আজ জন্মাষ্টমী, শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মদিন। শ্রী কৃষ্ণ কবে জন্মালেন আর কবে মারা গেলেন, তার সঠিক সাল-তারিখ বলে কিছু আমাদের জানা নেই। আসলে শ্রীকৃষ্ণের যারা পরমভক্ত তাঁরা এর কোনো হিসেবে রাখেন নি। শ্রীকৃষ্ণের যথার্থ ভক্তগন বলেন, ভগবানের জন্মও হয় না, আবার মৃত্যুও হয় না। তাই তাঁদের জন্ম-মৃত্যুর কোনো হিসেবে আমরা রাখি না। হিসেব তাদের রাখা হয়, যাদের জন্ম-মৃত্যু আছে। এমন নয়, যে আমরা হিসেবে রাখতে পারতাম না। আসলে শ্রীকৃষ্ণের ব্যাক্তিত্ত্বের সঙ্গে এই জন্ম-মৃত্যু একটা বিপরীত ব্যাপার হয়ে যায় । শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমদ্ভগবৎ গীতাতে অর্জ্জুনকে বলছেন, (শ্লোক : ২/১২) আমি এর আগে কখনো ছিলাম না তা নয়, আবার তুমিও যে ছিলে না, তাও নয়, আবার এর পরেও আমরা থাকবো না তাও নয়। আবার শ্লোক নং ২/২০ তে বলছেন,
"ন জায়তে ম্রীয়তে বা কদাচিৎ, নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা নঃ ভুয়ঃ,
অজো নিত্য শাশ্বতোঽয়ং পুরণো, ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে। " (২/২০)
আত্মা কখনো জন্ম গ্রহণ করেন না, আবার কখনো মৃত্যু বরণ করেন না। আত্মা না জন্মেছেন, না ভবিষ্যতে জন্মাবেন। তিনি অজঃ নিত্যঃ শাশ্বতঃ ও পুরান। শরীরের বিনাশ হয়, আত্মার কখনও বিনাশ নেই। তো যেখানে আমার অর্থাৎ আত্মার জন্ম মৃত্যু বলে কিছু নেই, সেখানে জন্ম-মৃত্যুর তারিখ বলে কিছু থাকে না। হ্যাঁ এখন অবশ্য পাশ্চাত্য পন্ডিতের কবলে পড়ে, ভারতীয় পন্ডিতগণও এই হিসেবে রাখার চেষ্টা করছেন। পশ্চিমের পন্ডিতগণ জন্ম-মৃত্যুর হিসাব রাখেন, তার কারন হচ্ছে, পশ্চিমের সব ধর্ম্মে যেখানে ইহুদিদের প্রভাব রয়েছে, অর্থাৎ খ্রিস্টান, মুসলমান ইত্যাদি এদের একটা ধারণা হচ্ছে, জন্মানোতে শুরু আর মৃত্যুতে সব শেষ হয়ে যায়। জন্মের আগেও কিছু ছিল না আবার মৃত্যুর পরেও কিছু থাকবে না। তাই তারা জন্ম-মৃত্যুর হিসেবে রাখে। কিন্তু যারা জেনেছে, যে এই আসা-যাওয়ার যাত্রা অনন্ত, তাঁরা হিসেবে রাখলেও, কতবার হিসেবে রাখবে ? যদি হিসেবে রাখাও হয়, তবে তা গুলিয়ে যাবে। কেননা বারবার আসতে হবে, আবার বারবার চলে যেতে হবে। ব্রহ্ম বৈবর্ত্ত পুরানে বলা হয়েছে, দেবকী শ্রীকৃষ্ণের তিন জন্মের মা। প্রথমে সুতপা পৃশ্নির গর্ভে প্রশ্নিগর্ভ, পৃশ্নি কথাটার অর্থ যাকে অনায়াসে স্পর্শ করা যায়, সূক্ষ্ম কিরণ। পরবর্তীতে কশ্যপ ও অদিতির গর্ভে বামন বিষ্ণু । অদিতি কথাটার অর্থ যাকে ছেদন করা যায় না, পৃথিবী । তৃতীয় বসুদেব ও দেবকীর গর্ভে শ্রীকৃষ্ণ। তো শ্রীকৃষ্ণ বারবার জন্ম গ্রহণ করে থাকেন।
