মানুষ কেন ঈশ্বরে বিশ্বাস করে ?

ঈশ্বরে বিশ্বাস আসে কি করে ? 

ভগবৎ  বিশ্বাস সত্যিই এক রহস্যময় ব্যাপার। যাঁকে  তাঁরা  কেউ কখনো চোখের সামনে দেখতেই  পায়নি, তাঁকেই  তাঁরা  তাদের জীবন মরনের কারন বলে মনে করেন। এঁরা  ঈশ্বরকে নিত্য ডাকেন, ঈশ্বরের ধ্যানাদি করেন, ঈশ্বরের মনন করেন, ঈশ্বরের কাছে পার্থনা করেন। এঁরা এঁদের ইচ্ছে পূরণের জন্য, এবং দুর্গতি নাশের  জন্য ঈশ্বরের স্মরণ করেন। 

সংখ্যায় কম হলেও, একদল মানুষ আছেন, তাঁরা মনুষ্য কল্পিত ঈশ্বরে  বিশ্বাস করেন না। খুশবন্ত সিং একসময় বলেছিলেন, "অহিংসাকে আমি পরম  ধর্ম্ম বলে মনে করি, আমার নিজের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক দাঁড়িয়ে আছে কেবলমাত্র একটা বিশ্বাসের ভর করে।  আমি একটা জীবনই  লাভ করেছি, সেই জীবনকে যতবেশি পারি উপভোগ করবো। আমি যা পছন্দ করি তাই  করবো, যা পছন্দ করি না, তা  করবো না। আমি যা চাই তাই খাবো, শরীরের দিকে নজর দেব, কেননা শরীরটা না থাকলে, জীবনটাই মাটি। আমি প্রার্থনা করি আয়নায় প্রতিফলিত আমার প্রতিচ্ছবির সামনে দাঁড়িয়ে।" (দেশ- ২৫/০৪/১৯৮৭) তো ইনি  ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না, কিন্তু শুদ্ধকর্ম্মময় জীবনে বিশ্বাস করেন। দেহকে অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। 

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর "ধর্ম্ম ও আমি" প্রবন্ধে বলেছিলেন, এই পৃথিবী ও বিশ্বের, এমনকি মানুষের শরীর ও মন নামক বিচিত্র বস্তুটির অনেক রহস্যের সন্ধান আমরা এখনো জানি না। কিন্তু যুক্তি দিয়ে মানুষ অন্তত এইটুকু বুঝেছে, যে অন্তরীক্ষে ঈশ্বর নাম এক সর্ব্বশক্তিমানের অস্তিত্ত্ব কল্পনা নিছক বাতুলতা। ঈশ্বরই  নেই, তবে তার আবার পুত্র-কন্যা বা অবতার-অনুগ্রহিত কী  ? ".... ব্রাহ্মণ সন্তান, শ্রী গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয় আবার বলছেন, "মনুসংহিতা নামে, হিন্দু সমাজের একটা অর্বাচীন গ্রন্থ আছে। এরকম একটা নিরস, প্রতিক্রিয়াশীল, কাপুরুষোচিত, কূসংস্কারগ্রস্ত রচনাকে যে সঙ্গে সঙ্গে বর্জন করা হয়নি, তাতেই হিন্দু সমাজের মানসিক দৈন্য ও ব্যাধি সূচিত করে। বর্ণাশ্রম প্রথা যে  এককালের গৌরবময় আর্য-ভারতের ধংশ ডেকে এনেছে, তা আজো  অনেকে মানতে চান না দেখে বিষ্ময় জাগে।" অর্থাৎ তিনি  ঈশ্বরের নাম করে প্রচারিত যে তথাকথিত ধর্ম্মবিশ্বাস, তার প্রতি তাঁর অনীহা শুধু নয়, একটা ঘৃণা আছে। 

তো কেউ ঈশ্বরের সর্ব্বশক্তিতে বিশ্বাস স্থাপন ক'রে, তাকেই ভরসা করছেন, বিপদ আপদে তাঁর কাছে ছুঁটে  যাচ্ছেন, আবার কেউ নিজের নৈতিকতার উপরে ভর করে, জীবন সংগ্রাম করছেন। 

