছে।  শব্দ আমাদের কানের মধ্যে নেই, গন্ধ আমাদের নাকের মধ্যে নেই, কান বা নাক হচ্ছে মাধ্যম মাত্র যার সাহায্যে মানস এই শব্দ-গন্ধ অনুভবের মধ্যে তরঙ্গের ঢেউ তুলছে।  আর বুদ্ধি বা মহৎ-এ প্রতিফলিত চৈতন্য শক্তির মাধ্যমে পুরুষ এই ভোগ করছেন। 

এই তন্মাত্র মহাভূতদেরকে সঙ্গে নিয়ে এই পার্থিব জগতের প্রকাশ ঘটাচ্ছে। সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে যে চেতনশক্তি তা মনের মাধ্যমে এই প্রকাশিত পার্থিব জগতের জ্ঞান সংগ্রহ করছে। জগতের সমস্ত বস্তু সম্পর্কে জ্ঞাত করাচ্ছে মানস । 

এবার আসি রাজসিক অহঙ্কারের  কথায়। রাজসিক অহঙ্কার  হচ্ছে একটা মাধ্যম যার সাহায্যে এই জ্ঞানের  প্রবাহ চলছে।  এই রাজসিক অহঙ্কার আমাদের অজ্ঞান অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। অথবা জ্ঞানালোক থেকে অজ্ঞান অন্ধকারের জগতে প্রবেশ করাচ্ছে। এই রাজসিক অহঙ্কার যেন একটা চলমান গাড়ি, যা আমাদের অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসে, বা উল্টোটা করে থাকে। রাজসিক অহঙ্কার  একটা শক্তি বিশেষ যা আমাদের সুপ্ত গুন্ অর্থাৎ সাত্ত্বিক বা তামসিক গুন্ প্রকাশে সাহায্য করে থাকে। এই রজঃ শক্তি না থাকলে, আমাদের ভিতরের সুপ্তগুন্ অর্থাৎ তামসিক গুন্ বা সাত্ত্বিক গুন্, তার প্রকাশ সম্ভব হতো না। তো রজঃগুন হচ্ছে সেই শক্তি যা আমাদেরকে অজ্ঞান অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোকে নিয়ে যেতে পারে, আবার এই রাজসিক শক্তিই পারে আমাদের জ্ঞানের জগৎ থেকে অজ্ঞানের জগতে নিয়ে যেতে। আর এই কারণেই যোগীপুরুষগন সাধন পথে রজোগুণের মাহাত্ম স্বীকার করেছেন।  

তো সাংখ্য  দার্শনিকদের মতে  প্রকৃতি ও পুরুষের মিলনে উদ্ভূত হচ্ছে মহৎ বা বুদ্ধি। এই বুদ্ধি সূক্ষ্ম। এই বুদ্ধিই দ্বৈত বোধের সৃষ্টিকারী।  অর্থাৎ এই বুদ্ধির কারণেই ভালো-মন্দ, নিত্য-অনিত্য, সত্য-মিথ্যা, ঠিক-বেঠিক নির্ধারিত হচ্ছে। এই সূক্ষ্ম বুদ্ধিই  পুরুষের নিত্যতা বা শাশ্বত অবস্থা এবং প্রকৃতির অনিত্যতা নির্নয় করে থাকে।  যা কিছু দৃশ্যমান, তার সবই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তনশীল। তো প্রকৃতির পরিনাম ধর্ম্মী স্ব-ভাব অর্থাৎ অনিত্যতা, ও পুরুষের অপরিণামী স্ব-ভাব বা নিত্যতা বুদ্ধির উপস্থিতেই প্রকট হয়ে থাকে। এবার বুদ্ধি থেকে অহঙ্কার  অর্থাৎ আমি-বোধ। সাত্ত্বিক অহঙ্কার  থেকে আমরা পাই মানস, অর্থাৎ চিন্তা করবার শক্তি, কর্ম্মেন্দ্রিয় অর্থাৎ ক্রিয়া করবার শক্তি, এবং জ্ঞানেন্দ্রিয় অর্থাৎ বিষয় বা দৃশ্যের মধ্যে ভিন্নতাকে সুনির্দিষ্ট করবার শক্তি। 


স্থূল চোখ, কান, ইত্যাদি নিজেরা দেখতে বা শুনতে সক্ষম নয়, কারন এদের নিজস্ব চেতনা নেই, কেবল মাত্র মানস-এর  উপস্থিতে ইন্দ্রিয়সকল চেতনাবানের ন্যায় ক্রিয়া করে থাকে। ইন্দ্রিয়সকল যখন বিষয়ের সম্পর্কে আসে, তখন সেই বিষয়চিত্র ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে  মানসের মধ্যে প্রতিফলিত হয়।
তো জ্ঞানেন্দ্রিয় বা কর্ম্মেন্দ্রিয় দুইই মানসের সান্নিধ্যে চৈতন্যবান হয়ে ওঠে। মানস  থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে, এরা চৈতন্যহীন হয়ে যায়।
 
তবে একটা কথা বলি, এরা  সবাই চৈতন্যহীন হয়ে গেলেও, শব্দের কম্পন, আলোর তরঙ্গ, ইত্যাদি একে  অবশ্যই প্রভাবিত করে। অর্থাৎ কান থাকলে শুনবে, চোখ থাকলে দেখবে, মন সে সব গ্রহণ করুক না করুন, জৈব প্রকৃতির স্বভাব বা গুন্ কিন্তু পরিত্যাগ করে না। অর্থাৎ আপনার মন যেখানেই থাকুন, আগুনে হাত পড়লে, হাত পুড়বে - এতে কোনো সন্দেহ নেই। অর্থাৎ পঞ্চভূতের যে স্বাভাবিক গুনগত স্বভাব তার কোনো পরিবর্তন হবে না।  জলের আদ্রতা, আগুনের দাহিকা শক্তি ক্রিয়া করবে। 

যাইহোক, সাত্ত্বিক অহঙ্কার  থেকে যাকিছু এসেছে, অর্থাৎ মানস  ও ইন্দ্রিয়সকল তার মধ্যে প্রতিফলিত চেতনা প্রবাহিত হচ্ছে।  কিন্তু তামসিক অহঙ্কার-জাত যে পঞ্চ-তন্মাত্র, পঞ্চ-মহাভূত, তার মধ্যে চেতনার প্রতিফলন নেই।  আর মাঝখানে আছে রাজসিক  অহঙ্কার, যা আসলে এই দুই অহঙ্কারের বাহন মাত্র । এই রাজসিক অহঙ্কার  যখন সাত্ত্বিক অহঙ্কার  বহন করে অর্থাৎ যাকিছু আমাদের অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান অর্জনে সাহায্য করে সেই মতো চেতনা সম্পন্ন বলে প্রতিভাত হয়, আবার যখন তামসিক অহঙ্কার  বহন করে, তখন অচেতন বলে প্রতিভাত হয়। আসলে চেতনা  তো পুরুষের। বুদ্ধির বা মহতের মধ্যে যখন এই চেতনা প্রতিভাসিত হয়, তখন তাকে চেতন বৎ  বলে মনে হয় মাত্র।  

তো তেরোটি তত্ত্ব অর্থাৎ বুদ্ধি, অহঙ্কার, মানস, পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পাঁচটি কর্ম্মেন্দ্রিয় প্রত্যেকেই তাদের নিজস্ব গুনের কারনে ভিন্ন ভিন্ন স্বভাবের হয়ে থাকে। কিন্তু সবাই আলাদা আলাদা স্বভাবের হলেও, এরা  সবাই সম্মিলিত হয়ে ক্রিয়া করে থাকে।  আর এদের সমস্ত  ক্রিয়াই  পুরুষের উদ্দেশ্যে নিবেদিত হচ্ছে। অর্থাৎ প্রকৃতির সমস্ত ক্রিয়াই আসলে পুরুষকে খুশি করবার জন্য হয়ে থাকে। 

আমরা শুনেছি,  তামসিক অহঙ্কারই এই  পার্থিব জগৎ, বা দৃশ্যমান স্থূল জগৎ সৃষ্টির কারন।  অর্থাৎ তামসিক অহঙ্কার থেকে পঞ্চ তন্মাত্র, আবার পঞ্চ তন্মাত্র (সূক্ষ্ম)  থেকে পঞ্চমহাভূত (সূক্ষ্ম)।, আর এই দুইয়ে  মিলে (তন্মাত্র ও পঞ্চমহাভূত)  ধীরে ধীরে এই স্থূল জগৎ নির্মাণ করা হয়েছে। তো জগতের প্রত্যেক বস্তুর মধ্যে দুটো অবস্থা একটা বাহ্য বা স্থূল অবস্থা আর একটা সুপ্ত অবস্থা বা সূক্ষ্ম অবস্থা। এই যে পঞ্চ তন্মাত্র তা আসলে মহাভূতের সূক্ষ্ম গুনসকল।  অর্থাৎ শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ। এই পঞ্চ তন্মাত্র  থেকে ক্রমে ক্রমে ব্যোম, মরুৎ, তেজঃ, অপ, ক্ষিতির উদ্ভব হয়েছে।  

শব্দ নামক তন্মাত্র থেকে উদ্ভূত হয়েছে আকাশ বা ব্যোম। শব্দ ও স্পর্শ থেকে  এসেছে  মরুৎ বা বাতাস।  শব্দ, স্পর্শ, রুপ থেকে এসেছে অগ্নি বা তেজ।  শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস থেকে এসেছে অপ বা জল, এবং শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ থেকে এসেছে ক্ষিতি বা পৃথিবী। এইসব তত্ত্ব কথা আমাদের কাছে পুরানো নয়। কিন্তু সাংখ্য দার্শনিকগন বলছেন, বিভিন্ন তন্মাত্রের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় মিশ্রনের ফলে ভিন্ন ভিন্ন মহাভূতের উদ্ভব হয়েছে।  আবার একই সময়, প্রত্যেকটি উপাদান তৈরির সময় একটা নতুন গুনের সমাহার হয়েছে।  অর্থাৎ শব্দ ও স্পর্শ যখন মিলিত হলো, তখন একটা নতুন  গুন্ অর্থাৎ অগ্নি যদিও দুটি তন্মাত্র থেকে জাত অর্থাৎ শব্দ ও স্পর্শ থেকে উদ্ভূত কিন্তু অগ্নির মধ্যে একটা নতুন গুন্ দেখা দিলো, আর তা হচ্ছে রূপ। ঠিক তেমনি পৃথিবী যদিও শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস এই চারটি থেকে উদ্ভূত, কিন্তু এর মধ্যে নতুন গুনের সমাহার হলো তা হচ্ছে গন্ধ। অর্থাৎ মহাভূতের মিশ্রনের প্রতি পদক্ষেপে একটা করে  নতুন গুনের সমাহার হলো। 

সাংখ্য দার্শনিকগণ বলছেন, শব্দ যেমন আকাশের মধ্যে মিলিয়ে গেলো, শব্দ ও স্পর্শ  তেমনি বাতাসের মধ্যে মিশে গেলো। শব্দ, স্পর্শ, রূপ অগ্নির সঙ্গে মিশে গেলো। শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস মিলিত হলো জলের সঙ্গে।  সবশেষে শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ পৃথিবীর সঙ্গে মিলিয়ে গেলো।  তো পঞ্চভূত, আসলে মিশ্রণ মাত্র। এদের প্রত্যেকের যেমন নিজস্ব গুন্ থাকে, তেমনি আছে পূর্ব-পুরুষের গুন্। এই তন্মাত্র ও মহাভূতের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে ইন্দ্রিয়সকলের সঙ্গে। অর্থাৎ নাকের সঙ্গে সম্পর্ক হচ্ছে পৃথিবীর, জিভের সঙ্গে জল, অগ্নির সঙ্গে চোখ, বাতাসের সঙ্গে ত্বক, আর কানের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে আকাশের। এবার আমরা বুঝতে পারলাম সূক্ষ্ম তন্মাত্র ও মহাভূতের সঙ্গে  একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে আমাদের জ্ঞানেন্দ্রিয়ের। আর এই জ্ঞানেন্দ্রিয়ের দ্বারাই আমাদের কাছে এই পার্থিব প্রাকৃতিক জগৎ অনুভূতিতে আসছে।


আমরা বুঝতে পারলাম, এই যে স্থূল ও সূক্ষ্ম জগৎ তা এসেছে অহঙ্কার থেকে। তামসিক অহঙ্কার  থেকে এসেছে  স্থূল ও সূক্ষ্ম ভূৎসকল। আর সাত্ত্বিক অহঙ্কার  থেকে এসেছে মানস ও ইন্দ্রিয়সকল। আমরা জানি, আমাদের এই যে দেহ তা হচ্ছে কর্ম্মদেহ। কর্ম্ম সম্পাদনের জন্য এই দেহ নির্মিত হয়েছে। আর এই কর্ম্ম সম্পাদিত হচ্ছে এই ভূত সকলের দ্বারা। আর এই কর্ম্মের কর্ত্তা হচ্ছে মানস। যদিও এই ভূৎসকল আমাদের সর্ব্বদেহ ব্যাপী ব্যাপৃত হয়ে রয়েছে,  তথাপি প্রত্যেক ভূতের একটা প্রধান কর্ম্মকেন্দ্র আছে। যেমন ব্যোম বা আকাশ তত্ত্বের কর্ম্ম প্রধান কেন্দ্র হচ্ছে আমাদের কন্ঠ প্রদেশ। বায়ুভূতের প্রধান কর্ম্মকেন্দ্র হচ্ছে  বক্ষ প্রদেশ।  অগ্নি ভূতের প্রধান কর্ম্মকেন্দ্র হচ্ছে আমাদের উদরপ্রদেশ। বরুন বা অপ ভূতের প্রধান কর্ম্মকেন্দ্র হচ্ছে মূত্রস্থলী সহ নিম্ন প্রদেশ। সবশেষে ক্ষিতির প্রধান কর্ম্মকেন্দ্র হচ্ছে অস্থি-মাংসময় এই স্থূল দেহ। আর আমরা যে মহৎ ও অহং-এর কথা শুনেছি, তারও  প্রধান কর্ম্মকেন্দ্র আছে আমাদের এই স্থূল শরীরে।  আমাদের ললাটপ্রদেশ বা ভ্রূযুগলের মধ্যস্থলে অবস্থান করছে অহঙ্কার।  আর এই অহং-এর উর্দ্ধে অর্থাৎ মস্তিষ্কে মহৎ তার কর্ম্মকেন্দ্র স্থাপন করে সমস্ত কিছু পরিচালনা করছে। প্রাসঙ্গিকক্রমে বলি, এই মহৎ-তত্ত্বের উপরে আছে আমাদের সহস্রার, কেউ বলেন ব্রহ্মরন্ধ্র, যেখান থেকে পুরুষ প্রকৃতির সঙ্গে মিলিত হয়ে লীলা করছেন। অর্থাৎ এখানেই আছে সেই গুণাতীত ভূমি, যেখানে দিব্য চৈতন্য অধিষ্ঠান করছেন।

সাংখ্য দর্শন আমাদেরকে   জগতের অব্যক্ত থেকে ব্যক্ত পর্যন্ত, পঁচিশটি তত্ত্বের কথা বলেছে। অর্থাৎ পুরুষ থেকে মহাভূত পর্যন্ত মোট পাঁচিশটি পরিণতির কথা বলা হচ্ছে।  এর মধ্যে ১৩টি অঙ্গ আমাদের জগতের নির্ণায়ক, ক্রিয়া ও উপলব্ধি করবার জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।  এর মধ্যে  মানস, অহঙ্কার  ও বুদ্ধি এই তিনটির  বাহ্য বা স্থূল প্রকাশ নেই।  তাই এগুলোকে বলা হয় অন্তঃকরণ। এগুলোর মাধ্যমে আমরা বিষয়ের বিচার, বিশ্লেষণ, এবং বোঝার ক্ষমতা পেয়ে থাকি। এগুলোই আমাদের জ্ঞান আহরণের ক্ষমতা প্রদান করে থাকে। এগুলোই আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বোঝার ও উপলব্ধি করবার কাজে সহায়ক হয়ে থাকে। এছাড়া পাঁচটি কর্ম্মেন্দ্রিয় ও  পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় আছে যাকে বহিরঙ্গ বা বহিঃকরণ বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে তেরোটি অঙ্গ  বা দেহ-যন্ত্র যা আমাদের সমস্ত ক্রিয়ার কারন হয়ে থাকে। এই যে বহিঃকরণ এরা কাজ করে থাকে বর্তমান কালে, আর অন্তঃকরণ  কাজ করে থাকে ত্রিকাল ব্যাপী  অর্থাৎ আমাদের অন্তঃকরণ ক্রিয়াশীল থাকে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কাল ব্যাপী।  

