আধ্যাত্মিক জীবন পথের কিছু কথা।


আধ্যাত্মিক জীবন পথের কিছু কথা।

- শশাঙ্ক শেখর শান্তিধাম -

পর্ব্ব -এক 

একটু ভাবুন।  মানুষ হয়ে জন্ম গ্রহণ করেছি। মনুষ্য দেহ ধারণ করেছি।  এই দেহের মধ্যে আছে একটা মন, আছে স্মৃতি, আছে আত্মা।  তো এই চারে  মিলে  আমি, আমার অহংবোধ । এই দেহ কর্ম্মদেহ, কর্ম্মহীন থাকতে পারে না। এই দেহ ভোগদেহ,  ভোগের সন্ধানে ভোগ লালসায় মনকে দৌড় করাচ্ছে। এই মন সারাক্ষন চিন্তা করছে, চিন্তাহীন মন বলে কিছু হয় না। আছে স্মৃতির ভাণ্ডারে অসংখ্য অভিজ্ঞতা। যা মাঝে মধ্যে মনের মধ্যে ভেসে উঠছে। আছে অহংবোধ - যা আমাকে নিয়ে ভেসে চলেছে যেন জীবন নৌকা। কবে কোথা  থেকে এই জীবন নদীতে অহংকারের নৌকা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম, তা আমার স্মৃতিতে নেই। আছে কিছু সংস্কার - যা আমাকে নিজের অজ্ঞাতসারেই পরিচালিত করে চলেছে। কোথা  থেকে এসেছি, কোথায় যাবো ? কেনই বা এসেছি, কেনই বা চলে যেতে হয় ?  শুধু আসা আর যাওয়া ? নাকি আছে কিছু সংগ্রহের তাগিদ, নাকি শুধুই খেলা ? খেলতে খেলতে ভেসে যাওয়া ? 

স্বামী প্রণবানন্দ বলেছিলেন, জীবনের উদ্দেশ্য আত্মজ্ঞান লাভ।  নিজেকে জানা। তাহলে কি আমার আত্মজ্ঞানের অভাব হয়েছে ? আমি কি নিজেকে ভুলে গেছি ? গিরিশ ঘোষ বলেছিলেন, জুড়াইতে চাই, কোথায় জুড়াই  ? কোথা থেকে আসি কোথা  ভেসে যাই ? তাহলে কি সব ভুলে বসে আছি ? আমি কে, তা আমার স্মৃতিতে নেই ? কেন নেই ? তাহলে কি আমার স্মৃতিবিভ্রম ঘটেছে ? আমি কি অজ্ঞান হয়ে আছি ? আমি কি তন্দ্রাচ্ছন্ন নাকি সংজ্ঞা হারিয়েছি ? আমার মধ্যে কি চেতনা নেই ? নাকি আমি বিভ্রান্তির ঘুর্ণিপাকের  মধ্যে পড়ে  হাবুডুবু খাচ্ছি ?

 হরিদ্বারে গঙ্গায় হর কি পৌড়ির অদূরে একটা ঘাট আছে, যার নাম কুশাবর্ত ঘাট। এই ঘাটের  সম্মুখে আছে একটা ঘূর্ণাবর্ত - যার উপরে  কিছু ফুল-পাতা সারাক্ষন ঘুরছে। একবার ডুবছে, আবার ভেসে উঠছে। আমরাও কি সংসারের ঘূর্ণাবর্তে এইভাবে কখনো ভেসে উঠছি, আবার কখনো অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছি ? কঠোপনিষদের ঋষি  বলছেন, ওঠো, জাগো, শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গ লাভ করো, তাদের কাছ থেকে আত্মজ্ঞান লাভ করো। "উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্নিবোধাৎ" (১/৩/১৪) . কিন্তু কথা হচ্ছে এই পথ কি এতটাই সহজলভ্য, যে চাইলাম আর আত্মজ্ঞান লাভ হয়ে গেলো। শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের অনুসরণ করা কি এতটাই সহজ ? তাদের সঙ্গ  চাইলেই কি পাওয়া যায় ? উপনিষদের ঋষি আবার এই একই শ্লোকে বলছেন, "ক্ষুরস্য  ধারা নিশিতা দূরত্যয়া দুর্গম পথস্তৎ কবয়ো  বদন্তি।" বিবেকবান ব্যাক্তিগন বলে থাকেন, ক্ষুরের তীক্ষ্ণ  অগ্রভাগ যেমন হয়, সেই অধ্যাত্ম পথ তেমনি দুর্গম। 

আমরা ইন্দ্রিয়াসক্ত জীব। ইন্দ্রিয়সুখের চেয়ে সুখকর আর কিছু আছে, তা আমাদের জানা নেই। আর এই ইন্দ্রিয়সুখ যেমন আমাদের পরিচিত, তেমনি এই ইন্দ্রিয়ের কারণেই আমাদের যত  দুঃখ-কষ্ট ভোগ হয়ে থাকে।  তথাপি আমরা এই ইন্দ্রিয়-ব্যবহার থেকে নিবৃত্ত হতে পারি না। ইন্দ্রিয়ই  আমাদের সুখ-দুঃখের ভোগ করাচ্ছে। এর থেকে আমাদের নিষ্কৃতি নেই। এখান  থেকে না বেরুতে পারলে, আমরা কেউ শাশ্বত আনন্দের সন্ধান পাবো না।  তাই উপনিষদের ঋষিগণ বারংবার উচ্চারণ করেছেন,  "মোহনিদ্রা ত্যাগ করো." . কিন্তু কথা হচ্ছে , কি করে সে  বুঝবে, যে সে ঘুমিয়ে আছে ? যে স্বপ্নের জগতে বিচরণ করছে,  সে কি করে বুঝবে যে তার এই স্বপ্নে-দেখা জগতের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।  এসব মনের কল্পনা ছাড়া কিছু নয়। না তোমার এই স্বপ্নের জগতে কেউ প্রবেশ করতে পারেন, না কেউ তোমাকে বোঝাতে পারবে, যে তুমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কেবল স্বপ্নের সুখ-দুঃখ ভোগ করছো। 

ঋষিগণ বলছেন, ইন্দ্রিয়ের অগোচরে আরো অনেক বস্তু আছে, যা আরো বেশি, আরো স্থায়ী আনন্দের সন্ধান দিতে পারে। সেই ইন্দ্রিয়ের অগোচর সর্বোচ্চ বস্তুর জন্য, মনের মধ্যে ব্যাকুলতা জেগে উঠুক। অবিনাশী সেই সত্ত্বা লাভের  জন্য সচেষ্ট হও। এই অবিনাশী সত্ত্বা সম্পর্কে হয়তো তোমার কোনো ধারণা নেই, এই অবিনাশী সত্ত্বা সম্পর্কে হয়তো তুমি কিছুই জানো  না।  কিন্তু যারা জানেন, তাঁদের  শরণাপন্ন হও। তাদেরকে জিজ্ঞেস করে জেনে নাও। এমনটা ভেবো না যে জাগতিক সবকিছু পেয়ে গেলেই, তুমি চিরসুখী  হয়ে যাবে। আর এটা তো তুমি  হাড়ে হাড়ে  টের পাচ্ছো যে, যে জাগতিক বস্তু পেলে, যে প্রিয় মানুষকে পেলে, তুমি ভেবেছিলে,যে তুমি সুখী হবে, তারা  তো কিছু দিনের পরেই তোমার কষ্টের কারন হয়ে গেছে, তোমার দুঃখের কারন হয়ে গেছে।

আবার এমনটা ভেবো না যে আমি সব জেনে গেছি, আমি সব পেয়ে গেছি।  যা কিছু জেনেছো, তা তোমার ভ্রান্তজ্ঞান, যা কিছু পেয়েছো এসব তোমার নশ্বর বস্তু, দুদিন পরে হয়তো তুমি সেটা বুঝতে পারবে, কিন্তু অপেক্ষা করো না। অযথা সময় নষ্ট করো না। সময় চলে যাচ্ছে। জীবন প্রবাহ নদীর  স্রোতের মতো ভেসে চলেছে।  আর তুমি মোহগ্রস্থ হয়ে বসে আছো ।  এই মোহজাল ছিন্ন করো। আচার্য্যের শরণ নাও, যোগাচার্যের শরণ নাও। তাঁরাই তোমাকে যোগমার্গের সঠিক পথে নিয়ে যাবেন। আচার্য্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হও। তাঁর  কথায় বিশ্বাস জাগুক তোমার মনে। তাঁর হাতে  নিজের জীবনতরীর বৈঠা তুলে দাও। আর তুমি কেবল তাঁর  নিমিত্ত, তাঁর নির্দেশে  ক্রিয়া করো।   ঋষিগণ বলছেন, ক্ষুরের তীক্ষ্ণ ধার  দিয়ে চলার মতোই এই সাধনমার্গ দুরূহ। এই পথ মসৃন নয়, এই পথে আছে চড়াই উৎরাই।  এই যোগ-সাধনার পথই সঠিক মার্গ যা তোমাকে লক্ষে পৌঁছে দিতে পারবে। এই পথ বেয়েই সাধক মহাসাধক হয়েছেন, মানব মহামানব হয়েছেন। এই পথই মানুষকে দেবত্বে উন্নীত করেছে। যত  দুর্গম হোক যত  কঠিন হোক, এই পথই মনুষ্যজীবনকে সার্থক করে তুলতে পারে। এই পথ কঠিন হোক আর সহজ হোক, এই পথেই  সবাইকে যেতে হবে, তা সে আজ হোক বা কাল - এ জন্মে না হোক পরজন্মে। ভেবো না, এই কঠিন পথে আমি কি করে যাবো ? ভেবো না, এই কঠিন অধ্যাত্ম জীবন আমার  জন্য নয়। এই পথ সবার। এই পথেই  হাজার হাজার সাধক এগিয়ে  গিয়ে অমৃতের সন্ধান পেয়েছেন ।  তুমিও পারবে, তুমিও পারো। অন্যরা যা পারে, তুমিও তা পারো।  শুধু একবার সংকল্প করো।  শুধু একবার ঈশ্বরের জন্য ব্যাকুল হও।  শুধু একবার সত্যের সন্ধানে দৃঢ় সংকল্প করো। তোমার ব্যাকুলতা যত  বাড়বে, জানবে আচার্য্যের কাজ ততো  বাড়বে। তুমি যত  আচার্য্যের প্রতি নির্ভরশীল হবে, জানবে আচার্য্য তত তোমার সমস্ত ভার নিজের কাঁধে তুলে নেবেন। শুধু  একবারটি  ব্যাকুল হয়ে, জিজ্ঞাসু হয়ে আচার্য্যের শরণাপন্ন  হও। আচার্যকে জিজ্ঞেস করো, আচার্যকে প্রশ্ন করো। আর এই প্রশ্নের জবাব পাবার জন্য সর্বোচ্চ মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকো। আমরা সবাই এই আত্মজ্ঞান লাভের  অধিকারী। শুধু অধিকারী নয়, আমাদের সবাইকেই এই আত্মজ্ঞান লাভ করতেই হবে।  এর থেকে কারুর নিষ্কৃতি নেই। 

এই পথ কঠিন, তাই এই জ্ঞানও  দুর্লভ।  এই পথ দুরূহ তাই এই জ্ঞান সর্বোচ্চজ্ঞান। এই জ্ঞান মূল্যবান তাই এই জ্ঞান তৃপ্তিদায়ক। এর জন্য প্রয়োজন কেবল নিজের মধ্যে প্রশ্ন জাগিয়ে তোলা। মিথ্যাকে সত্য বলে ভ্রমে পতিত হয়ো  না।  সত্যকে সত্য বলেই  জেনো । মিথ্যাকে মিথ্যে বলেই জেনো। ইন্দ্রিয়সুখ নিত্য নয়, আমাদের বৃদ্ধ বয়সে এই উপলব্ধি আসে। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে যাবার আগেই, এই বোধ জেগে উঠুক সবার মধ্যে। দূর হোক তোমার ভ্রমজ্ঞান। প্রকাশিত হোক সত্য। আর সত্যের আলোতে তুমি তোমাকে জেনে নাও। 

ওম শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।  হরি ওম। 

--------

আধ্যাত্মিক জীবন পথের কিছু কথা।

পর্ব্ব -দুই 

এর আগের দিন আমরা একটু ভাবতে বলেছিলাম।  কি ভাবতে বলেছিলাম, না নিজের মধ্যে কিছু  প্রশ্ন জাগিয়ে তুলে অর্থাৎ আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, কোথায় এসেছি আবার কোথায় চলে যাবো - এইসব আপাত দৃষ্টিতে অবান্তর কিন্তু গম্ভীর প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে বলেছিলাম। এর পরে,  উত্তরের জন্য নিজের দিকে তাকাতে হবে, এই প্রশ্নের উত্তর যদি নিজের কাছে না থাকে, তবে অন্য কোনো আচার্য্যের কাছে এই প্রশগুলো তুলে ধরতে বলেছিলাম।  প্রশ্ন গুলো নিয়ে উদ্বেল হতে, যথার্থ সত্যের সন্ধানে নিজেকে  গভীরভাবে আগ্রহী করে তুলতে বলেছিলাম। সব শেষে বলেছিলাম, "আমি সব জানি" এই ভাবনা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে। অর্থাৎ আমি সব জানি, এই ধারণা  যার মধ্যে একবার  ঢুকে গেছে, তার আর কিছু জানবার থাকে না। আমি জানি না ভাবলেই জানবার আগ্রহ হয়ে থাকে। নতুবা সবই  পন্ডশ্রম। পেট ভর্তি থাকলে, নতুন খাবার আপনার হজম হবে না,  খাবার ইচ্ছেও জাগবে না, এমনকি বমি হতে পারে । তাই অধ্যাত্ম ক্ষুধা জাগিয়ে তুলতে গেলে, বা কোনো নতুন বিষয়ে জানতে গেলে, আগে নিজেকে  শূন্য করতে হয়, নিজের মধ্যে ঔৎসুক্যের জগরন করতে হয়।  নিজেকে শিশুর মতো জিজ্ঞাসু হতে হয়।  আবার শিশু যেমন সমস্ত জবাব মন-প্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করে, তেমনি আচার্য্যের কথায় সম্পূর্ণ  বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়। প্রথম দিকে বিচারবুদ্ধি দিয়ে নয়, কেবলমাত্র সরল বিশ্বাসে ভর করে এগুলোকে মনোযোগ  দিয়ে শুনতে হয়।  নিজের মধ্যে সন্দেহ থাকলে, সেই সন্দেহকে দূর করতে হয়।  সন্দেহের নিরসন যতদিন না  হচ্ছে, ততক্ষন শ্রদ্ধা  বা বিশ্বাসের ভীত দৃঢ় হয় না। তাই নিজেকে শিশুর মতো সরল করতে হবে। যা কিছু শুনবেন, তা নিজে গভীর ভাবে চিন্তা করতে থাকুন।   অন্ধ বিশ্বাস নয়।  কারন অন্ধবিশ্বাস  মানুষকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। যাকিছু শুনবেন, তা নিজের বিচার বুদ্ধি দিয়েই  উপলব্ধি করতে হবে। যদি নিজের বিচার বুদ্ধির সঙ্গে আচার্য্যের কথার সাজুয্য  না পান, তবে আচার্যকে মন খুলে সেই সন্দেহের নিরসনের কথা বলুন।  আসলে অনেক সময় হয়কি, আচার্য্য কোন একটা সূত্র বলে দেন, যে সূত্রের ব্যাখ্যা শিষ্য বা ছাত্র নিজের মতো করে, করে নেয়। এইজন্য দরকার সূত্রের উৎস খুঁজে নেওয়া। এইজন্য দরকার আচার্য্যের সান্নিধ্যে থাকা।  তার আচরণের মধ্যেই আছে এই সূত্রের ব্যাখ্যা - যা যথার্থ ও সত্য লুকিয়ে থাকে। 

এখন কথা হচ্ছে, আধ্যাত্মিক জীবনে প্রবেশের দরকার কি ? ভালোই তো আছি, খাচ্ছি-দাচ্ছি-ঘুমুচ্ছি - জীবনকে উপভোগ করছি।  এর পরে আর কি চাই ? যিনি ভালো আছেন, তিনি ভালোই থাকুন। যারা ভালো নেই, অর্থাৎ আহার-নিদ্রা-মৈথুনে যিনি ভালো থাকতে পারেন না, তাদের জন্য আমাদের  এইসব কথা। আপনি যদি নিজের অন্তরের দিকে তাকান তবে আশ্চার্য্য হয়ে লক্ষ করবেন, আপনার ভিতরে একটা একটা তীব্র অসন্তোষ আছে। এই তীব্র অসন্তোষ আমাদের মনের মধ্যে একটা সাংঘাতিক চাপ সৃষ্টি করছে। এই চাপ হাজার বছর  আগেও ছিলো , আজো  আছে, এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এই অস্বাভাবিক মানসিক চাপ, যা জাগতিক ঘটনার কারনে আমার মধ্যে উদ্ভূত হয়ে থাকে। অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন ঘটনা আমার মনের মধ্যে একটা আলোড়ন তুলছে।  এই আলোড়ন ঝঞ্ঝার আকারে মনের আকাশে বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি করছে। আর এই মানসিক বিশৃঙ্খলতা থেকেই আমাদের মন, আমাদের শরীর অসুস্থ হয়ে উঠছে। বাহ্যত এর কারন যাই হোক না কেন, আমাদের মন যখন এই বাহ্য  কারনের  সঙ্গে নিজেকে  সম্পৃক্ত করছে তখন মনের গতি সহস্রমুখী হয়ে নিজের মধ্যে নিজেই দিশাহারা ভাবের সৃষ্টি করছে। তখন একটা অর্থহীন জীবন, উদ্দেশ্যহীন জীবন, নিয়ে আমরা ব্যাকুল হয়ে উঠছি। আর এই অসন্তোষ শুধু নিজের মধ্যে সৃষ্টি করছি না, এই অসন্তোষ আমরা অন্যের মধ্যেও বিতরণ করে চলেছি। জীবাণুঘটিত রোগ যেমন সংক্রামক, তেমনি মনের অস্থিরতা রোগও সংক্রমণ হয়ে সমাজের মধ্যে একটা বিশৃঙ্খল ভাবের প্রবাহ সৃষ্টি করে চলেছে। 

আমরা কাজ করি, কিন্তু ভালোবাসা নিয়ে কাজ করি না, কাজ করি একটা প্রত্যাশা নিয়ে।  আর এই প্রত্যাশা পূরণ না হলেই, আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। আর এই হতাশা থেকেই জন্ম নেয়, অদ্ভুত সব ক্ষতিকর মনোভাব।  আর আমাদের চারপাশে যারা ঘোরাফেরা করে, তাদের মধ্যে আমি দুটো ভাগ করে ফেলি। একদল আমার শত্রু, একদল আমার মিত্র।  কাল্পনিক এই শত্রুকে আমরা বধ করতে চাই। আবার কাল্পনিক এই মিত্রদেরকে আমি আপন ভাবি। আসলে একটা মূর্খের স্বর্গ বা নরক আমি নিজের মধ্যে  তৈরী করে নেই। আর এই মূর্খের স্বর্গে আমি কখনও  রাজা, কখনও  প্রজা। একটা সময় এমন হয়, যখন নিজেকে অসহায় বলে মনে হয়। যুদ্ধে ক্লান্ত সৈনিকের মতো অবস্থা হয় আমাদের। একটা সময় নিজেকে ঘৃণা করতে ইচ্ছে করে। এমনকি জীবনকেও আর লোভনীয় বলে মনে হয় না।  জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিসহ। 

এখন এই দুর্বিসহ জীবন থেকে বেঁচে ওঠার রাস্তা হচ্ছে অধ্যাত্ম জীবন। জীবনশৈলীর পরিবর্তনের নামই আধ্যাত্মিকতা। সার্থক ভাবে বেঁচে থাকবার একটা আদর্শ পথ। নিজের ধারণার মধ্যে, নিজের চিন্তাধারার মধ্যে একটা পরিবর্তন আনা। জগৎ জগতের মতোই চলবে, আমরা কেউই এর পরিবর্তন করতে পারবো না। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা,  শরৎ, হেমন্ত, বসন্ত আসবে।  মানুষ জন্মাবে, মানুষ মারা যাবে। পৃথিবীটা যেমন কামনার অস্থিরতা দিয়ে শিশু হয়ে জন্ম গ্রহণ করবে, বা জীবন  দিয়ে শুরু হবে, তেমনি জরা-ব্যাধি বা বৃদ্ধ হয়ে মৃত্যু হবে। এই  ক্রোম আমরা কেউ পরিবর্তন করতে পারবো না। এখন কথা হচ্ছে, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির, বা আমাদের ধারণার মধ্যে পরিবর্তন কি করে আনবো  ? এর জন্য দরকার আমাদের মনের মধ্যে প্রবেশ করা। মনের মধ্যে কি চলছে, তা আগে পর্যবেক্ষন করা। 

মনের মধ্যে প্রবেশ করলেই, আপনি নিজের মধ্যে দুটো মনের সন্ধান পাবেন। এবং এই দুটো মনই পরস্পর বিরুদ্ধ আচরণ করছে। এই বিরুদ্ধভাবাপন্ন দুটো মনের একটি হচ্ছে চেতন মন, আর একটি হচ্ছে অচেতন মন। এই দুটি মনের মধ্যে সমন্বয় সাধন করাই  সাধারণ ভাবে যোগের প্রাথমিক কাজ।  অবচেতন মনের শুদ্ধিকরণ, তার পরে চেতন মনের সঙ্গে তার সংযোগ-স্থাপন। অর্থাৎ দুটো মনকে এক রাস্তায় চালনা করা। দেখুন গরুর গাড়ির দুটো গরু যদি দুই দিকে টানে তবে আরোহীর অবস্থা কি হয় ? সে সব সময় ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে থাকে - এই বুঝি গর্তে গিয়ে পড়লো।  কিন্তু সারথির ইচ্ছেমতো যদি গরুদুটো একই গতি সম্পন্ন হয়, তবে আরোহী তার গন্তব্যে পৌঁছুবে নিশ্চিন্তে।   

 একটা গল্প বলি। এক বদ্ধ মাতাল গভীর রাতে, বাঘ বাঘ বলে চিৎকার করতে করতে ল্যাম্প পোষ্টের  উপরে উঠে পড়লো। স্বভাবতই দমকল বাহিনীর লোকেরা পুলিশ বাহিনীর লোকেরা রে রে করে তেড়ে এলো। ব্রিজ থেকে নিচে নামানো হলো।  কিন্তু নিচে নামানো হলে কি হবে ? সে ততোধিক  জোরে গলা ভাটিয়ে বাঘ, বাঘ, বলে চিৎকার জুড়ে দিলো। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে হাজতে নেবার পরে, সে নিশ্চিন্ত হলো। চুপ হয়ে গেলো।  পরের দিন তাকে যখন বিচারপতির কাছে হাজির করা হলো, তখন সে একটা অদ্ভুত কথা বললো।  বললো, আমি কি করবো ? চারিদিকে  বাঘের দল ঘোরা  ফেরা করছিলো।  আমি ভয় পেয়ে, লাম্পপোষ্টে  উঠে গিয়েছিলাম। সবাই তো অবাক, শহরের মধ্যে  বাঘ আসবে কোথা থেকে ? মানুষ  যখন নেশাগ্রস্থ হয়, মানুষ যখন তদ্রাচ্ছন্ন হয়, মানুষ যখন স্বপ্নের জগতে ঘোরাফেরা করে, তখন সে যা দেখে, শোনে তার সত্যতা অস্বীকার করবার উপায় নেই। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে এসব অসত্য। এসব অবাস্তব, মিথ্যে। একে  আপনি ভ্রান্ত দর্শন বা ভ্রান্তশ্রবণ বলতে পারেন। কিন্তু ওই নেশাগ্রস্থ, তন্দ্রাচ্ছন্ন স্বপ্নের  জগতের মানুষের  কাছে, এসব সত্য বৈ  মিথ্যে নয়। 

