সত্যধর্ম্ম ও প্রেম


সত্যধর্ম্ম ও প্রেম (১) 
 বৃহৎ আরণ্যক উপনিষদ - ভগবান কেন স্বামী স্ত্রী সৃষ্টি করলেন ?
বৃহদারণ্যক - এর প্রথম অধ্যায়ের চতুর্থ ব্রাহ্মনে বলা হচ্ছে শরীর ইত্যাদি সৃষ্টির পূর্বে বিভিন্ন দেহ সমষ্টিরূপ এই জগৎ হস্ত পদাদি যুক্ত পুরুষাকার  প্রথম জাত  বিরাট পুরুষ রূপেই ছিল. অর্থাৎ পৃথক পৃথক আত্ম-অভিমানী প্রাণীবর্গ তখনও সৃষ্টি হয়নি। সেই বিরাট পুরুষ ভাবতে লাগলেন, এবং উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন, আমি কে ? আমার স্বরূপ কি ? কিন্তু দেহ-ইন্দ্রিয় সমষ্টিরূপ আপনা থেকে তিনি ভিন্ন কিছু দেখতে পেলেন না. অর্থাৎ নিজেকে ছাড়া কাউকেই তিনি দেখতে পেলেন না।  তখন তিনি "অহম অস্মি সঃ" আমি হই সেই, এই কথা উচ্চারণ করলেন । যেহেতু তিনি পূর্ব সংস্কার অনুযায়ী নিজেকে "আমি" বলে নির্দেশ করলেন, সেই কারনে তিনি "আমি" এই নামধারী  হলেন। আজও  আমরা সবাই এই "আমি" হয়েই প্রকাশিত হচ্ছি। আমরা সবাই আমি।   

কয়েকদিন আগে একটা উপাসনার আসরে গিয়েছিলাম। সত্যধর্ম্মের উপাসনা। বলা হয়, আজ থেকে দেড়শত বছর  আগে, এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত শ্রী গুরুনাথ সেনগুপ্ত মহাশয় পারলৌকিক আত্মাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত হয়ে এই ধর্ম্মমত  প্রচার করেছিলেন। যদিও এই ধর্ম্মমত  ব্রাহ্মণদের কাছে খুব একটা গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়নি, বিষ্ণুভক্তদের কাছেও মান্যতা পায়নি । লক্ষ করেছি, এই ধর্ম্মমতের বাহক হচ্ছেন, মূলত নমঃশুদ্র সম্প্রদায়।   এই ধর্ম্মমতে পরমপিতার  গুন্ সাধনের প্রতি অধিক গুরুত্ত্ব প্রদান করা হয়েছে। এই গুনগুলোর মধ্যে একাগ্রতা, ভক্তি ও প্রেমের সাধনার কথা বলা হয়েছে। আমার মধ্যে একটা ধারণা  ছিল, প্রেমের সাধনা করে থাকেন কেবলমাত্র বাউল সাধকগন। এই বাউল সাধকগণ প্রেমের নাম করে নানান গুহ্য সাধনা করে থাকেন, যা সাধারনের কাছে প্রকাশযোগ্য নয়। কেবলমাত্র যারা এই পথের  পথিক তারাই এই গুহ্য সাধনতত্ত্ব জানতে পারেন।  এই সাধনা সাধারনের জন্য নয়। কিন্তু সত্যধর্ম্মে সবার জন্য প্রেম সাধনার কথা বলা হয়েছে। এই ধর্ম্ম মত যে খুব বেশি লোকের কাছে পৌঁছেছে তা নয়।   শ্রী গুরুনাথ সেনগুপ্ত মহাশয় বলছেন, "প্রেমময়ের রাজ্যে যত কিছু গুন্ আছে, তন্মধ্যে প্রেম সর্ব্বপ্রকারে সর্ব্বাংশে সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।"

কিন্তু আমাদের মতো সাধারনের মধ্যে একটা ধারণা  আছে, প্রেমে পড়েছো কি মরেছো।  তোমার দ্বারা আর সাধনভজন কিছুই হবে না। আসলে  আমরা প্রেম আর কামনার মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখি না। কামনা থেকেই  প্রেমের উৎপত্তি। তো সাধন জগতে ঋষিপুরুষের নির্দেশ হলো আগে কামনা -বাসনার  নিষ্পত্তি করো, তবে তুমি সাধন জগতে প্রবেশের অধিকারী হবে। আগে ১২ বৎসর ব্রহ্মচর্য পালন করো। তারপরে তোমাকে সন্যাস দেওয়া হবে।  তার আগে নয়। 

