পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ সমাধিপাদ

             
       

       
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ
শশাঙ্ক শেখর শান্তিধাম। 
সংক্ষেপে সমাধিপাদ 
 
কিছু কথা :     

ব্রহ্ম ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছেন , আর জড়িয়ে গেছেন  প্রকৃতির সঙ্গে। প্রকৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে তিনি  নতুন সংসার পেতেছেন । এখন এই সংসার থেকে তাঁকে বিচ্ছিন্ন করা সহজ নয়। এই সংসার থেকে ব্রহ্মকে বের করে নিয়ে আসাই যোগের উদ্দেশ্য। প্রকৃতির সঙ্গে মিশে তাঁর  যা ভাব হয়েছে, সেখান থেকে তাঁকে  বের করা  সহজ নয়। কেননা যেখানেই তিনি  যাচ্ছেন  সেখানেই প্রকৃতি তাঁকে ঘিরে থাকছেন । তো ব্রহ্মকে একলা  পাওয়াই যাচ্ছে না। যখন তিনি জেগে থাকেন, তখন তার সঙ্গে প্রকৃতি, যখন ঘুমিয়ে থাকেন, তখন তাঁর  সঙ্গে প্রকৃতি, যখন চলে ফিরে বেড়ান তখনও তার সঙ্গে প্রকৃতি। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাঁকে  একটু একান্তে চাই, তাঁকে  একটু নিভৃতে চাই। কিন্তু সারাক্ষন প্রকৃতি পরিবৃত হয়ে আছেন বলে, এই প্রাণপুরুষকে আমরা একলা ধরতে পারি না। 

ঋষি পতঞ্জলি তাঁর  যোগদর্শনের মাধ্যমে বলছেন - " আমার  সঙ্গে এসো - আমি তোমাকে নিভৃতে নির্জনে শুধুই তাঁর  সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেবো। হাজার বছর ধরে তুমি অপেক্ষা করছো, কিন্তু  এই ব্রহ্মকে দেখতে পাচ্ছো না। যে মনের মধ্যে তোমার এতদিন জগৎ উদ্ভাসিত হচ্ছিলো, সেই মনেই ব্রহ্ম সাক্ষাৎকার হবে। তোমার যাকিছু আছে, অর্থাৎ ইন্দ্রিয়াদি যা দিয়ে তুমি এতদিন জগতের আস্বাদন করছিলে, সেই ইন্দ্রিয়াদি দিয়েই ব্রহ্মানুভূতি হবে। এসো আমার সঙ্গে এসো। " 

হাজার বছর আগের  ঋষি পতঞ্জলির এই ডাক আমরা এতদিন উপেক্ষা করেছি।  আমরা  উপনিষদের ব্রহ্মকে খুঁজে বেড়িয়েছি।  কিন্তু উপনিষদ কেবল ব্রহ্ম -উপদেশ দিয়েছেন। বলছেন ব্রহ্ম কেবল আলোচনার বিষয়। উপনিষদের ব্রহ্মকে জানা যায় না, তিনি ইন্দ্রিয়াতীত।  কিন্তু ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, "এস - আমরা নিভৃতে এনার সাক্ষাৎ করি। "  

-------------


পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং -১-২ 

"অথ যোগানুশাসনম" ( ০১/১)

এখানে যোগের অনুশাসন সম্পর্কে বলা হচ্ছে। 

ঋষি পতঞ্জলি এখানে দুটো শব্দ ব্যবহার করেছেন ।  এক হচ্ছে "যোগ" আর একটা হচ্ছে "অনুশাসন।" যোগ বলতে আমরা বুঝি জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন। আর এই যোগ সম্পর্কে বিভিন্ন শাস্ত্রে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন।  ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন, মহাভারতের গীতপর্ব্বে চার রকম যোগের কথা  বলছেন। সেগুলো হচ্ছে, কর্ম্মযোগ, ধ্যানযোগে, জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ ইত্যাদি।  এছাড়া আমরা হঠযোগ-এর কথাও শুনে থাকি। 

অনুশাসন হচ্ছে কোনো কিছু প্রাপ্তির উপায় সম্পর্কিত উপদেশ। এখানে ব্রহ্মপ্রাপ্তির উপায় সম্পর্কে  উপদেশ দেওয়া হচ্ছে। 

"যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ" (০১/২)

চিত্ত বৃত্তির নিরোধের নাম যোগ। 

যোগের প্রাথমিক লক্ষণ হলো, চিত্ত বৃত্তির নিরোধ। এখন চিত্তবৃত্তি কাকে বলে ? "চিৎ" কথাটার অর্থ হচ্ছে জ্ঞান, আর "ত" কথাটার অর্থ হচ্ছে যার দ্বারা জানা যায়। অর্থাৎ আমাদের মন বা চৈতন্য স্থান। আমরা জানি প্রকৃতি ত্রিগুণময়ী অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ এই তিন গুনের সমাহার হচ্ছে প্রকৃতি। আর এই প্রকৃতিই মনের প্রসবকারিনী জননী। তাই মনের মধ্যেও এই তিনটি গুন্ দেখা যায়। এখন প্রকৃতি হচ্ছে জড় অচেতন পদার্থ। কিন্তু এর মধ্যে যখন সত্ত্ব গুনের আধিক্য দেখা যায়, তখন প্রকৃতি চেতন  হয়ে ওঠে। আমাদের এই চিত্ত সত্ত্বগুণ প্রভাবে জ্ঞানস্বরূপে স্থিত।  কিন্তু যখন রজঃ ও তম  গুনের সান্নিধ্যে আসে, তখন সে চঞ্চল হয়ে ওঠে এবং বিষয়ের দিকে ধাবিত হয়। ইন্দ্রিয়রূপ তীরধনুক নিয়ে সে যেন অরণ্যের মধ্যে মায়ামৃগের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর বিষয় সংস্পর্শে এসে ইন্দ্রিয়সকল কতনা বৈচিত্রের সম্মুখীন হচ্ছে। তম গুনের প্রভাব যখন বেশি দেখা  যায়, তখন চিত্ত মূঢ়তায় আছন্ন হয়, আর অনৈশ্বর্যের  দিকে ধাবিত হয়।   আবার এই তম গুনের প্রভাব যখন কেটে যায়, কিন্তু রজঃ গুনের প্রভাব থাকে, তখন সে যোগ ঐশ্বর্যের দিকে ধাবিত হয়। এর পরে রজঃ  গুনের প্রভাব যখন ধীর হতে থাকে তখন সে ধ্যানের গভীরে প্রবেশ করে। তখন তার মধ্যে বিবেকজ্ঞানের উন্মেষ ঘটে। এই বিবেকজ্ঞান প্রকৃতি ও পুরুষের পার্থক্য উপল্বদ্ধিতে সাহায্য করে। পরুষ থেকে প্রকৃতির বিয়োগের ক্রিয়াই আসলে যোগক্রিয়া । যোগ বলতে আমরা মিলনকে বুঝে থাকি। কিন্তু সাধনপ্রক্রিয়া প্রকৃতপক্ষে  বিয়োগের ক্রিয়া। পুরুষ ও প্রকৃতিকে  বিচ্ছিন্ন করাই  যোগের উদ্দেশ্য।
---------------

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং -৩-৪
 
"তদা  দ্রষ্টুঃ স্বরুপে অবস্থানম।"  (০১/৩)

তখন দ্রষ্টা পুরুষের স্বরূপে অবস্থান হয়। 

আগে আমরা শুনেছি, চিত্ত বৃত্তি নিরোধের নাম যোগ।  এখন বলছেন, এই অবস্থায় অর্থাৎ চিত্তবৃত্তির নিরোধ হয়ে, পুরুষ তাঁর স্বরূপে অবস্থান করেন। 

পুরুষের সঙ্গে নিভৃতে সাক্ষাৎ করতে হবে। আর এই সাক্ষাৎকার ঘটবে আমাদের মন বা চিত্তের মাধ্যমে। মন দিয়ে আমরা এতোদিন বিষয়কে দেখেছি। সেই মন দিয়েই আমাদের পরমপুরুষকে দেখতে হবে। এখন কথা হচ্ছে এই মন যেমন আমাদের আগে থেকেই আছে  এখনো আছে, তেমনি পরম-পুরুষও  আগে থেকেই ছিলেন এবং এখনও আছেন। তাহলে এখন কেন  আমরা দেখতে পাচ্ছি না ? সৃষ্টিকে দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু স্রষ্টাকে  কেন দেখতে পাচ্ছি না। দেখতে পাচ্ছি না, তার কারন হচ্ছে আমাদের মন চঞ্চল। মলিন আয়নায় আমরা আমাকে, আমার রূপকে বা মুখকে  দেখতে পারি না। কিন্তু আয়না  যদি স্বচ্ছ হয়, তবে আমরা আমাদেরকে ভালোভাবে দেখতে পারবো।  
তো গন্ডগোল হচ্ছে আমাদের মনের অস্থিরতায়, চিত্ত চঞ্চলতায়। তো ঋষি পতঞ্জলি তাই প্রথমেই আমাদের বোঝাতে  চাইছেন, মনের এই অস্থিরতা কেন হয় ? মনের এই অস্থিরতার কারন জানতে পারলে, এবং তার প্রতিকার করতে পারলে, আমাদের মন শান্ত হতে পারে।

"বৃত্তিসারূপ্যম ইতরত্র। "(০১/৪)

স্বরূপ অবস্থার বিপরীতে অর্থাৎ মনের বিক্ষেপ কালে বৃত্তি ও পুরুষ একাকার হয়ে থাকেন। 

মন যখন বিক্ষেপশূন্য হয়, তখন পরামপুরুষকে স্পষ্ট ভাবে প্রকৃতি থেকে আলাদা করা যায়।  কিন্তু যখন মন বিক্ষিপ্ত থাকে তখন প্রকৃতি ও পুরুষ একাকার হয়ে যায়। জল যখন স্থির তখন চাঁদের স্পষ্ট ছবি জলের উপরে দেখতে পারি। কিন্তু জল যখন  বাতাসের কারনে  চঞ্চল তখন জলে প্রতিবিম্বিত চাঁদ নজরে আসে না। মনে হয়, জল ও চাঁদ একাকার হয়ে আছে। ঠিক তেমনি  মনের আয়নায় পরম-পুরুষের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠলেও, বিষয় বাতাসে মন চঞ্চল থাকবার জন্য, তা দৃশ্যমান হচ্ছে না।

মনের পাঁচটি স্তর - 
১. আমরা যখন রজঃ গুনের দ্বারা প্রভাবিত থাকি তখন আমাদের মন থাকে স্বভাব-চঞ্চল। তখন মন  বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। 
২. আবার মন যখন তমঃ গুনের দ্বারা প্রভাবিত হয়, তখন মন কোনো কিছুতেই উৎসাহ পায়  না। একটা নিস্পৃহ অবস্থা।  কোনো কিছুতেই আগ্রহ নেই। 
৩. মন যখন এই দুই ভূমির উপরে অবস্থান করে, অর্থাৎ কখনো চঞ্চল, কখনও মূঢ়, কখনও  গতিশীল  কখনও  বিমূঢ়। কখনো ঘুমোই, কখনো জেগে থাকি। কখনো পরিশ্রম করছি, কখনও  পরিশ্রান্ত হয়ে বসে আছি। এই অবস্থাতেই আমাদের বেশিরভাগের সারা জীবন কাটে। 
৪. এর মধ্যে কেউ কেউ যেন কোনো একসময় নিজের মধ্যে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। এইসময় তার মধ্যে না থাকে চঞ্চলতা, না থাকে মূঢ় ভাব। তখন সে সকাল  সন্ধ্যেয়  পূজ্য কারুর সন্ধান করে। এটি যেন সন্ধিক্ষণ। এইসময় তার মধ্যে একটা সাত্ত্বিক ভাব জেগে ওঠে। এই সময় যেন প্রহরীর বদল হচ্ছে। এই সন্ধিক্ষণ যেন প্রহরীর বদলের সময়। অর্থাৎ পরমপুরুষ তখন প্রহরী বিহীন হয়ে দৃশ্যমান হচ্ছেন । আর খোলা দরজায় পরমপুরুষ এসে দাঁড়িয়েছেন। একটা শান্তির বাতাস বইছে। 
৫. এর পরে একটা  সময় আসে, তখন না দিন না রাত,  এই সময় না সূর্য্যের অস্ত  যাওয়া, না সূর্য্যের উদয় হওয়া, না মূঢ়ভাব না বিক্ষিপ্ত ভাব। এটি একাগ্র ভাব। এই হচ্ছে যোগের সময়। চিত্তকে একমুখী করে তোলে এই অবস্থা যা যোগ নামে  চিহ্নিত করেছেন যোগীপুরুষগন। 
--------- 

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং -৫-৬  

"বৃত্তয়ঃ পঞ্চতয্যঃ ক্লিষ্টাঃ অক্লিষ্টাঃ। "  - (০১/৫)
বৃত্তিগুলি পাঁচপ্রকার। কখনও  ক্লেশ দায়ক, কখনও  ক্লেশ নাশকারী। 

বৃত্তি হচ্ছে আমাদের মনের ধর্ম্ম বা স্বভাব। আমরা আগে শুনেছি আমাদের মন প্রকৃতিজাত।  আর এই প্রকৃতির মধ্যে যেমন তিন গুনের সমাহার, তেমনি আমাদের মনের মধ্যেও এই তিন গুনের সমাহার। এখন এই মন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম আচরণ করে থাকে। অর্থাৎ মনে যখন যেমন গুন্ দ্বারা প্রভাবিত হয়, তেমন সে আচরণ করে থাকে। 

আমাদের অবিদ্যাই ক্লেশের মূল কারন। যে বৃত্তিগুলো আমাদের ধর্ম্ম-অধর্ম্ম ইত্যাদি সংস্কারের জন্ম দেয় তা হচ্ছে ক্লেশদায়ক (ক্লিষ্টা) । আর যে বৃত্তিগুলো সংসার পরিণামের বিরোধী, সেগুলো হচ্ছে ক্লেশনাশকারী (অক্লিষ্টা)।  বৃত্তি থেকেই সংস্কারের জন্ম হচ্ছে আবার সংস্কার থেকে বৃত্তির জন্ম হচ্ছে। এ যেন একটা চক্র। অবিদ্যা, অস্মিতা, রাগ, দ্বেষ ও মরণভয় এই পাঁচটি হচ্ছে ক্লেশ দায়ক বৃত্তি। আবার এর বিপরীত অর্থাৎ জ্ঞান, নিরহঙ্কার, প্রেম, একাত্মবোধ ও দেহাতীত ভাব এই হচ্ছে ক্লেশ নাশকারী বৃত্তি। 

"প্রমান-বিপর্যয়-বিকল্প-নিদ্রা-স্মৃতয়ঃ । " (০১/৬) 

প্রমাণ অর্থাৎ অবিসংবাদী জ্ঞান, বিপর্যয় অর্থাৎ বিপরীত জ্ঞান, বিকল্প অর্থাৎ শব্দভ্রম, নিদ্রা এবং স্মৃতি - এগুলো হচ্ছে পাঁচ বৃত্তির পরিচয়। 

প্রমান -প্রমান হচ্ছে যথার্থ জ্ঞান, অর্থাৎ যেমনটি ঘটছে, তেমনটি বোধ হওয়া। 
বিপর্যয় - যথার্থ ঘটনার বিপরীত বোধ করা। 
বিকল্প - ভিন্ন অবস্থা বিষয়ক বোধ। 
নিদ্রা - ঘুমের মধ্যে অস্ফুট বোধ।  
স্মৃতি - স্মরণাত্মিকা বৃত্তি। 

আমরা যা কিছু দেখছি, শুনছি  তা এই চিত্তবৃত্তি থেকে সঞ্জাত। আর এই চিত্তবৃত্তি  ক্ষনে ক্ষনে পরিবর্তিত হচ্ছে। কখনো চঞ্চল, কখনো স্থির। মানুষের জ্ঞান লাভের  প্রধান উপায় হচ্ছে ইন্দ্রিয়বর্গ। আর এই ইন্দ্রিয়ের দ্বারা  জ্ঞান তার কাছে প্রতক্ষ্য প্রমান।  কিন্তু এই প্রতক্ষ্য জ্ঞানের একটা মারাত্মক ত্রুটি আছে, আর  তাহচ্ছে সীমাবদ্ধতা। আমরা কাছের  জিনিস যেমন দেখতে পাই না, তেমনি দূরের  জিনিস দেখতে পাই না। আমরা শব্দের একটা স্তর  মাত্র অনুভব করতে পারি, তার বাইরের শব্দ আমাদের শ্রুতি গোচর  হয় না।  দ্বিতীয় ত্রুটি হচ্ছে ইন্দ্রিয়ের বিকলতা  জনিত জ্ঞান।  চোখে ছানি পড়েছে, বা কানে তালা লেগেছে, তখন আমরা আবছা দেখি বা অস্পষ্ট শুনি। এর থেকে আমাদের মধ্যে ভ্রান্তি জ্ঞান হতে পারে। তৃতীয়ত,  আমাদের মন ও বুদ্ধি বিচারের সাহায্যে দৃশ্যমান বস্তু, বা শ্রুতিগোচর  ধ্বনি সম্পর্কে একটা জ্ঞান আহরণ করে।  তো  যার যেমন বিচারবুদ্ধি, সে সেইমতো বুঝে থাকে।  জ্ঞান যা ইন্দ্রিয় দ্বারা অর্জন হয়ে থাকে, তা সীমাবদ্ধ  জ্ঞান।  অর্থাৎ আমাদের ইন্দ্রিয়সকল সীমাবদ্ধ জ্ঞান প্রদান করে থাকে।  আবার  ইন্দ্রিয় বিকল থাকলে, বা আমরা মনোযোগী না হলে, এক শুনতে আর এক শুনি। এক দেখতে আর এক দেখি। যদিও বিজ্ঞানের আবিষ্কার আমাদের এই ব্যাপারে, সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছে, এখন চশমা আমাদের স্পষ্ট দেখতে সাহায্য করছে। দূরদর্শন যন্ত্র, দূরবীক্ষণ যন্ত্র আমাদের দর্শন ও শ্রবণক্রিয়াকে সুদূর প্রসারী করছে। কিন্তু তথাপি একথা সত্য, যে আমাদের ইন্দ্রিয় বা বিজ্ঞান এখনও আমাদেরকে সীমাবদ্ধ করেই রেখেছে। সীমার বাইরে, বা অভ্রান্ত জ্ঞানের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। আর এই কারণেই হাজার হাজার বছর  আগেই, আমাদের মুনিঋষিগন পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের পারে,  মন নামক যে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আছে, তাকে কাজে লাগিয়ে, অর্থাৎ বুদ্ধির মাত্রাকে বৃদ্ধি  করে, জ্ঞানের মধ্যে স্বচ্ছতা, ও সীমানাবৃদ্ধির প্রয়াস করেছেন। 
------------------

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং -৭-৮

"প্রতক্ষ্য অনুমান আগমাঃ প্রমাণানি।"  (০১/৭)

প্রতক্ষ্য করা, অনুমান করা ও আগম অর্থাৎ আপ্তবাক্যে বিশ্বাস করাকেই প্রমান বলা হয়ে থাকে। 

এই শ্লোকে প্রমাণ তিনটে শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। 

১. সাক্ষাৎ অনুভব - আপনি যা নিজের কানে শুনছেন, যা  নিজের চোখে দেখছেন, বা যা কিছু আপনি ইন্দ্রিয় দ্বারা (মন সহ ) প্রতক্ষ্যরূপে অনুভব  করছেন। 
২. অনুমান - আপনি হয়তো দেখছেন বা শুনছেন না, কিন্তু অনুমান করতে পারছেন যে কি ঘটছে, বা ঘটছে চলেছে। 
৩. আগম  - বা আপ্তবাক্য - বিশ্বাসযোগ্য বিশিষ্টজন যা বলছেন, বা বলে গেছেন, বা লিখে গেছেন - তাকে সত্য বলে মেনে নেওয়া। 

সাক্ষাৎ অনুভব - আমরা ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে বাহ্য  বস্তুর সঙ্গে সম্পর্ক  স্থাপন করতে পারি, সরাসরি। সেই সংযোগক্রিয়ার ফলে আমাদের মনের আয়নায় একটা চিত্র ভেসে ওঠে এবং আমাদের চিত্তের মধ্যে একটা বৃত্তির জন্ম দেয়।  মন তখন বুদ্ধির সাহায্যে সেই বিষয়ের বিচার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে আমাদের সেই বিষয় সম্পর্কে প্রতক্ষ্য জ্ঞানের জন্ম হয়। আমরা সেই বিষয় সম্পর্কে একটা নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নিতে পারি। 

অনুমান - অনুমান যোগ্য বিষয়কে প্রতক্ষ্য করে, আমরা প্রতক্ষ্য বিষয়ের পিছনের (অন্তর্নিহিত) জ্ঞান পেতে পারি। দূরে কোথাও ধোঁয়া  দেখে আমরা আগুনের অনুমান করতে পারি।  PM SECURITY লেখা পুলিশের গাড়ি দেখলে আমরা প্রধান মন্ত্রীর আসার সম্ভাবনাকে আমরা অনুমানের সাহায্যে নিশ্চিত হতে পারি। 

আগম - সিদ্ধ পুরুষের দ্বারা দৃষ্ট কোনো বিষয়, আচার্য্য বা গুরুদেবের বলা কোনো বিষয়, যা আমাদের প্রতক্ষ্য হয়নি, তার সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত ধর্ণা করে নিতে পারি। আপনি হয়তো আমেরিকা বা কৈলাশ পর্বতে যান নি, কিন্তু যারা গিয়েছেন, তাদের কাছ থেকে শুনে, বা তাদের লেখা বই পড়ে , আপনি আমেরিকা বা কৈলাশ পর্বত সম্পর্কে একটা প্রাথমিক জ্ঞান পেতে পারেন। 

অর্থাৎ এই তিনটি উপায়ে আমরা পদার্থের জ্ঞান সংগ্রহ করতে পারি।  আর আর এই তিনভাবে পদার্থের জ্ঞান হলে, সেই জ্ঞানকে আমরা সত্য বলে নিজের চিত্তে একটা বৃত্তির জন্ম দিতে পারি। 

দেখুন, ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে বিষয়ের যোগ,  মনের সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের যোগ, আবার জীবাত্মার সাথে মনের যোগ।  তো বিষয়ের প্রতিচ্ছবি, ইন্দ্রিয় দ্বার দিয়ে মনের আয়নায় প্রতিফলিত হচ্ছে, জীবাত্মা এই মনের পিছনে থেকে মনের আয়নায় প্রতিফলিত প্রতিচ্ছবিকে দেখছেন ।  জীবাত্মার সঙ্গে বিষয়ের সরাসরি কোনো যোগাযোগ নেই।  তথাপি এই জীবাত্মাই বিষয়কে ভোগ করছেন । এই জীবাত্মা হচ্ছেন চৈতন্য স্বরূপ। চৈতন্য তাই কখনও  বিষয়কে সরাসরি সাক্ষাৎ দেখতে পান না। শুধু মনের আয়নায় প্রতিবিম্বিত বিশ্বের ছায়াকে দেখতে পান। এই মনরূপ আয়না  মলিন থাকলে, বিশ্বের ছায়ারূপ প্রতিচ্ছবি স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হবে না - চৈতন্য স্বরূপ জীবাত্মার  কাছে।  আবার মনরূপ আয়না  যদি বিষয় সম্পর্ক থেকে সরে যায়, তবে সংসার নিবৃত্তি হবে।   

"বিপর্যয়ো  মিথ্যা জ্ঞানম অতদ্রূপ প্রতিষ্ঠম।" (০১/৮)

বিপর্যয় হলো মিথ্যা জ্ঞান, যা প্রকৃতপক্ষে বস্তুর স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত নয়। 

বিপর্যয় জ্ঞান হচ্ছে, জ্ঞানের বিপরীত অবস্থা - যা সত্য নয়, অথচ সেই মুহূর্তে তা মনের আয়নায় প্রত্যক্ষীভূত হচ্ছে। রজ্জুতে সর্পভ্রম। মরীচিকায় জল দর্শন। ওই মুহূর্তে এই দর্শন অসত্য নয়, কিন্তু প্রত্যক্ষীভূত এই বস্তু প্রকৃতপক্ষে তা নয়, যা আমার মনের আয়নায় প্রতিফলিত হচ্ছে। জলে ঢেউতোলা পুকুরে চাঁদকে একাধিক রূপে দর্শন হচ্ছে।  দেখাটা তো সত্য, কিন্তু বাস্তবে চাঁদ তো একটাই।

এই ভ্রমজ্ঞান বা বিপর্যয় জ্ঞানকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়। অর্থাৎ এই ভ্রমজ্ঞানের এর কারণকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়।  এগুলো হচ্ছে, অবিদ্যা, অস্মিতা, রাগ, দ্বেষ ও অভিনিবেশ। এ সম্পর্কে আমরা ধীরে ধীরে শুনবো। 
----------------

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং - ৯-১০

"শব্দজ্ঞান-অনুপাতী বস্তুশূন্যো বিকল্পঃ ।" (০১/৯)

শব্দ হচ্ছে জ্ঞানের অনুধাবনকারী। বস্তুর অস্তিত্ত্ব যদি না থাকে, তবে সেই শব্দ ভ্রমজ্ঞানের কারন হতে পারে। 

শব্দের সাহায্যে আমরা যে জ্ঞান সংগ্রহ করে থাকি, তা হচ্ছে বিকল্প জ্ঞান। বিকল্প জ্ঞান হচ্ছে বস্তুশূন্য জ্ঞান। যেমন ধরুন, কেউ বললেন, ঈশ্বর চৈতন্য স্বরূপ। শুধু ঈশ্বর বলতে আমাদের বোধে কোনো জ্ঞান আসে না। কিন্তু চৈতন্য বলতে আমাদের মধ্যে একটা বোধের অনুভব আসে। তো ঈশ্বর ও চৈতন্য অভিন্ন সম্পর্কযুক্ত। এখন কথা হচ্ছে, কেউ যদি এতে করে ভাবেন, যে চৈতন্য হচ্ছে ঈশ্বরের গুন্, ব্যাপারটা কিন্তু তেমন নয় - ঈশ্বর ও চৈতন্য অভিন্ন। তাই চৈতন্য স্বরূপ হিসেবে ঈশ্বরকে ভাবাটাই বিকল্প জ্ঞান। এই বিকল্প জ্ঞান হচ্ছে বিকল্পক বৃত্তি জ্ঞান। কিন্তু এই বিকল্প জ্ঞানে ভ্রমের সম্ভাবনা প্রবল। 
ধরুন স্থির পুকুরের জলে চাঁদের ছায়া পড়েছে।  এই যে চাঁদের ছায়া, এটি চাঁদ নয়, কিন্তু চাঁদের অনুরূপ বা  বিকল্প। আবার আমরা যখন আচার্য্য দেবের কাছ থেকে কোনো বিষয়ের জ্ঞান কানে শুনে বোঝার চেষ্টা করি, তা এই বিকল্প জ্ঞান। এখানে আমাদের সামনে সেই আলোচ্য বস্তুর প্রতক্ষ্য দর্শন হয় না, কিন্তু সেই বস্তুর একটা প্রতিচ্ছবি আমাদের সামনে ফুটে ওঠে, অর্থাৎ আমাদের মনের আয়নায় বস্তুর অবয়ব  ফুটে ওঠে। ঠিক তেমনি আমরা যখন শাস্ত্রগ্রন্থ ব্রহ্মসূত্র বই থেকে বা বেদ  বেদান্ত থেকে ব্রহ্মজ্ঞান সংগ্রহ করি, তা এই বিকল্প জ্ঞান। এই বিকল্প জ্ঞান প্রতক্ষ্য জ্ঞান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা না হলেও অবশ্যই আলাদা ।  আর এই বিকল্প জ্ঞান সব সময় অভ্রান্ত নাও হতে পরে। এমনকি যার চিত্তবৃত্তি যেমন তার কাছে এই বিকল্পজ্ঞান সেই ভাবে প্রতিভাত হয়। উপন্যাস পড়া-কালীন আমাদের মানস-চক্ষের সামনে উপন্যাসের চরিত্র ভেসে বেড়ায়, কিন্তু পাঠকের মানসিক চরিত্রভেদে এটি আলাদা আলাদা হতে পারে। তাই  বিকল্প জ্ঞান যা আমরা শব্দের মাধ্যমে গ্রহণ করি, তা আমাদের  অভ্রান্ত জ্ঞান নয়। তো  শব্দ একটা মাধ্যম মাত্র, যার সাহায্যে আমরা এই জ্ঞান সংগ্রহ করে থাকি। তাই ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, শব্দ হচ্ছে জ্ঞানের অনুধাবনকারী, এখানে প্রকৃত বস্তুর উপস্থিতি নেই, তাই এই জ্ঞান আমাদের ভ্রমজ্ঞানের কারন  হতে পারে।

"অভাব প্রত্যয় আলম্বনা বৃত্তিঃ নিদ্রা।" (০১/১০)

অভাবের প্রত্যয়কে অবলম্বন  করে যে বৃত্তি তাকে বলে নিদ্রা। 

এর আগের শ্লোকগুলোতে  আমরা প্রমান, বিপর্যয় ও বিকল্প জ্ঞান সম্পর্কে শুনেছি। এগুলো সবই আমাদের জাগ্রত অবস্থায় ঘটে থাকে। অর্থাৎ কিন্তু না কিছু বস্তু বা বিষয় হচ্ছে  এই জ্ঞানের কর্ম্মক্ষেত্ৰ। এসব আমাদের  জাগ্রত অবস্থায় বৃত্তির যে পরিনাম তা নিয়ে আলোচনা। 

এবার বলছেন, জগতের অভাবাত্মক জ্ঞান - অর্থাৎ যে অবস্থায় আমাদের দৃশ্যমান জগৎ মুছে যায়। তখন বাহ্য বস্তু-জগতের কোনো অস্তিত্ত্ব থাকে না কিন্তু একটা বোধশক্তি তখনও কাজ করে। এরই নাম নিদ্রা । 

যোগশাস্ত্রের ভাষায় ঘুম দুই প্রকার বা ঘুমের দুটো  অবস্থা। একটা হচ্ছে স্বপ্নাবস্থা, আর একটা হচ্ছে সুসুপ্তির অবস্থা। স্বপ্নাবস্থায়  দৃশ্যমান জগতের অনুরূপ একটা জগৎ তখন আমাদের সামনে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, যার বাস্তব ভিত্তি নেই। এই দর্শন আমাদের মানস  চক্ষে হয়ে থাকে। আর একটা অবস্থা হচ্ছে সুসুপ্তির অবস্থা যখন আমাদের সামনে থেকে এই দৃশ্যমান জগৎ, এবং  স্বপের জগৎ দুইই  অদৃশ্য হয়ে থাকে। স্বপ্নাবস্থায় ও সুসুপ্তির অবস্থায় মনের বৃত্তির পরিনাম ক্রিয়া স্তব্ধ থাকলেও, বৃত্তির লোপ সাধন হয় না। এই অবস্থাও  মনের বৃত্তি বিশেষ। 

এখন কথা হচ্ছে, এই গাঢ় নিদ্রা বা সুসুপ্তির সময় আমরা কিছুই জানতে পারি না, এইসময় মন নিষ্ক্রিয়  থাকে, তাহলে এই অবস্থাকে আমরা বৃত্তির মধ্যে ধরছি কেন ? 

