দুশ্চিন্তাহীন আনন্দময় জীবন

 


দুশ্চিন্তা কাটিয়ে কিভাবে আনন্দে থাকবো।  দুশ্চিন্তাহীন আনন্দময় জীবন 

মন একটা অদ্ভুত যন্ত্র, যা আমাদের শরীরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়ে আছে।  এই মনের সাহায্যেই নাকি  জাগতিক সমস্ত বস্তু থেকে শুরু করে স্বয়ং ভগবানকে পাওয়া যায়। যা আমাদের নিরবিচ্ছিন্ন আনন্দ এনে দিতে পারে। তা সে বিষয়-আনন্দ  বলুন আর স্বর্গীয় আনন্দ বলুন।  জীবন হতে পারে, এক আনন্দ সাগর। আবার এই মনের মধ্যেই ভিড় করে থাকে ভয়. যা আমাদের জীবনকে বিষিয়ে দিতে পারে।  এই মনের মধ্যেই জমা হয়, রাগ, ঘৃণা, দ্বেষ ইত্যাদি। যা আমাদের জীবনকে দুর্বিসহ করে দিতে পারে। তো একটা মানুষের  মনের অসীম শক্তি যা মানুষকে আনন্দ এনে দিতে পারে, আবার এই মনই মানুষের জীবনকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারে। তো কারুর মনে যদি আনন্দ থাকে তবে সে যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন, তার মতো সুখী মানুষ আর কে আছে পৃথিবীতে। হোক না সে গরিব, হোক না অশিক্ষিত, হোক না সে গরিব ভারতবাসী, মনে যার শান্তি আছে, তার জীবন সার্থক। বড় বার সে ফিরে ফিরে আস্তে চায়, এই পৃথিবীর বুকে। 

বলা হয়ে থাকে এই মনের সামান্যতম শক্তি আমরা ব্যবহার করতে পারি। বেশিরভাগ শক্তি আমাদের জীবনে অব্যবহৃত হয়ে থাকে। তো মনের এই অসীম শক্তি পরিচয় আমরা জানি না। আবার জানিনা বললে ভুল হবে। মনের কষ্ট  আমরা অনুভব করি, মনের আনন্দ আমরা উপভোগ করি। তো আসুন এই মনের সাহায্যে আমাদের বাস্তব জীবনের সমস্যা কিভাবে দূর করতে পারি, তার কতকগুলো সহজ ও সাধারণ পদ্ধতির ব্যবহার  সম্পর্কে শুনে নেই। 

১. প্রথমেই শুরু করি মন কিভাবে দুশ্চিন্তাহীন, নিরুদ্বিগ্ন  থাকবে। 

মুক্তানন্দ বলছিলেন, সমস্যা নিয়ে বেশি না ভেবে তার সমাধান সম্পর্কে ভাবুন । কিন্তু এই কথা বলা যত  সহজ তা কার্যকরী করা কিন্তু তত সহজ নয়।  আমরা সমস্যা নিয়ে ভাবি, আর নিজেকে উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দেই। আর এই যে দুশ্চিন্তা আমাদের আসে, এর জন্য আমাদের আসলে কিছুই করতে হয় না। তো মুক্তানন্দ বলছেন, জল নিচের দিকে নেবার জন্য কিছুই করতে হয় না। কিন্তু জল উপরের দিকে নিতে গেলে, কসরত  করতে হয়। কিন্তু কথা হচ্ছে করবো টা  কি ?

মুক্তানন্দ বলছেন, 

একটা চেয়ার নিয়ে, অথবা মাটিতে আসন পেতে মেরুদন্ড সোজা করে বসুন। আরাম করে বসুন।  শরীরকে স্থির করুন, শরীরকে শিথিল করুন, দেখবেন, মনও ধীরে ধরে শান্ত হচ্ছে। এবার চোখদুটো বন্ধ করুন। প্রথমে তিন বার অনুলোম বিলোম  করে নিন।  অর্থাৎ ডান  হাতের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে ডান নাক বন্ধ  করে বা নাক দিয়ে ধীরে ধীরে শ্বাস নিন। এবার ডান  হাতের অনামিকা দিয়ে বা নাক বন্ধ করে দেন নাক দিয়ে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন। এই হলো একবার, এইভাবে তিনবার করুন। এই শ্বাস যত  ধীরে নেবেন, তত এর উপকারিতা বেশী হবে। এবার শুনুন বাইরে কিসে আওয়াজ হচ্ছে।  ফ্যানের শো শো আওয়াজ হচ্ছে, বা বাইরে দূরে কোথাও মাইক বাজছে। ত্রিশ সেকেন্ড কান দিয়ে এটি শুনতে থাকুন। এবার শরীরের দিকে খেয়াল করুন, দেখুন  ছেলে হলে বুকের দিকে আর মেয়ে হলে পেটের  দিকে মনটাকে নিয়ে যান। খেয়াল করুন, বুক বা পেট ওঠানামা করছে। কিন্তু কেন ?  না আপনার শ্বাস একবার ভিতরে অর্থাৎ বুক-পেটে প্রবেশ করছে, আর একবার বাইরে বেরিয়ে আসছে। তো মনটাকে নাকের কাছে নিয়ে যান। এই যে প্রক্রিয়া বললাম, এটি ৫ মিনিটের মধ্যেই শেষ করুন। 

এবার ১ থেকে ১০০ আবার ১০০ থেকে ১ পর্যন্ত গুনতে থাকুন। ভুল হয়ে গেলে, আবার প্রথম থেকেই শুরু করুন। 