একজন  যুবক পার্থিব প্রেমে প্রত্যাক্ষিত হয়ে এক আজন্ম ব্রহ্মচারীর কাছে এসে তাঁকে বললো, আমি সন্যাস নেবো, আমি ভগবানের সাধনা করবো, আমি ভগবানকে পেতে চাই। তো ব্রহ্মচারী বললেন, তুমি কি কখনো কাউকে ভালোবেসেছো ? যুবকটি মিথ্যে করে বললো, আমি কখনো কাউকে ভালোবাসিনি। আমি এই ঝামেলার মধ্যে যেতে চাই না।  আমি ভগবানকে খুঁজছি। তো ব্রহ্মচারী আবার বললো, তুমি সত্যি কাউকে কখনো ভালোবাসোনি ? যুবক আবার বললো, আমি আপনাকে সত্যি কথাই বলছি।  যুবকটি আসলে সত্যি কথা বলেনি।  সে এক যুবতীকে ভালোবেসেছিলো, কিন্তু সেখান থেকে আঘাত পেয়ে বেরিয়ে এসে এখন সন্যাস নিতে চাইছে। আসলে এই যুবকটি শুনেছে, ধর্ম্মের জগতে, সাধন জগতে  ভালোবাসা অপরাধ। ধর্ম্মের জগতে ভালোবাসা অযোগ্যতা।  তাই সে মিথ্যে মিথ্যে বলেছিলো, যে সে কাউকে কখনো ভালোবাসেনি। আসলে এ জগতে এমন কেউ নেই, যে জীবনে কোনোদিন কাউকে ভালো বাসেনি। ব্রহ্মচারী সন্যাসী আবার জিজ্ঞেস করলো, ঠিক করে বলো, কাউকেই কোনোদিন এতটুকুও  ভালোবাসোনি ? যুবকটি এবার বললো, আপনি কেন বারবার একই কথা আমাকে জিজ্ঞেস করছেন ? আমি ওই ভালোবাসাকে ঘৃণা করি। আমি সবসময় ভগবানের খোঁজ করছি। জোর দিয়ে কথাটা যুবক বললো বটে, কিন্তু  মনে মনে ভাবতে লাগলো, ব্রহ্মচারী সন্যাসী কি আমার ভালোবাসার কথা জেনে গেছে ? 

কেননা সে শুনেছে সন্যাসীরা অন্যের মনের কথা আগে থেকে জানতে পারে। যাই হোক এবার সে চুপ রইলো।  কিন্তু ব্রহ্মচারী বললো, তুমি অন্য কোথাও যাও। আগে ভালোবাসা শেখো। তুমি যদি সত্যিই কোনোদিন কাউকে না ভালোবেসে থাকো, তবে তুমি কোনোদিন ভগবানের নাগাল পাবে না। দেখো যার  মধ্যে ভালোবাসা জাগেনি, যার ভালোবাসার কোনো অভিজ্ঞতা নেই, তার দ্বারা ভগবানের কাছে পৌঁছনো সম্ভব নয়। কেননা ভগবানের কাছে পৌঁছতে গেলে, ভালোবাসার সিঁড়ি দিয়েই সেখানে যেতে হয়।  তুমি তো ভালোই বাসোনি  কোনোদিন, কাউকে। যদি তোমার মধ্যে ভালোবাসার কোনো বীজ না থাকে, তবে গাছ কিভাবে হবে ? তুমি অন্য কোথাও যাও। আমাকে বিরক্ত করো না। ভালোবাসা হচ্ছে অংকুর যার থেকে প্রেমের উৎপত্তি হতে পরে। জাগতিক ভালোবাসা থেকেই নৈসর্গিক প্রেমের জন্ম হতে পরে। ভগবান একমাত্র ভালোবাসা দ্বারাই পাওয়া যায়। প্রেমহীনের কাছে ভগবানের কোনো অস্তিত্ত্ব নেই। 

এই সত্যধর্ম্মে আর একটা ব্যাপারকে খুব গুরুত্ত্ব দেওয়া হয়, আর তা হচ্ছে পাপ। সত্যধর্ম্মে দীক্ষিত করবার সময় দীক্ষার্থীকে তার পূর্বকৃত পাপের  স্বীকার করতে হয়। আমরা স্বামী বিবেকানন্দের কাছে শুনেছি, যে নিজেকে পাপী  মনে করে, সে-ই পাপী হয়ে যায়।  আমরা সবাই ঈশ্বরের সন্তান, আমাদের আবার পাপ কিসের ? কিন্তু সত্য ধর্ম্ম মনে করে, জগতের সবাই কিছু না কিছু পাপ করবার ক্ষমতা রাখে, বা জ্ঞাতসারে হোক বা অজ্ঞাতসারে হোক, সে কিছু না কিছু পাপ অবশ্যই  করেছে। নিষ্পাপ কোনো মানুষ নেই।  একবার নাকি, এই  মহাত্মা গুরুনাথের কাছে, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এক যুবক এসেছিলেন, দীক্ষা নেবার জন্য, তো তাকে যখন বলা হয়, তুমি তোমার পাপের  কথা মনে মনে উচ্চারণ করো। তখন  যুবক বললো, আমি জ্ঞানত কোনো পাপ করিনি। এতে করে মহাত্মা গুরুনাথ বিরক্ত হয়ে তাকে দীক্ষা দিতে অস্বীকার করেন। 

আসলে প্রেম যেমন আমাদের জন্মগত অধিকার, তেমনি পাপও আমাদের জন্মগত অধিকার। সত্য ধর্ম্মের উদ্দেশ্য হচ্ছে এই পাপের নিস্পত্তি আর প্রেমের উৎপত্তি। আমাদের মধ্যে পাপ ও প্রেমের বীজ রয়েছে। আমাদের উচিত প্রেমের বীজকে অঙ্কুরিত হতে সাহায্য করা, আর পাপের  বীজকে ধংস করা। কিন্তু আধুনিক জগতে প্রেম ও পাপ যেন সমার্থক হয়ে গেছে।  আমরা প্রেমকেও পাপ বলেই মনে করি।  আসলে মানুষের জীবনে যা কিছু স্বাভাবিক, তা আমরা অনুভব করতে পারি, কিন্তু প্রকাশ করতে পারি  না। প্রেমের নিবিড় সম্পর্কে জীবন সুখময় হয়ে উঠতে পারে, তাই  হাজার বছর ধরে আমরা শুধু প্রেমের কথা বলে এসেছি, প্রেমের গান গেয়ে চলেছি।  কিন্তু সত্য হচ্ছে, সমাজের দিকে তাকালে  দেখবেন, প্রেম বলে আমাদের জীবনে কিছু নেই।  প্রেমের সমস্ত ধারাকে আমরা রুদ্ধ করে দিয়েছি। আর পাপকে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে এসেছি। যে ধর্ম্ম আমাদেরকে প্রেমের কথা বলে এসেছে যুগ যুগ ধরে, তা সে এই দেশে বলুন আর বিদেশে বলুন, সেই প্রেমকে আমরা পাপে পরিণত করেছি।  প্রেমে পড়েছো কি মরেছ, তোমার ইহকাল-পরকাল ঝরঝরে হয়ে গেছে। তাই যারা ধর্ম্ম পথে আসতে চায়, তারা পাপের মতো প্রেমকেও  লুকিয়ে রাখতে চায়। 