কেউ মানুষের দুর্দশার দিকে তাকিয়ে, বলে উঠেছিলেন, "গবান ঘুমিয়ে পড়েছেন, তাকে কেউ বিরক্ত করো না।" অর্থাৎ ভগবান যদি ধর্ম্মের পালনকর্তা, আর অধর্ম্মের বিনাশকারী, তাহলে, পৃথিবীতে এতো অধর্ম্ম কেন ? তাহলে নিশ্চয় ভগবান এখন ঘুমিয়ে আছেন।  

কেউ বলছেন, ভগবান মারা গিয়েছেন, আর মানুষই তাকে মেরে ফেলেছে। ভগবান একসময় ছিলেন, এখন আর নেই। জগৎ যখন  অব্যক্ত, তখন তিনি ক্রিয়াশীল, আর জগৎ যখন ব্যক্ত হয়েছে, তখন তিনি হারিয়ে গেছেন। তো ভগবান মানুষের সৃষ্টি না ভগবানের সৃষ্টি মানুষ - এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সহজ নয়।  

আবার আমাদের উপনিষদের  ঋষি গন বলছেন, তুমিই ঈশ্বর। তু-হি। অহম ব্রহ্মস্মি - আমিই ব্রহ্ম. তৎ ত্বং অসি, তুমিই সেই।  কেউ বলছেন, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই, কেউ বলছেন, জীবে  প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর। 

আর আমাদের মতো সাধারণ মানুষ একথা হাড়ে  হাড়ে টের পাই, যে আমরা কেউ ঈশ্বর বা ঈশ্বরসম নোই। কারন আমরা কেউ জীবন সমস্যার সমাধান বা জীবন রহস্যের উন্মোচন করতে পারিনি। কোথা থেকে আসে জীব, আর কথা যায় চলে, তা আমরা জানি না। 

তবে এ কথা ধ্রুব সত্য যে, পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ অসহায়, আর সেই কারণেই কিনা জানিনা, বেশিরভাগ মানুষ কোনো না কোনো নামে  এই   ভগবানের প্রতি আস্থা রেখেছেন। এমনকি ভারতের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীগন, যারা চাঁদের দেশে চন্দ্রযানপাঠাচ্ছেন,  তারাও এই অদৃশ্য ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস রেখে, মাথা নত  করছেন। আমার মাঝে মধ্যে মনে হয়,  এই যে ভগবদবিশ্বাস, এটি হয়তো কোনো জ্ঞানের বিষয় নয়, আমাদের অনুভবের মধ্যেও আসেনি, বরং বলা যেতে পারে, এটি নিতান্ত হৃদয়গত জীবন সংযোগের ব্যাপার। মন্দির, মসজিদ, গির্জা, গুরুদ্বার, এমনকি পাহাড়ে, জঙ্গলে যেখানেই যাবেন, সেখানেই আপনি এই ভগবৎ  ভক্তদের দেখতে পাবেন।  আমার ছোটবেলায় মতুয়ার মেলায়  দেখেছি, হাজার হাজার নিরক্ষর ব্যক্তি হরিবোলে মেতে উঠেছেন। রাস্তার পাশে শনি  মন্দিরে প্রণাম করছেন।   তখন মনে হতো, মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো  জ্বললে, ঈশ্বরের প্রতি এই অন্ধবিস্বাস চলে যাবে।  কিন্তু অবাক হয়ে দেখি, আজও এই ঈশ্বরে বিশ্বাসের জায়গা একটুকু নষ্ট হয়নি।  বরং বলা যেতে পারে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও, সে তার মনের মধ্যে একটা ঈশ্বরের আসন পেতে রেখেছে। বাজারে ফুলের দোকান বেড়েছে বৈ কমেনি।   

একথা সত্য, যাঁরা  ভগবৎ  বিশ্বাসী, তাদের যে ভগবানের অস্তিত্ত্ব সম্পর্কে কোনো অনুভবলব্ধ জ্ঞান আছে, তা কিন্তু নয়।  কেবল মাত্র সংস্কার বশত, অভ্যাসের দাস হয়ে, ভগবানে প্রণতি জানাচ্ছেন, আবেদন নিবেদন করছেন। এর মধ্যে সত্য বা অসত্য জ্ঞানের কোনো স্থান নেই। এই যে সংস্কার এ  তার জন্ম জন্মান্তর ধরে সংগৃহিত হয়ে আছে। এসব কি আমাদের পূর্ব পূর্ব জন্মের থেকেই চলে আসছে ? 

