আলোর প্রভার ধ্যান AURA MEDITATION
আলোর প্রভার ধ্যান - AURA MEDITATION -
- একটি সহজ কিন্তু অদ্ভুত ফলপ্রদ প্রক্রিয়া
আমি তখন হিমালয়ের কোলে একটা ছোট্ট পাহাড়ের শিখরে এক গ্রাম্য মন্দিরে মুক্তানন্দের সঙ্গে বাস করছি। কিছু দূরে অন্য একটি পাহাড়ের চূড়ায়, মায়ের মন্দির। রাতের বেলা সেখানকার আলো এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ তৈরী করে। আমরা অন্ধকার রাতে সেই আলোর রোশনাই উপভোগ করি। মুক্তানন্দ আলাদা ঘরে থাকে। আমি আলাদা ঘরে থাকি। রাতের বেলা মুক্তানন্দ নিজের ঘরে ধ্যানস্থ থাকেন। আমি আমার ঘরে ঘুমিয়ে থাকি। একদিন ভোর রাতে নিত্য কর্ম্মের তাগিদে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। মুক্তানন্দের ঘরের সামনে দিয়ে যাবার সময় লক্ষ করলাম মুক্তানন্দের ঘরের মধ্যে আলোর রোশনাই। কৌতূহল বশতঃ দরজা ঠেলতেই নজরে এলো, মুক্তানন্দ ধ্যানাসনে বসে আছেন, আর তাকে ঘিরে আছে, আলোর আভা। এই আলোর আভাই সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। আমি একটু যেন ভয় পেলাম। অবাক হলাম। সঙ্গে সঙ্গে দরজা বন্ধ করে, ল্যাট্রিনের দিকে এগিয়ে গেলাম। আমার আর ঘুম এলো না। সারাক্ষন বসে চিন্তা করতে লাগলাম। এই আলোর উৎস কি ? কোথা থেকে এই স্নিগ্ধ অথচ উজ্জ্বল আলো মুক্তানন্দকে ঘিরে রেখেছে।
সময় সুযোগ বুঝে মুক্তানন্দকে ধরে বসলাম, এই রহস্যের উন্মোচন করবার জন্য। মুক্তানন্দ একটু হাসলেন, বললেন সিনেমার পর্দায় যে মানুষগুলো ঘুরে ফিরে বেড়ায়, তা আসলে আলোর খেলা। আমরা এসব বুঝি, আবার বুঝি না। এই পৃথিবীতে যা কিছু পদার্থ অপদার্থ দেখছেন, তাও এক একটা আলোর গোলক মাত্র।
এ কোনো রহস্যঃ নয়, এই আলোই আপনাকে আমাকে ঘিরে রেখেছে। কখনো কখনো এটি প্রকট হয়, কখনও নিষ্প্রভ থাকে। কিন্তু এই আলোই আমাদেরকে প্রকাশ করছে। সমস্ত জাগতিক বস্তুকেই এই আলোর প্রভা ঘিরে রেখেছে। এই আলোই আমাদের সূক্ষ্ম দেহ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই আলোর প্রভা সব সময় নজরে পড়ে না কেন ? আর আমাদের নজরে আসেই বা কখন ? এটি কি কোনো যোগবিদ্যা ? কিভাবে এই বিদ্যা আয়ত্ত্ব করা যায় ?