আরো একদল মানুষ আছেন, যাদেরকে আমরা ঋষি মানব বলে থাকি, যাঁরা  জ্ঞানাতীত হয়ে প্রজ্ঞায় প্রতিষ্ঠিত আছেন, তাঁদেরও এমন সব দর্শন-শ্রবণ  হয়, যার ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষের কাছে নেই। এমনকি বিজ্ঞানের কাছেও নেই। এই মানুষগুলো পাগলপ্রায়। এদেরকে ঘিরে  অদ্ভুত সব অপ্রাকৃত ঘটনা ঘটে যার কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। এঁদের কাছে, এইসব দর্শন বা শ্রবণ অসত্য নয়, কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে অসত্য। তো এ দুয়ের মাঝে আছি আমরা, যারা নিজেরদেরকে বুদ্ধিমান বলে মনে করি। যুক্তিদিয়ে, সব কিছু বিচার করে নেই। আমাদের বোধ বুদ্ধি দিয়ে ঘটনার বিশ্লেষণ করি। 

এখন কথা হচ্ছে, এই যে বুদ্ধিমান জীব, যাকে  বলা হয় মানুষ, এদের জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য কি ? আমরা শুনেছি, এই রক্তমাংসের শরীরের মধ্যে আছে জীবাত্মা।  এই জীবাত্মা নাকি অনাদি অনন্তকাল ধরে ভিন্নভিন্ন দেহের ভিতর দিয়ে কালের স্রোতে ভেসে চলেছে। সে  জানে না, কোথায় যেতে হবে, কিসের আশায় সে কাল থেকে কালান্তর ধরে ভেসে চলেছে। কোথায় গিয়ে সে শান্ত হবে, কোথায় গিয়ে সে স্থির হবে, কোথায় গিয়ে সে শান্তি পাবে, তা সে জানে না। এই যে অজ্ঞানতা - তার নিরসনের জন্য সব সাধনা। সাধনা হচ্ছে অজ্ঞানের নিবৃত্তি। আকাশে মেঘ থাকলে যেমন সূর্য্যের আলো দেখতে পাওয়া যায় না, তেমনি রাতের বেলাতেও সূর্যের আলো  দেখতে পাওয়া যায় না। ঠিক তেমনি বুদ্ধি দ্বারা অর্জ্জিত জ্ঞান না থাকলে, আবার স্বরূপের অজ্ঞানের নিবৃত্তি না হলে প্রকৃত জ্ঞানালোকের দর্শন পাওয়া যায় না। 

মহাত্মাগণ বলে থাকেন, জীবসকলের লক্ষ্য হচ্ছে জীবত্ত্ব থেকে শিবত্ত্বে উপনীত হওয়া। আগে শুনেছিলাম, আত্মজ্ঞান বা  নিজেকে জানাই জীবনের লক্ষ্য এখন শুনলাম জীবত্ত্ব থেকে শিবত্ত্বে উপনীত হওয়াই জীবনের লক্ষ্য।  নিজেকে জানাই সব নয়। কেননা, আমি শুনলাম, আমি জানলাম যে আমি স্বয়ং ব্রহ্ম তাতে করে আমরা কি ব্রহ্ম  হয়ে যাবো ? তা তো নয়, আমি এখন যেমন আছি, তেমনটাই থাকবো। আমি জানলাম, যে আমি রাজার ছেলে, এখন আমি ডাকাত সর্দারের কাছে আছি, কারন এই ডাকাত সর্দার নাকি আমাকে একদিন রাজার কাছে থেকে ছিনিয়ে নিয়ে এসেছিলো। তো শোনাটাই সব নয়, রাজার কাছে পৌঁছতে হবে, এমনকি রাজার কাছে পৌঁছে গিয়েও আমি  রাজার ছেলের স্বভাব পাবো না। কারন আমার মধ্যে ডাকাত সর্দারের শেখানো যা কিছু সংস্কার আছে, তার কোনো পরিবর্তন হয় নি।  এই অবস্থান্তর বা পরিবর্তনটাই আসল যা আমাদের করতে হবে। 

জগৎ এমনকি সমস্ত জীবের মধ্যে রূপান্তর ঘটে চলেছে। আমরাও এই রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছি। আপনি সাধন ভজন করুন আর না করুন, আপনি ঘুমিয়ে থাকুন কি জেগে থাকুন, আপনি ব্যস্ত থাকুন কি বিশ্রামে থাকুন, আমি শিশু হোন  বা বৃদ্ধ, আপনার মধ্যে প্রতিনিয়িত রূপান্তর ঘটে চলেছে। এই রূপান্তর কেন হচ্ছে ? কারন সৃষ্টির মধ্যে আছে অপূর্নতা। এই অপূর্নতা দূর করবার জন্য বা পূর্ণত্ব লাভের  জন্য  প্রতিনিয়ত পরিবর্ত্তন ঘটে চলেছে। স্রষ্টা  তাঁর  সৃষ্টির মধ্যে অপূর্নতা অনুভব করছে - তাই তা দূর করবার জন্য অবিরাম চেষ্টা করে চলেছেন। জগতে যে বিজ্ঞানের উন্নতি তাও  এই অপূর্ণতাকে দূর করবার প্রয়াসের কারনে ঘটে চলেছে। আমাদের সবার উদ্দেশ্য এই অপূর্নতা দূর করে জগতে শান্তি, সুখ, আত্মতৃপ্তি প্রতিষ্ঠিত করা। আমাদের যত  দর্শনশাস্ত্র, যত  ধর্ম্মশাস্ত্র, যত  বিজ্ঞান গ্রন্থ, যত  ঋষি-মনিষী  সবাই এই উদ্দেশ্য কার্য করে চলেছেন। আমাদের সমস্ত প্রয়াস ঐ  এক মহান উদ্দেশ্যে চালিত হচ্ছে।  আমরা রূপান্তরিত হয়ে চলেছি। এই যে রূপান্তর তা দ্বিমুখী - একটা উর্দ্ধমুখী, একটা নিম্নমুখী। সোনা থেকে গহনা, আবার গহনা থেকে সোনা। পরমাত্মা থেকে জীবাত্মা আবার জীবাত্মা থেকে পরমাত্মা। পুরুষ থেকে প্রকৃতি আবার প্রকৃতি থেকে পুরুষ। চলবে। ......

----------

আধ্যাত্মিক জীবন পথের কিছু কথা।

পর্ব্ব - তিন 

একদল মানুষ আছেন, যারা কর্ম্মে বিশ্বাসী, ধর্ম্মে নয়। এরা ইহলোকে বিশ্বাস করেন, কিন্তু পরলোকে নয়। এদের স্পষ্ট বক্তব্য "যা আছে-কি-নেই জানিনা, তার সম্পর্কে আমার মাথা ব্যাথা নেই, যা আছে  তাকে নিয়ে শান্তিতে রাখুন, যা আমার জ্ঞানের বাইরে, তাকে নিয়ে চিন্তা করে সময় ও অর্থ কোনোটাই ব্যায়  করতে চাই না। সমাজের উন্নয়নে, দুঃখী মানুষের  পাশে দাঁড়াতে এরা  পছন্দ করেন। কিন্তু তথাকথিত সাধু-সমাজের পাশে নয়। এরা সাধু-সন্তদের এড়িয়ে চলেন, এদেরকে অর্থাৎ এই সাধু-সমাজকে এরা উপেক্ষা করে থাকেন। এমনই  একজন নির্ভরশীল চরিত্রের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিলো। কিছুদিন হলো, তিনি ইহলোক ত্যাগ করেছেন। তো তিনি যখন মৃত্যুসজ্বায় তখন তাকে আমি দেখতে গিয়েছিলাম। ঠিক সেই সময়  ডাক্তারবাবু  এসেছেন, তাকে দেখতে।  আর ভদ্রলোক ডাক্তারবাবুকে বলছেন, আর ঔষধ খেয়ে কি হবে ? আমার এখন দেহ ছাড়ার সময় এসেছে। ঔষধে আর কাজ হবে না। আমাকে দেখে ভদ্রলোক বললেন, মশায়, এতদিন আমি পরলোকের কথা বিশ্বাস করিনি, কিন্তু এখন যা দেখছি এবং যে কষ্ট  আমার অনুভব হচ্ছে, তাতে আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি, এই ইহলোকের পরেও একটা লোক আছে,  যা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। আমার একটু শান্তি চাই। আপনি কি আমাকে একটু শান্তি দিতে পারবেন ? আমি মনে মনে ভাবলাম, বিচিত্র এই জগৎ, বিচিত্র এই মানুষের মন, বিচিত্র এই অজ্ঞাত ঈশ্বরের  লীলাখেলা। ইনি ঘোর  নাস্তিক ছিলেন, কিন্তু ছিলেন সৎ-জন। ইনি  ঘোর  সংসারাসক্ত ছিলেন না, বহু অর্থাদি উপাৰ্জন করেছেন, আবার দানও করেছেন, বহুলোকের দুঃখের সময় সাহায্য করেছেন। কিন্তু আজ তাকে সাহায্য করবার জন্য কেউই সক্ষম নন। অতুল ঐশ্বর্যের অধিপতি ইনি। কিন্তু সেই ঐশ্বর্য্য আজ আর কোনো কাজেই আসছে না।  

মানুষ কোথায় ছিলো, কোথায় যাবে, কেন এসেছিলো, কেনই  বা চলে যাবে - এই প্রশ্ন মানুষকে চঞ্চল করে তোলে। এমনকি এই প্রশ্ন একসময় মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলে।  তখন  মানুষ কোলাহল ছেড়ে নিৰ্জনতা খোঁজে। ক্ষণজন্মা এই মনুষ্য দেহধারী জীবের  ভূত ভবিষ্যৎ কি ?  

আমরা শুনেছি জগৎ পরিবর্তনশীল, আমার এই দেহ, মন এমনকি আমার জ্ঞানের মধ্যেও পরিবর্তন হয়ে চলেছে। আর এই যে পরিবর্তন হচ্ছে, এর নিয়ন্ত্রক আমি নোই। এই পরিবর্তন রোধ করবার সাধ্য আমার নেই। আবার আমার মধ্যে একটা ব্যক্তিত্ত্ব আছে, আমার মধ্যে একটা বিশ্বাস আছে, আমার মধ্যে একটা ধারণা  আছে। এই যে ব্যক্তিত্ত্ব, বিশ্বাস, এবং ধারণা  এটি আমি আমার গ্রহণযোগ্যতা অনুসারে প্রকৃতি বা সমাজ থেকে গ্রহণ করেছি।  এই যে আমি - আমার  এই ধারণার মধ্যে পরিবর্তন আনা  সম্ভব। এটি কোনো জটিল প্রক্রিয়া নয়।  সাধুসঙ্গ, সৎ-সঙ্গ, সৎ-গ্রন্থ বা ধর্ম্মগ্রন্থ পাঠ এমনকি গুরুবাক্য শ্রবনে আমাদের এই পরিবর্তন আসতে পারে। যদিও  এই যে পরিবর্তন, তা সাময়িক। আর এই পরিবর্তন অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। 

প্রত্যেকটি জীবের আছে ব্যক্তিসত্ত্বা  - আর এই ব্যক্তিসত্ত্বা  প্রতিনিয়ত পরিবেশের সঙ্গে ভাব বিনিময় করে চলেছে। এই ব্যাক্তিসত্ত্বার  যেমন প্রকারভেদ আছে, তেমনি পরিবেশের মধ্যেও বিস্তর প্রকারভেদ আছে। আবার স্থূল শরীরের সঙ্গে স্থূল জগতের একটা সম্পর্ক আছে।  তেমনি সূক্ষ্ম মনোময় শরীরের সঙ্গে মনোজগতের একটা সম্পর্ক আছে। সূক্ষ্মতর  বিজ্ঞানময়  শরীরের সঙ্গেও  জ্ঞানময় জগতের একটা সম্পর্ক আছে। ঠিক তেমনি জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার একটা সম্পর্ক আছে।  আমরা যখন যে শরীরে অবস্থান করি, তখন সেই জগতের বা সেই স্তরের অভিজ্ঞতাকে সত্য বলে মনে করি। স্বপ্নকালীন অবস্থায় স্বপ-জগৎকে সত্য বলেই মনে হয়। স্বপ্নের জগতের যে অনুভূতি তা অসত্য নয়। আবার এগুলো সত্য এমনটাও নয়।  কিন্তু আমাদের সমস্যা হচ্ছে যথার্থ অনুভূতি আর ভ্রান্ত অনুভূতির মধ্যে আমরা পার্থক্য নির্ণয় করতে পারি না। বিজ্ঞানী যেমন পরীক্ষার-নিরীক্ষার মাধ্যমে সত্যকে খুঁজে নিতে চান, তেমনি অধ্যাত্ম জগতের মানুষগণ অন্তর্দৃষ্টির সহায়ে এই অনুভূতির মধ্যে কোনটি সত্য তা যাচাই করে নিতে চান। দেখুন  আমাদের যে ইন্দ্রিয়-অনুভূতি যাকে  আমরা প্রতক্ষ্য অনুভূতি হিসেবে ধরে নিয়েছি, তা আসলে পরোক্ষ অনুভূতি। কারন হচ্ছে চোখ নিজে দেখে না, কান নিজে শোনে না। বাইরের বস্তু আমাদের ইন্দ্রিয়বাহিত হয়ে প্রথমে মনে, এবং শেষে আত্মায় এই অনুভূতি জাগায়। আত্মা হচ্ছে প্রকৃত পক্ষে আমি বা জ্ঞাতা। প্রকৃতপক্ষে প্রতক্ষ্য অনুভূতি হয়ে থাকে আমাদের অন্তর্লোকে যেখানে আত্মজ্যোতি প্রজ্বলিত হয়ে আছে। এই যে আত্মজ্যোতি এটি স্বয়ং প্রকাশ। একেই আমাদের উপনিষদ বলছে তুরীয় অবস্থা। যদিও এটি কোনো অবস্থা নয়, এটি স্বয়ং-চৈতন্য। এই চৈতন্যের আংশিক প্রকাশ ঘটে তুরীয়-অবস্থায়, স্বপ্নাবস্থায় ও জাগ্রত অবস্থায়। আধ্যাত্মিক অনুভূতি মানুষের এই ব্যক্তিসত্ত্বার মধ্যে রূপান্তর ঘটিয়ে থাকে। তখন মানুষের সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায় ও অশান্ত মানুষ পরম-শান্তির রাজ্যে প্রবেশ করে। 

চলবে। .....

আধ্যাত্মিক জীবন পথের কিছু কথা।

পর্ব্ব - চার 

আধ্যাত্মিক জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি উচ্চতর অনুভূতি আয়ত্ব করা। যোগীপুরুষগন যাকে  বলে থাকেন  জ্ঞানাতীত অবস্থা। আমাদের দুটো সমস্যা একটা শারীরিক, আর একটা হচ্ছে মানসিক। প্রথমত আমাদের প্রাথমিক  চেষ্টা হচ্ছে, নিজের শরীরকে বাঁচিয়ে রাখা। একটা শিশু যখন কিছুই বোঝে না, তখনও তার মধ্যে একটা শারীরিক ক্ষুধা বোধ হয়। সে বাতাসের জন্য আকুপাকু করে, তার মধ্যে এই স্বাভাবিক বোধ জন্ম  থেকেই এসেছে যে তাকে বেঁচে থাকতে গেলে  বাতাস সংগ্রহ করতে হবে।  সে খাবারের জন্য কান্নাকাটি শুরু করে। অর্থাৎ তার মধ্যে এমনটা বোধ স্বাভাবিক  ভাবেই এসে যায়, যে খাদ্য না হলে সে নিজেকে (শরীরকে) বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না। তো শরীরকে রক্ষা বা বাঁচিয়ে রাখবার জন্য তার মধ্যে যেমন জন্ম থেকেই একটা  চাহিদার তৈরী হয়।  তেমনি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তার মনের (যা আসলে খাদ্যের সূক্ষ্মতম কনা বিশেষ)  মধ্যে চাহিদার জন্ম হয়। মন ভোগ-সুখ চায়। সে ভালোবাসা চায়, সে অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়। একটা সময় সে অন্যদের উপরে আধিপত্য করতে চায়। আর এর অন্যথা হলে সে অশান্তির আগুনে জ্বলতে থাকে। 

সাধারণ ভাবে আমরা হিন্দুরা মনে করি, দেহ একটা স্থূল আবরণ বিশেষ।  এই দেহের অভ্যন্তরে আছে আমাদের মন, আছে আত্মা। কিন্তু ব্যাপারটা সম্পূর্ণ উল্টো - আত্মার ভিতরেই আছে মন, আর মনের মধ্যে আছে এই স্থূল-জড় দেহ।  আত্মা অনন্ত, আত্মা সর্বব্যাপী। ইনিই চৈতন্য স্বরূপ।  এই চৈতন্যের মধ্যেই রয়েছে মন।  আর মনের ভিতরে আছে দেহ।  এই যে স্থূল দেহ, তা সীমিত। মন তার থেকে বিস্তৃত, আর আত্মা সর্বব্যাপী। এই মন ও দেহের মধ্যে আছে সেই চৈতন্যের প্রকাশ যা নিতান্তই যৎসামান্য। 

এখন কথা হচ্ছে আধাত্মিক জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে জ্ঞানাতীত অবস্থায় পৌঁছানো। কিন্তু এই জ্ঞানাতীত অবস্থা সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই।  কিন্তু ধারণা  তো এমনি এমনি আসে না, আপনি আগে তাকে ধরবেন, তবেই না তার সম্পর্কে আপনার ধারণা আসবে। যোগীপুরুষগন বলে থাকেন, আধ্যাত্মিক সাধনার দ্বারাই এই অবস্থায় পৌঁছনো যায়।  আর এই অবস্থা অত্যন্ত শান্তি ও সর্বোচ্চ আনন্দের অবস্থা। এই অবস্থায় মানুষ নিজেকে পূর্ণের  সঙ্গে নিজেকে একাত্ম অনুভব করে। 

মানুষের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই  বহির্মুখী।  অবশ্য একদল মানুষ আছেন যারা অন্তর্মুখী। বহির্মুখী মানুষ যেমন বহির্জগৎ বা বাইরের বিষয় নিয়ে ভাবতে ভালোবাসে, তেমনি অন্তর্মুখী মানুষ কেবল নিজের দুর্বলতা নিয়ে ভাবতে ভালোবাসে। এই অন্তর্মুখী মানুষগুলো একটা ভাবের জগতে বাস করেন। আবার এই উভয় শ্রেণীর মানুষের বৈশিষ্ঠ আমরা প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যেই  দেখতে পাই। অর্থাৎ প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে কখনো অন্তর্মুখী ভাব, আবার কখনো বহির্মুখী ভাবের উদয় হয়। এই দুয়ের মধ্যে একটা সংহতি সাধন করাই সাধনার উদ্দেশ্য। সাধনা আমাদেরকে যেমন কর্ম্মে উদ্দীপ্ত করবে, তেমনি মনের মধ্যে নিজের সম্পর্কে একটা উচ্চ আদর্শের জন্ম দেবে। আমি যে দুর্বল নোই, আমি যে বিশ্বশক্তির অংশ, আমার দ্বারা সব কিছু না হোক, অনেক কিছুই করা সম্ভব সেই  প্রত্যয় এনে দেবে।সাধনা।  এমনকি শারীরিক ভাবে সুস্থ  থাকবার, যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে সংযত রাখবার একটা  ক্ষমতা এনে দেবে, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা আপনা থেকেই এসে যাবে । 

মনের মধ্যে রাগ, দুঃখ, এমনকি শারীরিক ভাবে ক্লান্তিকে দূর করবার জন্য, একটা সহজ উপায় হচ্ছে।, সুখাসনে বসে মেরুদন্ড সোজা  করে, চক্ষু মুদ্রিত করে, পুব বা উত্তর দিকে মুখ করে ক্ষাণিক্ষণ (১০/১৫ মিনিট) বসে থাকবার অভ্যাস করা। সমস্ত  অঙ্গগুলোকে শিথিল করে দিন। এর পরে পায়ের পাতা থেকে মাথার উপরিভাবে অবধি অর্থাৎ প্রতিটি অঙ্গের কাছে মনকে নিয়ে গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করুন।  তার ভালো মন্দের  খবর নিন। কিছুই করতে হবে না, শুধু খবর নিন, বলুন, হে পা-কোমড়, হাত, পেট বুক, গলা, মুখ সবাই ভালো আছো তো ?  আর তাকে বলুন, সব ঠিক হয়ে যাবে - একটু ধৈর্য্য ধরো। আমরা সেই সর্বশক্তিমান  ঈশ্বরের তত্ত্বাবধানে আছি, আমরা তাঁরই  সন্তান, তিনিই আমাদের রক্ষা করছেন। সারা দিনে দশ থেকে মাত্র পনেরো মিনিট এই ক্রিয়া করবার অভ্যাস করুন।  আর এর সুফল নিজেই উপলব্ধি করুন। দেখুন, যোগাচার্য্যগণ হয়তো বলবেন, আত্মবিশ্লেষণ করুন, ধ্যান  করুন, এতে আপনি আরো বেশি করে সুফল পাবেন। আমি বলি ধ্যান অনেক গভীরের ব্যাপার।  আর ধ্যান কখনও  করা যায় না।  ধ্যান কোনো করবার বিষয় নয় , ধ্যান হয় - ধ্যান করা যায় না। ঋষি পতঞ্জলি অষ্টাঙ্গ মার্গের শেষের দিকে এসে ধ্যানের নির্দেশ দিয়েছেন। তো আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ধ্যানের সুফল পাওয়া সহজ নয়। ধ্যানে বসলে, মনের মধ্যে নানান চিন্তা এসে ভিড় করবে। চঞ্চল মনে ধ্যানের  সুফল মিলবে না। কিন্তু এই শিথিলায়ন ক্রিয়া আপনি উত্তর বা পুব দিকে মাথা দিয়ে শুয়ে বা পুব বা উত্তর দিকে মুখ করে বসে  করতে পারেন। রাতে শোবার  আগে অথবা ভোরে ঘুম থেকে বিছানা ছাড়বার  আগে, অভ্যাস করুন।  এতে করে আপনার রাতের ঘুম ভালো হবে।  সকল বেলা শরীর  তরতাজা লাগবে। মন চাঙ্গা হবে। 

তো চুপচাপ ১৫ মিনিট নির্জনে বসে, আপনার শরীরের প্রতিটি অঙ্গের খোঁজ নিন। তাকে  শিথিল অর্থাৎ বিশ্রামে যেতে সাহায্য করুন। শ্বাসের গতিকেও স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করুন।  মাত্র পনেরো মিনিটের এই ক্রিয়া আপনাকে আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশের একটা অদ্ভুত সুখানুভূতি এনে দেবে।  আপনার ক্লান্ত দেহ-মন শান্ত হবে আপনি একটা অপার্থিব আনন্দের সন্ধান পাবেন। চলবে।.....

