মুক্ত পুরুষের কথা

মুক্ত-পুরুষের স্বীকারোক্তি। 

স্বামী মুক্তানন্দ গিরি ,মহারাজ।  এঁকে আপনি মুক্ত পুরুষ বলতে পারেন। না এনার কোনো অলৌকিক ক্ষমতা নেই। ইনি আপনার মৃত সন্তানকে বাঁচিয়ে দিতে পারেন না। ইনি আপনাকে জরা-ব্যাধি থেকে মুক্ত করতে পারেন না । ইনি আপনাকে মৃত্যুর পরে স্বর্গে স্থাপন করতে পারেন না। ইনি আপনাকে জাগতিক বস্তু পাইয়ে দিতে পারেন না। ইনি এক-জায়গায় বেশিদিন থাকেন না। কিন্তু এনার কথার মধ্যে একটা জাদু আছে, যা আপনাকে আকর্ষণ করবে। ইনি আপনাকে কিছু উপদেশ দিতে পারেন। এইমাত্র, এর বেশি কিছু নয়। তথাপি এনার কাছে বহু মানুষ আসেন, বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের জন্য, দুঃখ দূর করবার জন্য। তো এনার কাছে তথাকথিত শিক্ষিত এক ভদ্রলোক এলেন। তার ভালো ভালো কথায় মুগ্ধ হয়ে, কিছুদিন তার সাথে সাথে ঘুরলেন। শেষে তার মনে হলো, এই লোকটার কাছে কিছুই নেই। যিনি না পারেন, ভগবানের দর্শন করিয়ে দিতে, না পারেন, জাগতিক কোনো বাঞ্চিত বস্তু পাইয়ে দিতে। তো কিছু দিনের মধ্যেই, শিক্ষিত জিজ্ঞাসু  পুরুষ এই মুক্ত পুরুষের সঙ্গ  ছাড়লেন। আর বাইরে গিয়ে বলে বেড়াতে  লাগলেন, যে এনার কাছে, পাবার কিছুই নেই। শুধু কথার ফুলঝুরি। তাও হালকা চালের কথা। জ্ঞান বা দর্শনের কোনো কথা যিনি বলেন না। তিনি কিছু উপদেশ দিয়ে থাকেন, যা পালন করলে, হয়তো  কারুর দুঃখমুক্তি হতে পারে। এর  বেশিকিছু এনার কাছে নেই। ইনি সবার প্রশ্ন শোনেন, কিন্তু কোনো প্রশ্ন করেন না। 

তো মুক্তানন্দের কানে এলো কথাগুলো।  তিনি তাকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, শুনলাম, তুমি আমার হয়ে প্রচার করছো, আমার প্রসংসা করছো। তুমি নাকি বলেছো, আমি যে উপদেশ প্রদান করি, তা মান্য  করে চললে, সেই ব্যক্তির দুঃখমুক্তি ঘটতে পারে। দেখো, আমার কোনো অলৌকিক ক্ষমতা নেই। আমি কোনো অসম্ভবের গল্প করি না।  আমি অসম্ভবকে অসম্ভব বলেই চিনি, আর সম্ভব-কে সম্ভব বলেই জানি।  আমি বিশুদ্ধ ইন্দ্রিয়াতীত শব্দ শুনতে পাই। যা অতি নিকটে বা বহু দূরে ধ্বনিত হচ্ছে, তা আমি শুনতে পাই। আমার দিব্যদৃষ্টি আছে, আমি অন্যের চিত্তে যা কিছু উৎপন্ন হচ্ছে, তা আমি জানতে পারি। অন্যের চিত্তে রাগ, দ্বেষ, লোভ, মোহ প্রভৃতি যা কিছু উৎপন্ন হচ্ছে, তা আমি জ্ঞাত হই। অন্যের চিত্ত সমাহিত না সমাহিত নয়, বিমুক্ত বা বিমুক্ত নয়, এমনকি চিত্তের মধ্যে উৎপন্ন সমস্ত বিষয় সম্পর্কে আমি জ্ঞাত হই । 