আমরা জানি বৃত্তি হচ্ছে মনের পরিনাম, আবর্তন, বিবর্তন।  আমাদের যে শক্তি চিন্তা করে, তাকে বলে চিত্ত, যে শক্তি বিষয়ের মনন করে তাকে বলে মন, আর যে শক্তি বিষয়ের বিচার বিশ্লেষণ করে তাকে বলে বুদ্ধি, যে শক্তি আমিত্ব বোধ জাগিয়ে তোলে, তাকে বলে অহঙ্কার । তো প্রাণ যেমন পাঁচ ভাগে (প্রাণ, অপান ইত্যাদি) ভাগ হয়ে আমাদের শরীরে ক্রিয়া করে, তেমনি মন চার  ভাগে ভাগ হয়ে আমাদের শরীরে ক্রিয়া করে (মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহঙ্কার)। আমাদের মন ক্ষনে ক্ষনে পরিবর্তিত হচ্ছে, বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।  এই যে মন বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, একে  বলে মনের বৃত্তি বা চিত্তবৃত্তি ।  অর্থাৎ মনের মধ্যে প্রতিনিয়ত চিন্তার  পরিবর্তন হচ্ছে। 

যাই হোক, জাগ্রত অবস্থায় আমাদের একরকম বোধ থাকে, স্বপ্নাবস্থায় আমাদের বোধ অন্য মাত্রায় প্রবাহিত হয়, আবার গাঢ় ঘুমে বা সুসুপ্তির অবস্থায় আমাদের মন ভিন্ন মাত্রায় অবস্থান করে। তো বোধশক্তি  কিন্তু আমাদের গাঢ়  ঘুমের অবস্থাতেও হারায় না। গাঢ়  ঘুমের সময় আমরা কিছুই জানতে পারি নাসত্য কিন্তু আমরা যেই আবার জেগে উঠি তখন কিন্তু পূর্বাবস্থার  জ্ঞান ফিরে আসে। তো সুষুপ্তি কালে আমাদের অনুভবশক্তি বা বোধশক্তি  লোপ পায়  না। কেবলমাত্র ভাব বা বস্তুর জ্ঞান লোপ পায়। 

স্বপ্নাবস্থায় আমাদের কর্ম্মেন্দ্রিয় ও জ্ঞানেন্দ্রিয় জড় থাকে। তখন মস্তিষ্কের যে অংশ এই মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহঙ্কারকে পরিচালনা করে, সেই অংশ কিন্তু জড় থাকে না। আর ঠিক এই কারণেই, আমরা ঘুম থেকে জেগে উঠে স্মৃতিচারণ করতে পারি। অর্থাৎ স্বপ্নাবস্থায় যা কিছু ঘটেছিলো, তার স্মৃতি আমাদের মধ্যে থেকে যায়। যোগাচার্য্যগণ বলে থাকেন, জাগ্রত অবস্থায় মন থাকে ত্বগ ইন্দ্রিয়ে (মদন-ইন্দ্রিয়),  স্বপ্নে মন থাকে মেধ্য নাড়ীতে (শঙ্খ, কেতকী, শমী, শ্বেতবচা, মঞ্জুকী ও ব্রাহ্মী নাড়ী)  আর সুসুপ্তিতে থাকে পূরিতৎ (ব্রহ্ম) নাড়ীতে। আমরা যারা সাধারণ মানুষ তাদের গাঢ় ঘুমের অবস্থায় জ্ঞান থাকে না, কিন্তু প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি এই অবস্থাতেও  জ্ঞান হারান না।

যাইহোক, মহর্ষির কথাতে আমরা বুঝলাম, আমাদের নিদ্রা হলো বৃত্তি-জ্ঞান বা প্রত্যয় বিশেষ। নিদ্রাতেও আমাদের অভাবের প্রত্যায়রূপ  বৃত্তি থাকে।  

--------------
 পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং - ১১

"অনুভূতঃ বিষয়ঃ অসম্প্রমোষঃ স্মৃতিঃ ।" (০১/১১)

যা  অনুভূত হয়েছে, এমন বিষয় সম্মন্ধী  বৃত্তির  যথাযথ স্মরণকে বলা হয় স্মৃতি। 

এতক্ষনে আমরা জেনে গেছি, আমাদের পাঁচটি বৃত্তি, সেগুলো হচ্ছে প্রমান, বিপর্যয়, বিকল্পজ্ঞান, নিদ্রা ও স্মৃতি। স্মৃতি হচ্ছে সবশেষ বৃত্তি।  কারন হচ্ছে এই যে স্মৃতি তা আগের চারটি বৃত্তিকে অবলম্বন করেই  হয়ে থাকে।  অর্থাৎ যা কিছু আগে ঘটেছে, অর্থাৎ যে সব ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি, তা আমাদের স্মৃতিতে গেথে গেছে।  অতয়েব, প্রমানজ্ঞান  যেমন আমাদের স্মৃতিতে আসতে  পারে, তেমনি বিপর্যয় জ্ঞান, বিকল্প জ্ঞান, এমনকি নিদ্রার অভিজ্ঞতাও  আমাদের স্মৃতির মধ্যে আসতে  পারে। স্মৃতি আসলে আগে যা  ঘটে গেছে, তার স্মরন। মহাত্মাগণ বলে থাকে স্মৃতি আমাদের বন্ধন  মুক্তির কারন হতে পারে। কারন আমরা আমাদের স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছি, আর এই কারণেই আমরা নিজেদেরকে বদ্ধ ভাবনার মধ্যে বেঁধে রেখেছি। আমরা আমাদের স্বরূপের স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছি। যাত্রাপথে যখন আমরা তন্দ্রাচ্ছন্ন হই, তখন আমাদের যাত্রাপথের দৃশ্য আমাদের মধ্যে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না।  নিদ্রা কালীন সময়ে আমাদের সমস্ত জ্ঞানের অভাব ঘটে। গাঢ় ঘুমে মানুষ শিশুর অবস্থা প্রাপ্ত হয়। কিন্তু স্মৃতিতে আমাদের সব কিছু সঞ্চিত হয়ে থাকে। এই স্মৃতি রূপ বৃত্তি আছে বলেই, মানুষ শিশু থেকে বৃদ্ধ অবস্থা প্রাপ্ত হয়েও সে নিজেকে ভোলে না। আমাদের মনের মনিকোঠায়, জীবনের সমস্ত কিছুই এমনকি জন্ম-জন্মান্তরের কতো কথাই না লিপিবদ্ধ করা আছে। স্মৃতি একটা সংগ্রহশালা। আমাদের যাকিছু অনুভব, যাকিছু অভিজ্ঞতা, সব এই স্মৃতির ভাণ্ডারে জমা হয়ে আছে। এই স্মৃতিই কালের প্রবাহে আমাদের সংস্কার হয়ে যায়।  

আমরা যাকিছু জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করি, এমনকি এই মুহূর্তে আমি যা কিছু অনুভব করছি, তা এই  স্মৃতির ভাণ্ডারে জমা হয়ে চলেছে।  যার মধ্যে এই স্মৃতিরূপ বৃত্তি  প্রখর তাকেই জ্ঞানী পুরুষ বলা হয়ে থাকে।  আমাদের যে জ্ঞান তা আসলে এই স্মৃতির ভাণ্ডারে জমা হয়ে আছে। স্মৃতিকে জাগ্রত করাই  হচ্ছে স্মরণ। আমার আপনার সবার মধ্যে সমস্ত জ্ঞান সংস্কার রূপে সুপ্ত কিন্তু কঠিন হয়ে আছে। 

এই স্মৃতির সমুদ্রে যখন বুদ্বুদ ওঠে তখন তাকে আমরা বলি জ্ঞান। আমরা অনেক সময় বলি, গুরুদেব সর্বজ্ঞ - আসলে আমি আপনি সবাই সর্বজ্ঞ, নতুন করে আমাদের কিছুই জানবার নেই, সবই  আমরা জানি, কিছু সে সব আমরা ভুলে বসে আছি। এই বিস্মৃতির আড়াল সরিয়ে দিলে, যা আমাদের স্মরণে আসে, তাকেই বলে জ্ঞান। গুরুদেব বললেন, তুমিই সেই, তৎ ত্বম অসি।  গুরুদেবের মুখে এই কথা শোনার পরেই, আমাদের  স্মৃতি জেগে ওঠে। আমি তখন নিত্য, শুদ্ধ আত্মা - এই জ্ঞানের প্রকাশ ঘটে আমার মধ্যে ।  তো স্মৃতি যার হারিয়ে গেছে, সেই অভাগা।  সে আর নিজেকে চিনতে পারে না। আমরা সবাই অমৃতের পুত্র - এই স্মৃতি আমরা হারিয়ে বসেছি। গুরুদেব যখন বারংবার একই কথা ব'লে আমার স্মৃতিকে   জাগিয়ে তোলেন, তখন আমাদের ভ্রাম্তজ্ঞান কেটে যায়, আমরা স্বরূপে ফিরে যাই। তো সমস্ত সাধনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এই স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলা। স্মৃতি জেগে উঠলে, ভ্রান্ত দর্শনের অবলুপ্তি ঘটবে। স্মৃতি তাই শেষ বৃত্তি ও চিত্তের পরিনাম বিশেষ। 

এর আগে আমরা  শুনে ছিলাম, যোগ হচ্ছে চিত্ত বৃত্তির  নিরোধ -  "যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ" (২) আর এই অবস্থায় দ্রষ্টা পুরুষের স্বরূপে অবস্থান হয় - "তদা  দ্রষ্টুঃ স্বরুপে অবস্থানম।" (৩) 

তো চিত্তের যে বৃত্তি সকল, সে সম্পর্কে আমরা শুনলাম।  এই বৃত্তি থেকেই জন্ম হয় সংস্কারের। আবার  এই সংস্কার থেকেই  বৃত্তির জন্ম হয়। এইভাবে বৃত্তি ও সংস্কারের চাকা ঘুরছে। বৃত্তি থেকে সংস্কার, আবার সংস্কার থেকে বৃত্তি। সংস্কার থাকে আমাদের মনের গভীরে, আর বৃত্তি থাকে মনের  উপরিদেশে। কঠিন বস্তু  থাকে নদীর  গভীরে, আর বুদ্বুদ থাকে নদীর  উপরিভাগে।  আমাদের মনের যে সংস্কার আছে, তা বৃত্তিরূপ  বুদ্বুদ আকারে উপরে উঠে, ক্রিয়া  করছে, আবার সংস্কার হয়ে গভীরে প্রবেশ করছে।  চক্রাকারে এই খেলা চলছে নিরন্তর। আমাদের এখান থেকে বেরুতে হবে। 
------------

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং - ১২-১৪

"অভ্যাস-বৈরাগ্যভ্যাং তন্নিরোধঃ ।" - (০১/১২)

অভ্যাস ও বৈরাগ্যের সাহায্যে (বৃত্তির) নিরোধ হবে। 

চিত্তবৃত্তি নিরোধের নাম যোগ। আর চিত্ত বৃত্তি পাঁচ প্রকার।  এই পাঁচটি চিত্তবৃত্তিকে নিরোধ করতে গেলে আমাদের অভ্যাস ও বৈরাগ্যের সাহায্য নিতে হবে। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণও অর্জ্জুনকে (গীতা- ৬/৩৬) বলেছিলে, যার মন অসংযত তার পক্ষে যোগ দুষ্প্রাপ্য। 

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ (গীতা-৬/৩৫) বলছেন, "অভ্যাসেন তু  কৌন্তেয় বৈরাগ্যেণ চ গৃহ্যতে" - হে কৌন্তেয় অভ্যাস ও বৈরাগ্যের দ্বারা মনকে বশীভূত করা যায়। 

এই একই কথার প্রতিধ্বনি পাই আমরা ঋষি পতঞ্জলির শ্রীমুখে। মন চঞ্চল এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। 
তো যোগ সাধনার প্রথম দুটো সোপান হচ্ছে অভ্যাস ও বৈরাগ্য। একটাকে ধরে রাখতে হবে, আর একটা ছেড়ে দিতে হবে।  চিত্তকে  সংযত করবার অভ্যাসকে ধরে রাখতে হবে, আর বিষয়ের প্রতি যে আসক্তি তাকে  ছেড়ে দিতে হবে। এখন কথা হচ্ছে অভ্যাস কাকে বলে ? 

"তত্র স্থিতৌ যত্নঃ অভ্যাসঃ।" (০১/১৩) 

তত্র অর্থাৎ বৃত্তিগুলোকে স্থির করে রাখা বা বশে  রাখবার যে নিরন্তর চেষ্টা তাকে বলে অভ্যাস। 

স্থিতির জন্য যে যত্ন তাকে বলে অভ্যাস। চিত্ত একটা প্রবাহমান নদী। নদী সর্বদা গতিশীল।  বয়ে যাওয়াই তার স্বাভাবিক ধর্ম্ম। নদী যেমন গতিশূন্য থাকতে পারে না, তেমনি চিত্ত কখনও  স্থির হয়ে, চিন্তাশূন্য হয়ে থাকতে পারে না। এখন কথা হচ্ছে নদীর প্রবাহ থাকবে, কিন্তু তাকে উঠল-পাতাল হতে দেওয়া যাবে না। তেমনি মনের মধ্যে চিন্তার প্রবাহ থাকবে, কিন্তু তাকে উতলা হতে দেওয়া যাবে না। ঋষি ব্যাসদেব, বলছেন, নদীর  মতো চিত্তের মধ্যে প্রবাহ থাকবে।  কারন প্রবাহমানতাই তার ধর্ম্ম, এটি তার স্বাভাবিক স্বভাব। স্থির করবার কথার অর্থ হচ্ছে তাকে অশান্ত হতে না দেওয়া। তাকে প্রশান্ত রূপে বইতে সাহায্য করা। নদিকে উতলা করে বাইরের বাতাস। এই বাতাস থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলে, নদী প্রশান্ত ভাবে বইতে পারে।  তেমনি চিত্তের পারিনামরূপ তরঙ্গকে থামিয়ে, বিষয়ের আসক্তি থেকে বাঁচিয়ে,   চিত্তকে  শান্তভাবে বইতে সাহায্য করো। এর জন্য যত্নশীল হও। নিজের সর্বশক্তি দিয়ে, উৎসাহ-উদ্দোম  দিয়ে অশান্ত চিত্তকে  শান্ত করবার জন্য নিরন্তর প্রয়াস করো।  একেই বলে অভ্যাস। 

নির্ম্মল আকাশে যেমন মেঘ আসে আবার উড়ে যায়, আকাশ স্থির থাকে। আমাদের হৃদয়-আকাশেও ভালো-মন্দ চিন্তার মেঘ আসে, সবকিছু উথাল-পাতাল  করে দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবার একদিন শান্ত হয়ে আসে। শান্ত, বোধশূন্য  চিত্ত বেশ চলছিল, কিন্তু কখোন  যে মনের মধ্যে ক্লেশকর বৃত্তি ঢুকে মনকে কষ্টের মধ্যে ফেলে দেয়  আমাদের, তা আমরা ধরতে পড়ি না।  এখান থেকে বেরুনো সহজসাধ্য নয়। কিন্তু বেরুতে তো হবেই, তা না হলে যোগক্রিয়া সফল হবে কি করে ? 

"স তু দীর্ঘকাল-নৈরন্তর্য-সৎকার-আসেবিতঃ দৃঢ়ভূমিঃ। "(০১/১৪) 

সেই অভ্যাস  দীর্ঘকাল ধরে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে  নিয়ত চেষ্টা করলে তার ভূমি দৃঢ় হবে। 

চিত্তবৃত্তিকে নিরোধ করার  জন্য দরকার নিরন্তর নিরবিচ্ছিন্ন অভ্যাস।  পরম আদর, নিষ্ঠার সঙ্গে অভ্যাস। কতকালের অশান্ত এই মন, ঘুরে ঘুরে আনন্দের সন্ধান করছে। কখনো তেতো, কখনো কষা, কখনো টক, কখনো বা মিষ্টি আহরণ করছে। তাকে স্থিতির অবস্থায় আনতে  গেলেও আমাদের দীর্ঘকাল নিরন্তর ঐকান্তিকতার সঙ্গে অভ্যাস করতে হবে। একদিনের জন্যও বিরতি দেওয়া চলবে না। তিনটে জিনিস এর জন্য প্রয়োজন, ১. দীর্ঘকালের অভ্যাস, ২. নিরবিচ্ছিন্ন অভ্যাস ৩. অভ্যাসে আন্তরিক ও যত্নশীল হওয়া। হার মানা  চলবে না কিছুতেই। যোগক্রিয়ায় ধৈর্য্য ভীষণ দরকার। হচ্ছে না ভাবলে   না, "হবেই" - এই দৃঢ় প্রত্যয় ও সদর্থক ভাবনা থাকলে  একদিন না একদিন অবশ্যই হবে। 
-----------

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং - ১৫-১৬

"দৃষ্ট-আনুশ্রবিক-বিষয়-বিতৃষ্ণস্য বশিকার সংজ্ঞা বৈরাগ্যম। " (০১/১৫)

দৃষ্ট (যা দেখা যাচ্ছে)  এবং আনুশ্রবিক, (যা শোনা যাচ্ছে)  অর্থাৎ ইহলোক ও পরলোক বা স্বর্গাদি বিষয়গুলো সন্মন্ধে যার তৃষ্ণা দূর হয়েছে, এমন সাধকের বশিকার সংজ্ঞক বৈরাগ্য উৎপন্ন হয়েছে। 

আগে শুনেছি, অভ্যাসের কথা, এখন শুনছি বৈরাগ্যের কথা।  আসলে যোগ সাধনায় অভ্যাসের সাথে অভিন্ন ভাবে যুক্ত হয়ে আছে বৈরাগ্য।  বৈরাগ্য ও অভ্যাস একই সাথে চলতে থাকে। মনকে গুটিয়ে কেন্দ্রীভূত করতে হবে। এখন কথা হচ্ছে,  মনকে গুটিয়ে কেন্দ্রীভূত করতে  হবে,  এই কেন্দ্র ব্যাপারটা কি ? কেন্দ্র হচ্ছে স্বরূপ। 

এখন এই স্বরূপ সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা  নেই।  তাই আমাদের প্রথমে আচার্য্য বা গুরুদেবের কাছে আত্মসমর্পন করতে হবে। ধীরে ধীরে গুরুকেন্দ্রিক ভগবত সত্ত্বায় মনকে কেন্দ্রীভূত করতে হবে। তখন যা কিছু করছেন, তা যেন গুরু সমর্পিত হয়। গুরুদেবের ইচ্ছেয়, গুরুবাক্য অনুসারে হয়।  গুরুদেবের সন্তুষ্টির জন্য গুরুসেবা করতে হবে । গুরুদেবের সন্তুষ্টি বা গুরুসেবা মানে এই নয়, যে গুরুদেবের পা টিপে দিতে হবে, বা গুরুদেবকে মূল্যবান সামগ্রী দান  করতে হবে। গুরুদেবের নির্দেশের যথাযথ পালনই গুরুসেবা, গুরুসন্তুষ্টি। 

গীতায় যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই একই কথা বলছেন অর্জ্জুনকে - হে কৌন্তেয়, যা কিছু করো, দান  করো বা গ্রহণ করো, অর্থাৎ ভোজন বা আহুতি, হোম করো বা তপস্যা করো, সমস্ত কিছুই আমাতে সমর্পন করো। তাহলে তুমি কর্ম্ম বন্ধন থেকে মুক্ত হবে। অর্থাৎ ভগবানকে  ঘিরে তোমার সমস্ত কর্ম্ম আবর্তিত হোক। 

কেউ প্রার্থনা করছেন, কেউ নামাজ পড়ছেন, কেউ পুজোপাঠ করছেন, বা উপাসনা করছেন। এই সমস্ত কিছুর উদ্দেশ্য হোক পরমেশ্বর। যোগদর্শনের ব্যসভাষ্যে বলা হয়েছে, বৈরাগ্য চার প্রকার - যতমান, ব্যতিরেক , একেন্দ্রিয় ও বশীকার। 

যতমান - যে ইন্দ্রিয়ক্রিয়ার ফলে রাগ দ্বেষ ঘৃণা, ইত্যাদি চিত্তের যে মলিন ভাব উৎপন্ন হয়, তা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে।    

ব্যতিরেক - কোন বিষয় থেকে ইন্দ্রিসকলকে নিবৃত্ত রাখতে হবে, আর কোনটাতেই বা যুক্ত করতে হবে, সেই বিচার করে বৈরাগ্যপ্রবণ হতে হবে। 

একেন্দ্রিয় - মন বিষয়ে আসক্ত হবে, আবার সেই আসক্তিকে  মনের মধ্যেই লয় করে দিতে হবে। কিন্তু মন যখন বিশেষ কেন্দ্রীভূত থাকবে, তখন ইন্দ্রিয়সকল নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে।  

বশীকার - মনকে ইন্দ্রিয় থেকে গুটিয়ে আনতে  হবে। ইন্দ্রিয় তার নিজের কাজ করবে, চোখ দেখবে, কান শুনবে, কিন্তু যদি মন ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে সম্মন্ধ ছিন্ন করে, তবে চোখ দেখেও  দেখবে না, কান শুনেও শুনবে না। 

"তৎপরং পুরুষখ্যাতেঃ গুনবৈতৃষ্ণ্যম ।"  (০১/১৬) 

তার পরে, অর্থাৎ পুরুষ ও প্রকৃতির ভেদজ্ঞান জেগে উঠলে, পুরুষের গুনগুলোতে ও জড় প্রকৃতির বিষয়গুলোতে আসক্তির অভাব হেতু  পরম-বৈরাগ্য লাভ হয়।  

দৃষ্টবস্তু ও অদৃষ্টবস্তু  অর্থাৎ ইহলোক ও পরলোক বিষয়গুলোতে বিরক্ত  ও দোষ  দর্শনকারী যোগী পুরুষের মধ্যে অভ্যাস বশতঃ  চিত্ত শুদ্ধি হয়, ও দর্শনের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পায়। পুরুষখ্যাতেঃ কথাটার  অর্থ হচ্ছে স্বরূপে অবস্থান বা আত্মদর্শন। 

দেখুন বৈরাগ্য  হচ্ছে বিষয়ে বিরক্তির ভাব। আমরা যদি কারুর সঙ্গ  ছাড়তে চাই, তবে তার সম্পর্কে আমাদের মধ্যে বিরক্তির ভাব আনতে  হয়।    আপনি নেশা ছাড়তে চান, তবে নেশার খারাপ দিকগুলো নিয়ে বারংবার চর্চ্চা করতে থাকুন। একটা সময় দেখবেন, নিজের মন থেকে নেশা চলে গেছে।  কেননা নেশার কথা মনের মধ্যে এলেই তার অশুভ বা খারাপ দিকগুলোর কথা ভেবে,  মনের মধ্যে একটা বিরক্তির ভাব জেগে উঠবে, মন নেশা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেবে। এই যে নেশার গুনাগুন বিচার একেই বলে ব্যতিরেক। এর পরের ভাবটি হচ্ছে, মনের মধ্যে  তো নেশার কথা আসবে, বিশেষ করে যখন আপনি দেখবেন, আপনার  বন্ধুরা নেশা করছে   . তখন আপনার মনে নেশার কথা ফিরে ফিরে আসবে। মনের মধ্যে একটা লোভ তৈরী হবে, যেন ঠিক আছে, মাত্র একবার, কতদিন নেশা করিনি । এর পরে আর করবো না। একটা কথা জানবেন, once smok always smok . এই যে একটা তৃষ্ণার ভাব একে এড়িয়ে যাওয়া সহজ নয়।  বারবার করে মনে হবে একটা কথা,  সেবার নেশা করে কি মজাই না পেয়েছিলাম। জিভে বা মনের মধ্যে পুরানো আস্বাদের কথা বা মনের স্ফুর্তির কথা ভেসে উঠবে। অর্থাৎ তখনও মনের অন্তঃস্থলে তৃষ্ণা বাসা বেঁধে আছে। এই অবস্থাকে বলে একেন্দ্রিয়। এই যে তৃষ্ণা তা যাবে কি করে ? যখন নেশা না করার সুবিধা গুলো নিয়ে ভাবতে থাকবেন, তখন নেশা  না করার মধ্যে একটা আনন্দ খুঁজে পাবেন, অর্থাৎ একজনকে ছেড়ে শ্রেষ্ঠ আরেকজনকে ধরতে পারবেন, তখন পুরানো দিনের কথা ভুলতে শুরু করবেন। 
যখন জড় থেকে চেতন  ধরতে পারবেন তখন জড়ের দিকে আর নজর যাবে না।  মাটির পুতুল ছেড়ে যখন জ্যান্ত পুতুল পাবেন, তখন আর মাটির পুতুলের প্রতি আকর্ষণ থাকবে না। জড় প্রকৃতি থেকে যখন চৈতন্য পুরুষের সাক্ষাৎ পাবেন তখন সব তৃষ্ণা মিটে  যাবে। 
তাই ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, "তৎপরং পুরুষখ্যাতেঃ গুনবৈতৃষ্ণ্যম ।" - সবশেষে সেই পরম-পুরুষের সাক্ষাৎ পেলে, সব তৃষ্ণা মিটে  যাবে।

---------------- 

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং - ১৭-১৮

"বিতর্ক-বিচার-আনন্দ-অস্মিতারূপ-অনুগমাৎ সম্প্রজ্ঞাতঃ। " (০১/১৭) 

 বিতর্ক, বিচার, আনন্দ ও অস্মিতারূপে তাদের অনুগত  হেতু যে সমাধি, তা হলো সম্প্রজ্ঞাত সমাধি। 

 অভ্যাস ও বৈরাগ্যের দ্বারা সাধক যখন চিত্তের একাগ্রভূমিতে অবতীর্ন হন তখন  সমস্ত ক্লেশের দশা  প্রাপ্ত হয়ে যে সমাধির অধিকারী হন, তাকে বলে সম্প্রজ্ঞাত সমাধি। 

সম্প্রজ্ঞাত  কথাটার অর্থ সম্যক রূপে জ্ঞাত হওয়া। এক   বিষয়ে মনোনিবেশ হচ্ছে একাগ্রতা,  একাগ্রতা বদ্ধমূল হলে হয় ধারণা, ধারণা  বদ্ধমূল হলে হয় ধ্যান, ধ্যান যখন গাঢ় হয় তাকে বলে সমাধি। এই সমাধির অবস্থায়, কেবল মাত্র ধ্যেয় বস্তুর আভাস  থাকে, অহং জ্ঞান থাকে না। যদিও অহংজ্ঞান সহজে  যায় না। 

