পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ কৈবল্যপাদ

 



                                            পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ                                                         কৈবল্যপাদ 

                            শশাঙ্ক শেখর শান্তিধাম

পাতঞ্জল যোগদর্শন - কৈবল্যপাদ 

ভূমিকা : 

এবার কেবল এক পুরুষের জ্ঞান। প্রকৃতির স্বরূপ উপলব্ধি হয়েছে, আমাদের বিবেকজজ্ঞানের সাহায্যে, এবারে আমাদের বিবেকজ্ঞানের সাহায্য নিতে হবে। এই বিবেকজ্ঞানের সাহায্যে সাধককে কৈবল্যের দিকে ধাবিত হতে হবে।  আমরা এর আগে শুনেছি, ক্ষণ ও ক্রোমের সাহায্যে প্রকৃতির জ্ঞান লাভ করা যায়।  এবার এই ক্রোমের পরম্পরাকে অতিক্রম করে দাঁড়াতে হবে বিন্দুস্থানে। এর পরে বিন্দুকে অতিক্রম করে যেতে হবে শব্দব্রহ্মেের লোকে । শব্দব্রহ্ম থেকে আরো এগিয়ে যেতে হবে পরব্রহ্মে,  তখন হবে নিষ্কল সামধি। বিভুতিপাদের সবশেষে আমরা শুনেছি সিদ্ধি লাভের  কথা। এবার সিদ্ধিতে অতিক্রম করে এবার যেতে হবে নিত্যসিদ্ধির দেশে। 

আমাদের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে ঋষি পতঞ্জলি প্রণীত - যোগদর্শন - কৈবল্যপাদ। এই কৈবল্যপাদের অনুভূতি আমাদের নেই।  এমনকি সমাধির অভিজ্ঞতাও হয়তো আমাদের অনেকের নেই। তথাপি আমরা উচ্চতর সমাধির অবস্থার কথা শুনতে যাচ্ছি। এ আমাদের অনধিকার প্রবেশ। কিন্তু আমাদের ভ্রমণসূচিতে এমনটাই লিখে রেখেছেন, ঋষি পতঞ্জলি।  অমরনাথ বা কৈলাশের যাত্রীদের একজায়গায় এসে ঝাড়াই-বাছাই করা হয়। পাহাড়ের আবহাওয়া আমাদের ফুসফুস, এমনকি আমাদের হৃদযন্ত্র কতটা সহ্য করতে পারবে - সেটা একবার যাচাই করে নেওয়া হয়। 

কঠোপনিষদের নচিকেতা যমের বাড়ি গিয়েছেন। সেখানে গিয়ে যমরাজকে  জিজ্ঞেস করছেন, কেউ বলে মৃত্যুর পরে আমাদের সব শেষ হয়ে যায় না, আত্মা বলে একটা কিছু থাকে। আবার কেউ বলে, মৃত্যুতে আমাদের সব শেষ হয়ে যায়। আত্মা বলে কিছু নেই।  সত্য কি ? যমরাজ মহা-বিপদে পড়েছেন, কারন যমরাজ আগেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন, তিনটে বর দেবেন বলে।  এখন এক কিশোর বালক এমন প্রশ্ন করতে পারে, এমটা তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি। যা বাক্য-মনের অতীত, তা তিনি কিভাবে বলবেন ? 

যমরাজ মহা বিপদে পড়েছেন।  যমরাজ বললেন, দেখো এই আত্মতত্ত্ব রহস্যঃ দেবতারাও ভেদ করতে অক্ষম। এর চেয়ে তুমি দীর্ঘজীবন প্রার্থনা  করো, ধন সম্পত্তি চাও, সাম্রাজ্য চাও।  জীবনকে উপভোগ করবার জন্য, যাকিছু তোমার দরকার, সব তোমাকে দিতে রাজি আছি, কিন্তু এই আত্মার রহস্যঃ উন্মোচন করতে বোলো না। এই রহস্যঃ অতি সূক্ষ্ম, একে  জ্ঞাত হওয়া খুবই দুস্কর।  তুমি অন্য কোনো বর  চাও। 

কিন্তু নাছোড় এই বালক, নচিকেতা। সে শুনেছে, একমাত্র যমরাজ আত্মার গুড় রহস্যঃ জানেন। আর এই আত্মতত্ত্ব যাঁর  জানা হয়েছে, তিনি দিব্য-আনন্দ লাভ করেন। তিনি সকল পাপ-পুণ্যের উর্দ্ধে, সকল কর্তব্য-অকর্তব্যের পারে চলে যান। তিনি ত্রিকালজ্ঞ হয়ে যান।  সমগ্র বেদ অধ্যয়ন করে যাকে জানা যায় না, জন্মের পর জন্ম অতিক্রম হয়ে যায়, তথাপি এই আত্মতত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া যায় না। যোগীপুরুষ এই আত্মতত্ত্ব জানবার জন্য, যুগ যুগ ধরে তপস্যা করে থাকেন। আজ এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না।  তাই নচিকেতা গোঁয়ারের  মতো যমরাজকে আঁকড়ে ধরে রইলো, এই আত্মতত্ত্ব জানবার জন্য। যমরাজ  মৃত্যুর পারে অবস্থান করেন। আর মৃত্যুরহস্যঃ একমাত্র তিনিই জানেন। একটা কথা তো নিশ্চিত, মৃত্যুপুরীর যিনি রাজা, তার কাছে মৃত্যুরহস্য অজানা নয়। 

যমরাজ যখন দেখলেন, এই ছেলে, মোটেই সাধারণ নয়, এ জীবনের সবকিছুকে উপেক্ষা করতে পারে। জীবনকে তাচ্ছিল্য করেই, পিতার কাছ থেকে সে যমের  বাড়ি যাবার সম্মতি আদায় করেছে। আমার দেওয়া সমস্ত প্রলোভনকে সে হেলায় উপেক্ষা করেছে। তো যমরাজ  ভিতরে ভিতরে খুশী  হলেন, কারন এই আত্মতত্ত্ব তো কেউ জানতে চায় না। সবাইতো জীবনের জন্য সবকিছু চায়। জীবনকে সুখী সমৃদ্ধ করবার জন্য, জীবনকে  সুখে স্বাচ্ছন্দে রাখবার জন্য সারা জীবন পরিশ্রম করে। সে যে ঈশ্বরকে খোঁজে, তাও  এই জীবনকে সুখী করবার জন্য। শ্বাশত আনন্দের খোঁজ কেউ করে না। জ্ঞানের কথা কে শুনতে চায় ? সবাই কাজের কথা শুনে চায়। এই বালক যথার্থই  সংযমী। আর একমাত্র সংযমী পুরুষ (ঋষি পতঞ্জলির ভাষায় যিনি ধারণা-ধ্যান-সমাধিতে সিদ্ধ হতে পেরেছেন) এই   আত্মতত্ত্ব জানবার যোগ্য। শুধু যোগ্য নয়, এই বালক আত্মতত্ত্ব জানবার জন্য সবকিছু ছাড়তে রাজি অর্থাৎ পরবৈরাগ্যের সাধানসিদ্ধ ।  আত্মতত্ত্ব জানবার জন্য, এর মনে ব্যাকুলতার মধ্যে কোনো ঘাটতি নেই। আর ব্যাকুল মনই আত্মতত্ত্ব উপল্বদ্ধির যোগ্য। ব্যাকুলতা না জাগলে, কেউ সবছেড়ে ক আত্মকথা জানতে চায় না। তাই যমরাজ খুশি হয়ে বলতে শুরু করলেন।  

যমরাজ বললেন, হে নচিকেতা, আমার এটা ভেবে ভালো লাগছে, যে তুমি সবকিছু উপেক্ষা করে আত্মতত্ত্ব জানবার জন্য উদ্বেল হয়েছো। জ্ঞানই  সত্য।  এই জ্ঞানে প্রতিষ্টিত হলে, সত্যকে উপলব্ধি করা যায়। রাস্তা দুটো - একটা শ্রেয়, আর একটা প্রেয়। একটা ভোগের, আর একটা আনন্দের। এই দুটো পথ। আর দুটোই আনন্দেরই  পথ। একটা ভোগে, আর একটা ত্যাগে। ভোগের আনন্দ ক্ষয়জনিত আনন্দ, ক্ষনিকের আনন্দ।  আর ত্যাগের আনন্দ শ্বাশত, চিরস্থায়ী । ভোগ বিষয়মুখী হয়ে থাকে, আর ত্যাগ বিষয়বর্জ্জিত হয়ে থাকে। বিষয়ভোগ বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে নিয়ে যায়।  আর ত্যাগের আনন্দ জীবকে উৎসমুখী করে তোলে।  

সাধারণ মানুষ শ্রেয়কে ত্যাগ করে প্রেয়কে  আশ্রয় করে থাকে। যিনি শ্রেয়কে আশ্রয় করেন, তিনি হয়ে ওঠেন ঋষি। আর যিনি প্রেয়কে  আশ্রয় করেন, তিনি উপভোগের পথে পা বাড়ান। ধীরে ধীরে তিনি অধোগতি সম্পন্ন হন। আর মৃত্যুপুরীতে  বারংবার গমনাগমন করতে হয় তাকে। নচিকেতা, আমি তোমার প্রসংসা করছি, কারন, তুমি বাসনা পূরণের জন্য আমার কাছে প্রার্থনা করোনি। আমি তোমাকে উপভোগের নিমিত্ত বারবার প্রলোভিত করেছি। কিন্তু তুমি তা উপেক্ষা করেছো। তুমি যথার্থ সংযমের পরিচয় দিয়েছো। একটা জিনিস জেন  সম্ভোগের জীবন মানে পশুর জীবন। এই সম্ভোগের ফলে প্রাপ্ত ক্ষনিকের আনন্দের চেয়ে ত্যাগ ও জ্ঞানের জীবন অনেক উচ্চতর। যারা জীবনকে সম্ভোগের জন্য ব্যয় করে, তারা পশু ভিন্ন কিছু নয়। আবার যারা অহঙ্কারে মত্ত হয়ে, আমি সব জেনেছি, বলে নিজেকে ঋষি বলে পরিচয় দেয়, তারা অজ্ঞান অন্ধকারের পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর এই অজ্ঞান অন্ধকারে আচ্ছন্ন ঋষি নামধারী অহঙ্ককারী কখনো সত্যের সন্ধান দিতে পারে না। যারা এই জগৎকে অস্বীকার ক'রে, জগতের পারে, আত্মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, তারা আসলে ঘনান্ধকারে কালো বেড়ালের সন্ধান করছে। যারা এই জগৎকে বোঝে নি, তারাই জগতের বাইরে আত্মার খোঁজ করছে। আর এরফলে এরা বারবার এই জীবনে, এই জগতেই ফিরে ফিরে আসে। এই সত্য সবার শোনার সুযোগ হয়না। আবার কেউ শুনেও বুঝতে পারে না। কারন এই সত্যকে জানবার জন্য, বলবার জন্য যেমন  আচার্য্যকে যোগ্য হতে হবে, আবার এই সত্যকে উপলব্ধি করবার জন্য জিজ্ঞাসুকেও যোগ্য হতে হবে। তর্কের  দ্বারা এই সত্যকে জানা যাবে না। আবার হাজারবার বলেও, এই সত্যকে প্রকাশ করতে পারা যাবে না। তো গুরু শিষ্য উভয়কেই যোগ্য হতে হবে।  তবেই এই সত্যের প্রকাশ আপন হৃদয়ে  হবে। চঞ্চল মনে আত্মার প্রকাশ ঘটে না। স্থির ও পবিত্র-শুদ্ধ মনে আত্মার প্রকাশ  ঘটে থাকে। যিনি কাছের থেকেও কাছে, যিনি দূর থেকেও দূরে, যিনি সমস্ত জীবের হৃদয় গুহায় বাস করেন, তিনিই তোমার জিজ্ঞাসিত আত্মা । যার দৃষ্টি বহির্মুখী, যার দৃষ্টি বিষয়মুখী, তিনি এই বিশেষকে কাছে পেয়েও দেখতে পান না। যার দৃষ্টি অন্তর্মুখী হয়েছে, যার সমস্ত বাসনা ত্যাগ হয়েছে, যিনি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম, আবার বৃহৎ থেকে বৃহত্তর জগতের  অনুভূতি লাভের যোগ্যতা  অৰ্জন করেছেন, তার মধ্যে দিব্য আনন্দের অনুভূতির যে সংযোগ ঘটেছে, তা এই আত্মার উপস্থিতেই হয়েছে জানবে। 

রাজর্ষি জনক যখন ঋষি অষ্টাবক্রের কাছে  মুক্তির উপায় জানতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, "মুক্তিম ইচ্ছসি চেত্তাত বিষয়ান বিষবৎ  ত্যাজ" - যদি মুক্তির ইচ্ছে চিত্তে জাগে তবে বিষয়কে বিষবৎ ত্যাগ করো। যতক্ষন বিষয় বাসনা থাকবে, ততক্ষন মুক্তির পথের  সন্ধান পাওয়া যাবে না। যমরাজও নাচিকেতাকে পরীক্ষান্তে  সংযমী হতে দেখে বললেন, যে আত্মার বিষয়ে বহুলোক শুনতেও পায়  না, শুনেও যাঁকে  বহুলোক জানতে পারে না, সেই আত্মার বিষয়ে বক্তাও সুদুর্লভ।  এই আত্মার জ্ঞান অতি নিপুন লোকই লাভ করতে পারে; এবং নিপুন আচার্য কর্তৃক উপদিষ্ট হয়ে আত্মার জ্ঞানলাভ করেছে, এমন ব্যক্তিও সচরাচর দৃষ্ট হয় না। (কঠো : ১/২/৭) 

এর পরে যমরাজ বললেন, বেদ যাকে  অনুসন্ধান করে, যাঁকে  দর্শনের জন্য মানুষ কঠোর তপস্যা করে, তাঁর নাম হচ্ছে "ওঁং", তোমার জিজ্ঞাসিত সেই পরমবস্তুকে ওঙ্কার বলে জেনো। আমরা ঋষি পতঞ্জলির কাছেও শুনেছি, "তস্য বাচক প্রণবঃ" - তাঁর বাচক হচ্ছে প্রণব বা ওঙ্কার। ঋষিগণ বলছেন, কাজটি কঠিন, শাণিত ক্ষুরের উপর দিয়ে হাঁটার মতো।  যিনি ইন্দ্রিয়ের অতীত, যিনি মন, বুদ্ধির অতীত, যিনি অপরিণামী, যাঁকে  জানলে জন্ম-মৃত্যুর কবল থেকে মুক্ত হওয়া  যায়, যাঁকে  জানলে সমস্ত দুঃখ-কষ্টের উর্দ্ধে অবস্থান করা যায়, সেই সত্যের পথ দুর্গম। তবে ভয় পেয়ে, নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকলে, হবে না। যে সত্য আমাদের সবার মধ্যে স্থির-আসন পেতে বসে আছেন, তাঁকে  উপলব্ধি করতেই হবে।  দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে হবে। তাঁকে  প্রথমে ধারণার মধ্যে আনতে  হবে। তারপরে ওঙ্কারের জপ করতে থাকো। এর পর ধ্যানের মধ্যে ডুবে যাও। ওঙ্কারের ধ্যানের  মধ্যে নিরন্তর ডুবে থাকো।  একসময় এই ধ্যান গাঢ়  হবে, তখন সমাধির মধ্যে প্রবেশ করবে। নিরন্তর এই সমাধির অভ্যাস চালিয়ে যাও। যাঁকে   ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না, তাঁকে উপল্বদ্ধির দ্বারা জ্ঞাত হওয়া যায়।  

--------------------------------------

যোগদর্শনের প্রাসঙ্গিক সাংখ্যদর্শনের কিছু কথা  : 

আমরা শুনেছি, কপিলমুনির সাংখ্য দর্শন হচ্ছে সর্বোচ্চ জ্ঞানের ভান্ডার।  আর এই জ্ঞানভাণ্ডারকে উপল্বদ্ধিতে আনতে উপায় বাতলেছেন, ঋষি পতঞ্জলি।  যার নাম দেওয়া হচ্ছে, যোগ। এই যোগের সর্বোচ্চ অনুভূতি হচ্ছে কৈবল্য জ্ঞান। এই কৈবল্য জ্ঞানের কথা শুনবার আগে, আমাদের একবার সাংখ্য দর্শনের কথা সংক্ষেপে শুনে নেবো। তাহলে কৈবল্য ভূমিতে যে দর্শন হবে, তা আমরা শাস্ত্রসম্মত হচ্ছে কি না, তা বুঝতে পারবো 

সাংখ্য দর্শনের পুরোধা যদিও ঋষি কপিলদেব, তথাপি এই সাংখ্য দর্শনের বহু অনুগামী ছিলেন, যাদেরকে সাংখ্য দার্শনিক বলা যেতে পারে। যেমন চার্বাক দর্শনের বহু অনুগামী ছিলেন, তাদেরকে বলা হতো চার্বাকপন্থী ।  সাংখ্য দর্শনে বলা হচ্ছে এই যে জগৎ, যাকে  প্রপঞ্চ বলে আখ্যা  দেওয়া হয়েছে, এটি বিকাশের পূর্বে ছিলো, সম্পূর্ণ সাম্যাবস্থায়। তখন এই প্রকৃতি ছিল অবিনশ্বর, গতিহীন । এর পরে এই প্রকৃতির মধ্যে গতি শুরু হলো, আর গতির ফলেই শুরু হলো পরিবর্তন।  পরিবর্তন মানেই অস্থির, অস্থায়ী।  শুরু হলো  নতুন পুরাতনের  বিভাজন, শুরু হলো জন্ম-মৃত্যু। আমাদের ধারণা  হচ্ছে, সমস্ত জগতের কারন হচ্ছে পরমাণু।  এই জগৎ পরমাণু থেকে জন্ম নিয়েছে। সাংখ্য দর্শন বলছে, এই জগৎ পরমাণু থেকে সৃষ্টি হয়নি। পরমাণু হচ্ছে জগতের দ্বিতীয় বা তৃতীয় অবস্থা বিশেষ। আদিভূত কালের প্রভাবে পরমাণুতে পরিণত হয়। এবং ধীরে ধীরে তা স্থূল ও বৃহতে রূপান্তরিত হয়। আধুনিক বিজ্ঞান যাকে  ইথার বলছে, এটি তরঙ্গ বিশেষ।  এটি কোনো পরমাণুপুঞ্জ নয়। দেখুন বায়ুর মধ্যে আছে অসংখ্য পরমাণু।  কিন্তু পরমাণু  বায়ু নয়। বায়ুর মধ্যে পরমাণু। আবার এই বায়ু আকাশের মধ্যে অবকাশ পেয়েছে, অর্থাৎ বায়ু আকাশের মধ্যে আশ্রয় পেয়েছে। তো এই যে আশ্রয়দাতা আকাশ এ কিসের দ্বারা অবকাশিত ? এই আকাশের যিনি আশ্রয়দাতা তাকে আমরা কি বলবো ? একে  কোনো নামে বা শব্দের মধ্যে আবদ্ধ  করতে পারিনি। এইজন্য দার্শনিকেরা বলেন, এই কল্পনার বা প্রশ্নের কোনো শেষ উত্তর বলে কিছু হয় না। ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলেছিলেন, ঈশ্বরের কোনো শেষ করতে নেই। 

তো দুটো পরমাণুর মধ্যে অবকাশ থাকবে, আবার সেই অবকাশের মধ্যেও  অবকাশ থাকবে। যদি ধরে নেওয়া যায়, যে দুটো পরমাণুর মধ্যে যে অবকাশ তা হচ্ছে ইথার, তবে প্রশ্ন ওঠে ইথার কার আশ্রয়ে আছে ? আমাদের উদ্দেশ্য পূর্নকে খোঁজা। নিত্যসত্যকে খোঁজা। আশ্রিত নয়, আশ্রয়দাতাকে খোঁজা। 

আপনার আমার সবার মধ্যেই এই আশ্রয়দাতা আছেন। আবার আপনার আমার মধ্যেই আছেন, সেই আশ্রিত বস্তু। দেখুন ব্যক্ত বস্তুর মধ্যেই অব্যাক্ত অবস্থা আছে। যাকিছু ব্যক্ত তার সূক্ষ্ম অবস্থা অব্যক্ত। এই বস্তুর অব্যক্ত অবস্থাকে ধরতে গেলে, সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর অবস্থাকে ধরতে হবে। কোনো বস্তুই বস্তুতঃ  ধংশ  হয় না, কেবল কারনে ফিরে যায়। যেমন একটা ঘট্  ভেঙে গেলে, সে আবার তার উৎসে বা মাটিতে ফিরে যায়, তেমনি সমগ্র জগৎ ধংশ-প্রাপ্ত  হয়ে তা আবার সেই উৎসে ফিরে যায়। স্থূল, সূক্ষ্ম সমস্ত জগৎ, জীব, বা মানুষও  তেমনি মৃত্যুর পরে উৎসে ফিরে যায়।  কারনে ফিরে যায়। যদিও যাকে  আমরা মৃত্যু বলি, তা হচ্ছে দেহ থেকে প্রাণের নিষ্ক্রমন মাত্র। আর যেহেতু প্রাণ এই দেহতত্ত্বের সমস্ত ভূতকে আঠার মত ধরে রেখেছিলো, সেই প্রাণের নিষ্ক্রমনে সমস্ত ভূত তার নিজস্ব রূপের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। 

