ঈশ্বরের সান্নিধ্য বা শান্তি কিভাবে পাবেন ?
ঈশ্বরের সান্নিধ্য বা শান্তি কিভাবে পাবেন ?
এক যুদ্ধবাজ রাজা ছিলেন। তিনি তার রাজ্যের সমস্ত পুরুষকে সেনাবাহিনীতে যোগ দেবার জন্য ফতেয়া জারি করেছেন। তো সমস্ত পুরুষ-মহিলাদের মধ্যে একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো । এতে করে সমস্ত পুরুষের সাথে তাদের পিতা-মাতা ভাই-বোন সবাই আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে উঠলেন। কে জানে যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পারবেন কি না, তাদের আদরের সন্তান, তাদের আদরের ভাই, তাদের আশ্রয়দাতা পিতা, তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের সম্বল । তারা তাদের সমস্ত পুরুষকে বাড়ির মধ্যে লুকিয়ে রাখতে লাগলেন। এদিকে রাজকর্ম্মচারীগণ পাড়ায় পাড়ায় টহল দিয়ে পুরুষকে জোর করে ধরে এনে যুদ্ধে পাঠাতে লাগলেন। সমস্ত রাজ্যের মধ্যে একটা ত্রাহি ত্রাহি রব শুরু হলো। রাজকর্ম্মচারী দেখলেই, সবাই গলির মধ্যে লুকিয়ে পড়তে লাগলো। তো এক সাধুপুরুষ রাস্তার ফুটপাতে শুয়ে পায়ের উপরে পা তুলে দিয়ে হাত তালি দিয়ে গান গাইছিলো। রাজকর্ম্মচারীরা এসে তাকে শুধালো, তুমি কি জানোনা, রাজার আদেশ ? চারিদিকে যুদ্ধের দামামা বেজে গেছে। আর তুমি এখানে শুয়ে হাত-তালি দিয়ে গান গাইছো ? তোমার কি মৃত্যুর ভয় নেই ? এক্ষুনি আমাদের সাথে চলো, তোমাকে যুদ্ধে যেতে হবে। তো সাধুপুরুষ রাজকর্ম্মচারীকে গ্রাহ্যের মধ্যেই আনলো না। বরং গলার সুর যেন আরো উচ্চ থেকে উচ্চতর হয়ে উঠতে লাগলো। রাজকর্ম্মচারীগণ তাকে হাত ধরে তুলবার চেষ্টা করলো। আর গালাগাল করতে লাগলো। কিন্তু অবাক কান্ড সাধু পুরুষ যেমন শুয়ে ছিলেন, তেমনি শুয়ে রইলেন। এবার চারজন শক্তিশালী রাজপুরুষ তার দুই হাত, দুই পা ধরে টানাটানি করতে লাগলো, কিন্তু তাকে এক ইঞ্চিও সরাতে পারলো না। এতে তারা একটু ঘাবড়ে গেলো, এবার অনুরোধ উপরোধ করতে লাগলো। রাজার আদেশ পালন করবার জন্য অনুরোধ-উপরোধ করতে লাগলো। সাধু পুরুষ এবার গান থামিয়ে বললেন, কোথায় তোমার রাজা, তাকে নিয়ে এসো। তবেই আমি যাবো। নতুবা আমি কোত্থাও যাবো না। বলে আবার হাততালি দিয়ে গান শুরু করলো। তো রাজকর্ম্মচারীগণ এই শক্তিশালী সাধুপুরুষের দৃঢ়তা দেখে, ঘাবড়ে গেলো। তারা আর কথা না বাড়িয়ে রাজামহাশয়ের কাছে গিয়ে, এই সাধুপুরুষের কথা বললো। রাজা বুদ্ধিমান, তিনি কোনো কথা না বলে, সোজা সাধুমহারাজের কাছে চলে এলেন। এসে রাগত স্বরে বললেন, হে যুবক তুমিকি রাজার আদেশ শোনোনি ? রাজ্ আজ্ঞা অমান্য করলে, তার শাস্তি যে মৃত্যুদণ্ড তা কি তুমি জানো না ? সাধুপুরুষ ধীরে ধীরে বললেন, কে কাকে মারে ? না কেউ মরে, না কেউ মারে। শুনেছি, তুমি পাশের রাজ্য জয় করবার তরে, যুদ্ধ ঘোষণা করেছো, রাজ্যের সমস্ত পুরুষকে সেই