বিশ্বরূপ দর্শন ব্যাপারটা কি ? ভগবান কে ? (শ্রীমদ্ভগবৎ গীতা - সপ্তম অধ্যায়)

 বিশ্বরূপ দর্শন ব্যাপারটা কি ?

আমরা শুনেছি, যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে তাঁর বিশ্বরূপ দর্শন করিয়েছিলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে আজকের এই আলোচনা। বিশ্বরূপ - বিশ্ব কথাটার অর্থ সমস্ত আর রূপ কথাটার অর্থ মূর্তি। তো সমস্ত রূপ যখন একাধারে প্রকাশিত  হয়, তখন তাকে বিশ্বরূপ বলা যেতে পারে। আমাদের অনেকের ধারণা  হচ্ছে, এটি বোধহয় স্বয়ং ভগবানের মূর্তরূপ। আর বিরল এই মূর্তি যা অনেক সাধ্য সাধনা করে, ভগবৎ কৃপায় সাক্ষাৎ হয়ে থাকে। তবে এই মূর্তির কোনো পুজোর প্রচলন নেই।  দেখুন বিশ্বের তিনটে রূপ, সৃষ্টি-স্থিতি ও প্রলয়।  অর্থাৎ জন্ম-জীবন ও মৃত্যু।  এই তিনটে অবস্থাকে কবি-কল্পনায় একটা রূপ দেওয়া হয়েছে।  যাকে বলা হচ্ছে বিশ্বরূপ। এই ব্যাপারটা শ্রীমদ্ভগবৎ গীতার একাদশ অধ্যায় টি আমরা বুঝে নেবার চেষ্টা করবো।   

শ্রীগীতার সমস্ত কথাই আমরা সঞ্জয়ের মুখ দিয়ে শুনেছি।  তিনি আবার অন্যদের কথা তাদের নাম করে আমাদের  কাছে শুনিয়েছেন। প্রথমে ৫-৮ নং শ্লোকে, অর্থাৎ বিশ্বরূপের প্রকাশ ঘটাবার আগে, শ্রী ভগবান অর্জ্জুনকে কি দেখাতে চলেছেন, তার বর্ননা করেছেন। এই একাদশ অধ্যায়ে ৯-১৪ নং শ্লোক সঞ্জয়ের নিজের উক্তি, যা তিনি বিশ্বরূপ সম্পর্কে বলেছেন।  আবার ১৫-৩১ নং শ্লোকে অর্জ্জুন যে দেখেছেন, সেই বিশ্বরূপের বর্ননা করেছেন। শেষে ৩২-৩৪ নং শ্লোকে আছে কালস্বরূপ আত্মস্বরূপ বর্ননা যা শ্রীকৃষ্ণ নিজ মুখে করেছেন।

প্রথমে আমরা ভগবানের শ্রীমুখ থেকে শুনে নেই, তিনি কি দেখাতে চলেছেন। বলছেন, হে পার্থ, তুমি আমার নানা বর্ন ও আকৃতি বিশিষ্ঠ এবং সহস্র  সহস্র বিভিন্ন দিব্য মূর্তি দর্শন করো। হে ভারত, আমার দেহে আদিত্য-সকল, বসুগন, রুদ্রগন, অশ্বিনী কুমারদ্বয়, এবং বায়ুসকলকে দর্শন করো। পূর্ব্বে যা কখনো দেখোনি, এমন বহুপ্রকারের আশ্চর্য্য বস্তু আমাতে দর্শন করো। যে অর্জ্জুন, এই দেখো, আমার এই বিরাট শরীরে একত্রে অবস্থিত স্থাবর-জঙ্গমাত্মক সমস্ত জগৎ এবং যা কিছু তুমি দেখতে চাও, তাও দর্শন করো।

দর্শন করো তো বললেন, কিন্তু অর্জ্জুন দেখতে পাচ্ছে কি ? না অর্জ্জুন তখন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।যোগেশ্বর সেটা ভালোভাবে বুঝতে পারলেন,তার  এবার ভগবান অর্জ্জুনকে গুড়াকেশ সম্মোধন করে বললেন,  তুমি তোমার এই স্থুল চর্ম্ম  চক্ষু দ্বারা আমার বিশ্বরূপ দর্শন করতে পারবে না, এজন্য তোমাকে দিব্যচক্ষুঃ দান করছি।  এই দিব্যচক্ষু দ্বারা তুমি আমাদের ঐশ্বরিক যোগ-ঐশ্বর্য্য দর্শন করো।

