প্রতীকের উপাসনা


প্রতীকের উপাসনা - আপনার ঠাকুরঘরে এতো মূর্ত্তি কেন ? 

প্রতীকের উপাসনা সম্পর্কে আমাদের  অনেকের মধ্যে অনেক ভুল ধারণা আছে। কিছুদিন আগে, আমাদের বাড়িতে সত্যধর্ম্মের একটা উপাসনার আয়োজন করা হয়ে ছিল।  এই উপাসনার আসরে অনেক নিরাকারের সাধকের উপস্থিত হয়ে  ছিলেন । আমাদের ঠাকুর ঘরে, নানান রকম ঠাকুরের মূর্ত্তি বা ছবি  দেখে, তাঁরা একটু বিরক্তি প্রকাশ করলেন। বললেন, আপনারা সত্যধর্ম্মের ধারক বাহক।  সত্যধর্ম্ম কখনও সাকারের পূজা অর্চ্চনা সমর্থন করে না। যদিও আমি নিজে আদৌ সাধক নোই। এমনকি  আমি কোনো ধর্ম্মমতেই  দীক্ষিত নোই। আমার সাধন ভজন বলতে কিছু নেই। আমার উদ্দেশ্য নিজেকে খোঁজা। ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা  নেই, আর এতে আমার কোনো আগ্রহ বা উৎসাহও নেই। আমি আসলে নিজেকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমার মধ্যে কিছু প্রশ্ন জাগে।  আর সেই প্রশ্নের উত্তর আমি মহাত্মাদের কথার মধ্যে, অথবা নিজের মধ্যেই খুঁজতে থাকি।  আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, কেন এসেছি, এখানে আমার কি কাজ, এখান থেকে আমি আবার কোথায় চলে যাবো।  এই হচ্ছে আমার অনুসন্ধানের বিষয়।  এর বাইরে ঈশ্বর সম্পর্কে আমার কোনো আগ্রহ নেই। তবে আমার মধ্যে একটা বিস্ময় আছে, এই যে আমি যাকে আমি চিনিনা, সেই আমি আমার মধ্যেই বসে করছে টা  কি ?  

যাই হোক, তাদের এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে ছিল না, আমি তাদের কাছে কোনো অজুহাতও দেবার চেষ্টা করি নি। আমার ঘরে যে ঠাকুর দেবতার মূর্তি, এগুলো আসলে আমাদের পরম্পরা।  আমাদের পরিবারের পরম্পরা। এর মধ্যে কোনো বিশ্বাস, অবিশ্বাস কোনোটাই দৃঢ় নয়। অভ্যাস বশে এগুলো রেখে দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু অভ্যাসের কারণেই কি না জানি না, ঠাকুর ঘরে বসলে, আমার মন স্থির হয়, শান্ত হয়, আমি আমার অনেক প্রশ্নের জবাব এই ঠাকুর ঘরে বসেই পেয়ে থাকি। এখানেই আমি নিজের মধ্যে প্রবেশ করি।  এখানেই আমি ধ্যানস্থ হই। এখানে বসেই আমি যোগাদি  ক্রিয়া করে থাকি। ঠাকুর ঘরের এই সাজসজ্যা আমাদের বিরক্ত করে না, বরং এই সাজসজ্যা হয়তো, ঠাকুর ঘরের মধ্যে একটা আধ্যাত্মিক পরিবেশ এনে দিয়েছে।

তন্ত্রসার গ্রন্থে পড়ছিলাম, "প্রথমা প্রতিমা-পূজা জপস্তোত্রাদি মধ্যমা।  উত্তম মানসী পূজা সোঽহং পুজোত্তম-উত্তমা। " প্রতিমা পূজা হচ্ছে, প্রথম ধাপ, মধ্যম অবস্থায় জপস্তোত্র, অর্থাৎ ঈশ্বরের নাম গুন্ কীর্ত্তন,  উত্তম অবস্থায় মানসী পূজা অর্থাৎ ধ্যানাদি।  আর শেষ বা উচ্চতর  অবস্থায়, সোঽহং অর্থাৎ আমিই সেই এই উপলব্ধি করা। 