এখন মন হচ্ছে বস্তুর সবচেয়ে সূক্ষ্মতম অংশ, যার দ্বারা আমাদের সকল অনুভূতি হয়ে থাকে । এই মনকে ধরে প্রাচীন দার্শনিকগণ অনুসন্ধানক্রিয়া শুরু করেন। কারন তাঁরা  বুঝতে পেরেছিলেন, এই মন যা আমাদের সমস্ত অনুভূতির আশু বা তাৎক্ষণিক কারন। 

সাংখ্য দর্শন মনে করে এই বিশ্বব্রহ্মান্ড প্রকৃতি ও পুরুষের মিশ্র সত্ত্বা। যদিও পুরুষ থেকেই প্রকৃতির  উদ্ভব। তথাপি প্রকৃতির মধ্যেই পুরুষ এমনভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, যে একে এক থেকে অন্যকে আলাদা করা যায় না। ।  এই প্রকৃতি থেকে পুরুষকে আলাদা করলে, প্রকৃতি তার নিজস্বতা হারিয়ে পুরুষের মধ্যেই লয়প্রাপ্ত হয়ে যায়। তখন প্রকৃতি ও পুরুষ উভয়েই একই  অব্যক্ত অবস্থায় বিরাজ করে। এইজন্য বলা হয়, প্রকৃতি যেমন সত্য, তেমনি পুরুষও সত্য। প্রকৃতি ও পুরুষ উভয়ই অনন্ত। উভয়েই সর্ব্বব্যাপক। একজন পরিণামী, আর  একজন স্থির, এই হচ্ছে  বৈশিষ্ট।  এই প্রকৃতি  থেকেই উৎপন্ন হয়েছে মহৎ তত্ত্ব, যাকে  আমরা বুদ্ধির প্রাথমিক অবস্থা বা বুদ্ধিসত্ত্ব বলতে পারি। এই মহত্তত্ত্ব থেকে এসেছে অহঙ্কার ।  এই অহঙ্কার আবার  ত্রিগুনাত্বিক - সাত্ত্বিক, রাজসিক, ও তামসিক। এই তামসিক অবস্থা থেকে এসেছে তন্মাত্র, আবার তন্মাত্র থেকে মহাভূত। অন্যদিকে সাত্ত্বিক অবস্থা থেকে এসেছে মন, মন থেকে কর্ম্মেন্দ্রিয় ও জ্ঞানেন্দ্রিয়। তো খেয়াল করুন, তামসিক অবস্থা থেকে যা কিছু হয়েছে, অর্থাৎ তন্মাত্র ও মহাভূত থেকে যাকিছু হয়েছে, হয়েছে তা সব জড় পদার্থ।  আর সাত্ত্বিক অবস্থা থেকে যা কিছু এসেছে, তারমধ্যে   মন বা একটা অনুভূতি  গুন্ প্রাপ্ত হয়েছে। আর তামসিক অবস্থা থেকে যা কিছু এসেছে, তা জড় বা অনুভূতিহীন।  

তো পুরুষ-প্রকৃতির প্রথম পরিবর্তিত অবস্থা হচ্ছে মহত্তত্ত্ব বা বুদ্ধিসত্ত্বা। এর পরে এসেছে অহঙ্কার। এই যে অহঙ্কার, এ থেকেই আমাদের  অহংজ্ঞানেই উদ্ভব হয়েছে ।  বুদ্ধিসত্ত্বার মধ্যে কোনো অহংজ্ঞান ছিল না। মহত্তত্ত্ব বা বুদ্ধিসত্ত্বা হচ্ছে সার্বজনীন জ্ঞান। অহং জ্ঞান, জ্ঞান, বা জ্ঞানাতীত অবস্থা - এগুলো সবই  এই মহত্তত্ত্ব অবস্থার অন্তর্গত। 

দেখুন, প্রকৃতিতে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে, কেউ তা বুঝতে পারছে, আর কেউ বুঝতে পারছে না। জড়বস্তু এই পরিবর্তনকে ধরতে পারে না। কিন্তু চৈতন্যবান মানুষ এটিকে ধরতে পারে।  আবার কোনো কোনো পরিবর্তন আছে, যা আমাদের মানবীয় ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে ধরতে পারি না। অর্থাৎ এই যে পরিবর্তন তা এতটাই ধীর, বা এতটাই দ্রুত এবং এতটাই সূক্ষ্ম যে তা আমরা ধরতে পারি না। অর্থাৎ আমাদের যে বোধ শক্তি আছে, তাতে এই পরিবর্তন ধরা পড়ে  না। যাদের বোধশক্তি তীক্ষ্ণ তাঁরা  হয়তো এই পরিবর্তন প্রতক্ষ্য করতে পারেন। এই বোধশক্তিতকে  বৃদ্ধি করা বা তীক্ষ্ণ করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে যোগ-সমাধি। ঋষি পতঞ্জলি এই যোগমার্গের সন্ধান দিয়েছেন। 

--------------------------

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - কৈবল্যপাদ 

"জন্ম-ঔষধি-মন্ত্র-তপঃ-সমাধিজাঃ সিদ্ধয়ঃ।" - ০৪/১

জন্ম, ঔষধি, মন্ত্র, তপঃসাধনা, সমাধি - এই পাঁচভাবে সিদ্ধিলাভ হতে পারে। 

বিভূতিপাদের শেষের দিকে, আমরা নানান প্রকার সিদ্ধির কথা শুনেছিলাম।  সিদ্ধি কথাটা এসেছে সিদ ধাতু থেকে, যার অর্থ হচ্ছে নিস্পন্ন হওয়া। সিদ্ধি মানে পরিনাম।  আমাদের দৃষ্টিতে সিদ্ধি হচ্ছে অলৌকিক শক্তি বা অলৌকিক দৃষ্টি,  যার সাহায্যে সিদ্ধপুরুষ এমন কিছু করেন, দেখেন, শোনেন, যার কোনো ব্যাখ্যা সাধারণভাবে  বিজ্ঞান করতে অক্ষম। মৃত্যুর পরে, আমরা কোথায় যাই, কি করি, কিভাবে থাকি, এসব আমাদের কাছে অজ্ঞাত। এমনকি জন্মের আগে, আমরা কি ছিলাম, কেমন ছিলাম, তা আমাদের কাছে জানা নেই। বলা হয়, সিদ্ধপুরুষ স্বেচ্ছায় শরীর  ত্যাগ করতে আবার আপন ইচ্ছেয় পছন্দমত শরীর  ধারণ করতে পারেন । সমস্ত  বস্তুর পরিণতি সম্পর্কে তিনি অবহিত, এমনি পূর্বাবস্থা সম্পর্কেও তিনি জানেন। আর এইযে সিদ্ধি বা বিশেষ জ্ঞান, এটি যোগ-সাধনার ফল হিসেবে আমরা শুনেছি।  

কিন্তু এবার কৈবল্যপাদের প্রথমেই বলছেন, এই যে সিদ্ধি এটি যে কেবল সমাধির দ্বারাই প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাই নয়,  এই সিদ্ধি কারুর কারুর ক্ষেত্রে জন্ম থেকেই হতে পারে, ঔষধ সেবনে হতে পারে, মন্ত্র সাধনায় হতে পারে, তপঃ সাধনার দ্বারা বা সমাধি যোগের সাধনায় হতে পারে। 

জন্মসিদ্ধি -  অনেক সময় জন্মথেকে কারুর কারুর মধ্যে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা লক্ষ করা যায়। আসলে এই ক্ষমতা তার পূর্ব-পূর্ব জীবনের সাধনা বা ক্রিয়াকলাপ, যা এই জন্মে স্বভাবসিদ্ধ রূপে প্রকাশিত হচ্ছে। বহু মহাপুরুষের জীবনে এই অলৌকিক সিদ্ধির কথা শোনা যায়। শ্রীশ্রী পরমহংস যোগানন্দ তার "AUTO BIOGRAPHY OF A  YOGI  " বইয়ের প্রারম্ভেই বলছেন, "বেশ স্পষ্ট মনে পড়ে যে অতীত জীবনে আমি হিমালয়ের তুষার প্রদেশে যোগীরূপেই ঈশ্বর লাভের  জন্য ব্যাকুল হয়ে কেঁদে কেঁদে বেরিয়েছিলাম।" এটা তাঁর  অতীত জীবনের স্মৃতি - যা সাধারণত আমাদের কারুর মধ্যে নেই, কিন্তু পরমহংস যোগানন্দের  মধ্যে ছিল। ঠিক তেমনি অনেক মহাপুরুষ অনেকসময় অলৌকিক ক্ষমতা নিয়ে জন্মান, এবং এমন কিছু অদ্ভুত আচরণ করেন, যা আমাদের কাছে বিষ্ময়কর।  আসলে এসবই  তার অতীত জীবনের সাধনার ফল যা এই জীবনে প্রকাশ পাচ্ছে। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমৎ ভগবৎ-গীতাতে অর্জ্জুনকে বলছেন, তোমার আমার বহু জন্ম অতীত হয়েছে,  তুমি তা জানো  না, কিন্তু আমি জানি। আবার এক জায়গায় বলছেন, যাঁরা এই জীবনে যোগসাধনায় মগ্ন হয়ে আছেন, কিন্তু সাধনা অপূর্ন রেখে দেহ ত্যাগ করেছেন, তারা পরবর্তী জীবনে আবার যোগীকুলে, যোগের উপযুক্ত পরিবেশে জন্ম গ্রহণ করবেন। তো এই জীবনে আপনি যাকিছু করবেন, তা হারিয়ে যাবে না, একদিন না একদিন এর ফল আপনি ভোগ করতে পারবেন। যোগসাধনায় যারা সিদ্ধ হয়েছে, বা হবেন, তাঁদের   যোগধারা এই জীবন থেকে পরবর্তী জীবনে প্রবাহিত হবে।  এর অন্যথা হবে না। কোনো কিছুই ব্যর্থ হয় না, যোগক্রিয়ার ফলও  বিফলে যেতে পারে না।  

ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, ঔষধি দ্রব্য অর্থাৎ শেকড়বাকড়, বা রাসায়নিক দ্রব্য সেবনে এক ধরনের সিদ্ধি দেখা যায়। আসলে সিদ্ধি কথাটার অর্থই  হচ্ছে পরিণতি প্রাপ্ত হওয়া। এখন ঔষধ সেবনে যেমন একজন অসুস্থ  মানুষ সুস্থ  হয়ে উঠতে পারে, তেমনি উত্তেজক পদার্থ সেবনে শরীরের মধ্যে আমাদের বিশেষ কিছু স্নায়ু উত্তেজিত হয়ে এমন সব অদ্ভুত দর্শন, শ্রবণ, এমনকি এমনসব শক্তিশালী কাজের যোগ্য করে দেয়, যা আমরা অন্য সময়ে করতে পারতাম না।  

মন্ত্রসিদ্ধি বলে একটা কথা আমরা শুনেছি। মন্ত্র বা শব্দব্রহ্মের জপ, আমাদের স্নায়ুর মধ্যে একটা আলোড়ন তোলে।  আর আমরা জানি, আমাদের মনের যে চিন্তা-ক্রিয়া, তা আসলে আমাদের স্নায়ুকেন্দ্রের স্পন্দন বিশেষ। তো এই স্নায়ুকেন্দ্রে যখন মন্ত্রের মুহুর্মুহু জপ, বা বিশেষ মুদ্রাসহ মন্ত্রের জপ সাধিত হয়, তখন  আমাদের বোধশক্তি এক উচ্চ  মাত্রায় প্রবাহিত হয়।   আর এই বোধশক্তি তখন নানান অদৃষ্ট বস্তুকে দর্শনের, অশ্রুত শব্দকে শোনার, এমনকি আমাদের জ্ঞান অনুভূতির মাত্রাকে বাড়িয়ে দেয়।  আর এর দ্বারা, আমরা এমন অনেক কিছুই করতে পারি, বা এমন অনেক কিছু করবার ক্ষমতা আমাদের মধ্যে জন্মায়, যা সিদ্ধি নামে খ্যাত, বা মন্ত্রজপের  ফল হিসেবে বিবেচিত হয়। 

তপঃ সাধনা হচ্ছে সহ্যশক্তির ক্ষমতা বৃদ্ধির ক্রিয়া বিশেষ।  যেকোনো অবস্থায়, নিজেকে মানিয়ে নেবার ক্ষমতা বিশেষ। বরফের দেশে সাধুমহারাজগন সামান্য শীতবস্ত্রের দ্বারাই জীবন নির্বাহ করছেন, সামান্য খাদ্যের সাহায্যে জীবন ধারণ করছেন। এসব এই তপঃসাধনার ফল, যা আসলে সাধনার সিদ্ধি বিশেষ। 

সমাধির কথা আমরা আগেই শুনেছি।  অর্থাৎ ধারণা, ধ্যান, ও সমাধিতে সিদ্ধ হলে যে সংযম আয়ত্ত্ব  হয়, সেই সংযমের সাহায্যে সাধক অষ্টসিদ্ধি লাভ করে থাকেন। তো ঋষি পতঞ্জলি, সিদ্ধি-প্রাপ্ত হবার এই পাঁচ প্রকার উপায়ের কথা বলেছেন। কিন্তু সত্য হচ্ছে, ঔষধ-সিদ্ধি, এমনকি জন্মসিদ্ধি ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে। কারন ঔষধের প্রকোপ চিরস্থায়ী নয়, এমনকি পূর্ব জীবনের স্মৃতিও আমাদের জন্মের ৭ বছরের  মধ্যেই লোপ পেয়ে যায়। কিন্তু  নিরন্তর যোগক্রিয়ার মধ্যে যারা লেগে আছেন, তাদেরকে ঘিরে অনেক অলৌকিক ঘটনা বা  সিদ্ধি-ফল  প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকে, যাকে  উপেক্ষা করে সাধক সাধনপথে এগিয়ে যান। 

"জাত্যন্তর-পরিণামঃ প্রকৃত্যাপূরাৎ।" (০৪/০২)

জাত্যন্তর পরিনাম প্রাপ্ত হবার কারন হচ্ছে প্রকৃতির অনুপ্রবেশ। 

আমাদের এই জন্মের যে বাসনা ও সংকল্প  পূর্বপূর্ব জীবনের যে বাসনা ও সংকল্প  যা আমাদের সংস্কার রূপে বিরাজ করছে ও সেই অনুযায়ী আমাদের পরবর্তী জন্ম হচ্ছে। বলা হয়, কর্ম্মফল ভোগের জন্য, বা আমাদের বাসনা পূরণের জন্য, আমরা উপযুক্ত দেহ প্রাপ্ত হয়ে থাকি। অর্থাৎ আমি এমন কর্ম্মের মধ্যে নিযুক্ত হলাম, যার ফল ভোগ করতে গেলে,  আমার পুঁতিগন্ধময় পরিবেশের প্রয়োজন, তবে হয়তো আমি পরের  জীবনে তেমনই  দেহ প্রাপ্ত হবো, যা সেই  পুঁতিগন্ধময় প্রাকৃতিক পরিবেশের যোগ্য। আবার আমার সংকল্প,  বা বাসনাকর্ম্ম  যদি এমন হয়, যা ভোগের জন্য দৈব শরীরের প্রয়োজন তবে আমি সেই দৈব শরীর, অর্থাৎ স্বর্গরাজ্যে দৈব শরীর নিয়ে প্রকাশিত হবো। আবার মনুষ্যদেহে দেহসর্বস্য মনুষ্যচিত কর্ম্মের ফলে আমরা আবার মনুষ্য  দেহ প্রাপ্ত হবো। 

বলা হয়, দেহ ত্রিবিধ, ১. যে দেহে কেবলমাত্র ভোগ সম্পাদিত হতে পারে, যেমন - দিব্যদেহ ২. যে দেহে কর্ম্ম ও ভোগ উভয় সম্পাদিত হতে পারে, এবং কর্ম্মফল সঞ্চিত হতে পারে, যেমন মনুষ্য  দেহ।  ৩. যে দেহে ভোগ ও কর্ম্ম সম্পাদন হলেও, কর্ম্মফল সঞ্চিত হতে পারে না, যেমন পশুদেহ । যাইহোক,  এই দেহ যেমন ভোগের নিমিত্ত, উপযুক্ত হয়ে নির্মাণ হয়ে থাকে, তেমনি এই দেহেই  ভোগ সম্পাদন হয়ে থাকে।  আবার এই দেহ সংকল্প  পূরণের জন্য উপযুক্ত কর্ম্মের উপযোগী হয়ে থাকে।  তো এই যে মনুষ্যদেহ, বা পশুদেহ, বা কীট পতঙ্গের দেহ, এমনকি দিব্যদেহ  কি ভাবে পরিণতি প্রাপ্ত হয়ে থাকে ? 

ছিলাম তো মনুষ্য  দেহে, জন্মান্তরে হলাম পশু, বা দেবতা।  তো রূপান্তরিত এই দুই দেহের তো মিল পাওয়া যাচ্ছে না।  দেখুন প্রকৃতির স্তরভেদে যেমন দেহের রূপান্তর ঘটে থাকে, তেমনি প্রকৃতির উপাদানের তারতম্যের ফলে, দেহের রূপ পরিবর্তিত হয়ে থাকে। আমরা জানি, পূর্ব পরিণামের নাশে  উত্তর পরিনাম প্রাপ্তি হয়ে থাকে। আবার উত্তরগুন অনুযায়ী, অবয়বের উপাদানের মধ্যে, অর্থাৎ কারনে মধ্যে পার্থক্য লক্ষিত হয়।  শরীর  ও ইন্দ্রিয়ের যে প্রকৃতি, তার অনুপ্রবেশের কারনে বিকারগ্রস্থ হয়ে প্রকৃতির (স্বভাব ?) উপাদানের মধ্যে প্রবেশ ঘটে। আর এর ফলেই জীবাত্মা নতুন দেহের মধ্যে প্রবেশ করে। এই প্রকৃতির উপাদানের মধ্যে মিশ্রনের তারতম্যের ফলে দেহের মধ্যে ভিন্নতা দেখা যায়।  কিন্তু সে তার ধর্ম্মাধর্ম্ম  পরিবর্তন করতে পারে না। 

এই জগতের সমস্ত প্রাণীর  মধ্যেই যেমন কিছু মানবীয় গুন্ আছে, তেমনি কিছু পাশবিক  গুন্ বর্তমান থাকে। শারীরিক শক্তি যেমন মানুষের মধ্যে আছে, তেমনি পশুর মধ্যেও আছে। সুখ-দুঃখের অনুভূতি শক্তি যেমন মানুষের মধ্যে আছে, তেমনি পশুর মধ্যেও আছে। পশুর যেমন শরীর  রক্ষার চিন্তা আছে, তেমনি ক্ষুধা-তৃষ্ণা বোধ আছে। মানুষের মধ্যেও এমনটা হয়ে থাকে।  কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে যথার্থ উচ্চ বা শ্রেয় চিন্তা করবার ক্ষমতার অভাব রয়েছে পশুদেহের মধ্যে, যা মনুষ্য  দেহের ভিতরে লক্ষিত হয় ।  হিন্দু শাস্ত্র তো বলে থাকে, এক দেহেই আছে, মনুষ্যশরীর, দেবশরীর, পশুশরীর  । 

