যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - ষষ্ঠ অধ্যায় - ধ্যানযোগঃ শ্লোক নং - ৬/২৪-৪৭
০৪.০৪.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - ষষ্ঠ অধ্যায় - ধ্যানযোগঃ
শ্লোক নং - ৬/২৪-২৫
যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবার ধ্যানযোগের মাধ্যমে কিভাবে সমাধির অভ্যাস সম্ভব, সেকথা আলোচনা করছেন।আমার মাঝে মধ্যে মনে হয়, সমাধি কি জীবন থেকে নিষ্কৃতি পাবার উপায় ? আমাকে ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করেছিলেন, এসব কথায় সাধারণ মানুষের কি লাভ হবে ? সাধারণ মানুষের আছে ক্ষুধা-তৃষ্ণা, সাধারণ মানুষের আছে নিদ্রাসুখ, আছে মৈথুনের মাধ্যমে সৃষ্টির আনন্দ। যোগের কথায় সাধারনের কী লাভ হবে ? দেখুন সাধারণত পশুর খাদ্যের জন্য তাকে খাদ্যের সন্ধানে বেরুতেই হয়। কিন্তু গৃহপালিত পশুর খাদ্যের চিন্তা থাকে না। প্রভু তার খাদ্যের ব্যবস্থা করেন । তেমনি যিনি ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পন করেছেন, তার বেঁচে থাকার জন্য তাকে চিন্তা করতে হয় না। এমনকি মৃত্যু তাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করতে পারে না। সাধারনের আছে নিদ্রাসুখ যা কিছুক্ষন পরেই ভেঙে যায়। কিন্তু সমাধিতে আছে চিরনিদ্রার সুখ। প্রকৃত সমাধিবান পুরুষের নিদ্রাসুখ চলতেই থাকে। মৈথুনসুখ মানুষের সাময়িক। দুটো স্থুল শরীরের মিলনে এই সুখের উপলব্ধি। কিন্তু আত্মসুখ অর্থাৎ আত্মার সঙ্গে মিলনের সুখের কোনো তুলনা হয় না। তো সবাই আমরা একসময় সাধারণ থাকি। আর এই সাধারণ থেকে ধীরে ধীরে অসাধারন হয়ে ওঠাই সাধনা - যোগ সাধনা।
সংকল্প প্রভবান কামাংস্ত্যক্ত্বা সর্ব্বানশেষতঃ
মনসৈববে-ইন্দ্রিয়গ্রামং বিনিয়ম্য সমন্ততঃ। (৬/২৪)
সংকল্প হতে জাত সমস্ত কামনাগুলোকে নিঃশেষে ত্যাগ করে, মনের দ্বারাই ইন্দিরায়গুলোকে সমস্ত বিষয় থেকে বিশেষ প্রত্যাহৃত হবে।
পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, কামনা সংকল্প থেকে জাত। একে অর্থাৎ কামনাগুলোকে সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করতে হবে। দেখুন বিষয় আমরা ত্যাগ করতে পারি কখন - যখন সেই বিষয়ে আমাদের বিতৃষ্ণা আসে। আর বিষয়ের তৃষ্ণা বা বিষয়ের প্রতি স্পৃহা কখন যেতে পারে - যখন বিষয়ের প্রতি আমরা বীতশ্রদ্ধ হই। এই বীতশ্রদ্ধ ভাব তখনই আসতে পারে, যখন আমরা বিষয়ের বিচার করতে সক্ষম হই। আর বিচার কে করে ? বিচার করে মন, বুদ্ধির সাহায্যে। এই বুদ্ধি যার যত সূক্ষ্ম ও তীক্ষ্ণ, তার বিচার তত সঠিক। মন যখন বিচারশীল হয়, তখন মন বুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত হয়। আর বুদ্ধির দ্বারা মন পরিচালিত হলে সে ইন্দ্রিয়ের কথায় আসক্ত হবে না। তো বিচারের দ্বারা মনকে সংযত করতে পারলে, মন বিষয় গ্রহণে উদাসীন হয়ে যাবে। এখন যোগাভ্যাস দ্বারা যদি প্রাণ-মনকে স্থির করতে পারি, তবে বুদ্ধি স্বচ্ছ হবে, ক্ষুরধার হবে। বিচারশক্তি বৃদ্ধি পাবে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবো । এইসময় মন আর ইন্দ্রিয়মুখী বা বিষয়মুখী চাইবে না। মন হবে সঙ্কল্পরহিত। আর সঙ্কল্পরহিত মনে কামনার লেশমাত্র অবশিষ্ট থাকবে না। এই কথাটাই বলছেন, যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। ভগবৎ চিন্তায় যাঁর আগ্রহ হয়েছে, বিষয়ে তাঁর অনীহা আসে। চঞ্চল প্রাণ, মনকে অস্থির করে। তো যোগাভ্যাসের দ্বারা প্রাণকে স্পন্দন-রোহিত করতে হবে। তখন মন নিস্পন্দ হয়ে যাবে, ইন্দ্রিয়সকল তখন মনকে আকর্ষণ করতে পারবে না।
শনৈঃ শনৈরুপরমেদ্ বুদ্ধ্যা ধৃতিগৃহীতয়া
আত্মসংস্থং মনঃ কৃত্বা ন কিঞ্চিদপি চিন্তয়েৎ। (৬/২৫)
বার বার এই অভ্যাসের দ্বারা ধীরে ধীরে ধারণা বশীকৃত বুদ্ধি দ্বারা বিগতস্পৃহ মনকে আত্মাতে নিশ্চল করে, চিন্তাহীন হবে।
মনকে চিন্তাশূন্য করতে হবে, মনকে আত্মাতে স্থির করতে হবে। যোগের এইতো মূলসূত্র বা উদ্দেশ্য। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, বারবার যোগের অভ্যাস দ্বারা আমাদের বুদ্ধি দ্বারা বশীভূত স্পৃহাশূন্য মনকে আত্মাতে স্থির করতে হবে। দেখুন চিন্তা সহজে যাবার নয়। যোগক্রিয়ার সাহায্যে মনকে ধীরে ধীরে নিম্ন চক্র অর্থাৎ মূলাধার থেকে ধীরে ধীরে উর্দ্ধ চক্রের অভিমুখী করতে হবে। এমনকি শ্বাস-প্রশ্বাসকে ধীরে ধীরে প্রবাহিত করতে হবে। প্রথম শ্বাসকে অতিবেগে চালনা করলে উপকারের চেয়ে ক্ষতি হতে পারে বেশি। শ্বাসকে গ্রহণ করবার সঙ্গে সঙ্গে মনকে প্রতি চক্রে কিছুক্ষনের জন্য স্থির করতে হবে। প্রতিটি চক্রে মনের স্থিতি প্রয়োজন। যদিও নিম্ন চক্রে অর্থাৎ মূলাধার স্বাধিষ্ঠান এমনকি মনিপুরে বেশিক্ষন অবস্থান না করাই ভালো। এখানেই সংসারের বিড়ম্বনা বজায় থাকে।
রাজযোগ আসলে মনের সাধনা। রাজযোগে বলা হয়ে থাকে, প্রাণকে আকর্ষণ করে উর্দ্ধগামী করার সঙ্গে সঙ্গে মনকে আকর্ষণ করে প্রতিটি চক্রে স্থাপন করতে হবে। এবং ধীরে ধীরে মনকে উর্দ্ধগামী করে চক্রে স্থাপন করলেই সাধনার সিদ্ধি আসবে। আর প্রতিচক্রে মনকে স্পর্শ না করালে সেই চক্রের শক্তি জাগ্রত হতে পারে না। এই সময় মনের মধ্যে উদয় হওয়া নানান চিন্তাকে, এমনকি নানান রূপাদি দর্শন দর্শককে অর্থাৎ সাধককে বিভ্রান্ত করতে পারে। তো এমন সবকিছু প্রত্যাহার করে, শুধু ক্রিয়ার মধ্যে মনকে নিবদ্ধ রাখতে হবে। এইভাবে ক্রিয়া সাধনায় উন্নতি হতে থাকে। ধীরে ধীরে মন নিশ্চল অবস্থায় আসে। কিন্তু মনের মধ্যে সঞ্চিত পূর্ব পূর্ব সংস্কারের উদয় হতে থাকে। এতে করে নিজেকে বা নিজের মধ্যে লুক্কায়িত সংস্কার সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া যায়। প্রথম দিকে প্রত্যাহার দ্বারা এর নিবৃত্তি করতে হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে, এই প্রত্যাহার ক্রিয়ার প্রয়োজন ফুরিয়ে আসে। তখন ইষ্টে মন স্থির হতে শুরু করে। এই স্থিতি তখনও ঘনীভূত হয়নি। ধীরে ধীরে অভ্যাসের দ্বারা এই অবস্থার মধ্যে নিজের মনকে ধরে রাখতে পারলে, ধারণা ধ্যানে রূপান্তরিত হতে থাকে। এই ধ্যান যখন গভীর হয়, অর্থাৎ মন যখন এক-এ স্থির হয় তখন সমাধির অবস্থা। তো ধ্যান - সমাধি জোর করে আনা যায় না। প্রত্যাহারের অভ্যাস ধীরে ধীরে ধারণায় স্থিত লাভ করে, এবং একসময় ধারণা ধ্যানের রূপ নেয়। এটি সময় ও অভ্যাসের দ্বারাই হতে পারে, জোর করে হয় না। আমরা জেগে থাকতে বিষয়ের দিকে আকৃষ্ট হই। এইসময় আমাদের স্থুলশরীর -ইন্দ্রিয় সক্রিয় থাকে। একসময় ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্নের মধ্যে নানান দৃশ্য দেখি। তখন আমাদের মন-ইন্দ্রিয়সকল সক্রিয় থাকে, কিন্তু স্থুলদেহ নিষ্ক্রিয় থাকে । একসময় এই স্বপ্নাবস্থা কেটে আমাদের গভীর ঘুম আসে অর্থাৎ আমরা সুসুপ্তির অবস্থার দিকে অগ্রসর হই। তখন মন-দেহ-ইন্দ্রিয়সকল নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।
ঠিক তেমনি সমাধির আগে আমাদের একটা তন্দ্রাবস্থা ঘিরে রাখে। ক্ষনে চেতন, ক্ষনে অচেতন। বাহ্যজ্ঞান আসে আবার যায়, কিন্তু বাহ্য বস্তুর প্রত্যাহারে অন্তর্বস্তুর জ্ঞান হতে শুরু করে। অর্থাৎ ইষ্টে মন স্থিত হতে শুরু করে।
------------------------
০৫.০৪.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - ষষ্ঠ অধ্যায় - ধ্যানযোগঃ
শ্লোক নং - ৬/২৬
যতো যতো নিশ্চরতি মনঃ চঞ্চলম-অস্থিরম
ততঃ ততঃ নিয়ম্যৈ-তদাত্মন্যেব বশং নয়েৎ। (৬/২৬)
চঞ্চল মন অস্থির অবস্থায় যে যে বিষয়ের প্রতি ধাবিত হয়, সেই সেই বিষয় থেকে তাকে প্রত্যাহার করে আত্মাতে স্থির করতে হবে।
মনের স্বভাব হচ্ছে চঞ্চলতা। আমাদের জন্ম জন্মান্তরের যে সংস্কার, তার কিয়দংশ আমাদের স্মৃতিতে সঞ্চিত থাকে। এই স্মৃতির তখনই ক্রিয়াশীল বা জাগরণ হয় যখন মন সমধর্ম্মী বস্তুর সংস্পর্শে আসে। আবার আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস যতক্ষন আমাদের ইড়া ও পিঙ্গলা নাড়ীতে প্রবাহিত হয়, ততক্ষন আমাদের আমাদের মন অবশ্য়ই সংসারমুখী থাকবে। মন সঙ্কল্পরহিত হতে পারবে না। একে আপনি বাহ্যিক বিচার দ্বারা নিরস্ত্র করতে পারবেন না। সঠিক মুদ্রায় প্রাণায়ামের অভ্যাস করলে, একদিকে যেমন মনের মধ্যে সত্য উপল্বদ্ধির জন্য মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে, তেমনি মন হয়ে ওঠে বিষয় বিমুখ। সাপের লেজে পা পড়লে, সে ফনা দেবে, আবার সাপের মাথা চেপে ধরলে, সে নিশ্চুপ হতে বাধ্য। তখন সে লেজকে গুটিয়ে আনতে চায়। তো আমাদের শ্বাস যখন সুষুম্নার মুখে আঘাত করতে শুরু করে তখন মন বিক্ষেপাদি ছেড়ে শ্বাসে স্থির হয়। জ্ঞানীগণ যেমন বিচারের সাহায্যে মনকে বিষয়বিমুখ করতে পারেন, তেমনি যোগীগণ শ্বাসের সাহায্যে মনকে বিষয়বিমুখ করতে পারেন। বিচারের জন্য জ্ঞান-সাধুসঙ্গ প্রয়োজন। যোগীর দরকার অধ্যাস। তো যেভাবেই পারুন, আপনাকে এই বিষয় থেকে মনকে প্রত্যাহার করতে হবে।
যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, এবার এই মনকে আত্মাতে স্থির করতে হবে। আত্মা অর্থাৎ নিজের স্বরূপ। যে শক্তি সমস্ত ভূতের অধীশ্বর, সেই শক্তির মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত করতে হবে। অর্থাৎ নিজের মধ্যে নিজের প্রবেশ। আমাদের মন যখন সামান্য সময়ের জন্য হলেও শান্ত থাকে, তখন আমাদের বিচারবুদ্ধি করবার ক্ষমতা থাকে। কিন্তু মন বিক্ষিপ্ত হলে, আমাদের বিচারক্ষমতাও লোপ পায়। কিন্তু মনকে শান্ত করবার জন্য, অন্য কোনো শারীরিক ক্রিয়া, কোনো কাজে আসে না, একমাত্র প্রানায়াম ছাড়া। আপনি যত বড় শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত হন, আপনি যতবড়ো পদাধিকারী ব্যক্তি হন না কেন, বায়ুকে স্থির করতে না পারলে, আপনার মন শান্ত হতে পারে না। তো যাদের প্রাণায়াম করবার অভ্যাস আছে, তারা খেয়াল করবেন, কিছুক্ষন শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করলেই, আপনা থেকে মন শান্ত হতে শুরু করে। এমনকি আপনার শরীরের কামনা নামক রিপুর যে বাড়াবাড়ি তা থেকে আপনি রেহাই পেতে পারেন, এই প্রাণায়ামের দ্বারা। এখন কথা হচ্ছে যোগীপুরুষগণকে শুধু মনকে শান্ত করেই ক্ষান্ত হলে চলবে না। মনকে নিজঃ-অন্তঃপুরে প্রবেশ করাতে হবে। কিন্তু আপনি চাইলেই মন অন্তঃপুরে প্রবেশ করবে এমনটা নয়। কিন্তু অনবরত এই প্রয়াস, অর্থাৎ অনবরত বৈরাগ্যের সাধন, শ্বাসের গতিকে ধীর করার মাধ্যমে মন একসময় কূটস্থে প্রবেশ করবে। একদিকে বিচার, অন্যদিকে শ্বাসকে রুদ্ধ করবার ফলে, ভিতরে ভিতরে একটা আনন্দের আবহাওয়া বইতে শুরু করবে। আর এই আনন্দের সন্ধান যখন মন পেয়ে যাবে, তখন বিশুদ্ধ মন ওই নিরুদ্ধ ভূমিতে প্রবেশ করবে। তখন দেখবেন, সেখানে থেকে আর বেরুতে ইচ্ছে করছে না। আসলে সাধনায় আমাদের কোনো রসবোধ আসে না। তাই আমরা সাধনাকে রুক্ষ বলে মনে করি। তীর্থপথের অসহনীয় কষ্ট একসময় শেষ হয়ে আসে যখন আমরা এই হিমশীতল স্থির বায়ুর মধ্যে নিজেকে প্রবেশ করাতে পারি। আর এই যে নিরুদ্ধভূমির প্রবেশ পথ - এখানে কোনো দরজা নেই, আবার সবজায়গায় দরজা। এ যেন একটা দরজাহীন মশারি, যার প্রবেশপথ কালিদাস খুঁজে পায় না। আর মশারির মধ্যেই অবস্থান করছে, কালিদাসের প্রিয়তমা আত্মা । কালিদাস দেখছে, শুনছে, কিন্তু ধরতে পারছে না। ঠাকুর বলছেন, হারিকেনের আলো, কাঁচ দিয়ে ঢাকা। মনে হচ্ছে ধরতে পারবো, কিন্তু কোথায় যেন একটা বাধা। একবার যেখানে গেলে, আর বেরুতে চায় না মন। একেই বলে আত্মাতে স্থির হওয়া।
----------------------------
০৬.০৪.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - ষষ্ঠ অধ্যায় - ধ্যানযোগঃ
শ্লোক নং - ৬/২৭-২৮
প্রশান্ত-মনসং হ্যেনং যোগিনং সুখম-উত্তমম
উপৈতি শান্তরজসং ব্রহ্মভূতম-কল্মষম। (৬/২৭)
রজোগুণ থেকে মুক্ত, প্রশান্ত চিত্ত, নিষ্পাপ, ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত এই যোগীকে উত্তম সুখ আশ্রয় করে থাকে।
শান্তরজস অর্থাৎ যার রজোগুণ শান্ত হয়েছে। এখানে রজোগুণ বলতে চিত্ত চাঞ্চল্যের কথা বোঝানো হচ্ছে। আমাদের একদিকে যেমন তমোগুণ চিত্তের বৈকল্য সৃষ্টি করে তেমনি রজোগুণ আমাদের কর্ম্মচঞ্চল করে তোলে। রজোগুণের ফলেই আমাদের মধ্যে কর্তৃত্ত্বাভিমান জাগ্রত হয়। বিচারের দ্বারা আমরা যেমন বিষয়কে বর্জন করতে পারি, তেমনি প্রাণের সাধনক্রিয়ার দ্বারাও আমরা বিষয়কে প্রত্যাহার করতে পারি। যোগের দ্বারা যে প্রত্যাহার তা স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে থাকে। আসলে তখন বিষয়জনিত কর্ম্মে স্পৃহা থাকে না। কর্তৃত্ত্বাভিমান দূর হয়ে যায়। তখন মনে হয়, কর্ম্ম সেতো আমরা নয়। "তোমার কর্ম্ম তুমি করো মা লোকে বলে আমি করি"। মনের বিক্ষিপ্ততাই মনকে পাপবদ্ধ করে, অর্থাৎ আত্মা থেকে মন বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে। এই ছোটাছুটি শেষ হলেই মন পাপশূন্য হয়ে নিষ্পাপ হয়, অর্থাৎ আত্মাতে স্থিত হয়। নিষ্পাপ যোগীর মধ্যে তখন "সর্ব্বং ব্রহ্ম" ভাব হয়। এই সর্বং ব্রহ্ম ভাব তাঁকে এক সুখের সাগরে নিমজ্জিত করে। প্রাণের সাধনার দ্বারা রজো ও তম গুনের নাশ হলে মন হয় বিশুদ্ধ, নির্মল। আর এই বিশুদ্ধ মন আত্মসাক্ষাৎকার লাভ করে। ঋষি পতঞ্জলি মতে সমাধিতে সিদ্ধিলাভ করে, আত্মসাক্ষাৎকার লাভ করে, এই নির্ম্মল আনন্দে বিভোর হয়ে যাওয়াই জীবনের লক্ষ।
যুঞ্জন্নেবং সদাত্মানং যোগী বিগত-কল্মষঃ
সুখেন ব্রহ্ম-সংস্পর্শম-অত্যন্তং সুখমশ্নুতে। (৬/২৮)
এইভাবে সদা আত্মাকে (মনকে) বশীভূত করে, বিগতপাপ যোগী অনায়াসে ব্রহ্ম-সাক্ষাৎকার রূপ অত্যন্ত সুখ লাভ করে থাকেন।
মন যখন আত্মাকে আশ্রয় করে, তখন মন সমস্ত কলুষ মুক্ত থাকে। আমরা আগে শুনেছি, সাধনক্রিয়ার সাহায্যে ধারণা ধ্যান সমাধি সবই ধীরে ধীরে আসবে, কিন্তু বিষয়-সংস্কার আচ্ছন্ন মন সুযোগ পেলেই বিষয়ের দিকে ছুটবে। মনের বিষয়ের প্রতি এই যে আসক্তি, একভাবে কেবল আত্মার সন্ধানে মনকে ধরে রাখতে হবে। এই হচ্ছে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ। এই অভ্যাসের ফলে যোগীর মধ্যে থেকে সমস্ত পাপ দূর হয়ে যাবে। পাপ কথাটার অর্থ বিষয়াসক্তি। বিষয়াসক্তি দূর হলেই মন পাপশূন্য হয়ে থাকে। আসলে এই পাপশূন্য অবস্থা লাভই সাধনার উদ্দেশ্য। সাধনক্রিয়া অভ্যাসের ফলে সাধনায় যখন গভীরতা আসে, তখন "সর্ব্বং ব্রহ্মময়ং জগৎ" অবলোকন করতে থাকেন। এটাকেই সর্ব্ব সুখময় অবস্থা বলা হয়ে থাকে। তখন আর দ্বিধা, দ্বন্দ, ভয়, বিদ্বেষ থাকে না। তখন দেহ স্থির, প্রাণ স্থির, মন বিক্ষেপশূন্য, বুদ্ধি আত্মবিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকে। অর্থাৎ চিদানন্দ স্বরূপ আত্মস্থ ভাব, যোগীকে ঘিরে রাখে। বৃত্তিশূন্য অবস্থায় সাধন মুক্ত পুরুষ হয়ে যান। আসলে এই সময় সুখ-দুঃখ বোধের উর্দ্ধে অবস্থান করেন যোগীপুরুষ । সমস্ত অবিদ্যার নাশ ঘটে। কিন্তু এই অবস্থা থেকে বুত্থান ঘটে। যখন বুত্থান ঘটে তখন তার মধ্যে সমাধি-অবস্থার সুখের স্মৃতি জেগে থাকে । ফলত বাহ্যিক জগৎ ও অন্তর্জগতের মধ্যে পার্থক্য ধরতে পারেন।
মনকে এই নিষ্পাপ অবস্থায় দীর্ঘ-স্থায়ী করতে গেলে, এই বিক্ষেপ বা পাপের মল গুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা উচিত। ঋষি পতঞ্জলি তাঁর যোগদর্শন বইতে সমাধিপাদের ৩০ নং শ্লোকে বলছেন, চিত্ত বিক্ষেপের নয়টি কারন। এগুলো হচ্ছে - শারীরিক ব্যাধি, চিত্তের অলসতা, চিত্তের সংশয়, প্রমাদ, শারীরিক আলস্য, সর্বদা সম্ভোগের ইচ্ছে, ভ্রান্তিদার্শন, ওলাবদ্ধ-ভূমিকত্ব অর্থাৎ সমাধিভূমিতে না পৌঁছানো, অনবস্থিত অর্থাৎ সমাধি ভূমি লাভ করেও তাকে রক্ষা করতে না পারা। এই নয়প্রকার চিত্ত বিক্ষেপকে বলা হয় যোগমল বা যোগের অন্তরায়। যোগের এই অন্তরায়গুলো থেকে নিজেকে মুক্ত করতে হবে। আর তা হতে পারে একমাত্র সঠিক যোগক্রিয়ার দ্বারা।
---------
০৭.০৪.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - ষষ্ঠ অধ্যায় - ধ্যানযোগঃ
শ্লোক নং - ৬/২৯-৩০
সর্ব্বভূতস্থং-আত্মানং সর্ব্বভূতানি চাত্মনি
ঈক্ষতে যোগযুক্তাত্মা সর্ব্বত্র সমদর্শনঃ। (৬/২৯)
যোগাযুক্ত পুরুষ সর্বভূতে সমদর্শী হয়ে, আত্মাকে সর্বভূতে, এবং সর্বভূতে আত্মাকে দর্শন করে থাকেন।
সাধক যখন যোগারূঢ় অবস্থায় থাকেন, তখন তিনি সর্বত্র ব্রহ্মকেই দর্শন করে থাকেন। এবং এমনকি নিজেকেও ব্রহ্মবৎ দর্শন করে থাকেন। কিন্তু যখন সমাধি থেকে বুত্থিত হন, তখন প্রতিভাসিত এই প্রপঞ্চময় এই জগৎ তার নজরে পড়ে। কিন্তু যেহেতু তিনি ক্রিয়ার পরাবস্থায়, জগতের স্বরূপ সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান হয়েছে, অর্থাৎ জগৎ যে নশ্বর তা তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন, এবং এক ব্রহ্ম ছাড়া কিছু নেই, এই সত্যে তিনি উপনীত হয়েছেন, তাই সমাধি ভঙ্গের পরে, তার জগৎদর্শন হয় না তা নয়, কিন্তু এই দর্শনের মধ্যে তিনি অসত্যকে উপলব্ধি করেন। পাড়ার মদন যখন নাটকের আসরে রাজা সাজে, তখন তিনি অবাক হয়ে রাজদর্শনের পরিবর্তে সেই মদনকেই দেখতে থাকেন। কেননা মদনের সম্পর্কে তাঁর সম্যক ধারণা আছে। সাধন ক্রিয়ার সাহায্যে যখন পরাবস্থায় উপনীত হয়েছিলেন, তিনি বুঝে গেছেন, যে এক ব্রহ্ম বৈ কিছু নেই। তো ক্রিয়ার পরাবস্থায় যে ব্রহ্মদর্শন হয়েছিল, সমাধি ভঙ্গের পরেও, তার মধ্যে থেকে সেই জ্ঞানের বিলোপ হয় না। এই যে সমদর্শন এটি হয়, জ্ঞানের দ্বারা। তাই অজ্ঞানীর মধ্যে যে ক্লেশ বোধ থাকে তা জ্ঞানীর মধ্যে জাগে না। জ্ঞানী জানেন, সকল আত্মাই এক আত্মা, বিভিন্ন আধারে সেই মহা চৈতন্যের প্রতিফল হচ্ছে মাত্র। স্বরূপটি বহু বলে যা দর্শিত হচ্ছে, তা ভ্রমজ্ঞানের ফলে হয়ে থাকে। তো বহু বলে যা কিছু দর্শিত হচ্ছে তা একই সত্তার ভিন্ন রূপ মাত্র। কখনো রাজা, কখনো মদন। আবার একই রূপে কখনো, মাতা- কখনো কন্যা ইত্যাদি ইত্যাদি। স্বরূপত একই সত্তার ভিন্ন ভিন্ন নাম - রূপ মাত্র। অজ্ঞানীর ক্লেশ বোধ আছে, জ্ঞানীর ক্লেশবোধ নেই। এমনকি অজ্ঞানীর যে ক্লেশবোধ , দুঃখ-কষ্টবোধ তা জ্ঞানীকে বিড়ম্বিত করতেও পারে না। স্বপ্নে মানুষ দুঃখ-কষ্ট ভোগ করে, কিন্তু জেগে উঠে সে বুঝতে পারে, যা এতক্ষন সে ভোগ করছিলো, তা আসলে স্বপ্ন মাত্র, বাস্তব নয়, সত্য নয়। তো জ্ঞানী অর্থাৎ জাগ্রত পুরুষ যিনি সর্বত্র ব্রহ্মদর্শন করছেন, তিনি সমস্ত ক্লেশের উর্দ্ধে, তিনি সমস্ত দুঃখ-কষ্টের উর্দ্ধে অবস্থান করেন।
জ্ঞানীর সংস্পর্শে অজ্ঞানী এলে, অজ্ঞানীর মধ্যেও এই জাগতিক সুখ-দুঃখের অবসান হতে পারে। নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে, যিনি সুখ দুঃখ ভোগ করছেন, তাকে যদি কোনো জাগ্রত পুরুষ হাতের স্পর্শে জাগিয়ে তুলতে পারেন, বা ডেকে তুলতে পারেন, তবে সেই স্বপ্নের জগতে বিচারণকারীর স্বপ্ন ভেঙে যায়, আর আর দুঃস্বপ্নের তক্ষুনি অবসান ঘটে। তেমনি ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষের সংস্পর্শে কোনো সংসারী ভাগ্যক্রমে এসে যান, আর যদি অজ্ঞানী জ্ঞানীর ডাক শুনতে পান, তবে অজ্ঞানীর মধ্যে থেকে দুঃখ-কষ্টের লাঘব হতে পারে। এই মর্মবাণীর অভাস পাই আমরা পরবর্তী শ্লোকে।
যো মাং পশ্যতি সর্ব্বত্র সর্ব্বং চ ময়ি পশ্যতি
তস্য-অহং ন প্রণশ্যামি স চ মে ন প্রণশ্যতি। (৬/৩০)
যিনি সর্বভূতে আমাকে (নিজেকে) দর্শন করেন, এবং আমার মধ্যে (নিজের মধ্যে) সর্ব্বভূতের অবস্থিতি দেখেন, আমি তাঁর অদৃশ্য হই না এবং তিনিও আমার অদৃশ্য হন না।
সাধন জগতের সাধকের কাছে, ভগবানের এই উক্তি খুবই গুরুত্ত্বপূর্ন ও উৎসাহবর্দ্ধক। এই কথায় কোথায় যে একটা ভগবানের হাতের ছোঁয়া আছে। যেকেউ সর্বভূতে আত্মাকে দেখে, এবং আত্মার মধ্যে নিজেকে দেখে, নিজের মধ্যে আত্মাকে দেখে, তাঁকে ভগবান সর্বদা দেখেন, আবার তিনিও ভগবানকে দেখেন।