-----------

আধ্যাত্মিক জীবন পথের কিছু কথা।

পর্ব্ব - পাঁচ 

সাধনার উদ্দেশ্য হচ্ছে যথার্থ অনুভূতি লাভের  যোগ্যতা লাভ করা। আর এই অনুভূতি যেন সত্যের উপরে প্রতিষ্ঠিত হয়। যুক্তিবাদীগণ অনেক যুক্তি দিয়ে সত্যকে নিরুপন করবার চেষ্টা করেন। কিন্তু যার  অনুভূতি  হয়েছে, তার কাছে যুক্তি-তর্ক  বৃথা। এই আধ্যাত্মিক অনুভূতি ঋষিগণ লাভ করে থাকেন তুরীয় অবস্থায়। অর্থাৎ তুরীয় অবস্থার অভিজ্ঞতার উপরেই আমাদের সত্যের অনুভূতি হতে পারে। আর এই তুরীয় অবস্থায় পৌঁছনোর জন্য সাধক তপঃ সাধনা করে থাকেন। এই তপঃ  সাধনার ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি।  আর যেকোনো পথেই  এই লক্ষ্যে পৌঁছনো যায়।  

জাগ্রত অবস্থায় আমরা বাহ্য পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে অনুভব করে থাকি। স্বপ্নাবস্থায় আমরা অন্তর-ইন্দ্রিয়ের অর্থাৎ মনের সাহায্যে অনুভব করে থাকি। আর এই দুই অবস্থার মধ্যেই আমাদের যাকিছু অনুভব হয়, তাকে আমরা তাৎক্ষণিক ভাবে সত্য বলেই মনে করি। কিন্তু এই যে অনুভূতি অর্থাৎ জাগ্রত অবস্থায় বাহ্য ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে, আর স্বপ্নাবস্থায় মনের সাহায্যে যে অনুভূতি লাভ করে থাকি, তা সব সময় সত্য হবেই, এমনটা নয়। এইজন্য আমাদের ঋষিমুনিগন, বিচারের সাহায্যে এই অনুভূতিগুলোকে যাচাই করে নিতে বলে থাকেন। সাধন জগতের জিজ্ঞাসু সব সময় চাইবেন, ঈশ্বর যদি থেকে থাকেন, তা কেবল বুদ্ধি দিয়ে বা যুক্তি দিয়ে নয়, ঈশ্বরকে সরাসরি অনুভব করতে হবে। একেই যোগীপুরুষগন বলে থাকে অপরোক্ষ অনুভূতি, বা প্রতক্ষ্য অনুভূতি। 

আমাদের মতো সাধারণ মানুষের যে অভিজ্ঞতা তা আমরা তিনটি অবস্থার মাধ্যমে লাভ করে থাকি।  অর্থাৎ জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি এই তিন অবস্থার অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। আর এই তিনটি অবস্থার মধ্যেই আমরা জ্ঞান সংগ্রহ করে থাকি। কিন্তু যোগাচার্য্যগণ বলছেন, এই তিন অবস্থার বাইরে আরো একটা অবস্থা আছে যাকে  বলা হয় তুরীয় অবস্থা যা আসলে জ্ঞানাতীত বা চৈতন্যের স্বরূপ অবস্থা। এই অবস্থায়ও আমাদের জ্ঞান লাভ হয়ে থাকে। আর একেই  যথার্থ জ্ঞান বলা হয়ে থাকে। 

আগেই শুনেছি, এই লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য নানান পথ আছে।  এর মধ্যে কোনটি আমার পক্ষে উপযুক্ত তা নির্ণয় করতে হবে। সাধনার প্রথম দিকে এই পথ নির্ণয় করার জন্য সাধন পথে ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে হয়। অর্থাৎ প্রয়োজনে পথ পরিবর্তন করবার জন্য যেন আমাকে অধিক সময় ব্যায় না করতে হয়। 

দেখুন সাধারনতঃ আমরা কেউ আমাদেরকে দেখতে পারি না, এমনকি আমরা কেউই আমাদেরকে চিনতে পারি না। অন্যলোকের কথার উপরে আমাদের নির্ভর করতে হয়। অন্যরা যদি বলে, বাহ্ বেশ হয়েছে, তোমাকে খুব ভালো লাগছে, তবে আমরা নিজেকে সেইমতো ভেবে নেই। আর যদি উল্টোটা বলে তবে, আমরা সেইমতো নিজেকে ভাবতে শিখি। আমরা নিজেকে দেখবার জন্য আয়নার ব্যবহার করি। ঠিক তেমনি আপনার সাধন পথ কি হবে, অর্থাৎ আপনি কেমন মানুষ, তা আপনি নিজে যাচাই করতে পারবেন না। যদি কেউ সেটি পারেন, তবে উত্তম, তবে বেশিরভাগ মানুষ নিজের খাদ্য নিজে নির্বাচন করতে পারেন না। ছোটবেলায়, মাতা-পিতা , বড়ো  হলে ডাক্তার আমাদেরকে এই নির্দেশ দিয়ে থাকেন। অন্যদিকে আমরা নিজেরা লোভের  বশে, অথবা জিহবার স্বাদে খাদ্য গ্রহণ করে থাকি।  কোনটা আমার পক্ষে ভালো, আর কোনটা মন্দ তা আমরা অনেক সময় বুঝেও বুঝি না। 

আপনি শুনেছেন, যোগীপুরুষগন ধ্যানে বসেন।  তো আপনি বই পড়ে , বা কারুর কাছ থেকে শুনে যদি সরাসরি ধ্যানে বসে যান, তবে আপনার এই কাজ কেবলমাত্র সময়ের অপব্যয় ছাড়া কিছু হবে না। কারন ধ্যান সহজে হয় না, তার আগে অনেক প্রস্তুতি আছে, যা আপনি অভ্যাস করেন নি। তো বই পড়ে , বা শুধু কারুর কাছ থেকে শুনে এই সাধন পথে এগুনো যায় না। দেখুন বই কিন্তু কেবলমাত্র আপনার জন্য লেখা হয়েছে, তা নয়।  বই একটা সাধারণ  জ্ঞানের জন্য, সবার জন্য,  সাধারণ মানুষের জন্য, এমনকি সর্ব্ব-স্তরের মানুষের জন্য লেখা হয়ে থাকে। এমনকি সমস্ত সাধন পথের বর্ণনাও আপনি হয়তো বইয়ের পাতায় পাবেন, কিন্তু তার প্রয়োগ করা আপনার পক্ষে অনুচিত হবে। কারন এই সাধনপথের বাধা ও তার অপসারণের বাস্তব অভিজ্ঞতা আপনার নেই। তাই একজন আচার্য্য-এর আশ্রয় নিন। হোক না তিনি অযোগ্য, তথাপি তাকে দিয়েই আপনার প্রাথমিক ক্রিয়া শুরু হোক। এর পরে, আপনি আচার্য্যের পরিবর্তন করে নিতে পারবেন। দেখুন প্রাইমারি বিদ্যালয়ের ছাত্রকে মহাবিদ্যালয়ের আচার্য্য শিক্ষা দেবেন না।  তাই আপনি যার কথা বোঝেন, বা যিনি আপনার কথা বোঝেন, তার আশ্রয় দিয়েই নিজের সাধন জীবন শুরু করুন । 

আপনার লক্ষ যদি ঈশ্বর অনুভূতি লাভ হয়, তবে যাদের এই অনুভূতি হয়েছে, তাদের সাহায্য নিন, বা নিদেন পক্ষে তাঁর  সাহায্য নিন, যিনি এই অনুভূতির প্রতি গভীর আস্থাশীল । এখন কথা হচ্ছে, কার ঈশ্বর দর্শন হয়েছে, তা আপনি বুঝবেন কি করে ? এর জন্য প্রথমে আপনাকে বিশ্বাসের আশ্রয় নিতে হবে, এর পরে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাদের অনুভূতির সত্যতাকে আমাদের পরীক্ষা করে নিতে হবে। দেখুন শুধু বিশ্বাস আপনাকে কোনো অনুভূতি এনে দিতে পারে না।  কিন্তু বিশ্বাসের রাস্তা দিয়েই  প্রথমে চলা শুরু করতে হয়। একটা জিনিস জানবেন, এই ঈশ্বর বা আত্মা, বা ব্রহ্মকে কোটি কোটি লোক অনুভব করেছেন। তো যদি কেউ অর্থাৎ একজনও  যদি এই ঈশ্বরকে অনুভব করে থাকেন, তবে আপনি আমিও সেই অনুভব অবশ্যই  পেতে পারি। আর এই অনুভূতি সম্পন্ন হলেই আমরা যথার্থ ধর্ম্মিক হতে পারবো। 
--------চলবে 

আধ্যাত্মিক জীবন পথের কিছু কথা।

পর্ব্ব - ছয়  - গুরুর স্থান
 
প্রথমেই বলি গুরু স্বরূপতঃ নিরাকার চৈতন্যময়। এই গুরুকে খুঁজতে হয় না।  এই গুরু স্বতঃ প্রবৃত্ত হয়ে উদয় হন। আপনার চিত্ত আকাশেই এনার উদয় হয়ে থাকে। আপনি আজ  যাঁর জোরে এই অধ্যাত্ম চিন্তায় মগ্ন হয়েছেন,  সত্যকে খোঁজার জন্য অনুপ্রাণিত হয়েছেন, তা এই নিরাকার চৈতন্যময়ের উদয়ের কারনেই হয়েছে। অর্থাৎ জীবের  মধ্যেই স্বয়ংপ্রকাশ হয়েছেন চৈতন্যময়। এই নিরাকার গুরুই আপনাকে সাধন পথে পরিচালনা করছেন। এঁকে আমরা সাক্ষাৎ  করতে পারি না, কিন্তু একটু গভীরে মনোযোগ দিলেই বুঝতে পারি, ইনিই আমাকে সাধনপথে পরিচালনা করছেন। 

এর আগের দিন আমরা শুনেছিলাম একজন আচার্য্যের আশ্রয়ে যেতে। আচার্য্য অর্থাৎ যাঁর অধ্যাত্ম জগৎ সম্পর্কে তাত্ত্বিক জ্ঞান আছে। খেয়াল করবেন, আচার্যকে প্রথমে নির্বাচন করতে হয়। অর্থাৎ যার শাস্ত্র আলোচনা আপনার কাছে বোধগম্য হয়, তাঁর  কথা শুনুন। এবং বুঝবার চেষ্টা করুন, তাঁর  কথার মধ্যে কতটা সারবত্ত্বা আছে। এবার নিজের মধ্যে প্রশ্ন তুলুন, নিজের মধ্যে জবাব  খুজুন, নিজের মধ্যে  জবাব খুঁজে না পেলে, সেই প্রশ্নের জবাব আচার্য্যের কাছ থেকে জেনে নিন। এর বেশি আচার্য্যের কাছ থেকে আশা করবেন না। স্কুল-কলেজের শিক্ষার জন্য যেমন আমরা বই বা একজন শিক্ষকের বা একাধিক শিক্ষকের কাছ থেকে জ্ঞান লাভ করি, তেমনি অধ্যাত্ম জগতে প্রবেশ করতে গেলে, প্রথমে শাস্ত্র অধ্যায়ন ও আচার্য্যেদের  কাছ থেকে শাস্ত্রের ব্যাখ্যা শুনে নিতে হয়।
 
এই অধ্যাত্ম জগতে আরো দুজন মহাপুরুষের ভূমিকা আছে।  একজন গুরু আর একজন সদগুরু। যদিও সৎগুরু বা অসৎ গুরু বলে কিছু হয় না। তাই এই উভয়কেই আমরা গুরু বলে সম্ভাষণ করতে পারি। ছোট্ট করে এই দুইজনের মধ্যে পার্থক্যটা আমরা একবার বুঝে নেই। দেখুন সবাই ডাক্তার, তা তিনি কানের ডাক্তার হতে পারেন, অস্থি বিশারদ হতে পারেন, কেউ আবার হৃদরোগ বিশারদ। কিন্তু সবাই ডাক্তার। আবার সব কিছু সম্পর্কে যার ভাষা ভাষা জ্ঞান আছে, তিনি জেনারেল ফিজিশিয়ান।সমস্ত শরীর-বিদ্যা সম্পর্কে যার সম্যক জ্ঞান আছে, তিনি ধন্বন্তরী।  তিনিও ডাক্তার। আবার অভিজ্ঞ ডাক্তার বলে একটা কথা আছে - অর্থাৎ চিকিৎসাশাস্ত্র প্রয়োগবিদ্যায় যিনি পারদর্শী। আমাদের  স্কুল কলেজ জীবনেও আমরা ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের জন্য ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষকের সহায়তা নিয়ে থাকি। সবাই শিক্ষক   কিন্তু আমার যে বিষয়ে দুর্ব্বলতা, বা যে বিষয়ে আমার আগ্রহ বেশী  আমরা সেই শিক্ষকের  কাছে বেশি যাই।  এদের মধ্যে কাউকে আমার ভালো লাগে, আবার কাউকে লাগে না। তার কারন হচ্ছে, বিষয়কে আয়ত্ত্ব করবার জন্য আমার যে বোধবুদ্ধি, আমার যে ভাষাজ্ঞান, তার  সঙ্গে শিক্ষকের একটা সাজুয্য দেখা যায়।  আর এই কারণেই সেই শিক্ষকের কাছ থেকে আমার জ্ঞানের বৃদ্ধি হতে পারে।  

অধ্যাত্ম জগতে তিনজন গুরুর দর্শন পাওয়া যায়। কেউ জ্ঞান দাতা, কেউ ভক্তিদাতা, কেউ আবার কর্ম্মদাতা। এঁরা সবাই গুরু। সত্যকে যিনি খণ্ডিত আকারে উপদেশ প্রদান করেন, তিনি খন্ডসত্যের  উপদেষ্টা - গুরু।  আর যিনি অখন্ড সত্যের উপদেষ্টা তিনি সৎগুরু।  আমাদের মধ্যে যেমন জ্ঞানের গ্রহণ ক্ষমতার মধ্যে একটা তারতম্য আছে তেমনি  গুরুর মধ্যে জ্ঞান বিতরণের যে শক্তি আছে, তার মধ্যেও তারতম্য আছে। তাই গুরুতত্ত্ব এক হলেও, গুরুগনের মধ্যে শ্রেণী-বিভাগ আছে।  

গুরুর প্রাথমিক কাজ হচ্ছে, শিষ্যরূপী জীবের সকল দুঃখের অর্থাৎ ত্রিবিধ দুঃখের  নিবৃত্তি করা। দেখুন আমরা সবাই এই সংসার নামক নদীর  স্রোতে ভেসে চলেছি। এই যে সংসার এর মধ্যে দুটো জগৎ আছে, একটা শুদ্ধ আর একটা অশুদ্ধ। দুইই  মায়া  সঞ্জাত। এই সংসারের মুলে আছে অবিদ্যা যার সহজাত ফল হচ্ছে বিষয়-আসক্তি, যা অশুদ্ধির কারনে ঘটে থাকে।  আর একটা হচ্ছে বিষয়- জ্ঞানাসক্তি  যা শুদ্ধির কারনে ঘটে থাকে। এই দুইই মলিন সংসার। আত্মা এই দুই জগতের উর্দ্ধে।  তথাপি আত্মা প্রতিটি বস্তুর সঙ্গে অভিন্ন হয়ে অবস্থান করছেন। এরই কল্পিত খণ্ডরূপ এই সুখ-দুঃখময় জগতে আনন্দ ও শক্তির লীলারূপে  আত্মপ্রকাশ  করে থাকে।   তাই আত্মার পূর্ন  স্বরূপের উপলব্ধি পেতে গেলে, মলিন জগৎ তো বটেই শুদ্ধ জগৎকেও অতিক্রম করে কেবলমাত্র আত্মস্বরূপে উপনীত হতে হয়। তখন পূর্ন  শক্তির বিকাশের সাথে জগৎ শিবময় হয়ে ওঠে। তখন আপন-পরের মধ্যে অভিন্নতা আপনা-আপনি ফুটে ওঠে। এখন কথা হচ্ছে এর সঙ্গে গুরু বা সদ্গুরুর সম্পর্ক কি ?  

আমরা আগেই শুনেছি,  শিষ্যের  দুঃখ নিবৃত্তির ব্যবস্থা করাই  গুরুর আশু কর্তব্য। কর্তৃত্ত্বাভিমানী মনুষ্যরূপী জীব, অনাদিকাল থেকে কর্ম্মের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে কৃত কর্ম্মের ফল ভোগ করছে। জন্ম থেকে জন্মান্তর ধরে এই প্রবাহ চলছে। এই কর্তৃত্বাভিমান ও ভেদজ্ঞান যতক্ষন পর্যন্ত দূরীভূত না হচ্ছে, ততক্ষন এই সংসার লীলা ও সুখ-দুঃখের ভোগ চলতে থাকবে। প্রত্যেকটি জীব চিদাত্মক, কিন্তু মায়ার  প্রভাবে সে নিজের চিৎসত্তাকে ভুলে বসে আছে।  আর স্বরূপ  বিস্মৃত এই জীবরুপী  কর্ম্মশরীরের নির্মাণ করে কর্ম্মফল ভোগ করে চলেছে। কখনও  পুন্য কর্ম্মের ফলে সে স্বর্গসুখ ভোগ করছে, আবার কখনো পাপ কর্ম্মের ফলে সে নরকযন্ত্রণা ভোগ করছে। যতক্ষন সে নিজেকে জড়দেহ থেকে পৃথক বলে নিজেকে চিনতে না পারবে ততক্ষন এই জড়জগতের দুঃখময় কালচক্র থেকে নিষ্কৃতি নেই। এইখানে গুরুদেবের ভূমিকা গুরুত্ত্বপূর্ন। এই অজ্ঞান থেকে মুক্ত করবার জন্য যিনি সহায়তা করেন, তিনি গুরু। এই জ্ঞানকেই বলা হয়, বিবেকজ জ্ঞান বা  বিবেকজ্ঞান। যখন বিশুদ্ধতম বিবেকজ্ঞানের মধ্যে জীব প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন জীবের যে অবস্থা হয় তাকেই বলে মুক্তি। 

যদিও দুঃখ থেকে নিবৃত্তির অবস্থা জীবের পূর্ণত্ব প্রাপ্তি নয়। আত্মাই পরমাত্মা - শিবই জীব।  তিনটে জিনিস শব-জীব-শিব। শিব যখন শক্তি বিহীন থাকেন, তখন তিনি শব । যদিও শিব ও জীব  অভিন্ন তথাপি শিব ও জীব  এক নয়।  সাধন জগতে পূর্ন  বিকাশের জন্য শিব ও শক্তি উভয়কে আশ্রয় করতে হয়। শব, শিব ও শক্তির মিলিত সত্তা হচ্ছে জীব।  শব-শিব-শক্তি এই তিনের খেলা জগৎকে চঞ্চল করেছে। শিবের ব্যক্ত ও অব্যক্ত এই দুই অবস্থা। শিবই মহা-প্রকাশাত্মক হয়ে ব্যক্ত হয়েছেন। অধ্যাত্ম জীবনের পূর্ন  বিকাশের জন্য  শব-জীব-শিব এই তিনের অখন্ড অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেন গুরুদেব বা সৎগুরু। সত্যি কথা বলতে কি আত্মাই সৎগুরু। তিনিই মায়ায় অন্ধ জীবকে মায়া  থেকে মুক্ত করে অন্তর্নিহিত শক্তিকে প্রবুদ্ধ করে আপন শক্তিকে স্বরূপে অর্থাৎ শিব-স্বরূপে নিয়ে আসেন।
জ্ঞান  লাভের জন্য দুটো জিনিসের প্রয়োজন, একটা হচ্ছে ইচ্ছে, আর একটা হচ্ছে ক্রিয়া। আবার অন্যের দুঃখ দূরকরবর যে ইচ্ছে তাকে বলে কৃপা। জ্ঞানী ব্যক্তির মধ্যে যখন অপরের  দুঃখকে দূর করবার ইচ্ছে জাগ্রত হয়, তখন তিনি গুরুপদবাচ্য হয়ে ওঠেন। কিন্তু কেবলমাত্র ইচ্ছে জ্ঞানীকে জ্ঞান বিতরনে সাহায্য করতে পারে না। ইচ্ছেকে সফল রূপ দেবার সামর্থ্য বা শক্তি চাই। ইচ্ছে যখন প্রবল আকার ধারণ করে, বা কৃপা যখন ফল প্রদানে সক্ষম হয়, তখন আপ্ত-পুরুষের প্রকাশ ঘটে। এই অবস্থায় গুরু-শিষ্যের মধ্যে ইচ্ছেশক্তির একটা মিলন ঘটে। তখন উভয়ের হৃদয়ের মধ্যে একটা একাত্মতা অনুভব হয়। গুরুর ইচ্ছেশক্তির  প্রাবল্যে শিষ্যের হৃদয়ে একই শুদ্ধ জ্ঞানের প্রকাশ দেখা যায়। একেই গুরুর অলৌকিক ক্রিয়াশক্তি বলতে পারেন, যা কেবলমাত্র যথার্থ গুরুর মধ্যে দেখা যায় । এই অবস্থায় শিষ্যের মধ্যে জীবন পথের যাবতীয় অন্তরায় দূর করে দেয়। এঁকেই  আপনি দেহধারী সদ্গুরু বলতে পারেন। এঁরাই আপ্ত-পুরুষ, আদর্শ গুরু।  
চলবে। ....

আধ্যাত্মিক জীবন পথের কিছু কথা।

পর্ব্ব - সাত  - দীক্ষা 

দীক্ষ কথাটার অর্থ হচ্ছে উপদেশ করা।  স্ত্রীলিঙ্গে দীক্ষা। জ্ঞান বিজ্ঞানের  প্রকাশ পথের আবরক যে পাপরাশি তাকে ক্ষয় করাই দীক্ষা।  অধ্যাত্ম জীবনে দীক্ষা মানুষকে রূপান্তরিত করে দেয়। দীক্ষা মানুষকে জীব থেকে শিবে রূপান্তরিত করে দেয়। এই দীক্ষা, জীবের যে পৌরুষ অজ্ঞান  তা থেকে মুক্ত করে।  কেবলমাত্র  গুরুকৃপা বশতঃ এই দীক্ষা প্রাপ্ত হওয়া যায়। দীক্ষা হচ্ছে দিব্যজ্ঞান উন্মেষের দ্বারস্বরূপ। যোগক্রিয়ার দ্বারা যেমন ষটচক্র ভেদের ফলে জ্ঞাণনেত্রের উন্মীলন হয়, তেমনি সদ্গুরু থেকে প্রাপ্ত দীক্ষার সাহায্যে এক মুহূর্তে জ্ঞাননেত্রের উন্মীলন হয়। আমরা জানি ষটচক্র ভেদের জন্য সাধককে নিজেকে পরিশ্রম করে কুণ্ডলিনী জাগ্রত করতে হয়। কিন্তু সদ্গুরুর কৃপায় একমুহূর্তে এই সুপ্তশক্তিকে জাগ্রত করা হয়। দীক্ষা হচ্ছে একটা শক্তির প্রবাহ - যা গুরুদেব থেকে শিষ্যের মধ্যে প্রবেশ করে থাকে । 

আমাদের ধর্ম্মশাস্ত্রে দীক্ষাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একটা হচ্ছে বাহ্য  দীক্ষা আর একটা হচ্ছে অন্তরদীক্ষা। বাহ্য দীক্ষায় বাহ্য  উপকরণের দরকার হয়, যেমন মাটি, জল ইত্যাদি। কিন্তু অন্তরদীক্ষায় বাহ্য  উপকরণের পরিবর্তে দরকার  হয় তেজ, বায়ু, আকাশ ও মন। আমাদের আজকের আলোচনা এই অন্তর-দীক্ষা সম্পর্কে। এই অন্তর-দীক্ষা দেহধারী গুরুর মাধ্যমেও  সঞ্চারিত হতে পারে। 

শ্রী শ্রী বিজয় গোস্বামীর নাম নিশ্চয় আপনারা সবাই শুনেছেন। ইনি  ব্রাহ্ম ছিলেন, গুরুবাদে বিশ্বাস করতেন না। তার জীবনে বারংবার অলৌকিকভাবে গুরুকৃপা বর্ষিত হয়েছে। আসলে গুরুকৃপা চেয়ে পাওয়া যায় না। নিজেকে উপযুক্ত করলে, গুরুকৃপা অলৌকিকভাবে এসে যায়। যাইহোক, এই বিজয় গোস্বামী একদিন কাশীর  মণিকর্ণিকা ঘাটে  বসে আছেন, হঠাৎ সেখানে ত্রৈলঙ্গ স্বামী এসে উপস্থিত হলেন। বললেন, স্নান করে আয়, তোকে  দীক্ষা দেবো। বিজয় গোস্বামী বললেন, তোমার কাছে আবার দীক্ষা নেবো কী - আমি ব্রাহ্ম, গুরুবাদ মানিনা। তাছাড়া, তুমি কখনো শিবের পূজা করো, আবার কখনো কালীর  গায়ে প্রস্রাব ছিঁটিয়ে  দাও। আমি তোমার কাছে দীক্ষা নেবো না। আর গুরু বলেও তোমাকে আমি মনে করি না। ত্রৈলঙ্গ স্বামী বললেন, ঠিক বলেছিস, আমি তোর  গুরু নোই, সময়ে তোর গুরুর সাক্ষাৎ হবে। তথাপি তোকে দীক্ষা দেবার একটা কারন আছে। আমি তোর শরীর  শুদ্ধ করে দেবো। যা স্নান করে আয়। গোসাঁইজী বাধ্য হয়ে  স্নান করে এলে, একরকম জোর করেই, স্বামীজী তাকে তিনটি মন্ত্র দান  করেন, যা তিনি (বিজয় গোস্বামী) তাঁর মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। এই হচ্ছে আকাশ অর্থাৎ শব্দ দীক্ষা। 

