নিত্যকথা
নিত্যকথা - শশাঙ্ক শেখর শান্তিধাম
ঈশ্বরের ধ্যান।
আমি যদি নিজেকে সৎ রাখতে পারি, পবিত্র রাখতে পারি, তবে নিজের মধ্যে একটা শক্তি অনুভব করতে পারি। এই ব্যাপারে একটু স্বার্থপর হওয়া ভালো। কোনো অবস্থাতেই নিজের এই অবস্থান থেকে যেন সরে না আসি । এই ব্যাপারে একটা দৃঢ় অবস্থান নেওয়া ভালো। তখন দেখবেন, আপনার ভিতরের এই শক্তি যেকোনো রকমের অশুভ শক্তিকে প্রতিহত করবে। আপনার চিন্তা ধারার মধ্যে সঠিক বিচার করবার শক্তি অৰ্জন হবে। লোকে বলে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করো। আমি বলি, ঈশ্বরকে আমি জানি না, চিনিনা, না কেউ ঈশ্বরকে দেখেছে, না কেউ ঈশ্বরকে দেখাতে পারে। ঈশ্বর আমাদের কাছে একটা সর্ব্বশক্তিমান কাল্পনিক চিত্র বিশেষ, যাঁর কোনো বাস্তব অস্তিত্ত নেই। যদি থেকেও থাকে, তার অনুভব আমাদের কারুর কাছে নেই। সবচেয়ে বড়ো কথা হচ্ছে ঈশ্বর সম্পর্কে বলা হয়, ইনি বাক্যের অতীত, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়। তো যা বাকের অতীত, তাকে শব্দ বা বাক্য দিয়ে প্রকাশ করা বাতুলতা মাত্র। যা ইন্দ্রিয়াতীত তা চাক্ষুস হবে কি করে ?
অন্যদিকে বাস্তব সত্য হচ্ছে, আমাদের সবার মধ্যে একটা আত্মা আছে, যার শক্তিতে আমরা সবাই জীবিত আছি । এই শক্তিই আমাদের অজ্ঞাতসারে শ্বাসক্রিয়ার সাহায্যে প্রাণের প্রবেশ ও নিষ্ক্রমন ক্রিয়া নিরন্তর করে চলেছে। এই শ্বাসই এই শরীরকে ক্রিয়াশীল করে রেখেছে। এই শ্বাসক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলে, আমরা অর্থাৎ এই দেহ যাকে ঘিরে "আমির" বা আমি-বোধের জন্ম হয়েছে তা জড়-পচনশীল পদার্থে পরিণতি প্রাপ্ত হয় । এই সত্য আমাদের কাছে অভিজ্ঞতালব্ধ সত্য।
কিন্তু এই আত্মার অবস্থান সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। বলাহয়, আমাদের হৃদয়াকাশে এই আত্মার অবস্থান, কেউ বলেন চিদাকাশে এই আত্মার অবস্থান। আর ঠিক এই কারণেই, আমরা কাউকে হত্যা করবার জন্য বুকে ছুরি বসিয়ে দেই, নতুবা মাথাটা কেটে ফেলি। আর ঠিক তক্ষুনি শরীরে শ্বাসবায়ুর ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়, বা বলা যেতে আত্মা শরীর ছেড়ে অনন্তে পারি দেয়।
যাইহোক, আমরা একটা কিছুর সমন্বয়ের কারনে জীবিত, আর সমন্বয়ের অভাবে মৃত হয়ে যাই। এই যে শক্তির সমন্বয় সেই শক্তি অনন্ত বিশ্বে বিরাজ করছে। পৃথিবীর মাটির তলায়, সাগরের জলের তলায়, বিশ্বকোষে এই শক্তি যুগাতীত কাল যাবৎ বিরামহীন ভাবে বিরাজ করছে। আর আমরা সবাই এই বিশ্ব-আত্মার একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ যা আমাদের বোধশক্তি হিসেবে বিরাজ করছে। এই বোধশক্তির কারণেই, আমি আমাকে "আমি" ভাবছি, সমস্ত কর্ম্মের "কর্ত্তা" ভাবছি, সুখ-দুঃখের অনুভব করতে পারছি। তো বিশ্বাত্মার অংশবিশেষ যেমন আমাদের শরীরে অবস্থান করছে, তেমনি এই শরীরে আরো একটা সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয় অর্থাৎ মন বিরাজ করছে। এই মনও বিশ্বমনের অংশ বিশেষ। আমরা যদি একটু স্থির চিত্তে ধ্যানস্থ হতে পারি, এই কথাগুলোর মনন করতে পারি, তবে একথাগুলোর মধ্যে আমাদের শ্রদ্ধা ভক্তি বিশ্বাস জাগবে । তখন আমরা একটা উচ্চতর চেতন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারবো নিজেদেরকে । একটা সময় আসবে, যখন আর বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে হবে না। ধ্যানস্থ হয়ে আমরা সবাই সেই অব্যক্ত পরমেশ্বরের অনুভব করতে পারবো। তখন সমস্ত সংশয় কেটে যাবে। আমরা সবাই সেই বিরাট পুরুষের অংশ, আমরা সবাই পরমাত্মার সন্তান, এই অনুভবে আপ্লুত হয়ে নির্ভিক ও আনন্দময় সত্ত্বা হিসেবে এই বিশ্বে সতত বিরাজ করবো।
----------
DAILY TALKS - Shashank Shekhar Shantidham
13.01.2025
Meditation on God.
If I can keep myself honest, keep myself pure, then I can feel a power within myself. It is better to be a little selfish in this regard. Do not deviate from this position under any circumstances. It is better to take a firm stand in this regard. Then you will see that this power within you will resist any kind of evil force. You will gain the power to judge correctly in your thought process. People say, pray to God. I say, I do not know God, I do not know him, nor has anyone seen God, nor can anyone show him to me. God is an almighty imaginary image to us, who has no real existence. Even if he exists, none of us have the feeling of him. The biggest thing is that it is said about God, he is beyond words, not perceptible to the senses. So, expressing what is beyond words with words or sentences is just nonsense. How can that which is beyond the senses be seen?
On the other hand, the real truth is that we all have a soul within us, by whose power we are all alive. This power is the one that keeps the inflow and outflow of life going on without our knowledge through the breathing process. This breath is what keeps this body active. When this breathing process stops, we, that is, this body around which the "Amir" or the sense of self has been born, end up in a material and perishable substance. This truth is an experienced truth for us.
But we do not know anything about the location of this soul. It is said that this soul is located in our heart space, some say that this soul is located in the space of the ajna chakra. And for this very reason, we put a knife in the chest to kill someone, or we cut off their head. And right then the breathing process stops in the body, or it can be said that the soul leaves the body and passes away forever.
However, we are alive due to the coordination of something, and we die due to the lack of coordination. This coordination of energy is the energy that exists in the infinite world. Under the earth's soil, under the water of the ocean, in the universe, this energy has existed uninterruptedly for ages. And we are all a tiny part of this universal soul which exists as our cognitive power. Because of this cognitive power, I think of myself as "I", I think of myself as the "doer" of all actions, I can feel happiness and sorrow. So just as a part of the universal soul is present in our body, in this body there is another subtle sense, i.e. mind. This mind is also a part of the universal mind. If we can meditate with a steady mind, can contemplate these words, then our respect, devotion, faith will awaken in these words. Then we will be able to take ourselves to a higher level of consciousness. A time will come when we will no longer have to swing in the swing of belief or disbelief. By meditating, we will all be able to feel that unmanifested Supreme God. Then all doubts will be removed. We are all part of that great man, we are all children of the Supreme Soul, we will be filled with this feeling and will always exist in this world as fearless and joyful beings.
----------
নিত্যকথা - শশাঙ্ক শেখর শান্তিধাম
১৪.০১.২০২৫
ঈশ্বরের ধ্যান।
মৃত্যুর রাজা বলছেন, মানুষের সামনে দুটো পথ খোলা, একটা ভালো কাজ আরেকটা খারাপ কাজ। এই যে খারাপ কাজ, এটি কিন্তু খারাপ নয়, এটি আমাদের জাগতিক সুখ প্রদান করে। উপনিষদের ভাষায় একটা শ্রেয় আরেকটা প্রেয়। এইযে প্রেয় কর্ম্ম এটি আমাদের কাছে সুখপ্রদ। আমাদের মতো সাধারণ মানুষ এই প্রেয় অর্থাৎ সাময়িক সুখপ্রদ কাজকে বেশি পছন্দ করি। কিন্তু যাঁরা প্রাজ্ঞব্যাক্তি, তাঁরা এই প্রেয়কে ছেড়ে শ্রেয় কর্ম্মকে গ্রহণ করেন। তো একটা আপাত দুঃখপ্রদ, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য সুখপ্রদ, আরেকটা আপাত সুখপ্রদ কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য দুঃখপ্রদ । এই দুটোর কোনোটাতেই চিরস্থায়ী শান্তি পাওয়া যায় না। কেউ ইহলোকে ভালো থাকবার জন্য ক্রিয়া করেন, আবার কেউ পরলোকে ভালো থাকবার জন্য ক্রিয়া করেন। কেউ ইহলোকে সুখে শান্তিতে থাকতে চান, কেউ পরলোকে অর্থাৎ স্বর্গসুখে থাকতে চান। কেউ বর্তমানে শান্তির খোঁজ করছেন, কেউ ভবিষ্যতের শান্তির খোঁজ করছেন। আর এই দুই বিপরীত মেরুর অবস্থানকারী মানুষ কখনো চিরশান্তি লাভ করতে পারেন না।
যমরাজ নাচিকেতাকে বলছেন, (কঠোপনিষদ - ১/২/৬ ) সংসারে আসক্তচিত্ত বিত্তাদিতে আচ্ছন্ন বালসুলভ বিবেকহীন অপরিণত বুদ্ধির লোকের কাছে পরলোকের স্মরণ হয় না। তারা কেবল এই আপাতদৃশ্যমান জগৎ দেখতে পায়। পরলোকের অস্তিত্ত্ব তাদের কাছে মান্যতা পায় না। যমরাজ বলছেন, এরা সবাই আমার বশ্যতা স্বীকার করে, আমার অধীনে ফিরে ফিরে আসে। অর্থাৎ এরা জন্ম-মৃত্যুর পাকচক্রে ঘুরপাক খায়। এরা কখনো আত্মজ্ঞান লাভের জন্য সচেষ্ট হয় না। আর আত্মজ্ঞান লাভ হবেই বা কিভাবে ? কারন আত্মজ্ঞান দানের জন্য উপযুক্ত ব্রহ্মজ্ঞই বা কোথায় ? যিনি নিজেকে ব্রহ্মরূপে জেনেছেন, তিনিই ব্রহ্মজ্ঞ, তিনিই এই আত্মজ্ঞান দানের উপযুক্ত আচার্য্য। পুঁথিগত বিদ্যা, যুক্তিতর্ক, এমনকি অসাধারন পার্থিব জ্ঞান, এই অপার্থিব অব্যক্ত বস্তুর অস্তিত্ত্ব সম্পর্কে কোন জ্ঞান প্রদান করতে পারে না। যার মধ্যে অপার্থিব বস্তুর বোধের উৎপত্তি হয়েছে তিনি ব্রহ্ম ও নিজের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতে পারেন না। তিনি স্বয়ং ব্রহ্ম কারন তিনিই স্বরূপকে জেনেছেন। এঁকে সাধারণ মানুষ পাগল বলতে পারে, ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতে পারে, কারন সাধারণ মানুষের বুদ্ধির সীমার মধ্যে এই ব্রহ্ম পুরুষ বিচার্য নন। একে সাধারণ মানুষের বুদ্ধির মাপকাঠিতে মাপা অসম্ভব হয়ে যায়।
---------
DAILY TALKS - Shashanka Shekhar Shantidham
14.01.2025
Meditation on God.
The king of death says that two paths are open before man, one good deed and the other bad deed. This bad deed is not bad, it gives us worldly happiness. In the words of the Upanishads, one is good শ্রেয়ঃ and the other is love (প্রেয়ঃ). This is the love deed that gives us happiness. Ordinary people like us prefer this love, that is, work that gives temporary happiness. But those who are wise, leave this love and accept good deed. So one is apparently painful, but it gives happiness for the future, the other is apparently happy but it gives sadness for the future. In neither of these two can one find permanent peace. Some act to be good in this world, and some act to be good in the next world. Some want to be happy and peaceful in this world, and some want to be happy in the next world, that is, in heaven. Some are seeking peace in the present, some are seeking peace in the future. And people who are at these two opposite poles can never attain eternal peace.
Yamaraj says to Nachiketa, (Kathupanishad - 1/2/6) People of childish, immature intellect, obsessed with wealth, attached to the world, do not remember the afterlife. They only see this apparent world. The existence of the afterlife is not accepted by them. Yamaraj says, all of them accept my submission, return to my subjugation. That is, they go around in the cycle of birth and death. They never strive to attain self-knowledge. And how will self-knowledge be attained? Because where is the Brahman who is suitable for giving self-knowledge? He who has known himself as Brahman is the Brahman, he is the suitable Acharya for giving this self-knowledge. Textual knowledge, logic, and even extraordinary worldly knowledge cannot give any knowledge about the existence of this unearthly, unmanifested object. He in whom the perception of the unearthly object has arisen cannot differentiate between Brahman and himself. He is Brahman Himself because he has known the form. The common man may call him mad, may ridicule him, because this Brahman Purusha cannot be judged within the limits of the common man's intellect. It becomes impossible to measure him by the standard of the common man's intellect.
নিত্যকথা - শশাঙ্ক শেখর শান্তিধাম
১৫.০১.২০২৫
ঈশ্বরের ধ্যান।
আত্মা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নহে। আত্মাকে আমরা চাক্ষুষ করতে পারি না। তাই যদি হয়, তবে আত্মা কিভাবে আমাদের জ্ঞাতব্য হবেন ? আর সত্য কথা বলতে কি, এই আত্মাকে না দর্শন করে, আত্মাকে না জেনে, আমরা তো কেউ খারাপ নেই। বেশ তো খাচ্ছি যাচ্ছি ঘুরে বেড়াচ্ছি। নিদ্রা, ভোজন, রমন, করে ভালোইতো আছি। ছেলেপুলে নিয়ে, বিষয়-আশয় নিয়ে সুখে শান্তিতেই আছি। তাহলে আত্মার আলোচনা বা এঁকে জানবার জন্য জন্ম থেকে জন্মান্তর ঘুরে বেড়াবার দরকার কি ?
তো একটা গল্প বলি। ভগবান শ্রীবিষ্ণু একবার শূকর হয়ে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। সেখানে তিনি জল-কাদার মধ্যে বছরের পর বছর বাস করতে লাগলেন। স্বরূপ ভুলে, নিজে শূকর-মা-বাবা-স্ত্রী-পুত্র পরিবার নিয়ে মল-মূত্র -০জল-কাদার মধ্যে বেশ সুখে দিন কাটাতে লাগলেন। এদিকে বিষ্ণুলোক ফাঁকা পরে রয়েছে বহুকাল। যমরাজ এলেন - তাকে মর্তলোকে থেকে বিষ্ণুলোকে নিয়ে যেতে। কিন্তু এই শূকর তো আসল শূকর নয়, এর তেজও আলাদা। শূকর-বিষ্ণু যমকে বাড়ি থেকে দূর করে দিলেন। বললেন ভাগো, তা না হলে তোমাকে যমের বাড়ি পাঠিয়ে দেব। যমরাজ ভয় পেয়ে পালিয়ে বাঁচলেন। শেষে প্রজাপতি ব্রহ্মা কে তার অসহায় অবস্থার কথা জানালেন। সৃষ্টি জগতে নিয়মের বাইরে কিছু হতে পারে না। যে জন্ম গ্রহণ করেছে, তাকে মরতেই হবে। এর অন্যথা হলে সৃষ্টি নড়বড়ে হয়ে যাবে। আবার বিষ্ণুর মতো দেবতাকে বাগে আনা কার সাধ্য। প্রজাপতি ব্রহ্মা মহাদেব রুদ্রকে ডাকলেন, বললেন কালের নিয়মে পালনকর্ত্তা শ্রীবিষ্ণুকে সৃষ্টিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য মর্তলোকে উভচর জীব হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে সে শূকর হিসেবে দীর্ঘকাল ঘরকন্না করছে। কিন্তু এখন তো সময় হয়েছে, তাকে আবার তার নিজস্ব লোকে ফিরে আসতে হবে। কিন্তু শ্রীবিষ্ণুতো তাঁর স্বরূপ ভুলে এখন নিজেকে শূকর ভাবতে শুরু করেছে। হে মহাদেব, তুমি গিয়ে তার ভুল ভেঙে স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত করো।
তো দেবাদিদেব মহাদেব মর্তে নেমে এলেন। এসে দেখলেন, দুর্গন্ধময় এক জলাধারে শ্রীবিষ্ণু শূকররূপে বিরাজ করছেন। চারিদিকে অসংখ্য ছোট বড়ো, বাচ্চা বুড়ো অনেক শূকর। মহাদেব শূকর-বিষ্ণুর কানের কাছে গিয়ে বললেন, হে বিষ্ণুদেব - এই জগতের পালনকর্ত্তা আপনি এখানে কি করছেন ? এই দুর্গন্ধময় জল কাদার মধ্যে আপনার কি কাজ ? প্রজাপতি ব্রহ্মা আপনাকে নিজভূমিতে চলে যেতে বলেছেন। আপনার অবর্তমানে বিষ্ণুলোক ফাঁকা পরে আছে। আপনার সেই দেবলোক এখন খা খা করছে। আর আপনি এখানে এই দুর্গন্ধ যুক্ত জল-কাদার মধ্যে শুকরের বাচ্চাদের সাথে নিজেকে কর্দমাক্ত করছেন ? ছিঃ একি চেহারা হয়েছে আপনার ? গা থেকে ভোটকা গন্ধ বেরুচ্ছে। তো শূকর বিষ্ণু মুখ ঘুরিয়ে মহাদেবের দিকে তাকালেন, তার স্মৃতি ফিরে এলো। কিন্তু শূকর-বিষ্ণু তার এই শূকর-সংসারে ছেলে মেয়ে নিয়ে মায়ার বাঁধনে আবদ্ধ হয়ে গেছেন। এই মায়ার বাঁধন কেটে তিনি বেরুতে চাইলেন না। বললেন, এখানে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে আমি বেশ ভালোই আছি। তুমি ব্রহ্মাকে গিয়ে বোলো, আমি আরো কিছুকাল এখানে থাকবো। দেবাদিদেব মহাদেব রুদ্র তাকে অনেক বোঝালেন। এটা আপনার জায়গা নয়, আপনি জীবের রক্ষাকর্তা, পালনকর্ত্তা - আপনার এই অবস্থা শোভা পায় না। শূকররুপী বিষ্ণু কিন্তু কোনো কথা শুনতে চাইছেন না। বলছেন, আমাকে বিরক্ত করো না। এখন এই জল-কাদার মধ্যে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে বেশ ভালোই আছি। তুমি বিদেয় হও। এখানে থেকে চলে যেতে আমার একদম মন চাইছে না। কিন্তু রুদ্রদেব তো ছাড়বার পাত্র নয়। শেষে ত্রিশূলের গুতো দিয়ে শ্রীবিষ্ণুর শূকরদেহের নাশ করলেন, এবং শ্রীবিষ্ণুকে নিয়ে ব্রহ্মলোকের দিকে ধাবিত হলেন ।
তো যারা ভালো আছেন, থাকুন। কিন্তু স্বল্প কিছু মানুষ আছেন, যারা মনে করেন লক্ষ-কোটি যোনি ভ্রমন করে, অর্থাৎ বহু জন্ম অতিক্রান্ত করে ভাগ্যক্রমে আজ আমরা এই দুর্লভ মনুষ্য শরীর পেয়েছি। আর এই যে লক্ষ কোটি জীবন তা আমার কেবল সুখে কেটেছে তো তো নয়, এই জীবনে আমি প্রত্যেকবার মাতৃগর্ভে দুর্গন্ধময় পুঁজ-রক্তের মধ্যে আমাকে অসহ্য যন্ত্রনা সহ্য করতে হয়েছে। কতবার যে বিয়োগ ব্যথায় কেঁদেছি, তা আজ আর আমার স্মৃতিতেও নেই। ভুলে গেছি সেই সব দিনের কথা যেদিন আমি মৃত দেহকে ঘিরে কেঁদেছি। মাতৃ-পিতৃ বিয়োগ ব্যাথায় কেঁদেছি। কত লাঠি ঝাঁটা খেয়েছি। কত অপমান সহ্য করেছি। লাখ লাখ দেহ ত্যাগ করে, মৃত্যু যন্ত্রনা সহ্য করে আবার সেই পুঁতিগন্ধময় অন্ধকার মাতৃগর্ভে প্রবেশ করেছি। মাতৃদেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেঁদেছি। চাই না আর সেই মৃত্যু যন্ত্রনা, চাইনা আর সেই গর্ভবাস জনিত জন্ম যন্ত্রনা। এই জন্ম মৃত্যুর চক্র থেকে বেরিয়ে আমি অনন্তের সঙ্গে একাকার হয়ে যেতে চাই। জানি না এই অনন্তে কে বা কি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে ? সেই সৎ-চিৎ-আনন্দের সঙ্গে একাকার হয়ে যেতে চাই। শুনেছি এই পথ বড়োই দুর্গম, এই স্থান দুর্জ্ঞেয়। অনেক সাধ্য-সাধন, অনেক আয়াস, অনেক কষ্ট সহ্য করে এই পথ পারি দেওয়া যায়। মহাজনগন নাকি এই পথেই গমন করেছেন।
আর সেখানে গিয়ে কি পেয়েছেন ? তিনি সুখ-দুঃখের অতীত হয়েছেন। ইনি সুখ-দুঃখে নির্বিকার হয়ে গেছেন । সুখে তিনি উৎফুল্ল নয়, আবার দুঃখেও তিনি অভিভূত নন। তিনি সমস্ত অবস্থাতেই শান্ত, নির্বিকার অচঞ্চল হয়ে সাম্য অবস্থায় বিরাজ করছেন। তার না আছে মান না আছে অপমান। ভালো মন্দের উর্দ্ধে শুভ্র মেঘের মতো উর্দ্ধ আকাশে বিরাজ করছেন। এসব কথা শুনে মনে হয়, তাহলে কি তাঁর কি আত্মসম্মান বোধ নেই ? তিনি কি জড় বস্তুর মতো অচেতন হয়ে অবস্থান করেন? মহাত্মাগণ বলছেন, না এমনটা নয়, এনার মন সদাই প্রসন্ন, ইনি সর্বোচ্চ শুদ্ধ চৈতন্যর সঙ্গে একাকার হয়ে নির্ম্মল বুদ্ধিসত্ত্বার মধ্যে অবস্থান করছেন। এনার না আছে বিয়োগ ব্যাথা, না আছে অভাব বোধ। এনার অপ্রাপ্তি বলে কিছু নেই। যখন যাকিছু তাঁর মনের মধ্যে উদয় হচ্ছে, তা তাঁর সামনে এসে উপস্থিত হচ্ছে। অপার আনন্দের মধ্যে সদা বিরাজমান এই ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ। আমরাও চাই সেই দুর্লভ অপার্থিব শান্তির অবস্থা। কিন্তু পাবো কিভাবে ? কে দেখাবে সেই পথ ? কে হাতে ধরে নিয়ে যাবে সেই দুর্গম পথে ?
-------------
DAILY TALKS - Shashanka Shekhar Shantidham
15.01.2025
Meditation on God.
The soul is not perceptible to the senses. We cannot see the soul. So if it is, then how can the soul be known to us? And to tell the truth, without seeing this soul, without knowing the soul, we are not bad at all. We are eating well, going around. I am doing well in sleeping, eating, and sexual activities. I am happy and peaceful with my children and my affairs. So is there any need to wander from birth to birth to know the soul?
Let me tell you a story. Lord Vishnu was once born as a pig. There he started living in water and mud for years. Forgetting his form, he started spending his days happily in the feces, urine, water and mud with his family of pigs-mother-father-wife-son. Meanwhile, Vishnu's world has been empty for a long time. Yamaraj came to take him from the mortal world to Vishnu's world. But this pig is not a real pig, its radiance is also different. Pig-Vishnu sent Yama away from his house. He said, "Bhago, otherwise I will send you to Yama's house." Yamaraj got scared and ran away. Finally, Prajapati He told Brahma about his helpless condition. Nothing can happen outside the rules in the world of creation. He who has taken birth must die. Otherwise, the creation will become unstable. Who can bring a god like Vishnu into the world? Prajapati Brahma called Lord Rudra and said that according to the rules of time, Lord Vishnu, the preserver, was sent to the mortal world as an amphibian creature to take the creation forward. There, he was living as a pig for a long time. But now the time has come, he has to return to his own people. But Lord Vishnu has forgotten his true form and has started thinking of himself as a pig. O Lord, you go and correct his mistake and establish him as his true form.
So Lord Devadidev Mahadev came down to earth. When he came, he saw that Lord Vishnu was residing in a foul-smelling reservoir in the form of a pig. There were countless pigs, young and old, all around. Mahadev went to the ear of pig-Vishnu and said, O Vishnu Dev - what are you doing here, the guardian of this world? What is your business in this foul-smelling water and mud? Prajapati Brahma has asked you to go to your own land. In your absence, Vishnu Loka is empty. Your god-world is now empty. And you are here, muddling yourself with the piglets in this foul-smelling water and mud? What a strange look you have got? The smell of vodka is coming out of your body. So pig-Vishnu turned his face and looked at Mahadev, his memory came back. But pig-Vishnu was bound by the bonds of Maya with his sons and daughters in this pig-world. He did not want to break this bond of Maya and go out. He said, I am quite happy here with my children and young ones. You go and tell Brahma that I will stay here for some more time. The god of gods, Mahadev Rudra, convinced him a lot. This is not your place, you are the protector, the maintainer of living beings - this situation does not befit you. But Vishnu in the form of a pig does not want to listen to anything. He says, do not disturb me. Now I am quite happy with the child and the calf in this water and mud. You go away. I do not want to leave here at all. But Rudradeva is not one to be left. Finally, he destroyed the pig body of Shri Vishnu with the tip of the trident, and rushed towards Brahmaloka with Shri Vishnu.
So those who are good, stay. But there are a few people who think that after traveling through millions of wombs, that is, after passing many births, we have fortunately got this rare human body today. And these millions of lives have not only been spent in happiness, in this life I have had to endure unbearable pain in the mother's womb, in the foul-smelling pus and blood. How many times I have cried in the pain of separation, I no longer remember. I have forgotten the days when I cried around dead bodies. I cried in the pain of separation from my mother and father. How many sticks I have been beaten with sticks. How much humiliation I have endured. After leaving millions of bodies, enduring the pain of death, I have entered that dark, pearl-smelling womb again. I have cried after being separated from my mother's body. I do not want that pain of death anymore, I do not want that pain of birth caused by pregnancy. I want to get out of this cycle of birth and death and become one with the infinite. I do not know who or what is waiting for us in this infinite? I want to become one with that righteous mind and joy. I have heard that this path is very difficult, this place is unknowable. This path can be crossed by enduring a lot of effort, a lot of hardship, and a lot of suffering. It is said that great people have walked this path.
