ঈশ্বর ও তাঁর উপলব্ধি
ঈশ্বর ও তাঁর উপলব্ধি - মূল সূত্র : মহাত্মা গুরুনাথ সেনগুপ্ত প্রণীত তত্ত্বজ্ঞান - প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড
আমাকে বলা হয়েছিল, ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব সম্পর্কে কিছু কথা বলা।
মহাত্মা গুরুনাথ সেনগুপ্ত বলছেন,
সর্ব্বাত্মনে নমস্তুভ্যং নির্গুনায় গুণাত্মনে। "
অনির্ব্বাচ্য তুমি প্রেমময় প্রভু, তুমি যা হও তাই হও। তুমিই সর্ব্বাত্মা, তুমি নির্গুণ, আবার তুমিই সগুন। তোমাকে প্রণাম করি।
এখন কথা হচ্ছে, তাই যদি হয়, আমাদের জীবনে যদি ঈশ্বরের কোনো ভূমিকায় না থাকে, এখানে অর্থাৎ প্রকৃতির জগতে যদি ঈশ্বরের কোনো হাত না থাকে তবে এই ঈশ্বরের উপাসনা করে আমাদের কি লাভ ? ঈশ্বরের আরাধনা করে আমাদের কি লাভ ? ঈশ্বরের উপাসনা করে কি আমরা নীরোগ শরীর পাবো, শারীরিক জরা ব্যাধি থেকে মুক্তি পাবো ? জন্ম মৃত্যুর যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পাবো ? না তা হবে না। তবে কি হবে ? আমাদের নতুন করে হাত-পা-মাথা গজাবে ? যাঁরা ঈশ্বরের সন্ধান পেয়েছেন, তারা কি কোনো পরশ পাথরের হাতে পেয়েছেন যা থেকে তার সমস্ত পার্থিব দুঃখ-কষ্ট থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছেন ?
তাহলে যুগ যুগ ধরে মানুষ যে ঈশ্বরের সন্ধান করছেন, তার কারন কি ? মহাত্মা গুরুনাথ সেনগুপ্ত বলছেন, যাঁকে বাক্য দ্বারা প্রকাশ করা যায় না, তিনি প্রেমময়, সগুন, আবার নির্গুণ। তিনি সর্বভূতে স্থিত জীবাত্মা আবার তিনি এই জীবাত্মার আত্মা অর্থাৎ পরমাত্মা।
মহাত্মা বলছেন, এই পরমপুরুষকে লাভ করবার উপায় হচ্ছে, উপাসনা। আর এই উপাসনা একসময় উপাসককে উপাস্য হিসেবে ভূষিত করে থাকে। অর্থাৎ যাঁর উপাসনা আপনি করছেন, বা যাঁকে আপনি উপাসনা করছেন, তার সমস্ত গুণাদি বা শক্তি আপনাকে আশ্রয় করবে। অর্থাৎ উপাসক ধীরে ধীরে উপাস্যকে ভূষণ রূপে প্রাপ্ত হবে। ঈশ্বর আছেন। আমরা সবাই ঈশ্বর থেকেই উদ্ভূত, ঈশ্বরের সঙ্গেই বাস করছি, অন্তিমে আবার সেই ঈশ্বরের সঙ্গেই মিলিয়ে যাবো। কিন্তু আমরা ঈশ্বরের সন্ধান পাচ্ছি না। এ এক অদ্ভুত জাদু। দেখছি কিছু দেখছি না। শুনছি কিন্তু শুনছি না। এর কারন হচ্ছে আমরা নিজেদেরকে অষ্টপাশে আবদ্ধ করে ফেলেছি। নিজেদেরকে ওষুধ করে ফেলেছি। আমরা যা নোই তার মধ্যে প্রবেশ করে, নিজেকে তাই ভাবতে ভাবতে বিভোর হয়ে গেছি। আর এই কারণেই ধর্ম্মের উদ্ভব হয়েছে। ধর্ম্ম মানুষের মনের ময়লাকে দূর করে দিতে পারে। মহাত্মা গুরুনাথ প্রণীত ধর্ম্মশাস্ত্র সেই ইঙ্গিত দিয়ে থাকে। কিন্তু কথা হচ্ছে, কেবল শাস্ত্রপাঠ আমাদের জীবন বোধের পরিবর্ত্তন করতে পারে না। এর জন্য দরকার মহাত্মা নির্দেশিত পথের নিরন্তর অনুশীলন।