দেখুন, পাহাড় থেকে ঝর্ণা নেমে আসে। গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গা নেমে আসে, যমুনোত্রী থেকে যমুনা নেমে আসে। সে জানে সে কোথায় যাবে। সে জানে তার গতি সমুদ্রমূখী। সে জানে তাকে সমুদ্রেই যেতে হবে।  কিন্তু সে কখনো কাউকে এমনকি পুলিশকেও জিজ্ঞেস করে না, সমুদ্র কোথায় ? আসলে সমুদ্রের খোঁজ তার অন্তরেই প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে। সারা পৃথিবীতে  প্রাণের শক্তি বয়ে চলেছে । আমাদের শরীরের মধ্যেও  আছে সেই  প্রাণের শক্তি। এই শক্তিই পাহাড  ভেঙে জঙ্গলভূমি পার  হয়ে, সমতলভূমি পার হয়ে, একদিন সে সমুদ্রেই পৌঁছে যাবে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে মানুষ কাজ হচ্ছে এই নদীকে  আটকে দেওয়া।  মানুষের কাজ হচ্ছে এই নদীর গতিপথ রুদ্ধ করে দেওয়া, বাঁধ দেওয়া। তাই গঙ্গা তার গতিমুখ  বদলায়। বারবার সে সমুদ্রের অভিমুখে যেতে চেষ্টা করে, আর মানুষ তার সর্ব্বশক্তি দিয়ে তাকে বাধা দিতে থাকে। আর আমরা একেই বলি ধর্ম্ম - যা মানুষকে তার স্বাভাবিক, প্রকৃতি দত্ত ক্ষমতা রুদ্ধ করে সামনে এসে দাঁড়ায়। এটা করো না সেটা করো না। প্রেম করো না। ব্রহ্মচর্য পালন করো। ইন্দ্রিয়গুলোকে দমন করো। কিন্তু এতে করে দমন তো হয়ই না, বরং নদী তার সর্ব্বশক্তি প্রয়োগ করে রাস্তা করে নেয় - ধংস করে দেয় লোকালয়। 

চাষী  জমিতে বীজ  ছড়িয়ে দিয়ে, উপরে মোই দিয়ে দেয়, আসলে বীজের উপরে মাটি চাপা দেবার জন্য। আসলে বীজের উপরে এই যে মাটি, তা বীজকে  অংকুরিত হতে সাহায্য করে থাকে। পৃথিবীর  কোলে সে অংকুরিত হয়, আর সূর্য তাকে টেনে তোলে। গাছের জন্ম হয়। বাইরে থেকে আমরা কিছুই বুঝতে পারি  না। প্রকৃতির মধ্যে একটা সমন্বয়ের  খেলা আছে, একটা সাম্যের খেলা আছে, একজন আরেকজনকে সাহায্য করে। কিন্তু মানুষ একজনের সঙ্গে আরেকজনকে লড়িয়ে দেয়। এটাই মানুষের ধর্ম্ম। 

কোনো মানুষের মধ্যে প্রেমের ফুল না ফুটলে, আমরা তাকে দোষ দিতে পারি । কিন্তু সত্য হচ্ছে, প্রেমের অংকুর তো সবার মধ্যেই ছিল, তাকে আমরা জল-বাতাস-সূর্য থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছি  রেখেছি।  আমরা আড়াল  করেছি। নদীর  জন্ম যেমন এগিয়ে যাবার জন্য, মানুষের জন্মও এগিয়ে যাবার জন্য। নদীর  জন্ম সমুদ্রে এগিয়ে যাবার জন্য, যেটা তার উৎস, যেখান থেকে সে এসেছে। সমুদ্র থেকে মেঘ, মেঘ থেকে বৃষ্টি, বৃষ্টি থেকে জল, জল থেকে নদী, নদী থেকে সমুদ্র। এই হচ্ছে স্বাভাবিক গতিপথ, এই গতিপথেই জলের ধারা বইছে।  তেমনি পরমাত্মা থেকে এই জীবকুলের  সৃষ্টি হয়েছে। আবার এই জীবকুলের গতি পরমাত্মাতেই নিঃশেষিত হবে। এই গতিপথে আপনি যত বাঁধ সৃষ্টি করবেন, তত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। সমাজে যে  উশৃঙ্খখলা তার কারন হচ্ছে এই বাঁধ। 

