মম যোনির্মহদ ব্রহ্ম তস্মিন গর্ভং দধাম্যহম
সম্ভবঃ সর্ব্বভূতানাং ততো ভবতি ভারত। ১৪/০৩)
শব্দার্থ : মম : আমার, যোনি: গর্ভধান স্থান : মহৎ-ব্রহ্ম : আমার প্রকৃতি তস্মিন : তাতে ; গর্ভং : গর্ভ : দধাম্যহম : দদামি অহম - আমি দান করি : সম্ভবঃ - উৎপত্তি, সর্ব্বভূতানাং : সর্ব্ব জীবের বা ভূতের, ততো ভবতি : তা থেকে হয়, ভারত - ভারত অর্থাৎ অর্জ্জুন।
বঙ্গানুবাদ : হে ভারত, মহৎ-ব্রহ্ম অর্থাৎ প্রকৃতি আমার গর্ভধান স্থান। তাতে আমি জগৎবীজ নিক্ষেপ করি। তা হতেই সমস্ত ভূতের উৎপত্তি হয়।
বিস্তার : আবার সেই সৃষ্টিতত্ত্বের কথা। এই সৃষ্টি তত্ত্ব সহজে বোধগম্য হবার নয়, তাই ভগবান পুনরায় এই সৃষ্টি তত্ত্বের কথা বলছেন। আমরা জীবকূলে সৃষ্টির সাধারণ পাঁচটি উপায় দেখি ,১. আত্মজ, ২.স্বেদজ, ৩.উদ্ভিজ্জ, ৪. অন্ডজ ৫. জরায়ুজ।
বীজ থেকে উদ্ভিদ , ডিম্ থেকে সাপ পক্ষীকুল, জরায়ু থেকে প্রাণীসকল, । এছাড়া আরো দুটো উপায় আছে, আর সেগুলো হচ্ছে স্বেদজ ও আত্মজ । স্বেদজ অর্থাৎ উকুন ইত্যাদির জন্ম হয় ঘাম থেকে। শৈবাল , ছত্রাক ইত্যাদিও স্বেদজ । প্রথম তিনটি উপায়ে যে দেহ সৃষ্টি হচ্ছে, তা পিতা-মাতার অনুরূপ দেহ। চতুর্থটি পিতা-মাতার অনুরূপ নয়। আর সবশেষে আত্মজ উপায়ে যে জন্ম তার বিশেষ কোনো আকৃতি বিশিষ্ট নয়। এককোষী জীব, অনেক ক্ষেত্রে ফ্লাজেলা বিশিষ্ট হয়ে থাকে ।
বলা হয়ে থাকে জীবকুলের জন্মকালে বাহ্যজ্ঞান থাকে না, আবার যখন সে শরীর ছেড়ে দেয় তখনও তার বাহ্যজ্ঞানের লোপ হয়। তো যে জ্ঞান নিজবোধ রূপে হবার কথা, তা জীবের হওয়া সহজসাধ্য নয়, অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুর জ্ঞান প্রতক্ষ্য জ্ঞান নয় । আর অন্যের মুখে মিষ্টি খেলে, মিষ্টত্ব অনুভব হয় না। অন্যের মুখে ঝাল খেলে, সে ঝালের মর্ম বোঝা যায় না। ব্রহ্ম সর্ব্বব্যাপক, নিরাকার, নির্বিকার, জন্ম-মৃত্যু রোহিত। ব্রহ্মের না আছে উৎপত্তি, না আছে বিনাশ। তো যে ব্রহ্ম উৎপত্তি বিনাশের ঊর্দ্ধে সেই ব্রহ্মস্বরূপের আবার জন্ম-মৃত্যু কোথায় ?
শিব সংহিতায় বলা হয়েছে, "বিন্দুঃ শিবো রজঃ শক্তিরুভয়োর্মেলনাৎ স্বয়ম। স্বপ্রভূতানি জায়ন্তে স্বশক্ত্যা জড়রূপয়া"। (শ্লোক-৯৮) - বিন্দু হচ্ছেন শিবস্বরূপ এবং রজঃ শক্তিস্বরূপ ; উভয়ের মিলন হলে স্বয়ং আত্মা জড়রূপিণী নিজ শক্তি দ্বারা বহুরূপে প্রকাশমান হন। শিব সংহিতায় আরো বলা হয়েছে, সৃষ্টি হচ্ছে অবিদ্যার প্রকাশিত রূপ। অবিদ্যা মিথ্যে, যা জীবের স্বভাব বলে পরিচিত। বিদ্যা হচ্ছে নির্ম্মল, স্বচ্ছ আকাশ আর অবিদ্যা হচ্ছে অন্ধকার আছন্ন যা স্বচ্ছ আকাশের বাধক। এই অস্বচ্ছ আকাশ থেকে বায়ু ,অগ্নি, জল পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে। চৈতন্য থেকেই এই চরাচর বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে। প্রলয়কালে পৃথিবী জলে, জল তেজে, তেজ বায়ুতে আর বায়ু আকাশে লীন হয়। এই যে অবিদ্যারূপিণী জড় রূপ (অচেতন) মহামায়া সত্ত্ব-রজঃ-তমঃ গুন্ যুক্তা, এই তিন গুন্ সমস্ত কর্ম্মের প্রেরণাদায়িকা, ক্লেশদায়িনী , দূরতিক্রমনীয়া - শক্তি রূপে সমস্ত বস্তুকে আচ্ছাদিত করে রেখেছেন। এই মহামায়া তার বিক্ষেপ শক্তি বলে জগৎরূপ সংসারকে পরিচালনা করছেন। এই মহামায়ার যে সত্ত্বগুণ তাকে বলা হয় লক্ষ্মী, রজোগুনকে বলা হয় বিদ্যা বা সরস্বতী, আবার তমোগুণের আধিক্যে তিনি হন মা-দূর্গা।
এই শরীর জড়বস্তু, আর এই যে সত্ত্ব, রজঃ,তমঃ গুন্ বা বিদ্যা কেবল জড় বস্তুতেই প্রকাশিত হয়। জগতের এই যে জড়বস্তু তা কেবলমাত্র যথার্থ জ্ঞানের সাহায্যে রক্ষিত হচ্ছে। এখানে কেউ জ্ঞাতা, কেউ জ্ঞেয় কেউ জ্ঞান। প্রকৃতপক্ষে কোনো বস্তুরই প্রকৃত সত্তা বলে কিছু নেই। কেবল ভাসক-চৈতন্য আত্মা রূপে নিত্য বিদ্যমান। এই আত্মা জড় পদার্থ নন, কিন্তু এই আত্মা সর্ব বস্তুর মধ্যে থেকে তা ভোগ করেন। জড় পদার্থ হতে নিজ নিজ কর্ম্মে আবদ্ধ হয়ে জীব নানা নামে, নানারূপে, নানা প্রকার হয়ে থাকে। ব্রহ্মাণ্ডে (দেহে) বারবার কর্ম্ম করে ভোগ করতে থাকে। আর এই আসক্তিজনিত কর্ম্ম যেহেতু নিরন্তর চলতে থাকে, তাই জন্ম-মৃত্যুও বারবার হতে থাকে। কিন্তু নিরাসক্ত হয়ে কর্ম্ম সমাধা করলে, অর্থাৎ যখন নিজ কর্ম্ম সমূহের দ্বারা ভোগের অবসান হয় তখন জীব ব্রহ্মে লীন হয়।
বাউলদের যোগ সাধনায়, বলা হচ্ছে তাঁর (মনের মানুষ) বাস তো দ্বিদলে। কিন্তু স্বেচ্ছায় নেমে আসেন, বিশুদ্ধচক্রে, তারপর মনিপুরে, তারপরে একেবারে কুলকুন্ডলিনী যজ্ঞেশ্বরীকে নিয়ে নর্মদা নদীর কূলে দোলায় দোলায়িত হয়ে শুভ যোগের সময় মূলাধারে স্থিত হন। এবার তাঁকে উজানে নিয়ে যেতে হবে। উর্দ্ধে ওঠাতে হবে। কিন্তু কিভাবে ? অলক্ষ্যে বায়ু বা দমের শক্তিতে। এই কুম্ভক শক্তি দ্বারা তাঁকে পূর্বস্থানে নিয়ে তাঁর স্বরূপকে উপলব্ধি করতে হবে।
"তুমি বাইরে যারে তত্ত্ব (খোঁজ) কর
অবিরত সে যে আজ্ঞাচক্রের উপরে।
কুলকুণ্ডলিনী শক্তি রয় মূলাধারে
প্রণয়ের যোগে জাগাও তাহারে
শক্তি চেতন হলে পূর্ণানন্দ মিলে
তোমার সদানন্দ স্বরূপ একবার দেখো না।
বামে ইড়া নাড়ী দক্ষিণে পিঙ্গলা,
রজঃ তমঃ গুনে করিতেছে খেলা,
মধ্যে বিরাজে সুষুম্না,
তারে ধর না কেন সাদরে। "
যখন এক বস্তু থেকে অন্যবস্তু উৎপন্ন হবার সময় হয়, তখন তা বিকার। এই বিকারের ফলেই বস্তুর রূপান্তর ঘটে। দুধের বিকার হচ্ছে দই। শব্দের বিকার হচ্ছে আকাশ। কিন্তু এক বস্তুতে যখন অন্য বস্তুর ভ্রমাত্মক জ্ঞান হয়, তাকে বলে বিবর্ত্ত। যেমন সাপকে দড়ি ভাবা বা দড়িকে সাপ ভাবা। আসলে দড়ি বা সাপ যা ছিল তাই আছে, কিন্তু জ্ঞানের বিকারহেতু ভ্রমদর্শন হচ্ছে। ঠিক তেমনি ব্রহ্ম হতে যে পরিবর্তনশীল জগতের সৃষ্টি হয়েছে, সেই জগত আসলে অপরিবর্তনীয় ব্রহ্ম কিন্তু পরিবর্তনশীল জগৎ বলে ভ্রম হচ্ছে। এই যে সৃষ্টি একে মানস সৃষ্টি বলা হয়। মন থেকে যখন এই ভ্রমজ্ঞান দূর হয়ে যায়, তখন সেই সৎবস্তুর দর্শন মেলে। মূল প্রকৃতির সঙ্গে সচ্চিদানন্দ ব্রহ্মের কোনো ভেদ নেই। শক্তির সঙ্গে শক্তিমানের কোনো ভেদ নেই। মায়ার সংকুচিত অবস্থাই ব্রহ্মভাব। আর সংকুচিত থাকার ফলে তা অগোচর।