তাই আমরা শ্রীকৃষ্ণের জন্ম-মৃত্যুর তারিখ রাখি না। যারা সমাধিতে ডুবে আছেন, যাঁরা কৃষ্ণময় হয়ে সমাধিতে স্থিত হয়েছেন তারাও কৃষ্ণের জন্মের সাল তারিখ বলতে পারেন না, কারন সমাধির সময় সময়জ্ঞান থাকে না। সময়ের অনুভূতি যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকেই শুরু হয় সমাধি। সমাধি কালের অতীত। সমাধির উদ্দেশ্যই হচ্ছে সময়ের অতীত হয়ে যাওয়া। তাই সমাধিস্থ পুরুষ কেবল প্রশ্ন করবে, কবে জন্ম হলো, আর কবেই বা তার মৃত্যু হলো ? কেননা এখনো, এইমাত্র সে এই সমাধিতে সেই শ্রীকৃষ্ণের সাথেই লীলা করছেন। আসলে আসা যাওয়ার ধারনাটা অসমাধি-অবস্থায় হয়ে থাকে। সমাধিস্থ হলে, আসা যাওয়া বলে কিছু থাকে না ।
আসলে সময়-এর উৎপত্তি স্থল হচ্ছে মন। সময় মনের উৎপত্তি। আপনি দেখবেন, সুখের দিনে আপনার সময় তাড়াতাড়ি কেটে যায়। আবার আপনি যখন দুঃখে থাকবেন, তখন সময় আপনার কাছে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে যাবে। ঘড়ি আপন মনে চলে, তবু দুঃখের দিন শেষ হতে চায় না। কিন্তু সুখের দিন তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়। মরণাপন্ন রোগীর রাত শেষ হতে চায় না, কিন্তু ফুলসজ্জার রাত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়। আসলে ঘড়ি তো তার নিজের মতো করে চলছে, কিন্তু মনের অবস্থার সঙ্গে সময়ের পরিমাপের অনুভব নির্ভর করে থাকে । সমাধিস্থ পুরুষ সুখ-দুঃখের বাইরে অবস্থান করেন। আনন্দে অবস্থান করেন। তাঁর কাছে সময়ের মাপকাঠি অর্থাৎ ঘড়ি বলে কিছুই থাকে না। ক্যালেন্ডার বলে কিছুই থাকে না। সমাধিস্থ পুরুষ কখনোই বলতে পারেন না, শ্রীকৃষ্ণ কবে জন্মেছিলেন আর কবেই বা মারা গেলো। কেননা, শ্রীকৃষ্ণকে তিনি সব সময় দেখছেন, শ্রীকৃষ্ণ যে এখনো বাঁশি বজান, আর সমাধিস্থ সাধক তা শোনেন। তাই শ্রীকৃষ্ণ তার কাছে বর্তমান - অতীত নয়। তিনি শ্বাশত। আবার কেবল শ্রীকৃষ্ণই শ্বাশত নয়, আমরা সবাই শাশ্বত। সবকিছুই শাশ্বত। কেউ একজন আধাঘন্টা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিলো। সে স্বপ্নের মধ্যে কাশিতে বেড়াতে গেলো। একসময় স্বপ্ন ভেঙে গেলে, সে বললো, আমি কাশি গিয়েছিলাম। তো তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তুমি তো মাত্র আধাঘন্টা ঘুমিয়েছিলে, এরমধ্যে তুমি কি করে কাশি ঘুরে এলে ? তো তিনি বললেন, হ্যাঁ আমি তো গিয়েছিলাম। আসলে স্বপ্নে আমাদের মন বদলে যায়। তাই তখন সময়ও বদলে যায়। গভীর নিদ্রায় আমাদের সময়জ্ঞান থাকে না। সুসুপ্তিতে অর্থাৎ গাঢ় ঘুমে, আমাদের সময় জ্ঞান থাকে না। কেউ একজন সংজ্ঞাহীন হয়ে বিছানায় শুয়ে ছিল। তিনি মাস এই অবস্থায় পড়েছিল। তিনমাস পরে, যদিও