মহাত্মা গুরুনাথ বলছেন, প্রেমের অংকুর হচ্ছে ভালোবাসা। ভালোবাসার উন্নত পরিণতি হচ্ছে প্রেম। এখন এই ভালোবাসা কাকে বলে ? ভালোবাসা আসলে কামনা বা মোহ ছাড়া আর কিছু নয়। আর এই কামনাকে, মোহকে তথাকথিত সমস্ত ধর্ম্ম বারবার ত্যাগ করতে বলছে। একটু চিন্তা করলে বুঝতে  পারবেন, কয়লা থেকেই হীরের জন্ম হতে পারে। হিরে ও কয়লার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কয়লার মধ্যেই লুকিয়ে আছে হীরের গুন্।  আবার হীরের মধ্যেই আছে কয়লার তত্ত্ব। কয়লাকে আমরা দূরে সরিয়ে রাখি, কয়লার ময়লা আমাদের চোখে পড়ে, কিন্তু কয়লার মধ্যেই যে হীরের গুন্ লুকিয়ে আছে, তা আমাদের নজরে পড়ে  না। কয়লায় একসময় রূপান্তরিত হয় হিরেতে। ভালোবাসা একসময় রূপান্তরিত হয় প্রেমে। কামনাই  প্রেমের শক্তি। কিন্তু আমরা এই কামনার বিরোধিতা করি, তাই  আমাদের মধ্যে প্রেমের জন্ম হতে পারে নি। এখন কয়লাকে হিরেতে পরিবর্তন করবার জন্য দরকার পরিবেশ, দরকার অপেক্ষা। কয়লাকে জল দিয়ে ধুয়ে ফেললে  হিরে পাওয়া যাবে না। অপেক্ষা করতে হবে।  হাজার বছর ধরে অপেক্ষা করতে হবে, তবে কয়লা থেকে হিরের জন্ম হবে। ঈশ্বরের কামনা থেকেই  এই জগৎ ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি হয়েছে।  সুতরাং  এই কামনাকে  উপেক্ষা করলে, জগতের সন্ধান পাওয়া যাবে না, প্রেমেরও সন্ধান পাওয়া যাবে না। আমরা স্ত্রীকে ভালোবাসি, আমরা আমাদের ছেলে-মেয়েদের ভালোবাসি, তার কারন হচ্ছে এরা সবাই আমাদের কামনার ধন।

সত্যধর্ম্মের অনুষ্ঠানের শেষে ছোটরা বড়দেরকে  প্রণাম করে, বড়রা সবাই সবাইকে কোলাকুলি করে। সত্যধর্ম্মের অনুরাগীদের মধ্যে একটা ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আছে। এরা  হয়তো সবাই সবাইকে ভালোবাসে। এই জিনিসটা আমি অন্য ধর্ম্মসাম্প্রদায়ের মধ্যেও দেখছি, গুরুভাইদের মধ্যে একটা ভালোবাসার সন্মন্ধ গড়ে ওঠে। এই ভালোবাসায় মানুষকে প্রেমের পথের  সন্ধান দিতে পারে। যাদের জীবনে ভালোবাসা নেই, তাদের জীবন দুঃখপূর্ণ।  

শিশুদের শৈশব থেকেই ভালোবাসার শিক্ষা দেওয়া উচিত। আমরা ভাবি ভালোবাসা হয়তো তাকে বিপথে নিয়ে যাবে। আমরা ছেলে-মেয়ের মধ্যে মেলামেশা দেখলে, ভালোবাসা দেখলে, আমরা আশঙ্কায় ভুগতে থাকি। আবার আমরাই এই ভালোবাসার কাঙাল। কে না ভালোবাসার কাঙাল, শুধু মানুষ নয়, জীব জন্তু সবাই ভালোবাসার কাঙাল। ঘৃণা মানুষকে তৃপ্তি দিতে পারে না। ঘৃণা মানুষকে ভেঙেচুরে ধংশ  করে দেয় । প্রেম মানুষকে বাঁচতে উৎসাহ যোগায়।  প্রেম মানুষের শরীরে একটা তৃপ্তির রস সৃষ্টি করে।  যা পান করে মানুষ আনন্দে অভিভূত হয়ে যায়। প্রেম মানুষকে সৃষ্টির উৎসাহ দেয়। প্রেম মানুষকে সৃজন শক্তি জোগায়। প্রেমের পাথেই  ব্যাক্তিত্ত্বের বিকাশ ঘটতে পারে। 

সত্যধর্ম্মে দীক্ষা দানের সময় দীক্ষার্থীর করযুগল  দীক্ষাদাতার করযুগলে ধারণ করে প্রেম ভক্তি ও শ্রদ্ধা সহকারে দীক্ষাদাতা বলেন, "হে অসীম, অনন্ত গুণময়  প্রভু দয়াময় পিতা, আজ আমার সহদর প্রতিম "অমুক" তোমার পথাবলম্বী হতে ব্যাকুল হয়েছে, একে তোমার চরণতলে সমর্পন করলাম।" খেয়াল করুন, দেহধারী কেউ দায়িত্ব নিলেন না,, বরং দেহধারী অগ্রজ সেই পরমপিতার কাছেই দায়িত্ব সপে দিলেন। অদ্ভুত এই সত্যধর্ম্ম যার প্রচার -প্রসার খুবই ক্ষীণ। আমার মাঝে মধ্যে মনে হয়, ভারতবর্ষের  কতো অমূল্য সম্পদ আজও এই ভূমিপুত্রদের দ্বারা সংরক্ষণ করা হচ্ছে।   

ওম শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।  হরি ওম।             

সত্যধর্ম্ম ও  প্রেম সাধনা  (২) 

