যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - ষোড়শ অধ্যায় দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগ যোগঃ


ওম নারায়ণং নমস্কৃত্য নরঞ্চৈব নরোত্তমম
দেবীং সরস্বতীং ব্যাসং ততো জয়মুদীরয়েৎ।

১০.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  ষোড়শ অধ্যায় দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগ যোগঃ

পরমাত্মার মধ্যে কিভাবে জীবভাব বা জীবাত্মার উদয় হয়, জীবাত্মা কিভাবে দেহ-মধ্যে  আসন পেতে বসেন, এ বড়ো জাদু। এই জাদুবিদ্যা আমাদের মতো ইন্দ্রিয়াসক্ত অজ্ঞানী জীবের পক্ষে আয়ত্ত্ব  করা সম্ভব নয়। জাদুকরের জাদুর রহস্যঃ বুঝতে গেলে, ইন্দ্রিয়গুলোকে মনের মধ্যে বসিয়ে রাখতে হবে , এর পরে মন-বাহ্য ইন্দ্রিয়ের সমস্ত শক্তি সমেত প্রাণের মধ্যে প্রবেশ করবে। আরো পরে, মন-প্রাণ-ইন্দ্রিয়সকল আত্মার মধ্যে প্রবেশ করবে। শুধু আত্মার মধ্যে প্রবেশ করতে পারলেই হবে না, এখানে তার স্থিতি  লাভ করতে হবে। অর্থাৎ একবার প্রবেশ করলাম, আবার বেরিয়ে এলাম, এই অবস্থায় পরমাত্মার জীবাত্মা লাভের  রহস্যঃ বোধগম্য হবে না। এই স্থিতিকাল যত  দীর্ঘায়ীত হবে, তত ধীরে ধীরে এই রহস্যের উন্মোচন হতে থাকবে। যে জিনিষটা আমরা কেবল শুনে থাকি, যে আত্মাই ইন্দ্রিয় ও মনে অধিষ্ঠান পূর্ব্বক বিষয়ভোগ করছেন, এই অতিশয় বিষ্ময়কর  ব্যাপারটা আমাদের বোধগম্য হবে।

দেখুন, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সমস্ত বিষয় দেহস্থ ষঠচক্র বাহিত হয়ে বিদ্যুৎবেগে দ্বিদলপদ্মে উপনীত হয়। দ্রুত এই প্রবাহ সহস্রদল পদ্মে উপনীত হয়। আর তখনই কেবলমাত্র আমাদের বিষয়ের অনুভব হয়ে থাকে। এই ক্রিয়া এতো দ্রুত সম্পন্ন হয়, যে আমরা তা ধরতে পারি না। যেসব যোগীপুরুষ যোগসাধনার সাহায্যে আজ্ঞাচক্রে স্থিত হয়েছেন, তাদের বুদ্ধি স্থির হয়ে যায়। আর এই স্থির বুদ্ধির কারনে, তিনি সূক্ষ্ম বিষয় অনুভবে সক্ষম হন। যাদের মন পবিত্র নয়, বুদ্ধি স্থির নয়, অর্থাৎ যারা বিমূঢ়, তাদের পক্ষে এই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ে জ্ঞান হওয়া সম্ভব নয়। যাঁরা আত্মাতে স্থির হতে পারেননি, যাঁরা ধ্যান-ধারণা-সমাধিতে সাফল্য লাভ করতে পারেন নি, তাদের সংযম শিক্ষা হয়নি।  তারা চিত্ত বৃত্তিকে নিরোধ  করতে অক্ষম। জগৎ যেমন সূর্য্যের জ্যোতির  কারনে  দৃশ্যমান হয়ে থাকে।  তেমনি আত্মজ্যোতির কারনে এই শরীর ও ইন্দ্রিয়সকল প্রকাশময় হচ্ছে । সূর্য্যজ্যোতিঃ যেমন আকাশের সূর্য থেকে পৃথিবীতে নেমে আসে, তেমনি আত্মজ্যোতিঃ ব্রহ্ম থেকে নেমে  আসছে। এই ব্রহ্মজ্যোতিঃ  আমাদের শরীরের মস্তকের উর্দ্ধে একদম মধ্যস্থলে (সহস্রারের উপরে স্থিত) বিন্দুতে প্রতিফলিত হচ্ছে। সূর্য যেমন শত-সহস্র আধারের মধ্যে দৃশ্যমান হয়, তেমনি এই ব্রহ্মজ্যোতি প্রতিটি জীবদেহে প্রতিফলিত হচ্ছে। এই বিন্দু সম্পর্কে আমাদের কোনো জ্ঞান নেই। সর্ব্বব্যাপী আকাশের মধ্যে আছে পরম-ব্যোম  স্বরূপ অণু, আবার এই অণুর মধ্যে হাজার-কোটি ব্রহ্মাণু।  আবার এই ব্রহ্মাণুর মধ্যে কত যে ব্রহ্মান্ড তার  কোনো সীমা  নেই। যোগাচার্য্য বলে থেকেন, এই অণুর জ্ঞান হলে, তবেই ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছে, বলতে হবে। 

যাই হোক, আমরা প্রবেশ করতে চলেছি, দৈবাসুর সম্পদ বিভাগ যোগে। এই জগতে সবই দ্বৈতে ভরা। এখানেই আছে দেবতা, এখানেই আছে অসুর।  এখানেই  আছে, ভালো-মন্দ, শুভ-অশুভ, সুপ্রবৃত্তি,-কুপ্রবৃত্তি, আছে আশা নিরাশা, জয়-পরাজয়, সুখ-দুঃখ। আর এই পরস্পর দ্বৈত-ভাবের  ফলে দ্বন্দ্ব চলছে নিরন্তর। এই দেহে যেমন সৎ-কর্ম্ম সম্পাদন হতে পারে, তেমনি হতে পারে অসৎ-কর্ম্ম। আমাদের কর্ম্ম (নিরাসক্ত) যেমন আমাদের মুক্তির কারন হতে পারে, তেমনি কর্ম্ম (আসক্তিজনিত) আমাদের বন্ধনের  কারন হতে পারে।  কর্ম্ম যেমন দুঃখের কারন হতে পারে, তেমনি এই কর্ম্মই আমাদের সুখের কারন হতে পারে। এই দেহেই যেমন আমাদের যোগক্রিয়া হতে পারে, তেমনি এই দেহেই আমাদের ভোগক্রিয়া হয়ে থাকে। 

আমরা সব বুঝি, তথাপি আমরা আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। পড়াশুনা করলে, পরীক্ষায় ভালো ফল হবে, এটা  আমরা বুঝি, কিন্তু পড়াশুনায় আমাদের মন বসে কৈ ? দুর্যোধন একসময় শ্রীকৃষ্ণকে বলেছিলেন, হে কৃষ্ণ আমাকে জ্ঞান দিও না, আমি সব বুঝি, কিন্তু আমি আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। কেউ যেন আমাদে দিয়ে খারাপ কাজগুলো করিয়ে নেয়, আর আমি অবশ হয়ে ধংসাত্মক কাজে উদ্দীপ্ত হই। কোনো মানুষই ভালো নয়, আবার কোনো মানুষই খারাপ নয়। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে যেমন আছে কুপ্রবৃত্তি, তেমনি আছে সুপ্রবৃত্তি। এই কুপ্রবৃত্তির  সঙ্গে সুপ্রবৃত্তির লড়াই চলছে নিরন্তর। আর বেশিরভাগ  মানুষ (যারা সবে মাত্র পশু থেকে মনুষ্য শরীর পেয়েছেন) তাদের মধ্যে কুপ্রবৃত্তির প্রভাব বেশী। এক্ষেত্রে তার কিছুই করবার নেই, কারন সে পূর্বপূর্ব জন্মে না-জানি কতো পশু শরীরে জীবন অতিবাহিত করেছেন । আর  তার স্বভাবের মধ্যে পূর্ব-পূর্ব জীবনের সংস্কার প্রভাবিত করছে। এখান থেকে দ্রুত  বেরিয়ে   আসতে  গেলে, আমাদের ইচ্ছে শক্তির উপরে নির্ভর করতে হবে। আর শুভ ইচ্ছে একসময় মানুষকে আচার্য্যের কাছে নিয়ে যাবে। আমাদের পুরুষকারের প্রয়োগ করতে হবে। যাঁরা আজ এই শ্রীভগবান মুখনিঃসৃত অমৃত কথা শুনছেন, তাঁদের  মধ্যে যে এই বই পড়বার বা একথা শুনবার  প্রবৃত্তি এক্ষুনি জেগেছে, তা  ভাববেন না, এটা আপনার একজন্মের সংস্কার নয় । এই সংস্কার জন্মান্তর থেকে প্রাপ্ত হয়েছেন। আর এই সংস্কারের ফলেই, আপনার মনের মধ্যে শুভ ইচ্ছের উদয় হয়েছে। এবং আপনার এই ইচ্ছেই, আপনাকে জীবনে এগিয়ে যাবার সারা সরঞ্জাম সামনে এনে দেবে।  নদী পার হতে গেলে, আমরা নৌকার খোঁজ করি, কিন্তু যার সংস্কার ভালো, তার কাছে নৌকো এসে হাজির হয়। মাঝি এসে জিজ্ঞেস করবে, তুমি কি ওপারে যাবে ?

ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা আমাদের নাও থাকতে পারে, কিন্তু প্রাণের স্থিরতায়, বুদ্ধি সূক্ষ্মতা হয়, আর যার বুদ্ধি সূক্ষ্ম হয়েছে, তাঁর মধ্যে ভালো-মন্দ বিচারের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।  কে যে দেবতা, আর কে যে অসুর তা আমরা জানি না,   কাকে আমাদের এড়িয়ে চলতে হবে, আর কাকে আমাদের সঙ্গে  নিতে হবে, তা আমরা জানিনা। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই কথাটাই আমাদের সামনে তুলে ধরছেন, এই ষোড়শ অধ্যায়ে। আমাদের কাজ হচ্ছে, ভগবানের কথার দিকে আরোবেশী মনোযোগ দেওয়া। 

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
       
১১.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা -  ষোড়শ অধ্যায় দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগ যোগঃ
শ্লোক ১৬/১

শ্রী ভগবান উবাচ 
অভয়ং সত্ত্বসংশুদ্ধির্জ্ঞান যোগব্যবস্থিতিঃ 
দানং দমশ্চ যজ্ঞশ্চ স্বাধ্যায়স্তপ  আর্জ্জবম।  (১৬/১)

শ্রী ভগবান, বললেন, ভয়শূন্যতা, চিত্তশুদ্ধি, জ্ঞান ও  যোগে নিষ্ঠা, দান, দম, যজ্ঞ, শাস্ত্রপাঠ, তপস্যা ও সরলতা। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই শ্লোক থেকে দৈবগুনগুলো সম্পর্কে বলে শুরু করলেন।  

যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ  বলছেন, নির্ভিক হতে হবে, চিত্তকে শুদ্ধ করতে হবে, জ্ঞান ও যোগে নিষ্ঠাবান হতে হবে। দান, যজ্ঞ শাস্ত্র অধ্যায়ন তপস্যা ও সরলতার জন্য নিজেকে উপযুক্ত করতে হবে।  যোগীবের বলছেন, সাধনক্রিয়ার পরাবস্থায় মৃত্যুভয় দূরীভূত হয়। প্রাণক্রিয়া সুষুম্নাতে চলতে থাকায়, বুদ্ধি নির্ম্মল হয়। ধ্যান ধারণা ও সমাধির দ্বারা একটা  বিশেষ ভাবে স্থিতি হয়। এই অবস্থায় আর সংযমী পুরুষের মধ্যে একটা ইচ্ছারহিত অবস্থা হয়। ইছারহিত অবস্থায়, না থাকে কোনো সংকল্প না থাকে বাসনা। এই অবস্থায় অদ্বৈত ভাবের উদয় হয়। তখন সমস্ত জগৎ আপনাতে  স্থিত হয়ে, আপনাতে আপনি হয়ে যায়। 

এর আগের অধ্যায়ে (পঞ্চদশ) আমরা শুনেছিলাম, একমাত্র সর্বজ্ঞ ব্যক্তি  পুরুষোত্তমকে জানতে পারেন। মুমুক্ষ জীব মুক্তির প্রত্যাশী।  আর যিনি মুক্তির প্রত্যশী তাকে প্রথমে অধিকারী হতে হবে। এই অধিকারী হতে গেলে, তাকে প্রথমে নিজের মধ্যে যে দেবত্বের ভাব আছে, তাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। কিন্তু কিভাবে ? যার দ্বারা এই দৈবী  সম্পদকে লাভ করা যায়, এবং দৈবী সম্পদ অধিকারীর কি কি লক্ষণ এবং কি কি সাধকের গুন্ থাকতে হবে, তার কথাই  বলছেন, যোগেশ্বর । 

১. অভয় বা ভয়শূন্য হতে হবে। ভয় মানুষের ততক্ষনই থাকে যতক্ষন সে মনে করে বাইরে অন্য কেউ দাঁড়িয়ে আছে। অর্থাৎ দ্বৈত ভাবের কারণেই আমাদের মধ্যে ভয়ের উদ্রেগ হয়। কাউকে পর না ভাবা অভয়পদ লাভের  অন্যতম উপায়। কাউকে পর না ভাবলে, নিজের মধ্যে হিংসার উদ্রেগ হতে পারে না। আর অহিংসার ভাব এলেই বৈরীভাবের নিস্পত্তি ঘটে থাকে। আসলে জীবের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ের কারন হচ্ছে যমরাজ বা মৃত্যু। সাধনার পরাবস্থায় সাধক সংসার জীবন থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে এমন একটা অবস্থার মধ্যে কালাতিপাত করেন, যা মৃত্যুসম অবস্থা। আসলে সাধক এইসময় দেহ থেকে নিজেকে পৃথক জ্ঞান করেন। তো মৃত্যু তো স্থুল  দেহকে ছেড়ে যাওয়া ছাড়া কিছু নয়।  কিন্তু প্রতিদিন সেই দেহাতীত অবস্থায় স্বাদ গ্রহণ করছেন, তার মধ্যে মৃত্যুভয় বলে কিছু থাকে না।  মনের মধ্যে কোনো শঙ্কা, উদ্বেগ, ব্যাকুলতা থেকে যে ভয়ের জন্ম হতে পারে, সাধক ক্রিয়ার পরাবস্থায় এই অবস্থার উর্দ্ধে অবস্থান করেন। 

