যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - চতুর্দশ অধ্যায়ঃ - গুণত্রয়বিভাগ যোগঃ

 



ওম নারায়ণং নমস্কৃত্য নরঞ্চৈব নরোত্তমম
দেবীং সরস্বতীং ব্যাসং ততো জয়মুদীরয়েৎ।

যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - চতুর্দশ অধ্যায়ঃ - গুণত্রয়বিভাগ যোগঃ 

০৬.১২.২০২২-২২-১২-২০২০

ত্রয়োদশ অধ্যায়ে আমরা ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ বিভাগ যোগ সম্পর্কে শুনেছি। এই ক্ষেত্র অর্থাৎ শরীর সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞানের অভাবে, আমাদের সংসারগতি হয়ে থাকে। এখন এই ক্ষেত্র সম্পর্কে যিনি জানেন, তিনি ক্ষেত্রজ্ঞ। এই ক্ষেত্র-জ্ঞানের উদয় না হলে সংসারসাগর উত্তীর্ন হওয়া যাবে না। তাই যোগীগণের উপদেশ হচ্ছে, প্রথমে গুরুমুখে এই তত্ত্বকথা শুনতে হবে। এই গুরুমুখে তত্ত্বকথা শোনার ব্যাপারে, একটা কথা বলতেই হয়, সেই গুরু কোথায় - যিনি তত্ত্বজ্ঞান সম্পন্ন। তাই শ্রী গুরুমুখের বাণীর বিকল্প হচ্ছে শাস্ত্র অধ্যয়ন। শাস্ত্রগ্রন্থ পাঠ - যা আসলে গুরুবাক্যঃ - লিপির আকারে আমাদের কাছে সহজলভ্য। শাস্ত্রগ্রন্থ পাঠের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়ের গভীরে মনকে নিয়ে যেতে পারলে, বারবার এই শাস্ত্রের চিন্তন করলে, শাস্ত্রবাক্যের যথার্থতা আমাদের উপলব্ধিতে আসতে পারে। এই উপলব্ধি একদিনেই হবে তা নয়, কিন্তু এই উপলব্ধি বা অনুভব যতক্ষন না হচ্ছে, ততক্ষন নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজনে একই বিষয়ের একাধিক লেখকের গ্রন্থ পাঠ করতে হবে। এতেকরে, একটা সময় বিষয়, মনের মধ্যে একটা তথ্যচিত্র তৈরী করে নিতে পারবে।

ভগবান বলছেন, জ্ঞানীভক্ত আমার সবচেয়ে প্রিয়। জ্ঞানী অর্থাৎ দেহাত্মবোধের উর্দ্ধে যে জ্ঞান। এখন কথা হচ্ছে কেন আমাদের এই দেহাত্মবোধ হয় ? দেখুন সেই পরমপুরুষ আমাদের শরীরে সূক্ষ্মপ্রান রূপে অসংখ্য নাড়ীর মধ্যে সঞ্চারিত হচ্ছে। আমাদের ইন্দ্রিয়সকল এই প্রাণশক্তির সাহায্যে জগৎবস্তুর উপলব্ধি করছে। তো প্রাণ ইন্দ্রিয়গত হয়ে দর্শন-শ্রবণ-স্পর্শন-আঘ্রান-আস্বাদন-মনন করছে। জ্ঞান অর্থাৎ এই ইন্দ্রিয়লব্ধ যে জ্ঞান তাকে অতিক্রম করে, আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করতে হবে। অর্থাৎ আত্মস্বরূপের জ্ঞান বা আত্মজ্ঞান লাভ করতে হবে। আমি তুমি যেমন আলাদা, আমি-আমার তেমনি আলাদা। তো যা কিছু আমার-বলে উপলব্ধি হচ্ছে, তার থেকে আমিকে আলাদা করতে হবে। এই আলাদা করা, বা বিভাজন প্রক্রিয়াই যোগদ্বারা সম্পন্ন হয়ে থাকে।

যোগেশ্বর ভগবান এবার গুণত্রয় বিভাগ যোগের কথা বলছেন। অর্থাৎ প্রকৃতির যে তিনটে গুন্ সত্ত্বঃ-রজঃ-তমঃ এর বিভাজন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলছেন। আমরা ধীরে ধীরে স্থির চিত্তে ভগবানের শ্রীমুখে সেই সব অমৃত কথা শুনবো।

শ্রীভগবান উবাচ :

পরং ভূয়ঃ প্রবক্ষ্যামি জ্ঞানানাং জ্ঞানম-উত্তমম
যজজ্ঞাত্বা মুনয়ঃ সর্ব্বে পরাং সিদ্ধিমিতো গতাঃ। (১৪/০১)

শব্দার্থ : পরং - পরম, অর্থাৎ প্রকৃতির উর্দ্ধে সেই আমি, বা অপ্রাকৃত, ভূয়ঃ প্রবক্ষ্যামি : পুনরায় আমি বলবো, জ্ঞানানাং - সমস্ত জ্ঞানের মধ্যে, জ্ঞানম-উত্তমম - উত্তম জ্ঞান, যজজ্ঞাত্বা মুনয়ঃ - যা জেনে মুনিগন, সর্ব্বে পরাং - সমস্ত পরম, সিদ্ধিম-ইতঃ- এই সিদ্ধি গতাঃ -লাভ করেছিলেন ।

বঙ্গানুবাদ :শ্রী ভগবান বললেন, সকল জ্ঞানের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পরমজ্ঞান পুনরায় বলছি, যা জেনে সকল মুনিগন এই দেহবন্ধন হতে পরাসিদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছেন।

বিস্তার : যে জ্ঞানের ফলে মুনিঋষিগন এই দেহবন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে উত্তম অবস্থায় স্থিতি লাভ করেন সেই সম্পর্কে পুনরায় বলছেন। এই জ্ঞান উত্তম কেন ? না আমাদের জানার শেষ নেই। একটা প্রশ্নের উত্তর জানবার পরেই, আমাদের মনের মধ্যে হাজার প্রশ্নের উদয় হয়। কিন্তু এই পরমজ্ঞান লাভের পরে, আর জানবার কিছুই থাকে না। প্রশ্নের শেষ হয়, জানবার ইচ্ছে পর্যন্ত লোপ পেয়ে যায়। সমস্ত বাসনা-সংকল্পের সমাপ্ত হয়। এর পরে আর কিছু আছে কি না, তা জানবার প্রবৃত্তি থাকে না। চরম দুঃখে যেমন দুঃখ-বোধের লোপ পায় , চরম পার্থিব-আনন্দে যেমন ক্ষনিকের জন্য হলেও, অনীহার জন্ম নেয়, তেমনি এই সত্য-জ্ঞান লাভের পরে, মানুষের মধ্যে থেকে সমস্ত প্রশ্নের চির সমাপ্তি হয়, জানবার আগ্রহ চিরতরে লোপ পায় । আসলে এই জ্ঞান লাভের পরে, সাধক মৌন হয়ে যান, তখন না থাকে হারাবার ভয়, না থাকে পাবার আকাঙ্খা। না থাকে অভাববোধ, না থাকে প্রাপ্তির প্রত্যাশা । তখন একটাই ভাব, আর তা হচ্ছে, আত্মাতে স্থিতি। তখন তার মধ্যে এমনকি সিদ্ধি আর অসিদ্ধির বোধও থাকে না। একেই বলে আপ্তকাম বা পূর্নকাম পুরুষ যা পরাসিদ্ধির অবস্থা।

ইদং জ্ঞানম-উপাশ্রিত্য মম সাধর্ন্ম্যম-আগতাঃ
সর্গেঽপি ন-উপজায়ন্তে প্রলয়ে ন ব্যাথন্তি চ। (১৪/০২)
শব্দার্থ : ইদং জ্ঞানম - এই জ্ঞান, উপাশ্রিত্য - আশ্রয় করে, মম সাধর্ন্ম্যম- আমার একই প্রকৃতি, আগতাঃ- লাভ করে, সর্গেঽপি - সৃষ্টি কালেও, ন-উপজায়ন্তে- জন্ম গ্রহণ করে না, প্রলয়ে ন ব্যাথন্তি চ- প্রলয়েও ব্যথিত হয় না।
বঙ্গানুবাদ : এই জ্ঞান আশ্রয় করে, আমার স্বরূপতা প্রাপ্ত হয়ে সৃষ্টি কালেও জন্মগ্রহণ করেন না এবং প্রলয়কালেও ব্যথিত হন না।

বিস্তার : ঈশ্বর জ্ঞানস্বরূপ। এই জ্ঞানস্বরূপকে জানবার যে সাধনা তাকেও জ্ঞান বলে। আমরা আগেই শুনেছি, ভগবানের প্রিয় ভক্ত হচ্ছেন জ্ঞানী। এই জ্ঞান সাধনের সম্যক অনুষ্ঠান দ্বারা আপন-স্বরূপের প্রাপ্তি ঘটে। অর্থাৎ মৎস্বরূপতা প্রাপ্ত হওয়া যায়। গুরুসান্নিধ্যে আসবার আগে, বা সাধনক্রিয়ার শুরুর আগে, ব্রহ্ম থেকে আমি পৃথক, এমনকি এই বিশ্বব্রমান্ড থেকে আমি পৃথক, এই বোধের মধ্যেই অর্থাৎ ভেদবোধের মধ্যেই আমাদের নিবাস হয়ে থাকে। কিন্তু এর পরে, কোনো কারণে অর্থাৎ গুরুকৃপায় বা গুরু-আদিষ্ট পথে সাধনক্রিয়ার ফলে যদি এই পৃথকবোধ বা ভেদ বুদ্ধি মিটে যায়, তখন একটা অদ্বিতীয় ভাবের স্থিতি হয়। তখন জন্ম-মরন, সুখ-দুঃখ, বাসনা-সংকল্প সব দূরীভূত হয়ে সাম্যবস্থার ভাব হয়। যা করলে এই ভাবে স্থিতি হয় তাকেই বলে সাধনা। এই সাধনাও একপ্রকার কর্ম্ম। এই যে কর্ম্ম এই কর্ম্ম হচ্ছে আমাদের স্বাভাবিক কর্ম্ম বা স্বাভাবিক ধর্ম্ম । আমরা যেমন বেঁচে থাকবার জন্য, স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে স্বাস গ্রহন করি, চোখের পাতা ফেলি, খাবার খাই, খাবার হজম করি, জল পান করি, এগুলোর জন্য আমাদের কোনো ক্লেশবোধ হয় না। বা এর জন্য কোনো বিশেষ উদ্যম নেবার দরকার পড়ে না। আসলে,জীবের জন্ম হবার সঙ্গে সঙ্গেই সৃষ্টিকর্ত্তা জীবের স্বভাবের মধ্যে এই প্রক্রিয়ার প্রবর্ত্তন করে রেখেছেন।আর এই যে প্রক্রিয়া বা কর্ম্ম এর কোনো বিরাম নেই। চলছে তো চলছেই। এর কোনো স্থিতি নেই, এর কোনো বিশ্রাম নেই। এই যে বিরামহীন, বিশ্রামহীন অবস্থা এর পিছনে আছে প্রাণকর্ম্ম। গতিশীল প্রাণ, তরঙ্গের আকারে প্রবাহিত হচ্ছে, যেমন সমুদ্রে ঢেউ উঠছে। প্রাণ স্বস্থান-চ্যুত হয়ে গতিশীল হয়েছে। আর এই চঞ্চল প্রান-তরঙ্গের উৎপাতে দেহ-ইন্দ্রিয়াদি স্ব-স্ব কর্ম্ম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশ্বব্রমান্ডে ছড়িয়ে পড়েছে। একেই অর্থাৎ প্রাণের গতিকে সাধুপুরুষগন সাধনক্রিয়ার সাহায্যে বিপরীমুখী করে কেন্দ্রর দিকে নিয়ে যাবার জন্য প্রয়াস করে থাকেন। চঞ্চল প্রাণ যখন স্থির হয়ে স্বরূপে অবস্থান করে, তখন যে ভাব হয়, তা জন্ম-মৃত্যু, সুখ-দুঃখের অতীত ভাব।

সাধারণ লোকের সঙ্গে সাধুজনের পার্থক্য হচ্ছে, সাধারণ লোক স্বাভাবিক ভাবে, ফুসফুসের সাহায্যে ইড়া-পিঙ্গলা দিয়ে বায়ুকে প্রবাহিত করছে, আর সাধুপুরুষগন সুষুম্না দিয়ে বায়ুকে প্রবাহিত করছেন। কেউ প্রাণশক্তিকে নিম্নাভিমুখী করে জগৎ সৃষ্টি করছেন, আবার কেউ প্রাণবায়ুকে উর্দ্ধাভিমুখী করে উৎসে ফিরে যেতে চাইছেন। কেউ জাল বিছিয়ে দিচ্ছেন, কেউ জাল গুটিয়ে নিতে চাইছেন। প্রাণের অচল স্থিতিই ব্রহ্মপদ। জন্ম-মৃত্যুর ক্লেশ এই স্থিতি-পদাধিকারীকে ধরতে পারে না। যখন যোগীপুরুষ এই স্থির ব্রহ্মপদ লাভ করতে পারেন, অর্থাৎ চিত্ত যার সম্পূর্নরুপে লয় হয়েছে, তিনি প্রলয়ের সাক্ষাৎ করে থাকেন। কিন্তু সাধকের মন বলে কিছু অবশিষ্ট নেই, তাই তার কাছে কী-বা সৃষ্টি, কী-বা প্রলয়। তাঁর কাছে সব একাকার হয়ে যায়। না জন্ম না মৃত্যু। জন্ম মৃত্যুর উর্দ্ধে এক অমর জগতের বাসিন্দা হয়ে মুক্তানন্দে ভেসে চলেন।


মম যোনির্মহদ ব্রহ্ম তস্মিন গর্ভং দধাম্যহম
সম্ভবঃ সর্ব্বভূতানাং ততো ভবতি ভারত। ১৪/০৩)

শব্দার্থ : মম : আমার, যোনি: গর্ভধান স্থান : মহৎ-ব্রহ্ম : আমার প্রকৃতি তস্মিন : তাতে ; গর্ভং : গর্ভ : দধাম্যহম : দদামি অহম - আমি দান করি : সম্ভবঃ - উৎপত্তি, সর্ব্বভূতানাং : সর্ব্ব জীবের বা ভূতের, ততো ভবতি : তা থেকে হয়, ভারত - ভারত অর্থাৎ অর্জ্জুন।
বঙ্গানুবাদ : হে ভারত, মহৎ-ব্রহ্ম অর্থাৎ প্রকৃতি আমার গর্ভধান স্থান। তাতে আমি জগৎবীজ নিক্ষেপ করি। তা হতেই সমস্ত ভূতের উৎপত্তি হয়।

বিস্তার : আবার সেই সৃষ্টিতত্ত্বের কথা। এই সৃষ্টি তত্ত্ব সহজে বোধগম্য হবার নয়, তাই ভগবান পুনরায় এই সৃষ্টি তত্ত্বের কথা বলছেন। আমরা জীবকূলে সৃষ্টির সাধারণ পাঁচটি উপায় দেখি ,১. আত্মজ, ২.স্বেদজ, ৩.উদ্ভিজ্জ, ৪. অন্ডজ ৫. জরায়ুজ।
বীজ থেকে উদ্ভিদ , ডিম্ থেকে সাপ পক্ষীকুল, জরায়ু থেকে প্রাণীসকল, । এছাড়া আরো দুটো উপায় আছে, আর সেগুলো হচ্ছে স্বেদজ ও আত্মজ । স্বেদজ অর্থাৎ উকুন ইত্যাদির জন্ম হয় ঘাম থেকে। শৈবাল , ছত্রাক ইত্যাদিও স্বেদজ । প্রথম তিনটি উপায়ে যে দেহ সৃষ্টি হচ্ছে, তা পিতা-মাতার অনুরূপ দেহ। চতুর্থটি পিতা-মাতার অনুরূপ নয়। আর সবশেষে আত্মজ উপায়ে যে জন্ম তার বিশেষ কোনো আকৃতি বিশিষ্ট নয়। এককোষী জীব, অনেক ক্ষেত্রে ফ্লাজেলা বিশিষ্ট হয়ে থাকে ।

বলা হয়ে থাকে জীবকুলের জন্মকালে বাহ্যজ্ঞান থাকে না, আবার যখন সে শরীর ছেড়ে দেয় তখনও তার বাহ্যজ্ঞানের লোপ হয়। তো যে জ্ঞান নিজবোধ রূপে হবার কথা, তা জীবের হওয়া সহজসাধ্য নয়, অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুর জ্ঞান প্রতক্ষ্য জ্ঞান নয় । আর অন্যের মুখে মিষ্টি খেলে, মিষ্টত্ব অনুভব হয় না। অন্যের মুখে ঝাল খেলে, সে ঝালের মর্ম বোঝা যায় না। ব্রহ্ম সর্ব্বব্যাপক, নিরাকার, নির্বিকার, জন্ম-মৃত্যু রোহিত। ব্রহ্মের না আছে উৎপত্তি, না আছে বিনাশ। তো যে ব্রহ্ম উৎপত্তি বিনাশের ঊর্দ্ধে সেই ব্রহ্মস্বরূপের আবার জন্ম-মৃত্যু কোথায় ?

শিব সংহিতায় বলা হয়েছে, "বিন্দুঃ শিবো রজঃ শক্তিরুভয়োর্মেলনাৎ স্বয়ম। স্বপ্রভূতানি জায়ন্তে স্বশক্ত্যা জড়রূপয়া"। (শ্লোক-৯৮) - বিন্দু হচ্ছেন শিবস্বরূপ এবং রজঃ শক্তিস্বরূপ ; উভয়ের মিলন হলে স্বয়ং আত্মা জড়রূপিণী নিজ শক্তি দ্বারা বহুরূপে প্রকাশমান হন। শিব সংহিতায় আরো বলা হয়েছে, সৃষ্টি হচ্ছে অবিদ্যার প্রকাশিত রূপ। অবিদ্যা মিথ্যে, যা জীবের স্বভাব বলে পরিচিত। বিদ্যা হচ্ছে নির্ম্মল, স্বচ্ছ আকাশ আর অবিদ্যা হচ্ছে অন্ধকার আছন্ন যা স্বচ্ছ আকাশের বাধক। এই অস্বচ্ছ আকাশ থেকে বায়ু ,অগ্নি, জল পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে। চৈতন্য থেকেই এই চরাচর বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে। প্রলয়কালে পৃথিবী জলে, জল তেজে, তেজ বায়ুতে আর বায়ু আকাশে লীন হয়। এই যে অবিদ্যারূপিণী জড় রূপ (অচেতন) মহামায়া সত্ত্ব-রজঃ-তমঃ গুন্ যুক্তা, এই তিন গুন্ সমস্ত কর্ম্মের প্রেরণাদায়িকা, ক্লেশদায়িনী , দূরতিক্রমনীয়া - শক্তি রূপে সমস্ত বস্তুকে আচ্ছাদিত করে রেখেছেন। এই মহামায়া তার বিক্ষেপ শক্তি বলে জগৎরূপ সংসারকে পরিচালনা করছেন। এই মহামায়ার যে সত্ত্বগুণ তাকে বলা হয় লক্ষ্মী, রজোগুনকে বলা হয় বিদ্যা বা সরস্বতী, আবার তমোগুণের আধিক্যে তিনি হন মা-দূর্গা।

এই শরীর জড়বস্তু, আর এই যে সত্ত্ব, রজঃ,তমঃ গুন্ বা বিদ্যা কেবল জড় বস্তুতেই প্রকাশিত হয়। জগতের এই যে জড়বস্তু তা কেবলমাত্র যথার্থ জ্ঞানের সাহায্যে রক্ষিত হচ্ছে। এখানে কেউ জ্ঞাতা, কেউ জ্ঞেয় কেউ জ্ঞান। প্রকৃতপক্ষে কোনো বস্তুরই প্রকৃত সত্তা বলে কিছু নেই। কেবল ভাসক-চৈতন্য আত্মা রূপে নিত্য বিদ্যমান। এই আত্মা জড় পদার্থ নন, কিন্তু এই আত্মা সর্ব বস্তুর মধ্যে থেকে তা ভোগ করেন। জড় পদার্থ হতে নিজ নিজ কর্ম্মে আবদ্ধ হয়ে জীব নানা নামে, নানারূপে, নানা প্রকার হয়ে থাকে। ব্রহ্মাণ্ডে (দেহে) বারবার কর্ম্ম করে ভোগ করতে থাকে। আর এই আসক্তিজনিত কর্ম্ম যেহেতু নিরন্তর চলতে থাকে, তাই জন্ম-মৃত্যুও বারবার হতে থাকে। কিন্তু নিরাসক্ত হয়ে কর্ম্ম সমাধা করলে, অর্থাৎ যখন নিজ কর্ম্ম সমূহের দ্বারা ভোগের অবসান হয় তখন জীব ব্রহ্মে লীন হয়।
বাউলদের যোগ সাধনায়, বলা হচ্ছে তাঁর (মনের মানুষ) বাস তো দ্বিদলে। কিন্তু স্বেচ্ছায় নেমে আসেন, বিশুদ্ধচক্রে, তারপর মনিপুরে, তারপরে একেবারে কুলকুন্ডলিনী যজ্ঞেশ্বরীকে নিয়ে নর্মদা নদীর কূলে দোলায় দোলায়িত হয়ে শুভ যোগের সময় মূলাধারে স্থিত হন। এবার তাঁকে উজানে নিয়ে যেতে হবে। উর্দ্ধে ওঠাতে হবে। কিন্তু কিভাবে ? অলক্ষ্যে বায়ু বা দমের শক্তিতে। এই কুম্ভক শক্তি দ্বারা তাঁকে পূর্বস্থানে নিয়ে তাঁর স্বরূপকে উপলব্ধি করতে হবে।
"তুমি বাইরে যারে তত্ত্ব (খোঁজ) কর
অবিরত সে যে আজ্ঞাচক্রের উপরে।
কুলকুণ্ডলিনী শক্তি রয় মূলাধারে
প্রণয়ের যোগে জাগাও তাহারে
শক্তি চেতন হলে পূর্ণানন্দ মিলে
তোমার সদানন্দ স্বরূপ একবার দেখো না।
বামে ইড়া নাড়ী দক্ষিণে পিঙ্গলা,
রজঃ তমঃ গুনে করিতেছে খেলা,
মধ্যে বিরাজে সুষুম্না,
তারে ধর না কেন সাদরে। "

যখন এক বস্তু থেকে অন্যবস্তু উৎপন্ন হবার সময় হয়, তখন তা বিকার। এই বিকারের ফলেই বস্তুর রূপান্তর ঘটে। দুধের বিকার হচ্ছে দই। শব্দের বিকার হচ্ছে আকাশ। কিন্তু এক বস্তুতে যখন অন্য বস্তুর ভ্রমাত্মক জ্ঞান হয়, তাকে বলে বিবর্ত্ত। যেমন সাপকে দড়ি ভাবা বা দড়িকে সাপ ভাবা। আসলে দড়ি বা সাপ যা ছিল তাই আছে, কিন্তু জ্ঞানের বিকারহেতু ভ্রমদর্শন হচ্ছে। ঠিক তেমনি ব্রহ্ম হতে যে পরিবর্তনশীল জগতের সৃষ্টি হয়েছে, সেই জগত আসলে অপরিবর্তনীয় ব্রহ্ম কিন্তু পরিবর্তনশীল জগৎ বলে ভ্রম হচ্ছে। এই যে সৃষ্টি একে মানস সৃষ্টি বলা হয়। মন থেকে যখন এই ভ্রমজ্ঞান দূর হয়ে যায়, তখন সেই সৎবস্তুর দর্শন মেলে। মূল প্রকৃতির সঙ্গে সচ্চিদানন্দ ব্রহ্মের কোনো ভেদ নেই। শক্তির সঙ্গে শক্তিমানের কোনো ভেদ নেই। মায়ার সংকুচিত অবস্থাই ব্রহ্মভাব। আর সংকুচিত থাকার ফলে তা অগোচর।

