যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - পঞ্চদশ অধ্যায় পুরুষোত্তম যোগঃ
২৩.১২.২০২২
শশাঙ্ক শেখর সঙ্কলিত যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - পঞ্চদশ অধ্যায় পুরুষোত্তম যোগঃ
এর আগের অধ্যায়ে গুণত্রয় সম্পর্কে শুনেছি, গুনত্রয়ের প্রভাব থেকে মুক্ত হবার উপায় সম্পর্কে বলেছেন। এবার ত্রিগুণময় এই যে সংসার এর উৎপত্তি বৃদ্ধি, ক্ষয় কিভাবে সাধিত হয়, জীবনের চরম লক্ষ কি, পরমপুরুষই বা কি, তিনি কোথায় থাকেন , কি করেন ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে বলা হয়েছে।
আমাদের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ। তাই আমরা সীমিত দৃষ্টির সাহায্যেই সমস্ত বস্তুর মধ্যে সসীম রূপ দেখতে পাই। যখন আমাদের আন্তর্দৃষ্টি উন্মিলিত হবে, তখন আমরা সমস্ত বস্তুর মধ্যে নিত্য পূর্ণ স্বরূপকে দেখতে পাবো। আর তখনই আমাদের অনুভবে আসবে আমাদের প্রকৃত সত্তাটিকে। এখন আমরা নিজেদেরকে পরিবেশসৃষ্ট একটা ক্ষুদ্র প্রাণী বলে মনে করি। আর তাই বেঁচে থাকার জন্য, সামান্য সুখের জন্য, ভিক্ষারির মতো পরিবেশের কাছে, ভিক্ষাপাত্র নিয়ে ম্লানমুখে দাঁড়িয়ে আছি। ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করেছি। পূর্ণত্বের জন্মগত অধিকারী সেই অমৃত-মানব আজ আবর্জনার স্তুপ থেকে সামান্য সুখ-কনা খুঁজে বেড়াচ্ছি পাগল-ভিখারির মতো। আমাদের সকলের মধ্যে এই যে নিকৃষ্ট মানবিক সত্তা এর পরিবর্তন দরকার। মানবকে তার নিজের মধ্যেই যে ভাগবত সত্তা আছে সেই জ্ঞানে শিক্ষিত করতে হবে। এই হচ্ছে আত্মজ্ঞান। এই জ্ঞান কোনো অহংবৃত্তির জ্ঞান নয়, একই আত্মা যা সকলের মধ্যে বিরাজ করছে তার জ্ঞান। এই একই সত্তা আমাদের সবার জীবন, আমাদের সবার গতি। এই জ্ঞানে আমাদের সবাইকে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। আর এই জ্ঞান অৰ্জনের স্বাধীনতা আমাদের সবার আছে, এ আমাদের জন্মগত অধিকার। আমরা যে আজ মানুষ হয়ে জন্মেছি, তা আমাদের ভাগ্য নয়, কোনো প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণেও নয়, এমকি কোনো রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, এটি আমাদের সংগ্রামের ফল স্বরূপ। জন্ম-জন্মান্তরের সাধনার ফল। কিন্তু মনুষ্য দেহ প্রাপ্তির পরেও, আমাদের জৈবিক অক্ষমতার কারনেই আমরা এই জ্ঞানের মধ্যে প্রবেশ করতে পারছি না। এই জৈবিক অক্ষমতা আমাদের দূর করতে হবে। এই জৈবিক অক্ষমতা দূর করতে পারলেই , আত্মার স্বাভাবিক পবিত্রতা, স্বাভাবিক পূর্ণতা উপলব্ধি করতে পারবো আমরা ।
কিন্তু কথা হচ্ছে, এই উপলব্ধি আমাদের কিভাবে আসবে ? আমরা আমাদের মূল সত্তাকে ভুলে গেছি, জগতের অন্ধগলিতে আমাদের পথ হারিয়েছি। কিন্তু কে আমাদের পথ দেখাবে ? কেউ আমাদের পথ দেখতে আসবে না, পথ আমাদের খুঁজে নিতে হবে। আর কেবলমাত্র আমরাই পারি এই পথের সন্ধান করতে। মন যত পবিত্র হবে, তত সহজে মনকে সংযত রাখা সম্ভব হবে। আর পবিত্র ও সংযত মনই পারে, ঈশ্বরের পথকে খুঁজে নিতে। আসলে বিষয়ের লোভে সংসারে ঢুকে পড়েছি। পালাবার পথ খোলাই আছে, কিন্তু বিভ্রান্ত মন সেই পথের সন্ধান পায় না। বদ্ধজীবের মুক্তির পথ খোলাই আছে, কিন্তু বিষয়াসক্ত মন বিষয়-বিষের আঠায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে। "চিচিং ফাঁক" এই অতি সাধারণ মন্ত্র বিষয়ে-বিমুগ্ধ মন ভুলে গেছে। তাই জেনে বুঝেও, সে মুক্তির পথের ধারে কাছে যেতে পারছে না। আমাদের প্রাচীন মুনিঋষিগন মানবকুলের কাছে নিরবিচ্ছিন্ন প্রেরণাপ্রবাহ উপনিষদ আকারে রেখে গেছেন। শ্রীমৎ ভগবৎ গীতা এই উপনিষদের সারগ্রন্থ। সমস্ত উপনিষদ-রুপী নদী এই গীতা সমুদ্রে এসে মিশেছে। প্রত্যেক মুনিঋষিদের তপঃলব্ধ জ্ঞান বেদ-বেদান্তের ভূমি পার হয়ে, এখানে এই গীতা সমুদ্রে মিলিত হয়েছে। বস্তুত এই জ্ঞানের গুহ্যতা সংরক্ষণের সংস্কার এতো দৃঢ় ছিলো যে সাধারণ মানুষ এর সুফল থেকে বঞ্চিত ছিলো। আজ সময় এসেছে, এই গুড় সত্যকে উপলব্ধি করবার। আজ সময় এসেছে এই গুহ্যতত্ত্বকে উন্মুক্ত করবার।
আমার মাঝে মধ্যে মনে হয়, স্বামী বিবেকানন্দ এই সংস্কার ভেঙে উপনিষদকে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন দেশ বিদেশের কাছে। যার জন্য আজ আমরা সুফল পাচ্ছি। এখন আবার একদল অর্থপিচাশ এই এগুলোকে নিয়ে ব্যবসায় নেমেছেন। উপনিষদ চায় একটা জিজ্ঞাসু মন, একটা অন্বেষী মন। এইসব জিজ্ঞাসু মনকে শ্রেষ্ঠ ও সত্য বস্তু লাভে সহায়তা করবে উপনিষদ। কেবল নিষ্ঠা দরকার। আলসে হয়ে ঘুরে বেড়ালে সত্যের অনুসন্ধান সম্ভব হবে না। ঈশ্বর সম্পর্কে সন্দেহবান ছুড়ে দিয়ে উত্তরের অপেক্ষা না করে চলে গেলে চলবে না। আর এভাবে উপনিষদের গুড় অর্থ কখনোই নিজের কাছে প্রকাশিত হবে না। সত্য এই দেহে-মনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে, তাকে মন্থন করতে হবে। দুধের মধ্যে মাখন আছে, মন্থন করলেই উপরে সেই মাখন ভাসবে। দেহকে-মনকে মন্থন করে, উপনিষদ থেকে সত্যকে অনুধাবন করতে হবে। উপনিষদ তত্ত্ব গুড় সন্দেহ নেই, কিন্তু আন্তরিক অন্বেষণ, অধ্যবসায় সহকারে যখন আমরা উপনিষদের অনুধ্যান করবো তখন এর থেকে আমরা সুফল পেতে থাকবো। সন্দেহ নয়, জিজ্ঞাসু মন নিয়ে সাধনক্রিয়ার দ্বারাই আমরা আমাদের সত্তার গভীরতম প্রদেশে প্রবেশের অধিকারী হবো। একটা জিনিস জানবেন, যা দেখছি তা সবসময় সত্য নাও হতে পারে। দর্শন যত গভীরে যাবে তত নতুন নতুন পথের আবিষ্কার হবে।
এক যোগীমহারাজকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি কি শ্বাস চুরি করেন ? কেননা ঘন্টার পর ঘন্টা আপনি কুম্ভকে অবস্থান করেন। যা অসম্ভব বলেই মনে হয়। তো মহাত্মা আমাকে বলেছিলেন, শ্বাসের কটা পথ তুমি জানো ? আমি বললাম, কেন, শ্বাস তো নাক আর মুখ দিয়েই যাতায়াত করে। মহাত্মা আবার বললেন, শ্বাসের গতি বন্ধ রাখা দুঃসাধ্য। আমি নাক-মুখের শ্বাস রোধ করতে পারি, কারন তার চাবি আমার কাছে আছে, কিন্তু দেহের বাকি দ্বারগুলোর চাবি ঈশ্বরের কাছে। তিনি না চাইলে সেই দ্বার বন্ধ করে কার সাধ্য। প্রাণ প্রবেশের জন্য শুধু নাক -মুখ নয়, সর্ব্ব অঙ্গে ঈশ্বর ছিদ্র করে রেখেছেন। গাছেরা শ্বাস নেয়, এমনকি বীজের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্রিয়া চলছে, তা না হলে বীজের সাধ্য ছিলোনা অংকুরের উদ্গমন করে, গাছের সাধ্য ছিল না ফুল ফলে মাতিয়ে রাখে। শরীরের মধ্যে অবস্থান করা অর্থাৎ বেঁচে থাকা কঠিন নয়, কঠিন হচ্ছে শরীর ছেড়ে চেতন থাকা। সেই অধরা মানুষকে ধরতে হবে, যিনি এই জগতের আশ্রয়, যাঁর বিভূতি এই জগৎ।
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
২৩.১২.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - পঞ্চদশ অধ্যায় পুরুষোত্তম যোগঃ
শ্লোক নং ১
শ্রী ভগবান উবাচ
ঊর্দ্ধমুলম অধঃ শাখম অশ্বত্থং প্রাহুঃ-অব্যয়ম
ছন্দাংসি যস্য পর্নানি যস্তং বেদ স বেদবিৎ। (১৫/১)
শ্রীভগবন বললেন, অশ্বত্থ বৃক্ষের মূল উর্দ্ধে, শাখা অধোমুখী। এই বৃক্ষ অবিনাশী, বেদসমূহ এর পাত্র স্বরূপ যিনি এই বৃক্ষকে জানেন, তিনি বেদবিদ।
যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, এই সংসাররূপ বৃক্ষের নাম করেছেন অশ্বত্থ। অশ্বত্থ বৃক্ষের নাম শুনেই আমাদের মনে এক বয়োবৃদ্ধ প্রাচীন গাছের কথা মনে হয়। আসলে এই অশ্বত্থম শব্দ দ্বারা অন্য দ্বিবিধ অর্থ প্রকাশ হয়। এক) যা কাল পর্যন্ত স্থির থাকে তাকে বলা হয় শ্বত্থ আর যা কাল পর্যন্ত স্থির থাকে না তাকে বলা হয় অশ্বত্থ। দুই) বৃক্ষরূপ অশ্বত্থ -যা দীর্ঘ জীবনের প্রতীক।
এই সংসাররূপ বৃক্ষের মূল অর্থাৎ সংসারের যা কিছু উত্তম তা উপরে অবস্থান করছে। অর্থাৎ এই সংসাররূপী বৃক্ষ রস সংগ্রহ করছে উপর থেকে। এই গাছের মূল আমাদের দৃষ্টিগোচর নয়। এই বৃক্ষের মূল ব্রহ্মে গ্রথিত হয়ে আছে। কঠোপনিষদে (শ্লোক নং, ২/৩/১) একই ঊদাহরণ আমরা দেখতে পাই, সেখানে বলা হচ্ছে,
এষঃ অশ্বত্থঃ - এই জগৎ অশ্বত্থ বৃক্ষের ন্যায়,
ঊর্ধ্মুলঃ - এই বৃক্ষের মূল উর্দ্ধ দিকে অবস্থিত
অবাকশাখঃ - শাখা প্রশাখা নিম্নমুখী
সনাতনঃ - নিত্য
তৎ এব শুক্ৰম - তিনিই বীজ
তৎ ব্রহ্ম - তিনি ব্রহ্ম
তত এবং অমৃতম উচ্চতে -তিনিই অমৃত বলে কথিত
তস্মিন সর্বে লোকা শ্রিতাঃ - তিনিই সমস্ত লোকের আশ্রয়
কশ্চন তৎ উ ন অত্যেতি - কেউ তাকে অতিক্রম করতে পারে না
এতৎ বৈ তৎ - ইনিই সেই আত্মা।
এই জগৎ অশত্থ বৃক্ষের মতো। এই বৃক্ষ উর্দ্ধমূল সম্পন্ন। অর্থাৎ শাখাপ্রশাখা নিচের দিকে, আর মূল আছে উপরের দিকে। এই বৃক্ষের মুলে আছে ব্রহ্ম। মূল অপ্রকাশিত থাকলেও, জগতের মধ্যে দিয়ে তিনি নিজেকেও প্রকাশ করেছেন। শাখা প্রশাখা অর্থাৎ জড়জগৎ ও প্রাণীজগৎ। এই দুয়ের মুলে আছে ব্রহ্ম। অশ্বত্থ গাছ যেমন বিনাশশীল, পরিবর্তনশীল তেমনি এই জগৎ বিনাশশীল, পরিবর্তনশীল । আবার অন্য অর্থে এই জগৎ পরিবর্তনশীল হলেও বিনাশশীল নয়। বৃক্ষ যেমন বীজ রেখে যায়, তেমনি জগৎ বীজের (শুক্রের) মধ্যে প্রবেশ করে।
আমরা যখন যোগের কথা শুনছিলাম,তখন শুনেছি আত্মা প্রাণবায়ুকে উর্দ্ধে ও অপান বায়ুকে নিম্নে চালিত করেন। এই ব্রহ্মান্ডই সংসার আবার এই ব্রহ্মান্ডের ক্ষুদ্র সংস্করণ হচ্ছে আমাদের দেহভান্ড। শিব সংহিতায় স্বয়ং শিব বলছেন, (শ্লোক- ২/১-১১) এই মানুষই শরীরের মধ্যে সপ্তদ্বীপ সমন্বিত মেরুপ্রদেশ, সকল নদ-নদী, সাগর, শৈল, ক্ষেত্র, ক্ষেত্ৰপাল, ঋষি, মুনি, নক্ষত্রপুঞ্জ, গ্রহবর্গ, পুণ্যতীর্থ, পীঠস্থান, পীঠদেবতা অধিষ্ঠান করেন। এই শরীরে সৃষ্টি-সংহার কর্ত্তা চন্দ্র ও সূর্য নিত্য ভ্রমন করেন। আকাশ বায়ু অগ্নি জল ও পৃথিবীও এই শরীরের মধ্যেই আছে। ত্রিলোকে যাকিছু বস্তু আছে, তা এই শরীরের মধ্যে আছে। সেই বস্তুগুলো মেরুকে বেষ্টন করে সর্বত্র অবস্থানের দ্বারা নিজ নিজ ব্যবহারিক কর্ম্মে নিযুক্ত আছে। মেরুর চূড়ায় চন্দ্র্ররশ্মি ষোড়শকলা পূর্ণ হয়ে দিবারাত্র বর্ত্তমান আছেন। এই চন্দ্র সর্ব্বদা নিম্ন মুখী হয়ে সুধা বর্ষণ করছেন, সেই অমৃতধারা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে দেহের দুই নাড়ীর (ইড়া ও পিঙ্গলা) মধ্যে প্রবেশ করছে। ইড়া নাড়ী বাহিত হয়ে অমৃতরূপ চন্দ্ররশ্মি সুষুম্নার পথ ধরে মেরুতে প্রবেশ করছে। আবার সূর্য্যরশ্মি পিঙ্গলা নাড়ী বাহিত হয়ে চন্দ্র্ররশ্মিকে ও শরীরের ধাতুসমূহকে গ্রাস করছে। এই সূর্য্যরশ্মিই সৃষ্টিকে সংহার করছেন।
সুষুম্না নাড়ীর মধ্যভাগে আছে চিত্রা। এই চিত্রা শরীরের আধার স্বরূপ। এই চিত্রা নাড়ীর মধ্যে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর একটা ছিদ্র আছে, তাকে বলা হয় ব্রহ্মরন্ধ্র। কুণ্ডলিনী শক্তি মূলাধার থেকে এই ব্রহ্মরন্ধ্রের মধ্যে দিয়েই সহস্রারের গমন ক'রে পরমব্রহ্মের সঙ্গে মিলিত হন। এই ব্রহ্মরন্ধ্রের পথ দিব্যপথ, অমৃতদায়ী, আনন্দদায়ক। এই পথেই যোগীশ্রেষ্ঠগন যাতায়াত করে থাকেন। এই সহস্রার পদ্মকে বিদিত হয়ে, যিনি নিজ চিত্তকে সংযত করতে সমর্থ হন, তিনি যোগীশ্রেষ্ঠ। তাঁকে আর সংসারমুখী হতে হয় না। ইনি শূন্যমার্গে বিচরণ করেন। এই ব্রহ্মরন্ধ্রে যদি কেউ ক্ষনিকের জন্যও অবস্থান করতে পারেন, তিনি সর্ব্বপাপ থেকে মুক্ত হতে পারেন। যার চিত্ত ব্রহ্মরন্ধ্রে লিন হয়ে গেছে তিনিই পুরুষোত্তম। ইনি ঈশ্বরের ঐশ্বর্য্য ভোগের অধিকারী।
তো সহস্রার থেকে যে তিনটি নাড়ী অর্থাৎ ইড়া-পিঙ্গলা-সুষুম্না ভাষান্তরে গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতী - এইযে তিনটি ধারা একেই বলে ত্রয়ী বা বেদত্রয়। এই বেদত্রয়ের ক্রিয়া যতক্ষন চলতে থাকে ততক্ষন ত্রিলোকের (ভূর্ভুবঃস্বঃ) বিদ্যমানতা। সহস্রারে সব মিলিত হয়ে ছিলো - মহাশূন্য, পরব্যোম। শ্রেষ্ঠযোগীর এখানেই অবস্থান।
এই সহস্রারের উপরে আছে বিন্দু। বিন্দু বলতে আমরা বুঝি এক অখন্ড সত্ত্বা যাকে ভাগ করা যায় না। আর এই বিন্দুর সমষ্টি হচ্ছে রেখা। জীবকুলের সকাম কর্ম্ম প্রভাবে কর্ম্মফল স্বরূপ অবিদ্যার প্রভাবে মায়ার প্রাদুর্ভাব হয়। এর পরে বিন্দুরূপী ত্রিগুণাত্মক অব্যক্তের আবির্ভাব ঘটে। এই রেখাই আকৃতির কারন। মায়ার দ্বারা অখন্ড বস্তু। বহুরূপে প্রতিভাত হন।
আত্মা বিষয় সংস্পর্শে এসে জীব, আর বিষয়পাশ রহিত হলে শিব। সাধনক্রিয়ার সাহায্যে স্থির হতে পারলে, শূন্য থেকে নাদধ্বনি শ্রুতিগোচর হয়। বলা হয়, এই নাদব্রহ্মের থেকে এই জগৎ। অব্যক্ত ব্রহ্ম থেকে এক জ্যোতির্বিন্দুর জন্ম হয়। এই জ্যোতির্বিন্দু ভ্রূমধ্যে চিদাকাশে দৃষ্ট হয়। একেই জীবাত্মা বলে কথিত হয়। এই জ্যোতির্বিন্দু সুষুম্না নাড়ীর মধ্যে যাতায়াত করে থাকে। সাধন ক্রিয়া করতে করে এই জ্যোতি দর্শন হয়। এই জ্যোতি লিঙ্গমূল থেকে নাভি পর্য্যন্ত উপস্থিত থেকে সংসারকার্য্য নির্বাহ করে থাকে। প্রাণ-অপান সমান বায়ু যখন মস্তক থেকে হৃদয় পর্য্যন্ত স্থির হয়ে থাকে - তখন যোগীর দৃর্ষ্টিতে প্রলয়। গাছের পাতা যেমন বৃক্ষকে জীবিত রাখতে সাহায্য করে, তেমনি জীবের ইচ্ছে বা বাসনা সেই সংসারবৃক্ষকে জীবিত রাখে। এই জ্ঞানই ত্রয়ীবেদ।
ওম নমঃ শ্রী বাসুদেবায়।
২৪.১২.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - পঞ্চদশ অধ্যায় পুরুষোত্তম যোগঃ
শ্লোক নং ২
অধশ্চোর্দ্ধং প্রশ্রিতাঃ-তস্য-শাখা গুন্প্রবৃদ্ধা বিষয়প্রবালাঃ
অধশ্চ মুলানি-অনুসন্ততানি কর্ম্মানুবন্ধীনি মনুষ্যলোকে। (১৫/২)
এই সংসাররূপ অশ্বত্থ বৃক্ষের শাখাসমূহ গুণত্রয় দ্বারা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ও বিষয়রূপ পল্লব-বিশিষ্ট । এর শাখাসমূহ অধোদেশে ও উর্দ্ধোদেশে বিস্তৃত। এর মূলসকল অধোদিকে মনুষ্যলোকে প্রসারিত। এই মূলসকল ধর্ম্ম-অধর্ম্মরূপ কর্ম্মের কারন।
ব্রহ্ম সমুদ্ভূত সগুন ব্রহ্ম হচ্ছেন সংসার বৃক্ষের প্রধান শাখা। এই শাখা থেকেই জগতের বিস্তার। স্বর্গ-মর্ত-পাতাল যেখানে যত জীবকুল আছে, তা সে দেবতা থেকে মনুষ্য কীটপতঙ্গ, পশুপাখি সবাই এই জগৎ বৃক্ষের শাখা স্বরূপ। আলো বাতাস জল মাটি এবং উন্মুক্ত আকাশ পেলে যেমন বৃক্ষের শাখাগুলো পল্লবিত হয়ে ওঠে তেমনি এই সংসার বৃক্ষপঞ্চভূতাত্মক জগৎ ত্রিগুণের ছোঁয়ায় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছে। এই গুন্ থেকে যতক্ষন না বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, সংসারবৃক্ষ ততক্ষন বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে থাকবে। তো গুণাদিতে অনাসক্তি এলে জগৎ-সংসার থেকে সম্পর্ক ছেদ করা সম্ভব হবে।