এবার মনকে নির্দেশ দিতে থাকুন, হে মন তুমি শান্ত হও। স্থির হও। ধরুন কালকে একটা গুরুত্ত্বপূর্ন কাজ আছে, যার জন্য আপনার ভীষণ  দুশ্চিন্তা হচ্ছে। আপনি আজই সেই কাজটি মনে মনে করতে শুরু করে করুন। ধরুন,কালকে আপনার পরীক্ষা আছে,  কালকে আপনার চাকরির ইন্টারভিউ আছে। কল্পনায় সেই পরিস্থিতির কথা চিন্তা করতে থাকুন। মনে মনে বলুন আমার মন শান্ত আছে, সমস্ত প্রশ্নের উত্তর  আমি লিখতে পারছি  / বলতে পারছি  । মনে মনে আপনি সেই ইন্টারভিউ স্থলে চলে চলে যান। সেখানে তাদের অভিবাদন করে স্থির হয়ে বসুন। ভাবুন, যারা ইন্টারভিউ নেবেন, তারা আমাকে সবাই প্রসংসা করছেন, তারা হাসিমুখে খুবই সহজ প্রশ্ন করছেন। আর আপনি সাবলীল ভাবে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। একসময় আপনি ইন্টারভিউ রুম  থেকে হাসিমুখে বেরিয়ে এলেন। শুধু কল্পনা করুন। মাত্র পাঁচ+পাঁচ  মিনিট এই অভ্যাস আপনি প্রতিদিন ঘুমুতে যাবার আগে, এবং ভোরবেলা ঘুম ভেঙে বিছানায় বসেই, অভ্যাস করুন। মাত্র ৭টি দিন এই অভ্যাস আপনার মনের জোর বাড়িয়ে দেবে। আপনার মধ্যে একটা নতুন নির্ভিক মানুষের জন্ম হবে।    

২. মনের মধ্যে কিভাবে আনন্দ ধরে রাখবো। 

এই প্রক্রিয়াকে কোয়ান্টাম মেডিটেশন বলা হয়। ভোরের দিকে, অর্থাৎ সূর্য ওঠার এক ঘন্টা আগে এটি করতে পারলে, খুবই কার্যকরী হবে।  আরাম করে কম্বলের বিছানায়  বসুন, মেরুদণ্ড সোজাকরে বসুন। শরীরকে শিথিল করে দিন। চোখ বন্ধ করুন। শ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে বুক-পিঠের  ওঠানামা অনুভব করতে থাকুন ২ মিনিট। এবার একটা কল্পনার জগতে চলে যান।  মনে করুন।  আপনি নির্জনে  হরিদ্বারের গঙ্গার তীরে বা বারাণসীর গঙ্গার  তীরে,,  বসে আছেন। সবুজ ঘাসের উপরে বসে আছেন। সামনে দিয়ে গঙ্গা নদী বয়ে যাচ্ছে, নদীর  উপর দিয়ে ছোট ছোট ঢেউ তুলে কলকল ধ্বনি তুলে নদীর জল উত্তর  থেকে দক্ষিণে চলে যাচ্ছে।  দক্ষিণ দিক থেকে শীতল বাতাস এসে আপনাকে স্পর্শ করছে। সামনে দূরে ত্রিশূল হাতে শিব ঠাকুরের রঙ্গিন পাথরের মূর্তি। মাথার উপরে নীল আকাশ। ছোট ছোট সাদা রঙের মেঘ । মেঘগুলো ধীরে ধীরে দক্ষিণ থেকে উত্তরে হিমালয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আপানার শরীর হালকা বোধ হচ্ছে। পালকের মতো হালকা। মনের পাখনা দিয়ে আপনি আকাশে মেঘের উপরে গিয়ে  বসলেন।  মেঘ আপনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, হিমালয়ের পর্বত শিখরে দেবী পার্বতীর গৃহের প্রাঙ্গনে। বাস্তবে আপনি বসে আছেন, নদীর পারে, ঘাসের উপরে কিন্তু আপনার মন গিয়ে বসেছে মেঘের উপরে।  আপনি উড়ে চলেছেন।  নিচে নদী বয়ে যাচ্ছে।  মন্দিরগুলোর চুড়ো দেখা যাচ্ছে। মহাদেবের ত্রিশূল দেখা যাচ্ছে। আপনি মেঘের উপরে বসে আছেন।  আর মেঘ আপনাকে হিমালয়ের দিকে নিয়ে চলে যাচ্ছে। আপনার শরীর  এখন হালকা পেজা তুলোর মতো।  আপনি উড়ে চলেছেন। হিমশীতল বাতাস আপনার সারা শরীরকে শান্তির বাতাবরণ দিয়ে ঘিরে রেখেছে। 

মাত্র দশ থেকে পনেরো মিনিট মৃদু সঙ্গীত ধ্বনির সঙ্গে এই বা জলের কলতানের ধ্বনির সঙ্গে নিজের মনকে এইভাবে ভাসিয়ে দিন। এর পরে ধীরে ধীরে স্বপ্নের জগৎ থেকে বাস্তব জগতে ফিরে আসুন। নিজের ইষ্টদেবকে  প্রণাম করুন। এক মিনিট চুপচাপ বসে থেকে নিজের কাজে লেগে যান। 

--------------------         

৩. জীবন-সমস্যা সমাধানে মনকে কিভাবে কাজে লাগাবো  .

৪. দেখুন যা অসম্ভব তা কখনো সম্ভব হবে না। আমরা কেউ, স্বরং ডাক্তারবাবু মৃত মানুষকে বাঁচিয়ে তুলতে পারেন  না। আর এই কাজ স্বয়ং ভগবানও  পারেন না।   কিন্তু অন্যকেউ যা পারে না,  এমনকি ভগবান যা পারে, তা আমরা  এই মনের সাহায্যে করে উঠতে পারি। কিন্তু কিভাবে ?

৫.মনে মধ্যে যে রাগ, দ্বেষ, ঘৃণা, ভয়, এগুলো কিভাবে দূর করবো ?  

৬. মনের মধ্যে হতাশা এলে তা কিভাবে দূর করবো ?

৭. 