এই দেহভান্ড ও ব্রহ্মান্ড একই নিয়মের অধীন। একই রূপ-গুনের সমাবেশে নির্মিত হয়েছে। এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু আছে, তার সব কিছুই আনুপাতিক হারে দেহভাণ্ডেও আছে। মোট কথা ত্রিলোকের মধ্যে যা কিছু যেভাবে আছে, দেহের মধ্যেও সেসব দ্রব্য মেরু অবলম্বন পূর্বক অবস্থান করে স্ব-স্ব ধর্ম্ম পালন করছে। এই মনুষ্য শরীরেই সপ্তদ্বীপ-সমন্বিত মেরু-পর্বত, নদনদী সমূহ, সমুদ্রসকল, পর্বতসমূহ, ক্ষেত্রসমূহ, ক্ষেত্রপালগন, ঋষি-মুনিবর্গ, গ্রহ-নক্ষত্র, পুণ্যতীর্থসকল, পীঠস্থানসমূহ, ও পীঠদেবতাগন অধিষ্ঠান করছেন। এই শরীরেই সৃষ্টি ও সংহারকারী রবি-শশী সর্বদা ভ্রমন করছে।
পৃথিবীর গুন্ বা বিকার, অস্থি, চর্ম্ম, নাড়ী লোম ও মাংস রূপে বিদ্যমান। জলের যে বিকার তা মল, মূত্র, শুক্র , শ্লেষ্মা, ও শোণিত আকারে শরীরে রয়েছে। তেজের বিকার যা আমাদের শরীরে রয়েছে তা হচ্ছে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, নিদ্রা,মোহ, ক্ষান্তি। বায়ুর বিকার বা গুন্ আমাদের শরীরে বিরোধ, আক্ষেপন, আকুঞ্চন, ধারণ ও তৃপ্তি। আকাশের গুন্ - রাগ, দ্বেষ, মোহ, ভয়, লজ্বা - শরীরের মধ্যে বিদ্যমান।
প্রাণবায়ুর বায়ুর অবস্থা বিশেষ হচ্ছে প্রাণ, অপান, সমান, উদান , ব্যান, এবং নাগ, কূর্ম্ম, কৃকর, দেবদত্ত, ধনঞ্জয়। প্রাণ হৃদয়ে, অপান গুহ্যদেশে, নাভিতে সমান, কন্ঠে উদান, সর্ব্ব শরীরে ব্যান। নাগ, কূর্ম্ম, কৃকর, দেবদত্ত, ধনঞ্জয়, জীব বা চৈতন্যস্বরূপ এই পাঁচটি বায়ু সহস্র নাড়ীর মধ্যে পাঁচটি নাড়ীতে অবস্থান করে। ললাট, উরঃ, স্কন্ধ, হৃদয়, নাভি, ত্বক, ও অস্থিতে এই পঞ্চবায়ুর অবস্থিতি।
সপ্তপাতাল - দেহের অধোভাগে অতল, উর্দ্ধভাগে-বিতল, জানুদ্বয়ে সুতল, সন্ধিরন্ধ্রে তল, গুদমধ্যে তলাতল, লিঙ্গমূলে রসাতল, পাদের অগ্রভাগে ও কটির সন্ধি-স্থলে পাতাল।
সপ্তলোক - নাভিদেশে ভুর্লোক, হৃদয়ে ভুবর্লোক, কণ্ঠদেশে স্বর্লোক, চক্ষুদ্বয়ে মহর্লোক, ভ্রুদ্বয়ে জনলোক, ললাটে তপলোক, মস্তকে অর্থাৎ সহস্রারে সত্যলোক। এই সপ্তলোক ও সপ্তপাতাল মিলে চতুর্দশ ভুবন।
সপ্তপর্ব্বত - ত্রিকোণে (মূলাধারচক্রের মাধ্যস্থলে যে ত্রিকোণ) মেরুপর্ব্বত, ঊর্ধ্বকোনে মন্দর, দক্ষিণ কোনে কৈলাশ, বাম কোনে হিমালয়, উর্দ্ধভাগে বিন্ধ্য ও বিষ্ণু পর্বত।
সপ্তদ্বীপ - অস্থিস্থানে জম্বুদ্বীপ, মাংসে কুশদ্বীপ, শিরাসমূহে ক্ৰৌঞ্চদ্বীপ, রক্তে শাকদ্বীপ, সমস্ত সন্ধিদেশে শাল্মলী দ্বীপ, লোমপূর্ন স্থানে - প্লক্ষদ্বীপ, নাভিতে পুস্কর দ্বীপ।
সপ্তসাগর - মূত্রে লবন সমুদ্র, শুক্রে ক্ষীরোদসাগর, মজ্জায় দধিসাগর, চর্ম্মে ঘৃত সাগর, বসা (যার দ্বারা শরীর আবৃত হয় অর্থাৎ মজ্জা, মেদ, চর্ব্বি) জলসাগর, কটিরক্তে ইক্ষুসাগর এবং শোণিতে সুরাসাগর অবস্থিত।
নবগ্রহ- নাদচক্রে সূর্য, বিন্দুচক্রে চন্দ্র, চক্ষুতে মঙ্গল, হৃদয়ে বুধ, উদরে বৃহস্পতি, শুক্রে শুক্র, নাভিচক্রে শনি, মুখে রাহু,পদ ও নাভিতে কেতু।

রত্নসার গ্রন্থে বলা হয়েছে :
ভান্ডকে জানিলে জানি ব্রহ্মান্ডের তত্ত্ব
ভান্ড বিচারিলে জানি আপন মাহাত্ম্য।
আপনা জানিলে জনি বৃন্দাবনতত্ত্ব
ভান্ড হইতে জানি জত (উৎপন্ন) কৃষ্ণের মহিমা।
ভন্ড হইতে জানি রাধা-প্রেমতত্ত্ব-সীমা।

নিজেকে নিজেই চিনতে হবে। আত্মনং বিদ্ধি। এই হচ্ছে সাধনার মূল। প্রাণ-অপান বায়ুর ক্রিয়া দ্বারা সৃষ্টিরূপা সুসুপ্তা কুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগ্রত করে সুষুম্নার মধ্যে দিয়ে ক্রমাগত উর্দ্ধে নিয়ে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর অবস্থা প্রাপ্ত করাতে পারলে স্থুল জীবশক্তি ত্রিগুণাতীত পরম অবস্থা বা ব্রাহ্মস্থিতি লাভ করতে পারে। তো দেহের মধ্যেই পরমতত্ত্বের বাস, তাই দেহকে অবলম্বন করেই আমাদের সাধনা করতে হবে। কিন্তু তার আগে জেনে নেবো "মম যোনির্মহদ ব্রহ্ম" মহদ ব্রহ্ম ভগবানের যোনী - ব্যাপারটা কি ?

আমরা এর মধ্যে বুঝে গেছি, আত্মা প্রকৃতিস্থ হলে মনের প্রকাশ ঘটে, আর মনের সংকল্প হেতু এই প্রপঞ্চময় জগৎ সৃষ্টি হয়েছে। তো যতক্ষন যোগী মন-বুদ্ধি-ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে লিপ্ত থাকেন, ততক্ষন ত্রিলোক বর্ত্তমান। আত্মা সর্ব্বব্যাপক, সর্ব্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ ও সুক্ষ। আবার এই সূক্ষ্মের সূক্ষ্ম-অংশ অতিসূক্ষ্ম অনুর মধ্যে প্রবেশ করতে পারলে, সাধক অনুভবে এই ত্রিলোকের দর্শন পান। ব্রহ্ম -অনুর ছয় ভাগের এক ভাগ এই মর্ত্যলোক। এই অনুর মধ্যেই সব। এই অণুই ব্রহ্মযোনি। যোনি কথাটার অর্থ উৎপত্তি স্থান। যোগীগণ বলে থাকেন, আজ্ঞাচক্র পর্যন্ত গুনের স্থান। আবার এই আজ্ঞাচক্রই ব্রহ্মযোনি। এই আজ্ঞাচক্র থেকে মনের অবতরণ মানে সংসারযাত্রা। আর এখানে স্থিতি লাভ করতে পারলেই , গুণাতীত অবস্থা প্রাপ্ত হওয়া যায়। এই আজ্ঞাচক্রই যোগমায়ার পুর। এই পুরে যিনি বাস করেন, তিনি উত্তমপুরুষ, মহেশ্বর। এই মহেশ্বরের সঙ্গে আদ্যাশক্তি নিত্যলীলা করছেন। কিন্তু গুণাতীত ব্রহ্ম বা পরশিব বাক্য-মনের অতীত। এখানে প্রকৃতি বা পুরুষ কেহই নেই। এখানে শিব ও শক্তি সম্মিলিত ভাবে সমাহিত। একেই বলা হয় অর্ধনারীশ্বর-ভাব।
ব্রহ্ম যতক্ষন মায়াকে স্বীকার না করেন, ততক্ষন তিনি নির্গুণ। মায়াতে উপস্থিত হয়ে ব্রহ্ম সগুন হন। ব্রহ্ম যখন কলাযুক্ত হন, অর্থাৎ মূল-প্রকৃতিতে উপস্থিন থাকেন, তখন শক্তির আবির্ভাব হয়। এই শক্তিই আদ্যাশক্তি নামে অভিহিত হন। এই আদ্যাশক্তি সচ্চিদানন্দ ব্রহ্মের সঙ্গে একীভূত। এখানে গুনের সাম্যাবস্থা থাকে। মূল যে প্রকৃতি তার মধ্যে কোনো বিকৃতি নেই। কিন্তু কালের সাহচর্যে এসে, আদ্যাশক্তিতে গুনের ক্ষোভ দেখা যায়। মূল প্রকৃতি থেকে চার প্রকার সৃষ্টি হয়ে থাকে ১. অদৃষ্ট সৃষ্টি, ২. বিবর্ত সৃষ্টি বা মানস সৃষ্টি ৩. পরিনাম সৃষ্টি ৪. যোগিকী সৃষ্টি।
অদৃষ্ট সৃষ্টি - যা দেখা যায় না। অর্থাৎ অব্যক্ত।
বিবর্ত সৃষ্টি - যখন এক বস্তু থেকে অন্য বস্তু উৎপন্ন হয়, কিন্তু পূর্ব্বের বস্তুর কোনো পরিবর্তন হয় না। এটি আসলে ভ্রমাত্মক জ্ঞান থেকে হয়ে থাকে। অর্থাৎ মরীচিকাকে জল বলে ভাবা। এখানে জল নতুন কোনো বস্তু নয়, অথচ দৃশ্যমান হচ্ছে। আর মরীচিকা মরীচিকায় থেকে যাচ্ছে।
পরিনাম সৃষ্টি - যখন একটা বস্তুকে রূপান্তরিত করে অন্য বস্তুতে পরিণত করা হয়। যেমন দুধ থেকে দই, ছানা ইত্যাদি। এখানে মূল বস্তুর রূপ পরিবর্তন হচ্ছে। এমনকি গুনেরও পরিবর্তন হচ্ছে।
যোগিকী সৃষ্টি - অহং তত্ত্ব থেকে একাদশ ইন্দ্রিয়, ও পাঁচ তন্মাত্র। আবার পাঁচ তন্মাত্র থেকে পঞ্চভূত। অর্থাৎ এক বা একাধিক মূল বস্তু থেকে একাধিক বস্তুর সৃষ্টি।

অদৃষ্টের কারনে, যখন জীবের ভোগকাল উপস্থিত হয়, তখন আদ্যাশক্তি বা মূল প্রকৃতিতে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এই ক্ষোভ তমঃগুণযুক্ত হয়ে থাকে। এইসময় চৈতন্য যুক্ত শক্তি এই তমোগুণের মধ্যে প্রবেশ করে। এই তমোগুণই মহাকাল সংস্পর্শে মা-দূর্গা। প্রলয় কালে এই তমোগুণ আবার রজঃগুনে, রজঃগুন আবার সত্ত্বগুনে প্রবেশ করে। জগতে যেমন স্ত্রী-পুরুষের মিলনে সন্তান উৎপাদন হচ্ছে, তেমনি মহাকাল ও আদ্যাশক্তি মিলনে জগতের সৃষ্টি হচ্ছে।

প্রকৃতিতে যখন মহাকালের সংযোগ ঘটে তখন মহৎ-তত্ত্ব বা নাদের উৎপত্তি হয়। এই মহৎ-তত্ত্বই হিরণ্যগর্ভ। তাই হিরণ্যগর্ভকে বা নাদকে প্রথম সৃষ্টি বলা হয়ে থাকে। এই হিরণ্যগর্ভ থেকেই গুন্ ভেদে অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ তমঃ এই তিন গুন্ ভেদে তিন মূর্ত্তি কল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ ব্রহ্মা (সত্ত্ব) বিষ্ণু (রজঃ) মহেশ্বর (তমঃ) . এই মহেশ্বর রুদ্র নামে পরিচিত। ব্রহ্মা হচ্ছেন, ইচ্ছাশক্তি স্বরূপ, বিষ্ণু হচ্ছেন ক্রিয়াশক্তি স্বরূপ, এবং রুদ্র হচ্ছে জ্ঞানশক্তি স্বরূপ। তো এই তিন শক্তি হতেই সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় চলছে। যোগশাস্ত্রে এই ত্রিশক্তিকে বিন্দু, বীজ ও নাদ বলা হয়ে থাকে।

তো "মম যোনির্মহদ ব্রহ্ম" মহদ ব্রহ্ম ভগবানের যোনী - ব্যাপারটা কি, তা হয়তো কিছুটা বোঝা গেলো। এই মহৎ-ব্রহ্মে যে গর্ভধান তা আসলে বিবর্ত সৃষ্টি। এখানে মূল সত্ত্বা থাকে অবিকৃত। কেবল অবিদ্যার কারনে এই সৃষ্টি দৃষ্ট হয়ে থাকে। এই মহদব্রহ্ম রূপ যোনিতে প্রবেশের ফলে ব্রহ্মের বহুরূপে প্রকাশ লক্ষিত হয়। ব্রহ্মা হচ্ছেন সমষ্টি মন। আর এই যাকিছু সৃষ্টি তা এই সমষ্টি-মনের দ্বারা সৃষ্ট হয়ে থাকে। ব্রহ্মা হচ্ছেন সমষ্টি মন, যা আসলে ইচ্ছেশক্তি। মন না থাকলে জগৎ অদৃশ্য হয়ে যাবে।

সাধন ক্রিয়া করতে করতে যাঁরা উত্তম অবস্থায় উন্নীত হয়েছেন, তাদের মন বলে কিছু অবশিষ্ট থাকে না। আর মন না থাকলে সংকল্প থাকে না। জীবের মৃত্যুকালে জীবের মধ্যেই উৎপত্তির বীজ সুপ্ত হয়ে থাকে। তাই মৃত্যুর পরে আবার জন্ম হয়। কিন্তু সাধনযোগে যখন ইচ্ছাশক্তির লোপ হয়, তখন আর জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হতে হয় না। কাম-কর্ম্ম অনুযায়ী জীবকে অদৃষ্ট ভোগ করবার জন্য ভোগ্যক্ষেত্রের সাথে সম্মন্ধ গড়বার যে চেষ্টা তাকেই গর্ভধান ক্রিয়া বলা হয়ে থাকে। আর এই গর্ভধান কর্ত্তা হচ্ছেন স্বয়ং ব্রহ্ম - সমষ্টিমন।


সর্বযোনিষু কৌন্তেয় মূর্তয়ঃ সম্ভবন্তি যাঃ
তাসাং ব্রহ্ম মহদযোনিরহং বীজপ্রদ পিতা। (১৪/০৪)

শব্দার্থ : সর্বযোনিষু - সব যোনিতে ; কৌন্তেয় - কুন্তীপুত্র ; মূর্তয়ঃ - মূর্তি সমূহ ;সম্ভবন্তি -উৎপন্ন হয় ;যাঃ- যে সমস্ত; তাসাং-তাদের সকলের ; ব্রহ্ম- আত্মা বা ব্রহ্ম ; মহদযোনি - মহৎ-তত্ত্বরূপী যোনি ; অহং - আমি ; বীজপ্রদ - বীজপ্রদানকারী ; পিতা- পিতা। (১৪/০৪)

বঙ্গানুবাদ : হে কৌন্তেয়, সর্ব্ব যোনিতে যে সকল মূর্ত্তিসমূহ উৎপন্ন হয়, মহদ্ব্রহ্ম তাদের মাতৃস্থানীয়া আর আমি বীজদাতা পিতা।

বিস্তার : যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, সমস্ত যোনিতে তা সে মনুষ্যকূলে হোক বা দেবকূলে হোক, পশুকূলে হোক, সমস্ত মূর্ত্তি বা রূপ সেই ব্রহ্মযোনি হতে উৎপন্ন। আর এই ব্রহ্মযোনিতে (হিরণ্যগর্ভে) বীজ প্রদানকারী পিতা স্বয়ং আমি (আত্মা) । আমরা যোনী বলতে মায়ের শরীরের বিশেষ অঙ্গকে বুঝে থাকি। যেমন প্রাণ বলতে আমরা জল বা বায়ুকে বা সূর্য্যরশ্মিকে বুঝে থাকি। আসলে এই প্রাণ কিন্তু অতিসূক্ষ্ম যা বায়ু জল বা রশ্মির সঙ্গে মিশে আছে। তেমনি স্থুল শরীরের অভ্যন্তরে আমাদের আজ্ঞাচক্রে যে সুষুম্নার দ্বারমুখ রয়েছে, তাকে বলা হয় ব্রহ্মযোনি। মায়ের গর্ভ থেকে বেরিয়ে এসে, শিশু যেমন সংসারের মধ্যে প্রবেশ করে, তেমনি বিশ্বশক্তি মস্তকের বিন্দু থেকে সহস্রার হয়ে আজ্ঞাচক্রে প্রবেশ করে। এখান থেকে নিচের দিকে যত নামতে থাকে, তত সে সংসারের মধ্যে আবদ্ধ হয়। বিশুদ্ধ, অনাহত,মনিপুর স্বাধিষ্ঠান হয়ে মূলাধারে এসে স্থিত হয়। তো জাগতিক সৃষ্টিক্রিয়া আমরা এই নিম্নভূমি থেকে প্রকাশমান হতে দেখি। দেখুন সব মূর্ত্তিই ব্রহ্ম থেকে এসেছে, ব্রহ্ম না থাকলে কোনো কিছুরই উৎপত্তি হাওয়া সম্ভব হতো না। সমস্ত জীবকুলের মধ্যেই এই মহৎ-যোনি রয়েছে। সাধন ক্রিয়ার উত্তম অবস্থায় এই উপলব্ধি হয়ে থাকে। দেখুন, আমরা সবাই শুনে থাকি, আমরা সবাই ব্রহ্ম, কিন্তু এই উপলব্ধি আমাদের নেই। এই ব্রহ্ম আবার সর্বত্র বিদ্যমান। কিন্তু আমাদের মতো সাধারনের কাছে, এই জ্ঞানের প্রকাশ হয় না। যোনি থেকে যখন ব্রহ্ম প্রকাশমান হয়, তখন তা অহংজ্ঞানে পরিণত হয়। আর সাধনক্রিয়ার ফলে যখন এই অহং জ্ঞানের লোপ পায়, তখন এই ব্রহ্মজ্ঞানের উদয় হয়। অর্থাৎ এই অহং-এর মধ্যেও সেই তিনি, আবার অহং-এর বাইরেও সেই তিনি। এই অহং-ই কূটস্থে চৈতন্য রূপে প্রতিবিম্বিত হন। আবার এই অহং-ই ব্রহ্মানুরূপে সর্বত্র ব্যাপ্ত। পিতার মধ্যে যেমন পুত্র, তেমনি সেই পুত্রের মধ্যে পিতৃত্ত্ব বিরাজ করছে। মায়ের মধ্যে কন্যা, কন্যার মধ্যে মা বা মাতৃত্ত্ব । আপনার মধ্যে আপনি প্রবেশ করতে না পারলে, এই জ্ঞানের প্রতক্ষ্য অনুভূতি সম্ভব নয়।

সাধন ক্রিয়ার পরাবস্থায় কূটস্থ জ্যোতির প্রকাশ, আবার উল্টোভাবে জ্যোতি থেকে কূটস্থ প্রকাশ পাচ্ছে। তো কূটস্থের জ্যোতি আর ক্রিয়ার উত্তম অবস্থা কেবল, মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। আমিটি কখনো বীজরূপে সংকুচিত, আবার ব্রহ্মনুরূপে সবত্র প্রবিষ্ট। সমুদ্র মধ্যে বুদ্বুদ-এর জন্ম হচ্ছে, আবার বুদ্-বুদ্ থেকে সমুদ্র। বিন্দু বিন্দু জলই সমুদ্র, আবার সমুদ্র বিন্দুবিন্দু জল ছাড়া কিছু নয়।

এই যে প্রকৃতি প্রদত্ত স্থুল, সূক্ষ্ম, কারন শরীর, এই প্রকৃতি পরমাত্মার উপাধি মাত্র। এই প্রকৃতির মধ্যেই চলছে চৈতন্যের খেলা। এই খেলাই আসলে জীবভাব। প্রকৃতি ও পুরুষ একই, কিন্তু যখন পুরুষের মধ্যে ত্রি-গুনের সমাহার দেখা যায়, তখন তা প্রকৃতি। আর গুনরহিত হলেই পুরুষ নামে আখ্যায়িত হয়। আবার প্রকৃতির মধ্যে যখন তম গুনের প্রভাব থাকে, তখন বস্তু সমূহ দৃশ্যমান হয়, আবার সত্ত্ব ও রজঃ গুনের যখন সমাহার হয়, তখন জীবভাব লক্ষিত হয়। প্রকৃতির মধ্যে যখন শুধু সত্ত্ব গুনের প্রভাব থাকে তখন তা দেবভাবের হয়ে থাকে। আবার আত্মা প্রকৃতিস্থ হলেই মনের দ্বারা আবিষ্ট হয়। অর্থাৎ আত্মা ও প্রকৃতি থেকেই মন। আর এই মনের বিক্ষিপ্ততার কারণেই সমস্ত সৃষ্টি কার্য্য চলছে।

সাধন ক্রিয়ার পরাবস্থাতে প্রাণের স্থিরতা, মনের স্থিরতা প্রাপ্ত হয়ে আজ্ঞাচক্রে স্থিত হতে পারলেই, জীব প্রকৃতির হাত থেকে মুক্ত হয়ে যায়। তখন সাম্যাবস্থা - না সৃষ্টি - না লয়। সাধক যতক্ষন এই আজ্ঞাচক্রে স্থির না হতে পারছেন, ততক্ষন প্রকৃতির অধীন থেকে জাগতিক সুখ-দুঃখ ভোগ করে থাকেন। আজ্ঞাচক্র হচ্ছে মধ্যাবস্থা, যেখান থেকে উপরে উঠতে পারলে, নির্গুন অবস্থা প্রাপ্ত হওয়া যায়। গুণাতীত অবস্থা সৃষ্টির উর্দ্ধে। তখন এক পরমানন্দ অবস্থা, এখানে না সৃষ্টি না ক্ষয়। যাইহোক, আমাদের আজ্ঞাচক্রই ব্রহ্মযোনি বা মহদব্রহ্মের স্থান। এখান থেকেই ভূতাদির উৎপত্তি। বিশুদ্ধিতে বাক, হৃদয়ে ইচ্ছে - ধীরে ধীরে নিচের দিকে এই ইচ্ছেকে কার্যকরী করবার জন্য কার্য্য-সৃষ্টি। এ এক বিষ্ময়কর বিষয়, যা বিচারের দ্বারা বোধগম্য হয় না, কেবল সাধক সাধনার সাহায্যেই এই উপলব্ধি করে থাকেন, এবং যা তার ব্যক্তিগত অনুভূতি মাত্র। এই অনুভূতির কোনো ভাগ হয় না। আমরা অসীম ভাগ্যবান, যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই উপল্বদ্ধিকে জগতের কাছে তুলে ধরেছেন। আর আমরা অজ্ঞান এই জ্ঞানের আস্বাদন প্রতক্ষ্য না হলেও, অ-প্রতক্ষ্য ভাবে কিঞ্চিৎ উপলব্ধি করছি।