পাঁচটি (শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ)  তন্মাত্র হচ্ছে উপাদানের অতি সূক্ষ্ম নির্যাস। এই তন্মাত্র বহির্বিষয়কে বহিঃ-করণের বা বহির-ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অন্তঃকরণ-এর সঙ্গে যোগাযোগ ঘটায়। এই তন্মাত্র হচ্ছে বিষয়ের সূক্ষ্ম নির্যাস যা মহাভূতগুলোর মধ্যে একটা সম্পর্ক গড়ে তোলে। আর এর ফলে জগৎ উদ্ভাসিত হয়, বা আমাদের বোধে আসে । অর্থাৎ সমগ্র জগৎ আমাদের কাছে কর্ম্মেন্দ্রিয়, জ্ঞানেন্দ্রিয় ও মানস দ্বারা উপলব্ধ হয়।  অতএব  এটা আমাদের বুঝতে হবে, তন্মাত্র, আমাদের বহিঃকরণ বা অন্তঃকরণ-এর সঙ্গে যুক্ত নয়। আবার পুরুষ ও প্রকৃতিও এর মধ্যে ধর্তব্য নয়। কারন পুরুষ হচ্ছে শুদ্ধ জ্ঞান, আর প্রকৃতি হচ্ছে জড় পদার্থের প্রাথমিক কারন মাত্র। শুদ্ধ বুদ্ধি (মহৎ) অন্য অন্তঃকরণগুলোর (মানস ও অহঙ্কার) সঙ্গে মিশে বিষয়কে হৃদয়ংগম করছে। সাংখ্য দার্শনিকগণ বলছেন, আমাদের বহিঃকরণ  যেন দ্বার আর অন্তঃকরণ হচ্ছে দ্বাররক্ষক।  

আবার বুদ্ধি বা মহৎ, অহঙ্কার (সাত্ত্বিক, তামসিক ও রাজসিক) ও মানস এবং দশ ইন্দ্রিয়গুলো সবার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। তার কারন হচ্ছে এদের মধ্যে গুনের তারতম্য বা প্রকারভেদ আছে, পরিমান ভেদ  আছে। যদিও কাজের সময় এরা  সবাই একসাথেই কাজ করে থাকে। 

সাংখ্য দর্শন মতে, এদের প্রকাশ বা ব্যক্ত কালের  যেমন একটা ক্রোম আছে, তেমনি এদের অন্তর্ধানের সময় একই ক্রোম ধরে বিপরীত মুখী হয়ে অব্যক্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ লয়কালে পাঁচ মহাভূত, পাঁচ তন্মাত্র পাঁচ কর্ম্মেন্দ্রিয়, পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং মানস অহঙ্কারের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। এর পরে অহঙ্কার  মহৎ-এর সঙ্গে মহৎ প্রকৃতির সঙ্গে লয় হয়ে যায়। যোগীপুরুষগন বলে থাকেন, কৈবল্য অবস্থায় প্রকৃতি থেকে পুরুষ আলাদা হয়ে যায়।  একেই বলে বন্ধন-মুক্তি।  
-----------------


আত্ম-বিশ্লেষণ - মূলসূত্র : সাংখ্য দর্শন। (৪)
চার - দুঃখ যাবে কিসে ?

নিজের দিকে যখন তাকাই, নিজের জীবনের দিকে যখন দেখি, তখন এই জীবনকে একটা হাসি-কান্নার আগড় বলে মনে হয়। আর এই হাসি ও কান্নার মধ্যে কান্নার রোল বেশি করে কানে বাজে। মাঝে মধ্যে মনে হয়, জীবনটা দুঃখে ভরা। নিজের বাইরের দিকে যখন দৃষ্টি যায়, তখনও এই একই দৃশ্য চোখের সামনে  আসে। পৃথিবীটা, জীব-জগৎটা যেন দুঃখে ভরা।  হাসি আসে ক্ষনিকের জন্য, কিন্তু দুঃখ যেন সঙ্গের সাথী। আমাদের যাকিছু শাস্ত্র-পুরান তা এই দুঃখ নিবৃত্তির উপায় খুঁজতে ব্যস্ত। আমরা সবাই সুখের সন্ধান করি, আর হাতে আসে দুঃখ। আমরা সবাই সুস্থ  থাকতে  চাই কিন্তু অসুস্থতা আমাদেরকে ছেড়ে যেতে চায় না। আমরা সবাই বাঁচতে চাই, আর মৃত্যু এসে আমাদেরকে ছিনিয়ে নেয়। 

ভগবান বুদ্ধ এই দুঃখ নিবৃত্তির জন্য রাজপাট ছেড়ে সন্ন্যাস জীবন নিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ  তো কোন ছাড়,  পৃথিবীতে  যত মহাপুরুষ এসেছেন, সবাইকেই এই দুঃখের জ্বালা সহ্য করতে হয়েছে। ঠাকুর রামকৃষ্ণকে শারীরিক দুঃখ সইতে  হয়েছে, স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে সারাজীবন যুদ্ধ করতে হয়েছে, আর দুঃখ-জনিত দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে । ভগবান রামচন্দ্রকে চোদ্দ বছর বনবাসী হতে হয়েছে। ঈশ্বরের সন্তান  যিশুখ্রিষ্টকে   ক্রুশবিদ্ধ হয়ে অসীম যন্ত্রনা নিয়ে দেহ ত্যাগ করতে হয়েছে। তাহলে কি দুঃখই সত্য, দুঃখই নিত্য, আর সুখ অনিত্য ? দুঃখই  আমাদের শেষ পরিণতি ? অন্ধকারই সত্য, আলো  মিথ্যে ? অজ্ঞান সত্য, জ্ঞান মিথ্যে ?

আমাদের আলোচ্য সাংখ্য দার্শনিকগণও এই দুঃখের অনুভব করে ছিলেন। আর এই কারণেই তাঁরা সেই প্রশ্নের উত্তর চেয়েছেন যে "দুঃখ কি , দুঃখ কেন, দুঃখ কিসে হয় ? আর দুঃখের নিবৃত্তির উপায়ই বা  কি ?

সাংখ্য  দার্শনিকগণ দুঃখকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন, আধিভৌতিক, আধ্যাত্মিক ও আধিদৈবিক । প্রথমটি অর্থাৎ আধিভৌতিক দুঃখ হচ্ছে পঞ্চভূত জনিত। অধি কথাটার অর্থ হচ্ছে মূল, ভৌত কথার অর্থ হচ্ছে পদার্থ, আর ইক কথাটার অর্থ ভব। অর্থাৎ ভবের যে মূল কারন,  তা থেকে জাত দুঃখ। আমরা আগেই শুনেছি, এই পার্থিব জগতের সৃষ্টির মূল কারন হচ্ছে পঞ্চ মহাভূত যার মধ্যে আছে পঞ্চ তন্মাত্র রূপ নির্যাস। সাংখ্য মতে স্বেদজ, অন্ডজ, জরায়ুজ, ও উদ্ভিদ জনিত এই চার প্রকার দুঃখকে বলা হয় আধিভৌতিক দুঃখ। দ্বিতীয়ত আধ্যাত্মিক, অর্থাৎ অধ্যাত্ম বা আত্মা সম্মন্ধীয়।  আমাদের অন্তঃকরণের যে দুঃখ, তাকেই বলা হয় আধ্যাত্মিক দুঃখ - তা সে শারীরিক ব্যাধি জনিত কারনে হতে পারে, প্রিয়জনের বিয়োগের কারনে হতে পারে, মানহানি, কলঙ্ক, ধনাদি নাশ ইত্যাদি কারনে হতে পারে। সবশেষে হচ্ছে আধিদৈবিক দুঃখ - দৈব দুর্বিপাক, অর্থাৎ অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বজ্রপাত, উল্কাপাত ইত্যাদি। সাংখ্য দার্শনিকগন বলছেন, যক্ষ,রক্ষ, বিনায়ক, গ্রহাদি আবেশহেতু যে দুঃখ তাকে বলা হয় আধিদৈবিক দুঃখ। 

সাংখ্য দার্শনিকগণ বলছেন, বলছেন, পুরুষের মধ্যে যখন ত্রিগুণের ক্রিয়া শুরু হয়, তখন পুরুষের মধ্যে অসাম্য দেখা দেয়। আর এই অসাম্যকে দূর করবার জন্য শুরু হয় বিবাদ, সংগ্রাম, যুদ্ধ। আসলে সমস্ত দুঃখ উৎপন্ন হয় প্রকৃতির মধ্যে, প্রকৃতিই সমস্ত দুঃখের কারন  কিন্তু প্রকৃতি যেহেতু জড় তাই প্রকৃতির মধ্যে এই দুঃখের কোনো প্রতিক্রিয়া বা অনুভূতি হয় না। প্রকৃতির কোনো চৈতন্য নেই। প্রকৃতির কোনো বোধশক্তি নেই। তাই প্রকৃতির কোনো সুখ-দুঃখ অনুভূতিও নেই। তাহলে দুঃখ ভোগ করে কে ? সুখ-দুঃখ ভোগ করি আমরা। আমরা যারা নিজেদের মূল সত্ত্বাকে ভুলে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম বোধ করছে। 

তো  আমাদের সুখ-দুঃখের অনুভূতি আছে।  এর কারণ হিসেবে সাংখ্য দার্শনিকগণ বলছেন, আমরা যেহেতু এই সুখ-দুঃখের উপরে পারস্পরিক ক্রিয়া বা মিথক্রিয়া করি, তাই আমাদের সুখ-দুঃখ হয়ে থাকে। আমরা সুখ-দুঃখকে নিয়ে খেলায় মাতি, আর এটি হয়ে থাকে আমাদের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত  সহজাত প্রবৃত্তি থেকে। আমরা নিজেদের মূল সত্ত্বাকে  ভুলে গেছি, আমরা প্রকৃতির সঙ্গে মিশে প্রকৃতির সঙ্গে ভবলীলা-খেলায় মেতে নিজেদেরকে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম বোধ করছি। অর্থাৎ আমাদের যে মূল সত্ত্বা অর্থাৎ  পুরুষ সত্ত্বা আছে, তার মধ্যে যে শুদ্ধ চৈতন্য আছে, সেই চৈতন্যের প্রতিফলিত সত্ত্বাই কেবলমাত্র সুখ-দুঃখের ভাগিদার হচ্ছে। এই খেলা যেদিন সাঙ্গ হবে, সেদিন সমস্ত দুঃখের অবসান হবে।

যেসব অভিনব ব্যাপার সংগঠিত হয়ে এই জগতের রূপান্তর হচ্ছে, তাকে বুদ্ধিমানগন বুদ্ধির দ্বারা বুঝতে চাইছেন, বোঝাতে চাইছেন। কিন্তু সত্য হচ্ছে প্রকৃতি ও পুরুষ দুইই  বুদ্ধির অগোচর না হলেও বিষয়টি জটিল, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই । অন্যদিকে যা নিত্য, যা পূর্ন, সত্য, যা অসীম, যা কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ডে ব্যাপ্ত হয়ে আছে, তা এই বুদ্ধির অতীত। সাধারণ মানুষ তো ছাড়, মহাপুরুষের পক্ষেও এর যথার্থতা অনুধাবন করা সম্ভব নয়।  এ এক অদ্ভুত রহস্যের বেড়াজাল দিয়ে ঘেরা, যেখানে স্থূল, সূক্ষ্ম, অতিসূক্ষ্ম কারুরই প্রবেশের ক্ষমতা নেই। আমরা সবাই দেবঋষির সেই শ্লোকটি শুনেছি - 

"ওঁং পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্নমুদচ্যতে। 
পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।" 

এই শ্লোকের মধ্যে পরেমেশ্বর সম্পর্কে একটা আভাস মাত্র দেবার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু  সত্য হচ্ছে মানবীয় বুদ্ধি একে ধারণ করতে সক্ষম নয়। এই পূর্ণের নিত্য স্থিতি, স্বয়ংপ্রকাশ, সর্বদা, সর্বত্র, অখন্ড রূপে বিদ্যমান। এর না আছে আসা-যাওয়া, না আছে, হ্রাস-বৃদ্ধি। সৃষ্টি ও প্রলয়, প্রকাশ ও অপ্রকাশ এঁকে  আশ্রয় করে একটা শক্তির খেলা চলছে। একটা কথা বলি, আমরা জন্মসূত্রে কিছু ইন্দ্রিয়শক্তির অধিকারী হয়েছি। আর এই ইন্দ্রিয়গুলো দিয়েই আমরা সবকিছু জ্ঞাত হচ্ছি, আস্বাদন করছি। আমাদের কাছে যাকিছু ইন্দ্রিয়ের গোচর, তাকেই জগৎ বলে প্রতিভাত হচ্ছে। সাধনক্রিয়ার ফলে, আমাদের এই সীমাবদ্ধ ইন্দ্রিয়শক্তিকেই  বর্দ্ধিত করে, একসময় যা ইন্দ্রিয়ের অগোচর ছিলো, তার সম্যক উপলব্ধি করা সম্ভব। আবার ও সত্য, এই যে ইন্দ্রিয়শক্তি তার প্রসারনের বিধি ও সীমাবদ্ধতা আছে, সেই সীমার বাইরে গেলে বেলুন ফেটে যায়। তখন আর এই ইন্দ্রিয়শক্তির প্রভাবও  লোপ পায়। 

সাংখ্য  দার্শনিকদের মতে - এক নয়,  নিত্য সত্ত্বা দুটি ।  পুরুষ ও প্রকৃতি। পুরুষ গুণাতীত আর প্রকৃতি গুণাত্মক। গুনের সাম্যাবস্থায় প্রকৃতি নিথর - স্থির।  আর গুনের অসাম্যের কারনে প্রকৃতি হয়ে ওঠে অস্থির, যাকে আমরা বলি গতিশীল, ক্রিয়াশীল, পরিণামী।  জাগতিক সমস্ত সৃষ্টির মুলে এই গুনের অসম্যাবস্থা। এখন কথা হচ্ছে এই যে গুনের অসাম্য, এর কারন কি ? কোন শক্তি একে  অসাম্য করছে। এই  শক্তিকে বলা হয় পরাশক্তি। এই শক্তি সৃষ্টির অতীত, এই শক্তি বিশ্বাতীত চিৎশক্তি। এই শক্তিকেই কেউ কেউ বলেন মাতৃশক্তি। এই যে সৃষ্টি তা এই মাতৃশক্তির অভিব্যক্তি মাত্র। এই শক্তি কখনো ব্যক্ত কখনো অব্যক্ত। পরমপুরষের এই শক্তি পুরুষের মধ্যে অব্যক্ত, প্রকৃতির মধ্যে ব্যক্ত। তো পুরুষ ও প্রকৃতির সৃষ্ট জগতের সন্মন্ধের দুয়ার হচ্ছে এই পরাশক্তি। এই শক্তির অপ্রকাশে এটি ভগবৎ শক্তি, আবার এই শক্তির প্রকাশে এটি মাতৃশক্তি। 