And what did they find there? He has gone beyond happiness and sorrow. He has become calm in happiness and sorrow. He is neither elated in happiness, nor overwhelmed in sorrow. He remains calm, calm, and equanimous in all situations. He has neither honor nor dishonor. He exists in the sky above good and evil like a white cloud. Hearing these words, one thinks, then does he have no sense of self-respect? Does he remain unconscious like an inanimate object? The great souls say, no, it is not like that, his mind is always happy, he is one with the highest pure consciousness and resides in pure intelligence. He has neither separation nor pain, nor a sense of lack. There is no such thing as lack in him. When whatever arises in his mind, it comes before him. This Brahman-knowing man always exists in boundless joy. We also want that rare state of unearthly peace. But how will I find it? Who will show me the way? Who will take me by the hand on that difficult path?
----------------- নিত্যকথা - শশাঙ্ক শেখর শান্তিধাম
১৬.০১.২০২৫
ঈশ্বরের ধ্যান।
আত্মতত্ত্ব জানবার জন্য যেমন ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষের সান্নিধ্যে আসতে হয়, তেমনি নিজের বুদ্ধিকে নির্ম্মল করতে হয়। ঋষিগন বলছেন, অনিত্য বস্তুকে যোগাগ্নিতে আহুতি দিতে হবে। তুমি ধীরে ধীরে সুবুদ্ধির দ্বারা বিচার করে জ্ঞানাগ্নি প্রজ্বলিত করো। সমস্ত সংকল-কামনা-বাসনা তাতে আহুতি দাও। এবার ধীরে ধীরে এই বিচারবুদ্ধিকে বিসর্জন দাও। পৃথিবীতে জরা,ব্যাধি, মৃত্যু থাকবে, কিন্তু থাকবে না যেটা, সেটা হচ্ছে ভয়। মরণশীল এই জীবকুল। এদের পুনঃপুনঃ জন্মগ্রহণ ও মৃত্যুমুখে পতিত হতে তো হবে। জীবের এটাই প্রকৃতি।
কিন্তু কথা হচ্ছে ঈশ্বরকে পাওয়া কি এতোই কঠিন ? মুক্তানন্দ বলছিলেন, যে জিনিস যত দুষ্প্রাপ্য বলে মনে হয়, সেই জিনিসের দাম তত অধিক হয়ে থাকে। আর ঈশ্বরকে পাওয়া খুব কঠিন, কারন তাকে কিছু ব্যবসায়ী ধর্ম্মগুরু কুক্ষিগত করে রেখেছেন । ঈশ্বর দুষ্প্রাপ্য নয়, বরং সদ্গুরু দুষ্প্রাপ্য। ঈশ্বরকে পাওয়ার জন্য কিছুই করবার দরকার নেই। এমনকি কিছু ত্যাগ করবার দরকারও নেই। ঈশ্বরকে পাবার জন্য না বৈরাগী হতে হবে, না সন্ন্যাসী হতে হবে। না পাহাড়ে যেতে হবে, যা জঙ্গলে যেতে হবে। ঈশ্বর তোমার সঙ্গেই আছেন। ঈশ্বর তোমার সামনেই আছেন। তোমার কাজ হচ্ছে কিছুই না করা। যাকিছু তুমি করবে, তাই তোমাকে ঈশ্বরের থেকে দূরে নিয়ে যাবে। যখন সব কিছু ছেড়ে কেবল চোখবুজে দেখতে থাকবে, তখনই তোমার সামনে ঈশ্বর প্রকট হয়ে উঠবে। সবছেড়ে তুমি শুধু সুখাসনে বসে ঈশ্বর চিন্তন করতে থাকো। ঈশ্বর আমাদের সামনেই আছেন, কিন্তু আমরা দেখতে চাইনা না, তাই দেখি না। আমার চোখ বাইরে দিকে খোলা, আমার কান বাইরের দিকে খোলা। সব ইন্দ্রিয়ের দ্বার বাইরের দিক থেকে বন্ধ করে দাও, অন্তরের দরজা খুলে দাও। যখনই অন্তরের দরজা খুলে যাবে, তখনই তোমার সামনে ঈশ্বর প্রকাশমান হয়ে যাবেন।
আমাদের ধর্ম্মগুরুগন এই ঈশ্বরকে পাবার নানান বাহানার কথা শুনিয়েছেন। কিন্তু সত্য হচ্ছে ঈশ্বরকে পাবার জন্য কিছুই করবার নেই। যেদিন তুমি কিছুই না করতে শিখে যাবে, সেদিন তোমার কাছে ঈশ্বর এসে যাবেন। কারন তিনি তো তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি তোমার থেকে দূরে নয়। তুমি ভাবছো, সে দূরে আছে, আসলে সে তোমার সব চেয়ে নিকটেই আছেন। তুমি কাজের বাহানায়, তার দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছো।
দেখো, দুষ্প্রাপ্য জিনিসের জন্য বহুমূল্য চোকাতে হয়। হিরে জহরত যদি লাউ কুমড়োর মতো হাটে বাজারে ফুটপাতে বিক্রি হতো, তবে রাজা মহারাজরা একে গলার মালা করতো না বা মুকুটে ধারণ করতো না। আলু, সবজি যদি মজুতদারগন মজুত না করতো, তবে এর বাজার মূল্য কমে যেত। ভারতের ৭০% শিশু অপুষ্টিতে ভোগে, আর সরকার চালডাল কিনে ভবিষ্যতের জন্য মজুত করে রাখে। মানুষ না খেয়ে মরে। আমরা ঈশ্বরকে পাবার জন্য প্রথমে গুরুর খোঁজ করি। কারন আমাদের কাছে মনে হয়, গুরুর কাছে ঈশ্বরের আস্তানার চাবি মজুত আছে। সত্য হচ্ছে, গুরুর কাছে ঈশ্বর নেই, ঈশ্বর আছে কেবল মাত্র তোমার কাছে, তোমারই কাছে। আর এঁকে পেতে গেলে, কিছু করতে হবে না। কেবল কিছু না করবার অভ্যাস করতে হবে। চোখ বুজে ধ্যানাসনে বসে যাও। কিছু না করবার অভ্যাসের নাম ধ্যান। ধ্যানে বসো আর কেবলই দেখতে থাকো। ব্যাস এইটুকুই। যত তাড়াতাড়ি তোমার মন কোনো কিছু না করবার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে, মনের সমস্ত চিন্তা দূর হয়ে যাবে, তখন সেই চিন্তা-রহিত নির্ম্মল মনে ঈশ্বরের চেহারা ফুটে উঠবে। ইশ্বর তোমার সবচেয়ে কাছের সম্পদ। তাকে খুঁজতে কোথাও যেতে হবে না, কারুর কাছে যেতে হবে না। কোনো ধর্ম্মগুরুর কাছে যেতে হবে না। কেবল নিজেকে নিজের মধ্যে ডুবিয়ে দাও।
----------
Daily Talk - Shashanka Shekhar Shantidham
16.01.2025
Meditation on God.
Just as one has to come close to the Brahman-knowing man to know the Self, one has to purify one's intellect. The sages say that impermanent objects should be sacrificed in the fire of yoga. You should gradually judge with good intelligence and light the fire of knowledge. Sacrifice all attachments, desires and desires in it. Now gradually abandon this judgmental intellect. There will be old age, disease and death in the world, but what will not be there is fear. This mortal race of living beings. They have to be reborn and die again and again. This is the nature of living beings.
But the question is, is it so difficult to find God? Muktananda was saying that the more rare a thing seems, the more valuable that thing becomes. And it is very difficult to find God, because some business gurus have taken him into their lap. God is not scarce, but a good guru is scarce. To find God, there is no need to do anything. There is no need to even give up anything. To find God, you do not have to become a bairagi, nor a sannyasi. Nor do you have to go to the mountains, nor to the jungle. God is with you. God is right in front of you. Your job is to do nothing. Whatever you do, it will take you away from God. When you leave everything and just close your eyes and watch, then God will become visible before you. Leaving everything, you just sit on a comfortable seat and think about God. God is right in front of us, but we do not want to see, so we do not see. My eyes are open to the outside, my ears are open to the outside. Close the doors of all the senses from the outside, open the door of the heart. Whenever the door of the heart is opened, then God will become visible before you.
Our religious gurus have told us various excuses to find this God. But the truth is that you don't have to do anything to get God. The day you learn to do nothing, God will come to you. Because He is standing right in front of you. He is not far from you. You think He is far, but in fact He is the closest to you. You have turned your attention away from Him under the pretext of work.
Look, you have to pay a lot of money for rare things. If diamonds and jewels were sold on the streets of the market like gourds and pumpkins, kings and emperors would not wear them as necklaces or crowns. If hoarders did not hoard potatoes and vegetables, their market value would decrease. 70% of children in India suffer from malnutrition, and the government buys rice and dal and stores them for the future. People die of hunger. We first look for the Guru to get God. Because we think that the Guru has the key to the abode of God. The truth is, the Guru does not have God, God is only with you, with you. And if you want to get it, you don't have to do anything. You just have to practice not doing anything. Sit in meditation with your eyes closed. The practice of not doing anything is called meditation. Sit in meditation and just watch. That's all. As soon as your mind is ready to do nothing, all thoughts go away from your mind, then the face of God will appear in that thoughtless, pure mind. God is your closest treasure. You don't have to go anywhere to find Him, you don't have to go to anyone. You don't have to go to any religious teacher. Just immerse yourself in yourself.
----------
নিত্যকথা - শশাঙ্ক শেখর শান্তিধাম
১৮.০১.২০২৫
ঈশ্বরের ধ্যান।
এই যে শরীর এটি একটি মন্দির। এই মন্দিরে যেমন ভক্তরূপী পূজারী আছেন, তেমনি আছেন আরাধ্য দেবতা। আমরা জানি, আমাদের এই শরীর পাঁচকোষের সমষ্টি । আর এই পঞ্চকোষের শরীরের মধ্যেই অনুপ্রবিষ্ট হয়ে আছেন, জীবাত্মা। । এইযে অন্নময় , প্রাণময় ও মনময় কোষ এই তিনটেই পার্থিব। বিজ্ঞানময় ও আনন্দময় কোষ অপার্থিব।
এই যে পাঁচটি কোষের শরীর, এই শরীরের সঙ্গেই আমাদের "আমি" বোধ বা অহং জড়িয়ে আছে। সাধকের কাজ হচ্ছে এই আমি-বোধকে কোষগুলো থেকে আলাদা করা। সমস্ত কোষমুক্ত যে আমিবোধ, তাই আমাদের প্রকৃত সত্ত্বা।
আমরা বলি আমার শরীর অর্থাৎ আমি শরীর নোই। এই স্থূল অন্নময় শরীরটাকে একদিন না একদিন শ্মশানে নিয়ে আগুনে দাহ করা হবে। কিন্তু আমার মৃত্যু হবে না, আমি বেঁচে থাকবো। এই ভাবনা যখন আমাদের মধ্যে দৃঢ় হবে, যখন বিচার বুদ্ধির সাহায্যে আমরা এই সত্যে উপস্থিত হবো, তখন এই স্থূল শরীরকে আর আমি বলে স্বীকার করতে ইচ্ছে করবে না। । এর পর হচ্ছে প্রাণময় কোষ। এই প্রাণের আগমন ও নির্গমনের সাহায্যে এই স্থূল শরীর প্রাণবন্ত আছে। এই প্রাণবায়ু কিন্তু আমি নোই। প্রাণবায়ু আমাদের মধ্যে একবার প্রবেশ করছে, আবার বেরিয়ে যাচ্ছে। তো বিচারের সাহায্যে অনন্ময় ও প্রাণময় কোষকে আমাদের "আমি" থেকে আলাদা করতে হবে। এই ক্রিয়া যদিও আমাদের বুদ্ধির সাহায্যে করতে পারি, তবে ধ্যানের মাধ্যমেও এই বাস্তব সত্যকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি।
এখন কথা হচ্ছে, স্থূল অনন্ময় কোষ আমি নোই, সূক্ষ্ম প্রাণময় কোষ আমি নোই, এটা না হয় বোঝা গেলো। তাহলে কি আমার এই মনটাই আমি বোধের কারন ? আসলে মনরূপ আমি একটা বিশেষ চরিত্র, এর নিজস্ব ব্যক্তিত্ত্ব আছে, এমনকি এর একটা নিজস্ব চিন্তার জগৎ আছে। আর এই কারণেই, সমস্ত চিন্তার যিনি মূল সেই মনটাকেই আমরা আমি বলে ভুল করি। এই মন কিন্তু প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। মনের কোনো স্থিরতা নেই। আসলে অনন্ময়, প্রাণময় কোষের মতোই মন একধরনের কোষ বিশেষ যা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। তথাপি এই মনকে বাদ দিয়ে আমরা কেউ আমির কল্পনা করতে পারি না। এই মনটা যে আমি নোই তা আমাদের বিচার বুদ্ধি দিয়ে বিচার্য নয়। এটি প্রথম উপল্বদ্ধিতে আসে, যখন আমরা মনকে শান্ত করতে পারি। আপনি একটু স্থির হয়ে মনকে দেখতে থাকুন। দেখবেন, মনের মধ্যে নানান রকম চিন্তার বুদ্বুদ উঠছে। মনের মধ্যে নানা ধরনের চিন্তার উদ্রেগ হচ্ছে। একটু স্থির হয়ে বসলেই, আপনি এই চিন্তাগুলোকে ধরতে পারবেন। এবার ভাবুন, এই চিন্তাগুলোকে কে দেখছে ? মন কিন্তু দেখছে না। মন বা মনের মধ্যে যে চিন্তার উদয় হচ্ছে তা হচ্ছে দৃশ্য, আর এই দৃশ্যকে কেউ একজন দেখছে যিনি একজন দ্রষ্টামাত্র । তো মন যদি দৃশ্য হয়, তবে মন থেকে আলাদা কোনো এক দ্রষ্টা আছেন । এই দ্রষ্টা ও দৃশ্যকে তখন আলাদা করে চিহ্নিত করবার চেষ্টা করুন। তবে বুঝতে পারবেন মন আমি নোই।
আলোচনার মধ্যে আমরা একটা জিনিস খেয়াল করলাম - একটা হচ্ছে আমিবোধ, আর একটা হচ্ছে আমার-বোধ। আমার-বোধ আমাদের মমতার ফলে ঘটে থাকে। আর আমিবোধ আমাদের বোধবুদ্ধির কারনে ঘটে থাকে। দেখুন আমি একজন পণ্ডিত বা বোকা - এ-কথার মাধ্যমে আমি নিজেকে জড়িয়ে ফেলি। আবার আমার জ্ঞান, আমার পান্ডিত্য একথার মধ্যে নিজেকে আর পান্ডিত্যকে আলাদা করতে পারি। যখনই কোনো কিছুকে আমি-আমার বলে ভাবতে থাকি, তখন তার প্রতি আমার মমত্ত্ব বোধ হয়। আর ঠিক এই কারণেই আমার শরীরের প্রতি আমার মমত্ত্ব হয়ে থাকে। আর এই আমার মমত্ব বোধ থেকেই আমার শরীরের সুখ-দুঃখের অনুভূতি আমার বলে মনে হতে শুরু করে।
এখন কথা হচ্ছে এই যে মমত্ত্ব বা আমার বোধ এর সঙ্গে আমি ছাড়াও অন্যকিছুর একটা ওতপ্রোত সংযোগ অনুভব করে থাকি। কিন্তু সত্যিকারের আমির সঙ্গে কিন্তু যোগ থাকবার কথা নয়। অর্থাৎ আমির স্বতন্ত্র সত্তা আছে, এই বোধ তখন আমাদের মধ্যে জেগে ওঠে। তবে এই আমি আর আমার স্বরূপ কিন্তু এক নয়। একে অর্থাৎ আমির প্রকৃত স্বরূপকে ধরতে গেলে আমাদের আরো একটু গভীরে প্রবেশ করতে হবে। তবে এটা বোঝা গেলো, আমি মন নোই, আমি প্রাণ নোই, আমি রক্তমাংসের শরীর নোই।
---------
Daily Talk - Shashanka Shekhar Shantidham
18.01.2025
Meditation on God.
This body is a temple. Just as there are devotees in this temple, so there is the worshipable deity. We know that this body of ours is a collection of five cells. And the soul is embedded in the body of these five cells. . These three cells containing food, life and mind are all earthly. The cells containing knowledge and joy are not earthly.
This body of five cells, our "I" sense or ego is associated with this body. The work of a sadhak is to separate this sense of I from the cells. The sense of I, which is free from all cells, is our true being.
We say that my body, that is, I am not the body. One day or another, this gross food-filled body will be taken to the crematorium and burned in the fire. But I will not die, I will live. When this thought becomes strong in us, when we come to this truth with the help of discernment, then we will no longer want to accept this gross body as I. . Next is the vital cell. With the help of this vital energy, this gross body is alive. But this vital energy is not I. The vital energy is entering us once and going out again. So with the help of discernment, we have to separate the impersonal and vital cells from our "I". Although we can do this action with the help of our intelligence, we can also realize this real truth through meditation.
Now the point is, the gross impersonal cell is not I, the subtle vital cell is not I, this is understood. Then is this mind of mine the reason for the feeling of I? Actually, the mind-form I is a special character, it has its own personality, and even has its own world of thought. And for this reason, we mistake the mind, which is the root of all thoughts, for I. But this mind is constantly changing. There is no stability of the mind. In fact, the mind is a special kind of cell, like an immortal, living cell, which is constantly changing. Yet, none of us can imagine the self apart from this mind. That this mind is not I cannot be judged by our judgmental intellect. This comes to the first realization when we can calm the mind. You should be still for a while and keep watching the mind. You will see that various kinds of thoughts are bubbling up in the mind. Various kinds of thoughts are stirring in the mind. If you sit still for a while, you will be able to catch these thoughts. Now think, who is seeing these thoughts? The mind is not seeing. The mind or the thoughts that are arising in the mind are the scene, and this scene is being seen by someone who is only a seer. So if the mind is the scene, then there is a seer different from the mind. Then try to identify this seer and the scene separately. Then you will understand that the mind is not I.
During the discussion, we noticed one thing - one is the sense of I, and the other is the sense of me. The sense of me arises as a result of our affection. And the sense of I arises as a result of our intellect. Look, I am a scholar or a fool - through this statement, I get entangled in myself. Again, in my knowledge, my scholarship, I can separate myself and scholarship. Whenever I think of something as mine, then I feel affection for it. And this is exactly why I feel affection for my body. And from this sense of my affection, the feelings of happiness and sorrow in my body start to seem to be mine.
Now the point is that with affection or the sense of I, we feel an intimate connection with something other than myself. But there is no connection with the real self. That is, there is an independent entity of self, this sense then awakens in us. However, this self and my nature are not the same. To grasp this, that is, the real nature of self, we have to go a little deeper. But it was understood, I am not a mind, I am not a soul, I am not a body of flesh and blood.
---------
নিত্যকথা - শশাঙ্ক শেখর শান্তিধাম
১৯.০১.২০২৫
ঈশ্বরের ধ্যান।
আমরা যখন ঋষি পতঞ্জলি আদিষ্ট যম নিয়মের অভ্যাস করি, তা আমাদের শুদ্ধ চিন্তা ও শারীরিক পবিত্রতা এনে দেয়। আমরা যে শারীরিক ব্যায়ামাদি করি, আহারে শুদ্ধতা বজায় রাখি, তা এই স্থূল শরীরকে সুস্থ সবল রাখবার জন্য। আমরা যে প্রানায়াম ইত্যাদি করি, তা এই প্রাণময় শরীরকে প্রাণবন্ত করবার জন্য। আমরা যে আসনাদি করি তা এই স্থূল ও সূক্ষ্ম শরীরের সুস্থতার জন্য বা চঞ্চল মনকে শান্ত করবার জন্য। আমরা যে প্রত্যাহার ধারণা ধ্যানাদি করি তা এই বিজ্ঞানময় শরীরের পুষ্টির জন্য। অর্থাৎ আমাদের যে জ্ঞান পিপাসা তা আমাদের বিজ্ঞানময় শরীরে হয়ে থাকে। আর এই যম-নিয়ম-আসন-প্রত্যাহার-ধারণা-ধ্যান ইত্যাদিতে সিদ্ধ হলে, আমরা আপনা থেকেই সমাধির মধ্যে অর্থাৎ আনন্দময় শরীরের মধ্যে প্রবেশ করি।
আমরা যখন এই স্থূল শরীর সূক্ষ্ম শরীর ও কারন শরীরের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে পারি, তখন আমাদের অন্তরে এক দিব্য আলোকের সন্ধান মেলে। এই আলোর উপরে যখন আমরা সচেতন ভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে পারি, তখন এই আলোর সঙ্গে সঙ্গে আমরা আমাদের হৃদয় গহ্বরে যে আকাশ আছে, তার মধ্যে প্রবেশ করি। আর এই হৃদয় আকাশে যে আলোর জ্যোতি আমাদের নজরে আসে, তা আসলে সেই পরমাত্মার অস্পষ্ট প্রতিফলন। এই আলোর আকাশে একটা কৃষ্ণগহ্বর বা একটা কালো রঙের বিন্দুর দর্শন পাই। এই কৃষ্ণ গহ্বরের মধ্যে যখন আমরা প্রবেশ করি, তখন সেই অন্ধকার আকাশে অসংখ্য নক্ষত্রের দর্শন পাই। এসব কোনো কল্পনা নয় - এসব অদ্ভুত দৃশ্য আমাদের ধ্যানস্থ অবস্থায় দৃশ্যমান হয়ে থাকে।
প্রশ্ন জাগলে, তবেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা শুরু হবে। মনময় কোষের কাছে বারংবার প্রশ্ন ওঠাতে থাকুন, যে আমি কে ? আমি কি শুধুই একটা শরীর, যা পঞ্চকোষের সমষ্টি মাত্র ? এই কালের গতিতে পঞ্চকোষের বিচ্ছিন্নতায় এই "আমি" হারিয়ে যাবে ? অর্থাৎ আমার এই দৃশ্যমান শরীরে অন্তর্জলি হলে, আমি হারিয়ে যাবো ? মনের সমস্ত চিন্তাকে কে দেখছে তাকে খুঁজতে থাকুন। যখনই এই চিন্তা বারবার মনের দিকে নিক্ষেপ করবেন, তখন দেখবেন মন আপনার এই প্রশ্ন বুদ্ধির কাছে পাঠিয়ে দেবে। আর ব্যষ্টি বুদ্ধি তখন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে ক্রিয়া শুরু করবে। হঠাৎ একসময় এই বুদ্ধি কোনো কুল কিনারা না করতে পেরে চেতন কেন্দ্রে ঝাঁপ দেবে। অর্থাৎ ব্যষ্টিবুদ্ধি সত্ত্বায়, সাংখ্য মতে মহৎ-তত্ত্বে এই প্রশ্ন ঢেউ তুলবে। তখন মন চুপ হয়ে বুদ্ধির উত্তরের অপেক্ষায় থাকবে। আর বুদ্ধি চেতন সমুদ্রে এই আমিকে খুঁজে বেড়াবে। মন নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়াতে আপনি এক অখন্ড নীরবতায় অবস্থান করবেন। একসময় মনে হবে, বোধহয়, একটা নতুন কিছুর সন্ধান মিলতে চলেছে।
আসলে এতক্ষন যাকিছু চলছিলো , তা কেবল মন-বুদ্ধির খেলা। কিন্তু বুদ্ধি চৈতন্য সাগরে ডুব দেবার ফলে একটা নতুন দুয়ার খুলে গেছে। আর মন অধীর হয়ে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বুদ্ধির উত্তরের অপেক্ষায়। এখন থেকেই শুরু হবে চৈতন্য সাগরে সাঁতারকাটা। শুরু হলো আধ্যাত্মিক যাত্রা।
---------
Daily Talk - Shashanka Shekhar Shantidham
19.01.2025
Meditation on God.
When we practice the Yama rules prescribed by sage Patanjali, it brings us pure thoughts and physical purity. The physical exercises we do, maintaining purity in food, are to keep this gross body healthy and strong. The pranayama etc. we do are to enliven this vital body. The asanas we do are for the health of this gross and subtle body or to calm the restless mind. The withdrawal and meditations we do are for the nourishment of this scientific body. That is, the thirst for knowledge that we have is in our scientific body. And when we are perfected in these Yama rules-asanas-withdrawal-meditation-meditation etc., we automatically enter into Samadhi, that is, into the blissful body.
When we can harmonize this gross body with the subtle body and the causal body, then we find a divine light in our heart. When we can consciously focus on this light, then with this light we enter the sky that is in the cavity of our heart. And the light that comes to our attention in this heart sky is actually the vague reflection of that Supreme Soul. In this sky of light, we see a black hole or a black dot. When we enter this black hole, we see countless stars in that dark sky. These are not imaginations - these strange scenes are visible to us in our meditative state.
When questions arise, only then will we start searching for answers to the questions. Keep asking the mind-body repeatedly, who am I? Am I just a body, which is just an aggregate of five body cells? Will this "I" be lost in the separation of the five body cells in this speed of time? That is, if my visible body is submerged, will I be lost? Keep looking for the one who is watching all the thoughts of the mind. Whenever you repeatedly throw this thought towards the mind, you will see that the mind will send this question of yours to the intellect. And the individual intellect will then start working spontaneously. Suddenly, this intellect, unable to find any edge, will jump to the center of consciousness. That is, this question will raise waves in the individual intellect, in the great theory according to Sankhya. Then the mind will be silent and wait for the answer of the intellect. And the intellect will search for this self in the ocean of consciousness. As the mind becomes silent, you will remain in an unbroken silence. At some point, it will seem that you are about to find something new.
In fact, everything that was going on until now was just a game of the mind and intellect. But as the intellect dived into the ocean of consciousness, a new door opened. And the mind became impatient and breathless, waiting for the answer of the intellect. From now on, swimming in the ocean of consciousness will begin. The spiritual journey has begun.