আমার দশটি বল-স্তম্ভ । তাই আমি ভয়শূন্য।  আমিই ধর্ম্মচক্রের প্রবর্তক। দশটি বল হচ্ছে  : আমি অতীত,  বর্তমান, ভবিষ্যৎ সমস্ত কর্ম্মের কারণ ও তার বিপাকীয় ধর্ম্ম সম্পর্কে জানি। সমস্ত সত্ত্বার কিসে ভালো হবে, সেই প্রকৃষ্ট জ্ঞান আমার আছে। বহুপ্রকার মানুষের চিত্তের, নানান মানুষের নানান স্বভাব সম্পর্কে আমি অবহিত। সমস্ত সত্ত্বার ইন্দ্রিয়ের দুর্বলতা, ইন্দ্রিয়দমন ইত্যাদি  উপায় সম্পর্কে আমি অবহিত।  আমি ধ্যান, সমাধি, মুক্তি, এমনকি সমাধি সম্পন্ন পুরুষের মালিন্য্, বিশুদ্ধি প্রক্রিয়া ও  সেখানে থেকে উত্তরণ সম্পর্কে জানি।  সেই ইন্দ্রিয়াতীত বিশুদ্ধ শব্দ  যা কাছে ও দূরে ধ্বনিত হয়, তা আমি জ্ঞাত আছি। আমার দিব্যদৃষ্টিশক্তি থাকার ফলে, আমার বহু পূর্ব-পূর্ব জন্মের কথা স্মরণ করতে পারি। আমি জীবদিগের জন্ম-মৃত্যু, আবার জন্ম, আবার মৃত্যু, সম্যক  রূপে দেখতে পাই। মানুষের  সমস্ত পাপ-ক্ষয়ের (সংস্কারের বিলোপ সাধনের) জ্ঞান আমার আছে। আমি পরমজ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে সর্বজ্ঞ অবস্থায় বিরাজ করছি। আমার মধ্যে এই দশপ্রকার বলের  সমন্বয় থাকার দরুন, আমি নির্ভিক। তাই আমার মুখ দিয়ে যা কিছু বাক্য স্ফূরিত হয়, তা সত্যভাষণ জানবে।  এর পরেও কেউ যদি আমার সম্পর্কে বলে আমি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী নোই, তবে বলবো  তিনি সত্যদ্রষ্টা নয়  । 

আমি চারটি বিষয়ে আস্থাবান। আমি সম্যকরূপে  সম্বুদ্ধ। আমার সমস্ত সংস্কার ক্ষয় হয়ে গেছে। সমস্ত প্রারব্ধ ক্ষয় হয়ে গেছে। সমস্ত পাপের  ক্ষয় হয়েছে। আমার দেওয়া ধর্ম্ম-উপদেশ কেউ যদি মেনে চলে, তবে তার ইহজগতের দুঃখের অবসান হবে। আমি আমার প্রতি আস্থাশীল, আমি শান্ত, আমি ভয়শূন্য। তাই আমার মুখ থেকে নির্গত বাক্য তেজঃসম্পন্ন। আমাকে কেউ উপেক্ষা করতে পারে না। 

আমি সকলকে ধর্ম্মে-পথের অনুশীলন করতে বলি, সমাধিবান হতে বলি, প্রজ্ঞাবান হতে বলি। যাতে  ইহজগতেই  সেই পরম সম্পদ লাভ করা যায়, আমি সেই পথের কথাই বলে থাকি। 

মানুষের মধ্যে কতো  শ্রেণীর সমাবেশ দেখতে পাওয়া যায়। আর এদের সবার কাছেই আমার যাতায়াত আছে। এঁরা  হলেন, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র, রাজা, বণিক, গৃহস্থ, ও সাধক। এদের সবার জন্যই  আমার ধর্ম্ম-উপদেশ। আমার না আছে ভয় না আছে সংকোচ। আমি নিজের প্রতি আস্থাশীল, তাই সবাই আমার প্রতি আস্থাবান। আমি ধর্ম্ম বিষয়ে সুবক্তা, আমার মধ্যে প্রতিভা প্রকাশিত, সুপ্ত নয়। 