 দিব্যচক্ষু কথাটার অর্থ হচ্ছে, চর্ম্মচক্ষে বা বহিরিন্দ্রীয়ের  অতীত বিষয় দর্শন করবার মতো চক্ষু। দিব্য কথাটার আরো একটা অর্থ হচ্ছে পবিত্র দেবসুলভ জ্যোতিঃ, অর্থাৎ নির্ম্মল জ্যোতি, । এই নির্ম্মল জ্যোতি দর্শনের জন্য সাধনক্রিয়ার সাহায্যে নিয়ে থাকেন।   এই দিব্যচক্ষু দানের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমরা গীতাতে কিছু দেখতে পাই না।  কিভাবে এই দিব্যচক্ষু দান  করলেন, তার কোনো প্রক্রিয়ার কথা এখানে বলা নেই। মহাভারত থেকে জানতে পারি, মনামুনি ব্যাসদেব ও শ্রীকৃষ্ণ এই বিদ্যা আয়ত্ব করেছিলেন। ব্যাসদেব, সঞ্জয়কে এই দিব্যচক্ষু দান করেছিলেন। আসলে এই অতীন্দ্রিয় শক্তি কেবলমাত্র যোগের অভ্যাসের ফলে আয়ত্ত্ব হয়ে থাকে। যোগের উত্তম অবস্থায়, এই দিব্যদর্শন বিদ্যা যোগের পার্শফল হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।

যাইহোক, আমাদের যে চোখ তা প্রাকৃত। এই চোখের দ্বারা অপ্রাকৃত বস্তু দর্শন সম্ভব নয়। তাই যোগেশ্বর অর্জ্জুনের অন্তর্চক্ষু উন্মীলন করে দিলেন। এবার অর্জ্জুনের অদ্ভুত দর্শন শুরু হলো। 

এবার আমরা সঞ্জয়ের কাছ থেকে শুনবো। সঞ্জয় ধৃতরাষ্টকে উদ্দেশ্য করে বলছেন,  হে রাজন, মহান যোগেশ্বর এই কথা বলে,পার্থকে নিজের পরম ঐশ্বরিক রূপ দেখালেন। সেই রূপ অনেক মুখ, অনেক নয়নযুক্ত, অনেক অদ্ভুত আকৃতি অনেক দিব্যলঙ্কার শোভিত এবং ক্ষেপণযোগ্য অস্ত্রসস্ত্রে (উদ্যত দিব্য আয়ূধ সমূহে) সুসজ্জিত। আকাশে সহস্র সূর্য্যের  প্রভা যদি যুগপৎ সমুদিত হয়, তবে তা সেই মহাত্মার প্রভাবতুল্য  হতে পারে। সেই দেব শরীরে নানাভাগে বিভক্ত সমগ্র জগৎ একত্রে অবস্থা করছে। অর্জ্জুন রোমাঞ্চিত দেহে সেই বিশ্বদেবকে অবনত মস্তকে প্রণাম করলেন। এই হলো, সঞ্জয়ের দর্শন উক্তি। এবার অর্জ্জুন কি বলছেন, বা তার কেমন লাগছে তা শুনি। 

অর্জ্জুন বলছেন, (১১/১৫-৩১) 

হে দেব, তোমার দেহে সমস্ত দেবতা, স্থাবর-জঙ্গমাত্মক চরাচর জগৎ, সমস্ত ঋষি, সমস্ত নাগ ও কমলাসনে স্থিত সৃষ্টিকর্ত্তা ব্রহ্মাকে দেখতে পাচ্ছি। (১৫)

হে বিশ্বেশ্বর বহুবাহু, বহুউদর, বহুমুখ, বহুনেত্র বিশিষ্ট তোমার অনন্ত রূপ সর্বত্র লক্ষ করছি।  কিন্তু হে বিশ্বরূপ তোমার আদি, অন্ত, মধ্য কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। (১৬)

