আত্মা কেন শরীরে থাকে ? ঈশ্বরকে দেখেছেন ? প্রার্থনায় কি কোনো কাজ হয় ?

 আত্মা কেন শরীরে থাকে ? 

আত্মা ভিন্ন শরীর নিষ্ক্রিয়। এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু এই প্রশ্ন কি কখনো আমাদের মনে জেগেছে, যে আত্মা কেন শরীরে থাকে ? এই ছিষ্টিছাড়া প্রশ্নের জবাব খুজবো আজ আমরা। 

এই প্রশ্নের জবাব পেতে গেলে, আমাদের আগে বুঝে নিতে হবে, দেহ কি আর আত্মাই বা কি ?

দেহবলা হয়ে থাকে কর্ম্ম থেকে দেহ সঞ্জাত। কর্ম্ম থেকেই নানান ধরনের দেহ উৎপন্ন হচ্ছে। তো কর্ম্ম থেকে যেমন শরীর ঠিক তেমনি কর্ম্মের জন্যই শরীর। শরীর ব্যাতিত কর্ম্ম সম্পাদন করা যায়  না।  আবার কর্ম্মহীন শরীর বলে কিছু হয় না।  অর্থাৎ শরীর ব্যাতিত কর্ম্ম করা যায় না, আবার শরীর না থাকলে ভোগাদি সম্পন্ন হতে পারে না। বলা হয়ে থাকে প্রারব্ধ কর্ম্মফল ভোগ করবার জন্য আমরা দেহ ধারণ করে থাকি। যতদিন ভোগ সম্পন্ন না হয়, ততদিন আমাদের শরীর  ধারণ করতে হয়।  ভোগ শেষ হয়ে গেলে, আমাদের শরীর ছেড়ে দিতে হয়। প্রারব্ধ কর্ম্মফল তিনটি একটা হচ্ছে জাতি। জাতি অর্থে মনুষ্য একটি জাতি, গরু একটা জাতি, কাক একটা জাতি, পাখি একটা জাতির সমষ্টি, পশু একটা জাতির সমষ্টি । এই জাতির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন হচ্ছে জন্ম, আবার সম্পর্কের বিচ্ছেদ হচ্ছে মৃত্যু। এই দুইয়ের মধ্যবর্তীকালকে বলা হয়, জীবন বা স্থিতিকাল বা আয়ু । সুখ বা দুঃখ আমাদের কর্ম্মফল জাত। এই ভোগ আমাদের বিনাবিচারে ভোগ করে যেতে হবে। এই  ভোগের নিস্পত্তি না হলে, আমাদের আবার দেহ ধারণ করতে হবে। এই দেহকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।  একটা হচ্ছে কর্ম্মদেহ, যার দ্বারা আমরা কর্ম্ম করে থাকি। একটা হচ্ছে ভোগদহ, যার দ্বারা আমরা শুধু ভোগ করতে পারি। আর একটা হচ্ছে মিশ্র দেহ যার দ্বারা আমরা ভোগ ও কর্ম্ম দুইই  করতে পারি। মনুষ্যদেহ মিশ্র দেহ।  এখানে কর্ম্ম ও ভোগ দুইই সম্পন্ন হতে পারে। তাই মনুষ্য দেহের এতো মহত্ত্ব, এতো কদর। 

বলা হয়ে থাকে ৮৪ লক্ষ যোনি ভ্রমনের পরে, মনুষ্য দেহ তৈরী হয়েছে। অর্থাৎ প্রকৃতির নিয়মে, শরীরের পরিবর্তন হতে হতে আজ এই দেহের আকৃতি ও গুন্ প্রাপ্ত হয়েছে।  

মায়ের গর্ভ থেকে সঞ্জাত এই স্থুল দেহ আসলে কর্ম্ম দেহ। এই দেহ না থাকলে কর্ম্ম করা যায় না। আবার এই কর্ম্মফল ভোগ করবার জন্য ভোগদেহের জন্ম হয়ে থাকে। ভোগ দেহ অর্থাৎ যে দেহে কেবল মাত্র ভোগ সম্পন্ন হতে পারে। যে দেহে কর্ম্মফল সঞ্চিত হয় না। কর্ম্ম দুই প্রকার আত্মকর্ম্ম আর অনাত্মকর্ম্ম। অনাত্মা কর্ম্ম অজ্ঞান অবস্থায় হয়ে থাকে। এবং অন্যতম কর্ম্ম আমাদের সংস্কারের জন্ম দিয়ে থাকে। সুখ-দুঃখ ইত্যাদি উদ্ভূত হয়ে থাকে এই অনাত্মকর্ম্ম থেকে। এই অনাত্মকর্ম্ম ফল ভোগ করবার জন্য, উর্দ্ধলোকে দেবদেহ, মনুষ্যলোকে মনুষ্য দেহ আর নিম্ন লোকে কীট-পতঙ্গ, পশু পক্ষীর দেহ গ্রহণ করতে হয়। এই ভোগ দেহে কর্ম্মফল সঞ্চিত হতে পারে না। কিন্তু কর্ম্মদেহ মনুষ্য ভিন্ন অন্য কোনো দেহ হতে পারে না। 

 আর আত্মকর্ম্ম জ্ঞানের উৎকর্ষতা বৃদ্ধির দ্বারা ঘটে থাকে। কর্ম্মের তীব্রতা অনুসারে কর্ম্মকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। চৈতন্যে শক্তির উন্মেষ না হলে, আত্মকর্ম্ম সম্পন্ন হতে পারে না। মনুষ্য  দেহে এই শক্তি কুলকুণ্ডলি শক্তি নামে  পরিচিত। যতক্ষন এই কুলকুণ্ডলিনী শক্তির উদ্বোধন না হচ্ছে, ততক্ষন মানুষ এই মানুষের আকার বিশিষ্ট  হয়েও প্রকৃতিতে সে পশুবৎ বিচরণ করে থাকে। আর কুলকুন্ডলিনী শক্তির উদ্বোধন হলে শিব-ভাবের  বিকাশ ঘটে থাকে। 

এই যে কুলকুন্ডলিনী শক্তির উদ্বোধন এটি সবার ক্ষেত্রে সমান ভাবে হয় না।  এমনকি বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে এই কুলকুণ্ডলিনী শক্তির জাগরণ একেবারেই হয় না। আবার যাদের মধ্যে হয়, তাদের ক্ষেত্রেও সমান ভাবে হয় না।  আবার যাদের সদগুরুর সাক্ষাৎ হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও আঁধারের বলবত্তার উপরে নির্ভর করে এই শক্তির বিকাশ ঘটে থাকে। সদগুরু আধার বুঝে এই শক্তির সঞ্চার করে থাকেন। না কম না বেশী। 

আপনি কি ঈশ্বরকে দেখেছেন ? (১) ভগবানের কাছে প্রার্থনায় কি কোনো কাজ হয় ?

