কেন উপনিষদ রহস্যঃ



কেন উপনিষদ রহস্যঃ   

শশাঙ্ক শেখর শান্তি ধাম 

ভূমিকা : 

কেন ? কেন  যে জিজ্ঞাসা জাগে ? মানুষ কেন জানতে চায় ? কি  জানতে চায় ? কাকে জানতে চায় ? যারা মেনে নেয়, তারা অনেক শান্তিতে থাকে। যার মধ্যে প্রশ্ন জাগে, সে ছুটে বেড়ায়। হন্যে হয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন নিয়ে বিব্রত হয়ে উত্তরের খোঁজে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হ'য়ে, একদিন দেহত্যাগ করে। আবার সে নতুন দেহে প্রশ্ন নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে। শিশুকে কেউ প্রশ্ন  করতে শেখায় না, তথাপি শিশু প্রশ্ন করে। আর বড়রা বিব্রত হয়ে,  হয় উপেক্ষা করে, নয়তো অপেক্ষা করতে  বলে।  কিন্তু অপেক্ষার শেষ হয় না। শিশু থেকে একদিন সে বুড়ো হয়ে যায়, তবু মন থেকে প্রশ্নের শেষ হয় না। 

কিসে মানুষ জ্ঞানী হয়, জ্ঞান কাকে বলে ? আর অজ্ঞানই বা কাকে বলে ? শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের ঋষিগণ প্রশ্ন তুলে ছিলেন, এই জগতের কারন  কি ? আমরা কোথা থেকে এসেছি ? কার দ্বারা আমরা পালিত হচ্ছি ? মৃত্যুর পরে আমরা কোথায় চলে যাবো ? কার কারনে আমরা এই সুখ-দুঃখ ভোগ করছি ?

প্রশ্ন উপনিষদে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, প্রাণ কোথা থেকে আসে ?  শরীরের মধ্যে প্রাণ কিভাবে প্রবেশ করে, আবার কিভাবেই বা বেরিয়ে যায় ? 

কঠোপনিষদে নচিকেতা প্রশ্ন করেছিলেন, যমরাজের কাছে, মৃত্যুর পরে আত্মার কোনো অস্তিত্ত্ব থাকে কি ? কেউ বলেন, মৃত্যুর পরে আত্মা থাকে, আবার কেউ বলেন, আত্মা থাকে না, সত্য কি ? 

এই কেন উপনিষদেও আবার সেই প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। এখানেও  প্রশ্ন - ১) কার  ইচ্ছেয় মন বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হয় ? ২) শ্বাসবায়ু  একবার শরীরের মধ্যে ঢুকছে, আর একবার বেরিয়ে যাচ্ছে - কার নির্দেশে সে এই কাজ করছে ? ৩) মানুষ কেন কথা বলে, বলতে পারেন  ? হাজার এক প্রশ্ন, কে জবাব দেবে ? কেনই বা দেবে ? কিভাবেই বা প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়। আর এই জবাবে জিজ্ঞাসু কি সন্তুষ্ট হবে ? মাঝে মধ্যে মনে হয়, অকারনে এই প্রশ্নের জালে জড়িয়ে জীবনকে বিব্রত করা হচ্ছে। মানুষ অশান্ত হয়ে উঠছে।  যাদের কোনো কাজ কর্ম্ম নেই, তাঁরাই এইসব উদ্ভট প্রশ্ন নিয়ে মাথাটাকে খারাপ করছে। আবার ভাবি যাদের মনে কোনো প্রশ্ন জাগে না তারা তো জড়। যাদের বোধশক্তি নেই, যারা নিস্পৃহ, তাদের কোনো প্রশ্ন-উত্তরের বালাই নেই। হয় তারা বুদ্ধু নয় বুদ্ধ। 

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে, একটা মোক্ষম জবাব আছে, এইসব প্রশ্ন শুনে ঋষিগণ গভীরে ধ্যানে মগ্ন হলেন - "তে ধ্যানযোগানুগতাঃ" । কাথাবার্তা বন্ধ  করে দিলেন, আলোচনা বন্ধ  করে দিলেন, আর শান্ত হয়ে গভীর ধ্যানে মগ্ন হলেন। অর্থাৎ মৌন হয়ে নিজের মধ্যে নিজেই প্রবেশ করলেন। সমস্ত প্রশ্ন যেখান  থেকে উৎসারিত হচ্ছিলো, সেই প্রশ্নকর্তার কাছেই নিজেকে উপস্থিত করলেন। ধীরে ধীরে  সমস্ত  প্রশ্নের সমাপ্তি হতে লাগলো। 

তো প্রশ্নের জবাব পান্ডিত্যে নয়, প্রশ্নের জবাব আমাদের মনের গভীরে আপনা-আপনি ভেসে ওঠে।  প্রশ্নের জবাব আছে মনের গভীরে, কিন্তু তা আমাদের নজরে পড়ে  না। আমরা বহির্মুখী হয়ে, অন্যের কাছে প্রশ্নের  জবাব চাই ।  কিন্তু জবাব তো তার কাছেই আছে, যার মধ্যে প্রশ্ন জেগেছে। মনকে যখন ধ্যানের  দ্বারা একমুখী করা হলো, অমনি উত্তরটা চেতনার স্তরে ভেসে উঠলো। 

কেন উপনিষদ সাম  বেদের অংশ। বলা হয়, এই উপনিষদ তলবাকার  নামক ঋষির দ্বারা উদ্গীত। এখানে চারটি খন্ড  আছে।  প্রথম খন্ডে ৯টি, দ্বিতীয় খন্ডে  ৫ টি, তৃতীয় খন্ডে ১২টি ও চতুর্থ খন্ডে ৯টি শ্লোক আছে। এই উপনিষদটি আত্মজ্ঞান পিপাসুর আছে এক অমূল্য সম্পদ।  আত্ম-উপল্বদ্ধিতে,  চিত্ত শুদ্ধিতে, এই ছোট্ট বই, চুম্বকের মতো কাজ করবে, যদি আমরা এর মূল সুরকে ধরতে পারি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বেদ-উপনিষদের জ্ঞান মেঘে ঢাকা সূর্য্যের মতো।  এঁকে উন্মুক্ত করলে চোখ ঝলসে যায়, আবার উন্মুক্ত না করতে পারলে, উত্তাপ পাওয়া যায় না। কখনও রূপকের বাক্সে, কখনও  গল্পের মোড়কে এই জ্ঞান পরিবেশিত হয়েছে। আবার কখনো নারকেল শাঁসের মতো কঠিন নারকেল মালার মধ্যে পরিবেশিত হয়েছে। তাই এই জ্ঞান সর্ব্বসাধারনের কাছে উন্মুক্ত হতে পারে নি।   

যাই হোক, নিজেকে জানাই শ্রেষ্ঠ জ্ঞান। এই জ্ঞান হলে, সাধক সমস্ত জগতের সঙ্গে (তা সে সূক্ষ্ম,  স্থূল বা  কারন যা-ই হোক না কেন)  একাত্মতা অনুভব করেন।  তখন এক ভিন্ন দুই থাকে না, তখন না থাকে জ্ঞাতা না থাকে জ্ঞেয়, তখন কেবলই জ্ঞানময় অপার  শান্তির জগতে তিনি বাস করেন। সব প্রশ্নের জবাব মিলে  যায়, আর আমরাও শান্ত-স্থির হয়ে যাই। 

------- 

কেন উপনিষদ রহস্যঃ  

মঙ্গলাচরণ মন্ত্র : 

"ওঁ আপ্যায়ন্তু মম অঙ্গানি বাক প্রাণঃ চক্ষুঃ শ্রোত্রম অথো বলম ইন্দ্রিয়াণি চ সর্বাণি। সর্বং ব্রহ্ম উপনিষদম। মা  অহং ব্রহ্ম নিরাকুর্যাং, মা মা ব্রহ্ম নিরাকরোৎ ;  অনিরাকরণম মে অস্তু,  অনিরাকরণম মে অস্তু। তৎ আত্মনি নিরতে য উপনিষৎসু ধর্ম্মাস্তে ময়ি  সন্তু, তে ময়ি  সন্তু।" 

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ। 

আমার সমস্ত অঙ্গ  যেন পুষ্ট  হয়।  আমার প্রাণবায়ু, বাকশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি, এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয়সকল যেন বলবান হয়। সকলই ব্রহ্ম, এই কথা সমস্ত উপনিষদ বলে থাকে। আমি যেন ব্রহ্মকথা শুনতে উদাসীন না হই। ব্রহ্ম যেন আমাকে নিরাকৃত না করেন। তিনি যেন আমাকে তাঁর কাছ থেকে সরিয়ে না দেন, আবার আমিও যেন তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে না আসি। উপনিষদে যে ধর্ম্ম কথা বলা হয়েছে, সেই আত্মনিষ্ঠ সাধনজ্ঞান লাভের  সাধনায় রত আমি। আমার যেন এই সাধনক্রিয়া আয়ত্বে আসে। 

ত্রিবিদ শান্তি হোক। শরীর  ও মানসিক শক্তি (অধ্যাত্মিক) শান্তি হোক।  পরিবেশ ও প্রাকৃতিক শান্তি (আধিদৈবিক) শান্তি হোক। কীট-পতঙ্গ ও হিংস্রপ্রাণী থেকে বিঘ্নের  ( আধিভৌতিক) শান্তি হোক। 

প্রত্যেক উপনিষদ শুরু করা হয়েছে, একটা প্রার্থনা মন্ত্র দিয়ে। উপনিষদের ঋষিগণ বারংবার উদাত্ত কন্ঠে ঘোষণা করছেন, সমস্ত জগৎ ব্রহ্মময়।  সমস্ত জীব ব্রহ্ম। আমাদের মাঝে মধ্যে প্রশ্ন জাগে, জীব যদি  ব্রহ্ম হয়, তবে ব্রহ্ম  নিশ্চই জীব। তাহলে ব্রহ্ম ও জীব-জগৎ কি সমার্থক ? আসলে একটু গভীর দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, ব্রহ্ম এক অনন্ত যাত্রায় বেরিয়ে জীব হয়েছেন। তিনি নিজেকে বিস্মৃত হয়েছেন ।  ভেড়ার দলে  মিশে নিজেকে ভেড়া হিসেবেই ধরে নিয়েছেন। এখন তাঁকে আবার স্বরূপে স্থিত হতে হবে। স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনতে  হবে।  সগৃহে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। অর্থাৎ ব্রহ্ম যেমন জীব হয়েছেন, এখন জীবকে আবার ব্রহ্ম হতে হবে, বিচিত্র এই অনন্ত যাত্রা।  এই যাত্রাই সাধনা। 

চেতন শক্তি ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে প্রকাশিত হচ্ছে। এই ইন্দ্রিয়শক্তির ক্রিয়া সীমাবদ্ধ। চোখ বেশিদূরে বা বেশি কাছে দেখতে পায় না।  শব্দ একটা বিশেষ মাত্রায় শ্রুতিগোচর হয় মাত্র। এই মাত্রার তারতম্য ঘটলে, কান কিছুই শুনতে পায় না। তো ইন্দ্রিয়ের শক্তি সীমাবদ্ধ। এই শক্তি অসীম নয়, পূর্ন  নয়। তো এই সীমাবদ্ধ শক্তি সম্পন্ন ইন্দ্রিয়শক্তি কিভাবে সীমাহীন ব্রহ্মকে গোচরের মধ্যে আনবে ? উপনিষদের ঋষিগণ এইখানে একটা আপ্তবাক্য শুনিয়েছে, আর তা হচ্ছে, ইন্দ্রিয়ের পুষ্টি এবং তার  বিশুদ্ধিকরণের মাধ্যমে সীমার ভিতর  দিয়ে অসীমকে উপলব্ধি করা যায়। জানালা তো ছোট্ট, কিন্তু এই ছোট্ট জানালা দিয়েই, অসীম আকাশকে দর্শন করা যেতে পরে। বিরাট সূর্যকে যেমন ছোট্ট জলের পাত্রে দেখতে পাওয়া যায়, বিরাট আকাশকে যেমন ঘটের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়, তেমনি আমাদের এই সীমিত শক্তিসম্পন্ন ইন্দ্রিসকল দিয়ে সেই অনন্ত পরমব্রহ্মকে দেখতে পাওয়া যায়।  এর জন্য দরকার আয়নাকে পরিষ্কার রাখা,  অর্থাৎ যাতে তিনি প্রতিবিম্বিত হবেন, তাকে পরিষ্কার পরিছন্ন রাখা।  অর্থাৎ আমরা যদি আমাদের ইন্দ্রিসকলকে শুদ্ধ, সবল রাখতে পারি, আমরা সেই বৃহৎ পুরুষকে ইন্দ্রিয়ের দ্বারাই উপলব্ধি করতে পারি। এইজন্য সেই বৃহতের কাছে আমাদের আবেদন - আমার সমস্ত অঙ্গ  যেন পুষ্ট  হয়।  আমার প্রাণবায়ু, বাকশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি, এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয়সকল যেন বলবান হয়। আমার সমস্ত অঙ্গ  সেই পরম-ব্রহ্ম  দর্শনে পরিতৃপ্ত হোক। আমার সমস্ত অঙ্গের আপ্যায়ন হোক। অর্থাৎ আমার সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে যখন বৃহতের দরবারে হাজির হবো, তখন যেন তিনি অর্থাৎ সেই পরমব্রহ্ম যেন আমাদেরকে আপ্যায়ন করেন, আমাদেরকে তৃপ্ত করেন। আমাদের শরীরকে আশ্রয় করেই আমাদের জীবন প্রবাহ চলছে, যাকিছু কর্ম্ম বা যাকিছু জ্ঞান তা এই শরীরের দ্বারাই সম্পাদিত হচ্ছে। আর এই শরীরের মধ্যে একটা শয়তান আছে, তার নাম হচ্ছে ব্যাধি।এই ব্যাধি নামক শয়তান আমাদেরকে আনন্দ উপভোগে বাধা দিচ্ছে। তা সে জাগতিক আনন্দ বলুন, বা ব্রহ্ম-আনন্দ বলুন,  এই ব্যাধি হচ্ছে আনন্দের প্রতিবন্ধক। কিন্তু কথা হচ্ছে এখান থেকে আমরা বেরুবো কি করে ? 

যোগাচার্য্যগণ বলছেন, অগ্নিতে যেমন সমস্ত দাহ্যবস্তু দাহ হয়। তেমনি  শরীরে যোগাগ্নি প্রজ্বলিত করতে পারলে, সমস্ত ব্যাধি দগ্ধ হয়ে যেতে পারে। তো ব্যাধিমুক্ত শরীর  যদি পেতে চান,  এবং এই শরীরেই যদি ব্রহ্মানুভুতি পেতে চান তবে  শরীরশুদ্ধির এই যোগক্রিয়ার অভ্যাস করুন। আর জানবেন, শুদ্ধকায়া যোগীপুরুষ এই ব্রহ্ম  সান্নিধ্য অনুভব করেন।  একেই ঋষি তলবাকার বলছেন,   "আপ্যায়ন্তু মম অঙ্গানি।" 

বাকশক্তি আমাদের মনের ভাবকে অভিব্যক্ত করতে সক্ষম। জ্ঞানের প্রথম প্রকাশ ঘটে এই বাকের মাধ্যমে। তো আমাদের অন্তরে যে বাকশক্তি আছে তাকে শুদ্ধ করতে হবে, বলবান করতে হবে, জাগিয়ে তুলতে হবে। কেননা এই বাকই একমাত্র শক্তি যা ব্রহ্মের নিকটস্থ। শুধু  তাই নয়, প্রণব ব্রহ্মবাচক শব্দ। তো অন্তরের ভাব শুদ্ধ হয়ে বাকের মধ্যে প্রবেশ করুক।  

প্রাণ - বলা হয়, প্রাণই ব্রহ্ম। এই প্রাণশক্তিই এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ড ব্যাপী ক্রীড়ারত। এই যে শরীর , এ-ও সেই প্রাণশক্তির সাহায্যে ক্রিয়া করছে। এই প্রাণশক্তির সূক্ষ্ম রূপ হচ্ছে আমাদের মন-বুদ্ধি-চিত্ত-অহঙ্কার। এই প্রাণশক্তির মধ্যেই সৃষ্টির বুদ্বুদ উঠছে। এই প্রাণশক্তির মধ্যেই কামনা-সংকল্প-বিকল্পের সৃষ্টি হচ্ছে। প্রাণকে এই কামনা থেকে আলাদা করতে হবে, তাহলেই আমরা দিব্য  জীবন লাভ করতে পারবো। কামকে আমাদের প্রেমে রূপান্তরিত করতে হবে। আর এসব হতে পরে, যদি প্রবৃত্তি কে ছেড়ে আমরা নিবৃত্তির নৌকায় চেপে জীবন নদী পাড়ি দিতে পারি। আর এর জন্য দরকার আমাদের প্রাণের সাধনা।   

চক্ষু - বিচিত্র এই জগৎ। কতো তার রূপ, কত তার রং। এই বৈচিত্রপূর্ণ জগৎ আমরা উপভোগ করে থাকি চোখের সাহায্যে। এই দর্শন আকাংখ্যার যেন তৃপ্তি হয় না। দেশে দেশে ঘুরে আমরা প্রকৃতির সৌন্দর্য্য উপভোগ করি। এই চোখের পিছনে আছে আরো একটা চোখ, যাকে  বলে জ্ঞাননেত্র। এই জ্ঞাননেত্রকে আমাদের উন্মোচন করতে  হবে। যেদিন এই জ্ঞাননেত্রের পাতা খুলে যাবে, জানবেন, সেদিন আপনার সত্যিকারের চোখের শুদ্ধি হয়েছে।  এর জন্য দরকার আমাদের চক্ষু মুদ্রিত করে ধ্যানের অবস্থায় স্থিত হওয়া। 

কর্ন - জগৎ শব্দময়। কত তার মধুরতা। ভ্রমরের গুঞ্জন, পাখির কল-কাকলী, নদীর কলতান, পাহাড়ের গম্ভীর ধ্বনি, সমুদ্রের গৰ্জন, মেঘের ডাক, এমনকি প্রিয়তমার মধুর ডাক, শ্রীকৃষ্ণের বাঁশি, সব আমাদের মনকে খুশি করছে। এই যে দর্শন, শ্রবণ, এসবই আমাদের মনের ভাবনাকে প্রভাবিত করছে। আমাদের চিন্তার মধ্যে একটা ভাবের উদয় হচ্ছে - যা জগৎ সম্পর্কিত বিষয়মাত্র। এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে প্রতি-নিয়ত আরো একটা মধুর ধ্বনি ধ্বনিত হচ্ছে, আর  তা হচ্ছে  নাদধ্বনি। আমরা যদি এই নাদধ্বনি একবার  শুনতে পেতাম, তবে আমরা একটা শুদ্ধধ্বনির জগতের বাসিন্দা  হয়ে যেতে পারতাম। এর জন্য দরকার আমাদের ওঙ্কারের  সাধনা। 

আমাদের দেহে স্থিত গ্রন্থিরস মনের বিকাশ ঘটিয়ে থাকে। অর্থাৎ মনের মধ্যে যে চিন্তা এত আর কিছুই নয়, কেবল মাত্র গ্রন্থিরসের মধ্যে স্পন্দন। তো এই গ্রন্থিরসের মধ্যে যে স্পন্দন তা যদি ছন্দবদ্ধ হয়, তবে আমাদের মনের চিন্তার মধ্যেও একটা ভারসাম্য থাকবে। আর এটি তখনই  হতে পারে, যদি আমরা ঋষিপ্রদত্ত যোগক্রিয়ার অনুশীলন করি।  

যোগক্রিয়ার দ্বারা মনের চিন্তাকে সংযত ক'রে যদি আমরা ব্রহ্মচিন্তন করতে পারি, এই জগতের সমস্ত কিছুই  ব্রহ্ম, আমিও ব্রহ্ম, এই চিন্তা যদি মনের মধ্যে সর্বদা উঠতে থাকে, তবে সাধক ব্রহ্মভাবে ভাবিত হয়ে, সমস্ত দুঃখের পারে চলে যেতে পারেন । তখনই উপনিষদের যে জ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞান তা আমাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পরে। আমরা ত্রিবিধ শান্তির অধিকারী হয়ে, জীবন ধন্য করতে পারি। এই মঙ্গল কামনা বা প্রার্থনা দিয়েই উপনিষদ (কেন) শুরু হলো। আমরা যেন এই ইন্দ্রিয়-জগতের মধ্যে থেকেই সেই অতীন্দ্রিয় জগৎ রহস্যঃ উপলব্ধি করতে পারি। ব্রহ্মশক্তি আছে আমাদের ইন্দ্রিয়সকলের মধ্যে।  এই যে দেহ-মন-ইন্দ্রিয় এমনি আমাদের যে অহঙ্কার, এসবই ব্রহ্মশক্তির দ্বারাই রূপায়িত। এই ব্রহ্মশক্তিই সর্বশক্তি উৎস। তো সেই আনন্দ-স্বরূপ, অমৃত-স্বরূপ ব্রহ্ম স্বয়ং বিরাজ করছেন, আমাদের এই স্থূল-সূক্ষ্ম-কারণ  দেহের মধ্যে। এঁকে  জানতে হবে, এঁকেই আস্বাদন করতে হবে। যে ব্রহ্ম একদিন জীব হয়েছিলেন, সেই জীবকে আজ ব্রহ্ম  হতে হবে।   

-------------------  

কেন উপনিষদ রহস্যঃ - প্রথম খন্ড 


"ওঁ কেন ইষিতং পততি  প্রেষিতং মনঃ কেন প্রাণঃ প্রথমঃ প্রৈতি যুক্তঃ ।
কেন ইষিতাং বাচম ইমাং বদন্তি চক্ষুঃ শ্রোত্রং ক উ দেবো যুনক্তি।"  (০১/০১)

কার ইচ্ছেয়, কার নির্দেশে মন ধাবিত হচ্ছে ? কার দ্বারা নিয়োজিত হয়ে, প্রাণবায়ু  ধাবিত হচ্ছে ? কার ইচ্ছেয় বাকশক্তি স্ফূরিত হচ্ছে ? দর্শন ক্রিয়া, শ্রবণক্রিয়া কোন কোন দৈবশক্তি চালনা করেন ? 

মনের স্বাভাবিক স্বভাব হচ্ছে চিন্তন। এই চিন্তাই মনের অস্তিত্ত্বকে জানান দেয়। চিন্তা রহিত মন বলে কিছু হয় না। তাই বলা যেতে পারে, মন একটা কল্পনার রাজ্যে, বা চিন্তার জগতে বিচরণ করে। আবার এই যে প্রাণশক্তি, এটি জীবের প্রেরণাদায়ক শক্তি।  বিচিত্র এই জগতে যে চেতনা তা প্রাণশক্তির সঙ্গেই ঘোরাফেরা করছে।  যেখানে প্রাণের ছোঁয়া  নেই, সেখানে চৈতন্যও নেই। যদিও প্রাণ ও চৈতন্য দুটি আলাদা সত্তা। প্রাণের কারণেই এই বিচিত্র জড় জগতে চৈতন্যের প্রভাব জেগে ওঠে। প্রাণ যখন আহত হয়, তখন স্ফূরিত হয় বাক্শক্তি। মানুষের মধ্যে যে মনের ভাবনা-চিন্তা তা এই এই বাকশক্তির দ্বারাই প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু কথা হচ্ছে এসব কার ইচ্ছেয়, কি উদ্দেশ্যে সংঘটিত হচ্ছে। কে এই ইন্দ্রিয়যুক্ত দেহ তৈরী করে, ইন্দ্রিয়ের  সাহায্যে  জগৎকে আস্বাদন করছেন ? সর্ব্বোপরি, কে এই জগৎকে সৃষ্টি করেছেন ? কি তার উদ্দেশ্য ? এই সব প্রশ্নের মধ্য  দিয়ে শুরু হয়েছে "কেন" উপনিষদ। আর এর উত্তর দানের মধ্য দিয়েই "কেন" উপনিষদ পূর্ন মর্যাদা প্রাপ্ত হয়েছে। 

এই স্থূল দেহ দশ ইন্দ্রিয়, পঞ্চপ্রাণ, পঞ্চ তন্মাত্র, মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহঙ্কার দ্বারা গঠিত। আবার দেহ-মন-প্রাণ এই ত্রিতত্ত্বের এই জীবসত্তা। এই ত্রিতত্ত্বের উৎপত্তিস্থল রহস্যে ঢাকা। এই রহস্য উন্মোচন করতে পরলে, মনুষ্য  জীবন সার্থক হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায় এই জীবন-যাত্রা বৃথা হয়ে যাবে। তাই এই অজানা রহস্যের সন্ধান জানার  জন্য, যার মনে ব্যাকুলত জাগে, যার মধ্যে এই পরাবিদ্যা লাভের  প্রত্যাশা জাগে, সেই মনুষ্য দেহধারী জীব, হয়ে ওঠেন ঋষি। আর এই ঋষিগনের উপলব্ধি জাত  জ্ঞান হচ্ছে এই সব উপনিষদ, যা প্রাচীন ভারতের এক অমূল্য সম্পদ। আমরা ভাগ্যবান যে, এই সম্পদের উত্তরাধিকারী হয়ে জন্মেছি।   
----------------- 

"শ্রোত্রস্য শ্রোত্রং মনসো মনো  যদ বাচো হ বাচং স উ প্রাণস্য প্রাণঃ। 
চক্ষুষঃ চ চক্ষুঃ অতিমুচ্য ধীরাঃ প্রেত্য অস্মাৎ লোকাৎ অমৃতা ভবন্তি।" (০১/০২)

যিনি শ্রোত্রের শ্রোত্র, যিনি মনের মন, যিনি বাকের বাক, তিনিই প্রাণেরও প্রাণ, চক্ষুর চক্ষু। তাই ধীর ব্যক্তি অর্থাৎ বিচারশীল প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি, এ জগৎ থেকে নিবৃত্ত হয়ে অর্থাৎ আত্মবুদ্ধি ত্যাগ করে, অমৃতত্ত্ব  লাভ করেন। 

আমাদের শাস্ত্রগ্রন্থের একটা বৈশিষ্ঠ হচ্ছে, সমস্ত প্রশ্নের উত্তর হয় প্রতীকের সাহায্যে, নতুবা পরোক্ষ ভাবে দেওয়া  হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে ছাত্রের বোধশক্তির উন্মেষের সম্ভাবনা থাকে। অর্থাৎ শুধু বিষয়বোধ নয়,  ছাত্রের বোঝার শক্তিকেও  ধীরে ধীরে বারবার একটা গোপন কৌশল অবলম্বন করা হয়।  