কূটস্থ ব্রহ্মে যার চিত্ত নিয়ত নিবিষ্ট আছে, তিনি সারাক্ষন ব্রহ্ম-সহবাস করছেন। তিনি সর্বত্র ব্রহ্মকেই দেখেন, ব্রহ্মভিন্ন কোনো বস্তু তার দৃষ্টিগোচর হয় না। আসলে আত্মদৃষ্টিসম্পন্ন যোগীপুরুষ সবার মধ্যে ধরা দেন, আবার সবার মধ্যে ধরা পরে যান। চৈতন্যভিন্ন কোনো সত্তা নেই। কিন্তু সর্ব্ব ভূতের মধ্যে তাঁকে দেখতে গেলে, আগে নিজের মধ্যে তার সন্ধান করতে হয়, নিজের মধ্যে তার দর্শন প্রাপ্ত হতে হয়। নিজের মধ্যে সেই সত্তার সাড়া আপনি যদি পেয়ে থাকেন, তবে বিশ্বভুবনের মধ্যেও যে সেই তিনিই আছে, তা আপনার কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে। আপনি কখনো মাটির প্রতিমা দেখেছেন ? আপনি কখনো আপনার মাতা-পিতার ছবি দেখেছেন ? দেখবেন, মাটির প্রতিমা কেবলমাত্র আপনার দিকেই তাকিয়ে আছেন। কাগজের ছবি আপনার দিকেই তাকিয়ে আছে। এটা ক্যামেরার কারসাজি নয়, বা শিল্পীর কারসাজি নয়, আপনি যার দিকে তাকাবেন, অর্থাৎ যাকে আপনি দেখবেন, সেই আপনাকে দেখবে। আপনি যাকে কাছে টানবেন, সেই আপনাকে কাছে টানবে। আপনি যার কথা ভাববেন, সেই আপনার কথা ভাববে। আপনি যার মধ্যে দোষ দেখবেন, সেও আপনার মধ্যে দোষ দেখবে। আবার আপনি কারুর মধ্যে ভালো খুজবেন, তো সেও আপনার মধ্যে ভালোই খুঁজবে। আপনি গাছের সাথে, জীবজন্তুর সাথে কথা বলে দেখবেন, সেও আপনার সাথে কথা বলবে। এবং আপনি সেই অদ্ভুত শব্দহীন বাক্য শুনতে পারবেন। এটা কোনো ভোজবাজি হয়। এগুলো সত্য। তাই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যে আমাকে দর্শন করে, যে আমার মধ্যে সর্ব্বভূতের স্থিতি দেখতে পায়, আমিও তাকেই দেখতে থাকি। এই চরম সত্য শুধু পুরুষোত্তমের ক্ষেত্রে সত্য নয়, একথা একজন সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও সত্য। হিন্দু মহাত্মাদের এ এক চরম উপলব্ধি। এঁরা মাটির মধ্যে, পাথরের মধ্যে, জঙ্গলের মধ্যে, শ্মশানের ঘাটে, নদীর জলে, জীবজন্তুর মধ্যে, এমনকি মানুষের মধ্যে সেই একই আত্মাকে দেখতে পায়। এঁদের কাছে বসুদেব কুটুম্ব। এ নিছক কল্পনা নয়, এসব শুধু কথার কথা নয়, শুধু উপল্বদ্ধির উচ্চ অবস্থা। জ্ঞানে যখন প্রপঞ্চ উপশমিত হয় তখন তুমি বলে কিছু থাকে না। কার্য্য ও কারনে মধ্যে কোনো পার্থক্য লক্ষিত হয় না। সমস্ত সত্তা তখন ব্রহ্ম সত্তায় পর্যবশিত হয়। জল বরফ হলেও জল, আবার বাষ্প হলেও জল। নদীতে থাকলেও জল আবার সমুদ্রে থাকলেও জল। খানাখন্দে থাকলেও জল, আবার সরোবরে থাকলেও জল। আকাশে স্থিত মেঘেও জল, পাহাড়ের ঝর্ণাও জল। তো জল নানান আকারে, নানান আধারে। আমরা যা কিছু দেখছি তা ব্রহ্মভিন্ন কিছু নয়। কিন্তু এইসব সত্য আমাদের কাছে তখনই ধরা পড়ে যখন সাধনক্রিয়ার সাহায্যে আমাদের উপলব্ধি বোধের মাত্রার উন্নয়ন হয়।
-----------------------------
০৭.০৪.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - ষষ্ঠ অধ্যায় - ধ্যানযোগঃ
শ্লোক নং - ৬/৩১-৩২
সর্ব্বভূতস্থিতং যো মাং ভজত্যেকত্বম-আস্থিতঃ
সর্ব্বথা বর্ত্তমানঃ-অপি স যোগী ময়ি বৰ্ত্ততে। (৬/৩১)
যে যোগী সমত্ত্ব বুদ্ধি সম্পন্ন হয়ে সর্বভূতে ভেদজ্ঞান পরিবার করে, সর্বভূতে স্থিত আমাকে ভজনা করেন, তিনি যেখানেই অবস্থান করুন না কেন, তিনি আমাতেই অবস্থান করেন।
আমাদের ধারণা হচ্ছে, ঈশ্বর আছেন, মন্দিরে, মসজিদে, গীর্জায়। আসলে ঈশ্বর আছে, আমাদের সবার মধ্যে। আমরা মনে করি ঈশ্বর আছে, আমাদের বাইরে,.কেউ কেউ অবশ্য এটাও মনে করেন, ঈশ্বর আছেন আমাদের হৃদয়ে । কিন্তু ঈশ্বর ভিতরে থাকলেও, তিনি আমি ভিন্ন অন্য কেউ, আবার বাইরে থাকলেও, তিনি আমি ভিন্ন অন্য কেউ। আমরা মনে করি, ঈশ্বর আমার থেকে আলাদা কেউ, যিনি আমাদের আশ্রয়দাতা, যিনি সর্ব্বশক্তিমান। এর ফলে আমরা ঈশ্বরের অনুসন্ধান করতে তীর্থে তীর্থে, ঘুরে বেড়াই। ঈশ্বরের ভজন কীর্তন করি, উপাসনা করি, প্রার্থনা করি । আসলে, আমরা সবাই কস্তুরীমৃগ। কস্তুরী আছে আমাদের মধ্যেই। আবার এই কস্তুরী বিরাজ করছে, সর্বত্র - সর্ব্বজীবের মধ্যে। কিন্তু সেই জ্ঞান আমাদের নেই, সেই উপলব্ধি আমাদের নেই। ভক্ত বিশ্বাসের সাহায্যে ঈশ্বরের কাছে যেতে চায়, জ্ঞানী বিচারের সাহায্যে ঈশ্বরকে জানতে চায়, কৰ্ম্মী নিষ্কাম কর্ম্মের মাধ্যমে ঈশ্বরকে পেতে চায়।
ব্রহ্মে যখন চিত্ত স্থির হয়, তখন তিনি যাকিছু দেখেন, সবই ব্রহ্ম। আত্মদৃষ্টি সম্পন্ন পুরুষ সর্বত্র নিজেকেই দেখেন। তো সর্ব্ব ভূতের মধ্যে আত্মাকে দেখতে গেলে আগে নিজেকে দেখতে হয়। নিজের মধ্যে আত্মাকে দেখতে হয়। যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যিনি সর্বভূতে আমাকে দেখেন, তিনি আমাতেই অবস্থান করেন। ক্রিয়ার পরাবস্থায়, যোগীর মধ্যে যখন পরম ঐক্য অনুভব হয়, তখন তিনি সমস্ত কিছুর মধ্যে সেই চরম এক-সত্যকে অনুভব করতে থাকেন। তখন তার মধ্যে কোনো শাস্ত্রজ্ঞান, কোনো আচারবিধি লক্ষিত হয় না। এইসময় বিষয়রহিত হয়ে, বাসনা শূন্য হয়ে, ব্রহ্মে অবস্থান করেন। এই অবস্থাকে শরীরবিদগন বলে থাকেন, বায়ুরোগ। হ্যাঁ বায়ুরোগই বটে, কেননা, আমাদের যেমন ইড়া-পিঙ্গলা দিয়ে শ্বাস বায়ু প্রবাহিত হচ্ছে, সংসার বোধ হচ্ছে, যোগীপুরুষের তখন ব্রহ্মনাড়ী অর্থাৎ সুষুম্নাতে বায়ু স্থির হয়েছে, সংসারবোধ অন্তর্হিত হয়েছে । একেই বলে প্রকৃত অদ্বৈত বোধ। দেখুন টিভি বা রেডিওর একটা চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখতে বা শুনতে চাইলে, অন্য চ্যানেল বন্ধ করতে হয়। তো সংসার চ্যানেল বন্ধ হলে ব্রহ্ম চ্যানেল খুলতে পারে। তো একবার যার ক্ষনিকের জন্য হলেও ব্রহ্ম-চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখবার সৌভাগ্য হয়েছে, তার কাছে সংসার-চ্যানেল আলুনি লাগে। দেখুন ঘটাকাশ আর মহাকাশের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু দৃষ্টি যার ঘটে বা ঘটাকাশে, তার মহাকাশের বোধ হতে পারে না। ঠিক তেমনি, ব্রহ্মচৈতন্য ও জীব চৈতন্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু সেই বোধ আমাদের তখনই আসতে পারে, যখন আমাদের বোধশক্তি অপরোক্ষ অনুভূতির স্তর স্পর্শ করবে। এই অবস্থায় জ্ঞান, জ্ঞাতা, জ্ঞেয় এই তিনের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। তখন যোগীর বোধে ব্রহ্ম বৈ কিছু অবস্থান করে না।
আত্মৌপম্যেন সর্বত্র সমং পশ্যতি যোঽর্জ্জুন
সুখং বা যদি বা দুঃখং স যোগী পরমো মতঃ। (৬/৩২)
হে অর্জ্জুন, সুখ হোক বা দুঃখ যিনি আত্মতুলনায় সর্বত্র সমদর্শী সেই যোগী সর্ব্বশ্রেষ্ঠ - এই আমার অভিমত।
যোগাভ্যাসের প্রথম দিকে অন্য্ কিছুর দিকে নজর দিতে নেই। এই সময় ক্ষানিকটা স্বার্থপরের মতো নিজের কাজেই অধিক মনোযোগী হতে হয়। তা না হলে, যোগের কাজে বিঘ্ন ঘটে। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই জায়গা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে বলছেন। আসলে যোগের অভ্যাস যখন দৃঢ়তর হবে, তখন যোগের এই বিঘ্ন কেটে যাবে। তখন যোগ চলবে ভিতরে, কর্ম্ম হবে বাইরের। তবে যোগীপুরুষগণের মধ্যে একটা নিস্পৃহ ভাব থাকে। কেননা সুখ দুঃখ তা সে নিজের হোক বা অপরের হোক, এগুলো তাকে বিব্রত করতে পারে না। স্থির চিত্তে সমস্ত সমস্যার সমাধান করেন। কোনো বাসনার মোহে যেমন তিনি আবদ্ধ নন, আবার প্রকৃতির অবশ্যম্ভাবী ক্রিয়াতে তিনি বিচলিত হন না। প্রিয়জনের মৃত্যুতে আমরা শোকাহত হয়ে পড়ি। কিন্তু যোগীপুরুষ জানেন, মৃত্যুকে কেউ রোধ করতে পারেন না। তাই ভবিতব্যকে তিনি মেনে নিয়ে শান্ত থাকেন। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা, প্রকৃতির নিয়মে আসবে - যাবে, একে সহ্য করা যোগীর স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। সাম্যাবস্থায় কারনে, সাধারণ ভাবে সুখ-দুঃখের অনুভূতি পক্ক যোগীর মধ্যে হয় না। কিন্তু যোগী সর্ব্বক্ষন লোক-কল্যাণের জন্য নিজেকে নিয়োজিত করেন। কেননা, লোকহিত তার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। আমরা এইসব ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষদের কাছ থেকেই ব্রহ্মকথা শুনে থাকি। শাস্ত্রের যত তত্ত্বকথা, তা আমাদের এই ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষগণের রচনা। ঠাকুর রামকৃষ্ণ অন্যের ব্যাথায় ব্যথিত হতেন। নদীতে মাঝির শরীরে আঘাত তাঁর শরীরে দেখা গেছে।
এখন কথা হচ্ছে আমরা জানি যোগ হচ্ছে চিত্ত বৃত্তির নিরোধের অবস্থা। তখন মন বলে কিছু থাকে না। তো যার মন বলে কিছুই নেই, তার মধ্যে নিজের সুখ-দুঃখ বোধও থাকে না। তো যার নিজের সুখ-দুঃখ বোধ থাকে না তার আবার অন্যের সুখ দুঃখ বোধ থাকবে কি করে ? আমাদের যাদের সমাধি সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই, কিন্তু সুষুপ্তি অর্থাৎ গভীর ঘুমের অভিজ্ঞতা আছে, তারা জানি আমরা যখন সুষুপ্তির মধ্যে থাকি তখন আমাদের বাহ্যিক কোনো জ্ঞান থাকে না। এমনকি সুষুপ্তি থেকে যখন জেগে উঠি, তখনও সাময়িক সময়ের জন্য, স্থান, কাল, পাত্রের জ্ঞান লোপ পায়। কোথায় আছি, এখন সকাল না সন্ধ্যা তা বুঝে উঠে ক্ষানিকটা সময় কেটে যায়। ঠিক তেমনি সমাধিবান পুরুষ সমাধি থেকে জেগে উঠে বাহ্যিক জ্ঞানের মধ্যে আসতে তাঁর ক্ষানিকটা সময় লাগে। আর যাঁর মধ্যে সমাধির অভ্যাস তৈরী হয়ে গেছে, তিনি সমাধি থেকে জেগে উঠেও সমাধির অবস্থায় যেমন ব্রহ্মে স্থিত ছিলেন, তেমনি জাগ্রত অবস্থায় তার স্মৃতিতে সে ব্রহ্মভাব জেগে থাকে। তখন তিনি জাগতিক সমস্ত বিষয়ের সংস্পর্শে এলেও, এই জাগতিক বিষয়ের পরিণতি সম্পর্কে প্রতক্ষ্য জ্ঞানের প্রভাবে বিষয়ের প্রতি তিনি নিস্পৃহ থাকেন। এই সময় তিনি তিনি লোকহিতের কথা ভাবেন। ধরুন আপনি ঘুমের মধ্যে কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখছেন, আর মুখে গোঁ-গোঁ আওয়াজ করছেন। এই সময় কেউ আপনার গায়ে হাত রেখে, বা আপনার নাম ধরে ডেকে আপনাকে জাগিয়ে দিলে, আপনি স্বপ্নের মধ্যে যে ভয়ের মধ্যে ছিলেন, সেখান থেকে আপনাকে বের করে নিয়ে আসতে পারেন। আর জেগে উঠে আপনি স্বস্তি বোধ করতে পারেন। সমাধি থেকে বুথিত পুরুষও তেমনি আমরা যাঁরা সংসাররূপ স্বপ্নের জালে পড়ে অসহ্য যন্ত্রনা ভোগ করছি, তাদেরকে শান্তনা দেবার জন্য, বা প্রকৃত সত্যে পৌঁছে দেবার জন্য, আমাদের চেতনাকে মহাপুরুষগন জাগিয়ে তুলতে পারেন। এই কাজই করে থাকেন স্থুল শরীরে স্থিত মহাপুরুষগন। এঁকেই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, শ্রেষ্ট যোগী। কেননা যোগে আপনার ব্যক্তিগত লাভ কি হলো, সেটা যদি আপনি ভাগ করে জনকল্যাণে না লাগাতে পারেন, তবে, আপনার এই যোগাভ্যাস জগতের কোনো কাজে লাগবে ?