প্রথমে বিতর্ক, তারপর বিচার, তারপরে আনন্দ। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে। আমরা জানি শব্দ নিজে অর্থহীন। যদি আমার চিত্তে তার কোনো অর্থ আগে থেকে ধরা থাকে, তবেই তা অর্থবহ হয়।  যেমন ধরুন  গরু  একটি শব্দ এটি যখন দেখলেন, বা শুনলেন, তখন নাম ও রূপাদি যোগে একক ভাবে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু  অর্থাৎ স্থূল রূপে আপনার ইন্দ্রিয় (চক্ষু) গ্রাহ্য   বিষয়ক একটা জ্ঞান হলো।  এই যে প্রজ্ঞা অর্থাৎ জ্ঞাতব্য বিষয়কে আশেপাশের সমস্ত কিছু থেকে  বিচ্ছিন্ন করে, যে জ্ঞানের সঞ্চার হলো, তা আমাদের  ইন্দ্রিয়-উপলব্ধ-জ্ঞান।  অর্থাৎ কর্ন ইন্দ্রিয় দ্বারা শুনে চক্ষু ইন্দ্রিয় দ্বারা দেখে চিত্ত বৃত্তিতে গরু   সম্পর্কে একটা ধারণা হলো। ঠিক তেমনি ধরুন "ওম" একটা ঈশ্বরবাচক শব্দ। এটি বস্তুশূন্য।  কিন্তু এটি আপনার চিন্তাময় জ্ঞান। এই দুটিই বিতর্ক। অর্থাৎ বিচারের সাহায্যে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। একটা হচ্ছে, শব্দের সাহায্যে কোনো স্থূল  বস্তুকে চিহ্নিত করা।  আর একটা হচ্ছে শব্দের সাহায্যে বস্তুর সূক্ষ্ম অবস্থা অর্থাৎ তন্মাত্রকে চিহ্নিত করা,  এবং  শব্দের সঙ্গে সঙ্গে মানস চক্ষে দর্শন করা।  এই অবস্থায় অহং বর্ত্তমান থাকে। অর্থাৎ কেউ একজনজন জানছে, বা দেখছে।  তো প্রজ্ঞার সাহায্যে  জ্ঞাত হচ্ছেন, তাই সম্প্রজ্ঞাত । 

তো বিতর্ক যেমন স্থূল বিষয়ক সমাধিপ্রজ্ঞা  যা প্রজ্ঞার সাহায্যে জ্ঞাত হয়েছে, তেমনি বিচার হচ্ছে সূক্ষ্ম বিষয়ক  সমাধিপ্রজ্ঞা। উভয়ই প্রজ্ঞার সাহায্যে জ্ঞাত হয়েছে।  এই সূক্ষ্ম বিষয় হচ্ছে তন্মাত্র।  অর্থাৎ শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ এগুলো হচ্ছে পঞ্চভূত অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোমের তন্মাত্র বিশেষ। এই যে তন্মাত্র বা সূক্ষ্ম বিষয় কিন্তু স্থূল পঞ্চভূত থেকে আলাদা নয়।  এই  তন্মাত্রকে লক্ষ করে যখন চিত্তের একতানতা হয়, তখন সমাধি হয়। এই যে সমাধি এটি হচ্ছে আমাদের সঙ্কল্পজনিত বস্তুর বা ধ্যেয় বস্তুর উপলব্ধি। এখানে স্থূল ভূতের অনুবস্থিতি থাকলেও, অনুভবে বিচারের সাহায্যে স্থূল বস্তুর সূক্ষ্ম  জ্ঞান হচ্ছে। একেই বলে সম্প্রজ্ঞাত সমাধি। এখানে শব্দ অর্থাৎ তন্মাত্র বিচারের দ্বারা স্থূলের সূক্ষ্ম অবস্থাকে জ্ঞাত হওয়া যায়। 

এখন কথা হচ্ছে আমরা সবাই আনন্দের সন্ধানে ঘুরছি। এই আনন্দ আর কিছুই নয়, আমাদের চিত্তের স্থির অবস্থা বিশেষ হচ্ছে আনন্দ। আমরা জানি, মন, দশ ইন্দ্রিয়, এবং প্রাণের আশ্রয়স্থল হচ্ছে এই স্থূল শরীর। সুতরাং চিত্তের স্থির অবস্থায় যে আনন্দ তা আমাদের সমস্ত শরীরব্যাপী অনুভূত হয়। আর এই আনন্দ বিতর্ক বা বিচারহীন হয়ে থাকে। শুধু চিত্তের স্থিরতায়, বা বলা যে যেতে পারে, চিত্তের মধ্যে যখন সাত্ত্বিক গুনের প্রভাব বাড়ে, তখন চিত্ত স্থির হয়ে এই আনন্দের প্রবাহ আমাদের সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে দেয়।  তো বলা  যেতে পারে, আনন্দ হচ্ছে আমাদের সত্ত্বগুণ বিশিষ্ট চিত্তের স্থির অবস্থা মাত্র।  

এই শ্লোকে আরো একটা বলা হচ্ছে, তা হচ্ছে "অস্মিতা". আমরা যতক্ষন আমিত্বের আশ্রয় নিয়ে ধ্যানস্থ থাকি, আর তখন যে আনন্দের অনুভূতি হয়, তা  এই অস্মিতাকে আশ্রয় করে অনুভূত হয়ে থাকে। অর্থাৎ আমি ধ্যান করছি, আমার আনন্দ হচ্ছে, এই অনুভূতি  প্রবল থাকে।  আসলে আমাদের ইন্দ্রিয়শক্তির পিছনে যে মন আর মনের পিছনে যে চেতনশক্তি এর মধ্যে  একটা  একতানতা বিরাজ করে।  এই অবিচ্ছিন্ন একতানতাই অস্মিতা বা "আমি" ভাব।  এইজন্য বলা হয়, সম্প্রজ্ঞাত সমাধি হচ্ছে অবলম্বনযুক্ত  অর্থাৎ এর সঙ্গে "আমি" বা অহং জড়িয়ে আছে। 

এখন কথা হচ্ছে, তাহলে কি আর কোনো সমাধি আছে , যা সম্প্রজ্ঞাত নয় ? যেখানে আমির উপস্থিতি নেই ? আর এই সমাধির অবস্থা যাকে  ঋষি অসম্প্রজ্ঞাত (সম্প্রজ্ঞাত  নয়) সমাধি বলছেন, তা প্রাপ্তির উপায় কি ?

"বিরাম-প্রত্যয়-অভ্যাসপূর্বঃ সংস্কার শেষঃ অন্যঃ। " (০১/১৮)

বিরাম-এর প্রত্যয়, বারংবার অভ্যাসের দ্বারা সংস্কারের নাশ হলে অন্য সমাধি (অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি ) হয়। 

বিরাম বলতে আমরা বুঝি বিশ্রাম। অর্থাৎ সমস্ত চিত্তবৃত্তিকে গুটিয়ে আনা। প্রত্যয় অর্থাৎ দৃঢ়তার সাথে সমস্ত চিত্তবৃত্তিকে গুটিয়ে আনার অভ্যাসের নিরবিচ্ছিন্নতার কারনে সংস্কারের শোধন হয়।  এখন সংস্কার বলতে আমরা কি বুঝি ? সংস্কার হচ্ছে পূর্বপূর্ব সঞ্চিত অভিজ্ঞতা যা আমাদের স্মৃতির পাতায় সংরক্ষিত হয়ে আছে। এখন সমস্ত চিত্তবৃত্তি যখন নিরোধ হয়, তখন সংস্কারের শোধন হয়। অর্থাৎ পুরোনো সংস্কারের উপরে নতুন সংস্কারের প্রলেপ পড়ে। পুরোনো সংস্কারের শোধন হয়, বা চাপা পড়ে। 

ধরুন আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে, গরুর রং কালো, সাদা, বা লাল হয়ে থাকে। এটি আমাদের অভিজ্ঞতা লব্ধ  জ্ঞান। এখন কোথাও আপনি হলুদ বা সবুজ রঙের গরু দেখলেন, তখন আপনার পূর্বলব্ধ জ্ঞানের মধ্যে একটা সংযোজন হলো, আর তা হচ্ছে গরুর রং লাল-সাদা-কালো-সবুজ-হলদে ইত্যাদি হতে পারে। তো পুরোনো জ্ঞানের উপরে আমাদের নতুন জ্ঞানের সংযোজনের ফলে নতুন সংস্কারের জন্ম হলো, আর পুরোনো জ্ঞান চাপা পড়ে  গেলো।  এখন আপনি লক্ষ্ম করলেন, সমস্ত গরুর দুধ সাদা, সমস্ত গরু একই শব্দে ডাকে, ইত্যাদি ইত্যাদি। তো সমস্ত গরুর মধ্যে আপনি যেমন একসময় ভিন্নতা উপলব্ধি করছিলেন, (রঙের কারনে) সেখান থেকে আপনার জ্ঞানের মধ্যে গরুর মধ্যে ভিন্নতার লোপ হলো।  তো আগের জ্ঞানের লোপ হলো, বা হলো না, কিন্তু  নতুন জ্ঞানের সঞ্চার হলো। এই যে পুরোনো জ্ঞানের লোপ সাধন একেই   বলা হয়, বৈরাগ্য।  অর্থাৎ বিষয়জ্ঞানের বিরাগ সাধন।   

আসলে জ্ঞানক্রিয়া  সংগঠিত হতে গেলে, প্রাথমিক ভাবে তিনটে জিনিষের অস্তিত্ত্বের আভাস   মেলে,  তা হচ্ছে, জ্ঞাতা, জ্ঞেয়, জ্ঞান। সমাধি হচ্ছে একটা জ্ঞানক্রিয়া  বিশেষ।  জ্ঞান সংগ্রহ করতে আমরা আচার্য্যের কথা শুনি,  বই পড়ি, ভ্রমন করি, তেমনি সমাধি হচ্ছে জ্ঞান লাভের  প্রক্রিয়া বিশেষ। পার্থক্য হচ্ছে, সমাধির উচ্চ পর্য্যায়ে এসে, এই তিন (জ্ঞাতা, জ্ঞেয়, জ্ঞান) এক হয়ে যায়। তখন কোনো ভিন্নতা থাকে না। 
--------------

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং - ১৯-২০

"ভব-প্রত্যয়ো বিদেহ-প্রকৃতিলয়ানাম। " - (০১/১৯) 
 ভবপ্রত্যয় অর্থাৎ  যার ভবের জ্ঞান হয়েছে। অর্থাৎ যিনি জন্ম গ্রহণ করেছেন। আর যিনি বিদেহ অর্থাৎ যিনি প্রকৃতির মধ্যে লয় হয়ে আছেন। 

সংস্কার হেতু বিদেহ  ও প্রকৃতি-লিনদের  জন্ম হয়ে থাকে । বিদেহী  অর্থাৎ দেবতাগণ, আর  দেহী  অর্থাৎ যিনি দেহে স্থির হয়ে আছেন। এই দুইয়েরই জন্ম  সংস্কারহেতু হয়ে থাকে। জীব মাত্রেই ত্রিস্তর বিশিষ্ঠ। স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারন। এই তিনটি স্তরই  প্রকৃতি থেকে জাত , আবার প্রকৃতিতেই  বিলীন হয়ে যায়। 

"শ্রদ্ধা বীর্য স্মৃতি সমাধি প্রজ্ঞা পূর্বক ইতরেষাম ।" - (০১/২০)

শ্রদ্ধা, বীর্য্য, স্মৃতি, সমাধি ও প্রজ্ঞা - ইত্যাদি দ্বারা নির্বীজ সমাধি লাভ হয়। 

শ্রদ্ধা : শ্রৎ +  ধা  + অ  = ভক্তিকে ধারণ করা। মনের নির্ম্মলতা থেকে যে প্রসন্ন ভাবের উদয় হয়, তাকে বলে শ্রদ্ধা।  মন যখন নির্ম্মল হয়, তখন তা স্বচ্ছ হয়ে অন্তরের  অন্তঃস্থল পর্য্যন্ত প্রতীয়মান হয়।  পুকুরের জল যেমন স্থির ও স্বচ্ছ হলে, পুকুরের জলের গভীরের দৃশ্য সহজেই নজরে আসে, তেমনি পরাভক্তির কারনে, মন যখন স্বচ্ছ হয়, তখন যে ভাবের উদয় হয়, তাকে বলে শ্রদ্ধা। আর শ্রদ্ধার কারনে সাধক অন্তরের  গহীনে যে সত্য আছে, তাকে ধরতে পারে। ভক্তির পথেই  হোক, আর জ্ঞানের পথেই  হোক, মন যখন নির্ম্মল হয়, স্বচ্ছ হয়, তখন সত্য বুদ্বুদের আকারে স্ফূরিত হতে থাকে। একটা মানুষের প্রতি,  কোনো বিষয়ের  প্রতি, বা কোনো অপার্থিব কল্পনার প্রতি যখন, শ্রদ্ধা জাগে, তখন সেই বিষয়ের অন্তঃস্থিত জ্ঞান ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।  দেখুন, আমরা বলে থাকি বিশ্বাস হচ্ছে অন্ধ - যা সত্যকে লুকিয়ে রাখে।  কিন্তু সত্য হচ্ছে বিশ্বাসকে যখন কেউ বুদ্ধি দিয়ে বিচার করতে  চায়, তখনই তার আচরণ অন্ধের মতো হয়। বিশ্বাস আসলে চক্ষুষ্মান, বিশ্বাস আসলে অন্তরেন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধ জ্ঞান। বুদ্ধি আমাদের ভাসমান বস্তুর বিচার করে থাকে।  কিন্তু শ্রদ্ধা অন্তরের  গভীরের বস্তুকে বিচার করতে পারে। এই যে অন্তরের  বস্তু, গভীরের বস্তু, এর উপলব্ধি করবার সামর্থ অৰ্জন করার নামই  সাধনা, যোগসাধনা ।  তো চিত্তকে স্থির করা, একাগ্র করা,  বোধ শক্তিকে সূক্ষ্ম করা, অর্থাৎ প্রজ্ঞার দ্বারা সত্যকে অনুধাবন করার জন্য প্রথমে দরকার শ্রদ্ধা। এই শ্রদ্ধা, বিশ্বাস একসময় অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলে। 
 
বীর্য্য : এই শ্রদ্ধা থেকে আসে, বীর্য।  অর্থাৎ সাধকের মধ্যে যখন অসীম উৎসাহ, উদ্দীপনার বৃদ্ধি  হতে থাকে, তখন চিত্তের নানান স্তরের উন্মেষ ঘটতে থাকে।  শ্রদ্ধা যার প্রবল, তার মধ্যে এই উৎসাহ, উদ্দীপনা, অর্থাৎ সংবেগ তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। দৃঢ় সংকল্প নিয়ে অর্থাৎ লক্ষ্যে  পৌঁছতে গিয়ে দেহকে বা জীবনকে সে বাজি রেখে বসে। জীবন বা মৃত্যু তখন তার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়, কেবল, লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়াই  তাঁর  ধ্যান জ্ঞান হয়ে যায়।
  
স্মৃতি : এই বীর্য থেকে দেখা যায় স্মৃতি। বীর্য্যই চিত্তকে  নিরন্তর স্মরণ মনন করতে সাহায্য করে। আর এই স্মরণ মনন, তাকে অভিজ্ঞার সম্মুখীন করে, স্মৃতিপটে চিত্র ফুটিয়ে তোলে। আর এই স্মৃতি তাকে পাগলের মতো দৌড় করায়। ক্ষনিকের জন্য বিস্মৃতি সাধককে ব্যাকুল করে তোলে। 
 
সমাধি : এই স্মৃতি তখন তাকে সমাধির ভূমিতে নিয়ে যায়। এইসময় চিত্তের চিন্তার সঙ্গে সাধক নিজেকে একাকার করে ফেলে। এই স্মৃতির কারনে সমস্ত গ্রন্থির বিমোচন ঘটে। আর এই গ্রন্থি বিমোচনে, স্মৃতি আচ্ছন্ন হয়ে ঘোরের জগতে নিয়ে যায় সাধককে। এই সময় গ্রন্থিসকল যেন গতিহীন নদীর  মতো হয়ে যায়।  গ্রন্থির মধ্যে যে গতি জীবনের আভাস  জাগিয়ে রেখেছিলো, তাকে সে রুদ্ধ করে দেয়।  অর্থাৎ জীবনের যে গতি, প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলছিল, তা যেন থমকে যায়। আর বেঁচে থাকে কেবল চৈতন্য। একটা উচ্চতর বোধশক্তি মাত্র। 
  
প্রজ্ঞা : এই যে উচ্চতর বোধশক্তি, বা সূক্ষ্মতম বোধশক্তি একেই বলে প্রজ্ঞা। এই প্রজ্ঞা বা উচ্চতর বোধশক্তি সাধনার ফল, যাকে  বলা হয় সমাধি। তো সাধনার আরম্ভ শ্রদ্ধা দিয়ে, আর শেষ প্রজ্ঞায় স্থিত হয়ে। তো প্রজ্ঞা লাভ করতে গেলে, আমাদের সমাধিবান হতে হবে, সাধনা করতে হবে । 
----------

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং - ২১-২২

"তীব্র সংবেগানাম আসন্নঃ। "(০১/২১) 

তীব্র সংবেগশালী ব্যক্তিদের (সমাধি) আসন্ন। 

সংবেগ হচ্ছে মনের একটা বিশেষ বৃত্তি, যা মানুষকে সাধনার পথে এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রবনতাকে প্রবল করে থাকে। আসলে সংস্কার যেমন মানুষকে দিয়ে নানান কাজ করিয়ে নেয়, তেমনি সংবেগ সাধন-জগতের কাজ করিয়ে নেবার ক্ষমতা রাখে। সাধনার ক্রিয়াকৌশলের অনুশীলন, বৈরাগ্যের প্রতি আকর্ষণ ইত্যাদি এই সংবেগের কারনে হয়ে থাকে। এই সংবেগ যার যত  তীব্র হয়ে ওঠে, তার সমাধি তত আসন্ন বলে ঋষি  পতঞ্জলি যোগীপুরুষদের আশ্বাস দিচ্ছেন।  

"মৃদু-মধ্য-অধিমাত্র-ত্বাৎ ততঃ-অপি বিশেষঃ। " (০১/২২) 

এই সংবেগের প্রকাশভেদ  অর্থাৎ মৃদু, মাঝারি, বা অধিক মাত্রার কারনে সমাধির মধ্যেও  বিশেষ বিশেষ ভাব হয়ে থাকে। 

অধিমাত্র ত্বাৎ কথাটার অর্থ হচ্ছে, যার মধ্যে অধিক মাত্রায় শ্রদ্ধা, বীর্য, স্মৃতি, সমাধি প্রজ্ঞা ইত্যাদি দেখা দিয়েছে।  এই অধিক মাত্রায় সংবেগের কারনেসাধকের মধ্যে  বৈরাগ্যের তীব্রতা দেখা যায়। আর এর ফলে যোগীর মধ্যে নির্বীজ সমাধি আসন্ন হয়ে থাকে। 

আমাদের অনেকের ধারণা  হচ্ছে, সাধনক্রিয়া সমাধি লাভের  উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকে। কিন্তু সত্য হচ্ছে সমাধি আমাদের প্রজ্ঞা বা অতীন্দ্রিয় জ্ঞান অর্জনের সহায়ক মাত্র। সমাধি হচ্ছে চিত্তের একাগ্রতা ও তন্ময়তা। সমস্ত বস্তুর যথার্থ স্বরূপ জানবার জন্য, এই সমাধি অতীব উচ্চ স্তরে আমাদেরকে পৌঁছে দেয়। স্থূল ও সূক্ষ্ম ভেদে এই সমাধির দুটো অবস্থা একটা বিতর্ক আর একটি বিচার। এদের আবার দুটি করে বিভাগ, একটা সবিতর্ক, আর একটি নির্বিতর্ক। অর্থাৎ বিচারের সাহায্যে যে জ্ঞান হয়, আর বিচার উর্দ্ধে যে জ্ঞান হয়। 

তো সমাধি থেকে জাত  প্রজ্ঞা আমাদেরকে সমাধি থেকে অর্জ্জিত জ্ঞানকে সমস্ত আবরণ মুক্ত ক'রে, অর্থাৎ অতিমাত্রায় শুদ্ধ করে আমাদের সামনে তুলে ধরে।  

আসলে আমাদের সমস্ত জ্ঞানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাম-রূপ-রঙ  ইত্যাদি । গোলাপ শব্দের সঙ্গে সেই সুন্দর ফুলটি, তার রূপ-গন্ধ-রঙ  ইত্যাদি নিয়ে আমাদের চোখের সামনে ফুটে ওঠে। তো আমাদের জ্ঞানের সঙ্গে মিশে থাকে এই শব্দ-নাম-রূপ-রঙ  ইত্যাদি। তো এই যে মিশ্র জ্ঞান বা শঙ্কর জ্ঞান এর থেকে মুক্ত না হতে পারলে, আমরা গোলাপের স্বরূপ সম্পর্কে  যথার্থ জ্ঞান লাভ করতে পারবো না। 

স্থূল বিষয়ে একাগ্রতার ফলে যে সমাধি হয়, তাতে এই শঙ্কর  জ্ঞান বা সবিতর্ক জ্ঞান লাভ হয়। যখন বিষয়ের ভিতর বা বাহির থেকে এই আবরণ অর্থাৎ  শঙ্করমুক্ত না করতে পারছি, ততক্ষন আমাদের স্বরূপের জ্ঞান লাভ সম্ভব নয়। শুদ্ধ জ্ঞান লাভের উপযুক্ত সমাধিকালীন অবস্থায় সমাধির বিশেষ অবস্থাকে চিহ্নিত করে, মহাত্মাগণ বলছেন,  সমাধির এই অবস্থায় হয় নির্বিতর্ক সমাধি। 

তেমনি আরো একটা বিষয় হচ্ছে, জ্ঞানের ক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্তা  বা জ্ঞাতা। অর্থাৎ জ্ঞানের একজন গ্রহীতা আছে। এই গ্রহিতানিষ্ঠ সমাধির নাম অস্মিতা সমাধি। অর্থাৎ আমি বোধ জাগ্রত আছে। আমি জানছি, এই বোধ জেগে আছে।  আমি সাধনা করছি, আমি সমাধিস্থ হচ্ছি, আমি জ্ঞানলাভ করছি - ইত্যাদি বোধ প্রবল থাকে। এই সমাধির নাম হচ্ছে অস্মিতাসমাধি। 

আসলে এই অস্মিতা থেকেই আমাদের অহং বোধ।  জগতের সমস্ত অনুভূতিই এই আমি বোধের কারনে হয়ে থাকে। যেখানে আমি বোধ থাকে না সেখানে জাগতিক জ্ঞানের লোপ সাধন হয়। অস্মি  থেকেই অস্তি অনুভূতি।  আমি যে আছি, এবং আমার সামনে জগৎ ভাসছে, তা কেবল অস্মিতা বোধের কারনে হয়ে থাকে। এই অহংকে উপনিষদ বলে থাকে ইদং - "ইদং ব্রহ্ম" . এই ইদং সব সময়ই জগতের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। জগতের অস্তিত্ত্ব না থাকলে ইদং থাকে না। আবার জগৎ না থাকলে ইদং থাকে না। কারন অস্তি এবং ইদং এই দুটি একত্রে বাস করে থাকে। এই ইদং ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে জগতের আস্বাদন করছে। গ্রহীতা বা জ্ঞাতা যখন গ্রহননিষ্ঠ হয়, তখন তার মধ্যে আনন্দের লহরী ওঠে। অর্থাৎ অস্মিতা আনন্দ সমাধিতে ডুব দেয়। 

সমাধির গভীরতায় এই আনন্দ আলোর আকারে বা জ্যোতির আকারে প্রকাশিত হয়। সাধনার গভীরতা বাড়তে বাড়তে একসময় শুধু প্রকাশ থেকে যায়। তো সমাধি স্থূল থেকে সূক্ষ্ম, সূক্ষ্ম থেকে আনন্দ, আনন্দ থেকে জ্যোতি বা প্রকাশ। তাই বলা হয়,  স্থূল, সূক্ষ্ম, আনন্দ, প্রকাশ এই হচ্ছে সমাধির চারটি স্তর। এই চারটি নিয়ে সমাধির প্রাথমিক পৰ্য্যায়।

ঋষি পতঞ্জলির দর্শনের ভিতরে আমরা যত সাবলীল হতে পারবো, তত আমরা এই তত্ত্বজ্ঞানের মধ্যে প্রবেশ করতে পারবো। তবে শুধু কথা দিয়ে নয়, আমাদের যোগের অনুশীলনীর অভ্যাস তৈরী করতে হবে, নতুবা এই শুষ্ক জ্ঞান আমাদের উপল্বদ্ধিতেও যথাযথভাবে  আসবে না। মনকে একাগ্র করতে হবে, বারংবার বিষয়ের অনুশীলন করতে হবে, বিষয়ের প্রতি  শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, ধৈর্যশীল ও  বীর্যবান হতে হবে, তবেই ঋষির অমৃত কথার যথাযথ তাৎপর্য আমাদের কাছে বোধগম্য হবে। 
-----------

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং - ২৩-২৫

"ঈশ্বর প্রণিধানাৎ বা ।" (০১/২৩)

ঈশ্বরে প্রণিধান থেকেও সমাধি হতে পারে। 

ঈশ্বরে প্রণিধান অর্থাৎ ঈশ্বরের প্রতি ভক্তিভাবের মাধ্যমে উপাসনা ইত্যাদি বা ঈশ্বরের প্রতি একাগ্র হয়ে ধ্যানাদির মাধ্যমে সমাধি লাভ হতে পারে। 

এখন কথা হচ্ছে, কে এই ঈশ্বর যার প্রতি একাগ্র হতে হবে, বা যাঁকে ভক্তি পূর্বক পুজো, অর্চনা, অথবা উপাসনাদি করতে  হবে ? 

