কৌষীতকী উপনিষদ (চতুর্থ অধ্যায়)

 বাহ্মন বালাকির ব্রহ্মজ্ঞান ও যথার্থ ব্রহ্মজ্ঞান। কৌষীতকী উপনিষদ (চতুর্থ অধ্যায়) 

পুরাকালে একটা সময় ছিলো, যখন জাগতিক সম্পদের অধিকারী ছিলেন ক্ষত্রিয়গন। রাজার ছিলো অঢেল সম্পদ। কিন্তু ব্রাহ্মণগণ ছিলেন, দরিদ্র। এই ব্রাহ্মণগণ ছিলেন, ব্রহ্মজ্ঞানের অধিকারী। এঁরা অর্থাৎ ব্রাহ্মণগণ কিছু ধনদৌলতের আশায়, রাজার কাছে ব্রহ্মজ্ঞানের শিক্ষা দিয়ে কিছু ধন উপাৰ্জন করতেন। এমনি ভাবেই ঋষি অষ্টাবক্রের পিতা কহোড়  একদিন গিয়েছিলেন, রাজা জনকের কাছে, কিছু অর্থের আশায়। কিন্তু এতে করে তার কি পরিণতি  হয়েছিল, তা আমরা সবাই জানি। তর্কযুদ্ধে হেরে,  তাঁকে সলিল সমাধিতে যেতে হয়েছিল। 

এই কৌষীতকী উপনিষদে এমনই  একটা কাহিনী আছে। "বালাকি ও অজাতশত্রু সংবাদ" গর্গ-বংশীয় বলাকা ঋষির পুত্র বালাকি। বেদ অধ্যয়ন  করতে করতে বালকি বেশ পণ্ডিত হয়ে উঠেছেন। বেশ ভালো গুছিয়ে কথা বলতে পারেন। এঁর মধ্যে যতনা পান্ডিত্য তার চেয়ে বেশি ছিল, পান্ডিত্যের দর্প। তো একদিন তিনি রাজা অজাতশত্রুর রাজসভায় গিয়ে রাজাকে ডেকে বললেন, "মহারাজ আমি আপনাকে, ব্রহ্ম কি তার উপদেশ দেবো।" উপনিষদে আত্মাকে বলা হয় ব্রহ্ম। এই রাজা অজাতশত্রু ছিলেন, সেযুগের প্রসিদ্ধ ব্রহ্মবিদ। তিনি জানতেন, ব্রহ্ম ইন্দ্রিয়াতীত। কিন্তু ইন্দ্রিয় দিয়েই তাঁকে উপলব্ধি করতে হয়। ব্রহ্ম অনির্বচনীয়।  এঁকে বাক্য দ্বারা সীমাবদ্ধ করা যায় না। তাই, এর জন্য আছে, এই উপলব্ধি শক্তিকে জাগ্রত করবার উপাসনা পদ্ধতি, সাধন ক্রিয়া । প্রথমে, মুখ্য প্রাণকে জানতে হবে। এর জন্য যেমন দেহশুদ্ধি প্রয়োজন, তেমনি দরকার মনশুদ্ধি। তা না হলে ব্রহ্মবিদ্যা শুধু মুখে বলে কাউকে বোঝানো যায় না। বাকের অতীত এই ব্রহ্ম। তো রাজা অজাতশত্রু, ব্রাহ্মণ পণ্ডিত বালাকিকে বললেন, খুব ভালো কথা, কিন্তু এই ব্রাহ্মবাক্য শোনানোর জন্য আপনাকে আমি সহস্র গোধন দান করবো। সমস্ত ব্রহ্মবিদ ব্রাহ্মণগন কেবল রাজা জনকের কাছে, চলে যায়। তারা ভাবেন কেবলমাত্র রাজা জনক এই ব্রহ্মবিদ্যার কদর বোঝেন।  আপনি আমার কাছে ব্রহ্মবিদ্যা দান  করতে এসেছেন, আমি খুব খুশি হয়েছি। আপনাকে আমি সহস্র গোধন দান  করবো। আসলে তখনকার দিনে এই গোধন দান ছিল শেষ্ঠ  দান। 

যাইহোক,  বালাকি ব্রহ্মকথা শুরু করলেন। 

বালকি বললেন, 

১. আদিত্যে যে পুরুষ আছেন, তিনিই ব্রহ্ম।  

রাজা অজাতশত্রু বললেন, দেখুন, আদিত্য শুক্ল বেশধারী, আদিত্য স্থির অচল, সর্ব্বভূতের উত্তম অঙ্গ মস্তক বা মুর্দ্ধা মাত্র। আমি তো এঁকে এই ভাবেই জানি। তো ইনি কিভাবে ব্রহ্ম হবেন ?