শরীর  অর্থে প্রকৃতির (স্বভাবের) পরিনাম বিশেষ। পঞ্চমহাভূত, ও সূক্ষ্ম-ইন্দ্রিয়সকল যা আসলে অহঙ্কারের পরিনাম বিশেষ এবং এই  অহঙ্কার  এবং অহঙ্কার  থেকে জাত যে মহাভূত, ও ইন্দ্রিয়াদি  - এর মধ্যেই পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।  কিন্তু ধর্ম্ম-অধর্ম্মের পরিবর্তন কেবল যোগ সাধনেই হয়ে থাকে। যোগ অর্থাৎ জীবাত্মা ও পরমাত্মার যোগ। এইজন্য বলা হয়ে থাকে, প্রকৃতির মধ্যে পরিণামের সম্ভাবনা সর্ব্বকালে, সর্বত্র ঘটে চলেছে, কিন্তু ধর্ম্ম-অধর্ম্মের পরিবর্তন হয় না। ধর্ম্মী  এভাবে ধর্ম, লক্ষণ ও অবস্থা পরিনাম প্রাপ্ত হলেও সে তার স্বরূপ অতিক্রম করে না।  অর্থাৎ পরিনাম প্রাপ্ত হলেও ধর্মীয় স্বরূপ যা ছিলো  তাই থাকে, একথা আমরা বিভূতিপাদের আলোচনার সময় শুনেছি (০৩/১৩) . ঋষি পতঞ্জলি এখানে এসে বলছেন, এক জাতি থেকে অন্য জাতিতে যে পরিনাম প্রাপ্ত হচ্ছে, তার কারন হচ্ছে প্রকৃতির উপাদানের মধ্যে অনুপ্রবেশ। অর্থাৎ শরীরের উপাদানস্বরূপ যে প্রকৃতির উপাদান, তার মধ্যে পরিবর্তন হচ্ছে। তো সিদ্ধি এমন একটা অবস্থা, যা আমাদের এক জাতের থেকে অন্য জাতে  নিয়ে যেতে পারে। আর জাতের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে, সাধারণ মানুষ হয়ে উঠতে পারে, মহাত্মা, দেবমানব। 


"নিমিত্তম-প্রয়োজকং প্রকৃতীনাং বরণ-ভেদস্তু  ততঃ ক্ষেত্রিকবৎ। " - (০৪/৩)

নিমিত্ত অর্থাৎ  ধর্ম-অধর্ম ইত্যাদি প্রকৃতিদের প্রযোজক (পরিণামের প্রবর্তক) হছে না। এর দ্বারা আবরণের  ভেদ হয়, এবং  নিমিত্ত থেকে প্রতিবন্ধক-নিবৃত্ত করে মাত্র। যেমন চাষি ক্ষেতের আল কেটে  জলের প্রবাহ বইয়ে নেয়। 

আমরা জানি, কারন কার্যকে প্রভাবিত করে।  কিন্তু কার্য কখনো কারণকে  প্রভাবিত করতে  পারে না। মানুষ দেবতায় রূপান্তরিত হতে পারে। আবার দেবতা মানুষ হয়ে জন্ম গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু এই যে পরিবর্তন এটি প্রকৃতি দ্বারা সম্ভব হয়েছে। স্বভাবের পরিবর্তন হচ্ছে বলে এই পরিনাম প্রাপ্ত হয়ে থাকে। আর   সবই সম্ভব হতে পারে, কেবলমাত্র প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে। প্রকৃতিতে আছে অফুরন্ত ভান্ডার। এখান  থেকেই সবকিছু জোগান  দেওয়া হচ্ছে। এখান  থেকেই সব খাটতি পূরণ করা হচ্ছে।  এই ব্যাপারটা একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন, সূত্রকার। চাষী  এক ক্ষেত থেকে অন্য ক্ষেতে জল বইয়ে দেয়।  চাষীর  কাজ হচ্ছে দুই খণ্ড  জমির মধ্যে বাধা স্বরূপ যে আল আছে, তার অপসারণ করা। নদী তো আপন বেগে সমুদ্র বা নিম্নাভিমুখী হয়ে থাকে। বাঁধ দিয়ে নদীর  স্বাভাবিক গতিকে আমরা রুদ্ধ করে দেই। এই বাঁধ বা আল যদি আমরা অপসারণ করে দেই , তবে নদী বা জল আপন বেগে ধাবিত হবে। এর জন্য আলাদা করে কোনো প্রয়াস করতে হয় না। আল বা বাঁধ না থাকলে, জল তার স্বাভাবিক গতিতে প্রবাহিত হবে, তখন জল  সেঁচতে হয় না। সাধনার ক্ষেত্রেও এই একই কথা সত্য। আমাদের মধ্যে যে প্রবৃত্তিরূপ আল রয়েছে, তার নিবৃত্তি করতে হবে। প্রবৃত্তির আল অপসারিত হলে, প্রকৃতির স্বাভাবিক গুন্ যেমন প্রকাশিত হবে তেমনি আগাছার উচ্ছেদ করে দিলে প্রকৃতির সঙ্গে পুরুষের মধ্যে যে প্রভা তা প্রকাশিত হবে। যোগের দুটো অন্তরায়, এক আকর্ষণ অপরটি অপকর্ষণ - একটা আল ছাড়িয়ে দেওয়া, আর একটা আগাছাকে উৎপাটন করা।  আমার মধ্যে জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কার আছে, তার উৎপাটন করতে হবে, আবার নতুন সংস্কারের জন্ম যাতে না হতে পারে, তার জন্য সদা সতর্ক থাকতে হবে। তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই আমরা স্বরূপে স্থিত হতে পারবো। একেই বলে ক্রিয়াহীন অবস্থা।  

"নির্মাণ-চিত্তানি-অস্মিতামাত্রাৎ। "  (৪/৪)

অস্মিতামাত্রাৎ  অর্থাৎ কেবলমাত্র অস্মিতা জনিত অহঙ্কার  হেকে এই নির্ম্মাণ-চিত্তগুলো  হচ্ছে। 

আমরা শুনেছি, মহত্তত্ত্ব বা বুদ্ধিতত্ত্ব থেকে অস্মিতার জন্ম হয়েছে। এই অস্মিতার প্রভাবেই চিত্ত নির্মাণ-ক্রিয়া করে থাকে। আমাদের যে জ্ঞান তা ওই চিত্তের নির্মিত কায়াবুহ্য ছাড়া কিছু নয়। 

আমরা জানি, তন্মাত্র আমাদের সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়ের সংস্পর্শে এলে, আমাদের একটা অনুভূতি হয় বা একটা ধারণার জন্ম হয়। এই ধারণা  করে কে ?  ধারণা  করে আমাদের অস্মিতাবোধ। এই অস্মিতা এসেছে আবার বুদ্ধিতত্ত্ব বা মহত্তত্ত্ব থেকে।  দুধ থেকে দই, দই থেকে ঘি-এর জন্ম হয়।  তেমনি অস্মিতা বুদ্ধিসত্ত্ব থেকে এসে থাকে। দেখুন আমাদের সবার একটা অস্মিতা বা আমি-বোধ আছে। আবার  ইতরপ্রাণীদের মধ্যেও অস্মিতাবোধ আছে। বলা হয়, প্রাণিজগতের বাইরে অসংখ্য চেহারার যে সব বস্তু আছে, তাদের সবার অস্মিতাবোধ আছে। অজৈব পদার্থ বা দেহের মধ্যেও অখিল অস্মিতা বিরাজ করছে।  বিশ্ব যে গতিশীল তা সেই অখিল অস্মিতার ক্রিয়া বিশেষ।  গতিশীলতাকে বলে আত্মা, আর গতিকে যে রোধ করে তাকে বলে অনাত্মা। 

এখন এই অস্মিতা থেকে জন্ম নেয় ইচ্ছে। অর্থাৎ যাকিছু চাওয়া-পাওয়া, তৃপ্তি-অতৃপ্তি, ভাব-অভাব তা এই অস্মিতার কারণেই হয়ে থাকে। অস্মিতার আকর্ষণ যত  প্রবল হয়, তত আমাদের অভাববোধ হতে থাকে। এই অভাববোধ একসময় আমাদের দুঃখ  জন্ম দিয়ে থাকে। এই কারনে ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, চিত্তের যাকিছু নির্ম্মাণ তা এই অস্মিতা থেকে হয়ে থাকে। চিত্তের মধ্যে যাকিছু নির্ম্মাণ ক্রিয়া চলছে, তা এই অস্মিতার বিশেষ মাত্রার কারনে হয়ে থাকে। 
---------

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - কৈবল্যপাদ (শ্লোক ০৪/০৫-০৬)

"প্রবৃত্তিভেদে প্রয়োজকং চিত্তম-একম-অনেকেষাম ।" ( ০৪/০৫)

একচিত্ত অনেক চিত্তের প্রবৃত্তিভেদে নিয়ামক হয়ে থাকে। 

আমাদের যে  প্রবৃত্তি তা এই চিত্তের নির্মাণ।  ঋষি  পতঞ্জলি বলছেন, একটি চিত্ত অনেক চিত্তের প্রবৃত্তির কারন হতে পারে। এখন কথা হচ্ছে একটি চিত্ত অনেক অনেক চিত্তের প্রবৃত্তি কিভাবে হতে পারে ?  ভাষ্যকার ব্যাসদেব বলছেন,  যোগী প্রথমে সমস্ত বৃত্তির নির্ম্মাণক্রিয়ার  প্রয়োজকরূপে  একটা চিত্ত নির্ম্মাণ করেন। এবং তা থেকেই বহুচিত্তে প্রবৃত্তি-ভেদ হয়ে থাকে। 

তো প্রথম বা প্রধান চিত্ত বহু চিত্তের জন্মদাতা। আর এই যে বহুচিত্ত এগুলো আসলে আমাদের পূর্বশরীর যা এককালে ছিল ও পরবর্তী শরীর যা নির্মাণ হতে চলেছে, তারই প্রতিফলন । এখন যোগীর যে প্রধান চিত্ত এর মধ্যে অবিদ্যাজনিত যে সংস্কার বা ভোগবৃত্তি স্থান পায় না।  আবার যে চিত্তে ভোগ চরিতার্থ হয়,  তার নির্মাণ করবার কোনো প্রয়োজন তিনি বোধ করেন না। আর এই কারনে যোগীপুরুষের ভোগাদি বলে অবশিষ্ট কিছু থাকে না। 
------------

"তত্র ধ্যানজম-অনাশয়ম।" - (০৪/০৬)

তত্র অর্থাৎ চিত্তের মধ্যে যে পাঁচপ্রকার (জন্ম, ঔষধ, মন্ত্র, তপঃ ও সমাধি) সিদ্ধি তার মধ্যে সমাধি জাত সিদ্ধি,  হয় অনাশয় অর্থাৎ রাগ দ্বেষ ইত্যাদি প্রবৃত্তির আশয় শূন্য, এই সমাধিজাত সিদ্ধি। 

আমরা আগে শুনেছি, সিদ্ধি পাঁচভাবে হতে পারে।  কেউ পূর্বজন্মের সাধনফলে  জন্মসিদ্ধ, কেউ ঔষধ প্রয়োগে সমাধি-প্রায় অবস্থায় নিত  হয়ে সিদ্ধির অধিকারী হয়েছেন,  কেউ আবার মন্ত্রসাধনায়  মন্ত্রসিদ্ধি লাভ করেছেন, কেউ তপঃসাধনা দ্বারা সমাধিসম  অবস্থায় উপনীত হয়ে সিদ্ধিলাভ করেছেন।  সবশেষে পতঞ্জলি আদিষ্ট পথে সমাধি লাভ করে সিদ্ধি লাভ করেছেন। এই পঞ্চবিধ উপায় হচ্ছে সিদ্ধির উদ্রেগ করতে পারে। এখন এই যে সিদ্ধাবস্থা তা আসলে আমাদের চিত্তের বিশেষ অবস্থা মাত্র। ধ্যান সমাধির সাহায্যে  চিত্তের যে সিদ্ধাবস্থা হয়, সেই চিত্তে কোনো প্রবৃত্তির লেশমাত্র থাকে না। এই অবস্থা আসলে চিত্তের অনাশয় অবস্থা। যার জন্য যোগী সমস্ত দুঃখ-কষ্টের উর্দ্ধে থাকেন, অর্থাৎ জাগতিক সমস্ত ক্লেশাদীর সম্পূর্ণ বিনাস  হয়ে থাকে। আবার সমাধি সিদ্ধি বাদে যত  ধরনের সিদ্ধি, তা সাময়িক সময়ের জন্য হয়ে থাকে, এই সিদ্ধির প্রভাব এই জন্মেই, এমনকি কিছুদিনের মধ্যেই  শেষ হয়ে যায়, কিন্তু সমাধিতে যে অষ্টসিদ্ধি তা যোগীপুরুষকে জন্ম জন্মান্তর ধরে সঙ্গ দেয়।  যদিও যথার্থ যোগসাধক এই সিদ্ধিকে অবশ্যই উপেক্ষা করবেন, এটি যোগাচার্য্য ঋষি পতঞ্জলি সতর্কবাণী। 

যাইহোক, চিত্তের এই অনাশয় অবস্থাই জীবনমুক্ত অবস্থা। এইসময় যোগীর অদৃষ্টের ভোগ সম্পাদন হয়ে থাকে, কিন্তু এই সময় সতর্ক থাকতে হয়, যাতে নতুন সংস্কারের জন্ম না হয়।  আর নতুন সংস্কারের জন্ম না হলে, পরবর্তী জীবনে তিনি জন্মসিদ্ধ পুরুষ হিসেবে জন্ম গ্রহণ করে থাকেন। অর্থাৎ তাঁর  সাধনলবদ্ধ সমস্ত শক্তি নিয়েই তিনি পরবর্তী দেহে প্রবেশ করেন।   
---------- 
 
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - কৈবল্যপাদ (শ্লোক ০৪/০৭)

"কর্ম্ম-অশুক্ল-অকৃষ্ণং যোগিনঃ-ত্রিবিধম-ইতরেষাম ।" (০৪/০৭)

(কর্ম্মফল ত্যাগী যোগীদের) কর্ম্ম অশুক্ল অর্থাৎ পুণ্যপ্রদ নয়, আবার অকৃষ্ণ  অর্থাৎ পাপপ্রদ নয়। কিন্তু অন্যদের এই কর্ম্ম ত্রিবিধ। 

ভগবান বলুন, যোগী বলুন, বা সাধারণ মানুষ বলুন, যখনই কেউ দেহপ্রাপ্ত হন, তখন থেকেই তাঁকে  কোনো না কোনো কর্ম্মে লিপ্ত হতে হয়।  যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতাতে বলছেন, হে অর্জ্জুন, কর্ম্ম তোমাকে করতেই  হবে। তা সে ভালো কাজ হোক বা মন্দকাজ। দেখুন, শরীর  রক্ষার জন্য আমাদের সবার কোনো না কোনো  কর্ম্ম করতেই  হবে, আর কিছু না করুন, শ্বাস প্রশ্বাস ক্রিয়া তো করতেই হবে। এর থেকে নিস্তার নেই।  দেহে থাকতে গেলে, শ্বাস-যন্ত্রকে  ক্রিয়াশীল রাখতে হবে। কিন্তু কথা হচ্ছে, আমরা তো কেবল শরীর  রক্ষার জন্য ক্রিয়া করি না, আমরা আমাদের প্রত্যাশা পূরণের জন্য, আমাদের সংকল্প পূরণের জন্য, এমনকি আমরা সামান্য শারীরিক ও মানসিক সুখের জন্য ক্রিয়া করে থাকি ।  আর এই যে ক্রিয়াসকল, এরা  সবাই কোনো না কোনো ফল আপনাকে প্রদান করবে। তা সে সুখকর হোক, বা দুঃখপ্রদ হোক। আর এই কর্ম্মফল ভোগের জন্য, আমাদের সবার কোনো না কোনো ভোগ-দেহের  প্রয়োজন হয়ে থাকে। আর এই কারণেই আমরা এক দেহ থেকে অন্য দেহে বিচরণ করে থাকি, বিবিধ ভোগ সম্পাদন করবার জন্য ।  যেমন যেমন ভোগলিপ্সা আমাদের জাগে, বা যেমন যেমন ভোগ আমাদের কর্ম্ম দ্বারা নির্ধারিত হয়, তা ভোগ করবার জন্য উপযুক্ত দেহের অধিকারী হয়ে থাকি। এবং কর্ম্ম অনুযায়ী, সুখ-দুঃখের অধিকারী হই। 

তো যোগীপুরুষকেও কাজ করতে হবে। কিন্তু ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, যোগীদের কর্ম্ম সুখ-দুঃখের উর্দ্ধে। অর্থাৎ না তিনি ভালো কাজ করেন, বা পুন্যকর্ম্ম করেন, না তিনি পাপকর্ম্ম করেন। যোগীর সমস্ত কর্ম্মকে তিনি দুই ভাগে ভাগ করেছেন, ১. অকৃষ্ণ (পাপ নয়) ২.অশুক্ল (পুন্য নয়)। কিন্তু অন্যসব  সাধারণ মানুষের কর্ম্ম তিন প্রকার। অর্থাৎ এক হচ্ছে, পাপকর্ম্ম যার ফলে তাকে দুঃখের ভাগিদার হতে হয়, বা হিন্দু মতে, নরক যন্ত্রনা ভোগ করতে হয়।  দুই, পুন্যকর্ম্ম যার ফলে তিনি স্বর্গসুখ ভোগ করবেন।  ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছে, অর্জ্জুন, তুমি যদি যুদ্ধ না করো, তবে তোমার স্বর্গলাভ হবে না। তিন, এই পাপ ও পুন্য মিশ্রিত কর্ম্ম।  অর্থাৎ এর ফলে কিছুদিন কষ্ট  (নরক যন্ত্রনা) ভোগ করতে হবে, আবার কিছুদিন সুখ (স্বর্গ-সুখ) ভোগ করতে হবে।  অর্থাৎ সাধারনের জীবনে যা কিছু কর্ম্ম সম্পাদিত হচ্ছে, তার দ্বারা সে সুখ-দুঃখ উভয় অবস্থা প্রাপ্ত হবেন। কিন্তু যোগীরা এই পাপ-পুন্য উভয় থেকে দূরে থাকেন। 

এখন কথা হচ্ছে, এই অবস্থায় তিনি কিভাবে শরীর  রক্ষা করেন, বা এই অবস্থায় তার কর্ম্ম কি ফলশূন্য হয়ে যায় ? না কর্ম্ম কখনো ফল শূন্য হয় না, আবার শরীর  রক্ষার জন্য তাকে অবশ্যই শ্বাস প্রশ্বাস ক্রিয়া করতে হয়, খাবার খেতে হয়, এমনকি ঘুমুতে হয়।  এমনকি আমরা দেখেছি, যোগীপুরুষ অনেক সময় আচার্য্যের ভূমিকায় ক্রিয়া করে থাকেন। আসলে কি জানেন, যোগস্থ পুরুষ যা কিছু করেন, তা তিনি সচেতন ভাবে করেন, কিন্তু কোনো প্রত্যাশা নিয়ে নয়। এমনকি দেহ রক্ষার তাগিদেও কোনো কর্ম্ম করেন না। আমাদের শ্বাস ক্রিয়া আমরা এজন্য করি না, যে আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। আমরা অনেক কিছু করি, যা আমাদের ভালো লাগে, তাই করি, এর ফলের চিন্তা করে করি তা নয়. তেমনি যোগী পুরুষের ক্রিয়া কেবল মাত্র হয়, তিনি কিছু করেন না। যোগীপুরুষের বোধশক্তির মাত্রা, অনেক উচ্চস্তরে প্রবাহিত হয়। সেখানে সাধারণ সুখ-দুঃখ তার অনুভূতিতে আসে না। 

নেশাগ্রস্থ মানুষকে গালাগাল করলে, তার মধ্যে কোনো বিকার হয় না। ভালো মন্দ বিচার তার থাকে না। মৃত মায়ের বুকের দুধ খেতে থাকে সন্তান। এ দৃশ্য বিরল হলেও, ঘটে থাকে। আসলে আমাদের বোধ-শক্তি, বিচারশক্তি, আমাদের মধ্যে যেমন ভালো মন্দকে আলাদা করেছে, তেমনি অভেদ জ্ঞানের লোপ সাধন করেছে। 

ঠিক  এর উল্টোটা হয়, যোগীপুরুষের মধ্যে, তাদের মধ্যেও এমন উচ্চ-বোধশক্তি বিরাজ করে, যা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। আসলে সমাধিজাত সজ্ঞা তাঁকে এই উপল্বদ্ধির যোগ্য করে তোলে।  ইনি জাগতিক  সবকিছুকে উপেক্ষা  করতে পারেন। জানিনা, ভগবান এঁদের কি দেন, যাতে এঁরা বিষ্ঠা আর অমৃতের মধ্যে কোনো ফারাক দেখেন না।  আমাদের দৃষ্টিতে যা ভালো বা মন্দ, তা যোগীপুরুষের বোধের মধ্যেই আসে না। যোগীপুরুষ অভেদজ্ঞানের সাগরে  ভাসেন। এনার মধ্যে থেকে ভেদবুদ্ধি লোপ পায়। আর তিনি যাকিছু করছেন, বলে আমরা দেখে থাকি, তা আসলে তিনি করছেন না, তিনি তখন নিমিত্ত হয়ে - কর্ম্মের সাক্ষী হয়ে যান। সাধারণ মানুষ আর চৈতন্যবান যোগীপুরুষের মধ্যে পার্থক্য কেবল বোধশক্তির মাত্রাতে। তাই আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কর্ম্ম ঋষি পতঞ্জলির ভাষায় তিন প্রকার, আর যোগীপুরুষের কর্ম্ম দুই প্রকার। যদিও তিনি সাধারণ মানুষ না বলে  ইতর (নিম্ন স্তরের) কথাটা ব্যবহার করেছেন । 
----------  