"ক্লেশ-কর্ম-বিপাকাশয়ৈঃ অপরমাদৃষ্টঃ পুরুষবিশেষ ঈশ্বরঃ ।" (০১/২৪) 

ক্লেশ, কর্ম্ম সংস্কার,  কর্ম্মের ফল (বিপাক) এগুলোর আশয় থেকে যিনি অসন্মন্ধযুক্ত বা বিমুক্ত সেই পুরুষ বিশেষ হচ্ছেন ঈশ্বর। 

ক্লেশ, জন্ম, কর্ম্ম, বিপাক, আশয় দ্বারা অপরাভূত চৈতন্য বিশেষ হচ্ছেন ঈশ্বর। ক্লেশ বলতে আমরা কি বুঝি ? ক্লেশ হচ্ছে অজ্ঞানজনিত অস্মিতা, রাগ, দ্বেষ ও মৃত্যুভয়। কর্ম্ম বলতে সমস্ত কর্ম্ম, তা হতে পারে ধর্ম্ম-কর্ম্ম বা অধর্ম্ম-কর্ম্ম। বিপাক হচ্ছে কর্ম্মজনিত ফল। আর বাসনাগুলো হচ্ছে আশয়।  অপরামৃষ্ট কথাটার অর্থ হচ্ছে বিযুক্ত। তো ঈশ্বর হচ্ছেন এমন একজন পুরুষ, যার মধ্যে অবিদ্যা জনিত আমাদের যে অহংভাব, আমাদের যে বৃত্তিসকল, আমাদের যে বাসনা , আমাদের যে কর্ম্মফল, ইত্যাদির সঙ্গে যিনি অসংপৃষ্ট - তিনিই ঈশ্বর। 

ঈশ্বর হচ্ছেন, (তিন) কালের অতীত। অর্থাৎ এনার না আছে অতীত, না আছে বর্ত্তমান, না আছে ভবিষ্যৎ। যিনি সর্ব গুনের আধার  আবার তিনি গুণাতীত।  অর্থাৎ প্রকৃতির যে তিনগুন, সত্ত্বঃ  রজঃ তমঃ, এইসব গুনেরও  উর্দ্ধে, সমস্ত গুনের আধার স্বরূপ এক বিশেষ পুরুষ হচ্ছেন ঈশ্বর। ঈশ্বর স্বয়ম্ভু, স্বপ্রকাশ।  যিনি জন্ম মৃত্যুর অতীত। যিনি স্বয়ং প্রকাশ।  এককথায় বলতে গেলে, সমস্ত সৃষ্টির পূর্বে যিনি ছিলেন,  সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে যিনি বিরাজ করছেন,  সমস্ত সৃষ্টি একদিন যার মধ্যে লয় প্রাপ্ত হবে, তিনিই ঈশ্বর। এই ঈশ্বরই আত্মপুরুষ, যাঁর  কাছ থেকে সমস্ত জ্ঞান লাভ করা যায়। এই ঈশ্বরই পরমাত্মা। সমস্ত ঐশ্বর্যযুক্ত (বিভূতি) অনাদি ও নিমিত্ত শুন্য সীমাহীন পুরুষ। 

"তত্র নিরতিশয়ং সর্বজ্ঞবীজম।  (০১/২৫) 

তত্র  অর্থাৎ ঈশ্বরে  সমস্ত জ্ঞানের বীজ রয়েছে ।  কেউ তাঁর  সর্বজ্ঞাতাকে অতিক্রম করতে পারে নি। 

সময়ের নিরিখে তিনকাল, জ্ঞানের নিরিখে ইন্দ্রিয়-জ্ঞান, অতীন্দ্রিয় জ্ঞান, এসব যে আধারে একত্রিত হয়েছে, তিনি সর্বজ্ঞ। এখান থেকেই সমস্ত জ্ঞানের বিচ্ছুরণ ঘটছে। উপনিষদের ঋষিগন  বলছেন, ব্রহ্মের (ঈশ্বরের) চারপাদ - প্রথম পাদে (জাগ্রত) মায়াশক্তি প্রভাবে তন্মাত্র শরীর, দ্বিতীয়পাদে (স্বপ্ন) কালাত্মক শরীর, তৃতীয়পাদে (সুষুপ্তি)  দিব্যশরীর, আর  চতুর্থ পাদে তুরীয় অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি ।  তো যেকোনো অবস্থায় শরীর  থাকুক না কেন, তাতে ঈশ্বরজ্ঞান পুরো মাত্রাতেই থাকে। মহাত্মাগণ বলে থাকেন, জগতের স্থিতির কারনে, জগৎ সংসারের উন্নতির কারনে, আধ্যাত্মিক উন্নতির কারনে স্বয়ং ভগবান ভিন্নভিন্ন রূপে স্থিত হয়েছেন। ঈশ্বরের নির্মানচিত্তই, "আমি বহু হবো"  এই ইচ্ছেই তাঁকে জগত রূপে প্রকাশ করেছে। নাম-রূপের মধ্যে ঈশ্বর নয়, ঈশ্বরের মধ্যে নাম-রূপ। জগতের মধ্যে ঈশ্বর নয়, ঈশ্বরের মধ্যে জগৎ খেলে বেড়াচ্ছে। তাই সমস্ত জীবের মধ্যে সেই এক ঈশ্বরের জ্ঞান  স্ফূরিত হয়। ঈশ্বর ভিন্ন কোনো জ্ঞান নেই।   তিনিই জ্ঞাতা, তিনিই জ্ঞেয়, তিনিই জ্ঞান। তিনিই সর্বজ্ঞ। সমস্ত জ্ঞান তাঁর  কাছ থেকেই আসে, আবার তাতেই ফিরে যায়। সমাধির ফলে যে প্রজ্ঞা লাভ হয়, তা এই ঈশ্বর-জ্ঞান ছাড়া কিছু নয়। 
-------------   

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং - ২৬-২৭ 

"পূর্বেষাম অপি গুরুঃ কালেন অনবচ্ছেদাৎ। " (০১/২৬)

পূর্ব-পূর্বে যারা জন্মেছেন তাঁদেরও গুরু এই ঈশ্বর। কালের দ্বারা তাঁর জ্ঞান সীমিত নয়। 

ঈশ্বর হচ্ছেন গুরুরও গুরু। অর্থাৎ ঈশরের পরে আর জ্ঞানদাতা আর কেউ নেই। তিনি যেহেতু কালের দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়, তাই তিনি অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যতের জ্ঞানদাতা গুরুদেব। প্রকৃত গুরু, যিনি আমাদের কাছে সত্যের প্রকাশ ঘটিয়ে দেন, তিনি আমাদের সকলের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত আর তিনিই স্বয়ং ঈশ্বর। আসলে এই ঈশ্বরের বাণী অনেক সময় কোনো না কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে আমাদের কাছে আসে, তাকে আমরা গুরু বলে আখ্যা দিয়ে থাকি। তাই ঈশ্বরকে গুরুর গুরু বলা হয়ে থাকে। বাহ্য  গুরুর কাছে থেকে আমাদের বেশিকিছু আশা করা উচিত নয়, কিন্তু যিনি গুরুরও  গুরু, অন্তরগুরু তিনি আর কেউ নয়, আমাদের অন্তর্নিহিত ঈশ্বর। এইজন্য দেহধারী গুরু বা শিষ্যকে যথাসম্ভব নৈর্ব্যক্তিক হয়ে উঠতে হবে।  গুরুদেব যখন শিষ্যের মধ্যে ঈশ্বরকে দেখেন, আবার শিষ্যও যখন গুরুদেবের মধ্যে ঈশ্বরকে দেখেন, তখন গুরু শিষ্য উভয়ের মধ্যে ঈশ্বর-অনুভূতি আসে। আর এই অনুভূতি কালে কালে সমস্ত জীবের মধ্যে, সমস্ত বস্তুর মধ্যে ব্যাপ্ত হয়ে উঠবে। তখন সাধকের মধ্যে প্রকৃত ভাগবত সত্ত্বার অনুভব হতে শুরু করবে। 

সমস্ত বিদ্যার আশ্রয় হচ্ছে ব্রহ্মবিদ্যা। জগৎরূপ ব্রহ্মান্ডের যিনি স্রষ্টা, রক্ষাকর্তা ও পালনকর্তা, তাঁর ধর্ম্ম, ঐশ্বর্য্য, বিরাগ-বৈরাগ্য এবং অসীম ক্ষমতা স্বভাবসিদ্ধ। সমস্ত কার্য্যের যেমন কারন আছে, তেমনি কারনেরও  কারন আছে। সমস্ত কারনে যিনি কারন তিনি হচ্ছেন ঈশ্বর। তিনি স্বয়ম্ভু। তিনি সমস্ত কারনে উর্দ্ধে। তিনি সমস্ত বিদ্যার আশ্রয়। তিনিই একমাত্র জ্ঞানদাতা, জ্ঞানের ভান্ডার, এবং জ্ঞানের জ্ঞাতা। 

"তস্য বাচকঃ প্রণবঃ "  (০১/২৭) 

তাঁকে অর্থাৎ ঈশ্বরকে যে শব্দ দ্বারা অনুভব  করা যায় তাই প্রণব বা ওঙ্কার। 

সমস্ত উপনিষদে এই প্রণবকে ঈশ্বরের বাচক বলা হয়েছে। ওম ইতি ব্রহ্ম। একেই অক্ষর ব্রহ্ম বলা হয়েছে। আমার মাঝে মধ্যে মনে হয়, ওম যাঁকে  বলা হচ্ছে প্রণব, এটি একটি ধ্বনি বা শব্দ বিশেষ যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য।  অন্যদিকে ঈশ্বর হচ্ছেন, ইন্দ্রিয়াতীত। তো প্রণব যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তা কি করে ঈশ্বর হতে পারেন ? বিষয়টা একটু বোঝার চেষ্টা করি।

বাচ্য কথাটার অর্থ হচ্ছে বোধ্য বা জ্ঞেয় বস্তু।  বাচক কথাটার অর্থ হচ্ছে শব্দার্থ। অর্থাৎ বাচক হচ্ছে একটা বাহন যা জ্ঞেয় বস্তুর দিকে ধাবিত করে। তো ঈশ্বর অবগতির মাধ্যম হচ্ছে প্রণব। যেমন গো  একটা শব্দ  মাত্র - এটি কিন্তু সত্যিকারের গরু নয়।  কিন্তু এই শব্দ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মানস চক্ষুর সামনে একটা চিত্র ফুটে ওঠে যা গরুর রূপ। তো গো  একটা শব্দ  হলেও, গো  শব্দ উচ্চারণের মধ্যে একটা রূপের প্রভাব আমার মনের মধ্যে ফুটে ওঠে। এখন কথা হচ্ছে এই যে রূপ যা আমাদের চোখের সামনে ফুটে উঠছে তা কিন্তু আমাদের  অভিজ্ঞতা লব্ধ  পূর্বস্মৃতি। যার স্মৃতির ভাণ্ডারে এই রূপ নেই, অর্থাৎ আগে যে  কখনো গরু দেখেনি, তার কাছে গো  শব্দে  গরুর চিত্র ফুটে নাও উঠতে পারে। বরং গো শব্দে সে পৃথিবী ভাবতে পারে, গো শব্দে সে যাওয়া (ইংরেজি)  ভাবতে পারে। তাহলে কি ওঙ্কার বা ওম অর্থাৎ এই  শব্দ বা ধ্বনির সঙ্গে আমাদের কোনো পূর্বপরিচিত আছে ? যাতে করে, প্রণব উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আমরা ঈশ্বরের চিন্তন করতে পারি ? 

দেখুন যে কোনো ধ্বনি, বা শব্দ আমাদের কাছে শ্রুতিগোচর।  অর্থাৎ কান নামক ইন্দ্রিয় দ্বারা এই শব্দকে অনুভব করে থাকি। এখন যার এই কান খারাপ বা কান নেই, তার পক্ষে এই শব্দ বা ধ্বনি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হবে না। আসলে প্রণব এমন একটা ধ্বনি যা আমরা কানের সাহায্য ছাড়াই শুনতে পারি। এমনিতে আমরা কানদুটি দুটো আঙ্গুল দিয়ে বন্ধ  করলে আমরা একটা শো-শো শব্দ শুনতে পাই। আবার কান আমাদের বিশেষ তরঙ্গের ধ্বনিকেই ধরতে পারি।  এই তরঙ্গের উচ্চমাত্রায়, বা নিম্ন মাত্রায় যে ধ্বনি প্রতিনিয়ত ধ্বনিত হচ্ছে, তা আমাদের কান নামক ইন্দ্রিয় ধরতে পারে না। 

আমরা যখন গভীর ধ্যানে মগ্ন থাকি, তখন আমাদের চারিপাশে আলোর তরঙ্গ ঘনীভূত রূপ নেয়, ঠিক তেমনি এই আলোর তরঙ্গের যে উৎস তা হচ্ছে এই প্রণব বা ওঙ্কার। একেই নাদব্রহ্ম বলা হয়। এই ধ্বনি বা ঘনীভূত আলোকবর্তিকা হয়তো ঈশ্বর নন কিন্তু অতীন্দ্রিয় অনুভূতিতে একটা আনন্দের শিহরন হয়।  এই অনুভূতি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়  অর্থাৎ পঞ্চ ইন্দ্রিয়দ্বারা অনুভূত বাস্তব সত্য নয়, কিন্তু এই অনুভূতি সাধন জগতের মানুষের কাছে অপরোক্ষ অনুভূতি লব্ধ  সত্য। যাঁরা  এই অবস্থায় কোনোদিন আসেননি, তাদেরকে এই অনুভূতির কথা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আর এই কারণেই সমস্ত উপনিষদে ওঙ্কারের মহিমা ব্যাপৃত এবং ভারতের সমস্ত  মুনি-ঋষিগণ এই ওঙ্কারের অর্থাৎ এই ত্রিমাত্রাত্মক অক্ষরের মাধ্যমে পরম-পুরুষের ধ্যান করেন। জলের যে আদ্রতা, আগুনের যে উত্তাপ একে যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনি প্রণব ও ঈশ্বরকে আলাদা করা যায় না। এইজন্যই ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, "তস্য বাচকঃ প্রণবঃ " - তাঁর  (ঈশ্বরের)  কাছে যাবার বাহন হচ্ছেন প্রণব। 
------------

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং -  ২৮-২৯

" তজ্জপঃ তদর্থভাবনম "  (০১/২৮)

(ওঙ্কারের) জপ ও তার অর্থের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। 

তো ঋষি পতঞ্জলি প্রথমে বললেন, ঈশ্বর কাকে বলে।  তার পরে বললেন, ঈশ্বরের কাছে যাবার বাহন কি। অর্থাৎ ওঙ্কার  বা প্রণব হচ্ছে ঈশ্বরের অনুভূতির মাধ্যম। এবার বলছেন কিভাবে তাঁর  উপাসনা করতে হবে। প্রণবের জপের মাধ্যমে  ঈশ্বরের ভাবনা করতে হবে। 

মানুষের সবকিছু চিন্তার উপরে নির্ভর করে।  যিনি যেমন চিন্তা করেন, তার চরিত্রের মধ্যে, তার কাজ কর্ম্মের  মধ্যে তার সেই ভাবনার প্রতিফলন  দেখা যায়।  স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, তুমি যেমন চিন্তা করবে তুমি তেমন হয়ে যাবে। মহাত্মাগণ বলে থাকে, চিত্তের সর্ব্বিক চিন্তা ও তার ধারণ ক্ষমতা দ্বারা প্রাণী তার ভবিষ্যৎ রূপ ও গুনের আঁধারে পরিণত হয়। অর্থাৎ একটা প্রাণীর চিন্তাই তার কর্ম্মে প্রতিফলিত হয়, এবং কর্ম্ম ধীরে ধীরে  তার ভবিষ্যৎ জীবন সেইমতো   রূপ ও গুন্ বিশিষ্ট হয়ে থাকে। মানুষ একমাত্র চিন্তা দ্বারাই নিজেকে পরিবর্তন করতে পারে। সৎ চিন্তাভাবনা যেমন মানুষকে সৎপথে পরিচালিত করতে পারে, উন্নত জীবনের অধিকারী করে পারে, তেমনি অসৎ চিন্তা ভাবনা মানুষকে অধঃপতিত করে থাকে। 

ঈশ্বর হচ্ছেন  শুদ্ধ চৈতন্য স্বরূপ। ঈশ্বর হচ্ছেন শুদ্ধ দিব্য  সত্ত্বা, অমূর্ত মুক্তপুরুষ।  এখন ঈশ্বরের চিন্তন মাধ্যম হচ্ছে  তার নাম জপ করা। এখন এই যে নাম বা নির্দিষ্ট মন্ত্র - এটি হচ্ছে বাচক।  আর এই বাচকের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাচ্য বা ঈশ্বর। তো স্থির চিত্তে নাম বা মন্ত্রের উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে সাধকের চিত্তে সেই শুদ্ধ, পবিত্র দিব্য সত্ত্বার গুন্ আরোপিত হতে থাকে। 

আমরা শুনেছি নাম ও নামি অভেদ। একাক্ষর ওঙ্কার বা ত্রিবর্ণাত্মক ওঙ্কার হচ্ছে সেই শুদ্ধ চেতন সত্ত্বার নির্যাস। আমরা জানি কোনো নাম ধরে ডাকলে সেই নামের লক্ষিত জন সারা দেন, বা কাছে আসেন, এমনকি প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করে থাকেন।  এই কারনে বলা হয় ঈশ্বরের সাধন মাধ্যম হচ্ছে ওঙ্কার - যা ঈশ্বরের নাম বিশেষ। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এই নামের সঙ্গে নামের লক্ষিত বস্তুর, অর্থাৎ নামের অর্থ বিষয়কে (ঈশ্বর) চিন্তন করতে হবে। 

"ততঃ প্রত্যকচেতানাধিগমঃ অপ্য অন্তরায়াভাবশ্চ" - (০১/২৯)

প্রণব বা ওঙ্কারের জপ ও চিন্তন হেতু চৈতন্যের  (আত্মার ) দিকে ধাবিত হবার সমস্ত অন্তরায় দূর হয়ে যায়। 

কথাটা হচ্ছে প্রত্যগ - অর্থাৎ অন্তরের।  তো যিনি প্রত্যেকের অন্তরে অবস্থান করছেন, সাধক চান তাঁর  সম্যক উপলব্ধি  বা  সাক্ষাৎকার। এই আত্মার সাক্ষাৎকারের আগে, সাধকের বুদ্ধির নির্বীজ অবস্থা থাকে। আর এই নির্বীজ বুদ্ধত্বে অর্থাৎ শুদ্ধ বুদ্ধিতে ঈশ্বর পুরুষ প্রতিবিম্বিত হন। এই হচ্ছে স্ব-স্বরূপের উপলব্ধি। এই সময় সাধকের সমস্ত  গ্রন্থি ছিন্ন হয়ে যায়।  মুণ্ডক  উপনিষদ এই অবস্থাকে ভারী সুন্দর ভাবে বর্ণনা করেছেন  . উপনিষদের ঋষি বলছেন, এই সময় সাধকের হৃদয়গ্রন্থি খুলে সমস্ত সংশয়ের বিনাশ হয়।  শুভ বা অশুভ কর্ম্ম ফল নষ্ট হয়ে যায়। এই অবস্থায় জীব সর্ব বন্ধন  মুক্ত হয়ে চিদানন্দ স্বরূপ পরম পুরুষকে লাভ করেন। 

জপ্ : এই সম্পর্কে আমাদের আরো একটু গভীরে প্রবেশ করতে হবে।  এই শ্লোকে ঋষি পতঞ্জলি প্রথম একটা যোগক্রিয়ার কথা বলেছেন।  অর্থাৎ প্রণবের জপ করতে হবে।  প্রণব বা ওঙ্কার  হচ্ছে বীজ মন্ত্র যা আমাদের জপ করবার উপদেশ দিচ্ছেন। আমাদের মতো সাধারনের কাছে, মন্ত্র, বিশেষ করে বীজ মন্ত্র ও শব্দ বা শব্দসমষ্টির  মধ্যে কোনো পার্থক্য ধরতে পারি না। মনকে যে শব্দ বা ধ্বনি ত্রাণ  করে তাকে বলা হয় মন্ত্র।  "মননাৎ ত্রায়তে  ইতি মন্ত্রঃ" . সাধারণ শব্দ আমাদের চিত্তের বিকল্প উৎপাদন করে।  এই বিকল্পের প্রভাবে আমাদের চিত্তের চঞ্চলতা সৃষ্টি করে। অর্থাৎ চিত্ত তখন শব্দকল্পিত বস্তুর দিকে ধাবিত হয়। এই জন্য ঋষি পতঞ্জলি বলেছেন, শব্দ বিকল্পের উৎপাদক। যে জ্ঞান প্রমা বা অপ্রমা  নয়, অর্থাৎ না এটি যথার্থ জ্ঞান, না ভ্রমজ্ঞান।  তো বিকল্প জ্ঞান শব্দ থেকে উৎপন্ন হয়ে থাকে। আমরা যে পার্থিব জ্ঞান সংগ্রহ করে থাকি, অর্থাৎ সমস্ত লৌকিক জ্ঞান আসলে এই সবিকল্প জ্ঞান। এই জ্ঞান শব্দের সাথে মিশ্রিত। লৌকিক জগতে এমন কোনো জ্ঞান নেই, যা শব্দের সাথে মিশ্রিত নয়। অন্যদিকে অপ্রাকৃত জ্ঞান, বা বিশুদ্ধ জ্ঞানের  সঙ্গে শব্দের কোনো সম্মন্ধ থাকে  না।  সমাধির অবস্থায় যে সাধক প্রজ্ঞার সাথে এই সবিকল্প জ্ঞানের ভূমি থেকে ধীরে ধীরে উন্নীত হন, আবার অনেক সময় আকস্মিকভাবে নির্বিকল্প জ্ঞানের ভূমিতে উত্তীর্ন হন। 

আমরা লক্ষ করেছি, আমাদের মনের মধ্যে যখন কোনো শব্দের উচ্চারণ হয়, বা মনের চিন্তায়  ভেসে ওঠে তখন তার অর্থবিশেষ রূপে একটা পদার্থের চিত্র আমাদের চিত্তে উদিত হয়, যা আমাদের পূর্বজ্ঞানও বটে। তো এই জ্ঞানের সঙ্গে পদার্থ মিশ্রিত থাকে। পদার্থ থেকে এই জ্ঞানকে আলাদা করতে হবে। শব্দ যেমন অর্থবহ, তেমনি শব্দ জ্ঞানবহ। তো শব্দকে অর্থ থেকে আলাদা করতে হবে, আবার অর্থ থেকে জ্ঞানকে আলাদা করতে হবে। শব্দ যখন শুধুই শব্দ অর্থাৎ শব্দ যখন অর্থ ও জ্ঞান থেকে আলাদা, তখন যা প্রাপ্ত হওয়া  যায়, তাকেই বলে নিবিকল্প জ্ঞান। 

মহাত্মাগণ বলে থাকেন, শব্দকে শোধন করতে পারলে, শব্দ বিশেষ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।  তান্ত্রিকেরা এই শব্দের সাহায্যে অসাধ্য সাধন করে থাকেন। শব্দ  জীবের ইহকাল-পরকালের সহায় হতে পারে। শব্দ ব্রহ্মস্বরূপে পরিণত হতে পারে। তাই বলা হয়ে থাকে এই শুদ্ধ শব্দকে ধরতে পারলে, সাধক পরব্রহ্ম পদে অধিষ্টিত হতে পারেন। শুদ্ধমন্ত্র সিদ্ধিদাতা হতে পারে। শব্দ যখন নিজে থেকে অর্থবহ হয়, অর্থাৎ শব্দের অর্থ যদি আমাদের পূর্ব জ্ঞানের ফসল না হয়, তাহলে এই শব্দ হতে পারে সত্যিকারের "বেদ" (শুদ্ধ জ্ঞান) যার কোনো বিকল্প হয় না। বেদাদিতে, তন্ত্রশাস্ত্রের সমস্ত স্লোককে বলা হয় মন্ত্র। এবং আমরা লক্ষ করেছি, বেদের মন্ত্র সঠিক উচ্চারনে উপাসনা হয়ে থাকে অর্থাৎ ঈশ্বরের গুনগান বা স্তুতি থাকে। 

মন্ত্রের জপ স্থূল ভাবে বাচিক, সুক্ষ ভাবে উপাংশু এবং অতি সূক্ষ্ম ভাবে মানসিক। আর একটা অবস্থা আছে যাকে  বলা যেতে পারে অন্তরজপ - যা স্বতঃস্ফূর্ত।  কোনো প্রয়াস ছাড়াই, এই অন্তরজপ সংগঠিত হয়।  
যাইহোক,  এই যে মন্ত্র উচ্চারণ ক্রিয়া, অর্থাৎ বাচিক, উপাংশু ও মানসিক, এর অবিচ্ছিন্ন ধারাকেই বলে জপ। জপ্ যত সুক্ষ থেকে সূক্ষ্মতর  হবে, তত মন্ত্রের  শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকবে।  

বাক বা শব্দ উদ্গত হয় মূলাধারস্থিত একটা গুপ্ত স্থান থেকে, যেখানে কুণ্ডলিনী সুসুপ্তির অবস্থায় আছে। আমরা জানি, শব্দ উচ্চারিত হলে বায়ুর মধ্যে  এক কম্পন হয়, বায়ু গতিশীল হয়।  তেমনি আমরা যখন কোনো শব্দ উচ্চারণ করি, বা শব্দের চিন্তন করি, তখন আমাদের মূলাধারস্থিত যে শূন্যস্থান  আছে, এবং সেখানে স্থির বায়ু আছে, তার মধ্যে একটা কম্পন শুরু হয়, তখন এই বায়ু সেই শব্দকে  ঠেলে তুলে দেয়  নাভিমুলে  বা মনিপুরে, ধীরে ধীরে সে একসময় হৃদয় স্পর্শ করে, এবং একসময় কন্ঠ নালী দিয়ে ওষ্ঠ ভেদ করে বায়ুতে বিলীন হয়। অর্থাৎ শব্দ একসময় বায়ুতে বিলীন হয়ে যায়। আর আমাদের কাছাকাছি যারা থাকেন, তাদের কাছে এটি শ্রুতিগোচর হয়। এই পৰ্য্যায়গুলোকেই বলা হয় পরা, পশ্যন্তি, মধ্যমা, বৈখরী। মূলাধারে শব্দের শক্তি অধিক থাকে এবং বৈখরীতে এসে শব্দের শক্তি কমে যায়। এইজন্য বলা হয়ে থাকে বাচিক থেকে উপাংশু, আবার উপাংশু থেকে মানসিক জপের শক্তি বেশি। কারন বাচিক জপে বায়ুর প্রভাব বেশি থাকে, উপাংশু  জপে বায়ুর প্রভাব অতি অল্প থাকে। আর মানসিক জপে বায়ুর প্রভাব একেবারেই থাকে না।  

যেই যে কথাগুলো বলা হলো, তা যেকোনো শব্দের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।  কিন্তু মন্ত্রের ধ্বনির সঙ্গে এর একটু পার্থক্য আছে। শব্দ প্রয়োগ ভেদে যেমন ভালো বা খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। মন্ত্রও প্রয়োগ ভেদে ভালো বা খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে।  কিন্তু মন্ত্র যতক্ষন গুপ্ত থাকে ততক্ষন এই  মন্ত্র সিদ্ধ শব্দ হয়ে থাকে, আর এই কারণেই  মন্ত্রকে মলিনতা থেকে মুক্ত রাখবার জন্য, মন্ত্রকে গোপন রাখতে বলা হয়েছে। মন্ত্র যখন মলিন চিত্তের সঙ্গে সন্মন্ধযুক্ত হয়, তখন তা কিঞ্চিৎ মলিনতা প্রাপ্ত হয়, আর তার প্রভাব সেইমতো প্রতিফলিত হয়।  কিন্তু মন্ত্র যতক্ষন শুদ্ধ চিত্তের সঙ্গে সন্মন্ধযুক্ত থাকে ততক্ষন তা মলিনতা প্রাপ্ত হতে পারে না। তাই শুদ্ধ মনের অধিকারী ব্যক্তির মানসিক জপ অধিক শক্তিশালী হয়ে থাকে।  তবে মহাত্মাগণ বলছেন মন্ত্র গোপন ও প্রতিনিয়ত জপের  মাধ্যমে  অবাঞ্চিত  মলিনতা কেটে যায়। 

আমরা জানি মন্ত্র প্রতিনিয়ত উচ্চারণ করতে হয়। আর এই আবর্তনক্রিয়ার ফলে মন্ত্রের মন্ত্রের মল ধীরে ধীরে দূরীভূত হতে থাকে। বলা হয়, শ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে অর্থাৎ আমাদের শ্বাস গ্রহণ (পূরক) ও শ্বাস ত্যাগ (রেচক) ও বায়ুকে নিরুদ্ধ করে (কুম্ভক) মন্ত্র জপ্ করতে হয়। এই বায়ু নিরুদ্ধ অবস্থায় তা সে বাহ্য  কুম্ভক হোক বা অন্তর কুম্ভক হোক, দুই প্রক্রিয়াই অধিক ফলপ্রদ।  এর মধ্যে আবার বাহ্য  কুম্ভকের সঙ্গে মন্ত্র জপ আরো অধিক শক্তিশালী হয়ে থাকে। তবে এই বাহ্য কুম্ভক সিদ্ধ পুরুষ ব্যাতিত নিষিদ্ধ। এমনকি অন্তর কুম্ভক গুরুর নির্দেশ ব্যাতিত, বা সাধ্যের বাইরে করা নিষিদ্ধ। 

এখন কথা হচ্ছে এই মন্ত্র জপের  ফলে কি হয় ? 

শ্বাসের গমন নির্গমনের সঙ্গে মন্ত্রকে  আবর্তিত করতে পারলে, ক্রমশ ইড়া-পিঙ্গলার ক্রিয়া স্তম্ভিত হয়ে যায়। আর ইড়া পিঙ্গলার ক্রিয়া রুদ্ধ হতেই, সুষুম্নার দ্বার খুলে যায়। অর্থাৎ বায়ুর বেগ সুষুম্নার দ্বার খুলে সাহায্য করে। আর এর ফলে আমাদের মনের চঞ্চলতা দূর হয়ে মন স্থির হতে শুরু করে। 

এখন আমরা যখন শব্দ-করে অর্থাৎ বৈখরী জপ করি, তখন আমাদের কন্ঠ, মুখ, জিহবা ইত্যাদির ক্রিয়া থাকে।  এতে করেও আমাদের ইড়া -পিঙ্গলার  ক্রিয়া ধীরে ধীরে রুদ্ধ হতে শুরু করে।  তখন হৃদয়ের অভ্যন্তরে একটা অস্ফুট ধ্বনি অনুরণিত হতে শুরু করে। এই যে মন্ত্রের অনুরণন এটি নাদের পূর্বাভাস মাত্র। অর্থাৎ বায়ুর গতি হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়।  এই নাদধ্বনিই বর্ণাত্মক মন্ত্রের প্রাণস্বরূপ। জপের সংখ্যা ও সময় যত  বাড়তে থাকে, তত তত মন্ত্রের স্পন্দন ভিতরে ভিতরে চলতে থাকে। দেখুন মানস  জপ চেতন মনের সাহায্য নিয়ে সংগঠিত হয়, কিন্তু অন্তরজপ অবচেতন মনের সাহায্যে ঘটে থাকে। এখানে চেতন মনের কোনো কর্তৃত্ত্ব থাকে না। কেবল মনে হয়, জপ আপনা-আপনি হচ্ছে। কিন্তু সাধকের অনুভবে আসে। যেন মনে হয়, নাদরূপ নদীর  স্রোতে বর্নরূপ মন্ত্র ভেসে চলেছে। ধীরে ধীরে মনের চঞ্চলতা দূর হয়ে গেলে, অর্থাৎ মনের নানান চিন্তার যে ঢেউ উঠছিলো, তা স্তিমিত হতে থাকে, মন শান্ত হতে থাকে আর নাদের গতি বাড়তে থাকে।  একসময় বর্ণাত্মক মন্ত্র নাদের স্রোতের সঙ্গে মিশে যায়। যদিও মন্ত্রের স্বরূপ পূর্বাবস্থাতেই থাকে। জপের প্রতক্ষ্য অনুভূতি কেবল শুদ্ধ চিত্তে নিরন্তর মন্ত্র জপের সঙ্গে সঙ্গে এসে থাকে। ঋষি পতঞ্জলি তাই বলছেন     

-------------

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং -  ১/৩০

"ব্যাধিঃ স্ত্যানং সংশয়ঃ প্রমাদঃ আলস্য অবিরতিঃ ভ্রান্তিদর্শন অলব্ধ-ভূমিকত্ব অনবস্থিতত্বানি চিত্তবিক্ষেপাঃ তে অন্তরায়াঃ ।" (১/৩০)

(শারীরিক) ব্যাধি, চিত্তের অলসতা, সংশয়, প্রমাদ, আলস্য, অবিরতি  (সবসময় সম্ভোগেচ্ছা) ভ্রান্তদর্শন,  অলব্ধ-ভূমিকত্ব (সমাধিভূমি লাভ করতে না পারা) অনবস্থিতত্ব (সমাধি ভূমি পেয়েও ধরে রাখতে না পারা) - এই চিত্তবিক্ষেপ গুলো হচ্ছে (সমাধির সাধনপথের) বাধাস্বরূপ।

ব্যাধিঃ - ব্যাধি বলতে আমরা দুই ধরনের ব্যাধির কথা জানি, একটা হচ্ছে শারীরিক ব্যাধি, আর একটি হচ্ছে মানসিক ব্যাধি।  ধর্ম্মসাধনের জন্য প্রথম দরকার শরীর , রোগমুক্ত  শরীর। শরীর সুস্থ  না থাকলে, তার দ্বারা কোনো কিছুই করা সম্ভব নয়, তা সে সাধন ভজন বলুন, বা সংসারের কাজকর্ম্ম বলুন। যদিও শরীর  ও মন একে  অপরের  সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত।  অর্থাৎ শরীর  ভালো না থাকলে আমাদের মন ভালো থাকে না, আবার মন ভালো না থাকলে আমাদের শরীর  ভালো থাকতে পারে না। শরীর  মনের অস্বস্তিকর অবস্থাকেই বলে ব্যাধি। দেখুন শরীর  থাকবে, আর রোগ খাবে না, এমনটা হতে পারে না। আবার মন থাকবে আর তার মধ্যে দুঃখ কষ্টের অনুভূতি থাকবে না, তা হবে না।  শরীরের সঙ্গে ব্যাধির যেন কাঠ-কুড়াল সম্পর্ক। একে  অপরের সঙ্গে থেকে কাজ করছে, আবার একে  অন্যের ক্ষতি করছে।  যার মন বলে কিছু নেই, তার মধ্যে শরীরে অহংবোধ জাগে না। আর অহংবোধ না থাকলে, তার কর্ম্মে উদ্দম থাকে না। এখন কথা হচ্ছে শরীর বা মন সুস্থ  রাখবার  উপায় কি ? 