২. চন্দ্রে যে পুরুষ আছেন, তিনিই ব্রহ্ম। 

রাজা অজাতশত্রু বললেন, সোমকে অন্নের জীবন বলে আমি জানি, চন্দ্র হচ্ছেন অন্নপতি। তো চন্দ্র কিভাবে ব্রহ্ম হবেন ? 

৩. বিদ্যুতে যে পুরুষ আছেন, তিনিই ব্রহ্ম। 

রাজা অজাতশত্রু বললেন, বিদ্যুতের মধ্যে আছে জল, আর জলই জীবন।  ইনি কিভাবে ব্রহ্ম হবেন ?

৪. শব্দায়মান মেঘে যে পুরুষ আছেন, তিনিই ব্রহ্ম। 

রাজা অজাতশত্রু বললেন, মেঘগর্জনকে আমি শব্দস্বরূপ বলেই জানি। 

৫. আকাশে যে পুরুষ আছেন, তিনিই ব্রহ্ম। 

রাজা অজাতশত্রু বললেন, দেখুন আকাশ সর্বত্র, পরিপূর্ন, ক্রিয়াশূন্য, এবং সবথেকে বৃহৎ - আমি একে  এইভাবেই জানি। 

৬. বায়ুতে যে পুরুষ আছেন, তিনিই ব্রহ্ম। 

রাজা অজাতশত্রু বললেন, দেখুন,  বায়ু ঐশর্য্বান, অনিবার্য এবং অপরাজিত বীর্য। আমি একে  এই ভাবেই জানি। 

৭. অগ্নিতে যে পুরুষ আছেন, তিনিই ব্রহ্ম। 

রাজা অজাতশত্রু বললেন, অগ্নিকে দুঃসহ জেনে আমি উপাসনা করি।  ইনি কিভাবে ব্রহ্ম হবেন ?

৮.জলে যে পুরুষ আছেন, তিনিই ব্রহ্ম। 

রাজা অজাতশত্রু, জলকে তেজের জীবন জেনে আমি উপাসনা করি। ইনি কিভাবে ব্রহ্ম হবেন ?

৯. দর্পনে যে প্রতিবিম্ব-পুরুষ দৃষ্ট হচ্ছেন, তিনিই ব্রহ্ম। 

রাজা অজাতশত্রু বললেন, দর্পনস্থ ছায়া আসলে প্রতিরূপ মাত্র। ইনি কিভাবে ব্রহ্ম হবেন ?

১০. ছায়াতে যে পুরুষকার দেখা যায়, একেই আমি ব্রহ্ম বলে উপাসনা করি। 

রাজা অজাতশত্রু বললেন, ছায়া অপগমনশূন্য দ্বিতীয়।  ইনি কি করে ব্রহ্ম হবেন ? 

১১. প্রতিধ্বনিতে যে পুরুষ বিদ্যমান, তিনিই ব্রহ্ম। 

রাজা অজাতশত্রু বললেন, প্রতিধ্বনি প্রাণস্বরূপ, ইনি কি করে ব্রহ্ম হবেন ?

১২. শব্দে, যে পুরুষ আছেন, স্বপ্নে যে পুরুষ আছেন, আমাদের অস্মাদাদিতে  যে পুরুষ আছেন, দক্ষিণ চক্ষুতে যে পুরুষ আছেন, বাম  চক্ষুতে যে পুরুষ আছেন, তিনিই ব্রহ্ম। বালাকি যেন একটু রেগে গেছেন। 

রাজা অজাতশত্রু বললেন, নিস্কারন শব্দোপলাভকে মৃত্যু বলে জেনো । স্বপ্নবিচারীকে যমরাজ  বলে জেনো, শরীরস্থ পুরুষকে প্রজাপতি বলে জেনো।  চক্ষু হচ্ছে, বস্তু সমূহের  নাম জানবার কারন, একে  অগ্নি বা আলোক বলে জেনো। চক্ষু হচ্ছে, প্রকৃতি পদার্থ, বিদ্যুৎ ও তেজ উপলব্ধি করবার কারন।  আমি এদেরকে এইভাবে জানি। 

বালাকি এবার মৌন হয়ে গেলেন। অজাতশত্রু এবার বললেন, ব্রহ্ম বলতে কিসব কথা তুমি বলে গেলে ? শোনো, যিনি এই চন্দ্র-সূর্য্যের সৃষ্টি করেছেন, যার দ্বারা এই চন্দ্র সূর্য সৃষ্ট তাঁকে জানা আবশ্যক। 