আমার মাঝে মধ্যে মনে হয়, মানুষই ভগবান। যেখানে মানুষ নেই সেখানে ভগবানের কোনো অস্তিত্ত্ব নেই।  মানুষের হৃদয়েই কেবল ভগবানের সুর ধ্বনিত হয়। তাহলে কি আমরা সবাই ভগবানের এক একটা অংশ ? আর এই কারণেই আমরা নিজের স্বরূপের কথা নিজের অজ্ঞাতসারেই চিন্তা করি, আর মাথা নত হয়ে আসে। 

মহাত্মা গুরুনাথ সেনগুপ্ত বলছেন, এই যে নিখিল ব্রহ্মান্ড এটি জগদীশ্বরের অংশ বটে, তবে সাক্ষাৎ অংশ নয়, এটি পরম্পরা সন্মদ্ধে অংশ। পরম্পরা অর্থাৎ অসাক্ষাৎ অংশ। জগদীশ্বর থেকে অব্যাক্তের উৎপত্তি, এই অব্যক্ত থেকে ব্যক্ত জগতের উৎপত্তি। এখন এই যে জগদীশ্বর - এনার অনন্ত গুন্। এই অনন্ত গুন্ আবার দুটো পিঠ। একটা কোমল, আর একটা কঠিন। এই যে কোমল গুণ-এর অংশে জন্ম হয়েছে রমণীকূল। আর কঠিন গুনের অংশে জন্ম হয়েছে পুরুষ জাতির। 

দেখুন তিলের মধ্যে তেল আছে, আখের মধ্যে রস আছে।  অর্থাৎ তেলের আধার হচ্ছে তিল, বা রসের আধার  হচ্ছে আখ। মহাত্মা বলছেন,  স্ত্রী জাতির মধ্যে  কোমল গুন্, আর পুরুষ জাতির মধ্যে কঠোর গুন্, সাধন প্রভাবে উভয় গুন্ বিগলিত হয়ে ঈশ্বরপ্রেমে বিভূষিত হলে, অর্থাৎ বিশুদ্ধ প্রেমগুনের বিকাশ হলে, মানুষ সাক্ষাৎ ঈশ্বর হতে পারে। নতুবা  মানুষ কেবল রক্ত মাংসের মানুষই থেকে যাবে। মানুষ  যদি ঈশ্বরের সাক্ষাৎ অংশ হতে চান তবে তাকে সাধনা করতে হবে। একটা সুন্দর উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বুঝিয়েছেন। বলছেন, সমুদ্রের জল আর ঘটের জলের মধ্যে কোনো গুনগত কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু বিস্তারে, পরিমানে। ঘটের জল পরিমানে অল্প সমুদ্রের জল পরিমানে অধিক ; এর বেশি কোনো পার্থক্য নেই। কারন এর মধ্যেও  আছে তারল্য, আছে লবনাক্ত ভাব।   কিন্তু তথাপি ঘটের  জলের শক্তি ও সমুদ্রের জলের শক্তি আকাশ পাতাল পার্থক্য। মহাত্মা গুরুনাথ বলছেন, জল যখন বাষ্প হয়ে আকাশে উড়ে বেড়ায়, অর্থাৎ অক্সিজেন ও হাড্রোজেন নামক বায়বীয় পদার্থদ্বয়ে পরিণত হয়, তবে এতে আর লবনাক্ত ও জলত্ব ধর্ম্ম থাকে না। তো ঘটের জল ও সমুদ্রের জল যেমন একই, তেমনি বায়বীয় বা গ্যাসীয় জল সেই একই সমুদ্রের থেকে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমুদ্রের জলবিন্দু, আর বায়বীয় অর্থাৎ হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন-কে আলাদা ভাবে জল বলে সমুদ্রের সাক্ষাৎ অংশ বলা যায় না, অথচ এগুলো সমুদ্র থেকে আলাদা নয়। আসলে যুগ যুগ ধরে মৌল পদার্থ যৌগ পদার্থে পরিণত হয়েছে। এই মিশ্রণক্রিয়া  একসময় জড় বস্তুকে চেতনা সম্পন্ন করেছে। যেমন ভাইরাস রূপ প্রাণহীন পদার্থ যখন প্রাণকোষের সংস্পর্শে আসে, তখন সে প্রাণিকোষের গুন্ সম্পন্ন হয়। 