জগতে যতপ্রকার সাধনার কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে প্রেম সাধনা সর্ব্বোত্তম। কিন্তু প্রেমের আবার সাধন হয় নাকি ? প্রেম তো এমনি এমনি হয়। প্রেম আবার কাউকে শেখানো যায় নাকি। নাকি প্রেম করতে বললেই কেউ প্রেম করতে পারে ? মহাত্মা গুরুনাথ সেনগুপ্ত মহাশয় বলছেন, অবশ্যই  হয়। প্রেম সাধনারও অনুশীলনী আছে।  সমস্ত গুনের যেমন বৃদ্ধি বা হ্রাস হতে পারে, তেমনি প্রেম সাধনায়, প্রেমের বৃদ্ধি  হতে পারে। আসলে প্রেম সমস্ত জীবের  হৃদয়ে স্থিত ধন। পরমাত্মার এই  প্রেমগুণ সবার মধ্যেই আছে। এই গুন্ হৃদয়ে বীজ আকারে স্থিত আছে।  এই বীজ থেকে যখন অংকুর উদ্গমন হয়, তখন তাকে ভালোবাসা বলি। এই ভালোবাসা অর্থাৎ অংকুর একসময় মহীরুহে পরিণত  হতে পরে। এই মহীরুহকেই  প্রেম  নামে আখ্যা দেওয়া হয়। বলা হয়, প্রেম কাউকে শেখানো যায় না। প্রেম হয়। কিন্তু গুরুনাথ সেনগুপ্ত  মহাশয় বলছেন, প্রেমের অনুশীলনে প্রেমের বৃদ্ধি হতে পারে। এই আলোচনার শুরুতে একটা গল্প  বলি। 

এক ফকির তার তার স্ত্রীকে নিয়ে  ছোট্ট কুটিরের মধ্যে শুয়ে আছে।  বাইরে ঝড়বৃষ্টি চলছে। মধ্যরাত্রি, হঠাৎ কুটিরের দরজায় আঘাতের শব্দ শোনা গেলো।  স্বামী স্ত্রীকে বললেন, দেখো বাইরে কোনো অপরিচিত বন্ধু এসেছেন, হয়তো আশ্রয় খুঁজছেন। দরজা খুলে দাও। তো স্ত্রী বলছেন, মাথা খারাপ হয়েছে তোমার, এই গভীর রাতে কোনো ভালো লোক ঘোরা  ফেরা করতে  পারে ? নিশ্চই চোর ডাকাত হবে। স্বামী বললেন, হোক না চোর-ডাকাত, সে আমাদের ঘরে এসেছে, তাকে ডেকে ভিতরে নিয়ে এসো। দুর্যোগের রাতে নিশ্চয় আশ্রয় খুঁজছে। ভাবুন, দুজনের মধ্যে চিন্তার ফারাক, একজন ভাবছে চোর, একজন ভাবছে আশ্রয়প্রার্থী। একজন ভাবছে শত্রু, একজন ভাবছে বন্ধু।  আবার অপরিচিত বন্ধু।  পরিচিত মানুষও আমাদের বন্ধু হতে পারে না। আর ফকির  বলছেন, "অপরিচিত বন্ধু" . যাইহোক, পত্নী বললো, ঘরে তো জায়গা কম।  আমাদের দুজনের জন্যই  অকুলান। এখানে অন্যলোক এলে আমরা শোবো কোথায় ? ফকির স্বামী বললেন, দেখো জায়গার অভাব তো অট্টালিকাতেই  হতে পারে, কুটিরে আবার জায়গার  অভাব কোথায় ? একটা  বেড়া ঘুলে দাও। মনের একটা দ্বার খুলে দাও, জায়গা হয়ে যাবে। অট্টালিকার দেওয়াল বড্ড কঠিন, খোলা যায় না, তাই সেখানে জায়গার অভাব হয়, কুটিরের বেড়া খুলতে সময় লাগে না, তাই সেখানে জায়গারও  অভাব হয় না।  পত্নী বললো, এখানে গরিব-বড়োলোকের কথা আসছে কেন ? জায়গা কম তাই বলছিলাম। ফকির বললো, যাদের হৃদয় বড়ো তাদের কাছে কুঁড়েঘর বড়ো  হয়ে যায়, আর যাদের হৃদয় ছোট, তাদের কাছে অট্টালিকাও ছোট বলে মনে হয় । দরজা খুলে দাও, বন্ধুকে জায়গা করে দাও, আশ্রয়প্রার্থীকে আশ্রয়  দাও। এতক্ষন আমরা দুজনে শুয়ে ছিলাম, এখন হয়তো আমরা আর শুতে পারবো না, কিন্তু বসে তো থাকতে পারবো। বাইরে বড্ড দুর্য্যগ।  ঝড়বৃষ্টির রাত বন্ধুকে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করতে দাও, দরজা খুলে দাও। বসার জন্য এখনও অনেক জায়গা আছে। যাইহোক, পত্নী নিমরাজি হয়ে, দরজা খুলে দিলো। অজানা বন্ধু অপরিচিত বন্ধু ভিতরে প্রবেশ করলো। অজানা বন্ধুর সারা শরীর বৃষ্টির জলে ভিজে গেছে। কোনো রকমে, হাত-পা-মাথা মুছে, কুটিরের মধ্যে আশ্রয় নিলো। দরজা আবার বন্ধ করে দেওয়া হলো। 