যুদ্ধে যেতে বাধ্য করছো। কিন্তু তুমি কি জানো, রাজ্য জয় করবার পরে, তুমি কি করবে ? তো মহারাজ বললেন, এক-এ করে আমি পৃথিবীর সমস্ত রাজ্য আক্রমন করবো, এবং জয় করবো। সাধুমহারাজ বললেন, তো ঠিক আছে, তার পরে তুমি কি করবে ? তার পরে আমি পায়ের উপরে পা তুলে দিয়ে বিশ্রাম করবো, আরাম করবো । সাধু মহারাজ বললেন, সেই কাজটাই তো আমি এখনই করছি। তুমি যা জীবনের শেষে এসে করতে চাইছো, তা আমি এখনই করছি। বুদ্ধিমান মহারাজ এবার সাধুপুরুষের পায়ে পড়লেন।
যুগে যুগে সমস্ত মাহাত্ম্যন বলে গেছেন, তোমার মধ্যেই আছেন, সেই ঈশ্বর। কিন্তু আমরা তাকে কেউ দেখতে পাই না, তাকে কেউ উপলব্ধি করতে পারি না। এই ঈশ্বরের সান্নিধ্য কিভাবে আমরা পেতে পারি, তা আমরা জানি না । আসলে ঈশ্বর হচ্ছেন, শান্তির প্রতীক। যেখানে ঈশ্বর, সেখানেই শান্তি বিরাজ করছে। কিন্তু ঈশ্বরকে আমরা চিনি না জানি না। তো কিভাবে আমরা ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করতে পারি, সে সম্পর্কে আমাদের কোনো জ্ঞান নেই। তবে শুনুন, বাস্তব জীবনে আমরা শান্তি পেতে পারি একমাত্র বিশ্রামে। একমাত্র বিশ্রামই আমাদের জীবনে শান্তি এনে দিতে পারে। কথায় বলে, মরলেই শান্তি। আমাদের দেহের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যখন নিস্তেজ হয়ে যায়, তখন সর্বত্ৰ শান্তি বিরাজ করে। ছুটির দিনে, আমরা ফুরফুর মেজাজে থাকি। কেননা আমাদের মন শান্ত থাকে। তো আপনি যদি বিশ্রামে থাকতে পারেন, তবে আপনি যদি শান্তিতে থাকেন, আর এতে করে, জানবেন আপনি ঈশ্বরের সঙ্গে আছেন। তো শান্তিতে থাকুন, আর ঈশ্বরকে উপলব্ধি করুন।
আমার এক বন্ধু ছিল, আজ আর তিনি দেহে নেই। তার কথা বলতে গিয়ে, আমি প্রথমে তার আত্মার শান্তি কামনা করি। বিকাশ কুসুম রায়। বড্ড হাসিখুশি মানুষ ছিলেন। বড্ড দয়ালু মানুষ ছিলেন। ওর মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আমি লক্ষ করেছি। আর তা হচ্ছে, ও অফিসে যখন টিফিন হতো, তখন দুটো চেয়ার একত্রিত করে, অথবা কোনো বেঞ্চ টেনে শুয়ে পড়তো। আধাঘন্টা ঘুমিয়ে নিতো। কোনো মিটিং-এ গেলে, আমি দেখেছি, চেয়ারে বসে ঘুমুচ্ছে। একবার বারুইপুরে একটা মিটিংএ গিয়ে বিকাশকে আর খুঁজে পাচ্ছি না। তো বিরতির সময় রাস্তায় বেরুলাম, ওকে খুঁজতে। দেখি একটা জানলা দিয়ে ছেড়া মোজা পড়া দুটো পা দেখা যাচ্ছে। মোজা দেখে, বিকাশকে ধরতে পারলাম। বড়ো শান্তিপ্রিয় মানুষ ছিল, বিকাশ। আর তার এই শান্তির পিছনে রহস্যঃ ছিল, সে সব সময় বিশ্রামের মেজাজে থাকতো।