তিনি মারা গিয়েছিলেন, কিন্তু যদি দৈবক্রমে বেঁচে যেতেন, তবে তিনি এই তিনমাসে কি কি ঘটেছিলো, তা কি তিনি বলতে পারতেন ? পারতেন না। কারন সুসুপ্তিতে অর্থাৎ গাঢ় ঘুমে মানুষের মন নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। মানুষ সুসুপ্তিতে চেতনায় লিন হয়ে যায়। আত্মাতে স্থিত হয়। তাই কৃষ্ণভাবনায় সমাধিবান পুরুষ বলতে পারেন না, কবে শ্রীকৃষ্ণ এসেছিলেন, আবার কবে চলে গেলেন।
দেখুন, ধর্ম্মের কোনো ইতিহাস হয় না। ভগবানেরও কোনো ইতিহাস হয় না। ইতিহাসতো সেটাই, যা একসময় শুরু হয়েছিল, আবার একদিন শেষ হয়ে গেছে। ধর্ম্মের না আছে শুরু না আছে শেষ। ধর্ম্ম সনাতন। সনাতন সেটাই যা সবসময় আছে। শ্রীকৃষ্ণ সনাতন তাই তাকে সময় দিয়ে মাপা যায় না। আমরা সময়কে ঘড়ি দিয়ে মাপি। আমরা ক্যালেন্ডার দিয়ে তারিখের হিসেবে রাখি। কিন্তু এই মাপকাঠি, ক্যালেন্ডার এটি আমাদের তৈরী - যা আসলে আমাদের পার্থিব জ্ঞান বা ভ্রমজ্ঞান ছাড়া কিছু নয়। আমরা আসলে কুয়োর ব্যাঙ। বিশাল ব্রহ্মান্ডের কতটুকুর খোঁজ আমরা রাখতে পারি ? আমরা রাস্তা মাপি, নদী মাপি, সমুদ্র মাপি, কিন্তু আমরা আকাশকে মাপতে পারি না। এইভাবেই আমরা শ্রীকৃষ্ণকেও মাপতে চেষ্টা করি । শ্রী কৃষ্ণের আসা-যাওয়ার, জন্ম-মৃত্যুর হিসেবে রাখতে চাই। যদি আপনি সত্যি শ্রীকৃষ্ণকে বুঝতে পারতেন, তবে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম মৃত্যুর হিসেবে করতে যেতেন না। কেননা হাজার হাজার বছর আগের শ্রীকৃষ্ণ, লক্ষ বছর আগের শ্রীকৃষ্ণ, আবার আজকের শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ইতিহাস কখনো শ্রীকৃষ্ণের কথা বলতে পারে না। ইতিহাস হচ্ছে যা অতীত। তো শ্রীকৃষ্ণ অতীত-বর্ত্তমান-ভবিষ্যৎ, আবার এরও বাইরে শ্রীকৃষ্ণ শাশ্বত। যাদের কাছে শরীর মূল্যবান, তাদের কাছে স্থুল ঘটনার মূল্য আছে। কিন্তু যাঁরা শরীরকে ছায়া বলে মনে করেন, তাদের কাছে এর কোনো মূল্য নেই। শ্রীকৃষ্ণ কখনো বলেননি, যে তিনি এই স্থুল শরীর। বরং তিনি বলেছেন, এই স্থুল শরীরের উর্দ্ধে তিনি আত্মা। শ্রীকৃষ্ণের জন্মের ২০০ বছরের মধ্যে তার কোনো মূর্তি তৈরী হয়নি। তার পূজার প্রচলনও হয়নি। কারন যাঁরা সূক্ষ্মকে জানেন, তাদের কাছে স্থুলের কোনো হিসেবে থাকে না। শ্রীকৃষ্ণের যে জীবন আমরা দেখি, তা আমাদের কাছে স্বপ্নের মতো। আমরা যে জীবনকে সত্য বলি, শ্রীকৃষ্ণ সেই জীবনকে বলতেন স্বপ্ন। তো স্বপ্নের কোনো হিসেব কেউ রাখে না। শ্রীকৃষ্ণও তার স্বপ্নের হিসেবে রাখতেন না। তো যখন জ্ঞানী শ্রীকৃষ্ণ রইলেন না, তখন অজ্ঞানীগন হিসেবে কষতে শুরু করলেন। স্থুল শরীরের হিসেব অজ্ঞান থেকেই জন্মায়। শ্রীকৃষ্ণ কখনো