ক্ষাণিক্ষণ পরেই, আবার দরজায় আঘাতের শব্দ শোনা গেলো। নবাগত বন্ধুটি দরজার কাছেই  বসে ছিল।  ফকির   নবাগত বন্ধুকে দরজা খুলে দিতে বললো।  নবাগত বন্ধুটি বললো, এখানে জায়গা কোথায়, দরজা খুললেই বৃষ্টির ঝাপসা আসছে, দরজা খোলার দরকার নেই। আমরা তিনজনে কোনো রকমে বসে আছি, এখানে আর জায়গা কোথায় ? ফকির এবার হেসে উঠলো, বললো, তুমি দেখছি আস্ত পাগল। যে তোমাকে জায়গা দিয়েছে, সে এখনো আছে। তুমি ঘরের ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে সে চলে যায়নি। সে এখনো আছে। যে প্রেম তোমাকে আমার কাছে নিয়ে এসেছে, সেই প্রেম এখনো আছে, তুমি দরজা খুলে দাও। যাইহোক, ফকিরের কথায় দরজা খুলতেই হলো, কিন্তু এবার একজন নয়, দু জন। এবার ওরা  পাঁচজন হয়ে গেলো । পাশাপাশি গা ঘেষাঘেষি করে বসতে  বাধ্য হলো। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, যত  বেশি লোক ঘরে প্রবেশ করলো, তত তাদের বেশ গরম বোধ হতে লাগলো।  আর শীতের হাত থেকে রেহাই পেলো। মানুষের হৃদয় যখন প্রেমপূর্ণ হয়, মানুষের মধ্যে যখন ভালোবাসার জন্ম হয়, তখন একটা নতুন মানুষের আবির্ভাব হয়। এই নতুন মানুষ তখন উষ্ণতা অনুভব করতে থাকে, একটা তৃপ্তির রস অনুভব করতে থাকে। আর এই তৃপ্তির রস তাকে শান্তির অনুভব এনে দেয়। প্রেম ও ধ্যান - দুইয়ে মিলে পরমাত্মার দরজা খুলে দেয়। 

মানব মনে অজস্র ভাব।  এই যে ভাব এগুলো  আমাদের মনে অহর্ণিশি সমুদ্র তরঙ্গের মতো উত্থিত হচ্ছে আবার লয়প্রাপ্ত হচ্ছে। রাগ, ভয়, দ্বেষ, ঘৃণা, যেমন একটা ভাব, তেমনি প্রেম-ভালোবাসাও একটা ভাব। এই ভাবই মানুষকে নিকৃষ্ট বা উৎকৃষ্ট করে থাকে ।  এই ভাবের ফলেই মানুষ অমানুষ হয়, এই ভাবের ফলেই মানুষ মহামানব হয়। এই ভাবই মানুষকে দুঃখ-কষ্ট দেয়, এই ভাবই মানুষকে আনন্দ দেয়। ভয় যেমন মানুষকে কষ্ট দেয় তেমনি প্রেম মানুষকে আনন্দ এনে দিতে পারে।  আমাদের আলোচ্য বিষয় প্রেম। প্রেমের মধ্যে আবার অনেকগুলো ভাগ  আছে। 

এইসব  ভাবের মধ্যে যে ভাবগুলো চিরন্তন তাকে স্থায়ীপ্রেম  ভাব বলে।  এই স্থায়ীভাবের  কখনো বিনাশ নেই। এই স্থায়ী ভাবগুলোকে বৈষ্ণব শাস্ত্রে, আট  ভাগে ভাগ করা হয়েছে।  এগুলো হচ্ছে রতি, হাস, শোক, ক্রোধ, উৎসাহ, ভয়. ঘৃণা বা নিন্দা,, ও বিস্ময়। এরা  আমাদের মনের মধ্যে  সংস্কার রূপে বিদ্যমান। এই আটটি ভাব থেকে আমাদের শরীরে বিভিন্ন ধরনের রস নিঃসৃত হতে থাকে। এই আটটি রস হচ্ছে : 

রতি থেকে  শৃঙ্গার,   হাস থেকে হাসি, শোক থেকে করুন,  ক্রোধ থেকে তেজ, উৎসাহ- থেকে ধীরতা , ভয় থেকে - ভয়ানক, জুগুপ্সা  থেকে  বীভৎস,  ও বিস্ময় থেকে অদ্ভুত  রসের নিঃসরণ হয়ে থাকে । এই যে রতি, এটি জৈবিক হতে পারে, আবার নৈসর্গিক বা ঐশ্বরিক হতে পারে। এই রতিকে আবার পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য, মধুর। 

শান্তরস : এই শান্তরসে,  সাধকের মন প্রশান্ত, স্থির, হয়ে যায়।  এইসময় তার চিত্তের বিক্ষুব্ধ ভাব তিরোহিত হয়, কামনা বাসনা বিলুপ্ত হয়। এই শান্ত রসে জাগতিক কামনা বাসনা না থাকলেও মুক্তির কামনা বর্তমান থাকে। এখানে নিষ্ঠা ও ত্যাগ দুই বর্তমান থাকে। 

দাস্যরস : দাস্য রসে সেবার ভাব দেখা যায়। তুমি প্রভু আমি দাস। আমি ছোট, তুমি বড়ো। বলা হয়, রামায়নের  হনূমান, মহাভারতের বিদুর,  শ্রীমৎ ভাগবতের উদ্ধব, এই দাস্যভাবে ভগবানের আরাধনা করেছেন। এখানে দুটো লক্ষণ প্রকাশ পায়, আর তা হচ্ছে সেবা ও নিষ্ঠা। 