--------------- নিত্যকথা - শশাঙ্ক শেখর শান্তিধাম
২১.০১.২০২৫
ঈশ্বরের ধ্যান।
জীবনের সমস্ত দুঃখ দূর করতে গেলে, দুটি জিনিসের খুব প্রয়োজন একটা হচ্ছে আত্মবিশ্বাস, আর একটা হচ্ছে ঈশ্বরে বিশ্বাস। আত্মপ্রচেষ্টা থেকে আসে, আত্মবিশ্বাস। আর আত্মপ্রচেষ্টা যখন পথ খুঁজে না পায় তখন আসে ঈশ্বরে বিশ্বাস। আর এই আত্মপ্রচেষ্টা রূপেই আসে ঈশ্বরের কৃপা।
ঈশ্বর বা ভগবান যে কি বস্তু তার যে কি রূপ তা আমাদের প্রতক্ষ্য অভিজ্ঞতায় নেই। কিন্তু ছোটবেলা থেকে শুনে শুনে অর্থাৎ মাতা-পিতা আত্মীয়-স্বজন অথবা শিক্ষকের কাছ থেকে শুনে আমাদের প্রত্যেকেরই ঈশ্বর সম্পর্কে একটা নিজস্ব ধারণা তৈরী হয়ে যায়, নিজের মধ্যে। আর তা হয় অসীম বা সর্ব্বশক্তিমান একটা অবয়ব। হতে পারে, তা সে মায়ের রূপে বা পিতার রূপে। ধীরে ধীরে সেটি হয়ে ওঠে একটা নিরাকার শক্তি বিশেষ। এইজন্য আমরা বলে থাকি ভগবান বা ঈশ্বর আসলে একটা অসীম শক্তির আধার ছাড়া কিছু নয়। এই শক্তির কারণেই নাকি আমাদের সর্ব্ব কর্ম্ম পরিচালিত হয়। এই শক্তিই নাকি আমাদের সুখ-দুঃখের নিদান দিয়ে থাকেন। এই শক্তিই সমস্ত জীব মায় সমস্ত জগৎকে ঘাড় ধরে ঘোরাচ্ছে। এই যে চন্দ্র সূর্য নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরে মরছে, তারও কারন সেই সর্ব্বশক্তিমান ঈশ্বর। কিন্তু এই ঈশ্বরকে কেউ আয়ত্ত্বে আনতে পারে না। সবাই এই ঈশ্বরের কাছে হেরে গিয়ে আত্মসমর্পন করেন। একটা সময় আসে, যখন আমরা অসহায় হয়ে তারই স্মরণ করতে থাকি আমরা।
আমরা কেন জন্মেছি, সেই সম্পর্কে আমাদের কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। ঈশ্বর বলে কিছু আছে কি না সে সম্পর্কেও আমাদের কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। যিনি আমাকে বা নিজেকে চিনতে পারেন নি, তিনি কখনও ঈশ্বরকেও চিনতে সক্ষম হবেন না। তাই ঈশ্বর আছেন, কি নেই, সেই জিজ্ঞাসার মধ্যে না গিয়ে আগে নিজেকে চিনতে হবে আমাদের। কেন না আমি যে আছি, সেটা আমরা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারি। আমার বোধশক্তি আমার অস্তিত্ত্বকে অস্বীকার করতে দেয় না। ভগবন বুদ্ধকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো - " ঈশ্বর কি আছেন ?" ভগবন বুদ্ধ তার জবাবে বলেছিলেন, আমি কি বলেছি যে ঈশ্বর আছেন? ক্ষাণিক্ষণ মৌন থেকে আবার বললেন আমি কি বলেছি যে ঈশ্বর নেই ? আসলে বুদ্ধদেব চেয়েছিলেন, ঈশ্বর আছে কি নেই, সেই প্রশ্নের মধ্যে না গিয়ে, তুমি আগে নিজেকে চেনো, জানো, আর তোমার দুঃখ-কষ্ট মোচনের দিকে দৃষ্টি ফেরাও। ঈশ্বরের দিকে দৃষ্টি দেবার সময় এখন নয়। আর দুঃখ-কষ্টের নিবৃত্তিতে তুমি যে জগতের সন্ধান পাবে সেখানে ঈশ্বর সম্পর্কে সমস্ত সংশয় দূর হয়ে যাবে ।
কেউ বলেন, মানুষ একটা জড় ও চৈতন্যের মিশ্রণ মাত্র। এর কোনো নিজস্বতা নেই। জড় অর্থাৎ পঞ্চভৌতিক দেহ, আর চৈতন্য হচ্ছে আমাদের অন্তরাত্মা। একটা সদা পরিবর্তনশীল সত্তা, আর একটা হচ্ছে অপরিবর্তনীয় সত্তা। একটা বিকারগ্রস্থ আর একটা অবিকার। এই যে পরিবর্তনশীল সত্তা এটি অজ্ঞানের কারনে বাসনা রূপ বায়ু তাড়িত হয়ে জন্ম মৃত্যুর পাকচক্রে ঘুরেই চলেছে। এই পরিবর্তনশীল সত্তা, এর গুরুত্ত্ব অস্বীকার করা যায় না। আবার যেটি অপরিবর্তনশীল সত্তা তার গুরুত্ত্ব অপরিসীম। পরিবর্তন শীল সত্তা বলুন, আর অপরিবর্তনশীল সত্তা বলুন, দুটোই নিত্য। গতির কারনে পরিবর্তনশীল সত্তাকে অনিত্য বলে ভ্রম হয়। আর স্থিরতার কারনে অপরিবর্তনশীল সত্তাকে শ্বাশত বলে মনে হয়। দুইই আসলে শাশ্বত সত্তা।
আধুনিক বিজ্ঞানী বা মনস্তাত্ত্বিকগন মনে করেন, মন চিন্তা ক্ষরণকারী একটা সূক্ষ্ম বস্তু বিশেষ। এটি স্থূল শরীরের মতো বা তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতো চাক্ষুষ না হলেও, এটি আমাদের প্রত্যক্ষ উপলব্ধজাত বস্তু। এখন কথা হচ্ছে তাহলে উপল্বদ্ধিটা কে করে তাহলে। মন যদি উপলব্ধি জাত বস্তু বিশেষ হয়, এবং এটি কেবলই পাথিব বস্তু হয়, তবে কি এটি শরীরের নাশের সঙ্গে সঙ্গে এটি লয় প্রাপ্ত হয় ? প্রত্যেকটি মনের একটা ব্যক্তিসত্তা আছে - মনের পরিবর্তন আছে, মনের গতি আছে। সেই মন কি তবে শরীরের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে অগ্নিদগ্দ্ধ হয়ে পঞ্চভূতের সঙ্গে লয় হয়ে যায় ? হিন্দু ধর্ম্মশাস্ত্র এই মনকে একটা সূক্ষ্মশরীর হিসেবে নির্দিষ্ট করেছেন সত্য, কিন্তু এই সূক্ষ্ম মনময় শরীর আমাদের স্থূল শরীরের মৃত্যুর পরেও ইন্দ্রিয়াদির সাথে কর্ম্মসংস্কারকে নিয়ে সূক্ষ্ম জগতে বিরাজমান থাকে বলে তাঁরা মনে করেন। যদিও চূড়ান্ত মুক্তিকালীন সময়ে আত্মা সমস্ত সূক্ষ্মশরীরের মতো মনোময় শরীরকেও ত্যাগ করে থেকে।
আমাদের অন্তরাত্মা যে দেহ-মন থেকে পৃথক, তা আমরা উপলব্ধি করতে পারি। আর এটি তখনই আমাদের কাছে স্পষ্ট হবে, যখন আমরা নিজেদেরকে নৈতিক শৃঙ্খলায় আবদ্ধ করে ঋষি আদিষ্ট যোগক্রিয়ার নিরন্তর অনুশীলন করবো। আমরা জানি, আমাদের শরীরের ইন্দ্রিয়গুলোই আত্মার বিষয়ভোগের কারন হয়ে থাকে। আর এই বিষয়ভোগ থেকেই আমাদের সুখ-দুঃখের অনুভূতি হয়ে থাকে। কিন্তু যখন আত্মা স্বরূপ বিস্মৃত হয়ে বুদ্ধিজাত অহঙ্কারের সাথে নিজেকে একাত্ম বোধ করে, তখন জীবাত্মা প্রকৃতির হাতের পুতুল হয়ে যায়। প্রকৃতির শক্তির উপরে নির্ভরশীল হয়ে যায়। আর এই অহং-সর্বস্য আত্মাই আমাদের জীবনের সমস্ত সুখ-দুঃখের অনুভব করে।
-----------
Daily Talk - Shashanka Shekhar Shantidham
21.01.2025
Meditation on God.
To remove all the sorrows of life, two things are very necessary, one is self-confidence, and the other is faith in God. Confidence comes from self-effort. And when self-effort does not find the way, then faith in God comes. And in the form of this self-effort comes the grace of God.
We do not have direct experience of what form God or God is. But by hearing from childhood, that is, from parents, relatives or teachers, each of us develops his own idea of God, within himself. And it is either an infinite or omnipotent form. It may be in the form of a mother or a father. Gradually it becomes a formless power. That is why we say that God or God is actually nothing but the source of an infinite power. Because of this power, all our actions are carried out. This power is the cause of our happiness and sorrow. This power is the one that is making all living beings and the whole world revolve around it. The reason why the moon and the sun are revolving in a specific orbit is also the Almighty God. But no one can bring this God into his power. Everyone surrenders to this God after losing. There comes a time when we become helpless and start remembering him.
We have no clear idea about why we were born. We also have no clear idea about whether there is anything called God or not. The one who could not know me or himself will never be able to know God. Therefore, before going into the question of whether God exists or not, we have to know ourselves first. Why don't we understand that I exist in the first place? My intellect does not allow me to deny my existence. Lord Buddha was once asked - "Does God exist?" Lord Buddha replied, Did I say that God exists? After a moment of silence, he said again, "Did I say that God does not exist?" Actually, Buddha wanted you to know yourself first, without going into the question of whether God exists or not, and turn your attention to the removal of your suffering. Now is not the time to look at God. And in the world where you will find the cessation of suffering, all doubts about God will be removed.
Some say that man is just a mixture of matter and consciousness. It has no individuality. Matter is the five-material body, and consciousness is our inner self. One is an ever-changing entity, and the other is an unchanging entity. One is subject to change and the other is non-change. This changing entity, driven by the wind of desire due to ignorance, keeps revolving in the cycle of birth and death. This changing entity, its importance cannot be denied. Again, the importance of the unchanging entity is immense. Say changing entity, and say unchanging entity, both are eternal. Due to motion, the changing entity is considered impermanent. And due to stability, the unchanging entity seems to be impermanent. Both are actually eternal entities.
Modern scientists or psychologists believe that the mind is a special subtle object that absorbs thoughts. Although it is not visible like the gross body or its limbs, it is a directly perceptible object. Now the question is, who does the realization? If the mind is a special perceptible object, and it is only a material object, then does it dissolve with the destruction of the body? Every mind has an individual entity - there is change in the mind, there is movement in the mind. Does that mind then burn with the death of the body and merge with the five elements? Hindu scriptures have defined the mind as a subtle body, but they believe that this subtle mind-body continues to exist in the subtle world with its senses and karmic structures even after the death of our gross body. Although at the time of final liberation, the soul leaves the mind-body body like all the subtle bodies.
We can realize that our inner self is separate from the body-mind. And this will become clear to us only when we bind ourselves to moral discipline and constantly practice the yoga practices prescribed by the sages. We know that the senses of our body are the cause of the soul's material enjoyment. And from this material enjoyment, we feel happiness and sorrow. But when the soul forgets its own nature and feels itself one with the ego born of intellect, then the soul becomes a puppet in the hands of nature. It becomes dependent on the forces of nature. And this ego-all-self is the soul that experiences all the happiness and sorrow of our life.
-----------
নিত্যকথা - শশাঙ্ক শেখর শান্তিধাম
২২.০১.২০২৫
ঈশ্বরের ধ্যান।
আমাদের জ্ঞানেন্দ্রীয়সকল যদি না থাকতো, তবে আমরা দেখা, শোনা ইত্যাদি করতে পারতাম না। আমাদের যদি কর্ম্মেন্দ্রীয়সকল না থাকতো তবে আমরা কার্য্যাদি করতে অক্ষম হোতাম। কিন্তু কথা হচ্ছে এই যে ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান, এর কি কোনো মূল্য আছে ? এই জ্ঞানতো পশু পাখির মধ্যেও হয়ে থাকে। এমনকি আমরা শুনেছি পশুদের এই ইন্দ্রীয়সকল নাকি মানুষের থেকেও বেশি শক্তিশালী। চিল, শকুনের দৃষ্টিশক্তি মানুষের চাইতে অনেক বেশি। পিঁপড়েরা নাকি ভবিষ্যতের ঝড়ের সম্ভাবনা বুঝতে পারে। পাখিরা মানুষের চাইতে অনেক দ্রুত চলাচল করতে পারে। অনেক দুর্গম জায়গায় যেখানে মানুষ বাস করতে পারে না, সেখানে অনেক কীট -পতঙ্গ বাস করে। সমুদ্রের তলায়, অনেক জীব-জন্তুর বাস। মানুষকে ঈশ্বরের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ জীব বলা হয়। অথচ তার মধ্যেই সীমাবদ্ধতা সবচেয়ে বেশী। মানুষ আকাশে উড়তে পারে না। মানুষ জলের গভীরে শ্বাসপ্রশ্বাস ক্রিয়া সচল রাখতে পারে না। এমনকি এই পৃথিবীর পাহাড়ের উপরে মানুষের গতি শ্লথ হয়ে আসে। তাহলে তো প্রশ্ন জাগে, মানুষ শ্রেষ্ঠ কিসে হলো ?
বলা হয়ে থাকে মানুষের একটা মন আছে, যা একাদশ ইন্দ্রিয় নামে পরিচিত। মানুষ চিন্তা করতে পারে। কিন্তু সত্য হচ্ছে পশু পাখির মধ্যেও এই মন আছে। তারাও মানসিক সুখ দুঃখের অনুভব করে থাকে। তাহলে পার্থক্যতা কোথায় ? মহাত্মাগণ বলছেন, ইন্দ্রীয়সকল যেমন সমস্ত জীব-জন্তুর মধ্যে আছে, তেমনি মনুষ্যের মধ্যেও আছে সত্য, কিন্তু পার্থক্যটা হচ্ছে মানুষের মনে চেতনশক্তির প্রতিফলন অধিকতর। মানুষ তার মনকে শুদ্ধ করতে পারে। যা জীব-জন্তু-পশু-পাখি করতে পারে না। পশু-পাখি প্রকৃতির নিয়মে শৃঙ্খলিত - যা সে বিমোচন করতে অক্ষম। কিন্তু মানুষের মধ্যে যে মন আছে, তা সে যতই কালিমালিপ্ত থাকুক না কেন, অস্বচ্ছ থাকুক না কেন, মানুষ তাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে, চৈতন্যের প্রতিফলনকে আরো স্পষ্টতর করতে পারে। যা একটা পশু কখনোই পারে না। মানুষ ও অন্য জীবসকলের মধ্যে এটাই পার্থক্য।
বিষয়ের সঙ্গে ইন্দ্রিয় সংযোগের ফলে আমাদের চেতনায় একটা বোধের অনুভব হয়। এই বোধ সমস্ত জীবজন্তুর মধ্যেই হয়ে থাকে। ধরুন আমাদের চোখের সামনে একটা আমি এলো - আমরা তাকে চোখ দিয়ে পরখ করলাম। এরপরে আমটাকে সরিয়ে নেওয়া হলো। এই আমটিকে সরিয়ে নেওয়া হলেও আমের চিত্র কিন্তু আমার মনের মধ্যে গেঁথে গেলো। এর পরে আবার যদি কখনো আমি আমের সান্নিধ্যে আসি, তবে মন তৎক্ষণাৎ এটিকে সনাক্ত করতে পারে। এবার ধরুন, আমটি আপনি খেয়ে দেখলেন, আমটি মুখ-জিভ হয়ে পেটের মধ্যে চলে গেলো। এইযে আম-ভক্ষনক্রিয়া হলো, এর স্বাদ আপনার জিভের মধ্যে লেগে রইলো। আর এর পরে আবার যদি কখনো আমের দর্শন মেলে, তখন আপনার মধ্যে এই আম ও তার স্বাদের কথা আপনার মনে পরে যাবে। কিন্তু কথা হচ্ছে এই প্রক্রিয়া তো একটা বাঘ বা পশুর ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে, তাহলে মানুষ আর পশুর মধ্যে পার্থক্য কোথায় ? পার্থক্য হচ্ছে, মনের পিছনে যেমন আমাদের স্মৃতি ক্রিয়া করছে, তেমনি মনের পিছনে আছে আমাদের প্রখর বুদ্ধি। মন আসলে ইন্দ্রিয়লব্ধ কোনো বস্তুকেই নির্দিষ্ট করতে পারে না। ইন্দিয় বাহিত হয়ে মন যখন বিষয়ের সংস্পর্শে আসে, তখন সে এই ছবি বুদ্ধির কাছে পাঠিয়ে দেয়। বুদ্ধি আবার তার স্মৃতির ভান্ডার থেকে অনুরূপ একটা আমাদের ছবি তুলে নিয়ে এসে মিলিয়ে দেখে। অর্থাৎ এখনকার দেখা আম আর স্মৃতিতে থাকা আমের সঙ্গে কোনো ফারাক আছে কি না। এই মনুষ্য দেহে স্থিত বুদ্ধির মধ্যে আছে বিচার শক্তি। যা দিয়ে সে সমস্ত বিষয়ের বিচার বিশ্লেষণ করতে পারে। অন্যান্য জীবজন্তুর মধ্যে এই বিচারশক্তির অভাব। এখানেই মানুষ ও অন্যান্য জীবের মধ্যে পার্থক্য।
এখন কথা হচ্ছে সবার মধ্যে বা সমস্ত মানুষের এই বিচার শক্তি বা বুদ্ধি সমান থাকে না। একটা শিশুর মধ্যে এই বিচারশক্তি কম - হয়তো একজন প্রবীনের মধ্যে এই বিচারশক্তি অনেক বেশী। তারমানে ছোটবেলায়, আমার যে বিচার শক্তি ছিলো , অর্থাৎ স্মৃতির ভাণ্ডারে যত অভিজ্ঞতা সঞ্চিত ছিল, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এই এই স্মৃতির ভান্ডার বা অভিজ্ঞতা বেশি করে সঞ্চিত হয়েছে। তাই বলে এটা ভাববার কোনো কারন নেই যে বয়স হলেই আমাদের বিচারশক্তির বৃদ্ধি পায়। আসলে বিচারশক্তি বৃদ্ধির কারন হচ্ছে মনের মধ্যে চৈতন্যকে প্রতিফলিত করবার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা। মনের ময়লাকে দূর করা। আর মনের ময়লা দূর হলে আমাদের বুদ্ধির মধ্যে স্বচ্ছতা আসবে। আসলে এই বুদ্ধির সাংখ্য মতে মহৎ-তত্ত্বের উপরেই চৈতন্যের সরাসরি প্রতিফলন হয়ে থাকে। তাই বুদ্ধির শুদ্ধিকরণ করাই জ্ঞানলাভের প্রাথমিক উপায়। যদিও এই বুদ্ধির সাহায্যে বিচার করে যে জ্ঞানের সঞ্চয় হয়, তা আসলে প্রাথমিক জ্ঞান মাত্র। এই বুদ্ধিকে যত পরিশীলিত করবেন, তত অধ্যাত্ম-ভাবনা মুখী হবে মন। আর মন যখন অধ্যাত্ম ভাবনায় ভরপুর হবে, তখন বিষয়ভাবনা দূরীভূত হয়ে আন্তরিক ভাবনায় ভাবিত হবে । তাই বলা হয়ে থাকে আত্মজ্ঞান সাধনার প্রথম ধাপ হচ্ছে বুদ্ধিকে শুদ্ধ করা, স্বচ্ছ করা । কিন্তু যতক্ষন আমাদের মন শুদ্ধ না হচ্ছে, ততক্ষন আমাদের বুদ্ধির শুদ্ধ হবার সম্ভব নেই। তো মন-বুদ্ধিকে শুদ্ধ করাই আমাদের প্রাথমিক কাজ। এর জন্য আমাদের নিয়মিত বুদ্ধির চর্চা করা উচিত।
------
Daily Talk - Shashanka Shekhar Shantidham
22.01.2025
Meditation on God.
If we did not have our senses, we would not be able to see, hear, etc. If we did not have our senses, we would be unable to act. But the point is that sense-obtained knowledge has any value? This knowledge is also present in animals and birds. We have even heard that these senses of animals are stronger than humans. The eyesight of eagles and vultures is much better than that of humans. Ants can understand the possibility of future storms. Birds can move much faster than humans. Many insects live in many remote places where humans cannot live. Many living creatures live at the bottom of the sea. Humans are called the greatest creatures of God. Yet they have the greatest limitations. Humans cannot fly in the sky. Humans cannot keep their breathing active in the depths of water. Even on the mountains of this world, human speed slows down. Then the question arises, what makes humans superior?
It is said that humans have a mind, which is known as the eleventh sense. Humans can think. But the truth is that animals and birds also have this mind. They also experience mental happiness and sorrow. So where is the difference? The greats say that just as all the senses are present in all living beings, so is the truth in humans too, but the difference is that the reflection of consciousness in the human mind is greater. Humans can purify their minds. Which living beings, animals, and birds cannot do. Animals and birds are bound by the laws of nature - which they are unable to free themselves from. But the mind that is present in humans, no matter how dirty or opaque it is, humans can clean it and make the reflection of consciousness clearer. Which an animal can never do. This is the difference between humans and other living beings.
As a result of the connection of the senses with the object, a feeling of feeling arises in our consciousness. This feeling is present in all living beings. Suppose an ego came before our eyes - we examined it with our eyes. Then the mango was removed. Even though this mango was removed, the image of the mango was embedded in my mind. After that, if I ever come near the mango again, the mind can immediately identify it. Now suppose, you ate the mango, the mango passed through your mouth and tongue and went into your stomach. This is the act of eating the mango, its taste remained on your tongue. And after that, if you ever see the mango again, then you will remember this mango and its taste. But the point is that this process can also happen in the case of a tiger or an animal, so where is the difference between humans and animals? The difference is, just as our memory is working behind the mind, similarly, our keen intelligence is behind the mind. The mind cannot actually specify any object perceived by the senses. When the mind comes into contact with the object through the senses, it sends this image to the intellect. The intellect again takes a similar image of us from its memory and compares it. That is, is there any difference between the mango we see now and the mango in our memory? The intellect residing in this human body has the power of judgment. With which it can judge and analyze all the things. Other living beings lack this power of judgment. This is the difference between humans and other living beings.
Now the point is that this power of judgment or intelligence is not equal among everyone or all people. This power of judgment is less in a child - perhaps this power of judgment is much more in an elderly person. That means, the power of judgment that I had in my childhood, that is, the amount of experience stored in the store of memory, this store of memory or experience has been stored more with age. Therefore, there is no reason to think that our power of judgment increases with age. In fact, the reason for increasing the power of judgment is to create a suitable environment for reflecting consciousness in the mind. To remove the dirt from the mind. And when the dirt from the mind is removed, clarity will come in our intellect. In fact, according to the Sankhya, this intellect directly reflects consciousness on the great principle. Therefore, purifying the intellect is the primary way to gain knowledge. Although the knowledge that is accumulated by judging with the help of this intellect is actually only primary knowledge. The more you refine this intellect, the more the mind will be oriented towards spiritual thought. And when the mind is filled with spiritual thought, then the thought of objects will be removed and it will be thought of in sincere thought. Therefore, it is said that the first step in the pursuit of self-knowledge is to purify the intellect, to make it clear. But until our mind is purified, it is not possible for our intellect to be purified. So purifying the mind and intellect is our primary task. For this, we should regularly practice our intellect.
------ নিত্যকথা - শশাঙ্ক শেখর শান্তিধাম
২৩.০১.২০২৫
ঈশ্বরের ধ্যান।
মানুষের বুদ্ধি এমন একটা বৃত্তি যা কেবল বাইরের বস্তুকে বিচার-বিশ্লেষণ করে তাই নয়, আমাদের অন্তরের বস্তুকেও সে পর্যবেক্ষন করে ও তার বিশ্লেষণ করে থাকে। যদিও আমাদের উদ্দেশ্য বুদ্ধিকে অতিক্রম করে জ্ঞানাতীত অবস্থায় যাওয়া, তথাপি এই বুদ্ধির সিঁড়ি দিয়েই সেখানে সেখানে অর্থাৎ উঁচুতে উঠতে হবে।
বুদ্ধিকে শুদ্ধ করে আমাদের বাহ্য বিষয় থেকে অন্তরের বিষয়ের মধ্যে প্রবেশ করতে হবে। অর্থাৎ আমাদের ভাবনা যেন হয় অধ্যাত্ম বিষয়মুখী। নিজেকে আবিষ্কার করতে গেলে, ভগবৎ সত্তাকে উপলব্ধি করতে গেলে, এই বুদ্ধিকে সহায়ক রূপে গ্রহণ করতে হবে। আমরা জানি, আমাদের একটা বিবেক আছে। আর এই বিবেক হচ্ছে আমাদের বুদ্ধির সৎ-ভাবনা বিশেষ। এই যে বিচারশক্তি ও বিবেকজ্ঞান এগুলো আসলে বুদ্ধিরূপ বৃক্ষের শাখা বিশেষ। এই বিবেকজ্ঞান দিয়ে আমাদের সমস্ত অন্তরের বিষয়কে পরখ করতে হবে। যখনই এই বিচারশক্তি বাহ্য বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে, তৎক্ষণাৎ তাকে ফিরিয়ে নিয়ে অন্তর্মুখী করে তুলতে হবে। অর্থাৎ আমাদের মন-বুদ্ধি যত অন্তর্মুখী হবে, যত অন্তরের গভীরে প্রবেশ করবে, তত সে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হয়ে উঠবে। আত্মদর্শনের জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠবে। এইভাবেই আমরা ভগবৎ দর্শনের জন্য উপযুক্ত অন্তর্চক্ষুর অধিকারী হয়ে উঠবো। আর আমরা সত্যের কাছাকাছি পৌঁছে যাবো।
দেখুন সাধনা কোনো ভোজবাজি নয়। আবার এই সাধনক্রিয়া কেউ আপনার হয়ে করতে পারবে না। আপনাকেই আপনার সাধনায় দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। আপনার হয়ে কেউ আহার করতে পারবে না। আপনার হয়ে কেউ শ্বাসক্রিয়া করতে পারবে না। আপনার হয়ে কেউ আত্মদর্শন করতেও পারবে না। আপনার মন, আপনার বুদ্ধি, আপনার বিবেক আপনাকে সত্যকে প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করিয়ে দেবে। মনভূমিকে নিরাসক্ত করতে হবে, বুদ্ধিকে নির্মল করতে হবে। বিবেকজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। মনে রাখবেন, সাধককে একটি সর্বোচ্চ চেতন ভূমিতে আরোহন করতে হবে। আপনার ভাবনায়, আপনার সংকল্পে, আপনার হৃদয়ে, আপনার প্রাণের প্রতিটি কনাকে এই কার্য্যে নিযুক্ত করতে হবে। আপনার শরীর-মন-ইন্দ্রিয়সকলযেন সর্ব্বদা উন্মুখ হয়ে থাকে আত্মদর্শনের জন্য। আর এই সব কিছুর মধ্যেই একটা সাম্যভাবের প্রবর্তনও করতে হবে।
দেখুন, মন-তো ভাবনা চিন্তা করবেই, সংকল্প করবেই, মনের মধ্যে নানান রকম বাসনার উদ্রেগ হবেই। এসব মনের স্বভাবজাত ধর্ম্ম। কিন্তু এই মন কোনো সিদ্ধান্তে কখনও পৌঁছাতে পারে না। মনের মধ্যে ভালো মন্দ বিচার করবার নিজস্ব ক্ষমতা নেই। তার মধ্যে ভালোলাগা, মন্দ লাগা আছে কেবলমাত্র । এই কারনে সে বিষয়ের সংস্পর্শে এলেই বুদ্ধির কাছে ছুটে যায়। এই বুদ্ধির উপরে অবস্থান করছে আমাদের বিবেক, সেখানে কেবল সূক্ষ্ম বুদ্ধির প্রবেশের অধিকার আছে, কিন্তু স্থূল বুদ্ধি বা মলযুক্ত বুদ্ধির প্রবেশ রুদ্ধ এই বিবেকভূমিতে । সূক্ষ্ম বুদ্ধির অধিকারী যখনই কেউ বিবেকের নির্দেশ শুনতে পায়, আর সেইমতো ক্রিয়া করে, তবে জানবেন, তার দ্বারা কোনো অশুভ ক্রিয়া করা সম্ভব হবে না। আর বুদ্ধি যার শুদ্ধ হয়নি, সে কখনো বিবেকের কাছে যেতে চায় না, বা যেতে পারে না। বিবেকজ্ঞান লাভের জন্য প্রথমেই দরকার আমাদের বুদ্ধির শুদ্ধিকরণ। বুদ্ধির শুদ্ধকরন মানেই বুদ্ধির সূক্ষ্মতার মাত্র বৃদ্ধি।
------------
Daily Talk - Shashanka Shekhar Shantidham
23.01.2025
Meditation on God.
