যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃ
ওঁং নারায়নং নমস্কৃত্য নরঞ্চৈব নরোত্তমম্
দেবীং সরস্বতীং ব্যাসং ততো জয়মুদীরয়েৎ ওঁং।
২১.০৫.২০২২যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃ
শ্লোক :৮/ ১-২
আমরা এবার অক্ষর ব্রহ্মযোগ অধ্যায়ে প্রবেশ করেছি। ক্ষর কথাটার অর্থ হচ্ছে, যার ক্ষয় আছে, যা ক্ষয়িষ্ণু, যা প্রতিনিয়ত ক্ষয় প্রাপ্ত হচ্ছে। তো কি এমন বস্তু আছে, যার ক্ষয় নেই, কোনো পরিবর্তন নেই ? জাগতিক সমস্ত বস্তু প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের ধর্ম্মে আবদ্ধ। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। জাগতিক দৃশ্যমান সকল বস্তু এমনকি আমাদের শরীর-মন প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে, আমাদের জ্ঞান পরিবর্তন হচ্ছে। আমাদের হৃদয়েও পরিবর্তন লক্ষিত হচ্ছে। তাহলে সেই অজানা বস্তু কি যার কোনো ক্ষয় নাই, যা নিত্য, অপরিবর্তনীয়, নিত্যবিরাজমান । শাস্ত্র বলেন, সবকিছুর অন্তরস্থ যিনি তিনিই ব্রহ্ম। এই ব্রহ্ম থেকে সবকিছুর উদ্ভব। ব্রহ্ম নির্গুণ, নিরাকার। এই ব্রহ্মই জ্ঞাতা-জ্ঞেয়-জ্ঞান। এই ব্রহ্ম সর্বত্র। এমন নয়, যে ব্রহ্ম কিছু সৃষ্টি করলেন, তারপর তাতে প্রবেশ করলেন। সত্য হচ্ছে ব্রহ্ম সবকিছুর উপরে ন্যস্ত। তিনি না প্রবেশ করেন, না উৎক্রান্ত হন। সবকিছুই তার উপরেই ন্যস্ত। তাই ব্রহ্মকে বলা হচ্ছে অক্ষর। ব্রহ্মসূত্র বলছেন, "জন্মাদ্যস্য যতঃ" যা হতে সৃষ্টি-স্থিতি-লয় হয়, তিনিই ব্রহ্ম।
সপ্তম অধ্যায়ের শেষেভাগে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মুমুক্ষ ব্যক্তিদের জ্ঞেয়রূপে যে ব্রহ্ম ইত্যাদি বিষয়ের কথা বলেছেন, সেই বিষয়ে জিজ্ঞাসু হয়ে অর্জ্জুন প্রশ্ন করছেন, ব্রহ্ম কি ? "কিং তদব্রহ্মেতি" । একি সেই পরমাত্মা-চৈতন্য নাকি জীবাত্মক চৈতন্য ? এই দুয়ের মধ্যে কাকে ব্রহ্ম বলছো ? তুমি যে অধ্যাত্ম শব্দের ব্যবহার করেছো, তা কি জ্ঞান-ইন্দ্রিয় বা কর্ম্ম-ইন্দ্রিয় নাকি সুক্ষ ভূত সমূহের কথা বলছো ? তুমি যে কর্ম্মের কথা বলছো, তা কি শাস্ত্র নির্দিষ্ট বা বৈদিক কর্ম্ম নাকি লৌকিক কর্ম্মের কথা বলছো ? আবার অধিভূত শব্দের দ্বারা তুমি কি এই স্থুল শরীর বা সমগ্র দৃশ্যমান জগৎ-প্রকতির কথা বলছো ? অধিদৈব দ্বারা কি নানান দেবতাদের কথা বলছো, নাকি সেই এক ঈশ্বরের কথা বলছো ? যদি বলো ঈশ্বর ও আমাতে বা ঈশ্বর ও দেবতাতে কোনো পার্থক্য নেই, তারা সবাই সমতুল্য তবে সে কথাও আমাকে বিষদ ভাবে বোলো। কেননা, তুমি পুরুষোত্তম। তুমি সর্বজ্ঞ, তোমার কাছে সবই সুবিদিত। কিন্তু আমার কাছে প্রশ্ন ছাড়া কিছুই নেই। আমি তোমার কাছে উত্তরের অপেক্ষায়। আমি জ্ঞান-তৃষ্ণার্ত - আমাকে জ্ঞানবারি সিঞ্চন করো।
অর্জ্জুন উবাচ :
কিং তদ্ব্রহ্ম কিম-অধ্যাত্মং কিং কর্ম্ম পুরুষোত্তম
অধিভূতং চ কিং প্রোক্তমধিদৈবং কিমুচ্যতে। (৮/১)
অধিভূতং চ কিং প্রোক্তমধিদৈবং কিমুচ্যতে। (৮/১)
হে পুরুষোত্তম, কি সেই ব্রহ্ম, অধ্যাত্ম কি ? কৰ্ম্মই বা কি ? অধিভূত ও অধিদৈব বলতে কি বোঝায় ?
প্রয়াণকালে চ কথং জ্ঞেয়ঽসি নিয়তাত্মভিঃ (৮/২)
হে মধুসূদন, অধিযজ্ঞ কি ? এই দেহে কিভাবে অবস্থিত ? মৃত্যুকালে সংযতচিত্ত ব্যাক্তিগন কিভাবে তোমাকে জানতে পারেন ?
কথার পিঠে কথা আসে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছিলেন, যারা অধ্যাত্ম,, আধিদৈব ও অধিযজ্ঞের সাথে আমাকে অবগত হন, দেহান্তরকালেও তাঁরা আমাকে কখনো ভোলে না। অর্জ্জুন, এই মহাবাক্যের মর্মার্থ ভালোভাবে না বুঝতে পেরে, বলছেন, হে পুরুষোত্তম, ব্যাপারটা একটু খুলো বোলো। অর্জ্জুন বলছেন, হে মধুসূদন, অর্থাৎ রিপুদমনকারী, তুমি ব্রহ্ম, অধিভুক্ত, অধিদৈব, অধিযজ্ঞ প্রভৃতি বিষয়ে বললে, এই বিষয়গুলোর জ্ঞানের সাথে তোমাকে কিভাবে লাভ করা যায়, তা আমাকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলো। আসলে ভগবানের মুখনিঃসৃত গুহ্যতত্ত্বের কথা শুনতে শুনতে আরো শুনবার আগ্রহ জাগে। অর্জ্জুনের মনে প্রশ্ন জেগেছে, ব্রহ্ম কি ? অধ্যাত্ম কি ? কর্ম্ম কি ? জীবদেহে শ্রী ভগবানকে কিভাবে চিন্তার মধ্যে আনা যায় ? এই প্রশ্নগুলো আসলে সমস্ত অধ্যাত্ম সাধকের মনের প্রশ্ন, যা অর্জ্জুনের মুখে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সত্যিকথা বলতে কি এই প্রশ্ন-উত্তরের মধ্যে লুকিয়ে আছে, সাধনক্রিয়ায় সিদ্ধি লাভের গুহ্য জ্ঞান-রহস্যঃ ।
দেহান্তরকালে জীব তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে যায়। তখন দৈহিক ও মানসিক ক্লেশ জীবাত্মাকে এতটাই অভিভূত করে, সে সময় চিন্তার মধ্যে তার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তো এই সময় ভাগবত চিন্তা করতে হবে, বা কি করতে হবে, এই বোধের লোপ পায়। স্থূল দেহের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হবার সময় শরীর যন্ত্রনায় অস্থির হয়ে ওঠে। এইসময় জীবাত্মা তার নিজকৃত পূর্বকর্ম্মের অনুস্মরন করতে থাকে। অন্যদিকে সংস্কার অনুযায়ী ভাবি সূক্ষ্মদেহ গঠনের উপাদান সংগ্রহ করবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কেননা দেহভিন্ন সে নিজেকে নিরাশ্রয় মনে করে। সুতরাং আগে থেকে যদি ভাগবত স্মরণের অভ্যাস না থাকে, তবে এই সঙ্কটযুক্ত নিদারুন দুঃসময়ে সে তার কর্তব্য স্থির করতে পারে না। সুতরাং দেহে থাকতে যে আদত তার তৈরী হয়েছিল, যে জ্ঞান সে সংগ্রহ করেছিল, তার উপরে ভিত্তি করে সে আশ্রয়ের খোঁজ করে। সুতরাং আগে থেকে যদি ব্রহ্ম, অধ্যাত্মবিদ্যা, অধ্যাত্মকর্ম্ম, এবং অধিভূতাদির জ্ঞান না থাকে তবে, পরমাত্মাকে সাধক স্মরণে রাখতে পারবে না। এটাই ভগবৎ উক্তি। তাই অর্জ্জুন প্রশ্ন করলেন, হে পুরুষোত্তম, তুমি সর্বজ্ঞ তুমি করুণাময়, আমি তোমার শরণাগত, দয়াকরে আমাকে জীবের অনন্ত যাত্রাপথের সহায় হয়ে সঠিক পথে পরিচালিত করো।
ব্রহ্ম সর্বত্র, ব্রহ্ম সগুন আবার নির্গুণ, ব্যক্ত আবার অব্যক্ত। কিন্তু এই ব্রহ্ম অজ্ঞেয়, মানুষের অজ্ঞাত। এই ব্রহ্ম জ্ঞাতব্য হলেও, ব্রহ্মতত্ত্ব নিগুড় রহস্যে ভরা। এই তত্ত্ব যেমন বোঝা আমাদের কাছে সহজসাধ্য নয়, তেমনি কেউ বোঝালেও আমাদের পক্ষে এই জ্ঞান আয়ত্ত্বে আনা সম্ভব হয় না। একমাত্র উপযুক্ত গুরুর সান্নিধ্যে, এই জ্ঞানের আভাস বোধগম্য হয়। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সেই যোগগুরু, সদ্গুরু।
প্রশ্নগুলো সাজালে দেখা যায় : ১. ব্রহ্ম কি ? কোন ব্রহ্ম জ্ঞেয় - সগুন না নির্গুণ ? ২. দেহকে অবলম্বন করে যিনি অবস্থান করছেন, সেই অধ্যাত্মের স্বরূপ কি ? চেতন না ভৌতিক ? জড়াত্মক না চেতনাত্মক ? ৩. কর্ম্ম কি ? বেদের মধ্যে উল্লেখিত যজ্ঞকর্ম্ম অর্থাৎ লৌকিক কর্ম্ম, যা দেবতাদের উদ্দেশ্য করা হয়ে থাকে, আবার বিষয়াদি কর্ম্ম, শরীর রক্ষার কর্ম্ম ইত্যাদি নানান কর্ম্ম আছে, এই সকল কর্ম্ম সন্মন্ধে আমাকে সময়রূপে অবহিত করো। ৪. আধিদৈব কি ? একি সেই ভর্গোদেবতাদের কথা ? নাকি বেদের দেবতাদের কথা ? ৫. অধিযজ্ঞ কি বা কে ? অর্থাৎ যজ্ঞের অধিপতি কে ? কার উদ্দেশ্য আমরা যজ্ঞকর্ম্ম করতে হয় ? ৬. সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ন প্রশ্ন হচ্ছে, মৃত্যুকালে সংযতপুরুষের কাছে তুমি কিভাবে জ্ঞেয় হও ? আমরা ধীরে ধীরে এই সব গুহ্যযোগবিদ্যার কথা শ্রী ভগবানের মুখে শুনবো।
-------------------
২৫.০৫.২০২২
যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃ
যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃ
শ্লোক :৮/ ৩
শ্রীভগবান উবাচ
অক্ষরং ব্রহ্ম পরমং স্বভাবঃ-অধ্যাত্মম-উচ্যতে
ভূত-ভাবউদ্ভবকরো বিসর্গঃ কর্ম্মসংজ্ঞিতঃ। (৮/৩)
শ্রীভগবান বলছেন,
পরম অক্ষরই ব্রহ্ম। স্বভাব অধ্যাত্ম বলে কথিত হয়। আর ভূতগণের উৎপত্তি ও বৃদ্ধি কারক সংসার কর্ম্মই কর্ম্ম নামে অবিহিত।
পন্ডিতেরা বেদকে দুই ভাবে ভাগ করেছেন। কর্ম্মকান্ড ও জ্ঞানকাণ্ড। এই জ্ঞানকাণ্ডের বিষয় হলো ব্রহ্ম বিষয়ক জ্ঞান। এই জ্ঞানকান্ডকেই আবার বলা হয় বেদান্ত। এই বেদান্তে আছে ব্রহ্মসূত্র। সূত্র হচ্ছে সংক্ষিপ্ত এবং দ্ব্যর্থহীন, আলোচ্য বিষয়ের সারাংশ। শ্রীমৎ ভগবৎগীতা একাধারে উপনিষদ, ব্রহ্মবিদ্যা আবার যোগশাস্ত্র। এখানে আছে ব্রহ্মবিদ্যা, ব্রহ্মকে জানার কৌশল, যোগক্রিয়া। ব্যবহারিক প্রয়োগবিধি। আমরা শ্রীগীতাকে যোগের দৃষ্টিতে দেখবার চেষ্টা করছি। কেননা শুধু নিরস জ্ঞান দিয়ে আমাদের কোনো লাভ হবে না। অন্ধভক্তি কোনো কাজের কথা নয়। ব্রহ্মজ্ঞান আমাদের ব্যবহারিক জীবনে কোনো উন্নতি এনে দিতে পারবে না, যদিনা আমরা ব্রহ্মকে নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করতে পারি। যোগক্রিয়া আমাদের ইহলোকে এমনকি পরলোকেও ব্যবহারিক প্রয়োজন মেটাবে, উভয় লোকেই আমাদের সমৃদ্ধির কারন হবে, এই উদ্দেশ্য নিয়েই আমরা শ্রীগীতার মধ্যে প্রবেশ করেছি ।
কূটস্থে আছেন চৈতন্য। যিনি স্বয়ং উৎপন্ন। ইনিই হৃষিকেশ। এই চৈতন্য আমাদের ইন্দ্রিয়সকলকে কর্ম্মক্ষম রেখেছে, ও স্ব-স্ব কার্য্যে নিযুক্ত রেখেছে। ইনিই সর্ব্ব কর্ম্মের কর্তা অর্থাৎ অধিযজ্ঞ পুরুষ। আর কুট-চৈতন্য যিনি সর্ব্ব ভূতের মধ্যে প্রবেশ করে আছেন বিষ্ণু। পঞ্চভূতময় বিশ্ব যাতে প্রবেশ করে আছে, তিনি বিষ্ণু । যিনি বিশ্ব ব্যাপিয়া আছেন, তিনি বিষ্ণু। তো এই বিষ্ণু আছেন বলে জীব ও জগৎ প্রকাশিত হচ্ছে।
এই শ্লোকে (৮/৩) তিনটে বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে ১. ব্রহ্ম ২. অধ্যাত্ম ৩. কর্ম্ম।
ব্রহ্ম : শব্দে ভগবান বলছেন, নিত্য, ও বিনাশরোহিত পরমবস্তু । এই ব্রহ্ম কথা আলোচনার সময় আমাদের তিনটি শব্দ খেয়াল রাখতে হবে, একটা হচ্ছে ব্রহ্মা, ব্রহ্ম আর একটা হচ্ছে পরব্রহ্ম। যিনি স্বীয় তেজঃ, জ্যোতিঃ বা দীপ্তি দ্বারা তমসাচ্ছন্ন দিগ্মণ্ডল আলোকিত করে, স্থাবর জঙ্গমাত্মক বিশ্বরূপে প্রকাশ পেয়েছেন, যিনি মনুষ্য ইত্যাদি বৃদ্ধি করেছেন, তাঁকেই ব্রহ্ম বলা হয়। সমস্ত জীবের মধ্যে যে শ্বাশ্বত শক্তি কাজ করছে, তাই ব্রহ্ম। আর এই শক্তিরহিত অবস্থায় রয়েছেন, পরব্রহ্ম। একজন ক্রিয়াশীল, আর একজন ক্রিয়ারহিত। অর্থাৎ পরব্রহ্মের সঙ্গে যখন শক্তি যোগ হচ্ছে, তখন তিনি ব্রহ্ম। পরব্রহ্ম একমাত্র অবিনাশী বস্তু যেখানে মায়ার প্রভাব নেই। হিন্দু শাস্ত্রে ব্রহ্মা বলতে চতুরানন বা চতুর্মুখী ব্রহ্মাকে বোঝায়। চতুর্মুখ অর্থাৎ সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি যুগের যিনি কর্ত্তা, স্রষ্টা তিনি ব্রহ্মা। সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডে একজন করে ব্রহ্মা আছেন। আর হাজার কোটি ব্রহ্মান্ডের হাজার কোটি ব্রহ্মা আছেন। এই ব্রহ্মার জন্ম মৃত্যু বা উৎপত্তি ও লয় আছে। হিন্দু শাস্ত্রে বলা হয়েছে বিষ্ণুর নাভি থেকে জন্ম হয়েছে, ব্রহ্মার।কিন্তু ব্রহ্মের জন্ম-মৃত্যু নেই। বেদে এঁকে পরম পুরুষ, বিরাট পুরুষ, পরমেশ্বর ইত্যাদি বলা হয়ে থাকে। ব্রহ্ম হচ্ছেন, বিশ্বাত্মা, আদি কারন, নিরালম্ব, নির্ব্বিকার। পরব্রহ্ম বলতে জগতের কারনেও কারন। অর্থাৎ সমস্ত তত্ত্বের আদি। জগৎ ব্রহ্ম, জগতের উর্দ্ধে যিনি তিনি পরব্রহ্ম। ব্রহ্ম সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে ইনি অনির্বচনীয়।
যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, তিনি নিত্য। অর্থাৎ আগেও ছিলেন, এখনো আছেন, আবার পরবর্তীতেও থাকবেন। আবার বলা হয়ে থাকেন, তিনি আছেন শুধু তাই নয়, তিনি ছাড়া কিছু নেই। তিনিই সমস্ত ব্যাপী আছেন। আমরা আগে শুনেছি, (৭/৭ শ্লোকে ) "ময়ি সর্ব্বমিদং প্রোতং সূত্রে মনিগণা ইব " । উপনিষদ বলছে, "সর্ব্বং খল্বিদং ব্রহ্ম"। আবার শ্রীগীতা বলছেন, বাসুদেবঃ সর্ব্বমিতি ( ৭/১৯)
ব্রহ্ম ও আত্মা সমার্থক শব্দ। বলা হয়ে থাকে আমাদের দেহ-ইন্দ্রিয়াদি থেকে পৃথক একটা সত্ত্বা আছে। যা আমাদের দেহ-ইন্দ্রিয়-মন ইত্যাদিকে সক্রিয় করে রেখেছে। এঁকে দেখা যায় না, শোনা যায় না, স্পর্শ করা করা যায় না। তথাপি বলা হয়, ইনি আছেন। আর অদ্ভুৎ ব্যাপার হচ্ছে, ইনি যে আছেন, তাঁকে সত্য বলে স্বীকার করেও, আমরা তাঁকে কেবলমাত্র শাস্ত্রবাক্য বলে স্বীকার করে থাকি। শাস্ত্র বাক্য অর্থাৎ শ্রুতি, দর্শন, ধর্ম্মশাস্ত্র ইত্যাদি। আর এই শাস্ত্র হচ্ছে আসলে আমাদের প্রাচীন মহাত্মা বা ঋষিপুরুষদের অনুভূতিলবদ্ধ জ্ঞান। এখন কথা হচ্ছে, যা আমাদের প্রাচীন ঋষিপুরুষদের অনুভূতি লব্ধ জ্ঞান, তা আমাদের অনুভূতিতে আসে না কেন ? তার কারন হচ্ছে, বিচার শক্তির তারতম্য। উপলব্ধি-শক্তির তারতম্য। আমাদের সবার মধ্যে একটা অহংবোধ আছে। এই যে আমি বোধ, এই আমিবোধ কে করছে ? এই আমি বোধ যিনি করছেন, তিনিই আত্মা বা ব্রহ্ম। তো ব্রহ্মজ্ঞানের ফলশ্রুতি হচ্ছে, স্বতন্ত্র অহংবোধ থেকে মুক্তি। কেননা, আত্মা অসীম, এই অসীমকে সীমার মধ্যে চিন্তা করাতেই আমাদের আমি বা অহংবোধের জন্ম হয়েছে। একেই বলে ভ্রান্তি বা মায়া।
এখন কথা হচ্ছে, ব্রহ্মের লক্ষণ কি, যাতে আমরা বুঝতে পারবো, ইনিই ব্রহ্ম। বলা হচ্ছে, যিনি এই জগতের কারন তিনিই ব্রহ্ম। একেই ব্রহ্মের তটস্থ লক্ষণ বলা হচ্ছে। আর কারন হচ্ছে, শাশ্বত এবং পরিবর্তনহীন। আবার বলা হচ্ছে, "সত্যং জ্ঞানম অনন্তং ব্রহ্ম" - সত্যিকারের জ্ঞান হচ্ছে অনন্ত ব্রহ্মজ্ঞান। অর্থাৎ ব্রহ্ম আদি-অন্তহীন, ব্রহ্মের এই লক্ষণকে বলা হচ্ছে স্বরূপ লক্ষণ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যা আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়, এমন বস্তুর সঙ্গে আমরা সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি না। এর জন্য আমাদের বুঝতে হবে বস্তু কখন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়। কার্য্য ও কারনে মধ্যে যখন সম্পর্ক স্থাপন হয়, তখন তা আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়। ঘটনা যখন ঘটে, অর্থাৎ কারন যখন কার্য্যে পরিণত হয়, তখন তা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। তার আগে ঘটনা সম্পর্কে আমাদের কোনো জ্ঞান উৎপন্ন হয় না। শুধু অনুমানের উপরে ভিত্তি করে, যে জ্ঞান বা ধারণা আমরা করতে পারি, তা বুদ্ধিমান ব্যক্তি কখনোই মেনে নিতে পারেন না। প্রতক্ষ্য অভিজ্ঞতার মূল্য অনেক বেশি। তবে, আমাদের শাস্ত্রবাক্য, সত্যদ্রষ্টা ঋষিদের প্রতক্ষ্য অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান, অর্থাৎ আপ্তবাক্যের উপরে বিশ্বাসের উপরে ভিত্তি করে, আমাদের এগুতে হবে। তৈত্তিরীয় উপনিষদ বলছেন, এই তত্ত্ব ধারণা করবার চেষ্টা করো যে, এই যে স্থুল দেহ, অন্ন বা খাদ্য, প্রাণবায়ু, মন, ইন্দ্রিয়াদি কোথা থেকে এসেছে ? এই তত্ত্ব ধারণা করবার চেষ্টা করো যে এই সকল বস্তু যেখান থেকে আসে, যাঁকে আশ্রয় করে থাকে, আবার যাতে ফিরে যায়, তিনিই ব্রহ্ম। দেখুন, ব্রহ্ম স্বতঃই বিরাজমান একটা সত্তা এবং যার অস্তিত্ত্বের প্রমান শুধু মানুষের চেষ্টার উপর নির্ভর করে না। এমনকি শাস্ত্রবাক্যের উপরেও নির্ভর করে না। ব্রহ্ম থেকেই শাস্ত্রসমূহের উৎপত্তি হয়েছে। শ্রুতি বলছেন, ঈশ্বর নিজের নিঃশ্বাস থেকে বেদের (জ্ঞানের) সৃষ্টি করেছেন। সেইজন্য ব্রহ্মকে সর্বজ্ঞ, এবং সর্ব্বশক্তিমান বলা হয়ে থাকে।
ব্রহ্ম আকাররহিত। আবার ব্রহ্ম আমাদের নিজস্ব আত্মা। এঁকে আপনি গ্রাহ্য বা অগ্রাহ্য কোনোটাই করতে পারেন না। ছান্দোগ্য উপনিষদে (৬.১৬.৩) বলছেন, "তৎ ত্বম অসি" - তুমিই সেই। কিন্তু আমরা বুঝতে পারি না। আসলে আমাদের সবার মধ্যে এমন একটা কিছু আছে, যা শুদ্ধ চৈতন্যস্বরূপ। যার থেকে সব কিছু আসে, যাঁকে আশ্রয় করে সব থাকে, আবার শেষে সব তাতেই লয় হয়ে যায়। বেদান্ত বলছে, সেই একই বহু হয়েছেন, কিন্তু এই বহু হওয়া সত্বেও, এঁর কোনো বিকার বা পরিবর্তন হয়নি। তিনি একই আছেন। এক একই আছেন, কেবল বহুরূপে প্রতিভাত হচ্ছেন মাত্র। চলবে। .........
