ঋষি পতঞ্জলির যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ
সাধনপাদ
শশাঙ্ক শেখর শান্তিধাম
কিছু কথা :
ঋষি পতঞ্জলি তাঁর যোগদর্শন বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ের নাম রেখেছেন "সাধনপাদ". সাধ+অন = সাধন। সাধ কথাটির অর্থ অন্তরের ইচ্ছে। সাধ কথাটার আরো একটা অর্থ হচ্ছে নিস্পন্ন করা। তো যে উপায় অবলম্বনে আমরা মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্যকে কার্যকরী করতে পারি, তাই সাধনা। এই সাধন কথাটার আরো একটা অর্থ হচ্ছে অন্তেষ্টিক্রিয়া। অর্থাৎ আত্মার মলিনতা মোচন ক্রিয়া। পাদ কথাটার অর্থ পা যা আমাদেরকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করে। অর্থাৎ ভীত - জীবনের ভীত, যার উপরে দাঁড়িয়ে আমরা আমাদের ক্রিয়াযজ্ঞ সম্পাদন করতে পারি।
এর আগের অধ্যায়ে অর্থাৎ সমাধিপাদে আমরা সমাধির পরিচয় পেয়েছি। তিনি দুই ধরনের সমাধির কথা বলেছেন, ১. সম্প্রজ্ঞাত ; ২ অসম্প্রজ্ঞাত। সম্প্রজ্ঞাত অর্থাৎ সম্যকরূপে বা প্রকৃষ্টরূপে জানা। তো সম্যক রূপে জানা যদি হয়ে গেলো, তবে আর অবশিষ্ট রইলো কি ? ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এতদিন আমরা প্রকৃতি ও পুরুষকে একত্রে অনুধাবন করেছি। যখন প্রকৃতি আর পুরুষের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়, তখন দুজনেই আলাদা হয়ে গেলেন, একলা হয়ে গেলেন। এই প্রকৃতি ও পুরুষকে আলাদাভাবে জানার নামই অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি। অর্থাৎ যাঁর যেমন স্বরূপ তাঁকে সেইভাবে জানা।
প্রকৃতি চঞ্চল, পরিণামধৰ্ম্মী। প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলছে। আমরা এই প্রকৃতির কোলে অবস্থান করেও আমরা সবসময় এটা ধরতে পারি না। তবে একটু স্থির চিত্ত হলেই, আমরা বুঝতে পারি, আমার নিজের মধ্যেও অর্থাৎ আমার দেহে, মনে, প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের ক্রিয়া চলছে। আর প্রকৃতির এই পরিণামের কারনে কতনা বিচিত্র রূপের সৃষ্টি হচ্ছে। কেউ আসছে, কেউ চলে যাচ্ছে। কেউই স্থির নয়। আর এই কারণেই প্রকৃতির মধ্যে অনাগত-আগত-অতীতের প্রবাহ চলছে। অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ। আমর দেহ একসময় ছিল না, অর্থাৎ অনাগত, আবার আমি যখন জন্ম নিলাম, তখন বর্তমান বা আগত আবার আমি একসময় এই দেহ ছেড়ে ছেড়ে চলে যাবো, তখন আমি অতীত। একটু মনোযোগ দিয়ে এই বিষয়ের দিকে খেয়াল করলেই, এই সত্য আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। প্রতিনিয়ত নতুনের আবির্ভাব হচ্ছে, একসময় নতুন পুরাতন হচ্ছে, আবার একসময় কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এই খেলাই চলছে নিরন্তর।
এইযে কালের চক্র, এর মধ্যে জীব ঘুরপাক খাচ্ছে। এই কালচক্রে থেকে বেরিয়ে সাধককে আসতে হবে। কিন্তু বেরিয়ে যাবো কোথায় ? যেতে হবে ক্ষনে। শ্বাস নিচ্ছি, আবার ছেড়ে দিচ্ছি। এই শ্বাস যখন ভিতরে প্রবেশ করছে, সেখানে ক্ষনিকের জন্য স্থিত হচ্ছে, আবার সে বেরিয়ে যাচ্ছে। আবার বাইরে ক্ষনিকের জন্য অপেক্ষা করেছে, আবার সে ঢুকবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এই যে সন্ধিক্ষণ অর্থাৎ গমন-নির্গমন এর মাঝের ক্ষণটিকে সাধককে ধরতে হবে। সেখানেই স্থিত হতে হবে। ভূত থেকে যেতে হবে তন্মাত্রে, তন্মাত্র থেকে অহঙ্কারে , অহংকার থেকে মহত্তত্ত্বে (লিঙ্গে), আবার মহত্তত্ত্ব থেকে অলিঙ্গে। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এখান থেকেও এগিয়ে যেতে হবে। এতো কেবল প্রকৃতির জগৎ, এখান থেকে পুরুষে প্রবেশ করতে হবে, যেখানে কোনো পরিবর্তন নেই, যা নিত্য, অপরিবর্তনীয়। প্রকৃতি তো সৃষ্টিজোড়া, পুরুষ সৃষ্টিছাড়া। প্রকৃতি চঞ্চলা, সারাক্ষন নেচেই চলেছে। কিন্তু কার জন্য প্রকৃতি নাচছে ? পুরুষের জন্য নাচছে। সারা সৃষ্টিতে এই নাচ চলছে। আমাদের এই নাচের ঘর থেকে বেরিয়ে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে এই পুরুষ প্রকৃতির খেলা উপভোগ করতে হবে। আর এই কারণেই সাধনা। সাধ পূরণের ক্রিয়াই সাধনা।
--------
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/০১
"তপঃ-স্বাধ্যায়-ঈশ্বরপ্রণিধানানি ক্রিয়াযোগঃ।" (০২/১)
তপস্যা, স্বাধ্যায়, ও ঈশ্বর-প্রণিধান - এই হচ্ছে ক্রিয়াযোগ।
এর আগের অধ্যায়ে আমরা শুনেছিলাম, চিত্তবৃত্তির নিরোধের নাম যোগ। এবার বলছেন, তপস্যা, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বর প্রণিধান হচ্ছে ক্রিয়াযোগ।
ভারতবর্ষে প্রাচীনকাল থেকেই যোগের প্রচলন। ঋষি পতঞ্জলি, মৎস্যেন্দ্রনাথ, গোরক্ষনাথ অনেকেই যোগসাধনার প্রণালী সম্পর্কে বলেছেন। আসলে যোগ হচ্ছে ক্রিয়ারহিত অবস্থা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমাদের এই যে শরীর এটি কখনোই কর্ম্ম রহিত হতে পারে না। এই স্থূল শরীরের ধর্ম্মই হচ্ছে কিছু না কিছু করা। যথার্থ ধ্যান মানুষকে ক্রিয়ারহিত অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে । কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমাদের মন চঞ্চল। আর চঞ্চল মনে ধ্যান হয় না। এইজন্য সাধারনের জন্য, এই ক্রিয়াযোগের ব্যবস্থা। অর্থাৎ যা ইচ্ছে তাই না করে এমন কিছু করো, যাতে তোমার শরীর মন স্থির হতে পারে। আমাদের চিত্তে অনবরত সঙ্কল্প-বিকল্পের ঢেউ উঠছে। এই সঙ্কল্প বিকল্পের কারনে মন অস্থির হচ্ছে। আমাদের বিচিত্র বাসনা, অনাদি কর্ম্ম, আর অনাদি ভোগের বিড়ম্বনা আমাদেরকে অশুদ্ধি করে রেখেছে। এখান থেকে বেরুতে গেলে, আমাদের ক্রিয়াযোগের অভ্যাস করতে হবে।
আর তাই ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, তপস্যা, স্বাধ্যায়, ও ঈশ্বর প্রণিধান - এই হচ্ছে ক্রিয়াযোগ।
তপস্যা : তপস্যা কথাটার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, যার দ্বারা জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পন্ন হওয়া যায়। যোগের দৃষ্টিতে সিদ্ধি লাভের উপায় হচ্ছে তপস্যা। তপস্যা তিন প্রকার, কায়িক, বাচিক, ও মানসিক । কায়িক অর্থাৎ শৌচ, সরলতা, ব্রহ্মচর্য, অহিংসা এবং শ্রদ্ধা। আর বাচিক বলতে বোঝায় সত্যের আশ্রয়ে থাকা, প্রিয় অথচ হিতকর বাক্যের প্রয়োগ, শাস্ত্রাদি পাঠ ও শ্রবণ, মন-মুখকে এক করা, বাকসংযম ইত্যাদির অভ্যাস করা। মানসিক অর্থাৎ মনের প্রসন্নতা, সৌমত্ব, মৌন, আত্মনিগ্রহ ও ভাবসুদ্ধি। আবার গুনভেদে তপস্যা ত্রিবিধ - সাত্ত্বিক অর্থাৎ ফলাকাঙ্খ্যা রোহিত হয়ে যে তপঃ সাধনা। রাজসিক : মান-সম্মানের জন্য অনুষ্ঠিত দম্ভপূর্বক যে তপস্যা, তাকে বলে রাজসিক । তামসিক : অপরের অমঙ্গলের জন্য নিজেকে পীড়িত করে যে তপস্যা তাকে বলে তামসিক।
প্রসঙ্গক্রমে বলি, হিন্দু পুরান মতে সত্যযুগে তপঃসাধনা, ত্রেতা যুগে জ্ঞানের সাধনা, দ্বাপরে যজ্ঞাদি ক্রিয়া, আর কলিতে নাম ও দান সাধনা মুক্তির জন্য প্রশস্ত। কিন্তু আমরা মনে করি, সাধনা সর্ব্বকালেই মানুষের মুক্তির কারন হয়ে থাকে। আর তার মধ্যে সাত্ত্বিক তপস্যা আজও সর্ব্বোৎকৃষ্ট সাধনা, যা মানুষকে মহামানবে পরিণত করে। তপস্যা অর্থাৎ নিজেকে তাপিত করবার ক্রিয়া যখন সর্ব্বকল্যানের জন্য হলে তা উৎকৃষ্ট। আর ফলের আকাঙ্খ্যা রোহিত হয়ে যে সাধনা তা হচ্ছে সর্বোৎকৃষ্ট।
স্বাধ্যায় : অর্থাৎ অধ্যায়ন। শ্রদ্ধার সঙ্গে অর্থজ্ঞান সহ বেদাদির (সাত্ত্বিক জ্ঞানগ্রন্থের) অধ্যায়ন করা। শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রণবের যথার্থ অর্থজ্ঞান লাভের জন্য সচেষ্ট হওয়া। যাঁরা শ্রদ্ধা ভক্তি সহ শ্রীমদ্ভগবৎ গীতা পড়েছেন, তাঁরা খেয়াল করে থাকবেন, যতবার গীতার শ্লোক উচ্চারণ করছেন, ততবার নতুন নতুন অর্থের অনুভব হচ্ছে। অর্থাৎ প্রথম দিকে শব্দের যে আভিধানিক অর্থ যা আমার স্মৃতিতে আগে থেকেই অর্জ্জিত হয়ে রয়েছে, তার ভিত্তিতে গীতার অনুধাবন করছি। কিন্তু কালে কালে শব্দের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নতুন নতুন অর্থ বেরিয়ে আসছে, যা আমার স্মৃতিতে ছিল না। নতুন নতুন ভাবের উদয় হচ্ছে পাঠকের হৃদয় আকাশে।
আসলে শব্দের কোনো নিজস্ব অর্থ হয় না, আমরা যেমনটা ভেবে নিয়েছি, অর্থাৎ আমাদেরকে যেমনটি বোঝানো হয়েছে, আমরা সেইভাবেই বুঝেছি বা বলা যেতে পারে মেনে নিয়েছি। আর সেই শব্দভাণ্ডার অর্থ সহ আমার স্মৃতিতে সংরক্ষিত হয়ে আছে। যার ভিত্তিতে আমরা যখন কোনো শব্দ শুনি তখন স্মৃতির পাতা থেকে এর একটা অর্থ বের করে নেই। এবং সেই মতো আমাদের জ্ঞানের চর্চা চলে। কিন্তু যখন সাধন জগতে প্রবেশ করবেন, এমনকি জপ-তপঃ ইত্যাদির মধ্যে নিজেকে প্রবেশ করাবেন, যখন সজ্ঞার উদয় হবে, তখন দেখবেন, শব্দের মধ্যেই নিহিত আছে কিছু নিগুড় তত্ত্ব - যা আসলে প্রণব - প্রতিনিয়ত নতুন। এই হচ্ছে যথার্থ স্বাধ্যায়।
ঈশ্বর প্রণিধান : প্রণিধান কথাটার অর্থ চিত্তের একাগ্রতা। অন্য অর্থে ধ্যান, অর্থাৎ ঈশ্বরের ধ্যান। ধ্যান অর্থে অভিনিবেশ, অর্থাৎ ঈশ্বরের মধ্যে প্রবেশ। সহজ কথায় ঈশ্বর প্রণিধান অর্থে ঈশ্বরের কাছে আত্ম-সমর্পণ। বিরাটের ইচ্ছের কাছে নিজের ইচ্ছেকে সমর্পন করতে হবে। এই বিরাট পুরুষের, বা অনন্ত গুনের অধিকারী পরমপিতার যে ইচ্ছে, এই ইচ্ছেই বিশ্বময় ক্রিয়া করছে। আমাদের যে ব্যক্তিগত ইচ্ছে তা ওই পরম-পিতার ইচ্ছের একটা কণিকা মাত্র। বিরাট পুরুষের শরীর বিশ্বময় ছড়িয়ে রয়েছে। সূর্য্যরশ্মি কণিকা যেমন সবত্র ছড়িয়ে জগৎ আলোকিত করছে, ক্রিয়াশীল করছে, তেমনি বিশ্বাত্মা সর্বত্র অধিষ্ঠান করছেন । আমার যে স্থূল ক্ষুদ্র শরীর, তাও এই বিরাট শরীরের একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোষ মাত্র। এই বিরাট পুরুষের শরীর থেকে যদি নিজের শরীরকে বিচ্ছিন্ন ভাবি, তাহলে আমরা শুধু দুর্বল নয়, আমাদের অস্তিত্বের সংকট দেখা যাবে। কিন্তু যখন এই অনন্তের সঙ্গে নিজে একাত্ম ভাববো, যখন এই বিরাট পুরুষের ইচ্ছের সঙ্গে নিজে ইচ্ছেকে মিলিয়ে নিতে পারবো, তখন আমাদের ইচ্ছে বলবতী হয়ে ফল প্রদান করতে শুরু করবে। তাই ঋষি পতঞ্জলি, শুধু ঋষি পতঞ্জলির কথাই বা বলি কেন, সমস্ত ধর্ম্ম শাস্ত্র, সমস্ত মহান পুরুষ যুগ যুগ ধরে আমাদের এই ক্ষুদ্র সত্তাকে বৃহতের কাছে সমর্পনের কথা বলেছেন। এই যে ক্ষুদ্র আমি তা ওই বিরাট আমির একটা ক্ষুদ সংস্করণ মাত্র। আমি তার-ই ছায়া মাত্র। আমার সমস্ত ক্রিয়া তারই উদ্দেশ্যে, আমার সমস্ত কর্ম্মের ফল তাঁকেই সমর্পিত হোক । এই হচ্ছে ঈশ্বর প্রণিধান।
---------
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/০২-০৩
"সমাধি-ভাবনার্থঃ ক্লেশতনুকরণ-অর্থশ্চ।" (০২/০২)
সমাধি ভাবনার্থ অর্থাৎ ক্রিয়া যোগের অনুষ্ঠানে সমাধিভাবনা পুষ্টি লাভ করে। আর এর জন্য ক্লেশতনুকরণ অর্থাৎ ক্লেশের নাশ প্রয়োজন।
ক্রিয়াযোগ ঠিক ঠিক ভাবে সম্পাদিত হলে, তা সাধককে সমাধির মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেয়। আবার অবিদ্যা জনিত যে ক্লেশ আমরা ভোগ করি, তাও দূর হয়ে যায়। দেখুন ঘাস মারা গেলেও তার বীজ থেকে যায়। তাই আমরা দেখি উপযুক্ত পরিবেশ পরিস্থিতিতে জমিতে আমার ঘাসের উদ্গমন ঘটে। এই প্রক্রিয়াই চলছে, ঘাস থেকে বীজ, আবার বীজ থেকে ঘাস। ধানগাছ ফল দিয়ে শুকিয়ে মারা যায়। এই ফল দিয়ে আবার গাছের জন্ম হয়। এখন এই বীজের নাশ না হলে ঘাসকে উৎখাত করা যাবে না। কর্ম্মফল ভোগ করবার জন্য স্থূলদেহ ধারণ। আর স্থূল দেহ মাত্রেই কর্ম্মদেহ। তো কর্ম্মদেহে আবার কর্ম্ম সম্পাদিত হচ্ছে। সেই কর্ম্মের ফল সঞ্চিত হচ্ছে। যদি একজন্মে কর্ম্মফল ভোগ শেষ করা না যায়, তবে আবার এই স্থূল দেহে ফিরে ফিরে আসতে হচ্ছে। সেই প্রারব্ধ কর্ম্মফল ভোগ করবার জন্য আবার সেই স্থূল দেহে সাংসারিক সুখ-দুঃখের ভাগিদার হতে হচ্ছে।
এখন ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, যোগের সাহায্যে জ্ঞানাগ্নি প্রজ্বলিত হলে কর্ম্মবীজ দগ্ধ হয়ে উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। এই যোগজ জ্ঞান সাধককে নিরোধ সমাধির ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত করে। তখন ত্রিগুণাত্মক প্রকৃতি আর সাধককে প্রভাবিত করতে পারে না। এই সময় কেবল মাত্র প্রারব্ধ ভোগ করতে হয়। নতুন করে আর কর্ম্মফল সঞ্চিত হয় না। এখন কথা হচ্ছে এই যে ক্লেশের কথা বলা হচ্ছে এগুলো কি কি ? সেই কথাই ঋষি পরের শ্লোকে বলছেন।
"অবিদ্যা-অস্মিতা-রাগ-দ্বেষ-অভিনিবেশাঃ।" - (০২/০৩)
অবিদ্যা, অস্মিতা, রাগ, দ্বেষ, ও অভিনিবেশ (মৃত্যুভয়) এই হচ্ছে পাঁচপ্রকার ক্লেশ।
ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, পঞ্চ ক্লেশ হচ্ছে, অবিদ্যা, অস্মিতা, দ্বেষ, ও মৃত্যুভয় বা বেঁচে থাকবার ইচ্ছে । ক্লেশ অর্থাৎ দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রনা।
অবিদ্যা বলতে কিন্তু জ্ঞান বা বিদ্যার অভাব বোঝায় না । এখানে অবিদ্যা বলতে ভ্রমাত্মক জ্ঞানকেই বোঝানো হয়েছে। এই ভ্রমাত্মক জ্ঞানই অবিদ্যা। মায়া ও অবিদ্যা সমার্থক। অবিদ্যা পাঁচপ্রকার - তম, মোহ, মহামোহ, তামিশ্র ও অন্ধতামিশ্র। অবিদ্যা অর্থাৎ যা বিদ্যমান নেই, যা অবর্তমান, যা অস্তিত্ত্বরহিত, যা সত্তাশূন্য।
দেখুন কিছু না জানা ভালো, কিন্তু ভুল জানা আমাদের মারাত্মক ক্ষতির কারন হয়ে থাকে। আসলে অবিদ্যা বা অজ্ঞান আমাদের একটা মানসিক অবস্থা বিশেষ। প্রচলিত একটা উদাহরন আছে এই বিষয়ে। অন্ধকারে রজ্জুকে সাপ বলে মনে হয়। আর তৎক্ষণাৎ আমার মধ্যে একটা ভয়ের উদ্রেগ হয়, আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। আমার শরীর কেঁপে ওঠে। হৃদয়ের স্পন্দন বেড়ে যায়। আমরা কষ্ট পাই। এই যে কষ্ট এটি সত্য, আবার এটি যে ভ্রমাত্মক জ্ঞান থেকে হয়েছে, এটিও সত্য। কেননা রজ্জু কখনো সাপ হতে পারে না। কিন্তু ঐমুহূর্তে আমার চোখের সামনে অস্পষ্ট আলোতে বা অন্ধকারে, আমি রজ্জুকে দেখতে পাচ্ছি না। আমি সত্যিকারের সাপকেই দেখতে পাচ্ছি। তো অনুভূতিটা সত্য, কিন্তু দর্শন ভ্রান্ত, সত্য নয়। অর্থাৎ বস্তুর সঠিক নির্নয় সম্ভব হয়নি। রজ্জু সাপ নয়, এটা যেমন সত্য, আবার আমি যে একে জ্যান্ত সাপ হিসেবেই মনে করছি ও কষ্ট বা ভয় পাচ্ছি এটাও সত্য। তো এই যে অবস্থা তা সৎ আবার অসৎ, উল্টোভাবে বলা যায় না সৎ, না অসৎ।
ঠিক তেমনি আমাদের সামনে যে জগৎ ভাসছে, তা এই মুহূর্তের জন্য আমাদের কাছে সত্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে, আমার এই যে স্থূল দেহ, তা "আমি" বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। কিন্তু একটা জিনিস সাধকের কাছে পরিষ্কার হওয়া উচিত যে একদিন এই দেহ থাকবে না, তথাপি "আমি" থাকবো। এই স্থূল শরীর পচে-গলে, বা অগ্নিতে দগ্ধ হয়ে পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যাবে, কিন্তু আমি (আত্মা) থাকবে। আর এই অসৎ দেহকে আমি-রূপে কল্পনা ক'রে, আমরা কতই না কষ্ট পাচ্ছি। আর এই কষ্টটা কিন্তু যথার্থ, সত্য। তাই ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, আমাদের ক্লেশের কারন হচ্ছে এই অবিদ্যা বা ভ্রান্তজ্ঞান। সাধন প্রভাবে এই ভ্রান্তজ্ঞান যেদিন দূরীভূত হয়ে যাবে, সেদিন আমরা সবাই সমস্ত ক্লেশমুক্ত হয়ে যাবো।
এর পরে বলছেন অস্মিতা। অস্মিতা বলতে অহংজ্ঞানকে বোঝায়। আমি আমার ভাব। আসলে আমরা সত্যিকারের "আমি" সম্পর্কে কিছুই জানি না। জানিনা বললে ভুল হবে, এটি আমাদের স্মৃতি থেকে উধাও হয়ে গেছে। পার্থিব জীবনে যেমন স্মৃতিই আমাকে ধরে রাখে, তেমনি আমার যে আপন সত্ত্বা, তাকেও সেই স্মৃতিই ধরে রাখে। এই দেহরূপ আমি একসময় শিশু ছিলাম, কিশোর ছিলাম, যুবক ছিলাম, প্রৌঢ় ছিলাম, আজ বৃদ্ধ হয়েছি। এই যে দেহ - মন তাও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে হতে পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে। একদিন এই নশ্বর দেহের বিনাশ হবে। আমি হয়তো দেহান্তরে চলে যাবো। তো দেহাত্মবোধে যে আমি তার কষ্ট হচ্ছে, দুঃখ হচ্ছে। আসলে জামা ছিড়ে গেলে, কাদা লাগলে যেমন আমাদের কষ্ট হয়,তেমনি দেহে আঘাত লাগলে, কেউ অপমানের কাদা ছেটালে আমাদের কষ্ট হয়। আর এই কষ্টকে আমি (আত্মা) আমার (দেহাত্মবোধে) বলে মেনে নিয়েছি। আর ঠিক এই কারণেই জাগতিক সমস্ত সুখ-দুঃখ আমাকে প্রভাবিত করছে।
আসলে আমরা কেউ আমাদের নিজ সত্ত্বা সম্পর্কে সচেতন নোই। আমরা জানিই না যে আমি কে ? আর তাই যেখানে এই আমির স্বরূপ অবস্থান করছে, অর্থাৎ বাসাবাড়িটাকেই আমি বলে ধরে নিয়েছি। যাঁরা অধ্যাত্ম পথে একটু এগিয়েছেন, তারা মনে করছেন, এটি একটা মানসিক অবস্থা মাত্র। আমরা জগৎ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী কিন্তু আমি আমাকে বা আমার স্বরূপকে জানতে আগ্রহী নোই। কারন দেহ ভিন্ন আমি বলে কিছু থাকতে পারে, তা আমাদের কল্পনার বাইরে। আমাদের সেই বিচার ক্ষমতা নেই যার দ্বারা আমি আমার স্বরূপের সন্ধান করতে পারি। ঋষি পতঞ্জলি তাই যথার্থই বলেছেন, এই অস্মিতা বা আমি-আমার ভাব, যা এই স্থূল নশ্বর দেহকে ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে, আর আমাদের সমস্ত দুঃখের (ক্লেশের) কারনহচ্ছে ।
আসক্তি থেকে থেকে জন্ম নেয় রাগ। এই আমি-আমার ভাব থেকেই আমাদের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে স্থূল দেহের প্রতি আসক্তি, বিষয়-আশয়ের প্রতি আসক্তি, স্ত্রী-পুত্র পরিবারের প্রতি আসক্তি, স্বজনপ্রীতি ইত্যাদি । আর এখানে কোনো বাধার সৃষ্টি হলে জন্মাচ্ছে আমাদের রাগ। এই রাগ যেমন আমাদের সমস্ত অশান্তির কারন, তেমনি এই রাগ আমাদের শারীরিক অসুস্থতার কারন। এই রাগের কারণেই শরীরে এমনকি আমাদের মনের মধ্যে সৃষ্টি হয় অসাম্য - যা আমাদের শারীরিক ও মানসিক রোগের ভীত।
অপরের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হওয়াই দ্বেষ। আমি যাকে আপন বলে মনে করি, তার কষ্ট হলে আমার কষ্ট হয়। প্রিয়জনের মৃত্যু আমার মধ্যে শোকের আবহ সৃষ্টি করে, কিন্তু এই একই মৃত্যু অন্যের ঘরে হলে, আমার মধ্যে কোনো প্রতিবেদন হয় না। আমরা আমাদের সুখকর জিনিষকে, বা আমার প্রিয়জনকে ধরে রাখতে চাই, যদি তা না পারি, অর্থাৎ কেউ যদি এতে বাধা সৃষ্টি করে তবে তারপ্রতি আমার রাগ হয়। ঠিক তেমনি আমাদের যা অপছন্দের জিনিস যা আমাকে কষ্ট দেয় , তাকে আমরা দূরে সরিয়ে দিতে চাই। আর সেটি না পারলে আমাদের মধ্যে জন্ম হয় দ্বেষ। রাগ দ্বেষ দুইই আমাদের ক্লেশের কারন।