এখন কথা হচ্ছে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনকে সমুদ্রের অংশ করতে গেলে উপযুক্ত ভাবে একের সাথে অন্যের অভিন্ন মিলন ঘটাতে হবে। তখন বাষ্প রূপ জল আবার মহাসাগরের অংশে পরিণত  হবে। মানুষ চেষ্টা করে যেমন এটি করতে পারে, তেমনি বিশ্বশক্তি এই কাজটি প্রতিনিয়ত করে চলেছেন, অর্থাৎ বাষ্পকে বৃষ্টিতে পরিণত করে আবার সমুদ্রের সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছেন। এই শক্তিকে বা মহান শক্তিধরকে আমরা দেখতে পাই না। 

কিন্তু এই বিশ্বশক্তির উপরে যার বিশ্বাস আছে, তার কাছে ঈশ্বর অতি বাস্তব, অতি আপন।  আমাদের পার্থিব জীবনে ভগবান তার উপস্থিতিকে গাঢ়  অন্ধকারের মধ্যে আড়াল করে রাখেন। ভগবৎ  বিশ্বাস যার নেই, তার কাছে এই অন্ধকারের বাধা কখনো ঘোচে না। আর ভগবৎ  বিশ্বাসীর কাছে, ভগবানের উপস্থিতি যেন নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধির সাহায্যে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। ভগবৎ  বিশ্বাস ভক্তের মনের মধ্যে একটা নিশ্চিত বোধ জাগিয়ে তোলে, যখন  ভক্ত এটা উপলব্ধি করেন, যে ভগবান আমাদের কথা শুনতে পান, আমাদের কথা তিনি ভাবেন, এমনকি আমাদের প্রার্থনা তিনি পূরণ করেন। তখন ভক্তের কাছে সীমার মাঝে অসীমের সন্ধান মেলে। সংকীর্ণ মন তখন সীমানা ছড়িয়ে অসীমের কাছে আত্মদান করেন। 

এখন কথা হচ্ছে, মানুষের অন্তরে কেন  ভগবৎ বিশ্বাসের জন্ম হয় ? আর কিজন্যই বা জন্ম হয় ? একটা   কথা বলা যেতে পারে,  এই যে ভগবৎ  বিশ্বাস এটি কিন্তু আমাদের অর্জ্জিত নয়। অর্থাৎ আধ্যাত্মিক সাধনার ফলে ভগবত বিশ্বাসের জন্ম হয়েছে, ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। বিশেষ পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে ভগবৎ বিশ্বাস জন্মে থাকে। অর্জ্জুনের মধ্যে যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতির চিন্তা এসে, অসহায় হয়ে, সখা শ্রীকৃষ্ণের আশ্রয় চেয়েছিলো।

 আমরা কেউ চেষ্টা করে এই ভগবত বিশ্বাস অৰ্জন করতে পারি না। পরিস্থিতি আমাদের মধ্যে একসময় ঈশ্বরে বিশ্বাস জাগিয়ে তোলে। আর এই যে পরিস্থিতি, তাও  সেই ভগবান সৃষ্টি করে থাকেন। আসলে ঈশ্বরে বিশ্বাস একটা জগৎ পরিণতি মাত্র, যা আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই একদিন উদয় হবে। আমরা যেমন শিশু থেকে বৃদ্ধে পরিণত হই, এর জন্য আমাদের কোনো প্রয়াস করতে হয় না।  তবে শরীর  ভেদে এই প্রক্রিয়ার মধ্যে সময়ের পার্থক্য দেখা যায়, অর্থাৎ একটা পোকা তাড়াতাড়ি বুড়ো হয়ে যায়, একটা গাছ অনেক দেরিতে বুড়ো হয়, তেমনি একটা মানুষও একটা নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুড়োতে  পরিণত হয়।  এটি যেমন শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তেমনি ভাগবত বিশ্বাস একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া যা আমাদের মনের মধ্যে এই জন্মে না হোক পরবর্তী জীবনে জাগ্রত হবে।  এর অন্যথা হবে না। এই ভাগবত বিশ্বাস জাগানোর জন্য আমাদের শুধুই অপেক্ষা করতে হবে। 

ওম শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।  হরি ওম। 

------------------ 

 


    

  












 


Comments

Popular posts from this blog

নিত্যকথা

ঈশ্বর ও তাঁর উপলব্ধি

সত্যধর্ম্ম ও প্রেম