স্থুল শরীরে ছিলেন, কি ছিলেন না, সেটা বড়ো কথা নয়। আপনি হয়তো বলবেন, শ্রীকৃষ্ণ না থাকলে আমরা কি নিয়ে থাকবো ? শ্রীকৃষ্ণ না থাকলে গীতা কিভাবে পেলাম ? শ্রীকৃষ্ণ অবশ্য়ই ছিলেন। আসলে সমাধিস্থ অবস্থায় শ্রীকৃষ্ণের অস্তিত্ব যদি আপনার কাছে উপল্বদ্ধির বিষয় হয়, তবে অবশ্যই শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন, আছেন, থাকবেন। শ্রীমদ্ভগবৎ গীতার মর্ম্মবাণী যদি আপনার উপল্বদ্ধিতে আসে, তবে শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন, আছেন, থাকবেন। কিন্তু সমাধিস্থ অবস্থায়, যদি আপনার মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের প্রভাব না পড়ে , তবে শ্রীকৃষ্ণ কোনো দিনই থাকতে পারেন না। একটা জিনিস জানবেন, যিনি আছেন, যিনি রয়েছেন, তিনিই ছিলেন। এর জন্য কোনো হিসেবের দরকার নেই।এক জমিদার রাতে স্বপ্নের মধ্যে স দেখলো, যে সে গাধা হয়ে গেছে। তো সকাল বেলা ঘুম ভেঙে দেখলো, না সবই তো ঠিক আছে, আমি সেই জমিদারই আছি। তখন সে ভাবতে বসলো, কোনটা সত্যি, গাধা সত্য না জমিদার সত্য ? মনে মনে ভাবতে লাগলো, আমার স্বপ্ন যদি সত্য হতো, স্বপ্ন যদি কোনোদিন না ভাঙতো তবে তো আমি গাধাই থেকে যেতাম । তো জমিদার আরো একটু এগিয়ে ভাবতে লাগলো, আমার মৃত্যুর পরে, আমি কি আবার সেই স্বপ্নের জগতে প্রবেশ করবো ? তখন গাধা হয়ে থাকতে হবে ? আসলে মহাপুরুষগন বলে থাকেন, জীবন একটা স্বপ্নের মতো। রাতের স্বপ্ন ৮ ঘন্টার পরেই ভেঙে যায়। কিন্তু এই জীবন -স্বপ্ন ভাঙতে ৭০/৮০/১০০ বছর লেগে যায়। আসলে আমরা যাকে জীবন বলি,শ্রীকৃষ্ণের মতো মহাপুরুষের কাছে, তা একটা স্বপ্ন মাত্র। আমরা স্বপ্নের কোনো হিসেবে রাখি না। শ্রীকৃষ্ণের মতো ব্যক্তির কোনো জন্ম-মৃত্যুর হিসেবে রাখা হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শ্রীমদ্ভগবৎ গীতায় আমরা স্বয়ং ভগবানের শ্রীমুখেই শুনেছি, তিনি সাধুদের পরিত্রানের জন্য, দুষ্কৃতীদের দমনের জন্য, আর যখন ধর্ম্মের গ্লানি হয়, তখন আমাকে আসতে হয়।
যদা যদাহি ধর্ম্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত
অভ্যূত্থানম-অধর্ম্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম।
পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম
ধর্ম্ম-সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে। (৪/৭-৮)