দেখুন একে ইংরেজিতে বলে AURA - কোনো পদার্থ থেকে নির্গত অদৃশ্য আলোর সূক্ষ্ম প্রভা। এটি আসলে SUBTLE BODY যা সমস্ত পদার্থকে ঘিরে রেখেছে। যোগীগণ এই SUBTLE বডিকে দেখতে পান। আমরা পাই না। কিন্তু এই SUBTLE BODY ধ্যান প্রভাবে যখন ঘনীভূত হয়, তখন তা আমাদের নজরে আসে। আসলে কি জানেন, আমরা সবাই একটা একটা আলোর শিখা। আমাদের হৃদয় কেন্দ্রে, আমাদের আজ্ঞাচক্রে, এবং আমাদের সহস্রারের ঠিক উপরিভাগে এই আলোর ঘনীভূত রূপ আছে। এটি যোগের সাহায্যে প্রতক্ষ্য করা যায়। এমনকি যোগীর আশেপাশে যারা থাকেন, তারাও এই আলোর প্রভা দেখতে পারেন। এর মধ্যে অলৌকিকতা বলে কিছু নেই। এটি বাস্তব ও বিজ্ঞানসম্মত। আমাদের সবার দেহকে ঘিরেই এই আলোর প্রভা বর্তমান। এই আলোর প্রভাব সাধারণত দেহের এক থেকে দেড় ফুট পর্যন্ত এর বিস্তার লাভ করে থাকে। এটি আপনি আমি সবাই প্রতক্ষ্য করতে পারি। আমাদের ধ্যান যখন গভীর হয়, তখন প্রাকৃতিক ভাবেই এই আলোর প্রভা দৃশ্যমান হয়ে থাকে। অর্থাৎ বিন্দু যেমন ঘনীভূত হয়ে দৃশ্যপট তৈরী করে, আর আমাদের গোচরে আসে। তেমনি আলো যখন ঘনীভূত হয়, তখন তা আমাদের নজরে আসে। আপনি একটা কথা শুনে আশ্চর্য্য হবেন, যারা স্থূল দেহ ত্যাগ করে সূক্ষ্ম দেহে অবস্থান করছেন, এবং আমাদের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছেন, তারা আমাদের এই আলোদেহই দেখতে পান।
যাইহোক, আপনি যদি আলোর ধ্যান করেন, তাহলেও এই আলোর প্রভা আপনাকে ঘিরে প্রকাশমান হতে পারে।
আমি বললাম, কিভাবে এই সূক্ষ্মদেহ বা আলোকদেহ ঘনীভূত হয়, সে সম্পর্কে যদি কিছু বলেন।
তো স্বামী মুক্তানন্দ এর পরে কয়েকটি এই আলোর প্রভার ধ্যানের প্রক্রিয়ার কথা বললেন। যার অভ্যাস করলে নাকি ২/৩ মাসের মধ্যেই এর সুফল পেতে পারেন। এ আসলে আলোর ধ্যান। ধ্যানে বসলে, কিছু দিনের মধ্যেই আপনি আপনার মুদ্রিত চক্ষুর সামনে একটা আলোর বিন্দু ঘোরাফেরা করতে দেখেন। এটি কখনও স্পষ্ট হয়, কখনও আবার চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে যায়। আসলে এই আলোই জীবকূলকে জীবন্ত ও প্রাণবন্ত করেছে। আবার এই আলোই বস্তুকুলকে আকার দিয়েছে।
১. প্রথমত ত্রাটক - আলোর ধ্যান ত্রাটক দিয়ে শুরু করতে হয়। এই ত্রাটকের কথা নিশ্চয় শুনেছেন। এই ত্রাটক ব্যাপারটা কি ? কিভাবে এই ত্রাটক অভ্যাস করতে হয় ?
মুক্তানন্দ বললেন : চোখেমুখে জলের ছিঁটে দিন। একটা অন্ধকার ঘরে রাতের বেলা, একটা মোমবাতি জ্বেলে নিন। এবার চোখ বন্ধ করে মেরুদন্ড সোজা করে মোমবাতির কাছে, সিদ্ধাসনে বা যেকোনো সুখাসনে বসুন। নিজের মধ্যে একটা প্রার্থনার ভঙ্গি জাগিয়ে তুলুন। যেন এই মোমবাতির শিখার কাছে, আপনি প্রার্থনায় বসেছেন। মোমবাতির কাছে প্রার্থনা করুন, "হে প্রদীপশিখা তুমি আমার ভিতরে প্রবেশ করো। তুমি আমাকে আলোকময় করো। " এই সময়, মনের মধ্যে থেকে সমস্ত চিন্তাগুলোকে দূর করে দিন । শুধু মোমবাতির শিখার দিকে দৃষ্টিপাত করুন, মনটাকে প্রদীপশিখার দিকে নিবদ্ধ করুন । মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আপনি লক্ষ করবেন, মোমবাতির আলোর মধ্যে নানান রকম পরিবর্তন ঘটে চলেছে। আসলে মোমবাতির মধ্যে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না, কেবল আপনার দেখার মধ্যে, আপনার দৃষ্টিকোণের মধ্যে পরিবর্তন হচ্ছে। এইভাবে প্রথমে শিখা এর পরে শিখাকে ঘিরে রেখেছে যে আলোর আভা তাকে লক্ষ করতে থাকুন। এই সময় আপনি এই মোমবাতির মধ্যে নানান রঙের খেলা দেখতে পাবেন, যা এর আগে কখনও খেয়াল করেননি। মোমবাতির আলো আমরা সবাই দেখেছি, কিন্তু এই মোমবাতিকে ঘিরে যে রামধেনু খেলা চলছে, সেটা হয়তো আমাদের নজরে আসেনি কখনও। আপনি শুধু অপলক দৃষ্টিতে এই রামধেনুর খেলা পর্যবেক্ষন করতে থাকুন। এইসময় হয়তো আপনার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়বে। এই অশ্রুধারাকে দেখতে থাকুন নিস্পলক দৃষ্টিতে। এই অশ্রুবর্ষণ আপনার চোখের দৃষ্টিকে আরো স্বচ্ছ করে দেবে। আপনি মোমবাতির আলোর মধ্যে এই অপূর্ব আলোর খেলা হয়তো আগে কখনও খেয়াল করেন নি। আজ সেই সাধারণ মোমবাতির আলো আপনাকে এক অন্য জগতের সন্ধান দেবে। একটা সূক্ষ্ম স্বর্গীয় অনুভূতি এনে দেবে। এই অনুভূতিটাকে উপভোগ করতে থাকুন। আলোর নানান রূপ যা আপনি হয়তো এতদিন খেয়াল করেননি, আজ সেই স্বগীয় অনুভূতি আপনাকে এক অন্য জগতে নিয়ে যাবে।
আসলে জগৎ তো আলোর খেলা। এই আলোর তরঙ্গ নেচে বেড়াচ্ছে ব্রহ্মান্ড জুড়ে। যার দিকেই আপনি তাকান না কেন, তা সে সে পাহাড় বলুন, নদী বলুন, সমুদ্র বলুন, গাছপালা বলুন, পশু-পাখি বলুন, বা মানুষজন বলুন, সবার থেকে অসংখ্য আলোর রশ্মি ছিটকে বেরিয়ে আপনার চোখে এসে পড়ছে। আর এই কারণেই এসব বস্তু আমাদের কাছে দৃশ্যমান হচ্ছে। এই সত্যকে অন্তর দিয়ে ধীরে ধীরে উপলব্ধি করবার চেষ্টা করুন। তাড়াহুড়ো করতে যাবেন না , নিজেকে স্থির করুন, শরীরকে স্থিরকরুন, মনকে স্থির করুন - তবে এই উপলব্ধি আপনার মধ্যে প্রবল হয়ে উঠবে। এই প্রক্রিয়া আপনি মোমবাতি ছাড়াও করতে পারেন। একটা সবুজ পাতার দিকে, এমনকি আপনার বুড়ো আঙুলের নখের দিকে তাকিয়ে থাকুন। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকুন সহজ করুন মনকে। দেখবেন, আপনার সামনে এমনসব সত্য উদ্ভাসিত হবে যা নিয়ে আপনি কখনও চিন্তাও করেন নি। একটা স্বর্গীয় অনুভূতি স্পর্শ করবে আপনাকে। আপনি তখন অন্য জগতের মানুষ হয়ে যাবেন । এক বিষ্ময়কর জগৎ আপনার সামনে নানান রূপে দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। মাত্র তিন মাসের অভ্যাস (প্রতিদিন মাত্র পানের মিনিট) আপনাকে অন্য মানুষ করে দেবে।
-----------------
