ষড়রিপুর সাতকাহন ।


ষড়রিপুর  সাতকাহন 

উপনিষদে একটা সুন্দর রূপক গল্প আছে। প্রজাপতির ব্রহ্মার নাকি তিন সন্তান, দেবতা, অসুর ও মানুষ। তো এরা  তিনজন একবার পিতার কাছে গিয়ে উপদেশ প্রার্থনা করলেন। বললেন, হে পরমপিতা আমাদের কিছু জ্ঞান-উপদেশ দিন।  এখন প্রজাপতি ব্রহ্মা তো বেশি কথা বলতেন না, প্রায় সারাক্ষন ধ্যানস্থ হয়ে অবস্থান করতেন।  প্রশ্ন শুনে কিছুক্ষন অপেক্ষা করবার পরে, তিনি উচ্চারণ করলেন, "দ" এবং সন্তানদের  জিজ্ঞেস  করলেন, কিছু বুঝেছো ? দেবতা, মানুষ, অসুর সবাই সমস্বরে বলে উঠলেন, "হ্যাঁ বুঝেছি"।

এখন কথা হচ্ছে কি বুঝলেন তারা ? কেউ বুঝলেন - দান  করো, কেউ বুঝলেন, - দয়া  করো, আবার কেউ বুঝলেন দমন করো। আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় এই দমন করা  নিয়ে। এখন কথা হচ্ছে, কাকে দমন করতে হবে, দমন করতে হবে শত্রুদের। শত্রুর কথা উঠলেই, আগে বুঝতে হবে, কে আমাদের শত্রু ? আর কোথায় সেই শত্রু ? ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে বলেছিলেন, তুমিই তোমার শত্রু, আবার তুমিই তোমার মিত্র। তাই যদি হয়, তবে তো নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে। এখন নিজের সঙ্গে কিভাবে যুদ্ধ করবো ? নিজের হাত-পা কামড়াবো, না মাথার চুল ছিড়বো ? মুক্তানন্দ বলছেন, রিপু-দমন করতে হবে।  রিপু কথাটার অর্থ হচ্ছে শত্রু। তো কে আমার শত্রু, যাকে  দমন করতে হবে।  মুক্তানন্দ বলছেন, ছয়জন আমাদের শত্রু বা বিপু, যাকে  সংক্ষেপে বলা হয় ষড়রিপু। এই ছয়জন হচ্ছে, কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ-মদ-মাৎসর্য্য। মুক্তানন্দ বলছেন, এই যে ছয় রিপু, এরা তোমার কেউ নয়, তথাপি, তোমার সাথে সাথেই এরা  ঘোরাফেরা করছে। তোমার মধ্যেই এদের জন্ম, তোমার মধ্যেই এরা  ক্রিয়া করছে, আবার  তোমার মধ্যেই এদের মৃত্যু ঘটে থাকে। আমাদের শরীরে যেমন অসংখ্য কোষের জন্ম-মৃত্যুর খেলা চলছে, তেমনি তোমার মনের মধ্যে নানান গুনের সমাহার।  এই গুনগুলো তোমার মধ্যেই জন্মাচ্ছে, আবার তোমার মধ্যেই এদের মৃত্যু ঘটে থাকে। তোমার বাইরে এদের কোনো অস্তিত্ত্ব নেই।  তোমাকে নিয়েই এদের সংসার। এইসব গুন্ কিন্তু  ব্যক্তির নিজস্ব  ইচ্ছেতেই জন্ম হয়, ব্যক্তির মধ্যেই ক্রিয়া করে,  আবার ব্যক্তির ইচ্ছেতেই এদের মৃত্যু ঘটে থাকে। 

এখন কথা হচ্ছে এই যে কামাদি নামে যে  ষড়রিপু, এরা আমাদের কি প্রয়োজন সাধন করে যার জন্য, আমরা স্বেচ্ছায় এদের জন্ম দিয়ে থাকি ? আমরা সবাই, তা সে দেবতা বলুন, মানুষ বলুন বা অসুর বলুন আমরা সবাই সেই নিত্য, শুদ্ধ, পবিত্র, পরম পিতার সন্তান। আমাদের মধ্যে এই অনিত্য বস্তুর কেন জন্ম হয় ? 