--------------------
২৫.০৫.২০২২
যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃ
যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃ
শ্লোক :৮/ ৩ (পূর্ব্ব প্রকাশিতের পর)
শ্রীভগবান উবাচ
অক্ষরং ব্রহ্ম পরমং স্বভাবঃ-অধ্যাত্মম-উচ্যতে
ভূত-ভাবউদ্ভবকরো বিসর্গঃ কর্ম্মসংজ্ঞিতঃ। (৮/৩)
অধ্যাত্ম : অধি-আত্ম অর্থাৎ আত্মাতে বুদ্ধিকে স্থির রাখাকে বলে অধ্যাত্ম। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, স্বভাব অধ্যাত্ম বলে কথিত হয়। আচার্য্য শংকর বলছেন, সেই পরব্রহ্ম যখন দেহরূপ আত্মাকে আশ্রয় ক'রে, প্রত্যাগত্মা বা জীবরূপে প্রবৃত্ত হন, তখন তাকে বলে অধ্যাত্ম। ব্রহ্ম যখন ভোক্তাজীবরূপে অবস্থান করেন, তখন তাকে বলে "স্বভাব", একেই অধ্যাত্ম বলা হয়ে থাকে। এই অধ্যাত্ম বা জীবাত্মা ব্রহ্মের স্বরুপভূত। তিনি আত্মা রূপে থেকেও, যখন দেহকে অবলম্বন করে ভোক্তারূপে অবস্থান করেন, তখন তাকে জীব-ভাব বা অধ্যাত্ম বলা হয়ে থাকে।
কর্ম্ম : ভূতের উৎপত্তি ও বৃদ্ধিকারক ক্রিয়াকে বলা হচ্ছে কর্ম্ম। জীবের মধ্যে যে বহুধাশক্তি বিরাজ করছে, তাকে জাগিয়ে তোলার নামই কর্ম্ম। "ভূতভাব-উদ্ভব-করো বিসর্গঃ কর্ম্ম" । জীবশক্তির ব্যবহার বা ব্যয় থেকেই কর্ম্মের উৎপত্তি। তপঃসাধন ক্রিয়াকেই বলে কর্ম্ম। ভূতভাব বলতে আমরা জীবের উৎপত্তির কারণস্বরূপ ভূতকেও বুঝতে পারি। আবার ভুতভাব বলতে আমরা জীবসকলের অন্তরের ভাবকেও বুঝতে পারি। আসলে ভাবের প্রকাশই সৃষ্টি। জীবের মধ্যে যে দেবত্বভাব আছে, তার বিকাশ সাধনকেই বলা হয় কর্ম্ম। সমগ্র জাগতিক কর্ম্ম যদি আমাদের ভাবের প্রকাশ করতে না পারে, তবে তা কর্ম্ম বলে বিবেচিত হয় না। ত্যাগ অর্থাৎ শক্তিক্ষয় থেকেই কর্ম্মের উৎপত্তি। তো এই ত্যাগ যখন দেবতাদের (গুন্-সাধনের) উদ্দেশ্যে করা হয়, তখন তা যজ্ঞ।
বলা হয়ে থাকে জীবসৃষ্টির উদ্দেশ্য হচ্ছে, জগতের কল্যাণ সাধন। কিন্তু কেউ যদি কর্ম্ম নিজ উদ্দেশ্য এমনকি তপস্যার উদ্দেশ্য যদি যোগ-ঐশ্বর্য্য লাভের জন্য হয়, তবে সে কর্ম্মশক্তি ব্যয় নিষ্ফল হলো।
যে সাধনা বা কর্ম্ম দ্বারা নিজের মধ্যে ব্রহ্মদর্শন বা আত্মস্বরূপের দর্শন পাওয়া যায়, তাকেই বলে অধ্যাত্মসাধনা। যে সাধনা দ্দ্বারা আত্মাতে বুদ্ধি স্থির হয়, প্রাণ, মন স্থির হয়, সাম্ভাযবের উপলব্ধি হয়, তাকেই অধ্যাত্ম বলা হয়ে থাকে। এই ভাব ত্রিগুণের অতীতে অবস্থান করা। ইড়া-পিঙ্গলা-সুষুম্নার বাহিত হয়ে প্রাণবায়ু যখন আপনভাবে অবরুদ্ধ হয়, তখন ত্রিগুণের অতীতের অবস্থা হয়। আমরা শুনেছি, ব্রহ্ম সগুন ও নির্গুণ ভেদে দ্বিবিধ। প্রাণ যতক্ষন স্পন্দিত হতে থাকে ততক্ষন সগুন ভাব, আবার প্রাণ যখন স্পন্দনহীন হয়ে অবস্থান করে, তখন নির্গুণ ভাব। এই যে গুণাতীত অবস্থা সেখানে যেতে গেলে, আমরা যেখানে আছি, অর্থাৎ সগুন অবস্থা থেকেই নিজেকে উত্তোলন করতে হয়। প্রথমে ইড়া-পিঙ্গলা তারপরে সুষুম্না বাহিত হয়ে নিজেকে এই তিনের উর্দ্ধে যাত্রা করতে হয়। কঠোপনিষদে যমরাজ বলছেন, যিনি নচিকেত যজ্ঞ করেন, অর্থাৎ ইড়া-পিঙ্গলা-সুষুম্নার মধ্যে তপ্তবায়ুর অভ্যাস করেন, তিনি জন্ম-মৃত্যুর পারে চলে যান। যিনি এই অগ্নিবিদ্যার অর্থাৎ প্রাণ-অপান বায়ু ঘর্ষনের সাহায্যে অগ্নিকে উদ্দীপ্ত করেন, এইরূপ যোগী, মৃত্যুর আগেই মানসিক, দুর্বলতা ও অজ্ঞানতা জনিত সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্ত হন। সব মানসিক দুর্গতিকে অতিক্রমন করে তিনি স্বর্গসুখ ভোগ করেন এবং নিজেকে সেই বিরাট পুরুষের সাথে অভিন্নতা সম্পর্কে সদা সচেতন থাকেন। এই হচ্ছে যমরাজ প্রদত্ত অগ্নিবিদ্যা, যা তিনি নচিকেতাকে দান করেছিলেন।
আত্মার মধ্যে শান্ত প্রান যখন অশান্ত হয়ে ওঠে, গতিহীন প্রাণ যখন গতিপ্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ শ্বাসপ্রশ্বাসের ক্রিয়া শুরু হয়, তখন সৃষ্টি-স্থিতি-পোষণ কার্য্য শুরু হয়। একই বলে সংসার প্রবাহ। এইভাবকেই বলা হয় জীবভাব। যখন জীবভাব অধ্যাত্ম কর্ম্ম দ্বারা বিলোপ সাধন হয়, তখন সেই অনাদি এক অব্যক্ত ভাবে জীব মিলিত হয়। তখন আর বহুভাব থাকে না। একেই বলে অব্যক্তে আত্মবিসর্জন। একই কেউ বলেন, শিবভাব, কেউ বলেন ব্রহ্মভাব।
--------------------------
২৬.০৫.২০২২
যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃ
যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃ
শ্লোক :৮/ ৪
অধিভূতং ক্ষরো ভাবঃ পুরুষশ্চাধিদৈবতম
অধিযজ্ঞো-অহমেব-অত্র দেহে দেহভুতাং বর। (৮/৪)
হে সর্ব্বপ্রাণীশ্রেষ্ঠ, নশ্বর পদার্থ সমূহই অধিভূত। বিরাট পুরুষই দেবগনের অধিপতি অধিদৈব। এই দেহে অবস্থিত আমিই অধিযজ্ঞ। অর্থাৎ অন্তর্যামীরূপে যজ্ঞাদিকর্ম্ম-প্রবর্তক আমিই ।
অধি অর্থাৎ বুদ্ধি যখন আত্মাকে ছেড়ে দেহকে নিয়ে অভিভূত থাকে, আর এই স্থুল দেহকেই নিজের স্বরূপ বলে মনে করে, তখনই অধিভূত অবস্থা। পঞ্চভূত অর্থাৎ ক্ষিতি-অপ-তেজ-মরুৎ-ব্যোম যাদের সূক্ষ্মাবস্থা বা গুন্ হচ্ছে গন্ধ, রস, রূপ, স্পর্শ, শব্দ। এই পঞ্চভূতে যখন মন খেলা করে বেড়ায়, তখন তাকে "অধিভুত" ভাব বলা হয়ে থাকে।আত্মা যখন এই পঞ্চভূতের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, তখন এই জগৎ প্রপঞ্চ সৃষ্টি হয়। আর আত্মা তখন এই জগতে জীবরূপে নিজেকে বদ্ধ করে ফেলে। তো যাতে জড়িত হয়ে সে নিজেকে বদ্ধ করেছে, সেই পঞ্চভূতে বা পঞ্চ তত্ত্বে মনকে স্থির করে সাধন করতে হবে। এ যেন কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা। এই পঞ্চভূত অর্থাৎ মূলাধারে আছে ক্ষিতি, স্বাধিষ্ঠানে আছে অপ, মনিপুরে আছে তেজঃ, অনাহতে আছে মরুৎ, বিশুদ্ধে আছে ব্যোম। মনকে এই পঞ্চতত্ত্বের অতিক্রম করে আজ্ঞাচক্রে স্থির হতে হবে। এই স্থিরতার সাধনক্রিয়ার ফলে আসবে এই অক্ষর ভাব। একসময় যেমন সে পঞ্চতত্ত্বের দিকে মনকে নিবিষ্ট করেছিল, এখন সে অক্ষরের সাথে মিলিত হয়ে, একাত্ম হয়ে যাবে।
যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, বিরাট পুরুষই দেবগনের অধিপতি আধিদৈব। এই আধিদৈব ভাবই পুরুষভাব। পুরুষ অর্থাৎ দেহ নামক পুরে যিনি শয়ন করে থাকেন। সীমাহীন এই আকাশ। সেই আকাশকে দেহ নামক পুর বা নগরের মধ্যে আবদ্ধ করতে পারলে হয়, দেহপুর। এই দেহপুরে যে চিদাকাশ তাতে অবস্থান করছেন, চৈতন্যস্বরূপ সেই পরমপুরুষ। এঁকেই বলা হয় অধিদৈব। অনন্তে বিস্তৃত যে বস্তু তাঁকে যখন সীমায়িত স্থানে ঘনীভূত করা হয়, তখন তিনি রূপ পরিগ্রহ করেন। দেহপুরের মধ্যে তখন সেই চিৎশক্তির জ্যোতিঃরূপ দেখা যায়। একেই বলে অধিদৈব পুরুষ। এই অধিদৈব পুরুষ দেহের সর্বত্র বিরাজ করছেন। কিন্তু এই বিরাটপুরুষকে আজ্ঞাচক্রে একটি চক্রের আকারে সাধক দর্শন করে থেকেন। এই জ্যোতিসূর্য্যই সাধকের বরণীয় শক্তি। এই জ্যোতিশক্তি ওঙ্কারের ধ্বনির আশ্রয়ে থাকে। এই ওঙ্কারের উপাসনার ফলে, একটা মধুর রসের অনুভব হতে থাকে। তখন এই শরীর ওঙ্কার স্বরূপ বলে জ্ঞাত হয়। এই অবস্থায় স্থিতিই ব্রহ্মপদ লাভ। ইনিই আত্মজ্ঞ। শ্বাস যখন সুষুম্না হয়ে ব্রহ্মযোনিতে অর্থাৎ মস্তকে স্থির হয়, তখন তিনি মহেশ্বরী অর্থাৎ শিবশক্তির জ্ঞানসম্পন্ন হন। এই শক্তিই প্রকৃতির ব্রহ্মস্বরূপা। স্বয়ং ব্রহ্ম দুটি অবস্থা প্রাপ্ত হন। একটি পরিণামী, আর একটি অপরিণামী। একটি কূটস্থ আর একটি ক্ষরভাব। কুম্ভক অবস্থায়, এই ভাবের উদয় হয়।
সাধনার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সাধকের মধ্যে শান্তি, জ্ঞান, প্রতিষ্ঠা, ও নিবৃত্তির যোগ হয়। তখন আত্মানন্দের অনুভব দৃঢ় হয়। এই জ্যোতিস্বরূপ অগ্নিকেই কাল বলা হয়। এই কালেই সৃজন, (সূর্য যেমন বীজ থেকে অংকুরকে টেনে বার করে) এই কালেই সংহার (অর্থাৎ তেজশক্তি দ্বারা সমস্ত জগৎকে দহন করে উৎপত্তি স্থলে পাঠিয়ে দেয়) আবার এই কালেই স্থিতি (সূর্যশক্তিই জগৎকে প্রকাশমান করে রেখেছে) । সাধনক্রিয়ার উত্তম অবস্থায় আত্মাস্বরূপ শিব, আর প্রকৃতি স্বরূপ সতী সমান হয়ে যায়। অর্থাৎ দুইই ব্রহ্মে অবস্থান করেন।
কূটস্থে মন স্থির হলে, উত্তমপুরুষ বা পরমাত্মার দর্শন লাভ হয়। আকাশের মধ্যে অর্থাৎ চিদাকাশের মধ্যে মন-বুদ্ধি স্থির হলে যে অবস্থা হয়, তাকে বলে অধিদৈব। যোগশাস্ত্রে বলা হয়েছে, মেরুদণ্ড মধ্যে সুক্ষরূপে ইড়া-পিঙ্গলা-সুষুম্না এই তিন ক্রিয়াধারার তিন মুখ এক হয়ে গেলেই রথস্বরূপ যে কূটস্থ তাতে উত্তমপুরুষের দর্শন হয়ে থাকে। . এঁকেই বলা হয় নারায়ণ। সূর্যসিদ্ধান্ত অনুযায়ী মহাদেব অপমধ্যে বীজ রোপন করলেন, তা থেকে সোনার মতো অন্ড উৎপন্ন হলো, অন্ধকারে আবৃত অর্থাৎ যেখানে ইন্দ্রিয়ের প্রকাশ ঘটেনি, সেখানে সব নিরুদ্ধ অর্থাৎ ব্যোমাতীত অবস্থা থেকে ওঙ্কার ধ্বনি ব্যক্ত হলো। এই ওঙ্কার থেকেই অর্ধেক সোনার মতো ও বাকি অর্ধেক রুপার মতো অন্ড অর্থাৎ অগ্নির গোলক উৎপন্ন হলো। এই অগ্নিরগোলক হচ্ছে ব্রহ্মান্ড। প্রথম প্রকাশ বলেই একেই বলে আদিত্য।
কূটস্থে আছেন পরম-জ্যোতিস্বরূপ সবিতা। এই সবিতাই আত্মার রূপ। পুরুষ, অব্যক্ত, ও পঞ্চতত্ত্ব এই সাত-প্রকৃতি সেই অন্ডকে আবৃত করে রেখেছে। এক মহাদেব তার তিন রূপ। কূটস্থে সবিতা, ক্রিয়ার পরাবস্থায় দ্বিতীয় সবিতা, আর তৃতীয় সবিতা হচ্ছে পরমজ্যোতিঃস্বরূপ ব্রহ্ম। এই ব্রহ্ম জগতের জন্মাদির কারন স্বরূপ। এই পুরুষ থেকেই প্রাণ, মন, ইন্দ্রিয়, আকাশ, বায়ু, তেজ, জল, ও সর্ববস্তুর আধার (মূলাধার) এই পৃথিবীর উৎপন্ন হয়েছে। যিনি আদিত্যমন্ডলস্থ পুরুষ তিনিই আমি, ব্রহ্মসূত্র। ইনিই অধিযজ্ঞ পুরুষ (পুরুষত্তম)। এনাতে মন রেখে সমুদয় কর্ম্মে প্রবৃত্ত হবার নাম অধিযজ্ঞ ভাব। সর্ব্ব ভূতের মধ্যে এই অধিযজ্ঞ পুরুষ অনুপ্রবিষ্ট হয়ে আছেন। ইনিই আমাদের সমস্ত কর্ম্মফল দাতা। ইনিই বিষ্ণু। ইনিই যজ্ঞেশ্বর। ইনিই শ্রীগীতার প্রবক্তা।
----------------------
২৭.০৫.২০২২
যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃ
যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃ
শ্লোক :৮/ ৫
অন্তকালে চ মাবেব স্মরণ মুক্তবা কলেবরম
যঃ প্রয়াতি স মদ্ভাবং যাতি নাস্ত্যত্র সংশয়ঃ। (৮/৫)
অন্তকালেও যিনি আমাকেই স্মরণ করতে করতে দেহকলেবর ত্যাগ করে প্রয়াণ করেন, তিনি আমার স্বরূপতা প্রাপ্ত হন, এতে কোনো সংশয় নেই।
এর আগে আমরা অর্জ্জুনের মুখে প্রশ্ন শুনেছিলাম, প্রয়াণকালে তুমি কিভাবে জ্ঞেয় হও ? এরই উত্তরে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, এই জ্ঞানের উপায় হচ্ছে আমাকে স্মরণ আর আমাকে স্মরণের ফল হচ্ছে আমার ভাবপ্রাপ্ত হওয়া অর্থাৎ "মদ্ভাবপ্রাপ্তি" ।
ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষের মৃত্যু যন্ত্রনা হয় না। বলা হয়ে থাকে এঁরা দেহে থাকতেই মুক্ত হয়ে যান। দেখুন সামাজিক বিয়েতে কন্যা বাপের বাড়ি ছাড়বার সময় কান্নাকাটি করে। পরিচিত আত্মীয়স্বজন, সুরক্ষার বলয় ছেড়ে যেতে গিয়ে তার মধ্যে একটা শূন্যতার সৃষ্টি হয়। আবার নতুন অজানা জায়গা সম্পর্কে আশঙ্কাজনিত ভীতি তৈরী হয় । ফলে কন্যা তার বাপের বাড়ি চিরকাল থাকা যাবে না জেনেও, যাবার সময় বারবার পিছন ফিরে চায়, কান্নাকাটি করে । কিন্তু আজকাল পূর্ব্ব-পরিচয়ের সূত্র ধরে, যখন স্বামীর সঙ্গে মেয়ে বাপের বাড়ি ছাড়ে, তখন তার মধ্যে কোনো ভীতি কাজ করে না। এমনকি সে ভাবি স্বামীর সঙ্গে বাপের বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। কারন নতুন শশুর বাড়ি তার কাছে অপরিচিত নয়। এখানে সে বারবার বিয়ের আগেই এসেছে। এখানকার লোকজন সম্পর্কে তার সম্যক ধারণা আছে। তো সাধনার পরাবস্থায় পৌঁছতে গেলে, আমাদের স্থুল দেহ থেকে সূক্ষ্ম দেহে বারবার আসাযাওয়া করতে হয়। ফলে একসময় যখন আমাদের প্রকৃতির নিয়মে এই স্থুল দেহ ছেড়ে যেতে হয়, তখন স্থুল দেহ ছাড়বার জন্য, তার মধ্যে কোনো কষ্টের অনুভব হয় না। তো সাধারনের মৃত্যু আর ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষের মৃত্যুর মধ্যে এখানেই পার্থক্য। এখন কথা হচ্ছে সবাই তো আর যোগী পুরুষ নন, সবাই ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষও নন। তো তাদের গতি কি হবে ? এইখানে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একটা মোক্ষম উপায়ের কথা বলেছেন, আর তা হচ্ছে, স্মরণ-অভ্যাস। আপনি শুধু ভগবানের স্মরণ করুন। ভগবান বলছেন, এই স্মরণ অভ্যাসই যদি অন্তিমকাল পর্যন্ত বজায় থাকে, তবে তিনি এই স্মরণ অভ্যাস স্বরূপ মদ্ভাব প্রাপ্ত হবেন। অর্থাৎ সেই সাধকের মন আত্মস্বরূপে লিন হয়ে যাবে।
যাঁরা যোগক্রিয়া অভ্যাস করেন, তাঁদের প্রায় প্রত্যেকেই এই অনুভব করতে পারেন। সাধক যখন মনকে নিয়ে মূলাধার থেকে ধীরে ধীরে আজ্ঞাচক্রে যাতায়াত করেন, তখন মনে অন্য কোনো বিষয় চিন্তার উদয় হয় না। তখন কেবল কূটস্থের চিন্তা হতে থাকে। আর মনে অন্য চিন্তার উদয় না হলে, মন আত্মস্থ হয়। আর এই অবস্থায় যদি প্রাণের উৎক্রমন ঘটে, তখন মন সেই আত্মাতেই স্থিত থাকে, অর্থাৎ মোক্ষলাভ ঘটে। আমরা লক্ষ করেছি, হিন্দু সমাজে কারুর মৃত্যু আসন্ন হলে, তাকে ভগবানের নাম শোনায়। যতক্ষন জ্ঞান থাকে, এবং মন যদি সেই ভগবৎ নামের শ্রবণ মনন করেন, তবে তাতে হয়তো কিছু লাভ হয়। কিন্তু যিনি নিত্যসাধন জগতে বিচরণ করেন, ভগবত অর্পিত চিত্ত যাঁর, সেই সাধকের মৃত্যুকালেও জ্ঞানত ভগবৎ চিন্তনের মধ্যে সময় অতিবাহিত করেন। এইসময় ভগবত ভক্তের দেহে ক্লেশের উদয় হলেও, তা তার মনকে ভগবৎ চিন্তন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। তার মনের মধ্যে কোনো বিক্ষেপের সৃষ্ট হয় না।
আত্মার স্থান হচ্ছে হৃদয়। মৃত্যুকালে হৃদয়ের মধ্যে একটা জ্বলন শুরু হয়। এই জ্বলন থেকে একটা দীপ্তি দেখা দেয়। এই দীপশিখা হৃদয় থেকে চক্ষু,-ওষ্ঠ-মুর্দ্ধা ইত্যাদি থেকে প্রাণকে সঙ্গে নিয়ে উৎক্রমন করে। তো যার হৃদয়ে তত্ত্বজ্ঞানরূপ পরমবিদ্যা ধারণ করা আছে, সেই জ্ঞানের প্রভাবে সে যোগবিভূতি স্বরূপ অনুস্মৃতি তাঁকে ব্রহ্মমুখী করে তোলে। পরমাত্মভাব প্রাপ্তি হয়। হৃদয়ে স্থিত পরমাত্মার অনুগ্রহে হৃদয় স্থিত নাড়ী সকলের মধ্যে যে নাড়ী উর্দ্ধমুখী সেই উর্দ্ধমুখী নাড়ী পথ ধরে, উদান বায়ু সহযোগে উর্দ্ধে গমন করে। উদান বায়ুর দ্বারা যোগীপুরুষ ব্রহ্মলোকে গমন করেন। সাধারণ মানুষ এই মৃত্যুলোকেই ঘুরতে থাকে। যে আলোকরশ্মি এই উদানবায়ুকে উর্দ্ধমুখী করে, তার তেজসমূহের উপরে নির্ভর করে জীবাত্মা কতদূর গিয়ে নিঃসঙ্গ হবে, বা কোথায় স্থিত হবে ।
-------------------------
২৭.০৫.২০২২
যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃ
যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃ
শ্লোক :৮/ ৬
যং যং বাপি স্মরণ ভাবং ত্যজতি-অন্তে কলেবরম
তং তমেবৈতি কৌন্তেয় সদা তদ্ভাবভাবিতঃ। (৮/৬)
হে কুন্তীপুত্র, মৃত্যুকালে যে যেভাব স্মরণপূর্ব্বক দেহত্যাগ করে, সে সর্ব্বদা সেইভাবে তন্মেচিত থাকায়, সেই ভাবই প্রাপ্ত হয়।
আমাদের সবার ভাবের জগৎ আলাদা আলাদা। আর এই ভাব থেকেই আমাদের কর্ম্মের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। আর কর্ম্ম আলাদা হলে আমাদের কর্ম্মফলের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। এমনকি আমরা যে দেহ প্রাপ্ত হয়েছি, তা আমাদের ভাবের ফল। মানুষের মধ্যে যে ভিন্নতা লক্ষিত হয়, তা তার ভাবের ফল। আর ভাবের ফলেই আমাদের শরীরে ভিন্ন ভিন্ন রসের নিঃসরণ হয়। যিনি ক্রূর স্বভাবের তার দেহ-মন-ইন্দ্রিয় একপ্রকার। আবার যিনি সহানুভূতিশীল, তার দেহ-মন-ইন্দ্রিয়ের গঠন আলাদা। এই পার্থক্য আমাদের সাধারনের বোধের বাইরে হলেও, সূক্ষ্মদর্শী মহাত্মাগণের দৃষ্টিতে এগুলো ধরা পড়ে । আবার আমাদের ভাবনার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শরীরের পরিবর্তন হয়, ভিন্ন মাত্রায় রস নিঃসরণ শুরু হয়। এগুলো আমরা বাইরে থেকে বুঝতে না পারলেও, আমাদের নিজেদের মধ্যে যে পরিবর্তন হচ্ছে, তা আমরা নিজেরা অনেক সময় ধরতে পারি। এমনকি ধীরে ধীরে আমাদের বাইরের আকৃতির মধ্যেও এই পরিবর্তন লক্ষিত হয়। তো প্রথমে নিজের অন্তঃকরণে পরিবর্তন হয়, তার পরে তার প্রভাব আমাদের শরীরের মধ্যে লক্ষিত হয়। এই পরির্তন আমরা প্রতিনিয়ত লক্ষ করে থাকি। একটা ছেলে চাকরি পাবার আগে ও পরের দেহের মধ্যে পার্থক্য লক্ষিত হয়। একটা মানুষ যখন আধ্যাত্মিক অনুশীলন শুরু করে তখন তার দেহে-চোখ-মুখের মধ্যে একটা পার্থক্য লক্ষিত হয়। একটা মানুষ যখন রেগে যায়, তখন তার চোখে মুখে পরিবর্তন লক্ষিত হয়। তো আমাদের ভাবের সঙ্গে আমাদের এই স্থূল শরীরের কোথায় যেন একটা যোগসূত্র আছে। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, মৃত্যুকালে যার যে ভাব, মৃত্যুর পরে, সে সেই ভাবের জগতে বাস করে। অর্থাৎ সেই অনুযায়ী তার দেহ ও লোক প্রাপ্তি ঘটে। মহাত্মাগণ বলে থাকেন, আমাদের জীবিত অবস্থায় যে কর্ম্মসংস্কার বা ভাবের মধ্যে অবস্থান করি মৃত্যুর পরে, আমরা সেই মতো সূক্ষ্ম দেহপ্রাপ্ত হয়ে থাকি। জীবিতকালে আমাদের এই ভাবের পরিবর্তন হতে পারে, পুরুষকারের প্রয়োগে আমরা আমাদের পরিবর্তন করে নিতে পারি, কিন্তু স্থূল দেহ ত্যাগের পরে, আমরা আর আমাদের এই ভাবের পরিবর্তন করতে পারি না। মৃত্যুকালে আমরা যে দেহ ত্যাগ করছি, সেই দেহে আর আমরা ফিরে আসতে পারি না, কিন্তু মৃত্যুকালে আমাদের যে ভাব থাকে সেই ভাবের সঙ্গে আমরা সূক্ষ্ম দেহে স্থায়ীভাবে অবস্থান করে থাকি। জন্ম-মৃত্যুর চক্রে যারা আবদ্ধ তারা মৃত্যুর পরে, মনোময় সূক্ষ্ম দেহে অবস্থান করে। মৃত্যুর পরে, পরলোকে কিছুকাল থাকবার পরে, যখন নতুন দেহ গ্রহণের সময় হয়, তখন কর্ম্মের অনুরূপ ভোগায়তন স্থূল দেহ, ওই মনোময় সূক্ষ্ম দেহের অনুরূপ ভাবেই রচিত হয়। এই ঈশ্বর-বিধানের কখনো অন্যথা হয় না। নদী যেমন সমুদ্রে কাছে কাছে গেলে, তার গতি বেড়ে যায়, তেমনি মৃত্যুকালে আমাদের মনের মধ্যে চিন্তার স্রোত ভীষণভাবে বেড়ে যায়। ফলত চিন্তার স্রোতে উথালপাথাল চলতে থাকে। চিত্তের ব্যাকুলতা হেতু, ভাবনার মধ্যে কোনো শৃঙ্খলা থাকে না। ধীরে ধীরে একসময় ইন্দ্রিয়শক্তির লোপ পায়। একসময় চেতন মনের চিন্তা শক্তিও লোপ পায়। এইসময় মনের মধ্যে পূর্ব্বকৃত কর্ম্মের অনুস্মরন হতে থাকে। অর্থাৎ তখন আমাদের অবচেতন মন কাজ করে। তখন অবশভাবে এইচিন্তাগুলোর মূর্তি দর্শন হতে থাকে। আর এই চিন্তামূর্তির মধ্যে আমরা তন্ময় হয়ে যাই। ধীরে ধীরে আমরা এই চিন্তা মূর্তিতেই পরিণত হয়ে যাই। বেঁচে থাকতে আমরা যেমন দেহসর্বস্য অবস্থায় থাকি, তেমনি মৃত্যুর পরে আমরা আমাদের চিন্তা প্রসূত মূর্তিতেই অবস্থান করে থাকি।
ইশ উপনিষদে বলা হচ্ছে, পরিবর্তনশীল এই জগতে সবকিছুর পরিবর্তন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তথাপি সবকিছুই পরমেশ্বর দ্বারা আবৃত। আত্মজ্ঞান অর্জনে উদাসীন ব্যক্তি মৃত্যুর পরে, সূর্যহীন (অসুর) অন্ধকারের জগতে প্রবেশ করে। যারা যান্ত্রিকভাবে যজ্ঞাদি কর্ম্ম (অবিদ্যা) তার অন্ধকার জগতে প্রবেশ করেন। কিন্তু যারা শুধু দেবদেবীর উপাসনা করেন, (বিদ্যা) তারা আরো গভীর অন্ধকারে প্রবেশ করেন। কিন্তু যিনি বিদ্যা (উপাসনা) ও অবিদ্যা (কর্ম্ম) উভয়ের উপাসনা করেন তিনি অবিদ্যা দ্বারা অমরত্ব লাভ করেন, আবার বিদ্যার দ্বারা আনন্দ লাভ করেন। যারা অব্যক্ত অবস্থা অর্থাৎ জগতের কারন অবস্থার উপাসনা করেন, তারা অন্ধের মতো অন্ধকারে প্রবেশ করেন। কিন্তু যারা ব্যক্তকে উপাসনা করেন, তারা আরো গভীর অন্ধকারে প্রবেশ করেন। কিন্তু যাঁরা উভয়ের অর্থাৎ ব্যক্ত ও অব্যক্ত একসঙ্গে উভয়ের উপাসনা করেন, তাঁরা অব্যক্তের দ্বারা অমরত্ত্ব লাভ করেন, আবার ব্যাক্তের উপাসনার দ্বারা মৃত্যুকে জয় করেন।
মৃত্যু আসন্ন কালে ইশ উপনিষদ একটা শক্তিশালী প্রার্থনা মন্ত্রের সন্ধান দিয়েছেন।
"বায়ুরনিলমমৃতথেদং ভষ্মান্তং শারীরম
ওঁ ক্রতো স্মর কৃতং স্মর ক্রতো স্মর কৃতং স্মর (১৭)
এখন সেই মৃত্যু আসন্নপ্রায়। সেইহেতু আমি প্রার্থনা করছি, আমার প্রাণবায়ু মহাবাযুতে অর্থাৎ বিশ্বপ্রাণে মিলিত হোক। আমার এই স্থুল শরীর ভস্মিভূত হোক। হে আমার মন স্মরণীয়কে স্মরণ করো, জীবনে যাকিছু করেছো তা স্মরণ করো, বারবার স্মরণ করো।
মৃত্যু আসন্ন হলে, আমাদের মনে হাজার-এক চিন্তা এসে ভিড় করে। আমরা সারাজীবন যেভাবে কাটিয়েছি আমাদের চিন্তার মধ্যে সেইসবই ফিরে ফিরে আসে। এই সময় আমাদের বিশেষভাবে চেষ্টা করা উচিত, যাতে কেবল শুভ চিন্তাই আমরা করতে পারি। আমরা যা চিন্তা করবো, আমরা তাই হয়ে যাবো। আমাদের চিন্তাই আমাদের সৃষ্টি করে থাকে। এই নিয়মের অন্যথা হতে পারে না। এই কারনে বারবার চেষ্টা করতে হয়, যাতে মন শুধু ভালো চিন্তাই করি ।