কিরীট,গাদা, ও চক্রধারী, সর্বত্র দীপ্তিমান, তেজঃপুঞ্জস্বরূপ, প্রদীপ্ত অগ্নি ও সূর্য্যের ন্যায় প্রভাসম্পন্ন তোমার অপরিমেয় রূপ আমি সর্ব্বত্র দেখতে পাচ্ছি। (১৭) 

 তুমি অক্ষর পরব্রহ্ম ও একমাত্র জ্ঞাতব্য, তুমি বিশ্বের পরম আশ্রয় ও সনাতন ধর্ম্মের রক্ষকম তুমি অব্যয়  সনাতন পুরুষ, এটাই আমার অভিমত। (১৮)

আমি দেখছি, তুমি অনাদি, অমধ্য, অনন্ত।  তুমি অশেষ বীর্যসম্পন্ন, অসংখ্য তোমার বহু, চন্দ্র-সূর্য তোমার নেত্রস্বরূপ। তোমার মুখ মন্ডলে অগ্নির প্রদীপ্ত জ্যোতিঃ, তুমি স্বীয় তেজে সমস্ত জগৎ সন্তপ্ত করছো।(১৯) 

হে মাহাত্ম্য, দেবলোক অর্থাৎ স্বর্গ, পৃথিবী, ও অন্তরীক্ষ এবং দশ দিক ব্যাপী তুমিই বিদ্যমান। তোমার এই অদ্ভুত উগ্ররূপ দর্শন করে ত্রিলোক ভীত ও ব্যথিত হচ্ছে। (২০) 

এই দেবতাগণ তোমাতেই প্রবেশ করছেন। কেহ কেহ ভীত হয়ে করযোগে রক্ষ রক্ষ তোমার স্তব করছেন এবং হর্ষি ও সিদ্ধগণ স্বস্তি স্বস্তি বলে উত্তম স্তুতিবাক্যে তোমার স্তুতি করছেন।  (২১)

যত  রুদ্র, আদিত্য, বসু, এবং সাধ্য, বিশ্বদেবগন, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, মরুৎগণ, গন্ধর্ব্ব , যক্ষ ও অসুর এবং সিদ্ধগণ সকলেই তোমাকে দর্শন করছে। (২২)

হে মহাবাহো, বহু বহু মুখ, নেত্র, বহু, উরু, পদ ও উদার বিশিষ্ট এবং অসংখ্য বৃহৎ দাঁতযুক্ত, ভীষণ দর্শন তোমার এই বিরাট মূর্তি দেখে, সমস্ত প্রাণী অতীব ভীত হয়েছে এবং আমিও অতিশয় ভীত হয়েছি।  (২৩)

হে বিষ্ণো, তোমার আকাশব্যাপী তেজোময়, নানানবর্নযুক্ত ও বিস্ফারিত মুখমন্ডল ও অতি উজ্বল বিশাল নেত্র দেখে আমার অন্তরাত্মা ব্যথিত।  আমি ধৈর্য্য ধরতে পারছি  না, শান্তি পাচ্ছি না। (২৪)

হে দেবেশ, দীর্ঘদন্তযুক্ত প্রলয়-অগ্নিতুল্য, তোমার মুখ মন্ডল দর্শন করে, আমরা দিগ্ভ্রান্তি ঘটছে।  আমি শান্তি পাচ্ছি না, হে জগন্নিবাস, তুমি প্রসন্ন হও। (২৫)

নৃপতিগণের সাথে ওই ধৃতরাষ্ট্র সমুদয় পুত্রগণই এবং ভীষ্ম দ্রোণ  আর ওই কর্ন  ও আমাদের প্রধান যোদ্ধাগন সহ  (২৬)

বেগে ধাবমান হয়ে তোমার করাল দাঁতযুক্ত ভয়ংকর বদনমধ্যে প্রবেশ করছে।  কেউ কেউ চূর্ণিত মস্তক হয়ে দন্তসমূহের   সন্ধি মধ্যে সংলগ্ন আছে, দেখা যাচ্ছে। (২৭)