ঋষি বলছেন, যিনি চোখের চোখ, মনের মন, বাকের বাক, প্রাণের প্রাণ - তিনি ব্রহ্ম। এখন কথা হচ্ছে, ধরুন, আমরা চোখের সামনে একটা গাছ দেখছি, আর তাতে ফল, ফুল, পাতা, কান্ড, শাখা প্রশাখা  আছে। এখন এই যে গাছ যা আমাদের চোখের সামনে কান্ড-শাখা-প্রশাখা-পত্র, পুষ্প, ফল শোভিত হয়ে আছে - এর নিচে আছে মূল, যা আমাদের চোখের সামনে আসছে না, কিন্তু গাছ এই মূল থেকেই  সমস্ত শক্তি আহরণ করে নিজেকে সুশোভিত করেছে। কিন্তু এই মূলশক্তি আমাদের চোখের বাইরে অবস্থান করছে। ঠিক তেমনি আমাদের এই যে দেহ, মন, ইন্দ্রিয়সকল এর মুলে আছে একটা অতীন্দ্রিয় শক্তি যা আমাদের বোধের বাইরে। এই যে অতীন্দ্রিয় সত্তা, যা এই বিশ্বকে বৈচিত্রময় করে রেখেছে, এঁকে  বলা হয় ব্রহ্মসত্তা বা ব্রহ্মচৈতন্য। আমাদের যে পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রীয়, এমন কি মন, প্রাণ ইত্যাদি এর পিছনে আছে সেই ব্রহ্মসত্তা। এই ব্রহ্মসত্তার মধ্যেই জীবসত্তা বিরাজ করছে। প্রজ্বলিত অগ্নিতে যেমন স্ফুলিঙ্গ - তেমনি ব্রহ্ম চেতনার  স্ফুলিঙ্গ হচ্ছে জীবচেতনা। সমুদ্রের মধ্যে যেমন ঢেউ খেলে  বেড়াচ্ছে  তেমনি ব্রহ্মসত্তার মধ্যে জীবসত্তা নৃত্য করছে। তো সমুদ্রের ঢেউ যেমন সমুদ্র ছাড়া কিছু নয়, সমুদ্র থেকেই উৎপত্তি আবার সমুদ্রেই লয় প্রাপ্ত হয়, তেমনি ব্রহ্ম চেতনার মধ্যে জীব চেতনা উৎপন্ন হচ্ছে, আবার সেই ব্রহ্মচেতনার মধ্যে লয় প্রাপ্ত হচ্ছে। তো জীব চেতনার উৎপত্তি ও লয় স্থান হচ্ছে ব্রহ্মচেতনা। 

মনের নির্ণায়ক শক্তি হচ্ছে বুদ্ধি। এই বুদ্ধিই আমাদের বিচারশক্তি। আমাদের যে শাস্ত্রজ্ঞান, ও তার বিচার বিশ্লেষণ, তা বুদ্ধির বিচারের অন্তর্গত। এই বিচারের সাহায্যে আমরা বিষয় সম্পর্কে একটা ধারণা  করতে পারি। এই যে ধারণা এটি হয়তো সত্য, কিন্তু আমাদের উপল্বদ্ধিতে এই সত্য ধরা পরে না। এই সত্যকে যথাযথ ভাবে অনুভব করতে গেলে, আমাদের ধীর হতে হবে, অর্থাৎ ধ্যানস্থ হতে হবে। ধ্যানের  গভীরতা যত বাড়বে, তত আমাদের চেতনশক্তি বাড়বে, অর্থাৎ চেতন রাজ্যে আমরা প্রবেশ  করতে পারবো। ধ্যানের ফলে সাধকের মধ্যে প্রজ্ঞা চক্ষুর উন্মোচন ঘটবে। আর এই প্রজ্ঞার আলোকে আমরা পরমসত্যের অনুভব করতে পারবো। 

এই প্রজ্ঞা চক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু যখন উন্মোচন হবে, তখন সাধক অমৃতলোকের বা আনন্দলোকের বাসিন্দা হয়ে যাবেন। তখন জাগতিক সুখ দুঃখের উর্দ্ধে অবস্থান করবেন। এই যে অবস্থা এটি সীমাবদ্ধ সুখের অবস্থা, যেমনটি আমরা সুসুপ্তির অবস্থায় উপলব্ধি করে থাকি। কিন্তু সুষুপ্তি বা গভীর নিদ্রার অবস্থা একসময় ভেঙে যায়, আর আমরা আবার এই সাংসারিক বাস্তব জগতে ফিরে আসি। তেমনি সাধক একসময়  সমাধিস্থ হয়ে  অতীন্দ্রিয় জগতের বাসিন্দা হন, কিন্তু এই অবস্থা বেশিক্ষন স্থায়ী হয় না। আবার এই মর্তলোকে ফিরে আসতে হয়। অর্থাৎ সমাধি একসময় ভেঙে যায়। 

এইজন্য উপনিষদের ঋষি বলছেন, প্রেত্য অস্মাৎ লোকাৎ অমৃতা ভবন্তি - অর্থাৎ  এই জগৎ থেকে নিবৃত্ত হয়ে অমরত্ব  লাভ করেন। তখন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের অস্তিত্ত্ব থাকে না, তখন আমাদের মনের শুদ্ধিকরণের ফলে মন দৈবশক্তি সম্পন্ন হয়ে, চিন্ময় জগতের বাসিন্দা হয়। 
---------------

"ন  তত্র চক্ষুঃ গচ্ছতি ন বাগ গচ্ছতি নো মনঃ। 
ন বিদ্মো  ন বিজানীমো যথা এতদ অনুশিষ্যাৎ।"  (০১/০৩)

সেখানে চোখ যেতে পারে না, বাক যেতে পারে না, এমনকি মনও সেখানে পৌঁছতে পারে না। এঁকে জানা যায় না। কিভাবে যে আচার্য্যদেব, শিষ্যের  কাছে এই বিষয়ে ব্যাখ্যা করেন, তাও আমরা জানি না। 

আমাদের যাকিছু জ্ঞান এই ইন্দ্রিয়লব্ধ। কিন্তু যে জ্ঞান ইন্দ্রিয়লব্ধ নয়, তাঁকে কিভাবে জানা যাবে ? কিভাবে এঁকে প্রকাশ করা যাবে, তাও  আমাদের অজানা।  কিন্তু কথা হচ্ছে সমস্ত উপনিষদে এই ব্রহ্মকথা বলা হচ্ছে।  তাহলে কি ধরে নেবো, যে কেউ কেউ এঁকে জানতে পারেন। আবার অনেকেই এঁকে জানতে পারেন না। তো তিনি জানার উর্দ্ধে আবার  অজানার উর্দ্ধে। 

দেখুন আমরা জানি নদী সমুদ্রগামী। অর্থাৎ সমস্ত নদীই একদিন সমুদ্রে গিয়ে মিশবে। এই সত্য আমরা একটু গভীর ভাবে নজর করলেই বুঝতে পারি। এটি আমাদের চক্ষু দ্বারা দেখতে পারি। অর্থাৎ জল সবসময় নিম্নগামী। কিন্তু এই জল উর্দ্ধগামী হতে পারে।  হতে পারে শুধু নয়, নদীর জল যেমন সমুদ্রমূখী, এই জল আবার সূর্যমুখী অর্থাৎ উর্দ্ধগামী। এই সত্য আমাদের মতো সাধারনের  কাছে, ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান নয়। কিন্তু জলকে যখন উত্তপ্ত করা হয়, জলের উপরে যখন সূর্যকিরণ পড়ে, তখন জল উর্দ্ধগামী হয়ে থাকে, যা আমাদের চোখে ধরা পড়ে  না। তো ব্রহ্মকে ইন্দ্রিয় দ্বারা জানা যাবে না। তাই  আচার্য্যদেব কীভাবে শিষ্যদের  কাছে এই ব্রহ্মবিদ্যা দান  করেন, তা আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। 

নাস্তিকেরা বলে থাকেন, ভগবান বলে কিছু নেই, তার কারন তাদের কাছে এই ভগবান বলে কোনো বস্তুর অস্তিত্ত্ব ইন্দ্রিয়শক্তিতে ধরা পড়ে  না। তাদের মতে জড় জগতের বাইরে চৈতন্যের প্রমান পাওয়া যায় না। তারা বলে থাকেন,  চৈতন্য হচ্ছে জড় শক্তির  রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফল মাত্র। এবং এই যে জ্ঞান অর্থাৎ চৈতন্য হচ্ছে জড় শক্তির রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফল, তা আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয় ও মনের দ্বারা উপলব্ধ। 

এখন কথা হচ্ছে, আমরা জানি সব কিছুই আমরা চোখের দ্বারা দেখে থাকি। কিন্তু আমরা এও জানি, চোখ বুজলেও আমরা অনেক কিছু দেখতে পারি। যেমন স্বপ্নাবস্থায় আমরা দেখে থাকি। বা আমরা যখন ধ্যানের অবস্থায় থাকি, তখন আমাদের মুদ্রিত চক্ষুর সামনেও অনেক  দৃশ্যের অবতারণা হয়। এই সত্য কিন্তু নাস্তিকরাও  উপলব্ধি করতে পারেন। আবার সুসুপ্তির অবস্থায় অর্থাৎ গাঢ় ঘুমের সময়, আমরা হয়তো কিছুই দেখতে পাই না। অর্থাৎ তখন আমাদের মন কোনো ক্রিয়া করে না। তাহলে আমরা বলতে পারি, এই যে দেখা কাজটি এটি কেবল চক্ষু করে না, এটি করে থাকে মন ও চক্ষুর সম্মিলিত শক্তি, অথবা কেবলমাত্র মন। 

এবার এই যে মন, যা আমাদের চিন্তা বা মনন শক্তি, এর অনেকগুলো প্রকারভেদ আছে। চেতন মন কাজ করে আমাদের জাগ্রত অবস্থায়, অবচেতন মন কাজ করে আমাদের স্বপ্নাবস্থায়। এবং সুসুপ্তিতে এই দুটি  মনই নিষ্ক্রিয় থাকে। এছাড়া আরো একটা মন আছে, যাকে  আমরা বলে থাকি অতিচেতন মন।  এই অতিচেতন মন সম্পর্কে আমরা বিশেষ কিছুই জানি না। এই অতিচেতন মন আমাদের সক্রিয় নয়।  একে সক্রিয় করতে গেলে আমাদের শুদ্ধ চিন্তার অধিকারী হতে হবে। 

মহাত্মাগণ বলে থাকে আমাদের মনের  কেবল এই তিনটি স্তর  নয়, মনের স্তর  সাতটি।  এগুলো হচ্ছে, চঞ্চল মন বা  একাগ্র মন, প্রজ্ঞা মন, শুদ্ধ মন, বোধি মন, দিব্য  মন, শূন্য মন ও চিন্ময় মন। আর  ব্রহ্ম হচ্ছেন মনেরও মন। দেখুন চোখ, নিজেকে দেখতে পায়  না, কান নিজেকে শুনতে পায়  না, তেমনি মন নিজে মনের কথা চিন্তা বা বিশ্লেষণ করতে পারে না। মন সমস্ত বিষয় অর্থাৎ মন অন্যের বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে পারে, কিন্তু মনের মধ্যে কোনো শক্তি তাকে চিন্তা করাচ্ছে, তা মন জানে না, তাকে বিচার করতেও পারে না, বিশ্লেষণ করতে পারে না ।

 ঠিক এই কারণেই উপনিষদের ঋষি বলছেন, তিনি চক্ষুর চক্ষু, বাকের বাক, এমনকি মনেরও  মন। দেখুন, যা অনন্ত, সীমাহীন, তাঁকে সীমার মধ্যে আবদ্ধ  করা যায় না। আমাদের যে বোধশক্তি, তারও  একটা সীমা আছে, আমাদের যে ইন্দ্রিয়শক্তি তার একটা সীমা  আছে, তো সীমাহীন অনন্তকে ইন্দ্রিয় দ্বারা জানা যায় না। 
এখন  প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে ঋষিগণ ব্রহ্মের অস্তিত্ত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হচ্ছেন কি করে ? আসলে সাধক যখন এই মনের জগৎকে অতিক্রমন করে, আত্মভূমিতে নিজেকে উত্তীর্ন করতে পারেন, তখন যে জ্ঞানের জগতে তিনি প্রবেশ করেন, তা প্রকাশযোগ্য নয়, আবার অজ্ঞাতও  নয়। 
--------- 

"অন্যৎ এব  তৎ বিদিতাৎ অথঃ অবিদিতাৎ অধি । 
ইতি শুশ্রুম পূর্বেষাং যে নঃ তৎ ব্যাচচক্ষিরে।"  (০১/০৪)

সমস্ত পরিচিত জিনিস থেকে তিনি (ব্রহ্ম)  আলাদা। প্রাচীন আচার্য্যের কাছ থেকে এই ব্যাখ্যা আমরা শুনেছি। 

যাকে জানা যায়, তিনি ব্রহ্ম নন। তাই বলে এমন ভাবার কোনো কারন নেই, যে যা আমি জানি না, সেইসবই  ব্রহ্ম। আসলে ব্রহ্ম সব কিছু থেকে স্বতন্ত্র। অনেক কিছু আছে, যা আমরা জানি না, কিন্তু চেষ্টা করলে জানা যায়। বা যারা জানেন, তাদের কাছে এই বিষয়গুলো অজ্ঞাত নয়। আমি হয়তো বিজ্ঞান জানি না, কিন্তু এমন অনেকে আছেন, যিনি বিজ্ঞান জানেন। কিন্তু এই যে ব্রহ্মজ্ঞানের কথা উপনিষদে বলা হচ্ছে, এই ব্রহ্মজ্ঞান জ্ঞান-অজ্ঞানের উর্দ্ধে। অর্থাৎ জ্ঞাত বস্তু ও অজ্ঞাতবস্তু এই দুইয়ের উর্দ্ধে ব্রহ্ম। ব্রহ্মজ্ঞান হচ্ছে আত্মজ্ঞান। এই আত্মজ্ঞান কোনো শাস্ত্রগ্রন্থ পড়ে , এমনকি কারুর কাছ থেকে শুনে এই জ্ঞান লাভ করা যায় না। আবার এই কেবলমাত্র জ্ঞান ব্রহ্মজ্ঞানীর কাছ থেকে আসা সম্ভব। 

দেখুন, আগুন তো সর্বত্র আছে, কিন্তু তাকে দেখতে পাই না। যখন এই আগুনকে  প্রজ্বলিত করবার জন্য, অরণী কাষ্ঠে ঘর্ষণ করা হয়, তখন অগ্নি রূপ পরিগ্রহ করে, আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। এবার এই অগ্নি থেকে সহজেই হাজার হাজার প্রদীপ জ্বালানো  যায়।

তাই, বলা হয় এই ব্রহ্মজ্ঞান শ্রদ্ধাশীলের কাছে ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ থেকে কৃপা রূপে বর্ষিত হয়ে থাকে। এক প্রদীপ থেকে যেমন হাজার এক প্রদীপ জ্বলানো যায়, তেমনি ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষের কৃপা বর্ষণ থেকে গুরু-শিষ্য পরম্পরা হিসাবে, এই ব্রহ্মজ্ঞান শিষ্যের মধ্যে জ্বলে ওঠে। কেমন করে এই প্রক্রিয়া সংগঠিত হয়, তা বুঝিয়ে বলা যায় না, কিন্তু হয়।  তখন গুরু শিষ্যের মধ্যে ভেদরেখা মুছে যায়। আসলে স্ব-প্রকাশিত জ্ঞানের প্রকাশ কেবল মাত্র উপযুক্ত ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে। 

 এই জ্ঞানের বীজ সবার মধ্যেই নিহিত আছে, গুরুর কৃপা হলে, তিনি এই বীজকে টেনে তোলেন মাত্র।  পৃথিবীর গর্ভে বীজ লুক্কায়িত ছিল, বর্ষাকালে যখন মাটি ভিজে যায়, বীজ তখন আবরণ ছেড়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে আর সূর্য তখন তাকে টেনে তোলে। তো সবার অন্তরে এই ব্রহ্মজ্ঞানের বীজ লুকোনো আছে, সাধকের মধ্যে যখন তীব্র ব্যাকুলতা জন্মায়, গুরুদেব তখন সেই জ্ঞানকে প্রকাশ করবার জন্য সাহায্য করে থাকেন। তো সাধক যদি নিজেকে তৈরী করতে পারেন, অর্থাৎ নিজের মধ্যে যদি ব্রহ্মজ্ঞানের জন্য তীব্র ব্যাকুলতার সৃষ্টি করতে পারেন, তখন গুরুকৃপাবলে আপনা থেকেই সাধকের মধ্যে ব্রহ্মজ্ঞান বা আত্মজ্ঞান বা আপন স্বরূপের উপলব্ধি আসতে  পারে। হাজার এক শাস্ত্রগ্রন্থ যা না পারে, তা হঠাৎ করে একদিন এইভাবে এসে যেতে পারে। 

----------- 

"যৎ বাচ্য অনভ্যুদিতং যেন বাক অভ্যুদ্যতে। 
তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যৎ ঈদম উপাসতে।"  (০১/০৫)

যা বাক্য  দ্বারা প্রকাশিত করা যায় না, বরং যার দ্বারা বাক্য প্রকাশিত হয়, তাঁকেই  ব্রহ্ম  বলে জেনো। ইন্দ্রিয় অর্থাৎ ইন্দ্রিয়-মন-বুদ্ধি গ্রাহ্য  যাঁর উপাসনা করা হয়, তিনি ব্রহ্ম  নন। 

অদ্ভুত এই উপনিষদের বাক্য। সারা উপনিষদ এই  "অবাঙমানসগোচরম" ব্রহ্মকে এই বাক্য দ্বারাই আমাদেরকে বোঝানোর প্রয়াস করছেন, আবার বলছেন, বাক্য  দ্বারা এঁকে জানা যাবে না। কিন্তু কথা হচ্ছে কেন জানা যাবে না। বাক্য বলতে আমরা সেই শব্দ বা শব্দ সমষ্টিকে বুঝি, যা আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করে থাকে।  অর্থাৎ মনের ভাব প্রকাশ করবার মাধ্যম হচ্ছে বাক। আসলে এইযে  ব্রহ্মের কথা বলা হচ্ছে, এটি তো আমাদের মনের কোনো বিশেষ ভাব নয়। তো যা আমাদের মনের ভাবই  নয়, তা বাক্য কিভাবে প্রকাশ করবে ? এই যে বৈচিত্রময় জগৎ  এটি আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। এমনকি আমাদের যে স্বপ্নের জগৎ, তাও আমাদের মন নামক অন্তর-ইন্দ্রিয়ের গ্রাহ্য। এখন এই যে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ এর পিছনে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, যিনি এই জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, যিনি এই জগৎকে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে আবদ্ধ  করে রেখেছেন, তিনি এক অদৃশ্য শক্তি যা এই জগতের নেপথ্যে  থেকে সবকিছুকে সচেষ্ট করে রেখেছে। 

দেখুন মন ও বুদ্ধির সাহায্যে  আমরা যে জ্ঞান সংগ্রহ করে থাকি,  সে-সব জাগতিক জ্ঞান, পার্থিব জ্ঞান। ব্রহ্ম অপার্থিব, তাই আমাদের জাগতিক জ্ঞানের সঙ্গে ব্রহ্মজ্ঞানের একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। আমাদের জ্ঞান মনের ভূমির উপরে দাঁড়িয়ে হয়ে থাকে। কিন্তু এই মনভুমি থেকে আমাদের চেতনার জগতে যেতে হবে, তবেই আমরা সেই পরম-চৈতন্যময়কে ধরতে পারবো।  আমাদের যে বাক বা মন এমনকি সমস্ত ইন্দ্রিয়ের যে বৃত্তি তার মুলে আছেন, সেই পরম চেতনা। 

দেখুন চোখ আমাদের বিষয়ের সংস্পর্শে এসে, বিষয়ের একটা প্রতিচ্ছবি আমাদের মনের কাছে পাঠিয়ে দেয়।  মন তার বিচার বুদ্ধির দ্বারা সেই বিষয়কে বিশ্লেষণ করে। এবার বাক বিষয়কে প্রকাশ করে। তো বাক হচ্ছে চক্ষু দ্বারা দৃষ্ট এবং মন-বুদ্ধি দ্বারা বিশ্লেষিত বিষয়ের প্রকাশক মাত্র। এই বাকের দ্বারা আমরা আমাদের ভাবাবেগ, আমাদের মনের চিন্তা ভাবনা, কল্পনা ইত্যাদি প্রকাশ করে থাকি। এখন উপনিষদ বলছেন, এই বাকের যে শক্তি অর্থাৎ বাক্শক্তি এটি যা থেকে উৎপন্ন হয়েছে, তিনিই ব্রহ্মস্বরূপ।  

এখানে ঋষি আরো একটা বলছেন, যে আমরা মন-বুদ্ধি গ্রাহ্য যাঁর উপাসনা করি, তিনি ব্রহ্ম নন।  আমাদের মনের যতক্ষন না লয় হচ্ছে, ততক্ষন আমাদের ব্রহ্ম-অনুভূতি হতে পারে না।  প্রথম কথাটার অর্থ না হয় বোঝা গেলো, যে মন-বুদ্ধির গ্রাহ্য যতসব জাগতিক বস্তু আছে, তারা কেউ ব্রহ্ম নন।  কিন্তু আমাদের সমস্ত অনুভূতি তা সে জাগতিক বলুন বা অধ্যাত্মিক বলুন, সবই এই মনের মধ্যে ভেসে ওঠে। তো  মনের যদি লয় হয়ে যায়, তবে এই ব্রহ্ম-অনুভূতি কে করবেন ? 

আসলে, আমরা এর আগে শুনেছি, মনে স্তর  ভেদে  ৭ রকম।  এগুলো হচ্ছে, চঞ্চল মন বা  একাগ্র মন, প্রজ্ঞা মন, শুদ্ধ মন, বোধি মন, দিব্য  মন, শূন্য মন ও চিন্ময় মন। অর্থাৎ আমাদের যে স্থূল মন (যা খাদ্যকণার সূক্ষাতিসূক্ষ্ম অংশ)  তা তপঃ প্রভাবে বা সাধনার  ফলে ধীরে ধীরে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হতে থাকে।  চঞ্চল থেকে একাগ্র, একাগ্র থেকে প্রজ্ঞা, প্রজ্ঞা থেকে শুদ্ধ, শুদ্ধ থেকে বোধি, বোধি থেকে দিব্য , দিব্য  থেকে শূন্য, সবশেষে শূন্যমন থেকে চিন্ময় মনে রূপান্তরিত হয়। এই চিন্ময় মন ব্রহ্মে বিলীন হয়ে স্বয়ং ব্রহ্ম হয়ে যান। অর্থাৎ চিন্ময় মন আর ব্রহ্ম  তখন একাকার। দেখুন, আমাদের এই যে স্থূল দেহ তা একদিন এই পৃথিবীর মাটিতে মিশে যাবে। অর্থাৎ যেখান সে এসেছিলো, সেখানেই সে বিলীন হয়ে যাবে। ঠিক তেমনি এই যে  মন এটিও ব্রহ্ম থেকে উৎপন্ন হয়ে আবার সেই ব্রহ্মতে বিলীন হয়ে যায়। এই সত্য আমাদের কাছে ধরা পড়ে  না। কিন্তু আপনি যখন গভীর ধ্যানে মগ্ন হতে পারবেন, তখন আপনার কাছে এই সত্য ধীরে ধীরে পরিস্ফুট হবে। সুতরাং মনকে যিনি সৃষ্টি করেছিলেন, মন আবার তার উৎসে ফিরে যাবে। এই জ্ঞানে যতক্ষন না আপনি প্রতিষ্ঠিত হতে পারছেন, ততক্ষন আপনার সমস্ত উপাসনা বৃথা। এইজন্য বলা হয়, সাধনার উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজেকে জানা। নিজের সত্তা যেমন স্থূল, তেমনি এই সত্তা সুক্ষও বটে। সাধনায় আমরা স্থূল থেকে ধীরে ধীরে সুক্ষের অনুভূতি  সম্পন্ন হই।  ঋষি পতঞ্জলির যোগদর্শন থেকে  একটা  উদ্ধৃতি দেই  - "ঈশ্বর প্রণিধানাৎ বা" (সমাধিপাদ- শ্লোক-২৩) ঈশ্বরের প্রতি প্রণিধান অর্থাৎ ভক্তিমূলক বিশেষ উপাসনার মাধ্যমে যিনি ঈশ্বরে শরণাগত তাকেই   ঈশ্বর অনুগ্রহ করে থাকেন। আর সব তথাকথিত  উপাসনায় পন্ডশ্রমমাত্র। আমরা যেন উপনিষদের ঋষিগণের গুহ্য কথার মর্ম উপলব্ধি করতে পারি, আমরা যেন অজ্ঞানের মোহজাল ভেদ করে ব্রহ্ম-উপল্বদ্ধির জন্য নিজেকে  ঋষি আদিষ্ট পথে  চালিত করতে পারি। 
----------

"যৎ মনসা ন  মনুতে যেন আহু মনঃ মতম 
তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি ন ইদং  যৎ ঈদম উপাসতে।" (০১/০৬) 

মন যাঁকে  মনন করতে পারে না, অথচ যাঁর  দ্বারা মনের  মনন শক্তি প্রকাশিত হয়, মুনিঋষিদের মতে তিনিই ব্রহ্ম।ইন্দ্রিয়-মন-বুদ্ধি গ্রাহ্য  যাঁর উপাসনা করা হয়, তিনি ব্রহ্ম  নন। 

উপনিষদ এখানে নেতি-নেতি  বিচার দিয়ে ব্রহ্মকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন। আত্মানুসন্ধানের এটাই উৎকৃষ্ট পথ। জ্ঞানযোগের সাধকগণ এই পথ অবলম্বন করেই সাধনা করে  থাকেন। 

আমাদের মাঝে মধ্যে মনে হয়, এই মনটাই আমি। এই মনের সাহায্যেই আমি আমাকে  স্বত্রন্ত্র করতে পারছি।  এই মনের শক্তিও অসীম। এই মন মুহূর্তের মধ্যে যেকোনো জায়গায় চলে যেতে পারে।  এই মন যা ইচ্ছে তাই কল্পনা করতে পারে, এই মন আমাদের স্বপ্নের জগতে নিয়ে যেতে পারে। এই মন আমাদের সূক্ষ্ম জগতের দর্শন করাতে পারে। তো এই মনটাই আমি - আমার স্বরূপ। এই মনকে আমরা আত্মার সঙ্গে এক করে ফেলি। আমাদের মনের শান্তি মানেই আত্মার শান্তি। কিন্তু এই মন কার  শক্তিতে দৌড়ে বেড়াচ্ছে, এই মন কার নির্দেশে চিন্তা করছে - তা আমরা জানিনা। 

ঋষি অষ্টাবক্র রাজা জনককে বলেছিলেন, রাগ দ্বেষ এগুলো মনের ধর্ম্ম, তোমার নয়। মনের সাথে তোমার কোনো সম্পর্কই নেই - "ন  মন্যতে কদাচন" (১৫/০৫) . মন আমাদের সাধনার উপকরণ, কিন্তু সাধন বস্তু নয়। ব্রহ্ম বৃহৎ,  ভূমা অর্থাৎ সর্ব্বব্যাপী বিরাট পুরুষ। এই ব্রহ্ম, মন-বুদ্ধি -চিত্ত অহংকার নয়। আমাদের মন-বুদ্ধির দ্রষ্টা হতে হবে, আমাদের ইন্দ্রিয়বৃত্তি সমূহের দ্রষ্টা হতে হবে। এই শ্লোক আসলে আমাদের সাধন পথে নিবৃত্তির অভিমুখী করতে সাহায্যে করতে পারে। ব্রহ্মজ্যোতিতেই মন আলোকিত হচ্ছে, ব্রহ্মশক্তিতেই মন শক্তিশালী হচ্ছে। তো চঞ্চল মনকে একাগ্র হতে হবে, একাগ্র মনকে ধীরে ধীরে চিন্ময় মনে রূপান্তরিত করতে হবে। স্থূল থেকে সূক্ষ্ম,  সূক্ষ্ম থেকে কারনে যেতে হবে, তা না হলে ব্রহ্মবিদ্যা আয়ত্বে আসবে না।  
----------------  

