অজপা সাধন রহস্যঃ
অজপা (স্বয়ংক্রিয়) সাধন রহস্যঃ - হংস (সোহং) মন্ত্রের জপ রহস্যঃ ।
প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মধ্যেই জপের প্রচলন আছে। জপ্ কথাটা বলতেই আমরা বুঝি বারবার ঈশ্বরের নামের পুনরাবৃত্তি। এই জপ অনেক রকম হতে পারে। জোরে জোরে নামের উচ্চারণ করাকে বলে বাচিক। শুধু ঠিক নেড়ে মন্ত্র জপাকে বলে উপাংশু। আর মনে মনে নীরবে জপ হলো মানসিক। সব ধরনের জপই ভালো, তবে জপের গুরুত্ত্বপূর্ন দিক হলো জপের সময় যেন মন যেন চেতন কেন্দ্রে অবস্থান করে। আরো একধরনের জপ আছে, যা আমরা সবাই নিরন্তর জপে চলেছি, তা হলো অজপা বা স্বয়ংক্রিয় জপ। আজ আমরা এই স্বয়ংক্রিয় জপ সম্পর্কে শুনবো।
ঋষি নারদ দস্যু রত্নাকরকে "রাম" মন্ত্র জপ করতে বলেছিলেন, কিন্তু দস্যু রত্নাকরের পাপের ঘড়া এতটাই ভর্তি ছিল, যে সে এই সহজ রামনাম জপ করতে পারছিলো না। তো নারদ বললেন, তবে তুমি "মরা" "মরা" জপ করো। এই মরা নামের গতি বাড়ালে রামমন্ত্র ফুটে ওঠে। আর দস্যু রত্নাকর হয়ে ওঠেন ঋষি বাল্মীকি, কালজয়ী রামায়নের লেখক। আসলে কেবলমাত্র উপযুক্ত সাধকের মধ্যেই মন্ত্রশক্তি প্রকাশ পায়। ঠাকুর রামকৃষ্ণ তার শিষ্য নরেন্দ্রকে রামমন্ত্রে দীক্ষা দিলেন। তো নরেন্দ্র ভাবাবেশে আবিষ্ট হয়ে রাম রাম করতে করতে কাশিপুর উদ্যানের বাড়ির চারিদিকে ঘুরতে লাগলেন। এইসময় নরেন্দ্রের মধ্যে বাহ্য চেতনা ছিল না। আসলে উপযুক্ত গুরু যখন উপযুক্ত শিষ্যকে মন্ত্রদীক্ষা দেন, তখন সেই মন্ত্র শিষ্যের মধ্যে অনবরত স্ফূরিত হতে থাকে। যার বেগ সামলানো সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তো মন্ত্র যদি মনের মধ্যে সতত স্ফূরিত না হয়, সেই মন্ত্র নির্বীজ। তাতে কোনো ফল হতে পারে না।
আজ আমরা আরো অদ্ভুত একটা মন্ত্রের কথা শুনবো, যা জপ্ করতেও হবে না, যে মন্ত্র আমরা জন্মের পর থেকেই আমাদের অজ্ঞাতসারেই জপ করছি। আর এই জপের ফলেই আমাদের সবার জৈবক্রিয়া সংগঠিত হচ্ছে। আর সেটি হচ্ছে হংস মন্ত্রের জপ। এই হংস যখন দ্রুততার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তখন তা হয় সোহং। এই হংস থেকে সোহং-এ পৌঁছানোর কৌশল সম্পর্কে আজ আমরা শুনবো।
শোনা যায়, নানক সাহেব রাজা শিবনাথকে প্রথমে রাম, তারপরে প্রণব বা ওঙ্কার, এবং সবশেষে হংস মন্ত্র জপ করতে বলেছিলেন। শ্রী গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, " অপানে জুহ্বতি প্রাণং প্রাণে অপানাং তথা পরে। প্রাণ-অপান গতি রুদ্ধা প্রাণায়াম-পরায়ণাঃ। অপরে নিয়তাহারাঃ প্রাণান প্রাণেষু জুহ্বতি। " (৪/২৯) কেউ কেউ প্রাণে অপান, আবার অপানে প্রাণ আহুতি দেন। আবার কেউ প্রাণ ও অপানের গতি রুদ্ধ করে, প্রাণায়াম করে থাকেন। আবার কেউ সংযত আহারী হয়ে প্রাণে প্রাণে আহুতি দেন। "