তো আমরা একটু দেখে নেই, এই ষড়রিপুর প্রয়োজন কি - তারপরে আমরা তার দমনের কারন ও উপায় সম্পর্কে শুনবো।  

কাম  - দেখুন বায়ু না থাকলে, জীব ক্ষনিকের জন্যও জীবিত থাকতে পারে না। আবার এই বায়ু যখন তীব্র বেগে ধাবিত হতে থাকে, অর্থাৎ এই  বায়ু যখন  ঝড়-ঝঞ্ঝার আকার নেয়, তখন এই বায়ুই জীবের ধংসের কারন হয়ে থাকে। অগ্নি না থাকলে এই জগৎ প্রকাশ পেত  না, বৈশ্বানর অগ্নি না থাকলে, আমাদের খাদ্যাদি হজম হতে পারে না। অগ্নির আবিষ্কার মানব ইতিহাসের উন্নতির প্রথম সোপান। এই অগ্নিকে প্রজ্বলিত করেই, সাধক মূলাধার থেকে শক্তিকে  জাগ্রত করে সহস্রারে নিয়ে পরাশান্তি লাভ করেন।  আবার  এই অগ্নি আমাদের বাড়ি-ঘর এমনকি আমাদের দেহকে পুড়িয়ে ছাই  করে দিতে পারে। তেমনি কামাদি  প্রভাবে, যেমন মানুষ পাপ-কর্ম্মে লিপ্ত হয়, জগতে  অশান্তির কারন হয়, তেমনি এই কাম না থাকলে প্রেমের বিকাশ হতে পারে না। এই কাম-বাসনাই সমস্ত সৃষ্টির সোপান। পিতা  মাতার মধ্যে যদি কাম-বাসনা না জাগতো, তবে এই পৃথিবীতে সন্তান জন্মাতে  পারতো না। সুতরাং কাম  যেমন অনিষ্টকারী, তেমনি এই কাম  আমাদের প্রেমরূপ ইষ্টসিদ্ধির নিদান হতে পারে।  এই কামই তত্ত্বজ্ঞানের দহনে  দগ্ধ হয়ে বিশুদ্ধু প্রেমের জন্ম দিতে পারে। তাই বলা হয়, কামই শুদ্ধপ্রেমের জন্মদাতা। 

ক্রোধ : আবার দেখুন ক্রোধের প্রভাবে মানুষ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে এমন নিকৃষ্ট কাজ করে থাকে, যা তাকে পশুত্বের পর্য্যায়ে নামিয়ে নিয়ে আসে। ক্রোধে উন্মত্ত ব্যক্তির না থাকে কোনো বাক্যের সংযম, না থাকে কর্তব্য অকর্তব্য বোধ। এই ক্রোধের বশেই  মানুষ মানুষকে হত্যা করে ফেলে। এমনকি নিজেকেও যমালয়ে নিয়ে হাজির করে। এই ক্রোধ মানুষের শরীরের নানান রোগের  কারন হয়ে থাকে। ক্রোধে মানুষের চক্ষু লাল, শরীরে কম্পন, নাসিকা বিস্ফারণ, শ্বাস প্রশ্বাসের দ্রুতগতি, শরীরের মধ্যে হরমন ক্রিয়ার ব্যাঘাত ঘটে।  এমনকি হৃদযন্ত্রের ক্রিয়াকে স্তব্ধ করে দিতে পারে, এই ক্রোধ । এই রাগান্বিত ব্যক্তির না থাকে লাজ-লজ্জা ঘৃণা ভয়। তো ক্রোধ অশেষ দোষকর  শুধু নয়, এটি আমাদের নিজেদের পক্ষে অতি ক্ষতিকর। কিন্তু কামের শুদ্ধ অবস্থা যেমন প্রেম, তেমনি ক্রোধের সংস্কৃত অবস্থা হচ্ছে তেজঃ  বা ন্যায়পরায়ণতা। এই ক্রোধকে যিনি প্রজ্ঞা দ্বারা বশীভূত করতে পারেন, তাদেরকে বলা হয় তেজস্বী। ক্ষমা একটা গুন্, কিন্তু দুর্বলের ক্ষমা তার অক্ষমতার লক্ষণ। তাই তেজস্বী পুরুষের ক্ষমা আর দুর্বল পুরুষের ক্ষমার মধ্যে পার্থক্য হয়ে থাকে। দুর্বল নিজেকে রক্ষা করতে অক্ষম কিন্তু তেজস্বী পুরুষ শুধু নিজেকে নয়, অপরকে রক্ষা করতে অধিক সক্ষম হন।  তো তেজ মানুষকে স্বমহিমায় বেঁচে থাকতে সাহায্য করে থাকে। কিন্তু ক্রোধ মানুষকে ধংসের দিকে টেনে নিয়ে যায়। 