মহানির্বাণ তন্ত্রে বলা হচ্ছে, "উত্তমো ব্রহ্মসদ্ভাবো ধ্যানভাবস্তু মধ্যমঃ।  স্তুতির্জপো-অধমভাবো বহির্পুজা-অধমাধমা। " ব্রহ্ম চৈতন্যভাব উচ্চতম, এর পরে ধ্যান মধ্যম, স্তূতি-জপ ইত্যাদি অধম ভাব, আর বাহ্যিক পূজা অধমেরও অধম। 

যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন,

ধ্যানেন-আত্মনি পশ্যন্তি কেচিদাত্মানমাত্মনা 
অন্যে সংখ্যেন যোগেন কর্ম্ম যোগেন চাপরে। ১৩/২৫) 
কেউ কেউ ধ্যানের  দ্বারা  আত্মাতে আত্মদর্শন করেন, কেউ কেউ সাংখ্যযোগের দ্বারা, আবার কেউ কেউ কর্ম্মযোগের দ্বারা আত্মদর্শন করেন। 

অন্য তু-এবং জানন্তঃ শ্রুতান্যেভ্য উপাসতে 
তেঽপি চ অতিতরন্তি-এব মৃত্যুং শ্রুতি-পরায়ণাঃ (১৩/২৬) 
কেউকেউ আত্মাকে জানতে না পেরে অপরের নিকট শুনে শুনে উপাসনা করেন । এবং শ্রদ্ধালু শ্রোতারাও গুরু নির্দিষ্ট পথে সাধনা করে মৃত্যুকে অতিক্রম করেন।

এখন কথা হচ্ছে, মানুষ নানান ভাবে সেই একই ব্রহ্মের উপাসনা করে চলেছেন । এক্ষেত্রে অনেকসময় উদ্দেশ্য ভিন্ন হয়, আবার উপায়ও ভিন্ন ভিন্ন হয়। অনুষ্ঠানাদি পূজা পাঠ মূর্তির পূজা বা প্রতীকের পূজা, এটি অধম হলেও, অধিকারী ভেদে এরও প্রয়োজন রয়েছে। আপনি কঠিন অঙ্কের  সমাধান করতে পারবেন, বলে আমিও পারবো তা তো নয়, আমাকে প্রথমে সহজ অঙ্ক  দিয়েই শুরু করতে হবে। বিবেকানন্দ ধ্যানে বসলে জ্যোতির দর্শন দিয়েই শুরু করতেন।  আমি ধ্যানে বসলে হয়তো চোখের সামনে অন্ধকার দেখি। আপনি ধ্যানে বসলেই হয়তো আপনার মন ইষ্টে নিবিষ্ট হয়ে যায়, আমি ধ্যানে বসলে হয়তো বিষয় চিন্তা এড়াতে পারি না। 

দেখুন ঈশ্বরে নিবেদিত হওয়াই আসল কথা। আপনি নিজেকে সহজে ঈশ্বরে নিবেদন করতে পারবেন না। কিন্তু আপনার যা কিছু আছে, তা সে জামা কাপড় হতে পারে, গাড়িবাড়ি হতে পারে, আপনার খাবার-দাবার  হতে পারে, এসব প্রথমে ঈশ্বরে নিবেদন করে তারপর নিজে ব্যবহার করুন। এক্ষেত্রে মনে করুন না, যে এই নিবেদন প্রক্রিয়ায় আপনার খাবার বা জামা কাপড়, গাড়ি, বাড়ি সব শোধন হচ্ছে। ঈশ্বর হচ্ছেন শোধন কর্ত্তা। আপনি লক্ষ করে থাকবেন, প্রত্যেকটি আশ্রমে উপাসনা গৃহ থাকুন বা না থাকুক, একটা ঠাকুরঘর আছে।  আর সেখানে নানান রকম মূর্তি, প্রতীক রাখা হয়েছে। এতে দোষের কিছু নেই। ঠাকুরঘর আসলে নিজেকে নিবেদনের নিৰ্জন কক্ষ। এইভাবে নিবেদন করতে করতে একসময় দেখবেন আপনার মধ্যে একটা অনাসক্তি ভাব জেগে উঠবে, আত্ম-সমর্পনের ভাব জেগে উঠবে। সাধু সেবা করুন, ক্ষুধার্থ মানুষকে খেতে দিন। এমনকি শিবঠাকুরের মাথায়, বা শিব লিঙ্গে, জলঢালুন।  একটা গাছের গোড়ায় জল ঢালুন। বাবা-মাকে প্রণাম করুন, তারা বেঁচে না থাকলে, তাদের ফটোতে একটা মালা  গেথে দিন। এসব করে দেখবেন, আপনার মধ্যে একটা নম্রতা আসবে। বিশ্বব্রহ্মান্ডের মধ্যে আমি একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কীট।  কতটুকু শক্তি আছে আপনার-আমার  ? কিন্তু আপনি যখন নিবেদিত প্রাণ হবেন, তখন দেখবেন, নিজেকে অখন্ড অনন্ত সত্তার অংশ হিসেবে মনে হবে। আপনি তখন একা  নন, আপনি তখন ক্ষুদ্র নন, আপনি তখন বিরাটের অংশ হয়ে যাবেন।

