এই যে তিনটি পরিনাম অর্থাৎ অতীতের আমি, বর্তমানের আমি ও ভবিষ্যতের আমি এই তিন পরিণামের উপরে আমরা যদি সংযম অভ্যাস করতে পারি তাহলে আমাদের অতীতে কি ঘটেছিলো,বা ভবিষ্যতে কি ঘটবে সে সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান লাভ হবে। যদি আমরা সংযম করতে পারি, এই সংযম কথাটা আগে আমরা শুনেছি, সংযম হচ্ছে ধারণা-ধ্যান-সমাধিতে সিদ্ধিলাভ । এইবার এই সংযমী পুরুষ যখন কোনো বস্তুর ধর্ম্ম-পরিনাম, লক্ষণ-পরিনাম, ও অবস্থা-পরিনাম এই তিন রকম পরিণামের উপর সংযমবিদ্যার প্রয়োগ করেন, তবে সেই বস্তুর উপরে যোগীর পূর্ব-বৃত্তান্ত জ্ঞান ও ভবিষ্যৎ-বৃত্তান্ত জ্ঞান প্রাপ্ত হবেন।
একজন যোগীপুরুষ যখন বর্তমান কোনো বস্তুর বা জীবের বিষয়ে জানতে চান, তবে সেই বস্তুর মূল কারন, তার পরিবর্তন প্রক্রিয়া অর্থাৎ কতদিন ধরে পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে সে এই অবস্থায় এসেছে, এবং ভবিষ্যতে তার কি পরিনাম হবে, এবং সেটা হতে তার কত কাল লাগবে, এইসব পরিণামের উপরে যোগী যখন সংযমবিদ্যার প্রয়োগ করবেন, তখন তার সামনে সমস্ত কিছু প্রতক্ষ্যবৎ প্রতিভাত হবে। তখন তিনি বস্তুর ভূতকাল ও ভবিষ্যৎকালের স্থিতি-কাল, তার নাম-রূপ ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞাত হন। একটা বীজ দেখে অভিজ্ঞ চাষীব্যক্তি যেমন বুঝতে পারেন, এই বীজ থেকে কি ধরনের গাছ জন্মাতে পারে, অর্থাৎ ভবিষ্যৎ জানতে পারেন, বা এই বীজটি কখন কেমন ধরনের ফলের মধ্যে অতীতে ছিলো। একটা মানুষ বা জীবকে দেখে আমরা অনেকসময় অনুমান করতে পারি, তার কত বয়স। মানুষ বা জীবের পরমায়ু সম্পর্কে যদি আমাদের জ্ঞান থাকে তবে আমরা বুঝতে পারবো, তার সম্ভাব্য আয়ু কতদিন হতে পারে। অর্থাৎ আগে কি ছিলো , আর ভবিষ্যতেই বা কি হতে পারে।
ব্যতিক্রম : তবে একটা কথা বলি, যদিও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা শুধুই বর্তমানের উপরে নির্ভর করে, আর এই বর্তমান দাঁড়িয়ে আছে চলমান প্রতিটি পরিবর্তিত ক্ষণের উপরে । এই ক্ষণ ধারাবাহিক ভাবে বস্তুকে পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। এইজন্য ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অনেকসময় নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে থাকে। আপনি বাড়ি থেকে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরুলেন। এখন বাড়ির লোক ভাবতেই পারেন, আপনি দশটার মধ্যে অফিসে পৌঁছে যাবেন । কিন্তু এই যে অফিসে পৌঁছে যাবার সম্ভাবনা ৯৯% হলেও এর অন্যথা হতে পারে না, এমনটা নয়। পারিপার্শ্বিক কারনে ভবিষ্যৎ বদলে যাওয়া অসম্ভব নয়। তাই ভবিষ্যৎ পরিবর্তিত প্রতিটি ক্ষনের অবস্থার উপরে নির্ভর করে। একে নির্দিষ্ট করা যায় না। যোগী ক্ষনের নিয়ন্ত্রক নয়, দর্শক মাত্র।
"শব্দার্থ প্রত্যয়ানাম ইতরেতর অধ্যাসাৎ সঙ্করঃ তৎ প্রবিভাগ সংযমাৎ সর্বভূতরুৎ জ্ঞানম্।" (০৩/১৭)
শব্দের অর্থ ও তার জ্ঞানের পরস্পর আরোপ বশত মিশ্র বা সঙ্করজ্ঞান হচ্ছে। এই সঙ্করজ্ঞান বিশ্লেষণ করে অর্থাৎ সঙ্করজ্ঞানের উপরে সংযম করে সমস্ত প্রাণীর উচ্চারিত শব্দের অর্থজ্ঞান হয়।
ঋষি পতঞ্জলি এবার বলছেন, সমস্ত প্রাণীর ভাষা সন্মন্ধে জ্ঞান লাভের উপায়। বলছেন, শব্দ ও তার অর্থজ্ঞান এই দুয়ের, একের মধ্যে অন্যের অধ্যাস অর্থাৎ আরোপ বশতঃ, এই দুয়ের মধ্যে যে মিশ্রণক্রিয়া হয়ে চলেছে তার বিভাগ অর্থাৎ তাকে পৃথক বোধের বিষয়ে সংযম পালন করলে সমস্ত প্রাণীর ভাষা সন্মন্ধে জ্ঞান লাভ করা যায়। আরো একটু পরিষ্কার করে বলি, শব্দ ও তার অর্থের জ্ঞানগুলোর পরপস্পরের আরোপ বা অধ্যাস থেকে একটা মিশ্র বা সঙ্কর জাতীয় অভিন্ন জ্ঞান হয়। এবার তাদের প্রত্যেকটিকে পৃথক ভাবে সংযমের সাহায্যে যোগীর সমস্ত জীবের উচ্চারিত শব্দের জ্ঞান হতে পারে।
একটা শব্দ বাতাসের সাহায্যে আমাদের কানের পর্দায় আন্দোলন তুললো। আমাদের কানের সঙ্গে মাথার পিছন অবধি যে গ্রাহক তন্ত্রী আছে, এই তন্ত্রীর সাহায্যে শব্দ-তরঙ্গকে সে মস্তিষ্কের স্নায়ুতে পাঠিয়ে দিলো । সেখানে অর্থাৎ মস্তিষ্কে আমাদের যে পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল, তার সাহায্যে বুদ্ধি এই শব্দের অর্থ নির্ধারণ করলো। এবং নির্দিষ্ট অঙ্গে বিশেষ নির্দেশ পাঠিয়ে দিলো। যদি পূর্ব অভিজ্ঞতায়, তার এই অর্থ জ্ঞান নাও থাকে, তথাপি সে সতর্ক হলো, এবং এর অর্থ ও পরিনাম পর্যবেক্ষন করতে থাকলো। এর মাধ্যমে সে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করলো। অর্থাৎ প্রথমে শব্দ বাহিত হয়ে অর্থ নিরুপন হলো, এবং শেষে তা জ্ঞানে পরিণত হলো। আসলে শব্দের মধ্যে কোনো অর্থ নেই। অর্থ আছে আমাদের মস্তিষ্কে বা স্মৃতিতে । সেখান থেকেই সে শব্দাদির অর্থ সংগ্রহ করে। এইজন্য ঋষি পতঞ্জলি শব্দ ও অর্থজ্ঞান এই দুটো জিনিসের প্রতি ধ্যান দিতে বলছেন। আমরা আর একটু বিস্তারিত ভাবে বুঝে নেবো।
পৃথিবী সৃষ্টির আদিতে ভাষার সৃষ্টি হয় নি। তখন শুধু ধ্বনির মাধ্যমেই ভাবের বিনিময় হতো। জীবের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ভাষার সৃষ্টি হয়েছে, এবং ধীরে ধীরে ভাষার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু ভাষার বিভিন্নতাও বেড়েছে। কিন্তু অনুন্নত জীবের ক্ষেত্রে আজো সেই প্রাচীন শব্দ বা ধ্বনি দিয়েই তারা তাদের ভাব প্রকাশ করে থাকে। আর এই শব্দ বা জীবজন্তুর ভাষা আপনি যদি একটু খেয়াল করেন, তবে আপনিও বুঝতে পারবেন। যারা জীবজন্তুকে ভালো বাসেন, তারা এটা ভালোভাবে বোঝেন। এদের যখন খিদে পায়, এরা যখন ভালোবাসা পায়, বা এরা যখন ভালোবাসা জানায়, এদের যখন যৌনক্ষুধা পায়, এরা যখন ঝগড়া করে, এরা যখন ভয় পায়, এরা যখন খুশি হয়, প্রতি ক্ষেত্রে অভিব্যক্তি হিসেবে এদের স্বরের মধ্যে একটা তারতম্য লক্ষ করা যায়। আর এসব আপনি একটু মনোযোগ দিলেই বুঝতে পারবেন। এর জন্য আপনাকে বেশি বেগ পেতে হবে না। আপনি বাড়ির পোষ্য বিড়াল, কুকুর, পাখি - এমনকি গরু, ছাগল - এদের কথা আপনার বুঝতে বেশি বেগ পেতে হয় না। আমার স্ত্রীকে দেখেছি, তিনি তার পোষ্য বিড়ালের সাথে, কুকুরের সাথে এমনকি গাছের সাথে কথা বলেন । যখন তিনি এই পোষ্যদের আদর করেন, তখন তারা এক ধরনের আওয়াজ তোলে। আসলে শুধু আপনার আন্তরিকতা ও মনোযোগ বা একাগ্রতা দরকার। তখন এদের কথা আপনি আপনার মতো করে বুঝতে পারেন। ছোটবেলায়, আমি দেখেছি, গাভী গর্ভবতী হবার আগে ডাক ছাড়ে, আর গৃহস্থ ঠিক বুঝে যান, গরুর গর্ভবতী হবার সময় এসেছে। বিড়াল, কুকুর, বা বাড়ির যেকোনো পোষ্য, খাবার সময় হলে ডাকে। আপনি তখন তাকে খাবার দেন। পছন্দমত খাবার হয়ে গেলে, তার স্বরের পরিবর্তন হয়। এবং আপনি সেটা বুঝতে পারেন। এমনকি আপনার বাড়ির পাম্প মেশিনেরও একটা আওয়াজ আছে, যা শুনে আমরা বুঝতে পারি, মেশিন ঠিক আছে কি নেই, জল উঠছে কি না।
আমরা জানি, ধ্বনির গতি ভেদে ধ্বনির চারটি পর্যায়। পরা, পশ্যন্তী, মধ্যমা ও বৈখরী।
শব্দের বা স্বরের উৎপত্তি হচ্ছে পরা - আমাদের শরীরের ক্ষেত্রে এটি মূলাধার। এই মূলাধারে আছে বায়ুশক্তি বা উর্জ্জাশক্তি। সৃষ্টিতত্ত্বের এখানেই অবস্থান। এইখানেই ধ্বনির উৎপত্তি। পরা কথাটার অর্থ হচ্ছে উচ্চ। অর্থাৎ ধ্বনির সর্বোচ্চ পর্যায়, যা আমাদের গোচরীভূত নয়।
এর পরে আছে পশ্যন্তি : ধ্বনি মূলাধার থেকে উঠে আসে আমাদের নাভিমূলে। যার জন্য কেউ কেউ বলে থাকেন, প্রণব নাভি থেকে উৎপন্ন শব্দ। নাভিতে থাকাকালীন ধ্বনি থাকে অতি সূক্ষ্ম। আমাদের নাভিচক্রের বায়ু সঙ্গে মিশে থাকে, এই ধ্বনি । আপনি যদি গভীর ধ্যানে নিমগ্ন থাকেন, তবে এই ধ্বনি শুনতে পাবেন । একে বলে নাদব্রহ্ম।
ধ্বনি এর পরে, নাভি থেকে চলে আসে হৃদয়ে। এখানকার অবস্থানে ধ্বনিকে বলা হয়, মধ্যমা। হৃদয়ের বায়ুচক্রে যখন ধ্বনি অবস্থান করে, তখন তাকে বলে মধ্যমা। এটিও সূক্ষ্ম। তাই হৃদয়ের ডাক আমরা সবাই শুনতে পাই না।
এরপরে, কন্ঠে - যেখান থেকে ধ্বনির উৎপত্তি বলে সাধারণের ধারণা। আসলে এই পর্যায়ে এসে ধ্বনি শব্দে পরিণত হয়ে যায়। এই ধ্বনি বা শব্দ আমরা শুনতে পাই। একে বলে বৈখরী। বৈখরী হচ্ছে শ্রুতিগোচর শব্দ।
এবার বিশ্বব্রহ্মান্ডকে যদি আমরা বিরাট পুরুষের দেহ বলে কল্পনা করি, তবে দেখতে পাবো, সেই বিরাট পুরুষের মূল উর্জ্জাশক্তি থেকে এই ধ্বনির উৎপত্তি। এটি সৃষ্টির সূচক মাত্র। আসলে ধ্বনির কোনো অর্থ হয় না, কেবল গুন্ বর্তমান। আর এই গুনের বিচার ক'রে, আমরা এর অর্থ বের করেছি মাত্র।
শব্দ আবার দুই রকম : ধ্বনি ও বর্ণ। ধ্বনি অর্থবহ নয়। যেমন বিভিন্ন বাদ্যের বাজনা। কাঁসর ঘন্টা, বাঁশির সুর, বজ্রের ধ্বনি। মেঘের ডাক ইত্যাদি। এমনকি প্রণব বা ওঙ্কার কোনো অর্থবহ ধ্বনি নয়।
ধ্বনি রূপান্তরিত হয় বর্ণে। আর বর্ণ কিন্তু অর্থবহ। মানুষ এই বর্ণের সাহায্যেই কথা বলে। তাই বর্ণ অর্থবহ। বর্ণ আবার দুই প্রকার ব্যঞ্জন বর্ণ ও স্বরবর্ণ। স্বরবর্ণ নিজে থেকে উচ্চারিত হতে পারে। কিন্তু ব্যঞ্জন বর্ণ স্বরবর্ণের সাহায্যে উচ্চারিত হয়।
এখন, অগ্নি ও বায়ুর মিশ্রনেই বর্ণের সৃষ্টি। বর্ন আর কিছুই নয় আলোর বিন্দুর সমষ্টি। পরাবিদ্যাবিদ-গন বলছেন, দেবতারা যখন কথা বলেন, তখন একটা আলোর আভা দেখতে পাওয়া যায়। আসলে আমরাও যখন কথা বলি, তখন বাতাসের মধ্যে একটা অগ্নির তরঙ্গ প্রবাহিত হতে শুরু করে, সেটাই আমরা আমাদের কান নামক রিসেপ্টর বা গ্রাহক যন্ত্রের সাহায্যে অনুধাবন করি। আর এর পরের প্রক্রিয়া আমরা আলোচনার প্রথমেই শুনেছি।
এইবার আমরা শব্দের অর্থ সম্পর্কে শুনবো। শব্দ সবসময় অর্থবহ। আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করবার জন্য এই শব্দের ব্যবহার করি। শব্দের মধ্যেই ধ্বনি অনুরণিত হয়। এই শব্দের মাধ্যমেই আমাদের জ্ঞানের বিতরণ সম্ভব হয়। আমাদের মধ্যে যে ভাবের উদয় হয়, সেই ভাব প্রকাশের মাধ্যম হচ্ছে এই শব্দ। আবার আমাদের মধ্যে যে জ্ঞানের উদয় হয়, সেই জ্ঞান প্রকাশের মাধ্যম হচ্ছে এই শব্দ। কতকগুলো শব্দের মিশ্রনে তৈরি হয় বাক্য। কতকগুলো বাক্যের মিশ্রণকে আমরা বলি ভাষা। এই ভাষা যেমন সময় ও স্থান ভেদে, জাতিভেদে, আলাদা আলাদা হয় অর্থাৎ মনুষ্য জাতির ক্ষেত্রে এক রকম, জীব জন্তু ক্ষেত্রে এক রকম, পাখিদের ক্ষেত্রে অন্য রকম। প্রত্যেক জাতির ভাষা আলাদা। তেমনি এই ভাষার আবার ক্রমবিকাশ আছে।
যাই হোক। সৃষ্টির আদি ভাষার নাম বৈজিক বা বৈচিক ভাষা। অর্থাৎ সমস্ত ভাষার বীজ আছে এই ভাষার মধ্যে। এই বৈজিক ভাষা থেকেই এসেছে আমাদের বৈদিক ভাষা। বৈদিক ভাষা থেকে এসেছে সংস্কৃত, গ্রিক, ল্যাটিন, আরবি, হিব্রু, ইত্যাদি ভাষা। আর সংস্কৃত ভাষা থেকে এসেছে প্রাকৃত তারপর সমস্ত আঞ্চলিক ভাষা অর্থাৎ বাংলা - ওড়িয়া - আসামি - মারাঠি -হিন্দি- গুজরাটি- তামিল- তেলেগু ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন আমরা যদি বৈজিক ভাষা জানি তবে আমরা সমস্ত জীবের ভাষা, বা নিখিল বিশ্বের ভাষা জানতে পারবো, তা সে মানুষের হোক, আর পশু-পাখির ভাষাই হোক। এখন এটা আমরা জানতে পারবো কি করে ? এর জন্য তো কোনো বিদ্যালয় নেই। এটাই বলছেন, আমাদের মহর্ষি পতঞ্জলি, বলছেন শব্দ-অর্থ-জ্ঞান, এই তিনের মিশ্রিত অবস্থাকে আমাদের ধারনার বিষয় করতে হবে। এই তিনকে একবার আলাদা করে, আবার এই তিনকে একত্রিত করে বোধের বিষয়ে সংযম পালন করতে হবে। এই সংযম পালন মানে আমরা শুনেছি, ধারণা-ধ্যান-সমাধি করে সংযম আয়ত্ত্ব করা যায়। বাকশক্তির ধর্ম্ম হচ্ছে শব্দ। আর শব্দই ভাষার জন্ম দেয়। তাই জগতের প্রথম ভাষা, এই বৈজিক ভাষার উপরে সংযমের সাহায্যেই আমরা এই ক্ষমতা অর্জন করতে পারবো। অর্থাৎ ধ্বনির তারতম্য অনুসারে এর অর্থ জানতে পারলে যে জ্ঞান আমাদের হবে, তাতেই আমরা সমস্ত প্রাণীর ভাষা বুঝতে পারবো। আসলে সংযম-ই মূল, যা আমাদের সাধনার সাহায্যে আয়ত্ত্ব করতে হবে। ঔষধ একটাই, মাপকাঠি একটাই আর তা হচ্ছে সংযম, যা আমাদের ধারণা-ধ্যান ও সমাধির মাধ্যমে অর্জন করতে হবে, তবেই আমরা সমস্ত বিভূতি বা তথাকথিত অলৌকিক শক্তি অর্জন করতে পারবো। আর এই পথেরই সন্ধান দিয়েছেন, ঋষি পতঞ্জলি। সংযম হচ্ছে আমাদের একটা গুন্ বা শক্তি যা আমাদের চিত্তবৃত্তিকে ধ্যেয় বস্তুতে প্রবাহিত করতে সাহায্য করে, আর ঠিক তখন-ই আমাদের সেই বস্তু সম্পর্কে সত্যিকারের জ্ঞান লাভ হয় ।
------
"সংস্কার-সাক্ষাৎ করণাৎ পূর্বজাতি জ্ঞানম।"(০৩/১৮)
সংস্কার-সাক্ষাৎ অর্থাৎ সংস্কারের উপরে সংযম করলে পূর্ব জাতি অর্থাৎ পূর্বজন্মের জ্ঞান হতে পারে।
ঋষি পতঞ্জলি এখানে আমাদের পূর্বজন্মের জ্ঞান লাভের উপায় সম্পর্কে বলছেন। আমরা আমাদের জীবনের পূর্বপূর্ব দিনের কথা জানতে পারি কিভাবে ? স্মৃতির সাহায্যে। স্মৃতি হচ্ছে আমাদের পূর্বানুভূতি বিষয়ক জ্ঞান। অর্থাৎ যাকিছু আমরা আগে শুনেছিলাম, দেখেছিলাম, করেছিলাম, এমনকি যাকিছু আমরা চিন্তা করেছিলাম, অনুভব করেছিলাম, তা আমাদের অভিজ্ঞতা আকারে সঞ্চিত হয়ে আছে। এই অভিজ্ঞতা যে ভাণ্ডারে সংরক্ষিত থাকে, তাকে বলে স্মৃতি-ভান্ডার। এই স্মৃতি ভান্ডার থেকেই, আমরা প্রয়োজন মতো স্মৃতি-চারণ বা স্মরণ করতে পারি। স্মৃতির সাহায্যে আমরা আমাদের আগের দিনগুলোর কথা জানতে পারি। আমাদের যদি স্মৃতিশক্তি না থাকতো, তবে আমাদের আগের দিনের কথা কিছুই স্মরণে আসতো না। স্মৃতি আমাদের প্রত্যক্ষ জ্ঞান ভান্ডার - যা আমরা আগেই লাভ করেছি। তো আমাদের পূর্বপূর্ব দিনের কথা আমরা জানতে পারি, এই স্মৃতির ভান্ডার উন্মোচিত করে।
কিন্তু ঋষি পতঞ্জলি এই শ্লোকে বলছেন, সংস্কারের উপরে সংযম করতে হবে, তাহলেই আমাদের পূর্ব জীবনের জ্ঞান হবে । এখন এই সংস্কার কি ? কিভাবেই এর উৎপত্তি হচ্ছে, কিভাবে এটি আমরা রক্ষা করছি, কিভাবে এটি আমাদের উপরে ক্রিয়া করে থাকে, কিভাবেই বা এর নিস্পত্তি হতে পারে ? আর এই সংস্কারের উপরে সংযম করলে, কিভাবে আমাদের পূর্বজন্মের জ্ঞান লাভ হয়ে থাকে। আসলে ঋষি পতঞ্জলি যে সংস্কারের সাক্ষাৎ-এর কথা বলছেন, এই সাক্ষাৎকার হচ্ছে দেশ, কাল ও নিমিত্তের অনুভব। এই অনুভবই আমাদের পূর্ব জাতির জ্ঞান।