সত্ত্বং রজস্তম ইতি গুণাঃ প্রকৃতিসম্ভবাঃ
নীবধ্নতি মহাবাহো দেহে দেহিনম-অব্যয়ম। (১৪/০৫)
শব্দার্থ : সত্ত্বং রজস্তম : সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ, ইতি গুণাঃ -- এই গুন্ সমূহ, প্রকৃতি সম্ভবাঃ - প্রকৃতি থেকে জাত, নীবধ্নতি - আবদ্ধ করে, মহাবাহো - মহাবাহো অর্থাৎ অর্জ্জুন, দেহে দেহিনম-অব্যয়ং - অবিনাশী আত্মাকে দেহে।
বঙ্গানুবাদ : হে মহাবাহো, এই সত্ত্ব, রজঃ তমঃ প্রকৃতি থেকে জাত। এই তিনগুন অবিনাশী আত্মাকে দেহের মধ্যে অবদ্ধ করে থাকে।
বিস্তার : অবিনাশী আত্মা জন্ম-জরা মৃত্যু রহিত যা দেহের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে আছে। আর দেহ জন্ম-জরা-মৃত্যুর অধীন। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, প্রকৃতি থেকে জাত তিনটি গুনের কারনেই আত্মা দেহের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে আছেন। এই তিনটি গুন্ হচ্ছে সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ, যা আসলে প্রকৃতির গুন্ এবং এই প্রকৃতিজাত দেহরূপ বস্তুর মধ্যেই কেবল প্রকাশিত হয়ে থাকে।

এখন কথা হচ্ছে, এই গুন্ কোথা থেকে আসে আর কেনই বা আসে ? আসলে প্রকৃতি ও তার গুনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। শক্তিমানের মধ্যে যেমন শক্তি অন্তর্নিহিত, তেমনি প্রকৃতির মধ্যে প্রকৃতির গুন্ অন্তর্নিহিত থাকে। শক্তিমান যদি নিঃশ্চুপ থাকে তবে তার মধ্যে যে গুন্ আছে, তা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। তেমনি প্রকৃতি যখন নিঃশ্চুপ অর্থাৎ সাম্যের মধ্যে অবস্থান করে, তখন তার এই গুনের প্রকাশ ঘটে না। কিন্তু এই প্রকৃতির মধ্যে যখন বৈষম্যে বা বিক্ষুব্ধ ভাব দেখা যায়, তখন তার গুনের প্রকাশ হতে থাকে। খোঁচা খেয়ে, রেগে গেলে, শক্তিমানের শক্তির প্রকাশ দেখা যায়। মৌচাকে ঢিল পড়লে, মৌমাছি সারা আকাশ ছেঁয়ে ফেলে। তো দেহ যেহেতু প্রকৃতিজাত, তাই দেহের মধ্যে প্রকৃতির গুন্ বর্ত্তমান। আর এই দেহ সৃষ্টির কারন হচ্ছে চঞ্চলতা। গুণীর গুন্, শক্তিমানের শক্তি, জ্ঞানীর জ্ঞান, আসলে সবার মধ্যেই অন্তর্নিবিষ্ট থাকে। যতক্ষন প্রকৃতির মধ্যে এই গুন্ সুপ্ত থাকে, ততক্ষন তাকে নির্গুণ, নিস্পন্দিত অবস্থায় দেখা যায়। এই অবস্থা হচ্ছে সাম্যভাব। অর্থাৎ তখন প্রকৃতি ও পুরুষ একে অন্যের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে থাকে।

যোগী পুরুষগন বলে থাকেন, দেহের মধ্যে আছে ইড়া-পিঙ্গলা-সুষুম্না নাম্নী নাড়ী। প্রকতির গুণসূমুহ এই নাড়ীর মধ্যে আরূঢ় হয়ে পঞ্চতত্ত্ব, মন, বুদ্ধি অহঙ্কার রূপে অবস্থান করছে।

বিশেষ জ্ঞানীব্যক্তিগন বলে থাকেন, কোনো এক আকস্মিক কারনে, কতকগুলো উপাদান একত্রিত হয়ে অ্যামিবার অর্থাৎ প্রথম এককোষী প্রাণীর সৃষ্টি হয়েছিল। এই যে আকস্মিক কারন, এর কারন এই বিশেষ গ্যাক্তি ধরতে পারেন নি আজও। কিন্তু হাজার হাজার বছর আগেই এর খোঁজ ,দিয়েছেন ব্রহ্মজিজ্ঞাসু মুনি ঋষি গন। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে (শ্লোক - ১/৩) বলা হয়েছে, মুনি-ঋষিগন ধ্যানস্থ হয়ে উপলব্ধি করলেন, জ্যোতির্ময় পরমাত্মার শক্তিই এই জগতের কারণ । মায়া তাঁর তিন গুনের সাহায্যে সেই পরমাত্মাকে যেন বিশ্ব থেকে আলাদা করে রেখেছে। আসলে এই উপলব্ধি মনের গভীর থেকে আপনা-আপনি ফুটে ওঠে। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর মনের গভীরে গ্রথিত থাকে। মন যখন ধ্যানস্থ হয়ে একমুখী হয়, তখন ধ্রুব-সত্য চেতনার স্তরে ভেসে ওঠে।

তাঁরা বলছেন, ব্রহ্ম ও মায়া দুটো পৃথক সত্তা নয়। ব্রহ্ম যখন ব্যক্ত তখন তাকে আমরা মায়া বা প্রকৃতি বলে থাকি। এই মায়া নিগূঢ়। অর্থাৎ নিজের গুন্ দিয়ে নিজেকে ঢেকে রেখেছেন। এই গুন্ হচ্ছে সত্ত্ব রজঃ, তমঃ। সত্ত্ব হচ্ছে শান্ত ভাব, সাম্যাবস্থা,বা প্রজ্ঞা। রজঃ হচ্ছে তেজ বা কর্ম্মতৎপরতা আর তমঃ হচ্ছে জড়তা বা নিষ্ক্রিয়তা। এই তিন গুনের কারনেই মানুষের মধ্যে এতো প্রভেদ। এই যে বিশ্ব-প্রপঞ্চ, এসবই এই তিন গুনের ভিন্নতা ছাড়া কিছু নয়। এই গুণগুলো একটা আরেকটার উপরে কাজ করে চলেছে। এইজন্যই ব্রহ্ম আমাদের দৃষ্টির বাইরে থেকে যাচ্ছেন। উপনিষদ বলছেন, "কালাত্মযুক্তান্যধিতিষ্ঠত্যেকঃ" (শ্বে ১/৩) "কাল-আত্মা-যুক্তানি অধিষ্ঠিতি একঃ" অর্থাৎ কেবল একই আছেন। কাল-আত্মা এককথায় সকল বস্তুর উৎসই সেই এক পরমব্রহ্ম। ইনিই সবকিছুর নিয়ামক।

পুকুরের মধ্যে চাঁদের ছায়া। জল বাতাসের কারনে ঢেউয়ের সৃষ্টি করছে। আমাদের মনে হচ্ছে, চাঁদ কাঁপছে, চাঁদের আলো কাঁপছে । তেমনি ব্রহ্মকিরণ মায়ার আকাশে ভাসছে, আর মায়া ত্রিগুণের বশবর্তী হয়ে চঞ্চল হচ্ছে। আর চিরস্থির ব্রহ্মকে অস্থির মনে হচ্ছে। প্রকৃতির বিক্ষুব্ধতার কারনে প্রাণ চঞ্চল হচ্ছে, আর প্রাণের চঞ্চলতার কারনে এই সৃষ্টি হচ্ছে। চঞ্চল প্রাণই সত্ত্ব-রজঃ-তমঃ-গুনরূপে ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না বাহিত হয়ে পঞ্চতত্ত্ব, মন, বুদ্ধি অহংকার হিসেবে এই জগৎ খেলায় মেতেছে। এইসময় সমস্ত বস্তুতে আত্মবোধ হওয়ায় এদের প্রতি ক্ষেত্রজ্ঞ আসক্তিপূর্ণ দৃষ্টিপাত করে থাকেন। আর ঠিক এই আসক্তির কারণেই, নিত্যমুক্ত সেই অবিনাশী আত্মা দেহের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েন । তখন আত্মা দেহকে আপনা ভেবে দেহের মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে পড়েন । তখন এই দেহকেই সর্বস্ব ভেবে, স্বরূপকে বিস্মৃত হয়ে যায়। আবার জ্ঞানের উদয় হবার সঙ্গে সঙ্গে তার স্বরূপ অর্থাৎ নিত্য-শুদ্ধ-মুক্ত স্বভাবকে প্রাপ্ত হন। তো যত গোলমাল, এই প্রাণের চঞ্চলতাহেতু ঘটে থাকে। তাই সাধক যোগী, এই প্রাণকে চঞ্চলতা থেকে মুক্ত করে, স্থির হতে সাহায্য করেন। আর প্রাণ স্থির হলে, মন স্থির হয়, স্থির প্রাণ-মন মানেই শুদ্ধ। এখানে আর আবিলতা দেখা যায় না। সূক্ষ্ম প্রাণ সুষুম্না পথে উর্দ্ধগামী হয়ে আজ্ঞাচক্রে নিজ মহিমায় বিরাজ করেন। তখন সমস্ত সম্মন্ধ থেকে মুক্ত হয়ে স্ব-মহিমায় আত্মস্থ হয়ে যান। তখন না থাকে এই প্রপঞ্চময় জগৎ, না থাকে, জাগতিক সুখ দুঃখের অনুভূতি।


তত্র সত্ত্বং নির্ম্মলত্বাৎ প্রকাশকম-অনাময়ম
সুখ সঙ্গেন বধ্নাতি জ্ঞান সঙ্গেন চ অনঘ। (১৪/০৬)
শব্দার্থ : তত্র -অর্থাৎ সেই গুন্ সুমুহের মধ্যে, সত্ত্বম - সত্ত্বগুণ, নির্ম্মলত্বাৎ - সবথেকে নির্ম্মল হবার ফলে, প্রকাশকম- প্রকাশকারী, অনাময়ম - নিরুপদ্রব, সুখ সঙ্গেন - সুখ সঙ্গের দ্বারা, বধ্নাতি - বন্ধনযুক্ত করে, জ্ঞান সঙ্গেন - গুণ সঙ্গের দ্বারা, চ - ও, অনঘ- হে নিষ্পাপ।

বঙ্গানুবাদ : হে নিষ্পাপ, (অর্জ্জুন) সেই সকলের মধ্যে নির্ম্মল বলে প্রকাশশীল, নিরুপদ্রব সত্ত্বগুণ আত্মাকে সুখাসক্তি ও জ্ঞানাসক্তি দ্বারা বন্ধন করে।

বিস্তার : যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে সত্ত্বগুণের (নির্ম্মল জ্ঞানের) অধিকারীও কিভাবে বন্ধনযুক্ত হন, সেই সম্পর্কে বলছেন। আমরা শুনেছি, তমঃগুণ, জ্ঞানকে আবৃত করে রাখে, রজঃগুন্ জ্ঞানের বিভ্রান্তি ঘটাতে পারে। অর্থাৎ রজঃ ও তমঃ গুন্ বস্তুর যথার্থ রূপকে প্রকাশে সাহায্য করে না। কিন্তু সত্ত্বগুন্ বস্তুর যথার্থ রুপকে প্রকাশ করে। আর এর ফলে, আমরা কোন বস্তুকে গ্রহণ করতে হবে, আর কোন বস্তুকে ত্যাগ করতে হবে, তা আমরা যথার্থভাবে বিচার করতে সমর্থ হই। এইজন্য সত্ত্বগুনকে বলা হয় উপদ্রপশুন্য। অর্থাৎ এখানে অজ্ঞান নেই, আবার ভ্রমাত্মক জ্ঞান নেই। মহাত্মাগণ বলছেন, মানুষের অন্তরে সত্ত্বগুণের কারনে যে জ্ঞানের প্রকাশ ঘটে, তা মিশ্ৰজ্ঞান। কারন এই জ্ঞানের মধ্যে কিঞ্চিৎ রজস্তমঃ ভাব মিশ্রিত থাকে। এই মিশ্র জ্ঞানের প্রকাশে জ্ঞানীর মধ্যে জ্ঞানের গরিমা, যা আসলে সুখদায়ক বলে মনে হয়। অর্থাৎ সত্ত্বজ্ঞানের অধিকারী জীব খণ্ডিত সুখে আবদ্ধ হন। আমি সব জানি, সবাই আমাকে মহাপুরুষ বলে থাকে ইত্যাদি ইত্যাদি মধুবাক্য জ্ঞানীকে সুখের ছোঁয়া এনে দেয়। এমনকি এই জ্ঞান আহরণের জন্য নিরন্তর প্রয়াস করে থাকেন। অর্থাৎ এই জ্ঞানের প্রতি তার একটা আসক্তি জন্মায়। আর এই প্রয়াস ততদিন থাকে, যতদিন তাঁর অখন্ড জ্ঞান হচ্ছে না । অর্থাৎ আত্মজ্ঞান হচ্ছে অখণ্ডজ্ঞান। কিন্তু সত্ত্বগুণীর মধ্যে খণ্ডিত জ্ঞানের, যেমন কোনটা ধর্ম্ম আর কোনটা অধর্ম্ম সমস্ত বিষয়েই তিনি অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন । আর এই দ্বিবিধ জ্ঞানের আকর্ষনে তিনি যেমন অন্তর্জগতের দিকে দৃষ্টিপাত করেন, তেমনি আবার বহির্বিশ্বের দিকেও তাঁর দৃষ্টিপাত ঘটে থাকে। আত্মা বিষয়ে আলোচনা, ধর্ম্মশাস্ত্র, দর্শনশাস্ত্র, এমনকি পদার্থ বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, শরীরবিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান সংগ্রহের আগ্রহ দেখা যায়। এই জ্ঞানসংগ্রহের নেশা ত্যাগ করাও বেশ কঠিন।

আসলে আত্মবিষয়ক জ্ঞান, এবং আত্মস্থিতি, এই হচ্ছে জ্ঞান। আত্ম বিষয়ক জ্ঞান হচ্ছে বিশুদ্ধ জ্ঞান, আর আত্মস্থিতি হচ্ছে বিশুদ্ধ আনন্দ। তো মন আত্মাতে না থেকে যদি পঞ্চতত্ত্বে আর দেহের জ্ঞানের দিকে লক্ষ যায়, তবে বুঝতে হবে, এই জ্ঞান বিশুদ্ধ নয়। পঞ্চতত্ত্বে মনোযোগের কারনে, প্রকৃত জ্ঞান অস্বচ্ছ হয়ে পড়ে । মন মলিন হলে, তাতে আত্ম-প্রতিবিম্ব স্পষ্ট রূপে প্রতিভাত হতে পারে না। মন যতক্ষন সংকল্প-বিকল্প শূন্য না হতে পারছে, ততক্ষন মনের মধ্যে আত্মার স্বরূপ দর্শন হতে পারে না। আত্মা ব্যাতিত অন্য বস্তু বা বিষয়ের মধ্যে এমনকি জ্ঞানের বিষয়ে মন নিবিষ্ট হলে, অথাৎ আত্মাকে জানছি, এই ভাব থাকলেও আত্মদর্শন হতে পারে না।
এখন কথা হচ্ছে, তাহলে আমাদের করণীয় কি ? শ্বাস গতিশীল হয়ে চক্রাকারে ঘুরছে। আমাদের মনে হচ্ছে একবার শরীরের ভিতরে প্রবেশ করছে, আবার শরীর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। গতিশীল শ্বাসের এই আসাযাওয়ার সঙ্গে মনকে লাগিয়ে রাখতে হবে। তবে মনের সঙ্গে শ্বাসের ঘর্ষনের ফলে মনের যে ময়লা তা দূর হয়ে যাবে। ময়লা দূর হয়ে গেলে, মন মৌন হয়ে যাবে। কেন মৌন হয় ? কারন এই অবস্থায় মনের মধ্যে সঙ্কল্পের উদয় হতে পারে না। তো মনের ময়লা কেটে গেলে মন যত নির্ম্মল হতে থাকবে,ততই শব্দের নিস্পত্তি হবে। মুখে কোনো কথা থাকবে না। এই অবস্থাতে বিন্দুর দর্শন হবে। এই বিন্দু প্রথম অবস্থায় স্থির না হলেও, ধীরে ধীরে তা স্থির হতে থাকবে। আর এই চিদ্রুপ বিন্দুকে স্থির করতে পারলে, একসময় বিশ্বরূপ দর্শন হবে, আত্মজ্ঞান হবে, আত্মদর্শন হবে। এই যে মনের বিশুদ্ধতা এর কয়েকটি লক্ষণের কথা বলছেন, আচার্য্য শংকর তার বিবেকচূড়ামনি গ্রন্থে : সেখানে বলছেন, প্রসন্নতা, ,পরমা শান্তি, তৃপ্তি, প্রহর্ষ ও পরমাত্মনিষ্ঠা - এই হচ্ছে নিত্যরূপ আত্মার দর্শনের লাভ। আত্মার যথার্থ স্বরূপ অত্যন্ত সূক্ষ্ম। আমরা জানি, দেহ থেকে মন সূক্ষ্ম, মন থেকে বুদ্ধি আরো সূক্ষ্ম, বুদ্ধি থেকে আত্মা আরো সূক্ষ্ম। তো যতক্ষন আমাদের স্থুলবুদ্ধি থাকবে, ততক্ষন আত্মা আমাদের ধারণার অগম্য থাকবে ।চিত্তের একাগ্রতার ফলে বিষয় থেকে বুদ্ধি শুদ্ধতত্ত্বে উত্তীর্ন হলে আত্মস্বরূপের উপলব্ধি সম্ভব হয়। নিরন্তর ব্রহ্মস্বরূপ ধ্যানের ফলে, মনের সত্ত্ব, রজঃ তমঃ গুনরূপ মলিনতা দূরীভূত হয়ে ব্রহ্মস্বরূপতা লাভ করে। আর নিরন্তর এই অভ্যাসের ফলে শুদ্ধ মন ব্রহ্মে লয় হয়। তখন নির্বিকল্প সমাধি আপনা আপনি উপস্থিত হয়।

যতদিন এই শ্বাস-প্রশ্বাস ইড়া পিঙ্গলা দিয়ে প্রবাহিত হবে, ততদিন সংসার জ্ঞানে আবদ্ধ থাকতে হবে। এর কোনো অন্যথা নেই। কিন্তু এই শ্বাসবায়ু রূপ প্রাণপ্রবাহ যখন আমাদের সুষুম্না দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করবে, তখন বিশুদ্ধ সত্ত্বের আবির্ভাবে ত্রিগুণাতীত অবস্থায় উন্নীত হওয়া সম্ভব হবে। তখন সমস্ত অজ্ঞানের মেঘ কেটে জ্ঞানের সূর্য্যের উদয় হবে। নিরানন্দ দূর হয়ে পরমানন্দ লাভ হবে।


রজো রাগাত্মকং বিদ্ধি তৃষ্ণা সঙ্গ সমুদ্ভবম
তৎ-নিবধ্নাতি কৌন্তেয় কর্ম্ম সঙ্গেন দেহিনম। (১৪/০৭)

শব্দার্থ : রজো রাগাত্মকং - রজোগুন অনুরাগত্মক, বিদ্ধি - জানবে, তৃষ্ণা সঙ্গ সমুদ্ভবম - তৃষ্ণা উৎপন্ন হয় আসক্তির কারনে, তৎ-নিবধ্নাতি - তা আবদ্ধ করে, কৌন্তেয় - হে কুন্তীপুত্র, কর্ম্ম সঙ্গেন - সকাম কর্ম্মের আসক্তির দ্বারা , দেহনাম - জীব বা দেহধারীকে ।

বঙ্গানুবাদ : হে কৌন্তেয় (অর্জ্জুন) রজোগুণ অনুরাগত্মক এবং তা তৃষ্ণা ও আসক্তি থেকে উৎপন্ন হয়। এবং সেই রজোগুণই জীবকে সকাম কর্ম্মের আসক্তির দ্বারা আবদ্ধ করে।

বিস্তার : আমাদের শ্বসবায়ু যখন ইড়া (ডান-নাক) নাড়ীতে বহমান থাকে তখন আমাদের মধ্যে রজোগুণের প্রভাব বেশি থাকে। এই রজোগুণের স্বভাব হচ্ছে তৃষ্ণা ও আসক্তি অর্থাৎ কোনো কিছু পাবার ইচ্ছেকে উৎপন্ন করা ও তার তেজকে বাড়িয়ে তোলা। অর্থাৎ যে বস্তু আমার কাছে নেই, তাকে পাবার ইচ্ছে, আর যে বস্তু আমার কাছে আছে, তাকে ধরে রাখার অভিলাষ। এই রজোগুণের কারণেই জীবকুলের মধ্যে কর্ম্ম করবার উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। আর এই কর্ম্ম নিরাসক্ত নয়, এই কর্ম্ম আসলে কর্ম্মফলের প্রত্যাশী হয়ে সম্পাদিত হয়। আসক্তির দৃষ্টিতে কোনো বস্তুর দিকে দৃকপাত করলে, তাকে পাবার জন্য আকাংখ্যা বা লোভ হয়। ইড়া নাড়ীতে প্রাণের প্রবাহ চলতে থাকলে, বাহ্যিক বস্তুর প্রতি যেমন লোভ দেখা যায়, তেমনি অন্যের কল্যাণ ইচ্ছেও উৎপন্ন হতে পারে। আর আসক্তিপূর্ণ কর্ম্মসকল থেকে কর্ম্মফল ভোগ করতে হয়, তা সে স্বর্গভোগ হোক, বা নরকভোগ। আর ভোগের কারণেই বারবার শরীর ধারন করতে হয়। আবার এই শরীরে থাকা কালীন, যদি কেউ নিরাসক্ত হয়ে প্রাণক্রিয়ার দ্বারা প্রাণকে স্থির করতে পারেন, তখন কোনো বস্তুর প্রতি, এমনকি জ্ঞান অন্বেষণের প্রতিও তাঁর আর আকর্ষণ থাকে না। আর এই অনাসক্ত প্রাণক্রিয়া সাধককে এক অন্য জগতে নিয়ে যায়, যা জন্ম-মৃত্যু রহিত।

তমঃ-তু-অজ্ঞানজম বিদ্ধি মোহনং সর্ব্ব দেহিনাম
প্রমাদ-আলস্য-নিদ্রাভিঃ-তৎ-নিবধ্নাতি ভারত। (১৪/৮)

শব্দার্থ : তমঃ-তু-অজ্ঞানজম : তমঃগুণ কিন্তু অজ্ঞানজাত, বিদ্ধি- জানবে, মোহনং সর্ব্ব দেহিনাম - মোহনকারী সমস্ত জীবের, প্রমাদ-আলস্য-নিদ্রাভিঃ- প্রমাদ, আলস্য, নিদ্রা দ্বারা, তৎ-নিবধ্নাতি - তা আবদ্ধ করে, ভারত - হে ভারত অর্থাৎ অর্জ্জুন।

বঙ্গানুবাদ : হে ভারত, তমোগুণকে সমস্ত জীবের মোহনকারী বলে জানবে। সেই তমোগুণ প্রমাদ, আলস্য , ও নিদ্রার দ্বারা জীবকে আবদ্ধ করে।

বিস্তার : প্রমাদ অর্থে অসাবধানতা, আলস্য অর্থ উদ্দমহীনতা, নিদ্রা অর্থাৎ অবসাদগ্রস্থ ভাব। আমাদের শরীরে যখন শ্বাসবায়ু বাম নাক দিয়ে অর্থাৎ পিঙ্গলা দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন এই ভাবের অর্থাৎ আলসেমি, অসাবধানতা, ও নিদ্রাতুর অবস্থার উদয় হয়। এই অবস্থা আমাদের রজোগুণের প্রভাব থেকেও ভয়ানক। রজোগুণ প্রভাবে আমরা হয়তো অন্যের কল্যাণের জন্য উদ্দীপ্ত হতে পারি, কিন্তু এই তমঃগুণের প্রকোপে পড়লে, না আমরা নিজেরদের কল্যাণ করতে পারি, না অন্যের উপকারে আসতে পারি। অর্থাৎ স্থবির কিন্তু নিম্নমুখী ভাব। একেই মনের বৈকল্য বলা হয়। যদিও এই দুই অবস্থায় আমাদের অবিদ্যার আবরণশক্তি। তমঃগুণ জীবকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। এদের মধ্যে কিসে ভালো হবে, সে কাজে উৎসাহ দেখা যায় না, কিন্তু জড়বুদ্ধির প্রভাবে খারাপের দিকে উৎসাহ বেশি দেখা যায় ,এঁরা ধর্ম্ম আলোচনার আসরে হয়তো করতাল দিয়ে ঠুন -ঠুন আওয়াজ করে, অথবা বইয়ের পাতা উল্টাতে থাকে, নতুবা ঘুমিয়ে পড়ে। অর্থাৎ ভালো কথা এদের কানে ঢোকে না। ধ্যানে বসলে, এরা নাক ডাকতে থাকে। আশ্চর্য্যের কথা হচ্ছে, এরা মুখে বলবে, শুনছি তো - কিন্তু জিজ্ঞেস করলে, উত্তর দিতে পারবে না। এমনকি এরা সাধু সন্তদের অনেক সময় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে থাকে। আমার মাঝে মধ্যে মনে হয়, এরা অহংকারী কিন্তু নির্জীব প্রাণী - এদের পাপ-তাপ বোধই নেই। তমোগুণ সাধকের সবচেয়ে বড় শত্রু বলে জানবে। এরা না পারে, জাগতিক উন্নতি করতে, না পারে, আধ্যাত্মিক জগতের ধারে কাছে যেতে। এদেরকে কি ভগবান ভুল করে মানব শরীর দিয়েছেন ? এরা কালের সমুদ্রে ভেসে চলেছে। কোথায় যাচ্ছে, তা এরা নিজেরাই জানে না। এদের জীবনের কোনো লক্ষ্যই নেই।