জগতে চার শ্রেণীর জীব আছে, অন্ডজ, জরায়ুজ, স্বেদজ, ও স্বয়ংজাত। জীবের পঞ্চগতি, পশুযোনি, পক্ষীযোনী, কীটযোনী, স্বেদযোনী, ও মনুষ্যযোনী। মনুষ্যযোনী সম্ভূত মানুষ বারবার মানুষ হয়েই জন্মায়। এর অন্যথা হয় না। পরচিত্ত জ্ঞানের দ্বারা আমি মানুষের গতি প্রকৃতি সব জানতে পারি। যে মানুষ যেভাবে চলছে, সে মৃত্যুর পরে, সেই ভাবেই আবার জন্ম গ্রহণ করবে। ক্লান্ত পথিক যখন বৃক্ষের খোঁজ করে, জানবে, সে বৃক্ষের ছায়ায় আশ্রয় চায়। যে মানুষ দুঃখের কথা চিন্তা করে, সে আবার সেই দুঃখের ভোগের জন্য মানুষ হয়ে জন্মায়। যে জাগতিক সুখের খোঁজ করে, সে আবার সেই জগতেই সুখের ভোগের জন্য জন্ম গ্রহণ করে থাকে। মানুষের ভাবগতিক দেখে আমি বুঝতে  পারি,সে জীবত্ত্ব থেকে মুক্তি পাবে কি না। কেউ যদি তৃষ্ণার্থ হয়, আর জলের দিকে দৃষ্টিপাত করে, তবে বুঝতে হবে, সে জল পান করবে। যে গৃহহারা সে গৃহের খোঁজ করে থাকে, আর সে একদিন গৃহের সন্ধান পায়।  তেমনি এই জীবনেই যে দুঃখ থেকে মুক্ত থাকতে পারে, তবে সে জন্ম-জন্মান্তরেও   দুঃখ থেকে মুক্ত থাকতে পারবে। আমি যা দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাই, ঠিক তাইই হয়। যিনি এই জীবনেই দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করেছেন, তার আর পুনর্জন্ম হয় না। 

আমার এই ভাব, বহুদিনের দিনযাপনের প্রণালী থেকে হয়েছে। আমি বহুদিন ধ্যান-সাধনা করেছি। তপস্যা আমার স্বাভাবিক অবস্থা। আমি কঠোর তপস্যা করেছি, আমি ঘৃণার সাধনা করেছি।  আমি উপেক্ষার সাধন করেছি, আমি চার প্রকার ব্রহ্মচর্য পালন করেছি। আমি ছিন্নবাস পরিহিত সন্যাসী হয়েছি। যে কেহ ভিক্ষা দিলেই আমি তা গ্রহণ করিনি। কারুর দাক্ষিণ্য, এমনকি নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিনি।  আমি মাদকদ্রব্য গ্রহণ করিনি। আমি সাত্ত্বিক ব্যক্তির দানে দিনযাপন করেছি। এর ফলে কখনো, দুই দিন বাদে, কখনো ৭ দিন বাদে, কখনো ১৫ দিনে বাদে আমি আহার করেছি।  ভিক্ষার অন্ন ছাড়া আমি গ্রহণ করিনি।  আমি মৃতমানুষের পরিত্যক্ত বস্ত্র শ্মশান থেকে নিয়ে ধারণ করেছি।  এই আমার স্বাভাবিক তপস্যা। কঠোর সাধনার ফলে, আমার শরীরে ময়লা  জমেছিলো। দীর্ঘদিন অনাহারের ফলে আমার শরীর অস্থি-চর্ম সার হয়েছিল। আমি নিজের হাতে মলমূত্র পরিষ্কার করেছি। ক্ষনে ক্ষনে আমি জ্ঞান হারিয়েছি। আমার শরীরে কোনো শক্তি ছিল না। উঠতে বসতে আমার কষ্ট  হতো।  শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে, না বন্ধ  হয়ে গেছে, সেই বোধ আমার লোপ পেয়ে গিয়েছিলো। এই ছিলো আমার তাপস্যাকালীন জীবন। 