না এ কোনো বিখ্যাত মহাত্মার প্রশ্ন নয়, নরেন্দ্রনাথ দত্ত বা বলরাম বসুর  প্রশ্ন নয়। যারা ভবিষ্যতে বিবেকানন্দ, বা ব্রহ্মানন্দ  হয়েছিলেন।  এ কোনো বিখ্যাত লোকের গল্প নয়, অতি সাধারণ পিতা-পুত্রের গল্প।  বাবার বয়স ৭০-এর আসে পাশে।  এখন তাঁর দেখতে গেলে দুটো জিনিসের দরকার পরে, একটা হচ্ছে পর্যাপ্ত আলো  আর একটা হচ্ছে চশমা। তা না হলে বাবা  আর এখন ভালো করে দেখতে পায়  না। তাই এখন পড়াশুনা করতে বা  লেখালেখি করতে গেলে এই দুটো জিনিসেরই দরকার। এর পরে হয়তো চলাফেরা করতে লাঠিও লাগবে। সে যাইহোক,  ছেলে উচ্চ শিক্ষিত, বোম্বাইতে চাকুরী করে।  বাইরে থাকে। বাবা অথ্যাত্মিক বিষয়ে একটু আধটু লেখা লেখি করে।  তো বৃদ্ধ বয়সে একসময় সে ছেলের অভাব বোধ  করতে লাগলো। নিজের অজ্ঞাতসারেই সে তারকেশ্বরের শিব ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করে বসে, "হে ঠাকুর ছেলেকে  কাছে এনে দাও। বাড়ির কাছে  রোজগারের  সংস্থান করে দাও।" যেমন আর পাঁচজন সংসারী স্বভাব অভাবী মানুষ করে থেকে।  তো বাবা  তারকেশ্বরের কৃপাতেই হোক, বা ছেলের যোগ্যতার জোরেই হোক, একসময় ছেলে বাড়ির কাছে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে চলে এলো। বাবা ছেলেকে বললেন, চলো তারকেশ্বরে গিয়ে শিবঠাকুরের পুজো দিয়ে আসি। ছেলে নিঁম  রাজি হলো, কিন্তু বাবার কাছে সে একটা মোক্ষম প্রশ্ন করে বসলো। বাবা তুমি কি কখনো ঈশ্বরকে দেখেছো ? আর তুমি যা বলো বা লেখো  তা কি সত্যি ? ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলে কি সমস্যার সমাধান হয় ? আমি নিজে যদি চেষ্টা না করতাম তবে কি আমি নতুন চাকরিতে যোগ দিতে পারতাম ? তো পুত্র পিতাকে দুটো প্রশ্নের সম্মুখীন করে দিলো, ১. ঈশ্বরকে কি দেখা যায় ? ২. ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনায় কি আদৌ কোনো কাজ হতে পারে ? 

বাবা বোবা হয়ে গেলেন। মনে মনে ভাবতে লাগলেন, সত্যিই তো আমি কখনো ঈশ্বরকে না সাক্ষাৎ দেখেছি, না কাউকে কখনো দেখাতে পারি।  এমনকি ঈশ্বর সম্পর্কে আমি কতুটুকুই বা জানি, যে ঈশ্বরের মহিমা প্রচার করে বেড়াই ? ঈশ্বর যে  আছেন, এই কথা বলার অধিকার কি আমার আছে ? যদি ঈশ্বর বলে কিছু থাকেন, তবে তাকে দর্শন করতে হবে।  যদি আত্মা বলে কিছু থাকে, তা উপলব্ধি করতে হবে। নতুবা এই ঈশ্বরে বিশ্বাস না করাই  ভালো। ভন্ড হওয়ার থেকে নাস্তিক হওয়া অনেক ভালো । তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্ক মানুজন বলে থাকেন, ধর্ম্ম, দর্শন, ঈশ্বরের অনুসন্ধান সবই নিষ্ফল।  কিছু বুদ্ধিজীবী মানুষ বলে থাকেন, ধর্ম্ম-দর্শন কিছু নীতিকথা মাত্র।  এর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তবে এইসব নীতিকথার কিছু  উপকারিতা আছে।  এই নীতিকথা মানুষকে সুশৃঙ্খল সমাজবদ্ধ রাখতে সাহায্য করে থাকে। জগতের মঙ্গলসাধনে এই শাস্ত্রকথা  প্রেরণাশক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। এর থেকে বেশি কিছু এই ধর্ম্মের মধ্যে নেই। এদের এই কথাগুলোকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারন, এরা  ধর্ম্ম বলতে কেবল কিছু অসংলগ্ন অন্তঃসারশূন্য প্রলাপবাক্য শুনেছে।  আমাদের ধর্ম্মগুরুগন  তাদের এই কথাতেই  বিশ্বাস রাখতে বলেছে। বলেছেন, বিশ্বাসে  মেলায়  বস্তু তর্কে বহুদূর। আর আমরা জানি,  যা নিষেধ  করা হয়, স্বপবুদ্ধি মানুষেরা  সেই বিষয়ে আরো বেশি আগ্রহী হয়ে উঠে।  আমরা আরো বেশি প্রশ্ন করতে চাই  তর্ক করতে চাই। আসলে মানুষ সত্য চায়. মানুষ সত্যকে অনুভব করতে চায়। কিন্তু ধর্ম্মগুরুর  মুখে অবাস্তব অন্তঃসারশূন্য  শব্দসমষ্টি তাকে কখনোই তৃপ্ত করতে পারে না। 

বেদ বলছে, 
অহং দেবো ন চান্যোঽস্মি ব্রহ্মৈবাষ্মিন ন শোকভাক
সাচ্চিদানন্দরূপঽস্মি নিত্য মুক্ত স্বভাববান।  

আমি দেহ নোই, আমার জন্ম-মৃত্যু-জরা নেই, আমি নিত্য-শুদ্ধ আত্মা। আমার মধ্যে আছে দেবত্ত্ব, আমার মধ্যে আছে ব্রহ্ম, আমিই সেই সচ্চিদানন্দ  স্বরূপ স্বয়ং ব্রহ্ম ।
আমার মাঝে মধ্যে মনে হয়, মানুষ  যদি নিজেকে  পড়তে পারতো, তবে খুব মজা হতো  । এমন কোনো অণুবীক্ষণ যন্ত্র যদি আবিষ্কার হতো , যাতে মানুষ তার নিজের  স্বরূপ দেখতে পারতো, তাহলে মানুষের ভুল ভেঙে যেতো  । আসলে এই অণুবীক্ষণ যন্ত্র ভগবান আমাদেরই মধ্যে রেখে দিয়েছেন, কিন্তু সেই যন্ত্র এতটাই কালিমালিপ্ত, এতটাই অসচ্ছ যাতে আমি আমাকে দেখতে পারি না। আর সেই যন্ত্রটি  হচ্ছে আমাদের মন। যাকে  বহু জন্ম ধরে উপেক্ষা করা হয়েছে ।  আমাদের মধ্যেই আছে অতিচেতন মন। এই মনের মলিনতা দূর করতে পারলেই, মনকে স্থির বুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত করতে পারলেই,  মনের আয়নায় প্রতিফলিত হতে পারে, সেই ছবি যা ছেলে দেখতে পাচ্ছে না, পিতা দেখতে পাচ্ছে। 
আমাদের এমনটা ভাবা উচিত নয়, যে আমরা সবাই শুদ্ধ ইন্দ্রিয়ের অধিকারী। আর এই ইন্দ্রিয় দ্বারা যে উপলব্ধি আমাদের হচ্ছে, তা সব সত্য ও অভ্রান্ত। বিচারের দ্বারা বুঝে নিতে হয়, যা কিছু দেখছি, যা কিছু শুনছি, তার মধ্যে কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যে, কোনটা  ক্ষনিকের কোনটা দীর্ঘ-স্থায়ী , বা চিরস্থায়ী। টেলিভিশনের কেন্দ্র থেকে যে তরঙ্গ ভেসে আসছে, তা আমরা খালি চোখে দেখতে পারি না। এর জন্য এমন একটা যন্ত্র দরকার যা রিসেপ্টর ও  এক্সপোজার-এর কাজ করতে পারে। তেমনি ঈশ্বর থেকে যে সূক্ষ্ম তরঙ্গরাজি ভেসে আসছে, আমাদের স্থুল  মন তা ধরতে পারে না। কিন্তু এই মন যখন মলিনতাশূন্য হয়ে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হবে, তখন আমাদের কাছে বাহ্যজগতের ভিতরেই  যে অন্তর্জগৎ আছে, তার আবিষ্কার করতে পারবো। কেবল শোনা কথা, কেবল বইপড়া বিদ্যা, আমাদের সেই অন্তর্জগতের সন্ধান দিতে পারে না। তথাকথিত বিষয়জ্ঞান, তথ্য-ভিত্তিক জ্ঞান আমাদের অধ্যাত্ম জ্ঞানের পথে যেতে সাহায্য করতে পারে না। তবে এগুলোর যে দরকার নেই তা নয়, বাস্তব জীবনে এর অবশ্য়ই  দরকার আছে, কিন্তু যিনি যিনি সূক্ষ্ম জগতের সন্ধান পেতে চান, তাকে আরো অনেক দূর অগ্রসর হতে হবে। 