দেখুন পিতৃ-মাতৃ প্রদত্ত পঞ্চভূতের এই শরীর। প্রকৃতিতে এই পঞ্চভূতের লীলা চলছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, প্রকৃতিতে নিয়ম বহির্ভূত কিছু হয় না।  সূর্য্য  যেমন তার কক্ষপথ থেকে  বিচ্যুত হতে পারে না, তেমনি শরীর প্রকৃতির নিয়মকে অগ্রাহ্য করলে, প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী শরীরের স্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে অসাম্যের অবস্থা দেখা দিলে, শরীর নিজেই তাকে প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করে, একেই আমরা বলে থাকি ব্যাধি। অর্থাৎ কোনো কারনে শরীরের মধ্যে যদি কেউ অবাঞ্চিত ভাবে প্রবেশের চেষ্টা করে, বা প্রবেশ করে, তবে তাকে বের করে দেবার যে প্রাকৃতিকভাবে শারীরিক  প্রতিক্রিয়া, তার নামই   ব্যাধি। আমরা ভাবি রোগ-ব্যাধি, আমাকে কষ্ট  দেবার জন্য, আসলে রোগ ব্যাধি হচ্ছে শরীরকে নিরাময় বা সুস্থ  স্বাভাবিক  করবার প্রাকৃতিক ক্রিয়াবিশেষ । 

আমরা জানি আর না জানি, এটা চিরন্তন সত্য যে এই যে স্থূল শরীর, এটি একটি যন্ত্র বিশেষ যা আমরা নিজেরাই সংকল্প সাধনের জন্য, বাসনা পূরণের জন্য  মাতা-পিতার সাহায্যে নিয়ে তৈরী করেছি। হ্যাঁ ঠিকই শুনছেন, এই যে এই শরীর  আমরা নিজেরাই তৈরী করেছি। প্রারব্ধ কর্ম্মফল ভোগ করবার জন্য, আমরা এই দেহ ধারণ করে থাকি। আমাদের জ্ঞাতসারে হোক বা অজ্ঞাতসারে হোক এই শরীর  আমাদের অনন্ত যাত্রাপথের একটা বাহন যা আমরাই তৈরী করে থাকি। আর এই বাহন যখন আমাদের উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হয়, বা অক্ষম হয়, তখন তাকে ছেড়ে দিয়ে আমরা আবার অনন্ত যাত্রায় বেরিয়ে পড়ি। দেহ থেকে দেহান্তরে ঘুরে বেড়াই। তো  এই দেহরূপ যানটি হচ্ছে আমাদের অবলম্বন। একে নিশ্ছিদ্র রাখতে হবে। এই দেহযন্ত্রের মধ্যে আছে আমাদের স্নায়ুতন্ত্র, আছে অসংখ্য কোষ আছে কোষকলা, ও অঙ্গাদি ।  আর এ সকল  পুষ্টি লাভ করে থাকে অন্ন, জল, বায়ু, ও তেজ দ্বারা। তাই এগুলোকেই  আমরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকি।  তো আমাদের পরিমিত পরিমানে অন্ন, জল গ্রহণ করতে হবে। পর্যাপ্ত বায়ু গ্রহণ করতে হবে, এবং তেজঃশক্তি যাতে অক্ষুন্ন থাকে তার জন্য আমাদের শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে। বাইরে থেকে দুধ, ঘি ইত্যাদি তেজবৃদ্ধিকারী খাদ্য গ্রহণ করতে হবে, পর্যাপ্ত সূর্যকিরণ গ্রহণ করতে হবে। পরিমিত পুষ্টিকর আহার গ্রহণ, মন ও শরীরের সংযম, এবং নিয়মিত দেহচর্চ্চা আমাদেরকে নীরোগ থাকতে সাহায্য করে থাকে। 

শরীরকে ব্যাধিমুক্ত  রাখবার জন্য, আরো একটা প্রক্রিয়া হচ্ছে যোগক্রিয়া। যদিও যোগের উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ, বা ঈশ্বর অনুভূতি, তথাপি  এই যোগক্রিয়া প্রাথমিক ভাবে উপরি পাওনা হিসেবে, শরীরকে সুস্থ  করে তোলে।  যোগী পুরুষ যোগ সাধন শুরু করলেই, বুঝতে পারেন, তার শরীরের মধ্যে একটা পরিবর্তন হচ্ছে, একটা রূপান্তর ঘটছে। যোগের আগুনে যোগীর দেহ শুদ্ধ হয়ে যায়। আমরা জানি, আমাদের এই যে স্থূল দেহ, তা পঞ্চভূতের সংমিশ্রণ মাত্র।  অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ , তেজ, মরুৎ  ব্যোম, এই স্থূল উপাদানের সংমিশ্রনের ফলে এই দেহ তৈরী হয়েছে। যোগের ফলে এই যে স্থূল উপাদান, তা সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হতে থাকে অর্থাৎ  যোগী তখন মহাভূতের অধিকারী হয়ে ওঠেন। পঞ্চভূত তখন  আর স্থূল থাকে না, তা যেন শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ অর্থাৎ তন্মাত্র  বা গুনের আধার হয়ে যায়। উপনিষদের ঋষিগণ বলছেন,  তখন 
"ন  তস্য রোগো ন জরা, ন মৃত্যুঃ 
প্রাপ্তস্য যোগাগ্নিময়ং শরীরম।    (শ্বেতাশ্বর উপনিষদ-২/১২) 

এই অবস্থায় যোগী পুরুষের মধ্যে তন্মাত্রের  প্রভাব হেতু, তিনি অপরিবর্তনীয় শরীরের অধিকারী হয়ে ওঠেন। আর এই কারণেই, আমরা অনেক মহাপুরুষের মধ্যে (তোতাপুরি, ত্রৈলঙ্গ স্বামী, বাবা লোকনাথ, গোবিন্দপাদ, মৎস্যেন্দ্রনাথ, গোরক্ষনাথ,  ইত্যাদি ) বহুদিন যাবৎ একই বয়সের শরীরের সাক্ষাৎ করে থাকি।  এই যোগক্রিয়াকে ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, কায়সিদ্ধি।  যা আমরা ধীরে ধীরে  শুনবো। এসব কথা কেবল কল্পনা নয়, এসব আমাদের ভারতবর্ষের ঋষি মুনিদের সাধনলব্ধ অনুভব। কিন্তু কথা হচ্ছে শুধু শুনলেই তো হবে না, এর জন্য দরকার দৃঢ়  প্রতিজ্ঞ হয়ে যোগ সাধনায় লিপ্ত হওয়া।  তবে জানবেন, রোগমুক্তি যোগের উদ্দেশ্য নয়।  যোগের উদ্দেশ্য ব্রহ্মজ্ঞান। যাই হোক, যোগসাধনায় লিপ্ত হতে গেলে, আগে শরীরকে ব্যাধিমুক্ত রাখতে হবে। 

স্ত্যানং : চিত্তের কার্যকারিতার অভাবকে বলে স্ত্যান। একটা অবসাদগ্রস্থ ভাব। মন তখন কিছুতেই একাগ্র হতে পারে না। মনের মধ্যে কোনো উদ্দম নেই। আমাদের যেমন শারীরিক আলস্য হয়, তেমনি মনের মধ্যেও একটা আলস্য ভাবের উদয় হয়।  এই সময় কোনো কিছুই ভালো লাগে না। এই অবস্থা থেকে উত্তীর্ন হতে গেলে এই মনেরই আশ্রয় নিতে হবে।  মনকে জিজ্ঞেস করুন, কেন ভালো লাগছে না, মানসিক আলস্যের এই কারণ খুঁজে পেতে হবে। এর কারন অনেক কিছু হতে পারে, যেমন অতিরিক্ত আহার-বিহার, বা অনাহার, অতিরিক্ত নিদ্রা, বা অনিদ্রা,. মনের এই অবস্থা থেকে রেহাই পেতে গেলে,  আহার-বিহার-নিদ্রার মধ্যে সংযম আনতে  হবে। শাস্ত্র গ্রন্থ পাঠ, বা ধর্ম্মালোচনা, এমনকি গুরু সান্নিধ্য মনের এই অবসাদকে কাটিয়ে তুলতে সাহায্য করে।  

সংশয়ঃ - অধ্যাত্ম জগতে সংশয় একটা বড় অন্তরায়। যদিও মনের মধ্যে প্রশ্ন থাকবে, কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তরের খোঁজ ও সত্য গ্রহণের জন্য নিজের মনকে উন্মুক্ত রাখতে হবে। যুক্তি তর্ক বা বিচার দিয়ে আমরা অনেক সময় অনেক কিছুর সমাধান খুঁজে পাই না। তথাপি এই যুক্তি বিচার দ্বারাই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।  তবে হ্যাঁ  প্রাজ্ঞব্যাক্তির কথার উপরে বিশ্বাস স্থাপন করে হবে।  অন্ধ বিশ্বাস নয়, সাধ্যমতো চেষ্টা করতে হবে সেই কথার মধ্যে সত্য খুঁজে নেওয়ার।  প্রাজ্ঞ ব্যক্তির কথায় বিশ্বাস স্থাপন  করে বা যোগীপুরুষের কথায় বিশ্বাস করে যদি আমরা বিষয়ের অনুসন্ধান বা উপায়ের মধ্যে নিজেকে দৃঢ় ভাবে স্থাপন করতে পারি, তবে প্রাজ্ঞ ব্যক্তির কথার সঙ্গে নিজের অনুভব বা উপল্বদ্ধিকে মেলাতে পারবো।  তা যদি না হয়, তবে জানবেন আমার নিজের কোথাও ভুল হচ্ছে।  কেননা জানবেন, ঋষিপুরষণ কখনও  মিথ্যে বলেন না। অনুভবের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে, কারন অনুভব শক্তির  মধ্যে মানুষে মানুষে পার্থক্য থাকে। তো ঋষি পতঞ্জলির ভাষায় সংশয় অধ্যাত্ম জীবনে অন্তরায় হলেও, এই সংশয়, বিস্ময় ইত্যাদি  মানুষকে সত্যের সন্ধানে এগিয়ে নিয়ে যায়। এখানে সংশয় অর্থে সিদ্ধান্তে আসতে না পারাকেই  বোঝানো হচ্ছে। 
 
প্রমাদ - প্রমাদ হচ্ছে, সমাধি প্রাপ্তির যে সব সাধনক্রিয়া আছে, তার অনুষ্ঠান না করা। 
 
আলস্য - এখানে আলস্য হচ্ছে শারীরিক উদ্দমহীনতা। অতিরিক্ত নিদ্রা, ভোজনের প্রতি অতি আগ্রহ, কর্ম্মে উদ্দমহীনতা এই আলস্যের ফল। 
 
অবিরতি : কথাটার অর্থ বিরামহীন। নিরন্তর সাধনক্রিয়ায় লেগে থাকতে হবে। প্রতিনিয়ত নিয়ম করে নির্দিষ্ট সময়ে যোগক্রিয়ার মধ্যে নিজেকে নিয়োগ করতে হবে।  একদিনের  জন্য বিশ্রাম বা বিরতি মানে ১০ দিন পিছিয়ে যাওয়া। তো সাধন ক্রিয়া একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এখানে বিরতি দিলে, ফললাভ সুদূর পরাহত হবে। অনেকে কিছুদিন সাধন করবার পরে, একটু আধটু অনুভব হলে, বা কিছুই অনুভব না হলে, উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। কিন্ত সাধন জগতে ধৈর্য্য খুব গুরুত্ত্বপূর্ন। এখানে যেমন নিরন্তর প্রচেষ্টাই  সাফল্যের একমাত্র পথ, তেমনি কিছু দিন করলাম, আবার কিছুদিন বাদ  দিলাম, আবার কিছুদিন করলাম, এতে করে সাধনার ফল মিলবে না। বেঁচে থাকতে গেলে,  যেমন আমাদের শ্বাসক্রিয়ায় বিরতি দেওয়া চলে না, শরীর  রক্ষার জন্য যেমন আমাদের প্রতিদিন নিয়ম করে,  পানীয়, খাদ্য গ্রহণ করতে হয়, তেমনি সাধনক্রিয়া একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, এখানে বিরতি দেওয়া মানে সাধনফল থেকে বঞ্চিত থাকা। 
  
 ভ্রান্তিদর্শন : ভ্রান্তদর্শন হচ্ছে আমাদের ভ্রমজ্ঞান। ধ্যানে বসলে আমরা অনেকে অন্ধকার দেখি, কেউ আলোর বিন্দু দেখি, কেউ নানান দৃশ্য, দেবতাদের মূর্তি, গুরুমূর্তি ইত্যাদি  দেখি।  প্রাথমিক সাধকের পক্ষে  এই দর্শন অসত্য নয়, কিন্তু এসব আমাদের মনের আয়নায় প্রতিফলিত ভ্রান্ত্র দর্শন।  এর মধ্যে কোনো ঈশ্বরসত্ত্বা বলে কিছুই নেই। এসব সত্য নয়, তা কিছুদিন সাধনার পরেই উপলব্ধি হয়।  আমি যা কিছু দেখছি , যা কিছু শুনছি তাকে আমাদের বিচার করে দেখতে হবে।  আমাদের বিবেক, বুদ্ধির প্রয়োগ করতে হবে। এই বিচারের ফলে একসময় আমাদের ভ্রান্তধারণাগুলো দূরীভূত হবে। আর নিরন্তর যোগের ফলে ধীরে ধীরে সত্য উদ্ভাসিত হবে। 
 
অলব্ধ-ভূমিকত্ব : অনেক দিন ধরে সাধনা করছেন, কিন্তু কিছুই হচ্ছে না, না কোনো উপলব্ধি, না কোনো দর্শন-শ্রবণ। এরফলে সাধক উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। মন বিদ্রোহী  হয়ে ওঠে।  একসময় মনে হয়, এইসব ঈশ্বর কল্পনার বস্তু,  অবাস্তব জিনিসের সন্ধানে সময় নষ্ট করছি নাতো ? জীবের মূল্যবান সময় হারিয়ে যাচ্ছে না তো ?  এসব করে আদৌ কি লাভ হয় ? নাকি শুধু অন্ধকারের পিছনে ছোটা। আর এসব করেই বা কি হবে, এতে করে কি আমি সুখী হতে পারবো ? এতে করে আমার পার্থিব লাভ তো হলোই না, অলীক ভগবানের পিছনে ছুটে  নিজের জীবনের অমূল্য সময় নষ্ট করলাম। আসলে বিক্ষিপ্ত মনে এইসব ধারণা  হয়ে থাকে। আর জানবেন, চঞ্চল মন যতক্ষন শান্ত না করতে পারছেন, ততক্ষন সাধন ক্রিয়ায় কোনো ফলপ্রাপ্তি হবে না। 

এই অবস্থায় কয়েকটা জিনিসের প্রতি নজর দিন। প্রথমে দেখুন, আপনার খাদ্যের মধ্যে কোনো উত্তেজক  পদার্থ আছে কি না, আপনার শরীর  সুস্থ  আছে কি না, আপনার সঠিক নিদ্রা হচ্ছে কি না, আপনার মধ্যে কোনো উদ্বেগ কাজ করছে কি না, আপনার মধ্যে কোনো ভয় বা দুশ্চিন্তা আছে কি না, এগুলোকে খেয়াল করবার চেষ্টা করুন।  নিরামিষ খান, শাস্ত্রবাক্যে গুরুবাক্যে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করুন, তাঁর  কথা অনুযায়ী কাজ করুন। কি করছেন, সেটা বড়ো  কথা নয়, গুরুবাক্যঃ অনুযায়ী কাজ করছেন কি না সেটাই বড়ো  কথা। নিয়মিত সময় মেনে সাধন-আসনে বসুন। মনকে সংযত করুন।  ধৈর্য্যধরে সাধন ক্রিয়া করুন। ফলাকাঙ্খী হয়ে সাধন করতে যাবেন না।  ফল সময়মতো আসবে, তার জন্য আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে। বরং বোঝার চেষ্টা করুন, আপনার সাধনার মধ্যে কোনো ফাঁকি আছে কি না।  নিজেকে প্রশ্ন করুন, আর সংশোধন করুন। যোগশাস্ত্র একটা প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান।  আপনার কিছু হচ্ছে না মানে, আপনার মধ্যেই  ত্রুটি আছে, যোগশাস্ত্র অভ্রান্ত এই বিশ্বাস দৃঢ় হোক।  

অনবস্থিতত্বানি :  সাধন জগতে যেমন উত্থান আছে, স্থিতি আছে আবার পতন আছে।  অনেক সময় মনে হয়, আর যেন এগুতে পারছি না। বা আগে যতটুকু হয়েছিল, সেটুকুও যেন এখন আর হচ্ছে না। ঋষি বলছেন, এই অবস্থা সাধকের পক্ষে অন্তরায়।  কিন্তু আমার মনে হয়, এই অন্তরায় সাধনার অঙ্গ।  একে কেউ উপেক্ষা করতে পারে না। এই অবস্থা হয়তো সবার সাধন জীবনেই আসে। এই অন্তরায়কে কাটিয়ে উঠতে হবে।  তবেই সাধনার বস্তু আয়ত্বে আসবে।  কঠিন পথ - দুর্গম পথ - কখনো চড়াই, কখনো উৎরাই।  পাহাড়ের উচ্চশিখরে উঠে গেলে, এই চড়াই  উৎরাই বেয়েই উঠতে হয়। পাহাড়ের পথ যেমন আঁকাবাঁকা, উঁচু-নিচু, এবড়োখেবড়ো, তেমনি একবার সামনে উৎরাই, একবার চড়াই। এটাই স্বাভাবিক। আর সাধককে এই পথেই  এগুতে হবে।  এতে ভাবনার কিছু নেই  বা থমকে গেলে চলবে না। সামনের পথ অধঃগামী বলে এগুবো না, তা চলবে না, একসময় আসবে পথ আবার আমাকে উঁচুতে নিয়ে যাবে।  তাই বলে পথ ছেড়ে পাশে দাঁড়িয়ে পড়লে চলবে না। এই অধোগামী পথকেও অতিক্রম করতে হবে। সাধক যদি ভাবে যে আমার উদ্দেশ্য তো উঁচুতে যাওয়া, আমি নিচে নামবো না, তবে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা হবে না। তাই সাধন পথে এগিয়ে যেতে হবে, তা সে চড়াই  বা উৎরাই যাই হোক না কেন । 

চিত্তবিক্ষেপ :  কিছুদিন সাধন করলে, কিছু বিভূতির দেখা পাওয়া যায়, অনেক সময় মনে হয়, নিজের মনের মধ্যে যা কিছু ভাসছে, তা যেন বাস্তবে  পরিণত হচ্ছে। কেন হচ্ছে, কিভাবে হচ্ছে সে সম্পর্কে কোনো জ্ঞান থাকে না।  কিন্তু হয়।  তখন চিত্তের মধ্যে বিক্ষেপ শুরু হয়। আবার বিশেষ পরিস্থিতিতে অনেক সময় প্রলোভন আসে, তখন মনের মধ্যে এই প্রলোভনের বস্তুটিকে অধিক  গুরুত্ত্বপূর্ন বলে মনে হয়। আর এসব হলে সাধনজগৎ থেকে সাধকের বিচ্যুতি ঘটার সম্ভাবনা থাকে । 

দুটো উদাহরণ দেই  -১)  এক সাধক নির্জনে জঙ্গলের  মধ্যে একটা গাছের তলায় বসে সাধন ভজন করতো। তো একদিন তার মস্তকে একটা পাখী মলত্যাগ করলো। সাধক রেগে গিয়ে উপরের দিকে তাকাতেই, গাছের ডালে বসে থাকা বকপাখীটি তৎক্ষণাৎ প্রাণত্যাগ ক'রে, সাধকের সামনে এসে পড়লো।  সাধক অবাক হলো, আর ভাবতে লাগলো, আমি না জানি কত শক্তির অধিকারী হয়েছি, আমার দৃষ্টিতেই বকের মৃত্যু হলো।  সাধকের মনের  মধ্যে অহঙ্কারের জন্ম হলো।  যদিও এই অহঙ্কার  চুরমার হয়ে গিয়েছিলো এক গৃহবধূর কথায়, যখন তিনি বলেছিলেন, তুমি কি আমাকে বক পেয়েছো ? আর এর পরেই সাধক যথার্থ গুরুর সাক্ষাৎ পায়, ও সাধন জগতে স্থায়ী  হয়। 

২) কিছুকাল সাধন ভাজনের পরে, গুরুদেবের নির্দেশে যুবক শিষ্য তীর্থভ্রমণে বেড়িয়েছেন। এক পাহাড়ি গ্রামে এসে রাত্রি বেলা শীতের প্রকোপে একটু আগুনের আশায়, এক গৃহস্তের বাড়িতে প্রবেশ করলেন । সেখানে গৃহকর্ত্তি একটা কাঠের টুকরো নিয়ে অগ্নিমন্ত্র উচ্চারণ করে অগ্নি প্রজ্বলিত করে, তাকে দিলো।  এখন সাধক ভাবলো, মন্ত্র উচ্চারণ করে অগ্নি প্রজ্বলিত করা সহজ কথা নয়, ইনি  নিশ্চয় বড়ো কোনো  সাধিকা হবেন। মনের মধ্যে ইচ্ছে জাগলো, এই বিদ্যা আয়ত্বে আনতে  হবে। গৃহকর্ত্তাকে এই কথা বলতে, তিনি যুবক সাধককে তাঁর  যুবতী মেয়েকে বিয়ে করে, সেখানে থেকে যেতে বললেন।  একে সুন্দরী যুবতী কন্যা, অন্যদিকে মনের মধ্যে অগ্নিমন্ত্র আয়ত্বের বাসনা, যুবক সাধকের চিত্তে বিক্ষোপ শুরু হলো। শেষমেশ  অবশ্য যুবক সাধক এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এগিয়ে গিয়েছিলেন। 

যাইহোক, মনের দুর্বলতা, অসৎসঙ্গ, বদ-অভ্যাস ইত্যাদি কারনে মনের মধ্যে বিক্ষেপের জন্ম হয়, যা যোগের অন্তরায়। ঋষি পতঞ্জলি এগুলো থেকে আমাদের সাবধান হতে বলছেন।  আমাদের ব্যাধি মুক্ত শরীরের অধিকারী হতে হবে, পতঞ্জলি কথিত যোগের অন্তরায়গুলো থেকে নিজেকে সাবধান করতে হবে, তবেই আমরা সাধন জগতের আস্বাদ নিতে পারবো। 
-------- 

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং -  ৩১-৩২

"দুঃখ দৌর্মনস্য অঙ্গমেজয়ত্ব শ্বাসপ্রশ্বাস বিক্ষেপসহ ভুবঃ." (০১/৩১)

দুঃখ,  দৌর্মনস্য, (ইচ্ছের বাধায় চিত্তের বিক্ষোভ) অঙ্গ কম্পন,  শ্বাসপ্রশ্বাস, এগুলো চিত্ত বিক্ষেপের ফলে জন্ম হয়ে থাকে।  

দুঃখ তিন প্রকার, আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক, ও আধিদৈবিক।  এর মধ্যে প্রথম দুটো লৌকিক।  প্রথমটি  শারীরিক জরা  ব্যাধি থেকে হয়ে থাকে, দ্বিতীয়টি প্রাকৃতিক কারনে বা জীবজন্তু দ্বারা হয়ে থাকে।  এই দুটোই লৌকিক দুঃখ।  তৃতীয়টি আধিদৈবিক অর্থাৎ আমাদের প্রারব্ধ জনিত। এই দুঃখকে ঋষি পতঞ্জলি বলছেন সাধনার অন্তরায়।  এই অবস্থায় আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন, মনকে কিছুতেই একাগ্র করতে পারি না। মনের বা শরীরের মধ্যে যখন এই দুঃখের সহনশীলতার অভাব ঘটে, তখন শরীর  মনের মধ্যে একটা স্পন্দন অনুভূত হয়, আর একেই বলে বিষাদ। এই বিষাদ মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে, মনের শক্তিকে দমিত করে রাখে। বিষাদে আক্রান্ত মনে  উচ্চভাব আসতে  পারে না। আসলে এই সময় মন তমঃ ও রজঃ গুনের প্রভাবে ভারাক্রান্ত হয়ে থাকে। মনের মধ্যে আলস্য, জড়তা, এমনকি সংশয় এসে বাসা বাধে। তখন চিন্তার মধ্যে মহত্বের ভাব কিছুতেই আনা যায় না।  এই সময় শ্বাস প্রশ্বাসের গতি অনিমিয়ত হয় । আর অনিমিয়ত অর্থাৎ  কখনও দ্রুত, কখনও  মন্থর  শ্বাস প্রশ্বাস মানেই মনের অধিক চঞ্চলতা। 

এখন কথা হচ্ছে এই দুঃখ ও দুঃখজনিত কারনে  শরীরের ও মনের মধ্যে যে অবাঞ্চিত পরিবর্তন হয়, তাকে আমরা রোধ করবো কি করে ?
 
