বেদের সার বেদান্ত।
ভূমিকা :
সনাতন হিন্দু ধর্ম্মের আদি ও অকৃত্তিম গ্রন্থবিশেষ হচ্ছে বেদ। এ এক অদ্ভুত বিষ্ময়কর গ্রন্থ। বলা হয়, আপনার যা কিছুর অভাব, তা সে লৌকিক হোক বা পারলৌকিক তার সমাধানের উপায় বলা আছে, এই গ্রন্থে। আপনার ইষ্টপ্রাপ্তি বা অনিষ্ট পরিহারের অলৌকিক সব উপায় সম্পর্কে বলা আছে এই "বেদ" নামক গ্রন্থে। বস্তুত শব্দ-আশ্রিত অনাদি অনন্ত জ্ঞানের ভান্ডার হচ্ছে এই গ্রন্থ। বলা হয়, জীবের শ্বাস প্রশ্বাস যেমন অকারনেই বইতে শুরু করে তেমনি পরমেশ্বরের নিঃশাসের সঙ্গে এই জ্ঞান বিনা প্রযত্নে অভিব্যক্ত হতে শুরু করে। মহাপ্রলয়ের পরে যখন আবার নবকল্পে নব কলেবরে এই জগতের সৃষ্টি হলো, তখন সৃষ্টিকর্ত্তা হিরণ্যগর্ভ ব্রহ্মার স্মৃতিতে প্রথম উদয় হয় এই জ্ঞান। বলা হয়, স্মৃতিপটে উদিত হবার আগে এই জ্ঞানভাণ্ডার সূক্ষ্মরূপে পরমেশ্বরীর শক্তিতে বিলীন ছিল। হিরণ্যগর্ভ ব্রহ্মা থেকে এই জ্ঞান বর্ণাত্মক বৈখরীরূপ পরিগ্রহ করে। প্রথমে এই জ্ঞান ছিল কেবলমাত্র অনুভবের মধ্যে। এর বাহ্যপ্রকাশ ছিল না। এই জ্ঞানের মধ্যেই ছিল সৃষ্টিক্রম, যাঁকে আশ্রয় করে প্রজাপতি ব্রহ্মা এই জগৎ রচনা করেন। এর পরে সন্ক, সনন্দন, মরীচি, বশিষ্ঠ, ভৃগু ও মনু এই জ্ঞান লাভ করেন। তাঁরা আবার, তাঁদের পুত্রগণ ও শিষ্যগণের মধ্যে এই জ্ঞান সঞ্চার করেন। এই জ্ঞান তখনও কেবলই স্মৃতি। এরপরে ধীরে ধীরে পিতা-পুত্র, শুরু-শিষ্য ঋষি পরম্পরায় এই গুহ্যজ্ঞান বিস্তারলাভ করতে থাকে। ধীরে ধীরে এই জ্ঞান প্রসারের প্রক্রিয়ার মধ্যে পরিবর্তন আসে। তখন তা শ্রুত হয়ে ওঠে। অর্থাৎ তখন কেবলমাত্র ধ্বনির সাহায্যে এই জ্ঞানের পরিবেশন হতো। এর পরে এই জ্ঞান বর্ণাত্মক শব্দের আশ্রয়ে গতিশীল হয় । কেউ কেউ অবশ্য তখনও তপস্যা প্রভাবে এই জ্ঞান লাভ করতে থাকেন। বর্তমানে আমরা যে ছাপার অক্ষরে বেদ নামক গ্রন্থের দ্রষ্টা বা পাঠক হয়েছি - তা সেই বিশাল জ্ঞানরাশির একটা অসম্পূর্ন অংশবিশেষ বলেই মনে হয় ।
জ্ঞান স্বরূপতঃ এক। তথাপি কালান্তরে এর ব্যবহারিক বিনিয়োগের কারনে, বা শিষ্যের আবশ্যকতা অনুযায়ী, অথবা শিষ্যের ধারণ ক্ষমতার তারতম্যের কারনে এই জ্ঞানের বিভাগ হতে শুরু করে, অর্থাৎ শাখা-প্রশাখা বিস্তার করতে থাকে। কর্ম্ম ও জ্ঞান ভেদে বেদের দুটি ভাগ - কর্ম্মকান্ড ও জ্ঞানকাণ্ড। আমরা যে উপনিষদের কথা শুনে থাকি, তা এই জ্ঞানকাণ্ডের কথা। আবার আমরা যে