সখ্যরস : সাধক এখানে ভগবানকে সখা  বা বন্ধুভাবে দেখেন। এখানে বিশ্বাস, সেবা, নিষ্ঠা উভয়ে উভয়ের প্রতি প্রদর্শন করে থাকেন। এখানে পরস্পরের প্রতি নিঃসংকোচ বিশ্বাস বজায় থাকে। মহাভারতের অর্জ্জুন, শ্রীমৎ ভাগবতে শ্রীদাম, সুদামাপ্রভৃতি এই সখ্যরসের উদাহরণ। সখ্যরসের তিনটি লক্ষণ বিশ্বাস, সেবা, নিষ্ঠা। 

বাৎসল্যরস : এখানে সাধকের সাথে ভগবানের সম্পর্ক হচ্ছে পাল্য ও পালক। ভগবান এখানে সন্তান, আর সাধক হচ্ছেন, মাতা বা পিতা। এখানে মমতার আধিক্য বর্ত্তমান থাকে। বাৎসল্য রসে চারটি লক্ষণ মমত্ত্ববোধ, বিশ্বাস, সেবা, নিষ্ঠা। 

মধুররস : এই মধুর রসে আপ্লুত  ভক্ত ভগবানের নিকট পরিপূর্ন আত্মসমর্পন করে থাকেন । দেহ, গেহ, পরিজন সবার কথা ভুলে, ভগবানে আত্মসমর্পন করা হয়। ভক্ত এখানে প্রকৃতি, ভগবান পুরুষ। শান্তরসের নিষ্ঠা, দাস্য রসের সেবা,  সখ্যরসের বিস্রম্ভ, বাৎসল্যের লালন,  ও মাধুরের কান্ত এই পাঁচটি ভাবের মিলনে মধুররসের উৎপন্ন হয়। 

এই মধুর রসের রতি আবার তিন প্রকার সাধারণী, সমঞ্জস্য, ও সমর্থা। রূপ লাবণ্য দেখে যে সঙ্গলাভেচ্ছা অর্থাৎ ইন্দ্রিয়বৃত্তি চরিতার্থ করবার জন্য, যে রতি হৃদয়ে জাগ্রত হয়, তাকে বলে সাধারণী।  এবার শাস্ত্রসম্মত ভাবে প্রীতির /পরিণয়  বাঁধনে দ্বারা পারস্পরিক সঙ্গসুখ লাভের  বাসনা হতে যে রতির উদ্ভব, তাকে বলে সমঞ্জস্য। সবশেষে যিনি নিজের পরিবর্তে প্রেমাস্পদের তৃপ্তি সাধন যার লক্ষ্য তাকে তা সমর্থা।      

মহাত্মাগুরুনাথ সেনগুপ্ত তাঁর সত্যধৰ্ম্ম গ্রন্থে বলছেন,  আমদের সবার মধ্যে আত্মার গুন্ ভিন্ন ভিন্ন পরিমানে আছে। যদিও মিলিত ভাবে প্রত্যেক আত্মার গুন্ সমষ্টি অন্য আত্মাদের সমানই হয়ে থাকে। অর্থাৎ প্রত্যেক আত্মায় গুনের পরিমান সমান হলেও, ভিন্ন ভিন্ন গুন্ ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় অবস্থান করছে। গুন্গুলোকে যদি বোঝার সুবিধের জন্য আমরা দুই ভাগে ভাগ করি, অর্থাৎ ভালো ও মন্দে ভাগ করি, তবে কারুর মধ্যে ভালো গুনের মাত্রা বেশি আবার কারুর মধ্যে মন্দ গুনের মাত্রা বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু মোট গুনের পরিমান সবার মধ্যেই এক। এখন মোট গুনের পরিমান সবার মধ্যে একই।  তাই কোনো একটা গুনের বৃদ্ধি  হলে অন্য কোনো না কোনো গুনের মাত্রা কমতে বাধ্য। আপনার মধ্যে সাহসের মাত্রা বেড়ে যায়, তবে ভয়ের মাত্রা কমতে এথাকবে। আপনার মধ্যে যদি প্রেমের মাত্রা বেড়ে যায়, তবে রাগ-দ্বেষ, ঘৃণার মাত্রা কমতে থাকবে।  অর্থাৎ  ভালো-গুনের মাত্রা যদি বৃদ্ধি পায়  তবে খারাপ গুনের পরিমান হ্রাস পাবে।  আবার খারাপ গুনের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে, ভালো গুনের পরিমান হ্রাস হবে।

মহাত্মা গুরুনাথ সেনগুপ্ত বলছেন, যে সব আত্মার গুনের পরিমান অন্যদের গুনের পরিমানের সঙ্গে অধিক নিকটস্থ তাদের প্রবৃত্তি, উদ্দেশ্য, কাজের ধরন, বাসনা,  রীতিনীতি ইত্যাদিও সমান হয়ে থাকে। এবং দেখা গেছে, এঁরা অর্থাৎ সম মানসিকতার  মানুষেরা সহজেই প্রেম সূত্রে গ্রথিত হতে পারে। এদের মধ্যে যদি কখনও  হঠাৎ দেখা হয়, তাহলেও এরা পরস্পরকে ভালোবেসে ফেলে। আবার যাদের মধ্যে মানসিকতার ফারাক থাকে, তাদের মধ্যে পরস্পরের সাক্ষাৎ বৈরী ভাবের সূচনা করে থাকে। এই জিনিষটা আমাদের সবার মধ্যেই অনুভব হয়ে থাকবে। কাউকে কাউকে হঠাৎ দেখাতেই আপনজন বলে মনে হয়। এর কারন হচ্ছে, দুজনের মধ্যে যে প্রেম গুনের সমাহার তা সম-মাত্রায় না থাকলেও অবশ্যই কাছাকাছি মাত্রায় রয়েছে।  তাই তারা পরষ্পর দ্রুত কাছাকাছি আসতে পারে। এই গুন্ সামঞ্জস্য একটা চুম্বকীয় শক্তির মতো কাজ করে থাকে। 