মূল বলতে যা গ্রথিত আছে, যা অব্যক্ত, যা অদৃশ্য। এখন কথা হচ্ছে, জাগতিক বৃক্ষের শাখা প্রশাখা উপরে আর মূল থাকে নিচের দিকে। কিন্তু এই সংসার বৃক্ষ উলটপুরাণ, এর শাখা প্রশাখা নিচের দিকে, আর মূল আছে উপরের দিকে। উন্নত জীবের মস্তক উপরের দিকে, যেখানে আছে মেরুশিখর। এই মেরুশিখরে আছে সহস্রার যাঁকে বলা হয় শ্রীবিষ্ণুর পরম্পদ। কেউ বলেন, শিবস্থান, কেউ বলেন পরমপুরুষ। কেউ বা একেই বলেন হরিহর-স্থান। কেউ বলেন প্রকৃত-পুরুষের স্থান। যিনি এই সহস্রার সম্পর্কে বিদিত হয়ে চিত্তকে সেখানে সমাহিত করতে পারেন, তিনিই যোগীশ্রেষ্ঠ, নরশ্রেষ্ঠ। সৃষ্টি-স্থিতি-সংহার যার নিয়ন্ত্রণে হয়ে থাকে। এই সহস্রার থেকেই ত্রিধারা প্রবাহিত হয়ে অর্থাৎ ইড়া পিঙ্গলা সুষুম্না বাহিত হয়ে ত্রিলোকের সৃষ্টি করছে। শুভ অশুভ স্পন্দিত হচ্ছে। কর্ম্ম দ্বারা এই প্রবাহের বেগ প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে থাকে। আর এই কারণেই জীব কর্ম্ম বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে। এই নাড়ীগুলো যেমন আজ্ঞাচক্র থেকে মূলাধার পর্যন্ত বিস্তৃত, আবার উল্টো দিক থেকে দেখতে গেলে, এই নাড়ী গুলো মূলাধার থেকে আজ্ঞাচক্র পর্যন্ত বিস্তৃত। কর্ম্ম হচ্ছে অধোমুখী প্রবাহের ফল। এই অধোমুখী প্রবাহের স্পন্দন থেকেই সকল কর্ম্ম-বাসনার উদয় হয় হচ্ছে। জীবসকল বারবার জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হচ্ছে। বাসনা অনুসারে কর্ম্ম দেহ প্রাপ্ত হচ্ছে। আবার এই প্রবাহ যখন উর্দ্ধমুখী তখন জীবকুলের মধ্যে সত্ত্বগুণের প্রাবল্য দেখা যায়। আর এই উর্দ্ধমুখী প্রবাহ হয়ে থাকে তখন, যখন প্রাণ সুষুম্না বাহিত হয়। প্রাণ-অপানের মিথুনে প্রাণ সুষুম্নাবাহিত হতে পারে। প্রাণ তখন মূলাধার থেকে সংসারশক্তিকে জ্যোতিস্বরূপে রূপান্তরিত করে। আর এই জ্যোতিঃ তখন আজ্ঞাচক্রে যোগীর মানসচক্ষে দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে। এই জ্যোতির্ময় আকাশে আবার কৃষ্ণবর্ণের বিন্দুরূপ গুহার দর্শন মেলে, এই জ্যোতিঃ-আকাশেই রক্তবর্ণের জ্যোতির্বিন্দু নক্ষত্র স্বরূপ, মুনি-ঋষির দর্শন মেলে। বাহ্য জগৎ যেমন ইন্দ্রিয়লব্ধ, তেমনি এই অন্তর্জগতে যাকিছু দৃশ্য তাও সেই একইরকম ভাবে মনের জগতে ভেসে ওঠে। মন যতক্ষন নাভি থেকে নিম্ন প্রদেশে ঘোরা ফেরা করবে, অর্থাৎ সংসারের ফুল-ফলের প্রতি আকৃষ্ট থাকবে, ততক্ষন সে সেই সংসারেরই যা মূল (পরমাত্মা) তাঁকে সে সম্যক ভাবে উপলব্ধি করতে পারবে না। হৃদয় থেকে উর্দ্ধচক্রে মনকে নিয়ে যেতে পারলে, অর্থাৎ যেখান থেকে এই সংসারবৃক্ষ রস সংগ্রহ করছে, সেই অমৃত-রস সমুদ্রের সন্ধান পাবে । আর অন্তর্জগতে যখন এই অপ্রাকৃত শব্দ-স্পৰ্শ-রূপ-রস-গন্ধের অনুভব হতে থাকবে, তখন সাধক এক অন্য মানুষ হয়ে যাবেন । একটা সময় আসে, যখন সগুন ব্রহ্ম নির্গুণ ব্রহ্মে , আবার নির্গুণ ব্রহ্ম পরব্রহ্মে লিন হতে থাকে। সেই পথ এখনো বহুত দূর।
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
২৫.১২.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - পঞ্চদশ অধ্যায় পুরুষোত্তম যোগঃ
শ্লোক নং ৩-৪
ন রূপমস্যেহ তথোপলব্ধতে
নান্তো ন চাদির্ন চ সংপ্রতিষ্ঠা।
অশ্বত্থমেনং সুবিরূঢ় মূল-
মসঙ্গশস্ত্রেণ দৃঢ়েন ছিত্ত্বা।। (১৫/৩)
এই সংসারে এই বৃক্ষের রূপ উপলব্ধি হয় না। তেমনি না অন্ত না আদি না স্থিতি, উপলব্ধ হয়। এই সুদৃঢ়মূল অশ্বত্থকে দৃঢ় বৈরাগ্যরূপ শস্ত্র দ্বারা ছেদন করে - ব্রহ্মকে জানতে হয়।
যেহেতু প্রাণীসকলের মন নিম্ন চক্র সমূহে আবদ্ধ থাকে, তাই এই সংসারের যে আদিমূল অর্থাৎ মূলস্বরূপ তা সে উপল্বদ্ধিতে আন্তে পারে না। এমনকি এই যে সংসার এর যে একটা আদি আছে, বা অন্ত আছে তাও সে উপলব্ধি করতে পারে না। যা কিছু আমরা স্বপ্নে দেখতে পাই, তা আমরা জাগ্রত অবস্থায় দেখতে পারি না। আর এই কারণেই আমাদের সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে যে স্বপ্নে দেখার বস্তুর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তেমনি অজ্ঞানতার কারনে, বা বুদ্ধির ভ্রমে, যে বস্তুর দর্শন সে জাগ্রত অবস্থায় দেখে থাকে তাকে সে আঁকড়ে থাকতে চায়। কিন্তু এই জগৎ-বস্তুকেও সে ধরে রাখতে পারে না। কেননা এই বস্তুও নিয়ত পরিবর্তনশীল। যৌবনকে সে উপভোগ করে, কিন্তু যৌবনকে সে ধরে রাখতে পারে না। এমনকি এই যে যৌবন কখন আরম্ভ হলো, আর কখনই বা শেষ হয়ে গেলো তাও সে টের পায় না। যখন বার্ধক্য এসে যাকে ঘিরে ফেলে, বা কৈশোরকে যখন সে হারিয়ে ফেলে, তখন সে উপলব্ধি করে, যৌবন বা কৈশোর আর এখন নেই। তো কখন যে সংসার আরম্ভ হলো, আর কখন যে তা শেষ হয়ে গেলো, তা সে ধরতে পারে না। একসময় কেবল তার মনে হয়, নেই আর নেই। মেঘের মতো মিলিয়ে গেছে। তো কখন সংসারের শুরু হলো, আবার কখন যে তা মিলিয়ে গেলো, এই সত্যক্ষণকে যদি ধরাই না যায়, তবে তার স্থিতি সম্পর্কেও যথেষ্ট সন্দেহের উদ্রেগ হয়। যৌবনকে একসময় সত্য বলে মনে হয়েছিল, শৈশব কে এক সময় সত্য বলে মনে হয়েছিল, বার্ধক্যকে একসময় সত্য বলে মনে হয়েছিল আজ আর তা নেই। সেই সত্য (শৈশব, যৌবন, বার্ধক্য) আজ অগোচরে চলে গেছে।
তাই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, অনর্থক এই সংসার দূরবেচ্ছেদ্য, অনর্থকারক, একে দৃঢ় বৈরাগ্যরূপ শস্ত্র দ্বারা ছেদন করে, তত্ত্বজ্ঞান লাভের চেষ্টা করতে হবে। "অসঙ্গশস্ত্রেণ দৃঢ়েন ছিত্বা"। জগৎ কেবলমাত্র কল্পনা, আর কল্পনা হচ্ছে মনের আকাশে। তো মন থেকে কল্পনাকে ছিন্ন করতে গেলে শস্ত্র চাই। সেই শস্ত্র হচ্ছে বৈরাগ্য। বৈরাগ্যের গুন্ হচ্ছে ছেদন। নিজেকে অসঙ্গ করা। অর্থাৎ আমি থেকে তুমিকে দূরীভূত করা। কিন্তু তুমিকে দূরীভূত করলে আমি থেকে যাবে। আর যতক্ষণ আমিবোধ থাকবে, ততক্ষন তুমিবোধের বিলোপ সাধন সম্ভব কি করে হবে ? এই কারনে মহাত্মাগণ বলেছে, আমির বিস্তার। এই আমির বিস্তারের ফলে সমস্ত কিছুই আমিকে ঘিরেই সম্পন্ন হতে থাকবে। মন থাকবে, আর কল্পনা থাকবে না তা হতে পারে না, কিন্তু এই কল্পনা যাতে মনের মধ্যেই লোপ পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। সমুদ্র থাকবে, বুদ্বুদ থাকবে, কিন্তু এই জল যেন কোনো আধারের দ্বারা সীমাবদ্ধ না হয়ে যায়। অর্থাৎ পুকুর, নালা, এমনকি নদীতে রূপান্তরিত হয়ে না যায়। তাহলেই আমাদের উদ্দেশ্য পূরণ হবে। দেহাতীত হতে হবে।
আমরা বারবার শুনেছি, প্রাণের চাঞ্চল্য হেতু জীবভাব ফুটে উঠছে। এই প্রাণের চাঞ্চল্য দূর হয়ে গেলেই মনের ঢেউ মনের মধ্যেই লয় হয়ে থাকবে। সাধনক্রিয়া করতে করতে একসময় প্রাণ যখন আজ্ঞাচক্রের উর্দ্ধে সহস্রারে স্থির হয়, তখন ত্রিগুণাতীত ইছারহিত অবস্থা। তখন দেহস্থিত ইন্দ্রিয়সকলের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক থাকে না। এই যে সম্পর্কহীন অবস্থা, এর মানে এই নয়, যে দেহ থেকে ইন্দ্রিয়গুলোকে বাদ দেওয়া হয়েছে, বা এরা সকলে নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে। অর্থাৎ মনের সাথে দেহস্থিত ইন্দ্রিয়সকলের সঙ্গে সে সম্পর্ক ছিল তা ছিন্ন হয়েছে । একেই অসঙ্গ অবস্থা বলা হয়ে থাকে। শুনছে কিন্তু শুনছে না, দেখছে কিন্তু দেখছে না, করছে কিন্তু করছে না। অর্থাৎ মন আত্মাতে স্থিত আর ইন্দ্রিয় তার কর্ম্ম করছে। কিন্তু ইন্দ্রিয়ের কাজের সঙ্গে মনের কোনো সম্পর্ক নেই। এই অবস্থাই মুক্তিপদ। বৈরাগ্য মানে এই নয়, আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জঙ্গলে গিয়ে বাস করা। বৈরাগ্য মানে এই নয়, যে কর্ম্ম থেকে রেহাই নিয়ে, আলস্যে জীবন যাপন করা। বৈরাগ্য হচ্ছে মনকে কর্ম্ম-প্রভাব বা সম্পর্কের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা। বৈরাগ্য হচ্ছে সংসার থেকে মনকে ছিন্ন করে আত্মাতে স্থির রাখা।
ততঃ পদং তৎ পরিমার্গিতব্যং
যস্মিন গতা ন নিবর্ত্তন্তি ভূয়ঃ।
তমেব চাদ্যং পুরুষং প্রপদ্যে
যতঃ প্রবৃত্তিঃ প্রসৃতা পুরাণী। (১৫/৪)
এর পরে সেই বৈষ্ণবপদ অন্বেষণ করতে হবে, যে পদে প্রতিষ্ঠিত হতে পারলে, সংসারে ফিরে আসতে হবে না। সেই আদিপুরুষকে শরণ করতে হবে, যা থেকে এই চিরন্তনী সংসার প্রবৃত্তি নিঃসৃত হয়েছে।
দেখুন সংসার ক্ষণভঙ্গুর, এসব বারংবার শুনলেও, আমাদের চক্ষু কর্ন এই কথা স্বীকার করে না। বিষয় থেকে যেটুকু রস সে পায়, তারজন্য মন লোভাতুর হয়ে এই সংসারের কোলে ঢোলে পড়ে। এই কারণেই সত্যিকারের সেই অমৃত, যার সামান্য অংশ এই বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবার জন্য বিষয়ের মধ্যে আনন্দ দেবার ক্ষমতা হয়েছে, সেই মধুর রস সমুদ্রে যতক্ষন না ডুব দেওয়া যাচ্ছে, ততক্ষন বিষয়ের তৃষ্ণা মিটবে না। বিষয়ে আসক্তির নিবৃত্তি হবে না। এইজন্য মনের মধ্যে ব্রহ্ম-অন্বেষণের ধারা জাগিয়ে তুলতে হবে। আমাদের দুটো চোখ, তাই আমাদের দ্বৈত দর্শন। আমাদের একচক্ষু বিশিষ্ট হতে হবে। সাধনার সাহায্যে অন্তরে যখন একচক্ষু বিশিষ্ট জ্যোতির্ময় আকাশের উদয় হবে, তখন সেই চোখের মধ্যেই ভেসে উঠবে, অনুরূপ ত্রিলোক। আর সেই ত্রিলোকের মধ্যেই দৃষ্ট হবে মর্ত্যলোক। আবার সেই মর্ত্যলোকের মধ্যে দেখা মিলবে স্বয়ংকে। সব কিছুর মধ্যে আমি, আবার আমার মধ্যে সবকিছু। এযেন ভোজবাজি। বাজিকরের খেলা। যাদের মন সহস্রারে স্থিত হতে পেরেছে, আর সেখান থেকে নামার ইচ্ছে পর্যন্ত চলে গেছে, সেখানে আমি সত্ত্বার বিলোপ সাধন হয়েছে। ব্রহ্ম তখন সূক্ষ্ম জ্যোতির্বিন্দু। আর এই সূক্ষ্ম অনুর মধ্যে সমস্ত লোক দৃষ্ট হচ্ছে। এই কূটস্থের মধ্যে যিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে, তিনিই পরমপুরুষ। আবার এই কূটস্থের মধ্যে যাঁকে দেখা যাচ্ছে, তিনিই পরমপুরুষ।
কৃষ্ণ যজুর্বেদে শ্লোক-৩১/১-৩ এ বলা হয়েছে, পরমাত্মা সহস্র শির, সহস্র চক্ষু ও সহস্র পাদশালী তিনি সকল দিকের ভূমিকে স্পর্শ করেও জগৎ বিকারের দ্বারা দশ অঙ্গুলি পরিমিত হৃদয় স্থানে অন্তর্যামী পুরুষরূপে স্থিত হয়ে আছেন। এই সবই সেই পুরুষ, যা হয়ে গিয়েছে, বা যা হবে তা সবই তিনি। তিনি সেই অমৃতত্বের স্বামী। তিনি সেই অন্নেরও স্বামী যে অন্যের দ্বারা বৃদ্ধিকে প্রাপ্ত করা যায়। অতীত-বর্তমান-অনাগত সকল কালের ও সকল জগতের মধ্যে এই পুরুষের মহিমা এতই এবং এই পুরুষের চেয়েও অধিক। এই সমস্ত ভূতজাত প্রাণীসকল এঁর এক-চতুর্থ অংশ মাত্র। বাকি তিন চতুর্থাংশ অমৃতস্বরূপ এবং তা দ্যুলোকে স্বপ্রকাশে অবস্থিত।
(শ্লোক ৩১/ ১৩) বলা হচ্ছে সেই বিরাট পুরুষের নাভি থেকে অন্তরীক্ষ উৎপন্ন হয়েছিলো, শির থেকে দ্যুলোক আর পাদদ্বয় থেকে ভূমি ও কর্ন থেকে দিক সমূহ সৃষ্টি হয়েছিল।
যোগীপুরুষগন বলছেন, ইড়া পিঙ্গলা ধরে আমাদের পৌঁছতে হবে, মূলাধারে, মূলাধার থেকে শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে সুষুম্না পথে মস্তকের সহস্রারে গিয়ে আসন পাততে হবে। তখন সেই মধুর নাদধ্বনি শ্রুত হবে। মনন করলে ব্রহ্মবিস্তাররূপ সৃজন। মনন না করলে, সৃষ্টি স্তব্ধ। মন সংকল্প রোহিত হলে, বুদ্ধি স্থির হয়ে আদি পুরুষের শরণাগত হয়। যোগীপুরুষগণ বলে থাকেন , আদি পুরুষের পদদ্বয় হচ্ছে শ্বাস প্রশ্বাস। এই শ্বাস-প্রশ্বাসরূপ চরণ ধরে, এগুলে পুরুষের হৃদয়ের নাগাল পাওয়া যাবে। তো শ্বাসের ক্রিয়া যারা করেন, তারাই সেই পরমপুরুষের অর্থাৎ শ্রীবিষ্ণুর পরমপদ ধরে আছেন। আর এই অবস্থায়, তাঁর দ্বারা যা কিছু কৃত হয়, তা সে ইচ্ছেয় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, সমুদয় সৃজন ক্রিয়া আপনা আপনি হয়ে থাকে, যা আসলে পরমপুরুষের ইচ্ছেতেই হয়ে থাকে। তো শরণাগত হতে হবে, সেই চরণযুগলের আশ্রয় নিতে হবে, শ্বাস-প্রশ্বাসের আশ্রয় নিতে হবে। তবেই একদিন পরম-পুরুষের হৃদয় স্পর্শ করা যাবে।
বিশেষ কিছু কথা -
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব কিছুর পরিবর্তন হয়। গীতা সম্পর্কে এর আগে যাঁরা এই কলমে বক্তব্য শুনেছেন, তাঁরা জানেন, গীতা ভাবনায় পরিবর্তন হয়েছে। চিরন্তন গীতার একটা অক্ষরের মধ্যেও কোনো পরিবর্তন নেই, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের কারনে, গীতার শব্দার্থে, গীতার ভাবার্থে পরিবর্তন হয়েছে। গীতা পাঠককে যোগের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে। গীতার প্রত্যেকটি অধ্যায় যে যোগ, তা ধীরে ধীরে প্রকট হয়েছে। কর্ম্মযোগ, জ্ঞানযোগ, ক্রিয়াযোগ, ধ্যানযোগ, আর সবশেষে ভক্তিযোগ। শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনসখা থেকে গুরু হয়েছেন । গুরু থেকে জগৎগুরু হয়েছেন । জগৎ গুরু থেকে শ্রীকৃষ্ণ পরমপুরুষে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। যোগী শ্রেষ্ঠ থেকে স্বয়ং ব্রহ্ম হয়ে উঠেছেন। কর্ম্মযোগ-এর প্রসংসা করতে গিয়ে বলেছেন, নিষ্কাম কর্ম্মই যোগ। কর্ম্মাসক্তি ত্যাগ করে, সিদ্ধি-অসিদ্ধি সমজ্ঞান করে স্বীয় কর্তব্য কর্ম্ম সম্পাদন করাই বুদ্ধিযোগ। এই অনাসক্ত কর্ম্মই সিদ্ধি লাভের উপায়। আবার পাতঞ্জল যোগদর্শন-এর উচ্চ প্রসংসা আছে এই গীতাতে। তো কর্ম্ম, জ্ঞান,, ধ্যান, ভক্তি ইত্যাদি চারটি পথের সন্ধান আছে এই গীতাতে। গীতার পাঠক কেউ জ্ঞানকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন, কেউ কর্ম্ম বা ভক্তিটিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন, কেউ আবার ষষ্ঠ অধ্যায়ে বর্ণিত ধ্যানযোগের কর্ম্মকেই মুখ্য বলে মনে করেন। তো গীতার মধ্যে প্রবেশ করতে গেলে, টিকা বা ভাষ্যকারের কথায় মজলে হবে না। একমাত্র গীতার অনুধ্যানই গীতাতত্ত্বকে সামনে এনে দিতে পারে। অন্য কোনো উপায় নেই।
রাম ও কৃষ্ণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, মাকালী ও শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ব্রহ্ম ও ভগবানে কোনো পার্থক্য নেই। সগুন ও নির্গুণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ক্ষর আর অক্ষরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ব্যক্ত ও অব্যক্তের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য হচ্ছে বোধশক্তির। যার যেমন বোধশক্তি, তিনি সেইভাবেই পরমতত্ত্বকে গ্রহণ করে থাকেন।