২. সত্ত্বসংশুদ্ধি : চিত্তকে সত্ত্বগুণের দ্বারা শুদ্ধ করতে হবে। যার মন পরিস্কার, যাঁর  মধ্যে কোনো  বৈরীভাব নেই, যিনি প্রবঞ্চনা বর্জ্জিত, মিথ্যাকে যিনি অস্বীকার করেছেন, তিনি সত্ত্ব গুনের অধিকারী। প্রাণক্রিয়ার সাহায্যে যখন আমাদের নাড়ীশুদ্ধি হয়, তখন সেই শুদ্ধ নাড়ীর মধ্যে যে প্রাণের প্রবাহ চলতে থাকে, তা হয় অতি সূক্ষ্ণ ও শুদ্ধ। আর যার মধ্যে প্রাণের প্রবাহের শুদ্ধিকরণ হয়েছে, তাঁর বুদ্ধি সূক্ষ্ম হয়ে থাকে। এনার প্রাণক্রিয়া সবসময় সুষুম্নাতে হয়ে থাকে। আসলে আমাদের শ্বাস ক্রিয়া যতক্ষন ইড়া ও পিঙ্গলা  বাহিত হয়, ততক্ষন আমাদের সংসারভাব।  ইড়া পিঙ্গলা থেকে শ্বাস যখন সুষুম্নার মধ্যে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়, তখন তাঁর মধ্যে সত্ত্বগুণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। 

৩. জ্ঞান  যোগব্যবস্থিতিঃ - জ্ঞান ও যোগে একান্ত নিষ্ঠা থাকা চাই। জ্ঞান সংগ্রহ ক্রিয়ায়  ও যোগক্রিয়াতে নিষ্ঠা থাকা চাই। যোগ বলতে আমরা বুঝি সংযুক্তি বা মিলন। আর এই মিলন হচ্ছে ঈশ্বরের সঙ্গে। আর  ঈশ্বর জ্ঞানালোক ছাড়া কিছু নয়। আমাদের নিত্য-অনিত্যের জ্ঞান সংগ্রহ করতে হবে। আর এই জ্ঞান সংগ্রহ করতে গেলে আমাদের বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে হবে। আর বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে গেলে, যা করতে হবে তা হচ্ছে যোগক্রিয়া। যা আমাদেরকে সংযমী করবে।  কারন একমাত্র যোগক্রিয়ায় আমাদের মন-প্রাণকে শান্ত করে বুদ্ধিকে নির্ম্মল করতে পারে।  বুদ্ধিকে তীক্ষ্ণ করতে পারে।  আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ যে কোনো বিষয়ের জ্ঞান সহজেই ধরতে পারেন। যোগাবস্থাই স্বাভাবিক ভাবে জ্ঞানবস্থার সামিল করে দেয় সাধককে। 

৪. দান : স্বার্থ ত্যাগ করে, আসক্তি ত্যাগ করে পরার্থে ক্রিয়া করাই দান। যা কিছু সম্পদ তা সে জাগতিক বস্তু হোক, বা আধ্যাত্মিক জ্ঞান হোক, তা বিলিয়ে দিতে হবে। আর একটা কথা জানবেন, "যতই করিবে দান তত যাবে বেড়ে" । অনেকে বলে থাকেন   বিদ্যা বা জ্ঞান দান করলে  হয়তো তা বেড়ে যেতে পারে, কিন্তু পার্থিব বস্তুর দানে সম্পদ কি করে বাড়বে ? দেখুন অর্থনীতিবিদগন বলে থাকেন, টাকা কখনো ধরে রাখতে নেই - টাকা যত  সচল হবে, তত টাকার বৃদ্ধি হতে থাকবে।  আর এছাড়া, আপনার কাছে আজ যা সম্পত্তি তা একসময় আপনার কাছে ছিল না, আবার এও সত্য এই সম্পদ একটা সময় আপনার অধিকারে থাকবে না। আজ না হোক, কাল, (মৃত্যুর পরে তো অবশ্যই) অন্য কারুর হয়ে যাবে। তো সৎপাত্রে দান করুন, যার নেই তাকে দিন, যার প্রয়োজন আছে তাকে দিন, দেখবেন আপনার ভাণ্ডারে সম্পত্তির কোনোদিন অভাব হবে না। হাত  ফাঁকা না হলে, ভগবান কোথায় দেবেন আপনাকে ? ঠাকুরকে দিয়ে তবে নিজে গ্রহণ করুন। সামর্থ্য অনুযায়ী অবশ্য়ই ব্যয় করুন। ব্যয়ে যার প্রবৃত্তি নেই, শক্তিক্ষয়ে যার আগ্রহ আসেনি, তার পক্ষে যোগসাধন সম্ভব নয়। কেননা, যোগসাধন আসলে নিজেকে শেষ করে দেওয়া। কাঁচা অমিকে  ত্যাগ করে পাকা আমির খোঁজে বেরিয়ে পড়া। একসময় এই পাকা আমিকে  ছেড়ে অনন্তের ভাসিয়ে দিতে হয় নিজেকে। তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, দানক্রিয়া দৈবসম্পদ সংগ্রহে সাহায্য করে থাকে। 

দম - দম  কথাটার অর্থ দমন করা, অর্থাৎ ইন্দ্রিয়কে দমন করা। যিনি ইন্দ্রিয়সকলকে দমন করতে পারেননি, অর্থাৎ জিতেন্দ্রিয় হতে পারেন নি, তার পক্ষে যোগক্রিয়া করা অসম্ভব। ইন্দ্রিসকল বিষয় বাসনাকে সর্ব্বদা ইন্ধন যোগাচ্ছে। আর এর ফলে আমাদের জাগতিক সুখ-দুঃখের অনুভূতি হচ্ছে, বাহ্য কর্ম্মে উদ্দীপ্ত করছে, আবার কর্ম্মফলের প্রত্যাশী করছে। 

যজ্ঞ : যজ্ঞের দুটো রূপ। একটা দেবযজ্ঞ, বা পুরুষ যজ্ঞ আরেকটি মনুষ্যযজ্ঞ। দেবযজ্ঞ হচ্ছে আদিম যজ্ঞ। পুরুষ নিজেকে আহুতি দিয়েছেন আগে, তবে এই সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে। তাঁরই আত্মাহুতির কারনে, মানুষ যজ্ঞ করতে শিখেছে। যজ্ঞ হচ্ছে চেতনার উত্তরণের সাধনা। বিশ্বের জীবনে দুটো ছন্দ - একটা উত্তরণের আর একটা অবতরণের। ছাড়তে  হয় ক্ষুদ্রতাকে আর ধরতে হয় বৃহৎকে। যিনি বৃহৎ তিনি অকৃপণ - তাই আমরা সবকিছু পাই। মাতা-পিতা তাদের সর্বস্য দিয়ে সন্তানকে লালন-পালন করে থাকেন। এমনকি মৃত্যুর সময় তাদের যাকিছু সংগ্রহ, সবই তাঁরা  সন্তানদের জন্য রেখে যান। আর এই কারণেই সন্তান তিলে তিলে  বড় হয়ে উঠতে পারে। বৃহতের আত্মত্যাগের ফলেই ক্ষুদ্র একসময় বৃহৎ হয়ে ওঠে। এই যে জীবন তা সেই বৃহতের দান।  আবার একসময় সময় এই জীবন আবার তাঁকেই ফিরিয়ে দিতে হবে, এই কথাটা যেন আমাদের সব সময় স্মরণে থাকে ।  

যজ্ঞের মুলে আছে আত্মত্যাগ।  যজ্ঞ ভাবনায় আমাদের দুটো জিনিস মনে রাখতে হবে, এক সেই  বৃহৎ নিজেকে আমার মধ্যে ঢেলে দিচ্ছেন। এই অনুভূতিতে  উদ্দীপ্ত হয়ে নিজেকে তাঁর মধ্যে ঢেলে দিতে হবে। আমার সমস্ত কর্ম্ম যেন  যজ্ঞে পরিণত হয়। আমার সমস্ত ভাবনা যেন সংকীর্ণ বাসনার বাঁধন কাটিয়ে অগ্নি শিখার  মতো যেন  প্রতিমুহূর্তে তার মধ্যে মিলিয়ে যায়। আমার কোনো  কর্ম্ম যেন আত্মতুষ্টির জন্য না হয়, আমার সমস্ত কর্ম্ম যেন সেই যজ্ঞেশ্বরের বিশ্বযজ্ঞে নিজেকে আহুতি দেবর জন্য হয়। জীবন আর যজ্ঞ যেন  এক হয়ে যায়। 

আবার যোগীদের কাছে সাধন ক্রিয়া হচ্ছে যজ্ঞ। এই যোগাভ্যাস  সকল যজ্ঞের সার। প্রাণেতে অপান, আবার অপানে প্রাণের আহুতি দেওয়াই প্রকৃত যজ্ঞ। একেই হোমকর্ম্ম বলা হয়ে থাকে। 
স্বাধ্যায় : বেদ বেদান্ত উপনিষাদির অধ্যয়ন, শাস্ত্র আলোচনা।  একেই বাহ্যত অধ্যয়ন বলা হয়ে থাকে। আসলে বুদ্ধির সূক্ষ্মতা লাভ করতে হবে। যোগাচার্য্যগণ বলে থাকেন, সাধন ক্রিয়া করতে করতে যখন  প্রাণ-অপানের গতি উর্দ্ধমুখী হয়ে সহস্রারে মিলিত হয়, তখন  জ্ঞান ঐশ্বর্য্য লাভ হয়ে থাকে। তো সাধন  ক্রিয়া হচ্ছে স্বাধ্যায়। শুধু বই বা শাস্ত্র অধ্যায়ন করে যে জ্ঞান লাভ হয়, তা অ-প্রতক্ষ্য  জ্ঞান।  কিন্তু সাধন ক্রিয়ার ফলে যে জ্ঞান লাভ হয় তা প্রতক্ষ্য জ্ঞান। আর যতক্ষন আমাদের জ্ঞান প্রতক্ষ্য অনুভূতির বিষয় না হয়, ততক্ষন সেই জ্ঞানের দ্বারা তথাকথিত পণ্ডিত হওয়া যায়, কিন্ত জ্ঞানী হওয়া যায় না। 

তপঃ : কায়িক অর্থে শৌচ, সরলতা, ব্রহ্মচর্য, অহিংসা, শ্রদ্ধা, এগুলো হচ্ছে তপঃসাধনার অঙ্গ।
আবার বাচিক  অর্থে, সত্য, প্রিয় ও হিতকর বাক্য প্রয়োগ ইত্যাদি। আবার মানসিক তপঃ সাধন বলতে বোঝায় মনের প্রসন্নতা, মন-মুখে এক হওয়া, শান্তভাব ও বাকসংযম ইত্যাদি হচ্ছে তপঃ সাধনা।   

আর্জ্জব : সরলতা। লোভাতুর বাসনা-প্রবণ মানুষ সহজ-সরল হতে পারে না । তো যতক্ষন ইচ্ছে, কামনা-বাসনা-সংকল্প থাকবে, ততক্ষন মানুষ নিজেকে তুষ্ট করতে পারে না।  সাধনার পরাবস্থায় যোগী ইচ্ছে রহিত হয়ে, কামনা-বাসনার উর্দ্ধে দেহাতীত অবস্থায় অবস্থান করেন। 

আসলে এই শ্লোকের  মধ্যে আছে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কথিত সমস্ত দৈব গুন্। এর পরে আমরা আরো বিস্তারিত শুনবো, পরবর্তী শ্লোকে। 

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।                
      
১২.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা -  ষোড়শ অধ্যায় দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগ যোগঃ
শ্লোক ১৬/২

অহিংসা-সত্যম-ক্রোধস্ত্যাগঃ শান্তিরপৈশুনম
দয়া ভূতেষ্বলোলুপত্বং মার্দ্দবং  হ্রীরচাপলম। (১৬/২)

অহিংসা, সত্য, অক্রোধ, ত্যাগ ও শান্তি পরনিন্দা ত্যাগ, অ-খলতা, সর্ব্ব ভূতের প্রতি দয়া, নির্লোভ ভাব, মৃদুতা অর্থাৎ স্থির ভাব, কু-কর্ম্মে লজ্জা, চঞ্চলতা হীন। - এগুলো সব সাধকের দৈব সম্পদ। 

আমরা আগেই শুনেছি, যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যোগাবস্থার উচ্চ পর্য্যায়ে যে স্থিতি লাভ হয়, সেই সম্পর্কে বর্ণনা করছেন। বা বলা যেতে পারে, যে সব দৈব গুন্ থাকলে, এই অবস্থায় উপনীত হওয়া যায়, সেই সম্পর্কে বলছেন। 

ঋষি পতঞ্জলি তার যোগ দর্শন গ্রন্থে বলছেন, "যম-নিয়ম-আসন-প্রাণায়াম-প্রত্যাহার-ধারণা-ধ্যান সমাধায়োঽষ্টাবঙ্গানি।" (সাধন-পাদ শ্লোক ২৯) অর্থাৎ যম, নিয়ম আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি - এই হচ্ছে, আট  প্রকার যোগাঙ্গ। ঋষি পতঞ্জলি আরো বলছেন, অহিংসা-সত্য-অস্তেয়-ব্রহ্মচর্য-অপরিগ্রহঃ এগুলো অষ্টাঙ্গ সাধনার পরিপূরক । 

আবার যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে বলছেন, অহিংসা, সত্য, অক্রোধ, ত্যাগ ও শান্তি পরনিন্দা ত্যাগ, অ-খলতা, সর্ব্ব ভূতের প্রতি দয়া, নির্লোভ ভাব, মৃদুতা অর্থাৎ স্থির ভাব, কু-কর্ম্মে লজ্জা, চঞ্চলতা হীন ইত্যাদি ২৫/২৬টি দৈবগুনের কথা বলেছেন, যা যোগীপুরুষের আয়ত্ত্ব করতে হবে। এর আগের শ্লোকে আমরা গোটা দশেক গুনের কথা শুনেছি, এবারের শ্লোকেও এমনিতর কিছু গুনের কথা শুনবো, যা যোগীপুরুষের মধ্যে লক্ষিত হয় ।   