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - কৈবল্যপাদ (শ্লোক ০৪/০৮-৯)

"তত তদ্বিপাক অনুগুণানাম এব অভিব্যক্তিঃ বাসনানাম।" (০৪/০৮)

ততঃ অর্থাৎ সেই কারনে, তদ্বিপাক অর্থাৎ সেই তিন রকম কর্ম্মকারীদের  কর্ম্ম থেকে জাত  অগুনগুলো বাসনা রূপে অভিব্যক্ত হয়। 

আমরা শুনেছি, আমাদের তিন ধরনের কর্ম্ম পাপ-কর্ম্ম, পুন্যকর্ম্ম, ও পাপ-পুন্য উভয়অর্থাৎ মিশ্রকর্ম্ম। আর এই কর্ম্ম সংস্কার সঞ্চিত হয় কর্ম্মাশয়ে।  এই কর্ম্মাশয়  হচ্ছে একটা বিপাকযন্ত্র। যেখান থেকে কর্ম্মফল উৎপন্ন হচ্ছে, যা আসলে আমাদের বাসনা রূপে আবার প্রকাশিত হচ্ছে, এবং সেই বাসনা অনুযায়ী আমরা পুনরায় কর্ম্মে প্রবৃত্ত হচ্ছি।  দেখুন, অভিজ্ঞতা আমাদের সুখ বা দুঃখের অনুভূতি এনে দেয়। আর যে অভিজ্ঞতা আমাদের সুখের অনুভূতি এনে দিয়েছিলো, আমরা আবার সেই একই ধরনের কর্ম্মের জন্য নিজের মধ্যে বাসনার উদ্রেগ করে থাকি। আর এই বাসনার অভিব্যক্তিরূপ যে কর্ম্ম তা আমাদের অনুরূপ অভিজ্ঞতা লাভ করতে সাহায্য করে থাকে। একসময় এই যে অভিব্যক্তি তা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। অর্থাৎ রসোগোল্লার স্বাদ গ্রহণের যে অভিজ্ঞাতা যা আমাদের এককালে হয়েছিল, উপযুক্ত পরিস্থিতিতে, বা রসোগোল্লার  দোকান দেখলে, আমরা আবার সেই রসোগল্লার আস্বাদন গ্রহণ করবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠি। ঠিক এই ভাবে আমাদের বাসনার উদ্রেগ ঘটে, আবার বাসনা আমাদেরকে কর্ম্মে উদ্দীপ্ত করে। 

সাধনার ক্ষেত্রেও এই একই কথা প্রযোজ্য। সাধনার মধ্যে যিনি একবার আনন্দের অনুভূতি পেয়েছেন, জন্মান্তরেও সে সেই সাধনার দিকে আকৃষ্ট হয়। মানুষ যে ভালো বা পুন্যকর্ম্ম করে, তাও সেই একইভাবে স্বর্গসুখের উপলব্ধি, বা এক ধরনের আত্মতৃপ্তি  থেকে হয়ে থাকে।  স্মৃতির  মধ্যে অনুভূতিগুলো সূক্ষ্ম সংস্কার রূপে বিরাজ করছে।  এই সংস্কারের কারণেই, বাসনাগুলোর উদ্রেগ হচ্ছে। কিন্তু বিচার-বুদ্ধির প্রয়োগে, এই সংস্কারের উৎপাটন করাই সাধনার উদ্দেশ্য। তাহলে বাসনা আর বিরক্ত করতে পারে না। তখন  নতুন সংস্কারের, বা বাসনার বা কর্ম্মের কারন হতে পারে না। প্রথম দিকে একটা কু-অভ্যাসকে দূর করবার জন্য,  একটা শুভ অভ্যাসের জন্ম দিতে হয়, আর সবশেষে দুটো অভ্যাসকেই ছেড়ে দিয়ে নিষ্কাম হতে হয়। 
--------

"জাতি-দেশ-কাল-ব্যাবহিতানাম অপি আনন্তর্যং স্মৃতি-সংস্কারয়োঃ একরূপত্বাৎ ।" (০৪/৯)  

স্মৃতি ও সংস্কারের  একরূপ হবার কারণে, জাতি-দেশ ও কালের ব্যবধান থাকলেও বাসনাগুলো নিরন্তর গতিপ্রাপ্ত হয়। 

ঋষি পতঞ্জলি এবার  একটা অদ্ভুত কথা বলছেন। বলছেন, আমাদের যে স্মৃতি, ও সংস্কার এটি সবসময় একইরকম থাকে। কথায় বলে স্বভাব যায় না ম'লে। দেশ,  জাতি  বা কালের পরিবর্তন হয়ে গেলেও, আমার মধ্যে সহজে কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। আমরা শুনেছি, রাজা ভরত এক সময় রাজা ছিলেন, পরে ঋষি হয়েছিলেন,  আবার পরের জন্মে নাকি হরিণ হয়ে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। আমাদের সবার জীবনেও  নাকি এই পরিবর্তন হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের স্থূল স্মৃতিতে তা ধরা পরে না। অর্থাৎ আগের জন্মে আমি কি ছিলাম, তা আমি জানি না। আবার পরের জন্মে আমি কি হবো তা আমরা জানি না। শ্রীমৎ ভগবত গীতা পড়বার সময় আমরা শুনেছিলাম, মানুষ মৃত্যুকালীন অবস্থায় তার মধ্যে যেমন ভাবনা জেগে ওঠে, মৃত্যু পরবর্তীতে সে পুনঃরায় সেই ভাবনা চরিতার্থ করবার জন্য উপযুক্ত শরীরের নির্ম্মাণ করে থাকে। মানুষ যেমন ভাবনা করে, সেই মতো সে কর্ম্মে নিযুক্ত হয়। কর্ম্ম কর্ম্মাশয়ের মাধ্যে বিপাকের ফলে কর্ম্মফলের সৃষ্টি করে। এখন আমরা যেমন ভাবনা বা কর্ম্ম করি, সেই ভাবনা জনিত কর্ম্মফল অভিজ্ঞতা আকারে স্মৃতির মধ্যে সংরক্ষিত হয়। এই স্মৃতি ধীরে ধীরে সংস্কারের আকার নেয়। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এই যে স্মৃতি ও সংস্কার এর রূপ একই হয়ে থাকে। আর যাকিছু আমাদের স্মৃতির ভাণ্ডারে জমা হচ্ছে, তা-ই ধীরে ধীরে সংস্কার হয়ে ওঠে।  এমনকি জাতি, অর্থাৎ পরবর্তী জন্মে, ভিন্ন দেশে এমনকি সময়ের ব্যবধানেও এই সংস্কারের পরিবর্তন হয় না। অর্থাৎ কোনো মানুষ যদি পরবর্তী জীবনে পশু হয়ে জন্মায়, বা কোনো পশু যদি পরবর্তী জীবনে মানুষ হয়ে জন্মায় তবে তাদের মধ্যে পূর্বজীবনের সংস্কার থাকবে। অর্থাৎ হরিন হয়ে  জন্মালেও তার মধ্যে মানুষের প্রবৃত্তি কিছুটা থাকবে। আবার কোনো পশু যখন মানুষ হয়ে জন্মাবে তখন তার মধ্যেও পশুবৃত্তির প্রকোপ দেখা যাবে। 

আমাদের বাড়িতে একসময় অষ্টপ্রহর নাম-সংকীর্ত্তন হতো।  প্রতিবছর একটা নির্দিষ্ট সময়ে এই অনুষ্ঠান করা হতো, সেখানে দেখেছি, একটা কুকুর কীর্ত্তনীয়াদের কাছে গিয়ে শুয়ে শুয়ে কীর্ত্তন শুনতো। তাকে যতই তাড়ানো হতো, সে কিছুতেই যেত না। একি তার পূর্বজীবনের সংস্কার ? আপনারা সকলে লক্ষ করেছেন নিশ্চয়, কিছু মানুষের স্বভাবের মধ্যে পাশবিক বৃত্তির প্রকাশ দেখা যায়। এসব কি তাহলে পশু থেকে মানুষ হবার লক্ষণ বিশেষ ? অর্থাৎ আজ আপনি যেমন চিন্তা ভাবনার মধ্যে ডুবে আছেন, যেমন কর্ম্মের মধ্যে লিপ্ত আছেন, তার প্রভাব আপনার স্মৃতি হয়ে সংস্কারের মধ্যে ঢুকে  যাচ্ছে। আর তা ভবিষ্যতে আপনার নতুন জীবনকে প্রভাবিত করবে। অর্থাৎ দেহ একটা নতুন পাবেন সত্য  কিন্তু পুরোনো সংস্কার আপনাকে ছেড়ে যাবে না, আপনি আপনিই থাকবেন।   
এক দেশ ছেড়ে যদি  আপনি অন্যদেশেও জন্ম গ্রহণ করেন, বা  হাজার বছর  পরেও যদি আপনি কোনো দেহ প্রাপ্ত হন, তথাপি পুরোনো সংস্কার আপনার পিছু ছাড়বে না। অর্থাৎ জাতি-দেশ-কালের ব্যবধান আপনার সংস্কারকে মুছে ফেলতে পারবে না। তাই মহাত্মাগণ বলে থাকেন, শুদ্ধ মন, শুদ্ধ চিন্তন, এবং শুদ্ধ কর্ম্ম, মানুষকে মানব থেকে মহামানব পরিণত করে, এই অশুদ্ধ  মন, অশুদ্ধ  চিন্তন, ও অশুদ্ধ  কর্ম্ম মানুষকে পশু যোনিতে নিক্ষেপ করবে। 
-------------
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - কৈবল্যপাদ (শ্লোক ০৪/১০)

"তাসাম-অনাদিত্বম-আশিষো নিত্যত্বাৎ।" (০৪/১০)

(তাসমি অর্থাৎ বাসনাগুলোর। আশিষ কথাটার অর্থ, অসম্পূর্ন বাসনা। ) বাসনাগুলোর অনাদিত্ব হেতু, অভাবের ভাবনাও অনাদি। উল্টোভাবে বলা যায়, আশীষের (আমার অভাব-বোধের) নিত্যত্ব  হেতু বাসনাগুলোও নিত্য। 

আমরা সবাই ভাবছি, আমি যেন বেঁচে থাকি, আমার যেন মৃত্যু না হয়। এখন কথা হচ্ছে, আমার যেন মৃত্যু না হয়, এই ভাবনা আমাদের কি করে এলো ? তাহলে কি আমাদের কোনো সময় এই মৃত্যুর অভিজ্ঞতা হয়েছিল, বা  মৃত্যুর সম্মুখীন হয়ে মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছিল  ? যদি হয়েও থাকে, তবে তা তো আমাদের স্মৃতিতে  থাকবার কথা নয়।   আর যদি এই অভিজ্ঞতার কথা আমাদের স্মৃতিতে না থাকে, তবে কেন আমরা এই মৃত্যু থেকে দূরে থাকতে চাইছি ? মরন ভয় আমাদের কিভাবে হচ্ছে ? আসলে কি জানেন, আমরা আজ যা হয়েছি, তার যে বিবর্তন প্রক্রিয়া, সে সম্পর্কে আমাদের কোনো জ্ঞান নেই। কিভাবে যে শিশু থেকে আমি বৃদ্ধে পরিণত  হয়েছি, সে সম্পর্কে আমাদের তাত্ত্বিক জ্ঞান থাকলেও, সেই রাস্তাটা কিভাবে পেড়িয়ে এলাম, এর কারন আমাদেরকে ভাবায় না। আমরা ধরেই নিয়েছি, এটা আমাদের ভবিতব্য। এমনটা হয়ে থাকে, এমনটা প্রকৃতির নিয়ম। আবার অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, একটা শিশু কখনও  ভাৱতেই পারে না, যে সে একদিন দাদার মতো বুড়ো হয়ে যাবে। এমনকি মৃত দাদাঠাকুর মতো তাকেও এই জীবন ছেড়ে অনন্তের পথে যাত্রা করতে হবে। আমাদের একটা সুপ্ত বাসনা সবসময় থাকে, যা আমাকে বাঁচিয়ে রাখে, তাকে অবশ্যই ধরে রাখবো। অর্থাৎ চিরকাল বেঁচে থাকবার ক্ষমতা আমার নেই, তাই আমি বেঁচে থাকতে চাই। আর যদি এমনটা হতো, যে আমার  কখনো মৃত্যু নেই, তবে আমাকে আর মৃত্যুভয় তাড়া  করে নিয়ে বেড়াতে পারতো না। আমাদের স্মৃতির মনিকোঠায়, এই মৃত্যুর অনুভূতি সঞ্চিত হয়ে আছে। তাই আমাদের মৃত্যুভয় তাড়া করে নিয়ে বেড়ায়। 

আমাদের চিত্তের মধ্যে অনাদি-অনন্ত  বাসনার জন্ম হচ্ছে। এই অনন্ত বাসনার মধ্যে কোনো এক বা একাধিক বাসনা অবলম্বনে চিত্ত, পুরুষের ভোগের জন্য সামনে এনে উপস্থিত করে।  এখন কথা হচ্ছে এই ভোগসামগ্রী, তার দুটো কারন, একটা হচ্ছে উপাদান কারন, আর একটা হচ্ছে নিমিত্ত কারন। বস্তুর নির্মাণে যেমন উপাদান আবশ্যিক, তেমনি একজন নিমিত্ত কারন আছেন। একটা ঘট তৈরী করতে যেমন , মাটি-জল ইত্যাদি দরকার, তেমনি দরকার একজন পাল-মহাশয়ের। এই পাল মহাশয় হচ্ছেন নিমিত্ত কারন, আর মাটি-জল ইত্যাদি হচ্ছে উপাদান কারন। এই যে ঘট তা তৈরির আগে, বা ঘটের নাশের পরেও এই পালমহাশয় থাকেন। এখন এই পাল মহাশয় ইনি  কিন্তু উপাদান কারন নয়। আবার দেখুন, এই ঘট্ তৈরির সঙ্গে সঙ্গে সেখানে বায়ু ও আকাশের প্রবেশ ঘটলো। ঘটটি ভেঙে গেলে, মাটি বা জল যেমন মাটিতে বা জলে মিশে গেলো, তেমনি আকাশ, বায়ু, যেখান থেকে এসেছিলো,  সেখানেই চলে গেলো। কিন্তু আকাশ বা বায়ুর না আছে আসা, না আছে যাওয়া, যেখানে ছিল, সেখানেই রয়ে গেলো, এই অনন্তের না আছে প্রবেশ না আছে নির্গমন।  তথাপি আমাদের মনে হয়, একসময় ছিলো, আজ আর নেই। 

তো উপাদান ভিন্ন বস্তু সত্তা সম্ভব নয়, আবার নিমিত্ব কারনেরও  আবশ্যিকতা  আছে। কিন্তু এই যে বস্তুসত্তা এ নিজে তার কারনের ধার ধারে  না। আমাদের যে চিত্ত বৃত্তি এরও একটা কারন আছে। কারন বিনা কখনো কোনো কার্য সংগঠিত হতে পারে না। সমগ্র জগৎ এই অমোঘ নিয়মের শৃঙ্খলে বাধা। এর থেকে বেরুবার কোনো উপায় নেই। আমাদের যে মৃত্যুভয় তারও  একটা কারন আছে, আর তা হচ্ছে, আমাদের মরণরূপ দুঃখের একটা অনুভূতি আমাদের স্মৃতিতে সংরক্ষিত হয়ে আছে। আর সেখান থেকেই আমাদের মধ্যে মৃত্যুভয় জেগে উঠছে। বেঁচে থাকবার বাসনা, তাকে চঞ্চল করে তুলেছে। সমস্ত প্রাণীর মধ্যেই এই বেঁচে থাকবার বাসনা সুপ্ত হয়ে আছে। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এই বেঁচে থাকবার বাসনা এটি নিত্য। আর নিত্যত্ব হেতু এটি অনাদি।  তো বেঁচে থাকবার তাগিদ যেমন অনাদি ও নিত্য তেমনি আমাদের বাসনাও অনাদি ও নিত্য। এখন বাসনা যখন অনন্ত, তখন তার নাশের  উপায় কি ? এর পরের শ্লোকে আমরা সে কথা শুনবো। 
------ 
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - কৈবল্যপাদ (শ্লোক ০৪/১১)

"হেতু-ফল-আশ্রয়-আলম্বনৈঃ সংগৃহীতত্বাৎ-এষাম-অভাবে তদ্-অভাবঃ। " (০৪/১১)

হেতু, ফল, আশ্রয়, আলম্বন - এর দ্বারাই  বাসনা সংগ্রহীত হচ্ছে। এদের অভাব হলেই বাসনার অভাব হবে। 

ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, বাসনা অনন্ত, অনাদি। এখন এই বাসনা উদ্রেগের  কারণগুলোকে   উচ্ছেদ করতে পারলেই, বাসনার নাশ হতে পারে। যার কারনে, যার আশ্রয়ে, যাকে  অবলম্বন করে, এই  বাসনাসকলের উদ্রেগ হচ্ছে, তার অভাব হলেই, বাসনার বিলুপ্তি হতে পারে। এই কারণগুলো হচ্ছে, হেতু, ফল, আশ্রয়, আলম্বন। হেতু হচ্ছে অবিদ্যাজনিত ক্লেশকর্ম্ম, যার ফল দ্বারা সংস্কারের জন্ম হচ্ছে।  এখন এই সংস্কার আমাদের স্মৃতিকে আশ্রয় করছে।  এই যে স্মৃতিতে সংরক্ষিত হচ্ছে তা থাকছে, কিছু অনুভূতির মাধ্যমে। অর্থাৎ শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ ইত্যাদিকে অবলম্বন করে স্মৃতিতে আশ্রয় করছে, যাকে  আমরা বলছি সংস্কার। এই সংস্কার থেকেই বাসনার জন্ম হচ্ছে। তো  এই বাসনার জন্মের যে হেতুগুলো তার নাশ করতে হবে।  

ঋষি পতঞ্জলির মতে , হেতু, ফল, আশ্রয়, ও আলম্বন এই হচ্ছে বাসনার ঋতুচক্র। হেতু যেমন ধর্ম্মকর্ম্ম থেকে সুখ, আবার অধর্ম্ম কর্ম্ম থেকে জন্ম নিচ্ছে দুঃখ।  আবার সুখের হেতু হচ্ছে রাগ বা আসক্তি, আর দুঃখের হেতু হচ্ছে বিদ্বেষ। এই যে আসক্তি বা বিদ্বেষ এর থেকে মন বাক্য ও শরীরের মধ্যে একটা স্পন্দন তৈরী হচ্ছে।  এই স্পন্দন প্রতিক্রিয়াশীল জীবকে পীড়িত করছে। এই স্পন্দন থেকেই সুখ-দুঃখের অনুভূতি হচ্ছে। এই যে কর্ম্ম তা সে ধর্ম্মকর্ম্ম হোক, বা অধর্ম্মকর্ম্ম হোক, এসব আসলে অবিদ্যা বা ভ্রমাত্মক জ্ঞানের  কারনে হয়ে থাকে। ফল হচ্ছে যাকে  আশ্রয় করলে পর এই ধর্ম্ম-অধর্ম্ম কর্ম্মের উৎপন্ন হচ্ছে। আশ্রয় হচ্ছে মন। আর আলম্বন হচ্ছে যে বস্তুকে আশ্রয় করে এই বাসনা সংগ্রহীত হচ্ছে।   

দেখুন বাসনার নাশ করতে গেলে, আমাদের বাসনার জীবনচক্রটা একবার বুঝে নিতে হবে। বাসনার বীজ সংস্কার রূপে স্মৃতিতে ধরা আছে। এটি আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতার অনুভূতি বিশেষ যা এককালে জন্ম হয়েছিলো  কর্ম্মের কারনে। অর্থাৎ কর্ম্ম থেকে কর্ম্মফল, যা আমাকে বিশেষ অনুভূতির অভিজ্ঞতা প্রদান করেছিল। এখন এই অনুভূতি আমাদের স্মৃতিতে ধরা আছে। এই অনুভূতি যদি সুখকর হয়, তবে সেই অনুভূতির আস্বাদন করবার জন্য আমাদের পুনরায় বাসনার উদ্রেগ হয়। এখন কথা হচ্ছে আমাদের স্মৃতিতে কোথায়, কিভাবে লুকিয়ে আছে এই অনুভব থেকে জাত সংস্কার।  তা আমাকে খুঁজে বার করতে হবে। তো এর জন্য আমাদের কি করতে হবে ? আমাদের মনের গভীরে প্রবেশ করতে হবে।  সেখানে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে হবে। মন হচ্ছে এমন একটা হেফাজতখানা, যেখানে আমাদের জন্ম জন্মান্তর ধরে সমস্ত অনুভূতিগুলো ধরা আছে। আগের জীবনে আমি কি ছিলাম, তা এই অনুভূতিগুলোর সন্ধান করলেই, বেরিয়ে আসে। ধরুন আগের জীবনে আমি একটা পশু  ছিলাম। এখন এই পশুস্তর  অতিক্রম করে আজ আমি মনুষ্য  দেহ ধারণ করেছি। এখন আমার স্মৃতির ভাণ্ডারে মধ্যে কিন্তু সেই পশুজীবনের সমস্ত অনুভূতির রেকর্ড করা আছে। শত শত জন্মের পরেও, আমাদের মধ্যে যে পশুসুলভ যে অনুভূতি তা মুছে যাবার নয়।  হয়তো সেই অদ্ভুত জন্তুটা আমার মনের কোনে ঘুমিয়ে আছে। যদি এমন কোনো পরিস্থিতির জন্ম হয়, অর্থাৎ যখন আমার সাথে একজন পশুর সাক্ষাৎ হলো, তখন আমার মধ্যে সেই পাশবিক রূঢ়ভাব জেগে উঠবে। যার জন্য  দেখবেন, আমাদের মতো সাধারণ মানুষ যখন অন্য কারুর কাছ থেকে পশুসুলভ আচরণ পাই, তখন আমরা তার প্রতি-উত্তরে, একই ধরনের পশুসুলভ আচরণ  করে ফেলি। আসলে এই পাশবিক প্রবৃত্তি, হঠাৎ করে আসেনি, এই প্রবৃত্তি আমার মধ্যে আগে থেকেই ছিলো , আজ সময়-সুযোগ বুঝে ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। এখন কথা হচ্ছে, এর থেকে রেহাই পাবো কি করে ? 