আমাদের কাউকে যদি বলা হয়, তুমি চৈতন্যস্বরূপ। তুমি সংসারে বদ্ধ জীব নও। তুমি এই শরীর মন বুদ্ধি কিছুই নও। তাহলে আমরা কিছুই বুঝতে পারি না। আমাদের যদি বলা হয়, এই শরীরের কষ্ট , মনের কষ্ট এগুলো আসলে তোমার নয়। আমাকে যদি বলা হয়, তোমার মৃত্যু নেই. মৃত্যু হয় শরীরের মাত্র।  এসব কথায় আমার শারীরিক কষ্টের লাঘব হয় না। এই সব তত্ত্বকথা আমরা এক কান দিয়ে শুনি আর এক কান দিয়ে বের করে দেই। আর আমরা পেটের  ক্ষিদে নিয়ে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ি। শরীরের অসুখ হলে, আমরা ডাক্তারের কাছে ছুটে যাই। শিশুকালের আমি, যৌবন কালের আমি, বৃদ্ধাবস্থার আমি, একই আছি।    

স্মৃতিশক্তি কিভাবে বাড়ানো যাবে ?  ওঙ্কারের সাধনা - স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে। স্মৃতি ও ওঙ্কারের সাধনা 

অধ্যাত্ম  জীবনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের আত্মস্মৃতিকে জাগিয়ে তোলা। অর্থাৎ আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, কেন এসেছি, কি আমার কর্তব্য, আমি আবার কোথায় ভেসে যাবো,  সেই স্মৃতিকে  জাগিয়ে তোলাই সাধন জীবনের উদ্দেশ্য । জাগতিক জীবনেও স্মৃতিধর মানুষকে আমরা শ্রদ্ধার চোখে দেখে থাকি । জাগতিক শিক্ষার জগতেও এই স্মৃতির অসীম গুরুত্ত্ব। তো স্মৃতি যদি আমাদের সুদূর প্রসারী হয়, অর্থাৎ বহু পুরোনো দিনের কথা যদি আমি মনে রাখতে পারি, তবে বলা যেতে পারে, আমার স্মৃতিশক্তি ভালো। এতেকরে,  আমরা যেমন জাগতিক জগতে সাফল্য অৰ্জন করতে পারি, তেমনি, অধ্যাত্ম জগতেও সাফল্য অৰ্জনের সহায় হতে পারে এই স্মৃতি । আজ আমরা  আমাদের স্মৃতিশক্তিকে কিভাবে জাগিয়ে  তুলতে পারি, তার একটা সহজ প্রক্রিয়ার কথা শুনবো। আসলে আমাদের জন্ম জন্মান্তরের স্মৃতি সঞ্চিত আছে আমাদের কারন শরীরে। যে কারন শরীর  সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা  নেই। যাই হোক, তত্ত্ব কথায় যাবো না।  আমরা সাধারণ মানুষ, আর সাধারনের বোধগম্য ভাষাতেই আমরা জানতে চাই, আমরা কিভাবে আমাদের স্মৃতি শক্তিকে বাড়াতে পারি। এই প্রক্রিয়া এতটাই শক্তিশালী, যে নিরন্তর অভ্যাসে, আপনি জন্মান্তর রহস্যের উদ্ঘাটন করতে পারবেন। এই সাধনক্রিয়ার জন্য কোনো গুরুর কাছে যাবার দরকার নেই। শুধু আমাদের এই কথাগুলো ভালোভাবে শুনুন ও অনুসরণ করুন। 

১. সোজা হয়ে কম্বলের আসনে বসুন।  মেরুদন্ড সোজা করে, বসুন। এই প্রক্রিয়াটি ঘুমুতে যাবার আগে করতে হয়। ধীরে ধীরে বার তিনেক অনুলোম বিলোম  করে নিন। চোখ দুটো বন্ধ করুন। এবার সকাল থেকে নিজে কি করেছেন, কোথায় ছিলেন, কোন অবস্থায় ছিলেন, সে কথা ভাবতে থাকুন। ধরুন, আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে, প্রথমেই ঠাকুরের উদ্দেশ্যে প্রণাম করেছিলেন। ধীরে ধীরে আপনি বিছানা থেকে নেমে, বাথরুমে গিয়েছেন, সেখানে  প্রস্রাব করে, এসে এক গেলাস জল খেয়ে ছিলেন। এরপর, আপনি দাঁত ব্রাশ করেছেন, এর পর প্রাণায়াম করতে বসেছেন। একঘন্টা প্রাণায়ামের পরে, এসে আপনি চা-বিস্কুট খেলেন, আবার একবার বাথরুমে গেলেন। এবার স্নান সেরে, আপনি ঠাকুরঘরে, ধূপধুনো জ্বালতে গেলেন। সেখানে বসে ৫ মিনিট ঠাকুরের সামনে বসে ঠাকুরের ধ্যান করলেন। এবার বেরিয়ে এসে, সকালের খাবার খেলেন। ধীরে ধীরে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলেন। রাস্তায় কার সাথে দেখা হলো, ট্রেনে বা বসে কেমন ভিড় ছিলো, ইত্যাদির কথা ভাবতে  ভাবতে নিজেকে অফিসের দিকে নিয়ে যান।  সেখানে কার সাথে প্রথম দেখা হলো, সেটা মনে করতে চেষ্টা করুন। অফিসে গিয়ে বসের সাথে, বা সহকৰ্ম্মীদের সাথে কি কথা হলো।  টিফিনে কি খেলেন। ........ইত্যাদি ইত্যাদি ভাবতে থাকুন। অফিস থেকে ফিরে বাড়িতে কাকে দেখলেন, ছেলেকে না মেয়েকে, না মাকে, না স্ত্রীকে , সেই স্মৃতি মন্থন করতে থাকুন। অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি আপনি আজ সারাদিন যা কিছু করেছেন, এমনকি কাল রাতে যাকিছু করেছেন, অর্থাৎ গত ২৪-ঘন্টায় যাকিছু করেছেন, তার স্মৃতি চারণ করতে থাকুন মাত্র দশ মিনিট। এই প্রক্রিয়া আগামী ৭দিন মাত্র ১০ মিনিট যাবৎ করবার অভ্যাস করুন। 