মানুষ দেখতে তো একই রকম, কিন্তু কেউ চিকিৎসক, কেউ লেখক, কেউ ভোগী কেউ যোগী, কেউ প্রচারক কেউ সাধক। দেখুন অধ্যাত্ম জীবন কেবল বক্তৃতার জন্য নয়, অধ্যাত্ম জীবন সত্যকে অনুভব করবার জন্য দরকার  নিরন্তর ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। এতে করে যেমন মন-ইন্দ্রিয় ইত্যাদির সংযম দরকার, তেমনি মনের যে দিব্য-দৃষ্টিশক্তি আছে, তার উন্মোচন বা প্রকাশ ঘটাতে হবে। মহাপুরুষগন যে সত্যের পথ আমাদের দেখিয়েছেন, তাকে অনুসরণ করতে হবে। আমরা যে-সত্যকে কখনও ধরতে পারি না, তা আমাদের কাছে মূল্যহীন। আর মূল্যহীন অসার বস্তু আমাদের কাছে অপ্রয়োজনীয়। 

কোনো সাধনক্রিয়া ছাড়াই আমরা সেই সত্যকে ধরতে পারবো, এমন ভাবাটা মূর্খামি। অধ্যাত্ম জীবন ও বাস্তব জীবনের মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। বাস্তব জীবনে ঈশ্বরের ছোঁয়া কেবল ঈশ্বর কৃপাতেই হতে পারে, তার আগে নয়।  আবার  অধ্যাত্ম  জীবন শুরু করেই আধ্যাত্মিক অনুভূতি পাওয়া শুরু হয়ে  যাবে, এমন ভাবারও  কোনো কারন নেই। অধ্যাত্ম  জীবনের প্রথম দিকে চলে ঝাড়াই-বাছাই-সাফাইয়ের কাজ। মনের মধ্যে যে জন্ম জন্মান্তরের সংস্কার জমে আছে, তাকে পরিষ্কার করতেই অনেক সময় চলে যায়। এর পরে নতুন সংস্কারের জন্ম দিতে আরো অনেক সময় লাগে। আমাদের মনের মধ্যে যে অহেতুক ও অশুভ চিন্তার স্রোত চলছে, তা দূর করা সহজ-সাধ্য নয়। যতদিন পর্যন্ত মনের মধ্যে কামনার উদ্রেগ হতে থাকবে, ততদিন আমাদের কাজ হবে, সেই কামনা-বাসনার গতিকে প্রতিরোধ করা। আর যতদিন আমরা ঈশ্বরের কৃপা অনুভব করতে না পারছি, ততদিন এই প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বাস্তব জীবনে উন্নতি করতে গেলে, যেমন পুরুষকারের প্রয়োগ করতে হয়, তেমনি অধ্যাত্ম  জীবনে উন্নতি করতে গেলে  পুরুষকারের প্রয়োজন আরো বেশী ।

ঈশ্বর দর্শন তখনি সম্ভব হতে পারে, যখন আমরা খুব শক্তিশালী, স্বাস্থবান, বীর্যবান, পবিত্র শরীরের অধিকারী হতে পারবো। কেননা, দর্শনের যে প্রতিক্রিয়া তা সহ্য করবার ক্ষমতা আগে অৰ্জন করতে হবে। আমরা যখন সম্পূর্ণভাবে শুদ্ধ শরীর ও মনের অধিকারী হতে পারবো, মনের মধ্যে যখন কামের লেশমাত্র থাকবে না, কেবল ভগবৎ দর্শনের জন্য, মন উদ্বেল হবে, তখন আমাদের মধ্যে একটা অনুভবের জাগরণ  হবে, তা হচ্ছে, আমরা কেউ শরীর  নোই, মন নোই, আমরা কেউ পুরুষ নোই, নারী নোই। আমরা এসব থেকে আলাদা, স্বতন্ত্র সত্তা যাঁকে  বলে আত্মা। এই দর্শন আমাদের সাকারেও হতে পারে, আবার নিরাকারের অনুভূতিও হতে পারে। নিরাকারের অনুভূতি সর্বোচ্চ অনুভূতি। সাকারের দর্শন অদ্বৈতে পৌঁছনোর প্রথম ধাপ। সাকারের দর্শন অনন্ত পূর্ণের অংশের দর্শন মাত্র। আমাদের সমস্ত ইন্দ্রিয়সকল, আমাদের মন যখন  নির্বিকল্প সমাধিতে স্থির হবে, তখন প্রকৃত দর্শন সম্ভব।  তার আগে নয়। 

চেতন সত্ত্বা সর্বত্র।  বাতাস সর্বত্র। তবে ফ্যানের সুইচ দিলে, নৌকায় পাল তুলে দিলে, ঝড় বইতে শুরু হলে,  বাতাসের প্রবাহ আমাদের প্রতক্ষ্য অনুভূতিতে আসে। ঠিক তেমনি, সদগুরুর সান্নিধ্যে এলে, সাধনার উচ্চ অবস্থায় পৌঁছতে পারলে, আমাদের মধ্যে ঈশ্বরীয় শক্তির প্রবাহ অনুভব হতে শুরু করে। 

দর্শন হলে কিভাবে বুঝবো ? 
দর্শন হলে, নিজের মধ্যেই তার প্রকাশ ঘটে। শরীরে ব্যাথা হলে, নিজেই তা উপলব্ধি করা যায়।  এর জন্য বাইরের জ্ঞানের দরকার পরে না। কাউকে প্রশ্ন করতে হয় না। আসলে এই সময় ঈশ্বর আমাদের কাছে সন্দেহাতীত হয়। ঈশ্বর সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন, সন্দেহ আমাদের মধ্যে থাকে না। আধ্যাত্মিক অনুভূতিগুলোও  অনেক স্পষ্ট হয়ে ওঠে,  মনের মধ্যে একটা শান্তির বাতাবরণ তৈরী হয় , জীবন সম্পর্কে একটা সাফল্যবোধের জন্ম হয়। বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করবার ক্ষমতা বেড়ে যায়।  আমাদের ধীশক্তি, উপস্থিত বুদ্ধি বেড়ে যায়।  কখনো অনাহত ধ্বনি, ভ্রমের গুঞ্জন, ঘন্টাধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়।  সবচেয়ে বড়ো  কথা হচ্ছে, এইসময় বেশ বোঝা যায়, কোনো একটা শক্তিপ্রবাহ আমার সঙ্গে সঙ্গে  চলছে। আমি যেন তাঁর ছায়া।  সর্বদা তিনি আমাকে রক্ষা করছেন। মুখ দিয়ে কথা বলছেন, অনেক সময় মুখের কথা আটকে দিচ্ছেন। এই অনুভূতি কেবল মাত্র সাধকের নিজস্ব। এই অনুভূতির কথা কেবল বোঝা যায়, কাউকে বোঝানো যায় না। হ্যাঁ একেবারেই বোঝানো যায় না তা নয়, তবে তার জন্য যেমন অধিক শক্তিসঞ্চয়ের প্রয়োজন হয়, তেমনি এই অভিজ্ঞতা অন্যকে ব্যক্ত করলে, অনুভূতির মাত্রা কমে যেতে পারে।  ঠাকুর রামকৃষ্ণের কাছে, এই অলৌকিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে, অন্ধকারে ঠাকুরকে আলোর রোশনাই জ্বেলে পথ দেখিয়েছিলেন, এক সাধক ।  এর পর থেকে নাকি, তার সে ক্ষমতা ঠাকুর রামকৃষ্ণ কেড়ে নেন।  কেড়ে নেন কিনা জানি না, তবে অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন শুধু ক্ষমতার অপব্যবহার নয়, এসব করলে ক্ষমতার লোপ পায় ।  সাধন এক ধাক্কায় অনেকটাই নিচে নেবে যান। অতি উচ্চ পর্য্যের সাধক এই অলৌকিক ক্ষমতার দ্বারা মানুষের উপকার সাধন করে থাকেন।  এই শক্তি কেবলমাত্র ঈশ্বর কৃপাতেই হয়ে থাকে।   