আবার একটু বোঝার চেষ্টা করি, এই রহস্যের।  আমরা আগে যে শ্লোকটা শুনেছি, সেখানে দুটো কথা শুনেছি, একটা হচ্ছে "পূর্ণমদ" অন্যটি "পূর্ণমিদং" - প্রথমটির অর্থ পূর্ণই ইন্দ্রিয়ের অগোচর, আর দ্বিতীয়টি পূর্ণমিদং অর্থাৎ পূর্ণই ইন্দ্রিয়ের গোচর। পূর্ণ  বলতে আমরা বুঝি অদ্বয়, অখন্ড। আবার এই পূর্ণ হতে যা কিছু নিঃসৃত হচ্ছে তাও পূর্ণ।  আসলে এই যে এক, এটি কখন বহু হতে পারে ? যখন তা প্রতিফলিত হয়।  অর্থাৎ সূর্য এক কিন্তু বহু পাত্রে প্রতিফলিত হয়ে কোটি-কোটি সূর্য প্রতীয়মান হচ্ছে।  চন্দ্র এক কিন্তু হাজার দর্পনে প্রতিফলিত হয়ে চন্দ্রকে হাজার রূপে দেখা যাচ্ছে। এখন কথা হচ্ছে কোথায় প্রতিফলিত হচ্ছে ? প্রতিফলিত হচ্ছে ইন্দ্রিয়দ্বারে। প্রতিফলিত হচ্ছে মানসে।  প্রতিফলিত হচ্ছে অহঙ্কারে, বুদ্ধিতে বা মহৎ-এ। 

যাইহোক, সাংখ্য দর্শন ঘোষণা করছে, পুরুষ যতক্ষন  মহৎ, অহঙ্কার, ও মানস দ্বারা প্রভাবিত না হচ্ছে, ততক্ষন তিনি শুদ্ধ চৈতন্য।  কিন্তু যখন এই চৈতন্যস্বরূপ পুরুষ  প্রকৃতির হতে নিঃসৃত মহৎ, অহঙ্কার,  মানস, ও ইন্দ্রিয় বাহিত হয়, অর্থাৎ পুরুষ যখন প্রকৃতির সঙ্গে সম্মন্ধ স্থাপন করে, তখন পুরুষ তার আপনসত্ত্বাকে ভুলে যায়। আর এই ভ্রমজ্ঞানের  কারনে,  পুরুষ নিজেকে বুদ্ধি, অহঙ্কার ও মানসের  সঙ্গে নিজেকে গুলিয়ে ফেলে এবং বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সে প্রকৃতির সঙ্গে অভিন্ন। আর এই যে পুরুষ ও প্রকৃতির সংযুক্তি যা আসলে ভাবানুসঙ্গ, আর এর কারণেই বন্ধন  তৈরী হয়। এটি ভ্রমাত্মক জ্ঞানের ফলেই হয়ে থাকে সুখ-দুঃখের ভোগ । আমরা স্বপ্নে কতকিছু দেখি।  স্বপ্নকালীন অবস্থায়,  স্বপ্নে দেখা জগতে আমরা নিজেদেরকে সেই জগতের বাসিন্দা হয়ে স্বপ্নের সঙ্গে একাকার হয়ে যাই।  স্বপ্নে আমরা ভয় পাই, আনন্দ পাই, দুঃখ পাই।  এই যে অনুভূতি এটি কিন্তু সেই সময়ের জন্য অবশ্যই  সত্য।  কিন্তু যখন  আমরা এই স্বপ্ন থেকে উত্থিত হই, অর্থাৎ যখন আমাদের স্বপ্ন ভেঙে যায়, যখন আমরা বাস্তব জগতে নিদ্রাহীন হয়ে যাই, তখন আমরা বুঝতে পারি, এতসব নিছক স্বপ্ন মাত্র।  এর মধ্যে কোনো সত্যতা নেই।  কিন্তু স্বপ্নাবস্থায় এর সত্যতা আমরা যাচাই করতে অক্ষম হই, সেই জ্ঞান তখন আমাদের আসে না।  ঠিক তেমনি পুরুষ যখন প্রকৃতির সঙ্গে খেলায় মেতে থাকে, তখন সে নিজেকে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম বোধ করে।  আর প্রকৃতির হতে জাত সুখ-দুঃখ ভোগ করে। প্রকৃতির সঙ্গে খেলায় মেতে খেলার  জয়ের আনন্দ আর পরাজয়ের গ্লানি ভোগ করে।  সোজা কথায় লম্পটের  সঙ্গে মিশে সে নিজেও লম্পট বোনে যায়। 

আপনি যখন ঘরের মধ্যে একাকী ধ্যানাসনে বসবেন, তখন নিজেকে প্রথমে শরীর, তারপরে মন, তারপরে মনের মধ্যে উদ্ভূত চিন্তার মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দেবেন। অথবা নিজের মনকে একসময় ইষ্ট চিন্তায় মগ্ন করে দেবেন। কিন্তু যখনই বাইরে থেকে কেউ আপনাকে ডাকবে, বা আপনার কাছে বাইরের থেকে কেউ আসবে, তখন তার কথার সঙ্গে, তার চিন্তার সঙ্গে  নিজেকে জড়িয়ে ফেলবেন। তখন আপনার মধ্যে ইষ্ট চিন্তা আসতে পারবে না।  অর্থাৎ ধ্যানের মধ্যে আপনি যে অন্তঃ জগতের বাসিন্দা, ধ্যান থেকে বাইরে এসে আপনি নিজেকে বাহ্য জগতের বাসিন্দা ভেবে সেইমতো ক্রিয়া করতে থাকবেন। 

পুরুষের ক্ষেত্রে ঠিক এই জিনিসটাই হয়ে থাকে। যখন পুরুষ প্রকৃতি থেকে স্বতন্ত্র, তখন সে স্থির শুদ্ধ চৈতন্য সাগরে শান্ত অবস্থায় শায়িত। কিন্তু যখন সে প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসে, তখন সে প্রকৃতির সঙ্গে লীলা-খেলায় মেতে যায়। তখন পুরুষ তার শান্ত স্বভাবের কথা ভুলে যায়। সে তখন প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম বোধ করে। প্রকৃতি-জাত অহঙ্কারের সঙ্গে মিশে সে নিজেকে কর্ত্তা, ভোক্তা ভেবে বসে।  নিজেকে বুদ্ধি-মানস-অহঙ্কার এর সঙ্গে একাকার করে ফেলে, যা আসলে সে নয়। 

এখন আর লেখালেখিতে মন বসাতে পারি না। মনটা যেন বুধ হয়ে গেছে। তথাপি এই অবস্থাতেও মনের মধ্যে একটা অশান্ত অবস্থা বিরাজ করে।  কেবলই  মনে হয়, এই স্থূল শরীর, এই কৰ্ম্ম  শরীর কর্ম্মকে অসম্পূর্ন রেখে বিনাশ হয়ে গেলে, আবার নতুন স্থূল শরীরেই  স্থিত হতে হবে। কারন অসম্পূর্ন কর্ম্ম তো এই শরীরের সাহায্যেই সামাপ্ত করতে হবে। যাই হোক, 
  
আত্মা থেকে জীবাত্মার যে অবতরণ তার একটা ক্রোম আছে। বিশ্বের অতীত যে স্থিতি তা নির্গুণ অবস্থা। পরমপুরুষ -  জ্ঞান, জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়কে গিলে খেয়ে বসে আছেন। এখানে সব এক। পরাশক্তির বা মাতৃশক্তির স্ফুরণে পরমপুরুষ বা সর্বজ্ঞের মধ্যে জ্ঞাতার প্রভাব লক্ষিত হয়, তার পরে জ্ঞান, শেষে জ্ঞেয় এসেছে। এই সৃষ্টিতে আছে ঈশ্বর (সগুন ব্রহ্ম) . "ইশ" কথাটির অর্থ আধিপত্য করা আর "বর"  কথাটার অর্থ "ত্ত্ব" - অর্থাৎ সমস্ত তত্ত্বের উপরে যিনি আধিপত্য করেন। এই সৃষ্টিতে আছে জীব, আছে জগৎ, আছে কাল, আছে কর্ম্ম।  আর এসবের একটা প্রবাহ চলছে। আর এই যে অবতরণ ক্রোম যখন চলতে থাকে তখন জীবাত্মা ঘোরের মধ্যে থাকে।  তখন কোনো কিছুর উপরে তার যেমন নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তেমনি সেই সম্পর্কে তার কোনো জ্ঞানও  থাকে না।  কিন্তু যখন সে জানতে পারে, তখন সে আসলে অজ্ঞানের জগতে প্রবেশ করেছে। এখানে  এই অজ্ঞানের জগতে ভ্রম-সকলকে সে জ্ঞান বলে ভাবতে শেখে। অনাদি কালের স্রোতে ভেসে ভেসে সে জীবভাব পরিগ্রহ করে, আত্মবিস্মৃতি ঘটে। আত্মার বিলীন বা জীবাত্মা বলুন তা আসলে দেশ-কালের অতীত। কিন্তু আত্মা পতিত অবস্থায় যখন জ্ঞানচক্ষুর  (অজ্ঞানচক্ষুর) উন্মীলন ঘটে তখন সে দেখতে পায়, সে একটা অনাদি স্রোতে ভাসমান। আর এই অনাদি স্রোতের আদি অন্ত  সে ধরতে পারে না। এই যে কালের স্রোত, এখান থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়ার নামই  সাধনা। আত্মবিস্মৃত জীবকুল, নিজেরই শক্তির অধীনে,  দেহান্দ্রিয়কে সঙ্গে করে সে কর্ম্ম ও ভোগের সাগরে সাঁতার দিতে থাকে।  এই কর্ম্ম ও ভোগ সাগরের কোনো কুল-কিনারা তার আয়ত্ত্বে আসে না। অসংখ্য লোক, অসংখ্য ব্রহ্মান্ড এই পতিত জীবের ভ্রমন ক্ষেত্র। কখনও  সে উর্দ্ধ লোকে, আবার কখনও  সে অধঃলোকে। আর এই যে অধোগতি, বা উর্দ্ধগতি ভিন্ন ভিন্ন কর্ম্মের কারনে হয়ে থাকে । তো কর্ম্ম কখনো আমাদের উর্দ্ধগতি সম্পন্ন করে, আবার কখনও  অধোগতি সম্পন্ন করে। কিন্তু অবস্থার বিশেষ পরিবর্তন ঘটে না। তাই যোগীপুরুষগন বলে থাকেন, ভালো কর্ম্ম হোক, বা খারাপ কর্ম্ম তা কখনও  জীবের মুক্তির কারন হতে পারে না। এর জন্য জীবকে জীবভাব ত্যাগ করে শিবভাবে প্রবেশ করতে হবে।  আর এটি হতে পারে, কেবলমাত্র শুদ্ধ জ্ঞানের প্রভাবে। ঈশ্বরকেও (সগুন ব্রহ্ম)  ছাপিয়ে যেতে হবে।
আমাদের প্রত্যেকের একটা নিজস্ব জগৎ আছে।  আর এই জগৎ আমাদের কল্পনা, বাসনা ও সংকল্পের দ্বারা সৃষ্ট হয়ে থাকে। আর এই স্বকৃত জগতের মধ্যেই আমরা ঘুরপাক খাই। আমাদের জাগতিক ব্যবহার এই জগৎ অনুসারে হয়ে থাকে। এখান থেকে বেরুতে গেলে, আমাদের দরকার শুদ্ধ জ্ঞানের জগতে প্রবেশ করা।  কিন্তু এই শুদ্ধ জ্ঞানের জগৎ সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারনাই  নেই।  তো যার ধারণা  আমাদের সাধ্যাতীত, তাকে আমরা গ্রহণ করবো কি করে ? এই কাজটি করে থাকে সৎগুরু। "অজ্ঞান-তিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জন সলাকয়া, চক্ষুরুন্মীলিতং (চক্ষুঃ-উন্মীলিতং) যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।" 

আমরা জানি, অর্থাৎ আমাদের বুদ্ধির দ্বারা এইটুকু আমরা বুঝতে পারি, যে আমাদের একটা জীবনকাল আছে।  আর এই জীবনকাল শুরু হয়, জন্ম বা স্বাসের শুরুতে, আর শেষ হয় মৃত্যু বা স্বাসের নির্গমনে। আর এই যে জীবনকাল, এই জীবনকালে একটা আমি সত্ত্বা বিরাজ করে। এই আমি স্বত্ত্বার শুরু হয় বুদ্ধির বিকাশে, আর শেষ হয় বুদ্ধির বিনাশে। অর্থাৎ বোধের শুরুতে আমাদের
"আমির" জন্ম হয়, আর বোধের নাশের  "আমি" সত্ত্বার লোপ হয়ে যায়। স্থূল শরীর  নাশের পরে, এই আমি সত্ত্বার কোনো অস্তিত্ত্ব থাকে না।  তাহলে কি বলা যায়, এই যে আমি সত্ত্বা এর জন্ম হয় কেবল স্থূল শরীরের সঙ্গে সঙ্গে, আবার স্থূল শরীর নাশের সঙ্গে সঙ্গে এই আমি সত্ত্বার বিলোপ সাধন হয়।  আর তাই পুরানো আমি বলে কিছু হয় না। আবার ভবিষ্যতের আমি বলে যদি কিছু হয়, তা হয় নতুন, সম্পূর্ণ নতুন।  মুক্তানন্দ বলছেন, এই যাকে  তুমি "আমি" বলছো, তা আসলে ব্যক্তিত্ত্ব - যা তোমার জীবন বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠেছে। তোমার এই ব্যক্তিত্ত্ব (স্থূল আমি) প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। আজকের "আমি" আর ভবিষ্যতের আমি বা অতীতের আমি এক নয়। তাই তোমার জীবন কালের শেষ হয়ে গেলে, যে "আমি" মারা যায়, তা আসলে তোমার ব্যক্তিত্ত্ব - তুমি নয়। তাই ব্যাক্তিত্ত্বের শুরু আছে, শেষ আছে।  কিন্তু সত্যিকারের আমির কোনও পরিবর্তন নেই, শেষ নেই, কেবল  এই আমির উপরে যে আবরণ চেপেছে, তার সংযোজন বা অপসারণ  হচ্ছে। যেমন তোমার পোশাকের  পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তুমি পাল্টে যাও  না।  তেমনি তোমার স্থূল শরীরের নাশের  পরেও তুমি তুমিই থাকো। তবে এই জীবন কালের যে তুমি আর মৃত্যুর পরের যে তুমি তার মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। আর এই পার্থক্য হচ্ছে, একটা লেংটি পরা আর একটা শাড়ী  পরা। কখনও  রাম কখনও রাহিম, কখনও  রাজা কখনও  ভিখারি, কখনও পশুদেহে, কখনও মনুষ্যদেহে  (কর্ম্মদেহ) কখনও বা  দেবদেহ (ভোগদেহ) . 