আমরা সবাই কোনো না কোনো সময়, একটু বিশ্রামের প্রয়াসী হই। রাতের দিকে আমরা সবাই ঘুমের মাধ্যমে এই বিশ্রাম পেয়ে থাকি। কেউ কেউ হয়তো দিনেও ঘুমায়। না ঘুমুলেও, কাজের ফাঁকে একটু বিশ্রাম করে নেয়। কিন্তু কেন সমস্ত জীবকুল বিশ্রামের জন্য ব্যাকুল হয়, তা কি জানেন। আসলে বিশ্রামে বা ঘুমের মধ্যে আমরা ঈশ্বরের সান্নিধ্য উপভোগ করি। আর ঈশ্বরের কাছ থেকে বেঁচে থাকবার, কাজ করবার রসদ সংগ্রহ করি। গাঢ় ঘুমে মানুষ চিন্তারহিত অবস্থায় থাকে। ঈশ্বরের সান্নিধ্য অনুভব করে। আর এই ঈশ্বরের সান্নিধ্য না পেলে আপনার পক্ষে বেঁচে থাকা অসম্ভব হবে। আর ঈশ্বরের কাছ থেকেই আমরা সমস্ত শক্তি পেয়ে থাকি। এটা আপনি জ্ঞাত সারেই করুন আর অজ্ঞাত সারেই করুন, এই বিশ্রাম বিহীন জীবন অতিবাহিত করা যায় না। আমাদের সমস্ত যন্ত্রণার তা সে মানসিক, হোক বা শারীরিক হোক, এই ঘুম আমাদের সমস্ত যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে পারে। কেউ যখন অসুস্থ হয়ে ছটফট করছে, আর ডাক্তার তার অসুখ ধরতে পারছে না, তখন তাকে ডাক্তারবাবু ঘুমের ঔষধ দেয়। আর যতক্ষন সে ঘুমোতে পারে, ততক্ষন সে যন্ত্রনা থেকে রেহাই পেতে পারে। অস্ত্রপচারের সময় দেখবেন, আমাদের শরীরকে অবশ করবার জন্য ঔষধ দিয়ে থাকেন, আসলে এই ঔষধ আর কিছুই নয়, কেবল শরীরের কোষ গুলোকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া।
আমাদের বাড়িতে এক অলিখিত নিয়ম আছে, কেউ ঘুমুলে, অথবা বই পড়লে, তাকে কেউ বিরক্ত করবে না। আপনি হয়তো বলবেন, সারাদিন যদি ঘুমিয়ে থাকি, তবে কাজ করবো কখন ? দেখুন না ঘুমুলে আপনি কাজ করতে পারবেন না। দিনে অন্তত ৮ ঘন্টা আমাদের ঘুমের দরকার। আর এই ঘুম আর কিছুই নয়, ঈশ্বরের সথে মিলিত হওয়া। তার কাছ থেকে, অর্থাৎ সেই বিশ্ব শক্তির কাছ থেকে বেঁচে থাকবার রসদ সংগ্রহ করা।
স্বামী গোকুলানন্দ তার "মানসিক চাপ জয় করার উপায়" বইয়ে বলছেন, আমাদের একটা ধারণা হচ্ছে, সবাই বিশ্রাম নিলেও, আমাদের ফুসফুস কখনো বিশ্রাম নিতে পারে না। আমরা যতদিন বেঁচে থাকি, ততদিন আমাদের ফুসফুস নিরন্তর কাজ করে চলেছে। ফুসফুস থেমে যাওয়া মানে আমাদের মৃত্যু। আসলে আপনি জেনে অবাক হবেন, আমাদের ফুসফুস সারাদিনে মাত্র ৯ ঘন্টা কাজ করে থাকে। সংকোচন-সম্প্রসারণের মাঝখানে সে একটু জিরিয়ে নেয়। যা আমরা ধরতে পারি না। আবার যোগীপুরুষগন যে প্রক্রিয়ার অভ্যাস করেন তার মধ্যে কুম্ভক হচ্ছে সর্ব্ব প্রধান। আসলে কুম্ভক এই ফুসফুসকে বিশ্রামের সুযোগ করে দেয়। সঠিক বিশ্রাম নিলে, একটা মানুষ ১৬ থেকে ১৮ ঘন্টা কাজ করতে পারে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখন ঘুমোতেন, তা তার সর্ব্বক্ষনের পরিচারকও জানতেন না। কিন্তু তিনি বিশ্রামের সঠিক প্রক্রিয়া জানতেন, তাই কখনো ক্লান্ত হতেন না। আসলে ধ্যান হচ্ছে, বিশ্রামের সর্বোৎকৃষ্ট উপায়। এক ঘন্টার ধ্যান আপনাকে ৮ ঘন্টা ঘুমোনোর মতো কাজ করতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ধ্যানের মধ্যেই থাকতেন।