অন্ধবিশ্বাস  নয়, ধর্ম্ম হলো অনুভূতি। আর এই অনুভূতিকে বারবার যাচাই করে নিতে হয়। এই অনুভূতি যেন শাস্ত্র সম্মত হয়। সবসময় যুক্তি বিচারের দ্বারা আত্মসমীক্ষা করতে হবে। তো প্রথমে অনুভূতি, তার পরে শাস্ত্র অনুযায়ী অনুভূতি, সবশেষে যুক্তি দিয়ে অনুভতিগুলোকে বিচার করতে হবে। নিজেকে চেতন রাখতে হবে। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই সত্যকে যেমন যাচাই করে নিতে হয়।  তেমনি অধ্যাত্ম অনুভূতিকেও যাচাই করে নিতে হয়। আমরা যেন স্নায়ুরোগে বা মস্তিস্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে না পড়ি। প্রকৃত সাক্ষাৎ আমাদের জীবনে পরিবর্তন আনে। যথার্থ  আত্মসমর্পনের জন্য মনকে প্রস্তুর করে তোলে। 

আমাদের যে ইন্দ্রিয় তার প্রভু হচ্ছে, আমাদের মন। আর  মনের  প্রভু হচ্ছে চেতনা।  এই চেতনার অনেকগুলো স্তর আছে। একটা স্তরে আমার জড় বস্তু সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারি। আমরা যখন চিন্তা করি, তখন সাময়িক ভাবে আমরা মনো জগতে বিচরণ করে থাকি। মন ও তার শক্তি সম্পর্কে আমরা  এখনো অনেক কিছুই জানি না। আমরা যখন স্বপ্ন দেখি, তখনও আমরা মনের জগতে  বিচরণ করে থাকি। আমাদের যেমন প্রত্যেকের  একটি করে আলাদা মন আছে, তেমন সমগ্র মনের সমষ্টিকে বলা হয় সমষ্টি  মন। এই মনের অন্দরে যে অসীম শক্তি নিহিত আছে, তার সামান্যই আমরা ব্যবহার করতে পারি। জড় জগতের শক্তিকে আমরা যেমন প্রয়োগ করতে পারি, তেমনি আমরা প্রাণশক্তির সাহায্যে আমাদের  মনঃশক্তিকে নানাভাবে প্রয়োগ করতে পারি। মানুষের মধ্যে এই প্রয়োগ ক্ষমতার মধ্যে তারতম্য থাকে। তবে প্রাণশক্তি যেমন সবার মধ্যে কাজ করে, তেমনি মনঃশক্তিও সবার মধ্যেই কাজ করে  থাকে। এই শক্তি বহির্মুখী হলে, আমরা জাগতিক সম্পদ লাভ করে থাকি। এই একই শক্তির সাহায্যে আমরা আধ্যাত্মিক জগতের বস্তুও  লাভ করতে পারি। আর এই শক্তি আমরা সাধন ক্রিয়া বা যোগক্রিয়ার সাহায্যে বর্দ্ধিত করতে পারি। কিন্তু যোগক্রিয়ার সাহায্যে এই শক্তি বৃদ্ধি করে যদি একে  নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তবে আমাদের মধ্যে কিঁছু অস্বাভাবিক শক্তির বিকাশ ঘটবে, এমনকি  তার প্রয়োগবিধি না জানার ফলে, এই শক্তি আমাদেরকে বিপথে চালিত করতে পারে। এই জন্য বলা হয়ে থাকে যোগক্রিয়া গুরুর সান্নিধ্যে বসেই  করা উচিত। না হলে, এই যোগশক্তি আমাদের আরো  অহংবোধ বাড়িয়ে দিতে পারে। 

যোগক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা প্রথমে অনুভব করি, আমাদের নিজ-আত্মা এবং অন্য সকলের আত্মা এক অখন্ড চৈতন্যের বিভিন্ন অভিব্যক্তি মাত্র।  যখন সবার মধ্যে সেই একই পরমাত্মার স্ফূরণ দেখি, তখন তাদের সবাইকেই অতি আপনজন বলে মনে করি। তখন প্রেম-ভালোবাসা ইত্যাদি দ্বারা নিজেকে পূর্ন  করে তুলতে পারি। আধ্যাত্মিক জীবনের এই যে অভিজ্ঞতা এতে জড়জগতে  নির্ভয়ে  বিচরণ করা যায়। বিপদের সঙ্কেত আগে থেকেই অনুভব করা  যায়, অনেক সময় বিপদকে এড়িয়েও  যাওয়া যায়। অন্যদিকে দিব্য চেতন প্রবাহের সাথে নিজেকে একাত্ম করতে পেরে, নিজেকে দিব্যচৈতন্য স্বরূপে স্থির  করতে পারি। 

এখন কথা হচ্ছে, ঈশ্বরের কাছে  মানত বা প্রার্থনা কিভাবে কাজ করে ? 

ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলছেন, ভগবানে দৃঢ় বিশ্বাস অলৌকিক কাজ করতে পারে। বিশ্বাসই জীবন বিশ্বাসের অভাব মৃত্যু। বাইবেল বলছে, জিজ্ঞাসা করো উত্তর পাবে, খুঁজে দেখ পেয়ে যাবে, দরজায় আঘাত করো দরজা খুলে যাবে। আমরা যেমন ডাক্তারের কাছে, শরীরের অসুবিধাগুলোর কথা জানাই, আমরা যেমন মনঃচিকিৎসকের কাছে মনের অসুবিধার কথা খুলে বলি, আমরা যেমন বন্ধুর কাছে মনের কথা বলি তেমনি প্রার্থনা হচ্ছে ভগবানের কাছে মনের কথা খুলে বলা। ঈশ্বরের কাছে একতরফা বাক্যালাপ হলো প্রার্থনা। 
আমরা কেউ বুঝি আর না বুঝি, আমরা কেউ জানি আর না জানি, জগতের মধ্যে এমন  একটা শক্তি আছে, যা বাক্য দিয়ে প্রকাশ করা যায় না, যার রহস্য আজও কেউ উন্মোচন করতে পারেনি। ভগবান আছেন কি নেই, তা বিজ্ঞান দিয়ে প্রমান করা যাবে না। এর জন্য চাই ব্রহ্মজ্ঞান। বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু ভগবানের শক্তির কোন সীমা  নেই, এই শক্তি অনন্ত। এই শক্তি চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ, ঋতুচক্র , পরিবেশ ইত্যাদিকে পরিচালনা করে চলেছে। এই শক্তিই বায়ুর মধ্যে অক্সিজেন, সূর্য্যের মধ্যে আলোকশক্তি, অগ্নির মধ্যে দাহিকা শক্তি, জলের মধ্যে আদ্রতা, সরবরাহ করে চলেছে, একেই বলে ঈশ্বর। এই শক্তি দ্বারাই প্রত্যেক জীবের জীবন চক্র ঘুরছে।  ভাবতে অবাক লাগে, জগতের কোথাও একবিন্দু জায়গা নেই যেখানে এই শক্তি ক্রিয়া করে না।  এমন কোনো জীব জগতে আসে না, যে এই শক্তির বাইরে অবস্থান করতে পারে। নাস্তিক বলুন, আস্তিক বলুন, জ্ঞানী বলুন, অজ্ঞানী বলুন, ভালো বলুন, মন্দ বলুন সবার মধ্যে একই রক্ত, একই প্রাণশক্তি, একই মনঃশক্তি, সঞ্চালিত হচ্ছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, এতসব একত্ত্ব সত্ত্বেও কেউ শান্তিতে আছে, কেউ অশান্তিতে ভুগছে, কেউ রোগগ্রস্থ, কেউ নীরোগ। একে  কেউ বলেন, কর্মফল, কেউ বলেন ভগবানের কৃপা। 