যৎ চক্ষুষা ন পশ্যতি যেন চক্ষুংষি পশ্যতি 
তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি ন ইদং  যৎ ঈদম উপাসতে।" (০১/০৭)

যাঁকে চোখের দ্বারা দেখতে পাওয়া যায় না, কিন্তু যার দ্বারা চোখ দেখতে পায় , তিনিই ব্রহ্ম।  ইন্দ্রিয়-মন-বুদ্ধি গ্রাহ্য  যাঁর উপাসনা করা হয়, তিনি ব্রহ্ম  নন। 

চক্ষু দ্বারা আমরা রূপের উপভোগ করে থাকি। চোখ নিজেকে দেখতে পায়  না। আমরা মনে করি চক্ষু উন্মীলন করলে, আমরা সবকিছু দেখতে পাবো। আসলে উন্মিলিত চোখ কেবল রূপের আভাস   পেতে পারে। কিন্তু অরূপের দর্শন তো চোখের দ্বারা হতে পরে না।  চক্ষু বুজেও  আমরা অনেক কিছু দেখতে পাই - এমনকি অনেক রূপেরও  সাক্ষাৎ পাই। আবার এই চোখের দৃষ্টিশক্তি  সীমাবদ্ধ। একটা সীমানার বাইরে, বা অতি কাছের বস্তুকে আমরা দেখতে পাই না। আবার এই চোখ যদি অণুবীক্ষণ, বা দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে  নেয়, তবে অতি ক্ষুদ্র, বা অতি দূরের  জিনিস দেখতে সক্ষম হয়। মহাভারতে আমরা দিব্যদৃষ্টির কথা শুনেছি।  অর্জ্জুন, সঞ্জয়, দিব্য দৃষ্টির অধিকারী  হয়েছিলেন, এবং স্বয়ং ভগবানের স্বরূপ দর্শন করেছেন । আবার ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারীকে ব্যাসদেব দিব্যদৃষ্টি দান  করেছিলেন।  এর ফলে তাঁরা তাদের মৃত সন্তানদের দেখতে পেয়েছিলেন।  যোগাচার্য্যগন বলে থাকেন, সাধক যখন গুরু আদিষ্ট সাধন পথে অগ্রসর হতে থাকেন, তখন তার ভিতর দিব্যদৃষ্টিশক্তি দেখা যায়। কিন্তু এসবই বাহ্য। এই মাটির পৃথিবীতে আলোর খেলা চলছে। এই আলোর কারণেই আমাদের সামনে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে বহু রূপ। এমনকি আকাশে বিচারণকারী বহু জ্যোতির্ময় রূপ আমাদের চোখে ভাসে। মেঘের মধ্যেও আমরা নানান রূপ দেখতে পাই। যিনি  বিশ্বতচক্ষু তাঁর সামান্যশক্তি বলে  আমাদের এই চক্ষুদ্বয় দ্বারা দৃষ্টিসুখ ভোগ করছি ।  এই দৃষ্টিশক্তি যিনি আমাদের চক্ষুদ্বয়কে প্রদান করছেন, তিনিই  ব্রহ্ম। 

সমস্ত রূপের মুলে আছে অরূপের খেলা। অনন্তের  মধ্যেই  শান্তের অবস্থান। ইন্দ্রিয়জ্ঞানের পারেই অতীন্দ্রিয় জ্ঞান। সাধক ইন্দ্রিয় জগতে বিচরণ করবে, কিন্তু অতীন্দ্রিয় জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত থাকবে । পার্থিব জগতে রূপের মধ্যে প্রবেশ করে অরূপের আস্বাদন গ্রহণ করতে হবে। উপাসনার এটাই উদ্দেশ্য।  তাই ঋষিবর বলছেন,  ইন্দ্রিয়-মন-বুদ্ধি গ্রাহ্য  যাঁর উপাসনা করা হয়, তিনি ব্রহ্ম  নন। মনকে চিন্ময় (অতিসুদ্ধ ও সূক্ষ্ম ) করে  তাঁর  মধ্যে নিজেকে স্থাপন করতে হবে, তবেই উপাসনা সার্থক রূপ নেবে । 
------------------------ 
   
"যৎ শ্রোত্রেণ ন শৃণোতি যেন শ্রোত্রম ইদং শ্রুতম। 
তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি ন ইদং  যৎ ঈদম উপাসতে।" (০১/০৮)

যাঁকে কান দিয়ে শোনা যায় না, অথচ যাঁর শক্তিতে কান শুনতে পায় , তাঁকেই  ব্রহ্ম বলে জেনো। ইন্দ্রিয়-মন-বুদ্ধি গ্রাহ্য  যাঁর উপাসনা করা হয়, তিনি ব্রহ্ম  নন।

আমাদের কান দিয়ে যা কিছু শ্রুতিগোচর হয়, সে সবই আহত শব্দ। এছাড়া এই ধ্বনির একটা মাত্রা বিশেষে আমাদের কাছে অনুভূত হয়।  দূরের শব্দ আমরা শুনতে পারি না।  তো আমাদের কর্ণেন্দ্রীয়ের একটা সীমিত ক্ষমতা আছে, যার জন্য আমরা বিশেষ মাত্রার শব্দ শুনতে পাই, বা অনুভব করতে পারি।  এই যে আহত শব্দ এটি বাস্তুসাপেক্ষ।  অর্থাৎ বস্তুতে বস্তুতে আহতের কারনে এই শব্দের উৎপত্তি হয়। তো যে শব্দ বস্তু সাপেক্ষ নয়, সেই শব্দ আমাদের কানে কোনো অনুভূতি জাগায় না। আমাদের স্থূল চক্ষু ইন্দ্রিয়ের দ্বারা যেমন আমরা কেবলমাত্র পার্থিব বস্তুই দর্শন করে থাকি।  তেমনি  কর্নেন্দ্রিয় আমাদের বস্তুসাপেক্ষ ধ্বনির অনুভূতি এনে দিতে পারে । কিন্তু যিনি বস্তু নন, যিনি সৃষ্ট পদার্থ নন, সেই সৃষ্টির অতীত তত্ত্বকে এই স্থূল ইন্দ্রিয়ের দ্বারা কিভাবে অনুভূত হবে ? আরো একটা কথা হচ্ছে, কান তখনই  শুনতে পায় , যখন আমাদের মন এই কানের দিকে খেয়াল রাখে। যখন কান থেকে মন দূরে চলে যায়, তখন এই কান শুনেও শুনে না। আর  এই মন সম্পর্কে আমরা আগেই শুনেছি, সে নিজের শক্তিতে মনন ক্রিয়া করে না। এই মন মনন ক্রিয়া করে থাকে যার সাহায্যে তিনিই  উপনিষদ উক্ত  ব্রহ্ম।  তো কান যে শক্তির দ্বারা শ্রবণ ক্রিয়া করতে সক্ষম হচ্ছে,  তা ওই সর্বশক্তির উৎস একমাত্র ব্রহ্ম। 

সাধারণ লোকে এই ব্রহ্ম ভেবে  যে ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য বস্তুর, অর্থাৎ দৃশ্যমান বা শ্রুতিগোচর ধ্বনির উপাসনা করছে তা ব্রহ্ম নন।  ব্রহ্ম সেই সত্যস্বরূপ যার উপস্থিতিতে সমস্ত জগৎ প্রকাশিত হচ্ছে।  আমাদের দেহ-ইন্দ্রিয়াদি চেতন বলে প্রতিভাত হচ্ছে, এর কারন হচ্ছে, এর পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন ব্রহ্ম - যা একমাত্র সত্য । 

"যৎ প্রাণেন ন প্রাণিতি যেন প্রাণঃ প্রনীয়তে। 
তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি ন ইদং  যৎ ঈদম উপাসতে।" (০১/০৯)

প্রাণের মধ্যে প্রাণ (স্পন্দন) নেই, কিন্তু যাঁর  দ্বারা প্রাণের মধ্যে প্রাণ (স্পন্দন) আসে, তিনিই ব্রহ্ম। ইন্দ্রিয়-মন-বুদ্ধি গ্রাহ্য  যাঁর উপাসনা করা হয়, তিনি ব্রহ্ম  নন। 

প্রাণ বলতে আমরা সাধারণত শ্বাস বায়ুকেই বুঝে থাকি। কিন্তু এখানে প্রাণ বলতে নাসিকাকে বোঝানো হয়েছে - যার সাহায্যে এই প্রাণবায়ু শরীরের মধ্যে যাতায়াত ক'রে, দেহকে প্রাণময় করে রেখেছে।  এই নাসিকা রূপ ইন্দ্রিয়ের  সাহায্যে আমরা ঘ্রানের আস্বাদন করে থাকি। তাই এই নাসিকাকে বলা হয় ঘ্রাণেন্দ্রিয়। তো এই ঘ্রাণেন্দ্রিয় যার শক্তির দ্বারা ঘ্রান নেয়, তাকেই উপনিষদ বলছেন, ব্রহ্ম। 

তো যাঁকে  ব্রহ্ম  বলা হচ্ছে, তিনি ইন্দ্রিয়সকল দ্বারা গ্রাহ্য নন। এখানে, অর্থাৎ এই আলোচনায়, আমাদের যে আরও  দুটো  জ্ঞান ইন্দ্রিয় আছে, অর্থাৎ ত্বক ও জিহ্বা, তার উল্লেখ করা হলো না। হয়তো আলোচনাকে দীর্ঘায়িত না করে, আমাদের বোঝাতে চাইছেন যে ব্রহ্ম কোনো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু নন। ইন্দ্রিয়সকল বস্তু সাপেক্ষ।  আর ব্রহ্ম কোনো বস্তু সাপেক্ষ নন। কিন্তু এই ব্রহ্মের সাহায্য ছাড়া বা সেই অতীন্দ্রিয় শক্তির সাহায্য ছাড়া ইন্দ্রিয়সকল তাদের নিজ নিজ কাজ করতে সক্ষম নয়। ইন্দ্রিয়সকলের যে শক্তি, তার উৎস হচ্ছেন  ব্রহ্ম। 

অথচ দেখুন, এই ইন্দ্রিয়সকলই আমাদের এই জগৎ অনুভূতি এনে দিতে পারে। আবার এই যে জগৎ, এটি সদা  পরিবর্তনশীল। কিন্তু যার শক্তিতে এই জগৎ উদ্ভাসিত, তিনি অপরিবর্তনীয় - নিত্য সত্ত্বা।  আর এই সমস্ত পরিবর্তনীয় সত্ত্বাই সেই সত্য-নিত্য-অপরিবর্তনীয় ব্রহ্মে আশ্রিত। ইন্দ্রিয় সকলের স্বতন্ত্র কোনো চেতন সত্তা নেই, এদের চেতন বলে মনে হচ্ছে, কারন এর মধ্য  দিয়েই চেতন ব্রহ্ম প্রবাহিত হচ্ছেন। 

তো লোকে যে দৃশ্যমান ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পদার্থসমূহের পূজা-অর্চনা করছেন, তা আসলে আমাদের ভ্রমজ্ঞান থেকে হয়ে থাকে। কিন্তু কেন এই ভ্রমজ্ঞান উৎপন্ন হচ্ছে ? কারন সেই ব্রহ্ম। অর্থাৎ ব্রহ্মশক্তির কারণেই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পদার্থের মধ্যে স্ব-স্ব  কার্যশক্তির প্রকাশ দেখা যাচ্ছে। তাই এঁকেই আমরা ব্রহ্মজ্ঞানে উপাসনা করছি, যাকে উপনিষদের ঋষিগণ বলছেন, এই উপাসনা সত্যিকারের ব্রহ্ম  উপাসনা নয় । 

এখানে একটা প্রশ্ন আমাদের মতো সাধারণ মানুষের মধ্যে জাগতে  পারে। প্রশ্নটা হচ্ছে - এই  যে দৃশ্যমান জগৎ, এই যে আহত ধ্বনি, এই যে স্পর্শ, এইযে সুগন্ধ, এই যে আস্বাদন - এসবই মিথ্যে ? না এগুলো মিথ্যে নয়, যতক্ষন এর সঙ্গে ব্রহ্ম সংযুক্ত আছেন - ততক্ষণ  এসব সত্য, কিন্তু যেদিন ব্রহ্ম থেকে  এসব বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে - সেদিন এসব মিলিয়ে যাবে। দেহ যেমন মাটিতে মিশে যাবে, বা অগ্নিতে ভস্মীভূত হয়ে যাবে, গন্ধ তেমনি বাতাসে মিলিয়ে যাবে, দৃশ্য তখন আলোতে মিশে যাবে,  অর্থাৎ যা যেখান থেকে এসেছিলো, সবই তখন উৎসে চলে যাবে।  আর উৎসই হচ্ছেন সেই পরমসত্য পরমব্রহ্ম - পরমাত্মা।   

কেন উপনিষদ রহস্যঃ - প্রথম  খন্ডের সমাপ্তি হলো।  
---------  

কেন উপনিষদ রহস্যঃ  - দ্বিতীয় খন্ড 


"যদি মন্যসে সুবেদেতি দভ্রম এব অপি 
নূনং ত্বং  বেত্থু ব্রহ্মন  রূপম। 
যদস্য ত্বং যদস্য দেবেষু অথ  নু 
মীমাংস্যম এব তে  মন্যেবিদিতম।" (০২/০১) 

যদি তোমার মনে হয়, আমি (ব্রহ্মকে) নিশ্চিতভাবে  জানি, তবে তুমি ব্রহ্ম-এর স্বরূপ সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানো  না। তুমি কেবল  জীবাত্মার মধ্যে, দেবতাদের মধ্যে এবং দৃশ্যমান জগতের মধ্যে তাঁর প্রকাশকেই জেনেছো। এই ব্রহ্মতত্ত্ব  সম্পর্কে তোমার আরো বেশী  অনুসন্ধান, বিচার বা মীমাংসা  প্রয়োজন। 

ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলতেন, ব্রহ্মকথার শেষ করতে নেই। যা অনন্ত তাঁর  সম্পর্কে জ্ঞানও  অনন্ত। সান্তের মধ্যে অনন্ত আছেন, কিন্তু এই সান্ত কখনও  অনন্ত হতে পারে না।  ঘটের মধ্যে আকাশ আছে, কিন্তু এই আকাশ সীমাবদ্ধ। আর বাইরের আকাশ সীমাহীন। দেবতাদের মধ্যে এক বা একাধিক গুন্ আছে, কিন্তু  ব্রহ্ম অনন্ত অনন্ত অনন্ত গুনের অধিকারী।

আমরা এর আগে শুনেছি, তিনি ইন্দ্রিয়ের অতীত। আমাদের মন-বুদ্ধি-চিত্ত-অহঙ্কার ইত্যাদিকে পাশ কাটিয়ে সাধককে অগ্রসর হতে হয়। সংস্কার আমাদের বাধা স্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষনিকের তরে এক ঝলক এসে কখনও সাধককে বিভ্রান্ত করে দেয়। সাধককে অগ্রসর হতে হবে, স্বরূপের ধামে, পরমধামে। জেনেছি মানেই কেউ একজন তোমার মধ্যে আছে, যিনি নিশ্চিত হচ্ছেন, যে তিনি জেনেছেন। অর্থাৎ তোমার অহঙ্কার রূপ আমি বলছে - আমি জেনেছি। জানা কাজটি তখনই  সম্পন্ন হতে পারে, যখন দ্রষ্টা ও দৃশ্য বর্তমান থাকে, জ্ঞাতা ও জ্ঞেয় বর্তমান থাকে। মহাত্মাগণ বলে থাকেন, আমি ব্রহ্মকে জেনেছি অর্থাৎ আমি সেই বৃহৎ চেতনার সংস্পর্শ লাভ করেছি। এ হচ্ছে সাধকের জ্ঞানাভিমান। এটি সাত্ত্বিক অভিমান। আর অভিমান যতক্ষন থাকে, ততক্ষন পূর্ণজ্ঞান হতেই পারে না।  তো এই অভিমানকে ত্যাগ করতে হবে।  

যতক্ষন তোমার মন, মুখ, বলবে আমি ব্রহ্মের স্বরুপ জেনেছি, ততক্ষন বুঝতে হবে, তোমার জ্ঞান অসম্পূর্ন। আসলে যার সীমা আছে, তা তো সীমাবদ্ধ।  ব্রহ্ম  বৃহৎ, অনন্ত, সীমাহীন। ব্রহ্ম অনন্ত জ্ঞান স্বরূপ।  তাই এই জানার শেষ নেই। আবার এই সীমার মাঝেই আছে, সেই সীমাহীন অনন্তের স্ফুলিঙ্গ। সীমার মাঝে চলছে অসীমের খেলা। তুমি হয়তো এই স্ফুলিঙ্গের আভাস পেয়েছো। কিন্তু স্ফুলিঙ্গ আর তার উৎস এক নয়।  উৎসে আছে অনন্তের সমাহার। এই জ্ঞান যখন তোমার মধ্যে প্রকাশ পাবে, তখন তোমার মন-বুদ্ধি-চিত্ত-অহঙ্কার ধুয়ে মুছে একাকার হয়ে যাবে। এই ব্রহ্মজ্ঞানের মধ্যে প্রবেশ করলে, না থাকে জ্ঞাতা , না থাকে জ্ঞেয় থাকে শুধুই জ্ঞান। এই জ্ঞান স্বয়ম্ভু - এই জ্ঞানের না আছে জ্ঞাতা, না আছে জ্ঞেয়, কেবলই  জ্ঞান। এই জ্ঞান কোনো বিষয়জ্ঞান নয়, এই জ্ঞান নির্ম্মল শুদ্ধ চেতনা মাত্র।  তথাপি যদি শিষ্য বলেন, যে তিনি ব্রহ্মকে জেনেছেন, তবে ধরে নিতে হবে, তিনি স্বয়ং ব্রহ্ম। ব্রহ্ম জানার বিষয় নয়, ব্রহ্ম স্বয়ং-এর অনুভূতি।  
--------

"নাহং মন্যে  সুবেদেতি নো ন বেদেতি বেদ  চ । 
যো নঃ তৎ বেদ তৎ বেদ নো ন  বেদেতি বেদ  চ ।" (০২/০২)

আমি ব্রহ্মকে ভালোভাবে জেনেছি,  তা আমি মনে করি না। আমি তাঁকে জানি না, তা নয়, আবার জানি তাও  নয়। আমাদের মধ্যে যিনি এই কথার অর্থ বোঝেন, তিনিই ব্রহ্মকে জানেন। 

লন্ডনের এক সাংবাদিক এক বিখ্যাত বাঙালির সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছেন। তো বাড়ির দরজায় গিয়ে দেখেন, বাড়ির কাজের লোক, গামছা পড়ে, গেটের কুঞ্জলতার আগাকে বাইয়ে দিচ্ছেন। ক্ষীণকায়  চেহারার, পাঁচফুট উচ্চতার  এই কাজের লোক   জিজ্ঞেস করলেন, কাকে খুঁজছেন ? তো সাংবাদিক বললেন, আমি তোমার মনিবের খোঁজ করছি। তিনি কি বাড়িতে আছেন ? দেখছি - বলে বাড়ির সেই কাজের লোক বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে, গামছাপড়া লোকটি কোট-টাই পড়ে সামনে এসে বললেন, তুমি যাঁকে খুঁজছো, সেটি এই - বলে নিজের বুকের দিকে আঙ্গুল ঘোরালেন। সাংবাদিকের লজ্বায় মাথা কাটা যায় আর কি। 

আমরা যখন গভীর নিদ্রায় অর্থাৎ সুসুপ্তিতে থাকি, তখন আমাদের মন-বুদ্ধি-চিত্ত-অহঙ্কার অর্থাৎ  সমস্ত ইন্দ্রিয় নিষ্ক্রিয় হয়ে অব্যক্তের মাঝে লিন হয়ে যায়। আর যতক্ষন আমরা এই সুসুপ্তির মধ্যে অবস্থান করি, ততক্ষন আমরা এই অব্যক্তের মধ্যেই অবস্থান করে থাকি। এই যে অব্যক্ত - এই অব্যক্ত থেকেই মহাপ্রাণ নির্গত হয়ে এই বিচিত্র জগৎ গড়ে তুলেছে।  আমরাও  প্রতিদিন এই অব্যক্তের সাথে  মিলিত হচ্ছি।  কিন্তু আমরা জানি না, গাঢ়  ঘুমের সময় আমরা কোথায় ছিলাম। এই অব্যাক্তই পরমাত্মা। এই পরমাত্মার সাথে আমরা সবাই প্রতিদিন একবার করে  মিলিত হচ্ছি, কিন্তু তা আমরা জানি না।  এই অব্যক্ত অবস্থা সম্পর্কে হয়তো আমাদের কোনো কৌতূহল নেই। অথচ প্রতিদিন এই অব্যক্তকেই আস্বাদন করে আমরা চনমনে হয়ে উঠছি। 

যোগীপুরুষগন, যাঁরা সমাধির অবস্থায় থাকেন, তাঁরাও সমাধি থেকে বেরিয়ে এসে, একটা অহেতুক আনন্দের জগতের রেশ মনের মধ্যে ধরে রাখেন। কিন্তু কেন এই আনন্দ তা বোঝা সহজ হয় না। তো এই যে সুসুপ্তির অবস্থা তা আমাদের কাছে অবশ্যই জ্ঞেয় আবার অজ্ঞেয় বটে। কারন এই সুসুপ্তির অবস্থার রহস্য ভেদ করতে আমরা অপারগ। 

ঠিক তেমনি আমরা সর্বদা এই ব্রহ্মের মধ্যেই বিচরণ করছি, ব্রহ্মই আমাদের স্থিতি, ব্রহ্মই আমাদের লয় স্থান। আমরা সবাই ব্রহ্মের  সঙ্গেই সম্পর্কযুক্ত। তো আমরা ব্রহ্মকে জানিনা, একথা যেমন সত্য নয়, তেমনি ব্রহ্মকে আমরা জানি একথাও সত্য নয়। যদি কেউ দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারেন, "নো ন বেদ ইতি, বেদ  চ" - অর্থাৎ জানিনা তা ঠিক নয়, আবার জানি তাও  বলতে পারি না - তিনিই স্বয়ং ব্রহ্ম। 
----------- 

যস্য  অমতম তস্য মতং যস্য ন  বেদ সঃ। 
অবিজ্ঞাতং বিজানতং বিজ্ঞাতম অবিজ্ঞানতাম। (০২/০৩)

যিনি বলেন যে তিনি জানেন না, তিনিই জানেন।  যিনি বলেন জানেন, তিনি জানেন না। যাঁরা বলেন জানেন না, তাঁরাই জানেন। যাঁরা বলেন, জানেন, তাদের কাছে এই তত্ত্ব অজানা। 

মত কথাটার অর্থ হচ্ছে, যা মনের কাছে ধরা পড়ে।  আর  অমত হচ্ছে হচ্ছে যা মনের কাছে ধরা পড়ে  না।  জ্ঞানবান ব্যক্তির নিকট ব্রহ্ম  অবিজ্ঞাত।  কারন তিনি জানেন, ব্রহ্ম ইন্দ্রিয়সকলের অগোচর। অজ্ঞানীদের কাছে তিনি জ্ঞাত কারন তারা মনে করেন, সবকিছু যেমন ইন্দ্রিয়গোচর, তেমনি ব্রহ্মও ইন্দ্রিয়গোচর। 

ব্রহ্ম জ্ঞানস্বরূপ। তিনি অনন্ত, অসীম, নিত্যসত্য  দেশকালের অতীত। কিন্তু যিনি ব্রহ্মকে আর পাঁচটা আশ্চর্য্য বস্তু বা সর্ব্বশক্তিমান ব্যক্তির মতো  মনে করেন, তিনি ভ্রান্তজ্ঞান বশতঃ মরীচিকাকে জল ভেবে, বা রজ্জুকে সর্প ভেবে ব্রহ্মকে জেনেছি বলে অভিমান করছেন। 

কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তি, যাঁর অন্ততঃ এইটুকু জ্ঞান হয়েছে, যে ব্রহ্ম ইন্দ্রিয়-মন-বুদ্ধির সীমিত ক্ষমতা দ্বারা জ্ঞাত হওয়া  যায় না, তাঁরাই ব্রহ্ম বিশেষজ্ঞ। অর্থাৎ নেতিবাচক ব্রহ্মজ্ঞান পন্থার একটা বাঁক অতিক্রম করেছেন। ব্রহ্ম  দেশ কালের দ্বারা আবদ্ধ পরিমিত বস্তুর মতো আমাদের মন-ইন্দ্রিয়-বুদ্ধির বিষয় নয়। ইনি  দেশ কালের অতীত, অনন্ত, নিত্যসত্য - এই জ্ঞান যাঁদের  হয়েছে, তাদেরকে বলা হচ্ছে ব্রহ্ম-বিশেষজ্ঞ।  আর যাঁরা স্থূল পদার্থের ন্যায় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু বলে ব্রহ্মকে মনে করছেন তাঁরা অবিশেষজ্ঞ। 

ব্রহ্ম অনির্বচনীয়।  কিন্তু অনির্বচনীয় বললে তাঁকে  আলোচনার বিষয় করা বৃথা।  অথচ সমস্ত উপনিষদের আলোচ্য বিষয় হচ্ছেন ব্রহ্ম। আসলে আমাদের যে মন - স্থূল পদার্থের সূক্ষ্ম অংশ দ্বারা গঠিত, সেই মনের শক্তি হচ্ছে বিচার যা সে বুদ্ধির দ্বারা করে থাকে। এই বিচারের উর্দ্ধে যিনি, তাঁকে তো বিচারের দ্বারা পাওয়া যাবে না। কিন্তু বিচার শেষ না হলেও তাঁকে পাওয়া যাবে না। কেননা আমরা যা কিছু সিদ্ধান্ত নেই, তা এই বিচারের দ্বারাই করে থাকি। সত্যের সন্ধানে আমরা বিচারের প্রয়োগ করে থাকি। আমাদের যে জ্ঞান তা এই বিচারের দ্বারাই বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। তাই আমরা লক্ষ করছি, একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলা হচ্ছে। অর্থাৎ নেতি বিচারের দ্বারা আমাদের বিচারপর্ব্ব শেষ করতে পারলেই, আমরা বিচারের উর্দ্ধে সেই পরমসত্যের সন্ধান পেতে পারি।
------------

প্রতিবোধ বিদিতং  মতম অমৃতত্বং  হি  বিন্দতে। 
আত্মনা বিন্দতে বীর্যং বিদ্যয়া বিন্দতে  অমৃতম।  (০২/০৪)