এই দেহভান্ড ও ব্রহ্মান্ড একই নিয়মের অধীন। একই রূপ-গুনের সমাবেশে নির্মিত হয়েছে। এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু আছে, তার সব কিছুই আনুপাতিক হারে দেহভাণ্ডেও আছে। মোট কথা ত্রিলোকের মধ্যে যা কিছু যেভাবে আছে, দেহের মধ্যেও সেসব দ্রব্য মেরু অবলম্বন পূর্বক অবস্থান করে স্ব-স্ব ধর্ম্ম পালন করছে। এই মনুষ্য শরীরেই সপ্তদ্বীপ-সমন্বিত মেরু-পর্বত, নদনদী সমূহ, সমুদ্রসকল, পর্বতসমূহ, ক্ষেত্রসমূহ, ক্ষেত্রপালগন, ঋষি-মুনিবর্গ, গ্রহ-নক্ষত্র, পুণ্যতীর্থসকল, পীঠস্থানসমূহ, ও পীঠদেবতাগন অধিষ্ঠান করছেন। এই শরীরেই সৃষ্টি ও সংহারকারী রবি-শশী সর্বদা ভ্রমন করছে।
পৃথিবীর গুন্ বা বিকার, অস্থি, চর্ম্ম, নাড়ী লোম ও মাংস রূপে বিদ্যমান। জলের যে বিকার তা মল, মূত্র, শুক্র , শ্লেষ্মা, ও শোণিত আকারে শরীরে রয়েছে। তেজের বিকার যা আমাদের শরীরে রয়েছে তা হচ্ছে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, নিদ্রা,মোহ, ক্ষান্তি। বায়ুর বিকার বা গুন্ আমাদের শরীরে বিরোধ, আক্ষেপন, আকুঞ্চন, ধারণ ও তৃপ্তি। আকাশের গুন্ - রাগ, দ্বেষ, মোহ, ভয়, লজ্বা - শরীরের মধ্যে বিদ্যমান।
প্রাণবায়ুর বায়ুর অবস্থা বিশেষ হচ্ছে প্রাণ, অপান, সমান, উদান , ব্যান, এবং নাগ, কূর্ম্ম, কৃকর, দেবদত্ত, ধনঞ্জয়। প্রাণ হৃদয়ে, অপান গুহ্যদেশে, নাভিতে সমান, কন্ঠে উদান, সর্ব্ব শরীরে ব্যান। নাগ, কূর্ম্ম, কৃকর, দেবদত্ত, ধনঞ্জয়, জীব বা চৈতন্যস্বরূপ এই পাঁচটি বায়ু সহস্র নাড়ীর মধ্যে পাঁচটি নাড়ীতে অবস্থান করে। ললাট, উরঃ, স্কন্ধ, হৃদয়, নাভি, ত্বক, ও অস্থিতে এই পঞ্চবায়ুর অবস্থিতি।
সপ্তপাতাল - দেহের অধোভাগে অতল, উর্দ্ধভাগে-বিতল, জানুদ্বয়ে সুতল, সন্ধিরন্ধ্রে তল, গুদমধ্যে তলাতল, লিঙ্গমূলে রসাতল, পাদের অগ্রভাগে ও কটির সন্ধি-স্থলে পাতাল।
সপ্তলোক - নাভিদেশে ভুর্লোক, হৃদয়ে ভুবর্লোক, কণ্ঠদেশে স্বর্লোক, চক্ষুদ্বয়ে মহর্লোক, ভ্রুদ্বয়ে জনলোক, ললাটে তপলোক, মস্তকে অর্থাৎ সহস্রারে সত্যলোক। এই সপ্তলোক ও সপ্তপাতাল মিলে চতুর্দশ ভুবন।
সপ্তপর্ব্বত - ত্রিকোণে (মূলাধারচক্রের মাধ্যস্থলে যে ত্রিকোণ) মেরুপর্ব্বত, ঊর্ধ্বকোনে মন্দর, দক্ষিণ কোনে কৈলাশ, বাম কোনে হিমালয়, উর্দ্ধভাগে বিন্ধ্য ও বিষ্ণু পর্বত।
সপ্তদ্বীপ - অস্থিস্থানে জম্বুদ্বীপ, মাংসে কুশদ্বীপ, শিরাসমূহে ক্ৰৌঞ্চদ্বীপ, রক্তে শাকদ্বীপ, সমস্ত সন্ধিদেশে শাল্মলী দ্বীপ, লোমপূর্ন স্থানে - প্লক্ষদ্বীপ, নাভিতে পুস্কর দ্বীপ।
সপ্তসাগর - মূত্রে লবন সমুদ্র, শুক্রে ক্ষীরোদসাগর, মজ্জায় দধিসাগর, চর্ম্মে ঘৃত সাগর, বসা (যার দ্বারা শরীর আবৃত হয় অর্থাৎ মজ্জা, মেদ, চর্ব্বি) জলসাগর, কটিরক্তে ইক্ষুসাগর এবং শোণিতে সুরাসাগর অবস্থিত।
নবগ্রহ- নাদচক্রে সূর্য, বিন্দুচক্রে চন্দ্র, চক্ষুতে মঙ্গল, হৃদয়ে বুধ, উদরে বৃহস্পতি, শুক্রে শুক্র, নাভিচক্রে শনি, মুখে রাহু,পদ ও নাভিতে কেতু।
রত্নসার গ্রন্থে বলা হয়েছে :
ভান্ডকে জানিলে জানি ব্রহ্মান্ডের তত্ত্ব
ভান্ড বিচারিলে জানি আপন মাহাত্ম্য।
আপনা জানিলে জনি বৃন্দাবনতত্ত্ব
ভান্ড হইতে জানি জত (উৎপন্ন) কৃষ্ণের মহিমা।
ভন্ড হইতে জানি রাধা-প্রেমতত্ত্ব-সীমা।
নিজেকে নিজেই চিনতে হবে। আত্মনং বিদ্ধি। এই হচ্ছে সাধনার মূল। প্রাণ-অপান বায়ুর ক্রিয়া দ্বারা সৃষ্টিরূপা সুসুপ্তা কুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগ্রত করে সুষুম্নার মধ্যে দিয়ে ক্রমাগত উর্দ্ধে নিয়ে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর অবস্থা প্রাপ্ত করাতে পারলে স্থুল জীবশক্তি ত্রিগুণাতীত পরম অবস্থা বা ব্রাহ্মস্থিতি লাভ করতে পারে। তো দেহের মধ্যেই পরমতত্ত্বের বাস, তাই দেহকে অবলম্বন করেই আমাদের সাধনা করতে হবে। কিন্তু তার আগে জেনে নেবো "মম যোনির্মহদ ব্রহ্ম" মহদ ব্রহ্ম ভগবানের যোনী - ব্যাপারটা কি ?
আমরা এর মধ্যে বুঝে গেছি, আত্মা প্রকৃতিস্থ হলে মনের প্রকাশ ঘটে, আর মনের সংকল্প হেতু এই প্রপঞ্চময় জগৎ সৃষ্টি হয়েছে। তো যতক্ষন যোগী মন-বুদ্ধি-ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে লিপ্ত থাকেন, ততক্ষন ত্রিলোক বর্ত্তমান। আত্মা সর্ব্বব্যাপক, সর্ব্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ ও সুক্ষ। আবার এই সূক্ষ্মের সূক্ষ্ম-অংশ অতিসূক্ষ্ম অনুর মধ্যে প্রবেশ করতে পারলে, সাধক অনুভবে এই ত্রিলোকের দর্শন পান। ব্রহ্ম -অনুর ছয় ভাগের এক ভাগ এই মর্ত্যলোক। এই অনুর মধ্যেই সব। এই অণুই ব্রহ্মযোনি। যোনি কথাটার অর্থ উৎপত্তি স্থান। যোগীগণ বলে থাকেন, আজ্ঞাচক্র পর্যন্ত গুনের স্থান। আবার এই আজ্ঞাচক্রই ব্রহ্মযোনি। এই আজ্ঞাচক্র থেকে মনের অবতরণ মানে সংসারযাত্রা। আর এখানে স্থিতি লাভ করতে পারলেই , গুণাতীত অবস্থা প্রাপ্ত হওয়া যায়। এই আজ্ঞাচক্রই যোগমায়ার পুর। এই পুরে যিনি বাস করেন, তিনি উত্তমপুরুষ, মহেশ্বর। এই মহেশ্বরের সঙ্গে আদ্যাশক্তি নিত্যলীলা করছেন। কিন্তু গুণাতীত ব্রহ্ম বা পরশিব বাক্য-মনের অতীত। এখানে প্রকৃতি বা পুরুষ কেহই নেই। এখানে শিব ও শক্তি সম্মিলিত ভাবে সমাহিত। একেই বলা হয় অর্ধনারীশ্বর-ভাব।
ব্রহ্ম যতক্ষন মায়াকে স্বীকার না করেন, ততক্ষন তিনি নির্গুণ। মায়াতে উপস্থিত হয়ে ব্রহ্ম সগুন হন। ব্রহ্ম যখন কলাযুক্ত হন, অর্থাৎ মূল-প্রকৃতিতে উপস্থিন থাকেন, তখন শক্তির আবির্ভাব হয়। এই শক্তিই আদ্যাশক্তি নামে অভিহিত হন। এই আদ্যাশক্তি সচ্চিদানন্দ ব্রহ্মের সঙ্গে একীভূত। এখানে গুনের সাম্যাবস্থা থাকে। মূল যে প্রকৃতি তার মধ্যে কোনো বিকৃতি নেই। কিন্তু কালের সাহচর্যে এসে, আদ্যাশক্তিতে গুনের ক্ষোভ দেখা যায়। মূল প্রকৃতি থেকে চার প্রকার সৃষ্টি হয়ে থাকে ১. অদৃষ্ট সৃষ্টি, ২. বিবর্ত সৃষ্টি বা মানস সৃষ্টি ৩. পরিনাম সৃষ্টি ৪. যোগিকী সৃষ্টি।
অদৃষ্ট সৃষ্টি - যা দেখা যায় না। অর্থাৎ অব্যক্ত।
বিবর্ত সৃষ্টি - যখন এক বস্তু থেকে অন্য বস্তু উৎপন্ন হয়, কিন্তু পূর্ব্বের বস্তুর কোনো পরিবর্তন হয় না। এটি আসলে ভ্রমাত্মক জ্ঞান থেকে হয়ে থাকে। অর্থাৎ মরীচিকাকে জল বলে ভাবা। এখানে জল নতুন কোনো বস্তু নয়, অথচ দৃশ্যমান হচ্ছে। আর মরীচিকা মরীচিকায় থেকে যাচ্ছে।
পরিনাম সৃষ্টি - যখন একটা বস্তুকে রূপান্তরিত করে অন্য বস্তুতে পরিণত করা হয়। যেমন দুধ থেকে দই, ছানা ইত্যাদি। এখানে মূল বস্তুর রূপ পরিবর্তন হচ্ছে। এমনকি গুনেরও পরিবর্তন হচ্ছে।
যোগিকী সৃষ্টি - অহং তত্ত্ব থেকে একাদশ ইন্দ্রিয়, ও পাঁচ তন্মাত্র। আবার পাঁচ তন্মাত্র থেকে পঞ্চভূত। অর্থাৎ এক বা একাধিক মূল বস্তু থেকে একাধিক বস্তুর সৃষ্টি।