দেখুন, ভগবানের মধ্যে যে শক্তির প্রাচুর্য্য সেই একই শক্তির সীমাবদ্ধ রূপ আছে সমস্ত মানুষের মধ্যে। বলা হয়, ভগবান হচ্ছেন সৎ-চিৎ-আনন্দম। জীবসকল এই আনন্দ ধারা থেকেই এসেছে। এই আনন্দের মধ্যেই বেঁচে আছে, আবার এই আনন্দস্বরূপেই প্রবেশ করছে। এই যে সংসার লীলা, এ ভগবানের সেই আনন্দস্বরূপের লীলা মাত্র। এই আনন্দলীলার সূক্ষ্ম তাৎপর্য্য হচ্ছে সৃষ্টি রক্ষা, বেঁচে থাকা। আনন্দহীন জীবন বলে কিছু হয় না। রাস্তার ভিক্ষারী থেকে শুরু করে, রাজা-উজির সবার মধ্যে এই আনন্দ বিরাজ করছে। আমাদের ক্ষিদে পায় তাই দুঃখ পাই, আবার খাবার খেলে আমরা আনন্দ পাই। এই ক্ষিদে যদি আমাদের না পেতো, তবে আমরা খেতে চাইতাম না, আর খাবারের আনন্দও পেতাম না। এমনকি আমরা বেঁচেই থাকতে পারতাম না। বেঁচে থাকতামও না। তাই উপনিষদ বলছেন, (২/৭/১) "রসঃ বৈ সঃ" - ব্রহ্ম রস তথা আনন্দ স্বরূপ। আমাদের যে দৈহিক সুখ তার কারণও এই আনন্দ। এই জগৎ শুধুই দুঃখময় তা নয়, দুঃখের পরেই আসে আনন্দ। তা সে আনন্দের প্রকৃতি যেমনই হোক না কেন। শিশু মায়ের কোলে আনন্দ পায়, পোষ্যপ্রাণী প্রভুর কাছে আনন্দ পায়। আর এই আনন্দ বাইরে থেকে আসে না, এই আনন্দ আছে তার নিজের ভিতরেই। এই আনন্দ যদি না থাকতো তবে আমরা কেউ শ্বাস-প্রশ্বাস পর্য্যন্ত নিতে চাইতাম না, কঠোর পরিশ্ৰম করা দূরে থাকুক। এই আনন্দের উৎস যিনি তিনি আমাদের হৃদয়ে আছেন।
চিৎ-ভাবের যে শক্তি সেই শক্তির ক্রিয়াতেই সবাই স্বতঃচেতন। এই চিৎশক্তি জীবজগৎকে চেতন করেছে। জ্ঞানবুদ্ধির প্রেরণা দানকারী শক্তি এই চিৎশক্তি। দেখুন নিজের অস্তিত্ত্বকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না। আর উপনিষদ বলছেন, "তুমিই ব্রহ্ম" . তো আমরা নিজেদের অস্তিত্ত্বকে যদি স্বীকার করি তবে বলতেই হয়, ব্রহ্ম আছেন।
সৎ-ভাবে যে শক্তি ক্রিয়া করে তাকে বলা হয় সৎ। এই শক্তির প্রকাশ হচ্ছে কর্ম্মে। দেখুন চন্দ্র-সূর্য-পৃথিবী গ্রহ-নক্ষত্র এরা যে নিজ নিজ পথে চলছে, নদী যে পাহাড় থেকে সমুদ্রের দিকে ধাবিত হচ্ছে, এমনকি মানুষ যে পৃথিবীর উপরে চলে ফিরে বেড়াচ্ছে, মাছ যে জলে সাঁতার কাটছে, পাখী যে আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে, এমনি স্বর্গ-মর্ত -পাতাল যে স্ব স্ব স্থানে বিধৃত হয়ে আছে, তার কারন এই সৎ-ভাব।
লোকে বলে জল নিচের দিকে ধাবিত হয়, লোকে বলে মানুষ পৃথিবীর উপরে হেটে বেড়ায়, পাখি উপরের আকাশে উড়ে বেড়ায়। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, লাট্টুর মতো ঘুরপাক খেতে থাকা পৃথিবীর কোনো উপর বা নিচ হয় না। পৃথিবীর উপরিভাগ আসলে একটা বাঁকা রেখা। পৃথিবীর চারিদিকে শূন্যতা - আকাশ মাত্র। তো কিসের টানে, এই পৃথিবী তার নিজস্ব কক্ষপথে ঘুরছে ? কিসের টানে আমরা এই পৃত্থিমাতাকে ঘিরে রয়েছি ? একেই বলে প্রেম, বিজ্ঞানের ভাষায় মাধ্যাকর্ষণ। এই প্রেমের খেলাই চলছে কাল থেকে কালান্তর ধরে । এই প্রেমই একসুরে সবাইকে বেঁধে রেখেছে।
কর্ম্ম-জ্ঞান-প্রেম এই তিন শক্তিই জীবের মধ্যে অস্ফুট অবস্থায়, অপূর্ন প্রকৃতির উপাধি দ্বারা ব্যাপৃত হয়ে আছে। সাধনক্রিয়ার সাহায্যে এই তিনটি শক্তিকে বিশুদ্ধ করে, বিকাশপ্রাপ্ত হলে জীব ঈশ্বরমুখী হয়ে ভগবৎ ভাবে ভাবান্বিত হতে পরে। এইজন্য সাধনার তিনটি পথ, কর্ম্ম যোগ (ধ্যানযোগ) জ্ঞানযোগ ও ভক্তিযোগ। জীবের মধ্যে যে অস্ফুট সৎভাব রয়েছে, তার প্রকাশ হয় কর্ম্মে। আর এই কর্ম্ম যখন নিরাসক্ত হয়, যখন ঈশ্বরমুখী হয়, তখন তা হয় নিষ্কাম কর্ম্ম-যোগ। জীবসকলের মধ্যে যে অস্ফুট চিৎ-ভাব তার প্রকাশ হয় জ্ঞানে, চিন্তা-ভাবনায়। আর এই চিন্তা-ভাবনা যখন ঈশ্বরমুখী হয়, তখন তা হয় জ্ঞান-যোগ। আবার জীবের মধ্যে যে অস্ফুট আনন্দভাব, এর প্রকাশ সাধারণত হয় কামনায়, কিন্তু এই কামনা যখন বিশুদ্ধ হয়ে ঈশ্বরমুখী হয় তখন তা হয় ভক্তি-যোগ। এই তিনটি যোগের অনুষ্ঠানেই কেবলমাত্র অপূর্ন জীব পূর্নতা প্রাপ্ত হতে পারে। আসলে যোগের পরিণতি ভক্তিযোগে। ভক্তিবিহীন কোনো যোগই কার্যকরী হতে পারে না। এমনকি ভক্তিবিহীন সাধনভজন, এমনকি বৈদিক যজ্ঞ কর্ম্মও কোনো সুফল প্রদানে সক্ষম হয় না। আবার ভক্তি-যোগের সঙ্গে জ্ঞান ও কর্ম্ম যোগের সমাবেশ থাকতে হবে। কর্ম্ম অর্থে ঈশ্বরের কর্ম্ম, জ্ঞান অর্থে ভগবৎ-জ্ঞান। ভক্তি হচ্ছে ঈশ্বরে ভক্তি। এই হচ্ছে সাধন-জীবনের সারকথা।
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
২৮.১২.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - পঞ্চদশ অধ্যায় পুরুষোত্তম যোগঃ
শ্লোক নং ৫
নির্ম্মাণমোহা জিতসঙ্গদোষা
অধ্যাত্মনিত্যা বিনিবৃত্তকামাঃ।
দ্বন্দ্বৈর্বিমুক্তাঃ সুখদুঃখ সংজ্ঞৈ-
র্গচ্ছন্ত্যমুঢ়াঃ পদমব্যয়ং তৎ।। (১৫/৫)
যাঁরা অভিমান ও মহাশূন্য, যাঁরা সঙ্গ ও আসক্তি জয়ী ও আত্মতত্ত্বে নিষ্ঠাবান, কামনাবিহিত এবং সুখ-দুঃখ রূপ দ্বন্দ্ব বিমুক্ত তাঁরাই পরমপদ প্রাপ্ত হন।
পরমপদ প্রাপ্ত যোগীপুরুষের লক্ষণ সম্পর্কে বলছেন। পরম-পদ প্রাপ্তি অর্থাৎ কূটস্থ ব্রহ্মাণুর মধ্যে প্রবেশ।
নির্মানমোহঃ : মান ও মোহ - যতক্ষন আমাদের দেহাভিমান থাকে, ততক্ষন আমাদের মান মর্য্যাদার গুরুত্ত্ব থাকে। কিন্তু পরম-পদ প্রাপ্তির পরে দেহাভিমান দূর হয়ে যায়, ফলতঃ মান-অপমান, মর্য্যাদা অমর্য্যদা ইত্যাদির কোনো প্রভাব তাঁর মধ্যে দেখা যায় না।
জিৎসঙ্গদোষ : বিষয়ের প্রতি আমাদের যে মায়া-মমতা, আমাদের যে আকাংখ্যা, আমাদের যে বাসনা, এসব আসক্তির কারনে হয়ে থাকে। এই আসক্তির গতিমুখ যখন বাহ্যিক বিষয় থেকে আমরা ঈশ্বরে নিবিষ্ট করতে পারবো, তখন আমাদের মধ্যে যে গুনের প্রকাশ ঘটবে তা হচ্ছে প্রেম। আর প্রেম তখনই স্থিতি লাভ করে, যখন সাধক সুষুম্নায় শ্বাসকে প্রবাহিত করাতে পারেন।
অধ্যাত্মনিত্যা : আত্মজ্ঞানে নিষ্ঠাবান থাকা। আসলে আমরা ছোটবেলা থেকে নিজেদের মধ্যে নিজেদের অজ্ঞাতসারেই একটা অহংবোধের জন্ম দিয়ে থাকি। আমি নিকৃষ্ট বা উৎকৃষ্ট। আমি ব্রাহ্মণ বা শুদ্র - ইত্যাদি নানান ভাব আমাদের মধ্যে ছোটবেলা থেকে গড়ে ওঠে। আর আমাদের আচরণের মধ্যে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে থাকে। কিন্তু কেউ যদি ছোটবেলা থেকেই ভাবতে পারে, যে সে ঈশ্বরের সন্তান, ঈশ্বরের সম্পত্তির সে অধিকারী, ঈশ্বরের সমস্ত গুনের সে অধিকারী, তবে তার মধ্যে এই ঐশ্বরীয় ভাবের প্রকাশ ঘটতে পারে। অথবা আমি কিছুই নোই, যা কিছু আমার মধ্যে আছে, তা সে ভালো হোক বা মন্দ সবই ঈশ্বরের , আমি বা আমার এই শরীর নিমিত্ত মাত্র। তবে নিরহঙ্কারী ভাব জেগে উঠতে পারে।
বিনিবৃত্তকামা : শিশু জন্ম থেকেই শরীরকে আপন বলে জেনে থাকে। আর এই শরীরের সুখ-দুঃখ তাকে বিব্রত করে, চঞ্চল করে তোলে। আর এই কারণেই শারীরিক সুস্থ থাকার কামনা তার মধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই উদয় হয়ে থাকে। ধীরে ধীরে এই শরীরবোধ তাকে বিষয়ের দিকে টেনে নিয়ে যায়। কেননা সে বিষয় থেকে একটা সাময়িক সুখের সন্ধান পেয়ে থাকে। কিন্তু দেহ-মন-বুদ্ধি যখন সাধনফলে আত্মাতে স্থিত হয়, তখন সমস্ত কামনা-বাসনা নিঃশেষ হয়ে যায়।
দ্বন্দ্বৈর্বিমুক্তাঃ সুখদুঃখ সংজ্ঞৈঃ - সাধনার পরাবস্থায় সাধক সুখ-দুঃখের উর্দ্ধে চলে যান। কিন্তু তাই বলে কি তাদের জীবনে বিয়োগ ব্যাথা, রাগ দ্বেষ,ঘৃণা ভয়, সুখ-দুঃখ ইত্যাদি রোধ করা সম্ভব হয় ? তা নয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের বোধের যে স্তরে সুখ-দুঃখ, দ্বিধা দ্বন্দ ইত্যাদির অনুভব হয়, যোগী পুরুষগন এই বোধমাত্রার অনেক সূক্ষ্ম স্তরে থাকার জন্য, একই ঘটনা তাঁকে সাধারনের মতো বিড়ম্বনায় ফেলতে পারে না। আমাদের দৃষ্টিতে এঁকে আমরা উদাসীন অবস্থা বলতে পারি। কিন্তু যোগীপুরুষের মধ্যে বস্তুর বা প্রাণীর পরিণতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকার জন্য, এঁরা সব কিছুর মধ্যে মঙ্গল দর্শন করে থাকেন। এবং যা ভবিতব্য সে সম্পর্কে নিস্পৃহ থাকেন। সমস্ত দ্বন্দ্বের উর্দ্ধে উঠে সাম্যাবস্থায় বিরাজ করেন। তার তাদের মধ্যে সুখ-দুঃখে কোনো বিকার (রাগ, দ্বেষ, ঘৃণা, ভয়, দুঃখ, আনন্দ) লক্ষিত হয় না।
মূঢ়তা : যতক্ষন মন মূঢ় অবস্থায় থাকে, ততক্ষন মনের মধ্যে দ্বন্দ্ব বর্তমান থাকে। সাধকের চিত্ত যতক্ষন সংসার সম্পর্ক থাকে ততক্ষন এই সংসার-সম্পর্কই তাকে দ্বন্দ্বের জালে আবদ্ধ করে রাখে। সংসার অস্তিত্ত্ব, সংসারের গুরুত্ত্ব মনের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। আর এসবই মনের ক্রিয়া। কিন্তু সাধন ক্রিয়ার ফলে যখন অন্তঃকরণ শুদ্ধ হয়, তখন জ্ঞানের আলো প্রজ্বলিত হয়। তখন বিষয়ের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি সম্পর্কেও জ্ঞানের উদয় হয়। আর যা অবশ্যম্ভাবী, যার কোনো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, যা হবেই, তা নিয়ে সাধকের মধ্যে কোনো দুশ্চিন্তার উদয় হয় না। শুধু মেনে নেওয়াই তার স্বভাব হয়ে থাকে।
সাধনক্রিয়া অজ্ঞানকে দূর করে, সাধককে সত্যের সম্মুখীন করে তোলে। এই সাধনক্রিয়াই সাধককে একটা অবিনাশী পরমপদ লাভে সাহায্য করে থাকে। ইড়া পিঙ্গলায় শ্বাস কখনো উপরে কখনো নিচে প্রবাহিত হচ্ছে। যখন ইড়া-পিঙ্গলায় বায়ু প্রবাহ স্থির হয়ে যায়, এবং বায়ুর গতি সুষুম্নার পথ ধরে উর্দ্ধগতি সম্পন্ন হতে শুরু করে, তখন পরমাত্মার সাথে মনের নিবিড় মিলন হয়, আর ধীরে ধীরে সাধক সমাধির অবস্থায় পৌঁছে যান । প্রথম দিকে এই অবস্থা ক্ষনিকের জন্য হয়ে থাকে। কিন্তু সাধনক্রিয়া যত দীর্ঘ হয়, একাগ্রতা যত বৃদ্ধি পায়, তত সমাধির স্থিতিকাল বাড়তে থাকে। একটা সময় অষ্টপ্রহর এই ক্রিয়া ভিতরে ভিতরে চলতে থাকে। তখন সাধক নেশাগ্রস্থের মতো সংসারবিমুখ হয়ে অপার্থিব শান্তিতে শয়ান করেন।
ওম নমঃ শ্রী ভাগবতে বাসুদেবায়।
২৯.১২.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - পঞ্চদশ অধ্যায় পুরুষোত্তম যোগঃ
শ্লোক নং ১৫/৬
ন তদ্ভাষয়তে সূর্য্যো ন শশাঙ্কো ন পাবকঃ
যদগত্বা ন নিবর্ত্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম। (১৫/৬)
আমার যে পরম ধাম, যা প্রাপ্ত হলে, আর পুনর্জন্ম হয় না, সেই ধামকে চন্দ্র-সূর্য-অগ্নি প্রকাশ করতে পারে না।
আমার ধাম, অর্থাৎ আমার নররূপের ঐতিহাসিক বাসস্থান বৃন্দাবন, মথুরা বা দ্বারকা নয়, আমার (আত্মার ) স্বরূপের ধাম। উপনিষদ বলছে, জীব স্বরূপত ব্রহ্ম। এই ব্রহ্মের যখন মন-রূপ উপাধির জন্ম হয়, তখন তার মধ্যে দেশ-কাল-এর ধারণা জন্মে। আর এই দেশ-কাল ধারণা থেকে দেশ-কালের যে ব্যবধান অর্থাৎ পৃথক পৃথক স্থান, পৃথক পৃথক বস্তু দৃষ্ট হয়ে থাকে। সাধন ক্রিয়ার উত্তম অবস্থায়, চিত্তবৃত্তি নিরুদ্ধ হলে, জীব ও ব্রহ্মের মধ্যে যে ভেদভাব তা দূরীভূত হয়ে যায়। তখন জীব যে অবস্থায় উপনীত হয়, তাকেই বলে স্বরূপের ধাম। কেউ একে বলেন, ব্রহ্মলোক, কেউ বলেন শিবলোক, কেউ বলেন বিষ্ণুলোক। দেহাভিমান বা দেহে-আত্মবোধ থেকে মন এই বিশ্বসংসারকে প্রকট করেছে। এবং এই সংসারেই নিজেকে আবদ্ধ করে স্বরূপের বিস্মৃতি ঘটিয়েছে। স্বকল্পিত হাজার এক সন্মন্ধে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে।
সাধনক্রিয়ার উত্তম অবস্থায়, চিত্ত নিরুদ্ধ হবার ফলে, নানাবিধ সম্মন্ধ, বিচিত্র রূপময় জগৎ নিমেষে হারিয়ে যায়। অন্তঃকরণ বৃত্তি দ্বারা দেহস্থিত আত্মভাবকে মন-প্রাণ-ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে যে জগৎরূপ বিষয়কে দর্শন করছিলো, দেহাভিমান ত্যাগ হবার ফলে, তা আবার স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তখন এই অনিত্যজগৎ বোধের লোপ হয়। আর যা সত্য-নিত্য অর্থাৎ যা স্বরূপ তার প্রকাশ ঘটে। এই অবস্থাকে বিষ্ণুর পরমপদ বলা হয়ে থাকে। স্বপ্ন ভেঙে গেলে যেমন আমরা বাস্তবে ফিরে আসি, তেমনি আমাদের জগৎ-স্বপ্ন ভেঙে গেলে, আমরা সত্য-স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হই।
প্রাণ বায়ু তখন ইড়া-পিঙ্গলা-সুষুম্না বাহিত হয়ে সহস্রারে স্থিত হয়। অর্থাৎ গুণাতীত অবস্থায় উপনীত হই। এই অবস্থায় যে জগৎ দর্শন হয়, সেখানে সূর্য্যের আলো, চন্দ্রের জ্যোৎস্না বা আভা চোখে পড়ে না। অথচ সেখানে একটা স্নিগ্ধ আলোর আভা অনুভব হয়, যা স্বপ্রকাশ। এই আকাশে নক্ষত্র রূপে মুনি ঋষির দর্শন মেলে। আবার কৃষ্ণবর্ণের বিন্দুর মধ্যে জ্যোতির্বিন্দুর দর্শন মেলে। মধুর প্রণব ধ্বনিতে মুখর হয়ে যায় এই জগৎ। এসব সাধনক্রিয়ার পরাবস্থায় ঘটে থাকে। এখানে অহেতুক আনন্দের স্নিদ্ধ বাতাস অনুভব হয়। সাধক অনাবিল আনন্দে বিরাজ করেন। এমনকি সাধক তখন এই আনন্দের সঙ্গে এক হয়ে যান। এই অবস্থা থেকে ফিরে এলেও, একটা ঘোরের মধ্যে জীব প্রবাহ চলতে থাকে। তখন যাকিছু তিনি অনুভব করেন, তার মধ্যে এই ব্রহ্মভাব বজায় থাকে। তখন অন্তর-বাহির এক হয়ে জগৎ ব্রহ্মময় হয়ে যায়। আসলে জগৎ যেমন ছিল, তাই-ই থাকে, কিন্তু যোগীর অনুভূতির স্তর সুক্ষ থেকে সুক্ষতর হবার কারনে, তিনি সুক্ষ জগৎ দর্শন করে থাকেন। যেখানে ভেদরহিত অবস্থা বিরাজ করছে। তখন দেহরূপ ঘট্ যেন ভেঙে গেছে, ঘটের জল সমুদ্রে মিশে গেছে। আনন্দ সাগরে সব ভেসে চলেছে। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছে, যিনি এই অবস্থার অধিকারী হয়েছে, তার আর জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ফিরে আসতে হয় না। কেননা তিনি সমস্ত কামনা বাসনার উর্দ্ধে চলে গেছেন।
কঠোপনিষদে আমরা একই কথার প্রতিদ্বনি পাই।
"ন তত্র সূর্য্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকং
নেমা বিদ্যুতো ভান্তি কুতোঽয়মগ্নিঃ।
তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বং
তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি।।" (শ্লোক ২/২/১৫)
যখন ব্রহ্মের উপস্থিতি হয়, তখন সূর্য দীপ্তি দান করেন না, চন্দ্র-তারকা, এমনকি বিদ্যুতও নয়। অগ্নির তো কথাই নেই। ব্রহ্মের জ্যোতিতে সবকিছু জ্যোতির্ময়। তাঁর আলোতেই সবকিছু আলোকিত। আমাদের সমস্ত ইন্দ্রিয় ও তার প্রকাশশক্তি সেই ব্রহ্ম বা আত্মা থেকে লাভ করে থাকে। সাধক ক্রিয়ার ফলে মন যখন শুদ্ধ হয়, অর্থাৎ অহং বুদ্ধি, মমত্ব বুদ্ধি থেকে মন যখন মুক্ত হয়, তখন সেই শুদ্ধ মনে ব্রহ্ম নিজেকে প্রকাশ করেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই অবস্থায় যেতে গেলে আমাদের কি করতে হবে ?