আর এই যে জন্ম-মৃত্যু চক্র, দেহ থেকে দেহান্তরন গমন,  এর উদ্দেশ্য হচ্ছে আনন্দের সন্ধান। সাংখ্য দার্শনিকগণ বলছেন, এই যে আনন্দ এটি শুদ্ধ নয়, এই আনন্দের  সঙ্গে মিশে আছে শোক-দুঃখ-বেদনা। আবার এই আনন্দের সঙ্গেই  আছে অস্মিতা। সাধনযোগে (অষ্টাঙ্গ যোগ সাধনায়) এই অস্মিতার সমাধিতে (শেষে) একটা অহেতুক আনন্দের সন্ধান পাওয়া যায় যখন আত্মা মহৎ বা বুদ্ধির সঙ্গে বাস করে। এই অবস্থায় যে আনন্দ লাভ হয়, তা জ্ঞানালোকের কারনে হয়ে থাকে। কিন্তু এই নির্ম্মল আনন্দ সত্ত্বগুণের কারনে হয়ে থাকে। তো  গুন্ তা সে সত্ত্ব হোক বা তামসিক দুইই প্রকৃতির অধ্যগত। এইজন্য যোগদর্শন বা যোগক্রিয়া আমাদেরকে এই সত্ত্বগুণের আনন্দের সন্ধান দিতে পারে। অর্থাৎ আমাদেরকে মহৎ (বুদ্ধি) পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে আমাদের এই যোগক্রিয়া। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এই স্বর্গসুখ বা  পরমানন্দ উপলব্ধ হয় এই মহৎ-এর সঙ্গে স্থিতিকালে। কিন্তু এই স্বর্গসুখ, যা মহৎ-এ স্থিতিকালে হয়ে থাকে, তা আমাদেরকে মুক্তি  দিতে পারে না। এই অবস্থাতেও আমাদের জন্ম মৃত্যু বা গতাগতি থাকে। 
 
এখন কথা  হচ্ছে  এই যে জন্ম-মৃত্যু এর সঙ্গে  ইন্দ্রিয়াদি সহ একটা স্থূল শরীরের সম্পর্ক আছে। আর এই স্থূল শরীর  যা আসলে সূক্ষ্ম, অতিসূক্ষ্ম ও স্থূলের সমষ্টি। অন্যভাবে বলা যায়, পার্থিব ও অপার্থিব শরীরের সমষ্টি। এই যে শরীর এটি অহঙ্কার ও মহৎ-এর নিচের দিকের অবস্থান।  এখানে মহৎ বা বুদ্ধির কিছুই করবার থাকে না। এমনকি এই শরীরে যাকিছু উপলব্ধি হয়, তার সঙ্গে পুরুষের কোনো সংশ্রব থাকে না। এই যে স্থূল ও সূক্ষ্ম শরীর তা সে পার্থিব হোক বা অপার্থিব এটি তখন একটা যান বিশেষ মাত্র। এই যানে যিনি সওয়ারী তার কোনো পরিবর্তন নেই, কিন্তু এই যানের নতুন পুরাতন, বা শিশু-যুবক-বৃদ্ধত্ব আছে। আবার এই যে সূক্ষ্ম শরীর এর একটা গতি আছে।  এই সূক্ষ্ম শরীরই এক যান থেকে অন্যযানের সাহায্যে পরিভ্রমন করে থাকে। জীবসকল স্থূল শরীরে অবস্থানকালীন যে অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করে থাকে তা সে সংস্কাররূপে পরবর্তী শরীরে সঙ্গে করে নিয়ে যায়। এসবই প্রকৃতির লীলাখেলা। যখন ইন্দ্রিয়সকলকে নিয়ে একটা স্থূল শরীরের জন্ম হয় তখন সূক্ষ্ম শরীরে অবস্থিত সংস্কার এবং স্থূল শরীরের কারনসকল এর মধ্যে প্রবেশ ক'রে, প্রকাশিত হতে শুরু করে।  নতুন স্থূল শরীরের কর্ম্ম ও পুরাতন সূক্ষ্ম শরীরের সংস্কার একটা নতুন সম্ভাবনা নিয়ে গতিশীল হয়। এসবই প্রকৃতির মধ্যে ঘটে থাকে। 

সাধকের উদ্দেশ্য হচ্ছে  প্রকৃতির বন্ধন  থেকে মুক্ত হয়ে পুরুষের মহিমাকে প্রকাশিত করা। সুতরাং সুক্ষ শরীরের সংস্কারকে পরিবর্ধিত করতে বা নাশ করতে একটা কর্ম্ম-শরীরের অর্থাৎ স্থূল শরীরের দরকার হয়ে থাকে।  সূক্ষ্ম শরীরে কোনো কর্ম্ম সম্পাদন করা সম্ভব হয় না। আর ঠিক এই কারণেই, সূক্ষ্ম শরীর স্থূল শরীরে প্রবেশ করে থাকে। এই হচ্ছে জন্মের রহস্য। 

মোক্ষ হচ্ছে এই সূক্ষ্ম ও স্থূল শরীরের উর্দ্ধে বা এদেরকে ছেড়ে পুরুষ সত্ত্বায় প্রবেশ করা। আর এই সাধন ক্রিয়ায় সাফল্য পেতে গেলে দরকার মনন। অর্থাৎ সংকল্প প্রত্যয় অহঙ্কার এবং বুদ্ধিকে  (মহৎ)  এদেরকে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে এক এক করে এদেরকে ছেড়ে দিতে হবে। তো আমাদের সংকল্প দৃঢ় হতে হবে, অহঙ্কারের সাহায্য নিতে হবে, বুদ্ধির সাহায্য নিতে হবে, আবার এদেরকে একসময় ছেড়ে দিতে হবে। তবেই আমরা এই ত্রিগুণাত্মক প্রকৃতির বন্ধন  থেকে মুক্ত হতে পারবো। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, স্মরণ, মনন ও নিধিধ্যাসন - এই হচ্ছে উপায়। 

তো এই জগৎ সৃষ্টির মুল কারন হচ্ছে নিমিত্ত ও উপাদান।  আর এই যে নিমিত্ত বশত উপাদানের পরিনাম হচ্ছে কার্য্য। নিমিত্ত হচ্ছে পুরুষ আর উপাদান হচ্ছে প্রকৃতি। আর এই উপাদান, পুরুষের সান্নিধ্যে এসে পরিনাম প্রাপ্ত হয়ে এই বিশ্ব  ব্রহ্মান্ড রূপে অভিব্যক্ত হয়েছে। সাংখ্য দর্শন, বলছে সমস্ত বস্তু থেকে সমস্ত বস্তু হতে পারে। পঞ্চভূত থেকেই উদ্ভিদ ইত্যাদির জন্ম হয়েছে, আবার এই উদ্ভিদ থেকে জঙ্গম প্রাণীকুলের সৃষ্টি হয়েছে। আবার এই প্রাণীদেহই পঞ্চভূতে পরিণত হচ্ছে। তো একটা চক্র, একটা জন্ম-মৃত্যুর চক্র, একটা পরিনামের  খেলা চলছে, প্রকৃতির মধ্যে। বলা হয়, এই পরিণামের শুরু আকাশ থেকে শেষ হচ্ছে বিশ্বব্রহ্মান্ড।  শুরু হচ্ছে প্রকৃতি পুরুষের মিলনে, আবার শেষ হচ্ছে প্রকৃতি পুরুষের বিচ্ছেদের মধ্য  দিয়ে। এই হচ্ছে মুক্তি। প্রকৃতির সিঁড়ি বেয়ে আমরা এই জগৎ সংসারে এসেছি, আবার এই প্রকৃতির সিঁড়ি বেয়ে আমাদের স্বমহিমায় স্থিত হতে হবে। 
-------------------


আত্ম-বিশ্লেষণ - মূলসূত্র : সাংখ্য দর্শন। (৫)
প্রকৃতি : 
 
আমরা জানি, আমাদের মন,  বুদ্ধি, চিত্ত, অহংকার, এমনকি এই যে স্থূল দেহ-ইন্দ্রীয়   সবই প্রকৃতির দান। তো এই প্রকৃতিকে আমাদের বুঝতে হবে।  আরো একটা জিনিস হচ্ছে, প্রকৃতি নিয়মে বাঁধা।  প্রকৃতিতে নিয়ম বিরুদ্ধ কিছু হয় না। তো এই প্রকৃতির যে সাধারণ নিয়ম, সে সম্পর্কে আমাদের ওয়াকিবহাল হতে হবে। আর এই নিয়মের মধ্যে আমাদের বাস করতে হবে।  শুধু বাস করতে হবে না, আমাদের প্রকৃতির এই স্বভাবকে অর্থাৎ সে যে নিয়মের দ্বারা আবদ্ধ তাকে আমাদের স্বীকৃতি দিতে হবে,  মেনে চলতে হবে। আর তা যদি না করতে পারি, অর্থাৎ আমরা যদি প্রকৃতির নিয়ম-বিরুদ্ধ  আচরণ করি, তবে প্রকৃতি প্রদত্ত  শাস্তি বা প্রকৃতির রোষ  আমাদের ভোগ করতে হবে। 

১, প্রথেমেই বলি, প্রকৃতি একটা শক্তি বিশেষ, এর একটা স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত গতি আছে। প্রকৃতির এই স্বাভাবিক গতিকে আমরা কেউ যেন অস্বীকার না করি।  প্রকৃতি সবসময় পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে।  এই পরিণতিকে প্রকৃতি নিজেও  রোধ করতে পারে না ।  একটা চাকার স্বভাব যেমন ঘোরা - এই যে ঘোরা-স্বভাব এটি সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।  এটি তার স্বভাব। কে ঘোরাচ্ছে তা সে কখনও  জানতেও চায় না। জ্ঞাতসারে হোক বা অজ্ঞাতসারে, সে এগিয়ে চলেছে, পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে, পরিণামের দিকে এগিয়ে চলেছে। এই পরিণামকে সে রোধ করতে পারে না।  জগতে যা কিছু বর্তমান তা যেমন অতীতের পরিনাম, তেমনি ভবিষ্যতের স্রষ্টা। একটা শিশু ধীরে ধীরে পরিণামের দিকে অর্থাৎ বৃদ্ধের দিকে এগিয়ে চলেছে। এই গতি কেউ রোধ করতে পারে না। এখানে যা কিছুর জন্ম হয়েছে, তা কেবলমাত্র মৃত্যুর দিকে ধাবিত হবার জন্য। এখন চেতন পদার্থ বলুন, বা অচেতন পদার্থ বলুন, সবাই একটি নির্দিষ্ট, বা অনির্দিষ্ট পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে।  তো প্রকৃতি হচ্ছে একটা গতিশীল শক্তি, যা কখনওই স্থির থাকতে পারে না।  

২. এই প্রকৃতিকে বলা হয়, মায়া। মায়া  হচ্ছে ক্ষনিকের জন্য প্রকাশ। এই আছে, আবার এই নেই। একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভেসে উঠছে, আবার ডুবে যাচ্ছে। শুধু ভেসে উঠছে না, বেঁচে থাকছে, বেড়ে উঠছে।  কিন্তু সময়ের নিরিখে তা স্বল্প সময়ের জন্য হয়ে থাকে। কারন থেকে কার্য্যের অভিব্যক্তি বিশেষ। একটা বীজের মধ্যে যদি গাব গাছ তবে, তা থেকে গাব  গাছই  হবে।  বট গাছ, বা বাঘের দেখা মিলবে না, গাবের বীজ থেকে। মাটি থেকে মাটির গেলাস  হবে, কাঁচের থেকে কাঁচের গেলাস হবে। মাটি থেকে কখনো কাঁচের গেলাস  হতে পারবে না।  বা কাঁচ  থেকে কখনো মাটির গেলাস হবে না।  তো কারণের মধ্যে (কারন সত্ত্বার) যে পরিণতির সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, তার প্রকাশ ঘটবে এই প্রকৃতিতে, এর অন্যথা হবে না। সাংখ্য দর্শন এইভাবেই মায়ার ব্যাখ্যা করেছেন। মায়া কোনো ভোজবাজি নয়, বা ভ্রমাত্মক জ্ঞান নয়। মায়া একটা গতিশীল সত্ত্বা যা সীমিত সময়ের জন্য প্রকাশিত সত্য হয়ে থাকে, এবং ভবিষ্যৎ পরিণতির জন্য এগিয়ে যাওয়াই  তার স্বভাব।  মায়া (প্রকৃতি) কখনো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে পারে না। সারাক্ষন ছুটছে। এটি কোনো বিভ্রম নয়। সত্য কিন্তু ক্ষনিকের জন্য। মায়া  হচ্ছে একটা বিশেষ শক্তি যার সীমাবদ্ধতা আছে। কারণ থেকে কার্য্যে পাড়ি  দেবার শক্তি। প্রকৃতির মধ্যে  অব্যক্ত রূপে  কারন লুকিয়ে আছে, আর এই কারণকেই সে সীমিত সময়ের জন্য, সীমিত পরিসরে প্রকাশিত করছে, ব্যক্ত করছে । আর এই প্রকাশ কখনোই এককালীন ঘটে না, কালের স্রোতের সঙ্গে সঙ্গে ভেসে ভেসে চলে। 

৩. প্রকৃতি হচ্ছে জড় পদার্থ  বা চেতনাবিহীন পদার্থ । প্রকৃতির মধ্যে অব্যক্ত অবস্থায় লুকিয়ে আছে, সমস্ত ব্রহ্মান্ডের সম্ভাবনা। সমস্ত পার্থিব বস্তু যা আজ আমাদের সামনে দৃশ্যমান হয়েছে, বা ভবিষ্যতে হবে, তার বীজ লুকিয়ে আছে, এই প্রকৃতির মায়ের গর্ভের মধ্যে, যা আজকে অপ্রকাশিত, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে  প্রকাশিত  হবে। এখন কথা হচ্ছে জড় বলতে আমরা কি বুঝি ?  জড় বলতে আমরা বুঝি অচেতন পদার্থ। কিন্তু জড়ের আরো একটা অর্থ হচ্ছে সমস্ত জগতের মূলীভূত কারন স্বরূপ। এই কারনে প্রকৃতিকে বলা হয়, সমস্ত পার্থিব বস্তুর কারন স্বরূপ।  

৪. আমরা ভাবি, প্রকৃতি সব সময় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পদার্থ  বিশেষ। সাংখ্য দর্শন বলছে  প্রকৃতিকে বোঝা বুদ্ধির কাজ নয়, বা কেবলমাত্র ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য বস্তুই প্রকৃতি তা নয়।  প্রকৃতির মধ্যে সূক্ষ্ম ও স্থূল দুই ধরনের বস্তুর সমাহার আছে। প্রকৃতির বেশিরভাগই  অপ্রতক্ষ্য। কারন ও কার্য্য, অর্থাৎ প্রকৃতিতে অসংখ্য অতীত আবার ভবিষ্যৎও অসংখ্য। প্রকৃতির পরিণতি কোথায় যাচ্ছে, তাকে নির্দিষ্ট করে বলা যায় না।  একে অনুমানের সাহায্যে  বোঝার চেষ্টা করতে হবে।  অর্থাৎ প্রকৃতির মধ্যে  স্থূল ও সূক্ষ্ম দুই ধরনের ক্রিয়া চলছে।  আমরা সব কিছুর কারণের সন্ধান পাই না।  আমরা কেন বেঁচে থাকতে চাই ? আমার মধ্যে কেন অহঙ্কারের জন্ম হয়ে থাকে ? আর অহঙ্কারের  পরিণতিই বা কি হয়ে থাকে ? এর সঠিক উত্তর আমাদের জানা  নেই। কাজ চালাবার জন্য আমরা হয়তো একটা উত্তর খুঁজে নিতে পারি, কিন্তু তার প্রমান আমাদের হাতে নেই, আমরা কেবল অনুমান করতে পারি। বীজ থেকে গাছ হবেই, বা গাছে ফুল ফল হবেই, এটা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারি না।  আমরা কেবল অনুমান করতে পারি। আর এই অনুমান সত্য হতে পারে, অথবা নাও হতে পারে।  তাই প্রকৃতির নিয়মকে কখনো একক ভাবে সিদ্ধ বলা যায় না। বহু কারনের  সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে ফল।  তাই প্রকৃতিকে দার্শনিকগণ বলে থাকে অনুমান বই কিছু নয়।  প্রকৃতিতে আছে কারন, যা অসংখ্য সম্ভাবনায় পূর্ন। তো প্রকৃতিকে জানতে গেলে আমাদের অনুমানের উপরে নির্ভর করতে হয়। আর এই কারণেই আমরা অনিশ্চয়তায় ভুগি।  কে জানে কি থেকে কি হয় ?