যাইহোক, আমরা আগেই শুনেছি, আমাদের শ্বাস কখনো ইড়া নাড়ীতে কখনো পিঙ্গলা নাড়ীতে প্রবাহিত হয়। এই শ্বাসের গতি অনুসারেই মনের দৃষ্টিকোণ বদলে যায়। সাধকের সবসময় উচিত, এই শ্বাসের দিকে লক্ষ্য রাখা। যারা এই শ্বাসের দিকে লক্ষ্য রাখেন না, তারা নিজেদেরকে লক্ষ্যে স্থির রাখতে পারেন না, যখন যেমন তখন তেমন চলে থাকেন। কিন্তু সাধক সাধক যদি শ্বাসের দিকে লক্ষ রাখেন, এবং শ্বাসবায়ুকে নিজের ইচ্ছে মতো পরিবর্তন করে নিতে পারেন, তবে তারা মনকে নিজের ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করে নিতে পারেন। এই শ্বাসের কারণেই আমাদের মনের মধ্যে রাগ, দ্বেষ, ঘৃণা, ভয়ের উদ্রেগ হয়ে থাকে। তো আমরা যদি আমাদের ইচ্ছে মতো শ্বাসের পরিবর্তন করে নিতে পারি, অর্থাৎ আমরা যদি দুই নাক দিয়ে সমান ভাবে বায়ুকে প্রবাহিত করতে পারি, তবে আমরা আমাদের জীবন থেকে যেমন এইসব অহেতুক ক্লেশের দূরীকরণ করতে পারি, তেমনি আমরা আধ্যাত্মিক জগতের পথে অগ্রসর হতে পারি।

যাইহোক, শরীর ও মনের বিশ্রাম দরকার ঠিকই, কিন্তু অনাবশ্যক নিদ্রা, বা আলস্যে দিনযাপন করা জীবনের উদ্দেশ্য হয়। একজন সাধকের ৪ ঘন্টা নিদ্রা যথেষ্ট। আর বিশ্রামের কথা উঠলে বলতে হয়, ধ্যান আমাদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের কাজ করে দিতে পারে। আলাদা করে সময় নিয়ে বিশ্রামের কোনো প্রয়োজন নেই। দেখুন সংসার বন্ধন আমাদের উপরে কেউ চাপিয়ে দেয় না। আমরাই নিজের অজ্ঞাতসারে নিজেদেরকে বন্ধনে আবদ্ধ করি। তাই এখান থেকে বেরুতে গেলে, নিজেকে সজাগ করতে হবে। শ্বাসের দিকে খেয়াল রেখে, শরীরকে সাম্যাবস্থায় নিয়ে এসে আত্মস্থ হতে হবে। উপায় সহজ কিন্তু সদা সজাগ থাকতে হবে।

সত্ত্বং সুখে সঞ্জয়তি রজঃ কর্ম্মণি ভারত
জ্ঞানম-আবৃত্য তু তমঃ প্রমাদে সঞ্জয়ত্যুত। (১৪/০৯)

শব্দার্থ : সত্ত্বং সুখে সঞ্জয়তি - সত্ত্বগুণ সুখে আবদ্ধ করে, রজঃ কর্ম্মণি - রজঃ গুন্ স্ক্যাম কর্ম্মে, ভারত - হে ভারত, জ্ঞানম-আবৃত্য - জ্ঞান আবৃত করে, তু তমঃ প্রমাদে সঞ্জয়ত্যুত - কিন্তু তমঃগুণ প্রমাদে আবদ্ধ করে, বলা হয় ।

বঙ্গানুবাদ : হে ভারত, সত্ত্বগুণ জীবকে সুখে আবদ্ধ করে, রজোগুণ সকাম কর্ম্মে আবদ্ধ করে এবং তমোগুম প্রমাদে আবদ্ধ করে।

বিস্তার : আমাদের মহৎসঙ্গে যে জ্ঞানের উদয় হতে পারে, তা তমঃগুণ সম্পন্ন ব্যক্তির মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারে না। চোখ কান দিয়ে হয়তো সে তা শোনে, বা দেখে, কিন্তু অমনোযোগী হবার কারনে, সে সেই উপদেশের কথা যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। আর যতটুকুই বা সে শোনে বা বোঝে তা সে তার জীবনে কার্যকর করে পারে না, কারন সে অলস। কোনো ভালো কাজেই তার মধ্যে উৎসাহ দেখা যায় না। আবার রজোগুন সম্পন্ন মানুষ কাজে তো উৎসাহ দেখায়, কিন্তু সেই কাজই তার একসময় কাল হয়। কেননা এই কাজে তার শুদ্ধ বুদ্ধির অভাব থাকে। আর শুদ্ধ বা অশুদ্ধ বুদ্ধি নিয়ে যে কাজ সে করে, আখেরে তার সুফল বা কুফল তাকেই একদিন ভোগ করতে হয়। এমনকি এই কর্ম্মফল ভোগ করবার জন্যই জন্ম-জন্মান্তরে নতুন দেহে তাকে ফিরে আসতে হয়। কারন তার কর্ম্ম উদ্দীপনা আসে আসক্তি থেকে। অন্যদিকে সত্ত্বগুণ সম্পন্ন মানুষও যখন কর্ম্ম করে, তখনও তাঁকে কর্ম্মফলের ভাগিদার হতে হয়। কিন্তু তার কর্ম্ম যেহেতু শুদ্ধ বুদ্ধি সম্পন্ন হয়, তাই এতে করে তার মধ্যে একটা সুখানুভূতি আসে। এই সুখানুভূতিও তাকে ভোগের রাজ্যে নামিয়ে নিয়ে আসে। এই সুখানুভূতি আসলে আসক্তি জনিত কর্ম্মফল। এখন কথা হচ্ছে, তাই যদি হয়, অর্থাৎ কর্ম্ম তা সে সত্ত্ব-রজঃ-তমঃ যে গুনের দ্বারাই সম্পন্ন হোক না কেন, কর্ম্ম ফল থেকে রেহাই নেই, জন্ম মৃত্যু থেকেও রেহাই নেই, তাহলে আমাদের কর্তব্য কি ? আমরা কি শুধু নিষ্ক্রিয় হয়ে অলস জীবন যাপন করবো ?
দেখুন, কাজ তো করতেই হবে, তা যে ধরনের কাজই হোক না কেন। কিন্তু কাজ থেকে বীজের জন্ম হচ্ছে, সেই বীজকে সমূলে বিনাশ করতে হবে। অর্থাৎ কর্ম্ম থেকে সংস্কারের জন্ম হচ্ছে, সেই সংস্কার যা নতুন করে না হয়, সে চেষ্টা করতে হবে। আবার পুরোনো যে সংস্কার আমাদের মধ্যে জন্ম-জন্মান্তর থেকে সঞ্চিত হয়ে আছে, সেই সংস্কারগুলোকে সমূলে বিনাশ করতে হবে। এখন কথা হচ্ছে, এটা কিভাবে সম্ভব হতে পারে ? দেখুন, কাজ তো আমাদের শরীর করবেই, চোখ থাকলে সে দেখবে, কান থাকলে সে শুনবে, ত্বক থাকলে সে স্পর্শ অনুভব করবে, জিহ্বা আস্বাদন করবে, মুখ কথা বলবে। এখন কথা হচ্ছে, এগুলো কে করছে, সেটা একবার ভাবুন। আমরা ভাবি, আমরা কাজ করছি, আমাদের শরীর কাজ করছে। আমরা ভাবি আমাদের কর্ম্ম ইন্দ্রিয়গুলো কাজ করছে। কিন্তু এটাও আমরা জানি, আমাদের সমস্ত ইন্দ্রিয়কে পরিচালনা করছে, ইন্দ্রিয়ের অধিপতি মন। তো কাজ আমাদের ইন্দ্রিয়ের নয়, কাজ হচ্ছে আমাদের মনের। এবার আরো একটি গভীরে ভাবুন, এই মনকে পরিচালনা করছে কে ? মনের শক্তি হচ্ছে আমাদের প্রাণ। প্রাণ যদি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, তবে মন নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। আবার এই মনকে পরিচালনা করছে, আমাদের বুদ্ধি। এই বুদ্ধিকে পরিচালনা করছে কে ? আমাদের চিত্ত। এই চিত্ত (যেখানে আমাদের সংস্কার বাসা বেঁধে আছে) পরিচালনা করছে কে, না সেই অবিনাশী আত্মা। তো এই যে কাজ আমরা করছি, বলে ভাবছি, সেটি কিন্তু করছে আসলে আত্মা (জীবাত্মা)। তো কোনো কাজই আমার নয়, আমি করছিও না। এই কথাটাকে ভালোভাবে হৃদয়ের মধ্যে বসিয়ে নিন। তো কাজ যদি আমার না হয়, তবে কাজের পারিতোষও আমার পাওনা নয়।
আরো একটু গভীরে প্রবেশ করি। মন বড্ড চঞ্চল। আবার এই মনকে চঞ্চল করছে, আমাদের প্রাণ। তো এবার মনকে যদি আপনি প্রাণ-সাধন-ক্রিয়ার সাহায্যে আত্মাতে নিবিষ্ট করতে পারেন, তবে মন যে বুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিলো, সেই মনের সঙ্গে বুদ্ধিও স্থির হয়ে যাবে।কেননা,প্রাণ না থাকলে মন থাকে না, আবার মন না চাইলে, বুদ্ধি কোনো কাজই করে না। অর্থাৎ প্রাণ হচ্ছে, রাজা। তাই আমাদেরকে প্রাণের সহযোগিতা নিতেই হবে। এখন কথা হচ্ছে, প্রাণ আমাদের কিভাবে সাহায্য করবে ? আমরা জানি প্রাণ আমাদের শ্বাসবায়ুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে, যদিও প্রাণ শুধু শ্বাসবায়ু নয়, প্রাণ জড়িয়ে আছে আমাদের অপতত্ত্বের সাথে, আছে তেজ তত্ত্বের সাথে। আমাদের শ্বাসও ইড়া-পিঙ্গলা- সুষুম্না নাড়ীর মধ্যে ক্রিয়া করে থাকে। ইড়া হচ্ছে তমঃগুণের , পিঙ্গলা হচ্ছে রজোগুণের, আর সুষুম্না হচ্ছে সত্ত্বগুণের উদ্রেগকারী। আমাদের শরীরে যখন যে নাড়ী সক্রিয় থাকে, তখন সেই মতো আমরা গুনের অধিকারী হই। তো প্রথমে আমরা প্রাণবায়ুকে এই ইড়া বা পিঙ্গলা থেকে সরিয়ে প্রাণ বায়ুকে সুষুম্না নাড়ীতে প্রবেশ করতে বাধ্য করবো। আর এই সুষুম্না যেহেতু সত্ত্ব গুনের উদ্রেগকারী, তাই তখন আমাদের মধ্যে সত্ত্বগুণের আধিক্য দেখা দেবে। যদিও এখানেই শেষ নয়, প্রাণবায়ুকে এই সুষুম্না পথ দিয়ে উর্দ্ধগামী করে, আজ্ঞাচক্রে স্থিত করতে হবে। এই আজ্ঞাচক্র হচ্ছে প্রকৃতির সাম্যাবস্থা, এখানে প্রকৃতি স্থির, কিন্তু সমস্ত গুন্ এখন সমান অবস্থায় বিরাজ করছে ।আমরা আজ্ঞাচক্রে স্থিত হতে পারলে আমাদের মধ্যে তখন ত্রিগুণেরও সাম্যাবস্থা দেখা দেবে। এর পরে আমরা যখন এই আজ্ঞাচক্র থেকে প্রান -মনকে সহস্রারে নিয়ে যেতে সক্ষম হবো,তখন আমরা প্রকৃতির ত্রিগুণের উর্দ্ধে নিজেকে স্থাপন করতে পারবো। তখন কর্ম্ম আমাদের আর প্রভাবিত করতে পারবে না। এমনকি আমরা যখন সাম্যের অবস্থায় অর্থাৎ আমরা যদি আজ্ঞাচক্রে অবস্থান করতে পারি, তাহলেও আমরা এক নির্ম্মল আনন্দের সন্ধান পাবো। এসব ক্রিয়াই গুরুসান্নিধ্যে সম্ভব হবে। তাই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণে আমাদের মতি হওয়া চাই।শ্রদ্ধা, ভক্তি, একাগ্রতা নিয়ে আমাদের শ্রীকৃষ্ণ উক্ত সাধনক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে। তা না হলে, কেবল মধুর কথায় চিড়ে ভিজবে না।
রজস্তমঃ-চ-অভিভূয় সত্ত্বং ভবতি ভারত
রজঃ সত্ত্বং তমশ্চৈব তমঃ সত্ত্বং রজস্তথা। (১৪/১০)
শব্দার্থ : রজস্তমঃ-চ-অভিভূয় - রজোগুণ তমোগুণকে পরাভূত করে, সত্ত্বং ভবতি - সত্ত্বগুণ প্রবল হয়, ভারত - হে ভারত, রজঃ সত্ত্বং তমশ্চৈব - রজঃ-সত্ত্ব-তম এভাবেই তমঃ সত্ত্বং রজস্তথা - তমোগুণ, সত্ত্বগুণ রজোগুণকে সেভাবেই ।

বঙ্গানুবাদ : হে ভারত, রজোগুণ তমোগুণকে পরাভূত করে সত্ত্বগুণ প্রবল হয়, আবার সত্ত্বগুণ ও তমোগুণকে পরাভূত করে রজোগুণ প্রবল হয়, এবং একইভাবে সত্ত্বগুন্ ও রজোগুনকে পরাভূত করে তমোগুণ প্রবল হয়।

বিস্তার : ত্রিগুনাত্বিকা প্রকৃতি। এই প্রকৃতিই আমাদের জড় শরীর। তো শরীরের মধ্যে তিনটি গুনের সমাহার। এই তিন গুনের মধ্যে কখন যে কোন গুন্ মাথাচাড়া দেয় আর কেনওই বা মাথা চাড়া দেয়, তা আমাদের মতো সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারি না। কিন্তু যাঁরা যোগশাস্ত্র সম্পর্কে অবহিত আছেন, তাঁরা এই ক্ষণগুলোকে ধরতে পারেন। আমরা আগেই শুনেছি, বাম নাকে শ্বাস প্রবাহকালে আমাদের তমঃ গুনের আধিক্য থাকে। ডান নাকে শ্বাস প্রবাহকালে আমাদের রজোগুণের প্রভাব থাকে আর যখন শ্বাস বায়ু আমাদের দুই নাক দিয়েই প্রবাহিত হয়, তখন আমাদের মধ্যে সত্ত্বগুণের প্রভাব পড়ে। সাধারণ মানুষের এই সত্ত্বগুণের প্রভাব কাল স্বল্প। যোগসাধক সাধনক্রিয়ার সাহায্যে এই সময়কে ধরে সাধনক্রিয়ার মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত করেন। অভিজ্ঞ যোগী সারাক্ষন এই সত্ত্বগুণের মধ্যে অর্থাৎ দুই নাক দিয়ে শ্বাস প্রবাহিত করবার কৌশল আয়ত্ত্ব করেছেন।

প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যেই এই তিন গুন্ বর্ত্তমান। আমরা যেমন আমাদের মনকে নিজেদের ইচ্ছেমতো পরিচালনা করতে পারি না। মন আমাদের অজ্ঞাতসারেই বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে ঘুরে বেড়ায়, তেমনি আমাদের মধ্যে সুপ্ত এই ত্রিগুণকে আমাদের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতে পারি না। আমরা মনে করি, এইসব গুন্ আমাদের স্বভাবজাত। অর্থাৎ একজন ভালো মানুষকে যেমন মনে করি এটা তার স্বভাব, তেমনি একটা খারাপ মানুষকে আমরা মনে করি, এটি তার স্বভাব। কিন্তু সত্য হচ্ছে, কোনো মানুষই নির্ভেজাল ভালো বা নির্ভেজাল খারাপ হতে পারে না। আবার সমস্ত মানুষের মধ্যেই আছে সেই ভাগবত সত্তা। এই ভাগবত সত্তাকে জাগ্রত করা, মানুষকে ভগবৎ স্বরূপে প্রতিষ্টিত করা যোগের উদ্দেশ্য। এই দেহই কুরুক্ষেত্র, এই দেহই ধর্ম্মক্ষেত্র। এখানেই সুর-অসুরের যুদ্ধক্ষেত্র। আমাদের দেহযন্ত্র, দেহস্থ গ্রন্থিসকল দোষযুক্ত হবার ফলে আমারদের মধ্যে কুচিন্তা আসছে, কুকৰ্ম্ম করছি। যোগাদির দ্বারা এই দেহ যন্ত্রকে শোধন করে আমরা পশুমানব থেকে মহামানবে রূপায়িত হতে পারি।

শ্বাসের-উপর আধিপত্য বিস্তার করে, ইড়া-পিঙ্গলার উপরে প্রাধান্য স্থাপন করে শ্বাসবায়ুকে ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করে, আমরা যেমন চিরদিন সুস্থ-সবল দেহের অধিকারী হতে পারি, তেমনি সুষুম্নার উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে আমরা আমাদের মনকে একাগ্র করে সাধনার উচ্চ ভূমিতে আরোহন করতে পারি। পার্থিব চঞ্চল মন তখন স্থির দেবমনে রূপান্তরিত হবে।

এই যে সূক্ষ্ম পঞ্চ মহাভূত যা পরিণতি প্রাপ্ত হয়ে স্থুল পাঞ্চভৌতিক জগৎ অর্থাৎ লক্ষকোটি নীহারিকা ছায়াপথ, লক্ষকোটি সৌরজগৎ প্রকাশিত হয়েছে, এই সৃষ্টির প্রত্যেকটি অনু-পরমাণু সংগঠেনের, স্পন্দনের মুলে এই ত্রিশক্তির (সত্ত্বঃ রজঃ তমঃ) খেলা ছাড়া আর কিছু নয়। যিনি তমোগুণকে প্রভূত করতে পেরেছেন, তিনি রজঃগুনকে বাড়িয়ে নিয়েছেন, আবার যিনি তমঃ ও রজঃগুনকে উপেক্ষা করতে পেরেছেন, তিনি সত্ত্বগুনকে বাড়িয়ে নিতে পারেন। আবার এই তিন গুনকেই যিনি উপেক্ষা করতে পারেন, তিনি প্রকৃতির নিয়মের উর্দ্ধে ভাগবত স্বরূপে অবস্থান করতে পারেন।

কিন্তু কথা হচ্ছে, গুনগুলোর নিজস্ব কোনো ইচ্ছেশক্তি আছে কি, যাতে স্বেচ্ছামতো দেহীকে আক্রমণ করে ? ব্যাপরটা এমন নয়, আসলে আমাদের মধ্যে পূর্ব পূর্ব জন্মের সংস্কার জমে আছে। এই সংস্কারের দ্বারা আমাদের বুদ্ধি আক্রান্ত হয়, আর বুদ্ধি বা বিচারশক্তি মনকে প্রভাবিত করে। আর মন তখন ইন্দ্রিয়দ্বারা তদ্রুপ কর্ম্ম সম্পাদন করে থাকে। তো আমাদের মধ্যে যে সংস্কার সঞ্চিত আছে, সেই সংস্কারের কারণেই আমরা সৎ-অসৎ কর্ম্মে লিপ্ত হই। এজন্য যোগীপুরুষগন ধ্যানের মাধ্যমে এই সংস্কারগুলোকে ধরতে চেষ্টা করেন, আর পুরোনো সংস্কারকে চাপা দেবার জন্য নতুন সংস্কারের জন্ম দিয়ে থাকেন। আর নিরন্তর সৎ কর্ম্মের অভ্যাস দ্বারা শুভ সংস্কারের জন্ম হতে পারে। এর ফলে আমাদের পুরুনো সংস্কার ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায়। এই সংস্কারকে কেউ বলেন, পূর্ব্বকর্ম্ম কেউ বলেন অদৃষ্ট। বহুদিনের সাধকের মধ্যেও অনেক সময় পূর্ব সংস্কারের ফলে অধঃপতন ঘটে থাকে। এইজন্য সাধন অভ্যাসের বিরতি করতে নেই। তো আমাদের আলস্য কাটিয়ে, অর্থাৎ তমঃগুণের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে, প্রথমে রজঃগুনের সান্নিধ্যে আসতে হবে, অর্থাৎ সাধনকর্ম্মে প্রবৃত্ত হতে হবে। আর এই সাধন কর্ম্ম করতে হবে আমাদের নিরাসক্ত ভাবে। সাধনক্রিয়া হবে, গুরুদেবের ইচ্ছেয় - আমার ইচ্ছেয় নয়। তবেই আমাদের সাধন কর্ম্ম হবে নিরাসক্ত। ঈশ্বরের ঐশ্বর্য্য পাবার জন্য নয়। শ্রীগুরু আদেশ পালনই আমাদের সাধনা। তবেই আমরা সত্ত্বগুণের সান্নিধ্যে আসতে পারবো। এইভাবে নিরন্তর অভ্যাস দ্বারা , যেমন যেমন কার্য্যে প্রবৃত্ত হবো, সেইমতো আমরা গুনের অধিকারী হতে পারবো। সবশেষে আমাদের সমস্ত গুনের উর্দ্ধে যেতে হবে, আর সেটা হতে পারে গুরুসান্নিধ্যে, নিরন্তর ব্রহ্মচিন্তন থেকে।

সর্বদ্বারেষু দেহে অস্মিন প্রকাশ উপজায়তে
জ্ঞানং যদা তদা বিদ্যাদ বিবৃদ্ধং সত্যম-ইতি-উত। (১৪/১১)

শব্দার্থ : সর্বদ্বারেষু - সব কয়টি দ্বারে, দেহে অস্মিন - এই দেহে, প্রকাশ উপজায়তে - প্রকাশ উৎপন্ন হয়, জ্ঞানং যদা - যখন জ্ঞান, তদা বিদ্যাদ - তখন জানবে, বিবৃদ্ধং- বর্দ্ধিত হয়েছে, সত্যম- সত্ত্বগুণ, ইতি-উত - এই ভাবে বলা হয়।

বঙ্গানুবাদ - যখন এই দেহের সমস্ত দ্বারে জ্ঞানের প্রকাশ হয়, তখন সত্ত্বগুণ বর্দ্ধিত হয়েছে জানবে।

বিস্তার : স্বরূপের জ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞান। দেহের সমস্ত দ্বার বলতে বোঝায় নবদ্বার অর্থাৎ চক্ষু (২) কর্ন (২) নাসারন্ধ্র - ২ মুখ-গহ্বর , উপস্থ, ও পায়ুদ্বার। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, প্রতিটি দ্বারেই সত্ত্বগুণের প্রকাশ ঘটে থাকে।

"কেন" উপনিষদে একটা সুন্দর শান্তিমন্ত্র আছে।

"ওঁ আপ্য়ায়ন্তু মম অঙ্গানি বাক প্রানচক্ষুঃশ্রোত্রমথো
বলম-ইন্দ্রিয়াণি চ সর্বাণি। সর্বং ব্রহ্মৌপনিষদম। মাঽহং
ব্রহ্ম নিরাকুর্য্যাং, মা মা ব্রহ্ম নিরাকরোৎ ;
অনিরাকরণমস্তু, অনিরাকরণং মেঽস্তু। তদাত্মনি নিরতে
য উপনিষৎসু ধর্মান্তে ময়ি সন্তু, তে ময়ি সন্তু।"
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।