অভিনিবেশ হচ্ছে মৃত্যুভয়, অন্যভাবে বলা যায়, বেঁচে থাকবার অদম্য ইচ্ছে । সমস্ত জীব, তা সে মানুষ হোক বা কীটপতঙ্গ, সবার মধ্যেই নিজের অস্তিত্ত্বকে টিকিয়ে রাখবার এক অদম্য ইচ্ছে কাজ করে। প্রত্যেক জীবের এটি সহজাত বৃত্তি। আমরা সবাই বেঁচে থাকতে চাই। কিন্তু কেন বেঁচে থাকতে চাই - তা কিন্তু আমরা জানি না। জীবনে এতো দুঃখ কষ্ট ভোগ করেও বেঁচে থাকতে চাই। হয়তো ক্ষনিকের সুখের স্পর্শ, তাকে বেঁচে থাকবার উৎসাহ যোগায়। জীব তার নিজের জীবন বা অস্তিত্ত্বকে হারাতে ভয় পায়। জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হবার কোনো সম্ভাবনা দেখা দিলেই, সে সতর্ক হয়ে ওঠে। আমার মাঝে মধ্যে মনে হয়, কোন শক্তি তাকে এই বেঁচে থাকবার জন্য উদ্দীপ্ত করে ? আমাদের সমস্ত কর্ম্ম তা সে ভালো হোক বা মন্দ সবই এই বেঁচে থাকবার স্পৃহা থেকে হয়ে থাকে। আমরা যা কিছুই করি, তা এই বেঁচে থাকবার স্পৃহা থেকে হয়ে থাকে। আমরা খাই, ঘুমাই, বসে থাকি, শুয়ে থাকি, এমনকি আমরা যে মলত্যাগ করি, তাও এই বেঁচে থাকবার তাগিদ থেকে হয়ে থাকে। কেননা, এসব না করলে আমার মৃত্যু হতে পারে।
একটা পিঁপড়ে যখন রেললাইনের উপর দিয়ে হাটছিলো, আর টেন দ্রুতবেগে তার দিকে এগিয়ে আসছিলো, তখন সে রেললাইন থেকে নিচে নেমে যায়। রেলের পাটিতে মৃদুকম্পনের মধ্যে সে তার মৃত্যুর সংকেত শুনতে পায়। আর সে নিজেকে সরিয়ে জীবনকে বাঁচিয়ে রাখে।
আসলে প্রত্যেকেই বেঁচে থাকতে চায়। আর এই বেঁচে থাকবার প্রবৃত্তি থেকেই হয়তো সে জন্মান্তরবাদের সমর্থন করে থাকে। আসলে মৃত্যুর পরেও সে বেঁচে থাকতে চায়। তাই জন্মান্তরের স্মৃতি তার মধ্যে থাকুক না থাকুন, সে আবার জীবনের মধ্যে ফিরে ফিরে আসতে চায়। এই স্পৃহা থেকেই জীব প্রোটোপ্লাজম থেকে ধীরে ধীরে মনুষ্য শরীরের রূপ পেয়েছে। এই বেঁচে থাকবার ইচ্ছেই রূপান্তরবাদের জন্ম দিয়েছে। মহাত্মাগণ বলে থাকেন মৃত্যুকালীন অবস্থাতেও নাকি শরীর ধারনের ইচ্ছের অবলুপ্তি হয় না। প্রত্যেক জীবের প্রানবীজের মধ্যে এই ইচ্ছে নিহিত আছে। প্রোটোপ্লাজম নিজের শরীরে মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন কোষের সৃষ্টি করে অঙ্গাদির জন্ম দিয়ে থাকে। অন্ধকার সরিয়ে রেখে সে আলোর সন্ধান করবার জন্য সে চোখের সৃষ্টি করে। নিঃশব্দ থেকে শব্দের মধ্যে প্রবেশ করার জন্য সে কর্নের জন্ম দিয়ে থাকে। আর এইভাবেই সে নিজের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ইন্দ্রিয়ের জন্ম দিয়ে থাকে। আবার কর্ম্ম করবার জন্য, নিজেকে সচল রাখবার জন্য সে কর্ম্মেন্দ্রীয়ের জন্ম দিয়ে থাকে।
তো জীবের বাঁচার ইচ্ছেই হচ্ছে অভিনিবেশ। এই অভিনিবেশ থেকেই সমস্ত কিছুর অভিব্যক্তি হয়েছে। প্রত্যেক জীবনের অন্তরেই আছে এই অভিনিবেশ অর্থাৎ বাঁচার প্রবৃত্তি। এই অভিনিবেশ যতদিন তার থাকবে, ততদিন, সে প্রকৃতি থেকে সে তার বেঁচে থাকবার উপযুক্ত রসদ পদার্থকনা সংগ্রহ করবে। এই যে শরীররূপ যন্ত্র এর একটা স্বাভাবিক শক্তি আছে, তা হচ্ছে শরীরকে বাঁচিয়ে রাখবার মন্ত্র। এমনকি সে শুধু নিজে বাঁচাতে চায় তাই নয়, সে নিজেকে বিস্তার করতে চায়, বহু রূপে দেখতে চায়। আর এই কারণেই সে অনুরূপ একটা শরীরের জন্ম দেয়। শরীরের প্রতিটি কোষ জানে কি খেলে সে বেঁচে থাকতে পারে। আর কি খেলে সে মারা যেতে পারে। তাই এটা বোঝা দুস্কর নয়, যে আমাদের প্রতিটি কোষের মধ্যে সেই চেষ্টা, সেই চৈতন্য বর্তমান যা তাকে বাঁচতে ও বাড়তে সাহায্য করে। তো আমরা পরিবেশ থেকে বেঁচে থাকবার শক্তি সংগ্রহ করছি, শরীরকে বৃদ্ধি করবার শক্তি সংগ্রহ করছি। আর এই যে ক্রিয়া তা আমরা যেমন আমাদের জীবনদ্দশায় করছি, এই দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হবার পরেও অর্থাৎ এই স্থূল দেহ ত্যাগের পরেও আমাদের মধ্যে এই বেঁচে থাকবার প্রবৃত্তি বেঁচে থাকে। ঠিক এই কারণেই, স্থূল দেহ ত্যাগের পরে আমরা আবার নতুন দেহ নির্ম্মানের জন্য প্রকৃতি থেকে অনুপদার্থ সংগ্রহ করে থাকি।
একটা কথা মনে রাখবেন, আমরাই এই শরীরের নির্মাতা, এই শরীরের পুষ্টিদাতা। কালের নিয়মে শরীরের নাশ হলেও, জীবনবীজের মধ্যে এই অভিনিবেশ নিহিত থাকে। শরীরের মৃত্যু হলেও এই অভিনিবেশের মৃত্যু হয় না। এই ব্যাপারটা আমাদের ভালোভাবে বুঝতে হবে, তাহলে আমরা যোগের পরবর্তী ধাপগুলো সম্পর্কে বুঝতে সক্ষম হবো।
ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, অবিদ্যা থেকেই জন্ম হয় অস্মিতা, রাগ, দ্বেষ, ও অভিনিবেশ। একথা পরবর্তী শ্লোকে শুনবো।
--------------
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/০৪
"অবিদ্যা ক্ষেত্রম উত্তরেষাং প্রসুপ্ত তনু বিচ্ছিন্ন উদারাণাম।" (০২/০৪)
অবিদ্যা হচ্ছে পরের চারটি ক্লেশের (অস্মিতা, রাগ, দ্বেষ, অভিনিবেশ) প্রসবভুমি। এরা জেগে ওঠার কারনের (অবিদ্যার) অভাবে এখন সুপ্ত, ক্ষীণ, বিচ্ছিন্ন ও উদার হয়ে অবস্থান করছে।
অবিদ্যা হচ্ছে ক্ষেত্র । এই অবিদ্যার ক্ষেত্রে ক্লেশের জন্ম হচ্ছে। আবার এই ক্লেশগুলো (অস্মিতা ইত্যাদি) অবস্থা ভেদে চার রকম। প্রসুপ্ত, তনু ,বিচ্ছিন্ন ও উদার।
প্রশ্নটা হচ্ছে, ঈশ্বরের সৃষ্টিতে এতো কষ্ট কেন ? এতো ভেদ কেন ? এক মহামানব একটা সুন্দর উত্তর দিয়েছিলেন। বলছেন, ঈশ্বরের সৃষ্ট এই জগতে কোনো দুঃখ নেই। দুঃখ তো তোমার নিজের মনের সৃষ্ট জগতে। যারা ঈশ্বরের জগতে বাস করেন, তাদের কোনো দুঃখ নেই, দুঃখ কেবল তাদেরই হয়, যারা নিজের সৃষ্ট জগতে বাস করে। এই কথাটা আমাদের ভাবায়, আমরা কি তাহলে কোনো জগতের সৃষ্টি করতে পারি? মহামানব বলছেন, তুমি যখন স্বপ্নাবস্থায়, স্বপ্নের জগতে বিচরণ করো, তখন তোমার সুখ-দুঃখের অনুভূতি হয়, আবার যখন তুমি জেগে ওঠো, তখন তোমার স্বপ্নজগতের সুখ দুঃখের অবসান হয়। এই যে স্বপ্নের জগৎ এটি কিন্তু ঈশ্বর সৃষ্টি করেন নি, এটি তোমার মানসসৃষ্ট। তোমার মন এই জগতের সৃষ্টি ক'রে, তার মধ্যে বিচরণ করছিলো, আর সুখ দুঃখের অনুভব করছিলো। স্বপ্নাবস্থায় তুমি যেমন একটা জগৎ সৃষ্টি করো, তেমনি জাগ্রত অবস্থাতেও তুমি একটা মানস জগৎ সৃষ্টি ক'রে, তার মধ্যে তুমি বিচরণ করছো। এটা হয়তো তোমার অজ্ঞাসারেই করছো। তুমি ভাবো, তুমি ঈশ্বর থেকে বিচ্ছিন্ন সত্ত্বা। তুমি ভাবো, তোমার ছেলে, তোমার মেয়ে, তোমার স্ত্রী, তোমার পরিবার, তোমার বিষয় সম্পত্তি, তোমার বাড়ি, তোমার গাড়ি। অর্থাৎ তোমার দৃষ্টিতে জগতে যাকিছু আছে, তা হয় তোমার, নয় অন্যকারুর। যাকিছু তুমি তোমার বলে মনে করছো, তাকে তুমি রক্ষা করবার চেষ্টা করছো। আবার যাকিছু অন্যকারুর তাকেও তুমি নিজের আয়ত্বে আনবার চেষ্টা করছো। তো তুমিই এই ভেদরেখা তৈরী করছো। এই পৃথিবীটা কারুর নয়, তথাপি তুমি এর মধ্যে বেড়া দিয়ে একটা অংশকে আমার করে নিয়েছো, আর অন্য অংশটাকে অন্যের বলে মনে করছো। প্রত্যেকটি মানুষ এইভাবে নিজের চারিদিকে একটা গন্ডি টেনে একটা জগতের সৃষ্টি করে থাকে। আর এটি করছে সে তার মনের সাহায্যে। এই নিজের তৈরী জগতেই বিষয় সুখ-দুঃখ অনুভূত হয়। এমনকি মানুষ একটা কাল্পনিক সুরক্ষার বলয় তৈরী করে বিপদের হাত থেকে বাঁচবার জন্য। ভবিষ্যতের অর্থকষ্টের হাত থেকে বাঁচবার জন্য, সে অর্থ সঞ্চয় করে। মেডিকেল ইন্সুরেন্স করে, হাসপাতাল থেকে বেঁচে ফিরে আসবার জন্য। ছেলে-মেয়ে মানুষ করে ভবিষতের লোকবলের জন্য। কিন্তু হায় এতো কিছু করেও, সে একটা ক্ষণও আয়ু বৃদ্ধি করতে তো পারে না, রোগ-শোক-দুঃখ-কষ্ট থেকে বাঁচতে পারে না। বরং বর্তমানকে বিসর্জন দিয়ে সে ভবিষ্যতের কাল্পনিক সুখের আশায় কালাতিপাত করে। এক সময় কালের গর্ভে প্রবেশ করে।
ঈশ্বরের সৃষ্ট জগতে কোনো ভেদ রেখা নেই। সেখানে না আছে বিষয়প্রাপ্তির সুখ না আছে বিষয় হারানোর দুঃখ। সেখানে না আছে ধন প্রাপ্তির সুখ, না আছে ধন হারানোর শোক। সেখানে না আছে জন্ম না আছে মৃত্যু। যারা এই ঈশ্বরের জগতে বাস করেন, তাদের মধ্যে কেবল অহৈতুকী আনন্দ বিরাজ করে। এখানে না আছে ভেদ, না আছে কোনো কষ্ট-ক্লেশ ।
(****এবার একটা অপ্রাসঙ্গিক কথা বলি, এই মহামানবকে আরো একটা প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনি কি ঈশ্বর দেখেছেন ? আপনি কি কাউকে ঈশ্বর দর্শন করাতে পারেন ? মহামানব বলেছিলেন, যার মধ্যে ভেদজ্ঞান রয়েছে, আমি-তুমি ভেদজ্ঞান আছে, সে-ই কাল্পনিক ঈশ্বরের দর্শন করে থাকে। তোমার শরীরের মধ্যে অসংখ্য কোষ বর্তমান। এই কোষগুলো তোমার মধ্যেই অবস্থান করছে, কিন্তু সে কি তোমাকে দেখতে পায় ? এমনকি সে কি তোমার এই বিরাট শরীরের কল্পনা করতে পারে ? সে কি তোমার শরীর ও নিজের ক্ষুদ্র শরীরের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে ? চোখ কি কখনো নিজেকে দেখতে পায় ? দেখা কাজটি তখনই সম্পন্ন হতে পারে, যতক্ষন আমি-তুমি ভেদ থাকে। জ্ঞাতা ও জ্ঞেয় থাকে। বিরাটকে, বিরাটের মধ্যেই অবস্থিত ক্ষুদ্র, কিভাবে দর্শন করতে পারে ? তবে অজ্ঞানের পর্দা যখন উঠে যায়, জ্ঞানের আলো যখন উদ্ভাসিত হয়, তখন সে অনুভব করে, যে তার আর ঈশ্বরের মধ্যে পার্থক্য নেই। সে ঈশ্বরের কোলেই দোল খাচ্ছে। সেই বিরাট ঈশ্বরের মধ্যেই তার অবস্থান । জ্ঞাত ও জ্ঞেয়র অবলুপ্তিতে থাকে কেবল জ্ঞানের প্রদীপ। ঈশ্বর এই জ্ঞানালোক মাত্র। ঈশ্বর অনুভবের বিষয়, ঈশ্বর দর্শনের বিষয় নয়। *** )
যাইহোক, আমরা পতঞ্জলির যোগদর্শনের মধ্যে প্রবেশ করি।
ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, অবিদ্যা হচ্ছে আমাদের সমস্ত সংস্কারের কারন স্বরূপ। এই যে সংস্কার, এর চারটি অবস্থা। এটি কখনও সুপ্ত, কখনও তনু (ক্ষীণ) কখনও বিচ্ছিন্ন কখনও উদার।
প্রসুপ্তি হচ্ছে বীজভাব, তনু হচ্ছে ক্ষীণ ভাব, বিচ্ছিন্নতা হচ্ছে অন্যদের থেকে আলাদা, উদারতা হচ্ছে বাধাহীন অবস্থা। তো আমাদের সংস্কার কখনও সুপ্ত, কখনো ক্ষীণ, কখনো অন্য সংস্কার দ্বারা অভিভূত কখনো বিস্তারপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। আমরা জানি সংস্কার হচ্ছে আমাদের পূর্বপূর্ব জীবনের অভিজ্ঞারলব্ধ জ্ঞান। যখন এই সংস্কার আমাদের মনের গভীরে চাপা থাকে, তখন আমরা কিছুই বুঝতে পারি না। যখন এই সুপ্ত সংস্কার মনের মধ্যে ভেসে ওঠে, তখন এই সম্পর্কে সচেতন হই । আর বাসনা আকারে সংস্কারগুলো প্রকাশ পেতে থাকে। ক্রমে ক্রমে সেই বাসনা প্রবল আকার ধারণ করে, তখন সে কোনো বাধা মানতে চায় না।
দেখুন বাবা এমনিতে ভালো, স্নেহশীল, কিন্তু যখন তিনি রেগে যান, তখন তিনি উন্মাদের মতো ছেলেমেদের পেটাতে থাকেন। এইসময় তার মধ্যে স্নেহ ভালোবাসা বলে কিছু থাকে না। অর্থাৎ এইসময় তাঁর ক্রোধ তাঁকে অভিভূত করে ফেলেছে। এর থেকে বোঝা যায়, দুটো সংস্কার এক সাথে কাজ করতে পারে না, যখন ক্রোধ প্রবল আকার ধারণ করে, তখন স্নেহ ক্রিয়াশীল থাকতে পারে না। এইসময় তার মধ্যে বিচারবুদ্ধি, স্মৃতি সমবকিছুই যেন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তখন এক দিশাহারা অবস্থা, আর আচরণের মধ্যেও লাগামছাড়া ভাব। অর্থাৎ সংস্কার যখন বুদ্বুদ আকারে মন-সরোবরের উপরে ভেসে ওঠে তখন তা তনুকৃত। এইসময় আমাদের মধ্যে বাসনার উগ্র বাসনার উদয় হয়। একে রোধ করা সহজ হয় না। বুদ্বুদ একসময় তরঙ্গের আকার নেয়। এই তরঙ্গই সংস্কারের বিস্তার করে থাকে। এই তরঙ্গ অন্য তরঙ্গের সঙ্গে মিশে যেতে পারে, আবার এই তরঙ্গ অন্য তরঙ্গকে বাধা দিতে পারে।
এই প্রবাহ নিরন্তর চলছে। একে আমরা রোধ করতে পারি না। এমনকি আমাদের এই স্থূল দেহ নাশের পরেও এই সংস্কার আমাদের সঙ্গে ঘুরতে থাকে। একটা শিশু যখন জন্ম নেয়, অর্থাৎ আমরা যখন আবার নতুন স্থূল দেহে ফিরে আসি, তখন এই সহজাত সংস্কার নিয়েই পৃথিবীতে উপস্থিত হই ।
ঋষি পতঞ্জলির কথায়, ক্রিয়াযোগ দ্বারা চিত্ত নিরোধ হয়। এতে করে আমাদের ক্লেশ (সংস্কার) ক্ষীণ (তনু) হতে শুরু করে। যে সংস্কারগুলো এলোমেলোভাবে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, ক্রিয়াযোগের ফলে নতুন প্রবল সংস্কারের জন্ম হওয়ায়, পুরানো এলোমেলো সংস্কারের হ্রাস হতে শুরু করে। আমরা একটা নতুন মানুষের জন্ম দেই।
---------
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/০৫
"অনিত্য-অশুচি-দুঃখ-অনাত্মসু নিত্য-শুচি-সুখ-আত্মখ্যাতিঃ-অবিদ্যা। " (২/০৫)
অনিত্য, অশুচি, দুঃখজনক ও অনাত্ম বস্তুতে যে নিত্য, শুচি, সুখজনক ও আত্মখ্যাতি (আমি-আমার ভাব) হয়, একেই অবিদ্যা বলে।
অনিত্যকে নিত্য ভাবা, অশুচিকে শুচি ভাবা, দুঃখকে সুখ ভাবা, অনাত্মাকে আত্মা ভাবাই আমাদের সমস্ত দুঃখের কারন। একেই বলে অবিদ্যা বা ভ্রমজ্ঞান।
হাজার হাজার বছর আগে, রাজ্ পরিবার থেকে এক যুবক জীবনের দুঃখের নিবৃত্তির জন্য রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিলেন। দীর্ঘ ছয় বছর কঠোর সাধনার ফলে তিনি সন্যাস ব্রত অবলম্বন করেছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, একমাত্র সন্যাস জীবনই পারে দুঃখের অবসান ঘটাতে। দুঃখ-শোক, জরা-ব্যাধি-মৃত্যু থেকে মুক্তির পথ হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন নির্বানের পথ।
ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, অবিদ্যাই সমস্ত ক্লেশের কারন। এই অবিদ্যার কারণেই আমরা অশুচিকে শুচি ভাবি, অনিত্যকে নিত্য ভাবি। আত্মা ও অনাত্মার মধ্যে যে পার্থক্য তা আমরা গুলিয়ে ফেলি। আর এর থেকেই যত বিপত্তির সৃষ্টি হয়। অবিদ্যা হচ্ছে একবস্তুতে অন্য বস্তুর ধারণা করা। যেমন আমরা আমাদের এই শরীরকে আমি ভাবছি। এই ধারণা যে সর্ব্বতভাবে অসত্য, তা আমাদের পক্ষে ঠিক ঠিক বুঝে ওঠা দুস্কর। তার কারন হচ্ছে, এই দেহে প্রবেশের আগে, আমি কোথায় ছিলাম, কেমন ছিলাম, আবার এই দেহ ত্যাগের পরে আমরা কোথায় চলে যাবো, সেখানে আমার পরিচয় কি হবে, তা আমাদের জ্ঞানের বাইরে। পূর্ব্ব পূর্ব্ব জীবনের কথা যেমন আমার স্মৃতিতে নেই, তেমনি ভবিষৎ জন্মের কথাও আমাদের অজ্ঞাত। তাই এই স্থূল রক্ত মাংসের শরীর আমার প্রকৃত পরিচয় নয়, এইসব কথা মহাত্মাদের মুখে শুনেও আমরা যথার্থ ভাবে তা উপলব্ধি করতে পারি না। আর সত্যি কথা বলতে কি, এই উপলব্ধি বাইরে থেকে সংগ্রহ করাও যায় না, এই উপলব্ধি আসে কেবলমাত্র ভিতর থেকে। যদিও এই উপলব্ধি কাউকে কোনোভাবে বোঝানো সম্ভব নয়, তথাপি এটা উপলব্ধি করতে গেলে, আমাদের এই কথাগুলো একটু মনোযোগ দিয়ে শুনুন, তবে একটা অস্পষ্ট ধারণার জন্ম হতে পারে আপনার মধ্যে।
দেখুন আপনার একটা ব্যক্তিত্ত্ব আছে। আপনার মধ্যে এই যে ব্যক্তিত্ত্ব সেটি কিন্তু একদিনে হয়নি। ইহ জীবনে বা বলা যেতে পারে, বহু জীবনের বহু ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে আপনার মধ্যে একটা ব্যক্তিত্ত্ব গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ আপনার জীবন ধারার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আপনার জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে এই ব্যক্তিত্ত্ব গড়ে উঠেছে। আমি আপনাকে যতই বলি না কেন, আপনি এই শরীর নন, একথা আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। একটা শিশুও তার পছন্দের জিনিসটিকে বেছে নয়, অপছন্দের জিনিসটিকে সে দূরে সরিয়ে দেয়। এই যে পছন্দ এটি তার স্বাভাবিক স্বভাব। কেউ বন্দুক পছন্দ করছে, তো কেউ পুতুল। কেউ মিষ্টি পছন্দ করছে তো কেউ টক। কোনো শিশুকে যদি আপনি জোর করে কিছু করতে বলেন, তবে সে তা নিজের ইচ্ছেতে কোরবে না। অর্থাৎ যদি সে তা করেও, জানবেন, এটি তার স্বভাব বিরুদ্ধ। প্রত্যেকের একটা স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে - যা একান্তই - নিজস্ব।
আমাদের মন বাইরে থেকে অভিব্যক্ত হয় না, মন অভিব্যক্ত হয় ভিতর থেকে। আপনি একটা গাছের ডাল কেটে দিয়ে দেখবেন তার পাশ দিয়ে আবার একটা ডাল গজাচ্ছে। তো অভিব্যক্তি সর্বদা ভিতর থেকে আসে, বাইরে থেকে নয়। আমাদের আত্মাতেই আমাদের স্বভাবের বীজ নিহিত হয়ে আছে। আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আত্মার বিস্তার হয়। একসময় এই আত্মা পূর্ন চেতনারূপে প্রকাশ পায়। শিশু ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে, কখনো কাঁদছে, কখনো হাসছে। আসলে এইসময় তার মনের মধ্যে নানান ভাবের উদয় হচ্ছে। হয়তো তার মনের মধ্যে পূর্বস্মৃতির উদয় হচ্ছে। তার মানে তার অনুভবের মধ্যে কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়ে আছে। এই সঞ্চিত অভিজ্ঞতাই সে স্বপ্নরূপে দর্শন করছে, আর কখনো কাঁদছে, কখনো হাসছে। শিশুর মনের মধ্যে তখন যে কষ্ট, বা অনুভূতি তা তার মা-বাবা বুঝতে পারেন না। তো যে শিশুকে আমরা অবোধ ভাবি, সে কিন্তু অবোধ নয়, তার মধ্যেও একটা বোধশক্তি কাজ করছে। শিশুর মধ্যে যে বোধ বা ভাব এটি পূর্ব জীবনের সংস্কার, যা তার মনের গভীরে গেঁথে আছে, যা তার অতীত জীবনের কর্ম্মের চিহ্ন। এই অতীত জীবনের কর্ম্মস্মৃতি আত্মাতে সূক্ষ্ম অবস্থায় থাকে। যাকে ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, সুপ্ত। নতুন দেহে, বা নতুন জীবনে এই সংস্কার তনু বা ক্ষীণ অবস্থায় স্বপ্নে ভেসে ওঠে। অনেক সময় দুটো বাসনা একসঙ্গে ভেসে ওঠে যার একটি বাসনা হয় প্রবল অপরটি অপেক্ষাকৃত দুর্বল। যে বাসনা প্রবল থাকে, মানুষ সেই মতো কাজে লিপ্ত হয়। অর্থাৎ তখন আমরা প্রবলতর বাসনা দ্বারা অভিভূত হয়ে যাই। আসলে আমি যে কথাটা বলতে চাইছি, তা হচ্ছে, আমাদের জন্মান্তরের মধ্যে স্থূল দেহের ছেদ ঘটলেও, আমাদের জীবন প্রবাহ চলতেই থাকে। আগের জীবনের বাসনা, এই জীবনে প্রভাবশালী হয়ে, আমাকে সেইমতো কর্ম্মে অনুপ্রেরণা দেবে। এই কারণেই, কেউ দেখবেন, পড়াশুনা করতে চায় না, আবার কেউ পড়াশুনার প্রতি আগ্রহান্বিত হয়। কারুর নাচ-গান ভালো লাগে, কেউ ছবি আঁকতে ভালোবাসে। পূর্বজন্মের বাসনার স্মৃতির সঙ্গে পরবর্তী জীবনের বাসনা, উদিত হয়ে পরস্পর মিশে যায়। একজন্মের বাসনার সঙ্গে অন্য জন্মের বাসনা একত্রিত হয়ে সেই কর্ম্মে আমরা উদ্দীপ্ত হয়ে যাই। কেন হয়, তা হয়তো আমাদের চেতন মন বুঝতে পারে না।