জীব যখন মাতৃগর্ভ থেকে কালের জগতে প্রবেশ করে, তখন তার নাড়ীচ্ছেদ ঘটে থাকে। মাতৃগভে থাকাকালীন শিশুর নিজস্ব শ্বাস-প্রশ্বাস থাকে না। কিন্তু প্রসবের পরেই শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়া শুরু হয়। আর এই ক্রিয়া তার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত চলতে থাকে। তাই জীবের জীবন মানেই শ্বাসের খেলা মাত্র। এই খেলা শেষে সে যেখান থেকে এসেছিলো, সেখানেই চলে যায়। আমাদের শরীরে যে ব্যাধি, আমাদের মনের যে বিক্ষিপ্ত ভাব, আমাদের যে সুখ-দুঃখ বোধ, আমাদের যে আলস্য, আমাদের যে উদ্দম, আমাদের যে ভ্রমজ্ঞান, বা যথার্থ জ্ঞান সবই এই শ্বাসক্রিয়ার তারতম্যের ফলেই ঘটে থাকে।
জ্ঞাতসারেই হোক বা অজ্ঞাতসারেই হোক, আমাদের সবার প্রতিনিয়ত শ্বাসক্রিয়া চলছে। আর এই শ্বাসক্রিয়া ফলেই, আমরা জীবিত আছি। শ্বাসের শুরুতে যেমন জীবন শুরু হয়, তেমনি শ্বাসের শেষে আমাদের মৃত্যু হয় । সাধারণ ভাবে আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের সংখ্যা এক দিবারাত্রিতে ২১৬০০ বার হয়ে থাকে। মহাত্মাগণ বলছেন, এই শ্বাস যখন বাইরে দিকে প্রবাহিত হয়, তখন "হং" ধ্বনি করতে করতে বাহির হয়। আবার যখন শ্বাস ভিতরে আসে, তখন সে "স" ধ্বনি করতে থাকে। `এঁকেই যোগীপুরুষগন হংস-মন্ত্র বলে থাকেন। তো শিশুর জন্মের প্রথমে সে "স" ধ্বনি দিয়ে জীবন শুরু করে, আবার জীবনের শেষে "হ" ধ্বনি দিয়ে জীবন শেষ করে। জীব মাত্রেই সারা জীবন ধরে, এই হংস-বা সোহং মন্ত্র নিজের অজ্ঞাতসারেই জপ করে চলেছে। যোগীগণ বলছেন, এক্ষেত্রে ইতর জীবে আর মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু মানুষ তার পুরুষকারের প্রয়োগে, এই "হংস" মন্ত্রকে "সোহং" গতিতে পরিবর্তন করতে পারেন। আর এটি করতে পারলে, মানুষের আত্মজ্ঞানের পথ খুলে যায়। তখন ইড়া-পিঙ্গলায় প্রবাহমান বক্রগতি সম্পন্ন বায়ু সুষুম্নামার্গে সরল গতিরূপে পরিণত হতে পারে। আর এই সুষুম্না নাড়ীপথই হচ্ছে ব্রহ্মপথ। তাই সুষুম্নাকে বলা হয়, ব্রহ্ম মার্গ। সাধকের কাজ হচ্ছে, বায়ুকে ইড়া-পিঙ্গলা থেকে আকৃষ্ট করে, সুষুম্নাতে প্রবেশ করানো। যে পরিমান বায়ু সুষুম্নাতে প্রবেশ করবে, সাধক তত আত্মজ্ঞানের উপলব্ধি করতে পারবে। সুষুম্নাতে বায়ু প্রবেশ করলে একদিকে যেমন বায়ুর উর্দ্ধগতি হয়, তেমনি মনের উর্দ্ধগতি হয়ে থাকে। আর মনের উর্দ্ধগতিলাভ না হলে, মনের বিকারের নাশ হয় না,মনের সাম্যাবস্থা আসে না, মনের স্থিতি লাভও সম্ভব হয় না। এই যে