যারা একটু আধটু ধ্যান-ধারণা  করেন, তারা  যখন মনের গভীরে প্রবেশ করেন, তখন তাদের এই অদ্ভুত দর্শন হয়ে থাকে। আর নিজেকে পরিশীলিত করবার জন্য, নিরন্তর তিনি শুভ সংস্কারের জন্ম দিতে থাকেন। যত বেশি শুভ সংস্কারের জন্ম হবে, তত সেই পূর্ব পূর্ব জীবনের অশুভ সংস্কার চাপা পড়ে  যাবে, আর এরা  সহজে মাথাচাড়া দিতে পারবে না।  মনের গভীরে প্রবেশ করে  একদিকে যেমন সাধক  তার চিন্তাগুলোকে ধরতে চেষ্টা করেন, অর্থাৎ নিজের বৃত্তিগুলোকে ধরবার চেষ্টা করেন, তেমনি বিচারবুদ্ধির সাহায্যে সেগুলোকে সংশোধন করতে চেষ্টা করেন। এরই নাম সাধনা , সাধনা কেবল চুপচাপ ধ্যানস্থ হয়ে বসে থাকা নয়। ধ্যানের  গভীরে প্রবেশ করে মনের মধ্যে যে বৃত্তি আছে, তাকে পরিশীলিত করা হয় বিচার দ্বারা। এই বিচার শক্তি প্রথমে শাস্ত্র বা গুরুবচন থেকে হয়ে থাকে।  তারপরে নিজের মধ্যে যখন প্রজ্ঞা আসে, তখন ভিতর থেকেই বোধশক্তি বা বিবেকজ্ঞানের উৎপন্ন হয়।  যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, জ্ঞানীভক্ত আমার সবচেয়ে প্রিয়। কারন জ্ঞানই সংস্কারের শোধন করতে সক্ষম। জ্ঞানই সংস্কারের শোধনতৈল বিশেষ।  
-------------- 
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - কৈবল্যপাদ (শ্লোক ০৪/১২-১৩)

"অতীত-অনাগতং স্বরূপতঃ-অস্তি-অধ্বভেদাৎ-ধর্মাণাম।"  (০৪/১২) 

অতীত ও অনাগত স্বরুপতঃ ধর্ম্মের কালভেদ মাত্র। 

কালের সঙ্গে সন্মন্ধ হেতু বস্তুধর্ম্মের যে অস্তিত্ত্ব তাকেই বলা হয় অতীত ও ভবিষ্যৎ। বস্তুর অনাগত অবস্থাই  হচ্ছে ভবিষ্যৎ। যা আজ প্রকাশিত হয়নি, কিন্তু একসময় প্রকাশিত হবে। এই ক্ষনে যা অভিব্যক্ত হয়েছে, তাকে বলা হয় বর্ত্তমান। যা একসময় অভিব্যক্ত হয়েছিল, তা হচ্ছে অতীত।  আবার যা ভবিষ্যতে প্রকাশিত হবে, তাকে বলা হয় অনাগত। বর্তমান হচ্ছে অতীতের ভবিষ্যৎ - যা  এখন প্রতিভাত হয়েছে, বা ভবিষ্যতের পূর্বাভাষ।  

 যা একসময় সাধকের  অনুভুটিতে এসেছিলো, তা অতীত, যা এখন অনুভব হচ্ছে তা বর্ত্তমান, যা ভবিষ্যতে অনুভব হবে, তা অনাগত। এই অনুভবই জ্ঞান। আর এই ত্রিকাল সন্মন্ধি বস্তুই জ্ঞানের বিষয় অর্থাৎ জ্ঞেয়। এখন কথা হচ্ছে, এই ত্রিকাল যদি না থাকতো, তবে জ্ঞানের বিষয়বস্তু কিছু থাকতো না। আর বিষয়হীন জ্ঞান বলে কিছু হয় না। তো যার বিষয়সত্তা নেই, তা ফল উৎপাদনে অক্ষম। তাই  বিষয়সত্তাহীন কোনো জ্ঞানের উৎপাদনও  হতে পারে না।  

এখন ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, অতীত ও অনাগত স্বরূপতঃ ধর্ম্মের কালভেদ মাত্র। তো ধর্ম্ম কার ? ধর্ম্ম হচ্ছে ধর্ম্মীর। প্রকাশ স্বরূপে যে ধর্ম্ম রয়েছে, তাকে বলা হয় দ্রব্য। এই যে প্রকাশ (দ্রব্য) তা কালভেদে পরিবর্তিত হচ্ছে, পরিণতির দিকে এগুচ্ছে, কিন্তু ধর্ম্মের কোনো পরিবর্তন হয় না। স্বরূপে যা ছিল, তাই ধর্ম্ম।  তো বর্তমান অতীত ও অনাগতের পরিচয় প্রদান করছে। এখন এই দ্রব্যের মধ্যে আছে ক্রিয়াশক্তি, যার প্রভাবে সে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত অবস্থায় অভিব্যক্ত হচ্ছে। এই শক্তি ত্রিগুণাত্মক।  আর এই গুনের সন্মন্ধ হেতু দ্রব্যাদি কালের প্রবাহে ভেসে চলেছে। আর এই ভাসমান দ্রব্য আমাদের চিত্তসত্ত্বার উপরে প্রভাব ফেলছে। মহাত্মাগণ বলে থাকেন, এই কালের জ্ঞান না থাকলে, দ্রব্য-প্রবাহ থেকে চিত্তকে  মুক্ত করা যাবে না। তো এই যে প্রপঞ্চময় জগৎ-প্রবাহ চলছে, তার থেকে চিত্তকে  মুক্ত রাখতে গেলে, সাধনার দরকার। অব্যক্তে স্থিত থেকে ব্যক্তকে বুঝতে হবে।  এই অব্যক্তে স্থিত বলতে বাসনা থেকে মুক্ত অবস্থা বোঝায়। বাসনার অভাব হলেই জগতের অনস্তিত্ত্ব জ্ঞান জন্মে। আর বাসনার উদ্ভব হলেই, প্রপঞ্চময় এই জগতের জ্ঞান (যা ভ্রমজ্ঞান ছাড়া কিছু নয়) হয়ে থাকে। তো অতীত মানে হারিয়ে যাওয়া নয়, আবার ভবিষ্যৎ মানে এখনো আসেনি তা নয়।  স্বরূপে সৎবস্তু সবসময় আছে। আবার অসৎ বস্তু বলে কিছু হয় না। কেবল কালের প্রবাহে, একবার ভেসে উঠছে, আবার ডুবে যাচ্ছে। বর্তমানে সব কিছু ব্যক্ত, অতীত ও ভবিষ্যতে তা সূক্ষ্ম। এই সূক্ষ্ম ও ব্যাক্তের  কথা আমরা পরবর্তী শ্লোকে শুনবো।

"তে ব্যক্তসুক্ষ্মা গুণাত্মনঃ" (০৪/১৩)

তে অর্থাৎ তিন কালের মধ্যেই যে ধর্ম্ম রয়েছে, তা ব্যক্ত, সূক্ষ্ম ও ত্রিগুণাত্বক। 

তো ধর্ম্ম তিন কালের মধ্যেই রয়েছে।  বর্তমান অবস্থায় ব্যক্ত স্বরূপে রয়েছে, আর অতীত ও ভবিষ্যতে গর্ভে আছে সূক্ষ্ম অবস্থায়। সূত্রকার ঋষি পতঞ্জলি আরো বলছেন, এটি ত্রিগুণাত্মক। যোগাচার্য্যগণ  বলে থাকেন, ত্রিগুণের সাম্যাবস্থায় ধর্ম্মী অব্যক্ত, নিষ্ক্রিয়। আর ত্রিগুণের অসাম্যে ক্রিয়াশীল, ব্যক্ত। তো সবকিছুই হচ্ছে সেই ত্রিগুণের বিন্যাস মাত্র। ভিন্ন ভিন্ন সন্নিবেশে বিশেষ বিশেষ রূপে প্রকাশিত হচ্ছে। যোগসাধকের কাছে ধীরে ধীরে এই সত্য উন্মোচিত হতে থাকে। 
----------

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - কৈবল্যপাদ (শ্লোক ০৪/১৪)

"পরিনাম-ঐকত্বাৎ বস্তুতত্ত্বম।"  (০৪/১৪)

পরিণামের একত্বের কারনে তত্ত্বগতভাবে বস্তুর একত্ব সিদ্ধি হয়। 

আমরা শুনেছি, সববস্তু ই `ত্রিগুণের পরিনাম। ত্রিগুণ আবার মিশ্রনের তারতম্য হেতু,  অসংখ্য গুনের সৃষ্টি করে। বস্তুর যে বিন্যাস, বস্তুর মধ্যে যে রকমারি সজ্জ্বা তা এই গুনের তারতম্যের কারনে ঘটে থাকে। কিন্তু গুনের তারতম্য সত্ত্বেও পরিনাম কিন্তু এক। আর এই পরিনাম যেহেতু এক, তাই আমরা একে একই রূপে পেয়ে থাকি। একটা হচ্ছে গ্রাহ্যরূপে, আর একটা হচ্ছে গ্রহণ রূপে। তিনটি গুনই দৃশ্য বা শব্দরূপে গ্রাহ্য, আর কর্ন বা চক্ষু রূপে শ্রোত্র, বা দ্রষ্টব্য  - যা আমাদের স্থূল ইন্দ্রিয় রূপে ফুটে উঠেছে। দৃষ্টিগোচর, শ্রুতিগোচর  যে বিশ্ব তা এই ত্রিগুণময়ী প্রকৃতির পরিনাম বিশেষ - যা একত্বে ফুটে উঠেছে। এই কারনে ঋষি পতঞ্জলি বলছেন সবকিছুর পরিনাম এক। 

দেখুন, শরীর  তো আমাদের সবার  সেই রক্ত মাংস, হাড়ের তৈরী, কিন্তু এক-একজনের শরীরের গঠন এক-এক রকম। মন আমাদের সবার এক - কিন্তু এই মনে আমাদের অনুভূতির স্তর ভিন্ন ভিন্ন। তেমনি চিত্ত আমাদের সবার এক কিন্তু এই চিত্তে নানানজনের নানান রকম চিন্তার উদ্রেগ হচ্ছে।  বুদ্ধি আমাদের সবার আছে, কিন্তু এই বুদ্ধির তারতম্য আছে। তো শরীর , মন, চিত্ত, বুদ্ধি সবার থাকলেও, এর মধ্যে গুনের তারতম্য আছে। কিন্তু আমরা সবাই সেই মন, বুদ্ধি, চিত্ত, ও শরীরের অধিকারী। 

আবার আমাদের সবার মধ্যেই আছে, সত্ত্ব, রজঃ , তম গুনের সমাহার। জড় বস্তু বলুন, বা চেতন বস্তু বলুন সবার মধ্যে এই একই ত্রি-গুনের সমাহার। আবার এই তিন গুনের মিলিত তত্ত্বের একটা পরিনাম  থাকবে।  গুনের মিশ্রতাভেদে এই পরিণামের মধ্যেও একটা পার্থক্য থাকবে। কিন্তু একথা সত্য যে এই পরিনমিত বস্তুর মধ্যে একত্ব হচ্ছে ত্রিগুনাত্বিক শক্তি । 

 তো বস্তুর মধ্যে ভিন্নতা আছে।  পার্থিব বস্তুর মধ্যে যেমন কেউ পশু কেউ পাখি, কেউ গরু  কেউ মহিষ, কেউ পাথর কেউ মাটি, কেউ জল কেউ বরফ।  তেমনি কেউ সুর কেউ অসুর, কেউ মানুষ কেউ কিন্নর। কিন্তু এদের  সবার মধ্যেই সেই একই চিত্ত থাকায় একত্ত্ব দেখা যাচ্ছে। আসলে বহু চিত্তের ভিন্নতার মধ্যে কোনো অসঙ্গতি বা অযৌক্তিকতা নেই।  এই যে বস্তুর স্থিতি  বাহ্যসত্তার মধ্যে যেমন ভিন্নতা - তেমনি অন্তরসত্তার মধ্যেও আছে ভিন্নতা। আর এই অন্তরসত্তার কল্পনায় ভিন্নতা হেতু বাহ্য বস্তুর ভিন্নতা দেখা যায়। আসলে আমরা সবাই এক।  কথায় বলে "মরলে সবাই মাটি"।  অর্থাৎ সেখানে আমাদের কোনো ভিন্নতা নেই। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, "পরিণামের একত্বের কারনে তত্ত্বগতভাবে বস্তুর একত্ব সিদ্ধি হয়"। একথায় সিদ্ধ হয় যে পরিণামে আমরা সবাই এক। 
------------

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - কৈবল্যপাদ (শ্লোক ০৪/১৫)

"বস্তুসাম্যে চিত্তভেদাৎ তয়োঃ-বিভক্তঃ পন্থাঃ ।" (০৪/১৫)

বস্তুর সাম্যে বা একত্বে সেই বিষয় গ্রহণে চিত্তের ভিন্নতায় তাদের দুটির পথও (স্বভাব) ভিন্ন। 

অদ্বৈতবাদীগণ বলছেন, এক ভিন্ন কিছু নেই। এই যে জগৎ তা প্রপঞ্চময় - এসব মনের কল্পনা বিশেষ।  এই মনের কল্পনাকেই  বস্তু বলে মনে হচ্ছে।  এই মতের যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে যে আমরা যখন স্বপ্ন দেখি, তখন একটা স্বপ্ন-জগতের মধ্যে আমরা বিচরণ করি। এই স্বপ্ন-জগতের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তেমনি, আমরা জাগ্রত অবস্থায় যে জগতের সন্মুখীন হই তাও  মনের কল্পনা ছাড়া কিছু নয়।  অবিদ্যা বা অজ্ঞানের কারনে এই দৃশ্যপট আমাদের সম্মুখে উন্মোচিত হচ্ছে। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সত্যিই যদি এই দৃশ্যমান জগৎ বলে কিছু না থাকে, তবে আমাদের এই যে স্থূল বা সূক্ষ্ম দেহ বিশেষ তাও কি কেবল কল্পনা মাত্র ? আর এই দেহ বলে যদি কিছু না থাকে, তবে আমাদের কর্ম্ম বা কর্ম্মফল বলে কিছু থাকতে পারে না। এই সাধন-ভজন যা দেহেকে ঘিরে উজ্জাপিত হচ্ছে, তাও  মনের কল্পনা বিশেষ বলে মেনে নিতে হয়। আগুনে হাত দিলে, আপনার হাত পুড়বে, বরফে হাত দিলে ঠান্ডা  লাগবে, এসব-কি আমাদের নিছক কল্পনা বিশেষ ? দেখুন আপনি অদ্বিতবাদী হোন, আর দ্বৈতবাদী হোন, আপনাকে বাস্তবের সম্মুখীন  হতেই হবে। সবই কেবল ব্রহ্ম  ভেবে, যদি সাপের খুলে চুমু খেতে যান, বা বাঘের সঙ্গে কোলাকুলি করতে যান, তবে তার পরিণতি আপনাকে ভোগ করতে হবে। এর থেকে কারুর নিস্তার নেই। 

এখানে সাংখ্যবাদীগণ বাস্তবকে স্বীকার করে, জগতের অস্তিত্ত্বকে স্বীকার করে, সত্যের অনুসন্ধান করেছেন। জগৎ বলে কিছু নেই, তা সাংখ্যবাদীগণ স্বীকার করেন না। কারন বাস্তবকে অস্বীকার করে কল্পনায় জগতের অনস্তিত্ত্ব স্বীকার করা মানেই কল্পনার জগতে বিচরণ করা। আর ঋষি পতঞ্জলি, এই সত্যকেই সাধ্যের মধ্যে আনতে  চাইছেন, সাধনার সাহায্যে । পতঞ্জলির যোগদর্শনের এখানেই বৈশিষ্ঠ। বাহ্য  জগতের অস্তিত্ত্বকে উপলব্ধি করে, তার অস্তিত্ত্বকে সম্পূর্ণ বজায়  রেখে, তার স্বরূপের খোঁজে বেড়িয়েছেন।  প্রকৃতির মধ্যে তন্ন তন্ন করে খোঁজ শুরু করেছেন।  এবং বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, এই যে বিচিত্র জগৎ তা কেবল অপরিণামী পুরুষের স্বরূপ।  আর এই অপরিণামী পুরুষের জন্য পরিণামী প্রকৃতির বিশাল আয়োজন। আর এই যে দুটি তত্ত্ব বা সত্য অর্থাৎ প্রকৃতি ও পুরুষ এই দুয়ের পরিচয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরবার জন্য প্রকৃতির যে পরিনামতত্ত্ব তার বিস্তৃত বিবরণ দিচ্ছেন। 

দেখুন আমাদের যে অনুভব তা দুইভাবে দেখা দেয়।  সুখ-দুঃখ, আনন্দ-নিরানন্দ, ভালো-মন্দ ইত্যাদি। এই দুটো অনুভূতিই আমাদের সবার হয়ে থাকে। যার সুখের অনুভূতি আছে, তার মধ্যে অবশ্যই দুঃখের অনুভূতিও আছে। আর যার মধ্যে সুখের অনুভূতি নেই, এমন কেউ যদি থাকেন, তবে জানবেন, তার মধ্যে দুঃখের অনুভূতিও নেই। ঠিক তেমনি জ্ঞান সংগ্রহের দিকে যদি আমরা তাকাই তবে আমরা দেখতে পারবো, দুটি সত্ত্বা, একটা হচ্ছে জ্ঞাতা , আর একটা হচ্ছে জ্ঞেয়। জ্ঞাতা  না থাকলে জ্ঞেয়র কোনো অস্তিত্ত্ব থাকে না।  আমরা যে স্বপ্নের  উদাহরনের কথা শুনেছিলাম, স্বপ্নের জগতে দৃশ্যমান বস্তু সেই দেখতে পারে, যার চোখ ভালো আছে।  যিনি অন্ধ, যার চোখের সামনে কোনো জগৎ কোনোদিন দৃশ্যমান হয়নি, তার স্বপ্নের মধ্যে কিন্তু কোনো দৃশ্যমান জগতের অনুরূপ কোনো জগৎ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে না। এই সত্য আপনি জানতে পারবেন, যদি অন্ধ মানুষের স্বপ্নের কথা জিজ্ঞেস করেন। 

এখন কথা হচ্ছে জ্ঞাতা থাকলে জ্ঞেয়  থাকবে, তা না হলে, জ্ঞেয়  বস্তুর কোনো অস্তিত্ত্বের প্রমান মেলে না। কিন্তু একটু সূক্ষ্ম ভাবে দেখলে, আমরা অনুভব করতে পারবো, আমি থাকি বা না থাকি, এই জগৎ কিন্তু থাকবে।  তেমনি জ্ঞাতা  না থাকলেও জ্ঞেয়  থাকবে - এমনকি জ্ঞানও  থাকবে, যা জ্ঞেয়  বস্তুর মধ্যেই  নিহিত আছে। তাই ঋষি পতঞ্জলির দর্শনে বলা হচ্ছে জ্ঞেয়  বস্তু অবশ্যই  আছে, যা আমাদের মনের সীমানা ছাড়িয়ে অবস্থান করছে। আমাদের যে উপলব্ধি মাত্রা তার মধ্যে ভেদ আছে।  আর এই ভেদের কারন হচ্ছে আমাদের মনের বা বুদ্ধির তারতম্য। আমাদের অনুভূতির স্তরে ভিন্নতা। আর এই কারণেই ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, "বস্তুসাম্যে চিত্তভেদাৎ তয়োঃ-বিভক্তঃ পন্থাঃ ।" বস্তুর সাম্যে বা একত্বে সেই বিষয় গ্রহণে চিত্তের ভিন্নতায় তাদের দুটির পথও (স্বভাব) ভিন্ন হয়ে থাকে ।