এর পরের শ্লোকে অর্জ্জুন কথা বলবেন। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবার শ্রোতা। যোগের কথা কিছুদিন বন্ধ থাকবে - কেননা বাকরুদ্ধ না হলে যোগে স্থিত হওয়া যায় না।
--------------------------------
০৮.০৪.২০২২ - ১৭-০৪-২০২২ মৌন অবস্থা।
১৮.০৪.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - ষষ্ঠ অধ্যায় - ধ্যানযোগঃ
শ্লোক নং - ৬/৩৩-৩৫
অর্জ্জুন উবাচ :
যোঽহং যোগস্ত্বয়া প্রোক্তঃ সাম্যেন মধুসূদন
এতস্যাহং ন পশ্যামি চঞ্চলত্বাৎ স্থিতি স্থিরম। (৬/৩৩)
অর্জ্জুন বললেন : হে মধুসূদন, তুমি যে সমত্ত্বযোগের ব্যাখ্যা করলে, আমার মন যেমন চঞ্চল তাতে সেই সমত্ব ভাব স্থায়ী হবে বলে মনে হয় না।
চঞ্চলং হি মনঃ কৃষ্ণ প্রমাথি বলবৎ-দৃঢ়ম
তস্যাহং নিগ্রহং মন্যে বায়োরিব সুদুষ্করম। (৩/৩৪)
হে কৃষ্ণ মন যেমন চঞ্চল, ইন্দ্রিয়-উত্তেজনাকর, বলবান, অনমনীয়, তাতে বায়ুকে বশে আনা যেমন দুস্কর, তেমনি মনকে বশে আনাও দুঃসাধ্য।
এখানে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে অর্জ্জুন প্রথমে মধুসুধন বলে সম্বোধন করছেন, পরে আবার কৃষ্ণ বলছেন । আমরা জানি মধু নামক অসুর যিনি বিষ্ণুর কর্নমল-উদ্ভূত, তাকে যিনি নিহত করেছিলেন, তাঁর নাম মধুসূদন। অর্থাৎ কানের ময়লা থেকে জাত। এই মধু আর কেউ নয়, আমাদের শরীরের শব্দ-রিপু সকল। কান সবকিছু শুনছে। তো এই শব্দের দুটো ভাগ। একটা শ্রুতিমধুর কিন্তু আখেরে ক্ষতি করে. আর একটি যা শ্রুতিকটু বা বোধগম্য না হলেও যা আমাদের আখেরে ভালো ফল প্রদান করে থাকে। যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ যে সাধন-তত্ত্বের কথাগুলো এতক্ষন বলছিলেন, তা আসলে সাধনার গুহ্যকথা। এইসব তত্ত্ব-কথা শোনার লোকের খুব অভাব, আর শুনতে ভালোও লাগে না। আর শুনলেও, আমাদের ভিতরে রজোগুণ-জাত যে সংস্কার আছে, তা তখন প্রশ্ন করতে শুরু করে। কেননা, এইসব কথা আমাদের জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কার বিরোধী কথা। তো এইসব কথায় সংস্কারে আঘাত লাগে। তাই অর্জ্জুন বলছেন, হে মধুসূদন তুমি যে সমত্ত্বযোগের কথা বললে, তা আমার চঞ্চল মনে স্থায়ী হওয়া সম্ভব নয়। মন চঞ্চল, ইন্দ্রিয় উত্তেজনাকর। একে বশে আনা যায় না - ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ আমাদের কর্ম্মচঞ্চল মন, যা রজোগুণের আধিক্য হেতু হয়ে থাকে, তাকে বশে আনা কঠিন থেকে কঠিনতর। অর্জ্জুনের ভাষায়, সুদূষ্কর।
যোগের দুটো অন্তরায়, যোগে স্থির হতে না পারা। আর স্থির হলেও, স্থিরাবস্থাকে ধরে রাখতে না পারা। এই সময় আমাদের শরীরের তেজঃশক্তি অর্থাৎ অর্জ্জুন, জিজ্ঞেস করে বসে চিত্তের সমতা কিভাবে আসতে পারে, আর এই সমতা কিভাবেই বা স্থায়ী হতে পারে ?
স্থুল দেহরূপ এই ঘরে বায়ুর প্রবেশদ্বার আছে ৯/১০টি (কান-২, চোখ-২, নাক-২, মুখ-১, গুহ্যদ্বার-১, লিঙ্গদ্বার-১, নাভি-১। তো দেহরূপ ঘর থেকে বায়ুকে বের করে দেওয়া সহজ সাধ্য নয়। আবার বায়ুকে স্থির করে ঘরের মধ্যে ধরে রাখাও কঠিনতর। কেননা কোনো না কোনো ফাঁক ফোঁকর পেলেই সে সেখান দিয়েই বায়ু যাতায়াত করতে শুরু করে। আমাদের সংস্কার যেমন প্রবল, সময়-সুযোগ পেলেই মাথাচাড়া দেয়। তেমনি বায়ু আমাদের শরীরের সর্বত্র যাতায়াতের গোঁ ছাড়তে পারে না। তো যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, প্রাণায়ামের দ্বারা প্রাণবায়ুকে স্থির করতে হবে, প্রাণ স্থির হলে মন স্থির হবে, - এই কথা বলা যত সহজ, একে কার্যকরী করা তত সহজ নয়। বিশেষ করে, যার মধ্যে রজোগুণের বা তমোগুণের প্রভাব আছে, তার পক্ষে এই কাজ অসম্ভব বলেই মনে হবে। যার মন রজোগুণের প্রভাবে কর্ম্ম চঞ্চল, বা যার মন তমোগুণের প্রভাবে আলসেমিতে ভরপুর, তার পক্ষে এই স্থিরত্বের ক্রিয়া একরকম দুঃসাধ্য। এবার আমরা শ্ৰীকৃষ্ণের মুখদিয়ে এই কঠিন প্রশ্নের সহজ উত্তর শুনবো।
শ্রী ভগবান উবাচ :
অসংশয়ং মহাবাহো মনো দুর্নিগ্রহং চলম
অভ্যাসেন তু কৌন্তেয় বৈরাগ্যেণ চ গৃহ্যতে। ( ৬/৩৫)
শ্রী ভগবান বললেন, হে মহাবাহো, (যার বাহুতে অদম্য শক্তি অর্থাৎ পুরুষকার যার মধ্যে জেগে আছে) মন স্বভাবতঃ চঞ্চল, তাকে নিরোধ করা দুস্কর - এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু হে কৌন্তেয় (নারীসুলভ কোমল স্বভাবের অধিকারী) অভ্যাস ও বৈরাগ্যের দ্বারা তাকে বশীভূত করা যায়।
জটিল প্রশ্নের সহজ উত্তর - চঞ্চল মনকে স্থির করতে গেলে, শুধু দুটো জিনিসের দরকার, একটা হচ্ছে অভ্যাস আর একটি হচ্ছে বৈরাগ্য।
অভ্যাস ও বৈরাগ্য : : বারবার একান্ত অনুশীলনে ও তীব্র প্রযত্ন প্রভাবে প্রশান্ত চিত্ত-বৃত্তিতে স্থিতি হলো অভ্যাস। আত্মার দর্শন-জ্ঞান ভিন্ন অন্য সবেতে বিতৃষ্ণা হলো বৈরাগ্য। পাতঞ্জল যোগ দর্শনের সমাধি পাদে বলা হচ্ছে, "অভ্যাস-বৈরাগ্যাভ্যাং তন্নিরোধঃ" (শ্লোক-১২), "তত্র স্থিতৌ যত্নোঽভ্যাসঃ" - (শ্লোক ১৩) যোগ হচ্ছে চিত্ত বৃত্তির নিরোধ। তো এই নিরোধের কাজ সহজ সাধ্য নয়। এর জন্য নিরন্তর যোগের অভ্যাস, আর বিষয়ে বৈরাগ্য দরকার । ঋষি পতঞ্জলি ও যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ একই কথা বলছেন, - অভ্যাস ও বৈরাগ্যের সাহায্যে এদের নিরোধ করতে হবে। যোগদর্শনে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, যম ও নিয়মের অভ্যাসের মধ্যে দিয়েই বৈরাগ্য এসে থাকে।
আমাদের চিত্তের পাঁচটি অবস্থা : ১. ক্ষিপ্ত ২. মুঢ় ৩. বিক্ষিপ্ত ৪. একাগ্র ৫.নিরোধ।
১. ক্ষিপ্ত : যে চিত্ত তার নিজের সেই ইন্দ্রিয়াতীত স্বরূপ তত্ত্বকে চিন্তাই করতে পারে না, অথবা মিথ্যা বা কাল্পনিক বলে মনে করে, অর্থাৎ তমভাবাপন্ন হয়ে যথেচ্ছ বিষয়ে বিচরণ করে থাকে।
২. মুঢ় : যে চিত্ত ইন্দ্রিয়সুখ চরিতার্থ করবার জন্য সদা ব্যস্ত। এই অবস্থায় তত্ত্বচিন্তার সুযোগ থাকে না। এই অবস্থায় রজঃ ও তমঃ গুনের আবেশে আচ্ছন্ন থাকে চিত্ত। একেই মূঢ় চিত্ত বলা হয়ে থাকে।
৩. বিক্ষিপ্ত : সত্ত্ব রজ ও তম গুনে আচ্ছন্ন চিত্ত ক্ষিপ্ত ও মূঢ় ভূমি থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে যখন কখনো স্থির কখনো চঞ্চল অবস্থায় ঘোরা ফেরা করে, তখন তাকে বলে বিক্ষিপ্ত চিত্ত।
৪. একাগ্র : এককে অগ্রাধিকার দেওয়াই একাগ্রতা। চিত্ত যখন একাকার-বৃত্তি ভূমিতে অবস্থান করে, তখন সম্প্রজ্ঞাত সমাধির অবস্থা।
৫.নিরোধ : একাগ্র অবস্থায় বাইরের বৃত্তির নিরোধ হয়। কিন্তু নিরোধ অবস্থায় সমস্ত বৃত্তির এমনকি বৃত্তি জনিত যে সংস্কার তার বিনাশ ঘটে।
তো পরমাত্মাতে মনের স্থিতির জন্য উৎসাহপূর্ব্বক যে যত্ন নিতে হয়, তাকেই বলে অভ্যাস। এই অভ্যাস আসে একাগ্রতা থেকে। এখন একাগ্রতা ও মনসংযোগ কিন্তু এক কথা নয়। মনঃসংযোগ যেকোনো বাহ্যিক বিষয়ের উপরেই দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু একাগ্রতা একমাত্র আত্মাতে মনকে স্থির করা। এক-কে অগ্রাধিকার দেওয়া। নিরন্তর সাধনক্রিয়ার সাহায্যে আগে মনকে কূটস্থের সন্ধান করতে হয়। এই কূটস্থের সন্ধান তখনই মিলতে পারে, যখন মন আন্তরিকভাবে একাগ্র হয়। এই যে প্রযত্ন, একেই বলে অভ্যাস। শ্রদ্ধা ও দৃঢ়তার সঙ্গে সন্ধান করলে, চিত্তের এই দৃঢ়ভূমি লাভ হয়। মনকে বিষয় সংকল্পাদি না করতে দেওয়াই বৈরাগ্য। সংকল্প থেকে আসক্তির জন্ম হয়। যোগীরাজ বলছেন বৈরাগ্য চার প্রকার > ১. যতমান - অর্থাৎ গুরুবাক্য শুনে বা শাস্ত্রবাক্য পাঠ করে, যে ভোগ-ত্যাগের প্রবৃত্তি জাগে মনের মধ্যে, তাকে বলা হয় য্তমান বৈরাগ্য। ২. বিষয় ভোগের পরে অথবা বিষয় বিচারে যখন বিষয়ের প্রতি বিতৃষ্ণা জাগে তাকে বলে ব্যতিরেক বৈরাগ্য। ৩. একসময় ইন্দ্রিয়সকল বিষয় গ্রহণে অপারগ বা অনিচ্ছা প্রকাশ করে, একে বলে একেন্দ্রিয় বৈরাগ্য। ৪. একসময় বিষয়ের প্রতি মনের কোনো উৎসাহ দেখা যায় না। মন তখন তৃষ্ণা বর্জিত হয়ে নিস্পৃহ ভাবে অবস্থান করে। একে বলা হয় বশীকার বৈরাগ্য। এইসময় সমস্ত সুখের প্রতিও আগ্রহ থাকে না। এই সময় চিত্তে প্রকৃতি ও পুরুষের মধ্যে পার্থক্যজ্ঞান জন্মায়। এর পরে আসে পর-বৈরাগ্য যখন প্রকৃতি ও পুরুষের মধ্যে পার্থক্য ঘুচে যায়। তখন মন নিরোধের উচ্চ অবস্থায় স্থির হয়।
যোগের অভ্যাস ব্যাতিত মনকে নিরোধের অবস্থায় আনা যায় না। সাধন ক্রিয়া যখন নেশায় পরিণত হবে, তখন বিষয়রসে বিতৃষ্ণা আসবে। যথাযথ বৈরাগ্য শাস্ত্রগ্রন্থ পাঠ করে, এমনকি গুরুর উপদেশেও আসে না। সাধন ক্রিয়ার সাহায্যে যখন আত্মবিদ্যা লাভ হয়, তখন বৈরাগ্য আপনা থেকেই আসে। তবে গুরুবাক্য শ্রবণ, শাস্ত্রগ্রন্থ পাঠ, এমনকি যথার্থ সাধুসঙ্গ থেকেই বৈরাগ্যের সাধনা শুরু হয়। এর দ্বারা আমরা আমাদের সংস্কারকে চিনতে শিখি। এমনকি সংস্কারকে পরিশোধিত করা, বা নতুন সংস্কারের জন্ম দেওয়া যেতে পারে। সাধনক্রিয়ার নিরন্তর অভ্যাসের দ্বারা ধীরে ধীরে ভিতরে ভিতরে বৈরাগ্যের বীজ অংকুরিত হতে থাকে। আত্মজ্ঞান লাভের এটাই একমাত্র উপায়।
যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন - চিত্ত বৃত্ত নিরোধের জন্য অভ্যাস ও বৈরাগ্যের সাধন জরুরি। অভ্যাসবলে অসাধ্য সাধন হতে পারে। বৈরাগ্য তখনই আসতে পারে, যখন পুনঃ পুনঃ অভ্যাসের দ্বারা মনকে অন্তর্মুখী করা যায়। আমাদের জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কার, সহজে ঘুচবার নয়। প্রাণের চঞ্চলতার কারনে মনের মধ্যে যুগ যুগ ধরে অসংখ্য বাসনার সৃষ্টি হচ্ছে। প্রথমে এই বাসনার প্রসূতিভূমিতে প্রানের স্পন্দনকে স্তিমিত করতে হবে, ধীরে ধীরে নিশ্চল করতে হবে। প্রাণায়ামের সাহায্যে প্রাণের স্পন্দনকে রোধ করতে পারলেই মনের চঞ্চলতা দূর হয়ে যাবে। আর মনের মধ্যে যে হাজারো বাসনার জন্ম হচ্ছিলো, তা সমূলে বিনাশ প্রাপ্ত হবে। ওঁং নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
-------------------------------------
১৯.০৪.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - ষষ্ঠ অধ্যায় - ধ্যানযোগঃ
শ্লোক নং - ৬/৩৬
অসংযত-আত্মনা যোগো দুষ্প্রাপ ইতি মে মতিঃ
বশ্যাত্মনা তু যততা শক্যঃ-অব্যাপ্তম-উপায়তঃ (৬/৩৬)
অভ্যাস ও বৈরাগ্য দ্বারা যার মন সংযত হয়নি অর্থাৎ যিনি অসংযতমনা, তার পক্ষে যোগ দুষ্প্রাপ্য - এই আমার মত। কিন্তু যত্নশীল চিত্ত বশীভূত ব্যক্তি কর্তৃক সঠিক উপায়ে এই যোগপ্রাপ্ত হওয়া সম্ভব।
যোগেশ্বর বলছেন, যার মন সংযত নয়, তার দ্বারা যোগে সাফল্য পাওয়া দঃসাধ্য। আসলে যোগের পথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার এটি একটি মোক্ষম কারন। যোগের পথে টিকে থাকতে গেলে, মনকে সংযত করতে হবে। ধৈর্য্য ধরতে হবে। অনেকে কিছুদিন সাধন করেও মনকে বসে আনতে পারে না। কিছুদিন করার পরে, তার মধ্যে একটা হতাশার সৃষ্টি হয়। যোগ এমন একটা ক্রিয়াকৌশল যা দীর্ঘ দিনে অভ্যাস সাধ্য। নিয়মিত যোগ সাধনা অবশ্য়ই ফল প্রদান করে থাকে। কিন্তু নিরন্তর এই যোগের অভ্যাস চালিয়ে যাওয়া যোগের একটি প্রধান শর্ত। আর প্রতিদিন যত বেশিক্ষন এই যোগক্রিয়ায় লেগে থাকতে পারবেন, তত যোগের ফল প্রদর্শিত হতে থাকবে। এটি ধ্রুব সত্য। যোগীরাজ বলছেন, দিনে তিন বারে অর্থাৎ সকাল সন্ধ্যা, রাত্রি তিন ঘন্টা করে ৬ ঘন্টা যোগের অভ্যাস করতে হবে। মনের জোর বাড়াতে হবে, প্রত্যাশা ত্যাগ করতে হবে। যোগগুরুর কথায় দৃঢ় বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা রাখতে হবে। মোদ্দা কথা প্রাণের স্পন্দন রুদ্ধ করতে হবে। যতক্ষন না প্রাণের স্থিরতা আসছে, ততক্ষন মনের সংযম আসতে পারে না। কিন্তু গুরু উপদেশে ও পুরুষার্থের প্রয়োগে একদিন অবশ্যই প্রাণের স্পন্দন রুদ্ধ হয়ে প্রজ্ঞার উদয় হবে। আর প্রজ্ঞার উদয় হলেই প্রারব্ধ ক্ষয় হতে শুরু করবে।
দেখুন সংসারে সুখ দুঃখ আমাদের জন্ম জন্মান্তরের প্রারব্ধ কর্ম্মের ফলে ঘটে থাকে। কিন্তু নতুন শুভ সংস্কারের জন্ম দিতে গেলে, আমাদের পুরুষার্থের সাহায্য নিজে হবে। মনকে শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। নিরন্তর যোগক্রিয়ার অভ্যাস করতে হবে। একদিনের বিরাম আপনাকে দশদিন পিছিয়ে দেবে। শ্রদ্ধা রাখতে হবে যোগগুরুর প্রতি, তেমনি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে যোগক্রিয়া রূপ বিষয়ের প্রতি। তীব্র অনুরাগ চাই। মনের মধ্যে প্রবল উৎসাহকে জাগিয়ে রাখাই বীর্য রক্ষা করা। এই বীর্য রক্ষা না করতে পারলে, আলস্য এসে সব তছনছ করে দেবে। বুদ্ধদেব বহুপ্রকার সাধনার দ্বারা মনকে স্থির করতে না পেরে, একসময় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে আসনে বসে আ-মৃত্য সাধনার সংকল্প করেছিলেন। জীবনের লক্ষ পূরণ করবার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে হবে। আবার এই সংকল্প থাকলেই হবে না। সাধনক্রিয়ায় যতটুকু সাফল্য বা জ্ঞানের উদয় হয়েছে, তাকে ধরে রাখতে হবে। অর্থাৎ সাধনক্রিয়া প্রতিমুহূর্তে আপনাকে নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করে দেবে। আর এই জ্ঞানকে ধরে রাখতে হবে। একেই ঋষি পতঞ্জলি বলছেন স্মৃতি। আমরা জীবনের সমস্ত কর্ম্ম থেকেই, অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারি, শিক্ষা লাভ করে থাকি। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা বা শিক্ষা কিছু দিন পরেই আমরা ভুলে যাই। এই যে বিস্মৃতি এটা আমাদের জীবনের চরম দুর্ভাগ্য। ফলত আমরা বারবার দুর্ভোগের শিকার হই। তো এই স্মৃতিসাধন ক্রিয়া যোগসাধনের জন্য অত্যন্ত জরুরী। আমরা সবাই জন্ম-জন্মান্তর ধরে নানান সুখ-দুঃখের ভাগিদার হয়েছি। বহু কষ্ট-ক্লেশ ভোগ করেছি। বহুবার জন্ম-মৃত্যুর যন্ত্রনা ভোগ করেছি। কিন্তু তা আমাদের স্মৃতিতে নেই। আমরা যদি এই সব ক্লেশকর অনুভূতির কথা স্মৃতিতে ধরে রাখতে পারতাম, তবে হয়তো আমরা এইসব ক্লেশের যে কারন, সেই কর্ম্ম থেকে দূরে থাকতে পারতাম। এইজন্য স্মৃতিসাধন করা যোগের অন্যতম অংশ। এইজন্য কল্যাণকর কর্ম্মের স্মৃতি বারবার স্মরণে আনতে হবে। আর এই স্মৃতিসাধন ক্রিয়ার সাহায্যে আমাদের মধ্যে একাগ্রতার জন্ম হবে। পূর্বস্মৃতি স্মরণ অভ্যাস করতে হবে। এর ফলে আমাদের মন সেই বিষয়ে তন্ময় হয়ে যাবে । এতে করে, মনে নতুন সংকল্প আসতে পারবে না। এমনকি যা আমাদের ক্লেশকর অভিজ্ঞতা তার স্মরণেও আমাদের দুষ্কর্ম্মের প্রবৃত্তির উদয় হতে পারবে না। বিক্ষেপযুক্ত মনে প্রানায়ামাদির বিশেষ উপকার সাধিত হয় না। তাই ঋষি পতঞ্জলি শ্রদ্ধা, বীর্য্য, ও স্মৃতিকে সাধনার সোপান করতে বলেছেন। শুধু এই তিন সাধনার সাহায্যেই সম্প্রজ্ঞাত সমাধির অবস্থা হতে পারে। এই সম্প্রজ্ঞাত সমাধি থেকেই প্রজ্ঞা বা যোগজ জ্ঞানের উদয় হবে। এবং আমাদের বুদ্ধি সত্ত্বগুণ সম্পন্ন হয়ে উঠবে । বৈরাগ্যের উচ্চ অবস্থা এসে যাবে । ধীরে ধীরে কৈবল্য লাভের পথ সুগম হয়ে যাবে । এই প্রযত্ন বা অভ্যাসের ক্রিয়াই জীবকূলকে উন্নত করে তোলে। মনুষ্যলোক থেকে দেবলোকে উন্নীত হয়। অদৃষ্টের উপরে নির্ভরতা মূর্খামি ছাড়া আর কিছু নয়। অদৃষ্ট আমাদেরকে সুখ-দুঃখ ভোগ করাবে, এটা যেমন সত্য, তেমনি সাধনক্রিয়ার নিরন্তর অভ্যাসের সাহায্যে নতুন ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে, নতুন সংস্কারের জন্ম দিতে হবে । এটাই যোগ সাধনার প্রাপ্তি। আজ যেখানে আছি, সেখান থেকে নিজেকে তুলে ধরতে হবে। উন্নত স্তরে নিয়ে যেতে হবে। এই সাধনাই যোগেশ্বর বলছেন, অভ্যাস ও বৈরাগ্যের সাধনা।
--------------------
২০.০৪.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - ষষ্ঠ অধ্যায় - ধ্যানযোগঃ
শ্লোক নং - ৬/৩৭-৩৯
অর্জ্জুন উবাচ :
অযতিঃ শ্রদ্ধয়োপেতো যোগাৎ-চলিত-মানসঃ
অপ্রাপ্য যোগ-সংসিদ্ধিং কাং গতিং কৃষ্ণ গচ্ছতি। (৬/৩৭)
অর্জ্জুন বললেন, হে কৃষ্ণ, যিনি প্রথমে শ্রদ্ধা সহকারে যোগ অভ্যাসে প্রবৃত্ত হন, কিন্তু শিথিলতা বশতঃ যোগ সাধনা হতে বিচলিত বা ভ্রষ্ট হন, এবং সিদ্ধিলাভে অসমর্থ হন, তিনি কি প্রকার গতি প্রাপ্ত হন ?
অর্জ্জুনের মন থেকে সংশয় এখনো যায় নি। যোগের ফলপ্রাপ্তির কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। এমনকি এক জীবনে এই ফল প্রাপ্তি হবে কি না, সে সম্পর্কেও নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যায় না। তো যোগে প্রবৃত্ত পুরুষ যদি কোনো না কোনো কারনে যোগ থেকে বিরত হন, তবে তার ভবিষ্যৎ কি ? তিনি কি অসম্পূর্ন যোগ-অভ্যাসের কোনো ফলই পাবেন না ? তাই যদি হয়, তবে এই অনিশ্চিত ও অনির্দিষ্ট কালের সাধনসংগ্রামে যুক্ত না হওয়াই হয়তো শ্রেয়। হয়তো এর থেকে জ্ঞানযোগ বা নিষ্কাম কর্ম্মযোগ শ্রেয় যার ফল হাতে হাতে পাওয়া যেতে পারে। যোগক্রিয়া তো শরীর-মনের কসরৎ ছাড়া কিছু নয়। তো শরীর ছাড়ার পরে, অর্থাৎ মৃত্যুর পরে, যোগ-অভ্যাসকারীর কি গতি হয় ?
বহু সাধক যোগীপুরুষের অপূর্ব মহিমা দর্শন করে, যোগে আকৃষ্ট হন। প্রথম দিকে বেশ শ্রদ্ধা সহকারেই সাধনার অভ্যাস শুরু করেন। কিন্তু সত্য হচ্ছে, আমাদের মন অস্থির। মনের বিক্ষেপ শক্তি বারবার মনকে বিষয়মুখী করে তোলে। আর যোগের ফল বিলম্বিত হয়। এতে করে, যোগের প্রতি একটা অনীহা বা হতাশা আসে। যে উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে শুরু করেছিলেন, তাতে ভাটার টান আসে। কিংবা সংযমে অকৃতকার্য্য হয়ে আবার বিষয় রস আস্বাদনে মন চলে যায়। এই অবস্থায় কালের প্রভাবে যদি সাধকের দেহ ছেড়ে যেতে হয়. এবং মৃত্যুকালে যদি ভগবত স্মরণ না আসে, তবে তার কি গতি হয় ? এই প্রশ্ন কালজয়ী প্রশ্ন। কেননা কালের প্রভাবের বাইরে কেউ যেতে পারে না। তো কালের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসবার জন্য, যোগক্রিয়া কোনো সাহায্য করতে পারে কি না।
কচ্চিৎ-ন-উভয়-বিভ্রষ্ট-ছিন্নাভ্রম-ইব নশ্যতি
অপ্রতিষ্ঠো মহাবাহো বিমূঢ়ো ব্রহ্মনঃ পথি (৬/৩৮)
হে মহাবাহো, ব্রহ্মপ্রাপ্তির পথে বিমূঢ় হয়ে নিরাশ্রয় কর্ম্ম ও যোগ উভয় মার্গ থেকে ভ্রষ্ট ব্যক্তি ছিন্ন মেঘের ন্যায় বিনষ্ট হয় না কি ?