উপাসনার অর্থই হচ্ছে কাছে বসা। ধ্যান যেমন ঈশ্বর চিন্তন, তেমনি প্রতীকের পূজাও ঈশ্বর চিন্তন। সাধন পদ্ধতি হয়তো আলাদা, কিন্তু সবার উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন ঘটানো। কিন্তু সাধকের ভিন্নতা হেতু, তাদের যাত্রা শুরুর স্থান বা বাহন হয় আলাদা আলাদা। জলপথ পেরুতে গেলে, আপনার  নৌকো নেওয়া ভালো, কিন্তু  যার জলপথ পেরুতে হবে না, তার নৌকোর দরকার নেই। জলপথের যাত্রীকে  হাটতে বলা বৃথা। সাধনক্রিয়া আসলে বাহন মাত্র। সাধনক্রিয়া আপনাকে লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে। বাহন গুরুত্ত্বপূর্ন নয়, লক্ষ্য গুরুত্ত্বপূর্ন। যাদের কাছে যে  পদ্ধতি কঠিন, তাকে সেই পদ্ধতিতে উপাসনা করতে বলার   অর্থ তাকে বিড়াম্বনায় ফেলা। 

প্রতীক আসলে প্রতিনিধি স্বরূপ। প্রতীকের উপাসনা হয় না। প্রতীকের মধ্যে ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব স্বীকার করে নিয়ে,প্রতীকের মধ্যে নিহিত সেই পরমাত্মার সাধনা করা নয়। প্রতিমার পুজো শেষ হয়ে গেলে, প্রতিমাকে জলে ফেলে দেওয়া হয়। তাহলে কি ঈশ্বরকে জলে ফেলে দেওয়া হয় ? আসলে ঈশ্বর থাকেন সাধকের হৃদয়ে। হৃদয়ের মধ্যে যখন ঈশ্বর সত্ত্বার অনুভূতি জেগে উঠবে, তখন প্রতীক উধাও হয়ে যাবে। 

সবাই বলে, ঈশ্বর নিরাকার। আসলে ঈশ্বর অর্থে জ্ঞান বোঝায়। এই জ্ঞানের কোনো আকার হয় না।  কিন্তু যে বস্তুতে এই জ্ঞানের প্রকাশ ঘটে, তার  একটা আকার আছে অবশ্যই । আর এই আকার আপনি আপনার দিব্যচক্ষু, বা অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখতে পারবেন। তা যদি নাই পারলেন, তবে বৃথা আপনার সাধনা। তা সে যে ধরনের সাধনাই করুন না কেন। 

ওম শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।  হরি  ওম।  

আমি নাস্তিক না হলে আস্তিক হতে পারতাম না।  ধর্ম্ম না ব্যবসা ? 

আমাদের বাড়ির পার্শ্বে একটা মন্দিরে একদিন আমি গীতা পাঠ  হচ্ছে শুনে অনাহূতের মতো উপস্থিত হলাম।  সেখানে যেতেই এক ভদ্রলোক, আমার কপালে একটা চন্দনের ফোটা দিয়ে, একটা পয়সার  ডালি তুলে ধরলো। নিজের অজ্ঞাতসারেই পকেট  থেকে ৫০টা  টাকা বের করে থালায় রাখলাম।  

পরে ভাবছিলাম, আমি আস্তিক না হয়ে নাস্তিক হলে ভালো করতাম।  ধর্ম্মের নামে  লোক ঠকানোর ব্যবসা চলছে, সারা বিশ্বজুড়ে - তাতে তাহলে আমাকে সমর্থন করতে হতো না।  ধর্ম্মের নামে  সরল বিশ্বাসী মানুষদের ঠকিয়ে নিজেদের আখের গোছানোর ধান্ধা ভারতের  ইতিহাসের প্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে। ২৩০০ বছরের পুরানো কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র পড়ছিলাম, সেখানে  বলা হচ্ছে, 