অহিংসা : হিংসা, বহির্মুখী জীবের স্বাভাবিক ধর্ম্ম। যতদিন নিজের মধ্যে বিন্দুমাত্র সুখের লালসা থাকবে, ততদিন, সে তার ইচ্ছে পূরণ করবার জন্য, এই হিংসার আশ্রয় নেবে। এমনকি পরশ্রী-কাতরতা থেকেও  আমাদের মধ্যে হিংসার জন্ম হয়। অর্থাৎ নিজের মধ্যে যে অপূর্ন বাসনা সঞ্চিত আছে, তার পূরনার্থে অন্যকে পীড়ন না করে উপায় নেই। একমাত্র যাঁদের বাসনা সংযত হয়েছে, যার মধ্যে নিজের সুখ-লাভের, অভিলাষ পূরণের ইচ্ছে দমিত হয়েছে তার পক্ষেই অহিংস হওয়া সম্ভব। সর্ব্বধর্ম্মের মধ্যেই "অহিংসা পরমধর্মঃ" বলে আখ্যাত  করা হয়েছে। মনের মধ্যে ক্রূরতা  না এলে হিংসাবৃত্তি জাগে না। আর এই ক্রূরতার  ফলে মনের মধ্যে কলুষতা বৃদ্ধি হয়, যা আসলে যোগ সাধনের পক্ষে বাধা স্বরূপ। আসলে সাধনার পরাবস্থায় সাধকের মধ্যে এই অহিংসার ভাব লক্ষিত হয়। 

সত্য : যে যেমন, তাকে সেইভাবে দেখাকেই বলে সত্য। বাহ্য দিক থেকে বলতে গেলে বলতে হয়, মিথ্যার বিপরীত সত্য। আর এই মিথ্যা হচ্ছে এই অনিত্য জগৎ।  আর সত্য হচ্ছে একমাত্র ব্রহ্ম। ক্রিয়ার পরাবস্থায় এই উপলব্ধি হয়ে থাকে। তখন জগতের সমস্ত দৃশ্য-পদার্থের অস্তিত্ত্ব বিলোপ হয়ে থাকে। 

অক্রোধ : বাসনার অপূর্তিতে ক্রোধের জন্ম হয়ে থাকে। কিন্তু সাধনকালে মন যখন সাম্যাবস্থায় বিরাজ করে, তখন মনের মধ্যে বৈরীভাবের উদয় হতে পারে না। ইচ্ছেশক্তির বিলোপ হওয়ায়, বাসনার উদ্রেগ হতে পারে না। তখন আপন-পর বোধের বিলোপ ঘটে। তো যখন আপন-পর বোধই নেই, তখন আর কার উপরে রাগ হবে ? 

ত্যাগ : ত্যাগই হচ্ছে সন্ন্যাস ধর্ম্ম। সাধনার উত্তম অবস্থায় বাহ্য কোনো কিছুতেই আসক্তি থাকে না। তখন না ভোগ, না ত্যাগ, এ এক অদ্ভুত সাম্যের অবস্থা। অর্থাৎ তখন  সাধক সমস্ত বস্তুর প্রতি স্পৃহাশূন্য হয়ে যান। 

শান্তি : সাধন ক্রিয়ার পরাবস্থায় একটা অহেতুক শান্তির মধ্যে  বিরাজ করেন সাধক । মন যখন বাসনা হীন হয়, মন যখন যখন সঙ্কল্পশূন্য হয়, অর্থাৎ প্রাণের ক্রিয়া যখন শূন্যপ্রায় হয়ে যায়, তখন মনের যে ক্রিয়া (চিন্তা)  স্তব্ধ হয়ে যায়,  তখন মনের মধ্যে একটা নিস্তরঙ্গ ভাব বিরাজ করে। একেই বলে শান্তি। 

অপৈশুন : কারুর দোষ  না দেখা। খল স্বভাবের লোকেরা অপরের দোষ অন্বেষণ করে বেড়ায়। আর এইভাবের মধ্যে সে একটা বিকৃত আনন্দ অনুভব করে থাকে । কিন্তু সাধন ক্রিয়ার মধ্যে যারা একবার প্রবেশ করতে পেরেছেন, তাদের মধ্যে এই স্বভাবের বিলুপ্তি ঘটে।  আসলে কার দোষ  দেখবেন, সবই তো আমি, সবই সে ব্রহ্ম  স্বরূপ আমি, আমারই স্বরূপ সর্বত্র ভিন্ন-ভিন্ন নামরূপে প্রকাশ হচ্ছে মাত্র।  তো খলতা কার উপরে প্রয়োগ করবেন ?

ভূতে দয়া : পঞ্চভূতের তৈরী পিতৃ-মাতৃ প্রদত্ত এই শরীর। আবার  এই স্থূল ভূত-শরীরের মধ্যেই অবস্থান করছেন, সেই পরম-পুরুষ। তো যিনি বা যে দেহ  পরমপুরুষের শয়ান ক্ষেত্র, সেই পঞ্চভূতের দেহকে  সর্বদা দয়ার ভাব স্বাভাবিক ভাবেই এসে যায়। এর মানে এই নয়, যে শরীরের প্রতি মায়া বা মোহ জন্মাবে  । শরীরের প্রতি সাধকের মায়া  বা মোহ  না থাকলেও তা যে পরমপুরুষ অবস্থান-ক্ষেত্র তাইতো এই শরীরকেও যত্ন করতে হবে।   আসলে শ্বাসের মাধ্যমে এই শরীরকে রক্ষা করাই ভূতে দয়া। শ্বাসকে ছন্দবদ্ধ করে, শরীরের সাম্যতা বজায় রাখা। আমরা জানি, শরীরের মধ্যে  সাম্যতার অভাবের কারণেই, আমাদের শরীর  অসুস্থতা  বোধ করে। কিন্তু যোগীপুরুষের শরীরে সাম্যাবস্থা বজায় থাকায়, তিনি শারীরিক অসুস্থতা বোধ করেন না। একেই বলে সর্বভূতে দয়া। যা আমাদের শরীর-মনকে শুদ্ধ রাখতে সাহায্য করে। পরম-পুরুষের আবাস-স্থলকে ভিতরে-বাইরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা।   

অললুপতা : ব্রহ্মে স্থিত পুরুষ কখনো বাহ্য বস্তুর প্রলোভনে পড়েন না। তাঁর ইন্দ্রিয়সমূহ সংযত থাকার ফলে, ইন্দ্রিয়লব্ধ বিষয় তাকে আকর্ষণ করতে পারে না। আসলে সাধনার উচ্চ অবস্থায় সাধকের সমস্ত বহিরিন্দ্রিয় নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে। আর তিনি সমস্ত বস্তুর মধ্যেই সেই এক ব্রহ্মকে উপলব্ধি করতে থাকেন। 

মার্দ্দব : একটা স্থির ভাব, একটা শান্ত ভাব।  সাধকের  ব্যবহারের মধ্যে একটা কোমল স্বভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। কখনো তিনি উগ্র নন, কখনও ক্রূর নন। তার মধ্যে কোনো ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠার লক্ষণ থাকে না। আসলে যা পাবার তা তিনি পেয়ে গেছেন। নতুন করে তাঁর আর কিছুই পাবার নেই, তাই আগ্রহ-অনাগ্রহ লোপ পেয়ে থাকে। 

লজ্জা : লজ্জা কথার অর্থ নমনীয়তা। হৃদয়ের কোমলবৃত্তি। হৃদয়ের এই কোমলবৃত্তি থাকার কারণেই, কোনো পরিস্থিতিই  সাধককে ব্রহ্ম থেকে চ্যুত করতে পারে না। স্ত্রী যেমন স্বামী ভিন্ন অন্য কারুর সামনে ঘোমটা উন্মোচন করেন না, তেমনি সাধক ব্রহ্মভিন্ন সব কিছু থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখেন। 

অচাপল্য : চঞ্চলতা বিহীন অবস্থা। মানুষের মন সদা দশ ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিষয় থেকে বিয়ান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানুষের মন এক দণ্ডের জন্যও স্থির হতে পারে না। কিন্তু সাধকের মন চপলতা বিহীন হয়ে কেবলমাত্র ব্রহ্মানন্দ  ভোগ করছে।  মানুষ মনের চঞ্চলতা হেতু, পাগলপ্রায় হয়ে এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে  ছোটাছুটি করছে। কিন্তু যোগ অভ্যাসকারীর মন ধীরে ধীরে শান্ত হতে থাকে।  ধীরে ধীরে এতটাই শান্ত হয়, যে তিনি একসময় সমাধিতে ডুবে যান। 

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।     

 ১৩.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা -  ষোড়শ অধ্যায় দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগ যোগঃ
শ্লোক ১৬/৩

তেজঃ ক্ষমা ধৃতিঃ শৌচম অদ্রোহো নাতিমানিতা 
ভবন্তি সম্পদঃ দৈবীম-অভিজাতস্য ভারত। (১৬/৩)

হে ভারত, তেজস্বিতা, ক্ষমা, ধৃতি, শৌচ, অদ্রোহ, নিরভিমানিতা এসব গুণগুলো জাতকের দৈবী সম্পদ। 

এর আগের দুটো শ্লোক ১৬/১-২) থেকেই  আমরা যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের  মুখে আমরা দৈবী সম্পদ সম্পর্কে শুনছি। এবার বলছেন, যথার্থ যোগীপুরুষ অবশ্য়ই তেজস্বী হয়ে থাকেন। এই তেজ বাইরে থেকে প্রাপ্ত নয়।  এই তেজ তাঁর অন্তঃস্থিত  ব্রহ্মজ্যোতি। সমস্ত বাহ্যবিষয়কে তিনি অগ্রাহ্য করতে পারেন, সমস্ত বিষয়কেই তিনি ক্ষমা করে থাকেন। তাঁর না আছে, মান-সম্মানের অভিলাষ না আছে অপমানের গ্রাহ্যতা। মান-অভিমানের উর্দ্ধে উঠে তিনি এক উদাসীন পুরুষ।  

তেজ : সাধকের মনে থাকে প্রবল উৎসাহ, থাকে সাহস, হৃদয়ের মধ্যে প্রেমপূর্ণ বল। অন্তরে থাকে এক তেজদীপ্ত ভাব। মনকে তিনি বশে এনেছেন। কাম-ক্রোধ, লোভ, মোহ থেকে দূরে এক সত্য-ধর্ম্ম পথের পথিক তিনি। যোগবলেই তার মধ্যে দীপ্তির প্রকাশ ঘটেছে। আর এর ফলে তার মধ্যে বিষয়কে বোঝার যেমন ক্ষমতা এসেছে, তেমনি যাকিছু কোরবার ক্ষমতা এসেছে। কিন্তু  সব দেখেও তিনি কিছুই দেখেন না, সব জেনেও তিনি কিছুই বোঝেন না, সব করেও তিনি কিছুই করেন না। তার দ্বারা যাকিছু কৃত হয়, তা কেবলমাত্র লোকহিতার্থে হয়ে থাকে। 

ক্ষমা : সাধন বলে যোগীর  মধ্যে ক্রোধের প্রশমন হয়েছে, তার ভিতরে ক্ষমাগুন জাগ্রত হয়েছে। সমস্ত তেজঃ  শক্তির অধিকারী হয়েও তিনি ভোলানাথ। কোনো তাড়নাই তাঁকে তাপিত করতে পারে না। তাই বলে তিনি অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন, প্রতিবাদ করেন না, ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়।  আসলে সাধকের তেজদীপ্ত ভাব, সবাইকে সতর্ক থাকতে বাধ্য করে। 

ধৃতি :  ধারণ করবার ক্ষমতা। যে বৃত্তি দ্বারা যোগী দেহ-মন-ইন্দ্রিয়সকলকে উত্তেজিত হওয়া বা অবসন্ন হওয়াকে প্রতিরোধ করতে পারে, তাকেই বলে ধৃতি। যোগ সাধকের পক্ষে এই ধৃতি-বিদ্যা আয়ত্ত্ব করা জরুরী। আবার সাধনার আগ্রহ ও গভীরতা যত  বাড়তে থাকে তত সাধকের মধ্যে এই ক্ষমতা আপনা-আপনি জেগে ওঠে।  যার জন্য, সব অবস্থাতেই তিনি অবিচল থাকতে পারেন।

শৌচ : শরীরকে যেমন বাইরের দিক থেকে পরিষ্কার পরিছন্ন রাখতে হবে, তেমনি দরকার অন্তঃকরনের  শুদ্ধি। শুভ চিন্তন, আত্মচিন্তন, অন্তঃ শৌচের ঔষধ। আসলে শৌচ তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন ক্রিয়ার উত্তম অবস্থায় সাধক স্থিত হতে পারেন। তিনি যখন আত্মাতে স্থির হন, তখন শৌচ কর্ম্ম সম্পন্ন হয়। মন তখন চিদাকাশে, আর এই চিদাকাশ থেকে শুচি-শুভ্র   আর কিছু নেই। 

অদ্রোহ : কারুর অনিষ্ট চিন্তা না করাকেই বলে অদ্রোহ। তো যিনি আত্মচিন্তায় মগ্ন, তার দ্বারা অনিষ্ট চিন্তা, বা অনিষ্ট কাজ করবার উপায় থাকে না। অদ্রোহ কথাটার আরো একটা অর্থ হচ্ছে  বিরোধ না করা। আত্মচিন্তায় যিনি উদাসীন, তার মধ্যে বিরোধের বীজ নিঃশেষ  হয়েছে। 

অনতিমানিতা : আত্ম্ভরী ভাব। আমি বড়ো  যোগী।  আমি প্রকৃতির উপরে প্রভুত্ত্ব বিস্তার করতে পারি। আমি ভগবানের উপরে প্রভুত্ত্ব বিস্তার করেছি।  আমি যা বলি, ভগবান তাই করেন। সবাই জানুক, আমার থেকে বড়ো  যোগী এ যুগে  আর কেউ নেই। আমিই লোকের মুক্তির কারন। আমিই পূজ্য। অনেকে-তো ঘটা করে আসনে বসে, ভক্তের পাদ্যার্ঘ গ্রহণ করে থাকেন।  সাধনায় ক্ষানিকটা অগ্রসর হয়েও, সাধকের এই আত্ম্ভরী ভাব থেকে যায়। এসব আসলে সাধন পথের অন্তরায়। এদের মনের অভিলাষ এখনো অপূর্ন। সাধনের পরাবস্থায় এই ভাব অন্তর্হিত হয়। তখন সব ব্রহ্মময় - ছোট বড়ো ভেদ ঘুচে যায়। গুরু-শিষ্য ভেদ ঘুচে যায়। 