Human intellect is such a faculty that not only judges and analyzes external objects, but also observes and analyzes our internal objects. Although our aim is to go beyond the intellect and go to the state of non-knowledge, we have to climb higher and higher through the ladder of this intellect.
We have to purify our intellect and enter from external objects into internal objects. That is, our thoughts should be oriented towards spiritual objects. If we want to discover ourselves, if we want to realize the divine being, we have to take this intellect as an assistant. We know that we have a conscience. And this conscience is the special good thought of our intellect. This power of judgment and the knowledge of conscience are actually special branches of the tree of intellect. With this knowledge of conscience, we have to examine all the matters of our internal objects. Whenever this power of judgment is involved with external matters, it must be immediately withdrawn and turned inward. That is, the more our mind and intellect turn inward, the deeper it penetrates into the heart, the more subtle it becomes. It becomes suitable for self-realization. In this way, we will become the possessor of inner eyes suitable for the vision of God. And we will reach closer to the truth.
See, sadhana is not a feast. Again, no one can do this sadhana for you. You yourself have to take firm steps in your sadhana. No one can eat for you. No one can breathe for you. No one can even do self-realization for you. Your mind, your intellect, your conscience will make you realize the truth directly. The mind has to be dispassionate, the intellect has to be purified. You have to be established in the knowledge of conscience. Remember, the sadhak has to ascend to a supreme conscious land. Your thoughts, your resolve, your heart, every part of your soul must be engaged in this work. Your body-mind-senses must always be open to self-reflection. And in all these things, a state of equanimity must also be introduced.
Look, the mind will think, make resolutions, and various desires will arise in the mind. These are the natural laws of the mind. But this mind can never reach any conclusion. The mind does not have its own ability to judge good and bad. It only has good and bad feelings. For this reason, whenever it comes into contact with a subject, it rushes to the intellect. Our conscience is located above this intellect, only the subtle intellect has the right to enter there, but the gross intellect or the intellect with feces is not allowed to enter this land of conscience. Whenever someone with a refined intellect hears the instructions of conscience and acts accordingly, then he will know that it will not be possible for him to do any evil deed. And one whose intellect is not purified, he never wants to go to conscience, or cannot go. To gain the knowledge of conscience, we first need to purify our intellect. Purification of intellect means only increasing the refinement of intellect.
------------
নিত্যকথা - শশাঙ্ক শেখর শান্তিধাম
২৪.০১.২০২৫
ঈশ্বরের ধ্যান।
আমাদের বুদ্ধিসত্তার উপরে আছে বোধিসত্তার অবস্থান। আমাদের সবার যেমন বুদ্ধি আছে, বিবেক আছে, তেমনি আছে বোধিসত্তা। এটি বিবেক-বুদ্ধি-বিচারশক্তির উপরে অবস্থান করে । এই বোধিসত্তা একটি ভাবনা বা অনুমান বিশেষ মাত্র যার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা কোনো বিষয়ে যখন গভীর ভ্যানে নিমগ্ন হই তখন আকস্মিক কোনো ভবিষ্যৎ ঘটনার আভাস আমাদের মনের মধ্যে ফুটে ওঠে। একে ইংরেজিতে ইনট্যুশন বলা যেতে পারে। এটি ঠিক অনুমান নয়, এটি একটা স্বতঃপ্রণোদিত অনুভূতি বা সজ্ঞান বিশেষ। আমাদের শুদ্ধবুদ্ধি যা আত্মজ্ঞান লাভের জন্য অপরিহার্য্য কিন্তু শুধু এই বুদ্ধির সাহায্যে পরমার্থ জ্ঞান লাভ সম্ভব নয়। এই পরমার্থ বিদ্যা আমাদের বুদ্ধির নাগালের বাইরে। আবার এই শুদ্ধ বুদ্ধিই এই পরমার্থ জ্ঞানের উন্মোচন করে থাকে। এই বোধিসত্তাতেই পরমার্থ জ্ঞানের আলোক প্রতিফলিত হয়। হঠাৎ একটা জ্ঞানালোকের ঝিলিক ওঠে আবার মিলিয়ে যায়। মন-বুদ্ধি যখন সম্পূর্ণরূপে নিস্তরঙ্গ হয়, তখন এই অধ্যাত্ম উপলব্ধি হয়ে থাকে। এই জ্ঞানের ঝিলিক হঠাৎ সমস্ত জাগতিক অনুভূতিকে দূর করে অপার্থিব অনুভূতির স্পর্শ এনে দেয়। এটা যেমন ইচ্ছে করে আনা যায় না, আবার একে ইচ্ছে করে পরিহার করাও যায় না। এই ঝিলিক একসময় বিরামহীন হয়ে ওঠে, আর সাধক জগৎকে বিস্মৃত হয়ে পরমলোকে বিচরণ শুরু করে। মন-প্রাণ তখন পরমার্থ জ্ঞানের আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। এ এক দুর্লভ অনুভূতি, যা বাক্যের অতীত।
ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, চিত্তবৃত্তি নিরোধের নাম যোগ। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, (২/২১) যোগস্থ পুরুষ ইন্দ্রিয়াতীত নির্ম্মল বুদ্ধিগ্রাহ্য যে আন্তরিক সুখ তা অনুভব করেন এবং যে অবস্থায় স্থিত হলে তাঁর সেই আত্মনিষ্ঠা আর বিচলিত হয় না তাই যথার্থ যোগ। "সুখম আত্যন্তিকম যৎ-তৎ বুদ্ধিগ্রাহ্যম অতীন্দ্রিয়ম"
এই অবস্থাই পরমানন্দের অবস্থা।
24.01.2025
Meditatio on God.
Above our intellect is the position of Bodhisatta. Just as we all have intellect, conscience, so too is Bodhisatta. It is situated above conscience-intellect-judgment. This Bodhisatta is just a thought or assumption for which no logical explanation can be given. When we are deeply immersed in a subject, a sudden glimpse of a future event emerges in our mind. This can be called intuition in English. This is not exactly an assumption, it is a spontaneous feeling or consciousness. Our pure intellect, which is essential for gaining self-knowledge, cannot attain supreme knowledge with the help of this intellect alone. This supreme knowledge is beyond the reach of our intellect. Again, this pure intellect reveals this supreme knowledge. The light of supreme knowledge is reflected in this Bodhisatta. Suddenly, a glimmer of knowledge arises and disappears again. When the mind and intellect are completely free, then this spiritual realization is realized. This glimmer of knowledge suddenly removes all worldly feelings and brings a touch of unworldly feelings. Just as it cannot be brought about at will, it cannot be avoided at will either. This glimmer eventually becomes uninterrupted, and the seeker forgets the world and starts wandering in the supreme world. The mind and soul then become illuminated by the light of supreme knowledge. This is a rare feeling, which is beyond words.
Sage Patanjali says that the name of yoga is the control of the mind. Yogeshwar Lord Sri Krishna says, (Geeta - 2/21) The person who is in yoga experiences the sincere happiness that transcends the senses, pure and intellectual, and when he is in that state, his self-confidence is no longer disturbed, that is true yoga. "Extremely happy, in every way, intelligible, transcendental"
This state is the state of bliss.-----------
নিত্যকথা - শশাঙ্ক শেখর শান্তিধাম
২৫.০১.২০২৫
ঈশ্বরের ধ্যান।
সাংখ্য দর্শন বলছে, পুরুষ ও প্রকৃতির সান্নিধ্য জগৎ সৃষ্টির কারন। আবার বলা হয়ে থাকে যাকিছু এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আছে তা এই ক্ষুদ্র শরীর রূপ ভাণ্ডারে অবস্থান করছে। প্রকৃতি জড় আর পুরুষ চৈতন্য স্বরূপ। তাহলে আমাদের এই স্থূল শরীরকে আমরা যদি প্রকৃতি বলে মনে করি, তবে আমাদের যে চেতন শক্তি তাই হচ্ছে পুরুষ সত্ত্বা। এই পুরুষকে বা চৈতন্যশক্তিকে যদি আমরা আত্মা বা ব্রহ্ম বলে নামকরণ করি, তবে বলতেই হয় এই আত্মার সাথে, আমরা যারা শরীর সর্বস্য জীব, তারা সবাই সেই আত্মার সঙ্গেই বাস করছি। তাহলে আমরা আর আত্মার থেকে আলাদা হলাম কি করে ? আর যোগাদি বা সাধন-ভাজন ইত্যাদির প্রয়োজন কোথায় ?
সত্য হচ্ছে আমরা কখনোই আত্মার থেকে বিচ্ছিন্ন নোই, আত্মা থেকে আমরা কখনো আলাদা হতেই পারি না। সেই ক্ষমতাও আমাদের নেই। কিন্তু কথা হচ্ছে তাহলে আমরা আর এই আত্মার খোঁজে জন্ম থেকে জন্মান্তর ঘুরে মরছি কেন ? আত্মা ভিন্ন তো কেউ নয়। এমনকি আমরা যখন এই স্থূল দেহ ত্যাগের পরে সূক্ষ্ম দেহে অবস্থান করি, তখনও আমরা সেই আত্মার সঙ্গেই বাস করি।
আর একটা সত্য হচ্ছে, আমরা নাকি প্রতিদিন অন্তত একবার এই আত্মার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে থাকি। এমনকি বলা হয়, আমরা যদি এই আত্মার সাথে সাক্ষাৎ করতে না পারি, তবে আমাদের পাগল হয়ে যাবার সম্ভাবনা। বা আমরা জরসত্ত্বায় পরিণত হবো। আমাদের প্রকৃতি জাত সত্ত্বা আর পুরুষ সত্ত্বা অর্থাৎ এই আত্মার সঙ্গে সাক্ষাৎ আমাদের প্রতিদিনই ঘটে থাকে। কিন্তু সেই মুহূর্তের কথাগুলো আমাদের স্মৃতিতে থাকে না। তাই আমরা যে আত্মার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি, সেই সত্য আমাদের মনের মধ্যে স্থান পায় না। আপনি বিশ্বাস করুন আর না করুন, আপনি আমি বহুজন্ম অতিক্রম করে আজ এই মনুষ্য দেহ ধারণ করেছি। কত লক্ষ জীবন যে আমরা অতিবাহিত করেছি, কত লক্ষ-কোটি যোনি ভ্রমন করে যে আমরা এই মনুষ্য যোনিতে প্রবেশ করেছিলাম, তা আমাদের স্মৃতিতে নেই। ঠিক তেমনি আমরা গত ২৪ ঘন্টায়, যে আত্মার সাথে সাক্ষাৎ করেছি, তাও আমাদের স্মৃতিতে থাকে না। কিন্তু থাকে যেটা সেটা হচ্ছে, সেই অমৃতক্ষনের একটা ছায়া বিশেষ, একটা আভা । আর ঠিক এই কারণেই হারানো সেই অমৃতের আস্বাদন করবার জন্য আমরা জলে জঙ্গলে, পাহাড়ে, ভিড়ের মধ্যে বা নিৰ্জনে সেই অমৃত বস্তুর সন্ধান করে থাকি। এই যে স্মৃতি না থাকা, বা ভুলে যাওয়া এর কারন কি জানেন ?
প্রথমেই বলি এই আত্মসাক্ষাৎকারের সময় হচ্ছে আমাদের সুসুপ্তি বা গাঢ় নিদ্রার সময়। এই গভীর ঘুমে আমরা জাগতিক সমস্ত কিছু ভুলে, এমনকি কি স্বপ্নের জগৎ পেরিয়ে আমরা সেই অন্তর্জগতে প্রবেশ করি, আর আত্মসাক্ষাৎ করে থাকি। এই সময়টি হচ্ছে আমাদের সত্যিকারের বিশ্রামের সময় বা বলা যায় আত্মার সাথে সময় বিতানোর সময়। এই সুসুপ্তি সময়ের নিরিখে হয়তো খুব বেশি নয়, কিন্তু এই সময়টুকুই আমাদের সমস্ত জাগতিক বন্ধন থেকে মুক্তির সময়। ঘুমের স্বপ্নাবস্থায় আমাদের শরীর বিছানায় শুয়ে থাকে, কিন্তু মনের ক্রিয়া চলতে থাকে। আর ঠিক এই কারণেই, আমরা তখন একটা স্বপ্নের জগতে অর্থাৎ আমাদের মানসিক শরীরে অবস্থান করে, সমস্ত ক্রিয়াদি এমনকি ভোগাদি সম্পাদন করে থাকি। এই অবস্থা থেকে জেগে উঠে আমরা স্বপ্নের জগতের বা সেখানে যাকিছু ঘটেছে, তার বিবরণ দিতে পারি।
কিন্তু আমরা যখন গাঢ় ঘুমের মধ্যে অর্থাৎ সুসুপ্তিতে প্রবেশ করি তখন আমাদের মনের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কথা হচ্ছে সুসুপ্তিতে শরীর বিছানায় পরে থাকে, তাহলে মনটা যায় কোথায় ? আমাদের মুনি-ঋষিগণ বলছেন, এইসময় আমরা স্ব-স্বরূপে প্রবেশ করে, আর সেখানেই লীন হয়ে অবস্থান করি। অজ্ঞানে আচ্ছন্ন জীবাত্মা তখন চৈতন্যস্বরূপ পরমাত্মায় প্রবেশ করে তার সাথে একাকার হয়ে যায়।
যে জীবাত্মা দেহের মধ্যে অবস্থান ক'রে এতক্ষন নিজেকে দেহ-মনের সঙ্গে অভিন্ন করে ফেলেছিলো আর মনের মধ্যে আত্মার (চৈতন্য) প্রতিফলন হেতু, মনের সঙ্গে নিজেকে অভিন্ন ভেবে নিয়েছিল, সেই জীবাত্মা এখন অর্থাৎ সুসুপ্তিতে পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হয়ে নিজের জীবসত্ত্বা ভুলে যায়, পরমাত্মার সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। আর স্মৃতি হচ্ছে মনের একটি কোটর বিশেষ। মন হচ্ছে একটা আয়না বিশেষ। আয়না যখন সামনে থেকে সরে যায়, তখন আমাদের অজ্ঞান দূর হয়ে যায়। আর অজ্ঞান দূরীভূত হলে আমরা চৈতন্যবোধে উদ্ভুদ্ধ হয়ে যাই। মন জড় পদার্থ, কিন্তু চৈতন্যের প্রতিফলন হেতু মনকে চেতন বলে মনে হয়। আর এই মনই ইন্দ্রিয়বাহিত সমস্ত বিষয়কে আত্মার কাছে উপস্থিত করে।
এখন কথা হচ্ছে, সুসুপ্তিতে আমরা আত্মার সাথেকে একাত্ম হয়ে গিয়েও আমাদের কেন আত্মজ্ঞান হয় না। এর কারন হচ্ছে আমাদের অজ্ঞানতা, বা ভ্রমজ্ঞান। জগৎ সত্য এই ভ্রমজ্ঞান যতদিন আমাদের না কাটছে ততদিন আমরাই আমাদের স্বরূপকে আড়াল করে রাখি। আর এই অজ্ঞানতা দূর করবার জন্যই যত সাধন-ভজন যোগাদির নির্দেশ দিয়েছেন, আমাদের প্রাচীন মুনিঋষিগন।
---------- নিত্যকথা - শশাঙ্ক শেখর শান্তিধাম
২৬.০১.২০২৫
ঈশ্বরের ধ্যান।
সাধন জগতে প্রাণ ও মনের মাহাত্ম অপরিসীম। প্রাণেই যদি না বাঁচলাম, তবে আর সাধন ভজন করে কি হবে ? আবার ধুক ধুক করে কোনো রকমে প্রানটাকে জিইয়ে রেখে, রোগ-শোকের মধ্যে জীবন অতিবাহিত হলে তার দ্বারা সাধন ভজনে মন বসানো সম্ভব নয়।
মানুষের জন্মের পিছনে যে শুক্র ও রজের ভূমিকা আছে, তাকে অস্বীকার করা যায় না। আর এই শুক্র ও রজঃ আসলে অম্লজানের (অক্সিজেন) ক্রিয়া বিশেষ। এই অক্সিজেন বা অম্লজান হচ্ছে গ্যাসীয় পদার্থ বিশেষ, যাকে আপনি জীবনের উৎস বলতে পারেন।
আমাদের এই যে স্থূল শরীর এটি অসংখ্য কোষের সমষ্টি মাত্র । আর এইযে কোষ এরা প্রত্যেকেই আমরই ক্ষুদ্র সংস্করণ বা অবয়ব। এই কোষের প্রত্যেকটির মধ্যে একটা আমি বসে আছে। এই অসংখ্য কোষের প্রত্যেকটির মধ্যে অনুরূপ কোষের জন্ম দেবার ক্ষমতা আছে। অর্থাৎ সময় ও আকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এরা আপনা থেকেই ভেঙে ভেঙে নিজেদের সংখ্যা বাড়াতে সক্ষম। আর এই কোষগুলোর প্রধান খাদ্য হচ্ছে অম্লজান বা অক্সিজেন। আমরা যাকিছু খাই বা পানকরী বা শরীরের মধ্যে বিভিন্নভাবে গ্রহণ করি, তার মধ্যে এই অক্সিজেন আছে। আর সেখানে থেকেই কোষগুলো তার বেঁচে থাকবার রসদ বা খাদ্য পাচ্ছে। এই অক্সিজেন ছাড়া আমাদের শরীরের আরো যেসব তত্ত্ব রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে কার্বনডাই অক্সাইড, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন ইত্যাদি। অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম, এইযে পঞ্চতত্ত্ব ও সপ্ত ধাতু অর্থাৎ রস, রক্ত, মাংস, মেদ, অস্থি, মজ্জা ও শুক্র এগুলো হচ্ছে শরীরের মূল উপাদান। এই সপ্তধাতু ও পঞ্চভূতের তৈরী শরীর একে জীবন্ত করে রাখতে বা একে চৈতন্যবান করে রাখতে অম্লজানের ভূমিকা সবচেয়ে বেশী। অক্সিজেন থেকেই আমাদের প্রত্যেকটি কোষের মস্তিস্ক তৈরী হচ্ছে। এই অক্সিজেন থেকে কোষের মধ্যে বিদ্যুতায়নের ফলে কোষের মধ্যে গতির সঞ্চার হচ্ছে। তো বলা যেতে পারে, এই অক্সিজেন হচ্ছে আমাদের জীবন যজ্ঞের ইন্ধন বিশেষ। এই অক্সিজেনের কারণেই কোষের গতি, আয়তন বৃদ্ধি ও সংখ্যাবৃদ্ধি হয়ে থাকে। তো আমাদের শরীরের ক্ষয়রোধে এবং জীবনীশক্তি সঞ্চয়ের মূল উপাদান হলো অক্সিজেন।
তো যা বলছিলাম, আমার মধ্যে অর্থাৎ আমার এই শরীরের মধ্যে কোটি কোটি আমি রূপ কোষ আছে। এরা সবাই আলাদা আলাদা করে কর্ম্মে নিযুক্ত আছে। অর্থাৎ এদের সবার কর্ম্ম করবার নিজস্ব ক্ষমতা আছে। এবং এদের প্রত্যেকের কর্ম্মের সঙ্গে অন্যের কর্ম্মের একটা সাযুজ্য আছে। এ যেন একটা গান-বাজনার দল। কেউ বাঁশি বাজাচ্ছে, কেউ হারমোনিয়াম বাজাচ্ছে, কেউ তবলা বাজাচ্ছে, কেউ গলা মেলাচ্ছে, কিন্তু একজনের সঙ্গে আরেকজনের একটা মধুর সম্পর্ক আছে। আর ঠিক এই কারণেই, একটা মধুর সংগীতের সুর আমাদের কানে আসছে। আমাদের ভালো লাগছে বা মন্দ লাগছে। এই মন্দ লাগা এটি আসলে সুর-তালের মিল না খাওয়া, আর ভালোলাগা মানে সুর-তালের মিল খাওয়া।
-----------------
নিত্যকথা - শশাঙ্ক শেখর শান্তিধাম
২৭.০১.২০২৫
ঈশ্বরের ধ্যান।
জীবকুল তা সে জাগ্রত অবস্থায় বলুন, আর নিদ্রাকালীন অবস্থাতে বলুন, সদা ভয়ের মধ্যে বাস করছে। কখনও শরীর খারাপের ভয়, কখনো সম্পত্তি হারানোর ভয়, কখনও পুলিশের ভয়, তো কখনও চোরের ভয়। কখনও সম্পর্ক বিচ্ছেদের ভয়, কখনও মৃত্যুর ভয়। মুক্তানন্দ বলছেন, সব ভয় দূর হয়ে যাবে, এমনকি মৃত্যুভয় দূর হয়ে যাবে, যদি তুমি প্রাণের শরণে আসতে পারো।
এ কথা সত্য জন্ম যখন হয়েছে, তখন মৃত্যুকে আমরা কেউ এড়িয়ে যেতে পারবো না। জাতস্য হি ধ্রুব মৃত্যু। আর মৃত্যু হচ্ছে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা। জন্মের সময় যেমন প্রথম শ্বাসের সঙ্গে জীবন ক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তেমনি মৃত্যুর সময় আমাদের শ্বাসের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। জন্ম আমার কাছে অতীত, তখন যে কত কষ্ট সহ্য করেছিলাম, তা আমার স্মৃতিতে নেই। কিন্তু মৃত্যু আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে ফাঁকি দিয়ে কেউ নিজেকে লুকোতে পারে নি। ভবিষ্যতেও পারবে না। প্রত্যেকটি জীবনের জীবন কালের একটা উর্দ্ধসীমা আছে। তার বাইরে কেউ যেতে পারে না। কেউ এক ঘণ্টা বাঁচে, কেউ একদিন বাঁচে, কেউ ৭ বছর বাঁচে তো কেউ ৭০ বছর বাঁচে। কেউ চার বছর বাঁচে, তো কেউ চারশ (কচ্ছপ) বছর বাঁচে। তো মৃত্য আমাদের সবার নিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তো মৃত্যুকে আমাদের ভয় করে, বা মৃত্যুকে আমরা দূরে সরিয়ে নিজেকে মৃত্যু থেকে আলাদা করে রাখতে পারবো না। এই শরীরের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে আমরা মৃত্যুকে নিয়ে এসেছি। তথাপি আমাদের ভয় হচ্ছে, আমাদের মৃত্যুযন্ত্রণা। জন্মের সময় যে যন্ত্রনা আমাকে ১০ মাস ১০ দিন ভোগ করতে হয়েছিলো , মৃত্যুর আগে কি আমাকে শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে বিছানায় পড়ে থাকতে হবে ? ভীষ্মের মতো মহাত্মা যার ইচ্ছেমৃত্যু বড় ছিল, তাকেও শরীর ছাড়ার আগে, যুদ্ধক্ষেত্রে শরশয্যায় দিনের পর দিন, নির্জনে অসহ্য শারীরিক মানসিক যন্ত্রনা ভোগ করতে হয়েছিল। আমাদের জন্য ভবিষ্যতে কি অপেক্ষা করছে, তা আমরা কেউ জানি না।
আমাদের প্রাচীন ঋষিগণ বলছেন, মাভৈ - জীবনের সমস্ত প্রতিকূলতা থেকে নির্ভয়ে বেঁচে থাকবার জন্য, এমনকি মৃত্যুকে হাসতে হাসতে বরণ করবার জন্য আমাদের প্রাণের শরণে আসতে হবে। আমরা কতদিন বাঁচবো, তা আমরা জানি না, তবে একথা ঠিক আমাদের বিধাতা আমার আয়ু যাকিছুই লিখে রাখুন না কেন, আমরা সেটা পরিবর্তন করে নিতে পারি। আপনার কর্ম্ম শেষ না হওয়া পর্যন্ত এখান থেকে কেউ আপনাকে নিতে পারবে না, যদি আপনি প্রাণের শরণে থাকেন । আর একটা জিনিস জানবেন, কর্ম্মক্ষয় হলে, কর্ম্মফল ভোগ সম্পাদন হয়ে গেলে, আর আমাদের এই কর্ম্মশরীর গ্রহণ করতে হবে না। ফলতঃ এই জীবনেই আমাদের মুক্তি নিশ্চিত হয়ে যাবে।
দেখুন মৃত্যুকালে কি হয় ? আমাদের প্রাণবায়ু বেরিয়ে যায়। আর আমরা যেহেতু এই প্রাণের গতাগতিকে সারাটা জীবন অগ্রাহ্য করেছি, কখনও প্রাণের সঙ্গে আমাদের সখ্যতা গড়ে ওঠেনি, প্রাণ তার নিজের মতো করেই একবার এসেছে, একবার চলে গেছে। প্রাণকে একবারও আমরা একটু বসতে বলিনি। সত্যি বলতে কি আমরা এই অমূল্য প্রাণকে গ্রাহ্যই করি নি। সে যে কখন আসছে, আর কখন চলে যাচ্ছে, তার দিকে আমরা খেয়াল করিনি। আর ঠিক কারণেই, প্রাণ যখন শরীর ছেড়ে বিদায় নেয়, তখন সে শরীরের মধ্যে একটা ঝড় তোলে, শরীরের মধ্যে একটা উথালপাথাল শুরু হয়। ধীরে ধীরে সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলোকে সে বিকল করে দেয়। আর আমরা ত্রাহি মাম ত্রাহি মাম বলে গোঙাতে থাকি। কারন কথা বলার শক্তি আমাদের হারিয়ে যায়। আমরা একটা অসহ্য যন্ত্রণার শিকার হই। এই অবস্থা থেকে রেহাই পেতে গেলে, আসুন আমরা সবাই প্রাণের শরণে আসি। যে প্রাণ আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, যে প্রাণ আমাদের সারা জীবনের সাথী হয়ে নিরলস ভাবে পরিশ্রম করে গেছে, শরীরটাকে কর্ম্মক্ষম রাখবার জন্য, যে প্রাণ আমাদের এই শরীরটাকে জীবন্ত করে রেখেছে, তার দিকে একটু ধ্যান দেই। প্রাণকে একটু বসতে বলুন, কখনো হৃদয়ে, কখনো উদরে। কখনও পেটের মধ্যে, কখনও বুকের মধ্যে। আসুন না প্রাণকে কখনো শরীরের বাইরে, সামনে বসাই, তাকে একটু ভালোকরে দেখি, তার কথা একটু শুনি। এতদিন প্রাণ তার ইচ্ছেমতো একবার ভিতরে প্রবেশ করেছে, একবার বাইরে বেরিয়ে গেছে। এবার আসুন, প্রাণের সঙ্গে আমরা একটু সময় কাটাই। যখন সে বাইরে যাচ্ছে তখন আপনিও তার সঙ্গে বাইরে এসে, তার কথা শুনুন। আবার যখন সে ভিতরে প্রবেশ করছে, তখন তাকে নিয়ে একটু হৃদয়াসনে বসান । হোক না ক্ষনিকের জন্য তথাপি, প্রাণ বুঝুক আমি তার কাছেই আছি। আমরাও প্রাণকে নিয়েই জীবন কাটাই। দেখবেন, জীবনটা কত সহজ হয়ে গেছে। আপনার মধ্যে থেকে হিংসা, রাগ, ঘৃণা, ভয় দূর হয়ে যাবে। আপনার মধ্যে প্রেমের অঙ্কুর পাতা ছাড়বে। ফলে ফুলে ভোরে উঠবে আপনার জীবন। আপনি নির্ভয়ে আপনার কর্ম্মজীবন অতিবাহিত করতে পারবেন। এ এক অদ্ভুত অলৌকিক ক্রিয়া যা আমাদের মুনিঋষিগন হাজার হাজার বছর আগে উপলব্ধি করেছিলেন। আজও এই ক্রিয়া অশেষ ফলদায়ী।
দেখুন এই বিরাট বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আমি একটা ক্ষুদ্র সংস্করণ। বহির্জগতে যেমন অদ্ভুত সব ক্রিয়া চলছে, আমার এই ক্ষুদ্র শরীরেও অদ্ভুত সব ক্রিয়া চলছে। আমরা সেইসব অদ্ভুত ক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত নোই, তার কারন হচ্ছে আমাদের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই আপনার উপল্বদ্ধিতে আসবে, চোখ রূপের প্রত্যাশী, কান ধ্বনির প্রয়াসী, জিভ রসনা তৃপ্তির জন্য উদগ্রীব, নাক সুগন্ধের প্রয়াসী, ত্বকের মধ্যে আছে স্পর্শসুখের প্রত্যাশা। কিন্তু প্রাণের কোনো প্রত্যাশা নেই। সে কেবল আপনার ভালোবাসার কাঙাল। কিন্তু তাকে আমরা সারাজীবন উপেক্ষা করেই এসেছি। শরীরের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিশ্রাম নেয়, কিন্তু প্রাণের আসা যাওয়া চলতেই থাকে, তার সে স্বপ্নের মধ্যে হোক, গভীর নিদ্রায় হোক, বা জাগ্রত অবস্থায় হোক। প্রাণের প্রবাহ চলতেই থাকে, এক মুহূর্তের জন্য সে আপনাকে ছেড়ে তো যায়ই না, বরং তার উপস্থিতিই আপনাকে জীবন্ত করে রেখেছে। আসুন আমরা সবাই প্রাণকে প্রাণবন্ত করি।
একটা ছোট্ট ঘুমন্ত শিশুর দিকে নজর দিন, দেখবেন, প্রাণের প্রবাহ কেমন ছন্দবদ্ধ হয়ে বয়ে চলেছে। আপনি খেয়াল করুন, নাক দিয়ে প্রাণবায়ু প্রবেশ করছে, শ্বাসনালী বাহিত হয়ে, কেমন গলা, বুক হয়ে পেটের মধ্যে প্রবেশ করছে, আবার সেই একই পথ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আরো একটু গভীর ভাবে পর্যবেক্ষন করলে বুঝতে পারবেন, নাক বা মুখের বায়ু যাচ্ছে আজ্ঞাচক্রে, সেখান থেকে সহস্রার অর্থাৎ মাথার তালু প্রবাহিত হয়ে মেরুদন্ড দিয়ে মূলাধারে প্রবেশ করছে। মাথার তালুতে হাত রাখতে বুঝতে পারবেন, প্রাণ সেখানে তরঙ্গ তুলছে। প্রাণ তার নিজের রাস্তা করে নিয়েছে। আসুন আমরা প্রাণের সেই যাত্রাপথের কাছে এসে তার জয়গান করি অভিনন্দন জানাই । তার এই বিরামহীন যাত্রা পথে এসে আমরা তাকে উৎসাহিত করি। আর আমাদের জীবন হোক, নির্ভিক, আনন্দময়।
-------------
নিত্যকথা - শশাঙ্ক শেখর শান্তিধাম
০৪.০৫.২০২৫
ঈশ্বরের ধ্যান।
এক জিজ্ঞাসু প্রশ্ন করছেন, ঈশ্বরের ধ্যান করলে কি হয় ? আপনি ঈশ্বরের ধ্যান করছেন, আমি করছি না। আপনার ও আমার মধ্যে তো কোনো পার্থক্য দেখতে পাচ্ছি না। জ্বরা ব্যাধি মৃত্যু এই তিন তো আমার জীবনে যেমন সত্য, তেমনি আপনার জীবনেও সত্য। আপনারও ক্ষুধা তৃষ্ণা আছে, আমারও আছে। তো আপনি ঈশ্বরের ধ্যান করে কি পেয়েছেন, যা আমি পাইনি। আপনার-আমার মধ্যে পার্থক্য কোথায় ?