আমি বহুদিন ঘৃণ্য সাধনা করেছি। আমি গরুর  গোমায় আহার করেছি।  স্বীয় মল-মূত্র গ্রহণ করেছি। যত্র -তত্র, ভূমিতে শয়ন করেছি। তৃণ, মূল, লতা, পাতা ভোজন করেছি। গভীর অরণ্যের মধ্যে একাকী বাস করেছি। সেখানে কোনো মানুষ দেখলে আমি আরো গভীর অরণ্যে প্রবেশ করেছি। ভয়ার্ত স্থানে আমি ভয়শূন্য হয়ে অবস্থান করেছি। আমার না ছিল কোনো শীতবস্ত্র, না ছিলো শরীর পালনের বোধশক্তি। ছোট ছোট ছেলের-মেয়েরা আমাকে তারা করে মারতে এসেছে, আমার গায়ে থুথু দিয়েছে, গরম জল ছুড়ে দিয়েছে, ইটপাটকেল ছুড়েছে । কিন্তু এদের উপরে আমার কোনো রাগ আসেনি। 

কেউ বলেন, আহারে শুদ্ধতা না থাকলে, আহারে সংযম না থাকলে চিত্ত শুদ্ধ হয় না।  আহারে সংযম থাকার, বা  শুদ্ধ আহার গ্রহণের কোনো স্পৃহা আমার ছিল না। যা জুটেছে তাই খেয়েছি, না জুটলে না খেয়ে থেকেছি। এর ফলে আমার দেহ ক্ষীণ হয়েছে, দুর্ব্বল হয়েছে, পেটের  চামড়া পিঠে ঠেকেছে । চোখদুটো গভীরে ঢুকে গেছে। বসে মল-মূত্র ত্যাগ করবার ক্ষমতাও আমরা চলে গিয়েছিলো। আমার দাঁড়াবার ক্ষমতা ছিল না। আমার গায়ের চামড়ায় অসংখ্য পোকার বাস ছিল। কিন্তু তথাপি আমি শুদ্ধ হতে পারিনি। সংসারে থেকেও আমি শুদ্ধ হতে পারিনি। আমরা বহু জন্ম অতীত হয়েছে, বারবার আমি জন্ম গ্রহণ করেছি, কখনো আমি রাজা, কখনো আমি ব্রাহ্মণ হয়ে আমি জন্ম গ্রহণ করেছি।  কিন্তু আমি শুদ্ধ হতে পারিনি।  কেবল দুঃখই পেয়েছি। আমি বহু জন্মে বহু যজ্ঞ করেছি। আমি বহু দানক্রিয়া  করেছি।  কিন্তু আমি শুদ্ধ হতে পারিনি, সুখী হতেও পারিনি। আমি বহু দেবতার পূজা করেছি, আমি অগ্নি, বরুনের পূজা করেছি - কিন্তু আমার জীবন এতেও শুদ্ধ হয়নি। আমার কপালে সুখও আসেনি। 

আমার এখন যৌবন নেই। আমার বয়স এখন আশি  পেরিয়ে গেছে। আর আমার শিষ্যগণ আমার থেকেও বয়সে বড়ো।  আমার পিতা  আমার কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েছিলেন,, আমার  মা আমার কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েছিলেন। এরা  সবাই গভীর প্রজ্ঞা সম্পন্ন, ধৃতিমান ব্যক্তি। আমিও এদেরই মতো। এঁরাও সবাই আমরি মতো।  তথাপি এঁরা  প্রশ্ন করেন। কেননা সমস্ত প্রশ্নের আমি একদিন না একদিন সম্মুখীন হয়েছিলাম।  এরা  আমাকে সমস্যা সমাধানের জন্য বলেন, কারন এরা  জানেন জীবনে এমন কোনো সমস্যা নেই, যা আমি ভোগ করি নি।  এমন কোনো সমস্যা নেই, যা আমি পেরিয়ে আসিনি। আমি নিজে প্রশ্নের অতীত, কেননা আমার সমস্ত সংশয় ঘুচে গেছে। আমি নিরালম্ব, আমি নিরাশ্রয়, আমি অব্যক্ত - আবার আমিই ব্যক্ত, তথাপি আমি মুক্ত।  তাই আমি মুক্তানন্দ।  এই মুক্ত মুরুষ আর কেউ নন স্বয়ং বুদ্ধদেব। 

---------------------

মুক্তানন্দ গিরি মহারাজকে একবার আমি প্রশ্ন করেছিলাম, আপনি কেন সন্ন্যাস নিলেন ? 

      

      


Comments

Popular posts from this blog

নিত্যকথা

ঈশ্বর ও তাঁর উপলব্ধি

সত্যধর্ম্ম ও প্রেম