প্রথমত বিশ্বশক্তির কাছে প্রার্থনা করুন। কিন্তু কেন প্রার্থনা করবো। দেখুন যতক্ষন আপনি নিজেকে জগৎ থেকে আলাদা বলে মনে করবেন, অর্থাৎ আপনি একটি স্বতন্ত্র সত্ত্বা - এই বোধ যতক্ষন থাকবে ততক্ষন আপনাকে প্রার্থনা করতে হবে। যদি নিরাকারে আপনার আপত্তি থাকে, এমনকি আকারেও আপনার আপত্তি থাকে তবে আপনি সেই জ্যোতি স্বরূপ সবিতা দেবের কাছে প্রার্থনা করুন। কেননা এই সবিতাদেব ছাড়া জীবন ধারণ সম্ভব নয়। আর এই জ্যোতির্ময় সূর্যদেবের কৃপায় দেখবেন, আনার মন স্থির হতে শুরু করবে। আর মন স্থির হলে ধ্যানাদির দ্বারা পরমাত্মার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করবার চেষ্টা করুন। তখন দেখবেন, আপনার ইন্দ্রিসকল পরমাত্মার দিকে ধাবিত হতে শুরু করবে। এই পরমাত্মাকে উপলব্ধি করবার জন্য যে বিচারশক্তির প্রয়োজন, তাও দেখবেন আপনা আপনি এসে গেছে। প্রথমে বাসনা পূরণের জন্য আমাদের কর্ম্ম করতে হবে, এই কর্ম্ম যখন ঈশ্বরের উদ্দেশে করা হবে তখন তা নিষ্কাম কর্ম্মে পরিণত হবে।
এর পরের ধাপ হলো প্রাণায়াম, বা শ্বাস-প্রশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করা। শ্বাসপ্রশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মন ও ইন্দ্রিয়ের সংযম হবে।
পরবর্তী ধাপ হচ্ছে সমাধি -যা সংযমের অভ্যাসের ফলে স্বাভাবিক ভাবেই ঘটে যাবে। এর জন্য আলাদা করে কিছুই করতে হবে না ।
প্রাণায়াম করবার সময় কয়েকটা দিকে একটু খেয়াল রাখতে হবে। যেমন -যোগশাস্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী খাদ্য নির্বাচন করতে হবে, খাদ্যের পরিমান স্থির করতে হবে। ছোটোখাটো আরো কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে। ধীরে ধীরে সাবধানে, অতি যত্নের সঙ্গে প্রাণবায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ক্লান্তি বোধ করলে, তবেই স্বাস ত্যাগ করবেন, নতুবা যথাসম্ভব বেশিক্ষন কুম্ভকে থাকতে হবে।
চঞ্চল মনকে শান্ত করতে হবে। এমন কিছু দেখবেন না, শুনবেন না, পড়বেন না, যাতে মন চঞ্চল হতে পারে। খাদ্যের কারণেও মন চঞ্চল হয়, সেদিকে অবশ্য়ই নজর দিতে হবে।
কেউ কেউ মনে করেন, যোগ একটা রহস্য। একটা প্রহেলিকা মাত্র। অন্ধকার ঘরে, কালো বিড়াল ধরা। কেউ বলেন, অন্ধের হাতি দর্শন। কিন্তু ব্যাপারটা আদৌ তা নয়, যোগ একটা বিজ্ঞান। যোগ হচ্ছে আত্মসংযমের বিজ্ঞান। আপনাকে মন ও ইন্দ্রিয়গুলোকে বশে আনতে হবে। এই কাজটা দুরূহ হলেও মোটেই অসম্ভব নয়। যথাযথ ভাবে যোগ-প্রক্রিয়াগুলোর অভ্যাসের ফলে, এই সংযম আপনা থেকেই এসে যাবে। তবে নিশ্চিত যে এই কাজ আপনাকেই করতে হবে। আপনার হয়ে অন্যকেউ তা করে দিতে পারবে না। একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, আপনি যদি যোগী হতে চান, তবে অবশ্য়ই আপনার প্রত্যেকটি কর্ম্ম হবে নিয়ন্ত্রিত। আপনার জীবন হবে সুশৃঙ্খল। শ্রীগীতাতেই ষষ্ঠ অধ্যায়ে যোগের প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। নিয়ন্ত্রিত খাওয়া , নিয়ন্ত্রিত ঘুমোনো, নিয়ন্ত্রিত যোগপ্রক্রিয়ার অভ্যাস, আলস্যতা বর্জন ধর্ম্ম জীবনের চাবিকাঠি। সাফল্য আপনার হাতে। যোগের প্রতি শ্রদ্ধা, নিয়মিত অভ্যাস, এবং ধৈর্য্য আপনাকে অবশ্য়ই সাফল্যের শিখরে নিয়ে যাবে।
এখন কথা হচ্ছে যোগের অভ্যাস তো শুরু করলেন, কিন্তু এতে করে আপনার কোনো অগ্রগতি হচ্ছে কি না সেটা কি করে বুঝবেন ? ব্রহ্ম উপল্বদ্ধির আগে, যোগী তুষার, ধোঁয়া, সূর্য বাতাস, আগুন জোনাকি, স্ফুলিঙ্গ, স্ফটিক, চাঁদ প্রভৃতি দেখতে পান। এগুলো সবই ব্রহ্মজ্ঞানের আভাস। এই যে পৃথিবী, জল, তেজ, বায়ু, আকাশ প্রভৃতি অর্থাৎ স্থুল পঞ্চভূত এগুলো যোগীর কাছে গুনের মাধ্যমে প্রকাশ হতে থাকবে। অর্থাৎ শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস গন্ধ, প্রভৃতি সূক্ষ্ম গুনে পরিণত হবে। এইসব গুনের মাধ্যমেই তখন জগতের সঙ্গে যোগীর যোগাযোগ ঘটবে। যোগের আগুনে যোগীর দেহ শুদ্ধ হয়ে যাবে। তখন রোগ, জরা, মৃত্যু তাকে স্পর্শ করতে পারবে না। যোগ অভ্যাসের ফলে যোগীর ইচ্ছামৃত্যুর অবস্থা হবে। শরীরের মধ্যে লঘুতা, রোগের অভাব, ভোগলিপ্সার অভাব, গায়ের রঙ উজ্জ্বল, গলার স্বর মধুর, দেহ থেকে সুগন্ধ বেরুতে থাকবে। মল-মূত্র ত্যাগের স্বল্পতা দেখা দেবে। এইসব লক্ষণ যদি আসে, তবেই বুঝবেন, আপনি যোগের সঠিক পথে এগুচ্ছেন। তবে এইসব লক্ষণের প্রকাশ এক-একজনের মধ্যে এক-এক রকম হতে পারে।
যাইহোক,যোগী যখন নিজের আত্মার সকলের আত্মাকে উপলব্ধি করতে পারেন, তখন তিনি অনুভব করবেন, যে তিনি সব দুঃখের পারে চলে গেছেন। যোগী তখন নিজেকে দীপের মতো উজ্জ্বল দেখেন। তিনি যে ব্রহ্মের সঙ্গে অভিন্ন, তাও তিনি স্পষ্ট অনুভব করে থাকেন। আর এই উপলব্ধির ফলেই তিনি জন্ম-মৃত্যুর উর্দ্ধে চলে যান। জ্যোতিস্বরূপ পরমাত্মাকে পেলে তিনি অবিদ্যাজনিত যত বন্ধন তার থেকে মুক্ত হয়ে জগতে নির্ভিক ভাবে বিচরণ করে থাকেন। এই বোধই মুক্তি, এই অনুভূতি লাভই জীবনের উদ্দেশ্য।
মানুষ জন্মাবে, মারাও যাবে। যিনি আজ মাতৃগর্ভে, কাল তিনি শিশু হয়ে জগতে প্রবেশ করবেন। একদিন বৃদ্ধ হয়ে, শরীর ত্যাগ করবেন আবার ভবিষ্যতেও আবার তিনিই শিশু হয়ে জন্মাবেন। কিন্তু একটা জিনিস জানবেন, যা কিছু আসছে, যাকিছু বর্তমান আছে, আবার যাকিছু ভবিষ্যতে আসবে, - সবই পরমআত্মা - সবই ব্রহ্ম। শুধু রূপের বদল হচ্ছে, নামের পরিবর্তন হচ্ছে। সেই জ্যোতিঃ-ব্রহ্ম সর্বত্র। সমস্ত মুখ তাঁরই মুখ। এক ব্রহ্ম সর্বত্র বিরাজ করছেন । এই পরমাত্মাকে বারবার প্রণাম করি।
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
৩০.১২.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - পঞ্চদশ অধ্যায় পুরুষোত্তম যোগঃ
শ্লোক নং ১৫/৭
মমৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতনঃ
মনঃ ষষ্ঠানীন্দ্রিয়াণি প্রকৃতিস্থানি কর্ষতি।(১৫/৭)
আমার সনাতন অংশ জীব হয়ে প্রকৃতিতে অবস্থিত মন ও পঞ্চইন্দ্রিয়কে সংসারে আকর্ষণ করে থাকে।
শ্রী গীতা আসলে উপনিষদের সারগ্রন্থ। তো এখানেও উপনিষদের মতোই "ব্রহ্ম এক", এই বাদকে স্বীকার করে নিয়েছেন। এই শ্লোকে অবশ্য যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, জীব ব্রহ্মের অংশ। আগুনের সঙ্গে স্ফুলিঙ্গের বা জলের সঙ্গে যেমন শিশিরকণার একটা সম্পর্ক আছে, তেমনি ব্রহ্মের সঙ্গে জীবের একটা সম্পর্ক আছে।
কথায় বলে স্বভাব যায় না ম'লে। অর্থাৎ মৃত্যুর পরেও, তার স্বভাবের পরিবর্তন হয় না। মানুষ যখন গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, তখন সে জাগতিক সবকিছু ভুলে থাকে। নিষ্ঠূর ক্রূর মানুষও শান্ত হয়ে যায়। কিন্তু আবার যখন সে জেগে ওঠে তখন আগের মতো সংকল্পিত বা স্বভাবজাত কর্ম্মের অনুসরণ করে। ঠিক তেমনি জীবের মৃত্যু হলে তার সমস্ত ইন্দ্রিয়াদির সঙ্গে জীবাত্মা স্বরচিত জগতে কর্ম্মফলের ভোগ সম্পাদন করে থাকে। আর ভোগের শেষ হলে আবার যখন জগতে আসবার সময় হয়, তখন প্রকৃতিতে লিন হয়ে যাওয়া সেই ইন্দ্রিয়সকলে সে আকর্ষণ করে, এবং তদনুরূপ দেহ-ইন্দ্রিয় ইত্যাদি সম্পন্ন হয়ে জীবদেহে স্থাপিত হয়। যারা অজ্ঞান, কর্ম্মবন্ধনে আবদ্ধ তাদের এই পুনরাবৃত্তি ঘটে থাকে। কিন্তু যাঁরা দেহস্থিত অবস্থায় দেহ-প্রাণ -মনকে শুদ্ধ করতে পেরেছেন, যাদের মনে সাংসারিক কামনা বাসনার লোপ হয়েছে, তাঁদের আর পুনরাবৃত্তি ঘটে না। আসলে প্রাণের চঞ্চলতা হেতু সংকল্প-বিকল্পরূপ বুদ্বুদ যতক্ষন উৎপন্ন হবে, ততক্ষন এই সংসার চক্রে অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুর চক্রে পাক খেতে হয়।
জীব স্বরূপতঃ শিব। সমস্ত দেহের মধ্যে সেই এক ব্রহ্মজ্যোতি বিরাজ করছে। আর এই ব্রহ্মজ্যোতিই দেহকে প্রকাশ করছে। ব্রহ্মজ্যোতিকে ঘিরেই দেহাদি কর্ম্ম সম্পাদন হচ্ছে। দেহ প্রকৃতির দান। প্রকৃতিতে নিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু ব্রহ্মজ্যোতির কোনো বিকার নেই, কোনো পরিবর্তন নেই। প্রাণের স্পন্দনের কারণেই সৃষ্টি হচ্ছে মন। মনের সংকল্প-বিকল্প হেতু জগৎসৃষ্ট হচ্ছে। তো প্রাণ যখন স্পন্দন রহিত হয়ে যাবে, তখন মন তিরোহিত হয়ে যাবে। আসলে মনের প্রকাশ ও মনের অন্তর্দ্ধানই জন্ম-মৃত্যুর অভিনয়। কিন্তু যাঁরা সাধনক্রিয়ার সাহায্যে প্রকৃতিকে বশ করতে পেরেছেন, অর্থাৎ প্রাণের গমনাগমনের উপরে নিয়ন্ত্রণ করে চিত্তকে নিরুদ্ধ করতে পেরেছেন, তাঁদের মন আত্মমুখী হবার ফলে বিষয়বিমুখ হয়েছে। আত্মমুখী মন কর্ম্মবন্ধন থেকে মুক্ত থাকে। আত্মমুখী মনে সাংসারিক বাসনার তরঙ্গ ওঠে না। তো জীব ভাব হচ্ছে তরঙ্গসংকুল বহির্মুখী ভাব। আর স্থির ভাব হচ্ছে শিবভাব, পুরুষোত্তমের অবস্থা। এই স্থির অবস্থাই মায়াতীত অবস্থা। শ্বাসের চরণ ধরে এই অবস্থায় পৌঁছনো যায়। এখানে এলে, আর ফিরে যাবার ইচ্ছে হয় না। এই যে জীবাত্মা তা আসলে পরমাত্মার প্রতিফলন। আর এই জীবাত্মাও একদিক থেকে সনাতন, কেননা এই জীবাত্মা পরমাত্মার অংশ। পরমাত্মার কারণেই জীবাত্মার অস্তিত্ত্ব বোধ হচ্ছে। আমরা শুনেছি পরমাত্মা পরা ও অপরা ভেদে দুই প্রকার। এক হচ্ছে শক্তি আর একটা হচ্ছে শক্তিমান। এই শক্তি আর শক্তিমানের পার্থক্য করা যায় না। একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে যুক্ত। তাই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা অনুযায়ী "আমার সনাতন অংশ জীব হয়ে প্রকৃতিতে অবস্থিত মন ও পঞ্চইন্দ্রিয়কে সংসারে আকর্ষণ করে থাকে"। পুরুষ ও তাঁর ছায়াকে যেমন ভিন্ন করা যায় না, তেমনি পরমাত্মা ও জীবাত্মাকে আলাদা করা যায় না। দুইই সনাতন।
কঠ উপনিষদ বলছেন, "অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ পুরুষো মধ্য আত্মনি তিষ্ঠতি।.. এতদ্বৈ তৎ" (২/১/১২) "অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ পুরুষো জ্যোতিরিবা ধূমকঃ। .. এতদ্বৈ তৎ" বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পরিমান পুরুষ (ব্রহ্ম) দেহের অভ্যন্তরে বাস করেন। ইনিই সেই। ...বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পরিমান পুরুষকে যোগীগণ নিজ হৃদয়ে ধূমহীন অগ্নিশিখার ন্যায় দেখেন। ইনিই সেই জিজ্ঞাসিত আত্মা।
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
৩১.১২.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - পঞ্চদশ অধ্যায় পুরুষোত্তম যোগঃ
শ্লোক নং ১৫/৮
শরীরং যদবাপ্নোতি যৎ-চ-অপি উৎক্রামতি-ঈশ্বরঃ
গৃহিত্বা-এতানি সংযাতি বায়ুঃ-গন্ধান-ইব আশয়াৎ। (১৫/৮)
পুষ্পাদি থেকে গন্ধ সমূহকে বায়ুর যেমন গ্রহণ করে, তেমনি দেহাদির যিনি প্রভু অর্থাৎ জীবাত্মা যখন যে দেহ প্রাপ্ত হয়, এবং যখন সেই দেহ হতে উত্ক্রান্ত হয়, তখন এই ছয় ইন্দ্রিয়কে সঙ্গে করেই গমন করে।
জীবাত্মার দেহ-ত্যাগ বা দেহ-গ্রহণ কালীন সময়ের কথা বলা হচ্ছে। বলছেন, গন্ধ যেমন বায়ুর সঙ্গে গমন করে থাকে, তেমনি ইন্দ্রিয়সকল জীবাত্মার সঙ্গেই গমন করে থাকে। জীব বা জীবাত্মা কর্ম্মবশে স্থুল দেহ ত্যাগ করে সূক্ষ্ম দেহে গমন করে থাকে। আমরা জানি জীবের শরীর ত্রিবিধ - স্থুল, সূক্ষ্ম ও কারন। আমরা বাহ্যত যে শরীরটাকে দেখতে পারি, তা হচ্ছে স্থুল দেহ। স্থুল পঞ্চভূতের দ্বারা তৈরী এই স্থুল শরীর। আর সূক্ষ্ম শরীর গঠিত হয় ১৮টি উপাদানে। পাঁচটি কর্ম্ম ইন্দ্রিয়, পাঁচটি জ্ঞান-ইন্দ্রিয়, পাঁচটি তন্মাত্র, মন, বুদ্ধি (মতান্তরে মহত্তত্ত্ব) অহংকার। এই আঠেরোটি উপাদানে তৈরী।
আমরা আগের শ্লোকে (১৫/৭) যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে শুনেছি, মন ও পঞ্চইন্দ্রিয় (জ্ঞান) জীবাত্মাকে সংসারে আকর্ষণ করে থাকে। আসলে ইন্দ্রিয় বলতে শরীরের যে বাহ্য অঙ্গকে আমরা বুঝি, যেমন চক্ষু, কর্ন, নাসিকা, জিহবা, ত্বক, হস্ত, পদ, বাক, পায়ু, উপস্থ - এগুলো আসলে মাধ্যম মাত্র। এই অঙ্গগুলো সক্রিয় থাকা না থাকার উপরে আমাদের জাগ্রত অবস্থায় দর্শন, শ্রবণ ইত্যাদি ঘটা বা না ঘটা নির্ভর করে বটে, কিন্তু এই ইন্দ্রিয়গুলোর মাধ্যমে আসলে আমাদের অন্তরিন্দ্রিয় অর্থাৎ মন ক্রিয়া করে থাকে। মন এই অঙ্গের প্রকৃত পরিচালক। আমরা জানি, স্বপ্নাবস্থায়, এই শারীরিক অঙ্গসকল নিষ্ক্রিয় থাকে। আমাদের দ্বারা স্বপ্নে মনময় জগতে যে শ্রবণ, দর্শন ইত্যাদি ঘটে থাকে এমনকি আমরা স্বপ্নে নানার কর্ম্মও করে থাকি, তার জন্য আমাদের স্থুল কর্ম্ম-ইন্দ্রিয়ের সাহায্যের দরকার পড়ে না। তো স্থুল ইন্দ্রিয়ভিন্ন যে দর্শন-শ্রবণ হয়, তার কারন হচ্ছে, তখন আমাদের সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়সকল কার্যকরী ভূমিকা নিয়ে থাকে।
বলা হয় আমরা যখন জন্ম গ্রহণ করে থাকি, তখন আমাদের পূর্বজন্ম অর্জ্জিত প্রকৃতির দেহ গঠনের জন্য পূর্ব দেহের ইন্দ্রিয়, মন প্রভৃতিকে সঙ্গে নিয়েই জন্ম গ্রহণ করে থাকি। এই জীবনে যার যেমন চিন্তা, যার যেমন স্বভাব, সেই অনুযায়ী তার মনোময় দেহ গঠন হয়ে থাকে। অর্থাৎ সূক্ষ্ম মনোময় দেহ আমাদের চিন্তা ভাবনার বায়বীয় রূপ। আমরা যেমন কোনো কাজ করতে গেলে, আগে সেই কাজের উপাদান সংগ্রহ করি, তেমনি মানসিক দেহ গঠনের জন্য আমরা আমাদের ভাবনা অনুযায়ী আমরা জগৎ থেকে স্থুল অনুসকলকে আকর্ষণ করে থাকি। সুতরাং এই জন্মে আমি যেমন চিন্তার প্রতি অনুরক্ত থাকি, সেই অনুযায়ী আমরা মানসিক দেহ গঠন হয়ে থাকে, যেখানে এই স্থুলদেহ নাশের অব্যবহিত পরে আমাদের অবস্থান করতে হয়। তো জীব তার ভাবনার মধ্যে যদি পবিত্রতা না আনতে পারে, তবে মৃত্যুর পরে, পরিনাম স্বরূপ তার এই চিন্তা অনুযায়ী গঠিত অপবিত্র মনোময় দেহেই অবস্থান করতে হয়।
বুদ্ধিমান যোগীপুরুষগন এই জীবনেই ভবিষ্যৎ দুর্গতির বিষয়ে জ্ঞাত হয়ে, চিন্তা প্রসূত দেহের শুদ্ধিকরণ করে থাকেন। আর যারা ইন্দ্রিয়ভোগে লিপ্ত থাকেন, অশুভ চিন্তা করেন, তাদের তথাকথিত মৃত্যুর পরে, এই অশুভ চিন্তানু দ্বারা গঠিত দেহে অবস্থান করে দুর্গতি প্রাপ্ত হতে হয়। তো মহাত্মাগণ বলে থাকেন, যারা পরমার্থ চিন্তা করেন না, আত্মা-ফাত্মা মানেন না, বা সেই সম্পর্কে কিছুই বোঝেন না, তারা আত্মঘাতী। আর এই কারণেই তারা মূঢ়যোনিতে জন্ম গ্রহণ করে থাকেন। তো আপনার মনের মধ্যে যদি হিংসা, দ্বেষ, ঘৃণা ইত্যাদি চিন্তা চলতেই থাকে তবে সেইমতো স্বভাব নিয়েই আপনার ভবিষ্যৎ দেহ গঠন হবে। অর্থাৎ আপনি হিংস্র পশুদেহেও জন্ম নিতে পারেন।
কেন উপনিষদ শ্লোক নং ৪/৮-এ বলা হয়েছে, "তস্যৈ তপো দমঃ কর্মেতি প্রতিষ্ঠা বেদাঃ সর্বঙ্গানি সত্যম-আয়তনম্" - কৃচ্ছ্রসাধন, আত্মসংযম, ও আধ্যাত্মিক অনুশীলন, এই তিনটি হলো আত্মজ্ঞানের ভিত্তি। বেদসমূহ এই জ্ঞানের অঙ্গপ্রতঙ্গ এবং সত্য এই জ্ঞানের আবাস। আর যারা আত্মজ্ঞান লাভের জন্য সচেষ্ট নন, (ইশ-শ্লোক-৩) অর্থাৎ আত্মজ্ঞান রহিত, তারা অসুরলোক প্রাপ্ত হন। তাই আমাদের বারংবার চিন্তন করতে হবে, আমি শুদ্ধ চৈতন্য, নিত্যমুক্ত , নামরূপহীন সচ্চিদানন্দ ব্রহ্ম। সাধারণ জীবকুল কেবল বাসনা ও আসক্তির পিছনে ছুটছে, আর বারবার দেহ ছাড়ছে, আবার দেহ ধরছে। কিন্তু ভোগের নিস্পত্তি হচ্ছে না, যন্ত্রণারও শেষ হচ্ছে না।
আমরা দেখছি, জীব জন্মাচ্ছে, আবার মারাও যাচ্ছে। আমরা জানি, অসৎকর্ম্ম, অসৎ চিন্তা ভালো নয়। কিন্তু সব জেনে বুঝেও আমরা অসৎ কর্ম্মে প্রবৃত্ত হচ্ছি। আসলে আমরা কি অবশ হয়ে আছি ? বায়ুতে ফুলের সুগন্ধের মতো, বা বিষ্ঠার দুর্গন্ধের মতো শুভ অশুভ কর্ম্মাশক্তি আমরা একজন্ম থেকে আর-এক জন্মে বহন করে নিয়ে চলেছি। আর এই কারণেই আমরা আমাদের প্রকৃতির বশে নানান শুভ অশুভ কর্ম্মে নিজেকে জড়িয়ে ফেলছি। কেবল একটা অন্ধমোহ আমাদেরকে দিয়ে নানান কাজ করিয়ে নিচ্ছে। আর আমরা দাসের মতো কর্ম্ম করে চলেছি। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে কর্ম্ম করছি। আমরা শুভবুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছি।