 ঋষি পতঞ্জলি পরবর্তী শ্লোকে বলছেন : 

"তৎ প্রতিষেধার্থম এক-তত্ত্বাভ্যাসঃ।" (০১/৩২)
 
এর  অর্থাৎ  সাধনার অন্তরায়গুলোর প্রতিষেধক হচ্ছে এক তত্ত্বের অভ্যাস । 

এই এক তত্ত্বটা কি ? যার অভ্যাস করলে সাধনার অন্তরায়গুলো দূর হয়ে যাবে।  এই এক তত্ত্ব হচ্ছে যেকোনো একটা বিষয়ের উপরে চিত্তকে  স্থির করা। 

চিত্ত  হচ্ছে যার  দ্বারা চিন্তন করা যায়, জানা যায়, জ্ঞান হয় । আর মন হচ্ছে চিত্তের আবাসস্থল। তো মনের গুন বা শক্তি  বিশেষ হচ্ছে চিত্ত। আমাদের অন্তঃকরণ বৃত্তি অর্থাৎ চিত্ত  বিষয়ের সংস্পর্শে এসে, সেই বিষয়ের আকার ধারণ করে। এই অন্তঃকরণ বৃত্তিগুলোকেই   বলে চিত্ত। এই চিত্ত হচ্ছে স্পন্দনশীল সূক্ষ্ম বস্তু। এর কোনো নিজস্ব  আকার নেই। চিত্ত যখন যার সংস্পর্শে আসে, তখন তার রূপ নেয়। এই কারনে ঋষি পতঞ্জলি ৪ নং শ্লোকে বলেছেন, "বৃত্তি সারূপ্যম ইতরত্র" .তো  চিত্ত বৃত্তি দর্শীতবিষয় রূপে চেতন পুরুষকে ভোগ করাচ্ছে। এবং পুরুষ সেই ভাবের অবস্থায় তন্ময় হয়ে যায়। 

বলা হয়, যদি মনকে সমস্ত বিষয় থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে এসে একটা মাত্র বস্তু বা বিষয়ের মধ্যে সমাহিত করা যায়, তাহলে মন সহজেই স্থির হতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কি আমাদের মন একই সময়ে একাধিক বিষয়ে অবস্থান করে ? দেখুন মন হচ্ছে সূক্ষ্ম বস্তুর স্পন্দনক্রিয়া মাত্র। আর চিত্ত ভিন্ন ভিন্ন আকারক্ষম, স্পন্দনশীল পদার্থ ।  চিত্ত যখন যার সংস্পর্শে আসে, তখন তার আকার নেয়। জলের যেমন কোনো বিশেষ আকার নেই, যে পাত্রে রাখা হয়, সেই আকার ধারণ করে। তেমনি চিত্ত একপ্রকার স্পন্দনশীল পদার্থ যা ভিন্ন ভিন্ন আকার নিতে সক্ষম। তাই চিত্ত বা অন্তঃকরণ বৃত্তি যখন যে বিষয় বা বস্তুর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে, তখন সেই আকারে মনকে  রাঙিয়ে তোলে। 

এখন  কোনো বিশেষ আকারের মধ্যে  যদি চিত্তকে  ধরে রাখা যায়, তবে মনেরও  স্থিরতা বা একাগ্রতা বাড়বে। মন তখন সেই  বিষয়ের মধ্যে নিবদ্ধ হবে। মনের রঙ তদ্রুপ হবে। 

যদিও সাধনার প্রথম অবস্থায়, মনের বিক্ষেপ দূর করতে, মনকে বিশ্লেষণ করতে বলা হয়, অর্থাৎ মনের বিক্ষেপের কারণগুলোকে খুঁজতে বলা হয়, কিন্তু এই কারনে অনুসন্ধানে না গিয়ে আমরা যদি কেবলমাত্র একটি বিষয়ে আমাদের চিত্তকে  ধরে রাখতে পারি, তবে আমরা সহজেই একাগ্র হতে পারবো। যদি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট বিষয়ে মনকে স্থির রাখতে চাই, তবে চিত্তকে  বিশেষ একটি বিষয়ের মধ্যে আবদ্ধ  করে রাখতে হবে। এই নির্দিষ্ট বিষয় বা বস্তুর কোনো বিশেষত্ব নেই। এটি হতে পারে, প্রদীপের শিখা, হতে পারে প্রভাত সূর্য্য , হতে পারে কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্য।  বিষয় যাই হোক, একই বিষয়ের নির্বাচন করে - তাকে আমাদের চিত্তবৃত্তিকে আটকে রাখতে হবে। এর ফলে সাধনার যে অন্তরায়, অর্থাৎ চিত্ত বিক্ষেপ  তা দূর হয়ে যাবে। যদিও এই কাজটি অসম্ভব না হলেও, দুঃসাধ্য। মনের বিভিন্ন অবস্থাকে স্ববশে আনা কঠিন তো বটেই। তবে নিরন্তর অভ্যাসে এই কাজ সাহজসাধ্য হয়ে যায়। এই কাজটিই করতে বলছেন, ঋষি পতঞ্জলি। 
---------------- 

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং -  ৩৩-৩৫

"মৈত্রী করুণা মুদিতা উপেক্ষাণাং সুখ দুঃখ পুণ্য অপূণ্য বিষয়াণাং ফ ভাবনাতঃ চিত্তপ্রসাদম।"  (০১/৩৩)

সুখীর প্রতি মৈত্রী, দুঃখীর প্রতি করুণা, পুন্য বিষয়ে হর্ষ, পাপ বিষয়ে উপেক্ষা - এই ভাবনা থেকেই চিত্তে প্রসন্নতা আসে।  

সমস্ত প্রাণীই ঈশ্বরের অংশ। এদের সবার প্রতি মৈত্রী ভাব সম্পন্ন হতে হবে। কেউ আমার শত্রু নয়, সবাই বন্ধু। কেউ অপমান করলে, বা অনিষ্ট করলেও তার প্রতি দুর্ব্যবহার করা চলবে না। বদলা বা প্রতিশোধের কথা চিন্তাতেও যেন না আসে। কাউকেই প্রত্যাঘাত করো না। শত্রুকেও ভালোবাসতে হবে। পাপীকেও ভালোবাসতে  হবে, পুণ্যবানকেও ভালোবাসতে হবে। আবার পাপকে এমনকি পুণ্যকেও উপেক্ষা করতে হবে।  

এখন কথা হচ্ছে,  এইসব নীতিকথা শুনতে তো ভালোই লাগে, কিন্তু আঘাতের প্রত্যাঘাত না করলে, বারংবার আঘাত আসবে।  জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। সবাই তোমাকে হয় দুর্বল, নয় বোকা ভাববে। যীশুখ্রিষ্টকে এরা  মেরে ফেলেছে, যিনি প্রেমের পূজারী ছিলেন। সর্ব্বত্যাগী মহাপুরুষ স্বামী বিবেকানন্দকে রাস্তার বিদেশের ছেলেরা ঢিল ছুঁড়েছিলো। রামকৃষ্ণকে এর পাগোল  ঠাওরেছিলো। গুরুনানককে কারাগারে নিক্ষেপ করেছিল। শ্রীকৃষ্ণকে এরা গোয়ালার পুত্র বলে গালি দিয়েছিলো। ইংরেজরা দমন-পীড়ন করে, ভারতবাসীকে পদদলিত করে রেখেছিলো। তাহলে এইসব নীতিকথার সার্থকতা ব্যবহারিক জীবনে কিভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব।  

দেখুন, কথায় বলে, আপনি অপরের  কাছ থেকে যেমন ব্যবহার আশা করেন, অপরের প্রতি আপনার সেইরূপ ব্যবহার করা উচিত। দেখুন সবাই আপনার মতো ভালো হবে, তার কোনো মানে নেই। কিন্তু সবাই খারাপ বলে আপনি কেন খারাপ হতে যাবেন ? এরা  সবাই সাধারণ মানুষ, আপনি সাধারণ থেকে আলাদা, এই কথাটা সবসময় মনে দৃঢ় রাখতে হবে । অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এক জিনিস, আর অন্যায়কারীর প্রতি অন্যায় ব্যবহার করা আর এক জিনিস। ঠাকুর রামকৃষ্ণকে যারা পাগল বলেছিলো, আজ তারা সবাই কবরে চলে গেছে।  কিন্তু ঠাকুর রামকৃষ্ণ আজও আমাদের সবার হৃদয়ে জ্বলজ্বল করছেন। যে ইংরেজ জাতি সম্পর্কে একদিন বলা হতো, ওদের রাজ্যে নাকি সূর্য অস্ত  যায় না, সেই ব্রিটেনে আজ ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রধানমন্ত্রী। কোথায় সেই দাপট ? যীশুখ্রিষ্টকে যারা ক্রুশবিদ্ধ করেছিল,  তারা সবাই হারিয়ে গেছে, যিশুখ্রিষ্ট আজও সারা পৃথিবীজুড়ে রাজত্ব করছেন। শ্রীকৃষ্ণকে যারা গালি দিয়েছিলো, তারা সবাই হারিয়ে গেছে, শ্রীকৃষ্ণ আজও সবার ঘরে ঘরে পূজিত হচ্ছেন। গুরুনানক আজ পৃথিবী ব্যাপী পূজিত। তো আপনাকে মহৎ হতে হবে, আপনাকে যোগীপুরুষ হতে হবে। আপনার মধ্যে সহ্যশক্তি সাধারন থেকে অবশ্যই বেশি হবে।  আপনি মনে রাখবে, আপনি আর পাঁচজন থেকে আলাদা। আপনার মধ্যের  বিশেষগুন  আপনাকে সাধারণ থেকে আলাদা করেছে। 

আসলে ঋষি পতঞ্জলি যে কথাগুলো এই শ্লোকে বলছেন, তা হচ্ছে চিত্ত শুদ্ধির প্রক্রিয়া। আপনার চিত্তে যখন দয়া, প্রেম, করুণা, মৈত্রী, ক্ষমার   ভাব আসবে, যখন তখন আপনার চিত্ত নির্ম্মল হবে। আর এই নির্ম্মল চিত্তেই ঈশ্বর প্রতিফলিত হতে পারেন। মলিন চিত্তে ঈশ্বর প্রতিবিম্বিত হতে পারেন না। আপনার মধ্যে যতক্ষন তামসিক ও রাজসিক ভাব থাকবে, ততক্ষন আপনার চিত্ত শান্ত হতে পারবে না।  তাই যোগসাধনায় উদ্যোগী পুরুষকে মনের মধ্যে  সাত্ত্বিক ভাবের  উদয় ঘটাতে হবে। সাত্ত্বিক চিত্তে একাগ্রতা স্বাভিকভাবেই স্থিত হয়। আসলে এই গুণগুলো  আমাদের স্থির চিত্তের লক্ষণ - যা চিত্তকে  নির্ম্মল  ও প্রসন্ন করে তুলতে পারে। 

"প্রচ্ছর্দন-বিধারণাভ্যাং বা প্রানস্য।"  (০১/৩৪) 

প্রাণের প্রচ্ছর্দন অর্থাৎ প্রাণবায়ুর ত্যাগ এবং তাকে বাইরে ধরে রাখলে চিত্ত স্থির হয়। 

শ্বাসবায়ুকে নাসাপুট দিয়ে বাইরে বের করে দেওয়াকে বলে প্রচ্ছর্দন। আর বিধারণ কথাটার অর্থ হচ্ছে শ্বাসকে  বিশেষ ভাবে ধরে রাখা। 

এই হচ্ছে প্রাণায়াম। প্রাণের আরাম বা প্রাণের সংযম। প্রাণায়ামের তিনটি পর্যায়, রেচক পূরক ও কুম্ভক। এই কুম্ভক আবার দুই প্রকার বাহ্য  কুম্ভক ও অন্তর কুম্ভক। শ্বাসবায়ুকে নাসাপুট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করানোকে বলে পূরক। শ্বাসবায়ুকে শরীরের ভিতরে আটকে রাখাকে বলে অন্তর কুম্ভক, আবার শ্বাসবায়ুকে বাইরে বের করে দেওয়াকে বলে রেচক, এবং বায়ুকে বাইরে বের করে দিয়ে বাইরে আটকে রাখাকে বলে বাহ্য  কুম্ভক। এই হচ্ছে প্রাণায়াম। 

এই চার প্রক্রিয়ার দ্বারা চিত্তের স্থিরতা সম্পাদনে ভীষণ কার্যকরী হয়ে থাকে। তবে একটা কথা বলি, প্রাথমিক সাধকের পক্ষে কেবলমাত্র রেচক পূরক অর্থাৎ অনুলোম-বিলোম করা উচিত।  কুম্ভকের ক্রিয়া না করাই  ভালো। বাহ্য কুম্ভক একেবারেই নয়।  এই কুম্ভক ক্রিয়া আসলে গুরুবিদ্যা। একমাত্র গুরুদেবের নির্দেশে ও গুরুসান্নিধ্যে এই ক্রিয়া যথার্থ ফলদায়ী হতে পারে। বাহ্য কুম্ভক পক্ক শরীর  ভিন্ন অভ্যাসে বিশেষ নিষেধ আছে। সাধ্য অনুযায়ী অন্তরকুম্ভক-এর অভ্যাস করা যেতে পারে। তাও  ১০-২০ সেকেন্ড করাই  ভাল, ধীরে ধীরে অভ্যাসের সঙ্গে সঙ্গে যখন সহ্যসীমা বাড়বে, তখন ১ মিনিট বা তার বেশি করা যেতে পারে। সর্বোচ্চ তিন মিনিটের  কুম্ভক একমাত্র সিদ্ধ যোগীপুরুষের পক্ষেই সম্ভব।  তাই অত্যুৎসাহী হয়ে কুম্ভক ক্রিয়া মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে নিয়ে আসতে পারে। শরীরে নানান রকম রোগের  কারন হতে পারে। তাই গুরুসান্নিধ্যেই কুম্ভকক্রিয়া করবার উপদেশ দেওয়া হচ্ছে। 

যাইহোক, এই অনুলোম-বিলোম আমাদের অস্থির চিত্তকে শান্ত করবার অব্যার্থ কাজ করে থাকে। 

"বিষয়বতী বা প্রবৃত্তিঃ উৎপন্না মনসঃ স্থিতিনিবন্ধিনী। " (০১/৩৫)
 
শব্দাদি বিষয়ে চিত্তবৃত্তি ধারনার প্রবৃত্তি হলে তাতেও মনের স্থিরতা সম্পাদন হয়।  

শব্দাদি কথাটার অর্থ হচ্ছে শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ - এই পাঁচটি  বিশেষ গুন্।  ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এঁরা  সবাই বিষয়বান, অর্থাৎ এদের প্রত্যেকের নিজ নিজ বিষয় আছে। আমাদের মনও  পঞ্চেন্দ্রীয়ের সাহায্যে এই বিষয়গুলোকে গ্রহণ করে থাকে। অর্থাৎ কান দিয়ে আমরা শুনি, নাক দিয়ে আমরা গন্ধ নিয়ে থাকি, জিহবা দিয়ে আমরা রস আস্বাদন করে থাকি, চোখ দিয়ে আমরা দেখি, ত্বক দিয়ে আমরা বিষয়ের অনুভব করি।  অর্থাৎ চক্ষু, কর্ন  নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক এগুলো আমাদের জ্ঞানেন্দ্রিয়। এগুলোর সাহায্যেই আমরা জ্ঞান সংগ্রহ করে থাকি। 

পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে মনকে শান্ত করবার প্রাথমিক উপায়। (পুনঃপ্রকাশ)

ধ্যানে প্রবৃত্ত হবার প্রাথমিক শর্তই হচ্ছে শান্ত মনের অধিকারী হতে হবে। এই মনকে শান্ত করবার জন্য ধ্যানের আগে আমরা ধারণা দিয়ে শুরু করি। ধারণা দুরকম। স্থুল ধারণা ও সূক্ষ্ম ধারণা। স্থূল বস্তুর উপর মনকে একাগ্র করাকে বলে স্থূল ধারণা। আর সূক্ষ্ম বস্তুর উপরে মনকে স্থির করাকে বলে সূক্ষ্ম ধারণা। আজ আমরা স্থূল ধারণার পাঁচটি উপায় নিয়ে আলোচনা করবো। এই পাঁচটি আসলে আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয়। চক্ষু, কর্ন, নাসিকা,জিহ্বা, ত্বক। 

১. চক্ষু : চোখের সাহায্যে মনকে শান্ত করবার যে উপায় তাকে বলাহয় ত্রাটক। ত্রি  কথাটার অর্থ হচ্ছে, কাঁছা। অর্থাৎ কাঁছা আটকে বসে থাকা। অর্থাৎ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হওয়া। এটি বিভিন্ন ভাবে করা যেতে পারে।

যে কোনো মূর্তি, বা ছবি, কাগজে একটা বৃত্ত এঁকে বা অক্ষর অর্থাৎ "ওং" এঁকে সামনে রাখুন। ছবিটিকে এমন ভাবে রাখবেন, যাকে সোজাসুজি দেখতে পারেন।  আপনি স্থির হয়ে সুখাসনে বসুন। মেরুদন্ড সোজা  করুন। এইবার স্থির দৃষ্টিতে আপনি আপনার লক্ষবস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকুন। চোখের পলক ফেলবেন না। প্রথমে সমগ্র ছবিটির দিকে তাকান, তারপরে, ছবিটির বিভিন্ন অংশ দেখতে থাকুন। চোখে জল আসলে, একটু বিশ্রাম করুন, আবার শুরু করুন। ক্রমে ক্রমে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার সময় বাড়ান। তবে যদি দেখেন, যে দৃশ্য ধীরে ধীরে বড়ো হচ্ছে বা ছোট হচ্ছে, বা একাধিক দৃশ্য চোখের সামনে ভাসছে, তাহলে খানিকটা বিশ্রাম নিন। ৫-৭ মিনিট এরকম করতে পারেন। 

অন্ধকার ঘরে একটি প্রদীপ জ্বেলে (সরিষার তেল বা ঘিয়ের) দ্বীপশিখার দিকে একদৃষ্টিতে  তাকিয়ে থাকুন। তবে যাদের চোখের সমস্যা আছে তারা এটি  করবেন না। চোখে জল পড়লে, বার বার পলক পড়লে, প্রক্রিয়া  ক্ষাণিক ক্ষনের জন্য   বন্ধ রাখুন। এটিও ৫-৭ মিনিট করতে পারেন। 

একটা কথা মনে রাখবেন, যেকোনো একটি বস্তুকে সামনে রেখে প্রতিদিন এটির অভ্যাস করুন। আজ এটা, কাল ওটা করবেন না। এতে করে মনের স্থিরতা নষ্ট হয়। 

এই ত্রাটক প্রক্রিয়ার একটা  শক্তিশালী মাধ্যম হচ্ছে, বুড়ো আঙুলের নখ, কোন উজ্জ্বল স্বচ্ছ  ধাতুকে সামনে রেখেও এটি করা যেতে পারে। তবে দুর্বল মানুষের পক্ষে এইসব মাধ্যমের সাহায্যে ত্রাটক করা উচিত নয়। এটি করার সময় যে সব দৃশ্য দেখা যায়, তা আমাদের সবার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নাও হতে পারে। তাতে সাধকের ক্ষতি হতে পারে। তাই নতুন সাধকদের এই অভ্যাস না করা  ভালো।  

একটা কথা সব সময় মনে রাখবেন, আমাদের মূল উদ্দেশ্য ধ্যান। মনকে ধ্যানের  জন্য প্রস্তূত করবার উদ্দেশ্যে, এইসব প্রাথমিক ধারণা আমাদের শিক্ষা করতে হয়। এই ধারণা  আসলে মনকে একজায়গায় স্থির করবার প্রক্রিয়া বিশেষ।  

২. কর্ন বা কানের সাহায্যে - আমরা আমাদের শ্রবণশক্তিকে ব্যবহার করেও মনকে স্থির করতে পারি। প্রতিনিয়ত হয়ে যাওয়া শব্দগুলোকে শোনার চেষ্টা করুন। ঘড়ির টিক-টিক শব্দ, ফ্যানের শো-শো শব্দ, আপনার পালসবিট , বা কোনো মৃদু সঙ্গীত, বা বাজনা। কান বন্ধ করলে একটা শব্দ শুনতে পাবেন, সেটিও শুনতে পারেন। এটা উৎকৃষ্ট পদ্ধতি। এর চেয়ে আরো ভালো হচ্ছে, অনাহত ধ্বনি শোনা। তবে  আগে নিজের নাড়ীশুদ্ধি করে নিন। তাহলে আপনার পক্ষে অনাহত ধ্বনি শোনা সম্ভব হবে। এই অনাহত ধ্বনি শোনা সবচেয়ে উৎকৃষ্ট। 

নাড়ীশুদ্ধি প্রক্রিয়া : যেকোনো সুখাসনে মেরুদন্ড সোজা রেখে বসুন। বা নাক বন্ধ করে, ডান নাক দিয়ে ধীরে ধীরে শ্বাস নিন, আবার ডান নাক বন্ধ করে বা নাক দিয়ে শ্বাস ছাড়ুন। এবার বা নাক দিয়ে শ্বাস নিন ডান  নাক দিয়ে শ্বাস ছাড়ুন। শ্বাস কখনো ভিতরে বা বাইরে রুখে দেবেন না।  এটি আসলে অনুলোম-বিলোম।  পার্থক্য হচ্ছে, এটি করবার সময়, ১০-১২ সেকেন্ড ধরে শ্বাস নিন আবার ১০-১২ সেকেন্ড সময় নিয়ে শ্বাস ছাড়ুন। ভুলেও অন্তরকুম্ভক বা বাহ্যকুম্ভক করবেন না। এটাই নাড়ীশুদ্ধি প্রক্রিয়া। এটি মাত্র ৫-৭ বার করুন। তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যেই আপনি ডানকানে একটা ভ্রমরের শব্দ শুনতে পাবেন। বা কানে যদি আসে, তার দিকে নজর দেবেন না। ডান  কানের দিকে খেয়াল করুন। যদি ডান  কানে এটি শুনতে পান তবেই  সেটা শুনতে থাকুন। কানের সাহায্যে মনকে শান্ত করবার এটা একটা শক্তিশালী প্রক্রিয়া। খেয়াল করার চেষ্টা করুন, এই ধ্বনি কোথা থেকে আসছে। প্রথমে আপনার মনে হবে, এটি মাথা থেকে আসছে, তারপর মনে হবে হৃদয় থেকে আসছে, তারপরে মনে হবে নাভি থেকে আসছে। এটি করবার সময় যদি মাথা ঘোরে, তবে প্রক্রিয়াটি বন্ধ রাখুন। মাথাঘোরা চলে যাবে। কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে আবার শুরু করুন। 

৩. নাকের সাহায্যে :  যেকোনো একটা সুগন্ধি ফুল বা ধূপের গন্ধ নিতে থাকুন। সবথেকে ভালো হয়, যদি শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে খেয়াল করে বসে থাকেন। চুপচাপ বসে শুধু শ্বাস-প্রশ্বাসের গতিকে অনুভব করার চেষ্টা করুন। খেয়াল করার চেষ্টা করুন, বাতাস আপনার নাক দিয়ে প্রবেশ করছে, ভ্রূদ্বয়ের মাঝে আঘাত খেয়ে, বাতাস বুকের মধ্যে ঢুকছে, ফুসফুসের মধ্যে ঢুকছে, কিছুটা বাতাস পেটের  মধ্যে চলে যাচ্ছে। আবার একই পথে বেরিয়ে আসছে। এটি অভ্যাস করলে, আপনার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি ধীর হয়ে যাবে। এমনকি, এটি আর তখন পেট পর্যন্ত যাবে না। ফুসফুস পর্যন্ত গিয়ে ফিরে আসবে। আপনার মনোযোগের গভীরতা যত  বাড়বে, বাতাসের গতি তত ধীর ও সংকুচিত হবে। একটা সময়  মনে হবে, এটি শুধু নাকের ডগায় ঘোরাফেরা করছে। এই প্রক্রিয়া, আপনাকে ধারণা থেকে ধ্যানে নিয়ে যাবে, আপনার অজ্ঞাতসারে। 

৪. জিভের সাহায্যে :  মুখ বন্ধ করুন, জিভের আগা দিয়ে মূর্ধা স্পর্শ করুন। অর্থাৎ আপনি যখন ট, ঠ, ড, ঢ,ণ উচ্চারণ করেন, জিভ এই সময় আমাদের মূর্ধা স্পর্শ করে। এইভাবে  মূর্ধা স্পর্শ করে  মনটাকে  সেখানে রাখুন। এই স্পর্শ সুখ অনুভব করতে থাকুন। কিছুদিন পরে দেখবেন, আপনার জিভে একটা মিষ্টি স্বাদ অনুভব করছেন। একেই যোগের ভাষায় বলে, দিব্যস্বাদ। 

৫. ত্বকের সাহায্যে : আপনার শরীরের যে কোনো অংশ দিয়ে যে কোনো বস্তূ স্পৰ্শ করুন, তা সে নরম  বিছানা হতে পারে, বা একটা শক্ত  গাছের গুড়ি হতে পারে, এবার আপনি সেটাকে অনুভব করতে থাকুন। 

আসলে মন কোনো বস্তু নয়।  আমাদের স্নায়ু কেন্দ্রের  ক্রিয়াকে বলে মনের ক্রিয়া।  
সাধকের ভাষায় বলে চক্রের ক্রিয়া। আমাদের দর্শন-শক্তি,  আমাদের শ্রবণ-শক্তি, স্পর্শশক্তি, ঘ্রাণশক্তি, ও বাকশক্তি  ইত্যাদি  আমাদের শরীরের বিভিন্ন স্নায়ুকেন্দ্রে   আঘাত করে, এবং সেখানে স্পন্দন তোলে, তাকে চঞ্চল করে তোলে, এবং ক্রিয়াশীল করে তোলে। আমাদের বিশেষ বিশেষ জায়গায় বা স্নায়ু গ্রন্থিতে আলোড়ন তোলার  সক্রিয় ভূমিকা নেয়, আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়। । আর ওই গ্রন্থি যখন ক্রিয়াশীল হয়ে যায়, তখনি আজব ব্যাপার সংগঠিত হয়। মানুষ তখন চিন্তাকরতে শুরু করে, ভাবনা করতে শুরু করে। এবং এই স্পন্দনধারায় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে  মানুষের চিন্তা ধারার পরিবর্তন হয়। বিচারাধারার পরিবর্তন হয়। কর্মধারার পরিবর্তন হয়। মানুষ পাশবিক প্রবৃত্তি ত্যাগ করে, দেবমানব হয়ে যায়।
------------

ওম শান্তি শান্তি শান্তিঃ।  হরি ওম।   
    
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং -  ১/৩৬-৩৯

"বিশোকা  বা জ্যোতিষ্মতী ।"- (০১/৩৬)

শোকরহিত যোগীর চিত্ত জ্যোতি স্বরূপ। 

চিত্তে  যখন সাত্ত্বিক ভাবের উদয় হয়, তখন যোগী শোকরহিত অবস্থায় অবস্থান করেন। এঅবস্থায় চিত্ত বৃত্তির স্থিরতা সাধন হয়।  একেই বলে জ্যোতিষ্ময়  অবস্থাপ্রাপ্তি। এখন কথা হচ্ছে শোক রহিত  বলতে কি বোঝায় ? শোক হচ্ছে দৈহিক ও মানসিক দুঃখের অবস্থা। আসলে রজঃ  ও তমঃ  গুনের প্রভাবে সত্ত্বগুণের অনাধ্যিক্যে এই অবস্থার জন্ম হয়। আবার যখন রজঃগুনের প্রভাব স্তিমিত হয়ে আসে, এবং সত্ত্বগুণের আধিক্য হয়,  তখন যে সুখময় অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাকে বলে  চিত্তের জ্যোতিস্মতী অবস্থা।  তখন মন থাকে স্থির, হৃদয়ে প্রশান্তি ও প্রজ্ঞার আলোক উদ্ভাসিত হয়। এই অবস্থায় চিত্তবৃত্তি নাশ না হলেও  স্থির হয়ে অবস্থান করে। 

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে শ্লোক নং. ২/১১ তে বলা হচ্ছে, ব্রহ্ম  উপল্বদ্ধির আগে, যোগী তুষার, ধোয়া, সূর্য, বাতাস, আগুন, জোনাকি, স্ফুলিঙ্গ, স্ফটিক, চাঁদ প্রভৃতি দেখতে পান।  এসব আসলে ব্রহ্মজ্ঞানের পূর্বাভাস । শোনা যায়, স্বামী বিবেকানন্দ ধ্যানে বসলেই জ্যোতির দর্শন  করতেন।   ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেখেছিলেন, মায়ের মূর্তি থেকে উজ্বল  জ্যোতির তরঙ্গ এসে তাঁকে  ভাসিয়ে নিয়ে গেলো। বহু যোগী পুরুষের কাছে শোনা যায়, তাঁরা ধ্যানের  গভীরে প্রবেশ করলে ধ্যানগৃহের মধ্যে জ্যোতির প্রবেশ ঘটে। এসব বাহ্য , আসলে চিত্ত যখন নির্ম্মল হয়, চিত্ত যখন শুদ্ধ হয়, স্থির হয়, তখন স্থির চিত্ত এই জ্যোতির আকার গ্রহণ করে থাকে। যখন কেউ যোগ সাধনা শুরু করেন, তিনি ধীরে ধীরে উপলব্ধি করেন, তার দেহ-মনে একটা রূপান্তর ঘটছে। যোগের তেজঃশক্তি যোগীর দেহ-মনকে  শুদ্ধ করে তোলে। এমনকি তিনি রোগ, শোক, জরা, মৃত্যুর অতীত হয়ে ওঠেন।  যোগ অভ্যাসের দ্বারা মনের মলিনতা দূর হলেই অন্তরে  ব্রহ্মজ্যোতি আপনা থেকেই ঝলমল করে উঠবে।  
 
"বীতরাগ বিষয়ং বা চিত্তম। " - (০১/৩৭)

অনাসক্ত বিষয়-চিন্তনে চিত্ত স্থির হয়। 

বীতরাগপুরুষ অর্থাৎ আসক্তিহীন পুরুষের চিত্ততে  ধ্যান করলে, যোগীর চিত্ত শান্ত হতে পারে। শ্রীমদ্ভগবৎ গীতায় যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন  কর্ম্মফলের আশা না রেখে, যিনি কর্তব্য  কর্ম্ম করেন, তিনি সন্ন্যাসি, তিনি যোগী।  (৬/১) সংকল্প ত্যাগ করতে না পারলে, কেহ যোগী হতে পারে না। (৬/০২)  মনঃসংযোগ পূর্ব্বক মদ্গতচিত্ত মৎপরায়ণ  হয়ে ধ্যানের  অভ্যাস করবে। (৬/১৪) 

ধ্যানযোগী সাধক কেবল যে আকাশ, প্রভাতসূর্য্য, বা প্রণবের ধ্যান করবে, তাই নয়, তিনি সদ্গুরু পরায়ণ  হয়েও ধ্যান করতে পাবেন।  অর্থাৎ অনাসক্ত সমদর্শী স্থিতধী  পুরুষের বা ভাগবত সত্ত্বার আশ্রয় নিয়েও ধ্যান করতে পারেন। এতেও চিত্ত স্থির হবে। 