আপনার মধ্যে যদি গুরুর প্রতি অধিক প্রীতি ও শ্রদ্ধা থাকে, তবে গুরুদেবের চরণামৃত আপনার কাছে সুখকর বলে মনে হবে।  কিন্তু যদি আপনার অশ্রদ্ধা থাকে থাকে সেই একই বস্তু আপনার কাছে ঘৃণার বস্তু হিসেবে চিহ্নিত হবে। আপনার হাতে প্রদীপ না থাকলে, রাস্তায় পড়ে  থাকা দড়িকে সাপ  বলে মনে হতেই পারে।  আবার যার হাতে প্রদীপ আছে, তার কাছে দড়ি - দড়ি বলেই মনে হবে, সাপ  নয়।  ভূত সম্পর্কে কোনো সংস্কার আগে থেকে যদি আপনার মনের মধ্যে বাসা বেঁধে থাকে, তবে আপনি শেওড়া গাছের তলা দিয়ে যেতে গিয়ে ভীত হবেন ।  কিন্তু যার মধ্যে এই সংস্কার নেই, তার মনে শেওড়া গাছ, কোনো ভীতির কারন নাও হতে পারে। সুখ দুঃখের যে অনুভূতি আমাদের মধ্যে হয়, তা আমাদের অজ্ঞানের কারনে হয়ে থাকে।  মৃত্যু সম্পর্কে আমাদের কোনো জ্ঞান না থাকার কারনে আমাদের মরনভীতি হয়ে থাকে। আপনার ছেলেকে বিদেশে পাঠাবার সময়, আপনার মধ্যে কষ্ট  হতে পারে, যদি ছেলে যেখানে যাচ্ছে, সে স্থান সম্পর্কে আপনার কোনো জ্ঞান না থাকে।  কিন্তু আপনি যদি জানেন, সেখানে আপনার অনেক আত্মীয়স্বজন আছে, যারা আপনার ছেলের দেখভাল করবে, তাহলে আপনার মধ্যে শঙ্কা বা দুশ্চিন্তা হবে না। যাঁর  মধ্যে সম্যগ দর্শন হয়েছে অর্থাৎ যার জ্ঞানচক্ষু উন্মিলিত হয়েছে, তিনি সব বিষয়ে এক মধ্যম অবস্থায় অবস্থান করেন। যাওয়া বা আসাতে তাঁর  কিছুই অনুভব হয় না, না আনন্দ না নিরানন্দ। তিনি নিরপেক্ষ উদাস দৃষ্টিতে সবকিছুকে দেখে থাকেন। না উচ্ছাস, না বিমূঢ়, না ম্রিয়মান - এর কোনোটাতেই থাকেন না। তিনি কেবল দ্রোষ্টাস্বরূপে অবস্থান করেন। 

আসলে যোগদর্শন  এটা স্পষ্ট করতে চাইছে, যে সাধারণ অবস্থায় আমাদের অনুভবের মধ্যে তারতম্য আছে।  কিন্তু যোগে প্রতিষ্ঠিত পুরুষের মধ্যে যে অনুভব হয়, তা মনের সৃষ্টি কোনো কাল্পনিক বস্তুকে দর্শন করে না।  বরং বলা যায়, যা যেমন, তাকে তিনি সেই ভাবেই দেখে থাকেন। যোগের  অনুশীলনীর ফলে আমাদের চিত্ত হয়ে ওঠে স্বচ্ছ। আর এই স্বচ্ছ চিত্তে যথার্থ স্বরূপের উপলব্ধি হয়। তখন এই পরিনাম তত্ত্বকে বিচার করে, বস্তুর স্বরূপের দর্শন হয়।  এই হচ্ছে যোগদর্শনের সারকথা। 
------ 

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - কৈবল্যপাদ (শ্লোক ০৪/১৬)

"ন চ এক চিত্ততন্ত্ৰং বস্তু তদ্প্রমাণকং (তৎ-অপ্রমাণকং) তদা কিং স্যাৎ।"  (০৪/১৬)

 বস্তু একটি মাত্র চিত্তের অধীন নয়। তাহলে বৃত্তি রহিত  অবস্থায় তার কি হবে ? 

কথা হচ্ছে বস্তুকে আমরা আমাদের জ্ঞানের সান্নিধ্যে এনে উপলব্ধি করে থাকি। এখন বস্তু যখন জ্ঞানের অগোচর থাকে তখন তার গতি কি হয় ? ঋষি পতঞ্জলি এখানে নিজেই প্রশ্ন করছেন। বস্তু যদি একটি মাত্র চিত্তের অধীন  না হয়, তবে  চিত্ত যখন বৃত্তিশূন্য তখন সেই চিত্ত দ্বারা বস্তুর স্বরূপ  কিভাবে নির্নয় করা সম্ভব হবে ? 

একথা বলা যায় যে চিত্ত যখন বৃত্তিহীন, তখন সেই চিত্ত আর বিষয়ীভূত হতে পারছে না। আর বিষয়ীভূত না হতে পারলে,  চিত্ত একপ্রকার বস্তুর অগোচর সম্পন্ন হয়ে যাবে, বা চিত্তের অগোচরে থেকে যাবে বস্তু । তো চিত্ত বৃত্তিশূন্য অবস্থায় বস্তুর অস্তিত্ত্ব ছিল না, কিন্তু চিত্তের আবার যদি বৃত্তির সংযোগ ঘটে তবে তখন আবার বস্তুর উৎপন্ন হবে কোত্থেকে ? যা আমাদের কাছে অজ্ঞাত, তা আমাদের কাছে অস্তিত্ত্বহীন, অবাস্তব। তো যা অবাস্তব তা আবার বৃত্তিযুক্ত চিত্তের মধ্যে কিভাবে  ধরা  দেবে ? এইজন্য ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, বস্তু কেবলমাত্র একটা চিত্তের অধীন নয়।  অসংখ্য জীবের অসংখ্য চিত্ত। আর বিষয়বস্তু ভিন্নভিন্ন চিত্তে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। চিত্তের সঙ্গে এইযে বিষয়ের সংযোগ বা সম্মন্ধ আর এরফলে যে উপলব্ধি, তা  হচ্ছে পুরুষের ভোগক্রিয়া। 

দেখুন বস্তু তো এক বা স্বতন্ত্র। কিন্তু একই বস্তু জনে জনে ভিন্ন রূপে উপলব্ধ হচ্ছে। এমনকি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে একই বস্তুর মধ্যে ভিন্নভিন্ন অনুভূতি দেখা যায়। আমিষ আহারে অভ্যস্থ ব্যক্তি  মাছ-মাংসের মধ্যে তৃপ্তির অনুভূতি পান, আবার নিরামিষাশী ব্যক্তির মধ্যে ঘৃণার উদ্রেগ হয়। কিন্তু একধরনের মানুষ আছেন, যাদের মধ্যে না আছে তৃপ্তির ভাব, না থাকে ঘৃণার ভাব। এঁরা একটা উদাসীন দৃষ্টি নিয়ে বস্তুর ভোগ করেন, বস্তুকে দর্শন করেন, বা অনুভব করেন। তো বস্তু তো এক, কিন্তু তার সন্মন্ধে জ্ঞান বা অনুভব হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন। আসলে ঋষি পতঞ্জলি বলতে চাইছেন, বাইরের  বস্তু তা সে যাই হোক না কেন, ভিন্ন ভিন্ন চিত্তে এই প্রভাব ভিন্নভিন্ন ভাবে হয়ে থাকে। বস্তুর মধ্যে কোনো আনন্দ নেই, আনন্দ আছে মনের গভীরে। আর মনের এই অনুভবের  পিছনে কাজ করে আমাদের চিত্ত। আর  সাধন প্রভাবে  যখন  সাধকের চিত্ত স্বচ্ছ ও নির্ম্মল হয়, তখন সেই চিত্তে বস্তুর যথার্থ রূপ ফুটে ওঠে। অর্থাৎ বস্তু কখনো কোনো  আনন্দ প্রদান করে না, করতে পারে না, আনন্দ বা দুঃখ  আছে আমাদের মনের গভীরে। তো জগৎ সত্য, কিন্তু জগতের যে রং-রূপ তা আমাদের মনের রঙে  রাঙানো রয়েছে।  যে প্রশ্নটা এখানে ঋষি পতঞ্জলি রেখেছেন, অর্থাৎ বৃত্তি রহিত অবস্থায়, বস্তুর কি হবে। বৃত্তি রহিত  অবস্থায় বস্তু স্বরূপে প্রকাশিত হবে - যোগীর অন্তরে। এই কথাটাই পরবর্তী শ্লোকে বিশ্লেষণ করেছেন সূত্রকার,  ভালোভাবে ।  
--------- 

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - কৈবল্যপাদ (শ্লোক ০৪/১৭-১৮)

"তৎ উপরাগ-আপেক্ষিকত্বাৎ-চিত্তস্য জ্ঞাত-অজ্ঞাতম।" (৪/১৭)

সেই চিত্ত যার সঙ্গে বিষয়ের সংযোগ হয়েছে, ও বিষয়ের রঙে রাঙিয়ে নিজেকে রাঙিয়ে নেবার অপেক্ষায় আছে, কেবলমাত্র তার কাছেই  বিষয় জ্ঞাত হয়, নইলে বিষয় অজ্ঞাত থাকে।  

দুটো বিষয়  - এক চিত্ত, আরেক বস্তু বা বিষয় ।  বিষয় আকর্ষণ করছে, আর চিত্ত আকৃষ্ট হচ্ছে। আমাদের পঞ্চ  ইন্দ্রিয়ের দ্বার অতিক্রম করে, শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধ আকার নিয়ে চিত্তের কক্ষে প্রবেশ করছে। চিত্ত যেন স্ফটিক, আর বস্তু বা বিষয়  যেন নানান রঙের ফুল।  লাল, নীল, হলুদ, নানান বর্ণের ফুল। রঙ্গিন ফুল স্ফটিকের সম্মুখে এসে স্ফটিককে রাঙিয়ে তুলছে। স্বচ্ছ স্ফটিক তখন নিজেকে সেই রঙের অধিকারী বলে মনে করছে।  চিত্ত তখন পরিনাম প্রাপ্ত হয়ে বৃত্তির সাহায্যে বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে  ভোগকার্য সংগঠিত  করছে।  আর ধীরে ধীরে পরিনাম প্রাপ্ত হচ্ছে। সাধক যখন অষ্টাঙ্গ সাধনার অভ্যাস করে, তখন তাঁর  চিত্ত বৈরাগ্যের রঙে  রেঙে  ওঠে। বৈরাগ্য অর্থাৎ বিষয়বর্জ্জিত অবস্থা। আর এই বিষয়বর্জ্জিত চিত্ত তখন অন্তর্মুখী হয়ে ওঠে। আর অন্তর্মুখী চিত্তে আপন স্বরূপের স্থিতি হয়। 

তন্মাত্রের অর্থাৎ শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ - এর যে বিষয় তা কখনো জ্ঞাত কখনো অজ্ঞাত।  কারন যে সব শব্দ, বা দর্শন ইত্যাদি আগে আমাদের কখনো হয়নি, তা আমাদের কোনো জ্ঞান প্রদান করতে পারে না, আবার যে শব্দ বা দর্শন ইত্যাদি আমাদের পূর্বে হয়েছে, অর্থাৎ আমাদের স্মৃতিতে  আছে, তা আমাদের একটা অনুভূতির জগতে বা জ্ঞানের জগতে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু পুরুষগত চিত্ত সবসময় জ্ঞাত হয়ে থাকে । কারন যতক্ষন অপবর্গ অর্থাৎ জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার যোগ না হচ্ছে ততক্ষন পুরুষকে জড়িয়ে রেখে  নিয়ে নিজেও বিষয়ভোগে পুরুষকে জড়িয়ে ফেলছে।  তখন চিত্ত পুরুষের বিষয় হয়ে যায়, এমনটাই মনে হতে  থাকে।  চিত্ত যখন যে বিষয়রঞ্জিত হয়,  তখন সে সেই বিষয়ে জ্ঞাত হয়। কিন্তু অন্য বিষয়ে  অর্থাৎ যার রঙ চিত্তে লাগেনি, তা  তখন অজ্ঞাত হয়েই থাকে । চিত্ত যখন স্বরূপে পরিনাম প্রাপ্ত হয়, তখন সে না জ্ঞাত, না অজ্ঞাত কেবল জ্ঞান। 
------

"সদা জ্ঞাতাঃ চিত্তবৃত্তয়ঃ তৎপ্রভোঃ পুরুষস্য অপরিণামিত্বাৎ।"  (০৪/১৮)

চিত্তের প্রভু পুরুষের অপরিণামিত্বের কারনে চিত্ত বৃত্তিগুলো সর্বদা জ্ঞাত। 

চিত্ত তার বৃত্তির মাধ্যমে কখনো প্রকাশ্য , আবার কখনো অপ্রকাশ্য।  চিত্ত যখন পঞ্চ  তন্মাত্রের দ্বারা উপরঞ্জিত  হয়, তখন সে বিকারপ্রাপ্ত হয়, যাকে  বলা হয় পরিনাম।  তো বিষয়ে রঞ্জিত হয়ে পরিনাম প্রাপ্ত হচ্ছে, কিন্তু পুরুষ অপরিণামী। পুরুষ স্বয়ং জ্ঞান। না জ্ঞাতা  না জ্ঞেয়। চিত্ত কখনো এই পুরুষের দৃষ্টির অগোচর হতে পারে না। পুরুষের আলোতে চিত্ত আলোকিত হয়ে সমস্ত বিষয়কে জানছে।  যখন চিত্ত বিষয়রঞ্জিত নয়, তখনও  পুরুষের সেই আলো  চিত্তের সঙ্গে যুক্ত হয়েই থাকে। এইজন্য বলা হচ্ছে পুরুষ চিত্তকে সর্বদা  দেখছে। কখনও চিত্তের ভিত্তি বিক্ষিপ্ত, কখনো মূঢ়, কখনো একাগ্র, কখনো নিরুদ্ধ।  তাই ঋষি পতঞ্জলি বলছেন "সদা জ্ঞাতাঃ চিত্তবৃত্তয়ঃ" . চিত্তের কাছে বিষয় কখনো জ্ঞাত, আবার কখনো অজ্ঞাত। বিষয়রঞ্জিত হলে বিষয়জ্ঞান হয়, আবার বিষয় বর্জ্জিত হলে বিষয়ের জ্ঞান হয় না। ঠিক তেমনি পুরুষের কাছে এই চিত্ত হচ্ছে বিষয়স্বরূপ। চিত্তকে  সদা তিনিই আলোকিত করছেন। তাই তিনি সর্বদা চিত্তকে  পর্যবেক্ষন করছেন। তাই এঁকে  আচার্য্যগণ সাক্ষীস্বরূপ বলে থাকেন। ঋষি পতঞ্জলি এখানে কৈবল্যপাদের এই শ্লোকে এসে, সেই সাক্ষীস্বরূপের অনুসদ্ধান করছেন।
------------------ 
  
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - কৈবল্যপাদ (শ্লোক ০৪/১৯-২০)

ন তৎ স্বাভাসং দৃশ্যত্বাৎ - (০৪/১৯)

তৎ  অর্থাৎ চিত্ত, ন  স্বাভাসং - স্বপ্রকাশ নয় কারন তা মধ্যে আছে দৃশ্য। 

ঋষি পতঞ্জলি এবার আলোচনা করছেন, দৃশ্য ও দৃষ্টা সম্পর্কে। এই যে দৃশ্য তা আসলে আমাদের চিত্ত। আর যিনি দ্রষ্টা তিন হচ্ছেন পুরুষ। আমাদের যে ইন্দ্রিয়সকল, তা শব্দাদি বিষয়কে গ্রহণ করে থাকে। সেখান থেকে  চিত্ত বিষয়কে আহরণ করে থাকে। এই যে চিত্ত সে নিজে থেকে না কোনো চিন্তন করতে পারে, না কোনো বিষয় আহরণ করতে পারে। চিত্তের কোনো চেতনসত্তা নেই। এই চিত্ত যখন পুরুষসত্ত্বার সান্নিধ্যে থাকে, তখন চিত্তকে চেতনবান বলে মনে হয় মাত্র। তো চিত্ত স্বপ্রকাশ নয়। দেখুন, বিষয়ের প্রকাশ হয়, চিত্তের সান্নিধ্যে এসে।  বিষয় যতক্ষন চিত্তের সান্নিধ্যে না আসে পারে, ততক্ষন বিষয় অপ্রকাশিত।  আবার যখনই বিষয় চিত্তের সান্নিধ্যে এলো তখন বিষয় প্রকাশিত হলো।  ঠিক তেমনি চিত্ত নিজেকে প্রকাশ করতে পারে না, কিন্তু যখনই  চিত্ত চৈতন্যস্বরূপ পুরুষসত্তার সান্নিধ্যে এলো তখন চিত্তকে চৈতন্যবান বা প্রকাশবান বলে মনে হচ্ছে। 

এখন প্রশ্ন জাগে, আমাদের কাছে তো  সব কিছুই চিত্ত-বুদ্ধি দিয়েই প্রকাশিত হচ্ছে।  তো চিত্তের  এর পিছনে আরো কেউ আছেন, যার কোনো ক্রিয়া নেই, তার কথা আমরা ভাবছি কেন ? অর্থাৎ এই যে চৈতন্যস্বরূপ পুরুষসত্তার কথা বলা হচ্ছে তার প্রয়োজন কোথায় ? অর্থাৎ পরমসত্য সেই পুরুষকে কেন মানতে হবে ? পুরুষের প্রকাশ্যেই এই  চিত্ত চৈতন্যবান হচ্ছে, একথা কেন মানতে হবে। আমরা যদি ধরে নেই চিত্ত নিজেই চৈতন্যবান, চিত্ত নিজেই নিজের প্রকাশক - তাহলে অসুবিধা কোথায় ? এইখানে ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, চিত্ত নিজেই একটা দৃশ্যমাত্র। তো চিত্ত যদি দৃশ্য হয়, তবে একজন দ্রষ্টার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আসলে চিত্ত হচ্ছে পুরুষের কাছে দৃশ্য। আর পুরুষ হচ্ছেন  সাক্ষীস্বরূপ দ্রষ্টা - যিনি ক্রিয়াহীন, যিনি নিরপেক্ষ। দেখুন আপনি আমি যখনই  কোনো বস্তু দেখছি, তখন  জানবেন, কোনো না কোনো আলোকসম্পদ  তাকে প্রকাশিত করেছে।  আর এই কারণেই আমাদের চক্ষু ইন্দ্রিয়ের কাছে সে দৃশ্যমান হচ্ছে। এই আলোক কিছু চোখের নয় বা বস্তুর নয় ।  এই আলোর  উৎস আলাদা।  ঠিক তেমনি পুরুষসত্তার দৃশ্য হচ্ছে চিত্ত, পুরুষ সত্তাই চিত্তের পর্যবেক্ষক। এইজন্য চিত্তকে কে প্রকাশিত করছে, তাকে জানার আগ্রহ এসে যায়।  দেখুন, আমরা অনেকসময় বলি, আমাদের মন খারাপ, আমার রাগ হয়েছে। অর্থাৎ মনের ভিন্ন ভিন্ন  অবস্থা কেউ একজন দেখছেন।  অর্থাৎ চিত্ত যে দৃশ্য, এ ব্যাপারে আমাদের আর কোনো সন্দেহ রইলো না।   

"একসময়ে চ-উভয়-অনবধারণম।" (০৪/২০)

একসময়ে অর্থাৎ একই ক্ষনে উভয়ের অবধারণ হতে পারে না। 

একই সময়ে নিজের ও অপরের রূপ ধারণ সম্ভব নয়। দেখুন জ্ঞাত ও জ্ঞেয়  সবসময় আলাদা হয়ে থাকে। আমি কাউকে দেখছি বা জানছি  অর্থাৎ যাকে  দেখছি বা জানছি  তার থেকে আমি অবশ্যই  আলাদা। তো স্বরূপের জ্ঞান ও বিষয়ের জ্ঞান, একই সঙ্গে হতে পারে না। তাই চিত্ত যেহেতু বিষয়কে  আভাসিত করছে, তাই চিত্ত কখনোই স্বাভাস (স্বয়ং-প্রকাশ)  হতে পারে না।  এইজন্য বলা হয়, জন্ম ক্রিয়া ও  কারক অবশ্যই  আলাদা। 