ইশ উপনিষদ-এর উপদেশ মতো প্রার্থনা হচ্ছে, হে অগ্নি, যা হিতকর তা লাভের জন্য অনুগ্রহ করে আমাদের সুপথে চালিত করো। হে দেব, আমাদের সমস্ত কৃতকর্ম্ম ও চিন্তা তুমি জানো। আমাদের মধ্যে যাকিছু অশুভ, অনুগ্রহ করে তা দূর করো। আমরা তোমাকে বারবার প্রণাম করি।
এইসব কথাগুলো বোঝা যায়, মৃত্যুকালে অর্থাৎ কিছুক্ষন পরেই যার স্থুলদেহ ভস্মিভূত হবে, তখন সারাজীবনের কৃতকর্ম্মের প্রতিচ্ছবি আমাদের মনের মধ্যে ভেসে ওঠে। আর এই যে স্মরণ, এই স্মরণই আমাদের পরবর্তী দেহ প্রাপ্ত করে দেবে। লিঙ্গশরীরে জীবের শুভ-অশুভ সমস্ত কর্ম্ম সংস্কার নিহিত থাকে। পরবর্তী যে দেহ হবে, তা এই ভোগ সম্পাদনের জন্য উপযুক্ত হবে। তো যার মন সাধনক্রিয়ার ফলে আত্মার সঙ্গে তন্ময় হয়ে যায়, তার মন তখন যে আত্মারাম হবে, এতে কোনো সন্দেহ করা উচিত নয়। তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যং যং বাপি স্মরণ ভাবং ত্যজতি-অন্তে কলেবরম। তং তমেবৈতি কৌন্তেয় সদা তদ্ভাবভাবিতঃ। (৮/৬) হে কুন্তীপুত্র, মৃত্যুকালে যে যেভাব স্মরণপূর্ব্বক দেহত্যাগ করে, সে সর্ব্বদা সেইভাবে তন্মেচিত থাকায়, সেই ভাবই প্রাপ্ত হয়।
---------------------------------
২৮.০৫.২০২২
যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃ
শ্লোক :৮/ ৭
তস্মাৎ সর্ব্বেষু কালেষু মাং-অনুস্মর যুধ্য চ
ময়ি-অর্পিত-মনবুদ্ধি মাম-এব এষ্যসি-অসংশয়ঃ।
অতএব, সর্বদা আমাকে অনুস্মরণ করো ও যুদ্ধ করো। আমাতে মন-বুদ্ধি অর্পণ ক'রে, আমাকেই নিশ্চয়ই প্রাপ্ত হবে।
শ্রীভগবান বলছেন, সর্বদা আমাকে চিন্তা করো। কিন্তু কথা হচ্ছে আমরা চাইলেই সর্বদা ভগবানের স্মরণ করতে পারবো, এমনটা নয়। আমাদের মন বিষয়মুখী, আমরা সংসার চিন্তায় মগ্ন, জাগতিক বস্তুর চিন্তা করেই কুলকিনারা করতে পারি না। আমরা সর্বদা সংসার যাতনায় জর্জরিত। এখান থেকে বেরুবো কি করে ? ভগবান বলছেন, যুদ্ধ করো। অর্থাৎ চিত্ত শুদ্ধ না হলে তার স্মরণ আমাদের মধ্যে আসবে না। এই চিত্ত শুদ্ধি করবার জন্য, আমাদের নিরন্তর সংগ্রাম করতে হবে, যুদ্ধ করতে হবে। সংকল্প যখন দৃঢ় হবে, সাধন ক্রিয়ায় যখন গভীর নিষ্ঠা আসবে, সমস্ত কর্ম্ম যখন তাঁরই উদ্দেশ্য নিবেদিত হবে, তখন আমরা সতত তাঁর স্মরণে থাকতে পারবো। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
মৃত্যুকালে একখানা শ্রীমদ্ভগবৎ গীতা বুকের উপরে শুইয়ে দিয়ে লাভ নেই। সারা জীবন শুধু গীতার উপরে জল-তুলসী আর অং বং করেও কোনো লাভ নেই। শ্রী গীতার শ্লোক মুখস্ত করেও কোনো লাভ নেই। দরকার যেটা আপনার সাধ্যের মধ্যে শ্রীগীতার বাক্য অনুসারে সাধন কর্ম্মে নিজেকে নিয়োজিত করা। দেহ থাকতে সাধন করো। মৃত্যু পর্যন্ত তাঁরই স্মরণে থাকো। তবে মৃত্যুর সময় সহস্র শারীরিক কষ্ট তোমাকে তোমার অভ্যাস থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারবে না। তবে একথা ঠিক যার মনের মধ্যে শুদ্ধতা আসে নি, যার মধ্যে সত্যকে উপলব্ধি করবার ক্ষমতা জন্মায় নি, মন যার বিক্ষিপ্ত তার স্মরণে স্মরণীয় আসেন না। আমাদের কর্ম্ম হোক ভগবত অর্পিত। কেটে যাক মনের ময়লা। আমাদের পূর্ব্ব-পূর্ব্ব জীবনের কর্ম্মফল আমাদের মধ্যে সংস্কার আকারে রয়ে গেছে। সেই সংস্কার আমাদের ভগবত স্মরণ-কাজে বাধা সৃষ্টি করবে। এইখানেই আমাদের পুরুষকারের (ক্ষত্রিয়শক্তি বা তেজশক্তি) প্রয়োগ আবশ্যক। আমাদের মধ্যে যে অশুভ সংষ্কারযুগ যুগ ধরে জমে আছে, তার নিরসন করতে হবে, নতুন নতুন শুভ সংস্কারের জন্ম দিতে হবে। সাধন যুদ্ধ থেকে কখনো বিরত হয়ো না। আমাদের সাধনযুদ্ধ দ্বারা আমাদের প্রতিপক্ষ বাসনারাজীকে পরাজিত করতে হবে। সাধনসংগ্রাম থেকে কখনো বিমুখ হয়ো না। মনকে গুরুমুখী করে সাধনায় রত থাকো। যার মন সদা আত্মস্থ থাকে, তার আর কোনো সংস্কার থাকে না। এক অখন্ড আত্মসত্ত্বারমধ্যে সে ডুবে থাকে। তখন মন আর বুদ্ধির মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। তখন সমস্ত কিছুই আত্মায় স্থিত। একেই বলে আত্মসমর্পন। এই আত্মসমর্পনের ভাব যত দৃঢ় হতে থাকে, তত তার কাছে ভূত-ভবিষ্যৎ বর্তমান সব একাকার হয়ে যায়। তখন জগতের ভিন্নতা তাকে বিড়ম্বনায় ফেলতে পারে না। দৃষ্টি তখন থাকে কেবল অন্তরের দিকে। প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়া তখন স্বয়ংকে জানান দেয়। সর্ব্বকালের উর্দ্ধে অবস্থান হয় - একেই বলে জীবন্মুক্ত অবস্থা।
জোর করে কিছু হয় না, আবার জোর না করলেও কিছু হয় না। প্রথম দিকে পুরুষকারের প্রয়োগে স্মরণ-মনন আয়ত্ত্বে আনতে হয়। একসময় মন আপনা থেকেই সংসার ছেড়ে ভগবানের পায়ে লুটিয়ে পড়ে । এর জন্য তখন আলাদা করে আর কিছু করতে হয় না। তখন ভগবান ছাড়া আর কিছুই ভালো লাগে না। কর্ম্ম হয় স্বতঃস্ফূর্ত, কর্ম্মফলে কোনো ভ্রূক্ষেপ থাকে না। এই অবস্থায় যতক্ষন না পৌঁছানো যাচ্ছে, ততক্ষন "আমি-আমার" ভাব থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নিজের মধ্যে যে ক্ষত্রিয় তেজ আছে, তাকে প্রজ্বলিত করতে হবে। সাধনযুদ্ধ থেকে নিবৃত্তি নয়, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন নয়, যুদ্ধ করতে করতে যদি দেহপাত হয়েও যায়, তথাপি সাধণরত থাকতে হবে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টার যেন ত্রুটি না হয়।
এখন কথা হচ্ছে, এই সাধন কার সাহায্যে করতে হবে। সাধন করতে হবে গুরুদেবের সাথে। সাধন করতে হবে প্রাণের সাথে। সাধন করতে হবে মনের সাহায্যে। মনে রাখবে, যিনি অক্ষর ব্রহ্ম, তিনিই প্রাণ, তিনিই মন, তিনিই বাক, তিনিই অমৃত স্বরূপ। মনকে এই বাক-প্রাণের সাহায্যে ব্রহ্মে সমাহিত করতে হবে।
মুন্ডাকে উপনিষদ বলছেন, (২/২/২-৩) : উপনিষদের বাণী বা প্রণবের বাণী যেন একটা বিরাট ধনুক, আর জীবাত্মা এই ধনুকের শর। ধ্যানের দ্বারা এই শরকে শাণিত করো। এরপর সবলে, ধনুকের জ্যা আকর্ষণ করে, অর্থাৎ পার্থিব বিষয় থেকে মনকে নিবৃত্ত করে, সেই মনকে তোমার লক্ষে অর্থাৎ ব্রহ্মে স্থির করো। তারপর সেই মনের দ্বারা ব্রহ্মকে বিদ্ধ করো। অখন্ড মনোযোগের সঙ্গে শরনিক্ষেপ করতে হবে অর্থাৎ ব্রহ্মচিন্তায় শরটি যেন তন্ময় থাকে। জীবাত্মা তখন ব্রহ্মের সাথে এক হয়ে যাবে।
ভগবান বলছেন, এইভাবে মনকে যুক্ত করে দিতে হবে। এই সংযোগের চেষ্টা দ্বারাই ভূতশুদ্ধি হয়ে যাবে। আর ভূতশুদ্ধি হলে তখন সমস্তই ব্রহ্মময় হয়ে যাবে। এই অবস্থাতে তুমি সন্দেহাতীত ভাবে আমাকে প্রাপ্ত হবে অর্থাৎ তখন আর "তুমি" বলে কিছু থাকবে না।
--------------------
০২.০৬.২০২২
যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃ
শ্লোক :৮/ ৮
অভ্যাসযোগযুক্তেন চেতসা নান্যগামিনা
পরমং পুরুষং দিব্যং যাতি পার্থ-অনুচিন্তয়ন। (৮/৮)
হে পার্থ, অভ্যাস যোগের দ্বারা অর্থাৎ চিত্তকে অন্য বিষয়ে যেতে না দিয়ে নিরন্তর অভ্যাসের দ্বারা চিন্তাকে স্থির করে, সেই দিব্য পরমপুরুষের ধ্যান করতে থাকলে সাধক তাকেই প্রাপ্ত হন।
"অভ্যাসযোগযুক্তেন" অর্থাৎ অভ্যাস যোগের সাথে যুক্ত থেকে। আমরা অভ্যাস বলতে বুঝি একই বিষয়ে বারবার ধ্যান দেওয়া। বা একই কাজ করবার পুনঃপুনঃ প্রয়াস। এখানে এই কাজ হচ্ছে ঈশ্বরচিন্তন। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, ১) চিত্তকে অন্য বিষয়ে যেতে না দেওয়া। ২) নিরন্তর পরমপুরুষ চিন্তন বা ধ্যান। এই দুয়ের অভ্যাস একসাথে চালিয়ে যেতে হবে। তো যার চিত্ত বহির্মুখী নয়, সে স্বাভাবিক ভাবে অন্তর্মুখীন হবেন। এই অন্তর্মুখীন ভাব একদিনে আয়ত্ত্বে আসে না। নিরন্তর চেষ্টার ফলে এই অবস্থা প্রাপ্ত হওয়া যায়। ধ্যানের আগে আমাদের ধারণা করতে হবে। এই ধারণায় স্থির থাকতে গেলে, বারবার আমাদের প্রত্যাহার করতে হয়। এই প্রত্যাহার ক্রিয়া যখন আমাদের আদতে পরিণত হয়ে যায়, তখন নিজের অজ্ঞাতসারেই মন ইষ্টে স্থির হয়।
আমাদের প্রত্যেকের, এমনকি প্রত্যেকে জীবসকলের একটা স্বাভাবিক রুচি আছে। স্বাভাবিক ভাবেই আমরা সেই রুচি অনুযায়ী বিষয়ের দিকে ধাবিত হই। কেউ মন্দিরের শিল্পশৈলী দেখে, কেউ মন্দিরের মধ্যে মৃত্তিকার মূর্তি দেখে, কারুর দৃষ্টি চলে যায় মন্দিরের কাঁচড়ার দিকে। কারুর নজর মন্দিরের দান পাত্রের দিকে। এই একই মন্দিরের মধ্যে যেমন ইট-কাঠ-পাথর আছে, তেমনি আছে ঈশ্বরের ঐশ্বর্য্য। এই ঐশ্বর্য্য আমাদের ধ্যানাবিষ্ট করে দেয়। পার্থিব জগৎ থেকে আমাদের অপার্থিব জগতে নিয়ে যায়। কিন্তু চঞ্চল মন আমাদের ওই ঈশ্বরের ঐশ্বর্যের দিকে ধাবিত না হয়ে, জাগতিক বস্তুর দিকে অর্থাৎ বহির্মুখী হয়ে সদা বিক্ষিপ্ত আচরণ করে থাকে। এই চঞ্চল মনকে বসে আনবার কৌশল হচ্ছে অভ্যসযোগ । ধীরে ধীরে মনকে বাহির থেকে অন্তরের যাত্রী করে তুলতে হয়। খারাপ অভ্যাস আমরা খুব তাড়াতাড়ি রপ্ত করে নিতে পারি, কিন্তু ভালো অভ্যাস রপ্ত করতে আমাদের সদা সচেতন থাকতে হয়। চেতন মনকে কাজে লাগিয়ে অবচেতন মনের সংস্কারকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। চোখ খুলতেই আমরা বহির্বিশ্বকে দেখতে পাই, কান তো আমাদের খোলাই থাকে, কোনো প্রয়াস ছাড়াই জাগতিক শব্দভান্ডার আমাদের শ্রুতিগোচর হয়। মনও এইসবের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু এই মনকে আমরা একটু চেষ্টা করলেই, সেই অনন্ত ঈশ্বরমুখী করতে পারি। আর তার জন্য দরকার একটু প্রয়াস। নিরন্তর প্রয়াসই আসলে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কথিত অভ্যাসযোগ। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, অভ্যাসযোগের দ্বারা চিত্তকে স্থির করে পরমপুরুষ ধ্যান করতে থাকলে সাধক সেই পরমপুরুষকেই প্রাপ্ত হতে পারে। অর্থাৎ ধ্যানের বিষয়কে প্রাপ্ত হতে পারবে।
এই পরমপুরুষ বা ধ্যেয় বস্তু ব্যাপারটা একটু বোঝার চেষ্টা করি। দেখুন পরমপুরুষ সম্পর্কে আমাদের কোনো পূর্ব্ব ধারণা নেই। আর যদি কেউ ধারণা করেও থাকেন, তা তার কল্পনা প্রসূত। কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নাও থাকতে পারে। এইজন্য দরকার গুরুপ্রদত্ত ধারণা। এবং এই গুরুপ্রদত্ত ধারণায় শ্রদ্ধা-বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়। কেননা গুরুদেব এই পরমপুরুষকে প্রতক্ষ্য করেছেন। তাঁর এই সম্পর্কে অপরোক্ষ জ্ঞান আছে। এখন ধ্যানে বসলে, আমাদের মুদ্রিত চক্ষুর সামনে অনেক বিচিত্র বর্ণের দর্শন মেলে। বিচিত্র দৃশ্যের অবতারণা হয়। বিচিত্র মূর্তি দর্শন হয়। একসময় অগ্নিস্বরূপ জ্যোতির দর্শন হয়। মনের একাগ্রতা বৃদ্ধি হলে, এই জ্যোতির মধ্যে একটা কৃষ্ণবর্ণের বিন্দুর দর্শন হয়। ব্যোমের মধ্যে আদিত্য, আদিত্যের মধ্যে কৃষ্ণবিন্দু, এবং নক্ষত্রের দর্শন মেলে। এই নক্ষত্রের মধ্যে একসময় অন্ধকার গুহার দর্শন পাওয়া যায়। এই গুহার মধ্যে আবার জ্যোতি, ও জ্যোতির মধ্যে কূটস্থ এবং কূটস্থের মধ্যে পরমপুরুষ বা উত্তমপুরুষের দেখা পাওয়া যায়। এই কূটস্থের মধ্যে অনেক দেবদেবীর দেখাও পাওয়া যায়। এই যে ব্যোমের মধ্যে বিভিন্ন মূর্তি, এগুলো চিদাকাশের অংশ মাত্র। এরপরে মনে সুক্ষ ব্রহ্মের অনুর প্রবেশ ঘটে। তখন ভিতর বাহির সব এক হয়ে যায়। এই কূটস্থে চিত্তকে স্থির করবার প্রযত্ন অর্থাৎ দ্রষ্টার স্বরূপে অবস্থানের জন্য বারবার প্রয়াস - একেই বলে অভ্যাস যোগ। এই অভ্যাসের সাহায্যে যেমন ব্রহ্মে স্থায়ী ভাবে স্থিতি লাভ করা যায়, তেমনি এই ব্রহ্মে বিচরণ করা সম্ভব হয়। এই হচ্ছে পরম পুরুষের ধ্যান ও সাধকের প্রাপ্তি।
তো এই প্রাপ্তি সহজলভ্য এমনকি সর্ব্বজনীনও নয়। পুরুষকারের প্রয়োগে, আত্মনিষ্ট হওয়াই আত্মজ্ঞান লাভের উপায়। আসক্তিশূন্য হয়ে, গুরুপ্রদত্ত নির্দেশের নিরন্তর প্রয়াস - আমাদের এই ভাগ্যের অধিকারী করে তুলতে পারে। তাই শ্রীগীতার প্রবক্তা যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অমৃত উপদেশ পালনের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে, আমরা সেই অমৃত পথের সন্ধান পেতে পারি। কিন্তু চেষ্টা করতে হবে আমাদেরই, যোগের অভ্যাস করতে হবে আমাদেরই।
---------------------
০৩.০৬.২০২২
যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃশ্লোক :৮/ ৯-১০
কবিং পুরাণম-অনুশাসিতারম্
অণোঃ-আণীয়াংসং-অনুস্মরেৎ-যঃ।
সর্ব্বস্য ধাতারম-অচিন্ত্যরূপম
আদিত্যবর্নং তমস্ঃ পরস্তাৎ। (৮/৯)
সর্বজ্ঞ পুরুষ সেই যিনি পুরানো থেকেও পুরাতন, যিনি নিয়ন্ত্রক, যিনি সূক্ষ্ম থেকেও সূক্ষ্মতর, যিনি সবার বিধাতা, যিনি মলিনমন-বুদ্ধির অগোচর, যিনি সূর্য্যসম ভাস্কর, যিনি অজ্ঞান মোহ-অন্ধকারের পরপারে বর্তমান, প্রপঞ্চের অতীত সেই পরম পুরুষকে স্মরণ করেন।
আমরা জানি স্থুল খাদ্যকণা থেকে মনের সৃষ্টি। তো স্থুল বস্তু সূক্ষ্ম হতেই মনের উদ্ভব হয়েছে। এই মন থেকে সূক্ষ্ম বস্তু হচ্ছে আমাদের আত্মা। স্থূল যেমন সূক্ষ্ম বস্তুর মধ্যে প্রবেশ করতে অক্ষম, তেমনি আমাদের সূক্ষ্ম মন থেকেও আরো সূক্ষ্ম হচ্ছে ব্রহ্মাণু। তাই ব্রহ্মাণুর মধ্যে মন প্রবেশ করতে পারে না। অর্থাৎ ব্রহ্মকে মন মনন করতে পারে না। অথচ মন যতক্ষন মননধর্ম্ম পালন করে, ততক্ষন মনের মধ্যে বাস করেন ব্রহ্ম। এ এক অদ্ভুত ব্যাপার, আমরা জানি ইন্দ্রিয়সকল দ্বারা মন দর্শন, শ্রবণ ইত্যাদি করে থাকে। কিন্তু চোখ মনকে দেখতে পায় না, কান মনের কথা শুনতে পায় না।
উপনিষদ বলছেন, আত্মা নিরাকার, তাই তাকে দেখা যায় না, আত্মা অনির্বচনীয়, তাই তাকে বাক্য দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। আত্মা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়। অথচ এই ব্রহ্ম থেকেই সবকিছু হয়েছে। এমনকি সব কিছুর মধ্যে সেই ব্রহ্ম বিরাজ করছেন। অথচ আমরা ধরতে পারছি না। আসলে আমাদের মন সসীম। তো সসীম কখনো অসীমকে ধরতে পারে না। মন আমাদের শুদ্ধ নয়, প্রাণের চঞ্চলতা হেতু মন চঞ্চল। অশান্ত মনে আত্মা ধরা দেয় না। মন যখন বিষয়বিমুখ হয়ে শান্ত হয়, তখন সেই শান্ত মনে পরমাত্মা নিজেকে প্রকাশ করেন। শান্ত, স্থির ও বাসনামুক্ত মনেই আত্মার পূর্ন প্রকাশ ঘটে থাকে।
উপনিষদ (মুণ্ডক ২/১/৮) বলছেন, এই ব্রহ্ম থেকে ৭টি ইন্দ্রিয়ের উদ্ভব। জীবদেহে এই ৭টি ইন্দ্রিয়ের সাতটি অধিষ্ঠান ক্ষেত্র আছে। এই ইন্দ্রিয়সকল যখন নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে, তখন আত্মাতেই বিলীন হয়ে থাকে। আর আত্মা তখন হৃদয়াকাশে বিরাজ করেন। এই ৭টি প্রাণ হচ্ছে, নাক-২, কান-২, চোখ-২ এবং জিভ। আত্মার সন্ধান করতে গেলে, এই সপ্ত জ্ঞানীন্দ্রিয়গুলো খুবই গুরুত্ত্বপূর্ন। এই ইন্দ্রিয়গুলোর শিখা, আলো বা কিরণ (অর্চিষ) আছে, এগুলো অনুভব করতে পারে। এই অর্চিষের সাহায্যে ইন্দ্রিয়গুলো ব্রহ্মের উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করছে। এই সত্যকে যদি ধ্যান করা যায়, তবে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হয়। এই ইন্দ্রিয়গুলো যা কিছু গ্রহণ করছে, তার সবই সে ব্রহ্মকেই অর্পণ করছে। এই অর্পনক্রিয়াই ব্রহ্মযজ্ঞ। এই ব্রহ্মযজ্ঞে "আপনাকে" উপস্থিত করতে হবে। এখানে ব্রহ্ম ব্রহ্মকে দেখছেন, শুনছেন, আস্বাদন করছেন। একেই বলে ব্রহ্ম-উপাসনা। চিত্তকে সেখানে উপস্থিত করাতে গেলে, চিত্তকে শুদ্ধ করতে হয়, তা না হলে সূক্ষ্ম দ্বারপথ দিয়ে চিত্তের প্রবেশ ঘটানো যায় না। প্রাণ-অপানের ক্রিয়া দ্বারা বায়ুকে কুম্ভক অবস্থায় রাখলে, মন আপনা থেকেই বাহ্যিক বিষয় পরিত্যাগ করে, শূন্যে প্রবেশ করতে পারে। আর এই শূন্য অবস্থায় ব্রহ্মানন্দের স্পর্শ অনুভব হয়। উত্তম পুরুষ সেই নারায়ণের সাক্ষাৎ দর্শন হয়। সাধকের মধ্যে এই সময় এক অলৌকিক শক্তির স্ফূরণ দেখতে পাওয়া যায়, তাঁর বুদ্ধি তখন তীক্ষ্ণ হয় । অগ্নির তেজসম্পন্ন চিদাকাশে একটা ক্ষুদ্র কৃষ্ণবিন্দু দেখতে পাওয়া যায়। এঁকেই যোগীগণ বলে থাকেন, ব্রহ্মাণু, আর এই নগর বা পুরকে বলে ব্রহ্মপুর। মন যখন ব্রহ্মপুরে প্রবেশ করে, তখন এই ব্রহ্মাণুর সঙ্গে মিলিত হয়। এই অবস্থায় স্থিত হবার জন্য নিরন্তর অভ্যাস করতে হয়। এর পরে তেজঃবিন্দু লক্ষিত হলে মনকে সেই তেজবিন্দুতে লীন করতে হয়। আর মন সেই তেজঃবিন্দুতে একাকার হয়ে গেলে, এক ভাস্কর তেজের প্রকাশ হয়। তখন এই তেজঃরূপকেই পূর্ণব্রহ্মস্বরূপ বলে জ্ঞাত হওয়া যায়। অন্ধকারের নাশ হয়, কালের গতি রুদ্ধ হয়ে যায়, আর প্রপঞ্চের অতীত সেই পরম পুরুষকে স্মরণে আসে। এই অবস্থায় স্থিত থাকাই সাধকের লক্ষ।
প্রয়াণকালে মনসাঽচলেন
ভক্তা যুক্তো যোগবলেন চৈব
ভ্রূবোর্ম্মধ্যে প্রাণমাবেশ্য সম্যক
স তং পরং পুরুষমুপৈতি দিব্যম। (৮/১০)
প্রয়াণকালে যিনি ভক্তিপূর্বক যোগবলে দ্বারাই যুক্ত হয়ে স্থির চিত্ত প্রাণকে ভ্রুদ্বয়ের মধ্যে সম্যক রূপে ধারণ করেন, তিনি সেই দিব্য পরমপুরুষকে প্রাপ্ত হন।
মনুষ্যদেহ ধারণ করে, যাঁরা উপযুক্ত গুরুর সান্নিধ্যে এসে, যোগের অনুশীলন করেছেন, মৃত্যুকালেও তার সেই অভ্যাস ত্যাগ হয় না। মৃত্যুকালেও তাঁরা প্রাণবায়ুকে ভ্রূমধ্যে প্রবেশ করাতে পারেন। এইজন্য বলা হয়ে থাকে সাধারণ মানুষ আর যোগীপুরুষের মৃত্যুর মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। আমরা জানি, জীবের মৃত্যুকাল উপস্থিত হলে, সমুদয় ইন্দ্রিয়শক্তি ও প্রাণশক্তি আমাদের সূক্ষ্ম মনোময় দেহে স্থানান্তরিত হয়। জীবসকল স্থুল দেহ ত্যাগ করে, সূক্ষ্ম দেহে পরলোকে গমন করে থাকে। সাধারণ মানুষ তার সারা জীবনের কর্ম্ম সংস্কার নিয়ে স্থূল দেহ ছেড়ে সূক্ষ্ম দেহে গমন করে। সেখানে তার প্রজ্ঞা, বিদ্যা, কর্ম্ম সমস্তই অনুগমন করে থাকে। পরলোকে কর্ম্মফল জনিত ভোগের ক্ষয় শেষ হলে, আবার সে পুনরায় কর্ম্মদেহে আগমন করে। কিন্তু যাঁরা নিষ্কাম কর্ম্মযোগী পুরুষ তাঁরা ব্রহ্মলোকে প্রবেশ করেন। দেখুন যোগ অভ্যাসের ফলে, যাঁরা জীবন্মুক্ত হয়েছেন, তাদের জীবিত অবস্থা দেহ তো থাকে, কিন্তু তাদের দেহাত্মবোধ থাকে না। এতে করে তাদের দেহের বিনাশে তাঁদের স্থিতির কোনো পরিবর্তন হয় না। যোগীরাজ এই অবস্থাকে একটা সুন্দর উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন। বলছেন কোনো দ্রব্যে বা বস্তু যদি উইপোঁকার খপ্পরে পড়ে, তখন বাইরে থেকে বোঝাই যায় না যে, দ্রব্যটি ধীরে ধীরে মাটিতে পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন পরে, সেই দ্রব্যকে ধরলেই বুঝতে পারবেন, দ্রব্যের অস্তিত্ত্ব বলে কিছু নেই, মাটিতে পরিণত হয়ে গেছে। ঠিক তেমনি যোগীপুরুষের দেহটি বাইরের দিক থেকে দেখে কিছুই বোঝা যায় না, কিন্তু তিনি ভিতরে ভিতরে অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছেন। তাঁর দেহের মধ্যে প্রাণের স্পর্শ টের পাওয়া যায় সত্য, তাঁর মধ্যে একটা মন আছে এটাও সত্য কিন্তু তাঁর দেহ-প্রাণ-মন ব্রহ্মময় হয়ে গেছে। তো যিনি ইহ জগতেই ব্রহ্মত্ত্ব প্রাপ্ত হয়েছেন, তার লোকান্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। তবে সবার ক্ষেত্রে যে এমনটি হয়, তাতো নয়, কারুর কারুর ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম দেহ বিনাশ প্রাপ্ত হয় না। এই সকল ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষের অভৌতিক দেহে অর্থাৎ কারন দেহে অবস্থান হয়। অর্থাৎ বিজ্ঞানময় বা আনন্দময় দেহে অবস্থান হয়ে থাকে। এই যে লোকান্তর প্রাপ্তি এই আমাদের পুরুষকারের প্রয়োগের উপরে নির্ভর করে। এই সূক্ষ্ম বিষয় অর্থাৎ আমাদের লোকান্তর প্রাপ্তি আমাদের মতো সাধারনের বোধগম্য নয়।
যাইহোক, যে কথা হচ্ছিলো, আমরা সবাই দেহধারী। অর্থাৎ দেহ আমাদের আশ্রয়। তা সে স্থুল, সূক্ষ্ম, অতিসূক্ষ্ম, যাই হোক না কেন। আবার ভৌতিক বা অভৌতিক যাই হোক না কেন। ভৌতিক দেহ প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন, কিন্তু অভৌতিক দেহ এই নিয়মের উর্দ্ধে। যোগের অনুশীলন করতে গিয়ে আমরা সবাই প্রথমে দেহকে স্থির করবার চেষ্টা করে থাকি। অর্থাৎ সুখাসনে বসে দেহকে স্থির করি। তখন আমরা দৈহিক জগতেই বাস করি। এর পরে আমরা প্রাণায়ামের সাহায্যে প্রাণের জগতে প্রবেশ করি। ধীরে ধীরে আমরা মনের জগতে প্রবেশ করি। মনের জগতে স্থিতিকাল বেশি হলেও একসময় আমরা জ্ঞানের জগতে প্রবেশ করি। এবং সবশেষে আমরা আনন্দের জগতে আনন্দের উপলব্ধি করি। এই যে বিভিন্ন জগৎ, এই সব জগতে আমাদের আশ্রয় হয়, সেই জগতের অনুরূপ একটা দেহ। এগুলোকেই বলা হয়, অনন্ময়, প্রাণময়, মনোময়, বিজ্ঞানময় ও আনন্দময় দেহ।