লোভ : এবার লোভের  কথায় আসি। লোভ থেকেই পাপের  উৎপত্তি হয়ে থাকে। লোভ সর্ব্বনাশা প্রবৃত্তি।  লোভ মানুষকে বিচলিত করে তোলে। লোভের বশে  মানুষের মন হয়ে ওঠে চঞ্চল। লোভ মানুষকে অন্যায় কার্য্যে লিপ্ত করে। লোভের  ফলে  বুদ্ধির মধ্যেও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। লোভে মানুষ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে লোভের আগুনে ঝাঁপ দেয়। আবার এই লোভ যখন সংস্কৃত হয়, তখন ঈশ্বর প্রাপ্তির ইচ্ছে জাগে। ব্রহ্মজিজ্ঞাসা জাগে, নিজেকে জানতে ইচ্ছে করে। এই যে ঈশ্বরকে পাবার লোভ, এ হচ্ছে  লোভের  সংস্কৃত অবস্থা। অতএব  লোভ আমাদের আশু দুঃখদায়ক হলেও, এই লোভ শুদ্ধ হয়ে সাধনমার্গে নিয়ে  যায় সাধককে। এমনকি এই লোভ একদিন মানুষকে ঈশ্বর সান্নিধ্যে এনে দেয়। 

মোহ : ষড়রিপুর মধ্যে চতুর্থ রিপু হচ্ছে মোহ। অজ্ঞানতার ফলে জন্ম হয় মোহের।  এইজন্য বলা হয়, অজ্ঞানতার আর এক নাম মোহ।  এই যে দেহে আত্মাভিমান বুদ্ধি - এটি  মোহের লক্ষণ। অবিদ্যা জনিত অহঙ্কারের  কারনে এই মোহ প্রাপ্ত হয়ে থাকে।  আমাদের যত দৈহিক কষ্ট তা এই দেহে আত্মজ্ঞানের কারনে হয়ে থাকে। আবার দেখুন, এই দেহে আত্মজ্ঞানের ফলেই, আমরা দেহকে  নীরোগ রাখবার জন্য, দেহকে  জরা ব্যাধি থেকে মুক্ত রাখবার জন্য আমরা সচেষ্ট হয়ে থাকি।  এই যে পৃথিবীর পার্থিব উন্নতি। তাও  এই পৃথিবীর প্রতি আমাদের মোহের কারনেই হয়েছে। জগতের প্রতি যদি আমাদের কোনো মোহ না থাকতো, তবে তার উন্নতির চেষ্টা করতাম না। আমরা যে মাতা-পিতা-স্ত্রী-পুত্র-পরিবার ইত্যাদির প্রতি যত্নশীল হই তার কারন হচ্ছে এদের প্রতি আমাদের মাত্রাতিরিক্ত মোহ। আবার দেখুন এই যে স্থূল দেহ, এই দেহ আমাদের সাধন-সম্পদ, এই দেহই ঈশ্বর সাধনার মাধ্যম। এই দেহ যদি সুস্থ-সবল-নীরোগ না  থাকে, তবে আমরা শুধু পার্থিব কর্ম্ম করতে অক্ষম হবো তাই নয়, আমরা আমাদের সাধনকর্ম্ম করবার যোগ্য থাকবো না। এইজন্য, সাধনার প্রথম অবস্থায় আমাদের অবশ্যই মোহ প্রয়োজনীয়, কিন্তু সাধন পথে ধীরে ধীরে এই মোহকে ত্যাগ করতে হবে। 