২. দ্বিতীয় প্রক্রিয়া বা এর পরের সমস্ত প্রক্রিয়াগুলোর অভ্যাস করতে হবে সকালে নয়, এটি করতে হবে, রাতের খাবার খাওয়ার  চারঘন্টা পরে। তার আগে ঘন্টাদুই ঘুমিয়ে নিন। গভীর রাতে ঠাকুরঘরে, অথবা বিছানায় বসেই এই প্রক্রিয়ার অভ্যাস করতে হবে। একইভাবে মেরুদন্ড সোজা করে, কম্বলের আসনে, চোখ বুজে বসে, শরীরকে শিথিল করে দিন। বার তিনেক অনুলোম-বিলোম করে নিন। এবার আপনার জীবনে ঘটে যাওয়া বিশেষ বিশেষ ঘটনার কথা মনে করতে চেষ্টা করুন, প্রথম দিকে সুখের বা দুঃখের যেকোনো স্মৃতি জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করুন।  যেমন ধরুন, আপনি যেদিন প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হলেন, যেদিন আপনি মাধ্যমিক পাশ করলেন, বা যেদিন আপনি প্রথম চাকরিতে যোগ দিলেন। যেদিন আপনার প্রথম সন্তান হলো। আপনার কোনো প্রিয় বন্ধুর কথা ভাবুন। ইত্যাদি নানান ঘটনার কথা স্মরণ করবার চেষ্টা করুন।  অথবা আপনার জীবনে ঘটে যাওয়া দুঃখের ঘটনা। প্রিয়জন হারানোর কথা, আপনার দিদির বিয়ের কথা। আপনার নিজের অসুস্থ অবস্থার কথা, বা পিতা-মাতার অসুস্থ হবার দিনের কথা।  এমনকি তাঁদের মৃত্যুর দিনের কথা স্মরণ করতে থাকুন। এই প্রক্রিয়া পনেরো মিনিট থেকে আধাঘন্টা  করুন। এই প্রক্রিয়া মাত্র ৭ দিন করুন। 

৩. তৃতীয় প্রক্রিয়া শুরু করবার আগে, অবশ্য়ই দু সপ্তাহ যাবৎ আগের দুটো প্রক্রিয়া করে নেবেন। 

 এই প্রক্রিয়া রাতের বেলা, খাবার চার ঘন্টা পরেই করতে হবে। প্রথমে, আপনি ধীরে ধীরে দীর্ঘ শ্বাস  নিন। এবার শ্বাস ছাড়বার সময় ওঙ্কারের উচ্চারণ করুন। এই প্রক্রিয়া  ৫ মিনিট বা অন্ততঃ দশবার অভ্যাস করুন। এইসময়  ওঙ্কারের অনুনাসিক ধ্বনিকে  দীর্ঘস্থায়ী করুন।  অর্থাৎ ং বা ম এর উচ্চারণ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করতে থাকুন। এর পর নীরবে আরো দুই মিনিট মনে মনে ওঙ্কারের উচারন করুন। ধীরে ধীরে শ্বাস গ্রহণ করুন, এবং শ্বাস গ্রহণ ও  ছাড়বার  সময় ওঙ্কারের উচ্চারণ করুন মনে মনে। 

এবার আপনি শুধু আপনার জীবনে শুধু আনন্দঘন মুহূর্তের কথা স্মরণ করতে থাকুন। হতে পারে, তা সে আপনার প্রথম প্রেমের কথা,  বিয়ের দিনের কথা, বা আপনার ছেলের জন্মের কথা, বা আপনার চাকরি হবার  কথা, যেদিন আপনার বি.এ বা এম.এ. পাশ করবার দিনের কথা। অর্থাৎ শুধু পুরানো সুখ-স্মৃতিকে  জাগিয়ে তুলে সেই দিনের কথা ভাবতে থাকুন। ছোটবেলার কথা ভাবতে থাকুন। কবে আপনি জাম  গাছে উঠেছিলেন। পেয়ারা গাছ থেকে কিভাবে পেয়ারা পেড়ে খেতেন।  অর্থাৎ এই অবস্থায় আপনি ছোটবেলার সুখস্মৃতির কথা স্মরণ করতে থাকুন।  

৪. চতুর্থ প্রক্রিয়া এটিও সেই রাতের বেলা, খাবারের চার ঘন্টা পরে করতে হবে। এবার ধীরে ধীরে ধীরে বুক ভোরে শ্বাস নিন, আর ওঙ্কারের ধ্বনি উচ্চারণ করতে করে শ্বাস ছাড়তে থাকুন।   দীর্ঘ শ্বাস নিন, ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়বার সময়  ওঙ্কারের উচ্চারণ করুন। এই ধ্বনি আপনি একাসনে বসে, দীর্ঘক্ষণ করতে হবে।  একটা সময় আসবে, যখন আর গলা দিয়ে এই ধ্বনি সশব্দে উচ্চারণ হবে না। কিন্তু মনে মনে, ভিতরে ভিতরে এই ধ্বনি উচ্চারিত হতে থাকবে। 

 এই ধ্বনি উচ্চারণ করবার সময় গলাটাকে চিবুকের দিকে একটু নামিয়ে নিন।  তাহলে দেখবেনা, আপনার গলার স্বর একটু গম্ভীর হবে, আর তখন উপলব্ধি করতে পারবেন, যে এই ওঙ্কারের  ধ্বনি আপনার নাভিপ্রদেশ থেকে উঠে আসছে। এই অবস্থায় আপনি যতক্ষন পারুন, অবস্থান করুন। তা সে যদি ভোর  হয়েও যায়, তথাপি বিরতি দেবেন না। তবে সূর্য ওঠার আধাঘন্টা আগেই এই প্রক্রিয়ার শেষ করুন। আপনি হয়তো ভাবছেন, এসব করলে, আপনি পরদিন স্বাভাবিক কাজকর্ম্ম করতে পারবেন না, বা অফিসে যেতে পারবেন না। তা কিন্তু নয়।  এই প্রক্রিয়া যদি ঠিকঠিক ভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তবে গাঢ় ঘুমের  পরে, আপনি যেমন চনমনে হয়ে ওঠেন, তেমনি এই প্রক্রিয়ার সাহায্যে  আপনার মন আরো বেশি কার্যকরী হবে, ও মনের উৎসাহ, স্ফূর্তিভাব বেড়ে যাবে । আপনার সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা বেড়ে যাবে।  