আমাদের শরীরে ক্ষুদ্র নক্ষত্রবৎ সেই পরমপুরুষ বিরাজ করছেন। সাধন ক্রিয়ার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সাধকের সামনে একটা গুহাপথ প্রকাশিত হয়। এই গুহাপথেই সেই সৎস্বরূপ ব্রহ্মদর্শন ঘটে। এইগুহাপথ সম্পর্কে একটা ধারণা দেওয়া যেতে পারে। প্রত্যেক পুরুষের হৃদয় প্রদেশ থেকে হিতা নামক অসংখ্য নাড়ী ও সুষুম্না নামক একশত নাড়ী নির্গত হয়ে সমস্ত শরীরে বিস্তার লাভ করেছে। এর মধ্যে একশত সুষুম্না নাড়ী মূৰ্দ্ধদেশ ভেদ করে এগিয়ে গেছে।
আমরা জানি সুষুম্না নাড়ী মূলাধার থেকে উথিত হয়ে মেরুদেশকে আবৃত করে মস্তকগ্রন্থিতে গিয়ে দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। এর একটি শাখা মস্তিষ্কের নিম্নভাগ দিয়ে একটু বাঁকা ভাবে এসে ভ্রূযুগলের অল্প উর্দ্ধেমুখ হয়ে আজ্ঞাচক্র ভেদ করে ইড়া-পিঙ্গলার সাথে মিলিত হয়েছে। এখান থেকে আবার উর্দ্ধমুখী হয়ে কপালের মাঝামাঝি স্থানে এসে একটা সূক্ষ্ম ছিদ্রমধ্যে প্রবেশ করে সামান্য বক্রগতি সম্পন্ন হয়ে মস্তিষ্কের ব্রহ্মরন্ধ্রে প্রবেশ করেছে।
এর অপর একটি শাখা মস্তিস্ক গ্রন্থি হতে উর্দ্ধ দিকে শিখর পর্যন্ত উঠে আবার দ্বিতীয়ার চাঁদের মত অর্ধবৃত্তাকারে ব্রহ্মরন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। সুষুম্নার এই দ্বিতীয় শাখাটির মুখ বন্ধ, কিন্তু প্রথম শাখাটির মুখ খোলা। ফলত উভয় শাখার মধ্যে যে ছিদ্র আছে তার সঙ্গে সংযোগ নেই। যোগীপুরুষগন যখন যোগবলে প্রাণত্যাগ করতে উদ্দত হন, তখন এই সুষুম্না নাড়ীর বদ্ধ মুখটিকে যোগক্রিয়ার সাহায্যে খুলে ফেলেন। তখন উভয় শাখার ছিদ্রে এক হয়ে যায়। এবং যোগীপুরুষের প্রাণবায়ু এই ব্রহ্মরন্ধ্র পথে উর্দ্ধগতি সম্পন্ন হয়।
এইযে আজ্ঞাচক্র বা ভ্রুদ্বয়ের থেকে মস্তিষ্কের ব্রহ্মরন্ধ্ৰ - এর নিয়ন্ত্রণ ভগবত কৃপা ও পুরুষকারের প্রয়োগে যোগক্রিয়ার সাহায্যেই সম্ভব হতে পারে। যোগীপুরুষগন জীবাত্মাকে পরমাত্মায় আবিষ্ট করে প্রাণকে রুদ্ধ করে মহাপ্রয়াণ লাভ করেন। একেই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যোগীপুরুষগন স্থির চিত্ত প্রাণকে ভ্রুদ্বয়ের মধ্যে সম্যক রূপে ধারণ করেন এবং সেই দিব্য পরমপুরুষকে প্রাপ্ত হন।
---------------------
প্রয়াণকালে মনসাঽচলেন
ভক্তা যুক্তো যোগবলেন চৈব
ভ্রূবোর্ম্মধ্যে প্রাণমাবেশ্য সম্যক
স তং পরং পুরুষমুপৈতি দিব্যম। (৮/১০)
প্রয়াণকালে যিনি ভক্তিপূর্বক যোগবলে দ্বারাই যুক্ত হয়ে স্থির চিত্ত প্রাণকে ভ্রুদ্বয়ের মধ্যে সম্যক রূপে ধারণ করেন, তিনি সেই দিব্য পরমপুরুষকে প্রাপ্ত হন।
পূর্বপ্রকাশিতের পর
প্রয়াণ কালে, অর্থাৎ প্রাণ যখন দেহপুর থেকে যমপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবার জন্য উদগ্রীব হয়। বিষ্ণু পুরাণে (৬/৭/৮৭) সিদ্ধ পুরুষ সম্পর্কে বলা হচ্ছে, তিনি গমন করুন, বা স্থির থাকুন, দাঁড়িয়ে থাকুন বা বসে থাকুন, কোনো কাজ করতে থাকুন বা না করতে থাকুন, শ্রী ভগবানের শ্রীমূর্তি তার চিত্ত থেকে দূরে যেতে পারে না। আমাদের সবার স্বপ্ন সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা আছে। যদিও আক্ষরিক অর্থে আপনি স্বপ্নের কথা বা দৃশ্য বা অনুভূতি তা সে সুখের হোক, বা দুঃখের হোক, কাউকে দেখাতে অর্থাৎ প্রতক্ষ্য করাতে পারবেন না। কিন্তু এই স্বপ্ন ধ্রুব সত্য। মৃত্যুকালে আমাদের অবস্থা হয় স্বপ্নবৎ। মৃত্যুকালে জীব স্বপ্নে যেমন হয়, অর্থাৎ একটা বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী হয়। এই যে জ্ঞান তা হচ্ছে ভাবিদেহ ও তার আশ্রয়ে ভোগ বিষয়ক বিশেষ জ্ঞানযুক্ত। এই জ্ঞান নিয়েই সে তার পরবর্তী গন্তব্যে যাত্রা করে। এবং মৃত্যুকালে জীব যেমন যেমন চিত্তবিশিষ্ট অর্থাৎ যেমন যেমন সঙ্কল্পযুক্ত হয়, তার সাথে সে মুখ্যপ্রাণে আগমন করে, মুখ্যপ্রাণ উদান বায়ুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে, জীবাত্মার সাথে মিলিত হয়, এবং জীবাত্মাকে যথা সংকল্পিত লোকে নিয়ে হাজির করে। বৃহদারণ্যক উপনিষদে সুন্দর উদাহরনের সাহায্যে এটি বোঝানো হয়েছে।
দেখুন আত্মার কোনো গতি নেই। তথাপি আত্মজ্যোতির (উদান) দ্বারা উদ্ভাসিত হয়ে, প্রানপ্রধান লিঙ্গশরীরের উৎক্রমনকেই আত্মার উৎক্রমন বলা হয়। ভারী জিনিস বহন করবার সময় যেমন শ্রমিক উচ্চ শব্দ করতে করতে যায়, তেমনি শরীরে অধিষ্ঠিত জীবাত্মা যখন উর্দ্ধশ্বাসী হন, তখন পরমাত্মার দ্বারা অধিষ্ঠিত হয়ে শব্দ করতে করতে যান। (বৃ আ : ৪/৩/৩৫) পাঁকা আম যেমন একসময় গাছের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে, অথবা ঝড়ের দাপটে যেমন কাঁচা আম গাছের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তেমনি এই দেহ যখন কৃশ হয়, অর্থাৎ জরা অথবা রোগের দ্বারা শীর্ন হয়,পরিণত বয়সে বা অকালে এই লিঙ্গাত্মা এই সব শীর্ন দেহাবয়ব থেকে সাময়িক উৎক্রমন ক'রে, প্রাণের বিশেষ অভিব্যক্তির জন্য যথোচিত দেহে ফিরে যান।
চোর ধরা পড়েছে, গ্রামের জনসাধারণ, মুরুব্বীগন - তিনি আসছেন, তিনি আসছেন, বলতে বলতে ভোজ্য পানীয়, প্রসাদ ইত্যাদি প্রস্তুত করে, রাজার জন্য প্রতীক্ষা করছেন। ঠিক তেমনি ভূতবর্গ (পঞ্চভূত) আমাদের ভোক্তা আসছেন, তিনি আসছেন, এই বলতে বলতে উক্ত সংসারী জীবের জন্য অপেক্ষা করে। (বৃ আ : ৪/৩৭)
এই দেহ যখন দুর্ব্বল হন, এবং যেন সংজ্ঞাহীন হন, তখন ইন্দ্রিয়বর্গ আত্মার নিকটে আসেন। আর আত্মা তখন এই ইন্দ্রিয়বর্গকে সঙ্গে নিয়ে হৃদয়াকাশে অবস্থান করেন। ক্ষমতাশালী লোকের কাছে, সবাই ঘুরঘুর করে, তেমনি জীবের যতক্ষন দেহ সবল থাকে এই ইন্দ্রিয়সকল (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক) সবাই দেহের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে। কিন্তু দেহ যখন দুর্বল হয়ে যায়, তখন তারা যেখান থেকে এসেছিলেন, সেখানে ফিরে যান। তখন চোখ আর দেখে না, নাক আর অঘ্রান নেয় না, বাক স্তব্ধ হয়ে যায়, কান শ্রবণ করে না। মন আর চিন্তা করে না ত্বক স্পর্শ করে না। বুদ্ধি আর কিছুই জানতে পারে না। তখন হৃদয়ের নিষ্ক্রমন দ্বার সমুজ্জ্বল হয়। চোখ, ব্রহ্মরন্ধ্র, বা অপর কোনো দেহাবয়বের ভিতর দিয়ে জীবাত্মা ওই জ্যোতি অবলম্বনে নিষ্ক্রান্ত হন। আর আত্মার নিষ্ক্রমণের সাথে সাথে প্রাণের উৎক্রমন ঘটে। প্রাণ উৎক্রমন করলে সকল ইন্দ্রিয় উৎক্রান্ত হয়। তখন জীব বিশেষবিজ্ঞানবান হন, এবং পরে ওই বিশেষবিজ্ঞানের দ্বারা উদ্ভাসিত দেহান্তরকে প্রাপ্ত হন। বিদ্যা ও কর্ম্মফল ও অতীত সংস্কার তার সাথে গমন করে।
দেখুন, আমাদের জ্ঞান-কর্ম্মপ্রযুক্ত সংস্কারের ফলে যেমন স্বপ্নাবস্থায় আমাদের বাসনা দ্বারা নির্মিত একটা দেহে আত্মাভিমান করি, সেখানে সুখ দুঃখ ভয় ইত্যাদি ভোগ করি, তেমনি মরণকালে যেমন যেমন আমাদের পূর্বপ্রজ্ঞা, কর্ম্ম, উপাসনা, সাধনক্রিয়া, ইত্যাদির দ্বারা নির্মিত সংস্কারবশতঃ বাসনা দ্বারা নির্মিত ভাবি ভোগায়তান দেহে আত্মাভিমান করি, এবং পরলোকস্থ সেই দেহকেই প্রাপ্ত হই। স্বর্ণকার যেমন খানিকটা সোনার তাল নিয়ে সোনাকে নতুন নতুন আকার দেয়, ঠিক তেমনি জীব এই স্থুল শরীরকে ত্যাগ করে একে বিচেতন করে, পিতৃলোক, গন্ধর্বলোক, দেবলোক, প্রজাপতিলোক, ব্রহ্মলোক ইত্যাদি জীবের উপযোগী অভিনব ও অধিকতর উত্তম দেহান্তর নির্মাণ করেন। (বৃ : ৪/৪/৪)
যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যোগী যখন ভ্রূমধ্যে অর্থাৎ আজ্ঞাচক্রে মনকে নিবিষ্ট করে অবস্থান করেন, তখন তাঁর প্রাণ-মন এই আজ্ঞাচক্রে স্থির হয়, সেখানে তিনি দিব্য পুরুষের ধ্যান করেন। আর এটি যার অভ্যাস হয়ে গেছে, তিনি মৃত্যুকালেও, হাজার এক শারীরিক কষ্ট সত্ত্বেও এই স্থিতি থেকে নিজেকে সরিয়ে আনেন না। ফলত শারীরিক মৃত্যু তাকে এক দিব্য অবস্থায় উন্নীত করে। পরমপুরুষের সান্নিধ্য লাভ করেন।
-----------------
০৯.০৬.২০২২
শ্লোক :৮/ ১১-১৩
যদক্ষরং বেদবিদো বদন্তি
বিশন্তি যদযতয়ো বীতরাগাঃ।
যদিছন্তো ব্রহ্মচর্য্যং চরন্তি
তৎ তে পদং সংগ্রহেণ প্রবক্ষ্যে। (৮/১১)
বেদবাদীগণ যাঁকে অক্ষর বলে নির্দ্দেশ করেন, অনাসক্ত যোগীগন যাতে প্রবেশ করেন, যাঁকে লাভ করবার জন্য সাধকগণ ব্রহ্মচর্য্য পালন করেন, সেই পরম পদের পদের প্রাপ্তির উপায় তোমাকে সংক্ষেপে বলছি।
অক্ষর : অক্ষর কথাটার দুটো অর্থ ; ১. যার কোনো ক্ষর বা ক্ষয় নেই। যার বৃদ্ধি আছে, তার ক্ষয় আছে। তো অক্ষর অর্থে ব্রহ্মকে বোঝানো হয়েছে। ব্রহ্ম অবিনাশী। ২. বর্নমালার একটি বর্নকে বলা হয় অক্ষর, যা শব্দকে বা ধ্বনিকে বোঝানোর জন্য উচ্চারণ করা হয়ে থাকে। এই অক্ষরের আদি শব্দ হচ্ছে, "ওঁং" কেউ বলেন, ওম, ওং, ওঁ. অউম। এঁকেই বলা হয় প্রণব বা ওঙ্কার। কেউ বলেন, ওঙ্কার হচ্ছে নাদব্রহ্ম। এই "ওঁং" থেকেই সমস্ত ধ্বনির উৎপত্তি হয়েছে। আমরা জানি সমস্ত জ্ঞান প্রকাশের মাধ্যম হচ্ছে শব্দ। আর এই জ্ঞানভান্ডারের নাম হচ্ছে "বেদ"।
যোগীদের ভাষায়, এই ব্রহ্ম হচ্ছেন, কূটস্থ। এই স্থুল-সূক্ষ্ম-কারন শরীর, ইন্দ্রিয় মন অহঙ্কার যার আশ্রয়ে থাকে, যিনি না থাকলে, শরীর নষ্ট হয়ে যায়, যার প্রকাশে সমস্ত জগতের প্রকাশ, যোগীগণ সেই জ্যোতির্ময় পুরুষকে কূটস্থে দর্শন করে থাকেন।
কঠোপনিষদ যা আসলে বেদ থেকে সংগৃহীত সেখানে যমরাজ বলছেন, সকল বেদ সমূহ বা উপনিষদ যে পরম লক্ষকে অর্থাৎ স্বরূপকে কীর্তন করেন, সকল তপস্যা যাঁকে ব্যক্ত করে, যা পাবার জন্য সাধক ব্রহ্মচর্য পালন করেন, তোমায় সেই পরম ইপ্সিত বস্তু সংক্ষেপে বলছি - "ওম ইতি এতৎ" অর্থাৎ তিনি হলেন ওম (অউম) ।
তো সমস্ত সাধনার উদ্দেশ্য সেই পরমধন লাভ। এই পরমধন লাভের উপায় সম্পর্কে সমস্ত সাধকের উদ্দেশ্যে তিনি এর উপায় সম্পর্কে বলবেন, বলে আমাদের আশ্বস্ত করছেন। আমরা পরবর্তী শ্লোকে থেকে সেই অমৃত কথা শুনবো। আর এই অমৃত কথার মধ্যে আমরা সেই উপনিষদের সুরধ্বনি শুনতে পাই যেন।
সর্ব্বদ্বারাণি সংযম্য মনোহৃদি নিরুধ্য চ
মুর্দ্ধ্যান-আধায়-আত্মনঃ প্রাণম-আস্থিতো যোগধারণাম। (৮/১২)
সমস্ত ইন্দ্রিয়দ্বার সংযত করে, এবং মনকে হৃদয়ে নিরোধ করে, আপনার প্রাণকে মস্তকে স্থাপন করে যোগ ধারণাকে অর্থাৎ যোগ অভ্যাস জনিত সমাধিতে আশ্ৰয় করে। .....
ওমিত্যেকাক্ষরং ব্রহ্ম ব্যাহরন মাম-অনুস্মরন
যঃ প্রয়াতি ত্যজন দেহং স যাতি পরমাং গতিম। (৮/১৩)
ওম এই একাক্ষররূপ ব্রহ্মকে মনে মনে অনুচ্চারিত ভাবে স্মরণ ক'রে, আমাকে অর্থাৎ আত্মাকে চিন্তা করতে করতে দেহকে ত্যাগ করে যিনি গমন করেন অর্থাৎ দেবযানমার্গে ব্রহ্মলোকে গমন করেন, তিনি পরমা গতি প্রাপ্ত হন।
কথায় বলে বেদের সার হচ্ছে, উপনিষদ। আর উপনিষদের সার হচ্ছে শ্রীমদ্ভগবৎ গীতা। তো শ্রীগীতা আর উপনিষদ আলাদা কিছু নয়। আসলে কথা সেই পুরাতন, তথাপি যতবার শুনি ততবারই মনে হয় নুতন।
যাইহোক, যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আগের (৮/১১) শ্লোকে আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন, যে প্রয়াণকালে যেভাবে যোগীপুরুষ দেহ ত্যাগ করলে পরম গতি লাভ করেন, সেই সংক্ষিপ্ত উপায়ের কথা বলছেন। আমরা যে কথা উপনিষদে (কঠো) যমরাজের কাছ থেকে শুনেছিলাম, সেই কথার প্রতিধ্বনি যেন শুনতে পাচ্ছি। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, প্রথমেই শরীরের সমস্ত দ্বারগুলো বন্ধ করতে হবে। দ্বার অর্থাৎ নবদ্বার (চক্ষু-২, কর্ন-২, নাসিকা-২, মুখ, মূত্রদ্বার, গুহ্যদ্বার) । ইন্দ্রিয়গুলোকে নিরন্তর অভ্যাসের দ্বারা প্রত্যাহার ক্রিয়া করতে করতে বাহ্যিক বিষয় থেকে মনকে সরিয়ে আনতে হবে। ইন্দ্রিয়গুলো খোলা থাকলে, বাহ্যবিষয় ইন্দ্রিয়ের মধ্যে প্রবেশ করবে, এবং মনকে বিক্ষিপ্ত করে তুলবে। প্রথম দিকে যদি এই সব দ্বারগুলোকে বাহ্যভাবেও বন্ধ করে, তাতেও উপকার হয়। আসলে ইন্দ্রিয়গুলোর মূল নিহিত আছে আমাদের মস্তিষ্কে। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গুলো রস গ্রহণ করছে, বা ক্রিয়াশীল থাকছে, আমাদের মস্তিস্ক থেকে প্রেরণা পেয়ে। মস্তিস্ক থেকে সূক্ষ্ম নাড়ীসকল ইন্দ্রিয়গুলোর সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করছে। এবং জ্ঞানেন্দ্রীয়ের দ্বারা জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করছে। ঠিক তেমনি কর্ম্ম ইন্দ্রিয়ের দ্বারা কর্ম্ম সম্পাদন করছে। এই জ্ঞান আস্বাদন করবার জন্যই মন উদগ্রীব হয়। শাস্ত্র বলছে, মন বহির্মুখী হলে আমাদের শক্তির অপচয় হয়। মন যখন বিষয় গ্রহণে বিমুখ হয়, তখন বা ইন্দ্রিয়দ্বার যদি বন্ধ থাকে তবে শক্তির অপচয় হয় না। আর এই শক্তির বাহ্যিক গতি, বা বাহ্যস্ফূরণ বন্ধ করতে পারলেই স্বাভাবিক ভাবেই শক্তির অন্তঃস্ফূরণ শুরু হয়। আর অন্তস্ফুরিত শক্তিপুঞ্জ তখন বিদ্যুতের মতো স্ফূরিত হতে থাকে। একটা আলোকপুঞ্জ দৃশ্যমান হয়। এই অবস্থাতেই সুষুম্নার দ্বার ঘুলে যায়। একেই যোগীপুরুষগন কুণ্ডলিনী শক্তির জাগরন বলেন।
এই শক্তিই ঈশ্বরের পরাশক্তি। জীবের মধ্যে প্রানভূত। এই প্রাণই জগৎকে ধারণ করে আছে। সাধনক্রিয়া দ্বারা মন যখন সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হয়, তখন মন প্রাণের সাথে সুষুম্নার মধ্যে প্রবেশ করে। একেই যোগের ভাষায় বলা হয় কুণ্ডলিনী শক্তির জাগরণ। দেখুন বায়ু সর্বত্র, এই বায়ুর মধ্যেই আছে প্রাণ, কিন্তু প্রাণ আমাদের দৃষ্টিগোচর নয়। ইন্ধনের মধ্যে আছে অগ্নি, উপযুক্ত পরিবেশ পেলে সেই অগ্নি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। ঠিক তেমনি আত্মা সমস্ত জীবের হৃদয়াকাশে বিরাজ করা সত্ত্বেও তিনি সাধারনের বোধগম্য নন। আর যেহেতু এই হৃদয়াকাশেই তিনি বিরাজ করছেন, এই আপ্তবাক্যে বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা স্থাপন করে, যোগসাধকগন হৃদয়াকাশে পরমপুরুষ ধ্যান করে থাকেন। একটা জিনিস জানবেন, হিতা নাড়ীর মধ্যে সুষুম্না নাড়ী হচ্ছে উত্তম। হিতা অর্থাৎ যেখান থেকে বহু নাড়ী শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে, আমাদের সমস্ত শরীরে বিস্তৃত হয়েছে। এই নাড়ী সকল চৈতন্যরূপী প্রাণের সমস্ত শরীরে যাতায়াত নিশ্চিত করে থাকে। এই নাড়ীর অবস্থানকে পর্যবেক্ষন ক'রে যোগীপুরুষগন একটি উর্দ্ধমূলী বৃক্ষের সঙ্গে একে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ যে গাছে মূল আকাশমুখী, আর শাখা-প্রশাখা নিম্নমুখী। তো প্রাণবায়ুর সাহায্য পেলে আমরা এই সমস্ত নাড়ীর মধ্যে যাতায়াত করতে পারি। যোগীপুরুষগন আত্মস্থ থেকে এই নাড়ী সকলের মধ্যে বিভিন্ন লোকের, এমনকি বিভিন্ন দেবতাদের দর্শন করে থাকেন। বলা হয়, আমাদের শরীরের মধ্যে যে ৭২ হাজার নাড়ী আছে, প্রাণবায়ুর সাহায্যে মন এই নাড়ী সকলের মধ্যে প্রবেশ ক'রে, বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের জ্ঞান অৰ্জন করতে পারেন।
যাইহোক, যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, নবদ্বার নিরোধপূর্বক প্রাণবায়ুর সাথে জীবাত্মা উর্দ্ধে অবস্থিত হলেই, জীব জ্ঞানলাভ করতে পারে এবং মোক্ষ অর্থাৎ সত্যে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন। আসলে প্রাণায়াম (রেচক-পূরক-কুম্ভক) করতে করতে মন-প্রাণ সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হয়, বুদ্ধি হয় তীক্ষ্ণ। সূক্ষ্ম প্রাণ তখন মনকে নিয়ে সুষুম্নার মধ্যে যাতায়াত শুরু করে। আর সুষুম্নার মধ্যে যখন প্রাণ-মন যাতায়াত শুরু করে, তখন সে সমস্ত শরীর ব্যাপী যে কর্ম্মকান্ড চলছে, তা শুধু পর্যবেক্ষন নয়, তাকে নিয়ন্ত্রণ করবার মতো শক্তিশালী নির্দেশ পাঠাতে পারে। আর আমরা জানি, মনই আমাদের সমস্ত কর্ম্মের কর্তা। যা কিছু ভাব তা আমাদের মনের মধ্যেই তৈরী হয়, আবার মনের মধ্যেই বিলোপ হয়। আর আমাদের যা কিছু কর্ম্ম তা সবই মনের নির্দেশেই ঘটে থাকে।
এখন প্রশ্ন হতে পারে, আমাদের সমস্ত নাড়ীর মধ্যে তো রক্ত-রস প্রবাহিত হচ্ছে। আমাদের শরীর রক্ত-মাংস-হাড়-মেদ-মজ্জা দ্বারা গঠিত। এখানে কিভাবে সূক্ষ্ম লোক, ইত্যাদির জ্ঞান হতে পারে ? দেখুন সুষুম্না কোনো রক্ত-রস বাহিত নাড়ী নয়। এর মধ্যে আছে জ্যোতিঃ-প্রবাহ, আছে বিদ্যুৎশক্তি। আমাদের মধ্যে যে জ্ঞানের প্রবাহ, জ্ঞানের যে গতাগতি, তা এই সুষুম্না নাড়ীবাহিত। এইজন্য বলাহয় জ্ঞানজ্যোতিঃ। এই জ্যোতির্ময় বেগ আমাদের মেরুদণ্ডের মধ্যে দিয়ে অনুভূত হয়ে থাকে। এইজন্য spinal cord এর মধ্যে মজ্জাগত কোনো সমস্যা থাকলে, আমাদের অনুভূতি শক্তি নষ্ট হয়ে যায়। আত্মা বা এই জ্যোতিঃশক্তি আছে বলেই আমাদের বোধশক্তি আছে। এই আত্মার সংয়োগেই দেহে প্রাণের সঞ্চার হয়। আমরা সাধারণত মনে করি প্রাণের সঙ্গে আত্মা বা চৈতন্য ঘোরাফেরা করে, কিন্তু সত্য হচ্ছে আত্মার সঙ্গে প্রাণ ঘোরাফেরা করে থাকে। প্রাণ হচ্ছে আত্মার ছায়া। তো আপনি যদি এই ছায়ারূপ প্রাণকে ধরতে পারেন, তবে সেই পরম পুরুষের দর্শন পেতে পারেন।
উর্দ্ধগতি সম্পন্ন জ্যোতির্ময় ধারাটিকেই বলা হয় সুষুম্না বা সূর্যদ্বার। এখানে ভৌতিক ও অভৌতিক, এখান থেকেই ইহলোক পরলোকের সঙ্গে সংযোগ ঘটে থাকে। আমাদের যেমন স্থুল দেহ আছে, আর সেই স্থুল দেহের সাহায্যে আমরা জগতের যত্রতত্র ঘোরাফেরা করতে পারি, তেমনি আমাদের আছে সূক্ষ্ম দেহ, সেই দেহের সাহায্যে আমরা পরলোকে যত্র তত্র বিচরণ করতে পারি। এইযে সূক্ষ্ম দেহের যাতায়াতের পথ একে বলা হয় জ্যোতির্পথ। ধরুন সূর্যদেবের এক একটা রশ্মি সূর্য থেকে আমাদের পৃথিবী পর্যন্ত বিস্তার করে আছে। সূর্য্যরশ্মির সাহায্যেই কিন্তু সমুদ্র থেকে জলরাশি উর্দ্ধগামী হয়ে মেঘে পরিণত হচ্ছে। আমরাও এই জ্ঞানরশ্মির সাহায্যে বিভিন্ন লোকে বিচরণ করতেপারি। সূক্ষ্ম তেজময় মার্গ ধরে আমরা সূক্ষ্ম দেহে লোক-লোকান্তরে ভ্রমন করতে পারি। এই যে পথ একে বলে দেবযান পন্থা। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের মধ্যে এই দেবযান পথের জ্ঞান বা সন্ধান জানা নেই। কিন্তু ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ এমনকি কিছু পুণ্যবান-ভাগ্যবান পুরুষ মৃত্যুর পরে এই মার্গের সন্ধান পান। কথায় বলে পৃথিবী গোল, আপনি যদি পৃথিবীর পৃষ্ঠ ধরে সোজা হাটতে শুরু করেন, তবে হয়তো একদিন আপনি যেখান থেকে শুরু করেছিলেন, সেখানেই ফিরে আসবেন। হয়তো সেই পরিক্রমা শেষ করতে ৫০০ বা হাজার বছর লাগবে। কিন্তু আপনি অবশ্যই একদিন শুরুতে এসে শেষ করবেন।
আরো একটা কথা হচ্ছে, ঘরের মধ্যের আবদ্ধ আকাশ আর বাইরের সীমাহীন আকাশের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।ঠিক তেমনি আমাদের হৃদয়াকাশ ও বাইরের আকাশের মধ্যেও কোনো পার্থক্য নেই। আবার এই হৃদয়গুহায় যিনি অবস্থান করছে, সেই পরমপুরুষ পরমাত্মা ভিতরে বাইরে সর্বত্র বিরাজ করছেন। কুয়াশায় আছন্ন পরিবেশে যেমন দূরের জিনিস দেখা যায় না, অন্ধকারে যেমন নিজের হাত দেখা যায় না, তেমনি অজ্ঞান অন্ধকারে নিমজ্জিত জীব নিজের স্বরূপকে জানতে পারে না। তো জ্ঞানের আলো জ্বলে উঠলে, অজ্ঞানের অন্ধকার মুহূর্তের মধ্যেই কেটে যায়। দেখুন আমরা এই স্থূল দেহে আছি বলে, আমরা বলে থাকি আমরা এইখানে আছি, অর্থাৎ এই দেহে আছি, এই দেশে আছি, আবার এই সময় বা কালে আছি। তো আমি যখন স্থূল দেহ ছেড়ে সূক্ষ্ম দেহে অবস্থান করবো, তখন আমরা দেশ ও কালের অতীত হয়ে যাবো। তখন আমার কাছে সময়ের মধ্যে কোনো ব্যবধান থাকবে না. এমনকি আমার কাছে কোনো দেশের অবস্থান থাকবে না। আবদ্ধ তাই ঘর। শুধু দেওয়ালটাকে ভেঙে দিন তখন ঘর বলে কিছু থাকবে না। তো যার আবরণ ছিঁড়ে গেছে, তিনি ন্যাংটা। যার আয়তন নেই, তিনি সীমাহীন জগতের বাসিন্দা। আসলে জীবাত্মা ও পরমাত্মা মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আবদ্ধ ঘরের মধ্যের বায়ু আর ঘরের বাইরের বায়ু, এইপর্যন্ত।
তো যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা আরো একবার স্মরণ করি - সমস্ত ইন্দ্রিয়দ্বার সংযত করে, এবং মনকে হৃদয়ে নিরোধ করে, আপনার প্রাণকে মস্তকে স্থাপন করে যোগ ধারণাকে অর্থাৎ যোগ অভ্যাস জনিত সমাধিতে আশ্ৰয় করে। ..... ওম এই একাক্ষররূপ ব্রহ্মকে মনে মনে অনুচ্চারিত ভাবে স্মরণ ক'রে, আমাকে অর্থাৎ আত্মাকে চিন্তা করতে করতে দেহকে ত্যাগ করে যিনি গমন করেন অর্থাৎ দেবযানমার্গে ব্রহ্মলোকে গমন করেন, তিনি পরমা গতি প্রাপ্ত হন।
এর পরে আমরা - "ওম"কে কেন স্মরণ করবো সেইকথা শুনবো। চলবে। .............