কথায় বলে স্বভাব যায় না ম'লে, ইল্লত যায় না ধুলে। এই প্রবাদ বাক্যে যে স্বভাবের কথা বলা আছে, এটি আসলে আমাদের সংস্কার। এই সংস্কারের বশে আমরা অধিকাংশ ক্রিয়ায় প্রবেশ করি। আবার আমরা যাকিছু করি না কেন, সেটি আমাদের অবচেতন মনে একটা দাগ কেটে যায়। এই যে দাগ একেই বলে স্মৃতি। এই স্মৃতি থেকেই জন্ম হয়, সংস্কারের। এইযে দাগ এটি হতে পারে সুখকর বা দুঃখজনক। আবার এটি হতেপারে বস্তুগত বা ভাবগত। এই যে দাগ, এটি হতে পারে, গভীর আবার হতে পারে হালকা। তো দাগ যখন গভীর হয়, তখন তা সহজে মুছে ফেলা যায় না। আমাদের পিতা-মাতার মৃত্যুর মতো ঘটনা আমরা সহজে মন থেকে মুছে ফেলতে পারি না। আবার অন্যদিকে পরশুদিন কি খেয়েছিলাম, তা হয়তো আমাদের আজ আর মনে নেই। এই যে সংস্কার অর্থাৎ স্মৃতির পাতায় গভীর দাগ তা যখন একসময় ইচ্ছেশক্তির সাহায্যে বিশেষ রূপ ধারণ করে, তাকে বলে বাসনা বা সংকল্প। আর এই বাসনা বা সংকল্প আমাদের কর্ম্মে প্রবৃত্ত করে থাকে। তো সংস্কার হচ্ছে আমাদের মনের মধ্যে কতগুলো ছবি, যা পূর্বথেকেই সংরক্ষিত হয়ে আছে। আর বাসনা হচ্ছে একটা শক্তি যাকে আমরা বলছি ইচ্ছেশক্তি। এই সংস্কার ও বাসনা যখন একত্রিত হয়, তখন মানুষ কর্ম্মে উদ্দীপনা অনুভব করে। তো সংস্কার হচ্ছে আমাদের অতীত স্মৃতি। স্মৃতি থেকে বাসনা, বাসনা থেকে কর্ম্ম। সংস্কার অতীত, স্মৃতি সাম্প্রতিক অতীত আর বাসনা হচ্ছে ভবিষ্যতের লক্ষ্য।
আমার কি ধরনের সংস্কার আছে, তা একটু খেয়াল করলেই, আমরা ধরতে পারি। সকালে বাহ্যক্রিয়ার সময়, বা খাবার পরে একটা সিগারেট চাই। এটি হয়তো বহুদিনের অভ্যাস বলতে পারেন। অর্থাৎ সংযমের (গভীর ধ্যানে) ফলে আমি আমার সংস্কারকে ধরতে পারলাম। এখন কথা হচ্ছে এই যে সংস্কারকে ধরতে পারলাম, তাতে কি হলো ? এতে আপনার মধ্যে স্মৃতির জাগরণ হতে পারে। অর্থাৎ কবে থেকে কিভাবে বন্ধুদের প্ররোচনায় আপনি এই সিগারেট খাওয়া একদিন শুরু করেছিলেন, তখন যে অনুভূতি হয়েছিল, সেই স্মৃতি আপনার মধ্যে জেগে উঠতে পারে। তাহলে বুঝতে পারছেন, আপনি যদি সংস্কারের উপরে সংযম করেন, তবে আপনি আপনার পুরানো দিনে ফিরে যেতে পারেন।
আমরা আগেই শুনেছি, সংস্কার স্মৃতি থেকে উৎপন্ন। বাছুরকে ধরে এগুলে যেমন মা-গাই পিছন পিছন আসে, কান ধরে টান দিলে যেমন মাথা চলে আসে, তেমনি আপনি যদি স্মৃতির গভীরে যেতে চান, অর্থাৎ পুরোনো দিনে যদি যেতে চান, তবে সংস্কারকে ধরে এগুতে থাকুন। আপনার ভিতরে কি কি সংস্কার আছে, দেখতে থাকুন। অনেক সময় দেখবেন, কাউকে কাউকে আপনার খুব পছন্দের মনে হয়, আবার কাউকে কাউকে দেখলে আপনার মধ্যে একটা বিরক্তির ভাব হয়, কারুর সাথে মিশতে ইচ্ছে করে, আবার কারুর সংসর্গ আমরা এড়িয়ে যেতে চাই। এই যে মনোবৃত্তি এটি যদি তাৎক্ষণিক কোনো ঘটনার ফলে না ঘটে থাকে, তবে জানবেন, এদের সঙ্গে আপনার জন্ম-জন্মান্তরের সম্পর্ক। আমরা যখন এই সংসারেসমুদ্রে দেহতরীতে সওয়ার হই, তখন একটা লক্ষ বা উদ্দেশ্য নিয়ে এই সংসারের মধ্যে প্রবেশ করি। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন এই ধরাধামে এসেছিলেন, তিনি নাকি তার সমস্ত পারিষদবর্গদের নিয়ে এই ধরাধামে অবতীর্ন হয়েছিলেন। ঠিক তেমনি জানবেন, কর্ম্মসূত্রে আপনি যাদের সঙ্গে আবদ্ধ, যাদের ঋণ আপনাকে শোধ করতে হবে, বা যাদের কাছ থেকে আপনার পাওনা গ্রহণ করতে হবে, এদের সবাইকে নিয়েই, আপনি এই ধরাধামে অবতীর্ন হবেন। এদের সঙ্গে দেনা-পাওনা মিটে গেলে, যেমন আপনাকে চলে যেতে হবে, তেমনি এই জীবনের দেনা পাওয়া মেটানোর জন্য আপনাকে আবার ভবিষ্যতে এদের সম্মুখীন হতে হবে। এই সত্য আমাদের উপল্বদ্ধিতে আসুক বা না আসুক, এই সত্য ধ্রুব - এর অন্যথা হবার নয়। ভোগ সম্পূর্ণ হয়ে গেল, কর্ম্মবীজের নাশ হয়ে গেলে, আমাদের আর এই সংসারে আসতে হবে না। তো সংস্কারের সাক্ষাৎকার হচ্ছে দেশ, কাল ও নিমিত্তের অনুভব, যা আমাদের স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলতে পারে, আর আমরা সেই দেশ-কাল-নিমিত্তের অনুভব করতে পারি।
------------
"প্রত্যয়স্য পরচিত্ত জ্ঞানম।" (০৩/১৯)
প্রত্যয় অর্থাৎ চিত্তবৃত্তি। নিজ চিত্ত বৃত্তির উপরে সংযমে যে জ্ঞান হয় তাতে অপরের চিত্তজ্ঞানও হয়ে থাকে।
আমাদের সবার মধ্যে আছে চিত্তের নানান বৃত্তি। আছে রাগ, দ্বেষ, ঘৃণা, ভয়, আনন্দ, স্ফূর্তি, দ্বিধা, দ্বন্দ ইত্যাদি। এই সব চিত্ত বৃত্তির উপরে সংযম অর্থাৎ গভীর ধ্যানে লিপ্ত হলে, এই চিত্ত বৃত্তির উদয়, স্বভাব, পরিণতি, ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞান হয়। আর জানবেন, এই একই বৃত্তিসকল যেমন আপনার মধ্যে ক্রিয়া করছে, তেমনি ক্রিয়া করছে অন্য সকলের মধ্যে। তো আপনি রেগে গেলে, ভয় পেলে, দুঃখ পেলে, আপনার মধ্যে অনুভূতি ও তার পরিণতি দেখা দেয়। এই পরিণতি অবস্থা ভেদে, সময় ভেদে, সামান্য পরিবর্তিত আকারে অন্যের মধ্যে প্রকাশ পেলেও এগুলোর চরিত্র মূলত এক। ফলত যার নিজের চিত্তবৃত্তির উপরে জ্ঞান হয়েছে, অর্থাৎ যিনি নিজের চিত্তবৃত্তিগুলোকে বিশ্লেষণ করে তার পরিণতি সম্পর্কে জ্ঞাত হতে পেরেছেন, তিনি অন্য একটা লোকের বাহ্যিক আচরণ দেখে বুঝে নিতে পারবেন, তার মনের মধ্যে কি চলছে। মহাত্মাগণ অপরের মুখমন্ডল, চোখের দৃষ্টি, মুখের হাসি, চলন, বলন ইত্যাদি, যা আসলে চিত্তবৃত্তির পরিণতি, পর্যবেক্ষন করে তার চিত্তের বৃত্তিগুলো সম্পর্কে জ্ঞাত হতে পারেন। আর এর জন্য জাদুকাঠি একটাই সেটি হচ্ছে সংযম।
----------
"ন চ তৎ সালম্বনং তস্য-অবিষয়ী ভূতত্বাৎ ।" (০৩/২০)
যেহেতু যোগিচিত্তের জ্ঞান বিষয়ীভূত নয়, তাই যোগীর পরচিত্ত জ্ঞান তার চিত্তগত বিষয়ের আলম্বনে হবে না।
প্রত্যয় বা চিত্তবৃত্তি সবসময় বিষয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তাই জ্ঞান সবসময় বিষয়ীভূত হয়ে থাকে। অর্থাৎ জ্ঞান মানেই কোনো না কোনো বিষয়ের জ্ঞান। এখন কেউ রেগে আছে, বা কেউ দুঃখ পেয়েছে, এটা তার মুখ দেখে বোঝা গেলেও, কি কারনে সে দুঃখ পেয়েছে, বা কি কারনে সে রেগে গেছে, সেসব কিন্তু যোগীর জ্ঞানের বিষয় হতে পারে না। অর্থাৎ সে সম্পর্কে তিনি জানতে পারেন না। আসলে সংযমী পুরুষ বিষয় বর্জ্জিত, নিরুদ্ধ চিত্ত হয়ে অবস্থান করেন। তাই তার জ্ঞান বিষয় বর্জিত হয়ে থাকে।
---------
"কায় রূপ সংযমাৎ তদ্ গ্রাহ্য শক্তি স্তম্ভে
চক্ষুঃ প্রকাশ-অসম্প্রয়োগে অন্তৰ্ধানম।" (০৩/২১)
শরীরের রূপের উপরে সংযম থেকে শরীরের রূপে অপরের চক্ষু-গ্রাহ্যশক্তি বাধাপ্রাপ্ত হলে, তখন অন্তর্ধান ক্রিয়া সিদ্ধ হয়।
এইসব যোগকথা আমাদের মতো সাধারনের কাছে ভোজবাজি বলেই মনে হয়। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, যোগীপুরুষ যখন তাঁর নিজের চিত্তবৃত্তি অন্যশরীরে সংযমের সাহায্যে অনুসঞ্চার করেন, তখন যোগীর স্থূল শরীর সাধারণ চক্ষে দেখার অযোগ্য হয়ে যায়। এর মানে এই নয় যে শরীরের অবলুপ্তি ঘটেছে। আসলে শরীর ও শব্দ তো আলোর তরঙ্গ বিশেষ। আর এই বিশেষ তরঙ্গে শরীর এমনকি শব্দ আমাদের কাছে দৃশ্যমান বা শ্রুতিগোচর হয়ে থাকে। আমরা যেমন অনেক শব্দ, যার তরঙ্গের মাত্রা অতিধীর বা অতিদ্রুত তা আমাদের কানের বা চোখের ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। তখন আমরা সেই শব্দ বা বিষয় (শরীর) আমাদের গোচরের বাইরে চলে যায়। একেই যোগীর অন্তর্ধান বলা হয়ে থাকে। এই বিশেষ বিদ্যা শুধু শরীরকে অন্তর্দ্ধান করতে সক্ষম তাই নয়, যেকোনো স্থানে এই শরীরের প্রকট করাও সম্ভব হয়ে থাকে।
এর পরের দিন আমরা শুনবো, মৃত্যুকালীন জ্ঞানের কথা। অর্থাৎ কোথায়, কখন, কিভাবে মৃত্যু হবে, তার বিবরণ শুনবো ঋষি পতঞ্জলির কাছ থেকে। এইসব আলোচনা বিস্তারিত করবার জন্য নিষেধাজ্ঞা আছে। পুঁথিগত বিদ্যা প্রয়োগে গুরুকরন আবশ্যিক। যথার্থ গুরুভিন্ন এই গুহ্যকথা শোনা বা বলা দুইই অপরিণামী। আমরা শুধু বইপড়া বিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবো। যোগশাস্ত্রে যোগবিভূতির আলোচনা আসলে, যোগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সচেতনার বার্তা বিশেষ।
--------
"সোপক্রমং নিরুপক্রমং চ কর্ম তৎ সংযমাৎ অপরান্ত জ্ঞানম অরিষ্টেভ্যো বা ।" (০৩/২২)
ফল প্রসবে উন্মুখ আর আপাতত ফল প্রদানে বিমুখ বা শীঘ্রই ফলদায়ী হবে এমন কর্ম্মের উপরে সংযম থেকে অরিষ্টভ্যঃ অর্থাৎ ত্রিবিধ দুঃখ-যন্ত্রণার (ক্লেশ) উপরে সংযম করলে মৃত্যুকালীন জ্ঞান হয়।
সাধনপদের আলোচনায় আমরা শুনেছিলাম, "সতি মুলে তদ্-বিপাকো জাতি-আয়ু-ভোগাঃ" - কর্ম্মের মুলে যদি ক্লেশ থাকে, তবে তার বিপাকজনিত কারনে আমাদের জাতি (জন্ম) আয়ু ও ভোগরূপে পরিনাম প্রাপ্ত হয়। এখানে অর্থাৎ এই শ্লোকে (০৩/২২) ঋষি পতঞ্জলি দুটো শব্দ ব্যবহার করেছেন, "সোপক্রম ও নিরুপক্রম" - সোপক্রম = স+উপক্রম অর্থাৎ সচেষ্ট বা প্রারম্ভযুক্ত। আর নিরুপক্রম অর্থাৎ চেষ্টা বিহীন। এক জন্মকালীন অবস্থায় অর্থাৎ সারা জীবনে আমরা যে কর্ম্ম করি, তা দুই ভাগে বিভক্ত একটা সচেষ্ট (সপোক্রম) অন্যটি হচ্ছে নিশ্চেষ্ট (নিরুপক্রম). এই দুই ধরনের কর্ম্মের উপরে সংযম করলে, মরণ সন্মন্ধি জ্ঞান হয়ে থাকে।
আমরা জানি প্রত্যেকটি কর্ম্মই কোনো না কোনো ফল প্রদান করে থাকে। আর এই কর্ম্মফল কখনো আগু ফল প্রদান করে, কখনও দীর্ঘকাল বাদে ফল প্রদানে উন্মুখ হয়ে থাকে। এখন এই কর্ম্মফল ভোগের জন্য উপযুক্ত দেহধারন করতে হয়। আর এই যে দেহধারন এটিই আমাদের জন্ম। আবার আমরা যখন এই স্থূল দেহ ত্যাগ করছি, তখন সারাটা জীবনে অর্থাৎ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্য্যন্ত যেসব কর্ম্ম করা হয়েছে, তা হতে তে পারে পুন্য কর্ম্ম বা অপূণ্য কর্ম্ম, তা কর্মশায়ে বিপাক হতে থাকে। এখন মৃত্যুকালীন অবস্থায় অর্থাৎ স্থূল দেহত্যাগের ঠিক
পূর্বমুহূর্তে মূর্ছা অবস্থায় বা অবশ অবস্থায়, সঞ্চিত কর্ম্মসংস্কার নতুন দেহের সৃষ্টি করতে উদ্যোগী হয়ে থাকে। এবং সঞ্চিত কর্ম্মরাশি অনুযায়ী যেমন জন্ম ও আয়ু নির্ধারিত হয়।
তো কর্ম্মফল থেকে উৎপন্ন ক্লেশরাশি পুরুষের জন্ম, আয়ু ও ভোগের নিমিত্ত একটা আধার তৈরী করে থাকে। আয়ুস্কালে সেই আধারের সুখ দুঃখ ভোগ হয়ে থাকে। কিন্তু কথা হচ্ছে জন্ম না হয়, কর্ম্মফল ভোগের জন্য। তো ভোগ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই দেহেই পুরুষের অবস্থান করা উচিত। তা কেন হয় না ? ভোগ শেষ না হওয়ার আগেই, কেন এই স্থূল দেহের নাশ হয়ে থাকে ? আসলে কর্ম্মফল ভোগের নিমিত্ত এই স্থূলদেহ। এই স্থূলদেহ যখন প্রাকৃতিক কারনে বা কালের প্রভাবে, ভোগের অযোগ্য হয়ে যায়, এমনকি এই দেহ যখন কর্ম্মের অযোগ্য হয়ে যায়, তখন পুরুষ এই স্থূলদেহ থেকে নিজেকে সরিয়ে নতুন স্থূল কর্ম্মদেহের সূচনা করেন । আর যিনি যোগবলে জ্ঞানপ্রভাবে কর্ম্মসংস্কার থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছেন, তিনি আর নতুন দেহে প্রবেশ করেন না। একেই বলে মুক্তি। কর্ম্ম থেকে মুক্তি, ক্লেশ থেকে মুক্তি।
বৃহৎ-আরণ্যক উপনিষদের ঋষি বলছেন "পুরুষের দেহে যে অগ্নি, তাকে বলে বৈশ্বানর। আমরা যে অন্ন ভোজন করি, তা ওই অগ্নিতে জীর্ন হয়। আমরা কানদুটো বন্ধ করলে, যে শো-শো শব্দ শুনতে পাই, তা ওই বৈশ্বানরের ধ্বনি। মানুষ যখন শরীর ত্যাগে উদ্যত হয়, তখন সে এই ধ্বনি শুনতে পায় না।
আধুনিক যুগের যুগপুরুষ, যোগাচার্য্য ঋষিপুরুষ শ্রীমৎ স্বামী শিবানন্দ সরস্বতী, তাঁর "বিবিধ প্রাণায়াম ও নেতি-ধৌতি" পুস্তকে কয়েকটি লক্ষণের কথা বলেছেন, যা মৃত্যুক্ষণকে পূর্বেই জানবার উপায় হতে পারে।
১. মৃত্যু যখন নিকটবর্তী হয়, তখন মানুষ নাসাগ্র ও জিহবার অগ্রভাগকে দেখতে পাবে না।
২. চোখের কোনে চাপ দিলে, একটা ক্ষুদ্র জ্যোতি দেখা যায়. যেদিন এই জ্যোতির্বিন্দু দেখা যাবে না, সেদিন থেকে দশ দিনের মধ্যে মৃত্যুর ডাক আসবে।
৩. বর্ষ, মাস, পক্ষের প্রথম দিন থেকে ১৬ দিন যাবৎ যদি শ্বাসবায়ু দক্ষিণ নাসিকায় প্রবাহিত হতে থাকে, এ ক্ষেত্রে তার ১৬ দিন পরে, বা ১৬ দিনের মধ্যেই, সে কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হবে, এবং এর ফলে তার এক মাসের মধ্যেই প্রাণবিয়োগ ঘটবে ।
৪. বর্ষ, মাস, পক্ষের প্রথম তিন দিন দিবারাত্র যার পিঙ্গলায় (দুই নাসাপুট দিয়ে) শ্বাস প্রবাহিত হয়, সে ব্যক্তি এক বৎসর মাত্র জীবিত থাকেন।
৪. বর্ষ, মাস, পক্ষের প্রথম দিন দক্ষিণ নাসিকা রুদ্ধ থাকে এবং বাম নাসিকায় অবিচ্ছেদ্য রূপে শ্বাস প্রবাহিত থাকে, তাহলে একমাসের মধ্যে তার মৃত্যু ঘটবে।
ব্যতিক্রম :
১. যদি কপাল কুহরে অতিরিক্ত শ্লেষ্মা সঞ্চয়ের কারনে কোনো নাসিকার শ্বাসপ্রবাহ বন্ধ থাকে।
২. দুর্ঘটনায় নাকের হাড় ভেঙে যদি নাসাপুট বন্ধ হয় এবং অস্বাভাবিক শ্বাস প্রশ্বাস প্রবাহিত হয়।
৩. যাদের দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়।
স্বামী শিবানন্দ সরস্বতী আরো বলছেন,যাদের দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়, তাদের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার কয়েক ঘন্টা আগে থেকে অবিশ্রান্ত ধারায় সুষুম্নায় (উভয় নাসিকায়) শ্বাস প্রবাহিত হতে থাকে। সুষুম্না বা উভয় নাসিকা দ্বারা বা মুখ দিয়ে সজোরে যখন শ্বাসবায়ু প্রবাহিত হতে থাকে, তখন তাকে বলে নাভিশ্বাস। এই নাভিশ্বাস আসন্ন মৃত্যুর কারন। তবে এই প্রসঙ্গে আমি একটা কথা বলি, যখন আমাদের উভয় নাসিকায় সমান ভাবে মৃদুগতিতে শ্বাস প্রশ্বাস প্রবাহিত হতে থাকে (সুষুম্নায়) তখন আমাদের ঈশ্বর চিন্তনের সময়, শুভ সময় । যোগীপুরুষগন এই সময়ের জন্য অপেক্ষা করেন, আর এই সময়ে তাঁরা নিজেদেরকে ঈশ্বর চিন্তনে মগ্ন রাখেন। ধ্যানাদিতে নিজেকে নিয়োজিত করেন। এইসময় আমাদের ঈশ্বর-উপল্বদ্ধির উপযুক্ত সময় বলে বিবেচিত হয় ।
--------------
"মৈত্র্যাদিষু বলানি।" - (০৩/২৩)
মৈত্রী-আদিষু অর্থাৎ মৈত্রী, করুণা, মুদিতা (উপেক্ষা) - ইত্যাদিতে সংযম করলে সেই বিষয়ে বল লাভ হয়।