জড়জগৎ দুঃখে ভরা, আর ভগবানের জগৎ শান্তি ও সন্তোষের আধার। তো যারা জড় জগতের বাসিন্দা তারা সুখে দুঃখে নিরন্তর চঞ্চল হয়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। আর যারা চেতন জগতের বাসিন্দা, তারা কখনো আনন্দের উৎস থেকে দূরে থাকেন না। তারা শান্ত, ধীর স্থির।  সাধুসন্তগণ বলে থাকেন, কাতর প্রার্থনা দ্বারা ভগবানের অনুগ্রহ লাভ করা যায়।  প্রার্থনা দ্বারা আমাদের মনের মধ্যে যে মন্দ প্রবৃত্তি আছে, তাকে রোধ করা যায়। ভগবানের আশীর্বাদ কোনো কল্পনা নয়, চরম সত্যলব্ধ অভিজ্ঞতা। এতে কোনো জাতি নেই, বর্ণ নেই, ধর্ম্ম নেই - ভগবানের করুণাসিক্ত এই অভিজ্ঞতা আপামর সবাই লাভ করতে পারে। জড় জগতে নিয়ম বহির্ভূত কিছু হয় না। কিন্তু ভগবানের জগতে নিয়মের কোনো বালাই নেই, এখানে ভগবানের দয়া, করুনাই একমাত্র বিচার্য। ঋষি অরবিন্দ বলছেন, নিষ্ঠাভরে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করলে,  ভগবানের করুনা অবশ্য়ই পাওয়া যাবে। তবে ধৈর্য্যধরে অপেক্ষা করতে হবে, আর নিরন্তর অধ্যাত্ম সাধনায় প্রবৃত্ত থাকতে হবে। প্রার্থনায় ফল পেতে গেলে, অহংকে ত্যাগ করতে হবে, ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখতে হবে, পরিপূর্ন ভাবে ঈশ্বরে নির্ভরতা আনতে হবে।  কিন্তু তার মানে এই নয়, যে অলস হয়ে, কেবল বসে থেকে ঈশ্বরের করুনা  প্রাপ্ত হওয়া যায়। বিবেকানন্দ বলছেন,  তাঁকে পাবার জন্য, তার করুনা, দয়া পাবার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করে যেতে হবে। ধৈর্য্য ধরে, অবিরত প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে সাগ্রহে অপেক্ষা করা  হলো, নৌকোয় পাল তুলে দেওয়া। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমদ্ভগবৎ গীতাতে অর্জ্জুনকে বলছেন :  

স তয়া শ্রদ্ধয়া যুক্তঃ তস্যঃ-আরাধনম ঈহতে
লভতে চ ততঃ কামান ময়ৈব বিহিতান হি  তান্। (৭/২২)

সেই দেব-উপাসক ভক্ত আমার বিধানমতো শ্রদ্ধাযুক্ত হয়ে সেই দেবমূর্ত্তির অর্চনা করে থাকেন এবং সেই দেবতাদের নিকট হতে যে সকল কাময়বস্তু লাভ করে থাকেন তাও আমার দ্বারাই  বিহিত হয়। 

এখন কথা হচ্ছে, সবার প্রার্থনাই কি ভগবান পূরণ করে থাকেন ?  দেখুন পরীক্ষায় ভালো করতে হলে, আমরা কি করি, নিজে পরিশ্রম করি, পরীক্ষার বিষয়ের প্রতি অধিক  ধ্যান দেই, পরীক্ষার বিষয় বহির্ভূত বই তখন আমরা ত্যাগ করি, আবার যোগ্য শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে থেকে তার কথামতো কাজ করি। তেমনি ঈশ্বরের প্রার্থনায় ভালো ফল পেতে গেলে, আগে নিজেকে বিশ্লেষণ করতে হয়, আগে দেখে নেওয়া দরকার আমায় যা চাইছি, আমি তার যোগ্য কি না। যদি যোগ্য না হই , তবে আমার উচিত হবে, আগে সেই যোগ্যতা অৰ্জন করা। এইবার লক্ষে স্থির হয়ে, ভগবানের কাছে প্রার্থনা করা। দেখুন কর্ম্ম ও দৈব যখন একত্রিত হয়, তখন কর্ম্ম প্রত্যাশিত ফল প্রদান করে থাকে। আপনি যদি বিদ্যা লাভ করতে চান, তবে, সেইবিদ্যার দেবী সরস্বতী অর্থাৎ আপনি যে গুনের  জন্য প্রার্থনা করছেন, তার একটা ঘনীভূত মূর্তির কথা কল্পনা করতে থাকুন। এই গুনের ঘনীভূত মূর্তিকে আপনি আপনার হৃদয়ে স্থাপন করুন। তখন দেখবেন, আপনার হৃদয়ের ভিতর থেকেই আপনার কাছে নির্দেশ আসবে, এখন আপনার কি করতে হবে। সেই মতো আপনি কর্ম্মের মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত করুন।  ফলাফলের কথা চিন্তা না করে, বিবেকের নির্দেশে কাজ করে চলুন।  ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করুন।  আর নিরন্তর প্রার্থনারুপ কর্ম্ম করে যান।  এতে করে, অচিরেই আপনার আকাঙ্ক্ষিত ফল এসে যাবে। আর ফল পেলে, আপনি আপনার ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানান। কৃতজ্ঞতা স্বীকার করুন। ভাববেন না শুধু আপনার পরিশ্রম, আপনার পরিকল্পনা আপনাকে সাফল্য এনে দিয়েছে, দৈব কৃপা না হলে মানুষের  কোনো কাজই সাফল্যমণ্ডিত হতে পারে না। 

যারা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে চান, তারা নিরন্তর ইষ্টনামের জপ, তাদের মনমতো দেবদীর পুজো, ধ্যান, করুন। যে যার পবিত্র ধর্ম গ্রন্থ পাঠ  করুন। গুরুদেবের কাছে  থেকে ঈশ্বরকথা শুনুন। ঈশ্বরকে উপলক্ষে করে কিছু ব্রত পালন করুন। ধরুন একটা দিন মৌন থাকুন, অথবা একটা দিন না খেয়ে থাকুন। অর্থাৎ যাকিছু করুন, তার মধ্যে যেন সেই ঈশ্বরের চিন্তন থাকে, ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে করুন। ঈশ্বরের কাছে কৃপা ভিক্ষা করুন। নিয়মিত ভাবে এই কাজ তা সে সপ্তাহে একদিন, বা মাসে একদিন করুন, না পারলে, তিন মাসে একবার করুন।  দেখবেন, এই সহজ ক্রিয়ার মাধ্যমে আপনার মন শুদ্ধ হতে শুরু করেছে। তবে এও ঠিক এই কাজ আপনাকে দীর্ঘদিন করতে হবে, তবে দেখবেন, আপনার মধ্যে একটা আদত বা অভ্যাস তৈরী হয়ে গেছে। তখন কাজটা সহজ মনে হবে, আর  উপল্বদ্ধির মাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি হতে থাকবে।
নিজেকে ঈশ্বরের কাছে উন্মুক্ত করে দিন, নিজেকে ঈশ্বরের কাছে মেলে ধরুন।  আপনার ভালো মন্দ সবকিছু ঈশ্বরের কাছে নিবেদন করুন। একটা জিনিস জানবেন, আপনি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করবেন, ভালো ফল পাবার জন্য আর  সারাদিন দুষ্কর্ম্মে লিপ্ত  থাকবেন, তবে আপনার কাছে ভগবানও  দুঃখ-কষ্টের বোঝা নিয়েই   আসবেন । একটি জিনিস জানবেন, আমরা দেহধারন করেছি, সঞ্চিত কর্ম্মফলের বোঝা নিয়ে। ধীরে ধীরে রাত্রির অবসান হবে, অন্ধকার কেটে যাবে, নতুন সূর্য্যের উদয় হবে। কুয়াশা কেটে যাবে, নিয়মিত প্রার্থনা আপনাকে কুকৰ্ম্ম থেকে দূরে নিয়ে যাবে।  আর কুকৰ্ম্ম-এর  কুফল থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে। 
             