তাই মহাত্মাগণ বলছেন, তুমি ক্ষনিকের জন্য কর্ম্মে বিরতি টেনে, একটু ভাব, কি করছি ? কেন করছি ? এর পরিণতি কি ? স্থির চিত্তে এই প্রশ্ন জাগিয়ে তুলুন। একটু সৎসঙ্গ করুন, একটু শাস্ত্র অধ্যয়ন করুন। সদ্গুরুর অন্বেষণ করুন। নির্জনে বসে, ভগবানের কাছে প্রার্থনা করুন, একটু চোখের জল ফেলুন। আর এতে করে, আপনার মধ্যে একটা শুভশক্তির জাগরন ঘটবে। ইন্দ্রিয় সংযমের ক্ষমতা জন্মাবে। অশুভ কর্ম্ম থেকে বিরত থাকবার জন্য মনের বল জন্মাবে। সবচেয়ে বড়ো কথা সমস্ত দুঃখের অবসান ঘটবে। ভগবানের কথা শোনা, শুধুই শোনার জন্য নয়, শ্রীগীতার পাঠ শুধুই বই পড়া নয়। নিজের মধ্যে শুভ বুদ্ধির জাগরণ করাই উদ্দেশ্য। শ্রী ভগবান সবসময় শুভ উপদেশ দিচ্ছেন, আমরা এক কান দিয়ে শুনে আর এক কান দিয়ে বের করে দিচ্ছি। এতে করে আমরা সেই শূন্য হয়েই থাকছি। হয়তো আমাদের মনের ভিতরে আবর্জনার স্তূপ, অজ্ঞান জমা হয়ে আছে। সেই অজ্ঞানরূপ আবর্জনার স্তূপ সরিয়ে একটু জায়গা করে দিন, ভগবানের বাণীগুলোকে সংরক্ষণের জন্য। আবর্জনা সরিয়ে নিজেকে একটু ফাঁকা করুন।
আমাদের শ্বাস একবার ইড়ানাড়ীতে প্রবাহিত হচ্ছে, আর আমরা বিষয়-চিন্তায় জর্জরিত হয়ে কর্ম্মচঞ্চল হয়ে উঠছি। আবার যখন পিঙ্গলা নাড়ীতে স্বাস প্রবাহিত হচ্ছে, তখন আমরা আলস্যে, নিদ্রা, মিথ্যার কল্পনিক জগতে বিচরণ করছি। এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। শ্বাসকে আমাদের সুষুম্না বাহিত করতে হবে। তখন বিষয়ের নেশা ছুটে যাবে। শ্বাসের নেই বিশ্বাস। শিয়রে দাঁড়িয়ে আছে যমদূত। কখন সে শ্বাসকে নিয়ে ছুটে পালিয়ে যাবে, কে বলতে পারে ? তাই আসুন, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, শ্বাসকে সুষুম্নাবাহিত করে, জীবনের মহৎ উদ্দেশ্যকে কার্যকরী করি। মহৎ চিন্তায় নিজেকে নিমজ্জিত করে, সুখ-দুঃখের ওপারে, সেই ভয়শূন্য আনন্দের জীবনের পথে পা বাড়াই।
ওম নমঃ শ্রী ভাগবতে বাসুদেবায়।
০১.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - পঞ্চদশ অধ্যায় পুরুষোত্তম যোগঃ
শ্লোক নং ১৫/৯-১০
শ্রোত্রং চক্ষুঃ স্পর্শনঞ্চ রসনং ঘ্রানমেব চ
অধিষ্ঠায় মনশ্চায়ং বিষয়ান উপসেবতে। (১৫/৯)
এই জীব কান, চোখ, ত্বক, জিহ্বা, ঘ্রান ও মনকে আশ্রয় করে বিষয় সমূহকে উপভোগ করে থাকে।
ঈশ্বর জীবাত্মাকে তিনটে শরীরে আবদ্ধ করে রেখেছেন। এগুলো হচ্ছে, ১) স্থুল দেহ যা পাঞ্চভৌতিক জড় দেহ, ২) সূক্ষ্ম অতিবাহিক দেহ, এবং ৩) কারন দেহ । জড়দেহী পৃথিবীর মানুষ ইন্দ্রিয়সকলের দ্বারা বিষয় অনুভূতি গ্রহণ করে থাকেন। কিন্তু আত্মিক জ্ঞানসম্পন্ন মানুষেরা প্রান্কণিকা দ্বারা গঠিত দেহের দ্বারা অনুভূতি সম্পন্ন হয়ে থাকেন। আর সবশেষে কারন শরীরধারী জীবসকল আনন্দময় ভাবরাজ্যে বিরাজ করে থাকেন। স্থুল শরীর যেমন অন্নাদি গ্রহণের সাহায্যে বেঁচে থাকে, তেমনি সূক্ষ্ম জগতের শরীর মহাজাগতিক শক্তি ও আলোক গ্রহণ করে বেঁচে থাকতে পারে। কারন শরীর আনন্দময় ভাবরাজ্যে বিরাজ করে থাকেন। প্রথম দুটো শরীর (স্থুল ও সূক্ষ্ম) পার্থিব পদার্থে নির্মিত, শেষ অর্থাৎ কারন শরীর অপার্থিব।
স্থুল শরীর অনন্ময় কোষের দ্বারা গঠিত। কিন্তু সূক্ষ্ম শরীর প্রাণময় ও মনময় কোষের দ্বারা গঠিত। তাই প্রাণময় শরীর প্রাণের হিল্লোলে পুষ্টি লাভ করে, আর মনোময় শরীর আমাদের চিন্তা-ভাবনা দ্বারা পুষ্টি লাভ করে থাকে। অন্যদিকে কারন শরীর বিজ্ঞানময় ও আনন্দময় কোষের দ্বারা গঠিত। এই বিজ্ঞানময় শরীর জ্ঞানদ্বারা পুষ্টি লাভ করে থাকে। আর আনন্দময় শরীর আনন্দ দ্বারা পুষ্টি লাভ করে থাকে। স্থুল ও সূক্ষ্ম দুই শরীরই পার্থিব। কিন্তু বিজ্ঞানময় ও আনন্দময় অর্থাৎ কারন শরীর অপার্থিব। আবার বিজ্ঞানময় দেহ পার্থিব না হলেও, পার্থিব ও অপার্থিব শরীরের সঙ্গে বিজ্ঞানময় দেহ যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে থাকে।
যাইহোক, স্থুল শরীরের নাশ হয়ে গেলেও, আমাদের সূক্ষ্ম শরীরের সহজে বিনাশ ঘটে না। জীব উৎক্রমণের সময় এই সূক্ষ্ম শরীর নিয়েই পরলোকে গমন করে থাকে। আবার যখন জন্ম গ্রহন করে তখন এই সূক্ষ্ম শরীরও তার সঙ্গে সঙ্গে আসে। এই সূক্ষ্ম শরীরে মন-বুদ্ধি সবই থাকে। এইজন্য আমাদের কর্ম্ম জনিত পাপ-পুন্য, ভালো মন্দ ধর্ম্ম-অধর্ম্ম সমস্ত কিছু সংস্কার আকারে এই সূক্ষ্ম শরীরের মধ্যে নিহিত থাকে। এই শরীর প্রতক্ষ্য করা যায়। যোগীগণ এই শরীর প্রত্যক্ষ করে থাকেন। এই সূক্ষ্ম ও স্থুল শরীরের কারণেই জীব জীবত্ব ভাবে ভাবিত হয়। আর এই কারণেই জীবের স্ব-রূপের অনুসন্ধান থেকে সে বিরত থাকে। জীব এই শরীর-ইন্দ্রীয়রূপ যন্ত্রে আরোহন করে বিষয়ের রস আস্বাদন করে থাকে। আর এই বিষয় রসের মধু পান করে নেশাছন্ন হয়ে সংসারের অশেষ যন্ত্রনা ভোগ সত্ত্বেও তার হুশ হয় না। বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে জন্ম থেকে জন্মান্তরে পরিভ্রমন করে থাকে। কিন্তু গুরুকৃপায়, কিছু ভাগ্যবান সাধক ইন্দ্রিয়ের সেবা ছেড়ে প্রাণের সেবায় নিযুক্ত হন । এঁরা গুরু বাক্যে বিশ্বাস করে, মন-প্রাণ দিয়ে সাধন ক্রিয়ার মধ্যে প্রবেশ করতে পারেন। এঁদের প্রাণ-অপান মিলিত হয়ে ইড়া-পিঙ্গলা ছেড়ে সুষুম্নার পথে ধাবিত হয়। জীবনের উদ্দেশ্য সার্থক হয়।
উৎক্রামন্তং স্থিতং বাপি ভুঞ্জানং বা গুনান্বিতম
বিমূঢ়া ন-অনুপশ্যন্তি পশ্যন্তি জ্ঞানচক্ষুঃ। (১৫/১০)
জীব কিভাবে সত্ত্বগুণাদি যুক্ত হয়ে দেহে অবস্থিত থেকে বিষয়সমূহ ভোগ করে, অথবা কিভাবে দেহ হতে উত্ক্রান্ত হয়, তা অজ্ঞ ব্যাক্তিগন দেখতে পান না কিন্তু জ্ঞানচক্ষু বিশিষ্ট ব্যাক্তিগন তা দেখতে পান।
মানুষের যে দেহটা আমরা দেখতে পাই, সেই দেহ আসলে অন্ন বা খাদ্য দ্বারা গঠিত এবং খাদ্য দ্বারাই পুষ্টিলাভ করে থাকে। আমাদের একটা ধারণা হচ্ছে এই স্থুল দেহই সমস্ত গুনের আধার। অর্থাৎ যকৃৎ থেকে যেমন পিত্তরস নির্গত হয়, তেমনি হয়তো আমাদের মাথা থেকে বুদ্ধি নির্গত হয়। মস্তক হয়তো সমস্ত বুদ্ধির আধার। ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। এই স্থুল দেহ ভৌতিক উপাদানে নির্ম্মিত। এই দেহ বিনষ্ট হলে, অর্থাৎ দেহের মধ্যে যে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চলছে, তার ব্যতিক্রম হলে দেহের যে উপাদান তা পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যায়। এই স্থুল দেহের ভিতরে এবং পনেরো/ষোলো ইঞ্চি পর্যন্ত বাইরে আরো একটা দেহ আছে, তার নাম সূক্ষ্মদেহ বা লিঙ্গদেহ। এই সূক্ষ্ম দেহে স্থুল উপকরণ নেই। এই দেহ আমাদের কামনা, বাসনা, আবেগ ইত্যাদি সূক্ষ্ম উপকরণের দ্বারা গঠিত। এই সূক্ষ্ম শরীরের অভ্যন্তরে আছে আমাদের মনোময় দেহ বা মানসদেহ । এই মনোময় দেহের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে আছে আরো একটা দেহ যাকে বলা হয় কারন-দেহ। এই কারন দেহই আসলে আমাদের মন-বুদ্ধির আধার। তো আমাদের তিনিটি দেহ ১. স্থুল, ২. সূক্ষ্ম, ৩. কারন। স্থুল দেহ অন্নময়, সুক্ষ দেহ প্রাণময় ও মনোময়, আর কারন দেহ বিজ্ঞানময় ও আনন্দময়।
ভৌতিক দেহের প্রত্যেক অনু-পরমাণুর মধ্যে দিয়ে সূক্ষ্ম দেহ বাইরের চারিদিকে প্রায় ১৫/১৬ ইঞ্চি পর্যন্ত বিস্তৃত। এর নাম আতিবাহিক দেহ। যোগীশ্রেষ্ঠ পুরুষগন স্থূল দেহের অন্তরে নিবিষ্ট এবং স্থুল দেহের ন্যায় আকৃতিবিশিষ্ট অতি সূক্ষ্ম পদার্থের দ্বারা নির্মিত আরো একটা দেহ দেখতে পান। এই অতিসূক্ষ্ম (etheric) অনুকৃতি (double) সূক্ষ্ম ও অন্যান্য দেহের সঙ্গে স্থুল দেহের সংযোগ স্থাপন করে থাকে। যখন স্থূল দেহে কোনো চিন্তা, মনের আবেগ, বুদ্ধি প্রভৃতির উদয় হয় তখন এই অতিসূক্ষ্ম অনুকৃতির (etheric double) সাহায্য নিয়ে থাকে। এই দেহ না থাকলে, স্থুল দেহের জীবনীশক্তি থাকতো না, এবং সূক্ষ্মতর ও উন্নততর দেহ থেকে বৃত্তিসকল স্থুল দেহে বিকশিত হতে পারতো না। প্রত্যেক মানুষের চতুর্দিকে একটা ধোঁয়ার ন্যায় বর্ণবিশিষ্ট একটা জ্যোতির্বলয় দেখতে পাওয়া যায়। এই জ্যোতির্বলয়ের মধ্যে আমাদের স্থুল দেহটি ভাসছে। এই জ্যোতির্বলয়ের চারিদিকে রশ্মিচ্ছটা বিচ্ছুরিত হচ্ছে। আমাদের যখন শরীর বা মন খারাপ হয়, তখন এই রশ্মিচ্ছটা বক্র আকার ধারণ করে। এই যে জ্যোতির্মণ্ডল, এটি আসলে আমাদের ইথারিক দেহ অর্থাৎ সূক্ষ্ম ও কারন দেহ বা বলা যেতে পারে মনোময় ও প্রাণময় দেহ থেকে নিঃসৃত জ্যোতি। এর মধ্যে আবার সূক্ষ্ম দেহ থেকে নিঃসৃত জ্যোতি সর্ব্বদা চঞ্চল হয়ে থাকে। এমনকি মনের ভাবের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই জ্যোতি বিভিন্ন বর্ণবিশিষ্ট হয়ে থাকে। মানুষ যখন কামাতুর হয়, তখন এই জ্যোতি গাঢ় লালবর্ণের হয়ে থাকে। স্বার্থপর মানুষের এই জ্যোতির বর্ণ হয় বাদামি রঙের। মানুষ যখন মানসিক দিক থেকে অবসাদগ্রস্থ হয়, তখন এই জ্যোতির বর্ণ হয় ধূসর । মানসিক উৎকর্ষতা বোধের লক্ষণ হচ্ছে হরিদ্রা বর্ণ। যাদের আধ্যাত্মিক উন্নতি হয়েছে, তার এই জ্যোতির বর্ণ হয়ে থাকে গাঢ় নীলবর্ণ। ভক্তের বর্ণ হচ্ছে বেগুনি। মহাত্মন যোগীপুরুষগন এই বর্ণের সাহায্যেই মানুষের মনের অবস্থা জানতে পারেন। যাইহোক, স্থুল দেহ নাশের পরে সবাইকেই (জীবাত্মা) এই সূক্ষ্ম দেহে বা ইথারিক দেহে বাস করতে হয়।
এবার যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথায় আসি। জীব কিভাবে সত্ত্বগুণাদি যুক্ত হয়ে দেহে অবস্থিত থেকে বিষয়সমূহ ভোগ করে, অথবা কিভাবে দেহ হতে উত্ক্রান্ত হয়, তা অজ্ঞ ব্যাক্তিগন দেখতে পান না কিন্তু জ্ঞানচক্ষু বিশিষ্ট ব্যাক্তিগন তা দেখতে পান।
প্রথমেই বলি প্রবেশ আর প্রস্থান বলে কিছু নেই। আত্মা সর্বত্র তাই তার প্রবেশ ও প্রস্থান বলে কিছু হয় না। আসলে অন্ধকার আর আলো। ব্রহ্ম সর্বত্র, যদি প্রবেশ থাকে বা প্রস্থান থাকে, তবে ধরে নিতে হয়, যেখান থেকে তিনি এসেছেন, সেখানে তিনি নেই। আবার যেখান থেকে প্রস্থান করেছে, সেখানে তিনি নেই। ব্যাপরটা এমন নয়। আসলে যতক্ষন আমাদের মধ্যে অজ্ঞানের অন্ধকার ততক্ষন আমরা ব্রহ্মদর্শন করতে পারি না, যখন জ্ঞানের আলো প্রজ্জ্বলিত হয়, তখন আমরা সর্বত্র ব্রহ্মদর্শন করে থাকি। এই যে দেহ, এই দেহের হৃদাকাশে যিনি অবস্থান করছেন, তিনিই আবার সূর্য্যের মধ্যে সূর্য্যরশ্মির মধ্যে রয়েছেন। যিনি এই সম্পর্কে জানেন, তিনি এই জগৎ সম্পর্কে উদাসীন হয়ে যান। অর্থাৎ বাসনা মুক্ত হয়ে যান। যোগীপুরুষগন যোগপ্রভাবে প্রথমে অনন্ময় আত্মার সঙ্গে অভিন্ন বোধ করেন। এর পর এক এক করে, প্রত্যেকটি শরীর অর্থাৎ প্রাণময়, মনোময়, বিজ্ঞানময় এবং আনন্দময় আত্মার সঙ্গে তিনি একাত্ম বোধ করেন। একসময় তিনি পরমাত্মা তথা ব্রহ্মে লিন হয়ে যান। যতদিন দেহাভিমান থাকে, ততদিন, আমরা নিজেদেরকে এই পাঞ্চভৌতিক দেহের সঙ্গে একাত্ম বোধ করি। কিন্তু স্বরূপের উপলব্ধি হলে, যোগী বুঝতে পারেন, যে তিনি দেহ নন। এখানে উৎক্রান্তঃ বলতে বোঝানো হচ্ছে জীব যখন স্থুল দেহ পরিত্যাগ করে, তখন সে সূক্ষ্ম ও কারন শরীরে প্রবেশ করে। আসলে শুদ্ধ চেতনার কোনো যাতায়াত ঘটে না, কেবলমাত্র প্রাণের যাতায়াত ঘটে থাকে।
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
০২.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - পঞ্চদশ অধ্যায় পুরুষোত্তম যোগঃ
শ্লোক নং ১৫/১১
যতত্নো যোগিনশ্চৈনং পশ্যন্তি-আত্মনি-অবস্থিতম
যতন্তঃ-অপি-অকৃতাত্মনো নৈনং পশ্যন্তি-অচেতসঃ। (১৫/১১)
সমাহিত চিত্ত যোগীগণ আপনাতে অবস্থিত এই আত্মাকে দর্শন করে থাকেন। কিন্তু যারা অজিতেন্দ্রিয় ও অবিবেকী তারা যত্ন সত্ত্বেও তাঁকে দেখতে পান না।
মানুষের হৃদযন্ত্রের সঙ্গে অসংখ্য ধমনীযুক্ত। এদের একটি ব্রহ্মরন্ধ্র পর্যন্ত বিস্তৃত। জীবাত্মা যখন এই পথে বেরিয়ে আসে, তখনই ব্যক্তি অমরত্ব লাভ করেন। কিন্তু অন্য ধমনীপথে বেরুলে, জীবাত্মার পুনর্জন্ম হয়, আর এইসব জন্ম যেমন মানবকুযে হতে পারে, তেমনি মনুষ্যেতর কূলেও হতে পারে (কঠ : ২/৩/১৬)
আত্মা দুর্জ্ঞেয়, আবার এই আত্মাই আমি। বিবেকবান পুরুষ ধ্যানাদি দ্বারা নিবিষ্ট চিত্ত হয়ে এই আত্মাকে অর্থাৎ নিজেকে উপলব্ধি করতে পারেন। কিন্তু যাদের চিত্ত চঞ্চল, যাদের প্রাণবায়ু স্থির হতে পারেনি, যারা ইন্দ্রিয়সকলকে নিজের বশে আনতে পারেন নি, তারা শতশত শাস্ত্রাদি পাঠের দ্বারা এমনি গুরুবিহীন হয়ে অসংযত প্রাণায়ামের দ্বারা ধ্যানাদির ভান করে কখনও সেই আত্মাকে উপলব্ধি করতে পারেন না। এই আত্মাই আমি। দেখুন চোখ সর্বত্র দর্শনক্রিয়া করে থাকে, কিন্তু নিজেকে সে দেখতে পায় না। এমনকি যে শরীরের সে অঙ্গ স্বরূপ হয়ে অবস্থান করছে, সেই শরীরের অন্তর প্রদেশ দূরে থাকুক, সমস্ত বাহ্য প্রদেশ (পিঠ মাথা ইত্যাদি) সে দেখতে পায় না। এর কারন হচ্ছে এর একপেশে দৃষ্টি। আবার এই চোখ চোখকে দেখতে পারে, যদি স্বচ্ছ আয়নায় তার প্রতিফলন হয়। ঠিক তেমনি স্বীয় আত্মা তদীয় তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতে প্রতিফলিত হয়। আর তখনই আত্মস্বরূপের উপলব্ধি হয়। কিন্তু যাদের বুদ্ধি ভোঁতা, যাদের বুদ্ধি অস্বচ্ছ, যাদের হৃদয় অসংস্কৃত, যারা ইন্দ্রিসকলকে জয় করতে পারেননি, যারা তপস্যাদি দ্বারা নিজেকে সংযমী করতে পারেননি, তাদের পক্ষে আত্মদর্শন সম্ভব নয়। অর্থাৎ চিত্ত শুদ্ধি আত্মদর্শনের প্রথম ও একমাত্র উপায়। আর এর জন্য দরকার তপঃ-সাধন, এরজন্য দরকার ইন্দ্রিয় নিগ্রহ। এই প্রাণায়ামরুপ তপস্যা ইন্দ্রিয়সকলকে বাহ্যবিষয় থেকে প্রত্যাহৃত করে অন্তর্মুখী করে তুলতে পারে। আর এই অন্তর্মুখী ভাবের গভীরতা যত বাড়তে থাকে, ধীরে ধীরে আত্মস্থ ভাবের ধারণা তত দৃঢ় হয়, ধ্যান জমে ওঠে, আর সমাধির অবস্থা প্রাপ্ত হওয়া যায়। সমাধি হচ্ছে চরম অন্তর্মুখী ভাব। এই অবস্থায় শ্বাসরূপী প্রাণের বহির্গমন প্রায় থাকে না বললেই চলে। মন বিষয়ান্তরের দিকে ধাবিত না হয়ে আপনাকে আপনি স্থিত হয়। এই স্থির অবস্থাতেই আত্মা আমাদের বোধগম্য হয়। একেই আত্মজ্ঞান বলা হয়ে থাকে। যাঁরা এই ভাবের মধ্যে প্রবেশ করতে পেরেছেন, তাঁরাই যথার্থ যোগী। কিন্তু যারা উপর উপর সাধনক্রিয়া করছেন বটে, কিন্তু বিষয়চিন্তা থেকে মুক্ত হতে পারেন নি, যারা ইন্দ্রিয়ের বশে ইন্দ্রিয়লব্ধ সুখ থেকে নিজেকে নিবৃত্ত করতে পারেন নি, তাদের পক্ষে আত্মদর্শন সম্ভব নয়। আসলে এই প্রাণায়াম ইত্যাদির অভ্যাস শুধু যন্ত্রের মতো করে গেলে চলবে না, এর মধ্যে চিত্তকে নিবিষ্ট করতে হবে। সমস্ত প্রতিকূল অবস্থাকে উপেক্ষা করে, নিরন্তর নিজের অধ্যাত্ম ক্রিয়ায় মন-প্রাণ ঢেলে দিতে হবে। কোনো কারণেই একদিনের জন্যও একে বাদ দিলে চলবে না। আমরা লক্ষ করেছি, কেউ কেউ বাহ্যত সাধন ক্রিয়া করছেন বটে কিন্তু মন অন্যত্র ঘোরাফেরা করছে, আর তিনি অভ্যাসবশে কেবল শ্বাস টানছেন আবার ছাড়ছেন। এসব আসলে আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছু নয়। আপনি যে কাজই করুন না কেন, সেই কাজে আপনি আপনার মন-প্রাণ ঢেলে দিন। আপনার সর্বাধিক শক্তি প্রয়োগ করুন। তাহলে দেখবেন, আপনার সেই কাজ সহজ ও সুন্দর হবে। যদিও প্রথম দিকে এই অবস্থায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা সাহজসাধ্য নয়, তথাপি নিরন্তর অভ্যাস এবং প্রত্যাহার দ্বারা মনকে সাধনক্রিয়ায় নিবিষ্ট করতে হবে। প্রত্যাহার অর্থাৎ মনকে অন্য বিষয় থেকে সাধনক্রিয়ার মধ্যে টেনে আনতে হবে। বারংবার এই পদ্ধতির মাধ্যমে সফল সাধনক্রিয়া করতে সক্ষম হবেন। তবে একবার যারা সাধনার সাহায্যে স্থিরতার স্বাদ বা আনন্দ পেয়েছে, তাঁরা নেশাগ্রস্থের মতো, সাধনক্রিয়ার মধ্যে নিজেকে বারবার টেনে নিয়ে আসেন। এঁরাই একসময় স্ব-স্ব প্রাণপ্রবাহকে অসীম প্রাণের সঙ্গে অর্থাৎ ব্রহ্ম-চৈতন্যের সঙ্গে নিজেকে নিমজ্জিত করবার সামর্থ্য লাভ করেছেন। যাদের সেই যোগ্যতা বা সামর্থ্য এখনও হয়নি তাদেরও হতাশ হবার কিছু নেই। গুরুবাক্যে শ্রদ্ধা-বিশ্বাস রেখে, দীর্ঘকাল মনোযোগ দিয়ে সাধনক্রিয়া করলে অবশ্য়ই সেই অমৃতের সন্ধান পাবেন। এর কোনো অন্যথা হবে না। ভগবান তো সবার মধ্যে এই শক্তি দিয়েছেন, কেবল এই শক্তির শুভপ্রয়োগ করতে হবে।
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
০৩.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - পঞ্চদশ অধ্যায় পুরুষোত্তম যোগঃ
শ্লোক নং ১৫/১২
যৎ-আদিত্যগতং তেজো জগৎ-ভাসয়তে-অখিলম
যচ্চন্দ্রমসি যচ্চাগ্নৌ তৎ তেজো বিদ্ধি মামকম। (১৫/১২)
যে তেজঃ সূর্য্যে অবস্থিত থেকে, জগৎ ঊদ্ভাসিত করে এবং যে তেজঃ চন্দ্র ও অগ্নিতে বিদ্যমান তা আমারই (আত্মার) জানবে।