আমাদের যে চিন্তা ভাবনা, তা মৈত্রী করুণা ও মুদিতা ইত্যাদি অবলম্বনে হয়ে থাকে। কোনো একটি বিষয়ে চিত্তবৃত্তির নিবিষ্ট হওয়াকে বলে ভাবনা। একনিষ্ঠভাবে কোনো বিষয়ের মধ্যে ভাবনাকে নিবিষ্ট করলে একটা শক্তি লাভ হয়। তো করুনার উপরে সংযম বা গভীর ধ্যান করলে, আপনার মধ্যে করুণা গুনের বৃদ্ধি হবে। আবার মৈত্রী বা মিত্রতা ভাবনার উপরে সংযমের প্রয়োগ করলে মৈত্রিগুণের বৃদ্ধি হবে। আবার উপেক্ষা অর্থাৎ মুদিতার উপরে সংযম করলেও উপেক্ষাগুনের বৃদ্ধি হবে। আসলে যার উপরে আপনি সংযম বিদ্যার প্রয়োগ করবেন, সেই বিষয়ের গভীরের জ্ঞান আপনার মধ্যে প্রকাশিত হবে।
ধারণা ধ্যান সমাধির অভ্যাসে যে সংযমবিদ্যার আয়ত্ত্ব হয়, তার প্রয়োগে বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করা সম্ভব হয়। এই যে বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করবার ক্ষমতা একেই ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, বল বা শক্তি বা বীর্যলাভ। এই বল বা শক্তিহীনের সাধনায় সিদ্ধি আসে না। এক বিষয়ে গভীর মনোযোগী হওয়ার অভ্যাসই সাধনা, আর সাধনা থেকে নানান রকম বল বা শক্তি লাভ হয়ে থাকে।
"বলেষু হস্তিবলাদীনি।" (০৩/২৪)
হাতির বলের উপরে সংযম করলে নিজ শরীরেও সেই বল অনুভব হয়।
হাতির বল কথাটার অর্থ অসীম শারীরিক বল। তো নিজের শারীরিক বল বৃদ্ধির সম্পর্কে ভাবনা করলে, শারীরিক বলের বৃদ্ধি হয়ে থাকে। আসল কথা হচ্ছে, সংযম সাধককে একটা মাত্র বিষয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন করে থাকে। আর ধীরে ধীরে সে সেই বিষয়ীভূত হয়ে যায়। মানুষ যেমন ধনের কথা চিন্তা করতে করতে ধনের মধ্যে প্রবেশ করে, তখন সে ধনী হয়ে যায় । যখন সে সংসারের কথা চিন্তা করে, তখন সে সংসারের মধ্যে প্রবেশ করে ও সংসারী হয়ে যায়। জ্ঞানের কথা চিন্তা করতে করতে জ্ঞানের মধ্যে প্রবেশ করে ও জ্ঞানী হয়ে যায়, তেমনি বল বা শক্তির কথা চিন্তা করতে করতে বল বা শক্তির মধ্যে প্রবেশ করে ও শক্তিমান বা বলবান হয়ে যায় । আর এই চিন্তাই একমাত্র কারন, যা একজন মানুষকে উন্নতি বা অবনতির দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে। এই চিন্তনের গভীর অবস্থাই হচ্ছে সংযম, যা সাধকের সাধনার উদ্দেশ্য। এই চিন্তাই আমাদেরকে একদিন শরীরের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছিলো, তাই আমায় শরীরী হয়ে গেছি। মোদ্দা কথা হচ্ছে আমাদের বোধশক্তিকে এক-বিষয়ভুক্ত করাই সাধকের লক্ষ।
"প্রবৃত্ত্যালোক ন্যাসাৎ সূক্ষ্ম ব্যবহিত বিপ্রকৃষ্ট জ্ঞানম।" (০৩/২৫)
প্রবৃত্তির আলোক চিত্তে পড়লে, যোগীর সূক্ষ্ম, বাধাযুক্ত ও দূরে স্থিত বস্তুর জ্ঞান হয়।
এর আগে, আমরা যখন সাধনপদ আলোচনা শুনেছি, তখন লক্ষ করেছি, ঋষি পতঞ্জলি বলেছিলেন, "বিশোকা বা জ্যোতিষ্মতী" - (০১/৩৬) অর্থাৎ শোকহীন চিত্ত জ্যোতিষ্মতী হয়ে ওঠে। যে যোগীপুরুষের হৃদয়পদ্মে সাধন প্রভাবে প্রকাশ-স্বভাব সম্পন্ন হয়েছে তাঁর চিত্ত যেমন শান্ত-ধীর তেমনি জ্যোতিকল্প প্রকাশে তা উদ্ভাসিত হয়ে থাকে। একেই সাত্ত্বিক প্রকাশ বলা হয়ে থাকে। এই যে জ্যোতি তা আসলে সাধকের অস্মিতার কল্পনাময় স্বরূপ।
ক্রিয়া যোগের নিরন্তর অভ্যাস করলে, বিভিন্ন জ্যোতিষ্ময় আলোকরূপগুলো এগিয়ে আসে। এগুলোর প্রকাশ থেকেই যোগী বুঝতে পারেন, যে তিনি সঠিক পথে এগুচ্ছেন। এগুলো আমাদের অস্মিতার স্বরূপ বিশেষ, যা কেবলই কল্পনা। আমাদের সাধারণ আমিত্বে সাথে মিশে আছে বিষয়বোধ, তাই বিষয়বতী প্রবৃত্তি আমাদের। আমাদের সবার হৃদয়ে আছে একটা সাত্বিক বুদ্ধি, তা এই জ্যোতিষ্মতী রূপে প্রকাশমান হয়ে থাকে। এই অস্মিতা তত্ত্বের ধ্যান-ই প্রথম অধ্যায়ে আমরা শুনেছি।
তো ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, অস্মিতার কল্পিত যে আলোকপ্রভা - তাতে সংযম করলে যোগী সূক্ষ্ম বস্তুতে বা দূরে অবস্থিত বস্তুতে সেই সাত্ত্বিক বুদ্ধির আলোক প্রভাবে সেই বিষয়কে জানতে পারেন।
----------------
"ভুবনজ্ঞানং সূর্যে সংযমাৎ।" (০৩/২৬)
সূর্যদ্বারে সংযম করলে, ভূবন সম্মন্ধী জ্ঞান হয়ে থাকে।
সূর্যদ্বার অর্থাৎ সুষুম্না দ্বার। ভুবন অর্থাৎ সপ্ত ভুবন (ভূঃ ভুবঃ, স্বঃ, মহঃ, জনঃঃ , তপঃ, সত্যম) । এই যে জনঃ লোক, তপঃলোক ও সত্যলোক - এই তিনে মিলে ব্রাহ্মলোক। মহর্লোককে বলা হয়, প্রজাপতিলোক। পাতাল থেকে শুরু করে, মেরুপৃষ্ঠ পর্যন্ত হচ্ছে ভুর্লোক, মেরুপৃষ্ঠ থেকে নক্ষত্রলোক পর্যন্ত অর্থাৎ এই যে তারকা শোভিত লোক, একে বলা হয়, ভুবর্লোক। আর এর বাইরে বা উর্দ্ধে যে সূক্ষ্ম লোক তাকে বলা হয় স্বর্গলোক। এই স্বর্গলোক আবার পাঁচভাগে বিভক্ত। এই হচ্ছে সপ্তদীপা বসুমতি। এই সমস্ত লোকেই ভিন্ন ভিন্ন বসবাসকারী আছে। এদেরকেই বলা হয়, দেবতা, অসুর, কিন্নর, যক্ষ, রাক্ষস, ভূত, প্রেত, অপ্সরা, কুষ্মান্ডু, ব্রহ্মদৈত্য ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে এই যে সাতটি লোকের কথা বলা হলো, এটি আমাদের বুঝবার সুবিধের জন্য। এই লোক হয়তো অসংখ্য। যত গভীরে আপনি প্রবেশ করতে পারবেন, ততই আপনার কাছে নতুন নতুন জগতের সন্ধান মিলবে। এইজন্য ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলেছিলেন, ঈশ্বরের শেষ করতে নেই। তাই সাধনার সমাপ্তি বলে কিছু হয় না।
ঋষি ব্যাসদেব বলছেন, মহর্লোক বা প্রজাপতির লোকে বাস করেন, সমগোত্রীয় পাঁচ পুরুষ। এঁরা হলেন, কুমুদ, ঋভুকুল, প্রতর্দন, অঞ্জনাভ ও প্রচিপভি। এরাই নিজেদেরকে পঞ্চভূত রূপে (ক্ষিতি, অপ , তেজ, মরুৎ , ব্যোম) প্রকাশ করেছেন। এঁরা কেবলমাত্র ধ্যানেই পরিতৃপ্ত। এঁরা সবাই তাই ধ্যানমগ্ন।
ব্রহ্মালোক তিনটি জনলোক , তপলোক, সত্যলোক। এই জনলোকে রয়েছে চার প্রকার যোনি। দেবযোনি, ব্রহ্মযোনী, পশুযোনি, প্রেতযোনি। ভুর্লোকের বাসিন্দাদের জন্ম হয় ব্রহ্মযোনি ও পশুযোনি থেকে। - আবার স্বেদজ, অন্ডজ, জরায়ুজ, উদ্ভিদজ (বীজ থেকে) - এই চারপ্রকার জন্ম প্রক্রিয়া লক্ষ করা যায়।
তপঃ লোকের বাসিন্দারা শারীরিক দিক থেকে তিন প্রকার - আভাস্বর, মহাভাস্বর ও সত্যমহাভাস্বর। এরাও ধ্যানাহারী। এঁরা যেমন উর্দ্ধলোক সন্মন্ধে জ্ঞান সম্পন্ন তেমনি নিম্নলোকের সম্পর্কেও জ্ঞান সম্পন্ন।
ব্রহ্মার তৃতীয়লোক হচ্ছে সত্যলোক। এখানে আছেন, অচ্যুত, সিদ্ধনিবাস, সত্যাভি ও সংজ্ঞা-সংজ্ঞী । এই অচ্যুতগণ স্থূল বিষয়ক সমাধি প্রজ্ঞায়ধ্যানে সমাধিস্থ। শুদ্ধনিবাসীরা সূক্ষ্ম বিষয়ক সমাধিপ্রজ্ঞায় ধ্যানমগ্ন। আর সংজ্ঞা-সংজ্ঞী অস্মিতা ধ্যানে নিমগ্ন। এঁরা সবাই ধ্যানসুখী হয়ে অবস্থান করছেন। এই সংজ্ঞা-সংজ্ঞীরাই ত্রিলোকে প্রতিষ্ঠিত।
এই সাতটি লোক মিলে ব্রহ্মলোক। বিদেহী দেবতারা কোনো বিশেষ লোকের বাসিন্দা নয়। এঁরা প্রকৃতির কোলে মোক্ষপদে প্রতিষ্ঠিত। যোগীপুরুষ যখন সূর্যনাড়ীতে (সুষুম্না) সংযমের অভ্যাস করেন, তখন তাঁরা যোগবিভূতির অধিকারী হন। আর এই যোগবিভূতির সাহায্যেই যোগীপুরুষগন এসব লোকের সাক্ষাৎ করে থাকেন।
সূর্যদ্বার হচ্ছে সুষুম্না নাড়ীর অভিমুখ। এটি নাভিদেশ থেকে আমাদের ব্রহ্মতালু পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে অর্থাৎ এই ব্রহ্মতালুতে অবস্থিত সুষুম্নার মুখকে বলা হয় ব্রহ্মরন্ধ্র। আমরা যখন মুন্ডক উপনিষদ শুনেছিলাম, তখন শুনেছি - সংযত-ইন্দ্রিয় যোগীপুরুষগন মৃত্যুর পরে এই সূর্যদ্বার পথে (উত্তরায়ণ মার্গে) ব্রহ্মলোকে প্রবেশ করেন। এখানেই সেই অবিনাশী অক্ষয়পুরুষ হিরণ্যগর্ভ বাস করেন।
মেরুদণ্ডের ভিতরে সুড়ঙ্গের মতো একটা ফাঁকা জায়গা আছে। এই ফাঁকা জায়গাতে লম্বালম্বি ভাবে দন্ডায়মান আছে সুষুম্না নাড়ী। এই সুষুম্না নাড়ীর মধ্যে আছে বজ্রাক্ষা নাড়ী। বজ্রাক্ষ্যা নাড়ীর মধ্যে আছে চিত্রাণি নাড়ী। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন সূর্যদ্বারে অর্থাৎ সূর্যনাড়ীর মুখে (সুষুম্না নাড়ীর মুখে) মনকে নিবিষ্ট করে ধ্যানস্থ হলে বা সংযম পালন করলে, এই সপ্তভুবন সম্পর্কে জ্ঞান হয়। তবে এসবই যোগের বিভূতি বিশেষ। বুদ্ধিমান দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যোগীপুরুষ এসবের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে, পুরুষ-প্রকৃতির অভেদাত্মক জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হয়ে, আবার প্রকৃতি থেকে পুরুষকে অর্থাৎ চিৎ ও জড়ের বন্ধন মুক্তির জন্য সচেষ্ট হন।
-------
"চন্দ্রে তারাবুহ্য জ্ঞানম। " (০৩/২৭)
চন্দ্রদ্বারে অর্থাৎ নাসিকাগ্রে সংযম করলে সমস্ত তারকা মন্ডলের সন্নিবেশের জ্ঞান হয়।
এর আগে শুনেছি, সূর্যদ্বারে সংযমের কথা। এবার বলছেন চন্দ্রদ্বারে সংযমের কথা। চন্দ্রদ্বারে অর্থাৎ নাসিকাগ্রে সংযম করলে সূর্য অস্তগামী হলে যে জগতের প্রকাশ দেখা যায়, সেই তারাদের সংস্থান ও সন্নিবেশের সম্পর্কে জ্ঞান জন্মে। বলা হয় সূর্যদ্বারে সংযম করলে যেমন উত্তর মার্গে গমন হয়, সাধককে আর ফিরে আসতে হয় না, কিন্তু চন্দ্রদ্বারে সংযমী পুরুষের দক্ষিণ মার্গে গতি হয়ে থাকে, অর্থাৎ তাকে আবার ফিরে ফিরে আসতে হয় বা জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হতে হয়। ।
"ধ্রুবে তৎ-গতিজ্ঞানম।" (০৩/২৮)
ধ্রুব মণ্ডলে সংযম করলে তার গতির জ্ঞান হয়।
ধ্রুব মন্ডল বলতে কি বোঝায় ? ধ্রুব কথাটার অর্থ নিশ্চল। ধ্রুব-মন্ডল অর্থাৎ নিশ্চল স্থান - যার কোনো গতি নেই, পরিবর্তন নেই। আমরা আকাশে যত তারা দেখি, তা গতিসম্পন্ন - অর্থাৎ সর্ব্বক্ষন স্থান পরিবর্তন করছে। বলা হয়, ধ্রুব তারামন্ডলের কোনো গতি নেই। যদিও প্রকৃতিতে স্থির বলে কিছু হয় না। জগতের সবকিছুই গতিশীল। (আসলে ধ্রুব মন্ডল গতিশীল কিন্তু পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে ধ্রুবমন্ডল একই গতিতে ঘুরছে, তাই একে গতিহীন বলে মনে হয়)।
যোগশাস্ত্রে নিশ্চল আকাশ হচ্ছে, চিদাকাশ। আমরা চোখ বুজে চোখের সামনে যে আকাশকে দেখতে পাই তাকে বলে চিদাকাশ। এই আকাশের মধ্যে নিশ্চল ধ্রুবতারার মতো একটা আলোর বিন্দু দেখতে পাওয়া যায়। এই আলোর বিন্দুর উপরে মনকে নিবদ্ধ করতে পারলে, মন শান্ত হয়ে যায়। গতি অর্থে চঞ্চলতা। মন সদা চঞ্চল। গতিজ্ঞান বলতে বোঝায়, শরীরের মধ্যে মনের গতিজ্ঞান। আমাদের শরীরের যেখানে আঘাত প্রাপ্ত হয়, সেখানে মন ছুটে যায়। আর বিষয়ের সঙ্গে বা ঘটনার সঙ্গে মনের সম্পৃক্ততা হেতু আমাদের সুখ-দুঃখের অনুভূতি হয়ে থাকে। আজ্ঞাচক্রে মনকে নিবিষ্ট করলে মনের গতিজ্ঞান জন্মায়। আর এতে করে মনকে প্রথমে হৃদয়চক্রে (হৃদয়াকাশে) তার পরে আজ্ঞাচক্রে (চিদাকাশে) গুটিয়ে আনার ক্ষমতা জন্মায়। একেই মনের উর্দ্ধগতি বলা হয়ে থাকে। আর মনকে শুদ্ধ করে উর্দ্ধরেতা করাই তারা-মন্ডল সূর্য-মন্ডল, জ্যোতিষ্ক মন্ডল ইত্যাদির জ্ঞান।
"নাভিচক্রে কায়ব্যূহ-জ্ঞানম।" (৩/২৯)
নাভিচক্রে সংযম করলে কায়ব্যূহ জ্ঞান জন্মে।
নাভিচক্রে অর্থাৎ যোগশাস্ত্রে যাকে বলা হয় মনিপুর চক্র। আমাদের সৃষ্টিধর্ম্মি ক্রিয়াসকল এখান থেকে মূত্রদ্বার পর্যন্ত বিস্তৃত। শরীর, মন, আত্মা এই তিনে মিলে "আমি"। সত্ত্ব রজঃ এই ত্রিগুণাত্বক প্রকৃতি থেকে "আমি"। বায়ু, পিত্ত, কফ -- এই তিন হচ্ছে শরীরের মূল। শরীর একটা মিশ্র ধাতব পদার্থ। ধাতুগুলো হচ্ছে ত্বক, রক্ত, মাংস, স্নায়ু, অস্থি, মজ্জা, ও শুক্র। নাভি হচ্ছে শরীরের মূল বা শেকড়। এই নাভিমূল থেকেই বোগের মতো, আরো একটা স্থূল শরীর মায়ের শরীর থেকে উৎপন্ন হয়। ভূমিষ্ট হলে, মায়ের এই নাভিমূল থেকে শিশুর শরীরের নাভিকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। এই সব কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু এই সত্যের গভীরে আমরা প্রবেশ করি না। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, সাধক যখন নাভিমূলে মনকে সংযত করেন, তখন তিনি এই সত্যের সাক্ষাৎ করেন। মন, বুদ্ধি, চিত্ত অহঙ্কার - এগুলো যেমন ত্রিগুণের প্রভাবে বিচলিত হচ্ছে, তেমনি শরীর বায়ু, পিত্ত, কফের প্রভাবে বিচলিত হচ্ছে। চিত্তের সংযমের জন্য দরকার শরীরের সংযম। শরীরের সংযমের ফলে আমাদের মনের বৃত্তি সকলের স্থিরতা আসে। তো যে শরীরের সংযমের কথা বলা হচ্ছে, - তা এই নাভিমূলে সংযমের ফলে ঘটে থাকে। তখন শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সচেতন হয়ে ওঠে। এই সচেতনতাই সাধককে ধারণা, ধ্যান, সমাধির দিকে অগ্রসর করিয়ে দেয়। তো পঞ্চভূতের শরীর, যাকে আমরা "আমি" বলে ভাবি, যারজন্য, আমরা আমাদের সমস্ত ক্রিয়া সংগঠিত করতে পারছি, যাকে আশ্রয় করে এই মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহঙ্কার, এমনকি স্বয়ং আত্মা বিরাজ করছেন, তাকে জ্ঞাত হওয়া একজন সাধকের কাছে খুবই গুরুত্ত্বপূর্ন। আর যোগশাস্ত্র মতে এটি নাভিমূলে মনকে সংযত করেই সম্ভব হতে পারে।
-------------------
"কণ্ঠকূপে ক্ষুৎ-পিপাসা নিবৃত্তি। "(০৩/৩০)
কণ্ঠকূপে সংযম করলে ক্ষুধা-তৃষ্ণার নিবৃত্তি হয়।
কণ্ঠকূপ কথাটার অর্থ জিহ্বামূল। এই জিহ্বার মুলে সংযমের অভ্যাস করলে ক্ষুধা-তৃষ্ণার নিবৃত্তি হয়ে থাকে।
মুখ দিয়ে আমরা কথা বলি, অর্থাৎ শব্দের উচ্চারণ করি। আবার এই মুখ দিয়েই আমরা খাদ্য গ্রহণ করি। এই মুখের গহ্বরে আছে দুটো নালী, একটি খাদ্যনালী, আরেকটি হচ্ছে শ্বাসনালী। এই দুটোর সংযোগস্থলকে বা সন্ধিস্থলকে বলে কণ্ঠকূপ। অর্থাৎ জিহ্বার মুলে তন্তুস্থান, তার নিচের অংশ কন্ঠ, তার নিচে কণ্ঠকূপ।
ক্ষুধা-তৃষ্ণা মানুষের শরীর রক্ষার প্রাথমিক শর্ত। যার মধ্যে থেকে ক্ষুধা অর্থাৎ অন্ন গ্রহণেচ্ছা মরে গেছে, যার মধ্যে তৃষ্ণা-বোধ চলে গেছে, তার মধ্যে শরীর-পাতের লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে, ধরে নিতে হয়। শ্বাস-প্রশ্বাস যেমন আমাদের প্রতিনিয়ত গ্রহণ-বৰ্জন করতে হয়, তেমনি খাদ্য-পানীয় আমাদের প্রতিনিয়ত গ্রহণ-বৰ্জন করতে হয়। এই নিয়মের অন্যথা হলে, শরীরপাত অবশ্যম্ভাবী।
এখন, আমরা লক্ষ করেছি, ভারতের দুর্গম পাহাড়ে, বা গভীর অরণ্যে আজও অনেক সাধু-মহারাজ আছেন, যাঁরা পরিমিত আহার সংগ্রহ করতে পারেন না। এমনকি সেখানে পর্যাপ্ত অক্সিজেনও নেই। তথাপি সেখানে কিভাবে সাধু-মহারাজগন শরীর রক্ষা করছেন ? কেউ কেবলমাত্র কন্দমূল খেয়ে, কেউ শুধু নিমপাতার রস খেয়ে, বা বিশেষ কিছু লতাপাতা খেয়ে বেঁচে আছেন, কেউ কেবলমাত্র দুধ খেয়ে শরীর রক্ষা করছেন, কেউ নাকি কেবলমাত্র হাওয়া খেয়ে শরীর রক্ষা করছেন। এটা কিভাবে সম্ভব ?