যেমন নদীসমূহের বহু জলপ্রবাহ সমুদ্রাভিমুখী হয়ে তার মধ্যে প্রবিষ্ট হচ্ছে, তেমনি এই নরলোকের বীরবৃন্দ সর্ব্বত্র ব্যাপ্ত তোমার জ্বলন্ত মুখ গহ্বরে প্রবেশ করছে। (২৮)

যেমন পতঙ্গগন অতি দ্রুতগতিতে ধাবমান হয়ে মৃত্যুর জন্যই জ্বলন্ত অগ্নিতে  প্রবেশ করে, সেইরূপ এইসব  লোকসকল মরনের নিমিত্ত অতিবেগে তোমার  মুখগহ্বরে প্রবেশ করছে।  (২৯)

হে ভগবন, তুমি তোমার জ্বলন্ত মুখসমূহের দ্বারা চতুর্দিকে লোকসমূহকে গ্রাস করে বারংবার লেহন করছো, তোমার তীব্র তেজঃ সমগ্র জগৎকে পরিব্যাপ্ত করে সন্তপ্ত করছে।  (৩০)

হে উগ্রমূর্তি তুমি কে, তা  আমাকে বলো. আমি তোমাকে প্রণাম করি।  হে দেববর  প্রসন্ন হও। হে আদিপুরুষ তোমাকে  জানতে ইচ্ছে করে  কিন্তু তোমার কার্য্য বুঝি না (৩১)

অর্জ্জুন যখন জিজ্ঞেস করলেন, হে উগ্রমূর্তি তুমি কে ? তখন শ্রীভগবান এককথায় বলছেন, আমি লোকক্ষয়কারী মহাকাল। 

অর্জ্জুন যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে নিতান্ত প্রিয় সখা সাব্যস্ত করেছিলেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ সান্নিধ্যে সে স্বস্তি ও আনন্দ অনুভব করতো। ঠাকুর রামকৃষ্ণকেও  নরেন্দ্রনাথ প্রথম দিকে বায়ুগ্রস্থ বলে  স্থির করেছিলেন। কিন্তু ঠাকুরের সংস্পর্শে এলেই নরেন নিজের মধ্যে একটা উল্লাস অনুভব করতেন।

এই ঠাকুর রামকৃষ্ণ একদিন হঠাৎ তাঁর ডান পা দিয়ে নরেনের অঙ্গে স্পর্শমাত্র নরেনের মধ্যে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হতে লাগলো। ঘরের সমস্ত বস্তু যেন প্রচন্ড বেগে ঘুরতে লাগলো। ঘুরতে ঘুরতে কোথায় লীন হয়ে যাচ্ছে। নরেনের মধ্যে একটা আতঙ্ক দেখা দিলো।  নরেন পরবর্তীতে বলছেন, সমস্ত বিশ্বের সাথে  আমার আমিত্ব যেন বিশ্বে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এসময় নরেন  চিৎকার করে ওঠায়, ঠাকুর আবার তার হাত দিয়ে বক্ষ  স্পর্শ করায় নরেন প্রকৃতিস্থ হলেন। আবার সব আগের  মতো হলো। এই ঘটনা শুধু  একবার নয়, এর পরেও এমন ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো নরেনকে। সেদিনও  এমনি ভাবে, ঠাকুর সমাধি থেকে উঠে নরেনকে স্পর্শ করলেন, এবং নরেন তৎক্ষণাৎ বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে গেলেন। এইসময় কি ঘটেছিলো, তা তিনি বুঝতে পারেন নি। 

আরো একদিনের ঘটনা, নরেন  সেদিন তামাক খেতে খেতে বন্ধুদের বলছেন,  "উহা কি কখনো হতে পারে, ঘাঁটিটা ঈশ্বর, বাটিটা ঈশ্বর, যা কিছু দেখছি, এমনকি আমরা সকলেই ঈশ্বর।" সবাই তখন এই নিয়ে হাসাহাসি করছে, এমন সময় ঠাকুর রামকৃষ্ণ ঘর থেকে বাইরে এলেন। ঠাকুরের তখন অর্ধ্ববাহ্য  দশা। তোরা কি বলছিস রে ? বলে হাসতে  হাসতে  নরেনকে স্পর্শ করেই তিনি সমাধিস্থ হলেন। 