যজ্ঞাদির কথা শুনে থাকি তা আছে এই বেদের কর্ম্মকান্ডে। কর্ম্মকান্ডে সংসারীর নিত্য নৈমিত্তিক কার্য্য এমনকি আমাদের কাম্যবস্তু লাভের উপায় সম্পর্কে বলা আছে। অর্থাৎ ইহজগতের সুখলাভ এমনকি মৃত্যুর পরে স্বর্গসুখ লাভের উপায় সম্পর্কে বলা আছে এই গ্রন্থে। আবার যাঁরা ইহলোক ও পারলৌকিক দুই ভোগসুখেই বীতশ্রদ্ধ তাদের জন্য ক্রমমুক্তির উপায় সম্পর্কে বলা আছে, এই জ্ঞানভান্ডরে । মোদ্দা কথা বেদ একটা সনাতন সর্ব্বজনীন গ্রন্থ যা জাতি-ধর্ম্মের উর্দ্ধে। এঁকে হিন্দুধর্ম্ম বিশ্বাসী লোকেরা নিজেদের ধর্ম্মগ্রন্থ বলে প্রচার করলেও, সত্য হচ্ছে, এই গ্রন্থে কোথাও "হিন্দু" বলে শব্দ নেই। এঁকে আপনি আদিম মানুষের গ্রন্থবিশেষ বলতে পারেন। এমনকি এঁকে আপনি জীবসৃষ্টির পূর্বের জ্ঞান বলতে পারেন, যা সৃষ্টিকর্ত্ত্য পরেমেশ্বরের নিঃশ্বাসের মতো যুগ যুগ ধরে এমনকি আজও প্রবাহিত হচ্ছে।
যাইহোক, দ্বাপর যুগের শেষে এসে, ভগবান বেদব্যাস এই অসীম জ্ঞানরাশির - যা ঋষি পরম্পরায় বিভাজিত হয়ে অবস্থান করছিলো, তাকে একত্রীকরণ শুরু করেন।
বেদব্যাস তার শিষ্য পৈলকে ঋক্বেদ, বৈশম্পায়নকে যজুর্বেদ, জেমিনিকে সামবেদ, এবং সুমন্তকে অথর্ববেদর জ্ঞান দান করেন। আমরা ধীরে ধীরে বেদান্তের (বেদের জ্ঞানকাণ্ডের) কথা সংক্ষেপে শুনবো।
ঈশ্বর থেকে মানুষ যত দূরে সরে যাচ্ছে, মানুষ যত পার্থিব বস্তু নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছে, তত মানুষের মেধা ও স্মৃতিশক্তির উপরে প্রলেপের মাত্রা বেড়েই চলেছে। বেদের চার ঋত্ত্বিক , - হোতা, উদ্গাতা, অধ্বর্য্যু ও ব্রহ্মা। এমনিতে ব্রহ্মা চার বেদের সমস্ত কর্ম্মকলাতে অভিজ্ঞ। তথাপি ব্রহ্মা অথর্ব্বেদের ঋত্ত্বিক। ঋত্ত্বিক অধ্বর্য্যু যজুর্বেদের রক্ষক। উদ্গাতা সামবেদের, এবং হোতা হচ্ছেন ঋক্বেদের রক্ষক। বেদের তিনটে অবয়ব, একটা ধ্বনি, একটা সুর, আর একটা শব্দার্থ । এই কারনে বেদকে ত্রয়ী বলা হয়ে থাকে।
ব্যবহারিক দৃষ্টিতে বলা হয়, যা থেকে জগতের জন্ম, যাতে জগতের স্থিতি ও যাতে জগৎ লয় প্রাপ্ত হয়, তাকেই বলে ব্রহ্ম বা আত্মা, যিনি সমস্ত কিছু থেকেই স্বতন্ত্ৰ। এই স্বতন্ত্র ব্রহ্ম সমস্ত ঐশ্বর্যের অধিকারী, ইনিই বহুরূপধারী, ইনিই জগতের পালনকর্ত্তা, ইনিই সমস্ত কর্ম্মের ফলদাতা, ইনিই সকলের অন্তর্যামী, আবার ইনিই সর্ব্বব্যাপক। ইনি সমস্ত রূপের উর্দ্ধে অরূপ, ইনি অব্যক্ত শ্বাশ্বত, আবার ব্যাক্তের হৃয়য়ে অন্তর্যামী।