"স্বপ্ন-নিদ্রা-জ্ঞান-আলম্বনং বা। " (০১/৩৮) 

স্বপ্নজ্ঞান অথবা নিদ্রাজ্ঞান আলম্বনে অর্থাৎ ভাবনায় চিত্ত স্থির হয়। 

চিত্তকে  শান্ত করবার আরো একটা উপায় হচ্ছে, স্বপ্নকালীন ও গাঢ়নিদ্রা-কালীন যে জ্ঞান তার উপরে ভাবনা বা ধ্যান করা যেতে পারে।  আমরা জানি, স্বপ্নাবস্থায় আমাদের বাহ্য  জগতের জ্ঞান থাকে না। স্থূল দেহ থাকে স্থির।  কিন্তু এই অবস্থায় আমরা বাহ্য  জগতের অনুরূপ একটা জগতে বিচরণ করে থাকি। আর বিচরণ হয়ে থাকে আমাদের সূক্ষ্ম মানসশরীরে। এই সময় অনেকের অনেক অলৌকিক দর্শন হয়ে থাকে।  অনেকে স্বপ্নাবস্থায় মানসচক্ষে দেবাদির মূর্তি  দর্শন করে থাকেন। সাধক স্বপ্নে দেখা এই দেবাদির ধ্যান করতে পারেন।  

আবার আমাদের গাঢ়  ঘুমে বা সুসুপ্তিতে আমাদের মনে কোনো বৃত্তি থাকে না। অর্থাৎ এই সময় আমাদের স্থূল শরীর-মন নিয়েও জড়ের মতো পড়ে  থাকি।  বাহ্যজ্ঞানরহিত অবস্থায় শূন্যের মধ্যে অবস্থান করি। এই যে বাহ্যজ্ঞানশূন্য অবস্থা অর্থাৎ চিন্তা রহিত  অবস্থা, এই অবস্থার উপরেও ধ্যান করা যেতে পারে। তাহলেও  সাধকের চিত্ত দ্রুত স্থিরতা প্রাপ্ত হবে। 

"যথাভিমত ধ্যানাৎ বা। " (০১/৩৯)

যেমন আপনার অভিমত বা অভিরুচি, সেইমতো বস্তুতে ধ্যান করলেও চিত্ত স্থিত হয়। 

যার যেমন ইচ্ছে বা অভিরুচি, সেই বস্তুতেই ধ্যান করা যেতে পারে।  আসলে যোগের ইচ্ছেটাই বড়ো  কথা।  কিসের উপরে ধ্যান করছেন, সেটা বড়ো  কথা নয়। কারন সমস্ত বস্তুই জানবেন সেই এক ব্রহ্ম।  তো আপনি যার উপরেই ধ্যান করুন না কেন আপনি সেই ব্রহ্মের ধ্যানই  করছেন, তা সে জ্ঞাতসারে  হোক বা অজ্ঞাতসারে । মনকে স্থির করাই  আসল  কথা।  তবে একটা কথা সবসময় মনে রাখতে হবে, যে বস্তুতে আপনার আসক্তি আসে, সেই বস্তু ধ্যানের মধ্যে না আনাই  ভালো।  কারন এতে করে অনাসক্তির পরিবর্তে আসক্তি বাড়তে থাকবে।  আমাদের উদ্দেশ্য যোগ অর্থাৎ জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার যোগ। এই যোগের উদ্দেশ্য নিয়ে অনাসক্ত হয়ে যে কোনো বস্তুতেই ধ্যান করা যেতে পারে। যোগী পুরুষগন বলে থাকেন সামনে যেকোনো বস্তুর রেখেই ধ্যানে লিপ্ত হওয়া  যায়। ধীরে ধীরে মন শুদ্ধ হতে হতে একসময় মন ঈশ্বরে বা ওঙ্কারে লয় হয়ে যায়। ঈশ্বরে মনকে স্থির করাই যোগের উদ্দেশ্য। 

"পরমাণু-পরম-মহত্ত্বান্তো  অস্য  বশীকারঃ। " - ( ০১/৪০) 

পরমাণু অর্থাৎ অতি সূক্ষ্ম পদার্থ। পরম মহৎ তত্ত্ব অর্থাৎ অস্মিতা ও পরমপুরুষ একত্রীকরণ রূপ। ধ্যানের  মাধ্যমে এখানে পৌঁছলে যোগীর  চিত্তে বশীকার অর্থাৎ উত্তম বৈরাগ্যপদ লাভ হয়। 

বশীকার অর্থে মনকে ইন্দ্রিয় থেকে গুটিয়ে আনতে  হবে। ইন্দ্রিয় তার নিজের কাজ করবে, চোখ দেখবে, কান শুনবে, কিন্তু যদি মন ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে সম্মন্ধ ছিন্ন করে, তবে চোখ দেখেও  দেখবে না, কান শুনেও শুনবে না। এই বশীকারের কথা এর আগে আমরা ১/১৫ শ্লোকে বিস্তারিত শুনেছি।  

চিত্ত যত  স্থির হবে, তত সে বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে। তখন বিষয়ের যে সূক্ষ্ম দিক, তা তার কাছে উদ্ভাসিত হবে। ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, যখন চিত্ত  বিষয়ের মধ্যে নিবিষ্ট হয়ে গেছে তখন স্থূলের মধ্যে যে পরমাণু রয়েছে, তাতে স্থিতি লাভ সম্ভব। অর্থাৎ স্থূল বিষয়ে নিবিষ্ট চিত্ত একসময় সূক্ষ্ম থেকে  পরম-মহৎ তত্ত্বের মধ্যে প্রবেশ করবে। এমনকি সেখানে সে স্থিত লাভ করতে পারে। এইসময় যোগীর চিত্তে ইন্দ্রিয়ের কর্ম্মকে না থাকে বাধা দেবার প্রবৃত্তি, না থাকে গ্রহণ করবার প্রবৃত্তি। এই হলো যথার্থ বশীকার। এই বশীকারের  কারনে চিত্ত শুদ্ধ হয়ে আকাঙ্খা রহিত হয়ে অবস্থান করে। 

আসলে ধ্যান করা যায় না, ধ্যান হয়। তবে ধ্যানের  অভ্যাস প্রয়োজন।  এই অভ্যাসের ফলেই চিত্ত স্থির হয়ে ধ্যানস্থ হয়ে যায়। তখন ইচ্ছে হলেই ধ্যানস্থ হওয়া  যায়। আর ধ্যান যখন গভীর হয়, তখন যোগীর সমাধিলাভ ঘটে। তখন মনের চঞ্চলতা থাকে না, চঞ্চলতা নিবারনের জন্যও কোনো প্রচেষ্টা করতে হয় না। কেবল যোগীর ইচ্ছেই তাকে ধ্যানস্থ করে দেয়।

"ক্ষীনবৃত্তেঃ অভিজাতাস্য ইব মনেঃ গ্রহীতৃ-গ্রহণ-গ্রাহ্যেষু তৎস্থ-তদঞ্জনতা সমাপত্তিঃ ।"  (০১/৪১)

যে যোগীর চিত্তের বৃত্তি ক্ষীণ হয়েছে, সেই যোগীর চিত্ত হয়  মনিসম। এই চিত্তের না আছে গ্রহীতা ভাব, না আছে গ্রহণ ভাব।  তখন  গ্রাহ্য বিষয়ে যে একাগ্রতা  এবং তাতে যে তন্ময়ভাব একেই বলে সমাপত্তি বা সম্প্রজ্ঞাত সমাধি। 

চিত্তের বৃত্তি ক্ষীণ হয়েছে অর্থাৎ তখন একটি মাত্র বৃত্তি অবলম্বন হয়েছে।  তখন কেবলমাত্র   ধ্যেয় বস্তুতেই চিত্ত স্থির হয়েছে। এবং চিত্ত তখন সেই ধ্যেয় বস্তুর রঙে  রাঙিয়ে উঠেছে। স্ফাটিক যেমন লালবস্তুর কাছে রাখলে লাল  হয়, আবার নীলের কাছে রাখলে নীল হয়, তেমনি  এই সমাপত্তি  সমাধি অবস্থায় ধ্যেয় বস্তুর দ্বারাই সাধকের চিত্ত রঞ্জিত হয়েছে।

ধরুন আপনি গুরুদেবের মূর্ত্তির ধ্যান করছেন। এখন ধ্যানে আপনার মানসচক্ষে প্রথমে গুরুদেবের প্রতিচ্ছবি বা একটা অবয়ব ভাসছে।  এই মূর্ত্তি  স্থূল দেহের অনুরূপ কিন্তু স্থূল নয়, সূক্ষ্ম। এবার এই সূক্ষ্ম দেহ পরিষ্কার (ঋষির ভাষায় অভিজাত)  আপনার সামনে ভাসছে। আপনি জানেন, গুরুদেব মুক্ত পুরুষ, কিন্তু তন্মাত্রের গ্রাহকও  বটে।  অর্থাৎ শব্দ, স্পর্শ, রূপ রস, গন্ধের গ্রাহকও বটে। কিন্তু এই তন্মাত্র এখন গ্রহণ করছে কে ? আপনি অর্থাৎ সাধক। এই তন্মাত্রের  যিনি গ্রাহক অর্থাৎ যার বোধে এই তন্মাত্র  গ্রহীত হচ্ছে তিনি হচ্ছে অস্মিতা। 

দেখুন যোগীর উদ্দেশ্য হচ্ছে, ত্রিগুণময়ী প্রকৃতি থেকে পুরুষকে পৃথক করে, শুদ্ধ আত্মস্বরূপে অবস্থান করা। এখন ত্রিগুণময়ী প্রকৃতি থেকে সত্ত্বগুনকে আশ্রয় করে চিৎ স্বরূপ পুরুষকে ধরতে হয়। এই অবস্থায় সত্ত্বগুণময় প্রকৃতি ও চৈতন্যময় পুরুষ এই দুজনকে এক বলে মনে হয়। এ আসলে অবিদ্যার কারনে ঘটে থাকে।  তথাপি এই যে মনে হওয়া একেই বলে অস্মিতা। এবং এই বিশ্বপ্রকৃতি এটি এই অস্মিতারূপ গ্রন্থি অবলম্বনে রচনা হয়েছে। যোগীকে এখান থেকে বেরিয়ে আসতে  হবে। 

সহজ করে বলতে গেলে, ধ্যানের মধ্যে যতক্ষন আমি দেখছি, আমি জানছি, আমি অনুভব করছি, অথচ ধ্যেয় বস্তুতেই মন নিবিষ্ট হয়ে আছে, সেই ধ্যানের অবস্থাকেই বলে সমাপত্তি  বা সম্প্রজ্ঞাত সমাধি।  ..........
--------       

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং -  ১/৪২

"তত্র শব্দার্থ জ্ঞান বিকল্পৈঃ সংকীর্ণা সবিতর্কা সমাপত্তিঃ ।"  (০১/৪২) 

যেখানে সবির্তক সমাধি, সেখানে শব্দের অর্থজ্ঞান হচ্ছে মিশ্রজ্ঞান অর্থাৎ সংকীর্ণ জ্ঞান। 

ঋষি পতঞ্জলি সমাধি জাত প্রজ্ঞাকে শুদ্ধ করবার প্রয়াস করেছেন। বাহ্যত শব্দ দ্বারা আমরা যে জ্ঞান সংগ্রহ করি, তা শুদ্ধ নয়। অর্থাৎ এই শব্দের সঙ্গে একটা নাম বা বিষয়  সম্পৃক্ত আছে। এমনি এই শব্দজ্ঞান আমাদের মিশ্র জ্ঞান দান  করে থাকে।  "গো" শব্দে যেমন আমরা গরু বুঝি, গমন করা বুঝি, গায়ত্রী, স্বর্গ, চক্ষু, ইন্দ্রিয়, বাক্য, কেশ, কিরণ, জল বুঝি  তেমনি "গো" শব্দ দ্বারা আমরা জ্ঞান, আবার "গো" শব্দ দ্বারা আমরা চন্দ্র, সূর্য, পৃথিবী বুঝে থাকি। (এই সব অর্থ বাংলায় প্রচলিত না হলেও, সংস্কৃতে এর বিরল প্রয়োগ দেখতে পাওয়া যায়) 

তাহলে, শব্দের সঙ্গে অর্থ বা বিশেষ পদার্থ আবার জ্ঞান বা বোধ ইত্যাদি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এই কারনে,  বিশেষ শব্দ দ্বারা কোনো বিশেষ অর্থকে ধরা আমাদের পক্ষে বিড়ম্বনার কারন হয়ে থাকে।  একটা জিনিস জানবেন,  প্রতক্ষ্য বস্তু বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়  এবং আমাদের ধারণার বিষয়কে গুলিয়ে দেয়। এইজন্য শব্দ দ্বারা আমাদের শুদ্ধ জ্ঞান পাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। 

এইযে শব্দ  ও তার বহুবিধ অর্থ মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে,  ঋষি পতঞ্জলি সাধককে এখান  থেকে বের করে নিয়ে আসতে  চাইছেন। আমাদের বোধ থেকে মিশ্রজ্ঞানকে শুদ্ধ করে, যথার্থ স্বরূপের জ্ঞান অৰ্জন করতে বলছেন। যথার্থ স্বরূপের জ্ঞান তাই শব্দ দ্বারা হতে পারে না। তাই শব্দজ্ঞান তর্কের উর্দ্ধে নয়। যখন আমরা এই মিশ্রজ্ঞান থেকে মুক্ত হয়ে শুদ্ধ জ্ঞানের অধিকারী হতে পারবো, তখন আমরা তর্কাতীত বা নির্বির্তক জ্ঞানের সন্ধান পাবো। এই মিশজ্ঞান যেমন স্থূল বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত, তেমনি সূক্ষ্ম বিষয়ের সঙ্গেও যুক্ত। মোদ্দা কথা হচ্ছে, আমাদের জ্ঞান যেন কোনো মনগড়া ধারণার মধ্যে আবদ্ধ  হয়ে না পড়ে। 

আমরা যখন ওঙ্কারের সাধনা বা জপ করি, তখন এই নামের সঙ্গে আমরা বা এই মন্ত্রের সঙ্গে এর বাচ্য যে ঈশ্বর তাঁকে  আমরা আমাদের হৃদয়কেন্দ্রে আসীন করে থাকি। এই যে ঈশ্বর ও তাঁর  নাম ওম,  অর্থাৎ নাম ও নামী  তখন এক হয়ে গেলো।  একেই ঋষি পতঞ্জলি বলছেন সংকীর্নতা।  এই অবস্থায় যোগীর যে সমাধি তা সামাপত্তি যা তর্কের উর্দ্ধে নয়, এটি সবির্তক। কারন এই যে ওম ধ্বনির সাহায্যে ঈশ্বরের ধারণা  করা হচ্ছে,  এটি কেবল বিশেষ  ধর্ম্মমতে স্বীকার করা হয়েছে।  অন্যরা কেউ প্রণবপুট বা নমঃ যোগে শিব, দূর্গা, বিষ্ণু, ব্রহ্ম  ইত্যাদির সাহায্য নিচ্ছেন। ঋষি পতঞ্জলি শুদ্ধ জ্ঞানের অধিকারী হতে বলছেন, প্রচলিত ধারণা  থেকে বেরিয়ে আসতে  চাইছেন। পরম-সত্যকে ধরতে চাইছেন। 

 আমরা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সমস্ত বিষয়কে বুদ্ধি দ্বারা বিচার করে নেই। আর এখানে গ্রহীতা হলো আমাদের অস্মিতা। এখানে  আমাদের গ্রহীতা কিন্তু আত্মা বা জীবাত্মা নয়। এই অস্মিতা আসলে আত্মার আভাস  মাত্র। পাঁচ ইন্দ্রিয় দ্বারা পাঁচ তন্মাত্রের বিষয়কে গ্রহণ করছি।  আমাদের ধ্যানের  মধ্যে বুদ্ধি বিচার চলতে থাকে। তো আমাদের জ্ঞান আসলে ভূত, ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি এই বিষয় অবলম্বনে হয়ে থাকে।  ঋষি পতঞ্জলি এখান  থেকে বের করে নিয়ে  আসতে  চাইছেন আমাদের। তিনি চাইছেন, কেবলমাত্র আত্মজ্ঞানের উপলব্ধি।  অর্থাৎ পুরুষাকারের বুদ্ধিতে নিজেকে অবস্থিত করতে পারলে যে বোধানন্দ বা জ্ঞানানন্দ হয় তার উপলব্ধি করাতে। ধ্যানস্থ হয়ে বোধিমূলে সমাপত্তি ভোগ করতে হবে।
-------------

পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং -  ১/৪৩-৪৫

"স্মৃতি-পরিশুদ্ধৌ স্বরূপ শূন্য এব অর্থমাত্র নির্ভাসা নির্বিতর্কা  " (০১/৪৩) 
স্মৃতির পরিশুদ্ধিতে অর্থাৎ শব্দচিন্তা থেকে যে শব্দহীন অর্থচিন্তন, আর বস্তুর স্বরূপে যে বিষয়  স্বরুপশূন্য যে স্থিতি জ্ঞান, একেই বলে নির্বিতর্কা সমাপত্তি। 

ধ্যানাবস্থায়,  যতক্ষন বস্তুবোধ থাকে, অর্থাৎ শব্দ, অর্থ, ও তার জ্ঞানের যে মিশ্রন  থাকে, তার পরিশুদ্ধিতে বস্তুর স্বরূপে থাকা যে বিষয় থাকে  তাতে যখন স্থিরজ্ঞান হয়, তা নির্বিতর্ক।  

ঋষি পতঞ্জলি এবার শব্দের বাহন থেকে আমাদের লক্ষ্য বস্তুতে নেমে আসতে বলছেন। শব্দের অর্থজ্ঞান থেকে আমাদের বস্তু, জাতি বা ব্যক্তির স্মরণ হয়। কিন্তু  শব্দকে বাদ দিয়ে কেবলমাত্র অর্থ চিন্তন আমাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয় ।  কিন্তু যোগীপুরুষগন বলে থাকেন, এটি সম্ভব, অর্থাৎ নিরন্তর অভ্যাসের দ্বারা শব্দকে বাদ  দিয়েও অর্থ চিন্তন সম্ভব। এরই নাম ঋষি পতঞ্জলির ভাষায় স্মৃতি পরিশুদ্ধি।  অর্থাৎ শব্দ ত্যাগের পরেও যখন কেবলমাত্র অর্থ চিন্তন হচ্ছে।  এইযে শব্দবিহীন অর্থ চিন্তন এতেকরে আমাদের স্মৃতির পরিশুদ্ধি হচ্ছে। 

মন্ত্র জপ করতে করতে একসময় মন্ত্রের ধ্বনি মনের মধ্যে অনুরণন হতে থাকে। অর্থাৎ একসময় শব্দ ধ্বনিতে রূপান্তরিত হয়। ধ্বনি কিন্তু অর্থবহ নয়। কিন্তু ধ্বনি আমাদের অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত।  আমরা জানি পূর্বানুভূত বিষয়ের জ্ঞান হচ্ছে স্মৃতি। এই স্মৃতিতে বিষয় ও শব্দ মিশ্রিত অবস্থায় থাকে। অভ্যাসের মাধ্যমে স্মৃতি থেকে যখন শব্দকে আলাদা করা সম্ভব হয় তখন তা হয় স্মৃতি-পরিশুদ্ধি। মোট কথা মনগড়া কোনো ধারণা, যা কেবলমাত্র শব্দকে আশ্রয় করে স্মৃতিতে পুঞ্জীভূত হয়েছে, অর্থাৎ যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই, তেমন কোনো বিকল্প যেন আমাদের বোধে লেগে না থাকে। - এটাই যোগের উদ্দেশ্য। স্থূল বিষয়ে সমাধি যতক্ষন এই সাঙ্কর্ষযুক্ত থাকে ততক্ষন তার নাম সবিতর্ক ।  আর যখন সঙ্কর্ষমুক্ত হয় তখন তা নির্বিতর্ক। 

"এতয়ৈব  সবিচারা নির্বিচারা চ সূক্ষ্ম বিষয়ে ব্যাখ্যাতা।"  (১/৪৪)

এই আলোচনার মাধ্যমেই সূক্ষ্ম বিষয়ক সবিচারা ও নির্বিচারা সমাধির সূক্ষ্ম তত্ত্ব  ব্যাখ্যা করা হলো। 

এর আগের শ্লোকে, আমরা শুনেছি, সবিতর্ক ও নির্বিতর্ক সমাধির কথা।  অর্থাৎ  স্থূল বিষয়ে সমাধি (বোধানন্দ ) যতক্ষন এই সাঙ্কর্ষযুক্ত থাকে ততক্ষন তার নাম সবিতর্ক ।  আর যখন সাঙ্কর্ষমুক্ত হয় তখন তা নির্বিতর্ক। ঠিক তেমনি সূক্ষ্ম বিষয়ে এই সাঙ্কর্ষ যুক্ত থাকলে, তা হয় সবিচার আর সাঙ্কর্ষ মুক্ত  থাকলে তা হয় নির্বিচার সমাপত্তি । 

"সূক্ষ্ম বিষয়ত্বং চ অলিঙ্গ  পর্যবসানম।" - (১/৪৫)

সূক্ষ্ম বিষয়ত্ব অলিঙ্গে পরিসমাপ্তি হচ্ছে।  

স্থূল বিষয় সূক্ষ্ম বিষয়ে লয় হচ্ছে।  আবার সূক্ষ্ম বিষয় অলিঙ্গে পরিসমাপ্তি লাভ করছে। 

পঞ্চভূতের কারন হচ্ছে পঞ্চ  তন্মাত্র। যা কোনো কিছুতে লয় হয়, তাকে বলা হয় লিঙ্গ। এই লিঙ্গ কখনো লয় হয় না। কিন্তু প্রকৃতি হচ্ছে অলিঙ্গ। তার কোনো লয় নেই, তা নয় । আবার  পুরুষের সান্নিধ্য বশতঃ  প্রকৃতি থেকেই যথাক্রমে বুদ্ধি,  অহঙ্কার ও পঞ্চ তন্মাত্র ইত্যাদির আবির্ভাব হয়েছে। এই অহঙ্কার  থেকে  আবার ১১ ইন্দ্রিয় (পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয়,পাঁচ কর্ম্মেন্দ্রিয়, ও অন্তরেন্দ্রিয়  মন) আর পাঁচ তন্মাত্র  থেকে পঞ্চভূতের সৃষ্টি। কিন্তু পরমপুরুষ প্রকৃতি থেকে ভিন্ন। পরমপুরুষ  এই প্রকৃতির উপাদান কারন নয়, কেবলমাত্র নিমিত্ত কারন।  ঋষি পতঞ্জলি এই শ্লোকে সৃষ্টি ও লয় রহস্যের অভাস  দিয়েছেন। 

ঋষি ব্যাসদেব তাঁর  ভাষ্যে বলছেন, পার্থিব কঠিন পদার্থের অর্থাৎ ক্ষিতির তন্মাত্র  হচ্ছে গন্ধ।  আবার জলের ( তরল) তন্মাত্র রস, তেজের বা তৈজসের তন্মাত্র হচ্ছে  রূপ, বায়বীব পদার্থের তন্মাত্র  হচ্ছে স্পর্শ। আকাশের তন্মাত্র  হচ্ছে শব্দ। এই যে তন্মাত্র এর সূক্ষ্মত্বের কারন হলো অহঙ্কার। এই অহঙ্কার  থেকেও মহৎ তত্ত্ব অর্থাৎ সূক্ষ্ম বিষয় হচ্ছে লিঙ্গ। আবার এই লিঙ্গের সূক্ষ্ম বিষয় হচ্ছে অলিঙ্গ। এই অলিঙ্গ  থেকে আর কোনো সূক্ষ্ম কিছু নেই। তো পদার্থকে সূক্ষ্ম করতে করতে একসময় যা থাকে তা অলিঙ্গ। এই অলিঙ্গ অবস্থাই বলা যেতে পারে স্থূল জগতের বীজ অবস্থা। সমাধির সঙ্গে এই অলিঙ্গ অবস্থার একটা সম্পর্ক আছে, যা আমরা পরবর্তীতে  শুনবো।  
-------------- 
  
পাতঞ্জল যোগদর্শন রহস্যঃ - সমাধিপাদ - শ্লোক নং -  ১/৪৬-৫১

"তা এব সবীজঃ সমাধিঃ। " - (১/৪৬)

যেসব সমাধির কথা বলা হলো, এগুলো সবই সবিজ সমাধি।  

এতক্ষন যে সমাধিগুলোর কথা বলা হলো, এগুলো সবই সবীজ অর্থাৎ সেখানে কিছু না কিছু আলম্বন আছে। এই সমাধিগুলো বিকল্প রহিত নয়, এগুলোকে সাবিকল্প সমাধি বলা হয়। এই সাবিকল্প সমাধি বিতর্ক ভেদে সবিতর্ক ও নির্বিতর্ক, আবার বিচার ভেদে সবিচারা ও নির্বিচারা। এসব সমাধি কোনো না কোনো অবলম্বনের সাহায্যে হয়ে হয়ে থাকে। এগুলোকেই সম্প্রজ্ঞাত সমাধিও  বলা হয়ে থাকে। 

"নির্বিচার-বৈশারদ্যে অধ্যাত্ম প্রসাদঃ।" (১/৪৭)

নির্বিচার সমাধির স্বচ্ছতায় অহং তত্ত্বে  বুদ্ধির  মধ্যে শান্তভাবের জন্ম হয়।

রজঃ ও তম  গুন্ দ্বারা প্রভাবিত বুদ্ধি  অশুদ্ধ স্বভাবের। কিন্তু সত্ত্বগুণ দ্বারা প্রভাবিত অর্থাৎ সত্ত্ব গুনের যখন আধিপত্য হয়, তখন অধ্যাত্ম প্রসাদ (ঈশ্বরের কৃপা) থেকে ধীরে চিত্তের উৎকর্ষতা  বৃদ্ধি  পায়। তখন সাধকের মধ্যে একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়। আর এই একাগ্রতা সাধকের অন্তঃকরণকে  নির্ম্মল জ্ঞানধারার প্রবাহকে গতিশীল করতে সাহায্য করে। এই হলো নির্বিচার বৈশারদ্য।  

সমাধি হচ্ছে চিন্তনের প্রতিফলন। সমাধি তাই স্থূল থেকে শুরু  হয়ে সূক্ষ্ম-এ অবস্থান, আবার সূক্ষ্ম থেকে আনন্দে, আনন্দ থেকে এক স্নিগ্ধ আলোর জগতে প্রবেশ। এই চারটি, অর্থাৎ স্থূল, সূক্ষ্ম,  আনন্দ, আলোক, নিয়ে প্রথম সমাধি। যাকে  বলা হয়, বিতর্ক সমাধি।  এর পরে, স্থূলকে ছেড়ে দিয়ে সূক্ষ্ম-এ উঠতে পারলে বিচার সমাধি। এর পরে স্থূল ও সূক্ষ্ম দুইই ছেড়ে দিয়ে আনন্দ সমাধি। এর পরে শুধুই প্রকাশকে (আলোক) অবলম্বন করে পৌঁছতে হয় অস্মিতা সমাধিতে। এইভাবে ধীরে ধীরে এক এক করে আলম্বনকে ছেড়ে দিয়ে এগুনোর  নামই যোগসাধনা। এই যোগ সাধনার ফলেই সাধকের বোধশক্তি ধীরে ধীরে তীক্ষ্ণ হতে থাকে। বোধ  বুদ্ধির মধ্যেও শান্তভাবে বৃদ্ধি  পেতে থাকে। 

"ঋতম্ভরা তত্র প্রজ্ঞা। " (৪৮) 

যেখানে ঋতম্ভরা সেখানেই প্রজ্ঞা। (প্রজ্ঞা কথাটার অর্থ হচ্ছে প্রকৃষ্ট জ্ঞান। )  

প্রকৃষ্ট বা উত্তম জ্ঞানই  সাধকের ঋতম্ভরা অবস্থা।  এই অবস্থায় সাধকের অনুভূতিতে সত্য সাক্ষাৎ হয়। এর আগে আমরা অনুমানের সাহায্যে জ্ঞানের কথা শুনেছি।  অর্থাৎ গুরুমুখে  শুনেছি বা অনুমান করেছি যে চিনির মধ্যে মিষ্টি আছে।  কিন্তু এই চিনি যখন আমার জিহ্বা  নামক জ্ঞানেন্দ্রীয়ের স্পর্শে এলো, তখন চিনির মিষ্টত্ব সাক্ষাৎ অনুভব হলো।  এই প্রতক্ষ্য  জ্ঞান অর্জনের অবস্থাই  ঋতম্ভরা।  

"শ্রুত অনুমান প্রজ্ঞাভ্যাম অন্য বিষয়া বিশেষার্থত্বাৎ।" (১/৪৯)

শোনা-প্রমান  (ঋষিবাক্য বা আগম) ও অনুমান-প্রমান  থেকে প্রজ্ঞা বিশেষ অর্থবোধক বা স্বতন্ত্র। 