------------------------
পূর্ব প্রকাশিতের পর :
ওমিত্যেকাক্ষরং ব্রহ্ম ব্যাহরন মাম-অনুস্মরন
যঃ প্রয়াতি ত্যজন দেহং স যাতি পরমাং গতিম। (৮/১৩)
ওম এই একাক্ষররূপ ব্রহ্মকে মনে মনে অনুচ্চারিত ভাবে স্মরণ ক'রে, আমাকে অর্থাৎ আত্মাকে চিন্তা করতে করতে দেহকে ত্যাগ ক'রে যিনি গমন করেন অর্থাৎ দেবযানমার্গে ব্রহ্মলোকে গমন করেন, তিনি পরমা গতি প্রাপ্ত হন।
এখন কথা হচ্ছে, এতো কিছু থাকতে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদেরকে কেন "ওম" ওং, ওঁ, ওঁং, অউম, - অর্থাৎ ওঙ্কারের স্মরণ নিতে বললেন ? শিবলিঙ্গের ধ্যান করতে বলতে পারতেন, বান লিঙ্গের ধ্যান করতে বলতে পারতেন, শালগ্রাম শীলার ধ্যান করতে বলতে পারতেন, এমনকি চন্দ্র-সূর্য্যের ধ্যান করতে বলতে পারতেন। নিদেনপক্ষে এটাও বলতে পারতেন, যে হে অর্জ্জুন তুমি আমার মূর্তির ধ্যান করো। বা নিজ মূর্তির ধ্যান করো। তা না বলে তিনি "ওম" ধ্যান করতে বললেন। আসলে তিনি কোনো মূর্তিপূজার প্রচলন চান নি। তিনি কোনো মূর্তির এমনকি গুরুদেবের মূর্তির ধ্যান শিক্ষা দিতে চান নি। তিনি চেয়েছিলেন, সরাসরি ব্রহ্মের চিন্তন। এখন কথা হচ্ছে সরাসরি "ব্রহ্ম" বলতে আমরা কিছুই বুঝি না। কারন, আমাদের সমস্ত চিন্তা মূর্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এমনকি আমি যখন নিজেকে চিহ্নিত করি, তখন এই স্থুল দেহকেই নির্দিষ্ট করি। আমরা যখন গুরুদেবের চিন্তা করি, এমনকি তাঁর গুনের কথা আলোচনা করি, তখন আমাদের সামনে গুরুদেবের স্থূল মূর্তি ভেসে ওঠে। আমরা যখন তৃষ্ণার্ত হয়ে জলের প্রত্যাশী হই, তখন আমাদের সামনে স্থূল জলের চিত্র ভেসে ওঠে। তাই আমাদের এক বা একাধিক গুনের অধিকারী সেই দেবতাগণ আমাদের কাছে এক-একটা মূর্তি। এইসব মূর্তি আসলে এক বা একাধিক গুনের প্রতীক মাত্র, যাদের আমরা দেবতা বলে থাকি। তো যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রতীকের ধ্যান বা স্মরণ করতে বলছেন, মূর্তির নয়। ব্রহ্ম বলতে আমাদের সামনে যেমন কোনো অবয়ব ভেসে ওঠে না তেমনি "ওম" বলতেও আমাদের সামনে কোনো প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে না। তবে কেউ যদি ওম বলতে "ওঁং" এই অক্ষররূপ ছবিকে ভেবে বসেন, আর সেই রূপ চিন্তা করতে থাকেন, তাহলে সেটা আলাদা কথা। এই রূপ চিন্তন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ করতে বলেন নি। তিনি প্রতীকের ব্যবহার করতে বলেছেন, রূপের নয়। দেখুন ব্রহ্মের কোনো বৈশষ্ঠ নেই, ব্রহ্মের কোনো বিশেষণ নেই। এখন কথা হচ্ছে, প্রতীককে আমরা চাক্ষুষ দেখতে পাই না সত্য, কিন্তু প্রতীকে আমরা মনকে একাগ্র করতে পারি। ঠিক যেমন পারি আমরা দেবমূর্তিতে, বা কারুর ছবিতে। একটা জিনিস বোঝার চেষ্টা করতে হবে, আমরা মাটি, পাথর বা কাগজের পূজা করি না, আমাদের প্রাচীন শাস্ত্র তা করতে বলেনি, কিন্তু এই প্রতীকের মধ্যে যে সর্বাত্মক ঈশ্বর আছেন, তার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে চাই।
এখন কথা ব্রহ্মের প্রতীক হিসেবে আমরা কেন "ওম" কে বেছে নেবো কেন ? দেখুন ব্রহ্মই সব। ব্রহ্ম কোনো সৃষ্টিকর্তা নন। ব্রহ্ম নিজেই সব হয়েছেন। ব্রহ্ম যে সব এই ধারণা করা আমাদের পক্ষে শুধু কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব। আবার ব্রহ্ম সব, এই যে ধারণা, এর বর্ণনা করাও সহজসাধ্য নয়। সমস্ত শব্দের মধ্যে নিহিত আছে এই ওম। এই শব্দই আমাদের জ্ঞান স্বরূপ। এই শব্দ দিয়েই তৈরী হয়েছে, জ্ঞানভাণ্ডার আমাদের বেদ-উপনিষদ ইত্যাদি। সমস্ত জ্ঞান ভান্ডার মিশে আছে, এই শব্দের মধ্যে। আর সমস্ত শব্দ নিহিত আছে এই ওঙ্কারের মধ্যে। আবার আমরা যখন ওম উচ্চারণ করি, তখন আমাদের নাভি থেকে শুরু করে পেট, বুক, গলা, থেকে ওষ্ঠ পর্যন্ত প্রতিটি অংশকেই আমরা এই শব্দের মাধ্যমে স্পর্শ করে থাকি। এই শব্দ থেকেই সমস্ত কিছুর উৎপত্তি। ঈশ্বরের প্রথম প্রকাশ হচ্ছে এই ধ্বনিস্বরূপ ওঙ্কার। তো আমরা যখন ব্রহ্মকে স্মরণ করি, তখন তার প্রথম প্রকাশের স্মরণ করে থাকি। আবার আমরা সবাই ব্রহ্ম, এই ভাবের উদয় হতে পারে নিরন্তর এই শব্দব্রহ্মে ধ্বনির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখে।
প্রশ্ন উপনিষদ বলছেন, (৫/২/৩) যিনি অউম (ওম) এর মধ্যে শুধু অ-এর ধ্যান করেন, সেই ধ্যান জাগতিক জ্ঞান সংগ্রহের পক্ষে যথেষ্ট। অ হচ্ছে ঋক্বেদের প্রতীক। অ-এর ধ্যানের ফলেই মানুষ আবার পৃথিবীতে ফিরে আসে, মনুষ্যজন্ম লাভ করে থাকে। এই অ-এর ধ্যানে যিনি মগ্ন থাকেন, তাঁর শ্রদ্ধা, তপস্যা, ব্রহ্মচর্য, আত্মসংযম, স্বাভাবিক ভাবেই এসে থাকে। শাস্ত্রকথা, গুরুবাক্যে তার বিশ্বাস দৃঢ় হয়, তিনি সকলের শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে ওঠেন।
এখন অ-কে ব্রহ্মের প্রতীক মনে না করে, যদি আলাদাভাবে অন্য কোনো প্রতীকের ধ্যান করি, তবে আমরা জাগ্রত অবস্থা সম্পর্কে অতি সচেতন থাকি, এবং জড় জগতের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকি। আমরা হয়তো সৎ জীবন যাপন করছি, আমরা হয়তো সাধু-সন্ন্যাস পদবাচ্য হয়েছি, কিন্তু জড়জগতের সাথে নিজেকে এতটাই সম্পৃক্ত রাখি, যে মৃত্যুর পরেও আমরা এই পৃথিবীতে মানুষ হিসেবে জন্ম গ্রহণ করবার বাসনা ত্যাগ করতে পারি না। এই মানুষ হিসেবে জন্ম গ্রহণ করবার বাসনা থেকেই আমারা পুনঃ পুনঃ পৃথিবীতে ফিরে ফিরে আসি, আর জীবন সংগ্রামে লিপ্ত থেকে সুখ-দুঃখের ভাগিদার হই। অর্থাৎ আমরা সেই ব্রহ্মের সাধনাই করছি, কিন্তু পূর্ন নয় অংশত। কেননা এই জগৎ ব্রহ্ম বই কিছু নয়।
প্রশ্ন উপনিষদ বলছেন (৫/২/৪) সাধক যদি শুধু মাত্র উ-কারের ধ্যান করেন, তবে তিনি মনকে উন্নত করেন। এবং মৃত্যর পরে এই উ বর্ণ, সাধনার ফলস্বরূপ তিনি অন্তঃরীক্ষের মধ্যে দিয়ে চন্দ্রলোকে গমন করেন। এই অন্তরীক্ষ হচ্ছে স্বর্গ মর্তের মধ্যবর্তী আকাশ। এই উ হচ্ছে ঋক্বেদের প্রতীক। সাধক এই চন্দ্রলোকের সমস্ত ঐশর্য্য ভোগ করে, পুনরায় এই মর্তলোকে মানুষ হিসেবে জন্ম গ্রহণ করে, জীবন সংগ্রামে লিপ্ত হন ও সুখ-দুঃখ ভোগ করেন। আসলে এই উ-কার ধ্যানী ব্যক্তিরাই পরহিতকর কার্য্যে লিপ্ত হন। কিন্তু জগৎ-হিতকর কার্য্য করে তারা বহু পুণ্যের অধিকারী হন। এবং সাময়িক সুখ-ভোগের অধিকারী হয়ে থাকেন।
সাধক যখন শুধু ম-অক্ষরের ধ্যান করেন, তখন তার কর্ম্ম দৃষ্ট হয় না। তিনি তখন নিষ্ক্রিয় অবস্থায় বিরাজ করেন। সাময়িকভাবে তিনি ব্রহ্মলোকে স্থিত হন। এই ব্যক্তি পরম জ্ঞানী। যিনি ব্রহ্মলোকে যেতে সক্ষম হলেও, ব্রহ্মের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করতে পারেন না। আবার তাঁর প্রারব্ধ শেষ না হবার ফলে তাকে আবার এই মৃত্যুপুরীতে ফিরে আসতে হয়।
প্রশ্ন উপনিষদ আবার বলছেন (৫/২/৫) : যিনি পরমাত্মার প্রতীক হিসেবে তিন অক্ষরের ( অ-উ-ম) ধ্যান করেন, তিনি মৃত্যুর পরে জ্যোতির্ময় সূর্য্যের সঙ্গে লীন হয়ে যান। সাপ যেমন জীর্ন খোলস ত্যাগ করে, নতুন দেহ প্রাপ্ত হয়, ঠিক তেমনি ওম এর উপাসনাকারী পাপমুক্ত হন। এই ওমকে বলা হয় সাম বেদের প্রতীক। সাম বেদের হচ্ছে, সমস্ত বেদের সুরঝংকার। এই সাম-মন্ত্র তখন সাধককে, ব্রহ্মলোকে নিয়ে উপস্থিত করে। সাধক তখন নিজেকে ব্রহ্মের সাথে একাত্ম অনুভব করেন।
তো সাধক যখন তিনটি অক্ষরকে আলাদা করে ধ্যান করেন, তখন তিনি মৃত্যুর অধীন। আসলে ব্রহ্মস্বরূপ জীবের তিন অবস্থা। জাগ্রত, স্বপ্ন, সুষুপ্তি। ব্রহ্মের আরো একটা অবস্থা আছে যাকে বলে তুরীয় অবস্থা । তো আমরা এই তিন অবস্থাতেই প্রতিনিয়ত সময়ভেদে যাতায়াত করে থাকি। আমাদের সবার আছে, জাগ্রত অবস্থা, আমাদের আছে স্বপ্নাবস্থা, আমাদের আছে সুসুপ্তির (গাড় -ঘুম ) অবস্থা। এই তিনটি অবস্থায় আমরা ঘোরাফেরা করে থাকি, তা সে জ্ঞাত অবস্থাতেই হোক বা অজ্ঞাত অবস্থাতেই হোক। কিন্তু এর থেকে অবস্থান্তর ঘটাতে পারলে, আমরা একসময় তুরীয় অবস্থায় উন্নীত করতে পারি নিজেকে । আসলে সাধক যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, তিনি সদা ব্রহ্মেই স্থিত আছেন। কেবলমাত্র অবস্থা ভেদে, আমাদের উপল্বদ্ধির তারতম্য ঘটছে।
অ উ ম এই তিন অক্ষরের সমষ্টি হলো "ওম" . প্রতিটি অক্ষরকে বলা হয় মাত্রা বা স্তর। এই তিনটির উর্দ্ধের অবস্থা হচ্ছে তুরীয় বা বিশুদ্ধ চৈতন্যের অবস্থা। 'অ' - জগৎ বা জাগ্রত অবস্থা। উ - অন্তরীক্ষ, স্বর্গ-মর্তের মাঝামাঝি, চন্দ্রলোক। আর ম হচ্ছে সূর্য্যলোক। তো একটা পৃথিবীলোক, একটা চন্দ্র লোক আর একটি সূর্যলোক। তো এই চন্দ্র-সূর্য-পৃথিবী মিলে এই সৌরলোক। এর বাইরেও একটা সীমাহীন জগৎ আছে, যাকে বলা হচ্ছে ব্রহ্মলোক, বা বিশ্ব ব্রহ্মান্ড । সাধক যখন এই তিনের সম্মিলিত অবস্থার মধ্যে প্রবেশ করেন, তখন তিনি ব্রহ্মলোকের বাসিন্দা হয়ে যান। আর সাধক এই ব্রহ্মলোকে হিরণ্যগর্ভের সাথে একাত্মতা অনুভব করেন। এই হচ্ছে ওম সাধনার পরিণতি। এই তুরীয় অবস্থা হচ্ছে নিরপেক্ষ অবস্থা। এই অবস্থায় সাধকের মধ্যে একত্বের বোধ ফুটে ওঠে। অর্থাৎ সাধক সমস্ত কিছুর মধ্যে সেই এক আত্মাকে দেখতে পান। সবাই সেই এক বিশ্বব্রহ্মান্ডের বাসিন্দা, অভিন্ন। এই পরমসত্য লাভের জন্যই সমস্ত সাধনা। তাই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ "ওম"এই প্রতীকের সাধনার কথা বলেছেন। গায়ত্রী মন্ত্রের মধ্যেও আমরা এই বিশালতার ছোঁয়া অনুভব করি।
নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
-----------------
১১.০৬.২০২২
শ্লোক :৮/ ১৪
অনন্য চেতাঃ সততং যো মাং স্মরতি নিত্যশঃ
তস্যাহং সুলভঃ পার্থ নিত্যযুক্তস্য যোগিনঃ।
হে অর্জ্জুন অনন্যচিত্ত হয়ে যিনি অনুক্ষণ আমাকে (আত্মাকে) স্মরণ করেন, সেই নিত্যযুক্ত যোগীর পক্ষে আমি (আত্মা) সহজলভ্য।
যার কোনো বিষয়চিন্তা নেই, তিনিই অনন্য চিত্ত। এই অনন্য চিত্ত ব্যক্তি যখন নিজেকে অর্থাৎ আত্মাকে স্মরণ করেন, তিনি আত্মাতে নিত্য যুক্ত থাকেন। আর যিনি আত্মাতে নিত্য যুক্ত থাকেন, তিনি স্বাভাবিক ভাবে সহজেই আত্মাকে লাভ করে থাকেন। যোগীরাজ বলছেন, যে ব্যক্তি সাধনক্রিয়ায় প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ইত্যাদিতে নিরন্তর লেগে থাকেন, তার একসময় সমাধির অবস্থা আসে। এই সমাধিতে সাধক জড়বৎ হয়ে যান। কেবল চৈতন্যেই স্থিত থাকে।
কিন্তু কথা হচ্ছে, যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, অনন্য চিত্তে তাঁকে স্মরণ করতে হবে। সাধক যখন তন্ময়চিত্তে কেবল আত্মচিন্তায় মগ্ন হয়ে থাকেন, তখন তিনি আত্মারাম হয়ে যান। কিন্তু এই অবস্থায় আসতে দীর্ঘকাল এই অভ্যাসের মধ্যে নিজেকে নিমগ্ন রাখতে হয়। দেখুন স্মরণ আমাদের আসে কোথেকে ? স্মরণ আসে আমাদের স্মৃতি থেকে। আর স্মৃতি হচ্ছে আমাদের পূর্ব অনুভূতির বিষয়সমূহ। আর এই পূর্বানুভূতির বিষয়গুলো সংস্কার আকারে আমাদের স্মৃতিতে সংরক্ষিত থাকে। তো যে বিষয়ে আমাদের পূর্ব অনুভূতি নেই, সেই বিষয় আমাদের স্মৃতিতে থাকতে পারে না। এখন কথা হচ্ছে সংস্কার যা স্মৃতির মধ্যে রক্ষিত, তা কি করে উৎপন্ন হয় ? আমাদের চিত্তবৃত্তি যখন কোনো গ্রাহ্য বিষয় দ্বারা রঞ্জিত হয়, তখন সেই জাতীয় সংস্কার উৎপন্ন হয়। পরে সেই সংস্কার গ্রাহ্য বিষয়কে নিজরঙে রাঙিয়ে নিয়ে নিজের মতন করে গ্রাহ্য ও গ্রহণরূপ স্মৃতি উৎপন্ন করে। সেই স্মৃতি আমাদের দুই প্রকার হতে পারে, একটা হচ্ছে কাল্পনিক ভাবনা আর একটা হচ্ছে জাগতিক ভাবনা । একটা হচ্ছে রূপ, আর একটা হচ্ছে অরূপ। একই ভাবনা কে বারবার স্মরণ করতে করতে তা আমাদের আমাদের সংস্কারের মধ্যে ঢুকে পড়ে। আবার আমাদের জগতের কল্পিত ভাবনাগুলো স্বপ্নে উদ্ভূত হয়। আমাদের কল্পনাগুলো ভাবিত স্মৰ্তব্যের বিষয়। আর অভাবিত স্মর্তব্য বিষয় ঠিক এর বিপরীত।
আমরা এর আগে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমুখে শুনেছি, "অভ্যাসেন তু কৌন্তেয় বৈরাগ্যেন চ গুহ্যতে" (৬/৩৫) । দুটো বিপরীত বিষয়, একটা হচ্ছে বৈরাগ্য অর্থাৎ ত্যাগ, আর একটা হচ্ছে অভ্যাস অর্থাৎ নিরন্তর কোনো বিষয়ের পুনরাবৃত্তি। বিষয়ভোগের বিতৃষ্ণা জাগিয়ে বৈরাগ্যবান হতে হবে। আবার সাধন বিষয়ে তৃষ্ণা বাড়িয়ে নিরন্তর তার অনুশীলন করতে হবে। এই সাধনার বিষয় হচ্ছে আত্মা। তো এই আত্মচিন্তানের অভ্যাস বাড়াতে হবে। আর আত্মচিন্তানের অভ্যাস আমাদের নতুন সংস্কারের জন্ম দেবে। এই নতুন সংস্কার আমাদের স্মৃতিকে আশ্রয় করবে। আর স্মৃতি আমাদের অনুক্ষণ আত্মচিন্তনের মধ্যে প্রবেশ করবে। এই আত্মবিষয়ের চিন্তনের অভ্যাস যখন দীর্ঘকাল ধরে, অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়, তখন তার সাধনভূমি দৃঢ় হয়। তখন আত্মা ব্যাতিত আর কোনো কিছুর দিকে লক্ষ্য থাকে না। সে কেবল আত্মচিন্তায় তন্ময় হয়ে বসে আছেন ।
দীর্ঘকালজাবৎ নিত্যদিন প্রাণায়াম ইত্যাদি অভ্যাস দিয়ে সাধন জগতে প্রবেশ করতে হয়। আর একটা ব্যবস্থা হচ্ছে, সুযোগ পেলেই, ধ্যানমগ্ন হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ মেরুদণ্ডের বিভিন্ন চক্রে মনকে স্থির করে রাখবার চেষ্টা করা। মন যদি হৃদয়চক্রে বা আজ্ঞাচক্রে স্থির হতে পারে, তবে মনের মধ্যে একটা আনন্দের আভাস অবশ্য়ই পাওয়া যেতে পারে। তবে এই আনন্দলাভের জন্য নয়, মনকে আত্মার সঙ্গে সংযুক্ত রাখাই উদ্দেশ্য। আর এর ফলে যে ফল লাভ হয়, সেই কথাই আমরা যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখে শুনছি। "হে অর্জ্জুন অনন্যচিত্ত হয়ে যিনি অনুক্ষণ আমাকে (আত্মাকে) স্মরণ করেন, সেই নিত্যযুক্ত যোগীর পক্ষে আমি (আত্মা) সহজলভ্য।"
----------------
১৩.০৬.২০২২
শ্লোক :৮/ ১৫
মামুপেত্য পুনর্জন্ম দুঃখালয়ম-শাশ্বতম
নাপ্নুবন্তি মাহাত্মনঃ সংসিদ্ধিং পরমাং গতাঃ । (৮/১৫)
পরমা সিদ্ধিপ্রাপ্ত মহাত্মাগণ আমাকে (আত্মাকে) পেয়ে পুনরায় এই দুঃখের আলয় স্বরূপ অনিত্য জন্ম প্রাপ্ত হন না।
পুনর্জন্ম কথাটার অর্থ আবার নতুন একটা দেহ প্রাপ্তি। এই নয় যে নতুন আত্মায় প্রবেশ, বা নতুন আত্মার প্রাপ্তি। যার স্বরূপে স্থিত হয়েছে, তার জন্ম-মৃত্যু নেই। এই যে ভৌতিক বা স্থুল দেহ এখন যা পেয়েছি, বা পরবর্তী জন্মান্তরে পাবো তা কিছুদিন পরেই আবার বিনাশপ্রাপ্ত হবে। আসলে আমি (আত্মা) এই দেহে আছি, তাই দেহ আছে। আমি (আত্মা) যদি এই দেহে না থাকি, তবে এই দেহ যেখান থেকে এসেছিলো, সেখানেই ফিরে যাবে। এই চিরসত্য থেকে কোথায় যাবো ? একের পর এক বিনাশশীল দুঃখের আলয় স্বরূপ দেহে অবস্থান করে, জন্ম জন্মান্তর ধরে কেবল দুঃখকে সাথী করে চলেছি। পরিবর্তনশীল জরা-ব্যাধি-মৃত্যু যে শরীরের অবশ্যম্ভাবী ভবিতব্য, তাকেই আশ্রয় করে যুগের পর যুগ ধরে ঘুরে মরেছি। কতবার মৃত্যু-যন্ত্রনা ভোগ করেছি, কতবার জন্ম-যন্ত্রনা ভোগ করে চলেছি, কতবার রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছি, কতবার বার্ধক্যের দুঃখ ভোগ করে চলেছি তা আমরা জানি না। কিন্তু এই গতিকে স্থির করে, যদি এই যাত্রার সমাপ্তি করতে পারতাম। তবে স্থিরতার শান্তিতে অতিবাহিত করতে পারতাম নিজেকে । জন্ম মাত্রই মৃত্যু এসে পাশে দাঁড়ায়। এই জীবন যন্ত্রনা থেকে কি করে রেহাই মিলবে ?
যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, এই যাতায়াত, এই জীবন যন্ত্রনা বন্ধ হতে পারে তাঁকে পেলে। আর তাঁকে পাবার জন্যই এই শরীরে আশ্রয় করে থাকি। জীবন মানেই তাঁকে পাবার সাধন। শরীর না থাকলে, সাধন হবে না। তাই বারবার এই শরীরের মধ্যে প্রবেশ করি। আর তাঁকে খুঁজে ফিরি। তাঁকে যারা পান তাঁরাই মহাত্মা হয়ে যান। তখন এই ক্ষুদ্র সীমাবদ্ধ দৃষ্টি আর থাকে না, মহাত্মাদের দৃষ্টি সীমাহীন বিস্তারে। তখন বিশ্ব চরাচরের মধ্যে তিনি কেবল সেই আত্মাকে দেখেন। তাঁকে বলতে সেই আত্মাকেই বোঝায়। সেই আত্মবোধ যার একবার হয়েছে, তিনিই মহাত্মা। মহাত্মার কাছে আত্মতত্ত্ব প্রকাশিত। সাধন ক্রিয়া করতে করতে একসময় সাধনক্রিয়ার পরাবস্থায় পৌঁছতে পারলেই, বিশ্বব্যাপী যে তাঁরই অবস্থান, সেই বোধ জেগে ওঠে। প্রাণের ক্রিয়ার দ্বারাই, সেই প্রাণের প্রাণ, প্রাণ যাঁর ছায়া স্বরূপ, সেই ব্রহ্মকে বোধের মধ্যে আনা যায়। বায়ুহীন গৃহের প্রদীপ শিখার মতো তখন সাধক অবিচল জ্যোতির্বিন্দুতে পরিণত হয়ে যান। সুষুম্নাতে যে ক্রিয়া করে, আজ্ঞাচক্রে, বা অনাহত চক্রে যে মনকে নিয়ে ক্রিয়ারত থাকে, তার সমস্ত ক্রিয়ার অবসান হয়। স্থিতি হয় আত্মাতে। তখন কোনো দর্শন থাকে না, কোনো শ্রবণ থাকে না। এক ভিন্ন দ্বিতীয় থাকে না। তিনি তখন সমস্ত বন্ধন মুক্ত হয়ে কূটস্থে ব্রহ্মবোধে সমস্ত সংসার দর্শন করে থাকেন। আর যার কাছে এক বৈ দ্বিতীয় নেই, তিনি ব্রহ্মলোকের বাসিন্দা হয়ে যান। যিনি এই আত্মস্বরূপে স্থিত হলেন, তিনি ক্ষুদ্র থেকে বৃহতে মিলিত হলেন। তখন বাসনা, সংকল্প, ইচ্ছা বলে কিছু থাকে না। এই ইচ্ছারহিত অবস্থাকেই বলা হয় পরমাগতি। তখন যোগীপুরুষের মূলাধার থেকে সহস্রার পর্যন্ত প্রাণের প্রবাহ থাকে স্থির। এঁকেই যোগের ভাষায় সিদ্ধাবস্থা বলে । একই বলে অভয়-অমৃত পদ। তখন আসা যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। না থাকে জন্ম , না থাকে মৃত্যু। শুধুই থাকা। জন্ম-মৃত্যুর পারে অবস্থান।
----------------
১৪.০৬.২০২২
শ্লোক :৮/ ১৬-১৭
আব্রহ্মভূবনাল্লোকাঃ পুনরাবর্ত্তিনোঽর্জ্জুন
মামুপেত্য টু কৌন্তেয় পুনৰ্জ্জন্ম না বিদ্যতে। (৮/১৬)
হে অর্জ্জুন ব্রহ্মলোক পর্যন্ত সমস্ত লোক থেকেই জীবকুল পুনরাগমন করে থাকে, কিন্তু হে কৌন্তেয়, আমাকে (আত্মাকে) একবার আমাকে (আত্মাকে) প্রাপ্ত হলে, আর পুনর্জন্ম থাকে না।
ব্রহ্মার যেখানে বাস, সেখান থেকেও অর্থাৎ ব্রহ্মলোক থেকেও জীবকুল মর্তলোকে, বা এই মৃত্যুপুরীতে পুনরায় আগমন করে থাকে। তো ব্রহ্মলোক বিনাশশীল। ব্রহ্ম থেকে সৃষ্ট যে লোকসকল, তাকে বলা হয়, ব্রহ্মলোক। ব্রহ্মলোক অসংখ্য। প্রত্যেক ব্রহ্মলোকের একজন করে অধিপতি যাঁকে বলা হয় ব্রহ্মা। আব্রহ্মভূবনাল্লোকাঃ অর্থাৎ ব্রহ্মলোকের নিচে যেসব লোক আছে, সেখান তো থেকে বটেই এমনকি ব্রহ্মলোক থেকেও জীবসকল ফিরে ফিরে আসে। এই ব্রহ্মলোকের নিচে আছে সাতটি লোক, ভূঃ, ভুবঃ, স্বঃ, মহঃ, জনঃ, তপঃ, সত্যম। এই সাতটি লোক বা ভুবনের উপরিভাগে অবস্থিত ব্রহ্মলোক। এই ব্রহ্মলোকের অধিপতির অর্থাৎ ব্রহ্মার, উৎপত্তি, লয় অর্থাৎ জন্ম মৃত্যু দুইই আছে। পরব্রহ্মে জন্ম মৃত্যু বলে কিচ্ছু নেই। তাই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, ব্রহ্মলোক পর্যন্ত যত লোকে আছে , তার যেখানে যিনি আছেন, তাকে আবার ফিরে ফিরে এই মৃত্যুপুরীতে আসতেই হয়। কিন্তু আমাকে অর্থাৎ আত্মাকে জানতে পারলে, তিনি আর জন্ম-মৃত্যুর অধীন থাকেন না। অর্থাৎ তাঁর স্থান হয় পরব্রহ্মে। আমাকে পাওয়া অর্থাৎ ক্রিয়ার উত্তম অবস্থায় যাওয়া। আর আমরা জানি শুধু সমাধি লাভ করলেই হবে না, কেননা সমাধিবান পুরুষও সমাধি থেকে উত্থিত হয়ে বা সমাধি ভঙ্গ হলে, আবার কর্ম্মে প্রবৃত্ত হন। যখন সাধক ক্রিয়ার পরাবস্থায় স্থায়ী ভাবে অবস্থান করতে পারেন, তখন আর তাঁকে অবতরণ করতে হয় না। ক্রিয়ার পারাবস্থায় আর মূর্তি দর্শন থাকে না, দেবমূর্তি দর্শন থাকে না কারন তখন সমস্ত দেবতা, আত্মা ব্রহ্মে লয় হয়ে যায়। শরীরবোধ থাকে না। এই অবস্থায় আর অবতরণ বলে কিছু থাকে না। তাই জন্ম-মৃত্যু বলেও কিছু থাকে না। সাধক তখন দেহাতীত অবস্থায় অবস্থান করেন। তখন দশদিক ব্রহ্মের আলোতেই আলোকিত হয়।
সহস্রযুগ পর্য্যন্তমহর্যদ্ ব্রহ্মণো বিদুঃ
রাত্রিং যুগসহস্রান্তাং তে অহোরাত্রবিদো জনাঃ। (৮/১৭)
চতুর্যুগ সহস্র পর্যন্ত যে ব্রহ্মার একটা দিন এইরূপ চতুর্যুগ সহস্র পর্যন্ত ব্রহ্মার যে একটা রাত্রি এ যাঁরা জানেন, তাঁরাই প্রকৃত অহোরাত্রির জ্ঞাতা।
আমরা শুনেছি, চারটে যুগ, সত্য-ত্রেতা-দ্বাপর-কলি। এই চার যুগ মিলে মহাযুগ। এইরকম হাজার মহাযুগের সম্মেলনে হয়, ব্রহ্মার একটা দিন। আবার হাজার মহাযুগে হয় ব্রহ্মার একটা রাত্রি। আমাদের মতো সাধারনের দিন রাত্রি হয় সূর্যের উদয় ও অস্ত। কিন্তু ব্রহ্মার দিন শুরু হয় সৃষ্টি দিয়ে, আর রাত্রি শুরু হয় প্রলয় দিয়ে। অর্থাৎ প্রলয় কাল মানে ব্রহ্মার রাত্রি, আর সৃষ্টির কাল হচ্ছে ব্রহ্মার দিন। ব্রহ্মার এই দিন রাত্রিকে বলা হয় কল্পকাল। এক এক কল্পকালে একেকজন ব্রহ্মার আবির্ভাব হয়, আবার এক কল্পকালে ১৪জন মনুর আবির্ভাব হয়। এক এক মনুর আবির্ভাব ও তিরোভাবের কালকে বলা হয় মন্বন্তর। এই ব্রহ্মার আয়ু হচ্ছে একশত ব্রহ্মবর্ষ। এর পরে ব্রহ্মাও থাকেন না আবার কোনো লোকও থাকে না। অর্থাৎ ব্রহ্মলোক ও আর নিম্নস্থিত ৭টি লোকের (ভূঃ, ভুবঃ, স্বঃ, মহঃ, জনঃ, তপঃ, সত্যম) অস্তিত্ত্ব থাকে না। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, এই কালের বা দিনরাত্রির কথা যিনি সম্যকরূপে জানেন, তিনিই প্রকৃত দিন-রাত্রির মাহাত্ম বুঝতে পেরেছেন। সেই মহাত্মাই কালের রহস্যের সন্ধান পেয়েছেন।
এই কালের রহস্যঃ উদ্ঘাটন করবার জন্যই যোগসাধনা, যোগের উদ্দেশ্যই কালের রহস্যকে উন্মোচন করা। পরিমিত কালই মায়ার স্বরূপ। তো কালকে অতিক্রম করতে পারলে, সাধকযোগী মায়াকে অতিক্রম করতে পারেন। দেহের প্রতি যতক্ষন দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে, ততক্ষন জীবসকল থাকে জন্ম-মৃত্যুর অধীন। মহাকালে জন্ম-মৃত্যু নেই। কাল যখন ঘটস্থ হয়, অর্থাৎ পরিমিত হয়, অর্থাৎ অনন্ত আকাশকে পরিমাপ করা যায় না, কিন্তু ঘটের আকাশ যেমন পরিমাপ করা যায়, তেমনি কালের পরিমান যেখানে আছে, সেখানে আরম্ভ ও শেষ আছে, জন্ম-মৃত্যু আছে। এইভাবে সৃষ্টি ও লয় থাকলে সেখানে ভোক্তা ও ভোগ্য পদার্থের বিদ্যমানতা থাকতে হয়। আবার ভোগ্য সৃষ্টি হলে ভোক্তার দেখা মেলে। এইভাবে ভোক্তা ও ভোগ্য থেকেই প্রাণ-জগৎ। আবার প্রাণ-জগতের সৃষ্টির জন্য স্থুল জগতের আবশ্যক হয়। এই ভোক্তা ও ভোগ্য হচ্ছে সূর্য্য ও চন্দ্র -এর মিথুন ক্রিয়ার ফল। সূর্য ও চন্দ্রের এই মিথুনের ফলে, এই প্রজাকুল বা জগৎ পরিপূর্ন হয়ে রয়েছে।
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে বলা হয়েছে,
ন তত্র সূর্যোভাতি না চন্দ্র তারকং
নেমা বিদ্যুতো ভান্তি কুতোঽয়মগ্নিঃ।
তমেব ভান্তম অনুভাতি সর্বং
তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি। (শ্বে :৬/১৪)
ব্রহ্মের উপস্থিতে সূর্য কিরণ দেয় না, চাঁদ, তারকাও নয়, বিদ্যুৎ নিষ্প্রভ, আগুনের তো কথাই নেই। তাঁর (ব্রহ্মার) দিপ্তি প্রকাশ পেলে তখন সবকিছু দীপ্যমান হয়। তার আলোকেই সবকিছু আলোকিত।
আমরা জানি সূর্য সবকিছুকে আলো দেয়, কিন্তু সত্য হচ্ছে পরমাত্মাকে সে আলোকিত করতে পারে না। সূর্য সেই ব্রহ্ম থেকেই আলোকপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। চাঁদ, তারকা, এদের ক্ষেত্রেও সেই একই কথা। রাতের অন্ধকারে যে বিদ্যুতের চমক আমরা দেখতে পাই, তা সেই ব্রহ্ম প্রদত্ত। ব্রহ্মবিনা বিদ্যুৎ দ্যুতিহীন। বস্তুত সমস্ত আলোর উৎস সেই অদ্বিতীয় ব্রহ্ম। এই যে মনোমুগদ্ধকর সৃষ্টি তা সবই ব্রহ্মেই ন্যস্ত।
আবার উপনিষদ বলছে, তুমিই সেই ব্রহ্ম। তুমিই সেই পরমসত্তা। তুমি নিজের সম্পর্কে যা কিছু ভাব, তা ভুল। তুমি দেহ নয়, তুমি মন নয়, তুমি স্মৃতি নয়, তুমিও স্বরূপতঃ সেই ব্রহ্ম। যা কিছু শ্রেষ্ট তা তিনি, যা কিছু নিকৃষ্ট তাও তিনি। যা কিছু ভালো, তা তুমি যাকিছু মন্দ তাও তুমি। যা কিছু বৃহৎ তা তিনি আবার যাকিছু ক্ষুদ্র তাও তিনি। যা কিছু ক্ষর তা তিনি, আবার যাকিছু অক্ষর তাও তিনি। উপনিষদের বলছেন (শ্বে : ৬/২০) মানুষের দেহ চামড়া দিয়ে ঢাকা। কিন্তু আকাশকে চামড়া দিয়ে যেমন ঢাকা যায় না, তেমনি আত্মাকেও এই দেহরূপ রক্ত চামড়া দিয়ে ঢাকা যায় না। আত্মা সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞানতার জন্যই জীবের বারবার জন্ম গ্রহণ করতে হয়, মৃত্যু বরণ করতে হয়। আত্মা সর্বদাই আমাদের অন্তরে আছেন। শুধু অজ্ঞানতার কারনে আমরা তাঁকে দেখতে পাচ্ছি না। যোগজ্যোতিঃর দ্বারা, জ্ঞানজ্যোতিঃর দ্বারা আমরা এই অজ্ঞানরূপ অন্ধকারকে দূর করতে পারি। এই অবস্থা লাভ করতে হলে, আমাদের প্রাণ-মনকে স্থির করতে হবে, আমাদের বিচারশীল হতে হবে, আমাদের সংযম অভ্যাস করতে হবে, যোগসাধনার নিরন্তর অভ্যাস করতে হবে।
কাল যখন সীমাবদ্ধ হয়, তখন নাম-রূপ এই অসত্য বস্তুর উৎপত্তির ভ্রান্তি প্রদর্শন হয়। যিনি জানেন সিনেমার পর্দায় চরিত্রগুলো কথা বলে, চলাফেরা করে, কিন্তু এইগুলো সবই ছায়া মাত্র সত্য নয়, তার কাছে সত্য লুকিয়ে থাকতে পারে না। যিনি কালকে জানেন, তিনি কালকে অতিক্রমন করে মুক্ত হয়ে, নিত্য বস্তুতে প্রিতিষ্ঠিত হতে পারেন। তখন কর্ম্মবন্ধন বলে কিছু থাকবে না। দেহস্থ কালকে বলা হয় অজপা শ্বাস-প্রশ্বাস। জীবসকল দিবারাত্র এই শ্বাস-প্রশ্বাসের ফলেই বেঁচে আছে। এই শ্বাস-প্রশ্বাসের ফলে জীবের আয়ু নির্ধারণ হচ্ছে। এক দিবারাত্রে এর পরিমান হচ্ছে, ২১৬০০ বার। জীব পূর্ব কর্ম্ম অনুসারে, এই শ্বাসের পুঁজি নিয়েই জন্ম গ্রহণ করে থাকে। এই পুঁজি শেষ হয়ে গেলেই, জীবের দেহপাত হয়। কিন্তু যোগীপুরুষ এই শ্বাসের ক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ ক'রে, অর্থাৎ এই শ্বাসের গতিকে রুদ্ধ করে, ধীর ক'রে, এই সংখ্যা অর্থাৎ ২১৬০০ বারকে দীর্ঘকাল বা স্বল্পকাল ব্যবহারের প্রক্রিয়া আয়ত্ত্ব করে থাকেন। আবার এই শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়ার সাহায্যে অর্থাৎ প্রাণায়ামের সাহায্যে দেহ, মন, বুদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। শ্বাস বহির্মুখী না হলে আমাদের বহির্জগতের বোধ লোপ পায়। তেমনি শ্বাস যখন অন্তর্মুখী অর্থাৎ সুষুম্নাবাহিত হয়, তখন দিব্যজ্ঞানের উদয় হয়। জ্ঞান হয় অন্তর্মুখী। শ্বাস যখন ইড়া পিঙ্গলা দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন আমরা অজ্ঞান অন্ধকারে অর্থাৎ রাত্রিতে অবস্থান করি। আবার শ্বাস যখন সুষুম্না দিয়ে প্রবাহিত হয়, বা সুষুম্নাতে স্থির হয়ে অবস্থান করে, তখন আমাদের জ্ঞানালোক বা দিনের প্রকাশ ঘটে, এক জ্যোতির্ময় জগতে অবস্থান করি । আর এই শ্বাসজনিত ক্রিয়ার ফলে শ্বাস ইড়া-পিঙ্গলা অতিক্রম করে সুষুম্নায় চলে, তখন বিজ্ঞানপদ লাভ হয়ে থাকে। তখন সমস্ত বস্তু ও লোকের সূক্ষ্ম জ্ঞান হয়। এই জ্ঞানসম্পন্ন যোগীপুরুষকে বলা হয় অহোরাত্রবেত্তা। এই জ্ঞানই মুক্তির সোপান। প্রাণায়াম অভ্যাসের ফলে দিন রাত্রির যে ২১৬০০ বার শ্বাস-প্রশ্বাস তাকে কালের মধ্যে বিস্তার করতে পারলে ২৪ ঘন্টায় ২১৬০০ না করে যদি ৪৮ ঘন্টায় ২১৬০০ বার বা ৭২ ঘন্টায় ২১৬০০ বার এমনি ভাবে কালের বিস্তার ঘটাতে পারি তবেই আমরা কালকে অতিক্রম করে যেতে পারি। এক দিনরাত্রিতে মাত্র ২০০০ বাড়ে নামিয়ে আনতে হবে, এই শ্বাসক্রিয়া গতি। আর এটা করতে পারলে, ইড়া ও পিঙ্গলায় প্রতিটিতে ১০০০ বার করে মোট ২০০০বার করতে হবে। আর এটি একমাত্র নিরন্তর অভ্যাসের মাধ্যমেই হতে পারে। আর আমরা জানি প্রতিবার ইড়া থেকে পিঙ্গলায় যখন শ্বাসের গতি পরিবর্তন হয়, তখন একবার করে সুষুম্নার মুখ স্পর্শ করে। এই যে সুষুম্নাতে যুক্ত হওয়া একেই বলে যুগ। এই একসহস্র যুগ ব্রহ্মার এক দিন আবার এক সহস্র যুগ হচ্ছে ব্রহ্মার এক রাত্রি। আমরা জানি ইড়া নারীর অপর নাম চন্দ্র, আবার পিঙ্গলা নাড়ীর আরের নাম সূর্য। ইড়া থেকে পিঙ্গলা, আবার পিঙ্গলা থেকে ইড়া ভ্রমন করবার সময় প্রাণ সুষুম্নাগামী হয়। একেই বলে অব্যাক্ত অবস্থা বা অব্যাক্ত পদ। সুষুম্নাতে স্থিত কাল বাড়াতে পারলেই প্রকারান্তরে ব্রহ্মে স্থিতিকাল বাড়ে। সাধনার ফলে যার এই স্থিতিকাল বেড়েছে, তাঁর ব্রহ্মলোকে বাস।
শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি যত বহির্মুখী হবে, তত আমরা সংসারে বা দেহে স্থিত হবো। আর শ্বাসকে যত আমরা ধরে রাখতে পারবো, তত আমাদের ব্রহ্মে স্থিতি কালের সময় বাড়বে। মুক্ত আত্মার দেহাত্মবোধ থাকে না। শ্বাস থাকে সুষুম্নাবাহী। এই সুষুম্নাবাহী প্রাণ আত্মাকে সঙ্গে নিয়ে অবস্থান করেন। এই মহান আত্মার আর পুনরাবৃত্তি ঘটে না।
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
-----------------------
১৫.৬.২০২২
শ্লোক :৮/ ১৮
অব্যক্তাদ্ ব্যক্তয়ঃ সর্ব্বাঃ প্রভবন্ত্যঽরাগমেে
রাত্র্যাগমে প্রলীয়ন্তে তত্রৈবাব্যক্তসজ্ঞকে। (৮/১৮)
ব্রহ্মার দিনের আগমনে অব্যক্ত প্রকৃতি থেকে সমস্ত ব্যক্ত পদার্থের উদয় হয়। আবার রাত্রির আগমনে সেই (অব্যক্তে) কারণেই সমস্ত লীন হয়ে যায়।
যথা হতে আসে জীব তথা চলে যায়। দিনের আলোতে জগৎ প্রকাশিত হয়, রাতের আঁধারে সব অপ্রকাশিত। আবার দিনের আকাশে সূর্য্যের দর্শন হয়, রাতের আকাশ তারকা ক্ষচিত। ব্রহ্ম থেকে জগৎ সৃষ্টি, আবার ব্রহ্মেই লয় প্রাপ্ত হয়। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে এই দিন-রাত্রি অনুভবে আসে। কিন্তু প্রাথমিক ভাবে যোগী পুরুষের কাছে সূর্য নাড়ী অর্থাৎ পিঙ্গলায় যখন শ্বাস প্রবাহিত হয়, তখন দিন, আর চন্দ্রনাড়ী অর্থাৎ ইড়ানাড়ী দিয়ে যখন শ্বাস প্রবাহিত হয়, তখন রাত্রি। এই ইড়া হতে পিঙ্গলায় যাবার মুখে এবং পিঙ্গলা থেকে ইড়াতে যাবার মুখে সুষুম্নায় শ্বাসের গতি হয়, একেই বলে অব্যক্ত অবস্থা। এই অব্যক্ত অবস্থায়, বাহ্য জগৎ অন্তরীণ হয়, অন্তর্জগৎ দৃশ্যমান হয়। অন্তর্জগতের অনুভব হয়। তখন "ন চন্দ্রস্য গতিস্তত্র ন সূর্যস্য গতিস্তথা"। এখানে না আছে সূর্য্যের গতি না আছে চন্দ্রের গতি। অর্থাৎ যখন ইড়া-পিঙ্গলায় শ্বাস প্রবাহিত হয় না, তখন বাহ্যজগৎ বলে কিছু অনুভবে আসে না। কিন্তু অন্তর্জগতের অনুভব ফুটে ওঠে। তখন যে স্নিগ্ধ জ্যোতির প্রকাশ হয় তার রশ্মির আলোকে সমস্ত বস্তুর বাহ্য ও অন্তর্নিহিত সমস্ত জ্ঞাতব্য প্রকাশ হয়ে পড়ে। এই জ্ঞাতব্যই যোগীপুরুষের জ্ঞানের বিষয়। এই অবস্থায়, যোগীর যে দৃষ্টি হয়, তাকেই বলে ব্রহ্মদৃষ্টি। এই ব্রহ্মদৃষ্টি বলে, যোগী ব্রহ্মপদ লাভ করেন। কিন্তু এই অবস্থা বেশিক্ষন নাও থাকতে পারে। তখন অব্যক্ত ব্রহ্মনাড়ী থেকে শ্বাস আবার ইড়া পিঙ্গলায় প্রবাহিত হয়। এই অবস্থায় যোগীর কাছে, আবার অন্ধকার নেমে আসে। যোগীর কাছে সংসার ভাব হচ্ছে অন্ধকার বা রাত্রি, আর সংসারের অতীত ভাব হচ্ছে দিন বা আলো।
জীব সৃষ্টির কথা শুনতে শুনতে মনে হয়, জীবকূলই তো জীবজগতের সৃষ্টা। আকাশ থেকে কেউ লাফিয়ে পড়ে না।দেখুন গাছ থেকে গাছের জন্ম হচ্ছে, মাছ থেকে মাছের জন্ম হচ্ছে, পাখী থেকে পাখীর জন্ম হচ্ছে, মানুষ থেকেই মানুষের জন্ম হচ্ছে। এমনকি দেবতা থেকে দেবতাদের জন্ম হচ্ছে। শিব ঠাকুরের স্ত্রী সন্তান আছে। এমনকি স্বয়ং ব্রহ্মার স্ত্রী সন্তান আছে। অন্তত আমাদের পুরান তো এই কথাই বলে থাকে। তবে এখানে ব্রহ্মার বা কোনো অদৃশ্য শক্তির দর্শন মেলে না। আসলে আমাদের কাছে দৃশ্যমান শক্তি, যা একটা অমোঘ নিয়মে আবদ্ধ তা হচ্ছে প্রকৃতি। এই প্রকৃতিতেই জন্ম মৃত্যুর খেলা চলছে যা আমরা প্রতক্ষ্য করছি। এবং এই প্রকৃতি নিয়মের বাইরে কিছুই করে না, করতে পারে না। আমরাও অর্থাৎ সমগ্র জীবজগৎ এই প্রকৃতি প্রসূত। আর এই প্রকৃতি হচ্ছে ব্রহ্মার মায়াশক্তি বিশেষ। এই প্রকৃতির পরিবর্তন আছে, এই প্রকৃতিতে যেমন জন্ম মৃত্যু আছে, তেমনি এই প্রকৃতিস্বরূপ মায়ারও জন্ম মৃত্যু আছে। এই মায়ার অন্তর্ধ্বান হলে, কেবল মাত্র ব্রহ্মার স্থিতি থাকে। আবার এই ব্রহ্মার জন্ম-মৃত্যু আছে। পুরান বলছে, ১৪টি মন্বন্তর। আর প্রত্যেক মন্বন্তর ৭১ বার চতুর্যুগের (সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি) সম্মেলন। এই ১৪টি মন্বন্তরের সমাপ্তি হলে হলে কল্প ক্ষয় শুরু হয়। তখন প্রলয়ের সূচনা হয়। এই প্রলয়ের শেষে জগতের সমস্ত কিছু যেখানে অবস্থান করে থাকে সেটি হচ্ছে পরব্রহ্ম। অর্থাৎ যেখান থেকে এসেছিলো, সেখানেই ফিরে যায়। এই স্বপ্রকাশ অনুভবপদই আদিপুরুষ হিরণ্যগর্ভ এবং তার অন্তর্গত পুরুষোত্তম। এই পুরুষোত্তমের নামান্তরে নারায়ণের শরীরেই সমস্ত জগৎ বা বাহ্য প্রকাশ লীন হয়ে যায়।
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
-------------------
১৬.০৬.২০২২
যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃশ্লোক :৮/ ১৯-২০
ভূতগ্রামঃ স এবায়ং ভূত্বা ভূত্বা প্রলীয়তে
রাত্র্যাগমে-অবশঃ পার্থ প্রভবত্যঽরাগমে। (৮/১৯)
হে পার্থ, সেই ভূতগণই বারবার জন্মগ্রহণ করে ব্রহ্মার রাত্রি সমাগমে লয় প্রাপ্ত হয় আবার দিবা সমাগমে তারা অবশ ভাবে,প্রাদুর্ভব হয়।
জীব বারবার জন্ম গ্রহণ করে, অর্থাৎ জীবাত্মা বারবার দেহ থেকে দেহান্তরে ভ্রমন করে, কারন সে নিজের স্বরূপকে বুঝতে চায়। কিন্তু কালের বশে তার সেই স্মৃতি বিনষ্ট হয়েছে। বারবার আসে বারবার যায়, আর দেহজনিত কর্ম্ম সংস্কার সঞ্চিত হতে থাকে। এইভাবে জন্ম-মৃত্যুর প্রবাহ অনন্তকাল ধরে চলতেই থাকে। সমুদ্রের জলের উপরে বুদ্বুদের মতো একবার জেগে ওঠে অর্থাৎ ব্যক্ত হয়, আবার সমুদ্রের জলের সঙ্গে মিশে যায়, অর্থাৎ অব্যক্ত হয়ে যায়। কতবার যে জীব এই ব্রহ্ম সমুদ্রের মধ্যে অবশ অবস্থায় ডুবছে, আর ভেসে উঠছে, তার ইয়াত্যা নেই। কিন্তু যার সন্ধানে সে এই জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবর্ত হচ্ছে, সেই বাসনা তার পূরণ হচ্ছে না। আসলে যাকে কেন্দ্র করে সে ঘুরছে, তাঁকেই সে খুঁজছে, কিন্তু দৃষ্টি বহির্মুখী তাই সে কেন্দ্রের সন্ধান পাচ্ছে না। সুখের সন্ধানে সে দুঃখকে আঁকড়ে ধরছে, জ্ঞানের সন্ধানে সে ভ্রমজ্ঞানকে আয়ত্ত্ব করছে। যার মধ্যে সে প্রবেশ করছে, তাকেই সে আমি মনে করছে। দেহের মধ্যে প্রবেশ করে, স্মৃতিভ্রম বশত দেহকেই সে আপন ভেবে, দেহের সুখ-স্বাচ্ছন্দ নিয়ে ব্যস্ত থাকছে। পঞ্চইন্দ্রিয় দ্বারা সে বহির্মুখী হয়ে বিষয়ের মধ্যে, শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ, বাহিত হয়ে অবশ হয়ে আছে। স্নায়ুবিক আচরণ করছে। আর বিষয়ভোগ নিমিত্ত তার জন্ম-মৃত্যু-জরা, ব্যাধি, শোক-তাপ নিয়ে একসময় দেহ ত্যাগ করছে। প্রাপ্তির আশায় কর্ম্ম করছে, আর কর্ম্ম করে সে কর্ম্ম বন্ধনের মধ্যে জড়িয়ে হা-হা-কার করছে। তথাপি তার মোহ কাটে না। জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকেও সে বেরুতে পারে না।
সাধন ক্রিয়ার অভ্যাস করলে, তার মধ্যে প্রজ্ঞার আলোর উদয় হতে পারে। মোহ রূপ রাত্রির অন্ধকার কেটে যেতে পারে। কিন্তু সাধনক্রিয়ার প্রতি তার অনুরাগ আসে না। অজ্ঞান অন্ধকারের মধ্যে অবশ হয়ে নিদ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় সময় অতিবাহিত করে। বিষয়-অগ্নি তাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারছে, আর সে উত্তাপের লোভে পতঙ্গের মতো সেই বিষয়রূপ অগ্নির দিকেই স্বভাব বশত ধাবিত হচ্ছে। এই রহস্যঃ উন্মোচন করা অসম্ভব।
মহাত্মাগণ বলছেন, গুরুপ্রদত্ত সাধনায় নিজেকে নিযুক্ত করো। সমস্ত বিষয় বাসনা ছেড়ে, বহির্মুখী মনকে অন্তর্মুখী করে নাও। যাঁকে কেন্দ্র করে তুমি জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হোচ্ছ, সেই কেন্দ্রের দিকে দৃষ্টি ফেরাও। দেখো, এক উজ্জ্বল জ্যোতি তোমার মধ্যেই বিরাজ করছে। এই উজ্জ্বল জ্যোতি স্বরূপতঃ তুমি। একবার নিজের দিকে দৃষ্টি দাও। শরীরের অভ্যন্তরে হৃদয়-আকাশে, ব্রহ্মরন্ধ্রে নির্ম্মল আত্মা বিরাজ করছে। নিরন্তর গুরুনির্দেশিত সাধনক্রিয়ার অভ্যাসের দ্বারা এই সত্যকে উপলব্ধি করো। যতদিন, যত জন্ম ধরে, এই সাধন ক্রিয়ার প্রতি তোমার অনুরাগ বৃদ্ধি না পাবে, ততদিন তোমার জন্ম-মৃত্যুর অবসান হবে না। তবে একদিন তো অবশ্য়ই ঈশ্বরের কৃপায়, তোমার এই মোহ-অন্ধকার কেটে যাবে, যাত্রা পথের সমাপ্তি ঘটবে। তবে সেই কল্পের জন্য অপেক্ষা করতে হবে, যেদিন মহাপ্রলয় আসবে। মহাত্মাগণ বলে থাকেন, তুমি যদি এক হাত বাড়াও তবে ভগবান তোমাকে দশ হাত দিয়ে তুলে নেবেন। কিন্তু আমি হাত না বাড়ালে, আমাকে তিনি ধরবেন কি করে ?