কথায় বলে ছালাও গেলো আমও গেলো। দুঃসাধ্য যোগের পথে এসে, চঞ্চল মনের স্থিরতা না করতে পেরে, দুর্লভ এই মানুষ্য দেহের পাত হয়ে গেলো, কিন্তু যোগের কোনো সুফল হলো না। যার ধর্ম্মও হলো না, মোক্ষও হলো না - তার কি গতি হবে ? বায়ুর সাধনা করতে এসে বায়ুর আঘাতের দ্বারা মেঘের ন্যায় ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেলো দেহ-মন । বায়ুর দ্বারা মেঘ ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। আবার এক ঝলক বাতাস পারে, মেঘের সঙ্গে মেঘের মিলন ঘটাতে। বায়ুতে মেঘ বিলীন হয়ে যায়। আবার অনুকূল বায়ুতেই মেঘ ঘনীভূত হয়। তো এই বায়ুকে নিয়ে খেলা করতে গিয়ে অর্থাৎ প্রাণায়াম ইত্যাদি করতে গিয়ে, যদি যোগভ্রষ্ট হই, তবে কি হবে ? না হবে পিতৃযানে গতি, না হবে ব্রহ্মে স্থিতি। তো যোগভ্রষ্টের গতি কি হবে ? মেঘের ন্যায় ছিন্ন ভিন্ন হয়ে বিনাশ প্রাপ্ত হবে ? নাকি এর কোনো ভবিষ্যৎ আছে। আসলে এই প্রশ্নের মধ্যেই আছে গুরুকরণের প্রয়োজনীয়তা।
এতস্মে সংশয়ং কৃষ্ণ ছেত্তুম-অর্হসি-অশেষতঃ
ত্বদন্যঃ সংশয়স্য-অস্য ছেত্তা ন হি উপপদ্যতে। (৬/৩৯)
হে কৃষ্ণ আমার এই সংশয় সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন করতে তুমি সমর্থ। যেহেতু এই সংশয়ের ছেদন কর্ত্তা তুমি ভিন্ন সম্ভব নয়।
চঞ্চল মনের মধ্যে প্রশ্নের শেষ হয় না। একটা প্রশ্নের উত্তর পেলে, অন্য প্রশ্নের উদ্গার তোলে। আমাদের মন প্রতিনিয়ত সংশয়ের দোলায় দুলছে। আমাদের মনকে আমরা নিজেরাই চিনতে পারি না। আমাদের কর্ম্মের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কেবল কল্পনা আছে, সেখানে সত্য নাও পৌঁছাতে পারে। কিন্তু যিনি সমস্ত কর্ম্মের দ্রষ্টা তিনি কর্ম্মের ভূত-ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জ্ঞাত। এই দ্রষ্টা আছেন, আমাদের সকলের হৃদয় কন্দরে। যিনি আমাদের হৃদয়ে অন্তর্যামী রূপে বিরাজ করছেন। তিনিই সর্বজ্ঞ। তিনি ভিন্ন সংশয়ের নিরসন কেউ করতে পারেন না। তাই তেজশক্তি অর্জ্জুন বলছেন, হে অন্তর্যামী, তুমি ভিন্ন কেউ সংশয় দূর করতে পারবে না। আমরা জানি সংসারী মানুষ মাত্রেই ইড়া-পিঙ্গলা দিয়ে শ্বাসক্রিয়া করে থাকে। কিন্তু সেই জ্ঞানপ্রবাহিনী নাড়ী সুষুম্নায় যাঁর শ্বাসবায়ু স্থির হয়েছে, তিনি সর্বজ্ঞ। পরমাত্মাতে এই সর্বজ্ঞ তত্ত্বের মূল নিহিত। যিনি পুরুষোত্তম, যিনি অক্ষর পুরুষ, যিনি সমস্ত জীবকুলের চৈতন্য স্বরূপ, তিনিই সর্ব্ব জীবের সংশয় ছেদন কর্ত্তা। যতক্ষন জীবের মন ক্রিয়াশীল, ততক্ষন সংশয়ের নাশ হয় না। কিন্তু যখন এই মন আত্মাতে প্রবিষ্ট হয়ে, নাম-রূপের পারে চলে যায়, তখন তাকে আর কোনো সংশয় বিড়ম্বিত করতে পারে না। সংশয়-ক্লিষ্ট মন তখন সর্ব্ব সংশয়ের অতীত হয়ে যায়। বাসনশূন্য মন যখন আত্মাতে স্থির হয়, তখন সে নিখিল জ্ঞানের অধিকারী হয়। এঁকেই বলে আত্মজ্ঞ পুরুষ, গুরুদেব, যোগাচার্য্য, যোগগুরু, যোগেশ্বর, ভগবান ।
ওঁং নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
--------------------
২১.০৪.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - ষষ্ঠ অধ্যায় - ধ্যানযোগঃ
শ্লোক নং - ৬/৪০-৪৩
শ্রী ভগবান উবাচ :
পার্থ নৈবেহ নামুত্র বিনাশস্তস্য বিদ্যতে
নহি কল্যানকৃৎ কশ্চিৎ-দুর্গতিং তত গচ্ছতি। (৬/৪০)
শ্রী ভগবান বললেন, হে পার্থ, যোগভ্রষ্ট ব্যক্তির ইহলোকে বা পরলোকে কোথাও বিনাশ নেই। কারন হে বৎস, কল্যাণকামী ব্যক্তি কখনো দুর্গতিপ্রাপ্ত হয় না।
যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই উক্তি যোগক্রিয়ার আসনকে সর্বোচ্চ পদে আসীন করেছে। স্বয়ং ভগবানের এই অমৃত বাণী যোগীর হৃদয়ে শান্তনার শীতল বায়ু প্রবাহিত করেছে।
সাধকের মনে যেমন সংশয় আসে, প্রশ্ন আসে, তেমনি এই সাধকের মন সাধনক্রিয়ার ফলে যত বিশুদ্ধ হতে থাকে, তত তার মধ্যে সংশয়ের নিরসন হতে থাকে। এ এক অদ্ভুত প্রক্রিয়া। যিনি প্রশ্নকর্তা, তিনিই উত্তরদাতা। যত আপনার মনে প্রশ্ন জাগবে, জানবেন মন তত উদগ্রীব হবে প্রশ্নের উত্তরের জন্য। নিরন্তর সাধনার ফলে, সাধকের মধ্যে দিব্যজ্ঞানের উন্মোচন হতে থাকে। এই ডিবি জ্ঞান দ্বারা তিনি জানতে পারেন, কল্যাণকামী পুরুষের কখনো দুর্গতির সম্মুখীন হতে হয় না। যে জীবাত্মা দেহ-মনের পাল্লায় পরে, দুর্গতি ভোগ করছিলো, সেই জীবাত্মা যখন দেহ-মনকে অগ্রাহ্য করে, নিজ অন্তঃপুরে প্রবেশের জন্য উদ্দামী হন, তখন তিনি আর ইন্দ্রিয়-মনের বশবর্তী হয়ে বিষয়ে সম্পৃক্ত হন না। যিনি শাস্ত্রবাক্যে শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস স্থাপন করে গুরু উপদেশ অনুযায়ী সাধনক্রিয়ার মধ্যে প্রবেশ করেন, তিনি আসলে কল্যাণকার্য্যে রত। তো কল্যানকৃৎ পুরুষের কখনো দুর্গতি হয় না। এঁরা আত্মস্থ হয়ে পরম নিশ্চিন্ত থাকেন।
এখন কথা হচ্ছে, বহুবছরের যোগাভ্যাসকারী কালেভদ্রে বিভ্রান্তি বশতঃ যোগ থেকে ভ্রষ্ট হয়ে বিষয়ে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। অথবা কোনো কারনে যোগক্রিয়ায় শিথিলতা এসে যায়। এই অবস্থায় যোগীর ভবিষ্যৎ কি হয় - এই ছিল অর্জ্জুনের প্রশ্ন। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যিনি যোগকৃৎ তিনি কল্যানকৃৎ। অর্থাৎ ভালোর অল্পও ভালো। যোগক্রিয়ার ফলে, শ্রীগুরুর কৃপায়, একবার যাঁর আত্মজ্যোতির দর্শন হয়েছে, ক্ষণকালের জন্য হলেও একবার যার ব্রহ্মদর্শন হয়েছে, তিনি যদি কোনো কারনে যোগপথে আর অগ্রসর হতে না পারেন, তাহলেও, যোগক্রিয়ার ফলে তার মধ্যে যে শুভ সংস্কারের জন্ম হয়েছে, সেই সংস্কার তাঁর সহজে যায় না। আর এই শুভ সংস্কার বশেই তিনি সদ্গতি প্রাপ্ত হন। তাঁর মধ্যে যে ঈশ্বর স্মরণের অভ্যাস এক সময় গড়ে উঠেছিল, দুর্ভাগ্যবশতঃ যদি সে যদি সেই অভ্যাস ত্যাগ করতে বাধ্য হয়, তা সে মৃত্যুজনিত কারণেই হোক বা যেকোনো কারণেই হোক না কেন, তার মধ্যে ঈশ্বর স্মরণ জনিত শুভফল তা লুপ্ত হবে না। এই ঈশ্বর স্মরণজনিত শুভফল তাকে উচ্চগতি সম্পন্ন করে দেবে। .
প্রাপ্য পুন্যকৃতাং লোকান-উষিত্বা শাশ্বতীঃ সমাঃ
শুচীনাং শ্রীমতাং গেহে যোগভ্রষ্ট-অভিজায়তে। (৬/৪১)
যোগভ্রষ্ট পুরুষ অর্জ্জিত পুণ্যফল অনুযায়ী লোকসমূহ প্রাপ্ত হয়ে বহুবৎসর বাস ক'রে, সদাচারী ধনবানদিগের ঘরে জন্ম গ্রহণ করেন।
যোগী মাত্রেই বিষয়বিমুখ। কিন্তু বিষয়বিমুখ মানেই বাসনাশূন্য নয়। ঈশ্বরকে পাবার বাসনা, যোগৈশ্বর্জ্য প্রাপ্তির বাসনা ইত্যাদি সংকল্প যোগীর মধ্যে থাকাটা অস্বাভিক নয়। তো যোগৈশ্বর্য্য লাভের পরে, বা ক্ষনিকের আত্মজ্যোতি দর্শনের পরে, যদি চিত্ত এই ঐশ্বর্যে মুগ্ধ হয়ে যায়, এবং সাধনপথ থেকে বিচ্চুত হয়, তবে তাঁর সিদ্ধিলাভ হতে পারে না। এই ঐশ্বর্য্যপ্রাপ্তি তাঁকে অভিমানী করে তোলে, এবং চিত্ত বিপথগামী হয়ে যায়। এমনকি ধনাদি লাভের জন্য, বিষয় লাভের জন্য, আকাংখ্যার উদয় হয়। এক্ষেত্রে এই যোগভ্রষ্ট বিষয়কামী পুরুষ মৃত্যুর পরে পুণ্যকর্ম্মের অর্জ্জিত ফল স্বরূপ স্বর্গাদির সুখ ভোগের অন্তে আবার মৃত্যুলোকে জন্ম গ্রহণ করেন। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, এই যোগভ্রষ্ট পুরুষের জন্ম সাধারণ সংসারী মানুষের থেকে আলাদা। এঁরা স্বচ্ছল পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন, এবং সংস্কার বশতঃ আবার সাধনপথে প্রবেশ করেন। তো সকাম ভগবৎ স্মরণকারীর জন্ম মৃত্যু রোধ হয় না। কিন্তু নতুন শরীরে সাধনক্রিয়ার প্রতি স্বাভাবিকভাবে আকৃষ্ট হন।
অথবা যোগিনামেব কূলে ভবতি ধীমতাম
এতদ্ধি দুর্লভতরং লোকে জন্ম যৎ-ঈদৃশম্। (৬/৪২)
অথবা ধীমান যোগীগণের কূলে জন্ম গ্রহণ করেন। জগতে এই যে জন্ম তা অতি দুর্লভ।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যাঁরা যোগে অবহেলা করেন না, আবার মৃত্যুর আগে যোগসিদ্ধি লাভও করতে পারেন না, তাদের কি গতি হয় ? বহুকাল যোগের অভ্যাস করা হলো, কিন্তু কালের প্রভাবে, বা স্বল্প আয়ুষ্কাল হেতু, অথবা সময় অভাবে যোগের অন্তরায়গুলোকে অতিক্রম করতে না পারার ফলে যদি যোগসিদ্ধি না হয় তবে কি হবে ? যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, তাঁদেরও আবার এই মর্ত্যলোকে ফিরে আসতে হয়। কিন্তু তিনি এবার কোনো না কোনো যোগীর বংশে জন্ম গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি যোগের সমস্ত অনুকূল পরিবেশ প্রাপ্ত হন। এখানে সবাই তাকে যোগে উৎসাহ প্রদান করেন, যোগের উপদেশ প্রদান করেন, এখানে তার সাধনার কোনো বিঘ্ন ঘটে না। এমনকি এখানে থেকে যোগভ্রষ্ট হবার সম্ভাবনা প্রায় থাকে না বললেই চলে। এই যোগীকুল যদি দরিদ্রও হয়, তথাপি এই পরিবারে যোগের পরম্পরা থাকে। এখানে নির্জনতা থাকে, সেখানে একান্তে প্রাণের মধ্যে আত্মার অনুসন্ধান করা সম্ভব হয়। আর সত্য হচ্ছে, এই জন্মেই তাঁর যোগসিদ্ধি লাভ হয়ে থাকে। এই জন্মে, এই পরিবেশে, এই বংশে যেহেতু যোগের অন্তরায় বলে কিছু থাকে না, তাই নিশ্চিন্তে সাধনার সিদ্ধি সহজলভ্য হয়। তো ধনীর গৃহে জন্মগ্রহণ অপেক্ষা যোগীর গৃহে জন্ম গ্রহণ শ্রেষ্টতর।
তত্র তং বুদ্ধিসংযোগং লভতে পৌর্ব্বদেহিকম্
যততে চ ততো ভূয়ঃ সংসিদ্ধৌ কুরুনন্দন। (৬/৪৩)
হে কুরুনন্দন সেই যোগীর কূলে পূর্বদেহজাত সেই বুদ্ধি সংযোগ লাভ করেন এবং এর পরে, পুনর্বার সংসিদ্ধির জন্য যত্ন করেন।