দেখুন একসময় আমার এই দেহ জেলির আকারে পৃথিবীর বুকে কোনো জলাধারে জন্ম নিয়েছিল। মনুষ্য দেহের উৎপত্তির ইতিহাস যদি দেখেন তবে বুঝতে পারবেন, জেলি একসময় বহুবাহু সম্পন্ন আকার গ্রহণ করে। ধীরে ধীরে জলজ উদ্ভিদের আকার নেয়। এর পরে মৎস, সরীসৃপ, পাখি, কুকুর, বানর, ইত্যাদির পরে, সবশেষে মানুষের আকার নিয়েছে। হিন্দু শাস্ত্র বলে থাকে ৮৪ লক্ষ যোনী ভ্রমনের পরে, আমরা এই মনুষ্য শরীর পেয়েছি। তো এই যে শরীর - এর ইতিহাস অনেক পুরোনো - হয়তো কোটি কোটি বছর। ক্রমবিকাশের ফলে আমরা আজ এই দেহ পেয়েছি। ভগবান বুদ্ধ নাকি তার পাঁচশত পূর্ব-জীবনের বৃত্তান্ত শুনিয়েছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে বলেছিলেন, আমার তোমার বহু জন্ম অতীত হয়েছে, আমি সে সব জানি, তুমি তা জানো না।
তো যে কথা বলছিলাম, আমাদের এই স্থূল শরীরের মৃত্যুর পরেও আমাদের জীবন প্রবাহ চলতে থাকে এবং আমাদের ব্যক্তিত্ত্ব পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে ক্রমবিকাশের দিকে ধাবিত হয়। এই বিশ্বাসের উপরে ভর করে আমাদের জীবনের আদর্শকে উচ্চতর পর্য্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। যথার্থ জ্ঞানের আলো জ্বেলে সমস্ত অজ্ঞানকে জয় করতে হবে, আর এই পার্থিব জীবনেই আমাদের চিরন্তন সত্যকে উপলব্ধি করতে হবে।
আমরা আগেই শুনেছি, অবিদ্যা হচ্ছে ভ্রান্তজ্ঞান। এই ভ্রান্তজ্ঞান কেমন সেটা একটু দেখে নেই। এই দেহ যেমন চিরস্থায়ী নয়, এই যে পৃথিবী, চন্দ্র সূর্য, নক্ষত্ররাজি কেউই চিরস্থায়ী নয়। এই পৃথিবীর একদিন যেমন জন্ম হয়েছিল, একদিন এই পৃথিবী ধংশপ্রাপ্ত হবে। আমাদের অনেকের ধারণা হচ্ছে, যা কিছু জড় পদার্থ অর্থাৎ যার প্রাণ নেই তা চিরস্থায়ী। এই যে পাহাড় নদী এ বোধহয় যুগ যুগ ধরে চলছে চলবে। একটু গভীর ভাবে এই বিষয়ে মনোযোগ দিলেই আমরা বুঝতে পারবো, এমন কথা সত্য নয়। যার জন্ম আছে, তা সে চেতন বলুন, জড় বলুন সবার একদিন মৃত্যু হবে। কিন্তু এর মধ্যে একজন আছেন, যিনি অবিনাশী, নিত্য, চিরন্তন। একেই উপনিষদে ঋষিগণ বলছেন ব্রহ্ম, যোগীদের ভাষায় আত্মা, ভক্তের ভাষায় নারায়ণ, সদাশিব ।
যাইহোক, আমাদের আলোচ্য বিষয় অবিদ্যা। অবিদ্যা যথার্থ জ্ঞানকে ঢেকে রাখে, আর অযথার্থ জ্ঞানের আভাস দেয়। ঋষি বলছেন, আত্মার সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান হলেই আমাদের অবিদ্যার ক্লেশ দূরীভূত হবে। এই অবিদ্যার ফলে চিত্তের একটি বিশেষ অবস্থার উদয় হয়, যাকে বলে অস্মিতা বা আমি-আমার-বোধ। আমাদের যে ব্যাক্তিত্ত্ববোধ তার ভিত্তি হচ্ছে এই অস্মিতা। আমাদের স্থূল দেহের সঙ্গে এই অস্মিতাবোধ ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। আমরা এই ব্যক্তিত্ববোধকে যদি দেহ থেকে আলাদা করতে পারি, তবে আমাদের আত্মজ্ঞান হতে পারে। আমাদের যে অস্মিতা, আমাদের যে ব্যক্তিত্ত্ব তা এই স্থূল দেহের সঙ্গে একত্ত্ব হয়ে গেছে। এই দুটিকে আলাদা করতে হবে। অস্মিতার সঙ্গে ব্যক্তিত্বের একটা ঘনিষ্ট সম্পর্ক আছে। এখন কথা হচ্ছে আমাদের দীর্ঘকালের অভ্যাসবশতঃ আমরা এই দেহের সঙ্গে নিজেকে অভিন্ন রূপে কল্পনা করে এসেছি। একে ভোলা সহজ নয়।
এখান থেকে বেরুতে গেলে, আমাদের মৃত্যুকালীন অবস্থাকে একটু বুঝবার চেষ্টা করতে হবে। মৃত্যুকালীন সময়ে, বিশেষ করে হঠাৎ করে কারুর মৃত্যু হলে, আত্মা দেহ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেও প্রথমে সে বুঝতে পারে না, যে তার দেহের পঞ্চত্ব প্রাপ্তি হয়েছে। আর এই কারণেই সে তার সদ্যমৃত দেহের চারিপাশে সে ঘুরতে থাকে। আত্মীয়স্বনের কান্না, চিৎকার চেঁচামেচি, তাকে বিহ্বল করে তোলে। দেহ স্থির হয়ে শায়িত হয়। এইসময় আত্মা দেহকে নানান রকম নির্দেশ দিতে থাকে। কিন্তু দেহ তার কোনো নির্দেশ পালন করে না। এতে করে সে অসহায় হয়ে যায়। দেহকে যতক্ষন না কবরস্থ করা হচ্ছে, বা দেহেকে যতক্ষন না অগ্নিতে দাহ করা হচ্ছে, ততক্ষন সে দেহের মায়া ছাড়তে পারে না, আবার সে দেহের মধ্যেও প্রবেশ করতে অক্ষম হয়ে যায়। এই অবস্থায় আত্মা ঘুরপাক খেতে থাকে। দেহ কবরস্থ হলে বা দেহকে দাহ করা হলে, সে সেখানে থেকে দূরে কোথাও ভেসে যায়।এইসময় পরলোকগত আত্মারা যারা তার শুভানুধ্যায়ী তারা তাকে সঙ্গ দেয়, নতুন অবস্থার কথা তাকে বোঝায়, নানান রকম উপদেশ দিয়ে, তাকে পরিস্থিতি বোঝাতে চেষ্টা করে । নতুন অবস্থায়, তাকে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে। আপনার আমার সবার এই অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু এ আমাদের স্মৃতিতে তা চাপা পরে গেছে, তাই কল্পনিকভাবে এই অবস্থাটার কথা প্রতিদিন একটিবার চিন্তা করতে থাকুন। ভাবুন এইসময় আপনার আত্মীয় স্বজন কে কি করতে পারে, কে কিভাবে আপনার মৃত্যুকে গ্রহণ করতে পারে।
যাই হোক, দেহত্যাগ হলেও আমাদের ব্যক্তিত্বের কোনো পরিবর্তন হয় না। বেঁচে থাকতে যেমন আমাদের ব্যক্তিত্ত্ব আমার স্থূল দেহের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে ছিল, তেমনি আমাদের স্থূল দেহ নাশের পরেও, ব্যক্তিত্ত্ব আমাদের সঙ্গে থাকে।
এছাড়া ক্রিয়াযোগ-এর সাধন প্রণালীর যে উপদেশ আছে তা আমাদের কাজে লাগে অবশ্যই। মনকে বাইরের জগৎ থেকে, ইন্দ্রিয়ের বিষয়গুলো থেকে প্রত্যাহার করে আমরা আমাদের অন্তরের ভিতরে প্রবেশ করাতে পারি। মনকে হৃদয়স্থিত আকাশের মধ্যে প্রবেশ করতে পারি। আজ্ঞাচক্রের চিদাকাশে মনকে নিবদ্ধ করতে পারি। এতে করে, আমাদের ক্ষনিকের জন্য হলেও ইন্দ্রিয়ভোগের নিবৃত্তি হতে পারে। চিত্ত এক অসীম সত্ত্বার সঙ্গে একীভূত বলে উপল্বদ্ধিতে আসতে পারে। এই অসীমের সঙ্গে আপনি যত বেশিক্ষন কাটাবেন, যত একাত্ম হতে পারবেন, তত অবিদ্যার আবরণ কেটে যেতে থাকবে। আপনার মধ্যে একটা নতুন মানুষের জন্ম হবে। জীর্ন বস্ত্র পরিত্যাগ করার মতো আপনার আগের ব্যাক্তিত্ত্বের অবসান ঘটবে।
মোদ্দা কথা হচ্ছে অবিদ্যাই সমস্ত ক্লেশের মূল, আর অবিদ্যার ফলেই আমরা যা নয়, তাই ভেবে কষ্ট পাচ্ছি। অশুচিকে শুচি ভাবছি, অনিত্যকে নিত্য ভাবছি, অনাত্মার মধ্যে আত্মাকে ভাবছি, যা আমি নয়, তাকে আমি ভাবছি, যা আমার নয়, তাকে আমার ভাবছি, যা সত্য নয়, তাকে সত্য ভাবছি - আর এই ভ্রমের ফলেই আমাদের জীবন হয়ে উঠছে অতিষ্ঠ। এখান থেকে বেরিয়ে সত্যে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
-------
"দৃগদর্শন শক্ত্যোঃ একাত্মতা ইব অস্মিতা ।" - (০২/০৬)
দ্রষ্টা ও দর্শনশক্তির একাত্মতাই অস্মিতা।
দৃক কথাটার অর্থ হচ্ছে যার দ্বারা দেখা যায়, অর্থাৎ চক্ষু। এখন কথা হচ্ছে সত্যিই কি চোখ দেখতে পায় ? আসলে চোখ একটা যন্ত্র বিশেষ যার দ্বারা আমি দেখতে পাই। দূরদর্শনে অনেক ছবি ভেসে ওঠে, অথচ দূরদর্শন নিজে কিছুই দেখতে পায় না। তেমনি চোখ দেখে না, চোখ আমাকে দেখতে সাহায্যে করে মাত্র। তাহলে কি মন দেখে ? না মনও দেখে না, তবে মনের আয়নায় চোখের বা ইন্দ্রিয়ের সংস্পর্শে আসা বিষয়ের একটা প্রতিচ্ছবি পড়ে। আর এই প্রতিচ্ছবি তখন একটি দৃশ্যপট মাত্র। মনের দর্পনে এই প্রতিচ্ছবি যখন বুদ্ধিকে সজাগ করে তোলে, তখন প্রতিচ্ছবির একটা পরিচয় প্রদান করে বুদ্ধি। অর্থাৎ প্রতিচ্ছবির বিচার বিশ্লেষণ ক'রে, তার পরিচয় প্রদান করে থাকে বুদ্ধি। তাহলে মন বা বুদ্ধি কিন্তু জ্ঞাতা নয়, জ্ঞাতা আছেন আরো গভীরে। এই জ্ঞাতাই হচ্ছেন আত্মা, চৈতন্য বা পুরুষ। তো ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি দ্বারা যিনি দেখছেন তিনি আত্মা অর্থাৎ প্রকৃত দ্রষ্টা হচ্ছেন আত্মা।
ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, পুরুষ হচ্ছে দৃকশক্তি, আর বুদ্ধি হচ্ছে দর্শন শক্তি। এই দুই-এর একত্ব জ্ঞানকে বলা হয় অস্মিতা। এই দুটির এক-স্বরূপতা-খ্যাতি হলো অস্মিতা যা আমাদের ক্লেশের কারন। তো চক্ষু, মন, বুদ্ধি সবই জড় - কিন্তু এর সঙ্গে যখন চৈতন্য মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, তখন তাকে বলে অস্মিতা বা আমি-ভাব।অস্মিতা যেন সূর্যকে ঢেকে রাখা মেঘ। মেঘ কেটে গেলেই সূর্য্যের দেখা মিলবে। আত্মা মন ও বুদ্ধি দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে আছে। সাধকের কাজ হচ্ছে এগুলোকে আলাদা করা।
দ্রষ্টা হচ্ছেন আত্মা। এর কোনো সীমা নেই। ইনি পূর্নপুরুষ। এর মধ্যে কোনো মলিনতা নেই। ইনি সদা পবিত্রতম। এই পবিত্রতম আত্মাকে যদি সাধক উপলব্ধি করতে পারেন, তবে তিনিও পবিত্রতম হয়ে যান। এর জন্য চাই আধ্যাত্মিক অনুশীলন। নিরন্তর যোগের অভ্যাসের সাহায্যে এই অবিনাশী সত্তার উপলব্ধি করা সম্ভব। আমাদের যে মন, বুদ্ধি, ইন্দ্রিয়সকল এগুলো হচ্ছে করণ, অর্থাৎ যার দ্বারা ক্রিয়া নিস্পন্ন হয়। তো যোগের উপকরণ হচ্ছে মন, বুদ্ধি, ইন্দ্রিয়সকল।
মন ইন্দ্রিয়সকলের সাহায্যে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে ধাবিত হচ্ছে। মনের মধ্যে সংকল্প বিকল্পের উদয় হচ্ছে। অর্থাৎ মন সব সময় অস্থির - কখনো এটা করবো, বা এটা করবো না - এইভাবে সংকল্প করে চলেছে। বুদ্ধি হচ্ছে আমাদের নিশ্চয়াত্মিকা বৃত্তি। এই বুদ্ধিই আমাদের মনকে একটা সিদ্ধান্ত প্রদান করে। তো আমাদের সমস্ত কর্ম্মের যিনি চালক তিনি হচ্ছেন বুদ্ধি। এইজন্য উপনিষদে বলা হয়েছে, বুদ্ধি হচ্ছে শরীররূপী রথের সারথি, মন হচ্ছে লাগাম, ইন্দ্রিয়গুলো হচ্ছে রথের ঘোড়া । আর সেই রথের যাত্রী হচ্ছেন স্বয়ং আত্মা । এই কথাগুলো আমাদের উপল্বদ্ধিতে আনতে হবে।
এখন কথা হচ্ছে এই অস্মিতার আবির্ভাবের কারন কী ? দেখুন বেলুনকে যদি আকাশে ওড়াতে হয়, তবে বেলুনে গ্যাস ভরতে হয়। তেমনি যদি আপনি সমুদ্রের নিচে যেতে চান তবে আপনার ওজন বাড়াতে হবে। অর্থাৎ আপনার সঙ্গে কিছু যোগ হলে আপনি নিম্নগতি সম্পন্ন হতে পারবেন, আর সমুদ্রের মধ্যে গিয়ে সেখানকার জগতের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবেন। আবার আপনি যদি অন্তঃরীক্ষের খবর জানতে চান, তবে আপনার ওজন কমাতে হবে। তো অনাবশ্যক বস্তু ত্যাগ করলে, আপনি উর্দ্ধমুখী হতে পারবেন, আবার অনাবশ্যক বস্তুর পরিমান বাড়ালে, আপনি পাতাল প্রবেশ করতে পারবেন। ঈশ্বর পুরুষ যখন ইহজগতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চান, তখন তাকে একটা স্থূল শরীর ধারণ করতে হয়। এই শরীর দ্বারাই আমরা বহির্জগতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি। শরীর যখন ছেড়ে যাই, তখন আমরা অন্তর্জগতের বাসিন্দা হয়ে যাই। আর এই অন্তর্জগতে সবকিছু একাকার বা একাত্মীভূত হওয়ায় আমাদের আমি-ভাবের বা অস্মিতার বিলোপ সাধন হয়। আবার দেহে স্থিত হবার কালে আমাদের অস্মিতাকে সঙ্গে নিয়েই আসতে হয়। এই অস্মিতা-ভিন্ন জগৎ ভোগের ক্রিয়া সম্পাদন করা সম্ভব নয়। প্রকৃতির সঙ্গে পুরুষের এ এক রমন ক্রিয়া।
তো দেহ আমি নোই, এই দেহাত্মবোধ কেবল অবিদ্যার কারনে হয়ে থাকে। আমরা দেহকেই আমি বা আত্মা বলে দৃঢ়ভাবে মেনে নিয়েছি। আর দেহাত্মবোধে অস্মিতা জড়িয়ে গিয়ে আমাদের যতসব ক্লেশের অনুভব হচ্ছে। আমার দেহ অসুস্থ হলে আমরা বলি আমি অসুস্থ। আমাদের দেহের মধ্যে ক্রোধের প্রভাব হলে, আমরা বলি, আমি রেগে গেছি। তো রাগ, দ্বেষ, ঘৃণা, ভয় ইত্যাদি যাকিছু আমাদের কষ্টের কারন, তার আমাদের দেহাত্মবোধে অস্মিতার সংযোজন-এর কারনে হয়ে থাকে। বলা হয়, এই যে ঈর্ষা, ঘৃণা, ভয়, এগুলো আসলে মনের মলিনতা। আর এই যে মনের মধ্যে মলিন-ভাব তার কারন হচ্ছে আমাদের অবিদ্যা। তো অবিদ্যাকে দূর করতে হবে। আর বাইরে থেকে কেউ এই অবিদ্যার প্রভাব দূর করতে পারে না। তাহলে কিভাবে এই অবিদ্যার নাশ হবে? দেখুন আলো জ্বাললে যেমন হাজার বছরের অন্ধকার এক মুহূর্তে দূর হয়ে যায়, তেমনি আমাদের সকলের মধ্যে একটা দিব্যভাব আছে। এই দিব্যভাব আমাদের সবার ভিতরেই আছে। আমাদের কাজ হচ্ছে, এই দিব্যভাবকে উপলব্ধি করা।
এখন কথা হচ্ছে এই দিব্যভাব উপলব্ধি করবো কি করে ? এর জন্য দরকার আমাদের বোধশক্তির উন্নতি। এই বোধশক্তি আমাদের সবার মধ্যেই আছে। দেখুন, আমরা সব বুঝি, কিন্তু যার যেমন বোধশক্তি সে তেমনটি বোঝে। যার যেমন জ্ঞান, সে তেমনটি বোঝে। শিক্ষকতো একই কথা সমস্ত ছাত্রের নিকট বলে, এর মধ্যে কেউ শোনে কেউ শোনে না, কেউ বোঝে কেউ বোঝে না, কেউ অমনোযোগী কেউ মনোযোগী। আর এর ফলে হয় কি, বোঝার মধ্যে একটা তারতম্য ঘটে যায়। যার বুদ্ধি তীক্ষ্ণ, যার মধ্যে বোঝার জন্য সদর্থক ভাবনা আছে, যার সংস্কার ভালো, তার মধ্যে বিষয়ের উপল্বদ্ধি সহজেই ঘটে যায়। এখন আপনার পেটে ক্ষিদে থাকলে আপনার পড়ায় মন বসবে না, আপনার শরীর খারাপ থাকলে আপনার মন বসবে না, আবার বিষয়ের প্রতি আপনার যদি আগ্রহ না থাকে তাহলেও আপনার মন বিষয়ে স্থির হতে পারবে না। এর জন্য দরকার শরীর ও মনের সুস্থতা, শরীর-মনের স্থিরতা। এই শরীর-মনের স্থিরতার শিক্ষাই যোগের প্রাথমিক পৰ্য্যায়।
আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমরা একটাকে ছেড়ে আর-একটা ধরতে চাই। আমরা দুঃখকে ছেড়ে সুখকে ধরতে চাই। মৃত্যুকে ছেড়ে জীবনকে ধরে রাখতে চাই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এযে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। শরীর থাকবে, আর জরা ব্যাধি থাকবে না, তা হতে পারে না। জন্ম থাকবে আর মৃত্যু থাকবে না তা হতে পারে না। সুখটুকু থাকবে আর দুঃখ থাকবে, তা হবে না। তাই ছাড়তে গেলে দুটোকেই ছাড়তে হবে। নতুবা দুটোকেই ধরতে হবে। আমাদের প্রকৃত স্বরূপের মধ্যে কোনো পরিবর্তন নেই, এটি না আলো না অন্ধকার, এটি না সুখ না দুঃখ। সুখ দুঃখের বিকাশ আছে, ক্ষয় আছে। কারুর জীবনেই কেবলমাত্র সুখ বা কেবলমাত্র দুঃখ থাকতেই পারে না। সুখ দুঃখ চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। কখনো সুখ কখনও দুঃখ। এই চক্র কখনও থামতে জানে না। চাঁদ-সূর্য কখনো থামতে জানে না। তাই কখনো জ্যোৎস্না, কখনো অমাবস্যা, কখনো দিন কখনো রাত। কখনো প্রভাত, কখনো সন্ধ্যা। এই চক্র ঘুরছে তো ঘুরছেই। এর বিরতি নেই।
আরো একটা অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের সুখে থাকতে ভূতে কিলায়। যখন কেউ সুখে থাকে তখন সে মনের মধ্যে আরো-আরো বাসনার উদ্রেগ ঘটাতে থাকে। এমনকি এমনও ঘটে তার নতুন বাসনা পূর্বের বাসনা থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত। মিষ্টি খেতে খেতে সে বিরক্ত হয়ে ওঠে, এবার সে একটু টক বা ঝাল খেতে চায়। অর্থাৎ সুখকে সে ধরে রাখতে চায় না। গান শুনতে শুনতে একসময় সে অধৈর্য্য হয়ে ওঠে। এবার সে একটু বাইরে বেড়াতে চায়। সে বেশিক্ষন ছায়ায় বসে থাকতে চায় না, সে একটু রোদের উত্তাপ নিতে চায়। তো আমরা কেউ সুখকে ধরে রাখতে চাই না। ব্যাপারটা শুনতে খারাপ লাগলেও, এটি সত্য। আমরা সবাই বেঁচে থাকতে চাই, কিন্তু আমাদের যদি কেউ হাজার বছর আয়ু প্রদান করে, তবে আমরা জীবন নিয়ে অতিষ্ঠ উঠবো।
আসলে আমরা সবাই অস্থির। আমরা কি চাই তা আমরা জানি না। আমাদের মন অস্থির-চঞ্চল। মন কখনো একটি বিষয়ে স্থির হতে চায় না। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে ঘুরে বেড়ানোই তার স্বভাব। তাই কখনও সে তিতো খেয়ে বিরক্ত হচ্ছে, কখনো সে মিষ্টি খেয়ে তৃপ্ত হচ্ছে।
এখান থেকে বেরুতে গেলে আমাদের আত্মস্থিত হতে হবে। সত্যকে ধরতে হবে। সব ছেড়ে সেই এক-কে ধরতে হবে। কিন্তু যতক্ষন আমাদের তৃষ্ণা না জাগছে, ততক্ষন আমরা কেউ জল পান করতে চাইবো না। তাই যতক্ষন না আমাদের সত্য উপল্বদ্ধির জন্য তৃষ্ণা বা ব্যাকুলতা না জাগবে ততক্ষন আমাদের এই তত্ত্ব-উপদেশের মর্ম উপল্বদ্ধিতে আসবে না। জীবনের সাফল্য খ্যাতিতে নয়, জীবনের সাফল্য অর্থ উপার্জনে নয়, জীবনের সাফল্য সরকারি পদ বা ক্ষমতার মধ্যে নেই। জীবনের সাফল্য সত্যের অনুসন্ধানে। জীবনের সাফল্য নিজেকে জানায়। জীবনের সাফল্য আত্মস্থ হওয়ায়।
যোগীপুরুষগন বলে থাকে প্রথমে একাগ্রতার অভ্যাস দিয়ে শুরু করুন। জীবনীশক্তিরূপ সেই শ্বাসের দিকে মন দিন। ধীরে ধীরে ধ্যানের মধ্যে প্রবেশ করুন। তখন দেখবেন, আপনার ভোতা বুদ্ধি সুচালু হতে শুরু করেছে। বুদ্ধির মধ্যে পবিত্রতা এসেছে। মন নির্ম্মল হচ্ছে। একটা জ্ঞানালোকের আভা আপনাকে ঘিরে থাকছে। আপনি আমি সবাই তো আসলে জন্ম-মৃত্যুহীন, অবিনাশী, শুদ্ধ, পূর্ন আত্মা। আর এই জ্ঞান যখন আমাদের উপল্বদ্ধিতে আসবে, তখন আমরা নিরবিচ্ছিন্ন আনন্দের মধ্যে প্রবেশ করবো। অবিদ্যা দূর হয়ে যাবে। আমরা সবাই সত্যের সম্মুখীন হয়ে মৃত্যুরহিত আত্মোপলব্ধি নিয়ে কালের উর্দ্ধে অবস্থান করবো। এই হচ্ছে যোগীপুরুষের অন্তিম লক্ষ।
-----
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/০৭-০৮
"সুখানুশয়ী রাগঃ।" - (০২/০৭)
সুখানুশয়ী অর্থাৎ সুখের অনুভব রয়েছে, এমন কর্ম্ম সংস্কার হচ্ছে রাগ। (০২/০৭)
"দুখানুশয়ী দ্বেষ।" - (০২/০৮)
দুঃখের অনুভব রয়েছে, এমন কর্ম্ম সংস্কার হচ্ছে দ্বেষ। (০২/০৮)
সুখের অনুভব রয়েছে, এমন অনুস্মৃতি আমাদেরকে সুখ সাধনের স্পৃহা, তৃষ্ণা, লোভ জাগ্রত করে। এই হচ্ছে রাগ বা আসক্তি। আবার আমরা যাতে অসুখী হয়েছিলাম, দুঃখ পেয়েছিলাম, অর্থাৎ যা আমাদের কাছে অপ্রীতিকর, তা অনুস্মৃত হয়ে যে বিতৃষ্ণা জাগে, তাকে বলে দ্বেষ। আসলে যা আমাদের সুখের অনুভূতি এনে দেয়, তা আমরা বারংবার অনুভব করতে চাই, আর যা আমাদের দুঃখের অনুভূতি এনে দেয়, তাকে আমরা বৰ্জন করতে চাই।
ছোটবেলার একটি সুখস্মৃতির কথা মনে পড়ে - সেদিন আমার পেটে খুব ব্যাথা। তো বাবা আমাকে মাধব মামার মিষ্টির দোকানে নিয়ে গেলেন। বিকেলের দিকে সেখানে গরম রসোগোল্লা পাওয়া যেতো। বাবার নির্দেশে মাধব মামা আমাকে দুটো রসোগোল্লা আর একটু বেশি করে চিনির সিরা (ঝোল) দিতে বললেন। সেদিনের সেই রসোগোল্লার স্বাদ আজও আমার জিভে যেন লেগে আছে। আজও সেই রাস্তা দিয়ে যখনই আমি যাই, তখন আমার মধ্যে রসোগোল্লা খাবার একটা স্পৃহা জেগে ওঠে। মাধব মামার কথা মনে পড়ে।