আসলে আমাদের ক্ষুধা-তৃষ্ণা একটা বিশেষ বোধমাত্র। আপনার যখনই মনে হবে, অনেকক্ষন কিছু খাইনি, তখন আপনার মধ্যে খাবার ইচ্ছে জাগ্রত হবে। এমনকি খাবার দেখলেও, আপনার মধ্যে খাবার ইচ্ছে জাগতে পারে। আমি নিজে দু-একদিন না খেয়ে দেখেছি, মন যখন ধ্যানস্থ তখন ক্ষুধাতৃষ্ণা থাকে না। কিন্তু মন যখন ধ্যান থেকে উত্থিত হলো, তখন ক্ষুধা-তৃষ্ণা বোধ জেগে উঠলো। এমনকি শরীরটা আনচান করতে লাগলো, দুর্বল লাগতে লাগলো, মন ম্রিয়মান বোধ করতে লাগলো। ধ্যানস্থ অবস্থায় এই বোধ ছিলো না। তখন সাময়িকভাবে শারীরবোধ ছিল না, মনটা ছিল উৎফুল্ল।
আমাদের যেমন সুখ-দুঃখের অনুভূতি হয়, তেমনি আমাদের মধ্যে একটা অভাববোধ তৈরী হয়। অর্থাৎ খাদ্যাভাব, বা জলের অভাববোধ তৈরী হয়। আসলে আমরা যাকিছু সংগ্রহ করি, তার বেশির-ভাগটাই মল -মূত্রের আকারে বেরিয়ে যায়। সামান্যতম অংশই আমাদের শরীর গ্রহণ করে থাকে। অনেক সময় আমরা দেখেছি, একটা বিশেষ সময়ে আমাদের ক্ষুধা পায়। অর্থাৎ একটা অভ্যাসবসে সকাল-দুপুর-রাত্রে আমাদের ক্ষিধে পায়। আমরা এও লক্ষ করেছি, যখন কোনও পছন্দের কাজে আমরা মনোযোগী হই, এমনকি বিনোদনে লিপ্ত হই, তখন আমাদের ক্ষুধা-তৃষ্ণা বোধ থাকে না। বয়স্ক লোকের মধ্যে দেখেছি, সকালে কিছু খেয়েছেন কি না, তা তিনি ভুলে গেছেন। হয়তো যখন মনে খাদ্যের কথা স্মরণে এসেছে, তখন তিনি আবার খাবার খেতে চাইছেন। যাইহোক, এই ক্ষুধাতৃষ্ণা থেকে অব্যাহতি কিভাবে পাওয়া যেতে পারে ?
এই প্রশ্নের উত্তর আছে ঋষি পতঞ্জলির এই শ্লোকে। বলছেন, কণ্ঠকূপে সংযম করলে (মনকে ধারাবাহিক ভাবে নিবদ্ধ করলে) ক্ষুধা তৃষ্ণা থাকে না। আসলে আমাদের মুখের মধ্যে সারাক্ষন জারক-রস নিঃসৃত হচ্ছে - যা আমাদের হজমের সহায়ক। অর্থাৎ ভোজ্য বস্তু থেকে নির্যাস বার করবার ক্ষমতা রাখে এই জারক রস। এই কন্ঠমূলে মনকে নিবিষ্ট করলে, আরো এক ধরনের রস নির্গত হয়, যা স্বাদ ঈষৎ মিষ্টি। এটি মধুর চেয়েও অধিক শক্তিপ্রদ। এতে যেমন তৃষ্ণার নিবৃত্তি ঘটে, তেমনি ক্ষুধারও নিবৃত্তি ঘটে। সাময়িক ভাবে এতে শরীর রক্ষা হলেও, দীর্ঘকাল এর দ্বারা শরীরকে রক্ষা করা যায় না। তবে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় আমাদের মনের বা শরীরের মধ্যে যে বিচলিত ভাব হয় - তার চিরতরে নিবৃত্তি ঘটে থাকে। আসলে যোগীপুরুষ শরীর রক্ষা ও শরীর ছাড়ার মধ্যে যে পার্থক্য, তাকে ক্ষীণ করে এনেছেন। তাই ক্ষুধা তৃষ্ণায় তাঁদের মধ্যে চঞ্চলতা আসে না। এসব ক্রিয়া সংসারী ও পরিশ্রমী মানুষদের জন্য নয়।
---------
"কুর্মনাড্যাং স্থৈর্যম। " (০৩/৩১)
কূর্ম নাড়ীতে সংযমের অভ্যাস করলে (চিত্তের) স্থিরতা আসে।
এর আগে আমরা শুনেছি কণ্ঠকূপে সংযমের অভ্যাস করলে ক্ষুধা তৃষ্ণার নিবৃত্তি হয়। এবার বলছেন, কুর্ম নাড়ীতে সংযম করলে স্থিরতা আসে। কিসের স্থিরতা না চিত্তের স্থিরতা। আমরা যে শুনেছি, জিহবার মুলদেশের নিচে আছে তন্তু স্থান, তার নিচের অংশ হচ্ছে কন্ঠ, তার নিচের অংশ হচ্ছে কণ্ঠকূপ। এবার এই কন্ঠকূপের (শ্বাসনালী ও খাদ্যনালীর সন্ধিস্থলের) নিচে বুকের মধ্যে কুর্ম বা কচ্ছপের আকার বিশিষ্ঠ নাড়ী আছে। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এই কুর্ম নাড়ীতে সংযমের অভ্যাস করলে চিত্তের স্থির-পদ লাভ হয়। অর্থাৎ চিত্তের যে স্বভাব-চঞ্চল ভাব, তা কমে যায়। তো প্রথমে ক্ষুধা-তৃষ্ণা থেকে অব্যাহতি, তারপরে চিত্তের স্থিরতা। আসলে বায়ুকে স্থির ক'রে কুর্ম নাড়ীতে সংযম করতে হয় । আমরা প্রাণায়াম সম্পর্কে আলোচনার সময় শুনেছি, কুম্ভকের কথা। এই কুম্ভক আসলে বায়ুকে কুর্ম নাড়ীতে স্থির করবার ক্রিয়া বিশেষ।
"মূর্ধজ্যোতিষি সিদ্ধ দর্শনম। " (০৩/৩২)
মূর্ধার জ্যোতিতে সংযমের অভ্যাস করলে সিদ্ধ পুরুষের দর্শন হয়।
মূর্ধা অর্থাৎ আমাদের মাথার তালু প্রদেশ। আমাদের মাথার যে স্কাল বা বাইরের অংশ (কপাল) তার তিনটে ভাগ। এই তিনটির সংযোগস্থলে অর্থাৎ মাথার উপরে ঠিক মাঝখানে একটা অতিক্ষুদ্র ছিদ্র আছে। বলা হয়, এই পথ দিয়ে বিশ্বজ্যোতিঃশক্তি প্রতিনিয়ত ব্যষ্টির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন । এই অতিক্ষুদ্র ছিদ্রকেই বলা হয় ব্রহ্মরন্ধ্র। আজ্ঞাচক্রে ধ্যান করলে আমরা চিদাকাশে উজ্জ্বল জ্যোতির দর্শন পাই, তা আসলে এই ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে প্রবেশ করে থাকে। অর্থাৎ ভ্রূমধ্যে ধ্যান করলে, একটা জ্যোতির্মণ্ডল আমাদের সামনে ভেসে ওঠে। এখানেই সাধকের ধারণা, ধ্যান করতে হয়। এই মূর্ধা-জ্যোতির গভীর-ধ্যান করলে দেবযোনি সম্ভূত দেবদেবীর বা দেবলোকবাসী যোগীপুরুষ অর্থাৎ সিদ্ধ মহামানবদের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়।
"প্রাতিভাদ্বা সর্বম।" (০৩/৩৩)
প্রতিভা জনিত জ্ঞানে সংযম করলে সবকিছু জানতে পারা যায়।
প্রাতিভ কথাটার অর্থ হচ্ছে প্রতিভাবান বা তীক্ষ্ণ বুদ্ধিশালী। এই যে প্রতিভাজনিত জ্ঞান, এটি আসলে যোগসাধনার অন্তরায়। এটি যোগসাধনার বিঘ্নকর উপসর্গ। অর্থাৎ বুদ্ধি দিয়ে সেই পরমপুরুষকে জানা যায় না। এরা অনেকসময় উপদেশের অপেক্ষা করে না। এঁরা নিজেদেরকে পণ্ডিত বলে মনে করে।
আবার কেউ কেউ বলে থাকেন, এই প্রাতিভ জ্ঞান হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানের প্রভা বিশেষ। এই প্রাতিভ জ্ঞানের উৎপত্তি হলে বুঝতে হবে, তার মধ্যে প্রকৃতজ্ঞানের উৎপত্তি হতে শুরু হয়েছে। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এই প্রাতিভ জ্ঞানের উপরে সংযম করলে, চরমসত্য উপল্বদ্ধিতে আসতে শুরু করে। অর্থাৎ তখন সব কিছু জানা যায়। বুদ্ধি বিচার দিয়ে, অর্থাৎ বিবেকজ্ঞান দিয়ে আমরা সত্যে পৌঁছতে পারি। যার মধ্যে বিবেকবুদ্ধি কাজ করে না, তার বিচারবুদ্ধিও দুর্ব্বল। আসলে একবার সত্যে পৌঁছে গেলে, তখন তার আর উপদেশের অপেক্ষা থাকে না। স্বভাবজ জ্ঞানই তাঁকে সত্য উপলব্ধি করায়। তখন তাঁর মধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই সবকিছুর জ্ঞান লাভ হয়।
-------------
"হৃদয়ে চিত্তসম্বিৎ। " - (০৩/৩৪)
হৃদয়ে সংযম করলে চিত্ত সম্পর্কে জ্ঞান হয়।
হৃদয় অর্থাৎ হৃদয়দেশে, হৃদয়-আকাশে। চিত্ত সম্পর্কে জ্ঞান অর্থাৎ চিত্তবৃত্তি সম্পর্কে জ্ঞান। এই হৃদয়-আকাশকে বলা হয় ব্রহ্মের নিবাসস্থল বা ব্রহ্মপুর।
কঠোপনিষদে যমরাজ নাচিকেতাকে বলছেন :
"শতং চ একা চ হৃদয়স্য নাড্য তাসাম মূর্ধানম অভিনিঃসৃতৈকা।
তয়া উর্দ্ধম আয়ন অমৃতত্বম এতি বিস্বক অন্যা উৎক্রমণে ভবন্তি ।" (০২/০৩/১৬)
হৃদয়ের সঙ্গে সংযুক্ত একশত এক নাড়ী আছে। তার মধ্যে একটি নাড়ী (সুষুম্না) মূর্ধা বা ব্রহ্মরন্ধ্র ভেদ করে নিঃসৃত হয়েছে। সেটি দ্বারা উর্দ্ধে গমন করলে অমৃতত্ব প্রাপ্ত হওয়া যায়। এছাড়া অন্য নাড়ী সমূহ বিবিধ গতির কারন হয়।
বিঃদ্রঃ - মানুষের হৃদযন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে, অসংখ্য ধমনী বা নাড়ী। (ধমনী বা ধমনি কথাটার অর্থ নাড়ী, দেহের অভ্যন্তরস্থ শিরাসমূহ - বাংলা ভাষার অভিধান - শ্রী জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস প্রকাশক সাহিত্য সংসদ, পৃষ্ঠা -১১২৪, স্বামী লোকেশ্বরানন্দ মহারাজ যখন উপনিষদের আলোচনা করেছেন, তখন তিনিও এই ভাবেই বুঝিয়েছেন - কঠোপনিষদ - শ্লোক - ২/৩/১৬ পৃষ্ঠা - ১৪৫) এদের মধ্যে একটি নাড়ী ব্রহ্মরন্ধ্র পর্যন্ত বিস্তৃত। জীবাত্মা দেহত্যাগের সময় যদি এই পথে বেরিয়ে আসে, তবে অমরত্বের পথে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ জন্মমৃত্যু রোহিত হয়ে যায়। কিন্তু জীবাত্মা অন্যপথে গমন করলে, পুনর্জন্ম হয়, অর্থাৎ আবার এই মৃত্যুপুরীতে ফিরে আসে।
"অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ পুরুষঃ অন্তরাত্মা সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ ।
তং স্বাৎ শরীরাৎ প্রবৃহেৎ মুঞ্জাৎ ইব ঈষীকাম ধৈর্যেণ।
তং বিদ্যাৎ-উক্ৰমন অমৃতং তং বিদ্যা-শুক্ৰম-অমৃতং-ইতি।" (বিদ্যাচ্ছুক্রোমমৃতমিতি) ( কঠ - ০২/০৩/১৭)
অঙ্গুষ্ঠ পরিমান অন্তরাত্মা-পুরুষ সর্বদা সবার হৃদয়ে সন্নিবিষ্ট হয়ে আছেন। মুঞ্জা ঘাস থেকে যেভাবে তার শীষকে আলাদা করা হয়, ঠিক তেমনি মুমুক্ষু ব্যক্তির উচিত আত্মাকে বিবেকজ্ঞানের দ্বারা দেহ-মন থেকে আলাদা করা, এবং স্বতন্ত্রীকৃত এই পুরুষকেই অমৃতস্বরূপ সেই পরমাত্মার সাথে অভিন্ন বলে জানবে।
দেহ-মন থেকে পরম পুরুষকে আলাদা করতে গেলে লাগে বিবেকজ্ঞান, যার কথা ঋষি পতঞ্জলি আগের শ্লোকে (৩/৩৩) বলেছেন।
ছান্দোগ্য উপনিবেদেও বলা হয়েছে, "যদিদমস্মিন ব্রহ্মপুরে দহরং পুণ্ডরীকং বেশ্ম দহরঃ অস্মিন অন্তরাকাশঃ তস্মিন যৎ অন্তঃ অন্বেষ্টব্যম তদ্বাব বিজিজ্ঞাসিৎ অব্যম ইতি । " (০৮/১/১)
দেহরূপ ব্রহ্মপুরে এই যে ক্ষুদ্রাকার পদ্মগৃহ এতে এক ক্ষুদ্র আকাশ আছে। তার মধ্যে যা আছে, তাঁকে অন্বেষণ করতে হবে। তাঁকেই বিশেষরূপে জানতে হবে।
একটু গভীরে চিন্তা করলে, আমরা সম্যকরূপে বুঝতে পারি, নিজ আত্মাই ব্রহ্ম, তাঁরই বাসস্থান এই শরীররূপী নগরে । এই নগরের মধ্যেই বিশেষ কক্ষ হচ্ছে এই হৃদয়দেশ। এখানে এসে পৌঁছতে পারলে, তাঁর সাক্ষাৎ করা সম্ভব।
ঋষি পতঞ্জলিও একই কথার প্রতিধ্বনি করছেন, বলছেন, এইখানে এই হৃৎ-প্রদেশে সংযমের অভ্যাস করলে চিত্ত-বৃত্তির সন্মন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ করা যায়। যোগ সাধনার বিধিসহ যোগবিদ্যা লাভ করে এই হৃদয়স্থিত পরমপুরুষের ধ্যানে নিমগ্ন হওয়াই পুরুষের স্বরূপ সিদ্ধি। এখন কথা হচ্ছে যোগবিধি বলতে আমরা কি বুঝি ? যোগ-অনুষ্ঠানের আবশ্যকতা সম্পর্কে জ্ঞান, যোগের প্রকৃত অর্থ, যোগের ফল, এবং যোগ অনুষ্ঠানের উপায় - সবশেষে শ্রদ্ধা ও দৃঢ়চিত্ত হয়ে যোগের অনুষ্ঠান - এই হচ্ছে যোগ বিধি। আত্মকথা শুনতে হবে, একে সম্যকরূপে উপলব্ধি করতে হবে। আর এই উপলব্ধি তখনই হবে, যখন সাধক যোগের অনুষ্ঠান করবেন। অষ্টাঙ্গযোগের যে কথা আমরা আগে ঋষি পতঞ্জলির কাছে শুনেছি, তার প্রয়োগ করতে হবে ব্যবহারিক জীবনে। তাহলে একদিন নিশ্চই এই হৃদয়স্থিত পরমপুরুষের ডাক শুনতে পারবেন। আর মনুষ্য জীবন সার্থক হবে।
--------------
সত্ত্ব-পুরুষোঃ অত্যন্ত অসংকীর্ণয়োঃ প্রত্যয়া বিশেষো
ভোগঃ পরার্থত্বাৎ স্বার্থ-সংযমাৎ পুরুষজ্ঞানম। (০৩/৩৫)
চিত্তসত্ত্ব ও পুরুষের অভেদজ্ঞানে ভোগ অর্থাৎ বিষয়ের অনুভব হয়। পুরুষের প্রয়োজন মেটাবার জন্য পুরুষের উপরে সংযম থেকে পুরুষজ্ঞান হয়।
পুরুষ ও প্রকৃতির অভিন্নতা স্বরূপ যে জ্ঞান তাকে বলে ভোগ। এই ভোগ আসলে পুরুষের বিষয়ভোগ। স্বার্থ-সংযমাৎ অর্থাৎ আমিই শুদ্ধ পুরুষ এই হলো জ্ঞান। আমাদের বুদ্ধি তিন গুনের দ্বারা প্রভাবিত। সত্ত্ব অর্থাৎ সত্ত্ববুদ্ধি বা যে বুদ্ধিতে সত্ত্বগুণের প্রভাব বেশি আছে। এই সত্ত্বগুণের প্রভাবেই আমাদের বিবেকখ্যাতির উদয় হয়। অসংকীর্ণ অর্থাৎ ব্যাপক, সমান ভাবে সন্মন্ধযুক্ত। পরার্থত্ব অর্থাৎ পরের প্রয়োজনে।
আমাদের বুদ্ধিসত্ত্ব হচ্ছে পরিণামধর্ম্মী। বুদ্ধির পরিবর্তন হচ্ছে। আবার বুদ্ধি কখনো ভোতা, কখনো তীক্ষ্ণ। আবার এই যে পুরুষের কথা বলা হচ্ছে, তা কিন্তু অপরিণামী। পুরুষের কোনো পরিবর্তন নেই। এটি নিত্য-সত্য। তাই বুদ্ধি ও পুরুষ আলাদা, এটিকে আমাদের বোধের বিষয় করতে হবে। আবার এই যে বুদ্ধিবৃত্তির প্রকাশ হচ্ছে, এটি কেবলমাত্র তখনই সম্ভব, যখন বুদ্ধি পুরুষের সান্নিধ্যে থাকে। পুরুষের সঙ্গ ছেড়ে দিলে, বুদ্ধি জড়ত্ব প্রাপ্ত হয়ে থাকে। তখন আর বুদ্ধির বিকাশ ঘটতে পারে না।
আমাদের ইন্দ্রিয়সকল বিষয়কে আকর্ষণ করে মনের কাছে পাঠিয়ে দেয়। মন আবার সেটি কি বস্তু, তা নির্নয় করবার জন্য বুদ্ধির কাছে প্রেরণ করে থাকে। মন কখনো বুদ্ধিহীন হয়ে বিষয়কে বিশ্লেষণ করতে পারে না। এই যে দর্শিত বিষয় তা মন-বুদ্ধির সাহায্যে পুরুষ দর্শন করে থাকে। আর এতে করে মন ভাবছে, পুরুষ ভোগ করছে। কিন্তু পুরুষ নির্লিপ্ত। এই পুরুষ এক অজানা কারনে, বলা যেতে পারে অদৃষ্টবশে পরিণামধৰ্ম্মী প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসেছে, আর বুদ্ধিসত্ত্বের সৃষ্টি করে সেখানেই অধিষ্ঠান করছে। ভোগ শেষ হয়ে গেলে, পুরুষ আবার স্বরূপে অধিষ্ঠান করে থাকে।
আমরা শিবলিঙ্গে জল, দুধ, ঘি, মধু ইত্যাদি দিয়ে স্নান করাই। আবার ধুয়ে মুছে, তাঁকে আসনে প্রতিষ্ঠিত করি। শিবলিঙ্গ যেমন ছিলো, তেমনই থাকে। তেমনি পরিণামী প্রকৃতি অপরিণামী পুরুষকে বিষয়ের মধ্যে ডুবিয়ে, শেষে পুরুষকে স্বাত্মায় প্রতিষ্ঠিত করে। এইযে পুরুষকে ভোগের মধ্যে টেনে আনা আবার তাকে অপবর্গ প্রাপ্ত করিয়ে দেওয়া (ধোয়া-মোছা) এটা প্রকৃতির স্বভাব। পুরুষ চৈতন্যস্বরূপ, নির্বিকার, অপরিণামী, অপরিবর্তনীয় । আর এটি বুদ্ধি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাই সাধকের কাজ হচ্ছে বুদ্ধির সিঁড়ি বেয়ে, পুরুষের কক্ষে পৌঁছে তাকে স্বরূপে দর্শন করা। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, পুরুষের উপরে সংযম থেকে পুরুষের জ্ঞান হয়।
--------
"ততঃ প্রাতিভ শ্রাবণ বেদন আদর্শ আস্বাদ বার্তা জায়ন্তে।" (০৩/৩৬)
সেই প্রাতিভ পুরুষজ্ঞান (যা সাধন অভ্যাস কালীন চলছে ) তার থেকে শ্রাবন অর্থাৎ দিব্য শ্রবণ জ্ঞান হয়, বেদন অর্থাৎ স্পর্শবোধ হয়, আদর্শ অর্থাৎ দিব্যরূপবোধ হয়, আস্বাদ অর্থাৎ দিব্যরসবোধ হয়, বার্তা অর্থাৎ গন্ধ সমন্ধে যে বিশেষ জ্ঞানলাভ হয়, এবং তা প্রতিনিয়ত জন্মাতেই থাকে।
সূর্য উদয়ের আগে পূর্বাকাশে সূর্য-উদয়ের পূর্বাভাস রূপে একটা উজ্বল প্রভার সাক্ষাৎ মেলে। এ থেকে বোঝা যায় যে সূর্য উদয়ের সময় এসেছে। ঠিক তেমনি,সাধক যখন সাধনায় সিদ্ধিপ্রাপ্ত হতে চলেছেন, তার আগে, তাঁর মধ্যে এক পূর্বাভাস দেখতে পাওয়া যায়। তখন তিনি কিছু কিছু দিব্য-অনুভূতির অধিকারী হয়ে ওঠেন। প্রথম দিকে যেমন স্থূল ভূতের জ্ঞান হতে থাকে, তার পরে সূক্ষ্ম অনুভূতির সম্পন্ন হয়ে ওঠেন সাধক। তখন পঞ্চ তন্মাত্রের জ্ঞান হতে থাকে। তখন নানান রকম ধ্বনি শোনা যায়, অপার্থিব কারুর স্পর্শ অনুভবে আসে। অনেক দিব্যমূর্তির দর্শন মেলে। মধুর স্বাদ আসে জিহ্বাতে, নাকের মধ্যে সুগন্ধ ভেসে আসে। সাধক সাধনায় যত অগ্রসর হতে থাকেন, তার মধ্যে তত এই অনুভূতিগুলোর ধারাবাহিকতা চলতে থাকে। আসলে যথার্থ সাধকের কাছে এই সব ঐশ্বর্য্য উপেক্ষার বিষয়। তথাপি ঋষি পতঞ্জলি সাধনপথের ধারাবাহিক বর্ণনায় এগুলো ব'লে সাধককে সতর্ক করছেন, অন্যভাবে বলা যায় যোগে উৎসাহিত করছেন।
"তে সমাধাবুপসৰ্গা ব্যূথানে সিদ্ধয়ঃ । " (০৩/৩৭)