মহাভারতে একটা অদ্ভুত ঘটনার বর্ণনা করা আছে। একদিন যুধিষ্ঠির সকালবেলা বারান্দায় বসে আছেন। তো একজন সন্ন্যাসি ভিক্ষারী "ভিক্ষাং দেহি" বলে সামনে এসে দাঁড়ালো। তো যুধিষ্ঠির বললেন, আজ আমি একটু ব্যস্ত আছি, আপনি কাল সকালে আসুন। যা আমাদের মতো সাধারণ মানুষ করে থাকি। তো ঘরের মধ্যে ছিল ভীম। ভীম দাদার একথা শুনে একটা ঢোলক নিয়ে বাইরে এসে, জোরে জোরে ঢোলক বাজাতে লাগলো। আর গ্রামের দিকে চলতে লাগলো। তো ভীমের এই ঢোলকের বাজনায় বিরক্ত হয়ে যুধিষ্ঠির বলে উঠলেন, ভীম এসব তুমি কি করছো ? আর ঢোলক বাজাতে বাজাতে কোথায় যাচ্ছ ? তো ভীম তার উত্তরে বললো, দাদা সময় চলে যাচ্ছে, আমাকে বাধা দিও না। আমি এক্ষুনি সবাইকে এই আশ্চার্য্য কথাটা বলে আসি, যে তুমি সময়কে জয় করেছো। তুমি কি জান , কাল তুমি বাঁচবে কি না ? তুমি কি জান , কাল ওই ভিক্ষারীকে আর এই স্থুল দেহে দেখতে পারবে কি না ? কাল আবার তোমাদের দুজনের সাক্ষাৎ হবে, এই ব্যাপারটা কি পাক্কা ? আমার বড্ডো আনন্দ হচ্ছে, যে আমার দাদা সময়কে জয় করেছে। আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, তবে তুমি আমার কথা শোনো, আর এক্ষুনি সন্ন্যাসীকে ডাকো, ডেকে যা দেবার আজই দিয়ে দাও। কালের গতি কেউ রুখতে পারে না। কালের প্রতি ভরসা করো না। যা করার আজই করো, কালকের জন্য কিছু রেখো না।
আসলে ভগবানের এই উক্তি, সম্পূর্ণ উল্টো। আমরা যাবার সময় বলে থাকি আসি। যে বোঝার সে বুঝে নেয়। শ্রীকৃষ্ণ কখনো ভবিষ্যতের কথা বলেন না। শ্রীকৃষ্ণ কখনো ভবিষ্যতের ভরসা দেন না। ভবিষ্যৎ বড্ড অনিশ্চিত, ভবিষ্যৎ বড্ড দীর্ঘ। ভবিষ্যতের কথা কিছুই বলা যায় না। তাই ভগবান যখন বললেন, আমি আসি, তখন আমরা বড্ড ধন্ধে পরে যাই। আমরা ভাবি শ্রীকৃষ্ণকে আসতে হবে। পরিবেশ পরিস্থিতি তাকে টেনে নিয়ে আসবে। এযেন জলকে গরম করা, জলকে গরম করলে বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে। পরিবেশ-পরিস্থিতি হলে ভগবান আসবেন । একটা জিনিস জানবেন, ভগবান পরিবেশ-পরিস্থিতির দাস নয়। ভগবানের আসার জন্য কোনো অনুকূল, বা প্রতিকূল পরিবেশের দরকার হয় না। ভগবান এলে পরিস্থিতির বদল হয়। পরিস্থিতি বদলাবার জন্য ভগবান কখনো আসেন না। আমার জন্য, আকাশে চন্দ্র-সূর্য্যের উদয় হয় না। আমাকে গন্ধ দেবার জন্য ফুল ফোটে না। আমাকে শীতল করবার জন্য বর্ষার আগমন হয় না। আসলে, ফুল ফোটে তাই আমরা গন্ধ পাই, বর্ষা আসে, তাই আমরা শীতল হই । সূর্য্যের উদয় হয়, তাই আমার তাপ অনুভব করি, চাঁদ ওঠে তাই আমরা জ্যোৎস্নার স্নিগদ্ধতা অনুভব করি। আমার জন্য কিছুই হয় না।