প্রথমদিকে দরকার হলে একদিন বাদে একদিন করুন। তবে নিরন্তর চালিয়ে যাবেন। নির্দিষ্ট সময়ে শুরু করুন, আবার নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করুন। এই ওঙ্কারের সাধনায় আপনাকে একদিন আত্মজ্ঞান লাভ করিয়ে দেবে। মাত্র মাস তিনেকের অভ্যাসে, আপনার আত্মস্মৃতি জাগিয়ে তুলবে। আপনি কে, কেন এসেছেন, এই মৃত্যুপুরীতে, তা আপনার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে। আপনি এখন থেকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আরো বেশি সচেতন হয়ে উঠবে।  আপনি পিছনের অতীতের কথা ভাবতে সক্ষম হবেন। অতীতের স্মৃতি আপনার মধ্যে আপনা-আপনিভাবেই জেগে উঠবে। এমনকি আপনার পূর্বজন্মের স্মৃতিকে তুলে আনবে। স্ফূর্তিভাব জেগে উঠবে। তবে আপনার সাফল্য নির্ভর করছে, আপনার শরীর-মনের পবিত্রতার উপরে। আপনার সাধনার একাগ্রতার উপরে। তবে একথা বলা যেতে সাফল্য অবশ্য়ই  আসবে, তা আজ হোক বা কাল। আমাদের প্রাচীন মুনিঋগন বলছেন, এই ওঙ্কার  থেকেই সমস্ত জগতের উৎপত্তি হয়েছে, এই সত্য আপনি আমি উপলব্ধি করতে পারি না। কিন্তু চরম সত্যকে আমাদের বিশ্বাস করতে হবে, উপলব্ধি করতে হবে। আর এই উপলব্ধি কেবলমাত্র সাধনক্রিয়ার প্রতি আপনার নিষ্ঠার উপরে নির্ভর করছে।  

ওঙ্কারের সাধনা একটা অদ্ভুত জাগরণ ঘটিয়ে দেবে, আপনার জীবনে। ওঙ্কারের ধ্বনি তখন স্বাভাবিক ভাবেই আপনার ভিতরে ধ্বনিত হতে থাকবে। এইসময় চোখ বুজলে আপনি জ্যোতির  দর্শন পাবেন।আপনি একজন অন্য মানুষ হয়ে উঠবেনা। তিন মাসের মধ্যেই আপনার এই পরিবর্তন বাইরের লোকের চোখে ধরা পড়বে। তবে একটা বলি, আপনার এই সাধন প্রক্রিয়ার কথা, বা আপনার এই অভিজ্ঞতার কথা কাউকে না বলাই ভালো। একমাত্র সম মানসিকতা সম্পন্ন, যোগগুরু, অথবা যোগসাথীদের সাথেই এই কথা আলোচনা চলতে পারে। অন্যথায়, নিজেকে মৌন রাখুন। 

----------------

বিশ্বাসে মেলায় বস্তু । 

আমরা একটা কথা সবাই শুনেছি, যে বিশ্বাসে মেলায় বস্তু।  সত্যিই কি বিশ্বাস করলে বস্তু পাওয়া সম্ভব  ? আর কাকেই বা আমরা বিশ্বাস করবো ?  আজ এই প্রচলিত  কথার গভীরে প্রবেশ করবো আমরা। মহাত্মাগণ বলছেন, আপনার এই যে জীবন, এই যে জগৎ  এটি কেবলমাত্র কতকগুলো বিশ্বাসের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। আর এই বিশ্বাস নাকি  বাসা করেছে আপনার/আমার  মনের গভীরে। আর এই বিশ্বাসগুলো আপনি নিজেই তৈরী  করেছেন, বা অৰ্জন করেছেন ।  আপনি হয়তো বলবেন, এটা  আবার হয় নাকি, শুধু বিশ্বাস দিয়ে কি মানুষের জীবন চলতে পারে ? 

দেখুন সকালবেলা আপনি যে প্রাণায়াম-ব্যায়াম  ইত্যাদি করেন, তার কারন হচ্ছে, আপনি বিশ্বাস করেন, যে এতে আপনার শরীর মন ভালো থাকবে। আপনি অফিসের যাবার আগে, যে ফুলটি দিয়ে বা ধুপ জ্বেলে  ঠাকুরকে প্রণাম করেন, আসলে  আপনি বিশ্বাস করেন যে এতে করে আপনার সারাদিন ভালো যাবে। আপনি যে ৮-৫০-এর ট্রেন ধরে অফিসে যান, তার কারন হচ্ছে, আপনি বিশ্বাস করেন, যে এই ট্রেনে গেলে, আপনি ঠিক ঠিক সময় অফিসে পৌঁছে যাবেন। আপনি যে উপাদেয় খাবার খান, তার কারন হচ্ছে, এতে করে যেমন আপনার ক্ষিদে মিটবে, তেমনি আপনার শরীর  ভালো থাকবে। এগুলো সবই আপনার বিশ্বাস মাত্র।   আপনি যে স্ত্রীকে-ছেলেমেয়েকে ভালোবাসেন, তার কারন হচ্ছে, আপনি বিশ্বাস করেন, যে ওরাও আপনাকে ভালোবাসে। এমনকি আপনি যে বন্ধুকে ভালো বসেন, বা অফিসের সহকৰ্ম্মীকে পছন্দ করেন, তার কারন হচ্ছে, আপনি বিশ্বাস করেন যে ওই অফিস কর্ম্মী আপনাকেও ভালোবাসে বা পছন্দ করে । আপনি যে ডাক্তারবাবুর দেওয়া ওষুধ খান, কারন আপনি ডাক্তারবাবুকে বিশ্বাস করেন। এই বিশ্বাস আপনার অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নিয়েছে।  আপনি যে আস্তিকতায় বা নাস্তিকতায় বিশ্বাস করেন, এটি আপনার জন্মসূত্রে বা পারিবারিক সূত্রে  পাওয়া।  আপনি যে রাজনৈতিক দলকে বিশ্বাস করেন, কারন আপনি এদের নীতিগুলোকে সঠিক মনে করেন। 