আমরা শুনেছি, শ্রীমদ্ভগবৎ হচ্ছে সমস্ত উপনিষদের সার। উল্লেখিত "কেন" উপনিষদের মঙ্গলাচরনে প্রার্থনা করা হচ্ছে, আমার সমস্ত অঙ্গ যেন পুষ্ট হয়। তার সঙ্গে আমার প্রাণবায়ু, বাকশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি এবং সব ইন্দ্রিয়গুলোও যেন শক্তিশালী হয়। ব্রহ্মের কথাই সব উপনিষদ বলে। আমি যেন কখনও ব্রহ্মের কথা শুনতে উদাসীন না হই। ব্রহ্মও যেন আমাকে কখনো সরিয়ে না দেন। আমি তার কাছ যেন থেকে সরে না আসি। তিনিও যেন আমাকে তাঁর কাছ থেকে সরিয়ে না দেন। আমি বিশেষ করে এই চাই যে, আমি যেন সরে না আসি। আমি আমার স্বরূপ সন্মন্ধে পড়াশুনা করছি। কি গুন্ থাকলে স্বরুপ-জ্ঞান হয়, তা উপনিষদ বলে দিয়েছেন, আমি যেন সেই গুণগুলো আয়ত্ত করতে পারি।

দেখুন, উপনিষদ যথার্থ ভাবে বুঝতে গেলে, আমাদের শক্তি চাই। কেননা উপনিষদ-এর বিষয় হচ্ছে, ব্রহ্মতত্ত্ব যা অমোঘ সত্য, তাই নিয়ে বলে থাকে। আমি সেই চির-সত্যকে জানতে চাই। দুর্ব্বল চিত্তে কখনো উপনিষদের সত্য ধরা পড়ে না। যারা দেহে-মনে এবং চরিত্রের শক্তিতে শক্তিমান, তারাই পারে উপনিষদের সূক্ষ্ম দুর্বোধ্য বিষয়কে বোধগম্য করে তুলতে। দুর্বলের পক্ষে ব্রহ্মকে বোঝা শুধু, দুঃসাধ্য নয় অসম্ভব। আর নিজেকে দুর্ব্বল থেকে সবল করতে গেলে চাই নিরন্তর যোগাভ্যাস।

যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই শ্লোকে সাধকের মধ্যে যখন সত্ত্ব গুন্ বৃদ্ধি হয় তার লক্ষণ সম্পর্কে বলেছেন। বলছেন, সত্ত্বগুণ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হলে, সমস্ত ইন্দ্রিয়দ্বারে একটা সাত্ত্বিক ভাবের প্রকাশ ঘটবে। সাত্ত্বিক পুরুষের আচরণে কথাবার্ত্তায় সাত্ত্বিক ভাবের প্রকাশ ঘটে থাকে। আসলে পুরুষের মধ্যে যখন শুদ্ধ জ্ঞানপ্রবাহ চলতে থাকে, তখন তার স্বভাবের পরিবর্তন ঘটে থাকে। তখন তার মুখ দিয়ে যেন কথা বের হতে চায় না। যদি তিনি কিছু বলেন, তবে তা হবে মনের কথা। অর্থাৎ তাঁর মনের কথা আর মুখের কথার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। শুধু তাই নয়, সত্ত্বগুনের অধিকারীর কাছে, তাঁর মনের আয়নায় ভবিষ্যৎ প্রতিফলিত হয়। সত্ত্বগুণের বৃদ্ধি হলে, কান এমন সব শব্দ শুনতে পায়, যা শুনলে, মনের বহির্মুখী ভাব বিনষ্ট হয়ে যায়। মুরলির সুর তাকে মূর্ছিত করে রাখে। সাধকের তখন অন্তর্দৃষ্টি খুলে যায়, আর অপূর্ব্ব সব দর্শন করতে থাকেন, যা থেকে তার কাছে বাহ্যিক দৃশ্য মলিন হয়ে যায়। নাসিকাগ্রে একটা সুগন্ধ ঘোরাফেরা করে। জিহ্বায়মুলে মধুর রসের সঞ্চার ঘটে। এমনিতর সমস্ত ইন্দ্রিয়দ্বারে এক অভূতপূর্ব দিব্যভাবের সমাহার ঘটে থাকে। মন বিক্ষেপশূন্য হয়ে চিদাকাশে স্থিতি লাভ করে। তখন বাইরের শব্দ, দৃশ্য, তাকে প্রভাবিত করতে পারে না। বাইরের কোনো কিছুই তাকে সুখ বা দুঃখের অনুভূতি এনে দিতে পারে না। তখন কে কি বললো, কে কি ভাবলো, কে নিলো, আর কে দিলো, তাতে তাঁর কিছুই আসে যায় না। আসলে সাধকের তখন সুষুম্নায় প্রাণবায়ু প্রবাহিত হচ্ছে। ইড়া-পিঙ্গলায় প্রাণবায়ু প্রবাহকালে যে সংসার জ্ঞান ছিল, সেই অজ্ঞানের, অবিদ্যার, ভ্রমজ্ঞানের লোপ সাধন হয়েছে, এখন তিনি প্রকৃত জ্ঞানের উচ্চ অবস্থায় অবস্থান করছেন। আসলে এসবই সাধনার পরাবস্থার লক্ষণ।

যে যত দৃঢ়সংকল্প হয়ে সাধনক্রিয়া করবে, তার মধ্যে ততই সত্ত্বগুণের বৃদ্ধি পাবে। কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা গৃহে বাস করলেও বুঝে গেছেন, যে আত্ম-উপল্বদ্ধিই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। পারিবারিক, সামাজিক দায়িত্ব পালনের পর তারা বৃদ্ধ হয়েছেন। এখন তারা সংসার থেকে অবসর নিয়ে বাণপ্রস্থ অবলম্বন করেছেন। আমাদের সামনে আজ যে উপনিষদ্গুলো আধ্যাত্মিক উপল্বদ্ধির কথা শোনাচ্ছেন, তার অধিকাংশই এইসব বানপ্রস্থীদের দ্বারা রচিত। আমরা অধিকাংশ মানুষই জানিনা কখন সংসার ত্যাগ করতে হয়, বা কখন অবসর নিতে হয়। আর এই কারনেই আমরা বৃদ্ধ বয়সে এসে সবাই না হলেও, অনেকেই নানান রকম দুঃখের মধ্যে দিনযাপন করতে বাধ্য হই। জীবনে একটা সময় আসে যখন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, "আর নয় সংসার এবার অবসর"। .তার মানে এই নয়, যে জীবন থেকে পালিয়ে যেতে হবে। অবসর জীবন আরো বেশি কঠিন, আরো বেশি সংগ্রামের। কেননা এখন পার্থিব বস্তুর সঞ্চয় নয়, এখন অপার্থিব বস্তুর সঞ্চয় করতে হবে। তবে মনের মধ্যে পার্থিব কোনো অভাব-বোধ রাখতে নেই। এই সময় আপন অন্তরের সম্পদ আবিষ্কার করতে হবে। ইন্দ্রিয়গুলো এইসময় অধিকাংশই ধীরে ধীরে শক্তিহীন হয়ে আসে। আলাদা করে ইন্দ্রিয় সংযমের জন্য কোনো প্রয়াস করতে হয় না। সারা জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোও এই সময় কাজে লাগে। এই সময় স্বল্পশক্তিধর ইন্দ্রিয়গুলোকে বাইরের দিক থেকে ঘুরিয়ে সহজেই অন্তর্মুখী করা সম্ভব হয়। বর্তমানে আমরা যে জগৎ সম্পর্কে সচেতন নই, সেই জগতের সন্ধান করতে হবে। যদিও সেই অন্তর্জগৎ বাইরের জগতের চাইতেও অধিক সত্য। ধ্যানের দ্বারা এই জগতের বিভিন্ন দিক তাঁরা আবিষ্কার করতে পারেন। আর এই ধ্যান-ধারণা - নিজের মধ্যে একটা নতুন প্রেরণা শক্তির জন্ম দেয় । আরাম হয়তো থাকে না, কিন্তু আনন্দ থাকে। কারন আত্মাই আনন্দের উৎস। আর এই আত্মা রয়েছে আমাদের সকলের অন্তরে। গৃহীগণ আনন্দকে বাইরে খোঁজে, আর বানপ্রস্থীরা আনন্দকে অন্তরে খোঁজে। মৃত্যুর পরে কি হবে, তা আমরা কেউ জানি না, উত্তরায়ণ মার্গে যাবো না দক্ষিণায়ন মার্গে যাবো, তা হয়তো জানি না, কিন্তু অন্তর যখন আত্মার আলোকে আলোকিত হয়, তখন মৃত্যুর পরেও সেই আলোই পথপ্রদর্শক হয়ে যায়। তখন আর মৃত্যুভয় থাকে না। এরা মৃত্যুর পর মোক্ষের পথের কাছাকাছি অবশ্যই পৌঁছে যাবেন। সাধনায় যত একাগ্রতা বাড়বে, ততই ব্রহ্মলোকের পথ সুগম হবে। পরাগতি প্রাপ্ত হয়ে মোক্ষলাভ হবে। জন্ম মৃত্যুর চক্র থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে যাবেন। ভগবানের মুখ নিঃসৃত বাণী শুনতে শুনতে একসময় তাঁরই সান্নিধ্যে এসে তারই সাথে একাত্ম হয়ে যাবেন।


লোভঃ প্রবৃত্তিরারম্ভঃ কর্ম্মণাম-অশমঃ স্পৃহা
রজস্যেতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে ভরতর্ষভ। (১৪/১২)

শব্দার্থ : লোভঃ - পরের দ্রব্য গ্রহণের ইচ্ছে, প্রবৃত্তিঃ- প্রবৃত্তি আরম্ভঃ- উদ্যম, কর্ম্মণাম - কর্ম্মসমূহে, অশমঃ - দুর্দমনীয়, স্পৃহা - বাসনা, রজস্যেতানি - রজোগুণ এইসমস্ত, জায়ন্তে -উৎপন্ন হয়, বিবৃদ্ধে - বর্দ্ধিত হলে, ভরতর্ষভ- হে ভরত বংশ শ্রেষ্ঠ অর্থাৎ অর্জ্জুন।

বঙ্গানুবাদ : হে ভরতশ্রেষ্ঠ অর্জ্জুন, রজোগুণ বর্দ্ধিত হলে, পরের দ্রব্য গ্রহণের ইচ্ছে, সারাক্ষন কাজে লেগে থাকা, কর্ম্মে উদ্যম ও দুর্দমনীয় বাসনার বৃদ্ধি হয়।

বিস্তার : এর আগের শ্লোকে (১৪/১১) আমরা শুনেছি, সত্ত্বগুণের বৃদ্ধি হলে সাধকের মধ্যে কি পরিবর্তন হয়। এবার বলছেন, রজোগুণের বৃদ্ধির ফলে সাধকের মধ্যে কি চিহ্ন ফুটে ওঠে। প্রথমত হচ্ছে, লোভ : কোথাও বা কারুর কাছে, কোনো দ্রব্য দেখলে, বা কোনো বিষয় দেখলে, তাকে পাবার জন্য আসক্তি পূর্ব্বক সেই বস্তুকে পাবার জন্য আকাংখ্যার জন্ম হয়। কোটি টাকার মালিক হয়েও আরো ধনের আশা তাকে ছাড়ে না। যা কিছু সে দেখে, যাকিছু তার মনে ধরে, তাকে সে নিজের করে পেতে চায়। এমনকি এদের খাবার লোভও বেশি হয়ে থাকে। দ্বিতীয়ত হচ্ছে প্রবৃত্তি : প্রবৃত্তি কথাটার অর্থ হচ্ছে ইচ্ছে, সারাক্ষন সে কিছু না কিছু পাবার জন্য ব্যস্ত থাকে। এই যে সারাক্ষন কিছু পাবার কাজে ব্যস্ত থাকা এর মুখ্য কারন হচ্ছে জাগতিক বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ। তৃতীয়তঃ কর্ম্মারম্ভ - এরা একটা পর একটা পরিকল্পনা করে থাকে। এরা খুবই উদ্যোগী পুরুষ হয়। আসলে স্বাধিকার বিস্তার এদের লক্ষ্য। চতুর্থতঃ - অশম - এদের মনে কখনও শান্তি নেই। এরা একটার পর একটি সংকল্প পূরণের জন্য ব্যস্ত। এরা কখনো হারতে চায় না, ফলত দিনের পর দিন লেগে থেকে নিজের ইচ্ছে পূরণ করতে চায়। পঞ্চমত : স্পৃহা অর্থাৎ বাসনা - এদের বাসনার শেষ হয় না। একটার পর একটা এদের চাই। তা সে ধনাদি হতে পারে, দ্রব্যাদি হতে পারে, এমনকি স্ত্রী-পুত্র হতে পারে। এরা চায়, জগতের সবকিছু আমার হোক।

যোগাচার্য্যগণ বলে থাকেন, এদের ইড়া নাড়ীতে শ্বাস প্রবাহ হওয়ার ফলেই এই ভাব হয়ে থাকে। যোগক্রিয়া দ্বারা যেমন এই অবস্থা থেকে পরিত্রান পাওয়া যায়, তেমনি এরা যদি একটু ভাবে, যে যা কিছু ভগবান দিয়েছেন, তা আমাদের জীবন নির্বাহের জন্য যথেষ্ট, আমার আর অতিরিক্ত কি প্রয়োজন ? এই প্রশ্ন যদি সে নিরন্তর নিজের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে পারে, তবে রজোগুণের বৃত্তিগুলোকে সে দমন করতে পারে।

অপ্রকাশঃ-অপ্রবৃত্তিঃ-চ প্রমাদো মোহ এব চ
তমস্যেতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে কুরুনন্দন। (১৪/১৩)

শব্দার্থ :অপ্রকাশঃ - অজ্ঞান অন্ধকার, অপ্রবৃত্তিঃ- নিষ্ক্রিয়তা, চ-এবং, প্রমাদো মোহ, এব চ - প্রমাদ ও অবশ্যই মোহ, তমস্যেতানি - এই সমস্ত তমঃগুণ, জায়ন্তে- উৎপন্ন হয়, বিবৃদ্ধে- বৃদ্ধি হলে, কুরুনন্দন- হে কুরুপুত্র অর্জ্জুন।

বঙ্গানুবাদ : হে কুরুনন্দন, জ্ঞানের অভাব, কর্ম্মে উদ্দমহীনতা, আলস্য, অসাবধানতা, কর্তব্যে বিস্মৃতি, মোহাচ্ছভাব, বুদ্ধির বিপর্যয়, ইত্যাদির প্রভাব তমগুণ বৃদ্ধি পেলে উৎপন্ন হয়ে থাকে।

জাগতিক বিষয়ে ও জাগতিক সম্পর্কে আসক্ত হয়ে যাওয়া, এই তমোগুণের কারণেই হয়ে থাকে। তমোগুণ বৃদ্ধি অর্থাৎ আমাদের শ্বাস পিঙ্গলা দিয়ে প্রবাহিত হওয়া। তখন কেবল সংসাররূপে মোহিত হবার সময়। তখন জ্ঞানের অপ্রকাশ অবস্থা। জ্ঞানের কথা মাথায় ঢোকে না। এরা হয় বিবেক বর্জ্জিত। এমনকি এদের মধ্যে সংসার কার্য্যেও অনীহা দেখা যায়। সংসারের কর্তব্য সম্পর্কে থাকে উদাসীন। শাস্ত্রবাক্য, আচার্য্যের উপদেশ, গুরুর নির্দেশ এরা শুনেও শোনে না। সেই অনুযায়ী কাজ করা তো দূরে থাকুক। সময়মতো কর্তব্যকর্ম্ম করতে এরা ভুলে যায়। এমনকি এদের মধ্যে বিপরীত বুদ্ধির প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়। অর্থাৎ যা করা উচিত নয়, তাই করে। তবে এরা যে সবসময় ভালো মন্দ বোঝে না তা নয়, অনেক সময় নেশা করার খারাপ দিক জেনেও নেশার দ্রব্য গ্রহণ করে থাকে। এদের জীবনে আলস্য নিদ্রা অকর্তব্য অধিক হয়ে থাকে। এই হচ্ছে তমঃগুণের বৃদ্ধির লক্ষণ। এদের মধ্যে অশুভ বৃত্তির বা কুপ্রবৃত্তির স্ফূরণ অধিক পরিমানে হয়ে থাকে। আসলে এরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম। মানুষের মধ্যে যে বুদ্ধিবৃত্তি আছে, তাকে যদি কাজে না লাগানো হয়, তবে আমাদের মধ্যে জ্ঞানের অনুপস্থিতি ঘটে। তমসাগ্রস্থ মানুষের মধ্যে এই বুদ্ধিবৃত্তির কোনো কার্যকরী ভূমিকা থাকে না। হয় সে কর্ম্ম থেকে বিরত থাকে, নতুবা উদ্দেশ্যবিহীন হয়ে খেয়ালখুশি মতো আচরণ করে থাকে। কর্ম্ম করবার ক্ষমতা আছে কিন্তু কোনো কর্ম্ম প্রচেষ্টা নেই। একেই বলে মোহগ্রস্থ অবস্থা। এদের জীবন নিষ্ক্রিয় হবার ফলে এদের মনুষ্য জীবন বৃথা, অন্য অর্থে এদের গতি অধোমুখী।

যদা সত্ত্বে প্রবৃদ্ধে তু প্রলয়ং যাতি দেহভৃৎ
তদোত্তমবিদ্যাং লোকানমলান প্রতিপদ্যতে। (১৪/১৪)

শব্দার্থ : যদা সত্ত্বে প্রবৃদ্ধে - যখন সত্ত্বগুণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়, তু প্রলয়ং যাতি দেহভুৎ - কিন্তু দেহভুত প্রলয়প্রাপ্ত হয়, তদা-উত্তমবিদ্যাং - তখন উত্তমবিদ্যাধর (মহর্ষি), লোকান-অমলান - অমলিন লোক, প্রতিপদ্যতে - লাভ করেন।

বঙ্গানুবাদ : যখন সত্ত্বগুণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত কালে দেহভূত মৃত্যুপ্রাপ্ত হয়, তখন তিনি উত্তমবিদগণের অর্থাৎ মহর্ষিগণের নির্ম্মল লোকসমূহ প্রাপ্ত হন ।
বিস্তার :পিঙ্গলা নাড়ীতে যখন প্রাণপ্রবাহ চলতে থাকে, তখন মানুষের চিত্ত পার্থিব বিষয়ে মোহযুক্ত হয়ে থাকে। আর এই সময় যদি জীবাত্মা দেহ ছেড়ে দেয়, তখন তার মধ্যে ভগবৎ চিন্তনের বিন্দু মাত্র থাকে না। সুতরাং তার চিন্তা তাকে নির্দিষ্ট চিন্তালোকে অর্থাৎ তার গতিও সেইরূপ হয়ে থাকে। কিন্তু যাদের সুষুম্নামার্গে প্রাণ-প্রবাহ চলাকালে জীবাত্মা দেহ থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়, তাঁরা ভগবৎ চিন্তার মধ্যেই অবস্থান করেন। অর্থাৎ মৃত্যুকালে যে যেমন চিন্তা করতে করতে দেহ থেকে বাইরে আসে, সে ঠিক তেমন লোকের বাসিন্দা হয়ে যায়। আমরা আগেই শুনেছি, সুষুম্নাতে প্রাণকে প্রবাহিত হলে মানুষের মধ্যে সত্ত্বগুণের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। তো সুষুম্নাতে প্রাণের স্থিতিকালে, অর্থাৎ সত্ত্বগুণের অধিষ্ঠান থাকাকালীন অবস্থায় যখন জীবাত্মা শরীর ত্যাগ করে, তখন উচ্চতর লোক প্রাপ্তি ঘটে থাকে। ব্রহ্মস্থান হচ্ছে অমল অর্থাৎ এখানে কোনো মলিনতা নেই। ইড়া-পিঙ্গলা-সুষুম্নার অতীত হচ্ছে গুনবর্জ্জিত স্থান। এই স্থানকে বলে ব্রহ্মপদ, অর্থাৎ সহস্রার। এখানে সাধকের স্থিতি হলে, তিনি ব্রহ্মস্বরূপ হয়ে যান। যারা সগুনের উপাসক অর্থাৎ ব্রহ্মা, বিষ্ণু বা শিবের উপাসক, তাঁরা মৃত্যুর পরে ব্রহ্মলোক, বিষ্ণুলোক, বা শিবলোকে অবস্থান করেন। আপনি লক্ষ করবেন, মানুষ সারাদিন, যা কিছু করে, তার প্রতিফলন ঘটে তার স্বপ্নের মধ্যে। যারা পূজা অর্চ্চনা করেন, তারা অনেকসময় স্বপের মধ্যেও সেই পুজো অর্চনা করে থাকেন। তো আমাদের চিন্তা বা কর্ম্ম যেমন আমাদের স্বপ্ন জগৎকে প্রভাবিত করে, তেমনি আমাদের চিন্তা আমাদের মৃত্যুর পরের জগৎকে লাভ করতে সাহায্য করে থাকে।

রজসি প্রলয়ং গত্বা কৰ্মসঙ্গিষু জায়তে
তথা প্রলীনস্তমসি মূঢ়যোনিষু জায়তে। (১৪/১৫)

শব্দার্থ : রজসি প্রলয়ং গত্বা - রজোগুণে মৃত্যু প্রাপ্ত হলে, কৰ্মসঙ্গিষু জায়তে - কর্ম্মাসক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে জন্ম হয়, তথা - তেমনই, প্রলীনঃ তমসি - তমোগুণে মৃত্যু হলে, মূঢ়যোনিষু জায়তে -অজ্ঞান অর্থাৎ পশুযোনিতে জন্ম হয় ।

বঙ্গানুবাদ : রজোগুনে মৃত্যু হলে কর্মাসক্ত মনুষ্যকূলে জন্ম হয়, তেমনি তমোগুণে মৃত্যু হলে পশুযোনিতে জন্ম হয়।
বিস্তার : কর্ম্মের প্রতি আসক্তিই রজোগুণের লক্ষণ। এই অবস্থায় মানুষ কর্ম্ম ফলের প্রত্যাশী হয়ে কর্ম্ম করে থাকে। তো রজোগুণের অধিকারীর যদি এই অবস্থায় দেহ ত্যাগ হয়, তখন তাদের কর্ম্ম করবার যে শরীর তা হয়তো থাকে না, কিন্তু যার দ্বারা কর্ম্ম সংগঠিত হচ্ছিলো, সেই সংস্কার সূক্ষ্ম মন-বুদ্ধি ও সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়সকল জীবাত্মাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে থাকে। দেহস্থিত বাসনার লোপ ঘটে না। তো জীব তখন সেই বাসনা বা সংকল্প পূরণের জন্য আবার নতুন দেহ ধারনের জন্য উদগ্রীব থাকে। সুতরাং এদের ক্ষেত্রে দেখা যায় আবার সংকল্প-জনিত কর্ম্মের উপযুক্ত মনুষ্য দেহেই তারা ফিরে আসে।

আর আমরা ও জানি, কর্ম্মফল একমাত্র মনুষ্য দেহেই সঞ্চিত হতে পারে। পশুদেহ বা দেবদেহ কেবলমাত্র ভোগ দেহ। দেবতাদের দেহ যেমন সুখ ভোগের নিমিত্ত, তেমনি পশু দেহ দুর্ভোগের জন্য। এদের কোনো কর্ম্মফল সঞ্চিত হয় না। অর্থাৎ একটা পশু যখন অন্য পশুকে হত্যা করে, তখন তাদের কোনো পাপ হয় না। ঠিক তেমনি দেবতারা যখন নিজের মধ্যে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তখনও তাদের কোনো পাপ হয় না। এরা কেবল পুণ্যফল ভোগের জন্য দেবদেহ প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। পুণ্যফল ভোগ শেষ হয়ে গেলে, তাদের আবার কর্ম্মদেহ ধারণ করতে হয়। একটা নিরীহ হরিণের যেমন কোনো পুন্য সঞ্চয় হয় না তেমনি একটা হিংস্র সিংহের কোনো পাপ সঞ্চয় হয় না।