অদৃষ্টের কারনে, যখন জীবের ভোগকাল উপস্থিত হয়, তখন আদ্যাশক্তি বা মূল প্রকৃতিতে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এই ক্ষোভ তমঃগুণযুক্ত হয়ে থাকে। এইসময় চৈতন্য যুক্ত শক্তি এই তমোগুণের মধ্যে প্রবেশ করে। এই তমোগুণই মহাকাল সংস্পর্শে মা-দূর্গা। প্রলয় কালে এই তমোগুণ আবার রজঃগুনে, রজঃগুন আবার সত্ত্বগুনে প্রবেশ করে। জগতে যেমন স্ত্রী-পুরুষের মিলনে সন্তান উৎপাদন হচ্ছে, তেমনি মহাকাল ও আদ্যাশক্তি মিলনে জগতের সৃষ্টি হচ্ছে।
প্রকৃতিতে যখন মহাকালের সংযোগ ঘটে তখন মহৎ-তত্ত্ব বা নাদের উৎপত্তি হয়। এই মহৎ-তত্ত্বই হিরণ্যগর্ভ। তাই হিরণ্যগর্ভকে বা নাদকে প্রথম সৃষ্টি বলা হয়ে থাকে। এই হিরণ্যগর্ভ থেকেই গুন্ ভেদে অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ তমঃ এই তিন গুন্ ভেদে তিন মূর্ত্তি কল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ ব্রহ্মা (সত্ত্ব) বিষ্ণু (রজঃ) মহেশ্বর (তমঃ) . এই মহেশ্বর রুদ্র নামে পরিচিত। ব্রহ্মা হচ্ছেন, ইচ্ছাশক্তি স্বরূপ, বিষ্ণু হচ্ছেন ক্রিয়াশক্তি স্বরূপ, এবং রুদ্র হচ্ছে জ্ঞানশক্তি স্বরূপ। তো এই তিন শক্তি হতেই সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় চলছে। যোগশাস্ত্রে এই ত্রিশক্তিকে বিন্দু, বীজ ও নাদ বলা হয়ে থাকে।
তো "মম যোনির্মহদ ব্রহ্ম" মহদ ব্রহ্ম ভগবানের যোনী - ব্যাপারটা কি, তা হয়তো কিছুটা বোঝা গেলো। এই মহৎ-ব্রহ্মে যে গর্ভধান তা আসলে বিবর্ত সৃষ্টি। এখানে মূল সত্ত্বা থাকে অবিকৃত। কেবল অবিদ্যার কারনে এই সৃষ্টি দৃষ্ট হয়ে থাকে। এই মহদব্রহ্ম রূপ যোনিতে প্রবেশের ফলে ব্রহ্মের বহুরূপে প্রকাশ লক্ষিত হয়। ব্রহ্মা হচ্ছেন সমষ্টি মন। আর এই যাকিছু সৃষ্টি তা এই সমষ্টি-মনের দ্বারা সৃষ্ট হয়ে থাকে। ব্রহ্মা হচ্ছেন সমষ্টি মন, যা আসলে ইচ্ছেশক্তি। মন না থাকলে জগৎ অদৃশ্য হয়ে যাবে।
সাধন ক্রিয়া করতে করতে যাঁরা উত্তম অবস্থায় উন্নীত হয়েছেন, তাদের মন বলে কিছু অবশিষ্ট থাকে না। আর মন না থাকলে সংকল্প থাকে না। জীবের মৃত্যুকালে জীবের মধ্যেই উৎপত্তির বীজ সুপ্ত হয়ে থাকে। তাই মৃত্যুর পরে আবার জন্ম হয়। কিন্তু সাধনযোগে যখন ইচ্ছাশক্তির লোপ হয়, তখন আর জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হতে হয় না। কাম-কর্ম্ম অনুযায়ী জীবকে অদৃষ্ট ভোগ করবার জন্য ভোগ্যক্ষেত্রের সাথে সম্মন্ধ গড়বার যে চেষ্টা তাকেই গর্ভধান ক্রিয়া বলা হয়ে থাকে। আর এই গর্ভধান কর্ত্তা হচ্ছেন স্বয়ং ব্রহ্ম - সমষ্টিমন।
সর্বযোনিষু কৌন্তেয় মূর্তয়ঃ সম্ভবন্তি যাঃ
তাসাং ব্রহ্ম মহদযোনিরহং বীজপ্রদ পিতা। (১৪/০৪)
শব্দার্থ : সর্বযোনিষু - সব যোনিতে ; কৌন্তেয় - কুন্তীপুত্র ; মূর্তয়ঃ - মূর্তি সমূহ ;সম্ভবন্তি -উৎপন্ন হয় ;যাঃ- যে সমস্ত; তাসাং-তাদের সকলের ; ব্রহ্ম- আত্মা বা ব্রহ্ম ; মহদযোনি - মহৎ-তত্ত্বরূপী যোনি ; অহং - আমি ; বীজপ্রদ - বীজপ্রদানকারী ; পিতা- পিতা। (১৪/০৪)
বঙ্গানুবাদ : হে কৌন্তেয়, সর্ব্ব যোনিতে যে সকল মূর্ত্তিসমূহ উৎপন্ন হয়, মহদ্ব্রহ্ম তাদের মাতৃস্থানীয়া আর আমি বীজদাতা পিতা।
বিস্তার : যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, সমস্ত যোনিতে তা সে মনুষ্যকূলে হোক বা দেবকূলে হোক, পশুকূলে হোক, সমস্ত মূর্ত্তি বা রূপ সেই ব্রহ্মযোনি হতে উৎপন্ন। আর এই ব্রহ্মযোনিতে (হিরণ্যগর্ভে) বীজ প্রদানকারী পিতা স্বয়ং আমি (আত্মা) । আমরা যোনী বলতে মায়ের শরীরের বিশেষ অঙ্গকে বুঝে থাকি। যেমন প্রাণ বলতে আমরা জল বা বায়ুকে বা সূর্য্যরশ্মিকে বুঝে থাকি। আসলে এই প্রাণ কিন্তু অতিসূক্ষ্ম যা বায়ু জল বা রশ্মির সঙ্গে মিশে আছে। তেমনি স্থুল শরীরের অভ্যন্তরে আমাদের আজ্ঞাচক্রে যে সুষুম্নার দ্বারমুখ রয়েছে, তাকে বলা হয় ব্রহ্মযোনি। মায়ের গর্ভ থেকে বেরিয়ে এসে, শিশু যেমন সংসারের মধ্যে প্রবেশ করে, তেমনি বিশ্বশক্তি মস্তকের বিন্দু থেকে সহস্রার হয়ে আজ্ঞাচক্রে প্রবেশ করে। এখান থেকে নিচের দিকে যত নামতে থাকে, তত সে সংসারের মধ্যে আবদ্ধ হয়। বিশুদ্ধ, অনাহত,মনিপুর স্বাধিষ্ঠান হয়ে মূলাধারে এসে স্থিত হয়। তো জাগতিক সৃষ্টিক্রিয়া আমরা এই নিম্নভূমি থেকে প্রকাশমান হতে দেখি। দেখুন সব মূর্ত্তিই ব্রহ্ম থেকে এসেছে, ব্রহ্ম না থাকলে কোনো কিছুরই উৎপত্তি হাওয়া সম্ভব হতো না। সমস্ত জীবকুলের মধ্যেই এই মহৎ-যোনি রয়েছে। সাধন ক্রিয়ার উত্তম অবস্থায় এই উপলব্ধি হয়ে থাকে। দেখুন, আমরা সবাই শুনে থাকি, আমরা সবাই ব্রহ্ম, কিন্তু এই উপলব্ধি আমাদের নেই। এই ব্রহ্ম আবার সর্বত্র বিদ্যমান। কিন্তু আমাদের মতো সাধারনের কাছে, এই জ্ঞানের প্রকাশ হয় না। যোনি থেকে যখন ব্রহ্ম প্রকাশমান হয়, তখন তা অহংজ্ঞানে পরিণত হয়। আর সাধনক্রিয়ার ফলে যখন এই অহং জ্ঞানের লোপ পায়, তখন এই ব্রহ্মজ্ঞানের উদয় হয়। অর্থাৎ এই অহং-এর মধ্যেও সেই তিনি, আবার অহং-এর বাইরেও সেই তিনি। এই অহং-ই কূটস্থে চৈতন্য রূপে প্রতিবিম্বিত হন। আবার এই অহং-ই ব্রহ্মানুরূপে সর্বত্র ব্যাপ্ত। পিতার মধ্যে যেমন পুত্র, তেমনি সেই পুত্রের মধ্যে পিতৃত্ত্ব বিরাজ করছে। মায়ের মধ্যে কন্যা, কন্যার মধ্যে মা বা মাতৃত্ত্ব । আপনার মধ্যে আপনি প্রবেশ করতে না পারলে, এই জ্ঞানের প্রতক্ষ্য অনুভূতি সম্ভব নয়।
সাধন ক্রিয়ার পরাবস্থায় কূটস্থ জ্যোতির প্রকাশ, আবার উল্টোভাবে জ্যোতি থেকে কূটস্থ প্রকাশ পাচ্ছে। তো কূটস্থের জ্যোতি আর ক্রিয়ার উত্তম অবস্থা কেবল, মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। আমিটি কখনো বীজরূপে সংকুচিত, আবার ব্রহ্মনুরূপে সবত্র প্রবিষ্ট। সমুদ্র মধ্যে বুদ্বুদ-এর জন্ম হচ্ছে, আবার বুদ্-বুদ্ থেকে সমুদ্র। বিন্দু বিন্দু জলই সমুদ্র, আবার সমুদ্র বিন্দুবিন্দু জল ছাড়া কিছু নয়।
এই যে প্রকৃতি প্রদত্ত স্থুল, সূক্ষ্ম, কারন শরীর, এই প্রকৃতি পরমাত্মার উপাধি মাত্র। এই প্রকৃতির মধ্যেই চলছে চৈতন্যের খেলা। এই খেলাই আসলে জীবভাব। প্রকৃতি ও পুরুষ একই, কিন্তু যখন পুরুষের মধ্যে ত্রি-গুনের সমাহার দেখা যায়, তখন তা প্রকৃতি। আর গুনরহিত হলেই পুরুষ নামে আখ্যায়িত হয়। আবার প্রকৃতির মধ্যে যখন তম গুনের প্রভাব থাকে, তখন বস্তু সমূহ দৃশ্যমান হয়, আবার সত্ত্ব ও রজঃ গুনের যখন সমাহার হয়, তখন জীবভাব লক্ষিত হয়। প্রকৃতির মধ্যে যখন শুধু সত্ত্ব গুনের প্রভাব থাকে তখন তা দেবভাবের হয়ে থাকে। আবার আত্মা প্রকৃতিস্থ হলেই মনের দ্বারা আবিষ্ট হয়। অর্থাৎ আত্মা ও প্রকৃতি থেকেই মন। আর এই মনের বিক্ষিপ্ততার কারণেই সমস্ত সৃষ্টি কার্য্য চলছে।