শব্দ অর্থাৎ শ্রুত জ্ঞান দ্বারা শ্রোতা তত্ত্বগতভাবে বিষয় বোধ করে থাকে সত্য কিন্তু এতেকরে তার প্রতক্ষ্য উপলব্ধি হয় না । কেননা শব্দ বিশেষ অর্থবোধক মাত্র, যা আগে থেকেই স্মৃতিতে ধরা আছে । ঠিক তেমনি অনুমান দ্বারাও প্রতক্ষ্য জ্ঞানের উপলব্ধি হতে পারে না। তাই শব্দের দ্বারা সংগ্রহীত জ্ঞান ও অনুমানের দ্বারা সংগ্রহীত জ্ঞান কোনো বিষয়কে (সত্যকে) পরিস্ফুট করতে পারে না। 

আসলে চিত্তে যখন পরম প্রশান্তির ভাব আসে, তখন যে জ্ঞানের সূক্ষ্মতা তা প্রজ্ঞা আর অন্তঃকরণ যখন সত্যের আলোতে উদ্ভাসিত হয়, তখন তা ঋতম্ভরা। 

"তজ্জ সংষ্কারো অন্য সংস্কার প্রতিবন্ধী।" (১/৫০)

প্রজ্ঞা থেকে জাত  যে সংস্কার তা অন্য সংস্কারের  বাধক স্বরূপ। 

আমরা সারাক্ষন সংস্কারের জন্ম দিচ্ছি।  আর এই সংস্কার মানুষে জন্ম জন্মান্তর ধরে, দেহ থেকে দেহান্তরে ঘুরে বেড়ায়। স্থূল দেহের নাশের  পরেও, মানুষের সংস্কার থেকে যায়। আর এই সংস্কার মানুষের স্বাভাবিক স্বভাবের জন্মদাতা। যার যেমন সংস্কার সে সেইমতো ক্রিয়াকর্ম্মে লিপ্ত হয়। এই সংস্কার দুই ধরনের হয়ে থাকে একটা কিষ্ট অর্থাৎ ক্লেশদায়ক, আর একটা অক্লিষ্ট অর্থাৎ এই সংস্কার কোনো  ক্লেশের কারন হয় না। বিদ্যাজনিত সংস্কার অক্লিষ্ট অর্থাৎ ক্লেশদায়ক নয়।  আর অবিদ্যা জনিত সংস্কার ক্লিষ্ট অর্থাৎ দুঃখের কারন হয়ে থাকে। সাধন জীবনে এই সংস্কারের নাশের  জন্য প্রচেষ্টা করতে হয়।  আর তা হয় নতুন নতুন সংস্কারের  জন্ম দিয়ে।  এতে করে পুরানো সংস্কার চাপা পড়ে  যায়।
 
আবার যথার্থ যোগীর জন্য সমস্ত সংস্কার তা সে অবিদ্যা জনিত হোক বা বিদ্যা জনিত হোক, দুইই  অমূলক। এইজন্য যোগাচার্য্যগন বলে থাকেন, সম্প্রজ্ঞাত সমাধি থেকে বিদ্যার উৎকর্ষতা হয়। বিবেকখ্যাতি হলে বিদ্যার চরম অবস্থা প্রাপ্ত হওয়া যায়। এরফলে অসম্প্রজ্ঞাত সমাধির পথে অগ্রসর হতে পারেন। আর তখন নতুন কোনো সংস্কারের জন্ম হয় না। অর্থাৎ এই সময় সাধকের মধ্যে পরবৈরাগ্যের দেখা যায়।  আসলে সংস্কার তো আর কিছু নয়, আমাদের সংকল্প বিকল্প সাধনের জন্য মনের প্রচেষ্টা - যা চিত্তে চিরতরের জন্য ছাপ  রেখে যায়। তো সংকল্প বিকল্প রহিত হতে পারলে, নতুন সংস্কারের জন্ম তো হয়ই না, বরং পুরোনো সংস্কারের নাশ হতে থাকে। এইভাবেই সাধক সাধনার উত্তম অবস্থায় অর্থাৎ সমাধি থেকে কৈবল্যে উপনীত হন ।  

"তস্যাপি নিরোধে সর্বনিরোধাৎ নির্বীজঃ সমাধিঃ। " - (১/৫১) 

তস্যাপি  অর্থাৎ সংস্কারের ক্ষয় হলে, এবং নতুন সংস্কারের জন্ম না হলে যোগীর নির্বীজ সমাধি হয়। 

নির্বীজ সমাধি পরবৈরাগ্যের ফল স্বরূপ। তখন সমস্ত বৃত্তির নাশ হয়। পরবৈরাগ্যের ফলে সমস্ত সংস্কারের লয় হয়ে থাকে। সমস্ত বৃত্তির নিরুদ্ধ অবস্থা হয়। এই সময় পরমপুরুষের সাথে যোগস্থ হয় যোগীপুরুষ। যোগী পুরুষ তখন পরমপুরুষের সাথে যুক্ত হয়ে শুদ্ধ-বুদ্ধ-মুক্ত হয়ে যান। 

শ্রী পাতঞ্জল-যোগদর্শনের সমাধিপাদের সমাপ্তহলো। 

------------ 

কিছু কথা : 

ঋষি পতঞ্জলির যোগ দর্শনের সমাধিপাদ অধ্যায়ের নির্যাস : (১) 
ঋষি পতঞ্জলির যোগদর্শন - সমাধিপাদের সারকথা  

ঋষি পতঞ্জলি তাঁর যোগদর্শনের আলোচনায় প্রথমেই সমাধির কথা বলছেন। এখন কথা হচ্ছে সমাধি বলতে আমরা কি বুঝি ? সমাধি হচ্ছে সম্যক রূপে উপলব্ধি। সম+আ+ধা+ই = সমাধি। যাতে মন সমাহিত করা যায়। আমরা জানি, কোনো একটা বিষয়ে মনোনিবেশ করাকে বলে একাগ্রতা, এই একাগ্রতা যখন বদ্ধমূল হয়, তখন তার নাম ধারণা, আবার ধারণা  যখন বদ্ধমূল হয়, তখন তাকে বলে ধ্যান। এই ধ্যান যখন বদ্ধমূল হয় তখন তাকে বলে সমাধি। এখন কথা হচ্ছে কার সমাধি হয় ?  আমার সমাধি হয়, অহং-এর সমাধি হয়। অর্থাৎ সমাধিতে অহংজ্ঞানের লোপ হয়। 

আমরা জানি, মানুষের মৃত্যুর পরে, হয় তাকে অগ্নিতে দাহ  করা হয়, নতুবা তাকে মাটিতে কবর  দেওয়া হয়। এই কবর দেওয়ার আর এক নাম হচ্ছে  সমাধি দেওয়া। কার সমাধি হলো ? আমার সমাধি হলো। অতয়েব সমাধি হচ্ছে অহংতত্ত্বের সমাধান। 

এখন তাহলে আমাদের আগে বুঝতে হবে, এই অহংটা কে ? কোথায় এর অবস্থান ? অহং বলতে আমরা বুঝি "আমি" - আমরা যা কিছু চিন্তা করি, কর্ম্ম করি, তার কর্ত্তা হচ্ছে এই অহং। অহং হচ্ছে একটা আত্মসচেতন সত্তা যা আমাদের চিন্তা ও কর্ম্মের দ্বারা প্রকাশিত হচ্ছে। 

দেখুন আমরা সুস্বাদু খাবার খেয়ে আনন্দ পাই। এই যে শরীর  খাদ্য গ্রহণ করে, এর নিজের কিন্তু সংবেদন শক্তি নেই।  অর্থাৎ আমাদের পাকস্থলী বা খাদ্যনালী  নিজে কিন্তু কোনো কিছুই অনুভব করে না। কিন্তু পাকস্থলীর মধ্যে  খাদ্যনালীর সাহায্যে যখন খাবার পৌঁছায়, তখন তার মধ্যে একটা সংবেদন সৃষ্টি হয়। তো হয়তো কেউ একজন আছেন, যিনি এই যন্ত্রগুলোকে ব্যবহার করে একটা সুখের বা দুঃখের অনুভব করছেন। এই সত্তাই সেই অহং যিনি অনুভব করছেন। আমাদের যে সুখ-দুঃখ তা কেবলমাত্র অনুভূতি বিশেষ। আর যে সত্তায়  এই অনুভূতি হচ্ছে তাকেই বলে আত্মা বা জীবাত্মা। এই আত্মাকে যোগের ভাষায় বলা হয় "পুরুষ" - এই পুরুষই প্রকৃতপক্ষে সমস্ত কিছুর জ্ঞাতা, ভোক্তা । ইনি (আত্মা) আমাদের শরীরের ভিতরে বাইরে সর্বত্র অবস্থান করছেন। ইনি  কিছুই করছেন না, কিন্তু সমস্ত কিছুর নিমিত্ত কারন এই আত্মা। যিনি কেবল সাক্ষী স্বরূপ হয়ে সবত্র বিরাজ করছেন। ইনিই আমাদের সমস্ত শক্তির উৎস। 

এই আত্মার শক্তির দ্বারাই আমাদের মনের এবং শরীরের যাবতীয় ক্রিয়া সংগঠিত হচ্ছে। আমাদের জ্ঞানেন্দ্রিয়, কর্ম্মেন্দ্রিয় ক্রিয়াশীল হচ্ছে এই অন্তঃশক্তির সাহায্যে। এই শক্তিই আমাদের জ্ঞানেন্দ্রীয়ের সাহায্যে বহির্জগতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করছে। বহির-জগতের বিষয় অনুভব করছে। এখন তর্কের খাতিরে আমরা ধরে নিতে পারি, আমি আত্মা। তর্কের খাতিরে কথাটা বললাম এইজন্য যে, আমরা আত্মা সন্মন্ধে বিশেষ কিছুই জনি-ত না-ই, এমনকি এই আত্মা সম্পর্কে আমাদের কোনো উপল্বদ্ধিও নেই। 

আমাদের  আসলে দেহভিন্ন "আমি" বলে কিছু আছে, সেই উপলব্ধি নেই। আমরা যাকে  আমি বলে মনে করি তা এই  দেহ ভিন্ন অন্য কিছু নয়। হ্যাঁ আত্মা সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা  বা উপলব্ধি না থাকলেও, আমাদের যে একটা মন আছে, আমাদের মনের যে চিন্তার ক্রিয়া চলছে, সেই উপলব্ধি কিন্তু আমাদের সবার আছে। যদিও এই মনেরও কোনো আকার নেই, কিন্তু একটা অনুভূতি আমাদের আছে, যাকে  আমরা আমাদের মন বলে চিহ্নিত করেছি। আর এই মনের জন্যই  যে আমাদের দুঃখ কষ্টের অনুভূতি হচ্ছে, সেটা আমরা হাড়ে  হাড়ে  উপলব্ধি করি। তো মন বলে যে বস্তুটি আছে, তা আমরা সবাই ধরতে পেরেছি। আর এই মনের মধ্যে যে নানান বৃত্তি বুদ্বুদের মতো উঠছে, সেটাই আমরা ধরতে পারি। এই মনের মধ্যেই আমাদের যত  সংকল্প-বিকল্পের জন্ম হচ্ছে। 

এই মনটা হচ্ছে একটা আয়না, যাকে  একটু ধুয়ে-মুছে নিলে, এখানে আমাদের আত্মার প্রতিফলন প্রতক্ষ্য করা সম্ভব। আর ঠিক এই কারণেই, ঋষি পতঞ্জলি এই মনের দিকে নজর দিয়েছেন।  মনের যে অসীম ক্ষমতা আছে, তার ব্যবহার করবার প্রক্রিয়া এই যোগক্রিয়ার সাহায্যে আয়ত্বে আনতে বলছেন। 

এই দেহ একটা জড় বস্তু, একথাও আমরা স্বীকার করে নিয়েছি। তো দেহ অনিত্য, আর দেহের মধ্যে কেউ একজন আছেন, যিনি নিত্য বা সৎবস্তু, এককথাও  আমরা মেনে নিয়েছি।  কেননা আমরা চোখের সামনে দেখছি, এই দেহ থেকে সৎ বস্তু বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে, এই দেহ শুধু জড় বস্তুতে  পরিণত হয়, তাই নয়, এটি একটি পচনশীল পদার্থে পরিণত হয়।

আরো একটা কথা হচ্ছে আমাদের আছে মাত্র পাঁচটি জ্ঞান-ইন্দ্রিয়। এই জ্ঞানেন্দ্রীয়ের ক্ষমতা যেমন সীমিত  তেমনি সংখ্যায়ও মাত্র পাঁচটি।  এই জ্ঞানেন্দ্রীয়ের ক্ষমতা ও সংখ্যা যদি বেশি হতো, তবে হয়তো আমরা খালি চোখে চাঁদ বা আরো দূরে বুধ, মঙ্গল, শুক্র গ্রহতে কি আছে , তা সব আমরা দেখতে পারতাম। সেখানকার অবস্থা সম্পর্কে প্রতক্ষ্য অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারতাম। এই মন হচ্ছে এমন একটা বিশেষ ইন্দ্রিয় যা দিয়ে আমরা অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারি। যোগ সাধনা আসলে এই মনের শক্তিকে বিকশিত  করা। 

এখন কথা হচ্ছে, এই দেহের তিনটি অবস্থা।  অর্থাৎ কখনো আমরা জেগে আছি, কখনো আমার ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্নের জগতে বিচরণ করছি,  আবার কখনো আমরা গাঢ় ঘুমে অজ্ঞান হয়ে আছি। গাঢ়  ঘুমে আমরা কিছুই টের পাই না। একে যোগের ভাষায় বলে সুষুপ্তি।  এই যে সুষুপ্তির  অবস্থা, এর অভিজ্ঞতা আমাদের সবার আছে। অন্ধকারে যেমন আমরা (চোখ থাকতেও) কিছুই দেখতে পাই না, তেমনি সুষুপ্তিতেও আমরা একটা অন্ধকারের জগতে বাস করি। 

ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, এই যে সুষুপ্তির  অবস্থা এর সঙ্গে সমাধির একটা মিল আছে।  সুষুপ্তিতে যেমন জাগতিক জ্ঞান-হারা হই  আমরা, তেমনি এই সমাধির অবস্থাতেও আমাদের কোনো জাগতিক জ্ঞান থাকে না।  পার্থক্য হচ্ছে, সুষুপ্তি থেকে জেগে উঠে আমরা সেই আগের মানুষটিই থাকি।  কিন্তু সমাধি থেকে জেগে উঠে আমরা অন্য মানুষ হয়ে যাই। সুষুপ্তিতে  আমরা বিচার শূন্য হয়ে যাই। কিন্তু সমাধিতে আমাদের জ্ঞান ও বিচারক্ষমতা লুপ্ত হয় না। সমাধি থেকে জেগে উঠে মানুষ হয়ে ওঠে দিব্যজ্ঞান সম্পন্ন, শুদ্ধবুদ্ধিযুক্ত নতুন মানুষ। সুষুপ্তির  অবস্থায় আমরা মনের স্পন্দন ধীর হয়ে যায়, অন্যদিকে সমাধির অবস্থায় মনের স্পন্দন বৃদ্ধি পায়। 

এখন এই সমাধির অবস্থা প্রাপ্ত হবার জন্য আমাদের কি করতে হবে ?  মনকে একাগ্র করতে হবে। বলছেন, চিত্ত বৃত্তির নিরোধ করতে হবে  আর চিত্ত বৃত্তি নিরোধের জন্য আমাদের নিরন্তর অভ্যাস দ্বারা  বৈরাগ্যের সাধন  করতে হবে। শরীর  মনকে স্থির করতে হবে। আর এর  ফলে আমাদের সম্প্রজ্ঞাত সমাধি লাভ হবে। 

আসলে সমাধির অবস্থা লাভই  যোগদর্শনের উদ্দেশ্য। প্রথমে স্থূল, তারপরে জড়, তার পরে মন (সূক্ষ্ম) এসবকিছুর মুলে পৌঁছতে পারলেই, জীবন-রহস্যের সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে। মনের ক্রিয়াকেই বলা হয় চিন্তা। এই যে চিন্তা, এর কারণ ধরতে পারলেই, আমরা বিশ্বের বীজের কাছে পৌঁছতে পারবো। আমাদের চোখের সামনে যে জগৎ ভাসছে, তা একটু গভীর ভাবে পর্যবেক্ষন করলেই বুঝতে পারবো, এসব অনু-পরমাণুর সংমিশ্রণ মাত্র। বীজের মধ্যে যেমন গাছ অব্যক্ত অবস্থায় থাকে, তেমনি যাকে  আমরা স্থূল বলি, তা আসলে কারন স্বরূপ  বীজ।  সুসুপ্তির অবস্থায় আমরা এই কারন অবস্থাতে চলে যাই।  আর সমাধির অবস্থাতে আমরা এই কারণকে  অতিক্রমন করে যা চিরন্তন সত্য সেই সত্তার মধ্যে বিরাজ করি। এই হচ্ছে মনুষ্য  জীবনের লক্ষ।  এই সত্য আমরা যত  তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করতে পারবো, ততই  মঙ্গল।  কারন যাকিছু আমার সংসারে থেকে উপলব্ধি করছি, তার মধ্যে কোনো সত্য নেই - কেবল ভ্রমজ্ঞানের কারনে এইসব উপলব্ধি হচ্ছে।  এখান থেকে বেরিয়ে আমরা যখন সমাধির সাগরে ডুব দিতে পারবো, তখন আমাদের পূর্ণজ্ঞান, বা ঈশ্বর উপল্বদ্ধিরর অভিমুখী হবো।  --------------- চলবে। ...... 
 
ঋষি পতঞ্জলির যোগ দর্শনের সমাধিপাদ অধ্যায়ের নির্যাস : (২)

অজ্ঞান থেকেই অহংকারের জন্ম। প্রতিদিন খানিকটা সময় নিজেকে নির্জনে নিয়ে বসিয়ে দিন। আর অনুভব করুন যে নিজের মধ্যে যে অজ্ঞান অন্ধকারের জন্ম হয়েছে, তা ধীরে ধীরে অপসারিত হয়ে যাচ্ছে। তখন সমস্ত দর্শন, সমস্ত ধর্ম্মের নিগূঢ়  তত্ত্ব,  সমস্ত মনস্তত্ত্ব  বুঝবার ক্ষমতা অৰ্জন হবে। নিজের মনের চিন্তার বিশ্লেষণ দ্বারা মনের  এক উচ্চতম অবস্থার সন্ধান পাওয়া যাবে, একেই  বলে সমাধি। এই সমাধি অবস্থার প্রাপ্তির সহায়ক হচ্ছে যোগ। সত্য কোনো জিজ্ঞাসার বস্তু নয়, সত্য আমাদের সহজাত। এই সহজাত বস্তুটি আমাদের সবার অন্তরের  অন্তঃস্থলে অবস্থান করছে। সেই কেন্দ্রবিদুতে নিজেকে স্থির  করতে পারলে সেই বিরাট পুরুষের কেন্দ্রকেও  খুঁজে পাবো। আর যতদিন এটি না হচ্ছে, ততদিন আমাদের বারবার এই পৃথিবীতে ফিরে ফিরে আসতে  হবে। 

ঋষি পতঞ্জলির নির্দেশিত যোগের সোপানগুলো বৈজ্ঞানিক উপায়ে আমাদের সমাধির অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে।  এমনটা ভাববার কোনো কারন নেই যে, ঈশ্বর আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, আর জগৎটা এখন  পাপী ও  শয়তানে  ভ'রে গেছে। আগে অনেক ঈশ্বর-পুরুষ ছিলেন, এখন আর কেউ নেই। আসলে আমরা সবাই সেই ঈশ্বর প্রেরিত।  সমাধির অবস্থা লাভ হলেই আমাদের সেই উপলব্ধি হবে। মনকে ইন্দ্রীয়ভূমিতে খেলতে না দিয়ে তাকে চৈতন্য ভূমিতে খেলবার সুযোগ করে দিতে হবে। 

ঋষি পতঞ্জলি বলছেন, সমাধি দ্বিবিধ - সম্প্রজ্ঞাত এবং অসম্প্রজ্ঞাত  . একাগ্রভূমিতে সম্প্রজ্ঞাত , আর নিরোধ-ভূমিতে অসম্প্রজ্ঞাত। চিত্ত বৃত্তির নিরোধের নাম যোগ। নিরোধ মানে কিছু দমন নয়, নিরোধের অর্থ এখানে লয়। এখন চিত্তকে  লয় করতে গেলে, চিত্তকে  প্রথমে  একাগ্র করতে হয়। চিত্তের ভূমি পাঁচটি - প্রমান, বিপর্যয়, বিকল্প, নিদ্রা, স্মৃতি। এই প্রমান আবার তিনটি - প্রত্যক্ষ, অনুমান, ও ঋষিবাক্যঃ বা আগম। সে যাই হোক, আমাদের চিত্ত কখনো প্রতক্ষ্য অনুভবের সাহায্যে জ্ঞান সংগ্রহ করে, কখনো অনুমানের সাহায্যে, কখনো বা আগমের  সাহায্যে।
অর্থাৎ আমরা জাগ্রত অবস্থায় এই তিন ভাবে আমরা জ্ঞানের সন্ধান পেতে থাকি। 

এই জ্ঞান আবার দুই রকম একটা যথার্থ জ্ঞান, আর একটি বিপর্যয় জ্ঞান। এছাড়া আরো এক রকমের জ্ঞান আছে যাকে  বলা হয় বিকল্প জ্ঞান। বিকপ্প জ্ঞান অর্থাৎ যার বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই কিন্তু একে  অবাস্তব বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।  ঈশ্বর চৈতন্য স্বরূপ। আমাদের কাছে, এই কথার  না আছে কোনো বাস্তব ভিত্তি, না একে  অস্বীকার করতে পারি।  অর্থাৎ শব্দের সাহায্যে বা বাক্য দিয়ে বস্তুর রচনা করলে  তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নাও থাকতে পরে। তবে ও ঠিক এই ধারণা থেকে  মানুষের ক্ষমতার  একটা সীমাবদ্ধতাকে বোঝানো হয়েছে।  আবার বলা হয় ঈশ্বর চৈতন্য স্বরূপ । চৈতন্য একটা গুন্, ঈশ্বরের চৈতন্য, তাহলে ঈশ্বর কে ?

যাইহোক, আত্মাতেই মনকে স্থির করতে হযে। কিন্তু আত্মাতে মনকে স্থির করতে বললে, আমরা কিছুই বুঝতে পারি না। কারন আত্মা সম্পর্কে আমাদের কোনো উপলব্ধি নেই।  তাই ঋষি পতঞ্জলি সমাধিপাদে এমন একটা সংকেত দিয়েছেন, যা আমাদের কাছে সাহজবোধ্য।  আর তা হচ্ছে প্রণবের উচ্চারণ। ওঙ্কারের সাধনা। ওম-এর জপ। যা আমাদের কাছে সহজবোধ্য। সহজেই আমাদের পক্ষে করা সম্ভব। আর এই জপ বা ওঙ্কারের জপ সম্পর্কে আমরা দুচার কথা শুনে নেই।  

জপ্ আর কিছুই নয়, এক বা একাধিক শব্দের নিরন্তর উচ্চারণ বা মনন হচ্ছে জপ। 

বৈখরী জপ হচ্ছে বাহ্য জপ, যা জপের প্রারম্ভ মাত্র।  বৈখরী জপ তিন প্রকার, বাচিক, উপাংশু ও মানস  জপ। প্রথমে সশব্দে, তারপরে বিড়বিড় করে, সবশেষে মনে মনে। এই তিন প্রকার জপই সচেষ্ট জপ, যেখানে অহং ভাবের আধিপত্য  থাকে। অর্থাৎ "আমি জপ করছি"  এই ভাবটি স্ফুট বা অস্ফুট অবস্থায় বর্তমান থাকে। এর পরে একটা সময় আসে, যখন অন্তর-জপ শুরু হয়। এই অন্তর-জপ  কখনো চেষ্টা দ্বারা করা যায় না। যদি প্রচেষ্টা থাকে তবে জানবেন, তা অন্তর-জপ হলো না।  অন্তর-জপ "হয়", অন্তর-জপ "করা" যায় না। বরং বলা যেতে পারে, এই অন্তর-জপ চেষ্টা করেও থামানো যায় না। আপনি যদি একজায়গায় দাঁড়িয়ে ঘুরতে থাকেন, বা মাথা ঝাকাতে থাকেন, তবে একসময় দেখবেন, আপনি আর থামতে পারছেন না।  দড়ি লাফানো খেলতে গিয়ে দেখেছি, শেষের দিকে নিজেকে থামানো খুব মুশকিল হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়া তখন নিরন্তর অবিচ্ছিন্ন ধারায় চলতে থাকে।  
এই অন্তর-জপের  অবস্থাও ঠিক তেমনি, এই ক্রিয়া স্বাভাবিক ভাবে চলতে থাকে, চেষ্টা করে যেমন এটা  করা যায় না, তেমনি এটিকে চেষ্টা করে থামানোও যায় না। এই অন্তর-জপের আবার তিনটি অবস্থা প্রথমে হৃদয়ে, তারপরে নাভিমূলে, শেষে মূলাধারে। তো প্রথমে বৈখরী, (কন্ঠে) তারপরে মধ্যমা, (হৃদয়ে) এর পরে পশ্যন্তী, (নাভিমূলে)  সবশেষে পরা (মূলাধারে) - এটাই হচ্ছে স্বাভাবিক ক্রোম। বৈখরীতে শব্দ ও অর্থের পার্থক্য থাকে। মধ্যমা  অবস্থায় জ্যোতি দর্শন হতে থাকে। এই সময় থেকেই নাদধ্বনি বিগলিত হতে শুরু করে।  পশ্যন্তী অবস্থায় শব্দ ও অর্থ একই সত্তায় প্রবেশ করে। এইসময়  থেকেই চেতনার স্ফূরণ হতে থাকে। এই সময় সাধকের আত্মসাক্ষাৎকার, বিভূতিলাভ ইত্যাদি হয়ে থাকে। এর পরে, আসে পরাবস্থা - যা অব্যক্ত। এসব অভিজ্ঞতা শ্রীগুরু সান্নিধ্যে গ্রহণ করলে ভালো হয়। 

এখন কথা হচ্ছে ঋষি পতঞ্জলি সব ছেড়ে ওঙ্কারের উচ্চারণ বা জপ করার কথা কোনো কেন বলছেন ? আসলে ওঙ্কার হচ্ছে সমস্ত শব্দের উৎপত্তিস্থল। এই ওঙ্কারের মধ্যে সমস্ত জ্ঞান নিহিত। এই ওঙ্কার ধ্বনির উদ্ভবে জগৎ আলোকিত হয়ে ওঠে। ওঙ্কার শব্দের সমার্থক শব্দ হচ্ছে প্রণব - অর্থাৎ প্রতিনিয়ত নতুন। অন্তর-জগতে কান পাতলে, আজো এই নাদধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়। আপনি কান বন্ধ  করে, যেমন একটা শো শো শব্দ শুনতে পান, তেমনি আমাদের সকল ইন্দ্রিয় যখন নিরুদ্ধ হয়ে অবস্থান করে, তখন এই ওঙ্কারের ধ্বনি শ্রুতিগোচর হয়। ওঙ্কারের মধ্যেই আছে স্মৃষ্টিতত্ত্ব, এই ওঙ্কারের মধ্যে লুকিয়ে আছে সমস্ত জ্ঞানের আলোক। এসব কথা শুধু বিশ্বাসের (অন্ধ) ব্যাপার নয়, সাধন জগতে প্রবেশ কিছু দিনের মধ্যে সমস্ত সাধকের মধ্যে এই সত্য দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ভাবতে অবাক লাগে ভারতের মুনি-ঋষিগণ হাজার হাজার বছর  আগেই এই সত্যকে উপলব্ধি করেছিলেন। আর এই হাজার হাজার বছর  পরেও, এই সত্যের এতটুকু পরিবর্তন হয় নি। সত্য চিরকালের জন্যই  সত্য। তা সে আমি বুঝি আর না বুঝি। তো আমরা ঋষি পতঞ্জলির কথা অনুসারে, ওঙ্কারের জপ দিয়ে সাধন জীবন শুরু করতে পারি।  এরই সাধনক্রিয়া সমস্ত যোগের মধ্যে শুধু শ্রেষ্ঠ নয়, এতে কোনো অমঙ্গলের সম্ভাবনা নেই।  সবার জন্য, আবাল বৃদ্ধ বনিতা, ব্রাহ্মণ, শুদ্র  সবাই এই জপ্ সাধনায় মগ্ন হয়ে জীবনকে সার্থক করে তুলতে পারেন। এর পরে আমরা ঋষি পতঞ্জলির প্রণীত সাধন পর্ব্বে প্রবেশ করবো, যা আমাদের জীবনকে পাল্টে দিতে সক্ষম। একটা নতুন জীবন শৈলী পেতে পারি আমরা। জয় হোক, ঋষি পতঞ্জলির।  
-------------  






 

    



   .   






  



 
 








      

 
 


 

     

 


  






  



  







  
  

 
 






























   

Comments

Popular posts from this blog

নিত্যকথা

ঈশ্বর ও তাঁর উপলব্ধি

সত্যধর্ম্ম ও প্রেম