যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ

ওম নারায়ণং নমস্কৃত্য নরঞ্চৈব নরোত্তমম
দেবীং সরস্বতীং ব্যাসং ততো জয়মুদীরয়েৎ। 

তারিখ : ০৭.০২.২০২৩

যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮-০১

অর্জ্জুন উবাচঃ
সন্ন্যাসস্য মহাবাহো তত্ত্বমিচ্ছামি বেদিতুম
ত্যাগস্য চ হৃষীকেশ পৃথক কেশিনিসূদন। (১৮/০১)

অর্জ্জুন বললেন,হে মহাবাহো, হে হৃষীকেশ, হে কেশিনিসূদন, সন্ন্যাস ও ত্যাগের তত্ত্ব আমি পৃথকভাবে জানতে চাই।

শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস, শ্রীমদ্ভগবৎ গীতার এই অধ্যায়ের নাম রেখেছেন, "মোক্ষযোগ" মোক্ষ কথাটার অর্থ মুক্ত হওয়া। আবার যোগ কথাটার অর্থ মিলন। তো কথাটা আমাদের কাছে বিভ্রান্তি মূলক। যিনি মুক্ত, তার যোগের কোনো সম্ভাবনা নেই। যিনি মুক্ত তিনি নিঃসঙ্গ। অবশ্য যোগীর কাছে যোগ কথাটার অর্থ জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন। আমরা শুনেছি, জীবাত্মা পরমাত্মা থেকে আলাদা নয়। আমাদের অবিদ্যার কারনে অর্থাৎ মায়ার বশে আলাদা বলে মনে হয় মাত্র। এই ভ্রান্ত জ্ঞানের অবসান হলেই, জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার কোনো পার্থক্য থাকে না। আত্মা নিত্য মুক্ত, আলাদা করে তার কোনো মুক্তির সম্ভাবনাই নেই।

যাই হোক, সংশয় আমাদের ছাড়ে না। আসলে আমি যা চাই, আমি যা জানি, আমার সেই চাওয়া, আমার্ সেই জ্ঞানকে সবাই স্বীকৃতি দিক, এই হচ্ছে আমাদের প্রত্যাশা । যুদ্ধে অর্থাৎ সাধনক্রিয়ায় আমরা সহজে লিপ্ত হতে চাই না। কেউ যদি অযাচিত ভাবে, সাধনক্রিয়া করবার কথা বলে, তবে আমরা তাঁকে প্রশ্নবানে বিদ্ধ করতে চাই। আসলে আমি আমার জায়গায় স্থির থাকতে চাই। আমি যা বুঝি, আমরা যা ভালো লাগে, আমি যাতে ঝঞ্ঝাট থেকে সহজে নিষ্কৃতি পেতে পারি তার একটা সহজ পথ আমরা শুনতে চাই। যুদ্ধের মতো রক্তক্ষয়ী ব্যাপার, বা সাধনক্রিয়ার মতো কষ্টসাধ্য ব্যাপার বৈরাগ্যের মতো সর্বহারার অবস্থায় আমরা কেউ যেতে চাই না। যোগৈশ্বর্য্যের মতো দুর্লভ বস্তু তো চাই, কিন্তু সেটা কতো সহজে লাভ করা যায়, আমরা সেই পথের সন্ধান করি। আসলে ঐশ্বর্য্য লাভের প্রত্যাশা, আবার নিজেকে হারাবার ভয়, আমাদেরকে আতঙ্কিত করে তোলে। এইসময় আমাদের মূঢ়তা এসে আমাদেরকে ঢেকে ফেলে। আমরা কিংকর্তাব্যবিমূঢ় হয়ে যাই। মনের মধ্যে হাজার এক প্রশ্ন ওঠে, কিন্তু জবাব শুনবার ধৈর্য্য থাকে না। তাই ভালো কথা আমরা শুনেও শুনি না।

আসলে কর্ম্মসন্যাস ও কর্ম্মত্যাগ সম্পর্কে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এর আগেও বলেছেন। কিন্তু অর্জ্জুনের মধ্যে আছে যুদ্ধ থেকে নিষ্কৃতি পাবার প্রবৃত্তি। আমাদের আছে সাধনমার্গে অনীহা। তাই আমরা গুরুদেবের অনেক কথাই শুনেও শুনি না, বুঝেও বুঝি না, বারবার মনে হয়, সাধন ভজন না করে, ভগবানের কৃপা কি করে পাওয়া যায়। গুরুকৃপা কি করে পাওয়া যায়। অর্থাৎ নিঃশব্দে, নিস্কর্মা হয়ে, সমস্ত সমস্যার সমাধান কি করে হতে পারে, সেই দিকে আমাদের দৃষ্টি থাকে। শ্রীকৃষ্ণ চাইলে তো এই যুদ্ধটা নাও হতে পারতো, তবে কেন তিনি এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আমাকে উদ্দীপ্ত করছেন ?সবচেয়ে বড়ো কথা শ্রীকৃষ্ণ নিজে যুদ্ধে সামিল হচ্ছেন না, অথচ অর্জ্জুনকে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করছেন। এ বড়ো জাদু।

ঋষি অষ্টাবক্র প্রথমেই বলছেন, যদি "মুক্তিমিচ্ছসি চেত্তাত বিষয়ান বিষবৎ ত্যাজ" (১/২) -- যদি মুক্তির ইচ্ছে করো, তবে বিষয়কে বিষবৎ ত্যাগ করো। আবার অন্যদিকে আমরা দেখছি, "কৃষ্ণঃভোগী শুকত্যাগী রাজানৌ জনকরাঘবৌ, বশিষ্ঠঃ কর্ম্মকর্ত্তা চ ত এতে জানুনঃ সমা। " - শ্রীকৃষ্ণ অতুলনীয় ঐশ্বর্য্য ভোগ করেছেন, অগ্রণী পরমহংস শুকদেব মহাত্যাগী, জনক রামচন্দ্র রাজভোগ ও রাজ্য পরিচালনা করেছেন, ঋষি বশিষ্টমুনি বৈদিক কর্ম্মকান্ডের অনুষ্ঠান করেছেন, নিরন্তর। এঁরা সবাই আমাদের নমস্য। কিন্তু আমরা কি করবো ?

অর্জ্জুন বলছেন, হে হৃষিকেশ অর্থাৎ সর্ব্বইন্দ্রিয়ের নিয়ন্ত্রক। হে কেশিনিসূদন অর্থাৎ কেশী নামের দৈত্যকে যিনি নিধন করেছিলেন। মহাভারতের কেশী হচ্ছে রাজা কংশের মল্লযোদ্ধা। অর্থাৎ আমাদের অশুভ প্রবৃত্তির সহযোগী মন। আমরা যখন সাধনক্রিয়া করবার জন্য মন স্থির করি, তখন আমাদের এই অশুভ মনঃবৃত্তি এসে নানান রকম যুক্তিতর্ক দিয়ে আমাকে সাধন ক্রিয়া থেকে নিবৃত্ত করতে চায় । আমরা বিভ্রান্ত হই। অর্জ্জুন তাই প্রশ্ন করছেন, সন্ন্যাস ও ত্যাগের তত্ত্ব আমি পৃথকভাবে জানতে চাই।

এই যে ত্যাগ ও সন্ন্যাস এর আভিধানিক অর্থ একই। কিন্তু এখানে ত্যাগ অর্থে বিষয় বৈরাগ্য। আর সন্ন্যাস বলতে সবত্র সমবুদ্ধিসম্পন্ন। সন্ন্যাসের আসল কথা বাড়িঘর ছেড়ে জঙ্গলে বাস নয় বা সাধারণ বেশভূষা ত্যাগ করে লেংটি পরাও না। সন্ন্যাসের প্রকৃত অর্থ বুদ্ধির সমতা। সমবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি যদি, গৃহস্থ হন, বা ব্রহ্মচারী হন তাতে তার পরিচয়ে কোনো হেরফের হয় না। ব্যাসদেব বা শুকদেব গৃহত্যাগী ছিলেন না। এমনকি প্রাচীনকালের বহু মুনিঋষি সংসারী ছিলেন। আসলে যিনি ফলের আকাংখ্যা না করে, স্বীয় কর্তব্যবোধে বিহিত কর্ম্ম করে থাকেন, তিনিই প্রকৃত সন্ন্যাসী, তিনিই প্রকৃত যোগী। ত্যাগী গৃহস্থ ও সন্ন্যাসীর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তথাপি ত্যাগ অভ্যাসকারীদের ও অধ্যাত্মমার্গীর মধ্যে একটা পার্থক্য আছে, সেই সব কথাই আমরা যোগেশ্বর ভগবানের শ্রীমুখে শুনবো। মোক্ষ জীবনের চরম উদ্দেশ্য।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ০৮.০২.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮-০২

শ্রীভগবান উবাচ
কাম্যানাং কর্ম্মণাং ন্যাসং সন্ন্যাসং কবয়ো বিদুঃ
সর্ব্ব-কর্ম্মফল-ত্যাগং প্রাহুস্ত্যাগং বিচক্ষণাঃ। (১৮/০২)

শ্রীভগবান বললেন, পন্ডিতগণ কাম্য-কর্ম্মসমূহের ত্যাগকে সন্ন্যাস বলে জানেন। বিচক্ষণ ব্যাক্তিগন সকলপ্রকার কর্ম্মফল ত্যাগকেই, ত্যাগ বলে থাকেন।

যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, শাস্ত্রজ্ঞ ব্যাক্তিগন মনে করেন, কামনাজনিত যে সব কর্ম্ম তাকে ত্যাগ করাকেই সন্ন্যাস বলা হয়। কিন্তু যাঁরা জ্ঞানী ব্যক্তি তাঁরা বলে থাকেন, কর্ম্ম নয়, সমস্ত কর্ম্মফলের ইচ্ছেকে ত্যাগ করে কর্ম্ম করাকেই সন্ন্যাস বলা হয়। অতএব ইচ্ছেরহিত হয়ে কর্ম্ম করাকেই প্রকৃত সন্ন্যাস বলা হয়ে থাকে। যিনি আত্মস্থ, যার মন-প্রাণ আত্মাতে আটকে আছে, যিনি সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পন করতে পেরেছেন, তিনিই এই ইচ্ছারহিত কর্ম্মের অধিকারী। সন্ন্যাসীদের না আছে কিছু পাবার ইচ্ছে, না আছে কিছু হারাবার ভয়। সংসারধর্ম্ম, বা শারীরিক ধর্ম্ম পালনের জন্য, তাঁকেও কর্ম্ম করতে হয়। তিনি কর্ম্ম করেন। কিন্তু এই কর্ম্মের জন্য না আছে তাঁর বর্তমানে কিছু পাবার ইচ্ছে, না আছে ভবিষ্যতে কিছু পাবার প্রত্যাশা।

আসলে কর্ম্মহীন জীবন বলে কিছু হয় না। এই যে শরীর বা মন কিছু না কিছু কর্ম্ম করবেই। হয় দৌড়োবে, নয় দাঁড়িয়ে থাকবে, হয় শুয়ে থাকবে নয় বসে থাকবে। হয় সাধন ক্রিয়া করবে, নয়তো অসাধ্য সাধন করবে। ভগবান যখন চোখ দিয়েছেন, তখন তুমি অবশ্য়ই দেখবে, যখন কান দিয়েছেন, তখন অবশ্য়ই শুনবে, যখন মুখ দিয়েছেন তখন তুমি কখনো না কখনো কিছু না কিছু বলবে। যখন ক্ষিদে পাবে তখন খাবে, যখন তৃষ্ণা পাবে তখন জল পান করবে। তো তুমি কর্ম্মহীন হয়ে জীবন কাটাতে পারবে না।

এখন প্রত্যেকটি কর্ম্ম বীজ, তা সে শারীরিক হোক বা মানসিক, একটা কর্ম্মবৃক্ষের জন্ম দেবে। একসময় সেই কর্ম্মবৃক্ষে ফল/ফুল হবে। এতে করে কখনো তোমার আনন্দ হবে, কখনও তোমার দুঃখ হবে। কোনো ফল তেতো হবে, কোনো ফল টক হবে, কোনো ফল কষা হবে, কোনো ফল মিষ্টি হবে। কোনো ফুল সুগন্ধ ছড়াবে, কোনো ফুল কটু গন্ধ ছড়াবে। এখন তুমি যদি কর্ম্মফল সম্পর্কে উদাসীন হও, তবে কর্ম্মফলের স্বাদ তোমার বোধগম্য হবে না।

এখন কথা হচ্ছে, দেহ-ইন্দ্রিয়াদিতে যতক্ষন আমাদের অহংবোধ থাকবে, ততক্ষন আমাদের কাম্য-কর্ম্ম ত্যাগ করা অসম্ভব। ফলাকাঙ্খ্যা বা অভাববোধ যতক্ষন থাকবে, ততক্ষন আমাদের দ্বারা নিষ্কাম কর্ম্ম করা সম্ভব নয়। তাহলে আমাদের কর্তব্য কি ? দেখুন, আমরা সবাই জানি, কাম-সঙ্কল্প যতদিন আমাদের মনে থাকবে, ততদিন আমাদের এই জন্মমৃত্যুর চক্রে ঘুরপাক খেতে হবে। বেদ বিহিত কর্ম্মই করুন, বা বেদ নিষিদ্ধ কর্ম্মই করুন, কর্ম্ম অনুষ্ঠানের দ্বারা আমাদের হয় স্বর্গসুখ, নয় নরক যন্ত্রনা ভোগ করতে হবে। শ্রীভগবানের কথায়, এখান থেকে বেরুনোর রাস্তাই হচ্ছে নিষ্কাম কর্ম্ম। দেখুন, কেউ যখন মোক্ষের ইচ্ছে করে সাধন কর্ম্ম করেন, তাও কামনারহিত নয়। কেউ যদি ভগবানের কৃপা পাবার জন্য কর্ম্ম করেন, তাও ইচ্ছে রহিত নয়। আপনি যদি যথার্থ সন্ন্যাসী হতে চান, তবে নিরাসক্ত হয়ে কর্ম্ম করতে হবে। এখন কথা হচ্ছে, এটা কি করে করা সম্ভব ?

এই নিরাসক্ত হয়ে কর্ম্ম করবার একমাত্র উপায় হচ্ছে আত্মসমর্পন। অর্থাৎ প্রথমে আপনি দেহধারী গুরুর ইচ্ছেতে সমস্ত কর্ম্ম করা শুরু করুন । তাঁরই আজ্ঞায় আপনি সমস্ত জাগতিক কর্ম্ম করতে শুরু করুন। একটা সময় দেখবেন, আপনার মধ্যে নিজস্ব ইচ্ছে বা অনিচ্ছে বলে আর কিছু থাকবে না। শুধু তাই নয়, আপনার মন ও গুরুদেবের মনে মধ্যে এমন একটা সাযুজ্য তৈরী হবে, যখন আপনি স্বাভাবিক ভাবেই নিজের মনের মধ্যেই গুরুদেবের ইচ্ছেকে অনুভব করবেন। এবং আপনার প্রত্যেকটি কর্ম্মই তখন গুরুদেবের অভিপ্রেত হয়ে উঠবে। অর্থাৎ তখন আপনি যা কিছু করবেন, গুরুদেব বলবেন, তুমি ঠিক করেছো। এই হচ্ছে প্রাথমিকভাবে আত্মসমর্পনের প্রথম ধাপ। অর্থাৎ গুরুদেবের ইচ্ছে আর আপনার ইচ্ছের মধ্যে একটা সামঞ্জস্য আসবে। এই প্রক্রিয়া যত গভীর হবে, তত আপনি ঈশ্বরের ইচ্ছেকে ধরতে পারবেন। তখন আপনার দ্বারা যা কিছু কৃত হবে তা জানবেন, ঈশ্বরের ইচ্ছেতেই হচ্ছে। আপনি তখন কেবল নিমিত্ত মাত্র। তখন আপনি যাকিছু করবেন, তা আপনার পুরুষকারের দ্বারা হচ্ছে না, কোনো অদৃশ্য শক্তি আপনাকে দিয়ে যেন এই কাজ করিয়ে নিচ্ছে। আপনি তখন অবশ হয়ে কাজগুলো করে যাচ্ছেন। আপনি তখন কেবল যন্ত্র, আর যন্ত্রী যেন অন্য কেউ। আর এর ফল যাকিছুই হোক না কেন, আপনাকে তা বিড়ম্বনায় ফেলতে পারবে না। আপনি উদাসীন থাকবেন। এই হচ্ছে প্রকৃত সন্ন্যাসের অবস্থা। সন্ন্যাসী কর্ম্মে উদাসীন নয়, কর্ম্মফলে উদাসীন। তখন তাঁর না থাকে মৃত্যুভয়, না থাকে বেঁচে থাকার ইচ্ছে, না থাকে সুখের অভিলাষ না থাকে দুঃখের প্রতি ত্যাগের ভাব। সন্ন্যাসী পুরুষ সদানন্দময়, দ্বন্দ্বাতীত অবস্থায়, নির্ভিক হয়ে ইহজগতের বিচরণ করে থাকেন।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ০৯.০২.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮-০৩

ত্যাজ্যং দোষবদিত্যেকে কর্ম্ম প্রাহুঃ-মনীষিণঃ
যজ্ঞ দান তপঃকর্ম্ম ন ত্যাজ্যম-ইতি চ-অপরে। (১৮/০৩)

কোনো কোনো পণ্ডিত ব্যাক্তিগন বলে থাকে কর্ম্ম মানেই দোষবিশিষ্ট, তাই পরিত্যাজ্য। আবার কেউ কেউ বলেন, যজ্ঞ, দান, তপস্যা ইত্যাদি কর্ম্ম ত্যাজ্য নয়।

দেখুন, কর্ম্ম মাত্রেই বন্ধনের হেতু। তাই কোনো কোনো পণ্ডিত ব্যাক্তিগন বলে থাকে কর্ম্ম মাত্রেই পরিত্যাজ্য। কর্ম্ম পরিহার করাই শ্রেয়। আবার কেউ কেউ বলে থাকেন, কর্ম্ম নয়, কর্ম্মফলের ত্যাগ করতে হবে। একথা আমরা আগের শ্লোকে শুনেছি।

এবার বলছেন, সমস্ত কর্ম্ম তা সে ভালো হোক বা মন্দ হোক, আমাদের বন্ধনের কারন, অতএব সমস্ত কর্ম্মই ত্যাগ করা ভালো। কিন্তু বেদজ্ঞ পন্ডিতগণ বলছেন, বেদবিহিত যজ্ঞাদি কর্ম্ম শুভ ফল প্রদায়ক। লোক হিতার্থে এই যজ্ঞাদি কর্ম্ম করা হয়ে থাকে। এই যজ্ঞাদি কর্ম্ম শুধু ইহলোকের হিতের জন্য নয়, এই যজ্ঞাদি কর্ম্ম আমাদের পরলোকবাসীদের এমনকি আমরা যখন পরলোকে যাবো, তখনও আমরা এই যজ্ঞ কর্ম্মের শুভ ফল ভোগ করতে পারবো। অতএব বেদবিহিত যজ্ঞাদি কর্ম্ম আমাদের কখনো পরিত্যাগ করা উচিত নয়।

দেখুন, কর্ম্মাদিতে আপনি কি পেলেন, সেই পাওনা ভালো কি মন্দ সেটা বড়ো কথা নয়। আবার ভালো কর্ম্মে অনুৎসাহিত করাও বোধহয় কাজের কথা নয়। কারন কর্ম্ম প্রকৃতির বিক্ষেপের কারনে ঘটে থাকে। আর এই প্রকৃতির বিক্ষেপ হচ্ছে জগৎ সৃষ্টির কারন। তো কর্ম্ম না থাকলে, জীবের জীবন, এমনকি জগৎ নিশ্চিন্হ হয়ে যাবে। কিন্তু কথা হচ্ছে কর্ম্ম যেন হিংসা বর্জিত হয়। আমরা দেখেছি, তথাকথিত বৈদিক যজ্ঞ, পশু হত্যাকে প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। তো হিংসা যজ্ঞকারীকে হিংসা জনিত পাপ থেকে নিষ্কৃতি দেবে, এমন ভাবার যুক্তিগ্রাহ্য কারন দেখতে পাই না। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, তথাকথিত যজ্ঞদ্বারা পাপ ও পুন্য উভয়ই উৎপন্ন হতে পারে। তাই বৈদিক যজ্ঞের দ্বারা জীবজগতের দুঃখের নিবৃত্তি কখনোই সম্ভব নয়।

কিন্তু যোগীপুরুষগন যজ্ঞ বলতে প্রাণযজ্ঞের কথা বলে থাকেন। আর এই প্রাণযজ্ঞ ক্রিয়ার ফলে যোগী পরাবস্থা প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে, কর্ম্ম বা ক্রিয়া কখনও ত্যাজ্য হতে পারে না। কারন সাধনক্রিয়া বা প্রাণক্রিয়া দ্বারাই জীবসকল জীবিত থাকে, আবার এই প্রাণক্রিয়া দ্বারাই মনুষ্য দেবত্ত্ব লাভ করে থাকে। ভগবৎ সত্তার অনুভূতি এই সাধনক্রিয়ার দ্বারাই সম্ভব হয়ে থাকে। তবে একথাও ঠিক যে সাধকের সাধনক্রিয়া-ফল স্বরূপ এমন একটা অবস্থা আসে, যখন প্রাণ স্থিরবৎ হয়ে যায়। তখন অর্থাৎ সেই অবস্থায় তার আর প্রাণক্রিয়া কি ভাবে সম্ভব হতে পারে? আসলে যাঁরা লক্ষ্যস্থলে পৌঁছে গেছেন, তাঁদের আর কর্ম্ম না করলেও চলে। কিন্তু এও ঠিক, এইসব যোগীপুরুষ, ইচ্ছারহিত হয়ে, উদ্দেশ্যবিহীন হয়ে স্বভাবধর্ম্ম বশতঃ ক্রিয়া করে থাকেন। এই কর্ম্ম তাদের আপনা থেকেই হয়ে থাকে। তো যোগীপুরুষের না আছে কর্ম্মে অনীহা, না আছে কর্ম্মে আসক্তি। তার কর্ম্ম কেবল স্বভাব বশতঃ হয়ে থাকে। তো চিত্ত স্থির না হওয়া পর্যন্ত লক্ষ্য স্থির রেখে কর্ম্ম করা সমীচীন। কিন্তু যখন লক্ষ্যে পৌঁছে গেলেন, তখন স্বভাবধর্ম্ম অনুযায়ী কর্ম্ম করতে হবে।

তো যাঁরা যজ্ঞ, দান, তপস্যা ইত্যাদি ত্যাজ্য নয় বলছেন, তারা এই প্রাণযজ্ঞ, লোকহিতার্থে সাধনপদ্ধতির সামাজিক-করণ, এবং তপস্যা অর্থাৎ নিজেকে বিধিবদ্ধ করার কাজে লিপ্ত থাকার উপরে জোর দিয়েছেন। দেখুন কামনা পূরণের জন্য বা দেহ রক্ষার জন্য, কর্ম্মের বিধান আছে, আবার এই কর্ম্মই মানুষকে জ্ঞান অর্জনে সাহায্য করবে। এর পরে যখন কেউ যোগারূঢ় হবেন, তখন সকাম কর্ম্মের নিস্পত্তি হবে। আর সকাম কর্ম্মের নাশ হলে, কর্ম্মের ফল বিড়ম্বনায় ফেলতে পারবে না। তো আমরা যে শুনেছিলাম, কর্ম্মই বন্ধনের কারন, এই সিদ্ধান্ত যোগারূঢ় ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। কেননা তিনি জীবন্মুক্ত হয়ে অবস্থান করছেন। তাঁর না আছে জন্ম না আছে মৃত্যু। তিনি জন্ম-মৃত্যুর উর্দ্ধে - কর্ম্ম বন্ধনের উর্দ্ধে।

ওম নমঃ শ্রী ভাগবতে বাসুদেবায়।
তারিখ : ১০.০২.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮-০৪-৫

নিশ্চয়ং শৃণু মে তত্র ত্যাগে ভরতসত্তম
ত্যাগো হি পুরুষব্যাঘ্র ত্রিবিধঃ সংপ্রকীর্ত্তিতঃ। (১৮/০৪)

হে ভরতসত্তম, ত্যাগ সম্পর্কে আমার অন্তিম অভিপ্রায়টি শোনো। হে পুরুষব্যাঘ্র ত্যাগ ত্রিবিধ বলে কথিত হয়ে থাকে।

হে ভরতসত্তম অর্থাৎ ভরত বংশের শ্রেষ্ঠ। পুরুষব্যাঘ্র, পুরুষ=পুর+বস+অ, পুর অর্থাৎ শরীর,বস মানে বাসকরা /তো পুরুষ কথাটার অর্থ যিনি শরীরে বাস করেন । পুরুষ+ব্যাঘ্র অর্থাৎ নরশ্রেষ্ঠ বা পুরুষপ্রধান। ত্যাগী পুরুষ তার সমস্ত ইচ্ছেকে হজম করে ফেলেছেন। ত্যাগ সম্পর্কে নানান জনের নানান মত - তাই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই বিষয়টিকে বারংবার উল্লেখ করছেন। আমরা এর আগেই শুনেছি, ত্যাগ গুনভেদে তিন প্রকার, সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক। জ্ঞানের উন্মেষের ফলে সাধকের মধ্যে এই ত্যাগের স্বভাব গড়ে ওঠে। এই ত্যাগের জন্য কোনো মানসিক পীড়নের প্রয়োজন পড়ে না। আর একেই বলে সাত্ত্বিক ত্যাগ।
আরো একপ্রকার ত্যাগ আছে, যা সাত্ত্বিক হলেও স্বাভাবিক নয়। এই ত্যাগের স্বভাব অৰ্জন করতে হয়। অর্থাৎ শাস্ত্রপাঠ, শাস্ত্রবিচার, স্মরণ-মনন ইত্যাদি দ্বারা এই ত্যাগের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। এই ত্যাগ গুনের উর্দ্ধে নয়, একেও সাত্ত্বিক ত্যাগ বলা হয়। তবে এর জন্য সাধককে পরিশ্রম করতে হয়। আর সত্যি কথা বলতে কি, এই অর্জ্জিত ত্যাগই সাধককে একদিন আধ্যাত্মিক জ্ঞান অৰ্জনের উপযুক্ত করে গড়ে তোলে।
আরো একপ্রকার ত্যাগ আছে, যা আসলে উচ্চতর কাম্যবস্তু লাভের জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থকে ত্যাগ করা। এরা যদি ভাগ্যক্রমে বা গুরুকৃপায় সাধনক্রিয়া করতে বসেন, তবে এদের মধ্যে যোগৈশ্বর্য্যের লোভ থাকে। এরা আত্মদর্শনের জন্য বা আত্মজ্ঞান লাভের জন্য সাধন-ভজন করেন না। এরাই গুরুদেবকে জাগতিক বস্তু দিয়ে খুশি করতে চান। গুরুদেবের কথা অনুযায়ী চলা, বা নিয়মিত সাধনক্রিয়া এদের পক্ষে সম্ভব হয় না। তবে এরা গুরুদেবকে বাহ্যত খুশি রাখার চেষ্টা করেন । এরা জাগতিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ, স্বর্গসুখ লাভের জন্য, বা কিছু অলৌকিক ক্ষমতা অর্জনের জন্য, পূজা-পাঠ ইত্যাদি করে থাকেন। এরা পূজা সামগ্রীকে ত্যাগের বস্তু মনে করেন। এই যে ত্যাগ এটি আসলে রাজসিক প্রকৃতির।
ছাড়া আছে তামসিক ত্যাগ। এরা আসলে অলসতার কারনে, অনেক কিছু থেকে নিজেকে দূরে রাখতে বাধ্য হয়। এদের কর্ম্মত্যাগ স্বাভাবিক, এমনকি এরা সংসারের ঝামেলা থেকে নিষ্কৃতি পেতে সংসার ত্যাগ করতেও পিছপা হয় না। কিন্তু এরা কামনা-বাসনা ত্যাগ করতে পারে না। এরা যেখানেই যাক না কেন অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে বেঁচে থাকে।
দেখুন ত্যাগ তারই করা সাজে যে ভোগ করতে সক্ষম। দাঁতবিহীন সিংহ, মাংস খায় না মানে নিরামিষাষীও নয়, আবার ধর্ম্মিকও নয়। দারিদ্রের ধনহীনতা ত্যাগের কারনে হয় না, বৃদ্ধের ইন্দ্রিয়সুখ বৰ্জন ত্যাগের কারনে হয় না। এরা পরিস্থিতির দাস। পরিস্থিতি এদেরকে ত্যাগী বা নিঃস্ব করেছে, এরা কিছুই ত্যাগ করবার যোগ্য নয়। এবার আমরা যোগেশ্বর ভগবান শ্ৰীকৃষ্ণের কাছ থেকে শুনবো, এই বিষয়ে তিনি কি বলতে চাইছেন।
যজ্ঞ-দান-তপঃ-কর্ম্ম ন ত্যাজ্যং কার্য্যমেব তৎ
যজ্ঞো দানং তপশ্চৈব পাবনানি মনিষীণাম। (১৮/০৫)

যজ্ঞ দান ও তপস্যা রূপ কর্ম্ম ত্যাগ করা উচিত নয়, এসব করা কর্তব্য। যজ্ঞ দান ও তপস্যা মনিষীগণের বিচারে চিত্তশুদ্ধিকর।

ভগবান এবার চিত্তশুদ্ধিকরণের উপায় হিসেবে যজ্ঞ দান ও তপস্যার করা কথা বলছেন। বলছেন, এসব ঠিকঠিক মতো অনুষ্ঠিত হলে, আমাদের চিত্ত শুদ্ধি হতে পারে। আমরা যখন ছান্দোগ্য উপনিষদ শুনছিলাম, তখন আমরা লক্ষ করেছি, এই ছান্দোগ্য উপনিষদের আটটি অধ্যায়ের মধ্যে পাঁচটিই কর্ম্মকান্ড। সেখানে যাগযজ্ঞের কথা বলা হয়েছে। কেবলমাত্র শেষ তিনটি অধ্যায়ে আত্মতত্ত্বের কথা আলোচনা হয়েছে। আসলে এই যাগযজ্ঞ দ্বারা আমাদের চিত্ত শুদ্ধি হয়ে থাকে।

কিন্তু কথা হচ্ছে কি দরকার আমাদের চিত্ত শুদ্ধিকরণের ? দেখুন যার মন পবিত্র নয়, যার চিত্ত শুদ্ধ হয়নি, তার পক্ষে যথার্থ জ্ঞানের উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। জ্ঞান তো শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয়, জ্ঞান হচ্ছে প্রতক্ষ্য অনুভূতি। সত্যকে অনুভব করাই জ্ঞান। মলিন আয়নায় যেমন প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হতে পারে না, তেমনি অশুদ্ধ চিত্তে বা অপবিত্র মনে জ্ঞানের উপলব্ধি স্বচ্ছ হতে পারে না। দেহ-প্রাণ-মন যখন স্থির হয়, তখন আমরা পবিত্র হতে পারি। যোগী যখন প্রাণক্রিয়া করেন, তখন তাঁর মন এতটাই শুদ্ধ হয় যায়, যে তিনি সঙ্কল্প শূন্য হয়ে যান। এই সঙ্কল্প শূন্য মন, বাসনাশূন্য মন, কামনাশূন্য মন, আত্মস্থ হবার যোগ্যতা এনে দেয় আমাদেরকে। যতক্ষন না আমাদের মন সঙ্কল্পশূন্য হচ্ছে, ততক্ষন আমাদের প্রাণক্রিয়া করে যেতে হবে।
আবার লোকহিতার্থে যে দান, অর্থাৎ ক্রিয়াদান, তাও আমাদেরকে চিত্ত শুদ্ধি করতে সহায়ক হয়ে থাকে। এই ক্রিয়াদান হচ্ছে পরোপকার। পর অর্থাৎ উচ্চ উপকার। এই পরোপকার আসলে অন্যের হিতের জন্য অনুষ্ঠিত হলেও, আখেরে আমাদের আপন চিত্তকে উচ্চ পর্য্যায়ে নিয়ে যায়। নিঃস্বার্থ ভাবে অন্যের উপকার করে দেখবেন, একটা তৃপ্তির আনন্দ পাওয়া যায়। যা আমাদের শুদ্ধ-পবিত্র মন থেকে উৎসারিত হয়ে থাকে। সুতরাং প্রাণায়াম ইত্যাদি অর্থাৎ যোগীগণের ক্রিয়া সাক্ষাৎভাবে আমাদের মনকে পবিত্র করতে পারে, মনকে শুদ্ধ করতে পারে, এমনকি আমাদের স্থুল দেহকেও শুদ্ধ করতে পারে। এই এইসব ক্রিয়া কখনোই পরিত্যাজ্য নয় বরং এসব করা আমাদের মনুষ্য জীবনের কর্তব্য।

ছান্দোগ্য উপনিষদ বলা হচ্ছে,জীবের উৎপত্তি যজ্ঞের কারনে হয়ে থাকে। বলছেন, (৫/৭/২) দেবগন যজ্ঞাগ্নিতে অন্নকে আহুতি দেন। সেই আহুতি থেকে শুক্র উৎপন্ন হয়। সেই আহুতি থেকে গর্ভসঞ্চার হয়। জরায়ু দ্বারা আবৃত এই গর্ভ নয় মাস বা দশমাস বা যতদিন আবশ্যক মাতৃজঠরে বাস করার পরে জন্ম গ্রহণ করে।

যাঁরা শ্রদ্ধাযুক্ত হয়ে তপস্যাদি করেন, তাঁরা মৃত্যুর পর আর্চিলোক (আলোর তরঙ্গ) প্রাপ্ত হন। এরপর অর্চি থেকে দিনে, দিন থেকে শুক্ল, শুক্ল পক্ষ থেকে উত্তরায়নে সেখান থেকে সংবৎসরে, সেখান থেকে আদিত্য, আদিত্য থেকে চন্দ্রে এবং চন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ-লোক প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। সবশেষে ব্রহ্মলোক থেকে এক অমানব পুরুষ এসে তাঁদের ব্রহ্মলোকে নিয়ে যায়। একেই দেবযান বা দেবলোকের পথ বলা হয়। (৫/১০/১-২)

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
তারিখ : ১১.০২.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/০৬-৮

এতান্যপি তু কর্ম্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা ফলানি চ
কর্ত্তব্যানীতি মে পার্থ নিশ্চিতং মতমুত্তমম (১৮/০৬)

হে পার্থ, তবে এইসব কর্ম্মও কর্তৃত্বাভিমান ও ফলাসক্তি ত্যাগ করে করা কর্তব্য। এই আমার নিশ্চিত ও সর্ব্বত্তম অভিমত।

যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, কর্তৃত্বাভিমান ত্যাগ করে, ফলাকাঙ্খ্যা ত্যাগ করে কর্তব্য কর্ম্ম করা উচিত। কিন্তু মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে, প্রত্যেকটি কর্ম্ম প্রকৃতির নিয়মে ফল প্রদান করে থাকে। এখানে স্বয়ং ভগবানেরও কোনো হাত নেই। দুর্যোধন বলুন বা ভীষ্ম বলুন, কংশ বলুন বা বিদুর বলুন, সবাই নিজ নিজ কর্ম্ম অনুযায়ী ফল ভোগ করে থাকেন। আসলে কর্ম্মের উদ্যোগ যদি একমাত্র ফলের জন্য হয়ে থাকে, তবে সেই মানুষের কাজের থেকে বেশি আগ্রহ থাকে ফলের দিকে। গাছের আশায়, মাটিতে বীজ পোতার পরে, যদি আপনি প্রতিদিন বীজটিকে মাটি থেকে তুলে গাছের দর্শন পেতে চান, তবে সেই বীজ কোনোদিন অঙ্কুরোদ্গমের যোগ্য হবে না। সাধনক্রিয়া করবার সময় যদি মনের মধ্যে যোগের ফল স্বরূপ যোগ-ঐশ্বর্যের কথা বারবার মনের মধ্যে উদয় হতে থাকে, তবে আপনার যেমন যোগক্রিয়া ব্যাহত হবে, তেমনি আপনার মন ক্রিয়া থেকে বেশী নজর দেবে ঐশ্বর্যের দিকে। অর্থাৎ আপনার প্রাণ-মন তখন চঞ্চল হয়ে কেবল ফলের খোঁজ করতে থাকবে। আর চঞ্চল মন জানবেন, বিষয়ে আসক্ত, মলিনতায় ভরপুর। আর মন যতক্ষন না শুদ্ধ হচ্ছে, মন যতক্ষন না স্থির হচ্ছে, ততক্ষন যোগের সাফল্য আসতে পারে না। এই নামমাত্র ক্রিয়া শুধু সময় নষ্ট করবে না, আপনাকে বিপথে চালিত করতে পারে। একটা জিনিস প্রত্যেকটি সাধককে মনে রাখতে হবে, যে সাধন ক্রিয়া কখনোই জাগতিক বস্তু লাভের জন্য নয়। সাধনক্রিয়া আমাদের সত্যের উপলব্ধির জন্য। আর এই সত্যের উপলব্ধি হতে পারে একমাত্র শুদ্ধ মনে। আর শুদ্ধ মন মানেই সংকল্প-বিকল্প রহিত। তো ফালাকাঙ্খ্যা মানে মনের মধ্যে ফলের প্রতিচ্ছবি। আর এই প্রতিচ্ছবি, যতক্ষন থাকবে, ততক্ষন সত্যের প্রতিবিম্ব আপনার মনে স্পষ্ট হতেই পারবে না।
আত্মসমর্পনের ভাব তা সে গুরুদেবের প্রতি হোক, বা ঈশ্বরের প্রতি হোক, যতক্ষন না আসছে, ততক্ষন আমাদের অবশ্যই ক্রিয়া করে যেতে হবে। কেননা এই আত্মসমর্পনই আমাদের কর্তৃত্বাভিমান দূর করতে সাহায্য করবে। আর এই ক্রিয়া চলাকালীন অন্য কোনো কিছুর প্রতি আমাদের নজর থাকবে না। গুরুবাক্যে ভরসা করে ক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে। সর্বান্তকরনে আমরা যখন ক্রিয়ার প্রতি মনোযোগী হবো, তখন আমাদের মনের ময়লা দূরীভূত হবে। আর নির্ম্মল চিত্তে সত্য প্রতিফলিত হবে, আমাদের চিত্তে জ্ঞানের সমাহার ঘটতে থাকবে। একসময় এই শুদ্ধজ্ঞানের দ্বারা আমরা ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হবো । তাই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, আমাদের যেন না থাকে কর্তৃত্বাভিমান, না থাকে ফলের প্রতি আকাংখ্যা। নিষ্কাম ক্রিয়াই যোগেশ্বরের মতে শ্রেষ্ঠক্রিয়া।

নিয়তস্য তু সন্ন্যাসঃ কর্ম্মণো ন-উপপদ্যতে
মোহাৎ-তস্য পরিত্যাগঃ-তামসঃ পরিকীর্ত্তিতঃ। (১৮/৭)

কিন্তু নিত্যকর্ম্মের ত্যাগ যুক্তিযুক্ত নয়। মোহবশতঃ সেই নিত্যকর্ম্মের পরিত্যাগ তামস বলে কথিত।
"নিয়তস্য তু সন্ন্যাসঃ কর্ম্মণো ন-উপপদ্যতে" - নিত্য বা স্বধর্ম্মরূপ যে কর্ম্ম যা আবশ্যিক, তাকে ত্যাগ করা উচিত নয়। আপনি যদি ব্রাহ্মণের ঘরে জন্ম গ্রহণ করে থাকেন, তবে আপনার স্বধর্ম্ম অনুযায়ী সন্ধ্যা-উপাসনাদি করা কর্তব্য। আবার যদি আপনি খ্রিষ্টধর্ম্মে জন্ম গ্রহণ করে থাকেন, তবে আপনার খ্রিষ্ট-উপাসনাতে অংশ গ্রহণ করা উচিত। আবার কেউ যদি ইসলাম ধর্ম্মে জন্ম গ্রহণ করেন, তবে আপনার স্বধর্ম্ম অর্থাৎ নমাজ ইত্যাদিতে নিজেকে নিযুক্ত করা উচিত। অর্থাৎ যার যা কুলধর্ম্ম, তা তার পালন করা উচিত।
আসলে আমরা সবাই পূর্ব্বজন্মের কিন্তু সংস্কার নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে থাকি। যা আমাদের আসলে স্ব-ভাব। এই যে স্ব-ভাব, এই স্ব-ভাব বশতঃ আমরা যেমন কেউ কুকর্ম্মে আকৃষ্ট হই, আবার এই স্ব-ভাবের কারণেই আমরা সুকর্ম্মে আকৃষ্ট হই। আমাদের এই যে স্ব-ভাব, যা আসলে আমাদের পূর্ব-পূর্ব জনমের সংস্কার, একে আমরা সহজে ত্যাগ করতে পারি না। জীবনের প্রথম দিকে এই সংস্কারকে সাথী করেই আমাদের চলা শুরু করতে হয়। পাখি হয়ে জন্মালে আমাদের উড়তে শিখতে হবে। হাস্ হয়ে জন্মালে আমাদের সাঁতার কাটতে হবে। গরু হয়ে জন্মালে আমাদের চার হাত-পায়ে হাটতে হবে। মানুষ হয়ে জন্মালে আমাদের সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। মেরুদন্ড সোজা রেখে আমাদের চলতে হবে।
সমস্ত জীবকুল দেহাভিমানী। সমস্ত মানুষ সংসারমুখী। তো প্রথম দিকে আমাদের অবশ্যই এই দেহ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। দেহ রক্ষার নিয়মাবলীর পালন করতে হবে। সংসারের নিয়মকানুন সম্পর্কে অবহিত হতে হবে।
পশুকুল ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে বিচার বুদ্ধির। একমাত্র মানুষের বিচারশক্তি আছে। অন্য কোনো জীবেরই বিচার শক্তি নেই। একমাত্র মনুষ্য শরীরেই ঈশ্বর উপলব্ধি সম্ভব। নিয়তির কারনে, আমরা যে দুর্লভ মনুষ্য শরীর পেয়েছি, তার যা স্ব-ভাব, তাকে সেই কাজে লাগাতে হবে। জানবেন, মনুষ্য শরীর ঈশ্বর উপলব্ধির জন্য, সংসার করবার জন্য নয়। এই মনুষ্য শরীরে বিচার বুদ্ধির দ্বারা আমরা আমাদের পূর্ব সংস্কারকে রুদ্ধ করতে পারি , সংশোধন করতে পারি। এই কাজই আমাদের নিত্যকর্ম্ম। এই নিত্যকর্ম্মের পালন করা উচিত। এই নিত্য কর্ম্মেকে যারা ত্যাগ করেন, তারা তামসিক প্রকৃতির।

নিরন্তর ব্রহ্মচিন্তন, সাধনক্রিয়া ইত্যাদির অভ্যাসের দ্বারা আমাদের প্রাণ-মন-বুদ্ধি স্থির হলে সেই নিত্যানন্দ স্বরূপ ব্রহ্মে অনুভূতি পেতে পারি। আমাদের যোগসাধনা যত ঐকান্তিক হবে, ততোই মদের মূলাধারস্থিত কুন্ডলিনীশক্তি জাগ্রত হয়ে সাধককে ধ্যান-সমাধির স্তরে নিয়ে যাবে। তখন আমরা ইচ্ছারহিত হয়ে দেহ-সন্মন্ধে উদাসীন হয়ে যাই। এই হচ্ছে যথার্থ ত্যাগের অবস্থা। সংসার ত্যাগ তো তামস ত্যাগ, সংস্কারের ত্যাগই যথার্থ সাত্ত্বিক ত্যাগ।


দুঃখমিত্যেব যৎ কর্ম্ম কায়ক্লেশভয়াৎ ত্যজেৎ
স কৃত্বা রাজসং ত্যাগং নৈব ত্যাগফলং লভেৎ। (১৮/৮)

দুঃখকর বলে, বা দৈহিক ক্লেশের ভয়ে, যিনি কর্ম্ম ত্যাগ করেন তিনি রাজস্ ত্যাগ করেন, এতে তিনি ত্যাগের ফল লাভ করতে পারেন না।

কাজ মানেই কষ্টকর। আর এই কষ্টকর শারীরিক কর্ম্মে যার অনীহা, তা না ইহকালে, না পরকালে, শান্তি হয়। কথায় বলে কষ্ট না করলে কেষ্ট মেলে না। তো শারীরিক কষ্টের দোহাই দিয়ে যারা নিত্য কর্তব্য কর্ম্ম থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে চান, সেই ত্যাগ রাজসিক। এদের মধ্যে আবার অনেকে বলে থাকেন, আমরা তো সাধন-ভজন করতে চাই, আশ্রমে এসেছি ঈশ্বরের সাক্ষাৎ লাভের জন্য, আর তার জন্য আমি ঠাকুরঘরে থাকতে চাই, আমি কেন রান্নাঘরের কাজে, বা গোয়ালঘরের কাজ করতে যাবো ? এইসব ফালতু কাজ যারা সংসারে থাকতে চান, তাদের জন্য। এসব সংসারী লোকের কাজ। আমিতো পুজো-পাঠ ভজনাদি সাধনক্রিয়া ইত্যাদি করে ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করতে চাই।

এমনকি এদের মধ্যে এমনসব লোকও আছেন, যা বলে থাকেন , ঘন্টার পর ঘন্টা মেরুদন্ড সোজা রেখে বসে থাকা, বা একনাক চেপে ধরে, অন্য নাকে শ্বাস নেবার মধ্যে কোনো
বাহাদুরি নেই। দম বন্ধ করে বসে থাকলেই কি ভগবান দেখা দেবেন ? ওসব আসলে কিছু অকেজো লোকের ভ্রান্ত ধারনা। তো বলতে ইচ্ছে করে, তো মহাশয়, আপনার কি কাজ ? খাওয়া ও শোয়া ? এই যে কায়ক্লেসের ভয়ে নিস্কর্মা হয়ে থাকা, একেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন রাজস ত্যাগ। এই ত্যাগ আসলে তাকে অন্ধকারের দিকে ঢেলে দিচ্ছে - যা বোঝার ক্ষমতাও তার নেই।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
তারিখ : ১২.০২.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/০৯-১১
কার্য্যমিত্যেব যৎ কর্ম্ম নিয়তং ক্ৰিয়তে-অর্জ্জুন
সঙ্গং ত্যক্ত্বা ফলঞ্চৈব স ত্যাগঃ সাত্ত্বিকো মতঃ। (১৮/৯)

হে অর্জ্জুন কর্ত্তৃত্বাভিমান এবং ফল কামনা ত্যাগ করে "ইহা কর্ত্তব্য" এমনটা ভেবে যিনি শাস্ত্রবিহিত নিত্যকর্ম্ম করেন, সেই ত্যাগ, সাত্ত্বিক বলে কথিত হয়।

তামসিক ও রাজসিক ত্যাগ বলতে আমরা শুনেছি, কর্ম্মকেই ত্যাগের কথা। কিন্তু সাত্ত্বিক ত্যাগে কর্ম্ম ত্যাগ্যের উল্লেখ নেই, সেখানে আছে কর্ম্মফল ত্যাগের কথা। অর্থাৎ কর্ম্মফলের আকাংখ্যা না করে, যে কর্ম্ম তাকে সাত্ত্বিক ত্যাগ বলা হয়েছে। সাংসারিক যে কর্ম্ম, এমনকি সাধন-ভজন আমাদের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। এসব বাদ দিলে চলবে না। আসক্তিবশতঃ কোনো কর্ম্ম করা উচিত নয়। অনাসক্ত হয়ে কর্ম্ম করতে হবে। যোগী পুরুষের সমস্ত কর্ম্ম তা সে যোগক্রিয়া বলুন, বা জাগতিক কর্ম্ম বলুন, তা কেবলমাত্র গুরুদেবের ইচ্ছেতেই বা ঈশ্বরের ইচ্ছেতেই সম্পাদিত হয়ে থাকে। যোগী এখানে যন্ত্র মাত্র, নিমিত্ত মাত্র । এই কর্ম্ম সম্পাদনে তার নিজস্ব কোনো সঙ্কল্প থাকে না। অর্থাৎ আমাদের স্ব-ভাব অনুযায়ী কর্ম্ম। শরীর রক্ষার জন্য শ্বাসক্রিয়া নয়, শ্বাসক্রিয়া হচ্ছে তাই শরীর রক্ষা পাচ্ছে। অন্নের স্বাদ গ্রহণের জন্য অন্নভোগ নয়, অন্ন গ্রহণ হচ্ছে তাই শরীর পুষ্টি লাভ করছে। এই সব (শ্বাস ও অন্ন) গ্রহণ ও ত্যাগ ( অজীর্ণ পদার্থ বা শ্বাস ত্যাগ) কর্ম্ম অবিশ্রান্তভাবে চলছে, এই স্ব-ভাব জাত কর্ম্মের মধ্যে কোনো সংকল্প নেই। সাধনক্রিয়ার পরিণতি হচ্ছে মনুষ্য থেকে দেবত্ত্বে উন্নতি হবার ক্রিয়া। জগৎ প্রতিনিয়ত পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে, আর এই পরিণতি আসলে ক্রিয়ার ফল মাত্র। এই পরিণতি প্রাপ্তির কারণস্বরূপ যে ক্রিয়া তাকে সাত্ত্বিক ক্রিয়া বলা হয়ে থাকে। আর এর মধ্যে যে ত্যাগের ভাব, তাকে বলে সাত্ত্বিক ত্যাগ। আর এই যে স্বাভাবিক ক্রিয়া, এর মধ্যে কোনো কর্তৃত্বাভিমান নেই। যোগী যখন সাধনার উত্তম অবস্থায় উপনীত হন, তখন তার শ্বাস-বায়ু সুষুম্না বাহিত হয়। এইসময় তাঁর সংসারবোধের লোপ হয়। তথাপি তিনি স্বাভাবিক ক্রিয়াকর্ম্ম করে চলেন, যার মধ্যে কোনো সংকল্পের লেশমাত্র থাকে না।

ন দ্বেষ্টকুশলং কর্ম্ম কুশলে ন-অনুষজ্জতে
ত্যাগী সত্ত্বসমাবিষ্টো মেধাবী ছিন্নসংশয়ঃ। (১৮/১০)

যিনি সত্ত্বগুণ সম্পন্ন ব্যক্তি, মেধাবী, সংশয়রহিত ত্যাগী ব্যক্তি, তিনি অকল্যাণকর বা দুঃখকর কর্ম্মে যেমন দ্বেষ করেনা না, তেমনি সুখকর বা কল্যাণকর কর্ম্মেও আসক্ত হন না।

মানুষ যখন আত্মস্থিত হন, তখন তার বুদ্ধি তীক্ষ্ণ হয়, তিনি সমস্ত ব্যাপারে সংশয়রহিত হন। তার কাছে প্রিয়-অপ্রিয় বলে কিছু থাকে না। আমাদের যে প্রাণকর্ম্ম তা আমাদের স্বভাবনিয়ত কর্ম্ম। আমাদের শরীর রক্ষার জন্য যে কর্ম্ম তা আমাদের স্বভাবনিয়ত কর্ম্ম। এমনকি আমাদের সংসার যাত্রা নির্বাহ করবার জন্য যে স্বাভাবিক কর্ম্ম করতে হয়, তা সবই স্বভাব-জাত কর্ম্ম। এই স্বভাব জাত কর্ম্ম জগতের জীবকূলকে পরিণতির দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আর এই স্বভাব জাত কর্ম্ম আমাদের ইচ্ছেয় হোক, বা অনিচ্ছায়, অবশ্য়ই সম্পাদন করতে হয়। এই স্বভাবজাত কর্ম্মে যিনি মন-প্রাণকে স্থির করতে পেরেছেন, তিনি ইচ্ছারহিত হয়ে যান। তার সমস্ত কর্ম্মই ইচ্ছারহিত হয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সুখকর কাজে আসক্তি, বা দুঃখদায়ক কাজে অনীহা থাকে না। প্রাণক্রিয়া যখন মনোযোগ দিয়ে করা হয়, বা প্রাণক্রিয়ায় যিনি মনোযোগী তার মধ্যে একটা সময় যেমন প্রাণের স্থিরতা আসে, তেমনি আসে মনে চঞ্চলরহিত অবস্থা। মনের বিক্ষুব্ধ ভাবের বিনাশ হয়। আর স্থির মনে বুদ্ধির প্রখরতা বৃদ্ধি পায়। তখন আত্মজ্ঞানের উপলব্ধির জন্য যে মেধা বা প্রজ্ঞা দরকার তার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি হতে থাকে। আর এই স্থির বুদ্ধিই আমাদের সমস্ত সংশয়ের নাশ করে থাকে। সত্য উদ্ভাসিত হতে থাকে। বিষয়ের গভীরে প্রবেশের অধিকার জন্মায়। একসময় আত্মা-অনাত্মা বিষয়ক জ্ঞানের উন্মেষ ঘটে। দেহাদিতে অনাসক্তি আসে। আর এই মেধা সমস্ত কর্ম্মকে কুশলতার সঙ্গে সম্পাদন করতে সহায়ক হয়ে থাকে। মন থাকে আত্মস্থিত। তাই কর্ম্মের কোনো ছাপ মনের মধ্যে পড়তে পারে না। তখন কর্ম্মের ভালো-মন্দ বিচার আসে না। মন তখন তরঙ্গবিহীন হয়, অর্থাৎ মনে সংকল্প-বিকল্পের বুদ্বুদ থাকে না। এক-এক সময় মনে হয় মন বলে কিছুই নেই। আসলে মন যতক্ষন দেহ-ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে, ততক্ষন মনের মধ্যে নানান সংকল্পের উদয় হতে থাকে। কিন্তু মন যখন আত্মাতে স্থিত হয়, তখন দেহ-ইন্দ্রিয়ের স্বভাবজাত যে বিষয়ভোগের তৃষ্ণা তা দূরীভূত হয়ে যায়। যোগী সহজেই সিদ্ধ অবস্থা প্রাপ্ত হন।

ন হি দেহভৃতা শক্যং ত্যাক্তুং কর্ম্মাণি-অশেষতঃ
যস্তু কর্ম্মফলত্যাগী স ত্যাগী-তু অভিধীয়তে। (১৮/১১)

দেহধারী ব্যক্তির পক্ষে সম্পূর্ণ কর্ম্মত্যাগ সম্ভব নয়। অতএব যিনি কর্ম্মফল ত্যাগী তিনিই প্রকৃত ত্যাগী।

দেহ দুই প্রকার ভোগদেহ, কর্ম্মদেহ। আবার এই ভোগদেহ দুই প্রকার দেবদেহ ও ইতরদেহ বা পশুদেহ। দেবদেহে সুখভোগ। এই দেবদেহে ভালো বা মন্দ কোনো কর্ম্মফলই সঞ্চিত হতে পারে না। ইতর দেহ দুঃখ ভোগের নিমিত্ত। এখানেও কর্ম্মফল, অর্থাৎ পাপ-পুন্য সঞ্চিত হতে পারে না। মনুষ্য দেহই একমাত্র কর্ম্মদেহ যেখানে মানুষ কর্ম্মের মাধ্যমে কর্ম্মফল তা সে সু বা কু যাই হোক না কেন, সংগ্রহ করতে পারে।

তো যতক্ষন আমাদের দেহাত্মবোধ আছে, ততক্ষন আমাদের কর্ম্ম করেই যেতে হবে। আর যেখানে দেহাভিমান আছে, সেখানে দেহাকৃত কর্ম্মের উপরেও আমাদের অভিমান-বোধ কাজ করবে। কর্তৃত্ববোধও থাকবে। এখন কথা হচ্ছে যিনি কর্ম্মফলের আশা করেন না, তার কর্ম্ম করার দরকার কি ? দেখুন, সাধারণ মানুষের অর্থাৎ দেহাভিমানী পুরুষের যেমন কর্ম্ম, সাত্ত্বিক পুরুষের কর্ম্ম সেইরূপ নয়। সাত্ত্বিক পুরুষের কর্ম্ম স্ব-ভাবজাত। আবার সিদ্ধ পুরুষেরও নানান রকম ভোগ দৃষ্ট হয়। সাধারণ পুরুষের কর্ম্মফল সঞ্চিত হয়। কিন্তু সিদ্ধ পুরুষের কর্ম্মফল সঞ্চিত হয় না। তথাপি তার পূর্বপূর্ব জন্মের যে কর্ম্ম তার ফল অর্থাৎ প্রারব্ধ কর্ম্মের ফল তাকে ভোগ করতেই হয়।

যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, কর্ম্মদেহ লাভ করে কর্ম্মহীন হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু কর্ম্মফলের আকাংখ্যা রহিত হওয়া সম্ভব। দেহ যতদিন থাকে, ততদিন কর্ম্ম থাকবে, কিন্তু নির্বীজ কর্ম্ম ভবিষ্যতে ফল প্রদানে সক্ষম নয়। তবে এই নিস্কাম কর্ম্ম সহজসাধ্য নয়, এর জন্য নিজেকে তৈরী করতে হয়, অর্থাৎ মনের মধ্যে অবিরত যে আকাঙ্খ্যার উদ্রেগ হচ্ছে, তার নিস্পত্তি করতে হয়। মনের মধ্যে যে বাসনা-সঙ্কল্পের উদয় হচ্ছে, তার সমাধান করতে হয়। আর ঠিক এই কারণেই যোগীপুরুষগন মন-প্রাণকে স্থির করে এই সমস্যার সমাধান করে থাকেন। প্রাণ-সাধনার সাহায্যে যিনি মন-প্রাণ-বুদ্ধিকে স্থির করতে পেরেছেন, তার মধ্যে থেকে দেহাভিমান চলে যায়, কর্তৃত্বাভিমান চলে যায়। আর সঙ্কল্পরহিত অবস্থায় নিষ্কাম কর্ম্মে নিযুক্ত হওয়া সহজ হয়।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ১৩.০২.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/১২

অনিষ্টম-ইষ্টং মিশ্রং-চ ত্রিবিধং কর্ম্মণঃ ফলম
ভবতি-অত্যাগিনাং প্রেত্য ন তু সন্ন্যাসিনাং ক্বচিৎ। (১৮১২)

ত্যাগহীন ব্যক্তিগণের মৃত্যুর পরে অর্থাৎ পরলোকে ইষ্ট, অনিষ্ট ও মিশ্র এই তিন প্রকার কর্ম্মফল লাভ হয়ে থাকে। কিন্তু সন্ন্যাসী ব্যক্তিদের এমনটা হয় না।

কর্ম্মফল তিন প্রকার, অনিষ্টকারী, ইষ্টকারী অথবা দুইই মিশ্রিত। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যারা ত্যাগী নহেন, তাদের মৃত্যুর পরে, এই তিন ধরনের কর্ম্মফল ভোগ করতে হয়। বলা হয়ে থাকে ইষ্টকর্ম্মের দ্বারা মানুষ দেবযোনী প্রাপ্ত হয়ে থাকেন, অনিষ্ট কর্ম্মের দ্বারা তির্য্যগ-যোনিতে জন্ম গ্রহণ করেন, আর মিশ্রকর্ম্মের দ্বারা মানুষ পুনরায় এই মনুষ্যযোনিতে জন্ম গ্রহণ করেন। আসলে এই তিন ধরনের কর্ম্মই জন্মান্তরের কারন। আর জন্ম-মৃত্যুর যে পরিক্রমা পথ, সে পথ থেকে তিনি বাইরে বেরুতে পারেন না। এইজন্য কেউ কেউ এই কর্ম্মবন্ধন থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য কর্ম্মত্যাগ করতে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু কর্ম্ম জীবকূলকে এমনভাবে বেঁধে রেখেছে, যে তার এখান থেকে বেরুবার কোনো উপায় নেই। যখনই কেউ দেহ ধারন করেছে, জানবেন তখনই সে, কর্ম্মবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেছে। এখান থেকে বেরুতে গেলে, আমাদের দেহত্যাগ করতে হবে। কিন্তু দেহত্যাগ তো সহজসাধ্য নয়। কেননা কামনাজনিত কর্ম্ম আমাদের আবার কোনো না কোনো দেহে স্থিত করে দেবে, এই কর্ম্মফল ভোগ করবার জন্য । আবার যখনই দেহধারন হবে, তখন আবার নতুনভাবে কর্ম্ম শুরু হয়ে যাবে। এযেন সেই ঘুড়ির সুতো ছাড়ানো। যতই ছাড়াতে চাই, তত যায় জড়িয়ে। আর জন্ম জন্মান্তর ধরে এই খেলাই চলছে।

কিন্তু এখান থেকে বেরুবার রাস্তা কি ? একথাই বলছেন, যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। বলছেন, সন্নাসীদের এমনটা হয় না অর্থাৎ ত্যাগী-ব্যক্তিদের এমনটা হয় না। "ন তু সন্নাসিনাং ক্বচিৎ" . সন্ন্যাসীদের এমনটা হয় না। কর্ম্মফল ভোগ থেকে যদি বাঁচতে চান তবে আপনাকে সন্ন্যাসী হতে হবে। এখন কথা হচ্ছে সন্ন্যাসী কাকে বলে ? সন্ন্যাস+ইন = সন্ন্যাসী। আর সন্ন্যাস = সং+নি+অস অর্থাৎ সর্ব্বত্যাগ। সংসার বাসনা যাঁর ত্যাগ হয়েছে, তিনিই সন্ন্যাসী। তো সংসারগতি থেকে যারা মুক্তিলাভ করতে চান, তাদের ত্যাগ অভ্যাস করতে হবে। এই ত্যাগের অভ্যাসকে বলা হয় বৈরাগ্য। বিষয়ে যিনি বিরক্ত, বিষয়ে যার বিরাগ এসেছে, তিনিই বৈরাগী। আসলে যতক্ষন না আমাদের আত্মজ্ঞান লাভ হচ্ছে, ততক্ষন আমাদের বিষয়বৈরাগ্য আসে না। আর এই আত্মজ্ঞান লাভের জন্য দরকার আমাদের বিচার। আত্মবস্তু ও অনাত্মবস্তুর বিচার। এই বিচারের সাহায্যে মনকে বিষয় থেকে বিরত করে আত্মস্থিত করতে হয়। ব্রহ্মস্বরূপের ধারণা করতে হয়। এই ধারণা তখনই হতে পারে, যখন আমরা শাস্ত্রবাক্যের অধ্যয়ন, গুরুবাক্য শ্রবণ, এবং মনন সঠিকভাবে করতে পারবো ।

হিন্দু ধর্ম্মে সন্ন্যাস বলে একটা আশ্রমের কথা বলা হয়েছে। এই আশ্রমে বিষয়বিরক্ত পুরুষ আশ্রয় নিয়ে থাকেন। এই আশ্রমে কোনো সাংসারিক কর্তব্য-কর্ম্ম নেই। এঁরা মাধুকরী অবলম্বন করে, অথবা আকাশবৃত্তি (অর্থাৎ ঈশ্বরের কৃপায় যদি কিছু জোটে, তবে শরীর নির্বাহের জন্য তা গ্রহণ করবেন, কিন্তু সঞ্চয় করবেন না) অবলম্বন করে দিনাতিপাত করবেন। এঁরা সারাক্ষন ব্রহ্মজ্ঞান লাভের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকেন। আবার এঁদের না আছে সংসারের প্রতি বিদ্বেষ না আছে মোক্ষ লাভের জন্য প্রলোভন। এঁদের না থাকে গ্রহণেচ্ছা, না থাকে ত্যাগের ইচ্ছে। এঁরা ইচ্ছেকেও যেন ত্যাগ করেছেন। যারা ইচ্ছেশক্তি থেকে বিমুক্ত হতে পারেন নি, তাদের আবার ফিরে ফিরে আসতে হয় এই সংসারে। ইচ্ছে দ্বেষ যতক্ষন থাকে, ততক্ষন মায়ার শাসনক্ষেত্র থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় না। এককথায় যাঁরা প্রতক্ষ্য আর অপরক্ষ ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করতে পেরেছেন, তাঁরাই জন্ম-মৃত্যু থেকে রেহাই পেয়েছেন। আপনি গৃহে থাকুন বা পাহাড়ের গুহায় থাকুন, তাতে কিছুই এসে যায় না, যতক্ষন দেহাভিমান আছে, ততক্ষন নিষ্কৃতি নেই। দেহ-ইন্দ্রিয়-মনের সাথে যতক্ষন সন্মন্ধ, ততক্ষন ব্রহ্মে স্থিতি হতে পারে না।
ত্রিপুর থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে হবে। ত্রিপুর অর্থাৎ স্থুল -সূক্ষ্ম-কারন এই তিন দেহ থেকে নিজেকে আলাদা করতে হবে। তা না হলে মুক্তি লাভের সম্ভাবনা থাকে না। আমাদের বিচারের সাহায্যে বুঝতে হবে, আত্মা থেকে প্রকৃতি ভিন্ন। আর এই অনুভবে যেতে গেলে, আমাদের সর্বাগ্রে প্রাণকে স্থিত করতে হবে। যতক্ষন প্রাণের স্থিরতা না আসছে, ততক্ষন আমাদের মনের চঞ্চলতা যাবে না। চঞ্চল মনই আমাদের বিষয়কে আকর্ষণ করছে। চঞ্চল মনেই আমাদের সংকল্প-বাসনার উদ্রেগ হচ্ছে। এই চঞ্চল মনের কারনে আমাদের ইন্দ্রিসকল কর্ম্মে প্রবৃত্ত করছে। তো প্রাণ-মনের চঞ্চলতা দূর না হলে, মন থেকে কামনা-বাসনা দূর হবে না। আর মন থেকে কামনা-বাসনা-সংকল্প দূর না হলে, আমাদের নিষ্কাম কর্ম্মে প্রবৃত্তি আসতে পারে না। তো যথার্থ ত্যাগী হতে গেলে আমাদের মনকে নিরুদ্ধ করতে হবে। নিরুদ্ধ মন মানেই স্পন্দনহীন প্রাণ। প্রাণের স্পন্দনহেতু মন স্পন্দিত হয়, আর ইন্দ্রিয়সকল বিষয়কর্ম্মে প্রবৃত্ত হয়। আর এই স্পন্দনই আমাদেরকে কর্ম্মে উদ্দীপ্ত করে থাকে। তো একথা আমাদের বুঝতে হবে, প্রাণকে স্পন্দনহীন না করা পর্য্যন্ত আমাদের বিষয়কর্ম্মের নিস্পত্তি হতে পারে না। আমরা ত্যাগীও হতে পারি না। যে স্পন্দিত প্রাণ আমাদের কর্ম্মপ্রচেষ্টার কারন, তাকে যদি আমরা সুষুম্নামুখী করে, মূলাধারস্থ জীবশক্তিকে আজ্ঞাচক্রে টেনে নিয়ে যেতে পারি, তবে আমাদের বিষ্য়্ত্যাগের জন্য আলাদা করে কোনো প্রয়াস করতে হবে না। তখন আমাদের মধ্যে ত্যাগধর্ম্ম স্বাভাবিক ভাবেই এসে যাবে । আর এই ত্যাগের জন্য যেমন কোনো প্রচেষ্টা থাকবে না, তেমনি ত্যাগের ফলে কোনো কষ্ট বা অভাববোধ থাকে না। এইসময় সাধক এমন ভাবের মধ্যে প্রবেশ করেন, যেখানে অভাব বলে কিছু নেই। তিনি তখন পূর্ন। একে আপনি পূর্নতা বলতে পারেন, সমতা বলতে পারেন, সমাধি বলতে পারেন। আসলে তখন তিনি ব্রহ্মের সাথে অভিন্ন হয়ে ব্রহ্মময় হয়ে যান। তখন তাঁর কাছে ব্রহ্মভিন্ন অন্যবস্তুর অস্তিত্ত্ব থাকে না। এই হচ্ছে যথার্থ ত্যাগের বা সন্ন্যাসের অবস্থা।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ১৪.০২.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/১৩-১৪

পঞ্চেমানি মহাবাহো কারণানি নিবোধ মে
সাংখ্যে কৃতান্তে প্রোক্তানি সিদ্ধয়ে সর্ব্ব-কর্ম্মণাম। (১৮/১৩)

হে মহাবাহো, সাংখ্যমতে, যেকোনো কর্ম্ম পরিসমাপ্তি সূচক নিমিত্ত পাঁচটি কারনের বিষয় বর্ণিত আছে, তা তুমি আমার নিকটে শোনো।

সাংখ্য কথার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মহামুনি কপিলদেবের সাংখ্যদর্শনের কথা মনে আসে। আসলে সাংখ্য কথাটার আরো একটা অর্থ আছে আর তা হচ্ছে শাশ্বত জ্ঞান। যে জ্ঞানের কোনো পরিবর্তন হয় না তা-ই সাংখ্যমত। এই শাশ্বত জ্ঞানের বাইরে যা কিছু জ্ঞাত হয়, তা আসলে অবিদ্যা। দেখুন আত্মা সত্য-নিত্য-জন্মরহিত। কিন্তু আমরা চারিদিকে জন্ম-মৃত্যুর খেলা দেখছি। ব্রহ্ম এক এবং অদ্বিতীয়, কিন্তু আমরা এই ব্রহ্মকেই বহুরূপে দেখতে পাচ্ছি।
এর কারন কি ? এর কারন হচ্ছে বিকার। এই বিকারের জ্ঞানকে বলা হয় অবিদ্যা। এই বিকার যখন তিরোহিত হয়, তখন আত্মা স্বরূপে প্রকাশিত হয়। আত্মার স্বরূপজ্ঞান বিস্মৃত হয়ে যখন অনাত্মবস্তুকে আত্মা বলে মনে হয়, তখন তা আমাদের অজ্ঞান। এই অজ্ঞান নষ্ট হতে পরে শাশ্বত জ্ঞানের দ্বারা। অবিদ্যার নাশ হলেই জ্ঞানের উন্মেষ ঘটে। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই সাংখ্যকে বলছেন, "কৃতান্ত" । কারন সাধন ক্রিয়া করতে করতেই একসময় সমস্ত কর্ম্মের পরিসমাপ্তি হয়। এই সাধনক্রিয়া হচ্ছে অজ্ঞান থেকে জ্ঞানের পথে যাত্রা। অপ্রকাশ থেকে প্রকাশের পথে যাত্রা। অজ্ঞানের যতক্ষণ নাশ না হচ্ছে, ততক্ষন আমাদের কর্ম্মের গতি রুদ্ধ হতে পারে না। আর কর্ম্মের গতি রুদ্ধ না হলে, আমদের জন্ম-মৃত্যুর চক্রে যে ঘূর্ণিপাক, তার সমাপ্তি হতে পারে না। জন্ম-জন্মান্তর ধরে যেমন কর্ম্ম চলবে, তেমনি এই কর্ম্মফল স্বরূপ ভোগদেহ বা কর্ম্মদেহ উৎপন্ন হবে। তো এই সংসারলীলা, একটা প্রবাহমান হয়ে কাল থেকে কালান্তর ধরে চলছে, কেবলমাত্র কর্ম্মের কারনে। আর এই কর্ম্ম হচ্ছে আমাদের অবিদ্যার ফল। অনাত্মবস্তুতে আত্মার অধ্যাস এই অবিদ্যার কারণেই হয়ে থাকে। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, এই মিথ্যা-জ্ঞানের যা কারন তা পঞ্চবিধ। তো এই মিথ্যাজ্ঞানের পঞ্চবিধ কারণগুলোকে ধরতে পারলে, আমরা এই কর্ম্ম, কর্ম্মফল, জন্মমৃত্যু ইত্যাদি থেকে মুক্তি পেতে পারব। তো এই অনাত্মজ্ঞান যার আশ্রয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেই করণগুলোকে আগে বিশেষ ভাবে জ্ঞাত হতে হবে। তখন আর আমাদের আত্মবিস্মৃতি ঘটবে না।

অধিষ্ঠানং তথা কর্ত্তা করণং চ পৃথগ্-বিধ্ম
বিবিধাশ্চ পৃথক চেষ্টা দৈবঞ্চৈবাত্র পঞ্চমম। (১৮/১৪)

দেহ আর অহঙ্কার (অধিষ্ঠানং তথা কর্ত্তা) কর্ম্ম সাধনের জন্য বিবিধ ইন্দ্রিয়, নানাবিধ পৃথক পৃথক প্রচেষ্টা আর এই কারন সমূহের মধ্যে দৈব, হচ্ছে পঞ্চম।

তো ভগবান কর্ম্মের পাঁচটি কারনের কথা বললেন, প্রথম হচ্ছে দেহ, দ্বিতীয় হচ্ছে অহংকার, তৃতীয় হচ্ছে ইন্দ্রিয়সকল, চতুর্থ হচ্ছে প্রচেষ্টা অর্থাৎ উদ্দোম, সবশেষে দৈব বা সর্ব্ব কার্য্যের প্রেরণাদায়ী সেই অন্তর্যামী।

কোনো কর্ম্ম সম্পাদনের পিছনের উপাদানগুলো খেয়াল করুন।
১.আমাদের মনের সংকল্প। এই সংকল্পের কারনে ইন্দ্রিয়সকল কার্য্যে নিযুক্ত হয়।
২. এই ইন্দ্রিয়াদির একজন ধারক আছেন, তিনি হচ্ছে আমাদের পঞ্চবায়ু। অর্থাৎ এই পঞ্চবায়ুর প্রভাবে ইন্দ্রিয়সকল ক্রিয়াক্ষম হয়ে থাকে।
৩. এই ইন্দ্রিয়সকলের (অন্তরেন্দ্রিয় ও বাহ্য-ইন্দ্রিয়) অধিষ্টান আছে কোথায় ? না আমাদের দেহে। তো এই দেহকে আশ্রয় করেই আমাদের সমস্ত ক্রিয়া সম্পাদিত হচ্ছে।
৪. এই দেহের কারণেই সমস্ত কর্ম্ম সম্পাদি হচ্ছে সত্য, কিন্তু এইসব কর্ম্মের কর্ত্তা কে ? তিনি হচ্ছে আমাদের অহঙ্কার। এই অহঙ্কারকে চিৎ-স্বরূপ বলে মনে হয়, কিন্তু তিনি চিৎ নন। চিৎ-এর সাথে একাত্মীভূত হয়ে থাকার কারনে চিৎ বলে ভ্রম হয়।
৫. সবশেষে ভগবান বলছেন, দৈব। অর্থাৎ কর্ম্মফল দাতা।

বেদান্ত মতে দেহ হচ্ছে অধিষ্ঠান ক্ষেত্র। কর্ত্তা হচ্ছে জীব, করণ হচ্ছে প্রাণ ও ইন্দ্রিয়সকলের ক্রিয়া, আর দৈব হচ্ছে জীবের জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কার, যাকে কেহ কেহ বলেন অদৃষ্ট .