এই যে বিশ্বাস, এগুলো আপনার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু সত্য হচ্ছে, এই যে বিশ্বাস আপনার মধ্যে বহুদিন ধরে  রয়েছে, এগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হচ্ছে। এই বিশ্বাস একসময় ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে পারে। এমনকি আপনি যাদের বিশ্বাস করেন, তাদের কার্যকলাপ আপনাকে বিশ্বাস থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। এদের কাছ থেকে কোনো অপ্রত্যাশিত ব্যবহার পেলে, আপনার মধ্যে বিশ্বাস চলে যেতে পারে।  যে ছেলেকে আপনি এতো ভালোবাসতেন, সেই ছেলে, আপনার অমতে বিয়ে করলে, বা আপনার অজ্ঞাতসারে আপনার ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে নিলেই, আপনি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবেন। এতদিনের বিশ্বাস আপনার একটা দিনে ঘটনায় আঘাতপ্রাপ্ত হবে। 

আবার কতকগুলো বিশ্বাস আছে, যা আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতা নয়, তথাপি তাকে আমরা বিশ্বাস করি, যেমন ইনি  আমার মা, ইনি  আমার পিতা , ইনি  আমার ভাই, বোন, ইত্যাদি ইত্যাদি ।  এই যে দেশটা  এর নাম নাকি ভারতবর্ষ। এই যে বিশ্বাস এটি আমাদের অভিজ্ঞতা লব্ধ  নয়। এটি আমাদেরকে শেখানো হয়েছে, বারবার শুনতে শুনতে একেই   আমরা বিশ্বাস করে নিয়েছি  । এই বিশ্বাস আমাদের অভিজ্ঞতা লব্ধ না হলেও, এই বিশ্বাস যা আমরা শুনে বিশ্বাস করেছি, তা  সাধারণত সহজে পরিবর্তন করা যায় না।  আমি  একজন হিন্দু, মুসলমান, জৈন, শিখ, বা খ্রিস্টান, ইত্যাদি এই যে বিশ্বাস এটি সহজে অবিশ্বাস  করা যায় না। কিন্তু কথা হচ্ছে, আমি যে কিভাবে  এই মায়ের সন্তান হলাম, আমি যে কি করে হিন্দু হলাম, বা মুসলমান হলাম, আমি যে কি করে অমুকের ভাই হলাম,  তা কিন্তু  আমরা জানি না। কিন্তু আমরা এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। এবং সেইমতো আচরণ করে থাকি। 

সে যাই হোক, বিশ্বাস ছাড়া জীবন চলে না।  বিশ্বাস নিয়েই মানুষ চলে, সমাজ চলে, দেশ চলে. এমনকি পৃথিবীটা চলছে বিশ্বাসের উপরে।  কিন্তু কথা হচ্ছে, আপনি আপনাকে বিশ্বাস করেন তো ? আপনি নিজের সম্পর্কে কি ভাবেন ? আপনি নিজেকে কি বুদ্ধিমান ভাবেন ? আপনি নিজেকেই অফুরন্ত  শক্তির ভান্ডার বলে বিশ্বাস করেন ? আপনি এই শরীরটাকে  কি ঈশ্বরের বা আত্মার  আবাসস্থল বলে বিশ্বাস  করেন ?  অর্থাৎ আপনার আত্মবিশ্বাস কতটা ? আপনি নিজেকে কতটা বিশ্বাস করেন ? আপনি নিজেকে যত বেশী বিশ্বাস করবেন, জানবেন, আপনার জীবন তত বেশি আনন্দময় হয়ে উঠবে।  আপনার জীবন তত সফলতার দিকে এগিয়ে যাবে। আর আপনি যত  বেশি অন্যকে বিশ্বাস করবেন, তত আপনার কষ্টের মাত্রা বাড়তে থাকবে।  

একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করি। আপনার ছেলের ব্রেন ভালো, এটা আপনার বিশ্বাস।  কিন্তু আপনার ছেলের রেজাল্ট আশানুরূপ হয় না। যদিও আপনার  মনে হয়, ও মাস্টারদের কাছে আলাদা করে পড়ে  না বলে, মাস্টাররা আপনার ছেলেকে কম নম্বর  দেয়।  কিন্তু সত্য হচ্ছে, আপনার ছেলের ব্রেন ভালো হলেও, সে বেশিক্ষন একনাগাড়ে পড়তে পারে না। বা পড়ার বই থেকে সে অন্য বইতে বেশী আগ্রহবোধ করে। তাই ক্লাসের পড়াতে তার যত  মনোযোগ, তার চাইতে গল্পের বই পড়ার ঝোক বেশি। এখন আপনি করলেন কি ছেলেকে বললেন, তুমি যদি এবার অঙ্কে ১০০% মার্ক্স পাও, তবে তোমাকে একটা মোবাইল কিনে দেবো। তবে আপনি দেখবেন, যে ছেলে অংকে ৭০ থেকে ৮০-র মধ্যে মার্ক্স্ পেতো সে ১০০ না পেলেও ৯০ ছাড়িয়ে গেছে। যে গৃহবধূ রান্নাঘরের বাইরে কোনোদিন কোনো  কাজের কথা ভাবেনি, স্বামীর অকালমৃত্যুতে সেই গৃহবধূ, স্বামীর ব্যবসার কাজে লেগে, সফলতার মুখ দেখেছে। আসলে আমরা যে বিশ্বাস  বাস্তব অভিজ্ঞাতার মাধ্যমে অৰ্জন করি, সেটি আমাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের ফলে হয়ে থাকে। কিন্তু আপনার ভিতরে সুপ্ত যে ক্ষমতা আছে, যা আপনার বিশ্বাসের মধ্যে কখনো আসেনি, তা পরিস্থিতির  চাপে  বা পুরস্কারের লোভে বেরিয়ে আসতে  পারে। তো আমাদের সফল জীবনের চাবিকাঠি, বা ব্রহ্মাস্ত্র আমাদের হাতেই আছে।  এর ব্যবহার আমরা ভুলে গেছি।  একে  আমাদের ব্যবহার করতে হবে। 