কিভাবে প্রার্থনা কাজ করে ? এই কথাগুলো আগে একবার আপনাদের বলেছিলাম, আজ আবার সেই কথা গুলোর পুনরাবৃত্তি করছি।

আপনি যদি কিছুটা সময়, নির্জনে-নিভৃতে ধ্যানমগ্ন হয়ে প্রার্থনা করেন, তবে আপনার আত্মা, মন এবং শরীর আপনার সেই প্রার্থনা অনুযায়ী স্পন্দিত হতে থাকবে। এমন নয়, যে আপনি একবার একদিন প্রার্থনা করলেন, আর অমনি আপনার মধ্যে অলৌকিক কিছু ঘটে গেলো, ব্যাপারটা এমন নয়। কিন্তু আপনার নিরন্তর ঐকান্তিক প্রার্থনা, আপনার শরীরের মধ্যে যে স্পন্দন তুলবে, তা আপনাকে একটা একতানতায় পৌঁছে দেবে। দেখুন, ঢাক, ঢোল, বাঁশি, কাঁসর-রূপ জীবনের উপাদান সব সময় আপনার শরীরকে আন্দোলিত করছে। সেই বাজনার মধ্যে কোনো সাযুজ্য না থাকার জন্য, আপনার মধ্যে বিরক্তি উৎপাদন হচ্ছে, কিন্তু যখন এর মধ্যে একটা একতানতা দেখা দেবে, তখন সেই একই ধ্বনি, মধুর সুরে পরিণত হতে পারে। প্রার্থনা এই কাজটিই করে থাকে। অর্থাৎ শরীর-মন-আত্মার মধ্যে একটা একমুখী গতি, আপনার জীবনধারাকে আনন্দ ধারায় বইয়ে দিতে পারে। প্রার্থনার মাধ্যমে আপনার মধ্যে আত্মবিশ্বাস, নিজের পায়ে দাঁড়াবার শক্তি উজ্জীবিত হবে। দেখুন, ভগবান বলছেন, তিনি কিছু করেন না, তার কিছুই করবার নেই। কিন্তু তাঁর শক্তিতেই আমরা সবাই শক্তিমান। যুদ্ধ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ করবেন না, অর্জ্জুনকেই করতে হবে। তিনি আপনাকে দিয়েই সবকিছু করিয়ে থাকেন। আবার ও সত্যি, যে আপনার কোনো শক্তি নেই কিছু করবার। ঈশ্বরের শক্তিই আপনার সমস্ত কাজ, এমনকি চিন্তা করবার শক্তি যোগাচ্ছে । তাই প্রার্থনা হচ্ছে এই শক্তির জাগরণ । অর্থাৎ আপনার ভিতরে যে ঈশ্বরীয় শক্তি আছে, তাকে স্মরণ করা, তাকে জাগিয়ে তোলা। একটা জিনিস জানবেন, বাইরে থেকে কোনো শক্তি এসে, আপনার সাহায্য করবে, এমন ভাবার কোনো কারন নেই। আপনি যখন, পরামর্শের জন্য, আপনি যখন প্রেম-ভালোবাসার জন্য, আপনি যখন স্ব-নির্ভরতার জন্য, আত্মশক্তির কাছে প্রার্থনা করবেন, অর্থাৎ যার প্রতি আপনি ধ্যান দেবেন, সেই মুহূর্তেই সেই শক্তি আপনার ভিতরে জাগ্রত হতে শুরু করবে। প্রার্থনা হচ্ছে, মনের ধ্বনি, মনের ডাক। এটি তখনি কার্যকরী হয়ে উঠতে পারে, যখন আপনি আপনার আত্মশক্তি ও ঐশ্বরিক শক্তিকে একত্রিত করতে পারবেন। বারবার শুভ প্রার্থনা, আপনার ভিতরে শুভ শক্তিকে কার্যকরী রূপ দিতে উদগ্রীব হবে। শুভ কামনা আপনার যত বাড়তে থাকবে, অশুভ কামনা আপনার কাছ থেকে তত দূরে চলে যেতে থাকবে। দেখুন, আমরা জন্ম-জন্মান্তর থেকে অনেক দুঃখের স্বীকার হয়েছি। আর এর ফলে আমাদের মধ্যে রাগ, দ্বেষ, হিংসা জমাট বেঁধে আছে। এগুলোকে দূর করবার জন্য, আমাদের প্রার্থনা করতে হবে, নিজের মধ্যে প্রেম-ভালোবাসা জাগিয়ে তোলাই প্রার্থনার কাজ । প্রার্থনা তখনই বেশি কার্যকরী হয়ে উঠতে পারেন, যখন আপনার প্রার্থনা মধ্যে একটা ধারাবাহিকতা থাকবে, ঐকান্তিকতা, থাকবে দৃঢ় বিশ্বাস, আর অসীম ধৈর্য্য থাকবে ।

ছোট্ট একটা গল্প দিয়ে শেষ করি। বলরাম বসুর নাম শুনেছেন। ঠাকুর রামকৃষ্ণের পরমভক্ত ছিলেন। যিনি পরবর্তীতে স্বামী ব্রহ্মানন্দ নামে আমাদের কাছে পরিচিত। এই বলরাম বসুর বাড়িতে ঠাকুর রামকৃষ্ণ মাঝে মধ্যে যেতেন। তো একদিন ঠাকুরকে সুযোগ পেয়ে, জিজ্ঞেস করে বসলেন, হ্যাঁ মশাই ভগবান কি সত্যিই আছে ? ঠাকুর বললেন, হ্যাঁ নিশ্চয়ই। বলরাম আবার প্রশ্ন করলেন, কেউ তাকে দেখতে পায় ? ঠাকুর বললেন, হ্যাঁ যে তাকে তার খুব নিকট ভাবে, প্রিয় ভাবে, তিনি তাঁকে দেখা দেন। তুমি তাকে প্রার্থনা করে যদি তুমি দেখা না পাও তবে এ কথা ভেবোনা যে, তিনি নেই। বলরাম আবার বললেন, আমি তার কাছে অনেক প্রার্থনা জানাচ্ছি, তবুও ডেকে পাই না কেন ? ঠাকুর রামকৃষ্ণ এবার হাসলেন, বললেন, তুমি কি তাঁকে তোমার সন্তানের মতো প্রিয় ভাবো ? বলরাম এবার বললেন : না প্রভু। ভগবানের জন্য আমার অত গভীর অনুভূতি আসেনি। ঠাকুর এবার মধুর কন্ঠে বললেন,
"ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানাও, তোমার নিজের থেকেও তাকে আরো আপনার বলে মেনে করো। তোমাকে সত্যি বলছি, তিনি তার ভক্তদের খুব ভালোবাসেন। তিনি তখন তাদের দর্শন না দিয়ে পারেন না। তাকে ঠিকমতো চাওয়া না হলেও তিনি তাদের কাছে আসেন। কেউ যদি ভগবানের দিকে এক পা এগোয় তবে ভগবান তার দিকে দশ পা এগিয়ে আসেন। ভগবানের চেয়ে আরও স্নেহশীল, আরও প্রিয় আর কেউ নেই। "