মহাত্মাগন বলে থাকেন, আমাদের পূর্বপূর্ব জন্মের সংস্কার হচ্ছে অবিদ্যার কারন। এই সংস্কার বা অবিদ্যা চিৎ-এর সঙ্গে মিশে "আমি-আমি" করছে। এই আমিবোধ যার মধ্যে নেই, তার কোনো কর্ম্মও নেই। এই আমি-বোধ না থাকলে, কেউ কোনো কর্ম্মে সম্পৃক্ত হতো না। তো এই অহঙ্কার বোধ হচ্ছে সমস্ত কর্ম্মের কর্ত্তা-স্বরূপ । আর এই অহঙ্কার বা আমি হচ্ছে চিৎ ও জড়ের মিলিত গ্রন্থি।

তবে একটা কথা মনে হয়, দৈবের নির্দেশ ছাড়া কোনো কর্ম্মই সংগঠিত হতে পারে না। দেখুন জীব বলুন, পশু বলুন, একটা দিন এমন ছিলো, যখন এদের কোনো অস্তিত্ত্ব ছিল না। তো যার অস্তিত্ত্ব নেই, তার আবার দেহ-ইন্দ্রিয়-অহঙ্কার কোথেকে আসবে ? আর ভিন্ন ভিন্ন দেহ ধারণ যদি কর্ম্মের কারনে হয়ে থাকে, তবে তো প্রশ্ন জাগে সর্বপ্রথম কর্ম্ম কে করেছিলেন আর কিভাবেই বা করে ছিলেন ? হিন্দুশাস্ত্রের সৃষ্টিতত্ত্বের আলোচনায় দেখা যায়, ব্রহ্ম সংকল্প করলেন, "একঽহং বহু স্যাম" এই নাকি জগৎপ্রকাশের মূল কারন-মন্ত্র। তো সঙ্কল্প হচ্ছে স্বয়ং ব্রহ্মের। তো ব্রহ্ম যদি সঙ্কল্প না করতেন, তবে হয়তো সৃষ্টিই সম্ভব হতো না। সুতরাং জীবকুলের যে অদৃষ্ট তা সেই ব্রহ্মের সঙ্কল্প দ্বারা প্রথম লেখা হয়ে গেলো। আমরা যতোই বলি না কেন, যে আমরা সবাই আমাদের নিজ-নিজ কর্ম্ম-বন্ধনে আবদ্ধ, এই যুক্তি কোথায় যেন ফিকে হয়ে যায়।

একটু যদি নিজের দেহের দিকে দৃষ্টি দেই , তবে বুঝতে পারি, এই জীবন হচ্ছে শ্বাসের খেলা। শ্বাস আছে তাই আমরা বেঁচে আছি, আবার যেদিন শ্বাসের নির্গমন ঘটবে, সেদিন আমরা সবাই জড় বস্তুতে পরিণত হবো। তখন না থাকবে ক্রিয়া, না থাকবে ক্রিয়ার ফল। প্রতিমুহূর্তে আমরা জন্ম নিচ্ছি আবার মৃত্যু বরণ করছি। শ্বাস শরীরে প্রবেশ করছে, আমরা বেঁচে উঠছি, শ্বাস চলে যাচ্ছে, আমরা মারা যাচ্ছি। এই খেলায় নিরন্তর চলছে। যেদিন শ্বাসের গতগতি থেমে যাবে সেদিন জীবন শেষ হয়ে যাবে।

তো প্রাণের স্পন্দনের কারণেই দেহরূপ ক্ষেত্রে কর্ম্ম সম্পাদিত হচ্ছে। এই কর্ম্মই সংস্কারের জন্ম দিচ্ছে। প্রাণক্রিয়া দ্বারাই শরীর-মন-ইন্দ্রিয় দৈব নির্দেশে অবশ হয়ে ক্রিয়া করতে প্রবৃত্ত হচ্ছে। তো সঙ্কল্প সেই ব্রহ্মের। আর সেই ব্রহ্মসঙ্কল্প পুরুষকারের সঙ্গে মিলিত হয়ে নিয়তিকে ফলপ্রসূ করছে। এখানে নিমিত্তের ভাগিদার হয়ে কর্ম্মফল ভোগ করছি জীবকুল । নিয়তির কি পরিহাস !

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ১৫.০২.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/১৫-১৬

শরীর-বাঙ্মনোভিঃ-যৎ কর্ম্ম প্রারভতে নরঃ
ন্যায্যং বা বিপরীতং বা পঞ্চ-এতে-তস্য হেতবঃ। (১৮/১৫)

মনুষ্য শরীর দেহ-মন-বাক্যের দ্বারা ন্যায্য বা অন্যায্য যে কোনো কর্ম্ম আরম্ভ করে, তার কারন এই পাঁচটি ।

বলা হয়, কর্ম্ম তিন প্রকার, শারীরিক, বাচনিক ও মানসিক। মানুষ যা কিছুই করে তার হেতু হচ্ছে পাঁচটি, যা আগেই বলাহয়েছে অর্থাৎ দেহ, অহঙ্কার, ইন্দ্রিয়, কর্ম্ম প্রচেষ্টা ও দৈব। অর্থাৎ জীবের সঙ্গে এই পাঁচটি হেতুর যোগের ফলে সকল কর্ম্ম সাধিত হচ্ছে।
জীব স্বয়ং চিৎ-স্বরূপ, সেই দিক থেকে দেখতে গেলে, জীবের কোনো কর্ম্ম নেই। কর্ম্ম হচ্ছে প্রকৃতির। আর জীব এই প্রকৃতির সঙ্গে সন্মন্ধযুক্ত হয়ে কর্ম্ম ও তৎজনিত সুখদুঃখ ভোগ করে থাকে। জীব যদি প্রকৃতির সঙ্গে এই কর্ম্মের অভিমান না করে, তবে জীব সুখ-দুঃখের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতো না। জীব প্রকৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হবার ফলে জন্ম হয় অহঙ্কারের। আর অহঙ্কারের উপরে চৈতন্যের প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হবার ফলে, প্রাকৃতবস্তু এই অহঙ্কারকে চেতনবৎ বলে মনে হয়। জলপাত্রে প্রতিবিম্বিত সূর্য্যের মতো, মায়াতে প্রতিবিম্বিত ব্রহ্ম-চৈতন্যকে বলা হয় জীব। যেন মায়ার ফাঁদে পড়ে , ব্রহ্ম কাঁদছেন । এই মায়াকেই বলা হয় অজ্ঞান। তো এই মায়া বা অজ্ঞানের নাশ হলে, ব্রহ্মের যে জীবভাব, তার সমাপ্তি হয়।

সাধারণ ভাবে বলতে গেলে, পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে আমরা যা কিছু করি, তা সবই কর্ম্ম। শরীর দ্বারা কর্ম্ম সাধিত হয়। অর্থাৎ শরীরে স্থিত যে কর্ম্মেন্দ্রিয় ও জ্ঞানেন্দ্রিয় তার দ্বারা যেমন আমরা স্থুল কর্ম্মাদি করে থাকি তেমনি আমরা শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ উপভোগ করে থাকি। এখন শরীরের বাহ্য ইন্দ্রিয়সকল দ্বারা আমরা যে কর্ম্ম করি, তা আমাদের বিচারের বিষয় হয়ে থাকে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের বা সমাজের বা পরিবারের প্রচলিত নিয়মাদির দ্বারা আমরা তার ভালো-মন্দ বা ন্যায্য ও অন্যায্য বিচার করতে পারি। এমনকি আমাদের যে বাচনিক ক্রিয়া, তাও আমাদের বিচারের বিষয় হতে পারে, কিন্তু মনের ক্রিয়া অর্থাৎ চিন্তার দ্বারা আমরা যে কার্য্য করি, তা সাধারণ অর্থে বিচারের বিষয় হয় না। কিন্তু এই চিন্তাই সমস্ত উন্নতি বা অবনতির কারন হয়ে থাকে, তা সে জাগতিক উন্নতি বলুন, বা আধ্যাত্মিক উন্নতি বলুন। এই চিন্তা হচ্ছে আমাদের অন্তর-ইন্দ্রিয়ের কাজ।

এখন কথা হচ্ছে, এই শরীর , বাক্য, মন, ইত্যাদিকে নিজের মনে করে, নিজের জন্য কর্ম্ম করলে, এতে অশুদ্ধি আসে। আর সাধক যদি শরীর ইত্যাদিকে নিজের মনে না করে, নিজের জন্য কাজ না করে, এগুলো সবই প্রকৃতির কর্ম্ম বলে মনে করেন, তবে তা হবে কর্ম্মযোগ। এই কর্ম্মযোগের দ্বারা কর্ম্মকে শুদ্ধ করে, কর্ম্ম থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা উচিত। আর এই কর্ম্মযোগের সাধনার দ্বারাই প্রকৃতি ও প্রকৃতির কার্য্য থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারলেই, প্রকৃত কর্ম্মতত্ত্ব অনুভবে আসে। যিনি নিজেকে কর্ম্মের কর্ত্তা বলে মনে করেন, তিনিই কর্ম্ম বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যান, আর যিনি নিজেকে কর্ম্মের কর্ত্তা বলে মনে না করেন, তিনি কর্ম্ম বন্ধনে থেকে মুক্তি পেয়ে থাকেন।

জড়ত্বের দিকে দৃষ্টি দিলে, নিজেকে বদ্ধ বলে মনে হয়, আবার আমাদের দৃষ্টি যখন চৈতন্যমুখী হয়, তখন বন্ধন ঢিলে হতে শুরু করে। মায়াতে আবদ্ধ জীবসকল, উপাধি দ্বারা আবৃত কিন্তু পরমেশ্বরের চিন্তন থেকে ধীরে ধীরে সে পরমেশ্বরের ভাব সম্পন্ন হয়ে, জীবনমুক্ত অবস্থা প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। তখন যে কর্ম্ম হয়, তা হয় নির্বীজ কর্ম্ম। যেমন শ্বাস গ্রহণ-ত্যাগক্রিয়া, শিশু থেকে যুবক, যুবক থেকে বৃদ্ধ হবার যে উত্তরণ ক্রিয়া, খাদ্যাদি হজম করা, চোখের পলক ফেলা, ইত্যাদি যে স্বাভাবিক ক্রিয়া তা বন্ধন রহিত। এইসব ক্রিয়ার সঙ্গে আমাদের অহংবোধ বা কর্তৃত্ত্ববোধ থাকে না। আমরা জানি, এগুলো সবই প্রকৃতির ক্রিয়া। এক্ষেত্রে আমাদের কোনো প্রচেষ্টা থাকে না। যদিও এই ক্রিয়া আমাদের শরীরকে ঘিরেই সংগঠিত হচ্ছে। তথাপি একে কেউ "আমি করছি" এই ভাবে ভাবি না । ঠিক তেমনি প্রকৃতির নিয়মেই আমাদের সমস্ত কর্ম্ম সম্পাদিত হচ্ছে, এই ভাবনা যদি আমাদের মধ্যে আসে, তবে আমরা সমস্ত কর্ম্মফল থেকেই নিষ্কৃতি পেতে পারি।

তত্রৈবং সতি কর্তারম-আত্মানং কেবলং-তু যঃ
পশ্যত্যকৃতবুদ্ধিত্বান্ন স পশ্যতি দুর্ম্মতিঃ। (১৮/১৬)

এই পাঁচটি কারন থাকলেও যে ব্যক্তি এই ব্যাপারে আত্মাকেই কর্ত্তা বলে মনে করে, সেই দুর্মতি প্রকৃত তত্ত্ব সম্পর্কে বুঝতে পারে না কারন তার জ্ঞান পরিমার্জ্জিত নয়।

এখন যদি তর্কের খাতিরে ধরে, নেওয়া যায় যে, যে কর্ম্ম সকল ইন্দ্রিয় বা দেহাদি করছে না, কারন এসকল জড় পদার্থ, আর একমাত্র আত্মার সংযোগ হেতু, এরা সবাই ক্রিয়া করতে সক্ষম বয়েছে, তাহলে আমাদের মতো অজ্ঞানের পক্ষে এটা ভেবে নেওয়া স্বাভাবিক যে, যেহেতু আত্মাভিন্ন কর্ম্ম সম্পাদন হয় না, তাই সমস্ত কর্ম্মের কর্ত্তা হচ্ছেন আত্মা। আত্মা না থাকলে, এই পঞ্চ-উপায়, অর্থাৎ যে-সকল দ্বারা কর্ম্ম সাধিত হয়, তা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। এই বুদ্ধি থেকে আমরা সিদ্ধান্তে আসতেই পারি, যে আত্মা নিজে কোনো কর্ম্ম করেন না, এই ঋষিবাক্যঃ শুনেও, আমরা ভাবতেই থাকি, যে আত্মা কর্ম্ম না করলেও, আত্মাই প্রকৃত কর্ত্তা। কেননা তাঁর শক্তিতেই সমস্ত কর্ম সম্পাদিত হচ্ছে।

এই ভাবনা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এখান থেকে বেরিয়ে আসবার উপায় হচ্ছে সাধনক্রিয়া। দেখুন আমরা যারা আত্মার কর্তৃত্ত্বভাবকে স্বীকার করে নিয়ে আমাদের শরীর মন, বুদ্ধি, ইত্যাদির ক্রিয়াকে আত্মার ক্রিয়া বলে ধরে নিয়েছি, তারা নির্বোধ। আমরা যারা সাধনক্রিয়া বিমুখ, তারা কেউ আত্মাকে দেখতে পাই না। অনুভব করতেও পারি না। কেবল অন্যের মুখে শুনে বা শাস্ত্রাদি পাঠ করে নিজের মধ্যে একটা অন্ধবিশ্বাসের জাল তৈরী করেছি। যেখানে কেবল কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নেই। আর সেই কল্পনাতে আমরা কেবল আত্মার কাল্পনিক ছবি এঁকে রেখেছি। দেখুন আত্মার জ্ঞাতা কেবলমাত্র আত্মাই হয়ে থাকে। অর্থাৎ আত্মার জ্ঞাতা কেবলমাত্র আত্মজ্ঞ পুরুষ। যোগীরাজ বলছেন, মনের চঞ্চলতা চলে গেলে, মন বিষয়বিমুখ হলেই, যোগীপুরুষ আত্মাকে দেখতে পান। তখন সব এক হয়ে যায়, আত্মাকে বুঝতে পারা যায়, আত্মার সাথে মিলিত হওয়া যায়। কিন্তু যারা ক্রিয়াহীন, তাদের পক্ষে আত্মাকে বোঝা সম্ভব হয় না। আত্মা সকল বিষয়ের কর্ত্তা হয়েও তিনি যে নির্লিপ্ত তা বুঝতে পারে না।

আমাদের আত্মজ্ঞানের অভাবহেতু অনাত্মা বস্তুর দর্শন হচ্ছে, এই অনাত্মা বস্তু বলে আসলে কিছুই নেই, সবই আত্মা। এই অসঙ্গ আত্মাকে ক্রিয়ার পরাবস্থায় উপলব্ধ হয়। তরঙ্গায়িত জলে যেমন অসংখ্য চাঁদের দর্শন মেলে, আবার সেই একই জল যখন স্থির হয়, তখন কেবলমাত্র একটাই চাঁদের দর্শন মেলে, তেমনি অস্থির মনে, একই আত্মা বহুরূপে দৃশ্যমান হচ্ছে। আমাদের মন-বুদ্ধি যখন সাধনক্রিয়ার ফলে স্থির হয়, তখন অস্থির অবস্থার বহু, এক হয়ে দর্শন দিয়ে থাকেন। আত্মা হচ্ছে শুদ্ধ সত্ত্ব, কিন্তু মাযার প্রভাবে অর্থাৎ চিৎ ও জড়ের মিশ্রনের কারনে অশুদ্ধ বলে মনে হয়। ক্রিয়ার পরাবস্থায় , যখন অশুদ্ধ ভাব কেটে যায়, তখন জীবত্ব থাকে না, শিবত্ব ভাব প্রাপ্ত হয়। শিব ও তার শক্তি তখন এক হয়ে যায়।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বসুদেবায়।

তারিখ : ১৬.০২.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/১৭

যস্য নাহংকৃতো ভাবো বুদ্ধির্যস্য ন লিপ্যতে
হত্বাপি স ইমান-লোকান ন হন্তি ন নিবধ্যতে। (১৮/১৭)

যাঁর মধ্যে "আমি কর্ত্তা" এই ভাব নেই, বুদ্ধি যার কর্ম্মফলে লিপ্ত নেই, তিনি সমস্ত লোক হত্যা করলেও কিছুই হত্যা করেন না, এবং তিনি কর্ম্মফলেও আবদ্ধ হন না।

আমরা এর আগে শুনেছি, কর্ম্মের গতি পঞ্চবিধ।

প্রথমে আমাদের মনের সংকল্প। এই সংকল্পের কারনে ইন্দ্রিয়সকল কার্য্যে নিযুক্ত হয়।
দ্বিতীয়ত এই ইন্দ্রিয়াদি ধারক হচ্ছে আমাদের পঞ্চবায়ু। অর্থাৎ এই পঞ্চবায়ুর প্রভাবে ইন্দ্রিয়সকল ক্রিয়াক্ষম হয়ে ক্রিয়া করে থাকে।
তৃতীয়তঃ দেহ, এই দেহকে আশ্রয় করেই আমাদের সমস্ত ক্রিয়া সম্পাদিত হচ্ছে।
চতুর্থতঃ অহঙ্কার,অর্থাৎ সমস্ত কর্ম্মের কর্ত্তা হচ্ছে আমাদের অহঙ্কার।
পঞ্চমত, বা সবশেষে দৈব, যা আসলে আমাদের সংস্কার বা কর্ম্মফল দাতা।

যোগীগণ বলে থাকেন, সাধনক্রিয়ার ফলে, যিনি পরাবস্থায় উন্নীত হন, অর্থাৎ আত্মস্থ থাকেন, সেই অবস্থায় কোনো ক্রিয়া থাকে না। এখন কথা হচ্ছে, তাইবলে কি তিনি কি কোনো ক্রিয়া করেন না ? না তা নয়, তাঁর যে স্বভাবজাত ক্রিয়া, তা তিনি করেন, কিন্তু তার মধ্যে কোনো কর্ত্তা-ভাব থাকেনা । আর এই কর্ত্তা-ভাবের অনুপস্থিতিতে মন-শরীর-ইন্দ্রিয়াদি দ্বারা কৃত কর্ম্ম কর্ত্তাহীন হবার ফলে, কেউই সেই কর্ম্মফলের ভাগিদার হন না। এই অবস্থায় মন-প্রাণ-বুদ্ধি স্থির থাকার ফলে ইন্দ্রিয়াদির কর্ম্মে বুদ্ধি লিপ্ত হতে পারে না। আবার আত্মস্থ হবার কারনে, অহঙ্কারের বিলুপ্তি ঘটে তাই কর্তৃত্ত্বভাব থাকে না। আর এই কারণেই এই অবস্থায় তাঁর দ্বারা যাকিছু কর্ম্ম সাধিত হয়, তার ফল ভোগ অর্থাৎ সুখ-দুঃখ ইত্যাদি ভোগ করবার জন্য যে বোধের দরকার তা তাঁর থাকে না। মন-বুদ্ধি-দেহ তখন সুখ-দুঃখ বোধের অতীতে অবস্থান করে।

এই অবস্থাকে বুঝতে গেলে, আমাদের সুষুপ্তি বা তুরীয় অবস্থাকে ধারণায় আনতে হবে। দেখুন জাগ্রত অবস্থায়, আমাদের সুখ-দুঃখ বোধ থাকে, এমনকি স্বপ্নাবস্থায়ও আমাদের সুখ-দুঃখ বোধ থাকে। কিন্তু সুসুপ্তির অবস্থায়, আমাদের একেবলমাত্র আনন্দের বোধ বর্তমান থাকে। আর তুরীয় অবস্থায় আমরা এই সুখ-দুঃখ-আনন্দের উর্দ্ধে উঠে একটা সাম্যাবস্থায় বিরাজ করে থাকি। এই অবস্থায় অর্থাৎ তুরীয় অবস্থায় আমরা কেবল নিরহঙ্কার ব্রহ্মানন্দ ভোগের উপযুক্ত থাকি। এই অবস্থায় আত্মাভিন্ন অন্য সমস্ত বস্তু তিরোহিত হয়। তখন সমদর্শন হয়। তখন আত্মাভিন্ন অন্য কিছুই থাকে না। তো যখন আত্মা ভিন্ন অন্য কোনোকিছুই যাঁর দৃষ্টিতে নেই, সে কাকেই বা হনন করবেন, আর কাকেই বা অ-হনন করবেন ? তো তখন হত্যা করা বা হত্যা না করা দুইই তার কাছে সমান। তখন আত্মজ্ঞ পুরুষের আমি কর্ত্তা, বা অহঙ্কার বর্জ্জিত অবস্থা।

আত্মার শুদ্ধ স্বরূপে কোনো অধ্যাস নেই। কোনো দ্বৈত নেই। তাঁর কাছে সবই ব্রহ্মময়। ব্রহ্মভিন্ন অন্য কোনোকিছুরই অস্তিত্ত্ব নেই। তো তিনি তখন যা কিছু করেন, তার মধ্যে না থাকে বুদ্ধি, না থাকে অহংভাব। এই সময় মন-প্রাণ-বুদ্ধি থাকে আত্মস্থ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই অবস্থায় তিনি যাকিছু করছেন, সেই কাজগুলো তাহলে করছে কে ? আর এই কাজের যে ফল, যা প্রকৃতির কারনে হয়ে থাকে তার ফল কে ভোগ করে ? আর কেই বা ভোগ করায় ? এই ব্যাপারটা বুঝতে গেলে, আমাদের "আমি কে" - এই ব্যাপরটা ভালোভাবে বুঝতে হবে।

এর আগে আমরা শুনেছি, আমাদের দেহ ইন্দ্রিয় এমনকি মন যাকিছু কর্ম্ম করছে, তা করা সম্ভব হতো না যদি না আমাদের মধ্যে সেই চেতনসত্তা থাকতো। এই চেতনার প্রেরণার কারণেই অচেতনের মধ্যে কর্ম্মের প্রবৃত্তি উঠছে। আমাদের সকল প্রবৃত্তির পিছনে আছে সেই চেতন স্বরূপ আত্মা। সেইদিক থেকে দেখতে গেলে, আত্মাকেই একমাত্র কর্ত্তা বলে মনে হয়। অর্থাৎ এই আত্মা আমাদের সবার শরীরে হৃদয়দেশে অবস্থান করে, জীবসকলকে দিয়ে নানান রকম কর্ম্ম করিয়ে নিচ্ছেন। আর অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, জীবও অবশ হয়ে কর্ম্ম করে যাচ্ছে, কেননা এছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই। আবার বলা হয়ে থাকে জীব তার সংস্কারের বশে কর্ম্ম করতে বাধ্য হয়। তা সে ভালো হোক বা মন্দ। এমনও দেখা যায়, আমরা কর্ম্মের ফল ভালো বা মন্দ জেনেও, এমন সব কর্ম্ম করি যা আমাদেরকে দুঃখ ভোগ করে, অর্থাৎ জেনেশুনে আমরা কুকৰ্ম্মে লিপ্ত হই। আর সেইমতো কর্ম্মফলও ভোগ করে থাকে। মাঝে মধ্যে মনে হয়, জীব বড্ড অসহায়। কর্ম্ম না করে থাকতেও পারে না, আবার কর্ম্ম করলে, তাকে সুখ-দুঃখের ভাগিদার হতে হয়। এযেন সেই খুড়োর কল। সামনে গাজর ঝোলানো। সুখের আশায় দৌড়োচ্ছি, কিন্তু যতই দৌড়োই না কেন, সুখ ততোধিক দূরে সরে সরে যায়।

আসলে আমরা সবাই ব্রহ্ম, একথা উপনিষদ বারবার ঘোষনা করেছেন । কিন্তু আমরা ভুলে গেছি, আমরা কে। ব্রহ্ম নিজেই সংকল্প হেতু ত্রিগুণের জাল বিস্তার করে, নিজেই নিজেকে আবদ্ধ করেছেন। নিজেকে নিজেই পীড়ন করছেন। আবার এই জীবের মোহ-নিদ্র্য থেকে জাগিয়ে স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত করছেন। তাই মনে হয়, জীবের কি সাধ্য আছে, এখান থেকে জাল ছিড়ে বেরিয়ে আসবার ? যদি না ঈশ্বরের কৃপা হয়। তবে, একটা দিন আসে, যেদিন সে বুঝতে পারে, যে কর্তৃত্বাভিমানকে সে আশ্রয় করে, সাধন-ভজন, সাধনক্রিয়া শুরু করেছিল, তার সামর্থের একটা সীমা আছে। এই সীমাকে অতিক্রম করা সম্ভব নয়। কেউ যেন তাকে কলুর বলদের মতো ঘুরাচ্ছে । তিনিই সর্ব্ব কর্ম্মের মালিক, তিনিই সর্বেশ্বর, তিনিই সবকিছুর কর্ত্তা। জীব আসলে অহঙ্কারের বশে তাকে ভুলে নিজেই মালিক সেজে বসে পড়েছে। জীব নিজের স্বরূপের কথা ভুলে গেছে। শুধু ভুলে গেছে না, স্বরূপের উপলব্ধি করবার সামর্থ হারিয়েছে। এখন তার কাছে যা কিছু আছে, তা জড় প্রকৃতি ছাড়া কিছু নয়। দেহকেই ঘিরেই সে বাস করছে। দেহকে ঘিরেই সে স্বপ্ন দেখছে, দেহকে ঘিরেই সে সুসুপ্তিতে যাচ্ছে। কিন্তু অজ্ঞান তাকে এমন ভাবে বশীভূত করে রেখেছে, যে সে সুষুপ্তি থেকে উঠে, সুসুপ্তির অনুভবের কথা ভুলে যাচ্ছে। প্রকৃতির সঙ্গে সে এমন ভাবে লেপটে গেছে, যে এখন সে আর কিছুতেই প্রকৃতি থেকে নিজেকে পৃথক করে অনুভব করতে পারছে না, হয়তো চাইছেও না। প্রকৃতির মোহেই জীব নিজেকে কর্ত্তা ভাবছে, আর যতটুকু বুদ্ধি আছে, তা সে তার কর্ম্মে ঢেলে দিচ্ছে আর সুখ-দুঃখ ভোগ করতে বাধ্য হচ্ছে।

চলবে। .........

তারিখ : ১৭.০২.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/১৭

যস্য নাহংকৃতো ভাবো বুদ্ধির্যস্য ন লিপ্যতে
হত্বাপি স ইমান-লোকান ন হন্তি ন নিবধ্যতে। (১৮/১৭)

যাঁর মধ্যে "আমি কর্ত্তা" এই ভাব নেই, বুদ্ধি যার কর্ম্মফলে লিপ্ত নেই, তিনি সমস্ত লোক হত্যা করলেও কিছুই হত্যা করেন না, এবং তিনি কর্ম্মফলেও আবদ্ধ হন না।

পূর্ব্ব প্রকাশের পর : (২)

দেহাভিমানী জীব, দেহকেই আপন সত্তা ভেবে, সকল কর্ম্মের কর্ত্তা সেজে বারবার জগতে ভ্রমন করছে, আর অষ্টপাশে আবদ্ধ হয়ে হাঁসফাঁস করছে। আর এখান থেকে বেরুবার উপায়ের কথা ভুলে বসে আছে। হবে বা-ই বা না কেন, এখন সে নিরহংকারী থেকে অহংকারী হয়েছে, নিঃসঙ্গ থেকে সঙ্গ খুঁজে পেয়েছে। নিরাশ্রয় থেকে এখন সে আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। এখান থেকে বেরুবার কথা শুনলে, তার কাছে পাগলের প্রলাপ বলে মনে হয়। বেরুতে গেলেও তার পাগল পাগল বোধ হয়। আর এই পাগলকে ঔষধের কথা বললেই কামড়াতে আসে। তথাপি শ্রীকৃষ্ণ আসেন, তথাপি শ্রীগুরু আসেন, তথাপি উদ্ধারকর্ত্তা আসেন, আর আমাদের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলনের কাজ শুরু করেন। কিন্তু হায়, আমরা তাঁকে তীরবিদ্ধ করি - প্রশ্নবানে জড়্জড়িত করি।

প্রকৃতিতে মোহগ্রস্থ হয়ে গাধাকে কাঁধে নিয়ে, ঘুরছি। সংসারে সং সেজে কতোনা নাম-রূপের মোহে মোহগ্রস্থ হয়ে, খেলা খেলছি। জীবের প্রাণ যখন স্থির হয়, মন যখন নির্ম্মল হয়, বুদ্ধি যখন স্বচ্ছ হয়, তখন সে নিজের সন্ধানে বেরিয়ে পরে। হেথা নয়, হেথা অন্য কোনোখানে। একসময় বাহির থেকে অন্তরে প্রবেশ করে। জীব ঈশ্বরের অংশ, তথাপি প্রকৃতির ত্রিগুনাত্বিকা শক্তির বাঁধনে আবদ্ধ হয়ে নিজের স্বরূপ ভুলে গেছে।

চৈতন্যময়ী শক্তি জীবের হৃদয় আকাশের গুহ্য গহ্বরে লুক্কায়িত। আবার এই একই শক্তি নিম্নগামী হয়ে মূলাধারে অবস্থান ক'রে, জীবকূলকে সংসারের মধ্যে নিমজ্জিত করেন। তখন জীবভাব, আর জন্ম-মৃত্যুর চক্র প্রকট হয়ে ওঠে। যন্ত্রনায় ছটফট করে। বিষয়ের দিকে ধাবিত হয়, একটু শান্তির আশায়। কিন্তু কোথায় শান্তি ? কস্তুরী নাভির সন্ধানে উন্মাদ হরিণ ছোটাছুটি করে। তখন সূক্ষ্ম জগতের কথা ভুলে স্থুল জগতের মধ্যে নিজের সন্ধান করে। অবিনশ্বর জীব নশ্বর হয়ে দিনযাপন করে।
যে স্পন্দন একসময় বিন্দুতে দেখা দিয়েছিলো, ধীরে ধীরে সহস্রার-এর পথ ধরে, আজ্ঞা চক্র হয়ে, বিশুদ্ধ চক্র ভেদ করে, হৃদয়ে সন্নিবিষ্ট হয়ে আছেন। এখনো অজ্ঞান আসেনি, এখনো জ্ঞান আছে। কিন্তু এর পরে যখন নাভিমূল হয়ে স্বাধিষ্ঠান অতিক্রমন করে মূলাধারে স্থিত হলো তখন সমস্ত জ্ঞানের বিলোপ হলো। ঐশী শক্তি সুপ্ত হলেন। এখন আর সে নিজেকে চিনতে পারে না। শুধু নিজেকে চিনতে পারে না, তাই নয়, সে এখন সংসারের একজন হয়ে গেছে। প্রকৃতির মোহে মোহগ্রস্থ হয়ে, উন্মাদের মতো আচরণ করছে। কখনো হাসছে, কখনো কাঁদছে। নিজভূমিতে প্রবাসী হয়ে পরকে আপন ভেবে কতনা আদরযত্ন করছে। হায়রে মানব কোথায় ছিলি, কোথায় এলি। আপন ভুলে পরকে পেলি, আপন স্বরূপ ভুলে গেলি ? জীব এখন মায়ার ঘোরে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে, কতনা স্বপ দেখছে সে। মায়ায় অভিভূত হয়ে, রাগ, দ্বেষ, কাম, ক্রোধ, লোভ- এর বোঝা সঙ্গে নিয়ে দৌড়োচ্ছে, আর হাপাচ্ছে ।

একটা সময় আসে, যখন সে শ্রীগুরুর সান্নিধ্যে আসে, আসতেই হয়। তবে কার কত জন্মের পরে এই অবস্থা আসে, তার নির্নয় করা কঠিন। ব্রহ্ম যখন জীব-জীব খেলা খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন, তখন স্বপ্নে তিনি আসেন, আর গুরুকৃপায়, তার স্মৃতি জেগে ওঠে, তখন সে নতুন পদ পায় , তখন সে নতুন পথের যাত্রী হয়। আসলে নতুন পথ তো নয়, যে পথে সে নিম্নগামী হয়েছিল, সেই পথে অর্থাৎ এবার উল্টোপথে সে স্বধামের দিকে যাত্রা শুরু করে। ভোগের পথ ধরে সে যেমন একদিন নিচের দিকে নেমেছিল, এখন সে নিবৃত্তির পথ ধরে উর্দ্ধগামী হতে থাকে। যে পথে সে একদিন একটা পর একটা অশুদ্ধির আবরণ গায়ে চাপিয়েছিলো, এবার সে শুদ্ধির চাদর চাপিয়ে, অনিবার্য্য পরিণতির দিকে ধাবিত হতে থাকে। অশুদ্ধির আবরণ যত খসে পড়তে থাকে, তত তার মধ্যে শুদ্ধির শুভ্রতা জ্বলজ্বল করতে থাকে।

জাগতিক স্থুল বস্তুকে একসময় সে নিজের মনে করে আগলে রাখতো। আর এই স্থুল বস্তু সংগ্রহের জন্য, সে একসময় অক্লান্ত পরিশ্রম করতো, পাছে হারায়, তাই সে উদ্বিগ্ন থাকতো, ভীত সন্ত্রস্ত থাকতো। কিন্তু গুরুকৃপায় যখন সে সূক্ষ্ম জগতের সন্ধান পেলো, সূক্ষ্ম বস্তুতে আনন্দের সন্ধান পেলো, তখন তার মধ্যে তৃপ্তিবোধের মাত্রা বাড়তে লাগলো। প্রথম দিকে সত্ত্বগুণের রশ্মি তার মধ্যে প্রকাশিত হতে লাগলো। আর এই শক্তি তাকে বারংবার আঘাত করে শুদ্ধ করতে লাগলো। কামার যেমন লোহাকে গনগনে আগুনে পুড়িয়ে হাতুড়ির ঘা মারতে থাকে, তেমনি গুরুদেব জ্ঞানের আলো জ্বেলে তাকে পোড়াতে লাগলো। শিষ্যের মনে সত্যের প্রকাশ হতে লাগলো। স্থুলের নেশা তার কেটে যেতে লাগলো। আর সূক্ষ্ম জগতের আলো তার সামনে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে লাগলো। সাধকের অন্তঃকরণ যেন শুদ্ধসত্ত্ব ভাবে পূর্ন হয়ে উঠতে লাগলো। আর যত শুদ্ধসত্ত্ব প্রকাশ হতে লাগলো, তত বৈরাগ্যের পথ প্রশস্ত হলো। তখন আর কিছুই চাহিনা - নিজের মধ্যে নিজেই বুঁদ হয়ে যাই। যাঁকে যোগীপুরুষগন বলছেন, যথার্থ সন্ন্যাস। তখন সর্ব্বধর্ম্ম পরিত্যাগ করে, ঈশ্বরে আত্মসমর্পন। তখন না আছে কর্ম্ম, না আছে তার ফল।

তখন ঐশীভাব আর জীবভাব মিলে মিশে একাকার। এই সেই শুভ মুহূর্ত যখন সাধক সহস্রারে অবস্থান করেন । এখনো অনেক রাস্তা বাকি। সহস্রার ছেড়ে বিন্দুতে যেতে হবে। অহঙ্কারের নাশ করে নিরহঙ্কারী হতে হবে। আশ্রয় ছেড়ে নিরাশ্রয় হতে হবে। গুন্ সকলকে ছেড়ে গুণাতীত হতে হবে। মায়াকে ছেড়ে মায়াতীত হতে হবে।

চলবে।...........

তারিখ : ১৮.০২.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/১৭

যস্য নাহংকৃতো ভাবো বুদ্ধির্যস্য ন লিপ্যতে
হত্বাপি স ইমান-লোকান ন হন্তি ন নিবধ্যতে। (১৮/১৭)

যাঁর মধ্যে "আমি কর্ত্তা" এই ভাব নেই, বুদ্ধি যার কর্ম্মফলে লিপ্ত নেই, তিনি সমস্ত লোক হত্যা করলেও কিছুই হত্যা করেন না, এবং তিনি কর্ম্মফলেও আবদ্ধ হন না।
পূর্ব্ব প্রকাশের পর : (৩)

জীব যখন আপন গৃহে যাত্রা শুরু করে, তখন তার ভাব শুদ্ধ থেকে শুদ্ধতর হতে থাকে। আর এই সত্য আমরা সবাই জানি, যে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষতর বস্তুই উর্দ্ধগামী হবার অধিকারী হয়ে থাকে। বুদ্ধি যত স্বচ্ছ হয়, মন যত নির্ম্মল হয়, তত সাধকের এই বোধের বিকাশ ঘটে যে জগৎ কেবলমাত্র তার মনের ইচ্ছেতেই প্রকাশ পাচ্ছে। তখন ঈশ্বর অনুভূতি প্রবল হতে শুরু করে। জড়ত্বের বন্ধন খসে পড়তে শুরু করে। পশুভাবের অর্থাৎ রাগ, দ্বেষ, হিংসা ইত্যাদির গলন শুরু হয়। এই গলনক্রিয়া আসলে ব্রহ্মজ্ঞান জ্যোতির প্রভার কারনে হয়ে থাকে। এসব আসলে সাধনক্রিয়ার উত্তম অবস্থার কথা - যা সাধারনের কাছে সাহিত্য ছাড়া কিছু নয়। এই ধারণা সাধারনের অনুভূতিতে আসে না। প্রাণের নিরোধ অবস্থায় এই ধারণা হয়ে থাকে। সাধন ক্রিয়ার অভ্যাস করতে করতে একসময় এই প্রাণের অবরুদ্ধ অবস্থা সহজে ও স্বাভাবিক ভাবে হয়ে থাকে। তখন শারীরিক ক্লেশ, অর্থাৎ স্বাভাবিক দম -বন্ধে যে শারীরিক ক্লেশ তা অনুভবে আসে না। এই অবস্থায় চিত্ত ব্রহ্ম ভাবে ভাবিত হয়ে ভূত সকলের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। প্রাণের গতি সুষুম্নাগামী হয়। ইড়া পিঙ্গলা ছেড়ে প্রাণ সুষুম্নায় প্রায় গতিহীন হয়ে স্থির হয়। একসময় সে সুষুম্না থেকে আজ্ঞা, আজ্ঞা থেকে সহস্রারের অভিমুখে যাত্রা করে। তখন সাধক ব্রহ্মময় উপনিষদের ভাষায় অর্থাৎ "সর্ব্বং খল্বিদং ব্রহ্ম" অনুভব করেন। ব্রহ্মবিন্দু যেমন একসময় প্রাণের হিল্লোলে ব্রহ্ম সিন্ধুতে রূপান্তরিত হয়েছিল। আবার এই ব্রহ্মসিন্ধু থেকেই আত্মা প্রাণকে ছায়া করে মন ইন্দ্রিয় শরীর রূপে প্রকাশিত হয়েছে। এই আত্মা সূক্ষ্ম থেকে একসময় স্থুলে পরিণত হয়েছিল, তেমনি সাধক যদি সেই আত্মাকে ধরতে চান, তবে তাকে স্থুল থেকে সূক্ষ্মে যেতে হবে। তো আমি বোধের যে স্থুল ভাব, সংকীর্ণ ভাব তাকে ত্যাগ করতে পারলে আমি-র ব্যাপক ভাবের অনুভব হয়। ধীরে ধীরে জাগ্রত ও স্বপ্নাবস্থায় যে স্থুল-সূক্ষ্ম বোধ তা লুপ্ত হয়ে সূক্ষ্মতর জগৎ অর্থাৎ সুসুপ্তিতে প্রবেশ করে। এই অবস্থায় জ্ঞান ও অজ্ঞানের মধ্যে যে পার্থক্য তা দূর হয়ে যায়। তখন নানাত্ব থাকে না। অর্থাৎ সাধন ক্রিয়া করতে করতে যে অবস্থার মধ্যে সাধক প্রবেশ করে, সেখানে না থাকে জাগ্রত অবস্থাটার স্থুল জগৎ, না থাকে স্বপ্নাবস্থার সূক্ষ্ম জগৎ, মন সেখানে নিরোধের অবস্থা প্রাপ্ত হয়েছে। সেখানে মনের মধ্যে কোনো তরঙ্গ না থাকার দরুন, কোনো সংকল্পের উদয় হচ্ছে না। তখন সমস্ত দৃশ্য প্রপঞ্চ দূর হয়ে যা থাকে তাকে বলা হয় ব্রহ্ম - অবস্থা। একটা জিনিস জানবেন, ব্রহ্মস্বরূপ একটা মনের অবস্থা মাত্র। ব্রহ্ম এই সূক্ষ্ম ও স্থুলের উর্দ্ধে একটা বিশেষ অবস্থা মাত্র।

এই অবস্থাকে মাণ্ডুক্য উপনিষদ বলছেন, ৪/১, যে যোগে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর সঙ্গে কোনো সংযোগ থাকে না, তাকে বলে অস্পর্শ যোগ। জাগ্রত অবস্থায় মানুষ অনেক কিছু দেখে, যাকে সে সত্য বলে মনে করে। আবার স্বপ্নেও সে একই ধরনের বস্তু দেখে, তাকেও সে সত্য বলেই মনে করে। এই যে সত্য বলে মনে করছে, ইনি কে ? ইনি চৈতন্য। এই চৈতন্যই আমাদের আত্মা। ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ বলছেন, এই যে দেখা এটি সত্য নয়, সত্য হচ্ছে চৈতন্য যিনি দেখছেন। এখন এই চৈতন্যের উপরে যখন অজ্ঞান ভর করে, তখন জগৎ নানান রূপে প্রতিভাত হয়। চোখের দোষে মানুষ ভুল দেখে, দুই দেখে, এক দেখাই সত্য। অর্থাৎ চোখের উপরে আবরণ হেতু এককে দুই বা বহু দেখাচ্ছে। চোখ যখন আবরণ শূন্য হবে, চোখ যখন যথার্থ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবে, তখন আবার একের দর্শন মিলবে। এই এক দেখাই জীবনের লক্ষ। যারা এই একত্বের উপলব্ধি করতে পেরেছেন, তাঁরা আর অবিদ্যায় মুগ্ধ হন না।

মাণ্ডুক্য উপনিষদ বলছেন, এই যে বাহ্য বস্তু তা চৈতন্য থেকে উৎপন্ন নয়, আবার বাহ্য বস্তু থেকেও চৈতন্যের উৎপত্তি হয় নি। যতক্ষন আমরা কার্য-কারণের মধ্যে গুরুত্ত্ব, বা সাযুজ্য খুঁজি, ততক্ষন এই বাহ্য বস্তুকে আমাদের সত্য বলে মনে হয়। কিন্তু যখন সাধন এই সম্পর্কে উদাসীন হয়ে যান, তখন তার কাছে সমস্ত সম্পর্কই মিথ্যে হয়ে যায়। আর এই কার্য্য-কারনে আসক্তির কারণেই মানুষ দুঃখের সংসারে আবদ্ধ থেকে নানান যন্ত্রনা ভোগ করছে। এই আসক্তিকে জয় করতে পারলেই মানুষকে আর এই জগতে ফিরে ফিরে আসতে হয় না। অর্থাৎ তখন তিনি মুক্ত হয়ে যান।

ব্যবহারিক দিকে থেকে দেখলে মনে হয়, জীব জন্মাচ্ছে, আবার মারা যাচ্ছে। এ আমাদের দৃষ্টিভ্রম ছাড়া কিছু নয়। দেখুন জাগ্রত অবস্থায় এই জগৎ ও তার মধ্যে জন্ম মৃত্যু কেবলমাত্র মনের গোচর হয়ে থাকে। তেমনি আমরা যদি স্বপ্নে কাউকে জন্মাতে বা মরতে দেখি, তখনও মনের কাছে সেটি সত্য বলে মনে হয়। কিন্তু এই দুইই সমান ভাবে অসত্য। এসব আসলে মনের খেলা মাত্র। আসলে কেউই জন্মায় না, জন্মাতে পারে না, জন্মাবার কোনো সম্ভাবনাই নেই। সত্য হচ্ছে কোনো কিছুরই জন্ম হয় না, এই হল পরম সত্য। জাগ্রত মনের অবস্থায়, আমরা যাকিছু দেখি, তাকে সত্য বলে দীর্ঘকাল মনে রাখি, আবার স্বপ্নাবস্থায় আমরা যাকিছু দেখি, তাকেও আমরা কিছুক্ষন সত্য বলে মনে করি। কিন্তু এই মন যখন সুসুপ্তির অবস্থায় চলে যায়, তখন আর আমাদের কাছে এই স্থুল জগৎ বা সূক্ষ্ম স্বপ্ন জগৎ সত্য বলে মনে হয় না। তখন আমরা জন্ম-মৃত্যুকে আর সত্য বলে মনে করি না। এই চূড়ান্ত তত্ত্বের অপরোক্ষ অনুভূতির জন্য মনকে প্রস্তুত করাই সাধনক্রিয়া। যদি কোনো বস্তুকে জন্মাতে দেখি, তবে তা আমাদের দৃষ্টিভ্রম মাত্র। ব্রহ্ম ছাড়া অন্য বস্তুর অস্তিত্ত্বই নেই।

সাধনার পরাবস্থাতে যিনি স্থিত হতে পেরেছেন, তার অহঙ্কার মুছে গেছে, মন নিষ্ক্রিয় হয়েছে, বুদ্ধি বিচারক্রিয়া থেকে অব্যাহতি নিয়েছে, তাই তার কাছে জন্ম মৃত্যু বলে কোনো কার্য্যের অস্তিত্ত্ব নেই। আর এই কারণেই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যোগস্থ অবস্থার কথা বলতে গিয়ে বলছেন :

"যস্য নাহংকৃতো ভাবো বুদ্ধির্যস্য ন লিপ্যতে
হত্বাপি স ইমান-লোকান ন হন্তি ন নিবধ্যতে।"

"যাঁর মধ্যে অহঙ্কার ভাব নেই, বুদ্ধি যার কর্ম্মফলে লিপ্ত নেই, তিনি সমস্ত লোক হত্যা করলেও কিছুই হত্যা করেন না, এবং তিনি কর্ম্মফলেও আবদ্ধ হন না।"

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
তারিখ : ১৯.০২.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/১৮

জ্ঞানং জ্ঞেয়ং পরিজ্ঞাতা ত্রিবিধা কর্ম্ম-চোদনা
করণং কর্ম্ম কর্ত্তেতি ত্রিবিধঃ কর্ম্মসংগ্রহঃ। (১৮/১৮)

জ্ঞান, জ্ঞেয় ও জ্ঞাতা এই তিনটি হচ্ছে কর্ম্ম প্রবৃত্তির হেতু। করণ, কর্ম্ম ও কর্ত্তা এই তিনটি হচ্ছে কর্ম্মের আশ্রয়।

জ্ঞান : জ্ঞা (জানা) + অন (ভা) । বিষয়কে বোধে আনাই জ্ঞান। জ্ঞান আসলে ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে বাইরে থেকে সংগৃহীত হয়। একে আপনি বিচারশক্তি বলতে পারেন। এই জ্ঞান দুই প্রকার, একটা বহির্জগৎ সম্মন্ধীয় বিচারশক্তি, আর অন্তর্জগৎ সম্মন্ধীয় বিচারশক্তি। এই বহির্জগৎ সম্মন্ধীয় বিচার শক্তিকে বলে অপরাবিদ্যা । আর অন্তর্জগৎ সম্মন্ধীয় বিচারশক্তিকে বলে পরাবিদ্যা । ইন্দ্রিয়সকল যে জ্ঞান এনে আমাদের মনের ভান্ডারে জড় করে, সেখানে অর্থাৎ সেই ক্ষেত্রে আমাদের বুদ্ধি অংকুরিত হয়। এই বুদ্ধি (বিচারশক্তি) কাউকে দান করা যায় না। কিন্তু জ্ঞান দান করা যায়। জ্ঞান সত্যকে প্রকাশ করে, সত্যকে প্রতক্ষ্য করে, আর বুদ্ধি এই জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে, কর্তব্য নির্নয় ও কর্তব্যের অনুষ্ঠানে, মন ইত্যাদি কর্ম্মেন্দ্রিয়গুলোকে উদ্দীপ্ত করে।

জ্ঞেয় ও জ্ঞাতা: জ্ঞানকে যিনি আয়ত্ত্বে আনেন, তিনি জ্ঞাতা । আর জ্ঞানের সাহায্যে প্রাপ্তব্য বিষয়কে বলে জ্ঞেয় ।

করণ অর্থাৎ ক্রিয়া সাধক, কর্ম্ম অর্থাৎ ইপ্সিত কর্ম্ম, আর কর্ত্তা অর্থাৎ যার দ্বারা কর্ম্ম সাধিত হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হতে পারে, ক্রিয়া সাধক (করণ) আর কর্ম্ম যার দ্বারা সাধিত হচ্ছে (কর্ত্তা)এর মধ্যে পার্থক্য কোথায় ? এই জড় শরীর হচ্ছে সাধক, যার সঙ্গে মন-ইন্দ্রিয় ইত্যাদি সংযুক্ত। আর অহঙ্কারবোধ হচ্ছে, কর্ত্তা যিনি শরীরকে এই কাজে লাগাচ্ছেন।

দেখুন জানা, জানবার বস্তু, আর যিনি জানবেন, আসলে এই তিনি একই । আর তিনি হচ্ছেন ব্রহ্ম বা আত্মা। ধরুন আপনি সাধনা ,করতে চান, তাহলে এই সাধনা সম্পর্কে আপনাকে আগে জানতে হবে। অর্থাৎ গুরুমুখে, বা শাস্ত্রাদি অধ্যয়ন করে, আগে আপনাকে বিষয়টি জানতে হবে। জানার পরে, আপনাকে বুঝবার চেষ্টা করতে হবে, যে কেন আমি এই সাধনক্রিয়া করবো। এই যে সাধনার আবশ্যকতা সম্পর্কে জানা, সাধনার ফলাদি সম্পর্কে জানা, একে বলে জ্ঞান। এখন সাধনার যে ক্রিয়া-পদ্ধতি তাকে বলে জ্ঞেয়। অর্থাৎ সাধনা করতে গেলে, সাধন পদ্ধতি সম্পর্কে আপনাকে অবহিত হতে হবে।

জ্ঞেয় বস্তুটি সম্পর্কে যার জ্ঞান আছে, তাঁকে বলে জ্ঞাতা। এই জ্ঞাতাই সাধনক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান দান করতে পারেন। এবার সাধক যখন এই জ্ঞান পেলো, তখন তিনিও সাধনক্রিয়ার জ্ঞাতা হলেন। তো জ্ঞান, জ্ঞেয়, এবং জ্ঞাতা এরা সবাই সাধনক্রিয়ার প্রেরণাদানকারী। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভাষায় "চোদনা" অর্থাৎ প্রবর্ত্তক ।

এর পরে হচ্ছে কর্ত্তা, কর্ম্ম ও করণ - এই তিনটি হচ্ছে ক্রিয়ার আশ্রয়। যার দ্বারা সাধন ক্রিয়া সাধিত হয়, তা হচ্ছে এই জড় শরীর - যা মন-প্রাণ-ইন্দ্রিয়াদির আশ্রয়স্থল মাত্র । এই জড় শরীরের দ্বারা সাধনক্রিয়া সাধিত হবে। এখন এই জড় শরীরের কোনো শক্তি নেই, যে সে নিজে থেকে কিছু করে। শরীর যেন মিস্ত্রির হাতুড়ি বাটাল, যার দ্বারা মিস্ত্রি কাজ করে থাকে। এখন এই সাধনক্রিয়া প্রকৃতপক্ষে যিনি করবেন, তিনি হচ্ছেন অহঙ্কার। এই অহঙ্কারই কর্ত্তা সেজে সমস্ত কর্ম্ম করে থাকেন । আর এই অহঙ্কারের বশে শরীর-মন দ্বারা যা কিছু কৃত হয়, তাকে বলে কর্ম্ম। তো এই তিনটির (করণ , কর্ত্তা ও কর্ম্ম ) সাধন ক্রিয়ার আশ্রয়।

দেখুন, সাধন ক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানলেন, কিভাবে করতে হবে, তাও হয়তো জানা হলো, কিন্তু এতে করে কর্ম্ম সাধিত হলো না। অর্থাৎ শুধু জ্ঞান থাকলেই ক্রিয়া সম্পাদিত হয় না। এর জন্য দরকার একটা আশ্রয়। এই আশ্রয় না থাকলে সাধনক্রিয়া সাধনের উপায় নেই। তো ক্রিয়ার কর্ত্তা, ক্রিয়ার জ্ঞাতা এই দুই জন আমাদের অহঙ্কারের সাথে মিলিত হয়ে, মন-বুদ্ধি-শরীরের সাহায্যে কাজ করে থাকে।
\এখন কথা হচ্ছে, ক্রিয়া বলতে আমরা কি বুঝি ? জানা বলতে আমরা কাকে বা কোন বিষয়কে জানা বুঝি ? অধ্যাত্ম দৃষ্টিতে জানার বস্তু হচ্ছে একমাত্র আত্মা। যিনি চৈতন্য স্বরূপ হয়ে সমস্ত বিশ্বকে প্রকাশ করছেন। তো যার দ্বারা এই বিশ্ব প্রকাশিত হচ্ছে দৃশ্যমান হচ্ছে, তাকে জানলে, সমস্ত বিশ্বকেই জানা হয়। আর এই কারণেই, উপনিষদের ঋষিগণ বারবার প্রশ্ন তুলেছেন, তুমি কি সেই বস্তুকে জেনেছো, যাঁকে জানলে, সমস্ত কিছুকে জানা হয় ? অর্থাৎ সমস্ত কিছুর মধ্যে একমাত্র জ্ঞাতব্য বস্তু হচ্ছেন সেই ব্রহ্ম। আর যা কিছু ক্রিয়াসাধন তার উদ্দেশ্য হচ্ছে, এই ব্রহ্মজ্ঞানলাভ। ব্রহ্মবোধের জন্য নিজেকে উপযুক্ত করা।

চঞ্চল মনে জীব-ভাব। স্বরূপের বিস্মৃতি। ক্রিয়ার অভ্যাসে বোধশক্তির বৃদ্ধি। ক্রিয়ার অভ্যাসে স্মৃতির উদয়। তখন আত্মস্থিত ভাবের জন্ম হয়। তখন সর্ব্ব ভূতে স্থিত ঈশ্বরকে অনুভব করা যায় । সাধক তখন সকলের অন্তরের মধ্যে প্রবেশ করতে পারেন। ব্রহ্মের সর্ব্বব্যাপকত্ব অনুভবে আসে। এই হচ্ছে সাধনক্রিয়ার ফল। আর এই কারণেই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ক্রিয়ার উৎপত্তিস্থল ও ক্রিয়ার গতাগতি সম্পর্কে আমাদেরকে অবহিত করছেন।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ২০.০২.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/১৯
জ্ঞানং কর্ম্ম চ কর্ত্তা চ ত্রিধৈব গুনভেদতঃ
প্রচ্যতে গুণসংখ্যানে যথাবচ্ছৃণু তান্য়পি। ১৮/১৯

সাংখ্যশাস্ত্রে জ্ঞান, কর্ম্ম ও কর্ত্তা গুন্ ভেদে তিন প্রকারই কথিত হয়েছে সে সকল যথাযথভাবে বলছি, শোনো।

বার বার আমরা শুনছি, যে আত্মা অকর্ত্তা। আর এও দেখছি, যে আত্মা ভিন্ন কোনো কর্ম্মই সম্ভব নহে। এই সন্দেহ দূর করবার জন্য যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, আত্মা অকর্ত্তা, তবে জ্ঞান, কর্ম্ম, ও কর্ত্তার গুন্ভেদে ত্রিবিধ অবস্থা পরিলক্ষিত হয়। আমরা জানি গুণাতীত অবস্থায় সাধকের কোনো ক্রিয়া থাকে না। তো তাই যদি হয়, তবে ক্রিয়া গুনের কারণেই হয়ে থাকে একথা মেনে নিতে হয়।

এখন গুন্ যেহেতু তিন প্রকারের অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ তমঃ তাই কর্ম্মের যিনি কর্ত্তা বলে অভিহিত হন, তিনি ত্রিগুণযুক্ত হয়ে থাকেন। তাই গুণাতীত ব্রহ্মে কোনো কর্ম্ম থাকতেই পারে না। আর আত্মাও অকর্ত্তা, এই সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত হয়।