এই হলো দৈবী সম্পদ।  এই দৈবীসম্পদ  কেউ একজীবনে  লাভ করতে পারেন  না। জন্ম-জন্মান্তরের সাধনার ফলে, মানুষ এই সম্পদের অধিকারী হয়ে থাকেন ।  যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের  শ্রীমুখে আমরা শুনেছি, " হে অর্জ্জুন, আমি তুমি  বহু জন্ম ব্যাতিত করেছি, আমি সে-সব জানি, আর তুমি তা জানো না।" আমরা শুনেছি, পূর্বজন্মে নর ও নারায়ণ নামে অর্জ্জুন-শ্রীকৃষ্ণ সাধনা করেছেন। এঁরা সবাই জন্ম-জন্মান্তরের সাধক।  যাইহোক, জগৎগুরুর কৃপায়, জীবের উত্তরোত্তর উন্নতি হবেই এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। , কিন্তু  পুরুষকারের প্রয়োগের তারতম্য অনুসারে, জীবের উন্নতি ত্বরান্বিত হবে বা শ্লথগতি সম্পন্ন হবে। যিনি যেপথে হাঁটবেন, সেই পথেই তার গতি হবে, এর কোনো অন্যথা হবে না। 

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়। 
   
১৪.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা -  ষোড়শ অধ্যায় দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগ যোগঃ
শ্লোক ১৬/৪

দম্ভো দর্পোঽভিমানশ্চ ক্রোধঃ পারুষ্যমেব চ 
অজ্ঞানং চাভিজাতস্য পার্থ সম্পদমাসুরীম। (১৬/৪)

হে পার্থ, দম্ভ, দর্প, অভিমান, ক্রোধ, নিষ্ঠুরতা এবং অজ্ঞান আসুরী ব্যক্তি প্রাপ্ত  হয়ে থাকে। 

মনে মনে নিজেকে বর্ণশ্রেষ্ঠ ভেবে দেমাকে মাটিতে পা পড়ে না, জ্ঞানের গুঁতোয় ভোঁসভোঁস করে, ৫৬ ইঞ্চি চওড়া বুক চাপড়ে গায়ের জোরের বড়াই করে।  সবাইকে তাচ্ছিল্য করা, নিষ্ঠূর বাক্য  প্রয়োগ, ইত্যাদি যার স্বভাব, তারা আসলে অজ্ঞান। এরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, এরা  সাধনক্রিয়ায় বৃথা সময় ব্যয় করতে চায়  না। এইসব দুঃশক্তি আসলে আসুরি সম্পদ। 

দম্ভ : ধার্ম্মিকতার ধ্বজাধারি, হাতে মালা, কপালে চন্দন, গলায় তুলসীর মালা, কিন্তু মন ঘুরে বেড়েছে অন্যত্র। বিষয় চিন্তায় মন মগ্ন।  মন্দিরের পুরোহিত সেজে লোকচক্ষুর সম্মুখে চক্ষু মুদ্রিত করে ধ্যানের ভান। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান করবার জন্য মুখে গীতার মুখস্ত করা বাণী, বিনয়ের পরাকাষ্ঠা। নিজেকে কুলীন বংশজাত বলে অভিমান, কিন্তু কাজের বেলায় বা স্বভাবে ইতরপ্রাণীর চেয়েও নিকৃষ্ট। এইরূপ ব্যক্তিকে বলা হয় দাম্ভিক। 

দর্প : ধনে-মানে-বিদ্যায়-বুদ্ধিতে আমার চেয়ে আর বড়ো  কে আছে ? ধন-জনের গর্ব্বে মাটিতে পা পড়ে  না। বুক চিতিয়ে, লাঠি দিয়ে তাল ঠুকে রাস্তায় হাটে। সবার কথায় নাক সেঁটকায় - ভাবটা এমন যেন, নতুন আর কি বললে, এসব আমার  জানা আছে।  তুমি যে কত ছোট, তোমার থেকে আমি যে কত বড়ো, সে আর মুখে কি বলবো ? নিজেকে পূজ্য আর অন্যকে তুচ্ছ বলে জ্ঞান করা। অন্যের প্রশংসার  কথা শুনলে, রেগে যায়। অন্যের প্রশংসা সে শুনতে পারে না।  নিজেকে মনে করে সবজান্তা, সর্বজ্ঞ ।

অভিমান : সব বিষয়ে আমিই শ্রেষ্ঠ, ধন-মান-জনে আমার থেকে শ্রেষ্ঠ আর কে আছে ? ধন-মান-জন-জ্ঞান থাকা ভালো, কিন্তু এগুলো এই আছে এই নেই। আর তা ছাড়া, এই সম্পদের কোনো উর্দ্ধসীমা হয় না। জ্ঞানের শেষ নেই - তাই জ্ঞানের অভিমানে কাউকে তাচ্ছিল্য করতে নেই। বরং আমি তুচ্ছ, কীই বা জানি, আর জ্ঞানের যিনি দাতা, নাজানি তিনি কতো জ্ঞানী - এই ভেবে নিজেকে সংযত রাখা ভালো। পান্ডিত্য ভালো, কিন্তু পন্ডিতের অভিমান ভালো নয়, যা   আসুরিক ভাবের মানুষের মধ্যে দেখা যায়। 

ক্রোধ : ক্রোধ হচ্ছে বায়ু-পিত্ত-কফের  অসাম্যের লক্ষণ। আসলে আমাদের শ্বাসের দীর্ঘ গতির সঙ্গে আমাদের কাম-ক্রোধের একটা সম্পর্ক আছে। এইজন্য যাদের মধ্যে শ্বাসের নিয়ন্ত্রণ নেই, তাদের মধ্যে এই ক্রোধের প্রাবল্য দেখা যায়।  এখান থেকে বেরিয়ে আসতে  না পারলে, আমাদের সাধন জগতে প্রবেশ সম্ভব হবে না। 

পারুষ্য: অন্যকে আঘাত দিয়ে কথা বলা। নিষ্ঠুর বচন  সত্য হলেও বলতে নেই।  অন্ধকে অন্ধ বলা, খোঁড়াকে  খোঁড়া বলা, দুর্ব্বলকে দুর্ব্বল বলা, কারুর জাতি-কুল নিয়ে কথা বলা নিষ্ঠুরতার সামিল। 

অজ্ঞান : প্রতিটি জীব জন্মসূত্রে অজ্ঞান। ধীরে ধীরে সে পরিবেশ পরিস্থিতি থেকে সে জ্ঞানের আলোক প্রাপ্ত হয়। আমরা বাইরে থেকে তথ্যভিত্তিক যে  জ্ঞান সংগ্রহ করি তা অপরা বিদ্যা, এই অপরা বিদ্যা সদা পরিবর্তনশীল। আজকের আপনি, আর কালকের আপনি এক নন। তো আজকের আপনার সম্পর্কে যে জ্ঞান আমি সংগ্রহ করলাম, তা আর কালকে সত্য থাকবে না। তাই আমরা দেখতে পাই, বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত নতুন কথা বলছে।  কিন্ত জ্ঞান হবে, অপরিবর্তনীয়। পরাবিদ্যা হচ্ছে প্রতক্ষ্য ও স্থির জ্ঞান। যা আসলে নিত্যবস্তুর কাছে থেকে এসে থাকে। তো প্রকৃত ও প্রতিষ্ঠিত জ্ঞান বিবেক-বুদ্ধি জাত।   
তাই বিবেককে অগ্রাহ্য করে, কর্তব্য-অকর্তব্যঃ বিচার না করে আলস্যে দিন যাপন করাই  মূঢ় ব্যক্তির  লক্ষণ।  নিজের ইচ্ছে আর কাম-বাসনা পূরণের জন্য প্রত্যাশী হয়ে কর্ম্ম করাই  অজ্ঞানীর লক্ষণ। দেখুন প্রকৃতপক্ষে জ্ঞান বাইরে থেকে আসে না, জন্মের সঙ্গে  সঙ্গেই আমরা আমাদের জ্ঞানভান্ডার  নিয়েই এই মর-জগতে প্রবেশ  করি। কিন্তু এই জ্ঞান থাকে সুপ্ত। এই জ্ঞানের আলোক প্রজ্বলিত করাই সাধনার উদ্দেশ্য। আবার আমরা সব বুঝি, কিন্তু সেইমতো ভালো কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারি না, তার কারন হচ্ছে আমাদের পূর্ব-পূর্ব জন্মের সংস্কার। এই সংস্কার গুলোকে যদি ধরতে পারেন, যা ধ্যানের  সাহায্যে সহজেই ধরা সম্ভব, তাহলে পুরাতন সংস্কারকে সংশোধন করা, আবার নতুন সংস্কারের জন্ম দিতে পারা যায়। এই কাজ সহজ না হলেও অসাধ্য নয়। আসলে সত্যের বিপরীত যে বুদ্ধি তাকেই বলে অজ্ঞান। অজ্ঞান মানে কিছুই জানে না, এমন  নয়, অজ্ঞান হচ্ছে ভ্রান্ত জ্ঞান। আর এই অজ্ঞান হচ্ছে অসুরদের সম্পদ। প্রজাপতি ব্রহ্মা বললেন, "দ" - দেবতারা বুঝলেন, ভগবান দান  করতে বলছেন, আর অসুর বুঝলেন, সবাইকে দমন করতে বলছেন। ব্রহ্মা আবার বললেন, "দ" অসুররা বুঝলেন,  সবাইকে দমন করো, দেবতারা  বুঝলেন ভগবান ইন্দ্রিয় দমন করতে বলছেন । তো আসুরিক বুদ্ধি আর দৈব বুদ্ধির এখানেই ফারাক।  

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়। 
    
 ১৫.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা -  ষোড়শ অধ্যায় দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগ যোগঃ
শ্লোক ১৬/৫

দৈবী সম্পদ-বিমোক্ষায় নিবন্ধায়-আসুরী মতা 
মা শুচঃ সম্পদং দৈবীম-অভিজাতো-অসি পাণ্ডব। (১৬/৫)

দৈবী  সম্পদ মোক্ষের  হেতু আর আসুরী সম্পদ বন্ধনের  কারন। হে পাণ্ডব শোক করো না, কেননা তুমি দৈবী সম্পদ নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেছো। 

দৈবী  সম্পদের যিনি অধিকারী, তিনি গুরুদেবের  কথায় গুরুত্ত্ব দেন, আর যিনি গুরু কথায় গুরুত্ত্ব দেন, মনোযোগী হন, গুরুর কথা অনুযায়ী চলেন, তাকে গুরুদেব তার সর্ব্বস্য দিয়ে সাধন পথে সাহায্য করেন। অন্যদিকে  যারা আসুরী সম্পদের অধিকারী, তারা সংসারে আগ্রহী হন, বৈষয়িক হন। এরা  আধ্যাত্মিক পথের ধরে কাছে থাকেন না। তবে মন্দির মসজিদে এদের যে দেখা পাওয়া যায় না, তা নয়, এরা দুটো কারনে মন্দির মসজিদ, গির্জায় যান, প্রথমত ওখান থেকে যদি কিছু বৈষয়িক লাভ হয়, কারন তারা বিশ্বাস করেন  যে লক্ষীর ভান্ডার, ও জাগতিক দুঃখ-হরক ক্ষমতা আছে, ঐসব প্রতিষ্ঠিত দেবতাদের কাছে। দ্বিতীয়ত সামাজিক প্রতিষ্ঠার জন্য বা একটা বিশেষ ভাব-মূর্তির - অর্থাৎ আমি বড়ো  ধর্ম্মিক, আমি বড়ো  দাতা, এটা সর্ব্বসন্মুখে প্রচার করা এদের উদ্দেশ্য। 

পূর্ব-পূর্ব জন্মের কর্ম্মফলের কারণেই মানুষ, হয় আসুরী সম্পদ, নয় দৈবী সম্পদ নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে থাকে। আসলে সংস্কার, পূর্ব জীবনের কর্ম্মফলজাত ।  এই সংস্কারকে সঙ্গে নিয়েই জীব পুনরায় জন্ম গ্রহণ করে। বাসনাবহুল চিত্তবিশিষ্ট মানুষ জন্ম থেকেই জাগতিক ভোগ সুখের দিকে লালায়িত হয়। জীবের স্বাভাবিক ধর্ম্ম হচ্ছে, আনন্দের সন্ধান করা। আর এই কারণেই, সে বিষয়ের দিকে ধাবিত হয়। বিষয়ে সুখ আছে, এটি ভ্রমাত্মক জ্ঞান থেকে হয়ে থাকে। জগতের সবকিছু যেমন ক্ষণস্থায়ী, তেমনি জাগতিক বিষয়সুখও ক্ষণস্থায়ী। বিষয় সুখের পিছনেই দাঁড়িয়ে থাকে বিষয়বেদনা। ফলতঃ  বিষয়সুখ শীঘ্রই তাকে বেদনার সামনে দাঁড়  করিয়ে দেয়। কিন্তু ওই যে ক্ষনিকের বিষয়সুখ, তাকে আবার আকৃষ্ট করে। বিষয় সুখের বাইরে যে নির্মল  আনন্দ থাকতে পারে, সে সম্পর্কে সে উদাসীন থাকে। এইজন্য দরকার শাস্ত্রগ্রন্থ পাঠ, সাধুসঙ্গ। আর এই সাধুসঙ্গ ও শাস্ত্র অধ্যায়নের ফলে, ধীরে ধীরে তার ধারণার মধ্যে  পরিবর্তন আসে, একসময় যথার্থ সুখ সম্পর্কে সে আগ্রহী হয়ে ওঠে। তখন গুরুমুখে আত্মার গুনগান শুনে, একসময় সে আত্মার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে । এই আত্মার সন্ধানে জীব যখন ব্যাকুল হয়, তখন বিষয়-বৈরাগ্যের জন্ম হতে থাকে। আর এই বিষয় বৈরাগ্যই তাকে একসময় দৈবীসম্পদ-এর সন্ধান দেয়।  আর সে ধীরে ধীরে দৈবীসম্পদ সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই দৈবীসম্পদ সংগ্রহের চিন্তা থেকে তার মধ্যে একটা সংস্কারের জন্ম হয়। এই সংস্কার নিয়েই সে একসময় প্রাকৃতিক নিয়মে স্থুল দেহ ছেড়ে দেয়। কিন্তু এই স্থুল দেহ ছেড়ে দিলেও, অর্থাৎ তার মৃত্যু ঘটলেও, জীবাত্মা এই সংস্কারগুলোকে নিয়ে ঘুরতে থাকে। আর পরবর্তী জীবনে অর্থাৎ নতুন দেহে সে সেই পূর্বজন্মের সংস্কারগুলোকে নিয়েই প্রবেশ করে। এইজন্য দেখা যায়, কতকগুলো মানুষ জন্ম থেকেই ভগবত মুখী, আবার কেউ ভগবত বিমুখ । যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন,   হে পাণ্ডব শোক করো না, কেননা তুমি দৈবী সম্পদ নিয়েই  জন্ম গ্রহণ করেছো। অর্থাৎ অর্জ্জুন জন্ম-জন্মান্তরের সাধক, তার সংস্কারের মধ্যে ভগবত চিন্তন আছে । সে প্রেয় নয়, শ্রেয়কেই খুঁজছে। 