আমাদের যেমন সুখকর অনুভূতি স্মৃতিতে সংরক্ষিত হয়ে আছে, তেমনি আমাদের দুঃখের অনুভূতিও স্মৃতিতে ধরা আছে। অর্থাৎ দুটোই আমাদের স্মরণে আছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, আমরা লক্ষ করে দেখেছি, এগুলো অর্থাৎ এই স্মৃতি মাঝে মধ্যে আমাদের মনের মধ্যে ভেসে ওঠে।
কেন এই স্মরণক্রিয়া ঘটে ? এর কারন হচ্ছে এইযে অনুভূতি, যা এককালে ঘটেছিলো, তা আমাদের মনের মধ্যে একটা দাগ কেটে যায়। এই দাগকেই বলা হয় সংস্কার। এটি আমাদের মনের গভীরে অব্যক্ত হয়ে অবস্থান করে। অর্থাৎ এটি আমাদের অবচেতন মনে অবস্থান করে। কখনও অনুরূপ পরিস্থিতি সামনে এলে, আমাদের সেই অনুভূতি আমাদের মনের অবচেতন স্তর থেকে চেতন স্তরে উঠে আসে। একেই বলা হয় স্মরণ বা স্মৃতির জাগরণ। আমি যখন মিষ্টির দোকানের পাশ দিয়ে যাই, তখন পূর্বে কোনো একদিন রাসগল্লার আস্বাদন আমাদের মধ্যে যে সুখের অনুভূতি এনে দিয়েছিলো - মন আবার সেটি পেতে চায়। এই যে পেতে চাওয়া, এর নামই বাসনা। ঠিক তেমনি কোনো একসময় কোনো ঘটনা, যা আমাদের মনের দুঃখের উদ্রেগ করেছিল, যা আমার তখন ভালো লাগেনি, সেই পরিস্থিতির উদ্রেগ হলে, আমাদের মধ্যে ঘৃণা, বিতৃষ্ণা, বা একটা অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়।
তো এই যে অনুস্মৃতি বা স্মরণ তা আমাদের রাগ ও দ্বেষের কারন হতে পারে। একটা অনুস্মৃতি আমাদের বিষয়ের কাছে টানে, আর একটা অনুস্মৃতি আমাদের বিষয় থেকে দূরে ঠেলে দেয়। তো কোনোটা পরিহার করতে চাই, আবার কোনোটা গ্রহণ করতে চাই।
তো মিষ্টির দোকানেই সামনে দিয়ে যেতে যেতে বা মাধবমামার দোকানের সামনে দিয়ে যেতে যেতে রসোগোল্লার স্মৃতি ভেসে উঠলো। এই স্মৃতির সঙ্গে জড়িত একটা অংশ হচ্ছে মাধবমামার দোকান, বা রসোগোল্লা যা আমি আগে খেয়েছি, তা আমার মনের গভীরে স্মৃতির ভাণ্ডারে গচ্ছিত ছিল। এখন সেখান দিয়ে যেতে যেতে আমার অবচেতন স্তর থেকে সেই স্মৃতি চেতন স্তরে উঠে এলো। এ হচ্ছে সংস্কারের কাজ। এখন আমার যদি ইচ্ছে প্রবল হয়, তবে আমি দোকানে ঢুকে পড়বো। এই হচ্ছে বাসনা।
তো সংস্কার হচ্ছে মনের মধ্যে কতকগুলো অস্পষ্ট ছবি, আর বাসনা হলো একটা শক্তি যাকে আপনি ইচ্ছেশক্তি বলতে পারেন। এই সংস্কার ও বাসনার যখন সংযোগ ঘটে, তখন মানুষ কাজ করতে বা না করতে উদ্যোগী হয়ে থাকে। আপনার হয় তো মনে হবে, না করার সঙ্গে উদ্যোগী হবার কি সম্পর্কে থাকতে পারে ? হ্যাঁ পারে, না করবার ইচ্ছেটা প্রবল না হলে, মানুষ কাজ থেকে বিরত থাকতে পারে না। যাদের এই ইচ্ছেশক্তি দুর্বল, তারা তাদের নিজেদের অজ্ঞাতসারে সংস্কারের দ্বারা পরিচালিত হয়। আর এই কারণেই মানুষের সংস্কার অর্থাৎ মনের গভীরে লুক্কায়িত স্মৃতি যেমন তাকে রাগ, হিংসামূলক কাজে লিপ্ত করে থাকে। ঠিক তেমনি এই সংস্কার মানুষকে ভালো কাজেও উদ্দীপ্ত করে থাকে। ছোটবেলা থেকে কেউ, বন্দুক নিয়ে খেলতে ভালোবাসে। কেউ আবার বইয়ের পাতা উল্টাতে ভালোবাসে। তো সংস্কারের ফলে আমরা যে দিশাহারা হয়ে কর্ম্মে লিপ্ত হই। সংস্কার আমাদেরকে কর্ম্মের জন্য উদ্দীপ্ত করে। এইজন্য অর্থাৎ সংস্কারের বশীভূত হয়ে কাজ না করে, যদি আমারা বিবেক-বিচারের দ্বারা কর্ম্ম নির্ধারণ করতে পারি তবে আমাদের জীবন অন্যরকম হতে পারে। এই সংস্কারের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসবার জন্য আমাদের সাধনা করতে হয়। তাই কর্ম্ম ও জ্ঞান অৰ্জন যেমন আমাদের সাহায্য করে, তেমনি বিচারশক্তিকে জাগ্রত করে সঠিক কর্ম্মপথের আশ্রয় নিতে হয়। অনুভব শক্তিকে বা বিচারবোধকে পরিশীলিত করতে হয়। সংস্কার আমাদের যেন মোহিত না করে ফেলে। এরজন্য দরকার যোগসাধনা - যা আমাদের সমাধির পথে নিয়ে গিয়ে সজ্ঞার উন্মোচন করে।
------
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/০৯
"স্বরসবাহী বিদূষঃ অপি তথারূঢ় অভিনিবেশঃ।" - (০২/০৯)
স্বরসবাহী অর্থাৎ নিজ অধিকারে থাকা রস। জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কার বিদ্বানদেরও (বিদ্যান বা অবিদ্যান উভয়ের) বেঁচে থাকবার ইচ্ছে বা মৃত্যুভয় থাকে।
আমরা আগেই শুনেছি, পঞ্চ ক্লেশের মধ্যে একটি হচ্ছে মৃত্যুভয়, বা বেঁচে থাকবার ইচ্ছে। এমন কোনো প্রাণী নেই, যার মধ্যে বেঁচে থাকবার ইচ্ছে জাগ্রত হয় নি। জন্ম থেকেই এই বোধ ক্ষুদ্র প্রাণী থেকে বৃহৎ, কীটাণু-কীট থেকে মনুষ্য, ভালো মন্দ, হিংস্র বা শান্তিপ্রিয়, সবারই মধ্যেই এই বেঁচে থাকবার অদম্য ইচ্ছে সৃষ্টিকর্তা দিয়ে রেখেছেন। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন এটি স্বরসবাহী অর্থাৎ পূর্ব পূর্ব জীবন থেকেই বহন করে নিয়ে চলেছে।
দেখুন মৃত্যু (দেহের) একটা চিরন্তন সত্য, অবধারিত পরিণতি। লক্ষকোটি জীবের মধ্যে কেউ এই অমোঘ নিয়মের বাইরে নয়। কেউ কয়েক মিনিট, কেউ বা কয়েক হাজার বছর বেঁচে থাকে, কিন্তু মৃত্যু থেকে কেউ অব্যাহতি পায় না। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, তুমি পণ্ডিত হও বা মূর্খ মৃত্যুর হাত থেকে তুমি রেহাই পাবে না।
আমরা যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেই, যে পুনর্জন্ম বলে কিছু নেই, তাহলে এটা সিদ্ধ হয় যে, মৃত্যুর অভিজ্ঞতা আমাদের কারুর নেই। তো যার সম্পর্কে আমাদের কোনো পূর্ব্ব অভিজ্ঞতা নেই, তাকে আমরা কেন ভয় পাবো ? মৃত্যু ভালো কি মন্দ তা তো তাহলে আমাদের জানবার কথা নয়। এমনি আমরা দেখেছি, কিসে আমাদের মৃত্যু হবার সম্ভাবনা আছে, সে সম্পর্কেও আমাদের টনটনে জ্ঞান আছে। মায়ের কোল থেকে মাটিতে পড়ে গেলে, আমার মৃত্যু হতে পারে, এই বোধ একটা সদ্যজাত শিশুর মধ্যেও স্পষ্ট। পড়ে যাবার সম্ভাবনা দেখা দিলে, সে আতঙ্কিত হয়, কেঁদে ওঠে। এই যে আতঙ্ক, মৃত্যুভয় এ তার পূর্ব-পূর্ব জীবনের অভিজ্ঞতা বলেই মনে হয় । কতবার সে এই মৃত্যু যন্ত্রনা ভোগ করেছে, তা সে বলতে না পারলেও, তার সংস্কারের মধ্যে এই মৃত্যুর ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়ে আছে। শুধু নিজের মৃত্যু নয়, সে তার প্রিয়জনের মৃত্যুর মধ্যেও একটা কষ্ট ,যন্ত্রনা অনুভব করে।
আমরা শুনেছি, মানুষ মৃত্যুর পরেও সে তার সংস্কারকে ছেড়ে যেতে পারে না। আবার নতুন দেহের মধ্যে যখন সে প্রবেশ করে, তখন সে তার পূর্ব পূর্ব জীবনের সংস্কার নিয়েই জন্ম গ্রহণ করে। আমরা সবাই বেঁচে থাকতে চাই, কেউই মরতে চাই না। অর্থাৎ যে সব কারনে আমার মধ্যে যন্ত্রণার অনুভূতি হয়, তা আমাদের প্রতিকূল, তাই তাকে আমরা পরিহার করতে চাই। এই যে অভিনিবেশ, এটি সমস্ত জীবকুলের মধ্যেই প্রকাশিত। হাঁসের বাচ্চা জন্মের পরেই জল দেখলে ছুটে যায়, মুরগির ছানা যায় না। মুরগি আবার চিল বা বাজপাথি দেখতে পেলে নিরাপন আশ্রয়ে ছুটে যায়। অথচ দুটো প্রাণীই কিন্তু ডিম্ থেকে ফুটে বেরিয়েছে। আসলে প্রানবীজের মধ্যে এই সংস্কার সুপ্ত থাকে। এর থেকে দৃঢ় প্রত্যয় হয়, যে আমার আপনার সবার পূর্বজন্ম অবশ্যই ছিলো। যদি পূর্বজন্ম না থাকতো, তবে আমাদের মৃত্যুও ঘটতো না, আর মৃত্যুর অভিজ্ঞতা থাকতো না।
এখন কথা হচ্ছে মৃত্যু কি সত্যিই একটা যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা ? আসলে ব্যাপারটা (মৃত্যু) কিছু সত্যিকারের যন্ত্রণাদায়ক নয়। আর যদি তাই হবে, তবে কেন আমরা মৃত্যুকে ভয় পাই। আসল ব্যাপারটা লুকিয়ে আছে, আমাদের বাসনার মধ্যে। আমরা সবাই বাঁচতে চাই। তার কারন হচ্ছে, আমাদেরকে বহুদূর পারি দিতে হবে। ঈশ্বর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, আমরা অনন্ত যাত্রায় বেরিয়েছি। আর এই যাত্রাপথে আমরা একটা বাহন চাই, নৌকা চাই। এই বাহন বা নৌকাটা হচ্ছে আমাদের যাত্রাপথের সুগমকারী সহায়। এই বাহন ভিন্ন আমাদের যাত্রাকাল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘায়িত হবে। তাই এই নৌকাটিকে আমরা ছাড়তে চাই না। তাই আমরা এই দেহে স্থিত থেকে সাধনক্রিয়া করে ঈশ্বর অভিমুখী হতে চাই। আমরা জানি এই দেহভিন্ন সাধনক্রিয়া অসম্ভব। তাই আমাদের একটা দেহ চাই। অসীম সমুদ্রে জল, হাবু-ডুবু খেতে খেতে কে এগিয়ে যেতে পারে ? কিন্তু নৌকা আমাদেরকে নিরাপদে লক্ষে পৌঁছে দিতে পারে। আর এই কারণেই আমরা একটা না একটা দেহকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকতে চাই। আর মনুষ্যদেহ হলো সবথেকে উৎকৃষ্ট যান, যা আমার সাধন সহযোগী হতে পারে। অন্য কোনো দেহ সাধনক্রিয়ায় সাহায্য করতে পারে না।
এইজন্য জ্ঞান-যোগী যেমন শরীরে থাকতে চায়, সাধন-ক্রিয়ার অনুষ্ঠান করবে বলে। আবার ভোগী পুরুষ দেহে স্থিত হতে চায় ভোগক্রিয়া সম্পাদন করবে বলে। সংকল্প-বিকল্প সাধনের জন্য আমরা এই দেহ ধারণ করে থাকি। এই দেহ যেমন কর্ম্মভূমি হতে পারে, কর্ম্মফল ভোগ হতে পারে, তেমনি এই দেহেই ধর্ম্মকর্ম্ম হতে পারে। এই দেহই সাধনভূমি। তাই এই জ্ঞানী বলুন আর অজ্ঞানী বলুন সবার মধ্যেই এই অভিনিবেশের প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়।
এখন কথা হচ্ছে, বেঁচে থাকবার ইচ্ছে বা মৃত্যুভয়কে তো স্বাভাবিক, তাকে ঋষি পতঞ্জলি কেন ক্লেশরূপে চিহ্নিত করেছেন ? আসলে এই অভিনিবেশের কারণেই আমরা বন্ধনের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছি। মৃত্যুভয় যদি না থাকতো, বেঁচে থাকবার ইচ্ছেই যদি না থাকতো, তাহলে কে কার তোয়াক্কা করে ? আমরা নির্ভিক হয়ে এই জগতে বিচরণ করতে পারতাম। মৃত্যুভয় আসলে আত্মার বন্ধন। এই মৃত্যুভয় যে অমূলক, তা আমরা যথাযথ সাধনক্রিয়ার ফলে অনুভব করতে পারি। সাধনক্রিয়া আর কিছুই নয়, আমাদের মনের মধ্যে যে বৃত্তিগুলো উঠছে, তাকে প্রতিহত করে নতুন নতুন বৃত্তির জন্ম দেওয়া। অন্যদিকে, আমরা এই জগৎটাকে একটা নির্দিষ্ট মানদন্ড দিয়ে মেপে ছোট-বড়ো -ভালো-মন্দের বিচার করে থাকি। আমাদের এই মানদন্ডটি পাল্টাতে হবে। তবেই আমরা জীবনের যথার্থ অর্থ বুঝতে পারবো।
----------
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/১০
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/১১-১২
ধ্যানের সাহায্যে সেই (ক্লেশ) বৃত্তিগুলোকে নাশ করা সম্ভব।
আমাদের চিত্তে যে ক্লেশজনিত বৃত্তির জন্ম হচ্ছে, তাকে ধ্যানের সাহায্যে দূর করা সম্ভব। ধ্যান গভীর একাগ্রতা ছাড়া কিছু নয়। অর্থাৎ সংকল্প-বিকালাপাত্মক মনকে আমাদের একাগ্রভূমিতে নিয়ে আসতে হবে। এখানে চিত্তকে আত্মাতে স্থির করতে হবে।
আমরা এর আগেই শুনেছি, ক্রিয়া যোগ হচ্ছে তপস্যা, স্বাধ্যায়, ও ঈশ্বর প্রণিধান। এই ক্রিয়াযোগের অভ্যাস করলে, আমাদের চিত্তবৃত্তির মধ্যে যে ক্লেশের জন্ম হচ্ছে, তা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে শুরু করে। অর্থাৎ ক্লেশের উৎপত্তির মাত্রা কমতে থাকে। এই ক্লেশের নিস্পত্তি হলে আমাদের ধ্যানাবস্থা প্রাপ্ত হই।
প্রথমে আমাদের শরীরকে স্থির করে আসনের অভ্যাস করতে হবে। এর পরে মনকে স্থির করে একাগ্রভূমিতে স্থাপন করতে হবে। আমাদের চিত্ত যখন ধ্যেয় বস্তুতে অবিরত অবস্থান করতে পারবে, তখন আমাদের ধ্যান শুরু হবে। অর্থাৎ ধারণার ধারাবাহিকতা শুরু হলে জানবেন ধ্যান শুরু হলো। আসলে আমাদের সবার মধ্যে যে সংস্কার আছে, সেই সংস্কার গুলোর দিকে প্রথমে নজর করতে হবে। এই সংস্কারগুলোই আমাদের চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে। তো এই সংস্কারের ফলে আমাদের চিত্তে যে ধারাবাহিক চিন্তার উদ্রেগ হচ্ছে, সে চিন্তাগুলি প্রথমে বিশ্লেষণ করতে হবে। এই বিচারের অনুশীলনীর ফলে এগুলোকে জয় করা সম্ভব হবে। এই বিচারের অনুশীলনই একসময় সংস্কারের শোধন বা নাশ করতে সাহায্য করবে। অনেকসময় বিপরীত চিন্তার প্রবাহ তৈরী করে, অবাঞ্ছিত সংস্কারের ধারাকে পরাজিত করতে হবে। ক্রিয়াযোগের ফলে, স্থূল-ক্লেশসকল ক্ষীনভাব (সূক্ষ্ম) প্রাপ্ত হয়। আর ধ্যানের সাহায্যে সূক্ষ্ম ক্লেশ তার উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তবে ধ্যানের বিষয় সম্পর্কে আমরা আগে ঋষি পতঞ্জলির নির্দেশ শুনেছি (০১/৩৬-৩৭) শোকরহিত জ্যোতিস্মান বস্তুর ধ্যান অথবা পূর্ন-বিষয়-বিরাগী পুতহৃদয়ের ধ্যান। যাইহোক, ধ্যানের অনুষ্ঠান ঠিক ঠিক মতো অনুষ্ঠিত হলে, আমাদের সমস্ত ক্লেশের নাশ অবশ্যই হবে, এ ব্যাপারে আমাদের কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়।
ক্লেশমুলঃ কর্মাশয়ো দৃষ্ট-অদৃষ্ট জন্মবেদনীয়ঃ। (২/১২)
ক্লেশের মূল (অবিদ্যা) কর্ম্মজনিত সংস্কারগুলো, হয় এজন্মে নয় পরজন্মে ফলপ্রদান করে থাকে।
আমরা যাকিছু দেখি, শুনি আস্বাদন করি, এমনকি চিন্তা করি, তার সমস্ত কিছুই আমাদের চিত্তে ছাপ রেখে যায়। একেই বলে সংস্কার। এইযে সংস্কার তা সে ভালো হোক, বা মন্দ, ধর্ম্ম হোক বা অধর্ম্ম, একেই বলে কর্ম্মাশয়। কর্ম্মাশয় অর্থাৎ যেখানে ভবিষ্যৎ কর্ম্মের বীজ নিহিত থাকে। এই কর্ম্মবীজ অনুকূল পরিবেশ পরিস্থিতিতে অংকুরিত হয়, অর্থাৎ জেগে ওঠে, আর আমাদের মধ্যে কর্ম্মের উদ্দীপনা অনুভব করি। সেইমতো আমরাও কর্ম্মে ধাবিত হই। কর্ম্ম পল্লবিত হয়ে ফুল-ফলের জন্ম দেয়। তখন আমাদের মধ্যে সুখ-দুঃখের অনুভব হয়। ক্লেশের অনুভব হয়। কিছু কর্ম্ম আছে, যা সদ্য ফল প্রদান করে, আবার কিছু কর্ম্ম আছে যা আমাদের সঞ্চিত কর্ম্মফল হিসেবে রক্ষিত হয়, ভবিষ্যতে সময়মতো ফল প্রদান করে থাকে। এই যে ভবিষ্যৎ এটি হতে পারে আমাদের এই জন্ম বা ভবিষ্যৎ জন্ম। এখন এই যে কর্ম্ম, তা হতে পারে ধর্ম্ম-কর্ম্ম (হিতকর) আবার অধর্ম্ম-কর্ম্ম (অহিতকর)। আর যেমন কর্ম্ম তেমনই ফল প্রদান করে থাকে। এখন এই যে কর্মাশয়, এর মধ্যে থাকে কর্ম্মের বীজ। এই কর্ম্মের বীজকে আমাদের নষ্ট করতে হবে। তা না হলে, কর্ম্ম থেকে যেমন সংস্কারের জন্ম হবে, তেমনি আবার সংস্কার থেকে কর্ম্মের উদ্ভব হবে। এই ঘূর্ণি-চক্র চলতেই থাকবে। আমরাও এক দেহ থেকে আবার আর-এক দেহে স্থানান্তরিত হতে থাকবো, কর্ম্মফল ভোগের জন্য ।
-------------
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/১৩
"সতি মুলে তদ বিপাকো জাতি-আয়ু-ভোগাঃ" - (২/১৩)
সতি মুলে অর্থাৎ (অবিদ্যা জনিত) কর্ম্মের মুলে, যদি ক্লেশ থাকে, তার বিপাকের ফলেই আমাদের জাতি, আয়ু, ও ভোগের ব্যবস্থা হয়ে থাকে।
জন ধাতু থেকে জাতি। জাতি কথাটার অর্থ হচ্ছে জন্মানো। আয়ু অর্থাৎ স্থিতিকাল। ভোগ অর্থাৎ সুখ দুঃখের অনুভূতি। বিপাক হচ্ছে কর্ম্মফল।
আমরা জানি, অনাদিকাল থেকে জন্ম-প্রবাহ চলে আসছে। শুধু জন্ম নয়, অনাদি কাল থেকে এই মৃত্যুর প্রবাহও চলে আসছে। এই জন্ম ও মৃত্যুর মাঝের অবস্থা হচ্ছে জীবন বা স্থিতি। এই স্থিতি হচ্ছে দেহকে ঘিরে। আর এই দেহ তৈরী হচ্ছে কর্ম্ম করবার জন্য ও কর্ম্মফল ভোগের নিমিত্ত। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এই জন্ম আয়ু ও কর্ম্মফল-ভোগ পূর্ব নির্ধারিত। আর এই তিনের অর্থাৎ জন্ম-স্থিতি-ভোগ পূর্ব-পূর্ব জন্মার্জিত কর্মাশায় ও বর্তমান কর্মাশায়। জগতে কারন ভিন্ন কার্যের উৎপত্তি হয় না। তো জন্ম-আয়ু ও ভোগের কারন হচ্ছে আমাদের কর্ম্ম জনিত। এই জন্মের হেতু হচ্ছে আমার পূর্বপূর্ব জন্মের কর্ম্মফল। আবার আগামী জন্মের কারন হতে পারে, এই জন্মের সঞ্চিত কর্ম্মফল ও গত জন্মের প্রারব্ধ কর্ম্মফল। অর্থাৎ যেসব কর্ম্ম এখনও ফল প্রদান করেনি, বা যেসব কর্ম্মের ফল এখনও ভোগের দ্বারা নিঃশেষিত হয়নি, সেই কর্ম্মফল ভোগের জন্য ভবিষ্যতে দেহ ধারণ করতে হয়।
আমরা বৃহৎ আরণ্যক উপনিষদের ঋষি যাজ্ঞবল্কের কাছে শুনেছি যে, আমাদের স্বপ্ন-কালীন অবস্থায় যেমন আমাদের মনের বাসনাসকল একটা রূপ পরিগ্রহ করে। তেমনি মরণকালেও আমাদের ভাবি জন্ম বিষয়ক বাসনাময় অন্তঃকরণবৃত্তি প্রবল আকার ধারণ করে। এই অবস্থায় একটা মূর্চ্ছার অবস্থা থাকে। এইসময় তার নিজস্বতা বলে কিছু থাকে না। কেবলমাত্র কর্ম্মফল জনিত যে সংস্কার সেই অনুযায়ী সে একটা ভাবী দেহ তৈরী করতে বাধ্য হয়।
তো আমাদের প্রত্যেকটি জন্মে নানাবিধ কর্ম্ম সম্পাদন হচ্ছে, আর সেই অনুযায়ী কর্ম্ম-সংস্কারের জন্ম হচ্ছে। এর মধ্যে যেগুলো আশু ফল প্রদান করে, তার ভোগ সম্পাদন হলেও, কিছু কর্ম্ম ভবিষ্যতে ফল প্রদানের জন্য অপেক্ষায় থাকে। আবার পূর্ব-পূর্ব জন্মের কিছু কর্ম্মফলের (প্রারব্ধ) ভোগ এই জীবনে শেষ হলেও কিছু হয়তো বাকি থেকে যায়। সেই প্রারব্ধ কৰ্ম্ম ও বর্তমান কর্ম্ম, যা ফল প্রসব করেনি, তাকে সঙ্গে নিয়ে জীবাত্মা নতুন দেহে প্রবেশ করে এবং সেইমতো নতুন দেহে আমাদের ভোগ সম্পাদিত হতে থাকে। একেই আমরা অদৃষ্ট বলে থাকি।
-----
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/১৪-১৫
"তে হ্লাদ-পরিতাপ-ফলাঃ পুণ্য-অপূণ্য হেতুত্বাৎ।" - (০২/১৪)
তে অর্থাৎ সেই জাতি-আয়ু-ভোগরূপ কর্ম্ম বিপাকগুলোই কখনো পুণ্যের কারনে সুখপ্রদ অনুভূতি এনে দেয়, আবার অপূণ্যের কারনে দুঃখের অনুভূতি এনে দেয়।
হ্লাদ অর্থাৎ সুখ, আর পরিতাপ অর্থাৎ দুঃখ (অনুশোচনা নয়) - এই দুয়েরই কারন হচ্ছে অবিদ্যাজনিত পঞ্চক্লেশ। এখন কথা হচ্ছে ক্লেশ বলতে আমরা বুঝে থাকি কষ্ট। তো অবিদ্যাজনিত পঞ্চ ক্লেশের কারনে কিভাবে সুখের অনুভূতি হতে পারে ? আসলে এই যে সুখ বা দুঃখ এসব বিষয়ের সংস্পর্শে হয়ে থাকে। আর যোগীদের কাছে, সমস্ত বিষয় সুখের মধ্যেই কষ্টের অনুভূতিই হয়ে থাকে। কর্ম্ম মানেই কষ্টের কারন। অর্থাৎ পুন্য কর্ম্ম বলুন, বা অপূণ্য কর্ম্ম বলুন, সবই কৰ্ম্মীকে পুনরায় ভোগরাজ্যে স্থূল দেহধারনে বাধ্য করে। আর এই ভোগ যতদিন না শেষ হয়, ততদিন সাধক সত্যের সন্ধান পায় না। সম্পদ তো সম্পদই হয়। সম্পদ সবসময় দুঃখের কারন। তা সে দৈবী সম্পদ বলুন, আর আসুরিক সম্পদ বলুন। দৈবী সম্পদ স্বর্গসুখের সহায়ক একথা সত্য কিন্তু এই স্বর্গসুখ শেষ হয়ে গেলে, অর্থাৎ পুন্য কর্ম্মের ফলভোগ শেষ হয়ে গেলে, তাকে আবার এই মৃত্যুলোকে ফিরে আসতে হয়। জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হতে হয়। এই কারনে ঋষি পতঞ্জলি পুন্য ও অপূণ্য কর্ম্মফলের হেতু হিসেবে এই অবিদ্যা জনিত পঞ্চক্লেশগুলোর কথাই বলেছেন।
"পরিণাম-তাপ-সংস্কার-দুঃখৈঃ গুণবৃত্তি বিরোধাৎ চ দুঃখমেব সর্বং বিবেকিনঃ। " (০২/১৫)
পরিণাম, তাপ ও সংস্কার এই তিন রকম দুঃখের জন্য ও গুনবৃত্তির মধ্যে পরস্পর বিরোধাত্মক স্বভাব হেতু বিবেকবানের কাছে সবই দুঃখপ্রদ।
ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, বিবেকী পুরুষের কাছে সংসারের সবই দুঃখপ্রদ, কিন্তু কেন ?