প্রতিবোধ বিদিতং অর্থাৎ চেতনার সর্বস্তরে ব্রহ্মকে জ্ঞাত হতে পারলে, তখন প্রকৃত ব্রহ্মজ্ঞান হয়।  এই ব্রহ্মজ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তি অমৃতত্ব লাভ করেন। আত্মার জ্ঞান দ্বারা পুরুষ বীর্যশক্তি লাভ করেন, এবং বিদ্যা অর্থাৎ একত্বের জ্ঞান দ্বারা অমৃতত্ব লাভ করেন।  

মনের সমস্ত বৃত্তি, অন্তরের  সমস্ত অনুভব যখন সহজেই ব্রহ্মময় হয়ে উঠবে তখন সেই অমৃতস্বরূপ ব্রহ্মকে লাভ করা যাবে। দেখুন ইন্দ্রিয়-মন-বুদ্ধির দ্বারা আমাদের জাগতিক বিষয়ের জ্ঞান হয়ে থাকে।  কিন্তু এই যে ইন্দ্রিয়সকল এদের  নিজস্ব কোনো শক্তি নেই,  যাতে তারা এই চেতনক্রিয়া করতে পারে। এই ইন্দ্রিয়সকল কেউই আমাদের বোধশক্তি এনে দিতে পারে না। তার কারন হচ্ছে, এই ইন্দ্রিয়সকল জড় পদার্থ। এদের নিজস্ব কোনো প্রকাশশক্তি নেই। আত্মা বা ব্রহ্মের  সংস্পর্শে আসার ফলে এদেরকে চৈতন্যবান বলে মনে হচ্ছে। আত্মার আলোতে আলোকিত হয়ে জাগতিক বিষয়বস্তুকে আমাদের জ্ঞানের বিষয় করে তুলছে। এই আত্মার আলো  নিভে গেলে, ইন্দ্রিয়সকল তাদের ক্রিয়াশক্তি অর্থাৎ বোধ-দানক্রিয়া করতে অক্ষম হয়ে যায়।  যাঁরা এই বিষয়ে অজ্ঞ, তাঁরা ইন্দ্রিয়সকলের মধ্যে এই আত্মার উপস্থিতি সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারেন না।  যদি করেনও  তাঁরা  মনে করেন, আত্মা কেবল এই দেহের মধ্যেই অবস্থান করছেন।  দেহের বাইরে যে আত্মা আছে তার ধারণা  তাঁরা করতে পারেন না। 

অন্যদিকে যাঁরা  জ্ঞানী ব্যক্তি তাঁরা  একদিকে যেমন উপলব্ধি করেন, ইন্দ্রিয়সকলের যে বোধদান শক্তি তা কেবল আত্মার উপস্থিতির কারণেই হচ্ছে।আবার অন্যদিকে  এটাও তাঁরা  সম্যক রূপে উপলব্ধি করেন, যে আত্মা ইন্দ্রিয়সকল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও বোধদায়ক শক্তি আত্মা সমস্ত জগৎকে ধারণ করে আছেন। তিনি অদ্বিতীয়, অখন্ড, নিত্যসত্ত্বা, জ্ঞানস্বরূপ। তিনি যেমন ছিলেন তেমনই  থাকেন। এই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞান। জাগতিক সমস্ত বস্তুর যে জ্ঞান - এই জ্ঞানের সঙ্গে মিশে আছে সেই আত্মশক্তি, একেই উপনিষদ বলছেন, মতম। তো জাগতিক জ্ঞানের (সমস্ত বিষয়) সঙ্গে যিনি ব্রহ্মকে অনুভব করতে পারেন,  তিনিই যথার্থ ব্রহ্মজ্ঞানী।  আর তিনি সমগ্র বিশ্বকে ব্রহ্মময় দর্শন করে থাকেন। আর এই যে প্রতিক্ষনে ব্রহ্মদর্শন, এই অবস্থায় তিনি এক অমৃতময় জগতের বাসিন্দা  হয়ে যান। বাহ্যত আমরা তাঁকে  হয়তো সংসারের মধ্যেই নিত্যকর্ম্মে  লিপ্ত দেখি, কিন্তু তিনি সাধারণ জীবনের উর্দ্ধে আনন্দময় জীবনের একজন হয়ে থাকেন । 

উপনিষদ বলছেন, "আত্মনা বিন্দতে বীর্যং"  এই আত্মজ্ঞান হলে বীর্যলাভ হয়। বীর্য অর্থাৎ বল, এই বল হচ্ছে অমৃতত্ব লাভের  ক্ষমতা। বিষয় জ্ঞান থেকে যে বীর্যলাভ হয়, তা আমাদের বিষয়সুখ দান  করতে পারে। কিন্তু এই জ্ঞান আমাদের শোক-দুঃখের অতীতে, এমনকি মৃত্যুভয় দূর করতে পারে না। কিন্তু আত্মজ্ঞান লাভ করলে মানুষ বুঝতে পারে, আমি এই দেহ নোই, আমি ইন্দ্রিয়সকল নোই, আমি মন নোই, আমি বুদ্ধি নোই, আমি আত্মা। আমি জন্ম-মৃত্যু রোহিত, শোকরহিত এক আনন্দময় সত্ত্বা। আমি চৈতন্যস্বরূপ আত্মা। আমি নিত্য-সত্য। আমার বিনাশ নেই, আমি এই জড় শরীর  নোই।  দেহাদির উর্দ্ধে আমি চৈতন্য। এই হচ্ছে বীর্যলাভের ফল। 

উপনিষদ আরো বলছেন, বিদ্যা থেকে অমৃতত্ত্ব লাভ হয় - "বিদ্যয়া বিন্দতে  অমৃতম". আত্মজ্ঞান উপল্বদ্ধিতে মানুষ  দুটো সত্যের সম্মুখীন হয়।  ১. আত্মা অভিন্ন - সর্বজীবের মধ্যে একই আত্মা বিরাজ করছেন ২. এই আত্মা স্বরূপত পরমাত্মা ভিন্ন অন্য কিছু নয়। এই আত্মবিদ্যা লাভ হলে, একত্বের অনুভূতি হয়। সমস্ত জীবের সাথে এমনকি সমগ্র বিশ্বের সাথে সে নিজেকে একাত্মীভূত বলে অনুভব করতে থাকেন। তখন, সুখ-দুঃখ, দ্বন্দ-মোহ, সংশয়-সন্দেহ দূর হয়ে এক দিব্যজীবন লাভ হয় । একেই উপনিষদের ঋষি বলছেন,  "বিদ্যয়া বিন্দতে  অমৃতম" আমরা এর আগে শুনেছি, মনের সাতটি  স্তর। চঞ্চল মন যখন একাগ্র হয়, তখন মনের শক্তি বৃদ্ধি পায়। এই একাগ্র মনের মধ্যে অনুসন্ধিৎসু বৃত্তি জাগে, তখন মানুষ সাধনায় উদ্বুদ্ধ হয়। এই মনের মধ্যে ই আত্মশুদ্ধির সাধনার জন্য স্পৃহা জাগে। আর আত্মশুদ্ধি হলে, মন ধ্যানের জগতের প্রতি আগ্রহ বোধ করে। আবার সাধক যখন ধ্যানে তন্ময় হয়ে যায়, তখন সে অতীন্দ্রিয় জগতের অনুভূতি পেতে থাকে।  আর এই অতীন্দ্রিয় জগতে একসময় বিদ্যুতের ঝলকের মতো  আকস্মিক আত্মদর্শন হয়। যদিও এই দর্শন কেবল মাত্র ক্ষনিকের জন্য হয়ে থাকে। কিন্তু একবার এই ঝলকের পুলক অনুভব হলে, অন্তর শুচিশুদ্ধ হয়ে ওঠে। তখন অশুভবৃত্তিসকল দূরীভূত হয়ে যায়। সাধনার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে একসময় আত্মদর্শনের কাল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে শুরু করে। তখন সাধক  নেশাগ্রস্থের মতো এখান  থেকে মন আর নামতে চায় না। তখন মন চিন্ময় হয়ে অমৃততত্ত্বকে আস্বাদন করতে থাকে। 
-------------

"ইহ চেৎ অবেদীৎ অথ সত্যম অস্তি 
ন চেৎ ইহ অবেদীৎ মহতী বিনষ্টিঃ ।
ভুতেষু ভূতেষু বিচিত্য ধীরাঃ 
প্রেত্য অস্মাৎ লোকাৎ অমৃতাঃ ভবন্তি।" (২/০৫)

যদি কেউ ইহজীবনে (ব্রহ্মকে) জানেন, তবে  তাঁর  সত্য লাভ হয়। আর যিনি জানতে না পারেন, তবে  তাঁর  মহান বিনাশ হয়। ধীর ব্যক্তি সর্বভূতে ব্রহ্মকে উপলব্ধি করে এই লোকেই অমৃতত্ত্ব লাভ করেন। 

এই শ্লোকটি মধ্যে এক মহান সত্য প্রকাশ করা হয়েছে,  একটা গুহ্য সাধনতত্ত্ব প্রকাশ করা হয়েছে। আর তা হচ্ছে তুমি যদি চাও তবে সত্য লাভ হবে এই জীবনেই, আর যদি না চাও তবে তোমার অধঃপতন কে ঠেকাবে ? এই মনুষ্য  জীবনেই ব্রহ্মানুভুতি সম্ভব।  

আমরা স্কুল কলেজে যাই শিক্ষা লাভ করতে। এখন এই স্কুল-কলেজে যেমন শিক্ষাদানের কক্ষ  আছে, তেমনি খেলাধুলা করবার জন্য আছে বিশাল খেলার মাঠ। এখন আমার মন যদি খেলার মাঠের দিকে বেশী আকৃষ্ট হয়, খেলনার দিকে আকৃষ্ট হয়, আর শিক্ষাকক্ষ থেকে বিমুখ হয়, বা ক্লাশের  বইয়ের দিকে যদি মন  দেই তবে আমার শিক্ষাগ্রহণ  অসম্পূর্ন থেকে যাবে। আর বছরের পর বছর  একই ক্লাশে থেকে যেতে হবে।  ঠিক তেমনি এই যে মনুষ্য  জীবন, এই যে মনুষ্য  শরীর, এটি এই ব্রহ্মজ্ঞানের উপযুক্ত করে তৈরী হয়েছে। এই ইহ জীবনেরই ব্রহ্মজ্ঞান লাভ সম্ভব। কিন্তু আমাদের বিড়াম্বনা হচ্ছে, আমরা সেই পথে না হেটে, আমরা এই ইহজগতের বৈচিত্র দেখে, তাতে আকৃষ্ট হয়ে, সময় অতিবাহিত করছি। খেলনা নিয়ে আনন্দে মেতে আছি। 

ব্রহ্মকে সম্যক রূপে জেনে, ব্রহ্মভাব  প্রাপ্ত হয়ে, সেই আনন্দময়, অমৃতময় মুক্ত জীবন লাভ করতে পারি। প্রতিটি মানুষের মধ্যে সেই পুরুষার্থ আছে, যার দ্বারা সে বুদ্ধিকে শুদ্ধ করে, চিন্ময় মনের সাহায্যে সে সর্বভূতে ব্রহ্মদর্শন করতে পারে। যাঁরা এই সত্যজ্ঞান ইহজন্মে লাভ করতে পারেন, তাঁদের জীবন সার্থক হয়। তাকে আর এই জরা-মৃত্যুর সংসারে ফিরে আসতে  হয় না। তাদের মোহান্ধকার কেটে যায়। স্বরূপে স্থিতি লাভ করতে পারেন। উপন্যাসে বলা হচ্ছে, যারা এটি করতে পারেন না, তাদের দুর্গতির হয়, অর্থাৎ বারবার তাকে এই সুখ-দুঃখের সংসারে ফিরে ফিরে আসতে  হয়, বারবার জন্ম-মৃত্যুর  ক্লেশ সহ্য করতে হয়। খেলতে গিয়ে যেমন হাত-পা ভেঙে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ি, তেমনি সংসারে আকৃষ্ট হয়ে নানান দুঃখ-কষ্টের শিকার হই। 

আমরা শুনেছি, একমাত্র মনুষ্য শরীরেই কর্ম্মফল সঞ্চিত হয়। অন্য কোনো শরীরে অর্থাৎ না দেব-শরীরে না ইতর পশু  শরীরে এই কর্ম্ম ফল সঞ্চিত হতে পারে। এইজন্য দেবতারাও এই মনুষ্য শরীরের জন্য লালায়িত হন। দেব শরীরে যেমন শুধু সুখভোগ সম্পাদিত হতে পারে, তেমনি ইতর-পশু  শরীরে দুর্ভোগ সম্পাদিত হয়ে থাকে। কিন্তু মনুষ্য শরীরে যেমন ভোগকার্য সম্পাদন হতে পারে, তেমনি এই মনুষ্য দ্বারা কৃত কর্ম্ম জীবাত্মার উন্নতি ঘটাতে  পারে। জীবাত্মার উন্নতি মানে এই নয়, যে জীবাত্মার পরিবর্তন।  জীবাত্মা অপরিবর্তনীয় - কিন্তু পরমাত্মা যেমন নির্ম্মল , শুদ্ধ চৈতন্য স্বরূপ, জীবাত্মা তা নয়।  পরমাত্মার যে অংশে উপাধি যুক্ত হয়, সেই অংশই জীবাত্মা। এখন জীবাত্মার উপরে আরোপিত উপাধি সকলেকে সরিয়ে দিতে পারলেই, জীবাত্মা পরমাত্মার সঙ্গে একাকার হয়ে যায় বা বলা যেতে পারে বিলীন হয়ে যায়।  তো স্থূল শরীরেই মানুষ কর্ম্মক্ষম থাকে অর্থাৎ এই স্থূল শরীরের সাহায্যেই সে কাজ করতে পারে।  স্থূল শরীরের মৃত্যুর পরে, যে শরীরে সে অবস্থান করে তা হচ্ছে সূক্ষ্ম শরীর।  এই সূক্ষ্ম শরীরের দ্বারা সে কোনো কর্ম্ম সম্পাদন করতে পারে না। আর ঠিক এই কারণেই সংকল্প পূরণের জন্য তাকে বারবার এই মনুষ্য  দেহেকে আশ্রয় করতে হয়। 

বলা হয়, মনুষ্য জীবনে ক্রমোন্নতি আছে। এখন যে জীবন আমরা উপভোগ করছি, পরবর্তী জীবন আমাদের উন্নততর হতে পারে।  আর এই যে পরবর্তী জীবন, তার রূপরেখা এই জীবনেরই তৈরী হয়ে যায়। যার যেমন চিন্তা, যার যেমন সংকল্প-বিকল্প  - সেই অনুযায়ী সে তার কর্ম্ম করে থাকে। আর এই কর্ম্মই তাকে উন্নতি বা অবনতির দিকে টেনে নিয়ে যায়। তাই পরবর্তী জীবন এখান  থেকেই নির্দিষ্ট হয়ে যায়। মানুষ যদি ইহ জীবনে ব্রহ্মজ্ঞানের   জন্য, অর্থাৎ আত্মবিষয়ের দিকে আকৃষ্ট না হয়, যদি ব্রহ্মজ্ঞান লাভের  জন্য  সচেষ্ট না হয়,  সে যদি কেবলই   অনাত্ম বিষয়ে আকৃষ্ট হয়, যদি দেহাদিতে আসক্ত হয়, বিষয়ভোগের প্রতি আকৃষ্ট হয়, সংসারের মোহে আবদ্ধ  হয়, তবে তার পরবর্তী জীবন অন্ধকারময় জগতের দিকে ধাবিত হবে। অর্থাৎ বারংবার এই জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হতে হবে। 

উপনিষদ বলছেন,  আমাদের মৃত্যু নেই। আমরা সবাই অমর।  আমরা আগেও ছিলাম, আজও  আছি, আবার ভবিষ্যতেও থাকবো।  কিন্তু এখন যে আকারে আছি, সে আকারে থাকবো না। এখন যে লোকে আছি,সেই লোকে থাকবো না। কিন্তু আমি থাকবো। শিশুর দেহে যেমন আমি ছিলাম, যুবকের দেহেও আমি ছিলাম আবার বৃদ্ধদেহেও সেই একই আমি আছি। তো তিন অবস্থাতেই আমি ছিলাম বা আছি  কিন্তু আমার আকারের পরিবর্তন হয়েছে। এই পরিবর্তন আমরা খেয়াল করি না। কিন্তু সহজেই  ধরতে পারি ।  ঠিক তেমনি মৃত্যুর পরেও আমি থাকবো।  তখন আমার যেমন আকারের পরিবর্তন হবে, অর্থাৎ স্থূল থেকে সূক্ষ্ম দেহে অবস্থান করবো, তেমনি ইহলোক থেকে পরলোকে প্রবেশ করবো। আমি আমিই থাকবো। কখনো ভালো থাকবো, কখনো খারাপ থাকবো, কিন্তু আমি থাকবো। 

আবার এই যে আমি - তুমি, এই ভেদ নাম-রূপের কারনে হয়ে থাকে। এই নাম-রূপের আবরণ সরে গেলে, আমরা সবাই এক হয়ে যাবো। একই জল কখনো তরল, কখনও বাষ্প (মেঘ) কখনো কঠিন (বরফ) .যিনি জ্ঞানী, তাঁর মধ্যে থেকে এই ভেদবোধ দূর হয়ে গেছে। তিনি এই অবস্থান্তর সম্পর্কে সচেতন। তিনি সর্ব্বভূতের মধ্যেই সেই এক আত্মাকে অর্থাৎ নিজেকে প্রত্যেক ভূতের মধ্যে প্রতক্ষ্য করেন। অর্থাৎ আমার যে মূল সত্ত্বা, আত্মাকে তাঁকেই প্রতিনিয়ত প্রতক্ষ্য করেন। যখন  কেউ সবার মধ্যে নিজেকে আবার নিজের মধ্যে সবাইকে দেখেন, অর্থাৎ যিনি সবকিছুর মধ্যে একাত্মবোধ অনুভব করেন, তখন তাঁর মধ্যে শুদ্ধ প্রেম গুনের প্রকাশ দেখা নয়। সত্ত্বগুণের প্রকাশ হয়। একত্ব বোধ মানুষকে এক অমৃতলোকের বাসিন্দা করে দেয়  সেখানে শুধুই আনন্দ, ভয়হীন, স্বাধীন জীবন। একেই বলে অমৃতত্ব। আমরা সকলেই সেই এক আত্মা - পার্থক্য শুধু প্রকাশের তারতম্যের কারনে। 

কেন উপনিষদের দ্বিতীয় খন্ড সমাপ্ত হলো। 
-----------  

কেন উপনিষদ রহস্যঃ - তৃতীয় খন্ড 

কিছু কথা : 

কেন উপনিষদের এই তৃতীয় খন্ডে একটা রূপক গল্পের অবতারণা করা হয়েছে। আমরা যা কিছু করি তা আমাদের অহং-এর অভিমান থেকে করি। আমরা কখনো এটা মনে করি না যে আমাকে দিয়ে কেউ কাজ করাচ্ছে। ফলত সমস্ত কর্ম্মের কৃতিত্ত্ব আমরাই দাবি করে থাকি। আর এই যে অহং-এর অভিমান, এটি আমাদের অজ্ঞানের কারনে হয়ে থাকে। আপনি যতই জ্ঞানী ব্যক্তি হোন না কেন, আপনার মধ্যে থেকে অহঙ্কার যাবে না। অর্থাৎ আত্মাভিমান থেকে আমাদের সহজে মুক্তি নেই। কিন্তু সত্য হচ্ছে, আপনার এই শরীর কিন্তু আপনার ইচ্ছেয় চলে না। এই শরীর কিছু নিয়মের অধীন। আর এই নিয়মের নিয়ন্ত্রক আপনি নন। আপনি শিশু থেকে একদিন বৃদ্ধ হয়ে যাবেন, আপনি কখনোই বৃদ্ধ থেকে শিশু হতে পারবেন না - তা সে যতই চেষ্টা করুন না কেন। আপনার মধ্যে প্রাণের প্রবেশ ও বাহির ক্রিয়া সংগঠিত  হবার জন্য, আপনার মধ্যে সাধারণত কোনো প্রচেষ্টা দেখা যায় না।  আপনার ভুক্ত খাদ্যদ্রব্যঃ  হজমের জন্য  আপনার কোনো প্রয়াস দেখা যায় না। আপনার চোখের পাতা আপনা থেকেই ক্ষনে ক্ষনে  বুজে আসে, যার দিকে আপনার হয়তো কোনো খেয়াল নেই। কে যে এইসব কাজ করছে, কেনই বা করছে, তা আমাদের জানা নেই। শ্বাস প্রশ্বাস কেন প্রবাহিত হয়, কেই বা ফুসফুসকে এই শক্তি যোগাচ্ছে, তা আমরা জানি না। খাদ্য থেকে রক্ত, রস, পিত্ত, অগ্নি ইত্যাদি তৈরী করবার জন্য, কে উদ্দীপ্ত হয়, তা আমাদের জানা নেই। বায়ুর বেগে আমাদের বর্জ্য পদার্থ শরীর  থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। অদ্ভুত এই হাড্ডি-রস-রক্ত-মাংসের শরীর।  এর মধ্যে যে কত যন্ত্ৰ বা অঙ্গ -প্রতঙ্গ আছে, তা আজও আবিষ্কার করা সম্ভব হয় নি। এমনকি কোন অঙ্গের যে কি ক্রিয়া, তা  আমরা বিস্তারিত ভাবে জানতে পারি নি। হাজার হাজার নাড়ীর মধ্যে কিভাবে বায়ুর প্রবেশ ঘটেছে, তা আমরা জানি  না।  যোগী পুরুষগন  বলছেন, বায়ুর ভিন্নভিন্ন  গতি, কোনটা উর্দ্ধমুখী, কোনটা অধঃগতি, আবার কোনটা সমানগতি। কে এই  যন্ত্রের যন্ত্রী ? ইনিই ব্রহ্ম। 

উপনিষদে বলা হচ্ছে, বিজ্ঞ  ব্যক্তির কাছে ইনি  অজ্ঞাত। আর অজ্ঞ ব্যক্তি বলছেন, আমি এঁকে জেনেছি। তো কেউ বলছেন, এঁকে জানা যায়, আবার অন্যেরা বলছেন, এঁকে জানা যায় না। আসলে যাকিছু আমরা জানি, তার একটা সত্তা  আছে।  অর্থাৎ সত্তাবান  বস্তুকে আমরা জানতে পারি। কিন্তু যার কোনো সত্তা  নেই, যিনি সত্তাহীন, তাঁকে আমরা জানবো  কি করে ? কাজেই আমাদের মতো সাধারণ  মানুষের মনে হতেই  পারে, যে ব্রহ্ম  যদি অজ্ঞাত হয়, তবে এটা ধরে নেওয়াই যেতে পারে,  ব্রহ্ম বলে কিছু নেই।  ব্রহ্ম কেবল কিছু অলস মস্তিষ্কের অধিকারী,  কল্পনাবিলাসীর ভাবনা বা কল্পনা মাত্র।  এর আদৌ কোনো অস্তিত্ত্ব নেই। 

এখন কথা হচ্ছে, তাহলে কি ব্রহ্ম বা আত্মা বলে কিছু নেই ? যদি না থাকে তবে এই বিশাল ব্রহ্মান্ড কার নির্দেশে চলছে ? যদি ধরে নেই যে এই ব্রহ্মান্ড একটা নিয়মের বন্ধনে আবদ্ধ  হয়ে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে,  এই বিশাল কর্ম্মযজ্ঞের সামিল হয়েছে, তবে প্রশ্ন জানে এই নিয়মের নিয়ন্ত্রক কে, কেই বা এই নিয়মের প্রচলন করলেন ?  নিয়মের মধ্যে যে ব্যতিক্রম দেখা যায়, তারই বা নিস্পত্তি কিভাবে হবে ? এমনি হাজারো এক প্রশ্ন আমাদের মনের মধ্যে উদয় হয়।  আবার এই যে ব্যষ্টি  মন, স্থূল শরীরের নাশের  পড়ে ব্যষ্টি  মনের স্থান কোথায় হয়। কোথায় আমরা সবাই একদিন হারিয়ে যাই, আবার কোথা  থেকেই বা আমরা আসি ? 
   
এই জায়গাটা পরিষ্কার করবার জন্য, উপনিষদ এখানে একটা রূপক গল্পের মাধ্যমে  ব্যাপারটা বোঝাবার চেষ্টা করেছেন। যাইহোক, রূপক গল্পটা  একবার আমরা শুনে নেই। তার পরে আমরা উপনিষদের তৃতীয় খন্ডে প্রবেশ করবো। 

পুরান কাহিনীতে দেবাসুরের নিরন্তর  লড়াইয়ের কাহিনী আমরা শুনেছি। বলা হয়, এই যুদ্ধ নাকি এখনো চলছে। কারন আমাদের আসুরিক বৃত্তি কখনো মঙ্গলময় পরমেশ্বরের বিধান মেনে চলতে চায়  না। তারা ঈশ্বরের সৃষ্টিকে উলোট পালট করে দিতে চায়।  এরা শুভবৃত্তি অর্থাৎ দেবতাদের সর্বদা হেয় প্রতিপন্ন করতে চায়।  এমনকি এই শুভ বৃত্তিকে সে ক্ষেত্র (দেহ-রূপ ধর্ম্মক্ষেত্ৰ) থেকে বিতাড়িত করতে চায়। এইজন্য এরা যেমন দেবত্বের উপরে আঘাত হানে, তেমনি এরা আমাদের মনুষ্যত্বের উপরেও আঘাত করে। এরা  কেবল ভোগ-সুখে আয়োজন করে থাকে।  এদের না আছে যোগক্রিয়া, না আছে ধর্ম্ম-কর্ম্ম। এরা কোনো ঈশ্বরকে মানে না, এরা  নিজেরাই নিজেদের বিধাতা বলে মনে করে। অন্যদিকে শুভ বৃত্তি বা দেবতা এঁরা ধর্ম্ম-কর্ম্ম করে বটে, তবে ধর্ম্ম-কর্ম্ম যে কার উদ্দেশ্যে করা হয়, তা তাঁরা  জানে না। এই শুভ বৃত্তি ও অশুভ বৃত্তি অর্থাৎ অসুর ও দেবতা দুজনের শক্তির উৎস যে সেই পরমেশ্বর পরমব্রহ্ম তা কেউ জানে না।  আসলে যারা নিজেদেরকে চেনে না, তারা ব্রহ্মকেও জানতে পারে না। কিন্তু ব্রহ্ম  সকলকে জানেন। 
তো একবার হলো কি, দেবাসুরের (দেবতা ও অসুরের মধ্যে) যুদ্ধে দেবতারা বিজয়ী হলো।  এই যুদ্ধে তাঁদের  অনেক সৈনিক মারা  গেলো বটে, তবে শেষমেশ দেবতারাই  জয়ী হলো।  এখন জয়ের পরে, তাঁরা  বিজয় উৎসবে মেতে উঠলো। কিন্তু এঁরা কেউ জানতোই  না যে আসলে এই জয় কেবলমাত্র ব্রহ্মশক্তিবলে সম্ভব হয়েছে। তাই তাঁরা  কেউ ব্রহ্মকে স্মরণ করলেন না। জ্যোতি তো পরম-ঈশ্বরের, সূর্য ভাবে আমার, আবার চাঁদ ভাবে আমার, অগ্নি ভাবে আমার। সূর্য ভাবে আলো  আমি দান  করি।  চাঁদ ভাবে আমিই জ্যোৎস্না দিয়ে থাকি ।  আর অগ্নিখণ্ডও ভাবে আমিই সব আলোকিত করছি। সবাই ভাবে আমিই অন্ধারকে নাশ করছি। তো স্বয়ং ব্রহ্ম ভাবলেন, দেবতারা আমার প্রিয়, তাঁরাই  আমার এই সুন্দর সৃষ্টিকে রক্ষা করছে, লালন-পালন করছে, এমনকি আমার সৃষ্টিকার্য্যে সহায়তা করছে। আমি আজ তাদের হৃদয়ে এমন একটা জ্ঞানের আলোক দান  করবো, যাতে তারা যেন অসুর নিধন যজ্ঞে নিজেদের  কৃতিত্ত্ব, বা মিথ্যে অভিমান না করে। 

এখন বিজয়-উৎসবে সমস্ত দেবতারা ধীরে ধীরে এসে উপস্থিত হলো। কিন্তু যাঁর  বলে বলীয়ান হয়ে, তাঁরা  এই যুদ্ধে জয় লাভ করেছে, তাঁর  কথা কারুর স্মরণে এলো না। অগ্নি, বরুন, উষা, অদিতি, অশ্বিনীকুমার সবাই এসে গেলেন।  একসময় স্বয়ং ইন্দ্র যিনি দেবতাদের রাজা তিনিও উপস্থিত হলেন। কাষর  ঘন্টা বেজে উঠলো, দেবতাদের জয়ধ্বনি শুরু হলো, এমন সময় আকাশজুড়ে জ্যোতির আবির্ভাব হলো। এই ব্রহ্মজ্যোতি সম্পর্কে কারুর কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকবার জন্য, কেউই বুঝতে পারলো না যে এই জ্যোতি কার জ্যোতি। সকল দেবতা আকাশের দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে দেখতে লাগলো।  আর অস্ফুট কন্ঠে বলতে লাগলো, কিম-আশ্চার্য্যম, কিম-আশ্চার্য্যম। 

দেবতাদের সর্বত্র গতাগতি। তাদের ধারণা ছিলো, এই পৃথিবীর সমস্ত কিছুই তাদের জ্ঞাত আছে। কিন্তু এমন জ্যোতিঃপুরুষ  সম্পর্কে তাদের কিছু জানা নেই। তো তাঁরা  ভাবলেন, এঁকে  জানতেই হবে।  ইনি  কে  ? 