"কোনো প্রসিদ্ধ পুন্য স্থানে ভূমি ভেদ করে দেবতা নির্গত হয়েছেন, এই ছলনার  আশ্রয় নিয়ে, সেখানে নির্জন রাত্রিতে একটা দেবতার বেদি স্থাপন করো, সেখানে উৎসদ্ব মেলা ইত্যাদি  শুরু করে দাও।  দেখবে, সেখানে অন্ধবিস্বাসী, শ্রদ্ধালু মানুষ দেবতার উদ্দেশ্যে ধন দান করছে।  সেখানে একজন দেবতা অধ্যক্ষ নিয়োগ করো, যিনি দেবতাদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ধন রাজ্ সমীপে উপস্থিত করবে। (কৌটিল্য - ৫/২/৯০)
আরো বলা হচ্ছে, দেবতাধ্যক্ষ এও  প্রচার করতে পারেন, যে বনের মধ্যে গাছে, অকালে ফুল-ফল হয়েছে। এতে করে মানুষের মনে দেবতার আগমন নিশ্চিত করা যাবে। 
এতে কাজ না হলে, মানুষকে ভয় দেখাও, আর এই ভয়ের প্রতিকার করতে জনসাধারণ থেকে অর্থ সংগ্রহ করো - আর সেসব গোপনে রাজার কাছে পাঠিয়ে দাও। 

ধর্ম্মের নামে  সুন্দর ব্যবসার নির্দেশ দিয়ে গেছেন, প্রাচীন অর্থনীতিবিদ কৌটিল্য।   

আমি একবার এক কীর্ত্তনের আসরে  কৃষ্ণভক্তকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, যে পাণ্ডবদের নিত্যসখা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ,   তাদের এতো কষ্ট  কেন ? ভদ্রলোক কথা শুনেই কানে আঙ্গুল দিলেন। কেননা ঈশ্বর খুব কাঁচা, দুর্বল, ননীর পুতুল। মান্যতা দিয়েই  তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, তা না হলে ঈশ্বরের কানাকড়িও মূল্য নেই। 

লোকে বলে, বিশ্বাসে মেলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে, বিশ্বাস মানুষসকে অন্ধ করে দেয়। সন্দেহ মানুষকে অন্বেষণ করতে উৎসাহ জোগায়। যদি তোমার মধ্যে সন্দেহ থেকে থাকে তবে  জানবে সেটা  তোমার জন্মগত। সন্দেহ সবার মধ্যেই জন্ম থেকেই  আছে।  যদি শিশুর মধ্যে কোনো প্রশ্ন না জাগে তবে জানবেন, শিশুর বুদ্ধির  বিকাশ প্রক্রিয়ায়   কোনো গোলযোগ আছে। তো সন্দেহ আমাদের সবার মধ্যেই আছে,  কিন্তু আমরা অন্যমনস্ক হয়ে সন্দেহকে দূর করতে চাইছি । দেখুন সন্দেহ যদি থাকে তাকে দূর করবার চেষ্টা করুন।  সন্দেহকে পুষে রাখবেন না। শত্রু যদি সামনে থাকে তো ভালো, শত্রু পিছনে ঘাপটি মেরে থাকলে, সেটা ভালো না। আস্তিক্যের সিঁড়ি হচ্ছে নাস্তিকতা। নাস্তিকতা হচ্ছে সোপান যা, বেয়ে আপনি আস্তিকের কাছে যেতে পারেন। 