"তে" অর্থাৎ এইসব প্রাতিভাগুলো "সমাধৌ-উপসৰ্গা" সমাধিতে অন্তরায় স্বরূপ। ব্যুত্থান কালে সিদ্ধিগুলো এসেই যায়।
ঋষি পতঞ্জলি এই শ্লোকে সাধককে সাবধান করছেন। এগুলো (আগে যা বলা হয়েছে) সাধনায় সিদ্ধিলাভের পূর্বাভাস মাত্র, সিদ্ধি নয়। এইসব অলৌকিক দর্শন, শ্রবণ ইত্যাদি লাভের উদ্দেশ্যে সাধক সাধনা করেন না। বরং এসব থেকে সাধককে সতর্ক থাকতে হবে। এখন কথা হচ্ছে এগুলো কখন হয় ? ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এগুলো ব্যুত্থান কালে হয়ে থাকে। অর্থাৎ সমাধি থেকে চিত্ত যখন ব্যুত্থিত হয়, তখন এইসব অলৌকিক ঘটনা ঘটতে থাকে। এতে সাধকের কোনো নিয়ন্ত্রন থাকে না সত্য, তবে একে উপেক্ষা করাই যথাথ সাধকের কর্তব্য।
----------
"বন্ধ-কারণ-শৈথিল্যাৎ প্রচার-সংবেদনাৎ চ
চিত্তস্য পরশরীর-আবেশঃ। " (০৩/৩৮)
বন্ধ কারণের শিথিলতায় গমনাগমনের সম্যক জ্ঞান হয়। তখন নিজ চিত্তের অপরের শরীরের মধ্যে আবেশ- সিদ্ধ হয়।
আমাদের শরীর ও চিত্তের মধ্যে একটা বন্ধন আছে। এই চিত্ত আমাদের শরীরের নাড়িপথে গমন করছে। আর এই নাড়িপথে গমনের কারনে যোগীর চিত্তে সম্যক জ্ঞান হয়ে থাকে। আর এই জ্ঞান উদয় হবার পরে, অর্থাৎ সংযমে সিদ্ধি এলে, অপরের শরীরের মধ্যেও সে প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
দেখুন একাগ্রতা থেকে ধ্যান, আবার ধ্যান থেকে সাধক সমাধিতে প্রবেশ করবে। ধারণা, ধ্যান, সমাধিতে সাবলীল হয়ে গেলে, সংযম এসে যাবে। তখন সাধকের মধ্যে একটা মৃত্যুহীন সত্ত্বার অনুভূতি হবে। তখন আত্মার আবরণ স্বরূপ শরীরের স্তর গুলো সম্পর্কে জ্ঞান হবে। জামার নিচে গেঞ্জি, গেঞ্জির নীচে চর্ম্ম-হাড্ডি-মাসের শরীর। স্থূল শরীরের ভিতরে সুক্ষ শরীর , সূক্ষ্ম শরীরের ভিতরে কারন শরীর। স্থূল শরীর আত্মার বহির্বাস, সূক্ষ্ম শরীর আত্মার অন্তর্বাস। এরও ভিতরে আছে কারন শরীর - যা এই সূক্ষ্ম ও স্থূল শরীরকে ধরে রেখেছে। এই কারন শরীরের মধ্যে বীজের আকারে মানুষের ভবিষ্যতে বিকাশের কারন লুকিয়ে আছে। এই যে কারন শরীর, এটি সূক্ষ্ম শরীর বা বায়বীয় শরীর তৈরিতে সক্ষম। আমাদের স্থূল শরীর যেমন চিরকাল থাকে না, এই বায়বীয় শরীরও চিরকাল থাকে না। এই দুইয়ের প্রকাশ সাময়িক সময়ের জন্য। কিছুকাল পরে, সূক্ষ্ম শরীর সূক্ষ্ম হতে হতে কারনে প্রবেশ করে। আবার যখন কামনা-বাসনা-সংকল্প-বিকল্পের উদয়ে বায়বীয় সূক্ষ্ম শরীরের উৎপাদন হয়। এইভাবে আত্মা নানান অবস্থার মধ্যে দিয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছে।
এইযে শরীরের সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বেরিয়ে আসতে গেলে, কর্ম্মের বন্ধন ছিন্ন করতে হবে। এই কর্ম্মের শিথিলতাই আসলে সমাধি। সমাধিতে সাধক চিত্তের সঞ্চরণ প্রতক্ষ্য করে থাকেন। চিত্ত আমাদের নাড়িপথে সঞ্চরণ করছে। সংযমী পুরুষের চিত্ত নিয়ন্ত্রণে থাকে। তো সংযমী পুরুষ যখন চিত্তকে নিজ শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন ক'রে, অপর কোনো শরীরে নিক্ষেপ করেন, তখন চিত্তের পিছন পিছন ইন্দ্রিয়গুলোও ধাবিত হয়। চিত্ত যখন অপরের শরীরকে আবেশিত করে, তখন সেই শরীর সাধক-আত্মার আবাসস্থল হয়ে যায়। এসব সমাহিত অবস্থায়, নিয়ন্ত্রিত চিত্তের সঞ্চরণ মাত্র। এর মধ্যে কোনো ভোজবাজি নেই। শঙ্করাচার্য এই ভাবেই নিজ শরীর ছেড়ে রাজার দেহে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন, কামবিদ্যা অৰ্জনের জন্য।
-----------
"উদান-জয়াৎ-জল-পঙ্ক-কণ্টকাদিষু অসঙ্গ উৎক্রান্তিঃ চ ।" (০৩/৩৯)
(সংযমের ফলে) উদান বায়ু জয় থেকে জল, পঙ্ক, কন্টকাদিতে অসঙ্গ হওয়া যায়। এমনকি নিজ বশে (শরীর থেকে) উৎক্রান্ত হওয়া যায়।
আমরা জানি এই যে স্থূল শরীর, তা কেবলই শ্বাসের খেলা। এই শ্বাসবায়ুকে ঋষি মুনিগন প্রধানত পাঁচটি ভাগে ভাগ করেছেন - প্রাণ, অপান, ব্যান, সমান ও উদান। এই যে উদান বায়ু এটি খুবই গুরুত্ত্বপূর্ন। এই উদান বায়ু, জীবনের আসা যাওয়ার নিয়ন্ত্রক। এটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে, শরীরে আসা-যাওয়াকে ইচ্ছেধীন করা যায়। উদান বায়ু যেন একটা রকেট , যা আমাকে ঠেলে উপরে তুলে দিচ্ছে। উদান বায়ুর সাহায্যে যেমন মানুষ কথা বলে, বা শব্দ করে, তেমনি এই উদানবায়ুর সূক্ষ্ম অংশ আমাদের মন-বুদ্ধি ও স্মৃতিশক্তিকে পুষ্ট করে থাকে। এই উদানবায়ুই কুণ্ডলিনী থেকে উর্জ্জা শক্তিকে সহস্রার-মুখী করে থাকে। এই উদানবায়ু সাধকের মনকে অতীন্দ্রিয় রাজ্যে প্রবেশ করিয়ে দিতে পারে।
ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এই উদান বায়ুকে বশে আনতে পারলে, সাধকের শরীর হাল্কা হয়ে যায়, এতে করে যোগীর শরীর জলের উপরে ভেসে থাকতে পারে। কাদার মধ্যে ডুবে যাবে না। কাঁটা আঘাত করতে পারবে না। এমনকি প্রয়াণকালে অর্চিরাদি মার্গে উৎক্রান্তি ঘটবে। অর্থাৎ মৃত্যুর পরে, তিনি জ্যোতির জগতে প্রবেশ করবেন।
---------------
"সমান জয়াৎ জ্বলনম। " (০৩/৪০)
সমান বায়ুতে সংযম করলে, শরীর জ্যোতির্ময় হয়।
সমান বায়ু আমাদের খাদ্যকে জীর্ন করতে সাহায্য করে থাকে। এই সমানবায়ু আমাদের খাদ্য হজম করবার জন্য যে জঠরাগ্নি তাকে সক্রিয় রাখে। জীর্ন খাদ্যের যে সার বস্তু ও অসার বস্তু তাকে পৃথক করে থাকে। এই অসার বস্তুকে মল আকারে মল নাড়ীতে প্রেরণ করে থাকে। খাদ্যবস্তুকে সারবস্তু অর্থাৎ রক্ত, রস, ইত্যাদিতে পরিণত করে, এই সমান বায়ু। আমাদের যে প্রাণ বায়ু ও অপান বায়ু তার মধ্যে সাম্যভাব রক্ষা করে এই সমান বায়ু। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, সাধক এই সমানবায়ুর উপরে সংযমের অভ্যাস করলে, তার শরীর হয়ে ওঠেন তেজস্বী, জ্যোতির্ময়।
------
"শ্রোত্র-আকাশয়োঃ সন্মন্ধ-সংযমাৎ দিব্যং শ্রোত্রম। " (০৩/৪১)
শব্দ ও আকাশের সঙ্গে যে সম্পর্ক তার উপরে সংযমের অভ্যাস করলে দিব্যশব্দ শ্রবন ক্ষমতা লাভ হয়।
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ বিভূতিপাদ পৃষ্ঠা - ৩৭
শব্দ হচ্ছে আকাশের গুন্, যা আমাদের কর্ন সংযোগে শ্রুতিগোচর হয়ে থাকে। তো শ্রবণ ইন্দ্রিয় ও আকাশের মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে। আকাশ হচ্ছে আশ্রয়দাতা, বা আধেয়। আর ইন্দ্রিয় হচ্ছে আশ্রয়গ্রহীতা। শব্দ-ধর্ম্ম বিশিষ্ট যে কর্ন তার ছিদ্রপথ আসলে সেই আকাশ। তো আকাশের আশ্রয়ে শ্রোত্র। এই শ্রোত্রই শব্দগ্রাহক যন্ত্র বা আমাদের ভাষায় কর্ণেন্দ্রিয়। তো সমস্ত শব্দের আশ্রয় যেমন আকাশ তেমনি আমাদের শ্রবণেন্দ্রিয় হচ্ছে শব্দের আশ্রয়স্থল। এই যে শব্দরূপ তন্মাত্র একেই বলা হয় ব্যোম। ব্যোম বা আবরণ বলতে আমরা আকাশকে বুঝে থাকি। আসলে ব্যোম হচ্ছে আকাশ ও শব্দের মিলিত অবস্থা। আকাশ আবরণ যা শব্দকে ঢেকে রেখেছে। এই যে আকাশের সঙ্গে শব্দের যে সমন্ধ অর্থাৎ ব্যোম স্বরূপের সংযম থেকে সমস্ত শব্দ শ্রুতিগোচর হয়ে থাকে। তা সে দূরের শব্দ হতে পারে, কাছের শব্দ হতে পারে। অর্থাৎ শব্দ তা সে যে তরঙ্গেই প্রবাহিত হোক না কেন, সাধকের কাছে তা শ্রুতিগোচর হয়ে যায়। বলা হয়, আজও নাকি শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির সুর শুনতে পাওয়া যায়। অর্থাৎ সমস্ত শব্দের অন্তর্নিহিত ভাব তার চিত্তকে সম-তরঙ্গে স্পন্দিত করে। তাই ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, শব্দ ও আকাশের উপরে সংযম করলে, দিব্য শব্দ শ্রবনের ক্ষমতা লাভ হয়।
বিষয়টা একটু সহজ করে বোঝার চেষ্টা করি। বিজ্ঞানের উন্নতিতে আমরা সাধারণ মানুষেরাও স্বীকার করি যে শব্দ ও ছবি আকাশ-বাতাসের মধ্যে ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে। আর এই কারণেই আমরা টিভির পর্দায় ছবি দেখি শব্দ শুনি, বা রেডিওতে কেবলমাত্র শব্দ শুনতে পাই। অর্থাৎ গ্রাহক যন্ত্র, ও প্রেরকযন্ত্র আবিষ্কারের ফলে এটি সম্ভব হয়েছে। আবার এই রেডিওতে বা টিভিতে ভিন্নভিন্ন তরঙ্গে (চ্যানেলে) ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ও ছবি আমাদের শ্রুতিগোচর বা দৃষ্টগোচর হচ্ছে। এই যে তরঙ্গ-বিশেষ এর মধ্যে ভিন্নতা থাকার দরুন ভিন্ন ভিন্ন শব্দ শ্রুতিগোচর হচ্ছে। হাজার হাজার বছর আগে এই সত্য আমাদের মুনি-ঋষিদের অনুভূতিতে এসেছিলো। তাঁরা যেমন নাদধ্বনি অর্থাৎ অনুচ্চারিত শব্দ শুনতেন। অতি দূরের বা অতি কাছের দৃশ্য ও শব্দ তারা অনুভব করতে পারতেন। আর এটি সম্ভব হতো কেবলমাত্র সাধনপথের পথিকদের কাছে।
------
"কায়-আকাশয়োঃ সন্মন্ধ সংযমাৎ লঘুতুল-সমাপত্তেঃ চ আকাশ-গমনম।" (০৩/৪২)
শরীর ও আকাশ এই দুটির সন্মন্ধে সংযমের অভ্যাস থেকে (শরীর) তুলোর মতো হাল্কা অনুভব হয়, যাতে করে আকাশগমন সম্ভব হয়।
আমরা আগেই শুনেছি, আকাশ হচ্ছে এই বিশ্বব্রহ্মান্ডের আশ্রয়দাতা, বা অবকাশ স্থল । তো এই যে পাঞ্চভৌতিক শরীর, এই শরীরের সঙ্গে আকাশের একটা সম্পর্ক আছে। আবার আমাদের আছে অহঙ্কার। এই যে অহঙ্কার বা অস্মিতা এর মধ্যে আছে, দুই ধরনের অশুদ্ধি। একটা হচ্ছে আসক্তি, আর একটা হচ্ছে অহংকার বা গর্ব। যোগমার্গে যখন আসক্তি ও অহংকার নিবৃত্ত হয়ে প্রজ্ঞার আলোকরশ্মি বিশুদ্ধরূপে প্রকাশ পায় , তখন সেই আলোর সাহায্যে যোগীপুরুষ পঞ্চভূতাত্মক নিজের দেহ এবং যাবতীয় ইন্দ্রিয় এই আলোকের দ্বারা শোধিত করে। কায়শুদ্ধি ও ইন্দ্রিয়শুদ্ধি এইভাবে সম্যকভাবে সিদ্ধ হলে যোগীর ইচ্ছামাত্র তদ্ অনুসারে ক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
যেখানে শরীর সেখানে আছে আকাশ। আবার শরীরের ভিতরে আকাশ, বাইরেও আছে আকাশ। পতঞ্জলি বলছেন, এই দুইয়ের মধ্যে একটা অবিচ্ছিন্ন সন্মন্ধ আছে। কায় ও আকাশ এই দুইয়ের সন্মন্ধে সংযমের অভ্যাস করলে, তাঁর শরীর তুলো অর্থাৎ আদি পরমাণুতে সমাপত্তি লাভ করতে পারে। এর ফলে তাঁর শরীর লঘু-সন্মন্ধ প্রাপ্ত হয়। অর্থাৎ তখন যেকোনো কিছু অবলম্বন করে বিচরণ করতে পারেন। এই যেকোনো কিছুর মধ্যে যদি সূর্য্যরশ্মি তার অবলম্বন হয়, তবে তিনি অবশ্যই আকাশে বিচরণ করতে পারেন। কারন এই সূর্য্যরশ্মি সৌরলোকের সর্বত্র মাকড়সার জালের মতো বিস্তৃত হয়ে আছে।
তবে একটা কথা মনে হয়, মন যেমন কল্পনাকে অবলম্বন করে ইতস্তত ভ্রমনে সক্ষম, তেমনি যোগীর শরীর যখন যোগাগ্নিতে ভষ্ম হয়ে অনু-পরমাণুতে পরিণত হয়েছে, তখনই এই সূক্ষ্ম যাত্রা সম্ভব। অন্যভাবে বলা যায়, এই যে শরীর তা আসলে একটা গতিশীল, সতত পরিবর্তনশীল, পারিনামধৰ্ম্মী আলোর তরঙ্গ বিশেষ। এই সত্য যিনি প্রতক্ষ্যভাবে অনুভব করতে পেরেছেন, তা কাছে আকাশগমন ইচ্ছেমাত্র হওয়া অসম্ভব কিছু নয়।
"বহিরকল্পিতা বৃত্তি-মহাবিদেহা ততঃ প্রকাশ আবরণ ক্ষয়ঃ। " - ৩/৪৩
(শরীরের অপেক্ষা রেখে) মনের যে বহির্বৃত্তি তা কল্পনা নয়, এটি মহাবিদেহা বৃত্তি। এর থেকে প্রকাশের আবরণ রূপ মলের ক্ষয় হয়।
ঋষি পতঞ্জলি এই শ্লোকে বুদ্ধিবৃত্তির আবরণ ক্ষয়ের কথা বলছেন। আমরা জানি, মন হচ্ছে খাদ্যের সূক্ষ্মতম অংশ বিশেষ । আবার আমরা এও শুনেছি, মনের ক্রিয়া (চিন্তা) হচ্ছে স্নায়ুরসের স্পন্দন মাত্র। তাহলে এটা আমাদের মনে হতেই পারে, যে মন আমাদের স্থূল শরীরকে আশ্রয় করেই অবস্থান করে থাকে। তাই যদি হয়, তবে শরীরের বাইরে মনের গতাগতি থাকার কথা নয়। কিন্তু বাস্তব হচ্ছে, মন উদ্ভ্রান্তের মতো বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি সশরীরে হয়তো বেনারসে বসে আছি, কিন্তু মন আমার কৈলাশ পর্বতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই সত্যকে আমরা কেউ অস্বীকার করতে পারি না। আবার মন যেখানে রয়েছে, সেখানেই আমি আছি। তো শরীরের বাইরে আমি আছি, আবার শরীরের ভিতরেও আমি আছি। এইজন্য ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, অহংশূন্য চিত্তবৃত্তি কেবলই কল্পনা। আবার দেহের বাইরে যখন এই মন ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেখানে তো স্থূল দেহ নেই, সেখানে আছে অহংবৃত্তি। তো শরীরের অপেক্ষা না রেখে চিত্তবৃত্তির অহংবৃত্তির শূন্যতা রূপ যে ধারণা তা হলো মহাবিদেহা ধারণা।
বিভূতিপাদের শুরুতেই প্রথম শ্লোকে (০৩/০১) আমরা শুনেছিলাম, "দেশবন্ধচিত্তস্য ধারণা" - দেশ বিশেষে চিত্তের স্থিতি হচ্ছে ধারণা। অর্থাৎ শরীরের বাইরে বা ভিতরে চিত্তকে বিশেষ স্থানে স্থির করাই ধারণা। এখানে বলছেন, মহাবিদেহা ধারণা - যেখানে শরীর নেই, আছে অহংকার - যা কার্যক্ষম নয়। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এই অবস্থাতে সংযম করলে, চিত্তের প্রকাশিত হওয়াতে যে আবরণ থাকে অর্থাৎ ক্লেশদায়ক কর্ম্ম তার ক্ষয় হয়। এই মহাবিদেহ ধারণায় চিত্তবৃত্তির মধ্যে যে ত্রিগুণের খেলা চলছে, তার মধ্যে রজঃ ও তমঃ গুনের ক্ষয় হয়। থাকে শুধু সত্ত্বগুণের প্রভাব।
----------
"স্থূলস্বরূপ-সূক্ষ্ম-অন্বয়-অর্থবত্ত্ব সংযমাৎ ভূতজয়ঃ। " - (০৩/৪৪)
স্থূলতা, স্বরূপতা , সূক্ষ্মতা, অন্বয়িতা, ও অর্থবত্ত্বা এই পাঁচটির উপরে সংযম করলে ভূতজয় হয়।
এই যে স্থূল জগৎ বা সূক্ষ্ম জগৎ সবই ভূতের খেলা। এই ভূতের যেমন পাঁচটি প্রকার অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ , তেজ, মরুৎ, ব্যোম তেমনি এই ভূতের আছে পাঁচটি রূপ। যদিও এই রুপগুলোর মধ্যে আমাদের মতো সাধারনের গোচরীভূত ভূত হচ্ছে স্থূল ও সূক্ষ্ম। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, ভূতের পাঁচটি রূপ। সেগুলো হচ্ছে স্থূলতা, স্বরূপতা, সূক্ষ্মতা, অন্বয়িতা ও অর্থবত্ত্বা।
স্থূলরূপ - যাকিছু দৃশ্যমান, তা হচ্ছে ভূতের স্থূলরূপ। যেমন, মানুষ, পশু, বৃক্ষ, যাবতীয় দৃব্য, পাহাড়, নদী, পৃথিবী, চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র ইত্যাদি।
স্বরূপতা - বলতে বোঝায় ভূতের স্বরূপ যেমন ক্ষিতির কঠিনতা, জলের আদ্রতা, তেজের দাহিকাশক্তি, বায়ুর গতিস্বরূপ চঞ্চলতা, আকাশের সর্ব্বব্যাপকতা।
সূক্ষ্মরূপ - এই ভূৎসকলের যে সূক্ষ্ম রূপ তা হচ্ছে তন্মাত্র। অর্থাৎ আকাশের শব্দ, বাতাসের স্পর্শ, তেজের রূপ, জলের রস, পৃথিবীর গন্ধ। তো সমস্ত ভূত-রূপের সূক্ষতম রূপ হচ্ছে তন্মাত্র। সমস্ত দ্রব্যের মধ্যে যে পরমাণু আছে, তাকেও ভূতের সূক্ষ্ম রূপ বলা যেতে পারে।
অন্বয়িতা - বলতে বোঝানো হচ্ছে ভূতের প্রকাশ সত্ত্ব, ক্রিয়াসত্ত্ব, ও স্থিতিসত্ত্ব। ঘুরিয়ে বললে বলতে হয়, সত্ত্বঃ, রজঃ ও তমঃ - এই তিন স্বভাব সম্পন্ন। সত্ত্বগুনে প্রকাশ, রজঃগুনে ক্রিয়া, আর তমোগুণে স্থিতি।
অর্থবত্ত্বা - পুরুষের ভোগের নিমিত্ত বা অপবর্গ সম্পাদনের বিষয় হিসেবে এই ভূতসকল কাজ করছে, একেই বলে অর্থবত্ত্বা।