যোগগুরু বলছেন, গভীরভাবে দেখতে গেলে তোমার ও আমার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য হচ্ছে তুমি শ্রোতা, আর আমি বক্তা। তোমার মধ্যে প্রশ্ন আছে, আর আমার মধ্যে উত্তর আছে। তোমার মধ্যে যিনি প্রশ্ন করছেন, আমার মধ্যে তিনিই বক্তা হিসেবে বিরাজ করছেন। যিনি শুনছেন, তিনিই বলছেন। আসলে বহুদিন আগে, আমিও প্রশ্ন কর্ত্তা ছিলাম, আজ আমি উত্তর দাতা। বহু জন্ম ধরে আমার মধ্যে ঢেউয়ের আকারে প্রশ্ন জেগেছে, এখন সেই আমার মধ্যেই বুদ্বুদের মতো উত্তরের সফেদ ফ্যানা দেখা দিয়েছে।
আসলে ঈশ্বরের ধ্যান করলে কি হয়, বা কি হবে, সেটা ভেবে ঈশ্বরের ধ্যান হয় না। ঈশ্বরের ধ্যান আপনা থেকেই আসে। এটা হয়তো আমার স্বভাবের মধ্যে ঢুকে গেছে। তোমার মধ্যে যেমন বিষয় চিন্তন হয়, আমার মধ্যে তেমনি ঈশ্বরের চিন্তন ঘুরপাক খেতে থাকে। তুমি বিষয় চিন্তন রোধ করতে পারো না, আমিও ঈশ্বর চিন্তন রোধ করতে পারি না। আর ঠিক এই কারণেই, তোমাকে ঘিরে আছে বিষয়রূপ জাগতিক ঐশ্বর্য্য। আমাকে ঘিরে আছে, পারমার্থিক ঐশ্বর্য্য।
হ্যাঁ তুমি বলছিলে, আমার জ্বরা, ব্যাধি, জন্ম মৃত্যু আছে, তোমারও আছে। তাহলে পার্থক্য কোথায় ? পার্থক্য হচ্ছে, এই জীবনেই মধ্যে তুমি জ্বরা ব্যাধি মৃত্যুকে দর্শন করছো, গুরুত্ত্ব দিয়ে উপলব্ধি করছো, আর আমি এগুলোকে উপেক্ষা করছি। তো শারীরিক ব্যাধি হলে তুমি ডাক্তারের কাছে ছুটে যাও প্রতিকারের আশায়। আর আমি ঈশ্বরের সান্নিধ্য উপলব্ধি করি এই সময়। তোমার জীবনের লক্ষ্য জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ, আমি জীবনের পারে যেতে চাই। তুমি গাছ দেখো, ফল দেখো, আমি ওই গাছের বীজের মধ্যে প্রবেশ করতে চাই। আমার লক্ষ্য জীবন থেকে জীবনের উর্দ্ধে। তুমি স্থূল শরীরের জন্য চিন্তিত, কেননা তুমি এই স্থূল শরীরের মধ্যে বাস করতে চাও। আমি শুধু স্থূল নয়, সূক্ষ্ম ও কারন শরীরকেও ছেড়ে জন্ম-মৃত্যুর অতীতে যেতে চাই। তাই স্থূল শরীরের জন্য বা স্থূল জগতের জন্য আমি শোক করি না। প্রিয়জনের মৃত্যু আমাকে শোকাচ্ছন্ন করে না, আবার জন্মেও আমি আনন্দিত হই না। স্থূল জগতের সুখ আমাকে সুখী করতে পারে না। জাগতিক সম্পদ আমাকে আকর্ষণ করে না। প্রকৃতির জগতে প্রকৃতির নিয়ম তো অগ্রাহ্য করবার উপায় নেই। কিন্তু আমি তাঁর সাক্ষাৎ চাই, যিনি এই নিয়মের প্রবর্তক। এই শরীর প্রকৃতির নিয়মে তৈরী হয়েছে, আবার প্রকৃতির নিয়মে কালের গর্ভে নিমজ্জিত হবে। এর জন্য তোমাকে আমাকে কিছুই করতে হবে না। তবে তোমার যদি মনে হয়, আমি তোমার চেয়ে ভালো আছি, তবে আমার কথাগুলো শোনো আর সেইমতো কার্য্যে লিপ্ত হও।
হে অমৃতের সন্তান, একবার ক্ষনিকের জন্য প্রাণের সাথে হৃদয়কেন্দ্রে এসে দাঁড়াও, আর সত্যকে উপলব্ধি করো। দেখো তোমার মেরুদণ্ডের অন্তঃস্থলে ঢেউ উঠেছে। তোমার সুষুম্নাকান্ড ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। আর তুমি চন্দ্র-সূর্য্যের দেশ ছেড়ে, এক মহাজাগতিক জগতে প্রবেশ করেছো - যেখানে স্নিগ্দ্ধ আলোর রোশনাই জগৎটাকে স্বপময় করে রেখেছে।
একটা জিনিস জেন, তোমার মধ্যে অশেষ গুনের সমাহার আছে। তোমার মধ্যে আছে বিচারশক্তি, তোমার মধ্যে আছে সংযমী হবার শক্তি। তোমার মধ্যেই আছে শরীরকে আরোগ্য করবার শক্তি, তোমার মধ্যেই আছে পাপকে দূরে রাখবার শক্তি। তোমার মধ্যে আছে দয়া, ক্ষমা, সত্য, দম ইত্যাদি গুন্। এই দিব্যগুন্ সম্পন্ন আত্মা তুমি। একটা জিনিস জেনো, প্রাণ আত্মার সঙ্গে ছায়ার মতো বিচরণ করে থাকে। যদিও প্রাণ অস্থির, কিন্তু আত্মা স্থির। প্রাণ গতিশীল, কিন্তু আত্মা গতিহীন। প্রাণ আত্মার সন্তুষ্টির জন্য দেহ থেকে দেহান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রাণই ইন্দ্রিয়সকলকে সক্রিয় করে আত্মার বিষয় ভোগ ঘোচাচ্ছে। এই প্রাণকে ধরতে গেলে, আমাদের নিয়ম করে প্রাণায়ামের অভ্যাস করতে হবে।
প্রাণায়ামের তিনটি ধাপ, রেচক, পূরক, কুম্ভক। কুম্ভকের আবার দুটো ভাগ - অন্তর-কুম্ভক ও বাহ্য কুম্ভক। আমরা জানি, প্রাণের আশ্রয়ে জীবের জীবনক্রিয়া চলছে। প্রাণের ক্রিয়ার একটা ছন্দ আছে। ঢেকিতে চিড়া কুটতে দেখেছো ? ঢেকির মাথা যখন উপরে ওঠে তখন হাত চালিয়ে চিড়ে নাড়িয়ে দেওয়া হয়। ঢেকির ওঠা-নামার মধ্যে একটা তাল আছে, একটা নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধান আছে। এই যে সময়ের ব্যবধান তার মধ্যে একটা সামঞ্জস্য আছে। প্রত্যেকটি পাড়ের মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধান হয়ে থাকে । এই সময়ের ব্যবধানে তারতম্য হলে বলা হয়, তাল কেটে গেছে। আর এই তাল কেটে গেলে, হাতের উপরে ঢেকির লোহামুখ এসে পড়বে আর হাতের আঙ্গুল থেঁতলে যাবে বা হাড় ভেঙে যাবে। তাই এই তাল বজায় রাখা জরুরী।
ঠিক তেমনি প্রাণের আসা-যাওয়ার একটা ছন্দ আছে। এই ছন্দ যখন কেটে যায়, তখন আমাদের শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয়। আর আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ি বা বিভিন্ন অশুভ বৃত্তির প্রকোপ দেখতে পাই আমাদের মধ্যে । তাই শরীরকে নীরোগ রাখতে গেলে, মনের মধ্যে অশুভ বৃত্তির নাশ করতে গেলে, আমাদের প্রাণের গতিকে ছন্দোবদ্ধ করতে হবে। এটি হচ্ছে প্রাণায়ামের প্রাথমিক শর্ত। নিয়মিত প্রাণায়ামের অভ্যাস তোমাকে শরীর ও মনের মধ্যে ভারসাম্য এনে দেবে। তোমার বুদ্ধিবৃত্তি তীক্ষ্ম হবে। তোমার বিচারশক্তির মধ্যে পবিত্রতার যোগান দেবে। তখন তুমি এই আমি আর সেই আমির মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারবে। দ্রষ্টা ও দৃশ্যের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারবে। দেখতে তো একই রকম, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তোমার মধ্যে পরিবর্তন আসবে। আর তুমি তখন, নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ, আত্মা হয়ে উঠবে, যা তোমার আসল সত্ত্বা। বই পড়ে, বা কারুর কাছ থেকে শুনে এটি বোধগম্য হয় না। নিরন্তর যোগক্রিয়া, এই উপলব্ধি এনে দিতে পারে।
আসলে জাগতিক ঘটনা, নিরন্তর ঘটে চলেছে, কিন্তু সেই ঘটনা তোমার মধ্যে কিভাবে প্রভাব বিস্তার করবে, তা নির্ভর করছে ঘটনার সঙ্গে তুমি কিভাবে সম্পর্ক গড়েছো তার উপরে। পাড়ার বকাটে ছেলেরা মারামারি করলে তোমার হয়তো কিছুই এসে যায় না । কিন্তু তোমার ছেলে সে দলে থাকলে, তুমি অবশ্যই প্রভাবিত হবে, বিড়ম্বিত হবে। প্রতিবেশীর বাড়িতে আগুন লাগলে, তুমি যতটা না প্রভাবিত হবে, নিজের বাড়িতে এমনকি তোমার আপন জনের বাড়িতে আগুন লাগলে তুমি অস্থির হয়ে উঠবে। ঘটনা ঘটবে, কিন্তু তুমি তার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছো কি না সেটাই আসল।
আমি কেবলই সমস্ত ঘটনার সাক্ষী, দ্রষ্টা। ঘটনার চরিত্রের সঙ্গে আমি কোনো সম্পর্ক গড়ি না। আমার সঙ্গে কেবলই ঈশ্বরের সম্পর্ক। এই জায়গায় তোমার সঙ্গে আমার পার্থক্য।
সবার মঙ্গল হোক।
++চলবে। ...
০৫.০৫.২০২৫
নিত্যকথা - শশাঙ্ক শেখর শান্তিধাম
প্রজ্ঞা ও সজ্ঞা
আমরা দুটো শব্দ সাধন জগতে এসে শুনে থাকি। একটা হচ্ছে "প্রজ্ঞা" আর একটা হচ্ছে "স্বজ্ঞা" .
প্রজ্ঞা কথাটার অর্থ হচ্ছে প্রকৃষ্ট জ্ঞান। জ্ঞাতব্য বিষয়ের দুটো দিক, একটা হচ্ছে তার বাহ্য - যা আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠছে , আর একটা হচ্ছে তার অন্তর্নিহিত দিক। অভিধান প্রজ্ঞা সম্পর্কে বলছে, "সম্মুখবর্তী জ্ঞাতব্য বিষয়কে আশেপাশের সমস্ত ডালপালা থেকে বিবিক্ত করে উপলব্ধ জ্ঞান।" এখন প্রজ্ঞার কাজটা কি ? অভিধান বলছে, "নানা বিজ্ঞান-প্রবাহিনীর সাগরসঙ্গম থেকে সার মন্থন করে, মানুষের পরম পুরুষার্থ এবং জগতের চরম ঊদ্দেশ্য বিষয়ে যথাসম্ভব তত্ত্ব নির্ধারণ করাই প্রজ্ঞার কাজ।" প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিই যথার্থ পণ্ডিত।
অন্যদিকে "স্বজ্ঞা" কথাটার অর্থ হচ্ছে স্বয়ং-এর জ্ঞান। এই স্বয়ং হচ্ছেন আত্মা বা জীবাত্মা। তো আত্মা বা জীবাত্মার প্রকৃষ্ট জ্ঞান হচ্ছে স্বজ্ঞা।
আমাদের আজকের প্রশ্ন এই প্রজ্ঞা কিভাবে জাগ্রত করা যায়।
জ্ঞান, জ্ঞাতা, জ্ঞেয় - এই তিন হচ্ছে জ্ঞানক্রিয়া । যে বিষয়ে বা যাকে জানছেন, তিনি জ্ঞেয়, যিনি জানছেন তিনি জ্ঞাতা। আর যাকিছু জানছেন, তাকে বলা হয় জ্ঞান। এই তিনে মিলে জানার কাজ সম্পন্ন হচ্ছে।
দেখুন চোখ থাকলে আপনি দেখতে পারবেন। কান থাকলে আপনি শুনতে পারবেন। এর জন্য কোনো প্রয়াস করতে হবে না। কিন্তু আপনার ইচ্ছে অনুযায়ী যদি জানতে বা দেখতে চান তবে আপনাকে সেই দিকে চোখ ফেরাতে হবে। নির্দিষ্ট বিষয়ে ধ্যান দিতে হবে। ঠিক তেমনি আপনি যা শুনতে চান তার দিকে আপনি কান খাড়া করে রাখলে, আপনি তা শুনতে পারবেন। তো আমাদের একটা ইচ্ছেশক্তি আছে, যার সাহায্যে আমরা আমাদের দৃষ্টিকে আমরা ইচ্ছেমতো ঘোরাতে পারি। আবার আমাদের আছে অনুভূতি শক্তি। এই অনুভূতি যেমন আমাদের ত্বকের সাহায্যে হয়ে থাকে তেমনি এর পিছনে একটা অন্তর্নিহিত অনুভূতি শক্তি যা আমাদেরকে বিষয়ের গভীরে নিয়ে যায়। স্পর্শ অনুভূতি, দৃষ্টি অনুভূতি, শ্রুতি অনুভূতি - বা বিষয়কে অনুভব করবার জন্য আমাদের একটা অন্তর্নিহিত শক্তি আছে, যার দ্বারা আমরা সুখ বা দুঃখের অনুভব করে থাকি। এছাড়া আমাদের আছে বুদ্ধিবৃত্তি যার সাহায্যে আমরা বিষয়কে বিশ্লেষণ করতে পারি, বিচার করতে পারি। এই যে ত্রিবিবিধ শক্তি অর্থাৎ বুদ্ধি, অনুভূতি, ও ইচ্ছে এগুলো আসলে আমাদের মনের শক্তি বিশেষ। এই ত্রিবিধ মানস শক্তিকে যথাযথ ব্যবহার করে, আমরা প্রজ্ঞাবৃত্তিকে জাগিয়ে তুলতে পারি। আবার প্রজ্ঞার সাহায্যে স্বজ্ঞাকে বা স্বয়ং-এর জ্ঞান পেতে পারি।
এখন কথা হচ্ছে এই স্বজ্ঞাবৃত্তিকে আমরা কিভাবে জাগিয়ে তুলবো ? এর জন্য প্রথমে দরকার আমাদের বৃত্তিগুলোকে শুদ্ধ করা বা পবিত্র করার জন্য দৃঢ় সংকল্প করা । দেখুন আমাদের সবার মধ্যে পূর্ব পুব জীবনের সংস্কারগুলো সুপ্ত আকারে বিরাজ করছে। এগুলোকে আমাদের প্রবল ইচ্ছেশক্তির সাহায্যে দূর করতে হবে। এর জন্য দুটো পথ, অর্থাৎ যাকে দূর করতে হবে, তার সম্পর্কে ঘৃণার উদ্রেগ করুন। আর যাকে আপনি ধরতে চান তার সম্পর্কে আপনি প্রসংশাসূচক বাক্য বারংবার শুনতে থাকুন। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে কিছু সৎ আবার কিছু অসৎ কর্ম্মের সংস্কার আছে। কতকগুলো সংস্কার আছে, যা দীর্ঘদিনের নয়, এগুলোকে কেবলমাত্র ইচ্ছেশক্তির সাহায্যেই দূর করা যায়। যেমন ধরুন আপনার সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস আছে, এই অভ্যাসকে কেবলমাত্র ইচ্ছেশক্তির সাহায্যেই দূর করা যায়। আবার ধরুন আপনার বই পড়বার বা ধর্ম্মগ্রন্থ পড়বার অভ্যাস আছে, এটিকে আপনি সহজেই ইচ্ছেশক্তির সাহায্যে বাড়িয়ে তুলতে পারেন। আবার এমন কতকগুলো সংস্কার আছে, যা আমাদের দীর্ঘদিনের এমনকি হয়তো আগের আগের জন্ম/কর্ম্মের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। যেমন ধরুন, আপনি কুকুরকে ভয় পান, বা জল দেখলে ভয় পান। বিশেষ ধরনের খাবারের প্রতি আপনার ঘৃণা বা আকর্ষণ অনুভব করেন। এগুলোকে আপনি নতুন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দূর করতে পারেন। ধরুন আপনি কুকুরকে ভয় পান। কেন ভয় পান তা আপনি জানেন না, এ জীবনে কখনও কুকুর আপনাকে আক্রমন করেনি, বা কামড়ায়নি। তথাপি কুকুর দেখলেই আপনি সতর্ক হয়ে যান। কিন্তু একদিন হলোকি - আপনি এক সাধুর সঙ্গে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন। এখন কুকুরগুলো, গেরুয়া রং দেখেই হোক, বা অন্য কোনো কারণেই হোক, আক্রমনাত্মক হয়ে আপনাদের দিকে ধেয়ে এলো, আর সাধুবাবা মুখে তুতু করে শব্দ করতে লাগলো, কাছে গিয়ে ঝোলা থেকে বিস্কুট দিয়ে কুকুরের মাথায় হাত বোলাতে লাগলো। আর অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, কুকুর মাথা নিচু করে, লেজ দোলাতে লাগলো। এই ঘটনা আপনাকে একটা নতুন অভিজ্ঞতার সামনে এনে দিলো। এর পর থেকে আপনি যখনই কুকুরের সম্মুখীন হন, তখন আপনিও এই একই পথ অবলম্বন করেন। এর পর থেকে কুকুরের থেকে আপনার ভয় যা বছরের পর বছর ধরে চলছিলেন, তা দূর করবার রাস্তা পেয়ে গেলেন। অর্থাৎ নতুন অভিজ্ঞতা আপনাকে আপনার পুরানো সংস্কারকে শোধন করে নিলো। তো শোধন ক্রিয়াই আসল, আপনার সমস্ত বৃত্তিগুলোকেই শুদ্ধ করে নিতে হবে। মনকে পবিত্র করতে গেলে, মনে-মুখে-কাজে সৎ হতে হয়। কোনো অবস্থাতেই অসৎ হবেন না। কেউ জানুক আর না জানুক, আপনি নিজেকে সৎ রাখুন, আর নিজের প্রশংসা নিজেই করুন। আর নিজেকে যত সৎ ভাবনার মধ্যে রাখতে পারবেন, দেখবেন, নিজের মধ্যে একটা তেজের প্রকাশ ঘটছে। নিজের মধ্যে প্রত্যয়ের ভাব সদা জেগে থাকবে।
যোগ, জপ, ধ্যান, এই তিনের প্রতিনিয়ত অভ্যাস মনকে পবিত্র করবার ব্যাপারে, ম্যাজিকের মতো কাজ করে। আহারের মধ্যে সূচিত বজায় রাখুন। যেখানে সেখানে যা তা খাবেন না। তাতে যদি একদিন না খেয়ে থাকতে হয়, সেও ভালো। নিজের শরীরে যা সহ্য হয়, সেইমতো খাবার খান। উপবাসের থেকে অতিভোজন অতি ক্ষতিকারক। নিদ্রার মধ্যেও সময়ানুবর্তিতা রাখবার চেষ্টা করুন। অনিদ্রা বা অতিনিদ্রা দুইই শরীর-মনের উপরে কুপ্রভাব বিস্তার করে। যোগী পুরুষের জন্য, বিশেষ করে যাদের জপ-ধ্যান করবার অভ্যাস আছে, তাদের রাতে চারঘন্টা ঘুমই যথেষ্ট। গ্রীষ্ম কালে, দিনের বেলা একঘন্টা বিশ্রাম নেওয়া যেতে পারে।
যারা নিয়মিত জপ-ধ্যান করেন, তাঁদের জ্ঞাতসারে হোক বা অজ্ঞাতসারে তাঁরা একটা মহাজাগতিক শক্তির সঙ্গে সংযুক্ত হন। এই মহাজাগতিক শক্তি সাধককে সাধনায় উত্তরণে সাহায্য করে থাকেন। ধ্যান যেমন মহাজাগতিক শক্তির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে, তেমনি ইহ জগতের সমস্ত বাধা-বিঘ্নকেও দূর করতে অলৌকিক ভাবে সাহায্য করে থাকে। এই সত্য উপলব্ধি করতে গেলে, নিয়ম করে দিন-রাতে অন্ততঃ ৬ ঘন্টা ধ্যানাসনে বসে থাকবার অভ্যাস করতে হবে।
আর এই যোগক্রিয়াই আপনাকে একসময় সফলতার সন্ধান দেবে। আর হঠাৎ একদিন আপনি প্রজ্ঞা-বৃত্তির সঙ্গে একত্রীভূত হয়ে যাবেন। এই প্রজ্ঞাবৃত্তি আপনাকে স্বজ্ঞার স্তরে নিয়ে যাবে। প্রথম দিকে এই অনুভূতি ক্ষনিকের জন্য বিদ্যুতের ঝলকের মতো হয়ে দেখা দেবে। অর্থাৎ একটা বৈদ্যুতিক আলোর রেখা আপনার সামনে ভেসে উঠবে। নিয়মিত ধ্যানের অভ্যাস করতে থাকলে, ধীরে ধীরে এই আলোর রেখা স্থির আলোর বিন্দুর আকার নেবে। এই আলোর বিন্দুর মধ্যে একটা কৃষ্ণ বর্ণের বিন্দু দেখতে পারবেন। এই বিন্দু একসময় গুহার আকার নেবে। আর এই গুহার মধ্যেই আপনার স্বয়ং-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে। এই হচ্ছে প্রজ্ঞা থেকে সজ্ঞায় যাত্রা। তখন ভৌত শরীরে ইন্দ্রিয়বাহিত হয়ে সমস্ত কর্ম্মের রহস্যঃ উন্মোচন ঘটবে। এটিএম উপলব্ধি হবে। তখন আপনা থেকেই জাগতিক সমস্ত ক্রিয়ার রহস্যঃ আপনার সামনে ভেসে উঠবে।
ওম শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ - হরি ওম তৎ সৎ।
ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা
একবারটি ভাবো , আমি অনাদি অনন্ত অসীম শক্তি-সম্পন্ন। অনন্ত অনন্ত অনন্ত গুণময় পরমেশ্বরের অংশ। স্থূল-সূক্ষ্ম ও কারন দেহত্রয় সম্পন্ন ত্রিগুণাত্মক প্রকৃতি নির্মিত দেহে বদ্ধ হয়ে আছি। এই বদ্ধাবস্থায় আমাকে জীবাত্মা বলে ভুল বোঝা হচ্ছে। আমার স্মৃতি বিভ্রম ঘটেছে। আমার আত্মবুদ্ধি বিস্মৃত হয়েছে বরং এই নশ্বর পঞ্চভূতের দেহেই আত্মবুদ্ধি জেগে আছে। হে পরমেশ্বর আমাকে এই পাশ থেকে মুক্ত করে গুণাতীত আত্মস্বরূপে স্থিত করো।
চৈতন্যের অংশ আজ এই ত্রিগুণাত্মক দেহে আবদ্ধ হয়ে স্বীয় জ্ঞানময়ত্ত্ব হারিয়ে ফেলে স্বয়ং-বোধ আর বুদ্ধিকে গুলিয়ে ফেলেছে। আমার মধ্যে বুদ্ধির উৎপত্তির সঙ্গে সঙ্গে সংশয়াত্মক মনের নির্মাণ হয়েছে। মন আর বুদ্ধি মিলে অহঙ্কারের জন্ম দিয়েছে। অহঙ্কার আমার মধ্যে চিত্তবৃত্তির সমস্ত স্মৃতিকে মুছে দিয়েছে। আর "আমি কর্ত্তা" এই অভিমানের জন্ম দিয়েছে।
হে ত্রিগুণাত্মিকা দেহবদ্ধ জীবাত্মা, মনকে স্থির করো, শান্ত করো, একাগ্র করো। অহঙ্কারের অসারতা ধারণা করো। বুদ্ধিকে সত্ত্বময়ী করো। সত্ত্বাধিক্যে বুদ্ধি স্বচ্ছ হবে। আর স্বচ্ছ বুদ্ধিতেই আত্মস্বরূপ প্রতিবিম্বিত হবে। তখন এই স্বরূপ অবস্থা লাভের জন্য মনের মধ্যে ব্যাকুলতা জন্মাবে। তখন সার-অসারের মধ্যে পার্থক্য করতে সক্ষম হবে। আর ক্রমে ক্রমে অসার পরিত্যাগ করবার প্রবৃত্তি জাগবে। আর অচিরেই মুক্তির আলো প্রকাশিত হবে। জীবন আনন্দময় হয়ে উঠবে।
১৯.০৭.২০২৫
ত্রিবিধ দেহ :
আমরা শুনেছি, জীব মাত্রেই ত্রিবিধ দেহ বিশিষ্ট। অর্থাৎ স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারন দেহ নিয়ে এই জীবদেহ। জীব দেহ উৎপত্তির শুরু কারন দেহ দিয়ে, পরে সূক্ষ্ম, এবং শেষে স্থূল দেহের উৎপত্তি হয়। এখন কথা হচ্ছে এই যে ত্রিবিধ দেহ, এগুলো কি দিয়ে তৈরী হয় ? আর এর মধ্যে পার্থক্যই বা কি ? দেখুন এই তিনটে দেহই পঞ্চভূতের তৈরী। তবে পার্থক্য হচ্ছে কারন দেহে আকাশ তত্ত্বের প্রাধান্য হয়ে থাকে। সূক্ষ্ম বা লিঙ্গ দেহ মরুৎ ও তেজঃ প্রধান হয়ে থাকে। সবশেষে স্থূল শরীরে ক্ষিতি তত্ত্বের প্রাধান্য দেখা যায়।
দেখুন সমস্ত সৃষ্টির মুলে আছে বীজ বা অন্ড। আর এই অন্ড ওঙ্কারের পরিণতি বিশেষ। এই অন্ড থেকেই সমস্ত জগতের সৃষ্টি হয়েছে। এখন কথা হচ্ছে আমাদের অভিজ্ঞতা বলে থাকে যে স্ত্রী-পুরুষের সংযোগে জীবকুলের সৃষ্টি হচ্ছে। তো প্রথমে তো স্ত্রী-পুরুষ ছিল না, তা হলে কিভাবে এই অন্ডের সৃষ্টি হলো ? পুরুষ ও আকাশের মিলনে এই অন্ডের সৃষ্টি হয়েছিলো। এই আকাশ হচ্ছে প্রকৃতি, প্রথম অস্তিত্ত্ব প্রকাশ বিশেষ।
আমরা শুনেছি প্রথমে কেবলমাত্র এক বিরাট পুরুষ বা ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব ছিলো। এই বিরাট পুরুষের ইচ্ছাশক্তির প্রভাবে প্রথমে মন তারপর আকাশের উৎপত্তি হয়েছিল। এখন কথা হচ্ছে কেনই বা ইচ্ছে হয় ? আর কেবলমাত্র ইচ্ছেশক্তির প্রভাবে কি কোনো কিছু সৃষ্টি করা যায় ? এই ব্যাপারটা অতি আশ্চর্য্যজনক, এমন কি অনির্বচনীয়। তথাপ বলি ইচ্ছেশক্তির প্রভাবে যে যাকিছু সম্ভব হতে পারে। ঈশ্বরের ইচ্ছের কথা ছাড়ুন, সাধারণ মানুষের ইচ্ছে হলে সে ডাক্তার হতে পারে, কবি হতে পারে, মঙ্গলে যেতে পারে এমনকি হয়তো একদিন সে সূর্য্যের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। এই যে ইচ্ছে মানুষের মধ্যে উদ্ভব হচ্ছে, তার কোনো কারন ব্যাখ্যা করা কঠিন। তো ইচ্ছে কেন হয়, তার কারন খোঁজা বৃথা।
এখন কথা হচ্ছে এখন কথা হচ্ছে প্রকৃতি পুরুষের মিলনে নতুনের সৃষ্টি হচ্ছে। এই যে নতুন তা কিন্তু পিতা মাতার অনুরূপ হয়ে থাকে। ছাগলের পেটে কখনো মানুষ হয় না। আম গাছে কখনো তাল হতে পারে না। তাহলে একই ঈশ্বর পুরুষ ও একই আকাশের মিলনে কিভাবে এই বৈচিত্রময় জগতের সৃষ্টি হলো। কোটি কোটি জাতের সৃষ্টি হলো। আবার প্রত্যেকটি সৃষ্টির মধ্যে তারতম্য হলো ?