তাই বলি, কাজের ফাঁকে একটু করে বিশ্রাম করে নিন। দাঁড়ানো থাকলে বসে পড়ুন, বসে থাকলে শুয়ে পড়ুন। শুয়ে থাকলে একটু ঘুমিয়ে নিন। জানবেন, বিশ্রাম মানুষকে শান্তি দিতে পারে। আর এই শান্তি হচ্ছে ঈশ্বরের গায়ের গন্ধ। আমাদের ধারণা হচ্ছে, মস্তিষ্কের পরিশ্রম, শরীরের পরিশ্রম আমাদের ক্লান্তি এনে দেয়। আসলে আমাদের ক্লান্তি আসে আমাদের মানসিক বা শারীরিক শ্রম থেকে নয়, বরং মানসিক চাপ, উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তা থেকেই আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি । এমনটা নিশ্চয়ই আপনারা দেখে থাকবেন, সারাদিন, বসে থেকেও আমাদের ক্লান্তি আসে, কারন মনের মধ্যে নানান দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ কাজ করছিলো। তাই বলছি, সুযোগ পেলেই সম্পূর্ণ বিশ্রামে নিয়ে যান নিজেকে। ধ্যান হচ্ছে বিশ্রামের সর্বোৎকৃষ্ট উপায়। সঠিক ধ্যান আপনাকে পূর্ন বিশ্রাম দিতে পারে।
এছাড়া জীবনে শান্তি পাবার জন্য, আরো দুটো একটা একটা প্রাসঙ্গিক কথা বলি।
১. যেখানে যে অবস্থায় থাকুন না কেন, আপনি আপনার শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে খেয়াল করুন। আসলে এই কাজটা আমরা কখনো ভুলেও করি না। শ্বাস-প্রশ্বাস আমাদের এমনি এমনি হয়, এর জন্য আবার মনোযোগ দিতে হয় নাকি ? হ্যাঁ একটু মনোযোগ দিয়েই দেখুন না, এক আশ্চার্য আনন্দ অনুভূতির ছোঁয়া পেতে থাকবেন, কিছুদিন নয়, কিছুক্ষনের মধ্যেই এই সত্য উপলব্ধি হবে সাধকের মধ্যে ।
২. সময়ের কাজ সময়ে করুন, এতে করে আপনার মানসিক উদ্বেগের সম্ভাবনা থাকবে না। যখন দেখবেন, কাজ কিছু বাকি নেই, তখন আপনার মনে একটা স্ফূর্তি বজায় থাকবে।
৩. যার কাজ তাকে করতে দিন। সব কাজ নিজের কাঁধে তুলে নেবেন না। সময়মতো না বলতে শিখুন। কাজের ভাগ করে দিন। একটা জিনিস জানবেন, মানুষ অতিরিক্ত পরিশ্রমে ক্লান্ত হয় না, মানুষ ক্লান্ত হয়, যখন মানুষ উদ্বেগের সঙ্গে বিশ্রাম নিতে যায়। ভ্রান্ত পথে কাজের জন্য ক্লান্তি আসে।
৪. যা কিছু করুন না কেন, সবসময় আপনার অন্তর্নিহিত দেবত্বের সঙ্গে একটা মধুর সম্পর্ক গড়ে তুলুন। জানবেন, জীবনে সমস্ত কিছুই ক্ষণস্থায়ী। গতিশীল একটা ছায়া মাত্র। আজ আছে কাল নেই। যে সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না, তা কালের কাছে সমর্পন করুন। দেখবেন কালের গতির সঙ্গে সঙ্গে সমস্যার গভীরতা কমতে কমতে একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
৫. সব শেষে আবার বলি, প্রতিদিন নিয়ম করে, সেই ঈশ্বরের ধ্যান করুন, তাঁর কাছে প্রার্থনা করুন, সমস্ত সমস্যা তার কাছে সমর্পন করুন। সমস্ত সমস্যা সৃষ্টিকারী কে সে কথা ভাবতে যাবেন না, যিনি সমস্ত সমস্যা সমাধানের শক্তি আমাদের দিয়েছেন, তাঁর কাছেই মনের কথা নিবেদন করুন।
ওম শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ। হরি ওম।
------------
Comments
Post a Comment