বায়ুর উর্দ্ধগতি, এটি সম্ভব হতে পারে কুম্ভক ক্রিয়ার ফলে। আসলে কুম্ভক বায়ুকে উর্দ্ধগতি সম্পন্ন করে তা নয়, কুম্ভক কোনো গতি নয়, বরং কুম্ভক বায়ুকে স্থির হতে সাহায্য করে। আর বক্রগতি সম্পন্ন বায়ুকে সরল গতির সূচনা করতে পারে এই কুম্ভক ক্রিয়া। যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভাষায় যাকে প্রাণ-অপানের ক্রিয়া বলা হয়, তাকে যোগীপুরুষগন বলছেন, হংস মন্ত্রের উচ্চারণ।
একটু খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন, প্রাণ ও অপান পরস্পর পরস্পরকে প্রতিনিয়ত টানছে। কিন্তু এই দুজনের গতি পরস্পর বিপরীতমুখী। প্রাণ উর্দ্ধমুখী আর অপান নিম্নমুখী। প্রাণ যেদিকে যায়, অপান তার বিপরীতে যায়। কিন্তু আশ্চর্য্যের কথা হচ্ছে, এরা কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারে না। তাই প্রতিনিয়ত পরস্পর পরস্পরকে আকর্ষণ করছে। এদের এই বিপরীতধর্ম্ম থেকে অনুমান করা হয়, প্রকৃত সাম্য অবস্থা থেকে এঁরা বিচ্যুত হয়েছে। আবার এঁরা সেই সাম্যে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। আর যতক্ষন সেটা না ঘটবে , ততক্ষন এই টানাপোড়েন চলতেই থাকবে অর্থাৎ শান্তি বিঘ্নিত হবে। আমরা যারা বদ্ধ জীব তারা এই টানাপোড়নের মধ্যেই জীবন অতিবাহিত করি। তাই আমাদের সুখ-দুঃখ চলতেই থাকে। প্রকৃত যোগীর কাজ হচ্ছে, এই দুই বিরুদ্ধ গতির সমন্বয় সাধন করা। সমস্ত অধ্যাত্ম সাধনার এটাই উদ্দেশ্য।
এইযে বিপরীতমুখী গতি, একটু খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন, এর একটা হচ্ছে নিম্নমুখী, আর একটা হচ্ছে উর্দ্ধমুখী। অর্থাৎ অপানের গতি নিম্নমুখী যা এই জগৎসৃষ্টির জন্য উন্মুখ। আর প্রাণ হচ্ছে উর্দ্ধমুখী অর্থাৎ স্বরূপে স্থিতিলাভ। এই ক্রিয়ার দুটো দিক একটা দেহগত আর-একটা কালগত। এই যে বায়ু আমাদের শরীর থেকে একবার বাইরে যাচ্ছে, আর-একবার ভিতরে আসছে - এর একটা সীমা আছে। অর্থাৎ আমাদের নাসাপুট থেকে বারো-আঙ্গুল পর্যন্ত এর বাহ্যগতি। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এই গতি বাড়া-কমা হয়, তথাপি এটা তার সাধারণ গতি। এই বাইরের গতি যার যত অধিক তার বহির্মুখী ভাব তত বেশি হয়ে থাকে। আবার যদি এই বহির্গতিভাব কম হয়, তবে তিনি অন্তর্মুখীন হয়ে থাকেন। আবার এর একটা কাল বা সময়ের ব্যাপার আছে। যেমন সাধারণ সংসারী মানুষ মিনিটে পনেরো বার শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়া করে থাকেন । অর্থাৎ ৪ সেকেন্ডে একবার। কিন্তু সংযমী পুরুষ এই সংখ্যাকে হ্রাসপ্রাপ্ত করতে পারেন। এই যে শ্বাসের বহির্মুখী লম্বতা এবং সংখ্যা, এই দুটোর মধ্যে পরস্পর সন্মন্ধ আছে।