মদ - মদ কথাটার অর্থ হচ্ছে অহঙ্কার। এই অহঙ্কার  হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড়ো  শত্রু। অহঙ্কার  আত্মোন্নতির অন্তরায়। অহঙ্কারীর সাধন ভজন কেবলমাত্র বাহ্য  আড়ম্বর। কথায় বলে অহঙ্কারীর পতন অবশ্যম্ভাবী। আবার এই অহঙ্কার  না থাকলে, মানুষ নিজেকে কর্ত্তা, ভোক্তা, জ্ঞাতা ভাবতে পারতো না।  আমি-আমার বোধ না থাকলে, মানুষের বেঁচে থাকবার আনন্দই মাটি হয়ে যেতো। আমি আমার বোধ না জাগলে, কোনো ব্যক্তি নিজের উন্নতির চেষ্টাই করতো না। অহঙ্কার  আছে বলেই জগতের উন্নতি হচ্ছে। অহঙ্কার  আছে বলে আমি আমার উন্নতির চেষ্টা করছি। কিন্তু সাধন জগতে এই অহঙ্কারের বিলোপ সাধন করতে হয়। মহৎ মানুষ হতে গেলে, এই অহঙ্কারের বিনাশ করতে হয়। তো প্রথম অবস্থায়, জগতের উন্নতির জন্য যেমন অহঙ্কারের প্রয়োজন অনস্বীকার্য, তেমনি এই অহঙ্কারের  বিলোপ সাধন না হলে, সাধনমার্গে অগ্রসর হওয়া যায় না। অতএব, একথা বলা যায়  যে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহের মতো মদ বা অহঙ্কারের প্রয়োজন আছে। এই অহঙ্কারকে অবলম্বন করেই মানুষ নিজেকে সমৃদ্ধ করে, নিজেকে জ্ঞানী করে, এমনকি নিজেকে মহতের  পথে নিয়ে যায়। অহঙ্কার  না থাকলে, মানুষ কোনো কিছুতেই উৎসাহ দেখাতো না। এমনকি তার বেঁচে থাকবার ইচ্ছেও হয়তো থাকতো না।  আর যদিবা  বেঁচে থাকতো তবে সে জড়বৎ হয়ে যেত। সবকিছুতেই সে নিরুৎসাহ থাকতো। তাই অহঙ্কার না থাকলে আমাদের চলে না।  

মাৎসর্য্য : দেখুন, কোনোকিছুই এই জগতে বিনা কারনে সৃষ্টি হয়নি।  সব সৃষ্টি পিছনে সৃষ্টিকারীর একটা উদ্দেশ্য আছে। মাৎসর্য্য বলতে বোঝায় পরশ্রীকাতরতা। পরের ভালো দেখে নিজের মধ্যে কষ্ট  অনুভব করা। এই অপগুন মানুষের চিত্তের সংকীর্ণতার লক্ষণ। এই কারনে মাৎসর্য্যে  আক্রান্ত মানুষ সারাক্ষন দহনজ্বালা অনুভব করে। এটি একটি ভ্রান্তদর্শন।  পরের ফুলের বাগানে রঙ-বেরঙের ফুল দেখে, কারুর মধ্যে জ্ঞানের বৃদ্ধি  দেখে, বা কারুর সম্পদ বৃদ্ধি দেখে, নিজের মধ্যে যে অনল  সৃষ্টি হয়, তা তাকে খারের ন্যায় পুড়িয়ে মারে। কিন্তু যদি একটু অন্যদিকে থেকে ভাবেন, অন্যের উন্নতিতে যদি আপনার মধ্যে দহন  অনুভব না হয়, তবে আপনার মধ্যে উন্নতি করবার ইচ্ছে কি করে জাগবে ? অমুক ভালো চাকরি পেয়েছে, দেখে যদি আমার মধ্যে এর চেয়েও ভালো চাকরি পাবার ইচ্ছে জাগ্রত হয়, এবং সেইমতো যদি আমার মধ্যে কর্ম্মের উদ্দীপনা দেখা যায়, তবে এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে ? অন্যে  পারে, আমিও পারবো, এই বোধ অবশ্যই দরকার। তাই অন্যকে দেখে আমিও তদ্রুপ হবো।  তাই  এই মাৎসর্য্য প্রথম অবস্থায় অবশ্যই প্রয়োজনীয়। 