অনেক ভেবে চিন্তে দেবতারা এই অদৃষ্টপূর্ব জ্যোতিঃপুরুষকে জানবার জন্য অগ্নিকে তাঁর  কাছে পাঠালেন। এখন অগ্নি দেবতাদের প্রতিনিধি হয়ে একটু গর্ব-সহকারে ব্রহ্মজ্যোতিঃ পুরুষের কাছে গিয়ে কিছু বলার আগেই, ব্রহ্মজ্যোতিঃ অগ্নিকে প্রশ্ন করলেন  তুমি কে ? অগ্নি সগর্বে জবাব দিলেন, আমি অগ্নি, আমি জাতবেদা, জাত  বস্তু মাত্রেই আমি বিদিত হয়ে থাকি। তো ব্রহ্মজ্যোতিঃ আবার প্রশ্ন করলেন, তোমার কাজটা কি ? অগ্নি এবারো গৌরবের সঙ্গেই বললো, আমি এই পৃথিবীর সমস্ত কিছুকেই দগ্ধ করতে পারি। তো ব্রহ্মজ্যোতিঃ পুরুষ একগাছি তৃণ তুলে তাকে দিলেন, দগ্ধ করবার জন্য।  ব্রহ্মজ্যোতিঃ মনে মনে হাসলেন, ভাবলেন, কার শক্তিতে তুমি এসব করো, তা তুমি জানো  না। অগ্নি প্রথমে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে, শেষে সর্বতেজঃ শক্তি প্রয়োগ করেও, এই তৃণখন্ডকে  পোড়াতে পারলেন না। কিন্তু তার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হলো, তৃণখন্ড যেমন ছিল, তেমনি রয়ে গেলো। অগ্নির সমস্ত পৌরুষ যেন এক লহমায় শূন্য হয়ে গেলো। দুঃখে অপমানে, অগ্নি দেবতাদের কাছে ফিরে এলো। 

এইভাবে এক এক করে,  বায়ুদেবতা, বরুনদেবতা, ব্রহ্মজ্যোতিঃ  কাছে গেলেন, আর সেখানে গিয়ে যেন বলহীন হলেন। বায়ু দেবতা তৃণ খন্ডকে নাড়াতে পারলেন না, বরুন তৃণখন্ডকে ভাসিয়ে দিতে পারলেন  না। 

দেবতারা শেষে ইন্দ্রকে পাঠালেন সেই ব্রহ্মজ্যোতিঃ-র কাছে। ইন্দ্র ধীরে ধরে এগিয়ে গিয়ে সেই পুরুষের কাছে উপস্থিত হলেন, কিন্তু তিনি আর তাঁকে দেখতে পেলেন না। ইন্দ্র ভাবলেন, এই আশ্চার্য্য পুরুষকে আমি দেখতে পেলাম না। কিন্তু তিনি তো ফিরে যাবার পাত্র নন।  তাই তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে মৌন হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। ইন্দ্র যেন আর নিজের জগতে নেই। দেবতাগণ তার  জন্য অপেক্ষা  করছে, কিন্তু ইন্দ্র যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন । ইন্দ্রের চোখে বিদ্যুতের ঝলক, সামনে একটা জ্যোতি রেখা, ধীরে ধীরে অপূর্ব সুন্দর নারী মূর্তিতে পরিণত হলো। এই রমণীর অঙ্গে হেমপ্রভা, দেহজ্যোতিতে চারিদিক উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এই কল্যাণময়ী জননী রূপে ইন্দ্রকে বরাভয় প্রদান করলেন। ইন্দ্রের মনে আনন্দ হলো। ইন্দ্রের চোখের সামনে থেকে অন্ধকার দূরীভূত হলো।  মনের মধ্যে থেকে অজ্ঞানের অন্ধকার দূরীভূত হলো। ইনিই উমা, ইনিই মা, দেবমাতা।  এই উমাই  সাক্ষাৎ ব্রহ্মবিদ্যা লাভের উপায়। ইনিই ব্রহ্মের নির্মল প্রসাদ। 

ইন্দ্র উমাকে  দেখে অভয় পেলেন। অবনত মস্তকে, ভক্তিপূর্ণ চিত্তে জিজ্ঞাসা করলেন, " কে এই আশ্চার্য্য জ্যোতিঃপুরুষ, এইমাত্র যিনি অন্তর্ধান করলেন ?" 

এইসময় মা উমা কেনোপনিষদের চতুর্থ খন্ডের   প্রথম শ্লোকটি বললেন :

"সা ব্রহ্ম-ইতি হ উবাচ, ব্রহ্মণঃ বা এতদ-বিজয়ে 
মহীয়ধ্বম-ইতি ততো হ-এব বিদাঞ্চকার ব্রহ্মেতি । " 

উনি ব্রহ্ম, যে বিজয়ের জন্য তোমরা এতো উল্লসিত হয়েছো, তা আসলে ব্রহ্মের জয় ।

এই যে রূপক গল্পের কথা বলা হলো, তা  আসলে, জ্যোতি পুরুষের ধ্যানাবস্থায় চিদাকাশে ভেসে ওঠা দৃশ্যের বর্ননা, যা একমাত্র সংযমী পুরুষের সামনে ঘটে থাকে। 
-----------------


ব্রহ্ম  হ দেবেভ্যো বিজিগ্যে তস্য  হ ব্রহ্মণো বিজয়ে দেবা অমহীয়ন্ত। 
ত ঐক্ষন্ত অস্মাকম এব  অয়ং  বিজয়ঃ অস্মাকম এব অয়ং মহিমা  ইতি। (০৩/০১) 

প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্মই দেবতাদের পক্ষে বিজয় লাভ করেছিলেন। সেই ব্রহ্মের বিজয়ে দেবতাগণ গর্ব বোধ করেছিলেন। তাঁরা  ভেবেছিলেন, এই জয় বস্তুত আমাদেরই, এ  আমাদেরই মহিমা। 

ব্রহ্মশক্তিতে শক্তিমান হয়ে, দেবতারা যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু দেবতারা মনে করেছিলেন যে, তারা নিজেদের শক্তিতেই যুদ্ধে জিতেছেন।  আর এই কারণেই তারা অহংকারী হয়েছিলেন। তারা নিজেদেরকে কৃতকৃত্য মনে করছিলেন। 

সৃষ্টিতে যা কিছু ঘটছে, তা সব শ্রষ্টার ইচ্ছেতেই হচ্ছে। সমস্ত জীবকুল স্রষ্টার  অধীনস্ত হয়ে ক্রিয়াশীল হচ্ছে। জীবের যে পরিবর্তন, অবনতি, উন্নতি তার দায়িত্বও সেই স্রষ্টার। তথাপি আমরা ভাবি আমরাই সব কিছু করছি। আর এর মাধ্যমে আমাদের উন্নতি বা অবনতি নির্ভর করছে।  এই যে ভাবনা,  এর কারন হচ্ছে অজ্ঞান, অবিদ্যা। এই অজ্ঞান বা অবিদ্যা আমাদের অহঙ্কারের জন্ম দিয়েছে। এই অহঙ্কারের বশেই আমরা গর্ব বোধ করি, মান-অপমান বোধ জাগে, অর্থাৎ  এই অহঙ্কারের বশেই  আমরা কর্ম্মফল অর্থাৎ সুখ-দুঃখ ভোগ করে থাকি। জীব যেদিন অনুভব করতে পারবে, যে স্বয়ং ভগবানের ইচ্ছের কারণেই এই শরীর-মন-ইন্দ্রিয়াদির সাহায্যে সমস্ত ক্রিয়া সংগঠিত হচ্ছে, সেদিন এই অবিদ্যার বা অজ্ঞানের খোলস খসে যাবে। আমি যন্ত্র, তুমি যন্ত্রী। পার্থিব জ্ঞান এই অহঙ্কারের  খোলস ছাড়াতে পারে না। তাই আমরা দেখেছি শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতপ্রবর  ব্যক্তির মধ্যেও অহঙ্কার। 

পঞ্চ-জ্ঞান-ইন্দ্রিয়  দ্বারা আমরা যে জ্ঞান সংগ্রহ করি, বা স্থূল ইন্দ্রিয়সকল যে আমাদের চৈতন্যবোধের কারন হয়েছে, তার কারন হচ্ছে এই ইন্দ্রিয়ের পিছনে আছে মন,  বা অন্তরেন্দ্রিয়, আর তার পিছনে আছে আত্মা বা ব্রহ্ম।  এই আত্মা যেদিন শরীর  ছেড়ে,  ইন্দ্রিয়সকলকে ছেড়ে যাবে, তখন তার সমস্ত ক্রিয়াশক্তি ধংস প্রাপ্ত হবে।  এই ইন্দ্রসকলকেই  বলা হয় দেবতা। দেবতা অর্থাৎ দ্যূতিশীল। সেই অর্থে আমাদের প্রাণ-মন-ইন্দ্রিয়সকলই   হচ্ছেন দেবতা। 

এই প্রাণ-মন যখন বিশুদ্ধ হবে, তখন ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে থেকে অহঙ্কারের  বিলোপ হবে। এই আত্মাভিমান ত্যাগ করতে পারলেই মানুষ মুক্তির আস্বাদন করতে পারবে। ধীরে ধীরে আমরা  এই  সম্পর্কে শুনবো। 
-------------

তৎ হ এষাং বীজজ্ঞৌ, তেভ্যো হ প্ৰাদূৰ্বভূব তৎ  ন  ব্যজানত  কিম ইদং যক্ষম ইতি।  (০৩/০২) 

তিনি  এসব (অর্থাৎ দেবতাদের মিথ্যে গর্ব) জানতে পেরেছিলেন। আর এই কারণেই তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে দেখে (অর্থাৎ তার জ্যোতিৰ্মূর্তি দেখে) চিনতে পারলেন না। 

দেবতা অর্থাৎ আমাদের সবার মধ্যেই আছে, দুটো সত্তা , একটা দৈব সত্তা  আর একটা হচ্ছে আসুরিক সত্তা ।  দৈব সত্তা অর্থাৎ আমাদের শুভ বুদ্ধি, আর আসুরিক সত্তা অর্থাৎ আমাদের অশুভ বুদ্ধি। অশুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের মধ্যে যেমন দম্ভ আছে, শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের মধ্যেও আছে অহঙ্কার। এরা প্রত্যেকেই অহঙ্কারের তৃপ্তির জন্য কর্ম্মে প্রবৃত্ত হয়। আর এই অহঙ্কারের নাশ করবার জন্য, আমাদের প্রত্যেকের হৃদয় আকাশে  সেই পরম পুরুষের আবির্ভাব হয়। অশুভ ব্যক্তির হৃদয় আকাশে  এই পরমপুরুষ-এর  আবির্ভাব সহজে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। কিন্তু শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের হৃদয়ে এর একটা প্রভাব পড়ে।  অজ্ঞানের অন্ধকার, অহঙ্কারের মোহ আমাদেরকে আচ্ছন্ন করে রাখে। তাই পরমপুরুষের   আবির্ভাব আমাদের মধ্যে কোনো জিজ্ঞাসা জাগায় না। কোনো প্রশ্ন তোলে না, কে এই পরম-পুরুষ। কিন্তু যাঁদের  মধ্যে দেবত্বের ভাব এসেছে, অর্থাৎ যাদের মধ্যে শুদ্ধবুদ্ধির প্রকাশ ঘটেছে, তাদের মধ্যে  প্রশ্ন জাগে।  তাই তাঁরা জানতে চান - সেই পরম-পুরুষের সন্ধান। কে এই পরম পুরুষ, আর মনের মধ্যে এই প্রশ্ন নিয়ে সাধনপথে এগিয়ে গিয়ে যান।  
তো শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন শুদ্ধ মনের মানুষ বলুন, আর অশুভ  বুদ্ধি সম্পন্ন অশুদ্ধ  মনের মানুষ বলুন, সবার  মধ্যেই এই পরমপুরুষ-এর  আবির্ভাব ঘটে, আমাদেরকে সতর্ক করবার জন্য, আমাদের অহঙ্কারের নাশের  জন্য, কিন্তু কেউ তা বুঝতে পারে, আর কেউ পারে না। তো উপনিষদে বলা হচ্ছে এই দেবতারাও তাঁকে চিনতে পারলেন না। কিন্তু তার উপস্থিতির একটা আভাস তাঁরা টের পেলেন। 
----------


"তে অগ্নিম অব্রুবন জাতবেদ এতৎ বিজানীহি কিম এতদ যক্ষম ইতি তথা ইতি। " (০৩/০৩)

তাঁরা (দেবতারা) অগ্নিকে বললেন, হে জাতবেদ এঁকে জেনে আসুন, এই দিব্যমূর্তি কে ? (উত্তরে অগ্নি বললেন) তাই হবে। 
 চেতনার দুটো সংস্করণ - একটা মানব চেতনা, আর একটা ঐশী চেতনা। সাধনার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানব চেতনাকে ঐশী চেতনায় উন্নীত করা।  এই কাজে সাহায্য করে আমাদের জ্ঞান।  জ্ঞান হচ্ছে এই দুয়ের  মাঝে একটা সেতুবিশেষ। শুদ্ধ মনের বোধের দ্বারা সত্যের মনন থেকে  জ্ঞানের সূত্রপাত হয়। মন সেই দেবতা যার মধ্যে মনন ক্রিয়া চলতে পারে। আর এই মনের পিছনে আছে আলোকরূপ ইন্দ্র, দেবতাদের মধ্যে যিনি শ্রেষ্ঠ। আমাদের শুদ্ধ মন যখন নিজেকে উন্মুক্ত করে, তখন আমাদের সমস্ত ইন্দ্রিয় পশ্চাৎমুখী অর্থাৎ অন্তর্মুখী হবে। তখন বাক পরাবাকের দিকে দৃষ্টি দেবে, প্রাণ সূক্ষ্ম হয়ে সুষুম্না দিয়ে উর্দ্ধমুখী হতে শুরু করবে। অর্থাৎ আমাদের সমস্ত ইন্দ্রিয়শক্তি যে যেখানেই থাকুক না কেন, তখন অন্তর্মুখী হয়ে বিশ্বশক্তির দিকে ধাবিত হতে শুরু করবে।  এই ইন্দ্রিয়াদি দেবতাদের বিশেষ মহিমা আছে, যার দ্বারা মানুষ পুষ্ট  হয়ে এমন অবস্থায় আসতে  পারে, যাতে করে তার সমস্ত বৃত্তি বিশ্বশক্তিকে উপলব্ধি করবার শক্তি পায়।  বিশ্বশক্তি সমস্ত কিছুর মধ্যে আবির্ভূত হন  বটে, সমস্ত কিছুকে প্রকাশ করেন বটে, কিন্তু নিজেকে এই প্রকাশের মধ্যে গুলিয়ে ফেলেন না। তিনি নিজেকে বিবৃত করেন না। ইন্দ্রিয় সকল এঁকে অস্পষ্টরূপে অনুভব করেন, তার সান্নিধ্য অনুভব করেন, কিন্তু এঁকে  জ্ঞাত হতে পারেন  না।

আর এই সন্ধান কাজে প্রথমে এগিয়ে আসে আমাদের অগ্নিদেবতা, অর্থাৎ চক্ষু। আমরা সব কিছু চাক্ষুস করতে চাই। অগ্নি হচ্ছে আমাদের রজঃশক্তি, পৌরুষ। যতক্ষন এই পুরুষকার জাগ্রত না হচ্ছে ততক্ষন সাধনজগতের দিকে অগ্রসর হওয়া যায় না। 

দেবতাদের সামনে যখন ব্রহ্ম  স্বয়ং আবির্ভূত হন,  তখন এই অজ্ঞাতরূপের মহাভূতের সম্পর্কে দেবতাদের অর্থাৎ মনের (ইন্দ্রিয়ের অধিপতি - দেবতাদের রাজা) মধ্যে প্রশ্ন জাগে। কে এই যক্ষ ? যক্ষ অর্থাৎ অশেষ ধনের অধিকারী। "তৎ কিম ইদং যক্ষ্মম". মানুষ যখন শ্রদ্ধাশীল ও জিজ্ঞাসু হয়, অর্থাৎ যখন সে জ্ঞানলাভের যোগ্যতা অৰ্জন করে, তখন তার মধ্যে ঈশ্বর জিজ্ঞাসা জাগে। তাই উপনিষদে বলা হচ্ছে  দেবতাদের মধ্যে প্রশ্ন জাগে। আর তাঁকে  জানবার জন্য প্রথম উঠে আসে, প্রথম উদ্যোগী হয়, অগ্নি। অগ্নি অর্থাৎ তেজঃশক্তি। অব্যক্ত বিশ্বশক্তি যখন ব্যক্ত হন, তখন তিনি ত্রিপাদবিশিষ্ট হয়ে জড়ভূমিতে নেমে আসেন। ইন্দ্র মনের রূপ ধরে, প্রাণ বায়ুর রূপ ধরে, অগ্নি স্থূল জড়ের আকারে আবির্ভূত হন। চিৎ শক্তির যে উত্তাপ, শিখা-রূপে বিশ্বকে আকার দান  করেছেন, সেই প্রথম রূপ হচ্ছেন  অগ্নি।  তাই অগ্নিকে শ্রেষ্ঠ দেবতা বলা হয়। ইনি জাতবেদা অর্থাৎ বিশ্বে জাত  সমস্ত  পদার্থের  ধর্ম্ম, কর্ম্ম সন্মন্ধে তিনি  জ্ঞাত আছেন। তো যাকিছু দৃশ্যমান হচ্ছে, তা এই জাতবেদা অগ্নির পক্ষেই জানা সম্ভব। তাই দেবতাগণ প্রথমেই অগ্নিকে পাঠালেন, এই যক্ষকে জানবার জন্য। 
----------- 

"তৎ  অভ্যদ্রবৎ তম অভ্যবদৎ ক অসি  ইতি অগ্নির্বা অহম অস্মি ইতি অব্রবীৎ জাতবেদা বা অহম অস্মি  ইতি।" (০৩/০৪)

তাঁর কাছে গেলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কে ? উত্তরে অগ্নি বললেন, আমি অগ্নি আমি সামান্য নোই।  আমিই জাতবেদা । 

অগ্নি দেবতা, পূর্ন  আস্থা নিয়ে  তাঁর অনুসন্ধানের বিষয়ের প্রতি ধাবিত হলেন।  কিন্তু প্রশ্নের তীর ছুঁড়বার  আগেই, প্রশ্নবাণ ছুঁটে  এলো।  তুমি  কে ? কি বল আছে তোমাতে ?  অগ্নি সগর্বে বললেন, আমি জাতবেদা - অর্থাৎ যা কিছু এই জগতে জন্ম গ্রহণ করেছে, তার সমস্ত কিছুই আমার জ্ঞাত আছে। অগ্নি সর্বগ্রাসী - সমস্ত বস্তুই তিনি ভক্ষণ করতে পারেন। যে যেখান থেকে এসেছিলো, তাকে সেখানে পাঠিয়ে দিতে পারেন।সমস্ত জাত বস্তুকে  নবজন্মের উপাদানে পরিণত  করে দিতে পারেন। আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি, তা এই অগ্নির কারণেই জীর্ন হয়ে প্রয়োজনীয় অংশ শরীরের পুষ্টি বর্ধন করে থাকে, আর বাকি অংশ শরীরও থেকে বেরিয়ে যায়। তো অগ্নি সমস্ত জীবের পুষ্টির কারন। এই অগ্নিই আমাদের সাধন  জীবনে একটা গুরুত্ত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে থাকে। অগ্নির সাহায্যেই  ঈশ্বর জগতের  শুদ্ধিকরণ করছেন। তো অগ্নির বিকল্প কেউ নয় - এই কারনে অগ্নি অসামান্য। অগ্নির তুল্য কেউ নেই। 

---------

"তস্মিন ত্বয়ি কিং বীর্যমিতি অপীদং সর্বং দহেয়ং যৎ ইদং পৃথিব্যাম ইতি।" (০৩/০৫)

(যক্ষ বললেন ) এমন প্রসিদ্ধ নাম ও গুন্ যুক্ত তোমাতে কি শক্তি আছে ? (অগ্নি বললেন) আমি এই পৃথিবীতে যাকিছু আছে, সমস্তই পুড়িয়ে ফেলতে পারি। 

অগ্নি জানে তার অসীম শক্তি - জগতের সমস্ত কিছুই সে দাহ  করতে সক্ষম। এমন কোনো বস্তু নেই, যা অগ্নিতে পুড়ে ছাই হয়ে যায় না। তো অগ্নি অহঙ্কার বশে  বলে উঠযেন,  "সর্বং দহেয়ং যৎ ইদং পৃথিব্যাম" - পৃথিবীর সমস্ত কিছুকে আমি দহন করতে পারি। 

আসলে এই অহঙ্কারই  মানুষকে পুড়িয়ে মারে।  এই অহঙ্কারই আমাদের পতনের মূল। এই অহঙ্কার অজ্ঞানের কারনে উদ্ভব হয়ে থাকে। যতক্ষন এই অহঙ্কারের নাশ না হয়, ততক্ষন সাধক ঈশ্বরের শরণে আসতে পারে না। সাধনপথে তাই অহঙ্কার বড়ো  বাধা হয়ে দাঁড়ায়। 
--------------------

"তস্মৈ তৃণং নিদধৌ এতৎ দহ ইতি  ; 
তৎ উপপ্রেয়ায় সর্বজবেন, তন্ন শশাক দগ্ধুম, স তত এব 
নিববৃতে - ন এতৎ অশকং বিজ্ঞাতুং যৎ এতৎ যক্ষম ইতি। "(০৩/০৬)

যক্ষ অগ্নির সামনে একটা তৃণ খন্ড রেখে বললেন, এটিকে দাহ করতো দেখি। (অগ্নি)  সর্বশক্তি প্রয়োগ করে এই তৃণখন্ডটিকে দগ্ধ করতে পারলেন না, এবং ফিরে এসে তিনি (দেবতাদের কাছে) বললেন, এই যক্ষ যে কে, তা আমি বুঝতে পারলাম না। 

যক্ষ অগ্নির সামনে  একটা  তৃণখন্ড রাখলেন, অর্থাৎ একটা তুচ্ছ বস্তু রাখলেন। উদ্দেশ্য অগ্নি যেন এইটুকু  বুঝতে পারে যে যাঁর সামনে অগ্নি দাঁড়িয়ে আছেন, তার সম্মতি না হলে, তাঁর  শক্তি  না পেলে, সমগ্র পৃথিবীর বস্তু তো দূরে থাকুক, তিনি একটা  তুচ্ছ পদার্থকেও দাহ করবার ক্ষমতা রাখেন না। এই ভাবে সেই পরমপুরুষ অগ্নি-দেবতার  অহঙ্কারকে বিনষ্ট করলেন। যিনি সমস্ত কিছুকে গ্রাস করতে পারেন, সেই সর্বগ্রাসী অগ্নি সামান্য একটা দূর্বাঘাস গ্রাস করতে পারলেন না। আসলে আমাদের সবার মধ্যে যতক্ষন সেই শাশ্বত ব্রহ্মের প্রকাশ বা শক্তি আছে, ততক্ষন আমাদের যত সব কারিকুরি।  অন্যথা আমরা একটা  বিশাল অশ্বডিম্ব । অগ্মি  মাথা নিচু করে, ফিরে এলেন অর্থাৎ যক্ষ কোনো পৃথিবীর জীব নয়, যক্ষ কোনো পার্থিব বস্তু  নয়, যক্ষ অগ্নির দাহিকা শক্তির বাইরে শ্বাশ্বত বস্তু যা অগ্নি দ্বারা না যায় পোড়ানো, না যায় বোঝা। 
-----------

"অথ বায়ুম অব্রুবন বায়ো এতৎ বিজানীহি কিম এতদ যক্ষম ইতি, তথা ইতি।" (০৩/০৭)

এরপর বায়ুকে বললেন, হে বায়ু এই যক্ষকে সঠিক ভাবে জানুন।  (বায়ু বললেন) তাই হবে। 

"তৎ অভ্যদ্রবৎ তম  অভ্যবদৎ ক অসি  ইতি বায়ুর্বা 
অহম অস্মি ইতি অব্রবীৎ মাতরিশ্বা বা অহম অস্মি  ইতি।" (০৩/০৮)

বায়ু তাঁর (যক্ষ) নিকটে গেলেন।  (যক্ষ) প্রশ্ন করলেন, আপনি কে ? বায়ু বললেন, আমি বায়ু আমি সামান্য নোই, আমি মাতরিশ্বা। 