তো কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা দৈবী   সম্পদ নিয়েই জন্ম গ্রহণ করে থাকেন, আবার কিছু মানুষ আছেন, যারা আসুরীক সম্পদ অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ভোগের প্রতি আসক্ত, অর্থাৎ পশুধর্ম্মী। যাঁরা দৈবী সম্পদ নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে আবার দুই ধরনের মানুষ আছেন, যাঁরা ভূতাত্মা ও জীবাত্মা সম্পর্কে হৃদয়ঙ্গম করেছেন। আবার একদল আছেন, যাঁরা ভূতাত্মা, জীবাত্মা ও প্রত্যগাত্মার অর্থাৎ প্রত্যেক আত্মার সঙ্গে একীভূত হয়ে আছেন। এই দুই দলের কাছেই বিষয়-রস বিরস বলে মনে হয়। এই দুই ধরনের  জীবই  যখন জগতে আসেন, তখন সংস্কার অনুযায়ী হয় দৈবীসম্পদ বা  আসুরীসম্পদ  নিয়ে আসেন ।

দেখুন পুরুষ চিন্মাত্র। এই চিন্মাত্রের কোনো ধর্ম্ম নেই। কিন্তু এক-একটা পুরুষ অনাদি কাল থেকে বিশেষ একটা চিত্তের বা প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। প্রকৃতি যেমন চিত্তাকারে পরিণত হয়, আবার চিত্তকেই প্রকৃতি বলা হয়। এই চিন্ময় পুরুষ হচ্ছেন দ্রষ্টা, আর বুদ্ধি হচ্ছে দৃশ্য।  কারন যাবতীয় দৃশ্য বুদ্ধিতে  প্রতিফলিত হয়। আর এই যে প্রতিফলিত দৃশ্য তা অজ্ঞানের কারনে দৃশ্যমান হয়ে থাকে। আবার এই অজ্ঞানই জীবের সমস্ত দুঃখের কারন। সত্যিকথা বলতে কি আত্মার সঙ্গে কারুরই সংযোগ হতে পারে না। কিন্তু সংযোগের প্রতীতি হয়। অর্থাৎ মনে হয় যেন সংযোগ হয়েছে। এই যে মনে হওয়া একেই বলে অজ্ঞান। সাধন ক্রিয়া করতে করতে যখন অজ্ঞানের বিলোপ সাধন হয়, তখন জাগতিক কোনো বস্তুর আর কোনো অস্তিত্ত্ব থাকে না। 

চিত্ত হচ্ছে প্রাণের স্পন্দন। প্রাণের স্পন্দনকে স্থির করতে পারলে, আমাদের সমস্ত বহির্মুখী বৃত্তি অন্তর্মুখী হয়ে যায়। প্রাণায়ামের ফলে যখন প্রাণ সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হয়ে সুষুম্নার মধ্যে প্রবাহিত হতে শুরু করে চিত্তের স্পন্দনও তখন স্তিমিত হতে থাকে। আর চিত্তের স্পন্দন হ্রাস পাওয়া মানে হচ্ছে চিত্তের মধ্যে বাসনার বেগ কমতে থাকা। চিত্ত ও প্রাণ যখন বিক্ষেপশূন্য হয়, তখন বুঝতে হবে, প্রাণের শুদ্ধি  হয়েছে। এমনকি চিত্তও শুদ্ধ হয়েছে। আর এর ফলে জীব শুদ্ধসত্ত্ব হয়ে মরজগতে জন্মগ্রহণ করেছে। এরাই পরমার্থ সাধনে আগ্রহী হয় ছোটবেলা থেকেই। তাই বলে এমন ভাবার কোনো কারন নেই, যার মধ্যে জন্মসূত্রে দৈবী সম্পদ নেই, তার পরমার্থ সাধন হবে না, তা নয়, যে সম্পদ নিয়েই আপনি আসুন না কেন, একে  যেমন প্রয়োগ করতে হবে, তেমনি এই সম্পদের নাশ বৃদ্ধি আছে।  অর্থাৎ দৈব সম্পদ নিয়ে এসেও মানুষের অধঃপতন হতে পারে, আবার আসুরিক সম্পদ নিয়ে এসেও, পুরুষকারের  প্রয়োগে বা ভাগ্যক্রমে সৎগুরুর কৃপায়, নিজের মধ্যে সাধন ক্রিয়ার প্রতি অনুরাগ জন্মাতে পারে। আর যারই ক্রিয়ার প্রতি আগ্রহ, শ্রদ্ধা, অনুরাগ থাকবে, তারই  সংযম অর্থাৎ ধারণা-ধ্যান-সমাধিতে সিদ্ধি আসবে। কারুর একটু বেশি সময় লাগবে, কারুর হয়তো সত্ত্বর হবে, কিন্তু কেউই নিরাশ হবেন না।  তাই  বলা যেতে পারে, আপনি জন্ম সূত্রে কি পেয়েছেন, তার পরিবর্তন করতে পারবেন না, কিন্তু যে মনুষ্য দেহ পেয়েছেন সেই মনুষ্য দেহে সাধনার সাহায্যে সিদ্ধি লাভ সম্ভব। এইজন্য দেবতারাও মনুষ্য দেহ লাভের  প্রত্যাশা করেন। তো যা পেয়েছেন, তার সদ্ব্যবহার করুন। আর সাধন পথে এগিয়ে যান। আপনি যেখানে আছেন, সেখান থেকেই সূর্য্যের উদয় হবে..আর আপনি প্রভাতের আলোয় স্নাত হবে।  শুধু জেগে উঠুন, আর সূর্য-উদয়ের অপেক্ষা করুন। 

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।                        

১৬.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা -  ষোড়শ অধ্যায় দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগ যোগঃ
শ্লোক ১৬/৬-৮

দ্বৌ ভূৎসর্গৌ লোকেঽস্মিন দৈব আসুর এব চ
দৈবো বিস্তরশঃ প্রোক্ত আসুরং পার্থ মে শৃণু। (১৬/০৬)

হে পার্থ, এ সংসারে দৈব ও আসুর এই দুই প্রকৃতির মানুষ  দেখায় যায়।  দৈবী প্রকৃতির বৰ্ণনা বিস্তারিত  ভাবে করা হয়েছে, এবার আসুরি প্রকৃতির কথা শোনো।
 
সাধন ক্রিয়ার ফলে মানুষের মধ্যে যে দৈব সম্পদের উৎপত্তি হয়, সে সম্পর্কে আগে বলা হয়েছে, এবার এই সাধনক্রিয়া থেকে যারা দূরে থাকেন, তাদের অবস্থা কি হয় , সে সম্পর্কে বলছেন। 

প্রবৃত্তিঞ্চ নিবৃত্তিঞ্চ জনা ন বিদুরাসুরাঃ 
ন শৌচং নাপি চাচারো ন সত্যং তেষু বিদ্যতে (১৬/০৭)

আসুরি প্রকৃতি সম্পন্ন ব্যাক্তিগন ধর্ম্ম বিষয়ে প্রবৃত্তি আর অধর্ম্ম বিষয়ে নিবৃত্তি  কি তা জানে না। তাদের মধ্যে সত্য সদাচার শৌচ বলে কিছু নেই। 

মানুষের জন্মগত স্বভাব ধর্ম্ম দুই প্রকার। এক হচ্ছে প্রবৃত্তিমূলক, আর এক হচ্ছে নিবৃত্তি মূলক। প্রবৃত্তির মধ্যে আছে  শুভ প্রবৃত্তি,  অশুভ প্রবৃত্তি। আবার নিবৃত্তির মধ্যে আছে শুভকাজে অনাগ্রহ, অশুভ কাজে আগ্রহ। এই উভয় ধরনের কর্মেই মানুষের ইচ্ছেশক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা আছে। এই ইচ্ছে শক্তি যদি শাস্ত্রসম্মত হয়, অর্থাৎ শাস্ত্র দ্বারা শাসিত হয়, তবে তা শুভফল প্রদান করতে পারে।  আর অশাস্ত্রীয় হলে অশুভ ফল প্রদান করে থাকে। এইজন্য প্রথমে শাস্ত্র অধ্যয়ন বা আচার্য্য বা সৎগুরুমুখে শাস্ত্রের বাণী শুনতে হয়। যাদের এই শাস্ত্র অধ্যায়নে অনীহা, তাদের পক্ষে শাস্ত্র বিধি জানা বা সেই অনুযায়ী কর্ম্ম করা সম্ভব নয়। অসুর প্রবৃত্তির লোকেদের মধ্যে জৈবিক প্রবৃত্তটির প্রাবল্য থাকলেও, আধ্যাত্মিক পথে বা ধর্ম্ম পথে চলাবার উপায় বা ইচ্ছে থাকে না। এদের যেমন ধর্ম্মে প্রবৃত্তি তেমনি অধর্ম্মে নিবৃত্তি থাকে না। ইন্দ্রিয় ভোগ বিলাসে তারা তারা তাদের সর্বস্য শক্তি নিয়োগ করে থাকে। আর এই ভোগ্য বস্তু সংগ্রহ করবার জন্য, এরা  যেকোনো পথ বা ক্রিয়া করতে দ্বিধা করে না। এদের মধ্যে মিথ্যা, প্রবঞ্চনা,কপটতা, শারীরিক  ও মানসিক অশুচির লক্ষণ প্রকট হয়ে থাকে। এরা  যদি দৈবক্রমে সাধুসঙ্গের মধ্যে এসেও  পড়ে, সেখানেও সে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। তবে এরা  ক্ষমতায় বিশ্বাস করে। অর্থাৎ যদি শোনে অমুক সাধু লোহা থেকে সোনা বানাতে পারে, তবে এরা সহজেই সেই সাধুর প্রতি আকৃষ্ট হয়। আসলে এরা  দুর্ব্বল চেতা , অপরাধ প্রবন মন, লোভী, এমনকি এরা  ভীতু, অলস। 

ইষ্টে  নিবিষ্ট থাকাই সাধনা।  আর ইষ্টের সাধনায় যখন মন বাহ্যিক বিষয় থেকে নিবৃত্ত হয়, তাকেই বলে নিবৃত্তি। সুর বলতে সত্ত্ব গুনের অধিকারীকে বলা হয়, আর অসুর বলতে তমঃ বা রজোগুণের অধিকারীকে বলা হয়। এরা  সৎবস্তুর সন্ধানে অপারগ। কিন্তু বিষয় সম্ভোগে উন্মাদ।    

অসত্যম-অপ্রতিষ্ঠং তে জগদাহুরনীশ্বরম
অপরস্পর সম্ভূতং কিমন্যৎ কামহৈতুকম। (১৬/৮)

জগৎ সত্যশুন্য, ন্যায় অন্যায়ের  প্রতিষ্ঠা বর্জ্জিত, সৃষ্টিকর্ত্তার অস্তিত্ত্ব নেই, স্ত্রী পুরুষের সংয়োগেই জীবকুলের সৃষ্টি - এছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। 

এরা  মনে করে জগতে সত্যের কদর নেই। ন্যায় অন্যায় বলে কিছু নেই। জগতে এরা কেবল মাত্র ভোগের জন্য এসেছে। এরা মনে করে মাতা-পিতার কামবাসনা থেকে এদের উৎপত্তি। এর বাইরে কোনো সৃষ্টিকর্ত্তা নেই। এরা  জগৎকে মিথ্যে বলে মনে করে না, যেমনটি জ্ঞানী ব্যক্তিরা মনে করেন । কিন্তু জগতের কোনো নিয়ন্ত্রক আছেন, তা তাদের বোধের বাইরে থাকে। জগৎকে এরা ভোগের আবাস্-স্থল  বলে মনে করে।  এদের সম্পর্কে যত  কম আলোচনা করা যায়, ততই ভালো। 

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।  

১৭.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা -  ষোড়শ অধ্যায় দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগ যোগঃ
শ্লোক ১৬/৯-১২

এতাং দৃষ্টিম-অবষ্টভ্য নষ্টাত্মানঃ অল্পবুদ্ধয়ঃ 
প্রভবন্তি-উগ্রকর্ম্মাণঃ ক্ষয়ায় জগতঃ অহিতাঃ। (১৬/৯)

এমনিতর দৃষ্টিকে আশ্রয় করে নষ্ট আত্মা অল্পবুদ্ধি উগ্ৰকৰ্ম্ম-কারী জগতের অমঙ্গলকারী ব্যক্তি  জগতের বিনাশের  জন্যই জন্ম গ্রহণ করে থাকে। 

যাদের সাধন ভজন নেই, তাদের আত্মা সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা  থাকে না। এরা  দেহাভিমানী আর দেহপাশে অবাধ্য  হয়ে, দেহের পালন পোষন করেই , সারাটা জীবন কাটিয়ে দেয়। এমন কোনো অকর্ম্ম কুকৰ্ম্ম  নেই, যা এরা  করতে পারে না। এদের বুদ্ধি তমসাচ্ছন্ন। খাওয়া-শোয়া আর যৌন ক্রিয়া এই এদের জীবন ধারা। এরা  এতটাই স্বল্প বুদ্ধি সম্পন্ন হয়, যে এরা অজ্ঞান বা ভ্রমজ্ঞানকেই শ্রেষ্ঠ মনে করে। এদের জ্ঞানের বিষয়ও স্বল্প। আত্মা বা যথার্থ জ্ঞানের এরা  ধার ধারে না। এরা  শুদ্ধ আত্মাতে শুধু অবিশ্বাসী নয়, এরা যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভাষায়  "নষ্ট-আত্মা"। এরা  মনুষ্য দেহধারী হলেও  স্বভাবে পশুবৎ। এরা  হিংসাপ্রবণ। এরা ন্যায়নীতির ধার ধারে না। অসৎ উপায়ে জাগতিক ভোগলিপ্সা এদের এতটাই প্রবল যে শাস্ত্রনিষিদ্ধঃ কাজে এরা পিছপা হয় না। আসলে এদের সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে, পশুদেরও অপমান করা হবে। প্রকৃতির নিয়মের ফাঁক  গলে, অজ্ঞাসারে কোনো সুকর্ম্মের ফলে হয়তো এদের মনুষ্য দেহ প্রাপ্তি হয়েছে, কিন্তু পশুজন্মের শেষ এদের এখনও  হয়নি।  এদের আবার সেই পশুশরীরেই ফিরে যেতে হবে। এরাই  মায়ের অশুভ সন্তান, এরাই মাতৃহন্তাকারী - পিতৃহন্তাকারী, সর্ব্বোপরি  জগতের ধংশকারী। এরা  সমগ্র জীব-জগতের জন্য অহিতকারী হয়ে থাকে।      