পরবর্তীতে স্বামী বিবেকানন্দ বলছেন, ঠাকুরের ঐদিনকার অদ্ভুত স্পর্শে মুহূর্তের মধ্যে অদ্ভুত ভাবের  উপস্থিত হলো। স্তম্ভিত হয়ে সত্যি সত্যি দেখতে লাগলাম, ঈশ্বর ভিন্ন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অন্য কিছুই আর  নেই। এই অবস্থায় নীরব রইলাম। ভাবলাম - দেখি কতক্ষন পর্যন্ত ওই ভাব থাকে।  কিন্তু সেই ভাব  সেদিন কিছুমাত্র কমল না। বাড়িতে ফিরলাম - সেখানেও একই অবস্থা, যাকিছু দেখছি সবই তিনি, এরকম বোধ হতে লাগলো।  খেতে বসে দেখি অন্ন, থালা, যিনি পরিবেশন করছেন (মা), এমনকি আমি নিজেও তিনি ভিন্ন অন্য কেহ নহে। দুই একগ্রাস খেয়ে বসে রইলাম।  মা বললেন, বসে আছিস কেন - খা না। আমার হুশ এলো, আবার খেতে আরম্ভ করলাম। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে  আচ্ছন্ন হয়ে রইলাম। রাস্তায় চলেছি, সামনে গাড়ি আসছে, দেখছি, কিন্তু সরবার প্রবৃত্তি নেই। মনে হতো উহাও যা আমিও তাই। হাত-পা সবসময় অসার হয়ে থাকতো। আহার করে বিন্দুমাত্র তৃপ্তি  হতো না।  কেবল মনে হতো অপর কেউ খাচ্ছে।  কখনও কখনো খেতে খেতে শুয়ে পড়তাম, আবার কিছুক্ষন পরে উঠে খেতাম। ..... যখন আচ্ছন্ন ভাবটা একটু কমে যেত, তখন  জগৎকে স্বপ্ন বলে মনে হতো। হাত পা অসার - পক্ষাঘাত হবে না তো ? যখন প্রকৃতিস্থ হলাম, তখন ভাবলাম, একেই বলে অদ্বৈত বিজ্ঞান আভাস। " 

এর থেকে আমাদের মনে হয়, শরীরের বিশেষ বিশেষ স্থানে স্পর্শ করলে হয়তো আমাদের মনের ভারসাম্যের ব্যাঘাত ঘটে। তখন আমরা নেশাগ্রস্থের মতো উল্টোপাল্টা ভাবি, বা দেখি।  মাথাটা ভোঁভোঁ করে ঘোরে ।  শরীর অসার হয়ে যায়। আবার এমনও  হতে পারে, এগুলো সন্মোহিনী বিদ্যা, যার দ্বারা মানুষকে বোকা বানানো যায়। কেউ বলেন, এসব HALLUCINATION বা মতিভ্রম। তখন কেমন যেন মনে হয়, কিছু দেখছি, যা আসলে আমার সামনে নেই। স্বপ্নে দৃষ্ট বস্তুর মতো, দেখছি কিন্তু বাস্তবে নেই। অথচ বাস্তবের থেকেও সত্য বলে মনে হচ্ছে। 

যাঁরা একটু আধটু ধ্যান ধারণার অভ্যাস করেন, তাঁরা জানেন, ধ্যানের জন্য চোখ বুজলে প্রথমে অন্ধকার দেখা গেলেও, অর্থাৎ কিছুই দেখা না গেলেও, কয়েকদিনের মধ্যেই নানান রকম দৃশ্য, আলোর বিন্দু বা আলোর গোলক মানস চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়। দৃশ্যগুলোর মধ্যে কোনটা চেনা চিত্র কোনটা অচেনা চিত্র।  কোনটা ভয়ঙ্কর আবার  কোনটা মনোমুগ্ধকর ।          