সাধক এটা উপলব্ধি করেছেন, প্রাণের স্পন্দনের কারণেই চিত্তের স্পন্দন, আবার প্রাণ যখন স্পন্দনহীন হয়, তখন চিত্ত নিস্পন্দিত হয়। তো সাধন প্রভাবে, প্রাণের সঙ্গে সঙ্গে চিত্ত যত নিস্পন্দিত হতে শুরু করে, তখন সাধকের মধ্যে ভোক্তৃভাবও বিলুপ্ত হতে শুরু করে। সাধক যখন স্বরূপে অবস্থান করেন, তখন এই অবস্থা প্রকট হয়ে থাকে। ধীরে ধীরে সাধকের সমস্ত বৃত্তি নিরুদ্ধ হতে শুরু করে। এমনকি তার মধ্যে স্বাভাবিক বোধ-বুদ্ধির অভাব দেখা যায়। কিন্তু সাধক যখন আবার সাধন অবস্থা থেকে বুত্থিত হন, বা বলা যেতে পারে আত্মস্থিত ভাব থেকে বিচ্যুত হন, তখন আবার তিনি বুদ্ধি-বৃত্তির সঙ্গে একত্রে বাস করেন। অর্থাৎ তখন আবার তার স্বাভাবিক বোধ-বুদ্ধি দেখা যায়। দেখুন, সাধক যখন সাধনার পরাবস্থাতে অবস্থান করেন, তখন তিনি দ্রষ্টা স্বরূপ হয়ে যান। আর এই দ্রষ্টা পুরুষই জানবেন, চৈতন্যস্বরূপ। এই অবস্থায় তিনি যাকিছু জ্ঞাত হন, তা অবশ্য়ই সম্যকরূপে দৃষ্ট, অপরোক্ষ জ্ঞান।

আবার একটু ভেবে দেখলে আমরা বুঝতে পারি, আমাদের বুদ্ধিই দ্রষ্টা। কেননা বুদ্ধিই বিষয়কে যথার্থভাবে প্রকাশ করতে পারে। যার মধ্যে বুদ্ধি নেই, সে যা কিছু দেখছে, বুদ্ধির অভাবে তার সেই দেখা কোনো জ্ঞানের আভাস দিতে পারে না। আসলে তখন সে যা কিছু দেখছে, তা সে অবশ হয়ে দেখছে। এতে করে তার মধ্যে কোনো জ্ঞান বা বিচারের অবস্থা আসে না। তো দ্রষ্টা চৈতন্যের সাহায্যে চেতনাযুক্ত হয়ে বুদ্ধিরূপ দর্পনে দৃশ্য বা জ্ঞেয় বস্তুকে জ্ঞাত হচ্ছেন।

তো আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, বুদ্ধিতে প্রতিবিম্বিত চৈতন্য হচ্ছে দ্রষ্টা বা জ্ঞাত পুরুষ। এবার একটু ঘুরিয়ে ভাবুন, বুদ্ধিতে প্রতিবিম্বিত হচ্ছে কি বা কে ? বুদ্ধিতে প্রতিবিম্বিত হচ্ছে চৈতন্য। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে, বলতেই হয় যে জ্ঞেয় বস্তু হচ্ছে চৈতন্য। এখন আমাদের মতো সাধারন মানুষের ধারণা হচ্ছে, জ্ঞাতাপুরুষ ও জ্ঞেয়বস্তু সবসময় আলাদা। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে জ্ঞাতা ও জ্ঞেয় এক অভিন্ন। দ্রষ্টা না থাকলে দৃশ্য থাকে না, আবার দৃশ্য আছে বলেই দ্রষ্টার অস্তিত্ব অনুভবে আসে। তো বস্তুর সত্ত্বা দ্রষ্টার সত্ত্বার উপরে নির্ভর করে সত্য, আবার দ্রষ্টার সত্ত্বাও দৃশ্যের সত্ত্বার উপরে নির্ভর করে।

আসলে যে কথা বুঝবার জন্য এতসব কথা তা হচ্ছে, এক ব্রহ্ম বহুভাবে প্রকাশিত। যিনি দেখছেন, তিনিও ব্রহ্ম, আবার যাঁকে দেখছেন, তিনিও ব্রহ্ম। কেবলমাত্র মায়ার প্রভাবে বহুরূপে প্রতিভাত হচ্ছে। আসলে দ্রষ্টা, দৃশ্য, আমি একই বস্তু। কিন্তু মাঝখানে মন এসে সব গুলিয়ে দিয়েছে। আমাদের এই বুদ্ধি যত নষ্টের গোড়া। আর আমাদের মন এই বুদ্ধির কথায় চলে। এই বুদ্ধিই সমস্ত বস্তুকে আলাদা আলাদা ভাবে চিহ্নিত ক'রে, আমার মধ্যে দ্বৈত বা বহুভাবের সৃষ্টি করে আমাদেরকে বিড়ম্বিত করছে। আমরা বহুর খোঁজে বেরিয়ে নিজেকে চঞ্চল, বিক্ষিপ্ত করে তুলছি। একবার স্ব-স্বরূপে স্থিত হতে পারলে, আমরা বুঝতে পারবো, আমি ভিন্ন কেউ কোথাও নেই। হাজার বুদ্ধিতে হাজার রূপে প্রকাশিত হচ্ছে। আমি বিভ্রান্ত হচ্ছি।

যোগ অর্থাৎ আত্মসমর্পনের সাহায্যে যখন আমরা যোগযুক্ত হতে পারবো, তখন আমরা বুঝতে পারবো, যে বাহ্য জগৎ আমারই রূপ, অর্থাৎ একই আত্মার প্রকাশ মাত্র। উপনিষদ বলছেন, ঈশ্বর মানুষের মন ও ইন্দ্রিয়সকলকে বহির্মুখী করেছেন, তাই, আমরা জগতে বাহ্য বস্তুর মধ্যে বৈষম্য দেখে ব্যথিত হচ্ছি। কিন্তু সাধনক্রিয়ার ফলে, এই মন-প্রাণ যখন স্থির হতে শুরু করে, তখন তাঁর মধ্যে থেকে এই ভেদবুদ্ধি দূর হয়ে যায়। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, সবই গুনের খেলা। ধীরে ধীরে আমরা যোগেশ্বরের শ্রীমুখে এই অভেদজ্ঞানের কথা শুনবো।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
তারিখ : ২১.০২.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/২০-২১

সর্ব্বভূতেষু যেনৈকং ভাবম-অব্যয়ম-ঈক্ষতে
অবিভক্তং বিভক্তেসু তজজ্ঞানং বিদ্ধি সাত্ত্বিকম। (১৮/২০)

যে জ্ঞান দ্বারা বিভক্তকে অবিভক্তভাবে স্থিত এক-অব্যয়-নিত্য স্বরুপে দৃষ্ট হয়, সেই জ্ঞান সাত্ত্বিক বলে জেনো।

উপনিষদের মুনি ঋষিগণ বলছেন, ব্রহ্ম থেকে আসে জীব, ব্রহ্মে চলে যায়। সন্তান মায়ের পেটে আসে পিতার শুক্র হতে, শুক্ৰ বৃহি থেকে, বৃহি, জল থেকে। জল তেজ থেকে, তেজ বায়ু থেকে বায়ু আকাশ থেকে।
সন্তান তো পাঁচজন, কিন্তু সবার মধ্যেই সেই মায়ের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। সন্তান তো পাঁচজন, কিন্তু সবার মধ্যেই সেই পিতা-মাতার ছায়ামূর্তি। সবাই প্রজাপতি ব্রহ্মের প্রজা তথাপি কেউ পুরুষ কেউ নারী, কেউ মানুষ কেউ পশু, কেউ দুর্জন কেউ সুজন। এই পার্থক্য ঘুচবে কি করে ? আসলে কেউ পাল্টাবে না, আপনাকে (নিজেকে) পাল্টাতে হবে। তবেই এই বৈষম্য ঘুঁচে যাবে। আর নিজের মধ্যে যখন পরিবতর্ন আসবে, যখন নিজের মধ্যে সাত্ত্বিক জ্ঞানের আলো প্রজ্বলিত হবে, তখন সম্যক দর্শন হবে। একত্বের হবে। আপাতত আমাদের মধ্যে যে ভ্রম-জ্ঞান এইসব বস্তু সমূহকে ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশ করছে, সেই ভ্রমজ্ঞান দূরীভূত হয়ে যখন আমাদের মধ্যে সাত্ত্বিক জ্ঞানের বৃদ্ধি হবে, তখন আমাদের চোখের সামনে থেকে এই দ্বৈতভাবের দূরীকরণ সম্ভব হবে। আমাদের বিভিন্ন ইন্দ্রিয়গুলোর যে শক্তি বহির্মুখী হয়ে বস্তু সকলের মধ্যে ভিন্ন ভাবের উপলব্ধি করাচ্ছে, সেই ইন্দ্রিয়গুলোর শক্তিকে একত্রিত করে একমুখী করতে হবে। আর এই ইন্দ্রিয়সকলের শক্তির একত্রীকরণের সাহায্যে সমস্ত বস্তুসত্তার একত্বিভূত ভাব মনের মধ্যে পরিস্ফুট হবে।

দেখুন, দুই বা বহু দেখছে কে ? দুই দেখছে আমাদের বহিরেন্দ্রিয়সকল, আর আমাদের এই যে দ্বৈত বা বহুত্বের উপলব্ধি করছে কে, আমাদের মন। আমাদের মন-প্রাণ চঞ্চল বলে ইন্দ্রিয়গুলোর যে বহির্মুখী বৃত্তি তাকে আমার নিবৃত্ত করতে পারি না। আর এই অবস্থায় আমাদের যে জ্ঞান হয়, তা হয় বৈচিত্রে ভরা, বহুমুখী জ্ঞান। এই বহুত্বের জ্ঞান থেকে নিজেকে নিরস্ত্র করতে হলে, মনের চঞ্চলভাবকে দূর করতে হবে। আবার মনের এই চঞ্চলতার কারণের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা বুঝতে পারবো যে, প্রাণের চঞ্চলতার কারণেই মন স্থির থাকতে পারছে না। তো এই প্রাণের চঞ্চলতাকে আগে ধরতে হবে। আর প্রাণের চঞ্চলতাকে বুঝতে গেলে, প্রাণের সঙ্গে সঙ্গে চলতে হবে। প্রাণকে বুঝতে হবে। প্রাণের আয়ামের ব্যবস্থা করতে হবে। এই প্রাণের আয়ামকেই যোগীপুরুষগন বলে থাকেন, প্রাণায়াম। তো প্রাণকে প্রাণায়ামের সাধনার দ্বারা স্থির করতে হবে।

দেখুন পুকুরের জলে চাঁদের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট ভাবে দেখতে গেলে, পুকুরের জলকে আগে স্থির করতে হবে। পুকুরের জলে বাতাসের কারনে যে ঢেউ উঠছে, সেই বায়ুকে ধরতে হবে। তাকে শান্ত করতে হবে, তবেই পুকুরের জল স্থির হতে পারবে। আর আমরা চাঁদের প্রতিবিম্ব স্পষ্ট রূপে দর্শন করতে পারবো। তখন আর চাঁদকে খণ্ডিত বা বহু বলে মনে হবে না। ঠিক তেমনি, এক অখন্ড জ্ঞেয় বস্তুকে আপাতত বহু বলে মনে হচ্ছে। আর এই জ্ঞেয় বস্তু সত্যিই বহু কি না তা বুঝতে গেলে, প্রাণায়ামের দ্বারা প্রথমে প্রাণকে স্থির করতে হবে। প্রাণের স্থিরতার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মন স্থির হবে। আর মন যখন স্থির হবে, তখন মন আত্মমুখী হবে। মন আত্মমুখী হলে, মন নিরোধের অবস্থায় স্থিত হবে। আর এই নিরোধ ভাব থেকেই এক-আত্মার জ্ঞান বা উপনিষদের ভাষায় ব্রহ্মজ্ঞানের উদয় হবে। তখন দ্বৈতরূপে যে ভ্রমদর্শন তার বিলোপ ঘটবে। আমাদেরও আত্মদর্শন হবে। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভাষায় সাত্ত্বিক জ্ঞান লাভ হবে ।

আসলে সাধনক্রিয়ার অভ্যাস নিরন্তর চলতে থাকলে, মানুষ স্বাভাবিক ভাবেই ইন্দ্রিয়ের দাসত্ত্ব থেকে মুক্ত হতে পরে। তখন ইন্দ্রিয়সকল তাকে বশীভূত করতে পারে না, বিপথেও চালিত করতে পারে না। আবার প্রশ্ন জাগে যে, তখন কি তাহলে ইন্দ্রিয়সকল অকেজো হয়ে যায় ? তা নয়। আসলে সাধনক্রিয়া দ্বারা প্রাণ-মন যখন আত্মাতে স্থির হয়, তখন ইন্দ্রিয়সকল যেন থেকেও নেই - এই অবস্থায় থাকে। তখন এই ইন্দ্রিয়গুলোর মধ্যে কর্ম্মের প্রতি যে স্বাভাবিক স্পৃহা, তা থাকে না। মন স্থির হবার দরুন, মনের মধ্যে কোনো সংকল্প-বিকল্পের উদয় হয় না। আর মন যখন সঙ্কল্পরহিত হয়, তখন মন কোনো কর্ম্মের প্রতি আসক্ত হয় না। আর আসক্তিহীন মন যদি বাহ্যত কোনো কর্ম্ম ইন্দ্রিয়-সকল দ্বারা করেও, তথাপি তার মধ্যে তখন কর্ত্তাভাব বা অহঙ্কার থাকে না। তখন কেই বা করে, আর কেই বা করায়। তখন কেই বা কর্ম্ম করে, আর কেই বা ভোগ করে ? নিরহঙ্কারী যোগীর না থাকে ভোগেচ্ছা, না থাকে ত্যাগের প্রবৃত্তি। তাই যোগীপুরুষগন সবার কাছেই সদা আহ্বান করছেন, সাধনক্রিয়া দ্বারা প্রাণ-মনকে বশে রেখে, সাত্ত্বিক জ্ঞানের অধিকারী হও। নিত্য-স্বরূপে স্থিত হও।

পৃথকত্বেন তু যজ্জ্ঞানং নানাভাবান পৃথগ বিধান
বেত্তি সর্ব্বেষু ভূতেষু তজ্জ্ঞানং বিদ্ধি রাজসম। (১৮/২১)

যে জ্ঞানের দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন ভূত্সকলের মধ্যে পৃথক পৃথক ভাবের অনুভব হয়, তাকে রাজস্ব জ্ঞান বলে জানবে।

আমরা অনেক সময় অনেক কিছু বুঝি, কিন্তু তা আমাদের উপল্বদ্ধিতে আসে না। আমরা মুখে বলি, এমনকি হয়তো মনে প্রাণে বিশ্বাসও করি যে ভগবান আছেন। কিন্তু এই ভগবৎসত্ত্বা সম্পর্কে আমাদের কোনো নিজস্ব উপলব্ধি নেই। আমরা কেবল পরের মুখে ঝাল খাই। যা আসলে শুষ্ক পুঁথিগত বিদ্যা, বা শোনা কথা ছাড়া কিছু নয়। এই জ্ঞান হয়তো খারাপ কিছু নয়, বরং ভালো, কিন্তু আমাদের এই জ্ঞান আমাদেরকে তৃপ্তি দিতে পারে না, অন্তরকে সমৃদ্ধ করতে পারে না।

যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, সাত্ত্বিক জ্ঞানের অধিকারীর মতো, একাত্মবোধ হয়তো ঘটেনি, বস্তুর মধ্যে নানাত্ব দেখছি, আর এই নানান বস্তুতে আসক্তি বা অনাসক্তি, আকর্ষণ বিকর্ষণ হচ্ছে না বটে, তথাপি মনে হচ্ছে আমি এককেই বহুরূপে দেখছি। অর্থাৎ আমি এককে বহুরূপে দেখছি, এই জ্ঞান যখন আমাদের হয়, তখন তাকে বলে রাজস জ্ঞান। আসলে একত্বের চিন্তা থাকলেও, সাধন প্রভাবে, যতদিন না আমাদের দেহাভিমান ঝড়ে পড়ছে, ততদিন আমাদের শুদ্ধ জ্ঞান হবার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। শুদ্ধ জ্ঞানে পৃথকত্বের আভাস একদমই থাকে না। কিন্তু আমরা যখন ভাবি, সবার মধ্যে সেই একই ব্রহ্ম আছেন, অর্থাৎ ব্রহ্ম এক কিন্তু এখানে সবার মধ্যে পৃথক পৃথক ভাবে একই ব্রহ্ম অবস্থান করছেন। এই যে জ্ঞান একেই রাজসিক জ্ঞান বলে।

আমরা জানি রজোগুণের ধর্ম্মই হচ্ছে কর্ম্ম চঞ্চলতা। বিচারের সাহায্যে হয়তো আমি ধরতে পারছি, যে একভিন্ন দুই নেই, কিন্তু আমাদের মধ্যে দ্বৈতভাবের অবলুপ্তি ঘটে নি। পৃথক পৃথক দেহবোধ রয়ে গেছে। এই যে একব্রহ্মকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে দর্শন জ্ঞান একেই রাজস-জ্ঞান বলে।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
তারিখ : ২২.০২.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/২২-২৩

যৎতু কৃৎস্নবৎ-একষ্মিন কার্য্যে সক্তম-অহৈতুকম
অতত্ত্বার্থবৎ-অল্পং-চ তৎ তামসম-উদাহৃতম। (১৮/২২)

কোনো একটি বিষয়ে সম্পূর্ণ বলে আসক্ত হয়, যুক্তিবিরুদ্ধ যা তত্ত্বগত অর্থকে প্রকাশ করে না, তুচ্ছ সেই জ্ঞান তামস বলে কথিত হয়।

এই গ্রামে আমরা আর মামারা, এছাড়া ভালো মানুষ কোই ? মানুষ যখন কেবলমাত্র দেহসর্বস্য বিবেক বর্জ্জিত নিজের অন্ধ ধারণাকেই আগলে রাখে, তখন বুঝতে হবে, তিনি তমসাচ্ছন্ন অজ্ঞান অন্ধকারের মধ্যে বাস করছেন। তামসিক জ্ঞানের মানুষ আসলে কুয়োর ব্যাঙের মতো পাতকুয়োকেই সমুদ্র ভেবে তৃপ্তি পায়। এরা নিজের বলতে বোঝে, নিজের শরীর , নিজের স্ত্রী-পুত্র-পরিবার-গৃহাদি-ধনরত্ন। অর্থাৎ পার্থিব বস্তুই এদের আরাধ্য। আর এতেই মোহাসক্ত হয়ে জীবন অতিবাহিত করে। আজকাল বিভিন্ন ধর্ম্ম-প্রতিষ্ঠানেও এই ধরনের বহু তামসিক জ্ঞানের প্রভুদের দর্শন পাওয়া যায়। এরা নিজেরাই এক-একজন ধর্ম্ম প্রবর্তক। ধর্ম্ম জগতে এই তামস জ্ঞানের মানুষের প্রভাবেই দ্বন্দ্ব-বিরোধ-হানাহানি হয়ে থাকে। এরা যে যার মতাদর্শকে, বা গুরুদেবকে অধিক মান্যতা দিতে গিয়ে অন্যের অপমান করে বসে। এদের পার্থিব ধনসম্পদের বৃদ্ধি চোখে পড়বার মতো। এরা এই ধনসম্পদের মোহে আসক্ত হয়ে জন্ম-জন্মান্তরের দুঃখ-দুর্দশার কারন সৃষ্টি করে থাকে। ভগবান এদের শুভবুদ্ধি দিন।

নিয়তং সঙ্গরহিতম -রাগ-দ্বেষতঃ কৃতম
অফলপ্রেপ্সুনা কর্ম্ম যৎ তৎ সাত্ত্বিকম-উচ্চতে। (১৮/২৩)

ফালাকাঙ্খ্যারহিত ব্যক্তি সঙ্গ রহিত অর্থাৎ অনাসক্তভাবে অনুরাগ বা দ্বেষ দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে, যে নিত্যকর্ম্মের অনুষ্ঠান করেন, তাকে সাত্ত্বিক কর্ম্ম বলে।

যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবার ত্রিবিধ কর্ম্মের কর্ম্মের কথা বলছেন। আমরা এর আগে শুনেছি, প্রাণের বিক্ষুব্ধতার কারনে, আমাদের চঞ্চল মনে সঙ্কল্পদির উদয় হয়। আর মনের সংকল্পের কারনে ইন্দ্রিয়াদি কর্ম্মে নিযুক্ত হয়। যোগেশ্বর বলছেন, এই কর্ম্ম ত্রিবিধ। অর্থাৎ আমাদের শ্বাসবায়ু যখন ইড়া পিঙ্গলা প্রবাহমান থাকে। দ্বিতীয়ত শ্বাসবায়ু বেশিরভাগ সময় ইড়া পিঙ্গলা দিয়ে প্রবাহিত হলেও , মাঝেমধ্যে হয়তো কিছুক্ষনের জন্য সুষুম্নায় চলে যায়। আর তৃতীয়ত অবস্থা হচ্ছে, সারাক্ষন প্রাণবায়ু সুষুম্না দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এই তিন অবস্থাতেই আমাদের ক্রিয়াকর্ম্ম চলতে থাকে। প্রথম অবস্থায়, অর্থাৎ শ্বাসবায়ু যখন কেবলমাত্র ইড়া পিঙ্গলা প্রবাহিত হয়, তখন আমাদের সাংসারিক কর্ম্ম সাধিত হয়, যাকে অধ্যাত্ম দৃষ্টিতে তামসিক কর্ম্ম বলা হয়ে থাকে। দ্বিতীয় অবস্থায় অর্থাৎ কিছুক্ষন ইড়া -পিঙ্গলা আবার কিছুক্ষন সুষুম্না নাড়ীতে প্রাণবায়ু প্রবাহিত হলে, কখনও আমাদের ভগবৎ চিন্তায় মন প্রবেশ করে, আবার কিছুক্ষন সংসারের দিকে আকৃষ্ট হই, তখন আমাদের সাংসারিক কর্ম্মের দিকেই ঝোঁক থাকে। এই অবস্থায় যে কর্ম্মসকল সাধিত হয়, তাকে রাজসিক কর্ম্ম বলা হয়ে থাকে।

কিন্তু যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই শ্লোকে বলছেন, প্রানের পূর্ন স্থিরতায় যেসকল কর্ম্ম সাধিত হয়, তাকে বলে সাত্ত্বিক কর্ম্ম। যেসব সাধক শ্বাসের এই ক্রিয়াকে লক্ষ্য করে থাকেন, তাদের পক্ষে এই পার্থক্য ধরা সহজ হবে। আর এই কারণেই আমরা দেখেছি, সাধক তক্কে তক্কে থাকেন, যখনই শ্বাসবায়ু দুই নাসিকা দিয়ে সমান ভাবে বায়ু প্রবাহিত হতে শুরু করে, তখন তিনি সাংসারিক সমস্ত কর্ম্ম থেকে অব্যাহতি নিয়ে ধ্যানাদিতে লিপ্ত হয়ে যান। আবার একটু অগ্রসর সাধক প্রাণের গতি সুষুম্নাতে প্রবাহিত করবার কৌশল রপ্ত করে, সমস্ত কর্ম্মের মধ্যে আধ্যাত্মিক ভাবের সম্প্রসারন করে থাকেন। তখন তাঁর সমস্ত কর্ম্মই শ্রীভগবানে অর্পিত হয়।

দেখুন এই পৃথিবী একটা কর্ম্মক্ষেত্ৰ। এখানে কর্ম্ম না করে কেউ থাকতে পারে না। আবার এই যে শরীর এটিও কর্ম্মের ফলে অর্জ্জিত হয়েছে, কর্ম্মের কারণেই উপযুক্ত দেহের প্রাপ্তি ঘটে থাকে। আবার দেহাভিমান ত্যাগ করবার জন্য যে সাধনক্রিয়া, তা এই দেহে স্থিত অবস্থাতেই করতে হয়। আর এই সাধনাই প্রাণের সাধনা, এই ক্রিয়াই প্রাণক্রিয়া। প্রাণ যখন কণ্ঠদেশ বা তার উর্দ্ধে ঘোরাফেরা করে, তখন সাধকের ইন্দ্রিয়সকলের মধ্যে (জ্ঞানেন্দ্রিয়-৫, কর্ম্মেন্দ্রিয়-৫, মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহঙ্কার) অর্থাৎ বহিরেন্দ্রিয় ও অন্তর ইন্দ্রিয়ের মধ্যে একটা সাত্ত্বিক ভাবের উদয় হয়। এই সাত্ত্বিক ভাবের অর্থ হচ্ছে, মনের মধ্যে কোনো কাম-সংকল্পের উদয় হয় না। ফলত এইসময় যেসকল কর্ম্মের উদয় হয় তা ফালাকাঙ্খ্যা রহিত হয়। এইসময় সাধক যা কিছু করুন না কেন, তা ধ্যানে রূপান্তরিত হয়। ধীরে ধীরে তিনি সমাধির অবস্থা প্রাপ্ত হন। আর সমাধির অবস্থায় তিনি সঙ্গরহিত হন। আর সঙ্গ রহিত অবস্থায় সাধকের দ্বারা যাকিছু কৃত হয়, তা রাগ-দ্বেষ বর্জ্জিত হয়ে থাকে।

যারা ফলের আশায়, যোগ-ঐশ্বর্যের আশায় যোগকর্ম্মে আকৃষ্ট হন, তারা মূঢ়। কেননা এরা ভগবানকে নয়, ভগবানের ঐশ্বর্যের জন্য যোগক্রিয়া করছেন । এরা আখেরে ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়তো হন, কিন্তু ভগবান থেকে দূরেই থেকে যান। আর জন্ম থেকে জন্মান্তরে এই ঐশ্বর্য্য ভোগের জন্য ঘুরপাক খেতে থাকেন।

একটা জিনিস জানবেন, সাধন ক্রিয়া নিজের ইচ্ছেতে নয়, সাধন ক্রিয়া করতে হয়, শ্রীগুরুর ইচ্ছেয়, ভগবানের ইচ্ছেয় । অর্থাৎ আমার কর্ম্ম আমি করছি, এই ভাব থেকে নিজেকে সরিয়ে আত্মসমর্পনে ভাব নিয়ে শ্রীগুরুর নির্দ্দেশে, শ্রীভগবানের ইচ্ছেয় আমার দ্বারা এই সাধনকর্ম্ম সাধিত হচ্ছে। আমি নিমিত্ত মাত্র। এই ভাব নিয়ে সাধনক্রিয়ায় নিবিষ্ট চিত্ত হলে, দেখবেন, সাধনক্রিয়া আমরা করি না, সাধনক্রিয়া হয়, এমনি এমনি হয়। তখন কোনো প্রয়াস ছাড়াই, কেউ যেন আমাকে দিয়ে করিয়ে নিচ্ছেন, এই অনুভূব স্পষ্ট হয়। আর এর ফলে সাধকের সাধনক্রিয়া আপনাআপনি নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে, বিরতিহীন ভাবে, চলতে থাকে। তখন শ্বাসবায়ু আপনা থেকেই সুষুম্নাবাহিত হয়ে যায়। আর শ্বাসবায়ু সুষুম্নায় চলাকালীন, যাকিছু কর্ম্ম সাধিত হয়, তা সবই সাত্ত্বিক কর্ম্ম।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ২৩.০২.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/২৪-২৫

যৎ তু কামেপ্সুনা কর্ম্ম সাহঙ্কারেণ বা পুনঃ
ক্ৰিয়তে বহুলায়াসং তদ্রাজসমুদাহৃতম (তৎ-রাজসম-উদাহৃতম) (১৮/২৪)

ফলাকাঙ্খ্যা নিয়ে অহঙ্কার বশে বহু ক্লেশ স্বীকার করে যে কর্ম্ম অনুষ্ঠিত হয়, তাকে বলে রাজস্ কর্ম্ম।

আড়ম্বর করে যে কর্ম্মের অনুষ্ঠান করা হয়, তাকে রাজস্ কর্ম্ম বলা হয়ে থাকে। আসলে এই কর্ম্মে যত-না মূল কর্ম্ম-অধিষ্ঠান, তার চেয়ে আয়োজন অনেক বেশি। অনেক যোগ সাধকের মধ্যেও এই ভাবের প্রকাশ দেখায় যায়। পুজোপাঠ করছেন, না সবাইকে শোনানোর জন্য চিৎকার করছেন, তা বোঝা মুশকিল। সাধন ক্রিয়া শুরু করবার আগে কতো না আয়োজন, যোগের বই কেনা হলো. একটা কম্বলের আসন কেনা হলো, ঘর পরিষ্কার করা হলো। দরজা বন্ধ করা হলো, সবাইকে সতর্ক করা হলো, কেউ যেন ঘরের দরজায় টোকা না দেয় - ইত্যাদি ইত্যাদি কত না আয়োজন, এমনকি আজ নয়, শিবরাত্রি থেকে শুরু হবে বলে পঞ্জিকা দেখা হলো। কিন্তু আসলে আসনে বসে বাহ্য সংসারিক চিন্তা করতে লাগলো, অথবা ঘুমিয়ে পড়লো। লোক দেখানোর জন্য, গলায় তুলসীর মালা, হাতে জপমালা, কপালে চন্দনের ফোটা, ভুলভাবে সিদ্ধাসনে বসে, চোখদুটো উল্টে বসে থাকা। হয়তো পা টনটন করছে, তথাপি লোককে দেখানোর জন্য পদ্মাসনে দীর্ঘক্ষণ বসে, ধ্যানের ভান করছে।

এর মধ্যে আবার কিছু লোক আছেন, যারা স্বর্গলাভের উদ্দেশ্যে, দীর্ঘজীবন লাভের আশায়, স্বজনের শারীরিক অসুখ ভালো করবার আশায়, নিজের ইন্দ্রিয় ভোগক্ষমতা বাড়াবার আশায়, দানধ্যান শুরু করে দিলেন। পুরোহিত ডেকে যজ্ঞের নির্দেশ দিলেন। এইসব বিকৃত মনের ভেক সাধক, অথবা আড়ম্বরে বিশ্বাসী লোক দেখানো পূজাপাঠ-এর যে প্রয়াস একেই বলে রাজস্ কর্ম্ম।

তবে একটা কথা বলি, এই রাজস কর্ম্ম অবশ্য়ই মানুষের মধ্যে একটা ভালো কর্ম্মের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে। এমনকি কিছু একটা করেছি, এই ভাব থেকে মনের মধ্যে একটা শান্তির বাতাবরণ তৈরী হতে পারে। তো ভান করতে করতে ধীরে ধীরে একসময় সাধন-ভজনের অভ্যাস হয়তো গড়ে উঠতে পারে।

অনুবন্ধং ক্ষয়ং হিংসাম-অনপেক্ষ্য চ পৌরুষম
মোহদারভ্যতে কর্ম্ম যৎ তৎ তামসম-উচ্চতে। (১৮/২৫)

ভাবি ফলাফল, নিজ সামর্থ্য, অর্থনাশ, অপরের ক্ষতি প্রভৃতি বিষয়গুলো বিচার-বিবেচনা না করে, মোহবশতঃ যে কর্ম্ম করা হয় তা তামস কর্ম্ম বলে কথিত হয়।

পশু ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, পশু ভালো মন্দ বিচার করতে পারে না, মানুষ পারে। তো বিচার রহিত হয়ে যে কর্ম্ম করা হয়, তাকে বলে পাশবিক কর্ম্ম, ভাষান্তরে তামস কর্ম্ম । পশু আশু ফলের আশায় কর্ম্ম করে, মানুষ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কর্ম্ম করে। পশু কেবল নিজের জন্য কর্ম্ম করে, মানুষ নিজের সঙ্গে সঙ্গে অন্যের জন্যও কর্ম্ম করে। পশু নিজকর্ম্মে কোনো দোষ দেখতে পায় না। মানুষ নিজ কর্ম্মের জন্য অনুশোচনা করে। পশু অন্যের কর্ম্মে দোষ দেখে, মানুষ নিজকৃত কর্ম্মের মধ্যে দোষ খুঁজবার প্রয়াস পায়। পশু জেদের বশে এমন কর্ম্মে উদ্দীপ্ত হয়, যা তার নিজের বিপদ ডেকে আনে, হিংস্র প্রবৃত্তির বশে কর্ম্ম করতে গিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করে তোলে। বিচারহীন সর্ব্বশক্তি নিয়োগ করে পশু কর্ম্মে প্রবৃত্ত হয় । মানুষ সামর্থ বুঝে কর্ম্ম করে।

আসলে, মানুষ ত্রিগুণের দ্বারা সাধিত হয়ে কর্ম্ম করে থাকে। যখন যার মধ্যে যে গুনের প্রাবল্য থাকে তখন সে সেই ধরনের কার্য্য করে থাকে। যোগীপুরুষগন বলছেন, তামসিক কর্ম্ম মানুষ তখনই করে, যখন মানুষের মন থাকে নাভির নিচে । এইসময় মানুষ কাম-উন্মত্ত হয়ে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে কর্ম্ম করে থাকে। আর এতে করে তার শরীর -মন দূষিত হয়। এমনকি এই উগ্র কর্ম্মে তার শারীরিক মানসিক শক্তির এমনকি বিত্তের অপচয় হয়। তথাপি কর্ম্মের জেদ সে ছাড়তে পারে না। লোভ, দ্বেষ, হিংসা তাকে এমন ভাবে উন্মত্ত করে যে তখন সে তার কর্ম্মের ভাবি ফলের কথা চিন্তা করতে অক্ষম হয়। একেই তামসিক কর্ম্ম বলা হয়ে থাকে।

আসলে কর্ম্মের ফল সম্পর্কে বিচার করতে গিয়ে আমাদের প্রাধান্য দেওয়া উচিত কর্ম্মের উদ্দেশ্যের দিকে। আপাত দৃষ্টিতে কর্ম্ম একই প্রকার হলেও , উদ্দেশ্যের ভিন্নতায় কর্ম্ম শুদ্ধ বা অশুদ্ধ হয়ে থাকে। আবার শুদ্ধ অন্তঃকরণে কর্ম্ম বাহ্যিক দিক থেকে বা ব্যবহারিক দিক থেকে আলাদা হলেও, শুভ ফল প্রদান করে থাকে। তাই শুদ্ধ অন্তঃকরণের কর্ম্ম বাহ্যিক দিক থেকে তামসিক বা রাজসিক হলেও তা সাত্ত্বিক কর্ম্ম বলে কথিত হয়। যুদ্ধ বাহ্যিক দিক থেকে ভয়াবহ হলেও, রাজসিক হলেও, শুদ্ধ অন্তঃকরণে লোক হিতার্থে যুদ্ধ হিতকর হতে পারে।

প্রাসাঙ্গিকক্রমে, একটা কথা না বললেই নয়, তা হচ্ছে, আমরা যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে কর্ম্মের বিভাগের কথা শুনছি, কৰ্ম্মীর বিভাগের কথা নয়। যেকোনো কৰ্ম্মীর মধ্যেই যাবতীয় গুনের সমাহার। কিন্তু যে গুন্ বা শক্তি যখন প্রভাবশালী হয়, তখন তিনি সেই গুন্ অনুসারে কর্ম্মের প্রবর্তক হন। আসলে গুনের প্রভাবে কৰ্ম্মী অবশ হয়ে গুন্ অনুসারে কর্ম্মে প্রবৃত্ত হয়। এইজন্য যিনি যথার্থ কর্ম্মযোগে লিপ্ত হতে চান, তাকে সাধনক্রিয়ার সঙ্গে লিপ্ত থেকে গুনত্রয়ের প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। আর সেই সাধন-কর্ম্মের মধ্যে তাঁর নিজস্ব অহং বা মমত্ববুদ্ধি বলে কিছুই রাখতে নেই।


ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ২৪.০২.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/২৬-২৮

কিছু কথা :

শ্রীমদ্ভগবৎ গীতা আমাদেরকে কোনো জীবিকার সন্ধানের কথা বলেনি। গীতায় জীবন-সংগ্রামে বিজয়ের সূক্ষ্ম ক্রিয়াপদ্ধতিগুলোকে, স্থুলরূপে বর্ণিত হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন, সূক্ষ্ম জগতের কথা স্থুলরূপে বর্ননা করেছেন। ধ্যান হয় স্বরূপের - সারথী হয় বিবেকরূপী শ্রীকৃষ্ণ। যজ্ঞ সম্পাদিত হয় শ্বাসপ্রশ্বাসের দ্বারা। প্রাণকে অপানে, অথবা অপানকে প্রাণে আহুতি দিয়ে বৈশ্বানর অগ্নি প্রজ্বলিত করে, প্রাণকে উর্দ্ধগামী করে সহস্রারে নিরুদ্ধ করতে হয়।
আমাদের মন হাজার বছরের সংস্কার নিয়ে বদ্ধ হয়ে আছে। মস্তিষ্কের মধ্যে কিছু গোড়া বিচারধারা প্রবাহিত হচ্ছে। এই সংস্কারবদ্ধ মন ও মস্কিষ্কের মধ্যে গোড়াবুদ্ধি, এই দুটোকে আমরা আলাদা করতে পারি না। আসলে যাকিছু আমরা শুনি, দেখি, বা পড়ি, তা আমাদের বিচারবুদ্ধিতে যদি স্বীকৃত হয়, তবে তা আমরা গ্রহণযোগ্য বলে মনে করি, নতুবা, প্রত্যাখ্যান করি। সত্য সত্যই থেকে যায়। আমরা চোখে রঙ্গিন চশমা দিয়ে দেখতে গিয়ে সত্যকে হারিয়ে অসত্যের ধান্ধায় পড়ে বিমূঢ় অবস্থায় জীবনকে জটিল করে তুলি। শ্রীমদ্ভগবৎ গীতা বিষয়বুদ্ধির অতীত শুদ্ধ জ্ঞানের নিগুড় শাস্ত্র। এই শাস্ত্র দেশ-কাল-জাতি-ধর্ম্ম-মত-পথের উর্দ্ধে শ্বাশ্বত জ্ঞানের ভান্ডার। কারুর মুখে শ্রীগীতার ব্যাখ্যা শুনে, বা কারুর কথায় মুগ্ধ হয়ে গীতার মূল সুরকে অনুভবে আনা যায় না। গুরুদেব সঙ্কেত দেন, শাস্ত্রগ্রন্থ সঙ্কেতের লিপিবদ্ধ রূপ মাত্র। সত্য-অন্বেষণকারীর উচিত, এই সঙ্কেতের উৎসে এগিয়ে যাওয়া। আর এই এগিয়ে যাওয়ার জন্য যেমন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে হয়, তেমনি সমস্ত পার্থিব অপার্থিব বস্তু ছেড়ে আত্মসংযমী হয়ে, দেহাভিমান ত্যাগ করে, ঈশ্বরে আত্মসমর্পন করতে হয়। আর যখন আপনি ঈশ্বরে আত্মসমর্পন করতে পারবেন, তখন স্বয়ং ঈশ্বর আপনাকে হাত ধরে গীতার পথে নিয়ে যাবেন।
যা গীত হয়েছে তাই গীতা। তো যা গীত হচ্ছে, তার মধ্যে একটা মধুর সুরের ঝর্ণা প্রবাহিত হচ্ছে- এই সুরকে যিনি ধরতে পেরেছেন, সুরঝর্ণায় যিনি স্নাত হতে পেরেছেন, তিনিই গীতাকে বুঝতে পেরেছেন। তিনিই শান্ত হতে পেরেছেন। এবার এই সুরকে অনুসরণ করে, এগিয়ে গেলে, বংশীবাদকের সন্ধান পাবেন। এই বংশীবাদক স্বয়ং ঈশ্বর - শ্রীকৃষ্ণ। যাই হোক, আমরা আবার শ্রীমদ্ভগবৎ গীতায় প্রবেশ করবো। কিন্তু বারবার মনে হচ্ছে, গীতার কথা বলতে গিয়ে কি গীতাকে কালিমা লিপ্ত করছি ? শ্রীগীতার ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে কি গীতার শ্রী নষ্ট করছি ? অন্তরের কথা উন্মুক্ত করতে গিয়ে গীতামাকে বসন- বিহীন করছি না-তো ? যাঁর কাজ তিনিই করেন - আমি কে ?


মুক্তসঙ্গঃ-অনহংবাদী ধৃত্যুৎসাহ-সমম্বিতঃ
সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোঃ-নির্বিকারঃ কর্ত্তা সাত্ত্বিক উচ্যতে। (১৮/২৬)

যিনি আসক্তিশূন্য, অহংবাদী নন, ধৈর্য্যশীল,উদ্যমী, যিনি কৃত কর্ম্মের সিদ্ধি বা অসিদ্ধিতে নির্বিকার - তিনি সাত্ত্বিক কর্ত্তা বলে কথিত হন।

বিকাররহিত মনের যিনি কর্ত্তা, তিনিই সাত্ত্বিক কর্ত্তা। যিনি ইচ্ছারহিত, মন যাঁর অচঞ্চল, মন যাঁর সঙ্কল্পরহিত, তিনিই সাত্ত্বিক কর্ত্তা। যার কর্ম্ম শুধু গুরুআজ্ঞা পালন মাত্র, যিনি ক্রিয়ার ফল নিয়ে উদ্বিগ্ন নন, আবার কর্ম্মে উৎসাহী, উদ্দমী এমন কৰ্ত্তাই সাত্ত্বিক কর্ত্তা। সাধনক্রিয়ার পরিণতি হিসেবে, সমাধির অবস্থা প্রাপ্ত হলো কি না, সেখানে স্থিতি হলো কি না, সমাধির স্থিতিকাল বাড়লো কি না, এই নিয়ে যাঁর মধ্যে বিন্দুমাত্র চিন্তার উদয় না হয়, তিনিই সাত্ত্বিক কর্ত্তা। এই অবস্থায় মন দীর্ঘসময় বৃত্তিরহিত হয়ে আত্মাতে স্থির হয়ে থাকে। এইসময় কামনাশূন্য হলেও, কূটস্থে তার কত কি যে দর্শন হয়, কত যে আনন্দের অনুভব হয়, তা প্রকাশযোগ্য নয়। এসব দর্শন না হলেও, কোনো আনন্দের অনুভূতি হলে বা না হলেও, যথার্থ সাত্ত্বিক কর্ত্তার মনে না থাকে কোনো প্রফুল্লতা না থাকে কোনো বিষন্নতা। শুধু একটা অস্ফুট হাসি যেন তার মুখে লেগে থাকে। না থাকে অহংভাব না থাকে বিষাদের ছায়া। কেবল গুরু আদিষ্ট সাধনক্রিয়ার মধ্যে ডুবে থাকেন। কূটস্থে নিজেকে স্থির করে, অবস্থান করেন। অর্থাৎ তাঁর সাধনক্রিয়া নিরন্তর চলতেই থাকে। এঁকেই সাত্ত্বিক প্রকৃতির ক্রিয়া-কর্ত্তা বলে।

রাগী কর্ম্মফলপ্রেপ্সুঃ-লুব্ধো হিংসাত্মকঃ-অশুচিঃ
হর্ষশোকাম্বিতঃ কর্ত্তা রাজসঃ পরিকীর্ত্তিতঃ। (১৮/২৭)

রাগী অর্থাৎ যার মধ্যে রাগ বা আসক্তি আছে, যার মধ্যে কর্ম্মফলের প্রার্থনা আছে, পরের দ্রব্যে যার লোলুপ দৃষ্টি আছে, পরকে পীড়ন করা যার স্বভাব, বাহ্য ও অন্তরে যার অশুচি ভাব, সুখে দুঃখে যার চিত্ত চঞ্চল, তিনি রাজস্ কর্ত্তারূপে কথিত হন।

এইসব কথা আসলে যোগীকে সতর্কীকরণ বার্তা মাত্র। এসবের মধ্যে যৌগিক প্রক্রিয়ার কথা নেই। আছে কিছু সাবধানবাণী - যা যোগের বাধাকে দূর করতে সাহায্য করতে পারে। যাঁরা সংসারিক কর্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত, জাগতিক বিষয়াদিতে আসক্ত, তাদের পক্ষে নিয়ম করে সাধনক্রিয়া করা সম্ভব নয়। এর মধ্যেও যদি কাউকে দেখা যায়, যে তিনি নিয়ম করে সাধনক্রিয়ার মধ্যে আছেন, তবে জানবেন, তার মধ্যে ক্রিয়ার দ্বারাঐশ্বর্য্য লাভ বা নিজের শারীরিক শক্তিকে ভোগসাধনের উপযুক্ত করে রাখাই উদ্দেশ্য। গুরু সান্নিধ্যে সাংসারিক বিপত্তি কেটে যাবে, লক্ষী ঘরে আসবে, এই হচ্ছে তার উদ্দেশ্য। এরাই রাজস্ কর্ত্তা। এদের পরের ধনে লোভ, পরের ধন হরণে পিছপা নয়, পরের অনিষ্ট করতেও এরা নানান প্রকার তান্ত্রিক উপায়ের অবলম্বন করে থাকেন। এদের কাছে পর্যাপ্ত ধন থাকলেও, এদের তৃপ্তি নেই। এরা সাত্ত্বিক- কর্তব্য পালনে অপারগ। এদের মন স্থির নয়, এরা অন্তরে অশুচি, এমনকি দেহাদিতেও অশুচি। এদের ভোজনে বাহুল্য, অনাচারী, অত্যাচারী, এমনকি ব্যভিচারী । নিজ কার্যসিদ্ধি হলে এরা উৎফুল্ল হয়ে ওঠে, আবার কর্যসিদ্ধি না হলে, কোলাহল শুরু করে। সাধক এসব থেকে নিজেকে দূরে রাখবেন।
অযুক্তঃ প্রাকৃতঃ স্তব্ধঃ শঠো নৈস্কৃতিকঃ-অলসঃ
বিষাদি দীর্ঘসূত্রী চ কর্ত্তা তামস উচ্যতে। (১৮/২৮)

মনোযোগশূন্য, যখন যা মনে আসে তাই করে, কাউকেই নিজ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলে মনে করে না, প্রবঞ্চক, পরকে অপমানকারী, অলস, বিষাদগ্রস্থ, দীর্ঘসূত্রী, এইরূপ কর্ত্তাকে তামস বলে।

তামসিক প্রকৃতির মানুষের মন বিষয়ের সঙ্গে এমনভাবে আটকে থাকে, যে সেখান থেকে মন কিছুতেই সাধনকর্ম্মে লিপ্ত হতে চায় না। সাধন ক্রিয়াতে এদের একেবারেই মন বসে না। এদের মধ্যে কেউই সাধনক্রিয়ার সাফল্য দেখতে পায় না। এরা নিজে যা বোঝে, অর্থাৎ এদের বোধবুদ্ধিতে কেবল অগ্রায্যের প্রবৃত্তি। এদের কাছে কেউ সাধনক্রিয়ার কথা বললেই বলবে, সংসারের কাজের মধ্যে সময় কোথায় ? অথচ এরা এমনসব কাজ করে থাকে, যার পরিণতি সম্পর্কে তার নিজেই কোনো স্বচ্ছ ধারণা নেই। এদের মধ্যে কাজে ফাঁকি দেওয়ার প্রবৃত্তি প্রবল। এদের মধ্যে কেউ যদি কখনো সঙ্গগুণে সাধন সমাজে এসে পরে, তবে এরা ধ্যানের নাম করে ঘুমিয়ে পড়ে। ধ্যানে বসে নাক ডাকতে শুরু করে, ডাকলেও সারা দিতে পারে না। আবার খারাপ কথার দিকে, দৃশ্যের দিকে এদের খুব ঝোঁক। এরা গুরুর দোষ খুঁজে বেড়ায়। রাজস্ ব্যক্তি তবুই কিছু পয়সা খরচ করে, আড়ম্বর করে পূজা পার্ব্বণ করে থাকে, কিন্তু তামসব্যাক্তি এইসব অহেতুক বাজে-কাজে পয়সা খরচ করতে চায় না। আবার এদের মন কখনোই সন্তুষ্ট হতে পারে না। এদের মধ্যে সারাক্ষন একটা বিরক্তির ভাব। এরা লোক দেখলেই নানান দুঃখের কথা শোনায়। কিন্তু দুঃখ নিবৃত্তির উপদেশে কান দেয় না। এরা ছিঁচকাঁদুনে - এরা মনে করে, পৃথিবীর সবাই, এমনকি ভগবান এদের কাজের দাম দেয় না। এরাই ভগবানকে গাল পাড়ে। ভগবানের বিচারকে এরা প্রভাবিত করতে না পেরে, একসময় নিজের দুর্দশার জন্য ভগবানকে দায়ী করে। এরা হাজার এক লোকের পরামর্শ শুনবে, আর কাজ করবে নিজের ইচ্ছেয়। যা করা উচিত তা না করে, উল্টোটা করে বসবে। আর হা-হুতাশ করবে। এদের মন থেকে কখনো সংশয়ের নিরসন হয় না। এরা সন্দেহ-বাতিকগ্রস্ত। এরা কখনো সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারে না। এদের যখন মৃত্যু আসন্ন হয় তখনও এদের বোধদয় হয় না, বরং হা-হুতাশ করতে করতে দেহত্যাগ করে। আর জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ঘুরপাক খেতে থাকে। এইসব কর্ম্মকর্ত্তারাই তামস কর্ত্তা বলে কথিত হয়।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ২৫.০২.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/২৯-৩০

বুদ্ধের্ভেদং ধৃতেশ্চৈব গুনতস্ত্রিবিধং শৃণু
প্রচ্যোমানমশেষেণ পৃথকত্বেন ধনঞ্জয়। (১৮/২৯)

হে ধনঞ্জয়, বুদ্ধি ও ধৃতির গুন্ অনুসারেই তিন প্রকার ভেদ হয়ে থাকে, তা তোমাকে পৃথক পৃথক ভাবে ও ভালোভাবে বোঝাচ্ছি, শোনো।

গুনের যেমন তিন প্রকার ভেদ, অর্থাৎ গুন্ যেমন তিন প্রকার সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ, তেমনি বুদ্ধিও তিন প্রকারের হয়ে থাকে। এই বিষয়টিকে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পৃথকভাবে বলবেন বলে আশ্বাস দিচ্ছেন। বুদ্ধি হচ্ছে একটা শক্তি যা আমাদের বোধের জন্ম দেয়। বুদ্ধি আমাদের নিশ্চয়াত্মিকা মনোবৃত্তি বিশেষ। আর ধৃতি হচ্ছে ধারণা। এই ধৃতিতেই সমস্ত বিষয় অধিগত হয়। ধৃতি কথাটির আরো একটা অর্থ হচ্ছে ধৈর্য্য-স্থৈর্য্য। সাধারণভাবে আমরা বুদ্ধি ও ধৃতি শব্দের মধ্যে পার্থক্য ধরতে পারি না। ধৃতি আছে স্বয়ং-এর মধ্যে। আর এই ধৃতির কারনেই মানুষ তার বুদ্ধিকে ব্যবহার করতে বা প্রয়োগ করতে পারে। ধৃতি যত শুদ্ধ হয়, সাত্ত্বিক হয়, সাধকের সাধনবুদ্ধিও তত স্থির হয়। সাধনার ফলে বুদ্ধির স্থিরতা আসে তা এই ধৃতি থেকে এসে থাকে । দেখুন সাধনার প্রথম দিকে আমাদের মনের স্থিরতা প্রয়োজন। তার পরে বুদ্ধির স্থিরতা প্রয়োজন। মনের স্থিরতার যোগান দেয় আমাদের স্থির প্রাণ।আর এই বুদ্ধির স্থিরতার যোগান দেয় আমাদের ধৃতি। যোগীপুরুষগন বলে থাকেন, প্রাণ-মনের স্থিরতা দ্বারা আমরা যোগমার্গে ঐশ্বর্য্য লাভের অধিকারী হতে পারি। কিন্তু পারমার্থিক উন্নতিতে সাহায্য করে স্থির বুদ্ধি - যা আসলে ধৃতির দ্বারা প্রেরিত। বুদ্ধির দ্বারা আমরা লক্ষ্যে পৌঁছতে পারি, আর ধৃতির দ্বারা আমরা সেই লক্ষ্যে স্থির হয়ে অবস্থান করতে পারি। তাই এই দুটির (ধৃতি ও বুদ্ধি) সম্পর্কে বিশেষভাবে জানা প্রয়োজন।

প্রবৃত্তিঞ্চ নিবৃত্তিঞ্চ কর্য্যাকার্য্যে ভয়াভয়ে
বন্ধং মোক্ষঞ্চ যা বেত্তি বুদ্ধিঃ সা পার্থ সাত্ত্বিকী। (১৮/৩০)

হে পার্থ, যে বুদ্ধি কর্ম্মে প্রবৃত্তি বা নিবৃত্তি, কার্য্য-অকার্য্য (কর্তব্য ও অকর্তব্য), ভয় বা অভয়, বন্ধ ও মোক্ষকে জানতে পারে, সেই বুদ্ধি সাত্ত্বিকী বুদ্ধি।

বুদ্ধি গুনভেদে তিন প্রকার। প্রথম হচ্ছে সাত্ত্বিকী বুদ্ধি। প্রত্যেকের মধ্যেই দুটো বৃত্তি কাজ করে থাকে। একটা সু-প্রবৃত্তি আর একটা কু-প্রবৃত্তি। সাধারণ জীব আহার-নিদ্রা-মৈথুন-ভয় প্রবৃত্তিকে গুরুত্ত্ব দিয়ে থাকে। একেই বলে জীবের প্রবৃত্তি। এই জৈবিক প্রবৃত্তি থেকে মানুষ যখন সাধনক্রিয়ার দিকে আকৃষ্ট হন, তখন তার মধ্যে নিবৃত্তির প্রভাব দেখা যায়। অর্থাৎ বিষয়সুখ, ইন্দ্রিয়সুখ তাকে তৃপ্ত করতে পরে না। এবার বিষয় ত্যাগ করে, কেউ পাহাড়ের গুহায় বসবাস করতে শুরু করলেন। এখন তার বিষয়সুখ বলে কিছু নাও থাকতে পারে। কিন্তু মনের মধ্যে সূক্ষ্ম আকাঙ্খ্যা সহজে যায় না। এখানে এসে তার সাধু হবার ইচ্ছে হলো, ধ্যানী হবার ইচ্ছে হলো, জ্ঞানী হবার ইচ্ছে হলো, এমনকি ভিতরে ভিতরে মান্যগণ্য যোগীপুরুষ বা সাধক হবার ইচ্ছে হলো, এই যে মনের মধ্যে আকাঙ্খ্যা একে সহজে ত্যাগ করা সম্ভব নয়। এখন কেউ যদি বাহ্যিক বস্তুর কামনা রহিত হতে পারেন, এবং অন্তরের কামনাকেও নিঃশেষ করতে পারেন, তবেই তাকে বলা হয় নিবৃত্তি। আপনি যাকিছু গ্রহন করছেন, বা যাকিছু ত্যাগ করছেন এই দুটোকেই প্রবৃত্তি বলে জানবেন। একটা ত্যাগের প্রবৃত্তি, আর একটা ভোগের প্রবৃত্তি। এই প্রবৃত্তির উর্দ্ধে উঠতে পারলে হবে নিবৃত্তি। অর্থাৎ আপনার ভোগেও ইচ্ছে-অনিচ্ছা বলে কিছু নেই, আবার ত্যাগেও ইচ্ছে বা অনিচ্ছা বলে কিছু নেই। এই যে নেই অবস্থা একেই বলে যথার্থ নিবৃত্তি মার্গ। অর্থাৎ বিশ্রামের অবস্থা।

এখন কথা হচ্ছে, কর্ম্ম না করে থাকার উপায় নেই। আবার বলা হয়ে থাকে কর্ম্মই বন্ধনের কারন। তো আমাদের বুঝতে হবে কোনটা কার্য্য আর কোনটা অকার্য্য। অর্থাৎ কোনটা আমাদের কর্তব্য আর কোনটা অকর্তব্য। কোনটা করা উচিত, আর কোনটা করা উচিত নয়। এই যে কর্তব্য আর অকর্তব্য এটি বিচার করে থাকে আমাদের বুদ্ধি। কেউ কেউ বলে থাকেন, শাস্ত্রবিহিত কর্ম্ম আমাদের কর্তব্য আর যা শাস্ত্রবিহিত নয় তা আমাদের করা উচিত নয়। এখন কথা হচ্ছে শাস্ত্র সম্পর্কে আমদের কজনের জ্ঞান আছে ? যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই, যে আমরা সবাই শাস্ত্রজ্ঞ, তাহলেও, আমাদের কার্য্য করবার ক্ষমতা সবার সমান নয়। তাই শাস্ত্রবিহিত সমস্ত কর্ম্ম আমাদের সবার পক্ষে করা সম্ভব নাও হতে পারে। তো সেক্ষেত্রে আমাদের কি কর্তব্য ? আমাদের কর্তব্য আমাদের কর্ম্মের উদ্দেশ্যের দিকে দৃষ্টি ফেরানো। এই উদ্দেশ্য অর্থাৎ আপনি যাকিছু করছেন, তা শ্রী ভগবানের উদ্দেশ্যে করুন। ভগবানের অর্থাৎ বিবেকের নির্দেশে করুন। আপনার মধ্যে যতটুকু বুদ্ধি ভগবান দিয়েছেন, সেই বুদ্ধির দ্বারা বিচার করে, কর্ম্মে লিপ্ত হন। দেখুন পশু হত্যা অপরাধ, আবার এই পশুহত্যা যদি জীবিকার প্রয়োজনে হয়, তবে তা অপরাধ নয়। মিথ্যে বলা অপরাধ, কিছু মিথ্যে যদি কাউকে প্রাণে বাঁচানোর জন্য হয়, তবে তা অপরাধ নয়। তো ঈশ্বরকে স্মরণ করে, আপনি যাকিছু করবেন, তা আখেরে ঈশ্বরের কর্ম্ম হয়ে যাবে। যা আপনাকে কর্ম্মবন্ধন থেকে মুক্তি দেবে।

আবার যে কাজের পরিনাম দ্বারা আপনার বা অন্যের অনিষ্ট হতে পারে, তাকে ভয়দায়ক কর্ম্ম বলা হয়। আর উল্টোটা অর্থাৎ যে কর্ম্মের পরিণামে আপনার বা জগতের মঙ্গল সাধিত হতে পারে, তাকে অভয়দানকারী কার্য্য বলা হয়ে থাকে।

তো জীব প্রবৃত্তির দাস। আর এই প্রবৃত্তি যখন বিষয়মুখী হয়, তখন তা আমাদের ক্লেশের কারন হয়ে থাকে। আর কর্ম্মশায় যতদিন আমাদের থাকবে, ততদিন, জন্ম-মৃত্যুরূপ ভোগাদি থাকবে। এই ক্লেশ থেকে মুক্তি পেতে গেলে, সাধনক্রিয়া করতে হবে। তপস্যা, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বর প্রণিধান - এই তিন হচ্ছে মুক্তির পথ। যতদিন আরব্ধ কর্ম্ম থাকবে, ততদিন তো ভোগ করতে হবে, তবে নতুন কর্ম্মফল যাতে সঞ্চিত না হয়, তার জন্য আমাদের শ্রদ্ধা ও মনোযোগ সহকারে সাধনক্রিয়া করে যেতে হবে। এমনকি আমাদের যে প্রারব্ধ তা সাধনক্রিয়ার ফলে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে থাকে। তো এই সাধনক্রিয়াই ঔষধ যা আমাদের ভবরোগ থেকে মুক্তি দিতে পারে। আমাদের যে দেহাভিমান, জন্ম-মৃত্যুর যে ক্লেশ, তা দূর করতে সাত্ত্বিক বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে জীবনকে সঠিক পথে চালিত করতে হবে। আবার বলি, তপস্যা, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বর প্রণিধান, এই হচ্ছে উপায়। নান্যপন্থা। বুদ্ধিতে যখন এই বোধ আসবে, তখন জানবেন, আপনার বুদ্ধি সাত্ত্বিক হয়েছে। আর এই সাত্ত্বিক বুদ্ধিই আপনাকে মুক্তির পথে নিয়ে যাবে।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ২৭.০২.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৩১-৩২

যয়া ধর্ম্মম-অধর্ম্মং-চ কার্য্যম-অকার্যম-এব চ
অযথাবৎ প্রজানাতি সা বুদ্ধিঃ পার্থ রাজসী। (১৮/৩১)

হে পার্থ যে বুদ্ধি ধর্ম্ম, অধর্ম্ম, কর্তব্য, অকর্তব্য বিষয়ে মিথ্যা জ্ঞান দান করে, তা রাজসী বুদ্ধি।

অধর্ম্মং ধর্ম্মম-ইতি যা মন্যতে তমসাবৃতা
সর্ব্বার্থান বিপরীতান-চ বুদ্ধিঃ সা পার্থ তামসী। (১৮/৩২)

হে পার্থ যে বুদ্ধিঃ অধর্ম্মকে ধর্ম্ম মনে করে, এবং সকল বিষয়ে বিপরীত জ্ঞান জন্মায়, তাকেই তামসিক বুদ্ধি বলে।
ধর্ম্ম অধর্ম্মের গূঢ় রহস্যঃ বোঝা মুশকিল। বৃহত্তর অর্থে ধর্ম্ম হচ্ছে বস্তু বা বিষয়ের নিজস্ব গুন যার অভাবে সেই বস্তু বা বিষয়ের অস্তিত্ত্ব থাকে না। যেমন জলের ধর্ম্ম তারল্য, অগ্নির ধর্ম্ম উত্তাপ। এই তারল্য বা উত্তাপ জল ও অগ্নির ধর্ম্ম। তো ধর্ম্ম আমাদের অস্তিত্ত্বকে জানান দেয়, প্রকাশিত করে। আর অধর্ম্ম আমাদের অস্তিত্ত্বকে জানতে বাধা দেয়, বা ঢেকে রাখে। এখন কথা হচ্ছে মানুষের ধর্ম্ম কি ? কেউ বলেন অহিংসাই মানব ধর্ম্ম। কেউ বলেন, ঈশ্বরের আজ্ঞা যথাযথ পালন, সকলের হিতকর অপক্ষপাত বিচার মানুষের ধর্ম্ম। কেউ বলেন, পরলোকের সার হচ্ছে ধর্ম্ম। অর্থাৎ যা সাধিত হলে সেই অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ কে সুখদায়ক করা যায়, তাকেই বলে ধর্ম্ম অর্থাৎ বেদবিহিত যজ্ঞাদি, উপাসনা ইত্যাদি হচ্ছে মানুষের ধর্ম্ম। কেউ বলেন, কর্ম্ম, সংস্কার ও কার্য্য-কারন ভাবকেই বলে ধর্ম্ম। কেউ বলেন কার্য্য-কারন ভাবই ধর্ম্ম শব্দের প্রকৃত তাৎপর্য্য। প্রেরণাত্মক অর্থযুক্ত লক্ষণ যাতে হয়, তাই ধর্ম্ম। তো নানা মুনির নানা মত। আমরা ধরে নেবো, ধর্ম্ম হচ্ছে সেই কার্য্য যা জীবের পক্ষে হিতকর।

এখন কথা কথা হচ্ছে, জীবের পক্ষে হিতকর কর্ম্ম আর অহিতকর কর্ম্ম এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য কিভাবে বোঝা যাবে ? পার্থক্য বোঝা যাবে বুদ্ধির দ্বারা, বিচারের দ্বারা। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যে বুদ্ধির দ্বারা নিশ্চিতভাবে কার্য্য-অকার্য্য, কর্তব্য-অকর্তব্য, ধর্ম্ম-অধর্ম্ম ইত্যাদির স্বরূপ বোঝা যায় তাকে বলে সাত্ত্বিক বুদ্ধি। আর যে বুদ্ধি এটি সঠিক ভাবে ধরতে পারে না, তাকে বলে রাজসিক বুদ্ধি। আর যে বুদ্ধি সমস্ত বিষয়কে বিপরীত ভাবে গ্রহণ করায় তাকে বলে তামসিক বুদ্ধি।

রাজসিক বুদ্ধি আমাদেরকে কার্য্যের ত্যাজ্য অথবা গ্রাহ্য এই ভাব সে স্পষ্ট ভাবে ধরতে পারে না। সর্ব্বদা সে দ্বন্দ্বের মধ্যে বা সন্দেহের মধ্যে দুলতে থাকে। নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

যোগীপুরুষগন বলে থাকেন, প্রাণক্রিয়ায় যাঁরা মনোযোগী, তারা ধার্ম্মিক, আর যাঁরা প্রাণক্রিয়ায় অমনোযোগী তাঁরাই অধার্ম্মিক। সাধন ক্রিয়ায় যার বুদ্ধি স্থির হয়নি, বিশ্বাস আসেনি, তার মধ্যে আছে সাংসারিক বুদ্ধি বা রাজস বুদ্ধি। আর সে এই ধন্ধ-বুদ্ধি দ্বারাই পরিচালিত হয়ে থাকে।

যোগীপুরুষগন বলছেন, সূত্রাত্মা রূপে প্রাণই জগতের পোষক ও পালক। অর্থাৎ আত্মার সঙ্গে সংযোগরক্ষাকারী হচ্ছে এই প্রাণ। প্রাণহীন সবকিছুই জড়। তাই প্রাণক্রিয়া দ্বারা প্রাণকে দীর্ঘ করতে হয়। আবার শ্বাসের গতাগতি রোধ করতে হয়। আর এই প্রাণের গতগতি রোধের ফলে জ্ঞানের উন্মোচন হয়। আত্মার উপরে অজ্ঞান-স্বরূপ যে আবরণ তার ক্ষয় হয়ে যায়। এইজন্য সাধন ক্রিয়াই সর্বোচ্চ ধর্ম্ম হলেও, রাজস বুদ্ধিসম্পন্ন লোক এটা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে না। আর যোগক্রিয়াতে অনাগ্রহী থাকে।

অন্যদিকে তামস বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষেরা অনিত্যবস্তুকে নিত্য বলে মনে করে। এরা ঋষি প্রণীত শাস্ত্রকে অবজ্ঞা করে থাকে। ধর্ম্মীয় আচার অনুষ্ঠানকে অন্ধ-কুসংস্কার বলে অবহেলা করে থাকে। এরা শ্রেয় ও প্রেয়-র মধ্যে প্রেয়কে গ্রহণ করে থাকে। এরা দেহকে নিত্য বলে মনে ক'রে, দেহের আদরযত্ন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এরা জাগতিক ভোগ-সুখে নিয়েই ব্যস্ত থাকে। এরা অজ্ঞতা বশতঃ যোগাভ্যাসের নিন্দা করে। আসলে সবার অন্তরেই সেই নিত্য-পরমপদার্থ বিরাজ করছেন । কিন্তু বুদ্ধির তারতম্য হেতু, মানুষ ধর্ম্ম বা অধর্ম্মের পথ বেছে নিচ্ছে।