প্রথমে বলি শূন্য থেকে কিছই সৃষ্টি হতে পারে না। পঞ্চভূত সৃষ্টির সময়েই এই বীজের রোপন করে রেখেছিলেন, স্বয়ং ঈশ্বর। সেই বীজ থেকেই যেমন উদ্ভিদের সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি জীব, জন্তু পশু পাখি, এমনকি মনুষ্য জাতির সৃষ্টি হয়েছে। তো এই পঞ্চভূতের মধ্যেই সমস্ত সৃষ্টির বীজ রয়েছে। আজ আমরা দেখছি, স্ত্রী-পুরুষের মিলনে জীবের জন্ম হচ্ছে, কিন্তু প্রথম সৃষ্টি হলো কিভাবে ? এই প্রশ্নের জবাবে বলি, দেখুন গর্তের মধ্যে জল জমলে, একসময় জলজ প্রাণী, বা মাছের জন্ম হতে পারে। এর জন্য কোনো জনন ক্রিয়ার দরকার পরে না। পাত্রে জল জমলে, মশার জন্ম হচ্ছে। এমনকি ঢেকে রাখা পাত্রে জল থাকলে পোকা জন্মাচ্ছে। ঠিক এই নিয়মেই একসময় জীব, জন্তু, পশু পাখি এমনকি মানুষের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু তাই যদি হয়, তবে আজ আর কেন মানুষের জন্ম এই প্রক্রিয়ায় হচ্ছে না ? অর্থাৎ প্রকৃতির কোলের মধ্যে মানুষের আবির্ভাব কেন দেখা যাচ্ছে না। এর উত্তরে বলা যায়, যে সব গ্রহে বা জ্যোতিষ্কে এখনও জীবের উৎপত্তি হয়নি, সেখানে এই প্রক্রিয়া বলবৎ আছে। সেখানে এই নিয়মের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু পৃথিবী মন্ডলে এই নিয়মের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। এখানে অসংখ্য দম্পতির আবির্ভাব হয়েছে। এখানে প্রাচীন পদ্ধতির প্রয়োগের কাল ফুরিয়েছে। তথাপি প্রশ্ন জাগে, বা মনের মধ্যে কৌতূহল জাগে, এমনটা যদি হতো। লাঙলের ফলায় যদি সন্তানের দেখা মিলতো। যজ্ঞের আগুনে যদি সন্তানের আবির্ভাব হতো। কলসির মধ্যে যদি সন্তানের জন্ম হতো তবে কি মজাই না হতো। অথবা সূর্য্যের বরে কেউ গর্ভবতী হতো। আসলে, সময় বা যুগের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত কিছুর পরিবর্ত্তন হয়। এই যে জন্ম প্রক্রিয়া তারও পরিবর্ত্তন হয়েছে। এখন কথা হচ্ছে বর্তমানে কেন হয় না ? বর্তমানে কেন হয় না তার কারন হচ্ছে - ১. প্রয়োজন ফুরিয়েছে, ২. কালের পরিবর্ত্তন হয়েছে ৩. যেখানে বহুসংখ্যক জীবের উৎপত্তি হয়েছে, সেখানে এই জীবের খাদ্য হিসেবে ঈশ্বর প্রদত্ত মূল বীজ বা অন্ড জীবগণের দেহস্থ হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ জীবের খাদ্য, শ্বাসপ্রশ্বাস এমনকি শারীরিক উত্তাপের কারনে, এইসব বীজের কার্যকরী ক্ষমতা লোপ পেয়ে গেছে। অর্থাৎ আদিম উৎপত্তির যে প্রক্রিয়া তা আজ আর কার্যকর হচ্ছে না। তবে এও ঠিক, আজও নতুন প্রজাতির জীবের সৃষ্টি এই আদিম পদ্ধতির সাহায্যেই হয়ে চলেছে। আর এসব সংগঠিত হচ্ছে নিৰ্জন গহীন জঙ্গলে, বা অতল সমুদ্র গর্ভে। এমনকি আমি বিশ্বাস করি নতুন উন্নত মনুষ্যজাতির সৃষ্টি এই আদিম প্রক্রিয়াতেই সম্ভব হবে একদিন। হয়তো হচ্ছে, যার খবর আমাদের কাছে নেই।২০.০৭.২০২৫
শ্রীহরি বিষ্ণু
শ্রীহরি বিষ্ণু কোথায় থাকেন ? - বৈকুন্ঠে
এই বৈকুন্ঠ জায়গাটা কোথায় ? কুণ্ঠাহীন চিত্তে, হৃদয় গুহায়, মনের কুঠুরিতে।
তাঁর কি শরীর আছে ? সত্য হচ্ছে, শ্রীহরির কোনো শরীর নেই। তিনি অশরীরী। তবে আমরা যেমন ভারত মাতার একটা চিত্র এঁকে থাকি, একটা কোম্পানির যেমন একটা লোগো এঁকে থাকি, একটা পতাকা দিয়ে দেশকে চিহ্নিত করে থাকি তেমনি অশরীরী এই বিষ্ণু শরীর নয় শরীরী। তার এই কাল্পনিক শরীরের একটা তাৎপর্য আছে।
তার গায়ের রঙ নীল। তাঁর গায়ের রঙ নীল বর্ণ কেন ? নীল হচ্ছে আকাশের প্রতীক। আকাশের কোনো রং নেই, তথাপি তাকে নীল বলেই দেখে থাকি আমরা। মুলে জগৎ অন্ধকারে স্থিত কিন্তু সূর্য্যের উপস্থিতে জগৎ আলোকময় হয়ে থাকে। তাই শ্রী হরির হৃদয়ে কৌস্তভ মনি অর্থাৎ সূর্যের প্রতীক কল্পনা করা হয়েছে।
তাঁকে চতুর্ভূজ বলা হয় কেন ? চতুর্ভূজ কারন তার চারটি হাত কল্পনা করা হয়েছে। হাতে আছে শঙ্খ , চক্র, গদা , পদ্ম। আকাশ শব্দবহ। শব্দময়। তাই শব্দময় শঙ্খ আকাশের প্রতীক হিসেবে স্থাপিত করা হয়েছে। চক্র হচ্ছে স্থিতি ক্রিয়ার প্রতীক, জগতের স্থিতি হয়ে থাকে স্থানে ও কালে। গদা হচ্ছে লয় সাধনের প্রতীক। আর পদ্ম হচ্ছে সৃষ্টির প্রতীক। অর্থাৎ শ্রীহরি বিষ্ণু হচ্ছেন, সৃষ্টি-স্থিতি ও লয়ের প্রতীক।
তাঁর দুই স্ত্রী - লক্ষ্মী ও সরস্বতী। সরস্বতী হচ্ছে জ্ঞানের প্রতীক, আর লক্ষ্মী হচ্ছে সৌন্দর্য্য ও ঐশ্বর্যের প্রতীক।
পরমেশ্বর হচ্ছেন, সচ্চিদানন্দ - সৎ-চিৎ-আনন্দ। শ্রী হরি বিষ্ণু হচ্ছেন সৎ, সরস্বতী হচ্ছেন চিৎ, আর লক্ষ্মী হচ্ছেন আনন্দ - এর প্রতীক। শ্রী হরি বিষ্ণু হচ্ছেন বৈকুন্ঠেশ্বর । অর্থাৎ কুন্ঠাশূন্য ভক্তের চিত্তে যিনি অনুক্ষণ ধ্যানস্থ।
তোমার মন যখন ইহজগতের কোনো কিছুতেই আর কুন্ঠিত হবে না, যখন তোমার চিত্ত বশীভূত হবে, ইন্দ্রিয় দমিত হবে, ঈশ্বরে যখন ভক্তির উদয় হবে, সমস্ত জীবজগতের প্রতি যখন প্রীতি জন্মাবে, হৃদয়ে যখন শান্তি বিরাজ করবে, যখন সুখ দুঃখের অতীতে কেবল এক অনাবিল আনন্দের বন্যা বইবে, তখন তুমি স্বরূপে বৈকুণ্ঠবাসী হয়ে যাবে। তখন তুমি বাহ্যত শরীর-সংসারে আছো কি নেই, ইহা জগতে আছো না ইহলোক ত্যাগ করেছো, সেটা বড়ো কথা নয়, তুমি তখন বৈকুণ্ঠবাসী।
হরি ওং তৎ সৎ।
২১.০৭.২০২৫
"তবে ধরে নেওয়া যাক যে আমি সর্বদাই সুস্থ, সর্বদা সচেতন, এমনকি ঘুমের মধ্যেও - এর অর্থ এই নয় যে আমি আমার স্বভাবগতভাবেই সমস্ত অসুস্থতা থেকে মুক্ত। এর অর্থ কেবল যখন এটি আসার চেষ্টা করে তখন এর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার শক্তি। আত্মরক্ষা এতটাই শক্তিশালী হতে পারে যে শরীর কার্যত অনেক যোগীর মতোই অনাক্রম্য হয়ে ওঠে। তবুও "ব্যবহারিকভাবে" অর্থ সর্বদা "একেবারে" নয়। পরমতা কেবল অতিমানবিক পরিবর্তনের সাথেই আসতে পারে। কারণ অতিমানবিকতার নীচে এটি অনেক শক্তির মধ্যে একটি শক্তির ক্রিয়া - অতিমানবিকতায় এটি প্রকৃতির একটি নিয়ম হয়ে ওঠে।" - হৃষি অরবিন্দ।
২০.০৭.২০২৫
তিন জন্মের কথা
মুক্তানন্দজী বলছিলেন, দীক্ষাদান কালে দীক্ষাপ্রার্থীর তিন জন্মের সংস্কার বিচার করে দীক্ষাবীজ নিরুপন করতে হয়। তা না হলে দীক্ষার প্রার্থিত ফল পাওয়া যায় না। সাধক পূর্ব্ব পূর্ব্ব জীবনে যে মার্গে সাধন ভজন করেছেন, এবং তারজন্য তার মধ্যে যে সাধন-সংস্কার জন্ম নিয়েছে, তাকে অনুসরণ করতে পারলে, অল্প পরিশ্রমে অধিক ফল পাওয়া যায়।
তো আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি তাহলে দীক্ষাপ্রার্থীর পূর্ব্বপূর্ব্ব তিনজন্মের লীলাক্ষেত্র, সাধন ক্ষেত্র ও অবয়ব সম্পর্কে অবহিত আছেন ?
মুক্তানন্দ বললেন, আসলে গত তিন জন্ম কেন, হাজার হাজার জন্মের বিচার করলেও, সাধকের প্রকৃতির সন্ধান পাওয়া সম্ভব নয়। আসলে এই জীবনেই সে যে দেহ ধারণ করেছে, তার মধ্যেই আছে তিন জন্মের ইতিবৃত্ত। এই যে স্থূল দেহ যা আমাদের চোখের সামনে ভাসছে তার মধ্যেই আছে তিনটি রূপ। একটা স্থূল, দ্বিতীয় সূক্ষ্ম, তৃতীয় কারন দেহ।
এই যে কারন দেহ তার মধ্যে আছে আকাশ ভূতের আধিপত্য। আকাশ অর্থাৎ শব্দময় জগৎ অর্থাৎ জ্ঞান ও আনন্দের জগৎ। আর স্থূল দেহে আছে ক্ষিতিতত্ত্বের আদিপত্য। সূক্ষ্ম দেহ আবার দুই প্রকার একটা বায়বীয়, অর্থাৎ যেখানে বায়ু তত্ত্বের আধিক্য, আর একটা হচ্ছে মনঃময় যেখানে তেজ তত্ত্বের আধিক্য । তো সুক্ষ্ম দেহে আছে বায়ু ও তেজ তত্ত্বের আধিপত্য।
এই যে স্থূল ও সূক্ষ্ম দেহ এ দুটো দেহই পার্থিব, আর কারন দেহ হচ্ছে অপার্থিব। অর্থাৎ দেহ দুই প্রকার, পার্থিব আর একটা অপার্থিব। কেউ (চিৎশক্তি) যখন স্থূল দেহ ধারন করছে, তখন সে ভৌতিক জগতে প্রবেশ করছে , এই স্থূল দেহ হচ্ছে তার চিহ্ন স্বরূপ। এই স্থূল দেহে স্থিতি তার কবে থেকে শুরু হয়েছিল, তার কোনো হিসেবে নেই। অর্থাৎ যবে থেকে এই পৃথিবীতে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে, তবে থেকেই সে এক দেহ থেকে অন্য দেহে সঞ্চারিত হচ্ছে। তাই আমি অধিক বয়স্ক আর আপনি কম বয়স্ক ব্যপারটা এমন নয়। আমরা সবাই আদি অনন্ত কাল থেকে দেহ থেকে দেহান্তরে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি। তো এই দেহান্তরের ইতিহাস আমাদের কারুর জানা নেই। স্থূল দেহকে আমরা জন্মাতে দেখি, আবার মৃত্যু বরণ করতে দেখি। এইযে জন্ম-মৃত্যু কতবার হয়েছে, বা আবার কতবার হবে তার সন্ধান এই ক্ষুদ্র জীবনের অধিকারী মানুষ বা এমনকি কোনো উন্নত মহাত্মার পক্ষেও জানা সম্ভব নয়।
এখন কথা হচ্ছে এই যে কালের জগতে নেমে এসে আমরা মৃত্যুর অধীন হই অর্থাৎ স্থূল দেহ ধারণ করে আমরা জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ হই তা আমাদের জানতে পারলে ভালো হয়। যদি সেই সন্ধান আমরা জানতে পারি, তবে আমাদের মূল সত্ত্বা অর্থাৎ চৈতন্যসত্ত্বাকে কবে কাল গ্রাস করেছে সেই সত্য আমাদের সামনে উন্মোচিত হতে পারে।
দীক্ষার উদ্দেশ্য পরম-পথের সন্ধান বা আবিষ্কার। অর্থাৎ মায়িক জগৎ, কায়িক জগৎ, ও পরম স্থানের আবিষ্কার করাই দীক্ষা বা সাধনার উদ্দেশ্য। তো কায়িক, মায়িক ও চিন্ময় দেহের প্রকৃতি আবিষ্কার করতে হবে।
এখন কথা হচ্ছে বিশুদ্ধ চৈতন্য হচ্ছে স্বরূপতঃ নিরাকার, নির্ম্মল, শুদ্ধ। যখন এই চিৎস্বরূপ সৃষ্টির প্রবাহে কালের জগতে প্রবেশ করে তখন তাকে প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন স্তর ভেদ করে তাকে এই কালের জগতে বা জন্ম মৃত্যুর জগতে প্রবেশ করতে হয়। চিদস্বরূপ হতে সে প্রথমে চিৎ-শক্তির মধ্যে প্রবেশ করে। এই চিৎশক্তির মধ্যে অনুর আকারে অবস্থান করে। একে কেউ কেউ চিদানু বলে থাকেন। এই চিদানু চিন্ময়ী শক্তি অভ্যন্তরে প্রবেশ করা মানেই চিন্ময়ী শক্তির আবরণ চিদানু রূপ চিদস্বরূপে ঢেকে ফেললো। এই আবরণটি আত্মার প্রথম দেহ হলো। এই দেহটি তখনো কালের রাজ্যে প্রবেশ করেনি কিন্তু এখানেই পূর্ন-অহম যা আসলে চিৎ স্বরূপের প্রতিবিম্ব মাত্র। এবার মহামায়া নিজের উপাদান দ্বারা বেষ্টন করে ফেললো। অর্থাৎ মহামায়ার গর্ভে প্রবেশ করলেন। এটি হচ্ছে চিৎ স্বরূপের দ্বিতীয় আবরণ বা দেহ। অর্থাৎ মহামায়ার গর্ভে এবার চিদস্বরূপ আবদ্ধ হলেন। আর মহামায়ার দ্বারা পুষ্ট হয়ে ধীরে ধীরে বর্দ্ধিত হতে লাগলেন। এর পরে মহামায়া থেকে মায়ার গর্ভে প্রবেশ করলেন, এটি তার তৃতীয় জন্ম।
তো এই মায়িক আবরণ পর্যন্ত যে যে তিনটি আবরণ চিৎ স্বরূপকে ঢেকে ফেললো, এই তিনটি আবরণকে বলা হয় ত্রিবিধ জন্ম।
এর পরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে কালের জগতে প্রবেশ করে ও কালদেহ বা স্থূল দেহ প্রাপ্ত হয়। এই কালদেহ পরিণামশীল এটির ক্ষয় বৃদ্ধি আছে। এই হচ্ছে তিন জন্মের কথা। এই জ্ঞান যতক্ষন না সাধকের সাধনার দ্বারা উপলব্ধি হচ্ছে, ততক্ষন সাধন মার্গে স্বছন্দ হওয়া সম্ভব হয় না।
--------
২১.০৭.২০২৫
মুক্তানন্দ বলছিলেন :
আলোক দেহ
আপনার যদি ঘুম না আসে, তবে আপনি ধ্যান জপে বসে যান। দেখবেন অবশ্যই না চাইলেও ঘুম এসে যাবে।
আসলে মুক্তানন্দ কখন ধ্যানে বসেন কখন জপ করেন, আর কখন তিনি ঘুমিয়ে থাকেন তা বাইরে থেকে বোঝা মুশকিল। ওঁর একটা ধ্যানাসন আছে, যা ৩/৬ ফুট লম্বা চওড়া। উচ্চতা ৬ ইঞ্চি। এখানে তিনি কখনো বসে ধ্যানের মধ্যে ডুবে থাকেন, আবার কখনো শুয়ে থাকেন।
মুক্তানন্দ বলছিলেন, সেদিন যোগনিদ্রায় শায়িত ছিলাম। আর আপনি তো জানেন, যোগ নিদ্রায় ধীরে ধীরে শ্বাস প্রশাসের সঙ্গে মনটা শরীরে আপাদমস্তক ঘুরতে থাকে। শ্বাস ছাড়া বা গ্রহণ করা হয় অতি ধীরে । এই যোগনিদ্রা আমার বহুদিনের অভ্যাস। একদিন এই যোগ নিদ্রায় আমার শ্বাসকষ্ট অনুভব হতে লাগলো, যা কোনোদিন হয় না। চোখ মেলে চেয়ে দেখি আমার বুকের উপরে বসে আছে আমারই একটা অবয়ব. আমার দেহের অনুরূপ একটা আলোক দেহ। আমি ঘাবড়ে গিয়ে সত্ত্বর উঠে বসবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু শায়িত শরীর যে অসার হয়ে গেছে। .প্রায় ১ মিনিট আমি নিজের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করতে লাগলাম। কিন্তু শরীর সাধ দিলো না। আমার শরীর যেন অকেজো হয়ে গেছে। আমি স্পষ্ট অনুভব করলাম, একটা শবদেহের উপরে যেন আমি বসে আছি। অর্থাৎ আমার একটা আলোকদেহ আমরাই স্থূল শরীরের বুকের উপরে বসে আছে। আর আমার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে। মিনিট খানিক এই অবস্থা চলেছিল। তারপরে আমার এই সূক্ষ্ম আলোক দেহ আকাশে বাতাসে মিলিয়ে গেলো। আমার শায়িত দেহে প্রাণের সঞ্চার হলো। আমার শ্বাস আবার বইতে শুরু করলো। আমি উঠে বসলাম বটে। কিন্তু আমার মনের মধ্যে ভয়ের আবহ চলতে লাগলো। শরীরেও অবসন্ন বোধ হতে লাগলো।
২২।০৭।২০২৫
ত্রিবিধ শরীর ও কর্ম্ম
মুক্তানন্দ বলছেন, প্রারব্ধ কর্ম্মফল ভোগের জন্য ও/বা সংকল্প পূরণের জন্য এই দেহ ধারণ করতে হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কর্ম্মের জন্য দেহ নাকি কর্ম্মের কারনে দেহ। অর্থাৎ কর্ম্ম হতে শরীরের উৎপন্ন হয়েছে, নাকি কর্ম্ম করবার জন্য শরীরের উৎপন্ন হয়েছে। মুক্তানন্দের কথা অনুযায়ী প্রারব্ধ কর্ম্মফল ভোগের জন্য এই শরীর। তাহলে ধরে নিতে হবে প্রারব্ধ কর্ম্মফল ভোগের সমাপ্তিতেই কেবলমাত্র এই শরীরের নাশ বা মৃত্যু হতে পারে। বলছেন, প্রারব্ধের কারনেই জন্ম, ভোগ ও মৃত্যু হয়ে থাকে। প্রারব্ধের সঙ্গে সম্মন্ধ বিচ্ছেদ হচ্ছে মৃত্যু।
আমরা এর আগে শুনেছি, আমাদের দেহ তিন প্রকার অর্থাৎ স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারন। এখন মুক্তানন্দ বলছেন, দেহ তিন প্রকার আর তার নাম হচ্ছে ভোগদেহ, কর্ম্মদেহ, ও মিশ্রদেহ। দেবতাদের যে সূক্ষ্ম দেহের কথা আমরা শুনে থাকি, তা হচ্ছে কেবলমাত্র ভোগদেহ। আর দেবতাদের ভোগদেহে কেবলমাত্র পুন্য কর্ম্মের ভোগ সম্পাদিত হয়ে থাকে। আর এঁরা বিরাজ করেন, স্বর্গ নামক এক পুণ্যভূমিতে। যেখানে দুঃখ বলে কিছু নেই। আরো একটি ভোগদহ আছে যার দ্বারা আমাদের পাপ কর্ম্মের ভোগ সম্পাদিত হয়ে থাকে। বলা হয় এরা নাকি নরকবাসী হয়ে থাকে। এখানে যে সূক্ষ্ম দেহ উৎপন্ন হয়ে থাকে তা কেবল পাপের নিস্পত্তির কারনে হয়ে থাকে। এই দেব দেহে বা পাপিদেহে কোনো কর্ম্মফল সঞ্চিত হয় না। অর্থাৎ এঁরা যতই অসুর নিধন করুন না কেন, তাতে এদের পাপ হয় না। এছাড়া আছে পশুদেহ, যেখানে কেবলমাত্র ভোগ ও কর্ম্ম উভয় সম্পাদিত হয় বটে, তবে এখানেও কোনো কর্ম্মফল সঞ্চিত হতে পারে না। অর্থাৎ গরু ছাগোল যতই আমাদের দুধ দান করুক, তাতে তার কোনো পুন্য হয় না। বাঘ সিংহ যতই হিংসা করুক না কেন তাতে তাদের কোনো পাপ হয় না। ফলতঃ এদের উন্নতি বা অবনতির কোনো সম্ভাবনা থাকে না। অর্থাৎ দেবদেহে, পাপদেহে বা পশুদেহে কোনো কর্ম্মফল সঞ্চিত হতে পারে না। কেবলমাত্র মনুষ্যদেহ হচ্ছে প্রারব্ধ কর্ম্মফল ভোগ এমনকি নতুন কর্ম্মফলের সঞ্চয় সম্ভব হতে পারে। তো মনুষ্য জন্ম হচ্ছে নিজেকে উন্নত বা অধোগতি সম্পন্ন করবার একটা ক্ষেত্র বিশেষ। স্বর্গবাসীদের বা পুণ্যাত্মাদের পুন্য কর্ম্মের ফল ভোগ শেষ হয়ে গেলে আবার এই মরজগতে ফিরে আসতে হয়, তেমনি নরকবাসী অর্থাৎ পাপাত্মাদের পাপ কর্ম্মের ফল ভোগ শেষ হয়ে গেলে, আবার তাদের এই কর্ম্ম জগতে প্রবেশ করতে হয়।
তো মনুষ্য যেমন ভোগদেহ তেমনি কর্ম্মদেহ। এখন কথা হচ্ছে কর্ম্ম কাকে বলে ? মনের দ্বারা দেহ-ইন্দ্রিয়গুলোকে আশ্রয় করে যাকিছু করা হয় তাকেই বলে কর্ম্ম। মনুষ্যদেহেই কর্ম্ম অনুযায়ী গতি লাভ করা সম্ভব হয়ে থাকে। এখান থেকে যেমন উর্দ্ধগতি সম্পন্ন হওয়া যায়, তেমনি অধোগতি হতে পারে। আবার এই কর্ম্ম প্রভাবেই আত্মজ্ঞানের বিকাশ হতে পারে যারদ্বারা জীবাত্মা তার স্বরূপের সন্ধান পেতে পারে। তো এই ব্যাপারটা আমরা একটু বোঝার চেষ্টা করবো। অর্থাৎ মনুষ্য শরীর কেন সর্বোৎকৃষ্ট।
একটা জিনিস জানবেন, প্রাণী মাত্রেই চৈতন্য ও জড় সত্তার মিলিত সত্তা। আমাদের যে অহং ভাব তা আসলে এক ধরনের বিশেষ রশ্মির বিকিরণের কারনে হয়ে থাকে। এই রশ্মি আমাদের দেহের ভিন্ন ভিন্ন চক্রে প্রতিফলিত হওয়ার কারনে আমাদের জ্ঞানের উন্মেষ হয়ে থাকে। এই কারনে একে জ্ঞানজ্যোতি বলা হয়ে থাকে। এই জ্ঞান জ্যোতি প্রতিক্ষণ আমাদের বিভিন্ন চক্রে প্রতিফলিত হচ্ছে। এই জ্যোতিঃ বা তেজশক্তি যখন চক্রের উপরে প্রতিফলিত হয় তখন শরীরের অভ্যান্তরে তেজঃশক্তির উৎপন্ন হয়। একে বুঝবার সুবিধার জন্য একপ্রকার বিদ্যুৎ শক্তি বলতে পারেন। সমস্ত স্থূলশরীর যেমন পৃত্থি তত্ত্বের প্রাধান্য মানব দেহেও এই পৃত্থি তত্ত্বের প্রাধান্য হয়ে থাকে। যদিও অন্যান্য ভূত সকলও এই স্থূল শরীরে বিদ্যমান থাকে। তো চিৎশক্তি ও অচিৎ শক্তির মিলনেই সৃষ্টি। সাধনার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই দুই শক্তিকে পৃথক করে উপলব্ধি করা। প্রথমে এই পৃথকীকরণ বিচারের সাহায্যে করা হয়ে থাকে। পরে এর ব্যবহারিক ভাবে বিবেকের সাহায্যে এই ক্রিয়া সম্পাদিত হয়ে থাকে।