পরস্তস্মাত্তু ভাবোঽন্যো-ঽব্যক্তোঽব্যক্তাৎ সনাতনঃ
যঃ স সর্ব্বেষু ভূতেষু নশ্যৎসু ন বিনশ্যতি। (৮/২০)
কিন্তু সেই অব্যক্তেরও অতীত যে নিত্য অব্যক্ত (পরমাত্মা) আছেন তিনি সকল ভূতের বিনাশ হলেও বিনষ্ট হন না।
উপনিষদ বলছে, ব্রহ্ম ব্যক্ত ও অব্যক্ত ভেদে দুই। আবার সগুন ও নির্গুণ ভেদে দুই। এবার আমরা যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমুখে শুনছি, অব্যক্তেরও অতীত আছে বলা হয় নিত্য অব্যক্ত। এই শ্লোকের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শ্রীধর মহারাজ বলছেন, সমস্ত লোক অনিত্য হলেও পরমেশ্বর নিত্য। সমস্ত চরাচরের কারনভূত অব্যক্ত হতেও শ্রেষ্ট। সমস্ত কারনেরও কারন এই অব্যক্ত পরমেশ্বর। যোগীরাজ বলছেন, সাধনক্রিয়ার অতি উত্তম অবস্থায়, ব্যক্ত অব্যক্ত দুইই অন্তরীণ হয়। সেখানে কিছু ব্যক্তও নেই, আবার অব্যক্তও নেই। এই অবস্থায় সাধক সনাতন ব্রহ্মে লীন হয়ে যান। যাঁর ভূতের জ্ঞান হয়েছে, তিনি নাশবান হয়েও বিনাশকে পান না। অর্থাৎ অন্তরীক্ষে ব্রহ্মস্বরূপে অনুরূপে অবস্থান করেন। এই অবস্থা নিরাধারের অবস্থা। সেখানে না আছে প্রবৃত্তি না আছে নিবৃত্তি। সকল ইচ্ছারহিত অবস্থা।
যোগীপুরুষ যখন সুষুম্নাতে প্রাণ-মনের সাথে অবস্থান করেন, তখন তিনি সকলই ব্রহ্মময় জ্ঞান করেন। এই যোগীশ্রেষ্ঠের সমস্তই ব্রহ্মলীন হয়। এই অবস্থাতেও যোগীর নাশ সম্পন্ন হয় না। এই অবস্থায় আপন-বোধ স্বরূপ অবস্থায় অবস্থান করেন ।অর্থাৎ কেউ একজন উপলব্ধি করছেন। আর এই বোধশক্তির দ্বারা তিনি উপলব্ধি করেন । অর্থাৎ তিনি শুধুই চৈতন্যে অবস্থান করেন। জ্ঞান জ্ঞাতা ও জ্ঞেয় এক হয়ে যায়। এই অবস্থায় যোগী জিতেন্দ্রিয় হয়ে ইন্দ্রিয়শক্তি রহিত হন। এই পরম অবস্থাই সাধকের অবিনশ্বর ব্রহ্মভাব। এই অবস্থায় ভূতাদির লয় হয় কিন্তু ভাব থাকে। এঁকেই অব্যক্তের অব্যক্ত অবস্থা। এই অবস্থায় যোগী ইড়া-পিঙ্গলা এমনকি সুষুম্না অতিক্রম করে বিশ্বময় জ্যোতির্মন্ডলে অবস্থান করেন। একেই হিন্দুশাস্ত্র বলছে, নারায়ণ, সবিতৃমন্ডল মধ্যবর্তী পরমপুরুষ।
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
২০.০৬.২০২২
যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃশ্লোক :৮/ ২১
অব্যক্তো-অক্ষর ইতি-উক্ত-তং-আহু পরমাং গতিম
যং প্রাপ্য ন নিবর্ত্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম। (৮/২১)
যা অব্যক্ত অক্ষর নামে কথিত হয়, যাঁকে পরমা গতি বলে বর্ণনা করা হয়, যাঁকে লাভ করলে আর প্রত্যাবর্তন করতে হয় না, সেখানেই আমার পরম ধাম।
আমার ধাম অর্থাৎ জীবের আসল বাড়ী - যেখান থেকে সে এসেছিলো, আবার একদিন যেখানে তাকে চলে যেতে হবে। বেদের সার উপনিষদ, আবার উপনিষদের সার হচ্ছে শ্রীমদ্ভগবৎ গীতা। ধীরে ধীরে আমরা সেই পবিত্র গ্রন্থের নির্যাস পান করতে করতে এগিয়ে চলেছি । এ কেবল বেদবিহিত কর্ম্ম-যজ্ঞ প্রণালী নয়, কেবল ঈশ্বর স্তুতি নয়, কেবল প্রার্থনা নয়, কেবল নীতিকথা নয়, শ্রীগীতা আমাদের সত্যের মধ্যে অনায়াসে প্রবেশ করিয়ে দেবেন । মন প্রাণ দিয়ে আমরা যেন সেই অমৃত দুগ্ধ আস্বাদন করতে পারি। শ্রী গীতার মধ্যেই আছেন, সেই প্রবক্তার শ্রীমুখখানি। আমাদের দৃষ্টিকে স্বচ্ছ করতে হবে। তবে আমরা সেই শ্রীমুখের দর্শন করতে পারবো। প্রাণ ও চৈতন্য একই জায়গায় অবস্থান করেন। পুরুষ ও পুরুষের ছায়া একই জায়গায় ঘুরপাক খায়। তো আমরা যদি অক্ষরধামের সন্ধান পাই, তবে সেই অক্ষর পুরুষের সন্ধান পাবো। গৃহ ও গৃহস্বামীর অবস্থান একই জায়গায় হয়ে থাকে। তো ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ একই জায়গায় অবস্থান করছেন।
অক্ষর কথাটার অর্থ আমরা জানি যার ক্ষর বা ক্ষয় নেই।উপনিষদ বলছে, এই অক্ষর থেকে সমুদয় বিশ্ব উৎপন্ন হয়েছে। তো যার থেকে সমুদয় উৎপত্তি হয়েছে, তাকে পেলে তাকে পেলে আর জন্ম-মৃত্যু বলে কিছু থাকবে না। আসলে সমস্ত জীবকুল সেই পরমধামের উদ্দেশ্যেই ঈশ্বর সাধনা করে থাকে। সাধনক্রিয়ার উত্তম অবস্থায় প্রথমে দেহবুদ্ধি লোপ পায়। মন সূক্ষ্মতর হতে হতে একসময় মনের লয় হয়। বুদ্ধি তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর হতে হতে বুদ্ধির বিলোপ সাধন হয়। তখন পৃথক সত্ত্বার উপলব্ধি বলে কিছুই থাকে না। তো পৃথক সত্তার উপল্বদ্ধিহীন হয়ে একক সত্তার সঙ্গে নিজেকে সে মিলিয়ে ফেলে। তখন জীবাত্মা আর পরমাত্মা অভিন্ন রূপে প্রতীয়মান হয়। আসলে আমাদের যতক্ষণ পৃথক মন-বুদ্ধির অস্তিত্ত্ব থাকে ততক্ষন আমাদের জীবসত্ত্বার উপলব্ধি হয়। সাধন ক্রিয়ার পরাবস্থায় প্রাণ নিরুদ্ধ হলে মন-বুদ্ধিও নিরুদ্ধ হয়ে যায়। তখন সাধকের জীবভাবের বিলোপ ঘটে থাকে। এই হচ্ছে জীবের সর্বোচ্চ গতি। তো এই গতি বা গন্তব্য সম্পর্কে যখন জ্ঞানের উদয় হয়, তখন সে তার যথাসর্বস্ব হারিয়ে সেই গন্তব্যে বিলীন হয়ে যায়।
অক্ষর কথাটার আরো একটা অর্থ হচ্ছে বর্ণ।
আমরা জানি বর্ণমালায় অক্ষর আছে ৪৮ টি
ব্যঞ্জন বর্ণ - ক,খ,গ,ঘ,ঙ,চ,ছ,জ,ঝ,ঞ,ট,ঠ,ড,ঢ,ণ,ত,থ,দ,ধ,ন,প,ফ,ব,ভ,ম,য,র,ল, ব, শ,ষ,স,হ,ড়,ঢ়,য় (৩৬)
স্বরবর্ণ : অ,আ,ই,ঈ,উ,ঊ,ঋ,ঌ,এ,ঐ,ও,ঔ (১২) এই বর্ণ আর কিছুই নয়, এগুলো সবই রশ্মি মাত্র। এক-একটা গুনের ধারক ও বাহক। এই গুনের প্রকাশকেই বলা হয়, দেবতা। এই বর্ণই সমস্ত জ্ঞানের প্রকাশক। এই বর্ণের মধ্যেই সমস্ত জ্ঞান সুপ্ত আকারে নিহিত আছে। আবার সমস্ত বর্ণের মধ্যে লুকিয়ে আছে প্রণব। প্রণবের মধ্যে লুকিয়ে আছে সমস্ত জ্ঞানজ্যোতি। তাই সর্বত্র প্রণবের গুনগান। এই প্রণব আমাদের উৎস আবার প্রণব আমাদের গন্তব্য।
-----
২১.০৬.২০২২
যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃশ্লোক :৮/ ২২
পুরুষঃ স পরঃ পার্থ ভক্ত্যা লভ্যস্ত্বনন্যয়া
যস্য-অন্তঃস্থানি ভূতানি যেন সর্ব্বমিদং ততম। (৮/২২)
হে পার্থ সমস্ত ভূত যাতে অবস্থিত, যার দ্বারা এই চরাচর বিশ্ব পরিব্যাপ্ত সেই পরম পুরুষকে একমাত্র অনন্যা ভক্তি দ্বারা লাভ করা যায়।
কথাটা লক্ষ্য করুন, সেই পরমপুরুষকে একমাত্র অনন্যা ভক্তি দ্বারা লাভ করা যায়। ব্রহ্মে স্বরূপ শক্তির কোনো অভিব্যক্তি নেই। ব্রহ্ম নিষ্ক্রিয়, উদাসীন। জীব-ভাব ও মায়ার অধিষ্ঠান ক্ষেত্র হচ্ছে ব্রহ্ম। অন্যদিকে ভক্তের ভগবানের মধ্যে স্বরূপশক্তির সম্পূর্ণ অভিব্যক্তি আছে। এই ভগবানে সকল শক্তি আশ্রিত। পরমাত্মা জীব ও জগতের ঈশ্বর। এই ঈশ্বরকে সাক্ষাৎভাবে দর্শন করা সম্ভব নয়। ভগবৎ-স্বরূপ পূর্ন চিৎশক্তিময়। সেখানে জীবের বা জড়ের কোনো স্থান নেই। এই চিদস্বরূপা নিজ শক্তির বিলাসে ভরপুর।
যোগী যোগবলে, চিত্তবৃত্তিকে নিরুদ্ধ করে, চিদাকাশে যাঁর দর্শন করেন, তিনি পরমাত্মা। এঁর দৃষ্টির প্রভাবেই সমস্ত দেহযন্ত্র চালিত হয়। জীব দেহাত্মবোধে বদ্ধ। জীব যখন এই দেহাত্মবোধ কাটিয়ে অন্তর্মুখী হয় তখন তিনি পরমাত্মার দর্শন লাভ করেন। কিন্তু যাঁকে দেখছেন, তিনি নির্লিপ্ত। আর এইসময় যোগী নিজেকেও তদ্রুপ মনে করেন । এঁকে যোগীর মুক্তাবস্থা বলা হয়ে থাকে। এই যে যোগলব্ধ ঐশ্বর্য্য এটি কিন্তু আসলে ভগবৎ সত্ত্বার অংশ মাত্র। কিন্তু জড় সন্মন্ধযুক্ত ভগবত সত্ত্বার অংশ মাত্র। এই জড় জগতের ন্যায় চিদানন্দময় একটা রাজ্য আছে। যিনি এই রাজ্যের অধীশ্বর, তার অনন্ত ঐশ্বর্য্য। এই অনন্ত ঐশ্বর্যের কণামাত্র হচ্ছে কোটি কোটি ব্রহ্মান্ড।এই কোটি কোটি মায়িক জগতের বিভূতি যারমধ্যে প্রকাশিত হয়, তিনিই প্রকৃত ভগবান। এই ভগবানকে পেতে গেলে, সাধকের মধ্যে চিৎ-কলার অভিব্যক্তি অধিক মাত্রায় প্রয়োজন হয়।
যোগীর পরমাত্মা যোগীর হৃদয়ে নিহিত। এখন এই হৃদয় থেকে ইষ্টদেবকে বের করতে গেলে আরো বেশি শক্তির প্রয়োজন। যা শুধুমাত্র যোগক্রিয়ায় লভ্য নয়। এর জন্য যা প্রয়োজন তা হচ্ছে ভগবৎকৃপা। যা শুধু ক্রিয়া দ্বারা অৰ্জন করা যায় না। যোগীপুরুষ যে দর্শন করেন তা স্বপ্নবৎ। কিন্তু ভক্ত ভগবানকে পায় জাগ্রত ভাবের মধ্যে। তাই যোগীর অনুভূতি ও ভক্তের অনুভূতির সঙ্গে মেলানো শুধু কঠিন নয়, অসম্ভব। আর ভক্তের এই যে শক্তি তা আসে ভক্তি নামক গুনের থেকে। ভক্তির বিষয় হচ্ছে একমাত্র ভগবান। আর এই ভক্তির অনুশীলনীতেই ভগবানের সাক্ষাৎ আবির্ভাব হয়। এই সাক্ষাৎ যোগের দ্বারা লাভ করা যায় না। এই সাক্ষাৎ লাভের জন্য চিত্তবৃত্তির রোধ করতেও হয় না, যা যোগের মূল কথা । ভক্ত তার ভক্তিগুণের সাহায্যে, অথবা বলা যেতে পারে ভগবত কৃপায়, বৃত্তির বাহ্য অবস্থাতেই ভগবানের সাক্ষাৎ করে থাকেন। তখন ভক্ত ভাবের কাজল মেখে সমস্ত জ্ঞানেন্দ্রিয়, এমনকি কর্ম্ম ইন্দ্রিয় দ্বারাও তার আস্বাদন লাভ করে থাকেন । আমরা জানি, যোগীর দর্শন লাভ হয়ে থাকে হৃদয়াকাশে, বা চিদাকাশে, কিন্তু ভক্তের দর্শন লাভ ঘটে বাহ্য বা বহিরাকাশে। যোগীর দর্শন হয়, জ্যোতির্ময় রূপে। আর ভক্তের দর্শন হয় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পুরুষ বা নারীর রূপে । এই যে রূপ বা মূর্তি এটির রচয়িতা ভক্ত স্বয়ং। এইজন্য যোগীর পরমাত্মার অনুভূতি আর ভক্তের ভাগবত অনুভূতি এই দূই-এর মধ্যে মূলগত একটা পার্থক্য আছে। পরমাত্মা হচ্ছেন জীব ও মায়ার অধিষ্ঠাতা। তো যে শক্তি জীব ও মায়াকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, সেই শক্তি যখন যোগীর মধ্যে জেগে ওঠে তখন যোগীশ্রেষ্ঠ পরমাত্মার অনুভব করতে পারেন । বস্তুত এই স্বরূপশক্তির মধ্যে চৈতন্যের পূর্নকলা প্রকাশিত হয় না। আসলে যোগীশ্রেষ্ঠ যখন ত্রিগুণের অতীত হয়ে যান, তখন তাঁর এই দর্শন হয়ে থাকে। কিন্তু কথা হচ্ছে, বলা হয়ে থাকে দেহাতীত অবস্থায় যোগীপুরুষ হৃদয়ের মধ্যে তাঁকে দর্শন করে থাকেন। তো যেখান দেহ নেই সেখানে হৃদয় থাকতে পারে না। আসলে, দেহবোধহীন, অথচ প্রাকৃতিক ভাবে তৈরী এই দেহভান্ডের মধ্যেই পরমাত্মার অনুভব হয়ে থাকে। কিন্ত ভগবত দর্শন এইভাবে ঘটে না। চিৎকলার পূর্ন অভিব্যক্তি না হলে সেই পূর্ন চিৎকলাময় ভগবত সত্তার সাক্ষাৎ পাওয়া সম্ভব নয়।ভগবানের স্বরূপ শক্তির পূর্ন প্রকাশ হচ্ছে হ্লাদিনীতে। তাই হ্লাদিনীকে (রাধা) আশ্রয় করেই ভগবত দর্শন হয়ে থাকে। ভগবান সমস্ত গুনের উর্দ্ধে। তাই গুনের আয়ত্ত্ব দ্বারা , ভগবৎ দর্শন সম্ভব নয়। প্রত্যেক জীবের মধ্যে আছে অপ্রাকৃত সত্ত্বা। প্রকৃতির দেওয়া চিত্তকে শুদ্ধ করে, যোগী যেমন পরমাত্মার দর্শন করে থাকেন, ভগবৎ সাক্ষাৎকার সেইভাবে সম্ভবপর নয়। কারন হচ্ছে, ভগবান সমস্ত গুনের উর্দ্ধে। তিনি সত্ত্বগুনের অধিকারীর কাছেও অগোচর। অপ্রাকৃত বিশুদ্ধ সত্ত্বার দরকার হয়, এই সাক্ষাৎকারের জন্য। আগেই বলেছি প্রত্যেক জীবের মধ্যেই অপ্রাকৃত সত্ত্বা নিহিত আছে। কিন্তু এই সত্ত্বা একাকিনী খেলা করতে পারে না। এই খেলার জন্য দরকার বাইরে থেকে আরো একটি অপ্রাকৃত সত্ত্বার অনুপ্রবেশ। এইজন্য যতক্ষন না ভগবান স্বয়ং জীবের মধ্যে হ্লাদিনীশক্তির সঞ্চার করছেন, অর্থাৎ যতক্ষন ভগবান নিজে কৃপা না করছেন, ততক্ষন তার ভিতরের সত্ত্ববীজ অংকুরিত হতে পারে না। মাতা যেমন একাকী সন্তানের জন্ম দিতে পারেন না, তেমনি ততক্ষন ভগবত কৃপা না হচ্ছে, ততক্ষন ভক্তের ভগবৎ দর্শন হতে পারে না। বিশুদ্ধ সত্ত্বার মধ্যে যখন প্রেম জাগ্রত হয়, তখন সে বাইরের সত্ত্বাকে আকর্ষণ করে থাকে। এই ভাবকেই বলা হয়, প্রেমের অংকুর স্বরূপ । এই ভাবকেই বলা হয় প্রেমের বীজ। যা থেকে প্রেমের উৎপত্তি হয়। প্রেম ক্রমশ পুষ্টিলাভ করে, প্রকাশের অপেক্ষায় থাকে। আর ভক্তের চোখে ভগবান দৃশ্যমান হন। এই রূপ কেবলমাত্র ভক্তের কাছে, ভক্তের মনমতো প্রকট হয়ে ওঠে।
এখন কথা হচ্ছে, যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, ভগবৎ প্রাপ্তির উপায় হচ্ছে, অনন্য ভক্তি। এই অনন্য ভক্তি কেবল শাস্ত্র পাঠে সম্ভব নয়। এমনকি যোগক্রিয়া দ্বারাও সম্ভব নয়। তবে শাস্ত্রবিহিত কর্ম্ম, গুরুর উপদেশ অনুযায়ী সাধনক্রিয়া তাকে আত্মমুখী করে তুলতে পারে। আর এই আত্মমুখী পুরুষ আত্মবিষয় ব্যাতিত অন্য কোনো কিছু শুনতে বা বলতে চান না। আত্মবিষয় ছাড়া অন্য কোনোকিছু জানতেও চান না। মনোযোগ দিয়ে সাধন ক্রিয়া করতে করতেও এই অবস্থার লাভ হতে পারে। সাধনক্রিয়ার উত্তম অবস্থায় যখন ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে সুধামৃত বর্ষণ হতে থাকে, তখন মনের অচঞ্চলতা হেতু মনের মধ্যে কোনো ইচ্ছাকনা বিরাজ করতে পারে না। এইসময় কোটি কোটি সূর্য্যজ্যোতিঃ স্বরূপ এক অগ্নির গোলক দেখতে পাওয়া যায়। এই অগ্নির গোলকের মধ্যে একটা কৃষ্ণবর্ণের বিন্দু দেখতে পাওয়া যায়। তার মধ্যে অসংখ্য নক্ষত্র বিরাজ করছে। এই নক্ষত্রবিরাজিত কৃষ্ণবর্ণের বিন্দুর অভ্যন্তরে গুহার ভিতরে একটা প্রবেশ দ্বার লক্ষিত হয়। এই গুহার অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে, পুরুষোত্তমের রূপ দর্শন হয়। যিনি কূটস্থের কারন সলিলে শায়িত। পরে অবশ্য এই দৃশ্য বিলুপ্ত হয়ে জ্ঞানের অতীত শিবভাবের উদয় হয়। তখন সমস্ত পূর্নভাবে স্থিতি হয়।
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
২৫.০৬.২০২২
যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃশ্লোক :৮/ ২৩
যত্রকালে ত্বনাবৃত্তিম-আবৃত্তিঞ্চৈব যোগিনঃ
প্রয়তা যান্তি তং কালং বক্ষ্যামি ভরতর্ষভ। (৮/২৩)
হে ভরতর্ষভ, অর্থাৎ ভরতশ্রেষ্ঠ, যেকালে গমন করলে যোগীগণ পুনর্জন্ম প্রাপ্ত হন না এবং যেকালে গমন করলে তাঁরা পুনর্জন্ম প্রাপ্ত হন , তা তোমাকে বলছি।
যে কালে, কাল বলতে আমরা বুঝি সময়। অর্থাৎ যে সময়ে দিনে, রাতে, সকাল, সন্ধ্যে, শীতকালে, গরমকালে এমনকি উত্তরায়নকাল বা দক্ষিণায়ন কাল। আমরা দেখেছি, মহাভারতের মহামতি ভীষ্ম মৃত্যুর জন্য উত্তরায়ণের অপেক্ষায় বেঁচে ছিলেন। আবার বলছেন, গমন করলে, অর্থাৎ একটা রাস্তা আছে, যেখান দিয়ে আমাদের যেতে হয়। আসলে কাল বলতে যেমন সময় বোঝায়, তেমনি যে পথে আমাদের প্রাণবায়ুর উৎক্রমন ঘটে তাকে কাল বা মার্গ বলা হয়ে থাকে।
আমরা জানি সূর্য থেকেই প্রাণের উৎপত্তি। ছান্দোগ্য উপনিষদ বলছেন, (৬/১.......) এই সূর্য্যে আছে, পিঙ্গল, সাদা, নীল, হলুদ, ও লাল রঙ । আবার আমাদের হৃদয়ে যে নাড়ীসমূহ আছে, এগুলোও পিঙ্গল, সাদা, নীল হলুদ, ও লাল রঙের সূক্ষ্ম রসে পূর্ন। সূর্য্যের সঙ্গে আমাদের হৃদয়ের একটা সাদৃশ্য আছে। সূর্যরশ্মি সূর্য থেকে বেরিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। ঠিক তেমনি আমাদের হৃদয় থেকেও নাড়ী সমূহ বেরিয়ে আমাদের সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। এই সব নাড়ী সূক্ষ্ম রস দ্বারা পরিপূর্ন। এই রসের রঙের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নাড়ীর রঙের পরিবর্তন ঘটে থাকে। একই ভাবে সূর্যও নানান রঙ ধারণ করে। সূর্যরশ্মি সূর্যমন্ডল থেকে উৎসারিত হয়ে মানব শরীরে প্রবেশ ক'রে শিরা উপশিরায় প্রবাহিত হয়। আবার সেখান থেকে পুনরায় সূর্যে ফিরে যায়। মানুষ যখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন থাকে, অর্থাৎ স্বপ্নহীন অবস্থায় সুসুপ্তিতে থাকে, তখন তখন ইন্দ্রিয়গুলো তার নাড়ীতে প্রবেশ করে। আর নাড়ীতে সূর্যরশ্মি পূরণ থাকায়, ইন্দ্রিয়গুলো নিস্তেজ হয়ে যায়। তখন ভালো মন্দ কোনো বোধ তাকে স্পর্শ করতে পারে না। তখন তিনি শুদ্ধ - মুক্ত অবস্থায় স্বরূপে অবস্থান করেন। এরপর যখন কেউ দেহত্যাগ করেন, তখন তিনি এই সূর্য রশ্মিগুলোর সাহায্যেই উর্দ্ধে গমন করে থাকেন। বলা হয় আত্মজ্ঞানী পুরুষ ব্রহ্মলোকে যান। উপনিষ বলছেন, সূর্য হচ্ছে ব্রহ্মলোকের দ্বার। যিনি আত্মজ্ঞানই নন, তার জন্য ব্রহ্মলোকের দ্বার বন্ধ।
উপনিষদ আরো বলছেন, হৃদপিণ্ডের সঙ্গে যুক্ত একশো একটা নাড়ী বা ধমনী আছে, এদের মধ্যে একটি ব্রহ্মরন্ধ্র অর্থাৎ মাথার উপর পর্যন্ত প্রসারিত। যিনি এই নারীর পথ ধরে উর্দ্ধে গমন করেন, তিনি অমরত্ব লাভ করেন। অন্যান্য নাড়ীগুলো বিভিন্ন দিকে প্রসারিত। একমাত্র সূর্য নাড়ী হচ্ছে সূর্যালোকে যাবার পথ। যারা এই পথে দেহত্যাগ করেন না, অর্থাৎ সূর্য নাড়ী বাদ দিয়ে অন্য কোনো নাড়ীপথে প্রাণবায়ুকে নিয়ে উৎক্রমন করেন, তাদের আবার জন্মাতে হয়। এরা সবাই অজ্ঞান। আপনার লক্ষ হাওয়া উচিত নিজেকে ব্রাহ্ম বলে অনুভব করা। তাহলে, আপনি একদিন না একদিন লক্ষ্যে পৌঁছে যাবেন। আমরা পরবর্তীতে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে এই সন্মন্ধে শুনবো।
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
---------------------
২৬.০৬.২০২২
যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃশ্লোক :৮/ ২৪
অগ্নির্জ্যোতিরহঃ শুক্ল ষন্মাসা উত্তরায়ণম
তত্র প্রয়াতা গচ্ছন্তি ব্রহ্ম ব্রহ্মবিদো জনাঃ। (৮/২৪)
অগ্নির্জ্যোতি অর্থাৎ জ্যোতির্ময় অগ্নির যিনি অধিপতি, দিনের আলোর যে দেবতা, শুক্লপক্ষের যিনি অধিপতি, ছয়মাস উত্তরায়ণের যে দেবতা এদের যে মার্গ, অর্থাৎ এঁরা যে পথে গমনাগমন করেন, সেই মার্গে গমনকারী ব্রহ্মজ্ঞ ব্যক্তি ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হন।
অন্ধকার রাতে অগ্নির দ্বারা জগৎ আলোকিত হয়, দিনের বেলা সূর্যের প্রকাশেে জগৎ প্রকাশিত হয়। শুক্লপক্ষ অর্থাৎ চন্দ্রের উদয়ে জগৎ প্রকাশিত হয়। উত্তরায়ণে সূর্য উত্তরমুখী হয়। আসলে অগ্নির প্রজ্বলন ইন্ধন শেষ না হওয়া পর্যন্ত চলতে পারে । ইন্ধন শেষ হয়ে গেলে অগ্নি আর আলো দিতে পারে না। আবার এই অগ্নির আলো সীমিত স্থানে সীমাবদ্ধ থাকে। দিনের বেলা যে সূর্য্যের উদয় হয়, তা কম-বেশী বারো ঘন্টা থাকে, এবং জগতের সবত্র এর প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়। শুল্পপক্ষ দীর্ঘ পনেরদিন পর্যন্ত আলোর প্রকাশকে ধরে রাখে। সবশেষে উত্তরায়ণ যা বছরের ছয়মাস ব্যাপী দিনের বিস্তারক্রোমকে করে থাকে। এইসময় দিনের দীর্ঘতা বাড়ে। এই যে ছয়মাস একে বলা হয়, দেবতাদের একদিন। উত্তরায়ণের প্রকাশ বহুদূর পর্যন্ত এবং বহু সময় ধরে হয়ে থাকে।
এখন কথা হচ্ছে, এর আগের শ্লোকের আলোচনার সময় আমরা শুনেছি, যে সূর্যরশ্মির সঙ্গে আমাদের নাড়ীর যোগাযোগ আছে। আমরা মৃত্যুকালে এই সূর্য্যরশ্মিকে আশ্রয় করে উর্দ্ধগতি সম্পন্ন হয়ে থাকি। তো যখন এই সূর্য রশ্মির বা অগ্নির্জ্যোতির বিস্তার যত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়, তত আমাদের উর্দ্ধ গতি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে পারে। আর পৃথিবী বা মৃত্যুপুরী থেকে যত দূরে আপনি অবস্থান করতে পারবেন, তত পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি থেকে আপনি নিস্তার পাবেন। যদিও অন্য কোনো গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আপনাকে টেনে নামাতে পারে, কিন্তু যখন আপনি সূর্যদ্বারে পৌঁছে যাবেন, সেখান থেকে আপনাকে ফিরে আসতে আরো দীর্ঘ সময় লাগবে। আবার এই সূর্য হচ্ছে ব্রহ্মদ্বার অর্থাৎ অন্য ব্রহ্মান্ডের আকর্ষণ কার্যকরী হবে এখানে। এখানে বিশ্বশক্তির ক্রিয়া অধিক প্রবল। এই জ্ঞান আমাদের মতো সাধারনের আয়ত্ত্বে প্রত্যক্ষভাবে আনা সম্ভব নয়।