জ্ঞাতসারে হোক, বা অজ্ঞাতসারে হোক, প্রাণদায়ী এই শ্বাসক্রিয়ায় যদি একবার কেউ মনোযোগী হতে পারে, তবে তাঁর প্রাণের স্থিরতা আসবে, মনের স্থিরতা আসবে, বুদ্ধির স্থিরতা আসবে। আর বুদ্ধি যখন স্থির হবে, তখন সেই শুদ্ধ বুদ্ধিতে পরমাত্মার প্রতিফলন হবে। স্বরূপের অনুভূতি হবে, আত্মজ্ঞান হবে, তা সে আপনি তামসিক, রাজসিক বা সাত্ত্বিক যেমন বুদ্ধির অধিকারী হন না কেন। কেবল মনটাকে বিষয় থেকে ঘুরিয়ে প্রাণের দিকে স্থাপন করুন ।

তবে শুধু লক্ষ্যে পৌঁছলে হবে না, লক্ষে স্থির থাকতে হবে। ধনুকের তীর যেমন ধনুক ত্যাগ করে লক্ষে গিয়ে স্থির হয়। তেমনি আমাদের পরমপদে স্থির হতে হবে। আর এই স্থিরতা এনে দেবে আমাদের ধৃতি - যার কথা আমরা পরবর্তীতে শুনবো।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ২৮.০২.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৩৩-৩৫

ধৃত্যা যয়া ধারয়তে মনঃপ্রাণেন্দ্রিয়ক্রিয়াঃ
যোগেন-অব্যভিচারিণ্যা ধৃতিঃ সা পার্থ সাত্ত্বিকী। (১৮/৩৩)

হে পার্থ যোগবলের প্রভাবে, বিষয়ান্তর ধারণা ব্যতিরেকে যে ধৃতির দ্বারা মন-প্রাণ-ইন্দ্রিয়ের যে ক্রিয়াসমূহ নিয়মিত হয়, সেই ধৃতি সাত্ত্বিকী।

যয়া তু ধর্ম্মকামার্থান ধৃত্যা ধারয়তে-অর্জ্জুন
প্রসঙ্গেন ফলাকাঙ্খী ধৃতিঃ সা পার্থ রাজসী । (১৮/৩৪)

অর্জ্জুন যে ধৃতির দ্বারা ধর্ম্ম-অর্থ-কাম সকল ধারণ করে থাকে, কিন্তু কর্ত্তৃত্বাভিমান বশতঃ ফলাকাঙ্খী হয়, হে পার্থ, সেই ধৃতি রাজসী।

যয়া স্বপ্নং ভয়ং শোকং বিষাদং মদমেব চ
ন বিমুঞ্চতি দুর্ম্মেধা ধৃতিঃ সা পার্থ তামসী। (১৮/৩৫)

হে পার্থ, দুর্বুদ্ধি পরায়ণ ব্যক্তি যে ধৃতির দ্বারা নিদ্রা, ভয়, শোক, বিষাদ, এবং গর্ব্ব পরিত্যাগ করে না, সেই ধৃতি তামসী।

আমরা আগেই শুনেছি, ধৃতি হচ্ছে ধারণা। ধৃ অর্থাৎ ধরা। এই ধৃতিতেই সমস্ত বিষয় অধিগত হয়। ধৃতি কথাটির আরো একটা অর্থ হচ্ছে ধৈর্য্য-স্থৈর্য্য। সাধারণভাবে আমরা বুদ্ধি ও ধৃতি শব্দের মধ্যে পার্থক্য ধরতে পারি না। ধৃতি আছে স্বয়ং-এর মধ্যে। আর এই ধৃতির কারনেই মানুষ তার বুদ্ধিকে ব্যবহার করতে বা প্রয়োগ করতে পারে। ধৃতি যত শুদ্ধ হয়, সাত্ত্বিক হয়, সাধকের সাধনবুদ্ধিও তত স্থির হয়। সাধনার ফলে বুদ্ধির স্থিরতা আসে তা এই ধৃতি থেকে এসে থাকে । যাঁরা সাধন জগতের মানুষ তারা জানেন, ধ্যানের আগে আমাদের ধারণা করতে হয়। তো যে প্রয়াস বা যত্ন দ্বারা মন-প্রাণ-ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়া নিয়মিত হচ্ছে, তাকেই বলে ধৃতি।

ধরবার ইচ্ছেই ধৃতি বা ধারণা । এখন এই যে ধারণা যা যোগীপুরুষগন ধ্যানের পূর্ব্বে করে থাকেন, তা প্রথমে থাকে কল্পনা বিশেষ। এই কল্পনার বা ধারণার দ্বারাই আমরা একসময় বিশেষ বিশেষ চক্রের অবস্থান ধরতে পারি। যেমন ধরুন আমাদের মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মনিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধি, আজ্ঞা, সহস্রার, ইত্যাদি চক্রের যে বিশেষ স্থান মেরুদণ্ডের মধ্যে অবস্থিত, তা প্রথমে আমাদের ধারণা নিতে হয়। সাধনার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে চক্রের সঠিক অবস্থান অনুভব হয়। তো ধারণা একটা কল্পনা বিশেষ, তাই এটি অসিদ্ধ, কিন্তু সাধনার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণা একসময় অনুভবের বিষয় হয়ে থাকে। তখন তা সিদ্ধ সত্য বলে উপলব্ধি হয়।

আমরা এও জানি, আমাদের শ্বাসবায়ু কিছুক্ষন ইড়া নাড়ীতে, কিছুক্ষন পিঙ্গলা নাড়ীতে প্রবাহিত হয়, আর অতি অল্পক্ষন মাত্র সুষুম্নায় প্রবাহিত হয়। আর ঠিক এইসময়, অর্থাৎ শ্বাসবায়ু যখন সুষুম্নায় প্রবাহিত হয়, তখন আমাদের স্থিরত্ব পদ লাভ হয়ে থাকে। এই ব্যাপারটা সবার শরীরেই নিরন্তর ঘটে চলেছে, এটা আমরা ধরতে পারি না। গাঢ় ঘুমে (সুষুপ্তি) আমাদের এই স্থির পদ লাভ হয়। যোগীপুরুষন এই অবস্থাকে ধরবার চেষ্টা করে থাকেন। আর এই অবস্থায় স্থিতি লাভ করতে চান। আর এই স্থিতিলাভের অবস্থার সময়সীমা বাড়াতে চান।
আরো একটা ব্যাপার আমাদের শ্বাসপ্রক্রিয়ার সঙ্গে ঘটছে, সেটা হচ্ছে, আমরা শ্বাসবায়ু ভিতরে নিচ্ছি, আবার বের করে দিচ্ছি, এই দুইয়ের একটা অন্তর আছে, অর্থাৎ শ্বাসবায়ু ভিতরে গিয়ে বেরুবার জন্য যখন প্রস্তুত হচ্ছে, সেই ক্ষণটাকে বলে স্থিরক্ষণ। এই স্থিরক্ষণটাকে যোগীপুরুষগন ধরতে চেষ্টা করেন। আর এই কারণেই যোগীপুরুষগন কুম্ভকের ও বিভিন্ন বন্ধের বিধান দিয়েছেন । যদিও এই কুম্ভক কৃত্তিম। প্রথম দিকে এই কুম্ভক ক্রিয়ার ফলে প্রাণ ছটফট করতে থাকে। কিন্তু নিরন্তর অভ্যাসের ফলে প্রাণ স্থিরতা প্রাপ্ত হয়। যাইহোক, এই স্থিরপদ যত বাড়বে, অর্থাৎ এই স্থির-অবস্থার সময় যত বাড়াতে পারা যাবে, সাধকের সিদ্ধিলাভের সময় তত এগিয়ে আসবে। এই স্থিতিপদ যত বাড়তে থাকবে, তত সাত্ত্বিকী ধৃতি হতে থাকবে। তখন মনের কোনো অবলম্বনের দরকার পড়বে না । বায়ু স্থির হলে, বাহ্যিন্দ্রিয়, অন্তরেন্দ্রিয় বিনা চেষ্টায় স্থির হয়ে যাবে। যোগীপুরুষগন খেচরী মুদ্রার বিধান দিয়েছেন, এই স্থিতিপদ লাভের জন্য ।

এখন যাদের মধ্যে ধর্ম্ম, (ফালাকাঙ্খ্যা জনিত ধর্ম্মকর্ম্ম) অর্থ ও কাম প্রভাব বেশী তাদের ধৃতিকে বলা হয় রাজসীক ধৃতি। এরা পূজা অর্চনা, দানাদি, এমনকি সাধনক্রিয়া করে ঐশ্বর্য্য লাভের আশায়। এরা বাসনারহিত নয়, এদের মন বিষয় চিন্তায় মগ্ন । এরা যাকিছু করে, তার মধ্যে কিঁছু পাবার প্রত্যাশা থাকে। এতে করে তারা জাগতিক সম্পদের অধিকারী হয়, আর পুনঃ পুনঃ ভোগ বাসনা পূরণের জন্য, উপযুক্ত দেহলাভ করে থাকে।

সবশেষে আছে, তামসী ধৃতি। যাদের মধ্যে এই তামসী ধৃতি আছে, তাদের মধ্যে শোক-দুঃখের স্মৃতি ভেসে ওঠে। আবার বিবশ হয়ে সেই শোকের কারণরূপ কর্ম্ম করে থাকে। এরা সংস্কারের বশে বিষয় চিন্তা ও বিষয়কর্ম্ম করে থাকে। এরা বিষয় থেকে বেরুতে পারে না। এদের মধ্যে আলস্য, নিদ্রার প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এদের জীবন জড় স্বভাবের।

তো সাত্ত্বিক ধৃতি সম্পন্ন মানুষের মধ্যে অকারনেই সাধনায় উৎসাহ, রাজসিক ধৃতি সম্পন্ন মানুষের ফালাকাঙ্খ্যা জনিত কর্ম্মে প্রবৃত্তি। আর তামসিক ধৃতি সম্পন্ন মানুষের মধ্যে একটা জড়তা, আলস্য, এমনকি সংস্কার বসে দুঃখদায়ক কর্ম্মে প্রবৃত্তি হয়ে থাকে।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ০১.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৩৬-৩৭

সুখং ত্বিদানীং ত্রিবিধং শৃণু মে ভরতর্ষভ
অভ্যাসাৎ রমতে যত্র দুঃখান্তঞ্চ নিগচ্ছতি। (১৮/৩৬)

হে ভরতশ্রেষ্ঠ এখন (ইদানিং) তিন প্রকার সুখের বিষয় আমার নিকট শোনো। আমার কাছে, যে সুখে অভ্যাস দ্বারা আনন্দ লাভ করে, এবং যার দ্বারা সমস্ত দুঃখের অন্ত লাভ করে থাকে।

যত্তদগ্রে বিষমিব পরিণামে-অমৃতোপমম
তৎ সুখং সাত্ত্বিকং প্রোক্তম আত্মবুদ্ধি-প্রসাদজম । (১৮/৩৭)

যে সুখ প্রথমে বিষের মতো, কিন্তু পরিণামে অমৃততুল্য এবং যা আত্মনিষ্ঠ পুরুষের বুদ্ধির নির্ম্মলতা থেকে জাত, সেই সুখ সাত্ত্বিক সুখ বলে কথিত হয়।

যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, সুখ গুনভেদে তিন প্রকার (সাত্ত্বিক, রাজসিক, ও তামসিক)। সুখ বা দুঃখ আসলে আমাদের মানসিক বৃত্তি মাত্র। আমরা সবাই এই সুখের সন্ধানেই ঘুরে মরছি। এমনকি আমরা যে জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হচ্ছি, দেহ থেকে দেহান্তরে প্রবেশ করছি, তাও এই সুখের সন্ধানে। এখন সুখ কিসে হয়, সেই সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা নেই। অথচ সবার জীবনে একটাই উদ্দেশ্য আর তা হচ্ছে সুখ বা শান্তি। আপনি যে জন্মেছেন, এই দেহ ধারণ করেছেন, পরীক্ষায় ভালো ফল করবার চেষ্টা করেছেন, একটা ভালো চাকরি (অর্থনৈতিক নিরাপত্তা), একটা সংসার চেয়েছিলেন, স্ত্রী-পুত্র-পরিবার চেয়েছিলেন, সবই সুখের জন্য। এখন কথা হচ্ছে আপনি কেন এমন টা ভেবেছিলেন, বা করেছিলেন, তার করেন হচ্ছে আপনি ধারণা করেছিলেন, যে এতে করে মানুষ সুখী হয়, আপনিও সুখী হবেন । এই যে ধারণা এটা আপনার মনের কল্পনা বিশেষ। আর কল্পনা হচ্ছে মনের প্রজেকশন - অভিক্ষেপন। অর্থাৎ আপনার মন মনে করেছিল, যে এতে সুখ পাওয়া যাবে। তো আমাদের সমস্যা হচ্ছে, কতকগুলো বিষয়কে আমরা সুখদায়ক বলে মনে করেছিলাম। এখন কথা হচ্ছে, লঙ্কায় ঝাল আছে, চিনিতে মিষ্টত্ব আছে, তেঁতুলে টক আছে একথা সত্য। কিন্তু এতে সুখ আছে, এমনটা সত্য নয়। কেননা কেউ টক খেতে ভালোবাসে, কেউ মিষ্টি খেতে ভালোবাসে, আবার কেউ ঝাল খেতে ভালোবাসে। তো দ্রব্যে দ্রব্যগুন আছে সত্য, কিন্তু সুখ বা দুঃখ নেই। সুখ-দুঃখ আছে আপনার মনে। এইজন্য বলছিলাম, সুখ দুঃখ হচ্ছে আমাদের মানসিক বৃত্তি। আমি যদি, বা আমার মন যদি মনে করে মিষ্টিতে সুখ আছে, তবে রসোগোল্লায় আমি সুখ পাবো। আর যদি আমার মন বলে যে মিষ্টিতে সুখ নেই, তবে নেই। ভালো চাকরিতে সুখ নেই, সুখ আছে আপনার মনে। আমার কথা যদি আপনার মনের মতো হয়, তবে আপনি সেটা গ্রহণ করবেন, আর যদি আমার কথা মনের মতো না হয়, তবে আপনি তা গ্রহণ করবেন না। আসলে আপনার মন যে সিদ্ধান্ত নেয়, তা আপনার বুদ্ধি-বিচারের দ্বারা করে থাকে। এখন এই বুদ্ধি বিচারের দ্বারা যা আপনার কাছে সত্য বলে মনে হচ্ছে, তা আপনি গ্রহণ করছেন। কিন্তু সত্য, কখনো বাছাবাছির বিষয় নয়। সত্য মনের মতো হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। কিন্তু কথা হচ্ছে, আমরা যদি বুদ্ধি-বিচার দ্বারা সত্যকে যাচাই করে না নেই, তবেতো আমরা সত্যকে ধরতে পারবো না, বুঝতে পারবো না । দেখুন সত্য বোঝার বিষয় নয়, সত্য উপল্বদ্ধির বিষয়, অনুভবের বিষয় । আর সত্যকে উপলব্ধি করতে গেলে, আমাদের মনের পছন্দ-অপছন্দকে ছেড়ে দিতে হবে।

আপনি শান্তি খুঁজছেন কাজের মধ্যে, আপনি শান্তি খুঁজছেন বিষয়ের মধ্যে, এমনকি আপনি শান্তি খুঁজছেন দেহের মধ্যে, জ্ঞানের মধ্যে, আপনি শান্তি খুঁজছেন বিশ্বাসের মধ্যে। এগুলোর মধ্যে আপনি এতদিন শান্তি খুঁজেছেন, তৃপ্তি খুঁজেছেন, আসলে আপনি আপনার আশা পূরণ করতে চাইছেন। আর এই আশা পূরণের আশায় আপনি সমস্ত কিছু করছেন। আপনি সত্যকে খুঁজছেন না। আর এই আশার পিছনেই আছে হতাশা। যা আপনাকে দুঃখের সাগরে ডুবিয়ে দিচ্ছে।

আসলে শান্তি হচ্ছে মনের একটা বিশেষ অবস্থা, যখন মন থাকে নিষ্ক্রিয়, মনের মধ্যে কোনো চিন্তার উদয় হয় না। মনের মধ্যে যখন কোনো সঙ্কল্পের উদয় নেই, মনের মধ্যে যখন কোনো বাসনার উদয় নেই, অর্থাৎ মন যখন শান্ত, তখন আপনার শান্তি। আপনি হয়তো শান্তির জন্য অনেকের কথা শুনছেন, আপনি হয়তো শান্তির জন্য অনেক বই পড়ছেন, কিন্তু যতক্ষন না আপনি নিজেকে পড়তে পারছেন, যতক্ষন না আপনি নিজের অন্তরের কথা শুনতে পারছেন, ততক্ষন আপনি সুখের সন্ধান পাবেন না। সুখ খোঁজার বিষয় নয়, সুখ বোঝার বিষয় মাত্র। সুখ কেবল অনুভব করতে হয় । আপনি যেমন বয়সের বৃদ্ধিতে ছোটবেলার কাঙ্খিত বিষয়কে ত্যাগ করতে পেরেছেন, আপনি যত জীবনের গভীরে প্রবেশ করবেন, তখন দেখবেন, আপনার ভিতর থেকে কামনা-বাসনা দূর হতে শুরু করেছে। নিজের ঘরে (দেহ-মন্দিরে) বাস করুন, ঘরকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন, এখানে কে এলো, আর কে চলে গেলো, (শ্বাস-প্রশ্বাস) তার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখুন, তবে দেখবেন, আপনি যাকে চান না, তার আসা যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। আপনার সন্মান, আপনার পদ, আপনার অর্থ, আপনার লোভ-হিংসা-দ্বেষ ঘৃণা (মশা-মাছি-পোকা-মাকড়-সাপ-ব্যাঙ) ইত্যাদিকে দূর করে দিন। এর পরে যা কিছু পড়ে থাকবে, তাকেই বলে প্রশান্তি অর্থাৎ আপনার যা নিজস্ব স্বরূপ। যোগদর্শন আমাদের এই কথাই শিক্ষা দেয়।

যাইহোক, আমরা আবার যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথায় প্রবেশ করবো। ভগবান বলছেন, বিষয়সুখ আমাদের কাছে পরিচিত বটে, এবং এই বিষয়সুখ সহজলভ্য, একথাও সত্য, কিন্তু এই সুখের পরিণতি হচ্ছে দুঃখ। সুতরাং এই বিষয়সুখ পরিত্যাগ করে, এমন সুখের সন্ধান করো, যা সহজে পাওয়া যায় না বটে, বারংবার সাধনক্রিয়ার অভ্যাস করতে করতে এই সুখের প্রাপ্তি ঘটে, আর দুঃখের নিবৃত্তি হয়। একেই সমাধি জনিত সুখ বলা হয়ে থাকে। আর এটি নিরন্তর অভ্যাসের দ্বারাই হয়ে থাকে। এই অভ্যাস কাকে বলে ? ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, "তত্র স্থিতৌ যত্নোঅভ্যাসঃ।".(সমাধিপাদ- শ্লোক ১৩) - মনের বৃত্তিগুলোকে সম্পূর্ণরূপে বশে রাখবার যে নিয়ত প্রচেষ্টা, তাকে বলে অভ্যাস। এই অভ্যাসের দ্বারাই আমাদের আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক, ও আধিভৌতিক দুঃখের অবসান হয়। আধ্যাত্মিক অর্থাৎ মানসিক, দৈববশে বা প্রারব্ধ বশে যে দুঃখ তাকে বলে আধিদৈবিক, আর আমাদের শারীরিক ব্যাধি অর্থাৎ বায়ু-পিত্ত-কফের অসাম্যের কারনে যে দুঃখ হয় , তাকে বলে আধিভৌতিক। এই ত্রিবিধ দুঃখের অবসান হলে, আমাদের যে সুখের অনুভব হয়, তাকে ভগবান তিন ভাগে ভাগ করেছেন। সাধনক্রিয়ার অভ্যাসের ফলে মন আমাদের একটা বিশেষ অবস্থায় পৌঁছে যায়। আর সেখানে পৌঁছলে, বিষয়ের প্রতি আর আসক্তি দেখা যায় না। দেখুন "খ" কথাটার বিশেষ অর্থ হচ্ছে, আকাশ, শূন্য, ব্যোম। যখন আমরা এই পর-ব্যোমের সঙ্গে যুক্ত থাকি, সান্নিধ্যে থাকি, তখন আমাদের সুখ, আর আমরা যখন এই পর-ব্যোম থেকে দূরে অবস্থান করি, তখন আমাদের দুঃখের অনুভূতি হয়। বিষয়াসক্তি যার যত বেশী, জানবেন, সে তত পর-ব্যোম থেকে দূরে অবস্থান করছেন। পঞ্চতত্ত্বের বৈচিত্র দেখে, আমরা মুগ্ধ হয়ে আমরা বৈচিত্রের স্বাদ নিতে ছুটে যাই । কিন্তু শূন্য কলসি যেমন শব্দ করে বেশী তেমনি পঞ্চতত্ত্বের জগৎ বেশি মনোহর বলে মনে হয়। সুখের আভাস আছে কিন্তু যথার্থ সুখ সেখানে নেই।

এখন কথা হচ্ছে যথার্থ সুখ কি ? যথার্থ সুখ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়। এই সুখ, তপস্যা বৈরাগ্য ও ধ্যানাদি রূপ সাধন ক্রিয়া দ্বারা সাধিত হয়। এই পথ দুর্গম। এখানে জাগতিক ভোগ-লালসা ত্যাগ করতে হয়। জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিসহ। দু-পাঁচ বছরের মধ্যেও কিছু অনুভবে আসে না। তখন কেবলই মনে হয়, আমি মরীচিকার পিছনে ছুটছি না তো ? এসব করে কি লাভ ? প্রথম দিকে কিছুটা আগ্রহ থাকলেও, ধীরে ধীরে মন বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। ফলতঃ সাধনায় শিথিলতা আসে। এমনকি একটা ভয় গ্রাস করে। জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে নাতো ? এইসময় গুরুদেবের মতো একজন আদর্শ পুরুষ সামনে উপস্থিত না থাকলে, অগ্রসর হওয়া যায় না। গুরুদেবের রূঢ় শাসন, গুরুদেবের কড়া নির্দেশ, এইসময় জীবনকে বিদ্ধস্ত করে তোলে। একসময় মনে সব ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যাই। এর পরেও যারা ধৈর্য্য ধরে, গুরুবাক্যে বিশ্বাস রেখে নিজেকে সাধনপথের দৃঢ়ভূমিতে স্থির করে রাখতে পারেন, তাঁরাই একসময় মরুভূমীর দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে মরুতীর্থে পৌঁছতে পারেন। তখন প্রাণ সুষুম্নায় প্রবেশ করে। পরমসুখের আস্বাদন পাওয়া যায়। আত্মাতে বুদ্ধি স্থির হয়। এই আত্মস্থিতি পরম সুখের কারণ হয়ে থাকে। এতদিন যে সুখ আমাদের শরীর-মনের বোধের মধ্যে সীমিত ছিল, এখন শরীর বোধের সমাপ্তি ঘটায়, মনের ক্রিয়া নিঃশেষ হওয়ায়, স্বরূপের আনন্দ অনুভূত হয়। মন-বুদ্ধি তখন আত্মাতে মিলিত হয়েছে - একেই বলে সাত্ত্বিক সুখ।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ০২.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৩৮-৩৯

বিষয়েন্দ্রিয়-সংযোগাদ যত্তদগ্রে-অমৃতোপমম
পরিণামে বিষমিব তৎসুখং রাজসং স্মৃতম। (১৮/৩৮)

বিষয়ের সাথে ইন্দ্রিয়ের সংযোগ বশতঃ যে সুখ উৎপন্ন হয়, এবং যা প্রথমে অমৃতের ন্যায় এবং পরিণামে বিষতুল্য - সেইসুখকে রাজস সুখ বলা হয়ে থাকে।
চক্ষু, কর্ন নাসিকা, জিহ্বা ত্বক, এই পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রীয়ের দ্বারা আমরা বিষয়ের সংস্পর্শে এসে, শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস,গন্ধ অনুভব করে থাকি । এই অনুভব আমাদের সুখ-দুঃখের অনুভূতি এনে দেয়। এখানে সুখ-দুঃখ, ভালো-লাগা, মন্দ-লাগা একত্রে অবস্থান করে। প্রথম দিকে এই বিষয় সংস্পর্শ আমাদের একপ্রকার সুখানুভূতি হয়। আর এই সুখানুভূতি বারবার আমাদেরকে সেই বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট করে থাকে। তখন মনে হয়, এর থেকে আর সুখ বোধহয় কিছুই নেই। কিন্তু একটা সময় আসে, যখন সেই একই বিষয় আর আমাদের আগের মতো আনন্দ প্রদান করতে পরে না। প্রথম রসোগোল্লার স্বাদ, পরবর্তী রসোগোল্লাকে আকর্ষণ করে, কিন্তু বারংবার এই একই বিষয়ভোগ হতে থাকলে, সুখানুভূতি কমতে কমতে একসময় বিরক্তির উদ্রেগ করে। গা বমি-বমি করে। শুধু তাই নয়, বারংবার এই রসোগোল্লার ভক্ষণে, শরীরের মধ্যে বিষক্রিয়া শুরু হয়। তখন এই রসোগোল্লা খাবার সুখকে শুধু তুচ্ছ বলে মনে হয়, তাই নয়, শরীরের ভয়াবহ পরিণতির কারন হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু মানুষ এই সামান্য বিষয়সুখের পিছনে ছুটে, শুধু সময় অতিবাহিত করে তাই নয়, নিজের ভবিষ্যৎকে তমসাবৃত করে, নিজেকে বিষের পাত্রের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। একেই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, রাজসিক সুখ। যা প্রথমে অমৃততুল্য মনে হলেও, পরিণতিতে জ্বালাময় হয়ে ওঠে।

আত্মজ্ঞান লাভে যাদের আগ্রহ নেই, সাধনক্রিয়ায় যাদের নিষ্ঠা নেই, ভগবানে যাদের বিশ্বাস নেই, তারাই বাহ্য বস্তু থেকে এই রাজসিক সুখের সন্ধান করে থাকে। এই বিষয়সুখের জন্যও তারা অনেক পরিশ্রম করে, কিন্তু এই পরিশ্রম আসলে পন্ডশ্রম ছাড়া কিছু নয়। যে সুখের আশায় সে এই জীবনকে বাজি ধরে, সেই সুখ একসময় দুর্গতির কারন হয়ে দেখা দেয়। এমনকি এই ইহকালেই, পরকাল দূরে থাকুক, তাকে নানান দুঃসহ শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রনা রোগ-ভোগ করতে হয়। আর পরকালেও তাদের নিরয় (পরলোকের দণ্ডভোগ স্থান) গমন হয়ে থাকে।
কঠোপনিষদে (শ্লোক ২/২/৭) বলা হচ্ছে, জীব নিজ নিজ কর্ম্ম ও জ্ঞান অনুসারে, কোনো কোনো জীবাত্মা পুনর্জন্মের মধ্য দিয়ে বারবার জীব দেহ প্রাপ্ত হয়, আবার কেউ কেউ বৃক্ষ-লতাদি স্থাবরদেহ ধারণ করে। শ্লোক নং. ২/১৩-তে বলা হচ্ছে যেসব প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি স্বরূপের দর্শন পেয়েছেন, কেবল তারাই মনে অপার শান্তি লাভ করেন। অন্যরা শান্তি থেকে বঞ্চিত হয়। একটা জিনিস জানবেন, জীবের বাসনা অসংখ্য এবং কোনো না কোনোভাবে জীবাত্মা তার বাসনা চরিতার্থ করতে চায়। আর এই কারণেই সে বিষয়ের দিকে ঝোঁকে। কিন্তু শান্তি তো বাসনা পূরণে নেই, শান্তি তো বিষয়ে নেই, শান্তি আছে স্বরূপের উপল্বদ্ধিতে। মানুষই স্বয়ং ঈশ্বর, এই মহাবাক্যঃ উপলব্ধি করাই মানব জীবনের উদ্দেশ্য।
এখন কথা হচ্ছে, কিভাবে এই বিষয়-বহির্ভূত আনন্দকে উপলব্ধি করা যায়। কোথা থেকে এই আনন্দ আসে ? উত্তরে বলা যায়, এই আনন্দ আমাদের সকলের অন্তরে বিরাজ করছে, কিন্তু সে সম্পর্কে আমরা অজ্ঞ। সুদীর্ঘকাল তপস্যার দ্বারা আত্মাকে জানলেই আমরা সদানন্দময় হতে পারবো।

যদগ্রে চ-অনুবন্ধে চ সুখং মোহনম-আত্মনঃ
নিদ্রালস্য- প্রমাদোত্থং তৎ তামসম-উদাহৃতম। (১৮/৩৯)

যে সুখ প্রথমে ও পরে বুদ্ধিভ্ৰংশ-কর হয়, এবং যা নিদ্রা, আলস্য, ও অসতর্কতা থেকে উৎপন্ন, তাকে তামসসুখ বলা হয়।
আমরা তিন ধরনের সুখের কথা শুনতে গিয়ে দুই ধরনের সুখের কথা শুনলাম, এক-বিষয় সংস্পর্শে রাজসিক সুখ, দুই-বিষয় বহির্ভূত আত্মস্থিতির সাত্ত্বিক সুখ। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আরো একধরনের সুখের কথা বলছেন, তা হচ্ছে তামসিক সুখ। এই তামসিক সুখ একদিকে যেমন বিষয় বহির্ভূত, আবার অন্য দিকে বিষয়-সম্পর্কিত। নিকৃষ্ট বিষয় সংস্পর্শে আমাদের একধরনের সুখ উৎপন্ন হয়, যেমন মাদকদদ্রব্য সেবনে একধরনের সুখানুভূতি হয়। আবার নিদ্রা, আলস্য ও প্রমাদ ইত্যাদিতে আমরা বিষয়বহির্ভূত সুখের অনুভব করে থাকি।
জীব-জন্তু-মানুষ সমস্ত প্রাণীর জৈবিক ধর্ম্ম হচ্ছে, নিদ্রা, আহার, মৈথুন। নিদ্রা আসলে বিশ্রামের উপায়। আর এই নিদ্রারূপ বিশ্রামের কারনে আমাদের শরীর মন বুদ্ধির মধ্যে সতেজতা আসে। আর এই সতেজ ভাব হলে, মানুষ যেমন সাংসারিক কাজ কর্ম্ম করতে পারে, তেমনি সে সাধনক্রিয়াতেও উৎসাহিত হতে পারে। তাই নিদ্রা সকলের পক্ষে প্রয়োজনী, আবশ্যক। তবে আমরা যখন কোনো বিষয়ে গভীর ভাবে চিন্তা করি, সেইসময় আমাদের নিদ্রা ছুটে যায়। তখন নিদ্রায় যে সুখ তা আমরা উপভোগ করতে পারি না। এখন কথা হচ্ছে নিদ্রা কি শুধু শরীর-মন-বুদ্ধির সতেজতার জন্য প্রয়োজন, তা নয়। নিদ্রাতে আছে স্থির তত্ত্ব। আমরা যখন গভীর ঘুমে বা গাঢ় ঘুমে অবস্থান করি, তখন আমরা আত্মার বিশেষ অবস্থায় অর্থাৎ প্রজ্ঞার সাথে অবস্থান করি। (জাগ্রত অবস্থায় বৈশ্বানর, স্বপ্নের অবস্থায় তৈজস, আর সুসুপ্তির অবস্থায় প্রজ্ঞা) তাই নিদ্রা আমাদের প্রয়োজন এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।
দেখুন, আমরা যখন গীতার ষষ্ঠ অধ্যায় শুনছিলাম, তখন শুনেছিলেন (শ্লোক ৬/১৭) যিনি পরিমিত আহার গ্রহণ করেন, পরিমিত রূপে নিদ্রিত থাকেন ও পরিমিত জাগরণের অভ্যাস করেন, সেই যোগীপুরুষের যোগসাধন দুখনিবারক হয়। নিদ্রার দুই অবস্থা, একটা হচ্ছে বেহুশ অবস্থা, আর একটা হচ্ছে বিশ্রামের অবস্থা। বিশ্রামের অবস্থা ভালো হলেও, আমরা বেহুশ না হয়ে বিশ্রামের পর্য্যায়ে যেতে পারি না। তাই আমরা নিদ্রাতে বেহুশ হয়ে থাকি। যোগীপুরুষ যোগনিদ্রাতে অবস্থান করেন। অর্থাৎ জগৎ চিন্তা থেকে অব্যাহতি নিয়ে আত্মতত্ত্বে স্থিত হন। 
এখন কথা হচ্ছে, যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে নিদ্রাকে তামস সুখ বলছেন কেন ? নিদ্রার দুটো ফল একটা হচ্ছে বিশ্রাম, যাতে করে আমাদের শরীর-মন তাজা হতে পারে, আর একটা হচ্ছে জড়-ভাব  যা আমাদের আলস্যের উদ্রেগ করতে পারে। অতিরিক্ত ঘুমের অভ্যাস করলে, বা শীতকালে দিনের বেলা ঘুমুলে দেখবেন, শরীরটা ম্যাজ-ম্যাজ করছে, মেজাজটা তিরিক্ষি হয়ে গেছে। আবার চোখ থেকে ঘুম-ঘুম ভাব যেতে চায় না। শরীরটা ভারী ভারী লাগে, কোনো কাজে উৎসাহ আসে না। আর একবার যদি এই অভ্যাস করে ফেলেন, তবে আপনার সবকাজেই ঘুম ঘুম পাবে।  তখন সাধন ভজন দূরে থাকুক, নিজের সাংসারিক কর্তব্য কর্ম্ম করতে নিরুৎসাহিত হবেন। এইজন্য ভগবান বলছেন, ঘুমে একটা সুখ আছে, কিন্তু তা তামস সুখ। যা আমাদের কর্তব্য কর্ম্ম থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। ফলত জীবনে দুঃখ ডেকে আনে। 
আসলে তমোগুণের যখন বৃদ্ধি পায় , তখন আমাদের বৃত্তিগুলো ভারী হয়ে ওঠে। মন জবুথবু হয়ে যায়। তখন আর কোনো কাজ করতে ভালো লাগে না। আর এই আলস্যের অবস্থাকেই সে সুখদায়ক বলে মনে করে। আর ইন্দ্রিয়সকলের (জ্ঞান ও কর্ম্ম) যথাযথ ব্যবহার না হবার ফলে মনের মধ্যে অলীক কল্পনা বাসা বাঁধে।  ইন্দ্রিয়সকল শিথিল হয়ে আসে। যা আসলে আমাদের দুশ্চিন্তার রূপ নেয়। আর এরফলে জীবন দুঃখদায়ক  হয়ে ওঠে। তমোগুণের আরো বৃদ্ধি হলে মানুষ প্রমাদগ্রস্থ হয়।  অর্থাৎ একদিকে যেমন সে তার সাংসারিক কার্যকর্ম্মে অমনোযোগী হয়, তেমনি দুষ্কর্ম্মে সক্রিয়  হয়। সহজে সবকিছু পেতে চায়।  তখন নেশাভাঙ, চুরি-চামারি, ইত্যাদি দুরাচারে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে।  ফল হয়, দুর্গতি। 
তো তামসিক ব্যাক্তিগন যোগনিদ্রার বা পরিমিত নিদ্রার বদলে, অতিনিদ্রায় সুখ পেয়ে থাকে, কর্ম্ম-তৎপরতা থেকে আলস্যে সুখ পেয়ে থাকে, আর সবশেষে প্রমাদগ্রস্থ হয়ে জীবনটাকে ধংসের দিকে টেনে নিয়ে যায়। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাই সমস্ত সাধককে নিদ্রা আলস্য  ও প্রমাদ থেকে দূরে থাকতে বলছেন। 

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়। 

তারিখ : ০৩.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৪০

ন তদন্তি পৃথিব্যাং বা দিবি দেবেষু বা পুনঃ
সত্ত্বং প্রকৃতিজৈঃ-মুক্তং যদেভিঃ স্যাৎ ত্রিভির্গুণৈঃ । (১৮/৪০)

পৃথিবীতে, স্বর্গে বা দেবতাদের মধ্যে এমন কেউ নেই - যা প্রকৃতিজাত এই ত্রিগুণের থেকে মুক্ত।

পৃথিবী অর্থাৎ কর্ম্মজগৎ, স্বর্গ অর্থাৎ ভোগলোক আর দেবতা অর্থাৎ ভগবানের অশেষ গুনের মধ্যে এক বা একাধিক গুনের অধিকারী। এই দেবতারা দিব্যলোকের বাসিন্দা, এদেরও শরীর আছে, যাকে বলা হয় দিব্যশরীর। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, এরা সবাই প্রকৃতিজাত ত্রিগুণাত্বক। আমরা এর আগে, জ্ঞান, কর্ম্ম, কর্ত্তা, বুদ্ধি, ধৃতি এবং সুখের মধ্যে ত্রিগুণের প্রভাব কেমন হয়, সে সম্পর্কে শুনেছি। এবার বলছেন, প্রকৃতির জগতে এমন কেউ নেই, যিনি এই ত্রিগুন থেকে মুক্ত। অর্থাৎ আমরা সবাই এই ত্রিগুন দ্বারা প্রভাবান্বিত। এখান থেকে বেরুতে গেলে, আমাদের প্রকৃতির আশ্রয় থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হবে। অর্থাৎ আমাদের নির্গুণ ব্রহ্মে লিন হয়ে যেতে হবে।

এই যে ত্রিগুণের কথা বলা হচ্ছে, এর মধ্যে তামস অবস্থান সবচেয়ে অধম, রাজস্ অবস্থা মধ্যম এবং সাত্ত্বিক অবস্থা উত্তম। সাত্ত্বিক স্বভাবের মানুষের কর্ম্ম হয় নিষ্কাম। ফলতঃ তাঁরা কর্ম্ম বন্ধনে আবদ্ধ হন না। স্থূল শরীরের নাশের পরে তাঁরা জ্যোতির্লোকের বাসিন্দা হন। যারা রাজস্ স্বভাবের মানুষ তারা সকাম কর্ম্মে প্রবৃত্ত হন। ফলতঃ কর্ম্ম বন্ধন হেতু জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ঘুরপাক খেতে থাকেন । স্থুল শরীর ত্যাগের পরে কিছুদিন কর্ম্ম-অনুযায়ী লোক-ভোগের পরে, আবার পৃথিবীতে ফিরে আসেন। সবশেষে তামস স্বভাবের মানুষ নিস্কর্মা, বা দুষ্কর্ম্ম করার ফলে, মৃত্যুর পরে অন্ধকার জগতের বাসিন্দা হন।

এখন কথা হচ্ছে ত্রিগুণের মধ্যে সবাইকেই আশ্রয় নিয়ে থাকতে হয়। এর মধ্যে যেহেতু সাত্ত্বিক স্বভাবের মানুষের হলে তাঁর মধ্যে ব্রহ্মেের প্রকাশ অনুভব হয়। আর এই ব্রহ্মজ্যোতির অনুভব হলে, গুণত্রয় আর জীবকে মুগ্ধ করতে পারে না। জলে বাস করেন বটে, কিন্তু জল তাকে আদ্র করতে পারে না। অগ্নির্জ্যোতির মধ্যে অবস্থান করেন বটে, কিন্তু অগ্নির উত্তাপ তাকে স্পর্শ করতে পারে না। এমনকি সংসারে থাকেন বটে, কিন্তু সংসারের মালিন্য তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। প্রকৃতির রাজত্বে থেকে প্রকৃতিজাত গুন্ পরিহার করা সম্ভব নয়, কিন্তু সাত্ত্বিক প্রকৃতির মানুষকে এই গুণত্রয় প্রভাবিত করতে পারে না।
আমরা ব্রহ্ম বিষয় শুনবার সময় সগুন ব্রহ্ম ও নির্গুণ ব্রহ্ম -এর কথা শুনেছি। নির্গুণ ব্রহ্ম সৃষ্টিকর্ত্তার উর্দ্ধে। অর্থাৎ নির্গুণ অবস্থায় সব স্থির, সেখানে কোনো বিক্ষোভ, গতি, বা সৃষ্টি শুরু হয় নি। তো যখনই সৃষ্টি শুরু হলো, তখন ত্রিগুণের প্রভাবে চলে এলো । অর্থাৎ প্রকৃতির সান্নিধ্যে ব্রহ্ম বহু হলেন। নির্গুণ তখন সগুন হলেন। তাই যোগেশ্বর ভগবান বলছেন, পৃথিবীবাসি বোলো, আবার স্বর্গবাসি বলো, মানুষ বলো আর দেবতা বলো, উৎকৃষ্ট জীব বলো বা নিকৃষ্ট জীব বলো সবাই এই ত্রিগুণের বাঁধনে বাঁধা। এখান থেকে কারুর বেরুবার উপায় নেই।

এখন কথা হচ্ছে, এখান থেকে যদি আমরা কেউ নিষ্কৃতি পেতে না পারি, তবে কেন এত সাধনভজন, কেন এতো সাধনক্রিয়া ? দেখুন এই ত্রিগুণময়ী প্রকৃতিই আমাদের স্থূল শরীরে ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না নাড়ীতে প্রাণবায়ু প্রবাহের ক্ষণকে নির্দিষ্ট করে থাকে। যতক্ষন আমাদের বাম নাক দিয়ে শ্বাসবায়ু প্রবাহিত হয়, ততক্ষন আমাদের স্থূল শরীরে তমঃগুণের প্রভাব থাকে। যখন ডান নাক দিয়ে শ্বাসবায়ু প্রবাহিত হওয়া শুরু করে তখন আমাদের মধ্যে রাজসিক গুনের প্রভাব লক্ষ করা যায়। এর পরে যখন এই একই শ্বাসবায়ু সুষুম্নাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে, তখন আমাদের মধ্যে সাত্ত্বিক গুনের প্রভাব পড়ে। এই যে তিনটি নাড়ীতে শ্বাসের প্রবাহ, এটি পরিবর্তনশীল। আর এই বায়ু-প্রবাহের পথ পরিবর্তনের কারনে মানুষের মধ্যে স্বভাবের পরিবর্ত্তন দেখা যায়। তাই একটা মানুষ কখনো ভালো আবার কখনো মন্দ। একই মানুষ যেমন অনেক ভালো কাজ করে থাকেন, ভালো চিন্তার অধিকারী হতে পারেন, তেমনি সেই মানুষটিই একসময় হিংসাত্মক, দ্বেষী, ভীতু বা সাহসী হয়ে উঠতে পারেন । ভয় পেলে মানুষের দম বন্ধ হয়ে আসে, আবার জোরের কাজ করতে গেলে মানুষ দমবন্ধ করে থাকে।
এমন কোনো মানুষ নেই, যার চিরকাল একই নাড়ীতে শ্বাস প্রবাহ চলছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শ্বাসবায়ু তার প্রবাহ-পথ পরিবর্ত্তন করে থাকে। এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া যেমন প্রাকৃতিক ভাবেই সংগঠিত হয়, অর্থাৎ স্বয়ংক্রিয়, তেমনি যোগসাধক শ্বাসের এই প্রবাহ-পথ সাধনক্রিয়ার সাহায্যে অর্থাৎ প্রাণক্রিয়ার সাথে মনকে যুক্ত করে, তাঁকে ইচ্ছেমতো পরিচালনা করতে পারেন। আর ঠিক এই কারণেই, অর্থাৎ আমাদের মধ্যে সাত্ত্বিক গুনের প্রভাব বাড়ানোর জন্য, আমাদের সাধন-ক্রিয়া অর্থাৎ প্রাণক্রিয়ার অভ্যাস করবার প্রয়োজন। এতে যেমন শরীর-মন সতেজ থাকবে, তেমনি আমাদের স্বভাবের পরিবর্তন হবে।
দেখুন আখের মধ্যে চিনি আছে, ধানের মধ্যে চাল আছে, শুকনো খেজুর গাছে মিষ্টি রস আছে, দুধের মধ্যে ঘি আছে, তেমনি সবার মধ্যে, এমনকি সমস্ত প্রকৃতিজাত বস্তুর মধ্যেও সেই একই ব্রহ্ম আছেন। ধ্যানে স্থির হতে পারলে, মন-বুদ্ধিকে নির্মল করতে পারলে এই ব্রহ্মজ্যোতির মধ্যে প্রবেশ করা যায়। তখন ত্রিগুণের প্রভাব থেকে আমরা মুক্ত হতে পারি। ত্রিগুন থাকবে, কিন্তু আমরা ত্রিগুণের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ব্রহ্মস্থিতি লাভ করে সুখ-দুঃখের অতীত হয়ে নির্ম্মল ব্রহ্মানন্দ সাগরে অবগাহন করতে পারবো।

যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর এইসব কথার মাধ্যমে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে বলছেন, অর্থাৎ সাধন জগতের বাধাকে অবহিত করাতে চাইছেন।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ০৪.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৪১

ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বিশাং শূদ্রাণাং চ পরন্তপ
কর্ম্মাণি প্রবিভক্তানি স্বভাব প্রভবৈগুণ্যৈঃ (১৮/৪১)

হে পরন্তপ, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রদিগের কর্ম্মসকল তাদের স্বভাবজাত গুন্ অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।

আমরা যখন ষষ্ঠ অধ্যায়ের আলোচনা শুনছিলাম, তখন যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমুখে শুনেছি (শ্লোক-৬/৪১-৪২), যোগভ্রষ্ট সাধক দেহত্যাগের পরে, পুন্য কর্ম্মহেতু স্বর্গাদি লোক প্রাপ্ত হন। এবং সেখানে দীর্ঘকাল বাস করবার পরে সদাচার-সম্পন্ন ধনীর গৃহে অথবা জ্ঞানবান যোগীর কূলে জন্ম গ্রহণ করে থাকেন। যদিও এরূপ জন্ম অতিদুর্লভ।

আবার অষ্টম অধ্যায়ে (শ্লোক নং. ৮/৬) যোগেশ্বর বলছেন, মৃত্যুপথযাত্রী, মৃত্যুকালে যেমন যেমন ভাব স্মরণ পূর্ব্বক দেহ ত্যাগ করেন, তিনি সর্ব্বদা সেই ভাবে তন্ময়-চিত্ত থাকায় সেই ভাবই প্রাপ্ত হন। অর্থাৎ আমাদের মৃত্যুকালীন চিন্তাই ভবিষ্যতের উপযুক্ত দেহধারনের নিয়ামক।

এখন কথা হচ্ছে এই যে দেহ, যা আমরা জন্মসূত্রে পিতা-মাতার কাছ থেকে পেয়েছি, তার সঙ্গে গুনত্রয়ের সম্পর্কটা কেমন ? এই দেহ যা আমি জন্মসূত্রে পেয়েছি তার সঙ্গে দেশ, কাল, পাত্রের কি কোনো সম্পর্ক আছে ? কেউ ব্রিটেনে বা আমেরিকায় জন্ম গ্রহণ করছে, কেউ ভারতের এক গন্ডগ্রামে জন্ম গ্রহণ করছে, কেউ ধনীর ঘরে জন্ম গ্রহণ করেছে, কেউ জ্ঞানীর ঘরে জন্ম গ্রহণ করেছে, কেউ শূদ্রের ঘরে জন্ম গ্রহণ করেছে, কেউ ব্রাহ্মণের ঘরে জন্ম গ্রহণ করেছে। কেউ হাজার বছর আগে জন্ম গ্রহণ করেছিল, কেউ আজ জন্ম গ্রহণ করেছে। এই যে জন্মকাল, জন্মস্থান ও পাত্র (মাতা-পিতা) নির্ব্বাচন এর সঙ্গে জন্মগ্রহীতার কোনো সম্পর্ক আছে কি ? এই ব্যাপারটা নির্ধারণ করা সহজ সাধ্য নয়।

দেখুন সমস্ত জীবকুল ব্রহ্ম থেকে উৎপন্ন, কিন্তু সবাই ব্রহ্মজ্ঞ নন। এই ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করবার জন্য, আমাদের জন্ম-জন্মান্তর ধরে প্রচেষ্টা করতে হয়। আর নিজ নিজ সাধন অনুযায়ী মানুষ শূদ্রত্ত্ব (অজ্ঞান) অবস্থা থেকে ব্রাহ্মণত্ব (জ্ঞানী) হতে পারেন। এই সাধনার কারণেই আমাদের বারবার এই কর্ম্মদেহ গ্রহণ করতে হয়। জীবন একটা অনন্ত যাত্রা। এই যাত্রাপথের রসদ সংগ্রহনের জন্য আমরা এই পৃথিবীতে কর্ম্ম দেহ ধারণ করি। আবার কখনো ভোগদেহ (ইতর অথবা দেব) ধারণ করি, যখন আমাদের কর্ম্মভোগ সম্পন্ন হয়।
আমার মাঝে মধ্যে মনে হয়, যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ক্ষত্রিয়ের ঘরে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, বিশ্বামিত্র ক্ষত্রিয়ের ঘরে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, রামচন্দ্র ক্ষত্রিয়ের ঘরে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। আবার বহু মহাপুরুষ আছেন যাঁরা শূদ্রের ঘরে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। যেমন দাদু নানক, যবন হরিদাস। বিবেকানন্দ ব্রাহ্মণ ছিলেন না। এঁরা সবাই নিজ নিজ সাধন-কর্ম্মের দ্বারাই ব্রহ্মজ্ঞান প্রাপ্ত হয়েছিলেন ? নাকি এঁরা সবাই আগে থেকেই ব্রহ্মজ্ঞ ছিলেন ?
দেখুন, একটা সময় ছিলো যখন কোনো জীবকুলের সৃষ্টিই হয়নি। ধীরে ধীরে জল-তেজ-বায়ুর প্রভাবে এই পৃথিবীতে আমিবা থেকে শুরু করে, জলজ উদ্ভিদ থেকে ধীরে ধীরে জীবকুলের সৃষ্টি হয়েছে। তো ক্রমবিবর্তনের কারণেই একসময় এই মনুষ্য দেহের উৎপন্ন হয়েছে। হিন্দুদের মধ্যে অনেকেই বিশ্বাস করেন, ৮৪ লক্ষ অর্থাৎ অনন্ত জীবন অতিবাহিত করে, আজ জীব মনুষ্য দেহ প্রাপ্ত হয়েছে। অর্থাৎ তার পূর্ব্ব পূর্ব্ব জীবনে সে নিশ্চিত একদিন কীট, উদ্ভিদ, পশু ইত্যাদি ছিল এবং তার আচরণ বা স্বভাব তদ্রুপ ছিল। কালের গতিতে দেহের ক্রমন্নতির কারনে আজ সে মনুষ্য দেহ পেয়েছে। তার মধ্যে স্বভাবেরও পরিবর্ত্তন হয়েছে।

এখন এই মনুষ্যদেহকে গুন-কর্ম্ম ও স্বভাব অনুযায়ী গীতার বক্তা যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চারভাগে ভাগ করেছেন। জীব তার পূর্ব্ব পূর্ব্ব জীবনের স্বভাব ও কর্ম্ম অনুযায়ী সংস্কারের জন্ম দেয়। এটা গীতার বক্তার পর্যবেক্ষন মাত্র, এই ভাগ ভগবান করেন নি। দেখুন ভগবান সবার প্রতি সমদৃষ্টি সম্পন্ন। তিনি কোনো ধর্ম্ম বা বর্ণের সৃষ্টি করতে পারেন না। এই চার বর্ণ সৃষ্টির জন্য অন্য কেউ দায়ী নয়। এটি একটি ধারা মাত্র। অর্থাৎ কালের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের গুন্ ও কর্ম্ম অনুসারে আমাদের মধ্যে এই বিশেষ বর্ণের গুন্ বা স্বভাবগুলো প্রকাশ পাচ্ছে।

দেখুন আমাদের শরীর প্রকৃতিজাত। আর প্রকৃতিজাত সমস্ত কিছুর মধ্যেই আছে গুণত্রয়। আর এই গুনত্রয়ের ভিন্নতার কারনে আমাদের মধ্যে স্বভাবের তারতম্য দেখা যায়। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র সবার মধ্যে এই তিনটি গুন্ বিরাজ করছে। এখন যার মধ্যে যে গুনের প্রভাব বেশি, তার স্বভাব ও কর্ম্ম সেইমতো হয়ে থাকে। সত্ত্বগুণের আধিক্যে ব্রাহ্মণ, স্বল্প সত্ত্ব ও অধিক রজোগুণের মিশ্রনে ক্ষত্রিয়, অধিক রজঃ ও স্বল্প তমঃগুণের মিশ্রনে বৈশ্য, আর সবশেষে স্বল্প রজঃ ও অধিক তমঃগুণের প্রভাব কালে মানুষ হয় শূদ্র।

মানুষের পূর্বজন্মকৃত কর্ম্ম (শুভকর্ম্ম ও অশুভ কর্ম্ম) প্রভাবে সংস্কারের জন্ম হয়। এই সংস্কার পরবর্তী জীবনে স্বভাবে পরিণত হয়। এই স্বভাব প্রকৃতির গুণপ্রভাবে সমস্ত সৃষ্টিকে তা স্থাবর হোক, বা জঙ্গম হোক, চার ভাগে বিভক্ত করেছে। এই স্বভাব বা সংস্কার সে জন্মসূত্রে পেলেও, এই সংস্কারের সংশোধন ও নতুন শুভ সংস্কারের জন্ম দেওয়াই মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্য - যা আমাদের সাধন ক্রিয়ার ফলে হয়ে থাকে।

দেখুন আপনি কোথায় জন্ম গ্রহণ করেছেন, সেটা বড়ো কথা নয়, আপনি কোন স্বভাবের মানুষ সেটাও বড়ো কথা নয়। আগে নিজেকে চিনুন - নিজের স্বভাবকে জানুন। নিজের বিবেকগুরুর কাছে জেনে নিন, আপনার মধ্যে ভালোদিক বা ভালো গুন্ কি কি আছে। আর সেইমতো আপনার মধ্যে সুপ্ত সদ্গুণাবলীকে জাগ্রত করে তুলবার চেষ্টা করুন। ভগবান সবার মধ্যেই কিছু না কিছু সদ্গুণাবলী দিয়ে, পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। আপনি আপনার মধ্যে সুপ্ত সেই গুনের বৃদ্ধি করবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করুন। সবাই ভালো ডাক্তার হবে, তার কোনো মানে নেই, আপনার মধ্যে হয়তো ভালো লেখক হবার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। আপনার মধ্যে হয়তো ভালো শিল্পী বা গায়ক হবার সম্ভাবনা আছে। অর্থাৎ আপনার মধ্যে যে গুণগুলো সুপ্ত আছে, আপনার যা ভালো লাগে, আপনি সেই গুনগুলোর চর্চা করুন। অন্যে ডাক্তার হয়ে অনেক নাম করেছে, বলে আপনাকেও ডাক্তার হতে হবে তার কোনো মানে নেই। ঠিক এই দৃষ্টিতে ভগবান বলছেন, প্রত্যেকের স্বধর্মের পালন করা উচিত।
অধ্যাত্ম মার্গেও এই একই কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। যখন পিঙ্গলায় শ্বাসবায়ু প্রবাহিত হয়, তখন সে শোক দুঃখ মোহে আছন্ন থাকে। অর্থাৎ তামসিক ভাব। আবার যখন ইড়া নাড়ীতে শ্বাস প্রবাহিত হতে শুরু করে, তখন রজোগুণের অর্থাৎ কর্ম্মে উদ্দীপনা আসে, কিন্তু বিষয় বাসনার অন্ত থাকে না। অর্থাৎ বৈশ্যের ভাব। এইসময় কেবল বিষয় চিন্তা, দু-পয়সা উপাৰ্জনের চিন্তা মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে। এইসময় ধর্ম্মকার্য্যের মধ্যেও বিষয় বাসনা থাকে। আবার যখন ক্ষণিক সুষুম্না আবার ক্ষণিক অন্য নাড়ীতেও শ্বাসবায়ু প্রবাহিত হয়, তখন ক্ষত্রিয় ভাব। তখন বিষয়কর্ম্ম যেমন থাকে তেমনি ভগবৎ চিন্তাও থাকে। এই ক্ষত্রিয়গণই ঋষি-পুরুষদের শান্তিতে সাধনার জন্য প্রচেষ্ট হন। মন্দির-মসজিদ এরাই নির্মাণে সাহায্য করে থাকেন। সবশেষে যখন সুষুম্নায় শ্বাসবায়ু নিরন্তর উর্দ্ধগতি সম্পন্ন হয়ে আজ্ঞাচক্রে বা সহস্রারে স্থিত হয়, তখন একই মানুষ ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ হন। যাঁকে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন ব্রাহ্মণ। ব্রাহ্মণ কোনো জন্মসূত্রে পাওয়া পদবি নয়, একে অৰ্জন করতে হয়। ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষই ব্রাহ্মণ।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
তারিখ : ০৫.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৪২

শমো দমঃ-তপঃ শৌচং ক্ষান্তিঃ আর্জ্জবম এব চ
জ্ঞানং বিজ্ঞানম আস্তিক্যং ব্রহ্মকর্ম্ম স্বভাবজম। (১৮/৪২)

শম, দম , তপঃ, শৌচ, ক্ষমা, সরলতা, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও আস্তিক্যবুদ্ধি যার স্বভাবজাত গুন্ তিনি ব্রাহ্মণ।

ভগবান এবার ব্রাহ্মণের কি কি গুনের অধিকারী হতে হবে সে সম্পর্কে বলছেন। দেখুন জীব (জীবাত্মারুপী পুরুষ ) তার জন্ম জন্মান্তরের সংস্কার বশে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে কাঙ্খিত দেহ ধারণ করে থাকেন । এবার এই কর্ম্মদেহ দ্বারা তিনি তার পূর্ব-পূর্ব সংস্কারের ক্ষয় সাধনে এবং নতুন সংস্কারের জন্ম না দিয়ে এদের সমূলে নাশ করবার চেষ্টায় ব্রতী হয়। তাই যোগাচার্য্যগণ বলে থাকেন, মানুষ জন্ম-জন্মান্তরের হেতু যে ভূৎসকল, তার যে কাম্য কর্ম্ম তা থেকে নিবৃত্ত হতে পারলে, সেই পুরুষ হন যোগাঙ্গ সাধনের অধিকারী। এই অধিকারী হবার পর সেই যোগীপুরুষ নিষ্কাম সাধনপথে অষ্টাঙ্গ যোগসাধন ক্রিয়ার নিয়মিত অভ্যাস করেন। ঋষি পতঞ্জলির মতে এই অষ্টাঙ্গ যোগ হলো, যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান, সমাধি (সাধনপাদ -২৯).

এখন কথা হচ্ছে সংস্কার ব্যাপরটা কি ? আসলে আমরা যা করি, দেখি শুনি, এমনি যাকিছু চিন্তা করি, তা আমাদের চিত্তে একটা ছাপ রেখে যায় । চিত্তের এই ছাপকে বলা হয় সংস্কার। আমাদের ধর্ম্মকর্ম্ম-সংস্কার বা অধর্মাত্মক কর্ম্মসংস্কার নিয়ে তৈরী হয় কর্ম্মশায়। এখন কথা হচ্ছে এই কর্ম্ম কি আমাদের জন্মের কারন হতে পারে ? বা একটা কর্ম্ম অনেক জন্মের কারন, বা অনেক কর্ম্ম কি একটা জন্মের কারন হতে পারে ?