ঋষি পতঞ্জলি তাঁর পাতঞ্জল যোগদর্শন সমাধিপাদ পৃ : ৫৭ বলছেন,  যখন নাকের সামনের অংশে চিত্ত স্থাপন করা হয়, তখন একটা দিব্য গন্ধের জ্ঞান হয়।  জিহ্বার অগ্রভাগে যখন চিত্ত স্থির হয়, তখন দিব্যরসের জ্ঞান হয়। তালুতে চিত্ত স্থির করলে, দিব্য  রূপজ্ঞান হয়ে থাকে। জিহ্বামূলে চিত্তকে স্থির করলে, শব্দজ্ঞান হয়।  হৃদয়পদ্মে ধারনা  করলে, যে বুদ্ধিসত্ত্বের সাক্ষাৎ হয়, সেই বুদ্ধিসত্ত্ব জ্যোতির্ময় আকাশকল্প। আমাদের মাথায় রয়েছে তিনটি কপাল বা খুলি, এই তিনটি খুলির সংযোগস্থলের যে ছিদ্র একেই বলে ব্রহ্মরন্ধ্র। এই যে ব্রহ্মরন্ধ্র,  এতে রয়েছে, উত্তম ও উজ্জ্বল জ্যোতিঃ। কেউকেউ বলেন, আমাদের ভ্রূমধ্যে অর্থাৎ ষষ্ঠভূমিতে আছে প্রভাস্বর জ্যোতির্ময় মন্ডল। এখানে সংযম করলে, অন্তরীক্ষে বসবাসকারী সিদ্ধ পুরুষদের দর্শন পাওয়া যায়। তো যেটা বলতে  চাইছিলাম, আমরা চর্ম্মচক্ষু দিয়ে কেবলমাত্র প্রাকৃত বস্তুর দর্শন পেয়ে থাকি।  কিন্তু অপ্রাকৃত যে জগৎ সেখানে এই চর্ম্মচক্ষুর কোনো ভূমিকা থাকে না. সেখানে আমাদের অন্তর্চক্ষু কার্য্য করে থাকে। দিব্য অর্থাৎ পবিত্র জ্যোতিঃ- দর্শনের জন্য যে দর্শনশক্তি কাজ করে থাকে তাকে বলা হয়  দিব্যচক্ষু। 

তো এই দিব্যচক্ষু যখন সাধকের উন্মিলিত হয়ে যায়, তখন সব অদ্ভুত দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে ভাসে। সমস্ত বিশ্ব  তখন আমাদের সামনে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।  জগতে যা কিছু ঘটছে, যা কিছু ঘটতে  চলেছে, এমনি যাকিছু ঘটে গেছে, সব তখন আমাদের  দিব্যচক্ষুর সামনে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়ে ওঠে। একেই বলে বিশ্বরূপ। অর্থাৎ অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ তখন একত্রে আমাদের সামনে ফুটে ওঠে। এসব ব্যাপার লৌকিক না হলেও, যথার্থ যোগীর কাছে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। এটি কোনো ভোজবাজির খেলা নয়। এসব আমাদের প্রাচীন মুনিঋষিদের অনুভূতি লব্ধ সত্য। আমরা তো বর্তমানে থাকি, কিন্তু যোগীপুরুষ ত্রিকালেশ্বর - তিনি ত্রিকালের সমস্ত কিছু অনুধাবন করতে পারেন।  তো যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ প্রদর্শন, বা অর্জ্জুনের বিশ্বরূপ দর্শন কোনো অলৌকিক ব্যাপার নয়। এটি সমাধিবান পুরুষের লক্ষণ। সঞ্জয় আসলে সংযমী পুরুষ।  অর্থাৎ তিনি ধারণা-ধ্যান-সমাধিতে প্রতিষ্ঠিত, সংযমী পুরুষ। এসব সত্যকে উপলব্ধি করতে গেলে, আমাদের ঋষি পতঞ্জলির নির্দেশিত পথে সাধনা করে, এই সত্যে উপনীত হওয়া  যায়। 

------------

ভগবান কে ?  (শ্রীমদ্ভগবৎ গীতা - সপ্তম অধ্যায়) 

ভগবান বলে একটা কথা আমরা সবাই শুনে থাকি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কে এই ভগবান ? তিনি কোথায় থাকেন ? কিভাবে তাকে জানা যায় ? এসব সম্পর্কে আমাদের ধর্ম্মশাস্ত্রে অনেক কথা বলা আছে।  কিন্তু সত্য হচ্ছে, এই ভগবানকে আজও  আমরা ধরতে পারলাম না। আজ আমরা শ্রীমদ্ভগবৎ গীতার সপ্তম অধ্যায় থেকে এই ভগবানকে বোঝার চেষ্টা করবো। 

যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, আপন (আত্মার) স্বরূপ জানো। যা জানলে আর কিছু জানবার থাকবে না। হাজার হাজার মানুষের মধ্যে ক্বচিৎ কেউ আমাকে জানতে চেষ্টা করে, আর যারা এই চেষ্টায় সাফল্য অৰ্জন করে, তাদের মধ্যেও  ক্বচিৎ কেউ ঠিক ঠিক ভাবে আমাকে জানতে পারে। হে অর্জ্জুন,  বিদ্যা দুই প্রকার, জ্ঞান ও বিজ্ঞান।  যোগশাস্ত্রে যাকে  বলা হয় পরা  ও অপরা।  পরা  অর্থাৎ পার্থিব জ্ঞান, আর অপরা  অর্থাৎ অপার্থিব জ্ঞান। জ্ঞান অর্থাৎ প্রকৃতির জ্ঞান আর বিজ্ঞান অর্থাৎ পুরুষের জ্ঞান। প্রকৃতি ও পুরুষের মিলিত সত্ত্বা হচ্ছে এই জগৎ। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, প্রথমে জ্ঞান বা প্রকৃতির সম্পর্কে জানো ।  প্রকৃতি দুই প্রকার পরা প্রকৃতি ও অপরা  প্রকৃতি।   (শ্লোক : ৭/৪) ক্ষিতি, অপ, তেজ, বায়ু, আকাশ, মন, বুদ্ধি, অহংকার এই আট  ভাগে প্রকৃতি বিভক্ত। একে বলে অপরা  প্রকৃতি। এ ছাড়া আরো এক প্রকার প্রকৃতি আছে যাকে  বলা হয় পরা  প্রকৃতি। এই পরা  প্রকৃতিও বিশ্ব  চরাচর বিধৃত হয়ে আছে।  

সমস্ত ভূৎসকল এই দুই প্রকৃতি থেকে জাত। মানুষের মধ্যে আছে পৌরুষ, জলের মধ্যে আছে আদ্রতা রস , অগ্নির মধ্যে আছে দাহিকা শক্ত বা প্রভা। বেদের মধ্যে আছে ওঙ্কার। আকাশের মধ্যে আছে শব্দ। অর্থাৎ শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ  ইত্যাদি হচ্ছে ক্ষিতি, অপ , তেজ, মরুৎ ব্যোমের গুন্ বিশেষ। তো জীবের মধ্যে আছে জীবনীশক্তি, তপস্বীর মধ্যে তপঃশক্তি। বুদ্ধিমানের মধ্যে আছে, বুদ্ধি, তেজস্বীর মধ্যে আছে তেজ। বলবানের মধ্যে আছে বল।  এসবই আসলে ত্রিগুণাত্বক প্রকৃতি থেকে জাত। ত্রিগুন অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ। এই যে ভাব অথাৎ সাত্ত্বিক, তামসিক ও রাজসিক ভাব, এসব প্রকৃতি জাত।   .এই ত্রিগুণের দ্বারা জগৎ মোহিত হয়ে আছে। আর ঠিক এই কারণেই, গুণাতীত সেই ব্রহ্মকে কেউ জানতে পারছে না। এই ত্রিগুনাত্বিক প্রকৃতি মায়াজাল বিস্তর করে জীবকে ভগবান থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। এই ত্রিগুনাত্বিক মায়াজাল সরিয়ে সাধক যখন ভগবানের শরণাপন্ন হয়, তখন সে ভগবানের দর্শন পায়। 

এই মায়াবদ্ধ জীব, গুন্ প্রভাবে নানান রকম আচরণ করে থাকে।  কেউ, অসুরসুলভ স্বভাব প্রাপ্ত হয়, কেউ বা সুর বা দেব-সুলভ স্বভাব প্রাপ্ত হয়ে থাকে। 