এখন কথা হচ্ছে এই পৃথকীকরণ অর্থাৎ জড় ও চৈতন্যকে আমরা কিভাবে আলাদা করবো ? দেখুন তিল থেকে তেল বের করি কিভাবে ? আখ থেকে রস বের করি আমরা কিভাবে ? পেষাই করে। আবার দুধ থেকে মাখন তৈরী করতে গেলে আমাদের মন্থন ক্রিয়ার সাহায্য নিতে হয়। প্রথম প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ পেষাই এর সাহায্যে আমরা কঠিন পদার্থ থেকে রসকে আলাদা করতে পারি। আর দ্বিতীয় প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ মন্থন হচ্ছে রস থেকে কঠিন পদার্থকে আলাদা করা হয়।
ঠিক তেমনি মন্থনরূপ কর্ম্ম, এবং পেষাইরূপ প্রক্রিয়ার সাহায্যে আমরা আমাদের এই স্থূল দেহ থেকে জলীয় ও কঠিন পদার্থকে বাদ দিয়ে তড়িৎ বা চৈতন্য শক্তিকে আলাদা করতে পারি। তো জড় (কঠিন ও তরল) দেহ থেকে চৈতন্য বা তড়িৎ শক্তিকে বের করে নিতে পারলে, আমাদের স্থূল শরীরের ক্রিয়ার সমাপ্ত হয়। তখন তড়িৎ বা জ্ঞানজ্যোতিঃ বা চৈতন্য যাই বলুন না কেন এঁকে স্থূল থেকে আলাদা করতে পারলেই আমরা এক অনাবিল আনন্দময় সত্ত্বার সন্ধান পেয়ে থাকি । এঁকে ধরে রাখতে পারলেই সমস্ত ত্রিতাপ দুঃখের অবসান ঘটে থাকে। আমরা চির শান্তির জগতে অনাদি অনন্ত কাল ধরে বিচরণ করতে পারি । এসব আমাদের মুনি ঋষিদের উপল্বদ্ধিতে প্রকাশিত হয়েছিলো হাজার হাজার বছর আগে যা আজও সত্য।
---চলবে---
২৩.০৭.২০২৫
ত্রিবিধ শরীর ও কর্ম্ম
মানব দেহ একটা গতিশীল সত্তা যা কালের প্রবাহে পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে। এই দেহরূপ পরিবর্তনশীল সত্তা - যা কাল ও কর্ম্মের প্রভাবে হয়ে উঠতে পারে ভগবৎদেহ বা ইতর দেহ। দেখুন, আমাদের ধারণা হচ্ছে, আমাদের যা কিছু কর্ম্ম তা স্থূল দেহ দ্বারাই সম্পাদিত হচ্ছে। কিন্তু সত্যই কি তাই, আমরা আমাদের সূক্ষ্ম দেহেও কর্ম্ম করে থাকি। আমরা যখন ঘুমিয়ে থাকি, তখন আমাদের স্থূল দেহ শয্যায় শায়িত থাকে, নিষ্ক্রিয় থাকে, কিন্তু আমরা স্বপ্নের মধ্যে মনোময় (সূক্ষ্ম) দেহে অনেক কর্ম্ম করে থাকি। এমনকি সেই সূক্ষ্ম দেহেও আমাদের সুখ দুঃখ অনুভূত হয়। তবে তা স্থায়ী হয় না। ঘুম থেকে জেগে উঠলেই, আমরা সেইসব কর্ম্মের কোনো পরিনাম দেখতে পাই না। আমাদের এই যে সূক্ষ্ম দেহ অর্থাৎ মনোময় প্রাণময়, জ্ঞানময় দেহ এগুলো আসলে পঞ্চতত্ত্বের সূক্ষ্ম ভাগ নিয়ে গঠিত। অর্থাৎ শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস গন্ধ - যা আসলে ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ব্যোম এরই সূক্ষ্ম রূপ। আপনি হয়তো ভাবছেন, এই পাঁচ তন্মাত্রের কোনো রূপ নেই। আসলে এরও রূপ আছে, যা আমাদের দৃষ্টিগোচর না হলেও, আছে। আমরা সেই আলোচনায় যাবো না। আমাদের আলোচ্য কর্ম্ম ও শরীর নিয়ে।
আখ থেকে রস বের নিলে যেমন পড়ে থাকে ছোবড়া, তেমনি এই স্থূল দেহ থেকে চৈতন্যকে আলাদা করে নিলে যা পড়ে থাকে তা দিয়ে আর কোনও ক্রিয়া সম্পাদিত হয় না। তখন স্থূল দেহের ক্রিয়ার অবসান হয়। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। এমনকি স্থূল দেহ নাশের পরে যে সূক্ষ্ম দেহ থাকে তাও চিরকাল থাকে না। কিন্তু জ্ঞানকর্ম্মের ফলে যে জ্ঞানের উন্মেষ হয়েছিলো স্থূল দেহে থাকাকালীন, তার প্রবাহ চলতে থাকে। আমরা ধীরে ধীরে এই গূঢ় তত্ত্বকথা শুনবো।
যোগী যখন যোগসাধন করেন, তার ফল হয় শরীরের মধ্যে তেজঃশক্তির উন্মেষ। এবার সাধন যজ্ঞের অনুষ্ঠানের ফলে যে তেজঃশক্তির উদ্ভব হয়েছিল, তা আমাদের স্থূল দেহের অভ্যন্তরস্থ যে ভূত সকল আছে, তাকে আলাদা করতে শুরু করে। এই সূক্ষ্ম পঞ্চতত্ত্বই একটা অবয়ব তৈরী করে স্থূল দেহের আকার নিয়েছিল। এখন স্থূল তত্ত্বকে বিগলিত করে সূক্ষ্ম তত্ত্বে পরিণত করা হয়। অর্থাৎ সূক্ষ্ম দেহ প্রকাশিত হয়। এই সূক্ষ্ম দেহ সাধকের ততদিন অধরা থাকে যতদিন না সাধক স্থূল দেহের কর্ম্ম সমাপ্ত করছেন। সাধক এই সূক্ষ্ম দেহের অধিকারী তো আগেই ছিলেন, কিন্তু স্থূল অভিমানের আবরণ থাকায় তা ঢাকা পরে গিয়েছিলো। সূক্ষ্ম দেহ প্রাপ্ত হলেও এই অভিমান কিন্তু সহজে যায় না। এখানেও অভিমান অর্থাৎ আমি আমার ভাব বর্তমান থাকে। অর্থাৎ একটা সময় আমি স্থূল শরীরের অভিমানী ছিলাম, এখন আমি সুক্ষ দেহের অভিমানী হয়েছি। এই অবস্থায় সাধক কখনো স্থূল শরীরে আবার কখনো সূক্ষ্ম শরীরে ঘোরা ফেরা করতে পারেন । আর এটা আমাদের মতো সাধারনের কল্পনার বাইরে হলেও যথার্থ সাধকের কাছে এটি স্বাভাবিক। এমনকি এই অবস্থা কেন অন্যের নেই, সেটা দেখে সাধক বিস্মিত হয়। অর্থাৎ আমি যে জিনিষটা সহজেই বুঝতে পারছি, সেটা কেন আমার বন্ধু বুঝতে পারছে না, তা ভেবে সে অবাক হয়, বিরক্ত হয়।
আমরা সবাই স্বপ্ন দেখি। এখন কেউ যদি কোনোদিন স্বপ্ন না দেখে থাকে, তবে তাকে বোঝানো কঠিন হবে, যে এই জগতের বাইরেও একটা সূক্ষ্ম জগৎ আছে। এই স্থূল জগতের অনুরূপ একটা সূক্ষ্ম জগৎ আছে, যা আমরা ঘুমের মধ্যে দেখে থাকি।
প্রকৃতির নিয়মে অথবা বলা যেতে পারে প্রকৃতির প্রেরণায় এই স্থূল থেকে সুক্ষ রূপের অনুভব ও গতাগতি হয়ে থাকে। এখানে একটা কথা বুঝতে হবে, সূক্ষ্ম দেহে যোগী যে জগতে ঘোরাফেরা করেন, তা কিন্তু এই দৃশ্যমান জগতের অনুরূপ একটা জগৎ বটে, তবে এই স্থূল দৃশ্যমান জগৎ নয় যেন একটা স্বপ্নের জগৎ। স্বপ্ন ভেঙে গেলে, যেমন পূর্ববৎ আমরা বাহ্য জগতে ফিরে আসি, তেমনি সূক্ষ্ম দেহধারী যোগী এক দেহ (স্থূল) থেকে অন্য দেহে (সূক্ষ্ম) সহজেই গতাগতি করতে পারেন।
চলবে। .....
২৪.০৭.২০২৫
কোথা থেকে আসে জীব কোথা চলে যায়
মুক্তানন্দ আমার মনের মানুষ। ওঁকে সব মনের কথা খুলে বলা যায়। আমরা উভয় উভয়কে শ্রদ্ধা করি। একজন আরেকজনকে গভীরভাবে বিশ্বাস করি। যে কথা নিজের স্ত্রী-ছেলেমেয়েদেরও বলা যায় না, মুক্তানন্দকে সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তো একদিন তাঁর সঙ্গে এক বরফ পড়া রাত্রিতে গুহার মধ্যে বসে কথা হচ্ছিলো। দুজনেরই ঘুম আসছে না। দুজনেই চারটে করে কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে আছি। গুহার মুখে ধুনো জ্বলছে। মাঝে মধ্যে ধুনোর কাঠ দেবার জন্য বিছানা ছাড়তে হচ্ছে। কথায় কথায় মুক্তানন্দ বলে উঠলেন, যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে চলে যাও - বলে এক টুকরো কাঠ ধুনীর আগুনে ঢুকিয়ে দিলেন।
আমার মনের মধ্যে প্রশ্ন জেগে উঠলো, কোথা থেকে আসে জীব কোথা চলে যায় ? কেনোই বা আসে জীব, কেন চলে যায় ? কি করতে আসে জীব, কি করে যায়।
মুক্তানন্দ বলে উঠলো - কোনো একটা কিছু আস্বাদনের জন্য সেই অচিন্ত্য শক্তি এই প্রকৃতির কোলে এসে পড়েছে। কে তাকে পাঠায়, তা সে জানে না। আবার সে যে নিজের ইচ্ছেতে এসেছে, এমন প্রমান পাওয়া যায় না। কেন, কি উদ্দেশ্যে সে এসেছে তাও সে জানে না। আর যা কিছু সে জানে বলে মনে করে, তা আসলে অস্পষ্ট অনুমান মাত্র। এই অনুমানের কোনো সত্যতা তার কাছে নেই। শুধু একটা অস্পষ্ট আভাস তার হৃদয়- আকাশে ভেসে ওঠে।
আমি বললাম, আমরা সবাই সৎ-চিৎ-আনন্দ স্বরূপ । সাধকের সাধনার উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বরূপে অর্থাৎ আনন্দের সাগরে স্থিত হওয়া। এই যে স্বরূপ সেখানে নাকি কেবল আনন্দই আনন্দ। তো যদি আমি পূর্বে আনন্দের মধ্যেই স্থিত ছিলাম, তবে আমি সেখান থেকে নিজেকে বিচ্যুত করলাম কেন ? আর যদি বিচ্যুতই হলাম, তবে আবার স্বরূপে স্থিত হবার জন্য এতো ব্যাকুলতা কেন ?
মুক্তানন্দ বললেন, এখানে অর্থাৎ জীবদেহে এসে সেই আনন্দের খোঁজ করছো - কখনও পার্থিব বস্তুর মধ্যে, কখনো অপার্থিব বস্তুর মধ্যে। কিন্তু কোথাও তুমি শান্তি পাচ্ছো না। কোথাও তুমি স্থিত হতে পারছো না। যদিবা কিছু আনন্দের সন্ধান পাও, তা ক্ষনিকের জন্য। আমরা খেয়ে আনন্দ পাই, কিন্তু কিছুক্ষনের মধ্যে আবার ক্ষুধার উদ্রেগ হয়। আমরা ভ্রমনে আনন্দ পাই, কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে তা একঘেয়ে লাগে। আমরা জল পান করে পিপাসার তৃপ্তি পাই, আবার কিছুক্ষনের মধ্যে পিপাসা জেগে ওঠে। আমারা গাড়ি করি, বাড়ি করি, এক থেকে দুই করি, একতলা থেকে দুতলা করি। কিন্তু আবার অভাব বোধ জেগেই থাকে। এই ক্ষুধা, পিপাসা, অভাব কবে চিরতরের জন্য নিবৃত্ত হবে ? কবে আমরা শান্তিতে চিরতরের জন্য ঘুমুতে যাবো ? তাহলে কি মৃত্যু বা দেহ ত্যাগ ভিন্ন অন্য কোনো উপায় নেই ?
মুক্তানন্দ বলছেন, এই অতৃপ্তির দশা চিরদিন থাকে না। এই অতৃপ্তিই একদিন বৈরাগ্যের সূচনা করে।
আমি বললাম আগে যা ভালো লাগতো, এখন আর তা ভালো লাগে না। এমনকি এখন আর কিছুই ভালো লাগে না। সব কিছুর মধ্যেই যেন নশ্বরতা লুকিয়ে আছে। সব কিছুর মধ্যেই যে ভবিষ্যৎ দুঃখ লুকিয়ে আছে। এতদিন হৃদয়ের মধ্যে যে আশা ছিলো, যে আকাংখ্যা ছিলো, বেঁচে থাকার আনন্দ ছিলো, পাওয়ার মধ্যে একটি তৃপ্তি ছিল, মনের আদ্রতা যে ছিল, তা যেন শুকিয়ে গেছে। এই জগতের কোনোকিছুই আর আকর্ষণ করে না।
মুক্তানন্দ বলছেন, সেকি ! তাহলে তো বুঝতে হবে জগৎ থেকে বিদায়ের সময় আগতপ্রায়। প্রবৃত্তির দ্বার যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন নিবৃত্তির দ্বার খুলে যায়. স্বধামে প্রত্যাবর্তনের সময় আসে। অনন্তের ডাক তখন প্রবল হয়। এখন তোমার জীবনে সন্ধ্যা নেমেছে। এই তো আরতির সময়। এই তো সত্য মার্গ লাভের সময়। তবে এইসময় আরো দুটো কথা শোনো।
স্বধামে পূর্বে তুমি স্বরূপেই স্থিত ছিলে। আবার সেই স্বরূপে যেতে চাইছো। কে বললো তোমাকে স্বরূপে কেবলই আনন্দ ? আসলে তুমি যা চাইছো, তা কোথাও নেই। তুমি আনন্দ চাইছো, কিন্তু সুখে থাকলে তোমাকে ভূতে কিলোতে থাকে। স্বরূপে তুমি ছিলে বটে, কিন্তু স্বরূপের জ্ঞান তোমার ছিল না। সেই বোধও তোমার ছিল না। স্বরূপের বোধ যদি তোমার থাকতো, তবে সেখানেই তুমি আনন্দে থাকতে। আর সেখানে থেকে অন্ততঃ স্বেচ্ছায় তুমি এখানে আসতে না। তাহলে ধরে নিতে হয়, হয় তুমি স্বেচ্ছায় আসোনি, নতুবা তোমার স্বরূপের বোধের অভাব ছিল। আর এই অভাব বোধ তোমাকে বিরুদ্ধশক্তির কাছে টেনে নিয়ে এসেছে।
দেখুন আনন্দের কথা সেই বোঝে যার নিরানন্দের অভিজ্ঞতা হয়েছে। সুখবোধ তারই হয়, যার দুঃখের অভিজ্ঞতা হয়েছে। অভাববোধ না থাকলে ভাবের ঘরে কেউ প্রবেশ করতে চায় না। ছায়ার মর্ম্ম সেই বোঝে যে রোদের তাপ অনুভাব করেছে।
একটা জিনিস জানবেন, স্বরূপের মধ্যে আনন্দ আছে, আবার দুঃখও আছে। আনন্দ স্বরূপের স্বভাব, আর দুঃখ স্বরূপের প্রতিকূল অবস্থা। এই যে প্রতিকূল স্বরূপদুঃখ তা হচ্ছে আনন্দের বিরুদ্ধ শক্তি। জীব যখন স্বরূপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন সে এই আনন্দের খোঁজেই আসে। কিন্তু স্বরূপে থাকাকালীন, সে যে আনন্দের মধ্যে ছিলো , সেই স্মৃতি সে ভুলতে পারে না। আর স্মৃতি চালিকা শক্তি হিসেবে জীবকূলকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। আর জীব সুখের আশায় ঘুরে মরছে।
একদিন না একদিন সে আবার স্বরূপে স্থিত অবশ্যই হবে, কিন্তু সেদিনও তার দুঃখের সমাপ্তি হবে না। কারন দুঃখ না থাকলে সুখের অনুভব হয় না. নিরানন্দ না থাকলে আনন্দের অনুভূতি আসে না। কষ্ট না থাকলে ফল প্রাপ্তিতে আনন্দ আসে না। যেদিন আনন্দের খোঁজের নিবৃত্তি হবে, সেইদিন দুঃখ নির্ম্মুল হয়ে যাবে। শ্বাস নিলে আপনাকে ছাড়তেও হবে, কেননা কাউকেই আপনি ধরে রাখতে পারবেন না। তাই আমাদের সবাইকে আনন্দের খোঁজ থেকে নিবৃত্ত হতে হবে। কেননা আনন্দের সঙ্গেই মিশে আছে নিরানন্দ। দুঃখের ভোগ সেইদিন শেষ হবে, যেদিন আনন্দের ভোগ শেষ হবে। এই আনন্দ ও নিরানন্দের মধ্যে সুখ ও দুঃখের মধ্যে একটা বিশেষ ক্ষণ বা স্থান আছে দুইই মুহূর্তের জন্য ও একত্রে স্থিত হতে পারে না। আপনি যখন বুক ভরে শ্বাস নিচ্ছেন, জানবেন ক্ষনিকের জন্য সেই বাতাস আপনার বুক থেকে পেটে গিয়ে আবার বেরুবার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে। এই ক্ষণটাকে ধরবার চেষ্টা করুন। আবার যখন বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে, তার সঙ্গে সঙ্গে নিজের মনটাকে বাইরে বের করে দিন। আবার বাতাস যখন ভিতরে ঢুকবার জন্য উদগ্রীব হচ্ছে সেই ক্ষণটাকে ধরবার চেষ্টা করুন।
দুঃখের ভোগ শেষ করতে চাইলে, আনন্দের ভোগের সমাপ্তি করতে হবে। জানবেন, দুঃখ আমাদের বাইরের শক্তি, আর আনন্দ আমাদের অন্তরের শক্তি। এমন স্থান/ক্ষণ বাছুন, যেখানে, একটা সময় এই দুই শক্তি মিলিত হচ্ছে আবার বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। সেই ক্ষনের মধ্যে নিজেকে স্থিত করুন। অর্থাৎ যেখানে দুইই সমান - একেই বলে সাম্যরস। অর্থাৎ সুখে দুঃখে নিরাসক্ত থাকুন। তবেই স্বরূপে স্থিত থাকতে পারবেন। নতুবা সব সাধনা বৃথা।
-------
২৫.০৭.২০২৫
কোথা থেকে আসে জীব কোথা চলে যায়
স্থূল দেহে যেমন স্থূল তত্ত্বের সমাহার তেমনি সূক্ষ্ম দেহে সূক্ষ্ম তত্ত্বের সমাহার। চৈতন্য থেকে উদ্ভূত তেজঃশক্তি এই তত্ত্বগুলোকে বিগলিত করে স্বয়ং চৈতন্যই তাঁর মনগড়া দেহের অবয়ব তৈরী করছেন। তো সূক্ষ্মতত্ত্ব সূক্ষ্ম দেহের অবয়বের উপাদান। কিন্তু এই সূক্ষ্ম তত্ত্ব থেকে যে অবয়ব তৈরী হয়েছে, তা আমাদের সাধারনের বোধগম্য হয় না। স্থূল দেহ যেমন স্থায়ী নয়, তেমনি সূক্ষ্ম দেহও স্থায়ী নয়। প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে। সাধক যখন স্থূল দেহাভিমান রহিত হয়, তখন সে সূক্ষ্ম শরীরের অভিমানী হয়। আর এই সময় সে স্থূল পিন্ড শরীর ত্যাগ করে বাইরে বেরুতে পারে, আবার ফিরেও আসতে পারে। এই প্রক্রিয়া আমাদের মতো সাধারণ মানুষের দ্বারা সম্ভব হয় না। তার কারন হচ্ছে তার কোনো স্থায়ী সূক্ষ্ম শরীর নেই। সূক্ষ্ম শরীর নেই, তা কিন্তু নয়, সবারই স্থূল শরীর যেমন আছে তেমনি সূক্ষ্ম শরীরও আছে। এমনকি কারন শরীরও আছে। তবে সেখানে তার কোনো অভিমান নেই। আর এই সূক্ষ্ম শরীর এতটাই দ্রুত পরিবর্তনশীল যে সে কখনও অভিমানের বীজ বপন করতে পারে না। খরস্রোতা নদীতে যেমন শ্যাওলা জমতে পায়ে না। দেখুন, স্থূল শরীরে কালের প্রভাব আছে সত্য কিন্তু আপনি ইচ্ছে করলেই ১০ বছরে বৃদ্ধ শরীর পেতে পারেন না। কিন্তু সূক্ষ্ম শরীরের কালের প্রভাব চেয়ে কর্ম্মের প্রভাব বেশি থাকে। ১০ বছর বয়সে আপনি বেদাদি আয়ত্ত্ব করে জ্ঞানবৃদ্ধ হতে পারেন। যেমন হয়েছিলেন, শঙ্করাচার্য বা অষ্টাবক্র মুনি।
যাইহোক, স্থূল শরীরের কর্ম্ম শেষ হয়ে গেলে, এই সূক্ষ্ম শরীর ধীরে ধীরে স্থির হতে শুরু করে। যেমন বৈদ্যুতিক পাখা যখন দ্রুততালে ঘুরতে থাকে, তখন তার পাখার স্থূলভাব আমাদের নজরে আসে না, কিন্তু যখন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়, তখন পাখাগুলো আমাদের নজরে আসে। ঠিক তেমনি চৈতন্য যখন দৃঢ়ভাবে স্থূল শরীরে বর্তমান থাকে, তখন আমাদের সূক্ষ্ম শরীরের অনুভূতি লাভ করতে পারি না। এবার যখন স্থূল শরীরে ক্রিয়ার সমাপ্তি হয়, তখন আমরা সূক্ষ্ম শরীরের অস্তিত্ত্ব অনুভব করি, আর সেখানে অর্থাৎ সূক্ষ্ম শরীরে অভিমান সম্পন্ন হই। অর্থাৎ তখন এই সূক্ষ্ম শরীরে আমাদের ক্রিয়া শুরু হয়। যোগীপুরুষ স্থূল অর্থাৎ পিন্ড দেহ ও সূক্ষ্ম দেহ উভয়ের সঙ্গে বিরাজ করতে পারেন। ঠিক যেমন একই মালিকের দুটো বাড়ী। কখনও দিল্লির বাড়িতে, কখনও বাংলার বাড়িতে। তো আমরা হয়তো বুঝতে পারলাম, যে যোগীপুরুষ যেমন স্বেচ্ছায় স্থূল জগতে স্থূল দেহ নিয়ে বিচরণ করেন, তেমনি আপন ইচ্ছেতেই সূক্ষ্ম জগতেও সূক্ষ্মদেহে বিচরণ করতে পারেন।
আসলে জড়বস্তুতে অর্থাৎ অনাত্মাতে আত্মাভিমান যতদিন থাকে, ততদিন স্থূল শরীরকে অবলম্বন করেই কর্ম্ম করতে হয়। কিন্তু যখন স্থূল দেহের কর্ম্ম সমাপ্ত হবে, অথবা স্থূল দেহ যখন কর্ম্মের অযোগ্য হবে, বা নাশ হবে, তখন সূক্ষ্ম সত্তার উপাদানে নির্ম্মিত সূক্ষ্ম দেহের অভিব্যক্তি ঘটবে। তখন আমাদের এই সূক্ষ্ম দেহকেই "আমি" "আমার" বলে একটা বোধের উৎপত্তি হবে। আর স্থূল দেহ হবে শবাসন । আর সূক্ষ্মাভিমানী জীবাত্মা তখন শবরূপী স্থূল দেহকে আসন রূপে ব্যবহার করবে। শুরু হলো এবার সূক্ষ্ম দেহের কর্ম্ম।