দেখুন জন্ম ও মৃত্যুর মাঝে যা কিছু করা হয়েছে বা হচ্ছে, তা আমাদের সংস্কাররূপে পরিণত হচ্ছে। অর্থাৎ কর্ম্মাশয়-এর মধ্যে আছে বিচিত্র সব সংস্কার - যার মধ্যে প্রধান বা অপ্রধান ভাবে থেকে মৃত্যুর সময় অভিব্যক্ত হয়, অর্থাৎ ফল উৎপাদনের অভিমুখী হয়। আর এই কর্ম্মফলগুলোই একসঙ্গে মিলে গিয়ে একটামাত্র জন্মের কারন হয়। আর সেই জন্ম সেই পূর্ব জন্মের সঞ্চিত কর্ম্ম-সংস্কার দ্বারাই আয়ু লাভ করে। এখন এই আয়ুতে মানুষ তার সঞ্চিত কর্ম্মরাশি দ্বারা ভোগ সম্পাদন করে থাকে। এই কর্ম্মজনিত সংস্কারই আমাদের জন্ম, জাতি, আয়ু নির্দিষ্ট করে থাকে। আবার বর্ত্তমান জন্মে কৃত কর্ম্ম ও ভোগ-অবিশিষ্ট, এবং সঞ্চিত কর্ম্ম, ভবিষ্যৎ জীবনের কারন হয়ে থাকে। এই কর্ম্মাশয়ের মধ্যে একটা বিপাকীয় ব্যবস্থা আছে। অর্থাৎ আজ যে কর্ম্ম করছেন, তা কবে ফল দানেরজন্য উন্মুখ হবে, তা এই বিপাকীয় ব্যবস্থার উপরে নির্ভর করে। যাইহোক, এইসব আলোচনা আমাদের বিষয় বহির্ভূত হয়ে যাচ্ছে। কিন্ত যে কারনে এই কথাগুলো বলা তা হচ্ছে, ভগবান বা অন্যকেউ আমার আজকের জন্মের জন্য, বা আজকের অবস্থার জন্য দায়ী নয়। আমরা নিজেরাই আমাদের এই অবস্থার কারন উৎপন্ন করেছিলাম। আবার ভবিষ্যৎ জীবনের জন্যও অন্য কেউ দায়িত্ত্ব নেবে না। আমাকেই আমার কর্ম্মের দ্বারা ভবিষ্যৎ নির্দিষ্ট করতে হবে।

এই ভবিষ্যৎ জীবন উজ্বল করবার জন্য প্রথমে যোগাঙ্গ সাধনের উপযোগী হতে হবে, অধিকারী হতে হবে। আর এই অধিকারী হতে গেলে, যেমন ঋষি পতঞ্জলির মতে অষ্টাঙ্গ যোগের সাধনা করতে হবে তেমনি যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথায় শম, দম, তপস্যা, শৌচ, ক্ষমা, সরলতা, জ্ঞান বিজ্ঞান ও আস্তিক্য এগুলোর অভ্যাস করতে হবে।

শম : কথাটার অর্থ চিত্তের স্থিরতা, মনঃ সংযম, নিরন্তর বাসনা ত্যাগের প্রবৃত্তি। বিষয়ে বারবার দোষ দর্শন করে, মন যখন স্থির লক্ষবস্তু পরব্রহ্মতে নিয়তভাবে অবস্থান করে তখন তাকে বলা হয় শম।

দম : হচ্ছে ইন্দ্রিয় সংযম। ইন্দ্রিয়সকলে নিগ্রহ করা। সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলোকে বশীভূত করা। আমাদের মন-ও ইন্দ্রিয়বিশেষ। তাই মনের উপরে অধিকার অৰ্জন করতে হবে। মনের মধ্যে আছে বিকারজনিত অস্থিরতা। মনের এই অস্থিরতাকে দূর করে মনকে স্থির করতে হবে।

তপস্যা : যার দ্বারা জ্ঞান-বিজ্ঞান লাভ করা যায়, যার দ্বারা নিষ্পাপ হওয়া যায়। যার দ্বারা অধ্যাত্ম জগতে সিদ্ধি লাভ করা যায়, তাকেই বলে তপস্যা । তপস্যা ত্রিবিধ, শারীরিক, বাচনিক, ও মানসিক।

শৌচ : কথার অর্থ পবিত্রতা। শরীর ও মনের শুদ্ধিকরণকেই বলে শৌচ। জল-সাবান দিয়ে যেমন শরীরের বাহ্যিক দিক শোধন করা হয়, তেমনি নাড়ীশুদ্ধি প্রক্রিয়ার দ্বারা আমাদের শরীরের অভ্যন্তর্ভাগকে শৌচ করতে হয়। আবার মনের মধ্যে মৈত্রেয়ী ভাব, ঈর্ষাদির ত্যাগ, হিংসা ত্যাগ দ্বারা মনের শুচিতা রক্ষা করতে হয়।

ক্ষমা : হচ্ছে সহ্যশক্তি। সহিষ্ণুতা - অপরাধীর অপরাধকে মাৰ্জনা করা।

সরলতা : কপটতাহীন, উদারচেতা, অকুটিল মন।

জ্ঞান : বলতে তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বোঝায়। অর্থাৎ শাস্ত্রাদি পাঠ করে, তার ভাবগুলোকে ঠিক ঠিক মতো বুঝতে পারা।

বিজ্ঞান : বিশেষ জ্ঞান, অর্থাৎ উপল্বদ্ধিজাত জ্ঞান। শাস্ত্রাদি পাঠের পরে, তার প্রয়োগবিধি জেনে, সম্যকভাবে উপলব্ধি করা।

আস্তিক্য : অস্তিত্ব বোধকে বলা আস্তিক্য। তিনি (ঈশ্বর) আছেন, ব্রহ্ম আছেন, চৈতন্য আছেন, আত্মা আছেন, সর্ব্বোপরি আমি সেই চৈতন্য-স্বরূপ এই বোধে নিজেকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা।

এগুলো হচ্ছে ব্রাহ্মণের স্বাভাবিক ধর্ম্ম - যা তাকে ব্রহ্মজ্ঞানের অধিকারী করে তোলে। যিনি ব্রহ্মজিজ্ঞাসু তাকে এই গুনগুলোর অৰ্জন করতে হবে। আপনি কোনো বংশে বা কূলে জন্ম গ্রহণ করেছেন, আপনার পিতা-মাতার কি সামাজিক পরিচয়, এমনকি আপনার পিতা ঋষিপুরুষ কি না, সেটা বড়ো কথা নয়। আপনি কে সেটা বুঝবার চেষ্টা করুন। আপনি কোথা থেকে এসেছেন, আবার কোথায় চলে যাবেন, সেই সম্পর্কে সম্যকরূপে অবহিত হবার চেষ্টা করুন। আজকের আপনি যেমন আপনার পূর্ব-পুব জন্মকৃত কর্ম্মের পরিণতি, তেমনি আজকের কর্ম্ম আপনার ভবিষৎ নির্দিষ্ট করে দেবে।
যোগেশ্বর ভগবান যে গুন গুলোর কথা বলেছেন, সেই গুণগুলো আয়ত্ত্ব করবার চেষ্টা করুন। যিনি আত্মস্থিত হন, সেই অবস্থায় তিনি সবত্র সমভাবাপন্ন হন। তাঁর ইন্দ্রিয়সকল থাকে অন্তর্মুখী। স্থিতি থাকে আত্মায়। কর্ম্ম হয় ফলাকাঙ্খ্যারহিত। কারুর দোষ দর্শন নয়, বরং সর্ব্বদা ক্ষমাশীল দৃষ্টি। জ্ঞান যাঁর শাস্ত্রবিদ্যাতেই আবদ্ধ নয়, জ্ঞান তাঁর অনুভবে, উপল্বদ্ধিতে। ঈশ্বর বা ব্রহ্মের অস্তিত্ত্বে তিনি সন্দেহাতীত। ব্যবহারিক জীবনে যা কিছু করেন, তাও ব্রহ্মকর্ম ছাড়া কিছু নয়। তাঁর শুদ্ধ বুদ্ধিতে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ সুস্পষ্ট রূপে প্রকাশ পাচ্ছে। এই হচ্ছেন ব্রাহ্মণ।

ওম নমঃ শ্রী ভাগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ০৬.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৪৩

শৌর্য্যং তেজো-ধৃতিঃ-দাক্ষ্যং যুদ্ধে চাপি-অপলায়নম
দানম-ঈশ্বর-ভাবঃ-চ ক্ষাত্রং কর্ম্ম স্বভাবজম। (১৮/৪৩)

শৌর্য্য, তেজ, ধৈর্য্য, কর্ম্মদক্ষতা, যুদ্ধে অপলায়ন, দান এবং ঈশ্বরভাব অর্থাৎ নিজেকে নিয়ন্ত্রক ভাবা ক্ষত্রিয়ের স্বভাবজাত কর্ম্ম।

দেখুন আমরা সবাই মানুষ হিসেবে জন্ম গ্রহণ করেছি, অর্থাৎ দুর্লভ মনুষ্য দেহ লাভ করেছি। এই মনুষ্যদেহ আর কিছু নয়, এটি একটি সাধনক্ষেত্র বিশেষ । যেহেতু মনুষ্য দেহেই একমাত্র সাধনক্রিয়া করা সম্ভব, তাই মহাত্মাগণ বলে থাকেন, এই মনুষ্য জন্ম পেয়েও যিনি আত্মজ্ঞান লাভের চেষ্টা না করেন, তিনি আত্মঘাতী। কিন্তু আমাদের বিড়ম্বনা হচ্ছে, মিথ্যাবস্তুকে সত্যভেবে তার পিছনে ছুটে আমরা অধোগতির দিকে অগ্রসর হচ্ছি। আর যত অধোগতি হচ্ছে আমাদের ক্লেশ ততো বেড়ে যাচ্ছে।
যাই হোক, এর আগের শ্লোকে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কিছু স্বভাবজাত কর্ম্মের কথা বলেছেন। এই সব স্বভাবজাত কর্ম্ম বা গুন আসলে এমন সব মানুষের মধ্যে দেখা যায়, যাঁরা সাধনজগতের উত্তম অবস্থায় অবস্থান করেন। কিন্তু কথা হচ্ছে, সবাই তো আর সাধনজগতের পরাবস্থায় থাকেন না, বা যেতেও পারেন না। কেননা এই অবস্থা কেবলমাত্র জন্ম-জন্মান্তরের যোগ-সাধকের মধ্যেই দেখা যায়। আমাদের মধ্যে এমনকিছু মানুষ আছেন, যাঁরা হয়তো সাধনার উচ্চ পর্য্যায়ে পৌছননি, কিন্তু তার স্বভাবের মধ্যে এমন কিছু গুন্ আছে, যা তাকে সাধনার মধ্যম-স্তরে উন্নীত করেছে।
আমরা শুনেছি, স্বভাবজাত কর্ম্ম আমাদের সংস্কার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ সংস্কারের বশে আমরা যে সমস্ত কর্ম্ম করে থাকি, তাকেই স্বভাবজাত কর্ম্ম বলা হয়ে থাকে । এর আগে আমরা সাত্ত্বিক (ব্রাহ্মণ) প্রকৃতির মানুষের স্বভাবজাত কর্ম্মের কথা শুনেছি। কিন্তু যাদের মধ্যে খানিকটা সাত্ত্বিক ভাব, আবার বেশিটা রজোগুণের প্রভাব থাকে তাদের ক্ষত্রিয় বলে সম্মোধন করা হয়েছে।
ক্ষত্রিয় বলতে আমাদের মধ্যে একটা ধারণা আছে, যারা যুদ্ধ করে বেড়ায় বা যুদ্ধের প্রবৃত্তি যার স্বভাবজাত, যে প্রতিরোধ করতে পারে, প্রতিবাদ করতে পারে । অনেক সময় আমরা দেখেছি, যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে ক্ষত্রিয় বলে সম্মোধন করেছেন।

আসলে ক্ষত্রিয়ের সঙ্গে বাহ্যিক যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই। ক্ষত্রিয় হচ্ছে আমাদের তেজঃশক্তি। এই তেজঃশক্তির প্রভাবে মানুষের মধ্যে দেখা যায়, শৌর্য্য, তেজ, ধৈর্য্য, কর্ম্মদক্ষতা, যুদ্ধে অপলায়ন, দান এবং ঈশ্বরভাব। ক্ষত্রিয় হচ্ছেন এই ক্ষেত্রের (দেহ-ইন্দ্রিয়-মন-বুদ্ধি) মালিক।

সাধন জগতে এমন কিছু সাধককে দেখা যায়, যাঁরা অষ্টপ্রহর ক্রিয়ার মধ্যে অবস্থান করতে পারেন - একেই বলা হয় শৌর্য্য। ক্রিয়া করতে করতে এঁদের মধ্যে যোগ বিভূতি-স্বরূপ তেজের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এঁরা সহজেই যোগবিভূতি সম্পন্ন হতে পারেন। এই তেজের ফলেই এদের অন্তঃশক্তির বিকাশ ঘটে থাকে। যদিও এই তেজঃশক্তির বিকাশ যোগসাধনের উদ্দেশ্য নয়। বরং ঋষি পতঞ্জলি বলেছেন, এই বিভূতিগুলোকে উপেক্ষা করে সাধনপথে এগিয়ে যেতে হয়। তবে একথাও ঠিক এই যোগ বিভূতির প্রকাশ থেকে বোঝা যায়, যে সাধনক্রিয়া ঠিক ঠিক পথে এগুচ্ছে । এদের মধ্যে আত্মস্থিতির ভাব দীর্ঘায়িত হতে শুরু করে একসময়। এই যে আত্মস্থিতির ভাব দীর্ঘসময় ধরে রাখার অভ্যাস একে বলে ধৃতি। এখন সাধকের লক্ষ স্থির হয়ে গেছে, এবং লক্ষ্যে স্থিত হতে পেরেছেন। এই ধৃতি লাভের ফলেই, সাধক ক্রিয়ার পরাবস্থায় স্থিতি লাভ করেছেন। অর্থাৎ ইনি এখন আজ্ঞাচক্রে অবিচ্ছেদ ভাবে অবস্থান করছেন। এই যে সাধনক্রিয়া এতে স্থির হতে গেলে, নিজেকে একটু উগ্র স্বভাবের মধ্যে প্রবেশ করাতে হয়। এই স্বভাবের সাধক কখনো সময় নষ্ট করতে চান না। সারাক্ষন ক্রিয়াতেই লেগে থাকেন, তাকে একে বলা হয় চতুর বা দক্ষতা সম্পন্ন। এরা সাধনপথ থেকে কখনো পলায়নের কথা চিন্তা করেন না। বরং যত কষ্ট সহ্য করতে হোক না কেন, এঁরা কিছুতেই সাধনপথ পরিত্যাগ করেন না। এইজন্য যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন ক্ষস্ত্রীয় স্বভাবের মানুষ অপলায়ান-পরায়ণ। এঁরা বিষয়াদির প্রতি নিস্পৃহ হয়ে যান। এমনকি অন্যদেরকে এই সাধনমার্গে আনবার জন্য বা বলা যেতে পারে, মানুষকে সৎপথে আনবার জন্য ক্রিয়া-পদ্ধতি যা তিনি এতদিনে আয়ত্ত্বে এনেছেন, তা দান করতে কুন্ঠাবোধ করেন না। এরাই তাই জগতে গুরু, মঙ্গলকারী বলে পরিচিত হন। এদের মধ্যে থাকে ঈশ্বর ভাব। অর্থাৎ এঁরা হৃদয়গ্রন্থিতে অবস্থানের স্বাদ পেয়েছেন, এমনকি হৃদয়গ্রন্থি ভেদ করে আজ্ঞাচক্রে স্থিত হয়েছেন। এঁরা তখন নিজেকে ঈশ্বর ভাবতে শুরু করেন, ঈশ্বরসম হয়ে যান । অর্থাৎ নিজের মধ্যেই এরা পুরুষোত্তমকে অনুভব করেন, দেখতে পান। এঁরা তখন আর সাধারণ মানুষ থাকেন না, এদের মধ্যে যেমন ব্রহ্মভাব জেগে ওঠে তেমনি এঁরা জগৎকে ব্রহ্মময় দেখেন।

যোগশাস্ত্র বলে থাকে, এই ক্ষত্রিয়ের তেজ সমুৎপন্ন করতে গেলে, আমাদের অপানে প্রাণের, বা প্রাণে অপানের নিরন্তর আহুতি দিয়ে বৈশ্বানর অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করতে হবে। তবেই আমরা ক্ষত্রিয়গুন সম্পন্ন, বা তেজঃ-সম্পন্ন হতে পারবো।

ওম নমঃ শ্রী বাসুদেবায়।
তারিখ : ০৭.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৪৪
কৃষি-গৌরক্ষ্য-বানিজ্যং বৈশ্যকর্ম্ম স্বভাবজম
পরিচর্য্যাত্মকং কর্ম্ম শূদ্রস্যাপি স্বভাবজম। (১৮/৪৪)

কৃষি, গোরক্ষা, বাণিজ্য, বৈশ্যগনের স্বভাবজাত কর্ম্ম এবং সেবামূলক কর্ম্ম শূদ্রদের স্বভাবজাত।

তমোগুণের সঙ্গে যদি রজোগুণের আধিক্য হয়, তবে মানুষ বৈশ্য স্বভাবের হয়ে থাকে। যোগেশ্বর ভগবান বলছেন, এদের কর্ম্ম হচ্ছে কৃষি, গোরক্ষা ও বাণিজ্য।
এখন কথা হচ্ছে কৃষিকৰ্ম্ম কাকে বলে ? যিনি দেহরূপ ক্ষেত্রকে কর্ষণ দ্বারা উন্নত করেন, অর্থাৎ এই দেহ-ক্ষেত্রকে ফল দানের উপযুক্ত করতে পারেন, তিনিই কর্ষণ করছেন। প্রাণক্রিয়াই কর্ষণ ক্রিয়া। দেহরূপ ক্ষেত্রে এই কর্ষণক্রিয়া করলে, দেহ-প্রকৃতির জড়ত্ব চলে যাবে। তখন দেহরূপ ক্ষেত্রে স্বভাবের পরিবর্তন হবে।
যোগেশ্বর বলছেন, গোরক্ষা করতে হবে। গো শব্দে জিহ্বা এবং ইন্দ্রিয়। জিহ্বাকে তালূমুলে রেখে প্রাণায়াম করলে প্রাণের মধ্যে সূক্ষ্মতা আসে, প্রাণের বিশুদ্ধি হয়। তখন ইন্দ্রিয়গুলোর যে বিষয়মুখীভাব তা অন্তর্মুখী হতে শুরু করে। ইন্দ্রিয়গুলো যখন বিষয়মুখী ছিলো, তখন সে অখাদ্য কুখাদ্য চর্ব্বন করছিলো। অর্থাৎ মনের মধ্যে তখন বিষয়চিন্তা প্রবাহিত হচ্ছিলো। আবার দেখুন গো-পালন ঠিক ঠিক মতো না হলে, কৃষিকার্য্য ঠিক ঠিক মতো হবে না। তাই গো-পালন যথার্থ ভাবে করতে হবে। তাহলে কর্ষণক্রিয়া ভালোভাবে হবে। এই কর্ষণের ফলে মাটির নিচে যা চাপা ছিলো, অর্থাৎ আমাদের যে পুরানো সংস্কার স্বভাবের মধ্যে মিশে ছিলো, তা উপরের দিকে উঠতে থাকে। তখন সংস্কারগুলোকে ধরা যায়। সংশোধনের চেষ্টা করা যায়। আর এই সংশোধনের চেষ্টা ফলে ধীরে ধীরে জ্ঞান ও শান্তির উন্মেষ ঘটে। কর্ষণক্রিয়া ঠিক ঠিক মতো হলে, ভালো ফসল হতে পারে। অর্থাৎ আমাদের নতুন নতুন শুভ সংস্কারের জন্ম হতে পারে। কিন্তু এই অবস্থার বিড়াম্বনা হচ্ছে, মন থেকে বিষয় তৃষ্ণা সহজে যায় না, অর্থাৎ ফলাকাঙ্খ্যা থাকে। এই ফলাকাঙ্খ্যাই বাণিজ্য। প্রকৃতির মধ্যে যতক্ষন তমঃ ও রজঃ গুন্ থাকবে, ততক্ষন অন্তঃকরণ নির্ম্মল হতে পারে না। ফলাকাঙ্খ্যা-রহিত হতে পারে না। তবে এই কৃষিকার্য্যের ফলে অর্থাৎ জিহ্বাকে তালূমুল রেখে প্রাণক্রিয়ার দ্বারা সাধন-তেজ প্রজ্জ্বলিত হতে পারে। এই হচ্ছে বৈশ্য।

শূদ্র বলতে আমরা বুঝি যারা সেবার কার্য অর্থাৎ অন্যের পরিচার্য্য করে থাকে। দেখুন এই সেবার ভাব না থাকলে, গুরুসেবা, গুরুভক্তি, গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা না থাকলে, তিনি সাধনক্রিয়ার সন্ধান পাবার অধিকারী হন না। যার মধ্যে আত্মম্ভরী ভাব, তিনি গুরুর কাছে কখনো মাথা নত করতে পারেন না। দেখুন এই ত্রিগুণময়ী প্রকৃতির মধ্যে জীবসকল হাবুডুবু খাচ্ছে। এখান থেকে বেরুতে গেলে, যতক্ষন আপনি অসহায় না হচ্ছেন, যতক্ষন আপনার ভিতরে আকুতি না জাগছে, যতক্ষন আপনার মধ্যে ব্যাকুলতা না আসছে, ততক্ষন আপনি আচার্য্যের সন্ধান পাবেন না। কারন যতক্ষন মানুষ নিজে থেকে লড়াই করবার ক্ষমতাবান মনে করে, ততক্ষন সে নিজেই লড়াই করে। নদীর স্রোতের সঙ্গে যে যত লড়াই করতে থাকে, সে তত ডুবে যেতে থাকে। যখন নদীর স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেবেন, তখন স্রোত আপনাকে ভাসিয়ে রাখবে। মরা নদীতে ভেসে থাকে, জ্যান্ত ডুবে যায়। তো সাধকের মধ্যে শূদ্রভাব অর্থাৎ সেবার মনোভাব না এলে, সাধনজগতের ক্রিয়ার অধিকারী হওয়া যায় না। তাই সাধন ক্রিয়ার অধিকারী তিনিই হতে পারেন, যার মধ্যে শূদ্রভাব বা সেবার মনোভাব আছে।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ০৮.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৪৫

স্বে স্বে কর্ম্মণি-অভিরতঃ সংসিদ্ধিং লভতে নরঃ
স্বকর্ম্মনিয়তঃ সিদ্ধিং যথা বিন্দতি তচ্ছৃণু। (১৮/৪৫)

নিজ নিজ কর্ম্মে অভিরত ব্যক্তি সিদ্ধি লাভ করে থাকেন। স্বধর্ম্মনিষ্ঠ হলে কিভাবে মানুষ সিদ্ধি লাভ করে তা শোনো।
আত্মজ্ঞান লাভের জন্য প্রত্যেককে একটা স্বাভাবিক ক্রোম অনুসরণ করতে হয়। প্রকৃতি প্রদত্ত এই শরীর ২৪ তত্ত্বের সমাহার। এগুলো হচ্ছে পাঁচ কর্ম্মেন্দ্রীয়, পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রীয়, পাঁচ ভূত, পাঁচ তন্মাত্র, ও মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহঙ্কার। আবার এই প্রকৃতির মধ্যে আছে ত্রিগুণের সমাহার। তিন গুন্ বিবিধ মিশ্রনের কারনে মানুষের স্বভাবজাত কর্ম্ম নির্দিষ্ট করে থাকে। এই স্বভাবজাত কর্ম্ম এর মুলে আছে পূর্বপূর্ব জন্মের সংস্কার। অর্থাৎ পূর্বপূর্ব জন্মে আমাদের যাকিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা সংস্কার আকারে সঞ্চিত হয়ে আছে। এই সঞ্চিত কর্ম্ম আমাদের কর্ম্মশায়-এর মধ্যে পরিপাক হচ্ছে। এই পরিপাকের ফলে কর্ম্ম একসময় কর্ম্মফল দানে উন্মুখ হয়। তখন আমাদের ভোগদেহ উৎপন্ন হয়, আবার এই ভোগদেহে কর্ম্মভোগ সম্পন্ন হলে আমাদের কর্ম্মদেহ উৎপন্ন হয়। এই কর্ম্মদেহ যখন প্রকৃতির গুনত্রয়ের সংস্পর্শে আসে, তখন আবার বিবিধ কর্ম্মের উৎপত্তি হয়। কাল থেকে কালান্তর ধরে, এই প্রক্রিয়াই চলছে। আর এই ঘানির মধ্যে সর্ষ্যের মতো আমরা আমরা পিষ্ট হয়ে যন্ত্রনা ভোগ করছি। এই প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে বের করে আনার প্রচেষ্টার নাম সাধনক্রিয়া।

এই সাধনক্রিয়ার একটা ক্রোম আছে। এই ক্রোম হচ্ছে প্রথমে শূদ্রত্ব - সেবার মনোভাব, দ্বিতীয়ত দেহক্ষেত্রকে কর্ষণ করে, দেহশুদ্ধি ক'রে, দেহের জড়ত্ব নাশ ক'রা, অর্থাৎ বৈশ্যত্বলাভ। তৃতীয়ত প্রাণায়ামের দ্বারা তেজঃশক্তি বৃদ্ধি করা, যাকে বলা হয় ক্ষত্রীয়ভাব। সবশেষে প্রাণবায়ুকে সুষুম্না বাহিত করে মনকে বিষয়বিমুখ করা, ও সত্যজ্ঞানে অর্থাৎ আত্মস্থ হওয়া। এই হচ্ছে সাধনক্রম।

এবার যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, স্বধর্ম্মে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে সিদ্ধি লাভ হবে। এখন কথা হচ্ছে সিদ্ধিলাভ বলতে কি বোঝায়, আর কিভাবেই বা সিদ্ধি লাভ হবে ? সিদ্ধিলাভ বলতে ক্রিয়ার পরাবস্থায় ইচ্ছেরহিত হওয়া বোঝায় । আর সিদ্ধিলাভের উপায় সম্পর্কে সোজা কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, সদ্গুরুদেব যখন যা নির্দেশ দেবেন, উপদেশ দেবেন, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেই সিদ্ধি লাভ হবে। এখন কথা হচ্ছে সাধনক্রিয়ার যেমন একটা ক্রোম আছে, প্রকার ভেদ আছে, তেমনি সাধকের মধ্যেও প্রকারভেদ আছে। সাধকের মধ্যে শক্তির তারতম্য আছে। আমরা এর আগে শুনেছি, জিহ্বাকে তালুমুলে রেখে প্রাণায়ামের অভ্যাস করতে হবে। এখন সত্য হচ্ছে, গুরুদেব বললেও, সবার মধ্যে এই জিহ্বাকে তালুমুলে রাখা সম্ভব হয় না। জিহ্বাকে উল্টে তালূমুল স্পর্শ করা বহুদিনের অভ্যাসের ফলেই হয়ে থাকে। আবার এমন দেখা যায়, কারুর কারুর জিহবা একটু মোটা। ফলত তার পক্ষে জিহ্বাকে উল্টানো প্রথম দিকে সম্ভব হয় না। ঋষি নারদ যখন দস্যু রত্নাকরকে "রাম" নাম জপ করতে বলেছিলেন, তখন তার গলা দিয়ে সেই স্বর উচ্চারণ হচ্ছিলো না।
আবার গুরুর উপদেশের মধ্যেও শিষ্যের বুদ্ধির তারতম্য অনুযায়ী, জ্ঞানের উন্মেষ ঘটে। যেমন বীজ তেমন গাছ। যার যেমন লক্ষ, তার বিচার হয় তেমন, আর সিদ্ধি অর্থাৎ তেমনই ফল হয়ে থাকে।
এক্ষেত্রে ভালো মন্দের কোনো প্রশ্ন নেই, দেবতা বা অসুরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। দেবরাজ ইন্দ্র ও অসুররাজ্ বিরোচন (এঁরা দুইভাই) লোকমুখে শুনেছিলো, আত্মাকে জানলে, সকল কামনা পূর্ন হয়, সকল লোক লাভ করা যায়। তো আত্মাকে জানবার উদ্দেশ্যে দুজনেই পিতা প্রজাপতি ব্রহ্মার কাছে উপস্থিত হলেন। আত্মার কথা জিজ্ঞেস করতেই প্রজাপতি একপাত্র জল আনতে বললেন, আর জলপাত্রের দিকে তাকাতে বললেন। দুজনেই জলপাত্রের দিকে তাকাতেই নিজেদের চেহারার প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলেন। ব্রহ্মা বললেন, এই-সেই। একথা শুনে দুজনেই দেহকে আত্মা মনে করে শরীরের সুখের নিমিত্ত খাওয়া-দাওয়া, আমোদ-আল্লাদ ইত্যাদি করতে লাগলেন। প্রজাপতি বুঝলেন, এদের চিত্ত এখনো শুদ্ধ হয়নি, এরা ব্রহ্মজ্ঞানের জন্যও আসেনি। এদের উদ্দেশ্য ছিল কাম চরিতার্থ করা, লোকসকল জয় করা আর ভোগ করা।
তো প্রথম কথা হচ্ছে, আপনি কি উদ্দেশ্য নিয়ে সাধন ক্রিয়া করতে চাইছেন, তার উপরেই আপনার বিচারশক্তি ক্রিয়া করবে। এইজন্য প্রথমে দরকার নিজের লক্ষ স্থির করা। এর পরের পদক্ষেপ হচ্ছে চিত্তকে নির্ম্মল করা। আর নির্ম্মল চিত্তে একসময় প্রশ্ন জেগে ওঠে যা শুনেছি আর যা বুঝেছি তা সত্য তো ? অন্তরের জিজ্ঞাসা নিয়ে গুরুমুখী হয়ে গুরুর পরিচার্য্যা করা। যার হৃদয়ে একবার জিজ্ঞাসা জেগেছে, বিচারের নির্ম্মল প্রদীপ যার বুদ্ধিতে প্রজ্বলিত হয়েছে, তিনি সত্যকে না জানা পর্যন্ত শান্ত হতে পারেন না। এইজন্য ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলেছিলেন, ঈশ্বরের শেষ করতে নেই। জিজ্ঞাসা, সংশয় এমনকি ভয়ের অনুভূতি সাধনার প্রথম সোপান। এই সংশয় থেকেই বিচার শুরু হয়, একসময় বৈরাগ্য আসে। সংশয় থেকে আসে সত্য, আর ভয় থেকে অভয় লাভ হয়।

যাইহোক, এখন গুরুর নির্দেশ অনুযায়ী জিহ্বাকে ওল্টানো গেলো না. এতে করে সে নতুন সাধনপথের নির্দেশ পেলেন না। কিন্তু কেউ যদি জিভ তালূমুল স্থাপন করতে না পারেন, তথাপি গুরুর আদেশ অনুসারে শুধুই প্রাণায়াম করেন, আর জীব ওল্টাতে নিরন্তর চেষ্টা করেন, তাহলেও তার সাধনার উন্নতি হবে। দেখুন সাধনক্রিয়া কেবল লক্ষে পৌঁছোবার বাহন বিশেষ। কিন্তু বাহনবীনা লক্ষে পৌঁছনো যাবে না এমন নয়, নিরন্তর লক্ষে স্থির থাকাই বড়ো কথা। মুক্তি কর্ম্মের দ্বারা নয়, মুক্তি হয় জ্ঞানের দ্বারা। কিন্তু কর্ম্মই জ্ঞান সংগ্রহে সাহায্য করে থাকে। সাধনক্রিয়া করতে করতে বিষয়কর্ম্ম ত্যাগ হয়। ঠিক তেমনি প্রাণক্রিয়া দ্বারা প্রাণ সুষুম্নায় প্রবেশ করলেই বাহ্যক্রিয়া আপনাআপনি চলে যায়। বাহ্য কর্ম্ম মনের ক্রিয়া বিশেষ কিন্তু প্রাণকর্ম্ম মনের নয়। সাধনক্রিয়া মনকে প্রাণের সঙ্গে মিলিত করবার নিরন্তর অভ্যাস। যাই হোক এসম্পর্কে আমরা পরবর্তিতে যোগেশ্বরের শ্রীমুখে শুনবো।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ০৯.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৪৬

যতঃ প্রবৃত্তিঃ-ভুতানাং যেন সর্ব্বমিদং ততম
স্বকর্ম্মণা তম-অভ্যর্চ্চ্য সিদ্ধিং বিন্দতি মানবঃ । (১৮/৪৬)

যা হতে জীবসমূহের উৎপত্তি ও জীবের কর্ম্ম প্রচেষ্টা, যিনি এই বিষয় পরিব্যাপ্ত হয়ে রয়েছেন, মানুষ স্বীয় কর্ম্ম দ্বারা তাঁর  অর্চ্চনা বা সেবা করে সিদ্ধি লাভ করে থাকে। 

একটা জিনিস আমাদের মেনে নিতে হবে, যে আমাদের মধ্যে আছে দুটো সত্ত্বা একটা পরিবর্তনশীল, বিনাশশীল  আর একটা অপরিবর্ত্তনীয় অবিনাশী । এই অবিনাশী সত্ত্বা হচ্ছেন আত্মা। এই আত্মার কোনো ক্রিয়া নেই। ইনি  অকর্ত্তা। যেটা পরিবর্তনশীল অর্থাৎ প্রাণীক সত্ত্বার ক্রিয়া আছে।  এই প্রাণীক সত্ত্বা কখনোই ক্রিয়াহীন  হতে পারে না।  আবার আত্মা আছেন বলেই মন সংকল্প করতে পারছে। এই বিরাট বাহ্যজগৎকে মন ব্যক্ত করতে পারছে। এই মন যখন সংকল্প ত্যাগ করে আত্মস্থিত হতে পারে, তখন সে কর্ম্মহীন হয়ে যায়। 

যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবার সিদ্ধি লাভের  উপায়ের কথা বলছেন। দেখুন সিদ্ধি কথাটার অর্থ হচ্ছে পরিনাম। এই সিদ্ধি অনেক ভাবে হতে পরে,  কেউ জন্মসিদ্ধ।  এরা  পূর্ব জন্মের সাধনক্রিয়ার ফলে এই জন্মে স্বভাবসিদ্ধ পুরুষ রূপে ফুটে উঠেছেন। মাদকদ্রব্য, শিকড়বাকর, এমনকি রাসায়নিক দ্রব্য সেবনের ফলেও একধরনের সিদ্ধি দেখা যায়।  কেউ আবার মন্ত্রসিদ্ধ।  অর্থাৎ মন্ত্রের দ্বারা সিদ্ধি লাভ করেছেন। কেউ আবার দীর্ঘকাল তপস্যার ফলে সিদ্ধিকে করতলগত করেছেন। কেউ আবার ধ্যান সমাধির দ্বারা সিদ্ধি লাভ  করে থাকেন। মোট কথা সিদ্ধি হচ্ছে একটা পরিনাম, অর্থাৎ একজাতের জিনিষকে অন্য জাতে  পরিণত করে দিতে পারে সিদ্ধি। ঠিক তেমনি এই সিদ্ধি দ্বারাই  সাধারণ মানুষ মহামানবে পরিণত হতে পারে।  মানুষই  দেবতা হয়ে উঠতে পারে। 

এখন কথা হচ্ছে - বেশিরভাগ মহাত্মাগণ বলে থাকেন, ধর্ম্ম আচরণের দ্বারা এই সিদ্ধি লাভ সম্ভব হতে পারে। আসলে প্রকৃতিতে ধর্ম্ম অধর্ম্ম বলে কিছু নেই, আছে একটা কর্ম্মপ্রবাহ। যেমন জল আপন গতিতে প্রবাহিত হয়। সূর্য তাপ  দেয়, মেঘ বৃষ্টি দেয়। এর মধ্যে ভালো বা মন্দ ধর্ম্ম বা অধর্ম্ম বলে কিছু নেই। এখন আপনি এই তাপ, জলকে অর্থাৎ প্রকৃতির প্রবাহকে যা আটকে রাখে, সেই আবরণ, বাধাস্বরূপ  আলকে যদি সরিয়ে দিতে পারেন, তবে জল স্বচ্ছন্দে প্রবাহিত হবে। প্রকৃতিতে অশুদ্ধি  বলে কিছু নেই, বাধা বা প্রবৃত্তি যখন নিবৃত্ত হবে, তখন সব শুদ্ধ। 

দেখুন  ইচ্ছে পূরণের জন্য আমরা সবাই কর্ম্ম করে থাকি। আর এই ইচ্ছে পূরণের জন্যই প্রকৃতির প্রবর্তন হয়েছে। এখন কথা হচ্ছে এই ইচ্ছেটা কার ? ইচ্ছে কার হতে পরে ?  ইচ্ছে হতে পারে তার, যার মধ্যে   চেতনা আছে।  অচেতন পদার্থের কখনো ইচ্ছে বলে কিছু থাকবার কথা নয়। তাই ইচ্ছে হচ্ছে চেতন পুরুষের।  কিন্তু এই ইচ্ছে পূরণের জন্য যে প্রয়াস বা ক্রিয়া তা রয়েছে প্রকৃতির আয়ত্ত্বে। পুরুষ নিষ্ক্রিয়, তাই অপরিণামী। আর প্রকৃতি হচ্ছে ক্রিয়াশীল, তাই পরিণামী। ইচ্ছেরুপ বীজ যতক্ষন  প্রকৃতির গর্ভে নিহিত না হচ্ছে, ততক্ষন ইচ্ছেপূরণের কোনো সম্ভাবনা নেই। ইচ্ছের বীজটি যখন প্রকৃতিতে নিহিত হয়, প্রকৃতি তখন সেটিকে লালন-পালন ক'রে বড়ো  করে তোলে, ফুলে ফলে ভরিয়ে তোলে। অর্থাৎ ইচ্ছের চরিতার্থতা হয়। তো ইচ্ছে হচ্ছে পুরুষের, কিন্তু এই ইচ্ছে পরিণতি লাভ করে, প্রকৃতির গর্ভে। এখন প্রকৃতির এই যে ফল্প্রসব, তাকে যদি কেউ ঠেকাতে চায়, তবে ইচ্ছেরুপ বীজরোপন বন্ধ  করতে হবে। এখন আমার ইচ্ছেরূপ বীজ-বপন  থাকবে,  আর তার ফল হলেই আমরা অনুযোগ করবো, দোষারোপ করবো, কেন প্রকৃতি এমন ফল দান  করলো, তা হবে মূর্খামি। 
এখন কথা হচ্ছে, ইচ্ছেকে কিভাবে সংযত করা যায় ? দেখুন সবার মধ্যে ভালো মন্দ দুই-ই  আছে, আমাদের মধ্যে যেমন আছে ক্রোধ, হিংসা, দ্বেষ তেমনি আছে প্রেম, ভালোবাসা। যখন মনের মধ্যে কোনো অবাঞ্চিত বৃত্তির উদয়   হচ্ছে, তখন যদি আমরা চিত্তে বিপরীত ভাব জাগিয়ে তুলতে পারি, তবে আমাদের অবাঞ্চিত ভাবের নিস্পত্তি হবে। প্রথম দিকে এই বিপরীত তরঙ্গের উত্থান ঘটানো কঠিন মনে হতে পরে, কিন্তু নিরন্তর অভ্যাসের দ্বারা এই কঠিন কাজ সহজ হয়ে যেতে পারে।  

ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, "সতিমূলে তদ্বিপাক জাত্যায়ুর্ভোগাঃ" (২/১৩) ।  "তে হ্লাদপরিতাপফলাঃ পুন্যাপুণ্য   হেতুত্বাৎ "(২/১৪)। কর্ম্ম সংস্কার রূপ মূল থেকেই জাতি, আয়ু, ও ভোগের  উৎপত্তি। পুণ্য কর্ম্মসংস্কারে সুখফল, আর অপূণ্য সংস্কারে দুঃখফল  প্রদান করে থাকে। তমোগুণের প্রাবল্য হেতু অজ্ঞান, অধর্ম্ম, অনৈশ্বর্য্য, অবৈরাগ্যের দিকে ঝোঁক , আবার সত্ত্বগুণের প্রাবল্য হেতু ধর্ম্ম, ঐশ্বর্য্য, বৈরাগ্যের প্রবণতা। আবার এই দুই গুনের ছোটাছুটিকে নিয়ন্ত্রণ করছে রজোগুণ। এই ত্রিগুণের খেলা চলছে সংসারে। ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে সত্ত্বগুনের  পরাকাষ্ঠা দেখা যায়, তখন আসে বিবেকজ্ঞান। আর এই জ্ঞানের ফলেই আসে আমাদের আকাঙ্খিত সিদ্ধি। তখন শুধু তাঁকেই  জেনে, তাঁরই উপাসনা করে, তাঁরই সেবা করে মুক্তি।  অন্য কোনো পথ নেই। যোগেশ্বর  ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন,  মানুষ স্বীয় কর্ম্ম দ্বারা তাঁর  অর্চ্চনা বা সেবা করে সিদ্ধি লাভ করে থাকে।  

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়। 
       
তারিখ : ১০.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৪৭

শ্রেয়ান স্বধর্ম্মো বিগুণঃ পরধর্ম্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ
স্বভাবনিয়তং কর্ম্ম কুর্ব্বন নাপ্নোতি কিল্বিষম (১৮/৪৭)

স্বধর্ম্ম দোষযুক্ত হলেও উত্তমরূপে অনুষ্ঠিত পরধর্ম্ম অপেক্ষা তা শ্রেয়। স্বীয় স্বভাবের অনুকূল কাজ করে, মানুষ পাপভোগী হয় না।

যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, স্বধর্ম্মে স্থিতি শ্রেয়। এই স্বধর্ম্ম ব্যাপারটা কি ? আর পরধর্ম্মই বা কি ? স্বধর্ম্ম হচ্ছে আত্মধর্ম্ম অর্থাৎ আত্মাতে স্থিতি। এই স্বধর্ম্ম বা আত্মাতে স্থিতি লাভের জন্য যখন মানুষ সচেষ্ট হয়, তখন তাকেই বলে স্বধর্ম্ম রক্ষা বা স্বধর্ম্ম পালন। আর অন্য দিকে পরধৰ্ম্ম, হচ্ছে ইন্দ্রিয়ে আসক্তি। ইন্দ্রিয়ে আসক্তি মানুষের ধর্ম্ম নয়, এটি পশুর ধর্ম্ম, তাই পরধর্ম্ম।

আমাদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন, যে বর্ণে বা কূলে সে জন্ম গ্রহণ করেছে, তার জন্য শাস্ত্র নির্দিষ্ট কিছু কর্ম্ম আছে, তাকেই স্বধর্ম্ম বলা হয়। আবার অন্য একদল আছেন, যারা মনে করেন, যার যেমন স্বভাব সেই স্বভাব ধর্ম্মই তার নিজস্ব ধর্ম্ম। আর এই স্বভাব অনুযায়ী তার কর্ম্ম করা উচিত। এই দুই ধরনের প্রবক্তারাই নিজেদের অজ্ঞাতসারে অধঃপতিত হচ্ছেন।

আত্মাতে স্থিত হয়ে পরমানন্দ লাভই জীবকুলের স্বধর্ম্ম। আর এই পরিস্থিতি লাভের জন্য, যে প্রচেষ্টা তাকেই বলে ধর্ম্মপালন বা ধর্ম্মরক্ষা। অধিকাংশ মানুষের এই আত্মস্থিতি নেই, প্রায় প্রত্যেকেই বহির্মুখী হয়ে ইন্দ্রিয়সুখের জন্য ব্যস্ত। কিন্তু এই আত্মস্থিতির উপায় অবলম্বন করে, যদি সে স্বধর্ম্ম পালন করে, তবে তার মধ্যে থেকে পাশবিক প্রবৃত্তির নাশ হতে পারে। পরের ধর্ম্ম অর্থাৎ ইন্দ্রিয়াসক্তি বাস্তবিক ভয়াবহ ফল প্রদান করে থাকে। মানুষ যতদিন সে এই পরধর্ম্ম থেকে বিরত না হচ্ছে, ততক্ষন তার আত্মজ্ঞানের কোনো সম্ভাবনা নেই। আগুনের ধর্ম্ম উত্তাপ ও ঔজ্বল্য , জলের ধর্ম্ম তারল্য ও শীতলতা, মানব ধর্ম্ম আত্মস্থিতি, পশুধর্ম্ম ইন্দ্রিয়তৃপ্তি।
মানুষের চতুর্বিধ সাধন - ধর্ম্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ। অর্থাৎ আত্মস্থিতি, যোগৈশ্বর্য্য লাভ, কাম-বাসনার ক্ষয় ও মুক্তি।
উপনিষদ (মাণ্ডুক্য) বলছেন, প্রজ্বলিত অগ্নির গোলক থেকে যেমন সহস্র-কোটি অগ্নি স্ফুলিঙ্গ নির্গত হয়, তেমনি সেই অক্ষর ব্রহ্ম থেকে নানান রূপ-গুন্-ভাবযুক্ত জীবকুলের উৎপন্ন হচ্ছে। আবার একসময় সেই ব্রহ্মে ফিরে যাচ্ছে। এই ব্রহ্ম থেকেই প্রাণশক্তি, মনঃশক্তি, চিন্তাশক্তি, ইন্দ্রিয়সকল, আকাশ, বায়ু, অগ্নি জল, পৃথিবী উৎপন্ন হয়েছে। আর এসবই হচ্ছে ব্রহ্মের সংকল্পের কারনে। তাঁর মধ্যেই সব আছে, তাই তাঁর কোনো কিছুরই প্রয়োজন নেই। তথাপি এই অহৈতুকী ইচ্ছেটিই আত্মার স্বধর্ম্ম। আর এই কারণেই তাঁরই শক্তি অর্থাৎ মায়াশক্তি পুরুষের ইচ্ছেপূরণের জন্য ক্রিয়াশীল। প্রাণের স্পন্দনহেতু ব্রহ্ম বিশ্বরূপে নিজেকে প্রকাশ করছেন। আবার প্রাণের স্থিরতা হেতু, নিজের মধ্যে সমস্ত বিশ্বকে সমাহিত করছেন। তো প্রাণের দুটো ভাব, একটা স্থির ভাব , আর একটা চঞ্চল ভাব। এই স্থির ভাবই আত্মস্বরূপ আর অস্থির ভাবেই জীব। এই স্থিরতা ও চঞ্চলতা দুইই প্রাণের ধর্ম্ম। এই প্রাণের দিকে যার লক্ষ্য নেই, তিনি ভববন্ধনে আবদ্ধ। অথচ প্রাণের ক্ষনিকের অনুপস্থিতি তাকে ব্যাকুল করে তোলে। তো যার জন্য জীবকুল ব্যাকুল, যার অভাব সে একমুহূর্ত সহ্য করতে পারে না, সেই প্রাণের দিকে তার খেয়াল নেই। এই প্রাণকে কখনো সে গুরুত্ত্ব দেয় না। এমনই নির্বোধ আমরা। এই প্রাণ প্রতিনিয়ত আমাদের শরীরের মধ্যে প্রবেশ করছে, আবার বেরিয়ে যাচ্ছে। প্রাণের এই প্রবেশ ও প্রস্থান নিয়ত-ক্রিয়া যতদিন চলছে, শরীরের ক্রিয়া, ততদিন মনের অস্তিত্ত্ব, ততদিন মনের চিন্তা শক্তি, ততদিন মনের উৎফুল্লতা, মনের নাচান-কোঁদন। তো প্রাণের শক্তিতেই শরীরের শক্তি, মনের শক্তি। আবার এই প্রাণের স্থিরতা যতদিন না হচ্ছে, ততদিন মনের বিশ্রাম নেই, শান্তি নেই। এই জন্য সাধকের মধ্যে যখন শান্তির খোঁজের ইচ্ছে জাগে, তখন তিনি প্রাণের শরণাপন্ন হন।

মন যতদিন এই ইন্দ্রিয়মুখী ছিল, অর্থাৎ পরধর্ম্মে ব্রতী ছিল, ততদিন মনের শান্তি আসেনি। এবার সে গুরু আদিষ্ট হয়ে সাধনক্রিয়ার করতে এসে নিজ ধর্ম্মের দিকে লক্ষ্য পড়লো। এইবার স্বধর্ম্ম (প্রথম দিকে শ্বাস-পপ্রশ্বাসের দিকে লক্ষ্য রাখা) পালন শুরু হলো। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, প্রথম দিকে হয়তো শরীর স্থির হতে পর্বে না, এমনকি মনও এই শ্বাসের দিকে যথাযথভাবে স্থির হতে পারবে না, তাই প্রথম দিকেই স্বধর্ম্ম পালন ঠিকঠিক মতো নাও হতে পারে। তথাপি স্বধর্ম্ম অর্থাৎ সাধনক্রিয়া থেকে বিচ্যুত হতে নেই। নিরন্তর এই প্রাণায়াম ইত্যাদির অভ্যাস চালিয়ে যেতে হয়। আর এই স্বধর্ম্ম ক্রিয়া চলতে থাকলে কিছুদিনের মধ্যে বিষয়ের প্রতি আসক্তি কমে যাবে। আর যাঁর বিষয়ের দিকে দৃষ্টি নেই তার আবার পাপ কোথায়, পাশেই বা কোথায় ? তখন ইচ্ছের মধ্যে বাসনা পুড়ে চাই হয়ে যাবে। একটি সময় আসবে এই ইচ্ছের আগুনও থাকবে না। তো যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, বিষয়কর্ম্ম বা ইন্দ্রিয়ে আসক্তি অর্থাৎ পরধর্ম্ম অপেক্ষা প্রাণকর্ম্ম যা আসলে স্বধর্ম্ম যদি ত্রুটিযুক্তও হয়, তথাপি তা অধিক শ্রেয়। স্বধর্ম্মে শুধু শান্তি শান্তি আর শান্তি।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ১১.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৪৮ 

সহজং কর্ম্ম কৌন্তেয় সদোষমপি ন  ত্যাজ্যেৎ 
সর্ব্বারম্ভা হি  দোষেণ-ধুমেনাগ্নিরিব আবৃতাঃ। (১৮/৪৮)

হে কৌন্তেয়, স্বভাবনুরূপ কর্ম্ম দোষযুক্ত হলেও, ত্যাগ  করতে নেই। অগ্নি যেমন ধোঁয়ার  দ্বারা আবৃত থাকে, তেমনি কর্ম্ম মাত্রেই দোষযুক্ত। 

কর্ম্ম তা দৃষ্ট হোক বা অদৃষ্ট হোক, কর্ম্ম মাত্রেই ফল প্রদান করে থাকে, তাই তা দোষযুক্ত। যোগেশ্বর  বলছেন, স্বভাব জাত  যে কর্ম্ম তা ত্যাগ করতে নেই, হোক না তা হাজার এক দোষযুক্ত। এই দোষযুক্ত কর্ম্ম থেকেই আমাদের দোষ-অংশ পরিত্যাগ করে, কর্ম্মের গুন্-অংশ গ্রহণ করতে হবে। ধোঁয়া যেমন অগ্নিকে ঢেকে রাখে, বুদ্ধিমান শীতের হাত থেকে বাঁচতে এই ধোয়াকে ত্যাগ করে, অগ্নির উত্তাপকে গ্রহণ করে থাকে। তেমনি কর্ম্মের দোষকে বাদ  দিয়ে গুনকে আয়ত্বে আনতে  হবে। 

এখন কথা হচ্ছে, সহজ কর্ম্ম বলতে আমরা কি বুঝি। সহজ কর্ম্ম হচ্ছে আমাদের জন্ম-জন্মান্তরের সহজাত কর্ম্ম, যা আমরা জন্ম সূত্রে পেয়ে থাকি। সহজ কর্ম্ম দিয়েই আমাদের কর্ম্মজীবন শুরু হয়। এই সহজ কর্ম্ম যার পক্ষে করা সম্ভব  না হয়, তার জীবন শুরুই হতে পারে না ।  তো জন্মসূত্রে প্রথম যে ক্রিয়া আমরা শুরু করি, তা হচ্ছে প্রাণক্রিয়া। এইজন্য প্রাণক্রিয়া হচ্ছে জীবের  সহজ কর্ম্ম। জীব যতদিন না মাতৃগর্ভে থেকে ভূমিতে নেমে আসে, ততদিন তার নিজস্ব প্রাণক্রিয়া থাকে না। তখন মায়ের প্রাণক্রিয়ার সাহায্যে মাতৃগর্ভে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উৎপত্তি ও বর্ধন করে থাকে। অর্থাৎ এইসময় তার মধ্যে প্রাণপ্রবাহ থাকে কিন্তু প্রাণক্রিয়া থাকে না।  আর এই যে প্রাণপ্রবাহ তা চলে সুষুম্না নাড়ীপথ ধরে। যখন শিশু ভূমিষ্ট হয়, তখন প্রাণপ্রবাহ বহির্মুখী অর্থাৎ ইড়া ও পিঙ্গলা দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে। আর প্রাণের যে অন্তঃপ্রবাহ তা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে শুরু করে। সুষুম্না নাড়ীর  মুখ শ্লেষ্মা-পিত্ত-কফ  ইত্যাদি দ্বারা বন্ধ  হয়ে যায়। এই যে শ্লেষ্মা-পিত্ত-কফ যতক্ষন না কঠিন আকার ধারণ করে, ততক্ষন সুষুম্না নাড়ীর দ্বার আধা খোলা আধা বন্ধ  থাকে। আর এই যে অর্থ উন্মীলন সুষুম্না নাড়ীপথ, এখানে  তখনও প্রাণপ্রবাহ  ধীর ধীরে চলতে থাকে।  আর ঠিক এই কারণেই, বেশ কিছুদিন, শিশুর মধ্যে পূর্ব্ব-জন্মের স্মৃতি জাগ্রত থাকে। যদিও এটি তার  তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থা। তাই শিশুর মধ্যে অনেক সময় বাহ্যিক কারন ছাড়াই, মুখে মৃদু হাসির বা কান্নার লক্ষণ প্রকাশ পায়।  ধীরে ধীরে সুষুম্না নাড়ীর মুখে আটকে থাকা শ্লেষ্মা-কফ-পিত্ত কঠিন হতে শুরু করে, এবং একসময় সুষুম্নার রন্ধ্রপথ সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ  হয়ে যায়। আর এই কারণেই, ধীরে ধীরে শিশু পূর্ব জীবনের স্মৃতি বিস্মৃত হয়ে যায়। তখন বাহ্য জগৎ তার কাছে ইন্দ্রিয়গোচর হতে থাকে। কিন্তু সংষ্কার থেকে যায়। ফলত যখনই জীবন সংশয় দেখা যায়, তখন সে উদ্বিগ্ন হয়ে যায়। মুরগির বাচ্চা, আকাশে চিলের আনাগোনা টের পেলে, ছটফট করতে থাকে। যদিও এই জীবনে তার এই অভিজ্ঞতা অর্থাৎ চিল দর্শন ঘটে নি। মায়ের কোলছাড়া (পড়ে  যাবার সম্ভাবনা) হলে শিশুর মধ্যে ভীতির ভাব জেগে ওঠে। 

যাইহোক, দিনদিন প্রাণবায়ু ইড়া-পিঙ্গলা নাড়ীতে স্বাভাবিক প্রবাহ শুরু করে, আর শিশুর মধ্যে সংসার অভিমুখী ভাব প্রবল হতে শুরু করে। এই যে প্রাণের অন্তঃপ্রবাহ এটা ছিল সহজ কর্ম্ম। এখন প্রাণ বহির্মুখী হলো শুরু হলো দোষযুক্ত কর্ম্ম। প্রাণের এই বহির্মুখী ভাব দোষযুক্ত হলেও, একে পরিত্যাগ করা সম্ভব নয়, উচিত-ও নয়। পরিত্যাগ করলে জীবপ্রবাহকে ধরে রাখা যাবে না। এমনকি আমাদের মধ্যে যে জ্ঞানের উন্মেষ ঘটে তা এই প্রাণের প্রবাহের করনেই ঘটে থাকে। বায়ু অন্তর্মুখী হলে, অন্তর্জগতের জ্ঞান, আর বহির্মুখী হলে, বাহ্যজ্ঞান। সাধন জগতের মানুষ এই অন্তর্জগতের জ্ঞানের পিয়াসী। তাই বায়ুপ্রবাহটিকে সে অন্তর্মুখী করতে চায়। আর বায়ু প্রবাহটিকে অন্তর্মুখী করবার প্রচেষ্টাই প্রাণায়াম। এই সাধনক্রিয়া অর্থাৎ প্রাণায়াম ইত্যাদি না অনায়াসসাধ্য, না সুখকর। তবুও যোগীপুরুষ প্রাণপ্রবাহের গতি অন্তর্মুখী করবার সতত প্রয়াস করে থাকেন। 

প্রথম দিকে এই সাধনক্রিয়া যেমন ঠিকঠিক মতো হবার নয়, তেমনি এতে মন বসানো সহজসাধ্য নয়। অনেক সময় মন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।  তথাপি এই সাধনক্রিয়া পরিত্যাগ করা উচিত নয়। কারন প্রাণক্রিয়া ব্যাতিত প্রাণকে অন্তর্মুখী করবার অন্য কোনো উপায় নেই। তাই বুঝি আর না বুঝি, ভালো লাগুক আর না  লাগুক, ঠিক ঠিক মতো হোক আর না হোক, নিরস লাগুক আর সরস লাগুক, এই ক্রিয়ার অভ্যাস চালিয়ে  যেতে হবে। সমস্ত কাজই প্রথম দিকে ত্রুটিমুক্ত নাও হতে পারে, দোষযুক্ত হতেই পারে, তথাপি শত কষ্ট  সহ্য করেও কার্য্যে  লেগে থাকতে হয়। আর যিনি কাজে লেগে থাকেন, তারই একসময় লেগে যায় - অর্থাৎ সাধনফল মিলতে শুরু করে। 

শিশুদেহে প্রাণ যখন বহির্মুখী হতে শুরু করে, দেহে তখন আত্মবোধ হতে শুরু করে। তখন দৈহিক কষ্ট আরম্ভ  হয়, অথচ দেহ তো অক্ষম - তাই শুধু কান্নাকাটি ছাড়া আর কিছুই করবার থাকে না। ভিতরের শান্তি থেকে সে বিচ্ছিন্ন আবার বাইরের সঙ্গেও সে খাপ  খাওয়াতে পারছে না। জীবের এই যে অসহায় ক্লেশকর অবস্থা একেই বলে তমঃ (শুদ্র) ভাব। তখন কষ্টের বোধ আছে, কিন্তু কষ্ট  নিরাময়ের ক্ষমতা নেই। এর পরে একসময় সে গুরুমুখী (মাতা-পিতা -ভ্রাতা-ভগ্নি) হয়। তখন সে বহির্মুখী হয়েও সে নিজেকে মানিয়ে নিতে শেখে। বিষয়-আনন্দ নিতে শেখে। নিজে থেকে কিছু কিছু কাজ করতে পারে। নিজের কষ্ট  নিজেই লাঘব করতে শিখে যায়। বাহ্যিক জ্ঞান আহরণ করতে শেখে। ধীরে ধীরে বয়স বাড়ার  সঙ্গে সঙ্গে,  একটা সময় আসে, যখন মানুষ বিষয়ের মধ্যে আর সুখ খুঁজে পায়  না।  বিষয়ভাবনা, বিষয় রক্ষা,  তাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলে। এইসময় দরকার হয়, দেহধারী সদ্গুরুর। তিনি তখন আবার তাকে অন্তর্মুখী হবার শিক্ষা প্রদান করেন। বিষয়বৃত্তি থেকে সরিয়ে, বাহ্যিক ধন উপাৰ্জন থেকে সরিয়ে অন্তরের  ধনের  সন্ধান করতে বলেন। এইসময় সাধক অনেক কিছু কল্পনা করতে থাকে, অনেক যোগৈশ্বর্য্যের স্বপ্ন দেখে। অর্থাৎ ফলাকাঙ্খী হয়ে সাধনক্রিয়ার দিকে মনোযোগী হয়। এইসময় হয় বৈশ্য ভাব অর্থাৎ তমঃ ও রজোগুণের মিশ্রণ দেখায় যায়। এর  পরে আসে ক্ষত্রিয় ভাব, অর্থাৎ আত্মজ্ঞান লাভের  জন্য যুদ্ধংদেহী  ভাব। এক্ষুনি চাই। সারাদিন-রাত আসনে বসে আছে। যেন উগ্র সাধনা - জলের মধ্যে, একপায়ে দাঁড়িয়ে, আহার-নিদ্রা  ত্যাগ করে, সাধনায় লিপ্ত হওয়া। বৈশ্য অবস্থায় সাধনার ভাব ছিলো  মৃদু, ক্ষত্রিয় অবস্থায় এই সাধনার মধ্যে এলো উগ্র ভাব। এর পরে সবশেষে আসে সাধনক্রিয়ার মধ্যে সাম্য ভাব। 

তো শুদ্র  অবস্থায় সাধনহীন, বৈশ্য অবস্থায় মৃদু সাধনা - এই অবস্থায় প্রাণবায়ুকে ধীরে ধীরে ওঠাতে হবে, আবার নামাতে হবে। তখন কোনো বলপ্রয়োগ চলবে না ।  এই অবস্থা কিছু দিন চলবার পরে, সাধকের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ সাধনায় রপ্ত থাকবার অভ্যাস গড়ে উঠবে, এমনকি শ্বাসের গ্রহণ ও নির্গমনের সময়কে বাড়িয়ে দিতে হবে।  অর্থাৎ ধীরে ধীরে দীর্ঘ সময় ধরে শ্বাস গ্রহণ, ও দীর্ঘসময় নিয়ে শ্বাস ত্যাগ করতে হবে।  এই অবস্থাকে যোগীপুরুষগন বলে থাকেন  বৈশ্য ভাব। এর পরে শ্বাসের উপরে বলপ্রয়োগ করতে হবে। শ্বাসকে একবার ভিতরে, একবার বাইরে আটকে রাখতে হবে। অর্থাৎ একবার অন্তরকুম্ভক , আর একবার বাহ্য-কুম্ভক  করতে হবে। তবে প্রথমে শুধু অন্তঃকুম্ভক করতে হবে সঙ্গে বন্ধ-ক্রিয়া।  এর ফলে শরীরের মধ্যে ,মনের মধ্যে একটা তেজের ভাব অনুভব হবে। এই ক্ষত্রিয় ভাবের সাধন কালে প্রবৃত্তি ও  নিবৃত্তির মধ্যে যুদ্ধ লেগে যাবে। তখন মনকে দুর্ব্বল করলে চলবে না। শরীরকেও সুস্থ-সবল রাখতে হবে। এইসময় শরীরে তেজস্কর পদার্থ ভক্ষণ অপরিহার্য। মনের মধ্যে কেবলমাত্র শুভচিন্তার উদ্রেগ করতে হবে। এর জন্য নিয়ম করে গুরুর উপদেশ শুনতে হবে। সেইমতো চলতে হবে।  নতুবা শরীর  দুর্ব্বল হয়ে রোগগ্রস্থ হয়ে পড়বে। এমনকি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে  যেতে পারে । যাইহোক,  যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করলে চলবে না। হয় যুদ্ধে জয় করে স্বর্গলাভ, নয়তো বীরগতি প্রাপ্ত হবে। এখান  থেকেই শুরু হবে যোগীর মধ্যে নানান রকম যোগৈশ্বর্য্য অর্থাৎ বিভূতি।

নিম্ন চক্র  থেকে  উর্দ্ধ চক্রে আরোহন করতে হবে। এই যে এক চক্র  থেকে আরো এক চক্রে  আরোহন, একেই  বলে যুদ্ধে জয়। মেরুদন্ড স্থিত যে ছয় চক্র (মূলাধার,স্বাধিষ্ঠান, মনিপুর,অনাহত বিশুদ্ধি ও আজ্ঞা) সেখানে মনের ও প্রাণের অবাধগতি সম্পন্ন হতে হবে। এই চক্রগুলোর সঠিক অবস্থান জেনে, সেখানে বারংবার যাতায়াত করতে হবে। এবং চক্রে  স্থিতিকাল অনাহত ও আজ্ঞা চক্রে থেকে বাড়িয়ে দিতে হবে। 

এই অবস্থায় সাধকের মধ্যে তত্ত্বজ্ঞান জন্মে। অর্থাৎ শরীরের কোথায় কোথায় কোন ভূতের (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ , ব্যোম) প্রাধান্য তা উপল্বদ্ধিতে আসে। একসময় ক্ষত্রিয় ভাবের শেষ হয়, তখন সাধক সর্ব্ব-বিষয়ে স্থির হয়ে যান। তখন ইচ্ছেরহিত মনের মধ্যে কোনো সংকল্প না থাকায়, সমস্ত ইন্দ্রিয় নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। এই অবস্থাকেই জিতেন্দ্রিয় বলা হয়। এইসব কথা আমরা প্রবর্ত্তীতে শুনবো। 
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়। 

তারিখ : ১২.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৪৯ 

অসক্ত-বুদ্ধিঃ সর্ব্বত্র জিতাত্মা বিগতস্পৃহঃ 
নৈষ্কর্ম্ম্য-সিদ্ধিং পরমাং সন্ন্যাসেন-অধিগচ্ছতি।  (১৮/৪৯)

যিনি সর্ব্ব বিষয়ে অনাসক্ত, জিতেন্দ্রিয়, নিস্পৃহ, তিনি সন্ন্যাসরূপে কর্ম্মফল ত্যাগের দ্বারা নৈষ্কর্ম্মসিদ্ধি লাভ থাকেন। 

এর আগের শ্লোকে শুনেছি, কর্ম্মের দোষ-অংশ পরিত্যাগ করে, গুন্-অংশ গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু 
এটা কি করে সম্ভব।  কর্ম্ম করলে, তার ভালো মন্দ অর্থাৎ ফল যাই হোক না কেন, তা কর্ত্তার উপরে  বর্ত্তাবে । এখন কর্ম্মফলের ভালোটুকু নেবো, আর খারাপটুকু নেবো না তা কি করে হবে ? এই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন এবার, যোগেশ্বর  শ্রীকৃষ্ণ। বলছেন, যিনি সন্ন্যাসী তিনি এমনটাই করে থাকেন। অনুসন্ধিৎসু মন যখন বিশেষ বিষয়ের উপরে ধ্যান করে, তখন মন অন্য সমস্ত বিষয়কে অগ্রাহ্য করে। আত্মস্থিত মনও  বাহ্যিক সমস্ত বিষয়কে বোধের বাইরে ঠেলে দেয়। এইজন্য প্রথম দিকে বারবার প্রত্যাহারের অভ্যাস করতে হয়। অর্থাৎ মন যখনই লক্ষ্য বস্তু আত্মা থেকে বেরিয়ে বাহ্যিক বিষয়চিন্তা করতে থাকে, তখন মনকে সেখান  থেকে ফিরিয়ে নিয়ে এসে, আত্মাতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হয়। এই ক্রিয়া একরকম যুদ্ধ করবার সামিল। এই যুদ্ধে জয় লাভ করতে গেলে, বারবার মনকে শাসন করতে হয়। মন যত ইন্দ্রিয়-বিষয়ে ধাবিত হয়, মনকে তত ইন্দ্রিয়াতীত বিষয়ে স্থির করতে হয়। এই কাজ সাহজসাধ্য না হলেও নিরন্তর অভ্যাসে, একসময় মন বশে  আসে। আর ইন্দ্রিয়সকল তখন অবশ হয়ে যায়। তো ইন্দ্রিয় অবশ হয়ে গেলে, মন বিষয় স্পৃহা ত্যাগ করে। এই যে প্রত্যাহার ক্রিয়া, এটি স্বকর্ম্ম। এই স্বকর্ম্মই ঈশ্বর অর্চনা। এই ঈশ্বর অর্চনা করতে করতে একসময় আত্মস্থিতি লাভ হয়। তখন কর্ম্মসকলে অনাসক্তি আসে। কর্ম্মফলেও তার আকাংখ্যা থাকে না। এই সময় তাঁর দ্বারা যাকিছু কৃত হয়, তা কেবল নৈষ্কর্ম্ম। এই কর্ম্মে না আছে, ইচ্ছে, না আছে ফলাকাঙ্খ্যা। কিন্তু কর্ম্ম বিরতি নয়। সকামী ব্যক্তিদের কর্ম্মের সাফল্যে বা অসাফল্যে তৃপ্তি বা অতৃপ্তি বোধ হয়ে থাকে।  আনন্দ বা নিরানন্দ বোধ হয়ে থাকে। কিন্তু আত্মস্থিত ব্যক্তির কর্ম্মে স্পৃহাহীন অবস্থা থাকায়, কর্ম্মের সাফল্য বা অসাফল্য তাকে বিচলিত করতে পারে না। কিন্তু আত্মস্থিতির  যে আনন্দ তা থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হন না। ফলতঃ তাঁর  মধ্যে যে  নিরবিচ্ছন্ন আনন্দ প্রবাহ তার কোনো ব্যাঘাত ঘটে না। 

তো প্রথমে আসন-প্রাণায়াম ইত্যাদি দ্বারা প্রাণ-মন-শরীরকে স্থির করতে হবে। এর পরে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় থেকে মনকে ফিরিয়ে এনে আত্মাতে স্থির করতে হবে। এই ক্রিয়া সাধককে ধীরে ধীরে জ্ঞানের উপল্বদ্ধির ক্ষমতা বাড়িয়ে দেবে। ধৃতির কারনে, আত্মস্থিতির সময়সীমা বাড়তে থাকবে। জ্ঞানের প্রতি নিষ্ঠা বাড়তে থাকবে। এই জ্ঞাননিষ্ঠাই  সাধনক্রিয়ার পরাবস্থা। এই জ্ঞাননিষ্ঠায় ইচ্ছেমতো অধিক থেকে অধিকতর সময় স্থিতি লাভ করতে পারলেই সাধকের নৈষ্কর্ম্মসিদ্ধি লাভ হয়। 

এই অবস্থায় সাধকের মধ্যে সংসারের ধন-জনের প্রতি আসক্তি থাকে না। স্ত্রী-পুত্র-পরিবার-বাড়ি-গাড়ি-টাকা-পয়সা এগুলো আর তাকে আকর্ষণ করে না। এসব তখন তুচ্ছ বলে মনে হয়। মন সঙ্কল্পবিহীন থাকায় সমস্ত কর্ম্মই নিরাসক্ত রূপে সংগঠিত হয়ে থাকে। এই অবস্থার স্থিতিকাল যত  বাড়তে থাকে, তত সাধকের জীবনের প্রতি, জীবন ধারনের প্রতি, এমনকি জন্ম-মৃত্যুর প্রতিও তার কোনো আগ্রহ বা অনাগ্রহ থাকে না। এইসময় ইন্দ্রিয়সকল নিস্পৃহ, মন  চিন্তাশূন্য,  বুদ্ধি বিচারক্রিয়া থেকে অব্যাহতি নিয়ে বিশ্রাম করে। অর্থাৎ  বুদ্ধি তখন স্থির হয়ে যায়। আর এই স্থির শুদ্ধ বুদ্ধিতেই জ্ঞানের আলোতে ব্রহ্মদর্শন হয়ে থাকে। তখন সমস্ত কিছুই ব্রহ্মময় - তুহি - তুহি। ওম-তৎ -সৎ। 

সিদ্ধিং প্রাপ্তো যথা ব্রহ্ম তথা-আপ্নোতি নিবোধ মে 
সমাসেনৈব  কৌন্তেয় নিষ্ঠা জ্ঞানস্য যা পরা।  (১৮/৫০)

হে কৌন্তেয়, সিদ্ধি প্রাপ্ত ব্যক্তি যেভাবে ব্রহ্ম প্রাপ্ত হয়, সংক্ষেপে আমরা নিকট শ্রবণ করো যা জ্ঞানের চরম নিষ্ঠা।  

তো ইন্দ্রিয়-মন-বুদ্ধি মিলিত হয়ে ক্রিয়া সহযোগে বিষয়জ্ঞান হয়। যখন এগুলো কাম্য-ক্রিয়া থেকে বিরত হয়, তখন নৈষ্কর্ম্ম  সিদ্ধি হয়। জ্ঞানের আলোতে ব্রহ্মদর্শন, আর জ্ঞানের নিঃশেষে পরমাস্থিতি, পরমাসিদ্ধি। এই জ্ঞানালোক তিন ভাবে ধরা দেয় , জ্ঞাতা, জ্ঞেয়, জ্ঞান। আত্মচৈতন্য  আমাদের বুদ্ধি-মন-ইন্দ্রিয়-শরীর ভেদ করে সকলকে চৈতন্যযুক্ত করছে। চৈতন্য এই শরীর-ইন্দ্রিয়-মন বা বুদ্ধির নয়। তবু প্রাণকে বাহন করে, সেই এইসবের মধ্যে প্রবেশ করে থাকে আত্মা বা চৈতন্য ।  আর তাঁরই  উপস্থিতিতে এগুলোকে চৈতন্যবান বলে ভ্রমজ্ঞান হচ্ছে। এমনকি এই যে শরীর-মন-ইন্দ্রিয় সকলের মধ্যে আত্মজ্ঞান (ভ্রমজ্ঞান) হচ্ছে, সেই জ্ঞানও  কেবল মাত্র সেই তাঁরই  উপস্থিতিতে সম্ভব হচ্ছে। দেখুন আত্মজ্ঞান যেমন নতুন কিছু নয়, কোনো ক্রিয়ার ফলে এই আত্মজ্ঞানের জন্ম হচ্ছে ব্যাপারটা এমনও  নয়। আত্মজ্ঞান স্বতঃসিদ্ধ যা আচ্ছাদিত হয়ে পড়েছিল, সাধন প্রযত্নের ফলে প্রকাশমান  হচ্ছে। চিন্তারহিত হতে পারলেই, এই অবস্থার মধ্যে প্রবেশ করা যায়। 

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।  

তারিখ : ১৩.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৫১-৫৩

বুদ্ধ্যা বিশুদ্ধয়া যুক্তো ধৃত্যা-আত্মানং নিয়ম্য চ
শব্দাদীন বিষয়ান-চ-ত্যক্ত্বা রাগ-দ্বেষৌ ব্যুদস্য চ। (১৮/৫১)

বিশুদ্ধ বুদ্ধিযুক্ত হয়ে ধৃতির দ্বারা মনকে নিয়মিত করে শব্দাদি বিষয় সমূহকে ত্যাগ করে ও রাগ দ্বেষকে পরিত্যাগ পূর্ব্বক। ........

যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবার ব্রহ্ম সাক্ষাতের উপায় সম্পর্কে বলতে শশুরু করলেন। ব্রহ্ম সাক্ষাতের অধিকারী হতে গেলে প্রথমে বিশুদ্ধ বুদ্ধির অধিকারী হতে হবে। এখন কথা হচ্ছে বিশুদ্ধ বলতে কি বোঝায় ? বিশুদ্ধ বুদ্ধিতে আত্মা ভিন্ন অন্য কোনোকিছু থাকবে না, এমনকি আত্মা সম্পর্কে কোনো সংশয়ও থাকবে না। দ্বিতীয়তঃ - ধৃতি - সাধনক্রিয়ার নিরন্তর অভ্যাসের দ্বারা সাধকের সমস্ত বৃত্তির রুদ্ধ অবস্থা হয়। প্রাণক্রিয়ার ফলে একসময় প্রাণ স্থির হয়, তখন মন, ইন্দ্রিয়সকল, শরীর স্থির হতে শুরু করে। এই যে স্থির অবস্থা, এইসময় মন-প্রাণ আত্মাতে স্থিত হয়। প্রথম দিকে এই আত্মস্থিতির ভাব ক্ষনিকের জন্য হয়ে থাকে। ধীরে ধীরে সাধনার সঙ্গে সঙ্গে এই স্থিরকাল বাড়তে থাকে। এই যে আত্মস্থিতির কাল ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা এটি যার সাহায্যে তাকে বলা হয় ধৃতি। অর্থাৎ ধারণ করবার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে থাকে ধৃতি। তৃতীয়তঃ - শব্দাদি অর্থাৎ শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ যে বিষয় সংস্পর্শে হয়ে থাকে তার লেশমাত্র থাকে না। অর্থাৎ সমস্ত বাহ্য বিষয় তখন গ্রাহ্যের মধ্যেই আসে না। চতুর্থতঃ - রাগ, দ্বেষ ত্যাগ - বিষয়ের প্রতি আসক্তিবশতঃ আমাদের রাগ-দ্বেষ হয়ে থাকে। তো যাঁর বিষয়বোধের বিলোপ হয়েছে, তার মধ্যে রাগ-ই বা কোথায়, বিরাগ-ই বা কোথায়। যখন আসক্তির নাশ হয়েছে তখন দ্বেষ বলে কিছু থাকতেই পারে না। এগুলো, এই চতুর্বিধ ভাব ব্রহ্ম-সাক্ষাৎকারের উপযুক্ত যোগীর লক্ষণ।

বিবিক্তসেবী লঘ্বাশী যতবাক্কায়মানসঃ
ধ্যানযোগপরো নিত্যং বৈরাগ্যং সমুপাশ্রিতঃ। (১৮/৫২)

নিৰ্জনস্থানবাসী মিতাহারী বাক্য-শরীর-মনকে সংযত করে, নিত্য ধ্যান পরায়ণ হয়ে, বৈরাগ্যকে সম্পূর্ণ আশ্রয় করে। .....
ব্রহ্ম সাক্ষাতের জন্য নিজেকে তৈরী করে এবার সাধনকর্ম্মের জন্য উদ্যোগী হতে হবে। প্রথমতঃ একটা নিৰ্জন জায়গা বেছে নিতে হবে। প্রাচীন কালে সাধক এই কারণেই, কোলাহল বর্জ্জিত স্থান অর্থাৎ পাহাড়ের গুহা, জঙ্গলে অথবা নদীর তীরে কুটির বেঁধে, অবস্থান করতেন। সেখানে তারা ফল-মূল আহার করতেন, আর নিবিষ্ট চিত্তে ধ্যানাদির অভ্যাস করতেন। এযুগে এই ব্যবস্থা প্রায় অসম্ভব। তার কারন হচ্ছে, যেখানেই আপনি যান, সেখানে খাদ্যের অর্থাৎ ফলমূলের প্রাকৃতিক সম্ভার আজ আর নেই বললেই চলে। তো খাদ্যের জন্য আপনাকে গৃহস্থের উপরে, অথবা যাত্রীসাধারণের উপরে নির্ভর করতে হয়, যা স্বাধীনচেতা সাধকের পক্ষে বিড়ম্বনার কারন। অথচ শরীর রক্ষা না হলে কোনো সাধন-ভজন সম্ভব নয়। তাই নিজের বাসস্থানের মধ্যেই একটা নির্জন স্থানের ব্যবস্থা নিজেকেই করে নিতে হয়। অথবা গভীররাতে অর্থাৎ সাধারণ মানুষ যখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন থাকে, পৃথিবী যখন জন-কোলাহল রোহিত হয় তখন ধ্যানাদির অভ্যাস শ্রেয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বিড়ম্বনা অর্থাৎ সাধনার বিপত্তি শুধু তো বাইরে থেকে আসে না, আসে নিজের ভিতর থেকেও। অর্থাৎ আমাদের মন ও ইন্দ্রিয়সকল সাধনক্রিয়ার প্রধান বাধা। তাকে বশে রাখা রাখবো কি করে ? মন ও ইন্দ্রিয়গুলোকে বশে রাখতে গেলে, যেমন আহারশুদ্ধি দরকার, তেমনি দরকার প্রাণক্রিয়ার নিয়মিত অভ্যাস। প্রাণায়ামের অভ্যাস করতে করতে একসময় দেখবেন, প্রাণ স্থির হতে শুরু করেছে। প্রাণের মধ্যে একটা ছন্দ এসেছে। মনের মধ্যে একটা সাম্য ভাব এসেছে। "আমি-আমার" - এর প্রতি যে তীব্র আসক্তিবোধ তা যেন কেটে যেতে শুরু করেছে। আপনাতে-আপনি থাকার একটা অভ্যাস গড়ে উঠেছে। তখন শত জন-কোলাহলের মধ্যেও যেন নিজেকে আলাদা করবার উপায় রপ্ত করতে পেরেছেন। এই নিঃসঙ্গ অবস্থা পুরোপুরি নিজস্ব অনুভূতি। আর এই অবস্থা সংসারে থাকলেও হতে পরে, আবার জঙ্গলে পাহাড়ে গিয়েও হতে পারে। তবে যেখানেই থাকুন, নিজের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিন। তবেই আপনি জনশূন্য অবস্থা, নির্জনতা উপলব্ধি করতে পারবেন।
যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, আহারে সংযম আনতে হবে। সহজপাচ্য খাবার সাধকের পক্ষে শুধু উপকারী নয়, আবশ্যিক। অতিভোজন, গুরুপাক খাবার, আলস্য, অতি-নিদ্রা এগুলো অধ্যাত্ম জীবনের পক্ষে বাধাস্বরূপ। এসব কথা আমরা আগেও বহুবার বহু মহাত্মার কাছে শুনেছি। কিন্তু আমাদের চৈতন্য হয় কৈ ? যারা নিরন্তর প্রাণক্রিয়া করেন, তাদের অতিনিদ্রা-রোগ দূর হয়ে যায়। বহু যোগীপুরষকে দেখেছি, আহার ও নিদ্রার জন্য ব্যতিব্যস্ত নন.। ধ্যানাবস্থাই তাদের ঘুমের সময় কমিয়ে আনে। ক্ষুধা তৃষ্ণাও যেন তাদের খুবই কম। আর এগুলোর জন্য তো বিশেষ কিছু যোগক্রিয়ার কথা বলা আছে। যদিও নিদ্রার স্বল্পতা হেতু, তাঁদের শরীর প্রায়শঃ ক্ষীণ হয়ে থাকে কিন্তু অসীম তাদের মানসিক ও শারীরিক বল।

আত্মজ্ঞান লাভ করতে হলে, শরীরে, মনে, সর্ব্বোপরি বাক্যের সংযম অভ্যাস করতে হবে।
শরীর সম্পর্কে যৌবনে আমাদের খুব দেমাক থাকে। দেখতে সুন্দর হলে তো কথাই নেই। কিন্তু আমরা যদি একটু স্থির হয়ে ভাবি, তাহলে দেখতে পাবো, শরীর নিয়ে গর্ব করা কত বোকামি। শরীর হচ্ছে যত দুঃখ কষ্টের কারন। ক্ষুধা , তৃষ্ণা এই শরীরের চাহিদা। আর এই চাহিদা মেটাতে আমরা সারা জীবন এই শরীরের প্রতি অত্যাচার করে থাকি। এই শরীর হচ্ছে একটা রোগের কারখানা। আর এর জন্য আমাদের কষ্টের শেষ নেই। কতবার যে ডাক্তারের কাছে যাই, কতনা ঔষধ সেবন করি, তার ঠিক নেই। যোগীপুরুষগন বলছেন, শরীর যত কষ্টের কারনই হোক না কেন, এই শরীরকে ছেড়ে আমরা একমুহূর্তের জন্য বাঁচতে পারি না। এই কথা মনে রেখে যদি আমরা প্রতিনিয়ত একটু আসন প্রাণায়ামের অভ্যাস করি, তবে আমাদের শরীরকে আমরা সংযত রাখতে পারি, সুস্থ সবল এমনকি নীরোগ রাখতে পারি। জরা নিয়মিত যোগের অভ্যাস করেন, তাঁরা আগাম শরীর খারাপের আভাস এমনকি মৃত্যুর আভাস পেতে পারেন। এসব কোনো ভৌতিক ব্যাপার নয়, এসব প্রত্যক্ষবৎ সত্য।

আবার মনের মধ্যে নানান রকম বিষয় চিন্তার উদয় হচ্ছে। আর এই বিষয়চিন্তাই মানুষকে নানান ভাবে উদ্দীপ্ত করে চলেছে। মানুষ পাগলের মতো বিষয়সুখের আশায় ঘুরে ঘুরে, একদিন ক্লান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ছে। তো আমরা যদি সারাদিনে ২৪ ঘন্টার মধ্যে অন্ততঃ একটি ঘন্টা, বিষয় চিন্তা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখে, ঈশ্বর চিন্তন করতে পারি, প্রাণের সঙ্গে মনকে আত্মস্থিত করতে পারি, তবে আমারা মনের সংযম করতে পারি। প্রাণায়ামের অভ্যাসের দ্বারা মনের সংযম হতে পারে।

আমাদের মধ্যে এক অভ্যাস আছে, আমরা বলি বেশী , শুনি কম। আমরা সব বিষয়ে বেশি কথা বলি। নিজেকে জাহির করবার জন্য, সমস্ত ব্যাপারেই নিজের মতকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। বুদ্ধিমান কম কথা বলেন। অনাবশ্যক কোনো কথাই বলা উচিত নয়। বাক সংযমের একটা শ্রেষ্ঠ উপায় হচ্ছে, জিহ্বাকে তালূমুলে রেখে শ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে মনকে বিভিন্ন চক্রে ভ্রমন করানো। এই বাক-সংযম করতে পারলে, যেমন আমরা আমাদের তেজঃশক্তির অনাবশ্যক ক্ষয় রোধ করতে পারি, তেমনি স্থির চিত্তে বিচারশক্তিকে বাড়াতে অর্থাৎ বুদ্ধিকে শুদ্ধ করে নিতে পারি।

যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, "ধ্যানযোগপরো নিত্যং বৈরাগ্যং সমুপাশ্রিতঃ" - অর্থাৎ নিত্যদিন ধ্যানের অভ্যাস ও যোগের অভ্যাস করবে। আমাদের মনের মধ্যে যে প্রতিনিয়ত বহু সংকল্পের উদয় হচ্ছে, এই সংকল্পকে রোধ করতে গেলে আমাদের যোগযুক্ত হতে হবে । যোগযুক্ত অর্থাৎ ঈশ্বরের সাথে যুক্ত হওয়া । আত্মস্থিত হতে গেলে যেমন প্রতিনিয়ত প্রত্যাহারের অভ্যাস করতে হবে, তেমনি মনকে একাগ্র করতে হবে। প্রাণের সংযম থেকে এই একাগ্রতা বৃদ্ধি হতে পরে। তো যোগেশ্বর বলছেন, প্রতিদিন ধ্যান-যোগের অভ্যাস করতে হবে।

সবশেষে বলছেন, বৈরাগ্যের কথা। বৈরাগ্য বলতে আমরা কি বুঝি। বৈরাগ্য বলতে আমরা বুঝে থাকি বিষয়সুখ থেকে নিজেকে সরিয়ে আনা। বৈরাগ্য হচ্ছে স্থূল বস্তুকে বিচারের সাহায্যে অসার জেনে, বস্তুর প্রতি উদাসীন বা অনুরাগবিহীন হতে হবে। কোনো কিছুর প্রাপ্তির আশা বা অপ্রাপ্তির নিরাশা ত্যাগ করতে হবে। বিষয়ে বিরক্তির ভাবই বৈরাগ্য, যা সাধন জীবনের সম্পদ ।
অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং পরিগ্রহম
বিমুচ্য নির্ম্মমঃ শান্তো ব্রহ্মভূয়ায় কলপ্তে। (১৮/৫৩)

অহঙ্কার , পাশবিক বল, দর্প, কাম, ক্রোধ, এবং পরিগ্রহ ত্যাগ করে, মমতাহীন ও বিক্ষেপশূন্য হলে ব্রহ্ম-সাক্ষাৎ লাভে সমর্থ হওয়া যায়।
যোগেশ্বর ভগবান আরো বলছেন, অহংকার, বল, দর্প, কাম , ক্রোধ, পরিগ্রহ ত্যাগ করতে হবে।
অহঙ্কার - দেহ ও ইন্দ্রিয়ে সমূহের মধ্যে যে আমি-আমার জ্ঞান তাকেই বলে অহঙ্কার। দেহ নশ্বর জেনে, এই দেহতে "আমি-আমার" ভাবের বিসর্জন দিতে হবে। অর্থাৎ দেহাত্মবোধের নিস্পত্তি করতে হবে। বল - বলতে বজায় সামর্থ। অসদ্বস্তু সংগ্রহে যে সামর্থ তাকে পরিত্যাগ করতে হবে। অর্থাৎ অসদ্বস্তু সংগ্রহে নিজের সামর্থের অপচয় করা চলবে না। দর্প - যোগের পথে যে বিভূতির প্রকাশ ঘটে থাকে, তাকে অগ্রাহ্য করতে হবে। বিভূতির কারনে সাধকের মনে যে দর্প আসলে তা সযত্নে পরিহার করতে হবে। কাম-ক্রোধ - অশুদ্ধ চিত্তে বিষয়-ভোগের অভিলাষ হয়। আর এই অভিলাষ পূরণে বাধা এলে, ক্রোধের জন্ম হয়। তো চিত্তকে শুদ্ধ করতে হবে - তবে আর বিষয়-ভোগের বাসনার উদ্রেগ হবে না। আর বিষয়ভোগের বাসনা না থাকলে, তৎ-জনিত ক্রোধের উৎপত্তি হবে না। পরিগ্রহ - শরীর ধারনের জন্য যতটুকু প্রয়োজন জন্য তার বেশী গ্রহণ করা চলবে না। এমনকি সঞ্চয়ের প্রবণতা ত্যাগ করতে হবে। নির্ম্মম অর্থাৎ মমত্ববিহীন হতে হবে। মমত্ত্ববোধ মানুষের সুখ-দুঃখের কারন হয়ে থাকে। এই মমত্ত্ববোধ থেকেই চিত্তের বিক্ষেপ ঘটে থাকে। শান্ত - সমস্ত অবস্থায় নিজেকে আত্মস্থিত করে রাখতে হবে। প্রাণ-মনকে শান্ত রাখতে হবে।

সাধন ক্রিয়া করতে করতে একসময় যোগী এইসব গুনের বা ভাবের মধ্যে প্রবেশ করেন। আমরা অনেক ভালো ভালো কথা জানি, এমনকি আমরা সবাই জানি কিসে ভালো হয়, আর কিসে মন্দ হয়। কিন্তু দুঃখের কথা হচ্ছে, যখন ব্যবহারিক জীবনে এইসব গুনের প্রয়োগের সময় আসে, তখন আমরা এই সব জ্ঞানের কথা ভুলে যাই। আমরা তখন বিমূঢ় হয়ে যাই। এই অবস্থা থেকে বেরুতে গেলে, যেমন একদিকে গুরুবাক্য শ্রবণ করতে হবে, গুরুবাক্যের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে, তেমনি গুরুর নির্দেশে সাধনক্রিয়ার অভ্যাস নিয়ম করে দীর্ঘকাল করে যেতে হবে। এর ফলে একটা দিন আসবে, যখন আমরা শ্রীকৃষ্ণ উক্ত এই নিয়ম-নির্দেশকে যথযথভাবে পালন করবার যোগ্য হয়ে উঠবো। তা না হলে এই শ্রীগীতা-বাক্য আমাদের কাছে কেবল কথার কথা হয়েই থাকবে। তবে আমরা বলবো, আমাদের এতো কিছু জানবার দরকার নেই , কেবল কিছুদিন আসন-প্রাণায়াম, ধারণা-ধ্যান-সমাধির অভ্যাস করলেই, এইসব কথার যথার্থতা উপলব্ধি ও পালনের যোগ্য হয়ে উঠবো। বই পড়ে কিছু হবে না, ভেবে কিছু হবে না, মুখস্থ করেও কিছু হবে না, কেবল সাধনক্রিয়ার অনুশীলন একসময় আপনাকে এইসব গুনের অধিকারী করে দেবে, একথা হলফ করে বলা যায়। তাই বলে ভাববেন না, শাস্ত্র গ্রন্থ পাঠের কোনো প্রয়োজন নেই। আপনি সাধন ক্রিয়া করতে করতে যাকিছু উপলব্ধি করছেন, সেগুলো যেন আপনার স্নায়ু দুর্বলতা থেকে না আসে। উপলব্ধির যথাযথ বিচার করে নিতে হয়। আপনার উপলব্ধির সঙ্গে যোগীপুরুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে কিনা, সেটা যাচাই করে নিতে পারবেন , যদি আপনার শাস্ত্রজ্ঞান থাকে। নতুবা আপনি মরীচিকাকে জল ভেবে দৌড়োতে থাকবেন।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ১৪.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৫৪-৫৫

ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্নাত্মা ন শোচতি ন কাঙ্খতি
সমঃ সর্ব্বেষু ভূতেষু মদ্ভক্তিং লভতে পরাম। (১৮/৫৪)

ব্রহ্মপ্রাপ্ত-লব্ধ প্রসন্ন আত্মার না থাকে শোক, না থাকে আকাংখ্যা। তখন তিনি সর্বভূতে সমদর্শী হয়ে আমাতে পরমা ভক্তি লাভ করেন।

যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবার "আমি-ব্রহ্ম" এই স্থির বুদ্ধিতে স্থিত ব্যক্তির অবস্থা বর্ননা করছেন। সাধন ক্রিয়ার পরাবস্থায় সাধক ব্রহ্মস্থিতি লাভ করেন - এমনটাই সমস্ত যোগশাস্ত্র বলে থাকে। সাধনার উত্তম অবস্থায় সাধক ব্রহ্মস্বরূপ বলে বোধ করেন। এই অবস্থায় তাঁর চিত্ত থাকে প্রসন্ন। এই অবস্থায় কোনো বস্তুর প্রাপ্তিতে বা অপ্রাপ্তিতে এমনকি প্রাপ্ত বস্তু নষ্ট হয়ে গেলেও তাঁর মধ্যে কোনো শোকের অভাস দেখা যায় না। আসলে এইসময় তিনি আকাংখ্যারহিত হয়ে থাকেন। তো যাঁর মধ্যে কোনো কিছুর জন্যই আকাংখ্যা নেই, তার মধ্যে শোকের আবহাওয়া কি ভাবে হবে ? মন-প্রাণ আত্মস্থিত থাকায়, তিনি সমদর্শী হয়ে যান। তার কাছে সবই সমান বলে বোধ হয়। এ কেবল বোধের খেলা, যা ছিল তাই আছে, কিন্তু সাধকের বোধে অন্যভাবে ধরা দিচ্ছে, যা সাধারনের কাছে দুর্বোধ্য। তাঁর মধ্যে অহেতুক আনন্দের শীতল প্রবাহ নিরন্তর হিল্লোল তুলছে। কেমন যেন একটা ঘোরের অবস্থা, একটা আচ্ছন্ন অবস্থা। মনের সমস্ত চিন্তা দূর হয়ে গেছে। তাই বলে মনে কোনো হা-হা-কার বা শূন্যতা আছে তা নয়। বরং মন যেন আনন্দের ভরপুর হয়ে আছে। একটা পূর্ণত্বের আভাস।

প্রথম দিকে সাধক এই অবস্থায় সারাক্ষন স্থিত থাকতে পারেন, তা নয়, কখনো কখনো তাঁর এই অবস্থা থেকে বুত্থান ঘটে থাকে। এই বুত্থিত অবস্থাতেও কিন্তু তার চিত্তের মধ্যে ব্যাকুলতা আসে না। এই অবস্থাতেও ব্রহ্মানন্দ অনুভব হতে থাকে এমনকি তখন তিনি সমদর্শী থাকেন। এই সময়েরও তার মধ্যে বিষয়সুখ-দুঃখ, বা মমত্ববোধের অভাব ঘটে থাকে। এই অবস্থায় সমস্ত কিছুতে অনাসক্ত থাকলেও, সাধনক্রিয়ায় তার আসক্তি যায় না। তিনি তখনও সাধনক্রিয়াতেই আকৃষ্ট থাকেন। যোগক্রিয়া যত গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে অন্তঃকরণ ততো নির্মল হতে থাকে, চিত্তশুদ্ধি হতে থাকে। আসলে প্রাণের বেগ যতক্ষন না স্তিমিত হচ্ছে, ততক্ষন বাসনার স্পন্দন থাকবে। প্রাণের বেগ স্তিমিত হতে থাকবে, তত বাসনার স্পন্দন কমতে থাকবে। এইসময় মনের এতটাই বিস্তারলাভ ঘটে থাকে যে, জগৎরূপই আমি বলে অভিমান হয়। জগৎ ও আমির মধ্যে দূরত্ত্ব ঘুচে যায়। এই যে অভেদ ভাব একেই বলে পরাভক্তি। এই পরাভক্তিই জ্ঞান ও মুক্তির কারন হয়ে থাকে।

ভক্ত্যা মামভিজানাতি যাবান যশ্চাস্মি তত্ত্বতঃ
ততো মাং তত্ত্বতো জ্ঞাত্বা বিশতে তদন্তরম। (১৮/৫৫)

এই পরাভক্তি লাভ হলে সাধক - আমি স্বরূপতঃ কি বা কে তা তত্ত্বতঃ অবগত হন এবং এই ভাবে আমাকে জেনে তিনি আমাতে প্রবিষ্ট হন।

আমাদের অনেকের ধারণা হচ্ছে, ভক্তিতেই ভগবান লাভ হয়। একথা সর্ব্বাংশে সত্য। তবে অজ্ঞানের ভক্তি ভ্রমদর্শন করিয়ে থাকে। মরীচিকাকে জল ভেবে আত্মতৃপ্তি লাভ করে থাকে। এঁরা কখনোই মুক্তি-পথের সন্ধান পান না। অবশ্য এঁরা মুক্তির পিয়াসীও নয়। এঁরা বলে থাকেন, আমি মুক্তি চাই না, আমি তোমাকে চাই। আর এক্ষেত্রে তাঁরা যা পায়, তা হচ্ছে ভগবানের কল্পিত মূর্তি মাত্র, যার মধ্যে প্রাণের ছোঁয়া নেই। এঁরা জন্ম মৃত্যুর চক্র থেকেও রেহাই পায় না। যতক্ষন অদ্বৈত জ্ঞান না হচ্ছে, ততক্ষন ভগবানের স্বরূপ উপল্বদ্ধিতে আসে না। আসলে এই অদ্বৈত জ্ঞানই তত্ববিদের তত্ব - অর্থাৎ ভগবৎ স্বরূপ। "তত্ত্বং যজ জ্ঞানম-অদ্বয়ং" - শ্রীমদ্ভাগবৎ।
এখন কথা হচ্ছে, একমাত্র জ্ঞানই যদি ভগবান লাভের উপায় হয়, তবে আর এই সাধনক্রিয়া করে কি লাভ ? শাস্ত্র গ্রন্থ পাঠ করে, গুরুবাক্য শুনেই আমাদের জ্ঞান লাভ হতে পারে। আচার্য্য শঙ্করও তার বিবেক চূড়ামণি গ্রন্থে বলেছেন, বিচারের সাহায্যে পরমাত্মার জ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞান হতে পারে। একসময় অর্জ্জুনও প্রশ্ন তুলেছিলো - জ্ঞানই যদি উৎকৃষ্ট তবে তুমি আমাকে কেন এই ভয়ানক যুদ্ধকর্ম্মে উদ্দীপ্ত করছো ? আচার্য্য শঙ্কর বলছেন, পরমাত্মা বিষয়ে নিরন্তর চিন্তা প্রবাহিত করতে পারলে, পরমাত্মা বিষয়ে জ্ঞান হয়। জ্ঞানের প্রতি নিষ্ঠা আর কর্ম্মের প্রতি নিষ্ঠা পরষ্পর বিরুদ্ধ। তাহলে আমরা যে সাধনক্রিয়ার কথা বলছি, এসব করে কি লাভ ?

দেখুন জ্ঞান হচ্ছে স্বতঃসিদ্ধ। আর আত্মাই এই জ্ঞানতত্ত্ব। এই আত্মা স্বপ্রকাশ-স্বরূপ। তো যা স্বয়ং প্রকাশিত তাঁকে প্রকাশিত করবার চেষ্টা বৃথা। দেখুন এই যে প্রাণশক্তি যা আমাদের মধ্যে চেতনার উন্মেষ ঘটাচ্ছে, তা আসলে পরমাত্মার মায়াশক্তি। এই মায়া-শক্তি থেকেই মনের উৎপত্তি হয়েছে। আর মনের মধ্যে যে অবিরত কল্পনা বা সংকল্পের উদয় হচ্ছে তা এই প্রাণের স্পন্দন হেতু হয়ে থাকে। তো প্রাণের স্পন্দন হেতু আমাদের মনন শক্তি, বুদ্ধির দ্বারা নিশ্চয়াত্মক ভূমিকা নিয়ে থাকে। মনের মধ্যে যে কল্পনার উদয় হয়, তা সত্য বা অসত্য তা নির্ধারণ করে থাকে বুদ্ধি। অর্থাৎ আমাদের বুদ্ধির প্রভাবেই, বা বুদ্ধির কারনে, কোনো জিনিষকে আমরা সত্য বা অসত্য বলে মনে করি। এখন সাধনক্রিয়ার দ্বারা, আমরা যখন প্রাণের স্পন্দনকে নিরুদ্ধ করতে পারি, তখন আমাদের মননশক্তি বা আমাদের মনের কল্পনারাশি নির্মুল হয়ে যায়। আর কল্পনারাশি যখন মন থেকে নির্মূল হয়ে যায়, তখন মনের আয়নায় যাকিছু ফুটে ওঠে তাই আত্মার স্বাভাবিক অবস্থা। আত্মার স্বাভাবিক অবস্থা আগেও যা ছিলো এখনো তাই আছে, স্পন্দিত মনের আয়নায় যাকে নানান বিকৃত রূপে দেখা যাচ্ছিলো, এখন প্রাণ স্পন্দনহীন হওয়ায়, বুদ্ধি শুদ্ধ হওয়ায় আমার মনের আয়নায় যা ভেসে উঠছে তাই আত্মার স্বাভাবিক ভাব, প্রকৃত স্বরূপ।
মনের মধ্যে সংকল্প বিকল্পের উদয় হেতু আত্মা আমাদের কাছে অপ্রকাশিত। আবার আত্মার কারণেই মন-ইন্দ্রিয়াদি কর্ম্মক্ষম হয়েছে। আর এই মনের কল্পনা-সংকল্প-বিকল্প স্বরূপ যে আচ্ছাদন তা সরে গেলেই আত্মার স্বপ্রকাশ অনুভবে আসে। দেখুন আত্মাকে কেউ ঢেকে রাখতে পারে না। মেঘ আমাৰ চোখের সামনে, চোখে আমার কালো চশমা, তাই আমার কাছে সূর্য অস্পষ্ট, অপ্রকাশিত। এই মেঘ কেটে গেলে, বা চোখ থেকে চশমা সরিয়ে নিলেই স্বপ্রকাশ আত্মা স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের গোচরে আসতে পারে। সাধনক্রিয়া অর্থাৎ প্রাণক্রিয়া এই কারণেই প্রয়োজন। প্রাণকে নিস্পন্দিত করা, মনকে স্থির করা, বুদ্ধিকে স্বচ্ছ করা - এই হচ্ছে সাধনক্রিয়ার ফল। তো আত্মজ্ঞানের জন্য সাধনার প্রয়োজন। সাধন ব্যাতিত মনের বিকার যাবে না। চশমা তো চোখেই ছিলো , কিন্তু খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কারন মন ছিল চঞ্চল, বুদ্ধি ছিলো অস্বছ। মন যখন শান্ত হলো, বুদ্ধি যখন শুদ্ধ হলো, তখন চশমার কথা মনের মধ্যে ভেসে উঠলো।

তাই সমস্ত যোগশাস্ত্রকার বলছেন, প্রাণকে স্থির করো। প্রাণের স্থিরতায় মনের মননশক্তি থাকবে না। মন হবে চিন্তা রহিত। আর তখন তুমি আত্মস্বরূপে বিরাজ করবে। প্রাণের স্পন্দন হেতু, মন ইন্দ্রিয়সহযোগে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে ঘুরে ঘুরে মরছে। প্রাণের ধারা ইড়া-পিঙ্গলা থেকে সুষুম্না নাড়ীতে প্রবাহিত হোক। তখন কালের প্রভাব থেকে মুক্তি, সংসার থেকে মুক্তি, আত্মার অবিকারী স্বরূপে অবস্থা করাই মুক্তি। জীবাত্মা আর পরমাত্মার মধ্যে কোনো ভেদ নেই। এই দ্বৈত অবস্থাই আমাদের জরা, জন্ম-মৃত্যুর কারন । এই দ্বৈত ভাব যখন কেটে যাবে, তখন আত্মা যে স্বরূপতঃ জরা-জন্ম-মৃত্যু রহিত, তা আমাদের বোধে আসবে। এই জ্ঞান-ই আসলে পরাভক্তি। এই পরাভক্তির কারনে "আমি" যে কি তা জ্ঞাত হওয়া যায়। আবার আমি যে কি, এই তত্ত্বজ্ঞান যার মধ্যে উদয় হয়েছে, তিনি হৃদয়গ্রন্থি ভেদ করে, ভেদবুদ্ধির উর্দ্ধে পরমাত্মার মধ্যে বুদ্ হয়ে যান। আমিকে জেনে আমার মধ্যে প্রবেশ করেন।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
তারিখ : ১৫.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৫৬-৫৭

সর্ব্ব-কর্ম্মাণি-অপি কুর্ব্বাণো মদব্যপাশ্রয়ঃ
মৎ-প্রসাদৎ-অবাপ্নোতি শাশ্বতং পদমব্যয়ম। (১৮/৫৬)

সর্ব্বদা সর্ব্বকর্ম্ম করেও, মৎ পরায়ণ হলে আমার প্রসাদে নিত্য-পরমপদ প্রাপ্ত হন।

আমরা শুনছি, মোক্ষযোগের কথা। যাঁর অন্তঃকরণ সাধনক্রিয়ার কারনে সর্ব্বতো শুদ্ধ হয়েছে, মলিনতা শূন্য হয়েছে, তখন তিনি কেবলমাত্র ধ্যানাবস্থাতেই স্থিত থাকেন । অর্থাৎ আত্মাতে স্থির হয়ে অবস্থান করেন। এই অবস্থায় তাঁর মধ্যে বাহ্যিক ক্রিয়া করবার অভিপ্রায় বা শক্তি সম্পূর্ণ রূপে লোপ পায়। তখন এঁরা আর বেশিদিন (বলা হয়, ২১ দিনের বেশী ) স্থূল দেহে অবস্থান করেন না। এই উচ্চস্তরের কর্ম্মসন্যাস যোগ বহু জন্মের সাধনক্রিয়ার ফল। এঁদের মধ্যে আত্মাকারা বৃত্তি ভিন্ন অন্য কোনো বৃত্তি জাগতে পারে না। কিন্তু একজন্মে সাধনার এই উচ্চপর্য্যায়ে কোটিতে একজন যেতে পারেন কি না সন্দেহ। এই উচ্চকোটি সাধকের সাধন অবস্থার কথা আলোচনার অধিকার আমাদের নেই। এঁদের এই অবস্থার বর্ননা এঁরা নিজমুখের করবার অবস্থায় থাকেন না, এমনকি এঁদের কাছে সেই সময়ও থাকে না। কিন্তু কিছু কিছু পারলৌকিক মহাত্মাগণ সূক্ষ্ম দেহে এই জ্ঞানের কথা অনেক সময় তাঁর প্রিয়তম সাধককের উপল্বদ্ধিতে ক্ষনিকের জন্য অবহিত করিয়ে থাকেন মাত্র। আর এই দুর্লভ অনুভূতি দান করেন, কেবলমাত্র অধিকারী সাধককে উৎসাহিত করবার জন্য, ব্যক্ত করবার জন্য নয়। তাই এঁদের সম্পর্কে বা এঁদের সাধন পরিণতির কথা, আমাদের কাছে অজ্ঞাত।

কিন্তু অন্তঃকরণ যাঁদের এখনও ততটা শুদ্ধ হয়নি, অর্থাৎ ক্রিয়ার পরাবস্থায় পৌঁছলেও অন্তিম অবস্থায় যাঁরা এখনো পৌঁছুতে পারেন নি, সাধনার গভীরতম অবস্থা এখনো যাদের আসেনি, এখনো যাদের প্রারব্ধ ক্ষয় হয়নি, এখনও যাঁরা ততটা নির্ম্মল চিত্তের অধিকারী হন নি, যাঁদের এখনো সাধন থেকে বুত্থিত হতে হয়, তাঁরা কিভাবে কর্ম্ম করলে শুদ্ধচিত্ত হয়ে ভগবৎ চরণে আত্ম-সমর্পণ করতে পারেন, সেই ভাবের কথাই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে বলছেন। অর্থাৎ যেসব সাধককে, এখনও বুত্থিত হতে হয়, সংসারের কাজকর্ম্ম, শরীর রক্ষার জন্য কিছু না কিছু করতেই হয়, অথচ সাধনক্রিয়াতেই যার মন পরে থাকে, এমনকি বাহ্য কর্ম্মের সময়ও যাঁর মন পড়ে থাকে প্রাণক্রিয়ার সঙ্গে, অথবা আজ্ঞাচক্রে যাঁর মন পরে আছে, সেইসব যোগীপুরুষও ধীরে ধীরে বিশুদ্ধ, নির্ম্মল ও প্রসন্ন চিত্তের অধিকারী হয়ে ওঠেন। এই যে প্রাণক্রিয়াকে আশ্রয় করে নিয়ত অবস্থান করা, বা আজ্ঞা চক্রে মনকে নিবিষ্ট করে রাখা, একেই বলে শরণাগতি। একেই বলে যোগেশ্বরের ভাষায় "মদব্যপাশ্রয়".

যার পূর্ব্ব পূর্ব্ব জীবনের সুকৃতি নেই, যিনি এখনো প্রারব্ধ বশত কর্ম্মফলের শিকার - তিনিও যদি দৃঢ় ভাবে গুরু আদিষ্ট উপায়ে সাধনক্রিয়ার মধ্যে শুধু গুরুকেই স্মরণ-মনন করতে থাকেন, গুরুকেই ধ্যান-জ্ঞানের আশ্রয় করে নিতে পারেন, তবে তার চিত্ত অবশ্যই নির্ম্মল হবে, প্রসন্ন চিত্ত হবে, মন স্থির হয়ে আত্মাতেই অবস্থান করবে। একেই ভগবৎ ভক্তি বলা হয়ে থাকে। এই ভগবৎ ভক্তি সাধককে বৈরাগ্যের চরম শিখরে নিয়ে পৌঁছে দেবে। আর সাধনার চরম ফলপ্রাপ্ত হয়ে, মনুষ্য জীবনকে সার্থক করতে পারবেন।

চেতসা সর্ব্ব-কর্ম্মানি ময়ি সংন্যস্য মৎপরঃ
বুদ্ধিযোগম-উপাশ্রিত্য মৎ-চিত্তঃ সততং ভব। (১৮/৫৭)

মন-বুদ্ধি-বিবেক দ্বারা সমস্ত কর্ম্ম আমাতে অর্পন করে, মৎপরায়ণ হয়ে সমত্ব বুদ্ধিযোগ আশ্রয় করে, সতত মৎ-চিত্ত পরায়ণ হও ।

দেখুন, কর্ম্ম করলে তার একটা ফল আছে। কর্ম্মে যখন কোনো মমত্ব থাকবে না সেই কর্ম্মের ফলভোগ কর্ত্তাকে করতে হয় না। হাতুড়ি লোহাকে পেটাচ্ছে, কুড়াল গাছকে কাটছে, এই কর্ম্মের অর্থাৎ হাতুড়ি বা কুড়ালের কর্ম্মের পিছে আছে মালিকের হাত। আর মালিকের আদিষ্ট কর্ম্মফল মালিকের কাছেই অর্পিত হয়ে থাকে। তো আমি ক্রীড়ানক, আমি যন্ত্র, আমি নিমিত্ত মাত্র, যাকিছু আমা কর্তৃক কৃত হচ্ছে, সেখানে আমার ইচ্ছে, আমার বাসনা যদি না থাকে, আর ভাবটা যদি সত্যি সত্যি এমনটাই হয়, যে যা কিছু হচ্ছে তা আমি করছি না, ব্রহ্মই করছেন, তবে সেই কর্ম্ম কখনোই তোমার কৃত হলো না। এক্ষেত্রে তোমার কর্ম্ম নাশ হলো বটে, কিন্তু কর্ম্মফল তোমাকে ছুঁতেও পারবে না। এখন কথা হচ্ছে, কাজ করবো আমার ইচ্ছেয়, আর মুখে বলবো, সবই তিনি করছেন, আমি নিমিত্ত মাত্র - তাহলে নিজেকেই ফাঁকি দেওয়া হবে। আর কর্ম্মফলও ভোগ করতে হবে। এইজন্য যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছে, মৎ পরায়ণ হতে হবে। অর্থাৎ সর্ব্বদা মন-প্রাণ আত্মাতেই রাখতে হবে।

নিরন্তর যিনি সাধনক্রিয়া করছেন, তার মন অন্য কোথাও যেতে পারে না। সাধনক্রিয়া সাধকের বুদ্ধিকে স্থির করে দেবে। আর স্থির বুদ্ধিতেই সাধক আত্মস্থিত থাকতে পারেন। আর এই স্থির বুদ্ধিই হয় আত্মমুখী। জল যেমন নিম্নগামী, আগুন যেমন উর্দ্ধমুখী, তেমনি তপ্ত প্রাণ উর্দ্ধমুখী, তীক্ষ্ণ ও স্বচ্ছ বুদ্ধি হয় আত্মমুখী। এইসময় সাধকের মনের মধ্যে কোনো সংকল্পের উদয় হতে পারে না। তথাপি তাঁর দ্বারা যদি কিছু কৃত হয়, তবে জানবেন তিনি সেই যোগমগ্ন হয়েই শরীর ইন্দ্রিয় দ্বারা সেই কর্ম্ম করছেন। বাইরে থেকে এই অবস্থা অনুমান করা কঠিন। এই যে বুদ্ধির স্থিরতা, তা আমাদের সাধন-ক্রিয়ার ফলেই হয়ে থাকে। এই বুদ্ধির স্থিরতার যোগ-ই বুদ্ধিযোগ। বুদ্ধিযোগে ভেদবুদ্ধি লোপ পায়। বুদ্ধিযোগে সাম্যতা আসে। বুদ্ধিতে এই সাম্যতাকেই বলে সমত্ত্ববুদ্ধি। সমত্ত্ব বুদ্ধি হলেই মৎ-পরায়ণ হওয়া যায়।

তো সাধনক্রিয়াই আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে। বিক্ষুব্ধ প্রাণ থেকে চঞ্চল মন সঙ্কল্পের জন্ম দিচ্ছে, সংকল্প থেকে কর্ম্ম, কর্ম্ম থেকে বিপত্তি। তো সাধনক্রিয়ার ফলে প্রাণ যখন স্থির হলো, তখন মনের চঞ্চলতা দূর হয়ে গেলো। আর মনের চঞ্চলতা দূর হলেই মনের মধ্যে যে সংকল্প-বিকল্পের উদয় হচ্ছিলো, তা স্তিমিত হয়ে গেলো। যখন বুদ্ধি স্থির হলো তখন মন-প্রাণ-বুদ্ধি আত্মস্থ হলো। এই অবস্থায় সাধকের আপন-পর বোধ, এমনকি দেহাত্মবোধের সমাপ্তি হলো। কারন এখন চিত্তে আত্মচিন্তন ব্যাতিত অন্যকিছু রইলো না। বুদ্ধি স্থির ও সূক্ষ্ম হবার ফলে আত্মজ্ঞানের লাভ হলো। এবার আত্মা ও বুদ্ধির যখন যোগ হলো, তখন আত্মাভিন্ন অন্যাসবকিছুর অবসান হয়ে অনন্যশরন হলো। এই হচ্ছে যোগ। এই হচ্ছে বুদ্ধিযোগ। এই হচ্ছে সাধনক্রিয়া। যার পরিণতিতে না থাকে কর্ম্মবন্ধন না থাকে অস্থিরতা।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।


তারিখ : ১৬.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৫৮

মচ্চিত্তঃ সর্ব্ব দূর্গাণি মৎপ্রসাদাৎ তরিষ্য়সি
অথ চেৎ ত্বমহঙ্কারান্ন শ্রোষ্যসি বিনঙ্ক্ষ্যসি। (১৮/৫৮)

আমাতে চিত্ত স্থির রাখলে, তুমি আমার প্রসাদে সমস্ত বিপদ অতিক্রম করবে, আর যদি আমার কথা না শোনো তবে তোমার বিনাশ হবে।
আমির দুটো রূপ, একটা "বাহ্য আমি" আর একটা "প্রকৃত আমি"। ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলতেন, "কাঁচা আমি" আর "পাকা আমি"। এই বাহ্য আমিতে অহঙ্কার বাসা বাঁধে। নিজেকে কর্ত্তা বলে মনে হয়। এই কাঁচা আমিতে যেমন অহঙ্কার বাসা বাঁধে তেমনি পাকা আমিতে স্থিত হতে পারলে একটা আত্মপ্রসাদ লাভ করা যায়। কাঁচা আমিকে ষড়রিপু বেষ্টন করে রেখেছে। এই ষড়রিপুর বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করতে পারলে নিরালম্ব হওয়া যায়। নিরালম্ব অর্থাৎ মন তখন অবলম্বহীন হয়ে যায়। তো আশ্রয়হীন মনকে তখন আত্মার মধ্যে নিমজ্জিত করা সম্ভব হয়। যতদিন মনের সংশ্রব থাকে ততদিন মন বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে ঘোরাফেরা করে। এখান থেকে ফিরিয়ে মনকে অন্তর্মুখী করে আত্মস্থ করাই সাধনক্রিয়ার উদ্দেশ্য। মনকে আত্মস্থ করাই ধর্ম্ম। এই ধর্ম্ম থেকে ভ্রষ্ট হলে জীব কখনো আত্মমগ্ন হতে পারে না। আর আত্মমগ্ন না হলে, বিশ্বশক্তির কৃপা অনুভবে আসে না। এই স্বধর্ম্ম পালনের কথাই বারবার যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন।
কঠোপনিষদে (১/২/২০) বলা হচ্ছে, আত্মা সুক্ষ থেকেও সূক্ষ্মতর আবার বৃহতের থেকেও বৃহত্তর। আর ইনি অন্তরাত্মারূপে প্রত্যেকের হৃদয় গুহাতে বিরাজ করেন। যেসব মানুষ সমস্ত কামনা-বাসনা ত্যাগ করেছেন, এবং নিজ মন ও ইন্দ্রিয় (বহিরীন্দ্রিয় ও অন্তরেন্দ্রিয়) সকলকে বশে আনতে পেরেছেন, তিনিই এই আত্মার মহিমা উপলব্ধি করতে পারেন। তখন তাঁরা শোকাতিত ও সংশয়ের পারে চলে যান। তো যাঁরা কামনাশূন্য, যাঁরা শোক-দুঃখাদির অতীত তাঁরাই এই মন-বুদ্ধি-ইন্দ্রিয়সকলকে স্থির করে বিশুদ্ধ চৈতন্যের অবস্থা অর্থাৎ নির্বিকার ভাবে আত্মসাক্ষাৎকার লাভ করে থাকেন।

অর্থাৎ সেই পরমপুরুষ শরণাগত হতে গেলে, পুরুষার্থ প্রয়োগে সাধনক্রিয়া দ্বারা এগুতে হবে। এই যে পুরুষার্থ বা পৌরুষ জানবেন, এই শক্তিও সেই আত্মশক্তির নামান্তর। এই আত্মশক্তির পৌরুষের সাহায্যেই সাধনক্রিয়া করে আত্মসাক্ষাৎকার সম্ভব। যেহেতু এই সাধনক্রিয়াও এই আত্মশক্তির দ্বারাই সম্ভব হচ্ছে, তাই আমাদের অহংকার করবার কিছু নেই। যিনি নিরন্তর এই সাধন ক্রিয়ায় নিজেকে সঁপে দিয়েছেন, তিনি একসময় জীবত্ব নাশ করে শিবত্বে উন্নীত হন।

এখন কথা হচ্ছে, সাধনক্রিয়ায় পুরুষার্থের প্রয়োগ করতে হয়। এই পুরুষার্থের প্রয়োগ আবার সাধককে অহঙ্কারী তোলে। কিন্তু কেবলমাত্র পুরুষার্থের প্রয়োগেই সাধনায় সিদ্ধিলাভ হয় না। এমনকি সাধক লক্ষ করেছেন, মন প্রাণকে উর্দ্ধগতি সম্পন্ন করতে গেলে, দৈবযোগ না হলে এই উর্দ্ধগতি লাভ করা যায় না। উর্দ্ধগতিতে এই বাধা তা দূর করবার ক্ষমতা তখন সাধকের থাকে না। এইখানে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, "মৎপ্রসাদাৎ তরিষ্যসি" আমার অনুগ্রহে সমস্ত দুর্গতির থেকে ত্রাণ পাবে। তো সাধক তার সাধ্যমতো সাধনক্রিয়া করবে, কিন্তু সাধনার সিদ্ধি লাভ করতে গেলে, তাঁর উপরে ভরসা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

যোগসাধকগন বলে থাকেন, যোগ সাধনার পথ যেন ক্ষুরধারের উপর দিয়ে চলা। অধ্যাত্ম পথে অগ্রসর ,হতে গেল, ঠিক ঠিক শিক্ষার প্রয়োজন। বুদ্ধি ও অহঙ্কারের ত্রুটিগুলো দূর করতে হবে। সৎপথে চলে মনকে সবল করতে হবে, ইচ্ছেশক্তিকে প্রবল করতে হবে। প্রলোভনকে পরাভূত করতে হবে। সুপ্ত বাসনাকে চিহ্নিত করে, তাকে দূরে ঠেলে দিতে হবে। অহংকেন্দ্রিক সাধনকর্ম্ম যথেষ্ট নয়। একটা জিনিস জানবেন, আমাদের এই সাধনপথে যেমন গুরুর নির্দ্দেশকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে, আচার্য্যের সান্নিধ্যে থাকতে হবে, তেমনি প্রত্যেকের হৃদয়গুহাতে আছেন আচার্য্যের আচার্য্য, গুরুর-ও গুরু। । এই আচার্য্যেরও যিনি আচার্য্যে তাঁর দিকেও ধ্যান দিতে হবে। নৈতিক আচরণ, প্রার্থনা, ধ্যান ইত্যাদির দ্বারা এই সুপ্ত আচার্য্যের (অন্তর্গুরু) সান্নিধ্যে আসা যায়। দেহ,মন, বুদ্ধিতে আরোপিত যে আত্মবুদ্ধি তাকে ত্যাগ করতে পারলেই, এই উপল্বদ্ধিতে আসা যায়, যে সাধক নিজেই আত্মা, আর আত্মারূপে সে পরমাত্মা - সকল আত্মার যিনি আত্মা তাঁর অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রবুদ্ধ ঋষিদের এই রকমই অনুভূতি হয়।

এখন কথা হচ্ছে, প্রবুদ্ধ ঋষিদের এইরকম অনুভূতি হলেও, আমাদের তো সেই অনুভূতি নেই. আমাদের কর্তব্য কি ? অধ্যাত্ম জীবনের শুরু থেকেই, আমরা যে আত্মা মনের মধ্যে এই বোধ জাগাবার জন্য যেন আমরা সচেষ্ট হই। আমরা সকলে পরমাত্মার অংশ, এই অনুভূতি লাভের জন্য যেন প্রয়াস করি । উপনিষদের সেই উদাহরণ অর্থাৎ শরীর আমাদের রথ , ঘোড়াগুলো ইন্দ্রিয়, মন লাগাম, বুদ্ধি হচ্ছে সারথি। উপনিষদের এই উপমাকে যেন দৃঢ় বিশ্বাসের মধ্যে নিয়ে আসি। আমরা যেন মনকে সংযত রাখি, ইন্দ্রিয়গুলোকে বশে রাখি, আর আচার্য্যের নির্দেশ অনুযায়ী নিরন্তর সাধনক্রিয়াতে রত থাকি। লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যেন বিরতি না চাই। আমরা যেন কঠোর নিয়মে নিজেকে বেঁধে ফেলে অধ্যাত্ম পথের অনুসারী হতে পারি। তাহলেই একদিন আমাদের মধ্যে জ্ঞানের আলোক রশ্মির দেখা মিলবে, হৃদয়ে আনন্দ উৎসারিত হবে। এবং অন্যদেরকেও সেই একই জ্ঞানালোক ও আনন্দ লাভ করতে সহায়তা করতে পারবো।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
তারিখ : ১৭.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৫৯
যদহঙ্কারম-আশ্রিত্য ন যোৎস্য ইতি মন্যসে
মিথ্যৈষ ব্যবসায়স্তে প্রকৃতিস্ত্বাং নিয়ক্ষ্যতি (১৮/৫৯)

যে অহংকারের বশে তুমি যুদ্ধ করবো না ভাবছো, তোমার সেই বিচার মিথ্যে, তোমার প্রকৃতিই তোমাকে প্রবৃত্ত করবে।

আমরা জানি প্রকৃতি প্রদত্ত এই শরীর . প্রকৃতি থেকে মহৎতত্ত্ব - মহৎ তত্ত্ব থেকে অহঙ্কার ইত্যাদির উৎপত্তি হয়েছে। এই অহঙ্কারের বিকৃত রূপ হচ্ছে এই স্থুল শরীর। এই যে অহঙ্কার আশ্রিত পুরুষ, ইনি কখনো ক্রিয়াহীন হতে পারেন না। কাজে কাজেই ক্রিয়া আপনা আপনি করতেই হবে। এমনকি এটা করবো না, সেটা করবো না, তা বললেও চলবে না। প্রকৃতি তোমাকে দিয়ে অবশ্যই কর্ম্ম করিয়ে নেবে। করেন জীবসকল প্রকৃতির দাস। তুমি না চাইলেও তোমার সংস্কার তোমাকে জাতকর্ম্মে টেনে নিয়ে যাবে। তুমি পাখী হয়ে জন্মেছো , আর আমি উড়বো না, তুমি হাঁস হয়ে জন্মেছো আর সাঁতার কাটবে না। মাছ হয়ে জন্মেছো আর জলে নামবে না, তা হবার নয়। ঠিক তেমনি প্রত্যেকটি মনুষ্য শরীরের একটা কর্ম্মধারা আছে, একটা জন্মগত স্বভাব আছে। এইজন্য বলা হয়ে থাকে, আজ যে শরীর তুমি পেয়েছো, তা তোমার পূর্ব-পূর্ব জন্মের কর্ম্ম-সংস্কার অনুযায়ী তৈরী হয়েছে। আপনি বলতে পারেন, জন্মগ্রহনে আমার কোনো হাত ছিল না। ব্যাপারটা আদৌ তা নয়। আপনি আজ যা কিছু পেয়েছেন, অর্থাৎ আত্মীয়-স্বজন, পরিবার-পরিজন, দেশ-কাল, মাতা-পিতা, ভাই বন্ধু সবার সাথেই আপনার পূর্ব-পূর্ব জীবনের একটা সম্পর্ক ছিল। এমনকি এদের সাথে আপনার লেনা-দেনার সম্পর্ক রয়েছে। এমনকি স্বয়ং ভগবান যখন দেহ ধারণ করেন, তখনও তিনি তাঁর পরিষদবর্গ নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে থাকেন। এই যে অর্জ্জুন আর শ্রীকৃষ্ণ এঁরা আগের জন্মে দুই সখা ছিলেন, একসাথে সাধনক্রিয়া করেছেন। তো আজকে যাকিছু তুমি পেয়েছো, তা তোমার পূর্ব জীবনের কর্ম্মের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। আবার ভবিষ্যৎ জীবন এই জীবনের কর্ম্ম দ্বারা প্রভাবিত হবে। হবেই - এর কোনো অন্যথা হবে না। এসব কথা আমরা জানি আর না জানি, এসব ধ্রুব সত্য। আমি জানি না বা আমার উপল্বদ্ধিতে নেই বলে আমার মধ্যে ঈশ্বর নেই তা নয়। ঈশ্বর তোমার সঙ্গেই আছেন, সবার সঙ্গেই আছেন, তা তুমি অনুভব করো আর না করো, বিশ্বাস করো আর না করো তাতে কিছু এসে-যায় না।

আমি আত্মজ্ঞান লাভ করবো না, আমি আত্মদর্শন করবো না, আমি পূজা অর্চনা করবো না, আমি স্বর্গাদিতে বিশ্বাস করি না, তাই সেখানে যেতেও চাই না। আমি এসব যোগক্রিয়ার ঝামেলার মধ্যে যেতে চাই না, এসব বলে কিছু লাভ হবে না। পরিস্থিতি তোমাকে এমন জায়গায় নিয়ে যাবে, যে তুমি এসব করতে বাধ্য হবে। আপনি আজ যে শ্রীগীতার কথা শুনছেন, তা কি আপনাকে কেউ জোর করে করতে বলেছে ? কেউ বলে নি, আকস্মিক ভাবেই আপনি হয়তো এই চ্যানেলের সন্ধান পেয়েছেন, আর শুনতে শুরু করেছেন। কেউ আপনাকে জোর করেনি, তথাপি আপনি এর মধ্যে জড়িয়ে পড়েছেন।

দেখুন একজীবনে কেউ আত্মসন্ধানের পথে আসে না। বহু জন্ম অতিক্রম করে, যেমন আপনি মনুষ্য দেহ লাভ করেছেন, তেমনি বহু মনুষ্যজন্ম অতিক্রম করে, আজ আপনার মধ্যে আত্মজ্ঞানের তৃষ্ণা জন্মেছে। জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কার বশত রজঃ-সত্ত্ব মিশ্রিত (ক্ষত্রিয়) স্বভাবগুনের অধিকারী হয়েছেন আপনি। আপনার মধ্যে সংসারে আসক্তির চেয়ে আত্মজ্ঞানের জন্য ব্যাকুলতা বেশী। এই আত্মজ্ঞান লাভের জন্যই যুদ্ধ, বা সাধনক্রিয়া। তুমি বলছো, সাধনক্রিয়া করবে না, যুদ্ধ করবে না, এতে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত - এমনকি এতে তোমাকে সংসারের অনেককিছু ত্যাগ করতে হবে। হ্যাঁ তা হয়তো হবে, কিন্তু তোমার সংস্কার যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে টেনে নিয়ে এসেছে, দৈববশে যেমন তুমি সাধনগুরুর সান্নিধ্যে এসেছো, তেমনি তুমি সাধনক্রিয়াতেও অবশ হয়ে যোগ দেবে। কেননা এটাই তোমার ভবিতব্য। এর থেকে বেরুবার কোনো উপায় নেই। তাহলে কি আমার ইচ্ছে বা অনিচ্ছার কোনো মূল্য নেই ? হ্যাঁ অবশ্য়ই আছে, তুমি তোমার ভিতরের সুপ্ত শক্তিকে সুপ্ত গুণাবলীকে যদি চর্চার মধ্যে নিয়ে আসো, তবে তোমার মধ্যে সেই গুন্ বা প্রতিভার সত্ত্বর বিকাশ সাধন হবে, আর তা যদি না করো, অর্থাৎ তুমি যদি তোমার স্বভাব বিরুদ্ধ কাজ করো, তবে তোমার অন্তর্নিহিত গুনের প্রকাশ ঘটবে না। এবং যা কিছু করবে, তাতে তোমার অসাফল্য আসবে। এইজন্য আগে নিজেকে চেনো, নিজেকে জানো, নিজের মধ্যে সে সুপ্ত গুণাবলী তোমার পূর্বপূর্ব জীবনের সঞ্চয়, তাকে সেবাযত্ন করে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাও।
তুমি ক্রিয়া করো, কিন্তু ক্রিয়ার মধ্যে যেন ফলাকাঙ্খ্যা না থাকে। ফালাকাঙ্খ্যা রহিত কর্ম্মই প্রকৃতিকে বশে আনার উপায়। সময়ের কাজ সময়ে করো। জানবে অসাধ্য বলে কিছু নেই। এখন যে সাধনযুদ্ধ তোমার সামনে এসেছে, তাকে সমাধান করো। তাহলে ভবিষ্যতে আর লড়াই করতে হবে না। এই সাধনক্রিয়াই তোমার স্বভাবের মধ্যে পরিবর্ত্তন এনে দেবে। অর্থাৎ আজ যে রজঃ ও সত্ত্ব গুনের প্রভাব তোমার মধ্যে দেখা যাচ্ছে, তা ধীরে ধীরে সাধনক্রিয়ার ফলে আপনা থেকেই পরিবর্তন হয়ে যাবে। সত্ত্বগুণের আধিক্য বাড়বে। কিন্তু যতদিন না সেটি হচ্ছে ততদিন তোমাকে যুদ্ধ অর্থাৎ সাধনক্রিয়া করতে হবেই। যে যুদ্ধ আজ তোমার সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে, তার সমাপ্ত করো। গুরুর আদিষ্ট পথে সাধনক্রিয়া করো, তাহলে তোমার জয় অবশ্যম্ভাবী। গুরু তোমার সঙ্গে আছেন - তার বাক্যকে অবহেলা করো না। যতক্ষন তোমার মধ্যে রজঃ গুনের প্রভাব রয়েছে, ততক্ষন তুমি শান্ত হতে পারবে না। ক্রিয়াযোগ থেকে জ্ঞানযোগ ভালো, তবে যতক্ষন ক্রিয়াযোগে সাফল্য না আসছে, ততক্ষন জ্ঞানযোগে বা ধ্যানযোগে তোমার অধিকার আসবে না। আমি অনেককে দেখেছি, প্রথমেই কিভাবে ধ্যান করবো, সে কথা জানতে চায়। কিন্তু ধ্যানের আগে, যম , নিয়ম, আসন-প্রাণায়াম-ধারণা, প্রত্যাহার, এগুলোতে রপ্ত না হলে ধ্যানে বসা বৃথা - একথা বোঝার ক্ষমতা তাদের নেই। কেননা চঞ্চল মনে, ধ্যান হয় না। প্রাণ স্থির না হলে মনের চঞ্চলতা যায় না।
তুমি তমঃ গুনের অধিকারী (শুদ্র) হলে, আলস্য, নিদ্রায়, আর সব উদ্ভট কল্পনা নিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে। তুমি যদি বৈশ্য হতে (অধিক রজঃ আর স্বল্প তম) তাহলে তুমি দেনা পাওনার হিসাব করতে। সাধনক্রিয়ার লাভালাভের হিসেবে কষতে। কিন্তু তুমি তো ক্ষত্রিয় অর্থাৎ তোমার মধ্যে রজঃ গুনের প্রভাব বেশি, আছে সত্ত্বগুণও স্বল্পমাত্রায়। তাই তোমার সামনে আজ গুরু এসে দাঁড়িয়েছেন, তুমি এখন সাধনসমরে এসে উপস্থিত হয়েছো। তুমি চুপ করে বসে থাকতে পারবে না। তোমার মন তোমাকে তাড়া করে নিয়ে বেড়াবে। তোমার মধ্যে সত্ত্ব গুন্ থাকার জন্য শান্ত থাকার একটা প্রবণতা আসবে, কিন্তু তা সাময়িক, এর পরেই আবার তোমার মধ্যে রজঃ গুনের কারনে যুদ্ধের (সাধনার) প্রবণতা ভেসে উঠবে। এখান থেকে বেরুতে গেলে, তোমাকে অবশ্য়ই সাধননক্রিয়ার দিকে পা বাড়াতে হবে। নান্য পন্থা। যদি আজ গুরুর কথা না শোনো, তবে তোমার এই জীবন বৃথা হবে, আর পরের জীবনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আবার আগামী জীবনে শ্রীগুরুর নিকটে এসে দাঁড়াবে। আসতেই হবে। তবে একটা জীবন বৃথা চলে যাবে। আবার জন্ম-মৃত্যুর ক্লেশ ভোগ করতে হবে। তাই যতই তুমি গুরুর উপদেশকে উপেক্ষা করবে, ততই তোমার জন্ম-মৃত্যুর ক্লেশ ভোগ করতে হবে। আর আজ গুরু উপদেশে সাধন ক্রিয়া (যুদ্ধ) করলে, তোমার ভবিষ্যৎ হবে উজ্বল, জীবন হবে সার্থক।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
তারিখ : ১৮.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৬০
স্বভাবজেন কৌন্তেয় নিবদ্ধঃ স্বেন কর্ম্মণা
কর্ত্তু নেচ্ছসি যন্মোহাৎ করিষ্যসি-অবশঃ-অপি তৎ। (১৮/৬০)

হে কৌন্তেয়, মোহ বশতঃ তুমি যা করতে ইচ্ছে করছো না, স্বভাবজ কর্ম্মে নিবদ্ধ থাকায়, তোমাকে অবশ হয়ে সেটাই অর্থাৎ স্বভাবজাত কর্ম্মই করতে হবে।

একই কথার সূত্র ধরে, ভগবান পুনরায় বলছেন, আত্মস্বরূপে মানুষ স্বাধীন, কিন্তু জীবত্ত্ব স্বরূপে প্রকৃতির অধীন। জীব জন্ম জন্মান্তরের সংস্কার বশে যে স্বভাবকে সঙ্গে নিয়ে সে জন্ম গ্রহণ করেছে, তাকে উল্লঙ্ঘন করবার সাধ্য জীবের নেই। দেহাত্মবোধ সম্পন্ন হয়ে, অর্থাৎ প্রকৃতির ভিতর দিয়ে যখন আমরা আত্মাকে দর্শন করি, তখন আত্মাকে প্রকৃতির রঙে রাঙানো অবস্থাতেই দেখি। আর আত্মাকে প্রকৃতি থেকে আলাদা হিসেবে চিহ্নিত করা দুরূহ হয়ে যায়। আসলে আমাদের চোখে যতক্ষন প্রকতির রঙ্গিন চশমা থাকবে, ততক্ষন প্রকৃতি আর আত্মাকে আলাদা বলে ধরতে পারবো না। আত্মা প্রকৃতির আড়ালেই থেকে যাবে। অর্থাৎ জীবভাবে আত্মদর্শন ভ্রান্ত আত্মদর্শন যা প্রকৃতির গুনে গুণান্বিত বলেই ভ্রমজ্ঞান এনে দেবে।