খুব জানতে ইচ্ছে করে, এই যে সূর্য্য কোটি কোটি বছর ধরে জ্বলছে, এর ইন্ধন আসছে কোথা থেকে ? খুব জানতে ইচ্ছে করে, আমাদের মনের মধ্যে যে এতো বাসনার উৎপত্তি হচ্ছে এগুলো আসছে কোত্থেকে ? মনের মধ্যে যে বাসনার উৎপত্তি হচ্ছে, প্রথম দিকে মনে হয়, এসব আসলে মনের ধর্ম্ম। কিন্তু সাধনার সঙ্গে সঙ্গে যখন উপলব্ধি বোধের সূক্ষ্মতা আসে, তখন বোঝা যায়, এসব আসলে মনের ধর্ম্ম নয়, এসব কেবল মনের মধ্যে আসছে আর যাচ্ছে। ঠিক তেমনি সমস্ত জগৎ প্রকাশক এই সূর্য্যের মধ্যে যে প্রকাশশীল উপাদান তা আত্মার শক্তিতে সম্পন্ন হচ্ছে। কেবল আসছে আর যাচ্ছে।
কঠোপনিষদে ( শ্লোক নং ২/১/৯) স্বয়ং যমরাজ বলছেন, "যতঃ-চ উদেতি সূর্যো-অস্তং যত্র চ গচ্ছতি। তং দেবাঃ সর্বে অর্পিতাঃ তৎ উ ন অত্যেতি কশ্চন। ..." যার থেকে সূর্য উদিত হন, এবং যাতে অস্তমিত হন, তাতেই সকল দেবতারা সমর্পিত। তাঁকে কেউ কখনোই অতিক্রম করতে পারেন না। আবার শ্লোক নং ২/২/১৫ তে বলা হচ্ছে, তমেব ভান্তং-অনুভতি সর্বং, তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি। অর্থাৎ তাঁর জ্যোতিতেই সবকিছু জ্যোতির্ময়, তাঁর দীপ্তিতেই সবকিছু দীপ্যমান।
চন্দ্র, সূর্য, অগ্নি, তারকা থেকে আমরা আলো পেয়ে থাকি। এই আলোই জগৎকে প্রকাশ করেছে। উপনিষদ বলছে, কিন্তু ব্রহ্মের উপস্থিতিতে এঁদের জ্যোতি ম্লান হয়ে যায়। আসলে এইসব জ্যোতিষ্কের নিজস্ব কোনো আলো নেই, সেই আত্মার জ্যোতিতেই এঁরা জ্যোতিস্মান হয়ে থাকে। সমস্ত আলোর উৎস সেই স্বয়ংপ্রকাশ ব্রহ্ম। আমরা ভাবি ইন্দ্রিয়সকলকে সক্রিয় করছে আমাদের মন, কিন্তু সত্য হচ্ছে মন এই শক্তি আত্মা থেকে পেয়ে থাকে।
তিনি জ্যোতির জ্যোতি। তিনিই সকল কিছুকে প্রকাশ করে থাকেন। আমাদের এই স্থুল শরীরের মধ্যেও তিনি জ্যোতিরূপে বিরাজ করছেন। আর তাঁর জ্যোতির প্রভাবেই শরীরের প্রকাশ অনুভব হচ্ছে। আমাদের শরীরের যতসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এমনকি আমাদের শরীরের যে লাবণ্য, সৌন্দর্য্য সেই কূটস্থ জ্যোতির কারণেই হয়ে থাকে। সেই কূটস্থ জ্যোতি যখন জীবাত্মা রূপে দেহ ত্যাগ করেন, তখন স্থুল দেহে পচন শুরু হয়। তখন পঞ্চভূত দেহকে ছেড়ে নিজস্ব আলয়ে চলে যায়। আবার এই সূক্ষ্মজ্যোতি আকাশের সর্বত্র ব্যাপ্ত হয়ে আছেন। ব্রহ্মাণুর মধ্যে জগৎ বিস্তার লাভ করে আছে। সেই এক কখনো অদ্বিতীয় কখনো বহু। প্রত্যেক জীবের মধ্যে যেমন এই চিৎ-জ্যোতি-কণিকা আছে, তেমনি চিদাকাশে অর্থাৎ চৈতন্যযুক্ত আকাশে কোটি কোটি চিৎ-জ্যোতি-কণিকা নক্ষত্রের মতো বিরাজ করছে। এরই একটা চিৎ-জ্যোতি-কণিকাই আমি,যা অনন্ত ব্রহ্মকনিকা থেকে অভিন্ন। সাধনার পারাবস্থায় এই অভিন্ন অবস্থার সম্যক উপলব্ধি হয়। পরমাত্মারূপ চিৎ-জ্যোতিকণিকা আর কোটি কোটি চিৎ-কণিকা সম ধর্ম্ম বিশিষ্ট, সম স্বভাব বিশিষ্ট। অর্থাৎ যিনি যেমন জরা-মৃত্যু রোহিত, তেমনি ক্ষুদ্র চিৎ-কণিকাও জরা-মৃত্যু রোহিত। প্রজ্বলিত অগ্নি থেকে যেমন অগ্নির স্ফুলিঙ্গ বিচ্ছুরিত হতে দেখা যায়, সূর্য থেকে অনন্ত আলোক রশ্মি বিচ্ছুরিত হতে দেখা যায়, তেমনি এই পরমাত্মারূপ চিৎ-জ্যোতির গোলক থেকে প্রতিনিয়ত এই চিৎ-কণিকা বিচ্ছুরিত হতে দেখা যায়।
মুন্ডক উপনিষদ শ্লোক নং ৩/১/৩ - যা ঋষিগণের যথার্থ উপলব্ধি থেকে জানতে পারি, সাধক যখন, এই জ্যোতির্ময় স্রষ্টা আত্মার কারন স্বরূপ হিরণ্যগর্ভ বা পরমপুরুষকে উপলব্ধি তখন তিনি সমস্ত পাপ পুণ্যের উর্দ্ধে নির্লিপ্ত-পবিত্র-সাম্যাবস্থা লাভ করেন। আত্মা হৃদয়ের জ্যোতির্ময় শ্রেষ্ঠ কক্ষে বিরাজ করছেন,এই আত্মা কোটি সূর্য্যের চেয়েও উজ্জ্বল। যিনি (শ্লোক ২/২/৮) কারন ব্রহ্ম ও কার্য্য ব্রহ্ম উভয়কে নিজ আত্মা রূপে উপলব্ধি করতে সক্ষম হন, তার সকল সংশয় দূর হয়ে যায়।
ওম নমঃ শ্রী ভাগবতে বাসুদেবায়।
০৪.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - পঞ্চদশ অধ্যায় পুরুষোত্তম যোগঃ
শ্লোক নং ১৫/১৩-১৪
গামাবিশ্য চ ভূতানি ধারয়ামি-অহং-ওজসা
পুষ্ণামি চ-ঔষধীঃ সর্ব্বাঃ সোমো ভূত্বা রসাত্মকঃ। (১৫/১৩)
আমি পৃথিবীতে প্রবিষ্ট হয়ে ওজস অর্থাৎ বল দ্বারা ভূত সকলকে ধারণ করে আছি, রসাত্মক চাঁদ হয়ে সমস্ত ঔষধীকে পুষ্ট করছি।
আমাদের ধারণা হচ্ছে, এই যে গ্রহ-উপগ্রহ, নক্ষত্র-তারকারাজি নিজ নিজ কক্ষপথে ঘুরছে, এটি মাধ্যাকর্ষণের কারনে হয়ে থাকে। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন আমি (আত্মা) সমস্ত শক্তির (বল) মধ্যে অধিষ্ঠিত হয়ে এই বিশ্বচরাচর, যা পঞ্চভূতের সংমিশ্রণ মাত্র তাকে ধারণ করে আছি। এমনকি আমিই চন্দ্র স্বরূপ রসময় উপগ্রহ হয়ে সমস্ত শস্যসমূহকে সংবর্দ্ধন করছি। এই যে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এটি আসলে সেই ঈশ্বরের শক্তি হতেই শক্তিমান। ঐশ্বরিক শক্তিই মাধ্যাকর্ষণ রূপে ক্রিয়া করছে। চন্দ্রের মধ্যে যে অমৃতসুলভ রস আছে, তাও এই ঐশ্বরিক শক্তি। চন্দ্রের এই অমৃতরূপ রস, লতাগুল্মের মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে, ঔষধী বৃক্ষ সমূহে সঞ্চিত হয়ে, রোগ-নিবারিনী অসাধারন শক্তি, অর্থাৎ জীবনীশক্তি রুপে কাজ করছে। যদিও আজ এই ঔষধী গাছের গুনাগুন সম্পর্কে জ্ঞাত হয়ে, বিজ্ঞান জীবজগতের উপকার সাধন করছে, কিন্তু এই জ্ঞান প্রথমে আসে যোগীপুরুষের যোগচর্চ্চার ফলে। যোগবিদ্যাই এই জ্ঞানের সংগ্রাহক। প্রাণরূপী আত্মাকে মস্তকস্থিত করে দ্রব্যের উপরে ধ্যান করলে, দ্রব্যের মধ্যে যে শক্তি নিহিত আছে, তা যোগীর জ্ঞানগোচরে আসে। লোকহিতার্থে যোগীগণ এই দ্রব্যগুন জনসমাজে প্রচার করেছিলেন। আজ যে চিকিৎসা শাস্ত্র আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা আসলে এই যোগীপুরুষের অর্জ্জিত জ্ঞানের বিস্তার মাত্র। যদিও যোগাভ্যাস আত্মস্থিতির কারনে করা হয়ে থাকে, কিন্তু এই পথে যাত্রাকালীন, যোগীর মধ্যে নানান রকম যোগৈশ্বর্য্যের দেখা মেলে, যা যোগের পার্শ্বফল। হিন্দু শাস্ত্র বিশ্বাস করে, সমস্ত প্রকাশ বা অভিব্যক্তি প্রজাপতি ব্রহ্মা থেকে এসেছে। কিন্তু তিনি এই প্রকাশের জন্য তিনি কোনো চেষ্টাই করেন না, কেবল সংকল্প অর্থাৎ গভীরভাবে চিন্তা করে থাকেন । আর তার এই সংকল্প থেকেই এই জগতের প্রকাশ ঘটেছে। চন্দ্র-সূর্যকে বলা হয় প্রাণ ও রয়ি। সূর্য হলো প্রাণ, রয়ি হলো অন্ন বা খাদ্য। এই চন্দ্রই আদ্রতা। এই আদ্রতার ফলে পৃথিবীতে উদ্ভিদ ও প্রাণীসকল বেঁচে বেড়ে উঠতে পারছে। অন্ন (চন্দ্র) হচ্ছে ভোগ্য আর প্রাণ (সূর্য) হচ্ছে ভোক্তা। এই ভোক্তা আর ভোগ্যের খেলা চলছে। উপনিষদ বলছে, প্রাণের প্রকাশ ত্রিবিধ, ১. সূর্য, ২. অগ্নি, ৩. জঠরাগ্নি। ভূত হচ্ছে ইন্ধন, এই জঠরাগ্নিকে বলা হয় বৈশ্বানর। এসব আমরা পরের শ্লোকে শুনবো
অহং বৈশ্বানরো ভূত্বা প্রাণিনাং দেহম-আশ্রিতঃ
প্রাণ-অপান-সমাযুক্তঃ পচামি-অন্নং চতুর্ব্বিধম্ । (১৫/১৪)
আমি বৈশ্বানর অগ্নিরূপে প্রাণীগণের দেহে অবস্থান করি এবং প্রাণ ও অপান বায়ুর সাথে চতুর্ব্বিধ অন্ন পরিপাক করি।
যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, তিনিই (আত্মাই) জঠরাগ্নিরূপে শরীরের মধ্যে প্রবেশ করে, চতুর্ব্বিধ অন্যের পরিপাক করছেন। কিভাবে পরিপাক করছেন, না প্রাণ ও অপান এই বায়ু দুটোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিপাক করেন।
চতুর্ববিধ অন্ন বলতে কি বোঝায়। ১. যা চিবিয়ে খেতে হয়, ভাত, রুটি সবজি ইত্যাদি। ২. যা চুষে খেতে হয়, অর্থাৎ চিবিয়ে খাদ্যের রস সংগ্রহ করে, চর্বিত অংশ ফেলে দিতে হয়। যেমন আখ, ইত্যাদি ৩. যা পান করতে হয়, যেমন জল, দুধ ইত্যাদি। ৪. যা লেহন করতে হয়, অর্থাৎ চাটনি মধু ইত্যাদি।
দেখুন ভোজনক্রিয়া ঠিক ঠিক ভাবে সম্পন্ন না হলে, এমনকি খাদ্যবস্তু সঠিকভাবে হজম না করতে পারলে, জীবনের সমাপ্তি ঘটবে। অর্থাৎ অন্ন বা খাদ্য হচ্ছে, জীবের বেঁচে থাকবার এমনকী বেড়ে উঠবার প্রথম সোপান। আমাদের ধারণা হচ্ছে, দেহকে বাঁচিয়ে রাখবার, বা দেহকে সক্রিয় রাখবার জন্য খাদ্যের প্রয়োজন। কিন্তু সত্য হচ্ছে, এই খাদ্য গ্রহণ করছেন, সেই দেবতা যিনি আসলে এই অন্যের ভোক্তা। এইজন্য আমরা দেখে থাকি, জ্ঞাণীপুরুষগন খাদ্য গ্রহণের আগে, খাদ্যকে পরম-দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করে থাকেন। আর এই অন্ন গ্রহণ করবার জন্য, যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, তিনি স্বয়ং বৈশ্বানর রূপে আমাদের জঠরের ভিতরে অবস্থান করছেন। আবার উপনিষদে বলা হচ্ছে অন্নই ব্রহ্ম।
তো পরমাত্মারূপী বৈশ্বানর অগ্নি আমাদের জঠরের মধ্যে অবস্থান করছেন। তাকে প্রতিদিন ভোজ্যরূপ আহুতি প্রদান করতে হবে। প্রাণ ও অপান-এর ঘর্ষনে যে বৈশ্বানর অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হচ্ছে, তাতে যদি ভোজ্য পদার্থ না দিতে পারি, তবে আমাদের আর বেঁচে থাকা সম্ভব হবে না।
প্রাণ ও অপানের ঘর্ষণের ফল এই বৈশ্বানর অগ্নি প্রজ্বলিত হয়। এই ক্রিয়া মনোযোগ সহকারে করতে হয়। মনোযোগ দিয়ে এই অগ্নির উপাসনা করতে হয়। অর্থাৎ এই অগ্নির কারণেই আমাদের মধ্যে ক্রোধাগ্নি, কামাগ্নি জ্বলে উঠতে পারে। আর এতে করে আমাদের দেহ-মন বিপথে চালিত হয়ে জীবের উদ্দেশ্যকে মাটি করে দিতে পারে। আবার এই অগ্নির কারনে আমাদের প্রাণবায়ু সুষুম্না বাহিত হয়ে জীবন ধন্য করতে পারে। আমরা বৈশ্বানর রূপে শ্রী ভগবানের উপলব্ধি করতে পারি
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
০৫.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - পঞ্চদশ অধ্যায় পুরুষোত্তম যোগঃ
শ্লোক নং ১৫/১৫
সর্ব্বস্য চাহং হৃদি সন্নিবিষ্টো
মত্তঃ স্মৃতি-জ্ঞানম-অপোহনং-চ।
বেদৈশ্চ সর্ব্বৈঃ-অহম-এব চ বেদ্যো
বেদান্তকৃদ্ বেদবিদেব চ-অহম্। (১৫/১৫)
আমি সকলের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত, আমা হতে জীবের স্মৃতি, জ্ঞান ও মোহ উৎপন্ন হয়। বেদসুমহের জ্ঞাতব্য আমিই। আমিই বেদার্থ প্রকাশক, আমিই বেদজ্ঞ।
যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, আমি (আত্মা) সকলের হৃদয়ে অবস্থিত । কঠোপনিষদেও আমরা এই একই ধ্বনি শুনতে পাই। শ্লোক নং.২/৩/১৭ - এ বলা হচ্ছে, "অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ পুরুষঃ-অন্তরাত্মা সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ" অর্থাৎ অঙ্গুষ্ঠ পরিমান অন্তরাত্মা প্রত্যেকের হৃদয়ে সদা বিদ্যমান। আবার যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, আমা থেকেই সমস্ত প্রাণীর স্মৃতি বা স্মরণক্ষমতা জন্মে।
অনুভূত বিষয়জ্ঞান হচ্ছে স্মৃতি। অর্থাৎ পূর্বপূর্ব জ্ঞানের স্মরণকে বলা স্মৃতি। জ্ঞান হচ্ছে সংগৃহিত তথ্য।
আমাদের এই স্থুল শরীর বাইরের দিক থেকে দেখতে গেলে, অস্থি, চর্ম্ম, মাংস, রক্ত, রসের দ্বারা নির্মিত একটা অচেতন কাঠামো ছাড়া কিছু নয়। এখানে কোনো কিছুই স্থায়ী নয় । প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে। এখানে প্রতিক্ষনে নতুন নতুন কোষের জন্ম হচ্ছে, আবার মৃত্যু হচ্ছে। তো এই অস্থায়ী শরীরের মধ্যে কোথায়, স্থায়ী সংরক্ষণশালা থাকতে পারে না. আসলে এই শরীরের মধ্যেই একটা জ্যোতিঃ স্বরূপ বিদ্যুৎ তরঙ্গ প্রবাহিত হচ্ছে। এই জ্যোতিস্বরূপ বিদ্যুৎ তরঙ্গ থাকার ফলেই জড় জীবশরীরকে জীবন্ত বলে মনে হচ্ছে। এই জ্যোতিস্বরূপ বিদ্যুৎ তরঙ্গের উৎস এই হৃদয়স্থিত আকাশ। এখান থেকেই স্ফুলিঙ্গের মতো সমস্ত শরীরে বিদ্যৎ তরঙ্গের প্রবাহ চলছে।
এইসব সাধনক্রিয়ার পরাবস্থায় উপলব্ধ হয়। তাই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, এমনকি জীবের যে ইন্দ্রিয়জাত জ্ঞান, তাও আমা হতেই হয়ে থাকে। আবার এই জ্ঞানের অভাব এবং স্মৃতির বিলোপ হবার কারণও আমি। বেদ থেকে যেসব দেবতাদের জ্ঞান হয়, তা আসলে আমারই জ্ঞান। অর্থাৎ বেদের যিনি জ্ঞাতব্য, তিনি আমি। বেদের অর্থের যিনি প্রকাশক তিনিও আমি। আবার বেদের জ্ঞাতাও আমি, তাই আমি বেদজ্ঞ।
এই জ্যোতির অনুপস্থিতে সব অন্ধকার। একেই বলে আত্মজ্যোতি। এই আত্মজ্যোতিরূপ পুরুষ দ্বারাই প্রকাশক্রিয়া হয়ে থাকে। এমনকি সমস্ত জগৎ তাঁর দীপ্তিতেই প্রকাশিত। সাধন ক্রিয়ার পরাবস্থার নামই প্রকৃত জ্ঞান। জ্ঞানই ব্রহ্ম। প্রকৃত জ্ঞানে কোনো দ্বৈতভাব থাকে না। আর দ্বৈতভাবের অনুপস্থিতির কারনে বিষয় তৃষ্ণা থাকে না। ক্রিয়ার পরাবস্থায় "আমিই সেই অদ্বিতীয়" এই স্মৃতিধারা উদয় হতে থাকে। এই অবস্থায় জ্ঞাতা না থাকায় জ্ঞেয় বলে কিছু থাকে না। সেই অদ্বিতীয় পরমাত্মা নিখিল ব্রহ্মান্ডের সত্তা-স্বরূপ এই জ্ঞান আমাদের মতো সাধারনের অনুমানের মধ্যে থাকলেও, সাধনার পারাবস্থায় এই জ্ঞান প্রত্যক্ষভাবে অনুভব হয়। আর একেই বলে বেদজ্ঞের অবস্থা।
এখন একই ব্যক্তি বা সত্তা একদিকে বেদজ্ঞ বা বেদবিদ আবার সেই সত্তাই জ্ঞানের অপসারণকারী, এটা কিভাবে সম্ভব ? আসলে নতুন করে আমাদের কিছুই জ্ঞাতব্য বলে নেই, আবার নতুন করে জ্ঞানের লোপ সাধনেরও কিছু নেই। আমরা যখন নিদ্রিত থাকি, তখন আমরা জাগ্রত অবস্থার ক্রিয়ার জগৎ সম্পর্কে বিস্মৃত থাকি। আবার যখন জাগ্রত থাকি, তখন আমরা স্বপ্ন জগৎ সম্পর্কে বিস্মৃত হয়ে থাকি। তেমনি যখন সমাধিতে থাকি তখন আমাদের চৈতন্যের অবস্থা হয়। এই অবস্থায় যে চৈতন্যজ্ঞান থাকে, তা এই বাহ্যিক জ্ঞান অর্থাৎ শাস্ত্রপড়া বিদ্যা থেকে স্বতন্ত্র। সাধনার উত্তম অবস্থায় আমাদের ধীশক্তি এতটাই বৃদ্ধি পায়, যে বাহ্য জগতে-বিষয় বলুন আর অন্তর্জগৎ-বিষয় বলুন, তা এতটাই স্পষ্ট ভাবে প্রতিভাত হয়, যে তিনি তখন সমুদয় জ্ঞানের মধ্যেই নিমজ্জিত হয়ে যান। তখন সাধক জাগ্রত-স্বপ্ন-সুষুপ্তি এমনকি তুরীয় অবস্থার যেকোনোটিতে প্রবেশ করেন না কেন, কেবল ব্রহ্মজ্যোতি বা জ্ঞানালোক তাকে ঘিরে থাকে। তখন তিনি যে বিষয়ের ভিতরে সংযম করেন, তখন সেই বিষয়ের গভীর তত্ত্ব সম্পর্কে যথার্থ উপলব্ধি করেন। আবার সমাধি থেকে বুত্থিত হন, তখন কেবল স্মৃতিটুকু ভেসে থাকে। তাই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, আমিই স্মৃতি, আমিই জ্ঞান আবার আমিই অজ্ঞান উৎপন্নকারী। আমিই বেদসুমহের জ্ঞাতব্য, আমিই বেদার্থ প্রকাশক, আমিই বেদজ্ঞ। অর্থাৎ যোগের সর্বোচ্চ অবস্থার অধিকারী। যোগের উত্তম অবস্থার অভিব্যক্তি এইসব শ্লোকের মধ্যে স্পষ্ট হয়েছে।
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
০৬.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - পঞ্চদশ অধ্যায় পুরুষোত্তম যোগঃ
শ্লোক নং ১৫/১৬
দ্বাবিমৌ পুরুষৌ লোকে ক্ষরশ্চাক্ষর এব চ
ক্ষরঃ সর্ব্বাণি ভূতানি কূটস্থ-অক্ষর উচ্যতে। (১৫/১৬)
এই লোকে ক্ষর ও অক্ষর নামে দুই পুরুষ প্রসিদ্ধ। এর সমধ্যে সমস্ত ভূত হচ্ছে ক্ষর, আর কূটস্থ ভোক্তা যিনি তিনি অক্ষর পুরুষ রূপে কথিত হন।
ক্ষর কথাটার অর্থ হচ্ছে, যা ক্ষরিত হয়। আর অক্ষর যা ক্ষরিত হয় না। অর্থাৎ একটা হচ্ছে নিত্য (অক্ষর) আর একটা হচ্ছে অনিত্য (ক্ষর) । ক্ষর হচ্ছে ঈশ্বরের মায়াশক্তি। আর অক্ষর হচ্ছে মায়াশক্তির উৎপত্তির কারণস্বরূপ। পরমাত্মা এক হলেও, উপাধির কারনে পরমাত্মার নানাত্ব উপলব্ধি হয়। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, ক্ষর শব্দ দ্বারা সর্ব্বভূতকে বোঝানো হচ্ছে। অর্থাৎ সমস্ত বিকারজাত বস্তুই হচ্ছে ক্ষর জাতীয়। আর কূটস্থ যে পুরুষ তাকে বলা হচ্ছে অক্ষর পুরুষ। কূটস্থ - কূট কথাটার অর্থ হচ্ছে শৃঙ্গ বা উচ্চ। যেমন চিরকুট পর্ব্বত। এই কুট কথাটার আরো একটা অর্থ হচ্ছে মায়ার দ্বারা আবৃত। আর কূটস্থ হচ্ছে মায়ার দ্বারা আবৃত নিত্য নির্বিকার পরমাত্মা। অর্থাৎ কূটস্থে পরমাত্মা মায়ার দ্বারা আবৃত হয়ে নিত্য-নির্বিকার হয়ে অবস্থান করছেন। মায়ার দ্বারা আবৃত হবার ফলে নাম হয়েছে জীবাত্মা। এই জীবাত্মা আর পরমাত্মায় স্বরূপত কোনো ভেদ নেই, কিন্তু পরমাত্মা যখন মায়ার দ্বারা আবৃত হন, তখন তিনি জীবাত্মা।
ব্রহ্মা থেকে শুরু করে, স্থাবর-জঙ্গম ইত্যাদি যে সমস্ত শরীর, যাকে অবলম্বন করে চৈতন্যের প্রকাশ ঘটে, সেই ব্যক্তভাবরূপ শরীর হচ্ছে ক্ষর পুরুষ। আর এই দেহ বিনষ্ট হলে যিনি থাকেন, তিনি হচ্ছেন, সেই কূটস্থ চেতন -ভোক্তা। এখন কথা হচ্ছে এই চেতন-ভোক্তা অর্থাৎ জীবাত্মা কিভাবে সেই অব্যক্ত ব্রহ্মসত্তা থেকে উদ্ভূত হলো ?