যাইহোক, আমরা শুনতে চলেছি বেদের সারকথা বেদান্ত। আসলে এই বেদান্তকে সমগ্র বেদের সার না বলে বেদের মধ্যে যে জ্ঞানকাণ্ড আছে, তার সারকথা বলা যেতে পারে। এই বেদান্তের যে সংকলন, তাও নাকি করেছেন ব্যাসদেব। অর্থাৎ এই গ্রন্থের লেখক হচ্ছেন, মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন। এখন কথা হচ্ছে এই ব্যাসদেব কি বেদ বিভাজনকারী ব্যাসদেব, না ব্যাসদেবের নামে অন্য কেউ এটা করেছেন, এই ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। যাই হোক, আমরা সরাসরি বেদান্তের মধ্যে প্রবেশ করবো। আসলে এটি একটি দর্শনশাস্ত্র। বিচারের সাহায্যে অদ্বৈত ব্রহ্মজ্ঞান লাভ, এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য।
বেদের সার বেদান্ত। বেদান্ত ত্রিপাদ বিশিষ্ট - উপনিষদ, ব্রহ্মসূত্র ও শ্রীমৎ ভগবৎগীতা। এই ব্রহ্মসূত্র আলোচনার সময় বা উপনিষদ আলোচনার সময়, এমনকি শ্রীমৎ ভগবৎ আলোচনার সময় এই তিন গ্রন্থের বিষয়ের যে সমন্বয় তা আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। তাই এই তিনটি গ্রন্থ একে অন্যের পরিপূরক বলা যেতে পারে। একটু ঘুরিয়ে যদি বলি তবে বলতে হয়, এই তিনটি গ্রন্থই সেই এক ব্রহ্ম-এর কথা আলোচনা করেছেন। এদের সবার বিষয় সেই ব্রহ্ম ছাড়া কিছু নয়।
ব্রহ্মসূত্র :
প্রথম অধ্যায় - সমন্বয় আখ্য - প্রথম অধ্যায়ে সমন্বয় পাদে আছে মোট ৩১টি সূত্র।
সূত্র নং ১/১
"জিজ্ঞাসাধিকরণম" - ০১/০১/০১
জিজ্ঞাসা-অধিকরণম - জিজ্ঞাসা কথাটার অর্থ হচ্ছে প্রশ্ন করা। অর্থাৎ মনের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব উপস্থিত হয়েছে, তার নিরসনের জন্য মনের ব্যাকুলতা প্রকাশ। এখন জিজ্ঞাসা জাগা মানেই কোনো না কোনো বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন। এখানে জিজ্ঞাসিত বস্তু হচ্ছে ব্রহ্ম।
অধিকরণম - কথাটার অর্থ বলা যেতে পারে অধ্যায়। আবার অধিকরণ কথাটার আরো একটা অর্থ হচ্ছে বিচারালয়। অর্থাৎ বেদের অর্থ বিচার যেখানে করা হয়। এখানে, এই বিচারালয়ে থাকে তিনটি পক্ষ - বিচারক, বিচার-প্রার্থী, ও প্রতিপক্ষ। এখানে আছে বিষয়, আছে বিষয়ের উপরে সংশয়। তো অধিকরণের পাঁচটি অবয়ব ১. বিষয়, ২. সংশয়, ৩. প্রতিপক্ষ ৪. আবেদনকারী ৫. বিচারের ফল।