ত্রিগুণাত্মক এই প্রকৃতি। এই ত্রিগুণের মিশ্রনে চিত্তে ভিন্ন ভিন্ন ভাবের উদয় হয়। আর এই চিত্ত বৃত্তিই আমাদের সুখ-দুঃখ ভোগের কারন। দুঃখের পরে সুখ, আবার সুখের পরে দুঃখ। এই সুখ দুঃখের অনুভব থেকে জন্ম নেওয়া বাসনারূপী সংস্কারের মধ্যে যে কর্ম্ম বীজ ছিলো , তার উদ্গমন ঘটে।
এ এক অদ্ভুত অবস্থা জলে কুমিড় আর ডাঙায় বাঘ। যোগীদের দৃষ্টিতে সংসার ভ্রমন এমনই এক অবস্থা। নিজের তৈরী জলাধারে ডুবে মরি আমরা। নিজের কর্ম্ম প্রভাবে ভোগ বা দুর্ভোগের সৃষ্টি করি আমরা। আমাদের দৃষ্টিতে সংসারে কেবলই দুঃখ এমনটা নয়, এখানে আছে ছেলে-মেয়ে নিয়ে সুখের থাকবার অনুভূতি। বিষয় সম্পত্তি ভোগের আনন্দ। যোগীরা বলছেন, এরা (সংসারীরা) নিজেদের নিপীড়নের মাধ্যমে সুখের আস্বাদ নিচ্ছে। কঠিন হাড় চিবোতে চিবোতে গালের ছাল ছিঁড়ে রক্ত বেরুচ্ছে, আর কুকুরের দল সেই রক্ত পান করে সুখের অনুভূতি পাচ্ছে। যোগীরা বলছেন, বিরুদ্ধে স্বভাব বিশিষ্ট এই পরিনাম প্রাপ্ত দুঃখগুলো সুখ ভোগের সময়েও আসলে ক্লেশের প্রাপ্তি ঘটে থাকে।
যোগীর উদ্দেশ্য হচ্ছে সংসার থেকে মুক্তি। আর সংসার হচ্ছে বিষয় যোগে সুখ-দুঃখের সমাহার। তো যোগীর কর্তব্য হচ্ছে, সংসারের সমস্ত বিষয় থেকে নিবৃত্তি । বিষয়ে আসক্তির কারণেই সুখ ও দুঃখের অনুভূতি হয়ে থাকে। আর এই আসক্তির কারণেই আমাদের বিচারবুদ্ধি লোপ পায়। যে কোনো বিষয়ের মধ্যে যদি দোষ দৃষ্ট না হয়, তাহলে বিষয়ে অনাসক্তি আসে না। মনের মধ্যে শোক-দুঃখের হাহাকার না উঠলে, যথার্থ জিজ্ঞাসার ভাব আসে না। সংসারে সুখ আছে, ভালো কর্ম্ম করলে, মৃত্যুর পরেও স্বর্গসুখ ভোগ করতে পারবো। কিন্তু এগুলো অস্থায়ী, অনিত্য। পার্থিব বিষয় সুখ যেমন চিরকাল থাকে না, তেমনি স্বর্গসুখও একদিন নিঃশেষ হয়ে যায়।
তাই যোগীগণ এটা বিচারের সাহায্যে অনুভব করেন, যে কর্ম্ম জনিত ফল দ্বারা নিত্যকে সম্যকরূপে দর্শন করা সম্ভব নয়। আর যখন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন, তখন তিনি জ্ঞানপ্রবাহে উপলব্ধি করেন, সংসারে সুখ-দুঃখের পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। এই সুখ-দুঃখের অনুভূতি থেকে জন্ম নেয়, বাসনারূপ সংস্কার। আবার এই বাসনারূপ সংস্কারই কর্ম্ম-সংস্কারের জন্ম দেয়। তো প্রয়োজন এই বাসনার বীজকে দগ্ধ করা। তাই সচেতন যোগী-সাধক সাবধানতা অবলম্বন করেন। আর এই কারণেই যোগী সংসারের সমস্ত বিষয়েই বিরক্ত হয়ে ওঠেন, বিতৃষ্ণ হয়ে ওঠেন । এই কারণেই ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, বিবেক-যোগীর কাছে সংসারের সবকিছুই দুঃখে ভরা।
নচিকেতাকে যমরাজ পার্থিব বস্তু, দীর্ঘ আয়ু ইত্যাদি দান করতে চাইলে, আত্মজিজ্ঞাসু নচিকেতা তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কারন এগুলো তাকে চিরশান্তি দিতে পারে না। যযাতি তার ছেলের যৌবন ভোগ করেও, আকাঙ্খ্যার নিবৃত্তি করতে পারেন নি। তার ভোগসুখের তৃপ্তি হয়নি। এইজন্য দরকার সূক্ষ্ম বুদ্ধি, বিচারবুদ্ধি, জ্ঞানের সমৃদ্ধি, ঐশ্বর্য্য ও অনৈশ্বর্য্য সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান, সবশেষে বিবেক বৈরাগ্য, যা যোগীপুরুষের পাথেয়।
--------------
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/১৬-১৭
"হেয়ং দুঃখম অনাগতম। " - ২/১৬
যে দুঃখ অনাগত অর্থাৎ এখনো আসেনি, হেয়ং, তাকেও পরিত্যাগ করতে হবে।
ঋষি পতঞ্জলি আমাদেরকে দুঃখে থেকে দূরে রাখতে চাইছেন। কিন্তু কথা হচ্ছে, দুঃখ তো আমরা কেউই চাই না তথাপি আসে। ঋষি বলছেন, যে দিন চলে গেছে, তার আপনি পরিবর্তন করতে পারবেন না। এমনকি আজ যে দিন বা মুহূর্তের মধ্যে দিয়ে আমরা চলেছি, সেটিকেও পরিবর্তন করতে পারবো না। কিন্তু ভবিষ্যতের দুঃখ থেকে আমরা রেহাই পেতে পারি। যোগের এটাই ঊদ্দেশ্য, ভবিষ্যুৎ আমাদের উজ্জ্বল হয়ে উঠুক, আর তা হতে পারে, আমাদের বর্তমান চিন্তা ধারার, কর্ন্মধারার পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে।
"দ্রষ্টৃ দৃশ্যয়োঃ সংযোগো হেয়হেতুঃ।" - ০২/১৭
দ্রষ্টা ও দৃশ্য এই দুয়ের সংযোগ ত্যাজ্য।
দ্রষ্টা ও দৃশ্যের সংযোগ হেতু নানারকম উপলব্ধি হচ্ছে। এখন কথা হচ্ছে দ্রষ্টা ও দৃশ্য বলতে আমরা কি বুঝি ? দেখুন আমরা যখন কাউকে দেখি, বা কোনো দৃশ্যকে দেখি, তার একটা প্রতিচ্ছবি আমাদের চোখের মাধ্যমে মনের আয়নায় প্রতিফলিত হয়। মনের আয়নায় এই প্রতিফলন কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে না। মন তখন বুদ্ধির সাহায্যে নেয়। বুদ্ধি দৃশ্যকে বিশ্লেষণ করে, এবং অভিজ্ঞতার সাহায্যে দৃশ্যের নাম-রূপ-গুনের নির্নয় করে। তো বুদ্ধি হচ্ছে নিশ্চয়াত্মিকা মনোবৃত্তি বিশেষ, যা সমস্ত দৃশ্যমান বস্তুকে বিশ্লেষণ ক'রে, একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। এবার আবার বুদ্ধির প্রতিবিম্ব স্বচ্ছ পুরুষে পড়ায়, সেই স্বচ্ছ পুরুষ অনুরূপ সংবেদন বিশিষ্ট হয়ে ওঠে। তাই এই পুরুষ হচ্ছেন দ্রষ্টা।
আর দৃশ্য হলো বুদ্ধি-সত্ত্ব-উপারূঢ় (আরূঢ়) সমস্ত তিনগুন বিশিষ্ট। উপারূঢ় কথাটার অর্থ হচ্ছে প্রাপ্ত হওয়া। তো দ্রষ্টা পুরুষের সঙ্গে যখন দৃশ্য-বুদ্ধির সংযোগ হয়, তখন তা দুঃখের কারন হয়ে থাকে। যখন বুদ্ধির সঙ্গে স্বচ্ছ পুরুষের যখন সংযোগ হয়, তখন পুরুষ নিরপেক্ষ হয়েও, বুদ্ধির সঙ্গে একাত্মীভূত হয়ে নিজ স্বরূপের অর্থাৎ চৈতন্য স্বরূপের ভ্রান্ত দর্শন ঘটতে থাকে।
দেখুন সুস্থ শরীরে যখন বাইরের জীবাণুর আক্রমন ঘটে তখন শরীর অসুস্থ হয়ে ওঠে। যদি এই সংক্রমণ না ঘটতো, তবে আর শরীর অসুস্থ হতো না। আবার যদি এই জীবাণুকে শরীর থেকে আলাদা করা সম্ভব হয়, তখন শরীর সুস্থ বোধ করতে থাকে। ঠিক তেমনি দৃষ্টা স্বচ্ছ পুরুষের সঙ্গে যখন বিষয়সংযোগে আরূঢ় বুদ্ধির সংযোগ ঘটে, তখন সুখ-দুঃখের অনুভূতি হয়ে থাকে। তাই সাধকের কাজ হচ্ছে এই সংযোগক্রিয়াকে হেয় প্রতিপন্ন করে, সত্ত্বর পরিত্যাগ করা।
এই যে সংযোগ, এর কারন হচ্ছে অবিদ্যা। এই সংযোগের ফলে যিনি বোদ্ধা হন, তিনি আসলে বুদ্ধির সঙ্গে সংবেদনশীল পুরুষমাত্র । এইসময় পুরুষ বুদ্ধিগুণে গুণান্বিত হয়ে ওঠেন । এরফলেই সংসার-বোধের জন্ম হয়। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এই সংযোগের হেতুর বৰ্জন করতে হবে।
-------
পুরুষ গুণাতীত। প্রকৃতি ত্রিগুণের আধার। মন প্রকৃতির গুনের দ্বারা আভাসিত হয়। মনের নিশ্চয়াত্মিকা বৃত্তি হচ্ছে বুদ্ধি। এই বুদ্ধিতেই পুরুষের ছায়া পড়ে। তখন পুরুষকে সগুন বলে অবিদ্যাজনিত জ্ঞান হয়।
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/১৮
"প্রকাশ-ক্রিয়া-স্থিতিশীলং ভুতেন্দ্রিয়াত্মকং ভোগ-অপবর্গার্থম দৃশ্যম ।" - ০২/১৮
প্রকাশ হচ্ছে সত্ত্ব, ক্রিয়া হচ্ছে রজঃ আর স্থিতি হচ্ছে তম। এই তিন গুনের নিজ নিজ স্বভাব সম্পন্ন হয়ে অর্থাৎ স্থূল বা সূক্ষ্ম ভূতের রূপে যখন ইন্দ্রিয়বর্গের সান্নিধ্যে আসে, তখন এর পরিণাম স্বরূপ দৃশ্য পদার্থ পুরুষের ভোগ ও অপবর্গের প্রয়োজন সিদ্ধ করে।
ঋষি পতঞ্জলি এখানে দৃশ্য পদার্থের স্বরূপ সম্পর্কে বলছেন। প্রকাশ-ক্রিয়া-স্থিতি, দৃশ্য পদার্থের এই হচ্ছে তিন অবস্থা। প্রকৃতি তিন গুনের সমাহার। সত্ত্বগুণের স্বভাব হচ্ছে প্রকাশে, রজঃ গুন্ হচ্ছে ক্রিয়ায়, আর তম গুন্ হচ্ছে স্থিতিতে। এই গুণগুলো একে অপরের থেকে আলাদা হলেও এরা একে অপরের প্রতি আসক্ত। অর্থাৎ এরা কখনো সংযুক্ত হচ্ছে, আবার কখনো বিযুক্ত হচ্ছে। এটি এদের ধর্ম্ম বলতে পারেন। এরা আবার সবাই রাজা। অর্থাৎ এদের মধ্যে কখনও সত্ত্ব গুনের আধিক্য থাকে, কখনও রজঃ গুনের আধিক্য থাকে, আবার কখনও তম গুনের আধিক্য থাকে। যার যখন আধিক্য থাকে তখন জগতমূর্তির মধ্যে তার প্রভাব বেশি করে দেখা যায়। আসলে তিনটি গুনই একে অপরের পিছনে থেকে প্রকাশিত হয়। এবং সেইমতো বৃত্তিকে অনুসরণ করে। এই ত্রিগুণই, ভূত সকলকে বা পঞ্চ-তন্মাত্রকে (শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধ) ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য করে তোলে। যাকে আমরা দৃশ্য বলে থাকি, বা জ্ঞেয় বস্তু বলে থাকি। এই ভূতগুলোই কখনও স্থূল, কখনও সূক্ষ্ম, আবার কখনও কারন রূপ প্রাপ্ত হয়। এই যে ভূত এদের কোনো নিজস্ব উদ্দেশ্য নেই, কেবলমাত্র পুরুষের প্রয়োজন স্বীকার করে থাকে। এই যে পুরুষ ও প্রকৃতির সান্নিধ্য ও বিচ্ছিন্ন ভাব, একেই পুরুষের ভোগ বা পুরুষের ত্যাগ (অপবর্গ) বলা হয়ে থাকে।
এই যে ভোগ ও ত্যাগ এটি বুদ্ধি দ্বারা কৃত হয়ে থাকে, আর এটি বুদ্ধিতেই বর্তমান থাকে। এই দিক থেকে দেখতে গেলে, ভোগ ও ত্যাগ আসলে বুদ্ধি দ্বারাই কৃত হয়ে থাকে। কেননা, বুদ্ধিই বলে দেয়, কোনটি ভোগের যোগ্য, আর কোনটি ত্যাগের যোগ্য। পুরুষ নিরপেক্ষভাবে ফলের ভোক্তা মাত্র। তো পুরুষ বুদ্ধির দ্বারা বন্দি - আবার বুদ্ধির দ্বারাই মুক্ত। "মুক্ত" যাকে যোগের ভাষায় বলা হয়, "মোক্ষ"। সমাধি হচ্ছে বুদ্ধিকে শুদ্ধ ও তীক্ষ্ণ করা। ভ্রমজ্ঞান বা অশুদ্ধজ্ঞান বুদ্ধিতে আসে, আবার যথার্থ শুদ্ধজ্ঞানও বুদ্ধিতেই হয়ে থাকে।
স্ফটিক যেমন গোলাপের কাছে এলে গোলাপী হয়ে যায়, চুম্বক যেমন লোহার সান্নিধ্যে এলে, লোহার গুন্ চুম্বকের মধ্যেও কার্যকরী ভূমিকা নেয়, তেমনি নির্গুণ পুরুষ ত্রিগুণের সান্নিধ্যে এলে তার মধ্যে গুনের চঞ্চলতা দৃষ্ট হয়। এই যে দৃশ্য অবস্থা এটি আসলে গুনগুলোর রূপ, পুরুষের নয় । স্থূল ভূত যখন সূক্ষ্মভূতে (তন্মাত্রাদিতে), আবার তন্মাত্র যখন ইন্দ্রিয়াদিতে অর্থাৎ দৃশ্য যখন গুন্ রূপে পুরুষের ভোগ ও ত্যাগের স্বীকার করে তখন পুরুষের সুখ-দুঃখ সাক্ষাৎকার হয়। পুরুষ তখন অকর্তা হয়েও কর্তা। পুরুষ ত্রিগুণের উর্দ্ধে, নির্বিকার তথাপি এই পুরুষই সাক্ষী, দ্রষ্টা স্বরূপ, তিনিই কূটস্থ পরমপুরুষ ।
-----------
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/১৯
"বিশেষ-অবিশেষ-লিঙ্গমাত্র-অলিঙ্গানি গুণপর্বাণি।" (২/১৯)
বিশেষ=পঞ্চভূত ও ইন্দ্রিয়সকল, অবিশেষ= তন্মাত্র ও অস্মিতা, লিঙ্গ=মহৎতত্ত্ব এবং অলিঙ্গ=প্রকৃতি, গুনপার্বণি = ত্রিগুণাত্মক দৃশ্য-পদার্থ।
পঞ্চ মহাভূত (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম) ও ইন্দ্রিয়সকল ( মন ও পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয় - চক্ষু, কর্ন, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক, ও পাঁচ কর্ম্মেন্দ্রিয় - হস্ত, পদ , বাক, পায়ু, উপস্থ) পঞ্চ তন্মাত্র = শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ। এছাড়া অহঙ্কার বা অস্মিতা, এবং লিঙ্গ (মহৎতত্ত্ব-বুদ্ধি ) ও অলিঙ্গ - এগুলো সবই প্রকৃতি। এগুলো সবই ত্রিগুণের (সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ) পরিমানের অবস্থা ভেদ মাত্র।
আমরা আগেই শুনেছি, পুরুষ প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। এই দুজনকে আলাদা করতে না পারলে, অর্থাৎ পুরুষ থেকে প্রকৃতি ও প্রকৃতি থেকে পুরুষকে আলাদা করতে হবে, তা না হলে সাধকের উদ্দেশ্য সাধিত হবে না।
তো প্রথমে প্রকৃতির মুলে যেতে হবে। স্থূল ভূত থেকে সূক্ষ্ম ভূতে (তন্মাত্রে) যেতে হবে। তন্মাত্র থেকে অহঙ্কারে যেতে হবে। অহঙ্কার থেকে মহৎতত্ত্বে বা লিঙ্গে। সেখান থেকে অলিঙ্গে । অলিঙ্গ অর্থাৎ যার কোনো লিঙ্গ নেই, বা যার আর কোনো কারন নেই। তিনি স্বয়ম্ভু, পরমতত্ত্ব। কার্য-কারনে পরম্পরা এখানেই শেষ হয়ে গেলো। তো প্রকৃতির শেষ আশ্রয়স্থলে যাওয়া গেলো। যেখান থেকে আর সীমারেখা রইলো না।
অন্যদিকে পুরুষের সন্ধান করতে গেলে, একটু অন্যভাবে যেতে হবে। কারন পুরুষ নিমিত্তমাত্র। পুরুষের প্রয়োজন সাধনের জন্য এই প্রকৃতি। এই যে বিশাল সৃষ্টি এর যে উপাদান বা মালমশলা এসব জোগাচ্ছেন প্রকৃতি। দেখুন মাল-মশলা তখনই কাজে লাগবে, অর্থাৎ প্রকৃতিতত্ত্ব তখনই কাজ লাগবে, যখন পুরুষের উপস্থিতি থাকবে। পুরুষই যদি না থাকেন, তবে প্রকৃতির এই আয়োজন বৃথা, কার জন্য এতসব, কারজন্য এই সৃষ্টির সমাহার ? কেননা পুরুষকে তৃপ্ত করবার জন্যই এই আয়োজন। যদি দ্রষ্টা না থাকে তবে দৃশ্য কোথায় ? এই দ্রষ্টা হচ্ছেন ক্ষেত্রজ্ঞ - দেহী, যিনি অন্তঃপুরে বসে আছেন।
এই পুরুষকে জানতে গেলে আশ্রয় নিতে হবে সমাধির। কেননা, সমাধি ভিন্ন প্রজ্ঞা ফুটতে পারে না। এই প্রজ্ঞাই পারে, পুরুষ ও প্রকৃতিকে আলাদা করে চিনিয়ে দিতে। প্রকৃতি পরিণামধৰ্ম্মী, অন্যদিকে পুরুষ হচ্ছে জ্ঞানক্ষেত্র। এই জ্ঞানক্ষেত্র সম্পর্কে জানা যায় যখন বিবেকজ্ঞানের জাগরণ ঘটে। এই বিবেকজ্ঞান থেকে আবার জন্ম হয় বিবেকজ জ্ঞানের। প্রকৃতির পরিণামত্ব সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়, এই বিবেকজ জ্ঞানের দ্বারা। আবার বিবেক জ্ঞানের যখন সমাপ্ত হয়, তখন দর্শন হয় স্বরূপের, পরমপুরুষ। সহজ কথায় বলতে গেলে, প্রকৃতির জ্ঞান হয়, নিজের অন্তরের প্রতিভা থেকে , আর সমস্ত বিবেকজ্ঞানের অবসানে হয় পরমপুরুষ জ্ঞান।
যাইহোক, গুনপর্ব্ব চারভাগে বিভক্ত - বিশেষ, অবিশেষ, লিঙ্গ, অলিঙ্গ। আবার গুনের চব্বিশ ভাগ - অবিশেষ (৬) হলো, পাঁচ তন্মাত্র ও অহঙ্কার। বিশেষ (১৬) হলো পঞ্চভূত ও একাদশ ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি ও চিত্ত এই ২৪ তত্ত্ব আসলে গুনের বিভাগ মাত্র। ৬টি অবিশেষ সত্ত্বা পুরুষের প্রয়োজন সিদ্ধ করে। এই সত্ত্বাহীন অবস্থায় প্রকৃতি অলিঙ্গ, তখন কোনো ক্রিয়া থাকে না। অলিঙ্গ প্রকৃতি নিত্যা, আর লিঙ্গ প্রকৃতি অনিত্যা। তো বিশেষ, অবিশেষ ও লিঙ্গমাত্র অবস্থা অবস্থা থেকে সাধককে অলিঙ্গে পৌঁছুতে হবে। আর এই সাধনাই যোগসাধনা।
-------------------
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/২০
"দ্রষ্টা দৃশিমাত্রঃ শুদ্ধঃ-অপি প্রত্যয়-অনুপশ্যঃ" - ০২/২০
দ্রষ্টা (পুরুষ) দৃশি মাত্র অর্থাৎ তিনিই চৈতন্য । তিনি শুদ্ধ (গুণাতীত) তথাপি বুদ্ধিবৃত্তি বলে সাক্ষীভাবে তিনি দর্শন করেন।
চোখ দেখছে বলে আমাদের মনে হলেও, তিনি দর্শক নন। মন-বুদ্ধিও কিছুই দেখছে না, বা দৃশ্যকে প্রত্যক্ষ করতে পারছে না। দর্শন ক্রিয়া তখনই সম্পন্ন হতে পারে, যখন তারমধ্যে চৈতন্যের প্রভাব পড়ে। যেখানে চৈতন্য নেই, সেখানে দৃশ্য-দ্রষ্টা বলে কিছু থাকতেই পারে না। এইজন্য চৈতন্যই একমাত্র দ্রষ্টা। জ্ঞানের অনুভবী হচ্ছেন সেই চৈতন্য পুরুষ।