দেখুন, ভগবান যাকিছু আমাদেরকে দিয়েছেন , তার কোনো কিছুই অকারনে নয়। আমাদের যে ইচ্ছেশক্তি, তাও  সেই ভগবানের দান।  এই ইচ্ছে শক্তি যেমন মানুষকে ভালো বা উন্নত করতে পারে, তেমনি এই ইচ্ছেশক্তিই আমাদেরকে অধঃপতনের মূল।  আবার অন্য দিক থেকে বলা যেতে পারে, আমরা সবাই নিত্য-শুদ্ধ-মুক্ত পবিত্র আত্মা।  সেখান থেকে  ধীরে ধীরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে, নানান গুনের সমাহার হয়েছে আমাদের মধ্যে। নানা প্রবৃত্তির সৃষ্টি হয়েছে।  এর মধ্যে যেমন আছে  ভালো, তেমনি  আছে মন্দ। এই মন্দগুলোকে নিয়েই আমি নিকৃষ্ট মানের মানুষ হয়েছি।  আবার ভালোগুলোর মধ্যে প্রবেশ করতে পারলেই আমরা সবাই সেই পরমপিতা পরেমেশ্বরের সান্নিধ্যে এসে, শুদ্ধ-আত্মা বলে নিজেকে উপলব্ধি করতে পারবো। 

ষড়রিপু দমনের উপায়। 

আমরা জানি ত্রিগুণাত্বক এই প্রকৃতি - সত্ত্বঃ  রজঃ  ও তমঃ। আর এই ত্রিগুণের সমাহারের ভিন্নতা হেতু, মানুষের মধ্যে আচরণের মধ্যে ভিন্নতা লক্ষিত হয়। এর মধ্যে সত্ত্বগুণের  আধ্যিক্য হেতু মানুষ প্রসন্ন, প্রীতি, ধৃতি, স্মৃতি ইত্যাদি লাভ করে থাকে।  কিন্তু রাজস্ ও তামস গুণগুলো আমাদের মধ্যে যেমন ষড়রিপুর আধিক্য  এনে দেয়, তেমনি শোক-তাপ-ভয়-সন্দেহ- অনায্যতা এসে থাকে। 

এই প্রসঙ্গে মহাভারত থেকে একটা মহাপ্রস্থানের গল্প শুনে নেই।  পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদী মহাপ্রস্থানের উদ্দেশ্যে গমন করলেন। তো কিছুদূর যাবার পরে, প্রথমে দ্রৌপদী যোগভ্রষ্ট হয়ে, ভূপাতিত হলেন।  ভীমের প্রশ্নের জবাবে, যুধিষ্ঠির বললেন, দ্রৌপদীর স্বামী পাঁচ জন, কিন্তু অর্জ্জুনের প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্ত্ব ছিলো। তেমনি এই স্থূল  . শরীর  পঞ্চভূতের তৈরী। কিন্তু  বিশেষ ভূতের পক্ষপাতিত্ত্ব বা কোনো বিশেষ  ভূতের অনাবশ্যক আধিক্য হেতু  সমস্ত শরীরকে নড়বড়ে করে তোলে। 

এর পরে দেহ ছাড়লেন, সহদেব।  যুধিষ্ঠির বললেন,  এই সহদেবের মধ্যে ছিল প্রাজ্ঞ-অভিমান। নিজেকেই সবচেয়ে প্রাজ্ঞ মনে করতো। এর পরে নকুল দেহ ছাড়লেন, যুধিষ্ঠির বললেন, নকুলের ছিল রূপের গর্ব। এর পরে অর্জ্জুন দেহ ছাড়লেন, যুধিষ্ঠির বললেন, অর্জ্জুনের কথায় কথায় দম্ভ বশে শত্রুদমন প্রতিজ্ঞা করতো, কিন্তু সেই প্রতিজ্ঞা সে রক্ষা করতে পারতো না। এর পরে একদিন ভীম ভুতলে  পতিত হলো, যুধিষ্ঠির বললেন, অতিভোজন, ও আত্মশ্লাঘা ভীমকে ক্ষিতিতলে পতিত করেছে। 