এখন কথা হচ্ছে ব্রহ্ম জিজ্ঞাসার কি কোনো সার্থকতা আছে ? কারন ব্রহ্মবিদগন বলে থাকেন, ব্রহ্ম হচ্ছেন এমন একটি বস্তু, যা আমাদের বাস্তবিক পক্ষে কোনো প্রয়োজন সিদ্ধ করে না। ব্ৰহ্মকে জানলে আমার ক্ষুধা দূর হবে না, আমার কোনো জাগতিক ঐশ্বর্য্য লাভ হবে না। আমার দুঃখ দূর হবে না। বলা হয়, ব্রহ্ম হচ্ছেন শুদ্ধ চৈতন্য স্বরূপ। তো অনন্ত চৈতন্য স্বরূপ সেই ব্রহ্ম সম্পর্কে আমরা অহেতুক কেন তর্ক বিতর্কের মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে ফেলছি ? যা সত্য, যা অনাদি, অনন্ত, তার সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন তোলাই তো উচিত নয়। আমরা শুনেছি, তিনি ইন্দ্রিয়াতীত। তো যা ইন্দ্রিয়াতীত তা নিয়ে সন্দেহ করে আমাদের কোনো লাভ নেই। আবার যা ইন্দ্রিয়াতীত সেই সম্পর্কে আমরা কখনওই নিঃসন্দেহ হতে পারবো না। তাহলে এই ব্রহ্মজিজ্ঞাসা অহেতুক নয় নি ?
দেখুন, আমরা বলে থাকি এই সংসার মায়ার খেলা। আবার এই সীমাহীন, অনন্ত আত্মাকে আমাদের মতো আবদ্ধ জীব, সসীম জীব, কিভাবে উপলব্ধি করবে ? এই ব্রহ্মজিজ্ঞাসাও তাহলে কি ভ্রান্ত জ্ঞানের লালসা থেকে হয়ে থাকে ? আসলে কি জানেন, আত্মজ্ঞানের ফলশ্রুতি হচ্ছে মুক্তি। সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্তি। আত্মজ্ঞান মানুষের জন্মগত অধিকার। আত্মজ্ঞান মানুষকে জীবন্মুক্ত করতে পারে। একটা চিরস্থায়ী আনন্দের জগতে নিয়ে যেতে পারে। আর ঠিক এই কারণেই বেদান্ত, বিচার-বিশ্লেষণ দ্বারা ব্রহ্মজ্ঞানের সন্ধান দিয়ে মানুষকে মুক্তচিন্তার অধিকারী করে থাকে। তাই আমাদের সকলের মধ্যেই এই ব্রহ্মজিজ্ঞাসা জাগা উচিত, আমাদের ব্রহ্মবিচারে প্রবৃত্ত হওয়া উচিত। এটা আমাদের অতি আবশ্যিক ও আশু কর্তব্য ।
সূত্র নং : ০১/০১/০২
"জন্মাদ্যস্য যতঃ" - ০১/০১/০২
জন্মাদি অস্য যতঃ - জন্মাদি অর্থাৎ জন্ম-স্থিতি-মৃত্যু ইত্যাদি যা থেকে হচ্ছে।
প্রশ্নটা হচ্ছে ব্রম্ম কি বা কে ? জগতের সৃষ্টি-স্থিতি-লয় যা থেকে হয়, তিনিই ব্রহ্ম নামপদ বাচ্য। এখন কথা হচ্ছে, জগৎ সৃষ্টির নিশ্চয় একটা কারন আছে। এই কারণকে বলা হচ্ছে ব্রহ্ম। দেখুন সমস্ত ঘটনার পিছনে একটা কারন অবশ্যই আছে, একথা মেনে নিলেও এই কারণের কখনও নিস্পত্তি বা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কেননা কারণের আবার একটা কারন থাকে। সূর্য্য পশ্চিম দিকে অস্ত যাচ্ছে, এটা আমাদের প্রত্যক্ষ্য। কিন্তু এই পশ্চিমের শেষ যদি আপনি খুঁজতে যান, কখনোই শেষ হবে না। আবার