মহাত্মা গুরুনাথ এই ব্যাপারটা একটা সুন্দর উদাহরনের সাহায্যে বুঝিয়েছেন। বলছেন, কোনো বীজ যখন অনুকূল  ভূমি, জল, তাপ, ও  আলোক প্রাপ্ত হয়, তখন সেই বীজ সহজেই অংকুরিত হতে পারে। স্বল্প সময়ের মধ্যে পল্লবিত  হয়ে তরুরূপে পরিণত হতে পারে। কিন্তু এই অনুকূল পরিবেশ না পেলে, বীজ যেমন ছিল, তেমনই থেকে যায়, হয়তো একসময় বীজের ধংশ হয়ে যায়। তেমনি আমাদের প্রেমের উৎপত্তি সম গুন্ সম্পন্ন, বা সম মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তি পেলে সত্বর  ডানা মেলতে পারে। একই বয়েসের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সহজেই বন্ধুত্ত্ব গড়ে ওঠে। একই ধরনের পরিবেশে বেড়ে উঠেছে, এমন মানুষের মধ্যে সহজেই বন্ধুত্ত্ব গড়ে ওঠে। কিন্তু ভিন্ন পরিবেশে গড়ে ওঠা মানুষের মধ্যে সহজে ভালোবাসার উৎপত্তি হয় না। তার কারন হচ্ছে, একই পরিবেশে গড়ে ওঠা মানুষের মধ্যে গুনের মাত্রার মধ্যে একটা ভারসাম্য ঘটে থাকে। 

এখন কথা হচ্ছে, এটা  তো স্বাভাবিক প্রেম উৎপত্তির কথা।  এখানে আমাদের কিছুই করবার থাকে না।  সবসময় এই ধরনের সমান মানসিকতার  মানুষ নাও পাওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আমাদের কি কর্তব্য ? তাহলে কি আমরা প্রেম-ভালোবাসা থেকে দূরে থাকবো ? আর তাই যদি হয়, তাহলে আমাদের প্রেমের উন্মেষ  কিভাবে হবে। 

মহাত্মা গুরুনাথ সেনগুপ্ত বলছেন, এক্ষেত্রে আমাদের চেষ্টা করতে হবে। অর্থাৎ আমাদের খেয়াল করতে হবে, আমার যেসব  গুন্ আছে, সেই গুনের সঙ্গে যেকোনো একটির সঙ্গে সামঞ্জস্য আছে, তেমন মানুষের সঙ্গে আমাদের একতা গড়ে তুলবার  চেষ্টা করতে হবে।  

এক ক্লাসের ছাত্র, কাছাকাছি বয়স, দুজনেই মধ্যে কিছু মিল আছে, আবার কিছু পার্থক্য আছে। তো  যে পার্থক্য আছে, সেটা ভুলে গিয়ে, যেখানে তাদের মধ্যে মিল আছে, সেই রাস্তা ধরে এগুতে হবে। তবেই ভালোবাসার উৎপত্তি হবে।  অর্থাৎ ওর মধ্যে এটা নেই, সেটা নেই, এমনটা না ভেবে, যা আছে, সেটা গ্রহণ করবার চেষ্টা করতে হবে। 

আসলে প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে দুটো দিক আছে, একটা তার বাহ্যিক দিক, আর একটা হচ্ছে তার অন্তরের  দিক। বাহ্যত আমরা সবাই আলাদা আলাদা, অন্তরের মধ্যে অবস্থিত পুরুষ সবার মধ্যেই এক। আর এই অন্তরের  পুরুষকে যিনি খুঁজে পেয়েছেন, তিনি সবার মধ্যেই সেই একটি সত্ত্বার সন্ধান পেয়ে থাকেন। আর যখন সাধক অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে সবার অন্তঃস্থিত পুরুষকে প্রত্যক্ষ করেন, তখন সবাইকেই আপন বলে মনে করেন, আর ভালোবাসার আলো  বিচ্চুরিত হতে থাকে। এই হচ্ছে প্রেম যা আমাদের সবার মধ্যে অংকুর আকারে গ্রথিত আছে, আমাদের কাজ হচ্ছে এই প্রেমরূপ অঙ্কুরকে লালন পালন করে মহীরুহে পরিণত করা। তখন আমরা আত্মস্থিত হয়ে সবার মধ্যে নিজেকে দর্শন করবো।  আর কে না জানে, মানুষ এমনকি সমস্ত জীবজন্তু নিজেকে সবচেয়ে বেশী ভালো বাসে। আসুন সবাই আমরা এই প্রেমের পূজারী হয়ে উঠি।  সবার মধ্যে আত্মার দর্শন করি। যা মহাত্মা গুরুনাথের সত্যধর্ম্ম বলে থাকে। 

ওম শান্তিঃ শান্তিঃ  শান্তিঃ।  হরি  ওম।  

-----------

        

             

   

  

       

 

     

Comments

Popular posts from this blog

নিত্যকথা

ঈশ্বর ও তাঁর উপলব্ধি