স্বামী বিবেকানন্দ ঠাকুর রামকৃষ্ণের কাছ থেকে পেয়েছিলেন স্পর্শ (বায়ু) দীক্ষা, সে কাহিনী আমরা অনেকবার শুনেছি।  কেবল মাত্র পায়ের স্পর্শশক্তি দ্বারা স্বামীজিকে তিনি সজ্ঞা বা যথার্থ জ্ঞান দান  করেছিলেন ।  

দেখুন, জননীর  গর্ভে পিতা বীজ গ্রথিত করেন। এর পর ক্রমশঃ  সেই বীজ মায়ের প্রাণের সংস্পর্শে এসে পুষ্টিলাভ করে অঙ্গ -প্রত্যঙ্গ সহকারে পূর্নতা প্রাপ্ত হয়। এরপর একদিন প্রসব ক্রিয়ার সাহায্যে ইন্দ্রিয়গোচর হয়ে ওঠে।  মায়ের মধ্যে তখন একটা অভূতপূর্ব আনন্দের অনুভূতি এনে দেয়।  ঠিক তেমনি গুরুমন্ত্র বা বীজমন্ত্র গুরুদেব শিষ্যের হৃদয়ক্ষেত্রে বপন করেন।  এরপর সাধকের পরিচর্য্যায় ও কালের অনুকূল পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একদিন এই বীজ অংকুরিত হয়ে আকার ধারণ করে। পরে সে সাকাররূপ  আনন্দময় সত্তা সাধকের দৃষ্টির গোচরে আসে।  তখন সাধক অসীম অনাদি আনন্দে উদ্বেল হয়ে যায়। তখন সাধকের  সকল ইন্দ্রিয় এই সাক্ষাতে সাধ দেয়। তখন ইষ্টদেব তার ইন্দ্রিয়সাধ্য হয়ে সাধকের  সম্মুখে প্রকাশিত হন। সাধকের এই অবস্থায়  সমস্ত অভাববোধ জীবন থেকে তিরোহিত হয়ে যায়। সমস্ত দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে যায়। প্রাথমিক ভাবে গুরুর কৃপায়, সাধকের এই ইষ্টদর্শন পূর্বে পূর্বে অনুভূত সমস্ত আনন্দকে ম্লান করে দেয়। 

যদিও এই যে ইষ্ট দর্শন ও তার উপায় সাধন সদ্গুরুদেবের  উদ্দেশ্য নয়  কিন্তু এই ইষ্টদর্শন অবস্থা সাধকের মধ্যে এলে, নিরাকার চৈতন্যস্বরূপের দিকে অগ্রসর হওয়া  সহজ সাধ্য হয়। ধীরে ধীরে ইষ্ট   ওই  নিরাকার চৈতন্যস্বরূপের্ মধ্যে বিলীন হতে থাকে।  তখন গুরুদেব ও চৈতন্যস্বরূপের মধ্যে একটা অভিন্ন ভাবের সৃষ্টি হয়। তখন সাধক স্বয়ং, সদ্গুরুদেব,  ও চৈতন্যময় সত্তা সব একীভূত হয়ে যায়। এই অবস্থা সাকার, নিরাকার থেকে আলাদা হয়ে একটা বিশুদ্ধ আত্মস্বরূপের দর্শন হয়। এক অখন্ড প্রকাশ, যেন সব আছে আবার কিছুই নেই।  তখন নানাত্ব আর একত্ত্ব একাকার হয়ে যায়।  
  
যাইহোক, আমরা আলোচনা করছিলাম, দীক্ষা নিয়ে।  অন্তর-দীক্ষায় তেজ, বায়ু, আকাশ ও মনের আবশ্যক হয়। আমরা যেমন কথা দিয়ে মানুষের মন জয় করতে পারি,  কথা দিয়ে আমরা ভাবের বিনিময় করি, কথা দিয়ে আমরা আমাদের জ্ঞানের বিতরণ করতে পারি ঠিক তেমনি দেখবেন, অনেকসময় গুরুদেব কেবলমাত্র দৃষ্টি (তেজ) দিয়ে অর্থাৎ ভ্রূমধ্যে দৃষ্টি (তেজঃ শক্তিকে) নিবদ্ধ করে সাধকের মধ্যে জ্ঞান সঞ্চার করেন। অনেক সময় কানের কাছে মুখ নিয়ে মন্ত্র (শব্দ যা আসলে আকাশের গুন্) উচ্চারণ করে থাকেন, অনেক সময় স্পর্শ (বায়ু) দিয়ে জ্ঞানের সঞ্চার করে থাকেন।  দীক্ষা যেমন ভাবেই হোক না কেন, একটা শক্তিকে শিষ্যের মধ্যে সঞ্চার করাই  উদ্দেশ্য। এখন কথা হচ্ছে, এসব অর্থাৎ স্পর্শ ইত্যাদি করে শক্তি সঞ্চার, বা দৃষ্টি দিয়ে শক্তি সঞ্চার, এগুলো কি আদৌ সম্ভব। গোপীনাথ কবিরাজ মহাশয় সুন্দর উদাহরনের সাহায্যে এই ব্যাপারটা বুঝিয়েছেন। তিনি বলছেন, মাছ তার ডিমের দিকে গভীর দৃষ্টি  নিক্ষেপ করে, ডিম্  থেকে বাচ্চা বের করে আনে । মুরগি বা পাখি স্পর্শ দ্বারা ডিম্ থেকে বাচ্চা বের করে আনে। কচ্ছপ ডিম্ সমুদ্রের পারে ডিম্ পেড়ে  নিজে জলের  মধ্যে থেকে কেবলমাত্র মানসিক চিন্তনের সাহায্যে ডিম্ থেকে বাচ্চা বের করে  আনে ।  তো শক্তি সঞ্চার করবার নানান প্রক্রিয়া আমরা প্রকৃতির মধ্যে দেখতে পাই। 
সব শেষে বলি, দীক্ষা কিভাবে, কোন প্রক্রিয়ার সাহায্যে হচ্ছে সেটা বড়ো  কথা নয়, আপনার মধ্যে গুরুপ্রদত্ত জ্ঞানের সঞ্চার হচ্ছে কি না সেটাই বড়ো কথা। যদিও আজকাল দীক্ষা একটা অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এইসব আনুষ্ঠানিক দীক্ষা আসলে  নির্বীজ দীক্ষা - যা কখনোই শিষ্যের মধ্যে না কোনো পরিবর্তন আনতে  পারে, না কোনো আধ্যাত্মিক জ্ঞানের বৃদ্ধি হতে পারে। 

চলবে। .....


আধ্যাত্মিক জীবন পথের কিছু কথা।

পর্ব্ব - আট   - গুরুকৃপা  

স্বামী যতীশ্বরানন্দ তাঁর সন্ন্যাস দীক্ষা সম্পর্কে বলছেন " আমার সন্যাস দীক্ষার দিন, আমি অনুভব করলাম শ্রীমহারাজ (স্বামী ব্রহ্মানন্দ ) যেন অলৌকিক ভাবাবেগে শিহরিত হচ্ছেন। 'হোমা'নুপানাদির পর যখন আমি তাঁকে প্রণাম করছি, তিনি তাঁর  হাতখানি আমার মাথায় রাখলেন আর আমি তখনই এক বিরাট সত্তার অনুভূতি লাভ করলাম - যেন তিনি, এই জগৎ আর আমি নিজে এক অসীম অনন্ত সত্তার সঙ্গে মিলে  মিশে এক হয়ে গেছি।" 

যার কখনও গুরুর সাক্ষাৎ ঘটেনি, তাকে গুরুর প্রয়োজনীয়তা বোঝানো বিড়ম্বনা। এই গুরু হতে পারেন  দেহধারী, আবার এই গুরুদেব হতে পারেন  দেহাতীত। লৌকিক বা পার্থিব  জগৎ সম্পর্কে জানতে যেমন একজন উপযুক্ত শিক্ষকের প্রয়োজন, তেমনি অলৌকিক বা অপার্থিব জগৎ সম্পর্কে জানতে, বা সেই অধ্যাত্ম জীবনের পথনির্দেশ জানতে একজন উপযুক্ত গুরুর প্রয়োজন। এখন কথা হচ্ছে - আমাদের অনেকের ধারণা  হচ্ছে যাঁরা  সাধন-মর্গে বিচরণ করছেন, যাঁরা নিজেরা দীক্ষিত, এমনকি যাঁরা  সিদ্ধি লাভ করেছেন, তাঁরাই  দীক্ষাদানের যোগ্য। ব্যাপারটা কিন্তু  এমন নয়। আপনি নিজে পণ্ডিত হলেও অন্যকে আপনি পণ্ডিত বানাতে পারবেন, এমনটা নয়। পণ্ডিত হতে গেলে যেমন একজন পন্ডিতের আবশ্যক তেমনি আপনার মধ্যে পণ্ডিত হবার যোগ্যতা অৰ্জন করতে হবে। অর্থাৎ আপনার সাধনাই আপনাকে সিদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, তবে এঁরা  অর্থাৎ এই ব্যতিক্রমী পুরুষ জন্মসিদ্ধ।  এঁরা  জন্ম-জন্মান্তরের সাধক।  জন্মান্তরে তাই এঁরা স্বভাবসিদ্ধ পুরুষ হয়ে থাকেন ।  কিন্তু এঁরা কোটিতে এক হয়ে থাকে। সর্ব্ব সাধারনের জন্য সাধন-পথের  নির্দেশের জন্য একজন উপযুক্ত গুরুর প্রয়োজন।  তবে কেউ যদি সিদ্ধপুরুষ হনও তথাপি তার মধ্যে অন্তর-দীক্ষা দেবার ক্ষমতা জন্মে না। দেখুন শক্তি সঞ্চয় করা, আর শক্তি সঞ্চার করা এক কথা নয়।  অনেক শিক্ষক আছেন, যিনি নিজে অনেক কিছু জানেন, কিন্তু ছাত্রের মধ্যে সেই জ্ঞান সঞ্চার করতে অক্ষম। তেমনি সিদ্ধ পুরুষের মধ্যে অবশ্যই শক্তি সঞ্চিত হয়েছে, কিন্তু শক্তি সঞ্চার করবার যে বিদ্যা তা তিনি আয়ত্ত্বে আনতে  পারেন নি। অনেক সময় দেখা যায়, এই শক্তি তিনি ধরে রাখতে অক্ষম হয়ে থাকেন, এবং তাঁর অজ্ঞাতসারে এই শক্তি সঞ্চারিত হতে থাকে।  আসলে এইসময় সিদ্ধ পুরুষকে ঘিরে অনেক অলৌকিক ঘটনা সংগঠিত হয়, যার ব্যাখ্যা বা কিভাবে এটি ঘটছে, তা তিনি নিজে থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননা - এমনকি এই ঘটনা তিনি বারংবার  করতেও পারেন না।  হয়তো তার হাতের ছোঁয়ায়  মৃত জীব প্রাণবন্ত হচ্ছে, কিন্তু এসব তার আয়ত্ত্বের বাইরে সংগঠিত হচ্ছে। আগুনের মধ্যে দাহিকাশক্তি আছে, এই দাহিকা শক্তিকে আগুন নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। এই ক্ষমতা আগুনের ধর্ম্ম হয়ে থাকে। তাই সিদ্ধ পুরুষ মানেই সিদ্ধিদাতা হবেন, তার কোনো মানে নেই।  বা দীক্ষিত পুরুষ মানেই দীক্ষা দেবার ক্ষমতা পেয়েছেন, এমন কথা বলা যায় না। আসলে এই শক্তি অৰ্জন করা, আর শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ  করবার ক্ষমতা অৰ্জন করা এক কথা নয়।  এছাড়া আরো একটা কথা আছে, যিনি ঈশ্বরকে প্রাপ্ত হবার জন্য সাধনমার্গে অবস্থান করছেন, তার পক্ষে ভগবৎ প্রাপ্তি না হওয়া পর্যন্ত, তার এই সাধনশক্তির  অপচয় করা উচিত নয়। এতে করে নিজের উন্নতি বাধাপ্রাপ্ত হয়। শুধু ভগবৎ  প্রাপ্তি নয়, ভগবানের নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত দীক্ষাদান শুধু নিজের পক্ষে ক্ষতিকর নয়, অন্যের এতে করে কোনো কল্যাণ হয় না।

আসলে গুরু-দেহের মধ্যে থেকে সেই জগৎগুরু ক্রিয়া করে থাকেন।  যিনি জগৎগুরুর সঙ্গে নিজেকে একাত্ম অনুভব করতে না পেরেছেন, তিনি গুরুগিরি থেকে দূরে থাকবেন। তবে একটা কথা বলি, আপনি কাকে গুরু হিসেবে মেনে নিচ্ছেন, তিনি সত্যিকারের গুরু কি না, অর্থাৎ তার মধ্যে ভাগবত সত্তার সারা পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা আমাদের পক্ষে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়।  তাই যাকেই আপনি গুরুপদে বরণ  করছেন, তার প্রতি আপনি সম্পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখুন, এবং আপনার বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে সাধন ভজন  করতে থাকুন। নিজের মধ্যে সন্দেহের বীজকে সমূলে উৎপাটন করুন। একটা জিনিস জানবেন, আপনার বিশ্বাস, আপনার সাধনপথে নিষ্ঠা ও নিরন্তর সাধনক্রিয়া আপনাকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাবে। আর আপনার এই শ্রদ্ধা, ভক্তি ও নিষ্ঠা আপনাকে সাধনায় সিদ্ধি অবশ্যই প্রদান করবে। এইজন্য হিন্দুশাস্ত্র, গুরুকে বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা দিয়ে গ্রহণ করতে বলেছেন। আরো একটা কথা বলি, আমার গুরুই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ, অন্যরা সব ভন্ড এমন ভাব নিজের মধ্যে যেন না আসে। এমনকি আমার গুরুর চাইতে অমুক গুরু হয়তো ভালো, এমন ভাবনাকেও  প্রশ্রয় দেবেন না। নিজের সাধন পথে দৃঢ়নিষ্ঠ থাকুন। এমনকি সাধনপথ  ভিন্ন হলেও,  নিজের সাধনপথেই প্রত্যয় রাখুন। সূর্য্যে যাবার জন্য হিল্লি, দিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই, লন্ডন, আমেরিকা, চীন, ভারত, সোভিয়েত - অর্থাৎ আপনি যেখানে আছেন, সেখান থেকেই যাত্রা শুরু করতে হবে।  ধীরে ধীরে দেখবেন, সব পথ সেই সূর্যে গিয়ে মিশেছে। তাই লক্ষ স্থির থাখুন। আর গুরুর নির্দেশে সাধনমর্গে নিজেকে নিঃশেষ করে দিন। জগৎগুরুই আপনাকে পথ দেখাবেন, এটা নিশ্চিত। 

এখন কথা হচ্ছে অন্তর-দীক্ষা সবার ভাগ্যে জোটে না। অন্তর-দীক্ষা গুরুকৃপা সাপেক্ষ। আসলে এই অন্তর-দীক্ষা পাবার জন্য আমাদেরকে প্রাকৃত দীক্ষা গ্রহণ করতে হয়।  নিজেকে উপযুক্ত করে নিতে হয়। যোগমার্গে বিচরণ করতে হয়। শরীরকে শুদ্ধ করতে হয়, মনকে পবিত্র করতে হয়, নিরাসক্ত  হয়ে কর্ম্ম করতে হয়। বাহ্য দীক্ষা আবশ্যক, এমন কোনো কথা নেই, তবে আধার যদি মলিন হয় তবে বাহ্যদীক্ষা দরকার , নতুবা সেই অনাদি-অনন্ত-জগৎগুরু সবার অন্তরে থেকে আমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন। নিভৃতে সেই অন্তর্গুরুর নির্দেশ শুনুন, আর সেই মতো নিজেকে কার্যে নিযুক্ত করুন। স্বততঃ তাঁর  দিকে কান খাড়া করে থাকুন। দেখবেন, আপনার সাধনপথের সমস্ত কাঁটা তিনিই দূর করে দেবেন।

দেখুন জীব অনাদি কাল থেকেই অবিদ্যার আশ্রয়ে এসেছে।  কেন এসেছে, এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর আমাদের কাছে নেই। একটা শক্তি যেন চৈতন্যকে ক্রিয়াশীল করে সংসার সাগরে হাবুডুবু খাওয়াচ্ছে। জীবরূপী আত্মা চৈতন্যের স্ফূরণ হলেও, চৈতন্যরূপ অগ্নি  থেকে বেরিয়ে স্ফুলিঙ্গের মতো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। আর এই স্ফুলিঙ্গ মায়িক জগতে সংসারী সেজে অধিকার অনুযায়ী অনুরূপ ক্ষেত্রে বিচরণ করছে। একেই বলে কুণ্ডলিনীর সুপ্ত অবস্থা। এই শক্তিকে জাগ্রত করতে হবে।  এই শক্তি জাগ্রত হলেই জীব তার জীবভাব থেকে মুক্ত হয়ে শিবভাবে অবস্থান করবে। এই যে কুণ্ডলিনী শক্তি তা মনুষ্য  দেহের মেরুদণ্ডের নিম্নভাগে অবস্থান করছে। যোগশাস্ত্রে যাবতীয় সাধন এই শক্তিকে জাগ্রত করবার জন্য হয়ে থাকে। এই শক্তি একবার জাগ্রত হলে তা উর্দ্ধমুখী  হয়ে মস্তিষ্কের উপরিভাগে যে বিন্দু আছে সেখানে স্থিত হয়। আর সেখানেই বিশ্বশক্তি ও ব্যষ্টিশক্তির মিলন সংগঠিত হয়। তখন কর্ম্ম-সংস্কারের নাশ হয়। শুদ্ধবিদ্যা লাভ হয়।  আর শুদ্ধ বিদ্যার উদয় হলে  চৈতন্য শক্তির উন্মেষ অনুভবে আসে।  একেই বলে গুরুকৃপা।    
-------- 


আধ্যাত্মিক জীবন পথের কিছু কথা।

পর্ব্ব - নয়  -  রূপান্তর 

জীব ও জগতের মধ্যে একটা অপ্রতিরোধ্য  ক্রিয়া সংগঠিত হচ্ছে।  আর তা হচ্ছে রূপান্তর। বাহ্য  জগতে যেমন জীবদেহ  শিশু থেকে বৃদ্ধ হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে, তেমনি জগতের সমস্ত বস্তু কালের প্রবাহে রূপান্তরিত হয়ে চলেছে। এখন কথা হচ্ছে প্রকৃতির মধ্যে এই যে অপ্রতিরোধ্য রূপান্তর প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে, এর কারন কি ? সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয়, এই রূপান্তর হচ্ছে পূর্নতা লাভের প্রবৃত্তির কারনে। কে করছে ? প্রকৃতি করছে। কার জন্য করছে, পুরুষের জন্য করছে। আমরা যে সৃষ্টির সঙ্গে পরিচিত, তা অপূর্ন। আর এই অপূর্ণতার কারনে সবকিছুর মধ্যে অভাববোধ জেগে উঠছে। এই অপূর্নতা, অভাববোধ দূর করবার জন্য, প্রতিনিয়ত  প্রকৃতির মধ্যে পরিবর্তন ঘটে চলেছে। আমাদের যে অভাববোধ, তার থেকেই জন্ম নিচ্ছে শোক, দুঃখ, কলুষতা। জন্ম বা সৃষ্টির পর থেকেই এই অপূর্নতা আমাদের অনুভবে এসেছে, আর তাকে দূর করবার জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা চলছে। এই অভাববোধ বা অপূর্নতা থেকে যতকিছুর আবিষ্কার হচ্ছে। এসব (রূপান্তর) যেমন পার্থিব জগতের ক্ষেত্রে ঘটে চলেছে, তেমনি অপার্থিব জগতেও, এমনকি অব্যক্ত জগতের মধ্যেও ঘটে চলেছে।  সবাই খন্ড খন্ড আকারের ভাবে ভাবিত হয়ে পূর্ণতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। সবার উদ্দেশ্য এই অভাবের পূরণ করা -  ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, খন্ড থেকে অখন্ডে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, দুঃখ দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠা  করা। জীব জগতে যাকিছু ক্রিয়া সংগঠিত হচ্ছে, তা এই এক ও মহান উদ্দেশ্য অর্থাৎ অপূর্ণতাকে দূর করে পূর্ণত্বে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার উদ্দেশ্যেই হচ্ছে । 

তো পূর্ণত্বলাভই জীব ও জগতের সমস্ত প্রকার ক্রিয়ার একমাত্র লক্ষ্য। জগৎ সৃষ্টির ক্ষণ থেকেই এই নীতি অনুসরণ করে চলেছে প্রকৃতি। পৃথিবী একসময় জ্বলন্ত অগ্নির গোলক ছিলো, পরিবর্তন ক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে পৃথিবী ঠান্ডা হয়েছে - জীবের বাসযোগ্য পৃথিবী হয়েছে - ধীরে ধীরে পৃথিবী প্রাণবন্ত হয়েছে। ধীরে ধীরে জীবের শারীরিক  ও মানসিক গঠনের পরিবর্তন হয়েছে। 

এখন কথা হচ্ছে, জীবের দুঃখ-কষ্ট  আগেও ছিলো , এখনও আছে, অভাববোধ আগেও ছিলো , এখনও  আছে। তাহলে কি ধরে নেবো, দুঃখ-কষ্টের নিবৃত্তি কখনও  সম্ভব নয় ?  জীব-জগৎ কি পূর্নতা লাভ করতে অক্ষম ? তবে যে শুনে থাকি, মহাত্মাগণ ব্রহ্মত্ব প্রাপ্ত হয়ে সমস্ত দুঃখের অতীত সেই আনন্দধামে অবস্থান করে থাকেন।  এসব কি কেবল কথার কথা ? নাকি এর মধ্যে কোনো সত্যতা আছে ? 