সূর্য পূর্ব দিক থেকে উদয় হচ্ছে, কিন্তু এই সূর্য্যের উৎসের সন্ধানে আপনি যদি পূর্বদিকে চলতে থাকেন, তবে সূর্য্যের উৎসে আপনি পৌঁছে যাবেন, এমনটা ভাবা বোকামি ছাড়া কিছু নয়। তাই বলা হয়, কার্য যেমন কারনের ফল স্বরূপ হয়ে দেখা দেয়, তেমনি যাকে আমরা কারন বা উৎস বলছি, তা আসলে কার্য ছাড়া কিছু নয়। আগে ডিম্ না আগে মুরগি, আগে বীজ না আগে গাছ - এই প্রশ্নের সমাধান সম্ভব নয়। গাছ থেকেই বীজ আবার বীজ থেকেই গাছ, মুরগি থেকে ডিম আবার ডিম্ থেকে মুরগী - এই প্রক্রিয়া নিরন্তর চলছে। তার এসবের শেষ বা শুরু বলে কিছু হয় না। এটি একটা চক্র। জন্ম থেকে মৃত্যু, আবার মৃত্যুর পরে জন্ম। এর পিছনে কোনও কারন খুঁজতে যাওয়া অহেতুক সময় নষ্ট। মায়ের নাভি ছিন্ন করে আর এক মায়ের জন্ম হয়ে থাকে। শূন্য থেকে কিছুই সৃষ্টি হতে না। পিতার শুক্র থেকে আর এক পিতার জন্ম হয়ে থাকে। নারায়ণের নাভি ভেদ করে ব্রহ্মার জন্ম। এই ব্রহ্মা নারায়ণ থেকে ভিন্ন নয়। একবার মহাদেবকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, আপনার পিতা কে ? উত্তরে বলেছিলেন, ব্রহ্মা। তো জিজ্ঞাসু আবার বলেছলেন, ব্রহ্মার পিতা কে ? ব্রহ্মার পিতা নারায়ণ। নারায়ণের পিতা কে ? তো মহাদেব উত্তরে বলেছিলেন, নারায়ণের পিতা আমি শিব। তো আজ এই জন্মে যিনি আপনার পিতা, তিনি আগের জীবনে আপনার পুত্র ছিলেন কিনা, তা কে বলতে পারে ? আমরা সবাই ঘুরে ফিরে, কখনো পিতা , কখনো পুত্র, কখনো মাতা, কখনো কন্যা হয়ে উদ্ভাসিত হচ্ছি, আবার বুদ্বুদের মতো মিলিয়ে যাচ্ছি। আদলে এই সত্য যার উপল্বদ্ধিতে এসেছে, যিনি এই সত্যকে জ্ঞাত হয়েছেন, তিনিই মুক্ত।
আগের সূত্রে আমরা শুনেছিলাম, ব্রহ্মজ্ঞান মুক্তির উপায়। এখন কথা হচ্ছে এই ব্রহ্মজ্ঞান কখনও বিতরণ করা যায় না। আপনি আপনার বিশেষ উপলব্ধি কাউকে সঞ্চার করতে পারবেন না। এই জ্ঞান কখনো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তাহলে আমরা এই জ্ঞানের প্রসার ও ব্যবহারিক সাফল্য কিভাবে আসবে ? এইজন্য ব্রহ্মজ্ঞপুরুষগন এই (আপাত কাল্পনিক) ব্রহ্মের কিছু লক্ষণের কথা বলেছেন। এই লক্ষণের মধ্যে প্রথম হচ্ছে তটস্থ লক্ষণ। তটস্থ কথাটার অর্থ হচ্ছে তট-এ বা তীরে যিনি স্থিত। সমুদ্রের ঢেউ উঠছে, নদীর জল বহমান। সাক্ষী হয়ে যিনি একে প্রতক্ষ্য করছেন। পক্ষপাতশূন্য হয়ে, নির্লিপ্ত হয়ে, উদাসীন হয়ে কেবলমাত্র দ্রষ্টা