কিন্তু যখন সাধক সাধনক্রিয়া করতে করতে শরীর-মন-প্রাণ-বুদ্ধির উর্দ্ধে প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন সে ইন্দ্রিয়াতীত হয়ে সজ্ঞার সাহায্যে আত্মস্বরূপের উপল্বদ্ধি করতে পারবে। অন্য কোনো উপায় নেই। আর এই ইন্দ্রিয়াতীত হয়ে আত্মস্বরূপে অবস্থিত হতে পারলে, সেখানে আত্মা ভিন্ন অন্য কোনো কিছুই অনুভবে আসবে না। তখন প্রকৃতিও থাকবে না অর্থাৎ তখন প্রকৃতির অনুভব থাকবে না। তখন প্রকৃতি ও আত্মা ভিন্ন হয়ে যাবে। আসলে, তখন প্রকৃতি থাকবে না তা নয়, কিন্তু আপনি প্রকৃতির উর্দ্ধে থাকার ফলে, আপনার উপরে প্রকৃতির কোনো কর্তৃত্ত্ব থাকবে না। যেমন আমরা যখন মেঘের উপরে প্লেনে চড়ে ভ্রমন করি, তখন আমাদের চোখ আর সূর্য্যের মধ্যখানে যে মেঘের আবরণ ছিলো , তার প্রভাব থেকে আমরা মুক্ত হয়ে স্বচ্ছ উজ্বল সূর্যকে অনুভব করতে পারি। তখন মেঘ নেই তা নয়, অর্থাৎ প্রকৃতি নেই তা নয়, আমি প্রকৃতির উপরে চলে গেছি। তেমনি সাধনক্রিয়ার ফলে, সাধনার পরাবস্থায় আমরা প্রকৃতি থেকে মুক্ত থাকতে পারি। তখন প্রকৃতি আমাদের উপরে কোনো কর্তৃত্ত্ব করতে পারে না।
দেখুন আত্মা বদ্ধ নয়, মুক্ত একথা যেমন সত্য। তথাপি আমি মুক্ত - আমি মুক্ত একথা ভাবলেও আমরা মুক্ত হতে পারি না। আবার প্রকতির বশে থেকেও, মানুষ নিজেকে বদ্ধ ভাবে না। সে মনে করে, সে স্বাধীন। আর তার যা ইচ্ছে তাই সে করতে পারে। যুদ্ধ করবে কি করবে না, সেই সিদ্ধান্ত সে নিজেই নিতে পারে, পাশা খেলবে কি খেলবে না, সেই সিদ্ধান্ত সে নিজেই নিতে পারে। রামচন্দ্র সোনার হরিনের পিছনে ছুটবে কি ছুটবে না, সেই সিদ্ধান্ত সে নিজেই নিতে পারে। কিন্তু সত্য হচ্ছে, যুদ্ধ অর্জ্জুনকে করতেই হবে, যুধিষ্ঠিরকে পাশা খেলায় হারতেই হবে। সীতা হরণের জন্য কারণ রামচন্দ্রকে দিয়েই তৈরী করা হবে। রামচন্দ্রকে বনে বনে কেঁদে বেড়াতে হবে। পঞ্চপান্ডবের বনবাস খন্ডাবে কে ? আর এসবই সাধনক্রিয়ার প্রারম্ভ মাত্র। পঞ্চপান্ডবের, রাম-লক্ষণের, সাধনক্রিয়া শুরু হয়, জঙ্গলের মধ্যে মুনি-ঋষিদের পর্ন কুটিরে। প্রকৃতির নিষ্ঠুর ঘাতপ্রতিঘাতে সাধনক্রিয়া এগুতে থাকবে।

আমরা যখন ৫/৬ বছর আগে, শ্রীমদ্ভগবৎ গীতার পঠন-পাঠন শুরু করেছিলাম, তখন ছত্রে ছত্রে দ্বন্দ্বের দর্শন দেখেছিলাম। ধীরে ধীরে সেই দ্বন্দ্বের অবসান হয়েছে। সাধনক্রিয়ায় লেগে থাকার এই হচ্ছে পরিণতি। ধীরে ধীরে দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে। কর্ম্ম বশত জ্ঞানের উদয় হয়। আবার কর্ম্মের প্রতি নিষ্ঠা বা কর্ম্ম প্রচেষ্টা সাধকের পূর্বকর্ম্ম সংস্কার থেকেই হয়ে থাকে। যাঁর মধ্যে জ্ঞান বৈরাগ্যের সংস্কার আছে, তার মধ্যে মুক্তিপথের সন্ধানের জন্য ঔৎসুক্য দেখা দেবে। সে সাধনার পথ অবলম্বন করবেই । তার মধ্যে সাময়িক ইচ্ছে বা অনিচ্ছা দেখা দিলেও, সাধনেচ্ছা বলবতী হয়ে উঠবে। তো স্বভাব যেমন নিজ-নিজ কর্ম্ম অনুযায়ী গড়ে ওঠে, তেমনি স্বভাবকে অতিক্রম করা সহজ সাধ্য নয়।

তাই মহাপুরুষগন বলে থাকেন, যতক্ষন জীবভাব ততক্ষন সে প্রকৃতির অধীন। জীবের কোনো স্বাধীনতা নেই। আপন প্রকৃতি অনুসারে সে কর্ম্ম করবেই। কিন্তু এই কর্ম্মে যে আত্মা লিপ্ত নন, এটা বুঝতে পারলেই, জীবের স্বরূপে অবস্থান হয়।

পূর্বজীবনের অভ্যাস বশতঃ জীব বিষয়ে আসক্ত হয়ে কর্ম্ম করে থাকে। আর তার জন্য তাকে কর্ম্মফলের ভোগস্বরূপ কষ্ট স্বীকার করতে হয়। আবার এইকষ্ট ভোগ থেকেই, একদিন সে পরিত্রানের রাস্তা খোঁজে। তখন সে পরিত্রাতার খোঁজ করে, সাধনক্রিয়ার দিকে আকৃষ্ট হয়। জন্ম-জরা-বার্ধক্য-মৃত্যু দেখে সে সেখান থেকে পরিত্রানের উদ্দেশ্যে শ্রীগুরু সান্নিধ্যে উপস্থিত হয়। তখন শ্রীগুরু তাকে সাধন উপদেশ দেন। আর যারা এই সাধন অনুষ্ঠান নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে, গুরুদেবের কথায় যারা শ্রদ্ধা রেখে, জীবনের ভবিষ্যৎ কর্ম্ম নির্ধারণ করে, তারাই একসময় জীবনের সার্থকতা খুঁজে পায়।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
তারিখ : ১৯.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৬১

ঈশ্বরঃ সর্ব্ব ভূতানাং হৃদ্দেশে-অর্জ্জুন তিষ্ঠতি
ভ্ৰাময়ন সর্ব্ব-ভূতানি যন্ত্ৰারূঢ়ানি মায়য়া। (১৮/৬১)

হে অর্জ্জুন, পরমেশ্বর মায়া শক্তি দ্বারা এই যন্ত্রবৎ পুতুলের ন্যায় ভূত সকলকে পরিভ্রমন করিয়ে সর্ব্বজীবের হৃদয় দেশে অধিষ্টিত আছেন।

ঈশ্বর তাঁর মায়াশক্তি দ্বারা ভূৎসকলকে যন্ত্রের মতো পরিচালনা করেন । এই মায়া হচ্ছে ঈশ্বরের এমনশক্তি যার কারনে অনাত্ম বস্তুকে আত্মবস্তু বলে ভ্রম হয়। আর ঠিক এই কারণেই মানুষ নিজেকে স্থূলশরীর বলে মনে করে। অর্থাৎ শরীরে যে আত্মবুদ্ধি এটি মায়ার কারনে হয়ে থাকে। আমার মাঝে মধ্যে মনে হয়, পুরুষ (ব্রহ্ম) যখন মাতৃগর্ভে প্রবেশ করেন, তখন তিনি মায়ার রাজ্যে প্রবেশ করেন, আর মাতৃগর্ভ থেকে বেরিয়ে সংসাররাজ্যে প্রবেশ করে। মাতৃগর্ভে সে নিজেকে ভুলতে শুরু করে, আর শরীর ধারণ ক'রে, সে নিজেকে শরীর বলেই মনে করে। এই যে মায়ায় অভিভূত পিন্ডশরীর তিন ভাগে ভাগ করা যায়। শুদ্ধ মায়া, অশুদ্ধ মায়া, ও মিশ্র মায়া। জ্যোতির্ময়, অন্ধকারময়, ও আলো-আঁধারের মিশ্র অবস্থা। জীবসকল জন্ম জন্মান্তরের সংস্কার বশতঃ এই তিন ধরনের শরীর প্রাপ্ত হয়ে থাকে।

কঠোপনিষদে (১/৩/১২) বলা হচ্ছে, 
"এষ সর্ব্বেষু  ভূতেষু গূঢ়ো আত্ম ন প্রকাশতে। 
দৃশ্যতে  ত্বগ্রয়া বুদ্ধ্যা সূক্ষ্ময়া সূক্ষ্-দর্শিভিঃ   । " 

পরম আত্মা সমস্ত  বস্তুতে প্রছন্ন ভাবে রয়েছেন । তিনি সকলের  অগোচরে আছেন ।  যাঁরা  সূক্ষ্ম বুদ্ধি সম্পন্ন, তাঁরাই কেবল তীক্ষ্ণ  একাগ্র বুদ্ধির  সাহায্যে পরমাত্মাকে উপলব্ধি করতে পারেন। 

পরমাত্মাকে আত্মস্বরূপে উপলব্ধি করাই মানব জীবনের উদ্দেশ্য। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যেমন বলছেন, তিনি সর্ব্ব জীবের হৃদয় দেশে অবস্থান করছেন, তেমনি উপনিষদে বলা হচ্ছে, তিনি সমস্ত বস্তুতে প্রছন্ন অবস্থায় আছেন। এখন কথা হচ্ছে, সমস্ত বস্তুতেই আছেন, বা আমাদের সকলের হৃদয়ে অবস্থান করছেন। এই হৃদয়দেশ ব্যাপারটা কি ? কোথায় এই হৃদয়ের অবস্থান ? আর আমরা কেউ তাঁকে দেখতে পাই না কেন ? হৃদয়দেশ হচ্ছে, বুকের মধ্যে হৃদযন্ত্রের কাছে একটা শূন্য স্থান বা আকাশ। এখানেই প্রথম বায়ুরূপে প্রাণের প্রবেশ ঘটে থাকে। যাঁরা প্রাণক্রিয়া করেন, তাঁদের এই হৃদয়দেশে প্রাণ-অপানের মৈথুনে, একটা জ্যোতির্বিন্দু বা জ্যোতিঃ-রেখা ফুটে ওঠে, যা আসলে রজঃশক্তির প্রকাশ স্বরূপ। এই সাধক যখন চক্ৰসাধনা করেন, তখন অনাহত চক্রে এই জ্যোতির্বিন্দুর দর্শন করে থাকেন। কিন্তু আমরা কেন পরমাত্মাকে উপল্বদ্ধিতে আনতে পারি না ?

আসলে আমাদের দৃষ্টিশক্তি স্বচ্ছ নয়। আমরা যা কিছু দেখি তা হয় ভাসা ভাসা। এমনকি আমরা যা কিছু করি, তাকেও আমরা সবাই দেহ-ইন্দ্রিয়-মন-বুদ্ধির ক্রিয়া বলেই মনে করি। আসলে এই যে দেহ-ইন্দ্রিয়-মন-বুদ্ধি এটি একটি যন্ত্র বিশেষ। এটি একটি পুতুল বৈ কিছু নোই। এই পুতুল যা কিছু করছে, তার পিছনে একটা অদৃশ্য হাত আছে। আর সেই অদৃশ্য হাতের সঙ্গে সুঁতোয় বাধা এই পুতুলটি। আড়াল থেকে সেই অদৃশ্য হাত দড়ি ধরে টানছে, ছাড়ছে আর তাতেই পুতুলগুলো নাচছে, খাচ্ছে, ঘুমুচ্ছে। আমরা যে ইন্দ্রিয়গুলোকে সক্রিয় হয়ে কাজ করতে দেখি, আসলে এরা কেউ স্বাধীন নয়, এরা স্বতন্ত্রভাবে কিছুই করতে পারে না, করেও না। এর পিছনে আছে সেই আত্মা যিনি আমাদের অন্তরাকাশে থেকে আমাদের কর্ম্মক্ষমবৎ বা কর্ম্মক্ষম করছেন। এই আত্মা দেহ ছেড়ে চলে গেলে, ইন্দ্রিয়সকল এমনকি মন-বুদ্ধি শরীর নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। এই কথাগুলো আমাদের উপল্বদ্ধিতে না এলেও, একে আমরা কিন্তু বিশ্বাস করতে শিখেছি, কারন আমরা দেখেছি, মরণউন্মুখ ব্যক্তির কেমন ধীরে ধীরে ইন্দ্রয়গুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তথাপি আমরা কেউ সেই আত্মাকে দেখতে পাই না - তার কারন হচ্ছে আমাদের দৃষ্টিশক্তি স্বচ্ছ নয়।

এখন দৃষ্টিশক্তি স্বচ্ছ হবে কিভাবে ? এটি করা যায়, সংযমের মাধ্যমে। ধারণা -ধ্যান- সমাধিতে যিনি সিদ্ধি লাভ করেছেন, তিনি সংযমীপুরুষ। দেখুন ইন্দ্রিসকলকে নিয়ন্ত্রণ করছে মন, আর মনকে নিয়ন্ত্রণ করছে বুদ্ধি, আর বুদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন আত্মা। প্রত্যাহার ক্রিয়ার দ্বারা ধীরে ধীরে আদি কারনের দিকে অগ্রসর হলে, এই আত্মার সন্ধান পাওয়া যায়। আর তখন উপলব্ধি হয় আমি ও আত্মা অভিন্ন। আমিই সর্বত্র। অন্তরে বাইরে সেই একই আত্মা বিরাজ করছে। তখন মানুষ শান্ত হয় - বাইরে আর কিছুই চাইবার থাকে না। এইজন্য বলা হয়, সাধনার মূলমন্ত্র হচ্ছে আত্মসংযম।

তো প্রকৃতির প্রেরণায় জীবকূলকে কর্ম্মবন্ধনহেতু এক যোনি থেকে আর এক যোনিতে ভ্রমন করতে হয়। প্রকৃতির আবেশে মুহ্যমান হয়ে জন্ম মৃত্যুর চক্রে ঘুরে ঘুরে মরতে হয়। এখন কথা হচ্ছে এখান থেকে মুক্তি কিভাবে হবে ? বলা হয়, কর্ম্মবশে জীব প্রকৃতির অধীনতা স্বীকার করেছে। কিন্ত সত্য হচ্ছে আকাংখ্যা পূরণের জন্য, পুরুষ নিজেকে দ্বিধাবিভক্ত করেছে। একজন দ্রষ্টা, নির্বিকার, আর একজন ভোক্তা। এখন এই দ্রষ্টা কখনো প্রকৃতির অধীন নয়। আর এই জীব বা জীবাত্মা যে পরমাত্মারই অংশ স্বরূপ, এই জ্ঞান যতক্ষন না হচ্ছে, ততক্ষন এই মায়ার খেলা চলতে থাকবে। আর আমরা মায়ার জগতেই বিচরণ করবো। যখন সে আপন স্বরূপ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করবে, তখন প্রকৃতির প্রাচীর ভেঙে যাবে। যোগশাস্ত্র বলে থাকে, মন-প্রাণ যতক্ষন নাভিচক্রের নিচে ঘোরাফেরা করবে, ততক্ষন মায়ারকার্য্য চলতে থাকবে। মন-প্রাণ যখন নাভিমূল থেকে উপরের দিকে ওঠা শুরু করবে, তখন জীবের মধ্যে বিষ্ণু শক্তির জাগরণ ঘটবে। এই বিষ্ণুশক্তি ও মায়াশক্তি অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত। এই মায়া মিশ্রিত চৈতন্যকে কেউ বলে মহামায়া, কেউ বলেন মুখ্য প্রাণ। মায়ার কাজ দেহকে ঘিরে। জীবের জন্ম-মৃত্যু এই মায়ার খেলা। তো মায়া যেহেতু এই দেহকে ঘিরে লীলা করছে, তাই এই দেহভান্ডকে সম্যকরূপে অবহিত হতে পারলেই মুক্তির আকাশের দর্শন হতে পারে।

দেহের মধ্যে আছে অসংখ্য নাড়ীমুখ। বলা হয় ৭২ হাজার নাড়ীর সমাহার এই দেহ। শিব সংহিতায় বলা হচ্ছে, (শ্লোক -১৩-১৫) বলা হচ্ছে, মানুষের শরীরে সাড়েতিন লক্ষ নাড়ী আছে। এর মধ্যে ১৪টা নাড়ী প্রধান। এগুলো হচ্ছে, ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না, গান্ধারী হস্তী-জিহ্বিকা, কুহূ , সরস্বতী, পূষা, শঙ্খিনী, পয়স্বিনী, বারণী, অলম্বুষা, বিশ্বদরী ও যশস্বিনী। এই চোদ্দটি নাড়ীর মধ্যে প্রধান হচ্ছে সুষুম্না। এই সুষুম্না নাড়ীর মধ্যে আছে, আবার বজ্রাক্ষ্যা ও চিত্রাণি। এই চিত্রা বা চিত্রনির নাড়ীর মধ্যে আছে একটা সূক্ষ্মতর ছিদ্র। একেই বলে ব্রহ্মরন্ধ্র। সাধন ক্রিয়ার ফলে কুণ্ডলিনী শক্তি উত্তপ্ত ও উর্দ্ধগতা হয়ে পরম ব্রহ্মের সঙ্গে সহস্রারে মিলিত হয়।

মহাভারতের শান্তিপর্ব্বে ব্যাসদেব বলছেন, যোগী পুরুষগন ইন্দ্রিয়সকলকে মনের মধ্যে সন্নিবেশিত করে, উদ্ভ্রান্ত চিত্তকে প্রথমে স্থির করেন। এইবার ধ্যানমার্গে অবস্থান করেন। যেহেতু মন ধ্যানমার্গে কিছুতেই স্থির হতে চায় না, তাই প্রত্যাহারের অভ্যাসের দ্বারা মনকে ধ্যানমার্গে বারংবার প্রযত্নের সাহায্যে স্থির করেন। প্রাণ সুষুম্না নাড়ী মার্গে প্রবেশকালে মন আরো বেশি চঞ্চল হয়ে ওঠে। তখন সাধক দৃঢ়ভাবে মনকে বশে এনে এই কাজে সাফল্য অৰ্জন করেন। এই কাজ দুরূহ, কিন্তু অসম্ভব নয়। নিরন্তর অভ্যাসের ফলে, এবং সাত্ত্বিক জীবন যাপনের ফলে এই কাজে একদিন সাফল্য আসে। ধীরে ধীরে বিচারের সাহায্যে মনকে দেহাতীত অবস্থায় নিয়ে আসতে হয়। মনকে নিরুদ্ধ করতে হয়। কথায় বলে ভষ্ম ও শুষ্ক গোময়ের রাশিতে জল সিঞ্চনমাত্রই আদ্র হয় না। পাথরের উপরে জলের ফোটা পড়লেই পাথর ক্ষয়ে যায় না। কিন্তু একদিন একফোটা জলই দীর্ঘকাল নিয়ম করে পড়তে থাকলে, পাথরে গর্ত হতে থাকে, শুস্কবস্তু আদ্র হয় । ঠিক তেমনি ইন্দ্রিয়গুলোকে ধ্যানমার্গে অবস্থানপূর্ব্বক ক্রমে ক্রমে স্থির করতে পারলে, আত্মার শান্তি অনুভবে আসে। মন ও ইন্দ্রিয় যখন এই আত্মার শান্তি লাভ করতে থাকে, তত যোগীপুরুষ যোগপ্রভাবে শান্তি লাভ করতে থাকেন। তো ধ্যানপ্রভাবে সেই অনির্বচনীয় পরমানন্দ সম্ভোগ করে নিরুপদ্রবে মোক্ষপদ নিশ্চিত হয়।

তো হৃদয়দেশে অবস্থিত সেই পরমেশ্বরকে অনুভব করতে হলে নিরন্তর অনাহত চক্রে পরমেশ্বরের ধ্যানের অভ্যাস করতে হবে।

চলবে। .......

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
তারিখ : ২০.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৬১ - পূর্ব্ব প্রকাশিতের পরে। ...

আমাদের শরীরে যে অসংখ্য শিরা-উপশিরা আছে, তাদের মাধ্যমেই স্থুল দেহ পুষ্টিলাভ করে থাকে। আমরা জানি, আমাদের মনের মধ্যে নানানরকম সংকল্পের উদয় হচ্ছে। এই সংকল্পকে কার্যকরী করবার জন্য যেমন কর্ম্ম-ইন্দ্রিয়গুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকে। আবার এই সঙ্কল্প সৃষ্টির জন্য আমাদের জ্ঞান-ইন্দ্রিয়গুলো বিশেষ ভূমিকা নিয়ে থাকে। জ্ঞান ইন্দ্রিয় অর্থাৎ চক্ষু কর্ন নাসিকা জিহবা ত্বক যা কিছু দর্শন করছে, শ্রবণ করছে, আস্বাদন করছে, এগুলো থেকে আমাদের মধ্যে সংকল্পের উদয় হচ্ছে। আর সঙ্কল্প যখন উদয় হচ্ছে, তখন আমাদের অজ্ঞাতসারেই কর্ম্ম-ইন্দ্রিয়গুলো ক্রিয়াশীল হয়ে উঠছে। তো আমরা যদি ধরে নেই, আমাদের মনের আসন হচ্ছে আমাদের হৃদয়দেশ তবে এই হৃদয়দেশ থেকে কোনো না কোনো বাহক নাড়ী মনের সংকল্পের সংবাদ কর্ম্ম-ইন্দ্রিয়ের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। অর্থাৎ মনের সঙ্গে যেমন জ্ঞান-ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে একটা নাড়ী সংবাদ বাহক হিসেবে কাজ করছে, তেমনি মনের সঙ্গে আরো এক বা একাধিক নাড়ী কর্ম্ম-ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। এই ক্রিয়া ঘটে থাকে বৈশ্বানরগুনে অর্থাৎ জাগ্রত অবস্থায়।

আবার তৈজষগুন আমাদের স্বপ্নাবস্থায় দর্শন ইত্যাদি কার্য্য সম্পাদন করছে। এই দর্শনের ফলে একটা উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে। কেবল স্বপ্ন দর্শন ক্রিয়া স্নায়ুর মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। শোনা যায়, অপ্সরার দর্শনের ফলে ঋষির (দ্রোণের পিতা ) শরীর থেকে শুক্র নিক্ষিপ্ত হয়ে কলসির মধ্যে পড়েছিল। আর সেখান থেকে দ্রোণের জন্ম হয়। তো স্ত্রী-সংসর্গ না হওয়া সত্ত্বেও কেবলমাত্র মনঃ-সংকল্প দ্বারা ক্রিয়া সংগঠিত হতে পারে । এই অভিজ্ঞতা আমাদের সকলের হয়ে পারে । স্বপ্ন-দোষে পুরুষের দেহ থেকে শুক্র নির্গত হয়ে থাকে। ঠিক তেমনি অনুরাগ বশত এই মনোবহা নাড়ী , নারীর দেহ থেকেও সংকল্প জনিত কারনে রস বা রজঃ নিঃসরণ করে দেয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, মনোবহা নাড়ীর সাহায্যেই বাহ্য ক্রিয়া স্ফূরিত হচ্ছে। আর এটাই ত্রিগুণময়ী প্রকৃতির সংসার লীলা বা সংসারের স্ফূরণ - প্রকাশ। আসলে আমরা বলতে চাইছি, ক্রিয়া হচ্ছে মন-ইন্দ্রিয়ের খেলা, যা নাড়ী বাহিত হয়ে কাজ করছে। এখন কথা হচ্ছে এই যে ক্রিয়া একে আপনি রোধ করবেন কি করে ?

যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, কর্ম্ম তোমাকে করতেই হবে। এখন তুমি গুরুবাক্যঃ অনুসারে ধর্ম্মক্রিয়া করো আর গুরুবাক্যঃ উপেক্ষা করে অধর্ম্ম ক্রিয়া করো। ধর্ম্মক্রিয়া, যা তোমার মঙ্গল করবে, আর অধর্ম্ম ক্রিয়া যা তোমার অমঙ্গল সাধিত করবে। উপায় হচ্ছে, নিরোধ। মনকে নিরোধ করতে হবে। আর মনকে নিরোধ করতে গেলে প্রাণকে নিরোধ করতে হবে। প্রাণক্রিয়ার ফলে যোগীর মধ্যে ত্রিগুণের সাম্যাবস্থা দেখা যায়। আর গুনের সাম্য লাভ করে, সুষুম্না মার্গে প্রাণকে প্রেরণ করতে পারলে, মন বিশ্বাত্মক হয়। অর্থাৎ মনের বিস্তারলাভ হয়। আর মন যখন বিস্তার লাভ করে, তখন মনেরমধ্যে জ্ঞানের বিস্তার ঘটতে থাকে। সমস্ত বিষয় তখন মনের মধ্যে পরিস্কার ভাবে ফুটে ওঠে। মন তখন বাসনাবিহীন অথচ সর্ব্বশক্তিমান হয়ে ওঠে। এই প্রাণক্রিয়ার অভ্যাসের ফলে ইন্দ্রিয় দ্বারা প্রভাবিত যে সংকল্প তার রোধ ঘটে। আর সঙ্কল্প ইত্যাদির রোধ হলে সাধন ক্রিয়ার উচ্চ অবস্থা আসে। তখন একটা স্থিতাবস্থা দেখা যায়। অর্থাৎ ক্রিয়াহীন অবস্থা দেখা যায়। একেই আপনি আত্মস্থ ভাব বা ঈশ্বর ভাব বলতে পারেন।
তো ঈশ্বরকে অনুভব করতে গেলে, আমাদের স্থিতাবস্থায় আসতে হবে। মূলাধার থেকে বিভিন্ন চক্র ভেদ করে ব্রহ্ম নাড়ীতে প্রাণের প্রবেশ ঘটাতে হবে। যার কারনে আমাদের ইন্দ্রিয়সকল ক্রিয়াশীল হচ্ছে, তাকে যদি স্থির করে দেওয়া যায়, তবে আর ইন্দ্রিয়সকল বাহ্য কর্ম্মে লিপ্ত থাকতে পারবে না। এই ব্যাপারটা আমরা আরো একটু ভালোভাবে বুঝবার চেষ্টা করবো। ...
প্রত্যেকের শরীরে মূলাধারে কুণ্ডলিনী শক্তি সুপ্ত অবস্থায় রয়েছেন। সাধনক্রিয়া দ্বারা এই শক্তিকে জাগ্রত করলে, সূক্ষ্মরূপে প্রাণ, শরীরের মেরুদণ্ডে স্থিত যে পঞ্চতত্ত্ব তার মধ্যে প্রবেশের অধিকার জন্মে। তখন বাহ্যিক জগৎরূপ আবরণ দৃষ্টিগোচর হয় না। তখন ভিতর বাহির এক হয়ে যায়, আর ক্রিয়াহীন অবস্থা হয়। এই ক্রিয়াহীন অবস্থায় যাবার জন্যই যত সাধনক্রিয়া। প্রাণ জীবাত্মাকে সঙ্গে নিয়ে যতক্ষন সুষুম্নার বাইরে ছিল, ততক্ষন মায়ার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল, আবার যখন সুষুম্নার মধ্যে প্রবেশ করলো, তখন মায়ার প্রভাব থেকে মুক্ত হলো। এই মায়ার প্রভাবেই শরীর ইত্যাদিতে আত্মবুদ্ধি হয়ে থাকে। এই মায়ার প্রভাবেই সংসার কল্পিত হয়। আবার মায়ার প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারলেই, সংসারবোধের নিস্পত্তি হয়। তখন বাহ্যিক কর্ম্মফল তাকে বিড়াম্বনায় ফেলতে পারে না। মুন্ডক উপনিষদ (৩/১/৯) বলছেন, প্রাণবায়ু পাঁচ ভাগে ভাগ হয়ে দেহের সবত্র ছড়িয়ে আছে। আবার এই সূক্ষ্ম আত্মাও রয়েছেন, যিনি আমাদের শুদ্ধ বুদ্ধির গোচর। সকল বস্তু ও ইন্দ্রিয়ের মধ্যেও শুদ্ধ আত্মা চৈতন্যরূপে বিরাজ করেন। চিত্ত শুদ্ধি হলেই, তিনি নিজেকে প্রকাশ করেন।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ২১.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৬২-৬৩
তমেব শরণং গচ্ছ সর্ব্বভাবেন ভারত
তৎ প্রসাদাৎ পরাং শান্তিং স্থানং প্রাপ্স্যসি শাশ্বতম। (১৮/৬২)

হে ভারত সর্ব্বভাবে তাঁরই শরণাগত হও। তাঁরই প্রসাদে পরমা শান্তি ও নিত্যধাম প্রাপ্ত হবে।

গুরুদেব যখন শিষ্যকে ভগবানের কাছে নিয়ে যাবার জন্য নির্দেশাদি দেন, তখন প্রথম দিকে বলেন, তুমি আমাকে লক্ষ করে এগিয়ে এস। আমি যা বলি তাই করো। আমি যে পথে যেতে বলি, সেই পথে হাটো। আমাকে অনুসরণ করো। এর পরে যখন ভগবানের মন্দিরের দুয়ারে পৌঁছে যান, তখন গুরুদেব বলেন, এই দেখো ভগবান, তুমি এবার এঁর শরনাপন্ন হও।
যিনি সর্বভূতে অবস্থান করছেন, যিনি সর্বভূতের হৃদয়গুহায় অবস্থান করছেন, সংসার দুঃখ থেকে পরিত্রান পাবার জন্য, সর্ব্বতো ভাবে তাঁর স্মরনাপন্ন (চিন্তন) হও। দেহ, মন, প্রাণ, ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি সবাইকে অতিক্রম করে কেবলমাত্র তাঁর শরণ নাও। আর তাহলেই তুমি পরমা শান্তি লাভ করতে পারবে।

জীবকুল ভালো মন্দ, শুভ অশুভ যা কিছুই করুক না কেন, তার মুলে আছে, সেই এক-ঈশ্বরের শক্তি। ঈশ্বরের শক্তি বিনা, ভালো বা মন্দ কোনো কিছুই কারুর পক্ষেই করা সম্ভব নয়। তো প্রথমে আমাদের মন্দকে পরিহার করে, ভালোর দিকে এগুতে হয়। প্রবৃত্তিকে পরিহার করে নিবৃত্তির দিকে যেতে হয়, ভোগ কে ত্যাগ বৈরাগ্যের দিকে অগ্রসর হতে হয়। অবিদ্যাকে পরিহার করে বিদ্যার আশ্রয় নিতে হয়। ভেদ বুদ্ধি পরিহার করে অভেদবুদ্ধির আশ্রয় নিতে হয়। আর সবশেষে সেই ভগবানের আশ্রয় নিতে হয়। আর সেই আত্মরূপী ভগবান আছেন, সবার হৃদয়গুহায়। অর্থাৎ সবথেকে নিকটে। তাঁর উপস্থিতিতেই আমি আমাকে দেখতে পাচ্ছি। তার উপস্থিতির কারণেই আমি-আমার অস্তিত্ত্ব। আর এই ভগবান নিত্যস্বরূপ, আনন্দস্বরূপ, জ্ঞানস্বরূপ। এই সৎ-চিৎ-আনন্দ সমুদ্রে তুমি বুদ্বুদের আকারে নাম-রূপময় হয়ে সমুদ্র থেকে নিজেকে আলাদা মনে করছো। যখন সাধনক্রিয়ার ফলে এই সমুদ্র শান্ত হবে, আনন্দ সিন্ধুর হিল্লোল যখন থেমে যাবে, প্রাণশক্তি যখন স্পন্দনহীন হবে, তখন তোমার জ্ঞানের স্ফূরণ শুরু হবে। প্রাণ তখন সুষুম্নার মধ্যে সঞ্চরণ করবে।

একসময় এই প্রাণ সুষুম্না ছেড়ে ইড়া-পিঙ্গলায় এসে প্রবিষ্ট হওয়ায় তোমাকে অবিদ্যা রূপ মায়া-মোহ আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো, ভোগ-লালশায় মগ্ন হয়েছিল। তখন তুমি তোমাকে ভুলে গিয়েছিলে। এখন সেই অবস্থা থেকে তোমার গুরুকৃপায় উদ্ধার হবে। তাই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, "তমেব শরণং গচ্ছ সর্ব্বভাবেন ভারত" সর্ব্বতভাবে তাঁরই শরণাগত হও।


ইতি তে জ্ঞানম-আখ্যাতং গুহ্যাদ গুহ্যতরং ময়া
বিমৃষ্য-এতদ-অশেষণ যথেচ্ছসি তথা কুরু। (১৮/৬৩)

আমি তোমাকে গুহ্য থেকে গুহ্যতর জ্ঞান বললাম। তুমি এখন ভালোমতো বিচার করে, যা ইচ্ছে তাই করো।

যোগেশ্বর ভগবান এবার গীতার শেষে চলে এসেছেন। যেন, যা বলার ছিলো , সবই তো বলা হলো। এবার তুমি তোমার বিচার বুদ্ধি দিয়ে যা ভালো বোঝো তাই করো। কর্ম্ম যোগের বলা হয়েছে, জ্ঞান যোগের কথা বলা হয়েছে, ধ্যানযোগের কথা বলা হয়েছে, ভক্তি যোগের কথা বলা হয়েছে, এবং এসবের ফলাফলের কথাও বলা হয়েছে। এবার কর্তব্য নির্নয় করবার অধিকার তোমার।

মানুষ জন্মের পর থেকেই দেহাত্মভাবে ভাবিত হয়ে নিজেকে কর্ত্তা ভেবে সমস্ত কর্ম্ম করে থাকে। একসময় সে বুঝতে পারে, যে সমস্ত কর্ম্মফল তার নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী হচ্ছে না। কোথায় যেন একটা অদৃশ্য শক্তি এই কর্ম্মফলকে নিয়ন্ত্রণ করছে। বিচার বুদ্ধি দিয়েও এই অদৃশ্যশক্তিকে অনুধাবন করা যায় না। তবে এই বিচার, অর্থাৎ ঈশ্বর-আলোচনার মাধ্যমে অদৃশ্যশক্তি সম্পর্কে একটা ধারণা প্রথমে বিশ্বাস আকারে মনের মধ্যে বাসা করে নেয়। কিন্তু শুধু বিশ্বাসে, এই অদৃশ্য শক্তিকে আয়ত্ত্বে আনা যায় না। এঁকে উপল্বদ্ধিতেও আনা যায় না। তখন তার মধ্যে একটা ঐকান্তিক প্রচেষ্টার উদ্ভব হয়। যা একসময় তপস্যার আকার নেয়। অর্থাৎ নিজেকে নিঃশেষ করেও, যেন তাঁকে জানবার ইচ্ছে প্রবল থেকে প্রবলতর হয়। এতেও যখন কোনোকাজ না হয়, তখন একটাসময় নিশ্চেষ্ট হয়ে আত্মসমর্পন করে। এই আত্মসমর্পনই ক্রিয়ার উত্তম অবস্থা। এই অবস্থায় উন্নীত হতে পারলে, প্রকৃতির অধীনতা অগ্রাহ্য করবার স্বাধীনতা বা ক্ষমতা জন্মায়। আর ঠিক এইসময় ঐকান্তিক অনুরাগ বশতঃ আত্মউপল্বদ্ধি হয়। তখন সমস্ত বাসনার বিলোপ হয়। একেই বলে ভক্তিযোগ। তখন মন বুদ্ধি আত্মস্থ হয়ে যায়। আর জীবাত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে ভেদরেখা মুছে যায়। একেই বলে পরমজ্ঞানের অবস্থা। এই অবস্থায় আপন-পর ভেদ থাকে না। যুক্তি তর্ক থাকে না। ইচ্ছে অনিচ্ছে থাকে না। একেই যোগেশ্বর ভগবানের ভাষায় পরমধাম প্রাপ্তি, পরমা শান্তির অবস্থা।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ২২.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৬৪-৬৫
সর্ব্ব গুহ্যতমং ভূয়ঃ শৃণু মে পরমং বচঃ
ইষ্টঃ-অসি মে দৃঢ়ম-ইতি ততো বক্ষ্যামি তে হিতম। (১৮/৬৪)

আরো একবার সবচেয়ে গুহ্যতম আমার কথা শোনো। তুমি আমার প্রিয় তাই আমি তোমাকে এই কল্যাণকর করা বলছি।

গীতশাস্ত্রের মধ্যে গুহ্য থেকে গুহ্যতর, গুহ্যতম তত্ত্বকথা অশেষরূপে গ্রহণে অসমর্থ আমরা। বারংবার শুনেও আমাদের মধ্যে এই তত্ত্বজ্ঞানের আলোকশিখা প্রজ্বলিত হয় না। কখনও মনে হয় বুঝেছি, আবার ক্ষনিকপরে ব্যবহারিক জীবনে তার প্রয়োগে আমরা অসমর্থ হয়ে যাই। এই সত্য শ্রী ভগবানের কাছেও অজ্ঞাত নয়। তাই তিনি বারবার আমাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলবার জন্য প্রয়াস করে থাকেন। করুনাময়, দয়াময় ঈশ্বরের এটাই স্বভাব। আর এই তত্ত্বকথা বারবার বলবার হেতু সম্পর্কে বলছেন, "ইষ্টোহসি মে দৃঢ়মিতি" - তুমি আমার প্রিয়।

আচার্য্য শঙ্করের আনন্দগিরি নামে এক ব্রাহ্মণ-শিষ্য ছিলো। এই গিরি লেখাপড়া বিশেষ জানতো না। কিন্তু শুদ্ধচেতা এই যুবক ছিল শঙ্করাচার্য্যের একনিষ্ট ভক্ত। এই গিরি শাস্ত্রবিদ্যায় বা শাস্ত্র বিচারে ছিল অপারগ। কিন্তু তার মধ্যে ছিল গুরুর প্রতি অগাধ ভক্তি ও শ্রদ্ধা, আর শাস্ত্রপাঠ শ্রবনে সে ছিল একনিষ্ট। তাই গুরুদেব যাকিছু বলতেন, তা গিরি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতো - বুঝুক আর না বুঝুক - শ্রী গুরুর মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে কান খাড়া করে থাকতো। আর তার এই অগাধ ভক্তি শ্রদ্ধার কারনে তার উপরে গুরুকৃপা বর্ষিত হয়েছিলো অকৃপণ ভাবে। আর এই গুরুকৃপাতেই স্বল্পশিক্ষিত, অবোধ বালক গিরি একদিন হয়ে উঠলো তোটক-আচার্য্য।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যেন বলতে চাইছেন, তোমাকে রহস্য কথা অনেকবার বলেছি, গুহ্য সাধনতত্ত্বও বলেছি, তার কারন তুমি শ্রদ্ধালু। শ্রদ্ধাহীনকে গভীরতত্ত্ব-উপদেশ দেওয়া নিস্ফল। আসলে যতক্ষন আমরা নিজেই নিজেকে না বোঝাতে পারছি, ততক্ষন কেউ কাউকে বোঝাতে পারে না। আর এই বোঝার শক্তি তখনই বৃদ্ধিপায় যখন মানুষ ইষ্ট সাধনায় দৃঢ় হয়। সাধনক্রিয়ায় দৃঢ়তা এলে, ভগবৎকৃপা বর্ষিত হতে শুরু করে, আর পরম রহস্য প্রকাশিত হতে শুরু করে। প্রথমে শাস্ত্রজ্ঞান, তারপরে গুরুমুখে শুনে পরোক্ষজ্ঞান লাভ হয়। এর পরে ভগবৎ কৃপা বারি বর্ষণ শুরু হলে, ক্ষেত্র উজ্জীবিত হয়। যতক্ষন কৃপাবারি বর্ষণ শুরু না হচ্ছে, ক্ষেত্র থাকে শুখা। আর নিরস জমিতে ফসল হয় না। তো জ্ঞান প্রথমে পরোক্ষ থাকে সেই একই জ্ঞান পরে প্রতক্ষ্য হয়ে ওঠে। আর এই অপরোক্ষ জ্ঞানই কল্যাণকর, যা একমাত্র ভগবৎ কৃপাতেই প্রাপ্ত হওয়া যায়।


মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদযাজী মাং নমস্কুরু
মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্ৰিয়োহসি মে । (১৮/৬৫)

তুমি মদ্গত চিত্ত হও, আমাকে ভক্তি করো, আমার পূজা করো, আমাকে নমস্কার করো। আমি প্রতিজ্ঞাপূর্ব্বক তোমাকে বলছি, তুমি আমাকেই লাভ করবে, কেননা, তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয়।

এর আগে আমরা শুনেছি :
১১/৫৫ - যে ব্যক্তি আমর জন্য সমস্ত কর্ম্ম করেন, আমার প্রতি নিষ্ঠাযুক্ত, আমার অনন্য ভক্ত, সর্ব্ববিষয়ে আসক্তিহীন, যার মধ্যে শত্রুভাব নেই, তিনি আমাকে প্রাপ্ত হন।
১২/৮ - আমাতেই মন রাখো, আমাতেই বুদ্ধি নিবিষ্ট করো, তাহলে দেহান্তে তুমি আমাকে লাভ করবে।
১২/৯ - যদি আমাতে চিত্ত না রাখতে পারো, তবে অভ্যাস যোগের দ্বারা আমাকে লাভ করবার চেষ্টা করো।
১২/১০ - যদি অভ্যাসে অসমর্থ হও তবে মৎ-কর্ম্ম পরায়ণ হও। আমার প্রীতি সাধনের জন্য সমস্ত কর্ম্ম করো।
১২/১১ - যদি এতেও অশক্ত হও , তাহলে আমাতে কর্ম্ম সমর্পন রূপ যোগের আশ্রয় করে সংযতচিত্ত হয়ে সমস্ত কর্ম্মের ফল ত্যাগ করো।
১২/১২ - অভ্যাস-যোগ থেকে জ্ঞানযোগ ভালো, জ্ঞানযোগ থেকে ধ্যানযোগ শ্রেষ্ঠ, ধ্যানযোগে থেকে কর্ম্মফল-ত্যাগ আরো ভালো।
৯/৩৪ - "মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদযাজী মাং নমস্কুরু। মামে বৈষ্যসি যুক্তৈবম-আত্মানং মৎ পরায়ণঃ। " - অর্থাৎ একই নির্দেশ - বা প্রতিশ্রুতি, তিনি আগেও দিয়েছেন।

এবার শেষে সারকথা বলছেন, প্রথমতঃ "মন্মনা ভবো" - অর্থাৎ মৎচিত্ত পরায়ণ হও। দ্বিতীয়তঃ - মদ্ভক্ত অর্থাৎ ভক্তির সাথে আমাতে আত্মসমর্পন করো। তৃতীয়তঃ - মদযাজি অর্থাৎ আমার যজন বা আমার পূজা অর্চনা করো। চতুর্থতঃ সবশেষ হচ্ছে আমাকেই নমস্কার অর্থাৎ নতি স্বীকার করো।

মন্মনা - আপনাতে আপনি থাকাই মন্মনা ভাব। ব্রহ্মে চিত্ত বিলয় করাই মন্মনা । এই অবস্থায় মন কূটস্থে স্থির হয়। প্রাণের চঞ্চলতা হেতু মনের চঞ্চলতা। ইন্দ্রিয় সংস্পর্শে মন বহির্বিষয় নিয়ে ব্যস্ত। সেখান থেকে শ্রীভগবানে স্থাপন করতে হবে। সুতরাং চিত্তের যে নিরন্তর বহির্মুখী ভাব, তাকে অন্তর্মুখী করতে হবে। প্রাণের স্পন্দনের কারনে মনের মধ্যে স্পন্দন উঠছে। আর এই স্পন্দন হেতু মনের মধ্যে সংকল্প-বিকল্পের উদয় হচ্ছে। বলা হয় মনের এটাই ধর্ম্ম অর্থাৎ এটাই মনের স্বাভাবিক স্বভাব। আর এই কারণেই মনকে সহজে সংকল্প-বিকল্পশূন্য করা যায় না। এখান থেকে বেরুতে গেলে প্রথমে প্রাণের স্থিরতা আনতে হবে। প্রাণ স্থির হলেই মনের স্থিরতা আসবে। তখন আমরা মনকে বহির্জগৎ থেকে অন্তর্জগতে বৃত্তিশূন্য অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো।

স্থুল দেহের মধ্যে স্পর্শকাতর আধ্যাত্মিক স্থান হচ্ছে ১, সহস্রার, ২. আজ্ঞাচক্র, (ভ্রূযুগলের মধ্যবর্তী স্থান) ৩. হৃদয়স্থল বা অনাহত চক্র। এর মধ্যে সহস্রার উত্তম, আজ্ঞা মাধ্যম ও অনাহত সর্ব্ব সাধারণ। তাই অধিকারীভেদে সাধক সহস্রারে, আজ্ঞায় বা অনাহত চক্রে মনকে স্থাপন করতে পারেন। কিন্তু যোগীপুরুষগন বলে থাকেন, সহস্রারে মনকে স্থাপন করা, শুধু কঠিন নয়, নিরাপদও নয়। এমনকি আজ্ঞাচক্রে মনকে নিবিষ্ট করতে গেলে, দুর্ব্বল শরীর ও মনের মানুষের মাথা ঘোরে। তাই সর্ব্বসাধারনের জন্য, বা প্রাথমিক সাধকের ক্ষেত্রে অনাহত বা হৃদয়চক্রে মনকে স্থাপন করা অধিক নিরাপদ ও সহজসাধ্য। প্রথমে প্রাণায়ামের সঙ্গে সঙ্গে মূলাধার থেকে প্রতিটি চক্রে পর্যায়ক্রমে মনকে স্থাপন করে এই চক্রগুলোর সঠিক অবস্থান নির্নয় করে নিতে হয়। তার পরে এই পরিক্রমার সঙ্গে অধিক সময় অনাহত চক্রে মনকে স্থির রাখার অভ্যাস আয়ত্বে আসে। আর এই অভ্যাসই ধীরে ধীরে মনকে স্পন্দনহীন বা স্থির করে দেয়। তখন মনের মধ্যে ইষ্টভিন্ন অন্য চিন্তার উদয় হয় না। এই অবস্থা কেবল মাত্র নিরন্তর অভ্যাসেই আয়ত্বে আসতে পারে, অন্য কোনো উপায় নেই। রসগল্লার স্বাদ যেমন কারুর মুখে শুনে, বা রচনা পড়ে উপলব্ধ হয় না, তেমনি নিরন্তর সাধনার অভ্যাস ব্যাতিত মনকে বৃত্তিশূন্য অবস্থায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। মনের এই যে আত্মস্থিত অবস্থা, নিরুদ্ধ অবস্থা একেই বলে মন্মনা অর্থাৎ আপনাতে আপনি থাকা। সমষ্টি মনের সাথে ব্যষ্টি মনের মিলন।

এখন পরবর্তী পদক্ষেপের কথা বলছেন, সেটি হচ্ছে যাদের পক্ষে এই মন্মনা ভাব আয়ত্ব করা সম্ভব নয়, অর্থাৎ সমষ্টি মনের সঙ্গে ব্যষ্টি মনকে লয় করে দেওয়া সম্ভব না হয়, তাদের উচিত মদ্ভক্ত হওয়া। ভক্ত হওয়া কথাটার অর্থ হচ্ছে অনুগত হওয়া। ভক্তি নয় প্রকার - নামশ্রবণ, কীর্ত্তন, স্মরণ, পদসেবা, পূজা, স্তব, পরিচর্য্যা, সখ্যভাব, এবং আত্মসমর্পন। সাধনক্রিয়ার সাহায্যে নিজেকে প্রস্তুত করা হয় - কূটস্থে স্থিত থাকার জন্য। মন তার স্বভাব বশত আপনা হতে অন্যত্র ছুঁটে যেতে চাইবে। কিন্তু তথাপি মনকে প্রত্যাহার ক্রিয়ার দ্বারা কূটস্থের চিন্তায় নিযুক্ত করতে হবে। আর কূটস্থের মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত সাময়িক ভাবে করতে পারলেও, ক্ষনিকের তরে হঠাৎ একদিন জ্যোতি দর্শন হবে, বা নাদের দিব্য সুমধুর ধ্বনি শুনতে পাওয়া যাবে। আর এই জ্যোতি বা ধ্বনি সাধককে আকৃষ্ট করবে। এবং নেশাগ্রস্থের মতো ধ্যানের পথে নিয়ে যাবে। এই হচ্ছে ভক্তির ফল।

এখন কথা হচ্ছে কেউ যদি এই অবস্থাও আয়ত্ত্ব করতে না পারেন - তিনি মদযাজি করবেন। সমস্ত বোধের উর্দ্ধে উঠে শুধু সাধনক্রিয়া অর্থাৎ যাকিছু তিনি করছেন, তা যেন কেবল তাঁরই ক্রিয়া হয়, এমন ভাব নিয়ে সমস্ত কর্ম্ম করবেন।
সবশেষে বলছেন, "মাং নমস্কুরু" . এর অর্থ হচ্ছে ওঙ্কারের সাধনা। শ্বাসের সঙ্গে ওঙ্কারের সাধনা। যিনি এই ওঙ্কারের সাধনা করেন, তার প্রাণশক্তি সহজেই উর্দ্ধগামী হয়ে থাকে। আত্মপূজাই শ্রেষ্ঠ পূজা। এই পূজা আমরা সবাই আমাদের অজ্ঞাতসারেই সম্পন্ন করছি। ওঙ্কার প্রতিনিয়ত ধ্বনিত হচ্ছে, শ্বাস-প্রশ্বাস আমাদের প্রতিক্ষনে ক্রিয়াশীল থাকছে , আপনি শুধু এই ক্রিয়ার দিকে মনোযোগ দিয়ে সমস্ত বাহ্য কর্ম্ম করুন। অর্থাৎ আপনি যার বলে বলীয়ান হয়ে আমি আমি করছেন, সেই শ্বাস-প্রশ্বাসকে সঙ্গে নিজেকে বিলিয়ে দিন। এই উত্তম সাধনক্রিয়া কিছুদিন করলেই, আপনি আপনাকে ভুলে যাবেন, তখন তুমি বলেও কিছু থাকবে না, সবাই এক আমিতে এসে মিশে যাবে অর্থাৎ স্বরূপে প্রতিষ্টিত হবে। এই হচ্ছে সাধনক্রিয়ার পরিণতি, এর অন্যথা হবার কোনো উপায় নেই। প্রকৃতি যেমন নিয়মের অধীন, তেমনি সাধনক্রিয়ার ফলও নির্ধারিত নিয়মেই হয়ে থাকে। যাঁরা যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ অনুযায়ী এই সাধন ক্রিয়ায় মনঃসংযোগ করবেন, তাঁকে স্বয়ং ভগবানও সাধনফল থেকে বঞ্চিত করতে পারবেন না। তাই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, আমার কথা শুনলে "তুমি আমাকেই লাভ করবে" কারন ভগবানের কাছে সাধক সবথেকে প্রিয়।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ২৩.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৬৬

সর্ব্বধর্ম্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরনং ব্রজ
অহং ত্বাং সর্ব্বপাপেভ্যো মক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ। (১৮/৬৬)

সর্ব্বধর্ম্ম পরিত্যাগ করে তুমি একমাত্র আমার শরণ গ্রহণ করো, আমি তোমাকে সর্ব্ব প্রকার পাপ হতে বিমুক্ত করবো - শোক করো না।

শোক করো না - বলে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীগীতা শুরু করেছিলেন। আবার একদম শেষের দিকে এসে, সেই শোক করো না বলে শ্রীগীতার কথা শেষ করতে চলেছেন। এর আগে শুনেছি, স্বধর্ম্ম পালনের উপদেশ - এবার বলছেন সকল ধর্ম্ম বিসর্জন দিয়ে আমার শরণ নাও। আর সমগ্র গীতার এটাই মর্ম্মকথা, এটাই সারকথা, এটাই শেষ কথা। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবার সার কথাটি বলে শ্রী গীতার উপসংহার টানতে চলেছেন। তো আমরা শ্রীগীতার এই মর্ম্মকথাটা কথাটা একটু ভালোভাবে বুঝবার চেষ্টা করবো।

এর আগে, ভগবান আমাদের কর্ম্মযোগের কথা বলেছেন, জ্ঞানযোগের কথা বলেছেন, ধ্যান যোগের কথা বলেছেন, বিভূতিযোগের কথা বলেছেন, ভক্তিযোগের কথা বলেছেন, এমনিতর সতেরটি অধ্যায়ে ১৭টি যোগের কথা বলেছেন। একদম শেষে এসে এবার মোক্ষযোগের কথা বলে শ্রীগীতার সমাপ্তি টানতে চলেছেন। আর এখানে এসে বলছেন, সবকিছু ছেড়ে দিয়ে আমরা শরণ নাও।

কত শাস্ত্রগ্রন্থ পাঠ করলাম, কতো পন্ডিতের কাছে শাস্ত্রের ব্যাখ্যা শুনলাম। যোগী পুরুষের কাছে যোগশিক্ষা করলাম। কত প্রশ্ন জেগেছিলো মনে, আর তার জন্য কত কত গুরুদেবের সেবা করলাম। কত উপদেশ শুনলাম, কত কাজই-না করলাম, আর কত কিছুই-না পরিত্যাগ করলাম, জীবনের অধিক সময় নিৰ্জনে পাহাড়ে জঙ্গলে, অনাহারে, অনিদ্রায় কেটে গেলো, অথবা সংসারের ঘানি টেনে, বিষয়লাভের প্রত্যাশায় জীবন অতিবাহিত করলাম। তথাপি মনের ক্ষিদে মিটলো না। অধরা, অধরাই থেকে গেলো। সবাই বললেন, আরো আরো আরো এগুতে হবে। জানি না, এ পথের শেষ কোথায় ?

তো যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এতোক্ষনে বলছেন, "সর্ব্বধর্ম্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরনং ব্রজ" সমস্ত ধর্ম্ম-অধর্ম্ম পরিত্যাগ করে, আমার শরণে এসো।

দেখুন আপনি যা কিছু করছেন, বা করছেন না, সেসব কেবলমাত্র ভগবৎ শক্তিতেই হচ্ছে। ভগবানকে ছাড়া কোনো কর্ম্ম করা যায় না, এই বোধ যতদিন আমাদের না হচ্ছে, ততদিন আমাদের কর্ম্ম করেই যেতে হবে। এই কর্ম্মে সাফল্য পাবার জন্য, আমাদের আপ্তবাক্যের উপরে নির্ভর করতে হবে। ধর্ম্মের অধর্ম্মের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে। কর্তব্য-অকর্তব্য সম্পর্কে পার্থক্য বুঝতে হবে। শাস্ত্রগ্রন্থ পাঠ করতে হবে। গুরুদেবের বা আচার্য্যের নির্দেশ শুনতে হবে।
ভগবানকে বাদ দিয়ে যে কর্ম্ম তা প্রকৃতিজাত। আর এই প্রকৃতিজাত কর্ম্ম আমরা আমাদের স্বভাববশত জৈবিক তাড়নায়, জীবসত্ত্বার অস্তিত্ত্ব টিকিয়ে রাখবার জন্য করে থাকি। আর এই জৈবিক কর্ম্মই আমাদের জীবসত্ত্বাকে জন্ম জন্মান্তর ধরে টিকিয়ে রেখেছে। এখান থেকে বেরুতে গেলে দরকার ভগবৎ কর্ম্ম। এই ভগবৎ কর্ম্ম হচ্ছে প্রেমের স্ফূরণ। এই প্রেম জৈবিক প্রেম নয়, এই প্রেম শুদ্ধপ্রেম, অহৈতুকী প্রেম। আর এখানে প্রেমাস্পদ হচ্ছেন স্বয়ং ভগবান। আত্মশুদ্ধি হলেই এই প্রেমের স্ফূরণ ঘটে থাকে।

দেখুন একদল মানুষ আছেন, যারা নিজের সুখের জন্য কাউকে ভালোবাসেন, একদল আছেন যারা উভয়ের সুখের জন্য কাউকে ভালো বাসেন। আর একদল আছেন, যারা পরের সুখের জন্য ভালোবাসেন। তো আমরা কর্ম্ম করি, আমাদের ভালোর জন্য, কিন্তু একদল আছেন যাঁরা লোকহিতার্থে কর্ম্ম করেন। আবার একদল আছেন, পরের জন্য (স্ত্রী-পুত্র-পরিবার যার মধ্যে নিজেকে দেখতে পান ) অর্থাৎ পক্ষান্তরে আমি ও আমার জন্য কর্ম্ম করেন। আর এক দল আছেন, তাঁরা স্বভাববশে কাজ করেন - কোনো প্রত্যাশা পূরণের জন্য নয়।

দেখুন অধ্যাত্ম জীবনের কথা বললেই বুঝি কিছু ভালো কর্ম্ম করতে হবে, অথবা কিছু খারাপ কর্ম্ম পরিত্যাগ করতে হবে। সাধারণ মানুষ বিষয়বাসনা পূরণের জন্য বিষয়-কর্ম্ম করে থাকে, আর সাধকপুরুষ ঈশ্বরকে পাবার জন্য সাধন-কর্ম্ম করে থাকেন। আসলে এই কর্ম্ম করা বা না করার সঙ্গে বিষয় বা ঈশ্বরের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা ভাবি বিষয়-কর্ম্ম করলে বিষয়লাভ হয়, বা সাধনক্রিয়া করলে ঈশ্বর লাভ হয়। কর্ম্মের সঙ্গে না আছে বিষয়ের কোনো সম্পর্ক না আছে ঈশ্বরের কোনো সম্পর্ক। বিষয়লাভ বা ঈশ্বরলাভ কেবলমাত্র দৈব প্রভাবেই ঘটে থাকে। এই গূঢ় রহস্য আমাদের কাছে অজ্ঞাত।
দেখুন এই যে শরীর এটি একটি আলোর তরঙ্গ বিশেষ। প্রতিনিয়ত পরিবর্তনে মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে। এই পরিবর্ত্তন আপনি রোধ করতে পারবেন না। আর এই আলোর তরঙ্গ স্বরূপ স্থূল-সূক্ষ্ম-কারন দেহ তার নিজের গতিতে এগিয়ে যাবে। আমরা মনে করি কর্ম্ম হচ্ছে দেহ-মন-ইন্দ্রিয়-বুদ্ধির খেলা। আসলে এরা সবাই নিমিত্ত মাত্র। আর আপনি সমস্ত ঘটনাবলী বা কর্ম্মের সাক্ষী মাত্র। সমস্ত কর্ম্ম আগে থেকেই কৃত হয়ে রয়েছে, আমরা কেবল ঘুরন্ত রিলের উপরে, বা সিনেমার পর্দার উপরে ক্ষনিকের তরে মাছির মতো বসে পড়েছি। ঘটনা ঘটে চলেছে, আর আমি ঘটনার সঙ্গে ভেসে চলেছি।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা ভিন্ন ভিন্ন কর্ম্মে লিপ্ত হচ্ছি। এই কর্ম্ম করা আর কর্ম্ম না করার মধ্যে একটা ক্ষীণতর সময় আছে, যা কালের অধীন নয়। এটা বোঝা খুব কঠিন নয় । একটু খেয়াল করলেই, আমরা এই অবস্থাকে ধরতে পারি। আমরা শ্বাস গ্রহণ করি, আবার ছেড়ে দেই। আমরা কুম্ভক করি না। কারন বেঁচে থাকবার জন্য , বা জীবসত্ত্বাকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য কুম্ভকের প্রয়োজন নেই। শ্বাস ভিতরে যায়, আর বাইরে বেরিয়ে আসবার জন্য প্রস্তুত হয়. তখন একটা শুভক্ষণ উপস্থিত হয়। আবার শ্বাস যখন বাইরে বেরিয়ে আসে, আবার ভিতরে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়, তখন আরো একটা শুভক্ষণ উপস্থিত হয়। এই দুটো ক্ষণ কালের অতীত ক্রিয়াহীন অবস্থা। এই ক্রিয়াহীন অবস্থায়, আমরা প্রকৃতির উর্দ্ধে পুরুষের সঙ্গে বাস করি। অর্থাৎ এইসময় আমরা ভগবানের শরণে থাকি। তখন না মৃত্যু না জন্ম। আমরা শ্বাস নিচ্ছি মানে আমরা বেঁচে উঠছি, আবার যখন আমরা শ্বাস ছেড়ে দিচ্ছি, তখন আমরা মারা যাচ্ছি। এই জন্ম-মৃত্যুর খেলা চলছে, নিরন্তর। আর এই দুইয়ের মাঝখানে সেই পরমপুরুষের সাক্ষাতে আমরা জন্ম-মৃত্যুর ওপারে চলে যাই। এই সময়টা এতই স্বল্প যে আমরা ধরতে পারি না, বা ধরবার চেষ্টাও করি না।

যোগীপুরুষগন প্রথমে কৃত্তিমভাবে এই অবস্থায় অবস্থানের শিক্ষা নিয়ে থাকেন। অর্থাৎ কুম্ভকের মধ্যে অবস্থানের চেষ্টা করেন। সাধনক্রিয়া করতে করতে একটা সময় আসে, যখন যোগী এই জন্ম-মৃত্যুর মধ্যিখানে দীর্ঘকাল অবস্থান করে থাকেন। প্রাণক্রিয়া করতে করতে, এটি তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। যোগের দৃষ্টিতে একেই বলে ভগবানের শরণে থাকা। দেখুন আমরা সবাই দম দেওয়া পুতুল মাত্র। দম দেওয়া পুতুল যেমন প্রথম দিকে জোরে জোরে দোল খায়, আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দোলের গতি কমতে থাকে, তেমনি মানুষের জন্মের সময় যে দম পেয়েছিলো, তাতে সে প্রথম দিকে অধিক চঞ্চল থাকতে পড়তো, আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে এই দোলের গতি স্তিমিত হতে থাকে। শেষে একদিন স্থির হয়ে যায়।

ঠাকুর রামকৃষ্ণ একদিন বিবেকানন্দকে বলেছিলেন, তোর সব ভালো, কেবল ঘুমুলে তো শ্বাস জোরে জোরে বয়। এরা বেশিদিন বাঁচে না। উত্তেজিত অবস্থায় আমাদের শ্বাস জোরে জোরে বইতে থাকে। যা আসলে আমাদের আয়ুক্ষয় করে থাকে। যোগীপুরুষগনের দীর্ঘকাল বাঁচার পিছনে এই একই কারন , অর্থাৎ তাদের শ্বাস ধীরগতি সম্পন্ন। এরাই ঈশ্বরের কাছে থাকেন, ঈশ্বরের শরণে থাকেন। তবে আপনি হয়তো বলবেন, বেঁচে থাকাটাই কি বড়ো কথা ? ঈশ্বরের সঙ্গে থাকাটাই বড়ো কথা।

দেখুন কর্ম্ম তা-সে বৈষয়িক হোক বা অধ্যাত্মিক হোক, কর্ম্ম সবসময় জ্ঞানের উদয় ঘটিয়ে থাকে। এখন এই জ্ঞানকে ঠিক ঠিক অনুধাবন করা, বা অনুভবে আনা দরকার। কর্ম্ম কখনো সুখ ভোগের জন্য নয়। আবার ঈশ্বর শরণ মানে শয়তানের থেকে পরিত্রান নয়, বা দুর্ভোগ থেকে বাঁচার রাস্তা নয়। প্রতিটি কর্ম্ম দুটো ফল্প্রসব করে থাকে। একটা হচ্ছে কর্ম্মফল, আর একটা হচ্ছে প্রত্যক্ষ্য জ্ঞান। তো সাধকের উচিত কর্ম্মফলের প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে জ্ঞানের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া। আর এই জ্ঞানের প্রতি দৃষ্ট দেবার প্রক্রিয়াই হচ্ছে প্রাণক্রিয়া। এই জ্ঞানকে উপল্বদ্ধিতে এনে দিতে পারে আমাদের সজ্ঞা - যা সাধনক্রিয়ার ফলে আমাদের মধ্যে জাগ্রত হয়। কেননা প্রাণের সঙ্গে সর্ব্বক্ষন চেতনশক্তি ওতপ্রোত ভাবে। আর এই চেতন শক্তিকে ধরেই একসময় সেই চৈতন্যের কাছে যাওয়া যায়। সবাইকেই যেতে হবে, শুধু সময়ের অপেক্ষা। তাই আবার সেই কথা বলি, সেই ক্ষণকে ধরুন, যখন ক্রিয়াহীন হয়ে আমরা পুরুষে অবস্থান করি। তাহলেই আপনি আমি সবাই ঈশ্বরে শরণ নিতে পারবো। এই অবস্থা শোক দুঃখের অতীত অবস্থা। তাই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, আমার শরণে এলে, সমস্ত পাপ, সমস্ত শোক থেকে মুক্ত হতে পারবে।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ২৪.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৬৭

ইদং তে নাতপস্কায় নাভক্তায় কদাচন
ন চ-অশ্রুশ্রূষবে বাচ্যং ন চ মাং যোঅভ্যসুয়তি (১৮/৬৭)

যিনি তপঃহীন, যিনি অভক্ত, যিনি শুনতে চান না, যিনি আমাকে দ্বেষ করেন,তাঁকে তুমি এসব কথা বলবে না।

শ্রীমদ্ভগবৎ গীতাকে কেউ বলেন, ব্রহ্মবিদ্যা, কেউ বলেন, উপনিষদ, কেউ বলেন যোগশাস্ত্র। এই তিনের মধ্যে আসলে কোনো পার্থক্য নেই। অথবা বলা যেতে পারে, এই তিন বিদ্যার সমন্বয় আছে এই গ্রন্থে। আমরা শ্রীগীতাকে প্রথম থেকেই যোগশাস্ত্র হিসেবে দেখেছি, আর তাই এই শ্রীগীতার মধ্যেই আমরা যোগশাস্ত্রের সমস্ত নিগুড় তত্ত্বের সন্ধান পেয়েছি। এর মধ্যে যা কিছু আছে, তার সবই ভগবানকে ঘিরে। ভগবত সাধনার অধিকারী ভেদে, ভিন্ন ভিন্ন সাধনপথের সন্ধান দেওয়া আছে, এই গ্রন্থে। কিন্তু কথা হচ্ছে, আমাদের সবার জানবার ইচ্ছে, বুঝবার ক্ষমতা সবার সমান নয়। স্বধর্ম্মে যাদের আস্থা নেই, যা অসংযমী, অলস, তপঃ-সাধনার অযোগ্য, শ্রী গীতার সাধন উপদেশ তাদের জন্য নয়। যাদের মধ্যে শ্রদ্ধা ভক্তি নেই, যারা আপ্তবাক্যে অবিশ্বাসী, শাস্ত্রবাক্যে শ্রদ্ধা করেন না, অর্থাৎ যাদের মধ্যে এখনো বিশ্বাস দৃঢ় হয়নি, তাদের কাছে এই তত্ব প্রকাশ শুধু অর্থহীন নয়, অপ্রকাশিত আর এটা তাদের পক্ষে ক্ষতিকর। কেননা এরা যথাযথ ভাবে না বুঝে এইসব পদ্ধতির প্রয়োগ করতে গেলে, এদের নিজেদের সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা থেকেই যায়। তবে একটা ভালোদিক আমি লক্ষ করেছি, বেশিরভাগ হিন্দু পরিবার, একখানি গীতাগ্রন্থ ঘরে রাখে বটে, কিন্তু পড়ে না, আর যদি পড়েও তবে এর মর্মার্থ না বুঝে কেবল পরশ পাথরের মতো পূজার আসনে লালকাপড়ে মুড়ে রাখে। এতে আর যাই হোক, ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা নেই।
আরও একটা জিনিস আমি লক্ষ করেছি, যে এদের কাছে গীতার আলোচনার সময় এরা অমনোযোগী অথবা অবান্তর প্রশ্ন করে, গীতার বক্তাকে বিব্রত করে থাকে। আসলে ব্রহ্মবিদ্যা বলুন বা যোগবিদ্যা বলুন, এসব কেবল গুরুসান্নিধ্যে শ্রদ্ধাবনত হয়ে শ্রবণ মনন করতে হয়। বই পড়ে , এর যথার্থ অর্থ খুঁজে বের করা শুধু শ্রমসাধ্য নয়, এককথায় অসাধ্য। আর এর মধ্যে যে সাধনপ্রণালীর কথা বলা আছে, তার উপযোগিতা কেবল মাত্র নিষ্ঠার সঙ্গে সাধনক্রিয়ার অনুশীলনীর মাধ্যমে প্রাপ্ত হওয়া যায়। তাই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যিনি তপঃহীন, যিনি অভক্ত, যিনি শুনতে চান না, যিনি আমাকে দ্বেষ করেন, তাঁকে তুমি এসব কথা বলবে না।

আমার মাঝে মধ্যে মনে হয়, এই কারণেই কি আমরা অর্জ্জুনের মুখে শ্রী গীতা সম্পর্কে কোনো কথা শুনতে পাই না। আমরা গীতার কথা শুনি সঞ্জয় অর্থাৎ ধারণা-ধ্যান-সমাধিতে সিদ্ধ পুরুষের কাছ থেকে। আর অর্জ্জুন তিনি তো গীতার কথা যুদ্ধের দামামায় ভুলেই বসেছিলেন । তা না হলে (অনুগীতা পর্ব্বে) তিনি কেনই বা বলবেন, হে শ্রীকৃষ্ণ "যুদ্ধের প্রারম্ভে তুমি যাকিছু বলেছিলে, আমি সেসব ভুলে গেছি, তুমি আরো একবার সেইসব কথা বলো। আর শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনের এই কথা শুনে দুঃখ পেয়ে বলেছিলেন, তখন আমি যোগের উচ্চ-পর্যায়ে অবস্থান করছিলাম। এখন আর সেসব কথা আমি বলতে পারবো না। অর্থাৎ যোগের পরাবস্থায় যে জ্ঞানের স্ফূরণ হয়, তা স্থায়ী হয় না। যোগ থেকে বুত্থিত হলে, আবার আমরা সাধারণ জগতে ফিরে আসি। যাই হোক, এর পরে আমরা সেই সব অমৃত কথা শুনতে পাই শুকদেবের (ব্যাসপুত্রের) কাছ থেকে। যিনি সমস্ত কামনা বাসনার উর্দ্ধে পাগলপ্রায় উলঙ্গ মানুষ। আর শ্রোতা হচ্ছেন, ঋষিকুল। এর পরে বৈশম্পায়ন বলেন, মৃত্যুপথযাত্রী মহাত্মা জনমেজয়কে । তাই শ্রী গীতার কথা, ভগবানের কথা বলবার লোকই বা কোথায়, আর শুনবার মতো শ্রোতাই বা কোথায় ?