এখন কথা হচ্ছে, তিনি তো গুণাতীত, তিনি নির্বিকার। কিন্তু আমরা জানি যিনি দ্রষ্টা তার মধ্যে দৃশ্যের প্রভাব পড়ে। তাহলে কি চৈতন্য-পুরুষের মধ্যে দর্শনের ফলে কি কোনো বিকার উপস্থিত হয় ? দেখুন, পুরুষ সবিশেষ আবার নির্বিশেষ। নিবিশেষ পুরুষ প্রতিবিম্বিত হয় বুদ্ধিসত্ত্বায়। তখন বুদ্ধির যা নিজস্ব ধর্ম্ম তা প্রতিফলিত হয় নির্বিশেষ পুরুষের মধ্যে। তখন যা হয়, তাকেই বলে সবিশেষ। অর্থাৎ তখন বুদ্ধিকেই চৈতন্যবৎ বলে মনে হয়। তো সবিশেষ পুরুষ আসলে বুদ্ধিতে প্রতিফলিত নির্বিশেষ পুরুষ।
ঋষি পতঞ্জলি বলছে, দ্রষ্টা দৃশি মাত্র। দৃশ্য যেখানে ফুটে উঠছে, তাকে বলা হয় দৃশি। তো দৃশ্য যেখানে অর্থাৎ যে পর্দায় ফুটে উঠছে সেটা তো দ্রষ্টা হতে পারে না। প্রকৃত দ্রষ্টা বাইরে থেকে পর্যবেক্ষন করছেন। দৃশ্য যেখানে ফুটে উঠছে অর্থাৎ মন-বুদ্ধি, এদের কোনো চৈতন্য নেই। তো যেখানে চৈতন্য নেই, সেখানে দেখা কার্য্য সম্পন্ন হতে পারে না। দেখাকার্য্য সম্পন্ন হতে গেলে, চৈতন্যের উপস্থিতি দরকার। এই চৈতন্য যখন বুদ্ধিতে প্রভাসিত হয়, তখন দেখা কার্য্য সম্পন্ন হয়। এই বুদ্ধিতে যখন চৈতন্য প্রতিভাসিত হয়, তখন তা সবিশেষ ব্রহ্মপুরুষ। ইনিই জ্ঞাতা। প্রকৃতপক্ষে এই জ্ঞাতাকে কেউ জানতে পারে না। কিন্তু ইনি সবাইকে জানছেন।
এই জায়গাটা আমাদের একটু ভালোভাবে বোঝা দরকার। দুই ব্রহ্ম - সবিশেষ ও নির্বিশেষ। বুদ্ধিতে প্রতিফলিত, ও বুদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কহীন। যখন আমাদের মধ্যে ব্যষ্টি ভাবের উদয় হয়, তখন আমরা একে অপরকে দেখি। কেনা দেখা কাজ সম্পন্ন করতে গেলে, দুইয়ের উপস্থিতি দরকার দ্রষ্টা-দৃশ্য। একজন জ্ঞাতা একজন জ্ঞেয় । এই দ্বৈতভাবের ফলেই, আমারা একে অপরকে শুনি, দেখি, আস্বাদন করি। একে অপরের বিষয়ে চিন্তা করি, একে অপরকে জানি। কিন্তু এই দ্বৈতভাবে যখন ঘুচে যায়, তখন না থাকে জ্ঞাতা-জ্ঞেয়, দৃশ্য-দ্রষ্টা, জানা, না জানা, শোনা না শোনা, তখন শুধুই জ্ঞান। এইজন্য ঋষি যাজ্ঞবল্ক প্রশ্ন তুলেছেন, (বৃহৎ-আরণ্যক উপনিষদ - ২/৪/১৪) বিজ্ঞাতাকে কিসের দ্বারা জানবে ? যত পন্ডিতি সব এই দ্বৈতজ্ঞানের (অজ্ঞান) ফলে হয়ে থাকে।
তো পুরুষ যখন বুদ্ধির সান্নিধ্যে আসে, তখন পুরুষের ভোগ শুরু হয়। এই বুদ্ধি থেকে পুরুষকে বিচ্ছিন্ন করতে পারলেই, আমাদের ভোগে নিবৃত্তি হবে। সুখ-দুঃখের উর্দ্ধে ওঠা যাবে। সমস্ত ক্লেশের নাশ হবে। তো আমাদের তাহলে বুদ্ধির স্বরূপ সম্পর্কে জানতে হবে।
--------------------
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/২১-২২
"তদর্থ এব দৃশ্যস্য আত্মা" - ০২/২১-২২
বুদ্ধিরূপ দৃশ্যের আত্মা হলো তাঁর (পুরুষের) বিষয়।
আমরা এর আগে শুনেছি, পুরুষই দেখছেন, শুনছেন, আস্বাদন করছেন অর্থাৎ তিনিই ভোক্তা, দ্রষ্টা, জ্ঞাতা। এখানে বুদ্ধি ছিল দৃশ্য আর আর পুরুষ হচ্ছেন দ্রষ্টা। দৃশ্যের স্বরূপ হচ্ছে ভোগ ও ত্যাগ বা অপবর্গ। আর পুরুষের দ্বারা এটি উপলব্ধ হওয়ায়, দৃশ্যরূপ এই জড়বস্তু লব্ধাত্মক (পুরুষ) বলে জ্ঞান হচ্ছে। অর্থাৎ চৈতন্যের সান্নিধ্যে এসে বুদ্ধিতে প্রতিফলিত বস্তু প্রতি লব্ধাত্মক (চৈতন্য) বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সাধনফলে যখন এই বুদ্ধির বিনাশ ঘটে, (যদিও সহজে বুদ্ধির বিনাশ সম্ভব নয়) তখন দেহাদি সহ সমস্ত বস্তুর লোপ সাধন হয়। যতক্ষন দেহাদী-বোধ থাকে ততক্ষন এই দৃশ্য বস্তুর স্থিতি থাকে। পুরুষ (চৈতন্য) শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে, বুদ্ধি ইত্যাদি থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বরূপে অবস্থান করে। বিষয়বুদ্ধির ভোগ-অপবর্গ শেষ হয়ে গেলে, অর্থাৎ পুরুষের প্রয়োজন মিটে গেলে, বুদ্ধিবৃত্তি বিনষ্ট হয়।
তাই ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, দৃশ্যের যে আত্মা তা হচ্ছে বিষয়। এই বিষয় অর্থাৎ ভোগ-ত্যাগ ক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে গেলে, পুরুষ আপনা থেকেই এই বুদ্ধি-দেহ ইত্যাদি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বরূপে অবস্থান করেন ।
আপনি যখন সুসুপ্তির মধ্যে অবস্থান করেন, তখন দেহ-বুদ্ধি-জ্ঞান ইত্যাদির মধ্যে থেকেও বাহ্য বস্তুজ্ঞান থাকে না। কিন্তু এই সময় দেহ-বুদ্ধি থেকে পুরুষ (চৈতন্য) আলাদা নয়। এইসময় (সুসুপ্তিতে) ভোগের বিরাম মাত্র হয়ে থাকে। জেগে উঠে আবার পুরুষের ভোগ শুরু হয়। কিন্তু তুরীয় অবস্থায় পুরুষ ভোগ থেকে বিরত হয়ে যায়। তখন তিনি দেহে আছেন, কি দেহে নেই, এই প্রশ্নের অতীতে চলে যান তিনি।
------
"কৃতার্থং প্রতি নষ্টম অপি অনষ্টং তদ-অন্য-সাধারণত্বাৎ । (২/২২)
সেই কৃতার্থ পুরুষের কাছে (বুদ্ধিতে প্রতিফলিত দৃশ্যবস্তু) নষ্ট হলেও, সাধারনের কাছে অর্থাৎ যারা কৃতার্থ হয়নি, তাদের কাছে (বুদ্ধিতে প্রতিফলিত) দৃশ্য নষ্ট হয়না ।
কৃতার্থ পুরুষ বলতে মুক্ত পুরুষকে বোঝানো হয়। একজন কৃতার্থ পুরুষের কাছে অপবর্গ লাভের ফলে দৃষ্টবস্তুর নাশ ঘটে থাকে। কিন্তু বদ্ধ পুরুষের কাছে তা নষ্ট হয় না। বদ্ধ পুরুষের কাছে থেকে বিষয় বুদ্ধি যায় না। অন্যভাবে বলা যায়, এই বিষয়-বুদ্ধিই বদ্ধ পুরুষের জন্মদাতা। এইজন্য অকৃতার্থ পুরুষের ভোগ-লালসার বৃত্তি (বুদ্ধি) নষ্ট হয় না।
-----------
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/২৩-২৬
"স্বস্বামিশক্ত্যোঃ স্বরুপ উপলব্ধি হেতুঃ সংযোগঃ।" (০২/২৩)
স্ব-স্বামিশক্ত্যোঃ অর্থাৎ দৃশ্যশক্তি ও দ্রষ্টাশক্তির স্বরূপ উপলব্ধির হেতুকে বলা হয় সংযোগ।
স্বামী অর্থাৎ সেই পরমপুরুষ নিজের স্বরূপের দর্শন হেতু দৃশ্যের সঙ্গে নিজেকে সংযোগ করছেন। আর এই সংযোগের ফলে দৃশ্য-সাক্ষাৎকার সম্পন্ন হচ্ছে। এই যে সাক্ষাৎকার এর ফলে একটা উপলব্ধি হচ্ছে, একেই বলে পুরুষের ভোগ। ইন্দ্রিয়াদি (মন সহ) বাহিত হয়ে, বুদ্ধির মধ্যে প্রতিফলিত হচ্ছে বিষয় যা দৃশ্য আকারে স্ফূরিত হচ্ছে। আবার পরমপুরুষ প্রতিফলন হচ্ছে এই বুদ্ধির উপরে। তো উভয়ের সংযোগে, অর্থাৎ বিষয়ের প্রতিফলন ও পুরুষের প্রতিফলনেই কারনে ভোগক্রিয়া সংগঠিত হচ্ছে। উভয়ের যত ঘনিষ্টতা বাড়ে, ভোগের মাত্রাও তত বাড়ে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই সংযোগের কারন কি ?
"তস্য হেতুরবিদ্যা" - (০২/২৪)
এই সংযোগের হেতু হচ্ছে অবিদ্যা।
অবিদ্যা অর্থাৎ মিথ্যা জ্ঞান। এই মিথ্যা জ্ঞানের কারণেই দ্রষ্টা পুরুষের সঙ্গে দৃশ্য বিষয়-বুদ্ধির সংযোগ ঘটে থাকে। এই যে সংযোগ এটি অনাদিকাল থেকেই হয়ে আসছে, তথাপি এটা বলা যেতে পারে, এই সংযোগ অনন্ত কাল ধরে চলবে না। এই সংযোগ তাই সান্ত, অর্থাৎ যার অন্ত আছে। এখন কথা হচ্ছে এই সংযোগ কবে বিচ্ছিন্ন হবে ? ঋষিগণ বলে থাকেন, বিবেকজ্ঞানের উদয়ে যখন পরাবৈরাগ্য লাভ হয়, তখন এই অবিদ্যার অন্ত হয়। অর্থাৎ পুরুষ তখন বিষয়-বুদ্ধি থেকে নিষ্কৃতি পায়। এই সংযোগকে বিচ্ছিন্ন করাই সাধনা। অবিদ্যার বিলোপ সাধনই সাধনা।
"তদ্-অভাবাৎ সংযোগ-অভাবো হানং তদ্-দৃশেঃ কৈবল্যম। " - (২/২৫)
তদ অভাবাৎ অর্থাৎ অবিদ্যার অভাব থেকে সংযোগের অভাব, তা হলো হান (ত্যাগ), এই হচ্ছে দ্রষ্টার কৈবল্য।
কৈবল্যম কথাটার অর্থ হচ্ছে কেবলের ভাব, স্বরূপ-স্থিতি বা মুক্তি। জ্ঞানযোগীদিগের সাধন প্রভাবে ক্রমশঃ নিখিল ব্রহ্মান্ড জ্ঞানের পর ব্রহ্মজ্ঞান সম্পন্ন হয়ে সেই জ্ঞানানন্দ পরমপুরুষের মধ্যে বিলীন হয়ে যাওয়ার নাম কৈবল্য। এই অবস্থায় সংসার-বোধ থেকে মুক্তি। এই অবস্থাই মোক্ষ নামে খ্যাত। তো কৈবল্য হচ্ছে মুক্তিদাতা মোক্ষদাতা, বা মোক্ষহেতু।
তো অবিদ্যার কারনে বা বিপরীতজ্ঞানের প্রভাবে পুরুষ ও বুদ্ধির সংযোগ হয়েছিল, যার ফলে পুরুষের ভোগক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছিলো। ক্লেশভোগ হচ্ছিলো। এই সংযোগ যখন বিচ্ছিন্ন হয়, তখন পুরুষ স্বরূপে স্থিত হয়, অর্থাৎ প্রকৃতির ত্রিগুণের যে বন্ধন তা থেকে পুরুষ ক্লেশমুক্ত হয়। তো ভ্রমজ্ঞান হলো বন্ধনের কারন, আবার যথার্থ জ্ঞানের উদয় হলে তিনি বুদ্ধি থেকে পৃথক হয়ে স্বরূপে স্থিত হন। এখন কথা হচ্ছে এই অবিদ্যা নাশের উপায় কি ?
"বিবেকখ্যাতি-অবিপ্লবা হানোপায়ঃ। " - (০২/২৬)
নিরন্তর বিবেকখ্যাতি হচ্ছে হানের (ত্যাগের) উপায়।
বিবেকখ্যাতি হচ্ছে পুরুষ ও বুদ্ধির মধ্যে পরস্পরের পৃথক জ্ঞান। কালের সূক্ষ্ম অংশকে বলা হয় বিপল। বিপ্লব হচ্ছে মিথ্যাজ্ঞান, আর অবিপ্লব হচ্ছে মিথ্যা জ্ঞানের নিস্পত্তি বা মিথ্যা জ্ঞানের শূন্যতা। অন্যদিকে অবিপ্লব হচ্ছে মিথ্যাজ্ঞানের অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ।
ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, বিষয়-বুদ্ধিকে ত্যাগ করবার উপায় হচ্ছে বিবেকখ্যাতি। খ্যাতি কথাটার অর্থ হচ্ছে জ্ঞান। বিবেক হচ্ছে আমাদের বুদ্ধিসত্ত্ব ও পুরুষের ভেদজ্ঞান। এই বুদ্ধিসত্ত্ব হচ্ছে প্রকৃতি আর বিবেক অর্থাৎ পুরুষ। তো পুরুষ ও প্রকৃতির যে ভেদ সেই জ্ঞানের উদয় না হলে আমাদের চিত্তের স্থির অবস্থা আসে না। বিষয়-সম্পর্কিত দৃশ্যের সাহায্যে আমাদের চিত্তে মিথ্যা জ্ঞানের উৎপত্তি হচ্ছে। আর দর্শিত বিষয়কে, বিষয়ী পুরুষ যেন ভোগ করছেন। একেই বলে ভ্রমজ্ঞান বা অবিদ্যা। যোগসাধন প্রভাবে আমাদের বিবেকখ্যাতি অৰ্জন হতে পারে। তখন বুদ্ধিসত্ত্বের সাথে পুরুষের ভাবনা যে অমূলক, এটি যে ভ্রমজ্ঞান তা উপল্বদ্ধিতে আসে। নিরন্তর সাধন প্রভাবে সাধক যখন এই সত্যভূমিতে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হন তখন পরাবৈরাগ্যের জন্ম হয়। এই পরাবৈরাগ্য আমাদের সমস্ত ভ্রম নাশের পরেই হতে পারে। অথবা বলা যেতে পারে, পরাবৈরাগ্যের ফলে এই সত্যজ্ঞানের উন্মেষ ঘটে। এইজন্য ঋষি পতঞ্জলি বলছেন বিবেকখ্যাতির আমাদের অজ্ঞান নাশের উপায়।
----------
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/২৭-২৮
"তস্য সপ্তধা প্রান্তভূমিঃ প্রজ্ঞা।" - (২/২৭)
তস্য অর্থাৎ তাঁর (যাঁর মধ্যে বিবেকখ্যাতি জন্মেছে) সাতপ্রকার প্রান্তুভূমি প্রজ্ঞা ( উচ্চ জ্ঞানাত্মক অনুভূতির স্তর) অনুভূত হয়।
প্রজ্ঞা বলতে আমরা বুঝি প্রকৃষ্ট জ্ঞান। এই প্রকৃষ্ট জ্ঞানের সাতটি স্তর। যে যোগীপুরুষের বিবেকখ্যাতি জন্মেছে, অর্থাৎ যিনি পরাবৈরাগ্যবান হতে পেরেছেন, তিনি জ্ঞানের এই সাতটি স্তর অনুভব করেন। এখন কথা এই সাতটি জ্ঞানের স্তর কি কি ? ব্যাসভাষ্যে এই স্তরগুলো সম্পর্কে বলা হয়েছে।
প্রথম স্তর : পার্থিব বস্তু যে ত্যাজ্য - এই জ্ঞান যাঁর হয়েছে। সংসারী জীব সুখের খোঁজে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর এই কারনে, সে ত্রিতাপ জ্বালায় দগ্ধ হচ্ছে। পার্থিব বিষয়ে যে চিরন্তন সুখ নেই, এসব কেবলই বাসনার বৃদ্ধি করছে, বাসনার তৃপ্তি এতে নেই, অতয়েব এই পার্থিব বস্তু অবশ্যই ত্যাজ্য, এই জ্ঞান যার হয়েছে, তিনি প্রকৃষ্ট জ্ঞানের প্রথম স্তর সম্পর্কে সম্যকরূপে অবহিত হয়েছেন।
দ্বিতীয় স্তর : যাঁর মধ্যে ত্রিতাপজ্বালার কারণগুলো বিনষ্ট হয়েছে। শুধু বিনষ্ট হয়েছে, তাই নয়, এই কারণের আর পুনরাবৃত্তি ঘটছে না।
তৃতীয় স্তর : যিনি অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি লাভ করেছেন। যাঁর আত্মসাক্ষাৎকার হয়েছে। চিত্ত যার নিরোধের উচ্চ-স্তরে পৌঁছেছে।
চতুর্থ স্তর : যাঁর মধ্যে বুদ্ধি ও পুরুষের ভেদজ্ঞান জন্মেছে।
এই চার অবস্থা অতিক্রম করে তবেই প্রজ্ঞার ভূমিতে প্রথম অবতরণ ঘটে থাকে। এর পরে আছে আরো তিনটে প্রান্তভূমি।
পঞ্চম স্তর : যার অপবর্গ লয় হয়েছে। অর্থাৎ ভোগের ইচ্ছে যার মধ্যে থেকে সম্পূর্ণ রূপে লোপ পেয়ে গেছে। এই অবস্থায় ভোগের ইচ্ছে চলে গেলেও বুদ্ধির ক্রিয়া চলছে।
ষষ্ঠ স্তর : বুদ্ধি মানেই ত্রিগুণাত্মক প্রকৃতির খেলা যেখানে ভেসে উঠছে। কিন্তু এই গুন্-বুদ্ধি তখন স্থির-অচঞ্চল, এমকি পরিনাম রহিত হয়েছে। এই সময় অবিদ্যা বা ভ্রমাত্মক জ্ঞানের লোপ সাধন হয়ে থাকে। এখন যোগীপুরুষ আর এই অবস্থা থেকে ফিরে আসবার তাগিদ অনুভব করছেন না।
সপ্তম স্তর : এই অবস্থায় সাধকের মধ্যে সমস্ত গুনের অভাবহেতু গুন্-সন্মন্ধহীন অর্থাৎ সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতিবিমুখ হয়েছেন। এই অবস্থায় যোগীপুরুষ জ্যোতিস্মান শুদ্ধ আত্মা বা কেবলী পুরুষ। এই অবস্থাকেই বলা হয় কৈবল্যের অবস্থা। এই অবস্থায় সাধক কৈবল্যবান পুরুষ। এই অবস্থায় সাধকের না আছে সুখ-দুঃখ-ভয়-মোহ-কুশল-অকুশল। যোগীপুরুষ এখন মুক্ত - ত্রিগুণাত্মক প্রকৃতির উর্দ্ধে অবস্থান করছেন। এইসময় শরীরপাত কেবলই সময়ের অপেক্ষা। শরীরপাত হয়ে গেলে, যোগীর সম্পূর্ণ অপবর্গ লাভ হলো।
"যোগাঙ্গ অনুষ্ঠানাৎ অশুদ্ধি ক্ষয়ে জ্ঞানদীপ্তিঃ অবিবেকখ্যাতেঃ ।"- (০২/২৮)
যোগাঙ্গের অনুষ্ঠানের ফলে অশুদ্ধির ক্ষয় হ'লে পরে বিবেকখ্যাতি (আর্ত্মজ্ঞান) পর্যন্ত জ্ঞানজ্যোতির প্রকাশ থাকে।
এই যোগাঙ্গের অর্থাৎ অষ্টাঙ্গ যোগের কথা আমরা পরের শ্লোকে ঋষি পতঞ্জলির শ্রীমুখ থেকে শুনবো। এখানে বলছেন, এই যোগাঙ্গের সাধানগুলোর অনুষ্ঠান হলে, অবিদ্যার কারনে যে অশুদ্ধি, তার ক্ষয় হয়। অশুদ্ধি হচ্ছে পুরুষের সঙ্গে প্রকৃতির (গুনের) সংযোগহেতু আত্মাতে যে অনাত্মক জ্ঞান হয়, বা অনাত্মাতে যে ভ্রমরূপ আত্ম -জ্ঞান। এই ভ্রমাত্মক জ্ঞান বা অবিদ্যার ফলেই চিত্ত অশুদ্ধ হচ্ছে। অনিত্য বস্তুকে নিত্য মনে হচ্ছে, মরীচিকায় জলের দর্শন হচ্ছে। এই ভ্রমাত্মক জ্ঞানের যখন সমাপ্তি হয়, তখন সেই স্বয়ংপ্রকাশ পরমপুরুষ স্বমহিমায় দীপ্তিমান হয়ে ওঠেন। বিবেকখ্যাতির ফলেই যোগী পুরুষের মধ্যে এই অবস্থা প্রাপ্ত হতে পারে আর বিবেকখ্যাতি-পরাবৈরাগ্য অষ্টাঙ্গ যোগ-সাধন ক্রিয়ার অভ্যাসে ঘটে থাকে। পরের শ্লোকে ঋষি পতঞ্জলি এই অষ্টাঙ্গযোগের কথা শুরু করেছেন।
-----------
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/২৯-৩০
যম-নিয়ম-আসন-প্রাণায়াম-প্রত্যাহার-ধারণা-ধ্যান ও সমাধি এই হচ্ছে আট প্রকার যোগাঙ্গ।
ঋষি পতঞ্জলির যোগ-দর্শন শুধু একটা গ্রন্থ নয়, এটি যেন সেই আদিগুরু জ্ঞানদাতা। সৃষ্টি তো পরিণামী। নদী সমুদ্র অভিমুখী। কে কবে শুনেছে গঙ্গা গঙ্গোত্রীর দিকে ধাবিত হচ্ছে ? জন্ম মৃত্যু আমাদের স্বাভাবিক ধর্ম্ম। শিশু থেকে যেমন একদিন আমরা যৌবনে পৌঁছে যাই, যৌবন পেরিয়ে যেমন আমরা একদিন নিজের অজ্ঞাতসারেই বার্ধক্যকে গ্রহণ করি, তেমনি জন্মের দিন থেকেই আমরা মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছি। এই প্রবাহ কেউ কখনও রোধ করতে পারে না। কেউ কখনো বৃদ্ধ থেকে শৈশবে ফিরে আসে না। আর তা যদি করতে হয়, তবে আবার তাকে জন্ম নিতে হবে। তখন এই দেহ ছেড়ে নতুন দেহ ধারণ করতে হবে। এই চিরন্তন গতিকে কে রোধ করতে পারে ?