এই বাহ্যগতি ১২ থেকে ১৫ আঙ্গুল হতে পারে, আবার ধীরে ধীরে ১২ থেকে কমতেও পারে। কমতে কমতে একসময় শূন্য হতে পারে। বাহ্যগতি যদি এক আঙ্গুল কমে তবে কালের গতি সওয়া পরিমান কমবে। অর্থাৎ বাহ্যগতি যদি ১২ আঙ্গুল থেকে শূন্যে পরিণত হয়, তবে মিনিটে ১৫ বার যে শ্বাসক্রিয়া চলছিল, তবে তা শূন্যে নেমে আসবে। এই অবস্থায় শ্বাসের যে স্থুল সঞ্চার তা রুদ্ধ হয়, অর্থাৎ রেচক পূরক ব্যাপারটা একেবারে শান্ত হয়ে যায়। একেই বলে কুম্ভক। এই কুম্ভকে স্থিতিই সাধনক্রিয়ার উদ্দেশ্য।
আমরা জানি প্রাণের চঞ্চলতা থেকেই সমস্ত কামনা-বাসনার উৎপত্তি হয়ে থাকে। তো প্রাণের বাহ্যগতির কাল ও সংখ্যা যত কমতে থাকে, তত সাধক অন্য জগতের বাসিন্দা হয়ে যান। ধীরে ধীরে মন থেকে কামনা-বাসনা-সংকল্পে ইত্যাদির যে উদয় হচ্ছিলো, তা স্তিমিত হয়ে যায়। যেন উথাল-পাথাল সমুদ্র স্থির হয়ে গেছে। এই সময় নানান রকম অলৌকিক শক্তির বিকাশ ঘটে থাকে। যোগী পুরুষগন বলছেন, এই সময় বাকসিদ্ধি, আকাশগমন, ইত্যাদি ইত্যাদি এমনকি নির্বাণলাভ (শরীরের মৃত্যু) হওয়াও অসম্ভব নয়।
যাইহোক, প্রানের বাহ্যগতির উপশম হচ্ছে সাধনক্রিয়ার উদ্দেশ্য। এই সাধনক্রিয়ায় সংযমের অভ্যাস অতি আবশ্যক। হংস মন্ত্রটিকে ভাগ করলে দাঁড়ায় অহং-স। অর্থাৎ সেই আমি। উল্টো করলে দাঁড়ায় স-অহং (সোহং). আমিই সেই । প্রত্যেক প্রাণীর হৃদয়ে আছে, অব্যাকৃত আকাশ। সেখানে আছে লিঙ্গশরীর। এখানেই হংসের গতাগতি। কেউ বলেন, হ-কার দ্বারা পুরুষ, আর স কার দ্বারা প্রকৃতি বোঝায়। তো হংস হচ্ছে প্রতি-পুরুষের যোগ। কেউ বলেন, হকার অর্থ অপানের সঞ্চার আর স-কার অর্থে প্রাণের সঞ্চার বোঝায় । আবার কেউ বলেন, হ-কার জীবাত্মাবাচক, আর স-কার শক্তিবাচক।
তো হংস বলতে আপনি যাই বুঝুন বা ভাবুন না কেন - আমাদের শ্বাস গ্রহণ, কুম্ভক ও শ্বাস ত্যাগ আসলে জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুসুপ্তির অবস্থা। আর তিন অবস্থায় জীবাত্মা পরমাত্মা থেকে অভিন্ন থাকে। আর এটিকে ধরতে গেলে আমাদের জেলে যেমন ছিপ ফেলে ফাৎনার দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে, তেমনি এই শ্বাসক্রিয়ার সঙ্গে নিজের মনকে একাগ্র করতে হবে। বস্তুত আমরা কেউ দেহ নোই, মন নোই। কিন্তু আমরা এই দেহ মনের সাথেই একাত্ম হয়ে গেছি। আমরা আসলে মনের সাক্ষী, আত্মা । কিন্তু কার্যক্ষেত্রে আমরা মন হয়ে বসে গেছি। মন থেকে যখন আমরা বিযুক্ত করতে পারবো, মন যখন ইন্দ্রিয় থেকে বিযুক্ত হতে পারবে, তখন আমরা প্রাণের খেলা ধরতে পারবো। প্রাণ প্রকৃতির সঙ্গে খেলায় মত্ত। মন এই খেলার সাক্ষী বা দ্রষ্টা হয়েও, নিজের অজ্ঞাতসারে, সে এদের সাথে একসময় খেলতে শুরু করে। আমাদের মন অশান্ত হবার এটাই কারন।