এই গল্পের মধ্যে আমরা পাঁচটি গুরুত্ত্বপূর্ন কথা শুনলাম। ভীমের অতিভোজন, অর্জ্জুনের অসম্ভব প্রতিজ্ঞা, সহদেবের বৃথা পান্ডিত্যের গর্ব, নকুলের  রূপের গর্ব, ও দ্রৌপদীর স্বামী-পক্ষপাতিত্ত্ব। তাই এঁরা কেউ সশরীরে স্বর্গে গমন করতে  পারলেন না। কিন্তু যুধিষ্ঠিরের মধ্যে ছিল ধর্ম্মরূপী কুকুরের প্রতি প্রীতি, তাই তিনি সশরীরে স্বর্গে প্রস্থান করেছিলেন।

 যদিও সশরীরে আদৌ স্বর্গ নামক কোনো গুপ্তস্থানে গমন করা যায়, এমনটা আমাদের জ্ঞানের মধ্যে আসে না। 

ষড়রিপু দমনের উপায় সম্পর্কে বলা হয় :-  

১) "ঈশ্বর সর্ব্বব্যাপী, তিনি সব দেখছেন, তিনি সব শুনছেন, এমনকি আপনি যা কিছু চিন্তন করছেন, তার সমস্ত কিছুর জ্ঞাতা হচ্ছেন  ঈশ্বর ।" এই ভাবে নিজেকে ভাবিত করুন। এই ভাবনা প্রথম দিকে অবশ্যই নিছক কল্পনা ছাড়া কিছু নয়।  কিন্তু নিরন্তর এই ভাবনা থেকে আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন, যে ঈশ্বর সর্ব্বব্যাপী হয়ে অবস্থান করছেন। সব সময় আপনি ঈশ্বরের সান্নিধ্য উপলব্ধি করতে পারবেন।  আর এতেকরে আপনার মধ্যে অবশ্যই সৎভাবনার উদয় হতে থাকবে।  এমনকি আপনি বিপদের দিনেও উপলব্ধি করবেন, যে ঈশ্বর আপনাকে সর্বতোভাবে রক্ষা করছেন। নিজের প্রতি  বিশ্বাস বাড়তে থাকবে। আপনি জানবেন, যাকিছু আপনার পক্ষে শুভ তা আপনাকে ঈশ্বর অবশ্যই দান করবেন, এবং করছেন। আর যাকিছু আপনি প্রত্যাশা করেছিলেন, অথচ পাচ্ছেন না, সে সম্পর্কে আপনার মধ্যে একটা ধারণা  হবে, যে এগুলো হয়তো এই মুহূর্তে আপনার পক্ষে শুভ নয়।  এই মুহূর্তে হয়তো এগুলো পাবার যাগ্যতা আসে নি। সবচেয়ে সহজ ও কার্যকরী একটা উপায় হচ্ছে গায়েত্রী মন্ত্রের যথার্থ অর্থ জেনে তার মনন করা ।  

২) সবসময় জগদীশ্বরের স্মরণ করুন। এই জগদীশ্বরের চিন্তন আপনাকে এক জ্যোতির্ময় আলোর জগতে নিয়ে যাবে। আপনাকে ত্রুটিমুক্ত করে দেবে। আপনার মধ্যে যে দোষত্রুটি   ছিলো, তা ক্রমশঃ দূর হতে থাকবে। আপনার মধ্যে জ্ঞানালোকের আভাস  মিলতে থাকবে। আপনার মধ্যে থেকে ভয়, এমনকি মৃত্যুভয় দূর হতে শুরু করবে। 