সাধন ক্রিয়ার পরাবস্থাতে প্রাণের স্থিরতা, মনের স্থিরতা প্রাপ্ত হয়ে আজ্ঞাচক্রে স্থিত হতে পারলেই, জীব প্রকৃতির হাত থেকে মুক্ত হয়ে যায়। তখন সাম্যাবস্থা - না সৃষ্টি - না লয়। সাধক যতক্ষন এই আজ্ঞাচক্রে স্থির না হতে পারছেন, ততক্ষন প্রকৃতির অধীন থেকে জাগতিক সুখ-দুঃখ ভোগ করে থাকেন। আজ্ঞাচক্র হচ্ছে মধ্যাবস্থা, যেখান থেকে উপরে উঠতে পারলে, নির্গুন অবস্থা প্রাপ্ত হওয়া যায়। গুণাতীত অবস্থা সৃষ্টির উর্দ্ধে। তখন এক পরমানন্দ অবস্থা, এখানে না সৃষ্টি না ক্ষয়। যাইহোক, আমাদের আজ্ঞাচক্রই ব্রহ্মযোনি বা মহদব্রহ্মের স্থান। এখান থেকেই ভূতাদির উৎপত্তি। বিশুদ্ধিতে বাক, হৃদয়ে ইচ্ছে - ধীরে ধীরে নিচের দিকে এই ইচ্ছেকে কার্যকরী করবার জন্য কার্য্য-সৃষ্টি। এ এক বিষ্ময়কর বিষয়, যা বিচারের দ্বারা বোধগম্য হয় না, কেবল সাধক সাধনার সাহায্যেই এই উপলব্ধি করে থাকেন, এবং যা তার ব্যক্তিগত অনুভূতি মাত্র। এই অনুভূতির কোনো ভাগ হয় না। আমরা অসীম ভাগ্যবান, যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই উপল্বদ্ধিকে জগতের কাছে তুলে ধরেছেন। আর আমরা অজ্ঞান এই জ্ঞানের আস্বাদন প্রতক্ষ্য না হলেও, অ-প্রতক্ষ্য ভাবে কিঞ্চিৎ উপলব্ধি করছি।
সত্ত্বং রজস্তম ইতি গুণাঃ প্রকৃতিসম্ভবাঃ
নীবধ্নতি মহাবাহো দেহে দেহিনম-অব্যয়ম। (১৪/০৫)
শব্দার্থ : সত্ত্বং রজস্তম : সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ, ইতি গুণাঃ -- এই গুন্ সমূহ, প্রকৃতি সম্ভবাঃ - প্রকৃতি থেকে জাত, নীবধ্নতি - আবদ্ধ করে, মহাবাহো - মহাবাহো অর্থাৎ অর্জ্জুন, দেহে দেহিনম-অব্যয়ং - অবিনাশী আত্মাকে দেহে।
বঙ্গানুবাদ : হে মহাবাহো, এই সত্ত্ব, রজঃ তমঃ প্রকৃতি থেকে জাত। এই তিনগুন অবিনাশী আত্মাকে দেহের মধ্যে অবদ্ধ করে থাকে।
বিস্তার : অবিনাশী আত্মা জন্ম-জরা মৃত্যু রহিত যা দেহের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে আছে। আর দেহ জন্ম-জরা-মৃত্যুর অধীন। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, প্রকৃতি থেকে জাত তিনটি গুনের কারনেই আত্মা দেহের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে আছেন। এই তিনটি গুন্ হচ্ছে সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ, যা আসলে প্রকৃতির গুন্ এবং এই প্রকৃতিজাত দেহরূপ বস্তুর মধ্যেই কেবল প্রকাশিত হয়ে থাকে।
এখন কথা হচ্ছে, এই গুন্ কোথা থেকে আসে আর কেনই বা আসে ? আসলে প্রকৃতি ও তার গুনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। শক্তিমানের মধ্যে যেমন শক্তি অন্তর্নিহিত, তেমনি প্রকৃতির মধ্যে প্রকৃতির গুন্ অন্তর্নিহিত থাকে। শক্তিমান যদি নিঃশ্চুপ থাকে তবে তার মধ্যে যে গুন্ আছে, তা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। তেমনি প্রকৃতি যখন নিঃশ্চুপ অর্থাৎ সাম্যের মধ্যে অবস্থান করে, তখন তার এই গুনের প্রকাশ ঘটে না। কিন্তু এই প্রকৃতির মধ্যে যখন বৈষম্যে বা বিক্ষুব্ধ ভাব দেখা যায়, তখন তার গুনের প্রকাশ হতে থাকে। খোঁচা খেয়ে, রেগে গেলে, শক্তিমানের শক্তির প্রকাশ দেখা যায়। মৌচাকে ঢিল পড়লে, মৌমাছি সারা আকাশ ছেঁয়ে ফেলে। তো দেহ যেহেতু প্রকৃতিজাত, তাই দেহের মধ্যে প্রকৃতির গুন্ বর্ত্তমান। আর এই দেহ সৃষ্টির কারন হচ্ছে চঞ্চলতা। গুণীর গুন্, শক্তিমানের শক্তি, জ্ঞানীর জ্ঞান, আসলে সবার মধ্যেই অন্তর্নিবিষ্ট থাকে। যতক্ষন প্রকৃতির মধ্যে এই গুন্ সুপ্ত থাকে, ততক্ষন তাকে নির্গুণ, নিস্পন্দিত অবস্থায় দেখা যায়। এই অবস্থা হচ্ছে সাম্যভাব। অর্থাৎ তখন প্রকৃতি ও পুরুষ একে অন্যের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে থাকে।
যোগী পুরুষগন বলে থাকেন, দেহের মধ্যে আছে ইড়া-পিঙ্গলা-সুষুম্না নাম্নী নাড়ী। প্রকতির গুণসূমুহ এই নাড়ীর মধ্যে আরূঢ় হয়ে পঞ্চতত্ত্ব, মন, বুদ্ধি অহঙ্কার রূপে অবস্থান করছে।
বিশেষ জ্ঞানীব্যক্তিগন বলে থাকেন, কোনো এক আকস্মিক কারনে, কতকগুলো উপাদান একত্রিত হয়ে অ্যামিবার অর্থাৎ প্রথম এককোষী প্রাণীর সৃষ্টি হয়েছিল। এই যে আকস্মিক কারন, এর কারন এই বিশেষ গ্যাক্তি ধরতে পারেন নি আজও। কিন্তু হাজার হাজার বছর আগেই এর খোঁজ ,দিয়েছেন ব্রহ্মজিজ্ঞাসু মুনি ঋষি গন। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে (শ্লোক - ১/৩) বলা হয়েছে, মুনি-ঋষিগন ধ্যানস্থ হয়ে উপলব্ধি করলেন, জ্যোতির্ময় পরমাত্মার শক্তিই এই জগতের কারণ । মায়া তাঁর তিন গুনের সাহায্যে সেই পরমাত্মাকে যেন বিশ্ব থেকে আলাদা করে রেখেছে। আসলে এই উপলব্ধি মনের গভীর থেকে আপনা-আপনি ফুটে ওঠে। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর মনের গভীরে গ্রথিত থাকে। মন যখন ধ্যানস্থ হয়ে একমুখী হয়, তখন ধ্রুব-সত্য চেতনার স্তরে ভেসে ওঠে।
তাঁরা বলছেন, ব্রহ্ম ও মায়া দুটো পৃথক সত্তা নয়। ব্রহ্ম যখন ব্যক্ত তখন তাকে আমরা মায়া বা প্রকৃতি বলে থাকি। এই মায়া নিগূঢ়। অর্থাৎ নিজের গুন্ দিয়ে নিজেকে ঢেকে রেখেছেন। এই গুন্ হচ্ছে সত্ত্ব রজঃ, তমঃ। সত্ত্ব হচ্ছে শান্ত ভাব, সাম্যাবস্থা,বা প্রজ্ঞা। রজঃ হচ্ছে তেজ বা কর্ম্মতৎপরতা আর তমঃ হচ্ছে জড়তা বা নিষ্ক্রিয়তা। এই তিন গুনের কারনেই মানুষের মধ্যে এতো প্রভেদ। এই যে বিশ্ব-প্রপঞ্চ, এসবই এই তিন গুনের ভিন্নতা ছাড়া কিছু নয়। এই গুণগুলো একটা আরেকটার উপরে কাজ করে চলেছে। এইজন্যই ব্রহ্ম আমাদের দৃষ্টির বাইরে থেকে যাচ্ছেন। উপনিষদ বলছেন, "কালাত্মযুক্তান্যধিতিষ্ঠত্যেকঃ" (শ্বে ১/৩) "কাল-আত্মা-যুক্তানি অধিষ্ঠিতি একঃ" অর্থাৎ কেবল একই আছেন। কাল-আত্মা এককথায় সকল বস্তুর উৎসই সেই এক পরমব্রহ্ম। ইনিই সবকিছুর নিয়ামক।