এই হচ্ছে ভূতের পাঁচটি রূপ। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, ভূত মাত্রেই এই পাঁচ প্রকার অবস্থা বিশেষে প্রতক্ষ্য গোচর হচ্ছে। এখন এই পাঁচটি ভূত-তত্ত্বের উপরে সংযম করলে, যোগী মহাভূতগুলোকে বশীভূত করতে পারবেন।
--------
"ততঃ অণিমাদি প্রাদুর্ভাবঃ কায়সম্পৎ তদ ধর্ম্ম অনভিঘাতঃ চ ।" ০৩/৪৫
ততঃ অর্থাৎ ভূতজয় হলে, অনিমা ইত্যাদির অর্থাৎ অষ্টসিদ্ধির উৎপন্ন হয়। কায়-সম্পৎ ও কায়-ধর্ম্ম তখন অভিঘাত শূন্য হয়।
পতঞ্জলি বলছেন, ভূতজয় হলে অনিমা ইত্যাদি অষ্টসিদ্ধি লাভ হয়। অষ্টসিদ্ধি অর্থাৎ অনিমা, লঘিমা, মহিমা, প্রাকাম্য, বশিত্ব, ইশিতৃত্ত্ব, গরিমা, ও কামাবসায়িত্বম। অর্থাৎ যোগীপুরুষের শরীর তার ক্রিয়ার বাধা হতে পারে না। সমস্ত কর্ম্ম তাঁর ইচ্ছাধীন হয়ে যায়। যোগীর শরীর এ ক্ষেত্রে যোগীর ইচ্ছাধীন হয়ে যায়।
অনিমা হচ্ছে - পরমাণুরূপ হয়ে যাওয়া, বা বিস্তার লাভ করা । লঘিমা হচ্ছে ভারহীন বা লঘু হয়ে যাওয়া, বা নিজেকে সংকুচিত করা । মহিমা অর্থে নিজ মহানতা। প্রকাম্য হচ্ছে ইচ্ছের বাধাকে অপসারণ ক্ষমতা, বশিত্ব হচ্ছে ভূত-সকলকে নিজের বশে আনা কিন্তু নিজেকে অন্যের বশে না যেতে দেওয়া। ইশিত্ব হচ্ছে শরীর ও মনের উপরে প্রভুত্ত্ব। গরিমা হচ্ছে ভারি হওয়া। কামাবসায়িত্বম অর্থাৎ সত্যসঙ্কল্পতা - বা সঙ্কল্পমতো প্রাকৃতিক ভাবে অবস্থান করা।
ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এই অষ্টসিদ্ধি লাভ হলে যোগীর শরীররূপ সম্পদ ও শরীরের যে স্বাভাবিক ধর্ম্ম অর্থাৎ পরিবর্তনশীলতা তা অভিঘাতশূন্য হয়ে অবস্থান করে।
এখন কথা হচ্ছে কায়সম্পৎ ও কায়ধর্ম্ম বলতে কি বোঝায় ? কায়সম্পদ সম্পর্কে আমরা পরবর্তী শ্লোকে শুনবো। কিন্তু কায়ধর্ম্ম হচ্ছে - আমাদের শরীরের কিছু বিশেষত্ব আছে। যেমন আমরা পাখির মতো আকাশে উড়তে পারি না, আমরা মাছের মতো জলে ভাসতে পারি না। এমনকি আমরা আগুনের তাপ সহ্য করতে পারি না, অস্ত্রের আঘাত সহ্য করতে পারি না। কঠিন পদার্থ ভেদ করে শরীরকে চালনা করতে পারি না। আমরা না খেয়ে বেঁচে থাকতে পারি না। আমরা শ্বাসপ্রশ্বাস ক্রিয়া না করে থাকতে পারি না। আমরা চিরকাল শিশুটি থেকে যেতে পারি না, এমনকি আমরা চিরকাল বেঁচেও থাকতে পারি না। আবার অনেক কিছুই পারি, যেমন আমরা গমনাগমন করতে পারি, আমরা চিন্তা করতে পারি। আমরা ভালো-মন্দ বিচার করতে পারি। আমরা সাধারণ মানুষ থেকে দেবমানবে পরিণত হতে পারি। এমনকি আমরা ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ হয়ে নির্ভিকভাবে জগতে বিচরণ করতে পারি। এই হচ্ছে শরীরের ধর্ম্ম।
ঋষি পতঞ্জলি পরের শ্লোকে কায়-সম্পদ সম্পর্কে বলছেন :
"রূপ-লাবণ্য-বল-বজ্রসংহননত্বানি কায়-সম্পৎ।" (০৩/৪৬)
রূপ, লাবণ্য, বল, বজ্রহননত্ব (কাঠিন্য) এই হচ্ছে কায়-সম্পৎ।
শরীর যেন দেখতে সুন্দর হয়, অর্থাৎ সৌম্যকান্তি, কমনীয় হয়, বলযুক্ত হয়, বজ্র অর্থাৎ হীরের মতো কঠিন হয়, এই হচ্ছে শরীরের সম্পৎ।
দেখুন যোগীপুরুষের শরীর ও সাধারনের শরীরের মধ্যে বস্তুগত কোনো পার্থক্য নেই। স্থূল দৃশ্যমান শরীর তা আসলে অন্নময়। এটি অন্ন দ্বারা গঠিত আবার অন্ন দ্বারাই পরিপুষ্ট হয়ে থাকে। সাধারনের খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে যোগীপুরুষের খাদ্যাভ্যাসের পার্থক্য থাকে। যোগীপুরুষের উচিত তেজস্কর খাদ্য অর্থাৎ দুধ ঘি ইত্যাদি সেবন করা। আর এই তেজস্কর পদার্থ শরীরের গঠনতন্ত্রকে বিশেষ বৈশিষ্ঠসম্পন্ন করে দেয়। এর ফলেই যোগীপুরুষের মধ্যে সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি পায়, সৌম্যভাব আসে। এঁদের ব্রহ্মচর্য পালন করতে হয়। তাই শরীর হয় অধিক বলযুক্ত। এমনটা ভাবার কোনো কারন নেই, যে অন্ন বিনা এই শরীর শুধু যোগক্রিয়াতেই রক্ষা পাবে। তবে প্রানায়ামাদি শরীরের হজমশক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে থাকে। ফলতঃ খাদ্যদ্রব্যের নির্যাস সে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। যোগীপুরুষের মনের মধ্যে শুভচিন্তার প্রবাহ চলতে থাকে। তাই তাঁদের মধ্যে ভবিষ্যতের জন্য দুশ্চিন্তা দেখা যায় না। শরীর থাকে নীরোগ। তবে একথা সত্য, কালের গতি কেউ রোধ করতে পারে না। তাই কালের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের প্রাকৃতিক পরিবর্তন ধীরে হলেও চলতেই থাকে। হীরে যেমন কঠিন ও দীর্ঘস্থায়ী বস্তুবিশেষ, তেমনি যোগীপুরুষের দেহ হয় বজ্রকঠিন ও আপাতভাবে অপরিবর্তনশীল। কিন্তু প্রকৃতির জগতে কেউ যেমন চিরস্থায়ী নয়, অপরিবর্তনশীল নয়, তেমনি যোগীপুরুষের মধ্যেও এই প্রকৃতির নিয়ম প্রযোজ্য - একথা অস্বীকার করা যায় না। তা না হলে হয়তো যোগাচার্য্য ঋষি পতঞ্জলি, মৎস্যেন্দ্রনাথ, গোরক্ষনাথ, যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ, বা আদি যোগগুরু দেবাদিদেব মহাদেব শিব আজও আমাদের মধ্যে সশরীরে অবস্থান করতেন।
----
একটা কথা : ঋষি পতঞ্জলির যোগদর্শনে এমনসব বাণী আছে, যা আমাদের বোধগম্য নয়। তথাপি এই যোগকথা আমরা শুনছি, বোঝার চেষ্টা করছি, এই যুগপুরুষের অমৃতকথা, উপল্বদ্ধির কথা। আসলে, যোগী যখন সত্যের গভীরে প্রবেশ করেন, তখন তিনি সেখানে কাউকে নিয়ে যেতে পারেন না, তিনি সত্যের সঙ্গে একাত্মীভূত হয়ে যান। ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ স্বয়ং ব্রহ্ম। আবার কেউ যখন সত্যের বাইরে এসে দাঁড়ায়, তখন সে সত্যকে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে পারে। যখন কিছুই বুঝি না, তখন সবাইকে বোঝাতে চেষ্টা করি। যখন বুঝি তখন মৌন হয়ে যাই। তখন না নড়ে মুখ না সরে কলম। তাই ব্রহ্মবিষয় বোঝার হলেও বোঝানো যায় না। তবে অদম্য কৌতূহল ও দৃঢ় সংকল্প এই বোঝার কাজটা হঠাৎ ঘটিয়ে দিতে পারে। তাই শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ধৈর্য্য ধরে ঋষি পতঞ্জলির যোগকথা বারংবার শুনতে হবে, বোধবুদ্ধি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে যেতে হবে। তবে, সত্য তখনই উদ্ভাসিত হবে, যখন ঋষির নির্দেশ অনুযায়ী যোগের নিরন্তর অনুশীলন করবো।
---------------
"গ্রহণ-স্বরূপ-অস্মিতা-অন্বয়-অর্থবত্ত্ব সংযমাৎ ইন্দ্রিয়জয়ঃ।" (০৩/৪৭)
গ্রহণ, স্বরূপ, অস্মিতা, অন্বয় ও অর্থবত্ত্ব - এগুলোতে সংযমের অভ্যাস করলে ইন্দ্রিয়জয় হয়।
এখন এই যে গ্রহণ, স্বরূপ, অস্মিতা, অন্বয় ও অর্থবত্ত্ব এগুলোর সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের কি সম্পর্ক ? এগুলো হচ্ছে ইন্দ্রিয়ের স্বরূপ। তাই ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এগুলোর উপরে সংযম করতে হবে, যদি আমরা ইন্দ্রিয়গুলোকে জয় করতে চাই।
আমরা জানি ইন্দ্রিয় তিন ভাগে বিভক্ত। অন্তরেন্দ্রিয় - অর্থাৎ মন, ৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয় অর্থাৎ চক্ষু, কর্ন, নাসিকা, জিহবা, ত্বক আর ৫টি কর্ম্মেন্দ্রিয়, হস্ত, পদ, বাক, পায়ু, উপস্থ। মোট ১১টি ইন্দ্রিয়। ইন্দ্রিয়গুলোর বৃত্তি হচ্ছে বিষয় গ্রহণ। বাহির-ইন্দ্রিয় বিষয়কে গ্রহণ করে অন্তর-ইন্দ্রিয়ের (মন) কাছে পাঠিয়ে দেয়। মন আবার এই বিষয়কে গ্রহণ ক'রে বুদ্ধির কাছে নিক্ষেপ করে। তো বিষয়গুলো যদি বাহির ইন্দ্রিয়সকল গ্রহণ না করতো, তবে মন (অন্তরেন্দ্রিয়) না পারতো এ নিয়ে চিন্তা করতে, আর বুদ্ধি না পারতো এ নিয়ে বিচার করতে। এখন কথা হচ্ছে এই ইন্দ্রিয়সকল বিশেষ করে জ্ঞানেন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ন , নাসিকা জিহবা ত্বক) ও অন্তরেন্দ্রিয় (মন) এগুলোকে বহির্মুখী থেকে অন্তর্মুখী করতে হবে। অর্থাৎ নিজের দিকে ফেরাতে হবে। আর এদেরকে ফেরাতে গেলে, দরকার এদের প্রতি নিয়ন্ত্রণ। তাই ঋষি পতঞ্জলি এই ইন্দ্রিয়গুলোর বৃত্তি বা স্বভাবের কথা বর্ণনা করছেন। কেননা এদের স্বরূপকে ধরতে পারলে তবেই এদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এদের বৃত্তি হচ্ছে গ্রহণ, স্বরূপ, অস্মিতা, অন্বয়, ও অর্থবত্ত্ব।
দেখুন পরমপুরুষ সেই সৎ চৈতন্য স্বরূপ আমাদের এই ইন্দ্রিয়সকলের মধ্যেই প্রথম প্রকাশ হচ্ছে। এই ইন্দ্রিয়সকল হচ্ছে ভোগের নিমিত্ত। এখন এই ইন্দ্রিয়গুলো যখন বিষয়-আকারে আকারিত হয়, তখন কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। প্রতিক্রিয়া হয় তখন, যখন বৃদ্ধিসত্ত্বের দ্বারা এটি আলোচিত বা নিশ্চয় করা হয়। এই যে বিষয় এটি প্রথমে স্থূল, অর্থাৎ দৃশ্যমান। আমরা যা কিছু দেখি, শুনি, অনুভব করি, এসবই স্থূল। এখন এই স্থূলের একটা স্বরূপ বা স্বরূপবস্থা আছে। যেমন কোনো বস্তু কঠিন, কোনো বস্তু শীতল, ইত্যাদি ইত্যাদি। এই দৃশ্যমান বস্তুর আবার একটা সূক্ষ্ম অবস্থা আছে যাকে বলা হয়, সূক্ষ্ম ভূত। অর্থাৎ পরমাণু বা তন্মাত্র। আবার এই ভুলসকল ত্রিগুণের দ্বারা প্রভাবিত। এইজন্য এর মধ্যে আছে প্রকাশত্ত্ব, আছে স্থিতিত্ব, আছে প্রবৃত্তিত্ত্ব অর্থাৎ প্রকাশ ধর্ম্ম, স্থিতিধৰ্ম্ম, ও পরিণামধৰ্ম্ম। একেই বলে অন্বয়িত্ব। অন্বয় বা ক্রমিক ধারা। এখন এই পরিণতি অর্থাৎ ভূতগুলোর যে পরিণতি, তা ভোগপ্রদানে সমর্থ। তাই সুখ-দুঃখ ভোগ জন্মাচ্ছে। এটাকেই বলে অর্থবত্ত্ব। তো পুরুষ প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসায় অর্থবত্ত্বার চরিতার্থ হচ্ছে অর্থাৎ সুখ-দুঃখ ভোগ করছে।
তো ইন্দ্রিয়সকল যখন রূপাদি প্রকাশে প্রবৃত্ত, তখন তা হচ্ছে গ্রহণ। প্রকাশধর্ম্মকে বলা হচ্ছে স্বরূপ অবস্থা। এই প্রকাশ-ধর্ম্মাত্মক স্বরূপ সাত্ত্বিক অহংকার হচ্ছে অস্মিতা। ত্রিগুণাত্বক অবস্থা হচ্ছে অন্বনিত্ত্ব। আর ভোগদানে সমর্থ অপবর্গ হলো অর্থবত্ত্ব।
---------------
"ততো মনোজবিত্বং বিকরণ-ভাবঃ প্রধানজয়ঃ চ ।" (০৩/৪৮)
যোগীর ইন্দ্রিয়জয় থেকে মনের (ইচ্ছেমতো) গতিলাভ হয়। আবার মন করণবিহীন হয়ে প্রধানজয় অর্থাৎ সমস্ত বিভূতি লাভ হয়ে থাকে।
ইন্দ্রিয়জয় থেকেই মনের গতিবেগ বাড়তে পারে। আবার এই মনের গতিবেগ থেকেই অলৌকিক সব বিভূতির জন্ম হয়ে থাকে। মনের বেগই আসলে শরীরকে উত্তমগতি লাভে সক্ষম করে তোলে। ইন্দ্রিয়শক্তি যখন দেহের সঙ্গে সম্পর্কহীন হয়ে দেশ-কাল-বিষয় সাপেক্ষে বৃত্তি লাভ করে, তখন তা হয়ে ওঠে কার্য-কারন সম্পর্কের উর্দ্ধে সংগঠিত ভাব। তখন প্রকৃতির যে স্বাভাবিক ধর্ম্ম তার উর্দ্ধে উঠে সাধক প্রকৃতিকে বশে নিয়ে আসেন । একেই বলে প্রধানজয়, বা বিভূতিলাভ। এই অবস্থায়, ঋষি পতঞ্জলির ভাষায় শরীরের সমস্ত সীমাবদ্ধ ভাবকে পরিহার করে, যোগী অভ্যাহত গতিতে যাতায়াত করতে পারেন । তখন যদিও দেহাভিমান থাকে না, তথাপি জ্ঞানের মধ্যে প্রবেশের অধিকার থাকে সাধকের। এ কারণেই আমরা দেখে থাকি, যোগের পরাবস্থায় স্থিত যোগীপুরুষ দূরে কোথাও না গিয়েও দূরের বস্তু সম্পকে জ্ঞানলাভ করতে পারেন। এমনকি অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ ঘটনার হুবহু চিত্র তাঁর সামনে প্রতক্ষ্যবৎ হয়ে ওঠে। আপাতদৃষ্টিতে কার্যকারণ সম্পর্কবিহীন, বহু অলৌকিক ঘটনা তাকে ঘিরে ঘটতে থাকে। এই সময় আসলে সাধকের ইচ্ছেশক্তি কারণের অভাব পূরণ করে থাকে। সাধকের ইচ্ছেমাত্রেই কার্য্য সংগঠিত হয়, যা আমাদের কাছে অলৌকিক বলে মনে হয়।
----------
"সত্ত্ব-পুরুষ-অন্যতাখ্যাতি-মাত্রস্য সর্বভাব-অধিষ্ঠাতৃত্বং সর্বজ্ঞাতৃত্বং চ ।" (০৩/৪৯)
সত্ত্বপুরুষ অর্থাৎ বুদ্ধি ও সত্ত্ব পুরুষ, এই দুয়ের মধ্যে অন্যতাখ্যাতি অর্থাৎ ভেদজ্ঞান মাত্রতে যিনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, এমন সাধকের বা যোগীপুরুষের সমস্ত ভাব বস্তুর আধিপত্য (অধিষ্ঠাতৃত্ব) জ্ঞাতা-জ্ঞেয়-জ্ঞান (সর্বজ্ঞাতৃত্ব) রূপে সিদ্ধি লাভ করেন।
দেখুন, উপনিষদে বলা হয়েছে, আত্মপ্রীতির জন্য, সমস্ত বস্তু আমাদের কাছে প্রিয় হয়ে থাকে। এখন কথা হচ্ছে, এই যে আত্মা, এটি কি বস্তুর মধ্যে নিহিত কোনো ক্ষুদ্র বস্তু ? আর এই ক্ষুদ্র বস্তুর (আত্মার) জন্যই আমরা বস্তুকে ভালোবাসি ? মৃত্যুর পরে, যে শবদেহ (প্রাণহীন) পড়ে থাকে, তার মধ্যে কি কোনো আত্মা বিরাজ করছে না ? আপাতদৃষ্টিতে এমনটাই মনে হয়, যে শবদেহের মধ্যে কোনো আত্মা বিরাজ করছে না। এই জ্ঞান আমাদের ভ্রম বই কিছু নয়। সংযমী পুরুষের কাছে, সত্য একটু অন্যরূপ। তাঁরা যথার্থভাবেই মনে করেন, বস্তুর মধ্যে আত্মা নন, আত্মার মধ্যে বস্তু। সমস্ত বস্তুই আত্মার অন্তর্গত। তাই শবদেহ, যাকে প্রাণহীন বলা গেলেও, আত্মাভিন্ন নয়।
এখন এই যোগের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আত্মাকে দর্শন, শ্রবণ, করতে হবে। আত্মা হচ্ছে সমগ্র, আর বস্তু হচ্ছে ক্ষুদ্র। তো যার মধ্যে সমস্ত বস্তু অবস্থান করছে, তাঁকে জানতে পারলে, অর্থাৎ বিরাটকে জানতে পারলে, ক্ষুদ্রকেও জানা হয়ে যায়। তাই আত্মাকে ছেড়ে কোনো বস্তুকে জানতে গেলে, সম্যক রূপে সেই বস্তুকে জানা হবে না। প্রাণহীন শবদেহকে ছেড়ে যদি আপনি আত্মার খোঁজ করেন, তবে আপনি আত্মাকে জানতে পারবেন না। এই যে লোকসকল, ভূতসকল, এ সবই আত্মা। বিষয় আর বিষয়ী আলাদা নয়। সুর ও বাদ্যযন্ত্র আলাদা নয়, গান ও গায়ক আলাদা নয়। আত্মা সর্ব বস্তুর মধ্যেই বিরাজ করছেন। তা সে বস্তু জড় হতে পারে বা অ-জড় হতে পারে, প্রাণহীন বা প্রাণবন্ত হতে পারে। সমুদ্র যেমন জলের আশ্রয়, চক্ষু যেমন রূপের আশ্রয়, তেমনি আত্মাই সমস্ত বস্তুর আশ্রয়। আত্মা সর্ববস্তু ব্যাপী হয়ে আছেন। স্থূল দৃষ্টিতে আমরা এঁকে ধরতে পারি না। কিন্তু সূক্ষ্ম ভাবে শুদ্ধবুদ্ধিতে দেখতে পাওয়া যায় যে সমস্ত জ্ঞেয় বস্তুতে তিনি জ্ঞেয় রূপে অবস্থান করছেন। ঋষি যাজ্ঞবল্ক বলছেন, এক খন্ড লবন জলের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হলে যেমন লবন জলের মধ্যেই বিলীন হয়ে যায়, একে সহজে পৃথক করা যায় না, কিন্তু উত্তাপ দিয়ে জলকে বাস্পে পরিণত করতে পারলে, যা পড়ে থাকে তা লবন। তেমনি স্থূল শরীরকে যোগাগ্নিতে দাহ করলে, যা পড়ে থাকে তা এই আত্মা।
বৈরাগ্যের অভ্যাস করলে, চিত্তের স্থিরতা আসে। আবার এই অভ্যাস নিরন্তর চালিয়ে গেলে, অভ্যাসভূমি দৃঢ় হয়। একেই যোগের ভাষায় বলে বিবেকখ্যাতি। এই বিবেকখ্যাতিতে প্রতিষ্ঠিত যোগীর চিত্তে সর্বভাবে অধিষ্ঠাতৃত্ব হলে, ত্রিকালের সমস্ত কিছুর জ্ঞান যোগীর চিত্তে উদয় হয়। এইযে সমস্ত কিছুর জ্ঞান, এটি আত্মসাক্ষাৎকার করা ছাড়া কিছু নয়। সবশেষে আরো একবার বলি. এই সর্বজ্ঞাতত্ত্ব-রূপ বিভূতি যোগীর কাছে লোভনীয় হলেও, সাধনপথে এটি পরিত্যাজ্য। কারন এরও পারে আছেন ঈশ্বর। ....