সাধক যখন নিজেকে সাধনার সাহায্যে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর করতে পারেন, যা কেবল কোটি কোটি সাধকের মধ্যে এক-আধ জনের হয়ে থাকে, তাদের শরীর ত্যাগের পর ব্রহ্মলোকে থাকতে থাকতে এই জ্ঞানের আভাস প্রাপ্ত হন। সাধকের মধ্যে যাঁরা উচ্চতর অধিকার সম্পন্ন তাঁরা যখন দেহ ত্যাগ করেন, তখন তাঁরা সজ্ঞানে কোটি-কোটি চন্দ্র-সূর্য্যের শ্বেতবর্ণ জ্যোতির প্রকাশ অনুভব করে থাকেন। তখন সমস্ত দিকে অবিশ্রান্ত বিদ্যুৎ প্রবাহ দ্বারা আলোকিত হয়ে যাবে। একেই বলে উত্তরায়ণের পথে গমন। জন্ম-জন্মান্তরের সাধনার ফলে, এই ফল প্রাপ্ত হওয়া যায়। এদের সুষুম্নার দ্বার খোলাই থাকে। এদের সহস্রারের উপরে যে বিন্দু অবস্থান করছে, সেখানে মন-ইন্দ্রিয়সকলকে নিয়ে স্থির হয়ে অবস্থা করে থাকে। উপনিষদ বলছেন, ওঙ্কারের সাধনাই যোগীপুরুষকে ব্রহ্মরন্ধ্র পথ থেকে নিষ্ক্রান্ত ক'রে, ব্রহ্মলোকে প্রয়াণ করান । বলা হয়ে থাকে মহামতি ব্রহ্মজ্ঞ ভীষ্ম এই সাধন দ্বারাই দেহপাত করেছিলেন।
এখন কথা হচ্ছে, সূর্যরশ্মি অবলম্বন করেই যদি আমাদের উর্দ্ধগতি সম্পন্ন হতে হয়, তাহলে কি যারা রাতের বেলায় দেহ ত্যাগ করেন, তাদের ব্রহ্মলোক প্রাপ্তির সম্ভাবনা নেই ? ব্যাপারটা এমন হয়। দেখুন সূর্যদেব সর্বদা সজাগ, এক-সেকেন্ডের কোটি ভাগের একভাগ সময়ও তিনি রশ্মি বিকিরণ ক্রিয়া বন্ধ রাখেন না। আর আমরা তো জানি, সূর্য সর্বদাই পৃথিবীকে প্রকাশ করছেন। ভারতবর্ষে যখন রাত হয়তো আমেরিকাতে তখন দিন। উত্তর গোলার্ধে ছয়মাস রাত, ছয়মাস দিন। এইজন্য যোগীপুরুষগন বলে থাকেন, সূর্যদেব রাত্রিকালেও রশ্মি প্রদান করে থাকেন। উদান বায়ুর সাহায্যেই উৎক্রমন ঘটে থাকে । এই উদান বায়ু সূর্য্যের আলোকে আলোকিত এমনটা নয়। যোগী সাধনক্রিয়ার সাহায্যে শরীরের ভিতরে বায়ুর ঘর্ষণের মাধ্যমে অগ্নি প্রজ্বলন করে থাকেন। যদিও এই অগ্নির উৎস সূর্যদেব, তথাপি, এঁকে সংরক্ষণ ও উজ্জীবিত করে থাকেন সাধক তার বায়ু-সাধনক্রিয়ার সাহায্যে। তাই বাইরের দিনের সূর্য্যের আলোর সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। আর এই স্ব-রচিত রশ্মির মধ্যেই যোগী দিন-রাত অবস্থান করে থাকেন। তাই যোগের পরাবস্থায় যিনি অবস্থান করছেন, তার কাছে, দিন-রাত্রি, শুক্লপক্ষ, কৃষ্ণপক্ষ, উত্তরায়ণ দক্ষিণায়ন সবই সমান। তিনি স্বরচিত জ্যোতির মধ্যেই সর্বদা বিরাজ করছেন।
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
---------------------
২৭.০৬.২০২২
যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃশ্লোক :৮/ ২৫-২৬
ধূমো রাত্রিস্তথা কৃষ্ণ যন্মাসা দক্ষিণায়নম
তত্র চান্দ্রমসং জোতির্যোগী প্রাপ্য নিবর্ত্ততে। (৮/২৫)
ধুম, রাত্রি, কৃষ্ণপক্ষ, ও দক্ষিণায়নের ছয়মাস। এই সময়ে যোগী চন্দ্রমার জ্যোতিঃ প্রাপ্ত হয়ে পুনরায় জন্ম গ্রহণ করে থাকেন।
এর আগে আমরা শুনেছিলাম, (৬/৪১-৪৩) যোগভ্রষ্ট ব্যক্তি শুদ্ধ শ্রীসম্পন্ন ঘরে জন্ম গ্রহণ করেন । জ্ঞানবান যোগীকুলে জন্ম গ্রহণ করে, এবং এই ব্যক্তি পূর্বজন্মের সাধন-সামগ্রী সহজেই প্রাপ্ত হন। আর সাধনার দ্বারা সিদ্ধি লাভের জন্য বিশেষভাবে চেষ্টা করে থাকেন। তো যোগীপুরুষ যতক্ষন সিদ্ধি লাভ না করছেন, ততক্ষন তাকে জন্ম-মৃত্যুর চক্রে পাক খেতে হয়।
এখানে বলছেন, যারা ধুম, রাত্রি, কৃষ্ণপক্ষ ও দক্ষিণায়ন কালে দেহ ত্যাগ করেন, তাদের গতি হয় চন্দ্রলোকে। এবং এখান থেকে পুনরায় পৃথিবীলোকে নেমে আসেন। এখানে একটা কথা বোঝবার আছে, আমরা যাকে চন্দ্রমণ্ডল বলে বুঝি, যা আসলে পৃথিবীর একটা উপগ্রহ মাত্র। কিন্তু শাস্ত্র উক্ত চন্দ্রলোক সূর্য্যেরও উপরে অবস্থিত। আর এখান থেকেই চন্দ্রমণ্ডল অমৃত লাভ করে থাকে। এই যে শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষ এগুলো আসলে এক-একটা মার্গ। এই পথে জীবাত্মা বিশেষ জ্যোতিঃ প্রাপ্ত হয়। ধুম বা ধোঁয়া হচ্ছে অগ্নির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এটি অগ্নির নির্বাপনে অর্থাৎ জ্যোতির নিষ্ক্রমনে ধোঁয়া গতিশীল হয়। যা আসলে জ্যোতির বিপরীত সেই অন্ধকারের পথে নিয়ে যায়।
যোগীপুরুষ মাত্রেই ভৌতিক বস্তুর আকর্ষণ ত্যাগ করতে পেরেছেন, এমনটা নয়। এমনকি যোগী পুরুষের মধ্যে যে ঐশ্বর্যের প্রকাশ দেখা দিয়েছে, তাঁকেই উপেক্ষা করা সহজ নয়। তো যিনি জগৎ-সন্মন্ধে উদাসীন নয়, তার পক্ষে প্রকৃত জ্ঞানালোক প্রাপ্ত হওয়া সম্ভব নয়। এই অবস্থায় যোগীপুরুষের প্রাকৃতিক কারনে দেহ ত্যাগ করতে হলে, তিনি সূর্যালোকের সন্ধান পান না। তিনি চন্দ্রলোকের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়ে যান। আবার এই চন্দ্রলোকে সম-অবস্থায় থাকে না। চন্দ্রের হ্রাস ও বৃদ্ধি আছে। আর এই চন্দ্রের হ্রাস-বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যোগীর কখনো বিমূঢ় অবস্থা, কখনো জ্ঞানের অবস্থা প্রাপ্ত হয়ে বিচরণ করে থাকেন। এঁরা কখনো বিষয়াসক্ত, কখনো বিষয়বর্জিত অবস্থা প্রাপ্ত হন । এরা দেহ ত্যাগ করে যদি ব্রহ্মলোকেও যান, তথাপি তাদের ফিরে আসতে হয়। এই অবস্থায় সাধকের কূটস্থের জ্যোতির প্রকাশ ক্ষনিকের জন্য হয়ে আবার মিলিয়ে যায়। এঁরা যে মার্গে যাতায়াত করেন, তা হচ্ছে দক্ষিণায়নের পথ। একেই উপনিষদ বলছে পিতৃযান।
দেখুন রাত বলুন আর দিন বলুন, শুক্ল পক্ষ বলুন, আর কৃষ্ণ পক্ষ বলুন, উত্তরায়ণ বলুন, আর দক্ষিণায়ন বলুন, আমাদের কারুর ইচ্ছামৃত্যু নয়, এমনকি আমাদের শরীর আমাদের ইচ্ছেমতো পরিবর্তন হয় না। মৃত্যুর যা কারন ও সময় তা আমরা কেউ নির্দিষ্ট করে দিতে পারি না। আসলে মৃত্যু আমাদের সর্ব্বক্ষন টানছে, আর কখন যে আমরা মৃত্যুমুখে পতিত হবো, তা আমাদের কাছে অজ্ঞাত। এমনকি অনেক যোগী পুরুষ আছেন, যারা সাধনক্রিয়ায় স্বল্পমাত্র অভ্যস্ত হয়েছেন, তারাও তাদের মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন না। তবে হ্যাঁ মৃত্যুর প্রাক্কালে, আমাদের মন সারা দেয়। একসময় মনে হয়, আমি আর বেশিদিন বাঁচবো না। কিন্তু ঠিক কবে মারা যাবো, শুক্লপক্ষে না কৃষ্ণপক্ষে, উত্তরায়ণে না দক্ষিণায়নে তা আমরা জানি না। তবে একটা কথা যোগীপুরুষগন বলে থাকেন, সাধকের মনে যদি বিষয়ের বিন্দুমাত্র চিন্তন থাকে, ধ্যানাবস্থায় যদি কূটস্থে জ্যোতির দর্শন নিরন্তর না মেলে, তবে তিনি সাধনার গতি ও সময় বাড়িয়ে দিবারাত্রি সাধন ক্রিয়া করতে থাকেন। যতক্ষন শরীরে শক্তি থাকে, যতক্ষন আয়ু থাকে, ততক্ষন তিনি সাধনক্রিয়াতেই অতিবাহিত করতে চান। যখন অতিবৃহৎ জ্যোতির প্রকাশ অনুভব হতে থাকে, বলা হয়, সেই সময় যদি তার মৃত্যু হয়, তাহলে নাকি তার আর পুনরাবৃত্তি ঘটে না।
শুক্ল কৃষ্ণে গতী হোতে জগতঃ শাশ্বতে মতে
একয়া যাত্যনাবৃত্তিম-অন্যয়াবর্ত্ততে পুনঃ। (৮/২৬)
জগতের এই শুক্ল ও কৃষ্ণ দুটি মার্গ অনাদি বলে প্রসিদ্ধ। এই দুই গতির মধ্যে একটি গতিধারায় মোক্ষপ্রাপ্ত হওয়া যায়, অন্য গতিটির দ্বারা পুনরাবর্তন করতে হয়।
সূর্যের দুটি অবস্থান, উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ন। সূর্য যখন মকর রাশি থেকে মিথুন রাশিতে অর্থাৎ দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে যায় তখন তাকে উত্তরায়ণ বলে। উত্তরায়ণের সময় দিন দীর্ঘ হয় এবং রাত ছোট হয়। আবার সূর্য যখন কর্কট থেকে ধনু রাশিতে অর্থাৎ উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে গমন করে তখন তাকে দক্ষিণায়ন বলা হয়। এই সময় দিন ছোটো আর রাত দীর্ঘ হয়। ২২-শে ডিসেম্বর থেকে ২১ শে জুন পর্যন্ত এই ছয় মাস উত্তরায়ণ। আবার ২১শে জুন থেকে ২২শে ডিসেম্বর এই ছয় মাস দক্ষিণায়ন। আসলে সূর্য একবার মহাকাশীয় গোলকের একবার দক্ষিণ গোলার্ধের দিকে একবার উত্তর গোলার্ধের দিকে ঘোরে।
সূর্যের দুটি অবস্থান, উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ন। সূর্য যখন মকর রাশি থেকে মিথুন রাশিতে অর্থাৎ দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে যায় তখন তাকে উত্তরায়ণ বলে। উত্তরায়ণের সময় দিন দীর্ঘ হয় এবং রাত ছোট হয়। আবার সূর্য যখন কর্কট থেকে ধনু রাশিতে অর্থাৎ উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে গমন করে তখন তাকে দক্ষিণায়ন বলা হয়। এই সময় দিন ছোটো আর রাত দীর্ঘ হয়। ২২-শে ডিসেম্বর থেকে ২১ শে জুন পর্যন্ত এই ছয় মাস উত্তরায়ণ। আবার ২১শে জুন থেকে ২২শে ডিসেম্বর এই ছয় মাস দক্ষিণায়ন। আসলে সূর্য একবার মহাকাশীয় গোলকের একবার দক্ষিণ গোলার্ধের দিকে একবার উত্তর গোলার্ধের দিকে ঘোরে।
জ্যোতি সত্ত্বগুণের আর অন্ধকার তমোগুণের লক্ষণ। একশ্রেণীর পণ্ডিতগণের ধারণা, আর্যদের আদি বাসস্থান হচ্ছে উত্তর মেরু অঞ্চল। সেখানে ছয়মাস দিন (উত্তরায়ণ) আর ছয়মাস রাত্রি (দক্ষিণায়ন)। সুতরাং আর্যগনের মধ্যে একটা বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে উত্তরায়ণে দেহত্যাগ শুভ আর দক্ষিণায়নে মৃত্যু অশুভ।
দেখুন অনাবৃত্তি আর পুনরাবৃত্তি কথা দুটোর সঙ্গে আমাদের বৃত্তির নাশ আর বৃত্তির আশ সম্পর্কিত। আমাদের যতক্ষন সমস্ত বৃত্তির নাশ না হবে, ততবার আমাদের ফিরে ফিরে আসতে হবে। যেদিন আমাদের বৃত্তির সম্পূর্ণ নাশ ঘটবে, সেদিন আর এই কর্ম্মজগতে ফিরে আসতে হবে না। আমাদের এই দুটো পথ ভালোভাবে বুঝে নেওয়া দরকার , কৃষ্ণপক্ষ আসলে অজ্ঞান অন্ধকার জগৎ যেখানে আমাদের কামনাবাসনা রূপ বৃত্তি সদা চঞ্চল। আর শুক্ল পক্ষ হচ্ছে, বৃত্তিহীন অবস্থা। অজ্ঞান মানেই অন্ধকার, আর জ্ঞান মানেই আলো। উত্তরায়ণ হচ্ছে উত্তীর্ন হবার মার্গ, আর দক্ষিণায়ন এর বিপরীত পথ। তবে একটা কথা, এই শরীরে থাকতেই এই জ্ঞানমার্গের পথে বা জ্যোতির্ময় মন্ডলে স্থিত হওয়া যায়, যদি শুধু ওঙ্কারের সাধনা করা যায়। এইসব সাধকের দেহত্যাগের সময় এঁরা অগ্নির্জ্যোতি দর্শন করে থাকেন। আর অগ্নির্জ্যোতির মধ্যে বিরাজ করছেন কৃষ্ণবর্ণের পুরুষত্তম। যোগসিদ্ধ পুরুষ, এই নারায়ণে তন্ময় হয়ে দেহ ত্যাগ করে থাকেন।
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
দেখুন অনাবৃত্তি আর পুনরাবৃত্তি কথা দুটোর সঙ্গে আমাদের বৃত্তির নাশ আর বৃত্তির আশ সম্পর্কিত। আমাদের যতক্ষন সমস্ত বৃত্তির নাশ না হবে, ততবার আমাদের ফিরে ফিরে আসতে হবে। যেদিন আমাদের বৃত্তির সম্পূর্ণ নাশ ঘটবে, সেদিন আর এই কর্ম্মজগতে ফিরে আসতে হবে না। আমাদের এই দুটো পথ ভালোভাবে বুঝে নেওয়া দরকার , কৃষ্ণপক্ষ আসলে অজ্ঞান অন্ধকার জগৎ যেখানে আমাদের কামনাবাসনা রূপ বৃত্তি সদা চঞ্চল। আর শুক্ল পক্ষ হচ্ছে, বৃত্তিহীন অবস্থা। অজ্ঞান মানেই অন্ধকার, আর জ্ঞান মানেই আলো। উত্তরায়ণ হচ্ছে উত্তীর্ন হবার মার্গ, আর দক্ষিণায়ন এর বিপরীত পথ। তবে একটা কথা, এই শরীরে থাকতেই এই জ্ঞানমার্গের পথে বা জ্যোতির্ময় মন্ডলে স্থিত হওয়া যায়, যদি শুধু ওঙ্কারের সাধনা করা যায়। এইসব সাধকের দেহত্যাগের সময় এঁরা অগ্নির্জ্যোতি দর্শন করে থাকেন। আর অগ্নির্জ্যোতির মধ্যে বিরাজ করছেন কৃষ্ণবর্ণের পুরুষত্তম। যোগসিদ্ধ পুরুষ, এই নারায়ণে তন্ময় হয়ে দেহ ত্যাগ করে থাকেন।
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
২৮.০৬.২০২২
যোগ সাধনার গুহ্যতত্ত্ব : শ্রীগীতা - অষ্টম অধ্যায় - অক্ষর ব্রহ্মযোগঃশ্লোক :৮/ ২৭-২৮
নৈতে সৃতী পার্থ জানন যোগী মুহ্যতি কশ্চন
তস্মাৎ সর্ব্বেষু কালেষু যোগযুক্তো ভবার্জ্জুন। (৮/২৭)
হে পার্থ এই মার্গ দুটির রহস্যঃ অবগত হয়ে যোগীপুরুষ মোহগ্রস্থ হন না। সুরতাং হে অর্জ্জুন, তুমি সর্ব্বদা যোগযুক্ত হও।
যোগীপুরুষগন যখন যোগের উত্তম অবস্থা প্রাপ্ত হন, তখন তাঁর ব্রহ্ম ভিন্ন অন্য কোনো বস্তুতে মন আটকে থাকতে পারে না। আবার এই সমাধিতে স্থিতপ্ৰাপ্ত না হতে পারলে, সাধকের বিষয়ের মোহ কাটে না। দেখুন, আমরা বুঝি অনেক কিছু, ভালো-মন্দ জ্ঞান আমাদের অনেকের মধ্যেই আছে, তথাপি, আমরা শ্রেয় ছেড়ে প্রিয় বস্তুর দিকে ধাবিত হই। বিষয়ের প্রতি মনের বহুদিনের সম্পর্ক। বিষয়ের একটা স্বাদ আছে। সেই স্বাদ পেতে বিষয়ের দিকে মন বারবার ছুটে যায়। আমরা শুনেছি, শুভ কর্ম্মে স্বর্গপ্রাপ্তি অর্থাৎ ভবিষ্যতে শান্তি পেতে পারি। অশুভ কর্ম্মে নরকবাস, অর্থাৎ অশান্তি দুর্দশাগ্রস্থ হতে পারি আমরা। আবার এই দুই অবস্থাই চিরস্থায়ী নয়। নরকবাস একদিন না একদিন শেষ হবে, আবার স্বর্গ বাসের মেয়াদ একদিন ফুরিয়ে আসবে। আবার আমরা এই কর্ম্ম ভূমিতে বা মৃত্যুপুরীতে ফিরে আসবো। আবার আমরা কর্ম্মে লিপ্ত হবো, আবার কর্ম্মজনিত ফল ভোগ করতে থাকবো। এই চক্র আমাদের বেঁধে রেখেছে। এখান থেকে বেরুতে হবে। সৃষ্টির প্রারম্ভে আমরা কিন্তু একদিন কর্ম্মভূমিতে ছিলাম না, তখন কর্ম্মহীন নিষ্ক্রিয় হয়েই অপার শান্তিতে অবস্থান করতাম। ধ্যানের গভীরতায় আমাদের সেই উপলব্ধি আসে। মায়ার রাজ্য পেরিয়ে আমরা এমন একটা রাজ্যে উপনীত হতে পারি, যেখান না আছে কোনো সংকল্প, না আছে কামনা, বাসনা, না আছে ভয়, না আছে রাগ, অনুরাগ, দ্বেষ ঘৃণা । এমনকি ইচ্ছেশক্তি রোহিত হয়ে আমাদের অবস্থান হয়ে থাকে। এই অবস্থা প্রাপ্তিই যোগীপুরুষের উদ্দেশ্য, এই অবস্থায় স্থিতিই যোগীপুরুষের সাধনা। আর এখানেই সমস্ত ঐশ্বর্যের মালিক নারায়ণ ক্ষীরোদ সাগরে লক্ষীকে (ঐশর্য্য) নিয়ে শয়ানে আছেন। এই ভাবের মধ্যে একবার প্রবেশ করতে পারলে, গতাগতি থাকে না। বারবার যাতায়াতের পরিসমাপ্তি হয়। আসলে সাধনক্রিয়া আর কিছুই নয়, শুধু ভাবের পরিবর্তন মাত্র। আর ভাবের ফলেই আমাদের অভাব থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারি।
ঋষি অষ্টাবক্র মুনি বলছেন,
দেহভিমানপাশেন চিরং বদ্ধোঽসি পুত্ৰক
বোধোঽহং জ্ঞানখর্গেন তন্নিকৃত সুখী ভব। (১/১৪)
হে পুত্র, সুদীর্ঘকাল যাবৎ তুমি দেহাত্ম অভিমানে বদ্ধ হয়ে আছো, সুতরাং "আমি চৈতন্যস্বরূপ" এই ভাবনারূপ জ্ঞানঃ খড়্গ দ্বারা দেহাভিমান ছিন্ন করে সুখী হও।
অষ্টাবক্র সংহিতার পরবর্তী শ্লোকে(১/১৫) ঋষি অষ্টাবক্র মুনি বলছেন, তুমি সর্ব্বসন্মন্ধশূন্য, সর্বক্রিয়ারহিত, স্বয়ংপ্রকাশ ও সর্ব্ব-অজ্ঞান এবং সেই কার্য্যের জন্য কালিমালিপ্ত হয়েও যে বৃত্তিনিরোধাত্মক সমাধির জন্য যত্নবান হচ্ছ, এটাও তোমার একটা বন্ধন। অর্থাৎ তোমার বন্ধন কেবলমাত্র মনের ভ্রম মাত্র, আর এই বন্ধন থেকে মুক্ত হবার জন্য, সে সাধনক্রিয়া করছো, তাও তোমাকে বন্ধনের কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এখান থেকে বেরিয়ে এসে স্বরূপে স্থিত হও, নিজের প্রকৃত স্বরূপকে স্মরণ করো। একেই বলে আমাকে (ভগবত) স্মরণ।
বেদেষু যজ্ঞেষু তপঃসু চৈব
দানেসু যৎ পুণ্যফলং প্রদিষ্টম।
অত্যেতি তৎ সর্ব্বমিদং বিদিত্বা
যোগী পরং স্থানমুপৈতি চাদ্য়ম। (৮/২৮)
বেদের জ্ঞান অর্জনে, যজ্ঞ তপস্যায় এবং দানাদিতে যে পুণ্যফল আছে, সেই পরমতত্ত্ব জেনেও যোগীপুরুষ সেই সকল অতিক্রম করেন এবং উৎকৃষ্ট পরম স্থান প্রাপ্ত হন।
ক্রিয়ার পরাবস্থায় আমি আমার বলে কিছুই থাকে না। তখন সমস্ত ব্রহ্মময় বলে প্রতীত হয়। এই ব্রহ্মময় অবস্থা সহজে স্থিত হয় না। একবার আসে, পরক্ষনে আবার জগৎ-অনুভূতি জেগে ওঠে। কিন্তু এই ধ্যানাবস্থা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘকাল অভ্যাসের ফলে ব্রহ্মময় অবস্থায় স্থিতি লাভ করতে থাকে। প্রাণ উর্দ্ধগতি সম্পন্ন হয়ে ধ্যেয় বস্তুতেই সম্পৃক্ত হয়। এই অবস্থাই মুক্ত পুরুষের অবস্থা। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, বেদপাঠে পুন্যজ্ঞান সঞ্চয় হয়, যজ্ঞ কর্ম্মে পুন্য হয়, তপস্যায় পুন্য হয়, দানক্রিয়া করলে পুন্য হয়। কিন্তু এই সঞ্চিত পুন্য কর্ম্মফল ভোগ করবার জন্য, আবার ফিরে ফিরে মৃত্যুপুরীতে আসতে হয়। কিন্তু যিনি পরমস্থান লাভ করতে চান, তাকে এই পুন্য কর্ম্ম থেকেও উর্দ্ধে উঠে নিজের স্বরূপে ক্রিয়াহীন, নিঃসঙ্গ, নিস্পৃহ হয়ে অবস্থান করতে হবে। এইসময় সাধক একমাত্র ভগবৎ স্মরণেই স্থিত থাকেন।
ইতি শ্রীমৎ-ভগবৎ-গীতা-উপনিষৎসু -ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণ-অর্জ্জুন সংবাদে অক্ষর-ব্রহ্মযোগ নাম অষ্টম-অধ্যায়।
ওম নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
--------------------
ভাববেন না আমি কাউকে গীতা বোঝাচ্ছি। আমি আসলে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমুখ থেকে নিঃসৃত অমৃতসুধা পান করতে চাইছি। বন্ধুরা কেউ কেউ এঁকে সংরক্ষণ করতে চাইছেন, কেউ অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাইছেন। দেখুন, কতকগুলো জিনিষ যা চিরকালীন, যা গতিশীল তাকে সংরক্ষণ করা যায় না। ভাগ করা যায় না। সংরক্ষণ মানেই স্থিতি - আর স্থিতি মানেই মলিনতা প্রাপ্ত হওয়া। জলকে ধরে রাখলে, তা দূষিত হয়ে যায়। বাতাসকে আপনি ধরে রাখতে পারবেন না। শ্বাসকে আপনি ধরে রাখতে পারবেন না। রোদকে আপনি ধরে রাখতে পারবেন না। স্রোতস্বীনি নদীকে বাঁধ দিলে, তার গতিকে রোধ করলে সে আর নদী থাকবে না। বাতাসকে আপনি উপভোগ করুন। বেঁচে থাকবার উপকরণ হিসেবে দেখুন। পাখা ঘুরিয়ে আমরা বাতাসের শান্তি উপভোগ করি। কিন্তু সত্য হচ্ছে পাখা ঘুরিয়ে বাতাস পাওয়া যায় না। বাতাস আছে, তাই তাকে আমরা আঘাত করে, নিজে উপল্বদ্ধির যোগ্য করে নেই। সূর্য আছে, তাই আমরা জীবনীশক্তি পাই। ভগবান আছেন, তাই আমরা ভগবানকে নাড়াচাড়া করে, তাঁকে উপল্বদ্ধিতে আনতে চাই। এই নড়াচড়ায় যদি কারুর মধ্যে ভগবানের উপলব্ধি আসে, ভগবানের কথার মধ্যে যদি ভগবানকে দেখতে পান, তবে জানবেন আপনিও ভগবানের কাছে মানুষ হয়ে গেছেন। নাই বা শুনলো অন্য কেউ। নাই বা সংরক্ষণ করলেন। শুধু উপল্বদ্ধিতে আনবার চেষ্টা করুন, আমিও সেই চেষ্টাই করছি। শ্রীমৎ ভগবৎ গীতা, আসলে গতিশীল ভগবানের বাণী। কালের স্রোতে ভেসে চলেছে। সমস্ত যুগের জন্য এই বাণী-প্রবাহ । আপনি যেকোনো ঘাটে বসেই এই পবিত্র অমৃতস্রোতে অবগাহন করতে পারবেন। এর কখনো লয় নেই। এটি ভগবানের মতোই চিরকালীন।আমাদের শুধু দরকার ঘাটের কাছে নিজেকে নিয়ে যাওয়া। সবাই ভালো থাকুন।
--------------------------------------- অষ্টম অধ্যায়ের সমাপ্তি।

Comments
Post a Comment