পুকুরের মধ্যে চাঁদের ছায়া। জল বাতাসের কারনে ঢেউয়ের সৃষ্টি করছে। আমাদের মনে হচ্ছে, চাঁদ কাঁপছে, চাঁদের আলো কাঁপছে । তেমনি ব্রহ্মকিরণ মায়ার আকাশে ভাসছে, আর মায়া ত্রিগুণের বশবর্তী হয়ে চঞ্চল হচ্ছে। আর চিরস্থির ব্রহ্মকে অস্থির মনে হচ্ছে। প্রকৃতির বিক্ষুব্ধতার কারনে প্রাণ চঞ্চল হচ্ছে, আর প্রাণের চঞ্চলতার কারনে এই সৃষ্টি হচ্ছে। চঞ্চল প্রাণই সত্ত্ব-রজঃ-তমঃ-গুনরূপে ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না বাহিত হয়ে পঞ্চতত্ত্ব, মন, বুদ্ধি অহংকার হিসেবে এই জগৎ খেলায় মেতেছে। এইসময় সমস্ত বস্তুতে আত্মবোধ হওয়ায় এদের প্রতি ক্ষেত্রজ্ঞ আসক্তিপূর্ণ দৃষ্টিপাত করে থাকেন। আর ঠিক এই আসক্তির কারণেই, নিত্যমুক্ত সেই অবিনাশী আত্মা দেহের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েন । তখন আত্মা দেহকে আপনা ভেবে দেহের মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে পড়েন । তখন এই দেহকেই সর্বস্ব ভেবে, স্বরূপকে বিস্মৃত হয়ে যায়। আবার জ্ঞানের উদয় হবার সঙ্গে সঙ্গে তার স্বরূপ অর্থাৎ নিত্য-শুদ্ধ-মুক্ত স্বভাবকে প্রাপ্ত হন। তো যত গোলমাল, এই প্রাণের চঞ্চলতাহেতু ঘটে থাকে। তাই সাধক যোগী, এই প্রাণকে চঞ্চলতা থেকে মুক্ত করে, স্থির হতে সাহায্য করেন। আর প্রাণ স্থির হলে, মন স্থির হয়, স্থির প্রাণ-মন মানেই শুদ্ধ। এখানে আর আবিলতা দেখা যায় না। সূক্ষ্ম প্রাণ সুষুম্না পথে উর্দ্ধগামী হয়ে আজ্ঞাচক্রে নিজ মহিমায় বিরাজ করেন। তখন সমস্ত সম্মন্ধ থেকে মুক্ত হয়ে স্ব-মহিমায় আত্মস্থ হয়ে যান। তখন না থাকে এই প্রপঞ্চময় জগৎ, না থাকে, জাগতিক সুখ দুঃখের অনুভূতি।
তত্র সত্ত্বং নির্ম্মলত্বাৎ প্রকাশকম-অনাময়ম
সুখ সঙ্গেন বধ্নাতি জ্ঞান সঙ্গেন চ অনঘ। (১৪/০৬)
শব্দার্থ : তত্র -অর্থাৎ সেই গুন্ সুমুহের মধ্যে, সত্ত্বম - সত্ত্বগুণ, নির্ম্মলত্বাৎ - সবথেকে নির্ম্মল হবার ফলে, প্রকাশকম- প্রকাশকারী, অনাময়ম - নিরুপদ্রব, সুখ সঙ্গেন - সুখ সঙ্গের দ্বারা, বধ্নাতি - বন্ধনযুক্ত করে, জ্ঞান সঙ্গেন - গুণ সঙ্গের দ্বারা, চ - ও, অনঘ- হে নিষ্পাপ।
বঙ্গানুবাদ : হে নিষ্পাপ, (অর্জ্জুন) সেই সকলের মধ্যে নির্ম্মল বলে প্রকাশশীল, নিরুপদ্রব সত্ত্বগুণ আত্মাকে সুখাসক্তি ও জ্ঞানাসক্তি দ্বারা বন্ধন করে।
বিস্তার : যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে সত্ত্বগুণের (নির্ম্মল জ্ঞানের) অধিকারীও কিভাবে বন্ধনযুক্ত হন, সেই সম্পর্কে বলছেন। আমরা শুনেছি, তমঃগুণ, জ্ঞানকে আবৃত করে রাখে, রজঃগুন্ জ্ঞানের বিভ্রান্তি ঘটাতে পারে। অর্থাৎ রজঃ ও তমঃ গুন্ বস্তুর যথার্থ রূপকে প্রকাশে সাহায্য করে না। কিন্তু সত্ত্বগুন্ বস্তুর যথার্থ রুপকে প্রকাশ করে। আর এর ফলে, আমরা কোন বস্তুকে গ্রহণ করতে হবে, আর কোন বস্তুকে ত্যাগ করতে হবে, তা আমরা যথার্থভাবে বিচার করতে সমর্থ হই। এইজন্য সত্ত্বগুনকে বলা হয় উপদ্রপশুন্য। অর্থাৎ এখানে অজ্ঞান নেই, আবার ভ্রমাত্মক জ্ঞান নেই। মহাত্মাগণ বলছেন, মানুষের অন্তরে সত্ত্বগুণের কারনে যে জ্ঞানের প্রকাশ ঘটে, তা মিশ্ৰজ্ঞান। কারন এই জ্ঞানের মধ্যে কিঞ্চিৎ রজস্তমঃ ভাব মিশ্রিত থাকে। এই মিশ্র জ্ঞানের প্রকাশে জ্ঞানীর মধ্যে জ্ঞানের গরিমা, যা আসলে সুখদায়ক বলে মনে হয়। অর্থাৎ সত্ত্বজ্ঞানের অধিকারী জীব খণ্ডিত সুখে আবদ্ধ হন। আমি সব জানি, সবাই আমাকে মহাপুরুষ বলে থাকে ইত্যাদি ইত্যাদি মধুবাক্য জ্ঞানীকে সুখের ছোঁয়া এনে দেয়। এমনকি এই জ্ঞান আহরণের জন্য নিরন্তর প্রয়াস করে থাকেন। অর্থাৎ এই জ্ঞানের প্রতি তার একটা আসক্তি জন্মায়। আর এই প্রয়াস ততদিন থাকে, যতদিন তাঁর অখন্ড জ্ঞান হচ্ছে না । অর্থাৎ আত্মজ্ঞান হচ্ছে অখণ্ডজ্ঞান। কিন্তু সত্ত্বগুণীর মধ্যে খণ্ডিত জ্ঞানের, যেমন কোনটা ধর্ম্ম আর কোনটা অধর্ম্ম সমস্ত বিষয়েই তিনি অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন । আর এই দ্বিবিধ জ্ঞানের আকর্ষনে তিনি যেমন অন্তর্জগতের দিকে দৃষ্টিপাত করেন, তেমনি আবার বহির্বিশ্বের দিকেও তাঁর দৃষ্টিপাত ঘটে থাকে। আত্মা বিষয়ে আলোচনা, ধর্ম্মশাস্ত্র, দর্শনশাস্ত্র, এমনকি পদার্থ বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, শরীরবিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান সংগ্রহের আগ্রহ দেখা যায়। এই জ্ঞানসংগ্রহের নেশা ত্যাগ করাও বেশ কঠিন।
আসলে আত্মবিষয়ক জ্ঞান, এবং আত্মস্থিতি, এই হচ্ছে জ্ঞান। আত্ম বিষয়ক জ্ঞান হচ্ছে বিশুদ্ধ জ্ঞান, আর আত্মস্থিতি হচ্ছে বিশুদ্ধ আনন্দ। তো মন আত্মাতে না থেকে যদি পঞ্চতত্ত্বে আর দেহের জ্ঞানের দিকে লক্ষ যায়, তবে বুঝতে হবে, এই জ্ঞান বিশুদ্ধ নয়। পঞ্চতত্ত্বে মনোযোগের কারনে, প্রকৃত জ্ঞান অস্বচ্ছ হয়ে পড়ে । মন মলিন হলে, তাতে আত্ম-প্রতিবিম্ব স্পষ্ট রূপে প্রতিভাত হতে পারে না। মন যতক্ষন সংকল্প-বিকল্প শূন্য না হতে পারছে, ততক্ষন মনের মধ্যে আত্মার স্বরূপ দর্শন হতে পারে না। আত্মা ব্যাতিত অন্য বস্তু বা বিষয়ের মধ্যে এমনকি জ্ঞানের বিষয়ে মন নিবিষ্ট হলে, অথাৎ আত্মাকে জানছি, এই ভাব থাকলেও আত্মদর্শন হতে পারে না।
এখন কথা হচ্ছে, তাহলে আমাদের করণীয় কি ? শ্বাস গতিশীল হয়ে চক্রাকারে ঘুরছে। আমাদের মনে হচ্ছে একবার শরীরের ভিতরে প্রবেশ করছে, আবার শরীর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। গতিশীল শ্বাসের এই আসাযাওয়ার সঙ্গে মনকে লাগিয়ে রাখতে হবে। তবে মনের সঙ্গে শ্বাসের ঘর্ষনের ফলে মনের যে ময়লা তা দূর হয়ে যাবে। ময়লা দূর হয়ে গেলে, মন মৌন হয়ে যাবে। কেন মৌন হয় ? কারন এই অবস্থায় মনের মধ্যে সঙ্কল্পের উদয় হতে পারে না। তো মনের ময়লা কেটে গেলে মন যত নির্ম্মল হতে থাকবে,ততই শব্দের নিস্পত্তি হবে। মুখে কোনো কথা থাকবে না। এই অবস্থাতে বিন্দুর দর্শন হবে। এই বিন্দু প্রথম অবস্থায় স্থির না হলেও, ধীরে ধীরে তা স্থির হতে থাকবে। আর এই চিদ্রুপ বিন্দুকে স্থির করতে পারলে, একসময় বিশ্বরূপ দর্শন হবে, আত্মজ্ঞান হবে, আত্মদর্শন হবে। এই যে মনের বিশুদ্ধতা এর কয়েকটি লক্ষণের কথা বলছেন, আচার্য্য শংকর তার বিবেকচূড়ামনি গ্রন্থে : সেখানে বলছেন, প্রসন্নতা, ,পরমা শান্তি, তৃপ্তি, প্রহর্ষ ও পরমাত্মনিষ্ঠা - এই হচ্ছে নিত্যরূপ আত্মার দর্শনের লাভ। আত্মার যথার্থ স্বরূপ অত্যন্ত সূক্ষ্ম। আমরা জানি, দেহ থেকে মন সূক্ষ্ম, মন থেকে বুদ্ধি আরো সূক্ষ্ম, বুদ্ধি থেকে আত্মা আরো সূক্ষ্ম। তো যতক্ষন আমাদের স্থুলবুদ্ধি থাকবে, ততক্ষন আত্মা আমাদের ধারণার অগম্য থাকবে ।চিত্তের একাগ্রতার ফলে বিষয় থেকে বুদ্ধি শুদ্ধতত্ত্বে উত্তীর্ন হলে আত্মস্বরূপের উপলব্ধি সম্ভব হয়। নিরন্তর ব্রহ্মস্বরূপ ধ্যানের ফলে, মনের সত্ত্ব, রজঃ তমঃ গুনরূপ মলিনতা দূরীভূত হয়ে ব্রহ্মস্বরূপতা লাভ করে। আর নিরন্তর এই অভ্যাসের ফলে শুদ্ধ মন ব্রহ্মে লয় হয়। তখন নির্বিকল্প সমাধি আপনা আপনি উপস্থিত হয়।