মহাত্মা গুরুনাথ সেনগুপ্ত বলছেন, ঈশ্বর সগুন, আবার সেই একই ঈশ্বর নির্গুণ। সগুন অর্থাৎ ত্রিগুণাত্বক প্রকৃতির সান্নিধ্যে তিনি সগুন। আবার তিনি নির্গুণ অর্থাৎ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থা বিশেষ। তিনি ত্রিগুণাত্মক প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে সগুন হয়েছেন, আর আমরা সবাই এই প্রকৃতির কোলে, প্রকৃতি থেকে জাত ক্ষনিকের জন্য প্রকাশিত জীবনের সঙ্গে সম্ভোগ করছি। এই স্থূল শরীরের মধ্যেই আছেন জীবাত্মা যা আসলে আত্মার প্রতিফলিত সত্ত্বা বিশেষ। এই জীবাত্মা ত্রিগুণাত্বক প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে ইন্দ্রিয়াদির সাহায্যে ভোগাদি সম্পন্ন করছে। মহাত্মা গুরুনাথ বলছেন, এই যে জগৎ দৃষ্টিগোচর হচ্ছে, এর জড় অংশ পরমেশ্বরের অনন্ত নিরাকারত্ব ও অনন্ত সাকারত্ব একত্ব-নামক গুন্ হেকে উৎপন্ন হয়েছে। এবং এই জড় অংশের মধ্যে যে চৈতন্য আছে, তা সেই পরমেশ্বের সাক্ষাৎ অংশ।
তো আমাদের মধ্যেই আছে, সেই চৈতন্য আবার আমাদের মধ্যেই আছে সেই জরসত্ত্বা। চৈতন্য সহযোগে এই জরসত্ত্বা জীব নামে খ্যাত। জড় সত্ত্বার কোনো বোধ নেই। কিন্তু এর মধ্যে যেহেতু চৈতন্য সত্ত্বার স্থিতি আছে, তাই আমাদের মধ্যে দুঃখ কষ্টের অনুভব হচ্ছে। তো দুঃখ কষ্টের অনুভব থেকে বেরুতে গেলে, আমাদের হয় এই জড় সত্ত্বা থেকে চৈতন্যকে আলাদা করতে হবে। এই আলাদা করার কাজটাই হচ্ছে সাধনা। নিরন্তর সত্ত্বগুণের অনুশীলন।
আমরা যেখানে আছি, অর্থাৎ প্রথমে এই ত্রিগুণাত্বক প্রকৃতিকে যথার্থ ভাবে উপলব্ধি করতে হবে। তো প্রকৃতিতে সবই গুনের খেলা। সত্ত্ব, রজঃ তমঃ। সত্ত্বগুণ সুখাত্মক, রজোগুণ দুঃখাত্মক, আর তমোগুণ মোহাত্মক। আর এই কাজটি সম্পন্ন হতে পারে, যথার্থ ধ্যান ও উপাসনার দ্বারা।