২. এর পরের প্রক্রিয়া অভ্যাস করতে হবে করতে হবে ভোরবেলা বিছানা ছাড়বার আগে, আর রাতে বিছানায় শোবার পরে। । পনের মিনিট থেকে কুড়ি মিনিট এই ক্রিয়ার অভ্যাস করুন। সকালবেলা যখন আপনার ঘুম ভেঙে গেছে, কিন্তু চোখ খোলেননি। আমরা জানি, সকালের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে জগৎ জেগে ওঠে। আর এসময়টা প্রার্থনার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। পৃথিবীর সমস্ত সম্প্রদায়ের মধ্যেই এই সময়কে বিশেষ গুরুত্ত্ব দেওয়া হয়েছে। যখন সকালবেলা আপনার ঘুমের রেশ কেটে ওঠেনি, অর্থাৎ আপনি যখন আধোঘুম, আধো-জাগরণের অবস্থায় আছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে এই ক্রিয়ার অভ্যাস করতে হবে। আপনি বিছানায় চোখ বুঝে শুয়ে আছেন । আপনি শ্বাস নিচ্ছেন, আবার ছেড়ে দিচ্ছেন। এই প্রক্রিয়ার দিকে খেয়াল করুন। অর্থাৎ আপনি সচেতন ভাবে এই ক্রিয়া করতে থাকুন। এবার মনে মনে ভাবুন, একটা আলোর গোলক আপনার মাথার মধ্যে দিয়ে আপনার শরীরে প্রবেশ করছে। ধীরে ধীরে মাথা থেকে সমস্ত শরীরে এই আলো ছড়িয়ে পড়ছে। মনে মনে ভাবুন, প্রভাতের সোনালী সূর্য আপনার মাথা দিয়ে শরীরের মধ্যে প্রবেশ করছে। এই সূর্য্যরশ্মি আপনার শরীরকে ধৌত করতে করতে আপনার মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত চলে গেলো। এবার শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে মনে মনে ভাবুন, সোনালী সূর্য্য পায়ের পাতা থেকে শুরু করে আপনার শরীরের যত অবাঞ্চিত রোগ-ব্যাধি তাদেরকে ঝেটিয়ে নিয়ে মাথা দিয়ে আপনার শরীর ত্যাগ করলো। অর্থাৎ যখন শ্বাস নেবেন, তখন মনে মনে ভাবুন, সোনালী প্রভাত সূর্য রশ্মি আপনার মাথা দিয়ে প্রবেশ করে শেষে পায়ের পাতায় প্রবেশ করলো, আবার যখন শ্বাস ছাড়বেন তখন মনে মনে ভাবুন, সেই সূর্য্যরশ্মি আপনার শরীরকে স্নাত করে আপনার শরীরের সমস্ত রোগব্যাধিরূপ আবর্জনাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। শ্বাস নেবার সঙ্গে সঙ্গে মনে মনে ভাবুন, আপনার শরীরে জীবনদায়ী আলোর প্রবেশ ঘটলো, আর শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে চিন্তা করুন, আপনার ভিতরের সমস্ত অন্ধকার দূরীভূত হয়ে গেলো।
এই প্রক্রিয়াটিও তিন মাস নিয়ম করে অভ্যাস করুন। এই প্রক্রিয়া আপনি যেমন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠবার সময় করবেন, তেমনি রাতে বিছানায় যাবার সময় ১৫/২০ মিনিট অভ্যাস করুন। এতে করে আপনি লক্ষ করবেন, যে শক্তি এতদিন আপনার মূলাধারে সঞ্চিত হচ্ছিলো, তা যেন ধীরে ধীরে উপরের চক্রগুলোতে সঞ্চিত হতে শুরু করেছে। অর্থাৎ আপনার মধ্যে পবিত্র চিন্তাধারার স্রোত বইতে শুরু করবে। এই প্রক্রিয়া ত্রাটক অর্থাৎ প্রথম ক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গে করা যেতে পারে।
৩. এবার তৃতীয় প্রক্রিয়ার কথা। এই প্রক্রিয়ার দুটো ধাপ.
প্রথমেই বলি, আমাদের প্রত্যেকের হৃদয়াকাশে একটি করে ব্রহ্মালোকের প্রদীপ জ্বলছে, এটি আপনি অনুভব করতে পাড়ুন আর না পাড়ুন , প্রথমে সহজ মনে বিশ্বাস করুন । আর এই ব্রহ্মপ্রদীপের যে আলোকশিখা তার বাইরে যে আলোর আভা সেটাই আসলে এই দৃশ্যমান স্থূল শরীর।