কামম -আশ্রিত্য দুষ্পূরং দম্ভমানমদাম্বিতাঃ 
মহাদ গৃহিত্বা-অসদ-গ্রাহান প্রবর্ত্তন্তে অশুচিব্রতাঃ। (১৬/১০)

দুষ্পূরণীয় কামকে আশ্রয় করে, দম্ভ, মান  ও মদমত্ত হয়ে মোহ বশতঃ অসৎ আগ্রহ ও অশুভ সিদ্ধান্ত অবলম্বন করে, অশুচি কর্ম্মে প্রবৃত্ত হয়। 

এইযে উগ্ৰ-স্বভাবের  ব্যক্তি, এদের কামনার শেষ নেই। আর কামনার বশবর্তী হয়ে দম্ভ মান ও মদ এই তিনটির সাথে সারাক্ষন যুক্ত থাকে। এরা  দেবতার আরাধনা করে অন্যের ক্ষতি করবার জন্য, বা ধনাদি লাভের  জন্য। এরা  অনেক সময় উগ্র সাধুর ভান করে কামকে চরিতার্থ করে থাকে। এরা  অং-বং-জং কত যে মন্ত্র জপ করে তার ঠিক নেই। এদের চিত্ত অশুচি হবার ফলে, এদের দ্বারা কোনো সাত্ত্বিক কাজ  হবার সম্ভাবনা থাকে না। এদের আহারাদিতেও অশুচি লক্ষ করা যায়। এমনকি এরা অনেক সময়  রক্ত পান করতেও দ্বিধা করে না। এদের বিচারবোধ অত্যন্ত নিম্ন মানের। ফলত  এরা  সৎসঙ্গ থেকে দূরে থাকে। ভালো কোনো কিছুতেই এদের প্রবৃত্তিতে  আসে না। এরাই  সমাজে চোর, ডাকাত, বদমায়েশ, প্রবঞ্চক। লোককে ভয় দেখিয়ে বিত্তহরন, এদের পেশা। এরা  এমন কোনো অপকর্ম্ম  নেই, যা করতে পারে না। খুন, ডাকাতি, রাহাজানি এদের রক্তে মিশে আছে। ইন্দ্রিয় ভোগের জন্য এরা  সদাই উদ্যত। শত চেষ্টা করেও, এদেরকে ভালপথে আনা  যায় না। আমার মাঝে মধ্যে মনে হয়, কলিযুগে হয়তো এদেরই সংখ্যাধিক্য। এদেরই রাজত্ব। কলিযুগে এরাই রাজা সেজে দেশ শাসন করবে। মারামারি, দাঙ্গাবাজি, যুদ্ধ এদের কাজের মধ্যে পড়ে।  আজকাল খবরের কাগজেও   এদেরই  কুকর্ম্মের প্রচার চলছে । শ্রী গীতায় ভগবান এদের খোঁজ দিতেও কার্পণ্য করেন নি। 

চিন্তাম-অপরিমেয়ান-চ প্রলয়ান্তামুপাশ্রিতাঃ
কামোপভোগপরমা এতাবৎ-ইতি নিশ্চিতাঃ ( ১৬/১১)

প্রলয়কাল পর্যন্ত অর্থাৎ মৃত্যু পর্যন্ত অপরিমেয় চিন্তাকে আশ্রয় করে কাম ভোগ পরায়ণই পুরুষার্থঃ - এমটাই এরা ভেবে থাকে। 
মৃত্যুকাল পর্যন্ত এদের এই কাম চিন্তার বিরাম ঘটে না। আমার্ ভাবতে অবাক লাগে, সমস্ত মানুষের দেহ-তো সেই চৈতন্য যুক্ত হয়েই আছে। তাহলে এরা  কেন কামভোগকেই জীবনের চরম চরিতার্থ বলে মনে করে। এরা  অবশ্য মনে করে, মৃত্যুতেই মানুষের সব শেষ হয়ে যাবে। দেহান্তের পরে আর কোনো ভোগ বা দুর্ভোগ করতে হবে না।  সারাজীবন ধরে যে কুকৰ্ম্ম সে করে, তারজন্য হয়তো তাকে জবাব দিতে হবে না, বা সেই কুকর্ম্মের ফলও ভোগ করতে হবে না। এইজন্য তারা এই জীবনেই কামভোগের শেষ দেখে নিতে চায়। এরা  ভগবানে বিশ্বাস করে না তা নয়, তবে  ভগবানকে এরা কেবল একজন বিশাল দাতা, শত্রু হন্তাকারী, এবং মঙ্গলময় বলেই মনে করে। কিন্তু ভগবান যে মহাকাল, ভগবান যে কতটা বিচারশীল, তা এদের মাথার মধ্যে আসে না। আসুরী প্রবৃত্তির মানুষ কাম-ভোগের চিন্তা নিয়েই থাকে, একেই এরা পুরুষার্থঃ বলে মনে করে।  

আশাপাশ-শতৈর্ব্বদ্ধাঃ কামক্রোধ পরায়ণাঃ
ঈহন্তে কামভোগার্থম-অন্যায়েন-অর্থসঞ্চয়ান। (১৬/১২)

(এইসব মানুষগুলো ) আশারূপ যে শত শত পাপ তার দ্বারা বদ্ধ  হয়ে আছে। কাম ও ক্রোধ পরায়ণ ব্যাক্তিগন কামভোগের  জন্য অসৎ উপায়ে অর্থ সঞ্চয়ের ইচ্ছে করে। 

যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই উক্তির যথার্থতা আমরা আজ চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। এদের আসার শেষ নেই, আর এই আশা দ্বারাই সে আবধ্য  হয়ে আছে। এরা লোকের কাছে যা কিছু দেখে, বা শোনে তাতেই তারা আকৃষ্ট হয়। এবং মনে মনে এই সম্পদ পাবার জন্য ফন্দি আটতে থাকে। আর আশা পূরণ না হলে, এরা  রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে যায়। নিজের কামনা চরিতার্থ  করবার জন্য কোনো অপচেষ্টাই এদের বাকি থাকে না। এরাই মানুষকে খুন করে, এটাই মায়েদের সম্ভ্রম হানি করে, এরাই নারী জাতির ইজ্জ্ত লুট করে থাকে। এরা  এমনকি মন্দির মস্জিদ গির্জা থেকেও  সম্পদ লুট করে থাকে। এদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে কাম উপভোগ ও ধনাদি সংগ্রহ। ভগবান এদের সুমতি দিন। 

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।   
       
১৮.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা -  ষোড়শ অধ্যায় দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগ যোগঃ
শ্লোক ১৬/১৩-১৮

ঈদমদ্য ময়া লব্ধমিমং প্রাপ্স্যে মনোরথম 
ইদমস্তীদমপি মে ভবিষ্যতি পুনর্ধনম।  (১৬/১৩) 

আজ এটা আমি পেলাম, এই অভিলষিত  আমি পাবো, এটা আমার আছে, পুনরায় এই ধনও হবে। 

আসুরিক প্রবৃত্তির লোকের ধনতৃষ্ণা প্রবল। এমনকি এই ধনতৃষ্ণা দিন দিন প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে থাকে। আর এই ধনের নেশা এমনই যে এখান থেকে বেরিয়ে আসবার উপায় থাকে না। যার মধ্যে একবার এই ধন সংগ্রহের নেশা লেগেছে, সে সারা জীবন ধরেই এই ধনের আশাতেই সমস্ত কাজ করে থাকে।  এমনকি এই ধনের জন্য সে কুকর্ম্ম  করতেও দ্বিধা করে না।  ভাইবোনকে ঠকিয়ে পিতৃধন করায়ত্ব করে থাকে। ধন মানুষকে মনুষ্যত্ব হীন করে তোলে। 

অসৌ ময়া হতঃ শত্রুঃ-হনিষ্যে চ-অপরান-অপি 
ঈশ্বরোঽহমহং ভোগী সিদ্ধঽহং বলবান সুখী। ১৬/১৪)

এই শত্রু আমি বধ করেছি। অপর সকলকেও বধ  করবো। আমি সবার প্রভু। আমি সকল সুখভোগের অধিকারী।, আমিই সিদ্ধ বা কৃতকৃত্য, আমিই বলবান, অমিই সুখী।

এদের ভাবখানা এমন যেন, এরাই ঈশ্বর। এরাই  সবকিছুর নিয়ন্তা। সমস্ত কিছুই আমার, জমিদারি আমার।  লোকসকল আমার, বাড়িঘর আমার। স্ত্রী-পুত্র পরিবার আমার। সবই  আমার, আমিই সুখী। 

আঢ্য-অভিজনবান-অস্মি কোঽন্যোঽস্তি সদৃশো ময়া
যক্ষ্যে দাস্যামি মোদিষ্য ইত্যজ্ঞানবিমোহিতাঃ। (১৬/১৫)

আমি ধনবান, কুলিন, আমার তুল্য আর কে আছে ? আমি যজ্ঞ করবো, দান করবো, আনন্দিত হবো। এইভাবে অজ্ঞানে বিমোহিত। 

অনেকচিত্তবিভ্রান্তা মোহজালসমাবৃতাঃ
প্রসক্তাঃ কামভোগেষু পতন্তি নরকেঽশুচৌ।  (১৬/১৬)
 
বহুপ্রকার কাল্পনিক চিন্তায় বিভ্রান্ত চিত্ত মোহজালে আবদ্ধ বিষয়ভোগে অত্যন্ত আসক্ত এরা অপবিত্র নরকে পতিত হয়।  

আত্মসম্ভাবিতাঃ স্তব্ধা ধনমানমদাম্ভিতাঃ
যজন্তে নাম যজ্ঞৈস্তে দম্ভেনাবিধিপূর্ব্বকম। (১৬/১৭)

আত্মম্ভরী নম্রতা বিহীন ধন্যাভিমানী হয়ে মদমত্ত এরা দম্ভ সহকারে বিধি-বিধানের তোয়াক্কা না করে,নামমাত্র যজ্ঞাদি করে থাকে। 

অহংকারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং চ সংশ্রিতাঃ 
মামত্মপরদেহেষু প্রদ্বিষন্তোঽভ্যসূয়কাঃ। ১৬/১৮)

সাধু ও সজ্জন  বিদ্বেষী এইসমস্ত ব্যাক্তিগন অহংকার, কাম, ও ক্রোধের বশবর্তী হয়ে স্বদেহে অথবা পরদেহে আমাকে হিংসা করে থাকে। 

এইসব শ্লোকের বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা নিষ্প্রয়োজন। কথায় বলে তুমি যা কিছু চিন্তা করবে, ধীরে ধীরে তুমি তাইই হয়ে উঠবে। তথাপি এসব কথার উদ্দেশ্য হচ্ছে, সাধককে সাবধান করে দেওয়া। একদিকে এইসব ব্যক্তি থেকে সাধক যেন শতহস্ত দূরে থাকেন, অন্য দিকে নিজের মধ্যে যেন কখনো এইসব ভাবের  উদয় না হয়, সেই সম্পর্কে সাবধান করে দেওয়া। 

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।  

১৯.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা -  ষোড়শ অধ্যায় দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগ যোগঃ
শ্লোক ১৬/১৯ 
তানহং দ্বিষতঃ ক্রূরান সংসারেষু নরাধমান
ক্ষিপামি-অজশ্রম-অশুভান-আসুরীষু-এব যোনিষু।  (১৬/১৯) 

সেইসকল দ্বেষ পরায়ণ ক্রূর নরাধম ব্যক্তিসকলকে আমি সংসারে আসুরি যোনিতে পুনঃ পুনঃ নিক্ষেপ করি। 

দেখুন কেউ কাউকে কোথাও নিক্ষেপ করতে পারেন  না, করেনও না। তবে কেন যোগেশ্বর ভগবান বলছেন, যে "দ্বেষ পরায়ণ ক্রূর নরাধম ব্যক্তিসকলকে আমি সংসারে আসুরি যোনিতে পুনঃ পুনঃ নিক্ষেপ করি।"আসলে এরা  নিজেদের কর্ম্মফলেই নিজেদেরকে যথা ইচ্ছে তথা নিক্ষেপ করে থাকে।  বাসনা পূরণের জন্য যখন যেমন দেহ প্রয়োজন, জীবাত্মা সেইমতো দেহ ধারণ করে থাকে। এর জন্য কোনো ভগবানের দরকার পরে না। একটা জিনিস জানবেন, ভগবান প্রত্যেকের অন্তঃকরণে আত্মারূপে স্থিত। ভগবানের কাছে কেউ দ্বেষ্য নয়, আবার প্রিয়ও নয়।  জীব তার নিজ নিজ কর্ম্ম অনুযায়ী ফল ভোগ করে থাকে। এই কর্ম্মফলের বিধাতা অবশ্য়ই ভগবান, কিন্তু এই কর্ম্মফলের পরিবর্তন স্বয়ং বিধাতাও করতে পারেন না। সবাইকেই নিজ নিজ  কর্ম্মের ফল অবশ্যই  ভোগ করতে হয়, এবং সংকল্প-বাসনা অনুযায়ী দেহ ধারণ করে থাকে। ভগবান সর্বত্র সমভাবাপন্ন। 

আসলে অধম সেই হয়, যিনি "ম" অর্থাৎ মনিবন্ধের নিচে অবস্থান করেন। যোগীর মন আজ্ঞাচক্রে বা তদুর্দ্ধে অবস্থা করে থাকে । আর যোগহীন ব্যক্তির মন আজ্ঞাচক্রের নিচে অবস্থান করে থাকে। যোগহীন ব্যক্তির  কর্ম্ম আসক্তিপূর্ণ  আবার গতিও অধোমুখী। অর্থাৎ এদের মন সারাক্ষন নিম্ন স্তরের চিন্তায় মগ্ন হয়ে থাকে। তো আমরা শুনেছি, মৃত্যুকালে যে যেমন ভাবের মধ্যে ভাবিত হয়, তার সেইমতো লোকপ্রাপ্তি হয়। আর ভাবিজন্মের দেহ সেই লোকে থাকা  কালীন তাদের চিত্তবৃত্তির অনুরূপ তৈরী হয়ে থাকে। 

আমরা একটু এর আগে আলোচিত  ১৫/১৫ শ্লোকে  ফিরে যাই। সেখানে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন,  "আমা হতে জীবের স্মৃতি, জ্ঞান ও মোহ উৎপন্ন হয়।" তো জীবসকলের যে অজ্ঞান, আর যে আত্মবিস্মৃতি তার কারণও স্বয়ং ভগবান। 
শ্রীশ্রী চণ্ডীতে  এই কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। 

"যা দেবী সর্ব্বভূতেষু স্মৃতিরূপেণ সংস্থিতা 
.......যা দেবী সর্ব্বভূতেষু ভ্রান্তিরূপেণ সংস্থিতা।..."