তো রজোগুণের প্রভাবে যেমন মনুষ্যদেহ প্রাপ্ত হয়, তেমনি তমোগুণের প্রভাশালী, অর্থাৎ কাম,ক্রোধ,লোভ, মোহ যাদের অতিরিক্ত মাত্রায় থাকে, তাদের এই সব বৃত্তির চরিতার্থ করবার জন্য পশুদেহের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তা না হলে এই সব বৃত্তির চরিতার্থ হবে কিভাবে ? জীবিত অবস্থায়, রজোগুণের প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে ফালাকাঙ্খ্যা প্রবল থাকে। আর তমোগুণের আদিপাত্যহেতু মানুষ হয় গন্ডমুর্খ, বিপথগামী। ভগবান তো সবার মধ্যে বিরাজ করছেন, কিন্তু প্রকৃতির গুন্ প্রভাবে মানুষে মানুষে প্রভেদ দেখা যায়। এই বৈষম্য প্রকৃতির গুণবৈষম্যের কারণেই ঘটে থাকে। বাস্তবিক পক্ষে আত্মার মধ্যে কোনো শুদ্ধ-অশুদ্ধ বা গুনের তারতম্য বলে কিছু নেই। কিন্তু যখন সে দেহস্থিত হয়, অর্থাৎ প্রকৃতির আবরনে ঢাকা পরে, তখন তাকে নানান গুনের অধিকারী বলে মনে হয়। আর এই গুনের কারণেই প্রকৃতির গুন্ অনুযায়ী আধারের মধ্যে সে নিক্ষিপ্ত হয়। এই পরিনাম থেকে বেরুতে গেলে, আমাদের প্রাণক্রিয়ার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে হবে। ঈশ্বর প্রণিধান দ্বারাও আমরা কর্ম্মফল থেকে মুক্তি পেতে পারি। ঈশ্বরের প্রতি ভক্তিযুক্ত হয়ে একাগ্রচিত্তে উপাসনার মাধ্যমে অর্থাৎ ধ্যানাদি সহায়ে সম্যক শরণাগতি লাভ করতে পারলে, ঈশ্বর অনুগ্রহ করে থাকেন।

কর্ম্মণঃ সুকৃতস্য-আহু সাত্ত্বিকং নির্ম্মলং ফলম
রজস-অস্তু ফলং দুঃখম -অজ্ঞানম তমসঃ ফলম। (১৪/১৬)

শব্দার্থ : কর্ম্মনঃ - কর্ম্মের, সুকৃতস্য-আহু - সুকৃতি সম্পন্ন বলা হয়, সাত্ত্বিকং নির্ম্মলং ফলম - সাত্ত্বিক, নির্ম্মল ফলকে, রজস- রাজসিক, অস্তু-কিন্তু, ফলং- ফলকে দুঃখম - দুঃখ, অজ্ঞানম তমসঃ ফলম - অজ্ঞান তামসিক কর্ম্মের ফলকে ।

বঙ্গানুবাদ : সুকৃতি সম্পন্ন সাত্ত্বিক কর্ম্মের ফলকে নির্ম্মল, রাজসিক কর্ম্মফলকে দুঃখ, এবং তামসিক কর্ম্মের ফলকে অজ্ঞান বলা হয়।

যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবার গুনত্রয়ের আধিক্যহেতু কর্ম্মফল সম্পর্কে বলছেন। সত্ত্বপ্রধান কর্ম্ম সাধককে নির্মল অর্থাৎ প্রকাশবহুল নির্মল মনের অধিকারী করে। রাজসিক কর্ম্ম দুঃখ- পীড়িত মনের উদ্রেগ করে, আর তামসিক কর্ম্ম মূঢ় মনের অধিকারী করে।

সাত্ত্বিক কর্ম্ম অত্যন্ত নির্ম্মল বলে, মনের মলিনতা দূরকারী হয়ে থাকে। মলরহিত মনে কোনো আবরণ না থাকায়, মনের মধ্যে শুদ্ধ চিন্তার উদয় হয়। আসলে মনে অহঙ্কার-তত্ত্ব (আমি-আমার ভাব ) যে কাজের দ্বারা কেটে যায়, তাকেই বলে সাত্ত্বিক কর্ম্ম। যদিও ইন্দ্রিয়দ্বারে মনকে রেখে, সাত্ত্বিক কর্ম্ম করলেও তা নির্ম্মল ফল প্রদান করে না। রজো ও তমোগুনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অহঙ্কাররূপ অভিমানের প্রকাশ হয়। আবার এই অহঙ্কারের মধ্যে যে সাত্ত্বিক অংশ আছে, তা আমাদের ইন্দ্রিয় ও মনকে প্রবৃদ্ধ করে। শুধু ইন্দ্রিয়দ্বারা যে কর্ম্ম হয়, তার সঙ্গে অহংকারের কোনো সম্পর্ক নেই। চোখ দেখে, তা সে ভালো বা মন্দ যাই হোক না কেন। এই যে ভালো-মন্দের বিচারশক্তি তা ইন্দ্রিয়ের নেই। তাই সে নিষ্পাপ, ভালো মন্দের উর্দ্ধে । কিন্তু শুধু ইন্দ্রিয় তো কাজ করে না, ইন্দ্রিয়ের রাজা যে মন, তার নির্দেশেই সমস্ত কর্ম্ম সম্পাদন হয়ে থাকে। মন আবার বুদ্ধির দ্বারা বিষয়বিচার করে থাকে। তো আর মন প্রাণের চঞ্চলতা হেতু অবিরত স্থুল ও সূক্ষ্ম দেহের সাহায্যে কর্ম্ম করছে। তো মন ও প্রাণ যতক্ষন চঞ্চল থাকে, ততক্ষন সঙ্কল্পরহিত কর্ম্ম হতে পারে না। এইজন্য দরকার মন ও প্রাণকে স্থির করা। তো সাত্ত্বিক কর্ম্ম তাকেই বলে, যার দ্বারা এই মন-প্রাণ শান্ত হয়। অর্থাৎ সাত্ত্বিক কর্ম্ম বলতে সাধনক্রিয়াকেই বুঝতে হবে। তো প্রাণক্রিয়াই সাত্ত্বিক কর্ম্ম। দেখুন, আমাদের যে শ্বাস-ক্রিয়া চলছে, এর জন্য কোনো সংকল্প করতে হয় না। এর জন্য কোনো প্রয়াস করতে হয় না। কিন্তু এই শ্বাসক্রিয়াই জীবকে বেঁচে থাকতে অর্থাৎ দেহের মধ্যে আত্মাকে স্থিত হতে সাহায্য করছে। আত্মাকে দেহের সঙ্গে যুক্ত করছে, এই শ্বাসক্রিয়া। এই প্রাণক্রিয়াই আসলে সাধনক্রিয়া। আর সাধন ক্রিয়া করতে করতে মন শান্ত হয়ে আত্মাতে স্থিত হয়। যতক্ষন শ্বাস আমাদের ডান নাসিকা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, তখন আমাদের রজোগুণের প্রভাব থাকে, যখন শ্বাস বাম নাসিকা দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন আমরা তমোগুণের দ্বারা প্রভাবান্বিত হই। আবার এই শ্বাস যখন আমাদের সুষুম্নার মধ্যে প্রবেশ করে, তখন আমাদের শ্বাসের গতি ধীর হয়ে দুই নাক দিয়ে প্রবাহিত হয়। আর এইসময় যাকিছু আমরা করি না কেন, তা হয় ইচ্ছেরহিত সাত্ত্বিক কর্ম্ম। এই অবস্থাই মানুষকে ঈশ্বর-চিন্তনে নিয়োগ করে। রজোগুণের ফলে কর্ম্মাশয়ে কর্ম্মফলরূপ বীজের জন্ম হয়, তমোগুণের কারনে, আমাদের মধ্যে অজ্ঞানান্ধকার গাঢ় হয়। যা আমাদের দুঃখ প্রদান করে। আর সাত্ত্বিক কর্ম্ম আমাদের আত্মাতে স্থিত হতে সাহায্য করে।

সত্ত্বাৎ সঞ্জায়তে জ্ঞানং রজসো লোভ এব চ
প্রমাদমোহৌ তমসো ভবতঃ-অজ্ঞানম-এব চ। (১৪/১৭)

শব্দার্থ : সত্ত্বাৎ সঞ্জায়তে জ্ঞানং - সত্ত্ব গুন্ থেকে জ্ঞানের উৎপন্ন হয়, রজসো লোভ এব চ : রজোগুণ হতে লোভ এবং প্রমাদমোহৌ তমসো ভবতঃ-অজ্ঞানম-এব চ : তমোগুণ থেকে অজ্ঞান, প্রমাদ ও মোহ উৎপন্ন হয়ে থাকে।

বঙ্গানুবাদ : সত্ত্বগুণ থেকে জ্ঞান, রজোগুণ থেকে লোভ এবং তমোগুণ থেকে অজ্ঞান প্রমাদ ও মোহ উৎপন্ন হয়ে থাকে।

বিস্তার : সত্ত্বগুণ থেকে জ্ঞানের উদয় হবার ফলে, বিষয়ের জ্ঞানরূপে সুখের উদয় হয়। রজোগুণ থেকে লোভ, যা আসলে আমাদের দুঃখের কারন হয়ে থাকে। শুধু দুঃখ নয়, এই লোভ একসময় মানুষকে দিকবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে বিহিত কর্ম্মের বাইরে কর্ম্ম করতে বাধ্য করে। ফলত আখেরে দুঃখ, এবং জন্ম মৃত্যুর দুঃখ ভোগ করতে বাধ্য হয়। তমোগুণ প্রমাদ, মোহ ও অজ্ঞানের কারন।

আমরা এইসব কথা আগেই শুনেছি। সাধনক্রিয়া অর্থাৎ প্রাণক্রিয়া করতে করতে যখন প্রাণ সুষুম্নার মধ্যে প্রবাহিত হতে শুরু তখন তখন আমাদের সত্ত্বগুণের বৃদ্ধি হতে শুরু করে। এই যে সুষুম্নার মধ্যে প্রাণবায়ুর প্রবাহ, এটি যখন ধীরে ধীরে উর্দ্ধগামী হয়, তখন উর্দ্ধগামীতার সঙ্গে সঙ্গে গতি কমতে থাকে ধীরে ধীরে স্থির হতে থাকে। এই স্থিরতা বাড়তেই আমাদের মধ্যে সত্ত্বজ্ঞানের উদয় হয়, আর এই জ্ঞানই জানবেন ব্রহ্মজ্ঞান। আসলে ব্রহ্ম কোনো বস্তু নয়। ব্রহ্মজ্ঞান কোনো বস্তুজ্ঞান নয়। স্বরূপকে জানাই ব্রহ্মজ্ঞান। ইড়াতে থাকলে, বিষয়-তৃষ্ণা, এবং তদজনিত লোভ ইত্যাদি, আর পিঙ্গলাতে থাকলে মূঢ় ভাব, মোহাচ্ছন্ন ভাব, আর সুষুম্নায় থাকলে সাধনার উচ্চ অবস্থা ব্রহ্মপদ লাভ।

উর্দ্ধং গচ্ছন্তি সত্ত্বস্থা মধ্যে তিষ্ঠতি রাজসাঃ
জঘন্যগুনবৃত্তিস্থা অধো গচ্ছন্তি তামসাঃ। (১৪/১৮)

শব্দার্থ : উর্দ্ধং গচ্ছন্তি সত্ত্বস্থা - উর্দ্ধলোকে গমন করেন সত্ত্বপ্রধান ব্যাক্তিগন, মধ্যে তিষ্ঠতি রাজসাঃ - মধ্যলোকে অবস্থান করে রজোপ্রধান ব্যাক্তিগন, জঘন্যগুনবৃত্তিস্থা- নিকৃষ্ট গুণসম্পন্ন, অধো গচ্ছন্তি * অধোগতি প্রাপ্ত হন, তামসাঃ- তামস ব্যাক্তিগন ।
বঙ্গানুবাদ : সাত্ত্বিক প্রকৃতির ব্যক্তিগণ উর্দ্ধলোক অর্থাৎ স্বর্গলোকে গমন করেন, রাজসিক প্রকৃতির ব্যাক্তিগন মধ্যলোকে অর্থাৎ ভূর্লোকে অবস্থান করেন, এবং তামসিক প্রকৃতির ব্যাক্তিগন অধোমুখী অর্থাৎ পাতাললোক প্রাপ্ত হন।

বিস্তার : আমাদের মতো মূঢ় মানুষের ধারণা হচ্ছে, মানুষের স্থুল দেহ নাশের পরে, আমরা পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যাই। যথা থেকে আসে জীব তথা চলে যায়। স্থুল দেহ পঞ্চভূতে মিশে যাবে একথা সত্য হলেও, জীবাত্মা তার সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয় মন, ও সংষ্কারসমূহকে সঙ্গে নিয়ে বাষ্পের আকারে ঘুরতে থাকে।

দেখুন, এই জগতের সকল বস্তু প্রাণ থেকে এসেছে। এই প্রাণ হচ্ছে মায়াশক্তিযুক্ত ব্রহ্ম। এই প্রাণকে আশ্রয় করেই সমস্ত বস্তু সক্রিয়। যাঁরা এই ব্রহ্মকে জানেন, তাঁরা মৃত্যুকে জয় করতে পেরেছেন। মৃত্যুর পূর্বে কেউ যদি ব্রহ্মকে জানতে পারেন, তবে তিনি এই জীবনেই মোক্ষলাভ করতে পারেন । অন্যথায় তিনি এই পৃথিবীতে অথবা অন্যকোনো লোকে বারবার জন্ম গ্রহণ করে থাকেন। এখন কথা হচ্ছে ব্রহ্মকে জানলে কি হয় ? ব্রহ্মকে জানলে, নিজেকে ব্রহ্মরূপে দৃষ্ট হয়। সকল প্রাণী ও বস্তুর আত্মাকে তিনি নিজ আত্মা রূপে দর্শন করে থাকেন। অর্থাৎ তিনি সকলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান। এই একাত্ববোধই মনুষ্য জীবনের লক্ষ্ম। এইসব শুধু বুদ্ধি দিয়ে বোঝার নয়, এ তাঁর ব্যক্তিগত ও অপরোক্ষ অনুভূতি। আর এই অনুভব বা অভিজ্ঞতা যখন হয়, তখন সেই মানুষটাই পাল্টে যান। তিনি সমস্ত জাতি, ধর্ম্ম, দেশের ব্যবধান অতিক্রম করে এক বিশ্বজনীন ব্যক্তিত্ত্ব হিসেবে উর্দ্ধলোকে অবস্থান করেন। তিনিই স্বয়ং ব্রহ্ম হয়ে ওঠেন। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তদ্রুপ একজন যুগপুরুষ ছিলেন, যিনি স্বয়ং ব্রহ্ম।

শুদ্ধ মনে আত্মার দর্শন হয়। মন যত মলিন থাকে, আত্মা তত অস্পষ্ট - কখনও একেবারেই দৃষ্টির বাইরে চলে যান। কঠোপনিষদ শ্লোক নং ২/৫এ বলা হচ্ছে, পিতৃলোকে নিজ আত্মাকে স্বপ্ন-বস্তুর মতো অস্পষ্ট দেখা যায়। গন্ধর্ব লোকে জলে প্রতিবিম্বের মতো আত্মাকে ঝাপসা দেখা যায়, কিন্তু ব্রহ্মলোকে আত্মাকে আলো এবং ছায়ার মতো স্পষ্ট দেখা যায়। ছায়া এবং আলোর মধ্যে যেমন পার্থক্য স্পষ্ট, ব্রহ্মলোকে আত্মাকে তেমনি স্পষ্টভাবে দেখা যায়। দুর্লভ এই মনুষ্য জীবন। এই জীবনেই আত্মজ্ঞান লাভ সম্ভব। আমাদের উচিত এই মনুষ্যদেহের সদব্যবহার করা।

আমরা আগেই শুনেছি, প্রাণ নিজেকে পাঁচ ভাগে ভাগ করে, (প্রাণ, অপান, ব্যান, সমান ও উদান) পাঁচরকম কাজ করে থাকে। কিন্তু মুখ্যপ্রাণ শরীরের প্রধান কাজগুলো যথা শ্বাসক্রিয়া, শোনা, দেখা, ইত্যাদি নিজের দায়িত্ত্বে রাখেন। অর্থাৎ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক তার নিজের কাছেই রাখেন। অপান বায়ু আমদের শরীরের আবর্জনা বের করে দেওয়া, জনন ইন্দ্রিয়ের তত্ত্বাবধান ইত্যাদি এই অপান বায়ুর কাজ। জঠর অর্থাৎ পাকস্থলীতে রয়েছে সমান বায়ু। খাদ্য ও পানীয়কে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে দেওয়া, জঠরাগ্নিকে উদ্দীপ্ত করা সমান বায়ুর কাজ। এই অগ্নি আবার সাতটি শিখার দ্বারা নিজেকে প্রকাশ করেন। এই অগ্নির কারণেই আমরা শুনতে পাই, দেখতে পাই, কথা বলতে পারি, নাকে গন্ধ পাই। এই অগ্নির অভাবে আমাদের ইন্দ্রিয়সকল দুর্ব্বল হয়ে পড়ে।

আমাদের হৃদয় হচ্ছে আত্মার আসন। এই হৃদয়ে আছে একশত এক ধমনী, প্রত্যেকটি ধমনীর আবার একশত শাখা, প্রতিটি শাখার আবার বাহাত্তর হাজার উপশাখা। ব্যান বায়ু এই ধমনীর মধ্যে দিয়েই চলাফেরা করে। হৃদয়ের মধ্যে আছে আকাশ। এই আকাশের মধ্যে বিরাজ করছেন আত্মা তথা প্রাণ।

যদি কেউ পুন্য কর্ম্ম করে, তবে তিনি মৃত্যুকালে উদান বায়ুর সাহায্যে সুষুম্নার মধ্যে দিয়ে পুণ্যলোকে গমন করেন। আর যদি কেউ পাপ কর্ম্ম করে, তাহলে উদান তাকে পাপ লোকে নিয়ে যায়। যদি কেউ পাপ ও পুন্য উভয় কর্ম্ম করে থাকে তবে উদানের সাহায্যেই সে মনুষ্যলোকে যায়। (প্রশ্ন-উপনিষদ - শ্লোক-৩/৭)

এখন কথা হচ্ছে এই যে উর্দ্ধলোক বা অধোলোক এখানে অবস্থান কিভাবে হয়ে থাকে। দেখুন প্রাণই পৃথিবীর অধিপতি দেবতা। এই প্রাণের অধীনস্থ অপানের কাজ হচ্ছে সবকিছুকে ধরে রাখা। তা সে পৃথিবী বলুন, বা পৃথিবীর যেকোনো বস্তু বলুন। আর এই কারণেই কোনও বস্তু তার নির্দিষ্ট জায়গা ছেড়ে উপরে বা নিচে চলে যায় না। দ্যুলোক আর ভূলোকের অন্তর্বর্ত্তী এই বায়ুর অবস্থান। এই বায়ুই সমানের অধীন, আর সমানবায়ু প্রাণের অধীন। এই প্রাণের অধীনস্থ আরো একটা বায়ু হচ্ছে ব্যান যা আমাদের শরীরের বাইরে ও ভিতরে ছড়িয়ে আছে। আবার অগ্নি হচ্ছে উদান। মানুষের যখন মৃত্যু হয়, তখন তার শরীর শীতল হয়ে যায়, অর্থাৎ প্রথমে উদান বায়ুর নিষ্ক্রমন ঘটে। তার সমস্ত ইন্দ্রিয় তখন মনের মধ্যে বিলীন হয়ে যায় এবং সে জন্মান্তরের জন্য প্রস্তুত হয়। এই উদানই তাকে দেহের বাইরে নিয়ে যায়। এই অবস্থায় মনের যে অপূর্ন বাসনা সেগুলো চরিতার্থ করবার আর কোনো উপায় থাকে না। অর্থাৎ মন তার অপূর্ন বাসনাগুলোকে নিয়েই সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়গুলোর সাথে জীবাত্মার মধ্যে প্রবেশ করে,আর জীবাত্মা প্রাণের মধ্যে প্রবেশ করে। আর প্রাণরুপী আত্মা তখন যে লোক কামনা করে, সেই লোকে প্রবেশ করে। অর্থাৎ প্রাণ (গতিশীল বাহন) আত্মাকে তার অভীষ্টলোকে নিয়ে উপস্থিত করে। জীবাত্মা সেখানে কিছুদিন থেকে আবার নতুন দেহে জন্ম নেয়। তো এই হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন লোক প্রাপ্তির ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

নান্যং গুনেভ্যঃ কর্ত্তারং যদা দ্রোষ্টানুপশ্যতি
গুণেভ্যশ্চ পরং বেত্তি মদ্ভাবং সোঽধিগচ্ছতি। (১৪/১৯)

শব্দার্থ : নান্যং - ন অন্য, গুনেভ্যঃ- গুণসমূহ থেকে কর্ত্তারং - কর্ত্তাকে, যদা - যখন, দ্রোষ্টানুপশ্যতি - দ্রষ্টা দেখেন, গুণেভ্যশ্চ - জরা প্রকৃতি গুন্ সমূহ থেকে এবং পরং - গুণাতীত, বেত্তি - জানেন, মদ্ভাবং - আমার ভাব অর্থাৎ পরাপ্রকৃতি, সঃ-অধিগচ্ছতি - তিনি লাভ করেন।
বঙ্গানুবাদ : যখন দ্রষ্টা গুনব্যাতিত অন্য কাউকে কর্ত্তা ব'লে না দেখেন, এবং গুনের অতীত সেই পরমবস্তুকে অবগত হন, তখন তিনি আমার ভাব প্রাপ্ত হন।

বিস্তার : পুরুষ প্রকৃতির গুনসঙ্গের কারনে প্রপঞ্চময় সংসার দৃষ্ট হচ্ছে। পুরুষের প্রকৃতিস্থিত রূপ ও মিথ্যাজ্ঞানের সঙ্গে জীবের সম্মন্ধ হেতু গুনগুলোর সঙ্গে জীব কর্ম্ম বন্ধনে জড়িয়ে পড়ছে। সত্ত্বঃ রজঃ তমঃ এই তিন গুন্ মনের মধ্যে সুখ-দুঃখ-মোহ তিন ধরনের অনুভূতির ঢেউ তুলছে। আমি সুখী, আমি দুঃখী, কখনো আমি মূঢ়. এই গুনত্রয়ের সঙ্গে পুরুষ সঙ্গ করছে। আর গুনের সঙ্গে সঙ্গ-দেওয়াই পুরুষের সংসার স্থিতির কারন। আবার অসৎ-সৎ, নিত্য-অনিত্য সম্পর্কে মিথ্যা জ্ঞানের কারনে সংসার বন্ধন। জ্ঞানীগণ বলে থাকেন, সত্যদর্শনই মোক্ষের একমাত্র উপায়। এইজন্য কার্য্য, কারন ও বিষয় এই তিন রূপে কেবল গুণই কর্ত্তা বলে জানবে। যিনি এই ভাবে সমস্ত কিছুকে জেনে থাকেন,এমনকি গুন্ থেকে পৃথক দ্রষ্টা তাকেও জেনে থাকেন, তিনি মদ্ভাব প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। সত্যি কথা বলতে কি, দেহের মধ্যে বুদ্ধির আকারে যে গুণগুলো বিরাজ করছে, সেটাই আমাদের সমস্ত কর্ম্মের কর্ত্তা। অন্য কোনো কর্ত্তা নেই। এবং এই গুণগুলো থেকে স্বতন্ত্র যিনি তিনি দ্রষ্টা সাক্ষী আত্মা। এই জ্ঞানে যিনি প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছেন, তিনি ভগবতভাবে স্থিত হন অর্থাৎ ব্রহ্মস্বরূপ হয়ে যান।