এবার শুরু হলো সূক্ষ্ম দেহে আত্মকর্ম্ম। সূক্ষ্ম দেহে আত্মকর্ম্মর প্রভাবে একসময় চৈতন্যশক্তি বা তেজঃশক্তি কারন সত্তাকে বিগলিত করতে শুরু করে। আর বিগলিত কারন সত্তা তখন কারন দেহরূপে পরিণত হয়। আর এই কারন দেহ আত্মকর্ম্ম সম্পাদন করবার জন্য স্থূল ও সূক্ষ্ম উভয় দেহকে শবাসন রূপে গ্রহণ করে। এইজন্য যোগী মহাত্মাগণ বলে থাকেন, স্থূল দেহের আত্মকর্ম্ম অর্থাৎ ধ্যানাদি ক্রিয়া অপরিবাহী আসনকে অবলম্বন করে করতে হয়। এর পরে সূক্ষ্ম দেহের আত্মকর্ম্ম করা কালীন, স্থূল দেহকে আসন করতে হয়। আর কারন দেহের আত্মকর্ম্মাদি স্থূল ও সূক্ষ্ম উভয় আসনকে অবলম্বন করে সম্পাদিত হয়। তখন যোগীর এই কারন দেহে আত্মাভিমান জেগে থাকে। যখন যে দেহে সাধক আত্মকর্ম্ম করেন, তখন সেই দেহেই আত্মাভিমান জাগিয়ে রাখতে হয়। এর পরে একটা সময় আসে, যখন সাধককে দেহাভিমান তা সে স্থূল হোক, সূক্ষ্ম হোক বা কারন হোক, সব বৰ্জন করতে হয়। এখন সমস্ত অভিমানের পূর্ন আহুতি দানের সময় এসেছে বুঝতে হবে।
এই গুহ্যতত্ত্ব যত সহজে লিপিবদ্ধ করা হলো, এর ব্যবহারিক প্রয়োগ কিন্তু অতো সহজ নয়। প্রথমে দেহধারী গুরুর সান্নিধ্যে, পরে অন্তরের সৎ-গুরুর সান্নিধ্যে এই আত্মকর্ম্মের ক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে থাকে। এ বড়ো দুর্লভ অনুভূতি, যা আমাদের ঋষি পরম্পরায় প্রবাহিত হচ্ছে। এই ফল্গুধারা আমাদের সবার অন্তরেই প্রবাহিত হচ্ছে, যা আমাদের বোধের বাইরে হলেও, একদিন সবার মধ্যেই প্রকাশিত হবে । হে পরমপিতা সবার মঙ্গল করুন।
---------
২৬.০৭.২০২৫
কঠোপনিষদের জ্ঞান
পিতার বুদ্ধিমত্তা সন্তানের মধ্যে বিনা আয়াসে আসে না। সন্তান নিজের কর্ম্মের মধ্যে দিয়ে অর্জ্জিত অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে, সেই বোধ জাগিয়ে তোলে। আমাদের পূর্বজ-গন যা কিছু বলে গেছেন, তাকে আমরা তখনই যথার্থ ভাবে উপল্বদ্ধিতে আনতে পারবো, যখন সেই পথে নিজেকে বিস্তার করবো। হ্যাঁ জন্মসূত্রে সহজাত বৃত্তি, বা পিতৃপ্রদত্ত সম্পদ আমাদের সহজে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু আমার ব্যক্তিত্ত্ব আমাদের কৃতিত্বের উপরে নির্ভর করবে। বই পরে আমরা অনেক কিছু জানতে পারি, এমনকি জানাতেও পারি, কিন্তু এতে করে অন্ধের অন্ধত্ব ঘোঁচে না। তত্ত্বজ্ঞান আয়ত্ত্বে না আসলে, ব্যাবহারিক প্রয়োগবিধি না জানা থাকলে, কানামাছির মতো একই জায়গায় ঘুরপাক খেতে হয়।
নচিকেতাকে আচার্য্য যম (কঠোপনিষদ) বলেছিলেন, "অধ্যাত্ন-যোগ-অধিগমেন দেবং // মত্বা ধীরো হর্ষ -শোকৌ জহাতি" ........ অধ্যাত্ম যোগের অনুশীলন দ্বারা মত্ত্বা অর্থাৎ আত্মাকে মনন করে, ধীর বা প্রাজ্ঞ ব্যাক্তিগন হর্ষ ও শোকের অতীত হন।
দেখুন যা জানিনা, তা জানতে হবে। এই জানতে গেলে, আমাদের মনের মধ্যে প্রশ্নকে উদয় হওয়া চাই । প্রশ্ন না জাগলে, উত্তর আসবে কি করে ? আর উত্তর পেতে গেলে, যিনি জানেন, তার কাছে যেতে হবে। এখন এই যে যিনি জানেন, সেই মানুষটি আমাদের হাতের কাছে নাও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে সহজ উপায় হচ্ছে, মহাত্মারা যা কিছু বলে গেছেন, বা তাঁরা তাঁদের উপল্বদ্ধিকে যেখানে লিপিবদ্ধ করেছেন, সেই সব পুস্তকের সাহায্য আমাদের নিতে হবে। এবং নিজের মধ্যে বিচারশক্তির উদ্রেগ করে, নিজের বোধবুদ্ধি অনুযায়ী সত্য মিথ্যা বুঝে নেবার চেষ্টা করতে হবে। এবার তার প্রয়োগ করতে হবে। নিজেকে সচেষ্ট হতে হবে, যে উপায়ে তিনি অর্থাৎ আচার্য্য এই জ্ঞানের সন্ধান পেয়েছেন, সেই উপায়ের অনুশীলন করতে হবে। একটা সময় হয়তো আসবে, মহাত্মার উপলব্ধি ও আমার নিজের উপলব্ধি একাকার হয়ে যাবে। তা যদি না হয়, তবে বুঝতে হবে, আমার সাধনায় বা সাধন-যোগ্যতায় কমতি আছে। কেননা মহাত্মাগণ সত্য বৈ মিথ্যে বলেন না।
আমাদের যে সূক্ষ্ম শরীর আছে, আমার শরীরের চারিদিকে যে একটা আলোর বলয় আছে, তা ধ্যানপিয়াসীর উপলব্ধি জাত জ্ঞান। এই শরীরের ভিন্ন ভিন্ন নানা রঙের সমাবেশ আছে, এমনকি এই সূক্ষ্ম শরীরের পরিবর্ত্তন আছে। কিন্তু এই সত্য উপল্বদ্ধিতে আনবার জন্য আমাদেরকে রাতের পর রাত ধ্যানের গভীরে প্রবেশ করতে হয়েছে। বছরের পর বছর নিরন্তর ধ্যানের গভীরে অকারনে ডুবে থাকতে হয়েছে। মাঝে মধ্যে মনে হয়েছে, এসব করে কি হবে ? অহেতুক সময় নষ্ট, ঘুম নষ্ট, এমনকি শরীর নষ্ট। তথাপি মহাত্মাদের কথায়, বিশ্বাস করে এই অনুশীলন চালিয়ে যেতে হয় । এখন এই সত্য আমাদের অনেকের কাছে সূর্য্যের মতো সত্য হয়েছে।
দেখুন, ঈশ্বর অজ্ঞেয়, তাকে নাকি জানা যায় না। তিনি ইন্দ্রিয়লব্ধ নন। এই কথায় আমি যদি বুঝি, যে তিনি অজ্ঞেয়, তাই তাকে জানার চেষ্টা বৃথা, তবে মারাত্মক ভুল হবে। আসলে যাকে জানা যায় বা জানা হয়, তিনি জ্ঞেয়। তো জ্ঞেয়কে যিনি জানেন, তাকে বলা হয় জ্ঞাতা। তো যখনই আপনি কাউকে জানবেন, তখন তিনি হবেন জ্ঞেয়। তাহলে প্রশ্ন জাগে, তাহলে জানছেন কে ? এই যিনি জানছেন, তিনিই ঈশ্বর, তিনিই জ্ঞাত । তো সমস্ত জ্ঞানের সাক্ষীস্বরূপ যিনি আছে, তিনি ঈশ্বর। আর তিনি আমাদের চেতনশক্তি। এই চৈতন্য আছে বলেই, আমরা ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে জ্ঞাতব্য বস্তুকে জানতে পারছি। তো জানছে কে ? জানছে "আমি" রূপ আত্মা। এই আত্মাই মূলসত্ত্বা, যা সবার ভিতরে বাইরে বিরাজ করছে।
যমরাজ বলছেন, "তং দুর্দর্শং গূঢ়ম অনু-প্রবিষ্টম // গুহাতিতং গহ্বরেষ্ঠং পুরাণম" তিনি (এতটাই সূক্ষ্ম যে) সহজে দর্শনীয় নন। তিনি গূঢ় অর্থাৎ অতি সূক্ষ্ম ভাবে অনুপ্রবেশ করে আছেন। তিনি গহ্বর অর্থাৎ দুর্গম স্থানে উপবিষ্ট, তিনি গুহাহিতম অর্থাৎ হৃদয়গুহায় স্থিত, তিনি পুরাণম অর্থাৎ কালের অতীত।
তো তাঁকে জানতে গেলে, আচার্য্যের কথা শুনতে হবে, বা শাস্ত্রগ্রন্থ পাঠ করতে হবে, বুদ্ধি দিয়ে তাকে বিচার করতে হবে, এবার আমাদের মনকে নিয়ে গভীর ধ্যানের মধ্যে প্রবেশ করতে হবে, এই হচ্ছে মহাত্মাদের উপদেশ। অর্থাৎ আমার মধ্যে আমাকে প্রবেশ করতে হবে। বহির্মুখী মনকে অন্তরের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে স্থিত হতে হবে।
-----------
২৭.০৭.২০২৫
ত্রিবিধ আনন্দ :
আমরা ত্রিবিধ দুঃখের কথা শুনেছি। আমাদের জীবনে যেমন ত্রিবিধ দুঃখ হয়ে থাকে, তেমনি আমাদের কাছে ত্রিবিধ আনন্দের সন্ধান আছে। ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলতেন, বিষয়ানন্দ, ভজনানন্দ, আর ব্রহ্মানন্দ। উপনিষদ বলছে, আনন্দ আমাদের তিন প্রকার, আর তা হচ্ছে দৈহিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক। এই যে দৈহিক আনন্দ তা আমাদের বাহ্য জগতের বিষয় থেকে আগত যা আমাদের দেহের মধ্যে প্রবাহিত হয়ে থাকে। একে কেউ পাশবিক আনন্দ বলে থাকেন। আসলে এই আনন্দ পশু ও মনুষ্য উভয় দেহের মধ্যেই প্রবাহিত হয়ে থাকে। একটু বুঝিয়ে বললে বলা যেতে পারে, যা আমাদের দেহস্থিত ইন্দ্রিয়সকলকে তৃপ্ত করে থাকে, তাকে দৈহিক আনন্দ বলা হয়ে থাকে । তেমনি মানসিক আনন্দ আমাদের অন্তরেন্দ্রিয় অর্থাৎ মনের তৃপ্তিদায়ক। সাধারণ মানুষের এই দুই ধরনের আনন্দের অনুভূতি হয়ে থাকে। এই দুই আনন্দের উৎস হচ্ছে বহির্জগৎ। কিন্তু আরো এক ধরনের আনন্দ আছে যাকে বলা হয় আধ্যাত্মিক আনন্দ। এই আধ্যাত্মিক আনন্দ মানুষের ভিতরে যে দেবত্ব আছে, তার থেকে আসে। এই আধ্যাত্মিক আনন্দের উৎস বহির্জগৎ নয়, এটি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে উৎসারিত আনন্দ।
বৈষয়িক বস্তু বা বিষয়জ্ঞান থেকে মানুষের মধ্যে একটা আনন্দের প্রবাহ হয়ে থাকে। ঠিক তেমনি আত্মজ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞান থেকেও মানুষের অন্তরে আনন্দের ঢেউ উঠতে পারে। যার হৃদয় বাহ্য বিষয়ে অনাসক্ত হয়ে পড়ে, এবং ব্রহ্মজ্ঞানে যিনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তার মধ্যে এই অহেতুক আনন্দের প্রবাহ চলতে থাকে। মানুষ সাধারনতঃ পার্থিব বস্তুর বিষয়ে জানতে চায়। আর এই জ্ঞান অবশ্যই জীবনকে সমৃদ্ধ করে। এই বৈষয়িক জ্ঞান তাকে সীমিত ও সাময়িক আনন্দের সন্ধান এনে দিতে পারে। কিছুদিনের মধ্যে এই আনন্দ ধীরে ধীরে কমতে থাকে। আর তাই সে আবার পদার্থের বিষয়ে আরো গভীরে ঢুকতে চায়। মুক্তানন্দ বলছিলেন, বৈজ্ঞানিকদের ছোটার শেষ নেই। কেননা যা সে জেনেছে, তা সম্পূর্ণ নয়। তাই সে আরো জ্ঞানের আশায় ছুটে চলেছে। একসময় মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ছে। মৃত্যুর পরে তার এই জ্ঞান তার আর কোনো কাজে আসে না। এমনকি পরবর্তী প্রজন্ম তার এই জ্ঞানকে ভ্রমাত্মক জ্ঞান বলে দাগিয়ে দেয়।
বেদান্ত এই দৃশ্যমান জগতের নাম দিয়েছে মায়া। এটি প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্যে পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে। পার্থিব বস্তুসকল এখন যে অবস্থায়, যেখানে দৃশ্যমান হচ্ছে, ক্ষণিক পরেই তা আর সেখানে সেই অবস্থায় থাকছে না। তাই বেদান্ত মায়া বা প্রপঞ্চ বলে আখ্যা দিয়েছে। মায়ার রহস্য ভেদ করার মধ্যে আনন্দ আছে বৈকি ? কিন্তু তা হবে আসলে ছেলেখেলা। ছেলেবেলায় আমরা খেলনায় আনন্দ পাই। বয়স বাড়লে সেই আনন্দ আর থাকে না। ঠিক তেমনি মানুষ যতদিন নিজের মধ্যে দেবত্বের সন্ধান না পায়, ততদিন সে এই মায়ারূপ খেলনা নিয়ে মেতে থাকে। আর এতেই আনন্দ পায়। কিন্তু একদিন সে বুঝতে পারে, এই পুতুলের বিয়ে, বা খেলনা বন্দুক আসল নয়। এর মধ্যে কোনো সত্য নেই। এসব কেবলই খেলার সামগ্রী। বয়স বাড়লে, জ্ঞান হলে, একদিন তার কাছে এসব মূল্যহীন হয়ে যাবে। তাই সত্যকে জানতে গেলে, আমাদের মায়ার ওপারে যেতে হবে। আমাদের সেই আনন্দের খোঁজে যেতে হবে, যা দেহ-মনের অতীত। দেহাতীত হয়ে গেলেও যে আনন্দ আমাদের সঙ্গ দেবে।
এর জন্য দরকার আমাদের প্রথমে স্বধর্ম্ম পালন করা। এখন কথা হচ্ছে এই স্বধর্ম্ম বলতে আমরা কি বুঝি ? প্রত্যেক জীব, বস্তু ও বিষয়ের নিজস্ব গুন হচ্ছে তার ধর্ম্ম। যেমন জলের ধর্ম্ম হচ্ছে শৈত্য, অগ্নির ধর্ম্ম উত্তাপ, পশুর ধর্ম্ম পশুত্ব আর মানুষের ধর্ম্ম হচ্ছে মনুষ্যত্ব। এখন কথা হচ্ছে মানুষ বলতে আমরা কাকে বুঝি ? যে জীবের মধ্যে সৃষ্টিকর্ত্তা মনন করবার ক্ষমতা প্রদান করেছেন, পৃথিবীতে সেই সর্ব্বোৎকৃষ্ট জীবের নাম হচ্ছে মানুষ বা মনুষ্য। মনন করা অর্থাৎ যার মধ্যে বিচারবুদ্ধি আছে, যিনি ভালো-মন্দ বিচার করতে পারেন। যিনি শুভ ও অশুভের মধ্যে প্রভেদ করতে পারেন, তিনিই মানুষ। দুই হাত দুই পা একটা মাথা ছয়ফুট লম্বা একটা রক্তমাংস হাড্ডির দেহ থাকলেই মানুষ হবে তা নাও হতে পারে। যার মধ্যে মনন করবার শক্তি বা বিচারবুদ্ধি নেই, সেই জীব যেমনই দেখতে হোক, তিনি মনুষ্যেতর প্রাণী বই কিছু নয়।
যে বিদ্যা আমাদেরকে ধারণ করে শেখায়, তাকে বলে ধ্যান। ধ্যান আর কিছুই নয়, ধ্যান হচ্ছে চিন্তায় অভিনিবিষ্ট থাকা। ধ্যৈ+অন = ধ্যান - ধ্যৈ কথাটার অর্থ চিন্তা করা বা মনন করা। এই ধ্যান একমাত্র মনুষ্য দেহেই সম্ভব। পশু পাখি ধ্যানস্থ হতে পারে না। ধ্যান মানুষকে চিত্তশুদ্ধি ক'রে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার দিকে নিয়ে যায়। এই ধ্যানাবস্থাতেই মানুষ পূর্নত্ব লাভ করে স্বরূপের জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হয়। মনুষ্য জীবনে ধ্যান হচ্ছে অধ্যাত্মজ্ঞান লাভের একমাত্র উপায়। ধ্যানস্থ না হতে পারলে, মানুষ তার ভাগবত সত্ত্বাকে উপলব্ধি করতে পারে না। ধ্যানের সময় ধ্যানী জাগতিক বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে স্বরূপে অবস্থান করে। আর এই ধ্যানের জন্য বাইরের কারুর সহায়তা প্রয়োজন পরে না। যেকোনো নিঃসঙ্গ ব্যক্তি এই ধ্যানের আস্বাদ নিতে পারেন। ধ্যান একসময় দেহাত্ম বোধকে অতিক্রম করে যায়। ধ্যান জগতের সমস্ত বস্তুকে ছবির মতো সামনে তুলে ধরে। ধ্যানস্থ ব্যক্তি সমগ্র বিশ্বকে কেবলই দৃশ্য বলে মনে করে। আর নিজে এই দৃশ্যের সাক্ষী স্বরূপ অবস্থান করে। আমরা যেমন সিনেমা দেখে আনন্দ পাই, বাচ্চাদের খেলা দেখে আনন্দ পাই, কিন্তু তার মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে ফেলি না, তেমনি ধ্যানস্থ যোগী জগতের খেলায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন না। এই হচ্ছে ধ্যানের পরিণতি। ধ্যানরত মন অধ্যাত্ম জীবনের নিকটতর সঙ্গী। একসময় ধ্যানের গভীরে মনের বিলোপ সাধন হয়। তখন জীবনের সঙ্গে জড়িত যে জড় বিষয়, সেই জড় বিষয় থেকে নিজেকে মুক্ত করে চৈতন্যময় হয়ে ওঠে জীবন। আর এই চৈতন্য হচ্ছে নিত্য, সত্য, মুক্ত, শুদ্ধ আনন্দ স্বরূপ। একেই ঋষিগণ বলছেন ব্রহ্মানন্দ বা আধ্যাত্মিক জীবন।
কিন্তু এর জন্য প্রথমে দরকার আমাদের চিত্তশুদ্ধি। চিত্তশুদ্ধির কথা আমরা পরবর্তীতে আলোচনা করবো।
-------
২৯.০৭.২০২৫
চিত্তশুদ্ধি
মনের যে শক্তি আমাদের চিন্তন করায় অর্থাৎ যার দ্বারা চিন্তা করা যায়, জানা যায়, বা জ্ঞান হয় তাকে বলে চিত্ত। চিৎ কথাটার অর্থ হচ্ছে চৈতন্য বা জ্ঞান। তো মনের এই বিষ্ময়কর শক্তি চিত্ত আমাদের জ্ঞান বুদ্ধির ধারক। আমাদের মনের মধ্যে যে চিন্তার উদ্রেগ হচ্ছে, যে জ্ঞানের উদয় হচ্ছে, তা এই চিত্তের ধর্ম্ম। তো চিত্ত যার অশুদ্ধ তার মধ্যে শুদ্ধ চিন্তন আসে না। অধ্যাত্ম জীবনে তাই চিত্ত শুদ্ধির উপরে জোর দেওয়া হয়েছে। আমরা যে কর্ম্ম করি, আমরা যে সঙ্কল্পঃ করি সবই এই চিত্ত থেকে উদ্ভূত। জগতে যত ধর্ম্মমত প্রচলিত আছে সবার গোড়ার কথাই হচ্ছে চিত্তশুদ্ধি।
শ্রীমদ্ভগবৎ গীতায় ১৮টি যোগের বিষয়ে বলা হয়েছে। এর মধ্যে কর্ম্মযোগ , জ্ঞানযোগ, ও ভক্তিযোগ প্রধান। কিন্তু এই তিন যোগের প্রাথমিক শর্তই হচ্ছে চিত্তের শুদ্ধিকরণ। কর্ম্মযোগে বলা হয়েছে নিষ্কাম কর্ম্ম করতে হবে। কিন্তু নিষ্কাম কর্ম্ম চিত্ত শুদ্ধি ব্যাতিত সম্ভব নয়। জ্ঞানযোগে বলা হয়েছে বিচারের সাহায্যে চিত্তকে শুদ্ধ করবে। আর ভক্তিযোগে বলা হয়েছে প্রেমের সাহায্যে চিত্তকে শুদ্ধ করবে। তো সমস্ত যোগের বিষয়বস্তু হলো চিত্তশুদ্ধি।
ঋষি পতঞ্জলি এই চিত্ত শুদ্ধির একটা ব্যবহারিক রূপরেখা এঁকেছেন। তাঁর মতে চিত্ত শুদ্ধির উপায় দুটো ১. যম ২.নিয়ম। (সাধনপদ -শ্লোক নং ২৯-৩২)
যম : যম বলতে অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য্য ও অপরিগ্রহ এই পাঁচ নির্দেশ । অহিংসা হচ্ছে কারুর শরীর ও মনকে আঘাত না করা। সত্য হচ্ছে কায়িক, বাচিক ও মানসিক চিন্তাধারাকে যথাযথ ভাবে বিষয়ীভূত করা। অর্থাৎ যে যেমন তাকে ঠিক তেমন ভাবেই গ্রহণ করা। অস্তেয় অর্থাৎ চুরি না করা। ব্রহ্মচর্য্য অর্থাৎ শরীর মনে বিন্দুকে রক্ষা করা, বা উপস্থের সংযম। অপরিগ্রহঃ হচ্ছে আকাশবৃত্তি অবলম্বন অর্থাৎ কারুর কাছে কিছু না চাওয়া এমনকি অপ্রয়জনে কারুর কাছ থেকে কিছু না নেওয়া।
নিয়ম : নিয়ম হচ্ছে শৌচ, সন্তোষ, তপস্যা, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বর প্রণিধান, এই পাঁচটি। শরীর মনের ময়লা দূর করে শৌচ। সন্তোষ হলো যা কিছু আছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকা। তপস্যা হচ্ছে তপঃ সাধন অর্থাৎ যে কোনো পরিস্থিতিকে সহ্য করা, নিশ্চল থাকা। স্বাধ্যায় হচ্ছে শাস্ত্রগ্রন্থের অধ্যয়ন ও তার যথাযথ অর্থ জেনে তার মনন করা।
ঈশ্বর প্রণিধান হচ্ছে, যে কোনো পরিস্থিতিতে ঈশ্বর চিন্তন, তার কাছেই সর্বতঃ ভাবে নিঃশর্ত সমর্পন। চিত্তশুদ্ধির আলোচনায় এই ঈশ্বর প্রণিধান একটা মোক্ষম উপায়।
আসলে আমাদের অশান্ত মনকে শান্ত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে এই চিত্তশুদ্ধি। অজ্ঞানের আকর্ষনে মন অশান্ত হচ্ছে। এই মনের উপরে যখন জ্ঞানের আলোক বর্ষিত হবে, তখন মন শান্ত হবে। আর জ্ঞানের আলো যাতে মনের মধ্যে যথাযথ প্রতিফলিত হতে পারে তারজন্য এই সব ক্রিয়ার অনুশীলন করতে বলা হয়েছে।
চিত্তশুদ্ধির আরো একটা ফলপ্রসূ উপায় হচ্ছে প্রার্থনা - বিশ্বশান্তির জন্য, ত্রিতাপ দুঃখের নিবারনের জন্য পরমেশ্বরের কাছে একান্তে প্রার্থনা করা। সবার জন্য প্রার্থনা করবে। সমস্ত জীবজগতের শান্তির জন্য প্রার্থনা করবে। সমস্ত বিশ্বের জন্য শান্তি প্রার্থনা করবে, এমনকি ঈশ্বরের জন্যও শান্তি প্রার্থনা করবে। তখন বিশ্বশক্তি আমার এই শান্তি প্রার্থনা প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসবে জগৎ শান্তিধ্বনিতে মুখরিত হবে।
আমাদের যজুর্বেদে একটা সুন্দর শান্তি মন্ত্র আছে (যজু-৩৬/১৭)
বনস্পতঃ শান্তিঃ // বিশ্বে দেবাঃ শান্তিঃ // ব্রহ্ম শান্তিঃ
সর্বং শান্তিঃ // শান্তিরেব শান্তিঃ// সা মা শান্তিরেধি।"

Comments
Post a Comment