তো তিনিই সর্বভূতের হৃদয়ে স্মৃতিরূপে, আবার তিনিই  ভ্রান্তিরূপে বিরাজ করছেন। তো জগতের ভালো-মন্দ সবাই তাঁর বলেই বলীয়ান। নরকের রাস্তাতেও তিনি আবার স্বর্গে যাবার রাস্তাতেও তিনি। তো ঈশ্বরের ইচ্ছেই হচ্ছে প্রকৃতির নিয়ম। আর এই প্রকৃতির নিয়মকে লঙ্ঘন করে কার সাধ্যি। যার যেমন চিন্তা তার তেমনি কর্ম্ম, যার যেমন ভাব তার তেমনি মনোভাব। আর এই মনোভাব অনুযায়ী জীবাত্মার উচ্চ-নীচ যোনিতে জন্ম গ্রহণ করতে হয়। 

ছান্দোগ্য উপনিষদ (শ্লোক : ৫/১০/৬ - ৭) বলছেন,  কুয়াশা থেকে মেঘ, মেঘ থেকে বৃষ্টি। তারপর জীবসকল এই পৃথিবীতে ব্রিহী যব ঔষধী বনস্পতি, তিল মাষ  ইত্যাদি রূপে জাত  হন। এই শষ্যাদি থেকে নিষ্ক্রমন দুঃসাধ্য।  সন্তান উৎপাদনে সামর্থ যে যে প্রাণী ওই ব্রিহী ইত্যাদি ভক্ষণ করে এবং সন্তান উৎপাদন  করে সেই সেই প্রাণীরূপে জীবগন পুনরায় পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করে থাকে। কেউ কেউ অবশ্য বলে থাকে জীব কখনো কুয়াশা-মেঘ-বৃষ্টি-ব্রিহী ইত্যাদি হয়ে যায় না।  আসলে এগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে জীব পৃথিবীতে আসে। মানুষ যখন উর্দ্ধলোকে যায়, তখন তার সেই গতি সম্পর্কে পূর্ণমাত্রায় সচেতন থাকে।  কিন্তু আবার যখন পৃথিবীতে ফিরে আসে, তখন জীব সম্পূর্ণ সঙ্গাহীন হয়ে থাকে। সে যাইহোক, জীবের যতক্ষন না আত্মজ্ঞান হচ্ছে ততক্ষন জীব পুনঃ পুনঃ জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হতে থাকে। উপনিষদ বলছেন, (৫/১০/৭) এদের মধ্যে যারা পূর্ব্বজন্মে পুন্য কর্ম্ম করেছিলেন, তাঁরা ব্রাহ্মণ যোনিতে বা বৈশ্যযোনিতে শীঘ্রই জন্ম লাভ করেন। আর অশুভকর্ম্মা ব্যাক্তিগন তাদের শীঘ্রই কুকুরযোনিতে বা শূকর যোনিতে বা চণ্ডাল যোনিতে জন্ম হয়।এই ব্রাহ্মণ-যোনী, শূকর-যোনী, বা চণ্ডাল যোনী এসব কল্পনা বিশেষ, আসলে জীবাত্মার  জন্ম তার বাসনা অনুযায়ী  উপযুক্ত পরিবেশে বা উপযুক্ত দেহে  হয়ে থাকে। 

দেখুন যাঁরা সাধনক্রিয়ার সাহায্যে দেহাতীত হতে পেরেছেন, প্রকৃতির উর্দ্ধে মনকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন, এঁরা  কামনা বাসনা এমনকি ইচ্ছে রহিত হবার ফলে এঁদের আর কোনোপ্রকার  দেহের মধ্যেই ফিরে আসতে  হয় না। এমনকি সাধনার পরাবস্থায় স্থিতিকালে দেহাতীত হয়েই অবস্থান করেন। এঁরা  দেহবোধের উর্দ্ধে থাকায় দেহজনিত কর্ম্মের প্রভাব এঁদের মধ্যে পড়ে না। এঁরা দেহের সুখ-দুঃখের অতীতে অবস্থান করেন। তো যাঁরা  দেহে স্থিত অবস্থাতেই দেহাতীত হয়ে যান, তাদের আবার দেহের কর্ম্ম বা কর্ম্মফল বলে কিছু থাকে কি ?  এঁরা  জীবন্মৃত। মন প্রাণ যখন আজ্ঞাচক্রে বা তার উর্দ্ধে সহস্রারে অবস্থান করে তাদের এই জন্মেই  অমৃতলোকের বাসিন্দা হয়ে যান। এদের কোনো আসা-যাওয়া, জন্ম-মৃত্যু বলে কিছুই থাকে না।  কিন্তু যাদের মন-প্রাণ  আজ্ঞাচক্রের নিচে সদা ঘোরাফেরা করছে, যারা আসক্তিজনিত কর্ম্মে লিপ্ত, যাদের মধ্যে ক্রূরতা, দ্বেষ, রয়েছে, যাদের বুদ্ধি শুদ্ধ হয়নি তারা বারবার অশুভ কর্ম্মের মধ্যে নিজেদেরকে নিমজ্জিত করে রাখেন।  আর এই কারণেই এরা নিচ যোনিতে, বা ইতর প্রাণী হিসেবে জন্ম গ্রহণ করে থাকেন। 

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।                

২০.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা -  ষোড়শ অধ্যায় দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগ যোগঃ
শ্লোক নং - ১৬/২০-২২ 

আসুরীং যোনীমাপন্না  মুঢ়া জন্মনি জন্মনি 
মাম-অপ্রাপ্য-এব কৌন্তেয় ততো যান্তি-অধ্মাং গতিম। (১৬/২০)

হে কৌন্তেয়, এইসব মূঢ় ব্যক্তি জন্মে জন্মে আসুরি  যোনী প্রাপ্ত হয় এবং আমাকে না পেয়ে আরও অধোগতি প্রাপ্ত হয়। 
মানুষের অন্তঃকরণের  স্বভাব অনুযায়ী মানুষ দুই প্রকার একদলের মধ্যে দৈবী সম্পদের আধিক্য, আর একদলের মধ্যে আসুরিক সম্পদের আধিক্য। প্রত্যেকের  হৃদয়ক্ষেত্রে যে পরমপুরুষ আছেন, তাঁর আরাধনাই বুদ্ধিমানের কাজ, এবং দৈবী সম্পদ লাভের  উপায়।  আর যারা বাহ্য দেবতার পুজো করেন, তারা মূঢ় কেননা এতে করে দৈবী সম্পদ অধরা থাকে এবং আসুরী শক্তি জাগ্রত হয়। ভগবান  নির্গুণ স্বরূপে দ্রষ্টা বা  সাক্ষীমাত্র হয়ে অবস্থান করেন। আবার সগুন স্বরূপে তিনি সৎ-অসৎ কর্ম্মের ফল দান করেন।

মানুষ পূর্বপূর্ব জন্মের সংস্কার বশতঃ এই জনমে বিশেষ স্বভাব প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। যাদের পূর্ব  জনমের  সংস্কার ভালো নয়, তাদের প্রকৃতি দূষিত  হবার ফলে সৎ কর্ম্ম থেকে অসৎ কর্ম্মেই  উৎসাহ বেশি দেখা যায়। আর জন্ম-জন্মান্তর ধরে অসৎ বা নীচ প্রবৃত্তির কাজ করবার ফলে, এরা  নীচ যোনিতে জন্ম গ্রহণ করে থাকে। এদের চিত্ত অশুদ্ধ।  ফলত ভগবত প্রাপ্তির ইচ্ছে তাদের মধ্যে জাগে না। আবার ভগবৎ প্রাপ্তির পথও তারা জানে না। জানতে চায়ও না। কেউ ভগবৎ কথা বললে, এঁদের তারা উপহাস করে।  এরা  সাধুসঙ্গ সহ্য করতে পারে না। সাধুদের তারা অনাবশ্যক জীব বলে মনে করে। এর   ফলে এদের যে দূষিত প্রকৃতি তা সংশোধন হওয়ার কোনো উপায় এরা  রাখে না। শূকর জল-কাদাতেই স্বাছন্দ বোধ করে। এখানেই স্বামী-স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে মহাসুখে থাকে। এইভাবে যে কত জন্ম তাদের নিচ যোনিতে কাটাতে হয়, তার খবর কে রাখে ?  

ত্রিবিধং নরকস্য-ইদং দ্বারং নাশনং-আত্মনঃ 
কামঃ ক্রোধস্তথা লোভঃ-তস্মাৎ-এতৎ-ত্রয়ং ত্যাজেৎ।  (১৬/২১) 

কাম-ক্রোধ-লোভ এই তিনটি হচ্ছে নরকের দ্বার  স্বরূপ। এরা  মানবাত্মার অধোগতির মূল। অতএব এই তিনটিকে ত্যাগ করতে হবে। 

কাম ক্রোধ লোভ এই তিনটি হচ্ছে আসুরী সম্পদের মধ্যে প্রধান। এই তিনটিই আত্মজ্ঞান লাভের অন্তরায়। আর আমরা জানি, জীবের যতক্ষন আত্মজ্ঞান না হবে, ততক্ষন জন্ম-মৃত্যু চক্রের পাঁকে হাবুডুবু খেতে হবে। কামনা থেকে লোভের  উৎপত্তি, আর অতৃপ্ত কামনা থেকে ক্রোধের উৎপত্তি। মানুষ যখন  নিরন্তর  এই কামনা চরিতার্থ করবার জন্য চিন্তন করে, তখন তার মধ্যে অপ্রাপ্তির অগ্নি প্রজ্বলিত হয়। ক্রোধাগ্নি ধিকিধিকি করে জ্বলতে থাকে।  এই ক্রোধাগ্নি যেমন একদিকে তার শরীরকে উত্তপ্ত ক'রে, ব্যাধির উদ্রেগ করে। তেমনি মনের মধ্যে এক অসহনীয় ভয়, আশঙ্কা, উদ্বেগের সৃষ্টি করে মনকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারতে থাকে। একেই বলে নরক যন্ত্রনা। এদের আত্মচিন্তনের কোনো অবকাশ থাকে না। ফলতঃ এদের আত্মা অধোগতি সম্পন্ন হয়। 

কম-ক্রোধ-লোভ এইযে তিনটে বৃত্তি  আত্মজ্ঞানকে আচ্ছাদিত করে রাখে। আর এই তিনটি নিয়ে যারা মগ্ন  থাকে  তাদের আত্মাতে স্থিতিলাভ সম্ভব হয় না। আর আত্মাতে স্থিতিলাভ না করতে পারলে, অশান্ত হৃদয়ে অশান্তির মধ্যে দিনযাপন করতে হয়। কিন্তু  ফলাকাঙ্খ্যারহিত  সাধকের মধ্যে এই তিনটে বৃত্তির নাশ হয়ে থাকে। তখন তার মধ্যে যে পুরুষার্থঃ থাকে তা সৎ কর্ম্মের দিকে ধাবিত করে। আর ধীরে ধীরে তার কাছে মোক্ষের পথ উন্মোচিত হতে থাকে। তো যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, কাম-ক্রোধ-লোভ হচ্ছে নরকের দ্বার, অর্থাৎ জীবকে অধোগামী করে থাকে। অতএব এদেরকে পরিত্যাগ করাই বুদ্ধিমান সাধকের লক্ষণ। 

এতৈর্বিমুক্তঃ কৌন্তেয় তমোদ্বারৈস্ত্রিভির্নরঃ (তমোদ্বারৈ-ত্রিভিঃ-নরঃ) 
আচরত্যাত্মনঃ শ্রেয়স্ততো যাতি পরাং গতিম।  (১৬/২২) 

হে কৌন্তেয়, এই তিন নরকের দ্বার হতে মুক্ত হয়ে, মানুষ নিজের  মঙ্গল সাধন করে এবং তা-হতে পরমাগতি প্রাপ্ত হয়। 

চিত্তকে  বৃত্তিশূন্য না করতে পারলে, সাধনক্রিয়ায় সাফল্য আসে না। কাম ক্রোধ লোভের প্রাবল্য হেতু মানুষের মধ্যে যে দৈবসম্পদ আছে, তার ব্যবহার  করতে সে অপারগ হয়। আর এদের থেকে নিষ্কৃতি পেলেই সাধনক্রিয়ায় মন বসে। আর এতেই মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্য সাধন হয়। এদের শ্বাসপ্রশ্বাস ইড়া-পিঙ্গলাতেই  প্রবাহিত হয়, সংসারের জ্বালা যন্ত্রণার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করে। এদের চিত্ত সদা থাকে বহির্মুখী। কিন্তু প্রাণ-সাধনের সাহায্যে যখন প্রাণকে ইড়া-পিঙ্গলা থেকে সুষুম্নায় প্রবাহিত করানো যায়, তখন এই রিপু-ত্রয় থেকে নিস্তার পাওয়া যায়। ধীরে ধীরে একসময় প্রাণ-মন সহস্রারে স্থিতি লাভ করে। একেই জীবের সর্বোচ্চ অবস্থান বলে যোগীগণ  স্বীকার করে থাকেন। 