দেখুন পরম-অবস্থায়, অর্থাৎ জগৎ সৃষ্টির পূর্বে, জীবের কি অবস্থা ছিলো , তা আমাদের মতো সাধারণ  মানুষুষ কেন, জন্মসিদ্ধ পুরুষের পক্ষেও প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমরা অনেক অনেক কথা শুনে থাকি, সমাধি, নির্বিকল্প সমাধি, নির্বাণ, শিবত্ব, পূর্ণত্ব ইত্যাদি ইত্যাদি নানান কথা শুনে থাকি। এর মধ্যে কতটা সত্যতা আছে, তার উপলব্ধি আমাদের কাছে নেই। 

কথা বলতে গেলে খেই হারিয়ে যায়। সমাধির মধ্যে শব্দ হারিয়ে যায়। জীব ভাবের-ঘোরে  চলছে। কখনও  আমি-তুমি ভাব, কখনও  পিতা-পুত্র ভাব, কখনও  ভাই-বোন, কখনও  ভাই-ভাই, দাদা-ভাই ভাব। অনন্ত অনন্ত রকম ভাব। এই রকমই একটা ভাব হচ্ছে গুরু-শিষ্য ভাব। গুরু উপদেষ্টা, শিষ্য উপদিষ্ট। গুরু জ্ঞান-দায়ক, শিষ্য জ্ঞান-গ্রহীতা। মনের মধ্যে গুরুশিষ্য  ভাব বজায় রেখে যখন ভাবের বিনিময় হয় তখন তা অহংভাব থেকে হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে জ্ঞান-উপদেশের উদ্দেশ্য যদিও শিষ্যের ঊর্ধ্বগতি লাভ, তথাপি এই ঊর্ধ্ব কিন্তু সীমাবদ্ধ স্থান। এক্ষেত্রে শিষ্য কেবলমাত্র গুরুর স্তর  পর্যন্ত উঠতে পারে। এক্ষেত্রে গুরুর সমত্ব লাভে  সাধনের সমাপ্তি ঘটে থাকে। গুরু শিষ্যে  তখন এক হয়ে যায়। 

কিন্তু সাধনার উদ্দেশ্য তো কেবল গুরুজ্ঞান নয়, পরম-গুরুজ্ঞান লাভ হচ্ছে সাধনার উদ্দেশ্য  ।  আবার  পরম-গুরুজ্ঞান কেবল প্রাকৃত নয়, এটি অপ্রাকৃতও বটে। ভাব গন্ডি দ্বারা আবদ্ধ, কিন্তু ভাবাতীত  অবস্থা গন্ডিবদ্ধ নয়।  ভাব খণ্ডিত, ভাবাতীত  অবস্থা অখন্ড। এই অখন্ড ভাবাতীত অবস্থায় যেতে গেলে ভাবকেই আশ্রয় করে এগুতে হয়। তাই প্রথমে গুরু-শিষ্য ভাবকে আশ্রয় করতে হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, গুরু যদি নিজেকে গুরু ভাবেন, তবে তার দ্বারা প্রদত্ত উপদেশ শিষ্যকে গুরুভাব পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে, তার উপরে নয়।  কিন্তু গুরু মধ্যে যদি গুরুত্ব-অভিমান না থাকে, এবং গুরু যদি ভাবাতীত  হয়ে যান,  তখন গুরুবানী সেই অখণ্ডের আহ্বান  হয়ে ওঠে।  আবার এই অন্তরের  আহ্বানের মধ্যে যদি অসীমের ভাব থাকে, তবে তা আধারের (শিষ্যের) মধ্যে প্রকাশিত হতে শুরুও করে। আবার শিষ্যে যদি  ভাব-বিশেষের মধ্যে আবদ্ধ  না থাকেন, তবে তিনি মুক্ত আত্মস্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হন। একটা স্থিতি আছে, যেখানে ভাব বিনিময়ের জন্য শব্দের প্রয়োজন হয় না। ঠাকুর রামকৃষ্ণ যখন ত্রৈলঙ্গ স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন, তখন তাদের মধ্যে যে ভাবের বিনিময় হয়েছিল, তা বাক্যের দ্বারা হয়নি, হয়েছিল শব্দাতীত বোধের সাহায্যে। 

তো ভাবের বিনিময় যেভাবেই হোক না কেন, সকল ভ্রান্তির নিরসন গুরুসান্নিধ্যের উদ্দেশ্য। গুরু শিষ্য যখন ভাবের মধ্যে স্থিত হয়, তখন কোথায় গুরু, কোথায় শিষ্য ? তখন উভয়ই ভাবতিত জ্ঞানের  রাজ্যে বিচরণ করেন। এই স্থিতিতে এক বৈ  দুই থাকে না। এই অবস্থায়, যিনি বক্তা তিনিই শ্রোতা। সমস্ত ভাষা এই অবস্থায় অকেজো হয়ে যায়। এই অবস্থায় নিজের মধ্যে একটা আলোড়ন ওঠে - যা ঈশ্বরের অনুভূতি - একে  ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এই অবস্থায় শরীর  থাকা বা না থাকার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। একেই বলে জীবের উদ্ধারকার্য যা আপনার মধ্যে আপন যে জন, তিনিই করে থাকেন। 

এখন কথা হচ্ছে, সবই  যদি গুরুশক্তি, যা নিজের মধ্যেই আছে, তবে সাধক দেহধারী গুরুবিহীন অবস্থায়  স্বচেষ্টায় অথবা উলটো করে বলতে গেলে, বিনাউদ্দোমে কেবলমাত্র দেহধারী গুরু সহায়তায় এই শুদ্ধজ্ঞান লাভ করতে পারেন কি না। অর্থাৎ  কেবলমাত্র গুরুকৃপাই সাধককে এই শুদ্ধজ্ঞান লাভ করাতে সক্ষম  কি না। দেখুন সাধকের ধারণ ক্ষমতা যদি না থাকে তবে গুরুকৃপা সঞ্চারিত হলেও, শিষ্যের ধৃতিশক্তির  অভাবে তা কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারে না। আধারের  (শিষ্যের) কাজ ধারণ করা।  আর গুরুর কাজ শক্তিটিকে সঠিক ভাবে সঞ্চারিত করা। এইজন্য আধারকে যেমন ধারণযোগ্য হতে হয় আবার গুরুকে শক্তি সঞ্চয় ও সঞ্চারিত করবার ক্ষমতা অৰ্জন করতে হয়। এর কোনো একদিকে অভাব থাকলে ফল উৎপাদন হয় না। শুধু তাই নয়, গুরু যখন পূর্ন  দায়িত্ত্ব নেন, তখন তাঁরই কাজ হচ্ছে, শিষ্যের মধ্যে ধারণ ক্ষমতার বৃদ্ধি করা। শুধু জ্ঞানালোক দান  করলে হবে না, জ্ঞানালোক গ্রহণ করবার ক্ষমতা সম্পন্ন করে তুলতে হবে। সুতরাং শুধু জ্ঞানালোক দান  করে, গুরুকে নিষ্ক্রিয় হলে চলবে না।  যথার্থ গুরুকে জ্ঞানান্ধ শিষ্যের অন্ধত্ব দূর করা কর্তব্য। এইজন্য যেমন গুরুকৃপা দরকার তেমনি পুরুষকার প্রয়োগ করতে হবে। এই যে পুরুষকার - এটি প্রত্যেক সাধকের মধ্যেই নিহিত আছে। আবার পুরুষকারের  মুলে থাকে ইচ্ছেশক্তি, আবার ইচ্ছেশক্তির মূল হচ্ছে গুরুকৃপা। গুরুকৃপা হলে মন অন্তর্মূখী  হয়ে ওঠে। মনের মধ্যে ইচ্ছেশক্তির জাগরণ হয়। গুরুকৃপার ফলেই ইচ্ছেশক্তির জাগরন ঘটে।  আবার ইচ্ছেশক্তির ফলে পুরুষকারের প্রয়োগ সিদ্ধ হয়। এই ইচ্ছেশক্তিতে  যখন সত্ত্বগুণের প্রভাব বেশি থাকে, তখন একে কেউ কেউ ঈশ্বরের শক্তি বা ঐশীশক্তি বলে থাকেন।  গুরুশক্তি ও ইচ্ছেশক্তি মিলে  হয় মহাশক্তি। এই মহাশক্তির স্বভাব হচ্ছে সাধককে উর্দ্ধমুখী করে তোলা। এখানে দেহধারী গুরু নিমিত্ত মাত্র, ঐশীশক্তি আসল। এইজন্য আপনি দেহধারী গুরু পেলেন কি পেলেন না, সেটা বড়ো  কথা নয়।  আপনি অন্তর্মুখী হয়েছেন কি না, আপনার ইচ্ছেশক্তির মধ্যে সত্ত্বগুণের প্রভাব পড়েছে কি না, সেটাই সাধন জগতে মুখ্য। এই মহাশক্তির খেলা আপনাকে রূপান্তর করে দেবে। আপনি সব কিছুর মধ্যে থেকেও সবকিছুর উর্দ্ধে বিরাজ করবেন।  
---------

আধ্যাত্মিক জীবন পথের কিছু কথা।

পর্ব্ব - দশ -  রূপান্তর

ভদ্রলোক প্রতিদিন কয়েক মাইল হেটে গিয়ে গঙ্গাস্নান করেন। একদিন গঙ্গাস্নান সেরে ফেরার পথে রাস্তায় শ্রান্ত হয়ে একটা গাছের তলায় বিশ্রামে বসলেন। স্নানের পরে সাধারণত আমাদের পিত্ত  পড়ে।  তাই স্নানের পরেই আমাদের ক্ষুধার উদ্রেগ হয়। ভদ্রলোকেরও ক্ষুধাবোধ হওয়ায়, সঙ্গে থাকা চাল-ডাল  ফুটিয়ে খাবার ব্যবস্থা করতে বসলেন।  সেই গাছের তলায় ছিলেন আরো একজন পথিক।  তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি আমার সঙ্গে সামান্য অন্ন গ্রহণ করবেন ? তিনি রাজি হলেন। এই ভদ্রলোক ছিলেন, দীক্ষিত পুরুষ। এবং মনে মনে ভেবে নিয়েছিলেন, রন্ধনকারী এই ভদ্রলোক নিশ্চই দীক্ষিত। কিন্তু অন্ন গ্রহণ করবার পরে কথায় কথায় যখন জানতে পারলেন, গঙ্গাস্নান থেকে ফেরা এই ভদ্রলোক দীক্ষিত নয়,  তখন তিনি রেগে মেগে একসার। কারন দীক্ষিত পুরুষ কখনো অদীক্ষিত মানুষের রান্না করা অন্ন গ্রহণ করেন না। 

এখন কথা হচ্ছে দীক্ষা বলতে আমরা কি বুঝি ? আর দীক্ষার ফলে আমাদের কি হয় ? দীক্ষা হলেই কি মানুষের মধ্যে কোনো পরিবর্তন হয় ? মহাত্মাগণ বলে থাকেন, দীক্ষা হচ্ছে দেহ শুদ্ধি।  কেউ বলেন দীক্ষা হচ্ছে নতুন দেহলাভ । নতুন দেহ বলতে কি বোঝায় ? 

জন্মের সময় আমরা যে দেহ পাই তা স্থূল দেহ। যদিও এই দেহের মধ্যেই আছে আরো দুই  প্রকার দেহ, অর্থাৎ  সূক্ষ্ম ও কারনদেহ । এই তিন ধরনের দেহ একে  অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে অবস্থান করছে। আবার পার্থিব ও অপার্থিব ভেদে দেহ দুই প্রকার। পার্থিব  দেহ তিন প্রকার, অনন্ময়, প্রাণময় ও মনময়।  এই তিনটি দেহ পার্থিব। বিজ্ঞানময় ও আনন্দময় দেহ অপার্থিব। বিজ্ঞানময় দেহ অপার্থিব হলেও পার্থিব ও অপার্থিব দেহের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। পার্থিব দেহ ত্রিগুণাত্মিক।  অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ , তমঃ তিন গুনের সমাহার হচ্ছে এই প্রকৃতিপ্রদত্ত  শরীর। আবার পঞ্চভূতের এই দেহ। অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ , তেজ, মরুৎ  ব্যোম এই পাঁচ তত্ত্বের সমাহার এই দেহ। 

দীক্ষাতে  কি হয় ?  যে কারনে গর্ভবাস হয়, আর অজ্ঞানরূপ মল-মূত্রের মধ্যে বাস করতে হয়, সেই কারণের  বিনাশ হয়।  দুই প্রকার দেহ একটা অশুদ্ধ দেহ, আরেকটি বিশুদ্ধ দেহ। অশুদ্ধ  দেহের মধ্যেই আছে বিশুদ্ধ দেহ। দীক্ষাতে মল নিবৃত্তি হয়। তখন বিশুদ্ধ দেহ প্রকাশমান হয়।  কিন্তু প্রথম দীক্ষাতেই সমস্ত মলের নিবৃত্তি হবে, এমনটা নাও হতে পারে। তাই বারংবার দীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। আসলে দীক্ষার ফলে  আমাদের শরীরের  মধ্যে যে নঙ্গর্থক প্রবৃত্তি আছে, তার নিবৃত্তি ঘটে আর সদর্থক বৃত্তির উৎপন্ন হতে থাকে। দীক্ষা হচ্ছে বীজ-স্বরূপ একটা শক্তি, যাকে  কেউ কেউ নাদশক্তি বলে থাকেন। আর এই বীজ বপন ক্ষেত্র হচ্ছে চিত্ত বা মন। দেখুন আমাদের চিত্ত বা মন একটা আয়নার মতো এখানেই নানান বৃত্তির উদয় হচ্ছে। ভিন্ন ভিন্ন চিন্তার উদয় হচ্ছে। এই যে মনরূপ ক্ষেত্র তা একটা সূক্ষ্ম দেহ, যাকে  বলা হয় মনোময় দেহ। এই মনোময় দেহ পার্থিব অর্থাৎ স্থূলের সূক্ষ্ম রূপ। এই মনোময় দেহের মধ্যেই স্থূল দেহের ছায়া পরিস্ফুট হয়। তখন এই মনোময় দেহকেই স্থূল দেহের আকারে প্রতীয়মান হয়। একটা আলোক দেহের মতো দেখা যায়। এই দেহে নানান রঙের সমাহার - যা চিত্তের মধ্যে চিত্রের আকারে দেখা যায়, কখনো ভেসে উঠছে, কখনো হারিয়ে যাচ্ছে। 

ধরুন আপনি আপনার মৃত পিতার  বা শিববাবার কথা চিন্তা করছেন।  এই চিন্তার সংযাগে সঙ্গে এই মনোময় দেহে আপনার পিতার বা শিববাবার দেহের অনুরূপ একটা দেহ ভেসে উঠছে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।  দীক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে পিতা বা নামরূপ শিববাবা  আপনার চিত্তের মধ্যে বপন করা। তখন আপনি আর পিতাকে বা শিববাবাকে চিন্তন থেকে আলাদা করতে পারবেন না। এটি একটা রাসায়নিক ক্রিয়া। চিত্ত যেহেতু ক্রিয়াশীল, জীবন্ত, তাই এই বীজ চিত্তের মধ্যে বিস্তার লাভ করতে থাকে। যদি বিস্তার লাভ করতে নাও পারে, তথাপি এই বীজ সহজে নষ্ট হয় না, সজীব থাকে অর্থাৎ এই বীজ আপনার চিত্ত থেকে  আর কখনো আলাদা হবে না। তখন অন্য যেকোনো চিন্তাই  আপনার চিত্তে উঠুক না কেন, এই বীজ-শিববাবা  আপনার মধ্যে থেকেই যাবে। এটি প্রথম দিকে এই শিব-পিতা জ্যোতির আকারে দেখা যায়। যদিও এইযে শিববাবার চিত্র  এটি কিন্তু আপনার  ভিতর থেকেই  বেরিয়ে আসে, বা বলা যেতে পারে স্মৃতির ভান্ডার থেকে বেরিয়ে আসে।  পূর্ব অর্জিত জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা বিশেষ ।  অর্থাৎ এই চিত্রের একটা অবয়ব আপনার মনের মধ্যে আগে থেকেই  স্মৃতির জ্ঞানভাণ্ডারে সঞ্চিত হয়ে রয়েছে।  আপনি যখনই এই শব্দের কথা চিন্তা করছেন, তখন আপনার মধ্যে সেই চিত্তের অনুরুরূপ একটা আলোকদৃশ্য আপনার মনশ্চক্ষুর সামনে ফুটে উঠছে।  এটি কখনো স্পষ্ট কখনো অস্পষ্ট। তখন দ্রষ্টা সাধক শিববাবার রূপ দেখছে। এই হচ্ছে মন্ত্রদীক্ষা। 

চক্ষু দ্বারা যে দীক্ষা দেওয়া হয়, তাকে বলে চাক্ষুষী দীক্ষা। এই চাক্ষুষী দীক্ষায় চোখের সাহায্যে জ্ঞানকলা গতিশীল হয়ে শিষ্যের মধ্যে প্রবেশ করে। মন্ত্রদীক্ষায় যেমন কর্ণেন্দ্রীয়ের সাহায্য দরকার তেমনি চাক্ষুষী দীক্ষায় চক্ষু-ইন্দ্রিয়ের ব্যবহার করা হয়। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে আমরা অনেক সময় বিস্ময়বোধ করে থাকি। কিন্তু সত্য হচ্ছে আমরা নিজেরাই অনেক সময় ছোটদের শাসন করবার জন্য এই চক্ষু ইন্দ্রিয়ের ব্যবহার করে থাকি। এক দৃর্ষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আমরা শিশুকে শাসন করে দিতে পারি। মুখ দিয়ে  অর্থাৎ শব্দ দিয়ে যেমন আমরা ভাবের বিনিময় করতে পারি, তেমনি চোখ দিয়েও আমরা ভাবের বিনিময় করতে পারি। তখন মুখ বা কানের দরকার পরে না।  কেবল মাত্র চোখের সঙ্গে চোখের সম্পর্কই যথেষ্ট হয়ে থাকে।  ঠিক এই ভাবে  আমরা স্পর্শ দ্বারা, এমনকি মনের সাহায্যেও এই ভাবের বিনিময় করতে পারি। আসল কথা হচ্ছে জ্ঞানের সঞ্চার - কিভাবে বা কোন ইন্দ্রিয় দিয়ে হচ্ছে সেটা বড়ো  কথা নয়।  

সাধন জগতে একাগ্রতার কথা বিশেষ ভাবে আলোচিত। আপনি যা কিছুর উপরে একাগ্র হচ্ছেন, সেই বিষয়ে আপনার মধ্যে জ্ঞানের বিকাশ হচ্ছে।  এখন কথা হচ্ছে আমি একাগ্র হলেই কি আমার মধ্যে জ্ঞানের বিকাশ  হবে ? তা নয়, জ্ঞানের যেমন সঞ্চার থাকা চাই - আবার  জ্ঞান যখন সঞ্চারিত হচ্ছে তখন তা সহজে একাগ্রতা দ্বারা ধরকে  সম্ভব করতে হয়।  ফুল গাছের নিচে বাতাসে সুগন্ধ ভাসছে, একটু খেয়াল করলেই আপনার নাকে তখন সুগন্ধ অনুভব হচ্ছে বুঝতে পারবেন। তো সুগন্ধ সঞ্চার হচ্ছে তাই আপনার নাক তা অনুভব করতে পারছে। যদি বাতাসে সুগন্ধ সঞ্চারিত না হতো, তবে তা আপনি শত একাগ্রতা থাকলেও গ্রহণ করতে পারতেন না।  এইখানে বাহ্য গুরুদেবের কারিকুরি, বা পরম-গুরুর খেলা। আপনার চিত্তে যদি জ্ঞানবীজ  সঞ্চারিত থাকে, আপনি তা একাগ্রতা দ্বারা অনুভব করতে পারবেন। এটা পরম-গুরুর খেলা।  আবার বাহ্য গুরু যখন বাক্য-মন-চক্ষু দ্বারা জ্ঞান সঞ্চার করেন, তখন আপনার একাগ্রতা সেটিকে কুড়িয়ে  নিতে পারবে। 

এই যে একাগ্রতার কথা বলা হলো, তা আসলে অভ্যাস বা সাধনাভ্যাস দ্বারা তৈরী হয়ে থাকে। মানুষ যখন জন্ম গ্রহণ করে থাকে, তখন সে এই জ্ঞানবীজ  নিয়েই জন্ম গ্রহণ করে থাকে।  এই জ্ঞানবীজ আপনার সংস্কারভূত, অর্থাৎ আপনার জন্ম জন্মান্তরের অভিজ্ঞতা, যাকে  আমরা বলি  ঈশ্বরপ্রদত্ত। পশুদের এই সংস্কার নেই, কারন তাদের সাধনা নেই। আপনার এই জ্ঞানবীজকে উদ্দীপ্ত করাই  গুরুদেবের কাজ। আপনার ভিতরে যদি জ্ঞানবীজ  না থাকে তবে তা সঞ্চারিত করেন গুরুদেব। অর্থাৎ ধীরে ধীরে আপনার মধ্যে নতুন সংস্কারের জন্ম দিয়ে থাকেন, এই বাহ্য দেহধারী গুরুদেব। কেউ কেউ বলেন, জ্ঞানবীজ  তো ভগবান সবার মধ্যেই দিয়েছেন, কিন্তু তা সুপ্ত অবস্থায় আছে, তাকে জাগিয়ে তোলা অর্থাৎ উপযুক্ত পরিবেশ দান  করা, বা শিষ্যকে স্মরণ করিয়ে দেওয়াই  গুরুদেবের কাজ ।  কারুর  মধ্যে যদি জ্ঞানবিজ না থাকে, তবে দেহধারী গুরুদেবের সাধ্য কি এই জ্ঞান প্রদান করেন । এই জ্ঞান বীজ কারুর ক্ষেত্রে বৃত্তিসকল দ্বারা চাপা পড়ে  আছে। এই বৃত্তির নিরোধ না হওয়া পর্যন্ত বা বৃত্তির লয় না হওয়া পর্যন্ত একাগ্রতা আসে না। তাই আমরা দেখতে পাই, সবার মধ্যে সাধন-ইচ্ছে থাকে না। আর অভ্যাসের ফলে  যে একাগ্রতা লাভ হয়, তা বিষয়ভোগে ধাবিত হয়। আবার এই  বিষয়ভোগে যখন বিতৃষ্ণা আসে, তখন স্বভাবের মধ্যে প্রকৃতির সংকোচন ঘটতে শুরু করে। এর পরেই আসে নতুন জীবন - অধ্যাত্ম জীবনের প্রতি আগ্রহ। এই হচ্ছে রূপান্তর।  
--------

আধ্যাত্মিক জীবন পথের কিছু কথা।

পর্ব্ব - এগারো  -  গুরুর গুরুত্ত্ব 

আপনারা হয়তো খেয়াল করে থাকবেন, ব্রাহ্মণ পরিবারের পুত্র সন্তানের উপনয়নের পরে, তার স্বভাবের মধ্যে একটা পরিবর্তন আসে। দুষ্টু ছেলে কেবল একদিনের ব্যবধানে কেমন শান্ত স্বভাবের হয়ে  যায়। এই যে উপনয়ন - এটি আসলে শব্দ বা মন্ত্রদীক্ষা। 

কথা হচ্ছিলো ব্রহ্ম  কি বস্তু - যার জন্য এতো সাধন ভজন, এতো উপাসনা, যোগাদির প্রচলন। যা থেকে এই অসীম ব্রহ্মান্ডের উৎপত্তি, যার দ্বারা জীবসকল জীবিত আছে, প্রলয়কালে যার মধ্যে প্রবেশ ঘটে তাই ব্রহ্ম।  জীবাত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। জীব ও শিবের মধ্যেও কোনো পার্থক্য নেই। ব্রহ্মদর্শনের জন্য যোগের প্রয়োজন। যোগের সাহায্যে চিত্ত নির্ম্মল হলে জ্ঞানচক্ষুতে তাঁর  সাক্ষাৎ হয়।  জ্ঞানকর্ণে তা শ্রুতিগোচর হয়। উপাসনা ইত্যাদি যোগের প্রকারভেদ মাত্র। এখন কথা হচ্ছে এই ব্রহ্মসাক্ষাতের জন্য গুরুর প্রয়োজন কোথায় ? হিন্দু ধর্ম্মশাস্ত্র এমনকি বেশিরভাগ ধর্ম্মশাস্ত্র এই মধ্যব্যাক্তি গুরুর প্রয়োজন স্বীকার করেছে।  কিন্তু কেন ?  আমাদের পুরুষকারের সাহায্যে তা করা সম্ভব নয় কেন ? 