সাধুরা ভাবেন, তাদে রক্ষার জন্য ভগবান আসেন, এমনটা নয়। ভগবান আসেন, তাই সাধুদের রক্ষা হয়। আসলে এঁরা কেউ সাধু নয়, যারা ভগবানের সুরক্ষার জন্য অপেক্ষা করেন। সাধুতো সেই হয়, যার মধ্যে কোনো অনিশ্চয়তা নেই। নিজের অনিশ্চয়তায় যে সুরক্ষিত সেই তো সাধু। সাধুর আবার শত্রু কোথায় ? যিনি সবাইকে আপন করে নিতে পেরেছেন, তিনিই সাধু। যিনি স্ব-অধীন, তিনিই সাধু। দুষ্টের দমনের জন্য যদি ভগবানের আসার কারন হয়, তবে বলি, শ্রীকৃষ্ণের মতো প্রজ্ঞাবান ব্যক্তির কাছে, এই কথার কোনো গুরুত্ত্ব নেই। কেননা তিনি জানেন, কাউকে মারা যায় না। কেউ মরে না। কেবল এক দেহ থেকে অন্য দেহে স্থানান্তরিত হয় মাত্র। শ্রীমদ্ভগবৎ গীতার ২/১২ নং শ্লোকে অর্জ্জুনকে বলছেন, আমি এর পূর্ব্বে কখনো ছিলাম না, বা তুমিও যে ছিলে না, এমনটা নয়, এর পরেও যে আমরা থাকবো না তাও নয়। তো দুষ্টকে শারীরিক ভাবে বিনাশের জন্য, শ্রীকৃষ্ণকে কারন হতে হবে এমন বোকামির কথা শ্রীকৃষ্ণ কখনো বলতে যাবেন না। যে সাধুরা ভগবানের কাছে রক্ষাকবচ চায়, সে তো সাধু হতেই পরে নি, সে কেবল সাধু সেজেছে। এই ভেকধারী সাধু, সাধুবেশধারীগণ হয়তো এই ভেবে তৃপ্তি পান, যে তাদের রক্ষা করবার জন্য ভগবানের আবির্ভাব হবে। সাধুদের যে কষ্ট দেয় তাকে যদি সাধু শত্রু মনে করে, তবে তিনি কৃষ্ণ সাধনার ফল সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তো শ্রীকৃষ্ণকে জানতে গেলে, তাঁকে বুঝতে গেলে, তাঁর ঐশর্য্যকে বুজতে গেলে, তার প্রতিটি কথার অর্থকে ধরতে গেলে, এমনকি তার উপহাসকে ধরতে গেলেও, আমাদের বহু শতাব্দি অপেক্ষা করতে হবে। সাধন-ভাজন করতে হবে। তা না হলে, আমরা মানুষ শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে, ঐতিহাসিক শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে আসলে শ্রীকৃষ্ণ বিহীন হয়েই থাকবো।
তো ভগবান শ্রী কৃষ্ণের জন্ম কখনও এই মৃত্যুপুরীতে হতে পারে না। শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়, আমাদের হৃদয় কেন্দ্রে। আর এই হৃদয়কেদ্রে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাৎ হতে পারে, একমাত্র সাধন-ভজনের দ্বারা। যোগের সাহায্যেই আমরা শ্রীকৃষ্ণের সাক্ষাৎ পেতে পারি। যে যোগের কথা তিনি শ্রীমদ্ভগবৎ গীতার ছত্রে ছাত্রে বলেছেন। অলস, ক্রিয়াহীন ভন্ডের কাছে শ্রীকৃষ্ণ একটা পুতুল মাত্র। তার বেশি কিছু নয়। কিন্তু যথার্থ ভক্ত যখন সাধনক্রিয়ার সাহায্যে প্রাণ-মন স্থির করতে পারেন, তখন ভক্তের বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা বৃদ্ধি পায়। ভক্তের মধ্যে তখন একটা জ্ঞানজ্যোতিঃর দর্শন মেলে। এই জ্ঞানজ্যোতি চেতনশক্তির কাছে মনকে নিয়ে যায়। আর মন তখন এক অপার্থিব আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। ভক্ত কৃষ্ণানন্দে বিভোর হয়ে যায় । এই হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের জন্মকথা। কৃষ্ণ কোনো ঐতিহাসিক পুরুষ নয়, কৃষ্ণ আমাদের অন্তরের পুরুষ।
ওম নমঃ শ্রী ভাগবতে বাসুদেবায়।
Comments
Post a Comment