তথাকথিত পণ্ডিত মূর্খেরা আস্তিকতাকেই আশ্রয় করে থাকে। আস্তিক যদি কখনো  নাস্তিক হয়, তবে জানবেন সে কোথাও ধোঁকা  খেয়েছে, তার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তার ব্যবসা ভালো চলেনি। তার সমস্যা মেটেনি, তার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি  অর্থাৎ যে ঈশ্বরকে সে বিশাল দাতা, বা পরিত্রাণকর্ত্তা ভেবে বসেছিল, সেখানে তার কোনো আঘাত এসেছে। মিথ্যে আস্তিকতার চেয়ে নাস্তিকতা ভালো। আসলে আমাদের নিজেদের নাতো কোনো অনুভব আছে, না কোনো জ্ঞান আছে, লোকে বলে, আমার মা-বাবা- বলেছে, আমার পাড়াপড়শিরা বলেছে, আমার শিক্ষক বলেছে, বহুলোক বলেছে, ইত্যাদি ইত্যাদি কেবল শুনতে শুনতে নিজের অজ্ঞাতসারে, আমরা এসব মেনে নিয়েছি।  স্বীকার করে নিয়েছি। আমি নিজে না  কিছু জানি, না জানবার চেষ্টা করেছি। 

মানুষের মনে সন্দেহ স্বাভাবিক, এটি তার নিজস্ব, কিন্তু অন্ধবিশ্বাস বা শ্রদ্ধা,  তার ধার করা বিদ্যা। একটা বাচ্চা ছেলে যখন প্রশ্ন করে, তখন প্রথম দিকে  উত্তর দিলেও, শেষে আমরা   বিরক্ত হই ।  কারন এসব প্রশ্নের উত্তর আমদের  জানা নেই। তুমি নিজেকে বুদ্ধিমান ভাব, অথচ  একটা বাচ্চা ছেলের প্রশ্নের জবাব তোমাদের   কাছে নেই। সন্দেহবৃত্তি শিশুর জন্ম থেকেই এসেছে। কৌতূহল, শিশুর জন্মগত অধিকার।  সে জানতে চায়।  আসলে সন্দেহ হচ্ছে, বীজ, এই সন্দেহের মধ্যে লুকিয়ে আছে শ্রদ্ধারূপী বীজ। এই সন্দেহ যেদিন মাটির নিচে চাপা পড়বে, সেইদিন শ্রদ্ধার অংকুর বেরুতে শুরু করবে। তো সন্দেহকে মাটি চাপা দিতে হবে। যাতে সে অংকুরিত হতে পারে।  কিন্তু আমরা সন্দেহকে কবর দিয়ে দেই. যাতে কোনোদিন এই সন্দেহ থেকে সত্যিকারের শ্রদ্ধার গাছ না জন্মাতে পারে। 

আমরা ভাবি সন্দেহ আমাদের শত্রু। পন্ডিতগণ পুরোহিতগন বলছেন, ধর্ম্ম জীবনে সন্দেহ  থেকে শত্রু  আর কেউ নেই। কিন্তু প্রশ্ন না জাগলে, উত্তর আসবে কোথা  থেকে। কৌতূহল না থাকলে, আবিষ্কার কিভাবে হবে ,বিস্ময় না জাগলে, খোঁজ কি করে শুরু হবে ? শিশুর মনে প্রশ্ন জাগে, পুতুল আর প্রতিমা একই ? পুতুল আর প্রতিমার মধ্যে পার্থক্য কোথায়। পুতুলকে কেউ প্রণাম করে না, পুতুলের  পুজো হয় না, কিন্তু প্রতিমার সামনে ফুল-ফল-পাতা  দিয়ে ঘটা  করে ধুপ-ধুনো দিয়ে পুজো করা হয়।  

দেখুন সন্দেহ থেকেই একদিন যথার্থ শ্রদ্ধার জন্ম হতে পারে। সন্দেহ যদি না জাগে, তবে সেই শ্রদ্ধা মেকি। এই শ্রদ্ধায় কোনো সারবস্তু নেই। আমরা বলে থাকি ধর্ম্ম খুব উদার। আসলে এই উদারতা উপর উপর দেখানো হয়, আসলে ধর্ম্ম অনুদার।  আমরা মুখে বলি,আল্লা-ঈশ্বর তেরে নাম। আবার সুযোগ পেলেই এই আল্লা ও ঈশ্বরকে এমনভাবে লড়িয়ে দেই, এমনসব কথা বলি, যেন আমার মুখে মায়ের দুধের গন্ধ বেরুতে শুরু করে। 

ভারতবর্ষ এমন একটা দেশ যেখানে সেই ট্রেডিশন সামানে চলেছে। দাদা ঠাকুরের আমল থেকে আজো রামায়ন  পঠিত হয়। আজও লোকে সীতার দুঃখে কাঁদে।  কিন্তু বাড়ির লক্ষী-সরস্বতীর দিকে  কেউ খেয়াল করে না।  গরিব আরো গরিব হোক, বড়োলোক আরো বড়ো হোক। পন্ডিতের ঘরে পণ্ডিত জন্মাক। ব্রাম্মনের ঘরে ব্রাহ্মণ জন্মাক। 