ঋষি পতঞ্জলি এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী চরিত্র। তিনি শৈশবে যেমন শিশু, যৌবনেও শিশু, আবার বার্ধক্যেও সেই শিশুটি থেকে গেলেন। এমনকি এই দেহ ধারনের আগে, তিনি যে অবস্থায় ছিলেন, আজও তিনি যেন সেই মতোই অবস্থান করছেন। তিনি এক অপরিবর্তনীয় নিত্য জগতের সন্ধান দিলেন। যেখানে কোনো পরিবর্তন নেই। যেখানে কোনো পরিনাম নেই। যেখানে জন্ম, মৃত্য, জরা, ব্যাধি নেই। এ এক সাম্যের জগৎ। যেখান সময় থেমে গেছে। "অথ যোগানুশাসনম", ব্রহ্মজিজ্ঞাসা নয়, যোগের অনুশাসন। এযেন শাস্ত্র বহির্ভূত বিষয়। এ কোনো উপদেশ নয়, এই হচ্ছে ক্রিয়া। যা গঙ্গাকে গঙ্গোত্রী অভিমুখে চলতে বাধ্য করে। জন্ম থেকে মৃত্যু নয়, এযেন মৃত্যু থেকে জন্মের দিকে নিয়ে যাওয়া। এ যেন শ্মশান থেকে মায়ের গর্ভে নিয়ে যাওয়া। এই পথ চড়াইয়ের পথ। আমাদের এই দুর্গম পথের যাত্রী হতে হবে। কথায় ও কাজে এক হতে হবে। শুধু স্বপ্ন নয়, স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে আনতে হবে। শুরু হোক পথ-চলা। আমরা আজ থেকে ঋষি পতঞ্জলিকে অনুসরণ করে, আত্মসাক্ষাৎকারের পথ জেনে নেবো। যম-নিয়ম-আসন-প্রাণায়াম-প্রত্যাহার-ধারণা-ধ্যান ও সমাধি এই হচ্ছে আট প্রকার যোগাঙ্গ। ঈশ্বরের সাথে একাত্মীভূত হবার চাবিকাঠি। এক-এক করে তিনি সব খোলসা করছেন। বলছেন :
"অহিংসা সত্য-অস্তেয়-ব্রহ্মচর্য-অপরিগ্রহা যমাঃ ।" - ২/৩০
অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য,অপরিগ্রহ এই পাঁচটি হচ্ছে যম।
ঋষি পতঞ্জলি আমাদেরকে আগে বলছেন "কি করবেন না"। কি করতে হবে, প্রথমেই সেকথা না বলে, বলছেন কি করতে হবে না। অর্থাৎ কি করা উচিত হবে না। নেতিবাচক সাধন উপদেশ ।
অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য, অপরিগ্রহ এই পাঁচটি কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে। ।
অহিংসা - হিংসা কোরো না।
সত্য - অসত্যকে আশ্রয় করো না।
অস্তেয় - পরের জিনিস অপহরণ করো না।
ব্রহ্মচর্য - ইন্দ্রিয়সুখে লিপ্ত হয়ো না।
অপরিগ্রহ : অন্যের অনুগ্রহ স্বীকার করো না।
এই পাঁচটি হচ্ছে যম। যম কথাটার অর্থ হচ্ছে সংযম।
অহিংসা হলো, শরীর-মন-মুখে অন্যকে পীড়িত করবার প্রবৃত্তিকে সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করা। মনের মধ্যে যে ক্রুরতা আছে, তাকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করে দিতে হবে। বিদ্বেষ-বুদ্ধি ত্যাগ করতে হবে।
সত্য হচ্ছে স্বয়ং ব্রহ্ম। এই সত্যকে আশ্রয় করতে হবে। অসত্য অর্থাৎ অব্রহ্মকে পরিহার করতে হবে। তৈত্তরীয় উপনিষদে বলা হচ্ছে (শ্লোক-২/১/৩) "সত্যং জ্ঞানম অনন্তনং ব্রহ্ম" - তো আমাদের এই ব্রহ্মকে আশ্রয় করতে হবে। ক্ষনিকের জন্য এখান থেকে দূরে সরে যাওয়া চলবে না।
ব্রহ্মচর্য বলতে আমরা শরীরের সৃষ্টিশক্তি বীর্যকে ধারণ করার কথা বুঝে থাকি। আসলে ব্রহ্মচর্য কথাটা এসেছে ব্রহ্ম থেকে। ব্রহ্ম অর্থাৎ বৃদ্ধি পাওয়া, দ্বীপ্তি পাওয়া। যিনি স্বীয় তেজ বা জ্যোতি দ্বারা তমসাচ্ছন্ন এই দিগ্-মণ্ডলকে আলোকিত করে স্থাবর-জঙ্গম বিষয়ের মধ্যে বিশ্বরূপে প্রকাশ পেয়েছেন। তো এই ব্রহ্মতেজ আমাদের সবার মধ্যে আছে। এই ব্রহ্মতেজকে আমাদের ধারণ করতে হবে।
অপরিগ্রহ : কারুর কাছ থেকেই কোনো অনুগ্রহ গ্রহণ করা চলবে না। আপনার যাকিছু প্রয়োজন, আপনি যা কিছুর যোগ্য, সবই আপনার ভিতরে বাইরে ঈশ্বর স্বয়ং প্রতিনিয়ত যোগান দিচ্ছেন। জল, বায়ু, আলো, পৃথিবী,, আকাশ মুক্তভাবে আপনাকে লালন-পালন করে চলেছেন। আপনার যাকিছু প্রয়োজন সব তিনি সময়মতো আপনাকে দান করছেন - এই বিশ্বাস যেন আপনার মধ্যে দৃঢ় হয়।
মোট কথা হচ্ছে ভোগের জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে ত্যাগের জীবনকে বেছে নিতে হবে। নিজের চিন্তাকে, চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এই হচ্ছে যম বা সংযম।
-----
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/৩১-৩২
জাতি-দেশ-কাল-সময়-অনবচ্ছিনাঃ সার্বভৌমা মহাব্রতম। (০২/৩১)
জাতি, দেশ, কাল ও সময়ের সঙ্গে অনবচ্ছিন্ন (অভেদজ্ঞান) সর্ববিষয়ে মহাব্রত রূপে কথিত।
ঋষি পতঞ্জলির নির্দেশ, যোগীপুরুষকে সবসময় তা সে দেশ, কাল, জাতি, ইত্যাদি ভেদে সব সময় অহিংস ধর্ম্ম পালন করতে হবে। তা যদি না হয়, তবে আমাদের মধ্যে যে জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কার আছে, তা দূর করা সম্ভব হবে না। অহিংসাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ব্রাহ্মণ হত্যা মহাপাপ আর শূদ্র হত্যা পাপ নয়, এমন চিন্তা যোগীদের মধ্যে আসা উচিত নয়। তীর্থ ক্ষেত্রে একরকম আর কর্ম্ম ক্ষেত্রে আর-একরকম হলে চলবে না। আজ একরকম কাল আর-একরকম তা নয়, এমনটা নয়। ছাগল কাটলে অপরাধ নেই, গরু কাটলে অপরাধ এমন ভাবনা থাকলে যোগসাধনা করা যাবে না। হিংসা আসলে আপনার আমার মনে, হিংসা কার্য্য দ্বারা নির্ধারিত হয় না। হিংসা আসলে অশুদ্ধ মনের চিত্তবৃত্তি। কেন করছেন, সেটাই বড়ো কথা। কি করছেন সেটা বড়ো কথা নয়। আপনার সমস্ত কাজ জনকল্যাণের জন্য হোক, কাউকে ব্যাথা বা কষ্ট দেবার জন্য নয়। সমস্ত কাজেই এই ভাবনা জাগিয়ে রাখুন, আর বিবেকের দ্বারা পরিচালিত হোন । সমস্ত ঈশ্বর সমর্পিত কাজই অহিংস।
শৌচ-সন্তোষ-তপঃ-স্বাধ্যায়-ঈশ্বর-প্রণিধানানি নিয়মাঃ। (২/৩২)
শৌচ, সন্তোষ, তপঃ, স্বাধ্যায়, ও ঈশ্বর-প্রণিধান এই হচ্ছে ( পাঁচটি) নিয়ম।
এই স্থূল শরীর একটা যন্ত্র বিশেষ। এই যন্ত্রের ক্রিয়াশক্তিকে কাজে লাগাতে গেলে, যন্ত্রের উপযুক্ত রক্ষনাবেক্ষন প্রয়োজন। এছাড়া একটা কথা হচ্ছে এই স্থূল শরীর যেমন সাধনক্ষেত্র, তেমনি এই শরীরের মধ্যেই অবস্থান করছেন, সেই পরমপুরুষ। এই পরমপুরুষকে ধরবার জন্যই যতসব সাধনা। সংস্কার বশে পুরুষ প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে এই স্থূল শরীরকে আশ্রয় করেছে। প্রথমতঃ আমাদের জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কারকে সমূলে উৎপাটিত করতে হবে। আবার নতুন সংস্কারের জালে আমরা যাতে জড়িয়ে না পড়ি, সেই দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। একেই যোগের ভাষায় বলে অপবর্গ লাভ। এখন কথা হচ্ছে, এই স্থূল শরীর, কর্ম্মহীন থাকতে পারে না। কর্ম্ম করলে, আবার তার ফল ভোগ করতে হয়। তাই যোগীপুরুষগন বলে থাকেন, আমাদের প্রথমে কামনা রহিত কর্ম্মে লিপ্ত হতে হবে। তো কাম্য-কর্ম্ম থেকে যদি আমরা বিরত থাকতে পারি, তবে আমরা সাধনক্রিয়ার যোগ্য হতে পারবো। এই কামনা-রহিত কর্ম্মের সন্ধান দিয়েছেন, ঋষি পতঞ্জলি, যাকে বলা হয় অষ্টাঙ্গ যোগ। এই যোগক্রিয়ার অনুষ্ঠানই যম নিয়ম ইত্যাদি।
ঋষি পতঞ্জলি, পাঁচটি নিয়মের কথা বলেছেন, আর তা হচ্ছে শৌচ, সন্তোষ, তপঃ, স্বাধ্যায়, ঈশ্বর-প্রণিধান।
শারীরিক শুচিতা রক্ষাক্রিয়া হচ্ছে শৌচ। এই শারিরীক ক্রিয়া একদিকে যেমন বাহ্য তেমনি অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ। শরীরকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, প্রতিদিন স্নান করা, শুদ্ধ আহার গ্রহণ করা, নিয়মিত নিদ্রা ও পরিমিত শারীরিক পরিশ্রম করা। প্রতিদিন শরীরচর্চা করা। এই হচ্ছে বাহ্য ক্রিয়া। সৎ চিন্তা, অপরের ক্ষতি চিন্তা না করা, সকলের কল্যাণ চিন্তা, সকলের কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করা, ইত্যাদি হচ্ছে অভ্যন্তরীণ শুচিতা। অর্থাৎ মন ও শরীরকে সুস্থ ও শুদ্ধ স্বাভাবিক রাখতে হবে।
সন্তোষ হচ্ছে অল্পে সন্তুষ্ট থাকা। ভগবান সবাইকে তার প্রয়োজন মতো দ্রব্যাদির ব্যবস্থা করে থাকেন। প্রয়োজন অতিরিক্ত, বা অন্য দিকে বলা যেতে পারে, ভগবান যাকিছু দিয়েছেন, বা দিচ্ছেন, তার অতিরিক্ত কিছুর কামনা না করাই সন্তোষের লক্ষণ।
তপঃ সাধনা হচ্ছে সহ্য করবার শক্তি বৃদ্ধি করা। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা যেমন প্রকৃতি প্রদত্ত তেমনি পুরুষ এই প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে, সুখ, দুঃখ ভোগ করছে। শরীরে ক্ষুধা-তৃষ্ণা থাকবে, এর জন্য উতলা হলে চলবে না। আপনাকে এই সমস্ত অবস্থার মধ্যেই লক্ষ পূরণের জন্য অগ্রসর হতে হবে। কোনো অবস্থাতেই বিচলিত হলে চলবে না। থেমে থাকলে চলবে না। হ্যাঁ অবস্থা ভেদে, গতিকে শ্লথ করতে হলেও সাধন পথে চলার বিরাম দেওয়া চলবে না। যেকোনো অবস্থায় নিজেকে মানিয়ে নিয়ে, মনের মধ্যে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ঈশ্বরের সান্নিধ্যকে উপলব্ধ করতে হবে।
স্বাধ্যায় হচ্ছে শাস্ত্রগ্রন্থের অধ্যয়ন, যথার্থ অর্থ জেনে তার মনন। জপ সাধনাও এই স্বাধ্যায়। অর্থাৎ মন্ত্রের যথাযথ অর্থ জেনে, তার মনন করা।
ঈশ্বর-প্রণিধান হচ্ছে ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পন। তাঁর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস অৰ্জন করতে হবে। প্রথম দিকে এই বিশ্বাস কাল্পনিক হলেও, শ্রীগুরু সান্নিধ্যে এসে, যখন সেই গুরুদেবের প্রতি আত্ম সমর্পন করতে সমর্থ হবেন, তখন ধীরে ধীরে এই বিশ্বাস জাগ্রত হবে। জানবেন, সৎগুরু স্বয়ং ব্রহ্ম, তিনিই বিষ্ণু, তিনিই মহেশ্বর। স্থূল দেহধারী গুরুকে কেবল একজন সাধারণ মানুষ ভাববেন না। তাঁর মধ্যেই অবস্থান করছেন, আপনার বাঞ্ছিত ঈশ্বর। ধীরে ধীরে আপনার মধ্যেও এই বোধ জাগ্রত হবে, যে আপনার মধ্যেও সেই একই ঈশ্বর অবস্থান করছেন। তখন কে গুরু আর কেই বা শিষ্য ? তখন শিষ্য ও গুরুর মধ্যে ভেদরেখা মুছে যাবে। আজকের শিশুর মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের পিতা - এই সত্যকে ধরে রাখতে হবে। তেমনি শিষ্যের মধ্যেই আছেন পরমগুরু, এই সত্যকেও জাগ্রত করতে হবে।
এইভাবে নিষ্কাম কর্ম্মসাধনার ফলে, সাধক একদিন ঈশ্বরের সমীপে সর্বকর্ম্মফল সমর্পন করে এগিয়ে যেতে সমর্থ হবে। শ্রীমদ্ভগবৎ গীতায় অর্জ্জুনকে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ (শ্লোক - ৯/২৭) বলছেন, তুমি যা কিছু করো, যাকিছু ভোজন করো, যাকিছু হোম করো, যাকিছু দান করো, যাকিছু তপস্যা করো, সেই সমস্তই আমাকে সমর্পন করো।
----
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/৩৩-৩৪
"বিতর্কবাধনে প্রতিপক্ষভাবনম।" - (০২/৩৩)
বিতর্ক অর্থাৎ বিচারত্মক উল্টো ভাবনা। এটি মনের মধ্যে এলে তাকে প্রতিপক্ষ ভাবনা দিয়ে বাধা দিতে হবে।
মনের মধ্যে হিংসার গ্রহ মাথাচাড়া দিলে, খেয়াল করবার চেষ্টা করুন, কেন এই হিংসাত্মক চিন্তার উদ্রেগ হচ্ছে। এবার এর উল্টো ভাবনা দিয়ে হিংসাকে চাপা দেবার চেষ্টা করুন। অর্থাৎ যখনই মনের মধ্যে খারাপ ভাবনার উদয় হবে, তা সে কামনা জনিত হতে পারে, রাগ, দ্বেষের কারনে হতে পারে, ঘৃণার কারনে হতে পারে, বা অভিনিবেশের কারনে হতে পারে। যখনই এই ধরনের চিন্তার উদ্রেগ হবে, তখন এর উল্টো ভাবনার মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত করুন। রাগ হচ্ছে তো ক্ষমার কথা চিন্তা করুন, কামনার ভাব উঠলে, নিষ্কাম চিন্তার উদ্রেগ করুন। জানবেন, সংসার একটা বিচিত্র জায়গা। এখানে সবাই বেঁচে থাকতে চায়, সবাই ভালো থাকতে চায়, সবাই ধন-সম্পত্তির মালিক হতে চায়। কিন্তু প্রতিপদে আমাদের আমরা মৃত্যুর ঘন্টা শুনতে পাই, সবকিছুর মধ্যেই একটা খারাপের চিহ্ন দেখতে পাই। এখানে যেমন আছে জন্মসূত্রে হিংস্র জীবজন্তু, তেমনি আছে নিরীহ পশু পাখী। এমনকি মানুষের মধ্যে আছে পাশবিক প্রবৃত্তির মানুষ, আবার মানবিক মুখের দর্শন এখানেই পাওয়া যায়। এখানে মানবেতর জীব, আবার আছে দেবমানব। এদের সবাইকে নিয়েই এই জগৎ সংসার। কেউই এখানে অবাঞ্চিত নয়। সবার অধিকার আছে এখানে বেঁচে থাকবার। পৃথিবীটা কেবল মানুষের জন্য নয়, সমস্ত পশুপাখি, কীট পতঙ্গ এমনকি এখানে প্রয়োজন আছে সংক্রামক ভাইরাসের। এই যে ভাইরাস, এটি আসলে বস্তু থেকে প্রাণীর রূপান্তরের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া বিশেষ । পৃথিবী এককালে কেবল মাত্র বস্তুর সম্ভার ছিল। এই বস্তু থেকে আজ এই প্রাণীকুলের জন্ম হয়েছে। তো প্রকৃতির জগতে কেউই অবাঞ্ছিত নয়। প্রাণিকুল, উদ্ভিদকূল, এমনকি জড়বস্তু সবই সেই এক ব্রহ্ম থেকে এসেছে। সবার মধ্যে সেই এক সত্য বিরাজ করছে।
আর এদের সবার সঙ্গেই আমাদের খাদ্য-খাদকের সম্পর্ক। একজনকে খেয়ে আর-একজন বেঁচে থাকে। তাই সবার আচরণ একরকম হবে না, এটাই স্বাভাবিক। আপনাকে এই সত্য স্বীকার করতে হবে। আর সবার মধ্যে যখন আপনি এক সত্যকে উপলব্ধি করতে পারবেন, জানবেন তখন আপনার মধ্যে আত্মভাবের প্রকাশ ঘটবে। শ্রীমৎ ভগবৎ গীতায় একটা সুন্দর শ্লোক আছে, "ব্রহ্ম-অর্পনং ব্রহ্ম হবিঃ ব্রহ্ম অগ্নৌ ব্রহ্মণা হুতম। ব্রহ্মৈব তেন গন্তব্যং ব্রহ্ম কর্ম্ম সমাধিনা।" (৪/২৪)। উপনিষদের ঋষিগণ বলছেন, "সর্ব্বং খল্বিদং ব্রহ্ম", ঠিক তেমনি, বিচার বৈরাগ্যের দ্বারা শুদ্ধ মনে ব্রহ্মবুদ্ধিরূপ এই দিব্যজ্ঞান লাভ করা সম্ভব। অষ্টাবর্গ যোগসাধনার এটাই হচ্ছে চরম অনুভূতি।
মৃদুমধ্যাধিমাত্রা দুঃখ-জ্ঞান-অনন্তফলা ইতি প্রতিপক্ষ ভাবনম। " - (০২/৩৪)
হিংসা ইত্যাদির বিতর্কগুলো অর্থাৎ ভাবনা তা সে নিজে করা বা অপরকে দিয়ে করানো, এমনকি অপরের ভাবনা অনুমোদন করা, এথেকে লোভ, ক্রোধ ও মোহ পূর্বক ঘটে থাকে। এর ফল কখনো মৃদু, কখনো মধ্য, কখনো বা তীব্র আকার ধারণ করে। আর এর পরিনাম স্বরূপ অনন্ত দুঃখ, অজ্ঞানের জন্ম হয়। এই হচ্ছে প্রতিপক্ষ ভাবনা। (হিংসার দোষগুলোকে চিন্তন করা)
ঋষি পতঞ্জলি বলছেন - হিংসা তিন প্রকার অর্থাৎ নিজে হিংসা করা, অন্যকেউ হিংসা করলে, তাকে সমর্থন করা, সবশেষে অপরকে হিংস্র কৰ্ম্মে উদ্দীপ্ত করা। এই তিন ধরনের প্রবৃত্তি কর্ম্মকেই হিংসা বলে চিহ্নিত করা হয়। আপনি হয়তো নিজে হিংসা করেন নি, কিন্তু হিংসাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন, বা হিংসাকর্ম্মে উৎসাহ দিয়েছেন, এই ধরনের হিংসার ফলও আপনাকে কলুষিত করবে। আর এর ফলে আমাদের মধ্যে লোভ, ক্রোধ, মোহ ইত্যাদির জন্ম হবে। এই যে লোভ-ক্রোধ-মোহ এসব কখনও মৃদু, কখনও মধ্য আবার কখনও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।
----------------
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/৩৫-৩৬
অহিংসা প্রতিষ্ঠায়াং তৎসন্নিধৌ বৈর-ত্যাগঃ। (০২/৩৫)
কেউ অহিংসায় প্রতিষ্ঠিত হলে, তার সান্নিধ্যে যারা আসেন, তাদেরও, বৈরীভাব ত্যাগ হয়ে যায়।
অহিংস হতে গেলে, সাধককে হিংসার বিপরীত ভাবনার মধ্যে প্রবেশ করতে হয়। আর এই অহিংসার চিন্তার আবহে তাঁর কাছে যারাই থাকে, এমনকি পশুপাখি, হিংস্র জীব সবার মধ্যেই এই অহিংস ভাবের উদয় হয়। ফলতঃ সবার মধ্যেই শত্রুভাবের নিবৃত্তি ঘটে। শুদ্ধভাবনায় ধ্যানাত্মক যোগীর কাছে, সাপে-নেউলের দ্বন্দ দূর হয়ে যায়।
শোনা যায়, ভোলানন্দ গিরি মহারাজের সাধন গুহায় কতকগুলো বিষধর সাপ বাস করতো। এদের সঙ্গে যোগীবরের ছিল অবিচ্ছেদ্য সখ্য। কখনো দেখা যেত, সাপগুলো গুহার সামনে উঠোনে শির (ফনা) দুলে দুলে খেলা করছে। এসময় কেউ ভয় পেয়ে এদেরকে লাঠি দিয়ে মারতে গেলে, তিনি নিষেধ করতেন। এমনকি এদেরকে নিয়ে নাকি একই বিছানায় গিরিমাহারাজকে শুতে দেখা যেত। এদেরকে গিরিমাহারাজ "শিবজীর ভূষণ" বলে আখ্যা দিতেন।
এই অভিজ্ঞতা আমাদের নেই। কিন্তু এমন ঘটনা আমাদের সবার সামনেই ঘটে থাকে। হিংসাত্মক ভাব নিয়ে আপনি যদি কুকুর বিড়ালের দিকে তেড়ে যান, তবে সেই বিড়াল বা কুকুরের মধ্যে ভয়, বা হিংসার প্রভাব (অভিনিবেশ বশতঃ) দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু আপনি যদি অহিংস প্রেমের ভাব নিয়ে পশু পাখির কাছে যান, আর তা যদি সে বুঝতে পারে, তবে তারাও নির্ভিক ও প্রেমের কাঙাল হয়ে আপনার পাশে ঘুরঘুর করবে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের সবার জীবনে ঘটে থাকে। অর্থাৎ আপনার চিত্তে যে ভাবের উদয় হয়েছে, সেই ভাবের প্রভাব আপনার পরিবেশের মধ্যে পড়বে। আপনি রেগে থাকলে, আপনার কাছ থেকে সবাই দূরে সরে থাকবে।
তবে এই সাধনা, অর্থাৎ নির্ভেজাল অহিংস-সাধনা রপ্ত করা কিন্তু সহজ সাধ্য নয়, এর জন্য ধ্যান-তন্ময়তার মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দিতে হয়। আর এই কারনে বলি, ভুলেও আপনি কারুর স্বভাব বদলাতে যাবেন না, তাতে হিতে বিপরীত হবে। বরং হিংসা থেকে দূরে থাকুন।
"সত্য প্রতিষ্ঠায়াং ক্রিয়াফল আশ্রত্বম।" - (০২/৩৬)
সত্যে প্রতিষ্ঠিত হলে তাঁর (যোগীপুরুষের) দ্বারা কৃত কর্ম্ম যথাযোগ্য ফলের আশ্রয় লাভ করে।
এ এক অদ্ভুত শক্তি যা যোগীর নিজের অজ্ঞাতসারেই হয়ে থাকে। যিনি সদা সত্যকে আশ্রয় করে আছেন, তাঁর মুখ দিয়ে যা কিছু বেরোয়, তা বাস্তবে রূপ নেয়। আসলে শুদ্ধ চিন্তা, সত্য বাক্য যখন যোগীকে আশ্রয় করে, তখন সাধকের যা কিছু মনের মধ্যে উদয় হয়, বা যাকিছু তিনি মুখ দিয়ে বের করে ফেলেন, তা বাস্তবে ঘটে যায়। হয়তো এর পিছনে যে কার্যকারণ শক্তি তা তার অজ্ঞাতসারেই ঘটেছিলো, তিনি শুধু বলেছেন মাত্র। শ্রীকৃষ্ণ শাম্বকে বলেছিলেন, তোর কুষ্ঠ হবে। আর তাই হয়েছিল। এই সত্য শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত মাত্র, এর কার্যকারণ কিন্তু প্রকৃতি সংগঠিত করেছিল।
মানুষ যখন বাহ্যিক ও আন্তরিক সংযমের অভ্যাস করেন, তখন তার মধ্যে দিয়ে কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ ইত্যাদি ধীরে ধীরে দূরীভূত হতে থাকে। এই অভ্যাস যখন ধাতে এসে যায়, বা একটা সময় আসে, যখন তাঁর চিত্তের স্থিরতা আসে, তখন তার চিন্তার মধ্যে পরিণতি জ্ঞানের প্রভাব এসে পড়ে। তিনি যেন ভবিষ্যৎ দেখতে পান। আর নির্ভিক চিত্তে সত্য চিন্তনের ফলে মুখ থেকে সত্য বেরিয়ে আসে, যাকে সবসময় রোধ করা সম্ভব হয় না। এইকারনে যোগাচার্য্যদের সতর্কবাণী হচ্ছে, "কথা কম বলো - মৌন থাকো" । কারন, যা কিছু তোমার মুখ দিয়ে বেরুবে, তা সে ভালো হোক বা মন্দ তা বাস্তবে অবশ্যই রূপ নেবে। আসলে এই সময় যোগীর মনে মিথ্যা বা অসত্যের চিন্তন আসতে পারে না। বলা হয়, এসময় যোগীর সিদ্ধির দ্বার উন্মুক্ত হয়ে গেছে।
------------
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/৩৭