মুক্তানন্দ বলছেন - নৌকা নোঙর বাঁধা হয়ে রয়েছে। আমরাও সংসারের দ্বারা আবদ্ধ  হয়ে পড়েছি। আমরা দেহাত্ববোধের সঙ্গে জড়িয়ে আছি।  নৌকা নিজে নোঙর খুলতে জানে না।  এমনকি নৌকার মাঝিও নোঙর  খুলতে পারে না।  কারন নৌকার নোঙর পাড়ে গ্রথিত হয়ে রয়েছে। নোঙর ছেড়ে দিলে নৌকা নদির উথালপাথাল জলে এলোমেলো ছুটতে শুরু করে দেবে। তাই কাউকে একজন চাই যিনি পাড়ে  বসে নৌকার নোঙর খুলে দেবে, আর আপনি নৌকার হাল ধরবেন। একটা প্রচলিত গল্প আছে, এক নির্বোধ মাঝি, সারা রাত  বৈঠা বেয়ে ক্লান্ত হয়েছিলো , কিন্তু নৌকা এক হাতও আগে যায়নি। কারন নৌকার নোঙর তোলা হয়নি। কথাটা হচ্ছে ঈশ্বরের উদ্দেশ্য যাত্রা করতে গেলে, জীবননৌকার নোঙর খুলে দিতে হবে। তারপর পুরুষকার প্রয়োগে অগ্রসর হতে হবে।  ঘাটে  যদি নৌকা বাঁধা  থাকে তবে যেমন নৌকা এগুতে পারে না, তেমনি অনাদি কালের অজ্ঞানের বন্ধন  যতক্ষন না কাটছে, ততক্ষন অধ্যাত্মজগতের দিকে এগুলো যায় না। এই অজ্ঞানের বন্ধন  কাটাতে গেলে একজনের প্রয়োজন যার নাম গুরু। 

এই গুরু আমাদের বুদ্ধির মধ্যে যে অজ্ঞান জমে আছে তা দূর করেন।  আমরা যে বুদ্ধির বড়াই করি তা আসলে দেহাত্মবোধের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এখন কথা হচ্ছে গুরু যে জ্ঞান প্রদান করেন, তা কি আমাদের দেহাত্মবোধের সঙ্গে জড়িত নয় ? হ্যাঁ দেহাত্মবোধের সঙ্গে থাকে বটে, তবে তা আমাদের অনুভবের মধ্যেও আসে। তত্ত্বজ্ঞান আমরা বই পড়ে  সংগ্রহ করতে পারি।  রসোগোল্লা  মিষ্টি এই তত্ত্বজ্ঞান আমরা কারুর কাছ থেকে শুনে বা বই পড়ে  জানতে পারি। লংকা  ঝাল, তেতুল টক  তা আমরা বই পড়ে  বা কারুর কাছ থেকে শুনে জানতে পারি।  ঈশ্বর নিরাকার, সর্ব্বশক্তিমান, সর্ব্বব্যাপী, ইত্যাদি আমরা বই পড়ে  জানতে পারি।  কিন্তু এই সত্য আমাদের অনুভূতিতে আসে না। কেউ যখন লংকা  আমাদের জিভে ঘষে দেয় , কেউ যখন রসোগোল্লা  আমার মুখের মধ্যে পুড়ে দেয় , তখন লংকার ঝাল, রসোগল্লার  মিষ্টত্ব আমার অনুভবে আসে। তেমনি গুরু আমাদের বৌদ্ধ অজ্ঞান অন্ধকার থেকে টেনে তোলেন। এর পরে আমরা পুরুষকারের সাহায্যে এগিয়ে যেতে পারি। তবে একটা কথা বলি, আপনি যদি রসোগোল্লার স্বাদ নিতে চান তবে ময়রার কাছে যান, দোকানদারের  নয়। আপনি যদি লংকার বা তেতুলের স্বাদ নিতে চান তবে চাষীর  কাছে যান।  কারন চাষি বা ময়রা এই জিনিষ উৎপাদনে সক্ষম, দোকানদার নয়। আজকাল অবশ্য দোকানদারের সংখ্যা বেশী, আর এখানে জিনিস হয় সহজলভ্য, বিনিময়যোগ্য। দোকানদারের থাকে  ব্যবসায়ত্বিকা মনোভাব। প্রকৃত গুরু আপনার মধ্যে নতুন নতুন সংস্কারের জন্ম দিতে পারে।  আর এতে করে আপনার পুরানো সংস্কার চাপা পরে যাবে। যার ক্ষমতার মধ্যে এই নতুন সংস্কারের সঞ্চারের ক্ষমতা জন্মায়নি, তিনি গুরুগিরি থেকে অব্যাহতি নিন।  বরং গুরু ধরে এগুতে থাকুন।  

শ্রী বিজয় গোস্বামী ছিলেন, শ্রী শ্রী অদ্বৈত প্রভুর বংশধর। আমাদের সমাজে কুলগুরু প্রথা এখন বহুল প্রচলিত না হলেও একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। তো শ্রী শ্রী অদ্বৈত প্রভুর বংশধর হওয়ার সুবাদে বিজয় গোস্বামী অল্প বয়স থেকে দীক্ষা দেবার (কুলগুরু হবার) অধিকারী হিসেবে বিবেচিত  ছিলেন।  একদিন এক  বয়স্কা  মহিলা, যুবক কুলগুরু বিজয়ের পদসেবা করে কাতরভাবে নিবেদন করলেন, "হে প্রভু ! সংসারসাগরে হাবুডুবু  খাচ্ছি, আমাকে কৃপা করে উদ্ধার করুন। " যুবক কুলগুরু বিজয় ভাবলেন, আমার সে ক্ষমতা নেই, আমি স্বয়ং কিভাবে ত্রাণ  পাবো, তারই নিশ্চয়তা  নেই, আমি পরিত্রান করবো কি করে ?"  সেই থেকে তিনি কুলগুরুগিরি ছেড়ে নিজের উদ্ধারের পথের  সন্ধানে আগ্রহী হলেন। আসলে আমরা সবাই ইহকাল নিয়ে চিন্তিত, পরকালের কথা আমাদের মাথার মধ্যে আসে না। কিন্তু অল্পকিছু মানুষ আছেন, যাদের  সংস্কারের মধ্যে সাধন-ভজনের স্পর্শ আছে, তাঁর  মধ্যে এই পরকালের চিন্তা ভেসে ওঠে আপনা থেকেই। শ্রীগুরু সান্নিধ্যে এলে তো কথা নেই। 

যাইহোক, আমাদের আছে দেহাত্মবোধ। আমাদের বুদ্ধি এই দেহাত্মবোধকে আশ্রয় করেই বেড়ে ওঠে। কিন্তু পরমগুরুর কৃপায়, যার মধ্যে পৌরুষ-জ্ঞানের সঞ্চার হয়েছে, তার মধ্যে বৌদ্ধ-অজ্ঞান ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে। যোগ সাধনার দ্বারা বৌদ্ধজ্ঞান প্রকট হয়। এরপরে  বৌদ্ধজ্ঞানের নিবৃত্তি হয় এবং পৌরুষজ্ঞানের  উদয় হয়। এই হচ্ছে অধ্যাত্ম জীবনের রহস্য। 

কথা হচ্ছে সরল প্রাণে প্রকৃত ভক্তিভাবে কি বৌদ্ধ-অজ্ঞানের নিবৃত্তি হয় না ? হয়, এতে করেও সাধকের অজ্ঞাতসারেই গুরুকৃপা বর্ষিত হয়।  একসময় সাধকের অনাদিকালের বাঁধন কেটে যায়। সাধক হয়তো বুঝতে পারে না।  কিন্তু বুদ্ধি ক্ষেত্রে যখন অজ্ঞান কেটে গিয়ে পুরুষ-জ্ঞানের সঞ্চার হয় তখন নিজের মধ্যে এই অপ্রাকৃত অনুভবে সে নিজেই বিস্মিত হয়ে যায়। এযেন নোঙরের দড়ি ইঁদুরে কেটে দেবার মতো। তখন  তার বাহ্যদৃষ্টিতে গুরুর সাক্ষাৎ না হলেও, সে অন্তর্দৃষ্টিতে মনশ্চক্ষে তিনি গুরুর উপস্থিতি অনুভব করেন। সুতরাং সরল বিশ্বাসে ভগবানকে ডাকা ব্যর্থ হয় না। কখন কোন অজ্ঞাতসূত্রে পরম-গুরু কৃপাদৃষ্টি দেবেন, তা ভগবান নিজেও জানেন না। ভগবান ভক্তের আকুলতায় নিজেই একসময় উদ্বেল হয়ে ওঠেন ভক্তকে দেখা দেবার জন্য। আর পরমগুরুর সান্নিধ্যে কেবলমাত্র কৃপাশক্তির সাহায্যে  জীবনসাগরে ভেসে চলে সাধকের জীবন-নৌকা। 
------

আধ্যাত্মিক জীবন পথের কিছু কথা।

পর্ব্ব - বারো   -   কোথা থেকে শুরু করবো ? 

প্রথমেই বলি, অধ্যাত্ম জীবন কেবল কিছু অলীক কল্পনার জগতে বিচরণ নয়।  এই জীবনের বাস্তবের চেয়েও  আরো প্রখর ভাবে সত্য। কিন্তু এই সত্যের সন্ধানে যেতে গেলে ধাপে ধাপে এগুতে হবে। আমাদের অনেকের ধারণা হচ্ছে, অধ্যাত্ম পথ ধ্যান ধারণা  দিয়ে শুরু। যারা ঋষি পতঞ্জলির "যোগদর্শন " বইটি পড়েছেন, তারা জানেন তিনি অষ্টাঙ্গমার্গের কথা বলেছেন। আর এই অষ্টাঙ্গ মার্গের শেষে হচ্ছে ধারণা, ধ্যান সমাধি।  আমরা যদি প্রথমেই  যদি ধ্যানের  মধ্যে প্রবেশ করতে চান, তবে তা হবে  ভুল পদক্ষেপ, কারন একতলার সিঁড়ি না পেড়িয়ে  আপনি সপ্তম বা অষ্টম তলার মধ্যে প্রবেশ করতে পারবেন না।  ধ্যান তখন কেবল জাগতিক চিন্তার আবাসস্থল হবে। একসময় আপনার হতাশা আপনাকে গ্রাস করে নেবে। 

তাই প্রথমে আমরা প্রার্থনা দিয়ে শুরু করতে পারি।  প্রার্থনার কথা আসলেই, প্রশ্ন ওঠে, কার কাছে প্রার্থনা করবো, আর কিই  বা প্রার্থনা করবো ? ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে হবে। এখন কথা হচ্ছে ঈশ্বর বলতে আমরা কি বুঝি ? দেখুন আমরা অভাবী মানুষ, সংসারের যাঁতাকলে প্রতিনিয়ত পিষ্ট   হচ্ছি।   তাই প্রার্থনার কথা উঠলেই, আমাদের এমন একজন ঈশ্বরের দরকার, যিনি আমার সমস্ত অভাব দূর করতে পারেন। এমন একজন ঈশ্বরের দরকার, যিনি সর্ব্বশক্তিমান। যার কাছে যা কিছু চাওয়া হোক না কেন, সব তিনি দিতে পারেন।  তিনি শরীরের রোগ, মনের শোক, সংসারের অভাব দূর করে দিতে পারেন। তাঁর  কাছে কোনো কিছুর অভাব নেই।  আর তিনি একজন মহান বর-দাতা নিশ্চয় । এইভাবে যারা ঈশ্বর সম্পর্কে ধারণা  পোষন করেন, তারা সব সময় ঈশ্বরের কাছে দাও দাও করতে থাকে।  আর যখন ইচ্ছে পূরণ হয় না, তখন তারা ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে ওঠেন। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, সাপ  চাইছে ব্যাঙ ধরতে, কারন তার ক্ষুধা পেয়েছে।  আর ব্যাঙ চাইছে, সাপ  থেকে দূরে থাকতে, কারন সাপে  ধরলেই তার জীবন সংশয় উপস্থিত হয়।  এমকি মৃত্যু ঘটে। তাই ঈশ্বরের সৃষ্টিতেই ঈশ্বর অসহায় হয়ে যায়। তো আমাদের কাছে ঈশ্বর মানে একটা শুভ শক্তি - যা আমাকে সমস্ত দিক থেকে রক্ষা করবে।
 
কিন্তু সত্য হচ্ছে জীবন-মৃত্যু, শুভ অশুভ, ভালো মন্দ এসব মায়া  শক্তির খেলা। আর এই যে মায়াশক্তির খেলা এটি কেবল মাত্র আমাদের অন্তর্নিহিত প্রবণতা বিশেষ। মানুষের মধ্যে দুটি শক্তি একই সঙ্গে বিরাজ করছে।  একটা শুভ একটা অশুভ, একটা ভালো একটা মন্দ, একটা বিদ্যা আরেকটা অবিদ্যা।  একটা জ্ঞান আর একটা অজ্ঞান। একটা সত্যজ্ঞান আরেকটা ভ্রমজ্ঞান। এর মধ্যে বিদ্যা বা সত্যজ্ঞান বিচারবুদ্ধির সাহায্যে আনে  অনাসক্তি, আনে পবিত্রতা। ভ্রমজ্ঞান আমাদের অসত্যকে সত্য রূপে প্রতিভাত করে। এখানেও সেই বুদ্ধির সাহায্যেই তা ঘটে থাকে।  কিন্তু এই যে ভ্রমজ্ঞান তাকে আমরা সেই মুহূর্তের জন্য  সত্যজ্ঞান বলেই  মনে করি। অন্যদিকে অবিদ্যা বা অজ্ঞান আমাদের মধ্যে আনে  রাগ, দ্বেষ, ঘৃণা, ভয় স্বার্থপরতা, ইন্দ্রিয়সুখের লালসা। এখন আমাদের কাজ হচ্ছে এই দুই প্রবনতার মধ্যে পরিবর্তন আনা। 

আমরা যাকে  ভালো বা মন্দ ভাবছি, তা আসলে আমার যথার্থ বিদ্যার অভাবে ঘটে থাকে। আমাদের এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে  হবে। আমাদের যথার্থ জ্ঞানের পথে হাটতে হবে। শুভ-অশুভ, ভালো মন্দ দুইয়ের পারে যেতে হবে। আমরা যাকে  ভালো বা মন্দ ভাবছি, তা আসলে আমাদের মনের বিকার মাত্র। এই মনের বিকার থেকে বেরিয়ে যখন আমরা সত্যে প্রতিষ্ঠিত হবো তখন বুঝতে পারবো, কি ভুলটাই না করছিলাম। আর এই জ্ঞান পাওয়া যেতে পরে একমাত্র ঈশ্বরের কাছ থেকে, যিনি আপনারই হৃদয়ে অবস্থান করছেন। 

দেখুন, ঈশ্বর সর্বভূতে সাক্ষীরূপে অবস্থান করছেন। এই ঈশ্বর যেমন আপনার আমার সকলের হৃদয়ে অবস্থান করছেন, তেমনি তিনি  সর্বত্র, সর্ব্বব্যাপী হয়ে অবস্থান করছেন।  এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে তিনি নেই। জড় বলুন বা অজড়, প্রাণবন্ত বলুন বা প্রাণহীন বলুন সবকিছুই তাঁর  মধ্যে অবস্থান করছেন । সেই হিসেবে আকাশকে আপনি ঈশ্বর ভাবতে পারেন।  যদিও সত্য হচ্ছে আকাশ যাকে  আশ্রয় করে আছে. যাকিছু থেকে এই বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টি হয়েছে, আবার প্রলয়কালে যার মধ্যে এই বিশ্বব্রহ্মান্ড প্রবেশ করছে, তাকেই আপনি ঈশ্বর বলে জানবেন। অধ্যাত্ম জীবন হচ্ছে এই উপল্বদ্ধিতে উপনীত হওয়া। আত্মাকে বা ঈশ্বরকে খুঁজে বের করা - আবিষ্কার করা।  প্রার্থনা এই কাজটা সুচারু রূপে সম্পাদন করে দিতে পারে। প্রার্থনা  এমন একটি শক্তি যা আমাদের অন্তর্নিহিত অধ্যাত্ম শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে পারে। মানুষ জানে না কিসে তার ভালো হবে, কিসে তার মঙ্গল হবে। তাই কিছু চাইবার আগে একবার ভাবুন, যা আপনি এখন চাইছেন, তাতে আপনার শান্তি হবে তো ? দুদিন  পরে, আবার আপনার মধ্যে অভাব বোধ, বা কষ্টের মাত্রা বেড়ে যাবে নাতো ? 

দেখুন ঈশ্বর যদি আমাদের সমস্ত চাওয়া পূরণ করতেন, তবে ডাকাতের ইচ্ছে আর গৃহস্থের ইচ্ছে দুজনের ইচ্ছেকেই পূরণ করতে হতো। তাই ভাববেন না, যে ঈশ্বর আপনার ইচ্ছে পূরণ করবেন, আপনার ইচ্ছে আপনাকেই  পূরণ করতে হবে, এবং সেই শক্তি আপনার ভিতরেই আছে, সেই শক্তিকে জাগিয়ে তুলুন, তবে দেখবে, আপনার সমস্ত ইচ্ছে পূরণ হচ্ছে। 

আমরা প্রার্থনা করি, ভয়ে। অর্জ্জুন ভগবানের কাছে উপদেশ চাইছিলো, আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে, মোহগ্রস্থ হয়ে ।  অর্জ্জুনকে ভগবান কিছু পাইয়ে দেননি - তিনি কেবল রাস্তা দেখিয়েছিলেন। কর্তব্যবোধকে জাগিয়ে তুলবার জন্য অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন। অর্জ্জুনের ভিতরে যে শক্তি লুক্কায়িত আছে, যা অর্জ্জুন বুঝতে পারছে না, তার সম্পর্কে সজাগ করেছিলেন। ভগবান যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে বলেছিলেন, হে অর্জ্জুন চার জন ভগবানের প্রার্থনা করে আর্ত , তত্ত্বজিজ্ঞাসু, সুখকামী ও তত্ত্বজ্ঞানী। 

হিন্দুশাস্ত্রে একটা প্রভাবশালী প্রার্থনা শ্লোক আছে - যাকে  আমরা গায়েত্রী মন্ত্র বলে জানি। 

"ওম ভূর্ভুবঃ স্বঃ 
তৎসবিতুর-বরেণ্যম 
ভর্গো-দেবস্য ধীমহি 
ধিয়ো যো নঃ প্রচোদয়াৎ।"

বেদের প্রত্যেকটি শ্লোক, মন্ত্র, বা ঋক এর ত্রিবিধ ভাব বা অর্থ। প্রত্যেকটি মন্ত্রের একটা ভাষাগত অর্থ বা ভাব  আছে, একটা ধ্বনিগত ভাব আছে, আরেকটা গুহ্য অন্তর্নিহিত অর্থ বা ভাব  আছে।  এই যে গুহ্য অন্তর্নিহিত অর্থ বা ভাব  এটি সাধকের হৃদয়ে ফুটে ওঠে। এইগুহ্য ভাবার্থ সম্পর্কে  আমরা ধীরে ধীরে শুনবো। 
 
গায়েত্রী মন্ত্রকে একসময় গুহ্য মন্ত্র বলা হতো - এটি সর্ব্বসাধারনের জন্য ছিল না,  আজও নেই।  এই যে গুহ্য অর্থ যা অন্তরে ভেসে ওঠে তা গুরু-সান্নিধ্যেই হয়ে থাকে। এই মন্ত্র আমরা জপ করে থাকি, বলা যায় যন্ত্রের মতো অভ্যাসবসে জপ করতে  থাকি। এর দ্বারা কোনো উপকার হয় না তা নয়, অবশ্যই উপকার হয়ে থাকে।  কিন্তু এই মন্ত্র আদৌ  জপের বিষয় নয় - অনুভবের বিষয়। গায়ত্রী সাধনা আসলে একইসাথে কর্ম্মযোগ, জ্ঞানযোগ, ধ্যানযোগ ও ভক্তিযোগ এই চারপ্রকার যোগের সমন্বয় সাধন। 

চলবে। .... 

আধ্যাত্মিক জীবন পথের কিছু কথা।

পর্ব্ব - তেরো   -   প্রার্থনামন্ত্র। 

কথা হচ্ছিলো প্রার্থনা নিয়ে। প্রার্থনা কখনও কেবলমাত্র  নিজের জন্য করা উচিত নয়। কারন আপনার আশপাশের সবাই যদি ভালো না থাকে, তবে আপনিও ভালো থাকতে পারবেন না। তাই সবার জন্য প্রার্থনা করুন। এইজন্য আমরা প্রাচীনকালের আশ্রমী ঋষিপুত্রদের দেখেছি সমবেত প্রার্থনা করতে। আপনার পক্ষে যদি সমবেত প্রার্থনায় অংশগ্রহণ করা সম্ভব না হয়, তবে আপনি একাকী প্রার্থনায় বসুন, কিন্তু  সকলের হয়ে প্রার্থনা করুন। এমনকি আপনি যখন  প্রার্থনায় বসছেন, তখন "আমার" ভুলে "আমাদের" জন্য প্রার্থনা করুন।   

প্রার্থনা মন্ত্রের জপ্ বা উচ্চারণ শুধু অক্ষরের বা শব্দের আবৃত্তি নয়। প্রার্থনা-মন্ত্র হচ্ছে চৈতন্যশক্তি, এই চৈতন্য শক্তিকে ধরে চৈতন্যসত্তার কাছে পৌঁছতে হবে। দেখুন জীবাত্মার উপরে তিনটি আবরণ আছে, ১. আণব, অর্থাৎ প্রথম অক্ষর থেকে ক্ষর অবস্থাপ্রাপ্ত ২, মায়া বা অবিদ্যা, ও ৩. কর্ম্ম। 

আমরা যে গায়ত্রীদেবীর কথা শুনছি - তা আসলে একসময় ব্রহ্মার হৃদয়ে স্থিত ছিলেন। সেখান থেকে তিনি বিচ্যুত হয়ে ব্রহ্মার নাভিমূল ভেদ করে স্ফূরিত হয়েছিলেন। অর্থাৎ হৃদয়কেন্দ্র থেকে যখন বেরিয়ে পড়লেন, তখন তাঁর  উপরে একটা আবরণ পড়ে গেলো। একেই বলে ব্রহ্মশাপ। এইজন্য বলা হয়, গায়েত্রী দেবীকে  যদি ব্রহ্মশাপ থেকে মুক্ত করা না যায়, তাহলে সাধকের হৃদয়ে গায়ত্রীদেবী প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন না। এর পরে ব্রহ্মার একান্তশিষ্য বশিষ্ঠদেব প্রাপ্ত হন এই গায়ত্রীদেবীকে। বশিষ্ঠদেবের  কাছে তিনি কামধেনু রূপে বিরাজ করতে থাকেন । কামধেনু অর্থাৎ এনার কাছে যাকিছু যাচঞা করা হয়, তাই প্রাপ্ত হওয়া যায়। ঋষি বশিষ্ঠ এঁকে অতি যত্নে গুপ্তভাবে রক্ষা করতেন। কিন্তু তিনি প্রকট বা প্রতক্ষ্যবৎ হওয়ার কারনে এনার উপরে দ্বিতীয় আবরণ পড়লো। এই পর্য্যায়ে  কামনার আবির্ভাব হলো। এখন, আমরা যে প্রার্থনা মন্ত্রে গায়ত্রী দেবীর উপাসনা করি, তা   বৈদিক ঋষি বিশ্বামিত্রের কাছ থেকে  জানতে পারি।  অর্থাৎ ঋষি  বিশ্বামিত্রের কাছে এসে গায়েত্রী দেবী তৃতীয় আবরণ প্রাপ্ত হলেন। তো হৃদয় থেকে নাভি, নাভি থেকে কামধেনু বা প্রতক্ষ্য বীজস্বরূপ কামনা। এই বীজ একসময় নিম্নগামী হয়ে গর্ভস্থ হয়ে আকারপ্রাপ্ত হয়। আর  এই যে গতি তা নিম্নগামী।  এই নিম্নগামী শক্তিকে আমাদের উর্দ্ধগামী করতে হবে। 

আমরা যদি গায়ত্রীমন্ত্রের সুফল পেতে চাই, তবে এই তিন আবরণকে দূর করতে হবে। প্রথমে বিশ্বামিত্র, পরে বশিষ্ঠ এবং সবশেষে ব্রহ্মা এই তিন আবরণকেই  নষ্ট করতে হবে।  গায়ত্রী  উপাসনা সম্পর্কে আমাদের ধারণা  হচ্ছে, এটি সূর্যদেবের উপাসনা, বা সৌরশক্তির উপাসনা। আর এটা মনে করবার যথেষ্ট কারন আছে। শুক্ল যজুর্বেদে (৭/৪২) বলা হয়েছে "ওং চিত্ৰং দেবানামুদ্গাদনীকং চক্ষুরমিত্রস্য বরুণস্যাগ্নে।  আপ্রা দ্যাবাপৃথিবী অন্তরীক্ষং সূর্য্য আত্মা জগতস্তস্থুষশ্চ স্বাহা।" যে যাই বলুক না কেন, এই জগতের আত্মা (মূলশক্তি)  হচ্ছেন সূর্য্য। এমনকি আমাদের  যে আত্মা তা এই সূর্য্য স্বরূপ, জ্যোতিস্বরূপ । এই জ্যোতিস্বরূপ আত্মার আছে অনন্ত শক্তি, আর সূর্য্যের আছে অনন্ত রশ্মি। শক্তি দুই রকম, একটা অশুভ যা আমাদের অনুকূল নয়।  আর একটা শুভ অর্থাৎ যা আমাদের অনুকূল। এই যে শুভশক্তি যা আমাদের অনুকূল তাকেই বলে ভর্গো  বা ভৰ্গ। এখন এই ভর্গ কথাটার আরো একটা  অর্থ হচ্ছে তেজঃশক্তি বা জ্যোতিঃ। গায়ত্রী মন্ত্রে এই তেজশক্তিকে বরণ করতে বা ধ্যান করতে বলা হয়েছে। 

আমরা আরো একবার প্রার্থনামন্ত্রটা দেখে নেই। 

"ওং  ভূর্ভুবঃ স্বঃ 
তৎসবিতুর-বরেণ্যম 
ভর্গো-দেবস্য ধীমহি 
ধিয়ো যো নঃ প্রচোদয়াৎ। ওং"