দেহরাজ্য ছেড়ে দেহী অর্থাৎ আত্মা যখন চলে যায় তখন কি ঘটে ? দেহী তার অনুচরবর্গকে সঙ্গে নিয়ে মহাশূন্যে ভাসতে থাকে। এই অনুচরবর্গ হচ্ছে, ইন্দ্রিয়শক্তি, মানস শক্তি, বুদ্ধিশক্তি, প্রাণশক্তি প্রভৃতি। শরীরের যে জৈবিক ক্রিয়া, বা দেহকে বাঁচিয়ে রাখার যে নিয়ম, তা একটা স্তরের পরে আর দৃষ্ট হয় না। এই দেহযন্ত্রকে আত্মাই তৈরী করেছে, তাই আত্মাকে দেহের পিতা বলা যেতে পারে। কিন্তু কথা হচ্ছে, এই দেহ সৃষ্টির পিছনে আত্মার উদ্দেশ্য কি ? মহাত্মাগণ বলছেন, সুনির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্যের চরিতার্থতার জন্যই আত্মা দেহ নির্ম্মাণ করে থাকে। দৈহিক ভোগের মধ্যে দিয়ে, তার অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধতর করে, নিজকৃত কর্ম্ম ও চিন্তার ফল উপভোগ ও উপলব্ধি করবার জন্য সে দেহের সৃষ্টি ও তৎমধ্যে প্রবেশ করে। দেহ নির্ম্মানের এই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হলে আত্মা দেহটি ছেড়ে চলে যায়, এমনকি আরো একটা দেহের সৃষ্টি করে, তাকে আশ্রয় করে। কঠোপনিষদ বলছেন, "যোনিমধ্যে প্রপদ্যন্তে শরীরত্বায় দেহিনঃ।"(২/২/৭) একটা দেহ পরিত্যাগ করে, পুনরায় আত্মা কোন ধরনের দেহ পরিগ্রহ করে ? আত্মার সংস্কারের প্রবণতা ঠিক করে দেয় তার পরবর্তী দেহটি কেমন হবে। দেহ পরিত্যাগ কালে আত্মা সঙ্গে নিয়ে যায় তার এতদিনকার বাসনা, চিন্তা ও প্রবণতা দিয়ে গড়া সংস্কারগুলোকে। জাগতিক অন্য সব কিছু সে পিছনে ফেলে রেখে যায়। স্থুল ইন্দ্রিয়গুলো আত্মার সঙ্গে যায় না বটে, কিন্তু ইন্দ্রিয়ের তৃষ্ণা এবং সংস্কারগুলোকে আত্মা বহন করে নিয়ে যায়। আর এই সংস্কারগুলোর বশবর্তী হয়ে জীবাত্মা অনু-পরমাণুকে আকর্ষণ ক'রে পুনরায় শ্রুতি-দর্শন-ঘ্রান-মস্তিস্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের উপযোগী ইন্দ্রিয় ও দেহযন্ত্র সৃষ্টি করে নেয়। একটা অতিসূক্ষ্ম কনা থেকে কোষ নির্মাণ প্রক্রিয়ার সাহায্যে এই রকম সুন্দর একটি দেহতত্ত্ব প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। এই যে কোষের কথা বলা হলো, এগুলো সবই জীবন্ত, আর এদের বিভাজনও সম্ভব। জীবন্ত না হলে বিভাজন সম্ভব হতো না, দেহ সৃষ্টিও হতে পারতো না। দেহের বৃদ্ধি সম্ভব হতো না। তো স্থূল দেহের মৃত্যু ঘটলেও আত্মা সূক্ষ্ম দেহকে অবলম্বন করে নতুন দেহে বাস করতে থাকে । স্থুল দেহের মৃত্যু হলে, দেহাতীত এই আত্মা দেহের ধ্বংসকালে শব্দ,স্পর্শ,রূপ, রস, ঘ্রান, শক্তিগুলোকে নিয়ে নির্গমন করে।
দেখুন দেহ থেকে দেহান্তরে যখন আমাদের গতি হয়, তখন আমাদের মধ্যে একটা তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবের সৃষ্টি হয়। আমরা ঘুম থেকে জেগে উঠে যেমন পূর্বস্মৃতি লাভ করি, তেমনি পূর্ব্বজন্মের সাধন প্রবৃত্তি এই জন্মে সংস্কাররূপে আবির্ভাব হয়। এর ফলে সাধক নতুন দেহে নতুন করে, সাধনের জন্য অধিক যত্নবান হন। আমাদের যে কর্ম্মে প্রেরণা আসে, তা আমাদের জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কার থেকে জাত । তাই চেতন হন বা অবচেতন থাকুন, সংস্কার আপনাকে কর্ম্মে প্রবৃত্ত করবে। আমাদের স্থূল দেহ ত্যাগ হলেও আমাদের সূক্ষ্ম দেহের বিনাশ হয় না। সুতরাং পূর্ব্ব পূর্ব্ব জীবনের সংস্কার এই সূক্ষ্ম দেহে বর্তমান থাকে। তবে এটাও ঠিক দেহজাত সংস্কার থাকলেও, পরিবেশ-পরিস্থিতি না থাকলে, অনেক সময় সংস্কার মাথাচাড়া দিতে পারে না। এইজন্য অনেক সময় দেখবেন, গুরুদেব আমাদের পূর্বস্মৃতি জাগিয়ে, আমাদেরকে সাধনকর্ম্মে উৎসাহিত করেন। আমরা শুনেছি, যোগীরাজ শ্রী শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়কে তার জন্ম-জন্মান্তরের গুরু বাবাজী একই কাজ করেছিলেন। আবার এও ঠিক, পরিশ্রম বিনা কোনো সফলতাই কার্যকরী হতে পারে না। তবে সাধনার ফল জন্ম জন্মান্তর ধরে আপনার সূক্ষ্ম শরীর বহন করে চলবে। এর অন্যথা হবে না। ওঁং নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
------------------------
২২.০৪.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - ষষ্ঠ অধ্যায় - ধ্যানযোগঃ
শ্লোক নং - ৬/৪৪-৪৫
পূর্ব্বাভ্যাসেন তেনৈব হ্রিয়তে অবশঃ-অপি সঃ
জিজ্ঞাসুরপি যোগস্য শব্দ-ব্রহ্মাতি-বর্ত্ততে। (৬/৪৪)
যেহেতু তিনি অবশ হয়েও সেই পূর্ব্ব অভ্যাস বশত বিষয় থেকে তার মনকে সরিয়ে ব্রহ্মনিষ্ঠ করে যোগের জিজ্ঞাসু হলেও, শব্দব্রহ্ম অর্থাৎ বেদের জ্ঞানকেও অতিক্রমন করেন।
পূর্বজন্মের সংস্কার হেতু সাধক যেখানেই জন্ম গ্রহণ করুক না কেন, অর্থাৎ ধনবানের ঘরে বা যোগীপুরুষের ঘরে, যেখানেই জন্ম গ্রহণ করুন না কেন, তার মধ্যে ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা জাগবেই। আর যিনি সত্যিকারের ব্রহ্ম জিজ্ঞাসু তার উপযুক্ত গুরু সাক্ষাৎ পেতে বিলম্ব হয় না। আর গুরুকৃপা, এবং সাধকের সাধনলিপ্সা ও একনিষ্ঠতা, তাকে ক্রিয়ার উচ্চ অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত করে দেবে। বিবেকানন্দ বিছানায় শুয়ে চোখ বুজলেই জ্যোতি দর্শন করতেন। বিবেকানন্দ ব্রহ্মজিজ্ঞাসু ছিলেন। ঠাকুর রামকৃষ্ণ তাকে একটু বেশী ভালোবাসতেন। ঠাকুর তাকেই অষ্টাবক্র সংহিতা পড়তে বলেছিলেন। ঠাকুরের স্পর্শ তাকে ব্রহ্মানুভূতি এনে দিয়েছিলো । এঁরা সহজেই নাদের ধ্বনি শুনতে পান। এঁরা সহজেই জ্যোতি দর্শন করেন। এঁরা সহজেই গুরুকৃপা লাভ করেন। এর কারন হচ্ছে, জন্ম-জন্মান্তরের সাধনার ফল। এঁরাই একসময় শাস্ত্রজ্ঞানের উর্দ্ধে অপরোক্ষ জ্ঞানের অধিকারী হন।
প্রযত্নাদ্ যতমানঃ-অস্তু যোগী সংশুদ্ধ-কিল্বিষঃ
অনেক জন্ম সংসিদ্ধঃ-ততো যাতি পরাং গতিং। (৬/৪৫)
সেই যোগী আগের চেয়ে অধিকতর যত্ন করেন, এবং ক্রমে যোগাভ্যাস দ্বারা চিত্তকে শুদ্ধ করে, বহু জন্মের চেষ্টায় সিদ্ধিলাভ করে পরমগতি প্রাপ্ত হন।
সাধনক্রিয়া তা সে অল্প হোক, বা অধিক হোক, ক্রিয়ার ফল অবশ্য়ই ফলবে। কিন্তু সাধন ক্রিয়ায় যিনি অধিক যত্নবান হন তাঁর সাধনসিদ্ধি শুধু সময়ের অপেক্ষা। ক্রিয়ার পরাবস্থার স্থিতিকাল প্রথম দিকে স্বল্পক্ষণ হলেও, দেহেরে ধীরে স্থিতিকাল বাড়তে থাকে। আর দীর্ঘকাল স্থায়ী হলেই পরমাগতি লাভ হয়। পূর্বজন্মের যোগসাধক বর্তমান জন্মে স্বভাব বসতঃ অধিকতর যত্নশীল হন। যোগক্রিয়ার ধাপগুলো সহজেই তিনি অতিক্রম করতে পারেন। আর এতেকরে অন্তঃকরণ শুদ্ধ হতে শুরু করে। আত্মা ভিন্ন অন্য চিন্তা তাকে উদ্ভ্রান্ত করতে পারে না। একটা ঈশ্বর-ব্যাকুলতা তার মধ্যে সব সময় প্রবাহিত হতে থাকে। ফলত তার সাধন সমাধি শীঘ্র জমে ওঠে। ঈশ্বর কথা শুনতে শুনতে, এমনকি ভজনাদি শুনতে শুনতেও তার ঈশ্বরপিপাষু মন সমাধিতে প্রবেশ করে। বিষয়বিমুখ চিত্ত সহজেই শান্তির রাজ্যে প্রবেশ করে, ও সেখানে পরমানন্দে অবস্থান করে। যদিও এই অবস্থা চিরস্থায়ী নয়। তবে ক্ষনে ক্ষনে এবং এই অবস্থার মধ্যে প্রবেশের ফলে তার এই সমাধিস্মৃতি জেগে থাকে সারাক্ষন। তীব্র গর্ভযন্ত্রণার মতো সংবেগ এসে তাকে ঘিরে ধরে। এঁদের আত্মজ্ঞান লাভের বিলম্ব হয় না। তবে সাধন ভজনে তামসিক ভাবে মৃদুতা থাকে। কিন্তু যোগক্রিয়ায় তামসিক ভাব সত্ত্বর কেটে যায়।
জীবসত্ত্বার প্রতিক্ষণেই মৃত্যু হচ্ছে। দেহের কোষসকলের প্রতিক্ষণেই মৃত্যু হচ্ছে। বহির্মুখী মন যখন ব্রহ্মমুখী হয় তখন মনের প্রতিমুহূর্তে মৃত্যু হচ্ছে। এগুলো নৈমিত্তিক ও সাধারণ ব্যাপার। জাগ্রত অবস্থা থেকে জীব যখন নিদ্রাঅবস্থায় যায়, তখনও তার মৃত্যু হচ্ছে। ঠিক তেমনি সাধন অভ্যাসের দ্বারা সাধক যখন অন্তর্মুখী হচ্ছে, তখন তার মৃত্যু হচ্ছে। এই যে সাধন জনিত মৃত্যু, এই মৃত্যু যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, এবং আর পুনরাবৃত্তি না হয়, তখন তাকে বলে মোক্ষ। একেই যোগীদের ভাষায় প্রলয়। যোগশাস্ত্র জন্ম-মৃত্যু, সৃষ্টি-প্রলয়কে প্রতি মুহূর্তের খেলা বলে মনে করে। আমরা যখন শ্বাস গ্রহণ করছি, তখন জন্মাচ্ছি, আবার যখন শ্বাস ত্যাগ করছি, তখন আমরা মৃত্যু মুখে পতিত হচ্ছি।এই জন্ম মৃত্যু অর্থাৎ শ্বাস গ্রহণ ও অন্তিম শ্বাস ত্যাগের মধ্যাবস্থাই জীবন। এই অবস্থাকে যোগীপুরুষগন দীর্ঘস্থায়ী করতে নানান কৌশলের অবতারণা করেছেন। এইভাবে সাধক বহু জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবস্থায় যিনি অবস্থান করছেন, তাকে যোগের ভাষায় বলা হয় সংসিদ্ধি লাভ। যোগীরাজ বলছেন, মন দিয়ে ১২ বার প্রাণায়াম করলে হয় প্রত্যাহার, ১৪৪ বার করতে করলে হয় ধারণা, ১৭২৮ বার প্রাণায়ামে ধ্যান এবং ২০৭৩৬ বার প্রাণায়ামে সমাধি হতে পারে।
ওঁং নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
২৩.০৪.২০২২
যোগসাধনার গুহ্যতত্ত্ব - শ্রীগীতা - ষষ্ঠ অধ্যায় - ধ্যানযোগঃ
শ্লোক নং - ৬/৪৬-৪৭
তপস্বিভ্যো-অধিকো যোগী জ্ঞানিভ্যঃ-অপি মতোঽধিকঃ
কর্ম্মিভ্যঃ-চ-অধিকো যোগী তস্মাদযোগী ভবার্জ্জুন। (৪/৪৬)
যোগী তপস্বিগন অপেক্ষা, জ্ঞানীগণ অপেক্ষা এবং কৰ্ম্মীগন অপেক্ষা শ্রেষ্ট - এটাই আমার মত। অতএব হে অর্জ্জুন তুমি যোগী হও।
যোগী প্রাণে অবস্থান করেন, তপস্বী তপঃলোকে অবস্থান করেন, জ্ঞানী জ্ঞানজ্যোতিতে অবস্থান করেন। আর কৰ্ম্মী গুরুর উপদেশে যোগক্রিয়ার অভ্যাসে রত থাকেন। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, তপস্বী, জ্ঞানী ও কৰ্ম্মী অপেক্ষা যোগী শ্রেষ্ঠ।
চিত্তবৃত্তির নিরোধ অবস্থাকে বলা হয় যোগ। যোগ শব্দের অর্থ হচ্ছে মিলন, অর্থাৎ জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন।
যোগী পুরুষ তাকেই বলা হয়, যিনি যোগের পরাবস্থায় পৌঁছে গেছেন। একেই বলে সাধনায় সিদ্ধিলাভ। চিত্ত বহুমুখী না হলে দৃশ্যের অস্তিত্ত্ব থাকে না। চিত্তের স্পন্দনের কারনে শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধ রূপে পদার্থ প্রতিভাত হচ্ছে। সমস্ত বস্তুর মধ্যে পার্থক্য বোঝাবার জন্য আমাদের বিভিন্ন জ্ঞান-ইন্দ্রিয় কার্য্য করে থাকে। এই জ্ঞান ইন্দ্রিয়ের মধ্যে ভেদাভেদ ঘুচে গেলে, আমাদের জ্ঞানে এক-এর অস্তিত্ত্বই ফুটে উঠতো। সত্যি কথা বলতে গেলে, বস্তু এক ভিন্ন দুই নয়, কিন্তু অবিদ্যাহেতু ভিন্ন ভিন্ন দর্শন হচ্ছে। এমনকি একসময় দ্রষ্টা ও দৃশ্যের মিলনে দৃশ্য অগোচর হয়ে যায়। কিন্তু দ্রষ্টা থাকে। যোগের উচ্চ অবস্থায়, এই দ্রষ্টা ও দৃশ্যের মিলন হয়। এই একত্ব বা মিলনকে বলে যোগ। তখন কেবল দ্রষ্টা থাকে দৃশ্যের অবলুপ্তি ঘটে। দেখুন যোগ হলে দুই থাকতে পারে না, তখন সব এক হয়ে যায়। তো চিত্তের বিক্ষেপের কারনে নানাত্ব, আবার চিত্তের স্থিরতায় সব এক। মনের বৃত্তিসকল যখন মনে লয় হলো, আবার মন যখন ব্রহ্মে লয় হলো, তখন একমাত্র ব্রহ্মই রইলো। চঞ্চল মনের অধিকারী অর্জ্জুন অর্থাৎ রজোশক্তিঃ, আর স্থির মনের অধিকারি ভগবান, অর্থাৎ ভগবৎ জ্ঞানের অধিকারী। ভগবত জ্ঞানের অধিকারীকে বলা হয় ভগবন, বহুবচনে ভগবান। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বহুবচন। সাম্য়াবস্থায় যোগজ্ঞানের উপদেশকারী, আর সচঞ্চল অবস্থায় সংশয়জনিত প্রশ্নকারী।