মহাত্মা বলছেন, উপাসনার দুটো ভাগ একটা হচ্ছে, (৩) উপাস্যের গুনকীর্তন আর একটি হচ্ছে (২) স্বীয় পাপকথন। প্রথমেই বলি এই যে স্বীয় পাপ-কথন এটি আমাদের দুষ্কর্ম্মের স্বীকার বা বর্ননা নয়, পাপ হচ্ছে আমাদের অষ্টপাশ (লজ্বা, ঘৃণা, ভয়, জাতি, কুল, মান, শঙ্কা ও জিগীষা) অর্থাৎ আমাদের আত্মাকে যা থেকে রক্ষা করা কর্তব্য বা বলা যেতে পারে, আত্মার অধোগতিকে রুদ্ধ করাই আমাদের কর্তব্য। এই অষ্টপাশ আত্মাকে নিম্নগামী করেছে। এখান থেকে আত্মাকে শুদ্ধ করে আমাদের কাজ হবে, আত্মার শুদ্ধত্বকে প্রকাশ্যে আনা . আর এটা করতে পারলেই, জানবেন আমাদের আত্মন্নতি সম্ভব। এর পরের যাত্রা হচ্ছে আমাদের নিরন্তর পরমপিতার ধ্যানে নিমগ্ন থাকতে হবে।
মহাত্মা বলছেন, এই যে গুনকীর্তন, তা একটি মহাযজ্ঞ। সংকল্প এই যজ্ঞের বেদী, নিরন্তর রোযাস এর মহান অগ্নি। উৎসাহ এই যজ্ঞের উদ্দীপক, পাপ এই জগ্যের সমিধ কাষ্ঠ, দোষরাশি এর হবিঃ। জীবাত্মা এই যজ্ঞের হোতা। আর মোক্ষলাভ হয়ে এই যজ্ঞের ফল।
উপাসনাতে যেমন আমাদের চিত্ত পরমাত্মা মুখী হয়ে ওঠে, তেমনি ধ্যানাদি আমাদেরকে চিত্তবৃত্তির নিরোধ করে থাকে। দেখুন বাতাস তো বইছে, কিন্তু এই বাতাসের শক্তি অনুভব করতে গেলে, আমাদের পাল তুলে দিতে হবে। ঠিক তেমনি ঈশ্বরের শক্তি অনুভব করতে গেলে, আমাদের উপাসনা ও ধ্যানাদির সাহায্য নিতে হবে। আর এই ঈশ্বর অনুভূতি যখন আমাদের হবে, তখন এক অনির্বচ্চনীয় আনন্দ, উল্লাস, প্রশান্তি আমাদেরকে ঘিরে রাখবে। তখন এই জাগতিক কোনো বিপর্যয় আমাদেরকে উদ্বিগ্ন করতে পারবে না। তখন এক সন্দেহটাতিত ঈশ্বরজ্ঞানের উদয় হবে। আমাদের চরিত্রে একটা পরিবর্তন আসবে। আমরা তখন একটা পবিত্র জীবনের সন্ধান পাবো। মানসিক শক্তি যাবে বেড়ে, শঙ্কা যাবে দূর হয়ে. নতুন আশার সঞ্চার হবে। সমস্ত ভয় দূর হয়ে যাবে। তখন আপনি অবশ্যই অনুভব করবেন, যে কেউ একজন আপনাকে নিরন্তর ঘিরে রেখেছে, আপনাকে রক্ষা করছে। এই অদৃশ্য শুভশক্তিই পরম কল্যাণময় ঈশ্বর। এই শুভ শক্তি যখন আমাদের মধ্যে জাগ্রত হবে, তখন আমাদের মধ্যে ক্ষমা গুনের বৃদ্ধি হবে। অন্যের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে। জাগতিক সমস্ত বস্তুর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটবে। তখন জাগতিক সম্পদের চেয়ে অতিজাগতিক শক্তি আপনাকে ভর করবে। আর আপনি নির্ভিক চিত্তে জগতে বিচরণ করবেন। ঈশ্বর আপনার সঙ্গেই আছেন, শুধু আমাদেরকে সজাগ থাকতে হবে। ঈশ্বরের জন্য প্রাণ-মনকে উন্মুখ করতে হবে। নিজেকে চৈতন্যের সঙ্গে একাত্মীভূত করতে হবে। তবেই আমরা ঈশ্বরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবো। জাগ্রত অর্থে হবে

Comments
Post a Comment