তো চিত্ত স্বপ্রকাশ নয়, কারন  সে নিজেই দৃশ্য। আমাদের ধারণা,  চিত্ত বোধহয়  সবকিছু দেখছে, চিত্ত বোধহয় দ্রষ্টা।  আসলে চিত্তের  এই যে দেখার ক্ষমতা তা তার ধারকরা। দৃশ্য ও দ্রষ্টা এক নয়। 
-----------

  
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - কৈবল্যপাদ (শ্লোক ০৪/২১-২২)  

"চিত্তান্তর-দৃশ্যে বুদ্ধি-বুদ্ধেঃ অতিপ্রসঙ্গ স্মৃতি-সঙ্করঃ চ । " (৪/২১) 

এক চিত্তের দ্বারা অন্য চিত্তকে দৃশ্যরূপে স্বীকার করলে, বুদ্ধি ও বুদ্ধে অর্থাৎ জ্ঞান ও জ্ঞাতায় অনবস্থা দোষ  এসে যায়। আর স্মৃতিতে শঙ্করতা দোষ এসে যায়।

আমরা জানি, চিত্তে যা কিছু প্রতিফলিত হচ্ছে তা বুদ্ধির দ্বারা নিরূপিত হচ্ছে। এবং এই দৃশ্য বা অভিজ্ঞতা আমাদের স্মৃতির ভাণ্ডারে সংরক্ষিত হচ্ছে। এখন চিত্ত যদি একাধিক হয়, তবে ভিন্ন ভিন্ন চিত্তে ভিন্ন ভিন্ন রূপ দর্শন হবে। আর এই অভিজ্ঞতা যদি স্মৃতির ভাণ্ডারে পাঠানো হয়, তবে স্মৃতির ভাণ্ডারে একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন রূপ সংগ্রহীত হবে।  অর্থাৎ স্মৃতিতে শঙ্করদোষ  দেখা দেবে। এবং  বিভ্রান্তির  সৃষ্টি হবে।  আর এই প্রক্রিয়া অনন্তকাল চলতে থাকলে,  বিভ্রান্তির মাত্রা  বাড়তে থাকবে। এইজন্য ঋষি পতঞ্জলি পুরুষের অস্তিত্ত্বের প্রমান হিসেবে এই একাধিক চিত্তের অস্তিত্ত্বকে  অস্বীকার করলেন। 

"চিতেঃ অপ্রতিসংক্রমায়াঃ তদ্-আকারাপত্তৌ  স্ববুদ্ধি-সম্বেদনম ।" (৪/২২) 

 চিতেঃ অর্থাৎ চিত্তের বৃত্তি স্বরুপ যে বুদ্ধি  তার সঙ্গে সংক্রমণের অভাব সত্ত্বেও  পুরুষের চেতনশক্তি বুদ্ধিবৃত্তিতে প্রতিবিম্বিত হয়ে তারই  আকার লাভে  বুদ্ধির মধ্যে পুরুষের বৃত্তিবোধ সম্বেদ হয় । 

পুরুষ অপরিণামী। কিন্তু এই পুরুষই যখন পরিণামী বুদ্ধিতে প্রতিফলিত  হন, তখন পুরুষের আমিত্ত্ব বিষয়ক জ্ঞান হয়।
রাজর্ষি জনক ঋষি যাগ্যবল্ক্যকে (বৃহৎ-আরণ্যক উপনিষৎ - (০৪/০৩/০৭ ) প্রশ্ন করছেন, আত্মাটা কোনটি ? এই যে দেহ, ইন্দ্রিয়, প্রাণ, মন বুদ্ধি এর মধ্যে আত্মা কোনটি ? রাজর্ষি জনক ভ্রমে পড়েছেন, আমাদের সকল ইন্দ্রিয়কেই বিজ্ঞানময় বলেই বোধ হচ্ছে, তাহলে আত্মা কোনটি ? আমাদের যে চেতনা বোধ তা তো এই সকল ইন্দ্রিয়াদির অর্থাৎ মন-বুদ্ধির  দ্বারাই হয়ে থাকে। দেহ ইন্দ্রিয় মন বুদ্ধি এরা  যদি কেউ আত্মা না হয়, তাহলে আত্মা কোনটি ? ঋষি উত্তরে বলছেন, "এই যিনি বুদ্ধিতে উপস্থিত, আবার ইন্দ্রিয়গনের মধ্যে অবস্থিত, এবং বুদ্ধির অভ্যন্তরস্থ স্বয়ং জ্যোতি পুরুষ। তিনি বুদ্ধির সামানাকার হয়ে এই ইহলোক ও পরলোকের মধ্যে যথাক্রমে বিচরণ করেন, যেন ধ্যানস্থ হয়েও  সচল। কাঁচের ভিতরে আলো  এসে পড়লে, যেমন কাঁচও তার চারিদিকের বস্তুকে জ্যোতির্ময় করে তোলে, তেমনি আত্মজ্যোতি বুদ্ধি , প্রাণ, মন, ইন্দ্রিয়সকলকে সচেতন-প্রায় করে তুলছেন। এই কাঁচ থেকে আলোকে যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনি বুদ্ধির সাথে আত্মা এমনভাবে অভিন্ন হয়ে অবস্থান করেন, অর্থাৎ বুদ্ধিতে অবভাসিত আত্মা বুদ্ধির সমানাকার বলে প্রতিভাত হন, একে আলাদা করা সহজসাধ্য নয় । 

তো মূল দ্রষ্টা সেই পুরুষ।  আর এই পুরুষকে আলাদাকরে ধরবার লগ্ন  হচ্ছে কৈবল্যের স্থিতি।  অর্থাৎ কেবলমাত্র এক। পুরুষের আলোকজ্যোতি আমাদের মন, প্রাণ বুদ্ধির সঙ্গে মিশে আছে বলেই আমরা এদেরকে জ্ঞাতার আসনে বসিয়েছি, এতদিন। প্রতিফলিত আলো তো ধার করা। এইবার এই বুদ্ধিকে অর্থাৎ আয়নাটিকে ভেঙে চুরমার করে দিতে হবে। এতদিন বুদ্ধির মধ্যে সেই হিরণ্ময় জ্যোতিকে প্রতক্ষ্য করে, যা আসলে প্রতিফল ছাড়া কিছু নয়, আমরা ভ্রমের মধ্যে বিচরণ করছিলাম।  এবার সময় এসেছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে  হবে। এই দৃশ্য ও দ্রষ্টাকে আলাদা করতে হবে। 
--------

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - কৈবল্যপাদ (শ্লোক ০৪/২৩-২৫) 

"দ্রষ্ট-দৃশ্য-উপরক্তং চিত্তং সর্বার্থম। " (০৪/২৩)

দ্রষ্টা ও দৃশ্যের রঙে রাঙিয়ে নেওয়ায় চিত্ত সর্বার্থ-সম্পন্ন হয়ে ওঠে। 

আমরা জানি সমস্ত বিষয়কে গ্রহণ করছে আমাদের ইন্দ্রিয়সকল। ইন্দ্রিয়সকলের মাধ্যমে আবার আমাদের চিত্ত এই  বিষয়ের গ্রহীতা।  এখন এই চিত্ত চৈতন্যবান হওয়ায়, গ্রাহ্য বিষয় চিত্তের কাছেই স্বচ্ছতা লাভ করছে। তাহলে  প্রশ্ন হচ্ছে, চিত্তই যদি চৈতন্যবান হয়, তবে চেতন পুরুষের স্থিতি  কোথায় ? এই ব্যাপারটা সম্যকরূপে উপল্বদ্ধিতে আনতে  গেলে, আমাদের চিত্তের গঠনতন্ত্রের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। এই চিত্তের সঙ্গে দুটো জিনিস ওতপ্রোত ভাবে মিশে আছে, একটা হচ্ছে দ্রষ্টা, অপরটি হচ্ছে দৃশ্য। অর্থাৎ চিত্ত দৃশ্যতেও আছে, আবার দ্রষ্টাতেও আছে। এ যেন আমাদের স্বপ্নাবস্থা। স্বপ্নে দেখছি, একটা স্থূল জগতের মধ্যে আমরা ঘোরাফেরা করছি। কিন্তু স্বপ্ন ভেঙে  গেলেই আমরা বুঝতে পারি, এই স্বপ্নের জগতের বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই। এখানে দ্রষ্টা ও দৃশ্য সবই মনের বিশেষ অবস্থা।   এটি আমাদের মনের  কল্পনা বিশেষ। অথচ যখন আমরা স্বপ্নের জগতে বিচরণ করছিলাম, তখন এই স্বপ্নের জগৎকে কিন্তু সত্য বলেই মনে হয়েছিলো। অর্থাৎ আমি  বা দ্রষ্টা ও দৃশ্য আলাদা বলেই বোধ হচ্ছিলো। এমনকি স্থূল জগতের মতো আমাদের সুখ-দুঃখের অনুভূতিগুলোও আমরা ভোগ করছিলাম। কিন্তু স্বপ্ন তো স্বপ্নই  হয়। ঠিক তেমনি যখনই  চিত্তবৃত্তির সঙ্গে দ্রষ্টা পুরুষের অবিচ্ছিন্ন সন্মন্ধ থাকে, তখন চিত্ত উভয়ের দ্বারা অর্থাৎ দ্রষ্টা ও দৃশ্যের দ্বারা উপরোক্ত হয়ে যায়।  চিত্ত তখন একদিকে যেমন চেতন পুরুষের সঙ্গে যুক্ত তেমনি অচেতন বিষের সঙ্গে একাকার হয়ে আছে। তো দ্রষ্টা ও দৃশ্যের প্রকাশ দেখা যাচ্ছে এই চিত্তের মধ্যে। এই কারনে চিত্ত অচেতন বিষয়াত্মক হয়েও যেন চেতনাত্মক। তো সবকিছুর যে জ্ঞান তা এই চিত্তের মাধ্যমেই হচ্ছে। এই কারনে ঋষি পতঞ্জলি বলছেন চিত্ত হচ্ছে সর্বার্থ। অর্থাৎ এই চিত্তের মধ্যেই আছেন, অচেতন বিষয় আভাস আবার চেতন পুরুষ-আভাস। দ্রষ্টা ও দৃশ্যের রঙে নিজেকে অনুরঞ্জিত করে অবস্থান করছে চিত্ত । 

"তদ অসংখ্যেয় বাসনাভিঃ চিত্রম অপি পরার্থং সংহত্যকারিত্বাৎ ।" (০৪/২৪) 

চিত্ত অসংখ্য বাসনার দ্বারা বিচিত্রভাব প্রাপ্ত হলেও সংহতকারিত্ব হেতু পরার্থে তার স্থিতি। 

চিত্ত নিজের সুখের জন্য কিছু করে না।  চিত্তের মধ্যে নানান বাসনার উদয় হচ্ছে। চিত্ত আসলে একটা মাধ্যম মাত্র।  সংহতিকারক, যোগাযোগের মাধ্যম। চিত্তের এই বাসনা পরের জন্য কাজ করে থাকে। সংহতিকারত্ব আসলে পরার্থেই  হয়ে থাকে। ভাষ্যকার ব্যাসদেব এটিকে একটা উদাহরনের সাহায্যে বুঝিয়েছেন।  বলছেন, বাড়ি নির্ম্মানের জন্য, যে সরঞ্জাম, অর্থাৎ ইট,কাঠ,বালি, সিমেন্ট ইত্যাদির  কোনো নিজস্ব ভোগ নেই। কিন্তু এদের সংহতিতেই  তৈরী হয় একটা বাড়ি। আর তা ভোগ করেন বসবাসকারী। 

সারা জগৎ এই সংহতির কারনে উদ্ভাসিত হচ্ছে, কিন্তু কার জন্য এই সংহতি। গাছে ফুল হচ্ছে, ফল হচ্ছে, কার জন্য ? সূর্য আলো দিচ্ছে, বাতাস অক্সিজেন দিচ্ছে, অক্সিজেন হাইড্রোজেন মিলে  আবার জল হচ্ছে। কিন্তু কেন হচ্ছে, কি দরকার, কার কারণেই বা প্রকৃতি  সংহত হয়ে রূপের পসার মেলে ধরছে ?  

ভোগের মাধ্যমে যে চিত্ত সুখ, এর থেকে যিনি অর্থবান হন, তিনি হচ্ছেন পুরুষ।  আর এই পুরুষের  জন্যই প্রকৃতির এতো সমাহার। চিত্তও  পরিণামী প্রকৃতির অংশবিশেষ।  তাই চিত্তের মধ্যে প্রতিনিয়ত পরিনাম প্রাপ্ত হচ্ছে। বাসনার উদ্রেগ হচ্ছে - প্রকৃতি সেই বাসনা পূরণের বস্তুর বা বিষয়ের জোগান দিচ্ছে। চিত্তে কখনো সুখ কখনো দুঃখের উদ্রেগ হচ্ছে। আর এই সবকিছু সেই অসংহত, অপরিণামী পুরুষের কারণেই ঘটে চলেছে। তো চিত্ত দ্রষ্টা নয়, চিত্ত সর্বার্থ মাত্র। বিষয় চিত্তের মাধ্যমেই প্রকাশ পাচ্ছে। প্রকৃতির অনন্ত ঐশ্বর্য্য, কিন্তু এই ঐশ্বর্য্য তার নিজের ভোগের জন্য নয়। এমনকি নিজের  উপলব্ধি বা দর্শনের জন্যও  নয়। এসবই  পরার্থে। কৈবল্যে স্থিতপুরুষ প্রজ্ঞাবান, এই জ্ঞানে পরিপূর্ন চিত্ত হয়ে থাকেন। আবার এই যে জ্ঞানের উন্মেষ তাও  সেই পরার্থে।  আর এই পরই  হলেন, পুরুষ। 

এই কারনে  পরের শ্লোকে কৈবল্য প্রাপ্ত পুরুষের কথা বলছেন -

"বিশেষ-দর্শিন আত্মভাব-ভাবনা-বিনিবৃত্তিঃ ।" (০৪/২৫)

বিশেষদর্শীদের আত্মতত্ত্ব বিষয়ক ভাবনার নিবৃত্তি ঘটে।  

বিশেষদর্শী অর্থাৎ আমি চিত্ত থেকে আলাদা, আমি নিত্য শুদ্ধ, পবিত্র পুরুষ বা আত্মা  এটি যিনি সম্যকরূপে উপলব্ধি করেছেন, তিনি হচ্ছে বিশেষদর্শী।  তত্ত্বমূল সম্পর্কে যাঁর  স্পষ্ট অনুভব হচ্ছে, তাঁর  সমস্ত ভাবনার নিরসন হয়েছে। তত্ত্বজিজ্ঞাসু সাধকের মনের মধ্যে নানান রকম প্রশ্নের উদয় হয়।  আমি কে ? আমি আগেই বা কি ছিলাম। কোথায় ছিলাম, কিভাবে ছিলাম ? এই শরীর  কি ? এই শরীর  কিভাবে হলো, আমি কি এই শরীর  ? যদি শরীর  না হই , তবে আমি কে ? আত্মা ! আত্মা কিভাবে এই শরীরের মধ্যে প্রবেশ করে নিজেকে শরীরের সঙ্গে একাত্মবোধে  সামিল হল। এই শরীর ত্যাগের পরে, আমার কোথায় আবাস  হবে ? সেখানে কি অবস্থায় আমি থাকবো ? ইত্যাদি ইত্যাদি ভাবনা তত্ত্বজিজ্ঞাসুকে উদ্বেল করে তোলে। এই যে ভাবনা, বা এই যে প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা তার অবসান ঘটে থাকে তত্ত্বদর্শী অবস্থায়  এসে। একেই ঋষি পতঞ্জলি বলছেন "বিশেষদর্শী"। যা ভাবনা রহিত একটা বিশেষ  অবস্থা। সব প্রশ্ন, সব জিজ্ঞাসা, সব অনুসন্ধান  শেষ হয়ে গেছে। এখন  কেবল ভাবনারহিত স্থিতি। না বাসনার উদ্রেগ হচ্ছে, না চিন্তার উদয় হচ্ছে।  
--------------------

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - কৈবল্যপাদ (শ্লোক ০৪/২৬-২৭) 

"তদা  বিবেকনিম্নং কৈবল্য-প্রাগভারং চিত্তম। " (০৪/২৬)

তখন চিত্ত বিবেকের গভীরে কৈবল্যভাব প্রাপ্ত হয়। 

আমরা এর আগের শ্লোকে আভাস  পেয়েছি  বিশেষ দর্শনের কথা, বিশেষদর্শীর কথা। বিশেষ দর্শন অর্থাৎ বিশেষভাবে, বা প্রথকরূপে জানা। যার মধ্যে এই পৃথকীকরণ বিদ্যা আয়ত্ব হয়েছে, তিনি উপলব্ধি করেন এই জগৎ চিত্তের পরিনাম বিশেষ।  কখনো অহং কখনো ইদং আকারে প্রকাশিত হচ্ছে।  পুরুষ এসব চিত্তেধর্ম্ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এই বিশেষদর্শীর মধ্যে তখন চিত্তের পরিনাম স্পর্শ করতে পারে না। তিনি চিত্তের পরিণামের সঙ্গে সংযুক্ত হন না, বা চিত্তের এই পরিনাম তাকে কিছুই জ্ঞাত করায় না। 

এখন কথা হচ্ছে এই চিত্তের দ্বারাই আমরা পুরুষকে জ্ঞাত হতে পারছি।  এই চিত্ত একটা অহংয়ের  সৃষ্টি করে ইদংকে অনুভব করাচ্ছে। আবার এই অহং-এর কারণেই আমরা ইদংকে হারিয়ে ফেলছি। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, বিশেষদর্শী হলে চিত্ত ও চিত্তের গ্রন্থি-মোচন হয়। তখন সমস্ত অহং-ইদং ভাবনার নিবৃত্তি ঘটে। তো যখন ভাবনার নিস্পত্তি হলো, অর্থাৎ চিত্তের মধ্যে কোনো ভাবনার উদয়-অস্ত শেষ হয়ে গেলো, তখন অনুসন্ধানের স্পৃহারও নিস্পত্তি হলো। এবার যোগ-ক্রিয়ার ফল হৃদয়ে অঙ্কুরিত হতে শুরু হলো। যোগক্রিয়ার সাহায্যে এই বিশেষদর্শনের বীজ রোপন করা হয়েছিল হৃদয়তন্ত্রে। ভাষ্যকার ব্যাসদেব, এই ব্যাপারটা একটা সুন্দর উপমার সাহায্যে বুঝিয়েছেন। বলছেন, বর্ষার আগমনে মাটির নিচে গ্রথিত বীজ অংকুরিত হলো। ঈশ্বর প্রণিধান  করতে করতে চোখ বুজে এলো। অশ্রুপাত ঘটতে লাগলো। সর্বাঙ্গে রোমাঞ্চ অনুভব হতে শুরু করলো। এখন তিনি কৈবল্যের অভিমুখী জ্ঞানমার্গে বিচরণশীল। 

"তৎ-ছিদ্রেষু প্রত্যয়-অন্তরাণি সংস্কারেভ্যঃ।" (০৪/২৭)

(সমাধি থেকে বুথানকালে) তার অর্থাৎ বিবেকের অসাবধানতায় ছিদ্রপথে সংস্কারগুলো থেকে  অন্য প্রত্যয়  জেগে ওঠে।

বেশ চলছিলো সমাধির খেলা। চোখে অশ্রু, শরীরে রোমাঞ্চ।  চিত্ত এখন কৈবল্যের পথে জ্ঞানমার্গে বিচরণ করছে। বিবেক সঞ্চারী জ্ঞানে চিত্ত ভরপুর।  পুরুষ ও চিত্তের ভেদজ্ঞান প্রবাহ চলছে। কিন্তু ভূতজয় তো সম্ভব হয়নি। ভূতজয়  তখনই  সম্ভব হবে যখন ভূতের পরিনাম পর্বের পরিচয় শেষ হবে। 