৩) মহাপুরুষদিগের নিকটে ঐকান্তিক ভক্তিসহ একাগ্রচিত্তে প্রার্থনা করুন। যাদের পক্ষে এই অব্যক্ত ঈশ্বরের চিন্তন সম্ভব নয়, তিনি পছন্দমত মহাপুরুষের চিন্তন করুন। মহাপুরুষের চিত্র সামনে রেখে, অপলক  দৃর্ষ্টিতে তাকিয়ে থাকুন।  দেখবেন, একসময় এই মহাপুরুষ আপনার সাথে কথা বলবেন। ভাববেন  না, সত্যি সত্যি কেউ আপনার সাথে কথা বলছেন, মহাপুরুষ আপনার সামনে সশরীরে উপস্থিত হয়ে যাবেন, তবে একথা সত্য, আপনার মধ্যে দুটো সত্ত্বার উপস্থিতি  আপনি অবশ্যই  উপলব্ধি করতে পারবেন। এর মধ্যে একজন প্রশ্নকর্ত্তা, আর একজন হবেন উত্তরদাতা। আপনার মধ্যে সমস্ত সংশয়ের উত্তর এই অবস্থায় পেতে থাকবেন।  

৪) জগদীশ্বরের স্তুতি বাক্য উচ্চারণ করুন, ও তাঁর  কাছে রিপু দমনের জন্য প্রার্থনা করুন।  একটা জিনিস জানবেন, যিনি আমাদের জন্মের আগেই, আমাদের জন্য খাদ্যসামগ্রী  (মাতৃদুগ্ধ) এমনকি আশ্রয়ের ( মায়ের কোল ) স্থান সৃষ্টি  করেছেন, তিনি আমাদের সমস্ত অপূর্নতা সম্পর্কে জ্ঞাত। একাগ্র চিত্তের প্রার্থনার ফল প্রার্থনাকারীর মাত্রেই জ্ঞাত আছেন। 

৫)  এর পরে সর্ব্বভৌম প্রেম। সমস্ত জীবের মধ্যে সেই এক আত্মা বিরাজ করছে। তো যখন সাধক সমস্ত বিষয়ের  গভীরে প্রবেশ করেন, তখন তিনি একসত্ত্বাকে সমস্ত জীবের উপলব্ধি করতে পারেন। দেখুন, আমারা জন্মসূত্রে যে মা-বাবা-ভাই-বোন-আত্মীয় স্বজনের মধ্যে একটা একাত্মতা অনুভব করি। তেমনি  আমরা যখন কোনো গুরুদেবের কাছ থেকে দীক্ষা  নেই, বা কোনো সংঘের সদস্য হই,  তখন সেই সঙ্ঘের  সমস্ত সদস্যদের  আমরা গুরুভাই বলে থাকি। এবং যখন যেখানে সেই গুরুভাইয়ের দর্শন পাই, তার মধ্যে আমরা নিজের একজন আত্মীয়কে দর্শন করে থাকি। এমনকি আমরা যে সংস্থায় কাজ করি, সেই সংস্থার কোনো কৰ্ম্মীকে বিয়ে বাড়িতে দেখা পেলে, তার সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ বোধ করি।  

৬. সবশেষে বলি, তত্ত্বজ্ঞানের সম্যক উপলব্ধি করতে হবে। এই তত্ত্বগণের কথা আমাদের সমস্ত ধর্ম্মশাস্ত্রে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে। এই তত্বজ্ঞান আবার গুরুমুখে শ্রবণ করা বিধেয়। তত্ত্বজ্ঞানের মনন ও স্মরণ ধীরে ধীরে তত্ত্বজ্ঞানের উপল্বদ্ধিতে নিয়ে আসে সাধককে। তখন ষড়রিপুর উন্মাদ ক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত হয়ে, তাকে পরিত্যাগ করা শুধু সহজ সাধ্য হয়ে থাকে তাই নয়,  বারংবার কামাদির ধংসাত্মক কথা শুনতে শুনতে কামাদি  সম্পর্কে একটা ঘৃণার ভাব জেগে ওঠে, তখন তাকে পরিহার করবার জন্য সাধক অধিক যত্নশীল  হয়. এবং ধীরে ধীরে কামাদির অপসারণ ঘটে থাকে। অবশ্য একথাও ঠিক কামাদির  দমন না হলে তত্ত্বজ্ঞানের উপলব্ধি আসে না। 

------



      



Comments

Popular posts from this blog

নিত্যকথা

ঈশ্বর ও তাঁর উপলব্ধি

সত্যধর্ম্ম ও প্রেম