 "তস্মিন ত্বয়ি কিং বীর্যম ইতি  অপি ইদং  সর্বং আদদীয়ম  যৎ ইদং পৃথিব্যাম ইতি।" (০৩/০৯)

আপনি সত্যিই অসামান্য, কিন্তু আপনি কোন  বল ধারন করেন। বায়ু বললেন, এই বিশ্বের সবকিছুকে আমি উড়িয়ে দিতে পারি। 

"তস্মৈ তৃণং নিদধৌ এতৎ  আদৎস্ব   ইতি  ; তৎ উপপ্রেয়ায় 
সর্বজবেন, তন্ন শশাক  আদাতুম, স তত এব 
নিববৃতে - ন এতৎ অশকং বিজ্ঞাতুং যৎ এতৎ যক্ষম ইতি।" (০৩/১০)

যক্ষ  বায়ুর সামনে একখন্ড তৃণ রেখে বললেন, এটিকে উড়িয়ে নিয়ে যান তো দেখি।  বায়ু তার সর্ব্ব শক্তিদিয়ে ধেয়ে গেলেন, কিন্তু তৃনকে নাড়াতে পারলেন না। শেষে ফিরে এসে দেবতাদের কাছে বললেন, এই যক্ষ কে তা আমি জানতে পারলাম না। 

দেবতাদের অনুরোধে এবার এগিয়ে এলেন, বায়ু-দেবতা। মাতরিশ্বা কথাটার অর্থ হচ্ছে, যিনি শূন্যে বিচরণ করেন। আকাশের কোলে যার অবস্থান। বৃহৎ প্রানতত্ত্ব এই মাতরিশ্বা। এই বায়ু যেমন আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস রূপে প্রবাহিত হয়, তেমনি বৃহৎ পুরুষের শ্বাস প্রশ্বাস এই বায়ু। এই বায়ু হচ্ছেন বৃহৎ প্রানতত্ত্ব। এই প্রাণশক্তির স্পন্দন হেতু জগৎ সৃষ্টি লীলায় মেতেছে। এই প্রাণ অগ্নিকে সমস্ত বস্তুর মধ্যে স্থাপন করছেন। আর এই প্রাণের স্পন্দন  হেতুই জড় বস্তু প্রাণবন্ত হয়ে, ক্রিয়াশীল হচ্ছ , সুখ দুঃখ ভোগ করছে। এই যে যক্ষ ইনি  যদি জাত  বস্তু হন, তবে মাতরিশ্বা এঁকে  জানতে সক্ষম হবেন। কেননা এই প্রাণশক্তিই বস্তুকে চেতনা সম্পন্ন করে তোলে। 

কিন্তু বায়ু দেবতা যক্ষের কাছে যেতে না যেতেই, আবার সেই একই প্রশ্নের সম্মুখীন হলেন। "কে তুমি ? কি বল আছে তোমার ? মাতরিশ্বা অগ্নিদেবতার মতোই অহঙ্কারে মত্ত  ছিলেন। তাই যাঁর বলে বলীয়ান হয়ে তিনি শুন্যে বিচরণ করেন, যাঁর  বলে বলীয়ান হয়ে তিনি সবাইকে  চেতনাসম্পন্ন করে তুলতে পারেন, সেই দিব্যজ্যোতিঃ সম্পন্ন জ্ঞানপুরুষের সামনে দাঁড়িয়ে অহঙ্কারের সঙ্গে  বলে উঠলেন, আমি মাতরিশ্বা, এই বিশ্বের সমস্ত কিছুকে আমি উড়িয়ে দিতে পারি। তো যক্ষ আগের মতোই এক খন্ড তৃণ তার সামনে রেখে বললেন, এই তৃণখন্ডকে উড়িয়ে তোমার শক্তি প্রদর্শন করো। বায়ু দেবতা তার সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করতে গিয়ে বুঝলেন, তিনি শক্তিহারা। তার মধ্যে যেন ক্ষীণতম শক্তির আভাস নেই। লজ্বিত বায়ুদেবতা অবনত শিরে, অগ্নির মতো যক্ষের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। বুঝলেন, এই যক্ষ এমন কেউ যিনি এই প্রাণশক্তির উর্দ্ধে। প্রাণের কোনো স্পন্দন  যেখানে অনুভব হয় না।  বিশ্বপ্রাণের কোনো শক্তি এর মধ্যে কাজ করে না। তিনি বায়ুর অতীত। 

"অথ ইন্দ্রিম অব্রুবন মঘবন এতদ বিজানীহি কিম এতদ 
যক্ষ্মম  ইতি তথেতি তদ  অভ্যদ্রবৎ তস্মাৎ তিরোদধে। "  ( ০৩/১১)

এবার দেবতাগণ ইন্দ্রকে বললেন, হে মঘবন আপনি বিশেষ ভাবে জেনে আসুন, এই যক্ষ কে ? ইন্দ্রি বললেন, তাই হোক।  ইন্দ্র যখন তাঁর (যক্ষের) নিকট গেলেন, তখন যক্ষ ইন্দ্রের কাছ থেকে অন্তর্হিত হলেন। 

এবার দেবতাদের অনুরোধে স্বয়ং ইন্দ্র আসন ত্যাগ করে যক্ষের পরিচয় জানতে ছুটলেন। ইন্দ্রকে বলা হচ্ছে মঘবন।  মঘ কথাটার অর্থ স্বর্গীয় সুখ। স্বর্গীয় সুখের সঙ্গে যাঁর তুলনা করা চলে, তিনি মঘবন। ইন্দ্র হচ্ছে আমাদের মনের শক্তি। এই শক্তির সাহায্যে মন বিষয়ের সংস্পর্শে এসে, যেমন ভোগ সম্পাদিত করে, তেমনি অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান সঞ্চয় করে থাকে। সুতরাং অজ্ঞাত বস্তুকে জানতে, অর্থাৎ যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তাকে জানতে এই বৃত্তির প্রয়োগ করে থাকে মন। তো  মনের গোচরে আনতে, মনের অবধারণযোগ্য যতসব ইন্দিয়গ্রাহ্য বস্তু আছে, তাকে জেনে মন নিজের জ্ঞান বৃদ্ধি করতে পারে। কিন্তু যক্ষ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নন। আবার মনের অবধারণ যোগ্যও নন। তাই উপনিষদের ঋষি বলছেন, এইসময় যক্ষ অন্তর্হিত হলেন। আসলে আমাদের মন দেশ-কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু যিনি দেশ-কালের সীমার বাইরে তার সান্নিধ্যে আমাদের একাদশ ইন্দ্রিয় এই মন আসতেই পারে না। মন অগ্রসর হয়, কিন্তু মনের শক্তির বাইরে, মনের দৃষ্টির বাইরে থাকেন এই যক্ষ। তাই বলা হয়, সেই মনের বৃত্তির দ্বারা ব্রহ্মকে জানা যায় না। 

কিন্তু এই মনের সন্ধান শেষ হয় না। অগ্নি বা বায়ুর মতো মন সন্ধানকার্য থেকে বিরত হয় না। অর্থাৎ বিশুদ্ধ মন তখন শূন্য হৃদয়-আকাশের মধ্যে অপেক্ষা করেন। আর এখানেই একসময় দেখা হয় পরাশক্তি হৈমবতির সাথে ।  এই কথা আমরা পরবর্তী শ্লোকে শুনবো। 

সঃ তস্মিন  এব  আকাশে স্ত্রীয়ম আজগাম বহু শোভমানম উমাং 
হৈমবতীং  তাং হোবাচ  - কিম এতদ যক্ষ্মম ইতি। (০৩/১২)

তিনি  (ইন্দ্র) সেই আকাশে আবির্ভূতা স্ত্রীরূপা বহু শোভায়  শোভান্নিতা  হৈমবতী অর্থাৎ বহু অলঙ্কার শোভিত উমাকে দেখতে পেয়ে, তাঁকে বললেন, এই যক্ষ কে ? 
 
হিন্দু পুরানশাস্ত্রে এই উমা হৈমবর্তী হচ্ছে হিমালয় কন্যা। এঁর যে অলঙ্কার তা আসলে তত্ত্ববিদ্যা।  ইনি  আত্মজ্ঞানের মূর্ত প্রতীক। ইন্দ্র যেতে না যেতেই ব্রহ্ম অন্তর্দ্ধান করেছিলেন। কিন্তু শুদ্ধ মন স্বরূপের সন্ধান থেকে কখনো বিরত থাকতে পারে না। শুদ্ধ মনে  অহঙ্কার  প্রবল হতে পারে না। শুদ্ধ মনে ব্রহ্মকে জানবার ইচ্ছে প্রবল হয়ে থাকে। আর এই একাগ্রতার ফলেই, নির্ম্মল চিত্তের সাধকের মধ্যে প্রথমে জ্ঞানরূপিণী উমার সাক্ষাৎ ঘটে থাকে। এই উমাই সাক্ষাৎ ব্রহ্মবিদ্যা। এইজন্য বলা হয়, ব্রহ্মজ্ঞান ইন্দিরয়লব্ধ নয়, মন-বুদ্ধির দ্বারা এঁকে  জানা যায় না। বিচারের দ্বারাও  এই জ্ঞান লাভ করা যায় না। চিত্ত যখন নির্ম্মল হয়, বিচার যখন থেমে  যায়, তখন সাধকের হৃদয়বোধে অন্তর্দৃষ্টি জেগে ওঠে।  আর এই অন্তরদৃষ্টিই একসময় ব্রহ্ম  সাক্ষাৎকার ঘটিয়ে দেয়, অর্থাৎ তখন সাধকের  ব্রহ্ম উপলব্ধি হয়। 

এই রূপক গল্পের মধ্যে অগ্নিদেবতা, বায়ু দেবতা, ইন্দ্রদেবতা, উমা ও স্বয়ং ব্রহ্মকে আমারা দেখতে পেলাম। এই যে যে পাঁচ দেবতা এসব আমাদের আত্মানুভূতির পাঁচটি স্তর বিশেষ। অগ্নি হচ্ছেন আমাদের পার্থিব স্থূল চেতনা স্বরূপ। বায়ু হচ্ছেন, আমাদের সূক্ষ্ম বা অন্তরীক্ষ জগতের চেতনা। ইন্দ্রদেবতা হচ্ছেন আমাদের দিব্য চেতনা। উমা হচ্ছেন পরমাপ্রকৃতি বা প্রজ্ঞানঘন চেতনা আর সবশেষে ব্রহ্ম হচ্ছে সেই পরমপুরুষ। আমাদের পার্থিব জগতের যে চেতনা মানুষ মাত্রেই থাকে, কিন্তু আমাদের অন্তর জগতের যে চেতনা, এমনকি দিব্য  চেতনা, প্রজ্ঞানঘন চেতনা - এগুলো সাধনার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে। 

সাধকের মধ্যে যখন জ্ঞান স্পৃহা জেগেছে, জানবেন, তার মধ্যে অগ্নি দেবতা প্রবল হয়েছেন । ত্রিলোকে যা কিছু আছে তা এই মহাপ্রাণের অধীন। প্রাণের সাধনা দ্বারা ত্রিলোকের জ্ঞান জন্মায়। যোগীপুরুষগন তাই এই প্রাণের সাধনা করে থাকেন। কিন্তু এই প্রাণক্রিয়া দ্বারা ব্রহ্মকে জানা যায় না। অগ্নির রূপ আছে, প্রাণের রূপ নেই। প্রানের সাধন করলে প্রাণের ব্যাপ্তি ঘটে, আমাদের বোধশক্তিরও বিস্তার ঘটে। কিন্তু এই স্তরে পরম চেতনাকে জানা যায় না।  ইন্দ্রদেবতা হচ্ছেন  শুদ্ধ মনের প্রতীক। প্রাণ যখন নিস্তরঙ্গ হয়, তখন মনের মধ্যে একটা শূন্যতা অনুভব হয়। এই নিস্তরঙ্গ শুদ্ধ মনে উমা বা শুদ্ধজ্ঞানের আবির্ভাব ঘটে। তখন ইন্দ্রিয়াতীত হয়ে অতীন্দ্রিয় রাজ্যে প্রবেশের ক্ষমতা জন্মে। আর এই অতীন্দ্রিয় রাজ্যে প্রবেশ করতে পারলে সাধকের  ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হয়। সাধক তখন ব্রহ্মস্বরূপতা লাভ করে ধন্য হয়। 

কেন উপনিষদ রহস্যঃ  তৃতীয় খন্ড সমাপ্ত হলো। 
------ 
                                                   
কেনোপনিষদ রহস্যঃ - চতুর্থ খন্ড 

সা ব্রহ্ম-ইতি হ উবাচ, ব্রহ্মণো বা এতদ-বিজয়ে 
মহীয়ধ্বম-ইতি ততো হ-এব বিদাঞ্চকার ব্রহ্মেতি । (০৪/০১)

উনি ব্রহ্ম, যে বিজয়ের জন্য তোমরা এতো উল্লসিত হয়েছো, তা আসলে ব্রহ্মের জয় । (উমার) এই  কথা থেকে ইন্দ্র জানতে পারলেন, এই দিব্য জ্যোতিৰ্মূর্তি  আসলে ব্রহ্ম। 

সাধকের হৃদয়ে যখন উমারুপিনী বিবেক বুদ্ধির উদয় হয়, তার সাহায্যেই সাধক  ব্রহ্ম সম্পর্কে জ্ঞাত হতে পারেন। এইসময় সাধক নিজের শক্তি উৎস সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান লাভ করতে পারেন । প্রকৃত পক্ষে আমরা যা কিছু করছি, যার জন্য আমরা নিজেদেরকে সুখে বা দুঃখে রাখছি, যে কর্ম্মশক্তিকে আমি আমার বলে ভাবছি,  তার  উৎস কিন্তু স্বয়ং ব্রহ্ম।  সাধকের হৃদয়ে যখন এই ব্রহ্মজ্ঞানের উদয় হয়, তখন সে তার প্রতিটি কাজের  মধ্যেই সেই ব্রহ্মশক্তি অনুভব করেন। তখন তার মধ্যে থেকে অহঙ্কারের সম্পূর্ণরূপে লোপ না হলেও, অহঙ্কার তখন নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে।  কেননা তখনও সেই আমি জানছি - বোধ জাগ্রত থাকে।  

এ আসলে, জ্যোতি পুরুষের ধ্যানাবস্থায় চিদাকাশে ভেসে ওঠা দৃশ্যের বর্ননার রূপক গল্প, যা একমাত্র সংযমী পুরুষের সামনে ঘটে থাকে।

আমাদের একটা ধারণা আছে যে, আত্মা  বা ব্রহ্ম নামে  একটা বস্তু আছে, যা না থাকলে পৃথিবীর কোনো বস্তুকেই আমরা ধারণা করতে পারতাম না। কঠোপনিষদের  যমরাজ  বলছেন,  "তস্য ভাসা সর্বম ইদং বিভাতি" - তাঁর দীপ্তিতেই এই বিশ্বের সব কিছু দীপ্তিমান" . আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে এই জগৎকে বাদ দিয়ে কোনো স্বতন্ত্র চেতনার অভিজ্ঞতা লাভ করা সম্ভব নয়। আমরা এটা কেউ ভাবতেই পারি না যে আমি নেই। আমি আছি এই ধারণাকে কেন্দ্র করেই, আমরা সবাই আমাদের সম্মুখে সব কিছু দেখছি বা দেখছি না। আর এই যে দেখা বা না দেখা, এটি সত্য আবার মিথ্যে। দেখুন এই যে আকাশ একে কি দেখা যায় ? একটু গভীর ভাবে চিন্তা করলে বুঝতে পারবেন, আকাশকে দেখা যায় না। আকাশ সীমাহীন, আকারবিহীন, অদৃশ্য।  কিন্তু আমাদের কাছে মনে হয়, আমরা আকাশকে দেখছি, আর সেই আকাশের আকার হচ্ছে গোল, আকাশের বর্ণ নীল ইত্যাদি ইত্যাদি। এই যে আকাশের বর্ণ বা আকার যা আমি দেখছি বলে মনে হচ্ছে এটি আরোপিত সত্য। অর্থাৎ আমাদের মনের দ্বারা আরোপিত। 

এখন কথা হচ্ছে মহাত্মাগন বলছেন, এই যে জগৎ যা আমরা দেখছি, তা আমাদের মনের দ্বারা আরোপিত সত্য। বাস্তবে এই সত্য মিথ্যার নামান্তর।  আত্মা বা ব্রহ্ম হচ্ছেন  অনন্ত, অনাদি, অনির্বচনীয়, আমাদের অবিদ্যা বা অজ্ঞতার  ফলে আমরা আত্মার উপরে এই শরীর মন ইন্দ্রিয়াদির আরোপ করে থাকি। আমরা মনে করি আত্মাই কর্তা, ভোক্তা, এবং তিনিই বহু অংশে বিভক্ত হয়ে নানান রূপে প্রকাশসিত হয়েছেন। বাস্তবিক পক্ষে তিনি এর কিছুই নন। তবুও এইভাবে আমরা আত্মাকে বিষয় রূপে জ্ঞান করি। আত্মা বা ব্রহ্ম  কোনো জ্ঞানের বিষয় নয়। আত্মা যখন উপাধি বিশিষ্ট হন, তখন তাকে বলা হয় জীবাত্মা। এই জীবাত্মার পক্ষেই অহংবোধ সম্ভব হয়েছে। আর এই অহংবোধ অধ্যাসকে প্রতিষ্ঠা করে থাকে। বাস্তবিক পক্ষে আত্মা কোনো বিষয় নয়। আত্মা কোনো জ্ঞানের বিষয় হতে পারেন না। যুক্তি-তর্ক-জ্ঞান দ্বারা এই আত্মার কাছে পৌঁছানো যায় না। তাই বলে জ্ঞানের কি কোনো মূল্য নেই ? অবশ্যই আছে,  কিন্তু আপনার জ্ঞানের উপরে আত্মার অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ত্ব  নির্ভর করে না। আমরা কেউ আমাদের পিতৃ পরিচয় জানতে পারতাম  না, যদি না আমাদের মাতৃদেবী আমাদের পিতৃদেবের পরিচয় দিতেন। সমগ্র জগতের মা উমা বললেন, ইনিই ব্রহ্ম, ইনিই জগৎ পিতা । তোমরা যে বিজয় উল্লাসে মেতেছো, সেই বিজয় আসলে এই পরমপিতার কারণেই হয়েছে।  

 মানুষ যতদিন অহঙ্কারে  মত্ত  থাকে,  যতদিন সে তার স্বরূপ সম্পর্কে বিস্মৃত থাকে, ততদিন সে এই ভবলীলার ভাগিদার হয়ে লীলা করে বেড়ায়। স্বরূপ থেকে দূরে, দেহ-মন-বুদ্ধি রূপ সম্পদ  রক্ষা করবার জন্য  অহঙ্কারের প্রাচীর তুলে একটা নগরের বাসিন্দা হয়।  এখান থেকে সে আর   কিছুতেই বেরুতে চায়  না। এইজন্য আমরা আমাদের অন্তরে যে অধ্যাত্ম শক্তি আছে, তা থেকে দূরে আত্মাভিমান নিয়ে অহঙ্কারের  দম্ভে অন্ধ হয়ে আছি।  প্রত্যেক মানুষের মধ্যে যে আত্মশক্তি আছে, এই জ্ঞান যিনি প্রদান করেন, তিনিই  চিন্ময়ী মহাশক্তি, তিনিই সমস্ত সৃষ্টির বিধাত্রী। এই চিণ্ময়ীর কৃপাবর্ষণ হলে জীবক্ষেত্রে ব্রহ্মবিদ্যা উৎপন্ন হতে পারে। সাধক তখন ব্রহ্মজ্ঞ হয়ে সদানন্দময় জগতে বিচরণ করেন। 
-------------  

কিছু কথা : 

ব্রহ্মকে জানতে হবে।  কিন্তু কেন এই ব্রহ্মকে জানতে হবে ? ব্রহ্মকে জানতে হবে তার কারন হচ্ছে, ব্রহ্মজ্ঞানই মোক্ষ প্রদান করতে পারে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ব্রহ্মের স্বরূপ কি ? যাঁকে  জানতে চাইছি, তাঁর লক্ষণ সম্পর্কে একটা ধারণা থাকা দরকার।  তা না হলে আমরা ব্রহ্মের কাছে পৌঁছেও, তাঁকে সনাক্ত করতে পারবো না। অগ্নি, ও বায়ুদেবতা  তাঁর কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন, কিন্তু সনাক্ত করতে পারেন নি। পন্ডিতগণ বলছেন, ব্রহ্মের লক্ষণ বলে কিছু হয় না। তার কারন হচ্ছে, বিশ্বের সবকিছু সসীম ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। আর ব্রহ্ম হচ্ছেন অসীম ও ইন্দ্রিয়াতীত। তো যাকিছু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অর্থাৎ সসীম তার সঙ্গে অসীমের তুলনা করা চলে না। 

আবার ব্রহ্মসূত্রে বলা হচ্ছে "জন্মাদ্যস্য যতঃঃ " (১/১/২) - জগতের সৃষ্টি-স্থিতি-লয় যা থেকে হয়, তিনিই ব্রহ্ম। তৈত্তিরীয় উপনিষদে বলা হচ্ছে "....... যতো বা ঈমানি ভূতানি জায়ন্তে। .. তৎ  ব্রহ্ম ইতি...." (০৩/০১) যা হতে এই ভূতগণ জাত  হয়, যার দ্বারা জীবিত থাকে, যাতে প্রতিগমন করে, এবং শেষে যাতে বিলীন হয়, তিনিই ব্রহ্ম। এই কথা থেকে আমাদের মনে হতে পারে, ব্রহ্ম অদ্বিতীয়। 

 কিন্তু আমরা ও শুনেছি, অবস্থাভেদে ব্রহ্মের দ্বৈতভাব, সগুন ও নির্গুণ ব্রহ্ম।  অদ্বৈত অবস্থায় ব্রহ্ম নির্গুণ, অর্থাৎ জগতের সঙ্গে সম্পর্ক রহিত। আবার যখন তিনি জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেন, তখন তিনি সগুন।  অর্থাৎ ব্রহ্ম নিজেকে  জগৎরূপে বিবর্তিত করেছেন। 

আবার আমরা এও  শুনেছি, সমস্ত জীব স্বরূপতঃ ব্রহ্ম। ব্রহ্ম চতুষ্পাদ বিশিষ্ট।  অর্থাৎ জীবের চার অবস্থা, জাগ্রত, স্বপ্ন, সুষুপ্তি ও তুরীয়। 

এতো তত্ত্ব কথার মধ্যে না গিয়ে আমাদেরকে জানতে হবে ব্রহ্ম কে ?  আসলে ব্রহ্মই একমাত্র   সত্তা, যা সমগ্র জগৎ বিধৃত করে আছেন, কিন্তু আমাদের  মনে হচ্ছে  তিনি বহুধা বিভক্ত হয়ে অবস্থান করছেন। আমরা যখন গীতা পড়েছি, তখন দেখেছি, ১২ ও ১৩ নং অধ্যায়ে এই কথাগুলোই বলা হয়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে ব্রহ্ম সগুন ও নির্গুণ দুইই।  নির্গুণ  হচ্ছে ব্রহ্মের যথার্থ স্বরূপ, আর সগুন হচ্ছে মায়ার সৃষ্টি। যারা  ব্রহ্মের সগুণ সত্ত্বায় অনুরক্ত তাঁরা  যোগযুক্ত। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, আমি আমার যোগমায়ার দ্বারা সমাবৃত থাকায় সকলের নিকট প্রকট হই  না।  (গীতা- ৭/২৫) আবার বলছেন (গীতা- ১৮/৬১) হে অর্জ্জুন, ঈশ্বর সর্ব্বজীবের হৃদয়ে অবস্থিত থেকে স্বীয় মায়াশক্তির দ্বারা যন্ত্রারূঢ় পুতুলের ন্যায় জীবসকলকে চালিত করেন। ছান্দোগ্য উপনিষদে বলা হচ্ছে, "তত্ত্বমসি" - তুমিই সেই। বৃহৎ আরণ্যক উপনিষদে বলা হচ্ছে  (১.৪.১০)"অহং ব্রহ্মাস্মি" - আমিই ব্রহ্ম,  (বৃ - ৩.৯.২৮) "বিজ্ঞানমানন্দং  ব্রহ্ম"  - ব্রহ্ম হচ্ছেন জ্ঞান ও আনন্দ স্বরূপ।

 এই শেষ কথাটা ধরে আমরা সাধনপথে  এগুতে শুরু করবো।  প্রথমত, তিনি আমাদের সকলের হৃদয় অবস্থান করছেন, এই উপলব্ধি না থাকলেও, এই বিশ্বাস যেন দৃঢ় হয়। তিনি জ্ঞানস্বরূপ - তো আমাদের এই জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে, আর এতে সাহায্য করতে পারেন, আমাদের সজ্ঞা বা হৈমবতী। সবশেষে ইন্দ্রের মতো আমাদের শুদ্ধ মনের অধিকারী হয়ে, নিরহঙ্কারী হয়ে, অপেক্ষা করতে হবে। বায়ু বা অগ্নির মতো ফিরে গেলে চলবে না। আর চিদাকাশেরর দিকে মন-প্রাণ-দৃষ্টি নিবদ্ধ করে অপেক্ষা করতে হবে। এই অপেক্ষা আমাদের মধ্যে সেই সজ্ঞাশক্তিকে জাগ্রত করে দেবে। মা উমা আমাদের জ্ঞান দান  করবেন। 
------------ 


"তস্মাদ বা এতে দেবা  অতিতরাম ইব অন্যান দেবান  - 
যৎ অগ্নিঃ বায়ুঃ ইন্দ্রঃ তে হি  এনৎ নেদিষ্টং পস্পৃশুঃ তে হি এনৎ 
প্রথমো বিদাঞ্চকার ব্রহ্মেতি । " (০৪/০২) 

যেহেতু অগ্নি, বায়ু এবং ইন্দ্র ব্রহ্মের  অধকিতর নিকটবর্তী হয়ে (প্রায়) স্পর্শ করেছিলেন, এবং তাঁরাই প্রথম ব্রহ্মকে জেনেছিলেন, সেইকারণে  দেবতাদের মধ্যে এই তিনজনের স্থান সর্বোচ্চ। 

সাধারনের মানুষের মন চঞ্চল। সর্বদা বিষয়ে থেকে বিষয়ান্তরে ধাবিত হচ্ছে। এই চঞ্চল মনকে আমরা কিছুতেই বিষয়বিমুখ করতে পারি না। যা পাচ্ছে তাই খাচ্ছে, তা সে কটু বা টক, মিষ্টি হোক বা ঝাল, আর এর ফলে সে কখনও সুখী হচ্ছে, কখনো দুঃখী। 
 
এই যে অগ্নিদেবতার  কথা বলা হচ্ছে, এই অগ্নি আমাদের উদ্বুদ্ধ মন। অর্থাৎ উদ্বুদ্ধ মনেই প্রথম আমাদের ব্রহ্মজিজ্ঞাসা জাগে। এই উদ্বুদ্ধ মন ব্রহ্মের সংস্পর্শেই আছে, কিন্তু ধরতে পারছে  না। 

এবার  বায়ুর সাধন শুরু হলে,  বায়ু শুদ্ধ হতে শুরু করে। এই বায়ুর সাধন আমাদের মনকে শুদ্ধ করতে পারে।বায়ুর সাধনায়  যখন সাধকের মন শুদ্ধ হয়, অর্থাৎ প্রাণায়াম ইত্যাদি দ্বারা যখন নাড়ী শুদ্ধি হয়, প্রাণ সূক্ষতা লাভ করে, তখন আমাদের মনের মধ্যে শুদ্ধতার উদয় হয়। আর মন আত্মার সান্নিধ্য অনুভব করতে শুরু করে।  

সবশেষে এই যে ইন্দ্রের কথা বলা হচ্ছে, যিনি দেবতাগনের রাজা, ইনি আসলে আমাদের আমাদের দিব্য মন। এই দিব্য মনেই একসময় বিশুদ্ধ জ্ঞানের উপলব্ধি হতে শুরু করে। অর্থাৎ সাধকের মধ্যে সজ্ঞার উদয় হতে শুরু করে। 
আসলে এসবই আমাদের বোধের মাত্রা বিশেষ। বোধশক্তি যত বৃদ্ধি  পেতে থাকে তত আমরা সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর, সূক্ষ্মতম জ্ঞানের অধিকারী হয়ে উঠি। 

অন্যভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, অগ্নি হচ্ছে আকার বিশিষ্ট, স্থূল অর্থাৎ ভূলোকের বা পার্থিব লোকের অধিপতি।  অন্যদিকে বায়ু হচ্ছে  সূক্ষ্ম অন্তরীক্ষ লোকের অধিপতি। বায়ুর নিজস্ব কোনো আকার নেই। আর ইন্দ্র হচ্ছেন দ্যুলোকের অধিপতি।  তো তিনটে লোক, একটা স্থূল বা পার্থিব লোক, একটা সূক্ষ্ম বা অন্তরীক্ষ লোক যাকে  আমরা প্রাণলোক বলতে পারি। আর একটা হচ্ছে অতিসূক্ষ্ম লোক, স্বর্গলোক - দ্যুলোক। 

তো ব্রহ্মজ্ঞানের উপায় হলো, প্রথমে দৃশ্যমান জগতের পশ্চাতে কি আছে, তার অনুধাবন করা।  

এর পরে, এই অদৃশ্যমান জগতের পশ্চাতে কি আছে তাকে অনুধাবন করবার চেষ্টা করুন । দেখুন চোখ খুলতেই  আমরা দেখতে পাই, মুখ খুললে আমরা কথা বলতে পারি, কান খোলা থাকলে আমরা শব্দ শুনতে পাই। কিন্তু একটু স্থির হয়ে বসে, চোখ, কান, মুখ বন্ধ  করে দেখুন, - তখনও মনে মনে কথা বলতে পারবেন, মুদ্রিত চোখের সামনে নানান দৃশ্য দেখতে পারবেন, এমনকি কান বন্ধ অবস্থায় আর কিছু না হোক একটা শো-শো শব্দ শুনতে পারবেন। একটু গভীর মনোযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করুন, এর পিছনে কে আছে, কে দেখছে, শুনছে, বা বলছে।  আপনার শরীরের ইন্দ্রিসকল বন্ধ, তথাপি ক্রিয়া সম্পাদিত হচ্ছে।  কে করছে, কে দেখছে, কে শুনছে ? 