আমরা আগে বিভুতিপাদে (৩/৪৪) শুনেছি,  পঞ্চভূতের স্থূলতা, সূক্ষ্মতা, স্বরূপটা, অন্বয়িতা, ও অর্থবত্তা এই পাঁচরূপ বিশিষ্ঠ স্থূল ভূত গুলোতে সংযমের অভ্যাস করলে যোগীপুরুষের ভূত জয় হয়ে থাকে।  "স্থূল-স্বরূপ-সূক্ষ্ম-অন্বয়ার্থবত্ত্ব-সংযমমাৎ-ভূতজয়ঃ" । পুরুষের বিষয় হবো,  তার ভোগ্য  হবো, তার দৃশ্য হবো, এই প্রেরণা প্রয়োজন। গতি কৈবল্যের দিকে সত্য, গতি বিবেকজ্ঞানের দিকে, কিন্তু প্রকৃতি থেকে আলাদা হওয়া সহজসাধ্য নয়। যাকে  জন্ম জন্মান্তর ধরে জড়িয়ে আছি, তাকে ছাড়াবো কিভাবে ? দেহবোধ ক্ষীণ হলেও আছে, আমিবোধ ক্ষীণ হলেও আছে, আমি জানছি, আমি উপভোগ করছি, এই  বোধ তো আছে। আমি যে একজন  সমাধিস্থ পুরুষ, এই বোধও  তো আমাকে ছেড়ে যায়নি। চিত্তের বিলয়সাধন  তো হয়নি। চিত্তের গভীরে যে সংস্কার আছে, তারও  তো বিলোপ সাধন হয়নি। সংস্কারের বুদ্বুদ তো এখনও  উঠছে। ঈশ্বরকে উপলব্ধি করবার যে বাসনা তা তো এখনো ধুয়ে মুছে যায় নি, বা বিবেকজ্ঞানের অগ্নিতে তাকে এখনো দাহ  করা সম্ভব হয়নি। সুতরাং ক্লেশ রয়ে গেছে। তাই এই সংস্কারকে যেমন সম্পূর্ণরূপে ভস্মিভূত করতে হবে, তেমনি সমস্ত ক্লেশের নাশ করতে হবে। জ্ঞানাগ্নি দিয়ে প্রকৃতির সমস্ত ভূতকে জয় করতে হবে। তা না হলে আবার সমাধি থেকে বুত্থানে অর্থাৎ ভেজা মাটিতে যেমন শ্যাওলায় জন্ম হয়, তেমনি চিত্তে সংস্কারের বীজ অংকুরিত হতে থাকবে। তা যতক্ষন না হচ্ছে, ততক্ষন কৈবল্যলাভ সম্ভব নয়। আর এর ফলে অর্থাৎ যতক্ষন ভূত্জয়  না হয়, যতক্ষন সংস্কারের নাশ না হয়, ততক্ষন যোগীর  সাধনমার্গ থেকে স্খলনের সম্ভাবনা থেকে যায়। এখান থেকে বেরুতে হবে। 

----
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - কৈবল্যপাদ (শ্লোক ০৪/২৮-৩০) 

"হানমেষাং ক্লেশবৎ-উক্তম। " - ০৪/২৮

এষাং অর্থাৎ এই বুত্থানকালীন সংস্কারগুলোর নাশ করতে হবে, যেমন ভাবে ক্লেশের নাশ করা হয়েছিল। 

সমাধিকালীন অবস্থায় সমস্ত ক্লেশের নাশ হয়ে থাকে।  তেমনি জ্ঞান-বিচারের দ্বারা পূর্ব পূর্ব সংস্কারগুলোকে এমন ভাবে নাশ করতে হবে, যাতে আর  তার উথান না হতে পারে। বীজ যখন অগ্নিতে জ্বেলে গিয়ে অংকুর উদ্গমনে অক্ষম হয়ে যায়, তেমনি আমাদের পূর্বসংস্কারগুলোকে জ্ঞান-বিচারের দ্বারা দগ্ধ করতে হবে। 

চিত্তের মধ্যে জন্ম-জন্মান্তরের যে সংস্কার আছে, তা সমাধিকালীন অবস্থায় চাপা থাকলেও, যখনই সমাধি থেকে বুত্থান  হয়, তখন সংস্কারগুলো আবার চিন্তাবিহীন চিত্তের ছিদ্রপথ ধরে বেরিয়ে আসতে চায়।  চিত্তবিলয় যেমন দুঃসাধ্য তেমনি, চিত্তের মধ্যে সঞ্চিত সংস্কারগুলোর নিঃসংশয় নাশ করা সহজ সাধ্য নয়। তথাপি বিবেকজ্ঞানের আশ্রয় নিয়ে বিচারের সাহায্যে যেমন ক্লেশের নাশ করা হয়েছিল, তেমনি এই সংস্কারের নাশ করতে হবে। তখন আর সংস্কাররূপ বীজের অঙ্কুর  উদ্গম সম্ভব হবে না। অর্থাৎ শস্ত্র  একটাই তা হলে বিবেকজ্ঞান। এই বিবেকজ্ঞানই  পারে, ক্লেশের নাশ করতে আবার পুরোনো সংস্কারের নাশ করতে। 

"প্রসংখ্যানে-অপি-অকুসীদ-অস্য  সর্বথা-বিবেকখ্যাতে-ধর্মমেঘঃ সমাধিঃ ।" (০৪/২৯)

বিবেকজ জ্ঞানে আসক্তিশূন্য যোগীর লাগাতার বিবেকখ্যাতি থেকে আসে ধর্মমেঘ সমাধি। 

প্রসংখ্যান কথাটার অর্থ হলো বিবেকজ জ্ঞান - বিবেকজাত জ্ঞান। এই জ্ঞানে যোগী প্রকৃতি ও পুরুষের মধ্যে ভেদ নির্ণয়ে সক্ষম হন। যখন যোগীর চিত্তে বিবেকজ জ্ঞানের উদয় হয়, তখন তিনি ফলাকাঙ্খ্যা শূন্য হয়ে যান। তখন তার মধ্যে আর কোনো প্রার্থনা করবার কিছুই থাকে না। আসক্তিশূন্য এই যোগীর চিত্তে সমসময় বিবেকজ্ঞানের আলো  প্রজ্বলিত হতে থাকে। এই জ্ঞানাগ্নিতে দগ্ধ হতে থাকে সংস্কারের বীজ।  আর সংস্কারের  ক্ষয় হওয়ায়  যোগী ধর্মমেঘ  নামক সমাধি প্রাপ্ত হন। 
এখন কথা হচ্ছে ধর্মমেঘ  সমাধি বলতে কি বোঝায় ? ধর্মমেঘ সমাধি হচ্ছে - চিত্তবৃত্তির নিরোধের ফলে যে সাম্প্রজ্ঞাত সমাধি লাভ হয় - এইসময় বিবেক জ্ঞানের প্রতিও তার বিরক্তি আসে। পরবৈরাগ্যের প্রায় শেষ অবস্থা, এই ধর্মমেঘ সমাধি । এই সময় পরবৈরাগ্যের প্রতিও তিনি অনাসক্ত হয়ে ওঠেন। 

"ততঃ ক্লেশ-কর্ম-নিবৃত্তিঃ" - (০৪/৩০) 

ততঃ অর্থাৎ ধর্মমেঘ  সমাধি থেকে সমস্ত ক্লেশ ও কর্মের বিনাশ হয়ে থাকে। 

ধর্মমেঘ সমাধি লাভ হলে ভ্রমজ্ঞান ও অবিদ্যা জনিত যত ক্লেশকর সংস্কার তার বিনাশ  ঘটে থাকে। আমাদের যত  কষ্ট তার মুলে আছে আমাদের ভালো বা মন্দ উভয় সংস্কার। এই সংস্কারই আমাদের ক্লেশকর বা কর্মফল  প্রদানকারী কর্ম্মের উদ্ভব হয়ে থাকে।  এমনকি আমাদের জন্ম, বা দেহ-ধারণও   এই কর্ম্মজনিত সংস্কারের বশে নির্দিষ্ট হয়ে থাকে। তো যোগী যখন বিবেকখ্যাতির কারনে এই সংস্কার থেকে মুক্ত হতে পারেন, তখন তিনি সমস্ত ক্লেশদায়ক অনুভূতির উর্দ্ধে উঠে জীবিত কালেই জীবনমুক্ত হয়ে যান। অর্থাৎ যে ভাবনা-স্রোত  আমাদের জন্মের কারন হয়ে থাকে, সেই ভাবনার বিপরীত ভাবনার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারলে, তবে জীবের গতি উৎসমুখী হয়ে যায়। তখন জন্ম-মৃত্যুর আবর্তে ঘুরপাক খেতে হয় না। তাই ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, ধর্মমেঘ সমাধি থেকে "ক্লেশ ও কর্মের" গুলোর নিবৃত্তি হচ্ছে। 
------------

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - কৈবল্যপাদ (শ্লোক ০৪/৩১-৩২)

"তদা সর্ব-আবরণ-মল-অপেতস্য জ্ঞানস্য- আনন্ত্যাৎ-জ্ঞেয়ম-অল্পম।" (০৪/৩১)

তদা অর্থাৎ সেই অবস্থায়, (যেখান জীবমুক্তির দ্বার খুলে যায়)  সমস্ত জ্ঞান আবরণ-রুপী মল দূর হয়ে যায়। জ্ঞানের অসীমত্ব হেতু জ্ঞেয়  বিষয় কম হয়ে যায়। 

জ্ঞানের আলোয়   উদ্দীপ্ত হয়ে সংস্কার  ও ক্লেশের নাশ হলো। যখন জ্ঞানের আগুনে সমস্ত  জ্ঞেয়  বস্তুর নাশ শুরু  হলো, তখন জ্ঞানের আগুন জ্বালানোর জন্য যে  বিষয়-বস্তু দরকার তার স্বল্পতা দেখা দিতে লাগলো। অগ্নিতে ইন্ধন (কাষ্ঠ) না দিলে, অগ্নিতে আহুতি না দিলে ধীরে ধীরে অগ্নি নির্বাপিত হতে থাকে।  কিন্তু এই অগ্নি যায় কোথায় ? অগ্নি অনন্তে  মিলিয়ে  যায়। তেমনি ক্লেশকর্ম্ম মূলক আবরণ থেকে মুক্ত হয়ে জ্ঞান অনন্ততা প্রাপ্ত হয়।  একসময়  তমের দ্বারা আবৃত হয়ে জ্ঞান আচ্ছন্ন হয়ে ছিল। তখন ছিলো  ঘোর  অন্ধকার।  আবার রজোগুণ এসে  নাড়াচাড়া শুরু করতেই  অন্ধকারের চাদর যেন খুলতে শুরু করলো। অর্থাৎ বিষয়জ্ঞানের আলোক ঝলমল করতে শুরু করলো।  তখন জাগতিক বিষয়ের জ্ঞানলাভ হতে লাগলো। আবার বিবেকজ জ্ঞানের ফলে, জ্ঞান যখন  বিষয়শূন্য হলো, অর্থাৎ সত্ত্বগুণের জাগরণ ঘটলো, তখন জ্ঞান অনন্তে মিলিয়ে গেলো। চিত্ত যখন মলশূন্য তখন জ্ঞানের অনন্ততা প্রাপ্তি হলো। ধর্মমেঘ সমাধিতে ক্লেশকর্ম সমূলে বিনষ্ট হলে যোগী জীবন্মৃত হয়ে গেলেন।  যোগী জন্ম মৃত্যুর চক্র  থেকে বেরিয়ে অনন্তে মিলিয়ে গেলেন। 

"ততঃ কৃতার্থানাং পরিণামক্রম সমাপ্তিঃ গুণানাম" (৪/৩২) 

ততঃ অর্থাৎ ধর্মমেঘ  সমাধিতে কৃতার্থ হয়ে গুণসকলের পরিণামক্রমের সমাপ্তি হয়। 

যোগীপুরুষ যখন ধর্মমেঘ সমাধিতে কৃতার্থ হন, তখন ত্রিগুণাত্মক প্রকৃতির যে পরিনাম প্রাপ্ত স্বভাব তা আর তাকে প্রভাবিত করতে পারে না।  এখন কথা হচ্ছে, পুরুষ কিভাবে এই প্রকৃতির ত্রিগুণাত্মিক স্বভাবের দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে ছিল ? সহজ করে বলতে গেলে বলতে হয়, পুরুষকে তার সংষ্কার  ভোগ করিয়ে তার অপবর্গ বিধান করাই প্রকৃতির কাজ ।  অপবর্গ কথাটার অর্থ হচ্ছে জীবাত্মার সাথে পরমআত্মার যোগ। সংসার বন্ধন  থেকে মুক্তিই অপবর্গ লাভ। বিশ্ব সৃষ্টিতে আমরা যে বৈচিত্র দেখি, তা এই গুনগুলোর  ক্রোম-পরিণামের কারনে ঘটে থাকে।  অকারনে বা অদৃষ্ট  বশতঃ পুরুষপ্রধান ঘুরতে ঘুরতে যখন এই চিরচঞ্চল ত্রিগুণাত্মক প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসে, তখন প্রকৃতি তাকে ত্রিগুনের দ্বারা বেঁধে ফেলে।  আর তখনই  শুরু হয়, প্রসব ও প্রতিপ্রসব - জন্ম মৃত্যু আবার জন্ম থেকে মৃত্যু।  এটি কিন্তু পুরুষ প্রধান নয়, এটি তখন কেবলই পুরুষ। বুদ্ধিতে প্রতিফলিত পুরুষ।  আর এই পুরুষের ভোগ  যতক্ষন না সমাপ্ত হয়, ততক্ষন সে সংসার বন্ধনে আবদ্ধ  হয়ে ভোগের বা সংকল্পের সান্নিধ্যে সুখ-দুঃখের (ক্লেশকর অনুভূতির) অনুভব করতে থাকে। ভোগ শেষ হয়ে গেলে, বুদ্ধি ইত্যাদির ক্রমপরিনামের সমাপ্তি হয়।  আর তখন অপবর্গ বা পুরুষ শেষে পরমপুরুষে স্থিতি।  একেই বলে পুরুষের কেবলীভাব। 
------------  

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - কৈবল্যপাদ (শ্লোক ০৪/৩৩-৩৪)

"ক্ষণ-প্রতিযোগী পরিণাম-অপরান্ত-নির্গ্রাহ্যঃ  ক্রমঃ ।" (০৪/৩৩)

 ক্ষনের আধারে ক্ষনের পরম্পরায় স্থিত ধর্ম্মের পরিণামের অবসানের মাধ্যমে যা নিশ্চিতরূপে গ্রাহ্য তা হলো ক্রম।

ক্ষণ বলতে বোঝায় কালের অণুঅংশ,  যা ভাগ করা যায় না । ক্ষণ হচ্ছে প্রবাহমান কালের গতি বিশেষ আর এই ক্ষনের পরিণামের বা ক্ষণপ্রবাহের শেষ ক্ষণটুকু হচ্ছে, ক্রম। কাল নিজে অপরিণামী।  কিন্তু কালের সঙ্গে সম্পৃক্ত বস্তু বা গুন্ পরিণামী। আজ যেটি নতুন, কালের সঙ্গে থেকে সেই নতুন একদিন পুরাতন হয়ে যায়। আজ যেটি নতুন, বা গতকাল যেটি নতুন ছিলো, আগামীকাল সেটি পুরাতন। আর এই যে বস্তুর নতুন থেকে পুরাতন ভাব, এটি কেবল অনুভূতির বিষয় মাত্র। এই অনুভূতি যদি না হতো তবে সবকালেই বস্তুর একত্ব  সিদ্ধ হতো। এই অনুভূতির অভাবে পদার্থের নিত্যভাব দেখা যায়। কূটস্থে আছেন নিত্য, আবার অনিত্য বা পরিণামী ভাবের সত্যতা। ক্রোম যখন চলতেই থাকে অর্থাৎ ক্রোম যখন অবিনাশী তখন তা নিত্য। আবার এই ক্রোম যখন বিনাশী তখন তা অনিত্য। 

এখন এই যে প্রকৃতির গুন্ অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ , তমঃ, এগুলো বস্তু সাপেক্ষ্যে এসে পরিণামী হচ্ছে, কিন্তু যখন এই গুনসকল কোনো বস্তুর সাপেক্ষে না থাকে, তখন সে অপরিণামী। তাই নিত্যধর্মী গুনগুলোর মধ্যে পরিণামের কখনো পরিসমাপ্তি হয় না। কূটস্থে নিত্যসত্য পুরুষ স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত। এখন জীবনমুক্ত পুরুষের হৃদয়ে এই স্বরূপের স্থিতি ক্রমসহায়ে  অনুভূত হয়ে থাকে।  সাধারনের ক্ষেত্রে যা অনুভূতিতে আসে না। আবার সংসার পরিনাম প্রাপ্ত হচ্ছে, কিন্তু তার নিত্যতার পরিসমাপ্তি হচ্ছে না। আর পুরুষ সব সময় অপরিণামী হয়ে স্থিত। এই তত্ত্বজ্ঞান যোগীপুরুষের হৃদয়ে উদ্ভাসিত, কখনও  বিনষ্ট হয় না। এমনকি কালের প্রবাহেও নয়। তো প্রকৃতি ও পুরুষ দুইই  নিত্য, অনাদি, শুধু পার্থক্য হচ্ছে পুরুষ অপবর্গ লাভ করতে পারে, কিন্তু প্রকৃতির তা হয় না। অপবর্গ অর্থাৎ জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলন হতে পারে, কিন্তু প্রকৃতির অপবর্গ লাভ হয় না। অর্থাৎ প্রকৃতি পুরুষের মিলন হয় না।  

"পুরুষার্থঃ শূন্যানাং গুণানাং প্রতিপ্রসবঃ কৈবল্যং স্বরূপপ্রতিষ্ঠা বা চিতিশক্তেরিতি।" (০৪/৩৪) 

পুরুষের প্রয়োজন সমাপ্তিতে গুনগুলোর পরিনামের  সমাপ্তি হলেই কৈবল্য প্রাপ্ত হয়ে থাকে। এই অবস্থাই  আসলে পুরুষের চিতিশক্তির স্বরূপ প্রতিষ্ঠা। 

শরীর  যেমন প্রকৃতির অঙ্গবিশেষ তেমনি এই শরীরের মধ্যে আছেন, সেই চৈতন্য-পুরুষ। সংস্কার  বশতঃ পুরুষ প্রধান ঘুরতে ঘুরতে একসময় ত্রিগুনাত্বিকা প্রকৃতির খপ্পরে এসে পড়ে। আর ত্রিগুনাত্বিকা প্রকৃতি পুরুষের মধ্যে পরিণামের খেলা দেখতে থাকে। ছিল কারন, কারন থেকে সূক্ষ্ম, সূক্ষ্ম থেকে স্থূলে  এসে ইন্দ্রিয়াদি প্রাপ্ত হয়ে ভোগে লিপ্ত হয়েছিল। যোগীর কাজ হচ্ছে এই পুরুষকে ভোগাদির সমাপ্তি করিয়ে অপবর্গ প্রাপ্তি করানো। এই কারণেই ঋষি পতঞ্জলির যোগদর্শন  যম-নিয়ম ইত্যাদি অষ্টাঙ্গ যোগের সাধন করে বুদ্ধি সত্ত্বের সাহায্যে ভেদ জ্ঞানের উৎপন্ন করে থাকে। এটি করে থাকে বিবেকখ্যাতি। এই বিবেকখ্যাতির সিদ্ধিতে আসে পরবৈরাগ্য।  পরবৈরাগ্যের পরিণতি হয় অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি।  শুরু হলো কৈবল্যের পথে যাত্রা।  এর পরে ধর্মমেঘ সমাধি। ধর্মমেঘ সমাধি থেকে শুরু হলো প্রকৃতি পুরুষের ভিন্নতা জ্ঞান। এই জ্ঞানের পরিসমাপ্তিতে কৈবল্যের প্রাপ্তি।  

প্রথমে অধর্ম্মে ছাড়লাম, তারপরে ধর্ম্ম কে ছাড়লাম।  সত্যকে ছাড়লাম, অসত্যকে ছাড়লাম, এখন কি দিয়ে ছাড়লাম ? জ্ঞানাগ্নিতে এগুলোর বিসর্জন দিলাম। এবার জ্ঞানকেও ছেড়ে দিলাম।  কারন জ্ঞান হচ্ছে একমাত্র অবলম্বন যা দিয়ে সবকিছুকে ধরেছিলাম, এবার সেই  জ্ঞানকে ছেড়ে দিলাম। জ্ঞান ছিল সমস্ত দ্বন্দ্বের কারন, আবার সেই জ্ঞান দিয়েই সমস্ত দ্বন্দ্বের দূরীকরন হলো, এবার জ্ঞানকেও ছুড়ে ফেলে দিলাম। এবার নগ্ন হয়ে স্বরূপে প্ৰতিষ্ঠিত হওয়া। 

কৈবল্যপাদ সমাপ্ত। 

শেষ হলো ঋষি পতঞ্জলীকৃত যোগদর্শনের অমৃতকথা। 

যোগীশ্রেষ্ঠ ঋষি পতঞ্জলির শ্রীচরণে  প্রণাম। 

ইতি  পাতঞ্জল যোগদর্শনম । 


    
  












 

   
 

  


 
 
  










    

   







 


  

  
     
 

























 

Comments

Popular posts from this blog

নিত্যকথা

ঈশ্বর ও তাঁর উপলব্ধি

সত্যধর্ম্ম ও প্রেম