যোগ অভ্যাসকারী যখন যখন প্রাণে মন রেখে বিভিন্ন চক্রে আরোহন করেন, এবং একসময় আজ্ঞাচক্রে প্রাণকে প্রবেশ করিয়ে দেন, তখন তিনি তপস্বী। জ্ঞানযোগী বিভিন্ন মুদ্রা ও প্রাণায়ামের দ্বারা আত্মজ্যোতি দর্শন করেন, অশ্রুত শব্দ শ্রবণ করেন, অদৃশ্য বিষয়, বস্তু, এমনকি ঋষি-মুনি-দেবতা দর্শন করেন। একসময় নাদবিন্দুতে মনকে স্থির করে অন্তরজগতের জ্ঞানলাভ করেন। আর কৰ্ম্মী গুরুর উপদেশ অনুসারে সাধনক্রিয়ার অভ্যাসে রত থাকেন।এঁরা সবাই উচ্চস্তরের সাধক। কিন্তু যোগী তাকেই বলে, যিনি যোগের ফলে পরমাত্মায় স্থিত হতে পেরেছেন। আত্মস্বরূপে স্থিত হয়েছেন। অর্থাৎ সাধনার সিদ্ধাবস্থা। মোটকথা সাধনের মধ্যাবস্থায় যেন সাধন থেমে না যায়। যতক্ষন সাধনার উচ্চ-অবস্থা প্রাপ্ত না হচ্ছে, অর্থাৎ পরমাত্মায় মন না স্থিত হচ্ছে, ততক্ষন সাধনক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে। যোগে যিনি সিদ্ধ তিনিই যোগী। তিনি সর্ব্বশ্রেষ্ট। হে অর্জ্জুন তুমি রজোগুণের স্থিতি থেকে সাম্যাবস্থায় স্থিত হও। তোমার আত্মজ্ঞান হোক, নিজেকে চেনো, পরমাত্মাকে উপলব্ধি করো।
যোগিনামপি সর্ব্বেষাং মদগতেন-অন্তরাত্মনা
শ্রদ্ধাবান ভজতে যো মাং স মে যুক্ততমো মতঃ। (৬/৪৭)
যিনি শ্রদ্ধালু মদ্গতচিত্ত হয়ে আমাকে ভজনা করেন, সকল যোগীগণের মধ্যেও তিনি সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ - ইহা আমার অভিমত।
দেখুন এই দেহরাজ্য ত্যাগ করে আমাদের সবার একদিন চলে যেতে হবে। আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি রুদ্ধ হয়ে গেলে, আমাদের দেহত্যাগ হবে। কিন্তু কথা হচ্ছে, কে এই দেহ ত্যাগ করবে ? এক কথায় উত্তর হচ্ছে আত্মা এই দেহ ত্যাগ করবে। আমরা শুনেছি, যোগী পুরুষগন কয়েক সপ্তাহ (২১-দিন) শ্বাসপ্রশ্বাস ক্রিয়াকে স্তব্ধ করেও বেঁচে থাকতে পারেন। সুতরাং শ্বাসপ্রশ্বাস জনিত যে প্রাণবায়ু তা নিশ্চই আত্মা নয়। কিন্তু শ্বাসপ্রশ্বাস কেমন করে সৃষ্ট হচ্ছে ? আসলে আত্মায় নিহিত শক্তি থেকেই শ্বাস-প্রশ্বাস বা প্রাণবায়ু সৃষ্ট হচ্ছে। আত্মার এই শক্তি যখন স্নায়ুকেন্দ্র ও ফুসফুসের মাধ্যমে প্রকাশিত হতে থাকে তখন শ্বাসযন্ত্র ক্রিয়াশীল হয়ে আত্মশক্তির বাহ্য লক্ষণ প্রকাশিত হয়। আমাদের ধারণা শ্বাসপ্রশ্বাসের ক্রিয়া কেবলমাত্র ফুসফুস করে থাকে। কিন্তু সত্য হচ্ছে শ্বাসপ্রশ্বাস ক্রিয়া ফুসফুস ও ঝিল্লির নিজস্ব শক্তিতে পরিচালিত হচ্ছে না। আত্মার নিজস্ব শক্তিতেই শ্বাসযন্ত্র ক্রিয়াশীল হয়ে উঠছে। আপাতদৃষ্টিতে আমাদের মনে হয়, শ্বাসক্রিয়া কেবল একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এর পিছনে আছে আত্মা।
এখন আমরা যদি ভেবে থাকি, আমাদের ক্ষণস্থায়ী জাগতিক কামনা বাসনা বা কার্যগুলো আমাদের চিরসঙ্গী হবে, অথবা সেগুলো করে, আমরা সুখী হতে পারবো, তবে তা হবে আমাদের মারাত্মক ভুল। আবার এও ঠিক আমরা এখানে যা কিছু করছি, যা কিছু চিন্তা করছি, তা সংস্কার আকারে আমাদের সঙ্গে সঙ্গে ফিরবে। স্থুল দেহের বিনাশের সাথে সাথে আমরা অনস্তিত্ত্বের পর্য্যায়ে চলে যাবো, তার উপায় নেই। যদি তাই হতো তবে, সব ল্যাটা চুকে যেত। আমরা সবাই মৃত্যুর পরে, নিষ্কৃতি পেয়ে যেতাম। আসলে, আমরা একটা অমোঘ নিয়মের দ্বারা আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। এই নিয়ম আমাদের অস্তিত্ত্বের বিলোপ ঘটাতে দেবে না। অস্তিত্ত্ববান কোনো বস্তু অনস্তিত্ত্বে পর্যবশিত হতে পারে না। এটাই শাশ্বত নিয়ম। যে নিয়মের অধীনে আমাদের বর্তমান অস্তিত্ত্বের লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে, সেই একই নিয়মের মধ্যে ভবিষ্যতের অস্তিত্ত্ব টিকে থাকবে - নাশ হবে না।
স্থুল দেহ থেকে বিমুক্ত হয়ে যে বস্তুটির অস্তিত্ত্ব নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে বেঁচে থাকে তাই হলো আত্মা। এই আত্মার অনুসন্ধানের জন্য, আপনাকে শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্রিয়াকে স্বল্পক্ষণের জন্য স্তব্ধ রেখে এই শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়ার আধিপতিকে সন্ধান করতে হবে । শ্বাস প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই সেই অদৃশ্য শক্তিকে জানা যায়। এই দেহের অভ্যন্তরে কি ঘটছে, তা সজাগ দৃষ্টিতে লক্ষ করতে থাকুন। এতে করে আপনি বুঝতে পারবেন, দেহের প্রতিটি অনু-পরমাণুতে যেমন প্রাণশক্তি প্রকাশিত আছে, তেমনি আমরা যাকে প্রাণহীন ভাবছি, তার মধ্যেও সে প্রাণের লীলা চলছে। যে শক্তির কারনে আমরা প্রাণ-মন ও বুদ্ধির অধিকারী হয়েছি সেই শক্তিই হলো আত্মশক্তি।
যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যিনি মৎগতচিত্তের চিত্ত হয়ে অর্থাৎ যার মন ব্রহ্মেতে সদা বিরাজ করছে, সে আমাকে জানতে পারবে, আর আমাকে জানলে তার সমস্ত ইন্দ্রিয় সংযম হবে। যোগক্রিয়া শুরু হয়, ব্রহ্মনগরীতে যাবার রাস্তার পদচারনা থেকে। আর শেষ হয় জগন্নাথের মধ্যে নিজেকে মিলিয়ে দিয়ে। তো সাধনার শেষের দিকে শুধু ভক্তিকে আশ্রয় করেই এগুতে হয়। এই ভক্তির কথা আমরা ভগবানের শ্রীমুখে ধীরে ধীরে শুনবো। কিন্তু ভগবানের দৃষ্টিতে ভক্তযোগী যোগীদের মধ্যেও শ্রেষ্ঠ। শ্রদ্ধা না থাকলে, কোনো সাধনপথেই অগ্রসর হওয়া যায় না। যিনি যোগভক্ত তিনিই যোগের পথে চলতে পারেন। ভগবানের স্বরূপ উপলব্ধি করতে গেলে অবশ্য়ই যোগী হতে হবে কিন্তু আসক্তি নিয়ে, অর্থাৎ ভগবানকে পেতে হবে, ভগবানের সাক্ষাৎ করতে হবে, ইত্যাদি সংকল্প নিয়ে যদি যোগক্রিয়া করেনা, তবে তার পক্ষে যোগ হতাশার কারন হতে পারে। মনে যদি প্রশ্ন জাগে, এই যে যোগাভ্যাস করছি, তা কি জন্য, কার জন্য, তবে তারকাছে যোগাভ্যাসের পথ সুগম নাও হতে পারে। আসলে নিজের মধ্যে প্রবেশ করতে না পারলে, অর্থাৎ আত্মসংস্থ না হতে পারলে, আত্মসাক্ষাৎকার সম্ভব নয়। এই আত্মসংস্থা হবার কৌশল হচ্ছে যোগক্রিয়া। জীবাত্মা পরমাত্মার নিকটের ও আদরের ধন। জীবাত্মা যখন বিষয় সন্মন্ধে আসে, তখন সে তার স্ব-ভাব সম্পর্কে বিস্মৃত হয়।
প্রাণের সাধনায় প্রাণ স্থির হলে, প্রাণজ সংস্কারের বিলোপ হয়। সংসার-বৃত্তির লোপ হয়। আর মন থেকে যখন সংসারবৃত্তির লোপ হয়, তখন নদী যেমন সমুদ্রে মিশে বেগ রোহিত হয়, তেমনি যখন সংসারবৃত্তি চলে যায় , তখন জীবাত্মা পরমাত্মার মধ্যে আর কোনো পার্থক্য থাকে না। আসলে তখন নদী বলে কিছু থাকে না, থাকে শুধুই সমুদ্র। তেমনি জীবাত্মা যখন পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন জীবাত্মা বলে আলাদা কিছু থাকে না। আর জীবাত্মার সঙ্গে সম্পর্কিত মনেরও বিলোপ সাধন হয়। একেই পরমপদ বলা হয়। আসলে যোগাভ্যাসের সাথে সাথে আসে ঐশর্য্য-যোগবিভূতি, কিন্তু ঈশ্বরে বিশ্বাস, নির্ভরতা, এবং আত্মসমর্পন থেকেই যোগের উদ্দেশ্য সাধিত হয়। তাই যোগক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বর-বিশ্বাস, ঈশ্বর-নির্ভরতা না থাকলে, ঈশ্বরের কৃপা লাভ হয় না। তাই যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সাবধান করে দিচ্ছেন, যোগের প্রতি বিশ্বাস-শ্রদ্ধা চাই, যোগগুরুর প্রতি বিশ্বাস-শ্রদ্ধা চাই, সর্ব্বোপরি চাই ঈশ্বরে আত্মসমর্পন। ক্রিয়া সহায়, কিন্তু ক্রিয়া উদ্দেশ্য নয়।
ধ্যানযোগের আলোচনার শেষে বলি, ব্রহ্ম সমস্ত অস্তিত্ত্বের মূল। জগৎ ব্রহ্ম থেকে উদ্ভূত, ব্রহ্মে আশ্রিত, এমনকি ব্রহ্মের অধীন। মায়াশক্তি যুক্ত ব্রহ্ম হচ্ছেন প্রাণ। এই ব্রহ্মের কড়া শাসনে সমস্ত জগতের কর্ম্ম সাধিত হচ্ছে। এই ব্রহ্মকে জানাই জীবনের লক্ষ। যিনি ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করতে পারেন, তার আর পৃথিবীতে এমনকি অন্য কোনো লোকে জন্ম গ্রহণ করতে হয় না। এখন কথা হচ্ছে, ব্রহ্মকে জানলে কি হয় ? ব্রহ্মকে জানলে, তিনি নিজেকে ব্রহ্মরূপে দেখেন, সকল প্রাণীকূলকে, এমনকি সকল বস্তুসকলকে তিনি আত্মসদৃশ রূপে দর্শন করেন। তখন তিনি সবকিছুর সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান। এই একাত্মবোধই মানুষের জীবনের লক্ষ। আর এটি শুধু বুদ্ধি দিয়ে বোঝার নয়, এ তার ব্যক্তিগত অপরোক্ষ অনুভূতি। আর এই অভিজ্ঞতা লাভ হলে মানুষ পাল্টে যায়। তিনি এক নতুন মানুষে পরিণত হন। তিনি, জাতি-ধর্ম্ম-বর্ণ-দেশ-কালের ব্যবধানকে অতিক্রম করে এক "বিশ্বজনীন ব্যাক্তিত্ত্বে" উত্তীর্ন হন।
কঠোপনিষদ বলছে, মৃত্যুর পরেও, পিতৃলোকে বা গন্ধর্বলোকে গিয়েও এই আত্মদর্শন হতে পারে, কিন্তু সেখানে অর্থাৎ পিতৃলোকে আত্মাকে স্বপ্নে দৃষ্ট বস্তুর মতো অস্পষ্ট দেখা যায়। আবার গান্ধর্বলোকেও আত্মাকে ঝাপসা দেখায়। কিন্তু ব্রহ্মলোকে আত্মাকে আলো ও ছায়ার মতো স্পষ্ট দেখা যায়। তাই দুর্লভ এই মনুষ্য শরীরের পূর্ন সদ্ব্যবহার করা উচিত। মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা না করে, যাতে এই জীবনেই আত্মজ্ঞান লাভ হয়, মোক্ষ অর্জন করা যায়, তার জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করা উচিত। আর এইপথের নির্দেশ পাই আমরা শ্রীগীতার ধ্যানযোগ অধ্যায়ে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমুখে।
ওঁং নমঃ শ্রী ভগবতে বাসুদেবায়।
ইতি শ্রীমদ্ভগবৎ-গীতাসূপনিষৎসু-ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জ্জুন সংবাদে ধ্যানযোগো নাম ষষ্ঠ-অধ্যায়ঃ।
Comments
Post a Comment