----------
"তদ্ বৈরাগ্যাদ অপি দোষবীজ-ক্ষয়ে কৈবল্যম। " (০৩/৫০)
সেই সর্বজ্ঞাতা ইত্যাদি সিদ্ধিতে যে বৈরাগ্য আসে, তার থেকেই সমস্ত দোষবীজের ক্ষয় হয়ে কৈবল্য লাভ হয়।
ঋষি পতঞ্জলি এবার কৈবল্যের সন্ধান দিচ্ছেন। প্রথমে শরীরকে শুদ্ধ করা, তারপরে মনকে শুদ্ধ করা, তারপরে বুদ্ধিকে শুদ্ধ করা। এই হচ্ছে যোগের ক্রমিক। শুদ্ধিকরণ ক্রিয়া শেষ হলে, এটিকে ধরে রাখতে হয়। অর্থাৎ শরীর -মন-বুদ্ধি যেন পুনঃরায় ক্লেশকর কর্ম্মবীজের উৎপন্ন না করতে পারে। এতে করে যেমন ভূত সিদ্ধি হয়, তেমনি ইন্দ্রিয় সকল আপন নিয়ন্ত্রণে আসে। আবার যোগী সর্বজ্ঞাতা ইত্যাদিতে সিদ্ধি লাভ করেন । এর পরে আসে বৈরাগ্য। এই বৈরাগ্য থেকেই সমস্ত ক্লেশকর বীজের ক্ষয়সাধন হয়, ও যোগী কৈবল্য লাভের পথে অগ্রসর হন। এই হচ্ছে যোগ-রহস্যঃ।
বিভূতিপাদ অধ্যায়ে ঋষি পতঞ্জলি, নানান বিভূতির কথা আলোচনা করেছেন। সবশেষে বলেছেন, সর্বজ্ঞতা সিদ্ধি। একেই বিবেকজ সিদ্ধি নাম দেওয়া হয়েছে। এই বিবেকজ সিদ্ধি থেকে আসে পরাবৈরাগ্য। এই পরাবৈরাগ্য লাভের কারণেই স্বাভাবিক ভাবে এসে যায়, কৈবল্যের স্থিতি। বিভূতি আসলে যোগের অন্তরায়, যা যোগীকে প্রলোভিত করে। এই প্রলোভনকে উপেক্ষা করতে পারলে, যোগীপুরুষ ঈশ্বর সদৃশ হয়ে যান। ঈশ্বর সদৃশ অর্থাৎ না ঈশ্বর না মনুষ্য। কেউ একে দেবমানব, মহামানব, মহাত্মা বলে থাকেন। আসলে এইসময় যোগীপুরুষের ঈশ্বর সম্পর্কেও কোনো আগ্রহ দেখা যায় না। না ইনি মুক্তির প্রয়াসী, না তিনি বন্ধনে আবদ্ধ। এ এক অ-জীব অবস্থা, যা জন্ম-মৃত্যুর অতীত।
"স্থানী-উপনিমন্ত্রণে সঙ্গস্ময়াকরণং পুনঃ অনিষ্ট প্রসঙ্গাৎ।" - (০৩/৫১)
যোগের অনিষ্টকারী প্রসঙ্গে বলা যায়, স্থানী অর্থাৎ স্থান নিবাসী এখানে স্বর্গস্থান নিবাসী অর্থাৎ দেবতা দ্বারা নিমন্ত্রনে, তাদের সাথে সঙ্গ করবার দৌলতে যে ভোগ ও আত্মগৌরভ হয়, তা পরিত্যাগ করতে হবে, নতুবা পতন অবশ্যাম্ভাবী।
যোগস্থিত পুরুষের সঙ্গ দেবতাদের কাছেও প্রার্থনীয়। কিন্তু যোগীপুরুষের কাছে এই দেবতাদের নিমন্ত্রণ জনিত কারনে যে ভোগ আত্মগৌরভের উৎপন্ন হয়, তা সব সময় পরিত্যাজ্য। তা না হলে, যোগভ্রষ্ট হবার সম্ভাবনা। দেবতারা কর্ম্মহীন ভোগের রাজত্বে বাস করেন। দেবতাদের তপস্যাজনিত কর্ম্ম বলে কিছু হয় না। যার জন্য, তাঁরা দেবলোক অতিক্রম করে উর্দ্ধলোকে গমন করতে পারেন না। একসময় পুণ্যকর্ম করার কারনে, এই ভোগের রাজত্বে প্রবেশ করেছিলেন আবার পুন্য কর্ম্মের ভোগ শেষ হয়ে গেলে, তাদের পুনরায়, এই মৃত্যুলোকে ফিরে আসতে হয়। কিন্তু যোগী পুরুষকে ব্রহ্মলোকের বাসিন্দা হতে হবে। এবং সেখানেই স্থিতি লাভ করতে হবে। দেবলোকের ঐশ্বর্য্য যেন তাকে মোহিত করতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
আসলে যোগ-অভ্যাসের ক্রমোন্নতির সঙ্গে সঙ্গে যোগীর ভূমির পরিবর্তন হয়। প্রথম দিকে কেবল জ্ঞানালোকের সন্ধান মেলে। তখন সিদ্ধি বলে কিছু থাকে না। এটি যোগীর প্রথম অবস্থা। ধীরে ধীরে যোগী এই জ্ঞানালোকের ভূমি পরিত্যাগ করে, সত্যজ্ঞান অনুভূতির জগতে প্রবেশ করেন। এর পরে তাঁর স্থূল ভূতের জ্ঞান হয়, ইন্দ্রিসকল তাঁর নিয়ন্ত্রণে আসে। এইসময় তাঁকে ঘিরে অনেক অলৌকিক বিভূতির খেলা চলতে থাকে। আর এই বিভূতির কারণেই, যেমন সাধারণ মানুষ, রাজা জমিদার তারপ্রতি আকৃষ্ট হয়, তেমনি দেবতারাও তাঁর সঙ্গ আকাঙ্খ্যা করে। এইসময় যোগীকে আরো বেশি সতর্ক থাকতে হয়। বিভূতির প্রদর্শনকে উপেক্ষা করে, তাঁকে নিঃসঙ্গ হতে হয়। তা না হলে বিভূতির কারনে রাজা-মহারাজের এমনকি দেবতাদের সান্নিধ্য, তাকে ভোগের রাজত্বে নির্বাসিত করে। ফলত যোগীর তখন উর্দ্ধগতি তো দূরে থাকুক, তিনি তখন অধঃপতিত হতে শুরু করেন। এমনকি এই বিভূতির খেলাও তাকে একসময় ছেড়ে যায়। এই অবস্থাকে অতিক্রম করতে হবে। এই অবান্তর বিভূতির প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করতে হবে। তবেই সাধনার অন্তরায় দূর হবে। একে অতিক্রম করতে পারলেই, যোগী প্রজ্ঞার ভূমিতে উত্তীর্ন হবেন।
তাই ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, দেবতাদের সঙ্গ লাভের ফলে যে আত্মগৌরভ, ও ভোগের সাক্ষাৎ মেলে, তা যোগের অন্তরায় বিশেষ।
-----------------
"ক্ষণ-তৎ-ক্রময়োঃ সংযমাৎ বিবেকজং জ্ঞানম। " (০৩/৫২)
ক্ষণ ও তার ক্রোমতে সংযম করলে বিবেকজ জ্ঞান হয়।
ক্ষণ হচ্ছে কালের সূক্ষ্মতম অংশ। যে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় তাকে বলে ক্ষণ। কালের বিভাগ এইরকম :
১৮ নিমেষে এক কাষ্ঠা;
৩০ কাষ্ঠায় এক কলা;
৩০ কলায় ১ ক্ষণ ;
১২ ক্ষনে ১ মূহুর্ত্ত ;
৩০ মুহূর্তে এক অহোরাত্র ;
এখন কথা হচ্ছে, কাল তো বস্তু নয়, যে তার বিভাগ হবে, বা খন্ড খন্ড করা যাবে । আসলে বস্তুর ক্ষুদ্রতম অংশ যেমন পরমাণু, তেমনি কালের ক্ষুদ্রতম অংশ হছে ক্ষণ। পরমাণুগুলো একত্রিত হয়ে বস্তুর আকার নেয়। আবার বস্তুকে খণ্ডিত করে পরমাণু বের করা হয়। কিন্তু কাল একটা বেগবান ধারাবিশেষ, যার ক্ষীণতম অংশ হচ্ছে ক্ষণ। কালের এই যে অবিরাম প্রবাহ একেই বলে ক্রম। ক্ষণ ও তার ক্রম এই দুটি কখনো মিলিত হতে পারে না। কাল হচ্ছে বস্তুশূন্য, না এর বৃদ্ধি আছে, না এর ক্ষয় আছে। কাল হচ্ছে চিরন্তন প্রবাহমাত্র। দুটো ক্ষণ কখনো একসঙ্গে থাকতে পারে না। আর কালের এই যে ক্রম তাও কখনও একসঙ্গে উৎপন্ন হতে পারে না। এক-একটা ক্ষণকে বলা হয় বর্তমানকাল। এইজন্য ক্ষণ বা বর্তমানের না আছে কোনো অতীত, না আছে ভবিষ্যৎ। ক্ষণ সবসময় বর্তমান। অতীত বা ভবিষ্যৎ কাল হচ্ছে কালের পরিণামত্ব জ্ঞাপক বিশেষ শব্দ ।
তাই যোগীপুরুষ এই ক্ষণকে ধরে রাখতে চান, অর্থাৎ কেবল বর্তমানে থাকতে চান। অতীত ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যোগীপুরুষ নিস্পৃহ। এই ক্ষণ হচ্ছে সত্যের ধারক। আর ক্রম হচ্ছে ক্ষণাত্মক কালের প্রবাহ। এই ক্ষণক্রমের প্রভাবেই সমস্ত বস্তু পরিণামত্ব প্রাপ্ত হচ্ছে। ক্ষনের ধারাকে আশ্রয় করে ক্রমের উৎপত্তি হচ্ছে। যোগীপুরুষ যখন এই ক্ষণ ও তার ক্রমকে ধরতে পারেন, এবং এর উপরে সংযমের অভ্যাস করেন, তখন তার বিবেকজ জ্ঞান হয়। বিবেকজ জ্ঞান হচ্ছে সংযম থেকে জাত যে জ্ঞান।
যোগাচার্য্য মুক্তানন্দ গিরি মহারাজ সহজে এই ক্ষণ ও ক্রম বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, শ্বাস বায়ু যখন নাসিকার ছিদ্রপথ বেয়ে শরীরের মধ্যে প্রবেশ করছে, আবার শরীর ছেড়ে বেরিয়ে আসবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে সেই মুহূর্তকে বলে ক্ষণ। আবার শ্বাসবায়ু যখন শরীর ছেড়ে বেরিয়ে এসে ভিতরে প্রবেশ করবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, সেই মুহূর্তকেও বলে ক্ষণ। এই দুটি ক্ষণ আলাদা, একে অর্থাৎ এই দুটি ক্ষণকে কখনো একত্র করা যায় না। আবার এই যে শ্বাসবায়ু একবার প্রবেশ করছে আবার শরীর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে এটি হচ্ছে ক্ষনের ক্রম। এই ক্ষণ ও ক্রোমের উপরে সংযম করলে আমাদের বোধশক্তির মধ্যে একটা উন্নতি লক্ষ করা যায়। একেই বলে বিবেকজজ্ঞান। প্রাণ বেরিয়ে যাওয়া হচ্ছে মৃত্যু, প্রাণের প্রবেশ মানে জন্ম। এই জন্ম-মৃত্যুর খেলা প্রতিনিয়ত চলছে। যোগীপুরুষ যখন ক্ষনের উপরে সংযমের অভ্যাস করেন, অর্থাৎ কুম্ভক করেন, বা শ্বাসের গতাগতির দিকে একাগ্র হয়ে অবস্থান করেন, তখন তিনি জন্ম-মৃত্যুর মাঝে দাঁড়িয়ে দুজনকেই সমদূরত্ত্বে রাখতে পারেন। এই হচ্ছে ক্ষণ ও ক্রমের সংযম।
"জাতি-লক্ষণ-দেশৈঃ অন্যতা-অনবচ্ছেদাৎ-তুল্যয়োঃ ততঃ প্রতিপত্তিঃ । " (০৩/৫৩)
জাতি লক্ষণ ও দেশগত ভেদজ্ঞানের উৎপত্তি না হওয়ায়, দুটি বস্তুর মধ্যে যে অনবিচ্ছেদ্য অভিন্নভাব তা প্রতীয়মান হয়।
বিচিত্র জগৎ, আকাশে লক্ষ তারার ভীড়, মাটিতে হাজার ফুলের মেলা, রঙের বাহার, ভিন্ন ভিন্ন তার আকার। এই বৈচিত্ৰই জগৎকে মোহময় করে তুলেছে। কোটিকোটি পশুপাখি, বিচিত্র তার অবয়ব, বিচিত্র তার গায়ে রঙের বাহার। মানুষের মধ্যেও আছে ভিন্নতা, আছে ভিন্ন ভিন্ন মনের মানুষ। ভৌগলিক কারনে মানুষের রং ও আকৃতির বিভাগ আছে। সবাই সতন্ত্র, সবাই সবার থেকে আলাদা। জমজ সন্তানের মধ্যেও ফারাক। এই পার্থক্য কখনো ঘুচবার নয়। আবার এ-সবই সেই পঞ্চভূতের খেলা। তন্মাত্রের গুনে গুণান্বিত। সবকিছুর মধ্যে আছে, পঞ্চভূতের মিশ্রণ। এইযে পঞ্চভূত তা আসলে আবরণ মাত্র। এই আবরণের মধ্যে সেই এক অদ্বিতীয় আত্মার বাস। রং-বেরঙের ফুলের মালা, গাঁথা আছে একই সূত্রে। আত্মারূপী সূত্রে গাঁথা এই বৈচিত্রে ভরা বিশ্বের মালা। এসব শুধু তথ্যভিত্তিক জ্ঞানের বিষয় বা তত্ত্বকথা নয়, এই সত্যকে সাধকের অনুভব করতে হবে। কিন্তু কিভাবে ?