এই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হচ্ছে, কল্পনা করুন আপনার হৃদয়কেন্দ্রে একটা প্রদীপশিখা প্রতিনিয়ত জ্বলছে। আর তার ইন্ধন যোগাচ্ছে এই শরীরর মধ্যে বৈশ্বানর অগ্নি। কল্পনা করুন আপনার ভিতরে একটা আলোর প্রদীপ। আর আপনার দেহ হচ্ছে সেই প্রদীপ শিখার আভা। প্রথমে এটি কল্পনা করুন। ধীরে ধীরে মনের মধ্যে এই ভাবের দৃঢ়তা আসতে সাহায্য করুন। জানি, এই ভাব আমাদের সহজে দৃঢ় হবে না। তবে কিছুদিন এই ভাবের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিলে, দেখবেন ভাবটা সহজ হয়ে এসেছে। ধীরে ধীরে এই ভাবের মধ্যে আপনি সারা দিনরাত অতিবাহিত করতে পারবেন। আর এই ভাব তখন কেবল কল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটি তখন আপনার কাছে উপলব্ধ সত্যে পরিণত হবে। আসলে এই শিখা যেমন আছে আমাদের হৃদয়চক্রে, তেমনি আছে আমাদের আজ্ঞাচক্রে, আছে আমাদের সহস্রারের উপরে যে বিন্দু আছে, তার মধ্যে। আমরা জানি এই বিন্দুতেই বিশ্বশক্তি প্রতিফলিত হয়ে আমাদের সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে, আর এই কারণেই আমরা বিশ্বশক্তির সাহায্যে জীবন্ত-প্রানবন্ত হয়ে উঠছি। আসলে বিশ্বজুড়ে এই লীলা চলছে। তাই জগৎ উদ্ভাসিত হচ্ছে। জগৎ প্রকাশিত হচ্ছে, প্রাণবন্ত হচ্ছে। আমাদের চোখের সামনে জীবনের এই খেলা চলছে। কিন্তু তা আমাদের নজরে আসে না।
যাইহোক, যা বলছিলাম, আমাদের হৃদয়কেন্দ্রে এক ব্রহ্ম-আলোক বর্তিকা প্রজ্বলিত আছে। এটি প্রথমে আমাদের কল্পনা করে নিতে হয়, ধীরে ধীরে এটি আমাদের সম্যক উপল্বদ্ধিতে আসে। আপনি শুধু ভাবুন, আপনি একটি আলোর আভা। আপনার এই স্থূল দেহ ঘিরে একটা আলোর আভা বিরাজ করছে। আপনি জেগে আছেন, কি ঘুমিয়ে আছেন, বসে আছেন, কি চলাফেরা করছেন, তাতে কিছু আসে যায় না। আপনি একটি আলোর আভা বৈ কিছু নয়। আপনাকে যারা দেখছেন, তারা হয়তো কিছুই বুঝতে পারছে না, কিন্তু আপনি সেটি অনুভব করছেন। নিরন্তর এই চিন্তাধারার মধ্যে যদি আপনি নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে পারেন, তবে দেখবেন, অন্যের কাছেও এটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই অবস্থায় কাউকে কিছু বলতে যাবেন না। শুধু নিজের মধ্যে এই চিন্তাকে জাগিয়ে রাখুন, যে আপনি একটা আলোক শিখা , আপনার দেহ সেই আলোক শিখার আভা মাত্র, রক্তমাংসের শরীর নয়, একটা আলোর আভা । এই অবস্থায় যদি আপনি তিন মাস অতিবাহিত করতে পারেন, তবে আপনার কাছাকাছি যারা থাকবেন, তারাও অনুভব করবেন, যে আপনার ভিতরে কিছু একটা পরিবর্তন হয়েছে। তারাও আপনার শরীরের চারিপাশে একটা আলোর আভা কখনও কখনও দেখতে পারবেন, বিশেষ করে গভীর অন্ধকার রাতে । এই সময় আপনার কাছাকাছি কেউ এসে পড়লে, সে একটা উত্তাপ অনুভব করবে। আপনি যদি কাউকে এই অবস্থায় স্পর্শ করেন, তবে তারা চমকে উঠবে। শরীরের মধ্যে একটা ইথারিক প্রবাহ অনুভব করবে। একটা শিহরন ঘটবে। আপনি কিন্তু এই ব্যাপারে কাউকে কিছু বলতে যাবেন না। যদি আপনি গুরু সান্নিধ্যে এই প্রক্রিয়ার অভ্যাস করেন, তবে গুরুদেবের সঙ্গে নিভৃতে আলোচনা করুন। নতুবা মুখ হয়ে থাকুন। যদি অন্যরা আপনার মধ্যে এই রূপান্তর অনুভব করেন, তবে আপনি এই ক্রিয়ার পরবর্তী ধাপের মধ্যে প্রবেশের অধিকারী হবেন।