এখন আমাদের কাজ হবে, মনকে দ্রষ্টার আসনে স্থির করে বসিয়ে রাখা। প্রাণ আসছে, যাচ্ছে, মন শুধু দ্রষ্টা হয়ে পর্যবেক্ষন করবে। এই যে মনের কথা বলা হলো, এটি আসলে আমাদের শুদ্ধ মন, স্থির মন। মন যখন এই খেলায় জড়িত হয়, তখন মলিনতা প্রাপ্ত হয়। আর মন যদি খেলার মাঠে না নামে, তবেই সে শুদ্ধ থাকতে পারে।
এবার আরো একটু গভীরে প্রবেশ করবো। আসলে দেখছে তো আত্মা। আত্মাই আসল দ্রষ্টা। মনকে বাদ দিলেও আত্মা দ্রোষ্টাই থাকে। কিন্তু এই অবস্থায় আত্মার যে দর্শন হয়, তা কেবল নিজেকে দেখা, সবকিছুর মধ্যে কেবল আত্মদর্শন। তাই মনের সাহায্যে আত্মা যখন দেখে তখন তা হয় লীলা দর্শন। তাই আত্মার রস আস্বাদনের জন্য মনের দরকার হয়। এই মন আসলে দর্পনের কাজ করে থাকে। একেই বলে ভাবের খেলা। এবার এই লীলারঙ্গ থেকে মনকে বাদ দিলে একটা ভাবাতীত অবস্থায় স্থির হওয়া যায়। তখন আর রস-আস্বাদন থাকে না। তখন আত্মাতেই স্থিতি লাভ হয়।
আবার একটু অবস্থাটা বুঝে নেই। আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রবাহ হচ্ছে প্রাণের খেলা। একবার অধঃগতি একবার উর্দ্ধগতি। শিব অর্থাৎ সাম্যাবস্থা থেকে শক্তির অবস্থা। আবার শক্তি থেকে শিব অবস্থা পর্যন্ত এই প্রবাহ চলছে। এই শ্বাস গ্রহণ, ও শ্বাস ত্যাগের মধ্যে যখন বিরাম হয়, তখন শিব ও শক্তি একত্রে অবস্থান করেন । আমাদের কাজ হবে, এই স্থির অবস্থাকে ধরা। অর্থাৎ শিব-শক্তির মিলনক্ষণে স্থিত হওয়া। এটি পরম শান্তির অবস্থা। যখন প্রাণ ও অপানের যোগ হয়, তখন বায়ু স্তম্ভিত হয়, মন স্তম্ভিত হয়, সমস্ত বিশ্ব তখন স্থির, কালের গতি তখন নিরুদ্ধ। এইসময় ভিতরে ভিতরে একটা অদ্ভুত রহস্যের উন্মোচন হয়। হংস থেকে পরমহংস অবস্থার উন্নয়ন হয়। একেই বলে নিজের সঙ্গে নিজের খেলা। আত্ম-রমন। এই অবস্থাতেও অন্তঃ ক্রিয়া চলতে থাকে। শিব ও শক্তি অনুপ্রবিষ্ট হন। এর পরের অবস্থা বাক্যের অতীত।
ওম শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ। হরি ওম।
মূলাধারে "ওঁং লং" , স্বাধিষ্ঠান - ওঁং ৰং (ওয়াং), মনিপুরে - ওঁং রং, অনাহতে - ওঁং যং (য়ং), বিশুদ্ধ - ওঁং ঠং আজ্ঞা - ওঁং।