ওং ধ্বনি পরেমেশ্বর  বাচক। ভূঃ ভুবঃ স্বঃ - ভূঃ অর্থাৎ পৃথিবীলোক, ভুবঃ অর্থাৎ অন্তরীক্ষ লোক, এবং স্বঃ বলতে বোঝায় স্বর্গলোক। তো এই সূর্যালোককে তিনটে ভাগে ভাগ করা হলো।  যদিও সূর্যালোকের বিভাগ এইভাবে সম্পূর্ণ করা যায় না। কারন এই সূর্য্যলোকর মধ্যেই অনন্ত না হলেও, বহু লোকের সন্ধান পাওয়া যায়।  বোঝার সুবিধের জন্য সূর্য্যলোককে  ৭টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।  অর্থাৎ স্বর্গলোককে আরো  ৪ ভাগে ভাগ করে, মোট ৭টি লোকের কথা বলা হয়েছে, ভূঃ ভুবঃ স্বঃ মহঃ জনঃ তপঃ ও সত্যম। এইলোকগুলোই আবার আমাদের শরীরের মধ্যে অবস্থান করছে - মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মনিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধি, আজ্ঞা ও সহস্রার নামে। 

এখন এই ৭টি চক্র বা লোকের মধ্যে এক এক করে আমাদের মনকে বিস্তার করতে হবে। তৎ সবিতুর  বরেণ্যম - ভর্গো দেবস্য ধীমহি - সবিতুর কথাটার অর্থ হচ্ছে প্রসবকারী। তো শুভজ্যোতি প্রসবকারী শুভশক্তি সেই সবিতাকে অর্থাৎ জ্যোতিস্বরূপ সূর্য্যের ধ্যান করি। ধীমহি - ধী কথাটার অর্থ চিন্তা করা বা তীক্ষ্ণ বুদ্ধি দ্বারা প্রভাবিত করা। যখন এই ধী শক্তির স্ফূরণ হবে, তখন সাধকের মধ্যে ক্রিয়াশক্তিও বর্দ্ধিত হবে। তো  জ্ঞান ও ক্রিয়া শক্তি যিনি প্রেরণ করেন, তার চিন্তন করছি। এখন কথা হচ্ছে এই ধ্যান আমরা হৃদয়কেন্দ্রে (স্বঃ )বা তার উপরিভাগে অর্থাৎ আজ্ঞা, সহস্রার কেন্দ্রে করবো, তার কারন হচ্ছে জ্ঞানশক্তি ও ক্রিয়াশক্তির সঙ্গে যদি আমাদের পরমাশক্তির  যোগ হয় তবে আমাদের আমাদের সমস্ত ক্রিয়া শুভ ফল  প্রদান করবে। 

আবার বলি ভর্গ হচ্ছে শুভতেজঃ শক্তি বা জ্ঞানশক্তি  যা আমাদের সমস্ত মলিনতা ধ্বংস করে।  এই তেজঃ শক্তির ধ্যানের  কথাই গায়ত্রী মন্ত্রে   উল্লেখ করা হয়েছে। গায়ত্রী মন্ত্র মুখস্থ করে বারংবার আবৃত্তি করা নয়।  এটি যেমন একটি প্রার্থনা মন্ত্র তেমনি, এই মন্ত্রে আছে ধ্যানের প্রক্রিয়া বিশেষের কথা। জ্যোতি স্বরূপের ধ্যান। মূলাধার থেকে এই জ্যোতিশক্তিকে সঙ্গে নিয়ে মন চলবে স্বাধিষ্ঠান, মনিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধি আজ্ঞা হয়ে সবশেষে সহস্রারের সঙ্গে  মিলিত হবে।  এই সাধন ক্রিয়া গুরুসান্নিধ্যে করাই  বিধেয়।  

সবিতাদেবের সেই বরণীয় তেজকে আমরা ধ্যান করি. সেই সবিতা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিকে প্রেরণ করুন। 
----------------
আধ্যাত্মিক জীবন পথের কিছু কথা।

পর্ব্ব - চোদ্দ  -   প্রার্থনামন্ত্র  

সর্ব্বেষাং মঙ্গলং ভূয়াৎ, সর্ব্বে সন্তু নিরাময়াঃ। 
সর্ব্বে ভদ্রাণি  পশ্যন্তু, মা কশ্চিৎ দুঃখভাক ভবেৎ। 
নন্দন্তু সর্ব্বভূতানি, নিরান্তকানি  সন্তু চ।
প্রীতিরস্তু পরস্পরং, সিদ্ধিরস্তু চ কর্ম্মণাম। 
স্বস্ত্যস্তু নিত্যশো রাজ্ঞঃ শং প্রজাভ্যস্তথৈব।   
স্বস্ত্যস্তু দ্বিপদে নিত্যং শান্তিরস্তু চতুষ্পদে।
শান্তিরস্তু নো দেবস্য ভূর্ভুবঃ স্বঃ শিবং তথা ।
সর্বতঃ শান্তিরস্তু নঃ সৌম্যা ভূতানি চৈব হি।  
ত্বং দেব জগতঃ স্রষ্টা পাতা দৈবতমেব হি। 
প্রজাঃ পালয় দেবেশ শান্তিং কুরু জগৎপতে। 
যো ময়ি স্নিহ্যতি তস্য শিবমস্তু সদা ভুবি। 
যশ্চ মাং দ্বেষ্টি লোকে-অস্মিন সো-অপি  ভদ্রাণি পশ্যতু।। 
ওঁং শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ হরিঃ ওঁং ।।

সবার মঙ্গল হোক, সকলে নিরাময় লাভ করুক। 
সবাই শুভ দর্শন করুক, কখনো কারুর যেন দুঃখ না থাকে।
আনন্দিত হোক সর্ব্বভূতে, সবাই নিরাতঙ্কে থাকুক।  
পরস্পরের মধ্যে প্রীতি বজায় থাকুক, সকল কর্ম্ম সিদ্ধিপ্রদ হোক। 
নিত্যদিন রাজা স্বস্তিতে থাকুক, প্রজারাও স্বস্তিতে থাকুক। 
নিত্য স্বস্তি বিরাজ করুন দ্বিপদে (মানুষ) শান্তি হোক চতুষ্পদের (সকল প্রাণীর)।
শান্তি হোক সকল দেবতাদের, ভূঃ ভুবঃ স্বঃ - তিন লোকের হোক মঙ্গল ।
সর্বত্র শান্তি বিরাজ করুক, ভূৎসকল যেন  অসাম্য না হয়। 
তুমিই  সৃষ্টির দেবতা, হে দেব, তুমিই পালনকর্ত্তা 
হে দেবেশ, তুমিই সমস্ত প্রজাপালক, শান্তি করো জগতের সকলের । 
যিনি আমাকে স্নেহ করেন, তাঁর  মঙ্গল হোক সর্ব্বদা এই ভূতলে। 
যিনি আমাকে দ্বেষ করেন, তাঁরও শুভদর্শন হোক। 
----------

     
আধ্যাত্মিক জীবন পথের কিছু কথা।

পর্ব্ব - পনেরো   -   অধিকারী ভেদে - পূজা, উপাসনা, জপ, যোগ ও ধ্যান। 

আপনি যাকিছু করুন না কেন সব কিছুর মধ্যেই সেই একই শক্তি কাজ করছে। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ  বলেছিলেন, হে কৌন্তেয়, যারা অন্য দেবতায় ভক্তিমান হয়ে শ্রদ্ধাযুক্ত চিত্তে তাঁদের  পূজা করে, তারাও  আমাকেই পূজা করে, কিন্তু তা হয় অবিধি পূর্বক। (শ্রীগীতা -শ্লোক-০৯/২৩) আবার স্বর্গফল কামনার বশবর্তী হয়ে যারা বেদোক্ত যজ্ঞাদি কর্ম্ম করে তাঁরা  স্বর্গলোক প্রাপ্ত হয় বটে, তবে পুন্য কর্ম্মফল ক্ষয়  হলেই আবার সে মৃত্যুলোকে ফিরে ফিরে আসে।  তো যাগযজ্ঞ পূজার্চ্চনা জপ যোগ ধ্যান সবকিছুর মধ্যেই একটা সন্মন্ধ আছে। সব কিছুই আত্মিক উন্নতিতে সাহায্য অবশ্যই সাহায্য করে থাকে।  কিন্তু কথা হচ্ছে আমি কি করবো ? 

গায়ত্রী মন্ত্র সাধনার  মধ্যেও  দুটো দিক আছে, একটা হচ্ছে জপ, আরেকটা হচ্ছে ধ্যান। অধিকারী ভেদে এই প্রক্রিয়া কার্যকরী হয়ে থাকে। দেখুন আমাদের মতো সাধারণ মানুষের চিত্ত বহির্মুখী। কিন্তু  একদল ব্যতিক্রমী মানুষ আছেন, যাদের চিত্ত সদা  অন্তর্মুখী। সাধকের কাজ হচ্ছে চিত্তকে  শান্ত করা। এখন যার চিত্ত বহির্মুখী তার চিত্তকে  যে প্রক্রিয়ায় শান্ত করা সম্ভব হবে, যার চিত্ত অন্তর্মুখী তার চিত্ত সেই প্রক্রিয়ায় শান্ত নাও হতে পারে। সাধকের চিত্ত যদি বহির্মুখী হয়, তবে তাকে শান্ত হতে গেলে ক্রিয়াযোগ অবলম্বন করতে হবে। এই যে ক্রিয়াযোগ এর মধ্যে তপস্যা, স্বাধ্যায়,  ঈশ্বর প্রণিধান প্রধান ভূমিকা নিয়ে থাকে। এই স্বাধ্যায়  বোঝায় সদগ্রন্থ পাঠ, মন্ত্রজপ, উপাসনা, ঈশ্বরভজন ইত্যাদি বোঝায়। এতেকরে তার মধ্যে যে অভাববোধ আছে, তা দূর হতে শুরু করবে। মনের মধ্যে যে দ্বন্দ আছে তা দূর হয়ে যাবে। 

যাদের চিত্ত অন্তর্মুখী, তাদের এই ক্রিয়াযোগ মনকে শান্ত করতে পারে না। তাঁরা  আরো কিছু চান। এইজন্য এদের পক্ষে ধ্যানযোগ অধিক কার্যকরী হয়ে থাকে। অর্থাৎ চিত্তে যতক্ষন রজোগুণের প্রাধান্য থাকবে, ততক্ষন তার ধ্যানযোগ ফল প্রদান করবে না। আবার যার চিত্তে সত্ত্বগুণের প্রভাব বেশী তার পক্ষে ক্রিয়াযোগ ফলপ্রসূ হবে না। যদিও জানবেন, আমাদের সবার চিত্তেই তিনটি গুন্ বর্তমান। তথাপি যার চিত্তে যে গুনের প্রভাব বেশী  তাকে সে গুনের অধিকারী বলে মান্যতা দেওয়া হয়। তো বহির্মুখী চিত্তে ধ্যান জমে না, আবার অন্তর্মুখী চিত্তে ক্রিয়াযোগ হয় না। 

এখন কথা জপ বা ক্রিয়াযোগে কি হয় ? ক্রিয়াযোগে মন ক্রমশঃ  বহির্মুখী ভাবকে প্রত্যাহার করে ধীরে ধীরে অন্তর্মুখী হয়ে ওঠে। তখন ধ্যানের জন্য প্রস্তুত হতে হয়। যতক্ষন চিত্ত অন্তর্মুখী না হচ্ছে ততক্ষন জপ ইত্যাদি যত বেশী  করে করা যায়, তত লাভ হয়।  চিত্ত অন্তর্মুখী হয়ে গেলো, তখন ধ্যানের দিকে অগ্রসর হতে হয়। তবে প্রথম দিকে অর্থাৎ যোগক্রিয়া বা জপের মাত্রা  বাড়িয়ে ধীরে ধীরে ধ্যানের মধ্যে প্রবেশ করতে হয়। জপ্ সাধককের মধ্যে সত্ত্বগুণের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। অর্থাৎ নিরন্তর জপ একসময় সাধককে ধ্যানের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেবে। অন্যদিকে ধ্যান সাধককে সত্ত্বগুণের উর্দ্ধে একসময় নির্গুণের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেবে। জপের  সাহায্যে একাগ্রতা বাড়বে। একাগ্রতা সাধককে ধ্যানের জগতে নিয়ে যাবে। 

ধ্যান একসময় সাধকের  মধ্যে জ্ঞানালোকের প্রকাশ ঘটিয়ে দেবে।  ধ্যান যখন গাঢ়  হবে তবে সাধক সমাধিতে প্রবেশ করবে।  এই অবস্থায় তার মধ্যে সজ্ঞার উদ্ভব হবে। তখন অজ্ঞানগ্রন্থি ধীরে ধীরে খসে পড়বে।  এই যে জ্ঞান এ কোনো পার্থিব জ্ঞান নয়। এই জ্ঞান হচ্ছে জ্ঞানাগ্নি - যা আমাদের জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কাররূপ কর্ম্ম বীজগুলোকে দহন করবে। যদিও সংস্কার   সহজে ধংশ বা নিঃশেষ  হবার নয়। সময় সুযোগ পেলে আবার সেগুলো আগাছার মতো বেড়ে ওঠে। যোগীপুরুষগন বলে থাকে ক্রিয়াযোগের নিরন্তর অভ্যাস সংস্কারকে ক্রমশ ক্ষীণ করে থাকে।  তখন সংস্কার অব্যক্ত অবস্থায় বিরাজ করে। কিন্তু যখন জ্ঞানাগ্নি প্রজ্বলিত হয়, তখন এই ক্ষীণ  সংস্কার গুলোও ধংশপ্রাপ্ত হতে শুরু করে। আর এটি সমাধির  অবস্থায়  থাকে। আমাদের প্রাচীন মুনি-ঋষিগণ বলছেন, জপ্ ও ধ্যান একযোগে অবলম্বন করতে হয়। তাই গায়ত্রী মন্ত্র যেমন আমাদের জপ  করতে হবে, তেমনি এই মন্ত্রে ক্রিয়াযোগের কথা ও  ধ্যানের কথা বলা আছে, তার অভ্যাস করতে হবে। 
--------------- এর পরে শুনবো আধ্যাত্মিক জগতের শেষ কথা, যা শেষ হয়েও হয় শেষ। 

আধ্যাত্মিক জীবন পথের শেষ কথা। 

পর্ব্ব -  এক - সজাগ থাকুন। 

মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে আত্মজ্ঞানলাভ। নিজেকে চেনা, নিজেকে জানা।  আর নিজেকে চেনা বা  জানা,  কোনো জ্ঞানের বিষয় নয়, যা  গুরুমুখে  শুনতে হয় বা শাস্ত্রগ্রন্থ পাঠ  করে অৰ্জন করে করতে হয়। এ জ্ঞান কোনও বিচারের বিষয় নয়, যা আমরা বুদ্ধির  সাহায্যে করে থাকি। এই জ্ঞান একটা অনুভূতির বিষয়, অনুভবের বিষয়, যাকে আপনি বলতে পারেন, সংবেদনা যা আমাদের ভিতরে ভিতরে অনুভব হয়। এবং এই জ্ঞান  স্বয়ম্ভু - এই  জ্ঞানের বীজ আমাদের সবার মধ্যেই সুপ্ত অবস্থায় বিরাজ করছে। সাধনযোগে এই সুপ্ত অনুভূতি-বীজ অংকুরিত হয়ে প্রবল হয়। 

আমাদের মতো সাধারণ মানুষ নিজেকে কি ভাবি ? আমি অমুক চন্দ্র  তমুক, এই আমার পিতা-মাতা, ভাই-বোন ইত্যাদি ইত্যাদি। বড়োজোর আমরা ভাবতে পারি, আমি একটা পুরুষ, বা নারী। আরো একটু এগিয়ে বলতে পারি, আমি একটা মানুষ অর্থাৎ আমি পশু বা পক্ষী নোই। আমার একটা নিজস্ব অবয়ব বা আকৃতি আছে।  আমার একটা রক্ত-মাংসের দেহ আছে।  এই দেহের মধ্যে আমার একটা মন আছে, আছে বুদ্ধি, আছে অহংবোধ, আছে স্মৃতি। আরও  একটু এগিয়ে গেলে বুঝতে পারি, আমার মনের পারে আরো একটা শক্তি আছে যাকে প্রাণশক্তি বলা হয়। এই প্রাণশক্তির কারনে এই দেহ ক্রিয়াশীল বা গতিশীল থাকছে। এসবই পরিবর্তনশীল। যা ধীরে ধীরে পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে। এই প্রাণশক্তির পারে নাকি আরো একটা শক্তি কাজ করছে, তাঁকে বলা হয় চেতনশক্তি বা  আত্মা, যার কোনো পরিবর্তন নেই, চিরন্তন শ্বাশ্বত একটা সত্তা । 

তো এইযে দেহ, মন, প্রাণ এসব আমাদের অনুভূতিতে আসে, কিন্তু আত্মশক্তি আমাদের অনুভূতিতে বা উপল্বদ্ধিতে আসে না। এ কেবল আমাদের শোনা কথা। আমরা দেখেছি  দেহ থেকে প্রাণ বেরিয়ে গেলে, দেহ নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।  এই প্রাণের সঙ্গে সঙ্গে নাকি আত্মাও বেরিয়ে যায়।  তাই আমরা মারা যাই। প্রশ্ন ওঠে এই আত্মা যায় কোথায় ? এই আত্মা সম্পর্কে যুগ যুগ  ধরে মানুষের মনে বিস্ময় জেগেছে।  কঠোপনিষদের নচিকেতা একসময় যমরাজের কাছে জিজ্ঞেস করেছিল, কেউ বলে মৃত্যুর পরে আত্মা থাকে, কেউ বলে  নেই। কেউ বলে দেহ থেকে প্রাণ বেরিয়ে গেলে, আর কিছুই থাকে না।  সত্য কি ? এই সত্যের খোঁজে  যুগ যুগ ধরে মানুষ ছুঁটছে।  কেউ পেয়েছে, কেউ পায়নি।  যিনি পেয়েছেন, তিনি কাউকে তার উপলব্ধি সঞ্চার করতে পারেননি। আবার যিনি  পাননি, তিনিও সত্যকে অস্বীকার করতে পারেন নি। আত্মা যদি সত্যিই থাকে,   তবে তাঁকে আমাদের  সাক্ষাৎ করতে হবে। তাঁকে  আমাদের অনুভব  করতে হবে। আমরা এও শুনেছি, এই আত্মা আমাদের এই স্থূল দেহের মধ্যেই অবস্থান করছেন।  তবে তো আমরা এই দেহের মধ্যেই তাঁকে সাক্ষাৎ করতে পারি। 

আজ আমরা সেই কথাগুলো শুনবো, যার দ্বারা এই উপলব্ধি (আত্মোপলব্ধি) পাওয়া সম্ভব। দেখুন, আমরা যে জ্ঞান সংগ্রহ করে থাকি তা ৬টি ইন্দ্রিয় দ্বারা সম্পন্ন হয়ে থাকে।  এর মধ্যে ৫টি হচ্ছে বহিরিন্দ্রিয় আর একটি হচ্ছে অন্তরেন্দ্রিয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, যাদের দ্বারা আমরা এই জ্ঞান সংগ্রহ করে থাকি, তাদের দিকে আমরা একটি বারও খেয়াল করি না। আমরা  শুনি।  কিন্তু কানের দিকে আমাদের খেয়াল নেই। আমরা চোখ দিয়ে দেখি, কিন্তু চোখের দিকে আমাদের খেয়াল নেই। আমরা ত্বকের সাহায্যে স্পর্শজ্ঞান লাভ করে থাকি। কিন্তু ত্বকের দিকে আমাদের খেয়াল করি না। আমরা নাকের সাহায্যে গন্ধের সন্ধান পাই, কিন্তু নাকের দিকে আমাদের খেয়াল থাকে না। আমরা জিহ্বার  সাহায্যে রস আস্বাদন করে থাকি, কিন্তু সেই জিহ্বার  দিকে আমাদের খেয়াল থাকে না। আমরা মনের সাহায্যে চিন্তন করে থাকি, কিন্তু মনটার দিকে আমাদের খেয়াল থাকে না। চিত্তে আমাদের অসংখ্য বৃত্তি উঠছে, সেই বৃত্তির ফলে আমাদের মধ্যে নানান উদ্বেগ উঠছে। ইন্দ্রিয়সকল যখন বাইরের বস্তুর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করছে, তখন  মনের আয়নায় তার প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠছে। মন বুদ্ধির সাহায্যে এই প্রতিচ্ছবিকে নিশ্চয় করছে। তো আমাদের যদি এই স্থূল ইন্দ্রিয়সকল না থাকতো, বা আমাদের  মন-বুদ্ধি বলে যদি কিছুই না থাকতো, তবে আমাদের কোনো বোধের (সুখ-দুঃখ-ভয়-উদ্বেগ) উদয় হতো না। তো সুখ-দুঃখ-ভয়-দুশ্চিন্তা ইত্যাদি একটা বিশেষ বোধের কারন হচ্ছে, যার মাধ্যম হচ্ছে  আমাদের এই ইন্দ্রিয়সকল। তো  এই ইন্দ্রিয়সকলই আমাদের সমস্ত জ্ঞানবোধের উপলব্ধি  দেয়। ইন্দ্রিয়সকলই আমাদের সমস্ত জ্ঞানের বাহক হিসেবে কাজ করে থাকে। মহাত্মাগণ বলছেন, আমাদের যে আত্মজ্ঞানের সন্ধানে বেড়িয়েছি,  তাকেও এই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য করতে হবে। তবেই আমরা তাঁকে আমাদের বোধের মধ্যে আনতে পারবো। এখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠবে, এই আত্মজ্ঞান কি ইন্দ্রিয়ের বিষয় হতে পারে ? আমরা শুনে থাকি এই আত্মশক্তি ইন্দ্রিয়াতীত।  তাহলে এঁকে কি করে ইন্দ্রিয়ের বিষয় করা যাবে ? দেখুন চোখেরও  একটা চোখ আছে, কানেরও  একটা কান আছে, অর্থাৎ প্রত্যেকটি ইন্দ্রিয়শক্তির একটা স্থূল বাহ্যদিক  যেমন আছে, তার একটা অব্যক্ত সূক্ষ্মদিক আছে। আমরা যেমন চোখ দিয়ে বাইরের বস্তু দেখতে পাই, তেমনি আমরা স্বপ্নে অনেককিছু দেখতে পাই, যখন চোখ আমাদের বন্ধ  থাকে। তো চোখের দুটো দিক একটা স্থূল আর একটা সূক্ষ্ম। তেমনি আমাদের সমস্ত ইন্দ্রিয়ের দুটো দিক আছে। এটা আমাদের বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়। 

কিন্তু কথা  হচ্ছে এই যে স্বপ্নে দেখা জগৎ,  এর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। আমরা অনেক সময় ধ্যানের মধ্যেও  অনেক দৃশ্যের দেখা পাই, কিন্তু তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।  এমনকি এই স্বপ্নের জগতের বা ধ্যানের জগতের কোনোকিছুই আমাদের ব্যবহারিক জীবনে কাজে আসে না। 

এবার আরো একটু গভীরে প্রবেশ করি। 

দেখুন আমরা যে বেঁচে-বর্তে, খাচ্ছি-দাচ্ছি, ঘুরছি-ফিরছি তার কারন হচ্ছে আমাদের শরীরে এখনো প্রাণের অর্থাৎ শ্বাসের আনাগোনা চলছে। জীবন হচ্ছে শ্বাসের খেলা, এই শ্বাসের শুরুতে জীবনের শুরু, আবার শ্বাসের শেষে জীবনের শেষ। এবং এই যে শ্বাসক্রিয়া চলছে, তা আমাদের সবার অনুভূতিতেই  ধরা পড়ে।  যদিও এই শ্বাসক্রিয়া স্বতঃস্ফূর্ত।  এরজন্যে আমাদের কোনো প্রয়াস করতে হয় না। আর এই শ্বাসই যে আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, তা আমাদের কাউকে বুঝিয়ে বলবার দরকার পড়ে  না। আমাদের শরীরের সুস্থতা-অসুস্থতা নির্ভর করে এই শ্বাসক্রিয়ার  গতাগতির উপরে। এসব কথা আমরা সবাই জানি। এই শ্বাস আমাদের নাক বা মুখ দিয়ে শরীরের ভিতরে প্রবেশ ক'রে, সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে  পড়ছে। আমাদের শরীরের যদি কোনো অংশে এই শ্বাসের প্রবাহ (প্রাণবায়ু) না পৌছিয়ে থাকে, তবে সেই অঙ্গ আমাদের চেতনা রহিত হয়ে যায়।  এই বোধও আমাদের সবার আছে। 

তো বোধশক্তি আমাদের যেমন শ্বাসের কারনে হয়ে থাকে তেমনি আমাদের ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে হয়ে থাকে। এই শ্বাসই আমাদের বর্তমানে  থাকতে সাহায্য করছে। এই শ্বাস যেমন আমাদের জীবনের কারন তেমনি এই শ্বাসের সঙ্গে যাত্রা করতে পারলে, আমরা  আমাদের জীবনের উৎসে ফিরে যেতে পারি। কারন এই শ্বাসের সঙ্গেই একদিন আমাদের জীবন শুরু  হয়েছিল। যোগাচার্য্যগণ বলছেন,   এই শ্বাসের সঙ্গে যদি আপনি ঘর করতে পারেন, তবে আপনি কাল বা সময় ও দেশের উর্দ্ধে উঠে যেতে পারেন। এই শ্বাস আপনাকে যেমন  আমাদের ইহ জগতের বাসিন্দা করেছে, তেমনি এই শ্বাসের সঙ্গে আপনি জগতের উর্দ্ধে যাত্রা করতে পারবেন। কারন এই শ্বাসের সঙ্গেই একদিন আমরা ইহ জগৎ  ছেড়ে অনন্তের  উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। তো প্রাণ বা শ্বাসবায়ু  এক অদ্ভুত বস্তু যা আমাদেরকে বস্তুর উর্দ্ধে নিয়ে যেতে পারে, আবার বস্তুর মধ্যেও  প্রাণবন্ত রাখতে পারে। যোগাচার্য্যগণ তাই যথার্থই বলেছেন, এই   শ্বাস  আপনাকে আত্মজ্ঞানে ভরপুর করে দেবে। এই শ্বাস আপনাকে আত্ম-উপলব্ধি এনে দিতে পারে।  

এখন কথা হচ্ছে কিভাবে আপনি শ্বাসের সঙ্গে যাত্রা করবেন ? প্রথমেই বলি, এই শ্বাসের সঙ্গে যাত্রা করতে গেলে, আপনাকে একলা হতে হবে। এই যাত্রাপথে আপনি স্বয়ং ও শুদ্ধশ্বাসবায়ু  ছাড়া আর কেউ থাকবে না। এমনকি আপনার মধ্যে যে বুদ্ধি আছে তাকেও আপনাকে পরিহার করতে হবে। আপনাকে হতে হবে শিশুর মতো সরল - নিষ্পাপ। আপনাকে হতে হবে দ্রষ্টা। শ্বাসের দ্রষ্টা, আর আপনার শরীরের মধ্যে যে স্পন্দন অনুভব হচ্ছে তার দ্রষ্টা। আপনি কর্ত্তা নন, আপনি ভোক্তা নন, আপনি কেবলই  দ্রষ্টা।

চলবে।... 