এর পরের ধাপ হচ্ছে, আপনার এই ভাবকে আপনি স্বপ্নের মধ্যে নিয়ে যান। অর্থাৎ চেতন মন থেকে অবচেতন মনে নিয়ে যান। আপনার চেতন মনের এই ভাবনাকে আপনি স্বপ্নের মনের কাছে নিয়ে যান। এই অবচেতন মনের মধ্যে যখন এই চিন্তাধারা প্রবাহিত হবে, তখন আর এটি আপনার কল্পনার বিষয় থাকবে না, তখন এটি বাস্তব হবে। জানবেন, জগতের সমস্ত পদার্থই এক একটা আলোক বর্তিকা ছাড়া কিছু নয়। আলোই সবকিছুর উৎস। জগৎ আলো থেকে এসেছে, আলোতেই মিলিয়ে যাবে। আমাদের প্রতক্ষ্য অনুভূতি হচ্ছে অগ্নির দাহিকা শক্তি সমস্ত পদার্থকে তা সে জৈব হোক বা অজৈব পদার্থ হোক সবই অগ্নির দাহিকা শক্তির সাহায্যে উৎসে ফিরে যায়। কেবলমাত্র পৃথ্বী শক্তি পরে থাকে, আর পৃথিবীর সঙ্গে মিলিয়ে যায়। বিজ্ঞানীগন বলছেন, সমস্ত পদার্থই ইলেক্ট্রন-এর সমন্বয়। সমস্ত পদার্থের এই যে ইলেক্ট্রন এর উৎস হচ্ছে আলোক রশ্মি। আমরা সবাই আলোর বিন্দু, আলোক রশ্মি মাত্র। মুক্তানন্দ বলছেন, কেবল কল্পনা দ্বারা এই সত্যের উন্মোচন ঘটতে পারে। আপনার সচেতন মনে এই কল্পনা যখন দৃঢ় হবে, তখন এটিকে মনের দ্বিতীয় স্তরে অর্থাৎ স্বপ্নের মনে বা অবচেতন মনে নিয়ে যেতে হবে।
এর পরে আপনি যখন ঘুমিয়ে পড়বেন, অর্থাৎ আপনি যখন স্বপ্নের জগতে ঘোরা ফেরা করবেন তখন আপনি নিজেকে একটা আলোক বর্তিকা হিসেবেই দেখবেন। আপনি তখন হালকা হয়ে যাবেন। নিজেকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বাইরে অনুভব করবেন। আপনার চিন্তা যখন চেতন মন থেকে অবচেতন মনে ঘোরা ফেরা করবে, অর্থাৎ আপনি জাগ্রত অবস্থা থেকে যখন স্বপ্নাবস্থায় চলে যাবেন, তখনও একই চিন্তার স্রোত আপনাকে প্রভাবিত করবে। এই সময় স্বপ্নের অবসান ঘটবে। এবং আপনি গভীর ঘুমে চলে যাবেন।
আমরা যখন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখি তখন জাগ্রত অবস্থার মতো একটা অনুরূপ জগতের বাসিন্দা হয়ে যাই । কিন্তু যখন আমরা গাঢ় ঘুমের মধ্যে প্রবেশ করি তখন এই দুটো জগতের অর্থাৎ বাস্তব জগৎ ও স্বপ্নের জগৎ - এই দুইয়ের অস্তিত্বই আর আমাদের কাছে থাকে না। আমরা তখন একটা শূন্যগর্ভে প্রবেশ করি। তখন আমরা এই জগতের জ্ঞানের বাইরে অবস্থান করি। তখন জগৎ যন্ত্রনা বা জগৎ সুখের অবসান ঘটে। আসলে এখন আপনি চৈতন্যের দ্বারে পৌঁছে গেছেন। আপনার জাগতিক জগতের বিলোপ হয়ে গেছে, আপনার স্বপ্নের জগতের অবসান ঘটেছে, কিন্তু আপনার সেই কল্পনাজাত অনুভূতির মধ্যে প্রবেশ করেছেন। আপনি এখন শুধুই আলোক খন্ড, একটা FLAME এই অবস্থায় আপনার শরীর ঘুমুবে, আপনি নয়। আপনি জেগে আছেন। আপনার চেতনা জেগে আছে।