দেশ ভেদে ভিন্নতা, জাতিভেদে ভিন্নতা, লক্ষণ ভেদে ভিন্নতা, এই ভিন্নতা থেকে বেরুতে গেলে ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, " ততঃ প্রতিপত্তিঃ" - তা থেকে উপলব্ধি করতে হবে। এই তা-টা কি ? তা হচ্ছে বিবেকজ জ্ঞান। এই বিবেকজ জ্ঞান থেকে উপলব্ধি আসবে।
দেখুন প্রকৃতির গুনে গুণান্বিত হয়ে, আমরা কতনা পন্ডিতি করছি। ব্রাহ্মণের ঘরে জন্ম গ্রহণ করে বড়াই করছি, শূদ্রের ঘরে জন্ম গ্রহণ করে হীনমন্যতায় ভুগছি। পশু হয়ে কতনা হিংসার আশ্রয় নিচ্ছি, আবার অবলা হরিণ হয়ে হিংসার শিকার হচ্ছি। পাখী হয়ে আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছি, আবার মৎসরূপে জলের মধ্যে খেলে বেড়াচ্ছি। প্রকৃতির গুনে গুণান্বিত হয়ে আমরা সংসার-সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছি। আবার এই প্রকৃতিরূপী মাতৃশক্তি সংস্কারের দ্বারা আবদ্ধ মানবগনকে ভোগসাধনের শেষে ভোগের উর্দ্ধে স্থাপন করে থাকেন । যোগসাধনা হচ্ছে প্রকৃতি ও মানবকুলের স্বরূপের মধ্যে যে পার্থক্য আছে, তার পরিচয় করিয়ে দেওয়া। ঈশ্বর প্রাণিধান, ওঙ্কারের সাধনা, অষ্টাঙ্গ যোগ ইত্যাদি সাধন মাধ্যম এই প্রচেষ্টার নামান্তর।
মানবকুল বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে বিষয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। চিত্তের এই বিক্ষিপ্ততা থেকে নিষ্কৃতি দিয়ে মনকে একটু বিশ্রামের অভ্যাস করাতে হবে। তখন মন ধ্যানের গভীরতায় প্রবেশ করবে। বাহ্য জগৎ থেকে মন তখন অন্তর্জগতে প্রবেশ করবে। এবার ধারণা-ধ্যান-সমাধিতে অভ্যস্ত হয়ে সংযমের অধিকারী হতে হবে। তখন অর্থাৎ সংযমী পুরুষের কাছে তখন যোগ-ঐশ্বর্যের আগমন ঘটবে। এই যোগৈশ্বর্য্যকে উপেক্ষা করে যখন সাধক সূক্ষ্মতম ক্ষণকে ধরতে পারবেন, তখন সাধকের মধ্যে বিবেকজজ্ঞানের উন্মেষ ঘটবে। এই বিবেকজজ্ঞানের উন্মেষের ফলে যোগী জাতি, লক্ষণ ও দেশের কারনে যে ভিন্নতা তার জ্ঞান লাভ করবেন।
------------
"তারকং সর্ব বিষয়ং সর্বথা - বিষয়মক্রমঞ্চেতি বিবেকজং জ্ঞানম।" (০৩/৫৪)
তারক অর্থাৎ ত্রাণকারী সমস্ত বিষয়ের মধ্যে সর্বদা অবস্থান করছেন। তার অবিষয়ী কিছু না থাকায়, সবকিছুকে বিষয়ী করতে পারেন। এই হচ্ছে বিবেকজ জ্ঞান।
তারক কথার অর্থ হচ্ছে ত্রাণকারী। এই ত্রাণকারী সর্বদা সর্বথা সমস্ত বিষয়ের মধ্যেই বিরাজ করছেন। প্রকৃত জ্ঞান স্বতঃস্ফূর্ত। আপন প্রতিভাই এই জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে দেয়। সমস্ত জীবের মধ্যে আপনা থেকেই মৃত্যুভয়ের জন্ম হয়,আবার বেঁচে থাকবার অদম্য ইচ্ছের জন্ম হয়। এই ইচ্ছেকে জাগ্রত করবার জন্য কোনো বাইরের জ্ঞানসংগ্রহের প্রয়োজন পড়ে না। ক্ষিদে বোধ জীবের স্বাভাবিক ধর্ম্ম - যা শরীর রক্ষার জন্য অপরিহার্য। তেমনি বিবেকজজ্ঞানও আপন প্রতিভার মধ্যে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে, যা স্বরূপের জ্ঞান এনে দিতে পারে । যোগক্রিয়া এই প্রতিভাকে ইন্ধন যোগায় মাত্র। এই জ্ঞান অন্যথেকে লব্ধ করা যায় না। কোনো উপদেশও এই জ্ঞানের জন্ম দিতে পারে না। এই হচ্ছে তারক জ্ঞান। বুদ্ধি যখন অক্রম অর্থাৎ ক্রোম হারায়, তখন এই বুদ্ধিতে সমুপস্থিত হয় এই তারক জ্ঞান। বিবেকজ জ্ঞান হচ্ছে পরিপূর্ন জ্ঞান। এরই অংশবিশেষ আমাদের সম্প্রজ্ঞাত সমাধিতে দেখা দেয়, আর অসম্প্রজ্ঞাত সমাধিতে এর পূর্নতা পায়।
সত্ত্ব-পুরূষয়োঃ শুদ্ধিসাম্যে কৈবল্যম ইতি। " (০৩/৫৫)
বুদ্ধির সত্ত্বতায়, শুদ্ধপুরুষ ও শুদ্ধ সত্ত্ববুদ্ধির মধ্যে সাম্যতা এলে কৈবল্য লাভ হয়।
জ্ঞানীদিগের ক্রমশঃ নিখিল ব্রহ্মান্ডজ্ঞানের পর ব্রহ্মজ্ঞান হয়ে জ্ঞানানন্দময় পরমাত্মাতে বিলীন হওয়ার নাম কৈবল্য। কেউ এঁকে বলেন সমস্ত দুঃখের নিবৃত্তি, কেউ একে বলেন সমস্ত ক্লেশ থেকে মুক্তি, কেউ বলেন, সংসার-মুক্তি, আবার কেউ বলেন মোক্ষ।
দেখুন পুরুষকে বেঁধে রেখেছে প্রকৃতির তিন গুন্। আবার বুদ্ধিকে অশুদ্ধ করেছে এই ত্রিগুণাত্বক অবিদ্যা। তো পুরুষকে ত্রিগুণের খপ্পর থেকে মুক্ত করতে হবে, আবার বুদ্ধিকে অবিদ্যা থেকে মুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ ত্রিগুণের অধিকার থেকে যখন বুদ্ধি ও পুরুষ মুক্ত হবেন, তখন
পুরুষের যথাযথ স্বরূপের প্রতিফলন হবে শুদ্ধ বুদ্ধিরূপ আয়নায়। তখন বুদ্ধিরূপ আয়নায় প্রতিফলিত চিত্র আর পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। এতেই আসবে কৈবল্য, এতেই আসবে পুরুষের স্বরূপে প্রতিষ্ঠা।
ঋষি পতঞ্জলি প্রণীত যোগদর্শনের এখানেই সমাপ্তি।
ওঁং নমঃ ঋষি পতঞ্জলি পাদপদ্মে।
ইতি শ্রী পাতঞ্জল সাংখ্য প্রবচনে বৈয়াসিকে বিভূতিপাদ্যঃ।
---------------
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমগ্র বিভূতিপাদ - সংক্ষিপ্ত আকারে।
ঋষি পতঞ্জলি প্রণীত যোগদর্শন পুস্তকের প্রথমপাদ হচ্ছে সমাধিপাদ - যা সাধকের সাধন জীবনের লক্ষ। অর্থাৎ যাত্রা শুরুর প্রথমেই জেনে নিতে হবে, আমাদের উদ্দেশ্য কি ? এই যে যোগক্রিয়া এর উদ্দেশ্য কি ? এখানে সমাধির সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে। দ্বিতীয়পাদ হচ্ছে সাধনপাদ। এখানে সাধনক্রিয়ার সম্পর্কে বলা হয়েছে। অর্থাৎ সাধনার বহিরঙ্গ দিকের কথা আলোচনা করা হয়েছে।
তৃতীয়পাদ হচ্ছে বিভূতিপাদ - অর্থাৎ অন্তরঙ্গ সাধনার ধরন ও তার ফল সম্পর্কে বলা হয়েছে। বিভূতিপাদ শুরু হয়েছে অন্তরঙ্গ সাধনার কথা দিয়ে অর্থাৎ ধারণা, ধ্যান ও সমাধির কথা - যার ফলশ্রুতি হচ্ছে সংযম। এই সংযমের ফলে আমাদের লাভ হয়েছে বিবেকজ জ্ঞান। এই বিবেকজ জ্ঞান দ্বারা আমরা পরিচিত হয়েছি প্রকৃতির সঙ্গে যা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বীজ স্বরূপ। আবার এই বিবেকজ জ্ঞানের দ্বারাই পুরুষের যথার্থ পরিচয় পাওয়া গেছে।
যোগ হচ্ছে জ্ঞানাগ্নিকে প্রজ্জ্বলিত করা। আসলে জ্ঞানের অগ্নি স্ফুলিঙ্গ আকারে আমাদের সবার মধ্যে আছে। এখন এই অগ্নিতে একটু বাতাস দিলেই এই অগ্নির প্রকাশ ঘটে। কিন্তু অগ্নিকে ঘিরে রাখে ধোঁয়া বা অবিদ্যা। এই ধোঁয়াকে দূর করবার জন্য দরকার অনিয়ন্ত্রিত বাতাসকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনা।
আমরা দেখেছি, ঋষি পতঞ্জলি সাধনপাদের কথা শেষ করেছেন, প্রত্যাহারের কথা দিয়ে। আর বিভূতিপাদের কথা শুরু করেছেন ধারণা দিয়ে। এতক্ষন নদীর ধার ঘেসে শীতের সূর্যের মিষ্টি রোদের মধ্যে তেল মেখে গা গরম করছিলাম। এবার নদীতে ঝাঁপ দিতে হবে। জীবন তরণীকে সংসারস্রোতে আলগা করে ছেড়ে দিতে হবে। এতদিন মন ছিলো বিষয়মুখী, এবার মন অন্তর্মুখী হয়েছে। কিন্তু অন্তর্মুখী হলে কি হবে, মন এখনও সেই প্রকৃতির বশে আছে। প্রকৃতির উপাদানে তৈরী এই যে দেহ, তা তো প্রকৃতির সম্পদ। এই দেহের বাইরে যেমন আছে প্রকৃতি, তেমনি দেহের ভিতরেও আছে একই প্রকৃতি। তো ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এতদিন তুমি প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন বস্তুতে মধু সংগ্রহের জন্য ঘুরে ঘুরে বেরাচ্ছিলে, এবার এসো দেহের মধ্যে বা বাইরে কোনো একটা গাছে বসে, একটু বিশ্রাম নাও। বিশ্বের যেকোনো একটা বস্তুতে মনটাকে বেঁধে ফেলো। এখন সেই বিশিষ্ট দেশে বা ধাতুতে মনকে নিবিষ্ট করতে হবে। দেহের মধ্যে নাভিচক্রে বা হৃদয়চক্রে, আজ্ঞাচক্রে, বা মস্তিষ্কের উপরে স্থিত বিন্দুতে মনটাকে স্থির করো। চিত্তের সমস্ত বৃত্তিকে সেই চেতনকেন্দ্রে নিবদ্ধ করো। যদি এই দেহচক্রের মধ্যে ধারণায় সন্নিবিষ্ট না হতে পারো, তবে দেহের বাইরে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে স্থির যেকোনো বস্তু, তা সে হতে পারে গ্রহ, নক্ষত্র, চন্দ্র , সূর্য, তারকারাজি এমনকি প্রদীপ, স্ফটিক, শিবলিঙ্গ, বানলিঙ্গ, শালগ্রাম শিলা এমনকি মাটির পুতুলের মধ্যে মনকে কেন্দ্রীয়ভূত করো। এইযে মনকে একটা স্থির বস্তুতে স্থির করা একেই বলে ধারণা। ঋষি বলছেন, "দেশবন্ধঃ চিত্তস্য ধারণা" - (৩/০১) তবে, এই ধারণায় অধিকার স্থাপন করতে গেলে, আগে প্রাণায়াম ইত্যাদিতে সিদ্ধ হতে হবে।
এর পরের ধাপ হচ্ছে ধ্যান। ঋষি বলছেন, "তত্র প্রত্যয় ঐকতানতা ধ্যানম" (০৩/০২) অর্থাৎ ধ্যেয় বস্তুতে মন-বুদ্ধি-চিত্তের একতানতা আনতে হবে। এবার এই ধ্যানকে টেনে নিয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ ধ্যানের নিরন্তর অভ্যাস করতে হবে। মনের ভাবনা যেন অখন্ড হয় - বিচ্ছিন্ন না হয়। ধ্যেয় বস্তু ছেড়ে মন যেন অন্য কোনো কিছুতে ক্ষনিকের জন্যও না সরতে পারে। ধ্যান যত গভীর হবে, জানবেন, আপনি তত যোগের লক্ষ পূরণের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। তো ধ্যানে একটা নির্দিষ্ট বিষয়কে ধরেছিলাম, এবার সেই বিষয়টিকে নিয়েই নিরবিচ্ছিন্ন চিন্তাকে প্রবাহিত করতে থাকলাম। অর্থাৎ মনের তখন একমুখী গতি। কেবল ধ্যেয় বস্তুর চিন্তন। এই অবস্থায় সাধক মন ও ধ্যেয় বস্তুতে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। এর পরে একসময় মন চিন্তারহিত হয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। যদিও মন থাকবে। অর্থাৎ দ্রষ্টা ও দৃশ্য দুইই থাকবে। কিন্তু দুইই স্থির। এতক্ষন যে চিন্তাপ্রবাহ মন থেকে ধ্যেয় বস্তুর দিকে ধাবিত হচ্ছিলো, তা নিষ্প্রভ হয়ে যাবে। ফলত মন ও ধ্যেয় বস্তু এই দুয়ের সম্পর্ক বলে কিছু থাকবে না। তখন জেগে থাকবে শুধু ধ্যেয় বস্তু বা ধ্যানের বিষয়। এই হচ্ছে সমাধির অবস্থা। ঋষি পতঞ্জলির ভাষায় - "তদের অর্থ মাত্র নির্ভাসং স্বরূপ শূন্যমিব সমাধি।" -(০৩/০৩) - সেই ধ্যান যখন তার বিষয়মাত্র প্রকাশে স্বরূপ-শূন্য-মতো হয়, তখন তা হলো সমাধি।
তো ধারণা, ধ্যান ও সমাধি সম্পর্কে শুনলাম। এবার ঋষি বলছেন, "ত্রয়ম একত্র সংযমঃ" - অর্থাৎ ধারনা ধ্যান ও সমাধিকে একত্রে বলা হয় সংযম। ধারণা ধ্যান ও সমাধিতে সিদ্ধিলাভ করাকেই বলে সংযম। অর্থাৎ একবস্তুতে তন্ময় হয়ে যাবার ক্ষমতা।
এখন কথা হচ্ছে, এই সংযমে সিদ্ধিলাভ করলে কি হয় ? এই সংযমে সিদ্ধিলাভ হলে, যথার্থ বিষয়জ্ঞানের উপলব্ধি হয়। আমরা যাকে জ্ঞান বলে থাকি তা আসলে তথ্যভিত্তিক জ্ঞান। যোগদর্শনের উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রতক্ষ্য জ্ঞান - যা আমাদের বোধের মধ্যে জাগ্রত হয়। এই যথার্থজ্ঞান বুদ্ধি দ্বারা লব্ধ নয়। বুদ্ধি আসলে সংগৃহিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিষয় বিচারে প্রবৃত্ত হয়। যেখানে পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, সেখানে বুদ্ধি বিমূঢ় হয়ে যায়। আর বুদ্ধি দ্বারা যদি এর বিচার করতে যান, তবে এসব যোগসাধনার ফল কাল্পনিক বলে বোধ হবে। যোগীগণ বরং বলে থাকেন বুদ্ধিজীবীদের জ্ঞান কেবল কল্পনা মাত্র। "আম" - একটা বিশেষ রসালো ফল। এই ফলকে বুদ্ধি আম বলে নিশ্চয় করে থাকে। আসলে আম বলে কিছুই নেই, এটি একটি কাল্পনিক শব্দ বিশেষ। এর নাম "MANGO" বা অন্যকিছু হলেও এই রসালো ফলের বিশেষ কোনো পরিবর্তন হতো না। কিন্তু এর মধ্যে যে বিশেষ রস আছে, যা সুস্বাদু, মিষ্টি, বা টক - এই উপলব্ধি একমাত্র ভক্ষণকারীর হয়ে থাকে। আমের রচনা মুখস্ত করে এই জ্ঞান মেলে না। যোগদর্শন এই কল্পনাকে সরাতে চেয়েছে। আমাদের যে তথাকথিত জ্ঞান তা নির্বিকল্প নয়, বিকল্প জ্ঞান। শব্দের সাহায্যে বস্তুকে জানতে চাইছি। এই বিকল্পজ্ঞান থেকে মুক্ত হয়ে বিশুদ্ধ জ্ঞানের ভূমিতে উত্তীর্ন হতে হবে। যাঁকে ঋষিমুনিগন বলছেন প্রজ্ঞায় উপনীত হওয়া। জ্ঞানকে সংকীর্নতা থেকে মুক্ত করতে হবে। প্রজ্ঞা লাভের পথ হচ্ছে অষ্টাঙ্গযোগ, যা ধারণা-ধ্যান-সমাধিতে এসে মিশেছে। আর এই তিনটে অনুশীলনীকে একত্রে বলা হচ্ছে সংযম।
এখন কথা হচ্ছে এই সংযম লাভ করে আমার কি হবে ? ঋষি বলছেন, এই সংযম লাভ করলে, প্রজ্ঞার আলোক প্রাপ্ত হওয়া যাবে। আর এর ফলে স্বল্প আলোতে যে রজ্জুকে সর্প বলে ভ্রমাত্মক জ্ঞানের কারনে আমার মধ্যে ভয়ের উদ্রেগ হয়েছিলো , তা সত্ত্বর দূর হবে।
কেননা টর্চ এখন আপনার হাতে। আর টর্চ সঙ্গে থাকলে বস্তুর স্বরূপ আপনার কাছে যথার্থরূপে প্রকাশিত হবে। ভ্রমের জন্য যে ভয় ও আবেগ আপনাকে সহ্য করতে হচ্ছিলো, তা দূর হয়ে যাবে। আপনি সদা সত্যে প্রতিষ্ঠিত থাকবেন। আপনি আনন্দে থাকবেন। আপনার মধ্যে একটা স্থিরপদ লাভ হবে। জ্ঞানের পূর্ণতায়, আপনার জীবন সার্থক হবে।
যাইহোক মশাল বা টর্চ এখন আপনার হাতে। এবার আপনি যে বস্তুর দিকে এই টর্চের আলো ফোকাস করবেন, সেই বস্তুর স্বরূপ তখন আপনার কাছে সহজেই প্রকাশিত হবে। ঋষি পতঞ্জলি এবার এর প্রয়োগবিধি সম্পর্কে বলছেন। বিদ্যা পুস্তকে আবদ্ধ থাকলে, আপনার কাছে সেই বিদ্যা কেবল পন্ডিতের বাগাড়ম্বর হবে। মন্ত্রের প্রয়োগবিধি না জানায়, সময়কালে এর প্রয়োগ করতে পারবেন না। ঋষি বলছেন, "তস্য ভূমিসু বিনিয়োগঃ" -৩/০৬) এই ত্রিস্তরীয় সাধনসিদ্ধিকে বিনিয়োগ করতে হবে। পাহাড়ের একটা চূড়াকে জয় করে, অন্য চূড়াতে যেতে হবে। ঋষি পতঞ্জলি বিভূতিপাদের ১৬-৩৬ সূত্রে এই প্রয়োগবিধির কথা বলেছেন, এবং তার ফল সম্পর্কে বলেছেন। এসব আমরা সূত্র-ভিত্তিক বিস্তারিত আলোচনার সময় শুনেছি। কিন্তু ৩৭ নং সূত্রে এসে বলছেন, এগুলো যোগের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া বিশেষ। শুধু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নয়, এগুলো যোগের অন্তরায়। এই যোগবিভূতির আশ্চর্য্য ফলে বিমোহিত হয়ে গেলে, বা এসবের মধ্যে সাধক আটকে গেলে, সাধক পথভ্রষ্ট হবেন। তীর্থযাত্রাকালীন অবস্থায়, যেমন তীর্থপথের সৌন্দর্য আমাদেরকে আকৃষ্ট করে, তেমনি যোগসাধনার মূল লক্ষে পৌঁছোবার আগে, আমাদের কাছে অনেক ঐশ্বর্যের প্রলোভন আসবে। কিন্তু যথার্থ যোগীকে এই সব যোগ-ঐশ্বর্য্যকে উপেক্ষা করতে হবে। তা যদি না করা হয়, তবে সাধকের উর্দ্ধগমন দূরে থাকুক, অধঃপতন নিশ্চিত। তো ৩৭ নং সূত্রে সতর্কীকরণের কথা বলার পরে, আবার তিনি কিছু সিদ্ধির কথা বলেছেন। যে সিদ্ধি আসলে সাধকের উন্নতির লক্ষণ। এগুলোকে উপেক্ষা নয়, বরং এর সাহায্যেই লক্ষে পৌঁছনোর সোপান পেয়ে যাবেন। এই সিদ্ধিগুলো অষ্টসিদ্ধি নামে পরিচিত। অনিমা, লঘিমা, মহিমা, প্রাকাম্য, বশিত্ব, ইশিতৃত্ত্ব, গরিমা, ও কামাবসায়িত্বম। অর্থাৎ যোগীপুরুষের শরীর তার ক্রিয়ার বাধা হতে পারে না। সমস্ত কর্ম্ম তাঁর ইচ্ছাধীন হয়ে যায়। যোগীর শরীর এ ক্ষেত্রে যোগীর ইচ্ছাধীন হয়ে যায়। এই সিদ্ধি যখন লাভ হয়, তখন প্রকৃতি তার সমস্ত ঐশ্বর্য্য যেন সাধকের কাছে তুলে ধরেন। আসলে সাধক তখন আর শরীর বা ক্ষেত্র নেই, তিনি তখন ক্ষেত্রজ্ঞ অর্থাৎ আত্মস্থ হয়ে গেছেন। এইসময় তিনি সর্বজ্ঞাতত্ত্ব লাভ করেছেন। এই চরম উপল্বদ্ধিতে তিনি ক্ষনে স্থিত থাকেন। অর্থাৎ তখন তার কাছে না থাকে অতীত, না থাকে ভবিষ্যৎ কেবল তিনি বর্তমানে উপস্থিত থাকেন। আর এই নিত্য-বর্তমান থাকাই বিবেকজজ্ঞান। যেখানে গুরু-শিষ্য এক হয়ে যায়। যেখানে সাধক আর সাধ্য এক হয়ে যায়।
শেষের দিকে এসে, অর্থাৎ ৩/৫১ নং সূত্রে আবার তিনি সাবধানবাণী উচ্চারণ করে বলছেন, সাধক কখনো সাধনপথ থেকে যেন সরে না দাঁড়ান। কারন যত সিদ্ধিই সাধক অৰ্জন করুন না কেন, সবই পরিণামী, যোগীপুরুষকে অপরিণামী হতে হবে। শুধু ত্যাগ আর ত্যাগ - অর্থাৎ বৈরাগ্যই সাধন। সবাইকে ছেড়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে, যেমন যুধিষ্ঠির স্বর্গারোহন কালে করেছিলেন। তা না হলে কৈবল্যধামে পৌঁছনো যাবে না। কৈবল্য অর্থাৎ জ্ঞানীদিগের ক্রমশঃ নিখিল ব্রহ্মান্ডজ্ঞানের পর ব্রহ্মজ্ঞান হয়ে জ্ঞানানন্দময় পরমাত্মাতে বিলীন হওয়া। কেউ এঁকে বলেন সমস্ত দুঃখের নিবৃত্তি, কেউ একে বলেন সমস্ত ক্লেশ থেকে মুক্তি, কেউ বলেন, সংসার-মুক্তি, আবার কেউ বলেন মোক্ষ।
বিভূতি যোগের কথা শেষ হলো। ঋষি পতঞ্জলির চরণে ভক্তিপূর্ণ প্রণাম।
-------
Comments
Post a Comment