৫. প্রকৃতি দুটো ভাগে বিভক্ত - একটা ব্যক্ত আর একটা অব্যক্ত। এই প্রকৃতির যে অব্যক্ত অবস্থা একে  বলা হয় মুলা প্রকৃতি। এই যে মুলা  প্রকৃতি এটি আমাদের কাছে দৃশ্যমান নয়, এখানেই সমস্ত কার্য্যের কারণের  কারন সুপ্ত অবস্থায় আছে। প্রকৃতির মধ্যে নিদ্রিত অবস্থায় এই অনাদি কারন বিরাজ করছে। একে  ধরা আমাদের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে সম্ভব নয়। 

৬. প্রকৃতিকে বলা হয় ব্রহ্ম। অভিধান বলছে, ব্রহ্ম  কথাটার অর্থ হচ্ছে বৃদ্ধি পাওয়া বা দীপ্তি পাওয়া। যিনি স্বীয় তেজ বা  জ্যোতি দ্বারা তমসাচ্ছন্ন দিগ্ মন্ডল আলোকিত করে স্থাবর-জঙ্গমাত্মক বিশ্বরূপে প্রকাশ পেয়েছেন। প্রকৃতি যদিও জড় বা অচেতন,  তথাপি চেতন পুরুষের সান্নিধ্যে হেতু একে চেতন বলে বোধ হচ্ছে। যদিও হিন্দু ধর্ম্ম শাস্ত্র অনুযায়ী   ব্রহ্ম ও ব্রহ্মা দুটি আলাদা অর্থবোধক শব্দ। ব্রহ্ম  বলতে হিন্দু শাস্ত্র অনাদি-অনন্ত-পরম পুরুষকে বুঝিয়েছেন।  এই ব্রহ্ম জন্ম-মৃত্যু রোহিত, বিশ্বাত্মা, নিরালম্ব, অপরিবর্তনীয় চেতন সত্ত্বা। কিন্তু চতুরায়ণ ব্রহ্মার উৎপত্তি-লয়, বা জন্ম মৃত্যু আছে। কিন্তু সাংখ্য দর্শন প্রকৃতিকেই ব্রহ্ম বলে উপাধি দিয়েছেন, কারন প্রকৃতিই সমস্ত প্রকাশের হেতু, প্রকৃতিতেই সমস্ত কিছু বেঁচে থাকে, বেড়ে ওঠে। আবার এখানেই সমস্ত কিছুর তাৎক্ষণিক লয় হচ্ছে। এখানেই জন্ম মৃত্যুর খেলা চলছে।   সৃষ্টি-স্থিতি ও লয়ে সেই পরমপুরুষের  কোনো ভূমিকা নেই। যা কিছু প্রকাশ তা সে সূক্ষ্ম হোক বা স্থূল সবই প্রকৃতির মধ্যেই  ঘটে চলেছে। পুরুষ কেবল নিষ্ক্রিয় দ্রষ্টা। প্রকৃতিই সমস্ত সৃষ্টির আধার, জন্ম মৃত্যুর কারন।  এই প্রকৃতির মধ্যেই জগৎ প্রকাশিত হচ্ছে, আবার এখানেই বিলোপ সাধন হচ্ছে । প্রকৃতিই সমস্ত সৃষ্টিকে ধরে রেখেছে তা-সে যে রূপেই হোক।  

৭. প্রকৃতিকে বলা হয় অবিদ্যা। আলোর অবর্তমানে যেমন অন্ধকার। তেমনি জ্ঞানের অবর্তমানে অজ্ঞান। বিদ্যার অভাবে অবিদ্যা। প্রকৃতির পেটে অসংখ্য সম্ভাবনা সুপ্ত অবস্থায় বিরাজ করছে। এই সুপ্ত  সম্ভাবনার কথা আমরা সুনির্দিষ্ট করে জানতে পারি না, কেবলমাত্র অনুমান করতে পারি। বীজের মধ্যে গাছ আছে, এটা আমাদের অনুমান মাত্র। এই অনুমান বাস্তবে দৃশ্যমান হবে তখনই  যখন হাজার এক অনুকূল পরিবেশ বীজকে প্রকাশিত হবার জন্য সাহায্য করবে। নতুবা বীজের মধ্যে যে সম্ভাবনা রূপ গাছ রয়েছে তা অপ্রকাশিত বা একসময় কালের প্রভাবে নিঃশেষ হয়ে যাবে। তো যা আমরা জানিনা তাকেই বলা হয় অবিদ্যা।  আর যা জানি তাকে বলা হয় বিদ্যা। বিদ  ধাতু থেকে বিদ্যা।  বিদ অর্থাৎ বিদিত হওয়া বা জানা। বলা হয়, যার দ্বারা ব্রহ্মা থেকে ব্রহ্মান্ড পর্য্যন্ত যাবতীয় পদার্থের সত্য-বিজ্ঞান লাভ হয়ে যথাযথ ব্যবহারিক উপকার প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাকেই বলে বিদ্যা।  তো  বিদ্যা - যার দ্বারা অক্ষর পুরুষকে জানা যায়।  আর অবিদ্যা, যা অক্ষর পুরুষকে আধাঁরে ঢেকে রাখে। পুরুষ অর্থাৎ শুদ্ধ জ্ঞানকে যিনি বিভ্রান্ত করছেন, তিনি প্রকৃতি। 

৮. প্রকৃতি যেমন কখনও ব্যক্ত আবার কখনও  অব্যক্ত, তেমনি প্রকৃতির মধ্যেই আছে সমস্ত প্রকাশের কারন, আবার  সমস্ত কারণের কারন। আমাদের এইযে স্থূল ব্রহ্মান্ড, এটি কখনো ব্যক্ত হচ্ছে বৃদ্ধি পাচ্ছে, আবার একসময় ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে অব্যক্ত হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতিকে বাদ দিলে, জগৎ বলে কিছু থাকবে না।  প্রকৃতিতে যেমন অকারনে কিছু হয় না, তেমনি প্রকৃতিই সমস্ত কারণেরও কারন।

৯. প্রকৃতি একটা অখন্ড সত্ত্বা।  একে খণ্ডিত করা যায় না। তথাপি প্রকৃতির মধ্যেই  বৈচিত্র বিরাজ করছে। একের সঙ্গে অন্যের মিল নেই।  আজকের (বর্তমানের) সঙ্গে আগামীর (ভবিষ্যতের) মিল নেই, এমনকি অতীত থেকে তাকে সম্পূর্ণ আলাদা বলে মনে হয়। অর্থাৎ যা ঘটে গেছে, যা হয়ে গেছে, তা আর কোনো দিনই ঘটবে না।  আজ যা ঘটছে, তা আর কোনোদিন ভবিষ্যতে ঘটবে না। প্রতি মুহূর্তে প্রকৃতি নতুন রূপে সেজে চলেছে।  এ এক বিরামহীণ অভিসার যাত্রা বিশেষ। এই অখণ্ড সত্ত্বা অসীম, অনন্ত, অনাদি। 

১০. অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, প্রকৃতির কোনো ইচ্ছে নেই, প্রকৃতির কোনো বুদ্ধি নেই, প্রকৃতি জড়, প্রকৃতির কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। তথাপি প্রকৃতিতেই চাওয়া-পাওয়ার খেলা চলছে। প্রকৃতিই  পুরুষকে খুশী  করছে, তৃপ্ত করে চলেছে, আবার অখুশি করছে, অতৃপ্ত করছে। 

১১. প্রকৃতি শাশ্বত, অনাদি, অনন্ত, দেশ কালের উর্দ্ধে। এমন কোনোদিন ছিলো  না, যেদিন প্রকৃতি বলে কিছু ছিল না, আবার এমন কোনো দিন আসবে না, যেদিন প্রকৃতি বলে কিছু থাকবে না। প্রকৃতিই সমস্ত সৃষ্টির মুলে, আবার এই প্রকৃতিই সমস্ত ধংশের মুলে। প্রকৃতি থেকে আলাদা কেউ নয়, আবার প্রকৃতি থেকে আলাদা কিছু কোনোদিন হবেও না। 

১২. প্রকৃতি ত্রিগুণাত্মক - সত্ত্ব-রজস-তামস। এই যে গুন্ এসব কিন্তু প্রকৃতির নয়, আবার গুন্ ভিন্ন প্রকৃতি বলে কিছু হয় না।  এই গুনই প্রকৃতিকে কখনো সাম্যাবস্থায় রাখছে,  অর্থাৎ স্থিরত্ব দান  করছে, অব্যক্ত করছে, আবার অসাম্য বা অস্থিরত্ব প্রদান করছে, ব্যক্ত করছে  । অর্থাৎ  এই গুনের তারতম্যের কারণেই, প্রকৃতির মধ্যে সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের খেলা চলছে।  গুন্ প্রকৃতি-জাত  নয়, আবার এই গুনের খেলা প্রকৃতিতেই চলছে। 

১৩. প্রকৃতি আসলে দ্রব্য বা পদার্থের সমষ্টি বিশেষ। এই যে দ্রব্য, তা আবার গুনের সমাবেশ মাত্র। তাই গুনের সাম্যাবস্থায় প্রকৃতি যেমন অদৃশ্য  তেমনি এই গুনের অসাম্যের কারনে প্রকৃতি দৃশ্যমান হয়ে থাকে। সাংখ্য দর্শন তাই প্রকৃতিকে ত্রিগুণের সমাহার বলে অভিহিত করে থাকেন। প্রকৃতির প্রকাশ ও অপ্রকাশের কারন এই  গুন্।  তাই গুনই প্রকৃতি, প্রকৃতিই গুন্।  প্রকৃতিতে গুনভিন্ন কিছু নেই। 

হরি ওম তৎ সৎ। 
----------     
    
আত্ম-বিশ্লেষণ - মূলসূত্র : সাংখ্য দর্শন। (৬)

সাংখ্যদর্শন ও যোগদর্শন 

আমরা সবাই বেঁচে থাকতে চাই।  আমরা সবাই আনন্দে বেঁচে থাকতে চাই।  আমরা সবাই আমাদের ইচ্ছে পূরণ করতে চাই। আমরা সবাই কষ্ট থেকে রেহাই পেতে চাই। আর এই বেঁচে থাকার জন্য আমাদের স্বাস-প্রশ্বাস নিতে হবে।  এই বেঁচে থাকবার জন্য আমাদের অন্ন-জল  গ্রহণ করতে হবে, এই বেঁচে থাকবার জন্য আমাদের আলোর স্পর্শ পেতে হবে। আমাদের শারীরিক সুস্থতার জন্য, শারীরিক কষ্ট  লাঘবের জন্য,  আমাদের ঔষধের প্রয়োজন।  ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে আমাদের সম্পদ সংগ্রহ করতে হবে, সঞ্চয় করতে হবে। এগুলো সবই আমাদের অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান বা আমাদের প্রচলিত ধারণা। 

কিন্তু সত্য হচ্ছে এই যাকিছু বিষয়-সম্পদ আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখছে, তা আমাদের থেকে একদিন হারিয়ে যাবে। এমনকি আজ যাকিছু আহার্য্য গ্রহণ করছি, বা পানীয় গ্রহণ করছি,  তা কালকে আমাদের মল-মূত্র আকারে বেরিয়ে যাচ্ছে।  একটা সময় আসবে, যখন এই বেঁচে থাকবার জন্য, যত  কিছু করেছি, যাকিছু সংগ্রহ করেছি, তা আর কোনো কাজেই লাগবে না। ডাক্তার, ঔষধ, সম্পদ, ঘর-বাড়ী, টাকা-পয়সা, আত্মীয়-স্বজন সবই একসময় মূল্যহীন হয়ে যাবে, আমার কাছে। এমনকি এরাই অর্থাৎ এই সম্পদ  আত্মীয়-স্বজন একসময় আমার ভয়ের কারন হবে। এই আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে মৃত্যপ্রায় হয়ে আমাকে বেঁচে থাকতে হবে।  আর সবশেষে একদিন, আমাকে মৃত্যু এসে টেনে নিয়ে যাবে। অদ্ভুত এই জীব, শুধু বেঁচে থাকবার জন্য, অদৃশ্য মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে চলেছে । সেই মৃত্যু যাকে  সে জানে না, তাকে সে শত্রু ভাবছে, আর জীবন  যাকে  সে জানে, তাকে সে মিত্র ভাবছে।  কিন্তু সত্য হচ্ছে, জীবন একটা যাত্রাপথ, আর মৃত্যু হচ্ছে সেই যাত্রাপথের বাঁক বিশেষ। এই বাঁকের শেষে কি আছে, তা সে জানে না।  আর এই অজানা তাকে তাড়া  করে নিয়ে বেড়াচ্ছে। 

তাই  প্রশ্ন জাগে, তাহলে আমরা বেঁচে থাকবার জন্য আমরা আর কি করতে পারি ? আমরা কি এই বিষয় ছেড়ে দিয়ে বেঁচে থাকতে পারি ? ভালো থাকতে পারি ? সত্যিই যদি তেমন কিছু থাকে, অর্থাৎ সত্যিকারের বেঁচে থাকবার জন্য আমাদের কি করণীয় ? ভালো থাকবার জন্য আমাদের কি করণীয় ? সুস্থ-সবল থাকার জন্য আমাদের কি করণীয় ? এইসব প্রশ্ন মনুষ্য কুলের উৎপত্তির মুহূর্ত থেকেই মানুষের মধ্যে  জেগেছে। আর আজও  এই প্রশ্ন নিয়ে সে বনে জঙ্গলে, সাগরে-পাহাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও, এটা সত্যি  আমরা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছি, কিন্তু ঘরের মধ্যে যা হারিয়ে গেছে, তা তো বাইরে পাওয়া যাবে না। সেই দুর্লভ বস্তু আমাদের ঘরের মধ্যেই খুঁজতে হবে। আর এই খোঁজার পথনির্দেশ আছে, সাংখ্য-যোগের মধ্যে। আজ আমরা এইসব চিরন্তন প্রশ্নের জবাব  খুঁজবো। আমরা বাঁচবো কি করে ? 