এমন কেউ এই জগতে নেই, যে ভগবানের  স্মরণ করে না। মানুষ যখন দুঃখ-কষ্টের মধ্যে পরে, তখন সে ভগবানের  কথা স্মরণ করে, মানুষ পার্থিব পদার্থের মধ্যে যখন সুখের সন্ধান করে, তখনও  সে ভগবানেরই স্মরণ করে। আবার যখন তার মধ্যে জীবন জিজ্ঞাসা জেগে ওঠে তখন সে  ভগবানের স্মরণ করে। কিন্তু এদের ভবনের স্মরণ ক্ষনিকের জন্য হয়, আবার অভাব দূর হয়ে গেলে,  সে ভগবান থেকে দূরে সরে যায়। কিন্তু  যখন সে আত্মস্থ হয়ে যায়, তখনও  সে নিরন্তর ভগবানের স্মরণে থাকে। এই আত্মস্থ পুরুষই একমাত্র নিরন্তর ভগবানের স্মরণে থাকতে  পারে। আর সবাই, অবস্থার দাস হয়ে ক্ষনিকের জন্য ভগবানের স্মরণাপন্ন হয়ে থাকে। 

মানুষ প্রকৃতিভেদে  ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন চাহিদার তৃষ্ণা নিয়ে ভগবানের দ্বারে  উপস্থিত হয়।  কেউ ধন চায়, সে লক্ষ্মীর পুজো করে, কেউ বিদ্যা চায়, তখন সে সরস্বতির পুজো  অর্চ্চনা করে। কখনো সে দুর্গতি নাশিনী মা দুর্গার উপাসনা করে, কখনও  সে বিঘ্নবিনাশক গনেশের কাছে উপস্থিত হয়।  তো যে যেমন ভাবে উপাসনা করে, প্রার্থনা করে, সেই মতো তার বাসনা পূরণের জন্য ভগবানের অংশশক্তি তাকে সাহায্য করে থাকে। কিন্তু এইসব  দেব-দেবীর  যে ফল লাভ হয়, তা বিনাশশীল। কেউ হয়তো পার্থিব ধন লাভ করে, কেউ পরা বিদ্যার অধিকারী হয়। কেউ হয়তো স্বর্গলোক প্রাপ্ত হয়, কেউ হয়তো দেবলোক প্রাপ্ত হয়।  কিন্তু এসবই ক্ষণস্থায়ী।  এতে সেই  শ্বাশত শান্তি পায়  না। আসলে ভগবান তো স্বয়ং শান্তি। ভগবানই একমাত্র সৎবস্তু, ভগবানই চৈতন্য স্বরূপ, ভগবানই আনন্দ স্বরূপ।  সৎ-চিৎ-আনন্দম। যারা দেবদেবীর উপাসনা করে, তারা   বারংবার কালের গর্ভে পতিত হয়। কিন্তু যিনি যোগস্থ পুরুষ তিনি সদা আত্মস্থ হয়ে অবস্থা করেন। আর তার কাছে ত্রিকালের সমস্ত বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে। তিনি  ত্রিকালজ্ঞ হয়ে জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধি-মুক্ত হয়ে অবস্থান করেন। এই যোগীপুরুষকেই বলা হয় ব্রহ্মবিদ, ব্রহ্মঞ্জ। তখন তিনিই যে  স্বয়ং ভগবান তা তার বোধের মধ্যে পরিস্ফুট হয়। ইনি  শরীর  ত্যাগের সময় এলেও সজ্ঞানে দেহ ত্যাগ করে থাকেন। দেহটা তো  তার সাময়িক আবাস্থল, এখান থেকে বেরিয়ে তিনি সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত হন। ভগবানই সব, ভগবান ভিন্ন কিছু নেই, জগতের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে তিনিই অবস্থান করছেন। এই জগৎ ভগবানের দ্বারাই বিধৃত হয়ে আছে। এই সত্যে প্রতিষ্ঠিত হতে গেলে, আমাদের অষ্টাঙ্গ যোগসাধনায় নিযুক্ত হতে হবে। 
--------       

,    

     


   

Comments

Popular posts from this blog

নিত্যকথা

ঈশ্বর ও তাঁর উপলব্ধি

সত্যধর্ম্ম ও প্রেম