আমরা উপনিষদে পড়েছি, ব্রহ্মার চার অবস্থা, জাগ্রত, স্বপ্ন, সুষুপ্তি ও তুরীয়। এই তুরীয় অবস্থা আমাদের কোনো ধারণা নেই। কিন্তু বাকি তিনটি অর্থাৎ জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি এই তিন অবস্থা সম্পর্কে আমরা পরিচিত। আসলে যোগাচার্য্যগণ বলছেন সবই মেঘের খেলা। ভেসে ভেসে চলেছে। যোগীর উদ্দেশ্য হচ্ছে তুরীয় অবস্থার মধ্যে প্রবেশ করা। আর তুরীয় অবস্থায় অর্থাৎ চৈতন্যের জগতে প্রবেশ করতে গেলে, মুক্তানন্দ বলছেন, এই প্রক্রিয়া এই ব্যাপারে আশু ফল প্রদান করে থাকে।
৪. ইথারিক জগৎ অনুভূতি : আপনি যখন আগের প্রক্রিয়া গুলোতে সহজ হয়ে যাবেন, তখন এই চতুর্থ প্রক্রিয়ায় প্রবেশের অধিকারী হবেন। আপনি এখন হালকা আলোর গোলক, আপনার চেতন মন, আপনার অবচেতন মন এখন নিজেকে হালকা আলোর বর্তিকা বলে অনুভব করছে। এই অবস্থায় আপনি বুঝতে পারবেন, আপনার স্থূল শরীর ঘিরে এক নীলাভ আলোর রোশনাই। এটা আপনি তখনই অনুভব করতে পারবেন, যখন আপনি আগের প্রক্রিয়ায় সহজ হয়েছেন। এইসময় আপনি কেবলই আলোক দেহ। আপনার উপরে আর কোনো চাপ নেই। আপনি মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বাইরে অবস্থান করছেন। যখন আপনি নিজেকে বাস্তবিক হালকা বলে উপলব্ধি করবেন, তখন আপনার পরবর্তী ধাপে যাবার যোগ্যতা হবে।
এবার আপনি অন্ধকার নিভৃত রাতে দরজা বন্ধ করে চক্ষু মুদ্রিত করে, সিদ্ধাসনে বসুন। নিজের পায়ের পাতার দিকে মনকে নিয়ে যান, পায়ের পাতার গঠনের দিকে খেয়াল করতে থাকুন। ধীরে ধীরে পা থেকে মাথা পর্য্যন্ত সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গের দিকে মনকে নিয়ে যান। এই প্রক্রিয়া দাঁড়িয়েও করতে পারেন। তবে মেরুদন্ড সোজা করে পায়ের পাতাসমানি ফাক করে দাঁড়ান, আর আপনি যদি বসে থাকেন, তবে সিদ্ধাসনে বসুন। প্রথমে শরীরের বাইরের গঠনের দিকে খেয়াল করতে থাকুন। অর্থাৎ পা, থেকে মাথা পর্য্যন্ত সমস্ত বহিরঙ্গে মন নিয়ে যান। এবার শরীরের ভিতরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের দিকে মনকে নিয়ে যান। অর্থাৎ চামড়ার ভিতরে যে মাংস, হাড়, শ্বাসনালী, ফুসফুস, পেট-পাকস্থলী, লিভার, অন্ডকোষ থলি একটু খেয়াল করলেই আপনার নজরে আসবে, যে আপনার শরীরের প্রতিটি অঙ্গের চারিদিকে একটা নীলাভ আলোর আভা। প্রথম দিকে চোখ বুজে এই ক্রিয়ার অভ্যাস করুন। ধীরে ধীরে আপনি লক্ষ করবেন, আপনার শরীরের চারিদিকে এই সিদ্ধাসনের আকৃতির একটা নীলাভ আলোর রেখা ফুটে উঠেছে। এবার এই আলোকে লক্ষ করে স্থির শরীরে, স্থির মনে অপেক্ষা করতে থাকুন। দেখবেন, একটা অহেতুক আনন্দের বন্যা আপনার শরীরের মধ্যে মনের মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছে। এ এক অপূর্ব অনুভূতি, যা আপনাকে এক অন্য জগতের বাসিন্দা করে দেবে।
এবার ধীরে ধীরে ধীরে আবার মনকে নিয়ে আলোর স্তর থেকে শরীরের স্তরে নাবিয়ে আনুন। ক্ষাণিক্ষণ এইভাবে চুপ চাপ বসে থাকুন। মিনিট পাঁচেক এই ভাবে থাকার পরে ধীরে ধীরে আপনার পা দুটো সোজা করুন। এবং ধীরে ধীরে আসন ত্যাগ করুন। এই প্রক্রিয়া ১৫ দিন থেকে তিন মাস করুন। একটা নতুন জীবনের আস্বাদ গ্রহণ করুন।
ওম মহর্ষি অগস্ত্য মুনি নমঃ।
-------

Comments
Post a Comment