প্রথমেই বলি, আমি বেঁচে থাকতে চাইছি, ভালো থাকতে চাইছি - এই আমিটা কে ? এই আমি হচ্ছে একটা  বোধ বিশেষ - যা শরীরকে ঘিরে অবস্থান করছে। শরীর থেকে  যখন এই বোধশক্তি হারিয়ে যায়, তখন আমার শারীরিক দুঃখ-কষ্ট-আনন্দ বলে আর কিছু থাকে না। এই স্থূল শরীর হচ্ছে, অনন্ময় অর্থাৎ অন্ন দিয়ে এই শরীর গঠিত হচ্ছে, এই অন্নের  দ্বারাই এটি পুষ্টি লাভ করছে, বেঁচে বেড়ে উঠছে। ঠিক তেমনি, আমার যেমন একটা শরীর বা শরীরবোধ আছে,  তেমনি আমার একটা মন আছে, এটিও আসলে খাদ্যের ক্ষুদ্রতম অংশ ছাড়া কিছু নয়। আমরা যখন খাদ্যের অভাব বোধ করি, তখন আমাদের এই মন ম্রিয়মান হয়ে যায়। এমনকি মনের বৃত্তিসকল আর কোনো কাজ করতে পারে না।  যেমন শরীর অসুস্থ হলে, আমাদের হাত-পা কাজ করতে পারে না। তেমনি খাদ্য-পানীয়র অভাবে মনের অপুষ্টি দেখা যায়।  মনের বৃত্তি নিষ্প্রভ হতে থাকে। এই স্থূল শরীর ও মনের পিছনে আমাদের বোধশক্তি। এই বোধশক্তির দ্বারাই আমরা এই শরীর মনের উপস্থিতি টের পাই। এই বোধশক্তি যার আরেক নাম চৈতন্যশক্তি। এই চৈতন্যশক্তি যতক্ষন আমাদের শরীরে-মনে অবস্থান করে, ততক্ষন আমরা  আমাদের এই আমি-বোধের অস্তিত্ত্ব থাকে। যখন এই চৈতন্যশক্তি,  আমাদের এই শরীর-মন হারিয়ে ফেলে,  তখন আমরা শরীর মনের সুখ-দুঃখ অনুভব করতে পারি না। একটা সঙ্গাহীন অবস্থা দেখা যায়। বিষয় সুখ-দুঃখ বলে কিছু থাকে না। এই অবস্থা কিন্তু  মৃত্যু নয়।  একটা সঙ্গাহীন অবস্থা।  আবার যদি চৈতন্য শক্তি প্রবাহিত হতে শুরু করে, তখন আবার এই শরীর-মন ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। 

সংখ্যা দর্শন বলছে, আমরা সবাই, এমনকি এই যে বিশ্বব্রহ্মান্ড তা কেবল দুটি নিত্যসত্ত্বার ক্রোম পরিণতি বিশেষ। আর এই দুটো সত্ত্বা হচ্ছে পুরুষ ও প্রকৃতি। পুরুষ অর্থাৎ বিশুদ্ধ চৈতন্য, আর প্রকৃতি হচ্ছে জড়। এই প্রকৃতি ত্রিগুণাত্ম। এই ত্রিগুণের  মধ্যে বা প্রকৃতির মধ্যে যখন মাতৃশক্তির  বিক্ষুব্ধ ভাবের উদয় হয়, তখন সৃষ্টির সূচনা হয়। প্রথম পরিণতি হচ্ছে মহৎ বা বুদ্ধি। এটি আসলে মহাজাগতিক রশ্মি রূপ বুদ্ধিমত্তা। এই রশ্মিতে পুরুষের অর্থাৎ বিশুদ্ধ চৈতন্যের প্রতিফলন ঘটে থাকে। এই প্রতিফলিত বিশুদ্ধ চৈতন্য ও প্রকৃতির সঙ্গে মিলে আবির্ভাব হয় মহাজাগতিক অহম বা আত্মা।  এই অহঙ্কারের মধ্যে তখন শুরু হয় ত্রিগুণের খেলা।  অর্থাৎ এখন থেকে সত্ত্ব রজঃ ও তমঃ গুনের খেলা শুরু হলো। সাত্ত্বিক গুনের পরিণতি বিশেষ হচ্ছে মানস বা বিশ্বমন। এই মানস থেকে  আবির্ভাব হলো দশ সূক্ষ্মইন্দ্রিয়। 

যাইহোক, আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে বেঁচে থাকা, ভালোভাবে বেঁচে থাকা। কোনও এক কালে, কোনও  এক মনুষ্যজন্মে, অর্থাৎ বারবার বিষয়াভিমুখী হয়ে বাঁচার লড়াই থেকে একসময় আমাদের বিরক্তি আসবে । বারংবার বিরহের যন্ত্রনা সহ্য করতে করতে একসময় সত্যিকারের বাঁচার লড়াইয়ের রাস্তা খুঁজতে চাই আমরা। আবার বিষয় ছেড়ে বাঁচার সম্ভাবনার  মধ্যেও একটা ভীতির জন্ম হয়ে থাকে। মৃত্যুভয় আমাদেরকে ঘিরে ফেলে। অর্জ্জুনের মধ্যে এই বিষাদের ছায়া আমরা দেখতে পাই। বিষয় ছেড়ে বেঁচে থাকা আর মৃত্যুর মধ্যে কোনো পার্থক্য করতে পারি না। তখন মনের বৃত্তিগুলোর মধ্যে লড়াই শুরু হয়। এই শুরুহলো যোগের সূত্রপাত। একেই যোগের ভাষায় বলে অভিনিবেশ। 

যোগ শুরুর প্রাথমিক লক্ষণ হচ্ছে বিচ্ছেদের আশঙ্কা বা ভয়। আর এই যে ভয়, এটি কিন্তু অমূলক নয়। যাদের সাথে আমার হাজার বছরের সম্মন্ধ, জন্ম জন্মান্তরের সম্মন্ধ তাকে ছাড়া ইহজগতের বাঁচবো কি করে ? যোগাচার্য্যগণ বলছেন, এই ভয়ের কারন হচ্ছে তামসিক বৃত্তির সক্রিয়তা।  এই যে তামসিক বৃত্তি, একে পরিত্যাগ করা সহজসাধ্য নয়।  আবার আমাদের এটা ভাবা উচিত নয়, যে এই তামসিক বৃত্তি কেবলই কু-প্রবৃত্তির উদ্রেগকারী। তামসিক বৃত্তি হচ্ছে, আমাদের ইহজগতে বেঁচে থাকবার উপায় বিশেষ। একে  খারাপ বা নেতিবাচক বলে উপেক্ষা করা উচিত নয়।  এই তামসিক বৃত্তির কারণেই আমরা বেঁচে আছি। আমরা নিজেদেরকে সুরক্ষিত বলে মনে করছি। এই তামসিক বৃত্তি আমাদের বেঁচে থাকবার প্রেরণা দিচ্ছে। এই তামসিক বৃত্তি আমাদের ব্যবহারিক জীবনে বাঁচিয়ে রাখছে। এই তামসিক বৃত্তি আমাদের ইহজগতে আশার আলো দেখাচ্ছে। 

এই তামসিক বৃত্তি আমাদেরকে স্বতন্ত্র করেছে অর্থাৎ আমি সত্ত্বার (ঠাকুর রামকৃষ্ণের ভাষায় কাঁচা আমি ) জন্ম দিয়েছে।  এই তামসিক বৃত্তি আমাদেরকে একটা পরিচয় এনে দিয়েছে। প্রদীপ (অগ্নি-শিখা) জ্বালতে গেলে, তেল-সলতে রাখবার জন্য আমাদের একটা পাত্র, তা সে সোনার হোক বা মাটির, অবশ্যই প্রয়োজন। জল খেতে গেলে, একটা গেলাস দরকার।  এই তামসিক তত্ত্বই আমাদের ইন্দ্রিয়াদি সহ মহাভূতের জন্ম দিয়েছে। আর আমরা জানি, এই মহাভূত থেকেই এই শরীরাদি সহ  ব্রহ্মান্ডের প্রকাশ ঘটেছে। তামসিক গুনের কারণেই আমরা আমাদের সামাজিক, মানসিক, ধর্ম্মীয় অর্থাৎ  আমার স্বতন্ত্র ব্যক্তি পরিচয় হয়ে থাকে। তো আমার "আমি" বলে যে পরিচিতি তা এই তামসিক গুনের কারণেই হয়ে থাকে। এই তামসিক বৃত্তিই আমাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের জন্ম দিয়ে থাকে।  আমরা যে আমাদেরকে এমনকি এই জগতের উন্নতি করতে চাইছি,  পরিবর্তন করতে চাইছি, এমকি আত্মোন্নতি করতে চাইছি, তা এই তামসিক গুনের কারনেই  হয়ে থাকে। জগতের যা কিছু পার্থিব উন্নতি তা এই তামসিক গুনের কারনে হয়ে থাকে।  তাই তামসিক গুন্ কেবলই  খারাপ, এমন ধারণা  আমাদের থাকা উচিত নয়। জগতে যাকিছু স্বাছন্দ বা জাগতিক উন্নতি তা এই তামসিক গুনের কারণেই ঘটে থাকে। আর এই কারণেই আমরা এই তামসিক বৃত্তিগুলোকে ধরে রাখতে চাই। এটি আমাদের স্বভাবের মধ্যেই বিদ্যমান। 

কিন্তু যখন যোগের পথে কেউ প্রথম পদক্ষেপ দিতে চায়, বা পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করে, তখন তার মধ্যে এই জাগতিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ, সামাজিক বন্ধন, বিশ্বাস-অবিশ্বাস উপেক্ষা করার কথা ভাবলেই একটা শোকের ছায়া নেমে আসে। তামসিক গুন্ নেতিবাচক নয়, কিন্তু যখন পরিবর্তনের হাওয়া প্রবাহিত হতে শুরু করে, তখন তা সে প্রতিহত করতে চায়। তামসিক গুনের ফলেই মানুষ স্থিতাবস্থা বজায় রেখে চলতে চায়। পরিবর্তনে আভাস  দেখলেই, সে অসহায় বোধ করে। 

সাংখ্য দর্শন এই জায়গার প্রতি লক্ষ করতে বলেছেন । এই লক্ষ্যেই আমাদের তীর নিক্ষেপ করতে হবে। আমরা কিভাবে নিজেদেরকে স্থিতাবস্থার প্রতি দুর্বল করে রেখেছি, কিভাবে  বর্তমানকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাই, তার বিশ্লেষণ করেছে সাংখ্য দর্শন ।  সাংখ্যদর্শন ও যোগদর্শন এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের সম্যক জ্ঞান দান  করেছে। সাংখ্য এই তামসিক গুনের বিশ্লেষণ করেছে, আর যোগদর্শন এই তাত্ত্বিক জ্ঞানের যথার্থ উপলব্ধি করিয়েছে। আর এসবের উদ্দেশ্য হচ্ছে : যাকিছু আমাদের এই পার্থিব জগতের দিকে  টানছে, আর সেখানেই অর্থাৎ সংসারে বেঁধে রাখছে সেখান থেকে বের করে নিয়ে আসা। তাই বলে ভাববেন না, যে সাধক পার্থিব জগতের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে  অপার্থিব, বা অবয়ব হীন হয়ে শূন্য ঝুলে থাকবে। ব্যাপারটা এমন নয়। বরং বলা যেতে পারে, এই পার্থিব জগতের মধ্যেই যে সেই পরমার্থ আছে, সেই জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত করাই এই দুই দর্শনের উদ্দেশ্য। একেই যোগের ভাষায় বলে সংস্কারের শোধনক্রিয়া। অর্থাৎ আমাদের মধ্যে যে সকল সংস্কার জন্ম জন্মান্তর থেকে বাসা বেঁধে আছে তাকে শোধন করা। আমাদের ভাবনার পরিবর্তন করতে হবে। 

আসলে আমরা যখন যেখানে অবস্থান করি, তখন সেইমতো আমরা নিজেদেরকে ভাবতে শিখি।  আমি যখন ভারতে  অবস্থান করি, তখন তখন আমি ভারতীয়।  আবার যখন আমি বাংলায় অবস্থান করি তখন আমি বাংলাবাসী হয়ে যাই। আমি যখন হিন্দুর ঘরে লালিতপালিত হই, তখন আমি হিন্দু হয়ে যাই, আমি যখন খ্রিস্টানের ঘরে লালিত পালিত হই, তখন আমি খ্রিস্টান হয়ে যাই আবার আমি যখন ইহুদীর  বা মুসলমানের  ঘরে জন্মাই, তখন আমি ইহুদি বা মুসলমান হয়ে থাকি।  আমি যখন পাপের মধ্যে অবস্থান করি, তখন আমি পাপী হয়ে যাই, আবার আমি যখন পুণ্যের মধ্যে অবস্থান করি তখন আমি পুণ্যবান হয়ে যাই। ঠিক তেমনি, আমি যখন জ্ঞানের মধ্যে অবস্থান করি, তখন আমি জ্ঞানী হয়ে যাই, পণ্ডিত হয়ে যাই । আমি যখন অজ্ঞানের মধ্যে অবস্থান করি, তখন আমি অজ্ঞানী হয়ে যাই, মূর্খ হয়ে যাই ।  আমি যখন দেহের মধ্যে অবস্থান করি, তখন আমি এই দেহ হয়ে যাই। কিন্তু সত্য হচ্ছে আমি যা আমি তাই-ই থাকি। এতে করে আমার কোনো পরিবর্তন হয় না। আমরা সবাই সেই অমৃতের সন্তান - এই সত্যকে উপলব্ধি করানোই  দর্শনের উদ্দেশ্য। যে  স্মৃতি আমাদের হারিয়ে গেছে, সেই স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলা। যে বিশুদ্ধ জ্ঞান থেকে আমরা বিচ্যুত হয়েছি, তাকে আবার আয়ত্ত্বে আনতে  হবে।  আমরা যেখান থেকে এসেছি, সেখানে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়াই সাংখ্য ও যোগ দর্শনের উদ্দেশ্য।     

কপিলদেবের সাংখ্য দর্শন যেমন সর্বোচ্চ তত্ত্বকথা, জ্ঞানের কথা, তেমনি এই তত্ত্বকথায় প্রভাবিত হয়ে ঋষি পতঞ্জলি যোগদর্শনের প্রবর্তন করেছেন। অর্থাৎ শুধু কথায় কাজ হবে না, একে আমাদের ব্যবহারিক জীবনে নামিয়ে আনতে  হবে তবেই এই সর্বোচ্চ জ্ঞানের উপলব্ধি হবে। জ্ঞান যদি আমাদের ব্যবহারিক জীবনে কাজে না লাগাতে পারি, তবে এই জ্ঞান শুধুই সাদা-মেঘ মাত্র, যার থেকে কখনো বৃষ্টি হবার সম্ভাবনা নেই। আর বৃষ্টি না হলে, পৃথিবী কিবাবে জীবনের উৎস হয়ে উঠবে ? জীবনক্ষেত্র  কিভাবে উর্ব্বর হবে ? 

আমরা জানি, এই যে স্থূল শরীর তা কেবলই জড় পদার্থ, একটা যন্ত্র মাত্র ।  এই শরীর কর্ম্ম সম্পাদনের জন্য তৈরী হয়েছে। কর্ম্মহীন শরীর  বলে কিছু হয় না। এক মুহূর্তও আমরা কর্ম্মহীন হয়ে থাকতে পারি না। শ্বাসক্রিয়া অর্থাৎ আমাদের ফুসফুস কোনও  প্রয়াস ছাড়াই ক্রিয়া করে চলেছে। আমাদের হজমযন্ত্র  আমাদের অজান্তে ক্রিয়া করে চলেছে।   এই শরীরের মধ্যে যে ইন্দ্রিয় সকল আছে, তা সবসময় ক্রিয়া করে চলেছে। যার চোখ আছে, সে দেখবে, যার কান আছে সে শুনবে। যার মন আছে, সে চিন্তা করবে। একে আমরা কিছুতেই প্রতিহত করতে পারি না।   আবার এই শরীরের মধ্যেই অবস্থান করছে, শরীরী। এই শরীর  একটা ক্ষেত্র বিশেষ, এর মধ্যেই অবস্থান করছেন সেই ক্ষেত্রজ্ঞ। এই ক্ষেত্রজ্ঞের সন্তুষ্টির জন্য একাদশ ইন্দ্রিয় ক্রিয়া করে চলেছে।  সাংখ্য যেমন জ্ঞান, তেমনি যোগদর্শন হচ্ছে সেই জ্ঞানের প্রকাশ। সাংখ্য  যদি  বীজ হয়, তবে যোগ হচ্ছে মহীরুহ।  বীজের মধ্যে যে সম্ভাবনা আছে, তাকে জাগিয়ে তুলতে হবে, তবেই একসময় শাখা-প্রশাখা, পাতা, ফুল, ফলের দেখা মিলবে।  আর আমরা তার থেকে ব্যবহারিক উপযোগিতা পাবো। নইলে বীজ অজন্মা  হয়ে কালের গতিতে একসময় নিঃশেষ হয়ে যাবে। 

ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, "যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ" -  চিত্ত বৃত্তি নিরোধের নাম যোগ। এখন কথা হচ্ছে চিত্ত কাকে বলে, আর তার বৃত্তি বলতে আমরা কি বুঝবো ? চিত্ত হচ্ছে অন্তঃকরণ। এখানে সমস্ত কিছু প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। যেহেতু প্রকাশের স্বরূপ হচ্ছে চিত্ত, তাই এখানে ত্রিগুণের সমাহার। এই ত্রিগুণের মধ্যে যখন তমঃগুণের আধিক্য দেখা যায়, তখন তা ঐশ্বর্য ও বিষয় প্রিয় হয়ে থাকে। অর্থাৎ তখন অধর্ম্ম, অজ্ঞান, অ-বৈরাগ্য, ইত্যাদিকে আশ্রয় করে।  আবার যখন রজগুনের আধিক্য হয়, তখন ধর্ম্ম, জ্ঞান, বৈরাগ্য ও ঐশ্বর্যের আধিপত্য দেখা যায়। আবার যখন সত্ত্বগুণের আধিক্য থাকে তখন চিত্ত সাত্ত্বিক গুন্ বিশিষ্ট বিবেকখ্যাতি অর্থাৎ চিত্ত তখন আত্মাতে আটকে থাকে। তো বিবেকখ্যাতি হচ্ছে সত্ত্বগুণাত্মিকা। বিবেকখ্যাতি হচ্ছে প্রকৃতি ও পুরুষের মধ্যে ভেদজ্ঞান স্বরূপ ।  সাধক এই তিন অবস্থাকেই নিরুদ্ধ করে যোগরূঢ় হন। 