অস্তেয় প্রতিষ্ঠায়াং সর্বরত্ন-উপস্থাপম। (২/৩৭)
সাধকের মধ্যে অস্তেয় প্রতিষ্ঠা হলে সমস্ত ধন-সম্পদ লাভ হয়।
অস্তেয় কথাটার অর্থ হচ্ছে চুরি না করা বা অন্যায়ভাবে পরের ধন গ্রহণ না করা।
দেখুন চোর চুরি করে কেন ? কারন তার মধ্যে স্পৃহা আছে। যোগীপুরুষের মধ্যে যখন এই স্পৃহাহীন ভাব আসে তখন তিনি নিস্পৃহ হন। আর নিস্পৃহ যোগীপুরুষের মধ্যে থেকে লোভ বলে কিছু থাকে না। ফলতঃ তিনি কোনো কিছুর জন্যই আগ্রহবোধ করেন না। এই অবস্থাকেই বলে "অস্তেয়"তে প্রতিষ্ঠালাভ।
এখন কথা হচ্ছে, আপনার লোভ না-ই, থাকতে পারে, আর এর ফলে আপনার মধ্যে কোনো কিছু পাবার আগ্রহ না-ই আসতে পারে। আর এর কারন হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন লোকের মধ্যে কারনের ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু তাই বলে, আপনি নিস্পৃহ থাকলে, আপনার কাছে সমস্ত ধন-সম্পদ এসে যাবে, যেকথা ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, সেটা কিভাবে সম্ভব হতে পারে ? এর দুটো ধরন হতে পারে।
এক - মনের দিক থেকে তার কোনো অভাববোধ না থাকার কারনে, তিনি নিজেকে ধনী বলে মনে করতে পারেন, যা কেবল মাত্র তার মানসিক ব্যাপার। এর সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। একটি পর্ন কুটিরের মধ্যে থেকেও, তিনবেলা পর্যাপ্ত খাদ্য না পেয়েও তিনি সম্পূর্ণ মানসিক তৃপ্তি পেতে পারেন। একটা স্বর্গীয় আনন্দের মধ্যে তিনি বাস করতে পারেন । কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে তো তিনি নির্ধনী, সহায়-সম্বলহীন। বর্ষায় জলে ভেজেন, রোদে কষ্ট পান, ক্ষিদেয় কষ্ট পান। কিন্তু কাউকে কোনো অভিযোগ করেন না। এর বেশি কিছই নয়।
দুই - দেখুন যে ছেলেটি খেতে চায় না, এমনকি খাবার সময় চৌকির তলায় গিয়ে লুকোয়, তার পিছনে মা খাবার থালা নিয়ে ঘুরছে। আর যে ছেলেটি, খাবার জন্য খ্যানর খ্যানর করছে, তাকে মা বকছে। এসব আমাদের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা। দেখুন চেয়ে-চিন্তে টাকা পয়সা জোগাড় করা তথাকথিত সাধুসমাজের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। এরা নিস্পৃহ নয়। শুধু তাই নয়, এরা শরীর রক্ষার জন্য, মন্দির-মসজিদের জন্য, এমনকি লোক-কল্যাণের জন্য এরা ভিক্ষের ঝুলি নিয়ে ধনী ব্যক্তির কাছে হাত পাতছে। এরা আসলে সন্ন্যাসী নয়, সংসারী। এরা হয়তো সংসারের কল্যাণ করতে চায়, আর এর মধ্যে এরা একটা তৃপ্তি, অহমিকা, সন্মান খুঁজে পায়। আসলে এরা সংসার থেকে বঞ্চিত বা তাপিত হয়ে এক সংসার ছেড়ে আর একটা সংসার পেতেছে।এরা এক বৌ বা স্বামীর সংসার না করতে পেরে, আরো একটা বিয়ে করছে। এরা যেখানে যায়, সেখানে একটা সংসার পাতে। তাই এদের অভাববোধ যায় না। ঋষি পতঞ্জলি উচ্চকোটির সাধক ছিলেন। তিনি বাস্তবতা উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি জানতেন, পৃথিবীর সমস্ত সম্পদের মালিক সেই এক ঈশ্বর ভিন্ন অন্য কেউ নয়।
মানুষের মধ্যে অর্থের ধনের বিনিময় হয় কখন ? যখন আপনি কাউকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন, তা সে বিষয়-সম্পত্তি দিয়ে হোক, বা বাক্য দিয়ে হোক, বা সেবা দিয়ে হোক। আপনি যখনই কাউকে কিছু দেবেন, তখন সে তার বিনিময়ে আপনাকে কিছু না কিছু দেবে। দেবেই আজ না হোক কাল। দিতেই হবে, এটি প্রকৃতির নিয়ম। আকাশ কখনো মেঘ ধরে রাখে না, বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। নদী কখনও জল ধরে রাখে না, যেখান দিয়ে সে প্রবাহিত হয়, তার দুপাশের মানুষ এমনি ভূমিকেও সে জল দান করে থাকে। আর এর ফলেই ফসল উৎপন্ন হয়, মানুষের তৃষ্ণা মেটে। মাটি ফসলকে ধরে রাখে না। সে তা জীব-জন্তু-পশু-পাখির জন্য বিতরণ করে থাকে। জীবজন্তু খাদ্যকে ধরে রাখে না, একসময় সে তা শরীর থেকে ছেড়ে দেয়। এসবই প্রকৃতির নিয়ম। এর বাইরে আমরা কেউ নোই।
এক ভিক্ষারী মসজিদের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ভিক্ষে করছিলো। সবাই কোনো কথা না বলে মসজিদের ভিতরে প্রবেশ করছিলো। মসজিদ থেকে বেরিয়ে এসে দুটো একটা পয়সা ভিক্ষারির দিকে ছুড়ে দিছিলো। তো ভিক্ষারী মনে মনে ভাবলো, তাহলে কি মসজিদের মধ্যে পয়সা আছে, যেখান থেকে এরা সবাই পয়সা নিয়ে এসে আমাকে দিচ্ছে ? তো ভিক্ষারী মসজিদের মধ্যে প্রবেশ করলো। এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলো। কিন্তু কোথাও কোনো পয়সার সন্ধান সে পেলো না। কিন্তু নিঃশব্দ মসজিদের মধ্যে কান পাততেই সে শুনতে পেলো, সবাই আল্লার কাছে, কিছু না কিছু চাইছে। হয় সুখ চাইছে, নয় ধন-সম্পদ চাইছে, নয় বিপদ থেকে নিস্তার চাইছে। সবাই শুধু চাইছে আর চাইছে । তখন তার নিজের মধ্যে একটা ধারণা হলো, এই আল্লাই দাতা, আর সব গ্রহীতা। তাহলে আমি ভিক্ষারী হয়ে আরেকজন ভিক্ষারির কাছে কেন চাইতে যাবো ? চাইতে যদি হয়, তবে আল্লাহর কাছেই চাইবো। একটা নতুন জীবনের সন্ধান সে পেয়ে গেলো ভিক্ষারী । আর আশ্চর্য্যের ব্যাপার হচ্ছে, জীবন থেকে তার অভাববোধের নিস্পত্তি হলো।
এর পরেও, গল্প আছে - ঠাকুর রামকৃষ্ণের গুরু ছিলেন, তোতাপুরি (ন্যাংটা বাবা) - তিনি পুরি শহরের সন্নিকটে একটা বালুর ঢিপির উপরে কুটির বেঁধে বাস করতেন। ঠাকুর রামকৃষ্ণকে দীক্ষা দেবার পরে (১৮৬১) প্রায় আরো ১০০ বছর তিনি স্থূল দেহে অবস্থা করেছিলেন। ১৯৬১ সালে তিনি স্থূল দেহ ত্যাগ করেন। তো কলকাতা থেকে অনেক জিজ্ঞাসু তাঁর কাছে যেতেন, তাকে চাক্ষুষ দেখবার জন্য, অথবা বলতে পারেন, কৌতূহল মেটাবার জন্য। কারন অবতার পুরুষের গুরুদেব কেমন দেখতে, সেটা নিশ্চয়ই একটা দর্শনীয় দেহ হবে। তো একবার একটা ছেলে, রোদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে সন্ধান করে, আশ্রমে গিয়ে ক্লান্ত বোধ করতে লাগলো। ন্যাংটাবাবা তাকে দেখে করুনা অনুভব করলেন। তো তার একজন শিষ্যকে ডেকে একটা ডাব কেটে দিতে বললেন। এখন ঘরে যেহেতু একটাই মাত্র ডাব আছে, আর সেটি গুরুদেবের জন্য রাখা আছে, তাই সে একটু ইতস্তত করতে লাগলো। গুরুদেবের ধমক খেয়ে শিষ্য ডাবটা কাটতে কাটতেই দেখতে পেলেন, একজন গৃহস্থ গরুর গাড়িতে করে এক গাড়ি ডাব নিয়ে আসছে। তো ঈশ্বর কাকে দিয়ে কার প্রয়োজন মেটাবেন, তা কেবল তিনিই জানেন। তাঁরই সব, তিনিই দেন, আবার তিনিই নেন। আমরা ভাবি আমার। আমরা ভাবি ধনী-গরিব। যিনি ভগবানের ইচ্ছেয়, ভগবানের কাজে নিয়োজিত, তার অভাব ভগবান স্বয়ং মিটিয়ে দেবেন। শুধু অপেক্ষা করুন, আর সমস্ত কর্ম্ম ভগবানে সমর্পন করুন। চাইতে যাবেন না, কারুর কাছে। এমনকি ভগবানের কাছেও কিছু চাইতে যাবেন না। তবেই দেখবেন, তিনি আপনাকে আঁচল ভরে উজাড় করে দিয়েছেন। আপনি রাখবেন কোথায় ?
ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, নিস্পৃহ মানুষের সমস্ত ধন লাভ লয়। আপনি যদি কখনো নিষ্পৃহ হতে পারেন, তবে এই সত্য আপনার বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে উপল্বদ্ধিতে আসবে। এর কোনো অন্যথা হয় না।
--------
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/৩৮
ব্রহ্মচর্য প্রতিষ্ঠায়াং বীর্যলাভঃ । (০২/৩৮)
ব্রহ্মচর্যে প্রতিষ্ঠা লাভ হলে বীর্যলাভ হয়।
ব্রহ্ম কথাটার অর্থ হচ্ছে দীপ্তি পাওয়া বা বৃদ্ধি পাওয়া। ব্রহ্মচর্য অর্থাৎ আচার্য্যের সম্মুখে থেকে বেদাদির পাঠ বা অধ্যয়ন। অর্থাৎ জ্ঞানপ্রদীপ প্রজ্বলিত করা। আবার অন্য দিকে ব্রহ্মচর্য কথাটার অর্থ হচ্ছে মৈথুনের অভাব।যাইহোক, ব্রহ্ম সাযুজ্য লাভের জন্য যে অনুশীলন তাকে বলা হয় ব্রহ্মচর্য। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, ব্রহ্মচর্য্য পালনের ফলে আমাদের বীর্যলাভ হয়।
আমরা যাকিছু খাদ্য গ্রহণ করি, তা প্রথমে রসে পরিণত হয়, রস থেকে রক্ত, রক্ত থেকে মাংস , মাংস থেকে মেদ, মেদ থেকে অস্থি, অস্থি থেকে মজ্জা, মজ্জা থেকে শুক্র বা বীর্য উৎপন্ন হয়। বীর্যবান পুরুষের মধ্যে পুরুষকারের প্রাবল্য দেখা যায়। এদের মধ্যে যেকোনো কাজেই উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। এই বীর্যই মানুষকে ধীশক্তি সম্পন্ন করে থাকে। বীনার তার টানটান থাকলে, সামান্য স্পর্শে যেমন ঝঙ্কার ওঠে, তেমনি বীর্যবান পুরুষের কানে যখন গুরুবাক্য প্রবেশ করে, তখন তার হৃদয়ে একটা ঝংকার ওঠে। এই বীর্যবান পুরুষের মধ্যেই মূলাধারের শক্তি জাগ্রত করবার শক্তি সঞ্চয় হয়। যেকোনো সাধু সমাজে প্রথমেই সাধককে বীর্যবান হবার অর্থাৎ ব্রহ্মচর্য পালনের উপদেশ দেওয়া হয়।
আমাদের ভারতবর্ষে পুরাকালে, গুরুগৃহে এই বীর্য রক্ষার উপদেশ দেওয়া হতো। সংসারে বা গার্হ্যস্থ জীবনে প্রবেশের পূর্ব্বে এই ব্রহ্মচর্য পালন ছিল অপরিহার্য। প্রশ্ন উপনিষদে ঋষি পিপ্পলাদ তাঁর কাছে আগত, ব্রহ্মজিজ্ঞাসুদের একবৎসর কাল গুরুগৃহে থেকে এই অষ্টাঙ্গযোগ সাধনের উপদেশ দিয়েছিলেন, যারমধ্যে ব্রহ্মচর্য ছিল অন্যতম।
এই ব্রহ্মচর্য থেকেই সাধকের মধ্যে ওজঃ শক্তি বৃদ্ধি পায়। দেখুন আমাদের শরীরের এই শুক্র বা বীর্য যেমন সৃষ্টিশক্তির আধার, এই বীর্য যেমন যৌনাঙ্গকে উত্তেজিত পারে, তেমনি এই বীর্য আমাদের আধ্যাত্মিক তেজঃবহ্নি সৃষ্টি করতে পারে। এই শক্তি যেমন মানুষকে কামক্রিয়ায় প্রলোভিত করে, আবার এই শক্তি সংযত হলে ওজঃ শক্তিতে পরিণত হয়ে মানুষকে অধ্যাত্মিক পথে টেনে নিয়ে যেতে পারে। কামশক্তি একসময় রামশক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে। মূলাধারের এই শক্তি ওজঃ শক্তি রূপে আমাদের মস্তিষ্কে আশ্রয় নিতে পারে। আর এতে করে, আমাদের স্মৃতিশক্তি তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর হতে পারে, আমাদের ধীশক্তি বৃদ্ধি হতে পারে। ব্রহ্মচর্য্যের অনুশীলনে, একটা বিশেষ নাড়ীর দ্বার উন্মোচন হয়ে ওঠে, যা জন্ম থেকে শ্লেষা, পিত্ত ইত্যাদি দ্বারা বন্ধ হয়ে রয়েছে। ব্রহ্মচর্য পালনে যারা অক্ষম তাদের আর যাই হোক, তারা কখনও যোগের পথে সাফল্য লাভ করতে পারেন না। ব্রহ্মচর্য আমাদের দেহ-মনের পুষ্টি সাধন করে থাকে। একটা মানুষ যদি ১২ বৎসর শুধুই ব্রহ্মচর্য পালন করেন, তবে তার মধ্যে মেধানাড়ী সক্রিয় হয়ে অর্থাৎ এই নাড়ীর মধ্যে প্রাণের প্রবেশ ঘটে এবং এই বীর্যবান পুরুষকে অন্তর্জ্ঞান সম্পন্ন করে তুলতে পারে। এছাড়া, ব্রহ্মচর্য সাধনকারীর ধ্যান সহজেই জমে ওঠে, কারন ব্রহ্মচর্য পালনকারীর মধ্যে যেমন পরিশ্রম করবার ক্ষমতা বেশি হয়ে থাকে, তেমনি একাগ্রতা, শরীর ও মনকে স্থির করবার ক্ষমতা বেশি হয়ে থাকে। রাজযোগের পথে যারা আধ্যাত্মিক শান্তি পেতে চান তাদের এই ব্রহ্মচর্য্যের অভ্যাস আবশ্যিক।
একবার দেবতাদের রাজা ইন্দ্র, আর অসুরদের রাজা বিরোচন প্রজাপতি ব্রহ্মার কাছে গিয়েছিলেন আত্মজ্ঞান লাভ করতে। তো আত্মজ্ঞান তো সহজে আয়ত্ব করা যায় না, এর জন্য প্রস্তুতি চাই, যোগ্যতা চাই। এঁরা দুজন ছিলেন পরস্পরের শত্রু। কিন্তু একটা মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে, প্রজাপতির নির্দেশে ৩২ বৎসর ব্রহ্মচর্য পালন করেছিলেন। আর এর ফলে এদের মধ্যে দেখা দিয়েছিলো বিনয়ীভাব, উদার হয়ে উঠেছিলেন, এমনকি এরা পরস্পরের বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। এমনই আশ্চর্য্য ক্ষমতা আছে এই ব্রহ্মচর্যের অনুশীলনীতে।
দেখুন, সাধকের উদ্দেশ্য হচ্ছে, চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থির হওয়া। আর এর জন্য দরকার এই চেতনার কেন্দ্রবিন্দুগুলোকে প্রথমে চিহ্নিত করা, তার পরে সেই কেন্দ্রের উপরে ধ্যানে লিপ্ত হওয়া, শেষে এই কেন্দ্রে নিজেকে স্থির করে রাখা। আর এটি সাফল্যের সঙ্গে সম্পাদন করতে গেলে, আমাদের ওজঃ শক্তি দরকার, যা একমাত্র বীর্যবান পুরুষই লাভ করতে পারেন। ব্রহ্মচর্যের কোনো বিকল্প নেই। অধ্যাত্ম জীবন পেতে গেলে, এই সহজ সত্যকে জীবনের ধর্ম্ম বলে মেনে নিতে হবে। সবশেষে বলি, এই শক্তিকে ধরে রেখে নিজেই পরীক্ষা করে দেখুন, এর ফলে আপনার জীবন পাল্টে যাবে, শরীরের মধ্যে অদম্য শক্তি ও উৎসাহ অনুভব করবেন। আপনার চিন্তাধারার মধ্যেও একটা পরিবর্তন আসবে, এমনকি আপনি সহজেই সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার অধিকারী হয়ে উঠবেন।
--------
কিছু ব্যক্তিগত কথা :
আমার একটা বাজে অভ্যাস হচ্ছে, আমি শুয়ে শুয়ে বই পড়তে ভালো বাসি। আর বই পড়তে পড়তে কখন আমি ঘুমিয়ে পড়ি, সেটা আমার খেয়াল থাকে না। ছোটবেলায়, আমার পড়ার ঘরে, রাতের দিকে বই পড়তে পড়তে হারিকেন বা ডিমলাইট জ্বালিয়ে রেখে বুকের উপরে বই নিয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়তাম। আর আমার মা এসে, বই গুছিয়ে মশারি টাঙিয়ে আমরা গায়ে চাদর চাপিয়ে চলে যেতেন। এখনও আমার সেই ছোটবেলার অভ্যাস যায়নি। বই পড়তে পড়তে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, মানুষ যেমন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে নানান রকম বিচ্ছিন্ন ঘটনার স্বপ্ন দেখে, আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বই পড়ি। এমনকি আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে শাস্ত্রপাঠ শুনি, ভাগবত কথাও শুনতে পাই। তখন কিন্তু আমার মধ্যে একবারও মনে হয় না, যে আমি এখন ঘুমিয়ে আছি। অর্থাৎ আমি যে ঘুমিয়ে আছি, সেই বোধ তখন আমার মধ্যে থাকে না। এটি স্বপ্নের অবস্থা, যা আমাদের সবার অভিজ্ঞতায় আছে। আশ্চর্য্যের ব্যাপার হচ্ছে, আমি যে বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, স্বপ্নেও আমি সেই একই বই পড়তে থাকি। অর্থাৎ চোখে না দেখে, বা আমার স্থূল শরীরের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলেও, আমার মন যেন সেই একই বইয়ের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। অর্থাৎ আমি মানসিক শরীরে বই পাঠ করতে থাকি। আবার যখন আমি জেগে উঠি তখন বই পড়তে শুরু করতে গিয়ে দেখি, এগুলো যেন পড়া হয়ে গেছে। ফলতঃ বইয়ের পাতা উল্টাতে হয়, না পড়া পৃষ্ঠা খুঁজে নেবার জন্য। জানিনা এই অভিজ্ঞতা অন্য কারুর হয় কি না।
-----------------
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সাধনপাদ - শ্লোক নং ০২/৩৯
"অপরিগ্রহস্থৈর্যে জন্ম-কথন্তা-সংবোধঃ।" (০২/৩৯)
অপরিগ্রহ যোগাঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হলে জন্ম-কথা জ্ঞাত হওয়া যায়।
অপরিগ্রহ অর্থাৎ ন-পরিগ্রহ। অর্থাৎ কারুর অনুগ্রহ বা দান গ্রহণ না করা। কারুর গলগ্রহ হয়ে না থাকা। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এই যোগাঙ্গের অনুষ্ঠানে জন্ম বৃত্তান্ত জানা যায়। অর্থাৎ নিজের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সন্মন্ধে জ্ঞান হয়। কথাটাকে স্থূল ভাবে গ্রহণ করলে আমাদের মনে হবে, এই যোগের অনুষ্ঠানে আমরা আমাদের পূর্ব-পূর্ব জীবন সম্পর্কে পারবো। এমনকি আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে জানতে পারবো। আর এই ব্যাপারে আমাদের সবার একটা আগ্রহ আছে।
কিন্তু সূক্ষ্মভাবে এই শ্লোকের অর্থ একটু অন্যরকম। আর অপরিগ্রহ হচ্ছে হচ্ছে বিষয়ে বিরক্তি। এখন বিষয় বলতে আমরা সাধারণ ভাবে বুঝি পার্থিব বিষয়। আর পার্থিব বিষয় বলতে আমরা এই ধন,সম্পদ, গাড়ি, বাড়ি ইত্যাদি বুঝে থাকি। কিন্তু একটু গভীরে প্রবেশ করলে আমরা বুঝতে পারবো, পার্থিব বলতে বোঝায় স্থূল বা সূক্ষ্ম বা কারন পদার্থ বিশেষ। যা আমাদের দেহের প্রকারভেদ মাত্র।
আমরা জানি আমাদের শরীর পঞ্চবিধ কোষের সমষ্টি । অনন্ময়, প্রাণময়, মনোময়, বিজ্ঞানময় ও আনন্দময়। এই শরীরগুলো কিছু-না-কিছুর দ্বারা পুষ্ট হচ্ছে। যেমন, অন্নময় শরীর অন্নের দ্বারা পুষ্ট হচ্ছে, প্রাণময় শরীর প্রাণক্রিয়া অর্থাৎ শ্বাসের দ্বারা পুষ্ট হচ্ছে। মনোময় শরীর আমাদের ভাবনা দ্বারা পুষ্ট হচ্ছে। এই তিনটি আমাদের ভৌতিক শরীর। এছাড়া আমাদের জ্ঞানের দ্বারা পুষ্ট শরীর হচ্ছে আমাদের অভৌতিক বিজ্ঞানময় শরীর। আবার যে শরীরে আমাদের আনন্দের অনুভূতি হয়, তাকে বলে অভৌতিক আনন্দময় শরীর। এই সহজ কথাগুলো আমরা সবাই জানি।
কিন্তু সত্য হচ্ছে আমি তো এই শরীর নোই। এই শরীর প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে। আমি অপরিবর্তনীয় সত্ত্বা আত্মা, যাঁর কোনো পরিবর্তন নেই। এরা অর্থাৎ এই পঞ্চকোষ যদি আমাদেরকে আঁকড়ে না ধরতো, তবে আমরা সবাই মুক্ত হতে পারতাম। আমি স্ব-স্বরূপে স্থিত হতে পারতাম। এদের অনুগ্রহে বা বলা যেতে পারে, এদের দ্বারা বন্দি হয়ে আমি সংসার-রূপ জেলখানার বাসিন্দা হয়ে, ক্লেশকর অনুভূতির মধ্যে নিজেকে প্রবেশ করিয়েছি। আর এটি অবিদ্যার কারনে ঘটে চলেছে। তো ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, অপরিগ্রহাত্মক যোগাঙ্গের অভ্যাসে, অর্থাৎ এই কোষগুলোর উপরে যদি বিরক্তি আসে, তবে আমি দেহাতীত হয়ে, আমার বর্তমান-অতীত-ভবিষ্যৎ অর্থাৎ আমার মূল সত্ত্বার সন্ধান পেতাম। দেহাতীত হয়ে, দেহের মধ্যে প্রবেশ, স্থিতি ও প্রস্থান সম্পর্কে আমরা সম্যকরূপে অবহিত হতে পারতাম। তখন, আমি কে, কিভাবেই বা আমি ছিলাম, এই শরীরটা কি, কিভাবেই বা এই শরীরটা তৈরী হলো, কিভাবেই বা আমি শরীরের মধ্যে প্রবেশ করলাম, সব তখন আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠতো । ভবিষ্যতে আমি আবার কোথায় যাবো, কিভাবেই বা যাবো, সবই আমার জ্ঞানের বিষয় হতে পারতো। এই মন-শরীরটাকেই আমরা জ্ঞাতা ভাবছি, আসলে শরীর তো জ্ঞাতা নয়, জ্ঞাতা আমি স্বয়ং "আত্মা"। এই হচ্ছে অপরিগ্রহ, অর্থাৎ সবাইকে উপেক্ষা করো, সবার উপরে বিরক্তি আসুক, কারুর অনুগ্রহ নয়, কারুর অনুরোধ, উপরোধও রক্ষা করতে যেও না। তবেই তোমার স্বরূপের জ্ঞান হবে।
---------
প্রশ্ন : জীবাত্মা কী? আত্মাকে পোড়ানো যায়না, ভেজানো যায়না, খণ্ডিত করা যায় না। তাহলে সব জীবের শরীরে আত্মা খন্ড খন্ড হয়ে থাকে কিকরে আর দেহের মৃত্যুর পর বেরিয়ে আর একটা দেহে ঢুকে যায় কী করে। মানুষ বাড়লে আত্নাও বেড়ে চলে কিকরে?
লিঙ্গ শরীর বা বাসনা দেহকেই কী আমরা চলতি কথায় আত্মা বা জীবাত্মা বলে ব্যবহার করে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছি ?

Comments
Post a Comment