তো আমরা জানি আর না জানি মহাত্মাগণ বলছেন, তিনি আছেন। সমস্ত ঐশ্বর্য্য তাঁরই। কেবল আকুলভাবে প্রার্থনা করলে, সমস্ত জাগতিক বস্তু তো দূরের কথা স্বয়ং তাঁকেই পাওয়া যায়।

ওম শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ। হরি ওম।

---------------------
আপনি কি ঈশ্বরকে দেখেছেন ? (২) ঈশ্বর দর্শন

যুবক নরেন সবে  তখন ঠাকুর  রামকৃষ্ণের কাছে যাতায়াত শুরু করেছেন। আর ঠাকুর আর আশেপাশে বালক , যুবক, বৃদ্ধ পরিবেষ্টিত হয়ে নানান আলোচনার মধ্যে  একদিন ঠাকুর  রামকৃষ্ণকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "মহাশয় আপনি কি ঈশ্বরদর্শন করেছেন?" ঠাকুর তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন, "হ্যাঁ আমি ঈশ্বর দর্শন করেছি, ঠিক যেমন তোমাদের দেখছি। তবে এর চেয়েও আরো ঘনিষ্ট রূপে। ঈশ্বর দর্শন হয়, তাকে দেখা যায়, তার সঙ্গে কথাবলা চলে, ঠিক যেমন আমি তোমাদের সাথে কথা বলছি।  কিন্তু কে তা চায় ? লোকে মাগ-ছেলের শোকে, বিষয়-আশয়ের দুঃখে ঘটি ঘটি কাঁদে, কিন্তু ভগবানের জন্য কে তা করে ? সরল ভাবে  ভগবানের জন্য কাঁদলে, তিনি নিশ্চয়ই দেখা দেন। "

ঠাকুর রামকৃষ্ণের এই কথার মধ্যে আমরা দুটি প্রশ্নের জবাব পেয়ে  যাই, একটা হচ্ছে, ঈশ্বর আছেন কি না, আর যদি থেকে থাকেন, তবে তাকে আমরা কিভাবে দর্শন করতে পারি, এমনকি তার সাথে আমরা কথা বলতে পারি। এসব আমাদের কাছে শোনা গল্পকথা। বাস্তব সত্য হচ্ছে, আমরা কখনো এই ঈশ্বরকে দেখি না, তার সঙ্গে কোনো কথাও বলতে পারি না। ঠাকুরের কথা আমরা সরল বিস্বাসে মেনে নিতে পারি, কিন্তু এই সত্য আমাদের কাছে উপলব্ধ নয়। 
এই গল্প আমাদের শুনতে ভালো লাগে, আমরা একটা কল্পনার জগতে অসম্ভবের স্বপ দেখতে পারি। তার বেশী কিছু নয়। 

আবার  যোগীশ্বর লোকনাথ ব্রহ্মচারীর সাক্ষাৎ শিষ্য ব্রহ্মানন্দ ভারতী "সিদ্ধজীবনী" গ্রন্থে লিখছেন, একবার ঢাকার কয়েকজন বিদ্বান ব্যক্তি ব্রহ্মচারীকে প্রশ্ন করেন, -ঈশ্বরের স্বরূপ কি ? এর উত্তরে বাবা লোকনাথ উত্তর দেন, "ঈশ্বর নামক কোনো পদার্থের সহিত এপর্যন্ত আমার পরিচয় হয় নাই, এরপর যদি সেই বস্তুর অস্তিত্ত্ব দেখতে পাই,তবে তোমাদের বলতে পারবো। "  এই ঘটনার কথা উল্লেখ করে, ব্রহ্মানন্দ  ভারতী বলছেন, "জগতের পতি কেহ নাই বন্ধুগন ! তোমরা না বুঝে জগতের সৃষ্টিকর্তা, পাপের  শাস্তিদাতা, পুণ্যের পুরস্কারদাতা, সুখদুঃখের নিয়ন্তা, ন্যায়বান  রাজার মতো জগতের একজন পতি  কল্পনা করে, সেই কল্পিত জগৎপতিকে ঈশ্বর বলছো। 

এই দুটো গল্পে আমরা দুটো সার বস্তু পাই।  ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলছেন, ঈশ্বর দর্শন, হয়, ঠিক যেমন আমি তোমাদের দেখছি। তাহলে কি বলছেন, তুমি আর ঈশ্বরে কোনো ভেদ নেই ? অর্থাৎ উপনিষদের সেই বাণী তৎ-ত্বম -অসি।  তুমিই সেই। আবার বাবা লোকনাথের কথায়, ঈশ্বর বলে কিছু নেই, যিনি তোমাদের পাপ বা পুণ্যের ফল প্রদান করছেন, বা সুখ-দুঃখ প্রদান করছেন, এসব তোমাদের কল্পনা।  সত্য হচ্ছে, তুমিই সেই যে  এই সুখ-দুঃখের সৃষ্টিকর্তা।

হিন্দুধর্ম্ম যাঁকে  বলা হয় সনাতন ধর্ম্ম অর্থাৎ যে ধর্ম্ম যুগযুগ ধরে চলে আসছে, সেখানে প্রভূত পরিমানে উদারতা লক্ষিত হয়। এখানে  ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব স্বীকার করা বা না করা সম্পূর্ণ ভাবে ব্যক্তিগত ব্যাপার। এখানে আপনি ঋষি পতঞ্জলিকে পাবেন,  তিনি তাঁর যোগদর্শন গ্রন্থে ঈশ্বর সম্পর্কে লিখছেন, "ঈশ্বরপ্রণিধানাদ্বা" (সমাধি-২৩), "ক্লেশ-কর্ম্ম-বিপাকাশয়ৈঃ-অপরামিষ্টঃ পুরুষ-বিশেষ ঈশ্বরঃ" (সমাধি-২৪) অবিদ্যা ক্লেশ, পুন্য-পাপাদি জনিত কর্ম্মসংস্কার এবং সেইজন্য কার্যবিনা কর্ম্মফল ও অন্তর্নিহিত বাসনাগুলোতে  অসন্মন্ধযুক্ত পুরুষবিশেষ হচ্ছেন ঈশ্বর। অবিদ্যারূপ ক্লেশ, ক্লেশ জনিত কর্ম্ম-অধর্ম্ম কর্ম্মের উদ্ভব, আবার এই কর্ম্ম জনিত যে ফল এগুলো থেকে সম্মন্ধ বিহীন, যে পুরুষ, তিনিই ঈশ্বর। 

অজ্ঞান বা অবিদ্যারূপ ক্লেশ,  ভালো মন্দ বা ধর্ম্ম-অধর্ম্ম দৃষ্ট-অদৃষ্ট  ইত্যাদি কর্ম্মজনিত যে সংস্কার তার ফল হলো বিপাক, অর্থাৎ বিক্ষিপ্ততা। আবার এই বিক্ষিপ্ততার কারন হচ্ছে, বাসনা মূলক সংস্কার। এগুলো থেকে যিনি মুক্ত তিনিই ঈশ্বর। 