তো অসাম্য গুন্ সম্পন্ন  প্রকৃতি সবসময় পরিণামী, অস্থির, গতিশীল ।  আর গুনগুলোর সাম্যাবস্থায় প্রকৃতি স্থির - যাকে  বলা হয়, মুলা-প্রকৃতি। এই অবস্থায় প্রকৃতি নিজের মধ্যেই লিন হয়ে আছে। পুরুষের ভোগ সাধনের জন্য, প্রকৃতি তাকে আকর্ষণ করছে।  আর পুরুষ, প্রকৃতির এই আকর্ষণকে উপেক্ষা করতে না পেরে, তার সান্নিধ্যে এসে ভোগ সাধনায় লিপ্ত হয়।  এই সান্নিধ্যের কারণেই গুণগুলো আরো সক্রিয় হয়ে ওঠে। আর প্রকৃতিও তখন পুরুষকে তার নিজের অধিকারে এনে ফেলে। এইভাবেই পুরুষ একসময় প্রকৃতির ফাঁদের পড়ে নিজেকে বদ্ধ করে ফেলে। এখন কথা হচ্ছে পুরুষের এই যে ভাবনা, অর্থাৎ প্রকৃতি ও পুরুষের যে ভেদজ্ঞান, আর এই ভেদজ্ঞানর  কারনে যে বদ্ধ  ভাব তা থেকে কি করে মুক্ত হওয়া যায় ?  যতক্ষন প্রকৃতির সান্নিধ্য, ততক্ষন চিত্ত চঞ্চল। আর এই চঞ্চল চিত্তের কারণেই ভোগান্তি। 

সাংখ্য দর্শনে বলা হয়, পুরুষ হচ্ছে নিমিত্ত কারন, আর উপাদান কারন হচ্ছে প্রকৃতি। চৈতন্য সত্তা অপরিণামী, অসঙ্গি, অসংক্রমক, শুদ্ধ ও অনন্ত।  আবার প্রকৃতি ও পুরুষের যে ভেদজ্ঞানরূপ বিবেকখ্যাতি তা সত্ত্ব গুনাধিক্যের কারনে ঘটে থাকে।  অর্থাৎ ভেদ জ্ঞানে প্রকৃতি ও পুরুষের অভেদ তত্ত্ব খণ্ডিত হয়। এখন প্রকৃত সাধক অর্থাৎ বৈরাগ্যবান পুরুষ চিত্তবৃত্তিকে সম্পূর্ণ নিরোধ করে অবিদ্যারূপ সংস্কারগুলোকে সম্পূর্ণ বিলোপ করে স্বরূপে অবস্থান করেন। এই যে অবস্থা, একেই যোগদর্শন বলছে, নির্বীজ সমাধি। অর্থাৎ সমস্ত সংশয়ের অতীত অবস্থা, অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি । 

সাংখ্য দার্শনিকদের কাছে  কখনও সর্ব্বশক্তিমান একক  ঈশ্বরের অনুভূতি নেই। তাঁরা জগৎকে পঁচিশ তত্ত্বের সমাহার বলে অনুভব করেছেন। এই পঁচিশ তত্ত্বের মধ্যে ২৪ তত্ত্বই জড় বা অচেতন। অর্থাৎ পুরুষ হচ্ছেন একমাত্র চৈতন্য আর প্রকৃতি হচ্ছে জড়।  আর এই সৃষ্টির কারনও  হচ্ছে দুটো - একটা নিমিত্ত কারন আর একটা উপাদান কারন। এই নিমিত্ত কারন হচ্ছে সেই পরমপুরুষ।  কিন্তু তিনি অক্রিয়, তাই তিনি কোনো সৃষ্টির দায় গ্রহণ করেন না।  তাই সাংখ্য দার্শনিকগণ বলছেন, এই সৃষ্টি কেবলই প্রকৃতি জাত। আর এই সৃষ্টির প্রকাশের সম্ভাবনা চৈতন্যবান পরমপুরুষের কারনে হয়ে থাকে।  

কিন্তু  কথা হচ্ছে যোগীগণ যখন আত্মানুসন্ধান করেন, অর্থাৎ নিজের মধ্যে ডুব দিতে চান, তখন তিনি কার মধ্যে ডুব দেবেন ? প্রকৃতির মধ্যে নাকি পুরুষের মধ্যে। জড়ের  মধ্যে নাকি চৈতন্যের মধ্যে ? ঋষি পতঞ্জলি তার দর্শনের সমাধিপাদে বলছেন, (শ্লোক -২১) "তীব্রসংবেগানামাসন্নঃ" - অর্থাৎ তীব্র বৈরাগ্য উপস্থিত হলে, জানবেন সমাধি আসন্ন হয়েছে। তাহলে তীব্র বৈরাগ্য থেকে আত্মস্থ হওয়া যায়।  এখন কথা হচ্ছে এই যে তীব্র  বৈরাগ্য কাকে বলে ?  বৈরাগ্য অর্থাৎ বিরাগ।  তো কার থেকে বিরাগ ? প্রকৃতি থেকে বিরাগ। ঋষি পতঞ্জলি আরো বলছেন, "ক্লেশকর্মবিপাকাশয়ৈরপরামৃষ্টঃ পুরুষবিশেষ ঈশ্বরঃ । " অবিদ্যাদি ক্লেশ, আবার ক্লেশ জনিত যে কর্ম্ম (তাসে  ধর্ম বা অধর্ম যাই হোক না কেন), আবার সেই কর্মজনিত যে ফল এগুলো থেকে সন্মন্ধ বিহীন যে পুরুষ তাঁরই নাম ঈশ্বর। এই ঈশ্বরেতে প্রণিধান থেকেও সমাধি লাভ করা যায়, বা আত্মস্থ হওয়া যায়। "ঈশ্বরপ্রণিধানাদ্বা" (২৩) .

আসলে এই যে ঈশ্বর প্রণিধান বলতে আমরা যা বুঝেছি, তা হলো, শ্রদ্ধা-ভক্তি সহকারে ঈশ্বরকে পরমগুরু জ্ঞানে কৃতকর্ম্মের সমস্ত ফলরাশি সমর্পন করাই  আত্মস্থ হবার উপায়।  

আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ধারণা  হচ্ছে, সমস্ত জীবের মধ্যে একমাত্র মানুষ অত্যন্ত বুদ্ধিমান। আর এই কারণেই সবাই নাকি মনুষ্যজন্ম লাভের  জন্য, এমনকি এই মনুষ্য জীবনকে দীর্ঘ্যায়িত করবার জন্য সাধ্য-সাধন করে। প্রত্যেকটি মানুষ দীর্ঘ জীবনকালের জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে। বলা হয়,  দেবতারাও নাকি মনুষ্যজন্ম লাভ করতে  চায়। এই মনুষ্য জীবনেই  নাকি  সর্ব্বসুখ।  এখানে এই কর্ম্মভূমিতে  এসে পুন্য কর্ম্ম করতে পারলেই, আমরা সবাই নাকি একসময় স্বর্গসুখ ভোগ করতে পারবো। কিন্তু সত্য হচ্ছে, এই বিজ্ঞ পন্ডিত ব্যাক্তিগন নাগরদোলার মতো জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছেন। মানুষ পুন্য কর্ম্মের দ্বারা স্বর্গসুখ  লাভ করতে চায়। আর ফল হয়, স্বর্গবাস, অর্থাৎ ভোগ-সুখের জীবন। কিন্তু পুন্য কর্ম্মের ফল শেষ হলেই আবার  একসময় স্বর্গ থেকে বিচ্যুত হয়ে এই মৃত্যুলোকে পতিত হয়।  
  
আবার এই মানুষের মধ্যেই স্বল্প কিছু মানুষ আছেন, যারা চিন্তার গভীরে ডুব দিয়ে, সূক্ষ্ম দৃষ্টি  সম্পন্ন হয়ে উপলব্ধি করেছেন, যে এই স্থূল জগৎ, এমনকি এই যে সুক্ষ জগৎ অর্থাৎ স্বর্গ, তা ক্ষণস্থায়ী। এমনকি এই জগৎ যেমন স্থূল সুখের জন্ম দেয়, তেমনি স্থূল দুঃখের আগড় হচ্ছে এই স্বর্গ-মর্তভূমি । এখানে সুখের পিছনে আছে দুঃখ, আর দুঃখের পিছনে সুখ ছুটে  বেড়াচ্ছে। এখানে আছে কর্ম্ম, আছে কর্ম্মফল।  কর্ম্মফল ভোগের জন্য শরীর নির্মাণ হয়, আবার শরীর  মাত্রেই যেহেতু কর্ম্মশরীর, এখানে শরীর  রক্ষার জন্য কর্ম্ম করতে হয়। তাই সে কর্ম্ম করতে বাধ্য হয়। আর কর্ম্ম তা সে পাপ-পুন্য, ভালোমন্দ যাই হোক না কেন, কর্ম্ম অবশ্যই ফলের উৎপাদন করে। স্থূল শরীরে অবস্থান কালে যেহেতু সমস্ত কর্ম্মফল ভোগ শেষ হয় না, তাই সে সূক্ষ্ম শরীরে ভোগ সম্পাদন করে।  আবার  ভোগশেষে  তাকে সংস্কার অনুযায়ী উপযুক্ত শরীর  গ্রহণ করতে হয়। 

সামান্য কিছু মহাত্মা আছেন, যাঁরা  ইন্দ্রিয় লব্ধ সুখ-দুঃখের পিছনে না ছুটে ইন্দ্রিয়াতীত নিত্যবস্তুর সন্ধানে অর্থাৎ সেই সত্য বস্তুর সন্ধানে নিজেকে যুক্ত করেন। এঁরাই মনুষ্যকুলকে মুক্তির সন্ধান দেন। উপনিষদের ঋষিগণ বলছেন, মনুষ্য শরীরে এসেছো তো কর্ম্ম তোমাকে করতেই হবে। এর থেকে তোমার রেহাই নেই।  কিন্তু এই কর্ম্ম দুই ধরনের হতে পারে।  অর্থাৎ একটা হচ্ছে সকাম কর্ম্ম, আর একটা হচ্ছে নিষ্কাম কর্ম্ম। এই নিষ্কাম কর্ম্ম হচ্ছে জ্ঞানের পথ। তোমাকে জ্ঞানেই পথে ধাবিত হতে হবে। আজ না হোক কাল, এ জন্মে না হোক পরের জন্মে তোমাকে এই জ্ঞানের পথেই মুক্তির সন্ধান করতে হবে।  কিন্তু কথা  হচ্ছে কি সেই জ্ঞান ? আমাদের পুঁথিগত বিদ্যা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যা তো কম নেই, তাহলে আর কি জ্ঞান যা আমাদের আয়ত্ত্বে আনতে  হবে ? এই জ্ঞান হচ্ছে আত্মজ্ঞান। আর এই আত্মজ্ঞান আয়ত্ত্বে আনবার জন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার প্রয়োজন নেই, এমনকি কোনো আচার্য্য বা গুরুর কাছেও তোমার যাবার প্রয়োজন নেই, এই জ্ঞান আছে তোমার ভিতরে, তোমার অন্তরে। তুমি তোমার অন্তরে এই জ্ঞানের সন্ধান করো। 

তোমার চোখ-কান সব বাইরের দিকে খোলা রেখেছো, বাইরের বস্তু তোমাকে আকর্ষণ করছে।  এখন থেকে এই ইন্দ্রিয়সকলকে তুমি অন্তরের  দিকে উন্মুক্ত করে দাও।  অন্তরের  দিকে দৃষ্টি দাও, অন্তরের  গভীরে যে ডাক উৎসারিত হচ্ছে, তা দিকে দৃষ্টিপাত করো। তাঁর  ডাক শোনো। তোমার সমস্ত সত্ত্বা অন্তরের অন্তঃস্থলে প্রবেশ করুক। এই অন্তরের  মধ্যে যে  শব্দব্রহ্ম প্রতিনিয়ত ধ্বনিত হচ্ছে তার ডাক শুনবার চেষ্টা করো। যে জ্ঞানের বাণী তোমার মধ্যে প্রতিনিয়ত উৎসারিত হচ্ছে তাকে ধরবার জন্য প্রয়াস করো।  কর্ম্ম শরীরের সমস্ত প্রয়াস এই নিষ্কাম কর্ম্মে লিপ্ত হোক। 

ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, "তস্য বাচকঃ প্রণবঃ" (সমাধিপাদ ১/২৭) প্রণব হচ্ছে ঈশ্বরের স্তব, যার দ্বারা ইপ্সিত বস্তু স্তুত  হন। সমস্ত জ্ঞেয় বস্তুর অবগতির মাধ্যম হলো প্রণব। প্রণব নিজেই বাচ্য আবার বাচক।  তৈত্তিরীয় (১/৮) উপনিষদ বলছে, "ওমিতি ব্রহ্ম" . আবার মাণ্ডুক্য উপনিষদ বলছে,  "ওমিত্যেতদক্ষরমিদং " - সমস্ত শব্দই ওঙ্কারের অবয়ব। আসলে ওঙ্কারের জপ হলো ঈশ্বরের বিষয়ে ভাবনা-চিন্তা। এই ভাবনায় নিমগ্ন হয়ে নিজেকে নিজের মধ্যে ডুবিয়ে দাও। তাহলে একসময় আত্মজ্ঞানের উপল্বদ্ধিতে তুমি উদ্ভাসিত হবে। তখন আত্মজ্ঞানী  হয়ে জানতে পারবে তোমার ভিতরেই সব রয়েছে। তুমিই তোমার প্রভু, তুমি সদামুক্ত, সদা আনন্দময়, সদা প্রসন্ন, তুমিই সেই ইপ্সিত বস্তু যাঁকে  তুমি জন্মান্তর থেকে জন্মান্তরে খুঁজে  চলেছো। যাকে  এতদিন তুমি বাইরে খুঁজেছো, তিনি তোমার হৃদয়-আকাশে উজ্বল নক্ষত্রের মতো বিরাজ করছেন। সেই জ্ঞানের আলোকে তুমি নিজেকে স্নাত করো। 