তো একটু ভাবুন, কে এই ইন্দ্রিয়সকলের পাশ্চাত্যে কে আছেনা, যিনি এদেরকে নিয়ন্ত্রণ করছেন ? মন-প্রাণ-ইন্দ্রিয়ের অহমিকা বা অভিমান ত্যাগ করে, সজ্ঞানে সেই বিশ্বশক্তির আনন্দ গ্রহণ করবার প্রতীক্ষায় নিজেকে নিস্পন্দ করে অবস্থান করুন। এর ফলে একসময় দেখবেন, একটা দিব্যসত্তা নিজেকে সুস্পষ্টরূপে আপনার  চিদাকাশে প্রতিবিম্বিত হচ্ছে। এই দিব্যসত্তা একটা আলোর বিন্দুর রূপ ধরে আপনাকে উদ্বেল করে তুলবে। আপনার হৃদয়ের আবেগ বাড়িয়ে তুলবে। এর ফলে আপনার ব্যক্তিসত্ত্বা, আপনার প্রকৃতির মধ্যে একটা পরিবর্তন এনে দেবে। এ কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়, সবার ক্ষেত্রে একই নিয়মে এটি ঘটে থাকে। প্রথম দিকে ক্ষণিক স্ফুরণরূপে, আকস্মিক স্পর্শরূপে, দৃষ্টিনন্দন রূপে, বিদ্যুতের চমকের  মতো আলোর ঝলক উজ্বল হয়ে, আবার যেন তা উৎসে মিলিয়ে যাবে। তখন মন ব্রহ্ম ছাড়া আর কিছুই জানতে চাইবে না। ব্রহ্ম  ছাড়া কিছুই চিন্তা করতে পারবে না। প্রাণ তখন সেই ব্রহ্মক্ষেত্রে বিচরণ করবে। চোখ ব্রহ্ম ছাড়া কিছুই দেখতে চাইবে না। কান ব্রহ্ম ছাড়া কিছুই শুনতে চাইবে না। সকল বাহ্য ব্যাপারের  তখন বিস্মরণ ঘটবে। 

------

"তস্মাৎ বৈ ইন্দ্রঃ অতীতরাম ইব অন্যান দেবান স হয় এনাৎ নেদিষ্টং পস্পর্শ স  হি এনৎ 
প্রথমো বিদাঞ্চকার ব্রহ্মেতি । " (০৪/০৩)

যেহেতু ইন্দ্রই প্রথম  ব্রহ্মের  সস্পর্শে এসেছিলেন, এবং তাঁর পরিচয় (উমা হৈমবতীর কাছ থেকে) জেনেছিলেন, সেই কারনে দেবতাদের মধ্যে ইন্দ্রই  শ্রেষ্ট। 

অগ্নি ও বায়ু দিব্যজ্যোতি স্বরূপ যক্ষের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে, প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিলেন। অহঙ্কারে মত্ত এই দুই দেবতা নিজের শক্তির জাহিরা করবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেন নি। অন্যদিকে ইন্দ্র দূর থেকে তাঁর আবির্ভাব প্রতক্ষ্য করেছিলেন, অর্থাৎ তাঁকে  সাক্ষাৎ করেছিলেন। কাছে যেতেই তিনি (দিব্যজ্যোতি) অদৃশ্য হয়ে যান। কিন্তু তিনি সেখান থেকে ফিরে আসেন নি, বরং তার মধ্যে একটা বিশ্বাস ছিলো, যে কাছেপিঠে কোথাও না কোথাও তিনি আছেন। তিনি অবশ্যই আছেন। আর তাই  ইন্দ্র অনুসন্ধানে রত হয়েছিলেন। এই অনুসন্ধান হচ্ছে, সাধনক্রিয়ায় লেগে থাকা। আর এর ফলে চিদাকাশে বিদ্যা স্বরূপ উমা হৈমবতীর আবির্ভাব ঘটে। এই বিদ্যা তাঁকে একসময় ব্রহ্মকে জানতে সাহায্য করে। তো তিন দেবতার মধ্যে ইন্দ্রদেবতাই  প্রথম তাঁর সাক্ষাৎ ও অপরোক্ষ জ্ঞান লাভ করেছিলেন।  এইজন্য ইন্দ্রকে বলা হচ্ছে শ্রেষ্ঠ দেবতা। 

তো দেবতা অর্থাৎ এক  বা একাধিক গুনের অধিকারী।  এই দেবতাগণই জগতে সবচেয়ে শক্তিশালী। প্রাকৃতিক সমস্ত শক্তির প্রতিভূ এই দেবতাগণ। কিন্তু এঁদের নিজস্ব কোনো শক্তি নেই। সমস্ত শক্তির উৎস যেমন ব্রহ্ম, তেমনি দেবতাদের শক্তির উৎসও সেই ব্রহ্ম। 

জগতে দুটো শক্তি সর্বদা ক্রিয়া করছে।  একটা সুরশক্তি আর একটা অসুরশক্তি। একটা কল্যাণের পথ, আর একটা অকল্যাণের পথ। একটা প্রবৃত্তি আর একটি নিবৃত্তি, একটা শুভ আর একটা অশুভ।  একটা নঙ্গর্থক আর একটা সদর্থক।  এই দুই শক্তির নিয়ত সংগ্রামকে বলা হয় সুরাসুরের যুদ্ধ। এই সংঘর্ষ নিরন্তর চলছে সর্বত্র। আমাদের সবার মধ্যেও  এই দুই শক্তির ক্রিয়া চলছে। আমাদের মধ্যে যে সু-প্রবৃত্তি তাকে বলা হয় দৈবী শক্তি। যা আমাদের কল্যাণকর কাজে উৎসাহ জোগায়। আর যে কু-প্রবৃত্তি বা আসুরিক শক্তি তা আমাদের অকল্যাণকর কাজে নিয়োগ করে। এই দুই শক্তির ক্রিয়ার ফলেই, আমরা কখনও সুখ ভোগ করি, কখনো দুঃখ ভোগ করি। এই দুই শক্তিই ব্রহ্মশক্তি থেকে এসে থাকে। অজ্ঞানীদের মধ্যে আসুরিক শক্তি প্রবল থাকে।  আর জ্ঞানীদের মধ্যে দৈবশক্তি প্রবল থাকে। কিন্তু এই দুই শক্তির উৎসই  কিন্তু সেই ব্রহ্ম। 

যতক্ষন আমাদের চিত্তে অহঙ্কার থাকে অর্থাৎ অজ্ঞানের কনা  মাত্রও থাকে, ততক্ষন আমরা ব্রহ্মের স্বরুপ সম্পর্কে জ্ঞাত হতে পারি না। এই ব্রহ্মই আবার আমাদের হৃদয়ে অবস্থান করছেন। শুদ্ধ চিত্তে যখন ব্রহ্মজিজ্ঞাসা জাগে, তখন এই হৃদয়মধ্যে আবির্ভূতা  হন আমাদের বিবেক-বুদ্ধিরূপ উমা। ইনিই আমাদের ব্রহ্মজ্ঞান দান  করে থাকেন। জীবের নিজস্ব কোনো শক্তি নেই, যা কিছু, তা সে ভালো হোক বা মন্দ, সবই সেই ব্রহ্মশক্তিতেই ঘটে থাকে। কিন্তু যার মনের মধ্যে বিদ্যারূপিণী উমার উদয় হয়েছে, তিনি তখন সদগুণের চর্চা করতে শুরু করেন। আর এই কারণেই ব্রহ্মবিদ্যার চর্চা অর্থাৎ ব্রহ্মধ্যান করতে শুরু করেন। আর এই ব্রহ্মধ্যান তাঁকে শ্রেষ্ঠত্বের অলঙ্কার পড়িয়ে দেয়।  জগতের তিনি সকলের পূজ্য হয়ে ওঠেন।  

------------------
 

"তস্য এষ  আদেশো যৎ এতৎ বিদ্যুতো বাদ্যুতৎ আ ইতীন  নামীমিষৎ আ ইতি অধিদৈবতম ।"  (০৪/৪) 

এখানে ব্রহ্ম সম্পর্কে একটা নির্দেশ (উপমা) দেওয়া হচ্ছে।  ব্রহ্ম  যেন এক ঝলক বিদ্যুতের মতো, অথবা চোখের নিমেষের মতো। এই হচ্ছে দৃশ্যমান জগৎ থেকে দুটো উদাহরণ। 

প্রতিটি সৃষ্ট বস্তুর মধ্যে ব্রহ্ম বিরাজ করছেন। তা সে জৈব বলুন বা অজৈব, জড় বলুন বা চেতন, মনুষ্য বলুন বা দেবতা, সবার মধ্যেই চেতনারূপ, জ্ঞানস্বরূপ ব্রহ্মসত্তা। কোথাও জ্ঞানরূপে, কোথাও অজ্ঞানরূপে, কোথাও চৈতন্যরূপে কোথাও অচেতনরূপে - সর্বত্রই ব্রহ্মসত্তা। ব্রহ্মভিন্ন কোথায় কি আছে ? এই যে শূন্য বলে যাকে  আমরা মনে করি, তাও ব্রহ্মময়। এখন কথা হচ্ছে সবই যদি ব্রহ্ম তবে তা আমাদের অনুভূতিতে আসে না কেন ?
 
আমরা আবার সেই আগের কথাগুলো একবার স্মরণ করি।  "চেতনার দুটো সংস্করণ - একটা মানব চেতনা, আর একটা ঐশী চেতনা। সাধনার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানব চেতনাকে ঐশী চেতনায় উন্নীত করা।  এই কাজে সাহায্য করে আমাদের জ্ঞান।  জ্ঞান হচ্ছে এই দুয়ের  মাঝে একটা সেতুবিশেষ। শুদ্ধ মনের বোধের দ্বারা সত্যের মনন থেকে  জ্ঞানের সূত্রপাত হয়। মন সেই দেবতা যার মধ্যে মনন ক্রিয়া চলতে পারে। আর এই মনের পিছনে আছে আলোকরূপ ইন্দ্র, দেবতাদের মধ্যে যিনি শ্রেষ্ঠ। আমাদের শুদ্ধ মন যখন নিজেকে উন্মুক্ত করে, তখন আমাদের সমস্ত ইন্দ্রিয় পশ্চাৎমুখী অর্থাৎ অন্তর্মুখী হবে। তখন বাক পরাবাকের দিকে দৃষ্টি দেবে, প্রাণ সূক্ষ্ম হয়ে সুষুম্না দিয়ে উর্দ্ধমুখী হতে শুরু করবে। অর্থাৎ আমাদের সমস্ত ইন্দ্রিয়শক্তি যে যেখানেই থাকুক না কেন, তখন অন্তর্মুখী হয়ে বিশ্বশক্তির দিকে ধাবিত হতে শুরু করবে।  এই ইন্দ্রিয়াদি দেবতাদের বিশেষ মহিমা আছে, যার দ্বারা মানুষ পুষ্ট  হয়ে এমন অবস্থায় আসতে  পারে, যাতে করে তার সমস্ত বৃত্তি বিশ্বশক্তিকে উপলব্ধি করবার শক্তি পায়।  বিশ্বশক্তি সমস্ত কিছুর মধ্যে আবির্ভূত হন  বটে, সমস্ত কিছুকে প্রকাশ করেন বটে, কিন্তু নিজেকে এই প্রকাশের মধ্যে গুলিয়ে ফেলেন না। তিনি নিজেকে বিবৃত করেন না। ইন্দ্রিয় সকল এঁকে অস্পষ্টরূপে অনুভব করেন, তার সান্নিধ্য অনুভব করেন, কিন্তু এঁকে  জ্ঞাত হতে পারেন  না।"

আমাদের এই দেহপুরেই আছেন সেই পরব্রহ্ম। কিন্তু আমাদের এই দেহ এবং দেহে স্থিত ইন্দ্রিয়সকল পূবের ও  উত্তরের জানালা বন্ধ  করে কেবলমাত্র দক্ষিণের ও পশ্চিমের জানালা খুলে একদিকে যেমন দক্ষিণী হাওয়ায় (বিষয়সুখে) উদ্বেল হয়ে আছে, তেমনি পশ্চিমের সূর্যাস্তের (মৃত্যু) করুন অবস্থার সাক্ষী হয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হচ্ছে ।  দেহে স্থিত সমস্ত ইন্দ্রিয়রূপ জানলা-দরজা খুলে দিতে হবে। অর্থাৎ এঁকে পরিচ্ছন্ন করতে হবে, শুদ্ধ করতে হবে। সূক্ষ্ম অনুভূতি সম্পন্ন বা সূক্ষ্ম দৃষ্টি সম্পন্ন হতে হবে। বদ্ধ ঘরে বসে কে কবে অসীম আকাশের সন্ধান পেয়েছে ? বদ্ধ  ঘরে বসে কে কবে চাঁদের জ্যোৎস্না অনুভব করতে পেরেছে ? 

"আমরা এর আগে শুনেছি, মনে স্তর  ভেদে  ৭ রকম।  এগুলো হচ্ছে, চঞ্চল মন বা  একাগ্র মন, প্রজ্ঞা মন, শুদ্ধ মন, বোধি মন, দিব্য  মন, শূন্য মন ও চিন্ময় মন। অর্থাৎ আমাদের যে স্থূল মন (যা খাদ্যকণার সূক্ষাতিসূক্ষ্ম অংশ)  তা তপঃ প্রভাবে বা সাধনার  ফলে ধীরে ধীরে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হতে থাকে।  চঞ্চল থেকে একাগ্র, একাগ্র থেকে প্রজ্ঞা, প্রজ্ঞা থেকে শুদ্ধ, শুদ্ধ থেকে বোধি, বোধি থেকে দিব্য , দিব্য  থেকে শূন্য, সবশেষে শূন্যমন থেকে চিন্ময় মনে রূপান্তরিত হয়। এই চিন্ময় মন ব্রহ্মে বিলীন হয়ে স্বয়ং ব্রহ্ম হয়ে যান। অর্থাৎ চিন্ময় মন আর ব্রহ্ম  তখন একাকার। দেখুন, আমাদের এই যে স্থূল দেহ তা একদিন এই পৃথিবীর মাটিতে মিশে যাবে। অর্থাৎ যেখান সে এসেছিলো, সেখানেই সে বিলীন হয়ে যাবে। ঠিক তেমনি এই যে  মন এটিও ব্রহ্ম থেকে উৎপন্ন হয়ে আবার সেই ব্রহ্মতে বিলীন হয়ে যায়। এই সত্য আমাদের কাছে ধরা পড়ে  না। কিন্তু আপনি যখন গভীর ধ্যানে মগ্ন হতে পারবেন, তখন আপনার কাছে এই সত্য ধীরে ধীরে পরিস্ফুট হবে। সুতরাং মনকে যিনি সৃষ্টি করেছিলেন, মন আবার তার উৎসে ফিরে যাবে। এই জ্ঞানে যতক্ষন না আপনি প্রতিষ্ঠিত হতে পারছেন, ততক্ষন আপনার সমস্ত উপাসনা বৃথা।"

ব্রহ্মকে জানতে গেলে আগে, প্রথমে শাস্ত্রজ্ঞান অৰ্জন করতে হবে। তবে শাস্ত্রের দ্বারা যে ব্রহ্মজ্ঞান তা আমাদের  পরোক্ষ জ্ঞান। শাস্ত্র অর্থাৎ শাসন করা। বেদান্ত শাস্ত্র  কিছু বিধি-নিষেধের সাহায্যে ব্রহ্মকে উপলব্ধি করবার জন্য উদ্বুদ্ধ করে থাকে। শাস্ত্র অধ্যয়ন হচ্ছে ব্রহ্মচিন্তন। এই ব্রহ্ম চিন্তন অর্থাৎ সমস্ত কিছুর কারনের যিনি  কারন তাঁর চিন্তন। এই ব্রহ্ম চিন্তন সাধককে স্থূলজগৎ থেকে সূক্ষ্ম জগতে অর্থাৎ স্থূল সত্য থেকে সূক্ষ্ম  সত্যে নিয়ে যাবে। জীব প্রতিদিন সুষুপ্তি কালে এই সৎস্বরূপ ব্রহ্মের সাথে মিলিত হচ্ছে।  (ছান্দোগ্য : ৬.৮.১) কিন্তু এসব তার স্মৃতিতে থাকে না। 

যিনি আদিত্যের অন্তরে থেকে আদিত্যকে নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি ব্রহ্ম।  আবার এই সূর্য্যের প্রতীক হচ্ছে  জীবশরীর। এই  জীবশরীরের যিনি অন্তর্যামী তিনি ব্রহ্ম। আবার আকাশ (উদ্গীথ) হচ্ছে ব্রহ্মের  গুনের (সগুন ব্রহ্ম) প্রকাশ। জীবশরীরের মধ্যে চিদাকাশ হচ্ছে সগুন ব্রহ্ম। ভূত সমূহ এই আকাশ থেকে উৎপন্ন হয়, আবার এই আকাশেই লয় প্রাপ্ত হয়।  আবার এই আকাশের মধ্যে আছে প্রাণ (প্রাণবায়ু নয়, এটি প্রাণেরও  প্রাণ)। ভূৎসকলের মধ্যে যে প্রাণ অর্থাৎ জীবনীশক্তি এসবই একসময় প্রাণের মধ্যে লয় প্রাপ্ত হয়। 

যে জ্যোতি সকলকিছুর উর্দ্ধে আলোক প্রদান করছেন, যোগীপুরুষ সেই জ্যোতির ধ্যান করবেন।  (ছান্দোগ্য : ৩.১৩.১৭) জ্যোতি বলতে কিন্তু  প্রাকৃতিক যে আলো তার কথা বলা হয়নি, এই জ্যোতি হচ্ছেন ব্রহ্ম। "জ্যোতিঃ-দর্শনাৎ" (ব্রহ্মসূত্র - ১/০৩/৪০)

উপনিষদ বলছেন, বিদ্যুৎ যেমন ক্ষনিকের তরে প্রকাশ পেয়ে পরক্ষনেই অদৃশ্য হয়ে যায়, চক্ষু যেমন ক্ষণকালের জন্য উন্মিলিত হয়ে পুনরায় নিমীলিত হয়ে যায়, ব্রহ্মও তেমনি চিদাকাশে ক্ষণকালের জন্য আবির্ভূত হয়ে পুনরায় তিরোহিত হয়ে যান। সাধকের কাজ হচ্ছে এই ক্ষণকে দীর্ঘায়ীত করা। মহাত্মাগণ বলে থাকেন, অজ্ঞানীর হৃদয়েও  ক্ষনে ক্ষনে এই ব্রহ্মপ্রকাশ ক্রিয়া চলছে , কিন্তু অজ্ঞান পুরুষ বিষয়চিন্তায় মগ্ন থাকার জন্য, এটিকে ধরতে পারেন  না। কিন্তু জ্ঞানযোগী পুরুষ, বিষয়চিন্তা রহিত সচেতন পুরুষ এই অবস্থাকে স্থায়ী করবার জন্য প্রয়াস করে থাকেন। 
-------------- 


"অথ অধ্যাত্মং যৎ এতদ গচ্ছতি ইব চ মনঃ অনেন চ এতদ উপষ্মরতি অভিক্ষং সঙ্কল্পঃ। " (০৪/০৫) 

এখন অধ্যাত্ম বিষয়ে উপদেশ দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, সাধক যেন মনকে ব্রহ্মে প্রবেশ করান । মন যখন বারংবার ব্রহ্মকে নিকটবর্তী রূপে স্মরণ করে, অর্থাৎ মনের মধ্যে যখন ব্রহ্মধ্যানের সংকল্প হয়, তখন ব্রহ্ম-উপলব্ধি হয়ে থাকে। 

সাধকের যে ব্রহ্ম-উপলব্ধি, তা আসলে মনের সঙ্কল্পের কারনে ঘটে থাকে। কথায় বলে আপনি যা চিন্তা করবেন ধীরে ধীরে আপনি তাই হয়ে যাবেন। আপনার চিন্তাই আপনার ভবিষ্যৎ রূপরেখা গড়ে দেবে। আমরা আগেই শুনেছি, সাধারনের মন  চঞ্চল। এই চঞ্চল মন বিষয় থেকে বিয়ান্তরে ঘুরে ঘুরে বিষয়জ্ঞান বা বিষয়ভোগে সাহায্য করছে। এই মনে তখন কেবলমাত্র বিষয়বোধ হয়ে থাকে। সাধারনের কাছে এমনকি অর্জ্জুনের মতো জন্মান্তরের সাধকের কাছেও মন চঞ্চল রূপে প্রতিভাত হয়ে থাকে। কিন্তু মনের এটি একমাত্র গতি নয়। এই মনকে যখন ইন্দ্রিয়সকল থেকে ঘুরিয়ে অন্তর্মুখী করা যায়, তখন মনের বোধশক্তি স্থূল বিষয় থেকে সূক্ষ্ম বিষয়ের দিকে ধাবিত হয়। মন বস্তুত চঞ্চল নয়, মন স্থির। মনের এই স্থিরতা আমরা অনুভব করতে পারি, যখন মনকে বিভিন্ন বিষয় থেকে প্রথমে একটি মাত্র বিষয়ে নিবদ্ধ করতে পারি। অর্থাৎ আমরা যখন মনকে একাগ্র করতে পারি, তখন এই একই মন নির্দিষ্ট বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে পারে। আর সেই বিষয়ে তখন আমরা অধিক জ্ঞান লাভ করতে পারি। আবার এই মন যখন আমরা শুদ্ধ থেকে শুদ্ধতর করতে পারি তখন এই একই মন দিব্যভাব সম্পন্ন হয়ে উঠতে পরে। অর্থাৎ এই একই মন তখন দিব্যদৃষ্টি সম্পন্ন হয়ে উঠতে পরে। এই সত্য আপনি যোগ-সাধনার  সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি করতে পারবেন।  

মন, শুদ্ধ থেকে বোধি, বোধি থেকে দিব্য , দিব্য  থেকে শূন্য, সবশেষে শূন্যমন থেকে চিন্ময় মনে রূপান্তরিত হয়। এই অবস্থাকে কেউ কেউ বলে থাকেন পরাভক্তির অবস্থা।  এই চিন্ময় মন ব্রহ্মে বিলীন হয়ে স্বয়ং ব্রহ্ম হয়ে যান। অর্থাৎ চিন্ময় মন আর ব্রহ্ম তখন এক হয়ে যায়। এইজন্য উপনিষদের ঋষি বলছেন, মনকে ব্রহ্মগামী করে তুলুন। 
দেখুন, ব্রহ্ম  সর্বত্র।  ব্রহ্ম কাছেও আছেন, আবার দূরেও আছেন। ব্রহ্ম অতিক্ষুদ্র আবার অতিবৃহৎ। গায়ত্রী মন্ত্রের যথার্থ অর্থ যাঁরা ধরতে পেরেছেন, তাঁরা এই অতি বৃহৎ ও অতি ক্ষুদ্র ব্রহ্মেরই উপাসনা পদ্ধতি আয়ত্বে আনতে  পেরেছেন।  একটা জিনিস জানবেন, আমরা সবাই এমনকি এই যে বিশ্ব-ব্রহ্মান্ড  এসবই ব্রহ্ম-সমুদ্রে  ডুবে আছে। আমাদের অন্তরে ব্রহ্ম, বাইরেও ব্রহ্ম। এই ভাবনা মনের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে হবে। নিরন্তর চেষ্টার দ্বারা ব্রহ্মস্মৃতিকে  জাগিয়ে তুলতে হবে।  তাঁকে ধরে রাখতে হবে, তবেই আমাদের ব্রহ্মস্মৃতি সুদৃঢ় হবে। 