বালাকি এবার মাথা নত  করলেন, একজন ক্ষত্রিয়ের কাছে ব্রাহ্মণ পুত্র শিষ্যত্বের আবেদন করলো। রাজা বললেন, তুমি ব্রাহ্মণ, আমি ক্ষত্রিয়। আমি তোমাকে দীক্ষা দিতে পারি না।  তবে আমি তোমাকে বিনা দীক্ষায় বিষয়টি বোঝাচ্ছি। এই কথা বলে, বালাকির হাত ধরে, একজন সুপ্ত (ঘুমন্ত) লোকের নিকট উপস্থিত হলেন। সুপ্ত ব্যক্তিটিকে এই বলে ডাকলেন, ওহে বিশুদ্ধ বেশধারী সোমাত্মক মহাপ্রাণ ! সুপ্ত ব্যক্তি তথাপি নিদ্রা যেতে লাগলেন। রাজা তাঁকে একটা লাঠি দিয়ে (যষ্ঠি) দ্বারা তাড়না  করলেন। সুপ্ত ব্যক্তি তৎক্ষণাৎ উঠলেন, তখন অজাতশত্রু বললেন, হে বালাকি এই পুরুষ কোন স্থানে শয়ান ছিল ? এর চৈতন্যই বা কোথায় ছিল ? কোথা থেকে এলো ? বালাকি একথা জানতেন না। 

যেখানে চেতন পুরুষ শয়ান ছিলেন, সেখানে এর চৈতন্য ছিল। কিন্তু কোথেকে এলো ? 

হিতা নামক, হৃদয়ের শিরাগুলো, হৃদয় থেকে চারিদিকে বিস্তৃত রয়েছে। সূক্ষ্ম কেশের হাজার হাজার ভাগের  একভাগ  কেশের মতো এই শিরাগুলো অতিসূক্ষ্ম। এরা বিভিন্ন বর্ণের অর্থাৎ পিঙ্গল, শুক্ল,  কৃষ্ণ, পিত, লোহিত ইত্যাদি বর্ণের  সূক্ষ্ম রস দ্বারা পূর্ন  এই শিরাগুলো। গাঢ়  ঘুমে, অর্থাৎ স্বপ্নশূন্য ঘুমের সময় চেতন পুরুষ সেখানে অবস্থান করেন। এই সময় প্রাণসমূহ, ইন্দ্রিয়সমূহের্ চেতনভাবও একই ভাব গ্রহণ করে। নাম সমূহের সাথে বাগেন্দ্রিয়, রূপের সাথে চক্ষুরিন্দ্রিয়, শব্দের সাথে শ্রবণ  ইন্দ্রিয়, সেখানে মিশে একাকার হয়ে যায়। এমনকি ইন্দ্রিয়ের রাজা মনের সমস্ত ধ্যান সেই স্থলে চলে যায়। চেতন পুরুষ যখন প্রবুদ্ধ হন তখন জ্বলন্ত অগ্নি থেকে স্ফূরিত স্ফুলিঙ্গ স্বরূপ ক্রমে ক্রমে নির্গত হয়। এই যে চেষ্টিত প্রাণ, এই প্রাণচেষ্টা থেকেই দেবসমূহ, আবার দেবসমূহ থেকে লোকসমূহ নিস্পন্ন হয়। ক্ষুর যেমন ক্ষুরের আধারে নিহিত থাকে, অগ্নি যেমন কাঠের মধ্যে নিহিত থাকে, প্রজ্ঞাত্মা প্রাণও তেমনি শরীরের প্রতিটি লোমকূপ পর্যন্ত অনুপ্রবিষ্ট হয়ে থাকে। রাজ্যের অধিপতিকে  যেমন রাজ্যবাসী অনুসরণ করে, ঠিক তেমনি প্রাণচেষ্টাসমূহ আত্মাকে অনুসরণ করে। ধনবান শ্রেষ্ঠী যেমন জ্ঞাতিবর্গের সাথে আহারাদি করে, তার জ্ঞাতিবর্গও তেমনি শ্রেষ্ঠীর সাথে আহারাদি করে। ঠিক তেমনি প্রজ্ঞাত্মা  প্রাণচেষ্টা সমূহের সাথে অবস্থিতি করে। এই আত্মাকে যা জানার জন্য, দেবরাজ ইন্দ্র অসুরগন কর্তৃক অভিভূত হয়েছিল।  পরে সেই আত্মাকে জেনে, অসুরগনকে  পরাজিত ও নিহত করে সকল দেবতা ও সর্বভূতের শ্রেষ্ট লাভ করেন, সাম্রাজ্য ও আধিপত্য প্রাপ্ত হয়েছেন। যিনি এই জ্ঞান লাভ করেন,তিনি সর্ব্ব পাপ থেকে মুক্ত হয়ে সারভূতে শ্রেষ্ঠত্ব, সাম্রাজ্য ও আধিপত্য লাভ করেন।  

--------------------        

  











Comments

Popular posts from this blog

ঈশ্বর ও তাঁর উপলব্ধি

নিত্যকথা

দুশ্চিন্তাহীন আনন্দময় জীবন