এসব কথার বিরোধিতা করতে গেলেই,  তোমাকে ধর্ম্মের আফিং খাইয়ে দেওয়া হবে। পূর্বজন্মের কর্ম্মফলের আজগুবি গল্প শোনানো হবে। নতুবা পরের  জন্মের লোভ দেখিয়ে তোমাকে দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে বলবে। তুমি এই জন্মে কষ্ট  করো,  পরের  জন্ম তোমার ভালো হবে। এখন তোমাকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, তুমি বাঁধা দেবার চেষ্টা করো না, বিদ্রোহ করো না, মেনে নাও। পণ্ডিত পুরোহিতগন বলছেন, এই জন্মের কষ্টগুলো তুমি অমায়িকভাবে সহ্য করে যাও।  যদি তা না করো, যদি তুমি বিদ্রোহ করো, যদি তুমি কষ্ট   সহ্য করতে অপারগ হও, তবে তোমার এই জন্মে তো বটেই পরের জন্মেও তোমার দুর্ভোগ আছে। দেখো, এই জন্ম তো তোমার গোল্লায় গেছে, এটাকে আর শুধরাবার কোনো চেষ্টা করো না, শুধু মেনে নাও, তবে তোমার আগামী জন্ম সুখের হবে। ভবিষ্যতের ভালোর জন্য, এই জন্মে ব্রাহ্মণ সেবা করে যাও।  কেউ তোমাকে দুঃখ দিচ্ছে না, তুমি তোমার পাপের  ফল ভোগ করছো। এখন যাদের তুমি ব্রাহ্মণ দেখছো, ধনীব্যক্তি দেখছো, ক্ষমতাশালী  দেখছো, এর সবাই আগের জন্মে সুকর্ম্ম করে এসেছে। আর তুমি কেবল পূর্ব পূর্ব জন্মে পাপই করেছো। 

চালাকিটা দেখুন,  এই জন্মে যে সাদা খাতা জমা দিচ্ছে, সে নাকি ভালো ছাত্র। সে নাকি ভালো শিক্ষক। আর যে খাতা ভর্তি লিখেছে, তার খাতা দেখবার লোক নেই।  ওসব জঞ্জাল পুড়িয়ে দাও। তোমার এই জন্মের সুফল তুমি এ জন্মে পাবে না।  তোমাকে পরের  জন্ম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আর এই জন্মটা তাদেরই জন্য সুখকর হবে, যে রুপোর চামচ নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেছে। এখানে কর্ম্ম নয়, জন্মই আসল কথা।  তা না হলে পণ্ডিত পুরাহিতবর্গ কিভাবে শোষণ করবে। পণ্ডিত-পুরোহিত, রাজা-মহারাজা সব এক হয়ে গেলো,  আর নিজেদের বিজয়গাথা লিখে রামাযান-মহাভারত রচনা করলো। 

এই দেশ যদি কর্ম্মের গুরুত্ত্ব দিতো, যাঁরা হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করে,  ক্ষেতে ফসল উৎপাদন করতো, তাহলে আজ হয়তো, এই দেশটা সমৃদ্ধিতে ভোরে  উঠতো। আমাদের দেশে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ।  এখানেই চার্বাক, কপিল, পতঞ্জলির জন্ম হয়েছে। এখানেই সত্যকাম, যাজ্ঞবল্ক, পরশুরামের জন্ম হয়েছে।  দেখুন গরিব কখনও ধর্ম্মিক হতে পারে না, আবার গরিব কখনো 
অধার্ম্মিক হতে পারে না। তাঁরা কেবল শ্রমিক হতে পারে। এই শ্রমিকশ্রেনীই দেশকে সমৃদ্ধ করতে পারে। কিন্তু শ্রমিকরা কখনও মানুষের মর্য্যাদা পায়  নি। তাদের ন্যায্য অধিকার দেওয়া হয় নি। 

---------------                    


            




Comments

Popular posts from this blog

নিত্যকথা

ঈশ্বর ও তাঁর উপলব্ধি

সত্যধর্ম্ম ও প্রেম