আমাদের আত্মবোধ এই দেহ-ইন্দ্রিয়ের মধ্যে প্রবেশ করে সীমাবদ্ধ আকার নিয়েছে। এই যে ক্ষুদ্র দেহাত্মবোধ এর উর্দ্ধে উঠতে হবে। মনটাকে গুটিয়ে আনুন, আর দেহটাকে ছড়িয়ে  দিন। মনে মনে ভাবুন, এই দেহটাতো একসময় ছড়িয়েই ছিলো, আবার একসময় ছড়িয়ে যাবে।  পাঁচভুতকে কুড়িয়ে এনে এই দেহ বানানো হয়েছিলো, আবার প্রাণের নিঃসরণে এই দেহ পঞ্চভূতে মিলিয়ে যাবে। এই সত্যকে অনুভূতিতে আনবার চেষ্টা করুন। যখন এই দেহ ছিল না, তখনও আপনি ছিলেন।  আপনার দেহ  যখন শিশু অবস্থায় ছিলো, তখন আপনি ছিলেন, আবার আপনার দেহ পরিবর্তিত হতে হতে বা বৃদ্ধি পেতে পেতে যুবকের অবস্থায় এসেছিলো, আবার একসময় বৃদ্ধ অবস্থা নেবে, একসময় এই দেহ পঞ্চভূতে মিলিয়ে যাবে। এসব আমরা চোখের সামনে দেখছি।  কিন্তু আমাদের চৈতন্য  হয় কোই  ? একটু ভাবুন, উপনিষদের ঋষিদের কথায় বিশ্বাস করুন - আপনি আগেও ছিলেন, আজও  আছেন, আবার ভবিষ্যতেও থাকবেন।  কিন্তু এই দেহ পরিবর্তন হতে হতে একদিন চোখের সামনেই উধাও  হয়ে যাবে। 

এই যে চঞ্চল মন - এটি মনের আসল চরিত্র নয়। এটি স্থির - আর এই স্থির মনের মধ্যেই আতস্মৃতি আছে। এই যে স্মৃতি বা আত্মস্মৃতি - এরই নাম সংকল্প। এই মন যেমন পদার্থের সূক্ষ্মতম অংশ দিয়ে তৈরী, তেমনি এই মনের মধ্যে আছে আরো একটা মন যা কেবলই চেতনা। এই চেতনাকে কেউ কেউ বলে থাকেন মনের সূক্ষ্মতম শুদ্ধতম অবস্থা, বা চিন্ময় অবস্থা। 
মনের মধ্যে যখন এই আত্মস্মৃতি জেগে ওঠে, এর পরে আসে সমাধির অবস্থা। সমাধি আর কিছুই নয়, মনের সাম্যাবস্থা।  এইসময় যোগীপুরুষ চৈতন্যবান হয়ে ওঠেন। সংকল্পে থাকে স্পন্দন - যা  সৃষ্টির মূলীভূত কারন। এই সংকল্পের ভিতরে প্রবেশ করতে পারলেই আত্মজ্ঞানের অর্থাৎ ব্রহ্মজ্ঞানের অভিব্যক্তি হয়।  

----------


"তৎ হ তদ্বনং  নাম তৎ বনম  ইতি উপাসিতব্যম। স য এতৎ এবং বেদ অভি হৈনং  সর্বাণি ভুতানি সংবাঞ্ছতি। " (০৪/০৬) 

তিনিই (ব্রহ্ম) বরণীয়। আর বরণীয় বলেই তাঁর উপাসনা  করা উচিত। যিনি ব্রহ্মকে এইভাবে জানেন, তিনি সকলের কাছে পূজনীয়।

দেখুন ব্রহ্মকে জানা যায় না। ব্রহ্মে স্থিতি লাভ করতে হয় ।  কেননা জানা কাজটা সম্পন্ন করতে গেলে দুটি সত্তার প্রয়োজন হয়।  এক হচ্ছে যিনি জানছেন অর্থাৎ জ্ঞাতা আর  যে বিষয়কে জানছেন অর্থাৎ জ্ঞেয়। কিন্তু ব্রহ্ম চচ্ছেন স্বয়ং জ্ঞান। এখানে জ্ঞাতা জ্ঞেয় বলে কিছু থাকে না। ব্রহ্ম থেকে সবকিছুর উৎপত্তি হয়েছে, আবার সেই ব্রহ্মে লয় প্রাপ্ত হবে।  তদ্বনং কথাটার অর্থ হচ্ছে প্রেম বা ভালোবাসা। অর্থাৎ ব্রহ্ম হচ্ছেন প্রেমস্বরূপ। তো কোনো সাধক যখন ব্রহ্মে স্থিত হন, অর্থাৎ তিনি যখন ব্রহ্মময় হয়ে যান, তখন তিনি কেবল মাত্র, প্রেমানন্দ স্বরূপ। তো প্রেমানন্দ পুরুষ সদা আনন্দময়। আর প্রেমময় পুরুষ সবাইকে আকর্ষণ করে থাকেন । সবাই তাঁকে আপনজন বলেই মনে করে। সবাই তার কাছে ছুটে  আসে। 

এই শ্লোকের আরো একটা দিক আছে, আর  সেটা হচ্ছে তিনি ব্রহ্ম বা আত্মা বা যেকোনো নামেই অভিহিত হতে পারেন। তাঁকে  আমরা পরম[পিতা বলে ডাকতে পারি, তাঁকে আমরা সর্বশক্তিমান বলে ডাকতে পারি।  কিন্তু এতে করে আমরা যেন নিজেদেরকে ব্রহ্ম থেকে আলাদা করে রাখি। কিন্তু তাঁকে যদি আমরা প্রেম বা ভালোবাসা নামর  ডাকতে পারি,  তবে যেন সেই নাম আমাদের আমাদের আত্মস্বরূপের উপল্বদ্ধির এক হয়ে যায়।  এখানে কোনো ভেদবোধ থাকে না। এইজন্য উপনিষদের ঋষি এঁকে তদ্ব্ন (প্রেম) নামে উপাসনা করতে বলছেন, যা আমাদের সবার মধ্যেই বিরাজ করছে। এখানে (তদ্ব্ন বলতে) কেবল গুনকে বোঝাচ্ছে। এখানে গুন্ ও নাম একাকার হয়ে গেছে।
মহাত্মা গুরুনাথ বলছেন, পরমেশ্বর অনন্ত অনন্ত অনন্ত গুনের সমন্বয়। আমাদের সবার মধ্যেও সেই একই গুন্ সুপ্ত আকারে রয়েছে। আর এই অনন্ত গুনের মধ্যে প্রেমগুণ হচ্ছে সর্বোৎকৃষ্ট। তাই গুন্  সাধনাই শ্রেষ্ট।  আর প্রেম গুনের সাধনা সর্বোৎকৃষ্ট। উপনিষদের এই শ্লোকে সেই উত্তম প্রেমগুনের সাধনার কথা বলা হয়েছে। তো বস্তু বিষয়  ব্যক্তির উর্দ্ধে উঠে কেবল গুনের সাধনা করতে হবে, প্রেম গুনের সাধনা করতে হবে। এই হচ্ছে কেন উপনিষদের ঋষির নির্দেশ। পরের শ্লোকে আমরা সেই গুনসাধনার উপায় সম্পর্কে শুনবো।  
------ 


"উপনিষদং ভো ব্রুহী ইতি উক্তা ত উপনিষদ ব্রাহ্মীং বাব ত উপনিষেদম অব্রুম ইতি।" (০৪/০৭)

হে (আচার্য) আমাকে উপনিষদ বলুন। (আচার্য বললেন) তোমাকে উপনিষদের কথাই বলা হয়েছে, যা ব্রহ্মবিষয়ক । 

শিষ্য  বলছেন, আমাকে উপনিষদ বিষয়ে বলুন। আশ্চর্য ! আমরা এতক্ষন যা কিছু শুনছি, সবই উপনিষদের বাণী। তাহলে এমনতর আপাত-নির্বোধ প্রশ্ন সাধকের মধ্যে কি করে এলো ? আসলে এতক্ষন যা কিছু বলা হয়েছে, তা ব্রহ্ম বিষয়ক। এখন কথা হচ্ছে, সমস্ত উপনিষদে আলোচ্য বিষয় হচ্ছে ব্রহ্ম, ব্রহ্মজ্ঞান। কিন্তু  নিছক এই ব্রহ্মজ্ঞানের কথা শুনে আমাদের কি হবে, যদি না তাঁকে আমরা সম্যক রূপে উপলব্ধি করতে পারি ? শুকনো জ্ঞান, শুষ্ক তত্ত্বকথা দিয়ে কি হবে ? শুধু কথায় কখনো জিরে ভেজে না।  জিরে ভেজাতে গেলে উপকরণ (জল-চিড়ে) ও কর্ম্ম লাগে। অধ্যাত্ম জ্ঞান শুধু জানার বিষয় নয়, এটি উপল্বদ্ধির বিষয়। যদি উপল্বদ্ধিতে না আসে, তবে জানবেন, সেই জ্ঞান আমাদের ব্যবহারিক দিক থেকে নিষ্ফলা। এ আমাদের কোনো কাজে আসে না। আগুন সর্বত্র আছে, আকাশে বাতাসে সর্বত্র আগুন আছে, কিন্তু এই আগুন আমাদের কোনো কাজে আসে না। কিন্তু কাঠে কাঠে ঘর্ষণের ফলে যখন আগুন আমাদের চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়ে উঠলো, তখন আমরা আগুনে রুটি  সেঁকে খেতে পারি। আগুন তখন আমাদের ব্যবহারিক প্রয়োজন মেটাতে পারে। বায়বীয়  জল সত্য, কিন্তু তা আমাদের তৃষ্ণা মেটাতে পারে না। জল যখন আকারে তরল হয়, তখন আমরা তা দিয়ে গলা ভেজাতে পারি। 

তো ব্রহ্ম সর্বত্র, ব্রহ্ম তোমার ভিতরে বাইরে সব জায়গায় আছে, ব্রহ্ম থেকে সবকিছুর উৎপত্তি, আমরা সবাই ব্রহ্ম থেকে এসেছি। সবাইকে আবার এই ব্রহ্মতে ফিরে যেতে হবে, ইত্যাদি তত্ত্বকথা দিয়ে আমাদের কি লাভ হবে - কোন কাজে আসবে ? তাই বাস্তববাদী সাধক বলছেন, আমাকে উপনিষদের কথা বলুন। এখন এই উপনিষদ বলতে  তিনি কি বোঝাতে চাইছেন ? 

প্রথমেই বলি , উপনিষদ বলতে কোনো গ্রন্থ বোঝায় না। উপনিষদ বলতে বোঝায় জ্ঞান। এই জ্ঞান কোনো বৈষিয়ক জ্ঞান নয়, এই জ্ঞান কোনো সাধারণ জ্ঞান নয়, এই জ্ঞান হচ্ছে পরাবিদ্যা - অর্থাৎ উচ্চকোটির জ্ঞান। এই জ্ঞানই মানুষকে চিরশান্তির রাজ্যে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু কথা হচ্ছে, এই জ্ঞান লাভ করতে গেলে, আমাদের কি করতে হবে ? মহাত্মাগণ বলছেন, এই জ্ঞান শুধু গ্রন্থলিপির মধ্যে পাওয়া যাবে না। এই জ্ঞান লাভ করতে গেলে, আমাদের যথার্থ আচার্যের কাছে যেতে হবে। যিনি স্বয়ং এই জ্ঞানের অধিকারী হয়েছেন। একটা প্রদীপ থেকে হাজার এক প্রদীপ জ্বলে উঠতে পারে। শূন্য থেকে প্রদীপ জ্বালানো যায় না। তাই আচার্যরূপ প্রদীপের কাছে যেতে হবে। রসগল্লার স্বাদ পেতে গেলে, সেই ময়রার কাছে যেতে হবে, যিনি স্বয়ং রসগল্লা খেয়েছেন, আবার অন্যকে খাওয়াতেও  পারেন। বহু যোগীপুরুষ এই ব্রহ্মজ্ঞানের আস্বাদ পেয়ে বুদ্ হয়ে নির্জনে অবস্থান করছেন। কিন্তু অন্যকে এই জ্ঞানদানে তাঁদের  কোনো উৎসাহ নেই। তাঁরা নিস্পৃহ - জড়বৎ হয়ে অবস্থান করছেন। এঁদের  মধ্যে থেকেই  কদাচিৎ এক-আধজন ব্রহ্মজ্ঞানী লোককল্যানে পাহাড় থেকে নিচে নেমে আসেন, জ্ঞানগঞ্জ থেকে, ব্রহ্মস্থিতি থেকে সংসারে নেমে আসেন। তখন তিনি সাধারনের মতোই আচরণ করেন, আর যোগ্য শিষ্য পেলে, তার সমস্ত ধন দান করে তৃপ্তি বোধ করেন। এই আচার্যকে আপনি খুঁজতে গেলে পাবেন না। আপনি নিজে যোগ্য হলে, তিনিই আপনার কাছে এসে উপস্থিত হবেন। কেননা আপনার আমার কি সাধ্য আছে, যে ব্রহ্মজ্ঞানীকে চিনতে পারবো ? তাই বলা হয়, যতক্ষন তাঁর অহেতুক কৃপাবারি বর্ষিত না হচ্ছে, ততক্ষন আমাদেরকে যোগ্য করবার প্রয়াস চালিয়ে  যেতে  হবে। 
উপনিষদ কথাটার আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে (উপ+নি+সদ) গমন করা, জ্ঞান হওয়া, যার দ্বারা জ্ঞান হয়। অজ্ঞান ভূমি থেকে জ্ঞানভূমিতে গমন করা। ব্রহ্মবিষয়ক রহস্যবিদ্যা যে গ্রন্থে আলোচনা হয়েছে, তাকে বলে উপনিষদ গ্রন্থ । সবশেষে বলি, উপনিষদ হচ্ছে আচার্য্যের "কাছে বসে" যে জ্ঞান শিষ্য লাভ করে। তো উপনিষদ কোনো পাঠ্যপুস্তক  নয়। উপনিষদ হচ্ছে  জ্ঞানের প্রজ্বলন। এক প্রদীপ থেকে যেমন অন্য প্রদীপ জ্বলে ওঠে, তেমনি আচার্য থেকে যে জ্ঞান শিষ্যের মধ্যে জেগে ওঠে তাকেই বলে উপনিষদ। উপনিষদ কথার অর্থ হচ্ছে কাছে বসা, আরো একুটু গভীর ভাবে বলতে হয়,  ঈশ্বরের কাছে বসা। 

তো শিষ্য এবার বলে উঠলেন, আমাকে উপনিষদের কথা বলুন। "উপনিষদম ভো ব্রুহী ইতি" অর্থাৎ ব্রহ্মবিদ্যা লাভের  জন্য আমাদের কি করতে হবে - তাই বলুন।  আসলে আমাদের মধ্যে একটা ধারণা  হচ্ছে, বিষয় লাভের  জন্য আমাদের যেমন কিছু না কিছু কর্ম্ম করতে হয়, তেমনি এই ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করতে গেলে, বা ব্রহ্মবিষয়কে উপলব্ধি করতে গেলেও আমাদের কিছু না কিছু করতে হবে। কিন্তু না করে কিছু পাওয়া যায়, এমন ধারণা আমাদের কাছে অমূলক। শিষ্য যখন গুরুর কাছে যান, তখন শিষ্য জানতে চান, তাকে কি করতে হবে, অর্থাৎ জপ্ ধ্যান প্রাণায়াম  ইত্যাদি করতে হবে - কেমন ভাবে করতে হবে।  জপ কতবার করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।  আসলে আমাদের এই যে শরীর এটি কর্ম্ম যেতে জাত, আবার কর্ম্মই এর স্বভাব-ধর্ম্ম। শ্রীকৃষ্ণ  বলছেন, তোমাকে কিছু না কিছু করতে হবেই, হয় খাবে, নয় খাবে না, হয় শোবে  নয় শোবে  না।  হয় পরিশ্রম করবে, নয় বিশ্রাম করবে। কিছু না করো শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়া করবে, খাদ্য হজম করবে, চোখের পাতা একবার বন্ধ  করবে, একবার খুলবে।  তো এক মুহূর্ত কেউ কর্ম্মহীন হয়ে থাকতে পারে না। তাই সোজা কথায় আমরা জানতে চাই, বেশি কথা না বলে বলুন, আমাকে কি করতে হবে। কিন্তু এই সত্যকে বোঝার চেষ্টা করুন যে,  ব্রহ্মবিদ্যা হচ্ছে ক্রিয়া, কারক ও  ক্রিয়াফল থেকে মুক্তির পথ। ভেদবুদ্ধি থেকে নিষ্কৃতির পথ। সেখানে কর্ম্মসমূহ কখনোই সাধনরূপে ইপ্সিত হতে পরে না। কোনো কর্ম্মই এই ব্রহ্মজ্ঞানের সহায়ক সাধন হতে পারে না। 

তাহলে কি আমাদের কিছুই করবার নেই ? কিছু না করার কৌশল শেখাই ব্রহ্মবিদ্যার সাধনা। শিষ্য যদি উত্তম অধিকারী হয়, তবে ব্রহ্মকথা  শ্রবণ  মাত্রেই তাঁর  অন্তরে ব্রহ্মজ্ঞানের স্ফূরণ ঘটবে। তা যদি না হয়, তবে ধরে নিতে হবে হয় আচার্য্য বা শিষ্য অথবা দু-জনই  এই ব্রহ্মবিদ্যার অধিকারী নন। কিন্তু সত্য হচ্ছে, আমরা কেউই অধিকারী হয়ে উঠতে পারিনি। তাই আজও এই মুদ্রিত উপনিষদ নামক গ্রন্থের মধ্যে ব্রহ্মকে খুঁজে ফিরছি। না পেয়েছি নিজেকে তৈরী করতে না খুঁজে পেয়েছি সেই আচার্যদেবকে যিনি ব্রহ্মজ্ঞানী। পণ্ডিত তো অনেক আছে, ব্রহ্মজ্ঞানী কোথায় ? এই সত্য কিন্তু উপনিষদের ঋষিগণ উপলব্ধি করেছিলেন, তাই শিষ্য মুখে বসানো হয়ে - "আমাকে উপনিষদের কথা বলুন"। অর্থাৎ আমার মধ্যে যেন ব্রহ্মজ্ঞান এক্ষুনি স্ফূরিত হতে শুরু করে, সেই মতো কিছু করুন । আমি যেন ঈশ্বরের কাছেই  বসি, ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করি। 

নরেন্দ্র (স্বামী বিবেকানন্দ) ধ্যানের মধ্যে অনেক সময় নিজের প্রতিমূর্তিকে দেখতে পেতেন।  নরেন্দ্র ভাবতেন, এ আবার কে ? ঠাকুরকে বলতেই তিনি বললেন, ধ্যানের উচ্চ অবস্থাতে অমন হয়ে থাকে। নরেন প্রথম প্রথম দেবদেবী মানতেন না। আবার "সবই ব্রহ্ম" অর্থাৎ অদ্বৈত দর্শনে তার বিশ্বাস ছিল না। জীব ও ব্রহ্মের অভেদ তত্ত্ব তিনি মানতেন না। বলতেন, মুনি-ঋষিদের নিশ্চয় মাথা খারাপ ছিল। ঠাকুরের নির্দেশে অষ্টাবক্র সংহিতা পাঠের পরে, ধীরে ধীরে তাঁর মত পরিবর্তন হয়েছিল। সেই অবিশ্বাসী নরেন এর পরে একদিন নিজ মুখে বলছেন, "ঠাকুরের অদ্ভুত স্পর্শে মুহূর্তের মধ্যে ভাবান্তর উপস্থিত হইলো। .........দেখিতে লাগিলাম, ঈশ্বর ভিন্ন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অন্য কিছুই আর নাই। " 

এই হচ্ছে আচার্যের কাছে বসা, ঈশ্বরের কাছে বসা, উপনিষদের তাৎপর্য্য। নিজের সাধন জোরে, নাকি গুরুদেবের সান্নিধ্যের সৌজন্যে এই ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হয় ? আসলে দুইই সমানভাবে গুরুত্ত্বপূর্ন।  
---------------------


তস্যৈ তপো দমঃ কর্মেতি প্রতিষ্ঠা বেদাঃ সর্ব অঙ্গানি সত্যম আয়তনম।  (০৪/০৮) 

এই  (ব্রহ্মজ্ঞান) বিষয়ে তপঃ তপস্যা বা কৃচ্ছ সাধন,  দম অর্থাৎ আত্মনিগ্রহ, কর্ম্ম অর্থাৎ আধ্যাত্মিক অনুশীলন, প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ ভিত্তি, বেদাঃ অর্থাৎ সর্বোচচ  জ্ঞান, অঙ্গানি অর্থাৎ বেদান্ত এবং সত্য এই  ব্রহ্মজ্ঞানের আবাস ।

গীতাকার শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন (গীতা-শ্লোক নং - ১৮/৪২) বলছেন, "শমো দমস্তুপঃ শৌচং ক্ষান্তি আৰ্জবম এব চ।  জ্ঞানং বিজ্ঞানম আস্তিক্যং ব্রহ্মকর্ম্ম স্বভাবজম।" অর্থাৎ শম দম তপঃ ক্ষমা আর্জব জ্ঞান বিজ্ঞান ও আস্তিক্য বুদ্ধি এই হচ্ছে ব্রহ্মজ্ঞান পিপাসুর স্বভাবজাত গুন্। ঋষি পতঞ্জলি যোগদর্শনের সাধন পাদে (শ্লোক-২৯) বলেছেন, যম-নিয়ম-আসন-প্রাণায়াম-প্রত্যাহার-ধারণা-ধ্যান ও সমাধি এই হচ্ছে অষ্টাঙ্গ যোগের সিঁড়ি। কেন-উপনিষদের ঋষি বলছেন, ব্রহ্মকে জানতে গেলে আমাদের তপঃসাধনা, দমসাধনা, অধ্যাত্ম কর্ম্মে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে হবে।  বলছেন, এই জ্ঞানের আবাস  স্থল হচ্ছে সত্য।  আর  বেদ  সমূহ হচ্ছে এই জ্ঞানের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। 

দেখুন, পুরুষ সংস্কারবশে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে দেহ ধারণ  করেছে। আর দেহে স্থিত হয়ে তাঁর আত্মস্বরূপের বিস্মৃতি ঘটেছে। এবার স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলতে হবে। যদিও কালের গতির সঙ্গে সঙ্গে এই স্মৃতি একসময় জেগে উঠবেই। তথাপি মহাত্মাগণ বলে থাকেন, এই কালের জন্য অপেক্ষা নয়। কারন এই দেশ-কাল জীবকে অশেষ দুঃখ কষ্ট ভোগ করাচ্ছে। এখান থেকে সত্তর নিষ্কৃতি পেতে  গেলে,  আবার সেই প্রকৃতি বিমুখ হতে হবে। তো এর জন্য দরকার : 
১. তপস্যা : কায়-মন-বাক্যে সত্যের অনুসরণ করতে হবে। চিত্তকে একাগ্র করে এই শরীরের, মনের এবং বাক্যের পিছেনে কোন শক্তি কাজ করছে, তার অনুসন্ধান করতে হবে। 
২. দম  : বাহ্য ইন্দ্রিয় ও অন্তর-ইন্দ্রিয়ের সংযম করতে হবে। 
৩. কর্ম্ম - ঈশ্বরের প্রীতির উদ্দেশ্যে নিষ্কাম কর্ম্ম করতে হবে। 
৪. জ্ঞান : সমস্ত জ্ঞানের উৎস হচ্ছে অপৌরুষেয় বেদ। এখানেই ব্রহ্মজ্ঞানের কথা লিপিবদ্ধ করা আছে। তাই বেদের জ্ঞানকে আয়ত্ত্বে আনতে  হবে। 

মোদ্দা কথা সত্যকে আশ্রয় করতে হবে, মিথ্যাকে বৰ্জন করতে হবে। নিত্যকে সাথী করতে হবে, অনিত্যকে পরিহার করতে হবে। এই হচ্ছে উপনিষদের নির্দ্দেশ।  

যো বা এতাম  এবং বেদ  অপহত্য পাপমানম অনন্তে 
স্বর্গলোকে জ্যেয়ে প্রতিতিষ্ঠতি প্রতিতিষ্ঠতি। (৪/০৯) 

যিনি ব্রহ্মকে এইভাবে জানেন, তিনি সমস্ত অজ্ঞানতা অতিক্রম করে সর্বশ্রেষ্ঠ স্বর্গলোকে অর্থাৎ পরব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত হন। 

উপনিষদের উল্লেখিত ব্রহ্মস্বরূপের যে ব্যাখ্যা, তাঁকে যিনি উপল্বদ্ধিতে আনতে  পেরেছেন, তিনি আত্মজ্ঞান লাভ করেছেন। সব অজ্ঞানতার উর্দ্ধে উঠে তিনি জন্ম-মৃত্যুর পারে চলে যান। 

উপনিষদ হচ্ছে জ্ঞানের স্রোতস্বীনি নদী। একটা জ্ঞানের ধারা। আমাদের যে ইন্দ্রিয়সকল আছে, বুদ্ধি-মন আছে, অর্থাৎ আমাদের যা কিছু আছে, তা দিয়েই আমাদেরকে ব্রহ্ম উপলব্ধি করতে হবে। চোখ দিয়ে বা পঞ্চ জ্ঞান ইন্দ্রিয় দিয়ে যে সাধনা তা প্রাকৃত ভূমির সাধন। প্রত্যেকটি  বিষয়ের গভীরেই তার কারন  লুক্কায়িত আছে। এই কারণকে  আমরা ধরতে পারি না।  রূপের সাধনা দিয়ে শুরু করে আমাদের অরূপের সাধনায় পৌঁছুতে হবে। শব্দ থেকে নিঃশব্দে। সাধনার ফলে আমরা যখন এই বিশুদ্ধ জগতের সন্ধান পাবো, তখন আমরাও বিশুদ্ধ বোধে বোধিত হবো। চঞ্চল মন ধীরে ধীরে চিন্ময় মনে রূপান্তরিত হবে। আমাদের অনুভব আমাদের বোধশক্তি বিষয়ের বাইরের দিক থেকে যখন ভিতরের দিকে প্রবেশ করবে, তখন এক অনিবর্চনীয় অনুভব হবে। বাইরের বিষয়ের মধ্যে পাওয়া  অনুভব থেকে অন্তরের অধ্যাত্ম বোধের অনুভব অনেক বেশি স্থায়ী ও সত্য। কেননা বাইরের বিষয় প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে, কিন্তু অন্তর অপরিবর্তনীয় সত্তায়  পরিপূর্ন। অনুভব যখন আত্মাতে প্রতিষ্ঠিত হয় তখন এক বিশেষ আবেশের মধ্যে মন প্রবেশ করে। এই আবেশের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হলে সমস্ত কর্ম্মফলের নাশ হয়। স্বর্গ পেরিয়ে সাধক তখন ব্রহ্মলোকের  বাসিন্দা হয়ে যান। 
-------------- 
কেন উপনিষদ রহস্যঃ চতুর্থ খন্ড সমাপ্ত হলো। 
-----------------



 












 











 


Comments

Popular posts from this blog

নিত্যকথা

ঈশ্বর ও তাঁর উপলব্ধি

সত্যধর্ম্ম ও প্রেম