সত্যি কথা বলতে কি, দেহ-বুদ্ধি-মন ইত্যাদি আকারে পরিণত হয়ে গুনগুলোই সমস্ত কর্ম্মের কারনরুপী কর্ত্তা। আর এই গুন্ থেকে স্বতন্ত্র আত্মা কেবল সাক্ষীমাত্র। এখন কথা হচ্ছে এই যেজ্ঞান এসব আমাদের কাছ বইপড়া বিদ্যা হিসেবে থেকে যায়। এসব আমাদের উপল্বদ্ধিতে আসে না। আর আমরা সেই সাক্ষিরূপ আত্মার কাছে পৌঁছতেও পারি না। এই উপলব্ধি বা প্রতক্ষ্য জ্ঞান কিভাবে আমরা অৰ্জন করতে পারি ? এর জন্য আমাদের দরকার প্রাণের সাধনা। প্রাণপ্রবাহকে আমাদের ইড়া-পিঙ্গলা-সুষুম্না থেকে শুরু করে, প্রথমে আজ্ঞাচক্রে তৎপরে সহস্রারের নিয়ে যেতে হবে। তখন সাধক গুণাতীত অবস্থার উপলব্ধি অর্থাৎ পরমপুরুষের সাক্ষাৎ পেতে পারেন। বুদ্ধি তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর, তীক্ষ্ণতম করে, বুদ্ধিকে পরাবস্থায় উন্নীত করতে হবে। তখন গুনের সঙ্গে সমস্ত সম্মন্ধ ছিন্ন হবে। তখন যে অবস্থায় উপনীত হবো, সেটাই আত্মস্থিতি। এই আত্মস্থিতি অবস্থা লাভ করতে পারলে, আমরা বুঝতে পারবো, ত্রিগুণের সঙ্গে আত্মার কোনো সম্পর্ক নেই। প্রাণপ্রবাহকে ধরে ইড়া-পিঙ্গলা-সুষুম্না পার হয়ে ব্রহ্মরন্ধ্রের উপরিভাগে যে বিন্দু আছে, সেখানে মনকে স্থির করতে হবে। এই কৌশল ভবিষ্যতে আমরা শুনবো ঠিকই তবে এই কৌশল শ্রীগুরুর সান্নিধ্যে থেকেই রপ্ত করা সম্ভব। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এই অভিজ্ঞতা সম্পন্ন গুরুদেবগন থাকেন উদাসীন। নিরন্তর এদের সান্নিধ্য পেয়ে, নিজেকেই গুরু আসনে বসাতে পারলে তবেই গুরুদেব ও নিজেকে অভিন্ন করে এই অবস্থা প্রাপ্ত হওয়া যেতে পারে। এই অভিজ্ঞতা দুর্লভ বললে অত্যুক্তি হবে না।
গুণানেতানতীত্য ত্রীন দেহি দেহসমুদ্ভবান
জন্মমৃত্যুজরা-দূঃখৈ-বিমুক্তো-অমৃতম-শ্নুতে। (১৪/২০)

শব্দার্থ : গুণানেতানতীত্য - গুনান এতান অতীত্য - গুনকে অতিক্রম করে এই,, ত্রীন - তিন দেহি - দেহধারী, দেহসমুদ্ভবান - দেহে উঁপন্ন হন, জন্মমৃত্যুজরা- জন্ম মৃত্যু জরা, দূঃখৈ - দুঃখ থেকে, বিমুক্তঃ- বিমুক্ত হয়ে,, অমৃত শ্নুতে - অমৃত ভোগ করেন ।

বঙ্গানুবাদ : জীব দেহ উৎপত্তির বীজস্বরূপ এই তিন গুনকে অতিক্রম করে জন্ম-মৃত্যু-জরা-দুঃখ হতে বিমুক্ত হয়ে অমৃতপদ লাভ করেন।

বিস্তার : যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবার মোক্ষের পথের সন্ধান দিচ্ছেন। মায়ার তিনটে গুন্। আর এই মায়াই জগৎ সৃষ্টির কারন। মায়া পুরুষের উপাধিমাত্র। আমরা যখন যার মধ্যে প্রবেশ করি, তখন তার মধ্যে নিজেকে গুলিয়ে ফেলি। আমরা যখন দেহের মধ্যে প্রবেশ করি, তখন আমরা নিজেকে দেহ ভিন্ন অন্যকিছু ভাবতেই পারি না। আমরা যখন জ্ঞানের মধ্যে প্রবেশ করি, তখন আমরা নিজেকে জ্ঞানী বলে ভেবে থাকি। যখন পাপের মধ্যে প্রবেশ করি, তখন নিজেকে পাপী ভাবি। আমরা যখন ধনের মধ্যে প্রবেশ করি, তখন নিজেকে ধনী বলে মনে করি।
কিন্তু সত্য হচ্ছে এই দেহ উৎপত্তির কারন হচ্ছে মায়ার ত্রিবিধ গুন্। এই গুনত্রয়ের পরিনাম হেতু এই দেহ। আর এই দেহের অতীত অবস্থা হচ্ছে মুক্তির অবস্থা। তো দেহাতীত অবস্থা লাভ করতে গেলে, আমাদের মায়ার যে গুণত্রয় তাকে অতিক্রম করতে হবে। অর্থাৎ ইড়া-পিঙ্গলা-সুষুম্না বর্জ্জিত অবস্থায় যেতে হবে। কেননা এই ত্রিগুণের স্থিতি হচ্ছে এই তিন নাড়ীর ভিতর। জীব জ্যোতির্বিন্দু স্বরূপ। সাধন ক্রিয়ার ফলে এই জ্যোতির্বিন্দু স্বরূপ যে জীব তা ব্রহ্মানুতে মিলিত হয়ে অ-জীব ব্রহ্ম হয়ে যেতে পারে। সাধন ক্রিয়া করতে করতে একসময় ধ্যানস্থ হয়ে, চিদাকাশে সেই অনুস্বরূপ ব্রহ্মের দর্শন মেলে। কেউ কেউ বিভিন্ন যোগমুদ্রার সাহায্যেও এই ব্রহ্মানুর দর্শন পেয়ে থাকেন। আমরা এর আগে ষষ্ঠ অধ্যায়ে আমরা যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে শুনেছি, (শ্লোক ১৩,১৪, ১৫) শরীর-মস্তক-গ্রীবা সরল স্থির নিশ্চল রেখে নিজ নাসাগ্রবর্ত্তী আকাশে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। অন্য দিকে মনোযোগ না দিয়ে প্রশান্ত চিত্তে, ভয়-বর্জ্জিত, ব্রহ্মচর্য্যশীল হয়ে মনঃসংযোগ পূর্বক মদ্গতচিত্তে, মৎপরায়ণ হয়ে ধ্যানের অভ্যাস করতে হবে। এইভাবে সর্ব্বদা মন সংযোগ করতে করতে সাধকের মন নিশ্চল হয়। এবং স্থির চিত্ত যোগী আমাতে (আত্মাতে) অধিষ্ঠিত নির্ব্বানরূপ পরম শান্তি লাভ করেন। তখন তিনি জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধি-সুখ-দুঃখের বোধের বাইরে চলে যান। অর্থাৎ যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভাষায় অমৃতপদ লাভ করেন।


অর্জ্জুন উবাচ :
কৈঃ-লিঙ্গৈঃ-ত্রীন গুণান-এতান-অতীতো ভবতি প্রভো
কিমাচারঃ কথং চ-এতান-ত্রীন গুনান অতিবর্ততে। (১৪/২১)

শব্দার্থ : কৈঃ-লিঙ্গৈঃ- কিরূপ লক্ষণ দ্বারা, ত্রীন গুণান-এতান- এই তিন গুন্, অতীতো ভবতি- মুক্ত হন, প্রভো - হে প্রভু, কিমাচারঃ - কিরূপ আচারযুক্ত হন, কথং চ-এতান-ত্রীন গুনান- এবং কি প্রকারে, এই তিনগুণ- কে, অতিবর্ততে - অতিক্রম করেন ।

বঙ্গানুবাদ : অর্জ্জুন বললেন, কোন লক্ষণের দ্বারা জানা যায় যে জীব ত্রিগুন অতিক্রম করেছেন ? তাঁর অর্থাৎ সেই গুণাতীত ব্যক্তির, আচার কেমন হয়, আর কিভাবেই বা এই ত্রিগুন অতিক্রম করেন ?

বিস্তার : খুবই গুরুত্ত্বপূর্ন প্রশ্ন। কেননা যখন যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমুখে আমরা শুনলাম গুণত্রয়ই আমাদের ভব বন্ধনের কারন, তখন এই ভববন্ধনের থেকে নিষ্কৃতি পাবার উপায় জানার আগ্রহ আমাদের মধ্যে আসতেই পারে। তাই ঋষি ব্যসদেব, অর্জ্জুনের মুখ দিয়ে এই চিরন্তন প্রশ্নের সম্মুখীন করে দিলেন, ব্রহ্মস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণকে। ত্রিগুণের কারনে জীব ছটফট করছে, তার লক্ষণ সম্পর্কেও তুমি বললে, এবার এখান থেকে বেরুবার উপায় বলে দাও। জন্ম-মৃত্যুর বীজকে কিভাবে নাশ করা যায় তার উপায় বাতলে দাও। আর জীবের মধ্যে থেকে এই ত্রিগুণের নিষ্ক্রমন ঘটলে, কোন কোন লক্ষণের দ্বারা আমরা সেটা বুঝতে পারবো ? কেননা আমরা তো ত্রিগুণের মধ্যে থেকে থেকে ত্রিগুণের অতীতের অবস্থা সম্পর্কে বিস্মৃত হয়েছি। তুমি আমাদের সেই স্মৃতি ফিরিয়ে দাও, তুমি সেই ত্রিগুণাতীত অবস্থার কথা বলে আমাকে চিনিয়ে দাও। গুনেতে থাকে কেমন করে, আবার গুন্ থেকে বেরিয়ে গিয়ে থাকে কেমন করে, আর কেমন করেই বা বুঝবো সেই গুণাতীত অবস্থায় জীবের দশা। হে প্রভু আমাকে সব বুঝিয়ে দাও।

শ্রী ভগবান উবাচ :
প্রকাশঞ্চ প্রবৃত্তিঞ্চ মোহমেব চ পান্ডব
ন দ্বেষ্টি সংপ্রবৃত্তানি ন নিবৃত্তিানি কাঙ্খতি। (১৪/২২)
প্রকাশঞ্চ - প্রকাশ অর্থাৎ জ্ঞান, প্রবৃত্তিঞ্চ - ও কর্ম্ম প্রবৃত্তি, মোহম-এব চ - এবং মোহ, পান্ডব - হে পাণ্ডব, ন দ্বেষ্টি - যিনি দ্বেষ করেন না, সংপ্রবৃত্তানি - আবির্ভূত হলে,, ন - না, নিবৃত্তিানি - নিবৃত্ত হলে, কাঙ্খিত আকাঙ্খ্যা করেন ।

বঙ্গানুবাদ : শ্রী ভগবান বললেন, হে পাণ্ডব, যিনি ত্রি-গুণের যে কাজ, অর্থাৎ প্রকাশ, কর্ম্মপ্রবৃত্তি, ও মোহ প্রভৃতিকে দ্বেষ না করেন, এইসব কার্য্যে নিযুক্ত হলেও তিনি এদের পেতে চান না, তিনি ত্রিগুণাতীত।

বিস্তার : আমরা জানি ত্রিগুন থেকেই জাত এই দেহ। তো দেহ আছে, আর ত্রিগুন পালিয়ে গেছে, এমনটা ভাবার কোনো কারন নেই। এই ত্রিগুণের কাজও তিন প্রকার। সত্ত্বগুনের - প্রকাশ, রজঃগুনের - কর্ম্মপ্রবৃত্তি ও তমঃগুনের - মোহ। এখানে থেকে আমাদের বেরুতে হবে, কিন্তু কিভাবে ?

প্রথমত হচ্ছে, প্রকাশ যা সত্ত্বগুণের কারনে ঘটে থাকে। আমরা প্রকাশ বলতে বুঝি গোচরীভূত অর্থাৎ দর্শনযোগ্য হওয়া । কিন্তু প্রকাশ হচ্ছে আসলে জ্ঞান। প্রকাশ অর্থাৎ জ্ঞান হলে, আমরা বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে পারি। আমরা পড়াশুনা করে জ্ঞান সঞ্চয় করতে পারি, আচার্য্যের মুখে শুনে জ্ঞান সঞ্চয় করতে পারি, কিন্তু প্রকৃত জ্ঞান আমাদের সাধনক্রিয়ার উত্তম অবস্থায় ঘটে থাকে। পড়াশুনা করে বা আচায্যের কাছ থেকে শুনে আমাদের যে জ্ঞান হয়, তা যেমন কেবলমাত্র তথ্যভিত্তিক তেমনি এই জ্ঞান আমাদের অপ্রতক্ষ্য জ্ঞান। কিন্তু যারা একটু আধটু ধ্যানাদির অভ্যাস করে থাকেন, অর্থাৎ চিত্তকে একাগ্র করে লক্ষ বস্তুর দিকে ধাবিত করতে পারেন, তাদের মধ্যে একটা প্রকাশ ঘটে যা তার নিজস্ব, আসল জ্ঞানের প্রকাশ। এই যে প্রকাশ এটি কোনো আলোর দ্বারা বস্তুকে ইন্দ্রিয়গোচর করা নয়, এটি আসলে সেই ইন্দ্রিয়ের উর্দ্ধে উঠে ইন্দ্রিয়ের অনধিগম্য বস্তুর স্বরূপের উপলব্ধি।

জ্ঞান আবার দুই প্রকার নিত্যবস্তুর জ্ঞান, আর অনিত্য বস্তুর জ্ঞান। এই অনিত্য বস্তুর স্থিরতা নেই, অনিত্য বস্তু প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল, তাই এই অনিত্য বস্তুর জ্ঞানও পরিবর্তনশীল। কিন্তু নিত্য বস্তু অপরিবর্তনীয়। তাই নিত্যবস্তুর জ্ঞান শ্বাশ্বত - অপরিবর্তনীয়। এই নিত্যবস্তু হচ্ছেন পরমাত্মা। তবে কি জীবাত্মা নিত্য নয় ? না জীবাত্মা অনিত্য, কেবলমাত্র পরমাত্মা আছেন বলেই, জীবাত্মাকে নিত্য বলে বলে হচ্ছে। একমাত্র পরমাত্মাই সমস্ত নাম-রূপ দ্বারা আরোপিত হয়ে জীবাত্মা রূপে প্রতিভাত হন। জীবাত্মার কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ত্ব নেই। পরমাত্মাই সমস্ত চেতন বস্তুর চৈতন্য স্বরূপ। চেতন বস্তুর চেতনার উৎস হচ্ছে পরমাত্মা। প্রতিটি মানুষ স্বয়ং ঈশ্বর, একথা উপলব্ধি করাই মানব জীবনের উদ্দেশ্য। এই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞান বা প্রকাশ। পরমাত্মা ও জীবাত্মা যে এক ও অভিন্ন, এই সত্য জীবাত্মাকে উপলব্ধি করতে হবে। এই উপলব্ধি না হওয়া পর্যন্ত জীবাত্মা নিজেকে দুর্বল, অসহায়, ক্ষুদ্র, ইত্যাদি ভ্রান্ত জ্ঞানের কারনে দুঃখ-কষ্ট ভোগ করবে। নিজেকে সে অসুখী মনে করবে। একটা অভাববোধ তাকে তারা করে বেড়াবে। কিন্তু পরমাত্মার সঙ্গে একাত্মতা উপল্বদ্ধিতে এলেই, জীব সর্ব্বানন্দের অধিকারী পূর্ন হয়ে যাবে। শান্তি ও আনন্দ তখন তাঁর অক্ষয় অধিকার হয়ে যাবে। তো এই জ্ঞান আসলে সাধারণ জ্ঞানের উর্দ্ধে। এই যে আনন্দস্বরূপ ব্রহ্মজ্ঞান এটি প্রকাশ ঘটে ব্রহ্মজ্যোতিঃ রূপে। এই যে ব্রহ্মজ্যোতিঃ এটি চন্দ্র-সূর্য-তারকার আলো নয়, বরং এই জ্যোতির প্রকাশে সমস্ত জাগতিক আলোর উৎস ম্লান হয়ে যায়। এই যে জাগতিক জ্যোতিষ্ক এদের কোনো নিজস্ব আলো নেই, এরা সবাই ব্রহ্মজ্যোতিতেই জ্যোতিস্মান হয়ে থাকে। ব্রহ্মই সমস্ত জ্ঞানালোকের উৎস। আর ব্রহ্ম স্বয়ংপ্রকাশ। উপনিষদের বাণী হচ্ছে, শুদ্ধ মনে ব্রহ্ম নিজেকে প্রকাশ করেন। শুদ্ধ মন বলতে আমি-আমার ভাবের উর্দ্ধে, তাই শুদ্ধ। তো আমাদের শুদ্ধ মনের অধিকারী হতে হবে। আর শুদ্ধ মনের অধিকারী হতে গেলে, আমাদের গুরু আদিষ্ট হয়ে নিরাসক্ত সাধনক্রিয়ায় রত হতে হবে। শ্রী যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, ত্রিগুণের কাজকে দ্বেষ করা চলবে না ।

আমাদের যে দর্শন-শ্রবণ,স্পর্শন ইত্যাদি যা ইন্দ্রিয় সংযোগে হয়ে থাকে, তা আসলে অবিদ্যা। সূক্ষ্ম বুদ্ধি সহযোগে অর্থাৎ বুদ্ধিকে স্থির করতে পারলে, অত্যন্ত সূক্ষ্মেরও যিনি সূক্ষ্ম তাঁকে উপলব্ধি করতে পারা যায়। অর্থাৎ মন তখন সেই জ্যোতির্ময় আত্মাতেই লেগে থাকে। এই অবস্থায় যে উপলব্ধি হয়, তা-ই যথার্থ বিদ্যা। যারা সংযত চিত্ত, যাদের মন অন্য দিকে যায় না, তাঁরা সেই জ্যোতির্ময় আত্মাকে দর্শন করে থাকেন। এই যে প্রকাশ যারা লাভ করতে পেরেছেন, তাদের মধ্যে কামনা নিঃশেষিত হয়েছে। এই অবস্থাতে তারা সংসারে থাকলেও, সংসারের প্রতি তারা কোনো বিদ্বেষভাব পোষণ করেন না। সংসার-ভোগ করবো না, বা সংসার-ভোগ করবো, এই দুই ভাবের সঙ্গেই সম্পর্কেহীন থেকে, তিনি উদাসীন থাকেন। এমনকি এই অবস্থায় ব্রহ্মবস্তু আর ভোগ্য বা কাম্যবস্তুর মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন না।
আসলে এইসময় যোগীপুরুষের প্রাণশক্তি মস্তকে সহস্রারে স্থির হয়ে যায়। ইড়া পিঙ্গলা সুষুম্না অতিক্রম করে অর্থাৎ সত্ত্ব, রজ্ঃ, তমঃ গুনকে অতিক্রম করে, গুনের পরাবস্থায় অনন্যমনা হয়ে স্থির চিত্তে অবস্থান করেন। তখন সব স্থির, বিশ্বাতীত, গুণাতীত। তখন সংসারে থাকলেও, সংসারের কার্য্যাদি করলেও, সংসার কর্ম্মে অভিভূত হবার জন্য কেউ আর অবশিষ্ট থাকে না। তখন তিনি নির্লিপ্ত - যেন এই জগতের কেউ নন। তখন যদিও সত্ত্বগুণের কিঞ্চিৎ ধারা বইতে থাকে, তথাপি, সেই ধারা সাধককে স্বরূপের স্থিতি থেকে বিচ্যুত করতে পারে না।


উদাসীনবৎ-আসীনো গুণৈর্যো ন বিচাল্যতে
গুনা বর্ত্তন্ত ইত্যেবং যঃ-অবতিষ্ঠতি নেঙ্গতে। (১৪/২৩)

শব্দার্থ : উদাসীনবৎ-আসীনো - উদাসীনের ন্যায় স্থিত হওয়া, গুণৈর্যো ন বিচাল্যতে - গুন্ সমূহের দ্বারা বিচলিত হন না, গুনা বর্ত্তন্ত - গুন্ই সমূহ স্বকার্য্য কার্য্য করছে, ইত্যেবং যঃ-অবতিষ্ঠতি - এইরূপে যিনি অবস্থান করেন, নেঙ্গতে - ন ইঙ্গতে অর্থাৎ চঞ্চল হন না।

বঙ্গানুবাদ : যিনি উদাসীনের ন্যায় অবস্থান করেন, ত্রিগুণের দ্বারা তিনি বিচলিত হন না। গুনের কাজ চলছে, এবং চলতে থাকবে, এসব জেনেও যিনি স্থির ভাবে অবস্থান করেন এবং কোনো কিছুতে যিনি চঞ্চল হন না - তিনিই গুণাতীত বলে জানবে।

বিস্তার : দেহ থাকলে, দেহ তার নিজস্ব কাজ করবে, কান থাকলে, শুনবে, চোখ থাকলে দেখবে, মুখ থাকলে কথা বলবে, মন থাকলে চিন্তা করবে। ত্রিগুন হচ্ছে এই দেহের কারন। দেহ থাকলে গুন্ থাকবে, তেমনি ত্রিগুন যেহেতু এই দেহের কারন, তো দেহস্থিত গুন্ তার স্বভাব বশতঃ কাজ করবে, এটাই স্বাভাবিক। প্রদীপ আর বাতাস একসঙ্গে থাকলে, প্রদীপশিখা চঞ্চল থাকবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এইসব শোনা বা দেখা, যিনি গ্রহণ করছেন, তিনি অর্থাৎ মন যখন বিষয় থেকে বিষয়ে ভ্রমন থেকে বিরত হয়ে আত্মাতে স্থিত হবেন, তখন দেহের যে ত্রিগুণের ক্রিয়া তা আর তাঁকে (সাধককে) স্পর্শ করতে পারবে না। চোর চোরের কাজ করছে, কিন্তু গৃহস্থ ফকির নীরব দর্শক। ফকিরের কোনো তাপ-উত্তাপ নেই। এই দেহ প্রকৃতির দান। আর প্রকৃতি ত্রিগুণের সমাহার। তো যতদিন দেহরূপ প্রকৃতি থাকবে, ততদিন আরব্ধ বশতঃ কর্ম্মফল ভোগ দেহাদিকে করতেই হবে, এর থেকে কোনো নিষ্কৃতি নেই। কিন্তু সুখ-দুঃখের অনুভূতি হচ্ছে মনের বিষয়। মন যদি দেহাতীত হয়ে আত্মাতে স্থিত হয়, তখন মনের মধ্যে আর কোনো ক্লেশের বা সুখ-দুঃখের অনুভূতি থাকবে না। তো যোগী নির্বিকার। তাকে কোনো বিষয়ই আর স্পর্শ করতে পারছে না। এই অবস্থাকেই বলে তুরীয় অবস্থা।

আমরা জাগ্রত ও স্বপ্নাবস্থায় সুখ-দুঃখের অনুভূতি সম্পন্ন হয়ে থাকি। যদিও জাগ্রত অবস্থায় শরীর ও মন সক্রিয় থাকলেও, স্বপ্নাবস্থায় শরীর ক্রিয়াশীল থাকে না। আমরা তখন এক মানসসৃষ্ট জগতে বিচরণ করি। কিন্তু আমরা যখন সুসুপ্তিতে চলে যাই, তখন আমাদের আমাদের দেহ ও মন থাকে না তা নয়, দুটোই বর্ত্তমান থাকে, তথাপি আমাদের কোনো জাগতিক সুখ-দুঃখের অনুভূতি থাকে না। কারন তখন আমাদের শরীর ও মন দুইই নিষ্ক্রিয়। কিন্তু ঘুম ভেঙে গেলেই, শরীর-মন আবার ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। তাই সুষুপ্তি থেকে জেগে উঠে আবার আমরা পূর্বাবস্থায় ফিরে যাই। অর্থাৎ যেখানে শেষ করেছিলাম, সেখান থেকে আবার কার্যক্রম শুরু করি। কিন্তু কেউ যদি সুসুপ্তির উর্দ্ধে তুরীয় অবস্থায় যেতে পারেন, তিনি জেগে উঠলেও একটা ঘোরের মধ্যে দিনাতিপাত করে থাকেন। একটি নেশার ঘোরের মধ্যে পড়ে যান। নেশার মধ্যে যেমন মানুষের বাহ্যিক হুশ থাকে না, শারীরিক ক্ষতের সৃষ্টি হলেও, কেউ গালাগাল করলেও, কেউ ভালো-মন্দ কিছু বললেও, তার কিছুই এসে যায় না, তেমনি তুরীয় অবস্থা থেকে ফিরে মানুষের মধ্যে একটা নিরুত্তাপ অবস্থার সৃষ্টি হয়। নেশাগ্রস্থ মানুষ যেমন বারবার নেশার পাত্রের দিকে হাত বাড়ান, তেমনি তুরীয় অবস্থার সংস্পর্শে যিনি একবার ভাগ্যক্রমে এসে গেছেন, তিনি বারবার সেই অবস্থা প্রাপ্তির জন্য লালায়িত থাকেন। এই তুরীয় অবস্থাই শিবভাব। এখানে কোনো ভোগের বিষয় নেই, এই অবস্থাই ত্রিগুণাতীত অবস্থা।