যতদিন এই শ্বাস-প্রশ্বাস ইড়া পিঙ্গলা দিয়ে প্রবাহিত হবে, ততদিন সংসার জ্ঞানে আবদ্ধ থাকতে হবে। এর কোনো অন্যথা নেই। কিন্তু এই শ্বাসবায়ু রূপ প্রাণপ্রবাহ যখন আমাদের সুষুম্না দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করবে, তখন বিশুদ্ধ সত্ত্বের আবির্ভাবে ত্রিগুণাতীত অবস্থায় উন্নীত হওয়া সম্ভব হবে। তখন সমস্ত অজ্ঞানের মেঘ কেটে জ্ঞানের সূর্য্যের উদয় হবে। নিরানন্দ দূর হয়ে পরমানন্দ লাভ হবে।
রজো রাগাত্মকং বিদ্ধি তৃষ্ণা সঙ্গ সমুদ্ভবম
তৎ-নিবধ্নাতি কৌন্তেয় কর্ম্ম সঙ্গেন দেহিনম। (১৪/০৭)
শব্দার্থ : রজো রাগাত্মকং - রজোগুন অনুরাগত্মক, বিদ্ধি - জানবে, তৃষ্ণা সঙ্গ সমুদ্ভবম - তৃষ্ণা উৎপন্ন হয় আসক্তির কারনে, তৎ-নিবধ্নাতি - তা আবদ্ধ করে, কৌন্তেয় - হে কুন্তীপুত্র, কর্ম্ম সঙ্গেন - সকাম কর্ম্মের আসক্তির দ্বারা , দেহনাম - জীব বা দেহধারীকে ।
বঙ্গানুবাদ : হে কৌন্তেয় (অর্জ্জুন) রজোগুণ অনুরাগত্মক এবং তা তৃষ্ণা ও আসক্তি থেকে উৎপন্ন হয়। এবং সেই রজোগুণই জীবকে সকাম কর্ম্মের আসক্তির দ্বারা আবদ্ধ করে।
বিস্তার : আমাদের শ্বসবায়ু যখন ইড়া (ডান-নাক) নাড়ীতে বহমান থাকে তখন আমাদের মধ্যে রজোগুণের প্রভাব বেশি থাকে। এই রজোগুণের স্বভাব হচ্ছে তৃষ্ণা ও আসক্তি অর্থাৎ কোনো কিছু পাবার ইচ্ছেকে উৎপন্ন করা ও তার তেজকে বাড়িয়ে তোলা। অর্থাৎ যে বস্তু আমার কাছে নেই, তাকে পাবার ইচ্ছে, আর যে বস্তু আমার কাছে আছে, তাকে ধরে রাখার অভিলাষ। এই রজোগুণের কারণেই জীবকুলের মধ্যে কর্ম্ম করবার উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। আর এই কর্ম্ম নিরাসক্ত নয়, এই কর্ম্ম আসলে কর্ম্মফলের প্রত্যাশী হয়ে সম্পাদিত হয়। আসক্তির দৃষ্টিতে কোনো বস্তুর দিকে দৃকপাত করলে, তাকে পাবার জন্য আকাংখ্যা বা লোভ হয়। ইড়া নাড়ীতে প্রাণের প্রবাহ চলতে থাকলে, বাহ্যিক বস্তুর প্রতি যেমন লোভ দেখা যায়, তেমনি অন্যের কল্যাণ ইচ্ছেও উৎপন্ন হতে পারে। আর আসক্তিপূর্ণ কর্ম্মসকল থেকে কর্ম্মফল ভোগ করতে হয়, তা সে স্বর্গভোগ হোক, বা নরকভোগ। আর ভোগের কারণেই বারবার শরীর ধারন করতে হয়। আবার এই শরীরে থাকা কালীন, যদি কেউ নিরাসক্ত হয়ে প্রাণক্রিয়ার দ্বারা প্রাণকে স্থির করতে পারেন, তখন কোনো বস্তুর প্রতি, এমনকি জ্ঞান অন্বেষণের প্রতিও তাঁর আর আকর্ষণ থাকে না। আর এই অনাসক্ত প্রাণক্রিয়া সাধককে এক অন্য জগতে নিয়ে যায়, যা জন্ম-মৃত্যু রহিত।
তমঃ-তু-অজ্ঞানজম বিদ্ধি মোহনং সর্ব্ব দেহিনাম
প্রমাদ-আলস্য-নিদ্রাভিঃ-তৎ-নিবধ্নাতি ভারত। (১৪/৮)
শব্দার্থ : তমঃ-তু-অজ্ঞানজম : তমঃগুণ কিন্তু অজ্ঞানজাত, বিদ্ধি- জানবে, মোহনং সর্ব্ব দেহিনাম - মোহনকারী সমস্ত জীবের, প্রমাদ-আলস্য-নিদ্রাভিঃ- প্রমাদ, আলস্য, নিদ্রা দ্বারা, তৎ-নিবধ্নাতি - তা আবদ্ধ করে, ভারত - হে ভারত অর্থাৎ অর্জ্জুন।
বঙ্গানুবাদ : হে ভারত, তমোগুণকে সমস্ত জীবের মোহনকারী বলে জানবে। সেই তমোগুণ প্রমাদ, আলস্য , ও নিদ্রার দ্বারা জীবকে আবদ্ধ করে।
বিস্তার : প্রমাদ অর্থে অসাবধানতা, আলস্য অর্থ উদ্দমহীনতা, নিদ্রা অর্থাৎ অবসাদগ্রস্থ ভাব। আমাদের শরীরে যখন শ্বাসবায়ু বাম নাক দিয়ে অর্থাৎ পিঙ্গলা দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন এই ভাবের অর্থাৎ আলসেমি, অসাবধানতা, ও নিদ্রাতুর অবস্থার উদয় হয়। এই অবস্থা আমাদের রজোগুণের প্রভাব থেকেও ভয়ানক। রজোগুণ প্রভাবে আমরা হয়তো অন্যের কল্যাণের জন্য উদ্দীপ্ত হতে পারি, কিন্তু এই তমঃগুণের প্রকোপে পড়লে, না আমরা নিজেরদের কল্যাণ করতে পারি, না অন্যের উপকারে আসতে পারি। অর্থাৎ স্থবির কিন্তু নিম্নমুখী ভাব। একেই মনের বৈকল্য বলা হয়। যদিও এই দুই অবস্থায় আমাদের অবিদ্যার আবরণশক্তি। তমঃগুণ জীবকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। এদের মধ্যে কিসে ভালো হবে, সে কাজে উৎসাহ দেখা যায় না, কিন্তু জড়বুদ্ধির প্রভাবে খারাপের দিকে উৎসাহ বেশি দেখা যায় ,এঁরা ধর্ম্ম আলোচনার আসরে হয়তো করতাল দিয়ে ঠুন -ঠুন আওয়াজ করে, অথবা বইয়ের পাতা উল্টাতে থাকে, নতুবা ঘুমিয়ে পড়ে। অর্থাৎ ভালো কথা এদের কানে ঢোকে না। ধ্যানে বসলে, এরা নাক ডাকতে থাকে। আশ্চর্য্যের কথা হচ্ছে, এরা মুখে বলবে, শুনছি তো - কিন্তু জিজ্ঞেস করলে, উত্তর দিতে পারবে না। এমনকি এরা সাধু সন্তদের অনেক সময় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে থাকে। আমার মাঝে মধ্যে মনে হয়, এরা অহংকারী কিন্তু নির্জীব প্রাণী - এদের পাপ-তাপ বোধই নেই। তমোগুণ সাধকের সবচেয়ে বড় শত্রু বলে জানবে। এরা না পারে, জাগতিক উন্নতি করতে, না পারে, আধ্যাত্মিক জগতের ধারে কাছে যেতে। এদেরকে কি ভগবান ভুল করে মানব শরীর দিয়েছেন ? এরা কালের সমুদ্রে ভেসে চলেছে। কোথায় যাচ্ছে, তা এরা নিজেরাই জানে না। এদের জীবনের কোনো লক্ষ্যই নেই।
যাইহোক, আমরা আগেই শুনেছি, আমাদের শ্বাস কখনো ইড়া নাড়ীতে কখনো পিঙ্গলা নাড়ীতে প্রবাহিত হয়। এই শ্বাসের গতি অনুসারেই মনের দৃষ্টিকোণ বদলে যায়। সাধকের সবসময় উচিত, এই শ্বাসের দিকে লক্ষ্য রাখা। যারা এই শ্বাসের দিকে লক্ষ্য রাখেন না, তারা নিজেদেরকে লক্ষ্যে স্থির রাখতে পারেন না, যখন যেমন তখন তেমন চলে থাকেন। কিন্তু সাধক সাধক যদি শ্বাসের দিকে লক্ষ রাখেন, এবং শ্বাসবায়ুকে নিজের ইচ্ছে মতো পরিবর্তন করে নিতে পারেন, তবে তারা মনকে নিজের ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করে নিতে পারেন। এই শ্বাসের কারণেই আমাদের মনের মধ্যে রাগ, দ্বেষ, ঘৃণা, ভয়ের উদ্রেগ হয়ে থাকে। তো আমরা যদি আমাদের ইচ্ছে মতো শ্বাসের পরিবর্তন করে নিতে পারি, অর্থাৎ আমরা যদি দুই নাক দিয়ে সমান ভাবে বায়ুকে প্রবাহিত করতে পারি, তবে আমরা আমাদের জীবন থেকে যেমন এইসব অহেতুক ক্লেশের দূরীকরণ করতে পারি, তেমনি আমরা আধ্যাত্মিক জগতের পথে অগ্রসর হতে পারি।