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ২৫.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৬৮ (অংশ-১)

য ইদং পরমং গুহ্যং মদ্ভক্ত্যেষু-অভিধাস্যতি
ভক্তিং ময়ি পরাং কৃত্বা মাম-এব-ইষ্যতি -অসংশযঃ। (১৮/৬৮)

যিনি পরমগুহ্য এই গীতাতত্ত্বকথা আমার ভক্তদের নিকট ব্যাখ্যা করেন, তিনি আমাকে পরাভক্তি করায় আমাকেই প্রাপ্ত হবেন - এ বিষয়ে কোনো সংশয় নেই।

প্রাক কথন : যিনি আত্মজ্ঞান লাভ করতে চান, তিনি শ্রীগীতা পড়বেন। জনমেজয়ের (যার দর্শনে রিপুগন কম্পিত) মতো, মৃত্যু যখন শিয়রে দাঁড়াবে তখন শ্রীগীতার ব্যাখ্যা শুনবেন । যখন রিপুগণের তাড়নায় উত্তক্ত হবেন তখন আত্ম অনুশীলন করবেন। গীতার গুহ্য রহস্য উন্মোচনের এটাই শ্রেষ্ঠ উপায়। কে পড়াতে পারেন, যিনি পড়েছেন এবং বুঝেছেন, যিনি সুত । যিনি গীতা বারবার পড়ে শোনান, তাঁর মধ্যে নতুন নতুন জ্ঞানের উদয় হয়। আর তিনি পাগলের মতো আচরণ করে করেন। তিনি সুখদেব, যাঁর কামনা বাসনা জ্ঞানের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আর প্রতিনিয়ত জ্ঞানের অনুশীলনে জ্ঞানের পরিশীলিত রূপ ফুটে ওঠে পাঠকের হৃদয়মধ্যে। আত্মজ্ঞানের চর্চা এবং তার প্রচার যেমন নিজেকে উন্নত করে, তেমনি অন্যকে আত্মোন্নতিতে সাহায্য করে। কেবল নিজের ভালো নয়, অন্যের ভালো করাও আত্মজ্ঞানী পুরুষের ধর্ম্ম।
গীতা আসলে সংযমী পুরুষের স্মৃতিচারণ। গীতাকে বুঝতে গেলে আমাদের দেহের সঙ্গে এই মহাভারতের প্রধান চরিত্রগুলোর সঙ্গে আমাদের কি সম্পর্ক সেটা বুঝতে হবে। তবেই আমরা গীতার যথার্থ মর্মার্থ উদ্ধার করতে পারবো। গীতায় মোট ১৮টি অধ্যায় আছে  আর  সমস্ত অধ্যায়ের নাম দেওয়া হয়েছে "যোগ" । যোগ কথাটার অর্থ হচ্ছে মিলন। অর্থাৎ সমস্ত অধ্যায় অধ্যয়নের সাথে সাথে, সাধারণ মানুষ যাতে  ঈশ্বরের সাথে মিলনের কথা অনুভব করতে পারেন  তারই আলোচনা  করা  হয়েছে এখানে। অর্থাৎ যতক্ষন আমরা এই আলোচনায় থাকবো, ততক্ষন আমরা ঈশ্বরের সাথেই যুক্ত হয়ে থাকবো। আসলে গীতা শুধু অধ্যয়নের বিষয় নয় এটি চিন্তন মনন ও আচরণে গীতার উপদেশগুলোকে  ফুটিয়ে তুলতে পারলে, আমরা এক নতুন জীবন-শৈলীর সন্ধান পেতে পারি ।

আসলে আমি ( আত্মা)  যখন প্রাণের স্পন্দনহেতু খন্ড-বিখন্ড হয়ে যায়, তখন বহু আমিত্বের সৃষ্টি হয়। আর বহু আমিত্ত্বের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব ও অস্তিত্ত্বের লড়াই অবশ্যম্ভাবী। আমাদের এই দেহ বহু অঙ্গের সমষ্টি মাত্র। কোনটা একটু কম গুরুত্ত্বপূর্ন কোনটা আবার বেশি গুরুত্ত্বপূর্ন। কিন্তু সবাইকে নিয়েই আমি। আমাদের প্রাণশক্তি, ঘ্রাণশক্তি, বাকশক্তি, শ্রবণশক্তি, স্পর্শশক্তি, এইসব শক্তির মিলিত সত্ত্বাই আমি।   আবার এই দেহের বিনাশ ঘটলেও পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রীয়  শক্তি  ভ্রূণাকারে বেঁচে থাকে। এরাই পান্ডব। কিন্তু মারা যায় আমাদের কর্মশক্তি অর্থাৎ কুরু। তাই গীতা শুনতে গেলে আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের নিজেদের ভিতরে যে অশুভ শক্তি আছে, আর যে শুভ শক্তি আছে, এই দুই শক্তির লড়াইয়ের কাহিনী এটি।  এ কোনো সাধারন যুদ্ধের কাহিনী নয়। রূপকের মাধ্যমে  আমাদেরকে শোনানো হয়েছে। এবং স্বয়ং মহাযোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই কাহিনীর নায়ক। অর্থাৎ যিনি অবিনাশী অকর্তা তাঁর মুখনিঃসৃত বাণী বা শাশ্বত জ্ঞান এই গীতায় নিহিত আছে। এটি কোনো বিশেষ ধর্মের ব্যাপার নয়, এটি সত্যকে উদ্ঘাটন করা মাত্র।

এই কাহিনীর রূপক চরিত্রগুলোর  দিকে আমরা একটু চোখ বুলিয়ে নেই, তাহলে গীতার মর্মার্থ বুঝতে আমাদের সুবিধে হবে। পঞ্চ পান্ডব, দ্রৌপদী ও কুন্তী সব সময় এক জায়গায় থাকেন । এর কারন কি ? একজন সাধারণ মানুষের মৃত্যু প্রক্রিয়ার সঙ্গে  দ্রৌপদী ও পঞ্চপাণ্ডবের মৃত্যু প্রক্রিয়ার সম্পর্ক কী । আর এঁদের জন্মের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কোথায় ? এসব আমাদের ভালো করে বুঝতে হবে, তবেই গীতাকে ধরতে পারবো।

এই পাঁচ পান্ডব, দ্রৌপদী, এমনকি দ্রোণাচার্য্য, ভীষ্ম, এঁদের কারুরই জন্ম স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয় নি।

আমরা জানি দ্রৌপদী অগ্নি থেকে উদ্ভূত। অর্থাৎ আমাদের মৃত্যুকালে  দেহের এই অগ্নিতেজ আমাদের সবার আগে ছেড়ে যায়।  পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কন্যা দ্রৌপদী।  এঁর আর এক নাম কৃষ্ণা। গায়ের রঙ কালো বা শ্যামলা। ইনি  জন্মেছিলেন, যজ্ঞাগ্নি থেকে। অগ্নিতেজঃ সম্পন্ন আমাদের এই দেহ। মৃত্যুকালে তাই এই অগ্নি আমাদের দেহ ছেড়ে দেয় সবার আগে। পাঁচ পান্ডব ও দ্রৌপদীর মধ্যেও , দ্রৌপদীর মৃত্যু হয় সবার আগে। আমাদের দেহের অগ্নি হচ্ছেন এই মহাভারতের দ্রৌপদী।

আমরা জানি অগ্নি চলে যাবার পরে আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়া ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ দেহ ছেড়ে চলে যায়।  এরা হচ্ছেন নকুল-সহদেব। এঁরা অশ্বিনীকুমারদ্বয় । এই অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের মাতা  হচ্ছে সংজ্ঞা। ইনি চন্দ্রভার্য্যা। কুমারদ্বয়ের নাম হচ্ছে, অশ্বিন ও রেবন্তঃ। এঁরা  জমজপুত্র।  এদের দেখতে একই রকম। থাকে একই সাথে। এরা চিকিৎসা বিদ্যায় পারদর্শী। এই কথাগুলোর মাধ্যমে বুঝতে পারবেন, আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস হচ্ছে এই নকুল ও সহদেব। এঁরাই  আমাদের সংজ্ঞা দান  করে থাকেন।  আর এই শ্বাস-প্রশ্বাস আমাদের শরীরের সমস্ত রোগ নিরাময়ে সাহায্য করে থাকে।

অর্জুন : দেবরাজ ইন্দ্রের পুত্র হচ্ছে অর্জুন। ইন্দ্র হচ্ছেন দেবতাদের রাজা। অর্থাৎ সমস্ত শুভশক্তির রাজা। আমাদের মধ্যে যে রাজসিক শক্তি আছে, অর্জুন তার প্রতিভূ। এই রাজসিক বা রজঃ শক্তির দ্বারাই আমরা কর্মে লিপ্ত হই। এবং এই শক্তি সুকর্ম দুস্কর্ম দুটোই করতে সক্ষম। তাই অর্জুন  হচ্ছে আমাদের পুরুষকার-এর প্রতীক এক শুভশক্তি  । ইচ্ছে করলে বা মনে করলে আমরা যুদ্ধ করতেও পারি, আবার নাও পারি। অপ্রতিরোধ্য শক্তি আছে আমাদের মধ্যে। যাকে  আমরা শুভ বা অশুভ দুটো কাজেই কাজে ব্যবহার করতে পারি, আবার নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারি । কিন্তু নকুল-সহদেব অর্থাৎ আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস চলে গেলে এই পুরুষকার কোনো কাজে লাগতে পারে না। তাই অর্জুন মারা যান।

ভীম  : ভীম হচ্ছে বায়ুপুত্ৰ। বায়ুর অসীম শক্তি। ভীম এই বায়ুর প্রতীক। আমাদের উর্জ্বা শক্তি।   বায়ু আমাদের সমস্ত শরীরে পরিব্যাপ্ত। আমরা জানি, বায়ু দশ রকম বা বায়ুর দশটি গুন্ - প্রাণ, অপান, সমান, উদান, ব্যান।    এছাড়া আছে, নাগ, কূর্ম, কৃকর (অর্থাৎ কয়ার পাখি) দেবদত্ত্ব ও ধনঞ্জয় । এই মোট দশটি বায়ুর গুন্। প্রাণবায়ু আমাদের হৃদয়ে অবস্থিত। অপান আমাদের গুহ্যদেশে। নাভিদেশে আছে সমান, কন্ঠে উদানবায়ু, এবং সর্বশরীরে ছড়িয়ে আছে ব্যানবায়ু। এই পাঁচটি বায়ু প্রধান।  নাগ, কূর্ম, কৃকর, দেবদত্ত্ব ও ধনঞ্জয় - এগুলো আমাদের নাড়ীতে অবস্থান করে। অর্থাৎ আমাদের শরীরে যে হাজার হাজার  নাড়ী  আছে, তার মধ্যে অবস্থান করে।  তবে প্রধানত পাঁচটি নাড়ী অর্থাৎ ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না, বজ্রাক্ষ্যা ও চিত্রাণি এই পাঁচটি নাড়ীতে অবস্থান করে। মৃত্যুকালে আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলেও, এই বায়ুর ধারাবাহিকতা শেষ হতে সময় নেয়। তাই দেখবেন, ডাক্তাররা, অন্তত ৪ ঘন্টা সময়  নেয়, দেহকে প্রাণহীন বলতে। ভীম আমাদের উর্জ্বা  দেহ। 

যুধিষ্ঠির : ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে একজন যুধিষ্ঠির আছেন। অর্থাৎ ধর্মবুদ্ধি আমাদের সবার আছে। এই ধর্মবুদ্ধি যদি আমাদের সক্রিয় থাকে তবে আমরা ভীম অর্থাৎ শারীরিক বল ও অর্জুন অর্থাৎ অর্থ-ধনুর্বিদ্যা  দিয়ে এই ধর্মবুদ্ধিকে কাজে লাগাতে পারি। আর তা না হলে এই ধর্মবুদ্ধি নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে। আর ধর্ম্মবুদ্ধি আমাদের মৃত্যুর পরেও অর্থাৎ স্থুল দেহ ত্যাগের পরেও বেঁচে থাকে। তাই বলা হয়ে থাকে যুধিষ্ঠির সশরীরে স্বর্গে যান। 

দুর্যোধন : আমাদের যেমন ধর্মবুদ্ধি আছে, তেমনি আছে আমাদের দুর্বুদ্ধি। এই দুর্বুদ্ধি আমাদের সদা সক্রিয়। এঁকে দমন করা সহজ নয়। সমস্ত শক্তি লাগে এই দুর্বুদ্ধিকে দমন করতে। তাই যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে সঙ্গেই  জন্ম নেয় দুর্যোধনও । বলা হয়ে থাকে দুর্যোধন হচ্ছে কলির অংশে জাত । ইনি দুই বছরের উপরে মায়ের গর্ভে ছিলেন। আসলে ধর্ম না এলে অধর্মের আভির্ভাব হতে পারে না। তাই অধর্ম আসে দেরি করে, কিন্তু ধর্মযুদ্ধে অধর্ম-ই আগে চলে যায়। 

কুন্তী : কুন্তীর আসল নাম পৃত্থি অর্থাৎ পৃথিবী। কুন্তীর পিতা সুরসেন ভাইয়ের নাম বসুদেব। অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের পিতা। শ্রীকৃষ্ণের সম্পর্কে পিসিমা। তো পৃথিবীতেই আমাদের সবার জন্ম। আর আমরা যেখানেই যাই না কেন, পৃথিবী আমাদের সর্বদা আশ্রয় দান করে। পালনকর্ত্রী পৃথিবীকে ছেড়ে আমরা কখনো কোথাও যেতে পারি না। এই পৃথিবীই আমাদের অগ্নি, জল, বায়ুকে ধরে রেখেছে।  

শ্রীমদ্ভগবৎ গীতার প্রথম অধ্যায়ের নাম অর্জুন বিষাদ যোগ। যদিও প্রত্যেক অধ্যায় এক একটা যোগ। তো বিষাদ কথার মানে  আমরা জানি শোক। আসলে সাধারণ মানুষের আধ্যাত্মিক জীবন শুরুই  হয়, এই শোক দুঃখ থেকে। যতদিন আমাদের জীবন সুখময় থাকে, ততদিন আমরা আধ্যাত্মিক জীবনের কথা ভাবতে পারি না।  এটাই স্বাভাবিক। যখন আমাদের জীবনে  দন্দ্ব উপস্থিত হয়, সংঘাত উপস্থিত হয়, যখন আমাদের জীবন দুঃখ বেদনায় ভরপুর হয়ে ওঠে, তখন আমরা এই দুঃখের জীবনকে কাটিয়ে উঠবার  জন্য, উপায় খুঁজি।  আর এই উপায় যখন আমরা জাগতিক বা পার্থিব  বস্তুতে না পাই, তখন আমরা  অপার্থিব বস্তুর খোঁজ করি। জীবনের এই  যাত্রায়, আমরা যখন হাপিয়ে উঠি,  সুখ সম্পদ আহরণ করতে গিয়ে যখন আমরা বিপদের সম্মুখীন হই, তখন আমাদের ঈশ্বরের কথা মনে পড়ে। বিরল কিছু মহাত্মা আছেন, যারা এর ব্যতিক্রম। 

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়। 

তারিখ : ২৬.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৬৯-৭১

ন চ তস্মাৎ-মনুষ্যেষু কশ্চিন্মে প্রিয়কৃত্তমঃ
ভবিতা ন চ মে তস্মাদ-অন্যঃ প্রিয়তরো ভুবি। (১৮/৬৯)

মানুষের মধ্যে তাঁর চেয়ে কেউ আমার প্রিয় নেই। তাঁর অধিক প্রিয় আর কেউ হবেও না।

জীবকুল যত বাহ্য বিষয়ে আকৃষ্ট হয়, তত সে ঈশ্বর থেকে দূরে সরে যায়। কিন্তু ঈশ্বরের স্বভাব হচ্ছে, তাকে কাছে টেনে নিয়ে আসা। এখন কেউ জল থেকে উঠবার জন্য হাত বাড়ায়, কুয়ো থেকে উঠবার জন্য কেউ যদি আর্ত চিৎকার করে, সন্তান যখন দুধের জন্য, বা ভয় থেকে পরিত্রান পাবার জন্য মা-মা বলে কান্না শুরু করে, তখন ত্রাতা আসেন - আর হাত তুলে ঝেড়ে-মুছে কোলে তুলে নেন। এতে যে শিশু নিরাপদ বোধ করে তাই নয়, মাও পরম তৃপ্তি লাভ করেন। তো জীবাত্মা আসলে তো পরমাত্মার অংশ। তাই আত্মা থেকে আত্মা দূরে গেলে, আত্মারই অসঙ্গ বোধ হয়। আত্মার সান্নিধ্য লাভ করে আত্মা তৃপ্ত হয়। সাধনক্রিয়া হচ্ছে, আত্মাতে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হবার জন্য আকুতির প্রকাশ। এই সাধনক্রিয়া জীবাত্মাকে পরমাত্মার সাথে মিলিয়ে দেবার প্রক্রিয়া।

অধ্যেষ্যতে চ য ইমং ধর্ম্ম্যং সংবাদম-আবয়োঃ
জ্ঞানযজ্ঞেন তেন-অহম-ইষ্টঃ স্যামিতি মে মতিঃ। (১৮/৭০)

আর যিনি আমাদের এই ধর্ম্মসংলাপ অধ্যায়ন করবেন, তিনি জ্ঞানযজ্ঞের দ্বারা আমার পূজা করবেন - এই আমার অভিমত।
সংলাপ সিনেমাকে জমিয়ে তোলে। শ্রোতাকে প্রভাবিত করে। শাস্ত্র গ্রন্থ অধ্যয়ন, গুরু-শিষ্য সংবাদ শ্রবণ-এর ফলে পাঠক বা শ্রোতার জ্ঞানযজ্ঞের ফল হয়। আর যে বিদ্যার সাহায্যে জ্ঞানকে প্রত্যক্ষ করা যায়, তাকেই বলে সাধনক্রিয়া। গীতার আছে গুরু-শিষ্য সংবাদ। এই সংবাদ পাঠ করলে বা শ্রবণ করলে, যেমন ভগবান সম্পর্কে মন উৎসুক হয়ে ওঠে তেমনি এই সংবাদের মধ্যে আছে সাধনক্রিয়ার পদ্ধতি, বিভিন্ন প্রশ্ন-উত্তর, সাধনক্রিয়ার ফল সম্পর্কে বার্তা। তাই জ্ঞানযোগের সাধনায় আপন অন্তঃকরণে যেমন উত্তরোত্তর জ্ঞান লালসা জন্মায়, তেমনি সাধনক্রিয়ার অনুশীলনে এই জ্ঞান প্রত্যক্ষীভূত হয়। যার জ্ঞান আছে তিনিই জ্ঞানী। তো শ্রীকৃষ্ণ শুধু রক্তমাংসের শরীর নয়, তিনি প্রজ্বলিত জ্যোতিষ্কময় জ্ঞানালোক সম্ভূত। শ্রীগীতা অধ্যয়ন মানেই এই জ্ঞানালোকের পূজা। এই জ্ঞানালোকের উত্তাপ গ্রহণ করলে আমাদের সমস্ত শোকরূপ শীত দূর হতে পারে। শ্রীগীতা পাঠে আমাদের বুদ্ধি শুদ্ধ থেকে শুদ্ধতর হবে, আর এই শুদ্ধ বুদ্ধির ফলে, বুদ্ধিতে পরমপুরুষের দর্শন মিলবে, আর একেই বলে মোক্ষ বা মুক্তি।

শ্রদ্ধাবান-অনসূয়শ্চ শৃণুয়াদপি যো নরঃ
সঃ-অপি মুক্তঃ শুভান লোকান প্রাপ্‌নুয়াৎ পুণ্যকর্ম্মণাম । (১৮/৭১)

যিনি শ্রদ্ধাবান ও অসূয়াশূন্য অর্থাৎ দ্বেষ-ঘৃনারহিত হয়ে শ্রীগীতা শ্রবণ করেন, তিনিও পুন্যকর্ম্মকারিগনের মতো শুভলোকসকল প্রাপ্ত হন।

যোগেশ্বসর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, শ্রীগীতার এইসব কথা শুনলেও নাকি আমাদের শুভলোক প্রাপ্তি হতে পারে। এটা কি করে সম্ভব ? সম্ভব। দেখুন আমাদের কর্ণকুহরে যাকিছু প্রবেশ করে, তা আমাদের স্নায়ুতন্ত্রে আন্দোলনের সৃষ্টি করে। কেউ যখন আমাদের গালাগাল করে, তখন আমাদের মধ্যে রাগ হয়, আমরা যখন ভালো কথা শুনি তখন আমাদের মধ্যে আনন্দ হয়, আমরা যখন মেঘের গৰ্জন শুনি তখন আমাদের মধ্যে আতঙ্ক বা ভয় হয়, আমরা যখন বাদ্যযন্ত্রের মধুর সুর শুনি, তখন আমাদের মধ্যে শান্তির বাতাবরণ তৈরী হয়। এসব আমাদের প্রতক্ষ্য অভিজ্ঞতা। ঠিক তেমনি ভগবানের লীলাকথা শুনলে, আমাদের কারুর কারুর মধ্যে একটা ভাবের উদয় হয়, হোকনা সেই ভগবৎ কথা কবিকল্পনা, বা ইতিহাস বৃত্তান্ত । টিভিতে যদি কখনও আপনার এলাকার কথা বলে, এমনকি আপনার কার্যকলাপের কথা বলে, তাহলে আপনার মধ্যে সেই কথা শুনবার একটা আগ্রহ জন্মাবে, আর আমরা সেইসব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবো । তবে পরিবেশনের কারুকার্য্যে অর্থাৎ বক্তার ভাষা ও ভঙ্গিমার গুনে একই বিষয় অনেক আকর্ষণীয় হতে পারে। পরিবেশনের অতুলনীয় কৌশল বাক-মাধুর্য্যের পরিচয় দিয়েছেন, আচার্য্য যোগগুরু ব্যাসদেব।

তো যে ভগবানকে আমরা বাইরে খুঁজি, সেই ভগবান আছেন, আমাদের সবার হৃদয়ে। আর সেই হৃদয়স্থিত ভগবানের কথা যখন কানের মধ্যে প্রবেশ করে, তখন আমরা তখন আত্মস্থিত হয়ে আত্মার মধুর সংগীত শুনতে পাই। আর ভিতরে বাইরে যখন একই সুর ধ্বনিত হয়, তখন আমরা আপ্লুত হয়ে যাই। আমাদের জ্ঞানালোক প্রজ্বলিত হয়। আর বুদ্ধি স্বচ্ছ হতে শুরু করে। আর স্বচ্ছ বুদ্ধিতেই ভগবানের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। আর আমরা শুভলোকের বাসিন্দা হয়ে যাই। এই হচ্ছে শ্রীমদ্ভগবৎ গীতার কথা শ্রবনের ফল।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ২৭.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৭২-৭৩

কচ্চিদেতৎ শ্রুতং পার্থ ত্বয়া-একাগ্রেণ চেতসা
কচ্চিদ-অজ্ঞান-সন্মোহঃ প্রনষ্টস্তে ধনঞ্জয়। (১৮/৭২)

হে পার্থ, তুমি একাগ্রতার সঙ্গে শুনছো তো ? হে ধনঞ্জয়, তোমার অজ্ঞানজনিত মোহ দূরীভূত হয়েছে তো ?

সমস্ত গীতাতে যোগেশ্বর ভগবানের অর্জ্জুনের কাছে এটি তাঁর দ্বিতীয় প্রশ্ন। প্রথম প্রশ্ন (২/৩) তিনি জবাবের প্রত্যাশা না করেই করেছিলেন। অর্থাৎ এই বিষম সময়ে অর্থাৎ সঙ্কটকালে কোথা থেকে অনার্য্যচিত স্বর্গলাভের অযোগ্য অকীর্তিকর মোহ তোমার মনে উপস্থিত হলো। এই প্রশ্নের জবাব চঞ্চল মনের অধিকারী সংসারমোহে আচ্ছন্ন অর্জ্জুনের কাছে ছিল না। যোগেশ্বরের এই জিজ্ঞাসাকে প্রশ্ন না বলে বিস্ময় বলা যেতে পারে। কিন্তু এবার যে প্রশ্ন যোগেশ্বর করলেন, সেটির জবাব তার চাই। তা না হলে সমগ্র গীতার বাণী ব্যর্থ হয়ে যায়। তাই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, হে পার্থ, তুমি একাগ্রতার সঙ্গে শুনছো তো ? হে ধনঞ্জয়, তোমার অজ্ঞানজনিত মোহ দূরীভূত হয়েছে তো ? পার্থ অর্থাৎ পৃথা-পুত্র। যার মধ্যে অপত্য স্নেহ রয়েছে। চোখের সামনে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত আত্মীয়স্বজনের প্রতি যার মমত্ত্ববোধ অটুট। আবার বলছেন ধনঞ্জয় - সাধারণ অর্থে যিনি ধনকে যিনি জয় করেছেন, কিন্তু যোগশাস্ত্রে ধনঞ্জয় বলতে বোঝায় শারীরস্থ পঞ্চবায়ুর অন্যতম বায়ু অগ্নি। তো একদিকে মমতাময়, অন্যদিকে তেজস্বী।
শ্রীকৃষ্ণের এই কথার মধ্যে একটা সাধনপথের নির্দেশ আছে "একাগ্রতা"। এই একাগ্রতা সম্পর্কে আমরা একটু ভালোভাবে বুঝে নেবার চেষ্টা করবো।

এক-কে অগ্রাধিকার দেওয়াই একাগ্রতা। এখন এই এক কি, আর অগ্রই বা কি ? যাতে জাতিগত, শ্রেণীগত, সংজ্ঞাগত কোনো পার্থক্য নেই, তাকেই এক বলা হয়। আর অগ্র শব্দের অর্থ প্রধান বা পুরোভাগ। তো একবিষয়ে নিবিষ্টতাকে একাগ্রতা বলে। যে গুন দ্বারা প্রথমে একটি মাত্র বস্তু প্রধান লক্ষ করা যায় বটে, কিন্তু পরিশেষে অনন্ত পদার্থ এক বলে প্রতীয়মান হয়। অর্থাৎ যে গুন্ দ্বারা আমরা সমস্তকিছুকে একের মধ্যে টেনে আনতে পারি, তাকে একাগ্রতা বলে।

সাধনার প্রথম দিকে এটি খুব কঠিন, কারন মন এক বিষয়ে স্থির হতে না হতে মন অন্য বিষয়ে চলে যায়। আর বারবার মনকে টেনে আবার লক্ষবস্তুতে স্থির করতে হয়। এই প্রত্যাহারের প্রচেষ্টাকে একাগ্রতার প্রথম পর্য্যায় বলা যেতে পারে। যখন মন ইন্দ্রিয়বিষয় থেকে নিজেকে আলাদা করে লক্ষ বস্তুতে স্থির হয়, তখন একাগ্রতার দ্বিতীয় পৰ্য্যায়। তখন ইন্দ্রিয়লব্ধ শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস,গন্ধের দিকে খেয়াল থাকে না। এর পরে যখন সাধক একাধিক বিষয়ে নিজেকে স্থির করতে পারে, অর্থাৎ ইন্দ্রিয়সকল বিষয়কর্ম্মে নিযুক্ত থাকলেও মন ঈশ্বরচিন্তনে বসে থাকতে পারে, তখন তার একাগ্রতার তৃতীয় স্তর। সবশেষে সাধক যখন তার অভীষ্ট বস্তু, সর্ব্ববস্তুতেই পান, তবে তিনি একাগ্রতার চতুর্থ স্তরে অর্থাৎ অন্তিম স্তরে পৌঁছেছেন বলা যেতে পারে।

এখন কথা হচ্ছে, অর্জ্জুনের মোহ দূর হয়েছে কি না, সর্বজ্ঞ ভগবান কি তা জানেন না ? যদি জানেন, তবে আর এই প্রশ্ন করা কেন ? আসলে আমরা যা কিছুই করি না কেন, তার প্রসংসা আমরা অন্যের মুখে শুনতে চাই । ব্যাথা দূর করবার দাওয়াই তো রুগীকে দেওয়া হলো, কিন্তু ব্যথা গেলো কি না, সেটা একমাত্র ভুক্তভোগীই বলতে পারেন। ডাক্তার কেবল ঔষধের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন, কিন্তু ঔষধ গিলতে হবে রুগিকেই। ঔষধ যদি শরীরে না যায়, তবে বৃথা এই ঔষধের প্রয়োগ। ভগবানের বাণী সর্ব্বসাধারনের জন্য, কিন্তু যিনি মনোযোগ সহকারে এই বাণী শ্রবণ করবেন, তার ভিতরে পরিবর্তনে প্রক্রিয়া শুরু হবে। তা যদি না হয়, তবে বুঝতে হবে, শ্রোতা মনোযোগী নয়। যার মধ্যে একাগ্রতার অভাব রয়েছে, তার পক্ষে ধ্যান ধারণা করা সম্ভব নয়। অথবা অমৃতবাণীর অযোগ্য এই শ্রোতা। গীতা শ্রবনের ফল অজ্ঞানের মোহ নাশ। তা যদি না হয়, তবে বৃথা এই বকবকানি। অহেতুক সময় নষ্ট। অজ্ঞানের কারনে জীবের মধ্যে জীবত্ত্ব জেগে থাকে। অজ্ঞানের নাশ হলে জীব শিবত্বে উন্নীত হয়। আর শিষ্য যখন কৃতকৃত্য হয়, তখন গুরুর মনে যত আনন্দ হয়, তা হয়তো শিষ্যের মনেও হয় না। সদ্গুরুর চিরকালের অভিপ্রায় হচ্ছে, যতক্ষন শিষ্য গুরুপ্রদত্ত্ব উপদেশ ধারণ করতে না পারছে, ততক্ষন তাকে নানান ভাবে বোঝানো। আর শিষ্য যখন যথার্থ জ্ঞানলাভ করে উপকৃত বোধ করতে লাগলো, যখন তার মোহান্ধকার দূর হলো, তখন উভয়ের প্রয়াস সার্থক হলো। এর পরের শ্লোকে আমরা অর্জ্জুনের জবাব শুনবো।

অর্জ্জুন উবাচ :
নষ্টো মোহঃ স্মৃতির্লব্ধা ত্বৎ-প্রসাদৎ-ময়-অচ্যুত
স্থিতোহস্মি গতসন্দেহঃ করিষ্যে বচনং তব। (১৮/৭৩)

অর্জ্জুন বললেন : হে অচ্যুত, তোমার প্রসাদে আমার মোহ বিনষ্ট হয়েছে, আমি আমার স্মৃতি ফিরে পেয়েছি।
আমি নিঃসংশয় হয়ে স্থির হয়েছি। এবার তোমার কথামতো কাজ করবো।

যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে বলা হচ্ছে অচ্যুত, অর্থাৎ যিনি আত্মা থেকে বিচ্যুত নন. আত্মস্থ পুরুষ। অর্জ্জুন এখানে হচ্ছে ক্ষাত্রতেজঃ সম্পন্ন লক্ষভ্রষ্ট জীব। অর্জ্জুন একসময় সংসারের মায়া-মোহে আছন্ন ছিল। সমস্ত কার্য্যের ফলাফল নিজেই নির্বাচন করছিলো - ভ্রমজ্ঞানে আছন্ন হয়ে, নিজেকে কর্ত্তা ভেবে, অভিভূত ও শোকাকুল হয়ে গান্ডীব ছেড়ে রথের উপরে বসে পড়েছিল। জীবের এই মায়ায় আবিষ্ট মন, সংসারের প্রতি মোহ-মমতা, এমনকি কর্ত্তাভাব, ভ্রমজ্ঞান জনিত ভবিষ্যতের কর্ম্মফল কল্পনা, ইত্যাদি নষ্ট করবার জন্য শ্রী ভগবানের এই প্রয়াস। দেহাত্মজ্ঞানে মোহাচ্ছন্ন জীবরূপ অর্জ্জুন স্বধর্ম্ম ত্যাগ করে, পরধর্ম্মে আকৃষ্ট হয়েছিল। শ্রী ভগবানের উপদেশে সেই আত্মবুদ্ধি আবার ফিরে এলো। তার স্মৃতি ফিরে এলো। তিনি যে দেহ নহেন, তিনি আত্মা, এই আত্মবুদ্ধি তার জাগ্রত হলো। আর এই স্মৃতি যখন ফিরে আসে তখন দেহের জন্ম কি মৃত্যু অবস্থার মধ্যে পার্থক্য ঘুচে যায়। জন্ম-মৃত্যুর থেকে সে পরিত্রান পায়। অজর-অমর আত্মার আবার জন্ম-মৃত্যু কি ? শ্রীভগবানের উপদেশে এবার তিনি সন্দেহশূন্য হয়ে অভয়পদ লাভ করলেন। যে অর্জ্জুন বাকশূন্য হয়েছিল, সেই অর্জ্জুন এবার বলে উঠলেন, আমার সমস্ত মোহ নষ্ট হয়েছে, আমি আত্মস্মৃতি ফিরে পেয়েছি। এই আত্মস্মৃতি হারিয়ে জীবসকল জন্ম-মৃত্যুর চক্রে বারবার আসা যাওয়া করে। কত জন্মে কত দেহ পায় , কতো নাম পায়, কতো স্বপ্ন দেখে, কত সংকল্প করে । জীবসকল সংসারে নিজেকে কর্ত্তা ভেবে কতো কতো সুখ-দুঃখ-কষ্টের মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে অনাত্ম অবস্থায় নিজেকে বিভ্রান্ত করে।
স্বপ্ন হারিয়ে গেলে, যেমন বাস্তব ফুটে ওঠে, স্বপ্নের সুখ-দুঃখ যেমন অলীক হয়ে যায়, চোখের সামনে থেকে মেঘ সরে গেলে যেমন সূর্য্যের আলোয় সব সত্য প্রকাশিত হয়, তেমনি আমাদের চোখের সামনে থেকে অজ্ঞানের মেঘ গেলে, আত্মস্বরূপের জ্ঞান হয়। এই স্মৃতি লাভ হলে আমাদের সমস্ত গ্রন্থির মোচন হয়। হৃদয়গ্রন্থি ভেদ করে জীব নিজভূমিতে উত্তরণের জন্য প্রস্তুত হয়। চিৎ ও জড়ের যে অভেদজ্ঞান, যা জীবকে বদ্ধ করে রেখেছিলো, তা থেকে সে মুক্ত হয়। এখন আর দেহাদিতে আত্মবুদ্ধি নেই। দেহাদির নাশে যে শোকের বাতাবরণ তৈরী হয়েছিল তা দূর হয়েছে। প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল শরীরের পরিণতি যে মৃত্যু, আর তা অবশ্যম্ভাবী। সর্বত্র সেই এক ব্রহ্ম, আমিও ব্রহ্ম। তুমিই সব, আবার আমিও তুমি। সবই আত্মস্বরূপ "সর্ব্বং খল্বিদং ব্রহ্ম" .. আমি অর্জ্জুন নামক দেহধারী নোই, আমার দেহাত্মবোধের কারনে পৃথক কর্তব্যের যে ধারণা হয়েছিল, তা এই দেহাত্মবোধ থেকেই হয়েছিল। এখন আমি বুঝেছি, আমি দেহাত্মবোধের উর্ধে আত্মস্বরূপ। আমার জন্য আলাদা কোনো ধর্ম্ম কর্ম্ম থাকতে পারে না। মায়ার প্রভাবে আমার মধ্যে যে দেহ-মন-প্রাণের যে চঞ্চলতা দেখা দিয়েছিলো, তা তোমার কৃপায়, সাধন প্রভাবে স্থির হয়েছে। তোমার উপদেশ অনুসারে প্রাণের সঙ্গে মনকে রেখে প্রাণের সাধনা করতে করতে আমি দিব্য অবস্থা প্রাপ্ত হয়েছি। এখন আমার প্রাণ সুষুম্নায় সঞ্চরণ করছে। স্বপ্নদর্শন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়েছে, ইন্দ্রিয়সকল মনের মধ্যে লয় হয়েছে, মন কূটস্থে স্থির হয়েছে। মায়ার প্রভাবে যে স্বপ্ন দর্শন হচ্ছিলো, তা দূর হয়েছে। আমার সব মোহ ভঙ্গ হয়েছে। আর এই মোহের কারনে যে ভয়, শোকাদির দেখা দিয়েছিলো, তার থেকে মুক্ত হয়ে আজ আমি স্ব-স্বরূপে স্থিতি লাভ করেছি। এতদিন বিষয়সুখের আশায়, রাজ্যের আশায়, আত্মীয়-স্বজনের প্রতি মমত্ত্ব বসত কতই না বিড়াম্বনার মধ্যে কাল কাটাচ্ছিলাম। আর নিজের কর্তব্যে নির্ধারণে অপারগ হয়েছিলাম। তোমার উপদেশে আজ আমার সেই মোহ কেটে গেছে। এখন আমি তোমার উপদেশ অনুসারে সাধন-সমরে মেরুদন্ড সোজা রেখে প্রাণের স্বাভাবিক যে কর্ম্ম তার দিকে দৃষ্টি ফেরাচ্ছি। যুদ্ধ করবো না বলে মেরুদন্ড বাকিয়ে বসে পড়েছিলাম। তোমার প্রসাদে দেখো, এই আমি মেরুদন্ড সোজা করেছি। এই দেখো প্রাণের প্রতি আমি মন রেখেছি। এখন তুমি যা বলবে আমি তাই করবো।

তেজতত্ত্ব যতক্ষন নাভিচক্রে ঘোরাফেরা করছিলো, ততক্ষন দৃষ্টি ছিলো সংসারের দিকে। এবার মেরুদন্ড সোজা রেখে মন যখন প্রাণের সংলগ্ন হলো, তখন তেজতত্ত্ব প্রাণ-মনকে নিয়ে উর্দ্ধগামী হলো। তো গুরুর উপদেশে আমরা যদি উদীপ্ত হয়ে সাধনসমরে আত্মোৎসর্গ করি, তখন আত্মজ্ঞান লাভের পথ পরিষ্কার হয়ে যায়। আর জগৎগুরু কূটস্থ চৈতন্যদেব তখন স্বমহিমায় প্রকাশিত হয়ে, সাধককে মাধুর্য্য আস্বাদন করাতে থাকেন। জীবাত্মা পরমাত্মার কোলে, শিশু মায়ের কোলে পরম নিশ্চিন্তে অবস্থান করে। না থাকে ভয়, না থাকে কষ্ট , না থাকে ভবিষ্যতের চিন্তা। তখন দেহাদিতে আত্মবুদ্ধি থাকে না। তাই সংসারবোধেরও সমাপ্তি হয়। পরমা শান্তি। তখন যোগের উত্তম অবস্থায়, সমস্ত কিছু করেও, না করার সামিল হয়ে যায়। পাপ-পুণ্যের উর্দ্ধে প্রবাহিত হয় কর্ম্মধারা।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।

তারিখ : ২৮.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৭৪-৭৫
সঞ্জয় উবাচ
ইত্যহং বাসুদেবস্য পার্থস্য চ মহাত্মনঃ
সংবাদম-অশ্রৌষম-অদ্ভুতং রোমহর্ষণম। (১৮/৭৪)

সঞ্জয় বললেন, আমি এইভাবে মহাত্মা বাসুদেব ও পার্থের এই অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর অদ্ভুত কথোপথন শ্রবণ করেছিলাম।

এই যে স্থূল দেহ এটি রক্ত-মাংস-মজ্জা-হাড্ডি-শ্লেষ্য-মল-মূত্র ইত্যাদির সমাহার। আবার এই দেহের মধ্যে আছে প্রাণের স্পন্দন। এই দেহের মধ্যে আছে মন। এই মনের মধ্যে প্রাণের স্পন্দন হেতু অসংখ্য সংকল্প বিকল্পের উদয় হচ্ছে। এই মনের পারে আছে, বুদ্ধি। প্রাণের সঞ্চরণ হেতু মন বুদ্ধির সংযোগে অসংখ্য দৃশ্যের দর্শন ঘটছে। কতশত অনুভব হচ্ছে, আর শরীর রোমাঞ্চিত হচ্ছে। কখনো এই অনুভূতি আমাদের ভালো লাগছে, কখনো আবার খারাপ লাগছে। কখনো আমরা কেঁদে উঠিছি, কখনো হেসে উঠছি, কখনো আতঙ্কিত হচ্ছি, কখনো পুলকিত হচ্ছি। আর যা কিছু হচ্ছে সবই সেই দিব্যপুরুষের উপস্থিতির কারনে হচ্ছে। সমস্ত অনুভূতি আমাদের অন্তঃকরণের অন্তঃস্থলে ভেসে উঠছে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। যোগীপুরুষ যোগসমাধিতে যখন মন-বুদ্ধিতে এই দিব্যপুরুষের দর্শন পান অর্থাৎ যখন তাঁর তত্ত্বজ্ঞানের উদয় হয় তখন এক অদ্ভুত অবস্থা হয়, যা ভাষার অতীত। তো ধারণা-ধ্যান-সমাধিতে সিদ্ধ মহাযোগী সঞ্জয় বলছেন, এ এক অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর বাক্যালাপ শ্রবণ করলাম।
ব্রহ্ম হতে উভূত মায়াশক্তি প্রানধারার সঙ্গে ভেসে ভেসে কতনা সূক্ষ্ম-স্থূল বস্তুর মধ্যে নিজেকে প্রকট করছেন। স্বয়ং ব্রহ্ম নিজেকে ভুলে, স্থূলে প্রকট হয়ে দেহাদিজ্ঞানে নিজেকে নিবদ্ধ করে, সুখ দুঃখের ভোগ করছেন। আত্মবিস্মৃত হয়ে জীবরূপে লীলা করছেন।
একসময় গুরুকৃপায় ব্রহ্মের জীবরূপে যে ঘুম তা ভেঙে যায় তখন জীব অতীন্দ্রিয় জগতের মধ্যে প্রবেশ করে। আর এই সংবাদ শ্রোতাকে অভিভূত করে। সঞ্জয় বলছেন এ এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। পরমাত্মা পরমাত্মাই আছেন, জীবাত্মা যে পরমাত্মার অংশ এই গুহ্য সংবাদে জীব মনের মধ্যে পুলক অনুভব করে, শরীরের মধ্যে রোমাঞ্চ হয় ।

ব্যাসপ্রসাদৎ শ্রুৎবান-এতদ গুহ্যমহং পরম
যোগং যোগেশ্বরাৎ কৃষ্ণাৎ সাক্ষাৎ কথয়তঃ স্বয়ম। (১৮/৭৫)

ব্যাসদেবের প্রসাদে (দিব্যদৃষ্টি প্রাপ্ত হয়ে) সাক্ষাৎ এই পরমগুহ্য যোগতত্ত্ব স্বয়ং বর্ননায় প্রবৃত্ত যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের মুখ থেকে প্রত্যক্ষভাবে শুনেছি।

সঞ্জয়-ধৃতরাষ্ট্রের অবস্থান আর শ্রীকৃষ্ণ-অর্জ্জুনের অবস্থান বাহ্য দৃষ্টিতে বহুদূর। এতদূর থেকে চর্ম্ম চক্ষুতে এই যেমন দেখা সম্ভব নয়, তেমনি তাঁদের বাক্যালাপ শোনাও সম্ভব নয়। কিন্তু তাহলে যাকিছু সঞ্জয় দেখলেন, এবং শুনলেন, তা কি ? একেই বলে পরম যোগ। এখন কথা হচ্ছে, শ্রীকৃষ্ণ-অর্জ্জুন সংবাদ গোপন। মহামতি ভীষ্ম ইত্যাদি যোদ্ধাগন এটি দৃশ্য প্রতক্ষ্য করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের (অর্জ্জুন-শ্রীকৃষ্ণ) মধ্যে যে গুহ্য কথা আলোচনা হয়েছে, তা তারা শুনতে পান নি। এই কথা শোনা যায় ব্যাসদেবের প্রসাদে। এই ব্যাসদেব কে ? এই ব্যাসদেব হচ্ছেন, শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন। আসলে ব্যাসদেব বা শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন আর বসুদেব পুত্র শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এঁরা উভয়েই কূটস্থ চৈতন্য। যখন যোগীপুরুষ আত্মস্থ হন, তখন তাঁরা চৈতন্যে অবস্থান করেন। আপনাতে আপনি অবস্থান করেন। তখন গুরু আর শিষ্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। এতো চর্ম্মচক্ষুতে দেখা দৃশ্য নয়, এতো স্থূল কর্নশ্রুত ধ্বনি বা ভাষা নয়।

দেখুন, বাহ্য ইন্দ্রিয়সকল যখন সাধনপ্রভাবে মনের সঙ্গে লয় হয়, মন যখন আত্মস্থিত হয়, তখন সাধনার পরাবস্থায় এই অদৃষ্টপূর্ব্ব দর্শন, অশ্রুতপূর্ব শ্রবণ হয়। একেই বলে দিব্যদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তির দিব্য জ্ঞান। আর এই দিব্যজ্ঞান যখন প্রকাশিত হয়, তখন মনঃজগতে দিব্যলীলা দর্শন-শ্রবণ হয়ে থাকে। একেই বলে ব্যাসদেবের প্রসাদ। এই ব্যাসদেব এক আবার একাধিক, যেমন শ্রীকৃষ্ণ এক আবার একাধিক। আমরা জানি, এই শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন, বেদবিভাজন করে ব্যাসদেব নাম পরিচিত হয়েছিলেন। তো এই ব্যাসদেবের মধ্যে আছে ভেদজ্ঞান। আত্মা ও অনাত্মাকে আলাদা করে বুঝবার জ্ঞান সম্পন্ন এই ব্যাসদেব। আর যেখানে পূর্নতা আছে আবার ভেদজ্ঞানও আছে, সেখান থেকেই সমস্ত দর্শন-শ্রবণ হয়ে থাকে। ব্যাসদেব তাই অংশ-অবতার। সাধনক্রিয়া যখন আরো অগ্রসর হয়, ধীরে ধীরে ধ্যান যখন ঘনীভূত নেয়, তখন দ্বিতীয় বস্তুর আভাস পাওয়া যায় না। তখন দ্রষ্টা-দৃশ্য, জ্ঞাতা-জ্ঞেয় বলে আলাদা কিছু থাকে না। কেননা যতক্ষন জ্ঞান ততক্ষন জ্ঞানীর অস্তিত্ত্ব। যখন সাধক জ্ঞানের উর্দ্ধে অবস্থান করেন, তখন কেবলমাত্র ব্রহ্মভাব। ব্রহ্মভাবের নিম্ন অবস্থায় থাকে ঈশ্বর ভাব। গুনের উর্দ্ধে পরমাত্মার একটাই ভাব। মায়াজগতের অধীশ্বরকে বলা হয় নারায়ণ। আর যত অবতারপুরুষ তাঁরা সবাই এই নারায়ণ থেকেই এসে থাকেন। তো অবতারগন মায়ার জগতে মনুষ্য দেহে অবতীর্ন হলেও, এঁরা নারায়ণ থেকে ভিন্ন নন। সোনা দিয়ে যখন গয়না গড়ানো হয়, তখন সেই গয়নাও সোনাই থাকে। তেমনি পুরুষোত্তম নারায়ণ থেকে অবতার পুরুষ আসেন, তখন তিনি নারায়ণই থাকেন। তো পরমাত্মার ঘনীভূত রূপ হচ্ছেন অবতারগন। এই অবতারগণের মধ্যে আবার ঐশ্বর্য্যের বিকাশভেদে পূর্ন-অবতার, অংশ-অবতার বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ অংশাবতারে জ্ঞানের পূর্নতা থাকলেও ঐশ্বর্য্য অপেক্ষাকৃত কম থাকে।

দেখুন বৈরাগ্য থেকে জীবন্মুক্তি লাভ হয়। এই বৈরাগ্যের প্রকারভেদ করতে গিয়ে ঋষি পতঞ্জলি বলছেন প্রথমে রাগ-দ্বেষ ইত্যাদি পরিত্যাগ করে মনকে ইন্দ্রিয়বিষয়ে ধাবিত হতে না দিলে প্রথম বৈরাগ্য জন্মে। এরপর বিচারের সাহায্যে বিষয় নির্বাচন করতে হয়। অর্থাৎ কোন বিষয়ে প্রবৃত্ত হবো, আর কোন বিষয়ে নিবৃত্ত হবো তা বিচারের সাহায্যে বের করতে হয়। এর পরে, বিচারকেও ত্যাগ করতে হয়। এই সময় আসক্তি মনের মধ্যে উদয় হয়ে পুনরায় মনের মধ্যেই লয় হয়ে থাকে। সবশেষে চিত্তে ইন্দ্রিয়গুলোকে গুটিয়ে সমস্ত ঔৎসুক্যের নিবারণ করা। এই হচ্ছে বৈরাগ্যের প্রকার ভেদ।
আবার সমাধির অবস্থার মধ্যেও অনেক অনেক উঁচু-নিচু ভাব থাকে। ঋষি পতঞ্জলির ভাষায়, বিচার, বিতর্ক আনন্দ ও অস্মিতা - এই চারের অনুগত যে সমাধি তা হলো সম্প্রজ্ঞাত সমাধি। আর অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি হচ্ছে চিত্ত বৃত্তির সামগ্রিক লয়।

যাইহোক, আমরা ব্যাসদেবের কথা শুনছিলাম। ঈশ্বরভাবের আংশিক বিকাশ যেখানে, সেখানে ব্যসের অবস্থান। এখানে মায়ার প্রভাব বেশী , তাই ভেদভাব থাকে। ভেদভাব না থাকলে জ্ঞানের বিভাগ বোঝা যায় না। এখানে সমাধির প্রজ্ঞা থাকে আবার সংসারজ্ঞানও থাকে। যোগস্থিত থাকা কালীন যে জ্ঞাণাত্মিকা ভাবের উদয় হয়, সমাধি থেকে বুত্থিত অবস্থায় স্মৃতিরূপ দিব্যদৃষ্টি থাকে। এই অবস্থায় যে দিব্যদর্শন বা দিব্যজ্ঞান হয়, তাকেই বলে ব্যসের কৃপা, যা সঞ্জয়ের মধ্যে হয়েছিল। এই যে যোগতত্ত্ব এর উদ্দেশ্য হচ্ছে পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মিলনের সংবাদ প্রচার। এই সংবাদ যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমুখ নিঃসৃত। নিখিল আত্মার সঙ্গে জীবাত্মা যখন অবস্থান করে, তখন সংসারের সমস্ত কিছু বিস্বাদ লাগে, একটি তীব্র টান অনুভব হয়, পরমাত্মার প্রতি।

সাধারণ মানুষ সুসুপ্তির কোলে (গাঢ় ঘুমে) আশ্রয় নিয়ে জগৎ ভুলে থাকে, কিন্তু ঘুম ভাঙলেই তার আবার জগতের কর্ম্ম বন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়। সুসুপ্তির কথা মনে থাকে না। কিন্তু সমাধি থেকে বুত্থিত হলে, তাঁর মধ্যে সমাধির স্মৃতি নষ্ট হয় না। সমাধির স্মৃতি তাকে উজ্জীবিত করে রাখে, একেই ব্যাসদেবের প্রসাদ বলে।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
তারিখ : ২৯.০৩.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা  -  অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ- মোক্ষযোগঃ
শ্লোক নং ১৮/৭৬-৭৮

রাজন সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য সংবাদম-ইমম-অদ্ভুতম
কেশবার্জ্জুনয়োঃ পুণ্যং হৃষ্যামি চ মুহুর্ম্মুহুঃ (৮/৭৬)

হে রাজন, কেশব ও অর্জ্জুনের সেই অদ্ভুত এই পবিত্র অদ্ভুত কথোপথন স্মরণ করে আমার বারবার রোমাঞ্চ অনুভব করছি।

আগের শ্লোকে শুনেছিলাম, বাসুদেব, অর্থাৎ যাঁর লোমকূপে সমস্ত ব্রহ্মান্ড বিরাজ করছে। এবার বলছেন কেশব অর্থাৎ জলের মধ্যে শায়িত মৃতদেহ। অনন্ত শয়নে ভাসমান। আবার ক অর্থাৎ মস্তক, ইশ অর্থাৎ প্রভুত্ত্ব করা, ব অর্থাৎ প্রাপ্তি। তো আমাদের মস্তিষ্কের সহস্রারে যিনি স্থিত। অর্থাৎ যাঁর ব্রহ্মপদ প্রাপ্তি হয়েছে। আর অর্জ্জুন হচ্ছে বিশুদ্ধ তেজতত্ত্ব। এই তেজঃ-প্রভাবেই জগতের ক্রিয়াকর্ম্ম চলছে। তো জীবের এই তেজতত্ত্ব যখন আত্মমুখী হয়, তখন তা ভগবতপ্রাপ্তির সহায়ক হয়। তেজতত্ত্ব যখন সখ্যভাবে আত্মস্থিত হয়, তখন প্রকৃতির এই ক্ষেত্ররূপ দেহাদি জয় করা সম্ভব হয়। যখন সাধকের মধ্যে এই তেজতত্ত্ব প্রকট হয়ে প্রাণবায়ুকে উর্দ্ধমুখী করে তোলে, তখন সাধক শরীরকে বিস্মৃত হয়ে, বহির্জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, অন্তর্জগতে অপূর্ব দৃশ্যাদি, শ্রত্বাদি আস্বাদন করে অনাবিল আনন্দ উপভোগ করে থাকেন। শুদ্ধ চিত্তের এই আনন্দ অন্যকিছুতে হয় না।


তচ্চ সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য রূপম-অত্যদ্ভুতং হরেঃ
বিস্ময়ো মে মহান রাজন হৃষ্যামি চ পুনঃ পুনঃ। (১৮/৭৭)

হে রাজন হরির সেই অতি অদ্ভুতরূপ স্মরণ করতে করতে আমার অতিশয় বিস্ময় বোধ হচ্ছে, এবং বারবার হৃষ্ট হচ্ছি।
ব্যাসদেবের কৃপায় সঞ্জয়, আর যোগেশ্বরের ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় অর্জ্জুন উভয়েই বিশ্বরূপ দর্শনের সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। এই বিশ্বরূপ আসলে সগুন ব্রহ্ম। ধ্যানের উৎকর্ষতা হেতু এই অদ্ভুত দর্শন হয়ে থাকে। এই অভূতপূর্ব দৃশ্য দর্শনে একটা ভয়াবহ আনন্দের স্ফূরণ হয়। এটি কখনও সৌম্য কখনও ভয়ঙ্কর সুন্দর।

কঠোপনিষদে হচ্ছে, (শ্লোক- ২/২/১২-১৩) আত্মা এক রূপকে বহুধা বিভক্ত করেন। তাঁকে যে ধীর ব্যাক্তিগন বুদ্ধিতে অভিব্যক্ত রূপে নিজের আত্মারূপে দর্শন করেন, তাঁরাই শাশ্বত আনন্দের অদিকারী হন। যিনি সকল অনিত্যের নিত্য, চেতনগনের মধ্যে যিনি চৈতন্য, যিনি সকল জীবের কাম্যবস্তুসকল বিধান করেন, সেই পরমাত্মাকে যে প্রজ্ঞাবানব্যক্তি আত্মস্বরূপে দর্শন করেন কেবল তাঁরাই অপার শান্তি লাভ করেন।

এখন সঞ্জয় বা অর্জ্জুন বিশ্বাত্মার মধ্যে যখন সমস্ত জীবসকল, এমনকি উদ্ভিদসকল, নদী, সমুদ্র, গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র অর্থাৎ এক-আধারে সমস্ত কিছুকে অবস্থিত দেখতে লাগলেন, যখন তার ব্যষ্টিমন সমষ্টিমন একাত্মীভূত হয়ে গেলো, তখন পৃথক পৃথক দৃশ্য বা পদার্থের আর অস্তিত্ত্ব কোথায়, এই ভেবে সঞ্জয়ের মনে বিস্ময় উৎপন্ন হলো। এই যে ভেদভাব, এটি বিচারের দ্বারা যায় না, যোগাদিতেও যায় না, কেবল ভগবৎ কৃপাতেই এই সংশয় দূর হয়। ভেদভাব দূরীভূত হলে অর্থাৎ বিশ্বের ঐক্য দেখে সাধক নির্বাক হয়, বিস্মিত হয়। শরীরের মধ্যে রোমাঞ্চের অনুভব হয়।


যত্র যোগেশ্বরঃ কৃষ্ণো যত্র পার্থো ধনুর্দ্ধরঃ
তত্র শ্রীঃ-বিজয়ো ভুতিঃ-ধ্রুবা নীতিষ্মতিঃ-মম। (১৮/৭৮)

যেখানে যোগেশ্বর কৃষ্ণ ও ধনুর্দ্ধর পার্থ সেখানে বিজয়, অভ্যুদয়, অখণ্ড ন্যায় রূপে বর্ত্তমান। এই আমার অভিমত।
ধনুর্দ্ধর পার্থ অর্থাৎ সাধনক্রিয়ায় পারদর্শী। মেরুদন্ড রূপ ধনুকের বাট (দন্ড) , ছিলা (জ্যা) রূপ নাড়ী, আর তীররূপী (বান) রজঃশক্তি যাঁর আয়ত্ত্বে এসে গেছে, তিনি ধনুর্দ্ধর । আর যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ অর্থাৎ যিনি যোগের সর্ব্বোচ্চ অবস্থায় অবস্থান করছেন। যিনি যোগবলে দেহাতীত হয়ে চৈতন্যে অবস্থান করছেন। এই পুরুষের সবত্র জয় ঘোষিত হয়। দেখুন সাংসারিক জীবনে পুরুষকার ও দৈব একত্রিত হলে সর্ব্বকর্ম্মে সাফল্য আসে। তেমনি সাধনক্রিয়ায় যিনি পারদর্শী, যিনি সমস্ত তত্ত্বের উর্দ্ধে সহস্রারে প্রাণ-মনকে স্থির করেছেন, তিনি যোগেশ্বর। আর যেখানে যোগেশ্বর সেখানে বিভূতি। যেখানে বিভূতি সেখানে সমস্ত ঐশ্বর্য্য, মহত্ত্ব, প্রভাব, সামর্থ, অর্থাৎ সমস্ত ঈশ্বরীয় গুন্ বর্ত্তমান। ধ্রুবা নীতি অর্থাৎ অটল নীতি, ন্যায় ধর্ম্ম। যোগীগণ যোগের প্রভাবে ঈশ্বর হয়ে ওঠেন, কিন্তু সমস্ত যোগীদের যিনি ঈশ্বর তিনি যোগেশ্বর। এই যোগেশ্বর একজনই তিনি শ্রীকৃষ্ণ।

সবশেষে বলি, সমস্ত জীবকুলের মতো মানুষও দেহভাবে মত্ত। জগৎ যেমন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, বস্তু থেকে যেমন একদিন প্রাণের জন্ম হয়েছে, তেমনি প্রাণের পরিণতিতে একদিন এই উৎকৃষ্ট মনুষ্যদেহ তৈরী হয়েছে। আর মানুষ স্বাভাবিক ভাবেই দেহাভিমানী হয়ে, প্রকৃতির বশে জীবন অতিবাহিত করছে। পরিবর্ত্তন যেমন জগতের শাশ্বত নিয়ম তেমনি মানুষের দেহ যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি হয়েছে, সেই উদ্দেশ্য একদিন পরিণতি লাভ করবে। চোর একদিন সাধু হবে, সাধু একদিন ক্রিয়াবান হবে। আর এই ক্রিয়াযোগের অনুষ্ঠানের দ্বারা সে একদিন চরম পরিণতিতে অর্থাৎ সে যেখান থেকে এসেছিলো, সেখানে ফিরে যাবে। এই ধ্রুব সত্যকে জানানোর জন্য, শ্রীগীতা আলোকবর্তিকা জ্বেলে আমাদের পথের নির্দেশ দিয়েছেন। আর এই সত্য যতক্ষন না আমাদের বোধগম্য হবে, ততদিন আমাদের পুনঃ-পুনঃ জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হতে হবে।

সঞ্জয়ের অন্তিম ও চূড়ান্ত মতামত দিয়ে শ্রীগীতার সমাপ্ত হলো।
সমস্ত জগতের কল্যাণ হোক, সমস্ত জীবের কল্যাণ হোক। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে প্রণাম করি। ব্যাসদেবের জয় হোক। শুকদেবকে প্রণাম। জনমেজয়কে প্রণাম। সবাইকে প্রণাম।

ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।


ইতি শ্রীমদ্ভগবৎ গীতাসু উপনিষদসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণ-অর্জ্জুন সংবাদে মোক্ষযোগ নাম অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ।
------------------
























 
 

 











































Comments

Popular posts from this blog

নিত্যকথা

ঈশ্বর ও তাঁর উপলব্ধি

সত্যধর্ম্ম ও প্রেম