হয়ে, সাক্ষীভাবে অবস্থান করছেন। জগৎ প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু স্থির ব্রহ্মসত্ত্বা, শান্তম ব্রহ্মপুরুষ এই পরিবর্তনের চিরসাক্ষী হয়ে বিরাজ করছেন। ইনিই দ্রষ্টা স্বরূপ হয়ে অবস্থান করছেন। শাস্ত্র বলছে, "সত্যং জ্ঞানম অনন্তং ব্রহ্ম" - এই ব্রহ্ম অনন্ত সত্য-জ্ঞান স্বরূপ। তো অনন্ত এই গতিশীল জীবন প্রবাহের যিনি সাক্ষী বা দ্রষ্টা তাকে বলা হচ্ছে ব্রহ্ম।
তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম, জন্ম-জীবন-মৃত্যু চলছে, সৃষ্টি-স্থিতি-লয় চলছে, একে যিনি সাক্ষীস্বরূপ অবলোকন করছেন, তিনি ব্রহ্ম নামধেয়। জন্ম-জীবন-মৃত্যু যা থেকে হচ্ছে তাকেই বলা হচ্ছে ব্রহ্ম।
এখন কথা হচ্ছে কার জন্ম-মৃত্যুর কথা বলা হচ্ছে ? কার জন্ম মৃত্যু হয় ? যা নিত্য তার তো জন্ম-মৃত্যু নেই। কিন্তু যা অনিত্য তার জন্ম মৃত্যু আছে। যা অপরিণামী তার জন্ম মৃত্যু নেই। যা পরিণামী তার জন্ম মৃত্যু আছে। তো তাহলে কি ব্রহ্ম কেবল পরিণামী বস্তুর কারণস্বরূপ। কিন্তু আমরা তো শুনেছি, ব্রহ্ম সগুন ও নির্গুণ ভেদে দুই ভাগে বিভক্ত। সগুনের পরিবর্ত্তন আছে, নির্গুণের নেই। তাহলে নির্গুণের কারন কে ? সংশয় কিন্তু থেকেই গেলো। ধীরে ধীরে বেদান্তের মধ্যে আমরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো।
হরি ওম তৎ সৎ।
"শাস্ত্রযোনিত্বাৎ অধিকরণম" - সূত্র - ০১/০১/০৩
শাস্ত্র হচ্ছে জ্ঞানের জন্মদ্বার ।
ব্রহ্ম সম্পর্কিত সমস্ত জ্ঞানলাভের একমাত্র উপায় হচ্ছে শাস্ত্র। আমরা শুনেছি শাস্ত্র হচ্ছে শ্রুতিজ্ঞান। গুরুমুখে এই জ্ঞানের প্রসার লাভ ঘটে থাকে।
"তত্তু সমন্বয়াৎ" - সূত্র -১/১/৪
তৎ তু সমন্বয়াৎ - তা (ব্রহ্ম ) কিন্তু শাস্ত্রের প্রতিপাদ্য বিষয়। সম্যকভাবে অন্বয় অর্থাৎ বিশ্লেষণ করা।
"ইক্ষতের্ণ, অশব্দম। " - সূত্র ১/১/৫
ঈক্ষতে ন, অশব্দম - যা চিন্তা করা যায় না, যা শব্দের উপরেও প্রতিষ্ঠিত নয়।
এই যে শাস্ত্রবিষয়-রূপ ব্রহ্ম, তিনি চিন্তার অতীত, এমনকি কোনো শব্দ বা বাক্য একে প্রকাশ করতে পারে না।
"গৌণশ্চেৎ, ন আত্মশব্দাৎ" সূত্র - ১/১/৬
গৌণঃ চেৎ আত্মশব্দাৎ - "আত্মা" এই শব্দ দ্বারা আদি কারণ বোঝানো হয়েছে।
আসলে আদি কারণ শব্দ দ্বারা বোঝানো যায় না। তথাপি "আত্মা" বা "ব্রহ্ম" একটা আলংকারিক শব্দ যার দ্বারা শ্রুতিশাস্ত্র আদি কারণ বোঝাতে চেয়েছেন।

Comments
Post a Comment