যাইহোক, শরীর ও মনের বিশ্রাম দরকার ঠিকই, কিন্তু অনাবশ্যক নিদ্রা, বা আলস্যে দিনযাপন করা জীবনের উদ্দেশ্য হয়। একজন সাধকের ৪ ঘন্টা নিদ্রা যথেষ্ট। আর বিশ্রামের কথা উঠলে বলতে হয়, ধ্যান আমাদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের কাজ করে দিতে পারে। আলাদা করে সময় নিয়ে বিশ্রামের কোনো প্রয়োজন নেই। দেখুন সংসার বন্ধন আমাদের উপরে কেউ চাপিয়ে দেয় না। আমরাই নিজের অজ্ঞাতসারে নিজেদেরকে বন্ধনে আবদ্ধ করি। তাই এখান থেকে বেরুতে গেলে, নিজেকে সজাগ করতে হবে। শ্বাসের দিকে খেয়াল রেখে, শরীরকে সাম্যাবস্থায় নিয়ে এসে আত্মস্থ হতে হবে। উপায় সহজ কিন্তু সদা সজাগ থাকতে হবে।
সত্ত্বং সুখে সঞ্জয়তি রজঃ কর্ম্মণি ভারত
জ্ঞানম-আবৃত্য তু তমঃ প্রমাদে সঞ্জয়ত্যুত। (১৪/০৯)
শব্দার্থ : সত্ত্বং সুখে সঞ্জয়তি - সত্ত্বগুণ সুখে আবদ্ধ করে, রজঃ কর্ম্মণি - রজঃ গুন্ স্ক্যাম কর্ম্মে, ভারত - হে ভারত, জ্ঞানম-আবৃত্য - জ্ঞান আবৃত করে, তু তমঃ প্রমাদে সঞ্জয়ত্যুত - কিন্তু তমঃগুণ প্রমাদে আবদ্ধ করে, বলা হয় ।
বঙ্গানুবাদ : হে ভারত, সত্ত্বগুণ জীবকে সুখে আবদ্ধ করে, রজোগুণ সকাম কর্ম্মে আবদ্ধ করে এবং তমোগুম প্রমাদে আবদ্ধ করে।
বিস্তার : আমাদের মহৎসঙ্গে যে জ্ঞানের উদয় হতে পারে, তা তমঃগুণ সম্পন্ন ব্যক্তির মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারে না। চোখ কান দিয়ে হয়তো সে তা শোনে, বা দেখে, কিন্তু অমনোযোগী হবার কারনে, সে সেই উপদেশের কথা যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। আর যতটুকুই বা সে শোনে বা বোঝে তা সে তার জীবনে কার্যকর করে পারে না, কারন সে অলস। কোনো ভালো কাজেই তার মধ্যে উৎসাহ দেখা যায় না। আবার রজোগুন সম্পন্ন মানুষ কাজে তো উৎসাহ দেখায়, কিন্তু সেই কাজই তার একসময় কাল হয়। কেননা এই কাজে তার শুদ্ধ বুদ্ধির অভাব থাকে। আর শুদ্ধ বা অশুদ্ধ বুদ্ধি নিয়ে যে কাজ সে করে, আখেরে তার সুফল বা কুফল তাকেই একদিন ভোগ করতে হয়। এমনকি এই কর্ম্মফল ভোগ করবার জন্যই জন্ম-জন্মান্তরে নতুন দেহে তাকে ফিরে আসতে হয়। কারন তার কর্ম্ম উদ্দীপনা আসে আসক্তি থেকে। অন্যদিকে সত্ত্বগুণ সম্পন্ন মানুষও যখন কর্ম্ম করে, তখনও তাঁকে কর্ম্মফলের ভাগিদার হতে হয়। কিন্তু তার কর্ম্ম যেহেতু শুদ্ধ বুদ্ধি সম্পন্ন হয়, তাই এতে করে তার মধ্যে একটা সুখানুভূতি আসে। এই সুখানুভূতিও তাকে ভোগের রাজ্যে নামিয়ে নিয়ে আসে। এই সুখানুভূতি আসলে আসক্তি জনিত কর্ম্মফল। এখন কথা হচ্ছে, তাই যদি হয়, অর্থাৎ কর্ম্ম তা সে সত্ত্ব-রজঃ-তমঃ যে গুনের দ্বারাই সম্পন্ন হোক না কেন, কর্ম্ম ফল থেকে রেহাই নেই, জন্ম মৃত্যু থেকেও রেহাই নেই, তাহলে আমাদের কর্তব্য কি ? আমরা কি শুধু নিষ্ক্রিয় হয়ে অলস জীবন যাপন করবো ?
দেখুন, কাজ তো করতেই হবে, তা যে ধরনের কাজই হোক না কেন। কিন্তু কাজ থেকে বীজের জন্ম হচ্ছে, সেই বীজকে সমূলে বিনাশ করতে হবে। অর্থাৎ কর্ম্ম থেকে সংস্কারের জন্ম হচ্ছে, সেই সংস্কার যা নতুন করে না হয়, সে চেষ্টা করতে হবে। আবার পুরোনো যে সংস্কার আমাদের মধ্যে জন্ম-জন্মান্তর থেকে সঞ্চিত হয়ে আছে, সেই সংস্কারগুলোকে সমূলে বিনাশ করতে হবে। এখন কথা হচ্ছে, এটা কিভাবে সম্ভব হতে পারে ? দেখুন, কাজ তো আমাদের শরীর করবেই, চোখ থাকলে সে দেখবে, কান থাকলে সে শুনবে, ত্বক থাকলে সে স্পর্শ অনুভব করবে, জিহ্বা আস্বাদন করবে, মুখ কথা বলবে। এখন কথা হচ্ছে, এগুলো কে করছে, সেটা একবার ভাবুন। আমরা ভাবি, আমরা কাজ করছি, আমাদের শরীর কাজ করছে। আমরা ভাবি আমাদের কর্ম্ম ইন্দ্রিয়গুলো কাজ করছে। কিন্তু এটাও আমরা জানি, আমাদের সমস্ত ইন্দ্রিয়কে পরিচালনা করছে, ইন্দ্রিয়ের অধিপতি মন। তো কাজ আমাদের ইন্দ্রিয়ের নয়, কাজ হচ্ছে আমাদের মনের। এবার আরো একটি গভীরে ভাবুন, এই মনকে পরিচালনা করছে কে ? মনের শক্তি হচ্ছে আমাদের প্রাণ। প্রাণ যদি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, তবে মন নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। আবার এই মনকে পরিচালনা করছে, আমাদের বুদ্ধি। এই বুদ্ধিকে পরিচালনা করছে কে ? আমাদের চিত্ত। এই চিত্ত (যেখানে আমাদের সংস্কার বাসা বেঁধে আছে) পরিচালনা করছে কে, না সেই অবিনাশী আত্মা। তো এই যে কাজ আমরা করছি, বলে ভাবছি, সেটি কিন্তু করছে আসলে আত্মা (জীবাত্মা)। তো কোনো কাজই আমার নয়, আমি করছিও না। এই কথাটাকে ভালোভাবে হৃদয়ের মধ্যে বসিয়ে নিন। তো কাজ যদি আমার না হয়, তবে কাজের পারিতোষও আমার পাওনা নয়।
আরো একটু গভীরে প্রবেশ করি। মন বড্ড চঞ্চল। আবার এই মনকে চঞ্চল করছে, আমাদের প্রাণ। তো এবার মনকে যদি আপনি প্রাণ-সাধন-ক্রিয়ার সাহায্যে আত্মাতে নিবিষ্ট করতে পারেন, তবে মন যে বুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিলো, সেই মনের সঙ্গে বুদ্ধিও স্থির হয়ে যাবে।কেননা,প্রাণ না থাকলে মন থাকে না, আবার মন না চাইলে, বুদ্ধি কোনো কাজই করে না। অর্থাৎ প্রাণ হচ্ছে, রাজা। তাই আমাদেরকে প্রাণের সহযোগিতা নিতেই হবে। এখন কথা হচ্ছে, প্রাণ আমাদের কিভাবে সাহায্য করবে ? আমরা জানি প্রাণ আমাদের শ্বাসবায়ুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে, যদিও প্রাণ শুধু শ্বাসবায়ু নয়, প্রাণ জড়িয়ে আছে আমাদের অপতত্ত্বের সাথে, আছে তেজ তত্ত্বের সাথে। আমাদের শ্বাসও ইড়া-পিঙ্গলা- সুষুম্না নাড়ীর মধ্যে ক্রিয়া করে থাকে। ইড়া হচ্ছে তমঃগুণের , পিঙ্গলা হচ্ছে রজোগুণের, আর সুষুম্না হচ্ছে সত্ত্বগুণের উদ্রেগকারী। আমাদের শরীরে যখন যে নাড়ী সক্রিয় থাকে, তখন সেই মতো আমরা গুনের অধিকারী হই। তো প্রথমে আমরা প্রাণবায়ুকে এই ইড়া বা পিঙ্গলা থেকে সরিয়ে প্রাণ বায়ুকে সুষুম্না নাড়ীতে প্রবেশ করতে বাধ্য করবো। আর এই সুষুম্না যেহেতু সত্ত্ব গুনের উদ্রেগকারী, তাই তখন আমাদের মধ্যে সত্ত্বগুণের আধিক্য দেখা দেবে। যদিও এখানেই শেষ নয়, প্রাণবায়ুকে এই সুষুম্না পথ দিয়ে উর্দ্ধগামী করে, আজ্ঞাচক্রে স্থিত করতে হবে। এই আজ্ঞাচক্র হচ্ছে প্রকৃতির সাম্যাবস্থা, এখানে প্রকৃতি স্থির, কিন্তু সমস্ত গুন্ এখন সমান অবস্থায় বিরাজ করছে ।আমরা আজ্ঞাচক্রে স্থিত হতে পারলে আমাদের মধ্যে তখন ত্রিগুণেরও সাম্যাবস্থা দেখা দেবে। এর পরে আমরা যখন এই আজ্ঞাচক্র থেকে প্রান -মনকে সহস্রারে নিয়ে যেতে সক্ষম হবো,তখন আমরা প্রকৃতির ত্রিগুণের উর্দ্ধে নিজেকে স্থাপন করতে পারবো। তখন কর্ম্ম আমাদের আর প্রভাবিত করতে পারবে না। এমনকি আমরা যখন সাম্যের অবস্থায় অর্থাৎ আমরা যদি আজ্ঞাচক্রে অবস্থান করতে পারি, তাহলেও আমরা এক নির্ম্মল আনন্দের সন্ধান পাবো। এসব ক্রিয়াই গুরুসান্নিধ্যে সম্ভব হবে। তাই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণে আমাদের মতি হওয়া চাই।শ্রদ্ধা, ভক্তি, একাগ্রতা নিয়ে আমাদের শ্রীকৃষ্ণ উক্ত সাধনক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে। তা না হলে, কেবল মধুর কথায় চিড়ে ভিজবে না।