এক বুদ্ধিমান বন্ধু, গোবিন্দ ভক্ত  শ্লেষের স্বরে  প্রশ্ন করেছেন, 

"আত্মাকে কি বস্তায় নাকি বোতলে ভরে বয়ে নিয়ে আসে ? আত্মার কি সংখ্যা হয় ? যদি হয় তবে তা কত, কথা বলতে হবে তাই বলে যাচ্ছেন নাতো?

দেখুন সমুদ্রের ঢেউয়ের কোনো সংখ্যা হয় ? হয়, আবার হয় না। সমুদ্রের পারে বসে আপনি ঢেউ গুনতে পারেন। কিন্তু একজন্মে এমনকি জন্মের পর জন্ম নিয়েও আপনি ঢেউয়ের গণনা শেষ করতে পারবেন না। শান্ত সমুদ্রে যখন বাতাস বইতে শুরু করে তখন সমুদ্রের জলে তরঙ্গ ওঠে যাঁকে আমরা ঢেউ বলে থাকি। এর সংখ্যা অবশ্যই আছে, কিন্তু এই সংখ্যার শেষ নেই। তেমনি পরমাত্মা যখন প্রকৃতির সংস্পর্শে আসে, তখন একটা গতিশীল তরঙ্গের সৃষ্টি হয়, যাকে আমরা জগৎ বলি। এই জগত পঞ্চভূতাত্মক, ত্রিগুণাত্মক। ভিন্ন ভিন্ন ভূত ও গুনের তারতম্য অনুসারে, সৃষ্টি হয় অহংবোধ - বিশ্বমন। আত্মা যখন বিকারগ্রস্থ হয়, তখন তা দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে। তাকে গুনতি করা যেতেও পারে। কিন্তু আত্মা যখন শুদ্ধ তখন তিনি সর্ব্বব্যাপী, অদৃশ্য, অনন্ত, সর্ব্বশক্তিমান তখন তাঁর গুনের পরিমাপ করা যায় না। তখন তিনি নির্গুণ অব্যক্ত। ঈশ্বর সাকার, আবার নিরাকার। ঈশ্বর নির্বিকার আবার চঞ্চল। আত্মাকে ধরতে গেলে এই বিকারের সাহায্যেই ধরতে হয়। তাই বিকারগ্রস্থ এই শরীর আমাদের সাধনক্ষেত্র, কর্ম্মক্ষেত্ৰ। এই শরীরের মধ্যে, আবার বলতে গেলে, এই শরীর আত্মার মধ্যেই অবস্থান করছে। স্থিরচিত্তে ধ্যানস্থ হয়ে নিজের মধ্যে প্রশ্ন জাগিয়ে তুলুন, আর ধৈর্য্যধরে শ্রদ্ধার সঙ্গে অপেক্ষা করুন। সমস্ত প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাবেন। কাউকে বিব্রত কোরবার জন্য, তাচ্ছিল্য করবার জন্যও নয়, জানার জন্য জেগে উঠুক প্রশ্ন। আর জিজ্ঞাসা জাগলে জবাব আসবেই। সত্য আড়ালে আছে, শুধু নিজের চোখের পিছনে যে পর্দ্দা আছে, তা তুলে ধরুন। দৃষ্টি বাইরের দিকে নয়, অন্তরের দিকে মেলে ধরুন।

আধ্যাত্মিক জীবন পথের শেষ কথা। 

পর্ব্ব -  দুই  (শেষ) - শুধু সজাগ থাকুন। 

এই প্রক্রিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বেশিরভাগ সাধক করে থাকেন। তার কারন হচ্ছে, এটি যেমন সহজসাধ্য, তেমনি শিশু থেকে বৃদ্ধ সবারপক্ষে  করা  সম্ভব।  এর কোনও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই। এটি যেমন সমবেতভাবে  করা যেতে পারে, তেমনি একাকী এর অভ্যাস করা যেতে পারে। আর এর উপলব্ধির মধ্যে  আছে একটা বিশুদ্ধ ভাব। মনের ময়লা দূর করে, একটা সত্যানুভূতির সন্ধান পাওয়া যায়। 

এই প্রক্রিয়ার তিনটি বিভাগ। 

১. স্থির হয়ে সুখাসনে বসুন। পায়ের পাতা থেকে মস্তিষ্কের উর্ধভাগে যে তালুভাগ, অর্থাৎ শরীরের সমস্ত অঙ্গকে মনের দ্বারা ছুঁতে ছুঁতে উপরের দিকে উঠতে থাকুন।  আবার মাথার তালু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত সমস্ত অঙ্গকে স্পর্শ করুন।  প্রতিটি অঙ্গের স্পন্দন অনুভব করুন।  (মোট   পাঁচ বার / পনের মিনিট)
 
২. স্থির হয়ে বসে, বুকের  মধ্যে যে ধুক ধুক হচ্ছে, তাকে শুনতে থাকুন। পালসবিট-এর ধ্বনি শুনতে থাকুন।  (১৫ মিনিট)

৩. স্থির হয়ে বসে শ্বাসের ওঠা-নামার কারনে আপনার পেট  বুকের  যে ওঠানামা চলছে, তাকে নিজেকে সম্পৃক্ত করুন। (১৫ মিনিট)
  
৪. স্থির হয়ে বসে শ্বাসের প্রবেশ ও গমন খেয়াল করতে থাকুন। (১৫ মিনিট)

ব্যাস সারাদিনে ২ বার (মোট দুঘন্টা) এই প্রক্রিয়ার অভ্যাস করুন। আপনার শরীরের মধ্যে বা মনের মধ্যে যে সুখানুভূতি বা দুঃখের অনুভূতি হচ্ছে, তাকে দেখতে থাকুন। সমস্ত অনুভূতির যে স্পন্দন তার  দ্রষ্টা হয়ে  যান। মাত্র ৭-দিনের মধ্যেই নিজের মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ করতে পারবেন। যার কারনে আপনার মধ্যে সুখ-দুঃখের অনুভূতি হচ্ছিলো, সেই সব কারনে উর্দ্ধে আপনি একটা সাম্যাবস্থায় বিরাজ করবেন। 
--------------- 
আধ্যাত্মিক জীবন পথের কিছু কথা। 

পর্ব্ব ষোলো। 

অধ্যাত্ম-বিদ্যা (আধ্যাত্মিক/অধ্যাত্মিক বিদ্যা) হচ্ছে আত্মাকে অধিকার করবার বিদ্যা। ব্রহ্ম বা আত্মা, জীবাত্মা বা পরমাত্মা বিষয়ক জ্ঞান। পরমাত্ম-বিষয়ক গূঢ় রহস্যজ্ঞ ব্যক্তিকে বলা হয় আধ্যাত্মিক। এই আধ্যাত্মিক বিদ্যা বিমূর্ত, কিন্তু এর একটা প্রকাশ আছে, একটা রূপ আছে, তা কারুর দৃষ্টিতে ধরা পড়ে , আবার কারুর দৃষ্টিতে ধরা পড়ে  না। এই জগতের অর্থাৎ  অধ্যাত্ম জগতের মানুষের মধ্যে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ঠ্য আমাদের অন্তর-চক্ষুতে ধরা পড়ে । আর তা হচ্ছে এক কথায় তিনি একজন ভালো মানুষ। এই যে ভালোমানুষী  স্বভাব তা তিনি কোনো অবস্থাতে পাল্টাতে পারেন না। জগতের কোনো কিছুই তা সে লোভ বলুন বা ভয় বলুন, জাগতিক ঐশ্বর্য্য বলুন, যোগৈশ্বর্য্য বলুন, কোনো কিছুই তার চরিত্রের এই বৈশিষ্ট্যকে পাল্টাতে পারেন  না। তিনি ভালো তাই ভালো, তিনি নির্ভিক তাই নির্ভিক, তিনি সৎ তাই সৎ - এনার  স্বভাব এনার  মধ্যে এমন নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত হয়ে আছে, যে তিনি এর বাইরে যেতেই পারেন না। এরজন্য তার অনেক জাগতিক কষ্ট  হয়তো ভোগ করতে হয়, তথাপি তিনি তাঁর  এই স্বভাবকে  পাল্টাতে পারেন না। তিনি নির্বিকার।   কেউ বলেন, এঁরা  ধার্ম্মিক পুরুষ, কেউ বলে মহামানব, কেউ বলেন আধ্যাত্মিক। ইনি  হতে পারেন, ধনী বা গরিব,  ইনি  হতে পারেন, নিরক্ষর বা পণ্ডিত, ইনি  হতে পারেন, তথাকথিত পার্থিব বিদ্যায় শিক্ষিত বা অশিক্ষিত । কিন্তু এনার স্বভাবের মধ্যে এমন একটা কিছু আছে, যা তাকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র করে রেখেছে। এদের মধ্যে এমন একটা কিছু আছে, যা সাধারণ মানুষ থেকে তাঁকে স্বতন্ত্র করেছে। 

কিন্তু কথা হচ্ছে কেন তিনি সাধারণ থেকে স্বতন্ত্র ? তার কারন হচ্ছে তার মধ্যে এমন একটা অতীন্দ্রিয় অনুভূতি শক্তির জাগরণ হয়েছে, যা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের মধ্যে নেই। আসলে এই মহাপুরুষের থেকে সাধারণ মানুষের দৈহিক কোনো পার্থক্য লক্ষ করা না গেলেও, কোথায় যেন একটা পার্থক্য আমরা বুঝতে পারি।  তার দৃষ্টির মধ্যে একটা গভীরতা, তার চিন্তার মধ্যে একটা গভীরতা, তার কথার মধ্যে কোথায় যেন দৃঢ় আস্থার লক্ষণ ফুটে ওঠে, যা তাঁকে আমাদের মতো সাধারণ থেকে আলাদা করে রেখেছে। 

আসলে সব মানুষই ভালো হতে চায়, সব মানুষই ভালো থাকতে চায়। সব মানুষের জীবনে সাফল্য চায়। কিন্তু এই যে ভালো হওয়া, ভালো থাকা, বা জীবনের সাফল্যের নির্ণয়বোধ মানুষকে আলাদা করে থাকে। 

আমাদের সবার মধ্যেই আছে সমৃদ্ধির বীজ।  এই বীজ আমাদের সবাইকেই সমৃদ্ধ করছে। আমরা সবাই আমাদের পূর্বনির্ধারিত পরিণতির দিকে  এগিয়ে চলেছি।  এই গতি রোধ করবার সাধ্য কারুর নেই। আমাদের মধ্যে যেমন আছে দেহকে বৃদ্ধি করবার ক্ষমতা, তেমনি আছে বুদ্ধিকে পরিশীলিত করবার ক্ষমতা। আছে  মনকে পরিবর্তন করবার ক্ষমতা। আসলে আমাদের যে মনন শক্তি, তা  একাগ্রতার তীব্রতার মধ্য  দিয়ে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হতে থাকে। বৌদ্ধিক শক্তি বাড়তে থাকে। আর এই যে বৌদ্ধিক শক্তি  তা একসময় নিস্তেজ হয়ে যায়। তখন এক সজ্ঞা শক্তির জন্ম হয়। এই সজ্ঞাশক্তি একসময় মানুষের মানসিক শরীর  থেকে বিজ্ঞানময় শরীরে উত্তীর্ন ঘটায়। অর্থাৎ স্থূল শরীরবোধ থেকে মানসশরীরবোধ, শেষে বিজ্ঞানময় শরীরবোধে স্থির হয়। এই জ্ঞানময় অবস্থায় স্থিত পুরুষকে আমরা ধার্মিক বা আধ্যাত্মিক মহৎ পুরুষ বলে থাকি।  আর এই মহৎ ব্যক্তি  থেকে উৎসারিত যে স্বভাব, তাকেই বলা হয় আধ্যাত্মিকতা। 

জীবন একটা বিস্ময়। আর এই বিষ্ময়কর জীবনের টানে, আমরা ছুটে  চলেছি। আমরা জীবনকে ছুঁতে চাইছি, কিন্তু জীবন আমাদের কাছে অধরা থেকে যাচ্ছে। এযেন খুড়োর কল, যতই এগুই, ততই  দূরে সরে যায়।  এই অধরা জীবনকে আয়ত্ত্বে আনতে  পারে আধ্যাত্মিকতা। অধ্যাত্ম বিদ্যা বিজ্ঞান বিশেষ। এই বিদ্যা মানুষকে হয়তো পণ্ডিত করে না, শিক্ষিত করে না, কিন্তু বিদ্যা জীবনকে সহজ-সরল করে দেয়। মনকে পবিত্র করে দেয়। তখন জীবনের সমস্ত অভাববোধ দূর হয়ে যায়, সমস্ত নিরানন্দ দূর হয়ে যায়, সমস্ত দুঃখ-কষ্ট সহ্যে করবার  শক্তি বৃদ্ধি করে দেয়, এই বিদ্যা ।  তখন আর কোনো কিছুই আমাদের আয়ত্বের বাইরে বলে মনে হয় না। সবই  যেন হাতের মুঠোয়। আনন্দই .....আনন্দ। 

---------

জীবন যখন শেষের দিকে চলে আসে, তখন মানুষ অনেক কথা বলতে চায়। আর আশ্চর্য্যের ঘটনা হচ্ছে, প্রিয়জন  তখন তাকে চুপ করে থাকতে বলে।  সবাই তখন বলে, আপনার কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে, এখন কথা বলতে হবে না।  একটু বিশ্রামে থাকুন। কিন্তু কে শোনে কার কথা, মুমূর্ষুর কথা ফুরায় না - আর কষ্ট  বেড়ে চলে। একসময় কথা আপনা থেকেই থেমে  যায়।  কিন্তু চিন্তা চলতে থাকে। কত পুরানো দিনের কথা তার মনে পড়ে। ধীরে ধীরে সে তার চিন্তার জগতে প্রবেশ করে।  সে তার মৃত আত্মীয়স্বজনের দেখা পায়। একসময় তাদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে। এ এক অদ্ভুত পরিণতি, যা আমাদের সবার জীবনেই একদিন আসবে।  আর আমরা সবাই একদিন এই চিন্তার জগতে প্রবেশ করবো। স্থূল দেহ ত্যাগ করে সূক্ষ্ম দেহে প্রবেশ করবো।  তখনও আমাদের চেতনশক্তি ক্রিয়া  করবে, আমরা সবাই তখনও কথা বলবো, শুনবো, সুখ দুঃখের অনুভব করবো। কিন্তু ইহজগতের সঙ্গে অর্থাৎ স্থূল জগতের সঙ্গে সম্পর্কহীন হয়ে যাবো। পরবর্তী শত শত বৎসর বা হাজার বছর  ধরে চলবে আমাদের এই সূক্ষ্মদেহের জীবনকাল। 

আধ্যাত্মিক জীবন পথের কিছু কথা। 

পর্ব্ব সতের । 

আমরা সবাই ভালো বা মন্দ। আমাদের মধ্যে আছে ভালো মনের প্রবৃত্তি, বা মন্দ মনের প্রবৃত্তি। আর এই কারনে আমরা ভালো বা মন্দ দুই ধরনের কাজই আমরা করতে পারি। কিন্তু এক ধরনের ধরনের মানুষ আছেন, যার পক্ষে মন্দ কাজ করা সম্ভব নয়। তিনি যা কিছুই করেন না কেন, ত সর্ব্বদা শুভফল প্রদান করে থাকে। তার পক্ষে না মন্দ হওয়া  সম্ভব, না মন্দ কাজ করা সম্ভব। আমরা অনেক সময়  মন্দ কাজ করতে ভয় পাই, আর এই কারনে আমরা অনেকে মন্দ কাজ থেকে দূরে থাকতে চাই।  কিন্তু আমাদের স্বভাবের মধ্যে এমন কিছু আছে, যা আমাকে মন্দ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে ।  মন্দ কাজ করতে ভালো লাগে। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একসময় দুর্যোধনকে ভালো মন্দ সম্পর্কে উপদেশ দিতে শুরু করেছিলেন।  উত্তরে দুর্যোধন  বলেছিলেন, দেখো, তোমার মধ্যে যে বিচারবুদ্ধি আছে, তোমার মধ্যে যে ভালো-মন্দ জ্ঞান আছে, তা আমার মধ্যেও আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তোমার ভালো কাজ করতে ভালো লাগে, তাই তুমি ভালো কাজ করো, আর আমার মন্দ কাজ করতে ভালো লাগে, তাই আমি মন্দ কাজ করি । তুমি অন্যের কষ্ট  দেখলে নিজেও কষ্ট  পাও, আর আমি অন্যের কষ্ট দেখলে নিস্পৃহ থাকি, কখনও  কখনও আনন্দ পাই।
 
আসলে কর্ম্মের একটা উদ্দেশ্য থাকে।  আর উদ্দেশ্যটাই বিচার্য, কর্ম্ম নয়। এমনকি যাঁকে  আমরা কর্ম্মহীন সাধু হিসেবে দেখি, যাঁরা পাহাড়ের প্রত্যন্ত প্রদেশে বাস করেন, তাঁদের  আপাতদৃষ্টিতে কর্ম্মহীন জীবন বলে মনে হয় । বাইরে থেকে দেখে মনে হয়, এরা সমাজের পরগাছা। সমাজের খায়, সমাজের পরে, কিন্তু সমাজের জন্য কিছুই করেন না। কেবল নিজের উদ্ধারের জন্য তপঃসাধন করছেন। দেখুন সত্যিকারের আধ্যাত্মিক ব্যক্তি আপাতদৃষ্টিতে কোনো সমাজসেবা করেন না। কিন্তু তার মধ্যে প্রতিনিয়ত সমাজের সকলের জন্য, এমনকি পৃথিবীর সমস্ত জীব-জন্তু-কীট-পতঙ্গের জন্য, একটা মঙ্গলধ্বনি উৎসারিত হচ্ছে। আর এর থেকে তিনি নিজেকে বের করে আনতেও পারেন না। এটি তাঁর  স্বভাবের মধ্যে নিহিত আছে। আমরা কাজ করি আমাদের কর্ম্মেন্দ্রীয়ের দ্বারা। অর্থাৎ হাত পা, বাক ইত্যাদি দ্বারা। আর এই যে আমাদের হাত, পা, বাক, ইত্যাদি কাজ করে আমাদের মনের দ্বারা। অর্থাৎ ব্যষ্টি মন তার ইন্দ্রিয়সকলের দ্বারা কর্ম্ম করছে।  আর আধ্যাত্মিক পুরুষ কাজ করেন সমষ্টি মনের অংশ হিসেবে।  আর এই সমষ্টি মন সমষ্টি ইন্দ্রিয়ের দ্বারা কাজ করে থাকে।  অর্থাৎ আধ্যাত্মিক পুরুষের চিন্তন তার পরিবেষ্টিত ব্যষ্টি-মনের সাহায্যে কাজ করে থাকে।  ব্যষ্টি মনে গুরুচিন্তনের প্রতিক্রিয়ার ফলে হাজার কর্ম্মেন্দ্রীয় ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। এ এক অদ্ভুত ক্রিয়াকৌশল, যা আধ্যাত্মিক ব্যক্তি সকলের অলক্ষে করে থাকেন । আর  এই ক্রিয়ার ফল হয় সুদূরপ্রসারী, সমাজের হয় কল্যাণ। বাস্তবে তিনি হয়তো ভালো বা মন্দ কিছুই করছেন না।  কিন্তু সত্য হচ্ছে,   অধ্যাত্মপুরুষ, বা মহাপুরুষগন, কখনও  জ্ঞাতসারে কখনও  অজ্ঞাতসারে  আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করছেন। আর আমরা যারা সাধারণ মানুষ সেই অনুপ্রেরণা বশে ক্রিয়া করে চলেছি। আর এই ক্রিয়ার মধ্যে আমাদের যত  কর্ত্তাভাব জেগে উঠছে, আমরা তত  আমরা কর্ম্মফলের ভাগিদার হচ্ছি। তাই আধ্যাত্মিক পুরুষ যা কিছু করছেন, তা আসলে সমষ্টি মনের ক্রিয়া বিশেষ, এবং সমাজের সবার জন্য কল্যাণকর। যারা এই প্রভাব থেকে মুক্ত, তার কাজ করে নিজের ইচ্ছেয়, আর ফল প্রদান করেন, ঈশ্বর তাঁর  ইচ্ছে অনুযায়ী। অধ্যাত্ম পুরুষের কর্ম্ম হয়, পরমপুরুষ ইচ্ছেতে আর ফল হয় সবসময় শুভ - মঙ্গলকর। 

---------- 

আধ্যাত্মিক জীবন পথের কিছু কথা। 

পর্ব্ব আঠেরো  । 

জন্মের পর থেকেই সমস্ত জীব বেঁচে থাকবার জন্য লড়াই শুরু করে দেয়। এই জৈবিক লড়াই করতে করতেই একসময় সে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে। জীবনযুদ্ধ করতে করতে একসময় মনে হয়, "মরলে বাঁচি" .




  


   





 














 



 









  









   

Comments

Popular posts from this blog

নিত্যকথা

ঈশ্বর ও তাঁর উপলব্ধি

সত্যধর্ম্ম ও প্রেম