বেশিরভাগ মানুষ মূলত সৎ ও আন্তরিক শুধু অল্প  কিছু মানুষ আছেন, যারা অসৎ ও কপট। আমরা অনেকেই ভাবি আমাদের সবার ক্ষমতার একটা সীমাবদ্ধতা আছে, তাকে আমরা কিছুতেই অতিক্রম করতে পারি না। দেখুন অন্যলোকে যা কিছু করতে পারে, আপনিও তা করতে পারেন। চা ওয়ালা থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া যায়।  অটো চালক থেকে মুখ্যমন্ত্রী হওয়া যায়।  শুধু ওই কাজের জন্য আপনাকে যোগ্য করে তুলতে হবে। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই আছে অসীম শক্তি, মানুষের অসাধ্য বলে কিছু নেই।  মানুষ হয়তো আকাশে পাখির মতো উড়তে পারে না,  কিন্তু সে  এরোপ্লেন বানাতে পারে। আমাদের অনেকের বিশ্বাস ভাগ্য আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে, কিন্তু সত্য হচ্ছে, মানুষ নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে তোলে তার কর্ম্মের মাধ্যমে। আমরা ভাবি, আমার বাবার পয়সা না থাকবার জন্য, আমি পড়াশুনা করতে পারিনি, কিন্তু সত্য হচ্ছে, আপনার মধ্যে উৎসাহের ঘাটতি ছিল। 

আমার এই কথাগুলো হয়তো আপনি বিস্বাস করতে পারছেন না, কিন্তু যদি আপনি আমার এই কথা গুলো মেনে নেন, এবং এখন থেকে নিজেকে সেইমতো দৃঢ় বিশ্বাসের উপরে স্থাপন করতে পারেন, তবে আপনার মধ্যে অবশ্যই  পরিবর্তন আসবে, সফলতা আসবে । দেখুন, আপনি বিশ্বাস করুন আর না করুন, আপনি জানেন না, যে আপনাকে ভগবান এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, একটা বিশেষ ও মহান উদ্দেশ্য নিয়ে। আমরা কেউ অহেতুক এই পৃথিবীতে আসিনি।  আমাদের সবার আসার পিছনে ঈশ্বরের একটা মহান উদ্দেশ্য আছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমরা বাহ্যিক আড়ম্বর দেখে, বা স্বরচিত সমস্যায় জড়িয়ে নিজের ঈশ্বরের সেই উদ্দেশ্যের কথা বেমালুম ভুলে গেছি। এমনকি আমরা ভগবানের কথাও  ভুলে গেছি।  আর যা নয়, তাই করে চলেছি।  আপনি হয়তো বলবেন, আমি যে অশিক্ষিত গরিব মা-বাবার ঘরে জন্মেছি, তার পিছনে কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে ? বন্ধু গরিব হয়ে জন্মেছেন, ধনী হবার জন্য। আপনি যদি ধনীর ঘরে জন্মাতেন, তবে কখনোই ধনী হতে পারতেন না। আপনাকে দেখে আর পাঁচটা মানুষ উৎসাহ পাবে, গরিব ঘরে জন্মেও কিভাবে শিক্ষিত ধনী ও বিশিষ্ট মনুষ হওয়া যায়, সেই লোক শিক্ষা দেবার জন্যই ভগবান আপনাকে গরিবের ঘরে পাঠিয়েছেন। একমাত্র আপনি হ্যাঁ, একমাত্র আপনিই এই লোকশিক্ষা  দিতে পারেন।  দেখুন দয়ার সাগর বিদ্যাসাগর গরিব ব্রাহ্মণের ঘরে জন্মেছিলেন। কিন্তু তাঁর দান তা সে শিক্ষা জগতে বলুন, সমাজ জীবনে বলুন, এমনকি অর্থদাতা  হিসেবে, তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে।  ঠাকুর রামকৃষ্ণ জন্মেছিলেন, গরিব গোড়া ব্রাহ্মণের ঘরে। কিন্তু তিনি গোড়ামি কাটিয়ে জগৎকে সর্ব্ব ধর্ম্ম সমন্বয়ের কাজ  কিভাবে করতে হয়, সেই পথ দেখিয়েছিলেন। বাবাসাহেব ডঃ ভীমরাও আম্বেদকর জন্মেছিলেন, অতি সাধারণ অস্পৃশ্যের   ঘরে। আর তিনি এই অস্পৃশ্যতার দূরীকরণের জন্য, সারাজীবন লড়াই করে গেছেন। অস্পৃশ্য সমাজের দাবি সর্ব্ব সমক্ষে তুলে ধরবার আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন।  আর এই সব মহাপুরুষদের জন্মের  সুফল আজকের সমাজে খানিকটা হলেও অবশ্য়ই আমরা দেখতে পাচ্ছি। তো আপনি জানবেন, আপনি যেখানে জন্মেছেন, যে অবস্থায় আছেন, সেখান থেকে নিজের চেষ্টায় কি করে নিজেকে উন্নত করতে পারা যায় , তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করবার জন্য আপনার জন্ম, আপনার জীবন গতানুগতিক ভাবে কাটিয়ে দেবার জন্য নয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন, আমার কিছুই পাবার নেই, আমার কোনো কর্তব্য নেই, তথাপি আমি লোকশিক্ষার জন্য কাজ করে থাকি। প্রত্যেকের জীবনেই এই উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। 