আমরা জানি আমাদের চারটি অবস্থা। অর্থাৎ চারটি জগতের মধ্যে আমরা ঘোরাফেরা করতে পারি। ১. জাগ্রত, ২. স্বপ্ন, ৩. সুষুপ্তি ৪. তূরীয়। যদিও মহাযোগীপুরুষগন বলে থাকেন, এ ছাড়াও আরো একটা জগৎ আছে আর তা হচ্ছে অতি-তূরীয় জগৎ।
যোগের উদ্দেশ্য হচ্ছে চেতনাকে এই চারটি স্তরে অভিনিবেশ ঘটানো। চেতনার নিম্ন স্তরে জীবভাব-পশুভাব। ধীরে ধীরে দেবভাব, শিবভাব। সমাধি অবস্থায় প্রজ্ঞাবান পুরুষ শিবভাব প্রাপ্ত হন। জীবাত্মা ও পরমাত্মা এক হয়েও প্রাণপ্রবাহের মধ্যে দিয়ে জড় বা জাগ্রত অবস্থায় অবতীর্ন হয়েছেন। আবার এখন এই প্রাণপ্রবাহের দ্বারা বিপরীতমুখী হয়ে স্বীয় কেন্দ্রে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। এই প্রত্যাবর্তন ক্রিয়াকেই সাধনক্রিয়া বলে। জাগ্রত অবস্থায় আমাদের স্থুল দেহ সক্রিয় থাকে, স্বপ্নাবস্থায় আমাদের সূক্ষ্ম দেহ সক্রিয় থাকে। সুসুপ্তির অবস্থায় কারন দেহ নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে। এই কারন দেহ অতিক্রম করে, চতুর্থ ভূমি বা তূরীয় অবস্থায় উত্তীর্ন হতে হবে। এই তিনটি দেহেই অর্থাৎ স্থুল, সূক্ষ্ম ও কারন দেহেই চৈতন্যের সঞ্চারণ অব্যাহত। যখন স্থুল দেহে এই চৈতন্য প্রকাশিত থাকে, তখন আমরা জাগ্রত অবস্থার মধ্যে বিরাজ করি। চৈতন্য যখন স্থুল দেহে বিরাজ করে তখন তিনি ভূতাত্মা। ইনি অনন্ময় কোষের বাহক। এই ক্ষেত্র হচ্ছে অহমিকার ক্ষেত্র। এই অবস্থায় অহং অভিমানী জীব, সুখ-দুঃখের ভোক্তা। তখন তার মধ্যে স্থুল জগৎ ও তার স্থুল বস্তু ভিন্ন অন্যকিছু নজরে পড়ে না। এই স্থুল ভাব, বা জড় ভাব যখন মাত্রাতিরিক্ত হয়, তখন তার মধ্যে পশুত্ব ভাবের জাগরণ ঘটে থাকে। এর থেকে একটু উপরে উঠতে পারলে, তার মধ্যে পাশবিক প্রবৃত্তির নাশ ঘটে থাকে।
এর পরে ভূতাত্মা জীবাত্মার মধ্যে প্রবেশ করে। জীবাত্মাই পরমাত্মার প্রকাশ স্থল। এই অবস্থায় একটা শুদ্ধভাব অহং রূপে জেগে থাকে। এই শুদ্ধ অহং ভাব স্থুল-সূক্ষ্ম-কারন এই তিন শরীরকেই প্রাণময় করে রাখে। এই শুদ্ধ সত্ত্বা আসলে সূক্ষ্ম ও কারন শরীরকে বাহন করে থাকে। এই অবস্থাকে জীবাত্মাকে যোগীপুরুষগন জ্যোতিঃরূপে প্রতক্ষ্য করে থাকেন। এই জ্যোতিঃ যদি স্থুল শরীরে না বিদ্যমান থাকে তবে স্থুল শরীর অক্রিয় হয়ে যায়। যেমন আমাদের স্বপ্নাবস্থায় হয়ে থাকে। তখন শরীর অক্রিয়, কিন্তু সূক্ষ্ম শরীর ক্রিয়াশীল হয়ে থাকে। এমনকি স্থুল শরীরের যে অহংভাব তাও বিলুপ্ত হয়ে যায়। এইজন্য জ্ঞানী অজ্ঞানী, ভালো মানুষ বা খারাপ মানুষ সবাই ঘুমের মধ্যে একাকার হয়ে যায়। যদিও এই তিনটি দেহই প্রপঞ্চ ছাড়া কিছু নয়, আর প্রপঞ্চের অতীত যে আত্মা যখন এই শরীরকে প্রানসূত্রে গেথে রাখে, অর্থাৎ শরীরে যতক্ষন প্রাণক্রিয়া চলতে থাকে, ততক্ষনই এই দেহে চৈতন্যের সঞ্চার ঘটে থাকে। তো প্রাণ হচ্ছে সূত্র যা তিনটি দেহ ও আত্মাকে মালার মতো গেছে রেখেছে। এই সূত্রাত্মাই জীব বলে কথিত হয়। এই সূত্রাত্মাই শ্বাসরূপে জীবের জীবন। একারনেই যোগীপুরুষগন শ্বাস-প্রশ্বাসকে দৃঢ় ভাবে অবলম্বন করে আত্মার সন্ধান করে থাকেন ।
কঠোপনিষদে বলা হচ্ছে, কোমল শীষকে যেমন অতিযত্নে কোষমুক্ত করতে হয়, ঠিক তেমনি মুমুক্ষ ব্যক্তির উচিত আত্মাকে বিবেকজ্ঞানের সাহায্যে দেহ-মনের থেকে আলাদা করা। "মুঞ্জাৎ ইষীকাম ইব স্বাৎ শরীরাৎ ধৈর্যেণ তং প্রবৃহেৎ" । (শ্লোক নং ২/৩/১৭ কঠো)
আমাদের যতক্ষন শ্বাসপ্রশ্বাস থাকে, ততক্ষন আমাদের আমাদের মধ্যে কামনা , বাসনার উদ্রেগ হতে থাকে। এই শ্বাস প্রশ্বাস স্থির হয়ে গেলে, বাসনার উৎপত্তি হয় না। আবার বাসনা জনিত কর্ম্মেরও উদ্ভব হয় না। ফলতঃ কর্ম্ম জনিত যে কর্ম্মফল তা ভোগের নিমিত্ত আমাদের আর জন্ম-মৃত্যুর কবলে পড়তে হয় না। আবার এইযে আত্মা বা পরমাত্মা এর থেকেই প্রাণের উৎপত্তি। আর এই প্রাণ চৈতন্যের সঙ্গে ছায়ার মতো বিচরণ করে থাকে। পুরুষের যেমন ছায়া সমুৎপন্ন হয়ে থাকে তেমনি প্রাণ আত্মাতে অনুগত হয়ে থাকে। এবং মনময় কোষাদির দ্বারা এই স্থুল শরীরে আগমন করে।
প্রত্যেক আত্মাই চিন্মাত্র। তিনিই কূটস্থ, জীবাত্মা এরই কিরণ মাত্র। চিৎ-কণিকা স্বরূপ প্রত্যেক আত্মাই শুদ্ধ বুদ্ধ মুক্ত স্বভাবের। এই চিৎ-কণিকা যে সংখ্যায় কত তার ইয়ত্বা নেই। এই চিৎ-কণিকাই আসলে সেই একের বহুরূপ। কিন্তু বহু হয়েও সেই একের সঙ্গে সর্বদা যোগযুক্ত। এই চিৎ-কণিকা পুরুষই অনন্ত চিদাকাশের বুকে প্রতিনিয়ত ফুটে উঠছে। এই যে চিদাকাশ এও আবার সেই অব্যক্ত পরব্রহ্মের খানিকটা ব্যক্ত রূপ।
অসংখ্য জলপাত্রে যেমন অসংখ্য সূর্য্যের দেখা পাওয়া যায়, কিন্তু পাত্র বিনষ্ট হলে, কেবল একসূর্য্য বর্তমান থাকে, তখন জ্ঞাতা বলেও আর কেউ থাকে না। তো যোগীরাজ বলছেন, জগতে পুরুষ দুই প্রকার। এক - যারা বিষয়াদিতে আসক্ত - অর্থাৎ দেহ বন্ধনে আবদ্ধ বদ্ধজীব। আর একদল আছেন যাঁরা কূটস্থে নিবদ্ধ। এঁদের মন, দেহ-সন্মন্ধে আবদ্ধ নয়। এদের মন, আত্মার সাথে মিলিত হয়ে আছেন, আর ধীরে ধীরে একসময় পরমাত্মার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান। পরম পদ লাভ করেন।
ওম নমঃ শ্রী ভাগবতে বাসুদেবায়।
০৭.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - পঞ্চদশ অধ্যায় পুরুষোত্তম যোগঃ
শ্লোক নং ১৫/১৭
উত্তমঃ পুরুষস্ত্বন্যঃ পরমাত্মেত্যুদাহৃতঃ
যো লোকত্রয়ম-আবিশ্য বিভর্ত্ত্যব্যয় ঈশ্বরঃ। (১৫/১৭)
অন্য এক পুরুষ পরমাত্মা বলে কথিত হন. তিনি লোকত্রয়ে প্রবিষ্ট হয়ে সকলকে পালন করছেন - তিনি অব্যয়, তিনিই ঈশ্বর।
শ্রীগীতায় ক্ষর, অক্ষর, এই শব্দ দুটি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়েছে। ১) অপরা প্রকৃতি, অহং প্রকৃতি (শ্লোক - ৭/৪-৬) ২) ক্ষেত্র, ক্ষেত্রজ্ঞ, মাম অর্থাৎ আমি (শ্লোক ১৩/১-২) ৩) যোনি, বীজ ও পিতা (শ্লোক নং. ১৪/৩-৪) ৪. ক্ষর, অক্ষর, পুরুষোত্তম (১৫/১৭)
আগের শ্লোকে (১৫/১৬) ক্ষর ও অক্ষর এই দুই পুরুষের কথা বলা হয়েছে। এবার বলছেন, উত্তম পুরুষ এই দুইয়ের থেকে পৃথক। এই উত্তম পুরুষ পুরুষোত্তম।
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ- এ বলা হচ্ছে পরব্রহ্ম অক্ষর ব্রহ্মের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। অক্ষর ব্রহ্মকে বলা হয় হিরণ্যগর্ভ। জ্ঞান ও অজ্ঞান দুইই এই পরব্রহ্মের অবস্থায় প্রচ্ছন্ন থাকে। অজ্ঞানই জন্ম-মৃত্যুর কারন কিন্তু জ্ঞান অমরত্বের দিকে নিয়ে যায়। আবার যিনি জ্ঞান ও অজ্ঞানের নিয়ামক তিনি নিজে এই দুয়ের থেকে আলাদা।
পরমাত্মাকে বর্নণা করা যায় না। তাঁর হাত নেই, তবু তিনি সবকিছু ধারণ করতে পারেন। তার পা নেই, তবু তিনি গমন করতে পারেন, তার চোখ নেই, তবু তিনি সব দেখতে পান. তার কান নেই, তবু তিনি শুনতে পান. তিনি সব জানেন, কিন্তু তাঁকে কেউ জানতে পারে না। তিনি একাধারে সর্ব্বব্যাপী, আবার তিনি সকলের অন্তরে অবস্থান করছেন। ব্রহ্ম বৃহৎ থেকে বৃহত্তম আবার ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতম। ব্রহ্ম অপরিমেয়। এই ব্রহ্ম আছেন বলে সবকিছু আছে, সবকিছু চলছে। তিনি কারুর উপরে অর্থাৎ হাত, পা, চোখ, কান, নাক, ত্বক, অর্থাৎ কোনো দেহ বা ইন্দ্রিয়াদির উপরে নির্ভর করেন না। ব্রহ্ম সবকিছুর উৎস, সারাৎসার। এখন কথা হচ্ছে, যাঁর চোখ নেই, তিনি কিভাবে দেখেন ? দেখুন আমরা যখন কোনো কিছু দেখি, তখন দ্রষ্টা ও দৃশ্য বা দ্রষ্টব্য বস্তুর দরকার পড়ে। তখন দুয়ের মধ্যে একটা পার্থক্য থাকে। একটা দূরত্ব থাকে। কিন্তু যেখানে দেশ-কাল বলে কিছু নেই, সেখানে কোনো দূরত্ব থাকতে পারে না। আবার তিনি সবকিছু জানতে পারেন, কারন তিনিই স্বয়ং প্রজ্ঞান-ঘন। তিনি স্বয়ং জ্ঞানস্বরূপ। জ্ঞানের ক্ষেত্রে আমরা তিনটি জিনিস থাকে, একটা হচ্ছে জ্ঞাতা, জ্ঞেয় আর জ্ঞান। ব্যবহারিক জীবনে জ্ঞাতা বিষয়ের জ্ঞান সংগ্রহ করে থাকে। কিন্তু পারমার্থিক দৃষ্টিতে সবকিছুই ব্রহ্ম স্বয়ং। তো যেখানে দ্বৈতের অবসান হয়েছে, সেখানে শুধুই জ্ঞান। জ্ঞাতা জ্ঞেয় বলে কিছু নেই। ব্রহ্ম স্বপ্রকাশ।
যোগীপুরুষগণ বলে থাকেন, সাধন ক্রিয়ার ফল স্বরূপ প্রথমে এই হিরণ্যগর্ভ কূটস্থে সর্বাগ্রে দর্শন হয়। এই হিরণ্যগর্ভ থেকেই সমস্ত ভূতের উৎপত্তি। ধীরে ধীরে হিরণ্যগর্ভ কূটস্থের মধ্যেই উত্তম পুরুষ বা পুরুষোত্তমের সাক্ষাৎ মেলে। এই পুরুষোত্তমের রূপ অঙ্গুষ্ঠমাত্র জ্যোতির মতো। তিনিই জীবাত্মা রূপে সুষুম্নার মধ্যে যাতায়াত করে থাকেন। এই উত্তম পুরুষের অধীনে পঞ্চতত্ত্ব। এই উত্তমপুরুষই সকলের কারন। তিনিই বিষয় ভোগ করছেন। তিনিই ব্রহ্মানন্দ ভোগ করছেন। এই উত্তম পুরুষ হচ্ছে ক্ষর ও অক্ষরের সংযুক্ত ভাব। এখানে ক্ষরের প্রাধান্য নেই।
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে ১/৩ নং শ্লোকে বলা হচ্ছে,
তে ধ্যানযোগানুগতা অপশ্যন
দেবাত্মশক্তিং স্বগুণৈনির্গূঢ়াম।
যঃ কারণানি নিখিলানি তানি
কালাত্মযুক্তান্যধিতিষ্ঠত্যেকঃ। (১/৩)
যোগীপুরুষগন গভীর ধ্যানে মগ্ন হয়ে দেখলেন, জ্যোতির্ময় পরমাত্মার শক্তি এই জগতের কারন। মায়া তার তিন গুনের সাহায্যে সেই পরমাত্মাকে যে এই বিশ্বের কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছে। কিন্তু সেই এক এবং অদ্বিতীয় পরমাত্মাই পুরুষ বা জীবাত্মা এবং সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।
সাধক যখন ধ্যানের গভীরে প্রবেশ করেন, তখন মনের গভীর থেকে সমস্ত সত্য আপনা-আপনি ভেসে ওঠে। আর এই অবস্থাকে বলে স্বজ্ঞা। ব্রহ্ম এবং মায়া দুটো পৃথক সত্তা নয়। মায়া হচ্ছে ব্রহ্মের শক্তি। তো পুরুষ ও তার ছায়াকে যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনি ব্রহ্ম থেকে মায়াকে আলাদা করা যায় না। আবার মায়া ত্রিগুণের (সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ) দ্বারা আচ্ছাদিত। সত্ত্ব হচ্ছে শান্তভাব, রজঃ হচ্ছে অস্থিরতা, আর তমঃ হচ্ছে জড়তা বা নিষ্ক্রিয়তা। তো ব্রহ্ম যেন তিন গুনের দ্বারা আচ্ছাদিত।
যাইহোক, যোগেশ্বর তিনটি পুরুষের কথা বলেছেন, ক্ষর, অক্ষর, ও পুরুষোত্তম। ভূত প্রকৃতিতে যে চৈতন্য সঞ্চারিত হয়ে আছে তাকে বলে ক্ষর পুরুষ। কূটস্থে প্রতিবিম্বিত যে চৈতন্য তাকে বলে ক্ষর পুরুষ। কিন্তু যা প্রতিবিম্বিত নয়, যা শুদ্ধ চৈতন্য যা ভূত প্রকৃতি থেকে ভিন্ন তাকে বলা হয় অক্ষর পুরুষ। ইনিই পরা -প্রকৃতি। অর্থাৎ প্রকৃতির উর্দ্ধে। যা না থাকলে সৃষ্টি ইত্যাদি হতে পারতো না। আর যিনি প্রাণরূপে সমস্ত বিষয় ব্রহ্মান্ডকে প্রাণময় করে রেখেছেন তিনি অবিনাশী পুরুষ।
আর একটু সহজ করে বলতে গেলে বলতে হয়, স্থুল দেহে যিনি অবস্থান করে তিনি ক্ষর। স্থুল দেহ নাশের পরেও যিনি অবস্থান করেন তিনি অক্ষর। উত্তম পুরুষ এই অক্ষর পুরুষের সঙ্গে অভিন্ন হলেও, এই উত্তম পুরুষের কিছু বৈশিষ্ঠ আছে। আসলে এঁকে জড় চৈতন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চৈতন্যবৎ বলে মনে হয়। কিন্তু শুদ্ধ চৈতন্য জড়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। যে চৈতন্য শুধু জ্যোতি মাত্র সেখানে মনঃসম্পর্ক নেই। জ্যোতির অন্তর্গত পুরুষ, যাতে জড়ের ধর্ম্ম নেই, যা শুদ্ধ চৈতন্য বিশেষ হয়েও কর্ত্তা ও শিব-ভাবে সমন্বিত, যিনি সকলের হৃদয়ে স্থিত হয়েও হৃদয়ভাব দ্বারা অনাবৃত, যাঁর কাছে আমরা মনের কথা বলতে পারি, যিনি সমস্ত কার্য্যের বিধাতা, যিনি আমার কথা শোনেন, আমাকে জানেন, আমাকে ভালোবাসেন, যিনি ভালোবাসা নিতে পারেন, তিনিই পুরুষোত্তম নারায়ণ বা ভগবান। এঁকেই একদিকে বলা হচ্ছে উত্তম পুরুষ, পুরুষোত্তম। ইনিই আমাদের শ্রীগীতার বক্তা শ্রীকৃষ্ণ। যদিও এই ব্যাপারটা আমাদের পক্ষে বোঝা সহজসাধ্য নয়। শ্রীকৃষ্ণই পরমাত্মা, ইনিই ঈশ্বর। ধ্যানের গভীরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে এসব উত্তমপুরুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে থাকে। যা যোগবিহীন মানুষের অনুমানের উর্দ্ধে।
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
০৮.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - পঞ্চদশ অধ্যায় পুরুষোত্তম যোগঃ
শ্লোক নং ১৫/১৮
যস্মাৎ ক্ষরম-অতীতো-অহম-অক্ষরাৎ-অপি চোত্তমঃ
অতোঽস্মি লোকে বেদে চ প্রথিতঃ পুরুষোত্তমঃ। (১৫/১৮)
যেহেতু আমি ক্ষরের অতীত এবং অক্ষর থেকেও উত্তম, সেহেতু আমি বেদে ও পূরাণে পুরুষত্তম বলে খ্যাত।
আমরা নির্গুণ ব্রহ্ম - সগুন ব্রহ্ম শুনেছি। আত্মা-পরমাত্মা, ঈশ্বর-পরমেশ্বর, পুরুষ-প্রকৃতি, পরা-প্রকৃতি ও অপরা-প্রকৃতি, ক্ষর-অক্ষর সম্পর্কে শুনেছি। কিন্তু পুরুষোত্তম কথাটা আমাদের কাছে নতুন। শ্রীগীতাতেই এই পরমতত্ত্বের প্রকাশ। গীতায় যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বিভিন্ন শ্লোকে বিভিন্ন ভাবে এই পরতত্ত্বের কথা শুনিয়েছেন। কখনো বলছেন, আমি কর্ত্তা হয়েও অকর্ত্তা। (৪/১৩) আমি নির্গুণ হয়েও গুনপালক, আমি সমস্ত ভূতের ধারক হয়েও ভূতস্থ নহি। (৯/৫) আমি অব্যক্ত মূর্তিতে জগৎ ব্যাপী হয়ে আছি। (৯/৪) আমি অজ অব্যয় হয়েও আত্মমায়ায় জন্মগ্রহণ করে থাকি। এবার বললেন আমি ক্ষরের অতীত এবং অক্ষরের থেকেও উত্তম। আমি পুরুষোত্তম। এই পুরুষোত্তম তত্ত্ব আসলে ভাগবত তত্ত্ব। এই তত্ত্ব ব্রহ্মতত্ত্ব ও আত্মতত্ত্বের সমাবেশ বলা যেতে পারে।
শ্রীগীতাতেই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, আমিই ব্রহ্মের প্রতিষ্ঠা। (শ্লোক-১৪/২৭)