আমরা জানি, সমস্ত ভাবের গ্রাহক হচ্ছেন মন। মন বুদ্ধির সাহায্যে সমস্ত নির্নয় করে থাকে। অর্থাৎ কোনটা সুখের, কোনটা দুঃখের, কোনটা ভয়ের ইত্যাদি অবস্থার নির্নয় মন বুদ্ধির সাহায্যে করে থাকে। সাধনক্রিয়ার উত্তম অবস্থায় এই মন থাকে পরম-আত্মাতে লীন হয়ে চরাচর বিশ্বের অনুভূতিহীন হয়ে অবস্থান করে থাকে। সকল বস্তুর ত্যাগ তখন আপনা-আপনি হয়ে যায়। কোনো বস্তুতেই মন ধাবিত হয় না। ঘটনা ঘটছে না তা নয়,ঘটনা ঘটছে কিন্তু সেই ঘটনা বা তার ফল মনকে প্রভাবিত করতে পারছে না। গুন্ তার কাজ করছে, দেহ তার কাজ করছে, কিন্তু যোগী যেন এই গুন্-সাগরের উপরে ভেসে ভেসে চলেছেন। এইরূপ আত্মস্থ পুরুষকে বলে গুণাতীত পুরুষ। ইনি যোগীশ্রেষ্ঠ। সত্ত্বগুণের সুখ, রজোগুণের দুঃখ, বা তমোগুণের মোহ তাকে বিচলিত করতে পারে না। তিনি এসবের উর্দ্ধে ব্রহ্মানন্দ জগতে নির্বিকার হয়ে অবস্থান করছেন। শিবোহম - শিবোহম।
সমদুঃখ সুখঃ স্বস্থঃ সমলোষ্টাশ্ম-কাঞ্চনঃ
তুল্য প্রিয়-অপ্রিয়ো ধীরঃ-তুল্য নিন্দাত্ম-সংস্তুতিঃ। (১৪/২৪)

শব্দার্থ : সমদুঃখ সুখঃ - সুখ-দুঃখ সম-ভাবাপন্ন, স্বস্থঃ - আত্মস্বরূপে অবস্থিত, সমলোষ্টাশ্ম-কাঞ্চনঃ - সম-লোষ্ট্র-অশ্ম-কাঞ্চন - সম ভাবাপন্ন মাটির ঢেলা, পাথর, স্বর্ণ, তুল্য প্রিয়-অপ্রিয়ো - প্রিয় ও অপ্রিয় তুল্য, ধীরঃ-তুল্য - ধৈর্যশীল তুল্যজ্ঞান, নিন্দা-আত্ম-সংস্তুতিঃ- নিন্দা ও নিজের প্রশংসায় তুল্যজ্ঞান।

বঙ্গানুবাদ : যার কাছে সুখ-দুঃখ সমান, যিনি আত্মস্বরূপে প্রতিষ্ঠিত, মাটির ঢেলা, পাথর,সোনা যার কাছে সমান, যিনি প্রিয় ও অপ্রিয়, নিন্দা ও স্তুতিকে সমান জ্ঞান করেন, যিনি ধৈর্যযুক্ত, তিনিই গুণাতীত বলে জানবে।

বিস্তার : এর আগের শ্লোকে বলেছেন গুন্ সম্পর্কে উদাসীন, গুনের কার্য্য সম্পর্কে অবিচলভাব এবং গুনের সঙ্গে সম্পর্কহীন হওয়া বলছেন। এখন বলছেন, গুনের কার্য্যে যে উৎপত্তি হচ্ছে, অর্থাৎ সুখ, দুঃখ মোহ এগুলোকে সমান ভাবে দেখতে হবে। দ্রষ্টারূপে গুনের কার্য্যের পর্যবেক্ষক হতে হবে। মাটি পাথর বা সোনার খন্ডে সমজ্ঞান করতে হবে সুখ আর দুঃখের মধ্যে কোনো পার্থক্য চলবে না। এই ব্যক্তি ধীর-স্থির নিন্দা স্তুতির উর্দ্ধে উঠে ত্রিগুনাতীত হয়ে যান।

আসলে এই যে অবস্থার কথা বলা হচ্ছে, এই অবস্থা একমাত্র সাধনার উত্তম অবস্থায় প্রাপ্ত হওয়া যায়। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সাধনার উচ্চমার্গে অবস্থিত পুরুষের অন্তরের অবস্থার কথা বর্ননা করছেন। অর্থাৎ আপনাতে আপনি থাকা। নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। সেই আনন্দময় সত্ত্বায় নিজেকে আত্মমগ্ন করা । মন তখন বিষয় থেকে বিরত হয়ে আত্মস্থিত হয়েছে। তখন মন বলে আলাদা কোনো কিছুর অস্তিত্ত্ব টের পাওয়া যাচ্ছে না। আর আমরা জানি, এই যে সুখ-দুঃখ এসব আমদের সেই অন্তর-ইন্দ্রিয়ে অর্থাৎ মনের মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছিলো। এখন মন সেই সৎ-চিৎ-আনন্দের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়ায় জগৎব্যাপার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। তখন সংসারের হীত-অহিত, ভালো মন্দ, আর তাঁকে স্পর্শ করতে পারছে না। তখন হিরে মনি মুক্তা আর মাটি-পাথর-সোনা-রুপো লোহার মধ্যে কোনো পার্থক্য দৃষ্ট হয় না। কারন এইসব ধনরত্নের যে উপযোগিতা, বা নিকৃষ্ট বস্তুর মধ্যে অনুপযোগিতা তা আর তার বোধের মধ্যে নেই। শিশুর কাছে যেমন বিষ্ঠা আর বিত্তের মধ্যে কোনো পার্থক্য লক্ষিত হয় না, তেমনি সাধনার পরাবস্থায় যাঁরা অবস্থান করছেন, তাদের মধ্যে এই শিশুসুলভ ভাব দেখা যায়। নেশাগ্রস্থ পুরুষ যেমন বাহ্যজ্ঞানহীন হয়ে যায়, তেমনি যোগীপুরুষ বাহ্যবস্তু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন, অন্তর্বস্তুর দিকে তন্ময় হয়ে থাকেন। তাই বলে এমন ভাবার কোনো কারন নেই, যে নেশাগ্রস্থ মানুষ বা শিশু আর সাধকপুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। একজন আছেন, মূত্র সাগরে আর একজন থাকে অমৃত সাগরে। একজন চেতনা সম্পন্ন, আর একজন চেতনাবিহীন। একজন জ্ঞানী আর একজন অজ্ঞানী। মুক্ত পুরুষের মধ্যে অপূর্নতা নেই, প্রিয়-অপ্রিয় নেই। তিনি সবকিছুর মধ্যে আপনসত্ত্বাকে দেখে থাকেন। বাহ্য বস্তুতে যে নাম-রূপের পার্থক্য, বস্তুর গভীরে প্রবেশ ফলে, তার মধ্যে থেকে সেই পার্থক্যবোধের অবলুপ্তি ঘটে।
মান-অপমানয়ো তুল্যঃ-তুল্যো মিত্র-অরিপক্ষয়ো
সর্ব্বারম্ভ-পরিত্যাগী গুণাতীতঃ স উচ্চতে। (১৪/২৫)

শব্দার্থ : মান-অপমানয়ো - মান অপমান, তুল্যঃ-তুল্য - তুলনামূলক ভাবে সমান মিত্র-অরিপক্ষয়ো - বন্ধু-শত্রু পক্ষ, সর্ব্বারম্ভ-পরিত্যাগী - সঙ্কল্পবিহীন, গুণাতীতঃ স উচ্চতে- তাঁকে গুণাতীত বলা হয় ।

বঙ্গানুবাদ : যিনি মান-অপমান, শত্রু-মিত্রকে তুল্য জ্ঞান করেন, ফল লাভের আশায় যিনি কর্ম্মে উদ্যমী হন না, এমন ব্যক্তি গুণাতীত বলে খ্যাত।

বিস্তার : নেশাগ্রস্থ বেহুশ ব্যক্তির কাছে পুরস্কার আর তিরস্কারের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, অর্থাৎ তার সাময়িকভাবে সংসার-বোধের বিলুপ্তি ঘটেছে। তেমনি গুণাতীত পুরুষ সামাজিক রীতিনীতি, এমনকি দৈহিক চাওয়া-পাওয়ার উর্দ্ধে অবস্থান করেন। তিনি যে কাজ করেন, তা তাঁর কাছে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে থাকে। এর জন্য কোনো বাসনা বা সঙ্কল্প করতে হয় না। তিনি যে কর্ম্মফল ভোগ করেন, তা তাঁর প্রারব্ধ থেকে ঘটে থাকে। আর সাধনার উত্তম অবস্থায় তিনি সংকল্প বিহিত কর্ম্ম করার ফলে তাঁর কোনো নতুন কর্ম্মফল সঞ্চিত হয় না। প্রারব্ধ কর্ম্মফল দ্রুত নিঃশেষ হতে শুরু করে। তিনি আমিষ খাচ্ছে কি নিরামিষ খাচ্ছেন, তাকে কেউ অপমান করছে কি প্রসংশা করছে, কেউ তাঁকে কিছু করতে বলছে, বা করতে নিষেধ করছে, তাঁর দিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ থাকে না। তাঁর না আছে খাবার জন্য আগ্রহ, না আছে পরার জন্য আগ্রহ। না আছে সুখ বোধ, না আছে দুঃখ বোধ। এ এক অদ্ভুত অবস্থা যা আমাদের মতো বিষয়াসক্ত মানুষের বোধের বাইরে। তাঁর মধ্যে যে ভাবনার উদয় হয়, তাই কার্য্যে রূপান্তরিত হয়, তিনি কিছু করেন না, কিন্তু তাঁর দ্বারা অনেক কিছু হয়, যা জগতের মঙ্গলে কাজে লাগে। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এঁকেই গুণাতীত বলছেন। যোগসাধনার উচ্চ অবস্থা।


মাঞ্চ যঃ-অব্যভিচারেণ ভক্তিযোগেন সেবতে
স গুনান সমতীত্য-এতান ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে। (১৪/২৬)

শব্দার্থ : মাঞ্চ: মাম চ - আমাকেও, যঃ-অব্যভিচারেণ - যিনি ঐকান্তিক, ভক্তিযোগেন - ভক্তিসহকারে, সেবতে - সেবা অর্থাৎ উপাসনা করেন, স গুনান - তিনি গুনকে,
সমতীত্য- অতিক্রম করে, এতান - এই সমস্ত, ব্রহ্মভূয়ায় - ব্রহ্মভূত স্তরে, কল্পতে-উন্নীত হন।

বঙ্গানুবাদ : যিনি ঐকান্তিক ভক্তিযোগ সহকারে আমার (আত্মার) সেবা করেন,তিনিই এই গুণসমূহ অতিক্রম করে ব্রহ্মভাব লাভ করতে সমর্থ হন।

বিস্তার : যোগেশ্বর ভগবান এবার ত্রিগুণকে কিভাবে অতিক্রম করা যায়, সে সম্পর্কে উপদেশ দিচ্ছেন। বলছেন, অন্য কোনো দিকে আসক্তিপূর্ব্বক দৃষ্টি না দিয়ে আত্মস্থ হতে হবে। এই আত্মস্থ হবার উপায় হচ্ছে গুরুবাক্যে শ্রদ্ধা রেখে ভক্তি সহকারে, সাধন-ক্রিয়া অর্থাৎ ধারণা ধ্যান, সমাধির অভ্যাস করতে হবে। অব্যভিচারিনী ভক্তিযোগ দ্বারা ভগবানের উপাসনা করতে হবে। এই যে ভক্তিযোগ এটি আসলে অব্যভিচার। এই ভক্তিযোগে অন্যথা-ভাবে থাকা চলবে না। আমাদের মধ্যে নিরন্তর বহুবিধ বৃত্তির উদয় হচ্ছে, কিন্তু অন্তঃকরণকে আমাদের এতটাই স্থির করতে হবে, যেখানে বৃত্তির উদয় না হয়, সেখানে কেবল মাত্র আত্মার স্থিরভাবকে লক্ষ করতে হবে। সবার হৃদয়েই সেই আত্মা - নারায়ণ, যিনি স্বয়ং আমিত্ত্ববিহীন আমি। সেই আমিকে ছাড়া অন্য কোনো ভাব যার মনে আসে না, তাঁরই সেই অব্যভিচারিনী ভক্তিযোগ সম্পন্ন হয়েছে, বলা যেতে পারে।

সমস্ত চেতন অচেতন বস্তু পরমেশ্বরের সত্ত্বায় পরিপূর্ন। ব্রহ্ম ব্যাতিত অন্য কিছু নেই। এই ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে ভজনাদি করতে হবে। এই অনন্য ভাব তখনই হতে পারে, যখন ইন্দ্রিয়লব্ধ রূপ-রস-গন্ধ ইত্যাদি থেকে মনকে সরিয়ে আত্মাতে নিশ্চল করতে পারবো । মন যদি লোভাতুর হয়, মন যদি স্বামী ভিন্ন অন্য পুরুষে আসক্ত হয়, তবে সেই মন ব্যভিচারিণী। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে গেলে, যেমন অন্য পুরুষের প্রতি বিরক্তির ভাব আনতে হবে, তেমনি স্বামীর প্রতি আসক্তি বাড়াতে হবে। আর এই মনকে আত্মাভিমুখী করতে হলে, আমাদের প্রাণের সাধনা করতে হবে। আর প্রাণের সাধনার দ্বারা প্রাণ স্থির হলে, মন তখন স্পন্দনশূন্য হয়ে যাবে, অর্থাৎ মনের মধ্যে আর কোনো বৃত্তির উথাল-পাথাল থাকবে না। এই অবস্থাই মনে নিরালম্ব অবস্থা। এই অবলম্বন হীন মনেই অর্থাৎ অনন্য চিত্তে, পরাভক্তির উদয় হবে।

যতক্ষন আমাদের শ্বাস বায়ু ইড়া-পিঙ্গলা দিয়ে প্রবাহিত হবে, ততক্ষন আমাদের মধ্যে এই ভাবে উদয় হতে পারে না, কিন্তু শ্বাস যখন সুষুম্নাতে প্রবাহিত হবে, এবং এই সুষুম্না নাড়ীতে প্রাণবায়ুর স্থিতি কাল যত বাড়তে থাকবে, তত প্রাণ মাথার মধ্যে চেপে বসবে। আসলে আমাদের মধ্যে একটা সাধারণ ধারণা হচ্ছে এই ভক্তিযোগ খুবই সহজ পন্থা। কিন্তু সত্য হচ্ছে, ভক্তির অভিনয় বা ভক্তির ভান করা হয়তো সহজ, কিন্তু প্রকৃত ভক্তি তখনই হতে পারে, যখন আমাদের প্রাণ-মনকে স্থির করে আত্মস্থিত হতে পারবো। কেবল গীতা মুখস্থ করে, বা জ্ঞানের কথা, ভক্তির কথা মুখে বলে এই পরমপদ লাভ সম্ভব নয়। যতদিন বিষয়ে আসক্তি থাকে, যতদিন, কামিনী কাঞ্চনে মন থাকবে, ততদিন ভক্তির দেখা পাওয়া যাবে না। তবে জ্ঞান ভক্তির কথা আলোচনার মাধ্যমে যে কোনো উপকার হবে না তা হয়, ভক্তি সম্পর্কে একটা আগ্রহ জগতে পারে। ধীরে ধীরে এই জ্ঞান-ভক্তির কথা আলোচনা শুনতে শুনতে মনের মধ্যে একসময় ভগবতপ্রাপ্তির প্রত্যাশা জেগে উঠে পারে। তাঁর সম্পর্কে আগ্রহ জেগে উঠে পারে। সৎসঙ্গের আলোচনা অবশ্যই মনকে ভগবৎমুখী করে দেয়। কিন্তু আলোচনার আসর থেকে বেরিয়ে এসে যদি আমরা সেসব ভুলে যাই, তবে আর কি করে কাজ হবে। আলোচনা যেমন শুনতে হবে, তেমনি নিরন্তর ভগবৎ চিন্তায় মগ্ন থাকতে হবে। তবেই অন্তরে সুপ্ত বীজ থেকে ধীরে ধীরে অংকুরের উদ্গমন হবে, একসময় মহীরুহে পরিণত হবে, তখন ধুলায় লুটাবে দেহ।

পরাভক্তির এই অবস্থার অর্থাৎ আত্মাতে বিশ্রান্তির ফল স্বরূপ সাধক স্বভাবসিদ্ধ জীবনমুক্তির দশা প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। তখন না থাকে ভূতবর্গ, না থাকে দেহ, না থাকে ইন্দ্রিয়সকল, না থাকে মন। তবে কি শূন্য ? শূন্য মানে তো নৈরাশ্য। না সেখানে নৈরাশ্যের কোনো স্থান নেই, কারন যেখানে আশা থাকে সেখানেই কেবল নৈরাশ্যের প্রশ্ন আসে। যেখানে কোনো আশাই নেই সেখানে নৈরাশ্য কোথায় ? সেখানে না থাকে শাস্ত্র, না থাকে আত্মজ্ঞান, সেখানে বিষয়বহির্ভূত মনেরও কোনো অস্তিত্ত্ব নেই। সেখান না আছে তৃপ্তি, না আছে তৃষ্ণা। সেখানে সবই গত হয়েছে। সেখানে না আছে বিদ্যা, না আছে অবিদ্যা সেখানে না আছে অহঙ্কার, না আছে কোনো সম্মন্ধ। কেননা সন্মন্ধ গড়তে গেলে তো আরো একজনকে চাই। সেখানে না আছে প্রারব্ধ কর্ম্ম, না আছে জীবনমুক্তি, না আছে সমাধি, না আছে কৈবল্য। সেখানে না আছে কর্ত্তা, না আছে ভোক্তা, তাই সেখানে নেই কোনো স্ফূরণ। সেখানে না আছে পরোক্ষ, না আছে অপরোক্ষ। শুধুই নিত্য। এই অবস্থায় লোকসকল কোথায়, মুমুক্ষই বা কোথায়, কোথায় সেই জ্ঞানী, কোথায় সেই বদ্ধ, কোথায়ই বা মুক্তি। না সৃষ্টি না সংহার, না সাধন না সাধক, না সিদ্ধি। সেখানে না থাকে ব্রহ্মভাব না থাকে জীবভাব। সেখানে না থাকে শিব, না থাকে বিষ্ণু, না থাকে ব্রহ্ম। সৎ থাকলে অসৎ থাকবে, ব্রহ্ম থাকলে অব্রহ্ম থাকবে। নাস্তিক থাকলে আস্তিক থাকবে। এক থাকলে দুই থাকতেই হবে। এখানে না আছে কোনো একত্ব, না আছে কোনো দ্বিত্ব। বেশি কথাবলে কাজ কি, কথায় কথা বাড়ে। সেখানে কিছুই প্রতিভাত হয় না। না অন্ধকার না আলো। এই হচ্ছে গুণাতীত অবস্থা। পরব্রহ্ম ভাব। .যেখানে যোগেশ্বের অবস্থান।

ব্রহ্মণো হি প্রতিষ্ঠাহম -অমৃত্স্য-অব্যয়স্য চ
শাশ্বতস্য চ ধর্ম্মস্য সুখস্য-ঐকান্তিকস্য চ। (১৪/২৭)

শব্দার্থ : ব্রহ্মণো হি প্রতিষ্ঠাহম - অবশ্যই নির্বিশেষ ব্রহ্মজ্যোতিতে আশ্রয়, অমৃত্স্য-অব্যয়স্য চ - অমৃতের অব্যয় ও শাশ্বতস্য - নিত্য, চ - এবং ধর্ম্মস্য সুখস্য- ধর্ম্মের, সুখের, ঐকান্তিকস্য চ - ও ঐকান্তিক ।

বঙ্গানুবাদ : আমিই ব্রহ্মের প্রতিষ্ঠা, আমি অমৃতের, সনাতন ধর্ম্মের এবং ঐকান্তিক সুখের প্রতিষ্ঠা।

ব্রহ্মভাব লাভ করতে গেলে গুনসমূহকে অতিক্রম করতে হবে। ইড়া পিঙ্গলা সুষুম্নার অতীতে যেতে হবে। এই যে ব্রহ্মভাবে প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ আমি সত্ত্বার ঘনীভূত রূপ. এই আমিই শ্রীগীতার প্রবক্তা কূটস্থের চৈতন্য। অধ্যাত্মপথের শেষ গন্তব্য স্থান (স্টেশন) । এর পরে যা আছে, তা কেবল অবর্ণনীয়। . এই স্থান নির্গুণ স্বরূপ অদৃশ্য অস্পর্শ, অব্যবহার্য্য। বরফ হচ্ছে জলের ঘনীভূত রূপ, জল হচ্ছে বাষ্পের ঘনীভূত রূপ। এই বাষ্প বিশ্বব্যাপী নিরাকার, নিলিপ্ত। আবার বায়ুর প্রভাবে গতিশীল। তেমনি আমাদের যে আত্মসত্ত্বা যা বিশ্বব্যাপী নির্লিপ্ত নিরাবয়ব সেই আত্মসত্ত্বার ঘনীভূত রূপ যোগীর কাছে প্রকাশ স্বরূপ কূটস্থ চৈতন্য, ব্রহ্ম । ইনিই সাধকের উপাস্য, ইনিই সাধকের জ্ঞানদাতা। রূপ বিবর্জিত ব্রহ্মের প্রকাশের জন্য একটা আশ্রয়ের প্রয়োজন হয়। যদি কোনো আশ্রয়ে এই রূপ-বিবর্জিত ব্রহ্ম নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন, তা হয় কূটস্থ চৈতন্য শ্রীকৃষ্ণ। এই কূটস্থ চৈতন্য, ব্রহ্ম, শ্রীকৃষ্ণ এঁদেরকে আলাদা করা যায় না । ইনি মন-বুদ্ধির অতীত, কিন্তু ইনিই আবার মন-বুদ্ধির গ্রাহ্য হয়ে থাকেন মাত্র ।

ইনি অবিজ্ঞাত, মন বুদ্ধি ইন্দ্রিয়ের ধারণার বাইরে, কিন্তু অবিজ্ঞাত ব্রহ্মই আবার মন-বুদ্ধিকে আশ্রয় করে ব্যক্ত হন। এই যে ব্যক্ত স্বরূপ ব্রহ্ম, একেই বলে প্রকৃতি বা মায়া, যা সেই ব্রহ্মেরই শক্তি স্বরূপ । এই অবিজ্ঞাত ব্রহ্ম যাঁকে আশ্রয় করে ব্যক্ত হন, তিনি যেমন মায়া, আবার এই মায়ার সত্ত্বগুনভাবে ইনি মহেশ্বর, পুরুষোত্তম, আদ্যাশক্তি ইত্যাদি। যোগীপুরুষগন কূটস্থ ভেদ অতিক্রম করে, যোগসাধনার দ্বারা এই পরমপুরুষকে জ্ঞানের বিষয় করে তোলেন। আর তখন জ্ঞাতা জ্ঞেয় ও জ্ঞান এক হয়ে ব্রহ্মময় জগৎ দর্শন করে থাকেন। তখন আমিও থাকে না তুমিও থাকে না। একেই অমৃতপদ বলা হয়ে থাকে। এই অবস্থায় যিনি দিন-রাত মগ্ন থাকতে পারেন, তার মধ্যে ষড়-রিপুর প্রভাব বলে কিছু থাকে না। এই অবস্থা সুখপ্রদ হয়ে থাকে। তখন ইচ্ছারহিত অবস্থা। এই অবস্থা তখনই আসে যখন যোগী প্রাণকে স্থির করতে পেরেছেন। এখান থেকেই সমস্ত কিছুর উৎপত্তি হচ্ছে। অর্থাৎ এই কেন্দ্রবিন্দুই ব্রহ্মযোনি স্বরূপ। হায়-রে জীবকুল, কতবার সে আসে, আর কতবার সে যায়, কিন্তু যাঁকে আশ্রয় করে সে আসে-যায়, অর্থাৎ সেই প্রাণের নাগাল সে পায় না। চেষ্টাও করে না।

ওম নমঃ শ্রী ভাগবতে বাসুদেবায়।

ইতি শ্রীমদ্ভগবৎ গীতাসু-উপনিষদসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণ-অর্জ্জুন সংবাদে গুণত্রয় বিভাগ যোগোনাম চতুর্দ্দশোঽধ্যায়ঃ।

-----------------


Comments

Popular posts from this blog

নিত্যকথা

ঈশ্বর ও তাঁর উপলব্ধি

সত্যধর্ম্ম ও প্রেম