রজস্তমঃ-চ-অভিভূয় সত্ত্বং ভবতি ভারত
রজঃ সত্ত্বং তমশ্চৈব তমঃ সত্ত্বং রজস্তথা। (১৪/১০)
শব্দার্থ : রজস্তমঃ-চ-অভিভূয় - রজোগুণ তমোগুণকে পরাভূত করে, সত্ত্বং ভবতি - সত্ত্বগুণ প্রবল হয়, ভারত - হে ভারত, রজঃ সত্ত্বং তমশ্চৈব - রজঃ-সত্ত্ব-তম এভাবেই তমঃ সত্ত্বং রজস্তথা - তমোগুণ, সত্ত্বগুণ রজোগুণকে সেভাবেই ।
বঙ্গানুবাদ : হে ভারত, রজোগুণ তমোগুণকে পরাভূত করে সত্ত্বগুণ প্রবল হয়, আবার সত্ত্বগুণ ও তমোগুণকে পরাভূত করে রজোগুণ প্রবল হয়, এবং একইভাবে সত্ত্বগুন্ ও রজোগুনকে পরাভূত করে তমোগুণ প্রবল হয়।
বিস্তার : ত্রিগুনাত্বিকা প্রকৃতি। এই প্রকৃতিই আমাদের জড় শরীর। তো শরীরের মধ্যে তিনটি গুনের সমাহার। এই তিন গুনের মধ্যে কখন যে কোন গুন্ মাথাচাড়া দেয় আর কেনওই বা মাথা চাড়া দেয়, তা আমাদের মতো সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারি না। কিন্তু যাঁরা যোগশাস্ত্র সম্পর্কে অবহিত আছেন, তাঁরা এই ক্ষণগুলোকে ধরতে পারেন। আমরা আগেই শুনেছি, বাম নাকে শ্বাস প্রবাহকালে আমাদের তমঃ গুনের আধিক্য থাকে। ডান নাকে শ্বাস প্রবাহকালে আমাদের রজোগুণের প্রভাব থাকে আর যখন শ্বাস বায়ু আমাদের দুই নাক দিয়েই প্রবাহিত হয়, তখন আমাদের মধ্যে সত্ত্বগুণের প্রভাব পড়ে। সাধারণ মানুষের এই সত্ত্বগুণের প্রভাব কাল স্বল্প। যোগসাধক সাধনক্রিয়ার সাহায্যে এই সময়কে ধরে সাধনক্রিয়ার মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত করেন। অভিজ্ঞ যোগী সারাক্ষন এই সত্ত্বগুণের মধ্যে অর্থাৎ দুই নাক দিয়ে শ্বাস প্রবাহিত করবার কৌশল আয়ত্ত্ব করেছেন।
প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যেই এই তিন গুন্ বর্ত্তমান। আমরা যেমন আমাদের মনকে নিজেদের ইচ্ছেমতো পরিচালনা করতে পারি না। মন আমাদের অজ্ঞাতসারেই বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে ঘুরে বেড়ায়, তেমনি আমাদের মধ্যে সুপ্ত এই ত্রিগুণকে আমাদের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতে পারি না। আমরা মনে করি, এইসব গুন্ আমাদের স্বভাবজাত। অর্থাৎ একজন ভালো মানুষকে যেমন মনে করি এটা তার স্বভাব, তেমনি একটা খারাপ মানুষকে আমরা মনে করি, এটি তার স্বভাব। কিন্তু সত্য হচ্ছে, কোনো মানুষই নির্ভেজাল ভালো বা নির্ভেজাল খারাপ হতে পারে না। আবার সমস্ত মানুষের মধ্যেই আছে সেই ভাগবত সত্তা। এই ভাগবত সত্তাকে জাগ্রত করা, মানুষকে ভগবৎ স্বরূপে প্রতিষ্টিত করা যোগের উদ্দেশ্য। এই দেহই কুরুক্ষেত্র, এই দেহই ধর্ম্মক্ষেত্র। এখানেই সুর-অসুরের যুদ্ধক্ষেত্র। আমাদের দেহযন্ত্র, দেহস্থ গ্রন্থিসকল দোষযুক্ত হবার ফলে আমারদের মধ্যে কুচিন্তা আসছে, কুকৰ্ম্ম করছি। যোগাদির দ্বারা এই দেহ যন্ত্রকে শোধন করে আমরা পশুমানব থেকে মহামানবে রূপায়িত হতে পারি।
শ্বাসের-উপর আধিপত্য বিস্তার করে, ইড়া-পিঙ্গলার উপরে প্রাধান্য স্থাপন করে শ্বাসবায়ুকে ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করে, আমরা যেমন চিরদিন সুস্থ-সবল দেহের অধিকারী হতে পারি, তেমনি সুষুম্নার উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে আমরা আমাদের মনকে একাগ্র করে সাধনার উচ্চ ভূমিতে আরোহন করতে পারি। পার্থিব চঞ্চল মন তখন স্থির দেবমনে রূপান্তরিত হবে।
এই যে সূক্ষ্ম পঞ্চ মহাভূত যা পরিণতি প্রাপ্ত হয়ে স্থুল পাঞ্চভৌতিক জগৎ অর্থাৎ লক্ষকোটি নীহারিকা ছায়াপথ, লক্ষকোটি সৌরজগৎ প্রকাশিত হয়েছে, এই সৃষ্টির প্রত্যেকটি অনু-পরমাণু সংগঠেনের, স্পন্দনের মুলে এই ত্রিশক্তির (সত্ত্বঃ রজঃ তমঃ) খেলা ছাড়া আর কিছু নয়। যিনি তমোগুণকে প্রভূত করতে পেরেছেন, তিনি রজঃগুনকে বাড়িয়ে নিয়েছেন, আবার যিনি তমঃ ও রজঃগুনকে উপেক্ষা করতে পেরেছেন, তিনি সত্ত্বগুনকে বাড়িয়ে নিতে পারেন। আবার এই তিন গুনকেই যিনি উপেক্ষা করতে পারেন, তিনি প্রকৃতির নিয়মের উর্দ্ধে ভাগবত স্বরূপে অবস্থান করতে পারেন।
কিন্তু কথা হচ্ছে, গুনগুলোর নিজস্ব কোনো ইচ্ছেশক্তি আছে কি, যাতে স্বেচ্ছামতো দেহীকে আক্রমণ করে ? ব্যাপরটা এমন নয়, আসলে আমাদের মধ্যে পূর্ব পূর্ব জন্মের সংস্কার জমে আছে। এই সংস্কারের দ্বারা আমাদের বুদ্ধি আক্রান্ত হয়, আর বুদ্ধি বা বিচারশক্তি মনকে প্রভাবিত করে। আর মন তখন ইন্দ্রিয়দ্বারা তদ্রুপ কর্ম্ম সম্পাদন করে থাকে। তো আমাদের মধ্যে যে সংস্কার সঞ্চিত আছে, সেই সংস্কারের কারণেই আমরা সৎ-অসৎ কর্ম্মে লিপ্ত হই। এজন্য যোগীপুরুষগন ধ্যানের মাধ্যমে এই সংস্কারগুলোকে ধরতে চেষ্টা করেন, আর পুরোনো সংস্কারকে চাপা দেবার জন্য নতুন সংস্কারের জন্ম দিয়ে থাকেন। আর নিরন্তর সৎ কর্ম্মের অভ্যাস দ্বারা শুভ সংস্কারের জন্ম হতে পারে। এর ফলে আমাদের পুরুনো সংস্কার ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায়। এই সংস্কারকে কেউ বলেন, পূর্ব্বকর্ম্ম কেউ বলেন অদৃষ্ট। বহুদিনের সাধকের মধ্যেও অনেক সময় পূর্ব সংস্কারের ফলে অধঃপতন ঘটে থাকে। এইজন্য সাধন অভ্যাসের বিরতি করতে নেই। তো আমাদের আলস্য কাটিয়ে, অর্থাৎ তমঃগুণের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে, প্রথমে রজঃগুনের সান্নিধ্যে আসতে হবে, অর্থাৎ সাধনকর্ম্মে প্রবৃত্ত হতে হবে। আর এই সাধন কর্ম্ম করতে হবে আমাদের নিরাসক্ত ভাবে। সাধনক্রিয়া হবে, গুরুদেবের ইচ্ছেয় - আমার ইচ্ছেয় নয়। তবেই আমাদের সাধন কর্ম্ম হবে নিরাসক্ত। ঈশ্বরের ঐশ্বর্য্য পাবার জন্য নয়। শ্রীগুরু আদেশ পালনই আমাদের সাধনা। তবেই আমরা সত্ত্বগুণের সান্নিধ্যে আসতে পারবো। এইভাবে নিরন্তর অভ্যাস দ্বারা , যেমন যেমন কার্য্যে প্রবৃত্ত হবো, সেইমতো আমরা গুনের অধিকারী হতে পারবো। সবশেষে আমাদের সমস্ত গুনের উর্দ্ধে যেতে হবে, আর সেটা হতে পারে গুরুসান্নিধ্যে, নিরন্তর ব্রহ্মচিন্তন থেকে।
সর্বদ্বারেষু দেহে অস্মিন প্রকাশ উপজায়তে
Comments
Post a Comment