উপনিষদাদিতে ব্রহ্মের সগুন ও নির্গুণের কথা পাওয়া যায়। শ্রী গীতাতে প্রথম এই পুরুষোত্তম তত্ত্ব সন্নিবেষ্টিত হলো।
ক্ষর অর্থাৎ জড়ের যে চেতনশক্তি। অক্ষর জড়-রহিত যে চেতনশক্তি। আর যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বীয় নাম নির্বাচন করলেন, পুরুষোত্তম। আমরা জানি, এই পৃথিবীতে একসময় কোনো প্রাণিজগতের অস্তিত্ত্ব ছিল না। মহামতি ডারউইন তার বিবর্তনবাদ তত্ত্বে (ORIGIN OF SPECIES) দেখিয়েছেন, পরিবর্তিত জীবনসংগ্রামের ভিতর দিয়ে সৃষ্টির ক্রমবিকাশ ঘটেছে। একদিকে যেমন দুর্বলকে সরিয়ে সবল জায়গা করে নিয়েছে। তেমনি অন্যদিকে কুৎসিতকে দূরে ঠেলে দিয়ে জগতে সৌন্দর্যের অভিব্যক্তি ঘটেছে। বিবর্তনবাদ যদি সত্য হয়, তবে ধরে নিতে হয়, আমিবা থেকে ধীরে ধীরে এই মানুষের আকৃতি এসেছে। কিন্তু বিবর্তন কখনো থেমে থাকতে পারে না। আজও নিশ্চই সেই বিবর্তন ক্রিয়া চলছে। মানুষ যেমন দেবমানবের কথা বলে থাকে অতিমানবের কথা বলে থাকে, কিন্তু তাদের সম্যক দর্শন বাহ্যিক জগতে মেলে না। আবার পরিবর্তন যেমন বহির্জগতে হচ্ছে তেমনি ঘটছে অন্তর্জগতে। হিন্দু দর্শন বলে থাকে জীবাত্মার বিনাশ নেই, কর্ম্মজনিত সংস্কার তাকে এক স্থুল দেহ নাশের পরে অন্য দেহে স্থানান্তরিত করে থাকে। তো একটা হচ্ছে মানবজীবন চক্রাকারে ঘুরছে। জন্ম-জরা-মৃত্যু-আবার জন্ম।.. অন্য দিক থেকে দেখতে গেলে, সমগ্র প্রাণীজগৎ বিবর্তনের নিয়মে ধীরে ধীরে উন্নতর শক্তিশালী প্রাণীর সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলছে। শ্রী গীতার শ্রীকৃষ্ণকে বুঝতে গেলে, আমারদের এই দুটো জায়গা বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
এক) গুরুগীতে বলা হচ্ছে,
"অখন্ড মন্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেন চরাচরম"
"গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণু গুরুদেব মহেশ্বরঃ"
"গুরুরেব পরং ব্রহ্ম"
"ব্রহ্মানন্দং পরমসুখদং কেবলম জ্ঞানমূর্ত্তিম
দ্বন্দ্বাতীতং গগনসদৃশং তত্ত্বমস্যাদি লক্ষ্যম
একং নিত্যং বিমলচলং সর্ব্বধী সাক্ষীভূতম
ভবাতীতং ত্রিগুনরহিতং সদগুরুং তং নমামী।
ত্বমেব মাতা চ পিতা ত্বমেব। ত্বমেব বন্ধুশ্চ সখা ত্বমেব।
ত্বমেব বিদ্যা দ্ৰবিণং ত্বমেব . ত্বমেব সর্ব্বং মম দেবদেব।
শাস্ত্রাদিকে গুরুদেবকে সর্ব্বোচ স্থান দেওয়া হয়েছে। এমনকি তিনি সাধারনের মতো দেহধারী হলেও, তাকেই দেবমানবের উর্দ্ধে স্থান দেওয়া হয়েছে।
২) সমস্ত মানুষের মধ্যেই পরিবর্তন হচ্ছে, তা আমাদের চোখে পড়ুক আর না পড়ুক। হয়তো দশটা হাত হচ্ছে না, বা চারটে চোখ, চারটে কান হচ্ছে না। কিন্তু জাগতিক উন্নতি বা বিজ্ঞানের উন্নতি দেখলে বোঝা যায়, মানুষের মধ্যে যে অসীম ক্ষমতা (কল্পনাশক্তি ও বুদ্ধিমত্তা) আছে, তার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। অথবা বলা যেতে পারে, মানুষ জন্ম-জন্মান্তরের অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজেকে উন্নত জীব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। ঋষি অরবিন্দ একসময় দিব্যমানবের কথা বলতেন। হয়তো মানুষ সাধন বলে একদিন এই দিব্যমানবে পরিণত হবে। আমাদের একথা স্বীকার করতেই হয়, যিশুখ্রিস্ট, বুদ্ধদেব, মোহাম্মদ, কবীর, গুরুনানক, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরামচন্দ্র, রামকৃষ্ণ, চৈতন্য, হরিচাঁদ, বিবেকানন্দ, রবি ঠাকুর, এমনকি রাবন, ভীষ্ম, ব্যাসদেব, রাজা জনক, অষ্টাবক্র, এমনিতর বহু মহামানব পৃথিবীতে এসেছিলেন, যারা অসাধারন কীর্ত্তি রেখে গেছেন। এখনো বহু মহাপুরুষ এই পৃথিবীতে বিচরণ করছেন, যাঁরা আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতো সাধারণ নন। এইযে মানুষগুলো, দেখতো তো আমাদের মতোই মনে হয়, কিন্তু এদের মধ্যে এমনকিছু নিশ্চয় ছিলো বা আছে, যার জন্য তাঁরা সাধারণ থেকে স্বতন্ত্র। না আমি শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে এঁদের তুলনা করছি না। আমি বলতে চাইছি, শ্রীকৃষ্ণ আর অর্জ্জুনের মধ্যে দৈহিক ফারাক তো ছিল না, কিন্তু কিছু একটা ছিল, যা একজনকে আচার্য্য আর একজনকে ছাত্র বানিয়েছে - একজনকে গুরু আরেকজনকে শিষ্য বানিয়েছে।
যাই হোক, যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, আমি পুরুষোত্তম। তার কারন হচ্ছে, ক্ষর আর অক্ষর পুরুষের উপরে আমার স্থান। গতিশীল কার্যরূপ এই জগৎ বা শরীর। আর এই শরীরের মধ্যে উৎকৃষ্ট হচ্ছে জীবাত্মা - যা আসলে পরমাত্মার প্রতিবিম্ব।
যোগীরাজ বলছেন, সাধনার পরিপক্ক অবস্থায়, কূটস্থের মধ্যে এঁকে সাধকগণ প্রতক্ষ্য করে থাকেন, জ্যোতি স্বরূপ । ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, অক্ষর থেকে উত্তম, আর ক্ষর থেকে অতীত। ক্ষরের অতীত, অর্থাৎ জড় দেহাদি বড্ড স্থুল ও বহির্মুখী। যারা দেহাভিমানী তারা এই জড় দেহের ইন্দ্রিয়াদিতে আকৃষ্ট হয়, কূটস্থে যে চৈতন্য, তার সন্ধান তারা রাখে না। এজন্য এই ধরনের মানুষ পুরুষোত্তমের সন্ধান পান না। আর অক্ষর থেকে উত্তম কারন, এই দেহেরই অভ্যন্তরে যে চৈতন্য স্বরূপ জ্যোতি কূটস্থে দেখা যাচ্ছে, তা তারা গুরুকৃপায়, সাধনবলে দেখতে পান। এঁরা পুরুষোত্তম নারায়ানকেও কদাচিৎ দেখতে পান। উত্তম পুরুষ ক্রিয়ার উত্তম অবস্থায়, অখন্ড চিৎসত্তার সাথে অভিন্ন হয়ে যান। এই ভাব সগুনের সর্বোচ্চ ভাব। নির্গুণ ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে গেলে, সাধনার আরো উচ্চ অবস্থা লাভ করতে হয়, একমাত্র ভগবৎ কৃপায় এই অবস্থা লাভ করা সম্ভব। এই পুরুষোত্তম দর্শনের পরে সাধক সহজ অবস্থা অর্থাৎ আপনাতে আপনি অবস্থা প্রাপ্ত হন।
যাইহোক, এসব কথা আমাদের মতো সাধারনের কাছে কেবলমাত্র শোনা কথা, বা বই পড়া বিদ্যা। অনেক সময় দেখা যায় , মহাপুরুষগন নিজে থেকে তাঁর উপলব্ধ জাত জ্ঞান লিপিবদ্ধ করেন না। গুরুমুখে শুনে কিছু শিষ্য এইসব কথা লিপিবদ্ধ করে থাকেন। এমন অনেক ভারসাম্যবিহীন অবস্থা আছে, যখনকার কথা মুখে প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। সেই সব অবস্থার জ্ঞান আমাদের কাছে এই অনুভূতির বিবরণ পৌঁছতেও পারে না। আবার বাহ্যজ্ঞান মানুষের কাছে পুরুষোত্তম রহস্য বোঝা দুরূহ। কেবল বিচারশক্তি দিয়ে চেতনসত্তাকে অনুভব করা যায় না। আবার এই চেতনা থেকে চিৎসত্তায় আসতে গেলে , এতো রূপের বা অবস্থার পরিবর্তন হয়, যে সব স্মৃতিতেও থাকে না। তবে একটা কথা বলা যেতে পারে, এই শরীরের মধ্যে একটা জ্যোতি সর্ব্বদা স্ফূরিত হচ্ছে - যা যেকোনো সাধারণ ব্যক্তি কিছুদিনের সাধনার ফলেই উপল্বদ্ধিতে সক্ষম হতে পারেন, যদি তিনি সামান্য কিছু নিয়মে নিজেকে শৃঙ্খলিত করে শুদ্ধ মনের অধিকারী হতে পারেন। শুদ্ধমন-বুদ্ধি সাধন জগতে একমাত্র সম্বল। আর একমাত্র শ্বাসের চরণ ধরে এগুলেই, এই পথের সন্ধান পাওয়া যায়। চিৎভূমিতে অবতরণ করা যায়। প্রাণকে স্থির করতে পারলেই কত রহস্যের উন্মোচন হতে পারে। কিন্তু পুরুষোত্তম নারায়ণ আরো উপরে। শুধু একটা কথা মনে রাখুন, ক্ষর সাকার, অক্ষর নিরাকার, আর পুরুষোত্তম চিদাকার, আনন্দবিগ্রহ। ক্ষর বিকারগ্রস্থ, অক্ষর নির্ব্বিকার, আর পুরুষোত্তম চিদ্ঘন-বিকারী। পুরুষোত্তমের তনু আছে, চিন্ময়ী মানুষী তনু। যা যেকেহ সৎ-গুরুকৃপায় দর্শন করতে পারেন। শুধু নিষ্ঠা আর ব্যাকুলতা থাকলেই হতে পারে।
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
০৯.০১.২০২৩
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব শ্রীগীতা - পঞ্চদশ অধ্যায় পুরুষোত্তম যোগঃ
শ্লোক নং ১৫/১৯-২০
যো মামেবম-অসংমূঢ়ো জানাতি পুরুষোত্তমম
স সর্ব্ববিদ্ ভজতি মাং সর্ব্বভাবেন ভারত। (১৫/১৯)
হে ভারত, যিনি মোহমুক্ত হয়ে এইভাবে আমাকে পুরুষোত্তম বলে জানতে পারেন, তিনি সর্বজ্ঞ হন এবং সর্ব্বতোভাবে আমাকে ভজনা করে।
সবার সঙ্গে নিজেকে মেলাতে না পারলে সর্বজ্ঞ হওয়া যায় না। কিন্তু সবার সঙ্গে মিলবো কি করে ? প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের একটা বিভেদ পরিলক্ষিত হয়। আমার সঙ্গে তোমার একটা ফারাক। কেউ পণ্ডিত, কেউ মূর্খ। কেউ অভাগা, কেউ সৌভাগ্যবান। কেউ ভালো কেউ মন্দ। কেউ পাপিষ্ঠ কেউ পুণ্যবান। এই ভেদ যতদিন না মিটবে, ততদিন মিলবো কি করে। আসলে দৃষ্টিভঙ্গির ফারাক। সন্তানের কাছে পিতা-মাতা ভালো। কিন্তু সেই একই পিতা-মাতা পড়শিদের কাছে খারাপ। সাধনার উদ্দেশ্য এই ভেদের সীমানা টেনে ছোট করে নিয়ে আসা। সাধক যখন প্রত্যেক জীবের মধ্যে কোথাও একটা মিল খুঁজে পায়, অর্থাৎ প্রত্যেকের কেন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত যার দৃষ্টি সন্নিবেশিত হয়েছে, তাঁর কাছে বাহ্যিক ভেদের রেখা মুছে যায়। সবার মধ্যে একই ব্রহ্ম বাস করছেন, এই বোধ যতক্ষন না হচ্ছে, নিজেকে ব্রহ্মভাবে ভাবান্বিত না করতে পারলে, এই ব্রহ্মবিদ বা সর্বজ্ঞ হওয়া যায় না। সাধন ক্রিয়ার ফলে চিত্ত যখন আত্মাতে স্থির হয়, তখন সেই চিত্তে সমুদয় বৃত্তিসকল নিস্পৃহ হয়ে থাকে। সেই একের মধ্যে চিত্তকে নিবিষ্ট করে, প্রাণবায়ুকে স্থির করতে পারলে, নাম-রূপের বৈষম্যের অবসান ঘটে। তখন কোনো ভান থাকে না আবার জ্ঞাতিভাবও থাকে না। অর্থাৎ আমি কারুর সঙ্গে যুক্ত, বা কেউ আমার, এই ভাব থেকেই সাধক নিষ্কৃতি পায়। আর তাকে বুঝবার জন্যও কেউ আর অবশিষ্ট থাকে না। তখন সব এক, তাই দেখার কেউ থাকে না, দেখবার কিছু থাকে না। একটা নেশাগ্রস্থ অবস্থা যেন। তবে সহজে এই বস্তুবোধের সমাপ্তি ঘটে না। ধীরে ধীরে মনের মধ্যে সংকল্পের ঢেউ নিবৃত হয়ে যায়। আর অজ্ঞানের পর্দা উঠে যেতে থাকে। যে জ্ঞান পূর্ব্বে ছিল না, যে দৃশ্য পূর্বে ছিল না, যে ধ্বনি আগে কখনো শোনা যেত না - তারই বোধ ধীরে ধীরে হচ্ছে। আরো অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে একসময় এই শোনা, দেখা, এমনকি জ্ঞানের বোধের বিলোপ ঘটে। তখন সব একাকার হয়ে নদী যেমন সমুদ্রে মিশে নদীর অস্তিস্ত্ব হারিয়ে ফেলে, সাধক তেমনি পরম-পুরুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পৃথক সত্ত্বার অনুভূতিকেও নিঃশেষ করে দেয়।
দেখুন ভগবানের মায়িক-রূপ দর্শন সাধনার শেষ কথা নয়। তার স্বরূপে নিত্যস্থিতি, সেই স্বরূপের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দেওয়াই ভক্তিভাবের উত্তম অবস্থা। এই ভাবই আসলে স্বরূপের বোধ। আপনাতে আপনি হওয়া। আপনাকে আপনি চেনা। সমস্ত ছবির মধ্যে চোখ নিবিষ্ট হলে, একটা সময় কেবল বিন্দুর দর্শন মেলে। এই বিন্দু যখন নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রসারিত হয়, তখন তা ছবি, আবার এই বিন্দু যখন কেন্দ্রস্থ হয়, তখন তা স্বরূপ। আবার যখন মাত্রাতিরিক্ত ভাবে প্রসারিত হয়, তখন তা বিশ্ব। মনের কল্পনা যখন বহির্মুখী তখন বহুমুখী প্রকাশ, আবার এই কল্পনার মুলে যখন মন স্থির হয়, তখন বহুমুখী প্রকাশের অভাব ঘটে। একই বলে দ্রষ্টার স্বরূপে অবস্থান, বা যোগ। এই যোগের অভ্যাসই জ্ঞান-ভক্তির উদয়কারী। যোগ-অভ্যাস আত্মদর্শনের প্রতক্ষ্য ফলপ্রদ উপায় হতে পারে। যোগবিহীন মূঢ় ব্যক্তি জগৎমোহে আচ্ছন্ন হয়ে বিবশ হয়ে গেছে। এখান থেকে বেরুতে গেলে, শ্বাসের সঙ্গে মনকে জুড়তে হবে। তবে ইন্দ্রিয়সকল বিবশ হয়ে বাহ্য বিষয় থেকে মনের সঙ্গে আত্মাতে স্থিত হবে।
ইতি গুহ্যতমং শাস্ত্র-ইদম-উক্তং ময়ানঘ
এতদ্বুদ্ধা বুদ্ধিমান স্যাৎ কৃত-অকৃতশ্চ ভারত। (১৫/২০)
হে নিষ্পাপ ভারত, এই আমি গুহ্য কথা তোমাকে বললাম। যেকেউ এসব জানলে জ্ঞানী ও কৃতকৃত্য হতে পারে।
গুহ্য-সত্য হচ্ছে, সকলের মধ্যে সেই পুরুষোত্তম রয়েছেন। আর পুরুষোত্তমকে উপলব্ধি করতে গেলে, যোগাচার্য্য উক্ত যোগক্রিয়া করতে হবে। আর এই যোগ অভ্যাসের ফলেই এই দেহেই কূটস্থের সন্ধান মিলবে। আবার এই কূটস্থের মধ্যেই পুরুষোত্তমকে দর্শন করে জীবন সার্থক করা যায়। কিন্তু জীবের বিড়ম্বনা হচ্ছে, নির্বোধ মন এই কাজে সহজে সে সময় দিতে চায় না। সে সুখের আশায় দুঃখকে ডেকে নিয়ে আসে, জীবনের আশায় মৃত্যুকে ডেকে নিয়ে আসে। কিন্তু যিনি বুদ্ধিমান, তিনি সংসারে থেকেও, সমস্ত কর্তব্যক্রিয়ার মধ্যেও সেই সাধনক্রিয়াতেই রত থাকেন । সাংসারিক কাজের মধ্যে সেই পরম-পুরুষের সন্ধান করেন, সমস্ত কর্ম্ম তারই উদ্দেশ্যে করে থাকেন, সমস্ত কর্ম্মফল সেই পরমপুরুষকে আহুতি দেন। ফলতঃ তাঁর কোনো কর্ম্মফল তাঁকে আবার এই ভৌতিক কর্ম্মদেহে স্থানান্তরিত করতে পারে না। তিনি সেই সৎ-চিৎ-আনন্দের সঙ্গে একাকার হয়ে যান। তিনি কারন দেহকেও অতিক্রম করে অপার আনন্দের জগতের বাসিন্দা হয়ে যান। একটা জিনিস জানবেন, ভগবানই নর শরীর ধারণ করেন, কিন্তু তাঁর এই পুরুষোত্তম লীলা দেখতে গেলে, বুঝতে গেলে, দিব্যদৃষ্টি সম্পন্ন হতে হবে, আর তার জন্য যেমন নিজেকে যোগক্রিয়ার দ্বারা যোগ্য করতে হবে, তেমনি সদা ভগবানের স্তুতি করতে হবে, ভগবানে নিবেদিত প্রাণ হতে হবে। ভগবান অর্জ্জুনকে বলছেন, হে নিষ্পাপ ভারত। সমস্ত মানুষই নিষ্পাপ। এই নিষ্পাপ সত্ত্বাকে জাগিয়ে তুলতে হবে, তবে আমরা ভগবানের আশীর্বাদের যোগ্য হবো, করুণার যোগ্য হবো ।
ওম নমঃ শ্রী ভাগবতে বাসুদেবায়।
ইতি শ্রীমদ্ভগবৎ গীতাসু, উপনিষদসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণ-অর্জ্জুন সংবাদে পুরুষোত্তম যোগ নাম পঞ্চদশ অধ্যায়ঃ।

Comments
Post a Comment