সে যাই হোক, আমরা আগে নিজের উন্নতির চেষ্টা করি, তারপরে অন্যের কথা ভাবা যাবে। দেখুন, ১. রুটিনবাঁধা কাজের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখবেন না। সৃষ্টিধর্ম্মি কাজের জন্য কিছুটা সময় বেছে নিন। ২. বিষয়ের মধ্যে আনন্দ না খুঁজে বিষয়ীর মধ্যে ঢুকুন। ৩. প্রিয়কে ছেড়ে শ্রেয়কে ধরুন। ৪. নিজের চিন্তা-ভাবনাকে পাঁচিল দিয়ে আবদ্ধ করে রাখবেন না। ৫. সবশেষে  বৃহতের শরিক হবার চেষ্টা করুন। এই পাঁচটি নিয়ম আজ থেকেই জীবনের সঙ্গী হিসেবে বেছে নিন, আর জীবনটাকে পাল্টে ফেলুন । 

এবার গোটা পাঁচেক ধ্যান-ধারণার  কথা বলি যা আপনার চিন্তাকে আরো সমৃদ্ধ করে তুলতে পারে। আপনার জীবনে চিন্তাকে সমৃদ্ধ করবে, এই ধ্যানের বিষয়চিন্তন। চোখ দুটো  বন্ধ করে, মেরুদন্ড সোজা করে বজ্রাসনে, বা সিদ্ধাসনে  বসুন। এই প্রক্রিয়াগুলো ঘুম থেকে উঠবার আগেই বিছানায় বসে, আর রাতে শোবার  আগে বিছনায় বসে অভ্যাস করুন। 

১.  চোখ বুজলে আমরা অন্ধকার দেখি। কল্পনা করুন, আপনি এক অন্ধকার সুড়ঙ্গের  মধ্যে প্রবেশ করেছেন। ঘন অন্ধকার। সুড়ঙ্গের অপর প্রান্তে উজ্বল আলোর জগৎ ।  আপনি অন্ধকার সুড়ঙ্গ  থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে সেই আলোর রাজ্যে প্রবেশ করছেন।  শুধু দুই/পাঁচ  মিনিট ধরে এই কল্পনা  করুন। 

২.  দ্বিতীয়তঃ  আপনার কাল্পনিক ভবিষ্যৎ অর্থাৎ আপনি যা হতে চান, আপনি যা পেতে চান, সেই অবস্থায় নিজেকে কল্পনায় নিয়ে যান। ধরুন বাড়ি, গাড়ি চান,  তো আপনি এগুলোর মধ্যেই  নিজেকে দেখতে থাকুন। ধরুন আপনি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বা IAS অফিসার হতে চান,  বা আপনি একজন সমাজ সেবক হতে চান,  আপনি একজন মহান  সাধু হতে চান, তো  কল্পনায়, আপনি নিজেকে সেই সাধু/ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার/IAS অফিসার  বেশে দেখতে থাকুন।  দুই থেকে ৫ মিনিট এই কল্পনা করতে থাকুন। 

৩. মনে করুন, আপনি মারা গেছেন, আপনাকে সবাই মিলে স্মশানযাত্রার জন্য প্রস্তুত করছে । হঠাৎ আপনার মনে হলো, আপনি বেঁচে আছেন। এক অসীমশক্তি আপনাকে জাগিয়ে তুলেছে, আর তিনি আপনাকে আপনার অসম্পূর্ন মহৎ কাজগুলোকে করবার জন্য নির্দেশ করছেন । এই অসম্পূর্ন কাজগুলো, সেই অশরীরী শক্তির কাছ থেকে শুনে নিন।  হ্যাঁ এগুলো আপনি শুনতে পারবেন। আর জেগে উঠে সেই কাজগুলো যথাশীঘ্র ঠিকঠিক মতো করে ফেলবার জন্য প্রতিজ্ঞা করুন।

৪. আপনার মধ্যে যে ভালো ভালো গুণগুলো আছে, সেই গুন্গুলো নিয়ে দুই মিনিট চিন্তা করুন। আপনি জীবনে কি কি ভালো জিনিস পেয়েছেন, বা আপনি জীবনে কি কি ভালো কাজ করেছেন, সেগুলো একবার স্মৃতির পাতা থেকে তুলে এনে, দেখতে থাকুন।  

৫. আপনি মনে মনে ভাবুন, আপনি একজন অসীম  শক্তিশালীর ঈশ্বরের সন্তান। আপনি নির্ভিক, আপনি সৎ, আপনি নিত্য- শুদ্ধ, আত্মা।  আপনি পবিত্র দেহে-মনের  অধিকারী। আপনি যাকিছু চান, তা সবই আপনি পেয়ে গেছেন - আর খুশিতে আপনার মন ভোরে গেছে। 

প্রতিটি প্রক্রিয়া আপনি মাত্র দু থেকে পাঁচ  মিনিট করে, মোট দশ থেকে পঁচিশ  মিনিট অভ্যাস করুন। একবার সকালে ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে।  আবার রাতে শুতে যাবার আগে, সেই বিছানায় বজ্রাসনে বা সিদ্ধাসনে বসে, প্রতিদিন এই অভ্যাসগুলো করুন । শুধু কল্পনা করুন।  আর একটা কথা  জানবেন, যাকিছু আপনি কল্পনা করতে পারবেন, সেইমতো আপনার জীবনে প্রাপ্তি হবে। আপনি যা কিছু দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবেন, সেইমতো আপনার ভবিষ্যৎ জীবন হয়ে উঠেবে। এর কোনো অন্যথা হবে না। করেই দেখুন। ভাগ্যের চাকাটা ঘুরছে, আপনিও ঘুরিয়ে নিন। 

ওম শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।  হরি ওম।  

ছবি (শিব)      ওঁং        ছবি শশাঙ্ক
শশাঙ্ক শেখর শান্তিধাম 
আধ্যাত্মিক শান্তির খোঁজে 
উপনিষদ  পাঠচক্র
শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ  

 

    

  

       

    

    

 


৮.মনে আরো বেশি অনুভূতি সম্পন্ন অর্থাৎ আমাদের বুদ্ধির বৃদ্ধি করবো কিভাবে ?








    

Comments

Popular posts from this blog

নিত্যকথা

ঈশ্বর ও তাঁর উপলব্ধি

সত্যধর্ম্ম ও প্রেম