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়। 
                
২১.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা -  ষোড়শ অধ্যায় দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগ যোগঃ
শ্লোক নং - ১৬/২৩-২৪

যঃ শাস্ত্রবিধিম-উৎসৃজ্য বৰ্ত্ততে কামকারতঃ
ন  স সিদ্ধিম-অবাপ্নোতি ন সুখং ন পরাং গতিম।  (১৬/২৩)

যিনি শাস্ত্রবিধি উল্লঙ্ঘন করে স্বেচ্ছাচারী ভাবে কর্ম্মে প্রবৃত্ত হন, তিনি সিদ্ধি, শান্তি, মোক্ষ কিছুই লাভ করতে পারে না।

যা আমাদের মুনিঋষিদের  বোধে (জ্ঞানে) এসেছিলো, তাই বেদ বা জ্ঞান। শাস্ত্র কথাটার  অর্থ হচ্ছে যার দ্বারা  শাসন বা শিক্ষা করানো হয়। শাস (শাসনে) + ত্র (ণ) ।.যা সত্যবিদ্যা প্রতিপাদনযুক্ত এবং যার দ্বারা মানুষের  সত্য-অসত্যের শিক্ষা লাভ হয়, তাকেই  বলে শাস্ত্র। তো যা মুনি-ঋষিদের  উপল্বদ্ধিতে আসেনি তা বেদ-বিরুদ্ধ। যা অজ্ঞাত বস্তু, শাস্ত্র হচ্ছে তার জ্ঞাপক। এই অজ্ঞাত বস্তুকে জানবার জন্য কিছু সাধনবিধি থাকে, সেই বিধির বোধক হচ্ছে শাস্ত্র। তো শাস্ত্র থেকে আমরা বিবিধ বিধি অবগত হতে পারি। 

দেখুন ধান থেকে চাল, বা চাল থেকে ভাত বের করবার কিছু বিশেষ বিধি নিয়ম আছে। এই বিধি নিয়ম মেনে কাজ করলে, উদ্দেশ্য সার্থক হবে। ঠিক তেমনি মনুষ্য জীবনের একটা উদ্দেশ্য আছে। আর সেই উদ্দেশ্য সার্থক করতে গেলে, আমাদের শাস্ত্রবিধি অর্থাৎ শাসনবিধি মেনে চলতে হয়। এখন কথা হচ্ছে, আমাদের জীবনের উদ্দেশ্যটা কি ? খাওয়া শোয়া আর যৌনক্রিয়া ? না আর কিছু আছে ? মহাত্মাগণ বলে থাকেনা, মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আত্মজ্ঞান লাভ। কিন্তু কথা হচ্ছে, আত্মজ্ঞান লাভের দ্বারা জগতের কি উপকার হবে ? আর আমারই বা কি হবে।  সারাটা জীবন হা ভগবান, হা ভগবান বলে কাটিয়ে দিলে, সেই অব্যক্ত ঈশ্বর কি আমাদের কোনো উপকারে আসবে ? 

যারা বেদের চর্চ্চা করে থাকেন, তারা জানেন, বেদে যেমন জ্ঞানকাণ্ড আছে, তেমনি আছে কর্ম্মকান্ড । একটা হচ্ছে পরাবিদ্যা, অন্যটি অপরাবিদ্যা।    কর্ম্মকান্ডে বিবিধ কর্ম্মের বিধি ও তার ফল সম্পর্কে বলা আছে। কর্ম্মকান্ড জাগতিক বস্তু লাভের  উপায় সম্পর্কে বিধিনির্দেশ দিয়েছে।  তেমনি জ্ঞানকাণ্ডে অধ্যাত্ম জীবনের কর্তব্য ও তার ফল সম্পর্কে বলা আছে। মানুষ তার রুচিমতো বিধি অনুসারে সেই বেদোক্ত কর্ম্ম করে বাঞ্চিত ফল পেতে পারেন। বেদে যেমন ঈশ্বর আরাধনার বা উপাসনার কথা বলা আছে, তেমনি অথর্ব বেদে আছে  চিকিৎসবিদ্যা। বেদের অংশ-বিশেষকেই বলা হয়, বেদান্ত, বা উপনিষদ। এই উপনিষদ মূলতঃ ব্রহ্মবিদ্যা। পঞ্চক্ষেত্রের মধ্যে যে দর্শন লুকিয়ে আছে, তা একযোগে পাওয়া যায় এই মহান-উপনিষদ্গুলোর মধ্যে। অর্থাৎ, পৃথিবী, অগ্নি, আকাশ, বায়ু, জল অর্থাৎ মানব দেহসংক্রান্ত এমনকি সন্তানবিষয়ক অর্থাৎ বংশবিস্তারের বিষয় সকল গুরুত্ত্ব দিয়ে এই উপনিষদের মধ্যে বর্ণিত আছে।
দেখুন মানুষ কি চায় ?  কেউ বলবেন, আমি ধনী হতে চাই। কিন্তু ধনীরা জানেন,  ধন লাভই মানুষের পক্ষে যথেষ্ট নয়। কারণ মানুষ একদিন কালের নিয়মে বৃদ্ধ হয়ে যায়, আর মানুষ তখন ধনসম্পদ ভোগ করতে পারে না। কোটি টাকা থাকলেও, আপনি ৩/৪টির  বেশি রুটি খেতে পারবেন  না। বিশাল বিছানার কোমল গদি  আপনাকে সুখ দিতে পারবে না। তো আপনাকে তখন যৌবন চাইতে হবে। কিন্তু যৌবনেও আপনার রোগ-শোক থেকে রেহাই নেই। তো আপনি তখন চাইবেন সুস্বাস্থ। আর শুধু সুস্বাস্থের অধিকারী হলেই চলবে না। আপনার একটু বুদ্ধিশুদ্ধিও চাই। একটু মান-সন্মান চাই। বুদ্ধি না থাকলে, আপনি ধন-সম্পদের সদ্ব্যবহার করতে পারবেন না। ধরুন, আপনার এই সবই  আছে, তাহলে আপনি নিশ্চয়ই আনন্দে আছেন। উপনিষদ বলছে, এই যে আনন্দ এর থেকেও আরো বেশী আনন্দ আছে, একে বলা হয় ব্রহ্মানন্দ। এই আনন্দ অন্যসকল  আনন্দ থেকে শতশত গুন্ বেশী। এখন কথা হচ্ছে এই আনন্দ ভোগ করছে কে ? আমাদের দৃষ্টিতে এই আনন্দ ভোগ করছে আমাদের মন। (যদিও এই আনন্দ  আসলে ভোগ করছে জীবাত্মা) .এই মন বা জীবাত্মাকে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। 

দেখুন বায়ুর চঞ্চলতা হেতু মনের উৎপত্তি হয়ে থাকে। এই বায়ু যখন স্থির হয়, হন প্রাণের সাথে মন মিলে  মিশে একাকার হয়ে যায়। তখন একটা অপরোক্ষ অনুভূতি হয়, একেই বলে ব্রহ্মানন্দ। একেই বলে ব্রহ্ম দর্শন। এইকারনে বায়ুরক্রিয়াই হচ্ছে ব্রহ্মবিদ্যা। বায়ুর ক্রিয়া দ্বারা মূলাধার থেকে সহস্রার পর্যন্ত চৈতন্যপ্রাপ্ত হলে যে জ্ঞান হয়, তাকেই বলে বেদজ্ঞান। এই বেদজ্ঞান সম্পূর্ণ হলে সাধক  ত্রিগুণের অতীতে অবস্থান করেন। প্রকৃত পক্ষে বেদবিধির অনুশীলনীতেই এই নিস্ত্রৈগুণ্যের অবস্থা লাভ হতে পারে। আর এই বেদ  বিধি বা শাস্ত্রবিধি হলো, ষট্চক্রের ক্রিয়া। দেখুন জ্ঞানের দ্বারা যখন বিষয়কে জেনে গেলেন, তখন আর এই জ্ঞানের প্রয়োজন নেই। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে যেমন সৈনিক শস্ত্র  ত্যাগ করে, তেমনি ত্রিগুণাতীত হতে পারলে  আর ক্রিয়ার বা শাস্ত্রের দরকার পড়ে না।  ষট্চক্রের মধ্যে থাকাই শাস্ত্রবিধি। ষট্চক্রের বাইরে থাকা মানেই শাস্ত্রবিধি লঙ্ঘন। কর্ম্ম কাণ্ডে শুরু আর জ্ঞানকাণ্ডে শেষ।  তো যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যিনি শাস্ত্রবিধি উল্লঙ্ঘন করে স্বেচ্ছাচারী ভাবে কর্ম্মে প্রবৃত্ত হয়, তিনি সিদ্ধি, শান্তি, মোক্ষ কিছুই লাভ করতে পারে না। শাস্ত্রবিধি মেনে ক্রিয়া করলে, ইড়া-পিঙ্গলার কাজ রুদ্ধ হয়,  সুষুম্নার দুয়ার  খুলে যায়। আর সাধক পরম-গতি লাভ করেন।      


তস্মাৎ -শাস্ত্ৰং প্রমাণংতে কার্য্যাকার্য্যব্যবস্থিতৌ 
জ্ঞাত্বা শাস্ত্রবিধান-উক্ত কর্ন্ম  কর্ত্তুম-ইহ-অর্হসি । (১৬/২৪)

তোমার কর্ত্তব্য-অকর্ত্তব্য নির্ধারণে শাস্ত্র একমাত্র প্রমান। তাই তুমি শাস্ত্র বিধান অনুযায়ী কর্ম্ম করো। 

দেখুন আপনার কি করা উচিত আর কি করা উচিত নয়, সে বিষয়ে শাস্ত্রকারগন  নির্দেশ দিয়ে গেছেন। কিন্তু যতদিন এই শাস্ত্র সম্পর্কে আপনি অবহিত হতে না  পারছেন, ততদিন শ্রীগুরুর উপদেশে আপনার সাধনক্রিয়া করা কর্তব্য। আসলে শাস্ত্রবাক্য গুরুমুখে শুনে বুঝে নিতে হয়। কেননা শাস্ত্রবাক্য অনেকসময় আমাদের মতো সাধারণ বুদ্ধির লোকেরা ধরতে পারে  না। গো শব্দে আপনি গরু ভাবতে পারেন, আপনি পৃথিবী ভাবতে পারেন, আপনি গোবিন্দ ভাবতে পারেন। একই শব্দ প্রয়োগস্থল ভেদে ভিন্ন ভিন্ন অৰ্থ পোষন করে থাকে। আবার শাস্ত্র অনেক, জ্ঞাতব্য বিষয়ের ভিন্নতা আছে। সমস্ত শাস্ত্র পাঠ  করে, তার পরে আমরা যদি সাধনক্রিয়ার কথা ভাবতে যাই, তবে আর আমাদের এই জীবনে সাধন পথে পা রাখাই হবে না। কেননা আমাদের স্বল্পায়ু। তাছাড়া আমাদের মন বিক্ষিপ্ত।  চঞ্চল মনে শাস্ত্রের স্বরূপ সঠিকভাবে  ধরা পড়ে  না। এই জন্য শাস্ত্রের সারবস্তু - সরল ভাষায় গুরুমুখে শুনে নিতে হয়। এই গুরুদেবও কিন্তু একইভাবে গুরুমুখে শুনে এই সারকথা সংগ্রহ করেছিলেন। আবার সমস্ত সাধনক্রিয়া সবার শরীরের পক্ষে উপযুক্ত নাও হতে পারে।  তাই কোন ধরনের সাধন কর্ম্ম  সাধকের  পক্ষে উপযুক্ত তা সবসময় নিজে নিজে নিরুপন করা সম্ভব হয় না।  এর জন্য দরকার একজন অভিজ্ঞ গুরু। তিনিই  পথ বলে দেন। 

দেখুন  যোগীপুরুষগন যখন প্রাণবায়ুকে আকর্ষণ করে মনকে  কূটস্থে  নিবিষ্ট করেন, তখন পঞ্চতত্ত্বের ক্রিয়া ও তার মধ্যে কোনো গুনের প্রাবল্য আছে, তা তারা সম্যক রূপে অনুধাবন করতে পারেন।  এই বায়ুর ক্রিয়া বা গতির কারনেই  জীবের মধ্যে বহির্মুখী বা অন্তর্মুখী ভাবের উদয় হয়। এই বায়ুর গতির কারনেই জীবের মধ্যে রাগ, দ্বেষ ইত্যাদির উৎপন্ন হচ্ছে।  আবার এই বায়ুর গতি শান্ত হবার সঙ্গে সঙ্গে জীবের শরীরের মধ্যে সাম্যভাব  আসে।  আর এর  ফলেই নানাররকম শুদ্ধ গুনের অর্থাৎ প্রেম-ক্ষমা ইত্যাদি গুনের প্রকাশ হতে থাকে। আসলে এই বায়ুই আমাদের দেহ-ইন্দ্রিয়সকলকে স্ব স্ব কর্ম্মে নিযুক্ত করে, এবং  শাসন করে থাকে। এই বায়ু যখন মস্তকে প্রবেশ করে সহস্রারে স্থিত হয়, তখন শাস্ত্রবিধি  পালন হয়। 
সাধন ক্রিয়ার এই ক্ষেত্র একমাত্র এই স্থুল মনুষ্যশরীর। কত জন্মের সাধনার ফলে এই মনুষ্য দেহ লাভ হয়েছে, তা কে বলতে পারে ? আবার এই মনুষ্য দেহ নাশের  পরে, নতুন মনুষ্যদেহ লাভের  জন্য , কতকাল অপেক্ষা করতে তাই বা কে বলতে পারে ? তো যদি ভাগ্যক্রমে এই স্থুল মনুষ্য দেহ প্রাপ্ত হয়েছো, সবকিছু ভুলে এই নিরাসক্ত প্রাণকর্ম্মে নিজেকে সঁপে দিয়ে জীবন সার্থক করো, এই হচ্ছে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ বা নির্দেশ । 

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়। 

ইতি শ্রীমদ্ভগবৎ গীতা - উপনিষদসু - ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণ-অর্জ্জুন সংবাদে দৈবাসুর-সম্পদ- বিভাগযোগো নাম ষোড়শ -অধ্যায়ঃ।                
 

       




       













       
                    
                                                                                     



















   

  


Comments

Popular posts from this blog

নিত্যকথা

ঈশ্বর ও তাঁর উপলব্ধি

সত্যধর্ম্ম ও প্রেম