একদল পণ্ডিত বলছেন, এই জগৎ দেখছো, এই জগতের যিনি সৃষ্টা তিনিই ঈশ্বর। এই জগৎ-এর যিনি নিমিত্তকারন, তিনি হচ্ছেন, ঈশ্বর। এখনকথা হচ্ছে, যেখানে কার্য্য নেই, সেখানে তাহলে ধরে নিতে হয়, কারনও  নেই। তাহলে জগৎ উৎপত্তির পূর্বে কোনো ঈশ্বর বা কারনে অস্তিত্ত্ব ছিল না ? আর একটা কথা হচ্ছে, জগৎ তৈরিতে যেমন একজন নিমিত্ত কারন দরকার, তেমনি দরকার উপাদান কারন। একটা বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে, যেমন একজন রাজমিস্ত্রি দরকার, তেমনি দরকার, ইট-কাঠ-পাথর দরকার । এই ইট-কাঠ-পাথর ছাড়া নির্মাতা কোনো বাড়ি নির্মাণ করতে অক্ষম। তো রাজমিস্ত্রি নিমিত্ত কারন, আর ইট-কাঠ-পাথর হচ্ছে উপাদান কারন। তো জগৎ সৃষ্টি  করতে গেলে, যদি স্রষ্টা বা নির্মাণ কর্তা হন ঈশ্বর তবে, উপাদান কারন নিশ্চই অন্য কেউ।  

আমাদের বেদশাস্ত্র বলছেন, এক ভিন্ন দ্বিতীয় নেই। গুটিপোকা যেমন নিজের লালা দিয়ে, নিজের বাসা তৈরী করে, নিজেকে আবদ্ধ করে।  ঠিক ঈশ্বর নিজের প্রকৃতি শক্তি দিয়ে এই জগৎ তৈরী করে, জগতের মধ্যে অবস্থান করছেন। নিজের তৈরী প্রকৃতির মধ্যে  নিজেই বদ্ধ থেকে, লীলা আস্বাদন করছেন। 
 
তো ঈশ্বর হচ্ছেন, উপাদান ও নিমিত্ত উভয় কারন। সমস্ত জীবের যে চৈতন্যশক্তি তাকে একত্র করলে যে চৈতন্যভাণ্ডার তৈরী হয়, তাকেই বলা হয় ঈশ্বর। যখন এই চৈতন্য একদেহ-অভিমানী হয়, তখন সে জীব,  আর এই জীব-চৈতন্যের সমষ্টির নাম হচ্ছে, ঈশ্বর। পাহাড় আর পাথরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।  বন ও গাছের সঙ্গে কোনো পার্থক্য নেই। এখন গাছ বা পাথর যদি কখনো পাহাড়ের বা বনের খোঁজে বের হয়, তবে সে এক আশ্চার্য্য ব্যাপার হবে। আপনি আমি সবাই স্বরূপতঃ ঈশ্বর, অন্য স্বতন্ত্র ঈশ্বর কোথাও নেই। এইজন্য বেদশাস্ত্রের ঋষিগণ  বলছেন, তৎ ত্বম অসি।  সেই ব্রহ্ম হচ্ছে তুমি বা জীব। অহং ব্রহ্মাস্মি। আমিই ব্রহ্ম। এক আত্মাই সবত্র। এই আত্মাই অন্তরে স্থিত অন্তর্যামী, আবার বহির্স্থিত পরমাত্মা। জীব-ভাবের ক্ষয় সাধনের পরে যে অক্ষর ভাবের অবশিষ্ট থাকে, তাকেই বলা হয় ঈশ্বর। যতক্ষন জীবভাব থাকে ততক্ষন ঈশ্বর ও জীব আলাদা মনে হয়।  যখন জীবভাবের অবসান হয়, তখন অখন্ড অক্ষর অদ্বয়তত্ত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়ে নিঃশ্রেয়স  লাভ হয়। এই হচ্ছে অদ্বৈত তত্ত্বের উপাসকদের সাধনতত্ত্ব। 

আসলে ঈশ্বর নেই, এই কথা ভাবতেই আমাদের মতো ভক্তের হৃদয় ব্যাথায় ভরে   ওঠে, এমনকি আমাদের রাগ হয়।আমরা যেন নিরাশ্রয় হয়ে যাই।  আমরা নিঃসঙ্গ হয়ে যাই।  ভক্ত আসলে ঈশ্বরকে মেনেই চলতে চায়, এর অন্যথা সে ভাবতেই পারে না। কারন সে ঈশ্বরভিন্ন অসহায় হয়ে যায়।  অন্যদিকে একদল লোক আছেন, যাঁরা ঈশ্বরকে জানতে চান, মানতে চান না। এঁরা পুরুষাকারে বিশ্বাস করেন।  নিজের কর্ম্ম দক্ষতার  দ্বারা জীবনকে গড়ে তুলতে চান। এই দুই দলের মধ্যে অর্থাৎ ভক্ত ও জ্ঞানীর মধ্যে  দুস্তর প্রভেদ। অন্যদিকে ভগবান বুদ্ধদেব ঈশ্বর সম্পর্কে সমস্ত প্রশ্নের উত্তরে নীরব থেকেছেন। আসলে, তিনি বলতে চাইছেন, তুমি মানুষ হয়ে জন্মেছ,  আর জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তুমি সুখ-দুঃখের পসার নিয়ে এসেছো। জরা-ব্যাধি-মৃত্যু নিয়ে এসেছ। সাপে  কাটলে, যেমন কার সাপ কার, কেন কামড়ালো, ইত্যাদি জিজ্ঞেস করার আগে, বিষের চিকিৎসা প্রয়োজন, আবার আগুন লাগলে, যেমন কার আগুন, বা কেন আগুন লাগলো, তার সমাধানে না গিয়ে, আগে আগুন নেভানোর চেষ্টা করা উচিত।  ঠিক তেমনি তুমি জীব হয়ে জন্মেছ। কর্ম্ম তোমার সাথী। এই কর্ম্মই তোমাকে পরিণতির দিকে টেনে নিয়ে যাবে, কর্ম্মই তোমাকে গতিশীল করেছে, কর্ম্মই তোমাকে বিক্ষিপ্ত করেছে। আর কর্ম্মের উৎস হচ্ছে প্রাণশক্তি। প্রানহীনের কর্ম্ম বলে কিছু নেই। প্রাণশক্তিই তোমাকে কর্ম্মে উদ্ভুদ্ধ করছে। এই প্রাণশক্তি তোমাকে কর্ম্ম করবার শক্তি প্রদান করছে।  এই প্রাণশক্তিকে স্থির করে ক্রিয়াহীন হতে পারলেই জীব স্বরূপে স্থিত হতে পারে।  সমস্ত সুখ-দুঃখের পারে অপার শান্তির রাজ্যে অর্থাৎ সাম্যাবস্থায় অবস্থান করতে পারে।  এখানে আসলে ঈশ্বরের কোনো ভূমিকা নেই। কাল্পনিক ঈশ্বরকে না খুঁজে নিজেকে খুজুন।  নিজেকে বিশ্বাস করুন, নিজেকে শ্রদ্ধা করুন। নিজের প্রতি আস্থা রাখুন। নিজের পুরুষকারের প্রয়োগ করুন। আর এই কারণেই  সমস্ত মহানপুরুষগন আমাদের বিভিন্ন রকম যোগের কথা বলেছেন, সাধনক্রিয়ার কথা বলেছেন । যোগের মধ্যেই তাঁরা  নিজেদের অস্তিত্ত্ব খুঁজে পেয়েছেন। তা সে ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলুন, বাবা লোকনাথ বলুন আর ভগবান বুদ্ধ বলুন, বা যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলুন। সবাই আমাদের একই কথা বলে গেছেন। আমরা অজ্ঞান তাই আমরা তাঁদের কথার অর্থ বুঝতে পারি না। জেগে উঠুন।  পুরুষকারের সাহায্যে নিজের অস্তিত্ত্বের খুঁজে বেরিয়ে পড়ুন। নিজেকে যেদিন খুঁজে পাবেন, সেদিনই আপনি স্বয়ং ঈশ্বরের সন্ধান পেয়ে যাবেন। 

ওম শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।  হরি ওম।    


          

         


         














             









   

         

   

Comments

Popular posts from this blog

নিত্যকথা

ঈশ্বর ও তাঁর উপলব্ধি

সত্যধর্ম্ম ও প্রেম