সাংখ্য দর্শনে বলা হচ্ছে প্রকৃতি ও পুরুষ দুইই  সত্য, দুইই  নিত্য, দুইই  সীমাহীন, ব্যাপক। আর জীব হচ্ছে সেই নিত্য সত্য অনন্ত প্রাণের কনা যেখানে পুরুষের প্রতিফলিত চৈতন্য  প্রকট হয়ে উঠেছে।  এই  জীব শুধু পুরুষের বা চৈতন্যের প্রতিফলন  নিয়ে থাকতে চায় না, সে প্রাণকে সাথে নিয়ে বাঁচতে চায়। সে প্রাণহীন হতে চায় না।  আবার চেতনারহিত হয়েও থাকতে চায় না। সে প্রাণহীন অর্থাৎ মৃত্যুকে সে চায় না, আবার সংজ্ঞাহীন হয়েও বেঁচে থাকতে চায় না। দেহ জরাগ্রস্থ হলেও সে এই দেহেই থাকতে চায়। জীবের এই যে প্রকৃতির মধ্যে চেতনার সংযোগে অমর  হবার আকাঙ্খ্যা তা সে পেলো কোথা থেকে ? সোজা কথায় মানুষ এই বেঁচে থাকবার অফুরন্ত প্রেরণা পেলো কোথা থেকে ? মরণশীল জীব ক্ষরজীব, অমর-অক্ষর হতে চায় কেন ? কোন শক্তি তাকে এই প্রেরণা যোগায় ? মহাত্মাগণ বলছেন, এই ডাক আসে আসে অন্তর-পুরুষের কাছ থেকে। কারন এখানে এই স্থূল দেহেই, এই দেহের অন্তরেই স্থিত আছেন অনন্ত, অমর অক্ষর পুরুষ। সেই  অন্তর-পুরুষ তো অমর অক্ষর, তিনি তাঁর  দাবি ছাড়বেন কেন ?   কিন্তু প্রকৃতি তো সদা পরিবর্তনশীল, অস্থির এই প্রাণ,  প্রকৃতি সদা পরিণামের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আর পুরুষ সে তার "আমি" টাকে সেই নৌকার মাঝে সাক্ষীর মতো বসে আছে। মরণশীল এই দেহকে সে আমি-আমার বন্ধনে বেঁধে চিরকালীন হতে চাইছে। কাজেই প্রকৃতির দান  এই দেহটাকে নিয়েই সে বেঁচে থাকতে চায়। একে  সে কিছু কাছছাড়া করতে চায় না।  আমরা যেমন মাতা-পিতা, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা-পরিবার আত্বিয়স্বজন নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই, আর এদের কারুর বিয়োগ আমাদেরকে বেঁচে থাকবার ইচ্ছেকে ম্রিয়মান করে দেয়, তেমনি এই অন্তরপুরুষ যেখানে বাস করছেন, তাদের সবাইকে নিয়েই চিরকালীন হতে চায়। এই হচ্ছে সংসারের বন্ধন, মায়ার বাঁধন, এই হচ্ছে দেহাত্মবোধ। এই হচ্ছে অবিদ্যা, অজ্ঞান, মায়া - যে নামেই তাকে ডাকুন না কেন। 

কিন্তু ঋষিপুরুষগন বলছেন,  সত্য হচ্ছে আমি দেহ নোই।  এই দেহ আমার আশ্রয়স্থল মাত্র, এই দেহে আমি ক্ষনিকের জন্য অবস্থান করছি মাত্র। আমি সেই অমর আত্মা, আমার জন্ম-মৃত্যু বলে কিছু নেই। কিন্তু দেহাত্মবোধ আমাদেরকে  মরণশীল করেছে। এই আত্ম-জ্ঞান যখন প্রকাশিত হবে, অর্থাৎ আমি এই দেহ নোই - এই জ্ঞানের উদয় হবে, তখন আমাদের মৃত্যুভয় চলে যাবে। আমি অমৃতের পুত্র - এই বোধ আমাকে অবিনশ্বর করে দেবে। এই জ্ঞানকেই যোগীপুরুষগন বলে থাকেন দেহাত্মবিবেক। ঋষি পতঞ্জলির ভাষায় বিবেকখ্যাতি। এই দেহাত্মবোধ যখন চলে যাবে, তখন আমরা উপলব্ধি করবো, আমি জন্ম-মৃত্যু রহিত  অমর  আত্মা। আমি আছি, ছিলাম, থাকবো। কখনও  ব্যক্ত, কখনও  অব্যক্ত,  কখনও  আধারে কখনো নিরাধারে। 

তো বিবেকখ্যাতি হলো - বিবেক কথাটার অর্থ পুরুষ, আর খ্যাতি হচ্ছে জ্ঞান।  বিবেকখ্যাতির অর্থ হচ্ছে পুরুষ ও মহৎ (বুদ্ধির) এর মধ্যে ভেদজ্ঞান। যতক্ষন এই জ্ঞানের উদয় না হয়, ততক্ষন দৃশ্য ও দ্রষ্টার মধ্যে ভেদভাবের নিস্পত্তি হয় না। আর এই যে দৃশ্য তা আমাদের চিত্তের বৃত্তির আহরিত বিষয় - যা সে সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে প্রাপ্ত হচ্ছিলো। অর্থাৎ চিত্ত এই দৃশ্যগুলোকে আহরণ করে পুরুষকে প্রদর্শন করাচ্ছে। আর এই দর্শিত বিষয়গুলোকে সে  ভোগ করছে। এই হচ্ছে অজ্ঞান, এই হচ্ছে অবিদ্যার খেলা। যোগদর্শন বলছে, যোগসাধন প্রণালী অবলম্বন করে সাধনায় নিরন্তর অভিনিবেশ করলে, বুদ্ধি সত্ত্বের সঙ্গে পুরুষের যে ভ্রমাত্মক একাত্ব-ভাব তা দূর হয়ে যায়। একে কেউ  কেউ পরবৈরাগ্য বলে থাকেন। এর পরে যোগীগন  প্রজ্ঞাভূমিতে অবতীর্ন হন। প্রজ্ঞা অর্থাৎ প্রকৃষ্ট জ্ঞান বা যথার্থ জ্ঞান। 

এই যে বিবেকখ্যাতি, এতে সিদ্ধ হতে গেলে, সাধন বিনা গতি নেই। এর পরের দিন আমরা সেই যোগসাধন পদ্ধতি সম্পর্কে শুনবো। তবে শুধু শুনলে হবে না - শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও ধৈর্য্য সহকারে  নিরন্তর প্রয়াস করে যেতে হবে। তবেই সাধনফল আমাদেরকে মুক্তির পথে টেনে নিয়ে যাবে। 

যোগ কোনো শারীরিক কসরৎ নয়, যোগ হচ্ছে  একটা  জীবনশৈলী, একটা জীবনধারা, ভালোভাবে জীবন ধারনের কৌশলবিশেষ, জীবন সংগ্রামে উত্তীর্ন হবার উপায় বিশেষ। দুর্লভ এই মনুষ্য জীবনকে স্বার্থক  করবার একটা উপায় বিশেষ। স্বরূপের উপল্বদ্ধির উপায় হতে পারে এই যোগ। আত্মজ্ঞান লাভের  প্রক্রিয়া বিশেষ।  তাই যোগ সর্ব্বজনীন - সবার জন্য - জাতি ধর্ম্ম বর্ণ  দেশ কাল নির্বিশেষে জীবনকে উন্নত  করবার একটা বিশেষ প্রক্রিয়া। 
আর এই জীবনশৈলীকে অর্থবহ রূপ দিতে গেলে একটা বিশেষ পরিবেশ সাহায্য করতে পারে। আমাদের সামনে একজন আদর্শ যোগীপুরুষ যদি থাকেন, তবে এই যোগক্রিয়া কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারে। নতুবা এই যোগের অনুষ্ঠান অসম্ভব না হলেও কঠিন হয়ে ওঠে, এব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই। যোগবিদ্যা কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়।  এটি একটি কার্য্যকরি বিদ্যা। শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস সহকারে নিরন্তর এর অভ্যাস করতে হয়। নতুবা এই বিদ্যা নিস্ফলা। এই কারনে যোগবিদ্যা গুরুমুখেই শোনা শ্রেয়। এই  বিদ্যা পুঁথিগত বিদ্যা থেকে আলাদা কিছু, বা তার থেকেও বেশি কিছু। কেবল পান্ডিত্য বা বুদ্ধির সাহায্যে এই সত্যকে উপলব্ধি করা যায় না। তবে একথাও ঠিক অধ্যয়ন নিশ্চয়ই করা উচিত। দৈনন্দিন অধ্যয়নের অভ্যাস আমাদের চিন্তাধারাকে পরিশীলিত করে। বাহ্যিক আচার অনুষ্ঠানের চাইতে পবিত্র ও সংযতমনা হয়ে ধ্যানপরায়ন জীবন অনেকবেশি শান্তি এনে দিতে পারে।  
 
যাইহোক, আমাদের উদ্দেশ্য মানুষকে এই বিদ্যা অৰ্জনে কেবলমাত্র আগ্রহী করে তোলা।  এর  যথাযথ প্রয়োগ কেবলমাত্র শ্রীগুরুর সান্নিধ্যেই  সম্পন্ন হতে পারে,  আর  তখনই  এই বিদ্যা যথাযথ ফলপ্রসূ হয়ে থাকে।  একটা জিনিস জানবেন, পরিবেশ ও সৎসঙ্গ মানুষকে তার স্বভাবে আমূল পরিবর্তন এনে দিতে পারে। এই সৎসঙ্গ বা পরিবেশের কোনো বিকল্প নেই। একজন আদর্শবান  পুরুষ বা  যোগাচার্য্য  সামনে থেকে নির্দেশ দিলে, অর্থাৎ একজন যোগসিদ্ধ পুরুষ সামনে  থাকলে, তার জীবনচরিত কাছ থেকে দেখতে পেলে, আমাদের যোগক্রিয়ায় আকর্ষণ হবে, যোগক্রিয়ার ভুল-ত্রুটির আশু সংশোধন হবে এবং  এই যোগবিদ্যা কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারবে । সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর উপযোগিতা উপল্বদ্ধিতে আসবে। এখন কথা হচ্ছে যদি আমাদের সামনে এই যোগগুরু উপস্থিত না থাকে, তবে কি করবো ? সম-মানসিকতার কিঁছু ভাই-বন্ধু একত্রিত হয়ে, অর্থাৎ সম্মিলিত ভাবেও এই যোগের অভ্যাস করা যেতে পারে। এবং নিজেদের ভুলত্রুটি নিজেরাই সংশোধন করে নেওয়া যেতে পারে।   

যাই হোক,যোগের আটটি অঙ্গ - বা যোগ  আট প্রকার। আমরা সংক্ষেপে শুনে নেবো।  তার আগে শুনে নেই, যোগ কেন করবো ? 

আমাদের ভ্রমজ্ঞানের কারনে যে অশুদ্ধির উৎপত্তি হয়, তার নাশ হয়ে থাকে এই যোগের অনুষ্ঠানে । আর এই অশুদ্ধি নাশের  ফলে আমাদের সম্যগ্জ্ঞানের প্রকাশ হয়ে থাকে। যেমন যেমন সাধন চলতে থাকবে, তেমন তেমন অশুদ্ধির নাশ হতে থাকবে, আর যেমন যেমন অশুদ্ধির নাশ হতে থাকবে, সেই ক্রোম অনুযায়ী আমাদের অজ্ঞান অন্ধকার কেটে জ্ঞানের দীপ্তি প্রজ্বলিত হতে থাকবে। একসময় বিবেকখ্যাতির উদয় হবে। অর্থাৎ সাধনার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেহাত্মবোধের নাশ হতে শুরু করবে। 

এখন কথা হচ্ছে আমাদের এই যে দেহাত্মবোধ এর কারন কি ? যোগাচার্য্যগণ বলছেন এর কারন হচ্ছে : উৎপত্তি, স্থিতি, অভিব্যক্তি, বিকার,  প্রত্যয়, আপত্তি, বিয়োগ, অন্যত্ব, ও ধৃতি। আর এই সবই হচ্ছে মনের বিকার  মাত্র।  শরীরে আহার না দিলে তার অভিব্যক্তি থাকবে না। অর্থাৎ আহারের অভিব্যক্তি হচ্ছে শরীর।অগ্নিতে ইন্ধন না দিলে, অগ্নি নির্বাপিত হয়ে যাবে।  তো আমাদের যে দেহাভিমান, তার যে কারন বা ইন্ধন সেগুলোর অপ্রাপ্তিতে আমাদের দেহাভিমান চলে যাবে। 

ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, যোগাঙ্গ  আট  প্রকার যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান, সমাধি। আর সাধনা দুই প্রকার বহিরাঙ্গ সাধনা ও অন্তরঙ্গ সাধনা। অর্থাৎ এই আট  প্রকার যোগাঙ্গের মধ্যে কিছু হচ্ছে বহিরঙ্গ সাধনা আর কিছু হচ্ছে অন্তরঙ্গ  সাধনা। 

ঋষি পতঞ্জলি তাঁর যোগদর্শনের সাধনপাদের ২৯ নং শ্লোকে বলছেন : 

"যম -নিয়মাসন-প্রাণায়াম-প্রত্যাহার-ধারণা-ধ্যান-সমাধয়োহষ্টাঙ্গানি " (সাধনপদ-২৯)

যোগের আটটি অঙ্গ - যম , নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা , ধ্যান ও সমাধি।
 
পরবর্তী শ্লোকগুলোতে এসব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। 

এই যম সম্পর্কে বলছেন, অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য, অপরিগ্রহঃ, এগোলো হলো যম। 

এর পরে হচ্ছে নিয়ম - নিয়মের পাঁচটি প্রত্যঙ্গ আছে সেগুলো হোলো  শৌচ, সন্তোষ, তপস্যা, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বর প্রণিধান। 

এর পর হচ্ছে আসন - স্থির ভাবে সুখে বসে থাকাই হলো আসন। 

এর পর প্রাণায়াম - আসনে সিদ্ধ হলে, শ্বাস-প্রশ্বাস  ও তাদের গতির যে রোধ তা হলো প্রাণায়াম। 

এর পর প্রত্যাহার - নিজ (বাহ্য) বিষয়ের প্রতি চিত্ত যখন সংযোগের অভাববোধ করে, অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গুলোর অথর্ব অবস্থাই প্রত্যাহার। এই অবস্থায় ইন্দ্রিয়গুলো চরম বশ্যতা স্বীকার করে। 

এরপর ধারণা  - দেশ বিশেষে চিত্তের স্থিতি হলো ধারণা। 

এরপর ধ্যান - ধারণাজনিত প্রত্যয়ের  একতানতা হচ্ছে ধ্যান। 

সবশেষে সমাধি  - ধ্যান যখন গভীর হয়, অর্থাৎ বিষয়মাত্র প্রকাশে স্বরূপ শূন্য মতো হয়, তখন তা হলো সমাধি। 

এই হচ্ছে সংক্ষেপে যোগক্রিয়ার পরিচয়। 

আমার মাঝে মধ্যে মনে হয়, আমরা এই মরণশীল শরীর রক্ষার জন্য, শরীরের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য,  তার পুষ্টির  জন্য সারাজীবন ধরে  কত কসরৎ করি, খাদ্য পানীয় গ্রহণ করি। আমাদের মনের ক্ষুধা মেটাবার জন্য কতনা বিনোদনের ব্যবস্থা করি।  কিন্তু একবারও আমরা আমাদের জীবাত্মার জন্য ভাবি না।  এই জীবাত্মা যে সারাটা জীবন ধরে উপবাসী রয়ে গেলো, তার খবর কে রাখে ? কিন্তু কথা হচ্ছে শরীরের ক্ষুধাবোধ আছে, মনের দুঃখ-কষ্ট  আছে - তা আমরা অনুভব করি।  কিন্তু আত্মা বা জীবাত্মার কষ্ট  আমরা অনুভব করি না। জীবাত্মার আবার কিছু চাইবার আছে নাকি ? হ্যাঁ আছে, জীবাত্মা সেই অনন্ত চৈতন্যের সাথে মিলিত হবার জন্য ব্যাকুল হয়ে রয়েছে। জানিনা তার কোনো চোখ আছে কি না, থাকলে সেখানে নিশ্চয়ই অশ্রু  ভরে  আছে। জানিনা তার কোনো মুখ আছে কি না, তাহলে নিশ্চয়ই চিৎকার করে কান্না করতো।  এই জীবাত্মা প্রেমের কাঙাল, শুদ্ধ প্রেমের পরমানন্দ উপল্বদ্ধির জন্য সে ব্যাকুল হয়ে রয়েছে। তার সেই ব্যাকুলতা আমরা উপলব্ধি করতে পারি না।  যেদিন এই জীবাত্মার জন্য একটু সময় বের করে, তার শান্তির জন্য ধ্যানাদিতে নিজেকে নিযুক্ত করবো, সেদিন  থেকে  আমাদের একটা নতুন জীবন শুরু হবে।

হরি  ওং তৎ  সৎ।  

সমাপ্ত। 


   


 


   



    
 
  

     ,



                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                     









      




  

  




 














  


Comments

Popular posts from this blog

নিত্যকথা

ঈশ্বর ও তাঁর উপলব্ধি

সত্যধর্ম্ম ও প্রেম