প্রথমে সিদ্ধাসনে বসুন। বাম গোড়ালি দ্বারা গুহ্যদেশ চেপে ধরে, শ্বাস নিন অর্থাৎ পূরক করুন। এটি করলে, মূলাধারে বায়ু সঞ্চিত হয়। এর পরে, নিজের শক্তি অনুসারে, গুহ্যদ্বারকে টেনে মূলাধার থেকে বায়ুকে উপরের দিকে ওঠাতে থাকুন। "ওঁং লং" মন্ত্র জপ করতে থাকুন। এই ক্রিয়া করতে পারলে, প্রাণ ও অপানের সাম্য স্থাপন হয়। প্রাণ ও অপানের সাম্য স্থাপন হলে, মূলাধারস্থিত ত্রিকোণে যে অগ্নি আছে, তাকে উঠিয়ে প্রাণ ও অপানের সাথে যুক্ত করতে পারলেই, কুণ্ডলিনী শক্তি জেগে ওঠে। এবার কুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত হলে, এই জাগ্রত কুণ্ডলিনী দ্বারা ব্রহ্মগ্রন্থি ভেদ করতে হয়। এই গ্রন্থি ভেদ হলে, ষট্চক্রের প্রথম চক্র মূলাধারে প্রবেশ করবার সামর্থ জন্মে। এখানে আছে চতুর্দল পদ্ম। এই কমলে প্রবিষ্ট হয়ে, এই কমলের যে বিন্দু অর্থাৎ তুরীয় ভূমি আছে, তাকে ধ্যান করতে হয়। এর নাম বিরাটের ধ্যান। এই ধ্যানের ফলে বায়ুর উর্দ্ধগতি জন্মে। তখন মূলাধারের উপরে যে স্বাধিষ্ঠান চক্র আছে যেখানে ষড়দল আছে সেখানে তিনবার প্রদক্ষিণ করে, দশদল পদ্মে অর্থাৎ মনিপুরে গমন করতে হয়। এইখানে একবার গ্রন্থিভেদ করতে হয়, একে বলে বিষ্ণুগ্রন্থি। এটির অবস্থান অনাহতের নিচে। একে ভেদ করলে হৃদয়চক্রে প্রবেশ করতে পারা যায়। এবার হৃদয়ে প্রবেশ করে, আগের মতো অনাহত চক্রের কেন্দ্রবিন্দুতে তুরীয় ধ্যান করতে হয়। এই তুরীয় ধ্যানে আত্মার সূত্র পাওয়া যায়। এই সময় সবিকল্প সমাধির উদয় হয়।
এবার অনাহত চক্র অতিক্রম করে বিশুদ্ধ চক্রে প্রবেশ করতে হয়, এখানে দুটো লম্বাটে মাংসখন্ড দেখতে পাওয়া যায়। এই মাংসখণ্ডের মধ্যস্থ পথ ধরে এগুলে, বিশুদ্ধ চক্রে প্রবেশ করা যায়। এখানে প্রাণ নিরুদ্ধ হয়। এর পরে অন্তিম চক্র বা আজ্ঞাচক্রে প্রবেশ করতে হয়। কিন্তু আজ্ঞাচক্রে নিচে আছে রুদ্র গ্রন্থি। এই রুদ্র গ্রন্থি ভেদ করতে পারলে তবে আজ্ঞাচক্রে প্রবেশ করা যায়। এই আজ্ঞাচক্রে প্রবেশ করে ওখানকার বীজ বা তুরিয়ের ধ্যান করতে হয়। যোগী এই পর্যন্ত করতে পারলে, চন্দ্র-সূর্য-অগ্নি এই তিন তেজের সমন্বয়ে তৈরী তেজঃবিন্দুর দর্শন পান। এই সময় সহস্রার থেকে ক্ষরিত অমৃত ধারার আস্বাদন করবার অধিকার জন্মে। তখন যোগী সহস্রদল পদ্ম শোভিত ব্রহ্মরন্ধ্রে প্রবেশ করেন। সেখানে তুরীয় বা চতুর্থ অবস্থায় উপনীত হন। যখন এই অবস্থা অনুভব হয়, তখন নিজেকে ত্রিমাত্র বলে অনুভব হয়। একসময় এই ত্রিমাত্রার অবস্থার বিলুপ্তি ঘটে। তখন মাত্রাহীন বা অমাত্ৰ অবস্থা। এই সাক্ষাৎকার ক্ষনিকের জন্য হয়ে থাকে। কিন্তু সাধনার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারের কাল স্থায়ী হতে থাকে। এই তুরীয় অবস্থাতেও প্রথম দিকে সাকারের লক্ষণ থাকে। কিন্তু ধীরে ধীরে এই সাকারের অবলুপ্তি ঘটে। তখন যে অবস্থা হয়, তাকে যোগীপুরুষগন কোটি সূর্য্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আসলে এর কোনো তুলনা হয় না। এই অবস্থা বর্ণনার অতীত। ```

Comments
Post a Comment